সোমবার , অক্টোবর ২৩ ২০১৭ | ৮ই কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Breaking News
Home / আন্তর্জাতিক / ভারতে ইসলাম

ভারতে ইসলাম

ভারতে ইসলামের ইতিহাস

ইসলামের ভারত বিজয়ের পূর্বেই দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছিল। খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথম ভাগে আরব বণিক সম্প্রদায়ের ভারতে আগমনের সূত্র ধরে ভারতবাসী ইসলাম সম্পর্কে অবহিত হন। আরব ও উপমহাদেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক অবশ্য আরবে ইসলামের প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই বজায় ছিল। সেযুগে মালাবার অঞ্চলের বন্দরগুলিতে আরব বণিকদের প্রায়শই যাতায়াত ছিল। কারণ এই বন্দরগুলি ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বন্দরগুলির প্রধান যোগসূত্র। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ প্রথম মুসলমান পর্যটকরা নৌপথে ভারতীয় উপকূলভাগে অবতরণ করেন। সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগে আরব মুসলমানরা প্রথম ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন। ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে আরব জাতি বিশ্বের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হয়। এরপর আরব বণিক ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় বিশ্বের সর্বত্র তাঁদের নতুন ধর্মপ্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।

৬২৯ সালে মুহাম্মদের (৫৭১–৬৩২ খ্রি.) জীবদ্দশাতেই ভারতে প্রথম মসজিদ স্থাপিত হয়। চেরামন পেরুমল নামে জনৈক ধর্মান্তরিত মুসলমানের নির্দেশে কেরলের ত্রিসূর জেলায় মালিক বিন দিনার এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। উল্লেখ্য, পেরুমলকেই প্রথম ভারতীয় মুসলমান মনে করা হয়।

মালাবারের মাপ্পিলা সম্প্রদায়ই সম্ভবত প্রথম ভারতীয় ধর্মান্তরিত মুসলমান সম্প্রদায়; কারণ এই সম্প্রদায়ই আরব বণিকদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করত। এই সময় সমগ্র উপকূল জুড়ে ব্যাপক প্রচারকার্য চালানো হয় এবং বেশ কিছু স্থানীয় অধিবাসী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এই সকল নব্য ধর্মান্তরিতেরা মাপ্পিলা সম্প্রদায়ভুক্ত হয়েছিলেন। আরব বণিকদের সঙ্গে এই সম্প্রদায়ের বৈবাহিক সম্পর্কও স্থাপিত হয়েছিল।

অষ্টম শতাব্দীতে মুহাম্মদ বিন কাশিমের নেতৃত্বে আরব বাহিনী সিন্ধু (অধুনা পাকিস্তান রাষ্ট্রের সিন্ধুপ্রদেশ) জয় করে। সিন্ধু উমায়াদ খিলাফতের পূর্বতম প্রদেশে পরিণত হয়।

দশম শতাব্দীর প্রথম ভাগে গজনির মামুদ পাঞ্জাব গজনাভিদ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি বর্তমান ভারত ভূখণ্ডের অন্যান্য স্থানেও অভিযান চালিয়েছিলেন। তবে দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে আরও সফলভাবে ভারতে অভিযান চালান মুহাম্মদ ঘোরি। তাঁর অভিযানের ফলস্রুতিতে শেষ পর্যন্ত দিল্লি সুলতানির পত্তন হয়।

আরব-ভারতীয় সম্পর্ক

আরবে ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ব থেকেই আরবদের সঙ্গে ভারতীয়দের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে ইসলামের আবির্ভাবের পরেও এই সম্পর্ক বজায় থাকে। অষ্টম শতাব্দী থেকে সংস্কৃত গ্রন্থাদি আরবি ভাষায় অনূদিত হতে শুরু করে।

সংস্কৃতি

ভারতের মিলনআত্মক সংস্কৃতিতে সুফিবাদ বিকশিত হয়েছে। কাওয়ালি, গযল ইত্যাদি সুর এসেছে।

মালিক দীনার

মালিক দীনার

 

মুহাম্মাদের শিষ্য ইসলামী ধর্মপ্রচারক, ধর্মতত্ত্ববিদ
জন্ম কূফা, ইরাক
মৃত্যু প্রায় ৭৪৮ সি.ই.
সম্ভবত থালাঙ্গারা, কসরগোদ, কেরল, ভারত
সম্মানিত ইসলাম
প্রধান মঠ মালিক দীনার মসজিদ, থালাঙ্গারা, কসরগোদ, কেরল, ভারত
যার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে মুহাম্মাদ, বসরার হাসান

 

মালিক দীনার (মৃত্যু: ৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) হলেন ইসলামের নবী মুহাম্মাদের প্রথম অনুসারী, যিনি ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের জন্য ভারতে এসেছিলেন।

মালিক দীনার বংশ পরম্পরায় সাহাবা পরবর্তী প্রজন্ম অর্থাৎ একজন তাবেঈ ছিলেন|

গজনভি রাজবংশ

গজনভি রাজবংশ  ছিল তুর্কি-পারসিয়ান উৎসের একটি মুসলিম রাজবংশ।সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ সীমায় তা পারস্যের বিরাট অংশ, ট্রান্সঅক্সানিয়ার অধিকাংশ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরাংশ নিয়ে গঠিত ছিল। এর স্থায়িত্বকাল ছিল ৯৭৭ থেকে ১১৮৬ সাল পর্যন্ত।সবুক্তগিন তার শ্বশুর আল্প তিগিনের মৃত্যুর পর ইনি গজনির (বর্তমান আফগানিস্তানের গজনি প্রদেশ) শাসক হন ও এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। আল্প তিগিন ছিলেন হিন্দুকুশের উত্তরে বৃহত্তর খোরাসান অঞ্চলের সামানিদের সাবেক সেনাপতি।

রাজবংশটি মধ্য এশিয়ার তুর্কি বংশোদ্ভুত হলেও তা ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও অভ্যাসের দিক থেকে পারস্যায়িত হয়ে যায়।তাই কেউ কেউ এটিকে তুর্কি না বলে “পারস্য রাজবংশ” উল্লেখ করেন।

সবুক্তগিনের পুত্র মাহমুদ গজনভি সামানিদের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।তিনি পূর্বে আমু দরিয়া, সিন্ধু অববাহিকা ও ভারত মহাসাগরের দিকে এবং পশ্চিমে রাইহামাদানে (বর্তমান ইরানের অন্তর্গত) গজনভি সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। প্রথম মাসুদের শাসনামলে গভনভি রাজবংশ দান্দানাকানের যুদ্ধের পর সেলজুকদের কাছে তার পশ্চিম অংশে নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে।১১৫১ সালে সুলতান বাহরাম শাহ ঘুরি রাজবংশের রাজা আলাউদ্দিন হুসাইনের কাছে গজনি হারান।

মাহমুদ গজনভি

ইয়ামিনউদ্দৌলা আবুল কাসিম মাহমুদ ইবনে সবুক্তগিন সাধারণভাবে মাহমুদ গজনভি( ২ নভেম্বর ৯৭১ – ৩০ এপ্রিল ১০৩০), সুলতান মাহমুদমাহমুদে জাবুলি  বলে পরিচিত, ছিলেন গজনভি সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাসক। ৯৯৭ থেকে ১০৩০ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি পূর্ব ইরানিয় ভূমি এবং ভারত উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিম অংশ (বর্তমান আফগানিস্তানপাকিস্তান) জয় করেন। সুলতান মাহমুদ সাবেক প্রাদেশিক রাজধানী গজনিকে এক বৃহৎ সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধশালী রাজধানীতে পরিণত করেন। তার সাম্রাজ্য বর্তমান আফগানিস্তান, পূর্ব ইরানপাকিস্তানের অধিকাংশ এলাকা জুড়ে ছিল। তিনি সুলতান (“কর্তৃপক্ষ”) উপাধিধারী প্রথম শাসক যিনি আব্বাসীয় খিলাফতের আনুগত্য স্বীকার করে নিজের শাসন চালু রাখেন। নিজ শাসনামলে তিনি ১৭ বার ভারত আক্রমণ করেন।

পূর্বসূরি:
ইসমাইল গজনভি
গজনভি সুলতান
৯৯৭–১০৩০
উত্তরসুরি:
মুহাম্মদ গজনভি

দিল্লি সালতানাত

১২০৬ থেকে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতে রাজত্বকারী একাধিক মুসলিম রাজ্য ও সাম্রাজ্যগুলিকে দিল্লি সুলতানি বা দিল্লি সুলতানেৎ নামে অভিহিত করা হয়। এই সময় বিভিন্ন তুর্কিপাশতুন (আফগান) রাজবংশ দিল্লি শাসন করে। এই রাজ্য ও সাম্রাজ্যগুলি হল: মামলুক সালতানাত (১২০৬-৯০), খিলজি রাজবংশ (১২৯০-১৩২০), তুঘলক রাজবংশ (১৩২০-১৪১৩), সৈয়দ রাজবংশ (১৪১৩-৫১), এবং লোদি রাজবংশ (১৪৫১-১৫২৬)। ১৫২৬ সালে দিল্লি সুলতানি উত্থানশীল মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে মিশে যায়।

মামলুক সালতানাত (দিল্লি) (১২০৬-৯০)

ভারতে তুর্কি আধিপত্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গজনির শাসনকর্তা মহম্মদ ঘুরি। ভারত বিজয়ের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ১১৭৫ খ্রিস্টাব্দে মুলতানউচ্ বিজয়ের মাধ্যমে তিনি ভারতে পদার্পণ করেন। এরপর একে একে পেশাওয়ার, লাহোরপশ্চিম পাঞ্জাব জয় করেন। ১১৯১ খ্রিস্টাব্দে থানেশ্বরের নিকট তরাইনের যুদ্ধক্ষেত্রে দিল্লি ও আজমেঢ়ের চৌহানবংশীয় রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানের সম্মুখীন হন। তরাইনের প্রথম যুদ্ধে মহম্মদ ঘুরির বাহিনী পৃথ্বীরাজের বাহিনীর কাছে সম্পূর্ণ পরাজিত হলেও পরের বছর (১১৯২ খ্রিস্টাব্দ) পৃথ্বীরাজ চৌহান মহম্মদ ঘুরির হাতে পরাজিত ও নিহত হন। অতঃপর ভারতে তাঁর বিজিত স্থানগুলির শাসনভার নিজের বিশ্বস্ত অনুচর কুতুবুদ্দিন আইবকের হাতে অর্পণ করে গজনি প্রত্যাবর্তন করেন মহম্মদ ঘুরি। কুতুবুদ্দিনের নেতৃত্বে মিরাট, দিল্লি, রণথাম্বোর, গুজরাট, বুন্দেলখণ্ড প্রভৃতি অঞ্চল অধিকৃত হয়। তাঁর অন্যতম সেনাপতি ইখতিয়াউদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে বিহার ও ১২০৫-০৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা জয় করেন। এইভাবে উত্তর ভারতের এক বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে প্রত্যক্ষ মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

ঘুরি রাজবংশ ছিল পূর্ব ইরানীয় সুন্নি মুসলিম রাজবংশ। এই রাজবংশ তাজিক বংশোদ্ভূত বলে ধারণা করা হয়। সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ সীমায় থাকাকালে আধুনিক আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও ইরান এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ৮৯৭ থেকে ১২১৫ সাল পর্যন্ত এই রাজবংশ শাসন ক্ষমতায় ছিল এবং গজনভিদের উত্তরাধিকারী হয়। ঘুরি রাজবংশের কেন্দ্র ছিল বর্তমান আফগানিস্তানের ঘুর প্রদেশ বা মান্দেশ। এটি পশ্চিমে বৃহত্তর খোরাসান এবং পূর্বে বঙ্গ পর্যন্ত পৌছেছিল।প্রথম রাজধানী ছিল ঘুরের ফিরোজকোহ। পরবর্তীতে তা হেরাতেস্থানান্তর করা হয়। এর পাশাপাশি গজনিলাহোরকে অতিরিক্ত রাজধানী হিসেবে ব্যবহার করা হত, বিশেষত শীতের সময়। ঘুরিরা পারস্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

ঘুরিদের পর পারস্যে খোয়ারিজমীয় সাম্রাজ্যভারত উপমহাদেশে দিল্লি সালতানাতে মামলুক সালতানাত ক্ষমতায় আসে।

মামলুক সালতানাত ১২০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। মধ্য এশিয়ার তুর্কি সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেক মামলুকদের উত্তর ভারতে নিয়ে আসেন। দিল্লি সালতানাত শাসনকারী পাঁচটি রাজবংশের মধ্যে মামলুক রাজবংশ প্রথম। এর শাসনকাল ছিল ১২০৬ থেকে ১২৯০ সাল পর্যন্ত। ঘুরি রাজবংশের শাসক হিসেবে কুতুবুদ্দিন আইবেক ১১৯২ থেকে ১২০৬ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। এসময় তিনি গাঙ্গেয় অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করেন এবং নতুন অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

মামলুক

ভারতে তুর্কি আধিপত্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গজনির শাসনকর্তা মহম্মদ ঘুরি। ভারত বিজয়ের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ১১৭৫ খ্রিস্টাব্দে মুলতানউচ্ বিজয়ের মাধ্যমে তিনি ভারতে পদার্পণ করেন। এরপর একে একে পেশাওয়ার, লাহোরপশ্চিম পাঞ্জাব জয় করেন। ১১৯১ খ্রিস্টাব্দে থানেশ্বরের নিকট তরাইনের যুদ্ধক্ষেত্রে দিল্লি ও আজমেঢ়ের চৌহানবংশীয় রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানের সম্মুখীন হন। তরাইনের প্রথম যুদ্ধে মহম্মদ ঘুরির বাহিনী পৃথ্বীরাজের বাহিনীর কাছে সম্পূর্ণ পরাজিত হলেও পরের বছর (১১৯২ খ্রিস্টাব্দ) পৃথ্বীরাজ চৌহান মহম্মদ ঘুরির হাতে পরাজিত ও নিহত হন। অতঃপর ভারতে তাঁর বিজিত স্থানগুলির শাসনভার নিজের বিশ্বস্ত অনুচর কুতুবুদ্দিন আইবকের হাতে অর্পণ করে গজনি প্রত্যাবর্তন করেন মহম্মদ ঘুরি। কুতুবুদ্দিনের নেতৃত্বে মিরাট, দিল্লি, রণথাম্বোর, গুজরাট, বুন্দেলখণ্ড প্রভৃতি অঞ্চল অধিকৃত হয়। তাঁর অন্যতম সেনাপতি ইখতিয়াউদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে বিহার ও ১২০৫-০৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা জয় করেন। এইভাবে উত্তর ভারতের এক বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে প্রত্যক্ষ মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

কুতুবুদ্দিন আইবক (১২০৬-১০ খ্রিস্টাব্দ)

১২০৬ খ্রিস্টাব্দে নিঃসন্তান মহম্মদ ঘুরি মৃত্যু হলে গজনির সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে কুতুবুদ্দিন আইবক নিজেকে স্বাধীন সার্বভৌম নরপতি ঘোষণা করেন। ১২০৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘সুলতান’ উপাধি গ্রহণ করেন। তাঁর সিংহাসনারোহণের ফলে দিল্লিতে স্বাধীন সুলতানি শাসনের গোড়াপত্তন হয়। ‘আইবক’ কথাটির অর্থ হল ক্রীতদাস। মহম্মদ ঘুরি কুতুবুদ্দিন আইবককে ক্রীতদাস হিসেবে ক্রয় করেছিলেন। এই কারণে ইংরেজ ঐতিহাসিকরা তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজবংশকে দাসবংশ নামে এবং ১২০৬ থেকে ১২৯০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়কে দাসবংশের শাসনকাল হিসেবে অভিহিত করেন। আধুনিক ঐতিহাসিকগণ অবশ্য সার্বভৌম সুলতান কুতুবুদ্দিনের প্রতিষ্ঠিত রাজবংশকে দাসবংশ হিসেবে চিহ্নিত করার পক্ষপাতী নন।

সিংহাসনে আরোহণের পর কুতুবুদ্দিন আইবক মাত্র চার বছর জীবিত ছিলেন। এই সময়কালে তিনি রাজ্য বিজয় বা প্রশাসন পরিচালনায় বিশেষ কোনো কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি। তবে দানশীলতার জন্য তিনি লাখবক্স বা লক্ষদাতা নামে পরিচিত ছিলেন। দিল্লি ও আজমেঢ়ে নির্মিত তাঁর দুটি মসজিদ ইসলামের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও শিল্পানুরাগের সাক্ষ্যবহন করছে। এছাড়া দিল্লির উপকণ্ঠে খাজা কুতুবুদ্দিন নামক জনৈক মুসলিম সন্তের স্মৃতিতে তিনি এক স্তম্ভ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এই স্তম্ভটি বর্তমানে কুতুবমিনার নামে পরিচিত।

ইলতুৎমিস (১২১১-৩৬ খ্রিস্টাব্দ)

কুতুবুদ্দিন আইবকের মৃত্যুর পর ১২১১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর অকর্মণ্য দত্তকপুত্র আরাম শাহ্‌কে সিংহাসনচ্যুত করে দিল্লির মসনদে বসেন কুতুবুদ্দিনের জামাতা ইলতুৎমিস। প্রথম জীবনে ইলতুৎমিস ছিলেন কুতুবুদ্দিনের ক্রীতদাস। পরে তাঁর কর্মদক্ষতা ও বিচক্ষণতায় মুগ্ধ হয়ে কুতুবুদ্দিন তাঁর সঙ্গে নিজ কন্যার বিবাহ দান করে তাঁকে বদাউনের শাসনকর্তা নিয়োগ করেন।

সিংহাসনে আরোহণের পর ইলতুৎমিসকে একাধিক বৈদেশিক আক্রমণ ও আঞ্চলিক বিদ্রোহের সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু ইলতুৎমিস কঠোর হাতে সমস্ত বিদ্রোহ দমন করেন ও বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিহত করেন। শুধু তাই নয় উজ্জয়িনী সহ বেশ কিছু নতুন অঞ্চলও তিনি সুলতানির অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কারণে ভারতের বিস্তৃর্ণ অঞ্চল মোঙ্গল সেনানায়ক চেঙ্গিজ খাঁর আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পায়।

১২২৯ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের খলিফা তাঁকে ‘সুলতান-ই-আজম’ উপাধি দিলে দিল্লি সুলতানির গৌরব বৃদ্ধি পায় এবং এই সুলতানি স্বতন্ত্র ও সার্বভৌম অস্তিত্ব মুসলিম জগতে স্বীকৃত হয়। কৃতজ্ঞতাবশত ইলতুৎমিস তাঁর মুদ্রায় নিজেকে ‘খলিফার সেনাপতি’ বলে উল্লেখ করেন।

কুতুবুদ্দিন আইবেক  মধ্যযুগীয় ভারতের একজন তুর্কী শাসক ছিলেন, যিনি দিল্লির প্রথম সুলতান এবং গোলাম বা মামলুক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি সুলতান হিসেবে ১২০৬ থেকে ১২১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মাত্র চার বছর শাসন করেন।

কুতুবুদ্দিন মধ্য এশিয়ার কোনো এক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন; তার পূর্ব পুরুষেরা ছিলেন তুর্কিশিশুকালেই তাকে দাস (গোলাম) হিসেবে বিক্রি করা হয়। তাকে ইরানের খোরাসান অঞ্চলের নিসাপুরেরে প্রধান কাজী সাহেব কিনে নেন। কাজী তাকে তার নিজের সন্তানের মত ভালবাসতেন এবং আইবেককে তিনি ভাল শিক্ষা দিয়েছিলেন, তিনি আইবেককে ফার্সি এবং আরবি ভাষায় দক্ষ করে তোলেন।তিনি আইবেককে তীর এবং অশ্বচালনায়ও প্রশিক্ষণ দেন। আইবেকের প্রভুর মৃত্যুর পরে প্রভুর ছেলে আইবেককে আবারও এক দাস বণিকের কাছে বিক্রি করে দেন। কুতুবুদ্দিককে এবার কিনে নেন ঘাজনি এর গভর্ণর জেনারেল মুহাম্মদ ঘুরি

সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ দিল্লির একজন তুর্কি শাসক ছিলেন। তিনি ১১৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেণ।

তার ভাইয়েরা তার রুপ ও যোগ্যতায় ইর্ষান্বিত হয়ে তাকে এক ক্রিতদাস বিক্রেতার কাছে বিক্রি করে দেয়। বিক্রির পর তাকে বুখারার কাজী সদর জং কিনে নেন। বুখারায় তিনি ভাল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পান। এর পরে তাকে দিল্লি নিয়ে আসা হয়, সেখানে তাকে কুতুবউদ্দিন আইবেক কিনে নেন। কুতুবউদ্দিন আইবেক তার যোগ্যতা খুশি হয়ে তাকে সার-জান্দার ( প্রধান প্রহরী ) হিসেবে নিয়োগ দেন। কঠোর প্ররিশ্রমের দ্বারা তিনি আমির-ই-শিকার এবং পরে গোয়ালিয়রের আমির হিসেবে উন্নিত হন। আইবেক তার কন্যাকে ইলতুতমিশের সাথে বিয়ে দেন। কুতুবউদ্দিন আইবেকের মৃত্যুর পর তার পুত্র শাসনভার গ্রহণের অযোগ্য প্রমানিত হলে তুর্কিরা তাকে সুলতান হিসেবে মনোনিত করে। ইলতুতমিশ একজন যোগ্য শাসক ছিলেন। তিনি জ্ঞানী, প্রশাষক ও উচ্চপদস্থ সেনাকর্মকর্তাদের দেশে নিয়ে আসেন যারা মঙ্গল আক্রমণের সময় চলে গিয়েছিল। এদের নিয়ে ইলতুতমিশ এক শক্ত প্রশাষনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

তিনি ধর্মপ্রান ছিলেন এবং দরবেশদের গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন। কুতুবউদ্দিন বাখতিয়ার খাকি তার সময়ের একজন বিখ্যাত দরবেশ।

কুতুবউদ্দিন আইবেকের শুরু করা কুতুব মিনারের কাজ ইলতুতমিশের সময় শেষ হয়। তিনি আজমিরে একটি বিখ্যাত মসজিদ তৈরি করেণ।

ইলতুতমিশ প্রথম ভারতবর্ষে আরবি খচিত রৌপ্য মুদ্রা চালু করেণ। তার সময়ে বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা মুনতানজির বিল্লাহ ১২২৯ সালে ভারতে বিপুল বিনিয়োগ করেণ।

ইলতুতমিশ একজন মহান শাসক ছিলেন। তিনি নতুন বিজিত অঞ্চলগুলোর বিদ্রোহ থেকে সম্রাজ্যকে রক্ষা করেণ। ঘুরি বংশের নাসিরউদ্দিন কুবাচাহ নিজ রাজ্যের স্বাধীনতা ঘোষণা করে উচ, মুলতান এবং লাহোর দখল করে নেন। অন্যদিকে, তুর্কি বংশভত তাজউদ্দিন ইলদিজ গজনীতে স্বাধীনতা ঘোষণা করেণ। ইলতুতমিশ দ্রুত পরিস্থিতি সামলে নিয়ে তাদের উভয়কে পরাজিত করেণ। ১২২৫ সালে তিনি বাংলার খিলজী বংশের শাসক হুসামউদ্দিন ইয়াজকে পরাজিত করে বাংলা দখল করে নেন। তিনি সিন্ধুর সুম্রা শাসকের পরাজিত করেণ। ১২৩১ সালে ইলতুতমিশ গোয়ালিয়রের কেল্লা অবরুদ্ধ করেণ। গোয়ালিয়রের শাসক মঙ্গল দেব একবছর পর পলায়ন করলে ইলতুতমিশ গোয়ালিয়র শহর দখল করেণ। ইলতুতমিশ মালওয়া, বিলসা, উজ্জান দখল করেণ এবং দক্ষিণে তার সাম্রাজ্য নারবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত করেণ।

ইলতুতমিশের আমলে চেঙ্গিস খান জালালউদ্দিন খোয়ারিজমিকে পরাজিত করে আতুকের নিকটে চলে আসে। জালালউদ্দিন ইলতুতমিশের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেণ। কিন্তু ইলতুতমিশ চেঙ্গিস খানের বিরুদ্ধে যেতে চান নাই, ফলে জালালউদ্দিনকে চিঠি লিখে জানান দিল্লি আবহাওয়া ভাল নয়, এই আবহাওয়া জালালউদ্দিন সহ্য করতে পারবে না। তখন জালালউদ্দিন সিন্ধু হয়ে ইরাণ চলে যান। এভাবে ইলতুতমিশ তার নব্য মুসলিম সম্রাজ্যকে মঙ্গল আক্রমণ থেকে রক্ষা করেণ।

রাজিয়া সুলতানা (১২০৫১২৪০সুলতান ইলতুতমিশের কন্যা ও ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা শাসক। তিনি একাধারে একজন ভাল প্রসাশক ও সেনাপতি ছিলেন; তাছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে একজন দক্ষ সৈন্য হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। সুলতান ইলতুতমিশের সবথেকে যোগ্য পুত্র সুলতানের জীবদ্দশায় মৃত্যু বরণ করলে সুলতান তার কন্যা রাজিয়া সুলতানাকে দিল্লির শাসক হিসেবে মনোনিত করে যান। যখনই ইলতুতমিশের রাজধানী ছাড়তে হত, তিনি তখন তার কন্যা রাজিয়া সুলতানাকে শাসনভার বুঝিয়ে দিয়ে যেতেন।

সুলতানের মৃত্যুর পর তার আরেক পুত্র রোকনুদ্দিন ফিরোজ দিল্লির শাসন কেড়ে নেন এবং প্রায় সাত মাসের মত শাসন করেণ। ১২৩৬ সালে দিল্লির জনগনের সাহায্য নিয়ে রাজিয়া সুলতানা তার ভাইকে অপসারণ করে ক্ষমতায় আরোহন করেণ।

রাজিয়া সুলতানা সম্রাজ্যে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। শাসনকার্য দৃঃঢ় ভাবে পালন করার জন্য তিনি নারীত্বের আবরণ পরিত্যাগ করে, পুরুষের পোশাক গ্রহণ করেণ। এই পোশাকে তিনি জনসম্মুখে, প্রশাসনে ও যুদ্ধক্ষেত্রে আসতেন। ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে রাজিয়া জালাল উদ্দিন ইয়াকুত নামক একজন ইথিওপিয়ান দাসকে নিয়োগ দেন। ইয়াকুতকে তিনি অত্যন্ত বিশ্বাস করতেন। এর ফলে তুর্কিরা রাজিয়ার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নামেন। ১২৩৯ সালে লাহোরের তুর্কি গভর্নর বিদ্রোহ করে। রাজিয়া তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে, গভর্নর প্রথমে পালিয়ে যান ও পরে ক্ষমা প্রার্থনা করেণ। তারপর ভাতিন্ডার গভর্নর বিদ্রোহ করেণ। রাজিয়া যখন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত হচ্ছিলেন তখন তার তুর্কি কর্মকর্তারা তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে এবং তার ভাই বাহারামকে সুলতান ঘোষণা করে। রাজিয়া ভাতিন্ডার গভর্নরকে বিয়ে করে তার সাহায্যে ক্ষমতা ফিরে পাবার চেষ্টা করেণ। কিন্তু রাজিয়া সুলতানা পরাজিত হন ও পলায়ন করেণ। ১২৪০ পলায়নকালে তার একজন ভৃত্য তাকে খাদ্যে বিষ দিয়ে হত্যা করে। এই ভৃত্যই তাকে আশ্রয় দিয়েছিল।

খিলজি রাজবংশ ছিল তুর্কি বংশোদ্ভুত মুসলিম রাজবংশ। ১২৯০ থেকে ১৩২০ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এই রাজবংশ দক্ষিণ এশিয়ার বিরাট অংশ শাসন করে।জালালউদ্দিন ফিরোজ খিলজি এই রাজবংশের পত্তন করেন। এটি দিল্লি সালতানাত শাসনকারী দ্বিতীয় রাজবংশ। আলাউদ্দিন খিলজির সময় খিলজিরা সফলভাবে মোঙ্গল আক্রমণ ঠেকাতে সক্ষম হয়।

দিল্লির খিলজি শাসকদের তালিকা (১২৯০–১৩২০)

Titular Name Personal Name Reign
শায়েস্তা খান

(Jalal-ud-din)
جلال الدین

মালিক ফিরোজ
ملک فیروز خلجی
১২৯০–১২৯৬
আলাউদ্দিন[৬]
علاءالدین
জুনা খান খিলজি
علی گرشاسپ خلجی
১২৯৬–১৩১৬
শিহাবউদ্দিন
شھاب الدین
উমর খান খিলজি
عمر خان خلجی
১৩১৬
‘কুতুবউদ্দিন
قطب الدین
মোবারক খান খিলজি
مبارک خان خلجی
১৩১৬–১৩২০
খসরু খান ১৩২০ সালে খিলজি রাজবংশের সমাপ্তি ঘটান।

মালওয়ার খিলজি সুলতান (১৪৩৬–১৫৩১)

  • মাহমুদ খিলজি (১৪৩৬–১৪৬৯)
  • গিয়াসউদ্দিন খিলজি (১৪৬৯–১৫০০)

তুঘলক রাজবংশ ১৩২১ সালে গিয়াস উদ দিন কতৃক প্রতিষ্ঠিত একটি মুসলিম রাজবংশ যার রাজধানী ছিল দিল্লি। এই রাজবংশ মধ্যযুগে ভারতবর্ষের বিস্তির্ন অঞ্চল শাষন করেছে।

তুঘলক রাজবংশের সূচনা হয়েছিল গিয়াস উদ দিন তুঘলকের মাধ্যমে। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে মোহাম্মদ বিন তুঘলক ক্ষমতায় আসীন হন। তিনিই তুঘলক সম্রাজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছিলেন। তার পরও মোহাম্মদ বিন তুঘলক তার দূর্বল রাজ্যনিতী, অসহিষ্ণুতা এবং রহস্যময় আচরনের কারনে কূখ্যাত ছিলেন। তাই বাংলা এবং উর্দূতে তুঘলকি কান্ড বলতে আজব এবং অবান্তর কান্ড-কারখানাকে বুঝায়।

মোহাম্মদ বিন তুঘলকের মৃত্যুর পর এক মাসেরও কম সময়ের জন্য ক্ষমতায় এসেছিলেন তার দুঃসম্পর্কের আত্বিয় মোহাম্মদ ইবন তুঘলক। কিন্তু ফিরোজ শাহ তুঘলক মোহাম্মদ ইবন তুঘলককে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে নেন। ফিরোজ শাহ তুঘলক সৈন্যবাহিনীর দিকে খুব একটা মনোযোগ না দেওয়ায় দক্ষিনাঞ্চলের একটা বিশাল অংশ তার হাতছাড়া হয়ে যায়। ফিরোজ শাহ তুঘলকের মৃত্যুর দশ বছরের মধ্যেই তুঘলক সম্রাজ্যের পতন শুরু হয়।

সুলতান

ধারনকৃত নাম আসল নাম রাজত্ব কাল নোট
সুলতান গিয়াস উদ দিন তুঘক শাহ
سلطان غیاث الدین تغلق شاہ
গাজি মালিক
غازی ملک
১৩২১-১৩২৫ তুঘলক রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা
সুলতান মোহাম্মদ আদিল বিন তুঘল শাহ
سلطان محمد عادل بن تغلق شاہ
Ulugh Khan
الغ خان
জুনা খান
جنا خان
মালিক ফখর উদ দিন
ملک فخر الدین
১৩২৫-১৩৫১ তুঘলক রাজবংশকে বাংলা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেছিলেন। কিছুটা পাগলাটে এবং রহস্যময় চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। সিন্ধ অভিযানে মৃত্যুবরন করেন।
সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক
سلطان فیروز شاہ تغلق
মালিক ফিরোজ ইবন মালিক রজব
ملک فیروز ابن ملک رجب
১৩৫২-১৩৮৮
সুলতান গিয়াস উদ দিন তুঘলক শাহ
سلطان غیاث الدین تغلق شاہ
তুঘলক খান ইবন ফতেহ খান ইবন ফিরোজ শাহ
تغلق خان ابن فتح خان ابن فیروز شاہ
১৩৮৮-১৩৮৯
সুলতান আবু বকর শাহ
سلطان ابو بکر شاہ
আবু বকর খান ইবন জাফর খান ইবন ফতেহ খান ইবন ফিরোজ শাহ
ابو بکر خان ابن ظفر خان ابن فتح خان ابن فیروز شاہ
১৩৮৯-১৩৯০
সুলতান মোহাম্মদ শাহ
سلطان محمد شاہ
মোহাম্মদ শাহ ইবন ফিরোজ শাহ
محمد شاہ ابن فیروز شاہ
১৩৯০-১৩৯৪
সুলতান আলাউদ্দিন সিকান্দার শাহ
سلطان علاءالدین سکندر شاہ
হুমায়ূন খান
ھمایوں خان
1394
সুলতান নাসির উদ দিন মোহাম্মদ শাহ তুঘলক
سلطان ناصر الدین محمود شاہ تغلق
মোহাম্মদ শাহ ইবন মোহাম্মদ শাহ
محمود شاہ ابن محمد شاہ
১৩৯৪-১৪১২/১৪১৩
সুলতান নাসিরুদ্দিন নুসরাত শাহ তুঘলক
سلطان ناصر الدین نصرت شاہ تغلق
নুসরাত খান ইবন ফাতেহ খান ইবন ফিরোজ শাহ
نصرت خان ابن فتح خان ابن فیروز شاہ
১৩৯৪-১৩৯৮

গিয়াস উদদিন তুঘলক অপর নাম গাজী মালিক (মৃত্যুঃ ১৩২৫) ছিলেন দিল্লির তুঘলক রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং এর প্রথম সুলতান। তিনি দিল্লি শহরের পত্তন করেন এবং এর নাম রাখেন তুঘলকাবাদ।১৩২৫ সাল পর্যন্তু তিনি দিল্লির বাদশাহ ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে মোহাম্মদ বিন তুঘলক দিল্লির শিংহাসনে বসেন।

গিয়াস উদ-দিন তুঘলকের বাবা ছিলেন তূর্কি এবং মা ছিলেন জট সম্প্রদায়ের হিন্দু। তিনি জীবনের প্রথম দিকে অনেক গরীব ছিলেন এবং বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধে এক কুরাউনা ব্যাবসায়ীর অধীনে কাজ করতেন। সাধারনভাবে মনে করা হয় যে গিয়াস উদ-দিন তুঘলক “তুঘলক” নামের একটি সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন যার থেকে পরবর্তীতে তুঘলক রাজবংশের উদ্ভব হয় কিন্তু অনেক ইতিহাসবিদের মতে তুঘলক তার ব্যাক্তিগত নাম ছিল যা পরবর্তিতে তার উত্তরশুরীরা গ্রহন করে যেমন- মোহাম্মদ বিন তুঘলক, ফিরোজ শাহ তুঘলক

ইতিহাস বিখ্যাত ভ্রমণকয়ারী ইবন বতুতার মতে কুরাউনা সম্প্রদায়টি মোংগল কিংবা তুর্কিশদের বংশধর নয় বরং তুঘলকরা একটি সম্প্রদায়ের সদস্য ছিল। আরো একজন বিখ্যাত ভ্রমণকারী মার্কো পোলোর মতে কুরাউনা একটি মিশ্র জাতিগোষ্ঠি ছিল যাদের আদি নিবাস ভারতেই ছিল।

১৩২৪ সালের দিকে বাংলা বিভিন্ন স্বাধীন সূলতান কতৃক শাসিত হত। বাংলায় সুলতান গিয়াস উদ দিন তুঘলক তার নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে চাইলেন এবং সেইজন্য তার পুত্র মোহাম্মদ বিন তুঘলককে দিল্লির সালতানাতের দায়িত্ব দিয়ে বিশাল এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে বাংলার দিকে রওনা দেন। তিনি বাংলায় যে অভিযান পরিচালনা করেন, ১৩২৪ সালের শেষের দিকে তা সফলতায় রুপ নেয়। বিজয় শেষে দিল্লি ফেরার পথে তিনি যখন দক্ষিণ বিহার পার হচ্ছিলেন অখন তিনি তার পুত্র মোহাম্মদ বিন তুঘলককে রহস্যময় এবং অযাচিত আচরনের ব্যাপারে আভাস পান। ইবন বতুতা তার সে সময় দিল্লিতে ছিলেন এবং সুলতানের সব আচরনের কথা পুরাটাই বর্ননা করেছেন। ইবন বতুতার বর্নণা মতে গিয়াস উদ দিন তুঘলক যখন দিল্লির কাছাকাছি এসে পৌছেছিলেন তখন আফগাহপুরে একটি একটি ছোট বিজয় কাঠামো বানানোর আদেশ দেন। সুলতানের উজির আহমেদ বিন আইয়াজ সুলতানের কথামত এমন একটি কাঠামো বানান যেটা দিয়ে একটি হাতি প্রবেশ করলে সেটি ভেঙ্গে যাবে। সুলতান এসে পৌছালে মোহাম্মদ বিন তুঘলক তাকে সেই কাঠামোর মধ্য দিয়ে তার বহর নিয়ে যেতে বলেন। সুলতানের হাতির বহর সেই কাঠামোর ভিতর প্রবেশ করলে কাঠামোটি ভেঙ্গে পড়ে এবং সুলতান সেই ভাঙ্গা কঠামোর নিচে চাপা পরেন। ইবন বতুতার মতে সুলতানের আরেক ছেলে মাহমুদ যখন সেই কাঠামোর ভেঙ্গে পড়ার আওয়াজ শোনেন তখনই উদ্ধারাভিযানের নির্দেশ দেন কিন্তু তার বড় ছেলে মোহাম্মদ বিন তুঘলকের আদেশে উদ্ধারাভিযান প্রলম্বিত করা হয় এবং সন্ধ্যার পরে শুরু করা হয়। সুলতানকে মৃত উদ্ধার করা হয়। আবার অনেকের মতে তাকে মেরে ফেলা হয়। পরবর্তীতে তার মৃতদেহ দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়।

মোহাম্মদ বিন তুঘলক  (অপর নামঃ শাহজাদা ফখর মালিক, জুনা খান) ১৩২৫ থেকে ১৩৫১ সাল পর্যন্ত তুঘলক রাজবংশের শাসক ও দিল্লির সুলতান ছিলেন। মোহাম্মদ বিন তুঘলক গিয়াস-উদ-দিন তুঘলকের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন। ১৩২৫ সালে তার বাবা গিয়াস উদ্দিন তুঘলকের মৃত্যু হলে তিনি শিংহাসনে আরোহন করেন। মোহাম্মদ বিন তুঘলক যুক্তি, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞানে একজন পন্ডিৎ ছিলেন এবং শারিরীক বিজ্ঞান এবং ঔষধবিজ্ঞানে তার ভাল ধারনা ছিল । এছাড়াও তুর্কিশ, আরবি, ফার্সি এবং উর্দু ভাষা তার আয়ত্বে ছিল। মুলতানে জন্মগ্রহনকারী তুঘলক বংশের এই শাসক সম্ভবত মধ্যযুগের সবচেয়ে শিক্ষিত, যোগ্য ও দক্ষ্য সুলতান ছিলেন তবে তার পাগলাটে এবং পাশবিক আচরনের কারনেও তার কূখ্যাতি রয়েছে। তার শাসন আমলেই মরোক্কোর বিশ্ববিখ্যাত ভ্রমণকারী ইবন বতুতা তার সম্রাজ্য ভ্রমন করেন।

মোহাম্মদ বিন তুঘলক ১৩৫১ সালে বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধ রাজ্যের ঠাট্টা অঞ্চলে সুমরু গোষ্ঠির সাথে যুদ্ধে মৃত্যুবরন করেন। তার জীবিত থাকা অবস্থাতেই তার রাজ্যে ভাঙনের সূত্রপাত হয়। তার রাজত্বকালেই দাক্ষিনাত্যের মালভূমি অঞ্চল তার রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তৎকালীন দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশের শাসক প্রলয়ভেমা রেড্ডি ও মুসুনুরি কাপানিডু তাদের নিজ নিজ শাষিত অঞ্চল দিল্লির অধীন থেকে মুক্ত করাতে সক্ষন হন। এতে করে দিল্লির অধীনস্ত অন্যান্য অঞ্চলসমূহের শাসক এবং তাদের গভর্নরদের কাছে দিল্লির মর্যাদা কমে যায় এবং ভাঙন অবশ্যম্ভাবি হয়ে পড়ে।

মোহম্দ বিন তুঘলক তৎকালীন সমসাময়িক অন্যান্য সম্রাজ্যের মত মুদ্রা ব্যাবস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার পূর্বসূরীদের চেয়েও অনেক বেশি মূদ্রা বাজারে ছাড়েন। তার চালুকৃত স্বর্নমূদ্রাগুলি ওজনে অন্যান্য মূদ্রার চেয়ে অনেক ভারী ছিল এবং আরবি হরফের ক্যালিগ্রাফি সংযুক্ত ছিল। এই মূদ্রাকে বলা হত “টংকা”। তিনি রূপার মূদ্রাও চালু করেছিলেন যা “আধুলি” নামে পরিচীত ছিল কিন্তু চালুর সাত বছরের মধ্যে জনগনের কাছে এর অগ্রহনযোগ্যতার জন্য তুলে নিতে বাধ্য হন। মোহাম্মদ বিন তুঘলক কাগজে ছাপা মূদ্রা চালু করার পরিকল্পনা করেছিলেন কিন্তু কিছু প্রভাবশালী প্রজা এবং কয়েকজন সভাসদের বিরোধিতার মুখে তিনি এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে বাধ্য হন।

মোহাম্মদ বিন তুঘলকের ধর্মনিতী অনেক উদারপন্থি ছিল। তাঁর রাজত্বে হিন্দু, মুসলিম এবং অন্যান্য ধর্মের লোকেরা নির্বিঘ্নে বসবার করতেন। হিন্দু এবং অন্যান্য ধর্মের প্রসারে তিনি যথেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।

বাংলায় “তুঘলকি কান্ড” নামে যে বাগধারাটি রয়েছে তার উৎপত্তি মূলত মোহাম্মদ বিন তুঘলকের আজব কান্ড কারখানা থেকেই। তিনি অধিকাংশ সময়ই লঘু পাপে গুরু শাস্তি দিতেন এবং এর থেকে ধনী, গরীব, মুক্ত কিংবা কৃতদাস কেউই রেহাই পেতেন না। এছাড়াও তার আচড়ন ছিল রহস্যময়। কথিত আছে একবার কিছু প্রজা তার নামে বিদ্রুপপূর্ন আজেবাজে কথা লিখে খামে ভরে শহরে প্রচার করেছিল এবং তার দরবার হলের দিকে ছুড়ে মেরেছিল। এতে করে তিনি ক্ষিপ্ত হন এবং সিদ্ধান্ত নেন দিল্লি থেকে সব প্রজাদের বের করে দিবেন। শহরে ঢোল পিটিয়ে ঘোষনা দেওয়া হল আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রজাদেরকে শহর খালি করে দিতে হবে। এর ফলে বেশিরভাগ মানুষ ভয়ে শহর ছেড়ে চলে গেলেও অনেকে আত্নগোপন করে থাকল। সময়সীমা পার হলে তিনি শহর তল্লাশি করার হুকুম দেন এবং যাদের পাওয়া যায় তাদের হয় হত্যা করা হয় নাহয় টেনে হিঁচড়ে পার্শবর্তী শহর দৌলতাবাদে রেখে আসা হয়। পুরো শহর ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পর একদিন তিনি তার প্রাসাদের ছাদে উঠে যখন দেখলেন যে শহরের কোথাও আগুন জ্বলছে না তখন তিনি বলে ওঠেন “এখন আমার মন শান্ত হয়েছে, রাগ কমেছে”

সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক (জন্ম: ১৩০৯– মৃত্যু: ২০শে সেপ্টেম্বর ১৩৮৮) তুঘলক রাজবংশের একজন শাষক যিনি মোহাম্মদ বিন তুঘলক মৃত্যুর পর ১৩৫১ সালে দিল্লির সিংহাসনে আরোহন করেন এবং ১৩৮৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন। তার মা ছিলেন দীপালপূরের একজন হিন্দু রাজকন্যা এবং পিতার নাম ছিলো রজব যিনি গিয়াস উদ দিন তুঘলকের ছোট ভাই এবং দীপালপুরের সিপাহসাহলার ছিলেন।সুলতান মোহাম্মদ বিন তুঘলক অসুস্থ অবস্থায় মৃত্যুবরন করলে ১৩৫১ সালে তিনি ক্ষমতায় আসীন হন।ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর তার সম্রাজ্যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পরে তাই মোহাম্মদ বিন তুঘলকের চেয়ে তার সম্রাজ্য অনেকটাই ছোট ছিল। তার রাজত্বকালে তিনি বাংলাকে আপাতঃ স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হন।

মোহাম্মদ বিন তুঘলকের মৃত্যুর পর তার চাচাত ভাই ফিরোজ শাহ তুঘলক ১৩৫১ থেকে ১৩৮৮ সাল পর্যন্ত দিল্লির সুলতান ছিলেন। সিংহাসনে আরোহনের পর তিনি বাংলা, গুজরাট এবং অন্যান্য স্থান হতে বিভিন্ন সময়ে বিদ্রোহের শিকার হন। তার পরেও তিনি তার রাজ্যের ক্যানেল এবং অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগ দেন। তিনি ভ্রমণকারীদের জন্য বিশ্রামাগার, হাসপাতাল ও পানির চাহিদা মেটানোর জন্য কূপ খনন করেন। তিনি জয়পুর, ফিরোজপুর এবং হিসার-ফিরোজ সহ বিভিন্ন শহরের গোড়াপত্তন করেন। ১৩৫০ সালে দিল্লির কাছে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন যার নাম হয় ফিরোজাবাদ।

ফিরোজ শাহ তুঘলক তার রাজ্য তথা প্রজাদের প্রকৃত উন্নয়নের লক্ষে অর্থনৈতিক উন্নয়নের রুপরেখা নির্ধারন করেন। তিনি জনগনের কাছে শিক্ষা পৌছে দেওয়ার জন্য অনেক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি গরীব প্রজাদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য অনেক হাসপাতাল স্থাপন করেন। এছাড়াও তিনি ডাক্তারদের ইউনানি চিকিৎসা ব্যাবস্থা উন্নত করার জন্য উৎসাহ দিতেন। কন্যা দায়গ্রস্থ পরিবারগুলোকে তিনি অর্থসহযোগিতা করতেন। তার শাষন আমলেই তিনি দিল্লিতে বিভিন্ন সরকারী কাজকর্ম ও রাজ প্রশাষনের কাজ পরিচালনার জন্য বড় বড় সরকারী দালান ও অবকাঠামো নির্মান করান। তার আমলেই দিল্লির আশেপাশে প্রায় ৩০০ গ্রামের গড়াপত্তন করা হয় এবং পাঁচটি বড় ক্যানেল খনন করা হয়, এতে করে সেচের সুবিধা হওয়ায় আবাদি জমির পরিমান বেড়ে যায় এবং অধিক জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা মেটাতে যথেষ্ট ছিল। শাষন কার্য পরিচালনার জন্য সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক মালিক মকবুলের উপর অতিমাত্রায় ভরসা করতেন। মালিক মকবুল একসময় ওয়ারেংগেল ফোর্টের সেনাপতি ছিলেন এবং সুলতান কতৃক ধৃত হন এবং পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন। শোনা যায় যে সুলতান একবার সিন্ধ ও গুজরাট অভিযানে যাওয়ার ছয় মাস পরও কোন খোজ খবর পাওয়া না গেলে মালিক মকবুল একাই সক্ষমভাবে দিল্লির সালতানাতের সুরক্ষা করেছিলেন। ফিরোজ শাহ তুঘলক মালিক মকবুলকে ভাই বলে ডাকতেন এবং তাকে খান-ই-জাহান উপাধি দেন।

সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক তার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ বিন তুঘলকের রাজ্য পরিচালনা থেকেই অনেক কিছু শিখেছিলেন। সিংহাসনে আরোহন করে তিনি রাজ্যের হারানো অংশগুলো পূনরূদ্ধারের কোন চেষ্টাই করেন নি, বরং তার বদলে যতটুকু তার রাজ্যের অধীনে ছিল ততটুকুই ভালভাবে শাষন করার চেষ্টা করে যান। তার সম্রাজ্যের বিদ্রোহিদের বিরূদ্ধেও ব্যাবস্থা গ্রহন বন্ধ রাখেন কারন সমস্ত বিদ্রোহীই তার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ বিন তুঘলকের আমলে জন্ম নেয় এবং তিনি নতুন করে এগুলোকে উষ্কে দিতে চান নি। তিনি তার রাজ্যে পিতার বদলে পুত্র প্রথা চালু করেন। সেনাবাহিনী কিংবা রাজকার্য যেখানেই হোক পিতা যদি উপস্থিত না হতে পারতেন তাহলে পুত্রকে পাঠিয়ে দেওয়া যেত। তিনি সরকারী কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি করেন এবং হাত কেটে ফেলা, গর্দান নেওয়া সহ সমস্ত প্রকার কঠোর শাস্তি দেওয়া বন্ধ করেন। এছাড়াও তিনি মোহাম্মদ বিন তুঘলকের আমলে আরোপিত ভূমির উপর অতিরিক্ত কর প্রত্যাহার করেন। এটা মনে করা হয় যে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমল ভারতের মধ্যযুগের ইতিহাসে সবচেয়ে দূর্নিতীগ্রস্থ ছিল। একটা গল্প থেকে জানা যায় যে সুলতান একবার এক সিপাহীকে একটি সোনার টংকা দেন আস্তাবলের দাড়োয়ানকে ঘুষ দিয়ে তার ঘোড়া আস্তাবল থেকে ছাড়ানোর জন্য। এছাড়াও সূলতানের সেনবাহিনীর প্রধান ছিলেন ইমাদুল-মুল্ক বাশির যে প্রথমদিকে সুলতানের কৃতদাশ ছিল। সুলতানের এই সেনাপতি অবৈধ পথে প্রায় তের কোটি টংকার সম্পদ অর্জন করেছিল যেখানে পুরো সম্রাজ্যের উত্তোলিত করের পরিমান ছয় কোটি সাতান্ন লাখ টংকার বেশি ছিল না।

সৈয়দ রাজবংশ দিল্লি সালতানাতের চতুর্থ রাজবংশ। ১৪১৪ থেকে ১৪৫১ সাল পর্যন্ত এই রাজবংশ ক্ষমতায় ছিল। তুঘলক রাজবংশের পর তারা দিল্লির ক্ষমতায় আসে। পরবর্তীতে লোদি রাজবংশের মাধ্যমে তাদের সমাপ্তি হয়।

সৈয়দ রাজবংশ নিজেদের সৈয়দ বা নবী মুহাম্মদ (সা) এর বংশধর বলে দাবি করত। তৈমুর লং এর আক্রমণের ফলে দিল্লি সালতানাতের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বিশৃংখলার পর যখন কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ছিল না তখন সৈয়দরা দিল্লির ক্ষমতা লাভ করে। ৩৭ বছরের শাসনে চারজন শাসক শাসন করেন।

খিজির খান সৈয়দ রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। তৈমুর তাকে মুলতানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। ১৪১৪ সালের ২৮ মে খিজির খান দৌলত খান লোদির কাছ থেকে দিল্লির ভার গ্রহণ করেন এবং সৈয়দ রাজবংশের সূচনা ঘটান। কিন্তু তিনি সুলতান উপাধি ধারণ করেননি বরং তৈমুরি রাজবংশের রায়াত আলা বা সামন্ত হিসেবে শাসন পরিচালনা করেন। ১৪২১ সালের ২০ মে খিজির খানের মৃত্যুর পর তার পুত্র মোবারক খান তার উত্তরাধিকারী হন। তিনি তার মুদ্রায় মুইজউদ্দিন মোবারক শাহ নাম মুদ্রণ করেন। ইয়াহিয়া বিন আহমদ সিরহিন্দির লেখা তারিখ মোবারক শাহি বইয়ে তার শাসনামলের বিবরণ রয়েছে। মোবারক শাহের মৃত্যুর পর তার ভাতিজা মুহাম্মদ খান ক্ষমতা লাভ করেন এবং সুলতান মুহাম্মদ শাহ হিসেবে নামধারণ করেন। তার মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার পুত্র আলাউদ্দিনকে বাদাউন থেকে ডেকে পাঠান এবং তার উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেন।

রাজবংশের শেষ সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহ স্বেচ্ছায় মুকুট ত্যাগ করেন। এরপর বাহলুল খান লোদি ক্ষমতায় আসেন। আলাউদ্দিন আলম শাহ বাদাউন চলে যান। ১৪৭৮ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন।

শাসকগণ

  1. খিজির খান (১৪১৪-১৪২১)
  2. মোবারক শাহ (১৪২১-১৪৩৪)
  3. মুহাম্মদ শাহ (১৪৩৪-১৪৪৫)
  4. আলাউদ্দিন আলম শাহ (১৪৪৫-১৪৫১)

লোদি রাজবংশ ছিল পশতু রাজবংশ। ১৪৫১ থেকে ১৫২৬ সাল পর্যন্ত উত্তর ভারত ও পাঞ্জাবের অংশবিশেষ ও বর্তমান পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে লোদি রাজবংশের শাসন ছিল। বাহলুল খান লোদি এই রাজবংশের সূচনা করেন।

ইবরাহিম লোদির আমলে লোদি রাজবংশের পতন ঘটে। তিনি মেবারের রানা সাঙ্গার সাথে কাছ থেকে বেশ কিছু আক্রমণের সম্মুখীন হন। রানা সাঙ্গা লোদিদেরকে বেশ কয়েকবার পরাজিত করে ফলে রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। ইবরাহিম লোদি বাবরের কাছে পরাজিত হওয়ার পর লোদি রাজবংশের সমাপ্তি ঘটে। বাবর মুঘল রাজবংশের সূচনা করেন।

বাহলুল খান লোদি ( (মৃত্যু ১২ জুলাই ১৪৮৯) ছিলেন দিল্লি সালতানাতের শেষ রাজবংশ লোদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। সৈয়দ রাজবংশের শেষ শাসকের ক্ষমতা ত্যাগের পর বাহলুল খান লোদি ক্ষমতায় আসেন।

সিকান্দার লোদি (মৃত্যু ২১ নভেম্বর ১৫১৭) (জন্মনাম নাজিম খান) ছিলেন দিল্লির লোদি বংশীয় সুলতান। তার পিতা বাহলুল খান লোদির মৃত্যুর পর তিনি সুলতান হন। লোদি রাজবংশের সবচেয়ে সফল শাসক হওয়ার পাশাপাশি তিনি ফারসি ভাষার একজন কবিও ছিলেন। তিনি ৯০০০ পংতির দিওয়ান রচনা করেছিলেন।

সিকান্দার লোদি ছিলেন সুলতান বাহলুল খান লোদির পুত্র। তার মা ছিলেন সিরহিন্দের একজন হিন্দু স্বর্ণকারের কন্যা। পিতার দিক থেকে তিনি পশতুন বংশোদ্ভূত।

পিতার মৃত্যুর পর সিকান্দার লোদি সুলতান হন। ক্ষমতায় আরোহণের সময় তাকে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় কারণ তার প্রতি পিতা বাহলুল লোদির মনোনয়ন সত্ত্বেও তার বড় ভাই জাওনপুরের আঞ্চলিক শাসক বারবাক শাহ ক্ষমতা দাবি করেন। তবে ব্যাপক রক্তপাত ছাড়াই সিকান্দার লোদি ক্ষমতা গ্রহণে সফল হন এবং তার ভাইকে জাওনপুরে শাসন চালানোর অনুমতি দেন। চাচা আলম খানের বিরোধও তিনি মিটিয়ে ফেলেন।

সিকান্দার লোদি সফল শাসক ছিলেন। তার সময় বাণিজ্যের উন্নতি হয়। তিনি লোদিদের শাসিত অঞ্চল গোয়ালিওরবিহার পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সাথে সিকান্দার লোদি সন্ধি করেছিলেন। ১৫০৩ সালে আগ্রা শহর নির্মাণের জন্য তিনি অনুমোদন দেন।

গুলরুখি ছদ্মনামে সিকান্দার লোদি ফারসি কবিতা চর্চা করতেন। তিনি হিসাবরক্ষণে আলাদা পদ্ধতির সূচনা করেন। বিচার ও কৃষিকাজে তিনি বিশেষ যত্ন নেন এবং আবাদি জমি পরিমাপের ক্ষেত্রে গাজিয়ে সিকান্দারি নামক পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। হিসাবরক্ষণের ক্ষেত্রে তিনি ফারসি ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

গোয়ালিওর দুর্গ জয়ের জন্য সিকান্দার লোদি প্রচেষ্টা চালান এবং তাতে পাঁচবার আক্রমণ করেন। তবে প্রতিবার তিনি ব্যর্থ হন। আগ্রাকে তিনি দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন। দিল্লি থেকে গোয়ালিওর পৌছাতে দীর্ঘ সময় লাগা এর কারণ হিসেবে কাজ করেছে। সিকান্দার লোদির সময় আগ্রা ভারতের শিরাজ বলে ক্ষেত ছিল।[১] চূড়ান্ত পর্যায়ে গোয়ালিওরের কাছে নারোয়ার নামক ক্ষুদ্র অঞ্চল তিনি আক্রমণ করেন এবং নারোয়ার দুর্গ ১১ মাস ধরে অবরোধ করে রাখা হয়। এরপর খাদ্য শেষ হয়ে গেলে দুর্গ সিকান্দার লোদির কাছে আত্মসমর্পণ করে। এরপর তিনি আবার গোয়ালিওর আক্রমণ করেন। তবে এবারও তিনি ব্যর্থ হন।

১৫১৭ সালে সিকান্দার লোদি মৃত্যুবরণ করেন। দিল্লির লোদি উদ্যানে তাকে দাফন করা হয়।

ইবরাহিম লোদি  ছিলেন লোদি রাজবংশের শেষ সুলতান। ১৫১৭ সালে তার পিতা সিকান্দার লোদির মৃত্যুর পর তিনি সুলতান হন। পানিপথের যুদ্ধে তার পরাজয় ও নিহত হওয়ার ফলে লোদি রাজবংশের সমাপ্তি ঘটে।

ইবরাহিম লোদি জাতিতে পশতুন ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতায় আসেন। তবে শাসনকাজে তিনি দক্ষ ছিলেন না। তার সময় বেশ কিছু বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। মেবারের শাসক রানা সংগ্রাম সিং উত্তর প্রদেশের পশ্চিম পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তার করেছিলেন এবং আগ্রায় হামলার হুমকি সৃষ্টি করেন। এছাড়াও পূর্বাঞ্চলেও বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। পুরনো ও জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের স্থলে তার প্রতি অনুগত অপেক্ষাকৃত তরুণদের নিয়োগ করায় ইবরাহিম লোদির প্রতি অভিজাত শ্রেণীও অসন্তুষ্ট ছিল। এসময় তার আফগান অভিজাতরা বাবরকে ভারত আক্রমণের আমন্ত্রণ জানায়। ১৫২৬ সালে বাবরের মুঘল সেনাবাহিনী ইবরাহিম লোদির বৃহৎ আকারের সেনাবাহিনীকে পানিপথের যুদ্ধে পরাজিত করে। যুদ্ধে ইবরাহিম লোদি নিহত হন।

পানিপথের তহশিল অফিসের কাছে ইবরাহিম লোদির মাজার অবস্থিত। এর কাছে বু আলি শাহ কালান্দারের দরগাহ রয়েছে। লোদি উদ্যানের শিশ গম্বুজকে অনেকে তার মাজার ভেবে ভুল করে।

 

শুরি সাম্রাজ্য তৈরি হয় আফগানিস্তানের লোজজনের দ্বারা, যারা সংস্কৃতিতে পাস্তুন ছিলেন এবং তারা ১৫৪০ থেকে ১৫৫৫/১৫৫৬ পর্যন্ত ভারত শাসন করেছেন।

‘শুর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন বীর শের শাহ শুরি। তিনি ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে চাউসার যুদ্ধে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে যুদ্ধে পরাজিত করে এ শুরি সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। মুঘল সম্রাট তার শাসন পুনপ্রতিষ্ঠা করলে তাদের শাসনের পতন ঘটে।

শুরি সাম্রাজ্যের শাসকগণ

শের শাহ সুরি

শের শাহ সুরি (১৪৮৬ – ২২ মে, ১৫৪৫) ছিলেন মধ্যযুগীয় দিল্লির একজন শক্তিশালী আফগান (পাশতুন) [১][২][৩][৪][৫][৬][৭] বিজয়ী। একজন সাধারণ সেনাকর্মচারী হয়ে নিজের কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীকালে তিনি মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাবাহিনীর সেনানায়কের পদে উত্তীর্ণ হন। শেষপর্যন্ত তাঁকে বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয়। ১৫৩৭ সালে নতুন মুঘল সম্রাট হুমায়ুন যখন অন্যত্র অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন, সেই সময় শের শাহ সুরি বাংলা জয় করে সুরি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেকে নতুন সম্রাট ঘোষণা করেন।[৮]

শের শাহ সুরি কেবলমাত্র একজন মেধাবী রণকৌশলবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক ও যোগ্য সেনানায়ক। তাঁর সাম্রাজ্য পুনর্গঠনের মধ্যেই পরবর্তীকালের (বিশেষত হুমায়ুন-পুত্র আকবরের) মুঘল সাম্রাজ্যের মূলভিত্তিটি নিহিত ছিল।[৮] ১৫৪০ থেকে ১৫৪৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তাঁর পাঁচ বছরের স্বল্পকালীন রাজত্বে তিনি নাগরিক ও সামরিক প্রশাসনের এক নতুন ধারার সূচনা ঘটিয়েছিলেন। তিনি প্রথম রুপিয়া নামক মুদ্রার প্রচলন করেন, যা বিংশ শতাব্দী অবধি চালু ছিল। তিনি মোহর নামে ১৬৯ গ্রেইন ওজনের স্বর্ণমুদ্রা ও দাম নামে তাম্রমুদ্রাও চালু করেন।[৯][১০] তাছাড়া তিনি ডাক ব্যবস্থারও আমূল সংস্কার করেন। তিনি হুমায়ুনের দিনাপানাহ শহরের উন্নতি ঘটান এবং এর নতুন নামকরণ করেন শেরগড়। আবার খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকে পতনোন্মুখ পাটনা শহরেরও পুনরায় সংস্কার করেন তিনি।[১১] কথিত আছে, তিনি কোনো এক ভারতীয় জঙ্গলে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘকে সম্পূর্ণ খালি হাতে হত্যা করেছিলেন।[১][৮]

গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (সড়কআজম) শের শাহ সুরির অমর কীর্তি। বিগত চার শতাব্দী ধরে এই সড়ক “বিশ্বে অদ্বিতীয় এক জীবননদীর মতো” দাঁড়িয়ে রয়েছে।[১২] আজও ভারতপাকিস্তান রাষ্ট্রে এই সড়ক অন্যতম প্রধান রাস্তা। এর ভারতীয় অংশটি বর্তমানে স্বর্ণ চতুর্ভূজ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

১৫৪৫ সালে চান্দেল রাজপুতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় কালিঞ্জর দুর্গে বারুদের বিস্ফোরণে শের শাহ সুরির মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র জালাল খান ইসলাম শাহ সুরি নাম গ্রহণ করে সুরি সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। সাসারামে একটি কৃত্রিম হ্রদের মাঝখানে তাঁর ১২২ ফুট উঁচু নয়নাভিরাম সমাধিসৌধটি আজও বিদ্যমান।[১৩] তাঁর মৃত্যুর পর হুমায়ুনের নেতৃত্বে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। আকবরের রাজত্বকালে ১৫৮০ সালে আব্বাস খান সারওয়ানি নামে মুঘল সম্রাটের এক ওয়াকিয়ানবিশ তারিখশের শাহি নামক গ্রন্থে শের শাহ সুরির রাজত্বকালের বিস্তারিত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন।

ইসলাম শাহ শুরি শুর সম্রাজ্যের দ্বিতীয় শাসক। ইসলাম শাহ শুরির আসল নাম ছিল জালাল খান এবং তিনি শের শাহ শুরির পুত্র ছিলেন। ইসলাম শাহ শুরি সাত বছর (১৫৪৫ – ১৫৫৩) শাসন করেছেন। তাঁর বার বছরের পুত্র ফিরোজ শাহ শুরি তাঁর উত্তরসূরী হন, কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই শের শাহের ভাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ মুবারিজ খান তাকে গুপ্তহত্যা করে। মুহাম্মদ মুবারিজ খান মুহাম্মদ শাহ আদিল নামে শাসন করেছেন।

ফরোজ শাহ শুরি (১৫৪০১৫৫৩) শুর সম্রাজ্যের তৃতীয় শাসক ছিলেন। তিনি ইসলাম শাহ শুরির পুত্র এবং শের শাহ শুরির দৌহিত্র ছিলেন। তিনি মাত্র বার বছর বয়সে ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে রাজ্যের শাসক ভার গ্রহণ করেন। কিছু দিনের মধ্যেই শের শাহ শুরির ভাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ মুবারিজ খান (যিনি পরবর্তীতে মুহাম্মদ শাহ আদিল নামে রাজ্য শাসক করেন) দ্বারা গুপ্তহত্যার স্বীকার হন।

 

পূর্বসূরী
ইসলাম শাহ শুরি
দিল্লীর শাহ
১৫৫৩ 
উত্তরসূরী
মুহাম্মদ শাহ আদিল

মুহাম্মদ শাহ আদিল শুর সম্রাজ্যের চতুর্থ শাসক ছিলেন। মুহাম্মদ শাহ আদিলের আসল নাম হল মুহাম্মদ মুবারিজ খান এবং তিনি শের শাহ শুরির ভাতুষ্পুত্র ছিলেন। ১৫৫৩ খিস্টাব্দে ফিরোজ শাহ শুরিকে গুপ্তহত্যা করে তিনি শুর সম্রাজ্যের শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। ফিরোজ শাহ শুরি শের শাহ শুরির দৌহিত্র ছিলেন, যার বয়স ছিল মাত্র বার বছর। তার উত্তরাধিকারী হিসেবে ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে রাজ্যের ভার গ্রহণ করেন ইব্রাহিম শাহ শুরি

 

পূর্বসূরী
ফিরোজ শাহ শুরি
দিল্লীর শাহ
১৫৫৩ – ১৫৫৫ 
উত্তরসূরী
ইব্রাহিম শাহ শুরি

ইব্রাহিম শাহ শুরি শুর সম্রাজ্যের পঞ্চম শাসক। তার উত্তরাধিকার ছিলেন আহমেদ খান যিনি পরবর্তীতে ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে সিকান্দার শাহ শুরি নামে শাসন কার্য পরিচালনা করেছেন।

 

পূর্বসূরী
মুহাম্মদ শাহ আদিল
দিল্লীর শাহ
১৫৫৫ 
উত্তরসূরী
সিকান্দার শাহ শুরি

সেকান্দার শাহ শুরি শুর সম্রাজ্যের ষষ্ঠ শাসক ছিলেন। সিকান্দার শাহ শুরির আসল নাম ছিলো আহমেদ খান১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ুন তাকে পরাজিত করে পুনরায় মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি উত্তর পাঞ্জাবের সিওয়ালিক পর্বতে পালিয়ে যান। সিকান্দার শাহ শুরি এবং তার ভাই আদিল শাহ শুরি মুঘল সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এবং পরাজিত হয়েছিলেন।

 

পূর্বসূরী
ইব্রাহিম শাহ শুরি
দিল্লীর শাহ
১৫৫৫ 
উত্তরসূরী
আদিল শাহ শুরি

আদিল শাহ শুরি শুর সম্রাজ্যের সপ্তম শাসক। তিনি সিকান্দার শাহ শুরির ভাই ছিলেন, ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ুনের কাছে সিকান্দার শাহ শুরি পরাজিত হলে যিনি দিল্লীর পূর্বাঞ্চল শাসন করছেন। তিনি এবং সেকান্দার শাহ শুরি দিল্লীর সিংহাসনে বসার জন্য মুঘল সম্রাট আকবরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। আদিল শাহের রাজ্বতের কিছু দিনের মধ্যেই, তিনি আবার বঙ্গের শাসক মুহাম্মদ শাহের সঙ্গে কঠর দ্বন্দ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পরেন। নভেম্বর ৫, ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে বিক্রম খানের নেতৃত্বে আকবরের মুঘল সেনারা পানিপাতের দ্বিতীয় যুদ্ধে দিল্লী থেকে ৫০ মাইল উত্তরে সংখ্যায় বিশাল হেমুর শক্তিশালী বাহিনীকে পরাজিত করে, হেমু চোখে ঘটনাচক্রে তীর বিদ্ধ হলে, তাকে অচেতন অবস্থায় আকবরের কাছে নিয়ে আসা হয় এবং পরে তার শিরচ্ছেদ করা হয়।

পূর্বসূরী
সিকান্দার শাহ শুরি
দিল্লীর শাহ
১৫৫৬ 
উত্তরসূরী
হুমায়ুন

মুঘল সাম্রাজ্য

মুঘল সাম্রাজ্য ভারত উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত ছিল; অঞ্চলটি সেসময় হিন্দুস্তান বা হিন্দ নামে পরিচিত ছিল। এছাড়া আফগানিস্তানবেলুচিস্তানের বেশ কিছু এলাকাও মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলো। মুঘল সাম্রাজ্য ১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, ১৭০৭ সাল পর্যন্ত এর সীমানা বিস্তার করে এবং ১৮৫৭ সালের এর পতন ঘটে। চেঙ্গিস খানতৈমুর লঙের উত্তরসূরী জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর ১৫২৬ সালে দিল্লীর লোদী বংশীয় সর্বশেষ সুলতান ইবরাহিম লোদীকে প্রথম পানিপথের যুদ্ধে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বশেষ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের প্রাক্কালে ইংরেজদের হাতে পরাজিত হয়ে তৎকালীন বার্মারেঙ্গুনে নির্বাসনে চলে যান। সেখানেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। তবে মূলত মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরেই মুঘল সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয় এবং ভারত উপমহাদেশে ইংরেজদের প্রভাব প্রতিপত্তি বেড়ে যায়।

বাবরের ভারত আক্রমণ

ফরগণা নামে এক মধ্য এশিয় সামন্ত রাজ্যের তৈমুর বংশীয় রাজা ওমর শেখ মিরজার ছেলে বাবর মধ্য এশিয়া থেকে রাজ্যচ্যুত হয়ে কাবুল আক্রমণ করেন। এই সময় তিনি ভারত আক্রমণের পরিকল্পণা করেন। ১৫২৬ সালে পাণিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে নিহত করে মুঘল সাম্রাজ্যের সুচনা করেন। এই যুদ্ধেই ভারতে প্রথম কামান ব্যবহার হয়েছিল।

খানুয়ার যুদ্ধ

১৫২৭ এই যুদ্ধে বাবর রাজপুত রাজা সংগ্রাম সিংহকে পরাজিত করেন।

শেরশাহের উত্থান

বিহারের এক জায়গীরদারের ছেলে ফরিদ খান শেরশাহ নাম ধারণ করে বাবরপুত্র হুমায়ুনকে বিল্বগ্রাম ও চৌসার যুদ্ধে পরাজিত করলে হুমায়ুন পারস্যে রাজা তামাস্পের আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। শেরশাহের শাসন ব্যবস্থা ভবিষ্যতে আকবরের শাসনব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে।

পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ ও আকবরের উত্থান

আকবর

পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে শেরশাহের উত্তরাধিকারী আদিল শাহের সেনাপতি হিমু হুমায়ুনপুত্র আকবর ও তাঁর সেনাপতি বৈরাম খানের সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হোন। এরপর আকবরের শাসনকালে মুঘল সাম্রায্য উত্তর ও মধ্যভারতে বিস্তৃত হয়। ১৫৬০ সালে বৈরাম খানকে সরিয়ে আকবর নিজে সকল ক্ষমতা দখল করেণ। আকবর রাজপুতদের সাথে মিত্রতানীতি নেন। মান সিংহকে সেনাপতিত্বে বরণ করেন। কিন্তু মেবারের শাসক প্রতাপসিংহকে মিত্র করতে সফল হন নি।

হলদিঘাটের যুদ্ধ

এই যুদ্ধে মুঘল পক্ষীয় সেনাপতি মান সিংহ মেবারের রাণা প্রতাপ সিংহকে পরাজিত করেন।

রাজমহলের যুদ্ধ

এই যুদ্ধে দাউদ খান কররাণী পরাজিত হলে বাংলায় মুঘল শাসন শক্তিশালী হয়। যদিও পরে বারো ভুঁইয়া নামে পরিচিত জমিদারেরা বিদ্রোহ করেন। আকবরের পুত্র ছিলেন জাহাঙ্গীর

১৬২৮-১৬৫৭ পর্যন্ত সম্রাট শাহজাহানের শাসনকাল

শাহজাহান তখ্তে এসে সমস্ত উত্তরাধিকারীর দাবীদারদের হত্যা করেন। তার সকল ভাইদের তিনি হত্যা করেন এবং শাহজাহানের শাসনকালে তাজমহল তৈরি হয়। ভালবাসার এক অনবদ্য নিদর্শনরূপে তাজমহল বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত।

আওরঙ্গজেবের উত্থান

আওরঙ্গজেব

শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর ছেলেরা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। দারা, সুজা ও মুরাদকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন আওরঙ্গজেব। তিনি মারাঠা, ইংরেজ, শিখ ও অন্যান্য মুঘল্বিরোধীদের দমন করার সাময়িক চেষ্টা করেন। কিন্তু স্থায়ীভাবে সফল হননি।

দাক্ষিণাত্য ক্ষত

এসময় মারাঠা নেতা শিবাজী সক্রিয় হয়ে ওঠেন যা মুঘল সাম্রায্যকে বিপন্ন করে।

আওরঙ্গজেবের মৃত্যু ও পতনের সুচনা

আওরঙ্গজেবের মৃত্যুতে আবার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এরপর যোগ্য উত্তরসুরীর অভাব ভারতকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়

সৈয়দ ভাতৃদ্বয় ও ফারুখশিয়ার

ফারুখশিয়ার নামে মুঘল সম্রাট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে ফরমান দেন।মুঘল সম্রাটদের অযোগ্যতা অনেক আমলাদের সক্রিয় করে তোলে এদের মধ্যে সৈয়দ ভাতৃদ্বয় উল্লেখ্য।

মহম্মদ শাহ আমল ও নাদির শাহের আক্রমণ

মহম্মদ শাহ সৈয়দ ভাতৃদ্বয়দের দমন করলেও তিনি অতি নিষ্ক্রিয় ছিলেন। পারস্য সম্রাট নাদির শাহ এসময় ভারত আক্রমণ করেন। দিল্লি শ্মশানে পরিণত হয়।

মারাঠা সাম্রাজ্য ও আব্দালির আক্রমণ

মারাঠা সাম্রাজ্যের এসময় চরম উন্নতি হয়। কিন্তু আফগান নেতা আহমেদ শাহ আব্দালির হাতে পাণিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠা প্রভাব বিনস্ট হয়। দিল্লি আবার লুন্ঠিত হয়।

বক্সারের যুদ্ধ

শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর

এই যুদ্ধে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম অযোধ্যার নবাব সুজা উদ দোউলা ও বাংলার নবাব মীর কাশীমের সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বিরোধীতা করেন কিন্তু নাকাম হন। তিনি ইংরেজদের দেওয়ানী দিতে বাধ্য হন। এরপর মুঘল সম্রাট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আশ্রিত হয়ে থাকেন। এই সময় মুঘল সাম্রাজ্য লালকেল্লায় সীমাবদ্ধ ছিল।

সিপাহী বিদ্রোহ ও মুঘল সাম্রাজ্যের অবসান

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ অবদমিত হলে যোগদান কারী মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে রেংগুণে পাঠানো হয়। এভাবে মুঘল সাম্রাজ্য শেষ হয়।

খাদ্য

  • মোগলাই

সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন

মুঘল আমলে দক্ষিণ এশীয়, মধ্য এশীয় ও পশ্চিম এশীয় সংস্কৃতির মিলন হয়।

সামরিক

মুঘল সম্রাটরাই প্রথম ভারতে ব্যাপকভাবে কামান, বারুদ ও বন্দুক ব্যবহার করেন।

ধাতুবিদ্যা

মুঘল আমলে ধাতুবিদ্যা বিষয়ে উন্নতি হয়। আলি কাশ্মীরি নামে এক কারিগর বিশেষ ধরণের গোলক তৈরি করা আবিষ্কার করেন।

অর্থনৈতিক

শের শাহের মুদ্রা ব্যবস্থাকে উন্নত করা হয়।

বিচার ব্যবস্থা

মুঘল বিচারব্যবস্থার প্রয়োগ আজও ভারতে অনেকাংশে অনুসরণ করা হয়।

 

চেঙ্গিজ খান

চেঙ্গিজ খান  (১১৬২আগস্ট ১৮, ১২২৭) প্রধান মঙ্গোল রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা বা মহান খান, ইতিহাসেও তিনি অন্যতম বিখ্যাত সেনাধ্যক্ষ ও সেনাপতি। জন্মসূত্রে তার নাম ছিল তেমুজিন । তিনি মঙ্গোল গোষ্ঠীগুলোকে একত্রিত করে মঙ্গোল সম্রাজ্যের ( ১২০৬ – ১৩৬৮) গোড়াপত্তন করেন। নিকট ইতিহাসে এটিই ছিল পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সম্রাজ্য। তিনি মঙ্গোলিয়ার বোরজিগিন বংশে জন্ম নিয়েছিলেন। এক সাধারণ গোত্রপতি থেকে নিজ নেতৃত্বগুণে বিশাল সেনাবাহিনী তৈরি করেন।যদিও বিশ্বের কিছু অঞ্চলে চেঙ্গিজ খান অতি নির্মম ও রক্তপিপাসু বিজেতা হিসেবে চিহ্নিত তথাপি মঙ্গোলিয়ায় তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে সম্মানিত ও সকলের ভালোবাসার পাত্র। তাকে মঙ্গোল জাতির পিতা বলা হয়ে থাকে। একজন খান হিসেবে অধিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে চেঙ্গিজ পূর্বকেন্দ্রীয় এশিয়ার অনেকগুলো যাযাবর জাতিগোষ্ঠীকে একটি সাধারণ সামাজিক পরিচয়ের অধীনে একত্রিত করেন। এই সামাজিক পরিচয়টি ছিল মঙ্গোল

বাল্যকাল

১১৫০ থেকে ১১৬০ সনের মধ্যে কোন এক সময়ে চেঙ্গিজ খান জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকাল কাটান ঘোড়া চালনা শিখে। মাত্র ছয় বছর বয়সে নিজ গোত্রের সাথে শিকার অভিযানে যোগ দেয়ার অনুমতি পান। নয় বছর বয়সে তার বাবাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয় এবং তাদের পুরো পরিবারকে ঘরছাড়া করা হয়। মা’র কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষায় তিনি পরিবারের কর্তার ভূমিকা পালন শুরু করেন। অন্যকে রক্ষা করার বিদ্যা তখনই তার রপ্ত হয় যা পরবর্তীতে কাজে লেগেছিল।

রাজ্য জয়

৪০- ৫০ বছর বয়সের সময় তিনি মঙ্গোল জাতির পত্তন ঘটানোর পর বিশ্বজয়ে বের হন। প্রথমেই জিন রাজবংশকে পরাজিত করেন। চীন থেকেই তিনি যুদ্ধবিদ্যা কূটনীতির মৌলিক কিছু শিক্ষা লাভ করেন। পালাক্রমে দখল করেন পশ্চিম জিয়া, উত্তর চীনের জিন রাজবংশ, পারস্যের খোয়ারিজমীয় সম্রাজ্য এবং ইউরেশিয়ার কিছু অংশ। মঙ্গোল সাম্রাজ্য অধিকৃত স্থানগুলো হল আধুনিক: গণচীন, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, আজারবাইজান, আরমেনিয়া, জর্জিয়া, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, কাজাখস্তান, কিরগিজিস্তান, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, মলদোভা, দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং কুয়েত। চেঙ্গিজ খান ১২২৭ সালে মারা যাওয়ার পর তার পুত্র ও পৌত্রগণ প্রায় ১৫০ বছর ধরে মঙ্গোল সম্রাজ্যে রাজত্ব করেছিল।

 

তৈমুর লং

তৈমুর বিন তারাগাই বারলাস  (১৩৩৬ – ফেব্রুয়ারি, ১৪০৫) ১৪শ শতকের একজন তুর্কীমোঙ্গল সেনাধ্যক্ষ।  তিনি পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিজ দখলে এনে তিমুরীয় সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন যা ১৩৭০ থেকে ১৪০৫ সাল পর্যন্ত নেতৃত্বে আসীন ছিল। এছাড়াও তাঁর কারণেই তিমুরীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই বংশ কোন না কোনভাবে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে নেতৃত্বে আসীন ছিল। তিনি তিমুরে ল্যাংগ্  নামেও পরিচিত যার অর্থ খোঁড়া তৈমুর। বাল্যকালে একটি ভেড়া চুরি করতে গিয়ে তিনি আহত হন যার ফলে তাঁর একটি পা অকেজো হয়ে যায়। তাঁর সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল আধুনিক তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত, ইরান থেকে মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ অংশ যার মধ্যে রয়েছে কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজিস্তান, পাকিস্তান, ভারত এমনকি চীনের কাশগর পর্যন্ত। তিনি একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করিয়ে যান যার নাম তুজুক ই তৈমুরী

বাবর

জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর সাধারণত বাবর নামেই বেশি পরিচিত (ফেব্রুয়ারি ১৪, ১৪৮৩ডিসেম্বর ২৬, ১৫৩০) মধ্য এশিয়ার মুসলমান সম্রাট ছিলেন। তিনি ভারত উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট। তিনি তৈমুর লঙ্গ-এর সরাসরি বংশধর ছিলেন এবং তিনি নিজে বিশ্বাস করতেন তিনি মাতার পক্ষ থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন। তিনি পানিপথের প্রথম যুদ্ধে দিল্লীর লোদী বংশীয় সুলতান ইব্রাহিম লোদী কে পরাজিত করে এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।. তার মৃত্যুর পর তার পুত্র হুমায়ুন সিংহাসনে আরোহণ করেন। সে তার উত্তরসূরীরাতে উইল দিয়ে দেনেছিল, অ-মুসলমান,এর জন্য সহনশীলের একটি উত্তরাধিকার যে এর সুবিন্দুতে মোঘল সাম্রাজ্যের অক্ষর পরবর্তী কালে বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করবে।

জহির উদ্দিন মোহাম্মদ জন্মেছিলেন ১৪৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি[৫]ফারগানা প্রদেশের আনদিজান শহরে। ফারগানা বর্তমানে উজবেকিস্তান নামে পরিচিত। তিনি ফারগানা প্রদেশের শাসনকর্তা ওমর মি্জার বড় পুত্র ছিলেন। তার স্ত্রী কুতলুক নিগার আনাম ইউনূস খান এর কন্যা ছিলেন। মঙ্গলদের থেকে উদ্ধুত বারলাস উপজাতিতে বেড়ে উঠলেও বাবরের জাতিতে তুর্কি  ও পারস্য সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ছিল। এই অঞ্চলগুলো পরবর্তীতে ইসলামিক জাতিতে পরিণত হয় এবং তুরকএস্থান এবং খোরাসান নামে পরিচিত লাভ করে। বাবরের মাতৃভাষা ছিল চাঘাতাই যা তার কাছে তুর্কি ভাষা নামে পরিচিত ছিল। এছাড়া তিমুরীয় বিত্তবানদের প্রধান ভাষা পার্সিও তার দখল ছিল। তিনি চাঘাতাই ভাষাতে তার আত্মজীবনী “বাবরনামা” লিখেছেন, যার ভাষা, বাক্য গঠন, শব্দ মূলত পারস্য ভাষার অনুসারী।

আন্দিজানির সকলে তুর্কি ছিলেন, শহর ও বাজারের সকলেই তুর্কি নামে পরিচিত। সাহিত্যের ভাষা মানুষের কথ্য ভাষাকেই প্রতিফলিত করেছিল, যেমন মীর আলি শের নাওয়াই এর লেখা, যদিও তিনি হিন (হেরাত) এ জন্মলাভ করেন ও বেড়ে ওঠেন, তবে তা এগুলোরই একটি উপভাষা। সুন্দর চেহারা তাদের মাঝে খুবই নিয়মিত ছিল। বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী খাজা ইউসূফ ছিলেন একজন আনদিজানি

বাবর একজন মঙ্গলীয় (অথবা ফার্সীতে মুঘল) হয়েও মধ্য এশিয়ার তুর্কি এবং ইরানীদের কাছ থেকে ব্যাপক সহযোগিতা লাভ করেছিলেন এবং তার সৈন্যবাহিনীতে পার্সি (তুর্কি অথবা সার্ট জাতি, বাবর যে নামে ডাকতেন),পাঠান,আরবীয় মানুষ ছিলেন।এছাড়াও তার সৈন্যবাহিনীতে কুইজিলবাস যোদ্ধারা ও অন্তর্ভুক্ত করেছিল, পার্সিয়া থেকে শিয়াসুফির মত একটি উগ্রপন্থী ধর্মীয় ধারা বর্তমান ছিল যা পরবর্তী কালে মোঘল কোর্টে সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী হয়েছিল।

কথিত আছে বাবর শক্ত সমর্থ এবং শারীরিক ভাবে সুস্থ ছিলেন। তিনি কেবল ব্যায়ামের জন্য দু’কাঁধে দু’জনকে নিয়ে ঢাল বেয়ে দৌড়ে নামতেন। কিংবদন্তী আছে, বাবর তার সামনে পড়া সবগুলো নদী সাঁতরে পাড় হতেন এবং উত্তর ভারতের গঙ্গা নদী দু’বার সাঁতার দিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন।

বাবরের দৃঢ স্পৃহা ছিল। তার প্রথম স্ত্রী সালতান বেগমের কাছে তিনি কিছুটা লাজুক ছিলেন, পরে তার উপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আত্মজীবনীতে তিনি কিশোর বয়সের কামনা বাবুরী নামক এক বালকের কথা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখে করেন।

বাবর একজন গোঁড়া সুন্নি মুসলিম ছিল। সে তার শিয়া মুসলিমদের অপছন্দ করাকে কখনও কখনও ব্যক্ত করেছিল ” তাদের বিচ্যুতি ” বলে ।যদিও ধর্ম বাবরের জীবনের এক প্রধান স্থান ছিল এবং তার সহযোগী রাজারা ইসলামকে হালকা ভাবে গ্রহণ করেছিল। বাবর তার সমকালীন এক কবির কবিতার একটি লাইন প্রায় উদ্ধৃত করতেন:” আমি মাতাল, আধিকারিক।আমাকে শাস্তি দিন যখন আমি সংযমি। ” বাবরের সহযোগী রাজারা মদ পান করতেন এবং প্রাচুর্য্য পূর্ণ ভাবে জীবন যাপন করতেন, তারা বাজারের ছেলের সঙ্গে প্রেমে পড়েছিল এবং তারা হিংস্র এবং নির্মম ছিলেন।বাবরের এক কাকার মতে “অধর্ম এবং পাপকার্জে সে আসক্ত হয়েছিল। সে সমকামিতেও আসক্ত হয়ে পড়েছিল। তার এলাকাতে, যখনই শান্ত কোনো যুবক তার সামনে এসেছে, তাকে পাবার জন্য সে সবকিছু সে করেছিল। তার সময় এই ধরনের সমকামিতা প্রচলিত ছিল এবং সেটা একটি গুণহিসাবে বিবেচনা করা হোতো। । ” সে তার মৃত্যূর দুই বছর আগে সুরাপান ত্যাগ করেছিলেন এবং তিনি তার রাজসভায় সকলকে একই কাজ করার দাবী করেছিলেন। কিন্তু সে নিজে আফিং এর নেশা ছাড়তে পারেননি।এবং তার কি বোধ হারানি। বাবর লিখেছিলেন: ” সবাই সুরাপান পছন্দ করে ,পান করার জন্য শপথ নেয়,আমি শপথ নিয়েছিলাম এবং অনুতাপ করেছিলাম। ”

তুর্ক-মোঙ্গলীয় ও পার্শি সংস্কৃতি

ট্রানসোক্সিয়ান এবং খোরাসান‘এ তুর্ক-মোঙ্গলীয় এবং পার্শি জনগণ পাশাপাশি বসবাস করতেন। এই বিভক্ত সমাজটি নৃতাত্বিক ভাবে সামরিক এবং বেসামরিক দিকে সরকার এবং নিয়মের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছিল। তুর্ক-মোঙ্গলীয়রা ছিল মূলত সামরিক গোষ্ঠী এবং ফার্সিরা মূলত বিভিন্ন বেসামরিক কাজে যুক্ত ছিল। তুর্ক-মোঙ্গলীয়দের মধ্যে কথ্য ভাষারূপে চাঘতাই ভাষা প্রচলিত ছিল। মধ্য এশিয়ার তৃণপ্রধান বৃক্ষহীন প্রান্তরে চেঙ্গিস খানের পৃষ্ঠপোষকতায় এরা এক রাজনৈতিক সংগঠনে পরিনত হয়েছিল।. এদের প্রধান ভাষা ফার্সি ছিল, তাজিক ভাষা এদের মাতৃভাষা ছিল(ফার্সি)। সমস্ত শিক্ষিত এবং শহুরে মানুষের ভাষাও ছিল ফার্সি। তৈমুর লঙ্গের সরকারী রাজভাষাও ফার্সিই ছিল এবং তার প্রশাসন, ইতিহাস,কবিতা ,সংস্কৃতি এই ভাষার মাধ্যমেই প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু তৈমুর লঙ্গের পরিবার বাড়িতে চাঘাতাই ভাষায় কথা বলতো। সেই সময় আরবি ভাষা বিজ্ঞান, দর্শনবিদ্যা, ধর্মতত্ত্ব এবং ধর্মীয় বিজ্ঞানের ভাষা হিসাবে যথেষ্ট ঔৎকর্ষ্য অর্জন করেছিল।

জহির উদ্দিন মোহাম্মদ তার ডাকনাম বাবর নামেই পরিচিত ছিলেন। বাবর নামটি লোমশ জন্তু বিভার তথা উদবিড়ালের নামের ইন্দো ইউরোপীয় সংস্করণ । তার নিকটাত্মীয় মির্জা মোহাম্মদ হায়দার লিখেছেন,

“চাঘাতাই এর আমল (মঙ্গল সম্প্রদায় চেঙ্গিস খানের দ্বিতীয় পুত্র চাঘাতাই খানের থেকে উদ্ধুত) ছিল নিষ্ঠুর এবং কুরূচিপূর্ণ এবং বর্তমান সময়ের মত শিক্ষিত ছিল না। তারা দেখল এ নামটা উচ্চারণ করা কঠিন, সেজন্য তাকে বাবর নাম দিয়েছে।”

১৪৯৪ সালে মাত্র বার বছর বয়সে বাবর প্রথম ক্ষমতা লাভ করেন, তিনি ফরগানার সিংহাসনে আরোহণ করেন যা বর্তমানে উজবেকিস্তান নামে পরিচিত। তার চাচা অনবরত তাকে সিংহাসন চ্যুত করার চেষ্টা করেছিলেন এবং তার অন্যন্য শত্রুও ছিল। একসময় সে বাবরকে ক্ষমতাচ্যূত করতে সফল হয়। ফলে জীবনের বেশকিছু সময় তাকে আশ্রয়হীন এবং যাযাবর থাকতে হয়। এসময় তার সাথে শুধুমাত্র তার বন্ধু ও চাষীদের যোগাযোগ ছিল। ১৪৯৭ সালে বাবর সমরকন্দের উজবেক শহরে আক্রমণ চালান এবং ৭ মাস পরে শহর দখল করতে সমর্থ হন। ইতিমধ্যে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দূরের ফরগানায় কিছু নোবেলদের বিদ্রোহের কারণে তাকে স্থানটি হারাতে হয়। ফরগানা পূনরুদ্ধারের জন্য অগ্রসর হলে তার বাহিনীর লোকজন তাকে ফেলে চলে যায়, ফলে তাকে সমরকন্দ ও ফরগানা উভয়কেই হারাতে হয়।

১৫০১ সালে বাবর আবার সমরকন্দের দখল নিতে প্রস্তুতি নেন, তবে আবারো তার পরাক্রমশালী প্রতিপক্ষ মোহাম্মদ শেবানী খান এর কাছে পরাজিত হন। তিনি তার কিছু অনুসারী নিয়ে পালিয়ে আসতে সমর্থ হন। পরবর্তীতে বাবর একটি শক্তিশালী দল গঠনে মনযোগী হন এবং প্রধানত তাজিকবাদাক্‌শানদেরকে তার দলে অন্তর্ভূক্ত করেন। ১৫০৪ সালে তুষার সমৃদ্ধ অঞ্চল হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করেন এবং কাবুল দখল করেন। এর ফলে তিনি একটি নতুন ধনী রাজ্য লাভ করেন এবং নিজের ভাগ্য পূণর্প্রতিষ্ঠিত করেন এবং বাদশাহ উপাধি গ্রহণ করেন। ১৫০৬ সালে হুসাইন বায়কারাহ এর মৃত্যু তার অভিযানকে বিলম্বিত করে। বাবর তার মিত্রপক্ষের শহর হেরাতে দু’মাসের জন্য অবস্থান করে সম্পদের অভাবে এলাকা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এর মধ্যেও তিনি এই রাজ্যকে প্রাচূর্য্যমণ্ডিত করেছেন। হেরাতের শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায়ের আধিক্য তাকে চমত্‌কৃত করে। তিনি অহিগুরের কবি মীর আলি শির নাভাই এর সাথে পরিচিত হন। নাভাই তার সাহিত্যে চাঘাতাই ভাষার ব্যবহার করতেন, তিনি বাবরকে তার আত্মজীবনী লিখতে উত্‌সাহিত করেন।

ঘনিয়ে আসা একটি বিদ্রোহ তাকে হেরাত থেকে কাবুল আসতে বাধ্য করে। তিনি এই পরিস্থিতি সামলে ওঠেন, তবে দুই বছর পর একটি বিপ্লব সংঘটিত হবার পর তার কিছু শীর্ষস্থানীয় নেতা তাকে কাবুল থেকে তাড়িয়ে দেন। বাবর কিছু সঙ্গী সহ শহর থেকে পালিয়ে গেলেও পুনরায় শহরে ফিরে এসে কাবুল দখল করেন। বিদ্রোহীদের তিনি তার অধীনে নিয়ে আসেন। এদিকে ১৫১০ সালে মোহাম্মদ শেবানী পার্সিয়ার শাসনকর্তা ইসমাঈল সাকাভিদ এর কাছে নিহত হন। বাবুর এই সুযোগে তার পূর্বপুরুষের রাজ্য তিমুরিদ পুনঃরুদ্ধার করতে চেষ্টা করেন। কয়েক বছর বাবর ইসমাঈল এর সাথে মধ্য এশিয়া দখলের জন্য মিলিত হন। বাবর সাকাভিদকে তার রাজ্যে সার্বভৌম রাজা হিসেবে চলার অনুমতি দেন। শাহ ইসমাঈল বাবর ও তার বোন খানজাদার মধ্যে পুনর্নিলন ঘটান। খানজাদাকে শেবানী বন্দী করে জোরপূর্বক বিয়ে করেছিল। ইসমাঈল বাবরকে অনেক ধনসম্পদ এবং রসদ সরবরাহ করেছিলেন এবং প্রতিদানে বাবর তাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছিলেন।

এদিকে শাহ এর পারস্য শিয়া মুসলিমদের একটি অভেদ্য দূর্গে পরিণত হয় এবং তিনি নিজেকে ৭ম শিয়া ঈমাম ঈমান মূসা আল কাজিমের বংশধর হিসেবে দাবি করতেন। তথন তার নামে মূদ্রা চালূ করা হয় এবং মসজিদে খুত্‌বা পড়ার সময়ে তার নাম নিয়ে পড়া হত। এই যুক্তিতে বাবর পারস্যের মিত্ররাজ্যের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন পার্সিয়ার শাহ্‌কে তাড়ানোর জন্য, যদিও কাবুলেও বাবরের নামে মূদ্রা ও খুতবা প্রচলিত ছিল।

পরে বাবর বুখার দিকে রওনা হন এবং সেখানে তার বাহিনীকে স্বাধীনতার সৈনিক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। তিইমুরিদ হিসেবে এক্ষত্রে তার খুব সমর্থন ছিল। শহর ও গ্রামের লোকজন তাকে ও তার বাহিনীকে সাহায্য করতে গিয়ে সর্বস্ব উজাড় করে দিত। বাবর পার্সিয়ার সহযোগিতা ফিরিয়ে দেন তাদের প্রয়োজন মনে না করার আত্মবিশ্বাসে। ১৫১১ সালের অক্টোবর মাসে প্রায় ১০ বছর পরে বাবর সমরকন্দে আবার প্রবেশ করতে সমর্থ হন। বাজার স্বর্ণবেষ্টিত হয়ে গিয়েছিল এবং আবারো জনগণ তাদের মুক্তিদাতাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। বাবর শিয়া পোষাক পরে সুন্নীদের সামনে দাঁড়ান এবং পরিস্থিতি সামাল দেন। তার কাজিন হায়দার লিখেছেন, বাবর একটু ভীত ছিলেন পার্সিয়ার সাহায্য প্রত্যাখ্যান করে। পার্সিয়ার শাহকে খুশী রাখার জন্য বাবর সুন্নী সম্প্রদায়কে কোন লাঞ্ছনা করেননি এবং শাহ্‌ এর সহযোগিতার আনুষ্ঠানিক হাতটিও সরিয়ে দেননি। এর ফলে ৮ মাস পরে তিনি উজবেক পুনরায় জয় করতে সমর্থ হন।

নিজের অতীতের কথা লিখতে গিয়ে বাবর বলেছেন, সমরকন্দ পূনরুদ্ধার ছিল আল্লাহ্‌র দেয়া সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার। এরপর বাবরের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ফরগানা দখল করা। এদিকে পশ্চিম দিক থেকে উজবেকদের আক্রমণের ভয়ও ছিল। ফলে তাকে ভারত ও এর পূর্ব দিকে মনোনিবেশ করতে হয়, বিশেষ করে আইয়ুদিয়ার রাজ্য এবং পেনিনসুলার মালায়া। বাবর নিজেকে সৈয়দ বংশের সত্যিকারের শাসনকর্তা হিসেবে দাবি করেন। একইভাবে নিজেকে তিমুরের মুকুটের দাবিদার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তিমুর প্রকৃতপক্ষে খিজর খানের ছিল, তিনি এটিকে মিত্ররাজ্য পাঞ্জার হাতে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন। পরে তিনি দিল্লী সালতানাতের সুলতান হয়েছেন। সৈয়দ বংশ পরে আফগানের শাসনকর্তা ইব্রাহীর লোদীর কাছে বেদখল হয়ে যায়। বাবর এটিকে পুণরুদ্ধার করতে চান। তিনি পাঞ্জাব আক্রমণ করার আগে ইব্রাহীম লোদীকে একটি অনুরোধ করেন, “আমি তাকে একটি গোসাওক পাঠিয়েছি এবং তার কাছে সে সব দেশের অধিকার চেয়েছি যেগুলো প্রাচীনকাল থেকেই তুর্কিদের উপর নির্ভরশীল।“

ইব্রাহীম বাবরের প্রস্তাব গ্রহণ করেন নি এবং খুব তাড়াতাড়ি তাকে আক্রমণের পরিকল্পনাও করেননি। তাই বাবর এর মধ্যে কিছু পূর্ব প্রস্তুতি সেরে নেন আক্রমণের জন্য এবং কান্দাহার বন্ধ করে দেন। তিনি কাবুলের পশ্চিম দিক থেকে আক্রমণ চালানোর একটি রণকৌশল ঠিক করেন ভারত দখলের জন্য। কান্দাহার বন্ধ করে দেবার ফলে আক্রমণ ধারণাকৃত সময়ের অনেক পরে সংঘটিত হয়। প্রায় তিন বছর পর কান্দাহার ও এর পৌরদূর্গ বেদখল হয়েছিল এবং এছাড়াও অন্যান্য ছোটখাট যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই খণ্ডযুদ্ধগুলো বাবরকে সফল হবার সুযোগ করে দেয়।

পাঞ্জাবে প্রবেশের সময় বাবরের রাজদূত লঙ্গর খান নিয়াজী বাবরকে পরামর্শ দেন জানজুয়ার রাজপুত্রকে এই অভিযানে সম্পৃক্ত করার জন্য, তাদের এই দিল্লী জয়ের অভিযান বেশ পরিচিত লাভ করে। বাবর তার প্রধান ব্যক্তি মালিক আসাদ এবং রাজা সংঘর খান এর কাছে তার রাজ্যে ঐতিহ্যগত শাসনের সুফল এবং তার পূর্বপুরুষের সহযোগিতার কথা তাদের কাছে উল্লেখ করেন। বাবর শত্রুদের পরাজিত করে তাদের নিজের দলে ভিড়ান। ১৫২১ সালে গাখারসে তার মিত্রদের একত্রিত করেন। বাবর তাদের প্রত্যেককে সেনাপ্রধান হসান রানা সঙ্গকে পরাজিত করেন, এটিও তার ভারত দখলের অন্তর্ভূক্ত।

১৫০৮ সাল থেকে ১৫১৯ সালের সময়টুকু বাবরের স্মৃতিকথায় ছিল না। এই সময় ইসমাঈল আই একটা দুঃসময় কাটান, তার বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী নিশ্চিহ্ন হয় অটোম্যান রাজার বিরুদ্ধে চালদিরান যুদ্ধে। সেখানে ম্যাচলক মাস্কেট নামক এক ধরণের নতুন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। বাবর এবং ইসমাঈল দু’জনেই প্রযুক্তির উন্নয়ন উপলব্ধি করেন এবং বাবর তার বাহিনীকে ম্যাচলক যন্ত্রের প্রশিক্ষণ দিতে একজন অটোম্যান উস্তাদ আলীকে তার বাহিনীতে আমন্ত্রণ জানান। ওউস্তাদ আলী তখন ম্যাচলক মানব নামে পরিচিত ছিলেন। বাবর মনে রেখেছিলেন যে, তার বিরোধীরা তার বাহিনীকে এই ধরণের কোন অস্ত্র আগে দেখেনি বলে বিদ্রুপ করত। এ যন্ত্রগুলো থেকে বিকট শব্দ হত এবং কোন তীর বা বর্ষা নিক্ষিপ্ত হত না।

এই অস্ত্রগুলো স্বল্পসংখ্যক সৈন্যের হাতে দেয়া হয় শত্রুদের উপর কর্তৃত্ব করার জনয। ভারতের পথে অগ্রসর হবার সময় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগুলোর সাথে খণ্ড যুদ্ধের সময় এটি ব্যবহার করা হয় শুধুমাত্র শত্রুদের অবস্থান এবং কোশল পরীক্ষা করার জন্য। কান্দাহার ও কাবুলের দুটি শক্ত প্রতিরোধ থেকে রক্ষা পাওয়া বাবর কোন অঞ্চল জয়ের পর স্থানীয়দের খুশী করার চেষ্টা করতেন। এজন্য স্থানীয় সংস্কৃতি পালনের পাশাপাশি বিধবা ও এতিমদের সাহায্য করা হত।

ইব্রাহীম লোদী অনেকের অপ্রিয় ছিলেন, এমনকি তার নিজস্ব নোবেলদের কাছেও। বাবর ১২০০০ সৈন্য যোগাড় করেন এবং লোদীর আফগান নোবেলদেরকে তার শামিল হবার আমন্ত্রণ জানান। এই সৈন্যসংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল কেননা তারা অগ্রসর হবার সময় স্থানীয় অনেকেই তাদের সাথে যোগ দিচ্ছিল। দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম বড় সংঘর্ষ হয় ১৫২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। বাবরের পুত্র হূমায়ুন ১৭ বছর বয়সে তিমুরিদ বাহিনীকে নেতৃত্ব দেন ইব্রাহীমের উন্নত বাহিনীর বিপরীতে। হূমায়ুনের বিজয় অর্জন ছিল অন্যন্য খণ্ডযুদ্ধের চেয়ে বেশ কঠিন। তবে তারপরও এটি একটি চূড়ান্ত বিজয় ছিল। যুদ্ধের পর আটটি হাতি সহ প্রায় শতাধিক যুদ্ধবন্দীকে আটক করা হয়। তারপর অন্যান্য যুদ্ধের বন্দীদের মত এই বন্দীদের পরে আর মুক্ত করা হয়নি। হুমায়ূনের আদেশ অনুসারে তাদের হত্যা করা হয়। বাবরের স্মৃতিকথায় আছে, “উস্তাদ আলীকুলি খান এবং ম্যাচলকমানবদেরকে সকল বন্দীদের গুলি করার আদেশ দেয়া হয়েছিল। হূমায়ুনের প্রথম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল এটি যা একটি চমত্‌কার পূর্বাভাস।“ এটিই ছিল খুব সম্ভবত ফায়ারিং স্কোয়াডের প্রথম উদাহরণ।

ইব্রাহীম লোদী প্রায় এক লক্ষ সৈন্য এবং ১০০টি হাতি সহ বাবরের দিকে অগ্রসর হন। তখন বাবরের সৈন্যসংখ্যা লোদীর অর্ধেকেরও কম ছিল, যা সর্বসাকুল্যে প্রায় ২৫০০০ এর মত। ১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিলে সংঘটিত এই যুদ্ধটি পানিপথের প্রথম যুদ্ধ নামে খ্যাত এবং বাবর ও লোদীর মধ্যে প্রধান সংঘাত। যুদ্ধে ইব্রাহীম লোদী নিহত হন এবং তার বাহিনীকে পরাজিত করে তাড়িয়ে দেয়া হয়। বাবর দ্রুত দিল্লী এবং আগ্রা উভয়ের দখল নেন। ঐদিনই বাবর হুয়ায়ূনকে আগ্রা যাবার আদেশ দেন জাতীয় ধনসম্পদ লুটপাটের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। হুমায়ূন সেখানে রাজা গোয়ালিয়রের পরিবারকে পান। রাজা যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন এবং তার পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা লাভের আশায় হুমায়ূনকে একটি বড় হীরা দেন। এই হীরাটিকে বলা হত “কোহিনূর” বা আলোর পর্বত।“ ধারণা করা হয়, এটি তারা তাদের রাজ্য পূণরুদ্ধারের জন্য করে। এই পরিবারটিই গোয়ালিয়রের শাসনকর্তা ছিল, তবে তার পিছনে উপহারটির গুরুত্বের কথা জানা যায় না।

বাবর বিজয়ের তৃতীয় দিন দিল্লী পৌছেন। তিনি তার উপস্থিতি উদযাপিত করেন যমুনা নদীর তীরে এবং সেখানে শুক্রবার পর্যন্ত উত্‌সব স্থায়ী করা হয়। পরে মুসলমানেরা শোকরানা নামায আদায় করেন এবং এবং জামা মসজিদে তার নামে তিনি খুতবা শোনেন। পরে তিনি আগ্রার দিকে অগ্রসর হন ছেলের সাথে সাক্ষাতের জন্য। বাবরকে সেই পাথরটি দিয়ে গ্রহণ করে নেয়া হয়। বাবর বলেছিলেন, আমি তাকে এটি ফিরিয়ে দিলাম এবং একজন বিশেষজ্ঞ অলঙ্কারবিদ বললেন যে, এর মূল্য দিয়ে পৃথিবীর সকল লোককে আড়াই দিন খাওয়ানো যাবে। পরবর্তী দুইশ বছর এটি বাবর হীরা নামে পরিচিত ছিল।

দিল্লী ও আগ্রা দখলের পরও বাবর মেওয়ারের রাজপুত রাজ রানা সাংগার দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাতে লাগলেন। বাবরের অভিযানের আগে রাজপুতের জমিদারেরা সালতানাতের কিছু জাতি জয় করতে সমর্থ হয়েছিল। তারা বাবরের নতুন রাজ্যের দক্ষিণ পশ্চিমের একটি অঞ্চল সরাসরি শাসন করত যা রাজপতনা নামে পরিচিত ছিল। এটি কোন একতাবদ্ধ রাজ্য ছিল না, বরং এটি ছিল রানা সিংগার অধীন কিছু রাজ্যের সংগঠন। বাবরের লেখনীতে, রানা সাংগা একটি বাহিনী গঠন করে।… দশজন ক্ষমতাবান প্রধান, প্রত্যেকে পাগান হোস্টের নেতা, তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তবে তারা আলাদা থেকে যায় একজন উশৃঙ্খল নেতার জন্য।

নাসিরুদ্দিন মুহম্মদ হুমায়ুন ( (মার্চ ৬, ১৫০৮ফেব্রুয়ারি ২২, ১৫৫৬) মুঘল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সম্রাট, যিনি ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দ এবং ১৫৫৫ খ্রস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দুই দফায় আধুনিক আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং ভারতের উত্তরাঞ্চ রাজত্ব করেছেন।তিনি এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের পুত্র ছিলেন। তিনি তার পিতা বাবরের মতই তার রাজত্ব হারিয়েছিলেন, কিন্তু পারস্য সাম্রাজ্যের সহায়তায় পরিনামসরুপ আরও বড় রাজ্য পেয়েছিলেন।

হুমায়ূন (শাসনকাল : ১৫৩০-১৫৫৬) ভারতবর্ষের দ্বিতীয় মোঘল সম্রাট। প্রথম মোঘল সম্রাট জহিরউদ্দিন মোহাম্মদ বাবরের চার ছেলে ছিল_ হুমায়ূন, কামরান, হিন্দাল ও আসকরি (বাবরের মোট সন্তান ছিল ১৮; অন্যরা শৈশবে ইন্তেকাল করেন)। বাবরের প্রথম ছেলে হুমায়ুন ১৫০৮ সালের ৬ মার্চ কাবুলে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার মৃত্যুর তিনদিন পর হুমায়ূন ১৫৩০ সালের ২৯ ডিসেম্বর দিল্লীতে সিংহাসনে আরোহণ করেন। মারা যান ১৫৫৬ সালে। মাঝে ১৬ বছর ছিলেন সিংহাসনচ্যুত। ১৫৩৯সালের ২৬ জুন চৌসায় এবং পরের বছর কৌনজে শেরশাহের কাছে হেরে সিংহাসন হারান। সিংহাসনচ্যুত অবস্থাতেই ১৫৪২ সালে আকবর জন্মগ্রহণ করেন। ১৫৫৫ সালের ২২ জুন সেরহিন্দের যুদ্ধে জয়ের মাধ্যমে তিনি পুনরায় সিংহাসন লাভ করেন। পরের বছরই তথা ১৫৫৬ সালের ২৪ জানুয়ারি মাগরিবের নামাজ আদায় করার জন্য লাইব্রেরি থেকে দ্রুত নামতে গিয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। এ সময় তার অধিকৃত এলাকা ছিল সীমিত। তবে তিনি যদি অংশ বিশেষ হলেও সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে না পারতেন, তবে মোঘল ইতিহাস সৃষ্টি হতো কিনা তা নিয়ে যথেস্ট সংশয় আছে। হুমায়ূন ছিলেন মার্জিত আচরণের অধিকারী। দয়ালু হিসেবেও তার সুনাম ছিল। তার চরিত্রের একমাত্র ত্রুটি ছিল তিনি ছিলেন আফিমে আসক্ত। এই আসক্তি তাকে সেনানায়ক ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আপন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল।

জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবর ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট। পিতা সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যুর পর ১৫৫৬ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে আকবর ভারতের শাসনভার গ্রহণ করেণ। বৈরাম খানের তত্ত্বাবধানে তিনি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সাম্রাজ্য বিস্তার করতে থাকেন। ১৫৬০ সালে বৈরাম খানকে সরিয়ে আকবর নিজে সকল ক্ষমতা দখল করেণ। কিন্তু আকবর ভারতবর্ষআফগানিস্তানে তার সাম্রাজ্য বিস্তার চালিয়ে যান। ১৬০৫ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় সমস্ত উত্তর ভারত তার সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে। আকবরের মৃত্যুর পর তার পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীর ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করেণ।

সাম্রাজ্যের রাজপুতদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার স্বার্থে আকবর বিভিন্ন রাজবংশের রাজকন্যাদের বিয়ে করেণ। তবে তার স্ত্রীদের মধ্যে সবচাইতে আলোচিত হলেন যোঁধা বাঈ

রাজ্য শাসনের জন্য আকবর আমলাতন্ত্র চালু করেন এবং প্রদেশগুলোকে স্বায়ত্বশাসন দান করেন। আকবরের আমলাতন্ত্র বিশ্বের সবথেকে ফলপ্রসু আমলাতন্ত্রের মধ্যে অন্যতম। তিনি প্রত্যেক অঞ্চলে সামরিক শাসক নিয়োগ দেন। প্রত্যেক শাসক তার প্রদেশের সেনাবাহিনীর দায়িত্বে ছিল। ক্ষমতার অপব্যবহারের শাস্তি ছিল একমাত্র মৃত্যুদন্ড

আকবর বুঝতে পেরেছিলেন, যে রাজপুতরা শত্রু হিসাবে প্রবল, কিন্তু মিত্র হিসাবে নির্ভরযোগ্য। আকবরের শাসনকালে তিনি রাজপুতদের সাথে সন্ধি করার প্রয়াস করেছিলেন। কিছুটা যুদ্ধের দ্বারা, এবং অনেকটাই বিবাহসূত্রের দ্বারা তিনি এই প্রয়াসে সফল হয়েছিলেন। অম্বরের রাজা ভর মল্লের কন্যা জোধাবাঈ-এর সাথে তার বিবাহ হয়। ভর মল্লের পুত্র রাজা ভগবন দাস আকবরের সভায় নবরত্নের একজন ছিলেন। ভগবন দাসের পুত্র রাজা মান সিংহ আকবরের বিশাল সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন। রাজা টোডর মল্ল ছিলেন আকবরের অর্থমন্ত্রী। আরেক রাজপুত, বীরবল, ছিলেন আকবরের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ও প্রিয়পাত্র। বেশিরভাগ রাজপুত রাজ্য যখন আকবরের অধীনে চলে আসছে, তখন একমাত্র মেওয়ারের রাজপুত রাজা মহারানা উদয় সিংহ মুঘলদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। চিতোরের পতনের পর তিনি উদয়পুর থেকে মেওয়ার শাসন করতেন। তার সুযোগ্য পুত্র মহারানা প্রতাপ সিংহ সারা জীবন মুঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছিলেন। মেওয়ারের রাজপুতরাই একমাত্র রাজপুত জাত যাদের কে আকবর তার জীবদ্দশায় জয় করে যেতে পারেননি।

আকবর তার নিজস্ব ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দীন-ই-ইলাহি নামক ধর্ম চালু করার চেষ্টা করেন।

দীন-ই-ইলাহি

সম্রাট আকবর ধর্মীয় ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন।তিনি ধর্মীয় বিষয়ে গবেষণার জন্য ১৫৭৫ খ্রী আকবর ফতেপুর স্রিকিতে একটা উপাসনা ঘর তৈরী করেন।যা’ধর্ম সভা’ নামে পরিচিত।সেখানে তিনি বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের কথা শুনতেন।অবশেষে সকল ধর্মের সারকথা নিয়ে তিনি নতুন একটি নিরপেক্ষ ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করেন।এটিই ‘দীন-ই-ইলাহি'(১৫৮২) নামে পরিচিত।তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা এই ধর্মমত কে ভালভাবে গ্রহন করতে পারেনি।অনেক ঐতিহসিক দীন-ই-ইলাহীকে নতুন ধর্ম বলতে অস্বীকার করেন।এই ধর্মমত সম্রাট আকবর কে বিতর্কিতও করে তুলেছিল।

জোধাবাই

হীরাবাঈ ছিলেন রাজস্থানের রাজপুত ঘারানার রাজা ভারমালের জ্যেষ্ঠ কন্যা।হীরাবাঈ ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দের পহেলা অক্টোবার জন্মগ্রহণ করেন।মৃত্যুবরণ করেন ১৯মে,১৬২৩ খ্রিস্টাব্দে,প্রায় ৮১ বছর বয়সে।তিনি রাজা ভগবান দাসের বোন ও রাজা মানসিং এর ফুপু ছিলেন।তিনি আকবরের ১ম রাজপুত স্ত্রী।সম্রাট আকবারের সাথে তার বিবাহ হয় তিনি ১৫৬২ খ্রিস্টাব্দের ৬ই ফেব্রুয়ারী।তিনি শাহাজাদা সেলিমের অর্থাত্‍ সম্রাট জাহাঙ্গীরের মা।তার আসল নাম রাজকুমারী হীরা কুমারী।আবার তার নাম যোধাবাঈ ছিল নাকি তা নিয়ে বির্তক রয়েছে।তবে বিয়ের পরে তিনি মরিয়ম উজ-জামানী নাম ধারন করেন। তিনি ছিলেন ‘আমের’ রাজেযযর রাজকুমারী। তাঁর মায়ের নাম হল ‘ময়নাবতী’ এবং তাঁর বোনের নাম হল ‘সুকন্যা দাস’। তাঁর মৃত্যু হয়েছিল সম্ভবত ১৬২৩ খৃষ্টাব্দে।

আকবরের সভাসদ দের মধ্যে নবরত্ন হিসেবে যারা ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছেন,

শেখ আবুল ফজল ইবন মুবারক (১৪ জানুয়ারি, ১৫৫১১২ অগস্ট ১৬০২) ছিলেন মুঘল সম্রাট আকবরের প্রধানমন্ত্রী। তিনি আবুলফজল, আবুল ফদলআবুল ফদলআল্লামি নামেও পরিচিত। তিনি তিন খণ্ডে রচিত আকবরের রাজত্বকালের সরকারি ইতিহাস গ্রন্থ আকবরনামা ও উক্ত গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ড আইন-ই-আকবরি-এর রচয়িতা এবং বাইবেলের একটি ফার্সি অনুবাদের অনুবাদক। পারিবারিক সূত্রে তিনি ছিলেন আকবরের সভাকবি ফৈজির কনিষ্ঠ ভ্রাতা।

আবুল ফজল ছিলেন রেল সিন্ধ নিবাসী শেখ মুসার অধস্তন পঞ্চম পুরুষ। তাঁর পিতামহ শেখ খিজির নাগৌরে বসতি স্থাপন করেন। এখানেই আবুল ফজলের পিতা শেখ মুবারকের জন্ম হয়। প্রথম দিকে শেখ মুবারক নাগৌরে খ্বাজা আহররের নিকট পঠনপাঠন করেন। পরে তিনি আহমদাবাদে গিয়ে শেখ আবুল ফজল, শেখ উমর ও শেখ ইউসুফের কাছে পড়াশোনা করেছিলেন। পরে তিনি আগ্রায় বসতি স্থাপন করেন। সেখানেই তাঁর জ্যৈষ্ঠ পুত্র শেখ ফৈজি ও কনিষ্ঠ পুত্র আবুল ফজলের জন্ম হয়। ১৫৭৫ সালে আবুল ফজল আকবরের রাজসভায় আসেন। ১৫৮০ ও ১৫৯০-এর দশকে আকবরের মতাদর্শে যে উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়েছিল, তাঁর পশ্চাতে আবুল ফজলের একটি প্রভাব কার্যকরী ছিল। আবুল ফজল দাক্ষিণাত্যে মুঘল সেনাবাহিনীরও নেতৃত্ব দান করেছিলেন।

জানা যায়, আবুল ফজল যুবরাজ সেলিমের সিংহাসনে আরোহণের বিরোধিতা করেছিলেন। এই কারণে সেলিমের ষড়যন্ত্রে নারওয়ারের নিকট সরাই বীর ও অন্ত্রীর মধ্যবর্তী কোনো এক স্থানে বীর সিংহ বুন্দেলার হস্তে তিনি নিহত হন। তাঁর ছিন্ন মস্তক এলাহাবাদে সেলিমের নিকট পাঠানো হয়েছিল। আবুল ফজলকে অন্ত্রীতে সমাধিস্থ করা হয়। উল্লেখ্য, আবুল ফজলের ঘাতক বীর সিংহ বুন্দেলা পরে ওরছার শাসক হয়েছিলেন এবং ১৬০২ সালে যুবরাজ সেলিম জাহাঙ্গির নাম ধারণ করে মুঘল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। পরে ১৬০৮ সালে জাহাঙ্গির আবুল ফজলের পুত্র শেখ আবদুর রহমান আফজল খানকে (২৯ ডিসেম্বর, ১৫৭১ – ১৬১৩) বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন।

আকবরনামা ছিল তিন খণ্ডে রচিত আকবরের শাসনকাল ও তাঁর পূর্বপুরুষদের ইতিহাস। এই গ্রন্থে তৈমুর থেকে হুমায়ুন পর্যন্ত আকবরের পূর্বপুরুষদের জীবনকথা এবং আকবরের রাজত্বকালের ৪৬ বছরের (১৬০২ সাল পর্যন্ত) বিবরণী লিখিত আছে। আইন-ই-আকবরি নামে আকবরের সাম্রাজ্যের একটি প্রশাসনিক প্রতিবেদনও এই গ্রন্থে সংযোজিত হয়েছে। আইনআকবরি গ্রন্থ থেকে লেখকের জীবন ও পুর্বপুরুষদের একটি বর্ণনাও পাওয়া যায়। আইন-ই-আকবরি গ্রন্থে আকবরের রাজত্বকালের ৪২ বছরের সম্পূর্ণ ও ৪৩তম বছরের বেরার জয় পর্যন্ত ইতিহাস লিখিত রয়েছে।

রাকাত বা রাকাতআবুল ফজল হল মুরাদ, দানিয়াল, আকবর, মারিয়াম মাকানি, সেলিম (জাহাঙ্গির), আকবরের রানি ও কন্যাগণ, তাঁর পিতা, মাতা, ভ্রাতৃগণ, ও একাধিক সমসাময়িক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে লিখিত আবুল ফজলের পত্রাবলি। এই গ্রন্থটি সম্পাদনা করেন তাঁর ভাগিনেয় নুর আল-দিন মুহাম্মদ।

ইনশাআবুল ফজল বা মক্তবাৎআল্লামি হল আবুল ফজল কর্তৃক লিখিত সরকারি প্রতিবেদনের সংগ্রহ। এই গ্রন্থ দুটি খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ডে তুরানের আবদুল্লাহ্ খান উজবেগ, পারস্যের শাহ আব্বাস, খান্দেসের রাজা আলি খান, আহমদনগরের বুরহান-উল-মুলক, ও আবদুর রহিম খান খানান প্রমুখ নিজ অভিজাতবর্গকে লিখিত আকবরের পত্রাবলির সংকলন। দ্বিতীয় খণ্ডে রয়েছে আকবর, দানিয়েল, মির্জা শাহ রুখ ও খান খানানকে লিখিত আবুল ফজলের পত্রাবলি। এই গ্রন্থের সংকলক আব্দুস সামাদ।

আইনআকবরি  খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত সম্রাট আকবরের প্রশাসনের বিস্তারিত বর্ণনাসমৃদ্ধ একটি নথি। এই গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন আকবরের প্রধানমন্ত্রী আবুল ফজল ইবন মুবারক। এটি আবুল ফজল রচিত গ্রন্থ আকবরনামা তৃতীয় তথা বিস্তারিত শেষ খণ্ড। আইনআকবরি তিন ভাগে বিভক্ত।

আইনআকবরি নথিটি ছিল আকবরের সাম্রাজ্যের আইন অর্থাৎ প্রশাসনিক তথ্যপুস্তক ও রাজস্ব পরিসংখ্যানের হিসাবনিকাশ। ১৫৯০ সালে লিখিত এই গ্রন্থে সেযুগের হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মাচরণ সম্পর্কেও নানা তথ্য জানা যায়।

আইনআকবরি পাঁচটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে রয়েছে সম্রাটের গৃহস্থালীর বিবরণী; দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে সম্রাটের সেবক, সেনাবাহিনী ও রাজকর্মচারীদের কথা; তৃতীয় ভাগে রয়েছে সাম্রাজ্যের প্রশাসন, বিচারবিভাগীয় নির্দেশিকা ও কার্যনির্বাহী দপ্তরগুলির বর্ণনা; চতুর্থ ভাগে রয়েছে হিন্দু দর্শন, বিজ্ঞান, সামাজিক রীতিনীতি ও সাহিত্য সংক্রান্ত তথ্যাবলি; পঞ্চম ভাগে রয়েছে আকবরের বচনাবলি এবং লেখকের সংক্ষিপ্ত বংশাবলি তথ্য ও জীবনী।

মিয়া তানসেন (১৫০৬১৫৮৯) প্রায় সকল বিশেষজ্ঞের ধারণা মতে উত্তর ভারতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞ। বর্তমানে আমরা যে হিন্দুস্তানী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সাথে পরিচিত তার মূল স্রষ্টা হলেন এই তানসেন। তার এই সৃষ্টি যন্ত্র সঙ্গীতের এক অনবদ্য অবদান। বহু প্রাচীনকালে সৃষ্টি হলেও এখন পর্যন্ত এর প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে। তার কর্ম এবং বংশীয় উত্তরাধিকারীদের মাধ্যমেই মূলত এই ধারাটি আজও টিকে রয়েছে। তিনি মুঘল বাদশাহ আকবরের রাজদরবারের নবরত্নের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তাকে সঙ্গীত সম্রাট নামে ডাকা হয়।

তানসেন ভারতের গোয়ালিয়রে এক হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মুকুন্দ মিস্ত্র ছিলেন একজন কবি। ছোটবেলায় তার নাম ছিল তনু মিস্ত্র। তার বাবা মূলত বিহাটের বাসিন্দা ছিলেন। ছেলের জন্মে তিনি অতি আনন্দিত হন এবং এই জন্মের পিছনে সাধু গাউসের আশীর্বাদ রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন। ছেলের নাম রাখেন রামতনু (রামতনু মিস্ত্র)। ছোটবেলা থেকেই তানসেন সঙ্গীত শিক্ষা করতে শুরু করেন। এই শিক্ষায় তার গুরু ছিলেন বৃন্দাবনের তৎকালীন বিখ্যাত সঙ্গীত শিক্ষক হরিদাস স্বামী। মাত্র ১০ বছর বয়সে তার মেধার ক্ষমতা প্রকাশিত হয়। তার মেধা দেখে স্বামীজি বিস্মিত হন এবং তার বাবাকে বলে নিজের সাথে বৃন্দাবন নিয়ে যান। এই বৃন্দাবনেই তানসেনের মূল ভিত রচিত হয়। বিভিন্ন রাগের সুষ্ঠু চর্চার মাধ্যমে তিনি বিখ্যাত পণ্ডিত শিল্পীতে পরিণত হন। অনেক বিখ্যাত হওয়ার পরও তাই তিনি সময় পেলেই বৃন্দাবন আসতেন।

বৃন্দাবন থেকে বিহাটে ফিরে তানসেন শিব মন্দিরে সঙ্গীত সাধনা শুরু করেন। লোকমুখে বলতে শোনা যায়, তার সঙ্গীতে মন্দিরের দেয়াল আন্দোলিত হত। স্থানীয়রা পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, তানসনের সঙ্গীতের কারণেই মন্দিরটি এক দিকে একটু হেলে পড়েছে। তানসেন সম্বন্ধে আরও কিছু অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন: বৃক্ষ ও পাথরকে আন্দোলিত করা, নিজ থেকেই বাতি জ্বালানো এবং যখন বৃষ্টির কোন চিহ্নই নেই তখন বৃষ্টি আনয়ন। বাবা-মার মৃত্যুর পর তিনি হযরত গাউসের নিকট আসেন।তিনি একই সাথে তানসেনের সাঙ্গীতিক ও আধ্যাতিক গুরু ছিলেন।তবে তানসেন ইসলাম গ্রহন করেছিলেন কি না তা নির্ভরযোগ্য ভাবে জানা যায় না।এর পক্ষে ও বিপক্ষে দুইদিকেই প্রচুর মত পাওয়া যায়।যাই হোক, শিক্ষা শেষে তিনি মেওয়া বান্ধবগড়ের রাজা রামচন্দ্রের রাজকীয় আদালতে সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে যোগ দেন। এরপর তিনি মুঘল বাদশাহ আকবরের রাজ দরবারে নবরত্নের একজন হিসেবে সঙ্গীতের সাধনা শুরু করেন। তানসেনের দুজন স্ত্রী ও পাচ সন্তানের খবর পাওয়া যায়।সন্তানদের নাম ঃহামিরসেন,সুরাটসেন,বিলাস খান,তান্সান্স খান,সরস্বতী দেবী।

গোয়ালিয়রের মহান সুফি সাধক শেখ মুহাম্মদ গাউসের সমাধি কমপ্লেক্সেই মিয়া তানসেনে সমাধি রচিত হয়েছিল। এখনও এটি বিদ্যমান রয়েছে। শেখ মুহাম্মদ গাউস ষোড়শ শতাব্দীর অন্যতম সুফী দরবেশ ও ফকির ছিলেন। সকল ধর্ম বিশ্বাসের লোকের কাছে তিনি সনামধন্য ছিলেন। গাউস এবং তানসেনের দুইটি সমাধি পাশাপাশি রয়েছে। এছাড়াও এই সমাধি সৌধে অন্যান্য কবর রয়েছে। প্রথাগত মুঘল স্টাইলে এই কমপ্লেক্সটি তৈরি করা হয়েছে। সমাধি ক্ষেত্রটি একটি বিশাল বর্গাকার মাঠের মত যার কেন্দ্র রয়েছে ষড়ভূজ আকৃতির কিছু স্তম্ভ। সমাধি সৌধের দালানগুলোর দেয়ালের মধ্যে পাথর কেটে নকশা করা হয়েছে। দেয়ালের একেক অংশে নকশা একেক রকম। পুরো দালানের উপর বিস্তৃত অংশ জুড়ে একটি বৃহৎ মিনার রয়েছে যা একসময় নীল রঙা টাইল্‌স দ্বারা আবৃত ছিল। সাধু গাউসের সমাধির ডান পাশে তানসেনের সমাধি অবস্থিত। সমাধিটি একটি বর্ধিত আয়তাকার কাঠামোর উপর অবস্থিত। কাঠামোটি মার্বেল পাথর দ্বারা নির্মিত। এর চারদিকে ছাঁইচবিশিষ্ট (eaves) প্যাভিলিয়ন রয়েছে যা বিভিন্ন নকশায় সুশোভিত।

বীরবল  অথবা রাজা বীরবল  আকবরের মোঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম সভ্য ছিলেন। তিনি তাঁর চতুরতার জন্যই তিনি মূলত সকলের কাছে সুপরিচিত। তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন। এবং ১৫৫৬-১৫৬২ সালের দিকে একজন কবিগায়ক হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে তিনি সম্রাটের অত্যন্ত কাছের হয়ে পড়েন এবং নানা সেনা অভিযানে যান যদিও প্রকৃতপক্ষে তিনি এই বিষয়ে কোনরুপ শিক্ষা নেননি। ১৫৮৬ সালের সম্রাট তাকে ভারতের উত্তর-দক্ষিণ দিকে (বর্তমান আফগানিস্তান) পাঠান। কিন্তু এই অভিযান অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয় এবং বিদ্রোহী উপজাতিদের আক্রমণে বহু সৈন্যসহ বীরবল মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু সম্রাটকে অত্যন্ত ব্যথিত করে।

আকবরের শাসনামলের শেষের দিকে তাঁর ও বীরবলের মধ্যকার মজার ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকে। এই কাহিনীগুলোতে তাঁকে অত্যন্ত চতুর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ধীরে ধীরে এই কাহিনী পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে জনপ্রিয় হয়। এই গল্পে তিনি তাঁর পরিপার্শ্বের সকলকে এবং স্বয়ং সম্রাটকেও বোকা বানান। বিংশ শতাব্দির দিক থেকে এই কাহিনীর উপর নাটক, চলচ্চিত্র এবং বই লেখা হতে লাগে। বর্তমানে পাঠ্যবইয়ের এই কাহিনীকে স্থান দেয়া হয়েছে।

ভারতের উত্তর প্রদেশের কল্পি নামক স্থানে ১৫২৮ সালের মহেশ দাস হিসেবে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ফোকলোর অনুযায়ী, স্থানটি যমুনার তীরবর্তী তিকওয়ানপুর।তাঁর পিতা গঙ্গা দাস এবং মাতা অনভা দাবিত। তিনি হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের তৃতীয় সন্তান।পরিবারটির পূর্ব হতেই কবিতাসাহিত্য সম্পর্কে অনুরাগ ছিল।

তিনি হিন্দি, সংস্কৃতপার্সিয়ান ভাষায় জ্ঞানার্জন করেন। তিনি সংগীত এবং ব্রজ কবিতায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তিনি সংগীতে ছন্দ প্রয়োগের ব্যাপারে অত্যন্ত দক্ষ হয়ে ওঠেন। তিনি তাঁর কবিতা ও গানের কারনে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। তিনি রেবার রাজা রাম চন্দ্রের রাজপুত কোর্টে ব্রাহ্ম কবি নামে কাজ করেন। তাঁর অবস্থার উত্তরণ ঘটে যখন তিনি একটি সম্মানিত এবং ধনী পরিবারের এক কণ্যাকে বিয়ে করেন। ইমপিরিয়াল কোর্টে কাজ করার পূর্বে তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভাল ছিল না।

ধারণা করা হয়, ১৫৫৬ থেকে ১৫৬২ সালের মধ্যে তাঁর সাথে আকবরের প্রথম দেখা হয়। এর কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি সম্রাটের কবি রাই হন।আকবর তাঁকে বীরবল নাম দেন এবং রাজা উপাধীতে ভূষিত করেন। এরপর থেকে তিনি এই নামেই পরিচিত হন।

বীরবল নামটি এসেছে বীর বর থেকে যার মানে সাহসী এবং মহান। কিন্তু এই উপাধীটা কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক, কারণ তিনি রণকৌশলে তেমন দক্ষ ছিলেন না। আকবর তাঁর হিন্দু সভাষদদের তাদের ঐতিহ্যানুযায়ী নাম প্রদান করতেন। এস.এইচ হোদিভালা বলেন, এই নামগুলো বেতাল পঞ্চবিংশতী হতে নেয়া হতে পারে। কারণ উক্ত বইয়ের বীর বর নামক এক চরিত্র একজন বিচারককে অনেক সম্মান প্রদর্শন করেন। আকবর সাহিত্য বিষয়ের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তিনি সংষ্কৃত ও ভাষার বই পার্সিতে অনুবাদ করতেন।

বীরবলের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা তাঁকে সম্রাট আকবরের নয়জন উপদেষ্টা, অর্থাৎ নবরত্নের একজন করে দেয়। অন্যান্য রত্নরা হলেন টোডার মল, মান সিংহ, ভগবান দাস প্রভৃতি। ক্রমেই তিনি একজন ধর্মীয় উপদেষ্টা, সামরিক কর্মকর্তা এবং সম্রাটের নিকট বন্ধু হয়ে পড়েন। সম্রাটকে তিনি প্রায় ৩০ বছর সেবা দান করেন।

১৫৭২ সালে সম্রাট তাঁকে ও এক বিশাল সেনাবাহিনীকে শের আফগান কোয়ালি খানকে তাঁর বড় ভাই হাকিম মির্জার আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য পাঠান। এটিই ছিল তাঁর প্রথম সামরিক অবদান। যদিও তাঁর কোন সামরিক অভিজ্ঞতা ছিল না, তথাপি অন্যান্য উপদেষ্টাদের মত, যেমন টোডার মল অর্থনীতিতে অবদান রাখেন, ঠিক সেইরুপ তাঁকে সম্রাট বিভিন্ন অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে পাঠান।

আবুল ফজল এবং আবদুল কাদির বাদওয়ানি কোর্টের ঐতিহাসিক ছিলেন। যদিও ফজল বীরবলকে সম্মান করত এবং তাঁকে প্রায় পঁচিশটি সম্মানজনক উপাধী দেয় ও দু’হাজার অভিযানের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন, কাদির হিন্দু হওয়ায় বীরবলকে সহ্য করতে পারত না। সে বীরবলকে বাস্টার্ড বলত এবং লিখত কিভাবে একজন ব্রাহ্মণ সংগীতশিল্পী হয়ে সে সম্রাটের এত প্রিয় ও বিশ্বাসভাজন হয়ে ওঠে।কিন্তু একই সময়ে আকবরের অন্যান্য মুসলিম সভাষদরা তাঁর প্রতিভা সম্পর্কে অবগত হয়েও তাঁকে পছন্দ করতেন না বলে জানা যায়।

আকবর দীন-ঈ-ইলাহি নামের একটি ধর্ম প্রচার করেন। এই ধর্ম হিন্দুধর্মইসলাম ধর্ম-এর সংমিশ্রণে তৈরি করা হয় এবং এই ধর্মমতে আকবর পৃথিবীতে এই সৃষ্টিকর্তার প্রেরিত মানুষ। আইনআকবরী অনুযায়ী বীরবল আকবর ছাড়া সেই সমস্ত মানুষের একজন ছিলেন যারা এই ধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং এই ধর্ম গ্রহণকারী একমাত্র হিন্দু ব্যক্তি।সম্রাটের সাথে বীরবলের সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর ছিল, যদিও তিনি সম্রাটের চেয়ে চৌদ্দ বছরের ছোট ছিলেন। নবরত্নের মধ্যে বীরবল ছিল সবচাইতে দামি রত্ন। বাদওয়ানী একে বিকৃত করে বলে, “তাঁর দেহ আমার দেহ, তাঁর রক্ত, আমার রক্ত”। আকবর দুইবার বীরবলের প্রাণ রক্ষা করেন বলে জানা যায়।

কলকাতার ভিক্টোরিয়া হলে অবস্থিত আকবরী নয় রত্ন-এ দেখা যায়, বীরবল ঠিক আকবরের পরের স্থানেই আছেন। প্রথমে বীরবল সম্রাটকে বিনোদন দিলেও পরবর্তীতে তাঁকে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে পাঠানো হয়। বীরবল সম্রাটের কাছ থেকে একটি দোতলা বাড়ি লাভ করেন, যা সম্রাটের প্রাসাদের সীমানার মধ্যে ছিল। তিনি বীরবলকে কাছে পেয়ে বেশ আনন্দিত ছিলেন এবং তিনিই একমাত্র সভাষদ ছিলেন যিনি সম্রাটের প্রাসাদের চত্বরের মধ্যে স্থান পান। আকবরের প্রাসাদের সাতটি দরজার একটির নাম ছিল বীরবলের দরজা (বীরবলস গেট বা Birbal’s Gate)

ফোক গল্পে, তাঁকে সর্বদাই ধার্মিক হিন্দু হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি আকবরের চেয়ে বয়সে ছোট, বিরুদ্ধ মুসলিম, যারা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত, তাদের বিরুদ্ধে দৃঢ়। তাঁর সাফল্যের কারণ ছিল তাঁর দক্ষতা। এভাবে তিনি তাঁর বুদ্ধিমত্তা এবং ধারাল কথার সাহায্যে সম্রাটের উপর ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত প্রভাব খাটান। যদিও ঐতিহাসিকভাবে তিনি কখনই এমনটা করেননি।

বাদওয়ানী তাঁকে অবিশ্বাস করত, যদিও তিনি বীরবল সম্পর্কে বলেন, “প্রচুর ক্ষমতা এবং প্রতিভা ধারণকারী”। ব্রজ ভাষার কবি রাই হোল আকবর এবং তাঁর নবরত্নকে প্রশংসা করেন এবং বীরবলের মহত্বের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। আবুল ফজল তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন মূলত তাঁর আত্মিক গুরুত্ব এবং সম্রাটের বিশ্বাসভাজন হিসেবে, তাঁর চতুরতা কিংবা কবিতার জন্য নয়।

আধুনিক হিন্দু ঐতিহাসিকগণ মনে করেন, তিনি আকবরকে বিভিন্ন সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছেন এবং সনাতন মুসলিমরা তাঁকে হেয় করত কারণ তাঁর কারণে সম্রাট ইসলামকে অবজ্ঞা করতেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যার কারণে বলা যায় তিনি সম্রাটকে তাঁর ধর্মের উপর প্রভাব খাটাতেন।বরং বিভিন্ন স্থান হতে জানা যায় যে তিনি সম্রাটের রাজনীতির উপর বেশ প্রভাব খাটাতেন। বীরবলের প্রতি সম্রাটের ভালবাসা, তাঁর ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সামাজিক স্বাধীনতাই এর কারণ ছিল, বীরবল নয়। ইতিহাস অনুযায়ী তিনি আকবরের ধর্মীয় নীতি এবং ধর্ম দীনইলাহির সমর্থক ছিলেন। আইনআকবরী-এ পতিতা সম্পর্কিত একটি ঘটনায় বীরবলের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে জানা যায়, যেখানে আকবর তাকে শাস্তি দিতে চান কারণ কিভাবে তাঁর মত একজন ধার্মিক ব্যক্তি এমন একটা কাজ করতে পারেন।

ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে আফগানিস্তানের ইন্দু নদীর তীরে ইউসুফজাই উপজাতি মোঘল শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ১৫৮৬ সালের অনেক সৈন্য হতাহতের পর আকবর তাঁর নতুন দুর্গ এটক হতে বীরবলকে এক সেনাদলের সাথে উক্ত স্থানে কমান্ডার জইন খানকে সাহায্য করার জন্য পাঠান। বীরবল পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হন।কিন্তু আফগানরা আগে থেকেই সেখানে প্রস্তুত হয়ে ছিলেন। এক মারাত্মক হামলায় বীরবল সহ প্রায় ৮০০০ সৈন্য উক্ত স্থানে মারা যান এবং বীরবলের দেহ আর কখনই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এটি ছিল আকবরের সর্ববৃহৎ সামরিক ব্যর্থতা এবং সেনা ধ্বংসের ঘটনা। এই ঘটনার ফলশ্রুতিতে আকবর প্রচন্ড শোকাহত হন এবং তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সভাষদের মৃত্যুতে তিনি টানা দুইদিন কোনরুপ খাদ্য কিংবা পানীয় গ্রহণ করেননি। তিনি আরো বেশি যন্ত্রণাকাতর হন কারণ হিন্দু শবদাহ রীতির ফলে তিনি বীরবলের দেহ আর কোনদিনই দেখতে পাননি। তিনি এই ঘটনাকে তাঁর সিংহাসন লাভের পর সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটয়না বলে অভিহিত করেন।

বাদওয়ানী লেখেন,

সম্রাট বীর বরের মৃত্যুর পর যে সম্মান দেখান, আর কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি। তিনি বলেন, “হায়! তাঁরা ওর দেহটাও ফিরিয়ে আনতে পারল না, তাহলে তা দাহ করা যেত।” কিন্তু শেষে তিনি নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দেন যে বীর বর এখন সকল পার্থিব প্রতিবন্ধকতা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং স্বাধীন। এবং তাঁর জন্য সূর্যরশ্মিই যথেষ্ট, তাঁকে আগুনে পোড়াবার কোন প্রয়োজন নেই।

আকবরের শাসনামলের প্রায় একশ’ বছর পর এক গল্পগুলোর উদ্ভব হয়। মোঘল বীরদের জীবনী মহাথীর আকউমরা-এ বীরবলকে তাঁর কাব্য এবং চতুরতার জন্য উন্নত ভাগ্যের অধিকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর চতুরতার প্রশংসা করা হয় এই বলে যে তাঁর বুদ্ধিমত্তা সেই সময়ে উত্তর ভারতে ক্রমশ জনপ্রিয় হয় কারণ তখন আকবরের কারণে মোঘল শাসন কিছুটা সাম্যাবস্থায় এসেছে। একইভাবে, রাজা এবং তাঁর প্রত্যুৎপন্নমতি মন্ত্রীদের কাহিনী ভারতে এর আগে থেকেই জনপ্রিয়। তন্মধ্যে তেনালী রমন ও রাজা বিজয়নগর এবং গোপাল ভাঁড়নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র উল্লেখযোগ্য।বীরবলের কাহিনীগুলো নানা ভঙ্গিতে বলা হয় যার একটি বলা হয় আরব্য রজনীর মত করে। কয়েক বছর পরে মোল্লা দো পেঁয়াজার উদ্ভব ঘটে। এগুলো ১৯০০ সালের দিকে লেখেন এক মুসলিম লেখক। তিনি আকবরের সময়কার এক পার্সিয়ান ব্যক্তি থেকে অনুপ্রানিত হন। তিনি ছিলেন বীরবলের কাহিনীগত মুসলিম প্রতিরুপ এবং সনাতন মুসলিম ধর্মীয় প্রবক্তা এক চরিত্র। কিছু গল্পে তিনি আকবর ও বীরবল দুজনকেই উৎকৃষ্ট হিসেবে দেখিয়েছেন, আবার কিছু গল্পে তাঁকে অযত্নে দেখানো হয়েছে।

সি.এম. নাঈম লেখেন যে এই কাহিনীগুলোকে ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে এরা তখনকার রাজনৈতিক ইতিহাসকে দেখিয়েছে। “আকবর ও বীরবল” কাহিনীগুলো একজন হিন্দু কথকের মোঘল শাসনের প্রতি পক্ষপাত দেখায়। আকবরকে এই কাহিনীগুলোতে কিছুটা খারাপ হিসেবে দেখানো হয় এবং বীরবল সর্বদাই শ্রেষ্ঠ হয়। প্রতিটিবারেই সেখানে একজন শক্তিশালী শাসক থাকেন যিনি অত্যন্ত শক্তিশালী ভাবে তাঁর শাসন কাজ করছিলেন। তাঁর সাথে একজন হাস্য-রসাত্মক মন্ত্রী থাকতেন যার চতুরতা অত্যন্ত ধারালো এবং যার জনপ্রিয়তা কিংবদন্তীতুল্য ছিল। এই রসিকতা এবং কাহিনীগুলো আকবরসহ প্রায় সকল শক্তিশালী শাসককে নিয়েই হয়েছে, কারণ তিনি মানুষকে অনুপ্রাণিত করতেন, তাঁদের সাথে অনেক বেশি মিশতেন। নাঈম আরো বলেন যে অন্য কোন সভাষদকে না নিয়ে বীরবলকে নেয়ার কারণ হচ্ছে তিনি একজ ব্রাহ্মণ যিনি ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী এক চরিত্র।

এই কাহিনীগুলো মূলত মুখে মুখে করে চলে এসেছে।এতে গুরত্ব দেয়া হয় কিভাবে সে অন্যান্য বিরোধী সভাষদদের টেক্কা দেয়, যারা তাঁকে সম্রাটের চোখে খাটো করতে চাইত। সাধারণত সে হাস্যকরভাবে এবং তীক্ষ্ণ ও বুদ্ধিমান উত্তর দিয়েই সমস্যার সমাধান করত। শেষে আকবর অবাক হতেন এবং মজা পেতেন। কিছু গল্পে আকবরই বীরবলকে একটি কবিতার লাইন দিয়ে কবিতাটি শেষ করতে বলত এবং কিছু গল্প সাধারণ হাস্য-রসাত্মক। প্রায় অসম্ভব এক পরিস্থিতিতে সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কিভাবে তা অতিক্রম করতে বস্তুত তাই এই কাহিনীত মূল বিষয়।

আকবর ও বীরবলের গল্পগুলো আমার চিত্র কথাচাঁদমামা বইয়ে আছে।শিশুতোষ বই এবং আরো নানা কমিক বইয়েও এই কাহিনীগুলোকে সংরক্ষণ করা হয়েছে।এছাড়া বেশকিছু পেপারব্যাক মুদ্রণ, চলচ্চিত্র, পাঠ্যবই, বইয়ের তালকা এবং নাটকেও এই চরিত্রগুলো মুখ্য।ভারতের টিভি চ্যানেল কার্টুন নেটওয়ার্ক ছোটা বীরবলআকবর এন্ড বীরবল নামের দুটো টেলিভিশন ধারাবাহিক প্রচার করেছে।

নুরুদ্দীন মহম্মদ সেলিম বা জাহাঙ্গীর (আগস্ট ৩০, ১৫৬৯অক্টোবর ২৮, ১৬২৭) ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের চতুর্থ সম্রাট। তিনি ১৬০৫ সাল থেকে তার মৃত্যু অবধি ১৬২৭ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

জাহাঙ্গীর ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট আকবর-এর পুত্র। তিনি ১৫৯৯ সালে তার পিতা আকবর-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। সেই সময় আকবর দক্ষিণ ভারত-এ ব্যস্ত ছিলেন। তিনি হেরে গেলেও পরবর্তী কালে তার সৎমা রুকাইয়া সুলতান বেগমসেলিমা সুলতান বেগম এর সমর্থনে ১৯০৫ সালে রাজা হতে সমর্থ হন। প্রথম বছরেই তাকে তার বড় ছেলে খসরুর বিদ্রহের মোকাবিলা করতে হয় ও তিনি তাতে সফল হন। তিনি খসরু সমর্থিত ২০০০ লোককে মৃত্যুদণ্ড দেন ও খসরুকে অন্ধ করে দেন।

বাবার মত চমৎকার প্রশাসন ছাড়াও জাহাঙ্গীর-এর শাষনামলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী অর্থনীতি এবং চিত্তাকর্ষক সাংস্কৃতিক সাফল্য বিদ্যমান ছিল। এছাড়া সার্বভৌম সীমানা অগ্রসরও অব্যাহত ছিল – বঙ্গ, মেওয়ার, আহমেদনগরদক্ষিণ ভারত পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তৃত ছিল। এই সাম্রাজ্য বৃদ্ধির একমাত্র বাধা আসে যখন পারস্য অঞ্চলের সাফারীদ রাজবংশের শাহেনশাহ আব্বাস কান্দাহার আক্রমন করেন। তা ঘটে যখন ভারতে তিনি খসরুর বিদ্রহ দমন করছিলেন। তিনি রাজপুতানা রাজাদের সাথে সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনায় বসেন ও তারা সকলেই মুঘল আধিপত্য মেনে নেন ও তার বদলে তাদের মুঘল সাম্রাজ্যে উঁচু পদ দেওয়া হয়।

জাহাঙ্গীর শিল্প, বিজ্ঞান এবং, স্থাপত্য সঙ্গে মুগ্ধ হয়ে তরুণ বয়স থেকেই চিত্রকলার প্রতি ঝোঁক দেখিয়েছেন এবং তার নিজের একটি কর্মশালায় ছিল। মুঘল চিত্রকলা শিল্প, জাহাঙ্গীর এর রাজত্বের অধীনে মহান উচ্চতায় পৌঁছেছিল। তার সময় উস্তাদ মনসুর জন্তু ও পাখির ছবি একে বিখ্যাত হন। জাহাঙ্গীর এর ছিল একটি বিশাল পক্ষিশালা ও পশুশালা ছিল। জাহাঙ্গীর ইউরোপীয় এবং ফার্সি শিল্পকলাকেও ভালবাসতেন। তিনি ফার্সি রানী নুর জাহান দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার সাম্রাজ্য জুড়ে ফার্সি সংস্কৃতি প্রচার করেন। তার সময়েই শালিমার গার্ডেন তৈরি হয়।

জাহাঙ্গীর তার বাবার মত একজন কঠোর সুন্নি মুসলমান ছিলেন না। তিনি সার্বজনীন বিতর্কে বিভিন্ন ধর্মের মানুষদের অংশগ্রহণ করতে দিতেন। জাহাঙ্গীর তার লোকদের কাউকে জোড়পূর্বক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বারণ করতেন। তিনি সকল প্রকার ধর্মের লোকেদের থেকে সমান খাজনা নিতেন। থমাস রো, এডওয়ার্ড টেরি-সহ অনেকেই তার এইপ্রকার আচরণের প্রশংসা করেন। থমাস রোর মতে জাহাঙ্গীর নাস্তিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন।

অনেক ভাল গুন থাকা সত্ত্বেও, মদ্যপান ও নারী এই দুই আসক্তির জন্য জাহাঙ্গীর সমালোচিত হন। তিনি এক সময় তার স্ত্রী নুর জাহান কে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়ে ফেলেন এবং নুর জাহান বিভিন্ন বিতর্কিত চক্রান্তের সাথে জড়িয়ে পরেছিলেন। ১৬২২ সালে তার পুত্র ক্ষুরাম প্রথম বিদ্রোহ করেন। কিন্তু ১৬২৬ সালে জাহাঙ্গীরের বিশাল সেনাবাহিনীর কাছে কোণঠাসা হয়ে তিনি নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু ১৬২৭ সালে তার মৃত্যুর পর ক্ষুরামই নিজেকে শাহ জাহান উপাধিতে ভূষিত করে সিংহাসন দখল করেন। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর বিভিন্ন গল্প , সিনেমা ও সাহিত্যে তার ও আনারকলির রহস্যে ভরা সম্পর্ক স্থান পায়।

রাজকুমার সেলিম ৩৬ বছর বয়েসে তার বাবার মৃত্যুর ৮ দিন পর ৩০ নভেম্বর ১৬০৫ সালে ক্ষমতায় এসে নিজেকে নুরুদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশাহ গাজী উপাধিতে ভূষিত করে। এখান থেকেই তার ২২ বছরের রাজত্বের শুরু।

তিনি প্রথমেই তার ছেলে খসরু মিরজার বিদ্রোহের মুখে পড়েন। খসরু কে তিনি অন্ধ করে দেন ও তাকে আর্থিক সাহায্য করায় পঞ্চম শিখ গুরু অর্জন দেব কে পাঁচ দিন ধরে অত্যাচার করা হয়। পরে তিনি নদীতে স্নান করার সময় উধাও হয়ে যান।

জাহাঙ্গীর তার ছোট ছেলে খুরাম (পরবর্তী কালে শাহ জাহানকে উত্তরাধিকার এর বিষয় সমর্থন করতেন।) উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে শাহ জাহান ১৬২২ সালে তার বড় ভাই খসরু কে খুন করেন।

মেয়ার এর রানা ও শাহ জাহান এর মধ্যে একটি সফল চুক্তি হয়। শাহ জাহান বঙ্গবিহার ব্যস্ত থাকার সময়, জাহাঙ্গীর তার জেতা রাজ্য কে নিজের বলে দাবি করেন। নিজেদের মধ্যে বিবাদের সাহায্য নিয়ে ফার্সি ভাষা রা কান্দাহার জয় করেন। এর ফলে মুঘল রা আফগানিস্তান ও পারস্য এর মুল্যবান বাণিজ্যিক রুট গুলি নিজেদের অধীন থেকে হারিয়ে ফেলে।

শাহবুদ্দিন মুহাম্মদ শাহ জাহান(আরও ডাকা হয় শাহ জাহান, শাজাহান বলে।  ( জানুয়ারি ৫, ১৫৯২জানুয়ারি ২২, ১৬৬৬) মুঘল সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন যিনি ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশ শাসন করেছেন। শাহ জাহান নামটি এসেছে ফার্সি ভাষা থেকে যার অর্থ “পৃথিবীর রাজা”। তিনি ছিলেন বাবর, হুমায়ুন, আকবর, এবং জাহাঙ্গীরের পরে পঞ্চম মুঘল সম্রাট।

তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং তাঁর হিন্দু রাজপুত স্ত্রী তাজ বিবি বিলকিস মাকানি-র সন্তান ছিলেন যিনি খুররাম নামে। বাল্যকালে তিনি দাদা আকবরের প্রিয়পাত্র ছিলেন। তিনি ১৬৭২ সালে তার পিতার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাকে মোগল সাম্রাজ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর শাসনামলকে স্বর্ণযুগ বলা হয় এবং তার সময়ে ভারতীয় সভ্যতা সবচেয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে। দাদা আকবরেরমতো তিনিও তার সাম্রাজ্য প্রসারিত করতে আগ্রহী ছিলেন। ১৬৫৮ সালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে পুত্র আওরঙ্গজেব তাকে বন্দী করেন এবং বন্দী অবস্থায় ১৬৬৬ সালে আগ্রা ফোর্ট -এ তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত।

তাঁর রাজত্বের সময়কালের মুঘল স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ ছিল। শাহজাহান অনেক শোভামণ্ডিত স্থাপনা তৌরি করেন, যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত আগ্রার তাজমহল তার স্ত্রী মমতাজ মহলের সমাধি হিসাবে পরিচিত (নির্মাণ ১৬৩২-১৬৫৪ সাল)।

আওরঙ্গজেব  আলসুলতান আলআজম ওয়াল খাকান আলমুকাররম আবুল মুজাফফর মুহি উদদিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীর I, বাদশা গাজী, আলমগীর প্রথম নামেও পরিচিত  (নভেম্বর ৩, ১৬১৮মার্চ ৩, ১৭০৭) ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মুঘল সম্রাজ্যের শাসক ছিলেন। তিনি ছিলেন বাবর, হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর এবং শাহ জাহানের পরে ষষ্ঠো মুঘল সম্রাট। তিনি সম্রাট শাহজাহানের পুত্র। মুঘল সম্রাট হিসেবে আওরঙ্গজেবের শাসনামল বিভিন্ন যুদ্ধের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের বিস্তারের মাধ্যমে চিহ্নিত।

মুয়াজ্জেম বাহাদুর শাহ [ অক্টোবর ১৪, ১৬৪৩ – ফেব্রুয়ারি, ১৭১২), শাহ আলম প্রথম নামেও পরিচিত, মুঘল সম্রাট যিনি ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭১২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতবর্ষ শাসন করেছেন।

পূর্বসূরী:
আওরঙ্গজেব
মুঘল সম্রাট
১৭০৭১৭১২
উত্তরসূরী:
জাহানদার শাহ

 

জাহানদার শাহ (মে ১০, ১৬৬১১৭১৩) মুঘল সম্রাট ছিলেন, যিনি ১৭১২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য হিন্দুস্তান শাসন করেছিলেন।

তিনি সম্রাট বাহাদুর শাহ প্রথম এর পুত্র ছিলেন। ফেব্রুয়ারি ২৭, ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে পিতার মৃত্যুর পর তিনি এবং তার ভাই আজিম-উস-শান নিজেদের সম্রাট হিসেবে দাবি করেন এবং ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হওয়ার জন্য বিবাদে লিপ্ত হন। ১৭১২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ ১২ তারিখে আজিম-উস-শানকে হত্যা করা হলে জাহানদার আরও ১১ মাস শাসন করতে সক্ষম হন।

পূর্বসূরী:
বাহাদুর শাহ প্রথম
মুঘল সম্রাট
১৭১২১৭১৩
উত্তরসূরী:
ফর‌রুখসিয়ার

 

ফররুখসিয়ার (১৬৮৩১৭১৯) ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭১৯ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল সম্রাট ছিলেন। সুদর্শন হলেও তিনি ছিলেন দূর্বল শাসক, তিনি সহজের উপদেষ্টাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পরতেন। ফর‌রুখসিয়ার চারিত্রিক ভাবে নিজে স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসনে অক্ষম ছিলেন। তাঁর রাজত্ব দেখা শোনা করতো সাইদ ভাতৃগণ, মুঘল শাসনের ছায়াতমে থেকে যারা রাজ্যের একটি বড় শক্তিতে পরিনত হয়েছিল।

পূর্বসূরী:
জাহানদার শাহ
মুঘল সম্রাট
১৭১৩১৭১৯
উত্তরসূরী:
রাফি উল-দারজাত

 

রাফি উলদারজাত (১৬৯৯১৭১৯), আজিম উস শানের ভাই রাফি-উস-শানের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র, যিনি দশম মুঘল সম্রাট ছিলেন। তিনি ফেব্রুয়ারি ২৮, ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে রাজ্যের উত্তরাধিকারী হন, তাকে সাইদ ভাতৃগণ বাদশাহ বলে ঘোষণা দেন।

পূর্বসূরী:
ফর‌রুখসিয়ার
মুঘল সম্রাট
১৭১৯
উত্তরসূরী:
রাফি উদ-দৌলত

 

শাহ জাহান দ্বিতীয়  নামেও পরিচিত, ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে স্বম্প সময়ের জন্য মুঘল সম্রাট ছিলেন। তিনি তার ঐ বছরই অকাল প্রয়াত ভাই রাফি উল-দারজাতের উত্তরসূরী ছিলেন, যিনি সাইদ ভাতৃগণ দ্বারা বাদশাহ বলে আখ্যায়িত হয়েছিলেন। তাঁর ভাইয়ের মতন তিনিও ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীতে নিহত হন, সাইদ ভাতৃগণের নির্দেশে তাকে সিংহাসন চ্যুত এবং হত্যা করা হয়।

পূর্বসূরী:
রাফি উল-দারজাত
মুঘল সম্রাট
১৭১৯
উত্তরসূরী:
নিকুসিয়ার

 

নিকুসিয়ার মোহাম্মদ ছিলেন দ্বাদশ মুঘল সম্রাট। তিনি ৪০ বছরের বেশি বয়সে ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। স্থানীয় মন্ত্রী বীরবল তাকে পুতুলের মত ব্যবহার করতেন এবং তাকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেছিল এই শর্তে যে তিনি সারা জীবন হারেমের ভিতরে কাটাবেন। তাকে সাইদ ভাতৃগণ ব্যাঙ্গ করতো এবং পুনরায় তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিলেন। তিনি ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে ৪৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

 

পূর্বসূরী:
রাফি উদ-দৌলত
মুঘল সম্রাট
১৭১৯
উত্তরসূরী:
মুহাম্মদ ইব্রাহিম

মুহাম্মদ ইব্রাহিম  ১৩তম মুঘল সম্রাট ছিলেন। তিনি ছিলেন রাফি উল-দারজাত এবং রাফি উদ-দৌলতের ভাই, সাইদ ভাতৃগণ দ্বারা নিকুসিয়ারের হত্যার পরে তাকে সিংহাসনে বসানো হয়।

মুহাম্মদ শাহ নিজামের ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার পরে তিনিই ছিলেন সাইদদের পরবর্তী দাবিদার। সাইদদের পরাজয়ের পরে তাকে হারেমে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তিনি ১৭৪৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

পূর্বসূরী:
নিকুসিয়ার
মুঘল সম্রাট
১৭২০
উত্তরসূরী:
মুহাম্মদ শাহ

 

মুহাম্মদ শাহ  (১৭০২১৭৪৮) ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পর্যন্ত ভারতের মুঘল সম্রাট ছিলেন। তিনি বাহাদুর শাহ প্রথমের নাতি ছিলেন। তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে সাইদ ভাতৃগণের সাহায্যে সিংহাসনে বসেছিলেন, পরবর্তীকালে তাদের অভ্যুত্থানেই তিনি সিংহাসনচ্যুত হন।

তাঁর রাজত্বকালে, মুঘল সম্রাজ্য ছোট ছোট কয়েকটি আঞ্চলিক রাজ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল এবং এদের উপর সম্রাটের তেমন কর্তৃত্বও ছিলনা, প্রতিটি রাজ্য তার নিজস্ব শাসক রাজত্ব করতো, তাই এ সম্রাটের সময়ই সার্বিক ভাবে মুঘল সম্রাটের ক্ষমতার পতন শুরু হয়।

পূর্বসূরী:
মুহাম্মদ ইব্রাহিম
মুঘল সম্রাট
১৭২০১৭৪৮
উত্তরসূরী:
আহমেদ শাহ বাহাদুর

 

সম্রাট বাহাদুর শাহ্ জাফর বা ২য় বাহাদুর শাহ্ (অক্টোবর ২৪, ১৭৭৫নভেম্বর ৭, ১৮৬২) মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট। সিপাহী বিপ্লবের শেষে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসকেরা তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে ও রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠায়। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।

তাঁর পূর্ণ নাম আবুল মুজাফ্ফার সিরাজুদ্দীন মুহাম্মদ বাহাদুর শাহ গাজী। তিনি ২৪ অক্টোবর ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে (২৭ শাবান ১১৮৯ হিজরি)দিল্লির লালকেল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহ (১৮০৬-৩৭ খ্রি:) ও সম্রাজ্ঞী লাল বাঈর দ্বিতীয় পুত্র। তার ঊর্ধ্বতন বংশ তালিকা বিশতম স্তরে গিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবুরের সাথে মিলেছে।

পিতার মৃত্যুর পর বাহাদুর শাহ (দ্বিতীয়) ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। প্রকৃতপক্ষে পিতামহ সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম (১৭৫৯-১৮০৬ খ্রি:) এবং পিতা সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহ উভয়ের মতো দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পেনশনভোগী ছিলেন। তিনি বার্ষিক ১ লাখ টাকা ভাতা পেতেন। পিতার মতো বাহাদুর শাহ নিজের ও মুঘল খান্দানের ভরণপোষণে ভাতা বৃদ্ধির জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু “বাদশাহ” উপাধি ত্যাগ এবং লালকেল্লার বাইরে সাধারণ নাগরিকের মতো জীবনযাপনের শর্তে তিনি রাজি হননি। এ ছাড়া সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন নিয়েও ইংরেজদের সঙ্গে সম্রাটের মনোমালিন্য হয়। সম্রাটের ক্ষমতা ও মর্যাদা খর্ব করতে নানা উদ্যোগ নেয় কোম্পানি। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও সম্পদ সব কিছু হারিয়ে সম্রাট প্রাসাদের চার দেয়ালের অভ্যন্তরে জীবন কাটাতে বাধ্য হলেন। এ সময় অমর্যাদার মনোবেদনা ভুলে থাকার জন্য তিনি গজলমুশায়েরায় নিমগ্ন থাকতেন ; লালকেল্লায় সাহিত্যের আসর বসিয়ে সময় কাটাতেন। তিনি নিজেও কবিতা লিখতেন। জীবনের কষ্ট ও বিষাদ তাঁর কবিতার মূল বিষয়। বাহাতাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে দু:খ ও বিষাদের সাথে দেশ ও জাতির পরাধীনতার কথা বিধৃত। একটি কবিদায় আছেঃ “উমর দরাজ মাঙ্গঁকে লায়েথে চার দিন দো আরজুমে কাট গয়ে, দো ইন্তেজার মেঁ।” যার অর্থ “চার দিনের জন্য আয়ু নিয়ে এসেছিলাম। দু’টি কাটল প্রত্যাশায় আর দু’টি অপেক্ষায়।”

সিপাহি বিদ্রোহ

বাহাদুর শাহ সিংহাসনে আরোহণের ২০ বছর পর সূত্রপাত হয় ঐতিহাসিক সিপাহি বিদ্রোহেরপলাশী যুদ্ধের পর ১০০ বছর কেটে গেছে তত দিনে। ছলেবলে কৌশলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সমগ্র ভারতবর্ষ দখল করে নিয়েছে। দেশবাসীর সাথে সৈন্য বিভাগের লোকদের ওপরও চলছে জুলুম, বঞ্চনা ও নির্যাতন। একের পর এক দেশীয় রাজ্য ইংরেজ অধিকারে নিয়ে যাওয়া, লাখেরাজ ও দেবোত্তর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, কারাগারে হিন্দু-মুসলমান সিপাহিদের জন্য একই খাবারের ব্যবস্খা, ঘিয়ের মধ্যে চর্বি ও আটার মধ্যে হাড়গুঁড়োর সংমিশ্রণ, গরু ও শূকরের চর্বি মিশ্রিত কার্তুজ বিতরণ ইত্যাদি ভারতবর্ষের জনমনে কিংবা সৈনিকদের মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ভারতীয় সিপাহিদের মধ্যে ধূমায়িত বিক্ষোভ ও অস্খিরতার প্রথম বহি:প্রকাশ ঘটে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের দমদম সেনাছাউনিতে। সিপাহিরা ইংরেজ অফিসারকে জানায়, এনফিল্ড রাইফেলের জন্য যে কার্তুজ তৈরি হয়, তাতে গরু ও শূকরের চর্বি মেশানো থাকে এবং এতে তাদের ধর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষ সিপাহিদের বুঝিয়ে শান্ত করে। কিন্তু খবরটি একে একে বিভিন্ন সেনাছাউনিতে পৌঁছে যায় এবং তা সিপাহিদের মধ্যে বিদ্রোহের রূপ ধারণ করে। প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে পশ্চিমবঙ্গের সহতস বহরমপুর সেনাছাউনিতে ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি। ১৯ নম্বর পদাতিক বাহিনীর সিপাহিরা কার্তুজ নিতে অস্বীকার করে, রাতে অস্ত্রাগারের দরজা ভেঙে পুরনো মাসকেট বন্দুক ও কার্তুজ সংগ্রহ করে। তারা ভীষণ উত্তেজিত অবস্খায় ছিল। পরিস্খিতি সামাল দিতে সিপাহিদের নিরস্ত্র ও বরখাস্ত করা হয়। এই সংবাদও দ্রুত পৌঁছে যায় বিভিন্ন সেনানিবাসে। ২৯ মার্চ রোববার ব্যারাকপুরের দেশীয় সিপাহিরা বিদ্রোহ করে। মঙ্গল পান্ডে নামের সিপাহি গুলি চালিয়ে ইংরেজ সার্জেন্টকে হত্যা করে। বিচারে মঙ্গল পান্ডে তাকে সহায়তার অভিযোগে জমাদার ঈশ্বরী পান্ডেকে দোষী সাব্যস্ত হবে। ৮ এপ্রিল সকাল ১০টায় তাদের ফাঁসি দেয়া হয়। এর পরিণতিতে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভারতের উত্তর থেকে মধ্যপ্রদেশ এবং জলপাইগুড়ি থেকে পূর্ববাংলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের চট্টগ্রাম পর্যন্ত। ৯ মে উত্তর প্রদেশের মিরাটের সিপাহিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন দিল্লির পথে অগ্রসর হন। ১১ মে সিপাহিরা দিল্লি অধিকার করে বহু ইংরেজকে হত্যা ও বিতাড়ন করেন। দেশপ্রেমিক সিপাহিরা এ দিন লালকেল্লায় প্রবেশ করে নামেমাত্র মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতের স্বাধীন সম্রাট বলে ঘোষণা করেন। সিপাহিরা সম্রাটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে শপথ নেন। এ দিন গভীর রাতে লালকেল্লায় একুশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে ৮২ বছরের বৃদ্ধ সম্রাটকে দেওয়ান-ই খানোস এ সম্মান জানানো হয়।

বাহাদুর শাহ জাফর সিপাহিদের বিপ্লব তথা ভারতবর্ষের প্রথম সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন­ এ সংবাদে কানপুর, লক্ষেîৗ, বিহার, ঝাঁশি, বেরিলি থেকে শুরু করে পশ্চিম ও পূর্ববাংলার সর্বত্র সিপাহিরা গর্জে ওঠে ‘খালক-ই খুদা, মুলক ই বাদশাহ, হুকুম ই সিপাহি।’ অর্থাৎ আল্লাহর দুনিয়া, বাদশার রাজ্য, সিপাহির হুকুম। একের পর সেনাছাউনিতে বিদ্রোহ হতে থাকে। ইংরেজরা অতি নির্মমভাবে বিদ্রোহ দমন করে। হাজার হাজার স্বাধীনতাকামীর রক্তে রঞ্জিত হয় ভারতবর্ষের মাটি। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষও বিক্ষুব্ধ ছিল। কিন্তু ভারতীয়দের এই সংগ্রাম সফল হতে পারেনি। ইংরেজরা দিল্লি দখল করে নেয় এবং সম্রাট ২১ সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পণ করেন। ইংরেজ সৈন্যরা মীর্জা মোগল, মীর্জা খিজির সুলতান, মীর্জা আবু বকরসহ ২৯ জন মুঘল শাহজাদাসহ বহু আমির ওমরাহ, সেনাপতি ও সৈন্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সম্রাটকে বিচারের নামে প্রহসনের আদালতে দাঁড় করানো হয়। হাজির করা হয় বানোয়াট সাক্ষী। বিচারকরা রায় দেন, দিল্লির সাবেক সম্রাট ১০ মে থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠনের দায়ে অপরাধী। তার শাস্তি চরম অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। কিন্তু তার বার্ধক্যের কথা বিবেচনা করে প্রাণ দণ্ডাদেশ না নিয়ে নির্বাসনে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়।

নির্বাসন ও মৃত্যু

১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ অক্টোবর ৮৩ বছরের বৃদ্ধ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর, সম্রাজ্ঞী জিনাত মহল, দুই শাহজাদা, শাহজাদী এবং অন্য আত্মীয় ও ভৃত্যদের নিয়ে ইংরেজ গোলন্দাজ ও অশ্বারোহী বাহিনী দিল্লি ত্যাগ করে। ৯ ডিসেম্বর জাহাজ রেঙ্গুনে পৌঁছে। ব্রিটিশ বাহিনীর ক্যাপ্টেন নেলসন ডেভিসের বাসভবনের ছোট গ্যারেজে সম্রাট ও তার পরিবার-পরিজনের বন্দিজীবন শুরু হয়। সম্রাটকে শুতে দেয়া হয় একটা পাটের দড়ির খাটিয়ায়। ভারতের প্রিয় মাতৃভূমি থেকে বহু দূরে রেঙ্গুনের মাটিতে সম্রাটের জীবনের বাকি দিনগুলো চরম দু:খ ও অভাব অনটনের মধ্যে কেটেছিল। সম্রাট পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হলেন। এমন বিড়ম্বনাপূর্ণ জীবনের অবসান হয় ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ নভেম্বর, শুক্রবার ভোর ৫টায়। তবে সম্রাটকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে দাফন করা হয়। কবরটি বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য, যা একসময় নষ্ট হয়ে যাবে, ঘাসগুলো গোটা জায়গা আচ্ছাদিত করে ফেলবে। কোথায় সর্বশেষ মুঘল সম্রাট শায়িত আছেন, তার চিহ্নিও কেউ খুঁজে পাবে না। ইংরেজরা খুব ভালোভাবে জানত ভারতবর্ষের জনসাধারণের মনে এই সম্রাটের প্রভাব কতখানি। ভারতবর্ষের মানুষ সম্রাটের কবরে ফাতেহা পাঠ করতে রেঙ্গুন যান ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে। কিন্তু প্রথম প্রচেষ্টা সফল হয়নি। পরে তার আসল কবর আবিষ্কৃত ও সমাধিসৌধ নির্মিত হয়। সম্রাটের প্রিয়তমা স্ত্রী জিনাত মহল মারা যান ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে। সম্রাটের পাশেই রয়েছে তার সমাধি। সম্রাট ও তার প্রিয়জনদের সমাধি হয়ে উঠেছে যুগ যুগ ধরে দেশপ্রেমিকদের তীর্থ স্খানের মতো। সম্রাটের ইচ্ছা ছিল স্বদেশের মাটিতে সমাহিত হওয়া। জন্মভূমির প্রতি ছিল প্রচণ্ড অনুরাগ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন জীবনের শেষ সময় ঘনিয়ে আসছে। স্বদেশের মাটিতে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ কিংবা সমাহিত হওয়ার সাধ কোনোটাই পূরণ হবে না। নিদারুণ দু:খে তিনি লিখেছেন একের পর এক কালোত্তীর্ণ কবিতা। তারই একটি­ নিম্নরূপঃ

মরনেকে বাদ ইশ্ক্ব মেরা বা আসর হুয়া উড়নে লাগি হ্যায় খাক মেরি ক্যোয়ি ইয়ার মে; কিৎনা বদনসিব জাফর দাফনকে লিয়ে দোগজ জামিন ভি মিলানা চুকি ক্যোয়ি ইয়ার মে

ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মায়ানমার সফরে গিয়ে তার সমাধি সৌধ পরিদর্শন করেন ।সে সময় তিনি পরিদর্শক বইতে লিখেছিলেন

“দু গজ জমিন তো না মিলি হিন্দুস্তান মে , পার তেরী কোরবানী সে উঠি আজাদী কি আওয়াজ, বদনসীব তো নাহি জাফর, জুড়া হ্যায় তেরা নাম ভারত শান আউর শওকত মে, আজাদী কি পয়গাম সে”।

বাংলায় অনুবাদ করলে দাড়ায়;

“হিন্দুস্তানে তুমি দু গজ মাটি পাও নি সত্য।তবে তোমার আত্মত্যাগ থেকেই আমাদের স্বাধীনতার আওয়াজ উঠেছিল। দুর্ভাগ্য তোমার নয় জাফর, স্বাধীনতার বার্তার মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষের সুনাম ও গৌরবের সঙ্গে তোমার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে”

About Shishir

Check Also

আমার পরিচয়

ধর্মীয়বাদ নবী ও রাসূল ************** নবী এবং রাসূলের মধ্যে পার্থক্য হ’ল, আল্লাহ তা‘আলা যাকে নতুন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *