সোমবার , অক্টোবর ২৩ ২০১৭ | ৮ই কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Breaking News
Home / ধর্ম ও ইতিহাস / বাংলার ইতিহাস

বাংলার ইতিহাস

বাংলার ইতিহাস বলতে অধুনা বাংলাদেশপশ্চিমবঙ্গের বিগত চার সহস্রাব্দের ইতিহাসকে বোঝায়। গঙ্গাব্রহ্মপুত্র নদ এক অর্থে বাংলাকে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের ইতিহাসে বাংলা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।ইন্দো-আর্যদের আসার পর অঙ্গ, বঙ্গ এবং মগধ রাজ্য গঠিত হয় খ্রীষ্টপূর্ব দশম শতকে । এই রাজ্যগুলি বাংলা এবং বাংলার আশেপাশে স্থাপিত হয়েছিল । অঙ্গ বঙ্গ এবং মগধ রাজ্যের বর্ণনা প্রথম পাওয়া যায় অথর্ববেদে প্রায় ১০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে ।

খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে বাংলার বেশিরভাগ এলাকাই শক্তিশালী রাজ্য মগধের অংশ ছিল । মগধ ছিল একটি প্রাচীন ইন্দো-আর্য রাজ্য । মগধের কথা রামায়ণ এবং মহাভারতে পাওয়া যায় । বুদ্ধের সময়ে এটি ছিল ভারতের চারটি প্রধান রাজ্যের মধ্যে একটি । মগধের ক্ষমতা বাড়ে বিম্বিসারের (রাজত্বকাল ৫৪৪-৪৯১ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) এবং তার ছেলে অজাতশত্রুর (রাজত্বকাল ৪৯১-৪৬০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) আমলে । বিহার এবং বাংলার অধিকাংশ জায়গাই মগধের ভিতরে ছিল ।

৩২৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সেনাবাহিনী মগধের নন্দ সাম্রাজ্যের সীমানার দিকে অগ্রসর হয় । এই সেনাবাহিনী ক্লান্ত ছিল এবং গঙ্গা নদীর কাছাকাছি বিশাল ভারতীয় বাহিনীর মুখোমুখি হতে ভয় পেয়ে যায় । এই বাহিনী বিয়াসের কাছে বিদ্রোহ ঘোষনা করে এবং আরও পূর্বদিকে যেতে অস্বীকার করে । আলেকজান্ডার তখন তাঁর সহকারী কইনাস (Coenus) এর সাথে দেখা করার পরে ঠিক করেন ফিরে যাওয়াই ভাল ।

মৌর্য সাম্রাজ্য মগধেই গড়ে উঠেছিল । মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য । এই সাম্রাজ্য অশোকের রাজত্বকালে দক্ষিণ এশিয়া, পারস্য, আফগানিস্তান অবধি বিস্তার লাভ করেছিল । পরবর্তীকালে শক্তিশালী গুপ্ত সাম্রাজ্য মগধেই গড়ে ওঠে যা ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরাংশে এবং পারস্য এবং আফগানিস্তানের কিছু অংশে বিস্তার লাভ করেছিল ।

অঙ্গ  প্রাচীন ভারতের একটি রাজ্য। খ্রিষ্টপূর্ব ৬ শতকের দিকে ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে এটি বিকাশ লাভ করে কিন্তু ওই শতাব্দীতেই এটি মগধ দ্বারা অধীকৃত হয়। প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থসমূহ যেমন: অঙ্গুত্তরা নিকায়াতে উল্লিখিত ষোলটি মহাজনপদের মধ্যে অঙ্গ অন্যতম। প্রাচীন জৈন গ্রন্থ ভৈক্ষপ্রাজনাপ্তির (যা ভগবতী সূত্র নামে সাধারণত পরিচিত) প্রাচীন জনপদের তালিকাতেও অঙ্গের উল্লেখ আছে। মহাভারত ও পৌরাণিক সাহিত্য মতে অঙ্গ নামটির উৎপত্তি হয়েছে এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা যুবরাজ অঙ্গের নামানুসারে। রামায়ণে বলা হয়েছে অঙ্গ নামটির উৎপত্তি হয়েছে সেই স্থানের নাম থেকে, যেখানে শিব কামদেবকে পুরিয়ে হত্যা করে এবং যেখানে তার শরীরের অংশ সমূহ (অঙ্গ) ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।

বঙ্গ, বাঙ্গালাহ, বাংলা, বাংলাদেশ বা বঙ্গদেশ, দক্ষিণ এশিয়ার উত্তরপূর্বে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক অঞ্চল। এই বঙ্গ বর্তমানে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র বাংলাদেশ এবং ভারতের একটি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ দ্বারা গঠিত। কিন্তু পূর্বে অবিভক্ত বাংলার বেশ কিছু অঞ্চল (ব্রিটিশ রাজের সময় কালে) বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের পার্শ্ববর্তী ভারতীয় রাজ্য বিহার, অসমওড়িশা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই বাংলার অধিবাসীরা বাঙালি জাতি হিসেবে অভিহিত হয়ে থাকেন এবং বাংলা ভাষা এই অঞ্চলের প্রধান ভাষা। বাংলার এই অঞ্চলটিতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী ঘনত্ত্বের জনসংখ্যা বসবাস করেন যা প্রায় জনসংখ্যার ঘনত্ত্ব ৯০০/বর্গকিমি। এই অঞ্চলটি অধিকাংশ গঙ্গাব্রহ্মপুত্র নদী বদ্বীপ বা গাঙ্গেয় বদ্বীপেঅবস্থিত,যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বদ্বীপ। দক্ষিণ বদ্বীপের অংশটিতে সুন্দরবন অবস্থিত — যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গরান অরণ্য এবং যেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বাস ভুমি। যদিও এই অঞ্চলের জনজীবন মুলত গ্রাম্য হলেও কলকাতা এবং ঢাকা এই দুটি মহানগর এই বাংলা অঞ্চলটিতে অবস্হিত। এই অঞ্চলের জনবাসীরা ভারতীয় সমাজের সমাজ-সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং ভারতের স্বাধীনতার জন্য সংঘটিত স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বাংলা  বা বেঙ্গল  শব্দগুলির অবিকল আদি হচ্ছে অজ্ঞাত, কিন্তু বিশ্বাস করা হয় যে শব্দটি Bang, একটি দ্রাবিড়ীয়-ভাষী উপজাতি (tribe) থেকে নিষ্পন্ন হয়েছে। Bang গড়পড়তা ১০০০ খ্রিস্টপুর্বে ক্ষেত্রে অধিষ্ঠিত করেছিলেন।

অন্য তত্ত্ব বলছে যে শব্দটি ভাঙ্গা (বঙ্গ) থেকে নিষ্পন্ন হয়েছে, যেটি অস্ট্রীয় শব্দ “বঙ্গা” থেকে এসেছিল, অর্থাৎ অংশুমালী। শব্দটি ভাঙ্গা এবং অন্য শব্দ যে বঙ্গ কথাটি অভিহিত করতে জল্পিত (যেমন অঙ্গ) প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থে পাওয়া যায়, যেমনঃ বেদ, জৈন গ্রন্থে, মহাভারত এবং পুরাণে। “ভাঙ্গালা” (বঙ্গাল/বঙ্গল)-এর সবচেয়ে পুরনো উল্লেখ রাষ্ট্রকূট গোবিন্দ ৩-এর নেসারি প্লেট্‌সে উদ্দিষ্ট (৮০৫ খ্রিস্ট-আগে) যেখানে ভাঙ্গালার রাজা ধর্মপালের বৃত্তান্ত লেখা আছে। আদ্য-অস্ট্রালয়ডেরা একটি বঙ্গের সবচেয়ে প্রথম অধিবাসী। দ্রাবিড়ীয় জাতি দক্ষিণ ভারত থেকে বঙ্গে প্রবেশ করেছিলেন, যখন তিব্বতী-বার্মিজ জাতি হিমালয় থেকে প্রবেশ করেছিলেন, ও ইন্দো-আর্য জাতি প্রবেশ করেছিলেন উত্তরপশ্চিম ভারত থেকে। যেহেতু জনগোষ্ঠীর গোড়াপত্তনের আপেক্ষিক ক্রম এখন জিন-তত্ত্ববিদগনের গবেষণাধীন, তাই এই বিষয় এখনও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুমান সাপেক্ষ। অধুনাতন বাঙালিরা এই জাতিগুলির সংমিশ্রণ। যদিও বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। পাশতুনেরা, এবং তুর্কীরাদেরও সংমিশ্রণ, যাঁরা এইখানে খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতক ওর তত্-পরবর্তীকালে প্রবেশ করেন। ইরানিরাআরবেরা মূলতঃ নৌপথে ব্যবসায়িক কারণে উপকূল-সংলগ্ন অঞ্চলে (যেমন চট্টগ্রাম) বঙ্গীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশ্রিত হন মধ্যযুগের বিভিন্ন সময়ে। প্রায় চারহাজার বছরের পুরনো তাম্রযুগের ধ্বংসাবশেষ বাংলায় পাওয়া গেছে । ইন্দো-আর্যদের আসার পর অঙ্গ, বঙ্গ এবং মগধ রাজ্য গঠিত হয় খ্রীষ্টপূর্ব দশম শতকে । এই রাজ্যগুলি বাংলা এবং বাংলার আশেপাশে স্থাপিত হয়েছিল । অঙ্গ বঙ্গ এবং মগধ রাজ্যের বর্ণনা প্রথম পাওয়া যায় অথর্ববেদে প্রায় ১০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে । খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে বাংলার বেশিরভাগ এলাকাই শক্তিশালী রাজ্য মগধের অংশ ছিল । মগধ ছিল একটি প্রাচীন ইন্দো-আর্য রাজ্য । মগধের কথা রামায়ন এবং মহাভারতে পাওয়া যায় । বুদ্ধের সময়ে এটি ছিল ভারতের চারটি প্রধান রাজ্যের মধ্যে একটি । মগধের ক্ষমতা বাড়ে বিম্বিসারের (রাজত্বকাল ৫৪৪-৪৯১ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) এবং তার ছেলে অজাতশত্রুর (রাজত্বকাল ৪৯১-৪৬০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) আমলে । বিহার এবং বাংলার অধিকাংশ জায়গাই মগধের ভিতরে ছিল । ৩২৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সেনাবাহিনী মগধের নন্দ সাম্রাজ্যের সীমানার দিকে অগ্রসর হয় । এই সেনাবাহিনী ক্লান্ত ছিল এবং গঙ্গা নদীর কাছাঁকাছি বিশাল ভারতীয় বাহিনীর মুখোমুখি হতে ভয় পেয়ে যায় । এই বাহিনী বিয়াসের কাছে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং আরও পূর্বদিকে যেতে অস্বীকার করে । আলেকজান্ডার তখন তাঁর সহকারী কইনাস (Coenus) এর সাথে দেখা করার পরে ঠিক করেন ফিরে যাওয়াই ভাল । মৌর্য সাম্রাজ্য মগধেই গড়ে উঠেছিল । মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য । এই সাম্রাজ্য অশোকের রাজত্বকালে দক্ষিণ এশিয়া, পারস্য, আফগানিস্তান অবধি বিস্তার লাভ করেছিল । পরবর্তীকালে শক্তিশালী গুপ্ত সাম্রাজ্য মগধেই গড়ে ওঠে যা ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরাংশে এবং পারস্য এবং আফগানিস্তানের কিছু অংশে বিস্তার লাভ করেছিল । বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা ছিলেন শশাঙ্ক যিনি ৬০৬ খ্রীষ্টাব্দ থেকে রাজত্ব করেছিলেন । প্রথম বৌদ্ধ পাল রাজা প্রথম গোপাল ৭৫০ খ্রীষ্টাব্দে গৌড়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন । পাল বংশের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই রাজা ছিলেন ধর্মপাল (রাজত্বকাল ৭৭৫-৮১০ খ্রীষ্টাব্দ) এবং দেবপাল (রাজত্বকাল ৮১০-৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ) । ব্রিটিশ শাসনের সময়ে দুটি মারাত্মক দুর্ভিক্ষ বা মন্বন্তর বহুমানুষের জীবনহানি ঘটিয়েছিল । প্রথম দুর্ভিক্ষটি ঘটেছিল ১৭৭০ খ্রীষ্টাব্দে এবং দ্বিতীয়টি ঘটেছিল ১৯৪৩ খ্রীষ্টাব্দে । ১৭৭০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির রাজত্বকালে বাংলার দুর্ভিক্ষটি ছিল ইতিহাসের সব থেকে বড় দুর্ভিক্ষগুলির মধ্যে একটি । বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল ১৭৭০ এবং তার পরবর্তী বছরগুলিতে । ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের সিপাহি বিদ্রোহ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির শাসনের অবসান ঘটায় এবং বাংলা সরাসরি ভাবে ব্রিটিশ রাজবংশের শাসনাধীনে আসে । বাংলা ছিল খুব ভালো ধান উৎপাদক অঞ্চল এবং এখানে সূক্ষ সুতিবস্ত্র মসলিন তৈরি হত । এছাড়া এই অঞ্চল ছিল পৃথিবীর পাট চাহিদার মুখ্য যোগানকারী । ১৮৫০ সাল থেকেই বাংলায় ভারতের প্রধান শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠতে থাকে । এই শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠেছিল মূলত কলকাতার আশেপাশে এবং সদ্য গড়ে ওঠা শহরতলি এলাকায় । কিন্তু বাংলার বেশিরভাগ মানুষ তখনও কৃষির উপরেই বেশি নির্ভরশীল ছিলেন । ভারতের রাজনীতি এবং সংস্কৃতিতে বাংলার মানুষেরা অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করলেও বিশেষ করে পূর্ব বাংলায় তখনও খুব অনুন্নত জেলা ছিল । ১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দে রানী ভিক্টোরিয়া যখন ভারতের সম্রাজ্ঞী উপাধিতে নিজেকে ভূষিত করলেন তখন ব্রিটিশরা কলকাতাকে ব্রিটিশ রাজের রাজধানী বলে ঘোষণা করে । ১৯৪৭ সালের আগষ্ট মাসে ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে গণপ্রজাতন্ত্র ভারত এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ পায়। তখন বাংলা ভাগ হয়ে পশ্চিম বাংলা ভারতের একটি অংশ এবং পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের একটি অংশে পরিণত হয়।

মগধ প্রাচীণ ভারতে ষোলটি মহাজনপদ বা অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম। ষোলটি মহাজনপদের মধ্যে মগধ বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই রাজ্য বর্তমানের বিহারের পাটনা, গয়া আর বাংলার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ছিল। রাজগৃহ ছিল মগধের রাজধানী।রাজা বিম্বসার ছিলেন মগধ প্রথম ঐতিহাসিক রাজা। তিনি অঙ্গ দখল করেন। রাজা বিম্বসারের পুত্র অজাতশত্রু হাতে মারা যান। অজাতশত্রু রাজা হলে কোশলের রাজা প্রসেনজিতের সংগে তার যুদ্ধ বেধে যায়। যুদ্ধে হেরে গিয়ে প্রসেনজিত মৈত্রী চুক্তি করে ও নিজের মেয়ে সংগে অজাতশত্রুর বিয়ে হয়। অজাতশত গঙ্গা ওপারে রাজ্য বিস্তার করার জন্য পাটলিপুত্রে রাজধানী স্থানারিত করেন। পাটলিপুত্রে তার নতুন দুর্গের সাহায্যে সহজেই লিছ্ছবি প্রজাতন্ত্র দখল করে ফেলেন। শোনা যায় অজাতশত্রু তার দুধরনের নতুন অস্ত্রের (গুলতি ও আচ্ছাদনযুক্ত রথ) সাহায্যে সহজেই সব যুদ্ধে জিতে যান। পঞ্চম এবং চতুর্থ খ্রীষ্টাব্দে মগধ শাসন করে নন্দ বংশ। শিশুনাংগ বংশের শেষ রাজা মহান্দীনের অবৈধ সন্তান মহাপদ্ম নন্দ নন্দ বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সমস্ত ক্ষত্রিয় রাজাদের পরাজিত করে বিন্ধ্য পর্বত পর্যন্ত সামাজ্য বিস্তার করেন। তাঁকে ভারতের প্রথম সামাজ্য প্র্রতিষ্ঠাতাও বলা যায়। সামাজ্য বিস্তারের জন্য তিনি ২,০০,০০০ পদাতিক, ২০,০০০ অশ্বারোহী, ২,০০০ রথ ও ৩,০০০ হস্তীবিশিষ্ট সুবিশাল বাহিনী গড়ে তোলেন। প্লুটার্কের মতে তাঁর বাহিনী আরো বড় ছিল। এই বংশের শেষ রাজা ছিলেন ধননন্দ।

গঙ্গাঋদ্ধি  খিষ্টপূর্ব ৩০০ শতকের একটি রাজ্য। ভারতী উপমহাদেশের বঙ্গ অঞ্চল বা বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এ রাজ্য বিস্তৃত ছিল। গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস তার ইন্ডিকা নামক গ্রন্থে এই রাজ্যের উল্লেখ করেন। গ্রিক ও লাতিন ঐতিহাসিকদের মতে, আলেকজান্ডার তার ভারতবর্ষ অভিযান থেকে সরে এসেছিলেন কারণ তাহলে তাকে গঙ্গাঋদ্ধি আক্রমণ করতে হতো। আলেকজান্ডার আশঙ্কা করছিলেন গঙ্গাঋদ্ধি সাম্রাজ্য আক্রমণ করার পরিনতি হবে ভয়াবহ। তবে এখন পর্যন্ত এই সাম্রাজ্য সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায়নি।

‘গঙ্গা নদী উত্তর হতে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত এবং গঙ্গারিডাই রাজ্যের পূর্ব সীমানায় সমূদ্রে মিলিত হইয়াছে।’ – মেগাস্থিনিস

‘গঙ্গা নদীর মোহনায় সমূদয় এলাকা জুড়িয়া গঙ্গারিডাই রাজ্য’ -টলেমি

‘গঙ্গারিডাই রাজ্যের ভিতর দিয়া গঙ্গা নদীর শেষ অংশ প্রবাহিত হইয়াছে’- প্লিনি

টলেমি (২য় খ্রিস্টাব্দে) গঙ্গারিডাই এর অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন যৈ, গঙ্গার পাঁচটি মুখ সংলগ্ন প্রায় সমূদয় এলাক গঙ্গারিডাইগণ দখল করে রেখেছিল, ‘গাঙ্গে’ নগর ছিল এর রাজধানী। তার বর্নণাকৃত চারটি দ্রাঘিমা ডিগ্রি সমূদ্র উপকূলের সর্ব পশ্চিম থেকে সর্ব পূর্ব নদীমুখ পর্যন্ত অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করছে। কার্যতঃ এর অর্থ হলো ‘গঙ্গারিডাই’ বঙ্গপোসাগরের উপকৃলবর্তী গঙ্গার সর্বপশ্চিম এবং সর্বপূর্ব নদীমুখ পযর্ন্ত বিস্তৃত ছিল। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো যে, ভাগীরথির (তমলুক এর নিকটে) এবং পদ্মার (চট্টগ্রামের নিকটে) নদীমুখের দ্রাঘিমা রৈখার পার্থক্য ৩৫ ডিগ্রির সামান্য কিছু বেশি। তাই টলেমির তথ্যানুযায়ী গব্দারিডাই-কে শনাক্ত করা যায় বর্তমান ভারতের পশ্চিমবাংলা ও বাংলাদেশে গঙ্গার প্রধান দুটি শাখার মধ্যবর্তী অঞ্চলটিতে।

‘গঙ্গারিডাই রাজ্য ৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ভারতীয় উপমাহাদেশের বাঙলা অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস তার ইন্ডিকা গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেছেন। ধ্রুপদী গ্রিক এবং ল্যাটিন ঐতিহাসিকদের বর্ণনানুযায়ী আলেকজান্ডার দি গ্রেট বাংলায় অবস্থিত এই গঙ্গারিডির লোকেদের পরাক্রমের কাহীনী শুনে শংকিত হয়ে যমুনার পশ্চিম পাড় থেকেই ফেরৎ চলে যান। একজন গ্রিক নাবিক তাঁর Periplous tes Erythras Thalasses (Periplus Maris Erythraei) গ্রন্থে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন উড়িষ্যা উপকূলের পূর্বে অবস্থিত গাঙ্গে দেশের কথা উল্লেখ করেছেন। নদী তীরে নদীর নামে গাঙ্গে ছিল একটি বাণিজ্য শহর। এটা স্পষ্ট যে টলেমির ‘গঙ্গারিডাই’ এবং পেরিপ্লাস গ্রন্থের লেখকের ‘গাঙ্গে দেশে’ বঙ্গপসাগরের উপকূলে অবস্থিত একই এলাকাকে ইঙ্গিত করছে। কালিদাশের রঘুবংশে বঙ্গের যে বিবরণ পাওয়া যায় তাও অভিন্ন অর্থ বহন করে। গঙ্গারিডাই শব্দের উৎপত্তি গঙ্গারিড থেকে। ধারণা করা হয় গঙ্গারিড ভারতের গঙ্গাহৃদ বা গঙ্গাহৃদি শব্দের গ্রিক রূপ। অর্থাৎ গঙ্গা হৃদয়ে যার – যে ভূমির বক্ষে গঙ্গা প্রবাহিত। ঐতিহাসিক অতুল সুরের মতে গঙ্গাহৃদ থেকে গঙ্গারিডি তার থেকে গঙ্গারাঢ়ি ও তার থেকে রাঢ় শব্দটি এসে থাকতে পারে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক নীহারঞ্জন রায় তাঁর বাঙালির ইতিহাস (আদি পর্ব) গ্রন্থে লিখেছেন-

গঙ্গারিডাই-রা যে গাঙ্গেয় প্রদেশের লোক এ সম্বন্ধে সন্দেহ নাই, কারণ গ্রিক লাতিন লেখকরা এ সম্বন্ধে একমত। দিয়োদারাস-কার্টিয়াস-প্লুতার্ক-সলিনাস-প্লিনি-টলেমি-স্ট্ট্যাবো প্রভৃতি লেখকদের প্রাসঙ্গিক মতামতের তুলানামূলক বিস্তৃত আলোচনা করিয়া হেমচন্দ্র রায় চৌধুরী মহাশয় দেখাইয়াছেন যে গঙ্গারিডাই বা গঙ্গারাষ্ট্র গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্বতীরে অবস্থিত ও বিস্তৃত ছিল।

আলেকজান্ডার ভারত অভিযান

আলেকজান্ডার ও তাঁর সৈন্যবাহিনীর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ডিওডোরাস (৬৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ-১৬ খ্রিস্টাব্দ) সিন্ধু পরবর্তী দেশ সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, গঙ্গা পেরিয়ে যে অঞ্চল সেখানে ‘প্রাসিয়ই’ ও গঙ্গারিডাই-দের আধিপত্য। তবে একথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, খ্রিষ্টের জন্মের পূর্বে অথবা অব্যবহিত পরে কয়েক শতকে গি্রক ও ল্যাটিন ক্লাসিক্যাল লেখকদের বর্ণনার সাথে মিলে এমন কোন সামরিক শক্তিসম্পন্ন রাজ্যের সুনির্দিষ্ট অস্তিত্ব স্থানীয় কোন উৎসের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। উল্লেখ করা হয়েছে যে, চতুর্থ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে গঙ্গারিডাইর রাজা অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। তাঁর ৬ হাজার পদাতিক, ১ হাজার অশ্বারোহী ও ৭ শত হস্তি বাহিনী ছিল। প্রাপ্ত তথ্য এ বিষয়ে ইঙ্গিত দেয় যে, পাশ্চাত্যের দূরবর্তী দেশগুলি পরবর্তী ৫০০ বছর তাদের নাম ও যশ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিল।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের সময়

প্লিনির মতে ‘গঙ্গারিডাই রাজ্যের ভিতর দিয়ে গঙ্গা নদীর শেষ অংশ প্রবাহিত হয়েছে। গঙ্গার দক্ষিণ অংশের অধিবাসীদের গাত্রবর্ণ ছিলো কালো এবং রৌদ্রে পোড়া, কিন্তু তারা ইথিওপিয়ানদের মতো কালো ছিলনা।

গঙ্গার শেষ অংশের প্রস্থ ৮ মাইল, এবং যেখানে এটি সবথেকে কম প্রস্থের সেই স্থানে এর গভীরতা প্রায় ১০০ ফুট। সেই মানুষরা যারা সেই সুদুর প্রান্তে থাকেন তারা হলেন গঙ্গারিডাই। এদের রাজার ১০০০ অশ্বারোহী, ৭০০ হস্তি এবং ৬০০০০ পদাতিক সৈন্য নিয়ে সজ্জিত সেনাবাহিনী আছে। — মেগাস্থিনিস

 

গৌড় রাজ্য

বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা ছিলেন শশাঙ্ক যিনি ৬০৬ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। সম্ভবত তিনি গুপ্ত সম্রাটদের অধীনে একজন সামন্তরাজা ছিলেল ।তিনি সম্ভবত হর্ষবর্ধন-এর ভগিনী রাজ্যশ্রী কে অপহরন করে ছিলেল ।এইজন্য হর্ষবর্ধন-এর সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ হয় ।তাঁর শক্তি বৃদ্ধি হতে দেখে কামরুপ রাজ ভাস্করবর্মন তাঁর শত্রু হর্ষবর্ধন-এর সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন ।৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দে শশাঙ্ক-এর মৃত্যুর পর তাঁর রাজ্যের পতন ঘটে ও বাংলাতে এক অরাজক অবস্থার সৃস্টি হয় যাকে বাংলায় মাৎস্যন্যায় বলা হয় ।

মাৎস্যন্যায়

৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দে গৌড় রাজ শশাঙ্ক-এর মৃত্যুর পর বাংলার ইতিহাসে একঘোরতর নৈরাজ্যের সৃস্টি হয় যা প্রায় দেড়শো বছর তা স্থায়ী হয় ।এই সময় বাংলাতে বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের সৃস্টি হয় আত্মকলহ,গৃহযুদ্ধ,গুপ্তহ্ত্যা,অত্যাচার প্রভৃতি চরমে ওঠে ।বাংলার সাধারণ দরিদ্র মানুষদের দুর্দশার শেষ ছিল না ।স্থায়ী প্রশাসন না থাকাতে বাহুবলই ছিল শেষ কথা।

পুণ্ড্রবর্ধন  ছিল প্রাচীন যুগের উত্তর বঙ্গের একটি এলাকা যাতে পুণ্ড্ররা বাস করত। পুণ্ড্ররা ছিল অনার্য একটি সম্প্রদায়।পুণ্ড্র নামের উত্পত্তি সম্পর্কে বেশকিছু মতবাদ আছে। একটি মতবাদ অনুসারে, পাণ্ডু নামের একটি রোগ থেকে পুণ্ড্র নামের উত্পত্তি। পুণ্ড্রকেস্ট্রার (পুণ্ড্রভূমি) অধিকাংশ ব্যক্তিই এ রোগে ভুগত। পুণ্ড্র আখের একটি প্রজাতি। আর যেখানে আখের অত্যাধিক ফলন হত তা পুণ্ডদেশ বা পুণ্ডভূমি নামে পরিচিত ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৭ম-৮ম শতকের দিকে প্রাপ্ত বেদবাক্য অনুযায়ী পুণ্ড্র ছিল একটি অনার্য গোষ্ঠী যারা সাদানিরা নদীর পূর্বদিকে বাস করত। ১ম খ্রিস্টাব্দের মহাভারতও এই তথ্যটি সমর্থন করে। অশোকদানায় এটি প্রথমবার পুণ্ড্রবর্ধন নামে উল্লেখিত হয়। পুণ্ড্রদের আবাসস্থলই পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্ধন নামে খ্যাত হয়েছিল। মহাস্থান ব্রাহ্মীলিপিতি উল্লিখিত ‘পুদনগল’ (পূণ্ড্রনগর) ও বগুড়ার মহাস্থারে যে অভিন্ন এবং পূণ্ড্রনগর যে পুণ্ড্রদের আবাসস্থল পূণ্ড্রবর্ধণের কেন্দ্র সে সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশনেই। পরবর্তী বেদবাক্য মতে পুণ্ড্র ছিল একটি জনগোষ্ঠী। মহাভারতের দিগ্বিজয় শাখায় তাদের আবাস হিসেবে মঙ্গিরের পূর্বদিকে এবং কোসির তীর শাসনকারী যুবরাজের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল। গুপ্ত আমলের এপিগ্রাফ এবং প্রাচীন চীনা লেখকরা পুণ্ড্রবর্ধনকে উত্তরবঙ্গে পুণ্ড্রদের স্থান হিসেবে উল্লেখ করে। কিছু নির্দিষ্ট কিংবদন্তী অনুযায়ী প্রাচীনকালের রাজকীয় আর্য ও অনার্য শ্রেণীর মিশ্রণ ঘটে। একটি মত অনুযায়ী অশুর রাজা বালির রাণীর গর্ভে ঋষি দীর্ঘতমর পাঁচ সন্তান অঙ্গা, ভঙ্গা, সুমহা, পুণ্ড্র ও কালিঙ্গা জন্মলাভ করে। তারা তাদের নামে পাঁচটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।

সাম্রাজ্য

উত্তর ভারতে আর্য-ব্রাহ্মণ সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ার অনেক পরে বাংলায় এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বাংলায় বসবাসকারী অনার্য ব্যক্তিরা অনেক ক্ষমতাবান হওয়ার জন্য তারা আর্য সংস্কৃতির প্রভাবকে প্রতিহত করে। মৌর্যরাই প্রাচীন ভারতে সর্বপ্রথম বড় ধরণের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে সমর্থ হয় যার প্রাণকেন্দ্র ছিল বর্তমান পাটনার অন্তর্ভূক্ত পাটালিপুত্রা। পুণ্ড্রনগর থেকে এর দূরত্ব খুব বেশি না থাকায় মৌর্যদের পুণ্ড্রবর্ধন অধিকার করার সম্ভাবনা আছে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৮৫ সালের দিকে মৌর্যদের শাসনামল শেষ হয়ে যাবার পরে কিছু নির্দিষ্ট সময়ে বেশকিছু ক্ষুদ্র সাম্রাজ্যের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই পর্যায়ের সমাপ্তি ঘটে ৪র্থ খ্রিস্টাব্দে গুপ্তদের পূণর্জাগরণের পরে। গুপ্ত আমলের ধাতব পাত্রে তাদের সাম্রাজ্যের পূর্ব প্রান্তের পুণ্ড্রবর্ধন ভূক্তির কথা উল্লেখ আছে, যেখানে ভূক্তি বলতে সাম্রাজ্যের একটি বিভাগের কথা বলা হয়েছে। ষষ্ঠ শতকে গুপ্ত সাম্রাজ্য পতনের মুখে পড়ে এবং তাদের অধিকৃত অঞ্চলসমূহ সম্ভবত ৫৬৭-৭৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিব্বতী রাজা সাম্বাতসনের অধিকারে চলে যায়। বাংলা পূর্বে সমতট ও পশ্চিমে গৌড় নামক দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। কিছু নির্দিষ্ট প্রাচীন নথিতে পুণ্ড্রবর্ধনকে গৌড়ের অন্তর্ভূক্ত হিসেবে বলা হয়েছে। ৭ম খ্রিস্টাব্দে এটি শশাঙ্কের সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল।

চীনা পাদ্রী, যুয়ানজাং (হিউয়েন সাং) ৬৩৯-৪৫ সালে পুণ্ড্রবর্ধন এলাকায় ভ্রমণ করেন। তিনি কাজানগালা থেকে কামাপুরা হয়ে পুণ্ড্রবর্ধনে যান। তবে তার ভ্রমণ নির্দেশিকাতে তিনি সে সময়ে পুণ্ড্রবর্ধনে কোন রাজা ছিল বলে উল্লেখ করেননি।

জুয়ানজাং পুণ্ড্রবর্ধন সম্পর্কে নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি দেন:

“এখানে ২০টি বৌদ্ধ মঠ এবং ৩০০০ এরও বেশি ব্রেথ্রেন ছিল যারা “সুবৃহত্‌ ও ক্ষুদ্র যানবাহনগুলো”কে অনুসরণ করত; দেব-মন্দিরগুলোর সংখ্যা ১০০ ছিল এবং বিভিন্ন শ্রেণীর অনুসারীরা অস্থির থাকত, দিগম্বর নির্গ্রন্থের সংখ্যা ছিল অসংখ্য।”

নির্দিষ্ট তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, ৭ম-৮ম শতকে পুণ্ড্রবর্ধন তার প্রাচুর্য হারিয়ে ফেলেছিল। মহাস্থানগড়ের নৃতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে জানা যায়, পাল আমলের সময় ১২শ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দূর্গের ব্যবহার করা হয়েছিল, তবে এটি তেমন কোন শক্তি কেন্দ্র ছিল না। এটি চন্দ্রবংশের রাজাদের ও ভোজ ভার্মার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল। ত্রয়োদশ শতকে মুসলিম শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে তারা হয়ত এটিকে শাসনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে তখন আর এর তেমন কোন গুরুত্ব ছিল না। এটি ক্রমশ তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে এবং পারিপ্বার্শিক এলাকার একটি অংশে পরিণত হয়। পুণ্ড্রবর্ধননগর বা পুণ্ড্রবর্ধনপুর এর পরিচয় হারিয়ে মহাস্থান নামে সূচীত হতে থাকে।

রাঢ় হল ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গঝাড়খণ্ডের একটি ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অঞ্চল। এটি পশ্চিমে ছোটোনাগপুর মালভূমি ও পূর্বে গাঙ্গেয় বদ্বীপ পর্যন্ত প্রসারিত। রাঢ় অঞ্চলের সীমানা সম্পর্কে প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে নানা পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া গেলেও, বোঝা যায় যে মূলত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যেই এই অঞ্চলের অবস্থিতি ছিল। অঞ্চলের কয়েকটি অংশ আধুনিক ঝাড়খণ্ড রাজ্যের অন্তর্গত। ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে রাঢ় অঞ্চলটির ভিন্ন ভিন্ন নামে চিহ্নিত হয়েছে। আবার ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রাজ্য এখানে গড়ে উঠেছিল। প্রাচীন রাঢ় সভ্যতা ও গঙ্গারিডাই রাজ্য এখানেই অবস্থিত ছিল। তবে এর প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানা যায় না।এই অঞ্চলের বিভিন্ন নামগুলি আসলে “রাঢ়” শব্দটির শব্দগত বিকৃতি। অনেক সময় “ঢ়” শব্দটি “ঢ” হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে রচিত জৈণ ধর্মগ্রন্থ আচারাঙ্গ সূত্র-এ “রাঢা”, “রাঢ”, “রাঢ়া”, “রাঢ়”, “লাঢা”, “লাঢ়” প্রভৃতি শব্দগুলি পাওয়া যায়। কোনো কোনো বইতে “লালা”, “রার” বা “লাড়” নামেও এই অঞ্চলের উল্লেখ আছে। ভাষাতাত্ত্বিক প্রভাতরঞ্জন সরকারের মতে, চীনারা রাঢ়কে “লাটি”, গ্রিকরা “গঙ্গারিডি” ও আর্যরা “রাট্টা” বলত। তবে অনেক গ্রিক, রোমানমিশরীয় বইতেই “গঙ্গারিডাই”, “গঙ্গারিডি”, “গঙ্গারিটাই” ও “গঙ্গারিডাম” সভ্যতা, রাজ্য বা জাতির উল্লেখ রাঢ়ের পাশাপাশি একইভাবে করা হয়েছে। মেগাস্থিনিস, টলেমি, স্ট্রাবো, প্লিনি দ্য এল্টার, অ্যারিয়ান, ডিওডোরাস সিকুলাস, কুইন্টাস কার্টিয়াস রিউফুসপ্লুটার্কের রচনায় গঙ্গারিডাই রাজ্যের নাম পাওয়া যায়।

“রাঢ়” শব্দের ব্যুৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেকে বলেছেন, এটি অস্ট্রোএশিয়াটিক পরিবার-ভুক্ত কোনো এক স্থানীয় ভাষা থেকে এসেছে। সাঁওতালি ভাষায় প্রচলিত নিম্নোক্ত ভাষাগুলি থেকে এর উদ্ভব হওয়া সম্ভব: “লার” (সুতো), “রাড়” (সুর) ও “লাড়” (সাপ)। প্রভাতরঞ্জন সরকারের মতে, শব্দটির উৎস প্রোটো-অস্ট্রোএশিয়াটিক “রাঢ়া” বা “রাঢ়ো” শব্দদুটি, যার অর্থ “লালমাটির দেশ” বা “ল্যাটেরাইট মৃত্তিকার দেশ”।

“গঙ্গারিডাই” শব্দের উৎসটিও স্পষ্ট নয়। ঐতিহাসিক ড. অতুল সুর, প্লিনি ও টলেমির মতে এর অর্থ “গঙ্গার তীরবর্তী রাঢ় অঞ্চল”। যদিও অন্যান্য গবেষকদের মতে, এর অর্থ, “গঙ্গাহৃদি” (যে অঞ্চলের হৃদয়ে গঙ্গা প্রবাহিত), “গঙ্গারাষ্ট্র” বা “গোন্ডা-রিডাই” (গোন্ডা জাতির দেশ)। মেগাস্থিনিস এই অঞ্চলের অধিবাসীদের বলেছেন, ডিওডোরাস সিকুলাসের বর্ণনা অনুসারে, গঙ্গারিডাই “রাষ্ট্রে সবচেয়ে বড়ো আকারের ও সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় হাতি ছিল।”

বর্ধমান বিভাগের সম্পূর্ণ বীরভূম জেলা, বর্ধমান জেলার মধ্যভাগ, বাঁকুড়া জেলার পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব ভাগ ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পশ্চিমভাগ রাঢ়ের অন্তর্গত। এছাড়া প্রেসিডেন্সি বিভাগের মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহকুমার অংশবিশেষ ও হুগলি জেলার সামান্য অংশ রাঢ়ের অন্তর্গত।

ভূগোল

  • ভূপ্রকৃতি ও মৃত্তিকা – পশ্চিমের মালভূমি থেকে কাঁকুড়ে পলিমাটি বয়ে এনে এই অঞ্চলের নদীগুলি এই সমভূমি সৃষ্টি করেছে। যদিও সঠিক অর্থে সমতলভূমি নয় রাঢ় অঞ্চল। স্থানে স্থানে ঢেউখেলানো অসমতম ভূমি ও টিলা এই অঞ্চলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

পুরনো পলিমাটি দিয়ে গঠিত এই অঞ্চলে ল্যাটেরাইট লাল মাটির প্রাধান্যই বেশি। মাটির স্তর এখানে অগভীর। মাটির জলধারণ ক্ষমতা কম। নদী অববাহিকাগুলি বাদে অন্যত্র তাই মাটি খুব একটা উর্বর নয়।

  • জলবায়ু – সমুদ্র থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় রাঢ় অঞ্চলের জলবায়ু চরমভাবাপন্ন। গ্রীষ্ম ও শীতকালের গড় তাপমাত্রা এখানে যথাক্রমে ৩৫º-৪০º ডিগ্রি সেলসিয়াস ও ১২º-১৪º ডিগ্রি সেলসিয়াস। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে রাঢ়ে বছরে গড়ে প্রায় ১৪০-১৬০ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। তবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উত্তর রাঢ়ের তুলনায় দক্ষিণ রাঢ়ে বেশি। এপ্রিল-মে মাস নাগাদ কালবৈশাখী ও অক্টোবরে আশ্বিনের ঝড়ও এই অঞ্চলের জলবায়ুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
  • প্রাকৃতিক উদ্ভিদ – এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক উদ্ভিদের মধ্যে শাল, মহুয়া, শিমূল, কুল, বাবলা, বাঁশ ও বিভিন্ন প্রজাতির ঘাস উল্লেখযোগ্য। এই অঞ্চল অরণ্যসংকূল। তবে বর্তমানে জনবসতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে বহুলাংশে অরণ্যচ্ছেদন ও চাষাবাদ এই অঞ্চলের ভূমিক্ষয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ভূমিক্ষয় রোধের জন্য তাই কৃত্রিম উপায়ে বনায়ন শুরু হয়েছে।

অর্থনীতি

  • কৃষি – কৃষিতে এই অঞ্চল পশ্চিমবঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অধিকারী। সমতল ভূভাগ, উন্নত সেচব্যবস্থা ও অনুকূল অবস্থার জন্য রাঢ়ের নদী অববাহিকাগুলিতে ধান, গম, আখ, ডাল, তৈলবীজ, জোয়ার ও আলু প্রচুর পরিমাণে জন্মায়। এর মধ্যে ধানচাষ সর্বাধিক হয় বর্ধমান ও পশ্চিম মেদিনীপুরে। জোয়ার ও তৈলবীজ মেদিনীপুরে, গম বাঁকুড়ায়, বীরভূমে আখ প্রচুর উৎপন্ন হয়। হুগলি ও বর্ধমান জেলায় প্রচুর আলু এবং হুগলি ও মেদিনীপুরে পান ও বিভিন্ন প্রকার সবজি উৎপন্ন হয়।

এছাড়া পণ্য ফসলের মধ্যে বাঁকুড়া জেলায় পলাশ ও কুল গাছে লাক্ষাকীট এবং বাঁকুড়া, বীরভূম ও মুর্শিদাবাদ জেলায় রেশমকীটের খাদ্য তুঁতগাছের চাষ হয়।

  • খনিজ – এই অঞ্চলে অল্প পরিমাণে হলেও কিছু উৎকৃষ্ট খনিজ পাওয়া যায়। বর্ধমানের রাণীগঞ্জ অঞ্চলে প্রচুর উৎকৃষ্ট কয়লা মজুত আছে। বীরভূমের মহম্মদবাজার, খড়িয়া, কামারপুকুর ও বাঁকুড়ার মেজিয়ায় অল্প পরিমাণে অভ্র, ফায়ার ক্লে ও চিনামাটি পাওয়া যায়। পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলপাহাড়ি, লাবণি ও সরিষা থানায় অল্প ম্যাঙ্গানিজ পাওয়া যায়। এছাড়া হুগলি ও বর্ধমান জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে বালির খাদ আছে।
  • শিল্প – রাঢ় অঞ্চলে বৃহৎ শিল্প খুব একটা গড়ে ওঠেনি। তবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য এই অঞ্চল জগদ্বিখ্যাত। এই অঞ্চলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প হল – বাঁকুড়া ও বীরভূম জেলার পোড়ামাটি ও টেরাকোটার কাজ ও পুতুল শিল্প, বিষ্ণুপুরের রেশম, তসর, শাঁখা ও কাঁসা-পিতলের শিল্প, মুর্শিদাবাদের হাতির দাঁতের শিল্প ও রেশম শিল্প, পশ্চিম মেদিনীপুরের মাদুর ও বেতশিল্প এবং হুগলির তাঁতশিল্প।

এছাড়া বীরভূমের আহম্মদপুরের চিনি কল ও রাঢ়ের বিভিন্ন অঞ্চলের চালকল, তেলকল ও কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানা এই অঞ্চলের মাঝারি শিল্পের কয়েকটি নিদর্শন। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বর্ধমান, বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরে কিছু বৃহৎ শিল্পস্থাপনে উদ্যোগী হয়েছেন। এর মধ্যে বর্ধমানের অন্ডালে একটি বিমাননগরী বা এয়াট্রোপোলিশ স্থাপনের পরিকল্পনা অন্যতম।

বজ্জভূমি (আক্ষরিক অর্থে বজ্রের দেশ) প্রাচীন রাঢ়ের একটি অংশ। বর্তমানে ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় এই অঞ্চলটি অবস্থিত। এই জেলার ঊষর পশ্চিমাঞ্চল এককালে বজ্জভূমি নামে পরিচিত ছিল। আচারাঙ্গ সূত্র নামক জৈনগ্রন্থে বলা হয়েছে, সর্বশেষ (২৪তম) তীর্থঙ্কর মহাবীর ভ্রমণ করতে করতে এই অঞ্চলে এসে উপস্থিত হন। উক্ত গ্রন্থে এই অঞ্চলকে “লাঢ়ার পথহীন দেশ” নামে উল্লেখ করা হয়েছে; এবং ওই বর্ণনা থেকে জানা যায় যে এই অঞ্চলের অধিবাসীরা ছিলেন দুষ্টপ্রকৃতির; তাঁরা মহাবীরের পশ্চাতে কুকুর লেলিয়ে দেন।কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন, আর্যাবর্তের অধিবাসীরা তাঁদের নিজেদের বসতাঞ্চলের বাইরে কোনো অঞ্চলের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না বলে এই সকল অঞ্চলের মানুষদের নিচু নজরে দেখতেন। বোধায়ন ধর্মগ্রন্থে বঙ্গ ভ্রমণকারীদের জন্য প্রায়শ্চিত্তের বিধান পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে।

সুহ্মভূমি বা সুব্ভভূমি বা দক্ষিণ রাঢ় বা তক্কণলাঢ়ম প্রাচীন বাংলার একটি জনপদ। জৈনদের আচারাঙ্গ সূত্রে রাঢ় জনপদকে বজ্জভূমি বা বজ্রভূমি এবং সুব্ভভূমি বা সুহ্মভূমি এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।

ধোয়ী রচিত পবনদূত গ্রন্থে গঙ্গার তীরবর্তী সুহ্মের উল্লেখ রয়েছে এবং এই দেশের অন্তর্গত বর্তমানে হুগলী জেলায় অবস্থিত ত্রিবেণী সঙ্গম অতিক্রম করে লক্ষ্মণসেনের রাজধানী বিজয়পুরের দিকে একটি পথের ইঙ্গিত রয়েছে। ৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে রচিত শ্রীধরাচার্য রচিত ন্যায়কন্দলী গ্রন্থে দক্ষিণ রাঢ়ের প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায়।একাদশ শতকে কৃষ্ণমিশ্র কর্তৃক রচিত প্রবোধচন্দ্রোদয় নাটকে, মধ্য প্রদেশের অমরেশ্বর মন্দিরের লিপিতে এবং ১৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দে মুকুন্দরাম রচিত চন্ডীমঙ্গলকাব্যেও দক্ষিণ রাঢ়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। ন্যায়কন্দলী গ্রন্থে দক্ষিণ রাঢ়ের অন্তর্গত ভূরিসৃষ্টি গ্রাম (বর্তমান হাওড়া জেলার ভুরসুট গ্রাম), প্রবোধচন্দ্রোদয় নাটকে নবগ্রাম (বর্তমান হুগলী জেলায়) এবং চন্ডীমঙ্গলকাব্যে দামিন্যা গ্রামের (বর্তমান বর্ধমান জেলার দামুন্যা গ্রাম) উল্লেখ রয়েছে। এর থেকে অনুমান করা হয়ে থাকে ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরবর্তী দক্ষিণ ভূখণ্ড অর্থাৎ বর্তমান হাওড়া জেলা, হুগলী জেলার পশ্চিমাংশ এবং বর্ধমান জেলার দক্ষিণাংশে প্রাচীন সুহ্মভূমি বা দক্ষিণ রাঢ় অবস্থিত।

লোক প্রকৃতি

আনুমানিক পঞ্চম শতাব্দীতে কালিদাস কর্তৃক রচিত রঘুবংশ কাব্যে রঘুর দ্বিগ্বিজয় বর্ণনাকালে সুহ্মদেশের অধিবাসীদের বর্ণনা করে বলা হয়েছে, যে তাঁরা বেতসলতার মত অবনত হয়ে রঘুর কোপ হতে রক্ষালাভ করেছিলেন। ভাগবত পুরাণে সুহ্মদের পাপ কোম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।কৃষ্ণমিশ্র তাঁর প্রবোধচন্দ্রোদয় নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কে সুহ্মদেশের ব্রাহ্মণদের দাম্ভিকতার বর্ণনা করেছেন।

বাংলার শাসকগণ

প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত বৃহত্তর বাংলা বা বঙ্গ অঞ্চলের শাসকগণের একটি তালিকা দেয়া হল। ঐতিহাসিক দলিলপত্র থেকে স্পষ্ট যে বাংলা মূলত অঙ্গদের অধীনে ছিল। পরবর্তীতে এর অধিকাংশ এলাকা মগধ সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। মগধ সাম্রাজ্যের পতনের পর বাংলা কিছুকাল নৈরাজ্যে পতিত হয়, অতঃপর হর্ষবর্ধনের ঘোরশত্রু শশাঙ্ক এখানে রাজত্ব করেন। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর অঞ্চলটিতে আবারও নৈরাজ্য বিরাজ করে এবং প্রায় এক শতক ধরে স্থানীয় গোত্রে গোত্রে ও রাজায় রাজায় লড়াই চলতে থাকে। রাজা গোপাল ও পালরাজবংশের পত্তনের মধ্য দিয়ে এই নৈরাজ্যের অবসান ঘটে এবং বাংলা এক ঐতিহাসিক স্বর্ণযুগে প্রবেশ করে। পালদের পতনের পর সেন রাজবংশের উত্থান ঘটে, কিন্তু শীঘ্রই মোঘল সুলতানদের আবির্ভাবে তাদের শাসনের অবসান ঘটে। অতঃপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাকে পদানত করতে সক্ষম হয় এবং দেশটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসে। ১৯০৫ সালে প্রথমবারের মত বঙ্গভঙ্গ করা হয় যা ধর্মীয় টানাপোড়েনকে উস্‌কে দেয় ও স্বাধীনতা আন্দোলনকে স্তিমিত করে। ভারতবর্ষ ভাগের পর পশ্চিমবঙ্গ ভারতে এবং পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়। পূর্ববঙ্গ বাংলাদেশ হিসেবে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে।

প্রাচীন রাজবংশ

বাংলার শাসকবর্গের তালিকা
শাসন কাল শাসক দেশের সীমা
৪০০ খ্রি.পূ. ঔগ্রসৈন্য
(নন্দনবংশের রাজা উগ্রসেনের পুত্র)
(গঙ্গা ও প্রাচ্য)
৪০০ খ্রি.পূ. মহারাজা চন্দ্রবর্মন পুস্করন (বাঁকুড়া থেকে ফরিদপুর-পশ্চিম ও দক্ষিণ বঙ্গ)
৪০০ খ্রি.পূ. গুপ্ত বংশের রাজা গুপ্ত অধিকারে বাংলা মোটামুটি দুইটি ভুক্তিতে বিভক্ত ছিল।
পুন্ড্রবর্ধনভুক্তি ও বর্ধমানভুক্তি (বর্তমানের উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গ)
৫০৭-৫০৮ খ্রিস্টাব্দ মহারাজাধিরাজ বৈন্যগুপ্ত পূর্ববঙ্গ
৫৪০-৫৮০ গোপচন্দ্র বঙ্গ
৫৮০-৬০০ সমাচার দেব বঙ্গ
৬০৬-৬২৫ শ্রীমহাসামন্ত শশাঙ্ক গৌড়, দক্ষিণে গঞ্জাম ও উত্তরে কান্যকুব্জ পর্যন্ত
৬২৫ জয়নাগ কর্ণসুবর্ণ
৬৩৮-৬৪২ অজানা
৬২৫-৭০৫ খড়গ রাজবংশ
খড়েগাদ্যম
জাত খড়গ
দেবখড়গ
রাজারাজভট
বঙ্গ, সমতট

 

 

বাংলার স্বাধীন বৌদ্ধ ও হিন্দু নৃপতি

পাল বংশ

সেন বংশ

বাংলার স্বাধীন সুলতান

ইলিয়াস শাহী বংশ (প্রথম পর্ব)

বায়াজিদ বংশ

  • শিহাবুদ্দিন বায়াজিদ শাহ (১৪১৩-১৪১৪)
  • প্রথম আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৪১৪-১৪১৫)

গণেশ বংশ

  • রাজা গণেশ (১৪১৪-১৪১৫ এবং ১৪১৬-১৪১৮)
  • জালালুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ (১৪১৫-১৪১৬ এবং ১৪১৮-১৪৩৩)
  • শামসুদ্দীন আহমদ শাহ (১৪৩৩-১৪৩৫)

ইলিয়াস শাহী বংশ (দ্বিতীয় পর্ব)

  • প্রথম নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৩৫-১৪৫৯)
  • রুকনুদ্দীন বারবক শাহ (১৪৫৯-১৪৭৪)
  • শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১)
  • দ্বিতীয় সিকান্দর শাহ (১৪৮১)
  • জালালুদ্দীন ফতেহ শাহ (১৪৮১-১৪৮৭)

হাবসি বংশ

  • বারবক শাহ (১৪৮৭)
  • সাইফুদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৪৮৭-১৪৯০)
  • দ্বিতীয় নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৯০)
  • শামসুদ্দীন মুজাফ্ফর শাহ (১৪৯০-১৪৯৩)

হুসেন বংশ

  • আলাউদ্দিন হুসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯)
  • নাসিরুদ্দীন নুসরত শাহ (১৫১৯-১৫৩২)
  • দ্বিতীয় আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৫৩২-১৫৩৩)
  • গিয়াসুদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৫৩৩-১৫৩৮)

উত্তর ভারতবর্ষের শূর সম্রাটদের অধীনে বাংলা

শূর বংশ

  • শের শাহ শূরি (১৫৪০-১৫৪৫)
  • ইসলাম শাহ শূরি (১৫৪৫-১৫৫৩)
  • ফিরোজ শাহ শূরি (১৫৫৩)
  • আদিল শাহ শূরি (১৫৫৩-১৫৫৭)- তাঁর শাসনকালে ১৫৫৫ সালে বাংলার শাসক মুহাম্মদ খান শূরি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ‘শামসুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ’ উপাধী ধারণ করে বাংলার সিংহাসনে বসেন।

বাংলার স্বাধীন সুলতান

শূর বংশ

  • শামসুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ (১৫৫৫)
  • প্রথম গিয়াসুদ্দীন বাহাদুর শাহ (১৫৫৫-১৫৬০)
  • গিয়াসুদ্দীন জালাল শাহ (১৫৬০-১৫৬২)
  • দ্বিতীয় গিয়াসুদ্দীন বাহাদুর শাহ (১৫৬২-১৫৬৩)

কররানি বংশ

  • তাজ খান কররানি (১৫৬৩)
  • সুলায়মান কররানি (১৫৬৩-১৫৭২)
  • বায়াজিদ কররানি (১৫৭২-১৫৭৩)
  • দাউদ খান কররানি (১৫৭৩-১৫৭৬)

মুঘল বাংলার শাসক

মুঘল বাংলার সুবাহদার

বাংলার নবাব

ব্রিটিশ বাংলার নবাব

শশাঙ্ক ছিলেন প্রাচীন বাংলার একজন শাসক। যিনি বাংলার বিভিন্ন ক্ষুদ্র রাজ্যকে একত্র করে তিনি গৌড় নামের জনপদ গড়ে তোলেন। তিনি খ্রীস্টিয় ৭ম শতাব্দীতে রাজত্ব করেছেন বলে ধারণা করা হয়। কারো কারো মতে তিনি ৬০০ হতে ৬২৫ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে রাজত্ব করেন। তাঁর রাজধানীর নাম ছিল কর্ণসুবর্ণ বা কানসোনা।

বাংলার ইতিহাসে তিনি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছেন। শশাঙ্ক মোটামুটিভাবে ৬০০ থেকে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রাজত্ব করেন বলে ধারণা করা হয়। তাঁর ৮ম ও ১০ম রাজ্যাংকে প্রকাশিত দুটি লিপি পাওয়া গেছে মেদিনীপুর থেকে এবং তারিখবিহীন অপর একটি লিপি খড়গপুরের নিকট এগ্‌রা হতে আবিষ্পৃত হয়েছে। এছাড়া শশাঙ্কের অধীনস্থ গঞ্জামের (উড়িষ্যা) রাজা মাধববর্মার তাম্রশাসন (৬১৯ খ্রিষ্টাব্দের), হর্ষবর্ধনের বঁাশখেরা ও মধুবন তাম্রশাসন এবং কামরূপের রাজা ভাস্কর বর্মনের নিধানপুর তাম্রশাসন থেকে তাঁর সম্পর্কে জানা যায়। শশাঙ্কের উৎকীর্ণ স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রাও পাওয়া গেছে। গুপ্তদের পতন ও শশাঙ্কের উত্থানের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলায় বেশ কিছু স্বাধীন শাসকের উদ্ভব ঘটে। এঁদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায় অল্প কিছু লিপি এবং স্বর্ণ মুদ্রার ভিত্তিতে। রোহতাসগড়ে প্রাপ্ত সিলের ছঁাচে লিখিত ‘শ্রী মহাসামন্ত শশাঙ্ক’, বাণভট্টের সমসাময়িক সাহিত্য উপকরণ, চৈনিক তীর্থযাত্রী হিউয়েন-সাং এর বিবরণ এবং বৌদ্ধ গ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প শশাঙ্কের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

শশাঙ্কের প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে অতি অল্প তথ্য জানা যায়। ধারণা করা হয় যে, তিনি রোহতাসগড়ের মহাসামন্ত হিসেবে কর্ণসুবর্ণের গৌড় রাজার অধীনে কিছুদিন রাজ্য শাসন করেন। কর্ণসুবর্ণের গৌড় রাজা ছিলেন সম্ভবত মৌখরী বংশের প্রতিনিধি। কর্ণসুবর্ণের অপর একজন রাজা জয়নাগ শশাঙ্কের সমসাময়িক বলে প্রতীয়মান হয়। বস্তুত কর্ণসুবর্ণ ছিল শশাঙ্কের রাজধানী এবং এ বিখ্যাত নগরী অবস্থিত ছিল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় রাজবাড়িডাঙ্গা র (রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের প্রত্নস্থল অথবা আধুনিক রাঙ্গামাটি) সন্নিকটে চিরুটি রেল ˆস্টশনের কাছে।

লিপিমালা এবং সাহিত্যিক সূত্রে শশাঙ্ক গৌড়ের শাসক হিসেবে বর্ণিত হয়েছেন। সংকীর্ণ অর্থে পদ্মা ও ভাগীরথী নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলই গৌড়। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এক বিস্তৃত এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত হয়। শক্তিসঙ্গম তন্ত্র গ্রন্থের ৭ম পটল ‘সটপঞ্চষদ্দেশবিভাগ’-এ বলা হয়েছে যে, গৌড়ের সীমানা বঙ্গদেশ হতে ভুবনেশ (উড়িষ্যার ভুবনেশ্বর) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। এটি অসম্ভব নয় যে, লেখক শশাঙ্কের রাজ্যসীমা, যা উড়িষ্যার একটি অংশকেও অন্তর্ভুক্ত করেছিল, চিন্তা করেই গৌড় দেশের বিস্তৃতির বর্ণনা দিয়েছেন।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির সঙ্গে গুপ্ত সাম্রাজ্যের ধ্বংস ও পতন আকস্মিক যুগপৎ সংঘটন। অনেক অপরিচিত এলাকা, যেগুলি সম্ভবত গোত্র প্রধানগণ শাসন করতেন এবং যেখানে জনবসতি ছিল হালকা, ঐতিহাসিক খ্যাতি অর্জন করে। এ এলাকাগুলির মধ্যে ছিল পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর উড়িষ্যা এবং মধ্যপ্রদেশ সংলগ্ন এলাকার (ছোটনাগপুর মালভূমির অংশ দ্বারা গঠিত) লালমাটি অঞ্চল, যেখানে চাষাবাদ ও বসবাস করা বেশ কষ্টসাধ্য।

এ পরিপ্রেক্ষিতে শশাঙ্ক ভারতের বিভিন্ন অংশে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম কাজ ছিল মৌখরীদের দৃঢ নিয়ন্ত্রণ থেকে মগধ মুক্ত করা। শশাঙ্ক তাঁর মিত্র মালবের রাজা দেবগুপ্তকে সঙ্গে নিয়ে পুষ্যভূতি রাজ প্রভাকরবর্ধনের জামাতা মৌখরী রাজ গ্রহবর্মার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। গ্রহবর্মা দেবগুপ্তের হাতে নিহত হন। এরপর প্রভাকরবর্ধনের জ্যেষ্ঠ পুত্র বৌদ্ধ ধর্মমতাবলম্বী থানেশ্বর রাজ রাজ্যবর্ধন দেবগুপ্তের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং দেবগুপ্তকে পরাজিত ও নিহত করেন। কিন্তু দেবগুপ্তের মিত্র শশাঙ্কের সঙ্গে এক সংঘর্ষে রাজ্যবর্ধন নিহত হন।

অধিকাংশ পণ্ডিত গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের সঙ্গে রাজ্যবর্ধনের সাক্ষাতের বিষয়টি সত্য বলে ধরে নিলেও শশাঙ্কের হাতে রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুর অভিযোগ এড়িয়ে যান। বাণভট্টের মতে, রাজ্যবর্ধন খুব সহজেই মালবের সৈন্যবাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করেন এবং তিনি ‘গৌড়ের রাজার মিথ্যা উপচারে আশ্বস্ত হয়ে নিরস্ত্র ও একাকী অবস্থায় শত্রু শিবিরে নিহত হন’। চৈনিক তীর্থযাত্রী হিউয়েন-সাং একই ধরনের বর্ণনা দেন। শশাঙ্কের শত্রুর মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের অভাব রয়েছে। তাই রাজ্যবর্ধনের প্রতি শশাঙ্কের আচরণ বিশ্লেষণ করা অসম্ভব। নিজের পৃষ্ঠপোষকের ভাইয়ের মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত বাণভট্ট এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগী ও হর্ষবর্ধনের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞ হিউয়েন-সাং উভয়েই তাদের মনোভাবের জন্য সুপরিচিত। সম্ভবত এ কারণেই রাজ্যবর্ধনের মৃত্যু সম্পর্কিত বিবরণ দানে আবেগ প্রশমিত করতে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন।

কোন কোন পণ্ডিত মনে করেন রাজ্যবর্ধন খুব সম্ভব শশাঙ্কের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় প্রস্তুত ছিলেন এবং এ কারণেই তিনি শত্রু শিবিরে আগমন করেন। হর্ষরচিতের চতুর্দশ শতাব্দীর ব্যাখ্যাকার শঙ্কর উল্লেখ করেন যে, গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক রাজ্যবর্ধনকে আমন্ত্রণ জানান রাজ্যবর্ধনের সঙ্গে নিজ কন্যার বিবাহ সংক্রান্ত আলোচনার জন্য। বিষয়টি কতটুকু সত্য তা নিশ্চিত করে বলা বেশ কঠিন, কেননা শঙ্করের প্রদত্ত এ তথ্যের উৎস সম্পর্কে কিছু বলা হয় নি। হর্ষবর্ধনের লিপি উৎস বঁাশখেরা তাম্রশাসনে উৎকীর্ণ রাজ্যবর্ধনের মৃত্যু সম্পর্কিত তথ্য পর্যাপ্ত নয়। কিন্তু বাণভট্ট ও হিউয়েন সাং-এর বিবরণের মাধ্যমে সৃষ্ট পরিস্থিতি উপশমিত হয় যখন বঁাশখেরা তাম্রশাসনে এ তথ্য পাওয়া যায় যে, হর্ষবর্ধনের ভাই রাজ্যবর্ধন ‘সত্যানুরোধে’ শত্রুর বাসভবনে প্রাণ ত্যাগ করেন। অবশ্য এখানেও শত্রুর নাম প্রকাশ করা হয় নি। এ থেকে মনে হয় যে, অসমাপ্ত শান্তি আলোচনার জের ধরেই রাজ্যবর্ধনের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু এ দুর্ঘটনার জন্য শশাঙ্কের ব্যক্তিগত দায়িত্ব নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

এ ঘটনার পর রাজ্যবর্ধনের কনিষ্ঠ ভ্রাতা থানেশ্বরের সিংহাসনে আরোহণকারী হর্ষবর্ধন বিপুল সৈন্যেবাহিনী নিয়ে শশাঙ্ককে শাস্তি দিতে অগ্রসর হন এবং শশাঙ্কের পূর্ব সীমান্তের প্রতিবেশী কামরূপ রাজ ভাস্করবর্মনের (বাণভট্ট উল্লিখিত কুমার) সঙ্গে মৈত্রী জোট গড়ে তোলেন। বাণভট্ট সূত্রে জানা যায়, হর্ষবর্ধন ভাণ্ডির ওপর সেনাবাহিনীর দায়িত্ব অর্পণ করে নিজে বিন্ধ্য পর্বতের জঙ্গলে তাঁর বোন রাজ্যশ্রীকে উদ্ধার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। বোনকে উদ্ধারের পর তিনি নিজ সৈন্যদলের সঙ্গে মিলিত হন। এরপর হর্ষবর্ধন বোন রাজ্যশ্রীর অনুমতি নিয়ে কান্যকুGব্জর (কণৌজ) সিংহাসনে আরোহন করেন। ভাণ্ডির সৈন্যবাহিনীর অগ্রগতি সম্পর্কে আর কিছু জানা যায় না। কিন্তু এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, শশাঙ্ক শৌর্য-বীর্যের সঙ্গেই তাঁর রাজ্য শাসন অব্যাহত রাখেন। শশাঙ্ক উত্তর উড়িষ্যা এবং বাংলা ব-দ্বীপাঞ্চলের দক্ষিণাংশও তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। হর্ষবর্ধন তাঁর শাসনের শেষ দিকে ৬৪০-৪৩ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ-পূর্ব বিহার ও উড়িষ্যায় প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং একই সময়ে ভাস্করবর্মন রাজধানী নগর কর্ণসুবর্ণ অধিকার করেন বলেও মনে হয়। এ সকল ঘটনা সম্ভবত শশাঙ্কের মৃত্যুর পরই ঘটেছিল, কেননা ততদিনে গৌড়ের শক্তির পতন হয়েছে এবং শশাঙ্ক সম্পর্কেও তেমন কিছু শোনা যাচ্ছিল না। কিন্তু বৌদ্ধ গ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প-এ পুণ্ড্রবর্ধনের যুদ্ধে হর্ষের হাতে শশাঙ্কের পরাজয়ের কাহিনী এবং শশাঙ্কের ১৭ বছরের রাজত্বকাল সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা সমসাময়িক অপর কোন উৎস দ্বারা সমর্থিত নয়। বরং অতি সম্প্রতি দক্ষিণ মেদিনীপুর হতে আবিষ্পৃত শশাঙ্কের শিলালিপিতে দণ্ডভুক্তি জনপদের অস্তিত্বের উল্লেখ রয়েছে, যা মেদিনীপুর ও উড়িষ্যার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ছিল।

হর্ষবর্ধন প্রথমদিকে শৈব ধর্মের অনুসারী ছিলেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের একজন মহান পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন। বৌদ্ধ ধর্মের একজন একান্ত অনুরাগী হিসেবে তিনি মহাযান মতবাদ প্রচারে কণৌজে এক বিশাল সংগীতি আহ্বান করেন। হর্ষবর্ধন ব্রাহ্মণদের বিদ্রোহ অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দমন করেছিলেন বলে কথিত আছে। কণৌজের পর তিনি প্রয়াগেও অনুরূপ বিশাল বৌদ্ধ সংগীতির আয়োজন করেন। কণৌজ ও প্রয়াগের বৌদ্ধ সমাবেশে হিউয়েন-সাং এবং সীমান্তবর্তী সকল রাজ্যের রাজা, মন্ত্রী, অভিজাত প্রমুখ অংশ নেন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন শশাঙ্ককে শায়েস্তা করার জন্যই বোধিস্বত্বের নির্দেশে হর্ষের জন্ম হয়েছে বলে হিউয়েন-সাং বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি শশাঙ্কের কয়েকটি বৌদ্ধ ধর্মবিরোধী কাজকর্মের উদাহরণও তুলে ধরেন।

কিন্তু নালন্দায় অবস্থিত বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের ( নালন্দা মহাবিহার ) উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, যেখানে হিউয়েন-সাং নিজেও বেশ কিছুদিন লেখাপড়া করেছিলেন, এবং শশাঙ্কের রাজধানী শহর কর্ণসুবর্ণের উপকণ্ঠে রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারসহ বেশ কিছু সংখ্যক বৌদ্ধ মঠের অস্তিত্ব থেকে হিউয়েন-সাং প্রদত্ত তথ্য সঠিক নয় বলে মনে হয়। অন্যদিকে হর্ষবর্ধনের পৃষ্ঠপোষকতা লাভকারী চৈনিক তীর্থযাত্রী হিউয়েন-সাং তাঁর পৃষ্ঠপোষকের শত্রু শশাঙ্ক সম্পর্কে বলতে গিয়ে হর্ষের প্রতি গভীর পক্ষপাতিত্ব করেছেন বলে মনে হয়। গৌড়াধিপের (শশাঙ্কের নাম উল্লিখিত হয় নি; শশাঙ্ক অর্থ ‘শিব’, আর সম্ভবত বাণভট্ট নিজেও শৈব মতাবলম্বী ছিলেন) বিরুদ্ধে হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্ট কটূক্তিপূর্ণ ভাষা যেমন ‘গৌড়ভুজঙ্গ’ বা ‘গৌড়াধম’ ইত্যাদি ব্যবহার করে শশাঙ্কের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেন। এটি সত্য যে, শশাঙ্ক ছিলেন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের একজন শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষক এবং শৈব ধর্মের প্রতি একান্ত অনুরাগী। ধনী বণিক শ্রেণী এবং তাঁর জাতশত্রু হর্ষবর্ধনের পৃষ্ঠপোষকতা লাভকারী বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তাঁর কোন সহানুভূতি ছিল না। অসম্ভব নয় যে, তৎকালীন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অনুভূতি এতে আহত হয়েছিল।

অপরপক্ষে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি হর্ষবর্ধনের অনুরাগ এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতি বিদ্বিষ্ট মনোভাব (এ প্রসঙ্গে কণৌজ সমাবেশের সময় বিপুল সংখ্যক ব্রাহ্মণকে নৃশংসভাবে দমন করার ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে) হিন্দুধর্মের অনুসারিগণকে হতাশ করে এবং তারা বিপুল সংখ্যায় পূর্ব ভারতের দিকে অভিবাসন করে। হিউয়েন-সাং কামরূপে বেশ কিছু শিক্ষিত ব্রাহ্মণের চলে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। বেশ কিছু ব্রাহ্মণ কামরূপে বসবাসের জন্য ভাস্করবর্মনের কাছ থেকে ভূমিদান লাভ করেন। কুলজি গ্রন্থে কণৌজের বেশ কিছু ব্রাহ্মণের বাংলায় অভিবাসনের উল্লেখ রয়েছে। সরযূ (উত্তর প্রদেশ) তীরবর্তী অঞ্চল থেকে বাংলার দিকে গ্রহবিপ্রগণের অভিবাসনের গল্প, সম্ভবত শশাঙ্কের আমন্ত্রণে, এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা ও কামরূপে সাদরে গৃহীত হলেও এই বিপুল অভিবাসন শেষ পর্যন্ত এ দুদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের শাসনকালে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে মেলামেশা, আচার-আচরণ ও রীতি-নীতির ক্ষেত্রে সামাজিক বাধা তেমন একটা ছিল না; কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদের গোড়া সমর্থক সেন রাজাদের সময় প্রবলভাবে এসকল বাধা বিদ্যমান ছিল। এর ফলে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি পায়। সমাজে নিম্ন অস্কৃশ্য ও অন্ত্যজ শ্রেণীর উত্থান ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠে। শশাঙ্ক বেশ ভাল রাজা ছিলেন।

কর্ণসুবর্ণ  ছিল বাংলার প্রথম স্বাধীন শাসক শশাঙ্কের রাজধানী। চৈনিক তীর্থ যাত্রী হিউয়েন-সাং-এর ভ্রমণ বৃত্তান্ত জিউ জি-তে কিলোনসুফলন হিসেবে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। তীর্থ যাত্রীর বিবরণ অনুযায়ী তিনি তান-মো-লি-তি (তাম্রলিপ্তি) থেকে কিলোনসুফলন (কর্ণসুবর্ণ) পৌছেন। এ রাজধানীর নিকটেই ছিল লো-তো-মি-ছি মঠটি। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত রাজবাড়িডাঙ্গার (পশ্চিম বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার সদর সাবডিভিশনের চিরুটি স্টশনের নিকবর্তী যদুপুর গ্রাম) মঠের সাথে লো-তো-মি-ছি (রক্তমৃত্তিকা)-র শনাক্তীকরণের জোরালো ভিত্তির বলে এখন যথার্থভাবেই বলা যায় যে, খননকৃত প্রত্নস্থলের নিকটে ছিল কর্ণসুবর্ণ। স্থানীয়ভাবে এটি রাজা কর্ণ-এর প্রাসাদ নামে পরিচিত। উৎকীর্ণ লিপিসহ পোড়ামাটির ফলকের আবিষ্পার ও এতে রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার নামের উল্লেখ এর শনাক্তকরণের সকল দ্বিধাদ্বন্দ্বকে দূর করে দিয়েছে।

হিউয়েন-সাং আমাদেরকে কর্ণসুবর্ণের একটি স্কষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। এর সাহায্যে আমরা এর অবস্থান ও মানুষ সম্বন্ধে জানতে পারি। তাঁর মতে, দেশটি ছিল বেশ জনবহুল ও এখানকার মানুষ ছিল বেশ ধনী। এলাকাটি ছিল নিচু ও স্যাঁতসেতে। নিয়মিত চাষাবাস হতো, ফুল ও ফলের প্রাচুর্যতা ছিল এবং এখানকার আবহাওয়া ছিল নাতিশীতোষ্ণ। এখানকার জনগণ উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন এবং তারা ছিলেন শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক। তাঁর এ বর্ণনায় দেশটির সমৃদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়।

কর্ণসুবর্ণের লিপিতাত্ত্বিক প্রমাণ মেলে কামরূপের শাসক ভাস্করবর্মণ-এর নিধনপুর দানপত্র থেকে। এ দানপত্রটি কর্ণসুবর্ণের বিজয় ছাউনি (জয়-সরদ-অনবর্থ-স্কন্ধবারাত কর্ণসুবর্ণ-বাসকাত) থেকে প্রদান করা হয়েছিল। এতে প্রতীয়মান হয় যে, স্বল্প সময়ের জন্য গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ কামরূপের শাসক ভাস্করবমর্ণ-এর হাতে চলে গিয়েছিল। সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝিতে কর্ণসুবর্ণ পুনরায় সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য জয়নাগের প্রশাসনিক কেন্দ্রও ছিল। জয়নাগের বপ্য ঘোষবৎ দানপত্র থেকে এ তথ্য পাওয়া যায় [স্বস্তি কর্ণ(স)উবর্ণকাস্থিতস্য মহারাজাধিরাজহ (জ) পরম ভগবত শ্রী-জয়নাগ(দে)বশ্য]।

হিউয়েন সাং-এর লেখা থেকে আমরা কর্ণসুবর্ণের জনগণের ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে ধারণা পাই। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মানুষ এখানে বসবাস করত। এখানে বৌদ্ধ ধর্ম যে সমৃদ্ধ অবস্থায় ছিল তার যথেষ্ট প্রমাণ হলো যে, কর্ণসুবর্ণের নিকটই অবস্থিত ছিল বিশাল ও বিখ্যাত মহাবিহারটি। হিউয়েন সাং-এর বিবরণ থেকেই জানা যায় যে, সম্মতীয় স্কুলের বৌদ্ধগণ প্রধানত কর্ণসুবর্ণের দশটি মঠেই বাস করত। বৌদ্ধ মঠ ছাড়াও এখানে পঞ্চাশটি দেব মন্দিরও ছিল।

খননকৃত রাজবাড়িডাঙ্গার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কর্ণসুবর্ণকে একটি নগর কেন্দ্র হিসেবে ইঙ্গিত করে। তবে বেশ কিছু গ্রামীণ বসতি যেমন গোকর্ন, মহলন্দি, শক্তিপুর প্রভৃতির অস্তিত্ব রাজধানী শহরের চারপাশে বিদ্যমান ছিল। এরা সম্ভবত নগরবাসীর প্রয়োজনীয় বস্তুর চাহিদা পূরণ করত। সম্ভবত এ অঞ্চলের সাথে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। মালয় উপদ্বীপের ওয়েলেসলী অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত পঞ্চম শতাব্দীর একটি উৎকীর্ণ লিপিতে রক্তমৃত্তিকা থেকে আগত জনৈক মহানাবিক বুদ্ধগুপ্তের উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্য আর একটি তথ্য অনুযায়ী রক্তমৃত্তিকা থেকে মালয় উপদ্বীপে আগত একটি বড় জাহাজের ক্যাপ্টেনের উপস্থিতি বাংলার সাথে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক বাণিজ্যের ইঙ্গিত দেয়। আর চিরুটি অঞ্চলের ভাগীরথী সংলগ্নতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়ায় এ কারণে যে সামুদ্রিক বাণিজ্যে এটি একটি চ্যানেল হিসেবে ব্যবহূত হতে পারত।

তাই কর্ণসুবর্ণ একটি সমৃদ্ধশালী রাজনৈতিক-প্রশাসনিক, সামরিক ও ধর্মীয় নগর কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত ছিল। তবে এর খ্যাতি ছিল ক্ষণস্থায়ী। এটি প্রসিদ্ধি লাভ করে সপ্তম শতাব্দীর প্রথম পর্যায়ে শশাঙ্কের উত্থাণের মাধ্যমে এবং ঐ শতাব্দী শেষেই আবার বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। পাল ও সেনদের কোন দলিলেই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী শহরের কোন উল্লেখ খঁজে পাওয়া যায় না।

পাল বংশ

মাৎস্যন্যায়ের সময় বাংলার বিশৃঙ্খলা দমনের জন্য বাংলার মানুষ নির্বাচনের মাধ্যমে গোপাল নামক এক সামন্তরাজা কে বাংলার রাজা হিসেবে গ্রহন করেন ।গোপালই হলেন পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা ।পাল বংশের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই রাজা ছিলেন ধর্মপাল (রাজত্বকাল ৭৭৫-৮১০ খ্রীষ্টাব্দ) এবং দেবপাল (রাজত্বকাল ৮১০-৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ) ।

পাল বংশ

প্রথম গোপাল

গোপাল (জন্ম: – ৭৭০ মৃত্যু) ছিলেন বাংলার পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ৭৫০ থেকে ৭৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। পাল রাজাদের নামের শেষে “পাল” শব্দাংশটির অর্থ “রক্ষাকর্তা”। তাঁদের সঠিক জাতি-পরিচয় জানা যায় না।

তিব্বতী বৌদ্ধ পণ্ডিত তারানাথখালিমপুর তাম্রলিপির বয়ান অনুসারে, গৌড়রাজ শশাঙ্কের মৃত্যুর পর এক শতাব্দী কাল ছিল বাংলার ইতিহাসে ঘোর অরাজকতা ও গৃহবিবাদের যুগ। বাংলা ইতিহাসে এই যুগটি “মাৎস্যন্যায়” নামে পরিচিত। মৎস্য জগতে বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে গিলে খায়, তেমনি বাংলায় এই সময় শক্তিমানেরা দুর্বলদের উপর নিরন্তর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছিল। দেশের জনসাধারণের দুর্দশার অন্ত ছিল না। ব্যবসাবাণিজ্য বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। রৌপ্যমুদ্রার আদানপ্রদান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সর্বোপরি বাংলার প্রধান বন্দর তাম্রলিপ্ত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। বাংলার এই সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার হাত থেকে মুক্তি পেতে, ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে ‘প্রকৃতিপুঞ্জ’ অর্থাৎ, বাংলার প্রধান নাগরিকবৃন্দ গোপাল নামে এক জনপ্রিয় সামন্ত নেতাকে বাংলার রাজপদে নির্বাচিত করেন।

গোপালের জাতি-পরিচয় সঠিক জানা যায় না। গোপালের পুত্র ধর্মপালের রাজত্বের ৩৪তম বর্ষে রচিত খালিমপুর তাম্রলিপি থেকে জানা যায়, গোপাল ছিলেন বপ্যট নামে এক যোদ্ধার পুত্র এবং দয়িতবিষ্ণু নামে এক “সর্ববিদ্যাশুদ্ধ” পণ্ডিতের পৌত্র।”) তারানাথের মতে, গোপাল ছিলেন গোঁড়া বৌদ্ধ এবং ওদন্তপুরী মহাবিহারের প্রতিষ্ঠাতা। পাল সভাকবি সন্ধ্যাকর নন্দী “রামচরিত” কাব্যে পাল রাজাদের “সমুদ্রকুলোদ্ভূত” বলেছেন। আবুল ফজল পাল রাজাদের কায়স্থ বলে বর্ণনা করেন। রামচরিতে বরেন্দ্রভূমি অর্থাৎ উত্তরবঙ্গকে পাল রাজাদের পিতৃভূমি (“জনকভূ”) বলা হয়েছে।

গোপালের রাজত্বকাল বা রাজ্যবিস্তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে এটুকু জানা যায় যে, তিনি সমগ্র বাংলা অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। গোপাল ২০ বছর রাজত্ব করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ধর্মপাল রাজা হন।

ধর্মপাল ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলা অঞ্চলের পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শাসক। তিনি ছিলেন পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপালের পুত্র ও উত্তরাধিকারী ছিলেন। তিনি পৈত্রিক রাজত্বের সীমানা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেন এবং পাল সাম্রাজ্যকে উত্তর ও পূর্ব ভারতের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেন।

রামধনপুরে আবিষ্কৃত রাষ্ট্রকূটরাজ তৃতীয় গোবিন্দের তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে ৭০৩ শকাব্দের শ্রাবণ মাসের অমাবস্যার পূর্বে বা ৮০৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে জুলাইয়ের পূর্বে তৃতীয় গোবিন্দ গুর্জ্জর রাজকে পরাজিত করেন। তৃতীয় গোবিন্দের পুত্র প্রথম অমোঘবর্ষের একটি তাম্রশাসন হতে জানা যায় যে, তৃতীয় গোবিন্দ দ্বিতীয় নাগভট নামক গুর্জর রাজকে পরাজিত করেন এবং ধর্মপাল ও চক্রায়ুধ তাঁর নিকট নতশির হয়েছিলেন। কিন্তু কাম্বে নগরে আবিষ্কৃত তৃতীয় গোবিন্দের তাম্রশাসন থেকে দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর অনুমান করেছিলেন যে, ধর্মপাল দশম শতাব্দীর সময়কালের শাসক ছিলেন, যদিও ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ধর্মপাল দ্বিতীয় নাগভট এবং তৃতীয় গোবিন্দের সমসাময়িক ছিলেন। প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার আলেকজান্ডার কানিংহামের মতে ধর্মপাল ৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন বলে মনে করলেও মহারাষ্ট্রের সিরুর ও নীলগুণ্ড নামক স্থানে প্রপ্ত শিলালিপি এই মত খন্ডন করে তাকে ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত করে যেখান থেকে জানা যায়, ৭৮৭ শকাব্দে বা ৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে তৃতীয় গোবিন্দের পুত্র প্রথম অমোঘবর্ষের রাজত্বের বাহান্ন বছর পূর্ণ হয়, অর্থাৎ তৃতীয় গোবিন্দ আনুমানিক ৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। ধর্মপাল তাঁর সমসাময়িক হলে তিনি ৮০৮ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বেই সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ৭৯০ থেকে ৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ধর্মপালের সিংহাসনে আরোহণের সময়কাল হিসেবে অনুমান করেছেন:১১২ এবং নীহাররঞ্জন রায়ের মতে তিনি ৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনারূঢ় হন।:৩৮৫। এছাড়া রমেশচন্দ্র মজুমদার ৭৭০ থেকে ৮১০ খ্রিষ্টাব্দে[, আবদুল মোমিন চৌধুরী ৭৮১ থেকে ৮২১ খ্রিষ্টাব্দে, বিন্দেশ্বরী প্রসাদ সিনহা ৭৮৩ থেকে ৮২০ খ্রিষ্টাব্দে এবং দীনেশচন্দ্র সরকার ৭৭৫ থেকে ৮১২ খ্রিষ্টাব্দে ধর্মপালের রাজত্বের সময়কালকে নির্ণয় করেছেন।

পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম গোপাল ও তাঁর স্ত্রী দেদ্দাদেবীর পুত্র ধর্মপাল পিতার মৃত্যুর পর সিংহাসনে আরোহণ করেন। ধর্মপাল প্রতিহার বংশীয় বৎস্যরাজের নিকট পরাজিত হন। বৎস্যরাজ এবং ধর্মপালও অনতিকাল পরেই রাষ্ট্রকূটরাজ ধ্রুব ধারাবর্ষের নিকট পরাজিত হন। কিন্তু যুদ্ধের পর ধ্রুব ধারাবর্ষ দাক্ষিণাত্যে ফিরে গেলে প্রতিহারদের পরাজয়ের সুযোগ নিয়ে ধর্মপাল তাঁর হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করে নেন। এরপর তিনি কান্যকুব্জ আক্রমণ করে ইন্দ্ররাজ বা ইন্দ্রায়ুধের পরিবর্তে চক্রায়ুধকে ঐ রাজ্যের সিংহাসনে আসীন করেন, যার ফলে ভোজ, মৎস্য, কুরু, যদু, যবন, অবন্তি, গান্ধার, কীর প্রভৃতি জনপথের রাজারা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নেন। এরফলে তাঁর অধিকার বর্তমান মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, পাঞ্জাবপাকিস্তানের সিন্ধু নদ উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। কিন্তু এরপরেই গুর্জ্জর রাজকে দ্বিতীয় নাগভট প্রথমে চক্রায়ুধ ও পরে ধর্মপালকে পরাস্ত করলে,  ধর্মপাল ও চক্রায়ুধ গুর্জ্জরদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকূটরাজ তৃতীয় গোবিন্দের সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। ৮০৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে জুলাইয়ের পূর্বে তৃতীয় গোবিন্দ গুর্জর রাজকে পরাজিত করলে, ধর্মপাল ও চক্রায়ুধ তাঁর নিকট নতি স্বীকার করে নিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর তৃতীয় গোবিন্দের সঙ্গে কোন কারণে ধর্মপালের বিবাদ উপস্থিত হলে তৃতীয় গোবিন্দ তাঁকে পরাজিত করেন। তৃতীয় গোবিন্দ দক্ষিণাপথে ফিরে গেলে ধর্মপাল সমগ্র উত্তরাপথের অধীশ্বর হন। তাঁর সাম্রাজ্য উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে বিন্ধ্য পরবত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

ধর্মপাল রাষ্ট্রকূট রাজবংশের পরবেলের কন্যা রণ্ণাদেবীকে বিবাহ করেন। মধ্য ভারতে পথারি নামক স্থানে পরবেলের রাজত্বকালে ৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে উৎকীর্ণ একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, পরবেলের পিতার নাম ছিল কক্করাজ এবং পিতামহের নাম ছিল জেজ্জ। পরবেল নবম শতাব্দীর তৃতীয় ভাগেও জীবিত ছিলেন বলে রামপ্রসাদ চন্দ মনে করেন যে, ধর্মপাল প্রৌঢ়াবস্থায় রণ্ণাদেবীকে বিবাহ করেছিলেন, কিন্তু রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই মতে সংশয় প্রকাশ করেছেন। বর্তমান দিন পর্যন্ত ত্রিভুবনপাল ও দেবপাল নামক তাঁর দুই পুত্রের নাম পাওয়া গেছে। জ্যেষ্ঠ পুত্র ত্রিভুবনপাল, পিতার রাজত্বকালেই মৃত্যুবরণ করেন এবং কনিষ্ঠ পুত্র দেবপাল পিতার উত্তরাধিকারী হয়ে সিংহাসনে আরোহণ করেন।

সোমপুর মহাবিহার, ধর্মপাল নির্মিত বৌদ্ধ বিহার, ১৯৮৫ সালে এটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান ঘোষিত হয়। ধর্মপাল ছিলেন বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক। তিনি বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় পরে এক উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। তিনি সোমপুরপাহাড়পুর মহাবিহারও প্রতিষ্ঠা করেন। বিহারের ওদন্তপুরীতে তিনি এক দর্শনীয় মঠও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কথিত আছে, তিনি পঞ্চাশটি বৌদ্ধ বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন।

মহেন্দ্রপাল পাল সাম্রাজ্যের চতুর্থ সম্রাট ছিলেন।পাল যুগের বিভিন্ন সূত্র থেকে মহেন্দ্রপালের নাম পাওয়া গেলেও ঐতিহাসিকেরা বহুকাল ধরে এই মহেন্দ্রপাল বলতে প্রতিহার বংশের প্রথম মহেন্দ্রপালের কথাই মনে করতেন। তাঁরা দেবপালের পরবর্তী পাল সম্রাট হিসেবে প্রথম বিগ্রহপালের উল্লেখ করতেন। কিন্তু ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই মার্চ জগজ্জীবনপুর নামক স্থানে প্রাপ্ত মহেন্দ্রপালের একটি তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, দেবপালের পুত্র ও উত্তরাধিকারী হিসেবে মহেন্দ্রপাল পরবর্তী সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। মহেন্দ্রপালের রাজত্বের সপ্তম বছরে উৎকীর্ণ এই তাম্রশাসন থেকে আরো জানা যায় যে, মহেন্দ্রপালের মহাসেনাপতি বজ্রদেব নন্দদীর্ঘিকা উদ্রঙ্গ নামক স্থানে একটি বৌদ্ধবিহার স্থাপন করেছিলেন। তাম্রশাসনটিতে মহেন্দ্রপালের কনিষ্ঠ ভ্রাতা হিসেবে প্রথম শূরপালের নাম রয়েছে, যিনি মহেন্দ্রপালের পরবর্তী সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন।

প্রথম শূরপাল পাল সাম্রাজ্যের পঞ্চম সম্রাট ছিলেন। গরুড়স্তম্ভলিপিতে প্রথম শূরপালের উল্লেখ পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকেরা দেবপালের পরবর্তী পাল সম্রাট হিসেবে প্রথম শূরপাল বা প্রথম বিগ্রহপালের উল্লেখ করতেন। কিন্তু ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই মার্চ জগজ্জীবনপুর নামক স্থানে প্রাপ্ত মহেন্দ্রপালের একটি তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, দেবপালের পুত্র ও উত্তরাধিকারী হিসেবে মহেন্দ্রপাল পরবর্তী সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাম্রশাসনটিতে মহেন্দ্রপালের কনিষ্ঠ ভ্রাতা হিসেবে প্রথম শূরপালের নাম রয়েছে, যিনি মহেন্দ্রপালের পরবর্তী সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। পূর্বে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় প্রভৃতি ঐতিহাসিকেরা মনে করতেন যে, প্রথম শূরপাল এবং প্রথম বিগ্রহপাল একই ব্যক্তি। কিন্তু ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে মির্জাপুর জেলায় আবিষ্কৃত তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, তাঁরা দুজনে খুল্লতাত ভ্রাতা ছিলেন। তাঁরা একই সময় দুইটি পৃথক স্থানে রাজত্ব করতেন না বিভিন্ন সময়ে রাজত্ব করতেন সেই নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। তবে যেহেতু প্রথম শূরপালের কোন বংশধরের কথা জানা যায় না এবং পাল সাম্রাজ্যের পরবর্তী সম্রাটেরা সকলেই প্রথম বিগ্রহপালের উত্তরাধিকারী ছিলেন, সেহেতু মনে করা হয়, উত্তরাধিকারী না থাকায় শান্তিপূর্ণভাবেই হোক, বা বলপূর্বকই হোক, প্রথম শূরপালকে সরিয়ে প্রথম বিগ্রহপাল সিংহাসনে আরোহণ করেন।

রমেশচন্দ্র মজুমদার ৮৫০ থেকে ৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে, আবদুল মোমিন চৌধুরী ৮৬১ থেকে ৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে, বিন্দেশ্বরী প্রসাদ সিনহা ৮৬০ থেকে ৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে এবং দীনেশচন্দ্র সরকার ৮৫০ থেকে ৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম শূরপালের রাজত্বের সময়কালকে নির্ণয় করেছেন। এর মধ্যে প্রথম তিনজন মনে করেন প্রথম শূরপাল ও প্রথম বিগ্রহপাল একই সময়ে পৃথক স্থানে রাজত্ব করতেন।

প্রথম বিগ্রহপাল পাল সাম্রাজ্যের ষষ্ঠ সম্রাট ছিলেন। ভাগলপুরের আবিষ্কৃত নারায়ণপালের তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, তিনি পাল সম্রাট ধর্মপালের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বাকপালের পৌত্র ও জয়পালের পুত্র ছিলেন এবং পরবর্তী পাল সম্রাট নারায়ণপালের পিতা ছিলেন। ঐতিহাসিকেরা দেবপালের পরবর্তী পাল সম্রাট হিসেবে প্রথম শূরপাল বা প্রথম বিগ্রহপালের উল্লেখ করতেন। কিন্তু ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই মার্চ জগজ্জীবনপুর নামক স্থানে প্রাপ্ত মহেন্দ্রপালের একটি তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, দেবপালের পুত্র ও উত্তরাধিকারী হিসেবে মহেন্দ্রপাল পরবর্তী সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাম্রশাসনটিতে মহেন্দ্রপালের কনিষ্ঠ ভ্রাতা হিসেবে প্রথম শূরপালের নাম রয়েছে, যিনি মহেন্দ্রপালের পরবর্তী সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন।

পূর্বে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় প্রভৃতি ঐতিহাসিকেরা মনে করতেন যে, প্রথম শূরপাল এবং প্রথম বিগ্রহপাল একই ব্যক্তি। কিন্তু ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে মির্জাপুর জেলায় আবিষ্কৃত তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, তাঁরা দুজনে খুল্লতাত ভ্রাতা ছিলেন। তাঁরা একই সময় দুইটি পৃথক স্থানে রাজত্ব করতেন না বিভিন্ন সময়ে রাজত্ব করতেন সেই নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। তবে যেহেতু প্রথম শূরপালের কোন বংশধরের কথা জানা যায় না এবং পাল সাম্রাজ্যের পরবর্তী সম্রাটেরা সকলেই প্রথম বিগ্রহপালের উত্তরাধিকারী ছিলেন, সেহেতু মনে করা হয়, উত্তরাধিকারী না থাকায় শান্তিপূর্ণভাবেই হোক, বা বলপূর্বকই হোক, প্রথম শূরপালকে সরিয়ে প্রথম বিগ্রহপাল সিংহাসনে আরোহণ করেন।

রমেশচন্দ্র মজুমদার ৮৫০ থেকে ৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে, আবদুল মোমিন চৌধুরী ৮৬১ থেকে ৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে, বিন্দেশ্বরী প্রসাদ সিনহা ৮৬০ থেকে ৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে এবং দীনেশচন্দ্র সরকার ৮৫৮ থেকে ৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বিগ্রহপালের রাজত্বের সময়কালকে নির্ণয় করেছেন। এর মধ্যে প্রথম তিনজন মনে করেন প্রথম শূরপাল ও প্রথম বিগ্রহপাল একই সময়ে পৃথক স্থানে রাজত্ব করতেন।

ভাগলপুরের আবিষ্কৃত নারায়ণপালের তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, প্রথম বিগ্রহপাল পাল সম্রাট ধর্মপালের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বাকপালের পৌত্র ও জয়পালের পুত্র ছিলেন। তিনি হৈহেয় রাজবংশের লজ্জাদেবীকে বিবাহ করেন এবং তাঁদের নারায়ণপাল নামে এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়, যিনি পরবর্তী পাল সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন।

নারায়ণপাল পাল সাম্রাজ্যের সপ্তম সম্রাট ছিলেন। তিনি পাল সম্রাট প্রথম বিগ্রহপাল ও হৈহেয় রাজবংশের লজ্জাদেবীর সন্তান ছিলেন। সুদীর্ঘ চুয়ান্ন বছর রাজত্ব করলেও নারায়ণপালের রাজত্বকালে পাল সাম্রাজ্যের অনেকাংশ অন্যান্য রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

রমেশচন্দ্র মজুমদার ৮৫৪ থেকে ৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে, আবদুল মোমিন চৌধুরী ৮৬৬ থেকে ৯২০ খ্রিষ্টাব্দে ও বিন্দেশ্বরী প্রসাদ সিনহা ৮৬৫ থেকে ৯২০ খ্রিষ্টাব্দে এবং দীনেশচন্দ্র সরকার ৮৬০ থেকে ৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে নারায়ণপালের রাজত্বের সময়কালকে নির্ণয় করেছেন।

নারায়ণপালের রাজত্বের প্রথমার্ধে মগধ, তীরভুক্তি ও বঙ্গ পাল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হলেও তাঁর সপ্তদশ রাজ্যাঙ্কের পরে গুর্জররাজ ভোজদেব এই সকল অঞ্চল হয় করে নেন। ভোজদেব তাঁর অধীনে সামন্তদের সহায়তায় বারাণসী জয় করে মগধ আক্রমণ করে নারায়ণপালকে পরাজিত করেন বলে অনুমান করা হয়। এই যুদ্ধে ভোজদেবের সামন্তরূপে প্রতীহার বংশীয় কক্ক মুদগিরিতে গৌড়রাজের বিপক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন। কলচুরী রাজবংশের প্রথম গুণাম্ভোধিদেব ভোজদেবকে গৌড় আক্রমণে সহায়তা করেছিলেন।

রাজ্যপাল পাল সাম্রাজ্যের অষ্টম সম্রাট ছিলেন।পাল সম্রাট নারায়ণপালের মৃত্যুর পর রাজ্যপাল পাল রাজবংশের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি রাষ্ট্রকূট রাজবংশের তুঙ্গ নামক নরপতির কন্যা ভাগ্যদেবীকে বিবাহ করেন। এই তুঙ্গ কে ছিলেন এই নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। নগেন্দ্রনাথ বসুর মতে শুভতুঙ্গ উপাধিধারী রাষ্ট্রকূট সম্রাট দ্বিতীয় কৃষ্ণ, ফ্রাঞ্জ কিলহর্ণের মতে দ্বিতীয় কৃষ্ণের পুত্র জগত্তুঙ্গ এবং রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে তুঙ্গধর্মাবলোক নামক রাজাই ছিলেন রাজ্যপালের শ্বশুর। বাণগড়ে আবিষ্কৃত প্রথম মহীপালের তাম্রশাসন থেকে জানা যা যে, রাজ্যপাল বহু গভীর জলাশয় ও উচ্চ দেবালয় নির্মাণ করিয়েছিলেন।

রমেশচন্দ্র মজুমদার ৯০৮ থেকে ৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে, আবদুল মোমিন চৌধুরী ও বিন্দেশ্বরী প্রসাদ সিনহা ৯২০ থেকে ৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে এবং দীনেশচন্দ্র সরকার ৯১৭ থেকে ৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে রাজ্যপালের রাজত্বের সময়কালকে নির্ণয় করেছেন।

দ্বিতীয় গোপাল পাল সাম্রাজ্যের নবম সম্রাট ছিলেন। পাল সম্রাট রাজ্যপালের মৃত্যুর পর তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন।দ্বিতীয় গোপালের শাসনাধীনে মগধ ছিল বলে মনে করা হয় কারণ তাঁর রাজত্বকালে মগধে প্রতিষ্ঠিত দুইটি মূর্তি ও মগধে লিখিত একটি বৌদ্ধগ্রন্থ আবিষ্কৃত হয়েছে। ত্রিপুরার মম্বুক নামক গ্রামে দ্বিতীয় গোপালের রাজত্বকালের দ্বিতীয় বছরে প্রতিষ্ঠিত একটি মূর্তি এবং মালদহ জেলার গাজোল থানার জাজলপাড়া গ্রামে তাঁর একটি তাম্রপত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। তাঁর রাজত্বকালের প্রথম বছরে তিনি নালন্দায় একটি বাগেশ্বরী মূর্তি তৈরী করান।তাঁর রাজত্বকালের পঞ্চদশ বছরে একটি অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা লেখা হয়েছিল।

রমেশচন্দ্র মজুমদার ৯৪০ থেকে ৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে, আবদুল মোমিন চৌধুরী ৯৫২ থেকে ৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে, বিন্দেশ্বরী প্রসাদ সিনহা ৯৫২ থেকে ৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে এবং দীনেশচন্দ্র সরকার ৯৫২ থেকে ৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় গোপালের রাজত্বের সময়কালকে নির্ণয় করেছেন।

রামপাল বাংলার পালবংশের (রাজত্বকাল ৭৫০-১১৫৪ খ্রিস্টাব্দ) পতনের কালে অন্যতম উল্লিখিত নাম; রামচরিতের বর্ণনা থেকে অনুমিত হয় যে দ্বিতীয় শূরপালকে কোনও উপায়ে সংহার করে তিনি পৈত্রিক রাজ্যাধিকার প্রাপ্ত হয়েছিলেন।রামপালের অভিষেক কালে পালরাজাদের রাজ্যপাট বোধহয় ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী বদ্বীপে সীমাবদ্ধ হয়েছিল; কারণ রামপালকে কৈবর্ত বিদ্রোহের নেতা দিব্বোকের রাজ্য উত্তরবঙ্গ অধিকারের জন্য ভাগীরথীর উপরে নৌকামেলক বা নৌ-সেতুবন্ধন করতে হয়েছিল। রামপাল,শূরপালের মৃত্যুর পর যখন গৌড়ের সিংহাসন অধিকার করেন তখন দিব্বোকের ভ্রাতুষ্পুত্র ভীম গৌড়ের মসনদে আসীন ছিলেন। দিব্বোকের পর অনুমান করা হয় তার ভ্রাতা রূদোক গৌড়ের অধিকার প্রাপ্ত হয়েছিলেন, পরে তাঁর পুত্র ভীম উত্তরাধিকার সূত্রে উত্তরবঙ্গের সিংহাসন আরোহণ করেছিলেন।
সেইসময় রামপাল অত্যন্ত হতাশ হয়ে পড়েছিলেন । তাঁর পুত্র রাজ্যপাল ও অন্যান্য আমাত্যগণ রাজ্যের বিভিন্ন কাজকর্ম সম্পর্কে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতেন । এমনকী রামপাল কিছুদিনের জন্য ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন, তাঁর বনময় রাজ্যগুলির সামন্তগণের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছিলেন । ভ্রমণ শেষে রামপাল বুঝতে পারেন যে তাঁর ব্যবহারে আমাত্যগণ সন্তুষ্ট হয়েছেন তাই তিনি পদাতিক, অশ্ব ও গজারোহী সৈন্য সংগ্রহ করেন ; আর এর জন্য তাঁকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়েছিল ।

তিন প্রকার সৈন্য সংগ্রহ করে রামপালদেবের মাতুল-পুত্র রাষ্ট্রকূট-বংশীয় শিবরাজদেব রামপালের আদেশে সেনা নিয়ে গঙ্গা পার হয়েছিলেন । মহাপ্রতিহার শিবরাজদেব কৈবর্ত রাজ্যে অবস্থিত বিভিন্ন গ্রামগুলি আক্রমণ করলে কৈবর্ত নায়ক ভীমের প্রজাগণ বিপন্ন হয়ে পড়ে । শিবরাজ বরেন্দ্রী হতে ভীমের রক্ষকগণকে বিতাড়িত করেছিলেন । শিবরাজের এই বরেন্দ্রী অধিকার দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়নি, কেননা কিছুদিন পরেই আবার রামপালকে বহু সেনা নিয়ে বরেন্দ্রী আক্রমণ করতে হয়েছিল । বারেন্দ্র-অভিযানে মগধ ও পিঠীর অধিপতি ভীমযশঃ, কোটাটবীর বীরগুণ, দণ্ডভুক্তি-রাজ জয়সিংহ, দেবগ্রাম-প্রতিবদ্ধ বালবলভীর বিক্রমরাজ, অপরমন্দারের অধিপতি এবং আটবিক সামন্তচক্রের প্রধান লক্ষ্মীশূর, কুজবটীর শূরপাল, তৈলকম্পের রুদ্রশেখর, উচ্ছালের অধিপতি ময়গলসিংহ, ঢেক্করীয়-রাজ প্রতাপসিংহ , কৌশাম্বীপতি দ্বোরপবর্ধন প্রমুখ সামন্তগণ এবং রাজ্যপাল সহ রামপালের অন্যান্য পুত্রগণ পিতার সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন ।

সামন্তগণের পরিচিতি

১ . মগধ ও পিঠীর অধিপতি ভীমযশ রামচরিতের টীকায় “কান্যকুব্জরাজবাজিনীগণ্ঠনভুজঙ্গ” নামে অভিহিত । সম্ভবত কান্যকুব্জ-রাজ তাঁর দ্বারা পরাজিত হয়েছিলেন; তবে সেই সময় কোন রাজা কান্যকুব্জের সিংহাসনে আসীন ছিলেন তা সঠিক জানা যায় না। প্রতিহার বংশীয় ত্রিলোচনপালের পর চেদি-বংশীয় কর্ণদেব বোধহয় কিছুদিনের জন্য কান্যকুব্জের সিংহাসনে বসেছিলেন; কারণ গাহডবাল-বংশীয় গোবিন্দচন্দ্রদেবের একখানি তাম্রশাসনে পাওয়া যায় যে, ভোজদেব ও কর্ণদেবের পর চন্দ্রদেব পৃথিবীর অধীশ্বর হয়েছিলেন। পিঠী দক্ষিণ মগধের প্রাচীন নাম, আবার গোবিন্দদেবের পত্নী কুমরদেবীর শিলালিপির পাঠোদ্ধার করে ডঃ স্টেইন কোনো ( Sten Konow ) অনুমান করেন পিঠী মাদ্রাজ প্রদেশের পিট্টপুরমের প্রাচীন নাম। রামচরিতের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের অষ্টম শ্লোকের টীকায় পাওয়া যায় যে, মথনদেব বিন্ধ্যমাণিক্য নামক হস্তিপৃষ্ঠে আরোহণ করে পিঠী ও মগধের অধিপতিকে পরাজিত করেছিলেন।

২. কোয়াটবীর রাজা বীরগুণ: রামচরিতের টীকাতে বীরগুণ সম্বন্ধে বলা হয়েছে ‘দক্ষিণ সিংহাসনে চক্রবর্তী’;নগেন্দ্রনাথ বসুর মতে এটি বিশাল অরণ্যানী-বেষ্টিত উড়িষ্যার গড়জাত প্রদেশ। আইন-ই-আকবরীতে এই স্থান কটক সরকারের অন্তর্গত ‘কোটদেশ’ বলেই অভিহিত হয়েছে। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই মত সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু উড়িষ্যায় রামপালের বা তাঁর পিতার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত সামন্তশাসিত কোনো রাজ্য ছিল এর কোনো প্রমাণ নেই। বিষ্ণুপুরের পূর্বে কোটেশ্বর নামক গ্রামের সাথে এর নামসাদৃশ্য আছে। শ্রীযুক্ত পঞ্চানন মণ্ডলের মতে অজয় নদের দক্ষিণ তীরে বর্ধমান জেলার ও আউসগ্রাম থানার অন্তর্গত ভল্কীকোট গ্রামই প্রাচীন কোটাটবী, কারণ এই অঞ্চলকে এখনও কোটার জঙ্গল বলা হয়।

৩. দণ্ডভুক্তির রাজা জয়সিংহ: দণ্ডভুক্তি মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণভাগে অবস্থিত ছিল। ইনি উড়িষ্যার রাজা কর্ণকেশরীকে পরাজিত করেছিলেন।

৪. বিক্রম: রামচরিতে শুধু এই নামটি আছে, টীকাতে এঁকে বিক্রমরাজ বলা হয়েছে। টীকাকারের ভাষ্যে ‘দেবগ্রাম প্রতিবদ্ধ’ ও ‘বালবলভী তরঙ্গ’, এই দুইটি শব্দ আছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এর অর্থ করেছিলেন যে বিক্রমরাজ দেবগ্রামের রাজা ছিলেন এবং এর চারিপার্শ্ব বালবলভী দেশের নদী দ্বারা বেষ্টিত ছিল। তাঁর মতে বালবলভী প্রাচীন বাগড়ীর (মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা) নাম। শ্রীরাধাগোবিন্দ বসাক বলেন যে, বালবলভী একটি নদীর নাম এবং বিশাল তরঙ্গ-বহুল নদীদ্বারা বেষ্টিত থাকায় রাজধানী দেবগ্রাম সুরক্ষিত ছিল। দেবগ্রামের অবস্থিতি সম্পর্কে কেউ কেউ ধারণা করেন: কলিকাতা-লালগোলা রেলওয়ে লাইনে কলিকাতার [শিয়ালদহ স্টেশন] হতে ১৪০ কিলোমিটার দূরে দেবগ্রাম নামক স্টেশনের আধ মাইল দূরে দেবগ্রাম নামক গ্রামই খুব সম্ভব প্রাচীন দেবগ্রাম।

৫. ‘নগেন্দ্রনাথ বসু নদীয়া জেলার একটি গ্রামকে চিহ্নিত করেছেন। রমেশচন্দ্র মজুমদার দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার সুবর্ণরেখা নদীর মুখে পিপলী গ্রামকে চিহ্নিত করেছেন। সম্পাদিত ‘বর্ধমানের পুরাকথা’ নামক গ্রন্থে এই স্থানের অনেক প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের বিবরণ আছে।

৬. লক্ষ্মীশূর: তিনি হুগলী জেলার অন্তর্গত অপারমন্দারের অধিপতি ছিলেন। শ্রীপঞ্চানন মণ্ডল বলেন যে, বর্তমান গড়মান্দারণ নামক গ্রাম হুগলী জেলার আরামবাগ হতে নয় মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। নলিনী দাশগুপ্ত এই মত গ্রহণ করেন নি। তাঁর মতে বর্তমান দেওঘর, বৈদ্যনাথ এবং অপর মন্দার অর্থাৎ ভাগলপুরের ৩০ মাইল দক্ষিণে মন্দার পর্বতের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত অরণ্যসঙ্কুল ‘অপর-মন্দার’ প্রদেশেই লক্ষ্মীশূরের রাজ্য ছিল। প্র ম মহীপালের সমসাময়িক রণশূর দক্ষিণ রাধা শাসন করতেন। লক্ষ্মীশূর এক বংশীয় হতে পারেন। [[বিজয়সেন] যে শূর বংশে বিবাহ করেছিলেন, হয়তো এরাই সেই বংশের। জানা যায় যে, লক্ষ্মীশূর পার্বত্য এলাকার সামন্তদের প্রধান ছিলেন।

৭. কুব্জবটির রাজা [[শূরপাল]: কুব্জবটি সাঁওতাল পরগনার অন্তর্ভুক্ত নয়া দুমকার ১৪ মাইল উত্তরে অবস্থিত ছিল।

৮. তৈলকম্পের (মানভূম) রাজা রুদ্রশিখর: বিহারের মানভূম জেলার তেলকুপিই প্রাচীন তৈলকম্প

৯. উচ্ছালের রাজা ভাস্কর অথবা মদকলসিংহ: পূর্বে বীরভূম জেলার অন্তর্গত ‘জৈনউঝিয়াল’ পরগনার নামই উচ্ছাল বলে গৃহীত হতো। শ্রীপঞ্চানন মণ্ডল বলেন যে, এটি বর্ধমান জেলার উছলান গ্রাম। এটিই অধিকতর সঙ্গত বলে মনে করেছেন ঐতিহাসিক রমেশ মজুমদার, কিন্তু অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেছেন।

১০. ঢেক্করীরাজ প্রতাপসিংহ: কাটোয়ার নিকটবর্তী বর্ধমান জেলায় অবস্থিত বলে জানা যায়।

১১. কয়ঙ্গলমণ্ডলের অধিপতি নরসিংহাসর্জুন: এর বর্তমান নাম কাঙ্গজোল- এটি বর্তমান রাজমহলের ২০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত।

১২. সঙ্কটগ্রামের রাজা চণ্ডার্জুন: শ্রীপঞ্চানন মণ্ডলের মতে বর্ধমান জেলার রায়না থানার অন্তর্গত সংকট নামক গ্রাম হতে শক্তিগড় পর্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগই প্রাচীন সংকট রাজ্য। আইন-ই-আকবরীতে সাতগাঁও সরকারের অন্তর্গত সকোট পরগনার উল্লেখ পাওয়া যায়। সম্ভবত বল্লাল চরিতের সংককোট এবং তবকাত-ই-নাসিরীর সঙ্কনাৎ ও এই সংকট গ্রাম অভিন্ন।

১৩. নিদ্রাবলীর রাজা বিজয়রাজ: সম্ভবত সেনবংশীয় রাজা বিজয় সেন। বিজয় সেন ও বিজয়রাজ অভিন্ন বলে গ্রহণ করলে নিদ্রাবলী পশ্চিম বাংলায় অবস্থিত ছিল। বল্লালসেন নৈহাটী তাম্রশাসন থেকে আমরা জানতে পারি যে, তাদের পূর্বপুরুষ রাধা রাজ্যে প্রথমে বসতি স্থাপন করে।

১৪. কৌশাম্বীর রাজা দ্বোরপবর্ধন: কৌশাম্বী সম্ভবত রাজশাহী অথবা বগুড়া জেলায় অবস্থিত ছিল। কেউ কেউ একে ভাগীরথীর পূর্ববতীরে কলিকাতার দক্ষিণে অবস্থিত বলে মত প্রকাশ করেছেন। শ্রীপঞ্চানন মণ্ডল বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার অন্তর্গত কুসুমগ্রামই রামচরিতের কোশাম্বী বলে মত প্রকাশ করেছেন।

১৫. পদুবন্বার রাজা সোম: ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ হুগলী, পাবনা অথবা দিনাজপুর চিহ্নিত করেছেন। খুব সম্ভব হুগলী জেলার অন্তর্গত পাউনান পরগনা প্রাচীন পদুবন্বার স্মৃতি বহন করছে বলে আচার্য মজুমদার চিহ্নিত করেছেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তা বর্তমান পাবনা নগরীর প্রাচীন নাম হতে পারে এরূপ মত প্রকাশ করেছিলেন।

বরেন্দ্র বিদ্রোহ

পালরাজত্বকালে কৈবর্তনায়ক দিব্বোকের নেতৃত্বে যে অভ্যুথান ঘটেছিল তাতে পালরাজ দ্বিতীয় মহীপাল পরাজিত ও নিহত হয়েছিলেন । রামচরিতের একটি শ্লোকে এরূপ ইঙ্গিত আছে যে দিব্বোক মহীপালের অধীনে উচ্চরাজকার্যে আসীন ছিলেন। রামচরিতে দিব্বোককে দস্যু ‘উপধিব্রতী’ বলা হয়েছে। টীকাকার উপধিব্রতীর অর্থ করেছেন ‘ছদ্মনিব্রতী’; কেউ কেউ এ থেকে সিদ্ধান্ত করেছেন যে, দিব্বোক কর্তব্যবশে বিদ্রোহী সেজে মহীপালকে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু এ-কথা যুক্তিযুক্ত মনে হয় না। দস্যু ও উপধিব্রতী হতে বরং এটিই মনে হয় যে, রামচরিতকারের মতে দিব্বোক প্রকৃতই দস্যু ছিলেন; কিন্তু দেশহিতের মোড়কে রাজাকে হত্যা করেছিলেন। বস্তুত রামচরিত কাব্যের অন্যত্রও দিব্বোের আচরণ কুৎসিত ও নিন্দনীয় বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিছুদিন পর্যন্ত বাংলার একদল লোক বিশ্বাস করতেন যে, দিব্বোক অত্যাচারী মহীপালকে বধ করে দেশকে রক্ষা করেছিলেন এবং তাঁর এই মহৎ কার্যের জন্য জনসাধারণ কর্তৃক রাজা নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁরা দিব্বোককে মহাপুরুষ সাজিয়ে উত্তরবঙ্গের নানা স্থানে প্রতি বছর ‘দিব্যস্মৃতি উৎসবের’ ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু রামচরিতে এর কোনো সমর্থনই পাওয়া যায় না। অবশ্য পালরাজগণের কর্মচারী সন্ধ্যাকর নন্দী দিব্বোক সম্বন্ধে বিরুদ্ধভাব পোষণ করতেন, এটি খুবই স্বাভাবিক; কিন্তু রামচরিত ব্যতীত দিব্বোক সম্বন্ধে জানার আর কোনো উপায়ও নেই। সুতরাং রামচরিতকার তাঁর চরিত্রে যে কলঙ্ক লেপন করেছেন, তা পুরোপুরি সত্য বলে গ্রহণ না করলেও দিব্বোককে দেশের ত্রাণকর্তা মহাপুরুষ মনে করার কোনোই কারণ নেই। বস্তুত মহীপাল যে প্রজাপীড়ক বা অত্যাচারী রাজা ছিলেন এবং এই জন্যই তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়েছিল এরূপ মনে করার কোনো কারণ নেই। আর এই বিদ্রোহকে কৈবর্ত জাতির বিদ্রোহ বলে চিহ্নিত করাও সঙ্গত নয়। দিব্বোক কৈবর্তজাতীয় ছিলেন কিন্তু তিনি যে এই জাতির উপর রাজার অত্যাচারের জন্য মহীপালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন রামচরিতে এর সমর্থনে কোনো উক্তি বা প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ ধরণের বিদ্রোহ সে যুগে প্রায়ই ঘটত। রামচরিতে বলা হয়েছে যে, রামপাল ‘নৃপতি-শ্রেষ্ঠ (মহীপালের) হত্যাকারী (কৈবর্ত রাজার) নিরাময়তা নষ্ট করেছিলেন।’ এ হতে মনে হয় যে, দিব্বোকই মহীপালকে বধ করেছিলেন।

সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত হতে জানা যায় যে, বর্ম্মবংশীয় জনৈক রাজা আত্মরক্ষার জন্য নিজের হস্তী ও রথ রামপালকে উপহার দিয়েছিলেন। বর্ম্মবংশীয় এই রাজার এমন আচরণের কারণ হতে পারে যে, রামপাল কর্তৃক বঙ্গ আক্রমণ এবং সেনবংশীয় সামন্তসেন কর্তৃক বঙ্গদেশ অধিকার। বৃদ্ধবয়সে রামপালদেব তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজ্যপালের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে রামাবতীতে বাস করছিলেন। মুঙ্গের অবস্থানকালে রামপালদেব তাঁর মাতুল মথনদেবের মৃত্যু সংবাদ শ্রবণ করে অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েনএবং ব্রাহ্মগণকে বহু ধন দান করে গঙ্গাবক্ষে সলিলসমাধি গ্রহণ করেন।

সেন বংশ

হেমন্ত সেন ছিলেন বাংলার হিন্দু সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। এবং সেন বংশের মূল প্রতিষ্ঠাতা “সামন্ত সেনের” পুত্র। সামন্ত সেন রাজা উপাধি ধারন করেননি, কিন্তু তার পুত্র হেমন্ত সেন স্বাধীন সেন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে প্রথম ‘মহারাজা’ উপাধি ধারণ করেন।

বল্লাল সেন (১১৬০-১১৭৮) ছিলেন বাংলার সেন রাজবংশের দ্বিতীয় রাজা। কুলজি গ্রন্থসমূহ থেকে জানা যায় যে, বিজয় সেনের পুত্র এবং উত্তরসূরি। বল্লাল সেন বাংলায় সামাজিক সংস্কার, বিশেষ করে কৌলীন্য প্রথা প্রবর্তনকারী হিসেবে পরিচিত।
বল্লাল সেন ওষধিনাথ নামক এক দাক্ষিণাত্য ব্রাহ্মণবংশ জাত।এজন্য সেন রাজাদেরকে ‘দ্বিজরাজ ওষধি নাথ বংশজ’ বলে উল্লেখ দেখা যায়।বল্লালের পিতা বিজয়সেন গৌড়াধিপতি চন্দ্রসেনের কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন।1033 শকাব্দে রামপাল নগরে বল্লালসেনের জন্ম হয়।শৈব বরে তাঁর জন্ম হওয়াতে বিজয়সেন পুত্রের নাম ‘বরলাল’ রাখেন।’বল্লাল’ শব্দ এরই অপভ্রংশ ।তিনি দীর্ঘকায়, বলবান, বুদ্ধিমান, মেধাবী ছিলেন; মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সেই শস্ত্রবিদ্যায় ও শাস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হয়েছিলেন।

বল্লাল সেনের সময়কার দুটি লিপি-প্রমাণ (নৈহাটি তাম্রশাসন এবং সনোকার মূর্তিলিপি) এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলিতে বল্লাল সেনের বিজয় সম্পর্কে কোন উল্লেখ নেই। অবশ্য তাঁর কিছু সামরিক কৃতিত্ব ছিল বলে মনে হয়। অদ্ভুতসাগর গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, গৌড়ের রাজার সঙ্গে বল্লাল সেন যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিলেন। এই গৌড়রাজকে পাল বংশের রাজা গোবিন্দ পালের সঙ্গে অভিন্ন বলে শনাক্ত করা হয়। আনন্দভট্টের বল্লালচরিতে (১৫১০ খ্রিস্টাব্দে রচিত) এ তথ্যের দৃঢ় সমর্থন পাওয়া যায়। এমনও হতে পারে যে, বল্লাল সেন মগধে পালদের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানেন। অদ্ভুতসাগর গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, পিতা বিজয় সেনের শাসনকালে বল্লাল সেন মিথিলা জয় করেছিল। এটি মোটেই অসম্ভব নয় যে, বল্লাল সেন পিতা বিজয় সেনের মিথিলা অভিযানের সময় তাঁর সঙ্গী ছিলেন। অবশ্য সেন সাম্রাজ্যে মিথিলার অন্তর্ভুক্তি সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায় না এবং বিজয় সেনের প্রতিপক্ষ নান্যদেবের উত্তরাধিকারিগণ দীর্ঘকাল ব্যাপী মিথিলা শাসন করেন।
মাতামহ ও পিতার উত্তরাধিকারিস্বত্বে গৌড় ও বঙ্গ দুইটি রাজ্য প্রাপ্ত হলেও তিনিই সমস্ত বরেন্দ্রভূমি, রাঢ়, বঙ্গ, বগ্দি, মিথিলা জয় করে পালরাজবংশ সহ বৌদ্ধরাজত্বের সকল চিহ্ন নি:শেষ করে বাঙ্লায় সনাতন ধর্ম পুনঃস্হাপন করেন।বৌদ্ধদের বহু মঠ ও সংঘকে তিনি দেবালয়ে পরিণত করেছিলেন। বল্লাল দ্বাদশ রাজ্যের অধিপতি হয়ে বিশ্বজিৎ যজ্ঞ করেন, এবং সার্বভৌম সম্রাট উপাধি ধারণ করেন।

বল্লালের মাসিক লক্ষ নিষ্ক আয় ছিল।দশ টাকা মূল্যের স্বর্ণ-মুদ্রার নাম নিষ্ক।তখন এক তোলা সোনার দাম ছিল ষোল টাকা।সুতরাং বল্লালের প্রকান্ড সাম্রাজ্যের বার্ষিক আয় মোট এক কোটি কুড়ি লক্ষ টাকা ছিল।

কৌলীন্য প্রথা

কৌলিন্য মর্যাদা বাঙালীদের জীবনাধিক গুরুতর গণ্য ছিল।অনেকে সর্বস্ব বিক্রয় করে কুলমর্যাদা রক্ষা করতেন।কেউ কেউ অশীতিপর বৃদ্ধের সাথে সপ্তবর্ষীয় কন্যার বিবাহ দিয়ে কুল বাঁচাতেন।এমনকী রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের মধ্যে অনেক সময় কুল মর্যাদা রক্ষায় ধর্মশাস্ত্রের বিধান লঙ্ঘিত হত এবং পঞ্চাশ বছর বয়স্কা কুমারীকে দশবর্ষীয় বালকের সাথে নামমাত্র বিবাহ দিয়ে কুলমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হত।পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরু থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ অবধি সুদীর্ঘ চারশ বছর কুল মর্যাদাই উচ্চ শ্রেণীর বাঙালীদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল। এটি বিশ্বাস করা হয় যে, কৌলীন্য প্রথা প্রবর্তনের মাধ্যমে বল্লাল সেন সামাজিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন করেন। কুলগ্রন্থ বা কুলজিশাস্ত্রসমূহ হচ্ছে কৌলীন্য প্রথার আদি ইতিহাস সম্পর্কে জানার মূল উত্স। অধিকন্তু বল্লাল সেনের সময়কালের পাঁচ-ছয়শত বছর পরে রচিত এসকল গ্রন্থ অসামঞ্জস্যতায় পূর্ণ এবং এগুলি নানা ধরনের পরস্পর বিরোধী তথ্য ধারণ করে আছে। সুতরাং এসকল গ্রন্থে লিপিবদ্ধ তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এছাড়া কোন সেন-লিপি-প্রমাণেও কৌলীন্য প্রথার উল্লেখ নেই। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় কৌলীন্য প্রথার বহুল প্রচলন দেখা যায় এবং এ প্রথার উদ্যোক্তা বাঙালি ব্রাহ্মণগণ নিজেদের দাবি জোরদার করার উদ্দেশ্যে একে ঐতিহাসিক ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ফলে বিগত হিন্দু শাসনকালে অর্থাৎ সেন যুগের রাজা বল্লাল সেনের সময় থেকে এ প্রথার উৎপত্তি হয়েছে, এমন মতবাদ পণ্ডিতরা প্রচার করেছেন।
অন্য মতে, বল্লাল সেন কনৌজের ভট্টশালীগ্রাম-নিবাসী শ্রোত্রিয়দের বসবাসের অসুবিধা দূর করার জন্য নিজের প্রকান্ড রাজ্যের নানা স্হানে পাঠিয়ে তাঁদের ভরণ-পোষণের যোগ্য ব্রহ্মত্র দিয়েছিলেন।এদের মধ্যে একশ ঘর গঙ্গার বাম পারে বরেন্দ্রভূমিতে বাসস্থান পেয়ে বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ নামে খ্যাত হন আর ছাপ্পান্ন ঘর গঙ্গার অপর পারে রাঢ়দেশে ব্রহ্মত্র লাভ করে রাঢ়ী ব্রাহ্মণ আখ্যা প্রাপ্ত হন।রাঢ়ী ও বারেন্দ্র বিভাগ ব্রাহ্মণ ছাড়াও বৈদ্য, কায়স্থ ও অধিকাংশ অপর জাতীর মধ্যেও ছিল।
সম্মানলাভার্থে প্রজারা সৎপথে চলবে, এই উদ্দেশ্যে বল্লালসেন কৌলিন্য প্রথা সৃষ্টি করেছিলেন।শ্রোত্রিয়দের মধ্যে যাঁরা নবগুণবিশিষ্ট ছিলেন, বল্লাল তাঁদের কুলীন উপাধি দিয়েছিলেন।বৈদ্যদের মধ্যে যারা ধার্মিক ও গুণবান এবং কায়স্থদের মধ্যে যারা শ্রোত্রিয়দের পরিচারক-সন্তান তারা কুলীন উপাধি পেয়েছিলেন।এভাবে ঘোষ, বসু, গুহ ও মিত্র বংশীয়রা কায়স্হরা কুলীন হল; তিলী, তাঁতি, কামার, কুমোর প্রভৃতি সৎশূদ্রদের গুণ ও সঙ্গতি দেখে বল্লাল তাদের শ্রেষ্ঠ লোকদের কুলীন করেছিলেন, এরাই মানী বা পরামানিক নামে পরিচিত হয়।

সেনদের লিপি-প্রমাণ এবং কিংবদন্তি থেকে এটি প্রমাণিত যে, বল্লাল সেন ছিলেন একজন বিখ্যাত পণ্ডিত ও প্রসিদ্ধ লেখক। ১১৬৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি দানসাগর রচনা করেন। ১১৬৯ খ্রিস্টাব্দে অদ্ভুতসাগর লেখা শুরু করলেও তা শেষ করতে পারেন নি। পিতার মতো তিনিও শিবের উপাসক ছিলেন। অন্যান্য রাজকীয় উপাধির সঙ্গে তিনি ‘অরিরাজ নিঃশঙ্ক শঙ্কর’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। চালুক্য রাজকন্যা রামদেবীকে তিনি বিবাহ করেন। এ বিবাহ আদি পুরুষদের বাসস্থানের সঙ্গে সেনদের নির্দেশ করে। অদ্ভুতসাগর গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, বৃদ্ধ বয়সে বল্লাল সেন রাজ্যভার নিজ পুত্র লক্ষ্মণ সেনকে অর্পণ করেন। বল্লাল সেন জীবনের শেষ দিনগুলি সস্ত্রীকে নিয়ে ত্রিবেণীর কাছে গঙ্গাতীরবর্তী একটি স্থানে অতিবাহিত করেন। তিনি প্রায় ১৮ বছর সাফল্যের সঙ্গে রাজত্ব করেন।

লক্ষ্মণ সেন মধ্যযুগীয় বাংলার সেন রাজবংশের চতুর্থ রাজা। তিনি ১১৭৮ হতে ১২০৬ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। তাঁর পূর্বসূরী ছিলেন তাঁর পিতা বল্লাল সেন। লক্ষ্মন সেন তাঁর রাজত্বকে কামরূপ (বর্তমানে অসম), কলিঙ্গ (বর্তমান উড়িষ্যা), এবং কাশী পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। ১২০৬ খ্রীষ্টাব্দে দিল্লী সালতানাতের তুর্কী সেনা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর বাহিনীর হাতে গৌড়ের পতন হয়। লক্ষণ সেন পূর্ব বঙ্গের বিক্রমপুরে পালিয়ে যান এবং পূর্ব বঙ্গে রাজত্ব করতে থাকেন।

ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী

ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী একজন তুর্কী সেনাপতি। তিনি ১২০৫-৬ সালের দিকে তৎকালীন বঙ্গের শাসক সেন রাজবংশের শেষ রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে সেন গৌড় দখল করেন। লক্ষণ সেন প্রাণ নিয়ে পালিয়ে তৎকালীন বঙ্গে পালিয়ে যান এবং তার সৈন্যরা পরাজিত হয়ে নদিয়া শহর ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

মোহাম্মদ বখতিয়ার নদিয়া শহর অধিকার করে তা ধ্বংস করে। এবং এই ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরে রাজধানী না করে গৌড়-লক্ষণাবতীতে গিয়ে রাজধানী স্থাপন করে।ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী  যাকে ‘মালিক গাজী ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়, ছিলেন মুসলিম খলজি উপজাতির একজন সদস্য। মুসলিম খলজি উপজাতি উত্তর-পুর্বের প্রায় সকল দখল-যুদ্ধে যোগদানকারী সেনাবাহিনীর অধিপতিদের কাজে নিজুক্ত ছিল।

ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী ছিলেন জাতীতে তুর্কি আর পেশায় ভাগ্যান্বেষী সৈনিক। জীবনের প্রথম ভাগে তিনি ছিলেন আফগানিস্তানের গরমশির বা আধুনিক দশত-ই-মার্গের অধিবাসী। তার বাল্যজীবন সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে মনে করা হয় দারিদ্রের পীড়নে তিনি স্বদেশ ত্যাগ করেন এবং নিজের কর্মশক্তির উপর ভর করে অন্যান্ন দেশবাসীর ন্যায় ভাগ্যান্বেষনে বের হন। প্রথমেই তিনি গজনীর সুলতান মুহাম্মাদ ঘুরীর সৈন্যবাহিনীতে চাকুরীপ্রার্থী হয়ে ব্যার্থ হন। আকারে খাটো, লম্বা হাত এবং কুৎসিত চেহারার অধিকারী হওয়ায় সেনাধ্যক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করতে ব্যার্থ হন। গজনীতে ব্যার্থ হয়ে তিনি দিল্লিতে কুতুবউদ্দীন আইবেকের দরবারে হাজির হন। এখানেও তিনি চাকরি পেতে ব্যার্থ হন। অতঃপর তিনি বদাউনে যান। সেখানকার শাসনকর্তা মালিক হিজবর-উদ্দিন বখতিয়ার খলজিকে নগদ বেতনে সেনাবাহিনীতে চাকরি প্রদান করেন। কিন্তু উচ্চভিলাসি বখতিয়ার সামান্য বেতনভোগী সিপাহি হয়ে পরিতৃপ্ত হতে পারেন নি। অল্পকাল পর তিনি বদাউন ত্যাগ করে অযোদ্ধায় যান। অযোদ্ধার শাসনকর্তা হুসামউদ্দীন তাকে বর্তমান মীর্জাপুর জেলার পূর্ব দক্ষিণ কোণে ভগবৎ ও ভিউলি নামক দুইটি পরগনার জায়গির প্রদান করেন। এখানেই বখতিয়ার তার ভবিষ্যৎ উন্নতির উৎস খুজে পান এবং এই দুটি পরগনাই পরবর্তীতে তার শক্তির উৎস হয়ে ওঠে।

বিহার বিজয়

১২০১ সালে বখতিয়ার মাত্র দু হাজার সৈন্য সংগ্রহ করে পার্শবর্তী হিন্দু রাজ্যগুলো আক্রমন ও লুন্ঠন করতে থাকেন। সেই সময়ে তার বীরত্বের কথা চারিদিক ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং অনেক ভাজ্যান্বেষি মুসলিম সৈনিক তার বাহিনীতে যোগদান করতে থাকে, এতে করে তার সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এভাবে চলতে থাকলে তিনি একদিন এক প্রাচীরবেষ্টিত দূর্গের মত স্থানে আসেন এবং আক্রমন করেন। প্রতিপক্ষ কোন বাধাই দেয় নি। দূর্গজয়ের পর তিনি দেখলেন যে দূর্গের অধিবাসীরা প্রত্তেকেই মুন্ডিতমস্তক এবং দূর্গটি বইপত্র দিয়ে ভরা। জিজ্ঞাসাবাদের পর তিনি জানতে পারলেন যে তিনি একটি বৌদ্ধ বিহার জয় করেছেন। এটি ছিল ওদন্দ বিহার বা ওদন্দপুরী বিহার। সেই সময় থেকেই মুসলমানেরা জায়গাটিকে বিহার বা বিহার শরীফ নামে ডাকে।

বিহার জয়ের পর বখতিয়ার খলজী অনেক ধনরত্ন সহ কুতুব-উদ্দীন আইবকের সাথে দেখা করতে যান এবং কুতুব-উদ্দীন কতৃক সম্মানিত হয়ে ফিরে আসেন। এর পরই তিনি বাংলা জয়ের জন্য সাহস এবং শক্তি সঞ্চয় করতে থাকেন।

বাংলা বিজয়

তৎকালীন বাংলার রাজা লক্ষণ সেন বাংলার রাজধানি নদিয়ায় অবস্থান করছিলেন কারন নদিয়া ছিল বহিঃশত্রুর কাছ থেকে সবচেয়ে সুরক্ষিত অঞ্চল। বলা হয়ে থাকে যে নদিয়ায় আসার কিছু আগে রাজসভার কিছু দৈবজ্ঞ পন্ডিৎ তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে এক তুর্কি সৈনিক তাকে পরাজিত করতে পারে। এতে করে লক্ষন সেনের মনে ভিতীর সঞ্চার হয় এবং নদিয়ার প্রবেশপথ রাজমহল ও তেলিয়াগড়ের নিরাপত্তা জোড়দার করেন। লক্ষন সেনের ধারণা ছিল যে ঝাড়খন্দের শ্বাপদশংকুল অরন্য দিয়ে কোন সৈন্যবাহিনীর পক্ষে নদীয়া আক্রমন করা সম্ভব নয় কিন্তু বখতিয়ার সেইপথেই তার সৈন্যবাহিনীকে নিয়ে আসেন। নদিয়া অভিযানকালে বখতিয়ার ধাড়খন্দের মধ্য দিয়ে এত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়েছিলেন যে তার সাথে মাত্র ১৮ জন সৈনিকই তাল মেলাতে পেরেছিলেন। বখতিয়ার সোজা রাজা লক্ষন সেনের প্রাসাদদ্বারে উপস্থিত হন এবং দ্বাররক্ষি ও প্রহরীদের হত্যা করে প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করেন। এতে প্রাসাদের ভিতরে হইচই পড়ে যায় এবং লক্ষণ সেন দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলে প্রাসাদের পেছনের দড়জা দিয়ে নৌপথে বিক্রমপূরে আশ্রয় নেন।
নদিয়া জয় করে পরবর্তীতে লক্ষনাবতীর (গৌড়) দিকে অগ্রসহ হন এবং সেখানেই রাজধানি স্থাপন করেন। এই লক্ষনাবতীই পরবর্তিতে লখনৌতি বা লখনৌ নামে পরিচীত হয়। গৌড় জয়ের পর আরোও পূর্বদিকে বরেন্দ্র বা উত্তর বাংলয় নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। সুসাষন প্রতিষ্ঠার লক্ষে তিনি এলাকাগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে একজন করে সেনাপতিকে শাষনভার অর্পন করেন। বখতিয়ারের সেনাধ্যক্ষদের মধ্যে দুজনের নাম পাওয়া যায়। এদের মধ্যে আলী মর্দান খলজী বরসৌলে, হুসামউদ্দীন ইওজ খলজী গঙ্গতরীর শাষনকর্তা নিযুক্ত হন।

তিব্বত আক্রমন

বখতিয়ারের রাজ্য পূর্বে তিস্তা নদীকরতোয়া নদী, দক্ষিণে পদ্মা নদী, উত্তরে দিনাজপুর জেলার দেবকোট হয়ে রংপুর শহর পর্যন্ত এবং পশ্চিমে পূর্বে অধিকৃত বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যদিও বাংলাদেশের বৃহদাংশ তার রাজ্যের বাইরে ছিল, ঐসব অঞ্চল দখল না করে তিনি তিব্বত আক্রমনের পরিকল্পনা করেন। উদ্দেশ্য ছিল তুর্কিস্তানের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা। তিব্বত আক্রমনের রাস্তা আবিষ্কারের জন্য বখতিয়ার বাংলার উত্তর পূর্বাংশের উপজাতীগোষ্টির সদস্য আলী মেচকে নিয়োগ দেন।

সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পর তিনি তিন জন সেনাপতি ও প্রায় দশ হাজার সৈন্য সামন্ত নিয়ে লখনৌতি থেকে তিব্বতের দিকে রওনা দেন। সৈন্যবাহিনী বর্ধনকোট শহরের কাছে পৌছালে তারা তিস্তা নদীর চেয়েও তিন গুন চওড়া বেগমতী নদী পার না হয়ে নদীর তীর ধরে তিন দিন দূরত্ব চলার পর একটি পাথরের সেতুর নিকটে আসেন এবং সেখানে তার দুইজন সেনাপতিকে সেতুর সুরক্ষায় রেখে সামনের দিকে অগ্রসর হন। সামনে একটি কেল্লা পরে। ঐ কেল্লার সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে বখতিয়ার জয় করলেও সৈন্যবাহিনী ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হয়। কেল্লার সৈন্যদের থেকে বখতিয়ার জানতে পারেন যে অদূরে করমবত্তন নামক শহরে কয়েক লক্ষ সৈন্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। এই কথা শুনে বখতিয়ার সামনের দিকে অগ্রসর না হয়ে প্রত্যাবর্তন করেন। ফেরার পথে তার সৈন্যরা অসীম কষ্ট সহ্য করে। সেতুর কাছে এসে বখতিয়ার দেখেন যে পার্বত্য লোকেরা তার দুই সেনাপতির উপর আক্রমন চালিয়ে তাদের মেরে ফেলেছে এবং সেতুটি পুরোপুরি বিদ্ধস্ত করে দিয়েছে। এরপর বখতিয়ার খুব অল্প সংখ্যক সৈন্য সহ ফিরে আসতে সক্ষন হন। এই ঘটনার পরেই বখতিয়ার বুঝতে পারেন যে তব্বত অভিযান বিফল হওয়ার ফলে তার শক্তি মারাত্বক ভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং এতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

তিব্বত অভিযান বিফল হলে বখতিয়ার দেবকোটে ফিরে আসেন। গৌহাটির নিকটে ব্রহ্মপুত্রের তীরে কানাই বড়শি বোয়া নামক স্থানে তুর্কি সেনাদলের বিদ্ধস্ত হওয়ার বিভিন্ন আলামত পাওয়া যায়। তিব্বত অভিযান বিফল এবং সৈন্যবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতির ফলে লখনৌতির মুসলিম রাজ্যের প্রজারের মধ্যে বিদ্রোহ ও বিরোধ দেখা দিতে শুরু করে। এরই ফলে বাংলার ছোট ছোট মুসলিম রাজ্যগুলো দিল্লির সাথে সম্ভাব্য বিরোধে আগে থেকেই কোনঠাসা হয়ে পড়ে। এরকম নানাবিধ চিন্তা, এবং পরাজয়ের গ্লানিতে বখতিয়ার অসুস্থ এবং পরে শয্যাশায়ী হন। এর অল্প কিছুদিন বাদে ১২০৬ খৃষ্টাব্দে তিনি শয্যাশায়ী অবস্থায় মৃত্যুবরন করেন। কেউ কেউ অনুমান করেন যে বখতিয়ারের মৃত্যুতে তার সেনাপতি আলীমর্দান খলজীর হাত ছিল। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী সংক্রান্ত সকল তথ্যই মুসলিম ঐতিহাসিক মিনহাজউদ্দীন শিরাজীর তবকাৎনাসিরী গ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করা। মিনহাজ বখতিয়ারের মৃত্যুর প্রায় চল্লিশ বছর পর বাংলায় গিয়ে বাংলা বিজয়ের যে কাহিনী শুনেছিলেন তাই মূলত লিপিবদ্ধ করেছেন এবং তার উপর ভিত্তি করেই ইতিহাস রচিত হয়েছে। তার বর্ণ‌না থেকে স্পস্ট বোঝা যায় যে তিনি মূলত প্রচলিত কাহিনীগুলিকেই লিপিবদ্ধ করেছিলেন যা ঐতিহাসিকদের কাছে বাংলা জয়ের একমাত্র দলিল। তাই মিনহাজের সব কথাই সঠিক তা নাও হতে পারে।

১১৯৩ সালে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি ধ্বংস করার জন্য খিলজীকে দায়ী করা হয়। সেখানে থাকা সকল ছাত্রদেরকেও সে সময় হত্যা করা হয়।তবে এসম্পর্কিত মূল সূত্র থেকে জানা যায় যে খিলজি এই বিষয়ে অজ্ঞাত ছিলেন যে এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়।

১৯৯০ সালের কাছাকাছি সময় বাংলাদেশি কবি আল মাহমুদ “বখতিয়ারের ঘোড়া” নামক এক কাব্যগ্রন্থ লেখেন যেখানে বখতিয়ার খলজীকে বাংলার একজন গুরুত্ত্বপূর্ণ দখলকারী হিসেবে উল্লেখ করেন।

পাঠান-রাজত্ব –

মহম্মদ ইবন বক্তিয়ার খিলিজির

নদীয়া জয় করিয়া মহম্মদ ইবন বক্তিয়ার যে সকল বিপদে পড়িয়াছিলেন, তবকাৎ-ই-নাসিরী-প্রণেতা মিনহাজ তাহার বর্ণনা দিয়াছেন। নদীয়া-জয়ের সময়ে যে দুইজন সৈনিক মহম্মদ বক্তিয়ারের সহচর ছিলেন, মিনহাজ তাহাদেরই মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত শুনিয়াছিলেন। ইবন বক্তিয়ার নবদ্বীপ বিজয়ের পরে গৌড়ের এদিক্‌ সেদিক্‌ লুণ্ঠন করিয়া লক্ষণাবতী ও হিমালয়ের মধ্যবর্ত্তী কোন স্থানের অধিবাসী মেচ্‌জাতীয় একজন নায়ককে মুসলমানধর্ম্মে দীক্ষিত করেন এবং তাঁহাকে ‘আলি’ উপাধি দেন। আলি মেচের উপদেশে তিনি দশ সহস্র সৈন্য লইয়া তিব্বত জয়ের জন্য রওনা দেন। পথে বর্দ্ধনকোট-সম্মুখে বিশালতোরা বেগবতী নদী। এই নদীর কূল ধরিয়া তিনি দশদিনের পথে পর্য্যটন করিয়া একটা প্রকাণ্ড সেতুর সাক্ষাৎ পান। এই সেটু ২০টি পাষাণনির্ম্মিত খিলানের উপর স্থিত। ইবন বক্তিয়ার সেই সেতু পার হইয়া চলিলেন। দুইজন সেনাপতিকে সেতুরক্ষার জন্য রাখিয়ে গেলেন, ক্রমাগত ১৬ দিন চলিয়া গিয়া একটু দুর্গ-রক্ষিত নগর আক্রমণ করেন, তথায় শুনিতে পান, ২৫ ক্রোশ দূরে একটি স্থান (করমপত্তনে) ৫০,০০০ তুরষ্ক সৈন্য বিদ্যমান আছে, তথায় বহু ব্রাহ্মণ বাস করেন এবং তথায় বৎসরে অনেক সহস্র টাঙ্গন ঘড়া বিক্রয়ের একটা বাজার বসে। কেহ কেহ মনে করেন, উহা আধুনিক দিনাজপুরে জেলার নেক-মর্দ্দনের হাট। মহম্মদ ইবন বক্তিয়ার ভয় পাইয়া অগ্রসর হইলেন না–ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হইলেন। খাদ্যের ভয়ানক কষ্ট হইল। শত্রুরা সমস্ত ক্ষেত নষ্ট করিয়া ফেলিয়াছিল। সৈন্যগণ ঘোড়া মারিয়া সেই মাংস খাইতে লাগিল। ইবন বক্তিয়ার কামরূপ ফিরিয়া আসিয়া শুনিলেন, তাঁহার রক্ষকগণ ঝগড়া করিয়া চলিয়া গিয়াছে এবং শত্রুরা বেগমতী নদীর সেই বিশাল পাষাণ নির্ম্মিত সেতুর দুইটি থাম ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে। তিনি নিকটবর্ত্তী এক দেবমন্দির আক্রমণ করেন। সেখানে দুই তিন হাজার মন স্বর্ণনির্ম্মিত দেবপ্রতিমা ছিল। শত্রুবেষ্টিত হইয়া তিনি ঐ মন্দিরে বন্দীর মত হইয়া রহিলেন, বহুকষ্টে তাঁহার সৈন্যগণ প্রাচীরের একদিক্‌ ভাঙ্গিয়া নদীর জলে ঝাঁপাইয়া পড়িল। তীরভূমি হইতে শত্রুর শর তাহাদের ধ্বংসক্রিয়া সাধন করিতে লাগিল। মুসলমান বীর বহুকষ্টে অতি অল্পসংখ্যক পরিকর লইয়া রক্ষা পাইলেন এবং আলি মেচের সাহায্যে দেবকোটে উপস্থিত হইলেন। তথায় পীড়িত হইয়া পড়েন এবং ১২০৫-৬ খৃষ্টাব্দে প্রাণত্যাগ করেন। কেহ কেহ বলেন মহঃ ইঃ বক্তিয়ারের অধীন নারান্‌কোই স্থানেই শাসনকর্ত্তা আলিমর্দ্দন খিলজি সুবিধা পাইয়া রোগশয্যায় তাঁহাকে নিহত করেন। বহুসংখ্যক সৈন্যক্ষয়ের জন্য তাঁহার প্রতি তাঁহার দলের লোকের আর কিছুমাত্র অনুরাগ ছিল না। মৃত্যুকালে তিনি নিঃসহায় ও বান্ধবহীন অবস্থায় দুর্গতির চরম সীমায় উপস্থিত হইয়াছিলেন। পরের দেশের সর্ব্বনাশ সাধন করিয়া আলেয়ার আলোর মত সে স্বল্পস্থায়ী যশঃপ্রভা তাঁহাকে গৌরব দান করিয়াছিল তাহার বিনিময়ে তিনি কি লাভ করিলেন?–পার্ব্বত্য প্রদেশে অশেষ বিড়ম্বনা, পরাজয়জনিত লাঞ্ছনা, স্বজনধ্বংস ও অকালমৃত্যু। মহঃ ইঃ বক্তিয়ারের দ্বারা সমস্ত বাঙ্গলাদেশ মুসলমানাধিকৃত হয় নাই। এমন কি নবদ্বীপকে ফিরিয়া জয় করিতে হইয়াছিল। এই সময়ে সম্ভবতঃ কেশবসেন (লক্ষণের পুত্র) গৌড় শাসন করিতেছিলেন এবং মুসলমানদের হাত হইতে দেশ রক্ষা করিতে না পারিয়া পূর্ব্ববঙ্গ আশ্রয় করিয়াছিলেন। বিক্রমপুরে স্বর্ণগ্রাম রাজধানী করিয়া সেনবংশীয়েরা আরও এক শতাব্দীর উর্দ্ধকাল পূর্ব্ববঙ্গে রাজত্ব করিয়াছিলেন।
ইহার কোন সময়ে সেন বংশের এক শাখা লাহোর ও কাশ্মীরে যাইয়া তথায় রাজ্য লাভ করিয়া থাকবেন।

মহম্মদ শিরান১২০৫১২০৮ খৃঃ

মহঃ ইবন বক্তিয়ার খিলজির প্রিয়পাত্র মহম্মদ শিরান বঙ্গদেশের রাজা বলিয়া নিজেকে প্রচার করেন। এই ব্যক্তি এরূপ দুর্দ্ধর্ষ ছিলেন যেন, একাই অশ্বারোহণপূর্ব্বক লক্ষণাবতীর নিকট কোন জঙ্গলে ১৮টি হাতী ঠেকাইয়া রাখিয়াছিলেন। তাঁহার অদ্ভুত সাহস দেখিয়া তিব্বতে অভিযানের পূর্ব্বে ইবন বক্তিয়ার তাঁহাকে গৌড়ের শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করিয়া গিয়াছিলেন। প্রভুর মৃত্যুর পর সামন্তগণ ও নেতারা একত্র হইয়া মহম্মদ শিরানকে রাজপদ প্রদান করেন। রাজা হইয়া তিনি প্রথমেই প্রভুহত্যায় অভিযুক্ত আলিমর্দ্দনকে পরাস্ত করিয়া কারাগারে নিক্ষেপ করেন। কারাধ্যক্ষকে ঘুষ দিয়া আলিমর্দ্দন পলাইয়া মুক্তিলাভপূর্ব্বক দিল্লী যাইয়া কুতুবদ্দিনের অনুগ্রহ লাভ করিয়াছিলেন। কুতুবুদ্দিন এই সময়ে সাম্রাজ্যের দৃঢ় ভিত্তি গড়িবার প্রয়াসী হইয়া অযোধ্যার শাসনকর্ত্তা কাএমাজ রোমীকে পূর্ব্বাঞ্চলের যুদ্ধ-বিগ্রহের ভার প্রদান করেন। গঙ্গোত্রীর শাসনকর্ত্তা সম্রাট্‌-সৈন্যদের সহযোগিতা করিয়া দেবকোটের শাসনকর্ত্তৃত্ব প্রাপ্ত হন। অপর অপর সেনাপতিরা দিল্লীশ্বরের অধীনতা স্বীকার না করিয়া কাএমাজ রোমীর সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ চালাইয়াছিলেন, কিন্তু পরাস্ত হইয়া কুচবিহারের দিকে পলায়নপর হন। ইঁহাদের মধ্যে আত্মকলহ উপস্থিত হয়, মহম্মদ শিরা এই কলহের ফলে নিহত হন। মহম্মদ শিরান ১২০৫ হইতে ১২০৮ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত রাজত্ব করিয়াছিলেন। তাঁহার সময়ে কুতুবুদ্দিন দিল্লীশ্বর ছিলেন (১২০৫-১২১০ খৃ;) কিন্তু তিনি দিল্লীশ্বরের অধীনত্ব স্বীকার করেন নাই।
শিরানের মৃত্যুর পর আলিমর্দ্দন খিলজি দিল্লীশ্বরের সনদ লইয়া বঙ্গদেশের মসনদ দখল করেন (১২০৮-১২১১ খৃঃ)।

আলিমর্দ্দন সুনতান আলাউদ্দিন১২০৮১২১১ খৃঃ

শিরানের মৃত্যুর পর আলিমর্দ্দন খিলজি দিল্লীশ্বরের সনদ লইয়া বঙ্গদেশের মসনদ দখন করেন (১২০৮-১২১১ খৃঃ)।
কুতুবুদ্দিনের মৃত্যুর পর আলিমর্দ্দন শ্বেতচ্ছত্রধারণপূর্বক নিজেকে স্বাধীন নৃপতি বলিয়া ঘোষণা করেন। এইবার তাঁহার কতকটা বুদ্ধিভ্রংশ হইয়াছিল, এ পর্য্যন্ত তিনি অক্লান্ত-কর্মা যোদ্ধা এবং রাজনীতিকুশল বুদ্ধিমান লোক বলিয়া পরিচিত ছিলেন। এখন সমস্ত ন্যায়সঙ্গত গণ্ডী অতিক্রম করিয়া তাঁহার গর্ব্ব আকাশস্পর্শী হইল। তিনি প্রকাশ্য দরবারে আপনাকে পারস্য, তুর্কিস্থান এবং দিল্লীর বাদশাহগণ হইতে শ্রেষ্ট বলিয়া প্রকার করিতে লাগিলেন এবং “তাঁহার অধিকার হইতে বহু দূরে অবস্থিত খোরাসান, ইরাক, গজনী, গোব ও ইস্‌ফাহানের অধিকার প্রত্যর্থিগণকে প্রদান করিতেন।” এই সকল রাজ্য তাঁহার অধিকার-বহির্ভূর,–শুনিলে চটিয়া যাইতেন। একদা পারস্য দেশের এক বণিক্‌ স্বীয় বহুমূল্য দ্রব্যাদি-বোঝাই জাহাজ জলমগ্ন হওয়াতে তাহার নিকট সাহায্যের প্রার্থী হন। আলাউদ্দিন তাঁহাকে ইসপাহানের শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করিয়া প্রধান মন্ত্রীকে এক ফরমান প্রস্তুত করিতে আদেশ দেন। এই উপহাস-যোগ্য নির্ব্বুদ্ধির ফল হইতে তাঁহাকে মন্ত্রী বুদ্ধি-কৌশলে রক্ষা করিয়াছিলেন। এই সকল বুদ্ধিহীনতা অবশ্য পার্শ্ববর্ত্তী রাজাদের বিরক্তিকর হইয়াছিল–তথাপি তাহা উপহাস-যোগ্য মনে করিয়া কেহ কোন প্রতিকূলতা করে নাই। কিন্তু তিনি কিছুদিন পরে অতিশয় নিষ্ঠুরভাবে অত্যাচার আরম্ভ করিয়াছিলেন; তাঁহার অত্যাচার শুধু আঢ্য ও সম্ভ্রান্ত হিন্দুদিদের উপর সীমাবদ্ধ রহিল না, তিনি অবিচারের খিলজিবংশীয় অনেক বড় লোককে হত্যা করিলেন। তাঁহাদের বংশধরগণের চক্রান্তে ১২১১ খৃষ্টাব্দে তিনি নিহত হন। আলিমর্দ্দনের হত্যার পর হসাম উদ্দিন ইউয়জ নামক ইবন বক্রিয়ারের পারস্যবাসী কোন প্রিয় সেনাপতি ‘গিয়াসউদ্দিন” উপাধি ধারণ করিয়া গৌড়ের মসনদ অধিকার করেন, ইহার পূর্ব্বে তিনি গঙ্গোত্রীর শাসন কর্ত্তা ছিলেন।

গিয়াসউদ্দিন ইউয়জ১২১১১২২৬ খৃঃ

কথিত আছে পারশ্য দেশের দুই দরবেশ ইঁহার ভাবী সৌভাগ্যসম্বদ্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়া ইঁহাকে ভারতবর্ষে পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। ইনি সিংহাসনে আরূঢ় হইয়া কামরূপ, ত্রিহুত ও পুরী জয় করেন। কিন্তু যদিও বীর্য্যবত্তায় ইনি ন্যূন ছিলেন না, ইঁহার রাজত্বের অধিক সময়ই লোকহিতকর কার্য্যে ব্যয়িত হইয়াছে। ইনি গৌড়ের অনেক রম্য অট্টালিকা নির্ম্মান করেন, তথায় অতি মনোজ্ঞ ও বিশাল এক মসজিদ, একটি বড় বিদ্যালয় ও অতিথিশালা প্রস্তুত করিয়া বীরভূম হইতে দেবকোট পর্যন্ত এক বিস্তৃত রাজপথ নির্ম্মান করেন। দশ বৎসর কাল ইনি শান্তির সহিত শাসন করিয়াছিলেন এবং ধনী ও দরিদ্র সর্ব্বশ্রেণীর প্রতি সমভ্যবে ন্যায়পরতা প্রদর্শন করিয়াছিলেন, কিন্তু শেষ ইনি আর দিল্লীতে রাজস্ব পাঠাইতেন না, দিল্লীশ্বর আলতামাস ক্রুদ্ধ হইয়া বঙ্গে অভিযান করেন। নির্ব্বিবাদে বিহার অধিকার করিয়া তিনি বঙ্গের দিকে আসিতেছিলেন, সে সময়ে গিয়াসউদ্দিন গঙ্গার সমস্ত জলযান দখন করিয়া সম্রাটের আসিবার পথ বন্ধ করিয়া ফেলেন। যাহা হউক একটি সন্ধি হইয়া এই কলহের মিটমাট হইয়া গেল। বঙ্গাধিপ দিল্লীশ্বরকে ৩৮টি হাতী এবং বহুলক্ষ টাকা দিয়া তাঁহার অধীনত্ব স্বীকার করেন। আলতামাস মুলক্‌ আলাউদ্দিনকে বিহারের শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করিয়া দিল্লীতে প্রত্যাবর্ত্তন করেন। কিন্তু সম্রাট্‌ যাইতে না যাইতেই গিয়াসউদ্দিন সন্ধির সর্ত্ত ভঙ্গ করিয়া বিহার করিয়া করিয়া প্রকাশ্যে বিদ্রোহী হন। আলতামাসের পুত্র যুবরাজ নাসিরুদ্দিন অযোধ্যা হইতে এক বিপুল বাহিনী সংগ্রহ করিয়া তদ্‌বিরুদ্ধে যাত্রা করেন। এই যুদ্ধে গিয়াসউদ্দিন নিহত হন। গিয়াসউদ্দিন অতি উদারচরিত্র এবং ন্যায়পরায়ন রাজা ছিলেন। এমন কি আলতামাস পর্য্যন্ত বলিতেন, “ইনি প্রকৃতই সুলতান হইবার যোগ্য।” ১২ বৎসর ব্যাপী রাজত্বের পর ১২২৬ খৃষ্টাব্দে ইঁহার মৃত্যু হয়।

নাসিরুদ্দিন মহমুদ১২২৬১২২৮ খৃঃ
হাসামুদ্দিন খিলিজি১২২৮ খৃঃ, কয়েক মাস
ইখ্তিয়ার উদ্দিন১২২৮২৯ খৃঃ
আলাউদ্দিন জানি১২৩০১২৩১ খৃঃ
সেক উদ্দিন১২২৩১২৩৩ খৃঃ

যুবরাজ নাসিরুদ্দিন বঙ্গের রাজা হইয়া শ্বেতচ্ছত্র ও রাজদণ্ড-ব্যবহারের অনুমতি প্রাপ্ত হন। তিনি অতি দক্ষতার সহিত রাজদণ্ড চালনা করিয়াছিলেন। ১২২৮ খৃষ্টাব্দে ইঁহার মৃত্যু হয়, তখন খিলিজি সামন্তেরা বিদ্রোহী হইয়া বঙ্গদেশে অরাজকতা আনয়ন করে। আলতামাস পুনরায় স্বয়ং বাঙ্গলাদেশে আসিয়া সেই বিদ্রোহ নিবারণ করেন। বিদ্রোহীর নেতা হাসামুদ্দিন খিলিজি অতি অল্প সময়ের জন্য বঙ্গের মসনদ অধিকার করিয়াছিলেন। এই বৎসরের জন্য ইখ্‌তিয়ার উদ্দিন বঙ্গেশ্বর হইয়াছিলেন।
আলতামাস মুলক্‌ আলাউদ্দিনকে বঙ্গের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন, ইনি চার বৎসর রাজত্বের পর পরলোকগত হন। তৎপরে সেক উদ্দিন তুরুক রাজা হইয়া তিন বৎসর রাজ্যাশাসনপূর্ব্বক বিষ খাইয়া প্রাণত্যাগ করেন (১২৩৩ খৃঃ)।

তোগান খাঁ১২৩৩১২৪৪ খৃঃ

ইহার পরের বঙ্গাধিপ তোগান খাঁ তাতারদেশীয় লোক ছিলেন, ইঁহাকে তরুণবয়স্ক, সুশ্রী ও নানাগুণে ভূষিত দেখিয়ে আলতামাস ইঁহার পক্ষপাতী হইয়াছিলেন। ইনি প্রথমতঃ রোহিলখণ্ডে, পরে বিহার এবং সর্ব্বশেষে বাঙ্গলার শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত হইয়াছিলেন। যখন আলতামাস বাদসাহের কন্যা রিজিয়া দিল্লীর মসনদ প্রাপ্ত অন, তখন তোগান খাঁ তাঁহার নিকটা অনেক উপঢৌকনসহ একজন বাগ্মী দূত প্রেরণ করেন। রিজিয়া বঙ্গেশ্বরের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ দেখাইয়া তাঁহাকে ওমরাহগণের মধ্যে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ পদ দান করেন এবং বঙ্গের মসনদে স্থায়িরূপে ইঁহার আসন স্বীকার করেন। রাজত্বের প্রথম দিকে ইনি ত্রিহুত বিজয় করেন, তৎপরে দিল্লীশ্বর মামুদের শাসন বিশৃঙ্খল ও শিথিল দেখিয়া কড়া-মানিকপুর বঙ্গের অধিকারভুক্ত করিলেন।

তোগান খাঁ তমুর খাঁ; উভয়ের রাজত্ব১২৪৪১২৪৬ খৃঃ

তোগান খাঁর সঙ্গে গঙ্গাবংশীয় অনঙ্গ ভীমদেবের পুত্র নৃসিংহদেবের প্রথম যুদ্ধ একটি স্মরণীয় ঘটনা। নৃসিংহদেব তোগান খাঁর অনুপস্থিতিতে লক্ষণাবতী আক্রমণ করিয়া রাজভাণ্ডার লুণ্ঠন করিয়া চলিয়া যান। প্রতিশোধ লইবার জন্য তোগান খাঁ জাজনগর আক্রমণ করেন। কিন্তু প্রবলপরাক্রান্ত কলিঙ্গরাহ ও সামন্ত নামক তাঁহার সেনাপতির রণকৌশলে তোগান খাঁ পরাস্ত হইয়া ফিরিয়া আসেন। এই দুরবস্থায় বঙ্গেশ্বর দিল্লীতে সাহায্য প্রার্থণা করিয়া দূত প্রেরণ করেন। এখানে বলা উচিত প্রথমতঃ তোগান খাঁ উড়িশ্যার কটাসিন দুর্গ আক্রমণ করেন, প্রতিশোধের জন্য নৃসিংহদেব লক্ষণাবতী আক্রমণ করিয়াছিলেন। (১২৪৩-৪৪ খৃঃ।) দিল্লী হইতে তমুর খাঁ অনেক সৈন্য লইয়া বঙ্গে আগমন করেন। বঙ্গেশ্বর এই রাজকীয় সৈন্যের সাহায্যে কলিঙ্গরাজের বিরুদ্ধে অভিযান করিয়া এবারও ব্যর্থকাম হন। পরন্তু তোগান খাঁর উপর তমুর খাঁ জুলুম করিতে আরম্ভ করিয়া নিজেকে লক্ষণাবতীর অধীশ্বর বলিয়া ঘোষণা করেন। কোন একদিন প্রভাত হইতে দ্বিপ্রহর পর্য্যন্ত লক্ষণাবতীর বক্ষের উপর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলমান সৈন্যের বিবাদ নগরবাসীদের একটা উপভোগ্য বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। তোগান খাঁর লোকেরা তাঁহাকে পরিত্যাগ করে, এবং তমুর খাঁই ক্ষেত্র-নায়ক হন। শেষে একটা সন্ধি হইয়া এই স্থির হইল যে তমুর খাঁ রাজধানীর যত হস্তী, অশ্ব ও রাজভাণ্ডার তাহা লইয়া যাইবেন কিন্তু তোগান খাঁ বঙ্গের অধিপতি থাকিয়া যাইবেন। তাবকাৎ-ইনাসিরী লেখক মিনহাজ এই তোগান খাঁর সঙ্গে অনেক দিন ছিলেন এবং পূর্ব্বোক্ত সন্ধি অনেকটা তাঁহারই চেষ্টায় হইতে পারিয়াছিল। তমুর খাঁ প্রায় দুই বৎসর লক্ষণাবতী শাসন করিয়াছিলেন, সেই সময়ে তোগান খাঁ স্বীয় সৈন্যগণ দ্বারা পরিত্যক্ত হইয়া দূরে অবস্থিতি করিতেছিলেন। কেহ কেহ বলেন তোগান খাঁর রাজত্বকালে সুপ্রসিদ্ধ চেঙ্গিস খাঁ ৩০,০০০ সৈন্য লইয়া গৌড় আক্রমণ করিয়াছিলেন। গঙ্গাবংশীয় রাজগণ এই সময়ে প্রবল হইয়া মুসলমানদিগকে বারংবার পরাজিত করিয়াছিলেন, দ্বিতীয় নৃসিংহদেবের তাম্রশাসনে প্রথম নৃসিংহদেবের এই বিজয়ের কথা-উপলক্ষে লিখিত হইয়াছে–“তাহার অমিত বিক্রমে রাঢ় ও বরেন্দ্রীয় যবনাঙ্গনাগণের কজ্জলরাগমিশ্রিত অশ্রু-সুধা-ধবল-গঙ্গা-প্রবাহকে কালিন্দীর ন্যায় শ্যামায়মানা করিয়াছিল।”

মুলুক যুজবেক (মুগীস উদ্দিন)–১২৪৬১২৫৮ খৃঃ

পরবর্ত্তী রাজা মুলুক যুজবেক সম্রাট আলতামাসের একজন তাতার দেশীয় দাস ছিলেন। ইনি দিল্লীর সম্রাটগণের প্রীতিলাভ করিয়া পরমুহূর্ত্তেই তাঁহাদের বিপক্ষতা করিয়াছিলেন। ইনু ষড়যন্ত্রী, অকৃতজ্ঞ ও স্বেচ্ছাচারী ছিলেন। তিনি সম্রাজ্ঞী রিজিয়া ও সম্রাট বাইরাম সাহ ইঁহাদের উভয়ের বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। নানাভাগ্যবিপর্য্যয়ের পর বঙ্গের মসনদ পাইয়া ইনি সর্ব্বপ্রথমই প্রতিশোধ লইবার জন্য জাজপুরে অভিযান করেন। প্রথম ও দ্বিতীয় বারের যুদ্ধে কলিঙ্গরাজের পরাজয় হইল। কিন্তু তৃতীয় বার যুববেক ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্থ হইয়া পরাস্ত হইলেন। তাঁহার সমস্ত হস্তী শত্রুহস্তগত হইল। তন্মধ্যে তই মূল্যবান একটি শ্বের হস্তী ছিল। এই পরাজয়ের পর তিনি দিল্লী হইতে সৈন্য সাহায্য পাইয়া আর একবার গোপনে কলিঙ্গ্রাজের রাজধানী আক্রমণ করিয়া ভাণ্ডার লুণ্ঠন করিয়া লইয়া আসিলেন। বিজয়োল্লাসে যুববেক দিল্লীশ্বরের অধীনতাপাশ ছিন্ন করিয়া রক্ত, শ্বেত ও কৃষ্ণ–এই ত্রিবর্ণের চন্দ্রাতপ ব্যবহার এবং সম্রাট মুগীসউদ্দিন উপাধিধারণপূর্ব্বক নিজেকে স্বাধীন বলিয়া ঘোষণা করিলেন। তৎপরে তিনি অযোধ্যা-জয়ার্থ অভিযান করিতে কৃতসঙ্কল্প হন। কামরূপ-পতি পরাস্ত হইলে ইনি তাঁহার ধনরত্ন লুণ্ঠন করেন। তদবস্থায় কামরূপের রাজা মুগীশউদ্দিনের অধীনতা স্বীকারপূর্ব্বক তাঁহাকে বাৎসরিক প্রভূত রাজস্ব দিতে প্রতিশ্রুত হইয়া দূত প্রেরণ করেন, পরন্তু বঙ্গেশ্বরের নামাঙ্কিত মুদ্রা নিজরাজ্যে চালাইতেও স্বীকৃত হন। কিন্তু বিজয়দৃপ্ত মুগীশউদ্দিন এই সন্ধির প্রস্তাব অগ্রাহ্য করিলেন। উপায়ান্তর না দেখিয়া হিন্দুরা পার্শ্ববর্ত্তী সমস্ত শষ্যক্ষেত্র ধ্বংস করিয়া ফেলিল এবং নদীর বাঁধ ভাঙ্গিয়া দিয়া তাহাদের দুর্গম দেশ জলমগ্ন করিয়া ফেলিল। এইবার মুগীশউদ্দিন শত্রুহস্তে পড়িয়া নিতান্ত লাঞ্ছিত হইলেন। হস্তিপৃষ্ঠে পলায়নপর বঙ্গেশ্বরকে সকলেই লক্ষ্য করিতে সুবিধা পাইল; একটি মারাত্মক বাণে বিদ্ধ হইয়া তিনি শয্যাশায়ী হইলেন। মুমূর্ষুকালে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে জীবিত বা নিহত পুত্রের মুখ দেখিতে চাহিলেন। কামরূপের রাজা এই প্রার্থনা মঞ্জুর করিয়া দিলেন। পুত্র বন্দী হইয়া সমীপবর্ত্তী হইল, অশ্রুসিক্ত চক্ষে তাঁহাকে দেখিতে দেখিতে তাঁহার প্রাণবায়ু বহির্গত হইল। (১২৫৮ খৃঃ।)

জালালুদ্দিন১২৫৮, এক বৎসর; আর্সলন খাঁ১২৫৮, ১২৬০১২৬১ খৃঃ

১২৫৮ খৃষ্টাব্দে দিল্লীশ্বরের সনদ পাইয়া জালালুদ্দিন মসুদ লক্ষণাবতীর শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত হইলেন। কিন্তু তিনি মাত্র এক বৎসর ঐ পদে নিযুক্ত ছিলেন। কড়ার শাসনকর্ত্তা আর্সলন সহসা এক বিপুল বাহিনী লইয়া লক্ষণাবতী আক্রমণ করেন, জালালুদ্দিন নিহত হন (১২৫৮ খৃ;)। আর্সলন খাঁ দুই বৎসর মাত্র বঙ্গের গদি দখল করিয়াছিলেন। ১২৬০ খৃঃ অব্দে তাঁহার মৃত্যু হয়। রাখালদাসবাবু এই সময়ের মধ্যে ইজুদ্দিন বল্‌বন নামক আর একজন বঙ্গেশ্বরের নাম উল্লেখ করিয়াছেন।

তাতার খাঁ১২৬১১২৬৬ খৃঃ

আর্সলন খাঁর পুত্র মহম্মদ তাতার খাঁ* সিংহাসনে অভিষিক্ত হইয়া সকলের অনুরাগ আকর্ষণ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। তিনি সম্রাট বুলবনকে বহুবিধ উপঢৌকন পাঠাইয়া তাঁহাকে বশীভূত করেন। এই উপঢৌকনের মধ্যে রেশমী কাপড় ও মস্‌লিন বহু পরিমানে ছিল, তাহা ছাড়া ৬৩টি হস্তী এবং বহু অর্থ রাজস্বস্বরূপ পাঠাইয়াছিলেন। বুলবন তাঁহার রাজত্বের সূচনায় এই সুপ্রচুর ভেট পাইয়া উহা একটা শুভচিহ্ন বলিয়া মনে করিয়াছিলেন এবং তাতারের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত হইয়াছিলেন। তাতার খাঁ ১২৭৭ খৃঃ অব্দে প্রাণত্যাগ করেন।
তাতার খাঁর মৃত্যুর পর সম্রাট তদীয় বিশ্বস্ত ও প্রিয় অনুচর তোগ্রেলকে বঙ্গের অধিকার প্রদান করেন। তোগ্রেল সিংহাসনে অভিষিক্ত হইয়া উড়িষ্যা আক্রমণ করেন। তথা হইতে ফিরিয়াই নিজেকে স্বাধীন নৃপতি বলিয়া ঘোষণা করেন এবং ইহাও প্রচার করেন যে সম্রাট বেলিনের মৃত্যু ঘটিয়াছে। তখন দিল্লীশ্বর পীড়িত ছিলন। তাঁহার প্রিয়তম অনুচরের এই অকৃতজ্ঞতা ও দুর্ব্যবহারে একান্ত ব্যথিত হইয়া তিনি পীড়িত থাকা সত্ত্বেও তাঁহার মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদ না রটে এই জন্য নিজে রাজধানীতে প্রকাশ্যভাবে দেখা দিতে লাগিলেন এবং তোগ্রেলকে চিঠি লিখিলেন। তোগ্রেল মগীসুদ্দিন খেতাব গ্রহণ করিয়া স্বাধীন নৃপতি হইয়াছেন, তিনি সে চিঠি উপেক্ষা করিলেন। সম্রাট তাঁহার বিরুদ্ধে দুইবার দুইজন সেনাপতি পাঠাইলেন, কিন্তু তোগ্রেল (মগীসুদ্দিন) তাঁহাদিগকে পরাস্ত করিলেন। সম্রাট স্বয়ং বঙ্গদেশে আসিয়া লক্ষণাবতীর দিকে অভিযান করাতে কতকটা ভয় পাইয়া কতকটা লজ্জায় পড়িয়া, বঙ্গেশ্বর তাঁহার অর্থসম্পদ লইয়া যাজনগরে আশ্রয় লইলেন। সম্রাট চলিয়া গেলে পুনরায় গৌড়ে ফিরিবেন এই উদ্দেশ্য ছিল। সম্রাট গৌড়ে হিসামউদ্দিন নামক সেনাপতিকে বঙ্গের মসনদে বসাইয়া যাজনগরে মগীসুদ্দিন তোগ্রেলকে আক্রমণ করিতে অভিযান করিলেন। তোগ্রেল এমন চতুরতার সহিত পলায়ন করিতে লাগিলেন যে দিল্লীশ্বর কোথায়ও তাঁহার সন্ধান পাইলেন না। তিনি বহু চেষ্টার পর একদল বণিকের মুখে সংবাদ পাইয়া অতর্কিতভাবে তাঁহাকে আক্রমণ করিয়া নিহত করেন। দিল্লীশ্বরের এই অভিযানে স্বর্ণগ্রামের দনুজ রায় তাঁহাকে অনেক সাহায্য করিয়াছিলেন। সম্রাট স্বয়ং তোগ্রেলের হস্তী ও ধনসম্পদ আত্মসাৎ করিয়া গৌড়ে প্রত্যাবর্ত্তনপূর্ব্বক তাঁহার অন্তঃপুরের মহিলা ও শিশুদিগের শিরচ্ছেদের আদেশ করিলেন এবং তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা নাসিরুদ্দিনকে কখনও দিল্লীশ্বরের বিদ্রোহিতা না করেন (যিনিই দিল্লীর রাজতন্ত্রের মালিক হউন না কেন) এই শপথ গ্রহণ করাইয়া বঙ্গের মসনদে স্থাপিত করেন (১২৮০ খৃঃ)।

নাসিরুদ্দিন বগড়া খাঁ১২৮২১২৯১ খৃঃ

নাসিরুদ্দিনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মহম্মদের অকস্মাৎ মৃত্যু হওয়াতে বৃদ্ধ সম্রাট অত্যন্ত বিচলিত হইয়া তাঁহাকে দিল্লীতে আসিতে লিখিলেন। তাঁহাকে নিজের কাছে ডাকাইয়া আনিয়া বলিলেন, “আমি বৃদ্ধ ও শোকবিচলিত হইয়াছি, যদিও মহম্মদের পুত্র খসরুই এই রাজ্যের প্রকৃত উত্তরাধিকারী, তথাপি সে অতি তরুণবয়স্ক, এত বড় রাজ্যের ভার সে বহন করিতে পারিবে না। আপাততঃ বঙ্গের শাসনের ভার অপর কাহারও উপর দিয়া তুমি কতকদিন এইখানেই থাক। আমি বেশীদিন বাঁচিব না। তুমি একটা ব্যবস্থা করিয়া রাজ্য রক্ষা করিল।
কিন্তু সম্রাট একটু একটু করিয়া ভাল হইতে লাগিলেন। নাসিরুদ্দিনের আর দিল্লীতে থাকিতে ভাল লাগিল না। রাজ্যের যাহা হয় হইবে, এই মনে স্থির করিয়া, মৃগয়ার ছল করিয়া বঙ্গদেশে ফিরিয়া আসিলেন।
পুত্রের এই ব্যবহারে সম্রাট অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইলেন, তিনি মহম্মদের পুত্র খসরুকে আনাইয়া তাঁহাকেই তাঁহার উত্তরাধিকারী পদে নির্দ্দিষ্ট করিয়া ৮০ বৎসর বয়ঃক্রমে পরলোকে গমন করিলেন (১২৮৬ খৃঃ)।
খসরু আইনতঃ উত্তরাধিকারী হইলেও, দিল্লীর আমিএরা তাঁহার দাবী উপেক্ষা করিয়া বঙ্গেশ্বর নাসিরুদ্দিনের অষ্টাদশবয়স্ক পুত্র কায়কোবাদকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করিলেন। এই বালক কুসঙ্গীদের হাতে পড়িয়া বিলাসস্রোতে গা ঢালিয়া দিলেন। নাজিমুদ্দিন নামক মন্ত্রীই সর্ব্বেসর্ব্বা হইয়া রাজ্য শাসন করিতে লাগিলেন। রাজা মন্ত্রীর কুপরামর্শে অতি নিষ্ঠুরভাবে খসরু ও কয়েকজন মন্ত্রীকে হত্যা করেন।

তুর্কী অভিযানের পরে

দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙ্গালা দেশে তুর্কী আক্রমণ সুরু হয়। বাঙ্গালা দেশ চিরদিনই আর্য্যবর্ত্তের রাষ্ট্রীয় সংঘাতের বাহিরে থাকিয়া নিজের স্বতন্ত্র পথে চলিয়া আসিতেছিল। সেই কারণে, আর্য্যাবর্ত্তে যখন শক হূণ প্রভৃতি বিদেশী আক্রমণকারিগণ প্রচণ্ড বিক্ষোভ তুলিয়াছিল, তখন তাহার ঢেউ বাঙ্গালা দেশের সীমানায় পৌঁছিয়া বাঙ্গালীর পল্লীজীবনের সুখশান্তির বিন্দুমাত্রও ব্যাঘাত ঘটাইতে পারে নাই। অনেক কাল পরে যখন তুর্কী ও পাঠান সৈন্য পশ্চিম ও উত্তর ভারতে একে একে দেশের পর দেশ গ্রাস করিয়া পূর্ব্বদিকে অগ্রসর হইতেছিল, তখনও এই ব্যাপারের গুরুত্ব বাঙ্গালীর বোধগম্য হয় নাই। অতএব যখন মুহম্মদ-বিন-বখতিয়ার মগধদেশ জয় ও লুণ্ঠন করিয়া অকস্মাৎ পূর্ব্বদিকে প্রধাবিত হইল, তখন বাঙ্গালা দেশের রাজশক্তি অথবা প্রজাবর্গ কেহই এই বিদেশী আক্রমণকারীদিগকে উপযুক্ত বাধা দিবার জন্যে একটুকুমাত্র প্রস্তুত ছিল না। সুতরাং মুষ্টিমেয় তুর্কী-পাঠান সৈন্যকে বাঙ্গালা দেশে বিশেষ কোন যুদ্ধ অথবা অন্য প্রকার বাধার সম্মুখীন হইতে হয় নাই।

তুর্কী আক্রমণের ফলে বাঙ্গালীর বিদ্যা ও সাহিত্যচর্চ্চার মূলে কুঠারাঘাত পড়িল। প্রায় আড়াই শত বৎসরের মত দেশ সকল দিকেই পিছাইয়া পড়িল। দেশে শান্তি নাই, সুতরাং সাহিত্যচর্চ্চা ত হইতেই পারে না। প্রধানতঃ এই কারণেই ত্রয়োদশ ও চতুর্দ্দশ এই দুই শতাব্দীতে কোন সাহিত্যিক রচনা পাওয়া যায় নাই।

চতুর্দ্দশ শতাব্দীর মধ্যভাবে শম্‌সু-দ্‌-দীন ইলিয়াস শাহ দিল্লীর সম্রাটের অধীনতা-পাশ ছেদ করিয়া বাঙ্গালায় স্বাধীন সুলতান রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিলেন। তখন হইতেই দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হইবার মত অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি হইল। দেশে পুনরায় জ্ঞানচর্চ্চা সুরু হইল, এবং সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্য-সৃষ্টির প্রচেষ্টাও দেখা দিল। পাল এবং সেন বংশীয় নরপতিদিগের মত এবারেও মুখ্যভাবে রাজশক্তিই জ্ঞান ও সাহিত্যচর্চ্চার পৃষ্ঠপোষকতা করিতে লাগিল।

পঞ্চদশ শতাব্দীতে অন্ততঃ তিন জন সুলতান এবং ষোড়শ শতাব্দীতে অন্ততঃ এক জন সুলতান এবং দুই জন উচ্চপদস্থ মুসলমান রাজকর্ম্মচারী যে নিজেদের সভাকবিদিগের দ্বারা অনেকগুলি উৎকৃষ্ট কাব্য রচনা করাইয়া ছিলেন, তাহার প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে। এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা যাইতেছে। তুর্কী অভিযানের পর, পঞ্চদশ শতাব্দী হইতে ইংরাজ অধিকারের পূর্ব্বকাল অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্য্যন্ত, বাঙ্গালা সাহিত্য প্রধাণতঃ গীতিমূলক ছিল। অর্থাৎ বাঙ্গালা কাব্য সাধারণতঃ পড়া বা আবৃত্তি করা হইত না,–মন্দিরা, মৃদঙ্গ ও চামর সংযোগে একাকী বা দলবদ্ধ ভাবে গীত হইত। অতি পূর্ব্বাকালে বোধ হয় পঞ্চালিকা বা পুতুল-নাচের সঙ্গে এই ধরনের কাব্য গীত হইত বলিয়া পরে বাঙ্গালা কাব্যের সাধারণ নাম হইয়াছিল “পাঁচালী”। আর, কাব্যগুলিতে কোন না কোন দেবতার অথবা দেবকল্প মানুষের মহিমা কীর্ত্তিত হইত। এই জন্য কাব্যের নামে প্রায় “মঙ্গল” বা “বিজয়” শব্দ যুক্ত থাকিত।

অনেকে ধারণা করিয়া থাকেন যে, প্রাচীন বাঙ্গালা সাহিত্যে “মঙ্গল” ও “বিজয়” কাব্য বলিয়া দুই স্বতন্ত্র প্রকারের কাব্যধারা বর্ত্তমান ছিল। এই ধারণা নিতান্তই ভুল। একই কাব্যের বিভিন্ন পুঁথিতে কখনও “মঙ্গল” কখনও বা “বিজয়” নাম পাইতেছি। যেমন, মালাধর বসুর কাব্য শ্রীকৃষ্ণবিজয়, শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল এবং গোবিন্দমঙ্গল এই তিন নামেই সমান ভাবে সুপরিচিত ছিল।

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে পশ্চিমবঙ্গে জনসাধারণের সাহিত্যিক রুচির চমৎকার ছবি পাওয়া যায় বৃন্দাবন-দাসের চৈতন্যভাগবত গ্রন্থে। বৃন্দাবন-দাস লিখিয়াছিলেন যে, তখন গায়কেরা শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা ও শিবের গৃহস্থালীর গান গাহিয়া ভিক্ষা করিত, পূজা উপলক্ষে সাধারণ লোকে আগ্রহ করিয়া মঙ্গলচণ্ডীর ও বিষহরি অর্থাৎ মনসার পাঁচালী শুনিত, এবং রামায়ণ-গানে আর ঐতিহাসিক-গাঁথায় সাধারণ লোকের, এমন কি বিদেশী মুসলমানদের চিত্ত বিগলিত হইত। পঞ্চদশ শতাব্দীতে রচিত এই সব কাব্যের দুই একখানি মাত্র পাওয়া গিয়াছে। কিন্তু ঐতিহাসিক-গাঁথাগুলি—বৃন্দাবন-দাসের কথায় “যোগীপাল ভোগীপাল মহীপালের গীত”—একেবারেই লুপ্ত হইয়া গিয়াছে বলিয়া বোধ হয়।

বাংলা সালতানাত

বাংলা সালতানাত , শাহি বাংলা ছিল মধ্যযুগের বাংলায় একটি মুসলিম রাষ্ট্র। ১৩৪২ সালে গৌড়ে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আধুনিক বাংলাদেশ, পূর্ব ভারতপশ্চিম বার্মাতে এর প্রভাব বর্তমান রয়েছে। তুর্কি, আরব, পারসিয়ান, বাঙালিহাবশি বংশোদ্ভূত বেশ কিছু রাজবংশ এর শাসনভার লাভ করে। ১৬ শতকের শেষের দিকে সালতানাত ভেঙে যায় এবং মোগল সাম্রাজ্য ও আরাকানি মারুক ইউ এর রাজ্যের অংশে পরিণত হয়।

১৩৪২ সালে স্থানীয় সেনাপতি শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ নিজেকে লখনৌতির রাজা ঘোষণা করেন। তিনি অন্যান্য স্বাধীন রাজ্যসমূহও জয় করার মাধ্যমে নিজের শাসন সংহত করেন এবং ১৩৫২ সালে নিজেকে বাংলার সুলতান ঘোষণা করেন।

ঘাঘরার যুদ্ধে সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ বাবরের কাছে পরাজিত হন। এর পর ধীরে ধীরে বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়।

ইলিয়াস শাহী বংশ

ইলিয়াস শাহী বংশ মধ্যযুগে বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজবংশ যা বাংলাকে চৌদ্দ এবং পনের শতকে শাসন করেছে। ইলিয়াস শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ যিনি দিল্লির অধীন থেকে বাংলাকে মুক্ত করে বাংলায় স্বাধীন সুলতানী কায়েম করেন। শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ যদিও তার রাজধানী পান্ডুয়ায় স্থাপন করেন পরবর্তীতে ১৪৫৩ সালে নাসিরউদ্দীন মাহমুদ সেই রাজধানীকে লখনৌতি তে স্থাপন করেন। ১৪১৫ সালে ইলিয়াস শাহি বংশকে পরাজিত করে রাজা গণেশ রাজ্য দখল করে নেন। রাজা গণেশের পুত্র যাদু ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে জালাল উদ্দীন মোহাম্মদ শাহ নাম ধারন করেন এবং তার পিতার উত্তরসুরি হন। তার পুত্র শামসউদ্দীন আহমেদ শাহ পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করলে শামসউদ্দীন ইলিয়াস শাহের উত্তরশুরী নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ পুনরায় ইলিয়াস শাহী বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। ইলিয়াস শাহী বংশের শেষ উত্তরসুরি জালালউদ্দিন ফাতেহ শাহ তার হাবশী সেনাপতি কতৃক নিহত হলে ইলিয়াস শাহী বংশের সমাপ্তি ঘটে।

শাসকদের তালিকা

ধারনকৃত নাম ব্যাক্তিগত নাম রাজত্বকাল
সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ ১৩৪২-১৩৫৮
সুলতান সিকান্দার শাহ ১৩৫৮-১৩৯০
সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ ১৩৯০-১৪১১
সুলতান সাইফউদ্দীন হামজা শাহ ১৪১১-১৪১৩
সুলতান মোহাম্মদ শাহ ১৪১৩
সুলতান শিহাবউদ্দীন শিহাবউদ্দীন বায়েজিত শাহ ১৪১৩-১৪১৪
সুলতান আলাউদ্দীন আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ ১৪১৪-১৪১৫
সুলতান নাসিরউদ্দীন আবুল মোজাফ্ফর মাহমুদ শাহ ১৪৩৫-১৪৫৯
সুলতান রোকনউদ্দীন বার্বাক শাহ ১৪৫৯-১৪৭৪
সুলতান শামসউদ্দীন আবুল মোজাফ্ফর ইউসুফ শাহ ১৪৭৪-১৪৮১
সুলতান দ্বিতীয় সিকান্দার শাহ ১৪৮১
সুলতান জালালউদ্দীন ফাতেহ শাহ ১৪৮১-১৪৮৭
১৪৮৭ সালে হাবসি সেনাপতি ইলিয়াস শাহী বংশের বিলোপ ঘটান এবং নিজে ক্ষমতা দখল করে নেন।

 

শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৮) ছিলেন বাংলার একজন স্বাধীন শাসনকর্তা। তিনি ১৩৪২ সালে সোনারগাঁও বিজয়ের পর লখনৈতির সুলতান হন। শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ অবিভক্ত বাংলার প্রথন মুসলিম স্বাধীন সুলতান ছিলেন এবং ইলিয়াস শাহী বংশের সূচনা করেন। ইলিয়াস শাহী বংশ ১৩৪২ সাল থেকে ১৪১৫ সাল পর্যন্ত একটানা ৭৩ বছর ধরে অবিভক্ত বাংলা শাসন করে এবং এরপর মাঝখানে প্রায় ২০ বছর বাদ দিয়ে আরো ৫২ বছর তাদের শাসন কায়েম থাকে। ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর পর তার পূত্র সিকান্দার শাহ ক্ষমতায় আসেন।

শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ প্রথম জীবনে দিল্লির সালতানাতের অধীনে চাকরী করতেন। কিন্তু কিছু সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার কারনে তিনি বাংলা পালিয়ে আসেন এবং তৎকালীন বাংলায় দিল্লির প্রাদেশিক গভর্নর ইজাজউদ্দীন ইয়াহিয়ার অধীনে কাজ করা শুরু করেন। ১৩৩৮ সালে ইজাজউদ্দীন ইয়াহিয়ার মৃত্যু হলে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সাতগাঁওয়ের ক্ষমতা দখল করেন এবং একে দিল্লির অধীন থেকে মুক্ত ঘোষনা করেন। ১৩৪২ সালে প্রায় দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধে লখনৈতির সুলতান আলাউদ্দীন আলী শাহকে পরাজিত করে তিনি লখনৌতির শিংহাসনে আরোহন করেন এবং ইলিয়াস শাহী বংশের সূচনা করেন।

সিকান্দার শাহ (শাসনকাল ১৩৫৮-১৩৯০ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন বাংলার শাসক ইলিয়াস শাহি রাজবংশের দ্বিতীয় সুলতান। সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ তার পিতা। ১৩৫৮ সালে তিনি পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ নির্মাণ করেন।

তার শাসনামলে দিল্লীর সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক বাংলা জয়ের জন্য অভিযান পরিচালনা করেন। সোনারগাঁওয়ের প্রাক্তন শাসক ফখরুদ্দিন মোবারক শাহর জামাতা পারস্য বংশোদ্ভূত ব্যক্তি জাফর খান ফারস বাংলা থেকে পালিয়ে দিল্লী পৌছান। ফিরোজ শাহ তাকে বাংলার ন্যায়সঙ্গত শাসক বলে ঘোষণা করেন। তার প্ররোচণায় ১৩৫৯ সালে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ৮০,০০০ অশ্বারোহী, ৪৭০ হস্তী ও বড় আকারের পদাতিক বাহিনীর বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত সেনাবাহিনীকে ব্যক্তিগতভাবে নেতৃত্ব দেন। পিতার মত সিকান্দার শাহও একডালা দুর্গে আশ্রয় নেন। ফিরোজ শাহ প্রাসাদ অবরোধ করেন। শেষপর্যন্ত ফিরোজ শাহ বাংলা থেকে তার বাহিনী ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন এবং সিকান্দার শাহর সাথে সন্ধি করেন।

সিকান্দার শাহ ও তার প্রথম স্ত্রীর ১৭ জন পুত্র ছিল। দ্বিতীয় স্ত্রীর ছিল ১ জন পুত্র। দ্বিতীয়জন পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সোনারগাঁওসপ্তগ্রাম দখল করেন। শেষপর্যন্ত ১৩৯০ সালে রাজধানী পান্ডুয়ার কাছে গোয়ালপাড়ার যুদ্ধে তিনি তার পিতাকে পরাজিত ও হত্যা করেনএবং গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ নামধারণ করে সিংহাসনে বসেন।

গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (শাসনকাল ১৩৯০-১৪১১) ছিলেন প্রথম ইলিয়াস শাহি রাজবংশের তৃতীয় সুলতান। তিনি তৎকালীন বাংলার সুপরিচিত সুলতানদের অন্যতম ছিলেন। বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে তার মাজার রয়েছে।

শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি কামরূপের বিরুদ্ধে একটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। তবে অঞ্চল জয়ের চেয়ে শাসন সুসংহত করার প্রতি তার মনোনিবেশ বেশি ছিল। জৌনপুরের খাজা জাহানের নিকট তিনি দূত ও উপহার প্রেরণ করেন। সমকালীন চৈনিক সম্রাট ইয়ং লির সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। ১৪০৫, ১৪০৮ ও ১৪০৯ সালে তিনি চীনে দূত প্রেরণ করেন।ইয়ং লিও তার কাছে দূত ও উপহার পাঠান। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ মক্কামদিনায়ও দূত প্রেরণ করেন। এই দুই স্থানে গিয়াসিয়া মাদ্রাসা নামক দুটি মাদ্রাসা নির্মাণে তিনি আর্থিক সাহায্য প্রদান করেন।তার শাসনামলে জমিদার রাজা গণেশ নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন।

গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ পন্ডিত ও কবিদের সমাদর করতেন। পারস্যের কবি হাফিজের সাথে তার পত্রবিনিময় হত। বাঙালি মুসলিম কবি শাহ মুহম্মদ সগীর তার বিখ্যাত রচনা ইউসুফ জুলেখা এ সময়ে সম্পন্ন করেন। এসময় কৃত্তিবাসের রামায়ণ বাংলায় অনুবাদ করা হয়।

১৪১১ সালে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ মৃত্যুবরণ করেন।

সাইফউদ্দিন হামজা শাহ (শাসনকাল ১৪১০-১৪১২ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন বাংলার প্রথম ইলিয়াস শাহি রাজবংশের চতুর্থ সুলতান। তার পিতা সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহর মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতালাভ করেন এবং সুলতানুস সালাতিন উপাধি ধারণ করেন।

হামজা শাহর রাজত্বকালে বাংলায় গৃহযুদ্ধ দেখা দেয়। ১৪১২ সালে তিনি তার দাস শিহাবউদ্দিন কর্তৃক নিহত হন।

শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৮) ছিলেন বাংলার একজন স্বাধীন শাসনকর্তা। তিনি ১৩৪২ সালে সোনারগাঁও বিজয়ের পর লখনৈতির সুলতান হন। শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ অবিভক্ত বাংলার প্রথন মুসলিম স্বাধীন সুলতান ছিলেন এবং ইলিয়াস শাহী বংশের সূচনা করেন। ইলিয়াস শাহী বংশ ১৩৪২ সাল থেকে ১৪১৫ সাল পর্যন্ত একটানা ৭৩ বছর ধরে অবিভক্ত বাংলা শাসন করে এবং এরপর মাঝখানে প্রায় ২০ বছর বাদ দিয়ে আরো ৫২ বছর তাদের শাসন কায়েম থাকে। ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর পর তার পূত্র সিকান্দার শাহ ক্ষমতায় আসেন।

শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ প্রথম জীবনে দিল্লির সালতানাতের অধীনে চাকরী করতেন। কিন্তু কিছু সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার কারনে তিনি বাংলা পালিয়ে আসেন এবং তৎকালীন বাংলায় দিল্লির প্রাদেশিক গভর্নর ইজাজউদ্দীন ইয়াহিয়ার অধীনে কাজ করা শুরু করেন। ১৩৩৮ সালে ইজাজউদ্দীন ইয়াহিয়ার মৃত্যু হলে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সাতগাঁওয়ের ক্ষমতা দখল করেন এবং একে দিল্লির অধীন থেকে মুক্ত ঘোষনা করেন। ১৩৪২ সালে প্রায় দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধে লখনৈতির সুলতান আলাউদ্দীন আলী শাহকে পরাজিত করে তিনি লখনৌতির শিংহাসনে আরোহন করেন এবং ইলিয়াস শাহী বংশের সূচনা করেন।

গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (শাসনকাল ১৩৯০-১৪১১) ছিলেন প্রথম ইলিয়াস শাহি রাজবংশের তৃতীয় সুলতান। তিনি তৎকালীন বাংলার সুপরিচিত সুলতানদের অন্যতম ছিলেন। বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে তার মাজার রয়েছে।শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি কামরূপের বিরুদ্ধে একটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। তবে অঞ্চল জয়ের চেয়ে শাসন সুসংহত করার প্রতি তার মনোনিবেশ বেশি ছিল। জৌনপুরের খাজা জাহানের নিকট তিনি দূত ও উপহার প্রেরণ করেন। সমকালীন চৈনিক সম্রাট ইয়ং লির সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। ১৪০৫, ১৪০৮ ও ১৪০৯ সালে তিনি চীনে দূত প্রেরণ করেন। ইয়ং লিও তার কাছে দূত ও উপহার পাঠান। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ মক্কামদিনায়ও দূত প্রেরণ করেন। এই দুই স্থানে গিয়াসিয়া মাদ্রাসা নামক দুটি মাদ্রাসা নির্মাণে তিনি আর্থিক সাহায্য প্রদান করেন।তার শাসনামলে জমিদার রাজা গণেশ নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন।

গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ পন্ডিত ও কবিদের সমাদর করতেন। পারস্যের কবি হাফিজের সাথে তার পত্রবিনিময় হত। বাঙালি মুসলিম কবি শাহ মুহম্মদ সগীর তার বিখ্যাত রচনা ইউসুফ জুলেখা এ সময়ে সম্পন্ন করেন। এসময় কৃত্তিবাসের রামায়ণ বাংলায় অনুবাদ করা হয়। ১৪১১ সালে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ মৃত্যুবরণ করেন।

সাইফউদ্দিন হামজা শাহ (শাসনকাল ১৪১০-১৪১২ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন বাংলার প্রথম ইলিয়াস শাহি রাজবংশের চতুর্থ সুলতান। তার পিতা সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহর মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতালাভ করেন এবং সুলতানুস সালাতিন উপাধি ধারণ করেন।

হামজা শাহর রাজত্বকালে বাংলায় গৃহযুদ্ধ দেখা দেয়। ১৪১২ সালে তিনি তার দাস শিহাবউদ্দিন কর্তৃক নিহত হন।

বায়াজিদ বংশ

  • শিহাবুদ্দিন বায়াজিদ শাহ (১৪১৩-১৪১৪)
  • প্রথম আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৪১৪-১৪১৫)

শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহ (শাসনকাল ১৪১৩-১৪১৪) ছিলেন ইলিয়াস শাহি রাজবংশের সুলতান। তিনি এক বছরের মত সংক্ষিপ্ত সময় সুলতান ছিলেন। তিনি তার পিতা সাইফউদ্দিন হামজা শাহর উত্তরাধিকারী হন।

শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহ তার পূর্বসূরিদের মত চীনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন। তিনি চীনের সম্রাটের কাছে একটি জিরাফ ও সোনালি পাতার উপর লেখা চিঠি পাঠিয়েছিলেন। ৮১৬ ও ৮১৭ হিজরিতে তিনি মুদ্রা চালু করেন। মুদ্রা সংক্রান্ত কিছু সূত্র মতে তার উত্তরসুরি পুত্র আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ ৮১৭ হিজরিতে মুদ্রা চালু করেন। ঐতিহাসিক মুহাম্মদ কাসিম হিন্দু শাহর মতে রাজা গণেশ শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহর মৃত্যুর পর ক্ষমতা দখল করেন। অন্যদিকে ১৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে লিখিত রিয়াজুস সালাতিন অনুযায়ী রাজা গণেশ শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেন।

প্রথম আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ ছিলেন সুলতান শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহর পুত্র ও উত্তরসুরি। সুলতান হলেও তার ক্ষমতা নামেমাত্র ছিল। দিনাজপুরের জমিদার রাজা গণেশ এসময় মূল ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। কয়েকমাস শাসন করার পর গণেশ তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ৮১৭ হিজরিতে মুয়াজজামাবাদ (পূর্ব বাংলা) ও সাতগাও (দক্ষিণ বাংলা) থেকে জারি করা প্রথম আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহর মুদ্রা পাওয়া গেলেও রাজধানী ফিরোজাবাদ (পান্ডুয়া) থেকে জারি করা মুদ্রা পাওয়া যায়নি। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি রাজধানী ত্যাগ করে দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলার উপর কর্তৃত্ব স্থাপনের প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু গণেশ তাকে পরাজিত ও হত্যা করেন।

গণেশ বংশ

রাজা গণেশ (শাসনকাল ১৪১৫) ছিলেন বাংলার একজন হিন্দু শাসক। তিনি বাংলার ইলিয়াস শাহি রাজবংশকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতায় আসেন। মধ্যযুগের ইন্দো-পারসিয়ান ইতিহাসবিদরা তাকে একজন কাফির দখলদার বলে অবিহিত করেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ ১৪১৫-১৪৩৫ সময়কালে বাংলা শাসন করে। তার পুত্র সুলতান জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহর মুদ্রায় তার নাম কানস রাউ বা কানস শাহ বলে উল্লেখ রয়েছে। ইন্দো-পারসিয়ান ইতিহাসবিদরা তার রাজা কানস বা কানসি বলে উল্লেখ করেছেন। আধুনিক কিছু পন্ডিত তাকে দানুজামারদানদেব বলে উল্লেখ করলেও এই পরিচয়টি সর্বত্র স্বীকৃত নয়।

জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ (মূল নাম যদু) ছিলেন রাজা গণেশের পুত্র ও উত্তরসুরি। ১৪১৫ থেকে ১৪১৬ ও ১৪১৮ থেকে ১৪৩৩ এই দুই দফায় তিনি বাংলা শাসন করেন। কুতুবুল আলমের কাছে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ নাম গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় দফা শাসনের সময় তিনি সুলতান, আমিরখলিফাতুল্লাহ উপাধি ধারণ করেন।

ইলিয়াস শাহী বংশ (দ্বিতীয় পর্ব)

  • প্রথম নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৩৫-১৪৫৯)
  • রুকনুদ্দীন বারবক শাহ (১৪৫৯-১৪৭৪)
  • শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১)
  • দ্বিতীয় সিকান্দর শাহ (১৪৮১)
  • জালালুদ্দীন ফতেহ শাহ (১৪৮১-১৪৮৭)

নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ (শাসণকাল:১৪৩৫-১৪৫৯) ছিলেন বাংলার একজন সুলতান। তিনি ছিলেন বাংলার সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহর বংশধর। ১৪৩৫ সালে ক্ষমতাগ্রহনের পর তিনি নাসিরুদ্দিন আবুল মুজাফ্ফর মাহমুদ শাহ উপাধি গ্রহন করেন। তার ক্ষমতা গ্রহণ থেকে ২০ বছরের মধ্যে তার রাজবংশ ক্ষমতাচ্যুত হয়।

তার রাজত্বের সময় জৈনপুরের শারকি সুলতানরা দিল্লির লোদী সুলতানদের সাথে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে। এই ঘটনার সময় নাসিরুদ্দিনের রাজ্য ছিলো শান্ত। তিনি এ সময়টা তার রাজ্যের অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাটান। এছাড়াও তিনি বাংলার সামরিক বাহিনীর মনোবল পুনোরাদ্ধারে সমর্থ হন। ঔতিহাসিক নাজিমুদ্দিন আহমেদ ও ফিরিস্তারমতে নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ ছিলেন একজন আদর্শ সুলতান। অন্য আরেকজন ঔতিহাসিক গোলাম হোসাইন সেলিমের মতে তিনি তার ভালো প্রশাসনিক দক্ষতার বলে পূর্বের সুলতান শামসুদ্দিন আহমেদ শাহর রেখে যাওয়া ভঙ্গুর প্রশাসন পূণ:র্গঠিত করেন। নাসিরউদ্দিন ১৪৫৯ সালে ২৪ বছর রাজ্য শাসন করার পর মৃত্যুবরণ করেন।

তার রাজত্বের সময় খান জাহান আলী, খুলনাযশোর জয় করেন। বিভিন্ন মুদ্রায় পাওয়া তথ্য মতে, নাসিরুদ্দিনের রাজ্য ভাগলপুর থেকে পশ্চিমে, পূর্ব থেকে ময়মনসিংহসিলেট, উত্তরে গৌড় ও পাণ্ডুয়া এবং দক্ষিণে হুগলি পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তৃত ছিলো।

খান জাহান আলীর সহযোগিতায় তিনি বাংলার বিভিন্ন অংশে মুসলমানদের বসতি স্থাপনে সাহায্য করেন। তারা মসজিদ, পানি উত্তোলনের জন্য বিভিন্ন ধরনে খনন যেমন, খাল, কুপ ইত্যাদি এবং এরকম আরো বিভিন্ন জনকল্যানমূলক স্থাপনা নির্মান করেন। তার রাজত্বের সময়কার কিছু উল্লেখযোগ্য মসজিদ হলো:

  • ষাট গম্বুজ মসজিদ– খান জাহান আলী কর্তৃক স্থাপিত হয়।
  • ১৪৪৩ সালে জঙ্গিপুরের সরফরাজ খান মুর্শিদাবাদ জেলায় দুটি মসজিদ নির্মান করেন।
  • ১৪৫৫ সালে গৌড়তে হিলালি একটি মসজিদ নির্মান করেন।
  • ১৪৫৫ সালে ঢাকায় বখত বিনাত বিবি নামে একজন মহলি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন যা বিনাতি বিবির মসজিদ নামে পরিচিত।
  • ১৪৪৬ সালে ভাগলপুরে খুর্শিদ খান একটি মসজিদ নির্মান করেন।

এছাড়াও বাগেরহাটে খান জাহান আলীর মাজার ও আল্লামা হযরত পানদুয়ার মাজার তার সময়কালেই নির্মান করা হয়। তিনি নিজে গৌড়তে নগরদূর্গ ও প্রাসাদ নির্মান করেন। এগুলোর ছাড়াও পাথরের পাঁচ-তীরুদাজ সেতু, যা দূর্গের প্রধান বেষ্ঠনির অংশ ও কতোয়ালী দরজা তিনিই নির্মাণ করেন।

রুকনউদ্দিন বারবাক শাহ (শাসনকাল ১৪৫৯-১৪৭৪) ছিলেন সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের পুত্র ও উত্তরাধিকারী। বারবাক শাহ তার পিতার শাসনামলে সপ্তগ্রামের গভর্নর নিযুক্ত হন। পিতার মৃত্যুর পর ১৪৫৯ সালে তিনি ক্ষমতালাভ করেন।

রিসালাতুস শুহাদা অনুযায়ী বারবাক শাহের শাসনামলে কলিঙ্গের গজপতি রাজ্যের (বর্তমান উড়িষ্যা) রাজা দক্ষিণ বঙ্গ আক্রমণ করেন এবং মান্দারান দুর্গ দখল করেন। বারবাক শাহ তার সেনাপতি শাহ ইসমাইল গাজিকে তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। ইসমাইল গাজি কলিঙ্গের সেনাদের পরাজিত করে দুর্গ পুনরুদ্ধার করেন।

কামরূপের (বর্তমান আসাম) রাজা কামেশ্বর বাংলার উত্তর অঞ্চলে আক্রমণ করেন। শাহ ইসমাইল গাজিকে এবারও কামরূপের বিরুদ্ধে প্রেরণ করা হয়। সন্তোষের যুদ্ধক্ষেত্রে বারবাক শাহের সেনাবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেলেও ইসমাইল গাজি তার গুণের কারণে কামেশ্বরের মন জয় করেন। কামরূপের রাজা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং বারবাক শাহের অধীনতা স্বীকার করেন।তবে ইসমাইল গাজির গৌরব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গুজব ছড়ায় যে তিনি কামেশ্বরের সাথে পরিকল্পনা করে নিজের জন্য কামরূপে একটি স্বাধীন রাজ্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন। ইসমাইল গাজিকে হত্যা করা হয় এবং তার মৃতদেহ দুটি ভিন্ন স্থানে দাফন করা হয়। বারবাক শাহ মিথিলা (বর্তমান জনকপুর) আক্রমণ করেন এবং এই অঞ্চল জয় করেন। তিনি কেদার রায়কে এই অঞ্চলের গভর্নর নিযুক্ত করেন।

কামরূপ অভিযানের মাধ্যমে তার শাসিত এলাকা উত্তরে করতোয়া নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ১৪৬৮ সালে তিনি হাজিগঞ্জ দুর্গতিরহুতের চারপাশের এলাকা আক্রমণ করেন। এই বিজয় বুড়িগঙ্গা নদী পর্যন্ত তার রাজ্যের সীমানা বিস্তার করে। একটি সূত্রমতে সিলেট বারবাক শাহের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। আরেকটি বর্ণনা মতে, বাকেরগঞ্জও সালতানাতের অংশ ছিল। তিনি চট্টগ্রামে কর্তৃত্ব পুনপ্রতিষ্ঠিত করেন।

বারবাক শাহ মুসলিম ও হিন্দু পন্ডিতদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তার সময়ে জয়নুদ্দিন তার রাসুল বিজয় রচনা করেন ও ইবরাহিম কাওয়াম ফারসি গ্রন্থ ফারহাংই ইব্রাহিম (শরফনামা বলেও পরিচিত) রচনা করেন। রায়মুকুল ব্রশপতি মিশ্র, মালাধর বসু, কৃত্তিবাস ও কুলাধর সেসময়কার অগ্রগণ্য হিন্দু পন্ডিত ছিলেন। রুকনউদ্দিন বারবাক শাহ ১৪৭৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহ (শাসনকাল ১৪৭৪-১৪৮১) ছিলেন সুলতান রুকনউদ্দিন বারবাক শাহের পুত্র ও উত্তরসুরি। ১৪৭৪ সালে তিনি ক্ষমতালাভ করেন এবং শামসউদ্দিন আবুল মুজাফফর ইউসুফ শাহ নাম গ্রহণ করেন। শাসনামলে তিনি খলিফাতুল্লাহ বিল হুজ্জাত ওয়াল বুরহান, সুলতানুল সালাতিন, জিল্লুল্লাহ ফিল আলামিনখলিফাতুল্লাহ ফিল আরদিন উপাধি ধারণ করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় কবি জয়নুদ্দিন তার রাসুল বিজয় গ্রন্থ সম্পন্ন করেন। তার শাসনামলে বেশ কিছু মসজিদ নির্মাণ করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মসজিদটি হল মালদার সাকোমোহন মসজিদ, তান্তিপারা মসজিদ, কদম রসুল মসজিদ ও গৌড়ের দরাসবারি মসজিদ। নিজ রাজ্যে শরিয়া আইন প্রয়োগ করেন এবং মদ্যপান নিষিদ্ধ করেন।১৪৮১ সালে শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহ মৃত্যুবরণ করেন।

দ্বিতীয় সিকান্দার শাহ ১৪৮১ সালে সংক্ষিপ্ত সময় বাংলার সুলতান ছিলেন।

সুলতান শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহের পুত্র সিকান্দার শাহ পিতার মৃত্যুর পর ক্ষমতালাভ করেন। তবে তিনি বেশিদিন ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেননি। ইতিহাসবিদ গোলাম হোসেন ও নিজামউদ্দিন আহমাদের মতে তিনি এক বা দুইদিনের জন্য সুলতান ছিলেন। মানসিক ভারসাম্যহীনতার জন্য তাকে সরে দাঁড়াতে হয়। তবে সুলতান হিসেবে তার সময়সীমা দুই মাস পর্যন্ত ছিল হতে পারে।

জালালউদ্দিন ফাতেহ শাহ (শাসনকাল ১৪৮১-১৪৮৭) ছিলেন ইলিয়াস শাহি রাজবংশের শেষ সুলতান। তিনি সুলতান শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহের ভাই ছিলেন।

ফাতেহ শাহ কর্তৃক পরিচালিত কোনো সামরিক অভিযানের বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে মুদ্রা সংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে তার রাজ্য পূর্বে সিলেট ও দক্ষিণ পশ্চিমে দামোদর নদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।তার শাসনামলে হাবশিরা দরবারে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী অবস্থান লাভ করে। ফাতেহ শাহ নিয়ন্ত্রন পুনরায় লাভ করার প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয় ও পরবর্তীতে ১৪৮৭ সালে হাবশি প্রাসাদরক্ষীদের প্রধান তাকে হত্যা করে।তার মৃত্যুর মাধ্যমে ইলিয়াস শাহি বংশের শাসনের সমাপ্তি হয়।

হাবসি বংশ

  • বারবক শাহ (১৪৮৭)
  • সাইফুদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৪৮৭-১৪৯০)
  • দ্বিতীয় নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৯০)
  • শামসুদ্দীন মুজাফ্ফর শাহ (১৪৯০-১৪৯৩)

শাহজাদা বারবক বঙ্গে হাবশি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি জালালউদ্দিন ফাতেহ শাহ-এর রাজত্বে তাঁর প্রাসাদরক্ষী বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন।ইলিয়াস বংশের শাসক জালালউদ্দিন ফাতেহ শাহ-এর রাজত্বে ইথিওপীয়রা (হাবশি) রাজসভায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেন। জালালউদ্দিন তাঁর অধিকার পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হন। কিন্তু প্রাসাদরক্ষীদের সর্বাধিনায়ক বারবক তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। অনতিবিলম্বে জালালউদ্দিনকে হত্যা করা হয়। শাহজাদা বারবক ক্ষমতা দখল করেন এবং সুলতান শাহজাদা নাম নিয়ে ১৪৮৭ খ্রীষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। কিন্তু বারবকের রাজত্ব ছিল অতি ক্ষণস্থায়ী। অভিষেকের বছরেই সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহ নামক ইলিয়াস বংশের একজন ভূতপূর্ব সেনাপতি তাঁকে হত্যা করেন। সাইফউদ্দিন নিজেও জাতিগতভাবে হাবশি ছিলেন।

সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহ (শাসনকাল ১৪৮৭-১৪৮৯) ছিলেন বাংলার হাবশি রাজবংশের দ্বিতীয় সুলতান। তার মূল নাম মালিক ইনদিল। তিনি আবিসিনিয়দের বংশধর ছিলেন। ইলিয়াস শাহি রাজবংশের তিনি একজন সেনা অধিনায়ক ছিলেন।

১৪৮৭ সালে হাবশি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা শাহজাদা বারবাক নিহত হওয়ার পর সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহ ক্ষমতালাভ করেন।

দ্বিতীয় মাহমুদ শাহ (শাসনকাল ১৪৮৯-১৪৯০) ছিলেন বাংলার একজন সুলতান। তিনি শৈশবে সুলতান হন। হাবশ খান এসময় প্রকৃতপক্ষে শাসক ছিলেন।

শামসউদ্দিন মোজাফফর শাহ কর্তৃক তারা দুজনেই ১৪৯০ সালে নিহত হন।

শামসউদ্দিন মোজাফফর শাহ (শাসনকাল ১৪৯০-৯৪) ছিলেন বাংলার একজন হাবশি সুলতান। তার মূল নাম ছিল সিদি বদর। তিনি প্রথমে বালক সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ শাহের অভিভাবক হাবাশ খান ও পরে সুলতানকে হত্যা করেন। তিনি শামসউদ্দিন মোজাফফর শাহ উপাধি গ্রহণ করে ক্ষমতারোহণ করেন। ১৪৯৪ সালে তার উজির সাইদ হুসাইনের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন। উজির আলাউদ্দিন হোসেন শাহ নাম গ্রহণ করে ক্ষমতারোহণ করেন। ইন্দো-পারসিয়ান ইতিহাসবিদরা তাকে একজন অত্যাচারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন যার অত্যাচার অভিজাত ও সাধারণ প্রজাদের শত্রুভাবাপন্ন করে তুলেছিল।

হুসেন বংশ

  • আলাউদ্দিন হুসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯)
  • নাসিরুদ্দীন নুসরত শাহ (১৫১৯-১৫৩২)
  • দ্বিতীয় আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৫৩২-১৫৩৩)
  • গিয়াসুদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৫৩৩-১৫৩৮)

আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (শাসনকাল ১৪৯৪-১৫১৯) ছিলেন মধ্যযুগে বাংলার স্বাধীন সুলতান। তিনি হোসেন শাহি রাজবংশের পত্তন করেন। হাবশি সুলতান শামসউদ্দিন মোজাফফর শাহ নিহত হওয়ার পর তিনি বাংলার সুলতান হন। ইতিপূর্বে তিনি মোজাফফর শাহের উজির ছিলেন। ১৫১৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তার পুত্র নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ ক্ষমতালাভ করেন।হোসেন শাহের মূল নাম ছিল সাইদ হোসেন। ১৭৮৮ সালে লেখা রিয়াজুস সালাতিন অনুসারে তিনি তিরমিজের বাসিন্দা মক্কার শরিফ সাইদ আশরাফুল হোসাইনি আল ফাতিমি আল মাক্কির পুত্র ছিলেন। ইতিহাসবিদ গোলাম হোসেন সেলিম (রিয়াজুস সালাতিন এর লেখক) ও মুহাম্মদ কাসিম হিন্দু শাহ তাকে সাইদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যা তার আরব বংশোদ্ভূত হওয়ার চিহ্ন বহন করে। পাশাপাশি সুলতান হোসেন শাহ বিন সাইদ আশরাফুল হুসাইনি কথাটি তার মুদ্রায় উল্লেখিত হয়েছে।তবে তার বাংলায় আগমন ও সুলতান শামসউদ্দিন মোজাফফর শাহের উজিরের পদ লাভ করার ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যায় না। ধরা হয় যে তিনি প্রথমে মুর্শিদাবাদ জেলার চাঁদপারা গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। এর কারণ হোসেন শাহের প্রথম দিকের বেশ কিছু বিবরণ এই গ্রামের আশেপাশে পাওয়া যায় এবং ১৪৯৪ সালে হোসেন শাহ কর্তৃক নির্মিত খেরুর মসজিদ এখানে অবস্থিত।শেখের দীঘি নামক একটি জলাশয়ও তার সাথে সম্পর্কিত।

প্রথমদিকে তিনি গোপনে বিদ্রোহীদের প্রতি সমর্থন জানালেও পরবর্তীতে প্রকাশ্যে তাদের নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং দুর্গ অবরোধ করেন। এখানে সুলতান শামসউদ্দিন মোজাফফর শাহ কয়েক হাজার সৈনিক সমেত অবস্থান করছিলেন। ১৬ শতকের ইতিহাসবিদ নিজামউদ্দিন আহমেদের মতানুযায়ী, সুলতান গোপনে প্রাসাদ রক্ষীদের সাহায্যে হোসেন শাহ কর্তৃক নিহত হন। এর মাধ্যমে বাংলায় হাবশি শাসনের সমাপ্তি ঘটে।

হোসেন শাহ ২৫ বছর শাসন করেন। তার শাসনামলে শান্তি বজায় ছিল। হিন্দু প্রজাদের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গি তার আমলের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

ক্ষমতালাভ করার পর গৌড়ে লুটপাট থেকে ফিরে আসার আদেশ দেন। কিন্তু তারা তা অব্যাহত রাখলে তিনি বার হাজার সৈনিককে মৃত্যুদন্ড দেন এবং লুঠ হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার করেন। এর মধ্যে ১৩,০০০ স্বর্ণের প্লেট ছিল। এরপর তিনি প্রাসাদ রক্ষীদের দলকে বিলুপ্ত করেন। প্রাসাদের ভেতর এরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল। প্রশাসন থেকে তিনি হাবশিদের সরিয়ে দেন এবং তাদের স্থলে তুর্কি, আরব, আফগান ও স্থানীয় লোকদের নিয়োগ দেন।

জৌনপুরের সুলতান হোসেন শাহ শারকি বাহলুল খান লোদির কাছে পরাজিত হওয়ার পর বিহারে ফিরে আসেন। সেখানে অল্প এলাকায় তার কর্তৃত্ব বহাল ছিল। ১৪৯৪ সালে তিনি পুনরায় সিকান্দার লোদির কাছে পরাজিত হন এবং বাংলায় পালিয়ে যান। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ তাকে আশ্রয় প্রদান করেন।এর ফলে সুলতান সিকান্দার লোদি ১৪৯৫ সালে বাংলার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। দিল্লীর সেনাদের বিরুদ্ধে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ তার পুত্র দানিয়েলের অধীনে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। দুই বাহিনী পাটনার কাছে বড়হ নামক স্থানে মিলিত হয়। সিকান্দার লোদি তার সেনাদের অগ্রযাত্রা থামানোর নির্দেশ দেন এবং আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সাথে বন্ধুত্বের চুক্তি করেন। এই চুক্তি মোতাবেক বড়হের পশ্চিমাঞ্চল সিকান্দার লোদির অধীনে যাবে এবং পূর্বাঞ্চল আলাউদ্দিন হোসেন শাহের অধীনে থাকবে। জৌনপুর সালতানাতের চূড়ান্ত বিলুপ্তির ফলে এর সেনারা বাংলার সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং একে শক্তিশালী করে তোলে।

১৪৯৯ থেকে ১৫০২ সাল পর্যন্ত হোসেন শাহের সেনাপতি শাহ ইসমাইল গাজি কামাতা রাজ্য আক্রমণ করেন এবং হাজো পর্যন্ত এলাকা দখল করে নেন। কামতার রাজা নিলাম্বরকে বন্দী করা হয় ও রাজধানীর সম্পদ দখল করা হয়। মালদার একটি বিবরণীতে এটি লিপিবদ্ধ করা হয়।

মাদালা পাঞ্জির মতে শাহ ইসমাইল গাজি ১৫০৮-০৯ সালে মান্দারান দুর্গ (বর্তমান হুগলি জেলা) থেকে তার অভিযান শুরু করেন এবং পুরি পৌছান। পথে জজপুর ও কটক আক্রমণ করা হয়। উড়িষ্যার গজপতি শাসক প্রতাপরুদ্র দক্ষিণের অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন। এ সংবাদ পেয়ে তিনি ফিরে আসেন। তিনি বাংলার সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন ও বাংলার সীমান্ত পর্যন্ত তাদের পিছু নেন। তিনি মান্দারান দুর্গ পৌছান ও এটি অবরোধ করেন কিন্তু তা দখলে ব্যর্থ হন। হোসেন শাহের শাসনামল জুড়ে বাংলা ও উড়িষ্যার মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল।

রাজমালা নামক ত্রিপুরার রাজকীয় বিবরণী অনুযায়ী হোসেন শাহ চারবার ত্রিপুরায় সেনা প্রেরণ করেন। কিন্তু ত্রিপুরার সেনারা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং কোনো অঞ্চল তাদের হাতছাড়া হয়নি। কিন্তু খাওয়াস খানের সোনারগাঁ বিবরণী যা আধুনিক বেশ কিছু পন্ডিত ব্যবহার করেন, তা অনুযায়ী ত্রিপুরার একটি অংশ হোসেন শাহের সেনারা দখল করে নেয়।

ত্রিপুরায় হোসেন শাহের অভিযানের সময় আরাকানের শাসক ত্রিপুরার শাসককে সাহায্য করেন। তিনি চট্টগ্রামও দখল করেন ও হোসেন শাহের কর্মকর্তাদের সেখান থেকে বিতাড়িত করেন। ১৫১৩ সালে হোসেন শাহ পরাগল খানকে আরাকান আক্রমণের দায়িত্ব দেন। পরাগল খান ফেনী নদীতে তার কেন্দ্র থেকে অগ্রসর হন। পরাগল খানের মৃত্যুর পর তার পুত্র ছুটি খান অভিযানের দায়িত্ব নেন এবং আরাকানিদের কাছ থেকে চট্টগ্রামের দখল কেড়ে নেয়ার আগ পর্যন্ত তা পরিচালনা করেন। এই লড়াই ১৫১৬ সালের দিকে শেষ হয়।পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো ডা গামা ১৪৯৮ সালে সমুদ্রপথে ভারত আসেন। হোসেন শাহের রাজত্বের শেষের দিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য একটি পর্তুগিজ দল বাংলায় আসে।হোসেন শাহের শাসনামলে বাংলা সাহিত্য বেশ সমৃদ্ধি লাভ করে।হোসেন শাহের অধীন চট্টগ্রামের গভর্নর পরাগল খানের পৃষ্ঠপোষকতায় কবীন্দ্র পরমেশ্বর তার পান্ডববিজয় রচনা করেন। এটি মহাভারতের একটি বাংলা সংস্করণ। একইভাবে পরাগল খানের উত্তরাধিকারী হিসেবে চট্টগ্রামের গভর্নর হওয়া তার পুত্র ছুটি খানের পৃষ্ঠপোষকতায় শ্রীকর নন্দী মহাভারতের আরেকটি সংস্করণ বাংলায় রচনা করেন। কবীন্দ্র পরমেশ্বর তার পান্ডববিজয় গ্রন্থে হোসেন শাহকে কলি যুগের কৃষ্ণের অবতার হিসেবে প্রশংসা করেছেন।বিজয় গুপ্ত তার মনসামঙ্গল এসময় রচনা করেন। তিনি হোসেন শাহকে অর্জুনের সাথে তুলনা করেছেন।এতে হোসেন শাহকে নৃপতি-তিলক (তিলক অর্থ রাজার চিহ্ন) ও জগত-ভূষণ (বিশ্বের সৌন্দর্য) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হোসেন শাহের একজন কর্মকর্তা যশরাজ খান কিছু সংখ্যক বৈষ্ণব পদ রচনা করেন। তিনিও তার একটি পদে হোসেন শাহের সুনাম করেছেন।হোসেন শাহের আমলে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ইমারত গড়ে উঠে। ওয়ালি মুহাম্মদ গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদ নির্মাণ করেন।

হোসেন শাহের রাজত্বকাল হিন্দু প্রজাদের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত। তবে আর. সি. মজুমদার দাবিমতে উড়িষ্যা অভিযানের সময় তিনি কিছু হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেন।হোসেন শাহের রাজত্বকালে মধ্যযুগের সমাদৃত ধর্মগুরু চৈতন্য মহাপ্রভু ও তার অনুসারীরা ভক্তি প্রচার করেন।হোসেন শাহ তার ব্যাপারে জানতে পারলে কাজিকে নির্দেশ দেন যাতে তাকে কোনো প্রকার বাধা প্রদান করা না হয়।পরবর্তীতে তার প্রশাসনের দুজন উচ্চপর্যায়ের হিন্দু কর্মকর্তা ব্যক্তিগত সচিব (দবিরে খাস) রুপা গোস্বামী ও তার ঘনিষ্ট মন্ত্রী (সগির মালিক) সনাতন গোস্বামী চৈতন্য মহাপ্রভুর অনুসারী হন।

নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ (শাসনকাল ১৫১৯-১৫৩৩) ছিলেন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র।তিনি তার পিতার অনুসৃত নীতি বজায় রাখেন। শাসনের প্রথমদিকে নতুন অঞ্চল জয় করে সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করলেও ১৫২৬ সালের পর তাকে মোগলদের সাথে জড়িয়ে পড়তে হয়। অহোম রাজ্যের কারণেও তাকে কষ্টকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।

দ্বিতীয় আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ (শাসনকাল ১৫৩৩) ছিলেন সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহের পুত্র ও উত্তরাধিকারী। তার শাসনামলে আসামের সাথে সংঘর্ষ শুরু হয়। বাংলার সেনারা আসামে প্রবেশ করে ও কালিয়াবোর পৌছে যায়। ফিরোজ শাহের মৃত্যুর পরও যুদ্ধ চলতে থাকে। আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ তার পিতৃব্য গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ কর্তৃক নিহত হন।

গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ (শাসনকাল ১৫৩৩-১৫৩৮) ছিলেন হোসেন শাহি রাজবংশের সর্বশেষ সুলতান।১৪৯৪ সালে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। তাকে একজন “দুর্বল, বিলাসিতাপ্রবণ ও সহজসরল শাসক” হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই বর্ণনা অনুযায়ী তার কূটনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব ছিল এবং রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নিতেও তিনি ব্যর্থ ছিলেন। তার শাসনকালকে বিদ্রোহের কারণে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে তার সেনাপতি ও চট্টগ্রামের গভর্নর খোদা বখশ খান ও হাজিপুরের গভর্নর মাখদুম খানের বিদ্রোহ উল্লেখযোগ্য।

তার শাসনামলে ১৫৩৪ সালে পর্তুগিজরা চট্টগ্রাম আসে। অন্যায় আচরণের অভিযোগে তাদের বন্দী করে গৌড়ে পাঠানো হয়।কিন্তু সুলতান তাদের বিবেচনা করে চট্টগ্রামহুগলিতে কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেন। গিয়াসউদ্দিন ও তার পর্তুগিজ মিত্ররা ১৫৩৮ সালের ৬ এপ্রিল শের শাহ শুরির কাছে পরাজিত হন। মোগল সম্রাট হুমায়ুনের কাছে তার আবেদনের কোনো উত্তর দেয়া হয়নি।

সুরি সাম্রাজ্য

শুরি সাম্রাজ্য তৈরি হয় আফগানিস্তানের লোজজনের দ্বারা, যারা সংস্কৃতিতে পাস্তুন ছিলেন এবং তারা ১৫৪০ থেকে ১৫৫৫/১৫৫৬ পর্যন্ত ভারত শাসন করেছেন। ‘শুর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন বীর শের শাহ শুরি। তিনি ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে চাউসার যুদ্ধে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে যুদ্ধে পরাজিত করে এ শুরি সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। মুঘল সম্রাট তার শাসন পুনপ্রতিষ্ঠা করলে তাদের শাসনের পতন ঘটে।

শুরি সাম্রাজ্য তৈরি হয় আফগানিস্তানের লোজজনের দ্বারা, যারা সংস্কৃতিতে পাস্তুন ছিলেন এবং তারা ১৫৪০ থেকে ১৫৫৫/১৫৫৬ পর্যন্ত ভারত শাসন করেছেন।

‘শুর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন বীর শের শাহ শুরি। তিনি ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে চাউসার যুদ্ধে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে যুদ্ধে পরাজিত করে এ শুরি সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। মুঘল সম্রাট তার শাসন পুনপ্রতিষ্ঠা করলে তাদের শাসনের পতন ঘটে।

শুরি সাম্রাজ্যের শাসকগণ

শের শাহ সুরি (১৪৮৬ – ২২ মে, ১৫৪৫) ছিলেন মধ্যযুগীয় দিল্লির একজন শক্তিশালী আফগান (পাশতুন) বিজয়ী। একজন সাধারণ সেনাকর্মচারী হয়ে নিজের কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীকালে তিনি মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাবাহিনীর সেনানায়কের পদে উত্তীর্ণ হন। শেষপর্যন্ত তাঁকে বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয়। ১৫৩৭ সালে নতুন মুঘল সম্রাট হুমায়ুন যখন অন্যত্র অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন, সেই সময় শের শাহ সুরি বাংলা জয় করে সুরি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেকে নতুন সম্রাট ঘোষণা করেন।

শের শাহ সুরি কেবলমাত্র একজন মেধাবী রণকৌশলবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক ও যোগ্য সেনানায়ক। তাঁর সাম্রাজ্য পুনর্গঠনের মধ্যেই পরবর্তীকালের (বিশেষত হুমায়ুন-পুত্র আকবরের) মুঘল সাম্রাজ্যের মূলভিত্তিটি নিহিত ছিল।১৫৪০ থেকে ১৫৪৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তাঁর পাঁচ বছরের স্বল্পকালীন রাজত্বে তিনি নাগরিক ও সামরিক প্রশাসনের এক নতুন ধারার সূচনা ঘটিয়েছিলেন। তিনি প্রথম রুপিয়া নামক মুদ্রার প্রচলন করেন, যা বিংশ শতাব্দী অবধি চালু ছিল। তিনি মোহর নামে ১৬৯ গ্রেইন ওজনের স্বর্ণমুদ্রা ও দাম নামে তাম্রমুদ্রাও চালু করেন।তাছাড়া তিনি ডাক ব্যবস্থারও আমূল সংস্কার করেন। তিনি হুমায়ুনের দিনাপানাহ শহরের উন্নতি ঘটান এবং এর নতুন নামকরণ করেন শেরগড়। আবার খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকে পতনোন্মুখ পাটনা শহরেরও পুনরায় সংস্কার করেন তিনি। কথিত আছে, তিনি কোনো এক ভারতীয় জঙ্গলে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘকে সম্পূর্ণ খালি হাতে হত্যা করেছিলেন।

গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (সড়কআজম) শের শাহ সুরির অমর কীর্তি। বিগত চার শতাব্দী ধরে এই সড়ক “বিশ্বে অদ্বিতীয় এক জীবননদীর মতো” দাঁড়িয়ে রয়েছে। আজও ভারতপাকিস্তান রাষ্ট্রে এই সড়ক অন্যতম প্রধান রাস্তা। এর ভারতীয় অংশটি বর্তমানে স্বর্ণ চতুর্ভূজ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

১৫৪৫ সালে চান্দেল রাজপুতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় কালিঞ্জর দুর্গে বারুদের বিস্ফোরণে শের শাহ সুরির মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র জালাল খান ইসলাম শাহ সুরি নাম গ্রহণ করে সুরি সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। সাসারামে একটি কৃত্রিম হ্রদের মাঝখানে তাঁর ১২২ ফুট উঁচু নয়নাভিরাম সমাধিসৌধটি আজও বিদ্যমান।তাঁর মৃত্যুর পর হুমায়ুনের নেতৃত্বে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। আকবরের রাজত্বকালে ১৫৮০ সালে আব্বাস খান সারওয়ানি নামে মুঘল সম্রাটের এক ওয়াকিয়ানবিশ তারিখশের শাহি নামক গ্রন্থে শের শাহ সুরির রাজত্বকালের বিস্তারিত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন।

ইসলাম শাহ শুরি শুর সম্রাজ্যের দ্বিতীয় শাসক। ইসলাম শাহ শুরির আসল নাম ছিল জালাল খান এবং তিনি শের শাহ শুরির পুত্র ছিলেন। ইসলাম শাহ শুরি সাত বছর (১৫৪৫ – ১৫৫৩) শাসন করেছেন। তাঁর বার বছরের পুত্র ফিরোজ শাহ শুরি তাঁর উত্তরসূরী হন, কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই শের শাহের ভাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ মুবারিজ খান তাকে গুপ্তহত্যা করে। মুহাম্মদ মুবারিজ খান মুহাম্মদ শাহ আদিল নামে শাসন করেছেন।

ফরোজ শাহ শুরি (১৫৪০১৫৫৩) শুর সম্রাজ্যের তৃতীয় শাসক ছিলেন। তিনি ইসলাম শাহ শুরির পুত্র এবং শের শাহ শুরির দৌহিত্র ছিলেন। তিনি মাত্র বার বছর বয়সে ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে রাজ্যের শাসক ভার গ্রহণ করেন। কিছু দিনের মধ্যেই শের শাহ শুরির ভাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ মুবারিজ খান (যিনি পরবর্তীতে মুহাম্মদ শাহ আদিল নামে রাজ্য শাসক করেন) দ্বারা গুপ্তহত্যার স্বীকার হন।

মুহাম্মদ শাহ আদিল শুর সম্রাজ্যের চতুর্থ শাসক ছিলেন। মুহাম্মদ শাহ আদিলের আসল নাম হল মুহাম্মদ মুবারিজ খান এবং তিনি শের শাহ শুরির ভাতুষ্পুত্র ছিলেন। ১৫৫৩ খিস্টাব্দে ফিরোজ শাহ শুরিকে গুপ্তহত্যা করে তিনি শুর সম্রাজ্যের শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। ফিরোজ শাহ শুরি শের শাহ শুরির দৌহিত্র ছিলেন, যার বয়স ছিল মাত্র বার বছর। তার উত্তরাধিকারী হিসেবে ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে রাজ্যের ভার গ্রহণ করেন ইব্রাহিম শাহ শুরি

ইব্রাহিম শাহ শুরি শুর সম্রাজ্যের পঞ্চম শাসক। তার উত্তরাধিকার ছিলেন আহমেদ খান যিনি পরবর্তীতে ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে সিকান্দার শাহ শুরি নামে শাসন কার্য পরিচালনা করেছেন।

 

সেকান্দার শাহ শুরি শুর সম্রাজ্যের ষষ্ঠ শাসক ছিলেন। সিকান্দার শাহ শুরির আসল নাম ছিলো আহমেদ খান১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ুন তাকে পরাজিত করে পুনরায় মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি উত্তর পাঞ্জাবের সিওয়ালিক পর্বতে পালিয়ে যান। সিকান্দার শাহ শুরি এবং তার ভাই আদিল শাহ শুরি মুঘল সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এবং পরাজিত হয়েছিলেন।

আদিল শাহ শুরি শুর সম্রাজ্যের সপ্তম শাসক। তিনি সিকান্দার শাহ শুরির ভাই ছিলেন, ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ুনের কাছে সিকান্দার শাহ শুরি পরাজিত হলে যিনি দিল্লীর পূর্বাঞ্চল শাসন করছেন। তিনি এবং সেকান্দার শাহ শুরি দিল্লীর সিংহাসনে বসার জন্য মুঘল সম্রাট আকবরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। আদিল শাহের রাজ্বতের কিছু দিনের মধ্যেই, তিনি আবার বঙ্গের শাসক মুহাম্মদ শাহের সঙ্গে কঠর দ্বন্দ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পরেন। নভেম্বর ৫, ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে বিক্রম খানের নেতৃত্বে আকবরের মুঘল সেনারা পানিপাতের দ্বিতীয় যুদ্ধে দিল্লী থেকে ৫০ মাইল উত্তরে সংখ্যায় বিশাল হেমুর শক্তিশালী বাহিনীকে পরাজিত করে, হেমু চোখে ঘটনাচক্রে তীর বিদ্ধ হলে, তাকে অচেতন অবস্থায় আকবরের কাছে নিয়ে আসা হয় এবং পরে তার শিরচ্ছেদ করা হয়।

সুরি সাম্রাজ্যের অধীন বাংলার গভর্নর (১৫৩২-১৫৫৫)

নাম শাসনকাল নোট
শের শাহ ১৫৩২–১৫৩৮ ১৫৪০ সালে মোগলদের পরাজিত করে দিল্লীর শাসক হন।
খিজির খান ১৫৩৮–১৫৪১
কাজি ফাজিলাত ১৫৪১–১৫৪৫
মুহাম্মদ খান শুর ১৫৪৫–১৫৫৪
শাহবাজ খান ১৫৫৫

মুহাম্মদ শাহ রাজবংশ (১৫৫৪-১৫৬৪)

নাম শাসনকাল নোট
মুহাম্মদ খান শুর ১৫৫৪–১৫৫৫ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং শামসউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ নাম ধারণ করেন।
খিজির খান শুরি ১৫৫৫–১৫৬১
গিয়াসউদ্দিন জালাল শাহ ১৫৬১–১৫৬৪
তৃতীয় গিয়াসউদ্দিন শাহ ১৫৬৪

খিজির খান (শাসনকাল ১৫৩৯-১৫৪১) ছিলেন বাংলার শাসক। শের শাহ শুরি দিল্লীর সম্রাট হওয়ার পর ১৫৩৯ সালে তিনি বাংলার গভর্নর হন। খিজির খান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের কন্যাকে বিয়ে করেন।১৫৪১ সালে তিনি দিল্লীর কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

শের শাহ শুরি তাকে সরিয়ে কাজি ফাজিলাতকে তদস্থলে নিয়োগ দেন।

কাজি ফাজিলাত (শাসনকাল ১৫৪১-১৫৪৫) ছিলেন বাংলার গভর্নর। শের শাহ শুরি দিল্লীর সম্রাট থাকাবস্থায় তাকে নিয়োগ দেন।

মুহাম্মদ খান শুর (শামসউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ নামেও পরিচিত, শাসনকাল ১৫৪৫-১৫৫৫) ছিলেন দিল্লীর সুলতান ইসলাম শাহ সুরির অধীন বাংলার গভর্নর। কিন্তু ১৫৫৪ সালে সুলতানের মৃত্যুর পর তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং শামসউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ নামধারণ করেন। মুহাম্মদ খান শুর আরাকান জয় করেন। উত্তর ভারতে ক্ষমতার জন্য তিনি প্রচেষ্টা চালান। ১৫৫৫ সালে ইসলাম শাহের উত্তরসুরি আদিল শাহের সাথে যুদ্ধ জড়িয়ে পড়েন।এই যুদ্ধে তিনি আদিল শাহের সেনাপতি হিমু কর্তৃক পরাজিত হন ও নিহত হন।

এরপর আদিল শাহ শাহবাজ খানকে বাংলার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন।

শাহবাজ খান কামবোহ (১৫২৯-১১ নভেম্বর ১৫৯৯) ছিলেন মোগল সম্রাট আকবরের অন্যতম বিশ্বস্ত সেনাপতি। তিনি আকবরের বেশ কয়েকটি দুর্গম অভিযানে অংশ নেন এবং অনেক এলাকা সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। আকবরের পছন্দের তুলনায় তিনি একজন অধিক রক্ষণশীল সুন্নি মুসলিম ছিলেন। তবে প্রতি সহিষ্ণুতা দেখানো হয় এবং যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়।

তৃতীয় গিয়াসউদ্দিন শাহ (শাসনকাল ১৫৬৩-১৫৬৪) ছিলেন বাংলার মুহাম্মদ শাহি রাজবংশের শেষ সুলতান। ১৫৬২ সালের শুরুতে আফগান কররানি রাজবংশ বাংলার বড় এলাকা জয় করে নেয়। ১৫৬৪ নাগাদ তৃতীয় গিয়াসউদ্দিন শাহ তাজ খান কররানি কর্তৃক নিহত হন। ফলে মুহাম্মদ শাহি রাজবংশের সমাপ্তি ঘটে। এরপর কররানি রাজবংশের সূচনা হয়।

কররানি বংশ

  • তাজ খান কররানি (১৫৬৩)
  • সুলায়মান কররানি (১৫৬৩-১৫৭২)
  • বায়াজিদ কররানি (১৫৭২-১৫৭৩)
  • দাউদ খান কররানি (১৫৭৩-১৫৭৬)

কররানী রাজবংশ সুলতান তাজ খান কররানী কর্তৃক ১৫৬৪ সালে স্থাপিত হয়। কররানীরা আফগান বংশোদ্ভূত ছিলেন। এটি বাংলা সালতানাতের শেষ রাজবংশ।

তাজ খান পূর্বে আফগান সম্রাট শের শাহ শুরির একজন কর্মচারী ছিলেন। ১৫৬২ থেকে ১৫৬৪ সাল পর্যন্ত তাজ খান দক্ষিণ পূর্ব বিহার ও পশ্চিম বাংলা দখল করেন। বাংলার তৎকালীন সুলতানের হত্যার পর তিনি বাংলার ক্ষমতা লাভ করে। সোনারগাঁওয়ে তার রাজধানী ছিল। তাজ খানের পর সুলায়মান খান কররানী সুলতান হন। ১৫৬৫ সালে তিনি রাজধানী গৌড় থেকে তান্ডায় নিয়ে আসেন। সুলায়মান খান উড়িষ্যাকে স্থায়ীভাবে কররানী শাসনের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি মোগল সম্রাট আকবরের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেন। তার প্রধানমন্ত্রী লোদি খান মোগলদের উপহার সামগ্রী প্রদান করেন।কুচ বিহার থেকে পুরীসোন নদী থেকে ব্রহ্মপুত্র নদী পর্যন্ত সুলায়মান খানের কর্তৃত্ব ছিল।

১৫৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মোগল সেনাপতি মুনিম খান কররানীদের রাজধানী তান্ডা জয় করেন। ১৫৭৫ সালের ৩ মার্চ তুকারয়ের যুদ্ধের পর শেষ কররানী সুলতান দাউদ খান কররানী উড়িষ্যার দিকে সরে যান। যুদ্ধের পর কটকের সন্ধি নামের সন্ধি হয়। এর ফলে দাউদ খানকে বাংলা ও বিহার হারাতে হয় ও শুধুমাত্র উড়িষ্যা তার হাতে রয়ে যায়। ১৫৭৫ সালের অক্টোবরে মুনিম খান ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করলে সন্ধি ভেঙে যায়। দাউদ খান সুযোগ গ্রহণ করে বাংলা আক্রমণ করেন এবং আকবরের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৫৭৬ সালের ১২ জুলাই রাজমহলের যুদ্ধে কররানীরা পরাজিত হয়। এতে প্রথম খান জাহান মোগলদের সেনাপতি ছিলেন। দাউদ খানকে হত্যা করা হয়। তবে বারো ভূইয়া বলে পরিচিত আফগান ও স্থানীয় জমিদাররা ঈসা খানের নেতৃত্বে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখে। পরবর্তীতে ১৬১২ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় বাংলা চূড়ান্তভাবে মোগল প্রদেশে পরিণত হয়।

তাজ খান কররানী (শাসনকাল ১৫৬৪-১৫৬৬) ছিলেন বাংলা, উড়িষ্যা ও বিহারের অংশবিশেষ শাসনকারী আফগান বংশোদ্ভূত কররানী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা।

তাজ খান পূর্বে আফগান সম্রাট শের শাহ শুরির অধীনস্ত কর্মচারী ছিলেন। তিনি দক্ষিণ পূর্ব বিহার ও পশ্চিম বাংলার বড় এলাকা দখল করেন। তিনি বাংলার তৎকালীন সুলতানকে হত্যা করেন ও বাংলার নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন।তাজ খানের ছোট ভাই সুলায়মান খান কররানী তার উত্তরসুরি হন।

সুলায়মান খান কররানী (শাসনকাল ১৫৬৬-১৫৭২) ছিলেন বাংলার সুলতান। তার বড় ভাই তাজ খান কররানীর মৃত্যুর পর তিনি সুলতান হন। রিয়াজুস সালাতিন অনুযায়ী তিনি গৌড় থেকে তান্ডায় রাজধানী সরিয়ে আনেন। সুলায়মান খান, তার ভাই তাজ খান কররানী ও সুলায়মান খানের দুই পুত্র বায়েজিদ খান কররানীদাউদ খান কররানী মোগলদের অনুগত একটী স্বল্পস্থায়ী রাজ্য শাসন করেন। আকবরের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনপূর্বক সুলায়মান খান অত্র এলাকায় কর্তৃত্ব স্থাপন করেন। আফগানরা আকবরের কাছে পরাজিত হওয়ার তার পতাকার অধীনে অবস্থান করে।

সুলায়মান খান তার শাসনামলে নিজ নামে মুদ্রা চালু করেননি। এই কাজের মাধ্যমে মোগলদের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হত।মসজিদে আকবরের নামে জুমার খুতবা পাঠের মাধ্যমে তিনি আকবরকে বাংলার সর্বোচ্চ শাসক হিসেবে মেনে নেন। ইতিহাসবিদরা এই ঘটনাকে বাংলা ও মোগল সাম্রাজ্যের মধ্যকার কূটনৈতিক শান্তি স্থাপন হিসেবে দেখেন।

উত্তর ভারত ও দক্ষিণ ভারতের অংশবিশেষ মুসলিম শাসকদের অধীনে ছিল। তবে উড়িষ্যা তখনও মুসলিম শাসনের অধীনে আসেনি। ১৫৬৮ সালে সুলায়মান খান তার পুত্র বায়েজিদ খান কররানী ও তার বিখ্যাত সেনাপতি কালাপাহাড়কে উড়িষ্যা আক্রমণের জন্য পাঠান। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের পর উড়িষ্যা সুলায়মান খানের আওতায় আসে। কালাপাহাড় জগন্নাথ মন্দির আক্রমণ করেন ও পুরীর নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন। সুলায়মান কররানী লোদি খান ও কুতলু খানকে যথাক্রমে উড়িষ্যা ও পুরীর গভর্নর নিয়োগ করেন।

সুলায়মান খান কররানী এরপর তার সেনাপতি কালাপাহাড়কে কামতা (পরবর্তীতে মোগলদের অধীনে কুচ বিহার) প্রেরণ করেন। কালাপাহাড় ব্রহ্মপুত্র নদী অতিক্রম করেন এবং তেজপুর (বর্তমান দিনাজপুর জেলা) পর্যন্ত পৌছান। কালাপাহাড় কামতার সেনাপতি শুক্লধজকে পরাজিত ও বন্দী করেন।

সুলায়মান কররানী ৭ বছর শাসন করার পর ১৫৭২ সালের ১১ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। তার পুত্র বায়েজিদ খান কররানী এরপর সুলতান হন।সুলায়মান খান কররানী একজন ধার্মিক মুসলিম ছিলেন। পুরনো মালদার সোনা মসজিদ তিনি নির্মাণ করেন।

ইতিহাসবিদ আবদুল কাদির বাদাউনি উল্লেখ করেছেন যে সুলায়মান খান প্রতিদিন সকালে ১৫০ জন আলেমের সাথে ধর্মীয় আলাপ করতেন। এরপরই তিনি অন্যান্য বৈষয়িক বিষয়ে মনোনিবেশ করতেন।

বায়েজিদ খান কররানী (শাসনকাল ১৫৭২) ছিলেন কররানী রাজবংশের তৃতীয় শাসক। তার পিতা সুলায়মান খান কররানীর মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতালাভ করেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি মোগলদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।তিনি কয়েকমাস পর্যন্ত শাসন করেন। এরপর তার আত্মীয় হানসু তাকে হত্যা করেন। পরবর্তীতে সুলায়মান খানের বিশ্বস্ত অভিজাতরা হানসুর আধিপত্য খর্ব করেন। বায়েজিদ খানের ছোট ভাই দাউদ খান কররানী এরপর ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

দাউদ খান কররানী (শাসনকাল ১৫৭২-১২ জুলাই ১৫৭৬) ছিলেন সুলায়মান খান কররানীর কনিষ্ঠ পুত্র। পিতার রাজত্বকালে তিনি ৪০,০০০ অশ্বারোহী, ৩,৬০০ হাতি, ১১,৪০,০০০ পদাতিক ও ২০,০০০ কামানের এক বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি বর্তমান ভারতের দক্ষিণপশ্চিম অঞ্চল আক্রমণ করেন।

দাউদ খান বাংলা সালতানাত নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি শের শাহ শুরির মত হতে ইচ্ছুক ছিলেন এবং সমগ্র ভারত উপমহাদেশ জয়ের স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু সম্রাট আকবরের সাথে তার শত্রুতা সৃষ্টি হয়।

সম্রাট আকবর গুজরাটে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকার সময় দাউদ খান গাজীপুরের কাছে জামানিয়া আক্রমণ করেন। আফগান সেনারা জামানিয়া দখল করে এর দুর্গ অধিকার করে নেয়। আকবর তার জৌনপুরের গভর্নর মুনিম খানকে দাউদ খানের বিরুদ্ধে অগ্রসর হতে নির্দেশ দেন। মুনিম খান তার বন্ধু দাউদ খানের প্রধানমন্ত্রী লোদি খানের সাথে পাটনায় সাক্ষাত করেন এবং শান্তি স্থাপনে সম্মত হন। তবে এই সিদ্ধান্ত আকবর বা দাউদ খান কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি। পরবর্তীতে দাউদ খান লোদি খানকে শাস্তি দেন।

১৫৭৩ সালে মুনিম খান বিহার আক্রমণ করেন। ফলে দাউদ খান পিছু হটতে বাধ্য হন। তিনি পাটনায় আশ্রয় নেন। দাউদ খান কাতলু লোহানি, গুজার খান কররানী ও শ্রী হরিকে মোগলদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। মুনিম খান টোডরমলমানসিংকে নিয়ে হাজিপুর আক্রমন করেন। ব্যাপক সংঘর্ষের পর আফগানরা বিজয়ী হয়। আকবর এরপর হাজিপুরের দুর্গ দখল করে নেন। এটি আফগানদের রসদ সরবরাহের উৎস ছিল। আফগানরা এর ফলে প্রতিকূল অবস্থায় পড়ে এবং বাংলায় পিছু হটে। আকবর মুনিম খানকে বাংলা ও বিহারের গভর্নর নিয়োগ দিয়ে ফিরে যান। তাকে সাহায্য করার জন্য টোডরমলকে রেখে যাওয়া হয়।

১৫৭৫ সালের ৩ মার্চ মোগল ও আফগানদের মধ্যে তুকারয়ের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের পর আফগানরা উড়িষ্যার কটকের দিকে পিছু হটে। মোগলরা তৎকালীন বাংলার আফগান রাজধানী তান্ডা দখল করে নেয়। মুনিম খান তান্ডা থেকে গৌড়ে রাজধানী সরিয়ে নেন। কটকের সন্ধিতে দাউদ খান বাংলা ও বিহারকে মোগলদের কাছে ছেড়ে দেন এবং নিজে উড়িষ্যায় রয়ে যান। ছয় মাস পর প্লেগ ছড়িয়ে পড়লে মুনিম খান অক্টোবরে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর কালাপাহাড় ও ঈসা খান মোগল বিরুদ্ধে লড়াই করেন। দাউদ খান গৌড় পুনরায় অধিকারের জন্য উড়িষ্যা থেকে ফিরে আসেন।

আকবর এরপর খান জাহান কুলির অধীনে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। তিনি তেলিয়াগড়হি দখল করে রাজমহলের দিকে অগ্রসর হন। দুই বাহিনী রাজমহলের যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি হয়। যুদ্ধ অনেক দিন ধরে চলতে থাকে। বিহারের গভর্নর মোজাফফর খান তুরবাতি ও অন্যান্য সেনাপতিদের আকবর তাদের সাথে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেন। অন্যদিকে দাউদ খানের পাশে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আফগান নেতা, জুনায়েদ, কুতলু খান ও কালাপাহাড় ছিলেন।ভয়াবহ যুদ্ধের পর ১৫৭৬ সালের ১২ জুলাই ভয়াবহ যুদ্ধের পর দাউদ খান চূড়ান্তভাবে পরাজিত ও নিহত হন। তার মৃত্যুর পর বাংলা সরাসরি মোগলদের অধীনে চলে আসে। এরপর থেকে বাংলা সুবা একজন সুবেদারের অধীনে শাসিত হতে থাকে।

বারো ভুঁইয়া

বারো ভুঁইয়া, মোগল সম্রাট আকবর-এর আমলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল শাসনকারী কতিপয় জমিদার বা ভূস্বামী, বারো জন এমন শাসক ছিলেন, যাঁদেরকে বোঝানো হতো ‘বারো ভূঁইয়া’ বলে। বাংলায় পাঠান কর্‌রানী বংশের রাজত্ব দূর্বল হয়ে পড়লে বাংলাদেশের সোনারগাঁও, খুলনা, বরিশাল প্রভৃতি অঞ্চলে কিছু সংখ্যক জমিদার স্বাধীন রাজার মতো রাজত্ব করতে থাকেন। সম্রাট আকবর ১৫৭৫ সালে বাংলা দখল করার পর এসকল জমিদার ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোগল সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ‘বারো ভুঁইয়া’ নামে পরিচিত এই সকল জমিদাররা হলেন:

  1. ঈসা খাঁ – খিজিরপুর বা কত্রাভূ,
  2. প্রতাপাদিত্য – যশোর বা চ্যাণ্ডিকান,
  3. চাঁদ রায়, কেদার রায় – শ্রীপুর বা বিক্রমপুর,
  4. কন্দর্প রায় ও রামচন্দ্ররায় – বাক‌্লা বা চন্দ্রদ্বীপ,
  5. লক্ষ্মণমাণিক্য – ভুলুয়া,
  6. মুকুন্দরাম রায় ভূষণা বা ফতেহাবাদ,
  7. ফজল গাজী – ভাওয়াল ও চাঁদপ্রতাপ,
  8. হামীর মল্ল বা বীর হাম্বীর – বিষ্ণুপুর,
  9. কংসনারায়ন – তাহিরপুর,

সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) তাঁর জীবদ্দশায় সমগ্র বাংলার উপর মুঘল অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হননি।কারণ বাংলার বড় বড় জমিদারেরা স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে মুঘলদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।তাঁরা বারভূঁইয়া নামে পরিচিত।এখানে ‘বারো’ বলতে অনির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝায়।

ঈসা খাঁ—বারভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন।মুঘল সেনাপতি মানসিংহ জীবনে দুব্যক্তিকে পরাজিত করতে পারেননি-চিতরের রানা প্রতাপ সিং ও ঈসা খাঁ।১৫৩৭ সালে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার সরাইল পরগণায় ঈসা খাঁর জন্ম।তাঁর পিতা কালিদাস গজদানী ভাগ্যান্বেষণে অযোধ্যা থেকে গৌড়ে এসে স্বীয় প্রতিভা গুণে রাজস্বমন্ত্রী পদে উন্নীত হন।পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তাঁর নাম হয় সুলাইমান খাঁ।তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৫৩৩-৩৮) মেয়েকে বিয়ে করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সরাইল পরগণা ও পূর্ব মোমেনশাহী অঞ্চলের জায়গীরদারী লাভ করেন।১৫৪৫ সালে শের শাহের পুত্র ইসলাম শাহ দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করার পর সুলাইমান খাঁ দিল্লীর আনুগত্য অস্বীকার করলে কৌশলে তাঁকে হত্যা করে তাঁর দুই নাবালক পুত্র ঈসা খাঁ এবং ইসমাইল খাঁকে একদল তুরানী বণিকের নিকট বিক্রি করা হয়।১৫৬৩ সালে ঈসা খাঁর চাচা কুতুব খাঁ রাজকার্যে নিযুক্তি লাভ করে বহু অনুসন্ধানের পর সুদূর তুরান দেশের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে ২ ভ্রাতুস্পুত্রকে উদ্ধার করেন।এ সময় ঈসা খাঁর বয়স মাত্র ২৭ বছর।সুলতান তাজ খাঁ কররানী (১৫৬৪-৬৫) সিংহাসনে আরোহণ করে ঈসা খাঁকে তাঁর পিতার জায়গীরদারী ফেরত দেন।বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খাঁ কররানীর রাজত্বকালে (১৫৭২-৭৬) ঈসা খাঁ বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করেন অসাধারণ বীরত্বের জন্যে।

১৫৭৫ সালের অক্টোবর মাসে বাংলার সুবাদার মুনিম খাঁর মৃত্যু হলে আফগান নেতা দাউদ খাঁ কররানী স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজ নামে বাংলা ও বিহারে খুতবা পাঠ করান।স্বাধীন ভূঁইয়ারাও তাঁকে অনুসরণ করে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন।

এরপর অনেক বীরত্বগাথাঁ রচিত হয়।সর্বশেষ ১৫৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বিক্রমপুর হতে ১২ মাইল দূরে ঈসা খাঁ,মাসুম খাঁ কাবুলীর সম্মিলিত বাহিনী দুর্জন সিংহকে (মানসিংহের ছেলে) বাধা দিলে দুর্জন সিংহ বহু মুঘল সৈন্যসহ নিহত হন।অনেকে বন্দী হন।কিন্তু সুচতুর ঈসা খাঁ মুঘলদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা উচিত বলে মনে করে আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে নেন।তিনি বন্দীদের মুক্তি দেন এবং মানসিংহের সাথে আগ্রায় গিয়ে সম্রাট আকবরের সাথে সাক্ষাত করেন।সম্রাট এ বীর পুরুষকে দেওয়ান ও মসনদ-ই-আলা উপাধিতে ভূষিত করেন।১৫৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর মৃত্যু হয়।

মাসুম খাঁ কাবুলীঃ তিনি প্রথমে সম্রাট আকবরের সেনাপতি ও বাংলার শাসনকার্যে নিয়োজিত ছিলেন।আকবরের “দ্বীন-ই-এলাহী” প্রবর্তন করলে মুঘল কর্মকর্তারা বাংলায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।মাসুম খাঁ ছিলেন বিদ্রোহীদের অন্যতন নেতা।জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি মুঘল বিরোধীতা অক্ষুণ্ন রাখেন।১৫৯৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

মুসা খাঁ—- ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খাঁ সম্রাট জাহাংগীরের আমলে (১৬০৫-২৭) ভূঁইয়াদের মধ্যে সর্বাপাক্ষা শক্তিশালী ছিলেন।তিনি মুঘল আনগত্য অস্বীকার করে তাদের বিরুদ্ধে আজীবন যুদ্ধ করেন।বৃহত্তর ঢাকা,কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ জেলার অধিকাংশ স্থান নিয়ে তাঁর রাজত্ব গঠিত হয়েছিল।সোনারগাঁ ছিল তাঁর রাজধানী।১৬১১ সালের এপ্রিল মাসে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে সোনারগাঁয়ের পতন ঘটে।মুসা খাঁ মুঘলদের আনুগত্য স্বীকার করেন।

ফজল গাজী তিনি শেরশাহ এবং সম্রাট আকবরের সমসাময়িক।বীরত্বের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন।মুঘলদের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করেন।

বাহাদুর গাজীঃ তিনি তাঁর বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে মুসা খাঁকে যথেষ্ট সাহায্য করেন।মুসা খাঁ পরাজিত হলে বাহাদুর গাজী মুঘলদের পক্ষে যোগদান করে যশোর ও কামরূপ অভিযানে অংশ নেন।

খাজাউসমান খাঁ লোহানী তিনি কখনো মুঘলদের আনুগত্য স্বীকার করেননি এবং প্রাণ বিসর্জন দেন।তিনি ২ হাজার অশ্বারোহী, ৫ হাজার পদাতিক ও ৪০ টি হস্তীর এক বাহিনী নিয়ে মুঘলবাহিনীর গতিরোধ করতে উষার ত্যাগ করেন।শেরে ময়দান,খাজা ইব্রাহীম এবং খাজা দাউদ প্রমুখ আফগান নেতৃবৃন্দ স্ব স্ব সৈন্যবাহিনী নিয়ে উসমান বাহিনীকে শক্তিশালী করে তোলেন।৪৪-পরগনার দৌলম্ভপুর গ্রামে তারা সমবেত হন।সেখান থেকে মাত্র দেড়মাইল দূরে ছিল মুঘলবাহিনীর শিবির।১৬১২ সালের ১২ মার্চ, রোববার ভোরবেলা মুঘলবাহিনী প্রথম আক্রমণ পরিচালনা করে।ক্রমেই উভয়পক্ষের আক্রমণ তীব্র হয়ে উঠে।দুপুরবেলা মুঘল সৈনিক আব্দুল জলীল শেখের নিক্ষিপ্ত তীরের আঘাতে খাজা উসমান নিহত হন।

বায়েজিদ কররানীঃ সম্রাট জাহাংগীরের আমলে তিনি সিলেটে রাজা ছিলেন।বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আফগান সর্দার তার বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন।খাজা উসমা্নের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল।খাজা উসমা্নের পতন সংবাদে বায়েজিদ আত্মসমর্পণ করেন।বায়েজি্দের পতনে মুঘলদের বিরুদ্ধে আজাদী আন্দোলনের শেষ স্ফুলিংগ নিভে যায় এবং গোটা বাংলা দিল্লী সাম্রাজ্যের অধীনে আসে।

মুঘল সাম্রাজ্য

মুঘল সাম্রাজ্য ভারত উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত ছিল; অঞ্চলটি সেসময় হিন্দুস্তান বা হিন্দ নামে পরিচিত ছিল। এছাড়া আফগানিস্তানবেলুচিস্তানের বেশ কিছু এলাকাও মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলো। মুঘল সাম্রাজ্য ১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, ১৭০৭ সাল পর্যন্ত এর সীমানা বিস্তার করে এবং ১৮৫৭ সালের এর পতন ঘটে। চেঙ্গিস খানতৈমুর লঙের উত্তরসূরী জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর ১৫২৬ সালে দিল্লীর লোদী বংশীয় সর্বশেষ সুলতান ইবরাহিম লোদীকে প্রথম পানিপথের যুদ্ধে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বশেষ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের প্রাক্কালে ইংরেজদের হাতে পরাজিত হয়ে তৎকালীন বার্মারেঙ্গুনে নির্বাসনে চলে যান। সেখানেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। তবে মূলত মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরেই মুঘল সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয় এবং ভারত উপমহাদেশে ইংরেজদের প্রভাব প্রতিপত্তি বেড়ে যায়।

বাবরের ভারত আক্রমণ

ফরগণা নামে এক মধ্য এশিয় সামন্ত রাজ্যের তৈমুর বংশীয় রাজা ওমর শেখ মিরজার ছেলে বাবর মধ্য এশিয়া থেকে রাজ্যচ্যুত হয়ে কাবুল আক্রমণ করেন। এই সময় তিনি ভারত আক্রমণের পরিকল্পণা করেন। ১৫২৬ সালে পাণিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে নিহত করে মুঘল সাম্রাজ্যের সুচনা করেন। এই যুদ্ধেই ভারতে প্রথম কামান ব্যবহার হয়েছিল।১৫২৭ এই যুদ্ধে বাবর রাজপুত রাজা সংগ্রাম সিংহকে পরাজিত করেন।

বিহারের এক জায়গীরদারের ছেলে ফরিদ খান শেরশাহ নাম ধারণ করে বাবরপুত্র হুমায়ুনকে বিল্বগ্রাম ও চৌসার যুদ্ধে পরাজিত করলে হুমায়ুন পারস্যে রাজা তামাস্পের আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। শেরশাহের শাসন ব্যবস্থা ভবিষ্যতে আকবরের শাসনব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে।পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে শেরশাহের উত্তরাধিকারী আদিল শাহের সেনাপতি হিমু হুমায়ুনপুত্র আকবর ও তাঁর সেনাপতি বৈরাম খানের সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হোন। এরপর আকবরের শাসনকালে মুঘল সাম্রায্য উত্তর ও মধ্যভারতে বিস্তৃত হয়। ১৫৬০ সালে বৈরাম খানকে সরিয়ে আকবর নিজে সকল ক্ষমতা দখল করেণ। আকবর রাজপুতদের সাথে মিত্রতানীতি নেন। মান সিংহকে সেনাপতিত্বে বরণ করেন। কিন্তু মেবারের শাসক প্রতাপসিংহকে মিত্র করতে সফল হন নি।এই যুদ্ধে মুঘল পক্ষীয় সেনাপতি মান সিংহ মেবারের রাণা প্রতাপ সিংহকে পরাজিত করেন।এই যুদ্ধে দাউদ খান কররাণী পরাজিত হলে বাংলায় মুঘল শাসন শক্তিশালী হয়। যদিও পরে বারো ভুঁইয়া নামে পরিচিত জমিদারেরা বিদ্রোহ করেন। আকবরের পুত্র ছিলেন জাহাঙ্গীরশাহজাহান তখ্তে এসে সমস্ত উত্তরাধিকারীর দাবীদারদের হত্যা করেন। তার সকল ভাইদের তিনি হত্যা করেন এবং শাহজাহানের শাসনকালে তাজমহল তৈরি হয়। ভালবাসার এক অনবদ্য নিদর্শনরূপে তাজমহল বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত।শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর ছেলেরা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। দারা, সুজা ও মুরাদকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন আওরঙ্গজেব। তিনি মারাঠা, ইংরেজ, শিখ ও অন্যান্য মুঘল্বিরোধীদের দমন করার সাময়িক চেষ্টা করেন। কিন্তু স্থায়ীভাবে সফল হননি।এসময় মারাঠা নেতা শিবাজী সক্রিয় হয়ে ওঠেন যা মুঘল সাম্রায্যকে বিপন্ন করে। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুতে আবার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এরপর যোগ্য উত্তরসুরীর অভাব ভারতকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়ফারুখশিয়ার নামে মুঘল সম্রাট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে ফরমান দেন।মুঘল সম্রাটদের অযোগ্যতা অনেক আমলাদের সক্রিয় করে তোলে এদের মধ্যে সৈয়দ ভাতৃদ্বয় উল্লেখ্য।মহম্মদ শাহ সৈয়দ ভাতৃদ্বয়দের দমন করলেও তিনি অতি নিষ্ক্রিয় ছিলেন। পারস্য সম্রাট নাদির শাহ এসময় ভারত আক্রমণ করেন। দিল্লি শ্মশানে পরিণত হয়।মারাঠা সাম্রাজ্যের এসময় চরম উন্নতি হয়। কিন্তু আফগান নেতা আহমেদ শাহ আব্দালির হাতে পাণিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠা প্রভাব বিনস্ট হয়। দিল্লি আবার লুন্ঠিত হয়। এই যুদ্ধে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম অযোধ্যার নবাব সুজা উদ দোউলা ও বাংলার নবাব মীর কাশীমের সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বিরোধীতা করেন কিন্তু নাকাম হন। তিনি ইংরেজদের দেওয়ানী দিতে বাধ্য হন। এরপর মুঘল সম্রাট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আশ্রিত হয়ে থাকেন। এই সময় মুঘল সাম্রাজ্য লালকেল্লায় সীমাবদ্ধ ছিল।১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ অবদমিত হলে যোগদান কারী মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে রেংগুণে পাঠানো হয়। এভাবে মুঘল সাম্রাজ্য শেষ হয়।মুঘল আমলে দক্ষিণ এশীয়, মধ্য এশীয় ও পশ্চিম এশীয় সংস্কৃতির মিলন হয়।মুঘল সম্রাটরাই প্রথম ভারতে ব্যাপকভাবে কামান, বারুদ ও বন্দুক ব্যবহার করেন।মুঘল আমলে ধাতুবিদ্যা বিষয়ে উন্নতি হয়। আলি কাশ্মীরি নামে এক কারিগর বিশেষ ধরণের গোলক তৈরি করা আবিষ্কার করেন।শের শাহের মুদ্রা ব্যবস্থাকে উন্নত করা হয়।মুঘল বিচারব্যবস্থার প্রয়োগ আজও ভারতে অনেকাংশে অনুসরণ করা হয়।

চেঙ্গিজ খান  (১১৬২আগস্ট ১৮, ১২২৭) প্রধান মঙ্গোল রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা বা মহান খান, ইতিহাসেও তিনি অন্যতম বিখ্যাত সেনাধ্যক্ষ ও সেনাপতি। জন্মসূত্রে তার নাম ছিল তেমুজিন । তিনি মঙ্গোল গোষ্ঠীগুলোকে একত্রিত করে মঙ্গোল সম্রাজ্যের ( ১২০৬ – ১৩৬৮) গোড়াপত্তন করেন। নিকট ইতিহাসে এটিই ছিল পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সম্রাজ্য। তিনি মঙ্গোলিয়ার বোরজিগিন বংশে জন্ম নিয়েছিলেন। এক সাধারণ গোত্রপতি থেকে নিজ নেতৃত্বগুণে বিশাল সেনাবাহিনী তৈরি করেন।যদিও বিশ্বের কিছু অঞ্চলে চেঙ্গিজ খান অতি নির্মম ও রক্তপিপাসু বিজেতা হিসেবে চিহ্নিত তথাপি মঙ্গোলিয়ায় তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে সম্মানিত ও সকলের ভালোবাসার পাত্র। তাকে মঙ্গোল জাতির পিতা বলা হয়ে থাকে। একজন খান হিসেবে অধিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে চেঙ্গিজ পূর্বকেন্দ্রীয় এশিয়ার অনেকগুলো যাযাবর জাতিগোষ্ঠীকে একটি সাধারণ সামাজিক পরিচয়ের অধীনে একত্রিত করেন। এই সামাজিক পরিচয়টি ছিল মঙ্গোল

১১৫০ থেকে ১১৬০ সনের মধ্যে কোন এক সময়ে চেঙ্গিজ খান জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকাল কাটান ঘোড়া চালনা শিখে। মাত্র ছয় বছর বয়সে নিজ গোত্রের সাথে শিকার অভিযানে যোগ দেয়ার অনুমতি পান। নয় বছর বয়সে তার বাবাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয় এবং তাদের পুরো পরিবারকে ঘরছাড়া করা হয়। মা’র কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষায় তিনি পরিবারের কর্তার ভূমিকা পালন শুরু করেন। অন্যকে রক্ষা করার বিদ্যা তখনই তার রপ্ত হয় যা পরবর্তীতে কাজে লেগেছিল।

৪০- ৫০ বছর বয়সের সময় তিনি মঙ্গোল জাতির পত্তন ঘটানোর পর বিশ্বজয়ে বের হন। প্রথমেই জিন রাজবংশকে পরাজিত করেন। চীন থেকেই তিনি যুদ্ধবিদ্যা কূটনীতির মৌলিক কিছু শিক্ষা লাভ করেন। পালাক্রমে দখল করেন পশ্চিম জিয়া, উত্তর চীনের জিন রাজবংশ, পারস্যের খোয়ারিজমীয় সম্রাজ্য এবং ইউরেশিয়ার কিছু অংশ। মঙ্গোল সাম্রাজ্য অধিকৃত স্থানগুলো হল আধুনিক: গণচীন, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, আজারবাইজান, আরমেনিয়া, জর্জিয়া, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, কাজাখস্তান, কিরগিজিস্তান, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, মলদোভা, দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং কুয়েত। চেঙ্গিজ খান ১২২৭ সালে মারা যাওয়ার পর তার পুত্র ও পৌত্রগণ প্রায় ১৫০ বছর ধরে মঙ্গোল সম্রাজ্যে রাজত্ব করেছিল।

তৈমুর বিন তারাগাই বারলাস  (১৩৩৬ – ফেব্রুয়ারি, ১৪০৫) ১৪শ শতকের একজন তুর্কীমোঙ্গল সেনাধ্যক্ষ।  তিনি পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিজ দখলে এনে তিমুরীয় সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন যা ১৩৭০ থেকে ১৪০৫ সাল পর্যন্ত নেতৃত্বে আসীন ছিল। এছাড়াও তাঁর কারণেই তিমুরীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই বংশ কোন না কোনভাবে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে নেতৃত্বে আসীন ছিল। তিনি তিমুরে ল্যাংগ্  নামেও পরিচিত যার অর্থ খোঁড়া তৈমুর। বাল্যকালে একটি ভেড়া চুরি করতে গিয়ে তিনি আহত হন যার ফলে তাঁর একটি পা অকেজো হয়ে যায়। তাঁর সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল আধুনিক তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত, ইরান থেকে মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ অংশ যার মধ্যে রয়েছে কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজিস্তান, পাকিস্তান, ভারত এমনকি চীনের কাশগর পর্যন্ত। তিনি একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করিয়ে যান যার নাম তুজুক ই তৈমুরী

জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর সাধারণত বাবর নামেই বেশি পরিচিত (ফেব্রুয়ারি ১৪, ১৪৮৩ডিসেম্বর ২৬, ১৫৩০) মধ্য এশিয়ার মুসলমান সম্রাট ছিলেন। তিনি ভারত উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট। তিনি তৈমুর লঙ্গ-এর সরাসরি বংশধর ছিলেন এবং তিনি নিজে বিশ্বাস করতেন তিনি মাতার পক্ষ থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন। তিনি পানিপথের প্রথম যুদ্ধে দিল্লীর লোদী বংশীয় সুলতান ইব্রাহিম লোদী কে পরাজিত করে এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।. তার মৃত্যুর পর তার পুত্র হুমায়ুন সিংহাসনে আরোহণ করেন। সে তার উত্তরসূরীরাতে উইল দিয়ে দেনেছিল, অ-মুসলমান,এর জন্য সহনশীলের একটি উত্তরাধিকার যে এর সুবিন্দুতে মোঘল সাম্রাজ্যের অক্ষর পরবর্তী কালে বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করবে। জহির উদ্দিন মোহাম্মদ জন্মেছিলেন ১৪৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারিফারগানা প্রদেশের আনদিজান শহরে। ফারগানা বর্তমানে উজবেকিস্তান নামে পরিচিত। তিনি ফারগানা প্রদেশের শাসনকর্তা ওমর মি্জার বড় পুত্র ছিলেন। তার স্ত্রী কুতলুক নিগার আনাম ইউনূস খান এর কন্যা ছিলেন। মঙ্গলদের থেকে উদ্ধুত বারলাস উপজাতিতে বেড়ে উঠলেও বাবরের জাতিতে তুর্কি  ও পারস্য সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ছিল। এই অঞ্চলগুলো পরবর্তীতে ইসলামিক জাতিতে পরিণত হয় এবং তুরকএস্থান এবং খোরাসান নামে পরিচিত লাভ করে। বাবরের মাতৃভাষা ছিল চাঘাতাই যা তার কাছে তুর্কি ভাষা নামে পরিচিত ছিল। এছাড়া তিমুরীয় বিত্তবানদের প্রধান ভাষা পার্সিও তার দখল ছিল। তিনি চাঘাতাই ভাষাতে তার আত্মজীবনী “বাবরনামা” লিখেছেন, যার ভাষা, বাক্য গঠন, শব্দ মূলত পারস্য ভাষার অনুসারী।

আন্দিজানির সকলে তুর্কি ছিলেন, শহর ও বাজারের সকলেই তুর্কি নামে পরিচিত। সাহিত্যের ভাষা মানুষের কথ্য ভাষাকেই প্রতিফলিত করেছিল, যেমন মীর আলি শের নাওয়াই এর লেখা, যদিও তিনি হিন (হেরাত) এ জন্মলাভ করেন ও বেড়ে ওঠেন, তবে তা এগুলোরই একটি উপভাষা। সুন্দর চেহারা তাদের মাঝে খুবই নিয়মিত ছিল। বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী খাজা ইউসূফ ছিলেন একজন আনদিজানি

বাবর একজন মঙ্গলীয় (অথবা ফার্সীতে মুঘল) হয়েও মধ্য এশিয়ার তুর্কি এবং ইরানীদের কাছ থেকে ব্যাপক সহযোগিতা লাভ করেছিলেন এবং তার সৈন্যবাহিনীতে পার্সি (তুর্কি অথবা সার্ট জাতি, বাবর যে নামে ডাকতেন),পাঠান,আরবীয় মানুষ ছিলেন।এছাড়াও তার সৈন্যবাহিনীতে কুইজিলবাস যোদ্ধারা ও অন্তর্ভুক্ত করেছিল, পার্সিয়া থেকে শিয়াসুফির মত একটি উগ্রপন্থী ধর্মীয় ধারা বর্তমান ছিল যা পরবর্তী কালে মোঘল কোর্টে সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী হয়েছিল।

কথিত আছে বাবর শক্ত সমর্থ এবং শারীরিক ভাবে সুস্থ ছিলেন। তিনি কেবল ব্যায়ামের জন্য দু’কাঁধে দু’জনকে নিয়ে ঢাল বেয়ে দৌড়ে নামতেন। কিংবদন্তী আছে, বাবর তার সামনে পড়া সবগুলো নদী সাঁতরে পাড় হতেন এবং উত্তর ভারতের গঙ্গা নদী দু’বার সাঁতার দিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন।

বাবরের দৃঢ স্পৃহা ছিল। তার প্রথম স্ত্রী সালতান বেগমের কাছে তিনি কিছুটা লাজুক ছিলেন, পরে তার উপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আত্মজীবনীতে তিনি কিশোর বয়সের কামনা বাবুরী নামক এক বালকের কথা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখে করেন।

বাবর একজন গোঁড়া সুন্নি মুসলিম ছিল। সে তার শিয়া মুসলিমদের অপছন্দ করাকে কখনও কখনও ব্যক্ত করেছিল ” তাদের বিচ্যুতি ” বলে ।যদিও ধর্ম বাবরের জীবনের এক প্রধান স্থান ছিল এবং তার সহযোগী রাজারা ইসলামকে হালকা ভাবে গ্রহণ করেছিল। বাবর তার সমকালীন এক কবির কবিতার একটি লাইন প্রায় উদ্ধৃত করতেন:” আমি মাতাল, আধিকারিক।আমাকে শাস্তি দিন যখন আমি সংযমি। ” বাবরের সহযোগী রাজারা মদ পান করতেন এবং প্রাচুর্য্য পূর্ণ ভাবে জীবন যাপন করতেন, তারা বাজারের ছেলের সঙ্গে প্রেমে পড়েছিল এবং তারা হিংস্র এবং নির্মম ছিলেন।বাবরের এক কাকার মতে “অধর্ম এবং পাপকার্জে সে আসক্ত হয়েছিল। সে সমকামিতেও আসক্ত হয়ে পড়েছিল। তার এলাকাতে, যখনই শান্ত কোনো যুবক তার সামনে এসেছে, তাকে পাবার জন্য সে সবকিছু সে করেছিল। তার সময় এই ধরনের সমকামিতা প্রচলিত ছিল এবং সেটা একটি গুণহিসাবে বিবেচনা করা হোতো। । ” সে তার মৃত্যূর দুই বছর আগে সুরাপান ত্যাগ করেছিলেন এবং তিনি তার রাজসভায় সকলকে একই কাজ করার দাবী করেছিলেন। কিন্তু সে নিজে আফিং এর নেশা ছাড়তে পারেননি।এবং তার কি বোধ হারানি। বাবর লিখেছিলেন: ” সবাই সুরাপান পছন্দ করে ,পান করার জন্য শপথ নেয়,আমি শপথ নিয়েছিলাম এবং অনুতাপ করেছিলাম। ”

তুর্ক-মোঙ্গলীয় ও পার্শি সংস্কৃতি

ট্রানসোক্সিয়ান এবং খোরাসান‘এ তুর্ক-মোঙ্গলীয় এবং পার্শি জনগণ পাশাপাশি বসবাস করতেন। এই বিভক্ত সমাজটি নৃতাত্বিক ভাবে সামরিক এবং বেসামরিক দিকে সরকার এবং নিয়মের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছিল। তুর্ক-মোঙ্গলীয়রা ছিল মূলত সামরিক গোষ্ঠী এবং ফার্সিরা মূলত বিভিন্ন বেসামরিক কাজে যুক্ত ছিল। তুর্ক-মোঙ্গলীয়দের মধ্যে কথ্য ভাষারূপে চাঘতাই ভাষা প্রচলিত ছিল। মধ্য এশিয়ার তৃণপ্রধান বৃক্ষহীন প্রান্তরে চেঙ্গিস খানের পৃষ্ঠপোষকতায় এরা এক রাজনৈতিক সংগঠনে পরিনত হয়েছিল।. এদের প্রধান ভাষা ফার্সি ছিল, তাজিক ভাষা এদের মাতৃভাষা ছিল(ফার্সি)। সমস্ত শিক্ষিত এবং শহুরে মানুষের ভাষাও ছিল ফার্সি। তৈমুর লঙ্গের সরকারী রাজভাষাও ফার্সিই ছিল এবং তার প্রশাসন, ইতিহাস,কবিতা ,সংস্কৃতি এই ভাষার মাধ্যমেই প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু তৈমুর লঙ্গের পরিবার বাড়িতে চাঘাতাই ভাষায় কথা বলতো। সেই সময় আরবি ভাষা বিজ্ঞান, দর্শনবিদ্যা, ধর্মতত্ত্ব এবং ধর্মীয় বিজ্ঞানের ভাষা হিসাবে যথেষ্ট ঔৎকর্ষ্য অর্জন করেছিল।

জহির উদ্দিন মোহাম্মদ তার ডাকনাম বাবর নামেই পরিচিত ছিলেন। বাবর নামটি লোমশ জন্তু বিভার তথা উদবিড়ালের নামের ইন্দো ইউরোপীয় সংস্করণ । তার নিকটাত্মীয় মির্জা মোহাম্মদ হায়দার লিখেছেন,

“চাঘাতাই এর আমল (মঙ্গল সম্প্রদায় চেঙ্গিস খানের দ্বিতীয় পুত্র চাঘাতাই খানের থেকে উদ্ধুত) ছিল নিষ্ঠুর এবং কুরূচিপূর্ণ এবং বর্তমান সময়ের মত শিক্ষিত ছিল না। তারা দেখল এ নামটা উচ্চারণ করা কঠিন, সেজন্য তাকে বাবর নাম দিয়েছে।”

১৪৯৪ সালে মাত্র বার বছর বয়সে বাবর প্রথম ক্ষমতা লাভ করেন, তিনি ফরগানার সিংহাসনে আরোহণ করেন যা বর্তমানে উজবেকিস্তান নামে পরিচিত। তার চাচা অনবরত তাকে সিংহাসন চ্যুত করার চেষ্টা করেছিলেন এবং তার অন্যন্য শত্রুও ছিল। একসময় সে বাবরকে ক্ষমতাচ্যূত করতে সফল হয়। ফলে জীবনের বেশকিছু সময় তাকে আশ্রয়হীন এবং যাযাবর থাকতে হয়। এসময় তার সাথে শুধুমাত্র তার বন্ধু ও চাষীদের যোগাযোগ ছিল। ১৪৯৭ সালে বাবর সমরকন্দের উজবেক শহরে আক্রমণ চালান এবং ৭ মাস পরে শহর দখল করতে সমর্থ হন। ইতিমধ্যে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দূরের ফরগানায় কিছু নোবেলদের বিদ্রোহের কারণে তাকে স্থানটি হারাতে হয়। ফরগানা পূনরুদ্ধারের জন্য অগ্রসর হলে তার বাহিনীর লোকজন তাকে ফেলে চলে যায়, ফলে তাকে সমরকন্দ ও ফরগানা উভয়কেই হারাতে হয়।

১৫০১ সালে বাবর আবার সমরকন্দের দখল নিতে প্রস্তুতি নেন, তবে আবারো তার পরাক্রমশালী প্রতিপক্ষ মোহাম্মদ শেবানী খান এর কাছে পরাজিত হন। তিনি তার কিছু অনুসারী নিয়ে পালিয়ে আসতে সমর্থ হন। পরবর্তীতে বাবর একটি শক্তিশালী দল গঠনে মনযোগী হন এবং প্রধানত তাজিকবাদাক্‌শানদেরকে তার দলে অন্তর্ভূক্ত করেন। ১৫০৪ সালে তুষার সমৃদ্ধ অঞ্চল হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করেন এবং কাবুল দখল করেন। এর ফলে তিনি একটি নতুন ধনী রাজ্য লাভ করেন এবং নিজের ভাগ্য পূণর্প্রতিষ্ঠিত করেন এবং বাদশাহ উপাধি গ্রহণ করেন। ১৫০৬ সালে হুসাইন বায়কারাহ এর মৃত্যু তার অভিযানকে বিলম্বিত করে। বাবর তার মিত্রপক্ষের শহর হেরাতে দু’মাসের জন্য অবস্থান করে সম্পদের অভাবে এলাকা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এর মধ্যেও তিনি এই রাজ্যকে প্রাচূর্য্যমণ্ডিত করেছেন। হেরাতের শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায়ের আধিক্য তাকে চমত্‌কৃত করে। তিনি অহিগুরের কবি মীর আলি শির নাভাই এর সাথে পরিচিত হন। নাভাই তার সাহিত্যে চাঘাতাই ভাষার ব্যবহার করতেন, তিনি বাবরকে তার আত্মজীবনী লিখতে উত্‌সাহিত করেন।

ঘনিয়ে আসা একটি বিদ্রোহ তাকে হেরাত থেকে কাবুল আসতে বাধ্য করে। তিনি এই পরিস্থিতি সামলে ওঠেন, তবে দুই বছর পর একটি বিপ্লব সংঘটিত হবার পর তার কিছু শীর্ষস্থানীয় নেতা তাকে কাবুল থেকে তাড়িয়ে দেন। বাবর কিছু সঙ্গী সহ শহর থেকে পালিয়ে গেলেও পুনরায় শহরে ফিরে এসে কাবুল দখল করেন। বিদ্রোহীদের তিনি তার অধীনে নিয়ে আসেন। এদিকে ১৫১০ সালে মোহাম্মদ শেবানী পার্সিয়ার শাসনকর্তা ইসমাঈল সাকাভিদ এর কাছে নিহত হন। বাবুর এই সুযোগে তার পূর্বপুরুষের রাজ্য তিমুরিদ পুনঃরুদ্ধার করতে চেষ্টা করেন। কয়েক বছর বাবর ইসমাঈল এর সাথে মধ্য এশিয়া দখলের জন্য মিলিত হন। বাবর সাকাভিদকে তার রাজ্যে সার্বভৌম রাজা হিসেবে চলার অনুমতি দেন। শাহ ইসমাঈল বাবর ও তার বোন খানজাদার মধ্যে পুনর্নিলন ঘটান। খানজাদাকে শেবানী বন্দী করে জোরপূর্বক বিয়ে করেছিল। ইসমাঈল বাবরকে অনেক ধনসম্পদ এবং রসদ সরবরাহ করেছিলেন এবং প্রতিদানে বাবর তাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছিলেন।

এদিকে শাহ এর পারস্য শিয়া মুসলিমদের একটি অভেদ্য দূর্গে পরিণত হয় এবং তিনি নিজেকে ৭ম শিয়া ঈমাম ঈমান মূসা আল কাজিমের বংশধর হিসেবে দাবি করতেন। তথন তার নামে মূদ্রা চালূ করা হয় এবং মসজিদে খুত্‌বা পড়ার সময়ে তার নাম নিয়ে পড়া হত। এই যুক্তিতে বাবর পারস্যের মিত্ররাজ্যের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন পার্সিয়ার শাহ্‌কে তাড়ানোর জন্য, যদিও কাবুলেও বাবরের নামে মূদ্রা ও খুতবা প্রচলিত ছিল।

পরে বাবর বুখার দিকে রওনা হন এবং সেখানে তার বাহিনীকে স্বাধীনতার সৈনিক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। তিইমুরিদ হিসেবে এক্ষত্রে তার খুব সমর্থন ছিল। শহর ও গ্রামের লোকজন তাকে ও তার বাহিনীকে সাহায্য করতে গিয়ে সর্বস্ব উজাড় করে দিত। বাবর পার্সিয়ার সহযোগিতা ফিরিয়ে দেন তাদের প্রয়োজন মনে না করার আত্মবিশ্বাসে। ১৫১১ সালের অক্টোবর মাসে প্রায় ১০ বছর পরে বাবর সমরকন্দে আবার প্রবেশ করতে সমর্থ হন। বাজার স্বর্ণবেষ্টিত হয়ে গিয়েছিল এবং আবারো জনগণ তাদের মুক্তিদাতাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। বাবর শিয়া পোষাক পরে সুন্নীদের সামনে দাঁড়ান এবং পরিস্থিতি সামাল দেন। তার কাজিন হায়দার লিখেছেন, বাবর একটু ভীত ছিলেন পার্সিয়ার সাহায্য প্রত্যাখ্যান করে। পার্সিয়ার শাহকে খুশী রাখার জন্য বাবর সুন্নী সম্প্রদায়কে কোন লাঞ্ছনা করেননি এবং শাহ্‌ এর সহযোগিতার আনুষ্ঠানিক হাতটিও সরিয়ে দেননি। এর ফলে ৮ মাস পরে তিনি উজবেক পুনরায় জয় করতে সমর্থ হন।

নিজের অতীতের কথা লিখতে গিয়ে বাবর বলেছেন, সমরকন্দ পূনরুদ্ধার ছিল আল্লাহ্‌র দেয়া সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার। এরপর বাবরের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ফরগানা দখল করা। এদিকে পশ্চিম দিক থেকে উজবেকদের আক্রমণের ভয়ও ছিল। ফলে তাকে ভারত ও এর পূর্ব দিকে মনোনিবেশ করতে হয়, বিশেষ করে আইয়ুদিয়ার রাজ্য এবং পেনিনসুলার মালায়া। বাবর নিজেকে সৈয়দ বংশের সত্যিকারের শাসনকর্তা হিসেবে দাবি করেন। একইভাবে নিজেকে তিমুরের মুকুটের দাবিদার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তিমুর প্রকৃতপক্ষে খিজর খানের ছিল, তিনি এটিকে মিত্ররাজ্য পাঞ্জার হাতে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন। পরে তিনি দিল্লী সালতানাতের সুলতান হয়েছেন। সৈয়দ বংশ পরে আফগানের শাসনকর্তা ইব্রাহীর লোদীর কাছে বেদখল হয়ে যায়। বাবর এটিকে পুণরুদ্ধার করতে চান। তিনি পাঞ্জাব আক্রমণ করার আগে ইব্রাহীম লোদীকে একটি অনুরোধ করেন, “আমি তাকে একটি গোসাওক পাঠিয়েছি এবং তার কাছে সে সব দেশের অধিকার চেয়েছি যেগুলো প্রাচীনকাল থেকেই তুর্কিদের উপর নির্ভরশীল।“

ইব্রাহীম বাবরের প্রস্তাব গ্রহণ করেন নি এবং খুব তাড়াতাড়ি তাকে আক্রমণের পরিকল্পনাও করেননি। তাই বাবর এর মধ্যে কিছু পূর্ব প্রস্তুতি সেরে নেন আক্রমণের জন্য এবং কান্দাহার বন্ধ করে দেন। তিনি কাবুলের পশ্চিম দিক থেকে আক্রমণ চালানোর একটি রণকৌশল ঠিক করেন ভারত দখলের জন্য। কান্দাহার বন্ধ করে দেবার ফলে আক্রমণ ধারণাকৃত সময়ের অনেক পরে সংঘটিত হয়। প্রায় তিন বছর পর কান্দাহার ও এর পৌরদূর্গ বেদখল হয়েছিল এবং এছাড়াও অন্যান্য ছোটখাট যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই খণ্ডযুদ্ধগুলো বাবরকে সফল হবার সুযোগ করে দেয়।

পাঞ্জাবে প্রবেশের সময় বাবরের রাজদূত লঙ্গর খান নিয়াজী বাবরকে পরামর্শ দেন জানজুয়ার রাজপুত্রকে এই অভিযানে সম্পৃক্ত করার জন্য, তাদের এই দিল্লী জয়ের অভিযান বেশ পরিচিত লাভ করে। বাবর তার প্রধান ব্যক্তি মালিক আসাদ এবং রাজা সংঘর খান এর কাছে তার রাজ্যে ঐতিহ্যগত শাসনের সুফল এবং তার পূর্বপুরুষের সহযোগিতার কথা তাদের কাছে উল্লেখ করেন। বাবর শত্রুদের পরাজিত করে তাদের নিজের দলে ভিড়ান। ১৫২১ সালে গাখারসে তার মিত্রদের একত্রিত করেন। বাবর তাদের প্রত্যেককে সেনাপ্রধান হসান রানা সঙ্গকে পরাজিত করেন, এটিও তার ভারত দখলের অন্তর্ভূক্ত।

১৫০৮ সাল থেকে ১৫১৯ সালের সময়টুকু বাবরের স্মৃতিকথায় ছিল না। এই সময় ইসমাঈল আই একটা দুঃসময় কাটান, তার বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী নিশ্চিহ্ন হয় অটোম্যান রাজার বিরুদ্ধে চালদিরান যুদ্ধে। সেখানে ম্যাচলক মাস্কেট নামক এক ধরণের নতুন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। বাবর এবং ইসমাঈল দু’জনেই প্রযুক্তির উন্নয়ন উপলব্ধি করেন এবং বাবর তার বাহিনীকে ম্যাচলক যন্ত্রের প্রশিক্ষণ দিতে একজন অটোম্যান উস্তাদ আলীকে তার বাহিনীতে আমন্ত্রণ জানান। ওউস্তাদ আলী তখন ম্যাচলক মানব নামে পরিচিত ছিলেন। বাবর মনে রেখেছিলেন যে, তার বিরোধীরা তার বাহিনীকে এই ধরণের কোন অস্ত্র আগে দেখেনি বলে বিদ্রুপ করত। এ যন্ত্রগুলো থেকে বিকট শব্দ হত এবং কোন তীর বা বর্ষা নিক্ষিপ্ত হত না।

এই অস্ত্রগুলো স্বল্পসংখ্যক সৈন্যের হাতে দেয়া হয় শত্রুদের উপর কর্তৃত্ব করার জনয। ভারতের পথে অগ্রসর হবার সময় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগুলোর সাথে খণ্ড যুদ্ধের সময় এটি ব্যবহার করা হয় শুধুমাত্র শত্রুদের অবস্থান এবং কোশল পরীক্ষা করার জন্য। কান্দাহার ও কাবুলের দুটি শক্ত প্রতিরোধ থেকে রক্ষা পাওয়া বাবর কোন অঞ্চল জয়ের পর স্থানীয়দের খুশী করার চেষ্টা করতেন। এজন্য স্থানীয় সংস্কৃতি পালনের পাশাপাশি বিধবা ও এতিমদের সাহায্য করা হত।

ইব্রাহীম লোদীর সাথে যুদ্ধ

ইব্রাহীম লোদী অনেকের অপ্রিয় ছিলেন, এমনকি তার নিজস্ব নোবেলদের কাছেও। বাবর ১২০০০ সৈন্য যোগাড় করেন এবং লোদীর আফগান নোবেলদেরকে তার শামিল হবার আমন্ত্রণ জানান। এই সৈন্যসংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল কেননা তারা অগ্রসর হবার সময় স্থানীয় অনেকেই তাদের সাথে যোগ দিচ্ছিল। দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম বড় সংঘর্ষ হয় ১৫২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। বাবরের পুত্র হূমায়ুন ১৭ বছর বয়সে তিমুরিদ বাহিনীকে নেতৃত্ব দেন ইব্রাহীমের উন্নত বাহিনীর বিপরীতে। হূমায়ুনের বিজয় অর্জন ছিল অন্যন্য খণ্ডযুদ্ধের চেয়ে বেশ কঠিন। তবে তারপরও এটি একটি চূড়ান্ত বিজয় ছিল। যুদ্ধের পর আটটি হাতি সহ প্রায় শতাধিক যুদ্ধবন্দীকে আটক করা হয়। তারপর অন্যান্য যুদ্ধের বন্দীদের মত এই বন্দীদের পরে আর মুক্ত করা হয়নি। হুমায়ূনের আদেশ অনুসারে তাদের হত্যা করা হয়। বাবরের স্মৃতিকথায় আছে, “উস্তাদ আলীকুলি খান এবং ম্যাচলকমানবদেরকে সকল বন্দীদের গুলি করার আদেশ দেয়া হয়েছিল। হূমায়ুনের প্রথম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল এটি যা একটি চমত্‌কার পূর্বাভাস।“ এটিই ছিল খুব সম্ভবত ফায়ারিং স্কোয়াডের প্রথম উদাহরণ।

ইব্রাহীম লোদী প্রায় এক লক্ষ সৈন্য এবং ১০০টি হাতি সহ বাবরের দিকে অগ্রসর হন। তখন বাবরের সৈন্যসংখ্যা লোদীর অর্ধেকেরও কম ছিল, যা সর্বসাকুল্যে প্রায় ২৫০০০ এর মত। ১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিলে সংঘটিত এই যুদ্ধটি পানিপথের প্রথম যুদ্ধ নামে খ্যাত এবং বাবর ও লোদীর মধ্যে প্রধান সংঘাত। যুদ্ধে ইব্রাহীম লোদী নিহত হন এবং তার বাহিনীকে পরাজিত করে তাড়িয়ে দেয়া হয়। বাবর দ্রুত দিল্লী এবং আগ্রা উভয়ের দখল নেন। ঐদিনই বাবর হুয়ায়ূনকে আগ্রা যাবার আদেশ দেন জাতীয় ধনসম্পদ লুটপাটের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। হুমায়ূন সেখানে রাজা গোয়ালিয়রের পরিবারকে পান। রাজা যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন এবং তার পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা লাভের আশায় হুমায়ূনকে একটি বড় হীরা দেন। এই হীরাটিকে বলা হত “কোহিনূর” বা আলোর পর্বত।“ ধারণা করা হয়, এটি তারা তাদের রাজ্য পূণরুদ্ধারের জন্য করে। এই পরিবারটিই গোয়ালিয়রের শাসনকর্তা ছিল, তবে তার পিছনে উপহারটির গুরুত্বের কথা জানা যায় না।

বাবর বিজয়ের তৃতীয় দিন দিল্লী পৌছেন। তিনি তার উপস্থিতি উদযাপিত করেন যমুনা নদীর তীরে এবং সেখানে শুক্রবার পর্যন্ত উত্‌সব স্থায়ী করা হয়। পরে মুসলমানেরা শোকরানা নামায আদায় করেন এবং এবং জামা মসজিদে তার নামে তিনি খুতবা শোনেন। পরে তিনি আগ্রার দিকে অগ্রসর হন ছেলের সাথে সাক্ষাতের জন্য। বাবরকে সেই পাথরটি দিয়ে গ্রহণ করে নেয়া হয়। বাবর বলেছিলেন, আমি তাকে এটি ফিরিয়ে দিলাম এবং একজন বিশেষজ্ঞ অলঙ্কারবিদ বললেন যে, এর মূল্য দিয়ে পৃথিবীর সকল লোককে আড়াই দিন খাওয়ানো যাবে। পরবর্তী দুইশ বছর এটি বাবর হীরা নামে পরিচিত ছিল।

রাজপুতদের সাথে যুদ্ধ

দিল্লী ও আগ্রা দখলের পরও বাবর মেওয়ারের রাজপুত রাজ রানা সাংগার দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাতে লাগলেন। বাবরের অভিযানের আগে রাজপুতের জমিদারেরা সালতানাতের কিছু জাতি জয় করতে সমর্থ হয়েছিল। তারা বাবরের নতুন রাজ্যের দক্ষিণ পশ্চিমের একটি অঞ্চল সরাসরি শাসন করত যা রাজপতনা নামে পরিচিত ছিল। এটি কোন একতাবদ্ধ রাজ্য ছিল না, বরং এটি ছিল রানা সিংগার অধীন কিছু রাজ্যের সংগঠন। বাবরের লেখনীতে, রানা সাংগা একটি বাহিনী গঠন করে।… দশজন ক্ষমতাবান প্রধান, প্রত্যেকে পাগান হোস্টের নেতা, তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তবে তারা আলাদা থেকে যায় একজন উশৃঙ্খল নেতার জন্য।

নাসিরুদ্দিন মুহম্মদ হুমায়ুন ( (মার্চ ৬, ১৫০৮ফেব্রুয়ারি ২২, ১৫৫৬) মুঘল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সম্রাট, যিনি ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দ এবং ১৫৫৫ খ্রস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দুই দফায় আধুনিক আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং ভারতের উত্তরাঞ্চ রাজত্ব করেছেন।তিনি এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের পুত্র ছিলেন। তিনি তার পিতা বাবরের মতই তার রাজত্ব হারিয়েছিলেন, কিন্তু পারস্য সাম্রাজ্যের সহায়তায় পরিনামসরুপ আরও বড় রাজ্য পেয়েছিলেন।

হুমায়ূন (শাসনকাল : ১৫৩০-১৫৫৬) ভারতবর্ষের দ্বিতীয় মোঘল সম্রাট। প্রথম মোঘল সম্রাট জহিরউদ্দিন মোহাম্মদ বাবরের চার ছেলে ছিল_ হুমায়ূন, কামরান, হিন্দাল ও আসকরি (বাবরের মোট সন্তান ছিল ১৮; অন্যরা শৈশবে ইন্তেকাল করেন)। বাবরের প্রথম ছেলে হুমায়ুন ১৫০৮ সালের ৬ মার্চ কাবুলে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার মৃত্যুর তিনদিন পর হুমায়ূন ১৫৩০ সালের ২৯ ডিসেম্বর দিল্লীতে সিংহাসনে আরোহণ করেন। মারা যান ১৫৫৬ সালে। মাঝে ১৬ বছর ছিলেন সিংহাসনচ্যুত। ১৫৩৯সালের ২৬ জুন চৌসায় এবং পরের বছর কৌনজে শেরশাহের কাছে হেরে সিংহাসন হারান। সিংহাসনচ্যুত অবস্থাতেই ১৫৪২ সালে আকবর জন্মগ্রহণ করেন। ১৫৫৫ সালের ২২ জুন সেরহিন্দের যুদ্ধে জয়ের মাধ্যমে তিনি পুনরায় সিংহাসন লাভ করেন। পরের বছরই তথা ১৫৫৬ সালের ২৪ জানুয়ারি মাগরিবের নামাজ আদায় করার জন্য লাইব্রেরি থেকে দ্রুত নামতে গিয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। এ সময় তার অধিকৃত এলাকা ছিল সীমিত। তবে তিনি যদি অংশ বিশেষ হলেও সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে না পারতেন, তবে মোঘল ইতিহাস সৃষ্টি হতো কিনা তা নিয়ে যথেস্ট সংশয় আছে। হুমায়ূন ছিলেন মার্জিত আচরণের অধিকারী। দয়ালু হিসেবেও তার সুনাম ছিল। তার চরিত্রের একমাত্র ত্রুটি ছিল তিনি ছিলেন আফিমে আসক্ত। এই আসক্তি তাকে সেনানায়ক ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আপন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল।

জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবর ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট। পিতা সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যুর পর ১৫৫৬ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে আকবর ভারতের শাসনভার গ্রহণ করেণ। বৈরাম খানের তত্ত্বাবধানে তিনি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সাম্রাজ্য বিস্তার করতে থাকেন। ১৫৬০ সালে বৈরাম খানকে সরিয়ে আকবর নিজে সকল ক্ষমতা দখল করেণ। কিন্তু আকবর ভারতবর্ষআফগানিস্তানে তার সাম্রাজ্য বিস্তার চালিয়ে যান। ১৬০৫ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় সমস্ত উত্তর ভারত তার সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে। আকবরের মৃত্যুর পর তার পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীর ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করেণ।সাম্রাজ্যের রাজপুতদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার স্বার্থে আকবর বিভিন্ন রাজবংশের রাজকন্যাদের বিয়ে করেণ। তবে তার স্ত্রীদের মধ্যে সবচাইতে আলোচিত হলেন যোঁধা বাঈ

আকবরের শাসনকাল

রাজ্য শাসনের জন্য আকবর আমলাতন্ত্র চালু করেন এবং প্রদেশগুলোকে স্বায়ত্বশাসন দান করেন। আকবরের আমলাতন্ত্র বিশ্বের সবথেকে ফলপ্রসু আমলাতন্ত্রের মধ্যে অন্যতম। তিনি প্রত্যেক অঞ্চলে সামরিক শাসক নিয়োগ দেন। প্রত্যেক শাসক তার প্রদেশের সেনাবাহিনীর দায়িত্বে ছিল। ক্ষমতার অপব্যবহারের শাস্তি ছিল একমাত্র মৃত্যুদন্ড

আকবর বুঝতে পেরেছিলেন, যে রাজপুতরা শত্রু হিসাবে প্রবল, কিন্তু মিত্র হিসাবে নির্ভরযোগ্য। আকবরের শাসনকালে তিনি রাজপুতদের সাথে সন্ধি করার প্রয়াস করেছিলেন। কিছুটা যুদ্ধের দ্বারা, এবং অনেকটাই বিবাহসূত্রের দ্বারা তিনি এই প্রয়াসে সফল হয়েছিলেন। অম্বরের রাজা ভর মল্লের কন্যা জোধাবাঈ-এর সাথে তার বিবাহ হয়। ভর মল্লের পুত্র রাজা ভগবন দাস আকবরের সভায় নবরত্নের একজন ছিলেন। ভগবন দাসের পুত্র রাজা মান সিংহ আকবরের বিশাল সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন। রাজা টোডর মল্ল ছিলেন আকবরের অর্থমন্ত্রী। আরেক রাজপুত, বীরবল, ছিলেন আকবরের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ও প্রিয়পাত্র। বেশিরভাগ রাজপুত রাজ্য যখন আকবরের অধীনে চলে আসছে, তখন একমাত্র মেওয়ারের রাজপুত রাজা মহারানা উদয় সিংহ মুঘলদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। চিতোরের পতনের পর তিনি উদয়পুর থেকে মেওয়ার শাসন করতেন। তার সুযোগ্য পুত্র মহারানা প্রতাপ সিংহ সারা জীবন মুঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছিলেন। মেওয়ারের রাজপুতরাই একমাত্র রাজপুত জাত যাদের কে আকবর তার জীবদ্দশায় জয় করে যেতে পারেননি।

আকবর তার নিজস্ব ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দীন-ই-ইলাহি নামক ধর্ম চালু করার চেষ্টা করেন।

দীন-ই-ইলাহি

সম্রাট আকবর ধর্মীয় ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন।তিনি ধর্মীয় বিষয়ে গবেষণার জন্য ১৫৭৫ খ্রী আকবর ফতেপুর স্রিকিতে একটা উপাসনা ঘর তৈরী করেন।যা’ধর্ম সভা’ নামে পরিচিত।সেখানে তিনি বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের কথা শুনতেন।অবশেষে সকল ধর্মের সারকথা নিয়ে তিনি নতুন একটি নিরপেক্ষ ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করেন।এটিই ‘দীন-ই-ইলাহি'(১৫৮২) নামে পরিচিত।তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা এই ধর্মমত কে ভালভাবে গ্রহন করতে পারেনি।অনেক ঐতিহসিক দীন-ই-ইলাহীকে নতুন ধর্ম বলতে অস্বীকার করেন।এই ধর্মমত সম্রাট আকবর কে বিতর্কিতও করে তুলেছিল।

জোধাবাই

হীরাবাঈ ছিলেন রাজস্থানের রাজপুত ঘারানার রাজা ভারমালের জ্যেষ্ঠ কন্যা।হীরাবাঈ ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দের পহেলা অক্টোবার জন্মগ্রহণ করেন।মৃত্যুবরণ করেন ১৯মে,১৬২৩ খ্রিস্টাব্দে,প্রায় ৮১ বছর বয়সে।তিনি রাজা ভগবান দাসের বোন ও রাজা মানসিং এর ফুপু ছিলেন।তিনি আকবরের ১ম রাজপুত স্ত্রী।সম্রাট আকবারের সাথে তার বিবাহ হয় তিনি ১৫৬২ খ্রিস্টাব্দের ৬ই ফেব্রুয়ারী।তিনি শাহাজাদা সেলিমের অর্থাত্‍ সম্রাট জাহাঙ্গীরের মা।তার আসল নাম রাজকুমারী হীরা কুমারী।আবার তার নাম যোধাবাঈ ছিল নাকি তা নিয়ে বির্তক রয়েছে।তবে বিয়ের পরে তিনি মরিয়ম উজ-জামানী নাম ধারন করেন। তিনি ছিলেন ‘আমের’ রাজেযযর রাজকুমারী। তাঁর মায়ের নাম হল ‘ময়নাবতী’ এবং তাঁর বোনের নাম হল ‘সুকন্যা দাস’। তাঁর মৃত্যু হয়েছিল সম্ভবত ১৬২৩ খৃষ্টাব্দে।

আকবরের সভাসদ দের মধ্যে নবরত্ন হিসেবে যারা ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছেন,

শেখ আবুল ফজল ইবন মুবারক (১৪ জানুয়ারি, ১৫৫১১২ অগস্ট ১৬০২) ছিলেন মুঘল সম্রাট আকবরের প্রধানমন্ত্রী। তিনি আবুলফজল, আবুল ফদলআবুল ফদলআল্লামি নামেও পরিচিত। তিনি তিন খণ্ডে রচিত আকবরের রাজত্বকালের সরকারি ইতিহাস গ্রন্থ আকবরনামা ও উক্ত গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ড আইন-ই-আকবরি-এর রচয়িতা এবং বাইবেলের একটি ফার্সি অনুবাদের অনুবাদক। পারিবারিক সূত্রে তিনি ছিলেন আকবরের সভাকবি ফৈজির কনিষ্ঠ ভ্রাতা।

আবুল ফজল ছিলেন রেল সিন্ধ নিবাসী শেখ মুসার অধস্তন পঞ্চম পুরুষ। তাঁর পিতামহ শেখ খিজির নাগৌরে বসতি স্থাপন করেন। এখানেই আবুল ফজলের পিতা শেখ মুবারকের জন্ম হয়। প্রথম দিকে শেখ মুবারক নাগৌরে খ্বাজা আহররের নিকট পঠনপাঠন করেন। পরে তিনি আহমদাবাদে গিয়ে শেখ আবুল ফজল, শেখ উমর ও শেখ ইউসুফের কাছে পড়াশোনা করেছিলেন। পরে তিনি আগ্রায় বসতি স্থাপন করেন। সেখানেই তাঁর জ্যৈষ্ঠ পুত্র শেখ ফৈজি ও কনিষ্ঠ পুত্র আবুল ফজলের জন্ম হয়। ১৫৭৫ সালে আবুল ফজল আকবরের রাজসভায় আসেন। ১৫৮০ ও ১৫৯০-এর দশকে আকবরের মতাদর্শে যে উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়েছিল, তাঁর পশ্চাতে আবুল ফজলের একটি প্রভাব কার্যকরী ছিল। আবুল ফজল দাক্ষিণাত্যে মুঘল সেনাবাহিনীরও নেতৃত্ব দান করেছিলেন।

জানা যায়, আবুল ফজল যুবরাজ সেলিমের সিংহাসনে আরোহণের বিরোধিতা করেছিলেন। এই কারণে সেলিমের ষড়যন্ত্রে নারওয়ারের নিকট সরাই বীর ও অন্ত্রীর মধ্যবর্তী কোনো এক স্থানে বীর সিংহ বুন্দেলার হস্তে তিনি নিহত হন। তাঁর ছিন্ন মস্তক এলাহাবাদে সেলিমের নিকট পাঠানো হয়েছিল। আবুল ফজলকে অন্ত্রীতে সমাধিস্থ করা হয়। উল্লেখ্য, আবুল ফজলের ঘাতক বীর সিংহ বুন্দেলা পরে ওরছার শাসক হয়েছিলেন এবং ১৬০২ সালে যুবরাজ সেলিম জাহাঙ্গির নাম ধারণ করে মুঘল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। পরে ১৬০৮ সালে জাহাঙ্গির আবুল ফজলের পুত্র শেখ আবদুর রহমান আফজল খানকে (২৯ ডিসেম্বর, ১৫৭১ – ১৬১৩) বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন।

আকবরনামা ছিল তিন খণ্ডে রচিত আকবরের শাসনকাল ও তাঁর পূর্বপুরুষদের ইতিহাস। এই গ্রন্থে তৈমুর থেকে হুমায়ুন পর্যন্ত আকবরের পূর্বপুরুষদের জীবনকথা এবং আকবরের রাজত্বকালের ৪৬ বছরের (১৬০২ সাল পর্যন্ত) বিবরণী লিখিত আছে। আইন-ই-আকবরি নামে আকবরের সাম্রাজ্যের একটি প্রশাসনিক প্রতিবেদনও এই গ্রন্থে সংযোজিত হয়েছে। আইনআকবরি গ্রন্থ থেকে লেখকের জীবন ও পুর্বপুরুষদের একটি বর্ণনাও পাওয়া যায়। আইন-ই-আকবরি গ্রন্থে আকবরের রাজত্বকালের ৪২ বছরের সম্পূর্ণ ও ৪৩তম বছরের বেরার জয় পর্যন্ত ইতিহাস লিখিত রয়েছে।

রাকাত বা রাকাতআবুল ফজল হল মুরাদ, দানিয়াল, আকবর, মারিয়াম মাকানি, সেলিম (জাহাঙ্গির), আকবরের রানি ও কন্যাগণ, তাঁর পিতা, মাতা, ভ্রাতৃগণ, ও একাধিক সমসাময়িক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে লিখিত আবুল ফজলের পত্রাবলি। এই গ্রন্থটি সম্পাদনা করেন তাঁর ভাগিনেয় নুর আল-দিন মুহাম্মদ।

ইনশাআবুল ফজল বা মক্তবাৎআল্লামি হল আবুল ফজল কর্তৃক লিখিত সরকারি প্রতিবেদনের সংগ্রহ। এই গ্রন্থ দুটি খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ডে তুরানের আবদুল্লাহ্ খান উজবেগ, পারস্যের শাহ আব্বাস, খান্দেসের রাজা আলি খান, আহমদনগরের বুরহান-উল-মুলক, ও আবদুর রহিম খান খানান প্রমুখ নিজ অভিজাতবর্গকে লিখিত আকবরের পত্রাবলির সংকলন। দ্বিতীয় খণ্ডে রয়েছে আকবর, দানিয়েল, মির্জা শাহ রুখ ও খান খানানকে লিখিত আবুল ফজলের পত্রাবলি। এই গ্রন্থের সংকলক আব্দুস সামাদ।

আইনআকবরি  খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত সম্রাট আকবরের প্রশাসনের বিস্তারিত বর্ণনাসমৃদ্ধ একটি নথি। এই গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন আকবরের প্রধানমন্ত্রী আবুল ফজল ইবন মুবারক। এটি আবুল ফজল রচিত গ্রন্থ আকবরনামা তৃতীয় তথা বিস্তারিত শেষ খণ্ড। আইনআকবরি তিন ভাগে বিভক্ত।

আইনআকবরি নথিটি ছিল আকবরের সাম্রাজ্যের আইন অর্থাৎ প্রশাসনিক তথ্যপুস্তক ও রাজস্ব পরিসংখ্যানের হিসাবনিকাশ। ১৫৯০ সালে লিখিত এই গ্রন্থে সেযুগের হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মাচরণ সম্পর্কেও নানা তথ্য জানা যায়।

আইনআকবরি পাঁচটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে রয়েছে সম্রাটের গৃহস্থালীর বিবরণী; দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে সম্রাটের সেবক, সেনাবাহিনী ও রাজকর্মচারীদের কথা; তৃতীয় ভাগে রয়েছে সাম্রাজ্যের প্রশাসন, বিচারবিভাগীয় নির্দেশিকা ও কার্যনির্বাহী দপ্তরগুলির বর্ণনা; চতুর্থ ভাগে রয়েছে হিন্দু দর্শন, বিজ্ঞান, সামাজিক রীতিনীতি ও সাহিত্য সংক্রান্ত তথ্যাবলি; পঞ্চম ভাগে রয়েছে আকবরের বচনাবলি এবং লেখকের সংক্ষিপ্ত বংশাবলি তথ্য ও জীবনী।

মিয়া তানসেন (১৫০৬১৫৮৯) প্রায় সকল বিশেষজ্ঞের ধারণা মতে উত্তর ভারতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞ। বর্তমানে আমরা যে হিন্দুস্তানী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সাথে পরিচিত তার মূল স্রষ্টা হলেন এই তানসেন। তার এই সৃষ্টি যন্ত্র সঙ্গীতের এক অনবদ্য অবদান। বহু প্রাচীনকালে সৃষ্টি হলেও এখন পর্যন্ত এর প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে। তার কর্ম এবং বংশীয় উত্তরাধিকারীদের মাধ্যমেই মূলত এই ধারাটি আজও টিকে রয়েছে। তিনি মুঘল বাদশাহ আকবরের রাজদরবারের নবরত্নের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তাকে সঙ্গীত সম্রাট নামে ডাকা হয়।

তানসেন ভারতের গোয়ালিয়রে এক হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মুকুন্দ মিস্ত্র ছিলেন একজন কবি। ছোটবেলায় তার নাম ছিল তনু মিস্ত্র। তার বাবা মূলত বিহাটের বাসিন্দা ছিলেন। ছেলের জন্মে তিনি অতি আনন্দিত হন এবং এই জন্মের পিছনে সাধু গাউসের আশীর্বাদ রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন। ছেলের নাম রাখেন রামতনু (রামতনু মিস্ত্র)। ছোটবেলা থেকেই তানসেন সঙ্গীত শিক্ষা করতে শুরু করেন। এই শিক্ষায় তার গুরু ছিলেন বৃন্দাবনের তৎকালীন বিখ্যাত সঙ্গীত শিক্ষক হরিদাস স্বামী। মাত্র ১০ বছর বয়সে তার মেধার ক্ষমতা প্রকাশিত হয়। তার মেধা দেখে স্বামীজি বিস্মিত হন এবং তার বাবাকে বলে নিজের সাথে বৃন্দাবন নিয়ে যান। এই বৃন্দাবনেই তানসেনের মূল ভিত রচিত হয়। বিভিন্ন রাগের সুষ্ঠু চর্চার মাধ্যমে তিনি বিখ্যাত পণ্ডিত শিল্পীতে পরিণত হন। অনেক বিখ্যাত হওয়ার পরও তাই তিনি সময় পেলেই বৃন্দাবন আসতেন।

বৃন্দাবন থেকে বিহাটে ফিরে তানসেন শিব মন্দিরে সঙ্গীত সাধনা শুরু করেন। লোকমুখে বলতে শোনা যায়, তার সঙ্গীতে মন্দিরের দেয়াল আন্দোলিত হত। স্থানীয়রা পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, তানসনের সঙ্গীতের কারণেই মন্দিরটি এক দিকে একটু হেলে পড়েছে। তানসেন সম্বন্ধে আরও কিছু অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন: বৃক্ষ ও পাথরকে আন্দোলিত করা, নিজ থেকেই বাতি জ্বালানো এবং যখন বৃষ্টির কোন চিহ্নই নেই তখন বৃষ্টি আনয়ন। বাবা-মার মৃত্যুর পর তিনি হযরত গাউসের নিকট আসেন।তিনি একই সাথে তানসেনের সাঙ্গীতিক ও আধ্যাতিক গুরু ছিলেন।তবে তানসেন ইসলাম গ্রহন করেছিলেন কি না তা নির্ভরযোগ্য ভাবে জানা যায় না।এর পক্ষে ও বিপক্ষে দুইদিকেই প্রচুর মত পাওয়া যায়।যাই হোক, শিক্ষা শেষে তিনি মেওয়া বান্ধবগড়ের রাজা রামচন্দ্রের রাজকীয় আদালতে সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে যোগ দেন। এরপর তিনি মুঘল বাদশাহ আকবরের রাজ দরবারে নবরত্নের একজন হিসেবে সঙ্গীতের সাধনা শুরু করেন। তানসেনের দুজন স্ত্রী ও পাচ সন্তানের খবর পাওয়া যায়।সন্তানদের নাম ঃহামিরসেন,সুরাটসেন,বিলাস খান,তান্সান্স খান,সরস্বতী দেবী।

গোয়ালিয়রের মহান সুফি সাধক শেখ মুহাম্মদ গাউসের সমাধি কমপ্লেক্সেই মিয়া তানসেনে সমাধি রচিত হয়েছিল। এখনও এটি বিদ্যমান রয়েছে। শেখ মুহাম্মদ গাউস ষোড়শ শতাব্দীর অন্যতম সুফী দরবেশ ও ফকির ছিলেন। সকল ধর্ম বিশ্বাসের লোকের কাছে তিনি সনামধন্য ছিলেন। গাউস এবং তানসেনের দুইটি সমাধি পাশাপাশি রয়েছে। এছাড়াও এই সমাধি সৌধে অন্যান্য কবর রয়েছে। প্রথাগত মুঘল স্টাইলে এই কমপ্লেক্সটি তৈরি করা হয়েছে। সমাধি ক্ষেত্রটি একটি বিশাল বর্গাকার মাঠের মত যার কেন্দ্র রয়েছে ষড়ভূজ আকৃতির কিছু স্তম্ভ। সমাধি সৌধের দালানগুলোর দেয়ালের মধ্যে পাথর কেটে নকশা করা হয়েছে। দেয়ালের একেক অংশে নকশা একেক রকম। পুরো দালানের উপর বিস্তৃত অংশ জুড়ে একটি বৃহৎ মিনার রয়েছে যা একসময় নীল রঙা টাইল্‌স দ্বারা আবৃত ছিল। সাধু গাউসের সমাধির ডান পাশে তানসেনের সমাধি অবস্থিত। সমাধিটি একটি বর্ধিত আয়তাকার কাঠামোর উপর অবস্থিত। কাঠামোটি মার্বেল পাথর দ্বারা নির্মিত। এর চারদিকে ছাঁইচবিশিষ্ট (eaves) প্যাভিলিয়ন রয়েছে যা বিভিন্ন নকশায় সুশোভিত।

বীরবল  অথবা রাজা বীরবল  আকবরের মোঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম সভ্য ছিলেন। তিনি তাঁর চতুরতার জন্যই তিনি মূলত সকলের কাছে সুপরিচিত। তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন। এবং ১৫৫৬-১৫৬২ সালের দিকে একজন কবিগায়ক হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে তিনি সম্রাটের অত্যন্ত কাছের হয়ে পড়েন এবং নানা সেনা অভিযানে যান যদিও প্রকৃতপক্ষে তিনি এই বিষয়ে কোনরুপ শিক্ষা নেননি। ১৫৮৬ সালের সম্রাট তাকে ভারতের উত্তর-দক্ষিণ দিকে (বর্তমান আফগানিস্তান) পাঠান। কিন্তু এই অভিযান অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয় এবং বিদ্রোহী উপজাতিদের আক্রমণে বহু সৈন্যসহ বীরবল মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু সম্রাটকে অত্যন্ত ব্যথিত করে।

আকবরের শাসনামলের শেষের দিকে তাঁর ও বীরবলের মধ্যকার মজার ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকে। এই কাহিনীগুলোতে তাঁকে অত্যন্ত চতুর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ধীরে ধীরে এই কাহিনী পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে জনপ্রিয় হয়। এই গল্পে তিনি তাঁর পরিপার্শ্বের সকলকে এবং স্বয়ং সম্রাটকেও বোকা বানান। বিংশ শতাব্দির দিক থেকে এই কাহিনীর উপর নাটক, চলচ্চিত্র এবং বই লেখা হতে লাগে। বর্তমানে পাঠ্যবইয়ের এই কাহিনীকে স্থান দেয়া হয়েছে।

ভারতের উত্তর প্রদেশের কল্পি নামক স্থানে ১৫২৮ সালের মহেশ দাস হিসেবে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ফোকলোর অনুযায়ী, স্থানটি যমুনার তীরবর্তী তিকওয়ানপুর।তাঁর পিতা গঙ্গা দাস এবং মাতা অনভা দাবিত। তিনি হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের তৃতীয় সন্তান।পরিবারটির পূর্ব হতেই কবিতাসাহিত্য সম্পর্কে অনুরাগ ছিল।

তিনি হিন্দি, সংস্কৃতপার্সিয়ান ভাষায় জ্ঞানার্জন করেন। তিনি সংগীত এবং ব্রজ কবিতায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তিনি সংগীতে ছন্দ প্রয়োগের ব্যাপারে অত্যন্ত দক্ষ হয়ে ওঠেন। তিনি তাঁর কবিতা ও গানের কারনে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। তিনি রেবার রাজা রাম চন্দ্রের রাজপুত কোর্টে ব্রাহ্ম কবি নামে কাজ করেন। তাঁর অবস্থার উত্তরণ ঘটে যখন তিনি একটি সম্মানিত এবং ধনী পরিবারের এক কণ্যাকে বিয়ে করেন। ইমপিরিয়াল কোর্টে কাজ করার পূর্বে তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভাল ছিল না।

ধারণা করা হয়, ১৫৫৬ থেকে ১৫৬২ সালের মধ্যে তাঁর সাথে আকবরের প্রথম দেখা হয়। এর কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি সম্রাটের কবি রাই হন।আকবর তাঁকে বীরবল নাম দেন এবং রাজা উপাধীতে ভূষিত করেন। এরপর থেকে তিনি এই নামেই পরিচিত হন।

বীরবল নামটি এসেছে বীর বর থেকে যার মানে সাহসী এবং মহান। কিন্তু এই উপাধীটা কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক, কারণ তিনি রণকৌশলে তেমন দক্ষ ছিলেন না। আকবর তাঁর হিন্দু সভাষদদের তাদের ঐতিহ্যানুযায়ী নাম প্রদান করতেন। এস.এইচ হোদিভালা বলেন, এই নামগুলো বেতাল পঞ্চবিংশতী হতে নেয়া হতে পারে। কারণ উক্ত বইয়ের বীর বর নামক এক চরিত্র একজন বিচারককে অনেক সম্মান প্রদর্শন করেন। আকবর সাহিত্য বিষয়ের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তিনি সংষ্কৃত ও ভাষার বই পার্সিতে অনুবাদ করতেন।

বীরবলের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা তাঁকে সম্রাট আকবরের নয়জন উপদেষ্টা, অর্থাৎ নবরত্নের একজন করে দেয়। অন্যান্য রত্নরা হলেন টোডার মল, মান সিংহ, ভগবান দাস প্রভৃতি। ক্রমেই তিনি একজন ধর্মীয় উপদেষ্টা, সামরিক কর্মকর্তা এবং সম্রাটের নিকট বন্ধু হয়ে পড়েন। সম্রাটকে তিনি প্রায় ৩০ বছর সেবা দান করেন।

১৫৭২ সালে সম্রাট তাঁকে ও এক বিশাল সেনাবাহিনীকে শের আফগান কোয়ালি খানকে তাঁর বড় ভাই হাকিম মির্জার আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য পাঠান। এটিই ছিল তাঁর প্রথম সামরিক অবদান। যদিও তাঁর কোন সামরিক অভিজ্ঞতা ছিল না, তথাপি অন্যান্য উপদেষ্টাদের মত, যেমন টোডার মল অর্থনীতিতে অবদান রাখেন, ঠিক সেইরুপ তাঁকে সম্রাট বিভিন্ন অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে পাঠান।

আবুল ফজল এবং আবদুল কাদির বাদওয়ানি কোর্টের ঐতিহাসিক ছিলেন। যদিও ফজল বীরবলকে সম্মান করত এবং তাঁকে প্রায় পঁচিশটি সম্মানজনক উপাধী দেয় ও দু’হাজার অভিযানের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন, কাদির হিন্দু হওয়ায় বীরবলকে সহ্য করতে পারত না। সে বীরবলকে বাস্টার্ড বলত এবং লিখত কিভাবে একজন ব্রাহ্মণ সংগীতশিল্পী হয়ে সে সম্রাটের এত প্রিয় ও বিশ্বাসভাজন হয়ে ওঠে।কিন্তু একই সময়ে আকবরের অন্যান্য মুসলিম সভাষদরা তাঁর প্রতিভা সম্পর্কে অবগত হয়েও তাঁকে পছন্দ করতেন না বলে জানা যায়।

আকবর দীন-ঈ-ইলাহি নামের একটি ধর্ম প্রচার করেন। এই ধর্ম হিন্দুধর্মইসলাম ধর্ম-এর সংমিশ্রণে তৈরি করা হয় এবং এই ধর্মমতে আকবর পৃথিবীতে এই সৃষ্টিকর্তার প্রেরিত মানুষ। আইনআকবরী অনুযায়ী বীরবল আকবর ছাড়া সেই সমস্ত মানুষের একজন ছিলেন যারা এই ধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং এই ধর্ম গ্রহণকারী একমাত্র হিন্দু ব্যক্তি।সম্রাটের সাথে বীরবলের সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর ছিল, যদিও তিনি সম্রাটের চেয়ে চৌদ্দ বছরের ছোট ছিলেন। নবরত্নের মধ্যে বীরবল ছিল সবচাইতে দামি রত্ন। বাদওয়ানী একে বিকৃত করে বলে, “তাঁর দেহ আমার দেহ, তাঁর রক্ত, আমার রক্ত”। আকবর দুইবার বীরবলের প্রাণ রক্ষা করেন বলে জানা যায়।

কলকাতার ভিক্টোরিয়া হলে অবস্থিত আকবরী নয় রত্ন-এ দেখা যায়, বীরবল ঠিক আকবরের পরের স্থানেই আছেন। প্রথমে বীরবল সম্রাটকে বিনোদন দিলেও পরবর্তীতে তাঁকে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে পাঠানো হয়। বীরবল সম্রাটের কাছ থেকে একটি দোতলা বাড়ি লাভ করেন, যা সম্রাটের প্রাসাদের সীমানার মধ্যে ছিল। তিনি বীরবলকে কাছে পেয়ে বেশ আনন্দিত ছিলেন এবং তিনিই একমাত্র সভাষদ ছিলেন যিনি সম্রাটের প্রাসাদের চত্বরের মধ্যে স্থান পান। আকবরের প্রাসাদের সাতটি দরজার একটির নাম ছিল বীরবলের দরজা (বীরবলস গেট বা Birbal’s Gate)

ফোক গল্পে, তাঁকে সর্বদাই ধার্মিক হিন্দু হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি আকবরের চেয়ে বয়সে ছোট, বিরুদ্ধ মুসলিম, যারা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত, তাদের বিরুদ্ধে দৃঢ়। তাঁর সাফল্যের কারণ ছিল তাঁর দক্ষতা। এভাবে তিনি তাঁর বুদ্ধিমত্তা এবং ধারাল কথার সাহায্যে সম্রাটের উপর ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত প্রভাব খাটান। যদিও ঐতিহাসিকভাবে তিনি কখনই এমনটা করেননি।

বাদওয়ানী তাঁকে অবিশ্বাস করত, যদিও তিনি বীরবল সম্পর্কে বলেন, “প্রচুর ক্ষমতা এবং প্রতিভা ধারণকারী”। ব্রজ ভাষার কবি রাই হোল আকবর এবং তাঁর নবরত্নকে প্রশংসা করেন এবং বীরবলের মহত্বের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। আবুল ফজল তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন মূলত তাঁর আত্মিক গুরুত্ব এবং সম্রাটের বিশ্বাসভাজন হিসেবে, তাঁর চতুরতা কিংবা কবিতার জন্য নয়।

আধুনিক হিন্দু ঐতিহাসিকগণ মনে করেন, তিনি আকবরকে বিভিন্ন সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছেন এবং সনাতন মুসলিমরা তাঁকে হেয় করত কারণ তাঁর কারণে সম্রাট ইসলামকে অবজ্ঞা করতেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যার কারণে বলা যায় তিনি সম্রাটকে তাঁর ধর্মের উপর প্রভাব খাটাতেন।বরং বিভিন্ন স্থান হতে জানা যায় যে তিনি সম্রাটের রাজনীতির উপর বেশ প্রভাব খাটাতেন। বীরবলের প্রতি সম্রাটের ভালবাসা, তাঁর ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সামাজিক স্বাধীনতাই এর কারণ ছিল, বীরবল নয়। ইতিহাস অনুযায়ী তিনি আকবরের ধর্মীয় নীতি এবং ধর্ম দীনইলাহির সমর্থক ছিলেন। আইনআকবরী-এ পতিতা সম্পর্কিত একটি ঘটনায় বীরবলের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে জানা যায়, যেখানে আকবর তাকে শাস্তি দিতে চান কারণ কিভাবে তাঁর মত একজন ধার্মিক ব্যক্তি এমন একটা কাজ করতে পারেন।

ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে আফগানিস্তানের ইন্দু নদীর তীরে ইউসুফজাই উপজাতি মোঘল শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ১৫৮৬ সালের অনেক সৈন্য হতাহতের পর আকবর তাঁর নতুন দুর্গ এটক হতে বীরবলকে এক সেনাদলের সাথে উক্ত স্থানে কমান্ডার জইন খানকে সাহায্য করার জন্য পাঠান। বীরবল পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হন।কিন্তু আফগানরা আগে থেকেই সেখানে প্রস্তুত হয়ে ছিলেন। এক মারাত্মক হামলায় বীরবল সহ প্রায় ৮০০০ সৈন্য উক্ত স্থানে মারা যান এবং বীরবলের দেহ আর কখনই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এটি ছিল আকবরের সর্ববৃহৎ সামরিক ব্যর্থতা এবং সেনা ধ্বংসের ঘটনা। এই ঘটনার ফলশ্রুতিতে আকবর প্রচন্ড শোকাহত হন এবং তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সভাষদের মৃত্যুতে তিনি টানা দুইদিন কোনরুপ খাদ্য কিংবা পানীয় গ্রহণ করেননি। তিনি আরো বেশি যন্ত্রণাকাতর হন কারণ হিন্দু শবদাহ রীতির ফলে তিনি বীরবলের দেহ আর কোনদিনই দেখতে পাননি। তিনি এই ঘটনাকে তাঁর সিংহাসন লাভের পর সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটয়না বলে অভিহিত করেন।

বাদওয়ানী লেখেন,

সম্রাট বীর বরের মৃত্যুর পর যে সম্মান দেখান, আর কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি। তিনি বলেন, “হায়! তাঁরা ওর দেহটাও ফিরিয়ে আনতে পারল না, তাহলে তা দাহ করা যেত।” কিন্তু শেষে তিনি নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দেন যে বীর বর এখন সকল পার্থিব প্রতিবন্ধকতা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং স্বাধীন। এবং তাঁর জন্য সূর্যরশ্মিই যথেষ্ট, তাঁকে আগুনে পোড়াবার কোন প্রয়োজন নেই।

আকবরের শাসনামলের প্রায় একশ’ বছর পর এক গল্পগুলোর উদ্ভব হয়। মোঘল বীরদের জীবনী মহাথীর আকউমরা-এ বীরবলকে তাঁর কাব্য এবং চতুরতার জন্য উন্নত ভাগ্যের অধিকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর চতুরতার প্রশংসা করা হয় এই বলে যে তাঁর বুদ্ধিমত্তা সেই সময়ে উত্তর ভারতে ক্রমশ জনপ্রিয় হয় কারণ তখন আকবরের কারণে মোঘল শাসন কিছুটা সাম্যাবস্থায় এসেছে। একইভাবে, রাজা এবং তাঁর প্রত্যুৎপন্নমতি মন্ত্রীদের কাহিনী ভারতে এর আগে থেকেই জনপ্রিয়। তন্মধ্যে তেনালী রমন ও রাজা বিজয়নগর এবং গোপাল ভাঁড়নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র উল্লেখযোগ্য।বীরবলের কাহিনীগুলো নানা ভঙ্গিতে বলা হয় যার একটি বলা হয় আরব্য রজনীর মত করে। কয়েক বছর পরে মোল্লা দো পেঁয়াজার উদ্ভব ঘটে। এগুলো ১৯০০ সালের দিকে লেখেন এক মুসলিম লেখক। তিনি আকবরের সময়কার এক পার্সিয়ান ব্যক্তি থেকে অনুপ্রানিত হন। তিনি ছিলেন বীরবলের কাহিনীগত মুসলিম প্রতিরুপ এবং সনাতন মুসলিম ধর্মীয় প্রবক্তা এক চরিত্র। কিছু গল্পে তিনি আকবর ও বীরবল দুজনকেই উৎকৃষ্ট হিসেবে দেখিয়েছেন, আবার কিছু গল্পে তাঁকে অযত্নে দেখানো হয়েছে।

সি.এম. নাঈম লেখেন যে এই কাহিনীগুলোকে ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে এরা তখনকার রাজনৈতিক ইতিহাসকে দেখিয়েছে। “আকবর ও বীরবল” কাহিনীগুলো একজন হিন্দু কথকের মোঘল শাসনের প্রতি পক্ষপাত দেখায়। আকবরকে এই কাহিনীগুলোতে কিছুটা খারাপ হিসেবে দেখানো হয় এবং বীরবল সর্বদাই শ্রেষ্ঠ হয়। প্রতিটিবারেই সেখানে একজন শক্তিশালী শাসক থাকেন যিনি অত্যন্ত শক্তিশালী ভাবে তাঁর শাসন কাজ করছিলেন। তাঁর সাথে একজন হাস্য-রসাত্মক মন্ত্রী থাকতেন যার চতুরতা অত্যন্ত ধারালো এবং যার জনপ্রিয়তা কিংবদন্তীতুল্য ছিল। এই রসিকতা এবং কাহিনীগুলো আকবরসহ প্রায় সকল শক্তিশালী শাসককে নিয়েই হয়েছে, কারণ তিনি মানুষকে অনুপ্রাণিত করতেন, তাঁদের সাথে অনেক বেশি মিশতেন। নাঈম আরো বলেন যে অন্য কোন সভাষদকে না নিয়ে বীরবলকে নেয়ার কারণ হচ্ছে তিনি একজ ব্রাহ্মণ যিনি ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী এক চরিত্র।

এই কাহিনীগুলো মূলত মুখে মুখে করে চলে এসেছে।এতে গুরত্ব দেয়া হয় কিভাবে সে অন্যান্য বিরোধী সভাষদদের টেক্কা দেয়, যারা তাঁকে সম্রাটের চোখে খাটো করতে চাইত। সাধারণত সে হাস্যকরভাবে এবং তীক্ষ্ণ ও বুদ্ধিমান উত্তর দিয়েই সমস্যার সমাধান করত। শেষে আকবর অবাক হতেন এবং মজা পেতেন। কিছু গল্পে আকবরই বীরবলকে একটি কবিতার লাইন দিয়ে কবিতাটি শেষ করতে বলত এবং কিছু গল্প সাধারণ হাস্য-রসাত্মক। প্রায় অসম্ভব এক পরিস্থিতিতে সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কিভাবে তা অতিক্রম করতে বস্তুত তাই এই কাহিনীত মূল বিষয়।

নুরুদ্দীন মহম্মদ সেলিম বা জাহাঙ্গীর (আগস্ট ৩০, ১৫৬৯অক্টোবর ২৮, ১৬২৭) ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের চতুর্থ সম্রাট। তিনি ১৬০৫ সাল থেকে তার মৃত্যু অবধি ১৬২৭ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

জাহাঙ্গীর ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট আকবর-এর পুত্র। তিনি ১৫৯৯ সালে তার পিতা আকবর-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। সেই সময় আকবর দক্ষিণ ভারত-এ ব্যস্ত ছিলেন। তিনি হেরে গেলেও পরবর্তী কালে তার সৎমা রুকাইয়া সুলতান বেগমসেলিমা সুলতান বেগম এর সমর্থনে ১৯০৫ সালে রাজা হতে সমর্থ হন। প্রথম বছরেই তাকে তার বড় ছেলে খসরুর বিদ্রহের মোকাবিলা করতে হয় ও তিনি তাতে সফল হন। তিনি খসরু সমর্থিত ২০০০ লোককে মৃত্যুদণ্ড দেন ও খসরুকে অন্ধ করে দেন।

বাবার মত চমৎকার প্রশাসন ছাড়াও জাহাঙ্গীর-এর শাষনামলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী অর্থনীতি এবং চিত্তাকর্ষক সাংস্কৃতিক সাফল্য বিদ্যমান ছিল। এছাড়া সার্বভৌম সীমানা অগ্রসরও অব্যাহত ছিল – বঙ্গ, মেওয়ার, আহমেদনগরদক্ষিণ ভারত পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তৃত ছিল। এই সাম্রাজ্য বৃদ্ধির একমাত্র বাধা আসে যখন পারস্য অঞ্চলের সাফারীদ রাজবংশের শাহেনশাহ আব্বাস কান্দাহার আক্রমন করেন। তা ঘটে যখন ভারতে তিনি খসরুর বিদ্রহ দমন করছিলেন। তিনি রাজপুতানা রাজাদের সাথে সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনায় বসেন ও তারা সকলেই মুঘল আধিপত্য মেনে নেন ও তার বদলে তাদের মুঘল সাম্রাজ্যে উঁচু পদ দেওয়া হয়।

জাহাঙ্গীর শিল্প, বিজ্ঞান এবং, স্থাপত্য সঙ্গে মুগ্ধ হয়ে তরুণ বয়স থেকেই চিত্রকলার প্রতি ঝোঁক দেখিয়েছেন এবং তার নিজের একটি কর্মশালায় ছিল। মুঘল চিত্রকলা শিল্প, জাহাঙ্গীর এর রাজত্বের অধীনে মহান উচ্চতায় পৌঁছেছিল। তার সময় উস্তাদ মনসুর জন্তু ও পাখির ছবি একে বিখ্যাত হন। জাহাঙ্গীর এর ছিল একটি বিশাল পক্ষিশালা ও পশুশালা ছিল। জাহাঙ্গীর ইউরোপীয় এবং ফার্সি শিল্পকলাকেও ভালবাসতেন। তিনি ফার্সি রানী নুর জাহান দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার সাম্রাজ্য জুড়ে ফার্সি সংস্কৃতি প্রচার করেন। তার সময়েই শালিমার গার্ডেন তৈরি হয়।

জাহাঙ্গীর তার বাবার মত একজন কঠোর সুন্নি মুসলমান ছিলেন না। তিনি সার্বজনীন বিতর্কে বিভিন্ন ধর্মের মানুষদের অংশগ্রহণ করতে দিতেন। জাহাঙ্গীর তার লোকদের কাউকে জোড়পূর্বক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বারণ করতেন। তিনি সকল প্রকার ধর্মের লোকেদের থেকে সমান খাজনা নিতেন। থমাস রো, এডওয়ার্ড টেরি-সহ অনেকেই তার এইপ্রকার আচরণের প্রশংসা করেন। থমাস রোর মতে জাহাঙ্গীর নাস্তিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন।

অনেক ভাল গুন থাকা সত্ত্বেও, মদ্যপান ও নারী এই দুই আসক্তির জন্য জাহাঙ্গীর সমালোচিত হন। তিনি এক সময় তার স্ত্রী নুর জাহান কে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়ে ফেলেন এবং নুর জাহান বিভিন্ন বিতর্কিত চক্রান্তের সাথে জড়িয়ে পরেছিলেন। ১৬২২ সালে তার পুত্র ক্ষুরাম প্রথম বিদ্রোহ করেন। কিন্তু ১৬২৬ সালে জাহাঙ্গীরের বিশাল সেনাবাহিনীর কাছে কোণঠাসা হয়ে তিনি নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু ১৬২৭ সালে তার মৃত্যুর পর ক্ষুরামই নিজেকে শাহ জাহান উপাধিতে ভূষিত করে সিংহাসন দখল করেন। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর বিভিন্ন গল্প , সিনেমা ও সাহিত্যে তার ও আনারকলির রহস্যে ভরা সম্পর্ক স্থান পায়।

রাজকুমার সেলিম ৩৬ বছর বয়েসে তার বাবার মৃত্যুর ৮ দিন পর ৩০ নভেম্বর ১৬০৫ সালে ক্ষমতায় এসে নিজেকে নুরুদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশাহ গাজী উপাধিতে ভূষিত করে। এখান থেকেই তার ২২ বছরের রাজত্বের শুরু।

তিনি প্রথমেই তার ছেলে খসরু মিরজার বিদ্রোহের মুখে পড়েন। খসরু কে তিনি অন্ধ করে দেন ও তাকে আর্থিক সাহায্য করায় পঞ্চম শিখ গুরু অর্জন দেব কে পাঁচ দিন ধরে অত্যাচার করা হয়। পরে তিনি নদীতে স্নান করার সময় উধাও হয়ে যান।

জাহাঙ্গীর তার ছোট ছেলে খুরাম (পরবর্তী কালে শাহ জাহানকে উত্তরাধিকার এর বিষয় সমর্থন করতেন।) উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে শাহ জাহান ১৬২২ সালে তার বড় ভাই খসরু কে খুন করেন।

মেয়ার এর রানা ও শাহ জাহান এর মধ্যে একটি সফল চুক্তি হয়। শাহ জাহান বঙ্গবিহার ব্যস্ত থাকার সময়, জাহাঙ্গীর তার জেতা রাজ্য কে নিজের বলে দাবি করেন। নিজেদের মধ্যে বিবাদের সাহায্য নিয়ে ফার্সি ভাষা রা কান্দাহার জয় করেন। এর ফলে মুঘল রা আফগানিস্তান ও পারস্য এর মুল্যবান বাণিজ্যিক রুট গুলি নিজেদের অধীন থেকে হারিয়ে ফেলে।

শাহবুদ্দিন মুহাম্মদ শাহ জাহান(আরও ডাকা হয় শাহ জাহান, শাজাহান বলে।  ( জানুয়ারি ৫, ১৫৯২জানুয়ারি ২২, ১৬৬৬) মুঘল সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন যিনি ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশ শাসন করেছেন। শাহ জাহান নামটি এসেছে ফার্সি ভাষা থেকে যার অর্থ “পৃথিবীর রাজা”। তিনি ছিলেন বাবর, হুমায়ুন, আকবর, এবং জাহাঙ্গীরের পরে পঞ্চম মুঘল সম্রাট।

তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং তাঁর হিন্দু রাজপুত স্ত্রী তাজ বিবি বিলকিস মাকানি-র সন্তান ছিলেন যিনি খুররাম নামে। বাল্যকালে তিনি দাদা আকবরের প্রিয়পাত্র ছিলেন। তিনি ১৬৭২ সালে তার পিতার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাকে মোগল সাম্রাজ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর শাসনামলকে স্বর্ণযুগ বলা হয় এবং তার সময়ে ভারতীয় সভ্যতা সবচেয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে। দাদা আকবরেরমতো তিনিও তার সাম্রাজ্য প্রসারিত করতে আগ্রহী ছিলেন। ১৬৫৮ সালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে পুত্র আওরঙ্গজেব তাকে বন্দী করেন এবং বন্দী অবস্থায় ১৬৬৬ সালে আগ্রা ফোর্ট -এ তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত।

তাঁর রাজত্বের সময়কালের মুঘল স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ ছিল। শাহজাহান অনেক শোভামণ্ডিত স্থাপনা তৌরি করেন, যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত আগ্রার তাজমহল তার স্ত্রী মমতাজ মহলের সমাধি হিসাবে পরিচিত (নির্মাণ ১৬৩২-১৬৫৪ সাল)।

আওরঙ্গজেব  আলসুলতান আলআজম ওয়াল খাকান আলমুকাররম আবুল মুজাফফর মুহি উদদিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীর I, বাদশা গাজী, আলমগীর প্রথম নামেও পরিচিত  (নভেম্বর ৩, ১৬১৮মার্চ ৩, ১৭০৭) ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মুঘল সম্রাজ্যের শাসক ছিলেন। তিনি ছিলেন বাবর, হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর এবং শাহ জাহানের পরে ষষ্ঠো মুঘল সম্রাট। তিনি সম্রাট শাহজাহানের পুত্র। মুঘল সম্রাট হিসেবে আওরঙ্গজেবের শাসনামল বিভিন্ন যুদ্ধের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের বিস্তারের মাধ্যমে চিহ্নিত।

মুয়াজ্জেম বাহাদুর শাহ [ অক্টোবর ১৪, ১৬৪৩ – ফেব্রুয়ারি, ১৭১২), শাহ আলম প্রথম নামেও পরিচিত, মুঘল সম্রাট যিনি ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭১২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতবর্ষ শাসন করেছেন।

 

জাহানদার শাহ (মে ১০, ১৬৬১১৭১৩) মুঘল সম্রাট ছিলেন, যিনি ১৭১২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য হিন্দুস্তান শাসন করেছিলেন।

তিনি সম্রাট বাহাদুর শাহ প্রথম এর পুত্র ছিলেন। ফেব্রুয়ারি ২৭, ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে পিতার মৃত্যুর পর তিনি এবং তার ভাই আজিম-উস-শান নিজেদের সম্রাট হিসেবে দাবি করেন এবং ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হওয়ার জন্য বিবাদে লিপ্ত হন। ১৭১২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ ১২ তারিখে আজিম-উস-শানকে হত্যা করা হলে জাহানদার আরও ১১ মাস শাসন করতে সক্ষম হন।

 

ফররুখসিয়ার (১৬৮৩১৭১৯) ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭১৯ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল সম্রাট ছিলেন। সুদর্শন হলেও তিনি ছিলেন দূর্বল শাসক, তিনি সহজের উপদেষ্টাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পরতেন। ফর‌রুখসিয়ার চারিত্রিক ভাবে নিজে স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসনে অক্ষম ছিলেন। তাঁর রাজত্ব দেখা শোনা করতো সাইদ ভাতৃগণ, মুঘল শাসনের ছায়াতমে থেকে যারা রাজ্যের একটি বড় শক্তিতে পরিনত হয়েছিল।

 

রাফি উলদারজাত (১৬৯৯১৭১৯), আজিম উস শানের ভাই রাফি-উস-শানের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র, যিনি দশম মুঘল সম্রাট ছিলেন। তিনি ফেব্রুয়ারি ২৮, ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে রাজ্যের উত্তরাধিকারী হন, তাকে সাইদ ভাতৃগণ বাদশাহ বলে ঘোষণা দেন।

 

শাহ জাহান দ্বিতীয়  নামেও পরিচিত, ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে স্বম্প সময়ের জন্য মুঘল সম্রাট ছিলেন। তিনি তার ঐ বছরই অকাল প্রয়াত ভাই রাফি উল-দারজাতের উত্তরসূরী ছিলেন, যিনি সাইদ ভাতৃগণ দ্বারা বাদশাহ বলে আখ্যায়িত হয়েছিলেন। তাঁর ভাইয়ের মতন তিনিও ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীতে নিহত হন, সাইদ ভাতৃগণের নির্দেশে তাকে সিংহাসন চ্যুত এবং হত্যা করা হয়।

 

নিকুসিয়ার মোহাম্মদ ছিলেন দ্বাদশ মুঘল সম্রাট। তিনি ৪০ বছরের বেশি বয়সে ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। স্থানীয় মন্ত্রী বীরবল তাকে পুতুলের মত ব্যবহার করতেন এবং তাকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেছিল এই শর্তে যে তিনি সারা জীবন হারেমের ভিতরে কাটাবেন। তাকে সাইদ ভাতৃগণ ব্যাঙ্গ করতো এবং পুনরায় তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিলেন। তিনি ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে ৪৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

মুহাম্মদ ইব্রাহিম  ১৩তম মুঘল সম্রাট ছিলেন। তিনি ছিলেন রাফি উল-দারজাত এবং রাফি উদ-দৌলতের ভাই, সাইদ ভাতৃগণ দ্বারা নিকুসিয়ারের হত্যার পরে তাকে সিংহাসনে বসানো হয়।

মুহাম্মদ শাহ নিজামের ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার পরে তিনিই ছিলেন সাইদদের পরবর্তী দাবিদার। সাইদদের পরাজয়ের পরে তাকে হারেমে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তিনি ১৭৪৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

 

মুহাম্মদ শাহ  (১৭০২১৭৪৮) ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পর্যন্ত ভারতের মুঘল সম্রাট ছিলেন। তিনি বাহাদুর শাহ প্রথমের নাতি ছিলেন। তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে সাইদ ভাতৃগণের সাহায্যে সিংহাসনে বসেছিলেন, পরবর্তীকালে তাদের অভ্যুত্থানেই তিনি সিংহাসনচ্যুত হন।

তাঁর রাজত্বকালে, মুঘল সম্রাজ্য ছোট ছোট কয়েকটি আঞ্চলিক রাজ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল এবং এদের উপর সম্রাটের তেমন কর্তৃত্বও ছিলনা, প্রতিটি রাজ্য তার নিজস্ব শাসক রাজত্ব করতো, তাই এ সম্রাটের সময়ই সার্বিক ভাবে মুঘল সম্রাটের ক্ষমতার পতন শুরু হয়।

সম্রাট বাহাদুর শাহ্ জাফর বা ২য় বাহাদুর শাহ্ (অক্টোবর ২৪, ১৭৭৫নভেম্বর ৭, ১৮৬২) মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট। সিপাহী বিপ্লবের শেষে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসকেরা তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে ও রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠায়। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।

তাঁর পূর্ণ নাম আবুল মুজাফ্ফার সিরাজুদ্দীন মুহাম্মদ বাহাদুর শাহ গাজী। তিনি ২৪ অক্টোবর ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে (২৭ শাবান ১১৮৯ হিজরি)দিল্লির লালকেল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহ (১৮০৬-৩৭ খ্রি:) ও সম্রাজ্ঞী লাল বাঈর দ্বিতীয় পুত্র। তার ঊর্ধ্বতন বংশ তালিকা বিশতম স্তরে গিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবুরের সাথে মিলেছে।

পিতার মৃত্যুর পর বাহাদুর শাহ (দ্বিতীয়) ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। প্রকৃতপক্ষে পিতামহ সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম (১৭৫৯-১৮০৬ খ্রি:) এবং পিতা সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহ উভয়ের মতো দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পেনশনভোগী ছিলেন। তিনি বার্ষিক ১ লাখ টাকা ভাতা পেতেন। পিতার মতো বাহাদুর শাহ নিজের ও মুঘল খান্দানের ভরণপোষণে ভাতা বৃদ্ধির জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু “বাদশাহ” উপাধি ত্যাগ এবং লালকেল্লার বাইরে সাধারণ নাগরিকের মতো জীবনযাপনের শর্তে তিনি রাজি হননি। এ ছাড়া সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন নিয়েও ইংরেজদের সঙ্গে সম্রাটের মনোমালিন্য হয়। সম্রাটের ক্ষমতা ও মর্যাদা খর্ব করতে নানা উদ্যোগ নেয় কোম্পানি। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও সম্পদ সব কিছু হারিয়ে সম্রাট প্রাসাদের চার দেয়ালের অভ্যন্তরে জীবন কাটাতে বাধ্য হলেন। এ সময় অমর্যাদার মনোবেদনা ভুলে থাকার জন্য তিনি গজলমুশায়েরায় নিমগ্ন থাকতেন ; লালকেল্লায় সাহিত্যের আসর বসিয়ে সময় কাটাতেন। তিনি নিজেও কবিতা লিখতেন। জীবনের কষ্ট ও বিষাদ তাঁর কবিতার মূল বিষয়। বাহাতাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে দু:খ ও বিষাদের সাথে দেশ ও জাতির পরাধীনতার কথা বিধৃত। একটি কবিদায় আছেঃ “উমর দরাজ মাঙ্গঁকে লায়েথে চার দিন দো আরজুমে কাট গয়ে, দো ইন্তেজার মেঁ।” যার অর্থ “চার দিনের জন্য আয়ু নিয়ে এসেছিলাম। দু’টি কাটল প্রত্যাশায় আর দু’টি অপেক্ষায়।”

সিপাহি বিদ্রোহ

বাহাদুর শাহ সিংহাসনে আরোহণের ২০ বছর পর সূত্রপাত হয় ঐতিহাসিক সিপাহি বিদ্রোহেরপলাশী যুদ্ধের পর ১০০ বছর কেটে গেছে তত দিনে। ছলেবলে কৌশলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সমগ্র ভারতবর্ষ দখল করে নিয়েছে। দেশবাসীর সাথে সৈন্য বিভাগের লোকদের ওপরও চলছে জুলুম, বঞ্চনা ও নির্যাতন। একের পর এক দেশীয় রাজ্য ইংরেজ অধিকারে নিয়ে যাওয়া, লাখেরাজ ও দেবোত্তর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, কারাগারে হিন্দু-মুসলমান সিপাহিদের জন্য একই খাবারের ব্যবস্খা, ঘিয়ের মধ্যে চর্বি ও আটার মধ্যে হাড়গুঁড়োর সংমিশ্রণ, গরু ও শূকরের চর্বি মিশ্রিত কার্তুজ বিতরণ ইত্যাদি ভারতবর্ষের জনমনে কিংবা সৈনিকদের মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ভারতীয় সিপাহিদের মধ্যে ধূমায়িত বিক্ষোভ ও অস্খিরতার প্রথম বহি:প্রকাশ ঘটে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের দমদম সেনাছাউনিতে। সিপাহিরা ইংরেজ অফিসারকে জানায়, এনফিল্ড রাইফেলের জন্য যে কার্তুজ তৈরি হয়, তাতে গরু ও শূকরের চর্বি মেশানো থাকে এবং এতে তাদের ধর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষ সিপাহিদের বুঝিয়ে শান্ত করে। কিন্তু খবরটি একে একে বিভিন্ন সেনাছাউনিতে পৌঁছে যায় এবং তা সিপাহিদের মধ্যে বিদ্রোহের রূপ ধারণ করে। প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে পশ্চিমবঙ্গের সহতস বহরমপুর সেনাছাউনিতে ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি। ১৯ নম্বর পদাতিক বাহিনীর সিপাহিরা কার্তুজ নিতে অস্বীকার করে, রাতে অস্ত্রাগারের দরজা ভেঙে পুরনো মাসকেট বন্দুক ও কার্তুজ সংগ্রহ করে। তারা ভীষণ উত্তেজিত অবস্খায় ছিল। পরিস্খিতি সামাল দিতে সিপাহিদের নিরস্ত্র ও বরখাস্ত করা হয়। এই সংবাদও দ্রুত পৌঁছে যায় বিভিন্ন সেনানিবাসে। ২৯ মার্চ রোববার ব্যারাকপুরের দেশীয় সিপাহিরা বিদ্রোহ করে। মঙ্গল পান্ডে নামের সিপাহি গুলি চালিয়ে ইংরেজ সার্জেন্টকে হত্যা করে। বিচারে মঙ্গল পান্ডে তাকে সহায়তার অভিযোগে জমাদার ঈশ্বরী পান্ডেকে দোষী সাব্যস্ত হবে। ৮ এপ্রিল সকাল ১০টায় তাদের ফাঁসি দেয়া হয়। এর পরিণতিতে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভারতের উত্তর থেকে মধ্যপ্রদেশ এবং জলপাইগুড়ি থেকে পূর্ববাংলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের চট্টগ্রাম পর্যন্ত। ৯ মে উত্তর প্রদেশের মিরাটের সিপাহিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন দিল্লির পথে অগ্রসর হন। ১১ মে সিপাহিরা দিল্লি অধিকার করে বহু ইংরেজকে হত্যা ও বিতাড়ন করেন। দেশপ্রেমিক সিপাহিরা এ দিন লালকেল্লায় প্রবেশ করে নামেমাত্র মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতের স্বাধীন সম্রাট বলে ঘোষণা করেন। সিপাহিরা সম্রাটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে শপথ নেন। এ দিন গভীর রাতে লালকেল্লায় একুশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে ৮২ বছরের বৃদ্ধ সম্রাটকে দেওয়ান-ই খানোস এ সম্মান জানানো হয়।

বাহাদুর শাহ জাফর সিপাহিদের বিপ্লব তথা ভারতবর্ষের প্রথম সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন­ এ সংবাদে কানপুর, লক্ষেîৗ, বিহার, ঝাঁশি, বেরিলি থেকে শুরু করে পশ্চিম ও পূর্ববাংলার সর্বত্র সিপাহিরা গর্জে ওঠে ‘খালক-ই খুদা, মুলক ই বাদশাহ, হুকুম ই সিপাহি।’ অর্থাৎ আল্লাহর দুনিয়া, বাদশার রাজ্য, সিপাহির হুকুম। একের পর সেনাছাউনিতে বিদ্রোহ হতে থাকে। ইংরেজরা অতি নির্মমভাবে বিদ্রোহ দমন করে। হাজার হাজার স্বাধীনতাকামীর রক্তে রঞ্জিত হয় ভারতবর্ষের মাটি। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষও বিক্ষুব্ধ ছিল। কিন্তু ভারতীয়দের এই সংগ্রাম সফল হতে পারেনি। ইংরেজরা দিল্লি দখল করে নেয় এবং সম্রাট ২১ সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পণ করেন। ইংরেজ সৈন্যরা মীর্জা মোগল, মীর্জা খিজির সুলতান, মীর্জা আবু বকরসহ ২৯ জন মুঘল শাহজাদাসহ বহু আমির ওমরাহ, সেনাপতি ও সৈন্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সম্রাটকে বিচারের নামে প্রহসনের আদালতে দাঁড় করানো হয়। হাজির করা হয় বানোয়াট সাক্ষী। বিচারকরা রায় দেন, দিল্লির সাবেক সম্রাট ১০ মে থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠনের দায়ে অপরাধী। তার শাস্তি চরম অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। কিন্তু তার বার্ধক্যের কথা বিবেচনা করে প্রাণ দণ্ডাদেশ না নিয়ে নির্বাসনে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়।

১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ অক্টোবর ৮৩ বছরের বৃদ্ধ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর, সম্রাজ্ঞী জিনাত মহল, দুই শাহজাদা, শাহজাদী এবং অন্য আত্মীয় ও ভৃত্যদের নিয়ে ইংরেজ গোলন্দাজ ও অশ্বারোহী বাহিনী দিল্লি ত্যাগ করে। ৯ ডিসেম্বর জাহাজ রেঙ্গুনে পৌঁছে। ব্রিটিশ বাহিনীর ক্যাপ্টেন নেলসন ডেভিসের বাসভবনের ছোট গ্যারেজে সম্রাট ও তার পরিবার-পরিজনের বন্দিজীবন শুরু হয়। সম্রাটকে শুতে দেয়া হয় একটা পাটের দড়ির খাটিয়ায়। ভারতের প্রিয় মাতৃভূমি থেকে বহু দূরে রেঙ্গুনের মাটিতে সম্রাটের জীবনের বাকি দিনগুলো চরম দু:খ ও অভাব অনটনের মধ্যে কেটেছিল। সম্রাট পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হলেন। এমন বিড়ম্বনাপূর্ণ জীবনের অবসান হয় ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ নভেম্বর, শুক্রবার ভোর ৫টায়। তবে সম্রাটকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে দাফন করা হয়। কবরটি বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য, যা একসময় নষ্ট হয়ে যাবে, ঘাসগুলো গোটা জায়গা আচ্ছাদিত করে ফেলবে। কোথায় সর্বশেষ মুঘল সম্রাট শায়িত আছেন, তার চিহ্নিও কেউ খুঁজে পাবে না। ইংরেজরা খুব ভালোভাবে জানত ভারতবর্ষের জনসাধারণের মনে এই সম্রাটের প্রভাব কতখানি। ভারতবর্ষের মানুষ সম্রাটের কবরে ফাতেহা পাঠ করতে রেঙ্গুন যান ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে। কিন্তু প্রথম প্রচেষ্টা সফল হয়নি। পরে তার আসল কবর আবিষ্কৃত ও সমাধিসৌধ নির্মিত হয়। সম্রাটের প্রিয়তমা স্ত্রী জিনাত মহল মারা যান ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে। সম্রাটের পাশেই রয়েছে তার সমাধি। সম্রাট ও তার প্রিয়জনদের সমাধি হয়ে উঠেছে যুগ যুগ ধরে দেশপ্রেমিকদের তীর্থ স্খানের মতো। সম্রাটের ইচ্ছা ছিল স্বদেশের মাটিতে সমাহিত হওয়া। জন্মভূমির প্রতি ছিল প্রচণ্ড অনুরাগ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন জীবনের শেষ সময় ঘনিয়ে আসছে। স্বদেশের মাটিতে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ কিংবা সমাহিত হওয়ার সাধ কোনোটাই পূরণ হবে না। নিদারুণ দু:খে তিনি লিখেছেন একের পর এক কালোত্তীর্ণ কবিতা। তারই একটি­ নিম্নরূপঃ

মরনেকে বাদ ইশ্ক্ব মেরা বা আসর হুয়া উড়নে লাগি হ্যায় খাক মেরি ক্যোয়ি ইয়ার মে; কিৎনা বদনসিব জাফর দাফনকে লিয়ে দোগজ জামিন ভি মিলানা চুকি ক্যোয়ি ইয়ার মে

ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মায়ানমার সফরে গিয়ে তার সমাধি সৌধ পরিদর্শন করেন ।সে সময় তিনি পরিদর্শক বইতে লিখেছিলেন

“দু গজ জমিন তো না মিলি হিন্দুস্তান মে , পার তেরী কোরবানী সে উঠি আজাদী কি আওয়াজ, বদনসীব তো নাহি জাফর, জুড়া হ্যায় তেরা নাম ভারত শান আউর শওকত মে, আজাদী কি পয়গাম সে”।

বাংলায় অনুবাদ করলে দাড়ায়;

“হিন্দুস্তানে তুমি দু গজ মাটি পাও নি সত্য।তবে তোমার আত্মত্যাগ থেকেই আমাদের স্বাধীনতার আওয়াজ উঠেছিল। দুর্ভাগ্য তোমার নয় জাফর, স্বাধীনতার বার্তার মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষের সুনাম ও গৌরবের সঙ্গে তোমার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে”

বাংলার নবাবগণ ছিলেন বাংলাবিহারউড়িষ্যার শাসকগণ। ১৭১৭ থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত তারা সার্বভৌম বাংলার প্রধান হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। পদটি মুঘল আমলে পুরুষানুক্রমিকভাবে নাজিম ও সুবেদার থেকে সৃষ্টি হয়েছিল এবং পরবের্তিতে তারা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলসমূহে স্বাধীনভাবে শাসণ করেছিলেন।বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা পলাশীর যুদ্ধে মীরজাফর কর্তৃক প্রতারিত হন। তিনি ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হন যারা ১৭৫৭ সালে বাংলা অধিগ্রহণ করে মীর জাফরকে ক্ষমতায় বসান এবং একটি রাজনৈতিক ধারা প্রবর্তন করেন।

১৭৬৫ সালে দুটি সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় যেখানে নবাবগণ ব্রিটিশদের অধীণে শাসণ করতেন এবং তারা ব্রিটিশদের হাতের পুতুল ছিলেন। ১৭৭২ সালে ধারাটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে শাসণ ব্যবস্থা সরাসরি ব্রিটিশদের অধীনে নেওয়া হয়। ১৭৯৩ সালে নবাবদের কাছ থেকে নিজামত (গভর্নর) অধিকারও প্রত্যাহার করা হয়, তখন তাদের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে শুধু সামান্য অবসরকালীন ভাতা দেওয়া হত। বাংলার শেষ নবাব মনসুর আলী খান ১৮৮০ সালের ১লা নভেম্বর তার জেষ্ঠ্য পুত্রের জন্য ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করেন।

মনসুর আলী খানের পদত্যাগের পর মুর্শিদাবাদের নবাব ও বাংলার নবাব, মুর্শিদাবাদের নবাব বাহাদুর হিসেবে পরিচিতি পান যেহেতু ১৮৮০ সালে বাংলার নবাব উপাধিটি বিলুপ্ত হয়েছিল। সেসময় রাজস্ব আদায়ে তাদের খুবই কম বা অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব ছিল না বললেই চলে এবং তারা বল প্রয়োগ থেকেও বিরত ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর রাজ্যসমূহের ভারত বা পাকিস্তানের অঙ্গীভূত হওয়ার বাধ্যবাধাকতা ছিল। এটা উল্লেখ করা যেতে পারে যে মর্শিদাবাদ (রাজধানী শহর) দুদিনের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের অঙ্গীভূত হয়েছিল, কারণ এখানে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। ১৯৪৭ সালের ১৭ই আগস্ট এটি ভারতের অঙ্গীভূত হয়। হাজারদুয়ারী প্রাসাদ থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে তেরঙা ভারতের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ভারতের সাথে একত্রীত হওয়ার পর এসব রাজ্যসমূহের ক্ষমতা খর্ব হয়ে যায় কারণ ভারত সরকার সকল রাজ্যসমূহের কর্তৃত নিয়েছিল। ১৯৬৯ সালে শেষ নবাব ওয়ারিস আলী মির্জার সাথে সাথে নাবাব উপাধিটিও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। যদিও তিনি তিনজন ছেলে ও তিনজন মেয়ে রেখে গিয়েছিলেন কিন্তু তার মৃত্যুর পূর্বে কোন উত্তরাধীকারী ঘোষণা না করে যাওয়ার দরুন নবাব উপাধিটিও এখানেই সমাপ্তি ঘটে।

বাংলার নবাবদের তালিকা

নিম্নের তালিকাটি বাংলার নবাবদের একটি তালিকা। সরফরাজ খান ও মীর মুহাম্মদ জাফর আলী খান বাহাদুর দুইবার করে বাংলার নবাব ছিলেন। ধারাটি ১৭১৭ সালে মুর্শিদ কুলি খানের আমলে শুরু হয়েছিল এবং ১৮৮১ সালে মনসুর আলী খানের সাথে সাথে ধারাটি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

  উপাধি ব্যক্তিগত নাম জন্ম রাজত্ব মৃত্যু
নাসিরি রাজবংশ
জাফর খান বাহাদুর নাসিরি মুর্শিদ কুলি খান ১৬৬৫ ১৭১৭– ১৭২৭ জুন ৩০, ১৭২৭
আলাউদদীন হায়দার জং সরফরাজ খান বাহাদুর ? ১৭২৭-১৭২৭ এপ্রিল ২৯, ১৭৪০
সুজা উদদৌলা সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান ১৬৭০-এর সময়কাল (তারিখ পাওয়া যায়নি) জুলাই, ১৭২৭ – আগস্ট ২৬, ১৭৩৯ আগস্ট ২৬, ১৭৩৯
আলাউদদীন হায়দার জং সরফরাজ খান বাহাদুর ? মার্চ ১৩, ১৭৩৯ – এপ্রিল ১৭৪০ এপ্রিল ২৯, ১৭৪০
আফসার রাজবংশ
হাশিম উদদৌলা মুহাম্মদ আলীবর্দী খাঁন বাহাদুর ১০ই মে-এর পূর্বে, ১৬৭১ এপ্রিল ২৯, ১৭৪০ – এপ্রিল ৯, ১৭৫৬ এপ্রিল ৯, ১৭৫৬
সিরাজদ্দৌলা মুহাদ্মদ সিরাজদ্দৌলা ১৭৩৩ এপ্রিল ১৭৫৬ – জুন ২, ১৭৫৭ জুলাই ২, ১৭৫৭
নাজাফি রাজবংশ
জাফর আলী খান বাহাদুর মীর মুহাম্মদ জাফর আলী খান বাহাদুর ১৬৯১ জুন ১৭৫৭ – আক্টোবর ১৭৬০ জানুয়ারি ১৭, ১৭৬৫
ইতিমাদ উদদৌলা মীর কাশিম আলী খান বাহাদুর ? অক্টোবর ২০, ১৭৬০ – ১৭৬৩ মে ৮, ১৭৭৭
জাফর আলী খান বাহাদুর মীর মুহাম্মদ জাফর আলী খান বাহাদুর ১৬৯১ জুলাই ২৫, ১৭৬৩ – জানুয়ারি ১৭, ১৭৬৫ জানুয়ারি ১৭, ১৭৬৫
নজম উদদৌলা নাজিম উদ্দিন আলী খান বাহাদুর ১৭৫০ ফেব্রুয়ারি ৫, ১৭৬৫ – মে ৮, ১৭৬৬ মে ৮, ১৭৬৬
সাইফ উদদৌলা নাজাবুত আলী খান বাহাদুর ১৭৪৯ মে ২২, ১৭৬৬ – মার্চ ১০, ১৭৭০ মার্চ ১০, ১৭৭০
মুবারক উদদৌলা আশরাফ আলী খান বাহাদুর ১৭৫৯ মার্চ, ১৭৭০ – সেপ্টেম্বর ৬, ১৭৯৩ সেপ্টেম্বর ৬, ১৭৯৩
আজাদ উদদৌলা বাবর আলী খান বাহাদুর ? ১৭৯৩ – এপ্রিল ২৮, ১৮১০ এপ্রিল ২৮, ১৮১০
আলী জা জাইন উদ্দিন আলী খান বাহাদুর ? জুন ৫, ১৮১০ – আগস্ট ৬, ১৮২১ আগস্ট ৬, ১৮২১
ওয়াল্লা জা আহমেদ আলী খান বাহাদুর ? ১৮১০ – আক্টোবর ৩০, ১৮২৪ আক্টোবর ৩০, ১৮২৪
হুমায়ুন জা মুবারক আলী খান বাহাদুর সেপ্টেম্বর ২৯, ১৮১০ ১৮২৪ – অক্টোবর ৩, ১৮৩৮ অক্টোবর ৩, ১৮৩৮
ফেরাদুন জা মনসুর আলী খান বাহাদুর অক্টোবর ২৯, ১৮৩০ অক্টোবর ২৯, ১৮৩৮ – নভেম্বর ১, ১৮৮০ (পদত্যাগ) নভেম্বর ৫, ১৮৮৪

মুর্শিদাবাদের নবাবদের তালিকা

১৮৮০ সালে বাংলার নাবাব উপাধিটি বিলুপ্ত হওয়ার পর, ১৮৮১ সালে বাংলার নাবাব পদটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়। পরবর্তিতে মুর্শিদাবাদের নবাব উপাধিটি চালু হয়। মুর্শিদাবাদের তিনজন নবাব ছিলেন, নিম্নে তাদের তালিকা দেওয়া হল:

  উপাধি ব্যক্তিগত নাম জন্ম রাজত্ব মৃত্যু
নাজাফি রাজবংশ
আলী কাদির হাসান আলী মির্জা খান বাহাদুর আগস্ট ২৫, ১৮৪৬ ফেব্রুয়ারি ১৭, ১৮৮২ – ডিসেম্বর ২৫, ১৯০৬ ডিসেম্বর ২৫, ১৯০৬
আমীর উলউমরা ওয়াসিফ আলী মির্জা খান বাহাদুর জানুয়ারি ৭, ১৮৭৫ ডিসেম্বর ১৯০৬–২৩শে অক্টোবর ১৯৫৯ ২৩শে অক্টোবর ১৯৫৯
রেইস উদদৌল্লা ওয়ারিস আলী মির্জা খান বাহাদুর নম্বের ১৪, ১৯০১ ১৯৫৯ – নভেম্বর ২০, ১৯৬৯ ( কোনো সুস্পষ্ট উত্তরাধিকারী ছিল না/শিরোনাম বিতর্কিত) নভেম্বর ২০, ১৯৬৯

মুর্শিদ কুলি খান ছিলেন বাংলার প্রথম নবাব। এছাড়াও বিভিন্ন নথি-পত্র নির্দেশ করে তিনিই মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুপরবর্তী প্রথম স্বাধীন নবাব। তার উপর মুঘল সাম্রাজ্যের নামমাত্র আধিপত্য ছিল, সকল ব্যবহারিক উদ্দেশ্যেই তিনি বাংলার নবাব ছিলেন।

তার পরিবার সম্পর্কে কয়েক প্রকার মতভেদ রয়েছে। প্রথম সংস্করণমতে মুর্শিদ কুলি খানকে, হাজি শফি ইসফাহানি নামে ইরানের একজন উচ্চপদস্থ মুঘল কর্মকর্তা ক্রীতদাস হিসেবে ক্রয় করেন। ইসফাহানিই তাকে শিক্ষিত করে তুলেন। ভারতে ফেরার পর তিনি মুঘল সাম্রাজ্যে যোগদান করেন। ১৭১৭ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে কার্তালাব খান নামে ইসলাম ধর্মে স্থানান্তরিত করেন ও বাংলার গভর্নর নিযুক্ত করেন। অপর সংস্করনমতে তিনি ছিলেন, মারাঠা জেনারেল মুহাম্মদ কুলি খানের নাতি। কিন্তু সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো মুর্শিদ কুলি খান দরিদ্র দাক্ষিণাত্য মালভূমি ওড়িয়া ব্রাহমীয় পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হওয়ার পূর্বেই পারস্যের বণিক ইসফাহান তাকে ক্রয় করে ইসলাম ধর্মে স্থানান্তরিত করেন এবং নাম পরিবর্তন করে মুহাম্মদ হাদী বা মির্জা হাদী রাখেন। তিনি বেরার প্রদেশের দেওয়ান হাজী আব্দুল্লাহ কুরাইশির অধীনে চাকরী নেন। পরবর্তীতে বেরার প্রদেশের দেওয়ান সম্রাট আওরঙ্গজেবের অধীনে চলে আসে।

সরফরাজ খান (মৃত্যু: এপ্রিল ২৯, ১৭৪০) ছিলেন বাংলার একজন নবাব। তার আসল নাম মির্জা আসাদুল্লাহ। সরফরাজ খানের নানা নবাব মুর্শিদ কুলি খান সরফরাজকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার নবাব বা তার উত্তরাধীকারী মনোনীত করেন। ১৭২৭ সালে মুর্শিদ কুলি খানের মৃত্যুর পর যখন তিনি সিংহাসনে আরোহন করবেন তখন জানতে পারেন তার পিতা ওড়িশার সবেদার সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান ও তার ডেপুটি আলীবর্দী খাঁ বিশাল বাহিনী নিয়ে সিংহাসন দখলের জন্য মুর্শিদাবাদ অগ্রসর হচ্ছে। পরিবারের মধ্যে কলহ এড়ানোর জন্য দেওজার বেগম সরফরাজকে তার পিতার সম্মানে সিংহাসন ছেড়ে দিতে বলেন। যাইহোক পরবর্তীতে সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান তার উত্তরাধীকারী হিসেবে সরফরাজকেই মনোনীত করেন এবং ১৭৩৯ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি সিংহাসনে আরোহন করেন। সিংহাসনে বসার পর তিনি আলা উদ্দিন হাইদার জং উপাধি ধারন করেন।

সরফরাজ খানের দুর্ভাগ্য যে তিনি আলীবর্দী খাঁর মত একজন প্রতিপক্ষ পেয়েছিলেন যার ৭০ বছর বয়সেও নেতৃত্ত্ব দেওয়ার অসাধারন গুন ছিল এবং তিনি সরফরাজ খানের দূর্বলতাগুলো জানতেন। সরফরাজ খান ভাগীরথী নদীর তীরে গিরকার যুদ্ধে নিহত হন। তার প্রতিপক্ষ আজিমাবাদের (বর্তমান পাটনা) সুবেদার আলীবর্দী তাকে সরাসরি যুদ্ধে পরাজিত করেন। যুদ্ধটি ক্ষণস্থায়ী ছিল কিন্তু এর ভয়াভহতা ছিল মারাত্বক। যুদ্ধের প্রথম দিকেই সরফরাজ খান গুলিবিদ্ধ হন কিন্তু তার সেনাবাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত আলীবর্দী খানের নিপুন রণকৌশলের কাছে সর ফরাজের সেনাবাহিনী পরাজিত হয়।

প্রাথমিক ছত্রভঙ্গের কারন ছিল সরফরাজ খান কখনো আলীবর্দী খাঁর কাছ থেকে এরকম যুদ্ধ আশা করেন নি এবং আলীবর্দী খাঁ সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য সরফরাজকে সময় দেন নি। সিংহাসনে বসার ১৩ মাসের মাথায়ই তিনি আক্রমন করেন। অপর দিকে সরফরাজ খান আরো বড় হুমকি নাদির শাহকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন যিনি দিল্লি ও পাঞ্জাব আক্রমন করেছিলেন।

সরফরাজ খান মৃত্যুর সময় পাঁচ পুত্র ও পাঁচ কন্যা রেখে যান যারা কখনো কষমতা গ্রহন করতে পারেন নি। আলীবর্দী খাঁ বাংলার নবাব হিসেবে অভিষিক্ত হন ও একই সাথে মুর্শিদ কুলির নাসিরি রাজবংশের পতন ঘটে। আলীবর্দী খাঁ আফসার রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। সরফরাজ খানকে মুর্শিদাবাদের নাগিনাবাগে সমাধিস্থ করা হয়।

সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান ছিলেন বাংলার একজন নবাব। তিনি মুর্শিদ কুলি খানের কন্যা জয়নব উন-নিসা বেগম ও আজমত উন-নিসা বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। তার তৃতীয় স্ত্রীর নাম দুরদানা বেগম সাবিহা। ৩০শে জুন ১৭২৭ সালে তার শ্বশুর মুর্শিদ কুলি খানের মৃত্যুর পর তিনি নবাব সিংহাসনে আরোহন করেন।

তিনি দেক্কানের বুরহানপুরে মির্জা সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান (মির্জা দেক্কানী) নামে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম নবাব জান মুহাম্মদ খান (মির্জা নূর উদ্দিন খান)। তিনি ১৭১৯ সালে ওড়িশার সুবেদার (প্রাদেশিক শাসক) হিসেবে নিয়োগ পান। এছাড়াও তিনি ১৭২৭ সালের জুলাইয়ে বাংলা ও ১৭৩১ সালে বিহারের সুবেদার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। সুবেদার উপাধিটি মুঘল শাসনামল থেকে প্রচলিত।

সরাসরি উত্তারাধীকারী না থাকায় মুর্শিদ কুলি খান তার নাতি সুজাউদ্দিনের পুত্র সরফরাজ খানকে সিংহাসনের জন্য মনোনীত করেন। মুর্শিদ কুলি খান ১৭২৭ সালে মৃত্যুবরন করনে ও সরফরাজ খানের সিংহাসন লাভের উপক্রম হয়।

এদিকে সুজা উদ্দিন ছিলেন ওড়িশার সুবেদার ও তার ডেপুটি ছিলেন আলীবর্দী খাঁ। মুর্শিদ কুলি খান সাধারনত সুজা উদ্দিনের জনগনের জন্য গৃহীত সর্বব্যাপী নীতিকে সমর্থন করতেন না। পূর্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী যখন সরফরাজ খানকে সিংহাসনের উত্তারীধার হিসেবে ঘোষনা করা হয় তখন সুজাউদ্দিন নিজ পুত্রের অধীনে চাকরী করতে বিরক্ত ছিলেন। আলীবর্দী খাঁ ও তার ভাই হজি, সুজা উদ্দিনকে বলেন এই পদের জন্য তিনিই সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি। আলীবর্দী খাঁ ও হাজির সাহায্যে সুজাউদ্দিন সিংহাসন দখলের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এছাড়াও তিনি মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহ-এর সাহায্য পেয়েছিলেন, সম্রাট তাকে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলার নবাবদের রাজধানী মুর্শিদাবাদের দিকে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে গমন করেন। পরিবারের মধ্যে কলহ এড়ানোর জন্য তখন মুর্শিদ কুলি খানের স্ত্রী বৈঠক করেন ও সরফরাজ খান পিতা সুজাউদ্দিনকে সম্মান প্রদর্শনপূর্বক সিংহাসনে বসতে অস্বীকৃতি জায়ায়। ১৭২৭ সালের আগস্টের দিকে সুজা উদ্দিন পরিপূর্ণভাবে সিংহাসন লাভ করেন ও বাংলার দ্বিতীয় নবাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।

সুজাউদ্দিনকে সমর্থন করার স্বীকৃতি স্বরুপ তিনি মুঘল সম্রাটের কাছে বিপুল পরিমান উপঢৌকন পাঠান। মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহ পরিবর্তে তাকে মুতামুল মুলক (দেশের কর্তা), সুজাউদৌলা (রাষ্ট্রের নায়ক) ও আসাদ জং (যুদ্ধের সিংহ) উপাধিতে ভূষিত করেন। এছাড়াও মুঘল সম্রাট থাকে বিভিন্ন দামি উপঢৌকন দিয়ে সম্মান জানান।

১৭৩২ সালের দিকে নাদের শাহকে নিয়ে একটি উদ্বেগ ছড়িয়ে পরে। সুজাউদ্দিন অসুস্থ হয়ে পরেন ও মৃত্যুভয়ে তিনি তার পুত্র ও দুরদানা বেগমকে ওড়িশা পাঠিয়ে দেন। এছাড়াও তিনি সরফরাজ খানকে তার উত্তারীকারী হিসেবে মনোনীত করেন। তিনি সবসময় সরফরাজ খানকে হাজি আহমেদ, আলম চাদ ও জগতশেঠের উপদেশ মেনে নিতে বলতেন যদিও সরফরাজ তাদের পছন্দ করতেন না। ২৬শে আগস্ট ১৭৩৯ সালে তিনি মৃত্যুবরন করেন। তিনি দুই পুত্র ও দুই কন্যা রেখে যান। তাকে মুর্শিদাবাদের রোশনিবাগে সমাধিস্থ করা হয়। তার মৃত্যুর পর পুত্র সরফরাজ খান সিংহাসনে বসেন এবং এ সময়ই নাদের শাহ দিল্লি আক্রমন করেন।

সুজা উদ্দিন অত্যন্ত সম্বৃধিশীল একটি দেশ রেখে যান ও তার পুত্র ভালোভাবেই দেশ পরিচালনা করেন। নাসিরি রাজবংশ আরো ১৩ মাস স্থায়ী ছিল এবং সরফরাজ খানের সাথে সাথে এই রাজবংশেরও সমাপ্তি ঘটে।

সরফরাজ খান (মৃত্যু: এপ্রিল ২৯, ১৭৪০) ছিলেন বাংলার একজন নবাব। তার আসল নাম মির্জা আসাদুল্লাহ। সরফরাজ খানের নানা নবাব মুর্শিদ কুলি খান সরফরাজকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার নবাব বা তার উত্তরাধীকারী মনোনীত করেন। ১৭২৭ সালে মুর্শিদ কুলি খানের মৃত্যুর পর যখন তিনি সিংহাসনে আরোহন করবেন তখন জানতে পারেন তার পিতা ওড়িশার সবেদার সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান ও তার ডেপুটি আলীবর্দী খাঁ বিশাল বাহিনী নিয়ে সিংহাসন দখলের জন্য মুর্শিদাবাদ অগ্রসর হচ্ছে। পরিবারের মধ্যে কলহ এড়ানোর জন্য দেওজার বেগম সরফরাজকে তার পিতার সম্মানে সিংহাসন ছেড়ে দিতে বলেন। যাইহোক পরবর্তীতে সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান তার উত্তরাধীকারী হিসেবে সরফরাজকেই মনোনীত করেন এবং ১৭৩৯ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি সিংহাসনে আরোহন করেন। সিংহাসনে বসার পর তিনি আলা উদ্দিন হাইদার জং উপাধি ধারন করেন।

সরফরাজ খানের দুর্ভাগ্য যে তিনি আলীবর্দী খাঁর মত একজন প্রতিপক্ষ পেয়েছিলেন যার ৭০ বছর বয়সেও নেতৃত্ত্ব দেওয়ার অসাধারন গুন ছিল এবং তিনি সরফরাজ খানের দূর্বলতাগুলো জানতেন। সরফরাজ খান ভাগীরথী নদীর তীরে গিরকার যুদ্ধে নিহত হন। তার প্রতিপক্ষ আজিমাবাদের (বর্তমান পাটনা) সুবেদার আলীবর্দী তাকে সরাসরি যুদ্ধে পরাজিত করেন। যুদ্ধটি ক্ষণস্থায়ী ছিল কিন্তু এর ভয়াভহতা ছিল মারাত্বক। যুদ্ধের প্রথম দিকেই সরফরাজ খান গুলিবিদ্ধ হন কিন্তু তার সেনাবাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত আলীবর্দী খানের নিপুন রণকৌশলের কাছে সর ফরাজের সেনাবাহিনী পরাজিত হয়।

প্রাথমিক ছত্রভঙ্গের কারন ছিল সরফরাজ খান কখনো আলীবর্দী খাঁর কাছ থেকে এরকম যুদ্ধ আশা করেন নি এবং আলীবর্দী খাঁ সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য সরফরাজকে সময় দেন নি। সিংহাসনে বসার ১৩ মাসের মাথায়ই তিনি আক্রমন করেন। অপর দিকে সরফরাজ খান আরো বড় হুমকি নাদির শাহকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন যিনি দিল্লি ও পাঞ্জাব আক্রমন করেছিলেন।

সরফরাজ খান মৃত্যুর সময় পাঁচ পুত্র ও পাঁচ কন্যা রেখে যান যারা কখনো কষমতা গ্রহন করতে পারেন নি। আলীবর্দী খাঁ বাংলার নবাব হিসেবে অভিষিক্ত হন ও একই সাথে মুর্শিদ কুলির নাসিরি রাজবংশের পতন ঘটে। আলীবর্দী খাঁ আফসার রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। সরফরাজ খানকে মুর্শিদাবাদের নাগিনাবাগে সমাধিস্থ করা হয়।

নবাব আলীবর্দী খাঁ, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার মাতামহ। নবাব সিরাজউদ্দৌলা নবার আলীবর্দী খাঁর উত্তরসূরি হন।

আলীবর্দী খাঁ বাংলা, বিহার, ওড়িশার নবাব ছিলেন। তার পূর্ণ নাম মির্জা মুহাম্মদ আলী। তার পিতার নামদ মির্জা মুহাম্মাদ। আরব বংশোদ্ভূত মির্জা মুহাম্মদ আজম শাহের (আওরঙ্গজেবের দ্বিতীয় পুত্র) দরবারের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। আলীবর্দী খাঁর মা খুরসানের এক তুর্কি উপজাতি হতে এসেছিলেন। তার পিতামহ আওরঙ্গজেবের সৎ ভাই ছিলেন। পূর্ণ বয়স্ক হবার সাথে সাথে আজম শাহ তাকে পিলখানার পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন।

১৭০৭ এর যুদ্ধে আজম শাহের মৃত্যুর পর চাকরি চলে যাওয়ার মির্জা মুহাম্মদ আলীর পরিবার সমস্যার সম্মুখীন হয়। তখন, বাকি জীবনের জন্য তিনি সপরিবারে ১৭২০ সালে বাংলায় চলে আসেন। কিন্তু বাংলার তৎকালীন নবাব মুর্শিদকুলী খান তাকে গ্রহণ করেন নাই। ফলে, মির্জা মুহাম্মদ আলী চুতাকে গমন করেন, যেখানে সুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খান তাকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন। সুজাউদ্দিন তাকে মাসিক ১০০ রুপি বেতনের চাকুরিতে নিয়োগ দান করেন। তার কাজ ও বিশ্বস্ততায় খুশি হয়ে তিনি তাকে পদোন্নতি দেন। বিশেষ করে তাকে ওড়িশার কিছু জমিদারির তদারকি দান করেন।

ওড়িষ্যাতে মির্জা মুহাম্মদ আলী প্রশাসনিক দক্ষতা লাভ করেন। ওড়িশার সন্তোষজনক দ্বায়িত্ব পালন ছাড়াও সুজাউদ্দিনের শ্বশুর মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যুর পর বাংলার মসনদ রক্ষায় সুজাউদ্দিনকে তিনি সাহায্য করেন। ফলশ্রুতিতে মির্জা মুহাম্মদ আলীকে চাকলা আকবরনগর (রাজমহল) এর ফৌজদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৭২৮ সালে তাকে আলীবর্দি উপাধি দেওয়া হয়। নতুন ফৌজদারের অধীনে রাজমহলের জনগন শান্তি ও সমৃদ্ধি লাভ করে। প্রদেশের প্রায় সকল ক্ষেত্রে আলীবর্দি সুজাউদ্দিনের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। নবাব তার প্রতি এমন নির্ভরশীল হয়ে পড়েন যে, বছরে একবার রাজমহল থেকে মুর্শিদাবাদে তার ডাক পড়ত।

১৭৩২ সালে সম্রাট মুহাম্মদ শাহ বিহারকে বাংলা সুবার অধীনে নিয়ে আসেন। কিন্তু নবাব সুজাউদ্দিন সম্পূর্ণ অঞ্চল নিজের অধীনে রাখার থেকে, আলীবর্দীকে বিহারের নিজাম হিসেবে নিয়োগ দেবার সিদ্ধান্ত নেন। কিছু দিন আগে আলীবর্দির কনিষ্ঠ কন্যা আমিনা বেগম তার কনিষ্ঠ ভাতিজা জৈনুদ্দিন আহমেদ খানকে বিয়ে করেন। আমিনা বেগমের গর্ভেই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার জন্ম হয়। আলীবর্দীর নিজের কোন পুত্র সন্তান ছিল না। আলীবর্দী সিরাজউদ্দৌলাকে তার উত্তরসূরি ঘোষণা করেন।

নবাব সিরাজদৌল্লা বা মিরজা মুহাম্মাদ সিরাজদৌল্লা ( জন্ম: ১৭৩২ – মৃত্যু: ১৭৫৭) বাংলাবিহারউড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব। পলাশীর যুদ্ধে তাঁর পরাজয় ও মৃত্যুর পরই ভারতবর্ষে ইংরেজ-শাসনের সূচনা হয়।

নবাব সিরাজদৌল্লা ছিলেন বাংলার নবাব আলীবর্দী খান-এর নাতি। আলীবর্দী খানের কোন পুত্র ছিল না। তাঁর ছিল তিন কন্যা। তিন কন্যাকেই তিনি নিজের বড়ভাই “হাজি আহমদ”-এর তিন পুত্র, নোয়াজেশ মোহাম্মদের সাথে বড় মেয়ে ঘসেটি বেগমের, সাইয়েদ আহম্মদের সাথে মেঝ মেয়ে এবং জয়েনউদ্দিন আহম্মদের সাথে ছোট মেয়ে আমেনা বেগম-এর বিয়ে দেন। আমেনা বেগমের দুই পুত্র ও এক কন্যা ছিল। পুত্ররা হলেন মির্জা মোহাম্মদ (সিরাজদ্দৌলা) এবং মির্জা মেহেদী। আলীবর্দী খাঁ যখন পাটনার শাসনভার লাভ করেন, তখন তাঁর তৃতীয়া কন্যা আমেনা বেগমের গর্ভে মির্জা মোহাম্মদ (সিরাজ উদ দৌলা) -এর জন্ম হয়। এ কারণে তিনি সিরাজের জন্মকে সৌভাগ্যের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে আনন্দের আতিশয্যে নবজাতককে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। সিরাজ তার নানার কাছে ছিল খুবই আদরের, যেহেতু তার কোনো পুত্র ছিলনা। তিনি মাতামহের স্নেহ-ভালোবাসায় বড় হতে থাকেন। সিরাজদ্দৌলার জন্মতারিখ বা সাল নিয়ে সামান্য ভেদাভেদ আছে। তবে অধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো ১৭৩২ সাল। মীরজাফর তার কোন আত্বীয়ের মাঝে পড়েন না। কাজী ইসা তার চাচা হয়।

১৭৪৬ সালে আলিবর্দী খান মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেল কিশোর সিরাজ তার সাথী হন। আলিবর্দি সিরাজদ্দৌলাকে বালক বয়সেই পাটনার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর বয়স অল্প ছিল বলে রাজা জানকীরামকে রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু বিষয়টি সিরাজদ্দৌলাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তাই তিনি একদিন গোপনে কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচরকে নিয়ে ভ্রমণের নাম করে স্ত্রী লুৎফুন্নেসাকে সঙ্গে নিয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে বের হয়ে পড়েন। তিনি সোজা পাটনা গিয়ে উপস্থিত হন এবং জানকীরামকে তাঁর শাসনভার ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু নবাবের বিনা অনুমতিতে জানকীরাম তাঁর শাসনভার ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান। দুর্গের দ্বার বন্ধ করে বৃদ্ধ নবাবের কাছে বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে দূত পাঠান। অন্যদিকে জানকীরামের আচরণে ভীষণ ক্ষুদ্ধ হয়ে সিরাজদ্দৌলা দুর্গ আক্রমণ করেন। উভয়পক্ষে লড়াই শুরু হয়ে গেলে হতাহতের ঘটনাও ঘটে। ঘটনার সংবাদ পেয়ে আলিবর্দি খাঁ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছান এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন। সেদিনই আলিবর্দি খাঁ দুর্গের অভ্যন্তরস্থ দরবারে স্নেহভাজন দৌহিত্রকে পাশে বসিয়ে ঘোষণা দেন,

আমার পরে সিরাজদ্দৌলাই বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মসনদে আরোহণ করবে।

ইতিহাসে এই ঘটনাকে সিরাজদ্দৌলার যৌবরাজ্যাভিষেক বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই সময়ে সিরাজদ্দৌলার বয়স ছিল মাত্র সতেরো বছর। তবে তাঁকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন করার ঘটনা তাঁর আত্নীয়বর্গের অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। অনেকেই তাঁর বিরোধিতা শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিলেন আলিবর্দি খাঁর বড় মেয়ে ঘসেটি বেগম এবং তার স্বামী নোয়াজেশ মোহাম্মদ। এছাড়া আলিবর্দী খানের জীবদ্দশায় সিরাজদ্দৌল্লা ঢাকার নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তার অনুজ ভ্রাতা ইকরামউদ্দৌল্লা ছিলেন সামরিক বাহিনীর দায়িত্বে।

মুর্শিদকুলী খানের জামাতা সুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খান ১৭২৭ থেকে ১৭৩৯ পর্যন্ত সুবাহ বাংলার নবাব হিসেবে মুর্শিদাবাদ থেকে বাংলা শাসন করছিলেন। তাঁর সময়ে তাঁর পুত্র সরফরাজ খান ১৭৩৪ থেকে ১৭৪০ পর্যন্ত ঢাকার নায়েব নাজিম এবং ১৭৩৯ থেকে ১৭৪০ পর্যন্ত মুর্শিদাবাদের নবাবের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় (১৭৩৯-১৭৪০) ঢাকার নায়েব নাজিম হন আবুল ফাত্তাহ খান। প্রসঙ্গত, ১৭১৭ সালে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানানত্মরের সময় থেকেই নবাবগণ মুর্শিদাবাদে অবস্থান করতেন আর বাংলাদেশের জন্য তখন থেকেই একজন নায়েব নাজিম নিযুক্ত করা হতো। ১৭৪০ থেকে ১৭৪৪ পর্যন্ত আলীবর্দী খানের ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা নওয়াজিশ মুহাম্মদ খান নায়েব নাজিম নিযুক্ত হন। তবে তিনি মুর্শিদাবাদে অবস্থান করে তাঁর সহকারী হোসেন কুলী খান এবং হোসাইন কুলীর সহকারী হোসেন উদ্দিন খানকে (১৭৪৪-১৭৫৪) ঢাকায় দায়িত্ব পালন করান। এ সময় থেকেই আলীবর্দীর ভ্রাতুষ্পুত্র শাহামৎ জং নওয়াজিস মুহাম্মদের বিরোধ দেখা দেয়। এ বিরোধের জের হিসেবে ঢাকায় হোসেন উদ্দিন খান এবং মুর্শিদাবাদে তদীয় চাচা নিহত হন। ঢাকায় হোসেন উদ্দিন খানকে হত্যায় জড়িত ছিলেন আগা সাদেক এবং আগা বাখের। আগা বাখের ছিলেন বাখরগঞ্জের জমিদার এবং তাঁর পুত্র আগা সাদেক। হোসেন উদ্দিন খানের একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে আগা সাদেক মুর্শিদাবাদে হোসেন কুলী খান কর্তৃক বন্দী হন। সেখান থেকে ঢাকায় পালিয়ে এসে তিনি হোসেন কুলী খানকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। অত্যন্ত সৎ এবং ধার্মিক হোসেন কুলী খানকে রাতের আঁধারে তাঁর প্রাসাদে প্রবেশ করে হত্যা করা হয়। সকাল বেলা ঘটনাটি জানাজানি হয়ে গেলে শহরের অধিবাসীগণ একত্রিত হয়ে মারমুখী হয়ে ওঠে এবং আগা বাখের ও তদীয় পুত্রকে আক্রমণ করে। তারা নায়েব নাজিমের পদে নিয়োগের বিষয় বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করলে লোকেরা নায়েব নাজিম পদে নিয়োগের সনদ প্রদর্শনের দাবি করে।তা প্রদর্শন না করে তারা তরবারি ধারণ করে। এ অবস্থায় জনতার আক্রমণে আগা বাখের প্রাণ হারায় এবং আগা সাদেক মারাত্মকভাবে আহত হওয়া সত্ত্বেও পলায়ন করতে সক্ষম হয়।নোয়াজেশের পরমবন্ধু ছিলেন হোসেন কুলি খাঁরাজবল্লভ। হোসেন কুলি খাঁ ছিলেন নোয়াজেশের ধনভান্ডারের দায়িত্বে। তাঁর হত্যাকান্ডে রাজবল্লভ কিছুটা ভীত হয়ে পড়েন। তখন তিনি অন্য ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা করেন। নোয়াজেশ নিঃসন্তান ছিলেন বলে তিনি সিরাজের ছোটভাই মির্জা মেহেদীকে পোষ্যপুত্র গ্রহণ করেছিলেন। মির্জা মেহেদী নোয়াজেশের জীবদ্দশাতেই মারা যান। কিন্তু তাঁর অল্পবয়স্ক পুত্র সন্তান ছিল। রাজবল্লভ তাকেই সিংহাসনে বসিয়ে ঘসেটি বেগমের নামে স্বয়ং বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবি করার স্বপ্ন দেখছিলেন। এইরকম দুর্যোগময় পরিস্থিতিতেই আলিবর্দি খাঁ ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।

চারদিকে শুরু হয় প্রচন্ড অরাজকতা এবং ষড়যন্ত্র। ইংরেজরা নবাবের অনুমতি না নিয়েই দুর্গ সংস্কার করা শুরু করে। রাজবল্লভ ঘসেটি বেগমকে সহায়তা করার জন্য পুত্র কৃষ্ণবল্লভকে ঢাকার রাজকোষের সম্পূর্ণ অর্থসহ কলকাতায় ইংরেজদের আশ্রয়ে পাঠান। এ রকম পরিস্থিতিতেই ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল শাহ কুলি খান মির্জা মোহাম্মদ হায়বৎ জং বাহাদুর (সিরাজদ্দৌলা) বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সিংহাসনে আরোহণ করেন।

সিরাজদ্দৌলা যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন, তখন থেকেই কলকাতায় ইংরেজদের প্রতাপ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তিনি তাদেরকে দমন করার জন্য কাশিমবাজারের কুঠিয়াল ওয়াটসনকে কলকাতার দুর্গপ্রাচীর ভেঙে ফেলতে ও ভবিষ্যতে নবাবের পূর্বানুমতি ছাড়া এ ধরণের কাজ না করার নির্দেশ দেন। কিন্তু আদেশ তাঁর কাজ বহাল রাখলেন। সিরাজদ্দৌলা তখন বুঝতে পারলেন গৃহবিবাদের সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা উদ্ধত স্বভাবের পরিচয় দিচ্ছে। সুতরাং প্রথমেই ঘসেটি বেগমের চক্রান্ত চূর্ণ করার জন্য তিনি সচেষ্ট হন। তিনি মতিঝিল প্রাসাদ অধিকার করে ঘসেটি বেগমকে মুর্শিদাবাদ নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। মতিঝিল অধিকার করে নবাব কাশিমবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ২৭ মে তাঁর সেনাবাহিনী কাশিমবাজার দুর্গ অবরোধ করেন। তিনি কাশিমবাজার দুর্গের কুঠিয়াল ওয়াটসনকে দরবারে হাজির হয়ে তাঁর নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করার জন্য অঙ্গীকারপত্র লিখতে বলেন। ওয়াটসন এই অঙ্গীকারপত্র লিখতে বাধ্য হন।

একই বছর ১৮ জুন সিরাজদ্দৌলা কলকাতা আক্রমণ করেন। তুমুল যুদ্ধ হওয়ার পর ২০ জুন কলকাতা দুর্গ সিরাজের দখলে আসে। তিনি দুর্গ প্রবেশ করে এবং দরবারে উপবেশন করে উমিচাঁদ ও কৃষ্ণবল্লভকে সেখানে উপস্থিত হওয়ার আদেশ দেন। এরপর সেনাপতি মানিকচাঁদের হাতে দুর্গের শাসনভার ছেড়ে দিয়ে সিরাজদ্দৌলা রাজধানীতে ফিরে আসেন। ১২ জুলাই তিনি রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করেন।

দিল্লীর বাদশা পূর্ণিয়ার নবাব শওকত জঙ্গকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবি সনদ পাঠালেন। শওকত নবাব সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার আয়োজন করেন। ইংরেজরা এই সংবাদ পেয়ে গোপনে শওকত জঙ্গের সাথে মিত্রতার করার চেষ্টা করতে থাকে। অপরদিকে মাদ্রাজের ইংরেজ দরবার কর্নেল রবার্ট ক্লাইভকে প্রধান সেনাপতি করে কলকাতা পুনরুদ্ধারের জন্য পাঠায়। সিরাজদ্দৌলাও শওকত জঙ্গকে প্রতিরোধ করার জন্য রওনা হন। পথিমধ্যে নবাবগঞ্জ নামক স্থানে উভয়পক্ষ মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধে শওকত নিহত হন। সিরাজদ্দৌলা মোহনলালের হাতে পূর্ণিয়ার শাসনভার অর্পণ করে রাজধানীতে ফিরে আসেন।

ক্লাইভ ও ওয়াটসন পলতায় পৌঁছেই কলকাতা অভিমুখে রওনা হন। প্রায় বিনাযুদ্ধে তারা কলকাতা দুর্গ জয় করে নেন। এর আগে ক্লাইভ ও ওয়াটসন কলকাতায় এসে সিরাজদ্দৌলার কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন এবং সিরাজদ্দৌলা তাতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজরা শর্ত ভংগ করে কলকাতা আক্রমণ করে। সিরাজদ্দৌলা তাঁর মন্ত্রীদের কুচক্রের বিষয়ে শংকিত হয়ে পড়েন এবং এ কারণে ইংরেজদের সাথে একটি সম্পর্ক স্থাপনের জন্য চেষ্টা চালাতে থাকেন। তাই ইংরেজদের সকল দাবিতে রাজি হয়ে তিনি ১৭৫৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ইংরেজদের সাথে একটি সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করেন। ইতিহাসে এই সন্ধি ‘আলিনগরের সন্ধি’ নামে পরিচিত। কিন্তু ইংরেজরা তাদের মতিগতির কোন পরিবর্তন করল না। মূলতঃ তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল ফরাসিদের সঙ্গে। কিন্তু সিরাজদ্দৌলা ফরাসিদের বেশি প্রাধান্য দিচ্ছিলেন। আলিনগরের (কলকাতা) সন্ধির প্রতিশ্রুতি পালনে নবাবকে যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল।

সব ধরণের গোলমাল মোটামুটি শান্ত হওয়ার পর সিরাজদ্দৌলা সেনাপতিদের অপকর্মের বিচার শুরু করেন। মানিকচন্দ্রকে কারাবন্দী করা হয়। এটা দেখে রাজবল্লভ, জগৎশেঠমীরজাফর সবাই ভীত হয়ে গেলেন। স্বার্থ রক্ষার জন্য জগৎশেঠের মন্ত্রণাভবনে মিলিত হয়ে তারা ইংরেজদের সাহায্যে সিংহাসনচ্যুত করে মীরজাফরকে সিংহাসনে বসাবার চক্রান্ত শুরু করল। ইয়ার লতিফ গোপনে ওয়াটসনের সঙ্গে মিলিত হয়ে কুমন্ত্রণা দিলেন যে, সিরাজদ্দৌলা খুব শীঘ্রই ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করবেন। আর এই কারণেই তিনি পলাশীতে শিবির স্থাপন করেছেন। ক্লাইভ এরপর তার সেনাবাহিনীর অর্ধেক লুকিয়ে রেখে বাকীদের নিয়ে কলকাতায় পৌঁছালেন। আর নবাবকে পত্র লিখলেনঃ

আমরা সেনাদল উঠিয়ে আনলাম আর আপনি পলাশীতে ছাউনি গেড়ে বসেছেন?

সিরাজদ্দৌলা সরল বিশ্বাসেই মীরজাফরকে পলাশী থেকে ছাউনি উঠিয়ে মুর্শিদাবাদ চলে যাবার আদেশ দিলেন। মীরজাফর রাজধানীতে পৌঁছামাত্রই স্ক্রাফটন তার সঙ্গে মিলিত হয়ে গোপন সন্ধির খসড়া লিখে নিলেন। ১৭ মে কলকাতার ইংরেজ দরবারে এই গোপন সন্ধিপত্রের খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়। মীরজাফরের স্বাক্ষরের জন্য এই গোপন সন্ধিপত্র ১০ জুন তার কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু এই গুপ্ত বৈঠক গোপন থাকলো না। ক্লাইভ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলেন। এদিকে গোপন সন্ধিপত্রের সংবাদ জানতে পেরে সিরাজদ্দৌলা মীরজাফরকে বন্দি করার ব্যবস্থা নিলেন। ওয়াটসন রাজধানী থেকে পালিয়ে গেলেন।

মীরজাফর রাজধানীতে পৌঁছে নবাবকে খুঁজে না পেয়ে চারদিকে লোক পাঠালেন। ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই সিরাজদ্দৌলা মহানন্দা নদীর স্রোত অতিক্রম করে এলেও তাতে জোয়ার ভাটার ফলে হঠাৎ করে জল কমে যাওয়ায় নাজিমপুরের মোহনায় এসে তাঁর নৌকা চড়ায় আটকে যায়। তিনি নৌকা থেকে নেমে খাবার সংগ্রহের জন্য একটি মসজিদের নিকটবর্তী বাজারে আসেন। সেখানে কিছু লোক তাঁকে চিনে ফেলে অর্থের লোভে মীর কাশিমের সৈন্যবাহিনীকে খবর দেয়।এ সম্পর্কে ভিন্ন আরেকটি মত আছে যে এক ফকির এখানে নবাব কে দেখে চিনে ফেলে। উক্ত ফকির ইতিপূর্বে নবাব কতৃক শাস্তিপ্রাপ্ত হয়ে তার এক কান হারিয়েছিল। সেই ফকির নবাবের খবর জানিয়ে দেয়।  তারা এসে সিরাজদ্দৌলাকে বন্দি করে রাজধানী মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দেয়। বন্দী হবার সময় নবাবের সাথে ছিলেন তার স্ত্রী লুতফা বেগম এবং চার বছর বয়সী কন্যা উম্মে জহুরা। এর পরের দিন ৪ জুলাই (মতান্তরে ৩রা জুলাই)মীরজাফরের আদেশে তার পুত্র মিরনের তত্ত্বাবধানে মুহম্মদিবেগ নামের এক ঘাতক সিরাজদ্দৌলাকে হত্যা করে। কথিত আছে,সিরাজের মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ হাতির পিঠে চড়িয়ে সারা শহর ঘোরানো হয়। মুর্শিদাবাদের খোশবাগে নবাব আলিবর্দী খানের কবরের কাছে তাকে কবর দেয়া হয়।

সিরাজদ্দৌলার স্ত্রী লুৎফুন্নেছা এবং তাঁর শিশুকন্যাকে মীরজাফর পুত্র মীরনের নির্দেশে ঢাকায় বন্দী করে রাখা হয়েছিল। সিরাজের পতনের পূর্ব পর্যন্ত ষড়যন্ত্রকারীরা ঘষেটি বেগমকে ব্যবহার করলেও সিরাজের পতনের পর আর তাকে কোনো সুযোগই দেয়া হয়নি। এ সময় তারা তাদের মা শরফুন্নেছা, সিরাজের মা আমেনা, খালা ঘষেটি বেগম, সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নেছা ও তার শিশুকন্যা সবাইকে ঢাকার জিঞ্জিরা প্রাসাদে বন্দী করে রাখা হয়। ঢাকার বর্তমান কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা প্রাসাদে তারা বেশ কিছুদিন বন্দী জীবন যাপন করার পর মীরনের নির্দেশে ঘষেটি বেগম ও আমেনা বেগমকে নৌকায় করে নদীতে ডুবিয়ে মারা হয়। ক্লাইভের হস্তক্ষেপের ফলে শরফুন্নেছা, সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নেছা এবং তাঁর শিশুকন্যা রক্ষা পান এবং পরবর্তীতে তাদেরকে মুর্শিদাবাদে আনা হয়। ইংরেজ কোম্পানি সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সামান্য বৃত্তির ওপর নির্ভর করে তাদেরকে জীবন ধারণ করতে হয়। সিরাজের মৃত্যুর দীর্ঘ ৩৪ বছর পর লুৎফুন্নেছা ১৭৯০ খৃস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

সিরাজকে হত্যার পর মীরজাফর ও মীরন আমেনা এবং পরিবারের অন্যান্য মহিলাদের কয়েকটি নিকৃষ্ট নৌকায় চড়িয়ে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে ও অবহেলার সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগরে পাঠিয়ে দেয়। সিয়ারুল মুতাখখেরিনের লেখক গোলাম হোসাইন তাবাতাবাই লিখেছেন যে, সিরাজ পরিবারকে জাহাঙ্গীরনগর পাঠানোর কিছুদিন পর মীরন জাহাঙ্গীরনগরের শাসনকর্তা ও অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি যশরথ খানকে লিখিত নির্দেশ দেয়, যাতে তিনি দু’জন হতভাগ্য বয়স্কা মহিলাকে (ঘষেটি বেগম ও আমিনা) হত্যা করেন।এই সদাশয় শাসনকর্তা এই মহিলাদের ও তাদের স্বামীদের নিকট তার উন্নতি ও অন্নের জন্য ঋণী ছিলেন। তিনি মীরনের এই ঘৃণ্য নির্দেশ পালন করতে অসম্মতি জানান। পরে ঢাকার জিঞ্জিরা প্রাসাদে সিরাজের মা আমেনা এবং খালা ঘষেটি বেগম দীর্ঘদিন বন্দী থাকার পর তাদের পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়।

পলাশীর যুদ্ধ

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পলাশী নামক স্থানে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাই পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৭৫৭ সালের জুন ২৩ তারিখে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন এবং ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সূচিত হয়।

১৭৫৭ খৃস্টাব্দের ১২ জুন কলকাতার ইংরেজ সৈন্যরা চন্দননগরের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। সেখানে দুর্গ রক্ষার জন্য অল্প কছু সৈন্য রেখে তারা ১৩ জুন অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করে। কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদের পথে হুগলি, কাটোয়ার দুর্গ, অগ্রদ্বীপ ওপলাশীতে নবাবের সৈন্য থাকা সত্ত্বেও তারা কেউ ইংরেজদের পথ রোধ করল না। নবাব বুঝতে পারলেন, সেনাপতিরাও এই ষড়যন্ত্রে শামিল।

বিদ্রোহের আভাস পেয়ে সিরাজ মিরজাফরকে বন্দি করার চিন্তা বাদ দিলেন। তিনি মিরজাফরকে ক্ষমা করে তাকে শপথ নিতে বললেন। মিরজাফর পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে অঙ্গীকার করলেন যে, তিনি শরীরের একবিন্দু রক্ত থাকতেও বাংলার স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন হতে দেবেন না। গৃহবিবাদের মীমাংসা করে তিনি রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ, মিরজাফর, মিরমদন, মোহনলাল ও ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রেঁকে সৈন্য চালানোর দায়িত্ব দিয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা শুরু করলেন।

২৩ জুন সকাল থেকেই পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজরা মুখোমুখি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো।১৭৫৭ সালের ২২ জুন মধ্যরাতে রবার্ট ক্লাইভ কলকাতা থেকে তাঁর বাহিনী নিয়ে পলাশী মৌজার লক্ষ্মবাগ নামে আম্রকাননে এসে তাঁবু গাড়েন। বাগানের উত্তর-পশ্চিম দিকে গঙ্গা নদী। এর উত্তর-পূর্ব দিকে দুই বর্গমাইলব্যাপী আম্রকানন।  বেলা আটটার সময় হঠাৎ করেই মিরমদন ইংরেজবাহিনীকে আক্রমণ করেন। তাঁর প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে ক্লাইভ তার সেনাবাহিনী নিয়ে আমবাগানে আশ্রয় নেন। ক্লাইভ কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। মিরমদন ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু মিরজাফর, ইয়ার লতিফ, রায়দুর্লভ যেখানে সৈন্যসমাবেশ করেছিলেন সেখানেই নিস্পৃহভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তাদের সামান্য সহায়তা পেলেও হয়ত মিরমদন ইংরেজদের পরাজয় বরণ করতে বাধ্য করতে পারতেন। দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে সিরাজদ্দৌলার গোলা বারুদ ভিজে যায়। তবুও সাহসী মিরমদন ইংরেজদের সাথে লড়াই চালিয়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই গোলার আঘাতে মিরমদন মৃত্যুবরণ করেন।

গোলান্দাজ বাহিনীর প্রধান নিহত হওয়ার পর সিরাজদ্দৌলা মীরজাফর ও রায় দুর্লভকে তাঁদের অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে তীব্র বেগে অগ্রসর হতে নির্দেশ দেন। কিন্তু উভয় সেনাপতি তাঁর নির্দেশ অমান্য করলেন। তাঁদের যুক্তি হলো গোলন্দাজ বাহিনীর আশ্রয় ছাড়া অগ্রসর হওয়া আত্মঘাতী ব্যাপার। কিন্তু কোম্পানি ও নবাবের বাহিনীর মধ্যে তখন দূরত্ব মাত্র কয়েক শ গজ। বিকেল পাঁচটায় সিরাজদ্দৌলা বাহিনী নির্দেশনার অভাবে এবং ইংরেজ বাহিনীর গোলন্দাজি অগ্রসরতার মুখে যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করেন অর্থাৎ পরাজয় স্বীকার করেন। নবাবের ছাউনি ইংরেজদের অধিকারে আসে। ইংরেজদের পক্ষে সাতজন ইউরোপিয়ান এবং ১৬ জন দেশীয় সৈন্য নিহত হয়। তখন কোন উপায় না দেখে সিরাজদ্দৌলা রাজধানী রক্ষা করার জন্য দুই হাজার সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু রাজধানী রক্ষা করার জন্যেও কেউ তাঁকে সাহায্য করেনি। সিরাজদ্দৌলা তাঁর সহধর্মিণী লুৎফুন্নেসা ও ভৃত্য গোলাম হোসেনকে নিয়ে রাজধানী থেকে বের হয়ে স্থলপথে ভগবানগোলায় পৌঁছে যান এবং সেখান থেকে নৌকাযোগেপদ্মা ও মহানন্দার মধ্য দিয়ে উত্তর দিক অভিমুখে যাত্রা করেন। তাঁর আশা ছিল পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছাতে পারলে ফরাসি সৈনিক মসিয়ে নাস-এর সহায়তায় পাটনা পর্যন্ত গিয়ে রামনারায়ণের কাছ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে ফরাসি বাহিনীর সহায়তায় বাংলাকে রক্ষা করবেন।

বিখ্যাত পর্তুগিজ ঐতিহাসিক বাকসার পলাশীর যুদ্ধকে গুরুত্বের দিক থেকে পৃথিবীর সেরা যুদ্ধগুলোর অন্যতম মনে করেন।

মুহাম্মদ আজম শাহ (১৬৫৩১৭০৭) স্বল্প সময়ের জন্য মুঘল সম্রাট ছিলেন। সম্ভবত তার রাজত্যকাল ছিল ফেব্রুয়ারি ১৭০৭ থেকে জুন ১৭০৭ এর মধ্যে। তিনি মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের স্ত্রীর দিলরাস বানু বেগমের ঘরের পুত্র ছিলেন। সে সূত্রে তিনি ছিলেন সুলতান মুহাম্মদ আকবরের আপন ভাই। তার ভাইয়ের মত আজম শাহও দারাহ শিকোহের এক কন্যাকে বিয়ে করেন(১৬৬৮)।

জৈনুদ্দিন আহমেদ খান ছিলেন বিহারের “নায়েব-এ-নাজিম” (প্রশাসক) এবং বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পিতা।

তাঁর প্রকৃত নাম ‘মির্জা মুহাম্মদ হাসিম’, নবাব শুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান কর্তৃক তিনি ‘খান’ উপাধী লাভ করেন। নবাব আলীবর্দী খাঁ তাকে বিহারের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন।

আহমেদ শাহ্‌ দুররানীর ভারত আক্রমণ কালে ১৭৪৮ সালে আফগান সেনারা তাঁকে হত্যাকরে এবং তাঁর স্ত্রী ও দুই পুত্রকে অপহরণ করলে নবাব আলীবর্দী তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।

মীরজাফর, যাঁর সম্পূর্ণ নাম মীর জাফর আলী খান (জন্ম ১৬৯১- মৃত্যু ফেব্রুয়ারি ৫, ১৭৬৫), বাংলার একজন নবাব।

মীরজাফর সিরাজদ্দৌলার একজন অমাত্য ছিলেন। তিনি প্রধান সেনাপতি ছিলেন।নবাব আলীবর্দ্দী খান তার দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলাকে বাংলার নবাব করায় ক্ষুব্ধ হন মীর জাফর। তাই তিনি প্রধান সেনাপতি হয়েও কখনোই সিরাজউদ্দৌলাকে নবাব হিসেবে মেনে নিতে পারেন নি। সব সময় তিনি চেয়েছেন বাংলার নবাবের পতন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা করে তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরবার্ট ক্লাইভ এর সাথে তিনি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন, এবং পলাশীর যুদ্ধে তাঁর কারণেই ব্রিটিশদের হাতে সিরাজুদ্দৌলার পরাজয় ঘটে। এই যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মীরজাফরকে নবাবের মসনদে অধিষ্ঠিত করে।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজ বেনিয়াদের সঙ্গে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈন্যদের লড়াই হয়। এই যুদ্ধে নবাবের পক্ষে স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে প্রধান সেনাপতি ছিলেন মীরজাফর আলী খান। তার সঙ্গে ছিলেন মীর মদন আর মোহনলাল। মীর মদন আর মোহনলাল ইংরেজদের বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে লড়াই করে পরাজিত হন। আর যুদ্ধের ময়দানে নিরব দাঁড়িয়ে থেকে প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খান ও তার দোসররা ধূর্ত ইংরেজ বেনিয়া লর্ড ক্লাইভের হাতে বাংলার শাসন ক্ষমতা তুলে দেয়। পরাজিত হন বাংলা, বিহার উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। মুষ্টিমেয় ইংরেজ শাসক বিশ্বাসঘাতকদের সহায়তায় বাংলায় তাদের শাসন ক্ষমতা পোক্ত করে এবং সোয়া দুইশ’ বছর এদেশ শাসন করে। সেই থেকেই মীরজাফরের নাম বিশ্বাসঘাতকতার রূপক হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তাঁর নামটি বিশ্বাসঘাতকের প্রতিশব্দ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন বাংলাদেশে মীরজাফর নামে কারো নাম রাখা হয় না।

জগৎশেঠ সুবে বাংলার একটি মর্যদাকর পদবী যা একজন ঐশ্বর্য্যশালী ব্যক্তিকে নির্দেশ করতো। তবে এই পদবীধারী মাহাতাব চাঁদ নবাব সিরাজদ্দৌলার সময়ে একজন বিশেষ ক্ষমতাধর রাজন্য ছিলেন এবং যাদের চক্রান্তের শিকার হয়ে নবাব সিরাজদ্দৌলা পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন তাঁদের একজন হিসেবে তাকে চিহ্নিত করা হয়।

মীর কাশিম (পুরা নাম মীর মুহাম্মাদ কাসিম আলী খান) (মৃত্যু ৮ মে, ১৭৭৭) ১৭৬০ সাল থেকে ১৭৬৩ সাল পর্যন্ত বাংলার নবাব ছিলেন। পলাশীর যুদ্ধ পরবর্তী নবাব মীরজাফরকে ক্ষমটাচ্যুত করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মীর কাসিমকে ক্ষমতায় বসায়।

নাজিম উদ্দিন আলী খান যিনি নাজিমউদদৌলা (বা নাজামউদদৌলা) (১৭৫০ – ৮ই মে ১৭৬৬) নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন ১৭৬৫ থেকে ১৭৬৬ সাল পর্যন্ত বাংলাবিহারউড়িষ্যার নবাব। তিনি ছিলেন মীর জাফরের দ্বিতীয় পুত্র। নাজিম-উদ-দৌলা তার পিতা মীর জাফরের মৃত্যুর পর রাজপদে অধিষ্ঠিত হন। রাজ্যাভিষেকের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। তিনি ফেব্রুয়ারি ৫, ১৭৬৫ সালে সিংহাসনে আরোহন করেন।

১৭৬৫ সালে বক্সারের যুদ্ধে ব্রিটিশরা জয়লাভের ফলে বাংলা, বিহার ও ওরিষ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম-এর কাছ থেকে দেওয়ানী (রাজ্য শাসণের জন্য পদ) লাভ করে। ১৭৬৫ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নবাব কর্তৃক ব্রিটিশদের কাছে দেওয়ানী অর্পণ করা হয়।

নাজিমুদ্দিন, মুর্শিদাবাদের দূর্গে রবার্ট ক্লাইভের সম্মানে দেওয়া একটি পার্টিতে জ্বরে আক্রান্ত হন এবং ১৭৬৬ সালের ৮ই মে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে জাফরগঞ্জের সমাধিক্ষেত্র সমাহিত করা হয় এবং উত্তরাধিকারসূত্রে তার ছোট ভাই নাজাবুত আলী খান নবাব পদে অধিষ্ঠিত হন।

নাজিমুদ্দিন আলী খান ছিলেন মুন্নী বেগম ও মীর জাফরের দ্বিতীয় পুত্র। ১৭৬৪ সালের ২৯শে জানুয়ারি মীর জাফর নিজে নাজিমুদ্দিকে মুর্শিদজাদা বাহাদুর উপাধি দিয়ে তার উত্তরাধীকারী হিসেবে ঘোষণা করেন।

মীর জাফরের মৃত্যুর পর নাজিমুদ্দীন সুজাউলমুলুক (দেশের নায়ক), নাজামউদদৌলা (রাজ্যের স্টার), মহবত জং (যুদ্ধের বিভিষীকা) উপাধি গ্রহণ করে ১৫ বছর বয়সে ৫ই ফেব্রুয়ারি ১৭৬৫ সালে সিংহাসনে আরোহন করেন। ১৭৬৫ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও তাকে অনুমোদন দেয়। এরজন্য তাকে ₤১৪০,০০ ব্যায় করতে হয় এবং এটি কলকাতা কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।

১৭৬৬ সালের ৮ই মে নাজিমুদ্দীন মৃত্যুবরণ করেন। এরপূর্বে রবার্ট ক্লাইভের সম্মানে দেওয়া এক পার্টিতে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। তাকে জাফরগঞ্জ সমাধিক্ষেত্রে তার পিতা মীর জাফরের সমাধির পশ্চিম পাশে সমাধিস্থ করা হয়। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। তার ছোট ভাই নাজবুত আলী খান মোহাম্মদীয় আইন অনুসারে রাজত্ব লাভ করেন।

সাঈদ নাজাবুত আলী খান বাহাদুর, জন্মনাম মীর ফুলওয়ারী (১৭৪৯ – মার্চ ১০, ১৭৭০) যিনি ১৭৬৬ সালে তার বড় ভাই নবাব নাজিম নাজিমুদ্দীন আলী খানের মৃত্যুর পর বাংলাবিহারউড়িষ্যার নবাব হিসেবে সিংহাসনে আরোহন করেন। নাজাবুত আলী খান, সাইফ উদদৌলা নামেই বেশি পরিচিত।

তিনি ছিলেন মুন্নী বেগম ও মীর জাফরের তৃতীয় পুত্র। সিংহাসনে আরোহনের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। তিনি তার মায়ের তত্ত্বাবধানে সিংহাসন ত্যাগ করেন এবং ১০ই মার্চ ১৭৭০ সালে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

নাজিমুদ্দিন আলী খানের মৃত্যুর পর নাজাবুত আলী খানের সিংহাসনে আরোহনের সময় বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর এবং তিনি তার মাতা মুন্নী বেগমের তত্ত্বাবধানে রাজ্য পরিচালনা করতেন। ১৭৬৬ সালের ১৯শে মে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি চুক্তি মতে তাকে মওকুফ ৪১,৮৬,১৩১ ও ৯ আনা (১=১২ আনা), মানে ১৭,৭৮,৮৫৪ ও এক আনা নবাবের পরিবার এর জন্য এবং ২৪,০৭,২৭৭ ও ৮ আনা নিজামতের সমর্থনের জন্য দিয়েছিল।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য করার জন্য ষোড়শ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত একটি জয়েন্ট‌-স্টক কোম্পানি। এর সরকারি নাম “ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি”। ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাণী প্রথম এলিজাবেথ এই কোম্পানিকে তখনকার ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতে বাণিজ্য করার রাজকীয় সনদ প্রদান করেন। এ সনদ কোম্পানিটিকে ২১ বছর পর্যন্ত পূর্ব ভারতে একচেটিয়া বাণিজ্য করার প্রাধিকার অর্পণ করেছিল। তবে পরবর্তীকালে এ কোম্পানি ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে এবং ১৮৫৮ সালে বিলুপ্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করে। অত:পর ব্রিটিশ সরকার সরাসরি ভারত শাসন শুরু করে।

১৬০০ সালে ভারত ও পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ইংন্ডের একদল বণিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন করে।৩১ ডিসেম্বর রানি এলিজাবেথের সনদ বলে উক্ত কোম্পানি উত্তমাশা অন্তরীপ থেকে সমগ্র পূর্বাঞ্চলে বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকর লাভ করে। তারা ১৬০৮-এ মোগল সম্রাট জাহাঙ্গিরের শাসনকালে সুরাটে প্রথম বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের অনুমতি পায়। পরে অন্যান্য স্থানসহ হুগলিতে বাণিজ্য কুঠি স্থাপিত হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর ১৬৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন প্রতিনিধি হিসেবে জেমস হার্ট ঢাকা প্রবেশ করার মধ্য দিয়ে বাংলায় ইংরেজ আগমন শুরু হয়। ১৭১৫ সালে মোগল দরবার থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। ঐ মুদ্রা মোগল সাম্রাজ্যেও চালু হয়। ১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজউদৌলা কোলকাতা দখল করে নেবার পরে (২০ জুন) লর্ড ক্লাইভ এবং ওয়াটসন তামিলনাড়ু থেকে জাহাজযোগে সৈন্যবাহিনী নিয়ে আসেন ও কোলকাতা পুণরায় দখল করেন (২জানুয়ারি,১৭৫৭)। কোম্পানির কেরানি, পরে ফ্রান্স-ইংল্যান্ড যুদ্ধ শুরু হলে সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেন। নিজের যোগ্যতায় পরে উঁচু পদ পান৤ চন্দননগর দখল করার পরে সিরাজউদৌলাকে উৎখাত করার জন্য সিরাজের পরিবারের কয়েকজন ও মীরজাফর, উমিচাঁদ, জগত শেঠ প্রমুখদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেন। চুক্তি মতো কাজ হয় ও নদীয়ার পলাশির প্রান্তরে সিরাজউদৌলার সঙ্গে মেকি যুদ্ধ হয়। সিরাজউদৌলা পরাজিত হয়ে পালাবার সময় ধরা পড়ে নিহত হন। চুক্তি মতো মীরজাফর নবাব হন এবং ক্লাইভ নগদ ত্রিশ লক্ষ টাকা ও চব্বিশ পরগনার জায়গিরদারি লাভ করেন। জায়গির থেকে ক্লাইভের বছরে তিন লক্ষ টাকা আয় হত। পরে ১৭৬০-এ ক্লাইভ দেশে ফিরে যান। এ দিকে তার অভাবে ইংরেজরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন আবার ক্লাইভের ডাক পড়ে।

ক্লাইভ এ দেশে আবার ফিরে আসেন ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে এবং ইংরেজ সরকারের গভর্নর নিযুক্ত হন। তিনি তখন দিল্লির বাদশাহ শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা-বিহার-ওড়িশার দেওয়ানি লাভ করেন (১৭৬৫, আগস্ট ১)। বিহার-ওড়িশার প্রকৃত শাসন ক্ষমতা লাভ করে, নবাবের নামে মাত্র অস্তিত্ব থাকে। ফলে পূর্ব ভারতের এই অঞ্চলে যে শাসন-ব্যবস্থা চালু হয় তা দ্বৈত শাসন নামে পরিচিত। নবাবের হাতে থাকে প্রশাসনিক দায়িত্ব, আর রাজস্ব আদায় ও ব্যয়ের পূর্ণ কর্তৃত্ব পায় কোম্পানি। এতে বাংলার নবাব আসলে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে আর এই সুযোগে কোম্পানির লোকেরা খাজনা আদায়ের নামে অবাধ লুণ্ঠন ও অত্যাচার শুরু করে দেয়। ১৭৭০-এ (বাংলা ১১৭৬) অনাবৃষ্টি হয়। দেশে দেখা দেয় চরম বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষ৤ কয়েক লক্ষ মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যান। এটাই ইতিহাসখ্যাত ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত। এরপর ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে কোম্পানির শাসন চলেছিল মূলত এবং মুখ্যত লাভজনক ব্যবসায়িক দৃষ্টি ও রীতিপদ্ধতিতেই। কোম্পানির স্বার্থে ও সুবিধার জন্য ১৭৬৫ সালে বাংলার কৃষিপণ্যকে বাণিজ্যিকীকরণ, ১৭৭৩ সালে রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাস, ১৮১৩ সালে ভারতে ফ্রি ট্রেড প্রবর্তন এবং ওই বছরই বাংলার মুখ্য শিল্প খাত টেক্সটাইল রপ্তানি বন্ধ, ১৮২০ সালে টেক্সটাইলকে আমদানি পণ্য হিসেবে ঘোষণা, ১৮৩০-এ কলকাতা ডকিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা, ১৮৩৫ সালে ইংরেজিকে অফিস-আদালতের ভাষা হিসেবে ঘোষণা, ১৮৩৮-এ বেঙ্গল বন্ডেড ওয়্যারহাউস অ্যাসোসিয়েশন গঠন এবং ১৮৪০ সালে বেসরকারি খাতে চা-বাগান স্থাপনের মাধ্যমে এ দেশীয় অর্থনীতির স্বনির্ভর সত্তাকে পরনির্ভর করার কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলা নামের এই অঞ্চলটি ধীরে ধীরে ইংরেজদের সম্পূর্ণ করায়ত্ব হয় ১৮১৩ সালে। বৃটিশ সরকার এক চার্টার অ্যাক্ট বলে কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যাধিকার বিলুপ্ত করে এবং দেশের শাসনভার কোম্পানির উপর ন্যস্ত করে। ১৮৫৮ সালে কোম্পানি বিলুপ্ত ঘোষণা করে ব্রিটিশ সরকার ভারতশাসনের দায়িত্ব সরাসরি গ্রহণ করে।

ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি  ছিল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ১৬৬৪ সালে ব্রিটিশডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিদুটির সঙ্গে প্রতিযোগিতাকল্পে এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

জ্যঁ-ব্যপ্তিস্ত কোলবার্টের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজা চতুর্দশ লুইয়ের সনদ অনুযায়ী পূর্ব গোলার্ধে ব্যবসাবাণিজ্য পরিচালনার লক্ষ্যে এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। Compagnie de Chine (১৬৬০), Compagnie d’Orient ও Compagnie de Madagascar নামে তিনটি পূর্বতন একত্রিত হয়ে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গড়ে ওঠে। কোম্পানির প্রথম ডিরেক্টর জেনারেল ছিলেন দে ফায়ে। তাঁর সহকারী ছিলেন ফ্রান্সিস ক্যারনমারাকারা আভানচিন্টজ। ক্যারন ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে ৩০ বছর কর্মরত ছিলেন; তাঁর কর্মজীবনের ২০ বছরই কেটেছিল জাপানে। অপরপক্ষে আভানচিন্টজ ছিলেন পারস্যের এসফাহনের অধিবাসী এক শক্তিশালী আর্মেনিয়ান বণিক।

১৬০৩ সালে প্রথম ভারতের দিকে রাষ্ট্র-প্রযোজিত ফরাসি সমুদ্রযাত্রার ঘটনাটি ঘটে। এই সমুদ্রযাত্রার ক্যাপ্টেন ছিলেন Paulmier de Gonneville of Honfleurরাজা চতুর্থ হেনরি Compagnie des Indes Orientales নামক একটি কোম্পানিকে এই প্রথম অভিযানের অনুমোদন দেন। এই সনদ বলে উক্ত কোম্পানি ১৫ বছর ভারতে একচেটিয়া ফরাসি বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে। কোলবার্টের Compagnie des Indes Orientales নামক সংস্থার পূর্বসূরি এই সংস্থা অবশ্য জয়েন্ট-স্টক কর্পোরেশন ছিল না। রাজাই ছিলেন এই সংস্থার অর্থের জোগানদাতা।

Compagnie des Indes Orientales-এর প্রাথমিক পুঁজি ছিল ১৫ মিলিয়ন লিভ্র্। এই কোম্পানি ৫০ বছর ভারতে একচেটিয়া ফরাসি বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে। ১৭১৯ সালের মধ্যে কোম্পানি ভারতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কিন্তু এই সময় কোম্পানির আর্থিক দুরবস্থা চলছিল। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর কোম্পানি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। কিন্তু এই ব্যাপারে ইংরেজদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাদের পরাজয় ঘটে।

এরপর কোম্পানি আর আর্থিক দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ফরাসি বিপ্লবের ২০ বছর পূর্বে ১৭৬৯ সালে ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই সকল সম্পত্তি সহ কোম্পানি অধিগ্রহণ করে নেন। রাজা কোম্পানির সকল ঋণ পরিশোধ করতেও অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলেন।

পন্ডিচেরিচন্দননগর সহ বেশ কয়েকটি ভারতীয় বাণিজ্যকেন্দ্র অবশ্য ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ফরাসি অধিকারভুক্ত ছিল।

ব্রিটিশ ভারত বা ব্রিটিশ রাজ  বলতে ১৮৫৮ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যবর্তী সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকে বোঝায়। উক্ত শব্দদুটির দ্বারা ভারতে ব্রিটিশ অধিরাজ্য ও তার অধীনস্থ শাসনকেও বোঝায়। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তানবাংলাদেশ রাষ্ট্রে বিভক্ত এই সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশ-শাসিত প্রদেশ  ও ব্রিটিশ রাজশক্তির কদর রাজ্যসমূহ। ১৮৭৬ সালে সমগ্র অঞ্চলটিকে সরকারিভাবে ভারতীয় সাম্রাজ্য নামে অভিহিত করা হয় এবং এই নামেই পাসপোর্ট ইস্যু করা হতে থাকে। ভারত নামে এই দেশ লিগ অফ নেশনসরাষ্ট্রসংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এই নামেই ভারত ১৯০০, ১৯২০, ১৯২৮, ১৯৩২ ও ১৯৩৬ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করে।

১৮৫৮ সালে ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ রাজশক্তির হাতে স্থানান্তরিত হন। রানি ভিক্টোরিয়া নিজ হস্তে ভারতের শাসনভার তুলে নেন। এর সঙ্গে সঙ্গে ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭৬ সালে ভিক্টোরিয়া ভারত সম্রাজ্ঞী উপাধি গ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য ভারতীয় অধিরাজ্য (পরবর্তীকালে ভারতীয় প্রজাতন্ত্র) ও পাকিস্তান অধিরাজ্য (পরবর্তীকালে পাকিস্তান) নামে দুটি অধিরাজ্যে বিভক্ত হলে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। ১৯৩৭ সালে ব্রহ্মদেশকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে এই দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।

ভারতের গভর্নরজেনারেল (অথবা ১৮৫৮ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত গভর্নরজেনারেল এবং ভারতের ভাইসরয়) ছিলেন ভারতে ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রধান। পরবর্তী কালে স্বাধীন ভারতের ব্রিটিশ রাজার প্রতিনিধি।

গভর্নর জেনারেলদের তালিকা

বাংলার গভর্নর (রাজ্যপাল)

এরপর গভর্নরের পদ গভর্নর জেনারেলের হাতে থাকে। ১৮৫৩ সালের চার্টার আইন অনুযায়ী ১৮৫৪ সালে লেফটেন্যাণ্ট গভর্নর (উপরাজ্যপাল, ছোটলাট) পদ তৈরি হয়। ১৯১২ সালে দুই বাংলা একত্রিত হওয়ার পর গভর্নর পদ আবার চালু হয়।

  নাম
(
জন্মমৃত্যু)
  দায়িত্ব গ্রহণ দায়িত্ব ত্যাগ দায়িত্বদাতা
বাংলার প্রেসিডেন্সীর গভর্নর, ১৭৭৪১৮৩৩
ওয়ারেন হেস্টিংস
(১৭৩২-১৮১৮)
২০শে অক্টোবর, ১৭৭৪ ১লা ফেব্রুয়ারী, ১৭৮৫ ব্রিটিশ
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানি
স্যার জন ম্যাকফারসন, প্রথম ব্যারনেট
(ভারপ্রাপ্ত)
(১৭৪৫-১৮২১)
১লা ফেব্রুয়ারী, ১৭৮৫ ১২ সেপ্টেম্বর, ১৭৮৬
চার্লস কর্নওয়ালিস, প্রথম মার্কুইস কর্নওয়ালিস
(১৭৩৮-১৮০৫)
১২ সেপ্টেম্বর, ১৭৮৬ ২৮শে অক্টোবর, ১৭৯৩
স্যার জন শোর, প্রথম ব্যারন টেইনমাউথ
(১৭৫১-১৮৩৪)
২৮শে অক্টোবর, ১৭৯৩ ১৮ই মার্চ, ১৭৯৮
স্যার অ্যালুরেড ক্লার্ক
(ভারপ্রাপ্ত)
(১৭৪৪-১৮৩২)
১৮ই মার্চ, ১৭৯৮ ১৮ই মে, ১৭৯৮
রিচার্ড ওয়েলেসলি, প্রথম মার্কুইস ওয়েলেসলি
(১৭৬০-১৮৪২)
১৮ই মে, ১৭৯৮ ৩০শে জুলাই, ১৮০৫
চার্লস কর্নওয়ালিস, প্রথম মার্কুইস কর্নওয়ালিস
(১৭৩৮-১৮০৫)
৩০শে জুলাই, ১৮০৫ ৫ই অক্টোবর, ১৮০৫
স্যার জর্জ বার্লো, প্রথম ব্যারনেট
(ভারপ্রাপ্ত)
(১৭৬২-১৮৪৭)
১০ই অক্টোবর, ১৮০৫ ৩১শে জুলাই, ১৮০৭
গিলবার্ট এলিয়ট-মারে-কাইনিনমাউণ্ড, প্রথম আর্ল অব মিন্টো
(১৭৫১-১৮১৪)
৩১শে জুলাই, ১৮০৭ ৪ঠা অক্টোবর, ১৮১৩
১০ ফ্রান্সিস রডন-হেস্টিংস, প্রথম মার্কুইস অব হেস্টিংস
(১৭৫৪-১৮২৬) 
৪ঠা অক্টোবর, ১৮১৩ ৯ই জানুয়ারী, ১৮২৩
১১ জন অ্যাডাম
(ভারপ্রাপ্ত)
(১৭৭৯-১৮২৫)
৯ই জানুয়ারী, ১৮২৩ ১লা আগষ্ট, ১৮২৩
১২ উইলিয়াম আমহার্স্ট, প্রথম আর্ল আমহার্স্ট
(১৭৭৩-১৮৫৭)
১লা আগষ্ট, ১৮২৩ ১৩ই মার্চ, ১৮২৮
১৩ উইলিয়াম বাটারওয়ার্থ বেলি
(ভারপ্রাপ্ত)
(১৭৮২-১৮৬০)
১৩ই মার্চ, ১৮২৮ ৪ঠা জুলাই, ১৮২৮
১৪ লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক
(১৭৭৪-১৮৩৯)
৪ঠা জুলাই, ১৮২৮ ১৮৩৩
ভারতের গভর্নরজেনারেল, ১৮৩৩১৮৫৮
লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক
(১৭৭৪-১৮৩৯)
১৮৩৩ ২০শে মার্চ, ১৮৩৫ ব্রিটিশ
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানি
স্যার চার্লস মেটকাফ, প্রথম ব্যারন মেটকাফ
(ভারপ্রাপ্ত)
(১৭৮৫-১৮৪৬)
২০শে মার্চ, ১৮৩৫ ৪ঠা মার্চ, ১৮৩৬
জর্জ এডেন, প্রথম আর্ল অব অকল্যাণ্ড
(১৭৮৪-১৮৪৯)
৪ঠা মার্চ, ১৮৩৬ ২৮শে ফেব্রুয়ারী, ১৮৪২
এডওয়ার্ড ল, প্রথম আর্ল অব এলেনবরা
(১৭৯০-১৮৭১)
২৮শে ফেব্রুয়ারী, ১৮৪২ জুন, ১৮৪৪
উইলিয়াম উইলবারফোর্স বার্ড
(ভারপ্রাপ্ত)
(১৭৮৪-১৮৫৭)
জুন, ১৮৪৪ ২৩শে জুলাই, ১৮৪৪
হেনরি হার্ডিঞ্জ, প্রথম ভাইকাউণ্ট হার্ডিঞ্জ
(১৭৮৫-১৮৫৬)
২৩শে জুলাই, ১৮৪৪ ১২ই জানুয়ারী, ১৮৪৮
জেমস ব্রাউন-রামসে, প্রথম মার্কুইস অব ডালহাউসি
(১৮১২-১৮৬০)
১২ই জানুয়ারী, ১৮৪৮ ২৮শে ফেব্রুয়ারী, ১৮৫৬
চার্লস ক্যানিং, প্রথম আর্ল ক্যানিং
(১৮১২-১৮৬২)
২৮শে ফেব্রুয়ারী, ১৮৫৬ ১লা নভেম্বর, ১৮৫৮
ভারতের গভর্নরজেনারেল এবং ভাইসরয়, ১৮৫৮১৯৪৭
চার্লস ক্যানিং, প্রথম আর্ল ক্যানিং
(১৮১২-১৮৬২)
১লা নভেম্বর, ১৮৫৮ ২১শে মার্চ, ১৮৬২ রাণী ভিক্টোরিয়া
জেমস ব্রুস, অষ্টম আর্ল অব এলগিন
(১৮১১-১৮৬৩)
২১শে মার্চ, ১৮৬২ ২০শে নভেম্বর, ১৮৬৩
স্যার রবার্ট নেপিয়ার, প্রথম ব্যারন নেপিয়ার অব ম্যাগডালা
(ভারপ্রাপ্ত)
(১৮১০-১৮৯০)
২১শে নভেম্বর, ১৮৬৩ ২রা ডিসেম্বর, ১৮৬৩
স্যার উইলিয়াম ডেনিসন
(ভারপ্রাপ্ত)
(১৮০৪-১৮৭১)
২রা ডিসেম্বর, ১৮৬৩ ১২ই জানুয়ারী, ১৮৬৪
স্যার জন লরেন্স, প্রথম ব্যারন লরেন্স
(১৮১১-১৮৭৯)
১২ই জানুয়ারী, ১৮৬৪ ১২ই জানুয়ারী, ১৮৬৯
রিচার্ড বুর্ক, ষষ্ঠ আর্ল অব মেয়ো
(১৮২২-১৮৭২)
১২ই জানুয়ারী, ১৮৬৯ ৮ই ফেব্রুয়ারী, ১৮৭২
স্যার জন স্ট্র্যাচি
(ভারপ্রাপ্ত)
(১৮২৩-১৯০৭)
৮ই ফেব্রুয়ারী, ১৮৭২ ২৩শে ফেব্রুয়ারী, ১৮৭২
ফ্রান্সিস নেপিয়ার, দশম লর্ড নেপিয়ার
(ভারপ্রাপ্ত)
(১৮১৯-১৮৯৮)
২৩শে ফেব্রুয়ারী, ১৮৭২ ৩রা মে, ১৮৭২
টমাস বেয়ারিং, প্রথম আর্ল অব নর্থব্রুক
(১৮২৬-১৯০৪)
৩রা মে, ১৮৭২ ১২ই এপ্রিল, ১৮৭৬
১০ রবার্ট বালওয়ার-লিটন, প্রথম আর্ল অব লিটন
(1831-1891)
১২ই এপ্রিল, ১৮৭৬ ৮ই জুন, ১৮৮০
১১ জর্জ রবিনসন, প্রথম মার্কুইস অব রিপন
(1827-1909)
৮ই জুন, ১৮৮০ ১৩ই ডিসেম্বর, ১৮৮৪
১২ ফ্রেডারিক হ্যামিলটন-টেম্পল-ব্ল্যাকউড, প্রথম মার্কুইস অব ডাফরিন ও আভা
(1826-1902)
১৩ই ডিসেম্বর, ১৮৮৪ ১০ই ডিসেম্বর, ১৮৮৮
১৩ হেনরি পেটি-ফিৎসমরিস, পঞ্চম মার্কুইস অব ল্যান্সডাউন
(1845-1927)
১০ই ডিসেম্বর, ১৮৮৮ ১১ই অক্টোবর, ১৮৯৪
১৪ ভিক্টর ব্রুস, নবম আর্ল অব এলগিন
(1849-1917)
১১ই অক্টোবর, ১৮৯৪ ৬ই জানুয়ারী, ১৮৯৯
১৫ জর্জ ন্যাথানিয়েল কার্জন, প্রথম মার্কুইস কার্জন
(1859-1925)
৬ই জানুয়ারী, ১৮৯৯ ১৮ই নভেম্বর, ১৯০৫
১৬ গিলবার্ট এলিয়ট-মারে-কাইনিনমাউণ্ড, চতুর্থ আর্ল অব মিন্টো
(1845-1914)
১৮ই নভেম্বর, ১৯০৫ ২৩শে নভেম্বর, ১৯১০ Edward VII
১৭ চার্লস হার্ডিঞ্জ, প্রথম ব্যারন হার্ডিঞ্জ অব পেনশার্স্ট
(1858-1944)
২৩শে নভেম্বর, ১৯১০ ৪ঠা এপ্রিল, ১৯১৬ George V
১৮ ফ্রেডারিক থেসিজার, প্রথম ভাইকাউণ্ট চেমস্‌ফোর্ড
(1868-1933)
৪ঠা এপ্রিল, ১৯১৬ ২রা এপ্রিল, ১৯২১
১৯ রুফাস আইজাকস, প্রথম মার্কুইস অব রিডিং
(1860-1935)
২রা এপ্রিল, ১৯২১ ৩রা এপ্রিল, ১৯২৬
২০ এডওয়ার্ড উড, প্রথম ব্যারন আরউইন, প্রথম আর্ল অব হ্যালিফ্যাক্স
(1881-1959)
৩রা এপ্রিল, ১৯২৬ ১৮ই এপ্রিল, ১৯৩১
২১ ফ্রীম্যান ফ্রীম্যান-টমাস, প্রথম মার্কুইস অব উইলিংডন
(1866-1941)
১৮ই এপ্রিল, ১৯৩১ ১৮ই এপ্রিল, ১৯৩৬
২২ ভিক্টর হোপ, দ্বিতীয় মার্কুইস অব লিন্‌লিথ্‌গো
(1887-1952)
১৮ই এপ্রিল, ১৯৩৬ ১ লা অক্টোবর, ১৯৪৩ Edward VIII
২৩ আর্চিবল্ড ওয়াভেল, প্রথম আর্ল ওয়াভেল
(1883-1950)
১ লা অক্টোবর, ১৯৪৩ ২১শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৪৭ ষষ্ঠ জর্জ
২৪ লুই মাউন্টব্যাটেন, প্রথম আর্ল মাউন্টব্যাটেন
(1900-1979)
২১শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৪৭ ১৫ই আগষ্ট, ১৯৪৭
ভারত অধিরাজ্যের গভর্নরজেনারেল, ১৯৪৭১৯৫০
লুই মাউন্টব্যাটেন, প্রথম আর্ল মাউন্টব্যাটেন
(1900-1979)
১৫ই আগষ্ট, ১৯৪৭ ২১শে জুন, ১৯৪৮ ষষ্ঠ জর্জ
চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী
(1878-1972)
২১শে জুন, ১৯৪৮ ২৬শে জানুয়ারী, ১৯৫০

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ১৭৯৩ সনে কর্নওয়ালিস প্রশাসন কর্তৃক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকার ও বাংলার জমি মালিকদের (সকল শ্রেণীর জমিদার ও স্বতন্ত্র তালুকদারদের) মধ্যে সম্পাদিত একটি যুগান্তকারী চুক্তি। এই চুক্তির আওতায় জমিদার ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভূ-সম্পত্তির নিরঙ্কুশ স্বত্বাধিকারী হন। জমির স্বত্বাধিকারী হওয়া ছাড়াও জমিদারগণ স্বত্বাধিকারের সুবিধার সাথে চিরস্থায়ীভাবে অপরিবর্তনীয় এক নির্ধারিত হারের রাজস্বে জমিদারিস্বত্ব লাভ করেন। চুক্তির আওতায় জমিদারদের কাছে সরকারের রাজস্ব-দাবি বৃদ্ধির পথ রুদ্ধ হয়ে গেলেও জমিদারদের তরফ থেকে প্রজাদের ওপর রাজস্বের দাবি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোন বিধিনিষেধ আরোপিত হয় নি। জমিদারদের জমি বিক্রয়, বন্ধক, দান ইত্যাদি উপায়ে অবাধে হস্তান্তরের অধিকার থাকলেও তাদের প্রজা বা রায়তদের সে অধিকার দেওয়া হয় নি। নিয়মিত খাজনা পরিশোধ সাপেক্ষে উত্তরাধিকারক্রমে জমির মালিক থাকার প্রথাগত অধিকার রায়তদের থাকলেও জমি হস্তান্তরের অধিকার তাদের ছিল না। সরকারের বেলায় জমিদারদের অবশ্য একটি দায়দায়িত্ব কঠোরভাবে পালনীয় ছিল। সেটি হচ্ছে নিয়মিত সরকারের রাজস্ব দাবি পরিশোধ করা। জমিদারগণকে এই মর্মে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয় যে, তাদের কেউ নির্ধারিত তারিখে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে খেলাপি ব্যক্তির সকল জমি বা এসব জমির এমন এক অংশ যা বকেয়া দাবি পূরণের জন্য যথেষ্ট গণ্য হতে পারে, তা অবশ্যই নিলামে বিক্রয় করা হবে।

প্রাচ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্ক ও আলোচনার পর প্রণীত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে আদৌ রাজস্ব সংগ্রহের ব্যবস্থামাত্র রূপে গণ্য করা যায় না। বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থারই একটি প্রধান অংশ। প্রশাসনের নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও পুলিশ বিভাগকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থা কার্যকরীকরণের উপযুক্ত করে তোলা হয়। তবে, এ ব্যবস্থা বজায় রাখার সকল সযত্ন প্রয়াস সত্ত্বেও উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ভূমি রাজস্ব আইন-এর প্রভাব, এই শতকের শেষের দিকে সাম্রাজ্যবাদের উত্থান, বিশ শতকে জাতীয়তাবাদের প্রচার-প্রসার ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির মতো নানা কারণে সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতির চাপে এতে অবক্ষয়ের সূচনা হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলবৎ হওয়ার পর থেকে এ ব্যবস্থার কয়েক দফা সংশোধন ও পরিবর্তন করা হয়। পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে অবশেষে ১৯৫০ সনে সমগ্র ব্যবস্থাই বিলুপ্ত করা হয়।

কলকাতায় জমিদারি (১৬৯৮) প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি ক্রমাগত বাড়তে থাকে। পলাশীর যুদ্ধে (১৭৫৭) নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয়ের পর কোম্পানি সর্বাপেক্ষা আধিপত্যশীল হয়ে ওঠে। তবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেশের প্রকৃত শাসক হয়ে উঠার সত্যিকার প্রক্রিয়া শুরু হয় বাংলা, বিহারউড়িষ্যার (১৭৬৫) দেওয়ানির দায়িত্ব গ্রহণের পর। দেওয়ানি ব্যবস্থায় কোম্পানি বাংলার কার্যত অধীশ্বর হয়ে ওঠে।

নানা বাধাবিঘ্নের কারণে বাংলার এই নতুন অধীশ্বর গোড়া থেকেই রাজ্য শাসনের জন্য প্রস্তুত ছিল না। কোম্পানির বণিক ও হিসাবরক্ষক হিসেবে বাংলায় কোম্পানির কর্মকর্তারা পণ্যের কেনাবেচা, ব্যবসায়ের সুদীর্ঘ স্থিতিপত্র ইত্যাদি তৈরিতে দক্ষ ছিল বটে, তবে শাসনকাজে তারা ছিল একেবারেই অজ্ঞ। জনবলের অভাব, ভাষার সমস্যা, দেশজ ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অজ্ঞতা, বাংলায় অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী বৈদেশিক সমুদ্রচারী জাতির উপস্থিতি ইত্যাদি কারণ বাংলায় উপনিবেশ রাষ্ট্র গড়ে তোলার কাজে তাদের শ্লথ গতিতে অগ্রসর হতে বাধ্য করে। একেবারেই গোড়ার দিকে কোম্পানি তাই দেশীয় সহযোগীদের যোগসাজসে এই নতুন উপনিবেশ শাসনের পন্থা গ্রহণ করে। নব্য শাসকদের সমস্যাটি ছিল এই যে, এটি আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো নতুন বসতি স্থাপনের উপনিবেশ ছিল না, মূলদেশের (ইংল্যান্ডের) আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা অনুযায়ী এটির শাসন পরিচালনাও সম্ভব ছিল না। আবার বাংলার অধিবাসীরা আফ্রিকা বা প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপদেশগুলির আদিবাসীদের মতো কোন অর্ধসভ্য জনসমাজও ছিল না, যে কারণে এখানে বেত্রশাসন ছিল অবাস্তব।

সবচেয়ে বড় সমস্যাটি দেখা দেয় আইন-কানুন প্রয়োগের ক্ষেত্রে। কোম্পানি বাংলার নিজস্ব আইন-কানুন বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা অনুযায়ী দেশ শাসনের অবস্থায় ছিল না, কেননা তা হতো উপনিবেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যেরই পরিপন্থী। বলাবাহুল্য, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্দেশ্য ছিল, প্রাচ্যদেশীয় বাণিজ্য পরিচালনায় বাংলার রাজস্ব আয়কে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করা। এই পরিস্থিতিতে পলাশী প্রান্তরের ঘটনার নায়ক ও দেওয়ানি চুক্তির (১৭৬৫) প্রণেতা রবার্ট ক্লাইভ এর অন্তত সাময়িকভাবে হলেও পরিকল্পনা ছিল দেশটি দেশীয় লোকদের দ্বারাই শাসিত হবে। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশী লোকেরা তাদের নিজস্ব আইন-কানুন ও রীতি অনুসারে দেশ শাসন করবে, আর কোম্পানির কাজ হবে শুধু এক উপরিশক্তি হিসেবে মুর্শিদাবাদে নওয়াবের দরবারে নিযুক্ত কোম্পানির একজন প্রতিনিধির মারফত উদ্বৃত্ত রাজস্ব সংগ্রহ করা। সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজা খান (১৭১৭? -১৭৯১) নামে ইরান থেকে ভাগ্যানুসন্ধানে আগত ও বাংলায় দীর্ঘকাল নিবাসী এক ব্যক্তিকে নায়েব দেওয়ান হিসেবে নিযুক্ত করে তার উপর দেশশাসন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। রেজা খানকে নাবালক নওয়াবের (নাজমুদ-দাওলা) নায়েব নাজিম বা অভিভাবক নিযুক্ত করা হয়। নায়েব নাজিম রূপে মুহাম্মাদ রেজা খান ছিলেন নিজামত বা অসামরিক প্রশাসন প্রধান আর নায়েব দেওয়ান হিসেবে তিনি ছিলেন দেওয়ানি বা রাজস্ব প্রশাসনের প্রধান। তাকে দেশীয় আইন-কানুন ও প্রথা অনুযায়ী দেশ শাসন করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়।

ক্লাইভ প্রণীত এই শাসনপদ্ধতিকে সাধারণত দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা বলে পাঠ্যগ্রন্থে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। এই ব্যবস্থাটি ১৭৬৭ সন অবধি ভালভাবেই কার্যকর ছিল। ঐ বছরেই ক্লাইভ এদেশ থেকে চূড়ান্তভাবে বিদায় নেন। ক্লাইভের সমর্থনে রেজা খান দক্ষতার সাথেই কোম্পানির রাজ্য শাসনে সক্ষম হন। তবে পৃষ্ঠপোষক ক্লাইভ-এর নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের পর রেজা খানকে ফোর্ট উইলিয়ামের উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তাদের চরম বিরোধিতা মোকাবেলা করতে হয়। ফোর্ট উইলিয়ামের এসব কর্মকর্তা রাতারাতি ধনী হবার বাসনায় রেজা খানের প্রভাব-প্রতিপত্তি হ্রাসে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠেন। তারা পর্যায়ক্রমে রেজা খানের হাত থেকে প্রশাসন নিজেদের হাতে তুলে নেন। তাদের এ হস্তক্ষেপের বিষয় প্রথম স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিভিন্ন জেলায় ইউরোপীয় তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগের মাধ্যমে। তাদেরকে আপাতদৃশ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাস অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু রেজা খান অভিযোগ করতে থাকেন যে এই নবনিযুক্ত কর্মকর্তারা পল্লী অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছেন। সরাসরি দেশ শাসনের ক্ষেত্রে পরের ব্যবস্থাটি ছিল মুর্শিদাবাদে (বাংলার জন্য) ও পাটনায় (বিহার ও উড়িষ্যার জন্য) দুটি রাজস্ব পরিষদ (Revenue Councils) প্রতিষ্ঠা। ইউরোপীয় তত্ত্বাবধায়করা এই দুই পরিষদের আওতায় কাজ করতে থাকেন। রেজা খান ফোর্ট উইলিয়ম পরিষদের কাছে এই মর্মে অভিযোগ করতে থাকেন যে, অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যের নামে কোম্পানি কর্মকর্তারা দেশের পল্লী জনপদগুলিতে লুটপাট চালাচ্ছে। কিন্ত প্রতিকারের পরিবর্তে এসব অভিযোগ ফোর্ট উইলিয়ম কর্তাদেরকে তাঁর বিরুদ্ধে আরও ক্ষিপ্ত করে তোলে। এর পরিণতিতে কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে মন্দা দেখা দেয়, ফলে ১৭৬৯/৭০ সনের মহাদুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়। এ দুর্ভিক্ষে বাংলার মোট জনসমষ্টির এক তৃতীয়াংশ প্রাণ হারায়। বাংলার দুই-তৃতীয়াংশ ফসলি জমি লোকের অভাবে ঝোপ-জঙ্গলময় হয়ে ওঠে।

এ ধরনের ধ্বংসলীলার কারণে নতুন এই রাজ্যে প্রশাসনের ধরন সম্পর্কে শাসকদের আগের ধ্যানধারণা পুরোপুরি বদলে যায়। দেশীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে কোম্পানির দেওয়ানি প্রশাসন পরিচালনার ধারণাটি পরিত্যক্ত হয়। কোম্পানির পরিচালক সভার নির্দেশের (২৮ই আগস্ট, ১৭৭১) আওতায় কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ম কাউন্সিল দেওয়ানি প্রশাসনের ক্ষেত্রে নিজেকেই সুবা বাংলার জন্য সর্বোচ্চ সরকার ঘোষণা করে। নায়েব দেওয়ান রেজা খানকে পদচ্যুত করে দুর্নীতি ও অনিয়মের দায়ে কারারুদ্ধ করা হয়।

কোম্পানির আঞ্চলিক বিষয়াদি প্রশাসনের জন্য ১৭৭২ সনে কলকাতায় রাজস্ব কমিটি নামে এক কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়। এ কমিটির প্রেসিডেন্ট হন গভর্নর এবং বাংলার ফোর্ট উইলিয়মের প্রেসিডেন্ট। আর এভাবেই কলকাতা নীরবে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী নগরীতে পরিণত হয়। ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস ঘোষণা করেন যে, ক্লাইভের দেওয়ানিনিজামত দ্বৈত-প্রশাসন ব্যবস্থা এখন আবার ১৭৬৫-র আগের ব্যবস্থার মতোই সমম্বিত ব্যবস্থায় পরিণত হবে। এই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ১৭৭২ সনে কয়েক দফা ইস্তেহার জারি হয়। এসব ইস্তেহার অনুযায়ী রাজস্ব চাষীদের প্রকাশ্য নিলামে পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য জমি ইজারা দেওয়া হয়। এই পাঁচসালা বন্দোবস্ত স্থির করার দায়িত্ব দেওয়া হয় গভর্নর ও কাউন্সিলের চার সদস্যের নেতৃত্বে এক সার্কিট কমিটিকে। এই কমিটির আরও দায়িত্ব ছিল ইজারাদারদের কাছ (চাষীদের) থেকে রাজস্ব আদায় করা। দেশীয় জেলা কর্মকর্তা তথা ফৌজদার, কানুনগো আর আমিলদের জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হলো ব্রিটিশ কালেক্টর বা রাজস্ব আদায়কর্তা।

পাঁচসালা রাজস্ব বন্দোবস্ত সবার জন্য ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়। রাজস্ব নিলামদাররা অত্যুচ্চ হারে খাজনা আদায় করতে থাকে। এহেন পরিস্থিতিতে অনেক রায়ত জমি ছেড়ে পালিয়ে যায়, কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ পেশ করে কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে উভয় পন্থাই অবলম্বন করে এবং বহু জায়গায় বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তবে যেহেতু খোদ সরকারই অধিক থেকে অধিকতর রাজস্ব আদায়ে ছিল অনমনীয় সেহেতু নিপীড়িত রায়ত বা প্রজাকে স্বস্তি দেওয়ার মতো সদিচ্ছা ছিল না, তাদের সেরূপ প্রশাসনিক সামর্থ্যও ছিল না। ফলে, পল্লী জনপদে অর্থনৈতিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। বন্দোবস্ত সম্পাদনের পর থেকে ক্রমেই বর্ধিত হারে বকেয়া রাজস্বের জের পুঞ্জীভূত হতে থাকে। সরকারের কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে যে, পাঁচসালা বন্দোবস্তের বিষয়টি ছিল এক মহা প্রমাদ। সরকার উপলব্ধি করে যে, জমি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারভিত্তিক জমিদারদের একটা সামাজিক স্বার্থ জড়িত ছিল যা অস্থায়ী ইজারাদারদের বেলায় ছিল না। তাই ধরে নেওয়া হয় যে, জমিদারদের তাদের পুরানো মর্যাদা ফিরিয়ে দিলে ও তালুকের সম্পদ অনুযায়ী রাজস্ব ধার্য করা হলে একদিকে যেমন রাজস্ব আদায় সহজতর হবে অপরদিকে তা কৃষককুলকেও ইজারাদারের অত্যাচার থেকে রেহাই দেবে। কিন্তু পাঁচসালা বন্দোবস্তের শর্তাবলীর কারণে এক্ষেত্রে সরকারের হাত বাঁধা ছিল।

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য একমাত্র বিকল্প ছিল এই সর্বনাশা ব্যবস্থার মেয়াদ ১৭৭৭ সনে শেষ হওয়ার পর রাজস্ব আদায়ের সর্বোত্তম পদ্ধতি কি হবে তা নিয়ে আগেভাগেই বিচার-বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এ বিষয়ে কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব করা হয়। ১৭৭৫-এর ২৮শে মার্চ অনুষ্ঠিত এক সভায় কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য রিচার্ড বারওয়েল জমিদারদেরকে দীর্ঘমেয়াদে ভূমি বন্দোবস্ত দানের প্রস্তাব করেন। ১৭৭৬-এর ২২শে জানুয়ারি কাউন্সিলের আরেক সদস্য ফিলিপ ফ্রান্সিস এক তত্ত্ব উপস্থাপন করেন যাকে তিনি ‘চিরস্থায়ী ভূমি রাজস্ব পরিকল্পনা ১৭৭৬’ বলে অভিহিত করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, জমিদারই জমির মালিক। অতএব তাদেরকে চিরস্থায়িভাবে জমির বন্দোবস্ত দেওয়াই বাঞ্ছনীয়। জমিদারদের সাথে ভূমি বন্দোবস্তের ব্যাপারে ওয়ারেন হেস্টিংস বারওয়েলকে সমর্থন দেন। তাঁর মতে, ভূমি বন্দোবস্তের মেয়াদ নির্ধারণ করার আগে দেশের সম্পদের বিস্তারিত হিসাব নিরূপণ করা আবশ্যক। এসব অভিমতের ওপর কোম্পানির পরিচালক সভা যে নির্দেশ প্রদান করে তা হেস্টিংসের অভিমতের অত্যন্ত কাছাকাছি। পাঁচসালা বন্দোবস্ত ব্যবস্থার অবসানের প্রাক্কালে ১৭৭৬ সনের ২৪শে ডিসেম্বর কোম্পানির পরিচালক-সভা নির্দেশ দেয় যে, নিলামে জমি ইজারা দানের রীতি বাদ দিয়ে কেবল জমিদারদের সঙ্গে জমির স্বল্পমেয়াদি বন্দোবস্ত দিতে হবে। সভা ভূমি বন্দোবস্তের লক্ষ্যে জমির সম্পদ সঠিকভাবে নিরূপণের জন্য প্রয়োজনীয় জরিপ পরিচালনা করতে কাউন্সিলকে পরামর্শ দেয়। এভাবে কাউন্সিল ১৭৭৭ সন ও পরবর্তী তিন বছরের জন্য বার্ষিক ভিত্তিতে জমিদারদের সঙ্গে ভূমি বন্দোবস্তের সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে নতুন ব্যবস্থাটি রাজস্ব আদায়ে অবক্ষয় প্রবণতা রোধ করতে পারে নি। রাজস্ব বকেয়া ক্রমেই পুঞ্জীভূত হতে থাকে। রাজস্ব শাসনের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে গোটা দেশকে অনেকগুলি জেলায় বিভক্ত করা হয়। জেলা কালেক্টরকে জেলার সর্বেসর্বা প্রশাসকে পরিণত করা হয়। কালেক্টরকে সকল নির্বাহী ও বিচারবিভাগীয় ক্ষমতা প্রদান করা হয়। কেন্দ্রায়ন ও হস্তক্ষেপের প্রতীক রাজস্ব কমিটিকে বিলুপ্ত করে স্থাপন করা হয় রাজস্ব বোর্ড, যার দায়িত্ব হলো রাজস্ব-সংক্রান্ত বিষয়াবলির সাধারণ বা সার্বিক নিয়ন্ত্রণ। জমিদারগণকে তাদের জমির ন্যায্য রাজস্ব নির্ধারণের জন্য এই কালেক্টরের মুখাপেক্ষী হতে হয়। রাজস্ব বোর্ডও রাষ্ট্রের রাজস্বের জন্য কালেক্টরের ওপর নির্ভরশীল হয়। ১৭৮৬ সনের সংস্কার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রকৃত প্রশাসনিক বুনিয়াদ রচনা করে। সরকার তখন থেকে আগেকার যেকোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস ও দৃঢতার সঙ্গে জমিদারদের সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্য প্রস্তুত হয়। তবে সরকারের এই প্রস্তুতি রাজস্ব আদায়ে খুব বেশি নিয়ম-শৃঙ্খলা নিয়ে আসেনি, কেননা রাজস্ব আদায়ে এর পরেও অনিশ্চয়তা বিরাজমান ছিল।

পিট-এর ভারত আইন ১৭৮৪-এর একটি দফায় কলকাতা সরকারকে অনতিবিলম্বে রাজস্ব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ করা এবং সরকার ও জমিদার উভয় তরফের জন্য সুবিধাজনক শর্তের আওতায় জমিদারদের সাথে রাজস্ব প্রশ্নে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পাদনের নির্দেশ দেওয়া হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পাদনের জন্য স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে ১৭৮৬ সনে ব্রিটিশ ভূস্বামী শ্রেণীর অন্যতম সদস্য লর্ড কর্নওয়ালিসকে গভর্নর জেনারেল করে পাঠানো হয়। একটি চিরস্থায়ী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি তাঁর রাজস্ব উপদেষ্টা জন শোরের (রাজস্ব বোর্ডের সভাপতি ও কাউন্সিল সদস্য) প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হন। উল্লেখ্য, জন শোর ছিলেন বাংলার রাজস্ব বিষয়ে সেরা বিশারদ। শোরের বিশ্বাস ছিল যে, অনতিবিলম্বে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পাদন করার মতো যথেষ্ট তথ্য তাদের হাতে নেই। অবশ্য নীতিগতভাবে তিনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ধারণার বিরোধী ছিলেন না। তাঁর কেবল আপত্তি ছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থা প্রবর্তনের সময় নিয়ে। তাঁর যুক্তি ছিল এই যে, একেকটি স্বতন্ত্র তালুকের প্রকৃত সম্পদ এবং জমিতে রায়তসহ যাদের স্বার্থ জড়িত রয়েছে তাদের প্রকৃত অধিকার ও দায়দায়িত্বের বিষয় বিবেচনায় না নিয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পাদন করা হলে তাতে এ চুক্তির সকল পক্ষেরই স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। শোর তাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলবৎ করা আরও দুই বা তিন বছর স্থগিত রাখার অনুকূলে ছিলেন, যাতে করে ইত্যবসরে জমির সম্পদ ও জমিতে অধিকার সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যাপারে এহেন প্রশ্নে কর্নওয়ালিস ও শোরের মধ্যে প্রবল মতপার্থক্য দেখা দেয়। কর্নওয়ালিস যুক্তি দেন যে, গত বিশ বছরে সংগৃহীত তথ্যই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পাদনের জন্য যথেষ্ট। তাঁর আরও যুক্তি ছিল, কোন এক বা একাধিক তরফের বেলায় কোন গলদ-ত্রুটি ধরা পড়লে সেগুলি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সু-প্রভাবে অচিরেই দূর হয়ে যাবে। কর্নওয়ালিস বিশ্বাস করতেন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থা জমিদারদের নিজেদেরকে উন্নয়নকামী জমিদার ও কৃষি পুঁজিবাদী করে তোলার ব্যাপারে যথেষ্ট প্রেরণা যোগাবে।

কর্নওয়ালিস ও শোর তাদের নিজ নিজ অভিমত ও এতদসংক্রান্ত অন্যান্য দলিলপত্র কোম্পানির পরিচালক সভার কাছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য পাঠাতে সম্মত হন। তারা আরও একমত হন যে, ইত্যবসরে সরকারের উচিত হবে ১৭৯০ থেকে ১০ বছর মেয়াদের জন্য জমি বন্দোবস্ত দেওয়া যার সাথে এই মর্মেও বিজ্ঞপ্তি থাকবে যে, যদি পরিচালক সভা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অনুকূলে মত প্রকাশ করেন তাহলে এই দশসালা বন্দোবস্তই অবিলম্বে চিরস্থায়ী বলে ঘোষিত হবে। কাউন্সিলের সকল সদস্যের সভার কার্যবিবরণী সমীক্ষার পর কোম্পানির পরিচালক-সভা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অনুকূলে অভিমত প্রদান করে। ১৭৯৩ সনের ২৩শে মার্চ লর্ড কর্নওয়ালিস ঘোষণা করেন যে, দশসালা বন্দোবস্তের মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার পর জমিদারদেরকে তাদের নিজ নিজ জমিদারির বেলায় প্রদেয় যে রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়েছিল তাতে কোনপ্রকার রদবদল করা হবে না; উপরন্তু, তাদের ওয়ারিশ ও আইনগতভাবে অন্যান্য উত্তরাধিকারীদেরকে এই পরিমাণ প্রদেয় রাজস্বের ভিত্তিতে চিরস্থায়িভাবে তালুকের ভোগদখল করার অনুমতি দেওয়া হবে (ইস্তাহার অনুচ্ছেদ ৩, ধারা ৪, প্রবিধান ১, ১৭৯৩)।

জমিদারদের প্রতিক্রিয়া

জমিদারদের প্রতিক্রিয়া সম্ভবত যুক্তিসিদ্ধ কারণেই কর্নওয়ালিস প্রশাসনের প্রত্যাশা ছিল যে, তাদের এই নতুন ভূমি ব্যবস্থাটিকে জমিদাররা বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে নজিরবিহীন সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় স্বাগত জানাবে এ কারণে যে, এই ব্যবস্থার আওতায় ভূ-সম্পত্তির ক্ষেত্রে বেসরকারি মালিকানা সৃষ্টির এই সুযোগটি ইতোপূর্বে আর কখনও ছিল না। এই নবসৃষ্ট ভূ-সম্পত্তি বিনামূল্যে জমিদারদের হাতে ন্যস্ত করা হয়। সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আওতায় জমিদারগণ চিরকালের মতো নির্ধারিত হারে সরকারি রাজস্ব পরিশোধের ব্যতিক্রমধর্মী সুবিধা লাভ করে। বস্তুত এ সিদ্ধান্তটি সরকারের দিক থেকে রাজস্বের নিরিখে নিশ্চিতভাবেই একটি ত্যাগ স্বীকার। আর তাই স্পষ্টতই সরকার গভীর আগ্রহে আশা করছিলেন যে, এক সুবিধাভোগী পক্ষ হিসেবে জমিদারগণ এই বন্দোবস্ত ব্যবস্থা বিপুল আগ্রহ-উদ্দীপনা সহকারে গ্রহণ করবে ও ব্রিটিশ সরকারের সুশাসনের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবে। কিন্তু সরকার পরম বিস্ময়ে ও আশাহত হয়ে লক্ষ্য করলেন যে, জমিদাররা বরং চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থায় অসন্তোষ ও ক্ষুব্ধ মনোভাব প্রকাশ করছে। এমনকি বহু হতাশ জমিদার এই ভূমি বন্দোবস্ত ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে, অনেকে এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিরোধও গড়ে তোলে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের শর্তাদি সম্পর্কে জমিদারদের অসন্তোষের অনেক যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। এ পদ্ধতিতে পূর্ববর্তী দশ বছরের প্রকৃত খাজনা আদায়ের এক স্থূল গড়পরতার ওপর ভিত্তি করে জমিদারদের ওপর রাজস্ব নিরূপণ করা হয়। এ ধরনের অনির্ভরযোগ্য পদ্ধতির কারণে কোন তালুকের ওপর করের হার যেমন খুব কম হতে পারে আবার কোন তালুকের ওপর তা অত্যন্ত বেশিও হতে পারে। কাজেই যেসব তালুক-জমিদারি বিপুল করভারে ন্যুব্জ থাকবে তাদের জমি বকেয়া বাবদ প্রকাশ্য নিলামে উঠা অবশ্যম্ভাবী। এছাড়া, ভবিষ্যতে ‘খরা, প্লাবন, নদীভাঙন জনিত ক্ষয়ক্ষতি, রায়ত বা প্রজার মৃত্যু বা পলায়নের বেলায়’ কোনরকম খাজনা মওকুফ করা হবে না বলে সরকারের দৃঢ ঘোষণা জমিদারগণ একান্তই অবাস্তব বলে মত প্রকাশ করেন। তারা যুক্তি দেখান যে, বৃষ্টিনির্ভর যেকোন কৃষি অর্থনীতিতে মাঝে মাঝেই ফসলহানি ঘটা স্বাভাবিক, আর সে কারণে রাজস্ব বাকি পড়া অনিবার্য। তারা জোরালো যুক্তি দেখান যে, কর্তৃপক্ষ যদি একান্ত নিয়মিত ও রুটিনমাফিক বৃষ্টিপাতের নিশ্চয়তা বিধান না করতে পারেন তাহলে তারা কেমন করে তাদের প্রজাদেরকে যথাসময়ে ও নিয়মিতভাবে প্রদেয় ভূমি রাজস্ব পরিশোধের জন্য চাপ দেবেন? জমির মালিকগণ ভূমি বন্দোবস্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছে তাদের বক্তব্যের সপক্ষে সনাতন ঐতিহ্যিক প্রথার বিষয় তুলে ধরেন, যার আওতায় প্রাকৃতিক কারণে ইতঃপূর্বে ফসলহানি ঘটলে তাদেরকে সরকারি রাজস্ব মওকুফ করা হতো। ১৭৯০ সন থেকে পরের তিন বছর রাজস্বের ক্রমবৃদ্ধি ছিল জমিদারদের আরও একটি অভিযোগের কারণ। জমিদারগণ কর্তৃক এই নীতিকে অগ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করার কারণ হচ্ছে, রাজস্ব ক্রমবৃদ্ধির প্রত্যাশাই ছিল যে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সংশ্লিষ্ট তালুকের আয় বেড়ে যাবে এ ধরনের অনুমান নিছক কল্পনাসুলভ ও অযৌক্তিক।

জমিদারদের আরও একটি অভিযোগ ছিল তালুক নীতির প্রশ্নে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিধিবিধান অনুযায়ী, যেসব তালুক এ যাবৎ জমিদারদের মাধ্যমে রাজস্ব প্রদান করে আসছে সেসব তালুকের প্রত্যেকটিকে একেকটি স্বতন্ত্র জমিদারি হিসেবে গণ্য করতে হবে। সকল বড় আকারের জমিদারির নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের বহু তালুক ছিল। এসব তালুককে কোনরকম ক্ষতিপূরণ না দিয়েই সংশ্লিষ্ট জমিদারি থেকে সেগুলিকে আলাদা করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। তালুকগুলি এভাবে আলাদা করে ফেলার কারণে বহু জমিদারি, যেগুলি ব্যবস্থাপনা বা অন্য কারণে তালুকের সৃষ্টি করেছিল, কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়।

জমিদারদের জন্য আরেকটি অসুবিধাজনক আইন ছিল পাট্টা রেগুলেশন। এই আইনের আওতায় জমিদারদেরকে তাদের প্রজাদের পাট্টা প্রদানের নিয়ম করা হলো যাতে বন্দোবস্তের শর্তাবলি সংজ্ঞায়িত হয়। এ আইনটি এই মর্মে জমিদারদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যে, তারা নির্ধারিত অঙ্কের খাজনার অতিরিক্ত আবওয়াব বা এ ধরনের কোন কর আরোপ করতে পারবে না। জমিদারদের বিবেচনা ও দাবি অনুযায়ী, এ শর্তটি ছিল জমিদারি ব্যবস্থাপনা ও মালিকানায় সরাসরি হস্তক্ষেপ।

জমিদারদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ও বিক্ষোভ, সূর্যাস্ত আইন প্রয়োগের আওতায় বিপুল হারে জমি মালিকানার হস্তান্তর, সরকারি রাজস্বের ক্রমহ্রাস প্রবণতা, স্তূপাকারে জমে উঠা দেওয়ানি মামলা নিস্পত্তিতে বিচার বিভাগীয় ব্যর্থতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি আর সেই সাথে আনুষঙ্গিক অন্যান্য সকল বিষয় সরকারের জন্য বেশ অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। এমন আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে যে, এই প্রবণতাকে ঠেকাতে না পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে বাধ্য। তবে কর্তৃপক্ষের জন্য স্বস্তির বিষয় ছিল এই যে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অপারেশন পুরানো ভূমধ্যধিকারী অভিজাত শ্রেণীর ঐতিহ্যিক আর্থসামাজিক কাঠামোকে যথেষ্ট বিঘি³ত করলেও, নয়া শাসকগোষ্ঠী এর বিপরীতে এক পাঁচমিশালি সামাজিক শ্রেণী গঠন করতে সমর্থ হয়। এদের মধ্যে ছিল তালুকদার , জোতদার, স্বল্প রাজস্ব আরোপ করা হয়েছে এমন মালিক, নতুন জমিদার, উদীয়মান বেনিয়া, ইঙ্গ-ভারতীয় সওদাগর সম্প্রদায় ইত্যাদি ছাড়াও আরও অনেকে। কিন্তু এ সত্ত্বেও তারা সামাজিকভাবে তখনও তেমন মর্যাদা ও ক্ষমতার অধিকারী হয় নি যাতে তারা সঙ্কটকালে সরকারের সমর্থনে জনসমাজকে নেতৃত্ব দিতে পারে।

লর্ড ওয়েলেসলির শাসনামলে (১৭৯৭১৮০৫) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত-পরবর্তী পট পরিবর্তনকে অত্যন্ত উদ্বেগের চোখে দেখা হয়। ওয়েলেসলি সরকার ছিল সাম্রাজ্য গড়ে তোলায় অঙ্গীকারা বদ্ধ। এই সময়ে প্রতি মাসে শত শত জমিদারি নিলামে বিক্রয় করা হয়। ১৭৯৩ সনের পূর্বেকার মতো রাজস্ব আদায় অনিয়মিত ও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, প্রশাসনিক ব্যয় বেড়ে যায়, রাজস্ব আয় কমে আসে, দেশের অভ্যন্তরভাগে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। জমিদারি-হারা পুরানো ভূস্বামীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এ ধরনের দৃশ্যপট সরকারকে উদ্বিগ্ন করে তুলে।

ওয়েলেসলি তাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কিত মূল বিধিগুলির কিছু সংশোধন করে জমিদার শ্রেণীর সঙ্গে একটা আপসে উপনীত হবার সিদ্ধান্ত নেন। এরই প্রেক্ষাপটে প্রণীত হয় ১৭৯৯ সনের ৭ নং রেগুলেশন যা সাধারণত হফতম বা সপ্তম আইন নামে পরিচিতি লাভ করে। এ আইনের ফলে রায়তদের ওপর জমিদারদের লাগামহীন ক্ষমতা দেওয়া হয়। জমিদারগণ বকেয়া আদায়ের নামে প্রজাদের ফসল, গবাদি ও সম্পত্তি ক্রোক এবং বিক্রয় করে বকেয়া আদায়ের অধিকার লাভ করে। স্বত্বাধিকারী হিসেবে তারা খেলাপি রায়তদের তাদের নিজ নিজ কাচারিতে তলব করার ও বকেয়া পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাদের পায়ে বেড়ি পরিয়ে আটকে রাখার, কোন খেলাপি রায়ত তার পরিবার ও সহায়-সম্পত্তি নিয়ে অন্য কোন নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে গেলে ঐ রায়তের গ্রামের সকলের ওপর পাইকারি জরিমানা আরোপের ক্ষমতা লাভ করে। পরগনাপ্রথা অগ্রাহ্য করে জমিদাররা যথেচ্ছভাবে খাজনা বৃদ্ধির ক্ষমতা লাভ করে। সংক্ষেপে, রায়তগণ এতকাল যাবৎ ঐতিহ্যগতভাবে যেসব প্রথাগত অধিকার ভোগ করে আসছিল হফতম সেসব অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করে। রায়ত অসহায় কোর্ফা প্রজায় পরিণত হয়।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মূল আইনের পরবর্তী সংশোধন হয় ১৮১২ সনের ৫নং রেগুলেশনের অধীনে। আইনটি সাধারণ্যে পানজাম বা পঞ্চম নামে পরিচিত। এই রেগুলেশনের আওতায় জমিদারগণ যে কোন মেয়াদের জন্য তাদের জমি ইজারা দেওয়ার অধিকার লাভ করে। ইজারার মেয়াদ ১৭৯৩ সনের আইনে সর্বাধিক দশ বছরের মধ্যে সীমিত ছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ব্যাপকভাবে বদলে দেয় ১৮১৯ সনের ৮নং রেগুলেশন যা সাধারণভাবে পত্তনি আইন নামে পরিচিত লাভ করে। এই আইনবলে জমিদার ও রায়তের মধ্যবর্তী একটি বহুস্তরবিশিষ্ট মধ্যস্বত্ব শ্রেণী সৃষ্টি করার অধিকার লাভ করে। বাস্তবিকপক্ষে, এ ছিল জমিদারি ক্ষমতার চরম শিখর এবং একই সঙ্গে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মূল উদ্দেশ্যের ব্যর্থতা। এই আইনের আওতায় জমিদারগণ তাদের খেলাপি পত্তনিদারদের জমি প্রকাশ্য নিলামে বিক্রয় করার অধিকার লাভ করে, ঠিক যেভাবে সূর্যাস্ত আইনের আওতায় খেলাপি জমিদারের জমি নিলাম হয়ে যেতো।

জমিদারদের সাথে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পাদনের কিছু আশু উদ্দেশ্য ছিল। এগুলি হচ্ছে:

  • রাজস্ব প্রদায়ক শ্রেণীকে একটি নির্দিষ্ট ভিত্তি বা বুনিয়াদ দেওয়া এবং রাজস্ব আদায় সুনিশ্চিত করা;
  • সরকারকে প্রদেয় একটি নূ্যনতম রাজস্ব সংগ্রহ নিশ্চিত করা;
  • রাজস্ব-সংক্রান্ত বিষয় থেকে কর্মকর্তাদেরকে দায়মুক্ত করে তাদেরকে প্রশাসনের অন্যান্য ক্ষেত্রে নিয়োজিত করা; এবং
  • জমিদার শ্রেণী ও ঔপনিবেশিক শাসকদের মধ্যে মৈত্রী গড়ে তোলা।

সরকার পুরোপুরি না পারলেও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের এই স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্যগুলি অর্জনে সক্ষম হয়। রাজস্ব প্রদায়ক জমিদার শ্রেণী একটি নির্দিষ্ট ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে যায়। সরকার এখন থেকে জানত জমি থেকে বছরে তাদের সঠিক কত রাজস্ব আসছে আর জমিদারও জানতেন সরকারের প্রতি তার চুক্তিগত কি দায়দায়িত্ব রয়েছে। এর আগে অবশ্য সরকার বা রাজস্ব প্রদানকারী কোন তরফই জানত না রাজস্ব সংগ্রহ ও পরিশোধের ক্ষেত্রে তাদের সঠিক অবস্থানটি কোথায়। রাজস্ব বিক্রয় আইন একটি নূ্ন্যতম পরিমাণ রাজস্ব আদায় সুনিশ্চিত করে যা ইতোপূর্বে ছিল না।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জমিদারদের সাথে আঁতাত গড়ার কাজে আশু সাফল্য আসেনি। এর কারণ, বন্দোবস্তের মূল শর্তাদি জমিদারদেরকে তুষ্ট করতে পারেনি। তবে পরে তাদেরকে অপরিসীম ক্ষমতা দেওয়ার পর এবং দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতির আলোকে সরকারের রাজস্ব দাবি অনেক লঘু হয়ে আসায় ভূ-স্বামী শ্রেণী সূর্যাস্ত আইনের কবল থেকে রক্ষা পায়। এর ফলে সরকারের প্রতি তাদের আনুগত্য বৃদ্ধি পায়। এর প্রমাণ সিপাহী বিপ্লব, স্বদেশী আন্দোলন ও জঙ্গি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকালে সরকারকে জমিদার শ্রেণীর অকুণ্ঠ সমর্থন প্রদান।

তবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দীর্ঘমেয়াদি মহত্তর উদ্দেশ্য ছিল। এই আইন পাশ হওয়ার প্রাক্কালে কাউন্সিল সভার বিভিন্ন কার্যবিবরণী ও পত্রযোগাযোগ লক্ষ্য করলে বিষয়টি পরিষ্পার হয়ে ওঠে। এই ব্যবস্থার প্রণেতারা অনুমান করেছিলেন, এই নতুন পদ্ধতি বলবৎ হলে তা প্রথমে কৃষিখাত ও কৃষিকাজ সংশ্লিষ্ট শিল্পে পুঁজিবাদী পরিবর্তনের সূচনা করবে এবং এর ফলে দেশে একটি শিল্পবিপ্লব সংঘটিত হবে। আশা করা হয়েছিল, জমিতে স্বত্বাধিকার ও সরকারের চির অপরিবর্তনীয় রাজস্ব দাবির কারণে স্থানীয় জমিদারগণ ব্রিটেনের ভূস্বামীদের মতো উন্নয়নকামী ভূস্বামী হয়ে উঠবেন। মুনাফার প্রেষণা তাদেরকে তাদের উদ্বৃত্ত পুঁজি কৃষির বিভিন্ন খাতে যেমন, আবাদ বা বনজঙ্গল থেকে জমি উদ্ধার, সেচ, নিষ্পাশন ব্যবস্থা নির্মাণ, যোগাযোগ খাত, কৃষিঋণ, উন্নততর বীজ, হাট-বাজার নির্মাণ, মাছ চাষ, গবাদি পালন ইত্যাদিতে বিনিয়োগে উৎসাহ যোগাবে। প্রত্যাশা ছিল, কৃষিখাতে পরিবর্তন ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে রূপান্তরের সূচনা করবে আর এভাবে এসব পরিবর্তন সম্মিলিতভাবে অভিশুল্ক ও করের আকারে সরকারের আয় বরাবর বাড়াতে থাকবে। মনে করা হয়েছিল, জমিদারদের কাছে রাজস্ব দাবি চিরকালের মতো নির্দিষ্ট করে দিয়ে সরকার আগে দীর্ঘমেয়াদে যে ইচ্ছাকৃত ক্ষতি স্বীকার করেছিল এ ধরনের পরিস্থিতি তা বেশ ভালভাবে পুষিয়ে দেবে।

কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নেপথ্যে শাসকদের যে দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যশা ছিল তা বাস্তবায়িত হয়নি। নতুন-পুরানো কোন স্থানীয় জমিদারই কখনও ব্রিটেনের জমিদারদের মতো উন্নতিমুখী জমিদার হয়ে উঠেনি। গ্রামবাংলার দৃশ্যপট বদলানোর ক্ষেত্রে জমিদারদের ব্যর্থতা সম্পর্কে পণ্ডিতদের মধ্যে কোন দ্বিমত নেই। তবে জমিদারগণ কেন এরকম আচরণ করলেন সে বিষয়ে তাদের মধ্যে দারুণ মতপার্থক্য রয়েছে। পুঁজি সংগঠনমূলক উপকরণের সাহায্যে জমির উন্নতিবিধান না করে তারা বরং মহাজনি বিনিয়োগ, খাদ্যশস্যের ব্যবসায়, নতুন তালুক ক্রয়, বন্ড, উপ-কর, শহরের বিষয়-সম্পত্তি, রায়তদের খাজনা বৃদ্ধি ও তাদের ওপর আবওয়াব বা অবৈধ উপ-কর আরোপ ইত্যাদিতে নিয়োজিত হন। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জমিদারদের এ ধরনের আচরণ যুক্তিসঙ্গত ছিল এই কারণে যে, পুঁজিবাদী বিনিয়োগের চেয়ে সামন্তবাদী শোষণ ছিল অধিকতর লাভজনক। জমিতে বিনিয়োগ কম মুনাফাজনক ও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল বলে জমিদারদের তাদের পুঁজি জমিতে বিনিয়োগ করার কোন অর্থনৈতিক যুক্তি ছিল না। পক্ষান্তরে, ইংল্যান্ডে সে সময় কৃষিকে উৎসাহিত করার জন্য একটা শক্তিশালী শিল্পখাত গড়ে উঠেছিল। আর সেই সাথে ঐ দেশের সরকার দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা ও জমিমালিক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষায় নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বাংলার ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে, জমিদারগণ সে ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। কৃষি খাতে উন্নতি বা প্রবৃদ্ধির জন্য শিল্পায়নের প্রয়োজন অপরিহার্য। বাংলার কৃষি অর্থনীতি কোম্পানি শাসনে এ সুবিধা হারায়, কেননা এ দেশের শিল্পের ক্ষেত্রে যে বিরাট ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল তাদের আমলে তা ধ্বংস হয়। ব্রিটিশ শাসনের আওতায় বারংবার দুর্ভিক্ষ, আকাল, দ্রব্যমূল্যের উঠানামা, স্থানীয় শিল্পের বিলুপ্তি, বিত্ত অপচয়মূলক বৈরি কারণ ইত্যাদি থেকে বাংলার কৃষি খাত কখনও মুক্ত থাকতে পারে নি। এ ধরনের পরিবেশ-পরিস্থিতি পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে অপচয়কারী ভোগবাদী সামন্ত মানসিকতা গড়ে উঠারই অনুকূল ছিল। বাংলার জমিদারশ্রেণী সে মানসিকতার বাস্তব প্রমাণও দিয়েছে।

সামন্ত মূল্যবোধের সবচেয়ে রেখাপাতযোগ্য যে বৈশিষ্ট্যটি জমিদারগণ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরপরই অচিরে অর্জন করেন তা হলো তাদের অনুপার্জিত আয়ে জীবন নির্বাহ করা। একটা বার্ষিক নির্ধারিত অঙ্কের অর্থপ্রাপ্তির বিনিময়ে তারা তাদের জমিদারির ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ পাকাপাকিভাবে আরেক মধ্যস্বত্বাধিকারী শ্রেণীর হাতে ছেড়ে দেন। অর্থাৎ জমির নিরঙ্কুশ একচ্ছত্র স্বত্বাধিকারী হিসেবে জমিদাররাও আরেকটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করলেন মধ্যস্বত্বাধিকারীর সঙ্গে। জমিতে কোন মূলধন বিনিয়োগের দাবির ভিত্তিতে নয় বরং ঐ জমিতে চিরস্থায়ী স্বত্বাধিকারের বলেই জমিদাররা চিরস্থায়ী মধ্যস্বত্ব সৃষ্টি করে। স্থায়ী অধিকার লাভের ফলে এই নতুন মধ্যস্বত্বাধিকারীরাও আবার উপবন্দোবস্ত দিতে থাকে। আর এভাবে ভূ-স্বত্বে একের নিচে আরেক পর্যায়ক্রমিক স্তর তৈরি হতে থাকে, কোন কোন ক্ষেত্রে তা কয়েক স্তরে পৌঁছায়। বাকেরগঞ্জে এরকম পনেরটি স্তরের সন্ধান পাওয়া যায়।

এভাবে ভূমি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সোপানক্রমিক মধ্যস্থ শ্রেণীর আবির্ভাবের সুগভীর আর্থসামাজিক তাৎপর্য ছিল। রাজস্ব জরিপ (আনু. ১৮৬০-১৮৭০) এবং জরিপ ও বন্দোবস্ত কার্যক্রমের (আনু. ১৮৮৬) রেকর্ডপত্র থেকে দেখা যায়, যেসব জমিদার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরে তাদের পরবর্তী মধ্যস্বত্বশ্রেণী ভূমি ব্যবস্থার সৃষ্টি করেছিল তাদের প্রায় সকলেই পুরানো জমিদার। মধ্যস্বত্ব মানে প্রজার ওপর খাজনার অতিরিক্ত চাপ। কথাটি এভাবেও বলা যায় যে, জমিদার ও মধ্যস্বত্ব বন্দোবস্তধারীর অধিকারের স্থিতি এবং খাজনার চড়াহার ও মধ্যস্বত্ব পরস্পর-সম্পর্কিত। মধ্যস্বত্ব বন্দোবস্তের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। এটি হলো, এ যাবৎকালের বনজঙ্গলময় এলাকায় আবাদি জমির সম্প্রসারণের প্রয়াসে এ ধরনের বন্দোবস্তধারীদের