সোমবার , নভেম্বর ২০ ২০১৭ | ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Breaking News
Home / ধর্ম ও ইতিহাস / বাংলাদেশের ইতিহাস

বাংলাদেশের ইতিহাস

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি ক্ষুদ্রায়তন এবং উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই এর কিছু কিছু অংশে মানব বসতির অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বেশ প্রাচীন হলেও বাংলাদেশ অংশের জনসমাজ কোন পৃথক সভ্যতার জন্ম দিতে পারেনি। তবে অবশ্যই একটি স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট সংস্কৃতি হিসেবে টিকে ছিল যুগে যুগে। প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ প্রাচীন ইতিহাসের কোন পর্যায়েই সম্পূর্ণ স্বাধীন ও একতাবদ্ধভাবে আপন রাষ্ট্র গড়ে তোলার সুযোগ পায় নি। এই সুযোগ তারা লাভ করেছে ১৯৭১ সালে চূড়ান্ত স্বাধীনতার পর। তবে বাংলাদেশের জনসমাজ আবার কখনও কারও সম্পূর্ণ অধীনতাও স্বীকার করে নি। অনেক বিদ্রোহের জন্ম হয়েছে এই অঞ্চলে। দেশটির তিনদিক বর্তমানে ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং এক দিকে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। প্রাগৈতিহাসিক কালে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলই এই বঙ্গোপসাগরের নিচে চাপা পড়ে ছিল। বাংলাদেশের মূল অংশ সাগরের কোল থেকেই জেগে উঠেছে।

প্রাচীন বাংলা

উয়ারি-বটেশ্বর অঞ্চলে ২০০৬ সালে প্রাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী বাংলাদেশ অঞ্চলে জনবসতি গড়ে উঠেছিলো প্রায় ৪ হাজার বছর আগে। ধারণা করা হয় দ্রাবিড় ও তিব্বতীয়-বর্মী জনগোষ্ঠী এখানে সেসময় বসতি স্থাপন করেছিল। পরবর্তীকালে এই অঞ্চলটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয় এবং স্থানীয় ও বিদেশী শাসকদের দ্বারা শাসিত হতে থাকে। আর্য জাতির আগমনের পর খ্রিস্টীয় চতুর্থ হতে ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত গুপ্ত রাজবংশ বাংলা শাসন করেছিল। এর ঠিক পরেই শশাঙ্ক নামের একজন স্থানীয় রাজা স্বল্প সময়ের জন্য এ এলাকার ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হন। প্রায় একশ বছরের অরাজকতার (যাকে মাৎসন্যায় পর্ব বলে অভিহিত করা হয়) শেষে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজবংশ বাংলার অধিকাংশের অধিকারী হয়, এবং পরবর্তী চারশ বছর ধরে শাসন করে। এর পর হিন্দু ধর্মাবলম্বী সেন রাজবংশ ক্ষমতায় আসে। দ্বাদশ শতকে সুফি ধর্মপ্রচারকদের হাতে বাংলায় ইসলামের প্রবর্তন ঘটে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে সামরিক অভিযান এবং যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে মুসলিম শাসকেরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ১২০৫-৬ সালের দিকে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খীলজী নামের একজন তুর্কী বংশোদ্ভূত সেনাপতি রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে সেন রাজবংশের পতন ঘটান। ষোড়শ শতকে মোঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসার আগে পর্যন্ত বাংলা স্থানীয় সুলতান ও ভূস্বামীদের হাতে শাসিত হয়। মোঘল বিজয়ের পর ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থাপিত হয় এবং এর নামকরণ করা হয় জাহাঙ্গীর নগর

ঔপনিবেশিক শাসন

বাংলায় ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের আগমন ঘটে পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ থেকে। ধীরে ধীরে তাদের প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৭৫৭ খ্রীস্টাব্দে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করে (Baxter [১] , pp. 23–28)। ১৮৫৭ খ্রীস্টাব্দের সিপাহী বিপ্লবের পর কোম্পানির হাত থেকে বাংলার শাসনভার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে আসে। ব্রিটিশ রাজার নিয়ন্ত্রণাধীন একজন ভাইসরয় প্রশাসন পরিচালনা করতেন। (Baxter[১], pp. 30–32) ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে বহুবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এর মধ্যে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত ১৭৭০ খ্রীস্টাব্দের দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ৩০ লাখ লোক মারা যায়।[২]

১৯০৫ হতে ১৯১১ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গের ফলশ্রুতিতে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয়েছিল, যার রাজধানী ছিল ঢাকায়। (Baxter[১], pp. 39–40) তবে কলকাতা-কেন্দ্রিক রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের চরম বিরোধিতার ফলে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায় ১৯১১ সালে। ভারতীয় উপমহাদেশের দেশভাগের সময় ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে আবার বাংলা প্রদেশটিকে ভাগ করা হয়। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হয়, আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গের নাম পাল্‌টে পূর্ব পাকিস্তান করা হয়। [৩]

পাকিস্তান আমল ১৯৪৭-১৯৭১

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয় যথা ভারত ও পাকিস্তান। মুসলিম আধিক্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সীমানা চিহ্নিত করা হয় যার ফলে পাকিস্তানের মানচিত্রে দুটি পৃথক অঞ্চল অনিবার্য হয়ে ওঠে যার একটি পূর্ব পাকিস্তান এবং অপরটি পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল প্রধানত পূর্ব বাংলা নিয়ে যা বর্তমানের বাংলাদেশ। পূর্ব পাস্তিানের ইতিহাস মূলত: পশ্চিম পাকিস্তানীদ শাসকদের হাতে নিগ্রহ ও শোষণের ইতিহাস যার অন্য পিঠে ছিল ১৯৫৮ থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সামরিক শাসন।

১৯৫০ খ্রীস্টাব্দে ভূমি সংস্কারের অধীনে জমিদার ব্যবস্থা রদ করা হয়।(Baxter[১], p. 72) কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্ব সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৫২ খ্রীস্টাব্দের ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সংঘাতের প্রথম লক্ষণ হিসাবে প্রকাশ পায়। (Baxter[১], pp. 62–63) পরবর্তী দশক জুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে নেয়া নানা পদক্ষেপে পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের মনে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে।

পাকিস্তানী প্রভাব ও স্বৈর দৃষ্টিভঙ্গীর বিরূদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ ছিল মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের যুক্তফ্রন্ট নিবার্চনে বিজয় এবং ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক জেনারেল আইয়ুব খানকে পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়ে সম্মিলিত বিরোধী দল বা ‘কপ’-প্রতিষ্ঠা ছিল পাকিস্তানী সামরিক শাসনের বিরূদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বমূলক আন্দলোনের মাইলফলক। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের প্রশ্ন ১৯৫০-এর মধ্যভাগ থেকে উচ্চারিত হতে থাকে।

১৯৬০ দশকের মাঝামাঝি বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসাবে আওয়ামী লীগের উত্থান ঘটে, এবং ১৯৬৯ নাগাদ দলটি পূর্ব পাকিস্তান তথা বাঙালি জাতির প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি ৬ দফা আন্দোলনের সূচনা ঘটে। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে কারাবন্দী করা হয়। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় মাধ্যমে আবার তাঁকে বন্দী করা হয়। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব খানের সামরিক জান্তার পতন ঘটলেও সামরিক শাসন অব্যাহত থাকে। কারাবন্দীত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে শেখ মুজিব ১৯৭০-এ অনুষ্ঠিত জেনারেল ইয়াহিয়া প্রদত্ব প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জ্জন করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৯৭১

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ লাখ লোকের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার অসহযোগিতা অব্যাহত রাখে। ১৯৭০ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। (Baxter[১], pp. 78–79) মুজিবের সাথে গোলটেবিল বৈঠক সফল না হওয়ার পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান ২৫শে মার্চ গভীর রাতে মুজিবকে গ্রেপ্তার করেন এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসাবে বাঙালিদের উপর নির্বিচারে আক্রমণ শুরু করে । ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের পক্ষে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন । [৪] পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এই নারকীয় হামলাযজ্ঞে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে[৫] সেনাবাহিনী ও তার স্থানীয় দালালদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। প্রায় ১ কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। (LaPorte [৬] , p. 103) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মোট জীবনহানির সংখ্যার হিসাব কয়েক লাখ হতে শুরু করে ৩০ লাখ পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছে। [৭] [৮] আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁরা ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলে দীর্ঘ ৯ মাস। মুক্তি বাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভারতের সহায়তায় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে জয়লাভ করে। মিত্রবাহিনী প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পন করেন। প্রায় ৯০,০০০ পাকিস্তানী সেনা যুদ্ধবন্দী হিসাবে ধরা পড়ে, যাদেরকে ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়। [৯]

স্বাধীন বাংলাদেশ ১৯৭২-বর্তমান

শেখ মুজিবুর রহমান, ১৯৭২-১৯৭৫

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ প্রথমে সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থা চালু হয় ও জাতির জনক শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে যুদ্ধ বিদ্ধস্ত নতুন দেশে বিদেশি সরযন্তে দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।[২] ১৯৭৫ সালের শুরুতে মুজিব দেশে বাকশালের অধীনে শকল দল এবং ব্যক্তি নিয়ে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সেনাবাহিনীর কিয়দংশ ষড়যন্ত্রে সংঘটিত অভ্যুত্থানে মুজিব সপরিবারে নিহত হন।

খন্দকার মুশতাক আহমদ ১৯৭৫

১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মুশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি নতুন করে মন্ত্রী সভা গঠন করেন। তাঁর কার্যকাল ছিল ১৫ই আগস্ট থেকে ৬ নভেম্বর ১৯৭৫; এ সময় সামরিক আইন জারী করা হয়। তাঁর কর্মকাল ছিল সংক্ষিপ্তঅ অত:পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব লাভ করেন বিচারপতি আবু সাদাত মুহাম্মাদ সায়েম।

জিয়াউর রহমান,১৯৭৫-১৯৮১

সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ই নভেম্বর তথাকথিত সিপাহি বিপ্লব নামের আন্দোলনের পর পর্যায়ক্রমে রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট হন। ১৯শে নভেম্বর ১৯৭৬ সালে তাঁকে পুনরায় সেনাবাহিনীর চীফ অফ আর্মী স্টাফ পদে দায়িত্বে প্রত্যাবর্তন করা হয়। তিনি এসময়ে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত সায়েমের পরে ২১শে এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালের ৩রা জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান জয়লাভ করেন। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নামের রাজনৈতিক মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে জেনারেল জিয়াউর রহমান জাতীয় গণতান্ত্রিক দল(জাগদল)প্রতিষ্ঠা করেন,পরবর্তীতে ১৯৭৮ শালের ১লা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামকরণ করা হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়া এই দলের সমন্বয়ক ছিলেন এবং এই দলের প্রথম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক এ. কিউ. এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এর প্রথম মহাসচিব ছিলেন। বিএনপি গঠন করার আগে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে সভাপতি করে গঠিত হয়েছিল। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে।১৯৮১ সালের ২৯শে মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়া নিহত হন। অত:পর উপরাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি হলেন।

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, ১৯৮২-১৯৯০

১৯৮২ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের পরবর্তী শাসক জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রক্তপাতবিহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। এরশাদ স্বৈরশাসক হিসাবে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে তার পতনের পর সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু হয়।

বিএনপি ও খালেদা জিয়া, ১৯৯১-১৯৯৬

সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী হিসাবে ১৯৯১ হতে ১৯৯৬,১৯৯৬ এর ফেব্রুয়ারী ও ২০০১ হতে ২০০৬ পর্যন্ত ৩ বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০১৪ পর্যন্ত জাতীয় সংসদ এ বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) এর চেয়ারম্যান। দলটি ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় বর্তমানে সংসদ এর বাইরে আছে।

আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা, ১৯৯৬-২০০১

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ হতে ২০০১ সাল,২০০৯ হতে ২০১৪ সাল এবং ২০১৪ সাল হতে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামিলীগ এর নেত্রিত্বে গঠিত সরকার এর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

চারদলীয় ঐক্যজোট ও খালেদা জিয়া, ২০০১-২০০৬

২০০১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক স্থাপন করে। তারা ক্ষমতার পাঁচবছর সময় অতিবাহিত করতে সক্ষম হয়। বিরোধীদল সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক দেয়নি। পাঁচবছর পুর্তি শেষে আওয়ামী লীগ তত্তাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচনের আয়োজন করে। সেই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। এই সরকারের শাসনামলে বাংলা ভাই এবং জামায়েতুল মুজাহেদুনের উৎপাত শুরু হয়। বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরিত করে এই জঙ্গী সংগঠন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ২০০৬-২০০৯

২০০৬ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থায় তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদপুষ্ট হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এর সাবেক গভর্নর জনাব ফখরুদ্দিন আহমদ এর নেত্রিত্বে ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়

চৌদ্দদলীয় মহাজোট ও শেখ হাসিনা, ২০০৯-২০১৪

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ৯ম সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে, এবং দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা, ২০১৪ – বর্তমান

২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ৫ জানুয়ারী বাংলাদেশের ১০ম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তার মিত্র আঠারো দলীয় জোট দলীয় সরকারের অধীনের নির্বাচন সুষ্ঠ হবেনা অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করে। বিএনপি আগের মত তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য আন্দোলন শুরু করেন। ঢাকা সহ সারাদেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দেশে বিদেশে এই নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি প্রধান দুই দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মাঝে সংলাপের উদ্যোগ নেন। কিন্ত শাসকগোষ্ঠী তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। প্রথম দিকে জাতীয় পার্টি নির্বাচন বর্জনের কথা বললেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয়। এ নির্বাচনে ১৫৩টি পদে আওয়ামীলীগ প্রার্থী, জাতীয় পার্টি ইত্যাদির প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দীতায় নির্বাচিত হন সার্বিকভাবে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৩২টিতে বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে। এ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১৩টি আসনে জয় লাভ করে এবং সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসাবে আর্বিভুত হয়। রওশন এরশাদ সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে ওয়াকার্স পাটি ৪টি আসন এবং জাসদ ২টি আসন লাভ করে। ত্বরিক্বত ফেডরেশন ১টি এবং বিএনএফ ১টি আসন লাভ করে।

১২ জানুয়ারী তারিখে শেখ হাসিনা তৃতীয় বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ২৯ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রী সভা গঠন করেন। এছাড়াও নিয়োগ করেন ১৭জন প্রতিমন্ত্রী এবং ২ জন প্রতিমন্ত্রী।

জাতীয় পার্টির কিছু সংসদ সদস্য মন্ত্রিত্ব গ্রহন করেন। জাতীয় পার্টির চেয়্যারম্যান হুসেইন মোহাম্মাদ এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ পান। জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি সরকারী দল এবং বিরোধী দল উভয় পক্ষে থেকে গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক ভিন্নরকম মাইলফলক স্থাপন করেছে।

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি মাঝে মাঝে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য আন্দোলনের হুমকি প্রদান করছে, ক্ষমতাসীন দল দল আওয়ামী লীগ প্রথম দিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা বললেও এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তারা বিএনপির দাবীকৃত প্রহসনের এই নির্বাচনের মাধ্যমে পাঁচবছর ক্ষমতায় থাকতে চাইছে।

 

১৫. বৃহস্পতি, শ্রীকর, শ্রীনাথ ও রঘুনন্দন

বৃহস্পতি, শ্রীকর, শ্রীনাথ রঘুনন্দন

ধর্মের গৌরব, বিদ্যার গৌরব ও শিল্পের গৌরবে গৌরবান্বিত হইয়া বৌদ্ধগণ ও হিন্দুগণ বাংলা দেশে সুখে স্বচ্ছন্দে বাস করিতেছিলেন। বৌদ্ধেরা তিব্বতে গিয়া সেখানে আপনাদের প্রভাব বিস্তার করিতেছিলেন, ব্রাহ্মণেরাও বাংলায় নূতন সমাজের সৃষ্টি করিতেছিলেন। এমন সময় ঘোর বন্যার ন্যায় আফগান দেশ হইতে মুসলমানেরা আসিয়া উপস্থিত হইল। সে বন্যায় রাজা-প্রজা, বৌদ্ধ-হিন্দু, বজ্রযান-সহজযান, ন্যায়-স্মৃতি, দর্শন-বিজ্ঞান—সব ভাঙিয়া, ভাসিয়া গেল। বাঙালী ও বেহারী শিল্পের ভাল ভাল জিনিসগুলি, বড় বড় অট্টালিকা, বড় বড় মন্দির, দেবমূর্তি, মনুষ্যমূর্তি, ক্রোধমূর্তি, শান্তমূর্তি, হিন্দুমূর্তি, বৌদ্ধমূর্তি, তালপাতার পুঁথি, ভূর্জপত্রের পুঁথি, ছালের পুঁথি, তেড়েতের পুঁথি, নানারূপ চিত্র, নানারূপ কারুকার্য, সব নাশ হইয়া গেল। ওদন্তপুরে মুসলমানেরা সিপাই বলিয়া হাজার হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষুকে মারিয়া ফেলিল, কেল্লা বলিয়া মহাবিহারটিকে সমভূম করিয়া দিল, বৌদ্ধমূর্তি ও যাত্রার সাজসজ্জা সব লুটিয়া লইয়া গেল, সোনারূপার মূর্তিগুলি গলাইয়া ফেলিল, পুঁথিগুলি পুড়াইয়া ফেলিল। প্রতি বিহারেই এইরূপ হইতে লাগিল। ওদন্তপুরের বিহার এখনও চেনা যায়, সে জায়াগাটা এখনও তিরিশ ফুট উঁচু; নালন্দার নাম পর্যন্ত লোপ পাইয়াছে, পাশের একটি ক্ষুদ্র পল্লীগ্রামের নামে তাহার নাম হইয়াছে ‘বড়গায়েঁর টিবি’; বিক্রমশীলার সন্ধানও পাওয়া যায় নাই; জগদ্দল খুঁজিয়া মিলিতেছে না; বিদেশীরা এমনি করিয়া নষ্ট করিয়াছে যে, তাহাদের স্মৃতি পর্যন্ত লোপ পাইয়াছিল। ভাগ্যে নেপাল ছিল, তিব্বত ছিল, তাই এত দিনের পর তাহাদের স্মৃতি আবার জাগিয়া উঠিয়াছে। এবং ইংরাজ-আমলে খুঁড়িয়া খুঁড়িয়া আমরা আমাদের পূর্বগৌরবের ধ্বংসাবশেষ দেখিতে পাইতেছি।

পুষ্যমিত্রের ঘোরতর হত্যাকাণ্ডেও যে ধর্মের কিছুমাত্র ক্ষতি হয় নাই, কুমারিল-শঙ্করের প্রাণপন চেষ্টাতেও যে ধর্ম পূর্বভারতে অক্ষুণ্ণ ছিল, ব্রাহ্মণদের নিরন্তর বিদ্বেষসত্ত্বেও যে ধর্ম চারি দিক ছড়াইয়া পড়িতেছিল, এক তুর্কী-আক্রমণেই সে ধর্ম শুধু যে ধ্বংস হইল তাহা নয়, বিস্মৃতিসাগরে ডুবিয়া গেল। লাভ হইল মঙ্গোলিয়ার, লাভ হইল তিব্বতের, লাভ হইল পূর্ব-উপদ্বীপের, লাভ হইল সিংহলের। তলোয়ারের মুখ হইতে যাহারা অব্যাহতি পাইয়াছিল, তাহারা ঐ সকল দেশে গিয়া আশ্রয় লইল। তাহাদিগকে পাইয়া ঐ সকল দেশ কৃতার্থ হইয়া গেল; তাহাদের বিদ্যা বৃদ্ধি হইল, ধর্ম বৃদ্ধি হইল, জ্ঞান বৃদ্ধি হইল, শিল্প বৃদ্ধি হইল; ক্ষতি যাহা হইবার তাহা বাংলারই হইয়া গেল।

দুই শত বৎসর পর্যন্ত বাঙালীরা প্রাণের ভয়ে অস্থির হইয়া আপন দেশে বাস করিতে লাগিল। এই সময় দেশের কি অবস্থা হইয়াছিল, কুলগ্রন্থই তাহার সাক্ষী। দুই শত বৎসর নিরস্তর মারামারি কাটাকাটির পর একবার একজন হিন্দু বাংলার রাজা হইয়াছিলেন। অমনি আবার হিন্দুসমাজে সংস্কৃতসাহিত্য বাংলাসাহিত্য জাগিয়া উঠিল। যে মহাপুরুষের একান্ত আগ্রহ, একান্ত যত্ন ও দূরদর্শিতার ফলে সংস্কৃতসাহিত্য আবার বাঁচিয়া উঠে তাঁহার নাম বৃহস্পতি, উপাধি রায়মুকুট। তিনি নিজে অনেক সংস্কৃত কাব্যের টিকা লিখিয়া, একখানি স্মৃতিনিবন্ধ রচনা করিয়া, অমরকোষের টিকা লিখিয়া, অনেক পণ্ডিতকে প্রতিপালন করিয়া আবার সংস্কৃতসাহিত্যের চর্চা আরম্ভ করিয়া দিলেন। এই কার্যে তাঁহার প্রধান সহায় ছিলেন শ্রীকর। ইনিও বৃহস্পতির ন্যায় নানা গ্রন্থ রচনা করেন এবং দুইজনে মিলিয়া অমরকোষের আর-একখানি টীকা লিখেন। শ্রীকরের পুত্র শ্রীনাথ পুরা এক সেট নিবন্ধ সংগ্রহ করিয়া আবার হিন্দুসমাজ বাঁধিবার চেষ্টা করেন। তিনি বিশেষরূপ কৃতকার্য হইতে পারেন নাই, কিন্তু তাঁহার শিষ্য রঘুনন্দন সমাজ বাঁধিয়া দিয়া গেলেন। তাঁহার বাঁধা সমাজ এখনও চলিতেছে। বৃহস্পতি, শ্রীকর, শ্রীনাথ ও রঘুনন্দন আমাদের সমাজ বাঁধিয়া দিয়াছেন বলিয়া আমরা আজিও হিন্দু বলিয়া পরিচয় দিতে পারিতেছি। ইঁহারা আমাদের পূজ্য, নমস্য এবং গৌরবের স্থল।

 

 

১৬. ন্যায়শাস্ত্র

ন্যায়শাস্ত্র

তুর্কি-আক্রমণে অন্যান্য শাস্ত্রের ন্যায়, দর্শনশাস্ত্রও লোপ পাইয়াছিল। রাজা গণেশের পর হইতে যে আবার সংস্কৃতচর্চা আরম্ভ হইল, তাহার ফলে ন্যায়ের চর্চা আরম্ভ হইল। এই চারিশত বৎসরের মধ্যে বাংলার ন্যায়শাস্ত্র ভারতবর্ষময় ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ভারতবর্ষের যেখানেই চাও, যিনি নৈয়ায়িক তিনি কিছু না কিছু বাংলা কথা কহিতে পারেন। নবদ্বীপে না আসিলে তাঁহাদের চলে না। সুতরাং তাঁহাদের নবদ্বীপে আসিতেও হয়, বাংলা ভাষা শিখিতেও হয়। দেশে গিয়া যদিও বাংলা ভুলিয়া যান, তথাপি বাঙালী দেখিলেই আবার তাঁহাদের ফুটা বাংলা কথা কহিবার ইচ্ছা হয়। কাশ্মীর যাও, পাঞ্জাব যাও, নেপাল যাও, হিন্দুস্থান যাও, রাজপুতানা যাও, মাদ্রাজ যাও, মহিসুর যাও, ত্রিবাঙ্কুর যাও, নৈয়ায়িকের মুখে দুচারিটি বাংলা কথা শুনিতেই পাইবে। বাঙালীর এটা বড় কম গৌরবের কথা নয়। ভারতে বাঙালীর এই প্রাধান্য যাঁহারা করিয়া গিয়াছেন, তাঁহারা সকলেই আমাদেরপ পূজ্য ও নমস্য। তাঁহাদের মধ্যে প্রথমম বাসুদেব সার্বভৌম। তিনি কিন্তু কোন গ্রন্থ রাখিয়া যান নাই বা তাঁহার কোন গ্রন্থ চলিত হয় নাই। দ্বিতীয়, রঘুনাথ শিরোমণি। ইঁহার বুদ্ধি ক্ষুরের ধারের মত সূক্ষ্ম ছিল। তিনি ন্যায় ও বৈশেষিক সম্বন্ধে অনেক গ্রন্থ লিখিয়া গিয়াছেন। কিন্তু ইঁহার তত্ত্বচিন্তামণির টীকাই লোকে বেশী জানে। তিনি যে শুধু বাসুদেব সর্বভৌম ও পক্ষধর মিশ্রের নিকট পড়িয়াছিলেন এমন নহে—তিনি মহারাষ্ট্র দেশে যাইয়া রামেশ্বরের নিকট পড়িয়াছিলেন। তাঁহার ছাত্র যে শুধু বাংলা দেশেই ছিল এমন নহে—দ্বারবঙ্গের রাজার পূর্বপুরুষ মহে পণ্ডিতও তাঁহার ছাত্র ছিলেন। শিরোমণির পর আমাদের দেশের লোক হরিরাম, জগদীশ ও গদাধরকেই চিনে ও ইঁহাদের টীকাটিপ্পনী পাঠ করে। কিন্তু পশ্চিমাঞ্চলে এককালে ভবানন্দ সিদ্ধান্তবাগীশের বড়ই আদর হইয়াছিল। মহাদেব পুন্তামকর ভবানন্দের টীকারই টীকা লিখিয়াছিলেন ও সেই টীকা এখনও দুই-চারি জায়গায় চলে। ন্যায়-শাস্ত্রের গ্রন্থকারদিগের মধ্যে সকলের শেষ বিশ্বনাথ। তিনি কয়েকটি কারিকার মধ্যে ন্যায়শাস্ত্রের সমস্ত দুরূহ সিদ্ধান্তের যেরূপ সমাবেশ করেন, তাহা দেখিয়া সকল দেশেরই লোক আশ্চর্য হইয়া যায়। এখনও তাঁহার তিন শত বৎসর পূর্ণ হয় নাই, কিন্তু ভারতের সর্বত্রই তাঁহার কারিকা ও তাঁহার সিদ্ধান্তমুক্তাবলী চলিতেছে। বাংলায় তাঁহার টীকাকার কেহ জন্মে নাই; তাঁহার টীকাকার একজন মারহাট্টী, তাঁহার নাম মহাদেব দিনকর। এখন বলিতে গেলে, এই নৈয়ায়িকগণই এখনও ভারতে বাংলার নাম বজায় রাখিয়াছেন। কারণ বাংলার স্মার্তকে অন্য দেশের লোকের চিনিবার দরকার নাই, কিন্তু বাংলার নৈয়ায়িকদের না চিনিলে ভারতবর্ষে কাহারও চলে না।

About Shishir

Check Also

আমার পরিচয়

ধর্মীয়বাদ নবী ও রাসূল ************** নবী এবং রাসূলের মধ্যে পার্থক্য হ’ল, আল্লাহ তা‘আলা যাকে নতুন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *