বৃহস্পতিবার , ডিসেম্বর ১৪ ২০১৭ | ৩০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Breaking News
Home / বিনোদন / ভালোবাসা [আবেগ ও অনুভূতি]

ভালোবাসা [আবেগ ও অনুভূতি]

ভালোবাসা রোগ
*************
ভালোবাসা রোগ কোনো চিকিৎসীয় শিরোনাম নয়, এবং এটি ভালোবাসায় পতিত হওয়াকে মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিকভাবে ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত হয়।

ঐতিহাসিকভাবে, ভালোবাসা রোগ বলতে বোঝায় ভালোবাসা সংশ্লিষ্ট এক ধরনের মানসিক পীড়া। স্বীকৃত রেনেসা ব্যক্তিত্ত্বরা; উদাহরণস্বরূপ ইবনে সিনা বিষন্নতাকে এই মানসিক পীড়ার প্রথম লক্ষণ হিসেবে দায়ী করেছেন।

ভালোবাসার জীববৈজ্ঞানিক ভিত্তি
*********************
বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান, বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের মত জৈবিক বিজ্ঞানসমূহের মাধ্যমে ভালোবাসার জৈবিক ভিত্তিকে অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। অক্সিটোসিনের মত বেশ কিছু নির্দিষ্ট রাসায়নিক যৌগকে ভালোবাসার সাথে সম্পর্কিত মানব অভিজ্ঞতা এবং আচরণে তাদের ভূমিকার দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করা হয়।

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান
***************
বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান বিগত সময়ে ভালোবাসা সম্পর্কিত বেশ কিছু তত্ত্বের প্রস্তাব করেছে। মানব সন্তান এবং শিশুরা একটি দীর্ঘ সময় তাদের পিতামাতার সাহায্যের উপর নির্ভরশীল থাকে। এ কারণে ভালোবাসাকে এই সুদীর্ঘ সময়ে শিশুর জন্য বাবামায়ের পারস্পারিক সহায়তার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়। আরেকটি কারণ হল যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে যৌনরোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি, স্থায়ীভাবে সন্তানধারণ ক্ষমতা লোপ পাওয়া, ডিম্বাশয়ে আঘাতপ্রাপ্তি এবং সন্তান জন্মের সময় অত্যধিক ঝুঁকি। এই বিষয়গুলো যৌন সম্পর্কিত রোগে (এসটিডি) জরিয়ে পড়ার ঝুঁকি কমিয়ে একচেটিয়াভাবে দীর্ঘ সময়ের সম্পর্ক তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

ডারউইনের সময়কাল থেকেই আদর্শ সঙ্গীদের আকর্ষণ ও তাদের দক্ষতাকে বিচার করার আরও একটি আদর্শ সাংকেতিক পদ্ধতি হিসেবে সঙ্গীতে মানব আগ্রহের বিবর্তন সম্পর্কে একই রকম ধারণা বিবেচিত হয়ে আসছে। ধারণা করা হয় যে ভালোবাসার অভিজ্ঞতা নেয়ার ক্ষেত্রে মানুষের সামর্থ্য তাদের আদর্শ সঙ্গীদের কাছে এমন একটি ইঙ্গিত আকারে প্রকাশিত হয় যে, তাদের সঙ্গী ভবিষ্যতে একজন ভাল বাবা কিংবা মা হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মে তাদের জীন পরিবহনে সহায়তা করতে আগ্রহী হবে।

জীববিজ্ঞানী জেরেমি গ্রিফিথ ভালোবাসাকে ‘নিঃশর্ত নিঃস্বার্থতা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন, যা আধুনিক মানব উত্তরসূরি অস্ট্রালোপিথেকাস(Australopithecus)-দেরকে বাচনিকভাবে একে অপরকে সহযোগিতা করার সহজাত প্রবৃত্তি গঠনে সহায়তা করেছে। বনবো(একটি বিশালাকারের শিপ্পাঞ্জি যাকে পূর্বে পিগমি শিপ্পাঞ্জি নামে ডাকা হতো)-দের উপর কৃত গবেষণাগুলো অতীতে মানুষের সমবায়ী জীবনযাপনের স্বপক্ষে পরোক্ষ প্রমাণ হিসেবে এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

স্নায়বিক-রসায়ন
*************
জীববিজ্ঞানের প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি হল এই যে, ভালোবাসা, যৌন সামর্থ্য, ঘনিষ্ঠতা এবং সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান চালিকাশক্তি বিদ্যমান। যে সকল প্রাথমিক নিউরোট্রান্সমিটার, যৌন হরমোন, এবং নিউরো-পেপটাইড বা স্নায়বীয় পেপটাইড এই চালিকাশক্তিকে পরিচালনা করে তারা হল টেস্টোস্টেরন, ইস্ট্রোজেন, ডোপামিন, অক্সিটোসিন, এবং ভেসোপ্রেসিন।

কেন্দ্রীয় ডোপামিন পরিবহন ব্যবস্থা (সেন্ট্রাল ডোপামিনিক পাথওয়ে) সঙ্গীর পছন্দনীয় আচরণের গভীরতায় নিয়ে যায়, যখন কিনা ভেন্ট্রাল প্যালিডামে ভেসোপ্রেসিন এবং নিউক্লিয়াস অ্যাকুম্বেন্সে ও পারভেন্ট্রিকুলার হাইপোথ্যালামিক নিউক্লিয়াসে অক্সিটোসিন শুধু সঙ্গীর পছন্দের আচরণইই নয়, অন্তরঙ্গতার আচরণও ধারণ করতে সাহায্য করে।

প্রাথমিকভাবে যৌন সামর্থ্যের মাত্রা নির্ধারিত হয় মেসোলিম্বিক ডোপামিন পাথওয়ের (ভেন্ট্রাল ট্যাগ্মেন্টাল এরিয়া এবং নিউক্লিয়াস অ্যাকুম্বেন্স) কার্যক্রমের মাধ্যমে।ট্রেস অ্যামাইন-সমূহ (বিঃদ্রঃ ফেনেথ্যালামাইন এবং টাইরামাইন) কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে অর্থাৎ এ সকল পাথওয়ে বা পরিবহন পথে ডোপামিনার্জিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে একটি সূক্ষ্ম ও জটিল ভূমিকা পালন করে।

টেস্টোস্টেরন এবং ইস্ট্রোজেন ডোপামিন পাথওয়েজের ভেতর দিয়ে এই সকল চালিকাশক্তিতে অবদান রাখে। পুরুষ এবং নারী উভয়ের যৌন আচরণের জন্য মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত পরিমাণ ডোপামিনের উপস্থিতি থাকা প্রয়োজন। নরেপিনেফ্রিন এবং সেরোটোনিনের ভূমিকার গুরুত্ব এবং অবদান খুব কম কারণ তারা কিছু নির্দিষ্ট পাথওয়েতে ডোপামিন এবং অক্সিটোসিন নিঃসরণের উপর নিউরমডুলারি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

আবেগপ্রবণ ভালোবাসা এবং দীর্ঘস্থায়ী ঘনিষ্ঠতার জন্য দায়ী এই সকল রাসায়নিক উপাদানকে সে সকল কাজের জন্য অধিক কার্যকর বলে মনে করা হয় যে সকল বিশেষ কাজে উভয় সঙ্গীই অংশগ্রহণ করেন। যে সকল ব্যক্তি প্রেমে পরেন তাদের মধ্যে প্রেমে পড়ার শুরুর দিকে উচ্চ মাত্রার কর্টিসলের উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়।

ভালোবাসার দেয়াল
******************
ভালোবাসার দেয়াল হল ভালবাসা প্রসজ্ঞে স্থাপিত ৪০ বর্গমিটার (৪৩০ ফু২)-এর একটি দেয়াল যা প্যারিসের জেহান-রিক্টুস গাডেন চত্বরে অবস্থিত। এটি ২০০০ সালে হস্তাক্ষরশিল্পী ফ্রেডেরিক ব্যারন এবং ম্যুরাল শিল্পী ক্লাইরো কিতো তৈরি করেন, এটি ৬১২টি খন্ডের ইনামেল লাভার টালি দ্বারা নির্মিত যেখানে ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বাক্যটি ২৫০টি ভিন্ন ভাষায় ৩১১ বার লিপিবদ্ধ। যেখানে প্রত্যেকটি টালির আকার ২১ বাই ২৯.৭ সেন্টিমিটার (৮.৩ ইঞ্চি × ১১.৭ ইঞ্চি)। দেওয়ালে অংকিত লাল রঙে ছিটকানো অংশগুলো ভাঙ্গা হৃদয়ের টুকরোর প্রতীক হিসাবে দেখানো হয়েছে।

আবেগ
********
আবেগ-কে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। আবেগকে অনেকে অনুভূতির সমার্থক ধরে নেয়। যদিও অনুভূতি শারিরীক/মানসিক দুইই হতে পারে, আবেগ মূলতঃ মানসিক। এটা এমন একটি মানসিক অবস্থা যা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই উদ্ভূত হয়; সচেতন উদ্যম থেকে নয়। এর সাথে মাঝে মাঝে শারিরীক পরিবর্তনও প্রকাশ পায়। সেক্ষেত্রে আবেগকে বলা যায় অণুভুতির উৎস। আবার শারীরিক ভাবো বলতে গেলে মসৃন পেশী এবং বিভিন্ন গ্রন্থির কারনে শরীরের অন্তর্নিহিত পরিবর্তনই হল আবেগ ৷ সামগ্রিকভাবে, চেতনার যে অংশ অনুভূতি বা সংবেদনশীলতার সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত তাকে আবেগ বলা যায়।

অনুভূতি
*******
দেহে বা মনে সংবেদন সৃষ্টি হওয়াকে বলা হয় অনুভূতি। অনুভূতি শারীরিক ও মানসিক দুই ধরনের হয়। স্পর্শের দ্বারা ঠাণ্ডা, গরম কিংবা ব্যাথা, আরামের অনুভব করা শারীরিক অনুভূতির মধ্যে পড়ে। মনের আনন্দ, ব্যাথা-বেদনা, হতাশা, ভালোবাসা ইত্যাদি মানসিক অনুভূতির উদাহরণ।

অনুভূতি, মনোবিজ্ঞানে অন্যতম বিতর্কিত প্রসঙ্গ হিসেবে দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের মাঝে বহুবার আলোচিত হয়ে এসেছে। মানসিক অনুভূতি তীব্রতাভেদে অনেক সময় শারিরীক অণুভুতির উৎস হয়ে থাকে।

ক্রোধ
******
তীব্র অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ কে ক্রোধ বলে। এই আবেগের প্রকাশে মুখভঙ্গী বিকৃত হয়ে যায় এবং অপরের কাছে তা ভীতির সঞ্চার করে। ক্রোধ ষড়ঋপুর মধ্যে অন্যতম।অতিরিক্ত ক্রোধের ফলে বাড়তে পারে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন। হার্টঅ্যাটাক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরনের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

রেগে থাকলে একজন ব্যক্তির শরীরে স্ট্রেস হরমোনের নি:সরণ বেড়ে যায়। রক্তের সুগারের তারতম্য শুরু হয়। যারা প্রায়ই রেগে যান তাদের শুভ বুদ্ধির চর্চাও কমে যায়। অতিরিক্ত ক্রোধের ফলে পাকস্থলীয় কোষ উজ্জিবিত হয়ে পরে এবং এসিড নির্গমনের পরিমাণ বেরে যায়। চিকৎসকগন ক্রোধ নিয়ন্ত্রনের পরামর্শ দিযে থাকেন।

ঘৃণা
*****
ঘৃণা হচ্ছে কাউকে মন থেকে অসহ্য করা বা অধিক অপছন্দ করা। এটা ব্যক্তি, দল , সত্ত্বা, বস্তু, আচরণ, বা ধ্যানধারণার বিরুদ্ধে সরাসরি নির্দেশ হতে পারে। কেউ ইচ্ছা করেই কাউকে ঘৃণা করতে পারে না। ঘৃণা মূলত কারো প্রতি বিশ্বাস বা ভালোবাসার অবনতি হলে অপর জনের ঘৃণা জন্ম হতে পারে।

ঘৃণা অনেকটা ভালোবাসার বিপরীত শব্দ।সাধারণ মতে, ঘৃণা মানুষের একটি ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেটা একজন মানুষ অপর আরেকজন মানুষের প্রতি ঘৃণা অনুভব করে। কারো প্রতি অতিরিক্ত বিশ্বাস বা ভালোবাসার মর্যাদা হানি হলে ঘৃণা প্রকাশ পায়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বার্থপর লোকদের কে ঘৃণা বেশি করে থাকে।

ব্যথা
******
ব্যথা একটি পীড়াদায়ক অনুভূতি প্রায়ই তীব্র বা ক্ষতিকর উদ্দীপনার যেমন আঙ্গুলে খোঁচা খাওয়া, পুড়ে যাওয়া বা কেটে যাওয়ার কারণে হতে পারে। এটি একটি জটিল বিষয় হবার কারণে ব্যথার সংজ্ঞা বর্ণনা করা কঠিন। দ্য ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর স্টাডি অব পেইন’-এর ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত সংজ্ঞাঃ “ব্যথা একটি অপ্রীতিকর অনুভূতি এবং মানসিক অভিজ্ঞতা যা প্রকৃত বা সম্ভাব্য টিস্যু ক্ষতি কিংবা তদ্রূপ ক্ষতির সাথে সম্পর্কিত।” চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ব্যথা একটি রোগের উপসর্গ হিসাবে ধরা হয়।

দেহের বিভিন্ন অঙ্গকে রক্ষা করার জন্যে ব্যথা সেসব অঙ্গকে ব্যথার উৎস থেকে দুরে সরিয়ে নিয়ে যাবার কাজ করে। উৎস থেকে সরে যাবার পরে সাধারণত বেশিরভাগ ব্যথা ধীরে ধীরে কমে যায়, কিন্তু এটা দীর্ঘদিনও থাকতে পারে। কখনো কখনো বাইরের কোন উৎস ছাড়াই ব্যথা হতে পারে।

1994 সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর স্টাডি অব পেইন এর করা শ্রেণি অনুযায়ীঃ
1. অঞ্চলের শরীরের জড়িত (যেমন পেট, পা),
2. অঙ্গের অকার্যকারিতা, যার ফলে ব্যথা (যেমন, স্নায়বিক, আন্ত্রিক),
3. সময়কাল এবং ধরণ
4. তীব্রতা এবং সূত্রপাত থেকে পার হওয়া সময়, এবং
5. কারণ

ব্যথা সাধারণত ক্ষণস্থায়ী, রোগ সুস্থ হয়ে গেলে ব্যথা ঠিক হয়ে যায়, কিন্তু কিছু কিছু অবস্থায়, যেমন রিউম্যাটয়েড, পেরিফেরাল স্নায়ুরোগ, ক্যান্সার এবং ইডিওপ্যাথিক কারণে দীর্ঘদিনের ব্যথা হতে পারে। ৩ মাসের কম সময়ের ব্যথা কে সাধারণত তীব্র ব্যথা এবং ৬ মাসের বেশি সময়ের ব্যথাকে ক্রনিক ব্যথা বলা হয়। অন্যদের মতে তীব্র ব্যথা স্থায়ী হয় ৩০ দিনের কম আর ক্রনিক ব্যথা ছয় মাস’ সময়কালের।

ফ্যান্টম ব্যথা হয় শরীরের এমন একটি অংশ থেকে যার অস্তিত্ব নেই। ব্যথার কারণে হাত বা পা কেটে ফেলা রোগীদের ক্ষেত্রে এটা প্রায়ই দেখা যায়।মানসিক, মানসিক বা আচরণগত কারণের. মাথা ব্যাথা, কোমরে ব্যথা এবং পেটে ব্যথা হয়, কখনও কখনও মানসিক হিসাবে ধরা হয়। এটা ক্ষণস্থায়ী তীব্র এক ব্যথা যা রোগই নিয়মিত চিকিৎসার মধ্যে থাকলেও হঠাৎ করে হতে পারে। ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে এটা প্রায়ই দেখা যায়। ঔষধ দ্বারা ভালভাবে নিয়ন্ত্রিত রোগীর ক্ষেত্রেও কখনও কখনও এমন ব্যথা হতে পারে।

তীব্র ব্যথার রোগীদের মধ্যে মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ, স্মৃতি, মানসিক নমনীয়তা, সমস্যা সমাধান, এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণ গতির সমস্যা দেখা যায়। তীব্র এবং ক্রনিক ব্যথার সাথে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, ভয় এবং রাগও যুক্ত থাকতে পারে।

ভীতি
*******
ভবিষ্যতে কোনও অশুভ বা বিপদের আশঙ্কা অথবা বেদনার অনুভুতির আগাম চিন্তা করে মানসিক যে অস্বস্তির সৃষ্টি হয় তা হলো [ভয়] বা ভীতি। ভয়ের কারণে মানুষ যেকোনও উদ্যোগে দ্বিধাগ্রস্ত হয়, ভয়ের ব্যাপারে অন্যতম মুছলিম দার্শনিক{শাহ্ ফরিদ আল_আহমাদী}বলেছেন,গোটাসৃষ্টি জগতের ভিতরে সকল প্রানির অন্তরে ভয় নামক অনুভূতি আছে।প্রত্যেক প্রানিই মৃত্যুকে বা বিপদ আপদকে ভয় পায়।

লজ্জা
*******
লজ্জা হল একটি নেতিবাচক, যন্ত্রণাদায়ক, সামাজিক আবেগ যা “…নিজ কর্মের সাথে নিজ মতাদর্শিক মানদণ্ডের তুলনার…” ফলাফল হিসেবে উপলব্ধ হয়, কিন্তু এটি নিজের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে সমাজের আদর্শ মানদণ্ডের তুলনা থেকেও সমানভাবে উদ্ভুদ্ধ হতে পারে। এইভাবে, প্রবল ঐচ্ছিক সক্রিয়তা অথবা সহজাত আত্ম শ্রদ্ধা থেকে লজ্জার উৎপত্তি ঘটতে পারে, লাজুক ব্যক্তির সক্রিয় কাজকর্ম করার প্রয়োজন পরে না, স্বাভাবিকভাবে অবস্থান করাই এর জন্য যথেষ্ট হয়।

সামাজিকীকরণের মাধ্যমে তুলনা এবং আদর্শিক মানদণ্ড উভয়ই সক্রিয় হয়। যদিও একে একটি আবেগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, লজ্জাকে বিবিধভাবে একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া, চেতনা অথবা মানসিক অবস্থা বা দশা বলেও মনে করা হয়।

শালীনতা
*********
শালীনতা হল পোশাক এবং আচরণের একটি ধরন, যার উদ্দেশ্য হল অপরকে শারীরিক বা যৌন আকর্ষণে উৎসাহিতকরণ থেকে বিরত থাকা। তবে এর মানদন্ডের বিভিন্নতা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে, বলা যায় যে, শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অংশ ঢেকে না রাখাকে অনৈতিক এবং অশালীন বলে বিবেচিত হয়।

অনেক দেশে, নারীদের পুর্ণরুপে পোশাকে আবৃত রাখা হয়, যেন পুরুষেরা তাদের দ্বারা আকর্ষিত না হয়, এবং তাদের জন্য পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য পুরুষদের সাথে কথা বলা নিষিদ্ধ। আবার, যেখানে বিকিনি পড়ার প্রচলন স্বাভাবিক সেখানে এক টুকরো কাপড় পড়াও শালীন বলে বিবেচিত হয়।

পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই লোকসম্মুখে নগ্নতাকে অভদ্র শরীর প্রদর্শন মনে করা হয় । তবে, লোকসম্মুখে নগ্নতার ঘটনাও রয়েছে। ব্রিটেনের নগ্ন সাইকেল মিছিল এর উদাহরণ এবং এ ধরনের চলাচল একাধিকবার আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

হতাশা
******
কোনও ইচ্ছেপূরণ না হলে বা কাজের আশানুরূপ ফল না পেলে যে মানসিক অবসাদের সৃষ্টি হয় তা হলো হতাশা। লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব না হলে হাল ছেড়ে দেয়ার প্রবণতা-ই হতাশার লক্ষণ। হতাশা একটি মানবিক অনুভূতি যার মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি কখনও মানসিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে।

শ্রদ্ধা
****
শ্রদ্ধা একজন ব্যক্তির জন্য সম্মান সূচক একটি ইতিবাচক অনুভূতি। সম্মানিত ব্যক্তির প্রকৃত গুণাবলী জন্য এটি একটি নির্দিষ্ট অনুভূতি। এটি সম্মানের একটি নির্দিষ্ট নৈতিকতা অনুযায়ী পরিচালিত হতে পারে। সম্মান উভয় দেওয়া যেতে পারে এবং নেওয়া যেতে পারে। শ্রদ্ধার বিপরীতার্থক অসম্মান হয়।

সুখ
*****
সুখ একটি মানবিক অনুভুতি। সুখ মনের একটি অবস্থা বা অনুভূতি যা ভালোবাসা, তৃপ্তি, আনন্দ বা উচ্ছ্বাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। জৈবিক, মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক, দর্শনভিত্তিক এবং ধার্মিক দিক থেকে সুখের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং এর উৎস নির্ণয়ের প্রচেষ্টা সাধিত হয়েছে। সঠিকভাবে সুখ পরিমাপ করা অত্যন্ত কঠিন।

গবেষকেরা একটি কৌশল উদ্ভাবন করেছেন যা দিয়ে সুখের পরিমাপ কিছুটা হলেও করা সম্ভব। মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা তাত্ত্বিক মডেলের ভিত্তিতে সুখ পরিমাপ করে থাকেন। এই মডেলে সুখকে ইতিবাচক কর্ম ও আবেগসমূহের সমষ্টি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া এক্ষেত্রে তিনটি বিশেষ অবস্থাকেও বিবেচনা করা হয়: আনন্দ, অঙ্গীকার এবং অর্থ।

গবেষকগণ কিছু বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছেন যেগুলো সুখের সাথে পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত: বিভিন্ন সামাজিক সম্পর্ক, বহির্মুখী বা অন্তর্মুখী অবস্থা, বৈবাহিক অবস্থা, স্বাস্থ্য, গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা, আশাবাদ, ধর্মীয় সম্পৃক্ততা, আয় এবং অন্যান্য সুখী মানুষের সাথে নৈকট্য।

আনন্দ
******
পরিতোষ, প্রেম, পূর্ণতা, পুলক, উল্লাস, আহ্লাদ ইত্যাদির একক, একাধিক বা সন্মিলিত অণুভুতিকে আনন্দ বলে। জীববিদ্যা, মনঃস্তত্ত, ধর্ম ও দর্শন আনন্দের অর্থ ও উত্স উন্মোচনের বহুকালব্যাপী প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে। যদিও আনন্দ পরিমাপ করা বেশ কঠিন কাজ, বিজ্ঞানীরা নানা উপায়ে এই দুঃসাধ্য সাধন করেছেন।

অক্সফোর্ডে আনন্দ বিষয়ক গবেষণায় বহুসংখ্যক বৈশিষ্টের সাথে আনন্দের সরাসরি সংযোগ শনাক্ত করা হয়েছে। যেমন- সামাজিক ক্রিয়াকর্ম ও সম্পর্ক, দাম্পত্য অবস্থান, কার্যক্ষেত্র, স্বাস্থ্য, গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা, আশাবাদ, এনডরফিন, ধর্মীয় সম্পৃক্ততা, আয় এবং সুন্দর সান্নিধ্য।দার্শনিক ও আধাত্মিক সংজ্ঞা অণুযায়ী আনন্দ সেই পন্থা যা অবলম্বনে উপযুক্ত ও উন্নত জীবন যাপন করা যায়।

জীববিদ্যা
********
বিবর্তনীয় দৃষ্টিভগিতে আনন্দ অথবা উন্নত জীবনের গুণমান ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। সংক্ষেপে, যেসব প্রশ্ন সদুত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে সেগুলো হলো: মস্তিষ্কের কোন বৈশিষ্টের দ্বারা মানুষ ইতিবাচক ও নেতিবাচক অণুভূতিগুলোকে পৃথক করতে সক্ষম হয়, এবং এটি কিভাবে মানুষের জীবনের গুণমান ও প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে? এই ব্যাপারে ডারউইনিয়ান হ্যাপিনেস নামক গ্রন্থে বিশদ বর্ণনা রয়েছে।

ডেভিড লায়কেন ও অনান্য কিছু গবেষকরা দাবি করেন যে মানুষের আনন্দ ৫০% নির্ভর করে তার জিনের উপর। সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা জমজ সন্তানদের নিরীক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন। ১০% থেকে ১৫% নির্ভর করে বিভিন্ন প্রকারের পরিস্থিতির উপর। যেমন- আর্থ-সামাজিক অবস্থান, বৈবাহিক অবস্থান, স্বাস্থ্য, আয়, যৌন-জীবন ইত্যাদি।

অবশিষ্ট ৪০% ব্যক্তি নিজের মনের আনন্দে যা করে থাকে এবং অনান্য অনেক অনির্দিষ্ট ধ্রুবক দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। মাইকেল আরগাইল অক্সফোর্ড আনন্দ পরিমাপক প্রশ্নাবলী নামক একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি তৈরি করেছেন। নিন্দুকদের মতে এটি আত্মমর্যাদা, সংকল্প, পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক সংমিশ্রন, কৌতুক প্রবণতা এবং শিল্প ও সৌন্দর্যের মূল্যায়নের একটি পরিমাপক মাত্র।

কাম
******
কাম বা লাস্য হল শরীরে অনুভূত প্রবল চাহিদা, কামনা ও বাসনার একটি আবেগ বা অনূভূতি| কাম বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে; যেমন: যৌনসঙ্গমের জন্য কাম, জ্ঞানের জন্য কাম, শক্তির জন্য কাম, লক্ষ অর্জনের জন্য কাম ইত্যাদি| তবে যৌনসংগমের বাসনা অর্থেই এটি অধিকহারে ব্যবহৃত হয়|

হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম অনুসারে কাম (শারীরিক যৌনতার উদ্দেশ্যে কাম) হল ছয়টি ষড়ঋপূর একটি, খ্রিষ্টধর্মে এটি সাতটি মারাত্নক পাপের মাঝে একটি পাপ হিসেবে অন্তভূক্ত। ইসলাম ধর্মে অবৈবাহিক (যৌন)কাম নিষিদ্ধ, বৈবাহিক কাম বৈধ এবং বিবাহিত স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কারও দিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কামদৃষ্টিতে তাকানো নিষিদ্ধ।

আধ্যাত্মিক বিশ্বাস
**************
আধ্যাত্মিক বিশ্বাস হল কোন বস্তু, সত্ত্বা, জীব, দেবতা, ধর্মীয় মূলনীতি এবং দৃঢ়ভাবে সমর্থিত কোন বিষয়ের উপর আস্থা বা বিশ্বাস। এটি এমন বিশ্বাসও হতে পারে যার কোন প্রত্যক্ষ তথ্যসূত্র বা প্রমাণ নেই।

আশা
******
আশা বিশ্বের সর্ববৃহৎ আত্মনির্ভরশীল ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের সমীক্ষায় আশা বিশ্বের শীর্ষতম ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে স্বীকৃত। আশা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৮ সালে যাত্রা শুরু করে।

ডিসেম্বর ২০১১ পর্যন্ত বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ৫১১টি থানার ৩,১৫৪টি ব্রাঞ্চ কার্যালয়ের মাধ্যমে আশা’র কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ডিসেম্বর ২০১১ পর্যন্ত আশার মোট তহবিলের পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার সাতশ সাতান্ন কোটি টাকা।বাংলাদেশ ছাড়াও আশা ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, নাইজেরিয়া, ঘানা, কেনিয়া, তানজানিয়া এবং উগান্ডা তে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করছে।

প্রেম
*****
প্রেম অথবা রোমান্স হল ভালোবাসার এক প্রকার রহস্যময় এবং উত্তেজনাপূর্ণ আবেগ বা অনুভূতি। এটি হল কোন ব্যক্তির প্রতি যৌন আকর্ষণের সাথে সম্পর্কিত কোন আবেগীয় আকর্ষণ হতে উদ্বুদ্ধ একটি বহিঃপ্রকাশমূলক ও আনন্দঘন অনুভূতি। গ্রিক চারটি আকর্ষণের মধ্যে এটি আগেপ, ফিলিয়া কিংবা স্টরজ-এর তুলনায় ইরোসের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মনোবিজ্ঞানী চার্লস লিন্ডহোমের সংজ্ঞানুযায়ী রোমান্স হল “একটি প্রবল আকর্ষণ যা কোন যৌন-আবেদনময় দৃষ্টিকোণ হতে কাওকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরে, এবং যাতে তা ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মনোবাসনাও অন্তর্ভুক্ত থাকে।”

কোন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এতে অপর ব্যক্তির প্রতি একইসাথে শক্তিশালী মানসিক বা আবেগী এবং যৌন আকর্ষণ কাজ করে। দাম্পত্যের ক্ষেত্রে রোমান্সে বা রোমান্টিক সম্পর্কে প্রায়শই যৌন আকর্ষণের তুলনায় ব্যক্তিগত আবেগ ও অনুভূতি অধিক গুরুত্বের অধিকারী হয়।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পর্কসমূহের সূচনাপর্বে প্রেমের অনুভূতি অধিকতর দৃঢ়ভাবে কাজ করে। তখন এর সঙ্গে এমন এক অনিশ্চয়তা এবং দুশ্চিন্তা অনুভূত হয়, যে এ ভালোবাসাকে হয়তো আর কখনোই ফিরিয়ে আনা যাবে না।

প্রধানত শিল্পাঙ্গনে, বিশেষ করে সাহিত্য এবং উপন্যাসে একটি প্রধানতম ও গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষক বিষয় হিসেবে প্রেমের ব্যবহার দেখা যায়। এছাড়াও এর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে কিশোর কিশোরীদের রূপকথার গল্প ও নারীদের উপন্যাসসমূহে এবং উইলিয়াম শেক্সপিয়র এর মত জগদ্বিখ্যাত রচয়িতাদের সাহিত্যকর্মে।

প্রতিদানহীন প্রেম
***********
প্রতিদানহীন প্রেম বা একতরফা ভালোবাসা হলো এমন এক ধরনের অনুরাগ যেটি স্পষ্টত দু’জন মানুষের মাঝে পারস্পরিক নয় অথবা যার প্রতি এই ধরনের প্রেমের অনুরক্তি থাকে, সে এই অনুরাগের বিষয়ে অবহিত নয় অথবা সজ্ঞানে সে এড়িয়ে চলে বা প্রত্যাখ্যান করে। ম্যারিয়াম ওয়েবস্টার অনলাইন অভিধান এই ধরনের প্রেমকে “পারস্পরিকবিহীন বা বিনিময়হীন” প্রেম হিসেবে অভিহিত করেছে।

ফরাসী ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্তের মতে, “শুধুমাত্র প্রতিদানহীন প্রেমই হলো একমাত্র সফল ভালোবাসা” । কিন্তু অন্যদিকে মনঃচিকিৎসক এরিক বের্ন তাঁর “সেক্স অ্যান্ড হিউম্যান লাভিং” বইয়ে উল্লেখ করেছেন, “কেউ কেউ বলে সম্পর্কহীন জীবনযাপনের চাইতে একতরফা প্রেম শ্রেয়। কিন্তু একতরফা প্রেম অনেকটা রুটির অর্ধেক ডেলার মতো যেটি তৈরীতে দুরূহ হলেও খুব তাড়াতাড়ি বাসি হয়ে যায়”।

প্রতিদানহীন প্রেমের কারণ
*****************
মনঃবিজ্ঞানী রয় বাওমেস্টারের মতে, যে বিষয়গুলো একজন পুরুষ বা নারীকে আকাংখনীয় করে তোলে, সেসব জিনিসগুলোর মাঝে অবশ্যই আছে জটিল এবং ব্যক্তিগত গুণাবলী ও বৈশিষ্টের সংমিশ্রণ। শারীরিক সৌন্দর্য্য, মাধুর্য, বুদ্ধিমত্তা এবং সামাজিক পদমর্যাদার মতো প্রভাবকের দরুণ একজন মানুষকে অন্যদের তুলনায় প্রাধান্য দেওয়ার হেতু যে প্রেমের উদ্ভব হয়, বাওমেস্টারের মতে প্রতিদানহীন প্রেমে জড়ানো মানুষদের মাঝে এই প্রভাবকগুলোর অনুপস্থিতিই তাকে এক-পেশে ভালোবাসার দিকে ধাবিত করে।

প্রতিদানহীন প্রেমের নেতিবাচকতা
**********************
অনুভূতি প্রকাশে অক্ষমতা এবং আবেগীয় চাহিদা পুরণের অপারগতা মূলত প্রতিদানহীন প্রেমে জড়িত মানুষদের বিষণ্ণতা, মৃদু আত্মবিশ্বাস, উদ্বিগ্নতা এবং মেজাজ-পরিবর্তন (বা মুড সুয়িং) এর মতো মানসিক জটিলতার দিকে পরিচালিত করে। রয় বাওমেস্টারের গবেষণানুযায়ী, আমাদের মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষই জীবনের কোন না কোন এক সময়ে প্রতিদানহীন প্রেমে নিজেদের জড়িয়েছি।

প্রত্যাখ্যানের ফলে এই ধরনের প্রেমে একাকীত্ব সৃষ্টির পাশাপাশি নিজেকে মূল্যহীন হিসেবে ভাবতে প্ররোচিত করে। যার ফলে এই ধরনের প্রেম মানুষদের মাঝে আত্মবিশ্বাস কমিয়ে আনে।

প্রত্যাখ্যানকারী
***********
প্রতিদানহীন প্রেমের দুইটি পক্ষ আছে, কিন্তু শুধুমাত্র একটি পক্ষই আমাদের সংস্কৃতি কর্তৃক অধিক স্বীকৃত – আর সেটি হলো প্রতিদানহীন প্রেমে জড়িত প্রেমিক বা প্রেমিকা, প্রত্যাখ্যানকারী নয়। কিন্তু একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রতিদানহীন প্রেমের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানকারীও সচরাচর অপরাধবোধে ভোগেন এবং “না” বলার ক্ষেত্রে তারাও হতোবুদ্ধি হয়ে পড়েন। কেননা ক্ষেত্রবিশেষে প্রত্যাখ্যানকারীরাও তাদের বিপরীত পক্ষের মানুষদের কষ্ট অনুধাবন করতে পারেন।

সাংস্কৃতিক প্রতিফলন
***************
আধুনিক সংস্কৃতিতে প্রতিদানহীন প্রেম একটি বহুল আলোচিত বিষয়। চলচিত্র, গ্রন্থ এবং গানে প্রায়শ প্রত্যাখ্যানকারীদের নিয়ে প্রতিদানহীন প্রেমে জড়িয়ে যাওয়া মানুষদের অনড় অবস্থান এবং ভালোবাসার মানুষদের প্রতি প্রতিদানহীন প্রণয়ী বা প্রণয়ীনীদের অনুভূতি চিত্রায়িত হয়ে এসেছে। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত “দ্য ডার্ক সাইড অব ক্লোজ রিলেশেনশিপ” (The Dark Side of Close Relationship) গ্রন্থে বইয়ের লেখক প্রতিদানহীন প্রেমে জড়ানো মানুষদের তাদের অবস্থানে অনড় থাকার কারণ উল্লেখ করেছিলেন।

কিন্তু অন্যদিকে জার্মান আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস দ্য সরোজ অব ইয়ং ওয়ার্থার গ্রন্থে দেখা গিয়েছে প্রতিদানহীন প্রেমে জড়ানো প্রেমিকের আত্মহননের কাহিনী। এছাড়াও বৃটিশ লোকগীতি আই ওয়ান্স লাভ্ড এ লাস গানেও প্রতিদানহীন প্রেম চিত্রিত হয়েছিলো।

ভাবা হয় প্লেটোনিক প্রেমই হলো প্রতিদানহীন প্রেমের মূল ভিত্তি প্রস্থর। অর্থাৎ প্লেটোনিক প্রেম থেকেই প্রতিদানহীন প্রেমের উৎপত্তি। প্রতিদানহীন প্রেম মূলত বন্ধু-মহল বা পরিচিত/পরিচিতা, কর্মস্থলে নিয়মিত সম্মুখীন হওয়া মানুষ, স্কুল কলেজ কিংবা অনেক মানুষের মিলনায়তনে কর্মক্ষেত্রের ঘটনাস্রোতে আলাপ হওয়া কোন ব্যক্তিদের মধ্যে সংগঠিত হয়ে থাকে। এই ধরনে প্রেমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিদানহীন ভালোবাসায় জড়িত ব্যক্তি অপ্রস্তুত অবস্থার সম্মুখীন হয় যেখানে ভালোবাসার মানুষটির প্রতি তাদের সত্যিকারের অনুভূতি তারা ভেতর থেকে প্রকাশ করতে অপারগ হন শুধুমাত্র প্রত্যাখ্যান, লোক-লজ্জা কিংবা চিরতরে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ভয়ে।

উপকারিতা
********
প্রতিদানহীন প্রেম সৃষ্টিশীলতার নেপথ্যে যুগ যুগ ধরে মানুষদের অনুপ্রেরণা যুগিয়ে এসেছে। বিখ্যাত ইতালিয়ান কবি দান্তে আলিগিয়েরি তাঁর সৃষ্টিশীলতার কারণ হিসেবে তাঁর বাল্যকালের পরিচিতা বিট্রিস পোর্টিনারির কথা উল্লেখ করেছেন। দান্তের সাথে বিট্রিসের কখনো মন খুলে আলাপ না হলেও তিনি লা দিভিনা কমোদিয়া বা ডিভাইন কমেডি (Divine Comedy) এর মতো বিখ্যাত মহাকাব্যে বিট্রিসকে আলোকবর্তিকা নারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এমনকি বিট্রিসের মৃত্যুর পরে দান্তে তাঁর লা ভিতা নুওভা বা দ্য নিউ লাইফ (The New Life) রচনাতেও বিট্রিসকে নিয়ে তাঁর অব্যক্ত এবং বিষাদময় প্রেমের কথা বর্ণনা করেছেন।

এছাড়াও, প্রতিদানহীন প্রেম সৃষ্টিশীলতার পাশাপাশি বর্তমানকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে এবং বাস্তবতার সম্মুখীন হতে শেখায়। কেননা সম্পর্ক তৈরীতে বিপরীত পক্ষের অনীহা কিংবা প্রত্যাখ্যানই মূলত প্রতিদানহীন প্রেমে জড়িত মানুষদের তাদের প্রেম-বিভ্রম থেকে ফিরিয়ে আনে।

প্রতিকার
********
রোমান কবি ওভিড তাঁর রেমোডিয়া অ্যামোরিস বা “লাভ’স রেমেডি” (Love’s Remedy) কবিতায় প্রতিদানহীন প্রেম থেকে রেহাই পাওয়ার উপদেশ হিসেবে ভ্রমণ, মদ্যপান থেকে বিরত থাকা, গ্রামীণ জীবন পশ্চাদ্ধাবন এবং পরিশেষে রোমান্টিক কবিদের এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

কিন্তু এই ধরনের এক-পেশে প্রেম থেকে রেহাই পাওয়ার প্রধান উপায় হলো এসব বিষয় থেকে নিজের চিত্তকে সরিয়ে আনা। ভিন্নধর্মী কোন কিছু শেখায় নিজেকে নিয়োজিত রাখা অথবা স্বেচ্ছাসেবকমূলক কার্যকলাপে অংশীদারী হওয়া।

আইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস, ফরাসি লেখক স্টন্দল, ইতালিয়ান কবি দান্তে আলিগিয়েরি, রাশিয়ান-মার্কিনী উপন্যাসিক আয়ন রেন্ড, ড্যানিশ লেখক হান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসন এবং জার্মান লেখক ইয়োহান ভোলফগাং ফন গ্যোটে প্রমুখ অনেক মনিষী জীবনে প্রতিদানহীন প্রেমের উপস্থিতির কথা স্বীকার করেছিলেন।

প্লেটোনিক ভালোবাসা
**************
প্লেটোনিক ভালোবাসা বা বায়বীয় ভালোবাসা হ’ল সেই শুদ্ধতম ভালোবাসা যাতে কামনা বাসনার কোনও স্থান নেই। এ শব্দটির উৎপত্তি মূলত প্লেটোর “প্লেটোনিজম” মতবাদ থেকে যাতে বলা হয় এমন প্রকার ভালোবাসার কথা যাতে প্রেমিক-প্রেমিকা ভালোবাসার সর্ব্বোচ পর্যায়ে প্রবেশ করবে কিন্তু শরীর নামক বস্তুটি থাকবে অনুপস্থিত। যে প্রেমে শরীর বিষয়টি অনুপস্থিত অথচ প্রেমের স্বাদ বা রস আস্বাদন করা যায় ষোলো আনা, এমন প্রেমই একমাত্র প্লেটোনিক প্রেম বা বায়বীয় ভালোবাসা হিসেবে পরিগণিত হবে।

এ ভালোবাসা কামগন্ধহীন, কেবলই নিজেকে বিলিয়ে দেয় পরিবর্তে নেয় না কিছুই। এমন নিষ্কাম প্রেম, যে প্রেম রাজাধিরাজের মতো দু’হাত ভ’রে শুধু দিয়ে যায়, নেয় না কিছুই। যাকে লাভ করার জন্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর দুঃসহ যন্ত্রণাসমূহও সহ্য করতে হয় মুখ বুজে। বিনিময়ে কখনও কখনও কপালে জোটে ব্যর্থ প্রেমিকের অপবাদের ছাপ! প্রেমের জন্য স্বেচ্ছায়-স্বজ্ঞানে নিজের জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়-প্রেমের এমন ভয়ঙ্কর রূপের নামই তো প্লেটোনিক লাভ!

যেখানে প্রেমিকের শরীরের গন্ধই প্রেমিকাকে মোহিত করার জন্য যথেষ্ট তার উপস্থিতির দরকার পড়ে না। এরূপ ভালবাসায় থাকে না কোনও চাহিদা, থাকে কেবল অনন্ত ভালোবাসা। যৌনতার কোনও স্থান নেই প্লেটোনিক ভালোবাসায়। এ প্রেম ভালোবাসার সর্ব্বোচ পর্যায়। এ এক প্রচণ্ড ভালোবাসা যখন প্রেম কে মনে হয় স্বর্গ সুখ।

ফিলিয়া
*******
ফিলিয়া হল ভালোবাসা বিষয়ক প্রাচীন চারটি গ্রীক শব্দের মাঝে অন্যতম, যাকে “ভাতৃসুলভ ভালোবাসা” অর্থে অনুবাদ করা হয়| ফিলিয়া, স্টর্জ, এগেপ ও ইরোস নামক এই চারটি ধারণা এ্যারিস্টটলীয় নিকোম্যাচিয়ান রীতিনীতির অন্তর্ভুক্ত, যাদেরকে অনুবাদ করার সময় সাধারণভাবে একত্রে “স্নেহের সম্পর্ক” বা বন্ধুত্ব হিসেবে লিখা হয়|

অ্যারিস্টটল তার গ্রন্থ সংকলনের অষ্টম এবং নবম খন্ডে ফিলিয়ার উদাহরণ হিসেবে যে সকল সম্পর্ক দেখিয়েছেন তা হল, নবীন প্রেমিক, আজীবন বন্ধু, পাশাপাশি শহর, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক চুক্তি, পিতামাতা ও সন্তান, নাবিক ও সৈনিক সহকর্মী, একই ধর্মের অনুসারী, একই সম্প্রদায়ের সদস্য এবং একজন মুচি ও তার খদ্দের|

ভগ্ন হৃদয়
********
ভগ্ন হৃদয় হল কোন আকাঙ্ক্ষার তীব্র মানসিক—এবং কখনো কখনো শারীরিক— চাপ বা বেদনা বোধের রূপক অবস্থার সম্মুখীন হওয়া। এই ধারণা মূলত আন্তঃসাংস্কৃতিক, যা প্রায়ই বাঞ্ছিত বা ব্যর্থ প্রেমিকের উল্লেখের মাধ্যমে উদাহৃত হয়ে থাকে, এবং অন্তত ৩,০০০ বছর পূর্ব থেকে পরিচিত।
মানসিক ব্যথা এক ধরণের করুণ পরিস্থিতি পরিণতিতে যা ”ভাঙ্গা হৃদয় উপলক্ষ’ সৃষ্টি করতে পারে, এক্ষেত্রে হৃদয় থেকে শারীরিক ক্ষতি সাধনের সম্ভাবনাও থাকে।

To be continue…….

About Shishir

A positive person can be change the society.

Check Also

বাঙ্গালী ও বাংলা

  বাঙ্গালী ও বাংলা ছয় দফা আন্দোলন : ********************* ছয় দফা আন্দোলন বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *