সোমবার , নভেম্বর ২০ ২০১৭ | ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Breaking News
Home / ধর্ম ও ইতিহাস / খিলাফতের ইতিহাস

খিলাফতের ইতিহাস

উমাইয়া খিলাফত (৬৬১-৭৫০/১০৩১)
দামেস্কের খলিফা (৬৬১-৭৫০)
• প্রথম মুয়াবিয়া – ৬৬১-৬৮০
• প্রথম ইয়াজিদ – ৬৮০–৬৮৩
• দ্বিতীয় মুয়াবিয়া – ৬৮৩-৬৮৪
• প্রথম মারওয়ান – ৬৮৪-৬৮৫
• আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান – ৬৮৫-৭০৫
• প্রথম আল ওয়ালিদ – ৭০৫-৭১৫
• সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক – ৭১৫-৭১৭
• দ্বিতীয় উমর – ৭১৭-৭২০
• দ্বিতীয় ইয়াজিদ – ৭২০-৭২৪
• হিশাম ইবনে আবদুল মালিক – ৭২৪-৭৪৩
• দ্বিতীয় আল ওয়ালিদ – ৭৪৩ – ৭৪৪
• তৃতীয় ইয়াজিদ – ৭৪৪
• ইবরাহিম ইবনুল ওয়ালিদ – ৭৪৪
• দ্বিতীয় মারওয়ান – ৭৪৪-৭৫০
কর্ডোবার আমির (৭৫৬-৯২৯)
• প্রথম আবদুর রহমান – ৭৫৬–৭৮৮
• প্রথম হিশাম – ৭৮৮-৭৯৬
• প্রথম আল হাকাম – ৭৯৬-৮২২
• দ্বিতীয় আবদুর রহমান – ৮২২-৮৫২
• প্রথম মুহাম্মদ – ৮৫২-৮৮৬
• আল মুনজির – ৮৮৬-৮৮৮
• আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ – ৮৮৮-৯১২
• তৃতীয় আবদুর রহমান – ৯১২-৯২৯
কর্ডোবা খিলাফত (৯২৯-১০৩১)
• তৃতীয় আবদুর রহমান – ৯২৯-৯৬১
• দ্বিতীয় আল হাকাম – ৯৬১-৯৭৬
• দ্বিতীয় হিশাম ইবনুল হাকাম – ৯৭৬-১০০৯
• দ্বিতীয় মুহাম্মদ – ১০৯৯
• সুলাইমান ইবনুল হাকাম – ১০০৯-১০১০
• দ্বিতীয় হিশাম ইবনুল হাকাম, পুনরায় ক্ষমতালাভ – ১০১০-১০১৩
• সুলাইমান ইবনুল হাকাম, পুনরায় ক্ষমতালাভ – ১০১৩-১০১৬
• চতুর্থ আবদুর রহমান – ১০২১-১০২২
• পঞ্চম আবদুর রহমান – ১০২২-১০২৩
• তৃতীয় মুহাম্মদ – ১০২৩-১০২৪
• তৃতীয় হিশাম – ১০২৭-১০৩১
আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের (৬৮৪-৬৯২)
আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের ৬৮৪ সালে উমাইয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। মক্কায় তিনি খলিফা ঘোষিত হন। কিন্তু ৬৯২ সালে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ছয় মাসব্যাপী অবরোধের পর পরাজিত ও নিহত হন।[৬] আব্বাসীয় খিলাফত (৭৫০-১২৫৮/১৫১৭)
বাগদাদের খলিফা (৭৫০-১২৫৮)
• আস সাফাহ – ৭৫০-৭৫৪ (আব্বাসীয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা)
• আল মনসুর – ৭৫৪-৭৭৫
• আল মাহদি – ৭৭৫-৭৮৫
• আল হাদি – ৭৮৫-৭৮৬
• হারুনুর রশিদ – ৭৮৬-৮০৯
• আল আমিন – ৮০৯-৮১৩
• আল মামুন – ৮১৩-৮৩৩
• আল মুতাসিম – ৮৩৩-৮৪২
• আল ওয়াসিক – ৮৪২-৮৪৭
• আল মুতাওয়াক্কিল – ৮৪৭-৮৬১
• আল মুনতাসির – ৮৬১-৮৬২
• আল মুসতাইন – ৮৬২-৮৬৬
• আল মুতাজ – ৮৬৬-৮৬৯
• আল মুহতাদি – ৮৬৯-৮৭০
• আল মুতামিদ – ৮৭০–৮৯২
• আল মুতাদিদ – ৮৯২-৯০২
• আল মুকতাফি – ৯০২-৯০৮
• আল মুকতাদির – ৯০৮-৯৩২
• আল কাহির – ৯৩২-৯৩৪
• আর রাদি – ৯৩৪-৯৪০
• আল মুত্তাকি – ৯৪০-৯৪৪
• আল মুসতাকফি – ৯৪৪-৯৪৬
• আল মুতি – ৯৪৬-৯৭৪
• আল তাই – ৯৭৪-৯৯১
• আল কাদির – ৯৯১-১০৩১
• আল কাইম – ১০৩১-১০৭৫
• আল মুকতাদি – ১০৭৫-১০৯৪
• আল মুসতাজির – ১০৯৪-১১১৮
• আল মুসতারশিদ – ১১১৮-১১৩৫
• আর রশিদ – ১১৩৫-১১৩৬
• আল মুকতাফি – ১১৩৬-১১৬০
• আল মুসতানজিদ – ১১৬০-১১৭০
• আল মুসতাদি – ১১৭০-১১৮০
• আন নাসির – ১১৮০-১২২৫
• আজ জাহির – ১২২৫-১২২৬
• আল-মুসতানসির – ১২২৬-১২৪২
• আল মুসতাসিম – ১২৪২-১২৫৮ (বাগদাদের শেষ আব্বাসীয় খলিফা)
(আব্বাসীয় শাসনের শেষের দিকে মুসলিম শাসকরা সুলতান বা অন্যান্য উপাধি ব্যবহার শুরু করেন)
কায়রোর খলিফা (১২৬১-১৫১৭)
(কায়রোর আব্বাসীয় খলিফা মূলত মামলুক সালতানাতের পৃষ্ঠপোষকতায় আনুষ্ঠানিকভাবে খলিফা ছিলেন)
• দ্বিতীয় আল মুসতানসির – ১২৬১-১২৬২
• প্রথম আল হাকিম – ১২৬২-১৩০২
• প্রথম আল মুসতাকফি – ১৩০২-১৩৪০
• দ্বিতীয় আল হাকিম – ১৩৪১-১৩৫২
• প্রথম আল মুতাদিদ – ১৩৫২-১৩৬২
• প্রথম আল মুতাওয়াক্কিল – ১৩৬২-১৩৮৩
• দ্বিতীয় আল ওয়াসিক – ১৩৮৩-১৩৮৬
• আল মুতাসিম – ১৩৮৬-১৩৮৯
• প্রথম আল মুতাওয়াক্কিল, পুনরায় ক্ষমতালাভ – ১৩৮৯-১৪০৬
• আল মুসতাইন – ১৪০৬-১৪১৪
• দ্বিতীয় আল মুতাদিদ – ১৪১৪-১৪৪১
• দ্বিতীয় আল মুসতাকফি – ১৪৪১-১৪৫১
• আল কাইম – ১৪৫১-১৪৫৫
• আল মুসতানজিদ – ১৪৫৫-১৪৭৯
• দ্বিতীয় আল মুতাওয়াকিল – ১৪৭৯-১৪৯৭
• আল মুসতামসিক – ১৪৯৭-১৫০৮
• তৃতীয় আল মুতাওয়াক্কিল – ১৫০৮-১৫১৭ (প্রথম সেলিমের কাছে উপাধি হস্তান্তর করেন)
অন্যান্য খিলাফত (৯০৯-১২৬৯)
ফাতেমীয় খিলাফত (৯০৯-১১৭১)
• আল মাহদি বিল্লাহ – ৯০৯-৯৩৪ (ফাতেমীয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা)
• আল কাইম বিআমরিল্লাহ – ৯৩৪-৯৪৬
• আল মনসুর বিল্লাহ – ৯৪৬-৯৫৩
• আল মুইজ লিদেনিল্লাহ – ৯৫৩-৯৭৫
• আল আজিজ বিল্লাহ – ৯৭৫-৯৯৬
• আল হাকিম বি আমরিল্লাহ – ৯৯৬-১০২১
• আলি আজ জাহির – ১০২১-১০৩৬
• আল মুসতানসির বিল্লাহ – ১০৩৬-১০৯৪
• আল মুসতালি – ১০৯৪-১১০১
• আল আমির – ১১০১-১১৩০
• আল হাফিজ – ১১৩০-১১৪৯
• আল জাফির – ১১৪৯-১১৫৪
• আল ফাইজ – ১১৫৪-১১৬০
• আল আজিদ – ১১৬০-১১৭১
আলমোহাদ খিলাফত (১১৪৫-১২৬৯)
(ব্যাপকভাবে স্বীকৃত নয়, উত্তর আফ্রিকার অংশবিশেষ ও ইবেরিয়ান উপদ্বীপে কার্যকর ছিল)
• আবদুল মুমিন – ১১৪৫-১১৬৩
• আবু ইয়াকুব ইউসুফ – ১১৬৩-১১৮৪
• ইয়াকুব আল মনসুর – ১১৮৪-১১৯৯
• মুহাম্মদ আন নাসির – ১১৯৯ – ১২১৩
• দ্বিতীয় আবু ইয়াকুব ইউসুফ – ১২১৩-১২২৪
• প্রথম আবদুল ওয়ালিদ – ১২২৪
• আবদুল্লাহ আল আদিল – ১২২৪-১২২৭
• ইয়াহিয়া – ১২২৭-১২৩৫
• প্রথম ইদ্রিস – ১২২৭-১২৩২
• দ্বিতীয় আবদুল ওয়াহিদ – ১২৩২-১২৪২
• আলি – ১২৪২-১২৪৮
• উমর – ১২৪৮-১২৬৬
• দ্বিতীয় ইদ্রিস – ১২৬৬-১২৬৯
উসমানীয় খিলাফত (১৫১৭-১৯২২)
• প্রথম সেলিম – ১৫১৭-১৫২০ (মামলুক সালতানাতের পরাজয়ের পর ১৫১৭ খ্রিষ্টাব্দে তৃতীয় আল মুতাওয়াক্কিলের কাছ থেকে সেলিমের কাছে উপাধি হস্তান্তরিত হয়)
• সুলাইমান দ্য মেগনিফিসেন্ট – ১৫২০-১৫৬৬
• দ্বিতীয় সেলিম – ১৫৬৬-১৫৭৪
• তৃতীয় মুরাদ – ১৫৭৪-১৫৯৫
• তৃতীয় মুহাম্মদ – ১৫৯৫-১৬০৩
• প্রথম আহমেদ – ১৬০৩-১৬১৭
• প্রথম মোস্তফা – ১৬১৭-১৬১৮
• দ্বিতীয় উসমান – ১৬১৮-১৬২২
• প্রথম মোস্তফা, পুনরায় ক্ষমতালাভ – ১৬২২-১৬২৩
• চতুর্থ মুরাদ – ১৬২৩-১৬৪০
• প্রথম ইবরাহিম – ১৬৪০-১৬৪৮
• চতুর্থ মুহাম্মদ – ১৬৪৮-১৬৮৭
• দ্বিতীয় সুলাইমান – ১৬৮৭-১৬৯১
• দ্বিতীয় আহমেদ – ১৬৯১-১৬৯৫
• দ্বিতীয় মোস্তফা – ১৬৯৫-১৭০৩
• তৃতীয় আহমেদ – ১৭০৩-১৭৩০
• প্রথম মাহমুদ – ১৭৩০-১৭৫৪
• তৃতীয় উসমান – ১৭৫৪-১৭৫৭
• তৃতীয় মোস্তফা – ১৭৫৭-১৭৭৪
• প্রথম আবদুল হামিদ – ১৭৭৪-১৭৮৯
• তৃতীয় সেলিম – ১৭৮৯-১৮০৭
• চতুর্থ মোস্তফা – ১৮০৭-১৮০৮
• দ্বিতীয় মাহমুদ – ১৮০৮-১৮৩৯
• প্রথম আবদুল মজিদ – ১৮৩৯-১৮৬১
• আবদুল আজিজ – ১৮৬১-১৮৭৬
• পঞ্চম মুরাদ – ১৮৭৬
• দ্বিতীয় আবদুল হামিদ – ১৮৭৬-১৯০৯ (কার্যকরভাবে খলিফা উপাধি ব্যবহার করেন)
১৯০৮ থেকে শুরু করে পরবর্তী সময় উসমানীয় সুলতানরা নির্বাহী ক্ষমতাবিহীন সাংবিধানিক সম্রাট হিসেবে বিবেচিত হতেন। এসময় ক্ষমতা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত পার্লামেন্ট ক্ষমতা ভোগ করত।
• পঞ্চম মুহাম্মদ – ১৯০৯-১৯১৮
• ষষ্ঠ মুহাম্মদ – ১৯১৮-১৯২২
তুর্কি প্রজাতন্ত্রের অধীন খিলাফত (১৯২২-১৯২৪)
• দ্বিতীয় আবদুল মজিদ – ১৯২২-১৯২৪ (তুরস্ক প্রজাতন্ত্র ও এর রাষ্ট্রপতি কামাল আতাতুর্কের পৃষ্ঠপোষকতায় আনুষ্ঠানিকভাবে খলিফা ছিলেন)
• গ্র্যান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলি (তুরস্ক) – মার্চ ৩, ১৯২৪
খলিফার অফিস গ্র্যান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৯২৪ এর ৩ মার্চ তারা অফিস বিলুপ্ত করে এবং তুরস্ক প্রজাতন্ত্র কর্তৃক ধর্মনিরপেক্ষতাকে নীতি হিসেবে বহাল রাখে। উসমান পরিবারের বর্তমান প্রধান হলেন বায়েজিদ উসমান। খলিফার অফিস বিলুপ্তির পর তুরস্কের গ্র্যান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলি রাষ্ট্রে ইসলামের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে আলাদা কার্যালয় স্থাপন করে।
শরিফিয়ান খিলাফত (১৯২৪)
খলিফার পদ পুনরায় প্রতিষ্ঠার জন্য শেষ চেষ্টা করা হয় হুসাইন বিন আলির পক্ষ থেকে। তিনি ছিলেন হেজাজের রাজা ও মক্কার শরিফ। ১৯২৪ এর ১১ মার্চ তিনি খিলাফত দাবি করেন এবং ৩ অক্টোবর পর্যন্ত তা বজায় ছিল। এরপর তিনি তার পুত্র আলী বিন হুসাইনকে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। আলী বিন হুসাইন খলিফার উপাধি ধারণ করেননি।[১৭] উমাইয়া খিলাফত () ইসলামের প্রধান চারটি খিলাফতের মধ্যে দ্বিতীয় খিলাফত। এটি উমাইয়া রাজবংশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। ইসলামের তৃতীয় খলিফা উসমান ইবন আফ্‌ফানের খিলাফত লাভের মাধ্যমে উমাইয়া পরিবার প্রথম ক্ষমতায় আসে। তবে উমাইয়া বংশের শাসন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান কর্তৃক সূচিত হয়। তিনি দীর্ঘদিন সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন। ফলে সিরিয়া উমাইয়াদের ক্ষমতার ভিত্তি হয়ে উঠে এবং দামেস্ক তাদের রাজধানী হয়। উমাইয়ারা মুসলিমদের বিজয় অভিযান অব্যাহত রাখে। ককেসাস, ট্রান্সঅক্সানিয়া, সিন্ধু, মাগরেব ও ইবেরিয়ান উপদ্বীপ (আল-আন্দালুস) জয় করে মুসলিম বিশ্বের আওতাধীন করা হয়। সীমার সর্বোচ্চে পৌছালে উমাইয়া খিলাফত মোট ৫.৭৯ মিলিয়ন বর্গ মাইল (১,৫০,০০,০০০ বর্গ কিমি.) অঞ্চল অধিকার করে রাখে। তখন পর্যন্ত বিশ্বের দেখা সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ ছিল। অস্তিত্বের সময়কালের দিক থেকে এটি ছিল পঞ্চম।[৫] কিছু মুসলিমের কাছে উমাইয়াদের কর সংগ্রহ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা অনৈতিক ঠেকে। অমুসলিম জনগণ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত এবং তাদের বিচারিক কার্যক্রম তাদের নিজস্ব আইন ও ধর্মীয় প্রধান বা নিজেদের নিযুক্ত ব্যক্তি দ্বারা চালিত হত।[৬] তাদের কেন্দ্রীয় সরকারকে জিজিয়া কর দিতে হত।[৬] মুহাম্মদ (সা) এর জীবদ্দশায় বলেন যে প্রত্যের ধর্মীয় সম্প্রদায় নিজেদের ধর্মপালন করবে ও নিজেদের শাসন করতে পারবে। এ নীতি পরবর্তীতেও বহাল থাকে।[৬] উমর কর্তৃক চালু হওয়া মুসলিম ও অমুসলিমদের জন্য কল্যাণ রাষ্ট্র ব্যবস্থা চলতে থাকে।[৬][৬] মুয়াবিয়ার মা মায়সুম (ইয়াজিদের মা) ছিলেন একজন খ্রিষ্টান। রাষ্ট্রে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে সম্পর্ক ভাল ছিল। উমাইয়ারা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে ধারাবাহিক যুদ্ধে জড়িত ছিল।[৬][৬][৬] গুরুত্বপূর্ণ পদে খ্রিষ্টানদের বসানো যাদের মধ্যে কারো কারো পরিবার বাইজেন্টাইন সরকারে কাজ করেছিল। খ্রিষ্টানদের নিয়োগ অধিকৃত অঞ্চলে বিশেষত সিরিয়ার বিশাল খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর প্রতি ধর্মীয় সহিষ্ণুতার নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এ নীতি জনগণের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয় এবং সিরিয়াকে ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে স্থিতিশীল করে তোলে।[৭][৮] আরব গোত্রগুলোর মধ্যকার বিরোধের কারণে সিরিয়ার বাইরের প্রদেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে বিশেষত দ্বিতীয় মুসলিম গৃহযুদ্ধ (৬৮০-৬৯২) ও বার্বার বিদ্রোহের (৭৪০-৭৪৩) সময়। দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের সময় উমাইয়া গোত্রের নেতৃত্ব সুফয়ানি শাখা থেকে মারওয়ানি শাখার হস্তান্তর হয়। ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহের ফলে সম্পদ ও লোকবল কমে আসায় তৃতীয় মুসলিম গৃহযুদ্ধের সময় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং চূড়ান্তভাবে আব্বাসীয় বিপ্লবের ফলে ক্ষমতাচ্যুত হয়। পরিবারের একটি শাখা উত্তর আফ্রিকা হয়ে আল-আন্দালুস চলে যায় এবং সেখানে কর্ডোবা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে। এ খিলাফত ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল এবং আল-আন্দালুসের ফিতনার পর এর পতন হয়।

উমাইয়া পরিবার (বনু আবদ শামস নামেও পরিচিত) ও মুহাম্মদ (সা) উভয়েই আবদ মানাফ ইবনে কুসাইয়ের বংশধর এবং তারা মক্কার অধিবাসী ছিলেন। আবদ মানাফের পুত্র হাশিমের বংশে মুহাম্মদ (সা) জন্মগ্রহণ করেন। অন্যদিকে উমাইয়ারা আবদ মানাফের আরেক পুত্র আবদ শামশের বংশধর। উমাইয়া আবদ শামসের পুত্রের নাম। দুই পরিবার নিজেদের একই বংশ কুরাইশের দুটি ভিন্ন গোত্র হিসেবে বিবেচনা করত (যথাক্রমে হাশিম ও উমাইয়া)। শিয়াদের মতে উমাইয়া আবদ শামসের পালক পুত্র তাই তার সাথে আবদ শামসের কোনো রক্ত সম্পর্ক নেই। উমাইয়ারা পরবর্তীতে সম্ভ্রান্ত পরিবারের সম্মান হারায়।[৯] উমাইয়া ও হাশিমিদের মধ্যে মুহাম্মদ (সা) এর আসার পূর্ব থেকেই দ্বন্দ্ব চলছিল। বদরের যুদ্ধের পর তা আরো বিরূপ অবস্থায় পড়ে। এ যুদ্ধে উমাইয়া গোত্রের তিনজন শীর্ষ নেতা উতবা ইবনে রাবিয়াহ, ওয়ালিদ ইবনে উতবাহ ও শায়বা দ্বন্দ্বযুদ্ধের সময় হাশিমি গোত্রের আলী ইবন আবী তালিব, হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও উবাইদাহ ইবনুল হারিসের হাতে নিহত হয়।[১০] এ ঘটনার ফলে উমাইয়ার নাতি আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের মুহাম্মদ (সা) ও ইসলামের প্রতি বিরোধিতার মাত্রা আরো বৃদ্ধি পায়। বদর যুদ্ধের একবছর পর আবু সুফিয়ান আরেকটি যুদ্ধ মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দিয়ে মদিনার মুসলিমদের উপর প্রতিশোধ নিতে চাইছিলেন। পন্ডিতদের মতে এই যুদ্ধটি মুসলিমদের প্রথম পরাজয় যেহেতু এখানে মক্কার তুলনায় মুসলিমদের ভালো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধের পর আবু সুফিয়ানের স্ত্রী ও উতবা ইবনে রাবিয়ার মেয়ে হিন্দ হামজার লাশ কেটে তার কলিজা বের করে খাওয়ার চেষ্টা করে।[১১] উহুদের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পাঁচ বছর পর মুহাম্মদ (সা) মক্কা বিজয় করেন[১২] এবং সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। মক্কা বিজয়ের পর আবু সুফিয়ান ও তার স্ত্রী হিন্দ ইসলাম গ্রহণ করেন। এসময় তাদের পুত্র ও পরবর্তী খলিফা মুয়াবিয়াও ইসলাম গ্রহণ করেন।
উমাইয়াদের অধীনে খিলাফতের বিস্তার:
মুহাম্মদ (সা) এর অধীনে বিস্তৃতি, ৬২২-৬৩২
রাশিদুন খিলাফতের অধীনে বিস্তৃতি, ৬৩২-৬৬১
উমাইয়া খিলাফতের অধীনে বিস্তৃতি, ৬৬১-৭৫০
অনেক ইতিহাসবিদের মতে খলিফা মুয়াবিয়া (শাসনকাল ৬৬১-৬৮০) রাজবংশীয় কায়দার প্রথম শাসক হলেও তিনি উমাইয়া রাজবংশের দ্বিতীয় শাসক। উমাইয়া গোত্রের সদস্য উসমান ইবনে আফ্‌ফানের খিলাফতের সময় উমাইয়া গোত্র ক্ষমতায় আসে। উসমান তার গোত্রের কিছু বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসান। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলেন উসমানের শীর্ষ পর্যায়ের উপদেষ্টা মারওয়ান ইবনুল হাকাম যিনি সম্পর্কে উসমানের তুতো ভাই ছিলেন। তার কারণে হাশিমি সাহাবিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরী হয় কারণ মারওয়ান ও তার পিতা আল-হাকাম ইবনে আবুল আসকে মুহাম্মদ (সা) মদিনা থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছিলেন। উসমান কুফার গভর্নর হিসেবে তার সৎ ভাই ওয়ালিদ ইবনে উকবাকে নিযুক্ত করেন। হাশিমিরা তার প্রতি অভিযোগ করে যে তিনি মদপান করে নামাজের ইমামতি করেছিলেন।[১৩] উসমান মুয়াবিয়াকে বিশাল এলাকার কর্তৃত্ব দিয়ে সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে তার অবস্থান সংহত করেন[১৪] এবং তার পালক ভাই আবদুল্লাহ ইবনে সাদকে মিশরের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন। উসমান নিজের কোনো উত্তরসুরি মনোনীত করে যাননি তাই তাকে রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ধরা হয় না।
৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে প্রথম মুয়াবিয়া সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হন। এসময় আরো ২৫,০০০ মানুষ প্লেগে মারা যায়।[১৫][১৬] আরব-বাইজেন্টাইন যুদ্ধের সময় সমুদ্রের দিক থেকে বাইজেন্টাইন আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ৬৪৯ খ্রিষ্টাব্দে মুয়াবিয়া মনোফিসিট খ্রিষ্টান, কপ্ট ও জেকোবাইট সিরিয়ান খ্রিষ্টান নাবিক ও মুসলিম সৈনিকদের নিয়ে একট নৌবাহিনী গড়ে তোলেন। ৬৫৫ তে মাস্তুলের যুদ্ধে বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী পরাজিত হয় এবং ভূমধ্যসাগরের দিক উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।[১৭][১৮][১৯][২০][২১] প্রথম মুয়াবিয়া একজন সফল গভর্নর ছিলেন। তিনি সাবেক রোমান সিরিয়ান সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে একটি অনুগত ও নিয়মানুবর্তী বাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি আমর ইবনুল আসের বন্ধু ছিলেন। আমর ইবনুল আস মিশর জয় করেন ও পরবর্তীতে খলিফা তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন।
কুরআনে ও মুহাম্মদ (সা) এর হাদিসে জাতিগত সমতা ও ন্যায়বিচারের ব্যাপারে উল্লেখ করা আছে এবং বিদায় হজ্জের ভাষণেও তিনি একথা বলেন।[২২][২৩][২৪][২৫][২৬][২৭][২৮] গোত্রীয় ও জাতিভিত্তিক পার্থক্যকে নিরুৎসাহিত করা হয়। কিন্তু মুহাম্মদ (সা) এর মৃত্যুর পর পুরনো গোত্রীয় ভেদাভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। রোমান-পারসিয়ান যুদ্ধ ও বাইজেন্টাইন-সাসানীয় যুদ্ধের পর পূর্বে সাসানীয় সাম্রাজ্য কর্তৃক শাসিত ইরাক ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য কর্তৃক সিরিয়ার মধ্যকার বিরোধ তখনও বহাল ছিল। প্রত্যেকেই নতুন প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী নিজেদের অঞ্চলে পেতে আগ্রহী ছিল।[২৯] পূর্ববর্তী খলিফা উমর গভর্নরদের ব্যাপারে খুবই সতর্ক ছিলেন এবং তার গোয়েন্দারা তাদের উপর নজর রাখত। গভর্নর বা কমান্ডাররা সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠছে এমন প্রতীয়মান হলে তিনি তাদেরকে তাদের অবস্থান থেকে সরিয়ে দিতেন।[৩০] প্রথমদিকের মুসলিম সেনারা শহর থেকে দূরে নিজস্ব ক্যাম্পে অবস্থান করত। উমরের ভয় ছিল যে তারা হয়ত সম্পদ ও বিলাসিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বে এবং এর ফলে তারা আল্লাহর ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে এবং সম্পদ গড়ে তুলতে পারে ও রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।[৩১][৩২][৩৩][৩৪] উসমান ইবন আফ্‌ফান যখন খুবই বৃদ্ধ হয়ে পড়েন প্রথম মুয়াবিয়ার আত্মীয় প্রথম মারওয়ান তার সচিব হিসেবে শূণ্যস্থান পূরণ করেন এবং এসব কঠোর নিয়মে শিথিলতা আনেন। মারওয়ানকে ইতিপূর্বে দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর কিছু মিশরীয়কে খলিফা উসমানের বাসগৃহ দেখিয়ে দেন। পরে এই মিশরীয়রা খলিফা উসমানকে হত্যা করে।[৩৫] উসমানের হত্যাকান্ডের পর আলি খলিফা নির্বাচিত হন। তাকে এরপর বেশ কিছু সমস্যা সামাল দিতে হয়। আলি মদিনা থেকে কুফায় রাজধানী স্থানান্তর করেন। ৬৫৬ থেকে ৬৬১ পর্যন্ত চলমান সংঘাতকে প্রথম ফিতনা (“গৃহযুদ্ধ”) বলে ডাকা হয়। সিরিয়ার গভর্নর ও খলিফা উসমানের আত্মীয় মুয়াবিয়া চাইছিলেন যে হত্যাকারীদের যাতে গ্রেপ্তার করা হয়। মারওয়ান সবাইকে প্ররোচিত করেন এবং সংঘাত সৃষ্টি করেন। মুহাম্মদ (সা) এর স্ত্রী আইশা এবং তার দুই সাহাবি তালহা ও যুবাইর ইবনুল আওয়াম দোষীদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে আলিকে বলতে বসরা যান। মারওয়ান ও অন্যান্য যারা সংঘাত চাইছিল তারা সবাইকে লড়াই করতে প্ররোচিত করে। উটের যুদ্ধে দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই হয়। এ যুদ্ধে আলি বিজয় অর্জন করেন।
এ যুদ্ধের পর আলি ও মুয়াবিয়ার মধ্যে সিফফিনের যুদ্ধ হয়। কোনো এক পক্ষে বিজয়ী হওয়ার আগেই যুদ্ধ থেমে যায় এবং দুপক্ষে বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে একমত হয়। যুদ্ধের পর আমর ইবনুল আস মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে ও আবু মুসা আশয়ারি আলির পক্ষ থেকে আলোচক নিযুক্ত হন। সাত মাস পর ৬৫৮ এর ফেব্রুয়ারিতে আধরুহ নামক স্থানে সাক্ষাত করেন। আমর ইবনুল আস আবু মুসা আশয়ারিকে এ মর্মে রাজি করান যে দুপক্ষই লড়াই বন্ধ করবে এবং একজন নতুন খলিফা নিযুক্ত করা হবে। আলি ও তার সমর্থকরা এ সিদ্ধান্তে হতবাক হয়ে যান। এ ঘটনা মুয়াবিয়ার কাছে খলিফার মর্যাদা কমানোর সমতুল্য ছিল। আলি এ সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানালেও মীমাংসা মেনে নেয়ার ব্যাপারে নিজেকে বাধ্য অবস্থায় দেখতে পান। এর ফলে আলির অবস্থান তার নিজের সমর্থকদের মধ্যেও দুর্বল হয়ে পড়ে। আলির সমর্থকদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে চাপ সৃষ্টিকারীরা ছিল সবচেয়ে কঠোর প্রতিবাদকারী। তারা আলির বাহিনী থেকে বের হয়ে যায় এবং “একমাত্র আল্লাহর প্রতি” স্লোগান দিতে থাকে। এ দল খারিজি নামে পরিচিত হয়ে উঠে। ৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে আলি ও খারিজিরা মুখোমুখি হয়। আলি যুদ্ধে জয়ী হলেও ক্রমাগত সংঘর্ষ তার অবস্থানের উপর প্রভাব ফেলছিল এবং পরবর্তী বছরগুলোতে কিছু সিরিয়ান মুয়াবিয়াকে বিদ্রোহী খলিফা হিসেবে ঘোষণা করে।[৩৬] ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে আলি একজন খারিজির হাতে নিহত হন। সে বছর ছয় মাস পর হাসান ইবনে আলি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মুয়াবিয়ার সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। হাসান-মুয়াবিয়া চুক্তি মোতাবেক হাসান মুয়াবিয়াকে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন এ শর্তে যে তিনি জনগণের প্রতি ন্যায়ানুগ আচরণ করবেন, তাদের নিরাপদ রাখবেন এবং নিজের মৃত্যুর পর কোনো রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করবেন না।[৩৭][৩৮] এ ঘটনার ফলে খুলাফায়ে রাশেদীনের শাসনের অবসান হয়। এরপর মুয়াবিয়া চুক্তির বাইরে গিয়ে উমাইয়া রাজবংশের সূচনা করেন এবং দামেস্কে রাজধানী স্থাপন করেন।[৩৯] ৬৮০ তে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার নিয়ে পুনরায় সংঘাত শুরু হয় যা দ্বিতীয় ফিতনা নামে পরিচিত।[৪০] ব্যাপক লড়াইয়ের পর উমাইয়া রাজবংশ প্রথম মারওয়ানের হাতে এসে পড়ে।
৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে রাজবংশের পতনের আগ পর্যন্ত সিরিয়ে উমাইয়াদের খলিফার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তবে উমাইয়ারা কর্ডোবাতে (আল আন্দালুস, বর্তমান পর্তুগাল ও স্পেন) আমিরাত হিসেবে ও পরবর্তীতে খিলাফত হিসেবে ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল। ইবেরিয়ান উপদ্বীপে মুসলিম শাসন পরবর্তী ৫০০ বছর বিভিন্ন রূপে টিকে ছিল যেমন, তাইফা, বার্বার রাজ্য ও গ্রানাডা রাজ্য।
৭১২ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম ইন্দুজ নদীসহ সিন্ধু ও পাঞ্জাব অঞ্চল জয় করেন। সিন্ধু ও পাঞ্জাবের জয় উমাইয়া খিলাফতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিজয় ছিল। রাজস্থানের যুদ্ধের পর সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া থেমে যায়। আরবরা ভারত আক্রমণের চেষ্টা করে কিন্তু উত্তর ভারতের রাজা নাগাভাতা ও দক্ষিণ ভারতের সম্রাট দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য তাদের পরাজিত করেন। আরব লেখকদের ভাষ্যমতে এরপর খলিফা মাহদি ভারত বিজয়ের পরিকল্পনা বাদ দেন।
পরবর্তী বছরগুলোতে এবং বিশেষত ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দে ইবেরিয়ার তাইফা পদ্ধতির আওতায় গ্রানাডা আমিরাত স্বাধীনতা বজায় রাখে। উত্তরের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলোকে কর প্রদানের মাধ্যমে তারা টিকে ছিল। ১০৩১ থেকে তারা দক্ষিণে বিস্তৃত হতে শুরু করে।
১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দের ২ জানুয়ারি কর্ডোবার নাসিরি রাজ্যের পতনের মাধ্যমে ইবেরিয়ায় মুসলিম শাসনের সমাপ্তি হয়। গ্রানাডার শেষ মুসলিম শাসক দ্বাদশ মুহাম্মদ যিনি বোয়াবদিল নামে পরিচিত, আরাগনের রাজা দ্বিতীয় ফার্ডিনেন্ড ও কাস্টিলের রাণী প্রথম ইসাবেলার কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
মুয়াবিয়ার রাজবংশ “সুফয়ানি” (আবু সুফিয়ানের বংশধর) ৬৬১ থেকে ৬৮৪ পর্যন্ত শাসন করে। মুয়াবিয়ার শাসনকালকে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও বাহ্যিক বিস্তৃতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সাম্রাজ্যের ভেতরে শুধু একটি বিদ্রোহের রেকর্ড আছে। হুজর ইবনে আদি কুফ্যার এই বিদ্রোহ করেন। হুজর ইবনে আদি নিজের আলির বংশধরদের খিলাফতের দাবিদার বলে সমর্থন জানান। কিন্তু ইরাকের গভর্নর জিয়াদ ইবনে আবু সুফিয়ান তার আন্দোলন সহজেই দমন করেন।
মুয়াবিয়া সিরিয়ার খ্রিষ্টানদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে উৎসাহিত করেন[৪১] এবং তার একজন ঘনিষ্ট উপদেষ্টা ছিলেন জন অব ডেমাস্কাসের পিতা সারজুন। একই সময় তিনি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে যান। তার শাসনামলে রোডস ও ক্রিট অধিকৃত হয় এবং কনস্টান্টিনোপলের বিরুদ্ধে বেশ কিছু আক্রমণ পরিচালিত হয়। ব্যর্থ হওয়ার পর এবং বড় ধরনের খ্রিষ্টান উত্থানের ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার পর তিনি বাইজেন্টাইনদের সাথে শান্তি অবস্থায় আসেন। মুয়াবিয়া উত্তর আফ্রিকা (কাইরাওয়ানের প্রতিষ্ঠা) ও মধ্য এশিয়া (কাবুল, বুখারা ও সমরকন্দ জয়) সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন।
৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তার পুত্র প্রথম ইয়াজিদ তার উত্তরাধিকারি হন। অনেক নামকরা মুসলিম ইয়াজিদের ক্ষমতালাভের বিরোধী ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মুহাম্মদ (সা) এর এক সাহাবির ছেলে আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের ও চতুর্থ খলিফার পুত্র হুসাইন ইবনে আলি। ফলশ্রুতিতে ঘটে যাওয়া সংঘাত দ্বিতীয় ফিতনা বলে পরিচিত।
৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের মক্কার উদ্দেশ্যে মদিনা ত্যাগ করেন। ইয়াজিদের বিপক্ষে হুসাইনের অবস্থানের কথা শুনে কুফার জনগণ হুসাইনের কাছে তাদের সমর্থন নেয়ার জন্য আবেদন জানায়। হুসাইন তার চাচাত ভাই মুসলিম বিন আকিলকে এর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পাঠান। এ খবর ইয়াজিদের কাছে পৌছলে তিনি বসরার শাসক উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদকে কুফার জনগণকে হুসাইনের নেতৃত্বে সমবেত হওয়া থেকে নিবৃত্ত করার দায়িত্ব দেন। উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ মুসলিম বিন আকিলের পাশে থাকে জনতাকে প্রতিহত করতে সক্ষম এবং তাকে গ্রেপ্তার করেন। উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের উপর হুসাইনকে প্রতিহত করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে শুনে মুসলিম বিন আকিল তাকে অনুরোধ করেন যাতে হুসাইনকে কুফায় না আসার ব্যাপারে জানিয়ে চিঠি দেয়া হয়। তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ মুসলিম বিন আকিলকে হত্যা করেন। আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের আমৃত্যু মক্কায় থেকে যান। হুসাইন সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি তার পরিবারসহ কুফায় যাবেন। সমর্থনের অভাবের বিষয়ে তার এসময় জানা ছিল না। হুসাইন ও তার পরিবারকে ইয়াজিদের সেনাবাহিনী রুখে দেয়। এসময় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আমরু বিন সাদ, শামার বিন জিয়ালজোশান ও হুসাইন বিন তামিম। তারা হুসাইন ও তার পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সাথে লড়াই করে হত্যা করে। হুসাইনের দলে ২০০ জন মানুষ ছিল যাদের অধিকাংশ ছিল নারী। এদের মধ্যে হুসাইনের বোন, স্ত্রী, মেয়ে ও তাদের সন্তানরা ছিল। নারী ও শিশুদেরকে যুদ্ধবন্ধী হিসেবে দামেস্কে ইয়াজিদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। হুসাইনের মৃত্যু ও তার পরিবারের বন্দী হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে জনগণের সমর্থন তার দিক থেকে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের বন্দী করে রাখা হয়। এরপর তাদের মদিনা ফিরে যেতে দেয়া হয়। বেঁচে যাওয়া একমাত্র পুরুষ সদস্য ছিলেন আলি ইবনে হুসাইন জয়নুল আবেদিন। অসুস্থতার কারণে কাফেলা আক্রান্ত হওয়ার সময় তিনি লড়াই করতে পারেননি।[৪২] মক্কায় অবস্থান করলেও হুসাইনের মৃত্যুর পর আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের আরো দুটি প্রতিপক্ষ দলের সাথে যুক্ত হন। এর একটি মদিনা ও অন্যটি বসরা ও আরবের খারিজিরা সংঘটিত করে। মদিনা ছিল হুসাইনসহ মুহাম্মদ (সা) ও তার পরিবারের বাসস্থান, তার মৃত্যু ও পরিবারের বন্দী হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিরাট আকারে প্রতিপক্ষ সৃষ্টি হয়। ৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ইয়াজিদ আন্দোলন দমন করতে সেনাবাহিনী পাঠান। হাররাহর যুদ্ধে সেনারা মদিনার প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে। মদিনার মসজিদে নববী ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ইয়াজিদের সেনারা এগিয়ে গিয়ে মক্কা অবরোধ করে। অবরোধের এক পর্যায়ে আগুনে কাবার ক্ষতি হয়। কাবা ও মসজিদে নববীর ক্ষতিসাধনের ঘটনা পরবর্তী ইতিহাসবিদদের কাছে বেশ সমালোচনার বিষয়ে পরিণত হয়।
অবরোধ চলার সময় ইয়াজিদ মৃত্যুবরণ করেন এবং উমাইয়া সেনারা দামেস্কে ফিরে আসে। আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের মক্কার নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন। ইয়াজিদের পুত্র দ্বিতীয় মুয়াবিয়া (শাসনকাল ৬৮৩-৮৪) তার উত্তরসুরি হন কিন্তু সিরিয়ার বাইরে খলিফা হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন না। সিরিয়ার ভেতর দুটি দল তৈরী হয়, একটি হল কায়সদের দল, এরা আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়েরকে সমর্থন করত, আরেকটি হল কুদাদের দল যারা প্রথম মারওয়ানকে সমর্থন করত। মারওয়ানের সমর্থকরা মারজ রাহিতের যুদ্ধে বিজয়ী হয় এবং ৬৮৪ তে মারওয়ান খলিফার পদে আরোহণ করেন।
প্রথম মারওয়ানি
মারওয়ানের প্রথম কাজ ছিল এসময় ইসলামি বিশ্বের অধিকাংশ এলাকা জুড়ে খলিফা হিসেবে স্বীকৃত আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়েরের বিদ্রোহী দলের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। মারওয়ান মিশর অধিকার করেন ও নয় মাস শাসন করার পর ৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
মারওয়ানের পর তার পুত্র আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান (শাসনকাল ৬৮৫-৭০৫) খলিফা হন। তিনি খিলাফতের উপর উমাইয়াদের কর্তৃত্ব সংহত করেন। তার শাসনের প্রথমদিকে কুফাভিত্তিক আল-মুখতারের বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। আল-মুখতার আলির আরেক পুত্র মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়াকে খলিফা হিসেবে দেখতে চাইতেন। তবে বিদ্রোহের সাথে ইবনুল হানাফিয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায় না। আল-মুখতারের সেনারা ৬৮৬তে উমাইয়াদের সাথে ও ৬৮৭তে আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়েরের সেনাদের সাথে লড়াই করে এবং পরাজিত হয়। ফলে তার বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটে। ৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া সেনারা পুনরায় ইরাক অধিকার করে ও একই বাহিনী মক্কা দখল করে। আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের হামলায় নিহত হন।
আবদুল মালিকের শাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল জেরুজালেমের ডোম অব দ্য রক নির্মাণ। লিখিত দলিলে অস্পষ্টতা থাকলেও সম্পূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ ৬৯২ খ্রিষ্টাব্দে শেষ হয়েছে বলে ধরা হয়। অর্থাৎ এটি আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়েরের সংঘর্ষের সময় নির্মাণ করা হয়েছিল।
আবদুল মালিককে প্রশাসনকে কেন্দ্রিভুত করা ও আরবিকে সরকারি ভাষা করার কৃতিত্ব দেয়া হয়। তিনি স্বতন্ত্র মুসলিম মুদ্রা চালু করেন। ইতিপূর্বে বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় মুদ্রা ব্যবহার হত। আবদুল মালিক বাইজেন্টানটিয়ামের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। সেবাস্টপলিসের যুদ্ধে বাইজেন্টাইনরা পরাজিত হয় এবং আর্মেনিয়া ও ককেসিয়ান ইবেরিয়ায় কর্তৃত্ব পুনপ্রতিষ্টা করা হয়।
আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর তার পুত্র প্রথম আল ওয়ালিদ (শাসনকাল ৭০৫-১৫) খলিফা হন। আল ওয়ালিদ একজন দক্ষ নির্মাতা ছিলেন। তিনি মসজিদে নববী ও দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেন।
আবদুল মালিক ও আল ওয়ালিদ উভয়ের শাসনের সময়কার একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ। অনেক ইরাকি উমাইয়া শাসনের বিরোধি ছিল। শান্তি বজায় রাখার জন্য হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সিরিয়া সেনাদের ইরাকে নিয়ে আসেন। নতুন গেরিসন শহর ওয়াসিতে তাদের স্থান দেয়া হয়। বিদ্রোহ দমনে এই সেনারা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আল ওয়ালিদের পর তার ভাই সুলায়মান ইবনে আবদুল মালিক (শাসনকাল ৭১৫-১৭) খলিফা হন। তার শাসনকালে কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করা হয়। অবরোধ ব্যর্থ হলে বাইজেন্টাইন রাজধানী জয়ে আরবদের উৎসাহে ভাটা পড়ে। তবে অষ্টম শতকের প্রথম দুই দশক খিলাফত ক্রমাগতভাবে বিস্তৃত হচ্ছিল যা পশ্চিমে ইবেরিয়ান উপদ্বীপ থেকে পূর্বে ট্রান্সঅক্সানিয়া ও উত্তর ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
সুলায়মানের পর তার তুতো ভাই উমর ইবনে আবদুল আজিজ (শাসনকাল ৭১৭-২০) খলিফা হন। উমাইয়া খলিফাদের মধ্যে তার স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে। তিনি একমাত্র উমাইয়া খলিফা যাকে প্রচলিত অর্থে সম্রাট হিসেবে নয় বরং প্রকৃত অর্থে খলিফা বিবেচনা করা হয়।
উমরকে অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য কৃতিত্ব দেয়া হয়। উমাইয়া শাসনের সময় অধিকাংশ জনতা ছিল খ্রিষ্টান, ইহুদি, জরস্ট্রিয়ান ও অন্যান্য ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ের। এই ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয়নি। তাদেরকে জিজিয়া নামক কর দিতে হত। এ কর মুসলিমদের উপর ছিল না। ফলে রাজস্ব সংগ্রহের দিক থেকে ব্যাপকভাবে ইসলাম গ্রহণ সমস্যার সৃষ্টি করছিল। কিছু বিবরণী থেকে জানা যায় প্রাদেশিক শাসকরা ধর্মান্তরে নিরুৎসাহিত করছিলেন। উমর কিভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন তা স্পষ্ট না, কিন্তু সুত্র মতে তিনি আরব ও অনারবদের প্রতি একই নীতি অবলম্বন করেন এবং ইসলাম গ্রহণের পথে বাধা অপসারণ করেন।
উমরের মৃত্যুর পর আবদুল মালিকের আরেক পুত্র দ্বিতীয় ইয়াজিদ (শাসনকাল ৭২০-২৪) খলিফা হন। ইয়াজিদ খিলাফতের সীমানার ভেতরের খ্রিষ্টান ছবি মুছে ফেলার আদেশ দেন। ৭২০ এ ইরাকে [ইয়াজিদ ইবনুল মুহাল্লাব[ইয়াজিদ ইবনুল মুহাল্লাবের]] নেতৃত্ব আরেকটি বড় আকারের বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।
আবদুল মালিকের আরেক পুত্র হিশাম ইবনে আবদুল মালিক (শাসনকাল ৭২৪-৭৪৩) এরপর খলিফা হন। তার দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল শাসনকাল সামরিক অভিযান সংক্ষিপ্তকরণের কারণে চিহ্নিত করা হয়। হিশাম উত্তর সিরিয়ার রিসাফাতে তার দরবার স্থাপন করেন। এটি দামেস্কের চেয়ে বাইজেন্টাইন সীমান্তের বেশি কাছে ছিল। বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে আক্রমণ পুনরায় শুরু হয় এবং কনস্টান্টিনোপল শেষবার অবরোধ করে ব্যর্থ হওয়ার পর তা শেষ হয়। নতুন অভিযানের মধ্যে ছিল আনাতোলিয়ায় সফল অভিযান। এক্রোইননের যুদ্ধে পরাজয়ের পর আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ সীমানা বিস্তৃতি হয়নি।
হিশামের শাসনের সময় ৭৩২ খ্রিষ্টাব্দে টুরসের যুদ্ধে ফ্রেঙ্কদের কাছে আরব সেনাদের পরাজয়ের পর পশ্চিমদিকে সীমানা সম্প্রসারণ সমাপ্ত হয়। ৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর আফ্রিকায় বার্বার বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এটিকে খুব কষ্টে দমন করা হয়। ককেসাসে খাজারদের সাথে লড়াই চূড়ান্তে পৌছায়। আরবরা ডেরবেন্টে একটি সামরিক ঘাটি তৈরী করে এবং উত্তর ককেসাসে বেশ কয়েকটি আক্রমণ চালায়। কিন্তু যাযাবর খাজারদের পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। সংঘর্ষ খুবই রক্তাক্ত ছিল। ৭৩০ খ্রিষ্টাব্দে আরব সেনারা আরাদাবিলের যুদ্ধে পরাজিত হয়। মারওয়ান ইবনে মুহাম্মদ, পরবর্তীতে দ্বিতীয় মারওয়ান, ৭২৭ খ্রিষ্টাব্দে শেষপর্যন্ত অভিযান সমাপ্ত করেন। তারা ভলগা পর্যন্ত পৌছালেও খাজাররা তাদের আওতার বাইরে ছিল।
হিশাম পূর্বদিকেও পরাজয়ের সম্মুখিন হয়। তার সেনারা তোখারিস্তান ও ট্রান্সঅক্সানিয়া জয় করার চেষ্টা করে। দুটি এলাকাই ইতিমধ্যে আংশিকভাবে অধিকৃত হয়। কিন্তু এগুলো শাসন করা কষ্টসাধ্য ছিল। এসময় আরেকবার অনারবদের ধর্মান্তরের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয়, বিশেষত ট্রান্সঅক্সানিয়ার সোগডিয়ানদের ক্ষেত্রে। ৭২৪ খ্রিষ্টাব্দে পিপাসার দিনে উমাইয়াদের পরাজয়ের পর খোরাসানের গভর্নর আশরাস ইবনে আবদুল্লাহ আলসুলামি ইসলামে ধর্মান্তরিত সোগডিয়ানদের কর মওকুফের প্রতিশ্রুতি দেন কিন্তু যখন এ কথা খুবই বেশি জনপ্রিয়তা পায় ও রাজস্বের জন্য ক্ষতিকর বলে প্রতীয়মানে হয় তখন তিনি তা তুলে নেন। ৭৩১ ডিফাইলের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পর খোরাসানি আরবদের বিরোধ বৃদ্ধি পায়। আলহারিস ইবনে সুরায়জ একটি বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন এবং বলখ অধিকার করেন। তবে মার্ভ অধিকার করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনার পর আলহারিসের কার্যক্রম শেষ হয়ে গিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় কিন্তু অনারব মুসলিমদের অধিকারের প্রশ্নটি উমাইয়াদের মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি করে।
তৃতীয় ফিতনা
হিশামের পর দ্বিতীয় ইয়াজিদের পুত্র দ্বিতীয় আল-ওয়ালিদ (শাসনকাল ৭৪৩-৪৪) খলিফা হন। তার ব্যাপারে বলা হয় যে তিনি ধর্মীয় দিকের চেয়ে বরং পার্থিব সুখভোগের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন। বিরোধিদের মৃত্যুদন্ড দানে ও কাদারিয়াদের উপর নির্যাতনের মাধ্যমে দ্রুত তিনি অনেকের শত্রুতে পরিণত হন।
৭৪৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ওয়ালিদের এক পুত্র তৃতীয় ইয়াজিদ দামেস্কে নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। তার সেনারা দ্বিতীয় আল-ওয়ালিদকে হত্যা করে। তৃতীয় ইয়াজিদ দয়াপ্রদর্শনের জন্য সুনাম অর্জন করেন এবং কাদারিয়াদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। শাসনের ছয় মাসের মাথায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ইয়াজিদ তার ভাই ইব্রাহিমকে তার উত্তরসুরি মনোনীত করেন। কিন্তু প্রথম মারওয়ানের নাতি দ্বিতীয় মারওয়ান (শাসনকাল ৭৪৪-৫০) উত্তর দিক থেকে একটি সেনাদলের নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে আসেন ও ৭৪৪ এর ডিসেম্বরে দামেস্কে প্রবেশ করেন। এখানে তিনি নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। মারওয়ান তাৎক্ষনিকভাবে উত্তরে বর্তমান তুরস্কের অন্তর্গত হারানে তার রাজধানী সরিয়ে নেন। সিরিয়ায় শীঘ্রই বিদ্রোহ দেখা দেয়, সম্ভবত রাজধানী স্থানান্তরের কারণে। ৭৪৬ এ মারওয়ান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হোমস ও দামেস্কে চারপাশের দেয়াল ভেঙ্গে ফেলেন।
ইরাক ও ইরানের খারিজিদের কাছ থেকে মারওয়ান প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হন। তারা প্রথমে দাহহাক ইবন কায়স আল শায়বানি ও পরে আবু দুলাফকে বিদ্রোহী খলিফা হিসেবে মনোনীত করে। মারওয়ান ইরাকে পুনরায় কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হন কিন্তু এসময় খোরাসানে আরো বড় হুমকির জন্ম হয়।
আব্বাসীয় বিপ্লব
আব্বাসীয় পরিবার কর্তৃক পরিচালিত হাশিমিয়া আন্দোলন উমাইয়া খিলাফতকে উৎখাত করে। আব্বাসীয়রা হাশিমি গোত্রের সদস্য ছিল। তবে হাশিমিয়া শব্দটি আলির নাতি ও মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়ার পুত্র আবু হাশিম থেকে এসেছে বলে মনে হয়। কিছু সূত্রমতে আব্বাসীয় পরিবারের প্রধান আবু হাশিম ৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি মুহাম্মদ ইবনে আলি তার উত্তরসুরি মনোনীত করে যান। আল-মুখতারের ব্যর্থ বিদ্রোহের সমর্থকদের নিয়ে আব্বাসীয়রা এগিয়ে যায়। তারা নিজেদেরকে মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়ার সমর্থক হিসেবে তুলে ধরে।
৭১৯ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হওয়া হাশিমিয়া কর্মকাণ্ড খোরাসানে অনুগত লোক খুজতে থাকে। তারা মুহাম্মদ (সা) এর পরিবারের একজন সদস্যের জন্য সমর্থনের ডাক দেয়। তবে আব্বাসীয়দের কথা বলা হয়নি। এই কার্যক্রম আরব ও অনারব (মাওয়ালি) উভয়ের মধ্যেই সফল হয়। তবে দ্বিতীয় দলটি আন্দোলনের বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৭৪৬ এর দিকে আবু মুসলিম খোরাসানে হাশিমিয়াদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কালো পতাকার অধীনে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ শুরু করেন। তিনি শীঘ্রই খোরাসানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, এর উমাইয়া গভর্নর নাসর ইবনে সায়ারকে বহিষ্কার করেন এবং পশ্চিমদিকে একটি সেনাবাহিনী পাঠানো হয়। ৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দে কুফা হাশিমিয়াদের হস্তগত হয়। এটি ইরাকে উমাইয়াদের শেষ শক্ত ঘাটি ছিল। ওয়াসিতে অবরোধ করা হয় এবং সে বছরের নভেম্বরে আবুল আবাস কুফার মসজিদে খলিফা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। এর ফলে মারওয়ান তার সেনাদেরকে হারান থেকে ইরাকের দিকে পরিচালিত করেন। ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি দুই বাহিনী জাবের যুদ্ধে মুখোমুখি হয় এবং উমাইয়ারা পরাজিত হয়। এপ্রিলে দামেস্ক আব্বাসীয়দের হাতে এসে পড়ে এবং আগস্টে মারওয়ানকে মিশরে হত্যা করা হয়।
বিজয়ীরা সিরিয়ায় উমাইয়াদের কবরগুলোকে অবমাননা করা শুরু করে। শুধু দ্বিতীয় উমরের কবরের প্রতি কিছু করা হয়নি। উমাইয়া পরিবারের বাকি সদস্যদের অনুসরণ করা হয় ও হত্যা করা হয়। আব্বাসীয়রা উমাইয়া পরিবারের সদস্যদের জন্য ক্ষমা ঘোষণা করলে আশিজন ক্ষমা গ্রহণ করতে আসে এবং সবাইকে হত্যা করা হয়। হিশামের একজন নাতি প্রথম আবদুল রহমান বেঁচে যান এবং আল-আন্দালুস রাজ্য স্থাপন করেন এবং কর্ডোবা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রেভিট-অরটনের মতে উমাইয়াদের পতনের কারণ ছিল ইসলামের দ্রুত প্রসার। উমাইয়া শাসনামলে ব্যাপক মাত্রায় ধর্মান্তরের কারণে পারসিয়ান, বার্বার, কপ্ট ও আরামায়িকরা ইসলাম গ্রহণ করে। এই অনারবরা যারা মাওয়ালি বলে অবিহিত হত, প্রায় সময় তাদের আরব শাসকদের চেয়ে অধিক শিক্ষিত ও মার্জিত হত। নতুন ধর্মান্তরিতদের প্রতি সব মুসলিমের জন্য সমতার নীতির কারণে রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যায়। প্রেভিট-অরটনের এও বলেন যে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যকার জাতিবিদ্বেষের কারণে সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।[৪৩] উমাইয়া প্রশাসন
মুয়াবিয়ার প্রথম কাজ ছিল সাম্রাজ্যের জন্য একটি দক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থার চালু করা। পূর্ববর্তী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অংশ ছিল এমন প্রদেশে তিনি পূর্বতন নীতি চালু রাখেন। সরকারকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়, যথাক্রমে রাজনৈতিক ও সামরিক, কর সংগ্রহ এবং ধর্মীয় প্রশাসন। প্রত্যেকটি শাখা আরো বেশ কিছু শাখা, অফিস ও বিভাগে বিভক্ত ছিল।
প্রদেশ
সমগ্র সাম্রাজ্যে বেশ কিছু প্রদেশে বিভক্ত ছিল। উমাইয়া শাসনের সময় সীমান্ত বেশ কয়েকবার পরিবর্তন হয়। প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে খলিফা কর্তৃক নিযুক্ত গভর্নর থাকত। প্রদেশের ধর্মীয়, সেনা, পুলিশ ও বেসামরিক কর্তৃপক্ষ গভর্নরের অধীনে কাজ করত। স্থানীয় খরচ প্রদেশের সংগৃহীত কর থেকে মেটানো হত। অতিরিক্ত কর দামেস্কের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো হত। পরবর্তী সময় কেন্দ্রীয় সরকারের শক্তিক্ষয় হলে গভর্নররা অতিরিক্ত কর পাঠাতে গড়িমসি করে এবং নিজেদের ব্যক্তিগত ইচ্ছাপূরণে এগিয়ে যায়।[৪৪] সরকারি কর্মচারী
সাম্রাজ্যের দ্রুত বৃদ্ধির সাথে সাথে দক্ষ আরব কর্মীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমে যায়। ফলে মুয়াবিয়া বিজিত অঞ্চলগুলোতে পূর্ববর্তী সরকারি কর্মীদের দায়িত্বে বহাল রাখেন। ফলে স্থানীয় সরকারের অধিকাংশ দলিল গ্রীক, কপ্টিক ও ফার্সিতে লিপিবদ্ধ হত। আবদুল মালিকের সময় নিয়মিতভাবে সমস্ত সরকারি দলিলপত্র আরবিতে লেখা শুরু হয়।[৪৪] বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় সাম্রাজ্যে পূর্ব থেকেই মুদ্রা ব্যবস্থা চালু ছিল। উমাইয়া আমলেও একই ব্যবস্থা বহাল থাকে। আগে থেকে চলা মুদ্রাগুলো চলতে থাকে। তবে এগুলোর উপর কুরআনের আয়াত অঙ্কিত করা হয়। পাশাপাশি উমাইয়া সরকার নিজস্ব মুদ্রা চালু করে। এগুলো পূর্বের মুদ্রাগুলোর মতই ছিল। ইতিহাসে এটিই মুসলিম শাসক কর্তৃক প্রথম নিজস্ব মুদ্রা চালুর ঘটনা। স্বর্ণমুদ্রাকে বলা হত দিনার ও রৌপ্যমুদ্রাকে বলা হত দিরহাম।[৪৪] কেন্দ্রীয় দিওয়ান
প্রশাসনিক কাজে খলিফাকে সহায়তা করার জন্য কেন্দ্রে ছয়টি দপ্তর ছিল, দিওয়ান আল খারাজ, দিওয়ান আল রাসাইল, দিওয়ান আল খাতাম, দিওয়ান আল বারিদ, দিওয়ান আল কুদাত, দিওয়ান আল জুন্দ।
দিওয়ান আল খারাজ
এই বিভাগ সাম্রাজ্যের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা তদারক করত। সেসাথে নতুন করারোপ ও সংগ্রহ ব্যবস্থা করা এ বিভাগের কাজ ছিল।
দিওয়ান আল রাসাইল
এ বিভাগের কাজ ছিল কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক অফিসারদের কাছে আদেশ জারি করা। এটি সকল বিভাগের কাজকে সমন্বয় করত এবং প্রধান সচিবালয় হিসেবে কার্যনির্বাহ করত।
দিওয়ান আল খাতাম
রাষ্ট্রীয় দলিলপত্রের সংরক্ষণের জন্য মুয়াবিয়া এ বিভাগটি সৃষ্টি করেন। স্বাক্ষর ও গন্তব্যে পাঠানোর আগে প্রতিটি দাপ্তরিক নথিপত্রের একটি কপি সংরক্ষণ করে রাখা হত। এর ফলে আবদুল মালিকের সময় দামেস্কে একটি আর্কাইভ গড়ে উঠে। আব্বাসীয় শাসনের মধ্যভাগ পর্যন্ত এ বিভাগটি টিকে ছিল।
দিওয়ান আল বারিদ
মুয়াবিয়া একটি ডাক ব্যবস্থা চালু করেন। আবদুল মালিক এটিকে সাম্রাজ্যজুড়ে বিস্তৃত করেন এবং ওয়ালিদ এর পূর্ণ ব্যবহার করেন। আবদুল মালিক নিয়মিত ডাকবিভাগ গঠন করেন। উমর ইবনে আবদুল আজিজ খোরাসান মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ক্যারাভেনসরাই স্থাপন করে এর উন্নতি সাধন করেন। খলিফার কাছ থেকে প্রদেশের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের কাছে সংবাদ পাঠানোর জন্য সময় ব্যবধানে ঘোড়া বদল করা হত। পুরো মহাসড়ক ১২ মাইল (১৯ কিমি) ব্যবধানের কয়েকটি ধাপে বিভক্ত করা হয়। প্রত্যেকটি ধাপেই ডাক পরিবহনের জন্য ঘোড়া, গাধা ও উট রাখা থাকত। প্রথমদিকে এটি সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য চালু করা হলেও পর্যটকরাও এ থেকে উপকৃত হয়। ডাক পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত ঘোড়ার গাড়িগুলো দ্রুত সেনা পাঠানোর কাজেও ব্যবহৃত হত। এগুলো একই সময় ৫০ থেকে ১০০ জন সেনা পরিবহন করতে পারত। গভর্নর ইউসুফ বিন উমরের সময় ইরাকের ডাক বিভাগের জন্য বছরে ৪০,০০,০০০ দিরহাম খরচ হত।
দিওয়ান আল কুদাত
ইসলামের প্রাথমিক যুগে বিচারের কাজ মুহাম্মদ (সা) ও খলিফারা ব্যক্তিগতভাবে তদারক করতেন। সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ব্যাপক হওয়ার পর খলিফা উমর পৃথক বিচারবিভাগ চালু করেন এবং ২৩ হিজরি/৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দে মিশরে প্রথম কাজি নিযুক্ত করা হয়। ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দের পর উমাইয়া খলিফা হিশাম ও দ্বিতীয় ওয়ালিদের সময় মিশরের বেশ কিছু বিচারক একের পর একজন দায়িত্বপালন করেন।
দিওয়ান আল জুন্দ
উমরের সময় আরব ও অন্য জাতিগোষ্ঠীর মুসলিম সৈনিকদের ভাতা প্রদানের নীতি উমাইয়াদের সময় পরিবর্তন হয়। উমাইয়ারা সক্রিয় ভূমিকা না রাখলেও ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা রাখে। হিশাম এ ব্যবস্থার সংস্কার করেন এবং যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে শুধু তাদের ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করেন। বাইজেন্টাইনদের আদলে সেনাবাহিনীকে সংস্কার করা হয় এবং পাঁচটি অংশে বিভক্ত করা হয়, যথাক্রমে, মধ্যভাগ, দুই প্রান্ত, সম্মুখভাগ ও পশ্চাতভাগ। কুচকাওয়াচ বা যুদ্ধক্ষেত্রে একই গঠনবিন্যাস অনুসরণ করা হত। দ্বিতীয় মারওয়ান পুরনো বিভাগ বাতিল করেন এবং নতুন প্রথায় কুরদুস নামক সুসংঘটিত দলের সৃষ্টি করেন। উমাইয়া সেনারা তিনটি ভাগে বিভক্ত থাকত, যথাক্রমে, পদাতিক, অশ্বারোহী ও গোলন্দাজ। আরব সেনারা গ্রীক কায়দায় পোষাক ও অস্ত্রে সজ্জিত থাকত। উমাইয়া অশ্বারোহীরা সমান ও গোলাকার সেডল ব্যবহার করত। গোলন্দাজরা আরাদাহ (বেলিস্টা), মেনজানিক (মানগোনাল) ও দাবাবাহ বা কাবশ (বেটারিং রেম) ব্যবহার করত। ভারি যন্ত্রপাতি ও মালামাল উটের পিঠে করে সেনাবাহিনীর পিছনে থাকত।
সামাজিক সংগঠন
উমাইয়া খিলাফতের সময় প্রধান চারটি সামাজিক শ্রেণী ছিলঃ
1. মুসলিম আরব
2. মুসলিম অনারব (মুসলিম আরবদের মিত্র)
3. অমুসলিম স্বাধীন ব্যক্তি (খ্রিষ্টান, ইহুদি ও জরস্ট্রিয়ান)
4. দাস
মুসলিম আরবরা সমাজের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থান করত। ইসলামে সকল মুসলিমের সমান অবস্থান থাকলেও আরব মুসলিমরা নিজেদের সমাজের উপরের অবস্থানে রাখে।
মুসলিমদের মধ্যে এ বিভাজন সাম্রাজ্যজুড়ে সমস্যার সৃষ্টি করে। ইসলাম ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে মুসলিমদের মধ্যে অনারব জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আরব মুসলিমদের মত সমান অধিকার না থাকার ফলে নতুন ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব তৈরী হয়। সে সাথে ধর্মান্তরিত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে অমুসলিমদের কাছ থেকে সংগৃহিত করের পরিমাণ কমে আসে। ৭৪০ এর দশকে আব্বাসীয় বিপ্লবের আগ পর্যন্ত এ সমস্যা চলতে থাকে।[৪৬] অমুসলিম
অমুসলিমদের মধ্যে ছিল খ্রিষ্টান, ইহুদি, জরস্ট্রিয়ান ও পৌত্তলিক বার্বার যাদের জিম্মি বলা হত। মুসলিম শাসনের প্রতি অনুগত থাকার শর্তে তারা তাদের সামাজিক অধিকার ভোগ করত। তাদের নিজস্ব আদালত ছিল এবং সাম্রাজ্যজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা বহাল ছিল। সরকারি দপ্তরে সর্বোচ্চ পদ না পীও অনেক অমুসলিম প্রশাসনিক পদে আসীন ছিল। খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মধ্যে এসময় অনেক বড় মাপের ধর্মতাত্ত্বিকের আবির্ভাব হয়। কিন্তু পরবর্তীতে অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করে ফলে অমুসলিমদের মধ্যে চিন্তাবিদের সংখ্যা কমে যায়।[৪৭] ঐতিহাসিক গুরুত্ব[
উমাইয়া খিলাফতকে সাম্রাজ্য বিস্তার ও এরূপ বিস্তারের ফলে সৃষ্ট প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছাড়া উমাইয়ারা নতুন ধর্মান্তরিত মুসলিমদের (মাওয়ালি) তুলনায় পুরনো আরব পরিবারগুলো বেশি সম্মান বজায় রাখতে সচেষ্টা ছিল। ফলে তারা ইসলামের বিশ্বজনীনতা থেকে দূরত্বে অবস্থান করতে থাকে এবং পরবর্তীতে বিদ্রোহীদের প্রতিও একই আচরণ করে। জি. আর. হাউটিং এর মতে, “ইসলামকে বিজয়ীদের ধর্ম হিসেবে দেখা হত”।[৪৮] উমাইয়া শাসনের সময় আরবি প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃত হয়। রাষ্ট্রীয় দলিল ও মুদ্রা আরবিতে জারি করা হত। ব্যাপক মাত্রায় ধর্মান্তরকরণ সমাজে বিশাল সংখ্যক মুসলিম জনসংখ্যার জন্ম দেয়। উমাইয়ারা জেরুজালেমের ডোম অব দ্য রক ও দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ নির্মাণ করে।[৪৯] পরবর্তী ইসলামি ইতিহাসবিদদের কাছে উমাইয়ারা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন। তারা উমাইয়াদের প্রকৃত খিলাফতের পরিবর্তে রাজতন্ত্র চালুর জন্য দোষারোপ করেন। তবে আধুনিক আরব জাতীয়তাবাদীরা উমাইয়া শাসনের সময়কে আরবদের স্বর্ণযুগ বলে থাকে। এটি বিশেষত সিরিয়ান জাতীয়তাবাদী ও বর্তমানের সিরিয়া রাষ্ট্রের সাথে মেলে যাদের কেন্দ্র উমাইয়াদের মতই দামেস্ক। প্যান আরব রং হিসেবে যে চারটি রং বিভিন্ন আরব দেশের জাতীয় পতাকায় অঙ্কিত আছে তাকেও উমাইয়াদের প্রতিনিধিত্বশীল ধরা হয়।
সুন্নি দৃষ্টিভঙ্গি
সুন্নি পন্ডিতরা একমত যে মুয়াবিয়ার পরিবার ও তার পিতা আবু সুফিয়ান ইবনে হারব ও তার মা হিন্দ বিনতে উতবা ইসলামের বিরোধী ছিল। মুহাম্মদ (সা) এর মক্কা বিজয়ের পর তারা মুসলিম হন। আরব অভিজাতদের ভেতর সেসময় উমাইয়ারা বেশ প্রভাব ফেলে এবং চূড়ান্তভাবে রাশিদুন খিলাফত বিলুপ্ত করা হয় এবং রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
সুন্নি পন্ডিতরা ইসলাম গ্রহণকারী অনারব মুসলিমদের উপর মাওয়ালি প্রথা চালু রাখার জন্য উমাইয়াদের দোষারোপ করেন। শাসক অভিজাত আরবদের কাছে নতুন ইসলাম গ্রহণকারীরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হত এবং তাদেরকে অমুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য কর দিতে হত। সেসাথে তারা সরকার ও সামরিক বাহিনীতে কাজের সুযোগ পেত না।[৫০] মুয়াবিয়ার পরবর্তী অধিকাংশ শাসকের ব্যাপারে সুন্নি পন্ডিতরা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন এবং তাদের মতে তারা উম্মাহকে সংকটে ফেলেছিলেন। ব্যতিক্রমদের মধ্যে অন্যতম হলেন উমর ইবনে আবদুল আজিজ। খুলাফায়ে রাশেদীনের পর তাকে সবচেয়ে মহৎ খলিফা হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি পূর্বসূরিদের অন্যায় নীতি মাওয়ালিদের জিজিয়া কর বিলুপ্ত করেন।
শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি
উমাইয়াদের ব্যাপারে শিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গি শিয়া গ্রন্থ “সুলহ আল হাসানে” বর্ণিত করা আছে।[৫১][৫২] কিছু সূত্র মতে আলি তাদেরকে সর্বাপেক্ষা খারাপ ফিতনা বলেছেন।[৫৩]

উমাইয়া পরিবারের বংশলতিকা। নীল কালিতে : খলিফা উসমান, খুলাফায়ে রাশেদীনের অন্যতম। সবুজ কালিতে, দামেস্কের উমাইয়া খলিফা। হলুদ কালিতে, কর্ডো‌বার উমাইয়া আমির। কমলা কালিতে, কর্ডো‌বার উমাইয়া খলিফা। তৃতীয় আবদুর রহমান ৯২৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আমির ছিলেন, এরপর নিজেকে খিলিফা ঘোষণা করেন। মুহাম্মদ (সা) এর সাথে আত্মীয়তা দেখানোর জন্য তাকেও এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খলিফা শাসনকাল
দামেস্কের খলিফা
মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান
৬৬১–৬৮০
ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া
৬৮০–৬৮৩
মুয়াবিয়া ইবনে ইয়াজিদ
৬৮৩–৬৮৪
মারওয়ান ইবনে আল হাকাম
৬৮৪–৬৮৫
আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান
৬৮৫–৭০৫
আল ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক
৭০৫–৭১৫
সুলায়মান ইবনে আবদুল মালিক
৭১৫–৭১৭
উমর ইবনে আবদুল আজিজ
৭১৭–৭২০
ইয়াজিদ ইবনে আবদুল মালিক
৭২০–৭২৪
হিশাম ইবনে আবদুল মালিক
৭২৪–৭৪৩
আল ওয়ালিদ ইবনে ইয়াজিদ
৭৪৩–৭৪৪
ইয়াজিদ ইবনে আল ওয়ালিদ
৭৪৪
ইবরাহিম ইবনুল ওয়ালিদ
৭৪৪
মারওয়ান ইবনে মুহাম্মদ (জাজিরার হারান থেকে শাসন করেন) ৭৪৪–৭৫০
কর্ডো‌বার আমির
প্রথম আবদুর রহমান
৭৫৬–৭৮৮
প্রথম হিশাম
৭৮৮–৭৯৬
প্রথম আল হাকাম
৭৯৬–৮২২
দ্বিতীয় আবদুর রহমান
৮২২–৮৫২
প্রথম মুহাম্মদ
৮৫২–৮৮৬
আল মুনজির
৮৮৬–৮৮৮
আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ
৮৮৮–৯১২
তৃতীয় আবদুর রহমান
৯১২–৯২৯
কর্ডো‌বার খলিফা
তৃতীয় আবদুর রহমান, খলিফা হিসেবে
৯২৯–৯৬১
দ্বিতীয় আল হাকাম
৯৬১–৯৭৬
দ্বিতীয় হিশাম
৯৭৬–১০০৮
দ্বিতীয় মুহাম্মদ
১০০৮–১০০৯
সুলাইমান ইবনুল হাকাম
১০০৯–১০১০
দ্বিতীয় হিশাম, পুনরায় ক্ষমতালাভ
১০১০–১০১২
সুলাইমান ইবনুল হাকাম, পুনরায় ক্ষমতালাভ
১০১২–১০১৭
চতুর্থ আবদুর রহমান
১০২১–১০২২
পঞ্চম আবদুর রহমান
১০২২–১০২৩
তৃতীয় মুহাম্মদ
১০২৩–১০২৪
তৃতীয় হিশাম (কর্ডোবা)
১০২৭–১০৩১

প্রথম মুয়াবিয়া (মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান; ৬০২ – ২৯ এপ্রিল বা ১ মে ৬৮০) (মূল নাম, মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান) ছিলেন খিলাফতের উমাইয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা।[১][২] তিনি উমাইয়া গোত্রের দ্বিতীয় খলিফা। উসমান ইবনে আফফান এই গোত্র থেকে প্রথম খলিফা হন।[৩] মুয়াবিয়া পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের সাথে রাজনৈতিক বিষয়ে দক্ষ ছিলেন বলে মুহাম্মদ (সা) তাকে সচিব নিযুক্ত করেন।[৪] আবু বকর ও উমর ইবনুল খাত্তাবের খিলাফতের সময় তিনি সিরিয়ায় মুসলিম পক্ষে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
সমুদ্রের দিক থেকে বাইজেন্টাইন আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তিনি লেভান্টে নৌবাহিনী গড়ে তোলেন। এই নৌবাহিনী এজিয়ান সাগর ও মারমারা সাগরে বাইজেন্টাইনদের মোকাবেলা করতে ব্যবহৃত হয়। খিলাফত সাইজিকাসসহ বেশ কিছু অঞ্চল জয় করে এবং এখানে একটি নৌঘাটি স্থাপন করে।[৫] ইমাম সুয়ুতি সহ অনেক ঐতিহাসিকের মতে, মুয়াবিয়া ও তার পিতা আবু সুফিয়ান মক্কা বিজয়ের বছর ইসলাম গ্রহণ করেন।[৬] ওয়াকেদি বলেন, হুদায়াবিয়ার সন্ধির পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তবে বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে মক্কা বিজয়ের সময় প্রকাশ করেছিলেন।[৭] মুহাম্মদ এর সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ : ইসলাম গ্রহণের পর মুহাম্মদের সঙ্গে হুনাইন ও তায়েফের যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধ শেষে মুহাম্মদ তাকে গনিমতের মাল থেকে ১০০ উট ও ৪০ উকিয়া (আউন্স) রুপা দিয়েছিলেন। [৮]

মদিনায় হিজরত : ইসলাম গ্রহণের পর মুয়াবিয়া পরিবারের সঙ্গে মদিনায় হিজরত করেন। মুয়াবিয়া ও হুতাত ইবনে ইয়াজিদের মাঝে মুহাম্মদ ভ্রাতৃত্ব করে দেন। [৯]

ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান আরবি: يزيد بن معاوية بن أبي سفيان‎ (২০ জুলাই ৬৪৭ – ১৪ নভেম্বর ৬৮৩) সাধারণভাবে প্রথম ইয়াজিদ বলে পরিচিত, ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের দ্বিতীয় খলিফা। উত্তরাধিকার সূত্রে খিলাফত লাভকারীদের মধ্যে তিনি সর্বপ্রথম খলিফা হন। তার পিতা প্রথম মুয়াবিয়া তাকে খলিফা নিযুক্ত করেন। তিনি ৬৮০ থেকে ৬৮৩ সাল পর্যন্ত তিন বছর শাসন করেন।

দ্বিতীয় মুয়াবিয়া (বা মুয়াবিয়া ইবনে ইয়াজিদ) (معاوية بن يزيد) (28 মার্চ ৬৬১ – জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারি ৬৮৪) ছিলেন তৃতীয় উমাইয়া খলিফা। তার পিতা প্রথম ইয়াজিদের মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতায় আসেন। তিনি চার মাসের মত ক্ষমতায় ছিলেন। তার ক্ষমতারোহণের সময় আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের খিলাফত দাবি ও হেজাজসহ অন্যান্য এলাকার নিয়ন্ত্রণের কারণে সাম্রাজ্যে বিশৃংখলা বিরাজ করছিল।

মারওয়ান ইবনুল হাকাম ইবনে আবুল আস ইবনে উমাইয়া (৬২৩-৭ মে ৬৮৫) (আরবি: مروان بن الحكم بن ابو العاص بن أمية‎) ছিলেন চতুর্থ উমাইয়া খলিফা। তিনি খলিফা উসমান ইবনে আফফানের চাচাত ভাই ছিলেন। ৬৮৪ সালে খলিফা দ্বিতীয় মুয়াবিয়া ক্ষমতা হারানোর পর তিনি খলিফা হন। তার ক্ষমতারোহণের মাধ্যমে আবু সুফিয়ানের বংশধরদের কাছ থেকে হাকামের বংশধরদের কাছে ক্ষমতা চলে আসে। তারা উভয়েই উমাইয়ার নাতি ছিলেন। হাকাম ছিলেন উসমান ইবনে আফফানের চাচা।
উটের যুদ্ধের সময় বলা হয় যে মারওয়ান ইবনুল হাকাম তালহাকে তীর নিক্ষেপ করেন যার কারণে তার মৃত্যু হয়। তালহা তৃতীয় খলিফা উসমানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন এমন ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি একাজ করেন। খলিফা আলি তাকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেন। পরবর্তীতে খলিফা প্রথম মুয়াবিয়া তাকে পুনরায় নিযুক্ত করেছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের প্রথম ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে মারওয়ানকে শহর থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এখান থেকে তিনি দামেস্ক চলে যান এবং দ্বিতীয় মুয়াবিয়া ক্ষমতা হারানোর পর তিনি খলিফা হন।
তার সংক্ষিপ্তকালের শাসনের সময় সিরিয়ান আরব ও একই সাথে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের সাথে গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের হেজাজ, ইরাক, মিশর ও সিরিয়ার অংশবিশেষে শাসন করছিলেন। মারজ রাহিতের যুদ্ধে মারওয়ান সিরিয়ার দখল ধরে রাখতে সক্ষম হন। এর মাধ্যমে উমাইয়া খিলাফতের মারওয়ানি শাখার সৃষ্টি হয়। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের কাছ থেকে মিশর ও সিরিয়া পুনরায় দখল করে নেন। কিন্তু তাকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি।

আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান (আরবি: عبد الملك بن مروان‎ ‘Abd al-Malik ibn Marwān, ৬৪৬ – ৮ অক্টোবর ৭০৫) ছিলেন ৫ম উমাইয়া খলিফা। তিনি হেজাজের মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন।[১][৩] আবদুল মালিক সুশিক্ষিত ছিলেন এবং তার শাসনামলে বেশ কিছু রাজনৈতিক সমস্যার পরও তিনি শাসক হিসেবে সফল ছিলেন। ১৪ শতকের মুসলিম ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন বলেন যে: “আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান হলেন অন্যতম মহান আরব ও মুসলিম খলিফা। রাষ্ট্রীয় কাজে তিনি বিশ্বাসীদের নেতা উমর ইবনুল খাত্তাবের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন”।
তার শাসনামলে সব গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আরবিতে অনুবাদ করা হয় এবং প্রথমবারের মত মুসলিম বিশ্বে বিশেষ মুদ্রা চালু করা হয়। এর ফলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধ বেধে যায়। বাইজেন্টাইনরা ৬৯২ সালে সেবাস্টোপলিসের যুদ্ধে পরাজিত হয়। এরপর ইসলামি মুদ্রা মুসলিম বিশ্বের একমাত্র মুদ্রা হিসেবে গণ্য করা হয়। এসময় কৃষি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে আরো বেশ কিছু সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়। আবদুল মালিক মুসলিম শাসন সংহত ও বিস্তৃত করেন, আরবিকে সরকারি ভাষা করেন ও নিয়মিত ডাক ব্যবস্থা প্রণয়ন করেন।[৪]

আল ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক (আরবি: الوليد بن عبد الملك‎) বা প্রথম আল ওয়ালিদ (৬৬৮ – ২৩ ফেব্রুয়ারি ৭১৫) ছিলেন একজন উমাইয়া খলিফা। ৭০৫ থেকে শুরু করে ৭১৫ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি খলিফার পদে আসীন ছিলেন। তার শাসনামলে খিলাফত তার বৃহৎ বিস্তৃতি প্রত্যক্ষ করে। এসময় ট্রান্সওক্সানিয়া, সিন্ধু, হিস্পানিয়া ও বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে সফল অভিযান চালানো হয়।

সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক (আরবি: سليمان بن عبد الملك‎) (আনুমানিক ৬৭৪ – ২২ সেপ্টেম্বর ৭১৭) ছিলেন একজন উমাইয়া খলিফা। তিনি ৭১৫ থেকে ৭১৭ সাল পর্যন্ত খলিফার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের পুত্র ও খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদের ছোট ভাই।

উমর ইবনে আবদুল আজিজ
উমর ইবনে আবদুল আজিজ ( জন্ম: ২ নভেম্বর ৬৮২, ২৬ সফর ৬৩ হিজরি; মৃত্যু: ৩১ জানুয়ারী ৭২০, ১৬ রজব ১০১ হিজরী) উমাইয়া বংশীয় একজন শাসক। উমাইয়া বংশীয় অন্যান্য শাসকদের মত তাকেও মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে গণ্য করা হয়। খুলাফায়ে রাশেদীন এর চার খলিফার সাথে তুলনা করতে গিয়ে অনেকে তাকে ইসলামের পঞ্চম খলিফা বলে থাকেন[১]। তিনি ইসলামের ইতিহাসে দ্বিতীয় উমর নামে পরিচিত ছিলেন।

ইয়াজিদ বিন আবদুল মালিক বা দ্বিতীয় ইয়াজিদ (৬৮৭ – ২৬ জানুয়ারি ৭২৪) (আরবি: يزيد بن عبد الملك‎) ছিলেন একজন উমাইয়া খলিফা। তিনি ৭২০ থেকে ৭২৪ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খলিফা হিসেবে আসীন ছিলেন।
দ্বিতীয় ইয়াজিদ তার পূর্ববর্তী খলিফা দ্বিতীয় উমরের মৃত্যুর পর খলিফা হন।[১] উমর খারেজিদের সাথে আলোচনা করলেও তিনি তাদের সাথে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। ইয়াজিদের সেনারা বিজয় লাভ করে এবং খারেজিদের নেতা শাওদাব নিহত হয়। উমরের মৃত্যুর পর ইয়াজিদ ইবনে আল মুহাল্লাব বন্দীদশা থেকে পালিয়ে ইরাকের দিকে চলে যান এবং সেখানে সমর্থন লাভে সক্ষম হন। তিনি দ্বিতীয় ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং পাল্টা শক্তির উত্থান ঘটান। প্রাথমিকভাবে সফল হলেও পরে তিনি মাসলামা ইবনে আবদুল মালিকের সেনাদের কাছে পরাজিত ও নিহত হন।
আল আন্দালুস (ইবেরিয়ান উপদ্বীপ), উত্তর আফ্রিকা ও সাম্রাজ্যের পূর্ব অংশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ৭২০-৭২১ সালে (১০২ হিজরি) ইফ্রিকিয়ায় গভর্নর ইয়াজিদ ইবনে মুসলিমকে সরিয়ে পূর্ববর্তী গভর্নর মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদ ক্ষমতায় আসেন। খলিফা এটি মেনে নেন এবং মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদকে ইফ্রিকিয়ার গভর্নর হিসেবে নিশ্চিত করেন।
আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানে ইয়াজিদের গভর্নর আল জাররাহ ইবনে আবদাল্লাহ ককেসাসের দিকে অগ্রসর হন এবং ৭২২-২৩ সালে (১০৩ হিজরি) বালানজার অধিকার করেন। একই বছর মদিনার গভর্নর আবদুর রহমান ইবনে দাহহাক একজন নারীকে জোরপূর্বক বিয়ে করতে বাধ্য করে খলিফার বিরাগভাজন হন। সে নারী ইয়াজিদের কাছে অভিযোগ করেন। ইয়াজিদ আবদুল রহমানকে সরিয়ে আবদুল ওয়ালিদ ইবনে আবদাল্লাহকে তার স্থলে বসান।[২] বাইজেন্টাইন কাহিনীকার থিওফানস দ্য কনফেসার[৩] উল্লেখ করেন যে একজন জাদুগর ইয়াজিদকে বলেছিলেন যে তিনি যদি খ্রিষ্টান আইকনের বিরোধীতা করেন তবে চল্লিশ বছর রাজত্ব করতে পারবেন। ইয়াজিদ তা করেন কিন্তু সে বছর তার মৃত্যু হয়। অসন্তুষ্টদের মধ্যে উমাইয়া বিরোধীরা শক্তি অর্জন করে। আল তাবারির বিবরণ অনুযায়ী আব্বাসীয়রা ৭২০-৭২১ সাল (১০২ হিজরি) থেকে নিজেদের উদ্দেশ্য উন্নীত করছিল। তারা ইতিমধ্যেই একটি শক্তি গড়ে তুলছিল যা পরবর্তীতে উমাইয়াদেরকে ৭৫০ সালে উৎখাত করে।
দ্বিতীয় ইয়াজিদ ৭২৪ সালে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর তার ভাই হিশাম ইবনে আবদুল মালিক খলিফা হন।

হিশাম ইবনে আবদুল মালিক (৬৯১ – ৬ ফেব্রুয়ারি ৭৪৩) (আরবি: هشام بن عبد الملك‎) 10 ছিলেন ১০ উমাইয়া খলিফা। ৭২৪ সাল থেকে শুরু করে ৭৪৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি খলিফার পদে ছিলেন। তার মা নিজের পিতার নামে সন্তানের নাম রেখেছিলেন।

ওয়ালিদ ইবনে ইয়াজিদ বা দ্বিতীয় ওয়ালিদ (৭০৬ – ১৭ এপ্রিল ৭৪৪) (আরবি: الوليد بن يزيد‎) ছিলেন একজন উমাইয়া খলিফা। তিনি ৭৪৩ থেকে ৭৪৪ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তার চাচা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের উত্তরসুরি হিসেবে তিনি খলিফার পদে আসীন হন।

ইয়াজিদ ইবনে ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক বা তৃতীয় ইয়াজিদ (৭০১ – ৩/৪ অক্টোবর ৭৪৪) (আরবি: يزيد بن الوليد بن عبد الملك‎) ছিলেন একজন উমাইয়া খলিফা। ৭৪৪ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ৩ বা ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ৬ মাস তিনি শাসন করেন। এসময় তার মৃত্যু হয়।
ইবরাহিম ইবনুল ওয়ালিদ (? – ২৫ জানুয়ারি ৭৫০) (আরবি: ابراهيم ابن الوليد بن عبد الملك‎) ছিলেন একজন উমাইয়া খলিফা ও খলিফা প্রথম ওয়ালিদের পুত্র। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পূর্বে ৭৪৪ সালে তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য শাসন করেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভয়ে তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। শাসনকালের স্বল্পতা ও সর্বজন মান্যতার অভাবের কারণে মুহাম্মদ ইবনে জারির আল তাবারি তাকে খলিফা হিসেবে অসফল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এও লিখেছেন যে ইবরাহিম খলিফা থাকার সময় আবদুল্লাহ ইবনে উমরকে ইরাকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন।
ইবরাহিম তার ভাই খলিফা তৃতীয় ইয়াজিদ কর্তৃক উত্তরাধিকারী মনোনীত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় মারওয়ান ইয়াজিদের বিরোধীতা করেন। পরে ইয়াজিদকে তিনি সম্মতি দিলেও তার মৃত্যুর পর মারওয়ান নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যান। ইবরাহিম অনুরোধ করলে মারওয়ান তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানে সম্মত হন। তিনি মারওয়ানের সাথে সিরিয়ার রুসাফায় প্রাক্তন খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের বাসভবনে ভ্রমণ করেন। ৭৫০ সালে উমাইয়া পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মত তিনিও আব্বাসীয়দের হাতে নিহত হন।

মারওয়ান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মারওয়ান বা দ্বিতীয় মারওয়ান (৬৮৮ – ৬ আগস্ট ৭৫০) (Arabic: مروان بن محمد بن مروان بن الحكم / ALA-LC: Marwān bin Muḥammad bin Marwān bin al-Ḥakam) ছিলেন একজন উমাইয়া খলিফা। তিনি ৭৪৪ থেকে ৭৫০ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তিনি দামেস্কের উমাইয়া খিলাফতের শেষ খলিফা ছিলেন। তাকে হত্যা করা হয়।

প্রথম আবদুর রহমান (পুরো নাম আবদুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়া ইবনে হিশাম ইবনে আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান) (৭৩১-৭৮৮) ছিলেন কর্ডোবা আমিরাত শাসনকারী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। পরবর্তীতে এই আমিরাত খিলাফতে রূপ নেয়। আবদুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত সরকার বাকি মুসলিম বিশ্ব থেকে পৃথক হয়ে পড়ে। মুসলিম বিশ্বের অন্যত্র এসময় আব্বাসীয় খিলাফতের শাসন চলছিল। ৭৫০ সালে উমাইয়াদের পরাজিত করে আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় আসে।

প্রথম হিশাম (আরবি: هشام بن عبد الرحمن الداخل‎) ছিলেন কর্ডোবার আমির। ৭৮৮ থেকে ৭৯৬ পর্যন্ত তিনি আন্দালুসে উমাইয়া আমির হিসেবে দায়িত্বপালন করেন।
হিশাম ৭৫৬ সালে কর্ডোবায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রথম আবদুর রহমান ও তার স্ত্রী হালুলের প্রথম পুত্র।
শাসনের শুরুতে ৭৮৮ সালে তাকে তার ভাই সুলায়মান ও আবদুল্লাহ কর্তৃক সংঘটিত বিদ্রোহ মোকাবেলা করতে হয়।

কারোলিনগিয়ান অঞ্চল থেকে দক্ষিণের দিকে হুমকি অনুভূত হওয়ায় ৭৯৩ সালে তিনি ফ্রাঙ্কদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দেন এবং গিরোনা ও নারবোনে সেনাপ্রেরণ করেন। কিন্তু এ স্থানগুলো দখল করা সম্ভব হয়নি। উমাইয়া সেনাপতি আবদুল মালিক ইবনে আবদুল ওয়াহিদ ইবনে মুগিস কারকাসোনের দিকে অগ্রসর হয়ে সফল হন। সেখানে তিনি লুইস দ্য পাইওসকে পরাজিত করেন। তবে কারোলিনগিয়ানের বেশি ভেতরে অভিযান চালান না হলেও বিপুল পরিমাণ সম্পদ তাদের হাতে আসে। পরবর্তীতে কর্ডোবা মসজিদসহ আরো অনেক মসজিদ তৈরী করা হয়।
৭৯৪ সালে তার সেনাপতি আবদুল মালিক ও তার ভাই আবদুল করিম উত্তরের রাজ্য আলাভা, পুরনো কাস্টিল, অস্টুরাস এসব অঞ্চলে অভিযান চালান। এই অঞ্চলের নবগঠিত রাজধানী আক্রমণ করা হয়। অস্টুরিয়ার দ্বিতীয় আলফোনসো পালিয়ে যান এবং শার্লেমাইনের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। এসব অভিযানে উত্তরের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলোকে ধ্বংস করা উদ্দেশ্য ছিল না বরং কর্ডোভার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এর লক্ষ্য ছিল।
হিশাম ৭৯৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এসময় তার বয়স ছিল ৪০ বছর। তিনি অনেকটা দ্বিতীয় উমরের মত ছিলেন এবং ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালান। তিনি খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং জাঁকজমক এড়িয়ে চলতেন। তিনি আল্লাহভীরু ব্যক্তি ছিলেন এবং তার ন্যায়বিচার ও সুশাসনের জন্য পরিচিত ছিলেন। তার মৃত্যুর পর আবদুল্লাহ পলাতক অবস্থা থেকে ফিরে আসেন এবং ভেলেন্সিয়ার অধিকার দাবি করেন। অন্যদিকে সুলায়মান তানজাহর দাবি করেন।
প্রথম হিশাম (কর্ডোবা)
বনু উমাইয়া
বনু কুরাইশ এর ক্যাডেট শাখা

পূর্বসূরী
প্রথম আবদুর রহমান
কর্ডো‌বার আমির
৭৮৮–৭৯৬
উত্তরসূরী
প্রথম আল হাকাম

আল-হাকাম ইবনে হিশাম ইবনে আবদুর রহমান (আরবি: الحكم بن هشام‎) ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের অধীনস্ত কর্ডোবার আমির। তিনি ৭৯৬ থেকে ৮২২ সাল পর্যন্ত আল-আন্দালুসে (মুরিশ শাসিত ইবেরিয়ান উপদ্বীপ) দায়িত্ব পালন করেন।
আল-হাকাম ছিলেন তার পিতার দ্বিতীয় পুত্র। তার বড় ভাই অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ক্ষমতা লাভের পর তিনি তার চাচা সুলায়মান ও আবদুল্লাহর কাছ থেকে বিরোধীতার সম্মুখীন হন। আবদুল্লাহ তার দুই পুত্র উবায়দুল্লাহ ও আবদুল মালিককে শার্লেমাইনের কাছে সাহায্যের জন্য আলোচনার উদ্দেশ্যে নিয়ে যান। এসময় সুলায়মান কর্ডোবা আক্রমণ করেন। যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন ও মেরিডার দিকে যাত্রা করেন। সেখানে তিনি বন্দী হন। এরপর তাকে হত্যা করা হয়। আবদুল্লাহকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। কিন্তু তাকে ভেলেনসিয়াতে অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়।[১] আল-হাকাম তার শাসনের অধিকাংশ সময়ই টলেডো, সারাগোসা ও মেরিডার বিদ্রোহ দমনে ব্যয় করেন। বিদ্রোহীরা দুইবার কর্ডোবায় পৌছে যান। আল-হাকামকে অপসারণ করে তার এক ভাই সম্পর্কীয় আত্মীয়কে ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পনা করা হয়। এই পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর ৮০৬ সালের ১৬ নভেম্বর একটি ভোজসভায় ৭২ জন অভিজাতকে হত্যা করা হয়। কাউকে ক্রুশে ঝোলানো হয় ও গোয়াদালকুইভির নদীর তীরে প্রদর্শন করা হয়। এসময় এধরনের নিষ্ঠুরতা স্বাভাবিক হিসেবে ধরা হত। কর্ডোবার ফটকে উত্তরের অভিযানের সময় বিদ্রোহী নেতা বা খ্রিষ্টানদের মাথা পরিদর্শন করানো হয়েছিল।[২] ৮১৮ সালে গোয়াদালকুইভির নদীর দক্ষিণ পাড়ে আল-রিবাদ শহরতলীতে একটি বিদ্রোহ দমন করেন। প্রায় ৩০০ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় ও ক্রুশে ঝোলানো হয়। বাকিদেরকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। তাদের কেউ মিশরের আলেক্সান্দ্রিয়ায়, কেউ ফেজ ও ক্রিট চলে যান। বাকিরা লেভেন্টের জলদস্যুদের সাথে যোগ দেন।[১] আল-হাকাম ৮২২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ২৬ বছর রাজত্ব করেছেন।
আল-হাকাম ছিলেন প্রথম হিশাম ও তার উপপত্নী জোখরুফের পুত্র।[৩] আল-হাকামের সন্তানরা হল:[৪] • দ্বিতীয় আবদুর রহমান, কর্ডোবার উমাইয়া আমির (৮২২-৮৫২)
• আল-মুগিরা
• সাইদ
• উমাইয়া
• আল-ওয়ালিদ বিন আল-হাকাম। ৮৩৮ সালে তিনি গালিসিয়ায় একটি অভিযানের নেতৃত্ব দেন।[৫] আজাব নামে আল-হাকামের একজন উপপত্নী ছিল। কর্ডোবার শহরতলীতে তিনি কুষ্ঠরোগীদের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন।[৬] কুষ্ঠরোগীদের এই কলোনীর খরচ তার নামে নির্মিত একটি এস্টেট থেকে চালানো হত।[৭] তার এক পুত্র ছিল:[৬] • আবদুল মালিক মারওয়ান
আরেকজন উপপত্নীর নাম ছিল মুতা। তিনি একটি কবরস্থান স্থাপন করেন। দশম শতকেও এটির অস্তিত্ব ছিল।[৬]

আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ (আরবিعبد الله بن محمد ; ১১ জানুয়ারি ৮৪৪ – ১৫ অক্টোবর ৯১২)[১] ছিলেন কর্ডো‌বা আমিরাতের সপ্তম আমির। ৮৮৮ থেকে ৯১২ সাল পর্যন্ত তিনি শাসন করেন।
সমকালীন ইতিহাসবিদরা আবদুল্লাহকে তার ভাই আল মুনজিরের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন। তবে আবদুল্লাহ ক্ষমতার জন্য খুব কম আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ক্ষমতা পাওয়ার পর তিনি যাদেরকে হুমকি হিসেবে দেখতেন তাদের সরিয়ে দেননি। তার নিজের ভাইকে তার আদেশে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল। তিনি তার এক পুত্র আল মুতাররিফকে আদেশ দিয়েছিলেন তার ভাইকে হত্যার জন্য। পরবর্তীতে কয়েক বছর পর মুতাররিফকে বিশ্বাসঘাতকার অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] তার শাসনামলে আরব, বার্বা‌র ও মুলাদিদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তার ক্ষমতা কর্ডো‌বায় সীমাবদ্ধ ছিল। বাকি অঞ্চলগুলো বিদ্রোহী পরিবারের অধীনে ছিল। তারা তার কর্তৃত্ব মেনে নেয়নি।
৯০১ সালে তিনি ইবনে হাফসুনের সাথে শান্তিচুক্তি করেন। তবে কয়েকবছর পর মৃত্যুর আবার যুদ্ধ শুরু হয়। আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর তা থেমে যায়। তার এক ভাই তার উত্তরাধিকারী ঘোষিত পুত্রকে হত্যা করেন। পরে হত্যাকারীকে হত্যা করা হয় এবং আবদুল্লাহর মৃত পুত্রের পুত্র তৃতীয় আবদুর রহমান নামে তার উত্তরাধিকারী করেন।
আবদুল্লাহ ছিলেন প্রথম মুহাম্মদের ছেলে ও আল মুনজিরের ছোট ভাই।
আবদুল্লাহ ৮৬৩ সালের দিকে পাম্পলোনার রাজার মেয়ে অনেসা ফরটুনেজকে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।[২] আবদুল্লাহর কয়েকজন পুত্র ছিল,
• মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ (৮৬৪-৩ ডিসেম্বর ৮৯৫)। বিবরণ অনুযায়ী তিনি অনেসার পুত্র। তার ভাই আল মুতাররিফ তাকে হত্যা করেন। তিনি মুজনা নামক একজন বাস্ক বা ফ্রাঙ্ক নারীকে বিয়ে করেন। তৃতীয় আবদুর রহমান তাদের সন্তান।[৩] • আল মুতাররিফ, ৮৯১ সালে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হন।
• আবান
• আল আসি

দ্বিতীয় আবদুর রহমান (আরবি: عبد الرحمن الثاني‎) (৭৮৮-৮৫২) ছিলেন আল-আন্দালুসে উমাইয়া খিলাফতের অধীনস্ত কর্ডোবার আমির। তিনি ৮২২ থেকে শুরু করে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেন।[১] দ্বিতীয় আবদুর রহমান টলেডোয় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আমির প্রথম আল-হাকামের পুত্র ছিলেন। যৌবনে তিনি কথিত “পরিখার গণহত্যায়” অংশ নেন। এখানে ৭০০ থেকে ৫০০০ ব্যক্তি যুবরাজের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে আসলে আল-হাকামের নির্দেশে তাদেরকে হত্যা করা হয়।
৮২২ সালে তিনি তার পিতার উত্তরসূরি হিসেবে কর্ডোবার আমির হন এবং দ্বিতীয় অলফেনসোর সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তিনি অলফেনসোর দক্ষিণমুখী অগ্রযাত্রা রুখে দেন। ৮৩৭ সালে তিনি টলেডোয় খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের একটি বিদ্রোহ দমন করেন। ধর্মীয় উদ্দেশ্যে আত্মাহুতি নিষিদ্ধ মর্মে তিনি একটি খ্রিষ্টানদের জন্য একটি ডিক্রি জারি করেন। একে নিরুৎসাহিত করার জন্য তার একটি খ্রিষ্টান সাইনড ছিল।
৮৪৪ সালে আবদুর রহমান ভাইকিংদের একটি আক্রমণ রুখে দেন। তারা কাদিজে অবতরণ করে ও সেভিল জয় করে। তবে তারা এর দুর্গ জয় করতে ব্যর্থ হয়। তারা কর্ডোবা আক্রমণ করে। আবদুর রহমান ভবিষ্যত প্রতিরোধের জন্য একটি নৌবাহিনী গঠন করেন ও নৌ অস্ত্রাগার গড়ে তোলেন।
চার্লস দ্য বাল্ডের বিরুদ্ধে উইলিয়ামের সাহায্যের আবেদনে দ্বিতীয় আবদুর রহমান সাড়া দেন।
কর্ডোবায় তার ভবন নির্মাণ কার্যক্রমের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। এখানেই তিনি ৮৫২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। কর্ডোবা মসজিদ-ক্যাথেড্রালের অংশবিশেষ তিনি নির্মাণ করেন।[১] একজন তেজস্বী যোদ্ধার পাশাপাশি তিনি শিল্পের সমাদরকারীও ছিলেন।[২] কর্ডোবার আত্মাহুতি বলে পরিচিত ঘটনায় তিনি যুক্ত ছিলেন।

প্রথম মুহাম্মদ (আরবি: محمد بن عبد الرحمن الأوسط‎) (৮২৩–৮৮৬) ছিলেন কর্ডো‌বা আমির। ৮৫২ থেকে ৮৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
মুহাম্মদ কর্ডো‌বায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শাসনামলে মুলাদি (ইবেরিয়ান জাতিগোষ্ঠির মুসলিম) ও মুজারাবদের (মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের খ্রিষ্টান বাসিন্দা) কর্তৃক কিছু বিদ্রোহ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন সংঘটিত হয়।
বনু কাসি মুলাদি পরিবারের মুসা ইবনে মুসা নাভার রাজ্যের আরিস্টা পরিবারের সাথে মিত্রতা করে বিদ্রোহ করেন ও নিজেকে স্পেনের তৃতীয় রাজা দাবি করে (মুহাম্মদ ও প্রথম অরডন্ডোর পর)। বিদ্রোহ উমাইয়া কর্মকর্তা ইবনে মারওয়ান মেরিডা ফিরে আসেন এবং আমিরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। আমির তাকে দমনে অসমর্থ হন এবং ৮৭৫ সালে স্বাধীন শহর গড়ে তুলতে অনুমতি দেন। পরবর্তীতে প্রথম অরডন্ডোর সমর্থনে টলেডো বিদ্রোহ করে কিন্তু গুয়াজালেটের যুদ্ধে পরাজিত হয়।
৮৮০ সালে ভিসিগথ বংশোদ্ভূত বলে ধারণা করা উমর ইবনে হাফসুন বিদ্রোহ করেন। ৯২৮ সালে তৃতীয় আবদুর রহমানের সময় তা চুড়ান্তভাবে দমন করা হয়।
প্রথম মুহাম্মদ ৮৮৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার পুত্র আল মুনজির তার উত্তরাধিকারী হন।

আল মুনজির (আরবি: المنذر ‎) (আনুমানিক ৮৪২ – ৮৮৮) ছিলেন ৮৮৬ থেকে ৮৮৮ সাল পর্যন্ত কর্ডো‌বার আমির। তিনি মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমানের পুত্র।
আল মুনজির কর্ডো‌বায় জন্মগ্রহণ করে। পিতার শাসনামলে তিনি পার্শ্ববর্তী খ্রিষ্টান রাজ্য ও মুলাদি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানে নেতৃত্ব দেন।
৮৬৫ সালে রাজা অরডন্ডোর বিরুদ্ধে আংশিক ব্যর্থ অভিযানে নেতৃত্ব দেন। কর্ডো‌বায় ফেরার সময় তিনি কাস্টিলের কাউন্ট বুরগোস রড্রিগোকে পরাজিত করেন। তিনি লিওন জয়ের চেষ্টা চালান কিন্তু রাজা তৃতীয় অলফেনসোর কাছে পরাজিত হন।
তিনি বনু কাসি মুলাদি পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। তারা তৃতীয় অলফেনসোর সাথে মিত্রতা স্থাপন করেছিল। তবে তিনি ব্যর্থ হন। পরের বছর বিদ্রোহ আমির ইবনে মারওয়ানকে তিনি বাডাজোজ থেকে হটিয়ে দিতে সক্ষম হন।
৮৮৬ সালে তার পিতা প্রথম মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তিনি করডবার ক্ষমতা লাভ করেন। দুই বছরের শাসনকালে তিনি বিদ্রোহী উমর ইবনে হাফসুনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। আল মনজির ৮৮৮ সালে ববাস্ট্রোতে মৃত্যুবরণ করেন। ধারণা করা হয় যা তার ভাই আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল উমাউয়ি তাকে হত্যা করেন। তার মৃত্যুর পর আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ তার উত্তরাধিকারী হন।

তৃতীয় আবদুর রহমান (পুরো নাম, আবদুর রহমান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আল হাকাম আর রাবদি ইবনে হিশাম ইবনে আবদুর রহমান আদ দাখিল;[৬] আরবি: عبد الرحمن الثالث‎; ১১ জানুয়ারি ৮৮৯/৯১[৯] – ১৫ অক্টোবর ৯৬১) ছিলেন কর্ডো‌বার উমাইয়া বংশীয় আমির ও খলিফা (৯১২-৯৬১)। তার বয়স ২০ এর দশকে থাকার সময় তিনি ক্ষমতা লাভ করেন এবং প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবত ইবেরিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক হিসেবে শাসন করেন। তার শাসনামলে সব বিশ্বাসের মানুষ স্বাধীনতা ভোগ করে। তবে তিনি ফাতেমীয়দের বিরুদ্ধে হচিলেন। উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমীয়দের শত্রুদের তিনি সমর্থন দেন। তিনি নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেছিলেন।

আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ (আরবিعبد الله بن محمد ; ১১ জানুয়ারি ৮৪৪ – ১৫ অক্টোবর ৯১২)[১] ছিলেন কর্ডো‌বা আমিরাতের সপ্তম আমির। ৮৮৮ থেকে ৯১২ সাল পর্যন্ত তিনি শাসন করেন।
সমকালীন ইতিহাসবিদরা আবদুল্লাহকে তার ভাই আল মুনজিরের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন। তবে আবদুল্লাহ ক্ষমতার জন্য খুব কম আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ক্ষমতা পাওয়ার পর তিনি যাদেরকে হুমকি হিসেবে দেখতেন তাদের সরিয়ে দেননি। তার নিজের ভাইকে তার আদেশে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল। তিনি তার এক পুত্র আল মুতাররিফকে আদেশ দিয়েছিলেন তার ভাইকে হত্যার জন্য। পরবর্তীতে কয়েক বছর পর মুতাররিফকে বিশ্বাসঘাতকার অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] তার শাসনামলে আরব, বার্বা‌র ও মুলাদিদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তার ক্ষমতা কর্ডো‌বায় সীমাবদ্ধ ছিল। বাকি অঞ্চলগুলো বিদ্রোহী পরিবারের অধীনে ছিল। তারা তার কর্তৃত্ব মেনে নেয়নি।
৯০১ সালে তিনি ইবনে হাফসুনের সাথে শান্তিচুক্তি করেন। তবে কয়েকবছর পর মৃত্যুর আবার যুদ্ধ শুরু হয়। আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর তা থেমে যায়। তার এক ভাই তার উত্তরাধিকারী ঘোষিত পুত্রকে হত্যা করেন। পরে হত্যাকারীকে হত্যা করা হয় এবং আবদুল্লাহর মৃত পুত্রের পুত্র তৃতীয় আবদুর রহমান নামে তার উত্তরাধিকারী করেন।
আবদুল্লাহ ছিলেন প্রথম মুহাম্মদের ছেলে ও আল মুনজিরের ছোট ভাই।
আবদুল্লাহ ৮৬৩ সালের দিকে পাম্পলোনার রাজার মেয়ে অনেসা ফরটুনেজকে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।[২] আবদুল্লাহর কয়েকজন পুত্র ছিল,
• মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ (৮৬৪-৩ ডিসেম্বর ৮৯৫)। বিবরণ অনুযায়ী তিনি অনেসার পুত্র। তার ভাই আল মুতাররিফ তাকে হত্যা করেন। তিনি মুজনা নামক একজন বাস্ক বা ফ্রাঙ্ক নারীকে বিয়ে করেন। তৃতীয় আবদুর রহমান তাদের সন্তান।[৩] • আল মুতাররিফ, ৮৯১ সালে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হন।
• আবান
• আল আসি

তৃতীয় আবদুর রহমান (পুরো নাম, আবদুর রহমান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আল হাকাম আর রাবদি ইবনে হিশাম ইবনে আবদুর রহমান আদ দাখিল;[৬] আরবি: عبد الرحمن الثالث‎; ১১ জানুয়ারি ৮৮৯/৯১[৯] – ১৫ অক্টোবর ৯৬১) ছিলেন কর্ডো‌বার উমাইয়া বংশীয় আমির ও খলিফা (৯১২-৯৬১)। তার বয়স ২০ এর দশকে থাকার সময় তিনি ক্ষমতা লাভ করেন এবং প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবত ইবেরিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক হিসেবে শাসন করেন। তার শাসনামলে সব বিশ্বাসের মানুষ স্বাধীনতা ভোগ করে। তবে তিনি ফাতেমীয়দের বিরুদ্ধে হচিলেন। উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমীয়দের শত্রুদের তিনি সমর্থন দেন। তিনি নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেছিলেন।

দ্বিতীয় আল-হাকাম (দ্বিতীয় আল-হাকাম ইবন তৃতীয় ʿআব্দ আল-রহমান; আরবি: الحكم الثاني ابن عبد الرحمن‎) (১৩ জানুয়ারি ৯১৫ – ১৬ অক্টোবর ৯৭৬) ছিলেন আল আন্দালুস (ইবরিয়ান উপদ্বীপের মুর অঞ্চলের, যা বর্তমানে আধুনিক স্পেন-এর অন্তর্ভূক্ত)-এর কর্ডোবা খিলাফতের ২য় খলিফা, তৃতীয় আবদুর রহমান (আল-নাসির) এবং মুরজান-এর পুত্র। তিনি ৯৬১ থেকে ৯৭৬ খ্রি: পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

দ্বিতীয় হিশাম (আরবি: ھشام‎) ছিলেন কর্ডো‌বার তৃতীয় খলিফা। তিনি ৯৭৬ থেকে ১০০৯ সাল ও ১০১০ থেকে ১০১৩ সাল পর্যন্ত আল আন্দালুস (মুরিশ ইবেরিয়ান উপদ্বীপ, বর্তমান স্পেনের অংশ) শাসন করেন।

দ্বিতীয় মুহাম্মদ আল মাহদি (আরবি: محمد الثاني ، المهدي‎) ছিলেন কর্ডো‌বা খিলাফতের চতুর্থ খলিফা। ৭,০০০ সেনাকে সেনাবাহিনী থেকে বের করে দেয়ার পর তিনি তার অনেক প্রজার বিরোধীতার কারণ হন। তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী সুলাইমানের উত্থানের কারণে তিনি তার খলিফা উপাধি ধরে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। গোলযোগপূর্ণ শাসনের পর তিনি ক্ষমতা হারান।[১] সুলাইমান ইবনুল হাকাম (মৃত্যু ১০১৬) ছিলেন কর্ডো‌বা খিলাফতের পঞ্চম খলিফা। তিনি ১০০৯ থেকে ১০১০ সাল ও ১০১৩ থেকে ১০১৬ সাল পর্যন্ত আল আন্দালুসের শাসক ছিলেন।
চতুর্থ আবদুর রহমান (عبدالرحمن) ছিলেন কর্ডো‌বার খলিফা। তিনি ১০১৮ সালে সুলাইমান ইবনুল হাকামের উত্তরসুরি হন। একই বছর একটি যুদ্ধ থেকে পিছু হটার সময় কাদিজে তিনি নিহত হন।
চতুর্থ আবদুর রহমান
বনু উমাইয়া
বনু কুরাইশ এর ক্যাডেট শাখা
মৃত্যু: ১০১৮
পূর্বসূরী
সুলাইমান ইবনুল হাকাম
উমাইয়া নেতা
উত্তরসূরী
পঞ্চম আবদুর রহমান

কর্ডো‌বার খলিফা
১০১৮
উত্তরসূরী
আলি ইবনে হামুদ

পঞ্চম আবদুর রহমান (আরবি: عبد الرحمن الخامس‎) ছিলেন কর্ডোবা খলিফা তিনি ১০২৩ থেকে ১০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন।
পঞ্চম আবদুর রহমান
বনু উমাইয়া
বনু কুরাইশ এর ক্যাডেট শাখা
মৃত্যু: ১০২৪
পূর্বসূরী
চতুর্থ আবদুর রহমান
উমাইয়া নেতা
১০১৭–১০২৪
উত্তরসূরী
তৃতীয় মুহাম্মদ

পূর্বসূরী
আল কাসিম আল মামুন
কর্ডো‌বার খলিফা
১০২৩–১০২৪

মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন উবাইদাল্লাহ (আরবি: محمد بن عبد الرحمن بن عبيد الله‎) বা তৃতীয় মুহাম্মদ (Arabic: محمد الثالث) ছিলেন কর্ডোবার খলিফা। পঞ্চম আবদুর রহমানের মৃত্যুর অর তিনি ১০২৪ থেকে ১০২৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। এসময় কর্ডোবায় তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত হয় এবং তিনি শহর ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ধারণা করা হয় যে ৫০ বছর বয়সে তাকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি বিখ্যাত কবি ওয়ালাদা বিনতে আল মুসতাকফির পিতা।

তৃতীয় মুহাম্মদ (কর্ডোবা)
বনু উমাইয়া
বনু কুরাইশ এর ক্যাডেট শাখা

পূর্বসূরী
পঞ্চম আবদুর রহমান
কর্ডো‌বার খলিফা
১০২৪–১০২৫
উত্তরসূরী
ইয়াহিয়া ইবনে আলি ইবনে হামুদ আল মুতালি

তৃতীয় হিশাম (আরবি: هشام الثالث in full المعتد بالله” هشام بن محمد‎) ছিলেন আল আন্দালুসের শেষ উমাইয়া শাসক (১০২৬-১০৩১)। তিনি কর্ডোবার খলিফা উপাধিধারী শেষ ব্যক্তি।
তৃতীয় হিশাম ছিলেন চতুর্থ আবদুর রহমানের ভাই। সীমান্ত অঞ্চলের গভর্নর ও কর্ডোবার জনগণের মধ্যে আলোচনার পর খলিফা মনোনীত হন। ১০২৯ সালের আগ পর্যন্ত তিনি কর্ডোবায় প্রবেশ করতে পারেননি। এসময় হামুনি বার্বার সেনারা শহর অধিকার করে রেখেছিল।
তৃতীয় হিশাম (কর্ডোবা)
বনু উমাইয়া
বনু কুরাইশ এর ক্যাডেট শাখা
মৃত্যু: ১০৩৬
পূর্বসূরী
ইয়াহিয়া ইবনে আলি ইবনে হামুদ আল মুতালি
কর্ডোবার খলিফা
১০২৬–১০৩১
উপাধি বিলুপ্ত

আন্দালুস (আরবি: الأندلس‎, trans. al-ʼAndalus; স্পেনীয়: Al-Ándalus; পর্তুগিজ: Al-Andalus; টেমপ্লেট:Lang-an; কাতালান: Al-Àndalus; Berber: Andalus or Wandalus) মুসলিম স্পেন বা ইসলামি ইবেরিয়া দ্বারা মধ্যযুগে মুসলিম শাসিত ইবেরিয়ান উপদ্বীপ বোঝানো হয়। বর্তমানে এটি স্পেন ও পর্তুগালের অংশ। সংক্ষিপ্তকালের জন্য ফ্রান্সের দক্ষিণের সেপ্টিমেনিয়া অঞ্চল এর অংশ ছিল। পুরো ইবেরিয়ান উপদ্বীপকে বোঝানো হলেও রিকনকোয়েস্টা অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে এর সীমানা পরিবর্তন হয়েছে। ৭১১ থেকে ১৪৯২ সাল পর্যন্ত এর আয়ুষ্কাল ধরা হয়।[১][২][৩] উমাইয়াদের হিস্পানিয়া বিজয়ের পর আন্দালুসকে পাঁচটি প্রশাসনিক ইউনিটে ভাগ করা হয়। এগুলো মোটামুটি আধুনিক আন্দালুসিয়া, গেলিসিয়া ও পর্তুগাল, কাস্টিল ও লিওন, আরাগন, বার্সেলোনা কাউন্টি ও সেপ্টিমেনিয়া নিয়ে গঠিত ছিল।[৪] রাজনৈতিক পরিচিতির দিক থেকে এটি যথাক্রমে উমাইয়া খিলাফতের প্রদেশ (৭১১-৭৫০), কর্ডোবা আমিরাত (৭৫০-৯২৯), কর্ডোবা খিলাফত (৯২৯-১০৩১) ও কর্ডো‌বা খিলাফতের তাইফা রাজ্য হিসেবে ছিল। এসকল শাসনের সময় মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় লক্ষ্য করা যায়। খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা জিজিয়া দেয়ার বিনিময়ে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত।[৫] করডোবা খিলাফতের সময় আন্দালুস জ্ঞানের আলোকে পরিণত হয় এবং কর্ডো‌বা ইউরোপসহ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। জাবির ইবনে আফলা, আবু ইশাক ইবরাহিম আল জারকালি, আবুল কাসিম আল জাহরাউয়ি, ও ইবনে জুহরদের ত্রিকোণমিতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শল্যচিকিৎসা, ওষুধ ও অন্যান্য নানা বিষয় সংক্রান্ত গবেষণার ফলে ইসলামি ও পশ্চিমা সমাজ অগ্রগতি অর্জন করে। আন্দালুস ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্রের অন্যতম পরিগণিত হত এবং তা মুসলিম ও খ্রিষ্টান বিশ্বের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক আদানপ্রদানের স্থল হয়ে উঠে।
ইতিহাসের অধিকাংশ সময়জুড়ে আন্দালুসের সাথে উত্তরের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলোর বিরোধ চলেছিল। উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর আন্দালুস কয়েকটি রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে যার মধ্যে গ্রানাডা আমিরাত উল্লেখযোগ্য। খ্রিষ্টান কাস্টিলিয়ানদের হামলা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আলমোরাভি সাম্রাজ্য হস্তক্ষেপ করে খ্রিষ্টান হামলা প্রতিহত করে, দুর্বল আন্দালুসিয়ান মুসলিম রাজাদের সরিয়ে আন্দালুসকে সরাসরি বার্বার শাসনের আওতায় আনা হয়। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে আন্দালুস মারাকেশ ভিত্তিক বার্বার মুসলিম সাম্রাজ্য আলমোরাভি ও আলমোহাদের প্রদেশে পরিণত হয়।
শেষপর্যন্ত উত্তরের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলো তাদের মুসলিম প্রতিবেশি রাজ্যগুলোকে উৎখাত করতে সক্ষম হয়। ১০৮৫ সালে ষষ্ঠ অলফেনসো টলেডো দখল করেন। এরপর মুসলিমদের ধীরে ধীরে পতনের সূচনা হয়। ১২৩৬ সালে করডোবার পতনের পর গ্রানাডা আমিরাত বর্তমান স্পেনের একমাত্র মুসলিম অঞ্চল হিসেবে টিকে ছিল। ১২৪৯ পর্তুগিজ রিকনকোয়েস্টা শুরু হয় এবং পর্তুগালের তৃতীয় অলফেনসো আলগারভ জয় করেন। ১২৩৮ সালে গ্রানাডা আমিরাত কাস্টিল রাজ্যের করদ রাজ্যে পরিণত হয়। অবশেষে ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি আমির দ্বাদশ মুহাম্মদ কাস্টিলের রাণী প্রথম ইসাবেলার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ইসাবেলা ও তার স্বামী দ্বিতীয় ফার্ডিনেন্ড একত্রে “ক্যাথলিক সম্রাট” বলা হত। আত্মসমর্পণের পর আন্দালুসের রাজনৈতিক পরিচিতির অবসান ঘটে। এ অঞ্চলে ইসলামি সংস্কৃতির চিহ্ন এখনও বিদ্যমান রয়েছে।
আব্বাসীয় খিলাফত
আব্বাসীয় খিলাফত খিলাফতগুলোর মধ্যে তৃতীয় খিলাফত। এটি আব্বাসীয় বংশ কর্তৃক শাসিত হয়। বাগদাদ এই খিলাফতের রাজধানী ছিল। উমাইয়া খিলাফতকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে আন্দালুসে উমাইয়া খিলাফত উৎখাত করা যায়নি।
আব্বাসীয় খিলাফত নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদের কর্তৃক ৭৫০ সালে কুফায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ৭৬২ সালে বাগদাদে রাজধানী স্থানান্তরিত করা হয়। পারস্যে ১৫০ বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ করার পর খলিফাকে প্রধান কর্তৃপক্ষ মেনে নিয়ে স্থানীয় আমিরদের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে চাপ দেয়া হয়। খিলাফতকে তার পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ আন্দালুস, মাগরেব ও ইফ্রিকিয়া যথাক্রমে একজন উমাইয়া যুবরাজ, আগলাবি ও ফাতেমীয় খিলাফতের কাছে হারাতে হয়।
মোঙ্গল নেতা হুলাগু খানের বাগদাদ দখলের পর ১২৫৮ সালে আব্বাসীয় খিলাফত বিলুপ্ত হয়। মামলুক শাসিত মিশরে অবস্থান করে তারা ১৫১৯ সাল পর্যন্ত ধর্মীয় ব্যাপারে কর্তৃত্ব দাবি করতে থাকেন। এরপর উসমানীয় সাম্রাজ্যের কাছে ক্ষমতা চলে যায় ও কনস্টান্টিনোপলে রাজধানী স্থাপিত হয়।[স্পষ্টকরণ প্রয়োজন] আব্বাসীয় খলিফারা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর ছিলেন। তিনি ছিলেন মুহাম্মদ (সা) এর সর্বকনিষ্ঠ চাচাদের অন্যতম। মুহাম্মদ (সা) এর সাথে নিকটাত্মীয়তার কারণে তারা উমাইয়াদের হটিয়ে নিজেদের রাসুলের প্রকৃত উত্তরসুরি হিসেবে দাবি করে।
উমাইয়াদেরকে নৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে আক্রমণ করে আব্বাসীয়রা নিজেদেরকে তাদের চেয়ে আলাদা হিসেবে তুলে ধরে। ইরা লেপিডাসের মতে, “আব্বাসীয় বিদ্রোহ ব্যাপকভাবে আরবদের দ্বারা সমর্থিত ছিল, যারা ছিল মূলত মারুর বসতি স্থাপনকারী, সেসাথে ইয়েমেনি গ্রুপ ও তাদের মাওয়ালি।”[৩] মাওয়ালি তথা অনারব মুসলিমরা কাছে আব্বাসীয়দের পক্ষে ছিল। আব্বাসের প্রপৌত্র মুহাম্মদ ইবনে আলি আব্বাসি মুহাম্মদ (সা) এর পরিবারের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য দ্বিতীয় উমরের সময় পারস্যে প্রচারণা শুরু করেন।
দ্বিতীয় মারওয়ানের সময় আব্বাসের চতুর্থ বংশধর ইবরাহিম বিরোধিতা শুরু করেন। খোরাসান প্রদেশ ও শিয়া আরবদের[৪] কাছ থেকে সমর্থন লাভের মাধ্যমে তিনি বেশ সাফল্য অর্জন করলেও ৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ধরা পড়েন এবং কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। কারো মতে তাকে হত্যা করা হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] এরপর তার ভাই আবদুল্লাহ প্রতিবাদ এগিয়ে নেন। তিনি আবুল আব্বাস আস সাফাহ নামে পরিচিত হন। ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি উমাইয়াদের জাবের যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন।
বিজয়ের পর তিনি মধ্য এশিয়ায় সেনা পাঠান। তার সেনারা তালাসের যুদ্ধে ট্যাং রাজবংশের সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে লড়াই করে।[৫] বাগদাদকে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখা বারমাকিরা বাগদাদে পৃথিবীর প্রথম কাগজ কলের প্রচলন ঘটায়। এভাবে আব্বাসীয় শাসনামলে নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণ ঘটে। দশ বছরের মধ্য আব্বাসীয়রা স্পেনে উমাইয়া রাজধানী কর্ডোবাতে আরেকটি নামকরা কাগজ কল নির্মাণ করে।
আব্বাসীয়দের প্রথম পরিবর্তন ছিল সাম্রাজ্যের রাজধানী দামেস্ক থেকে বাগদাদে সরিয়ে আনা। এর উদ্দেশ্য ছিল যাতে পারসিয়ান মাওয়ালিদের অধিক কাছে টানা যায়। ৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে টাইগ্রিস নদীর তীরে বাগদাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় দায়িত্বপালনের জন্য উজির নামক নতুন পদ সৃষ্টি করা হয় এবং স্থানীয় আমিরদের উপর বড় দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। উজিররা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করাতে আব্বাসীয় খলিফারা অধিক মাত্রায় আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রাচীন আরব অভিজাততন্ত্র পারস্যের আমলাতন্ত্রের কারণে প্রতিস্থাপিত হয়ে পড়ে।[৬] উমাইয়াদের ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য আব্বাসীয়রা পারসিয়ানদের সাহায্যের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে।[৪] আবুল আব্বাসের উত্তরসুরি আল মনসুর অনারব মুসলিমদেরকে তার দরবারে স্বাগতম জানান। এর ফলে আরব ও পারস্যের সংস্কৃতি মিলিত হওয়ার সুযোগ পায়। তবে অনেক আরব সমর্থক বিশেষ করে খোরাসানের আরব যারা উমাইয়াদের বিরুদ্ধে তাদের সহায়তা করেছিল, তারা বিরূপ হয়।
সমর্থকদের মধ্যের এই ফাটল সমস্যার জন্ম দেয়। উমাইয়া ক্ষমতার বাইরে থাকলেও ধ্বংস হয়ে যায়নি। উমাইয়া রাজপরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য স্পেন চলে যান এবং সেখানে নিজেকে একজন স্বাধীন আমির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন (প্রথম আবদুর রহমান, ৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দ)। ৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে তৃতীয় আবদুর রহমান নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন এবং আল আন্দালুসে বাগদাদের প্রতিদ্বন্দ্বী খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন।
৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুর আন লুশানের বিরুদ্ধে ট্যাং রাজবংশকে সহায়তার জন্য ৪,০০০ আরব সৈনিক পাঠান। যুদ্ধের পর সৈনিকরা চীনে থেকে যায়।[৭][৮][৯][১০][১১] আরব খলিফা হারুনুর রশিদ চীনের সাথে মিত্রতা স্থাপন করেন।[১২] ট্যাং বিবরণীতে আব্বাসীয়দের সাথে চীনের দরবারের সম্পর্ক লিপিবদ্ধ পাওয়া যায়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আব্বাস, বাগদাদের প্রতিষ্ঠাতা আল মনসুর, ও আরব্য রজনীতে অধিক উল্লেখিত হারুনুর রশিদ। ট্যাং রাজবংশের বিবরণীতে আব্বাসীয়দের ēiyī Dàshí, বা ” The Black-robed Arabs.” বলে উল্লেখ করা হয়।[১৩][১৪][১৫][১৬] হারুনুর রশিদ দূত পাঠানোর মাধ্যমে ট্যাং রাজবংশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন।[১২][১৭][১৮][১৯][২০][২১][২২][২৩] ইসলামি স্বর্ণযুগ
এসময় জ্যোতির্বিজ্ঞান, আলকেমি, গণিত, চিকিৎসা বিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞানসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আরব বিজ্ঞানীরা এগিয়ে ছিলেন।[২৪] বাগদাদে মোঙ্গল আক্রমণের আগ পর্যন্ত অতিক্রান্ত সময়কে ইসলামি স্বর্ণযুগ বলে গণ্য করা হয়।[২৫] আব্বাসীয়দের ক্ষমতায় আগমন ও রাজধানী দামেস্ক থেকে বাগদাদে স্থানন্তরের পর থেকে স্বর্ণযুগ শুরু হয়।[২৬] আব্বাসীয়রা কুরআন ও হাদিসের জ্ঞানের প্রতি উৎসাহমূলক বাণীতে অনুপ্রাণিত হয়। বাগদাদে বাইতুল হিকমা প্রতিষ্ঠা ও আব্বাসীয়দের জ্ঞানের প্রতি আগ্রহের কারণে এসময় মুসলিম বিশ্ব বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা, শিক্ষার বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হয়ে উঠে। মুসলিম ও অমুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের পন্ডিত ব্যক্তিরা বিশ্বের জ্ঞানকে আরবিতে অনুবাদ করার কাজে নিয়োজিত হন।[২৬] হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল এমন অনেক ধ্রুপদি কাজ আরবি ও ফারসিতে এবং পরবর্তীতে তুর্কি, হিব্রু, ও ল্যাটিনে অনুবাদ করা হয়।[২৬] মুসলিম বিশ্ব বিভিন্ন সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়ার স্থলে পরিণত হয় এবং প্রাচীন রোম, চীন, ভারত, পারস্য, মিশর, উত্তর আফ্রিকা, গ্রীক ও বাইজেন্টাইন সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যায়। [২৬] হারুনুর রশিদ ও তার উত্তরসুরিদের শাসনকালে ব্যাপকভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জন সম্পন্ন হয়। আব্বাসীয় খলিফারা সাসানীয় সাম্রাজ্যের আদলে নিজেদের প্রশাসনকে সাজান।[৩২] হারুনুর রশিদের পুত্র আল মামুন এমনকি একথা বলেন:
পারসিয়ানরা হাজার বছর শাসন করেছে এবং একদিনের জন্যও তাদের আরবদের সাহায্য প্রয়োজন হয়নি। আমরা তাদের এক বা দুই শতাব্দী শাসন করছি এবং এক ঘন্টাও তাদের ছাড়া করতে পারিনি।
[৩৩] মধ্যযুগের বেশ কিছু সংখ্যক চিন্তাবিদ ও বিজ্ঞানী ইসলামি বিজ্ঞানকে খ্রিষ্টান পাশ্চাত্যে পৌছানোয় ভূমিকা রাখেন। এই ব্যক্তিরা এরিস্টোটলকে খ্রিষ্টান ইউরোপে পরিচিত করান।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] অধিকন্তু এ যুগে ইউক্লিড ও টলেমির আলেক্সান্ড্রিয়ান গণিত, জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞান পুনরায় ফিরে আসে। ফিরে পাওয়া গাণিতিক প্রক্রিয়াগুলো পরবর্তীতে মুসলিম পন্ডিত, বিশেষ করে আল বিরুনি ও আবু নাসর মনসুরের মাধ্যমে বর্ধিত ও আরো উন্নত হয়।
খ্রিষ্টানরা (বিশেষ করে নেস্টোরিয়ান খ্রিষ্টান) উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে আরব ইসলামি সভ্যতার বিকাশে অবদান রাখে। তারা গ্রীক দার্শনিকদের রচনা সিরিয়াক ও পরবর্তীতে আরবিতে অনুবাদ করে।[৩৪][৩৫] নেস্টোরিয়ানরা আরব সংস্কৃতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।[৩৬] জুন্দশাপুরের শিক্ষালয় সাসানীয়, উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।[৩৭] প্রায় আট প্রজন্ম ধরে নেস্টোরিয়ান বুখতিশু পরিবার খলিফা ও অষ্টম থেকে একাদশ শতকের সুলতানদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে কাজ করে।[৩৮][৩৯] বিজ্ঞানী আল খোয়ারিজমি তার গ্রন্থ কিতাব আল জাবর ওয়াল মুকাবালাতে বীজগণিত নিয়ে আলোচনা করেন। এই গ্রন্থ থেকে ইংরেজি এলজেব্রা শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে। তাই তাকে বীজগণিতের জনক বলা হয়।[৪০] তবে অনেকে গ্রীক গণিতবিদ ডিওফেনটাসকে এই উপাধি দেয়। এলগোরিজম ও এলগরিদম পদদুটিও তার নাম থেকেই উদ্ভব হয়। তিনি ভারত উপমহাদেশের বাইরে আরবি সংখ্যা পদ্ধতি ও হিন্দু-আরবি সংখ্যা পদ্ধতি সূচনা করেন।
ইবনে আল হাইসাম (পাশ্চাত্যে আলহাজেন নামে পরিচিত) ১০২১ খ্রিষ্টাব্দে তার গ্রন্থ কিতাব আল মানাজিরে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিকাশ ঘটান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল তত্ত্বের সাথে পরীক্ষালব্ধ উপাত্তের সমন্বয়ের জন্য পরীক্ষণের ব্যবস্থা করা, যা মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। ইবনে আল হাইসাম বস্তু দেখার ক্ষেত্রে আলোর চোখের ভেতর প্রবেশের প্রমাণ দেন যা একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে ধরা হয়। ব্রেডলি স্টেফেনস ইবনে আল হাইসামকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিকাশ ঘটানোর জন্য “প্রথম বিজ্ঞানী” হিসেবে উল্লেখ করেন।[৪১][৪২][৪৩] আব্বাসীয় আমলে মুসলিম জগতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়ন ঘটে। ৯ম শতকে বাগদাদে ৮০০ জন চিকিৎসক ছিল এবং এনাটমি ও রোগের উপর ব্যাপক আবিষ্কার সম্পন্ন হয়। হাম ও গুটিবসন্তের মধ্যে পার্থক্য এসময় বর্ণিত হয়। খ্যাতনামা পারসিয়ান বিজ্ঞানী ইবনে সিনা (পাশ্চাত্যে আভিসেনা নামে পরিচিত) বিজ্ঞানীদের অর্জিত বিশাল পরিমাণ জ্ঞানকে লিপিবদ্ধ করেন এবং তার বিশ্বকোষ কানুন ফিততিব ও কিতাবুশ শিফার মাধ্যমে তা বেশ প্রভাববিস্তারকারী ছিল। তিনি ও আরো অনেকের গবেষণাকর্ম রেনেসার সময় ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের সরাসরি প্রভাবিত করে।
মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্বে জ্যোতির্বিজ্ঞান আল বাত্তানির মাধ্যমে বিকাশ লাভ করে। তিনি পৃথিবীর অক্ষের ঘূর্ণনের উপর গবেষণা করেন। আল বাত্তানি, ইবনে রুশদ, নাসিরুদ্দিন তুসি, মুয়ায়েদুদ্দিন উরদি ও ইবনে আল শাতির কর্তৃক ভূকেন্দ্রিক মডেলের সংশোধন পরবর্তীতে কোপারনিকাসের সৌরকেন্দ্রিক মডেলে ব্যবহৃত হয়।[৪৪] গ্রীকরা এস্ট্রোলেব নির্মাণ করলেও মুসলিম জ্যোতির্বিদ ও প্রকৌশলীরা এর বিকাশ ঘটান এবং এরপর তা মধ্যযুগের ইউরোপে পৌছায়।
মুসলিম আলকেমিস্টরা মধ্যযুগের ইউরোপীয় আলকেমিস্টদের প্রভাবিত করেন, বিশেষত জাবির ইবনে হাইয়ানের রচনার মাধ্যমে। পাতনসহ বেশ কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়া মুসলিম বিশ্বে উদ্ভব হয় এবং এরপর ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
ইসলামি বিশ্বে জন্ম নেয়া সবচেয়ে পরিচিত সাহিত্য হল সহস্র এক রজনীর গ্রন্থ যা আরব্য রজনী নামে পরিচিত। মূল ধারণা ইসলাম পূর্ব ইরানি উপাদান থেকে আসে। এর সাথে ভারতীয় উপাদানও যুক্ত হয়। এতে বাকি মধ্যপ্রাচ্যীয় ও উত্তর আফ্রিকান গল্পও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ১০ শতকে এটি রূপ লাভ করে এবং ১৪ শতকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছায়। পান্ডুলিপি ভেদে গল্পের সংখ্যা ও প্রকারে ভিন্নতা রয়েছে।[৪৫] আরব রূপকথাগুলোকে প্রায় অনুবাদে “আরব্য রজনী” বলা হয়।[৪৫] ১৮ শতকে এন্টইন গালান্ড কর্তৃক অনূদিত হওয়ার পর থেকে এই গ্রন্থ পাশ্চাত্যে প্রভাব বিস্তার করেছে।[৪৬] এর অনেক প্রতিরূপ, বিশেষত ফ্রান্সে, লেখা হয়েছে।[৪৭] গল্পগুলোর অনেক চরিত্র পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে সাংস্কৃতিক আইকন হয়ে উঠে, যেমন আলাদিন, সিনবাদ ও আলি বাবা।
মুসলিম কাব্যের অন্যতম প্রণয়াশ্রিত উদাহরণ হল লায়লা ও মজনু। এটি ইরানি, আজারবাইজানি ও অন্যান্য ফারসি, আজারবাইজানি, তুর্কি ও অন্যান্য তুর্কি ভাষার কবিদের হাতে রূপলাভ করে।[৪৮] এর উতপত্তিকাল ৭ম শতকে উমাইয়া আমলকে ধরা হয়। পরবর্তী সময়ের রোমিও জুলিয়েটের মত এটিও একটি ট্র্যাজিক গল্প।[৪৯] আব্বাসীয় আমলে আরবি কাব্য তার শীর্ষ স্থানে পৌছায়, বিশেষত কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়া ও পারস্যীয় রাজবংশগুলোর উত্থানের আগে। নবম শতকে আবু তামাম ও আবু নুয়াসের মত লেখকরা বাগদাদের খলিফার দরবারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিলেন। অন্যদিকে আল মুতানাব্বি আঞ্চলিক দরবার থেকে পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন।
“ইসলামি দর্শন” বলতে ইসলামি সংস্কৃতিতে গড়ে উঠা দর্শনের ধারাকে বোঝায়।[৫০] এটা শুধুমাত্র ধর্মীয় ব্যাপার হয় এবং শুধু মুসলিমরাই এতে অবদান রাখেনি।[৫০] এতে এরিস্টটলের কর্মের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ইজতিহাদের ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দার্শনিকদের মধ্যে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম দার্শনিকরা মৌলিক দার্শনিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। মধ্য যুগে খ্রিষ্টান দর্শনে তাদের চিন্তাগুলো আত্মীকৃত হয়েছে, বিশেষত টমাস আকুইনাস কর্তৃক।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] তিনজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ আল কিন্দি, আল ফারাবি ও ইবনে সিনা এরিস্টটেলিয়ানিজম ও নিওপ্লাটোনিজমকে অন্যান্য মতের সাথে সমন্বিত করেন। এর ফলে আভিসিনিজম প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম খিলাফতের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিকরা ছিলেন আল জাহিজ ও আল হাসান।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে মুসলিম বিশ্ব চীনের কাছ থেকে কাগজ উৎপাদনের কৌশল গ্রহণ করে। কাগজের ব্যবহার চীন থেকে অষ্টম শতকে মুসলিম বিশ্বে ও দশম শতকে স্পেন ও বাকি ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এটি নির্মাণ করা পার্চমেন্ট থেকে সহজ ছিল এবং প্যাপিরাসের মত ভেঙে যেত না। লিখিত বিবরণ ও কুরআনের কপি করার জন্য এর উপযোগীতা ছিল। লিনেন থেকে কাগজ প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া মুসলিম বিশ্ব থেকে বাকি পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।[৫১] বারুদ তৈরীর প্রক্রিয়াও চীন থেকে মুসলিম বিশ্বের মাধ্যমে বিস্তৃত হয়।[৫২][৫৩] বায়ুকলের ব্যবহারের ফলে সেচ ও কৃষিতে এসময় অগ্রগতি সাধিত হয়। আন্দালুসের মাধ্যমে শস্য, বিশেষত এলমন্ড ও সাইট্রাস ইউরোপে আসত। এসময় ইউরোপীয়রা চিনি উৎপাদন ধীরে ধীরে গ্রহণ করে। নীল নদ, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস ছাড়া নৌবহনের অনুকূল বৃহৎ নদী ছিল না বিধায় সমুদ্রপথে পরিবহন খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেক্সটেন্টের (কামাল বলে পরিচিত ছিল) ব্যবহারের মাধ্যমে নৌচালনাবিদ্যা উৎকর্ষতা লাভ করে। এসময়ের মানচিত্রের সাথে তুলনা করলে নাবিকরা উপকূলের কিনারা ধরে যাতায়াতের পরিবর্তে সমুদ্রের মধ্য দিয়ে চলাচলে বেশি সক্ষম ছিলেন। ভূমধ্যসাগরে বৃহৎ তিন মাস্তুলবিশিষ্ঠ বাণিজ্যিক জাহাজ পুনরায় চালু করায় মুসলিম নাবিকদের অবদান রয়েছে। আরবি নৌকা কারিব থেকে ক্যারাভেল নামটি এসেছে বলে ধারণা করা হয়।[৫৪]১৬ শতাব্দীতে পর্তুগিজদের আগমনের আগ পর্যন্ত ভারত মহাসাগরে আরব বণিকরা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। এই বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল হরমুজ। ভূমধ্যসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জটিল নেটওয়ার্ক ছিল। এর মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলো একে অন্যের সাথে ও ইউরোপীয় শক্তিসমূহ যেমন ভেনিস, জেনোয়া ও কাটালোনিয়ার সাথে বাণিজ্যে অংশ নিত। সিল্ক রোড মধ্য এশিয়া পার হয়ে চীন ও ইউরোপের মধ্যবর্তী মুসলিম দেশগুলোর মধ্য দিয়ে যেত।
মুসলিম প্রকৌশলীরা শিল্পক্ষেত্রে জলশক্তিকে ব্যবহার করেন। প্রথমদিকে স্রোতশক্তি, বায়ুশক্তি ও পেট্রোলিয়াম (বিশেষত কেরোসিনে পাতনের মাধ্যমে) ব্যবহার করা হত। মুসলিম বিশ্বে পানিকল ব্যবহার সপ্তম শতকে শুরু হয়। আনুভূমিক চাকা ও উলম্ব চাকার পানিকল নবম শতকে বেশ মাত্রায় ব্যবহৃত হত। ক্রুসেডের সময় আন্দালুস ও উত্তর আফ্রিকা থেকে মধ্য প্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি প্রদেশে এসব কলের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। এসব কল বেশ মাত্রায় কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হত।[৫৫] মুসলিম প্রকৌশলীরা পাম্পের মত যন্ত্রও উদ্ভাবন করেন। এসবে ক্র্যাঙ্কশ্যাফট ব্যবহার করা হয়।[৫৬] কল ও পানি উত্তোলনকারী যন্ত্রগুলোতে গিয়ারের ব্যবহার হয়। পানিকলে অতিরিক্ত শক্তি সরবরাহ করার জন্য বাধ নির্মাণ করা হয়। এসব অগ্রগতির ফলে পূর্বে দৈহিক শ্রমে করা কাজগুলো সহজে করা সম্ভব হয়। শিল্পক্ষেত্রে জলশক্তির ব্যবহার মুসলিম বিশ্ব থেকে খ্রিষ্টান স্পেনে এসেছে এ নিয়ে আলোচনা হয় থাকে।[৫৭] আরব কৃষি বিপ্লবের সময় বেশ কিছু শিল্প বিকাশ লাভ করে। এর মধ্যে রয়েছে বয়নশিল্প, দড়ি প্রস্তুত, গালিচা, রেশম ও কাগজ। রসায়ন ও যন্ত্র নির্মাণের জ্ঞানের মাধ্যমে ১২শ শতকে ল্যাটিন অনুবাদ বিস্তার লাভ করে।[৫৮] এযুগে কৃষি ও হস্তশিল্প উচ্চ মাত্রায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।[৫৯] আব্বাসীয়রা উমাইয়া আমলে অনারবদের প্রতি সামাজিক অসাম্যের ফলে সৃষ্ট অসন্তোষের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও সাম্রাজ্য দ্রুত আরব পরিচয় ধারণ করে। জ্ঞান আরবি ভাষায় সাম্রাজ্য জুড়ে আদানপ্রদান করা হত। বিভিন্ন জাতির লোকেরা তাদের দৈনন্দিক জীবনে আরবি বলা শুরু করে। অন্য ভাষা থেকে রচনা আরবিতে অনুবাদ করা হয়। এক নতুন ইসলামি পরিচয় জন্মলাভ করে যাতে পূর্ব সময়ের আরব সংস্কৃতির সাথে মিথস্ক্রিয়া করে। এ সংস্কৃতি ইউরোপে বিস্ময়কর ছিল।[৬০] • শিয়াদের সাথে বিভেদ
আব্বাসীয়রা শিয়াদের সাথে পাল্টা অবস্থানে ছিল। উমাইয়াদের সাথে লড়াইয়ে শিয়ারা সমর্থন দিয়েছিল। আব্বাসীয় ও শিয়া উভয়েই মুহাম্মদ (সা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্কের কারণে আইনগত বৈধতা দাবি করেছিল। ক্ষমতায় থাকাকালে আব্বাসীয়রা সুন্নি মতাদর্শকে ধারণ করে এবং শিয়াদের সমর্থন দান থেকে বিরত থাকে। এরপর অল্প সময় পর বার্বা‌র খারিজিরা ৮০১ সালে উত্তর আফ্রিকায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। ৫০ বছরের মধ্যে মাগরেবের ইদ্রিসি ও ইফ্রিকিয়ার আগলাবি ও এর অল্পকাল পর মিশরের ইকশিদি ও তুলিনিরা কার্যকরীভাবে আফ্রিকার স্বাধীনতা লাভ করে।
• সেনাপতিদের সংঘাত
আল রাদির সময় আব্বাসীয় কর্তৃত্ব ভেঙে যেতে থাকে। এসময় তাদের তুর্কি বংশোদ্ভূত সেনাপতিরা খিলাফতকে অর্থ প্রদান বন্ধ করে দেয়। এসব সেনাপতিরা কার্যত স্বাধীন ছিল। এমনকি বাগদাদের কাছের প্রদেশগুলোও আঞ্চলিক রাজবংশের শাসন দাবি করতে থাকে।
এছাড়াও আব্বাসীয়দের প্রায় স্পেনের উমাইয়াদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হত।
৮ম শতাব্দীর শেষার্ধে বেশ কয়েকজন প্রতিযোগী খলিফা ও তাদের উজিরদের মাধ্যমে আব্বাসীয় নেতৃত্বকে কঠোর চেষ্টা করতে হয় যাতে সাম্রাজ্যের দূর বিস্তৃতির ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সমাধান করা যায়। বিস্তৃত সাম্রাজ্য জুড়ে সীমাবদ্ধ যোগাযোগ যোগাযোগ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রশাসনিক পরিবর্তনও বিবেচনায় ছিল।[৬১] বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে আব্বাসীয়রা সিরিয়া ও আনাতোলিয়ায় লড়াইয়ে লিপ্ত থাকার সময় সামরিক অভিযান কম করা হত। খিলাফত আভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগ দিয়েছিল। আঞ্চলিক শাসনকর্তারা বেশি স্বায়ত্ত্বশাসন লাভ করে নিজেদের অবস্থান বংশগত করে ফেলা খলিফার কাছে সমস্যার কারণ ছিল।[৬] একই সময়ে আব্বাসীয়রা আভ্যন্তরীণ আরেকটি সমস্যার মুখোমুখি হয়। প্রাক্তন আব্বাসীয় সমর্থকরা সম্পর্কছেদ করে খোরাসানের আশেপাশে পৃথক রাজ্য স্থাপন করে। হারুনুর রশিদ বারমাকিদের হটিয়ে দেন।[৬২] একই সময়কালে বেশ কিছু ভাঙন দেখা দেয়। এসবে জড়িতরা অন্যান্য ভূমির জন্য সাম্রাজ্য ত্যাগ বা সাম্রাজ্যের দূরবর্তী স্থানে অধিকার নিতে সচেষ্ট ছিল।

তাজিকিস্তানের মুদ্রায় খোরাসানের আমির ইসমাইল সামানির ছবি। তিনি আব্বাসীয়দের থেকে স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনা করেন।
৮২০ সাল নাগাদ সামানিরা ট্রান্সঅক্সিয়ানা ও বৃহত্তর খোরাসানে স্বাধীন কর্তৃত্ব অর্জন করে। শিয়া হামদানিরা উত্তর সিরিয়ায় এবং ইরানের তাহিরি ও সাফারি রাজবংশের উত্তরসুরি হয়। বিশেষত সামারার নৈরাজ্যের পর আব্বাসীয় কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে প্রদেশগুলোতে কেন্দ্রবিমুখী প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। ১০ম শতাব্দীর প্রথম নাগাদ আব্বাসীয়রা ইরাকের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং তা বিভিন্ন আমিরদের হাতে চলে যায়। খলিফা আল রাদি আমিরুল উমারা পদ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা মেনে নিতে বাধ্য হন। এর অল্পকাল পর দায়লাম থেকে বুইয়িরা উত্থান লাভ করে এবং বাগদাদের আমলাতন্ত্রে স্থান করে নেয়। ইবনে মিশকায়িয়ার মতানুযায়ী তারা তাদের সমর্থকদের ইকতা (কর খামার গঠনের জন্য জায়গির) বন্টন করতে থাকে।
অষ্টম শতকের শেষ নাগাদ আব্বাসীয়রা যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষমতা হারায়। ৭৯৩ সালে ইদ্রিসি রাজবংশ ফেজ থেকে মরক্কো পর্যন্ত একটি রাষ্ট্র স্থাপন করে। একই সময় আব্বাসীয় গভর্নরদের একটি পরিবারের ক্ষমতা বৃদ্ধি লাভ করতে থাকে এবং ৮৩০ এর দশকে তারা আগলাবি আমিরাত স্থাপন করে। ৮৬০ এর দশক নাগাদ মিশরের গভর্নররা তাদের নিজস্ব তুলুনি আমিরাত গঠন করে। প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ ইবনে তুলুনের নামে এর নাম করণ করা হয়। এরপর থেকে মিশর খলিফা থেকে পৃথক হয়ে রাজবংশের হাতে শাসিত হতে থাকে। পূর্বাঞ্চলেও গভর্নররা কেন্দ্র থেকে নিজেদের পৃথক করে নেয়। হেরাতের সাফারি ও বুখারার সামানিরা ৮৭০ এর দশকে সম্পর্কচ্ছেদ করে এবং পারস্যায়িত সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র গড়ে তোলে। এসময় শুধু মেসোপটেমিয়ার কেন্দ্রীয় অঞ্চল সরাসরি আব্বাসীয় নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফিলিস্তিন ও হেজাজ প্রায় তুলুনিরা নিয়ন্ত্রণ করত। আনাতোলিয়ায় বাইজেন্টাইনরা আরব মুসলিমদের আরও পূর্বদিকে ঠেলে দেয়।
৯২০ এর দশক নাগাদ অবস্থা আরো বদলে যায়। প্রথম পাঁচ ইমামকে মান্য করা শিয়াদের একটি গোষ্ঠী যারা মুহাম্মদ (সা) এর কন্যা ফাতিমার সাথে নিজেদের রক্তসম্পর্ক দাবি করত তারা ইদ্রিসি ও আগলাবিদের কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এই নতুন রাজবংশ ফাতেমীয় নামে পরিচিত হয়। ৯৬৯ সালে তারা মিশরের দিকে অগ্রসর হয় এবং মিশরের ফুসতাতে রাজধানী স্থাপন করে। একে তারা শিয়া শিক্ষা ও রাজনীতির মূল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে। ১০০০ সাল নাগাদ ফাতেমীয়রা সুন্নিদের আব্বাসীয়দের কাছে একটি আদর্শগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। এসময় আব্বাসীয় শাসন বেশ কিছু গভর্নরদের মধ্যে বিভক্ত ছিল এবং বাগদাদের খলিফার কর্তৃত্ব আগের মত শক্ত ছিল না। এসকল শাসনকর্তারা নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ে লিপ্ত থাকতেন। খলিফা নিজে বুইয়ি আমিরের নিরাপত্তায় ছিলেন। বুইয়ি আমির সমগ্র ইরাক ও পশ্চিম ইরানের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন।
ইরাকের বাইরের স্বাধীন প্রদেশগুলো ধীরে ধীরে বংশগত শাসকদের আওতায় চলে আসে। এসব স্থানে খলিফার অবস্থান ছিল আনুষ্ঠানিক। মাহমুদ গজনভি বহুল প্রচলিত “আমির” পদবীর স্থলে “সুলতান” পদবী ধারণ করেন। ১১ শতকে খলিফার অবস্থান আরো হ্রাস পায় যখন কিছু মুসলিম শাসক জুমার খুতবায় তার নাম উল্লেখ করার প্রথা থেকে সরে আসেন ও নিজেদের নামে মুদ্রা জারি করেন।[৬১] কায়রোর ফাতেমীয়রা মুসলিম বিশ্বের কর্তৃত্বের ব্যাপারে আব্বাসীয়দের সাথে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হন। বাগদাদ আব্বাসীয় খলিফাদের কেন্দ্র হলেও সেখানকার শিয়াদের মধ্যে ফাতেমীয়রা কিছু সমর্থন লাভ করে। ফাতেমীয়দের পতাকা ছিল সবুজ ও আব্বাসীয়দের পতাকা ছিল কালো। ফাতেমীয়দের সাথে এই প্রতিদ্বন্দ্বীতা ১২ শতকে সমাপ্তি ঘটে।
এই তালিকায় আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের ভাঙনের পর জন্ম নেয়া মুসলিম রাজবংশসমূহের উল্লেখ রয়েছে। এসব রাজবংশ কখনো তাদের অধীনস্ত কোনো আমিরের বিদ্রোহের ফলে সমাপ্ত হত। মিশরের ফাতেমীয় খিলাফত, স্পেনের কর্ডোবা খিলাফত ও আলমোহাদ খিলাফত ছাড়া প্রত্যেক মুসলিম রাজবংশ আব্বাসীয় খলিফার আনুষ্ঠানিক সার্বভৌমত্ব মেনে চলত ও তাকে বিশ্বাসীদের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিত।
• উত্তরপশ্চিম আফ্রিকা: ইদ্রিসি (৭৮৮-৯৭৪) → আলমোরাভি (১০৪০) → আলমোহাদ (১১২০-১২৬৯)।
• ইফ্রিকিয়া (আধুনিক তিউনিশিয়া, পূর্ব আলজেরিয়া ও পশ্চিম লিবিয়া): আগলাবি (৮০০-৯০৯) → মিশরের ফাতেমীয় খিলাফত (৯০৯-৯৭৩) → জিরি (৯৭৩-১১৪৮) → আলমোহাদ (১১৪৮-১২২৯) → হাফসি রাজবংশ (১২২৯-১৫৭৪)।
• (মিশর ও ফিলিস্তিন): তুলুনি (৮৬৮-৯০৫) → ইখশিদি (৯৩৫-৯৬৯) → ফাতেমীয় খিলাফত (৯০৯-১১৭১) → আইয়ুবীয় (১১৭১-১৩৪১) → মামলুক → (১২৫০-১৫১৭)।
• আল জাজিরা (আধুনিক সিরিয়া ও উত্তর ইরাক): হামদানি (৮৯০-১০০৪) → মারওয়ানি ও উকায়লিদি (৯৯০-১০৮৫) → সেলজুক (১০৩৪-১১৯৪) → মঙ্গোল সাম্রাজ্য ও ইলখানাত (১২৩১-১৩৩৫)।
• দক্ষিণপশ্চিম ইরান: বুইয়ি (৯৩৪-১০৫৫) → সেলজুক (১০৩৪-১১৯৪) → মঙ্গোল সাম্রাজ্য।
• খোরাসান (আধুনিক ইরান, আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান): সামানি (৮১৯-৯৯৯) → গজনভি (৯৬২-১১৬৮) → সেলজুক (১০৩৪-১১৯৪) → ঘুরি (১০১১-১২১৫) → খাওয়ারেজমি (১০৭৭-১২৩১) → মঙ্গোল সাম্রাজ্য ও ইলখানাত (১২৩১-১৩৩৫)।
• ট্রান্সওক্সিয়ানা (আধুনিক মধ্য এশিয়া): সামানি (৮১৯-৯৯৯) → কারাখানি (৮৪০-১২১২) → খাওয়ারেজমি (১০৭৭-১২৩১) → মঙ্গোল সাম্রাজ্য ও চাগতাই খানাত (১২২৫-১৬৮৭)।
বুইয়ি ও সেলজুক সামরিক নিয়ন্ত্রণ (৯৭৮-১১১৮)
বুইয়ি আমিরদের ক্ষমতা সত্ত্বেও বাগদাদে আব্বাসীয়দের হাতে একটি কার্যকর দরবার ছিল। বুইয়ি আমলা হিলালুল সাবির বর্ণনায় এমন কথা পাওয়া যায়। বাগদাদ ও ধর্মীয় জীবনে তাদের প্রভাব ছিল। বাহাউদ্দৌলার মৃত্যুর পর বুইয়িদের ক্ষমতা হ্রাস পেলে খিলাফত কিছু সামর্থ পুনরুদ্ধারে সমর্থ হয়। উদাহরণস্বরূপ খলিফা আল কাদির বাগদাদ মেনিফেস্টোর মত রচনা দ্বারা শিয়াদের বিরুদ্ধে আদর্শগত লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। খলিফা নিজে বাগদাদের আইনশৃংখলা বজায় রাখেন এবং রাজধানীতে ফিতনা ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে সচেষ্ট হন।
বুইয়ি রাজবংশের অবনতির পর তাদের ফাকা স্থলে অঘুজ তুর্কি ও সেলজুকরা জায়গা করে নেয়। আমির ও প্রাক্তন দাস বাসিরি ১০৫৮ সালে শিয়া ফাতেমীয় পতাকা নিয়ে বাগদাদে আসলে খলিফা আল কাইম বাইরের সাহায্য ছাড়া তাকে প্রতিরোধে অসমর্থ ছিলেন। সেলজুক সুলতান তুগরিল বেগ বাগদাদে সুন্নি শাসন পুনপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং ইরাককে তার রাজবংশের জন্য নিয়ে নেন। আরেকবার আব্বাসীয়দেরকে অন্য একটি সামরিক শক্তির সাথে ভারসাম্য স্থাপন করতে হয়। এসময় খলিফা ইসলামি বিশ্বের প্রধান ছিলেন। পরবর্তী সুলতান আল্প আরসালান ও প্রথম মালিকশাহ ও উজির নিজামুল মুলক পারস্য অবস্থান করতেন কিন্তু বাগদাদের আব্বাসীয়দের উপরও তাদের প্রভাব ছিল। ১২ শতকে এই রাজবংশ দুর্বল হতে থাকলে আব্বাসীয়রা পুনরায় অধিক ক্ষমতা লাভ করতে থাকে।
সামরিক শক্তির পুনরুত্থান (১১১৮-১২০৬)
যুদ্ধে সেলজুকদের সাথে লড়াই করতে সক্ষম সেনাবাহিনী প্রথমবার খলিফা আল মুসতারসিদ গড়ে তুলেন। তবে ১১৩৫ সালে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। খলিফা আল মুকতাফি উজির ইবনে হুবায়রার সহায়তায় খিলাফতের সামরিক স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। বাইরের রাজবংশগুলোর প্রভাবাধীন অবস্থার প্রায় ২৫০ বছর পর বাগদাদ অবরোধের সময় সেলজুকদের বিরুদ্ধে বাগদাদকে তিনি সফলভাবে প্রতিরক্ষা করতে সক্ষম হন। এর ফলে ইরাক আব্বাসীয়দের জন্য সুরক্ষিত হয়। আল নাসিরের শাসনামলে খিলাফত ইরাকজুড়ে শক্ত অবস্থান লাভ করে।
মঙ্গোল আক্রমণ (১২০৬-১২৫৮)] ১২০৬ সালে চেঙ্গিস খান মধ্য এশিয়ার মঙ্গোলদের মধ্যে শক্তিশালী রাজ্য গড়ে তোলেন। ১৩ শতাব্দীতে এই মঙ্গোল সাম্রাজ্য অধিকাংশ ইউরেশিয়ান অঞ্চল জয় করে ফেলে। ১২৫৮ সালে হুলাগু খানের বাগদাদ ধ্বংস করার ঘটনা ইসলামি স্বর্ণযুগের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হয়।[৬৩] মঙ্গোলদের আশংকা ছিল যে মুহাম্মদ (সা) এর চাচার বংশধর আল মুসতাসিমকে হত্যা করা হলে অলৌকিক দুর্যোগ হানা দেবে।[৬৪] পারস্যের শিয়ারা বলে যে শিয়া ইমাম হুসাইন বিন আলির মৃত্যুর পর এমন কোনো দুর্যোগ হয়নি। রাজকীয় রক্ত না ঝরানোর মঙ্গোল রীতি তাই অগুরুত্বপূর্ণ ঠেকে। হুলাগু খান ১২৫৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আল মুসতাসিমকে কার্পেটে মুড়ে ঘোড়ার সাহায্যে পদদলিত করে হত্যা করেন। খলিফার পরিবারকেও হত্যা করা হয়। তার কনিষ্ঠ পুত্রকে বাচিয়ে রাখা হয় ও মঙ্গোলিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। এক কন্যাকে হুলাগু খানের হারেমে দাসি হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়।[৬৫] মঙ্গোলিয়ান ইতিহাসবিদদের মতে বেঁচে যাওয়া পুত্রটি বিয়ে করে ও তার সন্তানসন্ততি হয়।] কায়রোর আব্বাসীয় খিলাফত (১২৬১-১৫১৭
নবম শতাব্দীতে আব্বাসীয়রা খলিফার প্রতি অনুগত সেনাবাহিনী গঠন করে। এতে অনারবদের থেকে লোক নেয়া হয়েছিল যাদের মামলুক বলা হত।[৬৬][৬৭][৬৮][৬৯][৭০] আল মামুন ও তার ভাই আল মুতাসিমের শাসনকালে গঠিত এই সেনাবাহিনী সাম্রাজ্যের পরবর্তী ভাঙন রোধ করে। প্রথমদিকে এরা সরকারকে আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সমস্যা বিষয়ে সাহায্য করত। আল মুতাসিম কর্তৃক বাগদাদ থেকে সামারায় রাজধানী স্থানান্তর খিলাফতের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে। অধিকন্তু আল রাদি মুহাম্মদ বিন রাইকের হাতে অধিকাংশ রাজকীয় কর্ম তুলে দেয়ার আগ পর্যন্ত মামলুকদের ক্ষমতা বৃদ্ধি থাকে।] মামলুকরা মিশরের ক্ষমতায় চলে আসে। মঙ্গোলদের হাতে বাগদাদের পতনের পর ১২৬১ সালে মামলুকরা কায়রোতে আব্বাসীয় খিলাফত পুনপ্রতিষ্ঠা করে। কায়রোর প্রথম আব্বাসীয় খলিফা ছিলেন আল মুসতানসির। তৃতীয় আল মুতাওয়াক্কিলের সময় পর্যন্ত কায়রোর আব্বাসীয় খিলাফত টিকে ছিল। প্রথম সেলিম তাকে কনস্টান্টিনোপলে বন্দী হিসেবে নিয়ে যান। কায়রো ফিরে আসার পর ১৫৪৩ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
বাসতাকের আব্বাসীয় খানাত] ১২৫৮ সালে বাগদাদের পতনের পর আব্বাসীয় রাজবংশের কিছু বেঁচে যাওয়া সদস্য তাদের জ্যেষ্ঠ দ্বিতীয় ইসমাইল বিন হামজা বিন আহমেদ বিন মুহাম্মদের নেতৃত্ব দক্ষিণ পারস্যের ফারস অঞ্চলে চলে যায়।[৭১][৭২] তারা খোনজ শহরে অবস্থান নেয়। এটি এসময় জ্ঞান অর্জনের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। শেখ আবদুস সালাম খোনজি বিন আব্বাস বিন দ্বিতীয় ইসমাইল বাগদাদের পতনের পাঁচ বছর পর খোনজে জন্ম লাভ করেন।[৭৩][৭৪] তিনি একজন বড় ধর্মীয় পন্ডিত ও সুফি হন। স্থানীয় জনতা তাকে শ্রদ্ধা করত। তার মাজার খোনজে রয়েছে।
শেখ আবদুস সালামের বংশধররা ধর্মীয় পন্ডিত ছিলেন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে সম্মানিত হতেন। তেমন একজন শেখ মুহাম্মদ (মৃত্যু আনুমানিক ৯০৫ হিজরি) বাসতাক চলে আসেন।[৭৫][পৃষ্ঠা নম্বর] তার নাতি শেখ মুহাম্মদ বিন শেখ নাসিরউদ্দিন আহমেদ বিন শেখ মুহাম্মদ খোনজে কিছু সময়ের জন্য বসতি করেছিলেন। কিন্তু ৯৩৮ হিজরি বর্ধমান সাফাভি শক্তির কারণে তিনি স্থায়ীভাবে তার দাদার মত বাসতাকে চলে আসেন।[৭৬] তার নিজের নাতি শেখ হাসান (মৃত্যু ১০৮৪ হিজরি) (মোল্লা হাসান বলেও পরিচিত) বাসতাকের আব্বাসীয়দের সাধারণ বংশধর।[৭৭] শেখ হাসানের নাতি শেখ মুহাম্মদ সাইদ (জন্ম ১০৯৬ হিজরি-মৃত্যু ১১৫২ হিজরি) ও শেখ মুহাম্মদ খান (জন্ম ১১১৩ হিজরি-মৃত্যু ১১৯৭ হিজরি) এই অঞ্চলের প্রথম আব্বাসীয় শাসক। ১১৩৭ হিজরি শেখ মুহাম্মদদ সাইদ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সমর্থন জড়ো করতে থাকেন। লার দখলের পর তিনি মৃত্যুর ১১৫২ হিজরিতে মৃত্যূর আগ পর্যন্ত ১২ বা ১৪ বছর এই শহর ও এর উপর নির্ভরশীল অঞ্চলগুলো শাসন করতেন।[৭৮] তার ভাই শেখ মুহাম্মদ খান বাসতাকি এরপর বাসতাক ও জাহানগিরিয়া অঞ্চলের শাসক হন। ১১৬১ হিজরিতে শেখ মুহাম্মদ খান বাসতাকি দিদেহবান দুর্গের উদ্দেশ্যে বের হন এবং বাস্তাক ও এর অঞ্চলসমূহ তার বড় ভাইয়ের পুত্র শেখ মুহাম্মদ সাদিক ও তার চাচাত ভাই আগা হাসান খানের হাতে অর্পণ করেন।[৭৯] শেখ মুহাম্মদ খান প্রায় ২০ থেকে ২৪ বছর দিদেহবান দুর্গ থেকে জাহানগিরিয়া শাসন করেন। একারণে তাকে শেখ মুহাম্মদ “দিদেহবান” বলা হয়।[৮০] এরপর তিনি বাসতাক ফিরে আসেন এবং আমৃত্যু সেখান থেকে শাসন করে যান। তার শাসনের সর্বোচ্চ সীমায় বাসতাক খানাতে শুধু জাহানগিরিয়া ছাড়াও লার ও বন্দর আব্বাস ও এসবের উপর নির্ভরশীল এলাকাগুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল।[৮১][৮২][৮৩][৮৪][৮৫] শেখ মুহাম্মদ খান বাসতাকি “খান” উপাধিধারী বাসতাকের প্রথম আব্বাসীয় শাসক। এরপর সকল আব্বাসীয় শাসকের ক্ষেত্রে “খান” উপাধিটি ব্যবহার হতে থাকে।
বাসতাক ও জাহানগিরিয়ার সর্বশেষ আব্বাসীয় শাসক ছিলেন মুহাম্মদ আজম খান বানিআব্বাসিয়ান। তিনি তারিখে জাহানগিরিয়া ওয়া বনিআব্বাসিয়ানে বাসতাক গ্রন্থ রচনা করেছেন।[৮৬] এতে এই অঞ্চলের ইতিহাস ও এর শাসনকর্তা আব্বাসীয় পরিবারের বর্ণনা রয়েছে। মুহাম্মদ আজম খান বনিআব্বাসিয়ান ১৯৬৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এ বছরকে বাসতাকের আব্বাসীয় শাসনের সমাপ্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।
আব্বাসীয় খলিফাদের তালিকা

আব্বাসীয় পরিবারের বংশলতিকা। সবুজ রং দ্বারা বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা ও হলুদ রং দ্বারা কায়রোর আব্বাসীয় খলিফা চিহ্নিত। আব্বাসীয়দের সাথে আত্মীয়তা দেখানোর জন্য মুহাম্মদ (সা) এর নামও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
# খলিফা হিজরি খ্রিষ্টাব্দ
আব্বাসীয় খিলাফতের খলিফা
১ আস সাফাহ
১৩১–১৩৬ ৭৫০–৭৫৪
২ আল মনসুর
১৩৬–১৫৮ ৭৫৪–৭৭৫
৩ আল মাহদি
১৫৮–১৬৯ ৭৭৫–৭৮৫
৪ আল হাদি
১৬৯–১৭০ ৭৮৫–৭৮৬
৫ হারুনুর রশিদ
১৭০–১৯৩ ৭৮৬–৮০৯
৬ আল আমিন
১৯৩–১৯৮ ৮০৯–৮১৩
৭ আল মামুন
১৯৮–২১৮ ৮১৩–৮৩৩
৮ আল মুতাসিম
২১৮–২২৭ ৮৩৩–৮৪২
৯ আল ওয়াসিক
২২৭–২৩২ ৮৪২–৮৪৭
১০ আল মুতাওয়াক্কিল
২৩২–২৪৭ ৮৪৭–৮৬১
১১ আল মুনতাসির
২৪৭–২৪৮ ৮৬১–৮৬২
১২ আল মুসতাইন
২৪৮–২৫২ ৮৬২–৮৬৬
১৩ আল মুতাজ
২৫২–২৫৫ ৮৬৬–৮৬৯
১৪ আল মুহতাদি
২৫৫–২৫৬ ৮৬৯–৮৭০
১৫ আল মুতামিদ
২৫৭–২৭৯ ৮৭০–৮৯২
১৬ আল মুতাদিদ
২৭৯–২৮৯ ৮৯২–৯০২
১৭ আল মুকতাফি
২৮৯–২৯৫ ৯০২–৯০৮
১৮ আল মুকতাদির
২৯৫–৩২০ ৯০৮–৯৩২
১৯ আল কাহির
৩২০–৩২২ ৯৩২–৯৩৪
২০ আল রাদি
৩২২–৩২৯ ৯৩৪–৯৪০
২১ আল মুত্তাকি
৩২৯–৩৩৪ ৯৪০–৯৪৪
২২ আল মুসতাকফি
৩৩৪–৩৩৬ ৯৪৪–৯৪৬
২৩ আল মুতি
৩৩৬–৩৬৩ ৯৪৬–৯৭৪
২৪ আল তাই
৩৬৩–৩৮১ ৯৭৪–৯৯১
২৫ আল কাদির
৩৮২–৪২২ ৯৯১–১০৩১
২৬ আল কাইম
৪২২–৪৬৮ ১০৩১–১০৭৫
২৭ আল মুকতাদি
৪৬৮–৪৮৭ ১০৭৫–১০৯৪
২৮ আল মুসতাজির
৪৮৭–৫১২ ১০৯৪–১১১৮
২৯ আল মুসতারশিদ
৫১২-৫৩০ ১১১৮–১১৩৫
৩০ আর রশিদ
৫৩০–৫৩১ ১১৩৫–১১৩৬
৩১ আল মুকতাফি
৫৩১–৫৫৫ ১১৩৬–১১৬০
৩২ আল মুসতানজিদ
৫৫৫–৫৬৬ ১১৬০–১১৭০
৩৩ আল মুসতাদি
৫৬৬–৫৭৬ ১১৭০–১১৮০
৩৪ আন নাসির
৫৭৬–৬২২ ১১৮০–১২২৫
৩৫ আজ জহির
৬২২–৬২৩ ১২২৫–১২২৬
৩৬ আল মুসতানসির
৬২৩–৬৪০ ১২২৬–১২৪২
৩৭ আল মুসতাসিম
৬৪০–৬৫৬ ১২৪২–১২৫৮
কায়রোর খলিফা
৩৯ দ্বিতীয় আল মুসতানসির
৬৫৯–৬৬০ ১২৬১–১২৬২
৪০ প্রথম আল হাকিম
৬৬০–৭০২ ১২৬২–১৩০২
৪১ প্রথম আল মুসতাকফি
৭০২–৭৪১ ১৩০৩–১৩৪০
৪২ প্রথম আল ওয়াসিক
৭৪১–৭৪২ ১৩৪০–১৩৪১
৪৩ দ্বিতীয় আল হাকিম
৭৪২–৭৫৩ ১৩৪১–১৩৫২
৪৪ প্রথম আল মুতাদিদ
৭৫৩–৭৬৪ ১৩৫২–১৩৬২
৪৫ প্রথম আল মুতাওয়াক্কিল
৭৬৪–৭৮৫ ১৩৬২–১৩৮৩
৪৬ দ্বিতীয় আল ওয়াসিক
৭৮৫–৭৮৮ ১৩৮৩–১৩৮৬
৪৭ আল মুতাসিম
৭৮৮–৭৯১ ১৩৮৬–১৩৮৯
৪৮ প্রথম আল মুতাওয়াক্কিল (পুনরায় ক্ষমতালাভ) ৭৯১–৮০৯ ১৩৮৯–১৪০৬
৪৯ আল মুসতাইন
৮০৯–৮১৭ ১৪০৬–১৪১৪
৫০ দ্বিতীয় আল মুতাদিদ
৮১৭–৮৪৫ ১৪১৪–১৪৪১
৫১ দ্বিতীয় আল মুসতাকফি
৮৪৫–৮৫৫ ১৪৪১–১৪৫১
৫২ আল কাইম
৮৫৫–৮৫৯ ১৪৫১–১৪৫৫
৫৩ আল মুসতানজিদ
৮৫৯-৮৮৪ ১৪৫৫–১৪৭৯
৫৪ দ্বিতীয় আল মুতাওয়াক্কিল
৮৮৪–৯০২ ১৪৭৯–১৪৯৭
৫৫ আল মুসতামসিক
৯০২–৯১৪ ১৪৯৭–১৫০৮
৫৬ তৃতীয় আল মুতাওয়াক্কিল
৯১৪–৯২৩ ১৫০৮–১৫১৭
আস সাফাহ
আবুল আব্বাস আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আস সাফাহ বা আবুল আব্বাস আল সাফাহ (আরবি: ‘‎أبو العباس عبد الله بن محمد السفاح) (জন্ম ৭২১/৭২২ খ্রিষ্টাব্দ – মৃত্যু. ৯ জুন ৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দ, শাসনকাল ৭৪৯–৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন প্রথম আব্বাসীয় খলিফা। ইসলামের ইতিহাসে আব্বাসীয় খিলাফত অন্যতম দীর্ঘতম ও গুরুত্বপূর্ণ খিলাফত।
আস সাফাহ
আব্বাসীয় খিলাফত
জন্ম: ৭২১ মৃত্যু: ৭৫৪
সুন্নি ইসলাম শিরোনাম

পূর্বসূরী
দ্বিতীয় মারওয়ান
ইসলামের খলিফা
৭৪৯–৭৫৪
উত্তরসূরী
আল মনসুর

পূর্বসূরী
পঞ্চম আবদুর রহমান
কর্ডো‌বার খলিফা
১০২৪–১০২৫
উত্তরসূরী
ইয়াহিয়া ইবনে আলি ইবনে হামুদ আল মুতালি

তৃতীয় হিশাম (কর্ডোবা)
তৃতীয় হিশাম (আরবি: هشام الثالث in full المعتد بالله” هشام بن محمد‎) ছিলেন আল আন্দালুসের শেষ উমাইয়া শাসক (১০২৬-১০৩১)। তিনি কর্ডোবার খলিফা উপাধিধারী শেষ ব্যক্তি।
তৃতীয় হিশাম ছিলেন চতুর্থ আবদুর রহমানের ভাই। সীমান্ত অঞ্চলের গভর্নর ও কর্ডোবার জনগণের মধ্যে আলোচনার পর খলিফা মনোনীত হন। ১০২৯ সালের আগ পর্যন্ত তিনি কর্ডোবায় প্রবেশ করতে পারেননি। এসময় হামুনি বার্বার সেনারা শহর অধিকার করে রেখেছিল।
তৃতীয় হিশাম (কর্ডোবা)
বনু উমাইয়া
বনু কুরাইশ এর ক্যাডেট শাখা
মৃত্যু: ১০৩৬
পূর্বসূরী
ইয়াহিয়া ইবনে আলি ইবনে হামুদ আল মুতালি
কর্ডোবার খলিফা
১০২৬–১০৩১
উপাধি বিলুপ্ত

আন্দালুস
টেমপ্লেট:History of Spain টেমপ্লেট:History of Portugal টেমপ্লেট:History of Gibraltar
আন্দালুস (আরবি: الأندلس‎, trans. al-ʼAndalus; স্পেনীয়: Al-Ándalus; পর্তুগিজ: Al-Andalus; টেমপ্লেট:Lang-an; কাতালান: Al-Àndalus; Berber: Andalus or Wandalus) মুসলিম স্পেন বা ইসলামি ইবেরিয়া দ্বারা মধ্যযুগে মুসলিম শাসিত ইবেরিয়ান উপদ্বীপ বোঝানো হয়। বর্তমানে এটি স্পেন ও পর্তুগালের অংশ। সংক্ষিপ্তকালের জন্য ফ্রান্সের দক্ষিণের সেপ্টিমেনিয়া অঞ্চল এর অংশ ছিল। পুরো ইবেরিয়ান উপদ্বীপকে বোঝানো হলেও রিকনকোয়েস্টা অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে এর সীমানা পরিবর্তন হয়েছে। ৭১১ থেকে ১৪৯২ সাল পর্যন্ত এর আয়ুষ্কাল ধরা হয়।[১][২][৩] উমাইয়াদের হিস্পানিয়া বিজয়ের পর আন্দালুসকে পাঁচটি প্রশাসনিক ইউনিটে ভাগ করা হয়। এগুলো মোটামুটি আধুনিক আন্দালুসিয়া, গেলিসিয়া ও পর্তুগাল, কাস্টিল ও লিওন, আরাগন, বার্সেলোনা কাউন্টি ও সেপ্টিমেনিয়া নিয়ে গঠিত ছিল।[৪] রাজনৈতিক পরিচিতির দিক থেকে এটি যথাক্রমে উমাইয়া খিলাফতের প্রদেশ (৭১১-৭৫০), কর্ডোবা আমিরাত (৭৫০-৯২৯), কর্ডোবা খিলাফত (৯২৯-১০৩১) ও কর্ডো‌বা খিলাফতের তাইফা রাজ্য হিসেবে ছিল। এসকল শাসনের সময় মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় লক্ষ্য করা যায়। খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা জিজিয়া দেয়ার বিনিময়ে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত।[৫] করডোবা খিলাফতের সময় আন্দালুস জ্ঞানের আলোকে পরিণত হয় এবং কর্ডো‌বা ইউরোপসহ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। জাবির ইবনে আফলা, আবু ইশাক ইবরাহিম আল জারকালি, আবুল কাসিম আল জাহরাউয়ি, ও ইবনে জুহরদের ত্রিকোণমিতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শল্যচিকিৎসা, ওষুধ ও অন্যান্য নানা বিষয় সংক্রান্ত গবেষণার ফলে ইসলামি ও পশ্চিমা সমাজ অগ্রগতি অর্জন করে। আন্দালুস ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্রের অন্যতম পরিগণিত হত এবং তা মুসলিম ও খ্রিষ্টান বিশ্বের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক আদানপ্রদানের স্থল হয়ে উঠে।
ইতিহাসের অধিকাংশ সময়জুড়ে আন্দালুসের সাথে উত্তরের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলোর বিরোধ চলেছিল। উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর আন্দালুস কয়েকটি রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে যার মধ্যে গ্রানাডা আমিরাত উল্লেখযোগ্য। খ্রিষ্টান কাস্টিলিয়ানদের হামলা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আলমোরাভি সাম্রাজ্য হস্তক্ষেপ করে খ্রিষ্টান হামলা প্রতিহত করে, দুর্বল আন্দালুসিয়ান মুসলিম রাজাদের সরিয়ে আন্দালুসকে সরাসরি বার্বার শাসনের আওতায় আনা হয়। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে আন্দালুস মারাকেশ ভিত্তিক বার্বার মুসলিম সাম্রাজ্য আলমোরাভি ও আলমোহাদের প্রদেশে পরিণত হয়।
শেষপর্যন্ত উত্তরের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলো তাদের মুসলিম প্রতিবেশি রাজ্যগুলোকে উৎখাত করতে সক্ষম হয়। ১০৮৫ সালে ষষ্ঠ অলফেনসো টলেডো দখল করেন। এরপর মুসলিমদের ধীরে ধীরে পতনের সূচনা হয়। ১২৩৬ সালে করডোবার পতনের পর গ্রানাডা আমিরাত বর্তমান স্পেনের একমাত্র মুসলিম অঞ্চল হিসেবে টিকে ছিল। ১২৪৯ পর্তুগিজ রিকনকোয়েস্টা শুরু হয় এবং পর্তুগালের তৃতীয় অলফেনসো আলগারভ জয় করেন। ১২৩৮ সালে গ্রানাডা আমিরাত কাস্টিল রাজ্যের করদ রাজ্যে পরিণত হয়। অবশেষে ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি আমির দ্বাদশ মুহাম্মদ কাস্টিলের রাণী প্রথম ইসাবেলার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ইসাবেলা ও তার স্বামী দ্বিতীয় ফার্ডিনেন্ড একত্রে “ক্যাথলিক সম্রাট” বলা হত। আত্মসমর্পণের পর আন্দালুসের রাজনৈতিক পরিচিতির অবসান ঘটে। এ অঞ্চলে ইসলামি সংস্কৃতির চিহ্ন এখনও বিদ্যমান রয়েছে।

আব্বাসীয় খিলাফত
আব্বাসীয় খিলাফত খিলাফতগুলোর মধ্যে তৃতীয় খিলাফত। এটি আব্বাসীয় বংশ কর্তৃক শাসিত হয়। বাগদাদ এই খিলাফতের রাজধানী ছিল। উমাইয়া খিলাফতকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে আন্দালুসে উমাইয়া খিলাফত উৎখাত করা যায়নি।
আব্বাসীয় খিলাফত নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদের কর্তৃক ৭৫০ সালে কুফায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ৭৬২ সালে বাগদাদে রাজধানী স্থানান্তরিত করা হয়। পারস্যে ১৫০ বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ করার পর খলিফাকে প্রধান কর্তৃপক্ষ মেনে নিয়ে স্থানীয় আমিরদের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে চাপ দেয়া হয়। খিলাফতকে তার পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ আন্দালুস, মাগরেব ও ইফ্রিকিয়া যথাক্রমে একজন উমাইয়া যুবরাজ, আগলাবি ও ফাতেমীয় খিলাফতের কাছে হারাতে হয়।
মোঙ্গল নেতা হুলাগু খানের বাগদাদ দখলের পর ১২৫৮ সালে আব্বাসীয় খিলাফত বিলুপ্ত হয়। মামলুক শাসিত মিশরে অবস্থান করে তারা ১৫১৯ সাল পর্যন্ত ধর্মীয় ব্যাপারে কর্তৃত্ব দাবি করতে থাকেন। এরপর উসমানীয় সাম্রাজ্যের কাছে ক্ষমতা চলে যায় ও কনস্টান্টিনোপলে রাজধানী স্থাপিত হয়।[স্পষ্টকরণ প্রয়োজন] আব্বাসীয় খলিফারা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর ছিলেন। তিনি ছিলেন মুহাম্মদ (সা) এর সর্বকনিষ্ঠ চাচাদের অন্যতম। মুহাম্মদ (সা) এর সাথে নিকটাত্মীয়তার কারণে তারা উমাইয়াদের হটিয়ে নিজেদের রাসুলের প্রকৃত উত্তরসুরি হিসেবে দাবি করে।
উমাইয়াদেরকে নৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে আক্রমণ করে আব্বাসীয়রা নিজেদেরকে তাদের চেয়ে আলাদা হিসেবে তুলে ধরে। ইরা লেপিডাসের মতে, “আব্বাসীয় বিদ্রোহ ব্যাপকভাবে আরবদের দ্বারা সমর্থিত ছিল, যারা ছিল মূলত মারুর বসতি স্থাপনকারী, সেসাথে ইয়েমেনি গ্রুপ ও তাদের মাওয়ালি।”[৩] মাওয়ালি তথা অনারব মুসলিমরা কাছে আব্বাসীয়দের পক্ষে ছিল। আব্বাসের প্রপৌত্র মুহাম্মদ ইবনে আলি আব্বাসি মুহাম্মদ (সা) এর পরিবারের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য দ্বিতীয় উমরের সময় পারস্যে প্রচারণা শুরু করেন।
দ্বিতীয় মারওয়ানের সময় আব্বাসের চতুর্থ বংশধর ইবরাহিম বিরোধিতা শুরু করেন। খোরাসান প্রদেশ ও শিয়া আরবদের[৪] কাছ থেকে সমর্থন লাভের মাধ্যমে তিনি বেশ সাফল্য অর্জন করলেও ৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ধরা পড়েন এবং কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। কারো মতে তাকে হত্যা করা হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] এরপর তার ভাই আবদুল্লাহ প্রতিবাদ এগিয়ে নেন। তিনি আবুল আব্বাস আস সাফাহ নামে পরিচিত হন। ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি উমাইয়াদের জাবের যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন।
বিজয়ের পর তিনি মধ্য এশিয়ায় সেনা পাঠান। তার সেনারা তালাসের যুদ্ধে ট্যাং রাজবংশের সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে লড়াই করে।[৫] বাগদাদকে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখা বারমাকিরা বাগদাদে পৃথিবীর প্রথম কাগজ কলের প্রচলন ঘটায়। এভাবে আব্বাসীয় শাসনামলে নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণ ঘটে। দশ বছরের মধ্য আব্বাসীয়রা স্পেনে উমাইয়া রাজধানী কর্ডোবাতে আরেকটি নামকরা কাগজ কল নির্মাণ করে।
আব্বাসীয়দের প্রথম পরিবর্তন ছিল সাম্রাজ্যের রাজধানী দামেস্ক থেকে বাগদাদে সরিয়ে আনা। এর উদ্দেশ্য ছিল যাতে পারসিয়ান মাওয়ালিদের অধিক কাছে টানা যায়। ৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে টাইগ্রিস নদীর তীরে বাগদাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় দায়িত্বপালনের জন্য উজির নামক নতুন পদ সৃষ্টি করা হয় এবং স্থানীয় আমিরদের উপর বড় দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। উজিররা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করাতে আব্বাসীয় খলিফারা অধিক মাত্রায় আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রাচীন আরব অভিজাততন্ত্র পারস্যের আমলাতন্ত্রের কারণে প্রতিস্থাপিত হয়ে পড়ে।[৬] উমাইয়াদের ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য আব্বাসীয়রা পারসিয়ানদের সাহায্যের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে।[৪] আবুল আব্বাসের উত্তরসুরি আল মনসুর অনারব মুসলিমদেরকে তার দরবারে স্বাগতম জানান। এর ফলে আরব ও পারস্যের সংস্কৃতি মিলিত হওয়ার সুযোগ পায়। তবে অনেক আরব সমর্থক বিশেষ করে খোরাসানের আরব যারা উমাইয়াদের বিরুদ্ধে তাদের সহায়তা করেছিল, তারা বিরূপ হয়।
সমর্থকদের মধ্যের এই ফাটল সমস্যার জন্ম দেয়। উমাইয়া ক্ষমতার বাইরে থাকলেও ধ্বংস হয়ে যায়নি। উমাইয়া রাজপরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য স্পেন চলে যান এবং সেখানে নিজেকে একজন স্বাধীন আমির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন (প্রথম আবদুর রহমান, ৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দ)। ৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে তৃতীয় আবদুর রহমান নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন এবং আল আন্দালুসে বাগদাদের প্রতিদ্বন্দ্বী খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন।
৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুর আন লুশানের বিরুদ্ধে ট্যাং রাজবংশকে সহায়তার জন্য ৪,০০০ আরব সৈনিক পাঠান। যুদ্ধের পর সৈনিকরা চীনে থেকে যায়।[৭][৮][৯][১০][১১] আরব খলিফা হারুনুর রশিদ চীনের সাথে মিত্রতা স্থাপন করেন।[১২] ট্যাং বিবরণীতে আব্বাসীয়দের সাথে চীনের দরবারের সম্পর্ক লিপিবদ্ধ পাওয়া যায়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আব্বাস, বাগদাদের প্রতিষ্ঠাতা আল মনসুর, ও আরব্য রজনীতে অধিক উল্লেখিত হারুনুর রশিদ। ট্যাং রাজবংশের বিবরণীতে আব্বাসীয়দের ēiyī Dàshí, বা ” The Black-robed Arabs.” বলে উল্লেখ করা হয়।[১৩][১৪][১৫][১৬] হারুনুর রশিদ দূত পাঠানোর মাধ্যমে ট্যাং রাজবংশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন।[১২][১৭][১৮][১৯][২০][২১][২২][২৩] ইসলামি স্বর্ণযুগ
এসময় জ্যোতির্বিজ্ঞান, আলকেমি, গণিত, চিকিৎসা বিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞানসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আরব বিজ্ঞানীরা এগিয়ে ছিলেন।[২৪] বাগদাদে মোঙ্গল আক্রমণের আগ পর্যন্ত অতিক্রান্ত সময়কে ইসলামি স্বর্ণযুগ বলে গণ্য করা হয়।[২৫] আব্বাসীয়দের ক্ষমতায় আগমন ও রাজধানী দামেস্ক থেকে বাগদাদে স্থানন্তরের পর থেকে স্বর্ণযুগ শুরু হয়।[২৬] আব্বাসীয়রা কুরআন ও হাদিসের জ্ঞানের প্রতি উৎসাহমূলক বাণীতে অনুপ্রাণিত হয়। বাগদাদে বাইতুল হিকমা প্রতিষ্ঠা ও আব্বাসীয়দের জ্ঞানের প্রতি আগ্রহের কারণে এসময় মুসলিম বিশ্ব বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা, শিক্ষার বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হয়ে উঠে। মুসলিম ও অমুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের পন্ডিত ব্যক্তিরা বিশ্বের জ্ঞানকে আরবিতে অনুবাদ করার কাজে নিয়োজিত হন।[২৬] হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল এমন অনেক ধ্রুপদি কাজ আরবি ও ফারসিতে এবং পরবর্তীতে তুর্কি, হিব্রু, ও ল্যাটিনে অনুবাদ করা হয়।[২৬] মুসলিম বিশ্ব বিভিন্ন সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়ার স্থলে পরিণত হয় এবং প্রাচীন রোম, চীন, ভারত, পারস্য, মিশর, উত্তর আফ্রিকা, গ্রীক ও বাইজেন্টাইন সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যায়। [২৬] হারুনুর রশিদ ও তার উত্তরসুরিদের শাসনকালে ব্যাপকভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জন সম্পন্ন হয়। আব্বাসীয় খলিফারা সাসানীয় সাম্রাজ্যের আদলে নিজেদের প্রশাসনকে সাজান।[৩২] হারুনুর রশিদের পুত্র আল মামুন এমনকি একথা বলেন:
পারসিয়ানরা হাজার বছর শাসন করেছে এবং একদিনের জন্যও তাদের আরবদের সাহায্য প্রয়োজন হয়নি। আমরা তাদের এক বা দুই শতাব্দী শাসন করছি এবং এক ঘন্টাও তাদের ছাড়া করতে পারিনি।
[৩৩] মধ্যযুগের বেশ কিছু সংখ্যক চিন্তাবিদ ও বিজ্ঞানী ইসলামি বিজ্ঞানকে খ্রিষ্টান পাশ্চাত্যে পৌছানোয় ভূমিকা রাখেন। এই ব্যক্তিরা এরিস্টোটলকে খ্রিষ্টান ইউরোপে পরিচিত করান।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] অধিকন্তু এ যুগে ইউক্লিড ও টলেমির আলেক্সান্ড্রিয়ান গণিত, জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞান পুনরায় ফিরে আসে। ফিরে পাওয়া গাণিতিক প্রক্রিয়াগুলো পরবর্তীতে মুসলিম পন্ডিত, বিশেষ করে আল বিরুনি ও আবু নাসর মনসুরের মাধ্যমে বর্ধিত ও আরো উন্নত হয়।
খ্রিষ্টানরা (বিশেষ করে নেস্টোরিয়ান খ্রিষ্টান) উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে আরব ইসলামি সভ্যতার বিকাশে অবদান রাখে। তারা গ্রীক দার্শনিকদের রচনা সিরিয়াক ও পরবর্তীতে আরবিতে অনুবাদ করে।[৩৪][৩৫] নেস্টোরিয়ানরা আরব সংস্কৃতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।[৩৬] জুন্দশাপুরের শিক্ষালয় সাসানীয়, উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।[৩৭] প্রায় আট প্রজন্ম ধরে নেস্টোরিয়ান বুখতিশু পরিবার খলিফা ও অষ্টম থেকে একাদশ শতকের সুলতানদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে কাজ করে।[৩৮][৩৯] বিজ্ঞানী আল খোয়ারিজমি তার গ্রন্থ কিতাব আল জাবর ওয়াল মুকাবালাতে বীজগণিত নিয়ে আলোচনা করেন। এই গ্রন্থ থেকে ইংরেজি এলজেব্রা শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে। তাই তাকে বীজগণিতের জনক বলা হয়।[৪০] তবে অনেকে গ্রীক গণিতবিদ ডিওফেনটাসকে এই উপাধি দেয়। এলগোরিজম ও এলগরিদম পদদুটিও তার নাম থেকেই উদ্ভব হয়। তিনি ভারত উপমহাদেশের বাইরে আরবি সংখ্যা পদ্ধতি ও হিন্দু-আরবি সংখ্যা পদ্ধতি সূচনা করেন।
ইবনে আল হাইসাম (পাশ্চাত্যে আলহাজেন নামে পরিচিত) ১০২১ খ্রিষ্টাব্দে তার গ্রন্থ কিতাব আল মানাজিরে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিকাশ ঘটান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল তত্ত্বের সাথে পরীক্ষালব্ধ উপাত্তের সমন্বয়ের জন্য পরীক্ষণের ব্যবস্থা করা, যা মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। ইবনে আল হাইসাম বস্তু দেখার ক্ষেত্রে আলোর চোখের ভেতর প্রবেশের প্রমাণ দেন যা একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে ধরা হয়। ব্রেডলি স্টেফেনস ইবনে আল হাইসামকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিকাশ ঘটানোর জন্য “প্রথম বিজ্ঞানী” হিসেবে উল্লেখ করেন।[৪১][৪২][৪৩] আব্বাসীয় আমলে মুসলিম জগতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়ন ঘটে। ৯ম শতকে বাগদাদে ৮০০ জন চিকিৎসক ছিল এবং এনাটমি ও রোগের উপর ব্যাপক আবিষ্কার সম্পন্ন হয়। হাম ও গুটিবসন্তের মধ্যে পার্থক্য এসময় বর্ণিত হয়। খ্যাতনামা পারসিয়ান বিজ্ঞানী ইবনে সিনা (পাশ্চাত্যে আভিসেনা নামে পরিচিত) বিজ্ঞানীদের অর্জিত বিশাল পরিমাণ জ্ঞানকে লিপিবদ্ধ করেন এবং তার বিশ্বকোষ কানুন ফিততিব ও কিতাবুশ শিফার মাধ্যমে তা বেশ প্রভাববিস্তারকারী ছিল। তিনি ও আরো অনেকের গবেষণাকর্ম রেনেসার সময় ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের সরাসরি প্রভাবিত করে।
মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্বে জ্যোতির্বিজ্ঞান আল বাত্তানির মাধ্যমে বিকাশ লাভ করে। তিনি পৃথিবীর অক্ষের ঘূর্ণনের উপর গবেষণা করেন। আল বাত্তানি, ইবনে রুশদ, নাসিরুদ্দিন তুসি, মুয়ায়েদুদ্দিন উরদি ও ইবনে আল শাতির কর্তৃক ভূকেন্দ্রিক মডেলের সংশোধন পরবর্তীতে কোপারনিকাসের সৌরকেন্দ্রিক মডেলে ব্যবহৃত হয়।[৪৪] গ্রীকরা এস্ট্রোলেব নির্মাণ করলেও মুসলিম জ্যোতির্বিদ ও প্রকৌশলীরা এর বিকাশ ঘটান এবং এরপর তা মধ্যযুগের ইউরোপে পৌছায়।
মুসলিম আলকেমিস্টরা মধ্যযুগের ইউরোপীয় আলকেমিস্টদের প্রভাবিত করেন, বিশেষত জাবির ইবনে হাইয়ানের রচনার মাধ্যমে। পাতনসহ বেশ কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়া মুসলিম বিশ্বে উদ্ভব হয় এবং এরপর ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
ইসলামি বিশ্বে জন্ম নেয়া সবচেয়ে পরিচিত সাহিত্য হল সহস্র এক রজনীর গ্রন্থ যা আরব্য রজনী নামে পরিচিত। মূল ধারণা ইসলাম পূর্ব ইরানি উপাদান থেকে আসে। এর সাথে ভারতীয় উপাদানও যুক্ত হয়। এতে বাকি মধ্যপ্রাচ্যীয় ও উত্তর আফ্রিকান গল্পও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ১০ শতকে এটি রূপ লাভ করে এবং ১৪ শতকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছায়। পান্ডুলিপি ভেদে গল্পের সংখ্যা ও প্রকারে ভিন্নতা রয়েছে।[৪৫] আরব রূপকথাগুলোকে প্রায় অনুবাদে “আরব্য রজনী” বলা হয়।[৪৫] ১৮ শতকে এন্টইন গালান্ড কর্তৃক অনূদিত হওয়ার পর থেকে এই গ্রন্থ পাশ্চাত্যে প্রভাব বিস্তার করেছে।[৪৬] এর অনেক প্রতিরূপ, বিশেষত ফ্রান্সে, লেখা হয়েছে।[৪৭] গল্পগুলোর অনেক চরিত্র পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে সাংস্কৃতিক আইকন হয়ে উঠে, যেমন আলাদিন, সিনবাদ ও আলি বাবা।
মুসলিম কাব্যের অন্যতম প্রণয়াশ্রিত উদাহরণ হল লায়লা ও মজনু। এটি ইরানি, আজারবাইজানি ও অন্যান্য ফারসি, আজারবাইজানি, তুর্কি ও অন্যান্য তুর্কি ভাষার কবিদের হাতে রূপলাভ করে।[৪৮] এর উতপত্তিকাল ৭ম শতকে উমাইয়া আমলকে ধরা হয়। পরবর্তী সময়ের রোমিও জুলিয়েটের মত এটিও একটি ট্র্যাজিক গল্প।[৪৯] আব্বাসীয় আমলে আরবি কাব্য তার শীর্ষ স্থানে পৌছায়, বিশেষত কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়া ও পারস্যীয় রাজবংশগুলোর উত্থানের আগে। নবম শতকে আবু তামাম ও আবু নুয়াসের মত লেখকরা বাগদাদের খলিফার দরবারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিলেন। অন্যদিকে আল মুতানাব্বি আঞ্চলিক দরবার থেকে পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন।
“ইসলামি দর্শন” বলতে ইসলামি সংস্কৃতিতে গড়ে উঠা দর্শনের ধারাকে বোঝায়।[৫০] এটা শুধুমাত্র ধর্মীয় ব্যাপার হয় এবং শুধু মুসলিমরাই এতে অবদান রাখেনি।[৫০] এতে এরিস্টটলের কর্মের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ইজতিহাদের ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দার্শনিকদের মধ্যে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম দার্শনিকরা মৌলিক দার্শনিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। মধ্য যুগে খ্রিষ্টান দর্শনে তাদের চিন্তাগুলো আত্মীকৃত হয়েছে, বিশেষত টমাস আকুইনাস কর্তৃক।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] তিনজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ আল কিন্দি, আল ফারাবি ও ইবনে সিনা এরিস্টটেলিয়ানিজম ও নিওপ্লাটোনিজমকে অন্যান্য মতের সাথে সমন্বিত করেন। এর ফলে আভিসিনিজম প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম খিলাফতের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিকরা ছিলেন আল জাহিজ ও আল হাসান।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে মুসলিম বিশ্ব চীনের কাছ থেকে কাগজ উৎপাদনের কৌশল গ্রহণ করে। কাগজের ব্যবহার চীন থেকে অষ্টম শতকে মুসলিম বিশ্বে ও দশম শতকে স্পেন ও বাকি ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এটি নির্মাণ করা পার্চমেন্ট থেকে সহজ ছিল এবং প্যাপিরাসের মত ভেঙে যেত না। লিখিত বিবরণ ও কুরআনের কপি করার জন্য এর উপযোগীতা ছিল। লিনেন থেকে কাগজ প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া মুসলিম বিশ্ব থেকে বাকি পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।[৫১] বারুদ তৈরীর প্রক্রিয়াও চীন থেকে মুসলিম বিশ্বের মাধ্যমে বিস্তৃত হয়।[৫২][৫৩] বায়ুকলের ব্যবহারের ফলে সেচ ও কৃষিতে এসময় অগ্রগতি সাধিত হয়। আন্দালুসের মাধ্যমে শস্য, বিশেষত এলমন্ড ও সাইট্রাস ইউরোপে আসত। এসময় ইউরোপীয়রা চিনি উৎপাদন ধীরে ধীরে গ্রহণ করে। নীল নদ, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস ছাড়া নৌবহনের অনুকূল বৃহৎ নদী ছিল না বিধায় সমুদ্রপথে পরিবহন খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেক্সটেন্টের (কামাল বলে পরিচিত ছিল) ব্যবহারের মাধ্যমে নৌচালনাবিদ্যা উৎকর্ষতা লাভ করে। এসময়ের মানচিত্রের সাথে তুলনা করলে নাবিকরা উপকূলের কিনারা ধরে যাতায়াতের পরিবর্তে সমুদ্রের মধ্য দিয়ে চলাচলে বেশি সক্ষম ছিলেন। ভূমধ্যসাগরে বৃহৎ তিন মাস্তুলবিশিষ্ঠ বাণিজ্যিক জাহাজ পুনরায় চালু করায় মুসলিম নাবিকদের অবদান রয়েছে। আরবি নৌকা কারিব থেকে ক্যারাভেল নামটি এসেছে বলে ধারণা করা হয়।[৫৪]১৬ শতাব্দীতে পর্তুগিজদের আগমনের আগ পর্যন্ত ভারত মহাসাগরে আরব বণিকরা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। এই বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল হরমুজ। ভূমধ্যসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জটিল নেটওয়ার্ক ছিল। এর মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলো একে অন্যের সাথে ও ইউরোপীয় শক্তিসমূহ যেমন ভেনিস, জেনোয়া ও কাটালোনিয়ার সাথে বাণিজ্যে অংশ নিত। সিল্ক রোড মধ্য এশিয়া পার হয়ে চীন ও ইউরোপের মধ্যবর্তী মুসলিম দেশগুলোর মধ্য দিয়ে যেত।
মুসলিম প্রকৌশলীরা শিল্পক্ষেত্রে জলশক্তিকে ব্যবহার করেন। প্রথমদিকে স্রোতশক্তি, বায়ুশক্তি ও পেট্রোলিয়াম (বিশেষত কেরোসিনে পাতনের মাধ্যমে) ব্যবহার করা হত। মুসলিম বিশ্বে পানিকল ব্যবহার সপ্তম শতকে শুরু হয়। আনুভূমিক চাকা ও উলম্ব চাকার পানিকল নবম শতকে বেশ মাত্রায় ব্যবহৃত হত। ক্রুসেডের সময় আন্দালুস ও উত্তর আফ্রিকা থেকে মধ্য প্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি প্রদেশে এসব কলের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। এসব কল বেশ মাত্রায় কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হত।[৫৫] মুসলিম প্রকৌশলীরা পাম্পের মত যন্ত্রও উদ্ভাবন করেন। এসবে ক্র্যাঙ্কশ্যাফট ব্যবহার করা হয়।[৫৬] কল ও পানি উত্তোলনকারী যন্ত্রগুলোতে গিয়ারের ব্যবহার হয়। পানিকলে অতিরিক্ত শক্তি সরবরাহ করার জন্য বাধ নির্মাণ করা হয়। এসব অগ্রগতির ফলে পূর্বে দৈহিক শ্রমে করা কাজগুলো সহজে করা সম্ভব হয়। শিল্পক্ষেত্রে জলশক্তির ব্যবহার মুসলিম বিশ্ব থেকে খ্রিষ্টান স্পেনে এসেছে এ নিয়ে আলোচনা হয় থাকে।[৫৭] আরব কৃষি বিপ্লবের সময় বেশ কিছু শিল্প বিকাশ লাভ করে। এর মধ্যে রয়েছে বয়নশিল্প, দড়ি প্রস্তুত, গালিচা, রেশম ও কাগজ। রসায়ন ও যন্ত্র নির্মাণের জ্ঞানের মাধ্যমে ১২শ শতকে ল্যাটিন অনুবাদ বিস্তার লাভ করে।[৫৮] এযুগে কৃষি ও হস্তশিল্প উচ্চ মাত্রায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।[৫৯] আব্বাসীয়রা উমাইয়া আমলে অনারবদের প্রতি সামাজিক অসাম্যের ফলে সৃষ্ট অসন্তোষের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও সাম্রাজ্য দ্রুত আরব পরিচয় ধারণ করে। জ্ঞান আরবি ভাষায় সাম্রাজ্য জুড়ে আদানপ্রদান করা হত। বিভিন্ন জাতির লোকেরা তাদের দৈনন্দিক জীবনে আরবি বলা শুরু করে। অন্য ভাষা থেকে রচনা আরবিতে অনুবাদ করা হয়। এক নতুন ইসলামি পরিচয় জন্মলাভ করে যাতে পূর্ব সময়ের আরব সংস্কৃতির সাথে মিথস্ক্রিয়া করে। এ সংস্কৃতি ইউরোপে বিস্ময়কর ছিল।[৬০] • শিয়াদের সাথে বিভেদ
আব্বাসীয়রা শিয়াদের সাথে পাল্টা অবস্থানে ছিল। উমাইয়াদের সাথে লড়াইয়ে শিয়ারা সমর্থন দিয়েছিল। আব্বাসীয় ও শিয়া উভয়েই মুহাম্মদ (সা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্কের কারণে আইনগত বৈধতা দাবি করেছিল। ক্ষমতায় থাকাকালে আব্বাসীয়রা সুন্নি মতাদর্শকে ধারণ করে এবং শিয়াদের সমর্থন দান থেকে বিরত থাকে। এরপর অল্প সময় পর বার্বা‌র খারিজিরা ৮০১ সালে উত্তর আফ্রিকায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। ৫০ বছরের মধ্যে মাগরেবের ইদ্রিসি ও ইফ্রিকিয়ার আগলাবি ও এর অল্পকাল পর মিশরের ইকশিদি ও তুলিনিরা কার্যকরীভাবে আফ্রিকার স্বাধীনতা লাভ করে।
• সেনাপতিদের সংঘাত
আল রাদির সময় আব্বাসীয় কর্তৃত্ব ভেঙে যেতে থাকে। এসময় তাদের তুর্কি বংশোদ্ভূত সেনাপতিরা খিলাফতকে অর্থ প্রদান বন্ধ করে দেয়। এসব সেনাপতিরা কার্যত স্বাধীন ছিল। এমনকি বাগদাদের কাছের প্রদেশগুলোও আঞ্চলিক রাজবংশের শাসন দাবি করতে থাকে।
এছাড়াও আব্বাসীয়দের প্রায় স্পেনের উমাইয়াদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হত।
৮ম শতাব্দীর শেষার্ধে বেশ কয়েকজন প্রতিযোগী খলিফা ও তাদের উজিরদের মাধ্যমে আব্বাসীয় নেতৃত্বকে কঠোর চেষ্টা করতে হয় যাতে সাম্রাজ্যের দূর বিস্তৃতির ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সমাধান করা যায়। বিস্তৃত সাম্রাজ্য জুড়ে সীমাবদ্ধ যোগাযোগ যোগাযোগ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রশাসনিক পরিবর্তনও বিবেচনায় ছিল।[৬১] বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে আব্বাসীয়রা সিরিয়া ও আনাতোলিয়ায় লড়াইয়ে লিপ্ত থাকার সময় সামরিক অভিযান কম করা হত। খিলাফত আভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগ দিয়েছিল। আঞ্চলিক শাসনকর্তারা বেশি স্বায়ত্ত্বশাসন লাভ করে নিজেদের অবস্থান বংশগত করে ফেলা খলিফার কাছে সমস্যার কারণ ছিল।[৬] একই সময়ে আব্বাসীয়রা আভ্যন্তরীণ আরেকটি সমস্যার মুখোমুখি হয়। প্রাক্তন আব্বাসীয় সমর্থকরা সম্পর্কছেদ করে খোরাসানের আশেপাশে পৃথক রাজ্য স্থাপন করে। হারুনুর রশিদ বারমাকিদের হটিয়ে দেন।[৬২] একই সময়কালে বেশ কিছু ভাঙন দেখা দেয়। এসবে জড়িতরা অন্যান্য ভূমির জন্য সাম্রাজ্য ত্যাগ বা সাম্রাজ্যের দূরবর্তী স্থানে অধিকার নিতে সচেষ্ট ছিল।

তাজিকিস্তানের মুদ্রায় খোরাসানের আমির ইসমাইল সামানির ছবি। তিনি আব্বাসীয়দের থেকে স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনা করেন।
৮২০ সাল নাগাদ সামানিরা ট্রান্সঅক্সিয়ানা ও বৃহত্তর খোরাসানে স্বাধীন কর্তৃত্ব অর্জন করে। শিয়া হামদানিরা উত্তর সিরিয়ায় এবং ইরানের তাহিরি ও সাফারি রাজবংশের উত্তরসুরি হয়। বিশেষত সামারার নৈরাজ্যের পর আব্বাসীয় কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে প্রদেশগুলোতে কেন্দ্রবিমুখী প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। ১০ম শতাব্দীর প্রথম নাগাদ আব্বাসীয়রা ইরাকের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং তা বিভিন্ন আমিরদের হাতে চলে যায়। খলিফা আল রাদি আমিরুল উমারা পদ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা মেনে নিতে বাধ্য হন। এর অল্পকাল পর দায়লাম থেকে বুইয়িরা উত্থান লাভ করে এবং বাগদাদের আমলাতন্ত্রে স্থান করে নেয়। ইবনে মিশকায়িয়ার মতানুযায়ী তারা তাদের সমর্থকদের ইকতা (কর খামার গঠনের জন্য জায়গির) বন্টন করতে থাকে।
অষ্টম শতকের শেষ নাগাদ আব্বাসীয়রা যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষমতা হারায়। ৭৯৩ সালে ইদ্রিসি রাজবংশ ফেজ থেকে মরক্কো পর্যন্ত একটি রাষ্ট্র স্থাপন করে। একই সময় আব্বাসীয় গভর্নরদের একটি পরিবারের ক্ষমতা বৃদ্ধি লাভ করতে থাকে এবং ৮৩০ এর দশকে তারা আগলাবি আমিরাত স্থাপন করে। ৮৬০ এর দশক নাগাদ মিশরের গভর্নররা তাদের নিজস্ব তুলুনি আমিরাত গঠন করে। প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ ইবনে তুলুনের নামে এর নাম করণ করা হয়। এরপর থেকে মিশর খলিফা থেকে পৃথক হয়ে রাজবংশের হাতে শাসিত হতে থাকে। পূর্বাঞ্চলেও গভর্নররা কেন্দ্র থেকে নিজেদের পৃথক করে নেয়। হেরাতের সাফারি ও বুখারার সামানিরা ৮৭০ এর দশকে সম্পর্কচ্ছেদ করে এবং পারস্যায়িত সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র গড়ে তোলে। এসময় শুধু মেসোপটেমিয়ার কেন্দ্রীয় অঞ্চল সরাসরি আব্বাসীয় নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফিলিস্তিন ও হেজাজ প্রায় তুলুনিরা নিয়ন্ত্রণ করত। আনাতোলিয়ায় বাইজেন্টাইনরা আরব মুসলিমদের আরও পূর্বদিকে ঠেলে দেয়।
৯২০ এর দশক নাগাদ অবস্থা আরো বদলে যায়। প্রথম পাঁচ ইমামকে মান্য করা শিয়াদের একটি গোষ্ঠী যারা মুহাম্মদ (সা) এর কন্যা ফাতিমার সাথে নিজেদের রক্তসম্পর্ক দাবি করত তারা ইদ্রিসি ও আগলাবিদের কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এই নতুন রাজবংশ ফাতেমীয় নামে পরিচিত হয়। ৯৬৯ সালে তারা মিশরের দিকে অগ্রসর হয় এবং মিশরের ফুসতাতে রাজধানী স্থাপন করে। একে তারা শিয়া শিক্ষা ও রাজনীতির মূল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে। ১০০০ সাল নাগাদ ফাতেমীয়রা সুন্নিদের আব্বাসীয়দের কাছে একটি আদর্শগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। এসময় আব্বাসীয় শাসন বেশ কিছু গভর্নরদের মধ্যে বিভক্ত ছিল এবং বাগদাদের খলিফার কর্তৃত্ব আগের মত শক্ত ছিল না। এসকল শাসনকর্তারা নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ে লিপ্ত থাকতেন। খলিফা নিজে বুইয়ি আমিরের নিরাপত্তায় ছিলেন। বুইয়ি আমির সমগ্র ইরাক ও পশ্চিম ইরানের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন।
ইরাকের বাইরের স্বাধীন প্রদেশগুলো ধীরে ধীরে বংশগত শাসকদের আওতায় চলে আসে। এসব স্থানে খলিফার অবস্থান ছিল আনুষ্ঠানিক। মাহমুদ গজনভি বহুল প্রচলিত “আমির” পদবীর স্থলে “সুলতান” পদবী ধারণ করেন। ১১ শতকে খলিফার অবস্থান আরো হ্রাস পায় যখন কিছু মুসলিম শাসক জুমার খুতবায় তার নাম উল্লেখ করার প্রথা থেকে সরে আসেন ও নিজেদের নামে মুদ্রা জারি করেন।[৬১] কায়রোর ফাতেমীয়রা মুসলিম বিশ্বের কর্তৃত্বের ব্যাপারে আব্বাসীয়দের সাথে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হন। বাগদাদ আব্বাসীয় খলিফাদের কেন্দ্র হলেও সেখানকার শিয়াদের মধ্যে ফাতেমীয়রা কিছু সমর্থন লাভ করে। ফাতেমীয়দের পতাকা ছিল সবুজ ও আব্বাসীয়দের পতাকা ছিল কালো। ফাতেমীয়দের সাথে এই প্রতিদ্বন্দ্বীতা ১২ শতকে সমাপ্তি ঘটে।
এই তালিকায় আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের ভাঙনের পর জন্ম নেয়া মুসলিম রাজবংশসমূহের উল্লেখ রয়েছে। এসব রাজবংশ কখনো তাদের অধীনস্ত কোনো আমিরের বিদ্রোহের ফলে সমাপ্ত হত। মিশরের ফাতেমীয় খিলাফত, স্পেনের কর্ডোবা খিলাফত ও আলমোহাদ খিলাফত ছাড়া প্রত্যেক মুসলিম রাজবংশ আব্বাসীয় খলিফার আনুষ্ঠানিক সার্বভৌমত্ব মেনে চলত ও তাকে বিশ্বাসীদের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিত।
• উত্তরপশ্চিম আফ্রিকা: ইদ্রিসি (৭৮৮-৯৭৪) → আলমোরাভি (১০৪০) → আলমোহাদ (১১২০-১২৬৯)।
• ইফ্রিকিয়া (আধুনিক তিউনিশিয়া, পূর্ব আলজেরিয়া ও পশ্চিম লিবিয়া): আগলাবি (৮০০-৯০৯) → মিশরের ফাতেমীয় খিলাফত (৯০৯-৯৭৩) → জিরি (৯৭৩-১১৪৮) → আলমোহাদ (১১৪৮-১২২৯) → হাফসি রাজবংশ (১২২৯-১৫৭৪)।
• (মিশর ও ফিলিস্তিন): তুলুনি (৮৬৮-৯০৫) → ইখশিদি (৯৩৫-৯৬৯) → ফাতেমীয় খিলাফত (৯০৯-১১৭১) → আইয়ুবীয় (১১৭১-১৩৪১) → মামলুক → (১২৫০-১৫১৭)।
• আল জাজিরা (আধুনিক সিরিয়া ও উত্তর ইরাক): হামদানি (৮৯০-১০০৪) → মারওয়ানি ও উকায়লিদি (৯৯০-১০৮৫) → সেলজুক (১০৩৪-১১৯৪) → মঙ্গোল সাম্রাজ্য ও ইলখানাত (১২৩১-১৩৩৫)।
• দক্ষিণপশ্চিম ইরান: বুইয়ি (৯৩৪-১০৫৫) → সেলজুক (১০৩৪-১১৯৪) → মঙ্গোল সাম্রাজ্য।
• খোরাসান (আধুনিক ইরান, আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান): সামানি (৮১৯-৯৯৯) → গজনভি (৯৬২-১১৬৮) → সেলজুক (১০৩৪-১১৯৪) → ঘুরি (১০১১-১২১৫) → খাওয়ারেজমি (১০৭৭-১২৩১) → মঙ্গোল সাম্রাজ্য ও ইলখানাত (১২৩১-১৩৩৫)।
• ট্রান্সওক্সিয়ানা (আধুনিক মধ্য এশিয়া): সামানি (৮১৯-৯৯৯) → কারাখানি (৮৪০-১২১২) → খাওয়ারেজমি (১০৭৭-১২৩১) → মঙ্গোল সাম্রাজ্য ও চাগতাই খানাত (১২২৫-১৬৮৭)।
বুইয়ি ও সেলজুক সামরিক নিয়ন্ত্রণ (৯৭৮-১১১৮)
বুইয়ি আমিরদের ক্ষমতা সত্ত্বেও বাগদাদে আব্বাসীয়দের হাতে একটি কার্যকর দরবার ছিল। বুইয়ি আমলা হিলালুল সাবির বর্ণনায় এমন কথা পাওয়া যায়। বাগদাদ ও ধর্মীয় জীবনে তাদের প্রভাব ছিল। বাহাউদ্দৌলার মৃত্যুর পর বুইয়িদের ক্ষমতা হ্রাস পেলে খিলাফত কিছু সামর্থ পুনরুদ্ধারে সমর্থ হয়। উদাহরণস্বরূপ খলিফা আল কাদির বাগদাদ মেনিফেস্টোর মত রচনা দ্বারা শিয়াদের বিরুদ্ধে আদর্শগত লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। খলিফা নিজে বাগদাদের আইনশৃংখলা বজায় রাখেন এবং রাজধানীতে ফিতনা ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে সচেষ্ট হন।
বুইয়ি রাজবংশের অবনতির পর তাদের ফাকা স্থলে অঘুজ তুর্কি ও সেলজুকরা জায়গা করে নেয়। আমির ও প্রাক্তন দাস বাসিরি ১০৫৮ সালে শিয়া ফাতেমীয় পতাকা নিয়ে বাগদাদে আসলে খলিফা আল কাইম বাইরের সাহায্য ছাড়া তাকে প্রতিরোধে অসমর্থ ছিলেন। সেলজুক সুলতান তুগরিল বেগ বাগদাদে সুন্নি শাসন পুনপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং ইরাককে তার রাজবংশের জন্য নিয়ে নেন। আরেকবার আব্বাসীয়দেরকে অন্য একটি সামরিক শক্তির সাথে ভারসাম্য স্থাপন করতে হয়। এসময় খলিফা ইসলামি বিশ্বের প্রধান ছিলেন। পরবর্তী সুলতান আল্প আরসালান ও প্রথম মালিকশাহ ও উজির নিজামুল মুলক পারস্য অবস্থান করতেন কিন্তু বাগদাদের আব্বাসীয়দের উপরও তাদের প্রভাব ছিল। ১২ শতকে এই রাজবংশ দুর্বল হতে থাকলে আব্বাসীয়রা পুনরায় অধিক ক্ষমতা লাভ করতে থাকে।
সামরিক শক্তির পুনরুত্থান (১১১৮-১২০৬)
যুদ্ধে সেলজুকদের সাথে লড়াই করতে সক্ষম সেনাবাহিনী প্রথমবার খলিফা আল মুসতারসিদ গড়ে তুলেন। তবে ১১৩৫ সালে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। খলিফা আল মুকতাফি উজির ইবনে হুবায়রার সহায়তায় খিলাফতের সামরিক স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। বাইরের রাজবংশগুলোর প্রভাবাধীন অবস্থার প্রায় ২৫০ বছর পর বাগদাদ অবরোধের সময় সেলজুকদের বিরুদ্ধে বাগদাদকে তিনি সফলভাবে প্রতিরক্ষা করতে সক্ষম হন। এর ফলে ইরাক আব্বাসীয়দের জন্য সুরক্ষিত হয়। আল নাসিরের শাসনামলে খিলাফত ইরাকজুড়ে শক্ত অবস্থান লাভ করে।
মঙ্গোল আক্রমণ (১২০৬-১২৫৮)] ১২০৬ সালে চেঙ্গিস খান মধ্য এশিয়ার মঙ্গোলদের মধ্যে শক্তিশালী রাজ্য গড়ে তোলেন। ১৩ শতাব্দীতে এই মঙ্গোল সাম্রাজ্য অধিকাংশ ইউরেশিয়ান অঞ্চল জয় করে ফেলে। ১২৫৮ সালে হুলাগু খানের বাগদাদ ধ্বংস করার ঘটনা ইসলামি স্বর্ণযুগের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হয়।[৬৩] মঙ্গোলদের আশংকা ছিল যে মুহাম্মদ (সা) এর চাচার বংশধর আল মুসতাসিমকে হত্যা করা হলে অলৌকিক দুর্যোগ হানা দেবে।[৬৪] পারস্যের শিয়ারা বলে যে শিয়া ইমাম হুসাইন বিন আলির মৃত্যুর পর এমন কোনো দুর্যোগ হয়নি। রাজকীয় রক্ত না ঝরানোর মঙ্গোল রীতি তাই অগুরুত্বপূর্ণ ঠেকে। হুলাগু খান ১২৫৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আল মুসতাসিমকে কার্পেটে মুড়ে ঘোড়ার সাহায্যে পদদলিত করে হত্যা করেন। খলিফার পরিবারকেও হত্যা করা হয়। তার কনিষ্ঠ পুত্রকে বাচিয়ে রাখা হয় ও মঙ্গোলিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। এক কন্যাকে হুলাগু খানের হারেমে দাসি হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়।[৬৫] মঙ্গোলিয়ান ইতিহাসবিদদের মতে বেঁচে যাওয়া পুত্রটি বিয়ে করে ও তার সন্তানসন্ততি হয়।] কায়রোর আব্বাসীয় খিলাফত (১২৬১-১৫১৭
নবম শতাব্দীতে আব্বাসীয়রা খলিফার প্রতি অনুগত সেনাবাহিনী গঠন করে। এতে অনারবদের থেকে লোক নেয়া হয়েছিল যাদের মামলুক বলা হত।[৬৬][৬৭][৬৮][৬৯][৭০] আল মামুন ও তার ভাই আল মুতাসিমের শাসনকালে গঠিত এই সেনাবাহিনী সাম্রাজ্যের পরবর্তী ভাঙন রোধ করে। প্রথমদিকে এরা সরকারকে আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সমস্যা বিষয়ে সাহায্য করত। আল মুতাসিম কর্তৃক বাগদাদ থেকে সামারায় রাজধানী স্থানান্তর খিলাফতের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে। অধিকন্তু আল রাদি মুহাম্মদ বিন রাইকের হাতে অধিকাংশ রাজকীয় কর্ম তুলে দেয়ার আগ পর্যন্ত মামলুকদের ক্ষমতা বৃদ্ধি থাকে।] মামলুকরা মিশরের ক্ষমতায় চলে আসে। মঙ্গোলদের হাতে বাগদাদের পতনের পর ১২৬১ সালে মামলুকরা কায়রোতে আব্বাসীয় খিলাফত পুনপ্রতিষ্ঠা করে। কায়রোর প্রথম আব্বাসীয় খলিফা ছিলেন আল মুসতানসির। তৃতীয় আল মুতাওয়াক্কিলের সময় পর্যন্ত কায়রোর আব্বাসীয় খিলাফত টিকে ছিল। প্রথম সেলিম তাকে কনস্টান্টিনোপলে বন্দী হিসেবে নিয়ে যান। কায়রো ফিরে আসার পর ১৫৪৩ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
বাসতাকের আব্বাসীয় খানাত] ১২৫৮ সালে বাগদাদের পতনের পর আব্বাসীয় রাজবংশের কিছু বেঁচে যাওয়া সদস্য তাদের জ্যেষ্ঠ দ্বিতীয় ইসমাইল বিন হামজা বিন আহমেদ বিন মুহাম্মদের নেতৃত্ব দক্ষিণ পারস্যের ফারস অঞ্চলে চলে যায়।[৭১][৭২] তারা খোনজ শহরে অবস্থান নেয়। এটি এসময় জ্ঞান অর্জনের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। শেখ আবদুস সালাম খোনজি বিন আব্বাস বিন দ্বিতীয় ইসমাইল বাগদাদের পতনের পাঁচ বছর পর খোনজে জন্ম লাভ করেন।[৭৩][৭৪] তিনি একজন বড় ধর্মীয় পন্ডিত ও সুফি হন। স্থানীয় জনতা তাকে শ্রদ্ধা করত। তার মাজার খোনজে রয়েছে।
শেখ আবদুস সালামের বংশধররা ধর্মীয় পন্ডিত ছিলেন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে সম্মানিত হতেন। তেমন একজন শেখ মুহাম্মদ (মৃত্যু আনুমানিক ৯০৫ হিজরি) বাসতাক চলে আসেন।[৭৫][পৃষ্ঠা নম্বর] তার নাতি শেখ মুহাম্মদ বিন শেখ নাসিরউদ্দিন আহমেদ বিন শেখ মুহাম্মদ খোনজে কিছু সময়ের জন্য বসতি করেছিলেন। কিন্তু ৯৩৮ হিজরি বর্ধমান সাফাভি শক্তির কারণে তিনি স্থায়ীভাবে তার দাদার মত বাসতাকে চলে আসেন।[৭৬] তার নিজের নাতি শেখ হাসান (মৃত্যু ১০৮৪ হিজরি) (মোল্লা হাসান বলেও পরিচিত) বাসতাকের আব্বাসীয়দের সাধারণ বংশধর।[৭৭] শেখ হাসানের নাতি শেখ মুহাম্মদ সাইদ (জন্ম ১০৯৬ হিজরি-মৃত্যু ১১৫২ হিজরি) ও শেখ মুহাম্মদ খান (জন্ম ১১১৩ হিজরি-মৃত্যু ১১৯৭ হিজরি) এই অঞ্চলের প্রথম আব্বাসীয় শাসক। ১১৩৭ হিজরি শেখ মুহাম্মদদ সাইদ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সমর্থন জড়ো করতে থাকেন। লার দখলের পর তিনি মৃত্যুর ১১৫২ হিজরিতে মৃত্যূর আগ পর্যন্ত ১২ বা ১৪ বছর এই শহর ও এর উপর নির্ভরশীল অঞ্চলগুলো শাসন করতেন।[৭৮] তার ভাই শেখ মুহাম্মদ খান বাসতাকি এরপর বাসতাক ও জাহানগিরিয়া অঞ্চলের শাসক হন। ১১৬১ হিজরিতে শেখ মুহাম্মদ খান বাসতাকি দিদেহবান দুর্গের উদ্দেশ্যে বের হন এবং বাস্তাক ও এর অঞ্চলসমূহ তার বড় ভাইয়ের পুত্র শেখ মুহাম্মদ সাদিক ও তার চাচাত ভাই আগা হাসান খানের হাতে অর্পণ করেন।[৭৯] শেখ মুহাম্মদ খান প্রায় ২০ থেকে ২৪ বছর দিদেহবান দুর্গ থেকে জাহানগিরিয়া শাসন করেন। একারণে তাকে শেখ মুহাম্মদ “দিদেহবান” বলা হয়।[৮০] এরপর তিনি বাসতাক ফিরে আসেন এবং আমৃত্যু সেখান থেকে শাসন করে যান। তার শাসনের সর্বোচ্চ সীমায় বাসতাক খানাতে শুধু জাহানগিরিয়া ছাড়াও লার ও বন্দর আব্বাস ও এসবের উপর নির্ভরশীল এলাকাগুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল।[৮১][৮২][৮৩][৮৪][৮৫] শেখ মুহাম্মদ খান বাসতাকি “খান” উপাধিধারী বাসতাকের প্রথম আব্বাসীয় শাসক। এরপর সকল আব্বাসীয় শাসকের ক্ষেত্রে “খান” উপাধিটি ব্যবহার হতে থাকে।
বাসতাক ও জাহানগিরিয়ার সর্বশেষ আব্বাসীয় শাসক ছিলেন মুহাম্মদ আজম খান বানিআব্বাসিয়ান। তিনি তারিখে জাহানগিরিয়া ওয়া বনিআব্বাসিয়ানে বাসতাক গ্রন্থ রচনা করেছেন।[৮৬] এতে এই অঞ্চলের ইতিহাস ও এর শাসনকর্তা আব্বাসীয় পরিবারের বর্ণনা রয়েছে। মুহাম্মদ আজম খান বনিআব্বাসিয়ান ১৯৬৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এ বছরকে বাসতাকের আব্বাসীয় শাসনের সমাপ্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।
আব্বাসীয় খলিফাদের তালিকা

আব্বাসীয় পরিবারের বংশলতিকা। সবুজ রং দ্বারা বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা ও হলুদ রং দ্বারা কায়রোর আব্বাসীয় খলিফা চিহ্নিত। আব্বাসীয়দের সাথে আত্মীয়তা দেখানোর জন্য মুহাম্মদ (সা) এর নামও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
# খলিফা হিজরি খ্রিষ্টাব্দ
আব্বাসীয় খিলাফতের খলিফা
১ আস সাফাহ
১৩১–১৩৬ ৭৫০–৭৫৪
২ আল মনসুর
১৩৬–১৫৮ ৭৫৪–৭৭৫
৩ আল মাহদি
১৫৮–১৬৯ ৭৭৫–৭৮৫
৪ আল হাদি
১৬৯–১৭০ ৭৮৫–৭৮৬
৫ হারুনুর রশিদ
১৭০–১৯৩ ৭৮৬–৮০৯
৬ আল আমিন
১৯৩–১৯৮ ৮০৯–৮১৩
৭ আল মামুন
১৯৮–২১৮ ৮১৩–৮৩৩
৮ আল মুতাসিম
২১৮–২২৭ ৮৩৩–৮৪২
৯ আল ওয়াসিক
২২৭–২৩২ ৮৪২–৮৪৭
১০ আল মুতাওয়াক্কিল
২৩২–২৪৭ ৮৪৭–৮৬১
১১ আল মুনতাসির
২৪৭–২৪৮ ৮৬১–৮৬২
১২ আল মুসতাইন
২৪৮–২৫২ ৮৬২–৮৬৬
১৩ আল মুতাজ
২৫২–২৫৫ ৮৬৬–৮৬৯
১৪ আল মুহতাদি
২৫৫–২৫৬ ৮৬৯–৮৭০
১৫ আল মুতামিদ
২৫৭–২৭৯ ৮৭০–৮৯২
১৬ আল মুতাদিদ
২৭৯–২৮৯ ৮৯২–৯০২
১৭ আল মুকতাফি
২৮৯–২৯৫ ৯০২–৯০৮
১৮ আল মুকতাদির
২৯৫–৩২০ ৯০৮–৯৩২
১৯ আল কাহির
৩২০–৩২২ ৯৩২–৯৩৪
২০ আল রাদি
৩২২–৩২৯ ৯৩৪–৯৪০
২১ আল মুত্তাকি
৩২৯–৩৩৪ ৯৪০–৯৪৪
২২ আল মুসতাকফি
৩৩৪–৩৩৬ ৯৪৪–৯৪৬
২৩ আল মুতি
৩৩৬–৩৬৩ ৯৪৬–৯৭৪
২৪ আল তাই
৩৬৩–৩৮১ ৯৭৪–৯৯১
২৫ আল কাদির
৩৮২–৪২২ ৯৯১–১০৩১
২৬ আল কাইম
৪২২–৪৬৮ ১০৩১–১০৭৫
২৭ আল মুকতাদি
৪৬৮–৪৮৭ ১০৭৫–১০৯৪
২৮ আল মুসতাজির
৪৮৭–৫১২ ১০৯৪–১১১৮
২৯ আল মুসতারশিদ
৫১২-৫৩০ ১১১৮–১১৩৫
৩০ আর রশিদ
৫৩০–৫৩১ ১১৩৫–১১৩৬
৩১ আল মুকতাফি
৫৩১–৫৫৫ ১১৩৬–১১৬০
৩২ আল মুসতানজিদ
৫৫৫–৫৬৬ ১১৬০–১১৭০
৩৩ আল মুসতাদি
৫৬৬–৫৭৬ ১১৭০–১১৮০
৩৪ আন নাসির
৫৭৬–৬২২ ১১৮০–১২২৫
৩৫ আজ জহির
৬২২–৬২৩ ১২২৫–১২২৬
৩৬ আল মুসতানসির
৬২৩–৬৪০ ১২২৬–১২৪২
৩৭ আল মুসতাসিম
৬৪০–৬৫৬ ১২৪২–১২৫৮
কায়রোর খলিফা
৩৯ দ্বিতীয় আল মুসতানসির
৬৫৯–৬৬০ ১২৬১–১২৬২
৪০ প্রথম আল হাকিম
৬৬০–৭০২ ১২৬২–১৩০২
৪১ প্রথম আল মুসতাকফি
৭০২–৭৪১ ১৩০৩–১৩৪০
৪২ প্রথম আল ওয়াসিক
৭৪১–৭৪২ ১৩৪০–১৩৪১
৪৩ দ্বিতীয় আল হাকিম
৭৪২–৭৫৩ ১৩৪১–১৩৫২
৪৪ প্রথম আল মুতাদিদ
৭৫৩–৭৬৪ ১৩৫২–১৩৬২
৪৫ প্রথম আল মুতাওয়াক্কিল
৭৬৪–৭৮৫ ১৩৬২–১৩৮৩
৪৬ দ্বিতীয় আল ওয়াসিক
৭৮৫–৭৮৮ ১৩৮৩–১৩৮৬
৪৭ আল মুতাসিম
৭৮৮–৭৯১ ১৩৮৬–১৩৮৯
৪৮ প্রথম আল মুতাওয়াক্কিল (পুনরায় ক্ষমতালাভ) ৭৯১–৮০৯ ১৩৮৯–১৪০৬
৪৯ আল মুসতাইন
৮০৯–৮১৭ ১৪০৬–১৪১৪
৫০ দ্বিতীয় আল মুতাদিদ
৮১৭–৮৪৫ ১৪১৪–১৪৪১
৫১ দ্বিতীয় আল মুসতাকফি
৮৪৫–৮৫৫ ১৪৪১–১৪৫১
৫২ আল কাইম
৮৫৫–৮৫৯ ১৪৫১–১৪৫৫
৫৩ আল মুসতানজিদ
৮৫৯-৮৮৪ ১৪৫৫–১৪৭৯
৫৪ দ্বিতীয় আল মুতাওয়াক্কিল
৮৮৪–৯০২ ১৪৭৯–১৪৯৭
৫৫ আল মুসতামসিক
৯০২–৯১৪ ১৪৯৭–১৫০৮
৫৬ তৃতীয় আল মুতাওয়াক্কিল
৯১৪–৯২৩ ১৫০৮–১৫১৭
আস সাফাহ
আবুল আব্বাস আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আস সাফাহ বা আবুল আব্বাস আল সাফাহ (আরবি: ‘‎أبو العباس عبد الله بن محمد السفاح) (জন্ম ৭২১/৭২২ খ্রিষ্টাব্দ – মৃত্যু. ৯ জুন ৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দ, শাসনকাল ৭৪৯–৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন প্রথম আব্বাসীয় খলিফা। ইসলামের ইতিহাসে আব্বাসীয় খিলাফত অন্যতম দীর্ঘতম ও গুরুত্বপূর্ণ খিলাফত।
আস সাফাহ
আব্বাসীয় খিলাফত
জন্ম: ৭২১ মৃত্যু: ৭৫৪
সুন্নি ইসলাম শিরোনাম

পূর্বসূরী
দ্বিতীয় মারওয়ান
ইসলামের খলিফা
৭৪৯–৭৫৪
উত্তরসূরী
আল মনসুর

ইসলামের ইতিহাস
ইসলামের আবির্ভাবের জন্য আরবের বিশেষত্ব[সম্পাদনা] বেশ কয়েকজন ঐতিহাসিকের মতে, তখনকার সময় একজন নবীর আগমন এবং তার সফলতা লাভের জন্য আরব দেশ যথেষ্ট উপযুক্ত স্থান ছিল। ইসলামী আন্দোলনের জন্যও তা একটি উর্বর ভূমি হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। এজন্যই সেখানে ইসলামের বিজয় সম্ভবপর হয়েছিল। তাদের মতামত অনুসারে ইসলামের ব্যাপক প্রসার সম্ভব হয়েছিল নিম্নে উল্লিখিত কারণে,
• এটি সুস্পষ্ট যে, কোন মতাদর্শের বিজয়ের জন্য কোন একজন ব্যক্তির জীবনই যথেষ্ট নয় বরং প্রয়োজন একদল যোগ্য লোকের একটি বাহিনী তৈরি যারা সেই মতাদর্শের প্রচার ও প্রসার কাজ আজীন চালিয়ে যাবেন। আর এ ধরনের কাজ আঞ্জাম দেয়ার ক্ষমতা আরব উপদ্বীপের অধীবাসীদের মাঝে তখন পূর্ণ মাত্রায়ই বিরাজমান ছিল। কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে বিষয়টি তা হল আরব বিশ্বের মানব অধ্যুসিত এলাকার প্রায় কেন্দ্রে অবস্থিত ছিল এবং এর সাথে বহির্বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থা সবচেয়ে উন্নত ছিল। মোহাম্মদের (সাঃ) জন্মের আগেই আরব বণিকরা সারা বিশ্বে বাণিজ্য উপলক্ষে ঘুরে বেড়াতো। এজন্যই মূলত নবীর (সাঃ) হাতে ইসলামের বিজয় সাধিত হওয়া সম্ভবপর হয়েছিল।
• আরেকটি গুরুত্ব ছিল আরবি ভাষার। বিশ্বের অন্য কোন ভাষী সেই সময়ে এতটা উৎকর্ষ লাভ করেনি যা চিরকাল অপরিবর্তিত রাখা সম্ভবপর। তদুপরি সেই সময়টা ছিল আরবি ভাষার চরম উৎকর্ষের কাল।
• আরবরা কোন রাজত্বের অধীনে শৃঙ্খলিত ছিলনা। অন্য জাতির গোলামীর কারণে মানুষের মুক্তচিন্তা ও তদসংশ্লিষ্ট যে সকল গুণাবলীর অপমৃত্যু ঘটে তাও প্রশ্নাতীত। আরবের চারদিকে পারস্য ও রোমের মত দুইটি পরাশক্তির রাজত্ব বিস্তৃত থাকলেও কেউ তাদেরকে পরাজিত করতে পারেনি। এতেই আরবদের শৌর্য্য বীর্যের পরিচয় পাওয়া যায় যা ইসলামী আন্দোলনের আরেকটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত।
• আরবদের স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। একটি কথা একবার শুনলেই তা মনে রাখার মত ক্ষমতা তাদের ছিল। এজন্যই ইসলামী শরীয়তের সকল উৎসের হুবুহু সংরক্ষণ সম্ভবপর ছিল যা কোন ধর্মের সার্বজনীনতা এবং সিদ্ধির জন্য একান্তই অপরিহার্য।
• সর্বোপরি আরবরা ছিল দূর্ধর্ষ জাতি। মরুভূমির রুক্ষতা তাদেরকে পুরোমাত্রায় বাস্তববাদী করে তোলে। ফলে যে মতাদর্শে তারা বিশ্বাসী তা গ্রহণ করার পর উপাসনালয়ের এক কোণায় বসে বসে কেবল তার প্রশস্তিকীর্তণ করা তাদের পক্ষে ছিল অসম্ভব বরং সেই মতাদর্শের প্রতিষ্ঠার জন্য মাথা তুলে দাঁড়ানো এবং তাতে সর্বশক্তি ব্যয় করাই ছিল তাদের ধর্ম যা ইসলামের প্রতিষ্ঠার জন্যও অপরিহার্য ছিল।
এই মতামতের ভিত্তিতে ঐতিহাসিকগণ আরো মনে করেন যে,এত সম্ভাবনা সত্ত্বেও ইসলামের প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক বিরুদ্ধবাদিতার মুখোমুখি হতে হয়, কারণ বিরোধী আরবদেরও এই গুণগুলো ছিল এবং তারা মাধা নত করায় অভ্যস্ত ছিলনা। যেহেতু আরবে নেতাদের অত্যধিক সম্মান ছিল এজন্য কেউই চায়নি যে ইসলাম সফলতা পাক এবং এজন্যে তাদের সর্বশক্তি তারা নিয়োগ করে। অর্থাৎ ইসলামের মূল দ্বন্দ্ব্ব ছিল নেতৃত্ব নিয়ে। প্রকৃতপক্ষেই যেকোন মতাদর্শের বিজয়ের জন্য নেতৃত্বই মুখ্য। তবে এই প্রতিকূলতাও মুসলমানদের পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল। তাই সবদিক দিয়েই ইসলামের জন্য আরব ভূমির উর্বরতা স্বতঃসিদ্ধ।
জেরুজালেম অবরোধ (৬৩৭)
৬৩৭ সালের জেরুজালেম অবরোধ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও রাশিদুন খিলাফতের মধ্যকার একটি সংঘর্ষ। ৬৩৭ সালে এই ঘটনা সংঘটিত হয়। রাশিদুন সেনাবাহিনী আবু উবাইদাহর নেতৃত্বে ৬৩৬ সালের নভেম্বরে জেরুজালেম অবরোধ করলে এই ঘটনা সংঘটিত হয়। ছয় মাস পর পেট্রিয়ার্ক সফ্রোনিয়াস তৎকালীন খলিফা উমরের ব্যক্তিগত উপস্থিতির শর্তে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হন। ৬৩৭ সালের এপ্রিলে খলিফা উমর জেরুজালেমে আসেন এবং এসময় শহর মুসলিমদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
শহরের উপর মুসলিমদের বিজয়ের ফলে ফিলিস্তিনের উপর আরব নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। একাদশ শতকে প্রথম ক্রুসেডের আগ পর্যন্ত এই নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিল। খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের পাশাপাশি এটি মুসলিমদের কাছেও একটি পবিত্র শহর। এই ঘটনার ফলে বাইজেন্টাইন প্রদেশ প্যালেস্টিনা প্রিমার অবস্থা স্থিতিশীল হয়। ৬১৩ সালে ইহুদিদের হেরাক্লিয়াসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পর ৬১৪ সালে সাসানীয়রা জেরুজালেম দখল করে নেয় এবং এখানে ইহুদি স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ৬২৯ সালে বাইজেন্টাইনরা পুনরায় শহর দখল করে নেয় ও গণহত্যা চালায়। ফলে ১৫ বছরের ইহুদি শাসনের অবসান হয়।
জেরুজালেমে মুসলিম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে বাইজেন্টাইন শাসন প্রতিষ্ঠার ৮ বছর পর ও জুডিয়া থেকে রোমানদের দ্বারা ইহুদিদের বহিষ্কারের প্রায় ৫০০ বছর পর ইহুদিরা এখানে স্বাধীনভাবে বসবাস ও ধর্মপালনের সুযোগ পুনরায় ফিরে পায়।[২] পূর্ব ঘটনা[সম্পাদনা] জেরুজালেম বাইজেন্টাইন প্রদেশ প্যালেস্টিনা প্রিমার একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল। মুসলিম বিজয়ের ২৩ বছর পূর্বে ৬১৪ সালে শেষ বাইজেন্টাইন-সাসানীয় যুদ্ধের সময় সাসানীয় সেনাবাহিনী শাহ্‌রবারাজের নেতৃত্বে এখানে আক্রমণ করে। পারসিকরা শহরে লুটপাট চালায়। বলা হয় যে তারা শহরের ৯০,০০০ খ্রিষ্টান অধিবাসীকে হত্যা করে।[৩] লুটপাটের অংশ হিসেবে চার্চ অব দ্য হলি সেপালাচার ধ্বংস করা হয়, এর ক্রুশ খুলে নেয়া হয় ও তিসফুনে নিয়ে যাওয়া হয়। ধারণা করা হয় যে ইহুদিরা পারসিকদের সাহায্য করেছিল।[৪] ৬৩২ সালে মুহাম্মদ (সা) এর মৃত্যুর পর আবু বকর মুসলিমদের নেতৃত্ব লাভ করেন ও খলিফা হন। এরপর তাকে রিদ্দার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়। আরবের উপর আবু বকরের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি পূর্ব দিকে ইরাক আক্রমণ করেন। এই অঞ্চলটি তৎকালীন সাসানীয় সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ ছিল। অপরদিকে পশ্চিমে তার বাহিনী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য আক্রমণ করে।[৫] ৬৩৪ সালে আবু বকর মৃত্যুবরণ করেন ও উমর তার উত্তরসুরি হন। তিনি এই বিজয় অভিযান চালিয়ে যান।[৬] ৬৩৬ সালে সম্রাট হেরাক্লিয়াস তার হারানো অঞ্চল পুনরুদ্ধারের জন্য একটি বড় অভিযান চালান। কিন্তু ৬৩৬ এর আগস্টে ইয়ারমুকের যুদ্ধে তার বাহিনী পরাজিত হয়। এরপর অক্টোবরের প্রথম দিকে সিরিয়ার মুসলিম বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চীফ আবু উবাইদাহ ভবিষ্যত পরিকল্পনা বিষয়ে একটি সভার আহ্বান করেন। উপকূলীয় শহর কায়সারিয়া ও জেরুজালেমের বিষয়ে বিভিন্ন রকম মত উঠে আসে। আবু উবাইদাহ এই দুটি শহরের গুরুত্ব অনুধাবন করছিলেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পেরে তিনি খলিফা উমরের কাছে নির্দেশনা চেয়ে চিঠি লেখেন। উত্তরে খলিফা দ্বিতীয় শহরকে জয় করার নির্দেশ দেন। এরপর আবু উবাইদাহ জাবিয়া থেকে জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হন। তার সাথে খালিদ বিন ওয়ালিদ ও তার অধীনস্থ বাহিনীও ছিল। নভেম্বরের প্রথমদিকে মুসলিমরা জেরুজালেমে পৌছে এবং বাইজেন্টাইন বাহিনী নগর প্রাচীরের ভেতর অবস্থান নেয়।[১] অবরোধ[সম্পাদনা] পারসিকদের কাছ থেকে জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের পর হেরাক্লিয়াস এটির প্রতিরক্ষা মজবুত করেন।[৭] ইয়ারমুকে বাইজেন্টাইনদের পরাজয়ের পর জেরুজালেমের পেট্রিয়ার্ক সফ্রোনিয়াস প্রতিরক্ষা পুনরায় সংস্কার করেন।[৮] মুসলিমরা শহর অবরোধ করতে চায়নি। তবে ৬৩৪ সালে মুসলিমরা শহরের সকল প্রবেশ পথের উপর কর্তৃত্ব স্থাপনের পর্যায়ে ছিল। মুসলিমরা পার্শ্ববর্তী দুর্গ পেল্লা ও বসরা দখল করে নেয়ার পর জেরুজালেমে একরকম অবরোধের মুখে পড়ে। ইয়ারমুকের যুদ্ধের পর শহরটি সিরিয়ার বাকি অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সম্ভবত অবরোধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখে।[৭] মুসলিম বাহিনী জেরিকো পৌছলে সফ্রোনিয়াস সকল পবিত্র চিহ্ন সংগ্রহ করেন ও কনস্টান্টিনোপলে পাঠানোর জন্য উপকূলে পাঠিয়ে দেন।[৮] মুসলিমরা ৬৩৬ এর নভেম্বরে শহর অবরোধ করে। শহরের উপর ক্রমাগত আক্রমণের বদলেa[›] তারা বাইজেন্টাইনদের রসদ কমে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন যাতে রক্তপাতহীন আত্মসমর্পণ সম্ভব হয়।[৯] অবরোধের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য লিখিত নেই।b[›] তবে এটি রক্তপাতহীন ছিল বলে প্রতীয়মান হয়।[১০] বাইজেন্টাইনরা হেরাক্লিয়াসের কাছ থেকে সাহায্যের ব্যাপারে আশা ছেড়ে দিয়েছিল। চার মাস অবরোধের পর সফ্রোনিয়াস জিজিয়া প্রদান ও আত্মসমর্পণে সম্মত হন। তবে তিনি শর্ত দেন যে খলিফা উমরকে নিজে এসে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে।[১১] বলা হয় যে, সফ্রোনিয়াসের শর্তগুলো মুসলিমদের কাছে পৌছালে অন্যতম মুসলিম সেনাপতি শুরাহবিল ইবনে হাসানা প্রস্তাব করেন যে মদীনা থেকে খলিফার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা না করে খালিদ বিন ওয়ালিদকে খলিফা হিসেবে পাঠানো হোক, কারণ তিনি দেখতে অনেকটা উমরের মত ছিলেন।[১২] কিন্তু এই কৌশল কাজ করেনি। সম্ভবত খালিদ সিরিয়ায় খুব পরিচিত ছিলেন অথবা শহরের খ্রিষ্টান আরবদের কেউ কেউ মদীনায় গিয়ে উমর ও খালিদ উভয়কেই দেখেছে ফলে তাদের পার্থক্যগুলো তাদের জানা ছিল। সফ্রোনিয়াস আলোচনায় অসম্মতি জানান। যখন খালিদ মিশনের ব্যর্থতা সম্পর্কে রিপোর্ট করেন, আবু উবাইদাহ খলিফা উমরের কাছে চিঠি লিখে পরিস্থিতি অবহিত করেন ও আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের জন্য তাকে জেরুজালেম আসার আমন্ত্রণ জানান।[১৩] আত্মসমর্পণ[সম্পাদনা]

চার্চ অব দ্য হলি সেপালচারের বর্তমান দৃশ্য। পেট্রিয়ার্ক সফ্রোনিয়াস এখানে খলিফা উমরকে নামাজ পড়ার আমন্ত্রণ জানান।
৬৩৭ সালের এপ্রিলের প্রথমদিকে উমর ফিলিস্তিনে পৌছান। প্রথমে তিনি জাবিয়ায় আসেন।,[১৪] আবু উবাইদাহ, খালিদ ও ইয়াজিদ তাকে সেখানে অভ্যর্থনা জানান। তারা খলিফাকে গ্রহণ করার জন্য এখানে আসেন। আমর অবরোধকারী মুসলিমদের নেতৃত্বের জন্য থেকে যান।[১৫] উমর জেরুজালেমে আসেন ও উমরের চুক্তি বলে পরিচিত চুক্তিটি সম্পাদন করা হয়। এর ফলে শহর মুসলিমদের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং জিজিয়ার বিনিময়ে অমুসলিমদের নাগরিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়। মুসলিমদের পক্ষে খলিফা উমর এতে স্বাক্ষর করেন এবং খালিদ বিন ওয়ালিদ, আমর ইবনুল আস, আবদুর রহমান বিন আউফ ও মুয়াবিয়া মুসলিম পক্ষে চুক্তির স্বাক্ষী হন। ৬৩৭ সালের এপ্রিলের শেষের দিকে জেরুজালেম কাগজকলমে খলিফার কাছে আত্মসমর্পণ করে।[১৬] ৫০০ বছরের নিপীড়নমূলক রোমান শাসনের পর এই প্রথম ইহুদিরা জেরুজালেম বসবাস ও উপাসনা করার জন্য পুনরায় অনুমতি পায়।[২] বিভিন্ন লিখিত মুসলিম দলিল মোতাবেক যোহরের নামাজের সময় সফ্রোনিয়াস উমরকে চার্চ অব হলি সেপালচারে নামাজ পড়ার আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু এমন করার ফলে ভবিষ্যতে চার্চের খ্রিষ্টান গুরুত্ব কমে যেতে পারে ও মুসলিমরা চুক্তি ভঙ্গ করে এটিকে মসজিদে পরিণত করতে পারে এই আশংকায় উমর তাতে রাজি হননি।[৯] জেরুজালেমে দশদিন অবস্থান করার পর খলিফা উমর মদীনা ফিরে আসেন।[১৭] পরবর্তী ঘটনা[সম্পাদনা]

৬৯১ সালে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ডোম অব দ্য রক।
খলিফার নির্দেশ অনুযায়ী ইয়াজিদ কায়সারিয়ায় যাত্রা করেন ও পুনরায় বন্দর নগরীর অবরোধে নেতৃত্ব দেন। আমর ও শুরাহবিল ফিলিস্তিন বিজয় সম্পন্ন করার কাজে যাত্রা করেন। সে বছরেই এই কাজ সমাপ্ত হয়। তবে ৬৪০ সাল নাগাদ কায়সারিয়া দখল করা সম্ভব হয়নি। এসময় প্রথম মুয়াবিয়া সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন ও তার কাছে এই শহর আত্মসমর্পণ করে। ১৭,০০০ সৈন্যের বাহিনী নিয়ে আবু উবাইদাহ ও খালিদ উত্তর সিরিয়া জয় করতে অগ্রসর হন। ৬৩৭ সালে এন্টিওক জয়ের পর এই অভিযান সমাপ্ত হয়।[১৮] ৬৩৯ সালে মুসলিমরা মিসর আক্রমণ ও জয় করে।
জেরুজালেমে অবস্থানের সময় সফ্রোনিয়াস উমরকে বেশ কিছু পবিত্র স্থান দেখাতে নিয়ে যান। এর মধ্যে টেম্পল মাউন্টও ছিল। এর দুরবস্থা দেখে উমর এখানকার জঞ্জাল ও ধ্বংসস্তুপ সরিয়া একটি কাঠের তৈরী মসজিদ নির্মাণের আদেশ দেন।[১৯] গলের বিশপ আরকালফ ৬৭৯ থেকে ৬৮২ এর মধ্যে জেরুজালেম ভ্রমণ করেন। তিনি এসময় তার দেখা মসজিদের বিবরণ দেন। তার বর্ণনায় এটির বীমগুলো কাঠের তৈরী ও এটি পুরানো ধ্বংসাবশেষের উপর নির্মাণ করা হয়েছিল এবং এতে মোট ৩,০০০ লোক একসাথে নামাজ আদায় করতে পারত।[২০] জেরুজালেম বিজয়ের ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর ৬৯১ সালে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ডোম অব দ্য রক নির্মাণের কাজে হাত দেন। দশম শতাব্দীর ইতিহাসবিদ আল-মুকাদ্দাসির লেখা অনুযায়ী আবদুল মালিক শহরের খ্রিষ্টান গির্জার চাকচিক্যের সাথে তুলনীয় কিছু গড়ার জন্য এই নির্মাণে হাত দেন। তবে তার উদ্দেশ্য যাই থাক, এর জাকজমক ও আকার তৎকালীন মুসলিমদের সাথে জেরুজালেমের সংযোগ বৃদ্ধিতে যথেষ্ট সহায়ক ছিল।[১৯] পরবর্তী ৪০০ বছর ধরে ঐ অঞ্চলে মুসলিমদের কর্তৃত্ব বজায় ছিল। প্রথম ক্রুসেডের সময় ইউরোপীয়রা জেরুজালেম দখল করে নেয়ার আগ পর্যন্ত এটি মুসলিমদের অধীনে ছিল।

প্রথম ফিতনা
প্রথম ফিতনা (আরবি: فتنة مقتل عثمان‎ Fitnat Maqtal Uthmān, “The Fitna of the Killing of Uthman”) ছিল ইসলামের প্রথম গৃহযুদ্ধ। ৬৫৬ সালে মিশরীয় বিদ্রোহীদল কর্তৃক খলিফা উসমান ইবনে আফফানকে হত্যার পর এই ফিতনা শুরু হয়। তার উত্তরাধিকারী আলি ইবনে আবি তালিবের খিলাফতকালে এই অবস্থা চলতে থাকে। ৬৬১ সালে আলির পুত্র ও উত্তরাধিকারী হাসান ইবনে আলি মুয়াবিয়ার সাথে চুক্তিতে আসার পর এর অবসান হয়। এরপর উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠা লাভ করে। [১] পটভূমি[সম্পাদনা] মূল নিবন্ধ: উসমানের অবরোধ
মুহাম্মদ (সা) ও প্রথম তিন খলিফার অধীনে মুসলিম রাষ্ট্র খুব দ্রুত বিস্তৃত লাভ করে। অধিকৃত অঞ্চলের স্থানীয় ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের উপর বাইজেন্টাইন-সাসানীয় যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের জন্য অধিক হারে করারোপ করা হত। তাই বাইজেন্টাইন ও সাসানীয়দের কাছ থেকে বিভিন্ন অঞ্চল জয় করতে তারা মুসলিমদেরকে সাহায্য করে।[২][৩] নতুন এলাকা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সাথে সাথে ইসলামি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে মুক্ত বাণিজ্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। এসময় শুধু সম্পদের উপর কর ধার্য করা হত, বাণিজ্যের উপর না।[৪] মুসলিমরা যাকাত হিসেবে গরীবদের অর্থ দিত। মদিনার সনদ মুহাম্মদ (সা) কর্তৃক চালু করা হয়েছিল। এর আওতায় ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা ইসলামি রাষ্ট্রের ভেতর তাদের নিজ নিজ আইন দ্বারা পরিচালিত হত এবং নিজেদের বিচারক দ্বারা বিচারকাজ পরিচালিত করতে পারত।[৫][৬][৭] তাই তাদের শুধু জানমালের নিরাপত্তার জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হত। রাষ্ট্রের দ্রুত সম্প্রসারণের সহায়তার জন্য বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় কর সংগ্রহের নিয়ম চালু রাখা হয় এবং বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় আমলের চেয়ে জনপ্রতি কম কর ধার্য করা হয়। মুহাম্মদ (সা) আরবকে ঐক্যবদ্ধ করার আগে আরবরা বিভক্ত ছিল। অন্যদিকে বাইজেন্টাইন ও সাসানীয়রা নিজেদের পক্ষের গোত্র ছিল যারা তাদের পক্ষে লড়াই করত।
৬৩৯ সালে প্রথম মুয়াবিয়া সিরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত হন। ইতিপূর্বে তার বড় ভাই ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান এখানকার গভর্নর ছিলেন। তিনি ও তার পূর্বের গভর্নর আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে মুয়াবিয়াকে সে দায়িত্ব দেয়া হয়। এসময় আরো ২৫,০০০ লোক মারা যায়। আরব-বাইজেন্টাইন যুদ্ধের সময় সমুদ্রপথে হামলা প্রতিহত করার জন্য মুয়াবিয়া ৬৪৯ সালে নৌবাহিনী গঠন করেন। এতে মনোফিসাইট খ্রিষ্টান, কপ্ট ও জেকোবাইট সিরিয়ান খ্রিষ্টান এবং মুসলিম সেনাদের নিয়োগ দেয়া হয়। ৬৫৫ সালে মাস্তুলের যুদ্ধে বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী পরাজিত হয় এবং ভূমধ্যসাগর উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।[৮][৯][১০][১১][১২] ৫০০ বাইজেন্টাইন জাহাজ যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যায়। সম্রাট দ্বিতীয় কনস্টান্স এসময় প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। খলিফা উসমান ইবনে আফফানের নির্দেশে মুয়াবিয়া এরপর কনস্টান্টিনোপল অবরোধের জন্য প্রস্তুত হন।
সিরিয়া ও মিশরে মুসলিমরা দ্রুত বিজয় লাভ করে। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য লোকবল ও এলাকা হারিয়ে ফেলায় তাদের অস্তিত্বের লড়াই শুরু হয়। পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্য ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়ে যায়।
কুরআন ও মুহাম্মদ (সা) এর বিদায় হজের ভাষণে মানুষের সাম্য ও ন্যায়বিচারের বিষয়ে বলা হয়েছে।[১৩][১৪][১৫][১৬][১৭][১৮][১৯] এতে বংশীয় ও জাতিতাত্ত্বিক পার্থক্য নিরুৎসাহিত করা হয়। কিন্তু মুহাম্মদ (সা) এর মৃত্যুর পর পুরনো গোত্রীয় বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। রোমান-পারসিয়ান যুদ্ধ ও বাইজেন্টাইন-সাসানীয় যুদ্ধে প্রাক্তন পারস্য শাসিত ইরাক এবং বাইজেন্টাইন শাসিত সিরিয়ার মধ্যে গভীর প্রোথিত বিভেদ চালু ছিল। প্রত্যেক অঞ্চল নবগঠিত ইসলামি সাম্রাজ্যের রাজধানী নিজ অঞ্চলে পেতে আগ্রহী ছিল।[২০] পূর্ববর্তী খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব তার আঞ্চলিক গভর্নরদের শাসনের ক্ষেত্রে কঠোর ছিলেন এবং তার গোয়েন্দারা সর্বত্র তাদের উপর নজর রাখত। কোনো গভর্নর বা কমান্ডারের মধ্যে সম্পদের প্রতি আগ্রহ বা প্রশাসনিক যোগ্যতার তারতম্য দেখলে উমর তাদের পদ থেকে সরিয়ে দিতেন।[২১] প্রথমদিকে মুসলিম সেনারা শহর থেকে দূরে সেনাক্যাম্পে অবস্থান করত। উমর ইবনুল খাত্তাবের আশংকা ছিল যে নাহয় সেনারা সম্পদের প্রতি আসক্ত হয়ে বিলাসিতায় ডুকে যাবে এবং এর ফলে তাদের আল্লাহ ভীতি হ্রাস পাবে ও বিভিন্ন রাজবংশের সৃষ্টি হবে।[২২][২৩][২৪][২৫] সৈনিকরা এসব ক্যাম্পে অবস্থানের ফলে শহরের জনগণের উপর বাড়তি চাপ পড়ত না। একইসাথে শহরের জনতা স্বায়ত্ত্বশাসন ভোগ করত এবং নিজেদের বিচারক ও প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ পরিচালিত করত। এসব ক্যাম্পের মধ্যে কিছু পরবর্তীতে বড় শহরের আকার লাভ করে। এর মধ্যে রয়েছে ইরাকের বসরা ও কুফা এবং মিশরের ফুসতাত।[২৬] কিছু শহরের অধিবাসীদের সাথে মুসলিমদের চুক্তি ছিল। ৬৩৭ সালে জেরুজালেম অবরোধের সময় এমন চুক্তি হয়।
তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফান খুব বৃদ্ধ হয়ে পড়লে মুয়াবিয়ার এক আত্মীয় প্রথম মারওয়ান শূণ্যস্থানে এসে পড়েন এবং তার সচিব হন। তিনি ধীরে ধীরে অধিক ক্ষমতা অর্জন করেন এবং কিছু কঠোরতা শিথিল করেন। প্রথম মারওয়ানকে ইতিপূর্বে দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিল। প্রথম খলিফা আবু বকরের ছেলে ও আলি ইবনে আবি তালিবের দত্তক পুত্র মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর এবং উসমানের দত্তক পুত্র মুহাম্মদ বিন আবি হুজায়ফার কোনো উচ্চপদ ছিল না।
উসমান ইবনে আফফান কর্তৃক নিয়োগকৃত গভর্নরদের মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত ছিলেন ওয়ালিদ ইবনে উকবা।[২৭] তাকে কুফার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল। ৩০ হিজরিতে (৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ) কুফার অনেক মুসলিম তার কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন।[২৮][২৯] ওয়ালিদ ইবনে উকবাকে এরপর সরিয়ে দেয়া হয় এবং তার স্থলে সাইদ ইবনুল আসকে কুফার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
সম্পর্কিত কতিপয় ব্যক্তির বংশলতিকা[সম্পাদনা] আবদে মানাফ ইবনে কুসাই

আবদে শামস হাশিম ইবনে আবদে মানাফ

উমাইয়া আবদুল মুত্তালিব

আবুল আস হারব আবদুল্লাহ
আবু তালিব
আব্বাস (আব্বাসীয়) সাফিয়া

আফফান হাকাম আবু সুফিয়ান মুহাম্মদ
আলি
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস
জুবায়ের ইবনুল আওয়াম

উসমান ইবনে আফফান
প্রথম মারওয়ান
ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান
প্রথম মুয়াবিয়া
হাসান ইবনে আলি
হুসাইন ইবনে আলি
আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের
(আবু বকরের নাতি)

প্রথম ইয়াজিদ (ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া)

[৩০]

দ্বিতীয় ফিতনা
দ্বিতীয় ফিতনা বা দ্বিতীয় মুসলিম গৃহযুদ্ধ ছিল উমাইয়া খিলাফতের প্রথমদিকে সংঘটিত রাজনৈতিক ও সামরিক বিশৃঙ্খলা। প্রথম উমাইয়া খলিফা প্রথম মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ইতিহাসবিদরা মতভেদে ৬৮০ বা ৬৮৩ সালকে এর সূচনা এবং ৬৮৫ থেকে ৬৯২ সালের মধ্যে এর সমাপ্তি বিবেচনা করেন। এসময় কারবালার যুদ্ধ ও আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়েরের বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।
বিস্তারিত[সম্পাদনা] বিদ্রোহের শুরু ও শেষ হওয়ার সময় নিয়ে মতপার্থক্য আছে। কেউ কেউ ৬৮০ সালে প্রথম মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পরের সময় থেকে এর সূচনা ধরেন। অন্য মতে তার পুত্র খলিফা প্রথম ইয়াজিদের মৃত্যুর বছর ৬৮৩ কে সূচনা ধরা হয়। সমাপ্তিকাল ৬৮৫ (খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের অভিষেক) থেকে ৬৯২ (আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের মৃত্যু ও তার বিদ্রোহের সমাপ্তি) এর মধ্যে ধরা হয়। সাধারণভাবে ৬৮৩-৬৮৫ সময়কে ব্যবহার করা হয়।
দ্বিতীয় ফিতনার সময় মুসলিম বিশ্বে জটিল অবস্থা বিরাজ করছিল। এসময় বেশ কিছু ঘটনা ঘটে। এসবের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক ছিল বলে প্রতীয়মান হয় না। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নরূপে দেয়া যেতে পারে।
৬৮০ সালে প্রথম উমাইয়া খলিফা প্রথম মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তার পুত্র প্রথম ইয়াজিদ খলিফা হন। মুহাম্মদ (সা) এর দৌহিত্র ও সাবেক খলিফা আলি ইবনে আবি তালিবের পুত্র হুসাইন ইবনে আলির সমর্থকদের কাছ থেকে প্রথম ইয়াজিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আসে। কারবালার যুদ্ধে হুসাইনসহ অনেকেই উমাইয়া সেনাদের হাতে নিহত হন। এই যুদ্ধকে প্রায়ই সুন্নি ও শিয়াদের মধ্যকার চূড়ান্ত ভাঙন হিসেবে ধরা হয়। কারবালার দিনকে শিয়ারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
এসকল ঘটনার পর ইয়াজিদ আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের বিদ্রোহের মুখোমুখি হন। আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের ছিলেন সাহাবি জুবায়ের ইবনে আওয়াম ও আসমা বিনতে আবি বকরের পুত্র। বিভিন্ন কারণে উমাইয়া শাসনের প্রতি অসন্তুষ্ট ব্যক্তিরা তার বিদ্রোহকে সমর্থন করে। ৬৮৩ সালে প্রথম ইয়াজিদ ও তার পুত্র দ্বিতীয় মুয়াবিয়ার আকস্মিক মৃত্যুর পর আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের খলিফা হিসেবে ব্যাপক সমর্থন লাভ করেন। তিনি তার শাসনের বিরোধীদের প্রতিহত করতে সচেষ্ট হন। সিরিয়ায় প্রথম মুয়াবিয়ার এক ভাই সম্পর্কিত ব্যক্তি মারওয়ান ইবনে হাকিম নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। সংক্ষিপ্তকাল শাসনের পর মারওয়ান ৬৮৫ সালে মৃত্যুবরণ করলে তার পুত্র আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান তার উত্তরসুরি হন। ৬৮৪ সালে মধ্য আরবে খারিজি বিদ্রোহীরা স্বাধীন রাষ্ট্র স্থাপন করলে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের তিহামাহ ও হেজাজ অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।[১] ইরাক ও ইরানে এরপর অন্যান্য খারিজিদের উত্থান হয়। এসময় হুসাইন ইবনে আলির মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়া এবং আলির অন্য পুত্রদের মধ্যে কাউকে খলিফার পদে বসানোর জন্য শিয়ারা বিদ্রোহ করে। আবদুল মালিকের সমর্থক সিরিয়ান সেনারা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনে। তিনি সব বিদ্রোহ দমনে সফল হন। তার সেনারা মক্কা অবরোধ করলে এরপর আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের সেনাদের হাতে নিহত হন।

কারবালার যুদ্ধ
কারবালার যুদ্ধ ইসলামিক ক্যালেন্ডার অনুসারে ১০ মুহাররম ৬১ হিজরী[২] (১০ অক্টোবর ৬৮০)[৭][৮] বর্তমান ইরাকের কারবালার প্রান্তরের সংগঠিত হয়। এই যুদ্ধটি ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা) এর নাতি হোসেইন ইবন আলী এর অল্প কিছু সমর্থক এবং আত্মীয় এবং উমাইয়া খলিফা ইয়াজীদ ১, যার বৈশ্যতা স্বীকার করতে হোসেইন অস্বীকার করেন, তারঁ বিশাল সেনাবাহিনীর মধ্যে সংগঠিত হয়। এই যুদ্ধে হোসেইন এবং তাঁর ছয় মাস বয়সী শিশুপুত্র আলী আল-আসগর ইবন হোসেইনসহ সকল সমর্থক নিহত হয় ও নারী এবং শিশুরা বন্দি হন। মুসলমানদের মতানুসারে নিহতদের সকলে ‘শহীদ’ হিসেবে অভিহিত হন এবং এই যুদ্ধটি শিয়া ইতিহাস ও ঐতিহ্যে মধ্যস্থানে অবস্থান করে।
কারবালার যুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ[সম্পাদনা] আরও দেখুন: মাকতাল আল-হোসাইন
প্রাথমিক উৎস[সম্পাদনা] আবু মিকনাফ (মৃত্যু: ১৫৭ হি./৭৭৪ খ্রি.) তারঁ কিতাব মাকতাল আল-হোসাইন গ্রন্থে সর্বপ্রথম নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা সংগ্রহ করে সেই বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন।[৯] আবু মিকনাফ-এর মূল পুস্তকটি এখন আর পাওয়া যায়না, যেটি পাওয়া যায় সেটি হচ্ছে তার ছাত্র হিশাম ইবন আল-কালবী (মৃত্যু: ২০৪ হি.) কর্তৃক বর্ণিত। গোথা (নং: ১৮৩৬), বার্লিন (স্পেরেঞ্জার, নং ১৫৯-১৬০), লিডেন (নং: ৭৯২) এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ (এম নং: ৭৮) লাইব্রেরীতে মাকতাল-এর চারটি পান্ডুলিপি বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে।[১০] দ্বিতীয় পর্যায়ের উৎস[সম্পাদনা] শিয়া লেখনীতে[সম্পাদনা] ইতিহাস বিকৃতি[সম্পাদনা] সাহিত্যে প্রভাব[সম্পাদনা] ফার্সী সাহিত্য[সম্পাদনা] আজেরি ও তুর্কি সাহিত্য[সম্পাদনা] সিন্ধি সাহিত্য[সম্পাদনা] উর্দু সাহিত্য[সম্পাদনা] বাংলা সাহিত্য[সম্পাদনা] মীর মোশারফ হোসেন বিষাদ সিন্ধু নামক একটি উপন্যঅস রচনা করেছেন এবং কাজী নজরুল ইসলাম প্রচুর কবিতা লিখেছেন এই বিয়োগাত্ক ঘটনার প্রেক্ষিতে। ১০ মুহররম তারিখে মার্সিয়া গাওয়া হয়।
শিয়া দর্শনানুসারে[সম্পাদনা]

The Imam Husayn Shrine during Arba’een
শিয়া মুসলমানরা প্রতিবছর মুহররম মাসে কারবালার যুদ্ধকে স্মরণ করে। পয়লা মুহররমের দিন থেকে এর শুরু হয় এবং ১০ মুহররমের দিন (আশুরা) তা চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে।
দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে, কারবালার যুদ্ধের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে প্রচুর সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রচলন ঘটেছে, যেমন: মার্সিয়া, নোহা এবং সোয়াজ।
• আল-মুখতার
• Persecution of Shia Muslims
• সাহাবী
• wikisource:The Sermon of Ali ibn Husayn in Damascus
• Mokhtarnameh
• The Hussaini Encyclopedia

উমাইয়া খিলাফত
উমাইয়া খিলাফত () ইসলামের প্রধান চারটি খিলাফতের মধ্যে দ্বিতীয় খিলাফত। এটি উমাইয়া রাজবংশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। ইসলামের তৃতীয় খলিফা উসমান ইবন আফ্‌ফানের খিলাফত লাভের মাধ্যমে উমাইয়া পরিবার প্রথম ক্ষমতায় আসে। তবে উমাইয়া বংশের শাসন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান কর্তৃক সূচিত হয়। তিনি দীর্ঘদিন সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন। ফলে সিরিয়া উমাইয়াদের ক্ষমতার ভিত্তি হয়ে উঠে এবং দামেস্ক তাদের রাজধানী হয়। উমাইয়ারা মুসলিমদের বিজয় অভিযান অব্যাহত রাখে। ককেসাস, ট্রান্সঅক্সানিয়া, সিন্ধু, মাগরেব ও ইবেরিয়ান উপদ্বীপ (আল-আন্দালুস) জয় করে মুসলিম বিশ্বের আওতাধীন করা হয়। সীমার সর্বোচ্চে পৌছালে উমাইয়া খিলাফত মোট ৫.৭৯ মিলিয়ন বর্গ মাইল (১,৫০,০০,০০০ বর্গ কিমি.) অঞ্চল অধিকার করে রাখে। তখন পর্যন্ত বিশ্বের দেখা সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ ছিল। অস্তিত্বের সময়কালের দিক থেকে এটি ছিল পঞ্চম।[৫] কিছু মুসলিমের কাছে উমাইয়াদের কর সংগ্রহ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা অনৈতিক ঠেকে। অমুসলিম জনগণ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত এবং তাদের বিচারিক কার্যক্রম তাদের নিজস্ব আইন ও ধর্মীয় প্রধান বা নিজেদের নিযুক্ত ব্যক্তি দ্বারা চালিত হত।[৬] তাদের কেন্দ্রীয় সরকারকে জিজিয়া কর দিতে হত।[৬] মুহাম্মদ (সা) এর জীবদ্দশায় বলেন যে প্রত্যের ধর্মীয় সম্প্রদায় নিজেদের ধর্মপালন করবে ও নিজেদের শাসন করতে পারবে। এ নীতি পরবর্তীতেও বহাল থাকে।[৬] উমর কর্তৃক চালু হওয়া মুসলিম ও অমুসলিমদের জন্য কল্যাণ রাষ্ট্র ব্যবস্থা চলতে থাকে।[৬][৬] মুয়াবিয়ার মা মায়সুম (ইয়াজিদের মা) ছিলেন একজন খ্রিষ্টান। রাষ্ট্রে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে সম্পর্ক ভাল ছিল। উমাইয়ারা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে ধারাবাহিক যুদ্ধে জড়িত ছিল।[৬][৬][৬] গুরুত্বপূর্ণ পদে খ্রিষ্টানদের বসানো যাদের মধ্যে কারো কারো পরিবার বাইজেন্টাইন সরকারে কাজ করেছিল। খ্রিষ্টানদের নিয়োগ অধিকৃত অঞ্চলে বিশেষত সিরিয়ার বিশাল খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর প্রতি ধর্মীয় সহিষ্ণুতার নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এ নীতি জনগণের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয় এবং সিরিয়াকে ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে স্থিতিশীল করে তোলে।[৭][৮] আরব গোত্রগুলোর মধ্যকার বিরোধের কারণে সিরিয়ার বাইরের প্রদেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে বিশেষত দ্বিতীয় মুসলিম গৃহযুদ্ধ (৬৮০-৬৯২) ও বার্বার বিদ্রোহের (৭৪০-৭৪৩) সময়। দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের সময় উমাইয়া গোত্রের নেতৃত্ব সুফয়ানি শাখা থেকে মারওয়ানি শাখার হস্তান্তর হয়। ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহের ফলে সম্পদ ও লোকবল কমে আসায় তৃতীয় মুসলিম গৃহযুদ্ধের সময় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং চূড়ান্তভাবে আব্বাসীয় বিপ্লবের ফলে ক্ষমতাচ্যুত হয়। পরিবারের একটি শাখা উত্তর আফ্রিকা হয়ে আল-আন্দালুস চলে যায় এবং সেখানে কর্ডোবা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে। এ খিলাফত ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল এবং আল-আন্দালুসের ফিতনার পর এর পতন হয়।

উমাইয়া পরিবার (বনু আবদ শামস নামেও পরিচিত) ও মুহাম্মদ (সা) উভয়েই আবদ মানাফ ইবনে কুসাইয়ের বংশধর এবং তারা মক্কার অধিবাসী ছিলেন। আবদ মানাফের পুত্র হাশিমের বংশে মুহাম্মদ (সা) জন্মগ্রহণ করেন। অন্যদিকে উমাইয়ারা আবদ মানাফের আরেক পুত্র আবদ শামশের বংশধর। উমাইয়া আবদ শামসের পুত্রের নাম। দুই পরিবার নিজেদের একই বংশ কুরাইশের দুটি ভিন্ন গোত্র হিসেবে বিবেচনা করত (যথাক্রমে হাশিম ও উমাইয়া)। শিয়াদের মতে উমাইয়া আবদ শামসের পালক পুত্র তাই তার সাথে আবদ শামসের কোনো রক্ত সম্পর্ক নেই। উমাইয়ারা পরবর্তীতে সম্ভ্রান্ত পরিবারের সম্মান হারায়।[৯] উমাইয়া ও হাশিমিদের মধ্যে মুহাম্মদ (সা) এর আসার পূর্ব থেকেই দ্বন্দ্ব চলছিল। বদরের যুদ্ধের পর তা আরো বিরূপ অবস্থায় পড়ে। এ যুদ্ধে উমাইয়া গোত্রের তিনজন শীর্ষ নেতা উতবা ইবনে রাবিয়াহ, ওয়ালিদ ইবনে উতবাহ ও শায়বা দ্বন্দ্বযুদ্ধের সময় হাশিমি গোত্রের আলী ইবন আবী তালিব, হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও উবাইদাহ ইবনুল হারিসের হাতে নিহত হয়।[১০] এ ঘটনার ফলে উমাইয়ার নাতি আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের মুহাম্মদ (সা) ও ইসলামের প্রতি বিরোধিতার মাত্রা আরো বৃদ্ধি পায়। বদর যুদ্ধের একবছর পর আবু সুফিয়ান আরেকটি যুদ্ধ মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দিয়ে মদিনার মুসলিমদের উপর প্রতিশোধ নিতে চাইছিলেন। পন্ডিতদের মতে এই যুদ্ধটি মুসলিমদের প্রথম পরাজয় যেহেতু এখানে মক্কার তুলনায় মুসলিমদের ভালো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধের পর আবু সুফিয়ানের স্ত্রী ও উতবা ইবনে রাবিয়ার মেয়ে হিন্দ হামজার লাশ কেটে তার কলিজা বের করে খাওয়ার চেষ্টা করে।[১১] উহুদের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পাঁচ বছর পর মুহাম্মদ (সা) মক্কা বিজয় করেন[১২] এবং সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। মক্কা বিজয়ের পর আবু সুফিয়ান ও তার স্ত্রী হিন্দ ইসলাম গ্রহণ করেন। এসময় তাদের পুত্র ও পরবর্তী খলিফা মুয়াবিয়াও ইসলাম গ্রহণ করেন।

উমাইয়াদের অধীনে খিলাফতের বিস্তার:
মুহাম্মদ (সা) এর অধীনে বিস্তৃতি, ৬২২-৬৩২
রাশিদুন খিলাফতের অধীনে বিস্তৃতি, ৬৩২-৬৬১
উমাইয়া খিলাফতের অধীনে বিস্তৃতি, ৬৬১-৭৫০
অনেক ইতিহাসবিদের মতে খলিফা মুয়াবিয়া (শাসনকাল ৬৬১-৬৮০) রাজবংশীয় কায়দার প্রথম শাসক হলেও তিনি উমাইয়া রাজবংশের দ্বিতীয় শাসক। উমাইয়া গোত্রের সদস্য উসমান ইবনে আফ্‌ফানের খিলাফতের সময় উমাইয়া গোত্র ক্ষমতায় আসে। উসমান তার গোত্রের কিছু বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসান। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলেন উসমানের শীর্ষ পর্যায়ের উপদেষ্টা মারওয়ান ইবনুল হাকাম যিনি সম্পর্কে উসমানের তুতো ভাই ছিলেন। তার কারণে হাশিমি সাহাবিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরী হয় কারণ মারওয়ান ও তার পিতা আল-হাকাম ইবনে আবুল আসকে মুহাম্মদ (সা) মদিনা থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছিলেন। উসমান কুফার গভর্নর হিসেবে তার সৎ ভাই ওয়ালিদ ইবনে উকবাকে নিযুক্ত করেন। হাশিমিরা তার প্রতি অভিযোগ করে যে তিনি মদপান করে নামাজের ইমামতি করেছিলেন।[১৩] উসমান মুয়াবিয়াকে বিশাল এলাকার কর্তৃত্ব দিয়ে সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে তার অবস্থান সংহত করেন[১৪] এবং তার পালক ভাই আবদুল্লাহ ইবনে সাদকে মিশরের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন। উসমান নিজের কোনো উত্তরসুরি মনোনীত করে যাননি তাই তাকে রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ধরা হয় না।
৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে প্রথম মুয়াবিয়া সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হন। এসময় আরো ২৫,০০০ মানুষ প্লেগে মারা যায়।[১৫][১৬] আরব-বাইজেন্টাইন যুদ্ধের সময় সমুদ্রের দিক থেকে বাইজেন্টাইন আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ৬৪৯ খ্রিষ্টাব্দে মুয়াবিয়া মনোফিসিট খ্রিষ্টান, কপ্ট ও জেকোবাইট সিরিয়ান খ্রিষ্টান নাবিক ও মুসলিম সৈনিকদের নিয়ে একট নৌবাহিনী গড়ে তোলেন। ৬৫৫ তে মাস্তুলের যুদ্ধে বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী পরাজিত হয় এবং ভূমধ্যসাগরের দিক উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।[১৭][১৮][১৯][২০][২১] প্রথম মুয়াবিয়া একজন সফল গভর্নর ছিলেন। তিনি সাবেক রোমান সিরিয়ান সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে একটি অনুগত ও নিয়মানুবর্তী বাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি আমর ইবনুল আসের বন্ধু ছিলেন। আমর ইবনুল আস মিশর জয় করেন ও পরবর্তীতে খলিফা তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন।
কুরআনে ও মুহাম্মদ (সা) এর হাদিসে জাতিগত সমতা ও ন্যায়বিচারের ব্যাপারে উল্লেখ করা আছে এবং বিদায় হজ্জের ভাষণেও তিনি একথা বলেন।[২২][২৩][২৪][২৫][২৬][২৭][২৮] গোত্রীয় ও জাতিভিত্তিক পার্থক্যকে নিরুৎসাহিত করা হয়। কিন্তু মুহাম্মদ (সা) এর মৃত্যুর পর পুরনো গোত্রীয় ভেদাভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। রোমান-পারসিয়ান যুদ্ধ ও বাইজেন্টাইন-সাসানীয় যুদ্ধের পর পূর্বে সাসানীয় সাম্রাজ্য কর্তৃক শাসিত ইরাক ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য কর্তৃক সিরিয়ার মধ্যকার বিরোধ তখনও বহাল ছিল। প্রত্যেকেই নতুন প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী নিজেদের অঞ্চলে পেতে আগ্রহী ছিল।[২৯] পূর্ববর্তী খলিফা উমর গভর্নরদের ব্যাপারে খুবই সতর্ক ছিলেন এবং তার গোয়েন্দারা তাদের উপর নজর রাখত। গভর্নর বা কমান্ডাররা সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠছে এমন প্রতীয়মান হলে তিনি তাদেরকে তাদের অবস্থান থেকে সরিয়ে দিতেন।[৩০] প্রথমদিকের মুসলিম সেনারা শহর থেকে দূরে নিজস্ব ক্যাম্পে অবস্থান করত। উমরের ভয় ছিল যে তারা হয়ত সম্পদ ও বিলাসিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বে এবং এর ফলে তারা আল্লাহর ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে এবং সম্পদ গড়ে তুলতে পারে ও রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।[৩১][৩২][৩৩][৩৪] উসমান ইবন আফ্‌ফান যখন খুবই বৃদ্ধ হয়ে পড়েন প্রথম মুয়াবিয়ার আত্মীয় প্রথম মারওয়ান তার সচিব হিসেবে শূণ্যস্থান পূরণ করেন এবং এসব কঠোর নিয়মে শিথিলতা আনেন। মারওয়ানকে ইতিপূর্বে দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর কিছু মিশরীয়কে খলিফা উসমানের বাসগৃহ দেখিয়ে দেন। পরে এই মিশরীয়রা খলিফা উসমানকে হত্যা করে।[৩৫] উসমানের হত্যাকান্ডের পর আলি খলিফা নির্বাচিত হন। তাকে এরপর বেশ কিছু সমস্যা সামাল দিতে হয়। আলি মদিনা থেকে কুফায় রাজধানী স্থানান্তর করেন। ৬৫৬ থেকে ৬৬১ পর্যন্ত চলমান সংঘাতকে প্রথম ফিতনা (“গৃহযুদ্ধ”) বলে ডাকা হয়। সিরিয়ার গভর্নর ও খলিফা উসমানের আত্মীয় মুয়াবিয়া চাইছিলেন যে হত্যাকারীদের যাতে গ্রেপ্তার করা হয়। মারওয়ান সবাইকে প্ররোচিত করেন এবং সংঘাত সৃষ্টি করেন। মুহাম্মদ (সা) এর স্ত্রী আইশা এবং তার দুই সাহাবি তালহা ও যুবাইর ইবনুল আওয়াম দোষীদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে আলিকে বলতে বসরা যান। মারওয়ান ও অন্যান্য যারা সংঘাত চাইছিল তারা সবাইকে লড়াই করতে প্ররোচিত করে। উটের যুদ্ধে দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই হয়। এ যুদ্ধে আলি বিজয় অর্জন করেন।
এ যুদ্ধের পর আলি ও মুয়াবিয়ার মধ্যে সিফফিনের যুদ্ধ হয়। কোনো এক পক্ষে বিজয়ী হওয়ার আগেই যুদ্ধ থেমে যায় এবং দুপক্ষে বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে একমত হয়। যুদ্ধের পর আমর ইবনুল আস মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে ও আবু মুসা আশয়ারি আলির পক্ষ থেকে আলোচক নিযুক্ত হন। সাত মাস পর ৬৫৮ এর ফেব্রুয়ারিতে আধরুহ নামক স্থানে সাক্ষাত করেন। আমর ইবনুল আস আবু মুসা আশয়ারিকে এ মর্মে রাজি করান যে দুপক্ষই লড়াই বন্ধ করবে এবং একজন নতুন খলিফা নিযুক্ত করা হবে। আলি ও তার সমর্থকরা এ সিদ্ধান্তে হতবাক হয়ে যান। এ ঘটনা মুয়াবিয়ার কাছে খলিফার মর্যাদা কমানোর সমতুল্য ছিল। আলি এ সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানালেও মীমাংসা মেনে নেয়ার ব্যাপারে নিজেকে বাধ্য অবস্থায় দেখতে পান। এর ফলে আলির অবস্থান তার নিজের সমর্থকদের মধ্যেও দুর্বল হয়ে পড়ে। আলির সমর্থকদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে চাপ সৃষ্টিকারীরা ছিল সবচেয়ে কঠোর প্রতিবাদকারী। তারা আলির বাহিনী থেকে বের হয়ে যায় এবং “একমাত্র আল্লাহর প্রতি” স্লোগান দিতে থাকে। এ দল খারিজি নামে পরিচিত হয়ে উঠে। ৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে আলি ও খারিজিরা মুখোমুখি হয়। আলি যুদ্ধে জয়ী হলেও ক্রমাগত সংঘর্ষ তার অবস্থানের উপর প্রভাব ফেলছিল এবং পরবর্তী বছরগুলোতে কিছু সিরিয়ান মুয়াবিয়াকে বিদ্রোহী খলিফা হিসেবে ঘোষণা করে।[৩৬] ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে আলি একজন খারিজির হাতে নিহত হন। সে বছর ছয় মাস পর হাসান ইবনে আলি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মুয়াবিয়ার সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। হাসান-মুয়াবিয়া চুক্তি মোতাবেক হাসান মুয়াবিয়াকে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন এ শর্তে যে তিনি জনগণের প্রতি ন্যায়ানুগ আচরণ করবেন, তাদের নিরাপদ রাখবেন এবং নিজের মৃত্যুর পর কোনো রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করবেন না।[৩৭][৩৮] এ ঘটনার ফলে খুলাফায়ে রাশেদীনের শাসনের অবসান হয়। এরপর মুয়াবিয়া চুক্তির বাইরে গিয়ে উমাইয়া রাজবংশের সূচনা করেন এবং দামেস্কে রাজধানী স্থাপন করেন।[৩৯] ৬৮০ তে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার নিয়ে পুনরায় সংঘাত শুরু হয় যা দ্বিতীয় ফিতনা নামে পরিচিত।[৪০] ব্যাপক লড়াইয়ের পর উমাইয়া রাজবংশ প্রথম মারওয়ানের হাতে এসে পড়ে।
৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে রাজবংশের পতনের আগ পর্যন্ত সিরিয়ে উমাইয়াদের খলিফার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তবে উমাইয়ারা কর্ডোবাতে (আল আন্দালুস, বর্তমান পর্তুগাল ও স্পেন) আমিরাত হিসেবে ও পরবর্তীতে খিলাফত হিসেবে ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল। ইবেরিয়ান উপদ্বীপে মুসলিম শাসন পরবর্তী ৫০০ বছর বিভিন্ন রূপে টিকে ছিল যেমন, তাইফা, বার্বার রাজ্য ও গ্রানাডা রাজ্য।
৭১২ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম ইন্দুজ নদীসহ সিন্ধু ও পাঞ্জাব অঞ্চল জয় করেন। সিন্ধু ও পাঞ্জাবের জয় উমাইয়া খিলাফতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিজয় ছিল। রাজস্থানের যুদ্ধের পর সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া থেমে যায়। আরবরা ভারত আক্রমণের চেষ্টা করে কিন্তু উত্তর ভারতের রাজা নাগাভাতা ও দক্ষিণ ভারতের সম্রাট দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য তাদের পরাজিত করেন। আরব লেখকদের ভাষ্যমতে এরপর খলিফা মাহদি ভারত বিজয়ের পরিকল্পনা বাদ দেন।
পরবর্তী বছরগুলোতে এবং বিশেষত ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দে ইবেরিয়ার তাইফা পদ্ধতির আওতায় গ্রানাডা আমিরাত স্বাধীনতা বজায় রাখে। উত্তরের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলোকে কর প্রদানের মাধ্যমে তারা টিকে ছিল। ১০৩১ থেকে তারা দক্ষিণে বিস্তৃত হতে শুরু করে।
১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দের ২ জানুয়ারি কর্ডোবার নাসিরি রাজ্যের পতনের মাধ্যমে ইবেরিয়ায় মুসলিম শাসনের সমাপ্তি হয়। গ্রানাডার শেষ মুসলিম শাসক দ্বাদশ মুহাম্মদ যিনি বোয়াবদিল নামে পরিচিত, আরাগনের রাজা দ্বিতীয় ফার্ডিনেন্ড ও কাস্টিলের রাণী প্রথম ইসাবেলার কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

প্রথম আবদুর রহমান
প্রথম আবদুর রহমান (পুরো নাম আবদুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়া ইবনে হিশাম ইবনে আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান) (৭৩১-৭৮৮) ছিলেন কর্ডোবা আমিরাত শাসনকারী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। পরবর্তীতে এই আমিরাত খিলাফতে রূপ নেয়। আবদুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত সরকার বাকি মুসলিম বিশ্ব থেকে পৃথক হয়ে পড়ে। মুসলিম বিশ্বের অন্যত্র এসময় আব্বাসীয় খিলাফতের শাসন চলছিল। ৭৫০ সালে উমাইয়াদের পরাজিত করে আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় আসে।
History of Greater Iran

Until the rise of modern nation-states
Pre-modern

Prehistory

Proto-Elamite civilization
3200–2800 BC
Elamite dynasties
2800–550 BC
Bactria-Margiana Complex
2200–1700 BC
Kingdom of Mannai
10th–7th century BC
Median Empire
728 –550 BC
Scythian Kingdom
652–625 BC
Achaemenid Empire
550–330 BC
Seleucid Empire
330–150 BC
Greco-Bactrian Kingdom
250-125 BC
Parthian Empire
248–BC 224
CE

Kushan Empire
30–275
Sassanid Empire
224–651
Afrighid dynasty
305–995
Hephthalite Empire
425–557
Kabul Shahi kingdom
565–879
Dabuyid dynasty
642–760
Kingdom of Alania
8th-9th century–1238/1239

Islamic [দেখাও] Patriarchal Caliphate
637–651
Umayyad Caliphate
661–750
Abbasid Caliphate
750–1258
Tahirid dynasty
821–873
Zaydis of Tabaristan
864–928
Saffarid dynasty
861–1003
Samanid dynasty
819–999
Ziyarid dynasty
928–1043
Buyid dynasty
934–1055
Ghaznavid Empire
975–1187
Ghurid dynasty
1149–1212
Seljuq Empire
1037–1194
Khwarazmian dynasty
1077–1231
Ilkhanate
1256–353
Kartids dynasty
1231–389
Muzaffarid dynasty
1314–1393
Chupanid dynasty
1337–1357
Jalayerid dynasty
1339–1432
Timurid Empire
1370–1506
Qara Qoyunlu Turcomans
1407–1468
Aq Qoyunlu Turcomans
1378–1508
Safavid Empire
1501–1722
Mughal Empire
1526–1857
Hotaki dynasty
1722–1729
Afsharid dynasty
1736–1750
Zand Dynasty
1750–1794
Durrani Empire
1794–1826
Qajar Dynasty
1794–1925

মুয়াবিয়ার রাজবংশ “সুফয়ানি” (আবু সুফিয়ানের বংশধর) ৬৬১ থেকে ৬৮৪ পর্যন্ত শাসন করে। মুয়াবিয়ার শাসনকালকে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও বাহ্যিক বিস্তৃতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সাম্রাজ্যের ভেতরে শুধু একটি বিদ্রোহের রেকর্ড আছে। হুজর ইবনে আদি কুফ্যার এই বিদ্রোহ করেন। হুজর ইবনে আদি নিজের আলির বংশধরদের খিলাফতের দাবিদার বলে সমর্থন জানান। কিন্তু ইরাকের গভর্নর জিয়াদ ইবনে আবু সুফিয়ান তার আন্দোলন সহজেই দমন করেন।
মুয়াবিয়া সিরিয়ার খ্রিষ্টানদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে উৎসাহিত করেন[৪১] এবং তার একজন ঘনিষ্ট উপদেষ্টা ছিলেন জন অব ডেমাস্কাসের পিতা সারজুন। একই সময় তিনি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে যান। তার শাসনামলে রোডস ও ক্রিট অধিকৃত হয় এবং কনস্টান্টিনোপলের বিরুদ্ধে বেশ কিছু আক্রমণ পরিচালিত হয়। ব্যর্থ হওয়ার পর এবং বড় ধরনের খ্রিষ্টান উত্থানের ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার পর তিনি বাইজেন্টাইনদের সাথে শান্তি অবস্থায় আসেন। মুয়াবিয়া উত্তর আফ্রিকা (কাইরাওয়ানের প্রতিষ্ঠা) ও মধ্য এশিয়া (কাবুল, বুখারা ও সমরকন্দ জয়) সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন।
৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তার পুত্র প্রথম ইয়াজিদ তার উত্তরাধিকারি হন। অনেক নামকরা মুসলিম ইয়াজিদের ক্ষমতালাভের বিরোধী ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মুহাম্মদ (সা) এর এক সাহাবির ছেলে আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের ও চতুর্থ খলিফার পুত্র হুসাইন ইবনে আলি। ফলশ্রুতিতে ঘটে যাওয়া সংঘাত দ্বিতীয় ফিতনা বলে পরিচিত।
৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের মক্কার উদ্দেশ্যে মদিনা ত্যাগ করেন। ইয়াজিদের বিপক্ষে হুসাইনের অবস্থানের কথা শুনে কুফার জনগণ হুসাইনের কাছে তাদের সমর্থন নেয়ার জন্য আবেদন জানায়। হুসাইন তার চাচাত ভাই মুসলিম বিন আকিলকে এর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পাঠান। এ খবর ইয়াজিদের কাছে পৌছলে তিনি বসরার শাসক উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদকে কুফার জনগণকে হুসাইনের নেতৃত্বে সমবেত হওয়া থেকে নিবৃত্ত করার দায়িত্ব দেন। উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ মুসলিম বিন আকিলের পাশে থাকে জনতাকে প্রতিহত করতে সক্ষম এবং তাকে গ্রেপ্তার করেন। উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের উপর হুসাইনকে প্রতিহত করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে শুনে মুসলিম বিন আকিল তাকে অনুরোধ করেন যাতে হুসাইনকে কুফায় না আসার ব্যাপারে জানিয়ে চিঠি দেয়া হয়। তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ মুসলিম বিন আকিলকে হত্যা করেন। আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের আমৃত্যু মক্কায় থেকে যান। হুসাইন সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি তার পরিবারসহ কুফায় যাবেন। সমর্থনের অভাবের বিষয়ে তার এসময় জানা ছিল না। হুসাইন ও তার পরিবারকে ইয়াজিদের সেনাবাহিনী রুখে দেয়। এসময় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আমরু বিন সাদ, শামার বিন জিয়ালজোশান ও হুসাইন বিন তামিম। তারা হুসাইন ও তার পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সাথে লড়াই করে হত্যা করে। হুসাইনের দলে ২০০ জন মানুষ ছিল যাদের অধিকাংশ ছিল নারী। এদের মধ্যে হুসাইনের বোন, স্ত্রী, মেয়ে ও তাদের সন্তানরা ছিল। নারী ও শিশুদেরকে যুদ্ধবন্ধী হিসেবে দামেস্কে ইয়াজিদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। হুসাইনের মৃত্যু ও তার পরিবারের বন্দী হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে জনগণের সমর্থন তার দিক থেকে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের বন্দী করে রাখা হয়। এরপর তাদের মদিনা ফিরে যেতে দেয়া হয়। বেঁচে যাওয়া একমাত্র পুরুষ সদস্য ছিলেন আলি ইবনে হুসাইন জয়নুল আবেদিন। অসুস্থতার কারণে কাফেলা আক্রান্ত হওয়ার সময় তিনি লড়াই করতে পারেননি।[৪২] মক্কায় অবস্থান করলেও হুসাইনের মৃত্যুর পর আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের আরো দুটি প্রতিপক্ষ দলের সাথে যুক্ত হন। এর একটি মদিনা ও অন্যটি বসরা ও আরবের খারিজিরা সংঘটিত করে। মদিনা ছিল হুসাইনসহ মুহাম্মদ (সা) ও তার পরিবারের বাসস্থান, তার মৃত্যু ও পরিবারের বন্দী হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিরাট আকারে প্রতিপক্ষ সৃষ্টি হয়। ৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ইয়াজিদ আন্দোলন দমন করতে সেনাবাহিনী পাঠান। হাররাহর যুদ্ধে সেনারা মদিনার প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে। মদিনার মসজিদে নববী ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ইয়াজিদের সেনারা এগিয়ে গিয়ে মক্কা অবরোধ করে। অবরোধের এক পর্যায়ে আগুনে কাবার ক্ষতি হয়। কাবা ও মসজিদে নববীর ক্ষতিসাধনের ঘটনা পরবর্তী ইতিহাসবিদদের কাছে বেশ সমালোচনার বিষয়ে পরিণত হয়।
অবরোধ চলার সময় ইয়াজিদ মৃত্যুবরণ করেন এবং উমাইয়া সেনারা দামেস্কে ফিরে আসে। আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের মক্কার নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন। ইয়াজিদের পুত্র দ্বিতীয় মুয়াবিয়া (শাসনকাল ৬৮৩-৮৪) তার উত্তরসুরি হন কিন্তু সিরিয়ার বাইরে খলিফা হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন না। সিরিয়ার ভেতর দুটি দল তৈরী হয়, একটি হল কায়সদের দল, এরা আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়েরকে সমর্থন করত, আরেকটি হল কুদাদের দল যারা প্রথম মারওয়ানকে সমর্থন করত। মারওয়ানের সমর্থকরা মারজ রাহিতের যুদ্ধে বিজয়ী হয় এবং ৬৮৪ তে মারওয়ান খলিফার পদে আরোহণ করেন।
প্রথম মারওয়ানি
মারওয়ানের প্রথম কাজ ছিল এসময় ইসলামি বিশ্বের অধিকাংশ এলাকা জুড়ে খলিফা হিসেবে স্বীকৃত আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়েরের বিদ্রোহী দলের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। মারওয়ান মিশর অধিকার করেন ও নয় মাস শাসন করার পর ৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
মারওয়ানের পর তার পুত্র আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান (শাসনকাল ৬৮৫-৭০৫) খলিফা হন। তিনি খিলাফতের উপর উমাইয়াদের কর্তৃত্ব সংহত করেন। তার শাসনের প্রথমদিকে কুফাভিত্তিক আল-মুখতারের বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। আল-মুখতার আলির আরেক পুত্র মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়াকে খলিফা হিসেবে দেখতে চাইতেন। তবে বিদ্রোহের সাথে ইবনুল হানাফিয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায় না। আল-মুখতারের সেনারা ৬৮৬তে উমাইয়াদের সাথে ও ৬৮৭তে আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়েরের সেনাদের সাথে লড়াই করে এবং পরাজিত হয়। ফলে তার বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটে। ৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া সেনারা পুনরায় ইরাক অধিকার করে ও একই বাহিনী মক্কা দখল করে। আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের হামলায় নিহত হন।
আবদুল মালিকের শাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল জেরুজালেমের ডোম অব দ্য রক নির্মাণ। লিখিত দলিলে অস্পষ্টতা থাকলেও সম্পূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ ৬৯২ খ্রিষ্টাব্দে শেষ হয়েছে বলে ধরা হয়। অর্থাৎ এটি আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়েরের সংঘর্ষের সময় নির্মাণ করা হয়েছিল।
আবদুল মালিককে প্রশাসনকে কেন্দ্রিভুত করা ও আরবিকে সরকারি ভাষা করার কৃতিত্ব দেয়া হয়। তিনি স্বতন্ত্র মুসলিম মুদ্রা চালু করেন। ইতিপূর্বে বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় মুদ্রা ব্যবহার হত। আবদুল মালিক বাইজেন্টানটিয়ামের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। সেবাস্টপলিসের যুদ্ধে বাইজেন্টাইনরা পরাজিত হয় এবং আর্মেনিয়া ও ককেসিয়ান ইবেরিয়ায় কর্তৃত্ব পুনপ্রতিষ্টা করা হয়।
আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর তার পুত্র প্রথম আল ওয়ালিদ (শাসনকাল ৭০৫-১৫) খলিফা হন। আল ওয়ালিদ একজন দক্ষ নির্মাতা ছিলেন। তিনি মসজিদে নববী ও দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেন।
আবদুল মালিক ও আল ওয়ালিদ উভয়ের শাসনের সময়কার একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ। অনেক ইরাকি উমাইয়া শাসনের বিরোধি ছিল। শান্তি বজায় রাখার জন্য হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সিরিয়া সেনাদের ইরাকে নিয়ে আসেন। নতুন গেরিসন শহর ওয়াসিতে তাদের স্থান দেয়া হয়। বিদ্রোহ দমনে এই সেনারা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আল ওয়ালিদের পর তার ভাই সুলায়মান ইবনে আবদুল মালিক (শাসনকাল ৭১৫-১৭) খলিফা হন। তার শাসনকালে কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করা হয়। অবরোধ ব্যর্থ হলে বাইজেন্টাইন রাজধানী জয়ে আরবদের উৎসাহে ভাটা পড়ে। তবে অষ্টম শতকের প্রথম দুই দশক খিলাফত ক্রমাগতভাবে বিস্তৃত হচ্ছিল যা পশ্চিমে ইবেরিয়ান উপদ্বীপ থেকে পূর্বে ট্রান্সঅক্সানিয়া ও উত্তর ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
সুলায়মানের পর তার তুতো ভাই উমর ইবনে আবদুল আজিজ (শাসনকাল ৭১৭-২০) খলিফা হন। উমাইয়া খলিফাদের মধ্যে তার স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে। তিনি একমাত্র উমাইয়া খলিফা যাকে প্রচলিত অর্থে সম্রাট হিসেবে নয় বরং প্রকৃত অর্থে খলিফা বিবেচনা করা হয়।
উমরকে অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য কৃতিত্ব দেয়া হয়। উমাইয়া শাসনের সময় অধিকাংশ জনতা ছিল খ্রিষ্টান, ইহুদি, জরস্ট্রিয়ান ও অন্যান্য ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ের। এই ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয়নি। তাদেরকে জিজিয়া নামক কর দিতে হত। এ কর মুসলিমদের উপর ছিল না। ফলে রাজস্ব সংগ্রহের দিক থেকে ব্যাপকভাবে ইসলাম গ্রহণ সমস্যার সৃষ্টি করছিল। কিছু বিবরণী থেকে জানা যায় প্রাদেশিক শাসকরা ধর্মান্তরে নিরুৎসাহিত করছিলেন। উমর কিভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন তা স্পষ্ট না, কিন্তু সুত্র মতে তিনি আরব ও অনারবদের প্রতি একই নীতি অবলম্বন করেন এবং ইসলাম গ্রহণের পথে বাধা অপসারণ করেন।
উমরের মৃত্যুর পর আবদুল মালিকের আরেক পুত্র দ্বিতীয় ইয়াজিদ (শাসনকাল ৭২০-২৪) খলিফা হন। ইয়াজিদ খিলাফতের সীমানার ভেতরের খ্রিষ্টান ছবি মুছে ফেলার আদেশ দেন। ৭২০ এ ইরাকে [ইয়াজিদ ইবনুল মুহাল্লাব[ইয়াজিদ ইবনুল মুহাল্লাবের]] নেতৃত্ব আরেকটি বড় আকারের বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।
আবদুল মালিকের আরেক পুত্র হিশাম ইবনে আবদুল মালিক (শাসনকাল ৭২৪-৭৪৩) এরপর খলিফা হন। তার দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল শাসনকাল সামরিক অভিযান সংক্ষিপ্তকরণের কারণে চিহ্নিত করা হয়। হিশাম উত্তর সিরিয়ার রিসাফাতে তার দরবার স্থাপন করেন। এটি দামেস্কের চেয়ে বাইজেন্টাইন সীমান্তের বেশি কাছে ছিল। বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে আক্রমণ পুনরায় শুরু হয় এবং কনস্টান্টিনোপল শেষবার অবরোধ করে ব্যর্থ হওয়ার পর তা শেষ হয়। নতুন অভিযানের মধ্যে ছিল আনাতোলিয়ায় সফল অভিযান। এক্রোইননের যুদ্ধে পরাজয়ের পর আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ সীমানা বিস্তৃতি হয়নি।
হিশামের শাসনের সময় ৭৩২ খ্রিষ্টাব্দে টুরসের যুদ্ধে ফ্রেঙ্কদের কাছে আরব সেনাদের পরাজয়ের পর পশ্চিমদিকে সীমানা সম্প্রসারণ সমাপ্ত হয়। ৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর আফ্রিকায় বার্বার বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এটিকে খুব কষ্টে দমন করা হয়। ককেসাসে খাজারদের সাথে লড়াই চূড়ান্তে পৌছায়। আরবরা ডেরবেন্টে একটি সামরিক ঘাটি তৈরী করে এবং উত্তর ককেসাসে বেশ কয়েকটি আক্রমণ চালায়। কিন্তু যাযাবর খাজারদের পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। সংঘর্ষ খুবই রক্তাক্ত ছিল। ৭৩০ খ্রিষ্টাব্দে আরব সেনারা আরাদাবিলের যুদ্ধে পরাজিত হয়। মারওয়ান ইবনে মুহাম্মদ, পরবর্তীতে দ্বিতীয় মারওয়ান, ৭২৭ খ্রিষ্টাব্দে শেষপর্যন্ত অভিযান সমাপ্ত করেন। তারা ভলগা পর্যন্ত পৌছালেও খাজাররা তাদের আওতার বাইরে ছিল।
হিশাম পূর্বদিকেও পরাজয়ের সম্মুখিন হয়। তার সেনারা তোখারিস্তান ও ট্রান্সঅক্সানিয়া জয় করার চেষ্টা করে। দুটি এলাকাই ইতিমধ্যে আংশিকভাবে অধিকৃত হয়। কিন্তু এগুলো শাসন করা কষ্টসাধ্য ছিল। এসময় আরেকবার অনারবদের ধর্মান্তরের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয়, বিশেষত ট্রান্সঅক্সানিয়ার সোগডিয়ানদের ক্ষেত্রে। ৭২৪ খ্রিষ্টাব্দে পিপাসার দিনে উমাইয়াদের পরাজয়ের পর খোরাসানের গভর্নর আশরাস ইবনে আবদুল্লাহ আলসুলামি ইসলামে ধর্মান্তরিত সোগডিয়ানদের কর মওকুফের প্রতিশ্রুতি দেন কিন্তু যখন এ কথা খুবই বেশি জনপ্রিয়তা পায় ও রাজস্বের জন্য ক্ষতিকর বলে প্রতীয়মানে হয় তখন তিনি তা তুলে নেন। ৭৩১ ডিফাইলের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পর খোরাসানি আরবদের বিরোধ বৃদ্ধি পায়। আলহারিস ইবনে সুরায়জ একটি বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন এবং বলখ অধিকার করেন। তবে মার্ভ অধিকার করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনার পর আলহারিসের কার্যক্রম শেষ হয়ে গিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় কিন্তু অনারব মুসলিমদের অধিকারের প্রশ্নটি উমাইয়াদের মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি করে।
তৃতীয় ফিতনা

হিশামের পর দ্বিতীয় ইয়াজিদের পুত্র দ্বিতীয় আল-ওয়ালিদ (শাসনকাল ৭৪৩-৪৪) খলিফা হন। তার ব্যাপারে বলা হয় যে তিনি ধর্মীয় দিকের চেয়ে বরং পার্থিব সুখভোগের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন। বিরোধিদের মৃত্যুদন্ড দানে ও কাদারিয়াদের উপর নির্যাতনের মাধ্যমে দ্রুত তিনি অনেকের শত্রুতে পরিণত হন।
৭৪৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ওয়ালিদের এক পুত্র তৃতীয় ইয়াজিদ দামেস্কে নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। তার সেনারা দ্বিতীয় আল-ওয়ালিদকে হত্যা করে। তৃতীয় ইয়াজিদ দয়াপ্রদর্শনের জন্য সুনাম অর্জন করেন এবং কাদারিয়াদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। শাসনের ছয় মাসের মাথায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ইয়াজিদ তার ভাই ইব্রাহিমকে তার উত্তরসুরি মনোনীত করেন। কিন্তু প্রথম মারওয়ানের নাতি দ্বিতীয় মারওয়ান (শাসনকাল ৭৪৪-৫০) উত্তর দিক থেকে একটি সেনাদলের নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে আসেন ও ৭৪৪ এর ডিসেম্বরে দামেস্কে প্রবেশ করেন। এখানে তিনি নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। মারওয়ান তাৎক্ষনিকভাবে উত্তরে বর্তমান তুরস্কের অন্তর্গত হারানে তার রাজধানী সরিয়ে নেন। সিরিয়ায় শীঘ্রই বিদ্রোহ দেখা দেয়, সম্ভবত রাজধানী স্থানান্তরের কারণে। ৭৪৬ এ মারওয়ান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হোমস ও দামেস্কে চারপাশের দেয়াল ভেঙ্গে ফেলেন।
ইরাক ও ইরানের খারিজিদের কাছ থেকে মারওয়ান প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হন। তারা প্রথমে দাহহাক ইবন কায়স আল শায়বানি ও পরে আবু দুলাফকে বিদ্রোহী খলিফা হিসেবে মনোনীত করে। মারওয়ান ইরাকে পুনরায় কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হন কিন্তু এসময় খোরাসানে আরো বড় হুমকির জন্ম হয়।
আব্বাসীয় বিপ্লব
আব্বাসীয় পরিবার কর্তৃক পরিচালিত হাশিমিয়া আন্দোলন উমাইয়া খিলাফতকে উৎখাত করে। আব্বাসীয়রা হাশিমি গোত্রের সদস্য ছিল। তবে হাশিমিয়া শব্দটি আলির নাতি ও মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়ার পুত্র আবু হাশিম থেকে এসেছে বলে মনে হয়। কিছু সূত্রমতে আব্বাসীয় পরিবারের প্রধান আবু হাশিম ৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি মুহাম্মদ ইবনে আলি তার উত্তরসুরি মনোনীত করে যান। আল-মুখতারের ব্যর্থ বিদ্রোহের সমর্থকদের নিয়ে আব্বাসীয়রা এগিয়ে যায়। তারা নিজেদেরকে মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়ার সমর্থক হিসেবে তুলে ধরে।
৭১৯ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হওয়া হাশিমিয়া কর্মকাণ্ড খোরাসানে অনুগত লোক খুজতে থাকে। তারা মুহাম্মদ (সা) এর পরিবারের একজন সদস্যের জন্য সমর্থনের ডাক দেয়। তবে আব্বাসীয়দের কথা বলা হয়নি। এই কার্যক্রম আরব ও অনারব (মাওয়ালি) উভয়ের মধ্যেই সফল হয়। তবে দ্বিতীয় দলটি আন্দোলনের বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৭৪৬ এর দিকে আবু মুসলিম খোরাসানে হাশিমিয়াদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কালো পতাকার অধীনে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ শুরু করেন। তিনি শীঘ্রই খোরাসানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, এর উমাইয়া গভর্নর নাসর ইবনে সায়ারকে বহিষ্কার করেন এবং পশ্চিমদিকে একটি সেনাবাহিনী পাঠানো হয়। ৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দে কুফা হাশিমিয়াদের হস্তগত হয়। এটি ইরাকে উমাইয়াদের শেষ শক্ত ঘাটি ছিল। ওয়াসিতে অবরোধ করা হয় এবং সে বছরের নভেম্বরে আবুল আবাস কুফার মসজিদে খলিফা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। এর ফলে মারওয়ান তার সেনাদেরকে হারান থেকে ইরাকের দিকে পরিচালিত করেন। ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি দুই বাহিনী জাবের যুদ্ধে মুখোমুখি হয় এবং উমাইয়ারা পরাজিত হয়। এপ্রিলে দামেস্ক আব্বাসীয়দের হাতে এসে পড়ে এবং আগস্টে মারওয়ানকে মিশরে হত্যা করা হয়।
বিজয়ীরা সিরিয়ায় উমাইয়াদের কবরগুলোকে অবমাননা করা শুরু করে। শুধু দ্বিতীয় উমরের কবরের প্রতি কিছু করা হয়নি। উমাইয়া পরিবারের বাকি সদস্যদের অনুসরণ করা হয় ও হত্যা করা হয়। আব্বাসীয়রা উমাইয়া পরিবারের সদস্যদের জন্য ক্ষমা ঘোষণা করলে আশিজন ক্ষমা গ্রহণ করতে আসে এবং সবাইকে হত্যা করা হয়। হিশামের একজন নাতি প্রথম আবদুল রহমান বেঁচে যান এবং আল-আন্দালুস রাজ্য স্থাপন করেন এবং কর্ডোবা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রেভিট-অরটনের মতে উমাইয়াদের পতনের কারণ ছিল ইসলামের দ্রুত প্রসার। উমাইয়া শাসনামলে ব্যাপক মাত্রায় ধর্মান্তরের কারণে পারসিয়ান, বার্বার, কপ্ট ও আরামায়িকরা ইসলাম গ্রহণ করে। এই অনারবরা যারা মাওয়ালি বলে অবিহিত হত, প্রায় সময় তাদের আরব শাসকদের চেয়ে অধিক শিক্ষিত ও মার্জিত হত। নতুন ধর্মান্তরিতদের প্রতি সব মুসলিমের জন্য সমতার নীতির কারণে রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যায়। প্রেভিট-অরটনের এও বলেন যে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যকার জাতিবিদ্বেষের কারণে সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।[৪৩] উমাইয়া প্রশাসন
মুয়াবিয়ার প্রথম কাজ ছিল সাম্রাজ্যের জন্য একটি দক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থার চালু করা। পূর্ববর্তী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অংশ ছিল এমন প্রদেশে তিনি পূর্বতন নীতি চালু রাখেন। সরকারকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়, যথাক্রমে রাজনৈতিক ও সামরিক, কর সংগ্রহ এবং ধর্মীয় প্রশাসন। প্রত্যেকটি শাখা আরো বেশ কিছু শাখা, অফিস ও বিভাগে বিভক্ত ছিল।
প্রদেশ
সমগ্র সাম্রাজ্যে বেশ কিছু প্রদেশে বিভক্ত ছিল। উমাইয়া শাসনের সময় সীমান্ত বেশ কয়েকবার পরিবর্তন হয়। প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে খলিফা কর্তৃক নিযুক্ত গভর্নর থাকত। প্রদেশের ধর্মীয়, সেনা, পুলিশ ও বেসামরিক কর্তৃপক্ষ গভর্নরের অধীনে কাজ করত। স্থানীয় খরচ প্রদেশের সংগৃহীত কর থেকে মেটানো হত। অতিরিক্ত কর দামেস্কের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো হত। পরবর্তী সময় কেন্দ্রীয় সরকারের শক্তিক্ষয় হলে গভর্নররা অতিরিক্ত কর পাঠাতে গড়িমসি করে এবং নিজেদের ব্যক্তিগত ইচ্ছাপূরণে এগিয়ে যায়।[৪৪] সরকারি কর্মচারী
সাম্রাজ্যের দ্রুত বৃদ্ধির সাথে সাথে দক্ষ আরব কর্মীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমে যায়। ফলে মুয়াবিয়া বিজিত অঞ্চলগুলোতে পূর্ববর্তী সরকারি কর্মীদের দায়িত্বে বহাল রাখেন। ফলে স্থানীয় সরকারের অধিকাংশ দলিল গ্রীক, কপ্টিক ও ফার্সিতে লিপিবদ্ধ হত। আবদুল মালিকের সময় নিয়মিতভাবে সমস্ত সরকারি দলিলপত্র আরবিতে লেখা শুরু হয়।[৪৪] বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় সাম্রাজ্যে পূর্ব থেকেই মুদ্রা ব্যবস্থা চালু ছিল। উমাইয়া আমলেও একই ব্যবস্থা বহাল থাকে। আগে থেকে চলা মুদ্রাগুলো চলতে থাকে। তবে এগুলোর উপর কুরআনের আয়াত অঙ্কিত করা হয়। পাশাপাশি উমাইয়া সরকার নিজস্ব মুদ্রা চালু করে। এগুলো পূর্বের মুদ্রাগুলোর মতই ছিল। ইতিহাসে এটিই মুসলিম শাসক কর্তৃক প্রথম নিজস্ব মুদ্রা চালুর ঘটনা। স্বর্ণমুদ্রাকে বলা হত দিনার ও রৌপ্যমুদ্রাকে বলা হত দিরহাম।[৪৪] কেন্দ্রীয় দিওয়ান
প্রশাসনিক কাজে খলিফাকে সহায়তা করার জন্য কেন্দ্রে ছয়টি দপ্তর ছিল, দিওয়ান আল খারাজ, দিওয়ান আল রাসাইল, দিওয়ান আল খাতাম, দিওয়ান আল বারিদ, দিওয়ান আল কুদাত, দিওয়ান আল জুন্দ।
দিওয়ান আল খারাজ
এই বিভাগ সাম্রাজ্যের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা তদারক করত। সেসাথে নতুন করারোপ ও সংগ্রহ ব্যবস্থা করা এ বিভাগের কাজ ছিল।
দিওয়ান আল রাসাইল
এ বিভাগের কাজ ছিল কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক অফিসারদের কাছে আদেশ জারি করা। এটি সকল বিভাগের কাজকে সমন্বয় করত এবং প্রধান সচিবালয় হিসেবে কার্যনির্বাহ করত।
দিওয়ান আল খাতাম
রাষ্ট্রীয় দলিলপত্রের সংরক্ষণের জন্য মুয়াবিয়া এ বিভাগটি সৃষ্টি করেন। স্বাক্ষর ও গন্তব্যে পাঠানোর আগে প্রতিটি দাপ্তরিক নথিপত্রের একটি কপি সংরক্ষণ করে রাখা হত। এর ফলে আবদুল মালিকের সময় দামেস্কে একটি আর্কাইভ গড়ে উঠে। আব্বাসীয় শাসনের মধ্যভাগ পর্যন্ত এ বিভাগটি টিকে ছিল।
দিওয়ান আল বারিদ
মুয়াবিয়া একটি ডাক ব্যবস্থা চালু করেন। আবদুল মালিক এটিকে সাম্রাজ্যজুড়ে বিস্তৃত করেন এবং ওয়ালিদ এর পূর্ণ ব্যবহার করেন। আবদুল মালিক নিয়মিত ডাকবিভাগ গঠন করেন। উমর ইবনে আবদুল আজিজ খোরাসান মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ক্যারাভেনসরাই স্থাপন করে এর উন্নতি সাধন করেন। খলিফার কাছ থেকে প্রদেশের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের কাছে সংবাদ পাঠানোর জন্য সময় ব্যবধানে ঘোড়া বদল করা হত। পুরো মহাসড়ক ১২ মাইল (১৯ কিমি) ব্যবধানের কয়েকটি ধাপে বিভক্ত করা হয়। প্রত্যেকটি ধাপেই ডাক পরিবহনের জন্য ঘোড়া, গাধা ও উট রাখা থাকত। প্রথমদিকে এটি সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য চালু করা হলেও পর্যটকরাও এ থেকে উপকৃত হয়। ডাক পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত ঘোড়ার গাড়িগুলো দ্রুত সেনা পাঠানোর কাজেও ব্যবহৃত হত। এগুলো একই সময় ৫০ থেকে ১০০ জন সেনা পরিবহন করতে পারত। গভর্নর ইউসুফ বিন উমরের সময় ইরাকের ডাক বিভাগের জন্য বছরে ৪০,০০,০০০ দিরহাম খরচ হত।
দিওয়ান আল কুদাত
ইসলামের প্রাথমিক যুগে বিচারের কাজ মুহাম্মদ (সা) ও খলিফারা ব্যক্তিগতভাবে তদারক করতেন। সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ব্যাপক হওয়ার পর খলিফা উমর পৃথক বিচারবিভাগ চালু করেন এবং ২৩ হিজরি/৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দে মিশরে প্রথম কাজি নিযুক্ত করা হয়। ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দের পর উমাইয়া খলিফা হিশাম ও দ্বিতীয় ওয়ালিদের সময় মিশরের বেশ কিছু বিচারক একের পর একজন দায়িত্বপালন করেন।
দিওয়ান আল জুন্দ
উমরের সময় আরব ও অন্য জাতিগোষ্ঠীর মুসলিম সৈনিকদের ভাতা প্রদানের নীতি উমাইয়াদের সময় পরিবর্তন হয়। উমাইয়ারা সক্রিয় ভূমিকা না রাখলেও ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা রাখে। হিশাম এ ব্যবস্থার সংস্কার করেন এবং যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে শুধু তাদের ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করেন। বাইজেন্টাইনদের আদলে সেনাবাহিনীকে সংস্কার করা হয় এবং পাঁচটি অংশে বিভক্ত করা হয়, যথাক্রমে, মধ্যভাগ, দুই প্রান্ত, সম্মুখভাগ ও পশ্চাতভাগ। কুচকাওয়াচ বা যুদ্ধক্ষেত্রে একই গঠনবিন্যাস অনুসরণ করা হত। দ্বিতীয় মারওয়ান পুরনো বিভাগ বাতিল করেন এবং নতুন প্রথায় কুরদুস নামক সুসংঘটিত দলের সৃষ্টি করেন। উমাইয়া সেনারা তিনটি ভাগে বিভক্ত থাকত, যথাক্রমে, পদাতিক, অশ্বারোহী ও গোলন্দাজ। আরব সেনারা গ্রীক কায়দায় পোষাক ও অস্ত্রে সজ্জিত থাকত। উমাইয়া অশ্বারোহীরা সমান ও গোলাকার সেডল ব্যবহার করত। গোলন্দাজরা আরাদাহ (বেলিস্টা), মেনজানিক (মানগোনাল) ও দাবাবাহ বা কাবশ (বেটারিং রেম) ব্যবহার করত। ভারি যন্ত্রপাতি ও মালামাল উটের পিঠে করে সেনাবাহিনীর পিছনে থাকত।
সামাজিক সংগঠন
উমাইয়া খিলাফতের সময় প্রধান চারটি সামাজিক শ্রেণী ছিলঃ
5. মুসলিম আরব
6. মুসলিম অনারব (মুসলিম আরবদের মিত্র)
7. অমুসলিম স্বাধীন ব্যক্তি (খ্রিষ্টান, ইহুদি ও জরস্ট্রিয়ান)
8. দাস
মুসলিম আরবরা সমাজের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থান করত। ইসলামে সকল মুসলিমের সমান অবস্থান থাকলেও আরব মুসলিমরা নিজেদের সমাজের উপরের অবস্থানে রাখে।
মুসলিমদের মধ্যে এ বিভাজন সাম্রাজ্যজুড়ে সমস্যার সৃষ্টি করে। ইসলাম ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে মুসলিমদের মধ্যে অনারব জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আরব মুসলিমদের মত সমান অধিকার না থাকার ফলে নতুন ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব তৈরী হয়। সে সাথে ধর্মান্তরিত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে অমুসলিমদের কাছ থেকে সংগৃহিত করের পরিমাণ কমে আসে। ৭৪০ এর দশকে আব্বাসীয় বিপ্লবের আগ পর্যন্ত এ সমস্যা চলতে থাকে।[৪৬] অমুসলিম
অমুসলিমদের মধ্যে ছিল খ্রিষ্টান, ইহুদি, জরস্ট্রিয়ান ও পৌত্তলিক বার্বার যাদের জিম্মি বলা হত। মুসলিম শাসনের প্রতি অনুগত থাকার শর্তে তারা তাদের সামাজিক অধিকার ভোগ করত। তাদের নিজস্ব আদালত ছিল এবং সাম্রাজ্যজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা বহাল ছিল। সরকারি দপ্তরে সর্বোচ্চ পদ না পীও অনেক অমুসলিম প্রশাসনিক পদে আসীন ছিল। খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মধ্যে এসময় অনেক বড় মাপের ধর্মতাত্ত্বিকের আবির্ভাব হয়। কিন্তু পরবর্তীতে অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করে ফলে অমুসলিমদের মধ্যে চিন্তাবিদের সংখ্যা কমে যায়।[৪৭] ঐতিহাসিক গুরুত্ব[সম্পাদনা] উমাইয়া খিলাফতকে সাম্রাজ্য বিস্তার ও এরূপ বিস্তারের ফলে সৃষ্ট প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছাড়া উমাইয়ারা নতুন ধর্মান্তরিত মুসলিমদের (মাওয়ালি) তুলনায় পুরনো আরব পরিবারগুলো বেশি সম্মান বজায় রাখতে সচেষ্টা ছিল। ফলে তারা ইসলামের বিশ্বজনীনতা থেকে দূরত্বে অবস্থান করতে থাকে এবং পরবর্তীতে বিদ্রোহীদের প্রতিও একই আচরণ করে। জি. আর. হাউটিং এর মতে, “ইসলামকে বিজয়ীদের ধর্ম হিসেবে দেখা হত”।[৪৮] উমাইয়া শাসনের সময় আরবি প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃত হয়। রাষ্ট্রীয় দলিল ও মুদ্রা আরবিতে জারি করা হত। ব্যাপক মাত্রায় ধর্মান্তরকরণ সমাজে বিশাল সংখ্যক মুসলিম জনসংখ্যার জন্ম দেয়। উমাইয়ারা জেরুজালেমের ডোম অব দ্য রক ও দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ নির্মাণ করে।[৪৯] পরবর্তী ইসলামি ইতিহাসবিদদের কাছে উমাইয়ারা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন। তারা উমাইয়াদের প্রকৃত খিলাফতের পরিবর্তে রাজতন্ত্র চালুর জন্য দোষারোপ করেন। তবে আধুনিক আরব জাতীয়তাবাদীরা উমাইয়া শাসনের সময়কে আরবদের স্বর্ণযুগ বলে থাকে। এটি বিশেষত সিরিয়ান জাতীয়তাবাদী ও বর্তমানের সিরিয়া রাষ্ট্রের সাথে মেলে যাদের কেন্দ্র উমাইয়াদের মতই দামেস্ক। প্যান আরব রং হিসেবে যে চারটি রং বিভিন্ন আরব দেশের জাতীয় পতাকায় অঙ্কিত আছে তাকেও উমাইয়াদের প্রতিনিধিত্বশীল ধরা হয়।
সুন্নি দৃষ্টিভঙ্গি
সুন্নি পন্ডিতরা একমত যে মুয়াবিয়ার পরিবার ও তার পিতা আবু সুফিয়ান ইবনে হারব ও তার মা হিন্দ বিনতে উতবা ইসলামের বিরোধী ছিল। মুহাম্মদ (সা) এর মক্কা বিজয়ের পর তারা মুসলিম হন। আরব অভিজাতদের ভেতর সেসময় উমাইয়ারা বেশ প্রভাব ফেলে এবং চূড়ান্তভাবে রাশিদুন খিলাফত বিলুপ্ত করা হয় এবং রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
সুন্নি পন্ডিতরা ইসলাম গ্রহণকারী অনারব মুসলিমদের উপর মাওয়ালি প্রথা চালু রাখার জন্য উমাইয়াদের দোষারোপ করেন। শাসক অভিজাত আরবদের কাছে নতুন ইসলাম গ্রহণকারীরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হত এবং তাদেরকে অমুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য কর দিতে হত। সেসাথে তারা সরকার ও সামরিক বাহিনীতে কাজের সুযোগ পেত না।[৫০] মুয়াবিয়ার পরবর্তী অধিকাংশ শাসকের ব্যাপারে সুন্নি পন্ডিতরা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন এবং তাদের মতে তারা উম্মাহকে সংকটে ফেলেছিলেন। ব্যতিক্রমদের মধ্যে অন্যতম হলেন উমর ইবনে আবদুল আজিজ। খুলাফায়ে রাশেদীনের পর তাকে সবচেয়ে মহৎ খলিফা হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি পূর্বসূরিদের অন্যায় নীতি মাওয়ালিদের জিজিয়া কর বিলুপ্ত করেন।
শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি
উমাইয়াদের ব্যাপারে শিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গি শিয়া গ্রন্থ “সুলহ আল হাসানে” বর্ণিত করা আছে।[৫১][৫২] কিছু সূত্র মতে আলি তাদেরকে সর্বাপেক্ষা খারাপ ফিতনা বলেছেন।[৫৩] উমাইয়া খলিফাদের তালিকা

উমাইয়া পরিবারের বংশলতিকা। নীল কালিতে : খলিফা উসমান, খুলাফায়ে রাশেদীনের অন্যতম। সবুজ কালিতে, দামেস্কের উমাইয়া খলিফা। হলুদ কালিতে, কর্ডো‌বার উমাইয়া আমির। কমলা কালিতে, কর্ডো‌বার উমাইয়া খলিফা। তৃতীয় আবদুর রহমান ৯২৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আমির ছিলেন, এরপর নিজেকে খিলিফা ঘোষণা করেন। মুহাম্মদ (সা) এর সাথে আত্মীয়তা দেখানোর জন্য তাকেও এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খলিফা শাসনকাল
দামেস্কের খলিফা
মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান
৬৬১–৬৮০
ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া
৬৮০–৬৮৩
মুয়াবিয়া ইবনে ইয়াজিদ
৬৮৩–৬৮৪
মারওয়ান ইবনে আল হাকাম
৬৮৪–৬৮৫
আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান
৬৮৫–৭০৫
আল ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক
৭০৫–৭১৫
সুলায়মান ইবনে আবদুল মালিক
৭১৫–৭১৭
উমর ইবনে আবদুল আজিজ
৭১৭–৭২০
ইয়াজিদ ইবনে আবদুল মালিক
৭২০–৭২৪
হিশাম ইবনে আবদুল মালিক
৭২৪–৭৪৩
আল ওয়ালিদ ইবনে ইয়াজিদ
৭৪৩–৭৪৪
ইয়াজিদ ইবনে আল ওয়ালিদ
৭৪৪
ইবরাহিম ইবনুল ওয়ালিদ
৭৪৪
মারওয়ান ইবনে মুহাম্মদ (জাজিরার হারান থেকে শাসন করেন) ৭৪৪–৭৫০
কর্ডো‌বার আমির
প্রথম আবদুর রহমান
৭৫৬–৭৮৮
প্রথম হিশাম
৭৮৮–৭৯৬
প্রথম আল হাকাম
৭৯৬–৮২২
দ্বিতীয় আবদুর রহমান
৮২২–৮৫২
প্রথম মুহাম্মদ
৮৫২–৮৮৬
আল মুনজির
৮৮৬–৮৮৮
আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ
৮৮৮–৯১২
তৃতীয় আবদুর রহমান
৯১২–৯২৯
কর্ডো‌বার খলিফা
তৃতীয় আবদুর রহমান, খলিফা হিসেবে
৯২৯–৯৬১
দ্বিতীয় আল হাকাম
৯৬১–৯৭৬
দ্বিতীয় হিশাম
৯৭৬–১০০৮
দ্বিতীয় মুহাম্মদ
১০০৮–১০০৯
সুলাইমান ইবনুল হাকাম
১০০৯–১০১০
দ্বিতীয় হিশাম, পুনরায় ক্ষমতালাভ
১০১০–১০১২
সুলাইমান ইবনুল হাকাম, পুনরায় ক্ষমতালাভ
১০১২–১০১৭
চতুর্থ আবদুর রহমান
১০২১–১০২২
পঞ্চম আবদুর রহমান
১০২২–১০২৩
তৃতীয় মুহাম্মদ
১০২৩–১০২৪
তৃতীয় হিশাম (কর্ডোবা)
১০২৭–১০৩১

প্রথম মুয়াবিয়া
প্রথম মুয়াবিয়া (আরবি: معاوية ابن أبي سفيان‎}} মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান; ৬০২ – ২৯ এপ্রিল বা ১ মে ৬৮০) (মূল নাম, মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান) ছিলেন খিলাফতের উমাইয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা।[১][২] তিনি উমাইয়া গোত্রের দ্বিতীয় খলিফা। উসমান ইবনে আফফান এই গোত্র থেকে প্রথম খলিফা হন।[৩] মুয়াবিয়া পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের সাথে রাজনৈতিক বিষয়ে দক্ষ ছিলেন বলে মুহাম্মদ (সা) তাকে সচিব নিযুক্ত করেন।[৪] আবু বকর ও উমর ইবনুল খাত্তাবের খিলাফতের সময় তিনি সিরিয়ায় মুসলিম পক্ষে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
সমুদ্রের দিক থেকে বাইজেন্টাইন আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তিনি লেভান্টে নৌবাহিনী গড়ে তোলেন। এই নৌবাহিনী এজিয়ান সাগর ও মারমারা সাগরে বাইজেন্টাইনদের মোকাবেলা করতে ব্যবহৃত হয়। খিলাফত সাইজিকাসসহ বেশ কিছু অঞ্চল জয় করে এবং এখানে একটি নৌঘাটি স্থাপন করে।[৫] ইসলাম গ্রহন
ইমাম সুয়ুতি সহ অনেক ঐতিহাসিকের মতে, মুয়াবিয়া ও তার পিতা আবু সুফিয়ান মক্কা বিজয়ের বছর ইসলাম গ্রহণ করেন।[৬] ওয়াকেদি বলেন, হুদায়াবিয়ার সন্ধির পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তবে বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে মক্কা বিজয়ের সময় প্রকাশ করেছিলেন।[৭] মুহাম্মদ এর সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ : ইসলাম গ্রহণের পর মুহাম্মদের সঙ্গে হুনাইন ও তায়েফের যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধ শেষে মুহাম্মদ তাকে গনিমতের মাল থেকে ১০০ উট ও ৪০ উকিয়া (আউন্স) রুপা দিয়েছিলেন। [৮]

মদিনায় হিজরত : ইসলাম গ্রহণের পর মুয়াবিয়া পরিবারের সঙ্গে মদিনায় হিজরত করেন। মুয়াবিয়া ও হুতাত ইবনে ইয়াজিদের মাঝে মুহাম্মদ ভ্রাতৃত্ব করে দেন। [৯]

প্রথম ইয়াজিদ
ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান আরবি: يزيد بن معاوية بن أبي سفيان‎ (২০ জুলাই ৬৪৭ – ১৪ নভেম্বর ৬৮৩) সাধারণভাবে প্রথম ইয়াজিদ বলে পরিচিত, ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের দ্বিতীয় খলিফা। উত্তরাধিকার সূত্রে খিলাফত লাভকারীদের মধ্যে তিনি সর্বপ্রথম খলিফা হন। তার পিতা প্রথম মুয়াবিয়া তাকে খলিফা নিযুক্ত করেন। তিনি ৬৮০ থেকে ৬৮৩ সাল পর্যন্ত তিন বছর শাসন করেন।

দ্বিতীয় মুয়াবিয়া
দ্বিতীয় মুয়াবিয়া (বা মুয়াবিয়া ইবনে ইয়াজিদ) (معاوية بن يزيد) (28 মার্চ ৬৬১ – জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারি ৬৮৪) ছিলেন তৃতীয় উমাইয়া খলিফা। তার পিতা প্রথম ইয়াজিদের মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতায় আসেন। তিনি চার মাসের মত ক্ষমতায় ছিলেন। তার ক্ষমতারোহণের সময় আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের খিলাফত দাবি ও হেজাজসহ অন্যান্য এলাকার নিয়ন্ত্রণের কারণে সাম্রাজ্যে বিশৃংখলা বিরাজ করছিল।

প্রথম মারওয়ান
মারওয়ান ইবনুল হাকাম ইবনে আবুল আস ইবনে উমাইয়া (৬২৩-৭ মে ৬৮৫) (আরবি: مروان بن الحكم بن ابو العاص بن أمية‎) ছিলেন চতুর্থ উমাইয়া খলিফা। তিনি খলিফা উসমান ইবনে আফফানের চাচাত ভাই ছিলেন। ৬৮৪ সালে খলিফা দ্বিতীয় মুয়াবিয়া ক্ষমতা হারানোর পর তিনি খলিফা হন। তার ক্ষমতারোহণের মাধ্যমে আবু সুফিয়ানের বংশধরদের কাছ থেকে হাকামের বংশধরদের কাছে ক্ষমতা চলে আসে। তারা উভয়েই উমাইয়ার নাতি ছিলেন। হাকাম ছিলেন উসমান ইবনে আফফানের চাচা।
উটের যুদ্ধের সময় বলা হয় যে মারওয়ান ইবনুল হাকাম তালহাকে তীর নিক্ষেপ করেন যার কারণে তার মৃত্যু হয়। তালহা তৃতীয় খলিফা উসমানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন এমন ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি একাজ করেন। খলিফা আলি তাকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেন। পরবর্তীতে খলিফা প্রথম মুয়াবিয়া তাকে পুনরায় নিযুক্ত করেছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের প্রথম ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে মারওয়ানকে শহর থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এখান থেকে তিনি দামেস্ক চলে যান এবং দ্বিতীয় মুয়াবিয়া ক্ষমতা হারানোর পর তিনি খলিফা হন।
তার সংক্ষিপ্তকালের শাসনের সময় সিরিয়ান আরব ও একই সাথে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের সাথে গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের হেজাজ, ইরাক, মিশর ও সিরিয়ার অংশবিশেষে শাসন করছিলেন। মারজ রাহিতের যুদ্ধে মারওয়ান সিরিয়ার দখল ধরে রাখতে সক্ষম হন। এর মাধ্যমে উমাইয়া খিলাফতের মারওয়ানি শাখার সৃষ্টি হয়। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের কাছ থেকে মিশর ও সিরিয়া পুনরায় দখল করে নেন। কিন্তু তাকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি।
বংশলতিকা

কুরাইশ বংশ

আবদ মানাফ ইবনে কুসাই
আতিকা বিনতে মুররাহ

আবদ শামস
মুত্তালিব
হাশিম
সালমা বিনতে আমর

উমাইয়া ইবনে আবদ শামস
আব্দুল মুত্তালিব

হারব আবুল আস
আমিনা
আবদুল্লাহ
আবু তালিব
হামজা
আব্বাস

আবু সুফিয়ান ইবনে হার্ব
আল হাকাম
আফফান ইবনে আবিল আস
মুহাম্মদ (সা)
(বংশলতিকা)
খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ
আলী ইবন আবী তালিব
খাওলা বিনতে জাফর
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস

মুয়াবিয়া
প্রথম মারওয়ান উসমান ইবনে আফফান
রুকাইয়া
ফাতিমা
মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়া
আলি ইবনে আবদুল্লাহ

উমাইয়া খিলাফত
উসমান ইবনে আবুল আস
হাসান ইবনে আলি
হোসেইন ইবন আলী
(বংশলতিকা)
মুখতার আল সাকাফি
(আবু আমরা`কায়সানিয়া)
মুহাম্মদ “আল ইমাম” (আব্বাসীয় খিলাফত)

আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান
আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান (আরবি: عبد الملك بن مروان‎ ‘Abd al-Malik ibn Marwān, ৬৪৬ – ৮ অক্টোবর ৭০৫) ছিলেন ৫ম উমাইয়া খলিফা। তিনি হেজাজের মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন।[১][৩] আবদুল মালিক সুশিক্ষিত ছিলেন এবং তার শাসনামলে বেশ কিছু রাজনৈতিক সমস্যার পরও তিনি শাসক হিসেবে সফল ছিলেন। ১৪ শতকের মুসলিম ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন বলেন যে: “আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান হলেন অন্যতম মহান আরব ও মুসলিম খলিফা। রাষ্ট্রীয় কাজে তিনি বিশ্বাসীদের নেতা উমর ইবনুল খাত্তাবের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন”।
তার শাসনামলে সব গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আরবিতে অনুবাদ করা হয় এবং প্রথমবারের মত মুসলিম বিশ্বে বিশেষ মুদ্রা চালু করা হয়। এর ফলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধ বেধে যায়। বাইজেন্টাইনরা ৬৯২ সালে সেবাস্টোপলিসের যুদ্ধে পরাজিত হয়। এরপর ইসলামি মুদ্রা মুসলিম বিশ্বের একমাত্র মুদ্রা হিসেবে গণ্য করা হয়। এসময় কৃষি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে আরো বেশ কিছু সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়। আবদুল মালিক মুসলিম শাসন সংহত ও বিস্তৃত করেন, আরবিকে সরকারি ভাষা করেন ও নিয়মিত ডাক ব্যবস্থা প্রণয়ন করেন।[৪]

প্রথম আল ওয়ালিদ
আল ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক (আরবি: الوليد بن عبد الملك‎) বা প্রথম আল ওয়ালিদ (৬৬৮ – ২৩ ফেব্রুয়ারি ৭১৫) ছিলেন একজন উমাইয়া খলিফা। ৭০৫ থেকে শুরু করে ৭১৫ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি খলিফার পদে আসীন ছিলেন। তার শাসনামলে খিলাফত তার বৃহৎ বিস্তৃতি প্রত্যক্ষ করে। এসময় ট্রান্সওক্সানিয়া, সিন্ধু, হিস্পানিয়া ও বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে সফল অভিযান চালানো হয়।

সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক
সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক (আরবি: سليمان بن عبد الملك‎) (আনুমানিক ৬৭৪ – ২২ সেপ্টেম্বর ৭১৭) ছিলেন একজন উমাইয়া খলিফা। তিনি ৭১৫ থেকে ৭১৭ সাল পর্যন্ত খলিফার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের পুত্র ও খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদের ছোট ভাই।

উমর ইবনে আবদুল আজিজ
উমর ইবনে আবদুল আজিজ ( জন্ম: ২ নভেম্বর ৬৮২, ২৬ সফর ৬৩ হিজরি; মৃত্যু: ৩১ জানুয়ারী ৭২০, ১৬ রজব ১০১ হিজরী) উমাইয়া বংশীয় একজন শাসক। উমাইয়া বংশীয় অন্যান্য শাসকদের মত তাকেও মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে গণ্য করা হয়। খুলাফায়ে রাশেদীন এর চার খলিফার সাথে তুলনা করতে গিয়ে অনেকে তাকে ইসলামের পঞ্চম খলিফা বলে থাকেন[১]। তিনি ইসলামের ইতিহাসে দ্বিতীয় উমর নামে পরিচিত ছিলেন।

দ্বিতীয় ইয়াজিদ
ইয়াজিদ বিন আবদুল মালিক বা দ্বিতীয় ইয়াজিদ (৬৮৭ – ২৬ জানুয়ারি ৭২৪) (আরবি: يزيد بن عبد الملك‎) ছিলেন একজন উমাইয়া খলিফা। তিনি ৭২০ থেকে ৭২৪ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খলিফা হিসেবে আসীন ছিলেন।
দ্বিতীয় ইয়াজিদ তার পূর্ববর্তী খলিফা দ্বিতীয় উমরের মৃত্যুর পর খলিফা হন।[১] উমর খারেজিদের সাথে আলোচনা করলেও তিনি তাদের সাথে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। ইয়াজিদের সেনারা বিজয় লাভ করে এবং খারেজিদের নেতা শাওদাব নিহত হয়। উমরের মৃত্যুর পর ইয়াজিদ ইবনে আল মুহাল্লাব বন্দীদশা থেকে পালিয়ে ইরাকের দিকে চলে যান এবং সেখানে সমর্থন লাভে সক্ষম হন। তিনি দ্বিতীয় ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং পাল্টা শক্তির উত্থান ঘটান। প্রাথমিকভাবে সফল হলেও পরে তিনি মাসলামা ইবনে আবদুল মালিকের সেনাদের কাছে পরাজিত ও নিহত হন।
আল আন্দালুস (ইবেরিয়ান উপদ্বীপ), উত্তর আফ্রিকা ও সাম্রাজ্যের পূর্ব অংশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ৭২০-৭২১ সালে (১০২ হিজরি) ইফ্রিকিয়ায় গভর্নর ইয়াজিদ ইবনে মুসলিমকে সরিয়ে পূর্ববর্তী গভর্নর মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদ ক্ষমতায় আসেন। খলিফা এটি মেনে নেন এবং মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদকে ইফ্রিকিয়ার গভর্নর হিসেবে নিশ্চিত করেন।
আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানে ইয়াজিদের গভর্নর আল জাররাহ ইবনে আবদাল্লাহ ককেসাসের দিকে অগ্রসর হন এবং ৭২২-২৩ সালে (১০৩ হিজরি) বালানজার অধিকার করেন। একই বছর মদিনার গভর্নর আবদুর রহমান ইবনে দাহহাক একজন নারীকে জোরপূর্বক বিয়ে করতে বাধ্য করে খলিফার বিরাগভাজন হন। সে নারী ইয়াজিদের কাছে অভিযোগ করেন। ইয়াজিদ আবদুল রহমানকে সরিয়ে আবদুল ওয়ালিদ ইবনে আবদাল্লাহকে তার স্থলে বসান।[২] বাইজেন্টাইন কাহিনীকার থিওফানস দ্য কনফেসার[৩] উল্লেখ করেন যে একজন জাদুগর ইয়াজিদকে বলেছিলেন যে তিনি যদি খ্রিষ্টান আইকনের বিরোধীতা করেন তবে চল্লিশ বছর রাজত্ব করতে পারবেন। ইয়াজিদ তা করেন কিন্তু সে বছর তার মৃত্যু হয়। অসন্তুষ্টদের মধ্যে উমাইয়া বিরোধীরা শক্তি অর্জন করে। আল তাবারির বিবরণ অনুযায়ী আব্বাসীয়রা ৭২০-৭২১ সাল (১০২ হিজরি) থেকে নিজেদের উদ্দেশ্য উন্নীত করছিল। তারা ইতিমধ্যেই একটি শক্তি গড়ে তুলছিল যা পরবর্তীতে উমাইয়াদেরকে ৭৫০ সালে উৎখাত করে।
দ্বিতীয় ইয়াজিদ ৭২৪ সালে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর তার ভাই হিশাম ইবনে আবদুল মালিক খলিফা হন।

হিশাম ইবনে আবদুল মালিক
হিশাম ইবনে আবদুল মালিক (৬৯১ – ৬ ফেব্রুয়ারি ৭৪৩) (আরবি: هشام بن عبد الملك‎) 10 ছিলেন ১০ উমাইয়া খলিফা। ৭২৪ সাল থেকে শুরু করে ৭৪৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি খলিফার পদে ছিলেন। তার মা নিজের পিতার নামে সন্তানের নাম রেখেছিলেন।

দ্বিতীয় আল ওয়ালিদ
ওয়ালিদ ইবনে ইয়াজিদ বা দ্বিতীয় ওয়ালিদ (৭০৬ – ১৭ এপ্রিল ৭৪৪) (আরবি: الوليد بن يزيد‎) ছিলেন একজন উমাইয়া খলিফা। তিনি ৭৪৩ থেকে ৭৪৪ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তার চাচা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের উত্তরসুরি হিসেবে তিনি খলিফার পদে আসীন হন।

তৃতীয় ইয়াজিদ
ইয়াজিদ ইবনে ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক বা তৃতীয় ইয়াজিদ (৭০১ – ৩/৪ অক্টোবর ৭৪৪) (আরবি: يزيد بن الوليد بن عبد الملك‎) ছিলেন একজন উমাইয়া খলিফা। ৭৪৪ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ৩ বা ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ৬ মাস তিনি শাসন করেন। এসময় তার মৃত্যু হয়।
ইবরাহিম ইবনুল ওয়ালিদ
ইবরাহিম ইবনুল ওয়ালিদ (? – ২৫ জানুয়ারি ৭৫০) (আরবি: ابراهيم ابن الوليد بن عبد الملك‎) ছিলেন একজন উমাইয়া খলিফা ও খলিফা প্রথম ওয়ালিদের পুত্র। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পূর্বে ৭৪৪ সালে তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য শাসন করেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভয়ে তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। শাসনকালের স্বল্পতা ও সর্বজন মান্যতার অভাবের কারণে মুহাম্মদ ইবনে জারির আল তাবারি তাকে খলিফা হিসেবে অসফল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এও লিখেছেন যে ইবরাহিম খলিফা থাকার সময় আবদুল্লাহ ইবনে উমরকে ইরাকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন।
ইবরাহিম তার ভাই খলিফা তৃতীয় ইয়াজিদ কর্তৃক উত্তরাধিকারী মনোনীত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় মারওয়ান ইয়াজিদের বিরোধীতা করেন। পরে ইয়াজিদকে তিনি সম্মতি দিলেও তার মৃত্যুর পর মারওয়ান নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যান। ইবরাহিম অনুরোধ করলে মারওয়ান তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানে সম্মত হন। তিনি মারওয়ানের সাথে সিরিয়ার রুসাফায় প্রাক্তন খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের বাসভবনে ভ্রমণ করেন। ৭৫০ সালে উমাইয়া পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মত তিনিও আব্বাসীয়দের হাতে নিহত হন।

দ্বিতীয় মারওয়ান
মারওয়ান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মারওয়ান বা দ্বিতীয় মারওয়ান (৬৮৮ – ৬ আগস্ট ৭৫০) (Arabic: مروان بن محمد بن مروان بن الحكم / ALA-LC: Marwān bin Muḥammad bin Marwān bin al-Ḥakam) ছিলেন একজন উমাইয়া খলিফা। তিনি ৭৪৪ থেকে ৭৫০ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তিনি দামেস্কের উমাইয়া খিলাফতের শেষ খলিফা ছিলেন। তাকে হত্যা করা হয়।

প্রথম আবদুর রহমান
প্রথম আবদুর রহমান (পুরো নাম আবদুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়া ইবনে হিশাম ইবনে আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান) (৭৩১-৭৮৮) ছিলেন কর্ডোবা আমিরাত শাসনকারী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। পরবর্তীতে এই আমিরাত খিলাফতে রূপ নেয়। আবদুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত সরকার বাকি মুসলিম বিশ্ব থেকে পৃথক হয়ে পড়ে। মুসলিম বিশ্বের অন্যত্র এসময় আব্বাসীয় খিলাফতের শাসন চলছিল। ৭৫০ সালে উমাইয়াদের পরাজিত করে আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় আসে।

প্রথম হিশাম (কর্ডোবা)
প্রথম হিশাম (আরবি: هشام بن عبد الرحمن الداخل‎) ছিলেন কর্ডোবার আমির। ৭৮৮ থেকে ৭৯৬ পর্যন্ত তিনি আন্দালুসে উমাইয়া আমির হিসেবে দায়িত্বপালন করেন।
হিশাম ৭৫৬ সালে কর্ডোবায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রথম আবদুর রহমান ও তার স্ত্রী হালুলের প্রথম পুত্র।
আভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ
শাসনের শুরুতে ৭৮৮ সালে তাকে তার ভাই সুলায়মান ও আবদুল্লাহ কর্তৃক সংঘটিত বিদ্রোহ মোকাবেলা করতে হয়।
সেপ্টিমেনিয়া অভিযান
কারোলিনগিয়ান অঞ্চল থেকে দক্ষিণের দিকে হুমকি অনুভূত হওয়ায় ৭৯৩ সালে তিনি ফ্রাঙ্কদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দেন এবং গিরোনা ও নারবোনে সেনাপ্রেরণ করেন। কিন্তু এ স্থানগুলো দখল করা সম্ভব হয়নি। উমাইয়া সেনাপতি আবদুল মালিক ইবনে আবদুল ওয়াহিদ ইবনে মুগিস কারকাসোনের দিকে অগ্রসর হয়ে সফল হন। সেখানে তিনি লুইস দ্য পাইওসকে পরাজিত করেন। তবে কারোলিনগিয়ানের বেশি ভেতরে অভিযান চালান না হলেও বিপুল পরিমাণ সম্পদ তাদের হাতে আসে। পরবর্তীতে কর্ডোবা মসজিদসহ আরো অনেক মসজিদ তৈরী করা হয়।
অস্টুরিয়ান ও বাস্কদের বিরুদ্ধে অভিযান
৭৯৪ সালে তার সেনাপতি আবদুল মালিক ও তার ভাই আবদুল করিম উত্তরের রাজ্য আলাভা, পুরনো কাস্টিল, অস্টুরাস এসব অঞ্চলে অভিযান চালান। এই অঞ্চলের নবগঠিত রাজধানী আক্রমণ করা হয়। অস্টুরিয়ার দ্বিতীয় আলফোনসো পালিয়ে যান এবং শার্লেমাইনের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। এসব অভিযানে উত্তরের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলোকে ধ্বংস করা উদ্দেশ্য ছিল না বরং কর্ডোভার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এর লক্ষ্য ছিল।
হিশাম ৭৯৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এসময় তার বয়স ছিল ৪০ বছর। তিনি অনেকটা দ্বিতীয় উমরের মত ছিলেন এবং ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালান। তিনি খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং জাঁকজমক এড়িয়ে চলতেন। তিনি আল্লাহভীরু ব্যক্তি ছিলেন এবং তার ন্যায়বিচার ও সুশাসনের জন্য পরিচিত ছিলেন। তার মৃত্যুর পর আবদুল্লাহ পলাতক অবস্থা থেকে ফিরে আসেন এবং ভেলেন্সিয়ার অধিকার দাবি করেন। অন্যদিকে সুলায়মান তানজাহর দাবি করেন।
প্রথম হিশাম (কর্ডোবা)
বনু উমাইয়া
বনু কুরাইশ এর ক্যাডেট শাখা

পূর্বসূরী
প্রথম আবদুর রহমান
কর্ডো‌বার আমির
৭৮৮–৭৯৬
উত্তরসূরী
প্রথম আল হাকাম

প্রথম আল-হাকাম
আল-হাকাম ইবনে হিশাম ইবনে আবদুর রহমান (আরবি: الحكم بن هشام‎) ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের অধীনস্ত কর্ডোবার আমির। তিনি ৭৯৬ থেকে ৮২২ সাল পর্যন্ত আল-আন্দালুসে (মুরিশ শাসিত ইবেরিয়ান উপদ্বীপ) দায়িত্ব পালন করেন।
আল-হাকাম ছিলেন তার পিতার দ্বিতীয় পুত্র। তার বড় ভাই অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ক্ষমতা লাভের পর তিনি তার চাচা সুলায়মান ও আবদুল্লাহর কাছ থেকে বিরোধীতার সম্মুখীন হন। আবদুল্লাহ তার দুই পুত্র উবায়দুল্লাহ ও আবদুল মালিককে শার্লেমাইনের কাছে সাহায্যের জন্য আলোচনার উদ্দেশ্যে নিয়ে যান। এসময় সুলায়মান কর্ডোবা আক্রমণ করেন। যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন ও মেরিডার দিকে যাত্রা করেন। সেখানে তিনি বন্দী হন। এরপর তাকে হত্যা করা হয়। আবদুল্লাহকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। কিন্তু তাকে ভেলেনসিয়াতে অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়।[১] আল-হাকাম তার শাসনের অধিকাংশ সময়ই টলেডো, সারাগোসা ও মেরিডার বিদ্রোহ দমনে ব্যয় করেন। বিদ্রোহীরা দুইবার কর্ডোবায় পৌছে যান। আল-হাকামকে অপসারণ করে তার এক ভাই সম্পর্কীয় আত্মীয়কে ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পনা করা হয়। এই পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর ৮০৬ সালের ১৬ নভেম্বর একটি ভোজসভায় ৭২ জন অভিজাতকে হত্যা করা হয়। কাউকে ক্রুশে ঝোলানো হয় ও গোয়াদালকুইভির নদীর তীরে প্রদর্শন করা হয়। এসময় এধরনের নিষ্ঠুরতা স্বাভাবিক হিসেবে ধরা হত। কর্ডোবার ফটকে উত্তরের অভিযানের সময় বিদ্রোহী নেতা বা খ্রিষ্টানদের মাথা পরিদর্শন করানো হয়েছিল।[২] ৮১৮ সালে গোয়াদালকুইভির নদীর দক্ষিণ পাড়ে আল-রিবাদ শহরতলীতে একটি বিদ্রোহ দমন করেন। প্রায় ৩০০ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় ও ক্রুশে ঝোলানো হয়। বাকিদেরকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। তাদের কেউ মিশরের আলেক্সান্দ্রিয়ায়, কেউ ফেজ ও ক্রিট চলে যান। বাকিরা লেভেন্টের জলদস্যুদের সাথে যোগ দেন।[১] আল-হাকাম ৮২২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ২৬ বছর রাজত্ব করেছেন।
আল-হাকাম ছিলেন প্রথম হিশাম ও তার উপপত্নী জোখরুফের পুত্র।[৩] আল-হাকামের সন্তানরা হল:[৪] • দ্বিতীয় আবদুর রহমান, কর্ডোবার উমাইয়া আমির (৮২২-৮৫২)
• আল-মুগিরা
• সাইদ
• উমাইয়া
• আল-ওয়ালিদ বিন আল-হাকাম। ৮৩৮ সালে তিনি গালিসিয়ায় একটি অভিযানের নেতৃত্ব দেন।[৫] আজাব নামে আল-হাকামের একজন উপপত্নী ছিল। কর্ডোবার শহরতলীতে তিনি কুষ্ঠরোগীদের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন।[৬] কুষ্ঠরোগীদের এই কলোনীর খরচ তার নামে নির্মিত একটি এস্টেট থেকে চালানো হত।[৭] তার এক পুত্র ছিল:[৬] • আবদুল মালিক মারওয়ান
আরেকজন উপপত্নীর নাম ছিল মুতা। তিনি একটি কবরস্থান স্থাপন করেন। দশম শতকেও এটির অস্তিত্ব ছিল।[৬]

আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল উমাউয়ি
আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ (আরবিعبد الله بن محمد ; ১১ জানুয়ারি ৮৪৪ – ১৫ অক্টোবর ৯১২)[১] ছিলেন কর্ডো‌বা আমিরাতের সপ্তম আমির। ৮৮৮ থেকে ৯১২ সাল পর্যন্ত তিনি শাসন করেন।
সমকালীন ইতিহাসবিদরা আবদুল্লাহকে তার ভাই আল মুনজিরের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন। তবে আবদুল্লাহ ক্ষমতার জন্য খুব কম আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ক্ষমতা পাওয়ার পর তিনি যাদেরকে হুমকি হিসেবে দেখতেন তাদের সরিয়ে দেননি। তার নিজের ভাইকে তার আদেশে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল। তিনি তার এক পুত্র আল মুতাররিফকে আদেশ দিয়েছিলেন তার ভাইকে হত্যার জন্য। পরবর্তীতে কয়েক বছর পর মুতাররিফকে বিশ্বাসঘাতকার অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] তার শাসনামলে আরব, বার্বা‌র ও মুলাদিদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তার ক্ষমতা কর্ডো‌বায় সীমাবদ্ধ ছিল। বাকি অঞ্চলগুলো বিদ্রোহী পরিবারের অধীনে ছিল। তারা তার কর্তৃত্ব মেনে নেয়নি।
৯০১ সালে তিনি ইবনে হাফসুনের সাথে শান্তিচুক্তি করেন। তবে কয়েকবছর পর মৃত্যুর আবার যুদ্ধ শুরু হয়। আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর তা থেমে যায়। তার এক ভাই তার উত্তরাধিকারী ঘোষিত পুত্রকে হত্যা করেন। পরে হত্যাকারীকে হত্যা করা হয় এবং আবদুল্লাহর মৃত পুত্রের পুত্র তৃতীয় আবদুর রহমান নামে তার উত্তরাধিকারী করেন।
আবদুল্লাহ ছিলেন প্রথম মুহাম্মদের ছেলে ও আল মুনজিরের ছোট ভাই।
আবদুল্লাহ ৮৬৩ সালের দিকে পাম্পলোনার রাজার মেয়ে অনেসা ফরটুনেজকে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।[২] আবদুল্লাহর কয়েকজন পুত্র ছিল,
• মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ (৮৬৪-৩ ডিসেম্বর ৮৯৫)। বিবরণ অনুযায়ী তিনি অনেসার পুত্র। তার ভাই আল মুতাররিফ তাকে হত্যা করেন। তিনি মুজনা নামক একজন বাস্ক বা ফ্রাঙ্ক নারীকে বিয়ে করেন। তৃতীয় আবদুর রহমান তাদের সন্তান।[৩] • আল মুতাররিফ, ৮৯১ সালে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হন।
• আবান
• আল আসি

দ্বিতীয় আবদুর রহমান
দ্বিতীয় আবদুর রহমান (আরবি: عبد الرحمن الثاني‎) (৭৮৮-৮৫২) ছিলেন আল-আন্দালুসে উমাইয়া খিলাফতের অধীনস্ত কর্ডোবার আমির। তিনি ৮২২ থেকে শুরু করে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেন।[১] দ্বিতীয় আবদুর রহমান টলেডোয় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আমির প্রথম আল-হাকামের পুত্র ছিলেন। যৌবনে তিনি কথিত “পরিখার গণহত্যায়” অংশ নেন। এখানে ৭০০ থেকে ৫০০০ ব্যক্তি যুবরাজের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে আসলে আল-হাকামের নির্দেশে তাদেরকে হত্যা করা হয়।
৮২২ সালে তিনি তার পিতার উত্তরসূরি হিসেবে কর্ডোবার আমির হন এবং দ্বিতীয় অলফেনসোর সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তিনি অলফেনসোর দক্ষিণমুখী অগ্রযাত্রা রুখে দেন। ৮৩৭ সালে তিনি টলেডোয় খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের একটি বিদ্রোহ দমন করেন। ধর্মীয় উদ্দেশ্যে আত্মাহুতি নিষিদ্ধ মর্মে তিনি একটি খ্রিষ্টানদের জন্য একটি ডিক্রি জারি করেন। একে নিরুৎসাহিত করার জন্য তার একটি খ্রিষ্টান সাইনড ছিল।
৮৪৪ সালে আবদুর রহমান ভাইকিংদের একটি আক্রমণ রুখে দেন। তারা কাদিজে অবতরণ করে ও সেভিল জয় করে। তবে তারা এর দুর্গ জয় করতে ব্যর্থ হয়। তারা কর্ডোবা আক্রমণ করে। আবদুর রহমান ভবিষ্যত প্রতিরোধের জন্য একটি নৌবাহিনী গঠন করেন ও নৌ অস্ত্রাগার গড়ে তোলেন।
চার্লস দ্য বাল্ডের বিরুদ্ধে উইলিয়ামের সাহায্যের আবেদনে দ্বিতীয় আবদুর রহমান সাড়া দেন।
কর্ডোবায় তার ভবন নির্মাণ কার্যক্রমের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। এখানেই তিনি ৮৫২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। কর্ডোবা মসজিদ-ক্যাথেড্রালের অংশবিশেষ তিনি নির্মাণ করেন।[১] একজন তেজস্বী যোদ্ধার পাশাপাশি তিনি শিল্পের সমাদরকারীও ছিলেন।[২] কর্ডোবার আত্মাহুতি বলে পরিচিত ঘটনায় তিনি যুক্ত ছিলেন।

প্রথম মুহাম্মদ (কর্ডোবা)
প্রথম মুহাম্মদ (আরবি: محمد بن عبد الرحمن الأوسط‎) (৮২৩–৮৮৬) ছিলেন কর্ডো‌বা আমির। ৮৫২ থেকে ৮৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
মুহাম্মদ কর্ডো‌বায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শাসনামলে মুলাদি (ইবেরিয়ান জাতিগোষ্ঠির মুসলিম) ও মুজারাবদের (মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের খ্রিষ্টান বাসিন্দা) কর্তৃক কিছু বিদ্রোহ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন সংঘটিত হয়।
বনু কাসি মুলাদি পরিবারের মুসা ইবনে মুসা নাভার রাজ্যের আরিস্টা পরিবারের সাথে মিত্রতা করে বিদ্রোহ করেন ও নিজেকে স্পেনের তৃতীয় রাজা দাবি করে (মুহাম্মদ ও প্রথম অরডন্ডোর পর)। বিদ্রোহ উমাইয়া কর্মকর্তা ইবনে মারওয়ান মেরিডা ফিরে আসেন এবং আমিরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। আমির তাকে দমনে অসমর্থ হন এবং ৮৭৫ সালে স্বাধীন শহর গড়ে তুলতে অনুমতি দেন। পরবর্তীতে প্রথম অরডন্ডোর সমর্থনে টলেডো বিদ্রোহ করে কিন্তু গুয়াজালেটের যুদ্ধে পরাজিত হয়।
৮৮০ সালে ভিসিগথ বংশোদ্ভূত বলে ধারণা করা উমর ইবনে হাফসুন বিদ্রোহ করেন। ৯২৮ সালে তৃতীয় আবদুর রহমানের সময় তা চুড়ান্তভাবে দমন করা হয়।
প্রথম মুহাম্মদ ৮৮৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার পুত্র আল মুনজির তার উত্তরাধিকারী হন।

আল মুনজির (কর্ডো‌বা)
আল মুনজির (আরবি: المنذر ‎) (আনুমানিক ৮৪২ – ৮৮৮) ছিলেন ৮৮৬ থেকে ৮৮৮ সাল পর্যন্ত কর্ডো‌বার আমির। তিনি মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমানের পুত্র।
আল মুনজির কর্ডো‌বায় জন্মগ্রহণ করে। পিতার শাসনামলে তিনি পার্শ্ববর্তী খ্রিষ্টান রাজ্য ও মুলাদি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানে নেতৃত্ব দেন।
৮৬৫ সালে রাজা অরডন্ডোর বিরুদ্ধে আংশিক ব্যর্থ অভিযানে নেতৃত্ব দেন। কর্ডো‌বায় ফেরার সময় তিনি কাস্টিলের কাউন্ট বুরগোস রড্রিগোকে পরাজিত করেন। তিনি লিওন জয়ের চেষ্টা চালান কিন্তু রাজা তৃতীয় অলফেনসোর কাছে পরাজিত হন।
তিনি বনু কাসি মুলাদি পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। তারা তৃতীয় অলফেনসোর সাথে মিত্রতা স্থাপন করেছিল। তবে তিনি ব্যর্থ হন। পরের বছর বিদ্রোহ আমির ইবনে মারওয়ানকে তিনি বাডাজোজ থেকে হটিয়ে দিতে সক্ষম হন।
৮৮৬ সালে তার পিতা প্রথম মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তিনি করডবার ক্ষমতা লাভ করেন। দুই বছরের শাসনকালে তিনি বিদ্রোহী উমর ইবনে হাফসুনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। আল মনজির ৮৮৮ সালে ববাস্ট্রোতে মৃত্যুবরণ করেন। ধারণা করা হয় যা তার ভাই আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল উমাউয়ি তাকে হত্যা করেন। তার মৃত্যুর পর আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ তার উত্তরাধিকারী হন।

তৃতীয় আবদুর রহমান
তৃতীয় আবদুর রহমান (পুরো নাম, আবদুর রহমান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আল হাকাম আর রাবদি ইবনে হিশাম ইবনে আবদুর রহমান আদ দাখিল;[৬] আরবি: عبد الرحمن الثالث‎; ১১ জানুয়ারি ৮৮৯/৯১[৯] – ১৫ অক্টোবর ৯৬১) ছিলেন কর্ডো‌বার উমাইয়া বংশীয় আমির ও খলিফা (৯১২-৯৬১)। তার বয়স ২০ এর দশকে থাকার সময় তিনি ক্ষমতা লাভ করেন এবং প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবত ইবেরিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক হিসেবে শাসন করেন। তার শাসনামলে সব বিশ্বাসের মানুষ স্বাধীনতা ভোগ করে। তবে তিনি ফাতেমীয়দের বিরুদ্ধে হচিলেন। উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমীয়দের শত্রুদের তিনি সমর্থন দেন। তিনি নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেছিলেন।

আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল উমাউয়ি
আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ (আরবিعبد الله بن محمد ; ১১ জানুয়ারি ৮৪৪ – ১৫ অক্টোবর ৯১২)[১] ছিলেন কর্ডো‌বা আমিরাতের সপ্তম আমির। ৮৮৮ থেকে ৯১২ সাল পর্যন্ত তিনি শাসন করেন।
সমকালীন ইতিহাসবিদরা আবদুল্লাহকে তার ভাই আল মুনজিরের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন। তবে আবদুল্লাহ ক্ষমতার জন্য খুব কম আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ক্ষমতা পাওয়ার পর তিনি যাদেরকে হুমকি হিসেবে দেখতেন তাদের সরিয়ে দেননি। তার নিজের ভাইকে তার আদেশে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল। তিনি তার এক পুত্র আল মুতাররিফকে আদেশ দিয়েছিলেন তার ভাইকে হত্যার জন্য। পরবর্তীতে কয়েক বছর পর মুতাররিফকে বিশ্বাসঘাতকার অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] তার শাসনামলে আরব, বার্বা‌র ও মুলাদিদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তার ক্ষমতা কর্ডো‌বায় সীমাবদ্ধ ছিল। বাকি অঞ্চলগুলো বিদ্রোহী পরিবারের অধীনে ছিল। তারা তার কর্তৃত্ব মেনে নেয়নি।
৯০১ সালে তিনি ইবনে হাফসুনের সাথে শান্তিচুক্তি করেন। তবে কয়েকবছর পর মৃত্যুর আবার যুদ্ধ শুরু হয়। আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর তা থেমে যায়। তার এক ভাই তার উত্তরাধিকারী ঘোষিত পুত্রকে হত্যা করেন। পরে হত্যাকারীকে হত্যা করা হয় এবং আবদুল্লাহর মৃত পুত্রের পুত্র তৃতীয় আবদুর রহমান নামে তার উত্তরাধিকারী করেন।
আবদুল্লাহ ছিলেন প্রথম মুহাম্মদের ছেলে ও আল মুনজিরের ছোট ভাই।
আবদুল্লাহ ৮৬৩ সালের দিকে পাম্পলোনার রাজার মেয়ে অনেসা ফরটুনেজকে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।[২] আবদুল্লাহর কয়েকজন পুত্র ছিল,
• মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ (৮৬৪-৩ ডিসেম্বর ৮৯৫)। বিবরণ অনুযায়ী তিনি অনেসার পুত্র। তার ভাই আল মুতাররিফ তাকে হত্যা করেন। তিনি মুজনা নামক একজন বাস্ক বা ফ্রাঙ্ক নারীকে বিয়ে করেন। তৃতীয় আবদুর রহমান তাদের সন্তান।[৩] • আল মুতাররিফ, ৮৯১ সালে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হন।
• আবান
• আল আসি

তৃতীয় আবদুর রহমান
তৃতীয় আবদুর রহমান (পুরো নাম, আবদুর রহমান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আল হাকাম আর রাবদি ইবনে হিশাম ইবনে আবদুর রহমান আদ দাখিল;[৬] আরবি: عبد الرحمن الثالث‎; ১১ জানুয়ারি ৮৮৯/৯১[৯] – ১৫ অক্টোবর ৯৬১) ছিলেন কর্ডো‌বার উমাইয়া বংশীয় আমির ও খলিফা (৯১২-৯৬১)। তার বয়স ২০ এর দশকে থাকার সময় তিনি ক্ষমতা লাভ করেন এবং প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবত ইবেরিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক হিসেবে শাসন করেন। তার শাসনামলে সব বিশ্বাসের মানুষ স্বাধীনতা ভোগ করে। তবে তিনি ফাতেমীয়দের বিরুদ্ধে হচিলেন। উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমীয়দের শত্রুদের তিনি সমর্থন দেন। তিনি নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেছিলেন।

দ্বিতীয় আল-হাকাম
দ্বিতীয় আল-হাকাম (দ্বিতীয় আল-হাকাম ইবন তৃতীয় ʿআব্দ আল-রহমান; আরবি: الحكم الثاني ابن عبد الرحمن‎) (১৩ জানুয়ারি ৯১৫ – ১৬ অক্টোবর ৯৭৬) ছিলেন আল আন্দালুস (ইবরিয়ান উপদ্বীপের মুর অঞ্চলের, যা বর্তমানে আধুনিক স্পেন-এর অন্তর্ভূক্ত)-এর কর্ডোবা খিলাফতের ২য় খলিফা, তৃতীয় আবদুর রহমান (আল-নাসির) এবং মুরজান-এর পুত্র। তিনি ৯৬১ থেকে ৯৭৬ খ্রি: পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

দ্বিতীয় হিশাম
দ্বিতীয় হিশাম (আরবি: ھشام‎) ছিলেন কর্ডো‌বার তৃতীয় খলিফা। তিনি ৯৭৬ থেকে ১০০৯ সাল ও ১০১০ থেকে ১০১৩ সাল পর্যন্ত আল আন্দালুস (মুরিশ ইবেরিয়ান উপদ্বীপ, বর্তমান স্পেনের অংশ) শাসন করেন।

দ্বিতীয় মুহাম্মদ (কর্ডোবা)

দ্বিতীয় মুহাম্মদ আল মাহদি (আরবি: محمد الثاني ، المهدي‎) ছিলেন কর্ডো‌বা খিলাফতের চতুর্থ খলিফা। ৭,০০০ সেনাকে সেনাবাহিনী থেকে বের করে দেয়ার পর তিনি তার অনেক প্রজার বিরোধীতার কারণ হন। তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী সুলাইমানের উত্থানের কারণে তিনি তার খলিফা উপাধি ধরে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। গোলযোগপূর্ণ শাসনের পর তিনি ক্ষমতা হারান।[১] সুলাইমান ইবনুল হাকাম
সুলাইমান ইবনুল হাকাম (মৃত্যু ১০১৬) ছিলেন কর্ডো‌বা খিলাফতের পঞ্চম খলিফা। তিনি ১০০৯ থেকে ১০১০ সাল ও ১০১৩ থেকে ১০১৬ সাল পর্যন্ত আল আন্দালুসের শাসক ছিলেন।
চতুর্থ আবদুর রহমান
চতুর্থ আবদুর রহমান (عبدالرحمن) ছিলেন কর্ডো‌বার খলিফা। তিনি ১০১৮ সালে সুলাইমান ইবনুল হাকামের উত্তরসুরি হন। একই বছর একটি যুদ্ধ থেকে পিছু হটার সময় কাদিজে তিনি নিহত হন।
চতুর্থ আবদুর রহমান
বনু উমাইয়া
বনু কুরাইশ এর ক্যাডেট শাখা
মৃত্যু: ১০১৮
পূর্বসূরী
সুলাইমান ইবনুল হাকাম
উমাইয়া নেতা
উত্তরসূরী
পঞ্চম আবদুর রহমান

কর্ডো‌বার খলিফা
১০১৮
উত্তরসূরী
আলি ইবনে হামুদ

পঞ্চম আবদুর রহমান

পঞ্চম আবদুর রহমান (আরবি: عبد الرحمن الخامس‎) ছিলেন কর্ডোবা খলিফা তিনি ১০২৩ থেকে ১০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন।
পঞ্চম আবদুর রহমান
বনু উমাইয়া
বনু কুরাইশ এর ক্যাডেট শাখা
মৃত্যু: ১০২৪
পূর্বসূরী
চতুর্থ আবদুর রহমান
উমাইয়া নেতা
১০১৭–১০২৪
উত্তরসূরী
তৃতীয় মুহাম্মদ

পূর্বসূরী
আল কাসিম আল মামুন
কর্ডো‌বার খলিফা
১০২৩–১০২৪

তৃতীয় মুহাম্মদ (কর্ডোবা)

মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন উবাইদাল্লাহ (আরবি: محمد بن عبد الرحمن بن عبيد الله‎) বা তৃতীয় মুহাম্মদ (Arabic: محمد الثالث) ছিলেন কর্ডোবার খলিফা। পঞ্চম আবদুর রহমানের মৃত্যুর অর তিনি ১০২৪ থেকে ১০২৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। এসময় কর্ডোবায় তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত হয় এবং তিনি শহর ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ধারণা করা হয় যে ৫০ বছর বয়সে তাকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি বিখ্যাত কবি ওয়ালাদা বিনতে আল মুসতাকফির পিতা।

তৃতীয় মুহাম্মদ (কর্ডোবা)
বনু উমাইয়া
বনু কুরাইশ এর ক্যাডেট শাখা

পূর্বসূরী
পঞ্চম আবদুর রহমান
কর্ডো‌বার খলিফা
১০২৪–১০২৫
উত্তরসূরী
ইয়াহিয়া ইবনে আলি ইবনে হামুদ আল মুতালি

তৃতীয় হিশাম (কর্ডোবা)
তৃতীয় হিশাম (আরবি: هشام الثالث in full المعتد بالله” هشام بن محمد‎) ছিলেন আল আন্দালুসের শেষ উমাইয়া শাসক (১০২৬-১০৩১)। তিনি কর্ডোবার খলিফা উপাধিধারী শেষ ব্যক্তি।
তৃতীয় হিশাম ছিলেন চতুর্থ আবদুর রহমানের ভাই। সীমান্ত অঞ্চলের গভর্নর ও কর্ডোবার জনগণের মধ্যে আলোচনার পর খলিফা মনোনীত হন। ১০২৯ সালের আগ পর্যন্ত তিনি কর্ডোবায় প্রবেশ করতে পারেননি। এসময় হামুনি বার্বার সেনারা শহর অধিকার করে রেখেছিল।
তৃতীয় হিশাম (কর্ডোবা)
বনু উমাইয়া
বনু কুরাইশ এর ক্যাডেট শাখা
মৃত্যু: ১০৩৬
পূর্বসূরী
ইয়াহিয়া ইবনে আলি ইবনে হামুদ আল মুতালি
কর্ডোবার খলিফা
১০২৬–১০৩১
উপাধি বিলুপ্ত

আন্দালুস
টেমপ্লেট:History of Spain টেমপ্লেট:History of Portugal টেমপ্লেট:History of Gibraltar
আন্দালুস (আরবি: الأندلس‎, trans. al-ʼAndalus; স্পেনীয়: Al-Ándalus; পর্তুগিজ: Al-Andalus; টেমপ্লেট:Lang-an; কাতালান: Al-Àndalus; Berber: Andalus or Wandalus) মুসলিম স্পেন বা ইসলামি ইবেরিয়া দ্বারা মধ্যযুগে মুসলিম শাসিত ইবেরিয়ান উপদ্বীপ বোঝানো হয়। বর্তমানে এটি স্পেন ও পর্তুগালের অংশ। সংক্ষিপ্তকালের জন্য ফ্রান্সের দক্ষিণের সেপ্টিমেনিয়া অঞ্চল এর অংশ ছিল। পুরো ইবেরিয়ান উপদ্বীপকে বোঝানো হলেও রিকনকোয়েস্টা অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে এর সীমানা পরিবর্তন হয়েছে। ৭১১ থেকে ১৪৯২ সাল পর্যন্ত এর আয়ুষ্কাল ধরা হয়।[১][২][৩] উমাইয়াদের হিস্পানিয়া বিজয়ের পর আন্দালুসকে পাঁচটি প্রশাসনিক ইউনিটে ভাগ করা হয়। এগুলো মোটামুটি আধুনিক আন্দালুসিয়া, গেলিসিয়া ও পর্তুগাল, কাস্টিল ও লিওন, আরাগন, বার্সেলোনা কাউন্টি ও সেপ্টিমেনিয়া নিয়ে গঠিত ছিল।[৪] রাজনৈতিক পরিচিতির দিক থেকে এটি যথাক্রমে উমাইয়া খিলাফতের প্রদেশ (৭১১-৭৫০), কর্ডোবা আমিরাত (৭৫০-৯২৯), কর্ডোবা খিলাফত (৯২৯-১০৩১) ও কর্ডো‌বা খিলাফতের তাইফা রাজ্য হিসেবে ছিল। এসকল শাসনের সময় মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় লক্ষ্য করা যায়। খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা জিজিয়া দেয়ার বিনিময়ে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত।[৫] করডোবা খিলাফতের সময় আন্দালুস জ্ঞানের আলোকে পরিণত হয় এবং কর্ডো‌বা ইউরোপসহ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। জাবির ইবনে আফলা, আবু ইশাক ইবরাহিম আল জারকালি, আবুল কাসিম আল জাহরাউয়ি, ও ইবনে জুহরদের ত্রিকোণমিতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শল্যচিকিৎসা, ওষুধ ও অন্যান্য নানা বিষয় সংক্রান্ত গবেষণার ফলে ইসলামি ও পশ্চিমা সমাজ অগ্রগতি অর্জন করে। আন্দালুস ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্রের অন্যতম পরিগণিত হত এবং তা মুসলিম ও খ্রিষ্টান বিশ্বের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক আদানপ্রদানের স্থল হয়ে উঠে।
ইতিহাসের অধিকাংশ সময়জুড়ে আন্দালুসের সাথে উত্তরের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলোর বিরোধ চলেছিল। উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর আন্দালুস কয়েকটি রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে যার মধ্যে গ্রানাডা আমিরাত উল্লেখযোগ্য। খ্রিষ্টান কাস্টিলিয়ানদের হামলা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আলমোরাভি সাম্রাজ্য হস্তক্ষেপ করে খ্রিষ্টান হামলা প্রতিহত করে, দুর্বল আন্দালুসিয়ান মুসলিম রাজাদের সরিয়ে আন্দালুসকে সরাসরি বার্বার শাসনের আওতায় আনা হয়। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে আন্দালুস মারাকেশ ভিত্তিক বার্বার মুসলিম সাম্রাজ্য আলমোরাভি ও আলমোহাদের প্রদেশে পরিণত হয়।
শেষপর্যন্ত উত্তরের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলো তাদের মুসলিম প্রতিবেশি রাজ্যগুলোকে উৎখাত করতে সক্ষম হয়। ১০৮৫ সালে ষষ্ঠ অলফেনসো টলেডো দখল করেন। এরপর মুসলিমদের ধীরে ধীরে পতনের সূচনা হয়। ১২৩৬ সালে করডোবার পতনের পর গ্রানাডা আমিরাত বর্তমান স্পেনের একমাত্র মুসলিম অঞ্চল হিসেবে টিকে ছিল। ১২৪৯ পর্তুগিজ রিকনকোয়েস্টা শুরু হয় এবং পর্তুগালের তৃতীয় অলফেনসো আলগারভ জয় করেন। ১২৩৮ সালে গ্রানাডা আমিরাত কাস্টিল রাজ্যের করদ রাজ্যে পরিণত হয়। অবশেষে ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি আমির দ্বাদশ মুহাম্মদ কাস্টিলের রাণী প্রথম ইসাবেলার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ইসাবেলা ও তার স্বামী দ্বিতীয় ফার্ডিনেন্ড একত্রে “ক্যাথলিক সম্রাট” বলা হত। আত্মসমর্পণের পর আন্দালুসের রাজনৈতিক পরিচিতির অবসান ঘটে। এ অঞ্চলে ইসলামি সংস্কৃতির চিহ্ন এখনও বিদ্যমান রয়েছে।

আব্বাসীয় খিলাফত
আব্বাসীয় খিলাফত খিলাফতগুলোর মধ্যে তৃতীয় খিলাফত। এটি আব্বাসীয় বংশ কর্তৃক শাসিত হয়। বাগদাদ এই খিলাফতের রাজধানী ছিল। উমাইয়া খিলাফতকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে আন্দালুসে উমাইয়া খিলাফত উৎখাত করা যায়নি।
আব্বাসীয় খিলাফত নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদের কর্তৃক ৭৫০ সালে কুফায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ৭৬২ সালে বাগদাদে রাজধানী স্থানান্তরিত করা হয়। পারস্যে ১৫০ বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ করার পর খলিফাকে প্রধান কর্তৃপক্ষ মেনে নিয়ে স্থানীয় আমিরদের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে চাপ দেয়া হয়। খিলাফতকে তার পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ আন্দালুস, মাগরেব ও ইফ্রিকিয়া যথাক্রমে একজন উমাইয়া যুবরাজ, আগলাবি ও ফাতেমীয় খিলাফতের কাছে হারাতে হয়।
মোঙ্গল নেতা হুলাগু খানের বাগদাদ দখলের পর ১২৫৮ সালে আব্বাসীয় খিলাফত বিলুপ্ত হয়। মামলুক শাসিত মিশরে অবস্থান করে তারা ১৫১৯ সাল পর্যন্ত ধর্মীয় ব্যাপারে কর্তৃত্ব দাবি করতে থাকেন। এরপর উসমানীয় সাম্রাজ্যের কাছে ক্ষমতা চলে যায় ও কনস্টান্টিনোপলে রাজধানী স্থাপিত হয়।[স্পষ্টকরণ প্রয়োজন] আব্বাসীয় খলিফারা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর ছিলেন। তিনি ছিলেন মুহাম্মদ (সা) এর সর্বকনিষ্ঠ চাচাদের অন্যতম। মুহাম্মদ (সা) এর সাথে নিকটাত্মীয়তার কারণে তারা উমাইয়াদের হটিয়ে নিজেদের রাসুলের প্রকৃত উত্তরসুরি হিসেবে দাবি করে।
উমাইয়াদেরকে নৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে আক্রমণ করে আব্বাসীয়রা নিজেদেরকে তাদের চেয়ে আলাদা হিসেবে তুলে ধরে। ইরা লেপিডাসের মতে, “আব্বাসীয় বিদ্রোহ ব্যাপকভাবে আরবদের দ্বারা সমর্থিত ছিল, যারা ছিল মূলত মারুর বসতি স্থাপনকারী, সেসাথে ইয়েমেনি গ্রুপ ও তাদের মাওয়ালি।”[৩] মাওয়ালি তথা অনারব মুসলিমরা কাছে আব্বাসীয়দের পক্ষে ছিল। আব্বাসের প্রপৌত্র মুহাম্মদ ইবনে আলি আব্বাসি মুহাম্মদ (সা) এর পরিবারের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য দ্বিতীয় উমরের সময় পারস্যে প্রচারণা শুরু করেন।
দ্বিতীয় মারওয়ানের সময় আব্বাসের চতুর্থ বংশধর ইবরাহিম বিরোধিতা শুরু করেন। খোরাসান প্রদেশ ও শিয়া আরবদের[৪] কাছ থেকে সমর্থন লাভের মাধ্যমে তিনি বেশ সাফল্য অর্জন করলেও ৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ধরা পড়েন এবং কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। কারো মতে তাকে হত্যা করা হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] এরপর তার ভাই আবদুল্লাহ প্রতিবাদ এগিয়ে নেন। তিনি আবুল আব্বাস আস সাফাহ নামে পরিচিত হন। ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি উমাইয়াদের জাবের যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন।
বিজয়ের পর তিনি মধ্য এশিয়ায় সেনা পাঠান। তার সেনারা তালাসের যুদ্ধে ট্যাং রাজবংশের সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে লড়াই করে।[৫] বাগদাদকে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখা বারমাকিরা বাগদাদে পৃথিবীর প্রথম কাগজ কলের প্রচলন ঘটায়। এভাবে আব্বাসীয় শাসনামলে নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণ ঘটে। দশ বছরের মধ্য আব্বাসীয়রা স্পেনে উমাইয়া রাজধানী কর্ডোবাতে আরেকটি নামকরা কাগজ কল নির্মাণ করে।
আব্বাসীয়দের প্রথম পরিবর্তন ছিল সাম্রাজ্যের রাজধানী দামেস্ক থেকে বাগদাদে সরিয়ে আনা। এর উদ্দেশ্য ছিল যাতে পারসিয়ান মাওয়ালিদের অধিক কাছে টানা যায়। ৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে টাইগ্রিস নদীর তীরে বাগদাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় দায়িত্বপালনের জন্য উজির নামক নতুন পদ সৃষ্টি করা হয় এবং স্থানীয় আমিরদের উপর বড় দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। উজিররা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করাতে আব্বাসীয় খলিফারা অধিক মাত্রায় আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রাচীন আরব অভিজাততন্ত্র পারস্যের আমলাতন্ত্রের কারণে প্রতিস্থাপিত হয়ে পড়ে।[৬] উমাইয়াদের ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য আব্বাসীয়রা পারসিয়ানদের সাহায্যের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে।[৪] আবুল আব্বাসের উত্তরসুরি আল মনসুর অনারব মুসলিমদেরকে তার দরবারে স্বাগতম জানান। এর ফলে আরব ও পারস্যের সংস্কৃতি মিলিত হওয়ার সুযোগ পায়। তবে অনেক আরব সমর্থক বিশেষ করে খোরাসানের আরব যারা উমাইয়াদের বিরুদ্ধে তাদের সহায়তা করেছিল, তারা বিরূপ হয়।
সমর্থকদের মধ্যের এই ফাটল সমস্যার জন্ম দেয়। উমাইয়া ক্ষমতার বাইরে থাকলেও ধ্বংস হয়ে যায়নি। উমাইয়া রাজপরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য স্পেন চলে যান এবং সেখানে নিজেকে একজন স্বাধীন আমির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন (প্রথম আবদুর রহমান, ৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দ)। ৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে তৃতীয় আবদুর রহমান নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন এবং আল আন্দালুসে বাগদাদের প্রতিদ্বন্দ্বী খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন।
৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুর আন লুশানের বিরুদ্ধে ট্যাং রাজবংশকে সহায়তার জন্য ৪,০০০ আরব সৈনিক পাঠান। যুদ্ধের পর সৈনিকরা চীনে থেকে যায়।[৭][৮][৯][১০][১১] আরব খলিফা হারুনুর রশিদ চীনের সাথে মিত্রতা স্থাপন করেন।[১২] ট্যাং বিবরণীতে আব্বাসীয়দের সাথে চীনের দরবারের সম্পর্ক লিপিবদ্ধ পাওয়া যায়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আব্বাস, বাগদাদের প্রতিষ্ঠাতা আল মনসুর, ও আরব্য রজনীতে অধিক উল্লেখিত হারুনুর রশিদ। ট্যাং রাজবংশের বিবরণীতে আব্বাসীয়দের ēiyī Dàshí, বা ” The Black-robed Arabs.” বলে উল্লেখ করা হয়।[১৩][১৪][১৫][১৬] হারুনুর রশিদ দূত পাঠানোর মাধ্যমে ট্যাং রাজবংশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন।[১২][১৭][১৮][১৯][২০][২১][২২][২৩] ইসলামি স্বর্ণযুগ
এসময় জ্যোতির্বিজ্ঞান, আলকেমি, গণিত, চিকিৎসা বিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞানসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আরব বিজ্ঞানীরা এগিয়ে ছিলেন।[২৪] বাগদাদে মোঙ্গল আক্রমণের আগ পর্যন্ত অতিক্রান্ত সময়কে ইসলামি স্বর্ণযুগ বলে গণ্য করা হয়।[২৫] আব্বাসীয়দের ক্ষমতায় আগমন ও রাজধানী দামেস্ক থেকে বাগদাদে স্থানন্তরের পর থেকে স্বর্ণযুগ শুরু হয়।[২৬] আব্বাসীয়রা কুরআন ও হাদিসের জ্ঞানের প্রতি উৎসাহমূলক বাণীতে অনুপ্রাণিত হয়। বাগদাদে বাইতুল হিকমা প্রতিষ্ঠা ও আব্বাসীয়দের জ্ঞানের প্রতি আগ্রহের কারণে এসময় মুসলিম বিশ্ব বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা, শিক্ষার বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হয়ে উঠে। মুসলিম ও অমুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের পন্ডিত ব্যক্তিরা বিশ্বের জ্ঞানকে আরবিতে অনুবাদ করার কাজে নিয়োজিত হন।[২৬] হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল এমন অনেক ধ্রুপদি কাজ আরবি ও ফারসিতে এবং পরবর্তীতে তুর্কি, হিব্রু, ও ল্যাটিনে অনুবাদ করা হয়।[২৬] মুসলিম বিশ্ব বিভিন্ন সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়ার স্থলে পরিণত হয় এবং প্রাচীন রোম, চীন, ভারত, পারস্য, মিশর, উত্তর আফ্রিকা, গ্রীক ও বাইজেন্টাইন সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যায়। [২৬] হারুনুর রশিদ ও তার উত্তরসুরিদের শাসনকালে ব্যাপকভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জন সম্পন্ন হয়। আব্বাসীয় খলিফারা সাসানীয় সাম্রাজ্যের আদলে নিজেদের প্রশাসনকে সাজান।[৩২] হারুনুর রশিদের পুত্র আল মামুন এমনকি একথা বলেন:
পারসিয়ানরা হাজার বছর শাসন করেছে এবং একদিনের জন্যও তাদের আরবদের সাহায্য প্রয়োজন হয়নি। আমরা তাদের এক বা দুই শতাব্দী শাসন করছি এবং এক ঘন্টাও তাদের ছাড়া করতে পারিনি।
[৩৩] মধ্যযুগের বেশ কিছু সংখ্যক চিন্তাবিদ ও বিজ্ঞানী ইসলামি বিজ্ঞানকে খ্রিষ্টান পাশ্চাত্যে পৌছানোয় ভূমিকা রাখেন। এই ব্যক্তিরা এরিস্টোটলকে খ্রিষ্টান ইউরোপে পরিচিত করান।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] অধিকন্তু এ যুগে ইউক্লিড ও টলেমির আলেক্সান্ড্রিয়ান গণিত, জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞান পুনরায় ফিরে আসে। ফিরে পাওয়া গাণিতিক প্রক্রিয়াগুলো পরবর্তীতে মুসলিম পন্ডিত, বিশেষ করে আল বিরুনি ও আবু নাসর মনসুরের মাধ্যমে বর্ধিত ও আরো উন্নত হয়।
খ্রিষ্টানরা (বিশেষ করে নেস্টোরিয়ান খ্রিষ্টান) উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে আরব ইসলামি সভ্যতার বিকাশে অবদান রাখে। তারা গ্রীক দার্শনিকদের রচনা সিরিয়াক ও পরবর্তীতে আরবিতে অনুবাদ করে।[৩৪][৩৫] নেস্টোরিয়ানরা আরব সংস্কৃতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।[৩৬] জুন্দশাপুরের শিক্ষালয় সাসানীয়, উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।[৩৭] প্রায় আট প্রজন্ম ধরে নেস্টোরিয়ান বুখতিশু পরিবার খলিফা ও অষ্টম থেকে একাদশ শতকের সুলতানদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে কাজ করে।[৩৮][৩৯] বিজ্ঞানী আল খোয়ারিজমি তার গ্রন্থ কিতাব আল জাবর ওয়াল মুকাবালাতে বীজগণিত নিয়ে আলোচনা করেন। এই গ্রন্থ থেকে ইংরেজি এলজেব্রা শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে। তাই তাকে বীজগণিতের জনক বলা হয়।[৪০] তবে অনেকে গ্রীক গণিতবিদ ডিওফেনটাসকে এই উপাধি দেয়। এলগোরিজম ও এলগরিদম পদদুটিও তার নাম থেকেই উদ্ভব হয়। তিনি ভারত উপমহাদেশের বাইরে আরবি সংখ্যা পদ্ধতি ও হিন্দু-আরবি সংখ্যা পদ্ধতি সূচনা করেন।
ইবনে আল হাইসাম (পাশ্চাত্যে আলহাজেন নামে পরিচিত) ১০২১ খ্রিষ্টাব্দে তার গ্রন্থ কিতাব আল মানাজিরে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিকাশ ঘটান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল তত্ত্বের সাথে পরীক্ষালব্ধ উপাত্তের সমন্বয়ের জন্য পরীক্ষণের ব্যবস্থা করা, যা মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। ইবনে আল হাইসাম বস্তু দেখার ক্ষেত্রে আলোর চোখের ভেতর প্রবেশের প্রমাণ দেন যা একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে ধরা হয়। ব্রেডলি স্টেফেনস ইবনে আল হাইসামকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিকাশ ঘটানোর জন্য “প্রথম বিজ্ঞানী” হিসেবে উল্লেখ করেন।[৪১][৪২][৪৩] আব্বাসীয় আমলে মুসলিম জগতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়ন ঘটে। ৯ম শতকে বাগদাদে ৮০০ জন চিকিৎসক ছিল এবং এনাটমি ও রোগের উপর ব্যাপক আবিষ্কার সম্পন্ন হয়। হাম ও গুটিবসন্তের মধ্যে পার্থক্য এসময় বর্ণিত হয়। খ্যাতনামা পারসিয়ান বিজ্ঞানী ইবনে সিনা (পাশ্চাত্যে আভিসেনা নামে পরিচিত) বিজ্ঞানীদের অর্জিত বিশাল পরিমাণ জ্ঞানকে লিপিবদ্ধ করেন এবং তার বিশ্বকোষ কানুন ফিততিব ও কিতাবুশ শিফার মাধ্যমে তা বেশ প্রভাববিস্তারকারী ছিল। তিনি ও আরো অনেকের গবেষণাকর্ম রেনেসার সময় ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের সরাসরি প্রভাবিত করে।
মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্বে জ্যোতির্বিজ্ঞান আল বাত্তানির মাধ্যমে বিকাশ লাভ করে। তিনি পৃথিবীর অক্ষের ঘূর্ণনের উপর গবেষণা করেন। আল বাত্তানি, ইবনে রুশদ, নাসিরুদ্দিন তুসি, মুয়ায়েদুদ্দিন উরদি ও ইবনে আল শাতির কর্তৃক ভূকেন্দ্রিক মডেলের সংশোধন পরবর্তীতে কোপারনিকাসের সৌরকেন্দ্রিক মডেলে ব্যবহৃত হয়।[৪৪] গ্রীকরা এস্ট্রোলেব নির্মাণ করলেও মুসলিম জ্যোতির্বিদ ও প্রকৌশলীরা এর বিকাশ ঘটান এবং এরপর তা মধ্যযুগের ইউরোপে পৌছায়।
মুসলিম আলকেমিস্টরা মধ্যযুগের ইউরোপীয় আলকেমিস্টদের প্রভাবিত করেন, বিশেষত জাবির ইবনে হাইয়ানের রচনার মাধ্যমে। পাতনসহ বেশ কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়া মুসলিম বিশ্বে উদ্ভব হয় এবং এরপর ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
ইসলামি বিশ্বে জন্ম নেয়া সবচেয়ে পরিচিত সাহিত্য হল সহস্র এক রজনীর গ্রন্থ যা আরব্য রজনী নামে পরিচিত। মূল ধারণা ইসলাম পূর্ব ইরানি উপাদান থেকে আসে। এর সাথে ভারতীয় উপাদানও যুক্ত হয়। এতে বাকি মধ্যপ্রাচ্যীয় ও উত্তর আফ্রিকান গল্পও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ১০ শতকে এটি রূপ লাভ করে এবং ১৪ শতকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছায়। পান্ডুলিপি ভেদে গল্পের সংখ্যা ও প্রকারে ভিন্নতা রয়েছে।[৪৫] আরব রূপকথাগুলোকে প্রায় অনুবাদে “আরব্য রজনী” বলা হয়।[৪৫] ১৮ শতকে এন্টইন গালান্ড কর্তৃক অনূদিত হওয়ার পর থেকে এই গ্রন্থ পাশ্চাত্যে প্রভাব বিস্তার করেছে।[৪৬] এর অনেক প্রতিরূপ, বিশেষত ফ্রান্সে, লেখা হয়েছে।[৪৭] গল্পগুলোর অনেক চরিত্র পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে সাংস্কৃতিক আইকন হয়ে উঠে, যেমন আলাদিন, সিনবাদ ও আলি বাবা।
মুসলিম কাব্যের অন্যতম প্রণয়াশ্রিত উদাহরণ হল লায়লা ও মজনু। এটি ইরানি, আজারবাইজানি ও অন্যান্য ফারসি, আজারবাইজানি, তুর্কি ও অন্যান্য তুর্কি ভাষার কবিদের হাতে রূপলাভ করে।[৪৮] এর উতপত্তিকাল ৭ম শতকে উমাইয়া আমলকে ধরা হয়। পরবর্তী সময়ের রোমিও জুলিয়েটের মত এটিও একটি ট্র্যাজিক গল্প।[৪৯] আব্বাসীয় আমলে আরবি কাব্য তার শীর্ষ স্থানে পৌছায়, বিশেষত কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়া ও পারস্যীয় রাজবংশগুলোর উত্থানের আগে। নবম শতকে আবু তামাম ও আবু নুয়াসের মত লেখকরা বাগদাদের খলিফার দরবারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিলেন। অন্যদিকে আল মুতানাব্বি আঞ্চলিক দরবার থেকে পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন।
“ইসলামি দর্শন” বলতে ইসলামি সংস্কৃতিতে গড়ে উঠা দর্শনের ধারাকে বোঝায়।[৫০] এটা শুধুমাত্র ধর্মীয় ব্যাপার হয় এবং শুধু মুসলিমরাই এতে অবদান রাখেনি।[৫০] এতে এরিস্টটলের কর্মের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ইজতিহাদের ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দার্শনিকদের মধ্যে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম দার্শনিকরা মৌলিক দার্শনিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। মধ্য যুগে খ্রিষ্টান দর্শনে তাদের চিন্তাগুলো আত্মীকৃত হয়েছে, বিশেষত টমাস আকুইনাস কর্তৃক।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] তিনজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ আল কিন্দি, আল ফারাবি ও ইবনে সিনা এরিস্টটেলিয়ানিজম ও নিওপ্লাটোনিজমকে অন্যান্য মতের সাথে সমন্বিত করেন। এর ফলে আভিসিনিজম প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম খিলাফতের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিকরা ছিলেন আল জাহিজ ও আল হাসান।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে মুসলিম বিশ্ব চীনের কাছ থেকে কাগজ উৎপাদনের কৌশল গ্রহণ করে। কাগজের ব্যবহার চীন থেকে অষ্টম শতকে মুসলিম বিশ্বে ও দশম শতকে স্পেন ও বাকি ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এটি নির্মাণ করা পার্চমেন্ট থেকে সহজ ছিল এবং প্যাপিরাসের মত ভেঙে যেত না। লিখিত বিবরণ ও কুরআনের কপি করার জন্য এর উপযোগীতা ছিল। লিনেন থেকে কাগজ প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া মুসলিম বিশ্ব থেকে বাকি পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।[৫১] বারুদ তৈরীর প্রক্রিয়াও চীন থেকে মুসলিম বিশ্বের মাধ্যমে বিস্তৃত হয়।[৫২][৫৩] বায়ুকলের ব্যবহারের ফলে সেচ ও কৃষিতে এসময় অগ্রগতি সাধিত হয়। আন্দালুসের মাধ্যমে শস্য, বিশেষত এলমন্ড ও সাইট্রাস ইউরোপে আসত। এসময় ইউরোপীয়রা চিনি উৎপাদন ধীরে ধীরে গ্রহণ করে। নীল নদ, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস ছাড়া নৌবহনের অনুকূল বৃহৎ নদী ছিল না বিধায় সমুদ্রপথে পরিবহন খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেক্সটেন্টের (কামাল বলে পরিচিত ছিল) ব্যবহারের মাধ্যমে নৌচালনাবিদ্যা উৎকর্ষতা লাভ করে। এসময়ের মানচিত্রের সাথে তুলনা করলে নাবিকরা উপকূলের কিনারা ধরে যাতায়াতের পরিবর্তে সমুদ্রের মধ্য দিয়ে চলাচলে বেশি সক্ষম ছিলেন। ভূমধ্যসাগরে বৃহৎ তিন মাস্তুলবিশিষ্ঠ বাণিজ্যিক জাহাজ পুনরায় চালু করায় মুসলিম নাবিকদের অবদান রয়েছে। আরবি নৌকা কারিব থেকে ক্যারাভেল নামটি এসেছে বলে ধারণা করা হয়।[৫৪]১৬ শতাব্দীতে পর্তুগিজদের আগমনের আগ পর্যন্ত ভারত মহাসাগরে আরব বণিকরা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। এই বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল হরমুজ। ভূমধ্যসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জটিল নেটওয়ার্ক ছিল। এর মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলো একে অন্যের সাথে ও ইউরোপীয় শক্তিসমূহ যেমন ভেনিস, জেনোয়া ও কাটালোনিয়ার সাথে বাণিজ্যে অংশ নিত। সিল্ক রোড মধ্য এশিয়া পার হয়ে চীন ও ইউরোপের মধ্যবর্তী মুসলিম দেশগুলোর মধ্য দিয়ে যেত।
মুসলিম প্রকৌশলীরা শিল্পক্ষেত্রে জলশক্তিকে ব্যবহার করেন। প্রথমদিকে স্রোতশক্তি, বায়ুশক্তি ও পেট্রোলিয়াম (বিশেষত কেরোসিনে পাতনের মাধ্যমে) ব্যবহার করা হত। মুসলিম বিশ্বে পানিকল ব্যবহার সপ্তম শতকে শুরু হয়। আনুভূমিক চাকা ও উলম্ব চাকার পানিকল নবম শতকে বেশ মাত্রায় ব্যবহৃত হত। ক্রুসেডের সময় আন্দালুস ও উত্তর আফ্রিকা থেকে মধ্য প্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি প্রদেশে এসব কলের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। এসব কল বেশ মাত্রায় কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হত।[৫৫] মুসলিম প্রকৌশলীরা পাম্পের মত যন্ত্রও উদ্ভাবন করেন। এসবে ক্র্যাঙ্কশ্যাফট ব্যবহার করা হয়।[৫৬] কল ও পানি উত্তোলনকারী যন্ত্রগুলোতে গিয়ারের ব্যবহার হয়। পানিকলে অতিরিক্ত শক্তি সরবরাহ করার জন্য বাধ নির্মাণ করা হয়। এসব অগ্রগতির ফলে পূর্বে দৈহিক শ্রমে করা কাজগুলো সহজে করা সম্ভব হয়। শিল্পক্ষেত্রে জলশক্তির ব্যবহার মুসলিম বিশ্ব থেকে খ্রিষ্টান স্পেনে এসেছে এ নিয়ে আলোচনা হয় থাকে।[৫৭] আরব কৃষি বিপ্লবের সময় বেশ কিছু শিল্প বিকাশ লাভ করে। এর মধ্যে রয়েছে বয়নশিল্প, দড়ি প্রস্তুত, গালিচা, রেশম ও কাগজ। রসায়ন ও যন্ত্র নির্মাণের জ্ঞানের মাধ্যমে ১২শ শতকে ল্যাটিন অনুবাদ বিস্তার লাভ করে।[৫৮] এযুগে কৃষি ও হস্তশিল্প উচ্চ মাত্রায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।[৫৯] আব্বাসীয়রা উমাইয়া আমলে অনারবদের প্রতি সামাজিক অসাম্যের ফলে সৃষ্ট অসন্তোষের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও সাম্রাজ্য দ্রুত আরব পরিচয় ধারণ করে। জ্ঞান আরবি ভাষায় সাম্রাজ্য জুড়ে আদানপ্রদান করা হত। বিভিন্ন জাতির লোকেরা তাদের দৈনন্দিক জীবনে আরবি বলা শুরু করে। অন্য ভাষা থেকে রচনা আরবিতে অনুবাদ করা হয়। এক নতুন ইসলামি পরিচয় জন্মলাভ করে যাতে পূর্ব সময়ের আরব সংস্কৃতির সাথে মিথস্ক্রিয়া করে। এ সংস্কৃতি ইউরোপে বিস্ময়কর ছিল।[৬০] • শিয়াদের সাথে বিভেদ
আব্বাসীয়রা শিয়াদের সাথে পাল্টা অবস্থানে ছিল। উমাইয়াদের সাথে লড়াইয়ে শিয়ারা সমর্থন দিয়েছিল। আব্বাসীয় ও শিয়া উভয়েই মুহাম্মদ (সা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্কের কারণে আইনগত বৈধতা দাবি করেছিল। ক্ষমতায় থাকাকালে আব্বাসীয়রা সুন্নি মতাদর্শকে ধারণ করে এবং শিয়াদের সমর্থন দান থেকে বিরত থাকে। এরপর অল্প সময় পর বার্বা‌র খারিজিরা ৮০১ সালে উত্তর আফ্রিকায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। ৫০ বছরের মধ্যে মাগরেবের ইদ্রিসি ও ইফ্রিকিয়ার আগলাবি ও এর অল্পকাল পর মিশরের ইকশিদি ও তুলিনিরা কার্যকরীভাবে আফ্রিকার স্বাধীনতা লাভ করে।
• সেনাপতিদের সংঘাত
আল রাদির সময় আব্বাসীয় কর্তৃত্ব ভেঙে যেতে থাকে। এসময় তাদের তুর্কি বংশোদ্ভূত সেনাপতিরা খিলাফতকে অর্থ প্রদান বন্ধ করে দেয়। এসব সেনাপতিরা কার্যত স্বাধীন ছিল। এমনকি বাগদাদের কাছের প্রদেশগুলোও আঞ্চলিক রাজবংশের শাসন দাবি করতে থাকে।
এছাড়াও আব্বাসীয়দের প্রায় স্পেনের উমাইয়াদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হত।
৮ম শতাব্দীর শেষার্ধে বেশ কয়েকজন প্রতিযোগী খলিফা ও তাদের উজিরদের মাধ্যমে আব্বাসীয় নেতৃত্বকে কঠোর চেষ্টা করতে হয় যাতে সাম্রাজ্যের দূর বিস্তৃতির ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সমাধান করা যায়। বিস্তৃত সাম্রাজ্য জুড়ে সীমাবদ্ধ যোগাযোগ যোগাযোগ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রশাসনিক পরিবর্তনও বিবেচনায় ছিল।[৬১] বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে আব্বাসীয়রা সিরিয়া ও আনাতোলিয়ায় লড়াইয়ে লিপ্ত থাকার সময় সামরিক অভিযান কম করা হত। খিলাফত আভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগ দিয়েছিল। আঞ্চলিক শাসনকর্তারা বেশি স্বায়ত্ত্বশাসন লাভ করে নিজেদের অবস্থান বংশগত করে ফেলা খলিফার কাছে সমস্যার কারণ ছিল।[৬] একই সময়ে আব্বাসীয়রা আভ্যন্তরীণ আরেকটি সমস্যার মুখোমুখি হয়। প্রাক্তন আব্বাসীয় সমর্থকরা সম্পর্কছেদ করে খোরাসানের আশেপাশে পৃথক রাজ্য স্থাপন করে। হারুনুর রশিদ বারমাকিদের হটিয়ে দেন।[৬২] একই সময়কালে বেশ কিছু ভাঙন দেখা দেয়। এসবে জড়িতরা অন্যান্য ভূমির জন্য সাম্রাজ্য ত্যাগ বা সাম্রাজ্যের দূরবর্তী স্থানে অধিকার নিতে সচেষ্ট ছিল।

তাজিকিস্তানের মুদ্রায় খোরাসানের আমির ইসমাইল সামানির ছবি। তিনি আব্বাসীয়দের থেকে স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনা করেন।
৮২০ সাল নাগাদ সামানিরা ট্রান্সঅক্সিয়ানা ও বৃহত্তর খোরাসানে স্বাধীন কর্তৃত্ব অর্জন করে। শিয়া হামদানিরা উত্তর সিরিয়ায় এবং ইরানের তাহিরি ও সাফারি রাজবংশের উত্তরসুরি হয়। বিশেষত সামারার নৈরাজ্যের পর আব্বাসীয় কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে প্রদেশগুলোতে কেন্দ্রবিমুখী প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। ১০ম শতাব্দীর প্রথম নাগাদ আব্বাসীয়রা ইরাকের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং তা বিভিন্ন আমিরদের হাতে চলে যায়। খলিফা আল রাদি আমিরুল উমারা পদ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা মেনে নিতে বাধ্য হন। এর অল্পকাল পর দায়লাম থেকে বুইয়িরা উত্থান লাভ করে এবং বাগদাদের আমলাতন্ত্রে স্থান করে নেয়। ইবনে মিশকায়িয়ার মতানুযায়ী তারা তাদের সমর্থকদের ইকতা (কর খামার গঠনের জন্য জায়গির) বন্টন করতে থাকে।
অষ্টম শতকের শেষ নাগাদ আব্বাসীয়রা যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষমতা হারায়। ৭৯৩ সালে ইদ্রিসি রাজবংশ ফেজ থেকে মরক্কো পর্যন্ত একটি রাষ্ট্র স্থাপন করে। একই সময় আব্বাসীয় গভর্নরদের একটি পরিবারের ক্ষমতা বৃদ্ধি লাভ করতে থাকে এবং ৮৩০ এর দশকে তারা আগলাবি আমিরাত স্থাপন করে। ৮৬০ এর দশক নাগাদ মিশরের গভর্নররা তাদের নিজস্ব তুলুনি আমিরাত গঠন করে। প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ ইবনে তুলুনের নামে এর নাম করণ করা হয়। এরপর থেকে মিশর খলিফা থেকে পৃথক হয়ে রাজবংশের হাতে শাসিত হতে থাকে। পূর্বাঞ্চলেও গভর্নররা কেন্দ্র থেকে নিজেদের পৃথক করে নেয়। হেরাতের সাফারি ও বুখারার সামানিরা ৮৭০ এর দশকে সম্পর্কচ্ছেদ করে এবং পারস্যায়িত সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র গড়ে তোলে। এসময় শুধু মেসোপটেমিয়ার কেন্দ্রীয় অঞ্চল সরাসরি আব্বাসীয় নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফিলিস্তিন ও হেজাজ প্রায় তুলুনিরা নিয়ন্ত্রণ করত। আনাতোলিয়ায় বাইজেন্টাইনরা আরব মুসলিমদের আরও পূর্বদিকে ঠেলে দেয়।
৯২০ এর দশক নাগাদ অবস্থা আরো বদলে যায়। প্রথম পাঁচ ইমামকে মান্য করা শিয়াদের একটি গোষ্ঠী যারা মুহাম্মদ (সা) এর কন্যা ফাতিমার সাথে নিজেদের রক্তসম্পর্ক দাবি করত তারা ইদ্রিসি ও আগলাবিদের কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এই নতুন রাজবংশ ফাতেমীয় নামে পরিচিত হয়। ৯৬৯ সালে তারা মিশরের দিকে অগ্রসর হয় এবং মিশরের ফুসতাতে রাজধানী স্থাপন করে। একে তারা শিয়া শিক্ষা ও রাজনীতির মূল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে। ১০০০ সাল নাগাদ ফাতেমীয়রা সুন্নিদের আব্বাসীয়দের কাছে একটি আদর্শগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। এসময় আব্বাসীয় শাসন বেশ কিছু গভর্নরদের মধ্যে বিভক্ত ছিল এবং বাগদাদের খলিফার কর্তৃত্ব আগের মত শক্ত ছিল না। এসকল শাসনকর্তারা নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ে লিপ্ত থাকতেন। খলিফা নিজে বুইয়ি আমিরের নিরাপত্তায় ছিলেন। বুইয়ি আমির সমগ্র ইরাক ও পশ্চিম ইরানের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন।
ইরাকের বাইরের স্বাধীন প্রদেশগুলো ধীরে ধীরে বংশগত শাসকদের আওতায় চলে আসে। এসব স্থানে খলিফার অবস্থান ছিল আনুষ্ঠানিক। মাহমুদ গজনভি বহুল প্রচলিত “আমির” পদবীর স্থলে “সুলতান” পদবী ধারণ করেন। ১১ শতকে খলিফার অবস্থান আরো হ্রাস পায় যখন কিছু মুসলিম শাসক জুমার খুতবায় তার নাম উল্লেখ করার প্রথা থেকে সরে আসেন ও নিজেদের নামে মুদ্রা জারি করেন।[৬১] কায়রোর ফাতেমীয়রা মুসলিম বিশ্বের কর্তৃত্বের ব্যাপারে আব্বাসীয়দের সাথে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হন। বাগদাদ আব্বাসীয় খলিফাদের কেন্দ্র হলেও সেখানকার শিয়াদের মধ্যে ফাতেমীয়রা কিছু সমর্থন লাভ করে। ফাতেমীয়দের পতাকা ছিল সবুজ ও আব্বাসীয়দের পতাকা ছিল কালো। ফাতেমীয়দের সাথে এই প্রতিদ্বন্দ্বীতা ১২ শতকে সমাপ্তি ঘটে।
এই তালিকায় আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের ভাঙনের পর জন্ম নেয়া মুসলিম রাজবংশসমূহের উল্লেখ রয়েছে। এসব রাজবংশ কখনো তাদের অধীনস্ত কোনো আমিরের বিদ্রোহের ফলে সমাপ্ত হত। মিশরের ফাতেমীয় খিলাফত, স্পেনের কর্ডোবা খিলাফত ও আলমোহাদ খিলাফত ছাড়া প্রত্যেক মুসলিম রাজবংশ আব্বাসীয় খলিফার আনুষ্ঠানিক সার্বভৌমত্ব মেনে চলত ও তাকে বিশ্বাসীদের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিত।
• উত্তরপশ্চিম আফ্রিকা: ইদ্রিসি (৭৮৮-৯৭৪) → আলমোরাভি (১০৪০) → আলমোহাদ (১১২০-১২৬৯)।
• ইফ্রিকিয়া (আধুনিক তিউনিশিয়া, পূর্ব আলজেরিয়া ও পশ্চিম লিবিয়া): আগলাবি (৮০০-৯০৯) → মিশরের ফাতেমীয় খিলাফত (৯০৯-৯৭৩) → জিরি (৯৭৩-১১৪৮) → আলমোহাদ (১১৪৮-১২২৯) → হাফসি রাজবংশ (১২২৯-১৫৭৪)।
• (মিশর ও ফিলিস্তিন): তুলুনি (৮৬৮-৯০৫) → ইখশিদি (৯৩৫-৯৬৯) → ফাতেমীয় খিলাফত (৯০৯-১১৭১) → আইয়ুবীয় (১১৭১-১৩৪১) → মামলুক → (১২৫০-১৫১৭)।
• আল জাজিরা (আধুনিক সিরিয়া ও উত্তর ইরাক): হামদানি (৮৯০-১০০৪) → মারওয়ানি ও উকায়লিদি (৯৯০-১০৮৫) → সেলজুক (১০৩৪-১১৯৪) → মঙ্গোল সাম্রাজ্য ও ইলখানাত (১২৩১-১৩৩৫)।
• দক্ষিণপশ্চিম ইরান: বুইয়ি (৯৩৪-১০৫৫) → সেলজুক (১০৩৪-১১৯৪) → মঙ্গোল সাম্রাজ্য।
• খোরাসান (আধুনিক ইরান, আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান): সামানি (৮১৯-৯৯৯) → গজনভি (৯৬২-১১৬৮) → সেলজুক (১০৩৪-১১৯৪) → ঘুরি (১০১১-১২১৫) → খাওয়ারেজমি (১০৭৭-১২৩১) → মঙ্গোল সাম্রাজ্য ও ইলখানাত (১২৩১-১৩৩৫)।
• ট্রান্সওক্সিয়ানা (আধুনিক মধ্য এশিয়া): সামানি (৮১৯-৯৯৯) → কারাখানি (৮৪০-১২১২) → খাওয়ারেজমি (১০৭৭-১২৩১) → মঙ্গোল সাম্রাজ্য ও চাগতাই খানাত (১২২৫-১৬৮৭)।
বুইয়ি ও সেলজুক সামরিক নিয়ন্ত্রণ (৯৭৮-১১১৮)
বুইয়ি আমিরদের ক্ষমতা সত্ত্বেও বাগদাদে আব্বাসীয়দের হাতে একটি কার্যকর দরবার ছিল। বুইয়ি আমলা হিলালুল সাবির বর্ণনায় এমন কথা পাওয়া যায়। বাগদাদ ও ধর্মীয় জীবনে তাদের প্রভাব ছিল। বাহাউদ্দৌলার মৃত্যুর পর বুইয়িদের ক্ষমতা হ্রাস পেলে খিলাফত কিছু সামর্থ পুনরুদ্ধারে সমর্থ হয়। উদাহরণস্বরূপ খলিফা আল কাদির বাগদাদ মেনিফেস্টোর মত রচনা দ্বারা শিয়াদের বিরুদ্ধে আদর্শগত লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। খলিফা নিজে বাগদাদের আইনশৃংখলা বজায় রাখেন এবং রাজধানীতে ফিতনা ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে সচেষ্ট হন।
বুইয়ি রাজবংশের অবনতির পর তাদের ফাকা স্থলে অঘুজ তুর্কি ও সেলজুকরা জায়গা করে নেয়। আমির ও প্রাক্তন দাস বাসিরি ১০৫৮ সালে শিয়া ফাতেমীয় পতাকা নিয়ে বাগদাদে আসলে খলিফা আল কাইম বাইরের সাহায্য ছাড়া তাকে প্রতিরোধে অসমর্থ ছিলেন। সেলজুক সুলতান তুগরিল বেগ বাগদাদে সুন্নি শাসন পুনপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং ইরাককে তার রাজবংশের জন্য নিয়ে নেন। আরেকবার আব্বাসীয়দেরকে অন্য একটি সামরিক শক্তির সাথে ভারসাম্য স্থাপন করতে হয়। এসময় খলিফা ইসলামি বিশ্বের প্রধান ছিলেন। পরবর্তী সুলতান আল্প আরসালান ও প্রথম মালিকশাহ ও উজির নিজামুল মুলক পারস্য অবস্থান করতেন কিন্তু বাগদাদের আব্বাসীয়দের উপরও তাদের প্রভাব ছিল। ১২ শতকে এই রাজবংশ দুর্বল হতে থাকলে আব্বাসীয়রা পুনরায় অধিক ক্ষমতা লাভ করতে থাকে।
সামরিক শক্তির পুনরুত্থান (১১১৮-১২০৬)
যুদ্ধে সেলজুকদের সাথে লড়াই করতে সক্ষম সেনাবাহিনী প্রথমবার খলিফা আল মুসতারসিদ গড়ে তুলেন। তবে ১১৩৫ সালে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। খলিফা আল মুকতাফি উজির ইবনে হুবায়রার সহায়তায় খিলাফতের সামরিক স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। বাইরের রাজবংশগুলোর প্রভাবাধীন অবস্থার প্রায় ২৫০ বছর পর বাগদাদ অবরোধের সময় সেলজুকদের বিরুদ্ধে বাগদাদকে তিনি সফলভাবে প্রতিরক্ষা করতে সক্ষম হন। এর ফলে ইরাক আব্বাসীয়দের জন্য সুরক্ষিত হয়। আল নাসিরের শাসনামলে খিলাফত ইরাকজুড়ে শক্ত অবস্থান লাভ করে।
মঙ্গোল আক্রমণ (১২০৬-১২৫৮)] ১২০৬ সালে চেঙ্গিস খান মধ্য এশিয়ার মঙ্গোলদের মধ্যে শক্তিশালী রাজ্য গড়ে তোলেন। ১৩ শতাব্দীতে এই মঙ্গোল সাম্রাজ্য অধিকাংশ ইউরেশিয়ান অঞ্চল জয় করে ফেলে। ১২৫৮ সালে হুলাগু খানের বাগদাদ ধ্বংস করার ঘটনা ইসলামি স্বর্ণযুগের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হয়।[৬৩] মঙ্গোলদের আশংকা ছিল যে মুহাম্মদ (সা) এর চাচার বংশধর আল মুসতাসিমকে হত্যা করা হলে অলৌকিক দুর্যোগ হানা দেবে।[৬৪] পারস্যের শিয়ারা বলে যে শিয়া ইমাম হুসাইন বিন আলির মৃত্যুর পর এমন কোনো দুর্যোগ হয়নি। রাজকীয় রক্ত না ঝরানোর মঙ্গোল রীতি তাই অগুরুত্বপূর্ণ ঠেকে। হুলাগু খান ১২৫৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আল মুসতাসিমকে কার্পেটে মুড়ে ঘোড়ার সাহায্যে পদদলিত করে হত্যা করেন। খলিফার পরিবারকেও হত্যা করা হয়। তার কনিষ্ঠ পুত্রকে বাচিয়ে রাখা হয় ও মঙ্গোলিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। এক কন্যাকে হুলাগু খানের হারেমে দাসি হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়।[৬৫] মঙ্গোলিয়ান ইতিহাসবিদদের মতে বেঁচে যাওয়া পুত্রটি বিয়ে করে ও তার সন্তানসন্ততি হয়।] কায়রোর আব্বাসীয় খিলাফত (১২৬১-১৫১৭
নবম শতাব্দীতে আব্বাসীয়রা খলিফার প্রতি অনুগত সেনাবাহিনী গঠন করে। এতে অনারবদের থেকে লোক নেয়া হয়েছিল যাদের মামলুক বলা হত।[৬৬][৬৭][৬৮][৬৯][৭০] আল মামুন ও তার ভাই আল মুতাসিমের শাসনকালে গঠিত এই সেনাবাহিনী সাম্রাজ্যের পরবর্তী ভাঙন রোধ করে। প্রথমদিকে এরা সরকারকে আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সমস্যা বিষয়ে সাহায্য করত। আল মুতাসিম কর্তৃক বাগদাদ থেকে সামারায় রাজধানী স্থানান্তর খিলাফতের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে। অধিকন্তু আল রাদি মুহাম্মদ বিন রাইকের হাতে অধিকাংশ রাজকীয় কর্ম তুলে দেয়ার আগ পর্যন্ত মামলুকদের ক্ষমতা বৃদ্ধি থাকে।] মামলুকরা মিশরের ক্ষমতায় চলে আসে। মঙ্গোলদের হাতে বাগদাদের পতনের পর ১২৬১ সালে মামলুকরা কায়রোতে আব্বাসীয় খিলাফত পুনপ্রতিষ্ঠা করে। কায়রোর প্রথম আব্বাসীয় খলিফা ছিলেন আল মুসতানসির। তৃতীয় আল মুতাওয়াক্কিলের সময় পর্যন্ত কায়রোর আব্বাসীয় খিলাফত টিকে ছিল। প্রথম সেলিম তাকে কনস্টান্টিনোপলে বন্দী হিসেবে নিয়ে যান। কায়রো ফিরে আসার পর ১৫৪৩ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
বাসতাকের আব্বাসীয় খানাত] ১২৫৮ সালে বাগদাদের পতনের পর আব্বাসীয় রাজবংশের কিছু বেঁচে যাওয়া সদস্য তাদের জ্যেষ্ঠ দ্বিতীয় ইসমাইল বিন হামজা বিন আহমেদ বিন মুহাম্মদের নেতৃত্ব দক্ষিণ পারস্যের ফারস অঞ্চলে চলে যায়।[৭১][৭২] তারা খোনজ শহরে অবস্থান নেয়। এটি এসময় জ্ঞান অর্জনের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। শেখ আবদুস সালাম খোনজি বিন আব্বাস বিন দ্বিতীয় ইসমাইল বাগদাদের পতনের পাঁচ বছর পর খোনজে জন্ম লাভ করেন।[৭৩][৭৪] তিনি একজন বড় ধর্মীয় পন্ডিত ও সুফি হন। স্থানীয় জনতা তাকে শ্রদ্ধা করত। তার মাজার খোনজে রয়েছে।
শেখ আবদুস সালামের বংশধররা ধর্মীয় পন্ডিত ছিলেন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে সম্মানিত হতেন। তেমন একজন শেখ মুহাম্মদ (মৃত্যু আনুমানিক ৯০৫ হিজরি) বাসতাক চলে আসেন।[৭৫][পৃষ্ঠা নম্বর] তার নাতি শেখ মুহাম্মদ বিন শেখ নাসিরউদ্দিন আহমেদ বিন শেখ মুহাম্মদ খোনজে কিছু সময়ের জন্য বসতি করেছিলেন। কিন্তু ৯৩৮ হিজরি বর্ধমান সাফাভি শক্তির কারণে তিনি স্থায়ীভাবে তার দাদার মত বাসতাকে চলে আসেন।[৭৬] তার নিজের নাতি শেখ হাসান (মৃত্যু ১০৮৪ হিজরি) (মোল্লা হাসান বলেও পরিচিত) বাসতাকের আব্বাসীয়দের সাধারণ বংশধর।[৭৭] শেখ হাসানের নাতি শেখ মুহাম্মদ সাইদ (জন্ম ১০৯৬ হিজরি-মৃত্যু ১১৫২ হিজরি) ও শেখ মুহাম্মদ খান (জন্ম ১১১৩ হিজরি-মৃত্যু ১১৯৭ হিজরি) এই অঞ্চলের প্রথম আব্বাসীয় শাসক। ১১৩৭ হিজরি শেখ মুহাম্মদদ সাইদ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সমর্থন জড়ো করতে থাকেন। লার দখলের পর তিনি মৃত্যুর ১১৫২ হিজরিতে মৃত্যূর আগ পর্যন্ত ১২ বা ১৪ বছর এই শহর ও এর উপর নির্ভরশীল অঞ্চলগুলো শাসন করতেন।[৭৮] তার ভাই শেখ মুহাম্মদ খান বাসতাকি এরপর বাসতাক ও জাহানগিরিয়া অঞ্চলের শাসক হন। ১১৬১ হিজরিতে শেখ মুহাম্মদ খান বাসতাকি দিদেহবান দুর্গের উদ্দেশ্যে বের হন এবং বাস্তাক ও এর অঞ্চলসমূহ তার বড় ভাইয়ের পুত্র শেখ মুহাম্মদ সাদিক ও তার চাচাত ভাই আগা হাসান খানের হাতে অর্পণ করেন।[৭৯] শেখ মুহাম্মদ খান প্রায় ২০ থেকে ২৪ বছর দিদেহবান দুর্গ থেকে জাহানগিরিয়া শাসন করেন। একারণে তাকে শেখ মুহাম্মদ “দিদেহবান” বলা হয়।[৮০] এরপর তিনি বাসতাক ফিরে আসেন এবং আমৃত্যু সেখান থেকে শাসন করে যান। তার শাসনের সর্বোচ্চ সীমায় বাসতাক খানাতে শুধু জাহানগিরিয়া ছাড়াও লার ও বন্দর আব্বাস ও এসবের উপর নির্ভরশীল এলাকাগুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল।[৮১][৮২][৮৩][৮৪][৮৫] শেখ মুহাম্মদ খান বাসতাকি “খান” উপাধিধারী বাসতাকের প্রথম আব্বাসীয় শাসক। এরপর সকল আব্বাসীয় শাসকের ক্ষেত্রে “খান” উপাধিটি ব্যবহার হতে থাকে।
বাসতাক ও জাহানগিরিয়ার সর্বশেষ আব্বাসীয় শাসক ছিলেন মুহাম্মদ আজম খান বানিআব্বাসিয়ান। তিনি তারিখে জাহানগিরিয়া ওয়া বনিআব্বাসিয়ানে বাসতাক গ্রন্থ রচনা করেছেন।[৮৬] এতে এই অঞ্চলের ইতিহাস ও এর শাসনকর্তা আব্বাসীয় পরিবারের বর্ণনা রয়েছে। মুহাম্মদ আজম খান বনিআব্বাসিয়ান ১৯৬৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এ বছরকে বাসতাকের আব্বাসীয় শাসনের সমাপ্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।
আব্বাসীয় খলিফাদের তালিকা

আব্বাসীয় পরিবারের বংশলতিকা। সবুজ রং দ্বারা বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা ও হলুদ রং দ্বারা কায়রোর আব্বাসীয় খলিফা চিহ্নিত। আব্বাসীয়দের সাথে আত্মীয়তা দেখানোর জন্য মুহাম্মদ (সা) এর নামও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
# খলিফা হিজরি খ্রিষ্টাব্দ
আব্বাসীয় খিলাফতের খলিফা
১ আস সাফাহ
১৩১–১৩৬ ৭৫০–৭৫৪
২ আল মনসুর
১৩৬–১৫৮ ৭৫৪–৭৭৫
৩ আল মাহদি
১৫৮–১৬৯ ৭৭৫–৭৮৫
৪ আল হাদি
১৬৯–১৭০ ৭৮৫–৭৮৬
৫ হারুনুর রশিদ
১৭০–১৯৩ ৭৮৬–৮০৯
৬ আল আমিন
১৯৩–১৯৮ ৮০৯–৮১৩
৭ আল মামুন
১৯৮–২১৮ ৮১৩–৮৩৩
৮ আল মুতাসিম
২১৮–২২৭ ৮৩৩–৮৪২
৯ আল ওয়াসিক
২২৭–২৩২ ৮৪২–৮৪৭
১০ আল মুতাওয়াক্কিল
২৩২–২৪৭ ৮৪৭–৮৬১
১১ আল মুনতাসির
২৪৭–২৪৮ ৮৬১–৮৬২
১২ আল মুসতাইন
২৪৮–২৫২ ৮৬২–৮৬৬
১৩ আল মুতাজ
২৫২–২৫৫ ৮৬৬–৮৬৯
১৪ আল মুহতাদি
২৫৫–২৫৬ ৮৬৯–৮৭০
১৫ আল মুতামিদ
২৫৭–২৭৯ ৮৭০–৮৯২
১৬ আল মুতাদিদ
২৭৯–২৮৯ ৮৯২–৯০২
১৭ আল মুকতাফি
২৮৯–২৯৫ ৯০২–৯০৮
১৮ আল মুকতাদির
২৯৫–৩২০ ৯০৮–৯৩২
১৯ আল কাহির
৩২০–৩২২ ৯৩২–৯৩৪
২০ আল রাদি
৩২২–৩২৯ ৯৩৪–৯৪০
২১ আল মুত্তাকি
৩২৯–৩৩৪ ৯৪০–৯৪৪
২২ আল মুসতাকফি
৩৩৪–৩৩৬ ৯৪৪–৯৪৬
২৩ আল মুতি
৩৩৬–৩৬৩ ৯৪৬–৯৭৪
২৪ আল তাই
৩৬৩–৩৮১ ৯৭৪–৯৯১
২৫ আল কাদির
৩৮২–৪২২ ৯৯১–১০৩১
২৬ আল কাইম
৪২২–৪৬৮ ১০৩১–১০৭৫
২৭ আল মুকতাদি
৪৬৮–৪৮৭ ১০৭৫–১০৯৪
২৮ আল মুসতাজির
৪৮৭–৫১২ ১০৯৪–১১১৮
২৯ আল মুসতারশিদ
৫১২-৫৩০ ১১১৮–১১৩৫
৩০ আর রশিদ
৫৩০–৫৩১ ১১৩৫–১১৩৬
৩১ আল মুকতাফি
৫৩১–৫৫৫ ১১৩৬–১১৬০
৩২ আল মুসতানজিদ
৫৫৫–৫৬৬ ১১৬০–১১৭০
৩৩ আল মুসতাদি
৫৬৬–৫৭৬ ১১৭০–১১৮০
৩৪ আন নাসির
৫৭৬–৬২২ ১১৮০–১২২৫
৩৫ আজ জহির
৬২২–৬২৩ ১২২৫–১২২৬
৩৬ আল মুসতানসির
৬২৩–৬৪০ ১২২৬–১২৪২
৩৭ আল মুসতাসিম
৬৪০–৬৫৬ ১২৪২–১২৫৮
কায়রোর খলিফা
৩৯ দ্বিতীয় আল মুসতানসির
৬৫৯–৬৬০ ১২৬১–১২৬২
৪০ প্রথম আল হাকিম
৬৬০–৭০২ ১২৬২–১৩০২
৪১ প্রথম আল মুসতাকফি
৭০২–৭৪১ ১৩০৩–১৩৪০
৪২ প্রথম আল ওয়াসিক
৭৪১–৭৪২ ১৩৪০–১৩৪১
৪৩ দ্বিতীয় আল হাকিম
৭৪২–৭৫৩ ১৩৪১–১৩৫২
৪৪ প্রথম আল মুতাদিদ
৭৫৩–৭৬৪ ১৩৫২–১৩৬২
৪৫ প্রথম আল মুতাওয়াক্কিল
৭৬৪–৭৮৫ ১৩৬২–১৩৮৩
৪৬ দ্বিতীয় আল ওয়াসিক
৭৮৫–৭৮৮ ১৩৮৩–১৩৮৬
৪৭ আল মুতাসিম
৭৮৮–৭৯১ ১৩৮৬–১৩৮৯
৪৮ প্রথম আল মুতাওয়াক্কিল (পুনরায় ক্ষমতালাভ) ৭৯১–৮০৯ ১৩৮৯–১৪০৬
৪৯ আল মুসতাইন
৮০৯–৮১৭ ১৪০৬–১৪১৪
৫০ দ্বিতীয় আল মুতাদিদ
৮১৭–৮৪৫ ১৪১৪–১৪৪১
৫১ দ্বিতীয় আল মুসতাকফি
৮৪৫–৮৫৫ ১৪৪১–১৪৫১
৫২ আল কাইম
৮৫৫–৮৫৯ ১৪৫১–১৪৫৫
৫৩ আল মুসতানজিদ
৮৫৯-৮৮৪ ১৪৫৫–১৪৭৯
৫৪ দ্বিতীয় আল মুতাওয়াক্কিল
৮৮৪–৯০২ ১৪৭৯–১৪৯৭
৫৫ আল মুসতামসিক
৯০২–৯১৪ ১৪৯৭–১৫০৮
৫৬ তৃতীয় আল মুতাওয়াক্কিল
৯১৪–৯২৩ ১৫০৮–১৫১৭
আস সাফাহ
আবুল আব্বাস আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আস সাফাহ বা আবুল আব্বাস আল সাফাহ (আরবি: ‘‎أبو العباس عبد الله بن محمد السفاح) (জন্ম ৭২১/৭২২ খ্রিষ্টাব্দ – মৃত্যু. ৯ জুন ৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দ, শাসনকাল ৭৪৯–৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন প্রথম আব্বাসীয় খলিফা। ইসলামের ইতিহাসে আব্বাসীয় খিলাফত অন্যতম দীর্ঘতম ও গুরুত্বপূর্ণ খিলাফত।
আস সাফাহ
আব্বাসীয় খিলাফত
জন্ম: ৭২১ মৃত্যু: ৭৫৪
সুন্নি ইসলাম শিরোনাম

পূর্বসূরী
দ্বিতীয় মারওয়ান
ইসলামের খলিফা
৭৪৯–৭৫৪
উত্তরসূরী
আল মনসুর

আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের
আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের (আরবি: عبد الله بن الزبير‎ ‘Abdallāh ibn az-Zubayr; ৬২৪–৬৯২)[১] ছিলেন একজন সাহাবি। তার বাবা ছিলেন সাহাবি জুবায়ের ইবনুল আওয়াম ও মা ছিলেন প্রথম খলিফা আবু বকরের কন্যা আসমা বিনতে আবি বকর। মুহাম্মদ (সা) এর স্ত্রী আয়েশা তার খালা ছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের ছিলেন হিজরতের পর মদিনায় জন্মগ্রহণকারী প্রথম মুসলিম।[২] মুসলিম অভিজাতদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে বিশিষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন।[১] আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের উমাইয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। কিন্তু তিনি পরাজিত হন ও সেনাপতি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মক্কা অবরোধের পর তাকে মক্কায় তাকে হত্যা করা আল মামুন
আবু জাফর আবদুল্লাহ আল মামুন ইবনে হারুন (আরবি: ابوجعفر عبدالله المأمون‎, ফার্সি: ابوجعفر عبدالله مامون) ( সেপ্টেম্বর ৭৮৬ – ৯ আগস্ট ৮৩৩) ছিলেন ৭ম আব্বাসীয় খলিফা। তিনি ৮১৩ সাল থেকে ৮৩৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পর্যন্ত শাসন করেন। তার ভাই আল আমিন নিহত হওয়ার পর তিনি তার স্থলাভিষিক্ত হন।[২] হয়।[৩]

আল আমিন
মুহাম্মদ ইবনে হারুনুর রশিদ (আল আমিন বলে বেশি পরিচিত) (এপ্রিল ৭৮৭ – ২৪/২৫ সেপ্টেম্বর ৮১৩) (আরবি: محمد الأمين بن هارون الرشيد‎) ছিলেন ষষ্ঠ আব্বাসীয় খলিফা। ৮০৯ সালে তিনি তার পিতা হারুনুর রশিদের উত্তরসুরি হন। ৮১৩ সাল পর্যন্ত তিনি শাসন করেন। এসময় তার ভাই আল মামুনের সাথে গৃহযুদ্ধ চলার সময় তিনি ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হন।
আল ওয়াসিক
আবু জাফর হারুন ইবনে মুহাম্মদ আল মুতাসিম (আরবি: أبو جعفر هارون بن محمد المعتصم‎; ৮১৬ – ১০ আগস্ট ৮৪৭) (আল ওয়াসিক বিল্লাহ নামে বেশি পরিচিত) (واثق بالل, “He who trusts in God”) ছিলেন ৯ম আব্বাসীয় খলিফা। তিনি ৮৪২ থেকে ৮৪৭ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তিনি তার পিতা ও পূর্ববর্তী খলিফা আল মুতাসিমের স্থলাভিষিক্ত হন।
আল মামুন
আবু জাফর আবদুল্লাহ আল মামুন ইবনে হারুন (আরবি: ابوجعفر عبدالله المأمون‎, ফার্সি: ابوجعفر عبدالله مامون) ( সেপ্টেম্বর ৭৮৬ – ৯ আগস্ট ৮৩৩) ছিলেন ৭ম আব্বাসীয় খলিফা। তিনি ৮১৩ সাল থেকে ৮৩৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পর্যন্ত শাসন করেন। তার ভাই আল আমিন নিহত হওয়ার পর তিনি তার স্থলাভিষিক্ত হন।[২] আল মাহদি
মুহাম্মদ ইবনে মনসুর আল মাহদি (আরবি: محمد بن منصورالمهدى ‎) (জন্ম: ১২৬ বা ১২৭ হিজরি; মৃত্যু: ১৬৯ হিজরি) (জন্ম: ৭৪৪ বা ৭৪৫ খ্রিষ্টাব্দ; মৃত্যু: ৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দ),[১] ছিলেন তৃতীয় আব্বাসীয় খলিফা। তিনি ১৫৮ হিজরি থেকে ১৬৯ হিজরি (৭৭৫-৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত শাসন করেন। তিনি তার পিতা আল মনসুরের উত্তরাধিকারী হন।
শাসন[সম্পাদনা] আল মাহদি তার পিতার মৃত্যুশয্যায় থাকার সময় খলিফা হিসেবে ঘোষিত হন। তার শান্তিপূর্ণ শাসনকালে পূর্বসূরিদের নীতিমালা প্রচলিত ছিল।
তার শাসনামলে আলিয়দের সাথে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। প্রভাবশালী বারমাকি পরিবার এসময় আরো ক্ষমতার অধিকারী হয়। তারা খলিফার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে।
আল মাহদি দশ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত উজির ইয়াকুব ইবনে দাউদকে কারারুদ্ধ করেন। ১৬৭ হিজরি/৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে আল মাহদি কর্তৃক চালু করা এক তদন্তের ফলে অভিযুক্ত জিন্দিকদের মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। তিনি সঙ্গীত ও কবিতার ভক্ত ছিলেন। অনেক শিল্পী ও কবি তার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। তিনি সঙ্গীত ও কাব্যের বিস্তারে ভূমিকা রাখেন।
৭৭৭ সালে তিনি খোরাসানের ইউসুফ ইবনে ইবরাহিমের বিদ্রোহ দমন করেন। একই বছর তিনি তার উত্তরাধিকারী হিসেবে ঈসা ইবনে মুসাকে সরিয়ে তার পুত্র মুসা আল হাদিকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন এবং তার জন্য অভিজাতদের কাছ থেকে বায়াত গ্রহণ করেন। ৭৭৮ সালে সিরিয়ায় উমাইয়া শক্তির নেতৃত্ব দানকারী আবদুল্লাহ ইবনে মারওয়ান ইবনে মুহাম্মদের বিদ্রোহ দমন করেন।
৭৮৫ সালে তাকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়।

সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক দিক[সম্পাদনা] আল মাহদির শাসনামলে বহুজাতিক বাগদাদ নগরী প্রাচুর্যপূর্ণ হয়ে উঠে। আরব উপদ্বীপ। ইরাক, সিরিয়া, পারস্য এবং আফগানিস্তান ও স্পেনের মত দূরবর্তী স্থান থেকেও অভিবাসীরা আসতে থাকে। বাগদাদ মুসলিম খ্রিষ্টান, ইহুদি, হিন্দু ও জরস্ট্রিয়ানদের আবাসস্থল ছিল। এটি বিশ্বের বৃহত্তম শহর হয়ে উঠে।
আল মাহদি আব্বাসীয় প্রশাসনকে বিস্তৃত করার কাজ চালু রাখেন। সেনাবাহিনী, বিচার ও কর সংগ্রহের জন্য নতুন দিওয়ান বা বিভাগ খোলা হয়। বারমাকি পরিবার এ নতুন বিভাগগুলোতে নিয়োগ পায়। বারমাকিরা পারসিয়ান বংশোদ্ভূত ছিল। প্রথমে বৌদ্ধ হলেও আরবদের আগমনের অল্পকাল আগে তারা জরস্ট্রিয়ানিজমে দীক্ষিত হয়। হারুনুর রশিদের সময় তাদের স্বল্পকাল স্থায়ী প্রভাব তাদের বিরুদ্ধে চলে যায়।
৭৫১ সালে চীন থেকে কাগজের প্রচলন (দেখুন তালাসের যুদ্ধ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখন পর্যন্ত পশ্চিমে আরবদের মধ্যে কাগজের প্রচলন ছিল না। পারসিয়ানরা পেপিরাস ও ইউরোপীয়ানরা ভেলাম ব্যবহার করত। কাগজ নির্ভর শিল্প বাগদাদে ব্যাপক হয়ে উঠে। শহরের একটি সড়ক শুধু কাগজ ও বইয়ের বিক্রির জন্য ব্যবহৃত হত। আব্বাসীয় আমলাতন্ত্রের বিস্তৃতিতে কাগজের স্বল্পমূল্য ও স্থায়ীত্ব প্রভাব ফেলেছিল।
আল মাহদি
আব্বাসীয় খিলাফত
জন্ম: ? মৃত্যু: ৭৮৫
সুন্নি ইসলাম শিরোনাম

পূর্বসূরী
আল মনসুর
ইসলামের খলিফা
৭৭৫–৭৮৫
উত্তরসূরী
আল হাদি

আল মুতাওয়াক্কিল
জাফর ইবনে মুহাম্মদ আল মুতাসিম বিল্লাহ (আরবি: جعفر بن محمد المعتصم بالل‎; মার্চ ৮২২ – ১১ ডিসেম্বর ৮৬১) (আল মুতাওয়াক্কিল আলা আল্লাহ (المتوكل على ال, “He who relies on God”) নামে বেশি পরিচিত) ছিলেন ১০ম আব্বাসীয় খলিফা। তিনি ৮৪৭ সাল থেকে ৮৬১ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তিনি তার ভাই আল ওয়াসিকের উত্তরসুরি হয়েছিলেন। তিনি মিহনার সমাপ্তি ঘটান।
আল মুতাজ
আল মুতাজ (৮৪৭ – জুলাই/আগস্ট ৮৬৯) (আরবি: المعتز‎) ছিলেন ১৩শ আব্বাসীয় খলিফা। তিনি ৮৬৬ থেকে ৮৬৯ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। ক্ষমতালাভের সময় তার বয়স ছিল ১৯ বছর। ক্ষমতালাভকালে বয়সের হিসাবে আব্বাসীয় খলিফাদের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ।[১] আল মুতাজ
আব্বাসীয় খিলাফত
জন্ম: ৮৪৭ মৃত্যু: ৮৬৯
সুন্নি ইসলাম শিরোনাম

পূর্বসূরী
আল মুসতাইন
ইসলামের খলিফা
৮৬৬–৮৬৯
উত্তরসূরী
আল মুহতাদি

আল মুতামিদ
আল মুতামিদ (المعتمد al-Muʿtamid) (৮৪৪ – ১৫ অক্টোবর ৮৯২) ছিলেন ১৫শ আব্বাসীয় খলিফা। তিনি ৮৭০ থেকে ৮৯২ সাল পর্যন্ত খলিফার পদে আসীন ছিলেন। আল মুতাওয়াক্কিলের বেঁচে থাকা সন্তানদের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। ২৩ বছর যাবত খলিফার দায়িত্ব পালন করলেও তার শাসন আনুষ্ঠানিক ছিল।

আল মুতামিদ
আব্বাসীয় খিলাফত
জন্ম: ৮৪৪ মৃত্যু: ৮৯২
সুন্নি ইসলাম শিরোনাম

পূর্বসূরী
আল মুহতাদি
ইসলামের খলিফা
৮৭০–৮৯২
উত্তরসূরী
আল মুতাদিদ

আল মুতাসিম
আবু ইসহাক মুহাম্মদ ইবনে হারুনুর রশিদ (আরবি: أبو إسحاق عباس بن هارون الرشيد‎; ৭৯৬ –৫ জানুয়ারি ৮৪২) (আল মুতাসিম বিল্লাহ নামে বেশি পরিচিত) ছিলেন ৮ম আব্বাসীয় খলিফা। ৮৩৩ সাল থেকে ৮৪২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি শাসন করেন। তিনি তার সৎভাই আল মামুনের উত্তরসুরি হন। আল মামুনের অধীনে তিনি সামরিক কমান্ডার ও গভর্নর ছিলেন। তার আমলে তুর্কি দাস সৈনিকদের সূচনা হয়। তাদের জন্য সামারায় নতুন রাজধানী স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে তুর্কিরা দ্রুত আব্বাসীয় সরকারে প্রভাবশালী হয়ে উঠে। তিনি তার পূর্বসূরি আল মামুনের মত মুতাজিলাদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখেন। এসময় প্রশাসনের কেন্দ্রীকরণ, আঞ্চলিক গভর্নরদের ক্ষমতা হ্রাস করা হয়। আল মুতাসিমের শাসনে বেশ কিছু আভ্যন্তরীণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তিনি ৮৪২ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
আল মুতাসিম
আব্বাসীয় খিলাফত
জন্ম: ৭৯৬ মৃত্যু: ৮৪২
সুন্নি ইসলাম শিরোনাম

পূর্বসূরী
আল মামুন
ইসলামের খলিফা
৯ আগস্ট ৮৩৩ – ৫ জানুয়ারি ৮৪২
উত্তরসূরী
আল ওয়াসিক

আল মুনতাসির
আবু জাওর মুহাম্মদ (আরবি: أبو جعفر محمد‎; ৮৩৭ – ২৫ জুন ৮৬২) (আল মুনতাসির বিল্লাহ নামে অধিক পরিচিত) (المنتصر بال, “He who triumphs in God”) ছিলেন ১১শ আব্বাসীয় খলিফা। তিনি ৮৬১ থেকে ৮৬২ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তার পক্ষে তুর্কি গোষ্ঠীর সমর্থন ছিল।
আল মুনতাসির
আব্বাসীয় খিলাফত
জন্ম: ৮৩৭ মৃত্যু: ৮৬২
সুন্নি ইসলাম শিরোনাম

পূর্বসূরী
আল মুতাওয়াক্কিল
ইসলামের খলিফা
৮৬১–৮৬২
উত্তরসূরী
আল মুসতাইন

আল মনসুর
আবু জাফর আবদাল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল মনসুর (৯৫ হিজরী – ১৫৮ হিজরী) (৭১৪ খ্রীষ্টাব্দ – ৭৭৫ খ্রীষ্টাব্দ)[১] (আরবি : المنصور أبو جعفر عبدالله بن محمد) ছিলেন দ্বিতীয় আব্বাসীয় খলিফা। ১৩৬ হিজরী থেকে ১৫৮ হিজরী (৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দ – ৭৭৫ খ্রীষ্টাব্দ) পর্যন্ত তিনি খলিফার পদে আসীন ছিলেন।[২][৩] জীবন[সম্পাদনা] আল মনসুর ৯৫ হিজরী সনে (৭১৪ খ্রীষ্টাব্দ) আব্বাসীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মুহাম্মদ ছিলেন নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের প্র-পৌত্র; ১৪শ শতাব্দীতে মুরিশ ইতিহাসবিদ আলী ইবন আবদুল্লাহ রচিত রাউদ আল কিরতাস গ্রন্থ অনুযায়ী তার মা একজন বার্বা‌র বংশীয় নারী ছিলেন।[৪] তিনি ১৩৬ হিজরীর যিলহজ্জ থেকে ১৫৮ হিজরীর যিলহজ্জ (৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দ – ৭৭৫ খ্রীষ্টাব্দ) পর্যন্ত শাসন করেন। ৭৬২ খ্রীষ্টাব্দে তিনি তার নতুন রাজকীয় আবাসস্থল ও প্রাসাদ হিসেবে মদীনাতুস সালাম (শান্তির শহর) প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে রাজকীয় রাজধানী বাগদাদের মূলকেন্দ্রে পরিণত হয়।
তার ভাই আবুল আব্বাসের (যিনি পরবর্তীতে আস সাফাহ (রক্তপাতকারী) হিসেবে পরিচিত হন) মৃত্যুর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ৭৫৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি আবু মুসলিমকে হত্যার নির্দেশ দেন। আবু মুসলিম একজন অনুগত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি পূর্বাঞ্চলীয় ইরানী প্রদেশ খোরাসানের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ৭৪৯-৭৫০ সালের গৃহযুদ্ধের সময় তিনি উমাইয়াদের বিরুদ্ধে আব্বাসীয়দের বিজয়ে নেতৃত্ব দেন। আল-মনসুরের আমলে তিনি ইরান ও ট্রান্সঅক্সানিয়ার অবিতর্কিত শাসক ছিলেন। সাম্রাজ্যে ক্ষমতার লড়াই স্তব্ধ করাই এই হত্যাকান্ডের উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে কিছু তথ্য মতে, আবু মুসলিম অবিশ্বস্ত হয়ে উঠছিলেন তাই তাকে হত্যা করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন].
আল মনসুর দুর্নীতির সন্দেহে তার উত্তরাধীকারী হিসেবে ঈসা বিন মুসা বিন মুহাম্মদ বিন আলীর স্থলে আল মাহদিকে মনোনীত করেন। তার জ্যেষ্ঠ ভাই সাফাহর মত তিনিও বিরোধীদের থেকে নিষ্কৃতি উদ্দেশ্যে অঞ্চলগুলোকে একত্রীভূত করতে চাইতেন।
তার শাসনামলে সাহিত্য ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ কর্ম ইসলামী জগতে পূর্ণ উদ্যমে যাত্রা শুরু করে। উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবন আবদুল মালিক পারস্যের দরবারী প্রথা গ্রহণ করলেও আল মনসুরের শাসনের আগ পর্যন্ত পারস্য সাহিত্য ও পাণ্ডিত্য ইসলামী জগতে সত্যিকারভাবে বিস্তারলাভ করতে পারেনি। আল মনসুরের আমলে পারস্য জাতীয়তাবাদের উপর নজরদারী কমার ফলে পারসিক পন্ডিতদের মধ্যে শুবিয়া ‘র জন্ম হয়। এটি ছিল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন। এতে পারস্যের শিল্প ও সংস্কৃতি আরবদের চেয়ে উন্নত এই বিশ্বাস প্রকাশ পেয়েছিল। এই আন্দোলন অষ্টম শতকের আরব-পারস্য রচনার প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

ইংরেজ রাজা অফফা অব মেরসিয়ার(৭৫৭-৭৯৬) স্বর্ণমুদ্রা। আল-মনসুরের দিনারের প্রতিলিপি[৫] ব্রিটিশ জাদুঘর
পারসিক জ্ঞানের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূরন ছিল অনারবদের ইসলাম গ্রহণ। জিজিয়া আদায়ের সুবিধার জন্য উমাইয়ারা ধর্মান্তরকে নিরুৎসাহিত করত। এই সময়ে এই আত্মীকরণের ফলে অত্র অঞ্চলে ইসলামের প্রসার বৃদ্ধি পায়। ৭৫০ খ্রীষ্টাব্দে খিলাফতের ৮% বাসিন্দা ছিল মুসলিম, আল মনসুরের শাসনের শেষদিকে এটি দ্বিগুণ হয়ে ১৫% হয়।
৭৫৬ খ্রীষ্টাব্দে আল-মনসুর আন শি বিদ্রোহে আন লুশানকে প্রতিহত করার ৪০০০ আরব যোদ্ধাকে চৈনিকদের সাহায্যার্থে প্রেরণ করেন। যুদ্ধের পর তারা চীনে থেকে যায়।[৬][৭][৮][৯][১০] আল-মনসুর ট্যাং কাহিনীতে “আপু চাফু” হিসেবে বিবৃত হন।[১১][১২][১৩][১৪][১৫][১৬][১৭] [১৮][১৯][২০][২১][২২] আল মনসুর ৭৭৫ খ্রীষ্টাব্দে হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় যাওয়ার সময় যাত্রাপথে মৃত্যুবরণ করেন। পথের কোথাও খনন করা কয়েকশ কবরের কোথাও তাকে দাফন করা হয়। উমাইয়াদের কাছ থেকে তার সমাধিকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে এমনটা করা হয়। তার পুত্র আল মাহদি তার উত্তরাধীকারী হন।
বেশ কিছু সূত্র অনুযায়ী ইমাম আবু হানিফা আল-মনসুর কর্তৃক কারারুদ্ধ হন। ইমাম মালিক ইবনে আনাসও তার শাসনামলে নিপীড়িত হন। তবে আল-মনসুর এতে জড়িত ছিলেন না – মূলত তার এক ভাই যিনি ঐ সময় মদীনার শাসক ছিলেন তিনিই এজন্য দায়ী। আল মনসুর তার ভাইকে শাস্তি দেন এবং ইমাম মালিককে সমর্থন করেন। (ইয়াকুবী, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৮৬; মুরুজ আল-যাহাব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৬৮-২৭০)
আল মুসতাইন
আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ (আরবি: أحمد بن محمد‎; ৮৩৬ – ১৭ অক্টোবর ৮৬৬) (আল মুসতাইন নামে অধিক পরিচিত) ছিলেন ১২শ আব্বাসীয় খলিফা। তিনি ৮৬২ থেকে ৮৬৬ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। পূর্ববর্তী খলিফা আল মুনতাসিরের মৃত্যুর পর তার তুর্কি সামরিক নেতৃবৃন্দরা উত্তরাধিকারী বিষয়ে বৈঠকে বসে। তারা আল মুতাজ বা তার ভাইদের ব্যাপারে উৎসুক ছিল না তাই আল মুতাসিমের নাতি আল মুসতাইনকে খলিফা নির্বাচন করা হয়।
আল মুসতাইন
আব্বাসীয় খিলাফত
জন্ম: ৮৩৬ মৃত্যু: ৮৬৬
সুন্নি ইসলাম শিরোনাম

পূর্বসূরী
আল মুনতাসির
ইসলামের খলিফা
৮৬২–৮৬৬
উত্তরসূরী
আল মুতাজ

আল মুহতাদি
আল মুহতাদি (? – ২১ জুন ৮৭০) (আরবি: المهتدي‎) ছিলেন ১৪শ আব্বাসীয় খলিফা। ৮৬৯ থেকে ৮৭০ সাল পর্যন্ত তিনি খলিফার পদে আসীন ছিলেন।
খলিফা আল মুতাজের মৃত্যুর পর তুর্কিরা তার চাচাত ভাই আল মুহতাদিকে নতুন খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করে। অন্য খলিফাদের তুলনায় তিনি বেশ সফল ছিলেন। তার অধীনে দরবারে সংস্কার করা হয়। গায়িকা ও সঙ্গীতকে দরবার থেকে বিদায় দেয়া হয়। প্রতিদিন খোলা আদালতে বিচার কাজ করা হত। মদ ও জুয়াও নিষিদ্ধ করা হয়। তিনি উমাইয়া খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজকে তার কাজের আদর্শরূপে স্থির করেন।
আল মুহতাদির শাসন এক বছরের মত স্থায়ী হয়। কিছু অসন্তোষ ও ষড়যন্ত্রের পর ৮৭০ সালে তিনি তুর্কিদের হাতে নিহত হন। এসময় তার বয়স ছিল আটত্রিশ বছর। প্রাচীন আরব লেখকরা তার ন্যায়বিচার ও মহানুভবতার প্রশংসা করেছেন। নিহত না হলে তিনি সেরা আব্বাসীয় খলিফা হতেন এমন বলা হয়।
আল মুহতাদি
আব্বাসীয় খিলাফত
জন্ম: ? মৃত্যু: ৮৭০
সুন্নি ইসলাম শিরোনাম

পূর্বসূরী
আল মুতাজ
ইসলামের খলিফা
৮৬৯–৮৭০
উত্তরসূরী
আল মুতামিদ

আল হাদি
আবু মুহাম্মদ মুসা ইবনে মাহদি আল হাদি (আরবি: أبو محمد موسى بن المهدي الهادي‎) (জন্ম: ১৪৭ হিজরি (৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দ); মৃত্যু: ১৭০ হিজরি (৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দ)[১] ছিলেন চতুর্থ আব্বাসীয় খলিফা। তিনি তার পিতা আল মাহদির স্থলাভিষিক্ত হন। ৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দ (১৬৯ হিজরি) থেকে ৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে (১৭০ হিজরি) মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি শাসন করেন।[২] আল হাদি ছিলেন আল মাহদির জ্যেষ্ঠ সন্তান। পিতার মত ইনি উদার ছিলেন এবং নাগরিকদের বাগদাদের প্রাসাদে তার সাথে দেখা করার অনুমতি দেন। আব্বাসীয় আমলের অগ্রগতি তিনি বজায় রাখেন।
তার স্বল্পকালীন শাসনে বেশ কিছু সামরিক সংঘাত ঘটে। হুসাইন ইবনে আলি ইবনে হাসান মদিনায় নিজেকে খলিফা ঘোষণা করলে বিদ্রোহ সৃষ্টি হয়। আল হাদি বিদ্রোহ দমন করেন। হুসাইন ইবনে আলি ইবনে হাসানসহ তার অনেক অনুসারীকে হত্যা করা হয়। তবে তার এক ভাই ইদ্রিস বিন আবদুল্লাহ পালিয়ে যান। মিশরীয় ডাক কর্মকর্তা ওয়াদিহ তাকে সাহায্য করেন। এবং মরক্কো পৌছে তিনি সেখানে ইদ্রিসি রাষ্ট্রের সূচনা করেন। আল হাদি একটি খারিজি বিদ্রোহও দমন করেন। তাছাড়া তাকে বাইজেন্টাইন আক্রমণও প্রতিহত করতে হয়। বাইজেন্টাইনরা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং আব্বাসীয়রা তাদের কাছ থেকে কিছু অংশ অধিকার করতে সক্ষম হয়[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]।
আল হাদি ৭৮৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে মুহাম্মদ ইবনে জারির আল তাবারি বেশ কিছু সম্ভাব্য কারণের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন।
আল হাদি
আব্বাসীয় খিলাফত
জন্ম: ৭৬৪ মৃত্যু: ৭৮৬
সুন্নি ইসলাম শিরোনাম

পূর্বসূরী
আল মাহদি
ইসলামের খলিফা
৭৮৫–৭৮৬
উত্তরসূরী
হারুনুর রশিদ

আলমোহাদ খিলাফত
রাজধানী তিনমিল
(১১২১–১১৪৭)
মারাকেশ
(১১৪৭–১২৬৯)[৩]

ধর্ম সুন্নি ইসলাম

সরকার রাজতন্ত্র

খলিফা

– ১১২১-১১৩০ আবদুল মুমিন

– ১২৬৬–১২৬৯ আবুল উলা আল ওয়াসিক ইদ্রিস

ইতিহাস
– সংস্থাপিত ১১২১
– আলমোরাভিদের উৎখাত ১১৪৭
– মারিনি অধিরাজ্য ১২৪৮
– ভাঙ্গিয়া দেত্তয়া হয়েছে ১২৬৯
আয়তন
. বর্গ কি.মি. ( বর্গ মাইল)
মুদ্রা দিনার[৪]

বর্তমানে অংশ আলজেরিয়া
জিব্রাল্টার
লিবিয়া
মরক্কো
পর্তুগাল
স্পেন
তিউনিসিয়া
পশ্চিম সাহারা

আলমোহাদ খিলাফত (Berber: Imweḥḥden, from Arabic الموحدون al-Muwaḥḥidun, “the monotheists” or “the unitarians”) ছিল ১২ শতকের মরক্কান বংশোদ্ভূত[৫][৬] বার্বা‌র-মুসলিম রাজবংশ যা ১২ শতকে আটলাস পর্বতমালার তিনমিলে প্রতিষ্ঠিত হয়।[৭]

উসমানীয় খিলাফত
উসমানীয় খিলাফত মিশরের আব্বাসীয় খিলাফতের পর খিলাফতে আসীন হয়। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই খিলাফত টিকে ছিল। খিলাফতের সর্বশেষ খলীফা ছিলেন দ্বিতীয় আবদুল মজিদ।
উসমানীয়দের উত্থানের সময় সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ খলিফার অধিকার দাবি করেন। তার নাতি প্রথম সেলিম মুসলিম ভূমিগুলো জয় করে ইসলামের পবিত্র স্থানসমূহের রক্ষক হন। পরবর্তীতে ইউরোপের সাথে প্রতিযোগীতায় ধীরে ধীরে সাম্রাজ্যের পতন হয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে সাম্রাজ্য বিভক্ত হয়ে যায়। শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদ দুই বছরের জন্য দায়িত্ব পান। কিন্তু কামাল আতাতুর্কে‌র সংস্কারের সময় খিলাফত বিলুপ্ত করে দেয়া হয়।
১৫শ শতাব্দী থেকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতানরা খিলাফত দাবি করতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে তারা মুসলিম বিশ্বের নেতা ও প্রতিনিধিতে পরিণত হন। সাম্রাজ্য সর্বোচ্চ সীমায় পৌছানোর সময় উসমানীয়রা কনস্টান্টিনোপল থেকে আনাতোলিয়া, অধিকাংশ মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, ককেশাস এবং পূর্ব ইউরোপের অনেক গভীর পর্যন্ত শাসন করতেন।
ওয়েস্টফিলিয়ার শান্তি ও শিল্প বিপ্লবের পর ইউরোপীয়দের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং উসমানীয় কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। দুর্বল নেতৃত্ব, প্রাচীন রাজনৈতিক প্রথা এবং ইউরোপের সাথে প্রযুক্তিগত বিষয়ে তাল মিলিয়ে চলতে না পারায় উসমানীয় সাম্রাজ্য ইউরোপের সাথে প্রতিযোগীতায় টিকতে ব্যর্থ হয় এবং পূর্বের বৃহৎ শক্তির অবস্থান থেকে স্থানচ্যুত হয়।
উনিশ শতাব্দীর শেষের দিকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সমস্যাগুলো যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। ইউরোপীয় অগ্রগতিকে ধারণ করার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি কিছুকাল ধারণ করা হয়। এসময় পাশ্চাত্য দন্ডবিধি গ্রহণ করা হয়েছিল[১] এবং ঐতিহ্যবাহী আইনগুলো ইউরোপীয় আইন দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয়েছিল। রুশ-তুর্কি যুদ্ধের মত সংঘর্ষে হারানো অঞ্চলসমূহের কারণে উসমানীয়দের ক্ষমতা ও প্রভাব অনেকাংশে কমে যায়। এছাড়াও গৃহিত ঋণের কারণে অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
দ্বিতীয় আবদুল হামিদ, ১৮৭৬-১৯০৯
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ অনুধাবন করেন যে সাম্রাজ্যের দুর্বল অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হল শক্ত ও যোগ্য নেতৃত্ব। তিনি তার পূর্বসূরিদের সময় দায়িত্বপালন করা তার মন্ত্রী ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেন এবং তার ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন। সাম্রাজ্যের প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ তিনি নিজের হাতে নেন। উসমানীয় বিষয়ে পাশ্চাত্যের প্রভাবের বিপরীতে গিয়ে তিনি সাম্রাজ্যের ইসলামি চরিত্রের উপর জোর দেন এবং নিজ খলিফা পদকে জোর দিয়ে খিলাফতের অধীনে মুসলিম ঐক্যের ডাক দেন।
আবদুল হামিদের সাম্রাজ্য সংহতকরণ কাজ সংক্ষিপ্তকালের জন্য সফল হয়। এসময় অনেক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়, জাতীয় ঋণ কমানো হয় এবং সাম্রাজ্যের অবনতিশীল কাঠামো পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা চালানো হয়। তার একনায়কতান্ত্রিক শাসনের ফলে জটিলতা সৃষ্টি হয় ফলে তার শাসনের অবসান ঘটে।
উসমানীয় সামরিক বাহিনীর পাশ্চাত্যপন্থি অফিসাররা আবদুল হামিদের শাসনের বিরোধী ছিলেন। তারা সাম্রাজ্যের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন গুপ্তসমিতি গঠন করেন। ১৯০৬ সাল নাগাদ আন্দোলন সেনাবাহিনীর উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থন লাভ করে। এর নেতারা কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রোগ্রেস গঠন করেন। এটি তরুণ তুর্কি পার্টি বলে পরিচিত ছিল। তরুণ তুর্কিরা সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থাকে পাশ্চাত্য ধাচে সাজাতে উৎসাহী ছিল। তাদের আদর্শ চরিত্রে ছিল জাতীয়তাবাদি। কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রোগ্রেসের নেতারা জনতার সামনে তাদের ধারণা তুলে ধরেন। তুর্কি সামরিক অফিসার আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে কমিটি ১৯০৮ সালে সুলতানের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত করে। ৬ জুলাই নতুন শাসন ঘোষণা করা হয়। আবদুল হামিদকে ক্ষমতায় রেখে তরুণ তুর্কিরা তাকে ত্রিশ বছর পূর্বে স্থগিত করা সংসদ ও সংবিধান পুনপ্রবর্তনের দাবি জানায়। এর মাধ্যমে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের সৃষ্টি হয়।
পাল্টা অভ্যুত্থান ও ৩১ মার্চ ঘটনা[সম্পাদনা]

সুলতানের প্রতি অনুগত সৈনিকরা একটি পাল্টা অভ্যুত্থান সংঘটন করে। তবে এই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়। নতুন সংসদীয় মেয়াদের নয় মাস পর পাল্টা বিপ্লবী ৩১ মার্চ ঘটনা সংঘটিত হয়। এই বিদ্রোহের অনেক দিক এখনো আলোচনায় আসে।
দ্বিতীয় আবদুল হামিদকে ১৯০৯ সালের ১৩ এপ্রিল ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তার স্থলে তার ভাই রশিদ এফেন্দি ক্ষমতায় বসেন। ২৭ এপ্রিল পঞ্চম মুহাম্মদ নাম ধারণ করেন।
পঞ্চম মুহাম্মদ, ১৯০৯-১৯১৮[সম্পাদনা] লিবিয়া[সম্পাদনা] ১৯১১ সালে ইটালি লিবিয়াকে কেন্দ্র করে উসমানীয়দের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। উসমানীয়রা এই অঞ্চল ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। ১৯১২ সালে বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, মন্টিনিগ্রো ও গ্রীস মিলে তুর্কি বিরোধী বলকান লীগ গঠন করে এবং উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যৌথ আক্রমণ করে। বলকান যুদ্ধের ফলে ইউরোপে উসমানীয়দের অবস্থান সমাপ্ত হয় এবং বলকান লীগের আভ্যন্তরীণ লড়াইএর ফলে তাদের আনাতোলিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়া থেমে যায়।
আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে উসমানীয়রা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ফলে সমস্যায় পড়ে। সাম্রাজ্যব্যপী জাতীয়তাবাদিদের উত্থান বৃদ্ধি পায়। কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রোগ্রেসের ১৯১৩ সালে দ্বিতীয় একটি অভ্যুত্থান ঘটায় এবং সরকারের সব ক্ষমতা গ্রহণ করে। পরবর্তী পাঁচ বছর সাম্রাজ্য কমিটির অধীন একটি একদলীয় রাষ্ট্র ছিল। এসময় নেতৃত্বে ছিলেন আনোয়ার পাশা, তালাত পাশা ও জামাল পাশা। সুলতান তার পদে বহাল থাকলে কোনো নির্বাহী ক্ষমতাহীন ছিলেন। ফলে পঞ্চম মুহাম্মদের অধীনে খলিফার পদ আনুষ্ঠানিক হিসেবে থাকে। মূল কর্তৃত্ব তরুণ তুর্কিদের হাতে ছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ[সম্পাদনা] আরও দেখুন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্য রণাঙ্গন
ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তরুণ তুর্কিরা জার্মান সাম্রাজ্যের সাথে মিত্রতা স্থাপন করে। এই পদক্ষেপের ফলাফল পরবর্তীতে বিপর্যয়কর প্রমাণিত হয়। ১৯১৪ সালের নভেম্বরে উসমানীয় সাম্রাজ্য অক্ষশক্তির পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করে। এরপরে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধ চলাকালীন সময় সাম্রাজ্যের অবস্থার আরো অবনতি হয় এবং পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যে হাতছাড়া হয়ে যায়।
জিহাদ আহ্বান[সম্পাদনা] তরুণ তুর্কিরা সুলতানকে জিহাদ আহ্বান করতে বাধ্য করে। এতে মিত্রশক্তিকে প্রতিহত করার ডাক দেয়া হয়। তবে এই আহ্বান সফল হয়নি। তরুণ তুর্কি সরকার পদত্যাগ করে এবং তিন পাশা বলে পরিচিত আনোয়ার পাশা, তালাত পাশা ও জামাল পাশা জার্মান যুদ্ধজাহাজ করে তুরস্ক ছেড়ে পালিয়ে যান। ১৯১৮ সালের জুলাই মাসে পঞ্চম মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করলে সুলতান ষষ্ঠ মুহাম্মদ তার স্থলাভিষিক্ত হন। ১৯১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একটি ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজে উসমানীয়রা আত্মসমর্পণের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষর করে। মিত্রবাহিনী কনস্টান্টিনোপলে উপস্থিত হয় এবং সুলতানের প্রাসাদ দখল করে নেয়া হয়।[১] উসমানীয় সাম্রাজ্যে বিভাজন[সম্পাদনা] মূল নিবন্ধ: উসমানীয় সাম্রাজ্যে বিভাজন, কনস্টান্টিনোপল দখল, খিলাফত আন্দোলন, এবং সেভ্রেস চুক্তি
যুদ্ধের শেষ নাগাদ উসমানীয়রা দৃশ্যত তাদের সমগ্র সাম্রাজ্য হারায়। সিংহাসন এবং উসমানীয় রাজবংশকে টিকিয়ে রাখার জন্য সুলতান মিত্রশক্তির সাথে সহযোগিতা করতে সম্মত হন। তিনি সংসদ বিলুপ্ত করেন এবং তরুণ তুর্কিদের ছেড়ে যাওয়া সরকারের স্থান নেয়ার জণ্য মিত্রশক্তির সামরিক প্রশাসনকে অনুমতি দেন।
খিলাফত আন্দোলন[সম্পাদনা] আরও দেখুন: খিলাফত আন্দোলন
ব্রিটিশ ভারতের মুসলিমরা উসমানীয় খিলাফতের পক্ষে খিলাফত আন্দোলন শুরু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল যাতে বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকার খিলাফতকে ক্ষতিগ্রস্থ না করে।
উসমানীয়দের পরাজয় ও মিত্রশক্তির কনস্টান্টিনোপল দখলের ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্য তাদের সবল স্থান হারায়। খিলাফত আন্দোলন এই অবস্থা থেকে উত্তোরনের জন্য উৎসাহী ছিল। ১৯২০ সালে সেভ্রেস চুক্তির পর আন্দোলন গতি লাভ করে।[২] বিলুপ্তি[সম্পাদনা]

সর্বশেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদ।
মূল নিবন্ধ: আতাতুর্কে‌র সংস্কার এবং তুর্কি জাতীয় আন্দোলন
তুর্কি জাতীয় আন্দোলনের ফলে তুরস্কে গ্র্যান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলি গঠিত হয়। ১৯২৩ সালের ২৪ জুলাই লুসানের চুক্তিতে জাতির স্বাধীনতা ও সীমানা বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা লাভ করা হয়। ন্যাশনাল এসেম্বলি ১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর তুরস্ককে প্রজাতন্ত্র ও আঙ্কারাকে এর রাজধানী ঘোষণা করে। ফলে প্রায় ৭০০ বছর পর উসমানীয় সাম্রাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়। তবে সুলতান এই আন্দোলন দমন করতে ইচ্ছুক ছিলেন এবং শাইখুল ইসলামের মাধ্যমে ফতোয়া জারি করেন যাতে তা অনৈসলামিক ঘোষণা করা হয়। তবে জাতীয়তাবাদিরা ধীরে ধীরে গতি পায় এবং ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে। হুমকি দূর করার জন্য সুলতান নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য রাজি হন। এতে জাতীয়তাবাদিরা জয়ী হয়।
প্রথমদিকে ন্যাশনাল এসেম্বলি নতুন শাসনের ভেতর খিলাফতে স্থান দিতে ইচ্ছুক ছিল বলে মনে হয় এবং ষষ্ঠ মুহাম্মদের দেশত্যাগের পর তার এক ভাই দ্বিতীয় আবদুল মজিদকে খলিফা হিসেবে বসায়। কিন্তু এসময় এই পদে কোনো কর্তৃত্ব অবশিষ্ট ছিল না। আবদুল মজিদের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক। মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক‌ উসমানীয় রাজবংশ ও এর ইসলামি অবস্থানের বিরোধী ছিলেন। আবদুল মজিদকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করার পর কামাল ঐতিহ্যবাহী উসমানীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার অনুমতি দেননি। তিনি বলেন,
আনুষ্ঠানিক প্রধান ছাড়া খলিফার কোনো ক্ষমতা বা অবস্থান নেই।
বরাদ্দ বৃদ্ধির জন্য আবদুল মজিদের একটি অনুরোধের জবাবে কামাল লেখেন,
আপনার কার্যালয় খিলাফত ঐতিহাসিক স্বারক ছাড়া বেশি কিছু না। এর অস্তিত্বের কোনো বৈধতা নেই। আমার কোনো সচিবকে লেখাটা একপ্রকার ঔদ্ধত্য!
এ পর্যন্ত লাভ করা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কামাল এসময় খিলাফত উচ্ছেদে আগ্রহী ছিলেন না। সাধারণ জনতার ভেতর খিলাফতের প্রতি সমর্থন ছিল।
ভারতের খিলাফত আন্দোলনের নেতা মাওলানা মুহাম্মদ আলি ও মাওলানা শওকত আলি ইসলামের জন্য উসমানীয় খিলাফতকে রক্ষা করার জন্য তুরস্কের জনগণকে আহ্বান জানিয়ে লিফলেট বিলি করেন। তুরস্কের নতুন জাতীয়তাবাদি সরকার একে বৈদেশিক হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করে। একে তুরস্কের সার্বভৌমত্বের প্রতি অপমান ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখা হয়। এরপর ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ ন্যাশনাল এসেম্বলি খিলাফত বিলুপ্ত করে। উসমানীয় পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ আবদুল মজিদকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। ফলে উসমানীয় খিলাফতের অবসান ঘটে।

জেনগি রাজবংশ
রাজধানী আলেপ্পো

ভাষাসমূহ অঘুজ তুর্কি
আরবি

ধর্ম সুন্নি ইসলাম

সরকার আমিরাত
আমির

– ১১২৭–১১৪৬ ইমাদউদ্দিন জেনগি (প্রথম)

– ১২৪১–১২৫০ মাহমুদ আল মালিক আল জহির (শেষ)
ইতিহাস
– সংস্থাপিত ১১২৭
– ভাঙ্গিয়া দেত্তয়া হয়েছে ১২৫০
মুদ্রা দিনার

সতর্কীকরণ: “মহাদেশের” জন্য উল্লিখিত মান সম্মত নয়

জেনগি রাজবংশ ছিল অঘুজ তুর্কি বংশোদ্ভূত একটি মুসলিম রাজবংশ।[১] সেলজুক সাম্রাজ্যের পক্ষ হয়ে তারা সিরিয়ার অংশবিশেষ ও উত্তর ইরাকের শাসন পরিচালনা করে।[২] ইতিহাস[সম্পাদনা] ইমাদউদ্দিন জেনগি এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। ১১২৭ সালে তিনি মসুলের সেলজুক আতাবেগ (গভর্নর) হন।[৩] দ্রুত তিনি উত্তর সিরিয়া ও ইরাকে প্রধান ক্ষমতাশালী তুর্কি ব্যক্তি হয়ে উঠেন। ১১২৮ সালে তিনি অরতুকি আমিরদের কাছ থেকে আলেপ্পো জয় করেন। ১১৪৪ সালে ক্রুসেডারদের কাছ থেকে এডেসা জয় করেন। এ ঘটনা তাকে মুসলিম বিশ্বে একজন বীরের মর্যাদা দেয়। দুই বছর পর ১১৪৬ সালে একজন দাস কর্তৃক তিনি নিহত হন।[৪] ইমাদউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার অঞ্চল বিভক্ত হয়ে যায়। মসুল ও ইরাকের অংশ তার বড় ছেলে প্রথম সাইফউদ্দিন গাজি এবং আলেপ্পো ও এডেসা তার দ্বিতীয় পুত্র নুরউদ্দিন জেনগির হাতে যায়। নুরউদ্দিন তার পিতার মত দক্ষ প্রমাণিত হন। ১১৪৯ সালে তিনি এন্টিওকের যুকরাজ রেইমন্ডকে ইনাবের যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং পরের বছর ফোরাত নদীর পশ্চিমে এডেসা কাউন্টির অবশিষ্টাংশ জয় করেন।[৫] ১১৫৪ সালে বুরি আমিরদের কাছ থেকে দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ নেন।
এরপর তিনি দামেস্ক থেকে শাসন করতে থাকেন। নুরউদ্দিনের সাফল্য বৃদ্ধি পেতে থাকেন। এন্টিওকের আরেকজন যুবরাজ রেইনল্ড অব শাটিলন গ্রেপ্তার হন এবং তার এলাকা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ১১৬০ এর দশকে নুরউদ্দিন জেরুজালেমের রাজা প্রথম আমালরিকের সাথে ফাতেমীয় খিলাফতের নিয়ন্ত্রণলাভের জন্য প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হন। শেষপর্যন্ত নুরউদ্দিনের কুর্দি সেনাপতি শিরকুহ ১১৬৯ সালে মিশর জয়ে সমর্থ হন। কিন্তু মিশরের গভর্নর হিসেবে শিরকুহর ভাতিজা ও উত্তরাধিকারী সালাউদ্দিন নুরউদ্দিনের নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন।[৬] সালাউদ্দিনকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য নুরউদ্দিন মিশর অভিযানের পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু ১১৭৪ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার পুত্র ও উত্তরাধিকারী আস সালিহ ইসমাইল আল মালিক এসময় শিশু ছিলেন এবং আলেপ্পো পালাতে বাধ্য হন। সেখানে তিনি ১১৮১ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। এসময় তাকে হত্যা করা হয়। মসুলের আতাবেগ তার স্থলাভিষিক্ত হন। সালাউদ্দিন দুই বছর পর আলেপ্পো জয় করেন। ফলে সিরিয়ায় জেনগি শাসনের অবসান হয়।
১৩ শতক পর্যন্ত জেনগি রাজবংশ উত্তর ইরাকে শাসন করতে সক্ষম হয়। ১২৫০ সালের আগ পর্যন্ত তাদের শাসন চূড়ান্তভাবে সমাপ্ত হয়নি।
জেনগি শাসকগণ[সম্পাদনা] মসুলের জেনগি আতাবেগ ও আমির[সম্পাদনা] • প্রথম ইমাদউদ্দিন জেনগি ১১২৭-১১৪৬
• প্রথম সাইফউদ্দিন গাজি ১১৪৬-১১৪৯
• কুতুবউদ্দিন মওদুদ ১১৪৯-১১৭০
• দ্বিতীয় সাইফউদ্দিন গাজি ১১৭০-১১৮০
• ইজাজউদ্দিন মাসুদ ১১৮০-১১৯৩
• প্রথম নুরউদ্দিন আরসালান শাহ ১১৯৩-১২১১
• দ্বিতীয় ইজাজউদ্দিন মাসুদ ১২১১-১২১৮
• দ্বিতীয় নুরউদ্দিন আরসালান শাহ ১২১৮-১২১৯
• নাসিরউদ্দিন মাহমুদ ১২১৯-১২৩৪
• বদরউদ্দিন লুলু ১২৩৪-১২৫৯
আলেপ্পোর জেনগি আমির[সম্পাদনা] • প্রথম ইমাদউদ্দিন জেনগি ১১২৮-১১৪৬
• নুরউদ্দিন মাহমুদ ১১৪৬-১১৭৪
• আস সালিহ ইসমাইল আল মালিক ১১৭৪-১১৮১
• দ্বিতীয় ইমাদউদ্দিন জেনগি ১১৮১-১১৮৩
দামেস্কের জেনগি আমির[সম্পাদনা] • নুরউদ্দিন মাহমুদ ১১৫৪-১১৭৪
• আস সালিহ ইসমাইল আল মালিক ১১৭৪
সিনজারের (উত্তর ইরাক) জেনগি আমির[সম্পাদনা] • দ্বিতীয় ইমাদউদ্দিন জেনগি ১১৭১-১৯৭
• কুতুবউদ্দিন মুহাম্মদ ১১৯৭-১২১৯
• ইমাদউদ্দিন শাহানশাহ ১২১৯-১২২০
• জালালউদ্দিন মাহমুদ ১২১৯-১২২০
• ফাতেহউদ্দিন উমর ১২১৯-১২২০
জাজিরার (উত্তর ইরাক) জেনগি আমির[সম্পাদনা] • মুইজউদ্দিন সানজার শাহ ১১৮০-১২০৮
• মুইজউদ্দিন মাহমুদ ১২০৮-১২৪১
• মাহমুদ আল মালিক আল জহির ১২৪১-১২৫০
আরও দেখুন[সম্পাদনা] • মসুলের আমিরদের তালিকা
• সুন্নি মুসলিম রাজবংশের তালিকা
তৃতীয় মুরাদ
তৃতীয় মুরাদ (উসমানীয় তুর্কি ভাষায়: مراد ثالث) (৪ই জুলাই ১৫৪৬ – ১৫ই/১৬ই জানুয়ারি ১৫৯৫) ছিলেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতান, যিনি ১৫৭৪ সাল থেকে ১৫৯৫ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উসমানীয় সাম্রাজ্য শাসন করেন। জানা যায় যে, ইংল্যান্ডের রাণী প্রথম এলিজাবেথের সঙ্গে সুলতান তৃতীয় মুরাদ মিত্রতা বজায় রেখেছিলেন।

দ্বিতীয় আবদুল মজিদ
২য় আবদুল মজিদ(তুর্কি ভাষায় Abdülmecit উসমানীয় তুর্কি ভাষায় عبد المجید الثانی Abdülmecid el-Sânî) ( ২৯ মে ১৮৬৮, ইস্তানবুল – ২৩ আগস্ট ১৯৪৪, প্যারিস ) ছিলেন ইসলামের শেষ খলিফা। তিনি উসমানীয় রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২২ সাল থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ছিলেন উসমানীয় রাজপরিবারের ৩৭তম প্রধান।
জীবনী[সম্পাদনা] সুলতান আবদুল মজিদ ১৮৬৮ সালের ২৯ মে ইস্তানবুলের বেশিকতাশের ডোলমাবাহচি প্রাসাদে (বেশিকতাশ প্রাসাদ) জন্মগ্রহণ করেন।[১] তৎকালীন সুলতান আবদুল আজিজ তার পিতা ও সুলতানের স্ত্রী হায়রানিডিল কাদিনেফেন্দি তার মা। আবদুল আজিজ নিজ গৃহে শিক্ষালাভ করেন।
১৯১৮ সালের ৪ জুলাই, তার চাচাত ভাই ষষ্ঠ মাহমুদ সুলতান হন এবং আবদুল আজিজকে তার উত্তরাধিকারী ঘোষণা করা হয়। ১৯২২ সালের ১ নভেম্বর মাহমুদকে সিংহাসনচ্যুত করা হলে সালতানাত বিলুপ্ত হয়। কিন্তু ১৯ নভেম্বর আঙ্কারায় তুরস্কের জাতীয় সংসদ তাকে খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করে। ২৪ নভেম্বর তিনি কন্সটান্টিনোপলে ক্ষমতায় আরোহণ করেন।[২][৩] ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ তিনি গদিচ্যুত হন এবং তাকে সপরিবারে তুরস্ক থকে বহিষ্কার করা হয়।
শিল্পী[সম্পাদনা] আবদুল মজিদকে উসমানীয় সেনাবাহিনীর জেনারেল পদবি দেয়া হয়। কিন্তু তিনি সামরিক ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। বরং উসমানীয় শিল্পী সমাজে তার ভূমিকা বেশী ছিল।
তাকে উসমানীয় চিত্রশিল্পের অতি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বলা হয় যে তার আকর্ষণীয় দাড়ি তার ব্যক্তিগত আড়ম্বরের উৎস ছিল।
তার আঁকা হারেমে আধুনিক সঙ্গীতের মজলিস ও গোটের ফস্ট পাঠরত রমণীর চিত্র ১৯১৮ সালে ভিয়েনায় উসমানীয় চিত্রশিল্পের প্রদর্শনীতে দেখানো হয়। ইস্তানবুল মডার্নে তার আঁকা নিজের পোর্ট্রেট সংরক্ষিত আছে।
প্রজাপতি সংগ্রহে তার অশেষ আগ্রহ ছিল। জীবনের শেষ ২০ বছর তিনি এই কাজে সময় ব্যয় করেন।
মৃত্যু[সম্পাদনা] ১৯৪৪ সালের ২৩ আগস্ট সুলতান ২য় আবদুল মজিদ প্যারিসের বুলেভার্ড সুচেটে নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। সৌদি আরবের মদিনায় তাকে দাফন করা হয়।
সুলতান আবদুল মজিদ ১৮৯৬ সালের ২২/২৩ ডিসেম্বর শেহসুভার বেশকাডিন এফেন্দিকে(২ মে,১৮৮১, কন্সটান্টিনোপল- ১৯৪৫, প্যারিস, ববিকগনি কবরস্থানে সমাহিত) বিয়ে করেন। কন্সটান্টিনোপলের অরটাকো প্রাসাদে তাদের বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। তাদের সন্তানরা হল :
• প্রিন্স শেহজাদ ওমর ফারুক এফেন্দি(২৭/২৯ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৮, অরটাকো প্রাসাদ, কন্সটান্টিনোপল-২৮ মার্চ ১৯৬৯/১৯৭১)। তার দুজন স্ত্রী ছিল। প্রথম স্ত্রী প্রিন্সেস রুকাইয়া সাবিহা সুলতান কাদিন এফেন্দি(কন্সটান্টিনোপল,১৮৯৪- কন্সটান্টিনোপল, ২৬ আগস্ট, ১৯৭১) তার দূর সম্পর্কের বোন ছিলেন। ১৯২০ সালের ২৯ এপ্রিল ইলডিয প্রাসাদে তাদের বিয়ে হয়। তাদের তিনজন কন্যাসন্তান ছিল। ১৯৪৮ সালের ৩১ জুলাই তার আরেক আত্মীয়া প্রিন্সেস মিহিরবান মিহিরিশাহ সুলতান কাদিন এফেন্দিকে (কন্সটান্টিনোপল, বেশিকতাশ, বেশিকতাশ প্রাসাদ, ১ জুন, ১৯১৬- কন্সটান্টিনোপল, ২৫ জানুয়ারি, ১৯৮৭) বিয়ে করেন। এই দম্পতির কোনো সন্তান ছিল না। তার ও তার প্রথম স্ত্রীর সন্তানরা হলেন :
o প্রিন্সেস ফাতমা নেসলিশাহ ওসমানুগ্লো সুলতান(কন্সটান্টিনোপল, নিশানতাশি, নিশানতাশি প্রাসাদ, ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২১- )। তার স্বামী দামাত প্রিন্স মুহাম্মদ আবদুল মনিম বেএফেন্দির (আলেক্সান্দ্রিয়া, মোনতাযা প্রাসাদ, ২০ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯- কন্সটান্টিনোপল, ১/২ ডিসেম্বর ১৯৭৯, কায়রোতে সমাহিত) সাথে ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪০ সালে কায়রোর হেলিওপলিস প্রাসাদে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পূর্বে তারা আত্মীয় সম্পর্কের ছিলেন। এই দম্পতির সন্তান ছিল।
o প্রিন্সেস জেহরা হানযাদ সুলতান( কন্সটান্টিনোপল, ডোলমাবাহচি প্রাসাদ, ১২ সেপ্টেম্বর, ১৯২৩- প্যারিস, ১৯ মার্চ, ১৯৯৮, ২৬ মার্চ তাকে সমাহিত করা হয়)। তার স্বামী দামাত প্রিন্স মুহাম্মদ আলি ইবরাহিম বেএফেন্দি( কায়রো, ২৯ এপ্রিল, ১৯০০-প্যারিস, ২ জুলাই, ১৯৭৭)। মিশরের কায়রোতে তাদের বিয়ে হয়। তাদের সন্তানরা হলেন :
 নাবিলা সাবিহা ফাযিলা ইবরাহিম হানিমসুলতান( ৮ আগস্ট, ১৯৪১ )। ইরাকের রাজা ২য় ফয়সাল নিহত হওয়ার সময় তিনি ফয়সালের বাগদত্তা ছিলেন। কয়েক বছর পর তিনি ডা. খেরি অগলুকে বিয়ে করেন। আলি ও সালিম নামে তাদের দুজন পুত্র ছিল।
 নাবিল সুলতানযাদ আহমাদ রিফাত ইবরাহিম বেএফেন্দি( ৩১ আগস্ট, ১৯৪২ )। ১৯৬৯ সালের ২৬ জুন এমেনি উশাকিদিলের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের কোনো সন্তান ছিল না।
o প্রিন্সেস নেকলা হেবেতুল্লাহ সুলতান(নিস,১৫ মে, ১৯২৬ – )। নাবিল আমর ইবরাহিমের (কায়রো, ১৮ এপ্রিল, ১৯০৩-১৯৭৭) সাথে ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের এক পুত্র ছিল।
 প্রিন্স নাবিল সুলতানযাদ ওসমান রিফাত ইবরাহিম বেএফেন্দি(২০ মে ১৯৫১)। তিনি চিরকুমার ছিলেন।
আবদুল মজিদ ১৯০২ সালের ১৮ জুন অরটাকো প্রাসাদে তার ২য় স্ত্রী হাইরুনিসা কাদিন এফেন্দির(বানদিরমা, ২ মার্চ ১৯৭৬-নিস, ৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৬) সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের কোনো সন্তান ছিল না।
৩য় বিয়ে[সম্পাদনা] তার ৩য় স্ত্রী আতিয়া মিহিসটি কাদিন এফেন্দি(আদাপজান, ২৭ জানুয়ারি, ১৮৯২-লন্ডন, মিডলসেক্স, ১৯৬৪)। কন্সটান্টিনোপলের উসকুদারে চেমলিকা প্রাসাদে ১৯১২ সালের ১৬ এপ্রিল তাদের বিয়ে হয়। তার সন্তান :
• প্রিন্সেস হাদিচ হায়রিয়ে আয়েশা দুররুহসেহভার সুলতান(কন্সটান্টিনোপল, উসকুদার, চেমলিকা প্রাসাদ, ২৬ জানুয়ারি ১৯১৪-৭ ফেব্রুয়ারি, ২০০৬)। তার স্বামী দামাত ওয়ালাশান নবাব স্যার মীর হিমায়েত আলি খান আযাম জাহ বাহাদুর(২২ ফেব্রুয়ারিতে ১৯০৭-৯ অক্টোবর ১৯৭০) ছিলেন হায়দ্রাবাদের শেষ নিজাম উসমান আলি খানের পুত্র। ফ্রান্সের নিসে ১৯৩১ সালের ১২ নভেম্বর তাদের বিয়ে হয়।
৪র্থ বিয়ে[সম্পাদনা] চতুর্থ স্ত্রী বিহরুয কাদিন এফেন্দিকে(ইযমিত, ২৪ মে ১৯০৩-ইস্তানবুল, ১৯৫৫) ১৯২১ সালের ২১ মার্চ চেমলিকা প্রাসাদে বিয়ে করেন। এই দম্পতির কোনো সন্তান ছিল না।
দ্বিতীয় আবদুল মজিদ
House of Osman
জন্ম: 29 May 1868 মৃত্যু: 23 August 1944
সুন্নি ইসলাম শিরোনাম

পূর্বসূরী
Mehmed VI
Caliph of Islam
November 19, 1922 – March 3, 1924
Vacant
Caliphate abolished
(Briefly claimed by Hussein bin Ali, Sharif of Mecca)

দ্বিতীয় মাহমুদ
দ্বিতীয় মাহমুদ (Ottoman Turkish: محمود ثانى Mahmud-u sānī, محمود عدلى Mahmud-u Âdlî) (তুর্কী: II. Mahmud ) (২০ জুলাই ১৭৮৯– ১ জুলাই ১৮৩৯) ছিলেন ৩০তম উসমানীয় সুলতান। তিনি ১৮০৮ থেকে ১৮৩৯ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। কনস্টান্টিনোপলের তোপকাপি প্রাসাদে তার জন্ম হয়।[১] তার পিতা সুলতান প্রথম আবদুল হামিদের মৃত্যুর পর তিনি জন্মলাভ করেন। তার শাসনামল প্রশাসনিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য প্রসিদ্ধ। এসব তানজিমাতের সময় চরমে পৌছায় এবং তার পুত্র প্রথম আবদুল মজিদ ও প্রথম আবদুল আজিজ তা চালিয়ে যান। ১৮২৬ আলে তিনি ১,৩৫,০০০ জনের জানিসারি দলকে বিলুপ্ত করেন এবং এভাবে তিনি সামরিক সংস্কারের বাধা দূর করার জন্য এর নেতাদের মৃত্যুদন্ড দেন।
দ্বিতীয় মাহমুদ
উসমানীয় রাজবংশ
জন্ম: ২০ জুলাই ১৭৮৫
Regnal titles
পূর্বসূরী
চতুর্থ মোস্তফা
উসমানীয় সুলতান
১৫ নভেম্বর ১৮০৮ – ১ জুলাই ১৮৩৯
উত্তরসূরী
প্রথম আবদুল মজিদ

সুন্নি ইসলাম শিরোনাম

পূর্বসূরী
চতুর্থ মোস্তফা
ইসলামের খলিফা
১৫ নভেম্বর ১৮০৮ – ১ জুলাই ১৮৩৯
উত্তরসূরী
প্রথম আবদুল মজিদ

দ্বিতীয় সেলিম
দ্বিতীয় সেলিম (উসমানীয় তুর্কি ভাষায়: سليم ثانى) (২৮শে মে ১৫২৪ – ১২ই/১৫ই ডিসেম্বর ১৫৭৪)ছিলেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতান, যিনি ১৫৬৬ সাল থেকে ১৫৭৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উসমানীয় সাম্রাজ্য শাসন করেন।

পঞ্চম মুহাম্মদ (উসমানীয় সুলতান)
পঞ্চম মুহাম্মদ (উসমানীয় তুর্কি ভাষা : محمد خامس Meḥmed-i ẖâmis, তুর্কি Mehmed V Reşad বা Reşat Mehmet) (২/৩ নভেম্বর ১৮৪৪ – ৩/৪ জুলাই ১৯১৮) ছিলেন ৩৫তম উসমানীয় সুলতান তিনি সুলতান প্রথম আবদুল মজিদের পুত্র ছিলেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] তার পরবর্তীতে তার সৎ ভাই ষষ্ঠ মেহমেদ তার উত্তরাধিকারী হন।
ইনি ইস্তানবুলের তোপকাপি প্রাসাদে জন্মগ্রহণ করেন।[২] সিংহাসনের অন্যান্য উত্তরাধীকারীদের মত তিনিও ৩০ বছর হারেমে কাটান। এর মধ্যে নয় বছর তিনি প্রাচীন ফার্সি কবিতা অধ্যয়ন করেন ও কবি হিসেবে নন্দিত হন। নবম জন্মদিনে তোপকাপি প্রাসাদে তাকে ইসলামী প্রথা অনুযায়ী খৎনা করানো হয়।
শাসনকাল[সম্পাদনা]

দ্বিতীয় কাইজার উইলহেম, পঞ্চম মুহাম্মদ, ফ্রাঞ্জ জোসেফ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অক্ষশক্তির তিন সম্রাট।
১৯০৯ সালের ২৭ এপ্রিল তার শাসনকাল শুরু হয়। তিনি প্রতীকীভাবে ক্ষমতায় ছিলেন। তার প্রকৃত কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না। ১৯০৮ সালের তরুণ তুর্কি বিপ্লবের সময় থেকে উসমানীয় রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলো তিন পাশা বলে পরিচিত তিনজন ব্যক্তিত্ব দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করাকে তার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কাজ হিসেবে ধরা হয়। অক্ষশক্তির পক্ষে যুদ্ধে যোগদানের সরকারি সিদ্ধান্তের পর ১৯১৪ সালের ১১ নভেম্বর তিনি এই ঘোষণা দেন। তিনি আনোয়ার পাশার জার্মানপন্থি নীতির প্রতি বিরুপ ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়।[৩] এই ঘোষণা ছিল ইতিহাসের কোনো খলিফা কর্তৃক সর্বশেষ জিহাদের ডাক। এরপর ১৯২৪ সালে খিলাফত বিলুপ্ত হয়। উসমানীয় অঞ্চলে অসংখ্য মুসলিম বসবাস করলেও এই ঘোষণা যুদ্ধে তেমন উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেনি। ১৯১৬ সালে আরব বিদ্রোহের মাধ্যমে আরবরা ব্রিটিশদের পক্ষে যোগ দেয়।
১৫ অক্টোবর ১৯১৩ তে পঞ্চম মুহাম্মদ তার মিত্র দ্বিতীয় কাইজার উইলহেমকে কনস্টান্টিনোপলে আপ্যায়িত করেন। ১৯১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি তিনি প্রুশিয়া রাজতন্ত্রের ও একই বছরের ১ ফেব্রুয়ারি জার্মান সাম্রাজ্যের জেনারেল ফিল্ড মার্শাল হন।
মৃত্যু[সম্পাদনা] যুদ্ধ শেষ হওয়ার চার মাস আগে পঞ্চম মুহাম্মদ ১৯১৮ সালের ৩ জুলাই ইলদিজ প্রাসাদে মৃত্যুবরণ করেন। এ সময় তার বয়স ছিল ৭৩ বছর। তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় ডোলমাবাহচি প্রাসাদ ও ইলদিজ প্রাসাদে অতিবাহিত করেন। ইস্তানবুলের ইয়াপ অংশে তাকে দাফন করা হয়।
সম্মাননা[সম্পাদনা] পঞ্চম মুহাম্মদ নিম্নোক্ত উসমানীয় পদবীর অধিকারী ছিলেন :
• অর্ডার অব ক্রিসেন্ট
• অর্ডার অব নিশান ইফতিখার
• অর্ডার অব মেজিদি
• অর্ডার অব উসমানীয়া
• নাইট অব মিলিটারি অর্ডার অব ম্যাক্স জোসেফ
পঞ্চম মুহাম্মদ (উসমানীয় সুলতান)
House of Osman
জন্ম: November 2, 1844 মৃত্যু: July 3, 1918
Regnal titles
পূর্বসূরী
দ্বিতীয় আবদুল হামিদ
উসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতান
Apr 27, 1909 – Jul 3, 1918
উত্তরসূরী
ষষ্ঠ মেহমেদ

সুন্নি ইসলাম শিরোনাম

পূর্বসূরী
দ্বিতীয় আবদুল হামিদ
ইসলামের খলিফা
Apr 27, 1909 – Jul 3, 1918
উত্তরসূরী
ষষ্ঠ মেহমেদ

প্রথম উসমান
প্রথম উসমান (১২৫৮ – ১৩২৪) (উসমানীয় তুর্কি ভাষায়: عثمان اوّل), ছিলেন তুরস্কের উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। এই সাম্রাজ্য, যেটি তাঁর নাম অনুসারে রাখা হয়, তা ছয় শতাব্দী ধরে পৃথিবীর একটি সাম্রাজ্য হিসেবে বিদ্যমান থাকে।
১২৯৯ সালে উসমান তুরস্কের সেলজুক সাম্রাজ্য থেকে তুরস্কের আনাতোলিয়ায় তাঁর নিজের একটি ছোট রাজ্যের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। প্রাচ্যে মঙ্গলদের অত্যাচারে অনেক মোসলমানরা তুরস্কে উসমানের আনাতোলিয়া রাজ্যতে আসা শুরু করে, যার ফলে উসমান এসব জনগণদের মাধ্যমে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠে এবং তাঁর নতুন রাজ্যের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সফল হয়। সুলতান উসমানের মৃত্যুর ১২৯ বছর পর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী,কন্সটান্টিনোপল উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধিনে চলে আসে এবং এভাবে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন ঘটে, যার ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্য পৃথিবীর একটি অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে স্থান লাভ করে।
প্রথম মাহমুদ
প্রথম মাহমুদ (উসমানীয় তুর্কি ভাষায়: محمود اول) কুঁজো হিসাবেও পরিচিত (কাম্বুর)(২০শে সেপ্টেম্বর, ১৭৩০ – ১৩ই ডিসেম্বর, ১৭৫৪) ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতান ১৭৩০ থেকে ১৭৫৪ পর্যন্ত। তিনি এডার্ন রাজভবনে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মোস্তফা II (১৬৯৫–১৭০৩) এবং তার মাতার নাম ভালিদে সুলতান সালিহা সাবকাতি। প্রথম মাহমুদ ছিল উসমান III (১৭৫৪–৫৭) এর বড় ভাই।

প্রথম সেলিম
প্রথম সেলিম (উসমানীয় তুর্কি ভাষায়: سليم اوّل) ছিলেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের নবম সুলতান, যিনি ১৫১২ সাল থেকে ১৫২০ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উসমানীয় সাম্রাজ্য শাসন করেন। তিনি তাঁর পিতা, সুলতান দ্বিতীয় বায়েজীদকে ১৫১২ সালে সিংহাসনচ্যুত করতে বাধ্য করেন এবং এভাবে তিনি উসমানীয় সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আসীন লাভ করেন। তিনি হচ্ছেন প্রথম উসমানীয় সুলতান যিনি ‘ইসলামের খলিফা’ হিসেবে উপাধী গ্রহণ করেন।
সুলতান সেলিম ১৫১৪ সালে পারস্যের সাফাভিদ সুলতান, শাহ ইসমাঈলকে পরাজিত করার পর পারস্যের রাজধানী, তাব্রিজ সহ মধ্য প্রাচ্যে পারস্য সাম্রাজ্যের অনেক অঞ্চল দখল করে নেয়। তারপর তিনি মিশরের মামলুক সুলতান, তৃতীয় আল মুতাওয়াক্কিলকে ১৫১৭ সালে পরাজিত করেন যার ফলে পুরো মধ্য প্রাচ্য উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধিনে চলে আসে। মিশরে অভিযান শেষ হলে সুলতান সেলিম হাঙ্গেরি হামলা করার জন্য তৈরী হন, কিন্তু তিনি অসুস্থে হয়ে পড়লে সে অভিযান বাতিল করা হয়। জানা যায় যে মিশরে তিনি দীর্ঘকাল তাঁর ঘোড়ার পিঠে চড়ে অভিযান চালান বলে তিনি সারপেন্স নামের এক অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত হন, যার ফলে তিনি ১৫২০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সময় উসমানীয় সাম্রাজ্য প্রায় এক বিলিয়ন একর জমির উপর তার আধিপত্য বজায় রাখে। সুলতান সেলিমের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র, সুলাইমান ইবনে সেলিম উসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতান হন।
প্রথম সুলাইমান
প্রথম সুলাইমান (উসমানীয় তুর্কি ভাষায়: سليمان اوّل) ছিলেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের দশম এবং সবচেয়ে দীর্ঘকালব্যাপী শাসনরত সুলতান, যিনি ১৫২০ সাল থেকে ১৫৬৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উসমানীয় সাম্রাজ্য শাসন করেন। পাশ্চাত্ত্যে তিনি মহৎ সুলাইমান হিসেবে পরিচিত। তিনি পুর্নবারের জন্য সম্পূর্ণভাবে উসমানীয় সাম্রাজ্যের নীতিমালাগুলো তৈরি করেছিলেন বলে প্রাচ্যে তাঁকে বলা হয় বিধানকর্তা সুলাইমান (আরবি: سليمان القانوني‎)। প্রথম সুলাইমান ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপে একজন বিশিষ্ঠ রাজা হিসেবে স্থান লাভ করেন, যার শাসনামলে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির বিস্তার ঘটে। সুলতান সুলাইমানের সেনাবাহিনী পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য এবং হাঙ্গেরির অনেক শহরের পতন ঘটায়। কিন্তু ১৫২৯ সালে পবিত্র রোমান সম্রাট, পঞ্চম চার্লসের সেনাবাহিনী সুলতান সুলাইমানের সেনাবাহিনীকে ভিয়েনা শহর দখল করতে ব্যর্থ করে। প্রথম সুলাইমান পারস্যের সাফাভিদ সুলতান, প্রথম তাহমাসবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং মধ্য প্রাচ্যের বেশির ভাগ অঞ্চল দখল করে নেন। তিনি উত্তর আফ্রিকায় আলজেরিয়া সহ বড় বড় অঞ্চলগুলো পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের হাত থেকে দখল করে নেয়। তাঁর শাসনামলে উসমানীয় নৌবাহিনী ভূমধ্যসাগর থেকে লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর পর্যন্ত তাদের আধিপত্য বজায় রাখে।
উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিস্তারকালে, সুলতান সুলাইমান ব্যাক্তিগতভাবে তাঁর সাম্রাজ্যের সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, খাজনা ব্যবস্থা ও অপরাধের শাস্তি ব্যবস্থার বিষয়গুলোতে আইনপ্রণয়নসংক্রান্ত পরিবর্তন আনার আদেশ দেন। তিনি যেসব কানুনগুলো স্থাপন করে গেছেন, সেসব কানুনগুলো উসমানীয় সাম্রাজ্যে অনেক শতাব্দী ধরে প্রচলিত ছিল। সুলতান সুলাইমান যে শুধু একজন মহান রাজা ছিলেন তা নয়, তিনি একজন মহান কবিও ছিলেন। তাঁর শাসনামলে উসমানীয় সংস্কৃতির অনেক উন্নতি হয়। সুলতান সুলাইমান উসমানীয় তুর্কি ভাষা সহ আরো পাঁচটি ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে পারতেন: আরবী ভাষা, সার্বীয় ভাষা, ফার্সি ভাষা, উর্দু ভাষা এবং চাগাতাই ভাষা (একটি বিলুপ্ত তুর্কি ভাষা)।
জানা যায় যে, সুলতান সুলাইমান উসমানীয় সাম্রাজ্যের দু’শ বছরের সংসকৃতির নিয়ম ভঙ্গ করে তাঁর হারেমের একজন রমণী, রোক্সেলানার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। রোক্সেলানার নাম পরবর্তীকালে হুরেম সুলতান রাখা হয়। তিনি সুলতান সুলাইমানের পুত্র, সেলিম ইবনে সুলাইমানের গর্ভধারণী হন। সুলতান সুলাইমানের মৃত্যুর পর, সেলিম ইবনে সুলাইমান, ‘দ্বিতীয় সেলিম’ হিসেবে উসমানীয় সাম্রাজ্যের শাহেনশাহ হন।

ফাতেমীয় খিলাফত
রাজধানী মাহদিয়া
(৯০৯–৯৪৮)
আল-মানসুরিয়া
(৯৪৮–৯৭৩)
কায়রো
(৯৭৩–১১৭১)
ভাষাসমূহ আরবি (দাপ্তরিক)
বার্বার, কপ্টিক

ধর্ম শিয়া ইসলাম

সরকার ইসলামী খিলাফত
খলিফা

– ৯০৯–৯৩৪ (প্রথম) আল-মাহদি বিল্লাহ

– ১১৬০–১১৭১ (শেষ) আল-আদিদ

ঐতিহাসিক যুগ প্রাক মধ্যযুগ
– সংস্থাপিত জানুয়ারি ৫ ৯০৯
– কায়রোর পত্তন আগস্ট ৮, ৯৬৯
– ভাঙ্গিয়া দেত্তয়া হয়েছে ১১৭১
আয়তন

– ৯৬৯[২] বর্গ কি.মি. ( বর্গ মাইল)
জনসংখ্যা

– আনুমানিক
মুদ্রা দিনার

প্রধান খিলাফত[দেখাও] •

প্রতিদ্বন্দ্বী খিলাফত[দেখাও] •


ফাতেমীয় খিলাফত (আরবি: الفاطميون, al-Fāṭimiyyūn) ইসলামী খিলাফতগুলোর মধ্যে চতুর্থতম। এই খিলাফত ইসমাইলি শিয়া মতবাদকে ধারণ করত। পূর্বে লোহিত সাগর থেকে শুরু করে পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকা এই খিলাফতের অধীনস্ত ছিল। এটি তিউনিসিয়াকে ভিত্তি করে গড়ে উঠে। এই রাজবংশ আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল শাসন করত এবং মিশরকে খিলাফতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। সর্বোচ্চ সীমায় পৌছার পর ফাতেমীয় খিলাফতের অধীনে মাগরেব, সুদান, সিসিলি, লেভান্ট ও হেজাজ শাসিত হয়।
ফাতেমীয়দের দাবি অনুযায়ী তারা মুহাম্মদ (সা) এর কন্যা ফাতিমার বংশধর ছিল। তারা উত্তর আফ্রিকা জয় করে। কুতামা নামক বার্বা‌র গোষ্ঠীর মধ্যে ফাতেমীয় রাষ্ট্র আকার লাভ করে। ৯০৯ সালে ফাতেমীয়রা রাজধানী হিসেবে তিউনিসিয়ার মাহদিয়া নামক শহর গড়ে তোলে। ৯৪৮ সালে আল মনসুরিয়ায় রাজধানী স্থানন্তরিত করা হয়। ৯৬৯ সালে তারা মিশর জয় করে এবং ফাতেমীয় খিলাফতের রাজধানী হিসেবে কায়রো শহর নির্মাণ করা হয়। মিশর পুরো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র হয়ে উঠে। রাজবংশ ও শাসকশ্রেণী ছিল শিয়া মতবাদের ইসমাইলি শাখা উদ্ভূত।
প্রাথমিক বিজয়ের পর খিলাফতে অইসমাইলি এবং ইহুদি, মাল্টিজ, খ্রিষ্টান ও মিশরীয় কপ্টিক খ্রিষ্টানদের প্রতি কিছু মাত্রায় ধর্মীয় সহনশীলতা দেখা যেত।[৩] প্রাথমিক প্রতিষ্ঠায় বার্বা‌ররা অবদান রাখে এবং একে সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে সাহায্য করে।
পরবর্তীতে একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে ফাতেমীয় খিলাফতের পতন ঘটতে থাকে। ১১৭১ সালে সুলতান সালাহউদ্দিন ফাতেমীয় খিলাফতের সমাপ্তি ঘটান। তিনি আইয়ুবীয় রাজবংশের সূচনা করেন এবং একে বাগদাদের আব্বাসীয় খিলাফতের সাথে যুক্ত করেন।[৪]

মক্কার শরিফ
মক্কার শরিফ (আরবি: شريف مكة‎, Sharīf Makkah) বা হেজাজের শরিফ (আরবি: شريف الحجاز‎, Sharīf al-Ḥiǧāz) উপাধিটি মক্কা শরিফাতের নেতাদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হত। তারা প্রথা অনুযায়ী মক্কা ও মদিনার তত্ত্বাবধান করতেন। শরিফ অর্থ সম্ভ্রান্ত। মুহাম্মদ (সা) এর নাতি হাসান ইবনে আলির বংশধরদের ক্ষেত্রে তা ব্যবহৃত হয়।
শহর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা ও হজ্জযাত্রীদের সুরক্ষা শরিফের দায়িত্ব ছিল। একে শেরিফ হিসেবেও উচ্চারণ করা হয়। টি ই লরেন্স তার সেভেন পিলারস অব উইজডোম বইয়ে শেরিফ উল্লেখ করেছেন। কিছু দেশে আইন ও প্রশাসনিক পদ হিসেবে যে শেরিফ দেখা যায় তার সাথে এই পদের সম্পর্ক নেই।
আব্বাসীয় যুগের শেষের দিকে মক্কার শরিফের পদটি প্রথম দেখা যায়। ১২০১ সাল থেকে শরিফাত হাশিমি গোত্রের ব্যক্তিরা এই পদে আসীন হতেন। তবে এটি বৃহত্তর বনু হাশিম গোত্র নয়। হাশিমি পরিবারের সদস্যরা ২০ শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন মুসলিম শক্তি যেমন আইয়ুবীয়, মামলুকদের প্রতিনিধি হিসেবে শরিফ পদ লাভ করতেন। ১৫১৭ সালে শরিফ উসমানীয় খিলাফতের অধীনতা মেনে নেন। তবে এসময় স্থানীয় স্বায়ত্ত্বশাসন বজায় ছিল। উসমানীয় যুগে শরিফাত উত্তরে মদিনা ও দক্ষিণে আসিরকে এর নিয়ন্ত্রণাধীন করে নেয় এবং নিয়মিতভাবে নজদে আক্রমণ চলতে থাকে।
হুসাইন বিন আলির সময় শরিফাত সমাপ্ত হয়। ১৯১৬ সালের আরব বিদ্রোহের সময় তিনি উসমানীয় শাসনের বিদ্রোহ করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পরাজয় ও সাম্রাজ্যের বিলুপ্তির পর তিনি নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। ব্রিটিশরা তার দুই পুত্র ফয়সাল ও আবদুল্লাহকে যথাক্রমে ইরাক ও ট্রান্সজর্ডান আমিরাতের ক্ষমতায় বসায়। ১৯২৪ সালে হুসাইন নজদের আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের ক্রমবর্ধমান হামলার সম্মুখীন হন। তিনি তার জাগতিক উপাধিগুলো তার পুত্র আলি বিন হুসাইনকে সমর্পণ করেন। আলি বিন হুসাইন ছিলেন শেষ শরিফ। ১৯২৫ সালের শেষদিকে ইবনে সৌদ হেজাজ জয় করে নেন এবং হাশিমিদের বহিষ্কার করা হয়। এরপর থেকে মক্কা ও মদিনা আল সৌদ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে।[১] পরিচ্ছেদসমূহ
[আড়ালে রাখো] • ১ মক্কার শরিফদের তালিকা (৯৬৭–১৯২৫)
o ১.১ ফাতেমীয় খিলাফতের সময় (৯৬৭–১১০১)
o ১.২ আইয়ুবীয় সাম্রাজ্যের সময় (১২০১-১২৫৪)
o ১.৩ মামলুক সালতানাতের সময় (১২৫৪-১৫১৭)
o ১.৪ উসমানীয় খিলাফতের সময় (১৫১৭-১৯১৭)
o ১.৫ হেজাজ রাজতন্ত্রের সময় (১৯১৬-১৯২৫)
• ২ আরও দেখুন
• ৩ তথ্যসূত্র
মক্কার শরিফদের তালিকা (৯৬৭–১৯২৫)[সম্পাদনা] ফাতেমীয় খিলাফতের সময় (৯৬৭–১১০১)[সম্পাদনা]

ফাতেমীয় হেজাজের পতাকা
• তাইমুন (৯৬৭–৯৮০)
• শরিফ ঈসা (৯৮০–৯৯৪)
• শরিফ আবুল ফুতুহ আল হাসান ইবনে জাফর (৯৯৪–১০৩৯), ১০১২ সালে সংক্ষিপ্তকাল খলিফা বিরোধী
• শরিফ শুকরুলদিন (১০৩৯–১০৬১)
• আবুল হাশিম ইবনে মুহাম্মদ (১০৬১-১০৯৪)
• ইবনে আবুল হাশিম আল সালাব (১০৯৪–১১০১)
আইয়ুবীয় সাম্রাজ্যের সময় (১২০১-১২৫৪)[সম্পাদনা]

আইয়ুবীয় হেজাজের পতাকা
• কাতাদা ইবনে ইদরিস (১২০১–১২২০)
• হাসান ইবনে কাতাদা আল হাসানি আল আলাউয়ি (১২২০–১২৪১)
• আল হাসান আবুল সাদ (১২৪১–১২৫৪)
মামলুক সালতানাতের সময় (১২৫৪-১৫১৭)[সম্পাদনা]

মামলুক হেজাজের পতাকা
• মুহাম্মদ আবুল নুবাজ (১২৫৪–১৩০১): প্রথম মামলুক শরিফ
• রুমাইসা আবুল রাদা (১৩০১–১৩৪৬)
• আলজান আবুল সারজা (১৩৪৬–১৩৭৫)
• দ্বিতীয় আল হাসান (১৩৯৪–১৪২৫)
• প্রথম বরকত (১৪২৫–১৪৫৫)
• মালিকুল আদিল ইবনে মুহাম্মদ ইবনে বরকত (১৪৫৫–১৪৯৭)
• দ্বিতীয় বরকত বিন মুহাম্মদ (বরকত এফেন্দি) (১৪৯৭–১৫২৫)
উসমানীয় খিলাফতের সময় (১৫১৭-১৯১৭)[সম্পাদনা]

উসমানীয় হেজাজের পতাকা

মক্কার শরিফ মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ (১৮২৭-১৮৫১)। ১৮৪৮ সালে উইলিয়াম ফ্রান্সিস লিনচের বইয়ে চিত্রিত।
• বরকত এফেন্দি (১৪৯৭–১৫২৫)
• মুহাম্মদ আবুল নুবাজ বিন বরকত (১৫২৫-১৫৮৩)
• আল হাসান বিন মুহাম্মদ আবুল নুবাজ (১৫৮৩-১৬০১)
• ইদরিস বিন আল হাসান (১৬০১-১৬১০)
• মুহসিন বিন হুসাইন (১৬১০-১৬২৮)
• আহমেদ বিন তালিব আল হাসান (১৬২৮-১৬২৯)
• মাসুদ বিন ইদরিস (মাসুদ এফেন্দি) (১৬২৯-১৬৩০)
• আবদুল্লাহ বিন হাসান (১৬৩০-১৬৩১)
• জাইদ বিন মুহসিন (১৬৩১-১৬৬৬)
• সাদ বিন জাইদ (১৬৬৬-১৬৬৭)
• মুহসিন বিন আহমেদ (১৬৬৭-১৬৬৮)
• সাদ বিন জাইদ (১৬৬৮-১৬৭০)
• হামুদ বিন আবদুল্লাহ বিন আল হাসান (১৬৭০)
• সাদ বিন জাইদ (১৬৭০–১৬৭১)
• বরকত বিন মুহাম্মদ (১৬৭২-১৬৮২)
• সাইদ বিন বরকত (১৬৮২-১৬৮৩)
• ইবরাহিম বিন মুহাম্মদ (১৬৮৩-১৬৮৪)
• আহমেদ বিন জাইদ (১৬৮৪-১৬৮৮)
• আহমেদ বিন গালিব (১৬৮৮-১৬৮৯)
• মুহসিন বিন আহমেদ (১৬৮৯-১৬৯১)
• সাইদ বিন সাদ (১৬৯১-১৬৯৩)
• সাদ বিন জাইদ (১৬৯৩-১৬৯৪)
• আবদুল্লাহ বিন হাশিম (১৬৯৪)
• সাদ বিন জাইদ (১৬৯৪-১৭০২)
• সাইদ বিন সাদ (১৭০২-১৭০৪)
• আবদুল মুহসিন বিন আহমেদ (১৭০৪)
• আবদুল করিম বিন মুহাম্মদ (১৭০৪-১৭০৫)
• সাইদ বিন সাদ (১৭০৫)
• আবদুল করিম বিন মুহাম্মদ (১৭০৫-১৭১১)
• সাইদ বিন সাদ (১৭১১-১৭১৭)
• আবদুল্লাহ বিন সাইদ (১৭১৭-১৭১৮)
• আলি বিন সাইদ (১৭১৮)
• ইয়াহিয়া বিন বরকত (১৭১৮-১৭১৯)
• মুবারক বিন আহমেদ (১৭১৯-১৭২২)
• বরকত বিন ইয়াহিয়া (১৭২২-১৭২৩)
• মুবারক বিন আহমেদ (১৭২৩-১৭২৪)
• আবদুল্লাহ বিন সাইদ (১৭২৪-১৭৩১)
• মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ (১৭৩১-১৭৩২)
• মাসুদ বিন সাইদ (১৭৩২-১৭৩৩)
• মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ (১৭৩৩-১৭৩৪)
• মাসুদ বিন সাইদ (১৭৩৪-১৭৫৯)
• জাফর বিন সাইদ (১৭৫৯-১৭৬০)
• মুসাইদ বিন সাইদ (১৭৬০-১৭৭০)
• আহমেদ বিন সাইদ (১৭৭০)
• আবদুল্লাহ বিন হুসাইন (১৭৭০-১৭৭৩)
• সুরাওর বিন মুসাইদ (১৭৭৩-১৭৮৮)
• আবদুল মুইন বিন মুসাইদ (১৭৮৮
• গালিব এফেন্দি বিন মুসাইদ (১৭৮৮–১৮০৩)
• ইয়াহিয়া বিন সুরাওর (১৮০৩-১৮১৩)
• গালিব এফেন্দি বিন মুসাইদ (১৮১৩-১৮২৭)
• আবদুল মুতালিব বিন গালিব (১৮২৭)
• মুহাম্মদ বিন আবদুল মুইন (১৮২৭-১৮৫১)
• আবদুল মুতালিব বিন গালিব (১৮৫১-১৮৫৬)
• মুহাম্মদ বিন আবদুল মুইন (১৮৫৬-১৮৫৮)
• আবদুল্লাহ কামিল পাশা (১৮৫৮-১৮৭৭)
• হুসাইন বিন মুহাম্মদ (১৮৭৭-১৮৮০)
• আবদুল মুতালিব বিন গালিব (১৮৮০-১৮৮২)
• আওন আল রফিক পাশা (১৮৮২-১৯০৫)
• আলি আবদুল্লাহ পাশা (১৯০৫-১৯০৮)
• হুসাইন বিন আলি (১৯০৮-১৯১৬) (পরবর্তীতে রাজা)
• আলি হায়দার পাশা (১৯১৬-১৯১৭)
হেজাজ রাজতন্ত্রের সময় (১৯১৬-১৯২৫)[সম্পাদনা]

হেজাজ রাজতন্ত্রের পতাকা
• হুসাইন বিন আলি (১৯১৬–১৯২৪) (পূর্বে হুসাইন পাশা)
• আলি বিন হুসাইন (১৯২৪–১৯২৫)
আরও দেখুন[সম্পাদনা] • খাদেমুল হারামাইন শরিফাইন
• মক্কা শরিফাত
• হেজাজ ভিলায়েত
• হেজাজ রাজতন্ত্র
• শরিফিয়ান খিলাফত
• মক্কার যুদ্ধ (১৯১৬)
• মক্কার যুদ্ধ (১৯২৪)
• মদিনা অবরোধ
• খলিফাদের তালিকা
• সুন্নি মুসলিম রাজবংশের তালিকা

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক
রাষ্ট্রপতি আতাতুর্ক
১ম তুর্কি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি

কার্যালয়ে
২৯ অক্টোবর ১৯২৩ – ১০ নভেম্বর ১৯৩৮
(১৫ বছর, ১২ দিন)

প্রধানমন্ত্রী আলি ফেতহি ওকয়ের
ইসমত ইনানো
চেলাই বায়ার

উত্তরসূরী ইসমত ইনানো

তুরস্কের প্রথম প্রধানমন্ত্রী

কার্যালয়ে
৩ মে ১৯২০ – ২৪ জানুয়ারি ১৯২১
(০ বছর, ২৬৬ দিন)

উত্তরসূরী ফেভজি চাকমাক

তুরস্কের পার্লামেন্টের প্রথম স্পিকার

কার্যালয়ে
২৪ এপ্রিল ১৯২০ – ২৯ অক্টোবর ১৯২৩
(৩ বছর, ২১৯ দিন)

উত্তরসূরী আলি ফেতহি ওকয়ের

রিপাবলিকান পিপলস পার্টির প্রথম নেতা

কার্যালয়ে
৯ সেপ্টেম্বর ১৯২৩ – ১০ নভেম্বর ১৯৩৮
(১৫ বছর, ৬২ দিন)

উত্তরসূরী ইসমত ইনানো

ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্ম ১৯ মে ১৮৮১ (ধারণাকৃত. তারিখটি তিনি তার দাপ্তরিক কাজের জন্য নির্বাচন করেন। সঠিক জন্মতারিখটি অজানা ছিল।)
সেলোনিকা, উসমানীয় সাম্রাজ্য (বর্তমান থেসালোনিকি, গ্রীস)

মৃত্যু ১০ নভেম্বর ১৯৩৮ (৫৭ বছর)
ডোলমাবাহচি প্রাসাদ
ইস্তানবুল, তুরস্ক

সমাধিস্থল আনিতকাবির
আঙ্কারা, তুরস্ক

জাতীয়তা তুর্কি

রাজনৈতিক দল কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস, রিপাবলিকান পিপলস পার্টি

দাম্পত্য সঙ্গী লতিফে উশাকলিগিল (১৯২৩-২৫)
ধর্ম ইসলাম

স্বাক্ষর

সামরিক পরিষেবা
আনুগত্য উসমানীয় সাম্রাজ্য (১৮৯২-১৯১৯)
তুরস্ক (১৯১৯-১৯২৭)

সার্ভিস/বিভাগ Army
পদ মার্শাল (ফিল্ড মার্শাল)

নেতৃত্ব ১৯তম ডিভিশন – ১৬তম কোর্পস – দ্বিতীয় বাহিনী – সপ্তম বাহিনী – ইল্ডিরিম আর্মি গ্রুপ – গ্র্যান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলির অধীন তুর্কি সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক
যুদ্ধ তোবরাক – আনযাক কোভে – চুনুক বাইর – স্কিমিটার পাহাড় – সারি বাইর – বিতলিস – সাকরায়া – ডুমলুপিনার

পুরস্কার তালিকা (২৪টি পদক)

Graphical Timeline
Detailed Chronology

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক(১৯ মে ১৮৮১ (ধারণা) – ১০ নভেম্বর ১৯৩৮) ছিলেন উসমানীয় সামরিক কর্মকর্তা, বিপ্লবী রাজনীতিক, লেখক এবং তুরষ্কের প্রথম রাষ্ট্রপতি। তিনি আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আতাতুর্ক একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন।[১] প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি তুর্কি জাতীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। আঙ্কারায় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর মাধ্যমে তিনি মিত্রশক্তির প্রেরিত বাহিনীকে পরাজিত করেন। তার সামরিক অভিযানের ফলে তুরস্ক স্বাধীনতা লাভ করে। আতাতুর্ক এরপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেন। সাবেক উসমানীয় সাম্রাজ্যকে একটি আধুনিক, পশ্চিমা ও ধর্মনিরপেক্ষ জাতিরাষ্ট্রে রূপান্তর এই সংস্কারের উদ্দেশ্য ছিল। আতাতুর্কের সংস্কার আন্দোলনের মূলনীতির উপর আধুনিক তুরস্ক প্রতিষ্ঠিত। তার মতবাদ কামালবাদ নামে পরিচিত।
পরিচ্ছেদসমূহ
• ১ প্রাথমিক জীবন
• ২ সামরিক জীবন
o ২.১ প্রাথমিক সময়
o ২.২ ইতালি-তুর্কি যুদ্ধ (১৯১১-১৯১২)
o ২.৩ বলকান যুদ্ধ (১৯১২-১৯১৩)
o ২.৪ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮)
o ২.৫ তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৯১৯-১৯২২)
• ৩ তুরস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
• ৪ রাষ্ট্রপতির পদ প্রাপ্তি
o ৪.১ আভ্যন্তরীণ নীতি
o ৪.২ রাষ্ট্রের উদ্ভব, ১৯২৩-১৯২৪
o ৪.৩ নাগরিক স্বাধীনতা ও খিলাফত, ১৯২৪-১৯২৫
o ৪.৪ কামালের বিরোধীপক্ষ, ১৯২৪-১৯২৭
o ৪.৫ আধুনিকীকরণের প্রচেষ্টা, ১৯২৬-১৯৩০
o ৪.৬ কামালের বিরোধীপক্ষ, ১৯৩০-১৯৩১
• ৫ তথ্যসূত্র
• ৬ বহিঃসংযোগ
প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা] মূল নিবন্ধ: কামাল আতাতুর্কের ব্যক্তিগত জীবন
মোস্তফা ১৮৮১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তবে জন্মের মাস অনিশ্চিত। আহমেদ সুবাশির আশেপাশে অথবা ইসলাহান সড়কে (বর্তমানে আপোস্টুলু পাভলু সড়ক) কোকা কাসিম পাশার(এই বাড়িটি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত) আশেপাশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।[২] তার মা জুবায়দা হানিম ও পিতা আলি রিজা এফেন্দি। তার অন্যান্য ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র বোন মাকবুল আতাদান (মৃত্যু : ১৯৫৬) শৈশবে বেঁচে ছিলেন।[৩] এন্ড্রু ম্যাংগোর মতে, তিনি একটি তুর্কিভাষী মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।[৪] এনসাইক্লোপিডিয়া জুডাইকার অনুযায়ী, সেলোনিকার অনেক ইহুদীর মতে কামাল ছিলেন দিওনমেহ বংশের। আতাতুর্কের ধর্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের অধিকাংশ এই মতটিকে গ্রহণ করে।[৫] কারো মতে তার পিতা আলি রিজা আলবেনিয়ান বংশোদ্ভুত;[৬][৭][৮][৯][১০] তবে ফালিহ রিফকি আতায়ের মতী আলি রিজার পূর্বপুরুষরা তুর্কি ছিলেন যারা আনাতোলিয়ার আয়দিন প্রদেশের সোক থেকে আসেন।[১১][১২] তার মা জুবায়দাকে তুর্কি বংশোদ্ভুত বলা ধারণা করা হয়।[৮][৯] সেভকেত সুরেইয়া আয়েদমিরের তিনি ছিলেন ইউরুক বংশোদ্ভুত।[১৩] আফেত ইনান রচিত in admiration of his capability and maturity ও আলি ফুয়াত চেবেসোর মতে, নামের দ্বিতীয় অংশ কামাল (অর্থ পূর্ণতা) তার গণিত শিক্ষক ক্যাপ্টেন উসুকুপলু মোস্তফা এফেন্দি কর্তৃক প্রদত্ত।[১৪][১৫] কারণ তার শিক্ষক তার ছাত্রদের মধ্যে তার নিজের নামের সাথে মিল আছে এমন নামের ছাত্রদেরকে আলাদা করতে চাইতেন।[১৬] তবে মোস্তফা কামালের জীবনীকার এন্ড্রু ম্যাংগোর মতে এই নামটি তিনি নিজেই নিজের জন্য রাখেন। জাতীয়তাবাদী কবি নামিক কামালের নামের সাথে মিল রেখে তিনি এই নাম বেছে নেন।[১৭] শৈশবে তার মা তাকে ধর্মীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের জন্য উৎসাহিত করেন। পরবর্তীতে তিনি তার পিতার নির্দেশে শেমসি এফেন্দি স্কুলে অধ্যয়ন করেন। এটি ছিল একটি ব্যক্তিগত বিদ্যালয়। এর পাঠ্যক্রম তুলনামূলকভাবে অধিক ধর্মনিরপেক্ষ ছিল। তার পিতামাতা তাকে বাণিজ্য শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের না জানিয়ে মোস্তফা কামাল সেলোনিকা সামরিক বিদ্যালয়ে ১৮৯৩ সালে ভর্তি পরীক্ষা দেন। ১৮৯৬ সালে তিনি মোনাস্তির সামরিক উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৪ মার্চ, ১৮৯৯ সালে তিনি উসমানীয় মিলিটারি একাডেমীতে ভর্তি হন।[১৮] এবং ১৯০২ সালে স্নাতক হন। পরবর্তীতে তিনি কন্সটান্টিনোপলের উসমানীয় মিলিটারি কলেজ থেকে ১১ জানুরারি ১৯০৫ সালে স্নাতক হন।[১৮] সামরিক জীবন[সম্পাদনা] মূল নিবন্ধ: কামাল আতাতুর্কের সামরিক জীবন
প্রাথমিক সময়[সম্পাদনা]

সেনাবাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন ক্যাপ্টেন পদে থাকাকালীন সময়, ১৯০৭ সালের ছবি
স্নাতক হওয়ার পর তিনি দামেস্কে পঞ্চম বাহিনীর আলি ফুয়াত ও লুতফু মুফিতের কোম্পানিতে স্টাফ ক্যাপ্টেন হিসেবে নিয়োগ পান।[১৮][১৯] মোস্তফা এলভানের নেতৃত্বাধীন সংস্কারবাদী কর্মকর্তাদের গোপন বিপ্লবী সংঘ ভাতান ভে হুরিয়াতে তিনি যোগ দেন। ১৯০৭ এর ২০ জুন সিনিয়র ক্যাপ্টেন পদে পদোন্নতি পান এবং ১৯০৭ এর ১৩ অক্টোবর মানাসতিরে তৃতীয় বাহিনীর সদর দপ্তরে নিয়োগ পান।[২০] তিনি কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেসে যোগ দেন। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি এই কমিটির সমালোচনা ও বিরোধীতার জন্য আলোচিত হন। ১৯০৮ সালের ২২ জুন পূর্ব রুমেনিলায় উসমানীয় রেলওয়ের পরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ পান।[২০] একই বছরের জুলাইয়ে তরুণ তুর্কি বিপ্লবে তিনি অংশ নেন। এই বিপ্লব সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয় এবং সাংবিধানিক রাজতন্ত্র সূচনা করে।

মোস্তফা কামাল বে (ডান থেকে চতুর্থ) ফরাসি কর্নেল অগাস্ট এডওয়ার্ড হিরসচাওরের বক্তব্য শুনছেন
১৯১০ সালে তাকে উসমানীয় প্রদেশ আলবেনিয়ায় পাঠানো হয়।[২১][২২] ঐ সময় ঈসা বোলেতিনি কসোভোয় আলবেনিয়দের উত্থানে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এই সময় আলবেনিয়ায় বিদ্রোহ হয়।[২৩][২৪] ১৯১০ সালে তিনি একেরেম ভ্লোরার সাথে সাক্ষাৎ করেন।[২৫][২৬] ১৯১০ সালের হেমন্তে ফ্রান্সে পিকারডি আরমিতে উসমানীয় সামরিক পরিদর্শকদের মধ্যে তিনিও অন্যতম ছিলেন।[২৭] ১৯১১ সালে তিনি ইস্তানবুলে যুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে স্বল্পকালের জন্য দায়িত্বপালন করেন।
ইতালি-তুর্কি যুদ্ধ (১৯১১-১৯১২)[সম্পাদনা] মূল নিবন্ধ: ইতালি-তুর্কি যুদ্ধ
আরও দেখুন: তোবরাকের যুদ্ধ (১৯১১)

দেরনায় একজন উসমানীয় সামরিক অফিসার ও বেদুইন সেনাদের সাথে মোস্তফা কামাল বে (বামে), ১৯১২।
পরবর্তীতে ১৯১১ সালে, তিনি উসমানীয় ত্রিপোলিতানিয়া ভিলায়েতে (বর্তমান লিবিয়া) ইতালি-তুর্কি যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য প্রেরিত হন। বেনগাজি, দেরনা ও তোবরাকের নিকট তিনি যুদ্ধে অংশ নেন। ইতালির প্রায় ১৫০০০০ জন সৈনিকের[২৮] বিপরীতে ২০০০০ জন বেদুইন[২৯] ও ৮০০০ তুর্কি ছিল।[২৯] ইতালি যুদ্ধ ঘোষণার পূর্বে লিবিয়ায় অবস্থানরত উসমানীয় সৈনিকদের একটা বিরাট অংশ ইয়েমেনে বিদ্রোহ দমনের জন্য প্রেরিত হয়। ফলে উসমানীয়রা লিবিয়ায় ইতালীয়দের প্রতিরোধে সমস্যার সম্মুখীন হয়। উরাবি বিদ্রোহের পর থেকে ব্রিটিশ সরকার মিশর ও সুদানের উসমানীয় প্রদেশ নিয়ন্ত্রণ করছিল। তারা উসমানীয় সৈনিকদেরকে মিশরের মধ্য দিয়ে লিবিয়ায় যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। ফলে মোস্তফা কামালের মত উসমানীয় সৈনিকদেরকে আরব পোষাকে নাহয় হাতে থাকে স্বল্প সংখ্যক ফেরির সাহায্যে লিবিয়ায় প্রবেশ করতে হয়। এতে ঝুকি ছিল কারণ মিশরের ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটা বুঝতে পারলে তাদের বন্দিত্ববরণ করতে হত, অন্যদিকে ইতালীয়রা নৌশক্তিতে এগিয়ে থাকায় ত্রিপোলিগামী জলপথ নিয়ন্ত্রণ করছিল। বাধা সত্ত্বেও মোস্তফা কামালের বাহিনী বেশ কয়েকটি যুদ্ধে ইতালীয়দেরকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। এই দুই বাহিনীর মধ্যে ১৯১১ সালের ২২ অক্টোবর তোবরাকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১৯১২ সালের ১৬-১৭ জানুয়ারি দেরনার যুদ্ধের সময় মোস্তফা কামাল যখন কাসর-ই হারুনের ইতালীদের নিয়ন্ত্রিত দুর্গ আক্রমণ করছিলেন, তখন ইতালীয় বিমান থেকে উসমানীয়দের উপর বোমা ফেলা হয় ও এর ফলে বিধ্বস্ত দালান থেকে চুনাপাথরের টুকরো মোস্তফা কামালের বাম চোখে প্রবেশ করে। এটি তার চোখের টিস্যুতে স্থায়ী সমস্যার সৃষ্টি করলেও দৃষ্টি পুরোপুরি নষ্ট হয়নি। প্রায় এক মাস চিকিৎসা নেয়ার পর (রেড ক্রিসেন্টের স্বাস্থ্য সুবিধা তিনি দুই সপ্তাহ পর ত্যাগ করতে চাইলেও চোখের অবস্থা অবনতি হওয়ায় তাকে পুনরায় চিকিৎসা নিতে হয়) ১৯১২ এর ৬ মার্চ তিনি পুনরায় দেরনায় উসমানীয় বাহিনীর কমান্ডার হন। ১৯১২ এর ১৮ অক্টোবর ইতালি-তুর্কি যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি শহর ও আশপাশের অঞ্চলের দখল ধরে রাখতে সক্ষম হন। ১৯১২ সালের ৮ অক্টোবর বলকান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মোস্তফা কামাল, এনভের বে, ফেতহি বে ও লিবিয়ায় অবস্থানরত অন্যান্য উসমানীয় সামরিক কমান্ডাররা উসমানীয় ইউরোপে ফিরে আসেন। এ কারণে উসমানীয় সরকার ত্রিপোলিতানিয়া, ফেজ্জান ও সিরেনকা প্রদেশ ইতালি রাজতন্ত্রের কাছে তুলে দিতে রাজি হয়। বলকান যুদ্ধ শুরু হওয়ার দশদিন পর ১৮ অক্টোবর আউচি চুক্তির মধ্য দিয়ে উসমানীয়রা এই প্রদেশগুলো ইতালীয়দের হাতে তুলে দেয়।
বলকান যুদ্ধ (১৯১২-১৯১৩)[সম্পাদনা] মূল নিবন্ধ: বলকান যুদ্ধ
আরও দেখুন: প্রথম বলকান যুদ্ধ ও দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধ
১৯১২ সালের ১ ডিসেম্বর মোস্তফা কামাল গেলিপলিতে তার নতুন সদরদপ্তরে আসেন। প্রথম বলকান যুদ্ধ চলাকালে তিনি থ্রেসের উপকূলে বুলাইরে অবতরণে অংশ নেন। এই অভিযান ফেতহি বে পরিচালনা করেন। কিন্তু বুলাইরের যুদ্ধের সময় স্টিলিয়ান কোভাচেভের বুলগেরিয়ার চতুর্থ বাহিনীর নেতৃত্বাধীন জর্জি টোডোরভের সপ্তম রিলা ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন একে বাধাগ্রস্থ করে।[৩০][৩১] ১৯১৩ সালের জুনে মোস্তফা কামাল দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধের সময় এনভের বের অধীন উসমানীয় সাথে ডিমেতোকা ও এডির্ন উদ্ধার যুদ্ধে অংশ নেন।
১৯১৩ সালে তাকে বলকানের উসমানীয় সামরিক এটাচে হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। বুলগেরিয়ার সফিয়ায় তার কার্যালয় ছিল। ১৯১৪ সালের ১ মার্চ তাকে কায়মাকাম (লেফটেন্যান্ট কর্নেল/কর্নেল) হিসেবে তিনি পদোন্নতি পান।[১৮] প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮)[সম্পাদনা] মূল নিবন্ধ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ

মোস্তফা কামাল বে গেলিপলির ট্রেঞ্চে। সাথে অন্যান্য সৈনিকরাও রয়েছে, ১৯১৫।

গেলিপলির যুদ্ধের সময় অন্যান্য উসমানীয় সামরিক অফিসারদের সাথে।

ইল্ডিরিম আর্মি গ্রুপের কমান্ডার হিসেবে মোস্তফা কামাল পাশা, ১৯১৮
১৯১৪ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্য অক্ষশক্তির সমর্থনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইউরোপীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের লড়াইয়ে যুক্ত হয়। মোস্তফা কামাল গেলিপলির যুদ্ধের সময় পঞ্চম বাহিনীর সাথে সংযুক্ত ১৯তম ডিভিশনের পুনর্গঠন ও নেতৃত্বদানের দায়িত লাভ করেন। অক্ষশক্তির কোথায় আক্রমণ করা উচিত ও পিছু হটার আগ পর্যন্ত কোথায় অবস্থান করা উচিত এসব ব্যাপারে পূর্বজ্ঞান থাকায় তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার হয়ে উঠেন। গেলিপলির যুদ্ধের পর মোস্তফা কামাল এডির্নে ১৯১৬ সালের ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্বপালন করেন। এরপর তিনি দ্বিতীয় বাহিনীর ১৬তম কোর্পসের নেতৃত্ব লাভ করেন এবং আনাতোলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলতে রাশিয়ানদের ব্যাপক হামলার পর ককেসাস অভিযানে প্রেরিত হন। ৭ আগস্ট মোস্তফা কামাল তার সৈনিকদের নিয়ে পাল্টা আঘাতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।[৩২] তার দুটি ডিভিশন বিতলিস ও মুশ অধিকার করেন।[৩৩] বিজয়ের পর কন্সটান্টিনোপলের কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস সরকার হেজাজে নতুন সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে এবং মোস্তফা কামালকে এর নেতৃত্বদানের জন্য নিয়োগ দেয়। তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এই সেনাবাহিনী আর প্রতিষ্ঠা হয়নি।[২৭] ১৯১৭ সালের ৭ মার্চ মোস্তফা কামাল ১৬তম কোর্পসের দায়িত্ব থেকে পদোন্নতি পেয়ে পুরো দ্বিতীয় বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব পান, যদিও রুশ বিপ্লব আরম্ভ হওয়ায় জারের সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করা হয়।[২৭][৩২] ১৯১৭ এর জুলাইয়ে ফেভজি পাশার স্থলে তিনি সপ্তম বাহিনীর নেতৃত্বভার লাভ করেন। ফেভজি পাশা জার্মান জেনারেল এরিক ভন ফাল্কেনহাইনের অধীনে ইল্ডিরিম আর্মি গ্রুপে কর্মরত ছিলেন।[২৭] মোস্তফা কামাল পাশা জেনারেল ভনের অধীনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলেন না। তিনি এবং ইসমত বে যৌথভাবে গ্র্যান্ড ভিজিয়ের তালাত পাশার কাছে চিঠি লিখে ফিলিস্তিন রণাঙ্গনের দুরবস্থা ও পর্যাপ্ত রসদের অভাবের কথা জানান। তালাত পাশা তাদের কথা নাকচ করে দিয়ে জার্মান কমান্ডের উপর নির্ভর না করে তুর্কিদের মাধ্যমে উত্তরে উসমানীয় সিরিয়ায় আরো শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তুলতে বলেন।[২৭] দাবি নাকচ হওয়ায় মোস্তফা কামাল সপ্তম বাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন ও কন্সটান্টিনোপলে ফিরে যান।[২৭] সেখানে তিনি যুবরাজ ও ভবিষ্যত সুলতান ষষ্ঠ মেহমেদের অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও জার্মানিতে রেলভ্রমণের সময় তার সহচরের দায়িত্ব পান।[২৭] জার্মানিতে অবস্থানকালে মোস্তফা কামাল পশ্চিম ইউরোপীয় রণাঙ্গনে জার্মান অবস্থানগুলো পরিদর্শন করেন। অক্ষশক্তি খুব শীঘ্রই যুদ্ধে পরাজিত হবে এই বোধ তার ভেতর জন্ম নেয়।[২৭] একথা তিনি খোলাখুলিভাবে কাইজার দ্বিতীয় উইলহাম এবং তার অন্যান্য উচ্চপদস্থ সেনানায়কদের কাছে উল্লেখ করেন।[২৭] ফিরতি পথে কার্লসবাদ ও ভিয়েনায় চিকিৎসার জন্য সাময়িকভাবে অবস্থান করেন।[২৭] ষষ্ঠ মেহমেদ ১৯১৮ এর জুলাইয়ে সুলতান হন। তিনি মোস্তফা কামাল পাশাকে কন্সটান্টিনোপলে ডেকে পাঠান এবং আগস্টে তাকে ফিলিস্তিনে সপ্তম বাহিনীকে নেতৃত্বদানের জন্য নিয়োগ করেন।[২৭] মোস্তফা কামাল ২৬ আগস্ট আলেপ্পোয় পৌছান এবং নাবলুসে তার সদরদপ্তরে কাজ শুরু করেন। সপ্তম বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রধান কেন্দ্রের দখল বজায় রাখছিল। ১৯ সেপ্টেম্বর মেগিড্ডোর যুদ্ধের প্রাক্কালে অষ্টম বাহিনী উপকূলীয় অঞ্চলের দখল ধরে রেখেছিল। তারা ব্যর্থ হলে লিমান পাশা সপ্তম বাহিনিকে উত্তর থেকে সরে জর্ডান নদীতে ব্রিটিশদের অগ্রগতিকে বাধাদানের আদেশ দেন। সপ্তম বাহিনী জর্ডান নদীর দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু ২১ সেপ্টেম্বর নাবলুস থেকে পিছু হটার সময় ব্রিটিশদের বোমাবর্ষণের ফলে তারা পর্যুদস্ত হয়।[৩৪] ৩০ সেপ্টেম্বর মাদরুসের যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর হয় এবং উসমানীয় সাম্রাজ্যে অবস্থানরত সকল জার্মান এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সৈন্যবহরকে অবস্থান ত্যাগের জন্য সময় দেয়া হয়। ৩১ অক্টোবর মোস্তফা কামাল লিমান ভন স্যান্ডার্সের স্থলে ইল্ডিরিম আর্মি গ্রুপের নেতৃত্বদানের দায়িত্ব পান। তিনি এন্টিপের বেসামরিক জনগণকে অস্ত্রসজ্জিত করেন যাতে মিত্রশক্তির হামলার মোকাবিলা করা যায়।[২৭] এই অংশের দক্ষিণে অবস্থানরত বাহিনীর ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব উসমানীয় সেনাবাহিনীতে তার শেষ সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ১৯১৮ এর নভেম্বরের দিকে ইল্ডিরিম আর্মি গ্রুপ দাপ্তরিকভাবে অবলুপ্ত হয়। ১৩ নভেম্বর মোস্তফা কামাল অধিকৃত কন্সটান্টিনোপলে ফিরে আসেন।[২৭] কিছুকালের জন্য তিনি যুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সদরদপ্তরে কাজ করেন। ১৯১৯ সালের ১৬ মে পর্যন্ত তিনি এখানে কাজ করেন।[২৭] উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিভক্তির সীমা বরাবর মিত্রশক্তি আনাতোলিয়া অধিকার করে নেয়। স্মারনার পর কন্সটান্টিনোপল অধিকারের ফলশ্রুতিতে তুরস্কের জাতীয় আন্দোলনের প্রতিষ্ঠা ও তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা হয়।[৩৫] তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৯১৯-১৯২২)[সম্পাদনা] মূল নিবন্ধ: তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধ
আরও দেখুন: তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধে মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্ব

মোস্তফা কামাল পাশা (ডানে) ও ইসমেত পাশা (বামে), আঙ্কারা

খ্যাতনামা জাতীয়তাবাদীদের সাথে

২৪ মার্চ ১৯২৩ সালের টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে ছবি। শিরোনাম : “Where is a Turk his own master?”
উসমানীয় সামরিক ইউনিটগুলোর অবস্থা পরিদর্শন ও আভ্যন্তরীন নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতির জন্য ১৯১৯ সালের ৩০ এপ্রিল কামাল পাশাকে নবম বাহিনীর পরিদর্শক নিয়োগ দেয়া হয়।[৩৬] ১৯ মে তিনি সামসুনে পৌছেন। তার প্রথম লক্ষ্য ছিল দখলদার বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে একটি জাতীয় প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠিত করা। জুনে তিনি আমসইয়া ঘোষণার মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন বলে ঘোষণা করেন। ৮ জুলাই তিনি উসমানীয় সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন। উসমানীয় সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। পরে তাকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয়।
উসমানীয় সংসদের সর্বশেষ নির্বাচন ১৯১৯ এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়। এতে মোস্তফা কামালের নেতৃত্বাধীন “অ্যাসোসিয়েশন ফর ডিফেন্স অব রাইট ফর আনাতোলিয়া এন্ড রুমেলিয়া” সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এসময় তিনি আঙ্কারায় অবস্থান করছিলেন। ১৯২০ সালের ১২ জানুয়ারি কন্সটান্টিনোপলে সংসদের চতুর্থ ও শেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। মিসাক-ই মিল্লি (“জাতীয় চুক্তি”) ঘোষণার কিছুদিন পর ১৮ মার্চ ব্রিটিশরা এটিকে ভেঙে দেয়। আঙ্কারায় নতুন তুর্কি সংসদ “গ্র্যান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলি” (জিএনএ) প্রতিষ্ঠার জন্য মোস্তফা কামাল জাতীয় নির্বাচনের ডাক দেন।[৩৭] ২৩ এপ্রিল মোস্তফা কামালকে স্পিকার করে করে এর কার্যক্রম শুরু হয়। এর ফলে রাষ্ট্রে দ্বৈত শাসনের সূচনা হয়।
১৯২০ সালের ১০ আগস্ট গ্র্যান্ড ভিজিয়ের দামাত ফেরিদ পাশা সেভরে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিভক্তি চূড়ান্ত হয়। তুর্কিদের মূল ভূখন্ড এই চুক্তির আওতায় ছিল। মোস্তফা কামাল তুর্কি জাতির স্বার্থে ও দেশের স্বাধীনতার জন্য এর প্রতিবাদ করেন। একটি জাতীয় সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্য তিনি জিএনএ এর প্রতি আহ্বান জানান। জিএনএ এর বাহিনী মিত্রশক্তির সাহায্যে এগিয়ে আসা খলিফার বাহিনীর মুখোমুখি হয়। পূর্ব রণাঙ্গনে আর্মেনিয়ান বাহিনী এবং স্মারনা (আধুনিক ইজমির) থেকে পূর্বদিকে ধাবমান গ্রীক বাহিনীর বিরুদ্ধে তারা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। গ্রীকরা ১৯১৯ এর মে মাসে স্মারনা দখল করে।

ডুমলুপিনার যুদ্ধের সময় কোচাটেপের পাহাড়ে মোস্তফা কামাল পাশা, ২৬-৩০ আগস্ট, ১৯২২।
জিএনএ’র সামরিক বাহিনী আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে ১৯২০ এর হেমন্তে বিজয় লাভ করে। পরবর্তীতে গ্রীকদের বিরুদ্ধেও তারা বিজয়ী হয়।[৩৮] ১৯২০ এর হেমন্ত থেকে রাশিয়ার বলশেভিক সরকার কর্তৃক কামালের লোকদেরকে স্বর্ণ ও যুদ্ধোপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে সাহায্য করা হয়।
গ্রীক-তুর্কি যুদ্ধের সময় পরপর কয়েকটি লড়াইয়ের পর সাকারইয়া নদীর অনেক কাছাকাছি, জিএনএ’র মাত্র ৮৯ কিলোমিটারের মধ্যে পৌছায়। ১৯২১ সালের ৫ আগস্ট জিএনএ মোস্তফা কামালকে প্রধান সেনানায়ক হিসেবে নিযুক্ত করে।[৩৯] ২৩ আগস্ট সাকারইয়ার যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং গ্রীকরা এতে পরাজিত হয়। এই বিজয়ের পর ১৯ সেপ্টেম্বর গ্র্যান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলি মোস্তফা কামালকে মার্শাল হিসেবে পদোন্নতি দেয়া ও গাজি উপাধিতে ভূষিত করে। কামালের সাফল্য সত্ত্বেও মিত্রশক্তি সেভরে চুক্তির কিছুটা পরিবর্তিত রূপে আঙ্কারার সামনে উত্থাপন করলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। ১৯২২ সালের আগস্টে কামাল গ্রীকদের উপর ব্যাপক আক্রমণ শুরু করেন। ৯ সেপ্টেম্বর তুর্কিরা স্মারনার অধিকার লাভ করে।[৪০] ১০ সেপ্টেম্বর মোস্তফা কামাল গণহত্যার জন্য আঙ্কারা সরকার দায়ী থাকবে না বলে লিগ অব ন্যাশনসে টেলিগ্রাম পাঠান।[৪১] তুরস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা[সম্পাদনা] আরও দেখুন: লোজান চুক্তি
১৯২২ সালের ২১ নভেম্বর লোজান সম্মেলন শুরু হয়। এতে তুরস্কের প্রতিনিধি ইসমত ইনানো তুরস্কের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করে এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।[৪২] ১৯২৩ সালের ২৪ জুলাই জিএনএকে তুরস্কের সরকার স্বীকার করে লোজান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর তুরস্ককে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়।
রাষ্ট্রপতির পদ প্রাপ্তি[সম্পাদনা]

৭ম বছর উদযাপন বৈঠক শেষে পার্লামেন্ট থেকে বের হয়ে আসছেন। বামে তুরস্কের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ইসমত ইনানো, ১৯৩০।
তুরস্ককে প্রজাতন্ত্র ঘোষণার পর একে আধুনিকীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। নতুন সরকার ফ্রান্স, সুইডের ও সুইজারল্যান্ডের মত ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানগুলো পর্যালোচনা করে সেগুলোকে তুরস্কের জন্য গ্রহণ করে। কামালের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনবহিত হওয়ায় জনগণ “আমরা প্রথম খলিফাদের দিনে ফিরে যাচ্ছি” বলে উল্লাস করে।[৪৩] মোস্তফা কামাল তার সংস্কারের স্বার্থে ফেভজি চাকমাক, কাজিম ওজাল্প ও ইসমত ইনানোকে রাজনৈতিক পদ প্রদান করেন। মোস্তফা কামাল একজন দক্ষ সামরিক অধিনায়ক হিসেবে প্রাপ্ত সম্মান কাজে লাগান এবং ১৯৩৮ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারকাজ চালিয়ে যান। এর মাধ্যমে তিনি তুর্কি সমাজকে বিশাল সাম্রাজ্যের একটি মুসলিম অংশ থেকে আধুনিক, গণতন্ত্রী ও ধর্মনিরপেক্ষ জাতিতে পরিণত করেন।
আভ্যন্তরীণ নীতি[সম্পাদনা] কামালের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের পূর্ণ স্বাধীনতা।[৪৪] তিনি তার অবস্থান এই বলে ব্যক্ত করেন:
“ ……পূর্ণ স্বাধীনতার মাধ্যমে আমরা সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, বিচারিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক ও সর্বক্ষেত্রে স্বাধীনতা বোঝাতে চাই। এগুলোর মধ্যে কোনো একটিতে স্বাধীনতা বঞ্চিত হলে সমগ্র স্বাধীনতাই বিপন্ন বলে বিবেচিত হবে।[৪৫] ”
নতুন প্রজাতন্ত্রের আইন, বিচার ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে ব্যাপক সংস্কারকাজে তিনি নেতৃত্ব দেন।
মোস্তফা কামাল প্রাক্তন উসমানীয় সাম্রাজ্য ও নব্য প্রজাতন্ত্রের ভেতরকার পরিবর্তন তুলে ধরার জন্য ব্যানার তৈরী করেন। প্রত্যেক পরিবর্তন একেকটি তীর চিহ্ন দ্বারা নির্দেশিত হয়। এগুলোকে একত্রে কামালবাদী আদর্শ বলা হয়। এই আদর্শ মোস্তফা কামালের চিন্তার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।[৪৬] মূলনীতিগুলো বিশ্বরাজনীতিতে নতুন ছিল না তবে তা তুর্কি সমাজে নতুন ছিল। এগুলো তুর্কিদের প্রয়োজন অনুসারে গঠিত হয়েছিল। এর একটি উদাহরণ হল, কামালবাদী ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র খ্রীষ্টান রাষ্ট্রগুলো থেকে যথেষ্ঠ পার্থক্যসূচক ছিল।
রাষ্ট্রের উদ্ভব, ১৯২৩-১৯২৪[সম্পাদনা]

মেভলেভি তরিকার সদস্যদের সাথে মোস্তফা কামাল পাশা, ১৯২৩। এটি তুরস্কে সূফিবাদ নিষিদ্ধের পূর্বের ছবি। নিষিদ্ধের পর দরবেশদের খানকাহগুলোকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। তবে এই প্রথা রাজনীতি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে যেতে সক্ষম হয়।

বুরসায় বক্তৃতাকালে, ১৯২৪।

একদলীয় যুগের সময়কার রাজনৈতিক স্যাটায়ার। এতে দেখানো হচ্ছে যে মোস্তফা কামাল পার্লামেন্টের জন্য সদস্য বাছাই করছেন। এই সময় প্রার্থীরা শুধ রিপাবলিকান পিপলস পার্টি থেকে নির্বাচিত হতেন।
মোস্তফা কামালের ব্যক্তিগত জার্নাল ১৯২৩ সালে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আগে থেকে চালু ছিল। এই জার্নাল থেকে বোঝা যায় যে তিনি জনগণের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করতেন। নতুন প্রজাতন্ত্র গঠনের সময় তুর্কি বিপ্লবীরা কন্সটান্টিনোপল এবং উসমানীয় ঐতিহ্যের পতন এবং দুর্নীতির বিষয়ে অনুধাবন করেন।[৪৭] তারা আঙ্কারাকে দেশের নতুন রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। এটি আনাতোলিয়ার একটি প্রাদেশিক শহর ছিল। আঙ্কারা স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে উঠে। সংসদ কর্তৃক শাসিত সরকার কামালের আকাঙ্খা ছিল।[৪৮] তিনি চাইতেন এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে জাতীয় সংসদ ক্ষমতা সর্বোচ্চ উৎস হবে।[৪৮] পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি তার অবস্থান বদল করেন। রাষ্ট্রে তখন ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন ছিল এবং সংসদ কর্তৃক শাসিত সরকার এই পরিস্থিতির জন্য উপযোগী ছিল না। বিপ্লবীরা প্রাক্তন উসমানীয় আমলের সমর্থক, সেই সাথে কমিউনিজম ও ফেসিজম সমর্থকদের কাছ থেকে ব্যাপক বিরোধীতার সম্মুখীন হন। মোস্তফা কামাল ১৯২০ ও ৩০ এর দশকে এই দুই মতাদর্শ প্রয়োগের ফলাফল প্রত্যক্ষ করেন। তাই তিনি এ দুটিকেই প্রত্যাখ্যান করেন।[৪৯] সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি ও ইতালির মত তিনি তুরস্কে পার্টির শাসনের পক্ষপাতি ছিলেন না।[৫০] মোস্তফা কামাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জিএনএ নতুন প্রজাতন্ত্রের কেন্দ্র হয়ে উঠে।[৫১] নির্বাচন ব্যবস্থা ছিল স্বচ্ছ।[৫১] এর সদস্যরা তুর্কি সমাজের প্রতিনিধি ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ও সরকার নির্বাচনের অধিকার সংসদের ছিল। এটি আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংরক্ষন করত, সেই সাথে নির্বাহী বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ অধিকারও ছিল। ১৯২১ সালের তুরস্কের সংবিধান অনুযায়ী সংসদ এই ক্ষমতা লাভ করে।[৫১] ১৯২৪ সালের সংবিধানে আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার পৃথকীকরণ করা হয়। এই দুই বিভাগের মধ্যে বিচারিক ব্যবস্থার পৃথকীকরণও এর অংশ ছিল। এরপর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোস্তফা কামাল শক্তিশালী অবস্থান লাভ করেন।
১৯২৪ সালের সংবিধান চালুর পরের বছর ১৯২৫ সালে একদলীয় শাসন চালু হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে গঠিত দল “পিপলস পার্টি” এসময় একমাত্র দল ছিল। ১৯২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এর নতুন নাম দেয়া হয় রিপাবলিকান পিপলস পার্টি।
নাগরিক স্বাধীনতা ও খিলাফত, ১৯২৪-১৯২৫[সম্পাদনা] মোস্তফা কামালের রাজনৈতিক সংস্কারের মধ্যে অন্যতম ছিল খিলাফতের বিলোপ সাধন ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা। খিলাফত ছিল সুন্নি মুসলিমদের রাজনৈতিক মতবাদ।[৫২] সালতানাতের বিলোপ সহজসাধ্য ছিল। এসময় একদিকে প্রজাতন্ত্র অন্যদিকে খলিফার সরকার, দুই বজায় ছিল। কামাল ও ইনানো এ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।[৫৩] ১৯২২ সালে সালতানাত বিলুপ্তির পর খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদ খলিফা নির্বাচিত হন।
খলিফার নিজস্ব কোষাগার ও সামরিক ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত নিজস্ব সেবার ব্যবস্থা ছিল। মোস্তফা কামাল বলেন যে এই ব্যবস্থার কোনো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বৈধতা নেই। তিনি বিশ্বাস করতেন যে খলিফা বৈদেশিক প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ দাপ্তরিক অনুষ্ঠান ও উৎসবে অংশগ্রহণ করে সুলতানদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন।[৫৪] তিনি খলিফার ক্ষমতাকে জিএনএ’এর সাথে একীভূত করতে চাইতেন। ১৯২৪ সালের ১ জানুয়ারি[৫৪] ইনানো, চাকমাক ও ওজাল্প খিলাফতের বিলুপ্তির ব্যাপারে সম্মতি প্রদান করেন। খলিফা রাজনৈতিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবেন না বলে বিবৃতি দেন।[৫৫] ১ মার্চ মোস্তফা কামাল সংসদে বলেন:
“ ইসলাম যদি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না হয় তবে এটি উন্নয়ন সাধন করবে.[৫৬] ”
১৯২৪ সালের ৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে খিলাফত বিলুপ্ত হয়। খিলাফতের ক্ষমতা জিএনএ’র এর আওতাভুক্ত করা হয়। অন্যান্য মুসলিম জাতিগুলো তুরস্কের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিতর্কে অবতীর্ণ হয়।[৫৫] ১৯২৬ সালের মে মাসে কায়রোতে “খিলাফত সম্মেলন” অনুষ্ঠিত হয়। খিলাফতকে “ইসলামের জন্য অত্যাবশ্যকীয়” ঘোষণা করা হয়। তবে এই ঘোষণা বাস্তব প্রয়োগের মুখ দেখেনি।[৫৫] ১৯২৬ ও ১৯৩১ সালে যথাক্রমে মক্কা ও জেরুজালেমে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এগুলো কোনো সিদ্ধান্তে পৌছতে ব্যর্থ হয়।[৫৫] তুরস্ক খিলাফতের পুনপ্রতিষ্ঠাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং মৌলিক অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। মোস্তফা কামাল ও অন্যান্য সংস্কারবাদীরা তাদের নিজেদের পথে যাত্রা শুরু করেন।[৫৭] খিলাফতের অবলুপ্তির পর সরকার ও ধর্মীয় কাজের মধ্যে পৃথকীকরণ করা হয়। এ উদ্দেশ্যে শিক্ষাকে মূল হিসেবে ধরা হয়। ১৯২৩ সালে তিনটি ধারার শিক্ষাব্যবস্থা ছিল। তার মধ্যে মাদরাসা ব্যবস্থা যা আরবি, কুরআন এসবের উপর পরিচালিত, তা বহুল প্রচলিত ছিল। দ্বিতীয় ধরনের প্রতিষ্ঠান ছিল ইদাদি ও সুলতানি। এগুলো তানযিমাত যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ হল কলেজ ও বিদেশী ভাষার সংখ্যালঘু বিদ্যালয়। এখানে ছাত্রদেরকে শিক্ষাদানের জন্য আধুনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হত। পুরনো মাদরাসা ব্যবস্থা আধুনিক করা হয়।[৫৮] মোস্তফা কামাল প্রথাগত ইসলামিক শিক্ষাপদ্ধতিকে পরিবর্তন করেন।[৫৮] শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারকে তিনি তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন।
“ জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা (একীভূতকরণ ও আধুনিকীকরণ) আজকের দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে উৎপাদনশীল কাজ। জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমে আমাদেরকে সফল হতে হবে এবং আমরা সফল হব। একটি জাতির স্বাধীনতা শুধুমাত্র এই পন্থায় আসতে পারে।[৫৯] ”
১৯২৪ সালের গ্রীষ্মে মোস্তফা কামাল তুরস্কের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের জন্য আমেরিকান শিক্ষা সংস্কারক জন ডেওয়েকে আঙ্কারায় আমন্ত্রণ জানান।[৫৮] তার শিক্ষা সংস্কার কার্যক্রমে গণস্বাক্ষরতা বৃদ্ধিকে মূল লক্ষ্য ধরা হয়। নাগরিক সংস্কৃতির বিকাশকে সহযোগীতা করার লক্ষ্যে তিনি শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে চান। রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয়গুলো একটি সাধারণ পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে। এটি “শিক্ষার একীভূতকরণ” বলে পরিচিতি পায়।
১৯২৪ সালের ৩ মার্চ শিক্ষাব্যবস্থার একীভূতকরণ আইনের মাধ্যমে বলবত করা হয়। নতুন আইনের অধীনে শিক্ষাকে অধিকমাত্রায় বিস্তৃত করা হয়। এই নতুন প্রক্রিয়ায় বিদ্যালয়গুলো তাদের পাঠ্যক্রম জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। একই সময় ধর্মীয় বিষয়গুলোকে সরকারের ধর্মীয় বিভাগের আওতাধীনে আনা হয়। শিক্ষাব্যবস্থার একীভূতকরণের পরও তুরস্ক ধর্মীয় বিদ্যালয় চালু ছিল। এগুলো উচ্চশিক্ষার দিকে অগ্রসর হয়। মোস্তফা কামালের মৃত্যুর পর সরকার তাদেরকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনে।

১৯২৫ সালে কাস্টামনু বক্তৃতার পর পানামা হ্যাট হাতে মোস্তফা কামাল
১৯২৫ সালে মোস্তফা কামাল তুর্কিদেরকে আধুনিক ইউরোপীয় পোষাক পড়তে উৎসাহ দেন[৬০]। দ্বিতীয় মাহমুদের সময় শুরু হওয়া পোষাক সংস্কার কার্যক্রম যাতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত পোষাক ত্যাগ করা হচ্ছিল তাকে চূড়ান্ত রূপ দেয়াতে তিনি বদ্ধ পরিকর ছিলেন।[৬০] উসমানীয় সাম্রাজ্যের আধুনিকীকরণের অংশ হিসেবে দ্বিতীয় মাহমুদের সময় ১৮২৬ সালে ফেজ ব্যবহার শুরু হয়। মোস্তফা কামাল সর্বপ্রথম সরকারি চাকুরেদের জন্য হ্যাটকে বাধ্যতামূলক করেন।[৬০] তার জীবদ্দশায় শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারীদের জন্য পোষাক বিধিমালা প্রণীত হয়। সরকারি চাকরিজীবিদের অনেকেই হ্যাটকে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে। ১৯২৫ সালে মোস্তফা কামাল একটি জনসমাবেশে তার পানামা হ্যাট পরিধান করেন। হ্যাট সভ্য জাতির পোষাক এটি বোঝাতেই তিনি এমনটা করেন। এই সংস্কারের সর্বশেষ অংশ ছিল পাগড়ির মত ধর্মভিত্তিক পোষাকের পরিবর্তে আধুনিক পশ্চিমা স্যুট ও নেকটাই সেই সাথে হ্যাট পরিধান করা।
মোস্তফা কামাল নারীদের জন্য আধুনিক পোষাককে উৎসাহিত করলেও নারীদের পোষাক কেমন হওয়া উচিত সেই বিষয়ে তিনি মত দেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে নারীরা তাদের নিজস্ব পোষাকের ধরন বেছে নিতে পারবে। বিভিন্ন আলোকচিত্রে তিনি ও তার স্ত্রী লতিফে উশাকগিলকে একসাথে দেখা যায়। এতে তার স্ত্রীকে ইসলামী রীতি অনুযায়ী মাথা ঢেকে রাখা অবস্থায় দেখা যায়। পশ্চিমা পোষাক পরিহিতা নারীদের সাথে তোলা আলোকচিত্রেও মোস্তফা কামালকে দেখা যায়। তবে তার দত্তক কন্যা সাবিহা গাকচেন ও আফেত ইনান ভবিষ্যৎ তুর্কি নারীদের জন্য রোল মডেল হয়ে উঠেন। মোস্তফা কামালের লেখা অনুযায়ী:”নারীদের ধর্মীয় মতে আবৃতকরণ সমস্যার সৃষ্টি করবে না। … মাথা ঢেকে রাখার এই রীতি আমাদের সমাজের মূল্যবোধ ও রীতিবিরুদ্ধ নয়।”[৬১] ১৯২৫ সালের ৩০ আগস্ট ধর্মীয় চিহ্নের উপর কামালের দৃষ্টিভঙ্গি তার কাস্তামনু বক্তৃতায় বিবৃত হয়। তিনি বলেন:
“ জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সভ্যতার সামনে দাঁড়িয়ে আমি তুরস্কের সভ্য সমাজের জনগণকে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক লাভের জন্য শেখদের নির্দেশনায় চলতে দিতে পারি না। তুর্কি প্রজাতন্ত্র শেখ, দরবেশ ও অনুসারীদের দেশ হতে পারে না। সর্বোৎকৃষ্ট রীতি হল সভ্যতার রীতি। মানুষ হওয়ার জন্য সভ্যতার প্রয়োজনীয়তা পূরণ করাই যথেষ্ঠ। দরবেশ প্রথার নেতৃবৃন্দ আমার কথার সত্যতা বুঝতে পারবেন এবং তাদের খানকাহগুলো গুটিয়ে নেবেন ও স্বীকার করবেন যে তাদের রীতিগুলো পুরনো হয়ে গিয়েছে।[৪৪] ”
২ সেপ্টেম্বর সরকার দেশের সকল সূফি কার্যক্রম ও খানকাহসমূহ বন্ধের আদেশ জারি করে। মোস্তফা কামাল খানকাহগুলোকে জাদুঘরে রূপান্তরের আদেশ দেন। সূফিবাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রদর্শন তুরস্কে বেআইনি ঘোষিত হয়। রাজনীতি নিরপেক্ষ সূফিবাদ যা শুধুমাত্র সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকবে, তার অনুমোদন দেয়া হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] খিলাফতের বিলুপ্তি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংস্কার বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। রক্ষণশীল মতাবলম্বীরা এতে নাখোশ হয় এবং কামালবাদী সংস্কারকদের উপর হামলা করে।[৫৫] কামালের বিরোধীপক্ষ, ১৯২৪-১৯২৭[সম্পাদনা] মিডিয়া চালান

মোস্তফা কামালের একটি আনাতোলিয়া সফরের ভিডিও ফুটেজ
১৯২৪ সালে কামাল যখন মসুল সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তখন শেখ সাঈদ বিদ্রোহ সংগঠিত করা শুরু করেন। শেখ সাঈদ ছিলেন একজন ধনী কুর্দি গোত্রীয় ব্যক্তি।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] তিনি নকশবন্দি তরিকার নেতা ছিলেন। তিনি খিলাফতের বিলুপ্তির প্রতিবাদের সাথে পাশ্চাত্য ধাচের নাগরিক আইন, ধর্মীয় রীতির অবলোপন, বহুবিবাহের উপর নিষেধাজ্ঞা ও সিভিল ম্যারেজ রীতিরও প্রতিবাদ করে। তিনি তার অনুসারীদেরকে সরকারের বিরুদ্ধের নীতির বিরুদ্ধে সংগঠিত করেন। ইসলামী আইনের পুনপ্রতিষ্ঠা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তার বাহিনী দেশময় ছড়িয়ে পড়ে, সরকারের কার্যালয়গুলো অবরোধ করে ও এলাজিগ ও দিয়ারবাকিরের গুরুত্বপূর্ণ শহরের অভিমুখে যাত্রা করে।[৬২] সরকারের সদস্যরা শেখ সাঈদের বিদ্রোহকে পাল্টা বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করেন। একে প্রতিরোধ করার জন্য তারা সামরিক পদক্ষেপ নেন। বিদ্রোহকে দমন করার জন্য ১৯২৫ সালের ৪ মার্চ আইন পাশ হয়। এই আইনের ফলে সরকার ব্যতিক্রমী ক্ষমতা লাভ করে সেই সাথে ধ্বংসাত্মক গ্রুপগুলো দমন করা কর্তৃত্ব লাভ করে। ১৯২৯ সালের ৪ মার্চ এটি বিলুপ্ত হয়।
জিএনএ এর অনেক সদস্য এসব পরিবর্তনে অসন্তুষ্ট ছিলেন। রিপাবলিকান পিপলস পার্টির বৈঠকে তারা বিরোধীদের প্রতি সহানুভূতিশীল উল্লেখ করে নিন্দিত হন। মোস্তফা কামাল তা নিজের দলের ভেতর সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার ভয় প্রকাশ করেন।[৬৩] তিনি এই দলটিকে বাদ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।[৬৩] পরবর্তীতে নিন্দা প্রস্তাব দলভঙ্গের সুযোগ করে দেয়। কাজিম কারাবেকির তার বন্ধুদের নিয়ে ১৯২৪ সালের ১৭ অক্টোবর এমন একটি দল প্রতিষ্ঠা করেন। এই নিন্দা মোস্তফা কামালের জন্য আস্থা ভোটে রূপ নেয়। ৮ নভেম্বর ভোটের পর এই নিন্দা প্রত্যাখ্যাত হয়।[৬৩] কামালের দল সংসদে একটি ছাড়া বাকি আসনগুলো লাভ করে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার লাভের পর[৬৩] কামাল বলেন, “তুর্কি জনগণ প্রজাতন্ত্র, সভ্যতা ও প্রগতির পথে যাত্রার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।”[৬৩] ১৯২৪ সালের ১৭ নভেম্বর দলত্যাগীরা প্রগ্রেসিভ রিপাবলিকান পার্টি গঠন করেন। এর ফলে বহুদলীয় ব্যবস্থা চালু হয়। পিআরপি এর অর্থনৈতিক কর্মসূচি রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের বদলে ব্যক্তি উদ্যোগকে সমর্থন করে। দলের নেতৃবৃন্দ কামালের বিপ্লবী মুলনীতিকে সমর্থন করলেও সাংস্কৃতিক বিল্পব ও ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতির ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে।[৬৪] তারা মোস্তফা কামালের কর্মকাণ্ডের সাথে মৌলিকভাবে দ্বিমত ছিলেন না।[৬৩] ১৯২৬ সালে ইজমিরে মোস্তফা কামালকে হত্যা করার পরিকল্পনা ফাস হয়। খিলাফতের বিলুপ্তির বিপক্ষে অবস্থানকারী একজন প্রাক্তন সাংসদ এর সূত্রপাত করেন। তদন্ত হত্যা পরিকল্পনা থেকে সহিংস কর্মকাণ্ডের হোতাদের দিকে গড়ায়। তবে মূল উদ্দেশ্য ছিল কামালের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিরোধীদের চিহ্নিত করা। তদন্তের ফলে কারাবেকিরসহ অনেক রাজনৈতিক কর্মীকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। চাভিদ, আহমেদ শুকরু ও ইসমাইল কানবুলাতসহ কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেসের বেশ কয়েকজন নেতা যারা তুর্কি বিপ্লবে দ্বিতীয় সারিতে ছিলেন, দোষী সাব্যস্ত হন। তাদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।[৬৫] পিআরপি ও শেখ সাঈদের বিদ্রোহী গ্রুপের মধ্যে যোগসাজোশ তদন্তে বের হয়ে আসে। বিচারের ফলে পিআরপিকে বিলুপ্ত করা হয়। ফলে নিয়মতান্ত্রিক বিরোধীতার ধারা ভেঙে পড়ে। মোস্তফা কামাল বলেন, “আমার নশ্বর দেহ ধুলো হয়ে যাবে, কিন্তু তুর্কি প্রজাতন্ত্র চিরকাল টিকে থাকবে”। হত্যাচেষ্টার পর তিনি এই উক্তি করেন।[৬৬] আধুনিকীকরণের প্রচেষ্টা, ১৯২৬-১৯৩০[সম্পাদনা]

স্টেট আর্ট এন্ড স্কাল্পচার মিউজিয়াম উদ্বোধনকালে ১৯২৭

রাষ্ট্রপতি মোস্তফা কামাল কায়সেরির জনগণকে নতুন তুর্কি বর্ণমালা শিক্ষা দিচ্ছেন, ২০ সেপ্টেম্মবর ১৯২৮।

লাইব্রেরীতে রাষ্ট্রপতি কামাল আতাতুর্ক, স্থান চানকায়া রাষ্ট্রপতি ভবন, আঙ্কারা, ১৯২৯
১৯২৬ সালের পরের বছরগুলোতে কামাল পূর্বতন উসমানীয় সাম্রাজ্যের সময়কার সংস্কার থেকে মৌলিকভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন শুরু করেন।[৬৭] ইতিহাসে এই প্রথমবার ইসলামী আইন সেক্যুলার আইন থেকে পৃথক হয় এবং শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ করা হয়।[৬৭] মোস্তফা কামাল বলেন,
“ আমরা অবশ্যই আমাদের ন্যায়বিচার, আইন ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেসব বন্ধন থেকে মুক্ত করতে হবে যা আমাদের শতাব্দীর উপযোগী নয় কিন্তু আমাদের উপর চেপে বসেছে।[৬৮] ”
১৯২৬ সালের ১ মার্চ ইতালীয় দন্ডবিধির উপর ভিত্তি করে গঠিত তুরস্কের দন্ডবিধি পাস হয়। সেই বছরের ৪ অক্টোবর ইসলামী আদালতগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। নতুন আইনের প্রতিষ্ঠা সময়সাপেক্ষ ছিল বিধায় কামাল ১৯৩৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এগুলোর অবলুপ্তিকে দীর্ঘায়িত করেন।
উসমানীয় আমলে নারী পুরুষের সামাজিক মেলামেশা নিরুৎসাহিত করা হয়। মোস্তফা কামাল সামাজিক সংস্কার কার্যক্রম খুব দ্রুত শুরু করেন। তার ব্যক্তিগত জার্নাল থেকে একথা বোঝা যায়। তিনি ও তার অধীনস্তরা নারীদের পর্দাপ্রথা ও বাইরের জগতের সাথে তাদের আত্মীকরণের বিষয়ে আলোচনা করেন। এই বিষয়ে তিনি কিভাবে অগ্রসর হচ্ছিলেন তা ১৯১৫ সালের নভেম্বরে তার জার্নালে পাওয়া যায়;
“ সামাজিক পরিবর্তনের উপায় হল (১) মাদেরকে শিক্ষিত করা; (২) নারীদেরকে স্বাধীনতা প্রদান; (৩) একজন পুরুষ তার নীতি চিন্তা ও অনুভূতি নারীদের সাথে একই জীবনযাপনের মাধ্যমে পরিবর্তন করতে পারে; যেহেতু তাদের ভেতর জন্মগতভাবে আকর্ষণ বিদ্যমান।[৬৯] ”
নারীদের স্বাধীনতা প্রদানের জন্য মোস্তফা কামালের নতুন আইনের প্রয়োজন ছিল। এর প্রথম পদক্ষেপ ছিল নারীশিক্ষা। ১৯২৬ সালের ৪ অক্টোবর তুরস্কের সিভিল কোড পাশ হয়। সুইস সিভিল কোডের উপর ভিত্তি করে এটি প্রণীত হয়। নতুন আইনের অধীনে নারীরা উত্তরাধীকার ও তালাকের মত ব্যাপারে পুরুষের সমান হিসেবে গণ্য হয়। মোস্তফা কামালের মতে নারি ও পুরুষের একতার মাধ্যমে সমাজ তার উদ্দেশ্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে উসমানীয় যুগের মত নারী পুরুষের পৃথকীকরণ থাকলে তার আকাঙ্ক্ষিত প্রগতি অর্জন করা যাবে না।[৭০] একটি বৈঠকে তিনি বলেন,
“ নারীদের প্রতি: আমাদের জন্য শিক্ষার যুদ্ধ জয়লাভ কর তবে তুমি তোমার দেশের জন্য আমাদের চেয়েও বেশী কিছু করতে পারবে। আমি তোমাদেরকেই বলছি।
পুরুষদের প্রতি: নারীরা যদি জাতির সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণ না করে তবে আমরা কখনোই আমাদের সামগ্রিক উন্নতি অর্জন করতে পারব না। এর ফলে আমাদেরকে পশ্চাৎপদ হয়ে থাকতে হবে এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে তাল মেলানো অসম্ভব করে তুলবে।[৭১] ”
১৯২৭ সালে স্টেট আর্ট এন্ড স্কাল্পচার মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠিত হয়। এতদিন ধরে তুরস্কে ইসলামী আদর্শের সাথে মিল রেখে ভাস্কর্যের চর্চা খুবই কম ছিল। কামাল বিশ্বাস করতেন যে সংস্কৃতি হচ্ছে তুর্কি প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি।[৭২] প্রাক-ইসলামী যুগের তুর্কি সংস্কৃতি গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে উঠে। সেলজুক ও উসমানীয় সভ্যতার পূর্বের তুর্কি সংস্কৃতির উপর জোর দেয়া হয়। লোকসংস্কৃতির উপরও জোর দেয়া হয়।
১৯২৮ সালের বসন্তে মোস্তফা কামাল সমগ্র তুরস্ক থেকে আসা বেশ কয়েকজন ভাষাবিদ ও অধ্যাপকের সাথে আঙ্কারায় বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে তিনি তুর্কি ভাষা লেখার জন্য ল্যাটিন বর্ণমালার উপর ভিত্তি করে নতুন বর্ণমালা গঠনের বিষয়টি উত্থাপিত করেন। এই নতুন বর্ণমালা তুরস্কের স্বাক্ষরতা সমস্যা সমাধানকল্পে পূর্বে ব্যবহৃত আরবি বর্ণমালার স্থলে ব্যবহারের কথা বলা হয়। এজন্য তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে বলে আগত বিশেষজ্ঞরা মত দেন। বলা হয় যে কামাল দৃঢ়তার সাথে উত্তর দেন, “আমরা এটি তিন থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে করব।”[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] পরবর্তী মাসগুলোতে নতুন তুর্কি বর্ণমালার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। এসময় তার বিভিন্ন বক্তৃতায় তিনি নতুন বর্ণমালার বিষয়ে উল্লেখ ক্করেন। ১৯২৮ সালের ১ নভেম্বর নতুন তুর্কি বর্ণমালা চালু ও আরবি বর্ণমালার ব্যবহার বিলুপ্ত করা হয়। এসময় জনগণে ১০ শতাংশ শিক্ষিত ছিল। তুর্কি ভাষায় আরবি বর্ণমালার ব্যবহার শিখতে প্রায় তিন বছর লাগত।[৫৮] এসময় প্রচুর আরবি ও ফার্সি শব্দ ব্যবহার করা হত।[৫৮] মোস্তফা কামালের প্রচেষ্টায় ল্যাঙ্গুয়েজ কমিশন ল্যাটিন বর্ণমালার প্রচলনের দায়িত্ব হাতে নেয়।[৫৮] এক উসমানীয়-আর্মেনিয়ান ক্যালিগ্রাফার এ ব্যাপারে সহায়তা করে।[৭৩] ১৯২৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর নতুন বর্ণমালা ব্যবহার করে তুরস্কে সর্বপ্রথম পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নাগরিকদেরকে নতুন পন্থা শিক্ষাদানের জন্য কামাল নিজে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করেন। তার ধারণা অনুযায়ী নতুন ব্যবস্থা খুব শীঘ্রই বিস্তার লাভ করে এবং তুরস্কের শিক্ষিতের হার দুই বছরের মধ্যে ১০% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৭০% হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] ১৯৩২ সালের শুরুতে দেশজুড়ে পিপলস হাউস খোলা হয় যাতে ৪ থেকে ৪০ বছরের মধ্যের মানুষেরা নতুন বর্ণমালা শিখতে পারে। কপিরাইট, গণশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক প্রকাশনীর উপর সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্বাক্ষরতা সংস্কারের জন্য নতুন কপিরাইট আইনে ব্যক্তিগত উদোগে প্রকাশনীকে সাহায্য করা হয়।
মোস্তফা কামাল প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির প্রবর্তন করেন। এজন্য ডেওয়ে সম্মানজনক অবস্থান লাভ করেন।[৫৮] তুরস্কের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ডেওয়ে একটি প্রস্তাব পেশ করেন।[৫৮] তিনি বয়স্ক শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। তুর্কি নারীদেরকে সন্তান প্রতিপালন, পোষাক তৈরী ও গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি ঘরের বাইরে কাজে অংশ নেয়ার জন্যও শিক্ষা দেয়া হয়। শিক্ষাব্যবস্থাকে রাষ্ট্র কর্তৃক তত্ত্বাবধান করা হয়।[৭৪] তার শিক্ষা কার্যক্রম এমনভাবে পরিকল্পিত ছিল যাতে নাগরিকদের দায়িত্ববান হিসেবে গড়ে তোলা যায়।[৫৮] দারিদ্র দূরীকরণ ও লিঙ্গ সমতার জন্য শিক্ষাকে ব্যবহার করা হয়।
আধুনিক শিক্ষাকে বিস্তৃত করার জন্য মোস্তফা কামাল গণমাধ্যমকে ব্যবহার করেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি দুটি পাঠ্যবই প্রণয়নের সাথে জড়িত ছিলেন। এদুটি হল “Vatandaş İçin Medeni Bilgiler (১৯৩০) ও জিওমেট্রী (১৯৩৭)।
কামালের বিরোধীপক্ষ, ১৯৩০-১৯৩১[সম্পাদনা]

লিবারেল রিপাবলিকান পার্টির নেতা ফেতহি বে ও তার কন্যার সাথে, স্থান ইয়ালোভা, ১৩ আগস্ট ১৯৩০।
১৯৩০ সালের ১১ আগস্ট মোস্তফা কামাল বহুদলীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি আলি ফেতহি ওকয়েরকে নতুন দল গঠন করতে বলেন। নবগঠিত লিবারেল রিপাবলিকান পার্টি দেশজুড়ে সাফল্য লাভ করে। তবে এবারেও এটি আতাতুর্কের সংস্কারের বিরুদ্ধাচারীদের কেন্দ্র হয়ে উঠে, বিশেষত ব্যক্তিজীবনে ধর্মের অবস্থানকে কেন্দ্র করে।
১৯৩০ সালের ২৩ ডিসেম্বর ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি সহিংস ঘটনা সংঘটিত হয়। মেনেমেন শহরে ইসলামী বিদ্রোহী গোষ্ঠী এর সূচনা করে। ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কারের প্রতি একে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১৯৩০ সালের নভেম্বরে আলি ফেতহি ওকয়ের তার দলকে বিলুপ্ত করেন। ১৯৪৫ সালে দীর্ঘস্থায়ী বহুদলীয় ব্যবস্থা শুরু হয়।

মসজিদে নববী
অবস্থান মদীনা, হেজাজ, সৌদি আরব[১]

প্রতিষ্ঠিত সি ৬২২
শাখা/ঐতিহ্য
ইসলাম

প্রশাসন আরব সৌদি সরকার

পরিচালনা ইমাম:
শাইখ ডঃ আলী আব্দুর রহমান আল হুধাইফি
শাইখ ডঃ আব্দুল বারী আয়াদ আল থুবাইথি
শাইখ সালাহ মুহাম্মদ আল বুদায়ের
শাইখ আব্দুল মহসিন আল কাসিম
শাইখ হুসেইন আব্দুল আজিজ আল শেখ
শাইখ আহমেদ বিন তালিব হামিদ
শাইখ আব্দুল্লাহ বুয়াজন
স্থাপত্য তথ্য
ধরণ
শাস্ত্রীয় এবং সমসাময়িক ইসলামিক; অটোমান; মামলুক

ধারণক্ষমতা ৬০০,০০০ (হজ এর সময়কালে ১০,০০,০০০ বৃদ্ধি)
মিনার ১০
মিনারের উচ্চতা ১০৫ মিটার (৩৪৪ ফু)
মসজিদে নববী (আরবি: المسجد النبوي‎, [mæsʤıd ænːæbæwiː], ইংরেজি: Al-Masjid al-Nabawi) এর শাব্দিক অর্থ হলো নবীর মসজিদ; তবে এরদ্বারা মদীনায় হিযরতের পর ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক নবী হজরত মুহাম্মদ (সা:) কর্তৃক নির্মিত মদিনা মসজিদ কে বোঝানো হয়ে থাকে। এই মসজিদের অভ্যন্তরে মুহাম্মদ (সা:)-এর রওযা সমাধিস্থল অবস্থিত। পৃথিবীর সকল মসজিদ সমস্থানীয় হলেও কাবা-এর পরেই মসজিদে নববী’র মর্যাদা।
মুহাম্মদ (সাঃ) খ্রীস্টাব্দে মক্কা থেকে মদীনায় হিযরত করেন। তখন এ শহরটির নাম ছিল “ইয়াসরিব”। তিনি ইয়াসরিবের নাম পাল্টে রাখেন মদিনা। হিজরতের পর মুসলমানদের নামাজের জন্য মুহাম্মদ (সা:) “মদীনা মসজিদ” অর্থাৎ “মসজিদে নববী” নির্মাণ করেন। মসজিদটি নির্মাণ করতে ৭ মাস সময় লেগেছিল। ৬২২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরের পর থেকে শুরু হয়ে ৬২৩ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মদিনা মসজিদের নির্মাণ কাল নির্ধারণ করা হয়।
নির্মাণপ্রক্রিয়া[সম্পাদনা] মুহাম্মদ(সা:) মদিনা মসজিদের নির্মাণের জন্য নাজ্জার গোত্রের সাহল ও সোহাইল নামক দুই জন বালকের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় জমি ক্রয় করেন। এর ক্ষুদ্র একটি অংশে বাসস্থান নির্মাণ করতঃ বাকী অংশে মদিনা মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। প্রতিটি কোণ থেকে তীর নিক্ষেপ করে যে পরিমাণ জায়গা পাওয়া গেল তা হলো একটি ক্ষেত্র। বর্গের প্রতিটি বাহুর পরিমাণ দাৎড়ালো ১০০ হাত বা ৫৬ গজ। অর্থাৎ মদিনা মসজিদের প্রাথমিক আয়তন ছিল ১০০*১০০ হাত বা ৫৬*৫৬ গজ। মসজিদের ভিত্তি ও দেয়ালের নিম্নভাগ ৩ হাত পর্যন্ত প্রস্তর নির্মিত ছিল। প্রথম পর্যায়ে মদিনা মসজিদ রৌদ্র-শুষ্ক ইট দ্বারা নির্মিত হয়। এই রৌদ্র-শুষ্ক ইট বাকী আল-খাবখাবা উপত্যাকা হতে আনিত কাদা দ্বারা তৈরি হয়েছিল। তখন মদিনা মসজিদের দেয়াল ছিল ৭ হাত উঁচু। ছাদকে শক্তিশালী ও মজবুত রাখার জন্য মদিনা মসজিদের ৩৬টি খেজুর গাছকে স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। মসজিদের ছাদ নির্মিত হয়েছিল খেজুর পাতা দিয়ে। ছাদকে সুন্দর করার জন্য, রৌদ্র ও বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য খেজুর পাতার উপর কাঁদামাটির আস্তরণ লেপে দেয়া হয়েছিল। সে সময় মদিনা মসজিদে প্রবেশের জন্য ৩টি দরজা ছিল। প্রধান প্রবেশ পথটি ছিল দক্ষিণ দিকে যা দিয়ে মুসল্লিরা মসজিদে প্রবেশ করতেন ও বাহির হতেন। পশ্চিম দেয়ালে ছিল মসজিদের দ্বিতীয় প্রবেশ পথ যা “বাবে রহমত” নামে পরিচিত। তৃতীয় প্রবেশ পথটি ছিল পূর্ব দেয়ালে যা দিয়ে মুহাম্মদ (সা:) এ মসজিদে প্রবেশ করতেন। এ জন্য এটির নাম হয় “বাব উন নবী”। ঐতিহাসিক উইনসিংকের মতে, মদিনা মসজিদের দরজা প্রস্তর নির্মিত ছিল। মদিনা মসজিদেই সর্ব প্রথম মেহরাব, মিম্বার, আজান দেয়ার স্থান বা মিনার ও ওজুর স্থান সংযোজন করা হয়। বর্তমানে মদিনা মসজিদে আগের চেয়ে অনেক সম্প্রসারিত। সম্পূর্ণ নতুন নকশার ভিত্তিতে এটিকে সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে লক্ষ লক্ষ মুসল্লীর নামাযের সুব্যবস্থা করা হয়েছে।
সংস্কার ও সম্প্রসারণ[সম্পাদনা] মদিনা মসজিদ বা মসজিদে নববী মুসলমান শাসকদের দ্বারা বহুবার সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। মুহাম্মদ (সা:) ওফাতের পর হযরত ওমর (রা:) ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মসজিদে রববীর সম্প্রসারণ করেন। তিনি মসজিদটি উত্তর দিকে ৩০ হাত, দক্ষিণ দিকে ১০ হাত, পশ্চিম দিকে ২০ হাত সম্প্রসারণ করেন। হযরত ওমর (রা:) এর সময় মসজিদের পরিমাণ দাঁড়ায় উত্তর-দক্ষিণে ১৪০ হাত, পূর্ব-পশ্চিমে ১২০ হাত। হযরত ওসমান (রা:) এর সময় ৬৪৬-৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে খেজুরপাতার পরিবর্তে ছাদে সেগুণ কাঠ ব্যবহার করা হয়। ছাদের আকার দাঁড়ায় ১৬০*১৩০ হাত। এ সময় সম্প্রসারিত হয়ে মসজিদের আকার দাঁড়ায় উত্তর দক্ষিণে ১৬০ হাত এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৫০ হাত। খলিফা আল ওয়ালিদের সময় মদিনা মসজিদটি আধুনিক ইমারতে পরিণত হয়। ওয়ালিদ ৭০৭ খ্রিস্টাব্দে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে মসজিদে নববীকে সাজিয়ে তোলেন। তাঁর সময় মসজিদে নববীর পরিমাপ দাঁড়ায় ২০০*২০০ হাত। ৭০৭ খ্রিস্টাব্দে সর্ব প্রথম মদিনা মসজিদের চারকোণে ৪টি মিনার নির্মাণ করেন আল ওয়ালিদ। তখন প্রতিটি মিনারের উচ্চতা ছিল ৫০ হাত এবং প্রস্থে ছিল ৮ হাত। খলিফা মাহদী ৭৭৫-৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি সম্প্রসারণ করেন ৩০০*৩০০ হাত। আর মামলুক সুলতান কয়েত-বে মসজিদে নববীতে গম্বুজ প্রতিষ্ঠিত করেন। এতে গম্বুজ করা হয় ১৪৮১ খ্রিষ্টাব্দে। গম্বুজ সবুজ রং-এর আস্তরণ দিয়েছিলেন ওসমানী সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে। বর্তমান আধুনিকায়নে মসজিদ-এ নববীর রূপদান করেন সৌদি বাদশাহ আব্দুল আজিজ ইবনে সউদ। এর পরিকল্পনা করা হয় ১৯৪৮ খ্রীস্টাব্দে। ১৯৫৩-১৯৫৫ সাল নাগাদ মসজিদ আধুনিকায়ন করা হয়। বিশালকার মসজিদে নববীর সমস্ত রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব সৌদি রাজ পরিবারের।
জিয়ারত[সম্পাদনা] ইসলামের বিধানানুযায়ী লক্ষ লক্ষ মুসলমান জিয়ারত করতে যান মদিনা মসজিদের অভ্যন্তরস্থ মুহাম্মদ (সা:)-এর রওজা শরীফ। মহানবীর রওজার দু’পাশে রয়েছে হযরত আবুবকর (রা:) ও হযরত ওসমান (রা:)-এর কবর। বিশেষ করে হজ্জ সম্পাদনের আগে বা পরে হাজীরা মসজিদে নববীতে একনাগাড়ে কমপক্ষে ৮ দিন অবস্থান করে নাগাড়ে ৪০ রাক্বাত নামায আদায় করেন।
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ
জন্ম কুলাইব বিন ইউসুফ
জুন ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ / ৪০ হিজরি
তাইফ, হেজাজ (বর্তমান সৌদি আরব)

মৃত্যু ৭১৪ (৫৩ বছর)
বংশোদ্ভূত আরব

পেশা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, প্রশাসক ও শিক্ষক
যে জন্য পরিচিত ইরাকের গভর্নর

ধর্ম ইসলাম

হাজ্জাজ বিন ইউসুফ (আরবি: الحجاج بن يوسف‎ al-Ḥajjāj bin Yūsuf}}) (জন্ম জুন ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ / ৪০ হিজরি – ৭১৪ খ্রিষ্টাব্দ / ৯৫ হিজরি) ছিলেন আরব প্রশাসক, রাজনীতিবিদ ও উমাইয়া খিলাফতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী।[১] হাজ্জাজ বুদ্ধিমান এবং কঠোর প্রকৃতির শাসক ছিলেন। তাকে কখনো পৈশাচিকভাবে বর্ণনা করা হলেও আধুনিক ইতিহাসবিদরা এতে পরবর্তীকালের আব্বাসীয় ইতিহাসবিদ ও জীবনীকারদের প্রভাব স্বীকার করেন। তারা উমাইয়া খিলাফতের প্রতি প্রবলভাবে অনুগত হাজ্জাজের বিরোধীতা করতেন।[১] সামরিক কমান্ডারদের বাছাইয়ের সময় হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কঠোর নীতি অবলম্বন করতেন। সৈনিকদের র‍্যাঙ্কের ক্ষেত্রে তিনি শৃঙ্খলা আরোপ করেন। এর পদক্ষেপ মুসলিম সাম্রাজ্যের দূর বিস্তৃতিতে সহায়ক হয়েছিল। তিনি সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল আরবিতে অনুবাদের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন এবং প্রথমবারের মত তিনি খলিফা আবদুল মালিককে মুসলিম বিশ্বের জন্য বিশেষ মুদ্রা চালুর ব্যাপারে রাজি করাতে সক্ষম হন। এর ফলে সম্রাট দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ানের অধীন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ৬৯২ সালে সেবাস্টোপলিসের যুদ্ধে লিওন্টিওস বাইজেন্টাইনদের নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধে বাইজেন্টাইনরা পরাজিত হয়।

হারুনুর রশিদ
হারুনুর রশিদ

হারুনুর রশিদের দরবারে শার্লে‌মাইনের দূতদের সাক্ষাত
৫ম আব্বাসীয় খলিফা
রাকার আব্বাসীয় খলিফা

সময়কাল ১৪ সেপ্টেম্বর ৭৮৬ – ২৪ মার্চ ৮০৯
পূর্বসূরী আল হাদি

উত্তরসূরী আল আমিন

দাম্পত্য সঙ্গী জুবাইদা

সন্তান
আল আমিন
আল মামুন
আল মুতাসিম
আল কাসিম ইবনে হারুনুর রশিদ
আবদান
সুকাইনা
রাজবংশ
আব্বাসীয়

পিতা আল মাহদি

মাতা আল খাইজুরান

জন্ম ৭৬৩
রাই, আব্বাসীয় খিলাফত

মৃত্যু ৮০৯
তুস, আব্বাসীয় খিলাফত

সমাধি তুস, আব্বাসীয় খিলাফত
হারুনুর রশিদ (আরবি: هارون الرشيد‎; Hārūn ar-Rashīd) (১৭ মার্চ ৭৬৩ বা ফেব্রুয়ারি ৭৬৬ — ২৪ মার্চ ৮০৯) ছিলেন পঞ্চম আব্বাসীয় খলিফা। কিছু সূত্র মতে তার জন্ম সাল ৭৬৩ থেকে ৭৬৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। তার পদবী “সঠিক”, “ন্যায়পরায়ণ” বা “সঠিকভাবে চালিত” অর্থে গ্রহণ করা হয়। হারুনুর রশিদ ৭৮৬ সাল থেকে ৮০৯ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। এসময় ইসলামি স্বর্ণযুগ তার সর্বোচ্চ সীমায় ছিল। তার শাসনকাল বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে সমৃদ্ধির কারণে খ্যাত। এসময় ইসলামি শিল্প ও সঙ্গীতের যথেষ্ট প্রসার হয়। তিনি বাগদাদের বিখ্যাত গ্রন্থাগার বাইতুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা করেন। তার শাসনামলে বাগদাদ জ্ঞান, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠে।[১] এসময় আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা বারমাকি পরিবারের ভূমিকা হ্রাস পেতে শুরু করে। ৭৯৬ সালে তিনি বর্তমান সিরিয়ার রাকা শহরে তার দরবার ও সরকারকে স্থানান্তর করেন।
হারুনুর রশিদ বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে সমৃদ্ধশালী হওয়ায় তার জীবন ও দরবার বিভিন্ন গল্পের উপাদানে পরিণত হয়েছে। এসবের মধ্যে কিছু বাস্তব তবে অধিকাংশই কাল্পনিক হিসেবে গণ্য করা হয়। বাস্তব ঘটনাবলীর মধ্যে অন্যতম হল শার্লেমাইনের কাছে ঘড়ি পাঠানোর ঘটনা। ৭৯৯ সালে হারুনুর রশিদের কাছে বন্ধুত্বের আহ্বান জানিয়ে পাঠানো ফ্রাঙ্কিশ দলকে বিদায়ী উপহার হিসেবে এটি দেয়া হয়েছিল। শার্লেমাইন ও তার লোকজন এই ঘড়ির শব্দ ও কার্যকলাপের কারণে একে জাদুবস্তু ভেবেছিলেন।[২] আরব্য রজনীতে হারুনুর রশিদ সম্পর্কে কাল্পনিক ঘটনাসমূহের উল্লেখ রয়েছে। এসব গল্প তিনি ও তার জৌলুসপূর্ণ দরবারের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে।[৩] শিয়া সম্প্রদায়ের কিছু ব্যক্তি সপ্তম শিয়া ইমাম মুসা ইবনে জাফরের হত্যার সাথে হারুনুর রশিদের সম্পর্কের কারণে তাকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখেন।