সোমবার , নভেম্বর ২০ ২০১৭ | ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Breaking News
Home / রাজনীতি / মুজিব ও তিরিশ লাখ শহীদঃ ভুল না আনুষঙ্গিক?

মুজিব ও তিরিশ লাখ শহীদঃ ভুল না আনুষঙ্গিক?

দেশের অর্ধেক মানুষ মনে করে একাত্তরে তিরিশ লক্ষ শহীদ অতিরঞ্জন।
কোন ভাবেই এত কম সময়ে এত বেশী মানুষ মেরে ফেলা সম্ভব না। মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা বড়জোর তিন লাখ, এমনকি কমও হতে পারে। আর মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা তিরিশ লক্ষ এই আষাঢ়ে গল্পের প্রবক্তা শেখ মুজিব। আর সেই আষাঢ়ে গল্পটা প্রথম মঞ্চস্থ হয় বাহাত্তরের আটই জানুয়ারি, মুজিব যখন পাকিস্তান থেকে লন্ডনে আসেন। সেখানে সাংবাদিকরা মুক্তিযুদ্ধে দেশের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জানতে চান। শেখ মুজিব এমনিতেই ভার্সিটি আউট স্টুডেন্ট ছিলেন, স্বাভাবিক ভাবেই ইংরেজী ভালো জানতেন না। তাই ভুল মৃতের সংখ্যা 3 Lac বলতে গিয়ে 3 Million বলে ফেলেন।

খুবই চমৎকার এবং যৌক্তিক থিউরি,
এই থিউরি সমাধানের জন্য সমস্যাটার কয়েকটা গুরুতর অংশ নিয়ে আমি প্রথমেই আলোচনা করবো।
আমার আজকের নিবন্ধের উদ্দেশ্য এটা নিরূপণ করা নয় মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত। সেই কাজটি বহু আগেই দেশের প্রচুর মুক্তিযুদ্ধ গবেষকেরা করে গেছেন সুনিপুণ ভাবেই। আপনারা চাইলে মুক্তমনায় ব্লগার যুঞ্চিক্তরের কালজয়ী লেখা ‘ত্রিশ লক্ষ শহীদ : মিথ নাকি বাস্তবতা’ আর্টিকেলটি পড়ে দেখতে পারেন, আমি নিশ্চিত এই লেখা আপনাদের নতুন করে চিন্তার খোরাক জোগাবে। এরপর পড়ে দেখতে পারেন ব্লগার তারিক লিংকনের লেখা ‘বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, প্রসঙ্গঃ ৩০ লাখ বাঙালী হত্যার আইকনিক মিথ’।
তবে সত্য মিথ্যা যাই হোক আমার আজকের উদ্দেশ্য এটা খুঁজে বের করা মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা তিরিশ লক্ষ এই গল্পের প্রথম প্রবক্তা কি সত্যিই শেখ মুজিব কি না।
যদি ধরে নেই একাত্তরে তিরিশ লক্ষ মানুষের শহীদ হওয়াটা একান্তই মুজিব সাহেবের মস্তিষ্ক প্রসূত, আসল সংখ্যাটা তিন লাখ। তাহলে প্রথমেই জেনে নেওয়া দরকার মুক্তিযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে এই তিন লাখ ফিগারটিই বা আসলো কোথা থেকে। তিরিশ লাখ আগে এসেছে নাকি তিন লাখ। এছাড়া আর কোন ফিগার কি আছে।
একটু ঘটাঘাটি করতেই সত্য বেরিয়ে এলো। একাত্তর সালেই মুক্তিযুদ্ধের প্রথম লগ্নে অর্থাৎ মার্চে পাকিস্তানে জেনারেল ইয়াহিয়া খান সদম্ভে বলেছিলেন,
“ওদের ত্রিশ লক্ষ হত্যা কর, বাকীরা আমাদের থাবার মধ্যে থেকেই নিঃশেষ হবে।”
Robert Payne, Massacre, The Tragedy of Bangladesh and the Phenomenon of Mass Slaughter Throughout History; P:50; New York, Macmillan, 1973
সত্যি বলতে, দেখা যাচ্ছে প্রথম ভুলটা ছিলো জেনারেল ইয়াহিয়া খানের তিনিই সম্ভবত তিন লাখ বলতে গিয়ে তিরিশ লাখ বলে ফেলেছিলেন। কিন্তু তিনিই শেষ না; মাওলানা ভাষানি যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়েই দশ লক্ষ হত্যাকাণ্ডের কথা বলেছিলেন।
কবি আসাদ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময় লিখেছেন তার শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘বারবারা বিডলারকে’ তার কয়েকটা লাইন তুলে দেই;
“তোমাদের কাগজে নিশ্চয়ই ইয়াহিয়া খাঁর ছবি ছাপা হয়-
বিবেকের বোতামগুলো খুলে হৃদয় দিয়ে দেখো;
ওটা একটা জল্লাদের ছবি।
পনেরো লক্ষ নিরস্ত্র লোককে ঠাণ্ডা মাথায় সে হত্যা করেছে…”
আমার মনে হয় কবি আসাদ চৌধুরী সম্ভবত পনেরো হাজার বলতে গিয়ে বলেছিলেন পনেরো লক্ষ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হতো ‘চরমপত্র’। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিলো এম আর আখতার মুকুল রচিত ও উপস্থাপিত চরমপত্র।
‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠানটি স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র চালু হওয়ার দিন ২৫শে মে থেকে শুরু করে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দিন পর্যন্ত প্রতিদিন প্রচারিত হয়েছে। ‘চরমপত্র’ – এর প্রতিটি অধ্যায় রচনা ও পাঠ করেন এম আর আখতার মুকুল। ‘চরমপত্র’ ছিল ব্যাঙ্গাত্মক ও শ্লেষাত্মক মন্তব্যে ভরপুর একটি অনুষ্ঠান মূলত এটা ছিলো খবরের অনুষ্ঠান। মানসম্মত রেকর্ডিং স্টুডিওর অভাবে টেপ রেকর্ডারে ‘চরমপত্র’ রেকর্ডিং করা হতো এবং ৮-১০ মিনিটের এই টেপ নিয়মিতভাবে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের ট্রান্সমিটার থেকে প্রচারিত হতো। ‘চরমপত্র’ – এর প্রতিটি অনুষ্ঠানের রচনা ও ব্রডকাস্টিং-এর জন্য এম আর আখতার মুকুল এর পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয়েছিল ৭ টাকা ২৫ পয়সা।
চরমপত্রের শেষ প্রচার দিবস অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বরের কিছু অংশ সরাসরি তুলে দিচ্ছি;
…২৫ শা মার্চ তারিখে সেনাপতি ইয়াহিয়া খান বাঙ্গালিগো বেশুমার মার্ডার করনের অর্ডার দিয়া কি চোটপাট! জেনারেল টিক্কা খান সেই অর্ডার পাইয়া ৩০ লাখ বাঙ্গালির খুন দিয়া গোসল করলো। তারপর বঙ্গাল মুলুকের খাল-খন্দক, দরিয়া-পাহাড়, গেরাম-বন্দরের মইদ্দে তৈরি হইলো বিচ্ছু…
(চরমপত্র; পৃঃ৩২৫)
সাংবাদিক এন্থনি মাসকারেনহাস মুক্তিযুদ্ধের সময়ই লিখেছিলেন “আশি লক্ষ মানুষ কেন মারা যাবে”।যেই আর্টিকেল পরবর্তীতে তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্যা রেইপ অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়। দৈনিক পূর্বদেশের সম্পাদক তার পত্রিকায় ২২.১২.১৯৭১ তারিখে “ইয়াহইয়া জান্তার ফাঁসি দাও” শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় লেখে। সেখানে পরিস্কার লেখা হয়,
“হানাদার দুশমন বাহিনী বাংলাদেশের প্রায় ৩০ লাখ নিরীহ লোক ও দু’শতাধিক বুদ্ধিজীবিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে…”
এটা প্রকাশিত হয় কিন্তু বাহাত্তরের আগে, অর্থাৎ মুজিব দেশে আসারও আঠারো দিন আগের কথা। তখনও দেশের সবখান থেকে পাকিস্তানী শত্রুমুক্ত হইনি আমরা।
এরপর আন্তর্জাতিক মহলে আসি; রাশিয়ার কমিউনিষ্ট পার্টির মুখপত্র “প্রাভদা পত্রিকা” ডিসেম্বরেই ৩০ লক্ষ শহীদের বিষয়টি তাদের পত্রিকায় প্রকাশ করে। তাদের পত্রিকায় দেখা যায়;

“over 30 lakh persons were killed throughout Bangladesh by the Pakistani occupation forces during the last nine months”।
ঢাকার পত্রিকা দৈনিক অবজারভার শিরোনাম করে এভাবে, Pak Army Killed over 30Lakh people” যেটা প্রকাশিত হয় ০৫.০১.১৯৭২ তারিখে মুজিব দেশে আসার ৩ দিন আগে।
লেখার শুরুতেই বলেছিলাম এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধের ক্ষয় ক্ষতি চুলচেরা পরিমাপ নয় বরং এটা অনুসন্ধান করা যে শহীদের সংখ্যা তিরিশ লক্ষ এই আষাঢ়ে গল্পের প্রবক্তা কি আসলেই শেখ মুজিব কি না। ফ্যক্টস এন্ড ডকুমেন্টস যাচাই করে এই পর্যন্ত পড়ে আসা যেকোন একজন সুস্থ মস্তিস্কের মানুষ নিশ্চয়ই মেনে নিতে বাধ্য হবেন তিরিশ লাখ ফিগারটা মুজিবের মাথায় হঠাৎ করে আসেনি। মুজিব জেলে থাকতে থাকতেই সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে এই সত্য পৌঁছে গিয়েছিলো।
জাতির জনকের প্রয়াণ দিবসে আজ অন্তত তাকে একটা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেই…

হামিদুর রহমান কমিশনের কাছে নিয়াজী জানিয়েছিল ১৫ লাখের মত মানুষ মারা গেছে। কমিশনের কাছে নিয়াজী সংখ্যাটা কমাবে যৌক্তিকভাবেই। এত কম সময়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ হত্যার দায় সে নিবে না। তবু নিয়াজীর কথাকেই মেনে নিলে সংখ্যাটা ৩ লাখ হয় না। জামাতের প্রচারণা এতটাই শক্তিশালী হয় যে পরে সেটা গোটা দেশের উপর প্রভাবিত হয়। এই ৩ লাখ “যুক্তি” দেখেছি অনেক মুক্তযুদ্ধ পক্ষের মানুষও গিলেছে। …আরিফকে অনেক ধন্যবাদ এই বিষয়ে লেখাটা লেখার জন্য। তবে আরো যুক্তি ও প্রমাণ দেখানোর প্রয়োজন ছিল। ৩০ লাখের বাস্তবতা বিস্তারিত দরকার ছিল।
দাদা আমি মোটেও তিরিশ লাখ শহীদ প্রমাণ করার চেষ্টা করি নাই,
আমি শুধু দেখাইসি মুজিব দেশে আসার আগেই বিভিন্ন সোর্সে তিরিশ লাখ শব্দটা ছিলো। এটা মুজিবের মাথা থেকে আসে নাই…
এটুকুই…
খুবই প্রয়োজনীয় লেখা!
আমার দীর্ঘদিনের জমানো প্রশ্নের উত্তর অবশেষে মিলল।
আর কেউ না যেন লেখাটাকে তিরিশ লাখ হত্যার প্রমানিক উৎস হিসেবে চিন্তা করেন; আসলে লেখাটি মুজিবের বিরুদ্ধে চালানো একটি প্রপাগান্ডার উত্তর দিতেই করা হয়েছে।
যুঞ্চিক্তর ও তারিক লিংকনকেও ধন্যবাদ তাদের কাজের জন্য।
মুজিবকে একটা গোষ্ঠি প্রায়ই হাল্কা করতে চায় তার পড়াশুনোর কথা বলে, কিন্তু মুজিব গাঁয়ের ছেলে হয়েও যে হয়ে উঠলেন জাতীয় নেতা, এমনকি পিছে ফেলে দিলেন ভাসানির মত নেতাদের, যে মুজিব প্রায় একক প্রচেষ্টায় অসম্ভব সম্ভব করলেন, যে জনগোষ্ঠি উজাড় করে ভোট দিয়েছিল পাকিস্তান পেতে, তাদেরকেই এমন টানলেন যে, ভোট বাক্স উপচে দিল ছয় দফার পক্ষে, তারাই ঝাঁপিয়ে পড়ল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের কবর রচনা করে, দ্বিজাতিতত্ত্বের কফিনে শেষ পেরকেটি ঠুকে। সুতরাং, এই মুজিব যতটুকু স্বশিক্ষিত ছিলেন, তার ধারে কাছেও যাওয়া সম্ভব এমনকি আমাদের দেশের অনেক বড় বড় পন্ডিতবর্গের পক্ষে???
দারুন যুক্তি আর তথ্যসূত্র। আর্কাইভ করে রাখবার মত আরো একটি লেখা। এগুলো কস্ট করে একসাথে করে লিখে দেবার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
যুঞ্চিক্তরের কালজয়ী লেখা ‘ত্রিশ লক্ষ শহীদ : মিথ নাকি বাস্তবতা’
এই লিঙ্কটা সহজে পড়বার জন্য লিঙ্ক হিসেবে ‘যুঞ্চিক্তরের কালজয়ী লেখা ‘ত্রিশ লক্ষ শহীদ : মিথ নাকি বাস্তবতা’ সম্পর্কিত করে দিলে ভালো হত মনে হয়। লিঙ্কটা:

চমৎকার হয়ছে, খুবই প্রয়োজনীয় লেখা । – ধ ;-( ন্যবাদ
৭১ এ পাক -বাহিনী কত মানুষ কে হত্যা করেছে এ সংখ্যাটা যাই হোক না কেন সব কটা সংখ্যাই অনুমান নির্ভর। এটি যাচাই করা হয়নি কখনো, তাই সংখ্যাটা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে।
৭১ এ যারা শহীদ হয়েছে তারা সাবাই ছিল এদেশের স্হায়ী অধিবাসী তাদের সবারই শিখর প্রথিত আছে এ দেশের মাটিতে । তাদের সঠিক সংখ্যা নির্নয় করা কি খুব কঠিন কাজ ছিল ?
বিগত ৪২ বছরে স্বাধীন দেশের সরকার গুলো কয়টা শহীদ পরিবারের খোজ করেছে ? কত জন বীরঙ্গনা কে পুর্ণবাসিত করেছে ? পাক -বাহিনী ৭১ এ কত লোককে হত্যা করেছে এটা যতটা না গরুত্বপুর্ণ তার চেয়ে আনেক বেশী গরুত্বপুর্ণ ছিল একটি বড় ফিগার যা বলতে ভাল লাগে ।
বাস্তবতা হচ্ছে এ দেশে এটাই ঘটেছে, এমন দঃখজনক বিষয়টা পরবর্তিতে গর্ভ করে বলার বিষয়ে পরিনত হয়েছে ।
সত্যি কথা হচ্ছে ৭১ এ কত জন শহীদ হয়ছে এর সঠিক সংখ্যা কখনও জানা যাবে না ।
লেখাটা খুবই ভাল লাগল। লিখিত দলিল সমাবেশে এত সহজ ভাবে বিষয়টির উপর আলোকপাত করা হয়েছে, আগে কেউ এভাবে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করেনি কেন ভেবে অবাক লাগছে। নিন্দুকদের মুখে নিপুন ভাবে চুনকালি মাখানো হলো এবার…।।
বাঙালি জাতির প্রতিনিধি হিসাবে শেখ মুজিব সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ মিথ্যাচার করেছেন এই ৩০ লক্ষ শহীদ বলে । পাহাড়ের সেটলার গন শান্তি বাহিনীর হাতে নিহত সেটলারের সংখ্যাও চট করে ত্রিশ হাজার বলে চালিয়ে দেয় ,তাইতো বলি বাংলায় ১০০ পর্যন্ত সংখ্যা থাকতে বাঙালি ত্রিশ এত ভালবাসে কেন ?
দেশের এক শ্রেনীর বুদ্ধিজীবির মাঝে মুজিবোফোবিয়া চরম আকার ধারক করেছে,মুজিবের কোনই কৃতিত্ব কোথাওই নেই, মুজিব ৭১ এর ফেক হিরো……উল্টা খালি গ্যাঞ্জাম বাধিয়েই গেছেন।
আরেক দিকে চলে বংগবন্ধুকে নবী ফেরেশতার কাতারে তুলে ফেলার প্রবনতা। দুয়ের প্রকোপে বস্তনিষ্ঠ আলোচনার পথ বন্ধ।

তিরিশ লক্ষ শহীদ, বাহুল্য নাকি বাস্তবতাঃ যুদ্ধকালীন নারী নির্যাতন; সূচনা পর্ব
1.
প্রারম্ভিকাঃ
প্রথমেই একটা বিষয়ে আলোকপাত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি, আর সেটা হচ্ছে ‘মুক্তিযুদ্ধে বড় পরিসরে ধর্ষণ হয়েছে’ এই উক্তিটি কি সর্বমহলে সমান গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে কি না, না পেয়ে থাকলে কেন পায়নি। এর বিপরীতে কি কি বক্তব্য এসেছে, কেন এসেছে এবং সেইসব বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতাই বা কতটুকু।
যুদ্ধ মাত্রই ধর্ষণ, সম্ভবত পৃথিবীতে বড় পরিসরে ঘটে যাওয়া এমন একটি যুদ্ধও পাওয়া যাবে না যেখানে কোন ধর্ষণ হয়নি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও প্রচুর ধর্ষণ হয়েছে বলেই আমরা দাবী করা হয়ে, বাংলাদেশ সরকারের হিসেবে সংখ্যাটা প্রায় দুই লাখ বিবেচনা করা হলেও প্রকৃত সংখ্যাটা এরচেয়ে অনেক বেশী হতে পারে কিংবা কমও হতে পারে। প্রকৃত সংখ্যা আসলে কত হতে পারে এ নিয়ে এই নিবন্ধের পরবর্তী পর্বগুলোতে বড় পরিসরে আলোচনা করা হবে। পক্ষে বিপক্ষের সমস্ত ডাটা থেকে আমরা বের করে আনার চেষ্টা করবো মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের প্রকৃত পরিসংখ্যান। কাজটা আমাদের জন্য খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না কারণ এই ঘটনার ভিকটিম আমরা নিজেরাই, আমাদের মা-বোনেরাই। তবুও আমরা চেষ্টা করবো সর্বোচ্চ নির্মোহ থাকার, চেষ্টা করবো আসল সত্যটাকে তুলে আনার। ব্যাপারটা অনেকটা চল্লিশ বছর পর বধ্যভুমি থেকে লাশ গোনার প্রচেষ্টাও বলা যেতে পারে, কিন্তু আমরা নিরুপায়। সময়ের প্রয়োজনে আজ এটা করা অনিবার্য।

এ বিষয়ে আমাদের কাজ সহজ করে দিয়েছেন একজন মানুষ, তার নাম শর্মিলা বসু। বসু একজন ভারতীয় বংশোদ্ভুত আমেরিকান, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের একজন সিনিয়র গবেষণা সহযোগী । ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ওপর বড় পরিসরে লেখা তাঁর বই “ডেড রেকনিং: ১৯৭১ এর বাংলাদেশ যুদ্ধের স্মৃতি” দেশে বিদেশে ব্যাপক আলোচনার রসদ যুগিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্মরণকালের সবচেয়ে বিতর্কিত বই হিসেবে এটি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এছাড়া Economic and Political Weekly এর September 22, 2007 সংখ্যায় “Losing the Victims: Problems of Using Women as Weapons in Recounting the Bangladesh War” প্রবন্ধেও ৭১ সালে সংগঠিত যুদ্ধে নারীদের ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে। এ ছাড়াও শর্মিলা বোসের লেখেন “Anatomy of Violence: Analysis of Civil War in East Pakistan in 1971″ (EPW, Oct 8, 2005)। নিবন্ধটির প্রথম সংস্করণ ডঃ বোস ২০০৫ সালের ২৮-২৯ জুন যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দফতরের ইতিহাস বিভাগ আয়োজিত দুই দিন ব্যাপী এক সম্মেলনে উপস্থাপন করেন। সম্মেলনের শিরোনাম ছিল “ সংকটে দক্ষিণ এশিয়াঃ যুক্তরাষ্ট্রের নীতি, ১৯৬১-১৯৭২” ।
প্রথমেই বলে নিচ্ছি এই প্রবন্ধে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বোসের সমস্ত লেখনীর ওপর আলোকপাত করা হবে না, শুধুমাত্র ৭১ সালে সংগঠিত যুদ্ধে নারী নির্যাতন সম্পর্কে তাঁর গবেষণার দিকেই আমরা দৃষ্টিপাত করবো।
যুদ্ধ নিয়ে জয়ী অংশের একটা গল্প থাকে, পরাজিতদেরও একটা গল্প থাকে। আর স্বাভাবিক ভাবেই দুটো গল্পে পরস্পরকে দোষারোপ করা হয়। দুটো গল্পেই থাকতে পারে অনেক ভুল তথ্য , অনেক মিথ্যাচার। কিন্তু অনেক অনেক বছর পর যখন ইতিহাস লেখা হয় তখন সব গল্পের জট খুলে সত্যটা ঠিকই বের হয়ে আসে। এটাই স্বাভাবিক।
এখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন হতে পারে কেন এই প্রবন্ধে শর্মিলা বসুকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, অন্য কেউ নয় কেন। অনেকেই তো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন।
উত্তরটা অতি সহজ, ওয়াশিংটনের একটি কনফারেন্সে শর্মিলা বোসের নিবন্ধ উত্থাপিত হবার পরপরই পাকিস্তানী বিভিন্নপত্র-পত্রিকাগুলোয় আবার মুক্তিযুদ্ধের ইস্যু গুলো নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়। ত্বরিত এ বিষয়ে লেখা ছাপা হয় দ্য ডেইলি টাইমস (হাসান, জুন ৩০, ২০০৫; সম্পাদকীয় জুলাই ২, ২০০৫) এবং ডন (ইকবাল, জুলাই ৭, ২০০৫) এর মত প্রভাবশালী পত্রিকায়। দু’টো পত্রিকাই বোসের বরাত দিয়ে উল্লেখ করে- বাংলাদেশের যুদ্ধে কোন ধর্ষণের ঘটনা ঘটে নি।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে পাকিস্তানী জেনারেলদের অনেকেই লিখেছেন। যারা পড়েছেন তারা জানেন এসব বইয়ের প্রায় সবটাই মিথ্যাচারে ভরপুর, এদিকে বাংলাদেশেও অনেক গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে নির্মোহভাবে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য উপাত্ত যাচাই করতে আমাদের সবচেয়ে বেশী সাহায্য করেছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া। পাকিস্তানী বাহিনীর রক্তচক্ষুর ভেতর দিয়েও মুক্তিযুদ্ধ আর গনহত্যার সমস্ত খবরা খবর বিশ্বময় পৌঁছে যায় এসব পত্রিকার মধ্যে দিয়ে। পৃথিবীর বড় অংশের জানতে পারে পাকিস্তানিদের নির্মমতার কথা। সারা পৃথিবীর জনমত চলে আসে বাঙালীদের পক্ষে। আর এইসব খবরাখবর সরবরাহ করেন যেসব সাংবাদিক এবং বিদেশী পর্যবেক্ষক তারা ঘটনাগুলো নিরপেক্ষ এবং নির্মোহভাবেই লিখেছেন। এইসব টেলিভিশন আর সংবাদপত্রের প্রচারণার কারণেই মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলী পাকিস্তানিদের নির্মমতা পৃথিবীর মানুষদের কাছে পরিস্কার। বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষরা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে ঘৃণা করে। কিন্তু অন্য দিকে পাকিস্তান তাদের পক্ষে কোন গ্রহণযোগ্য ইতিহাসকেই তারা দাঁড় করাতে পারেনি। যদিও পাকিস্তানের বিভিন্ন স্কুল কলেজের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক গুলোতে তারা নিয়মিত মিথ্যাচারিতা, বাংলাদেশীদের প্রতি বিনা কারণে বিদ্বেষে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশের পাঠ্যবইতে নিয়মমাফিক পাকবাহিনীর নির্মমতার কথাই বলা আছে, কখনোই বিনা কারণে পাকিস্তানের সাধারন নাগরিকদের প্রতি কোন হিংসার বানী নেই।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তানী জেনারেলদের বই গুলো খাপছাড়া। এসব বইতে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার সাথে সাথে স্ব-গোত্রীয়দের বিরোধিতা করেছে। সেনাবাহিনী পরাজয়ের জন্য দায়ী করেছে রাজনীতিবিদদের। পলিটিশিয়ানরা দায়ী করেছে সেনাবাহিনীকে। যুদ্ধকালীন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল আরেকজন জেনারেলকে দায়ী করে লিখেছে প্রচুর। ফলশ্রুতিতে পুরো পাকিস্তানী সেনাবাহিনী মিলে এমন একটা গ্রন্থ গ্রন্থনা করতে পারেনি যেখানে সমস্ত খুন-ধর্ষণ-গনহত্যা-লুটপাটের দায়মুক্তি পাবে তারা। একক ভাবে বাঙালীদের দায়ী করে একটা বই তারা আসলেই লিখতে পারেনি। তাদের এই শূন্যতাকে পূরণ করেছেন শর্মিলা বসু তার”ডেড রেকনিং: ১৯৭১ এর বাংলাদেশ যুদ্ধের স্মৃতি” বই এবং তাঁর বিভিন্ন গবেষণা নিবন্ধের মাধ্যমে।

গুরুতর অভিযোগঃ
শর্মিলা বসুর “Losing the Victims: Problems of Using Women as Weapons in Recounting the Bangladesh War” প্রবন্ধে করা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক।
১)শর্মিলা লিখেছেন “মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর বলছে ‘পঁচিশে মার্চ থেকে ষোলই ডিসেম্বরের মধ্যে তিরিশ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে, দুই লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং এক কোটিকে হতে হয়েছে শরণার্থী। এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঘটে যাওয়া সবচেয়ে জঘন্যতম গনহত্যা’
মাত্র ৩৪,০০০ সদস্যের একটি সেনা বাহিনীর পক্ষে আট থেকে নয় মাসের মধ্যে এই মাত্রায় ধর্ষণ করতে হলে প্রত্যেককে ধর্ষণে লিপ্ত হতে হবে এবং প্রত্যেককে অবিশ্বাস্য সংখ্যক ধর্ষণ করতে হবে।”
[Losing the Victims: Problems of Using Women as Weapons in Recounting the Bangladesh War. P-3865] ২) শর্মিলা জেনারেল নিয়াজীর যুদ্ধাবস্থায় (১৫ এপ্রিল ১৯৭১) দেয়া এক নির্দেশনার বরাত দিয়ে বলেছেন ‘যুদ্ধে কিছু ধর্ষণ হতেই পারে, তবে আমি আশা করবো আমার সৈনিকেরা সবধরনে লুট, ডাকাতি এবং অসদ আচরণ থেকে বিরত থাকবে। যদি এ ধরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত মূলক ব্যাবস্থা নেয়া হবে।’
[Losing the Victims: Problems of Using Women as Weapons in Recounting the Bangladesh War. P-3866] ৩)শর্মিলা লিখেছেন, বাংলাদেশে পাকিস্তানী হত্যাকান্ডের চাক্ষুস সাক্ষীদের সাথে সরাসরি কথা বলে আমি জানতে পেরেছি পাক বাহিনী সবসময় পুরুষদের টার্গেট করতো। মহিলাদের সবসময়ই আলাদা করে ছেড়ে দেয়া হত। কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ত ঘটতে পারে তবে এত বড় স্কেলে ধর্ষণ অসম্ভব। হত্যাকান্ডের সময় কখনই নারীদের হত্যা করা হয় নাই, কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে থাকলে সেসব ছিলো ক্রস ফায়ার
[Losing the Victims: Problems of Using Women as Weapons in Recounting the Bangladesh War. P-3866] ৪)শর্মিলা লিখেছেন; আমার কাছে যে তথ্য প্রমাণ আছে সেটা থেকে বলতে পারি ৭১এ কিছু ধর্ষণ হয়েছে কিন্তু সংখ্যাটা কখনোই হাজার হাজার কিংবা লক্ষ লক্ষ নয়।
ধর্ষিতাদের মধ্যে ছিলো হিন্দু এবং মুসলিম, বাঙালী, বিহারী এবং পশ্চিম পাকিস্তানী। আর ধর্ষণ করেছিলো বাঙালীরা, বিহারীরা, পশ্চিম পাকিস্তানিরা এবং আর্মি অফিসারেরা। অনেক অবাঙালীদের ধর্ষণের পর হত্যা করে বাঙালিরা।
[Losing the Victims: Problems of Using Women as Weapons in Recounting the Bangladesh War. P-3870] ৫)শর্মিলা লিখেছেন, তখনকার কিছু জুনিয়ার অফিসারের সাথে কথা বলে আমি জেনেছি যে কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং তাদের শাস্তিও দেয়া হয়েছে আর্মিদের বিধান অনুযায়ী। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের জেলও হয়েছে। কিছু বিচ্ছিন্ন ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও এত বড় স্কেলে ধর্ষণ কখনই ঘটেনি।
[Losing the Victims: Problems of Using Women as Weapons in Recounting the Bangladesh War. P-3866] ৬)ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী সম্পর্কে লিখেছেন-
পাকিস্তানিদের কর্তৃক কথিত ধর্ষণের পরেও তিনি তার পরিবারে কাছে পালিয়ে চলে যান নি, বরং অফিস করেছেন। ফেরদৌসী সেই সময় বন্দী ছিলেন না। বাসায় থাকতেন, অফিসে যেতেন, এমনকি ইচ্ছে হলে যশোর ক্যান্টনমেন্টে ঘুরে আসতেন। সেনারা তাকে সিনেমায় নিয়ে যেত, জেনারেল ম্যানেজারের বাসায় ডিনারে আমন্ত্রণ করতো, ফোন করতো…
[Losing the Victims: Problems of Using Women as Weapons in Recounting the Bangladesh War. P-3867] এই পুরো প্রবন্ধ জুড়ে শর্মিলা বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন কয়েকটি পয়েন্ট।
* পাক সেনাদের হাতে ধর্ষণ একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা
* ধর্ষণ হয়েছে কিন্তু সংখ্যা খুবই কম।
* পাকিস্তানীদের পাশাপাশি অনেক বাঙালীও ধর্ষণ করেছিলো।
* অনেক বাঙালী নারী সেনাবাহিনীকে মনরঞ্জন করতে সম্মত ছিলো।
এরপর তিনি তার মনমত কিছু কেস স্টাডি দেখান। ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণীর ঘটনাও তার মধ্যে অন্যতম। সবগুলো সম্পর্কেই বিস্তারিত আলোচনা করা হবে সামনের পর্বগুলোতে। কিন্তু সবার আগে একটা জিনিস পরিস্কার করা দরকার আর সেটা হচ্ছে
পাকিস্তানীদের হাতে ধর্ষণগুলো কি নিতান্তই বিচ্ছিন্ন ঘটনা, না কি তাদের কোন সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিলো।

ঈমানী দায়িত্বঃ
স্বাধীনতার পর ধর্ষিতা বাঙালী মহিলাদের চিকিৎসায় নিয়োজিত অষ্ট্রেলিয় ডাক্তার জেফ্রি ডেভিস গনধর্ষনের ভয়াবহ মাত্রা দেখে হতবাক হয়ে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে আটক পাক অফিসারকে জেরা করেছিলেন যে তারা কিভাবে এমন ঘৃণ্য কাজ-কারবার করেছিলো। অষ্ট্রেলিয় চিকিৎসক বিচলিত হলেও পাক অফিসারদের সাচ্চা ধার্মিক হৃদয়ে কোন রকম রেখাপাত ঘটেনি। তাদের সরল জবাব ছিলো,
“আমাদের কাছে টিক্কা খানের নির্দেশনা ছিলো যে একজন ভালো মুসলমান কখনই তার বাবার সাথে যুদ্ধ করবে না। তাই আমাদের যত বেশী সম্ভব বাঙালী মেয়েদের গর্ভবতী করে যেতে হবে।”
“We had orders from Tikka Khan to the effect that a good Muslim will fight anybody except his father. So what we had to do was to impregnate as many Bengali women as we could.”
ধর্ষণে লিপ্ত এক পাকিস্তানী মেজর তার বন্ধুকে চিঠি লিখেছে;
“আমাদের এসব উশৃঙ্খল মেয়েদের পরিবর্তন করতে হবে যাতে এদের পরবর্তী প্রজন্মে পরিবর্তন আসে, তারা যেন হয়ে ওঠে ভালো মুসলিম এবং ভালো পাকিস্তানী”
“We must tame the Bengali tigress and change the next generation Change to better Muslims and Pakistanis”
উপরের ঘটনা দুটো প্রচণ্ড তাৎপর্যপূর্ণ। এটা শুধুমাত্র নিম্নপদস্থ সৈনিকদের মানসিকতার প্রতিনিধিত্ব করছে। আর উচ্চপদস্থ অফিসারদের অবস্থা তো আর ভয়াবহ।
একাত্তরের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানের সকল ডিভিশান কমান্ডারের কনফারেন্সে এক অফিসার তুলেছিলেন পাকিস্তানী সেনা কর্তৃক বাঙ্গালী নারীদের ধর্ষনের প্রসঙ্গ । নিয়াজী তখন সেই অফিসারকে বলেন, “আমরা যুদ্ধের মধ্যে আছি। যুদ্ধক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিও।” তারপর তিনি হেসে বলেন, “ভালই তো এসব বাঙ্গালী রক্তে পাঞ্জাবী রক্ত মিশিয়ে তাদের জাত উন্নত করে দাও।”
আর এই ধর্ষণের পক্ষে তিনি যুক্তি দিয়ে বলতেন,
“আপনারা কি ভাবে আশা করেন একজন সৈন্য থাকবে,যুদ্ধ করবে, মারা যাবে পূর্ব পাকিস্তানে এবং যৌন ক্ষুধা মেঠাতে যাবে ঝিলমে?”
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার আবদুল রহমান সিদ্দিকী তার East Pakistan The EndGame বইতে আরও লেখেন,
“নিয়াজী জওয়ানদের অসৈনিকসুলভ, অনৈতিক এবং কামাশক্তিমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতেন। ‘গত রাতে তোমার অর্জন কি শেরা (বাঘ)?’ চোখে শয়তানের দীপ্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করতেন তিনি। অর্জন বলতে তিনি ধর্ষণকে বোঝাতেন।
পাকিস্তানী জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা “অ্যা স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি” বইতে লিখেছেন, নিয়াজী ধর্ষণে তার সেনাদের এতই চাপ দিতেন যে তা সামলে উঠতে না পেরে এক বাঙালি সেনা অফিসার নিজে আত্মহত্যা করতে বসেন।
এখানেই শেষ নয়।
ধর্ষণের অবিচ্ছিন্নতা প্রমাণের জন্য রয়েছে কিছু প্রামাণ্য ছবি,

“বেগ সাহেবের জন্য ভালো মাল পাঠাবেন। রোজ অন্তত একটা।” মাল বলতে এখানে বাঙালী মেয়েদের কথা বলা হয়েছে।
শর্মিলা বসু বারবার বলেছেন, পরিকল্পিত ধর্ষণ হয়নি, যা হয়েছে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বীভৎস নির্যাতনর ব্যাপারটি সতর্কভাবে এড়িয়ে গেছেন শর্মিলা। এটিকে কি শর্মিলার opportunistic rape মনে হয়?

পাকিস্তানি হেরেম থেকে চার হাজার বাঙালি মেয়েকে পাওয়া নিশ্চয়ই বিচ্ছিন্ন ঘটনা শর্মিলা বসুর কাছে।
সিলেটের শালুটিকরে পাকিস্তানী ক্যাম্পের দেয়ালে ঐ নরপশুদের আঁকা কয়েকটি ছবির দিকে দৃষ্টিপাত করছি।

এর থেকে বড় প্রমাণ বোধহয় আর হয় না

আমাদের প্রতি নিঃসংশতার প্রামাণ্য দলিল

এবারে দৃষ্টিপাত করি আরও কিছু ঘটনার দিকে,
ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির গ্রন্থ “যুদ্ধ ও নারী”তে উঠে আসে অনেক তথ্য যা পাঠকদের নিঃসন্দেহে আগ্রহ জোগাবে

“যুদ্ধ শেষে ক্যাম্প থেকে কয়েকটি কাঁচের জার উদ্ধার করা হয়,যার মধ্যে ফরমালিনে সংরক্ষিত ছিল মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অংশ। অংশগুলো কাটা হয়ে ছিল খুব নিখুঁতভাবে।”
– ডাঃ বিকাশ চক্রবর্তী, খুলনা

“আমাদের সংস্থায় আসা ধর্ষিত নারীদের প্রায় সবারই ছিল ক্ষত-বিক্ষত যৌনাঙ্গ। বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ছিড়ে ফেলা রক্তাক্ত যোনিপথ, দাঁত দিয়ে ছিড়ে ফেলা স্তন, বেয়োনেট দিয়ে কেটে ফেলা স্তন-উরু এবং পশ্চাৎদেশে ছুরির আঘাত নিয়ে নারীরা পুনর্বাসন কেন্দ্রে আসতো।”
-মালেকা খান, যুদ্ধের পর পুনর্বাসন সংস্থায় ধর্ষিতাদের নিবন্ধীকরণে যুক্ত সমাজকর্মী।

“কোনো কোনো মেয়েকে পাকসেনারা এক রাতে ৮০ বারও ধর্ষণ করেছে।”
-সুসান ব্রাউনি মিলার (এগেইনেস্ট আওয়ার উইল: ম্যান, উইম্যান এন্ড রেপঃ ৮৩)

এই সব খণ্ড খণ্ড জবানবন্দী এই কথাই প্রমাণ করে যে মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষণ সাধারন কোন যুদ্ধের ধর্ষণ নয়। এটা পাক বাহিনী শুধুই প্লেজারের জন্য করে নাই, তারা এটা করেছে দায়িত্ব বোধ থেকে। শুধু প্লেজারের জন্য বেয়নেট দিয়ে যোনি পথ খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করতে হয় নয়া, দাঁত দিয়ে স্তন ছিঁড়ে ফেলতে হয় না, দু দিক থেকে পা টেনে চিঁরে ফেলতে হয় না, একজনকে আশিবার ধর্ষণ করতে হয় না।
খুলনার একটি ক্যাম্প থেকে যখন কাচের জারে ফরমালিনে সংরক্ষিত ছিল মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অংশ পাওয়া যায় খুব নিখুঁতভাবে কাঁটা। যখন সিলেটের দেয়ালে ধর্ষকেরা সদম্ভে এঁকে রেখে যায় নিজেদের কৃতকর্ম, তখন বুঝে নিতে হয় এই ধর্ষণ দু’একজন সামরিক কর্মকর্তার বিচ্ছিন্ন মনোরঞ্জন নয়। তখন বুঝতে হয় তারা এসব করেছিলো একটা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে, আর সেই এজেন্ডার কথা সৈয়দ সামসুল হক তার কালজয়ী নিষিদ্ধ লোবান উপন্যাসে লিখেছেন সবচেয়ে সুন্দর করে।
“আমি তোমায় সন্তান দিতে পারব। উত্তম বীজ উত্তম ফসল। তোমার সন্তান খাঁটি মুসলমান হবে, খোদার ওপর ঈমাণ রাখবে, আন্তরিক পাকিস্তানী হবে, চাওনা সেই সন্তান? আমরা সেই সন্তান তোমাদের দেব, তোমাকে দেব, তোমার বোনকে দেব, তোমার মাকে দেব, যারা হিন্দু নয়, বিশ্বাসঘাতক নয়, অবাধ্য নয়, আন্দোলন করে না, শ্লোগান দেয় না, কমিউনিস্ট হয় না। জাতির এই খেদমত আমরা করতে এসেছি। তোমাদের রক্ত শুদ্ধ করে দিয়ে যাব, তোমাদের গর্ভে খাঁটি পাকিস্তানী রেখে যাব, ইসলামের নিশানা উড়িয়ে যাব। তোমরা কৃতজ্ঞ থাকবে, তোমরা আমাদের পথের দিকে তাকিয়ে থাকবে, তোমরা আমাদের সুললিত গান শোনাবে… ”
– নিষিদ্ধ লোবান, সৈয়দ শামসুল হক
পরবর্তি পর্বে আমরা কথা বলবো ডাক্তার জেফ্রি ডেভিসকে নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের পরপরই যাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছিলো বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অনুরোধে ১৯৭২ সালে। ধর্ষিত বীরাঙ্গনাদের চিকিৎসা এবং গর্ভপাতের জন্য। তার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন তিনি বলেছেন বাংলাদেশ চার লক্ষাধিক মহিলা এবং শিশুকে ধর্ষণের কথা, সরকারী হিসাবের ত্রুটি নিয়ে কথা বলেছেন। এছাড়া কথা বলবো সুসান ব্রাউনি মিলারের এগেইনেস্ট আওয়ার উইল: ম্যান, উইম্যান এন্ড রেপ বইটা নিয়ে।
এই লেখাটা শুরু করা ছিলো আমার অনেকদিনের স্বপ্ন। পোষ্ট গুলোতে নির্মোহ থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।
লেট দ্যা ডেটা স্পিক…
তিরিশ লক্ষ শহীদ, বাহুল্য নাকি বাস্তবতাঃ নির্যাতিত নারীর সংখ্যা হতে পারে দশ লক্ষ কিংবা তার চেয়েও বেশী
2.
আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমে একাত্তর জুড়েই পাক বাহিনী কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনা প্রচারিত হয়েছে, এর মধ্যে নির্বাচিত কয়েকটি উল্লেখ করছি।

“রাজাকাররা তাদের কর্মকাণ্ড এখন হত্যা ও চাঁদাবাজিতেই আটকে রাখেনি, এখন তারা বেশ্যালয়ও খুলেছে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে তারা একটি শিবির খুলেছে যেখানে অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েদের আটকে রাখা হয়েছে, রাতে পাকবাহিনীর অফিসারদের সরবরাহ করা হয় তাদের। এছাড়াও প্রতিদিনই অনেক মেয়ে অপহরণ করছে তারা নিজেদের জন্যও, এদের অনেকেই আর ফিরে আসেনি…”
-সানডে টাইমসঃ ২০ জুন ১৯৭১
“ ‘ওরা আমার বাবা মা কে মেরে ফেলে, দুজনকেই বন্দুকের বাট দিয়ে পেটাতে পেটাতে মেরেছে। এরপর মেঝেতে আমাকে চিৎ করে শুইয়ে তিনজন মিলে ধর্ষণ করেছে।’ এমনটা বলেছে পেত্রাপোলের উদ্বাস্তু শিবিরের এক ষোড়শী। একই প্রতিবেদনের ভাষ্য, ‘ভিটেমাটি ছেড়ে প্রাণভয়ে পালাতে থাকা পরিবারগুলোর মেয়েদেরও হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এরপর বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে পাকবাহিনীর কাছে। অবশ্য পরিবারগুলো মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ছুটিয়ে নিয়েছে অনেককে। যারা পারেনি, তাদের ঠাই হয়েছে রাজাকারদের খোলা বেশ্যালয়ে।’
-টাইমসঃ ২১ জুন ১৯৭১
‘আগুনে পোড়া গ্রামকে পেছনে ফেলে দুই কিশোরী মেয়ে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পালাচ্ছিলেন চন্দ্র মন্ডল। কাদামাটির ভেতর দিয়ে। একটু পর সৈন্যদের হাতে ধরা পড়লেন। অসহায় চোখে তাকে দেখতে হলো তার মেয়েদের ধর্ষনের দৃশ্য। বারবার, বারবার, বারবার।’
-২ আগস্ট ১৯৭১ নিউজউইক
‘১১ এপ্রিল সৈন্যরা আমাদের গ্রামে এল। একদল এসে আমাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে গেল কী যেন দেখাতে। ফিরে এসে দেখি আমার বোন নেই। আমার প্রতিবেশীর মেয়ে এবং এক হিন্দুর মেয়েও একইরকম নিখোজ। মে মাসের মাঝামাঝি আমার বোন আর প্রতিবেশিকে ওরা ছেড়ে দিল। কিন্তু হিন্দু মেয়েটার খোঁজ পাওয়া গেল না। ফিরে আসা দুজনই গর্ভবতী, বাচ্চা হবে। ওদের দিয়ে কাপড় ধোঁয়ানো হতো এরপর প্রতিদিন দু-তিনবার করে সৈন্যদের সঙ্গে শুতে হতো।’
-নিউইয়র্ক টাইমসঃ ১১ অক্টোবর ’৭১
‘সম্প্রতি পাকবাহিনী ডেমোরা গ্রাম চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে, ১২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সব নারীকে ধর্ষন করে এবং ১২ বছরের ওপর সব পুরুষকেই গুলি করে মারে।’
-নিউজউইকঃ ১৫ নভেম্বর ’৭১
উপরের সংবাদ গুলোর কোনটিই কোন দেশী পত্রিকার নয়, সবগুলোই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পত্রিকার। যাদের ধারণা পাকবাহিনী কর্তৃক বাঙালী ধর্ষণ নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তাদের অবগতির জন্যই দেয়া। তবে আরেকটা কথাও বলে রাখি, এটা কেবল বরফের ভেসে থাকা অংশ। এরকম হাজারো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে আমাদের দেশে, প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বময়, পাকিস্তানী বাহিনীর নির্যাতনের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে।

প্রথম পর্বে মোটামুটি পরিস্কার ভাবে প্রমাণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীদের ধর্ষণ ছিলো একটা উদ্দেশ্যমূলক সংঘবদ্ধ ক্রিয়া, কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই পর্বে আমরা আলোচনা করবো মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যাটা আসলে কত ছিলো সেই বিষয়টিতে। বাংলাদেশের সরকারী হিসেবে সংখ্যাটা ধরা হচ্ছে দুই লাখ। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া সহ বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দাবী করা হয় মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের হয়েছে প্রায় দুই লাখ। এখন একটু খতিয়ে দেখা দরকার এই দুই লাখ সংখ্যাটা এলো কোথা থেকে। এটাই কি একমাত্র সংখ্যা, সংখ্যাটা কি এর থেকে বেশী বা কম হওয়া সম্ভব। হলে কেন।
সরকারী ভাবে মুক্তিযুদ্ধের ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি ছিলো থানা ভিত্তির নিখোঁজ নারীর সংখ্যা অনুমান করে। ডঃ ডেভিস লিখেছেন;
“…অংকটা এরকমঃ হানাদার দখলদারিত্বের সময়কালে প্রতিটি থানায় প্রতিদিন গড়ে দু’জন করে মেয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। থানার সংখ্যা ৪৮০টি এবং দখলদারিত্ব স্থায়ী হয়েছে ২৭০ দিন। ৪৮০ কে ২৭০ ও ২ দিয়ে গুণ করে পাওয়া গেছে ২ লাখ ৬৮ হাজার ২০০ জন। অন্যান্য কারণে মেয়েরা নিখোঁজ হয়েছেন ধরে নিয়ে সংশ্লিষ্ট বোর্ড সংখ্যাটাকে রাউন্ড ফিগারে এনেছেন দুই লাখে! এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের এইটাই অফিশিয়াল ধর্ষিতার সংখ্যা।”
[দ্য চেঞ্জিং ফেস অব জেনোসাইড : ড. জিওফ্রে ডেভিস] তবে এর পরপরই ডক্টর ডেভিস বলেছেন এই হিসাবটি তার মতে ত্রুটিপূর্ণ। তার কারণ হিসেবে তিনি কিছু যুক্তিও দেখিয়েছেন।

“১. সরকার আমলে নিয়েছেন শুধু নিখোঁজ রিপোর্ট পাওয়া মেয়েদের। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারগুলো চেপে গিয়েছেন তাদের মেয়েদের অবস্থান ও অবস্থা। অনেকটা লোক-লজ্জায়, সম্মানহানী ও প্রাণহানির ভয়ে। এবং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যাদের কাছে অভিযোগ করবেন তাদের কাছেই মেয়ে, অর্থাৎ রক্ষকই ভক্ষক।
সাধারণভাবে দেখতে গেলে এই বিশাল অংশটা যুদ্ধকালীন সময়টায় আটকবস্থাতেই ছিল যদ্দিন না পাকসেনাদের কাছে তারা বোঝা হয়ে পড়েছে। বোঝা বলতে শারীরিক ব্যবহারের অযোগ্য গর্ভবতী কিংবা যৌনরোগগ্রস্থ, কিংবা দুটোই। এরপর মেয়ে যদি মুসলমান হয় তাহলে ছেড়ে দেয়া হয়েছে আর যদি হিন্দু হয় তাহলে মেরে ফেলা হয়েছে। অনেক মুসলমান মেয়েকেও হত্যা করা হয়েছে, অনেকে আত্মহত্যা করেছেন। এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার ও আত্মহত্যাকারীদের সঠিক সংখ্যাটা আন্দাজে বলাটা কঠিন।
২. সংখ্যাটায় পাকসেনাদের অস্থায়ী অবস্থানকে গোনায় নেওয়া হয়নি। মানে তারা একটা গ্রাম বা অঞ্চলে হামলা করল এবং গণহারে ধর্ষণ চালাল। পুরোপুরি ধংস হয়নি কিন্তু আক্রমণের শিকার এরকম গ্রামের সংখ্যা বাংলাদেশের তিনভাগের এক ভাগ। সুবাদেই ধর্ষণের সংখ্যাও ছিল অগণিত, যদিও সবক্ষেত্রেই গর্ভধারণ অনিবার্য ছিল না।
৩. রাজাকার ও পাকিস্তানের দালালরা উদ্বাস্তুদের ওপর হামলা চালিয়ে প্রচুর মেয়ে অপহরণ করেছিল (এ ব্যাপারে আগেও বলা হয়েছে)। অনুমান করা হয় ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল এক কোটি বাঙ্গালী, আর তাদের মধ্যে ১৫ লাখ ছিলেন নারী।
বাংলাদেশে আদমশুমারীর হাল বরাবরই করুণ, অনুমান নির্ভর। ১৯৭১ সালে বলা হয় সংখ্যাটা ছিল সাড়ে সাত কোটি এর থেকে এক কোটি লোক বাদ দিন, যারা পাশের দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছে কিংবা শহর বা নগর বা ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয়ের খোজে গেছে। বাকি থাকে সাড়ে ৬ কোটি। এদের মধ্যে ধরি দশ লাখ তরুণী-যুবতী, যারা সন্তান জন্মদানে সক্ষম। এদের এক তৃতীয়াংশ যদি ধর্ষিতা হন তাতেও সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৩ লাখ। ৩% বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই দেশে নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায় এদের অর্ধেক গর্ভধারণ করেছেন। ধর্ষনের কারণের এদের একজনও যদি গর্ভধারণ না করে (যেটা অবাস্তব), তারপরও দেড় লাখ নারী রয়ে যান যারা গর্ভবতী।
এদের সঙ্গে (১) নং বর্ণনার মেয়েদের ২ লাখ যোগ করুন (এখানে নিশ্চিত থাকতে পারেন তাদের সবাই গর্ভবতী এবং তাদের ঘরছাড়া হওয়ার পেছনে এটাই ছিল প্রধান কারণ)। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, মেয়েদের সংখ্যা প্রতিদিন বদলাতো এবং গর্ভবতীরাই ছিল আশ্রয়হীনা। ধরে নিতে হবে দু লাখ একটা রক্ষণশীল সংখ্যা। গর্ভবতীদের ১০ ভাগ দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই সন্তান জন্ম দিয়েছেন। এভাবে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ অবাঞ্ছিত গর্ভবতীদের সংখ্যা ছিল সাড়ে তিন লাখ। ঘটনার পরবর্তী প্রবাহের আলোকে ব্যাপারটা চমকপ্রদ।

যেসব জেলা আমি ঘুরেছি, এদের বেশিরভাগেই দেখা গেছে অবাঞ্ছিত গর্ভবতীদের সংখ্যা অনুমানের চেয়ে কম। হিসেবের মধ্যে নিতে পারেন ইতিমধ্যে প্রসব করা এবং আত্মহত্যাকারীদের। সংখ্যাটা ছিল গ্রাম পিছু ১০ জন করে! যেসব জায়গায় সামরিক কর্মকাণ্ড ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী ছিল (গোটা দেশের অর্ধেক জনপদ), সেখানে যখনই কোনো গ্রামবাসীর সঙ্গে কারো মাধ্যমে যোগাযোগ করেছি অবিশ্বাস্য এক ছবি পেয়েছি।
ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ থানা পিছু ছিল দেড়হাজার করে এবং জানুয়ারির শেষ নাগাদই গ্রামের দাই, হাতুরে ও হোমিওপ্যাথরা মিলে এদের বেশিরভাগেরই ব্যবস্থা করে ফেলে। রয়ে যায় অল্প কজনা। থানা পিছু দেড় হাজার করে ৪৮০টি থানায় (যেহেতু প্রশাসনিক ভবন, এখানে সামরিক অবস্থান দীর্ঘমেয়াদী হওয়াটাই স্বাভাবিক) ৩ লাখ ৬০ হাজার পোয়াতির সন্ধান পাওয়া যায়। অন্য যে কোনো পদ্ধতিতে হিসেব করলেও সংখ্যাটা এর ধারে কাছেই থাকবে।”

শেষ পর্যন্ত ডা. জিওফ্রে ডেভিস দেশজুড়ে তার চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতায় এবং উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় চালানো নমুনা জরিপের মাধ্যমে পরিসংখ্যান তৈরি করে জানান,
৪ থেকে ৪ লাখ ৩০ হাজার নারী মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের পর অস্ট্রেলিও চিকিৎসক ডক্টর জিওফ্রে ডেভিস বাংলাদেশে আসেন। দেশ স্বাধীন হবার একদম পরপরই যাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছিলো বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অনুরোধে ১৯৭২ সালে। ধর্ষিত বীরাঙ্গনাদের চিকিৎসা এবং গর্ভপাতের জন্য। ‘দ্য চেঞ্জিং ফেস অব জেনোসাইড’ ড. জিওফ্রে ডেভিসের ডাইরি। এই ডাইরিতে উঠে এসেছে অজানা অনেক তথ্য। আজকের লেখার শুরুতে দেয়া পত্রিকার বিবরন গুলোও তাঁর ডাইরি থেকেই পাওয়া। ডাইরি প্রয়োজনীয় অংশটুকুর সরাসরি অনুদিত অবস্থায় অনলাইনে পেয়ে বিস্মিত হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ওয়েব পোর্টাল ”জন্মযুদ্ধ ৭১” এবং অমি রহমান পিয়ালকে জানায় হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে অশেষ কৃতজ্ঞতা।

পাকিস্তানের নথিপত্রে বাংলাদেশে ব্যাপক হারে ধর্ষণের ব্যাপারটি অস্বীকার এবং পাকিস্তানীরা কিভাবে ধর্ষণ প্রক্রিয়াকে হালাল করেছিলো এসব প্রসঙ্গে ডঃ ডেভিসের একটা সাক্ষাতকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরছি। যেটি পরবর্তীতে ডঃ মুনতাসির মামুনের ‘বীরাঙ্গনা১৯৭২’ বইতে গুরুত্বের সাথে উঠে আসে।
‘প্রশ্ন : তারা নারী ধর্ষণের ব্যাপারটা কীভাবে জায়েজ করার চেষ্টা করেছে?
জেফ্রি : ওরে বাপস! তাদের ওপর টিক্কা খানের এক প্রকার আদেশ বা নির্দেশই ছিল যে, একজন সাচ্চা মুসলমান তার বাবা ছাড়া আর সবার সঙ্গেই লড়াই করবে। কাজেই তাদের যা করতে হবে তাহলো যতটা পারা যায় বেশিসংখ্যক বাঙালী নারীকে গর্ভবতী করা। এটাই ছিল তাদের কাজের পেছনের তত্ত্ব।’
‘প্রশ্ন : পাকিস্তানের অসংখ্য নথিপত্রে এখনও বলা হয়, ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা অত্যন্ত বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। আপনি কি তাদের এ দাবি সত্য মনে করেন?
জেফ্রি : না, না… তারা ধর্ষণ করেছে। সম্ভবত তারা প্রকৃতই যা করেছে, তার তুলনায় অনেকগুণ কম সংখ্যা দাবি করা হয়। তারা যে পদ্ধতিতে শহর দখল করত তার বিবরণ খুব কৌতূহলোদ্দীপক। তারা তাদের পদাতিক বাহিনীকে পেছনে রেখে গোলন্দাজ বাহিনীকে সামনে নিয়ে আসত। তারপর হাসপাতাল, স্কুল-কলেজে গোলা ছুড়ে গুড়িয়ে দিত। এরফলে শহরে নেমে আসত চরম বিশৃঙ্খলা আর তারপর পদাতিক বাহিনী শহরে ঢুকে পড়ে মেয়েদের বেছে বেছে আলাদা করত। শিশু ছাড়া যৌনভাবে ম্যাচিওরড সকল মেয়েকে তারা একত্রে জড়ো করত। আর শহরের বাকি লোকজনকে বন্দী করে ফেলত পদাতিক বাহিনীর অন্যরা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে গুলি করে মেরে ফেলা হতো। আর তারপর মেয়েদের পাহারা দিয়ে কম্পাউন্ডে নিয়ে এসে সৈন্যদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া হতো। অত্যন্ত জঘন্য একটা ব্যাপার ছিল এটা। বিশ্বের কোথাও কখনও এমন ঘটনার নজির পাওয়া যায় না। তবুও, এমনটাই ঘটেছিল।’
হ্যাঁ, যুক্তির খাতিরে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের ৬৪ হাজার গ্রামে তো পাকিস্তানী সৈন্যরা যায়নি। কথাটা ঠিক, ৬৪ হাজার গ্রামে পাকিস্তানী সৈন্যরা যায়নি; কিন্তু যেসব গ্রামে গেছে সেখানেই তারা মেয়েদের সর্বনাশ করেছে। আমরা এখানে যে ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছি তাতে একটি প্যাটার্ন ফুটে উঠেছে। তাহলো : গ্রামে গ্রামে তারা সুনির্দিষ্টভাবে মেয়েদের জন্য হানা দিচ্ছে, শহরাঞ্চল থেকে মেয়েদের উঠিয়ে নিচ্ছে, সে এক ভয়াবহ অবস্থা। অনেক জায়গায় রাজাকার বা শান্তি কমিটির সদস্যরা মেয়েদের তুলে নিয়ে গেছে। ধর্ষিতা নারীদের একটি অংশ আত্মহত্যা করেছে, মেরে ফেলা হয়েছে। একটি অংশের পরিবার-পরিজন ধর্ষণের কথা কখনও স্বীকার করেনি সামাজিক কারণে। ফলে সঠিক সংখ্যা কখনও জানা যাবে না। সরকারী কর্মকচারীরা তখন নানাবিধ কারণে ধর্ষিতার সংখ্যা কম করে দেখাতে চেয়েছে। এর পেছনে যে মানসিকতা কাজ করেছে তাহলো এক ধরনের অপরাধবোধ। কারণ, এই মেয়েদের রক্ষার দায়িত্ব আমরা যে কোন কারণেই হোক পালন করতে পারিনি। অনেকের কাছে এটি লজ্জার বিষয় মনে হয়েছে। এই মানসিকতার সমাজতাত্ত্বিক কারণ কি তা আমি জানি না। যে কারণে, এখনও নারী ধর্ষণের বিষয়টি পারতপক্ষে কেউ আলোচনায় আনতে চান না।
ডা. ডেভিস আরও উল্লেখ করেছিলেন, ‘হানাদার বাহিনী গ্রামে গ্রামে হানা দেয়ার সময় যে সব তরুণীকে ধর্ষণ করেছে তার হিসাব রক্ষণে সরকারী রেকর্ড ব্যর্থ হয়েছে। পৌনঃপুনিক লালসা চরিতার্থ করার জন্য হানাদার বাহিনী অনেক তরুণীকে তাদের শিবিরে নিয়ে যায়। এসব রক্ষিতা তরুণীর অন্তঃসত্ত্বার লক্ষণ কিংবা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে হয় তাদের পরিত্যাগ করা হয়েছে, নয়ত হত্যা করা হয়েছে।’
এবার একটু অন্য দিকে দৃষ্টিপাত করি বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্লগিং পোর্টাল আমার ব্লগের সাড়া জাগানো পোস্ট “আমি, আমার আত্মার আত্মীয়দের কথা বলছি”এর দিকে। যেখানে সবিস্তর আলোচনা করা হয়েছে সুসান ব্রাউনমিলারকে নিয়ে।
যুদ্ধশিশু সম্পর্কে সারা পৃথিবী জুড়ে যে গবেষণা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো সুসান ব্রাউনমিলার অ্যান্থনির (জন্ম: ফেব্রুয়ারি ১৫, ১৯৩৫) গবেষণা গ্রস্থ-নিবন্ধগুলো। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সাড়া জাগানো গ্রন্থ ‘অ্যাগেইনস্ট আওয়ার উইল: ম্যান, উইম্যান অ্যান্ড রেপ। সাইমন এন্ড শুস্টার নামের প্রকাশনী থেকে বের হয় এই গ্রন্থটি। আজ পর্যন্ত ১৬ টি বিদেশী ভাষায় অনূদিত হয়েছে এটি। বইটির কাজ যখন শুরু হয়- তখন বাঙলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছে, অর্থাৎ এটি ১৯৭১ সালের ঘটনা। সম্ভবত সে কারণেই বইটির একটা বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলী এবঙ তার আদলে যুদ্ধশিশু সম্বন্ধে আলোচনা। বইটির কিছু অংশের অনুবাদ এখানে তুলে ধরছি-

….ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যানড প্যারেন্টহুড আবিষ্কার করে যে, স্ত্রী রোগের সংক্রামণের মাত্রা ব্যাপক। একজন অস্ট্রেলিয় চিকিৎসক নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন. “পরীক্ষা করে প্রায় প্রতিটি ধর্ষিতারই যৌনরোগ পাওয়া গেছে”।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিপদটি ছিলো গর্ভধারণ। সন্তান-সম্ভবা ধর্ষিতার সংখ্যা সঠিকভাবে নিরূপণ করা না গেলেও ২৫,০০০ জন ছিলো একটি গ্রহণযোগ্য সংখ্যা। ধর্ষিতা অন্তঃসত্ত্বা মেয়েদের মনোভাবটি ছিলো কল্পনাতীত। সামান্য অংশই বাচ্চা ধারণ করতে আগ্রহী ছিলো। প্রায় জন্মদানের পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া মেয়েরা অনাগত বাচ্চার ভবিষ্যত নিয়ে সামান্যই আগ্রহ প্রকাশ করতো। জোরপূর্বক ধর্ষণের ফসল হিসেবে বাচ্চাদের ভীতিকর আবির্ভাব উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গে এটাও অনায়াসে অনুমেয় যে, বাঙলাদেশে ফরসা রঙের পাঞ্জবি বৈশিষ্ট্যের জারজ সন্তানেরা কখনোই বাঙালি সংস্কৃতিতে গৃহীত হবে না- এমনকি তাদের মায়েরাও না।”
গবেষক সুসান ব্রাউনমিলার ধর্ষণের সংখ্যাকে প্রায় চার লাখ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন-
During the nine-month terror, terminated by the two week armed intervention of India, a possible three million people lost their lives, ten millions fled across the border to India and 200,000, 300,000 or possible 400,000 women (three sets of statistics have been variously quoted) were raped. Eighty percent of the raped women were Moslems, reflecting the population of Bangladesh, but Hindu and Christian women were not exempt.
[Against Our Will : Men, Women and Rape; Susan Brownmiller; Page 81]

সুসান ব্রাউনমিলার আরও লিখেছেন;
“Rape in Bangladesh had hardly been restricted to beauty… girls of eight and grandmothers of seventy-five had been sexually assaulted.”
বাংলাদেশীদের ওপর পাকিস্তানিদের ধর্ষণ প্রক্রিয়া শুধুমাত্র যৌন লালসা চিরতারথ করার জন্য ছিলো না। আট বছরের শিশু থেকে পচাত্তর বছরের নানি-দাদিরাও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আর পাকিস্তানীরা স্থানিকভাবেই শুধু ধর্ষণ করেনি, শত শত নারীকে মিলিটারি ব্যারাকে নিয়ে আটকে রেখেছে রাতে ব্যবহারের জন্য।

Some women may have been raped as many as eight times in a night. How many died from this atrocious treatment, and how many more women were murdered as part of the generalized campaign of destruction and slaughter, can only be guessed at.
এবারে একটু দৃষ্টিপাত করা যাক ওয়ারক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির দিকে। স্বাধীন বাংলাদেশে এইসব বিরঙ্গনাদের নিয়ে সবচেয়ে বেশী কাজ তারার করেছে। তারা একাত্তরের নারী নির্যাতনের একটি সামগ্রিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে, এর মাধ্যমে জানা যায়-

১. স্পট ধর্ষণ, স্পট গণধর্ষণ ও বন্দী নির্যাতিতার সম্মিলিত সংখ্যা চার লাখ আটষট্টি হাজার (স্পট ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার তিন লাখ সাতা হাজার ছশ এবং বিভিন্নভাবে পাকিস্তানীদের নিকট বন্দী নির্যাতিত নারী এক লাখ চল্লিশ হাজার চারশ’ নারী)।
২. চিহ্নিত স্থানে নির্যাতিতা নিহত ও অপহৃতসহ স্পট ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার- তিন লাখ ষাট হাজার। এঁদের মধ্যে শুধুমাত্র স্পট ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার প্রায় তিন লাখ সাতাশ হাজার যা মোট নির্যাতিতার সত্তরভাগ। এঁদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন প্রায় ত্রিশভাগ অর্থাৎ এক লাখ আট হাজার নারী।
৩. নির্যাতিত বন্দী নারী প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার (এক লাখ চল্লিশ হাজার চারশ’) যা মোট নির্যাতিতার প্রায় ত্রিশভাগ। এরমধ্যে কারাগার, ক্যাম্প, বাঙ্কার প্রভৃতি স্থানে নির্যাতিতার সংখ্যা মোট নির্যাতিদের প্রায় আঠারভাগ।
এছাড়াও বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট, মার্শাল ল’ আদালত এবং শহর ও গ্রামাঞ্চলের বাড়িঘর, অফিস আদালত, হোটেল, বিনোদন কেন্দ্র প্রভৃতি স্থানে নির্যাতিত হন বারোভাগ (ক্যাটাগরি দুই-শতকরা পাঁচভাগ এবং ক্যাটাগরি তিন-সাতভাগ)।
৪. বন্দী নির্যাতিত নারীদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা আশিভাগ অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ছিয়াশি হাজার। এঁদের মধ্যে চল্লিশভাগকে হত্যা করা হয়েছে অথবা তাঁরা নিজেরাই আত্মহত্যা করেছেন।
[একাত্তরের নারী নির্যাতন : ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়; ডা. এম এ হাসান; প্রসঙ্গ ১৯৭১ : মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, পৃষ্ঠা ৩] ডা. এম.এ. হাসান তাঁর গ্রন্থে উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি রিপোর্টের কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে ধর্ষিতের সংখ্যা দুই থেকে চার লাখের কথা বলা হয়েছে। তাঁর নিজের জরিপের উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন,
‘১৯৯১-২০০২ সাল পর্যন্ত দেশের ৪২ জেলার ২৫টি থানায় পরিচালিত আমাদের গবেষণায় গৃহীত অসংখ্য সাক্ষাতকারের মধ্য থেকে নির্বাচিত ২৬৭ ব্যক্তির সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয়েছে যে, একাত্তরে দু’লাখ দু’হাজার জন নারী ধর্ষিত হয়েছে ওই সব স্থানে।… সারা দেশে ধর্ষিত ও নির্যাতিত নারীর সংখ্যা সাড়ে চার লাখের ওপরে।
ডক্টর হাসান পরবর্তীতে লেখেন ‘যুদ্ধ ও নারী’। মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর নির্মমতা নিয়ে যারা সন্দিহান তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য এই বই। এই বইটিতে উদ্ধৃত হয়েছে এমন সব ঘটনা যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহী মানুষকে অনেক চিন্তার খোরাক জোগান দেবে।

ডক্টর মুনতাসির মামুন ‘বীরাঙ্গনা একাত্তর’ শিরোনামে ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বার একটি কলাম লেখেন। যা কয়েকটি খণ্ডে নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে পত্রিকাটিতে। (রেফারেন্স অংশে লিঙ্ক সংযুক্ত করা হলো) পরবর্তীতে তাঁর কলামগুলো ‘বীরাঙ্গনা ১৯৭১’ গ্রন্থে সংকলিত হয়। ডক্টর মুনতাসির মামুন লিখেছেন তাঁর মতে ডক্টর হাসানের বক্তব্যই বলে দেয়, এটি সারা দেশের জরিপ নয়, সাক্ষ্যও সম্পূর্ণ নয়। তবুও ধর্ষণের ব্যাপকতটা ডক্টর হাসানের বই থেকে বোঝা যায়।
মুনতাসির মামুন বলেছেন যে, ডক্টর হাসানের বর্ণনাকে আক্ষরিক অর্থে ধরলে তাঁর দেয়া সংখ্যাই ছাড়িয়ে যাবে। তিনি লিখেছেন, পূর্বতন সিলেটে ৩০ হাজার বীরাঙ্গনার সন্ধান পেয়েছেন। এ অঞ্চলের চা বাগানগুলোর মহিলা শ্রমিক, তাদের যুবতী ও কিশোরী কন্যাগণ, মনিপুরী ও খাসিয়া মহিলারা ব্যাপক হারে নির্যাতনের শিকার হন। সিলেট শহর, বালাগঞ্জের বুরুঙ্গা, আদিত্যপুর, শ্রী রামসী, শেরপুর, পীরপুর, পীরনগর, করিমগঞ্জ সীমান্ত ও হাওড় এলাকা, সুনামগঞ্জের হাওড় এলাকা, মৌলভীবাজার শহর, রাজনগর, সাধুহাটি, কমলগঞ্জ থানার শমসের নগর, মনিপুরীদের বিভিন্ন গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি এবং হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, শায়েস্তাগঞ্জসহ বিভিন্ন থানার গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে পাকিরা অসংখ্য নারীকে ধর্ষণ করে। এ ছাড়া টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর থানার ছাব্বিশাসহ বিভিন্ন গ্রাম, বরিশালের গৌরনদী থানার প্রায় সব গ্রাম, আগৈলঝাড়ার রাজিহার, চেতনার কোলা গ্রামসহ সমগ্র বরিশালে পাকিরা ব্যাপক নির্যাতন চালায়।’ এ ছাড়া তিনি ফরিদপুর জেলারও বিভিন্ন থানার বেশ কিছু গ্রামের নাম দিয়েছেন যেখানে ব্যাপকহারে ধর্ষণ করা হয়। একটি শহরের প্রতিটি বাড়িতে হানা দিলে ধর্ষিতের সংখ্যা কত দাঁড়ায়।
মুনতাসির মামুন লিখেছেন, আগে উল্লেখ করেছি- শুধু খান সেনারা নয়, তাদের সহযোগী রাজাকার ও শান্তি কমিটির লোকজনও ধর্ষণ করেছে। ব্রাউনমিলার সংবাদপত্রের এক প্রতিবেদন উদ্ধৃত করেছেন যেখানে বলা হয়েছে, রাতে পাকিস্তানী সৈনিক ও রাজাকাররা গ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মেয়েদের তুলে নেয়। কাউকে কাউকে স্থানিকভাবে ধর্ষণ করা হয়। বাকিদের ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হয়।
ইন্টারন্যশনাল কমিশন অব জুরিস্টস জানিয়েছিল ‘জানা যায়, পাকিস্তানী সৈন্যরা ব্যাপক ধর্ষণ চালিয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক নারী এবং কম বয়সী মেয়েদের ওপর। অসংখ্য সূত্র থেকে ঘটনা সম্পর্কে স্বীকারোক্তি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ সরকার দাবি করেছে, ৭০,০০০-এর বেশি নারী এসব ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী হয়ে পড়েছে। সঠিক সংখ্যা যাই হোক না কেন, মার্কিন ও ব্রিটিশ শল্য চিকিৎসকরা গর্ভপাতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন জনগণকে এসব ধর্ষিত নারীকে সমাজে গ্রহণ করার প্রচারণায়। এসব অবস্থা সাক্ষ্য দিচ্ছে ধর্ষণের বিশাল সংখ্যার। পাকিস্তানী অফিসাররা এসব বর্বরতা সম্পর্কে নিজেদের অজ্ঞতা প্রকাশ করে দায়মুক্ত থাকতে চায়। বহু ক্ষেত্রেই কিন্তু এসব সেনা অফিসার নিজেরা যুবতী মেয়েদের ধরে এনে আটক রাখত নিজেদের যৌন সন্তুষ্টির জন্য।’ যে সব সাংবাদিক তখন রিপোর্ট করেছিলেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাদের প্রতিবেদনেও প্রসঙ্গটি এসেছে বারবার এ রকম চারজনের রিপোর্ট উদ্ধৃত করছি
নিউজ উইকের সাংবাদিক টনি ক্লিফটন উল্লেখ করেছেন, ‘আমি দেখতে পাই যে, আক্ষরিক অর্থে মানুষ বোবা হয়ে গেছে, যখন পাকিস্তানী সৈন্যরা তাদের চোখের সামনে বাচ্চাদের হত্যা করেছে এবং মেয়েদের উঠিয়ে নিয়ে গেছে তাদের ভয়ঙ্কর যৌন পরিতৃপ্তির জন্য। পূর্ব পাকিস্তানে শত শত মাইলাই এবং লেডিসির মতো নৃশংসতা সংঘটিত হয়েছে সে ব্যাপারে আমার কোনই সন্দেহ নেই।’
নিউজউইকের সিনিয়র সম্পাদক এ্যারমাউড ডি ব্রোচ গ্রেভ : ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী সাম্প্রতিক বিদ্রোহীদের খুঁজতে আসার ভান করে ডেমরা গ্রাম ঘেরাও করে। তারপর ১২ থকে ৩৫ বছর বয়সী সকল নারীকে ধর্ষণ করে এবং ১২ বছরের বেশি বয়সী সকল পুরুষকে হত্যা করে।’
নিউইয়র্ক টাইমসের সিডনি এইচ, শ্যেনবার্গ : ‘পাকিস্তানী সৈন্যরা প্রায় প্রতিটি সেক্টরেই বাঙালী মেয়েদের যৌনদাসী হিসেবে আটক রেখেছে। সৈন্যদের ব্যাংকারগুলিতে এসব মেয়েকে সারাক্ষণই নগ্ন অবস্থায় রাখা হতো। ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখে পাকিস্তানী সেনারা আত্মসমর্পণের পর এসব নারীর অধিকাংশেরই ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হয়।’
জন হেস্টিংস নামে এক মিশনারি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানী সৈন্যরা… মেয়েদের যোনিপথে বেয়নেট ঢুকিয়ে তাদের হত্যা করেছে।’ মেয়েদের মসজিদে আটকে রেখেও ধর্ষণ করা হয়েছে। সাতক্ষীরার একটি গ্রামের মসজিদ থেকে বেশ কিছু নগ্ন নারী উদ্ধারের পর এ ধরনের ঘটনা নজরে আসে।
সবশেষে মুনতাসির মামুনেই সিদ্ধান্তে এসে উপনিত হনঃ

এ সমস্ত বিবেচনায় নিয়ে বলা যেতে পারে, ধর্ষিত নারীর সংখ্যা ছয় লাখের কাছাকাছি হতে পারে বা তার চেয়েও কিছু বেশি, কম নয়।
(উপরের আলোচনার সিংহভাগই ডক্টর মুনতাসির মামুনের বই ‘বীরাঙ্গনা একাত্তর’ থেকে সরাসরি পাওয়া।)

সুতরাং এই বিষয় পরিস্কার মুক্তিযুদ্ধে আক্ষরিক অর্থে নির্যাতিত নারীদের সংখ্যা আসলে ছয় লক্ষের কাছাকাছি কোন একটা সংখ্যা ছিলো। যদিও এসব দেশী এবং বিদেশী পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি কয়েকটা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জিনিষকে এড়িয়ে গেছে। যারা খানিকটা আলোচনার দাবী রাখে বই কি;
১) মুক্তিযুদ্ধের প্রায় প্রতিটি দিনই কমপক্ষে পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। এদের অনেকে পরিবারের নারীরাই পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার, আর এসব অসহায় পরিবার গুলোর একটা অংশ (বিশেষ করে হিন্দু ধর্মালম্বি) যুদ্ধের পর আর দেশে ফিরে আসেন নি। তাদের সংখ্যা নিরূপণ করা অসম্ভব।
এটা যে কোন অবান্তর কেইস না সেটার জ্বলন্ত প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে সাজা প্রাপ্ত আল্লাম দেলোয়ার হোসেন সাইদীর ধর্ষণের ঘটনাটি। এই ঘটনায় মধুসূধন ঘরামীর স্ত্রী শেফালী ঘরামীকে সাইদী ধর্ষণ করে, এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতার পর মানুষের অপবাদ আর গঞ্জনা সইতে না পেরে শেফালী ঘরামী ভারতে পালিয়ে যান। যেই ধর্ষণে সাইদীর অংশগ্রহণের প্রমাণও পেয়েছে আদালত।
২) শরণার্থী শিবিরে মারা যাওয়া এবং আত্মহত্যা করা নারীদের সংখ্যাও কম নয় এবং এদের সংখ্যাটা আমরা কখনোই জানতে পারবো না। জহির রায়হানের স্টপ জেনসাইডে এরকম ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় যেখানে উল্লেখ করা হয় বাংলাদেশ থেকে নির্যাতিত হয়ে বাঙালী রমণী ভারতে পারী জমিয়েছে
৩) ব্রাউনমিলার লিখেছেন শতকরা দশজন মেয়েকে পাকিস্তানীরা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। এখন সরাসরি ধর্ষণের শিকার বাকি নব্বুইভাগ মেয়েদের পরিবারের মধ্যে যেসব পরিবার রক্ষনশীল ছিলো তাদের একটা বড় অংশই ধর্ষণের ঘটনা সেরেফ চাপা দিয়ে নিজেদের আর সন্তানের সম্মান বাঁচিয়েছেন।
সেই সময় স্বাভাবিক ভাবেই এসব বীরাঙ্গনাদের সময়ের স্রোতের সাথে মিলে যাবার প্রবণতা ছিলো। এবং সেই কারণেই যেসব মেয়েরা শারীরিক ভাবে অপেক্ষাকৃত কম আঘাতপ্রাপ্ত ছিলো, তাদের একটা বড় অংশই পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে গেছে।
উপরের তিনটা প্যারামিটারকে বিবেচনা করলে, এবং এদেশীয় দোসরদের হাতে নির্যাতনকে বিবেচনায় আনলে নিঃসন্দেহে একাত্তরে নির্যাতিত নারীদের সংখ্যা দশ লক্ষের কাছাকাছি হবে বলে আমার বিশ্বাস।
তিরিশ লক্ষ শহীদ, বাহুল্য নাকি বাস্তবতাঃ বিদেশী পত্রিকার, রিসার্চ-পেপার, ডিকশেনারি, এনসাইক্লোপিডিয়া অনুসারে শহীদের সংখ্যা নিরূপণের একটি প্রয়াস; প্রথম পর্ব
3.
মুক্তিযুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে গবেষণা হয়েছে অনেক। আজকে আলোচনা করবো কিছু আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং পত্রপত্রিকা নিয়ে। নিবন্ধের প্রথম পর্বে থাকবে যুদ্ধ কালীন সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রগুলোতে (বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানী সংবাদপত্র ব্যাতিত) শহীদের সংখ্যা সম্পর্কে কি বলা হয়েছে। নিবন্ধের দ্বিতীয় পর্বে থাকবে আন্তর্জাতিক গনহত্যা বিশেষজ্ঞের মতামত মুক্তিযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে। তৃতীয় অংশে থাকবে একজন কিংবদন্তীতূল্য গনহত্যা গবেষকের বাংলাদেশ সম্পর্কে গবেষণার আদ্যপান্ত। উল্লেখ্য এসব গবেষণা কিন্তু পত্রিকার রিপোর্ট বা কেবলই অনুমান ভিত্তিক নিবন্ধ নয় বরং থিসিস পেপার নির্ভর যেগুলো স্থান করে নিয়েছে অনেক রিসার্চ জার্নালে, আর তাই ফেলনা বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই।
মুক্তিযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপক করার জন্য আমি একটা পদ্ধতি ব্যাবহার করি ‘Concordia approach’ যার মানে করলে মোটামুটি দাঁড়ায় আমার নিজস্ব মতকে ভুল ধরে নিয়ে শত্রুপক্ষের মতকে ঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা। এজন্য মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা বর্ণনা করার সময় বরাবরই দেশী ইতিহাসবিদ-লেখকদের কোটেশান পারতপক্ষে গ্রহণ না করে আমরা চেষ্টা করি কোন থার্ড পার্টি কিংবা পাকিস্তানী কোন লেখকের বই থেকে কোট করতে। ফলে যদি দেখানো যায় আন্তর্জাতিক অথবা পাকিস্তানী ইতিহাসবিদের মতেই পাকিস্তানিদের কথা অগ্রহণযোগ্য তখন সেই আর্টিকেলের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায় অনেক গুন, সাথে সাথে দেশ বিরোধীদের কথা বলার সুযোগও থাকে না।
আসুন খুঁজে দেখছি একাত্তরের বিদেশী সংবাদপত্রগুলো। ঐ সময়ের মৃত মানুষের সংখ্যা নিয়ে বিদেশী পত্রিকাগুলোতে কি কি সংখ্যা দেয়া আছে সেটার একটা ডাটা শীট তৈরি করবো আমরা। যদিও এ পদ্ধতিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদের সংখ্যা নিরূপণের চেষ্টা বোকামি। কারণটাও খুবই সহজ, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ছিল বিদেশী সাংবাদিক মুক্ত। সাংবাদিকদের বড় অংশকেই বের করে দেয়া হয় ২৫ মার্চ রাতে,
দ্যা ডেইলি টেলিগ্রাফের ২৭শে মার্চ ১৯৭১ সংখ্যাটা পড়লে সবার কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে সাংবাদিকদের গ্রেফতার করে বের করে দেয়ার ঘটনাটি। আমি ঐ রিপোর্ট থেকে খানিকটা উদ্ধৃত করছি,
“স্বাধীনতা আন্দোলনকে ধূলিস্যাৎ করতে সেনাবাহিনী যখন অভিযানে নামে সেই সময় থেকেই পূর্বপাকিস্তানে অবস্থানরত সকল বিদেশী সাংবাদিককে অস্ত্রের মুখে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এবং পরে সবাইকে ধরে প্লেনে উঠিয়ে করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়।
ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার সংবাদদাতা সাইমন ড্রিং হোটেলের ছাদে লুকিয়ে থেকে গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হন; যদিও তাঁকে গ্রেপ্তার করার জন্য অবিরাম চেষ্টা চালানো হয়েছে। সাইমন ড্রিং ছাড়া কেবল এ্যসাসিয়েটেড প্রেস-এর ফটোগ্রাফার মাইকেল লরেন্ট গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। সাইমন ড্রিং জ্বলন্ত ঢাকা শহরে ব্যাপকভাবে ঘুরে দেখার সুযোগ পান। গতকাল একটি প্লেনে করে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে আসতে সক্ষম হন। দু’দুবার তার বস্ত্র উন্মোচন করে তল্লাশী চালানো এবং তার লাগেজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলেও, কৌশলে তিনি ঢাকায় নেয়া নোটগুলোসহ সোমবার সকালে ব্যাংকক পৌঁছে এই রিপোর্ট পাঠান।“
(দ্যা ডেইলি টেলিগ্রাফ, ২৭শে মার্চ ১৯৭১)
সাইমন ড্রিং এর মত হাতে গোণা যে কয়েকজন সাংবাদিক লুকিয়ে ছিলেন তাদের কাছে আসলেও সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া অসম্ভব ছিল কারণ অভিযান চলছিল সারা দেশ জুড়ে। পুরো দেশের সমস্ত খবর একত্র করে একটা ফিগার নির্ণয় করা প্রায় অসম্ভব একটা কাজ ছিল, এবং এই কথা সেই সময়ের সংবাদপত্রগুলোতেও এসেছে বারবার। পড়তে গিয়ে দেখেছি যখনি একটা ফিগারের কথা বলা হচ্ছে তখনি আবার বলা হচ্ছে সামগ্রিক অবস্থা আমরা জানি না, সংখ্যাটা এর চেয়েও অনেক বেশী হতে পারে।
আসুন দেখা যাক এতকিছুর পরেও বিভিন্ন টাইম লাইনে আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রগুলো কি লিখেছে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে;
১) Times একাত্তরের এপ্রিলের শুরুতেই লিখেছে ৩ লাখ ছাড়িয়েছে এবং বাড়ছে।
২) News Week এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ১৯৭১ লিখেছে সাত লক্ষ।
৩) The Baltimore sun ১৪ মে ১৯৭১ লিখেছে ৫ লাখ।
৪) The Momento, Caracas জুনের ১৩ তারিখে লিখেছে ৫ থেকে ১০ লক্ষ।
৫) কাইরান ইন্টারন্যাশনাল ২৮ জুলাই লিখেছে ৫ লক্ষ।
৬) Wall Street Journal ২৩ জুলাইয় রিপোর্ট করেছে, সংখ্যাটা ২ থেকে ১০ লক্ষ।
৭) Times সেপ্টেম্বরের বলছে প্রায় ১০ লক্ষাধিক।
৮) দি হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট এক্সপ্রেস- লন্ডন ১লা অক্টোবর ১৯৭১ বলেছে শহীদের সংখ্যা ২০ লক্ষ।
৯) ন্যাশনাল জিওগ্রাফী ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে লিখেছে শহীদের সংখ্যা ৩০ লক্ষ।
এর সাথে সাথে ১৯৮১ সালে ইউ এন ইউনির্ভাসাল হিউম্যান রাইটসের ডিকলেয়ারেশানের কথা মনে করিয়ে দেই। সেখানে লেখা হয়েছে;
“মানব ইতিহাসে যত গণহত্যা হয়েছে এর মধ্যে বাংলাদেশের ১৯৭১’ এর গণহত্যায় স্বল্পতম সময়ে এই সংখ্যা সর্ববৃহৎ। গড়ে প্রতিদিন ৬,০০০ – ১২,০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। .. .. .. এটি হচ্ছে গণহত্যার ইতিহাসে প্রতিদিনে সর্ব্বোচ্চ নিধনের হার।”
তার পাক বাহিনী এই কাজ (দিনপ্রতি ৬০০০-১২০০০ বাঙালী নিধন) করেছে মোটামুটি ২৬০দিনে (একাত্তুরের ২৫-এ মার্চ থেকে শুরু করে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত)।
বাঙালী নিধনের লোওয়ার লিমিট: ৬০০০ x ২৬০ = ১৫,৬০,০০০ (১৫ লক্ষ ৬০ হাজার)। আর নিধনের আপার লিমিট: ১২০০০ x ২৬০ = ৩১,২০,০০০ (৩১ লক্ষ ২০ হাজার)।
এটা আমার কথা না ইউ এন ইউনির্ভাসাল হিউম্যান রাইটসের ডিকলেয়ারেশান
আমরা এখান উল্লেখিত পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে কয়েকটি প্রতিবেদন নিয়ে কিঞ্চিত আলোচনা করবো
১) টাইমস ৫ই এপ্রিল ১৯৭১
২) হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট এক্সপ্রেস এর প্রতিবেদন
৩) ন্যাশনাল জিওগ্রাফীর প্রতিবেদন
টাইমস ৫ এপ্রিল তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে
“গত সাপ্তাহে পাকিস্তানে তিক্ত গৃহ যুদ্ধের প্রথম দফা শেষ হয়েছে। এক্ষেত্রে বিজয়ী সম্ভবত পশ্চিম পাকিস্তানের নিষ্ঠুর সেনা বাহিনী। বিদ্রোহী পূর্ব পাকিস্তানে তার ৮০ হাজার পাঞ্জাবী ও পাঠান সৈন্যের শক্তিশালী বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। সেখানকার কূটনীতিক, সন্ত্রস্ত উদ্বাস্তু আর গোপন বার্তার মাধ্যমে যেসব বার্তা পাওয়া যাচ্ছে তাতে ব্যাপক গরমিল রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে মৃতের সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।”
পঁচিশে মার্চ যুদ্ধ শুরু হবার পর ১৭ই এপ্রিল মুজিব নগর সরকার গঠনের আগেই সংখ্যাটা ৩ লাখ ছাড়িয়ে যায়, ভেবে দেখুন একবার
আশ্চর্যজনক ভাবে ১৯৭১ সালের ১লা অক্টোবর লন্ডনের ‘দি হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট এক্সপ্রেস’ তাদের এক চমকপ্রদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যদিও হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেটের সেই প্রতিবেদন একটা দীর্ঘ আলোচনার দাবী রাখে, অন্য কোন সময় এটা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলা যাবে। কারো আগ্রহ থাকলে আন্দালিব রাশদীর বিদেশীর চোখে একাত্তর বইটা পড়ে দেখতে পারেন, সেখানে পুরো প্রতিবেদনটা দেয়া আছে। চমৎকার ব্যাপারটা হচ্ছে সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে একটা মানবধিকার সংগঠনের কথা যাদের নাম অপারেশন-ওমেগা। মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে কাজ করতো অনেক বিদেশী সংগঠন, তারা যেমন খাদ্য, ঔষধের ব্যাবস্থা করতো তেমনি বস্ত্র এবং থাকার জায়গা সাস্থ্যসেবা এসব নিয়েও কাজ করতো কিন্তু এসব সংগঠনের কেউই সেই সময় বর্ডার ক্রস করে বাংলাদেশে প্রবেশ করার সাহস পায় নি, অপারেশন-ওমেগার দুঃসাহসী কর্মীরা কাজটা করলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন সীমান্তে যে দুর্দশা তারা দেখতে পাচ্ছেন সেটার থেকেও অনেক খারাপ অবস্থা ভেতরের মানুষগুলোর। তা না হলে তারা দেশ ছেড়ে এই অনিশ্চিত শরণার্থীর জীবন বেছে নিতো না। তাছাড়া সীমান্তের এপাড়ে তো মাত্র এক কোটি বাকি সাড়ে ছয় কোটি তো ওপারে। দুঃসাহসী কাজটা তারা করে ফেলেন। তারাই মুক্তিযুদ্ধের সময় একমাত্র বিদেশী সংগঠন যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে ত্রান বিতরণ করেন।
একদিন ত্রান বিতরণ করার সময় ৪জন স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেফতার করে পাকিস্তানীরা। তাদের যশোরের একটি কারাগারে ১১ দিন আটক রাখা হয় এবং এরপর সরাসরি লন্ডনে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। সংস্থাটির অন্যতম সদস্য বেন ক্রো হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট এক্সপ্রেস কে জানায় যশোরে কারাগারে থাকাকালীন সময়ে তিনি জানতে পারেন এখন পর্যন্ত এখানে ২০ লাখ লোককে হত্যা করা হয়েছে।
কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে যাবার অনেক পর পহেলা অক্টোবর প্রকাশিত হয় এই খবর। তাহলে আঁচ করা সম্ভব এর মধ্যে আরও কত মানুষ মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছে। আর সীমান্তের ঐ পারের শরণার্থীদের কথা তো বাদই দিলাম।
এবারে আসি ন্যাশনাল জিওগ্রাফীর সেই বিশেষ সংখ্যাটি নিয়ে। যদিও পত্রিকাটি বাহাত্তরের কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পত্রিকা যখন ৩০ লক্ষ সংখ্যাটিকে মেনে নিয়েছে তখন আমাদেরও একটু খুঁজে ঘুরে আসা দরকার প্রতিবেদনটি থেকে। ব্লগার শিক্ষানবিস সেই প্রতিবেদনটির সম্পূর্ণ অনুবাদ করেছেন, আমি কেবল গনহত্যার অংশটুকু ছবি সহ তুলে দিচ্ছি;
“গণহত্যা শেষে একটি জাতির উত্থান
শ্লোগান দিয়ে বা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে কোন লাভ হয়েছে কি-না জানি না। শুধু জানি, পৃথিবীর ১৪৭তম স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ঠিকই নিজের পায়ে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এদেশের মানুষ যেন নতুনভাবে জীবন সংগ্রাম শুরু করেছে। ১৯৭১ সালে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কথা চিন্তা করলে একে সত্যিই অলৌকিক বলে ভুল হয়।
বাংলাদেশীদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রভাব সুস্পষ্ট। শহর বলি আর গ্রামই বলি, সর্বত্র একই অবস্থা। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র আর দেশের প্রতিটি স্থানেই পুনর্গঠনের কাজ চলছে। কিন্তু আরোগ্য লাভের এই প্রচেষ্টাও বোধ করি খুব কষ্টকর।
শেখ মুজিবের সরকার বলছে, দেশে ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ৩০ লক্ষ বাঙালি নিহত হয়েছে। সংখ্যাটি হয়তো অতিরঞ্জিত, কিন্তু সে সময় ঢাকাসহ এই বিস্তীর্ণ নদীমাতৃক দেশের প্রতিটি প্রান্তে যে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে তা নিঃসন্দেহে গণহত্যার খুব কাছাকাছি।
যতদিনে যুদ্ধ শেষ হয়েছে, ততদিনে পঁচে যাওয়া লাশের মাংস খেয়ে খেয়ে শকুনেরা আরও মোটাতাজা হয়ে উঠেছে। এতোই মোটা হয়েছে যে, তারা আর আগের মতো স্বচ্ছন্দে উড়তে পারে না। যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের যেন কোন প্রাণশক্তিই অবশিষ্ট নেই। থাকবে কি করে, জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রাণশক্তির পুরোটাই যে বাঙালিরা যুদ্ধের ময়দানে ঢেলে দিয়ে এসেছে। সরকার ভিক্ষুকে পরিণত হতে বাধ্য হয়েছে। প্রয়োজনের খাতিরে তাকে বিশ্বব্যাপী ভিক্ষাবৃত্তি করে বেড়াতে হয়েছে। আর এভাবেই ইতিহাসের বৃহত্তম ত্রাণ কর্মসূচীর সূচনা ঘটেছে।
স্ক্যান্ডিনেভীয় এক দেশ থেকে ত্রাণ হিসেবে আসা একটি চালান এক্ষেত্রে উল্লেখ করার মত। তারা ভাল বুঝেই গরম কাপড় পাঠিয়েছে। ইউরোপে এই কাপড়গুলো স্কি করার জন্য ব্যবহৃত হয়। নাতিশীতোষ্ণ এক দেশে কি-না এলো স্কি-ক্লোদিং। ঢাকার এক ত্রাণকর্মী আমাকে বললেন, “অনেকেরই বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন ধারণা নেই। অনেকে মনে করে, হিমালয়ের কাছেপিঠে কোথাও হবে। আবার অনেকে ভাবে, দক্ষিণ দিকে থাইল্যান্ডের প্রতিবেশী হবে হয়তো।”

তর্কের খাতিরে যদি ন্যাশনাল জিওগ্রাফির ঐ সংখ্যাটাও বাদ দেই তবু পরিস্কার বলা যায় হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট এক্সপ্রেসের শহীদের সংখ্যা ২০ লাখ বলা সেই প্রতিবেদনটি যেটা প্রকাশ হয়েছিলো অক্টোবরের ১ তারিখ, সেই প্রতিবেদনের ঘটনা কাল সম্ভবত আগস্টের কিংবা বড়োজোর সেপ্টেম্বরে (কারণ বেন ক্রো নিজে সেই পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন না, এগারো দিন জেলে ছিলেন এবং তারপর ছাড়া পেয়ে দেশে যেতে কয়দিন লেগেছে আমরা জানি না কিন্তু যত কম সময়ই লাগুক ঘটনার সময়টা অক্টোবরের লেখা প্রকাশের অনেক আগে)
এই নিউজটাকে জোর দিচ্ছি কারণ যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩০ লাখ শহীদের ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি মনে করেন দাবী করেন সংখ্যাটা অনেক কম এবং উদ্দেশ্যমূলক ভাবে বানানো তাদের কাছে তুলে ধরতে যে সংখ্যাটা হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠে নি। আন্তর্জাতিক দৈনিক বলছে এপ্রিলে সাত লক্ষ, জুলাইতে দশ লক্ষ, সেপ্টেম্বরে বিশ লক্ষ তাহলে ডিসেম্বরে কত… ?

তিরিশ লক্ষ শহীদ, বাহুল্য নাকি বাস্তবতাঃ বীরাঙ্গনাদের জবানবন্দীর একটি সংকলন
4.
একাত্তরে আমাদের নারীদের ওপর পরিচালিত পাকিস্তানি সৈন্যদের যৌন নির্যাতনের কতটা মারাত্মক, কতোটা ভয়াবহ, কতোটা বীভৎস ছিলো- যুদ্ধ চলাকালে আমাদের দেশ থেকে প্রকাশিত কোনো দৈনিক পত্রিকায়ই তা প্রকাশিত হয় নি। গনহত্যা, শরণার্থীদের কথা যেমন বিদেশী সংবাদপত্র গুলোতে প্রকাশিত হয়েছিলো গুরুত্ব নিয়ে সে রকম করে ধর্ষণ কিংবা নারী নির্যাতনের খবরগুলো প্রকাশিত হয়নি বিদেশী সংবাদ মাধ্যমে। এখানে লক্ষণীয় এই নারী নির্যাতন ইস্যু নিয়ে সমৃদ্ধ এখনকার কাজগুলোও তেমন প্রচারণা পায়নি। ডঃ ডেভিস কিংবা সুসান ব্রাউনমিলারের গবেষণা ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশন কিংবা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কিছু কাজ ছাড়াও ব্যাক্তিগত উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের করা কিছু দুর্দান্ত কাজ ঠিকই রয়েছে, কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে এসব কাজ খুব একটা আলোর মুখ দেখতে পারে নি এদেশের মানুষের কাছে। কেন এই নিস্ক্রিয়তা, প্রথমেই আমাদের খোঁজটা হোক এই প্রশ্ন।
ভোরের কাগজ, ১৮ মে ২০০২ তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পর থেকে জাতীয় দৈনিকগুলোতে পাক সেনা কর্তৃক নারী নির্যাতনের বেশ কিছু সংবাদ প্রকাশিত হলেও ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন নির্যাতনের ধরন, প্রকৃতি, শারীরিক, মানসিক প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ে খুব কমই গবেষণা হয়েছে। “স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও দলিল প্রামাণ্যকরন” প্রকল্পের তৎকালীন গবেষক, বর্তমানে ইংরেজী দৈনিক ডেইলি ষ্টারের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক আফসান চৌধুরী এজন্য ইতিহাস রচনার সনাতনি দৃষ্টিভঙ্গিকে দায়ী করে বলেছেন, দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখনে বরাবরই সশস্ত্র লড়াই, ক্ষমতাসীন পুরুষদের কৃতিত্ব গ্রন্থিত করার উদ্যোগ চলছে, কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে লাখ লাখ নারী অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করেও যেভাবে যুদ্ধের ভয়াবহতার শিকার হয়েছে, সনাতনি মানুসিকতার কারণে কখনই তা নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সংঘর্ষকালীন ধর্ষণ এবং অন্যান্য নির্যাতনের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষক ক্যাসান্দ্রা ক্লিফোর্ড,ধর্ষণ কীভাবে হয়ে ওঠে গণহত্যার অনিবার্য অস্ত্র সে সম্পর্কে লিখেছেন
“Rape as a Weapon of War and its Long-term Effects on Victims and Society”
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের দেশে সংঘটিত গণহত্যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী নারী নির্যাতনের এই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের সর্বাত্মক ব্যবহার নিশ্চিত করে। মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই নয় মাসে ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনকে একটি বিকৃত শিল্পের পর্যায়ে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এই নির্যাতনের সংখ্যাগত মাত্রা সুবিশাল, এখন পর্যন্ত পাওয়া হিসেবে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা ছয় লক্ষের বেশী। যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী শিকার নারী। সম্ভবত পৃথিবীতে এমন কোন যুদ্ধ ঘটেনি যেখানে ধর্ষণ হয় নি। আক্রান্ত গোষ্ঠীকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিতে,আতঙ্কের রাজত্ব সৃষ্টি করতে,প্রতিরোধ গড়ে ওঠার চেষ্টাকে গুঁড়িয়ে দিতে ধর্ষণ সহ অন্যান্য নারী নির্যাতন হয়ে ওঠে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের প্রধানতম অস্ত্র। তারপরেও আগ্রাসী সেনাবাহিনীকে নারী নির্যাতনে সরাসরি উৎসাহিত করেছে কর্তৃপক্ষ , এমন ঘটনা ইতিহাসে খুব বেশি ঘটেনি। এই বিরল নিদর্শন পাকিস্তান সেনাবাহিনী রেখে গেছে ১৯৭১ সালে,বাংলাদেশ ভূখণ্ডে।
ডঃ মুনতাসির মামুন যুদ্ধকালীন নারী নির্যাতন নিয়ে লিখেছেন অনেক। তিনি তার ‘মুক্তিযুদ্ধ, নির্যাতন, বিচার’ শীর্ষক প্রবন্ধে গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন যুদ্ধ পরবর্তী ইতিহাস লুকোনোর প্রচেষ্টা নিয়ে।
তিনি তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিমের কথা। তার অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা হয়েছিলো ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ নামে দু’খণ্ডে এ সম্পর্কে তিনি গ্রন্থও। তার বিবরণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের নারী নির্যাতনের অনেক বিবরণ আছে। যেমন ‘আমাদের শাড়ি পরতে বা দোপাট্টা ব্যবহার করতে দেয়া হতো না। কোনো ক্যাম্পে নাকি কোনো মেয়ে গলায় শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তাই আমাদের পরনে শুধু পেটিকোট আর ব্লাউজ। যেমন ময়লা তেমনি ছেঁড়া-খোঁড়া। মাঝে মাঝে শহরের দোকান থেকে ঢালাও এনে আমাদের প্রতি ছুঁড়ে ছেড়ে দিত। যেমন দুর্গাপূজা বা ঈদের সময় ভিক্ষা দেয় অথবা জাকাত দেয় ভিখারিকে। চোখ জলে জলে ভরে উঠত।
শাহরিয়ার কবিরকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, বীরাঙ্গনাদের যে তালিকা ছিল স্বয়ং বঙ্গবন্ধু তা বিনষ্ট করে ফেলার জন্য বলেছিলেন কারণ তিনি অনুধাবন করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ হলেও সমাজের মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয় নি। সমাজ এদের গ্রহণ করবে না।
স্বাধীনতার ত্রিশ বছর পর একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি কয়েকজন বীরাঙ্গনাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য এবং যুদ্ধাপরাধ এ মাটিতে কী পর্যায়ে গিয়েছিল তার সাক্ষ্য হিসেবে। সেই মহিলারা এতদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করেছিলেন। কিন্তু এ ঘটনার পর সমাজপতি ও পরিবারের সদস্যবৃন্দ তাদের প্রায় পরিত্যাগ করে। খুলনায় আমি একজন মহিলাকে পাগলিনি বেশে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি যিনি ’৭১ সালে নির্যাতিত হয়েছিলেন। খুলনার অনেকেই তা জানেন, কিন্তু কেউ তার পুনর্বাসনে এগিয়ে আসেন নি। এই হচ্ছে বাংলাদেশ ও বাঙালির আসল রূপ। ডঃ মামুন লিখেছেন; সবাই প্রিয়ভাষিণী নন। প্রিয়ভাষিণীর যা আছে তা হলো চরিত্র, যা আমাদের নেই। থাকলে বাংলাদেশকে পোড়ার বাংলাদেশ বলতাম না।
নির্যাতনের জন্য পাকিস্তানী সৈন্যরা যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করতো তা নিয়ে আলোচনা করেছেন শাহারিয়ার কবির এবং মুনতাসির মামুন। এছাড়া এ সম্পর্কে গবেষণা লব্ধ “নারী নির্যাতনের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ” শীর্ষক একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ICSF এর অফিসিয়াল ওয়েবে। সব কিছু মিলিয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নির্যাতনের কয়েকটি প্রচলিত পদ্ধতি নিচে উল্লেখ করা হলোঃ
১. অশ্লীল ভাষায় গালাগালি, তৎসঙ্গে চামড়া ফেটে রক্ত না বেরুনো পর্যন্ত শারীরিক প্রহার,
২. পায়ের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা এবং সেই সঙ্গে বেয়নেট দিয়ে খোঁচানো এছাড়া রাইফেলের বাঁট দিয়ে নির্মম ভাবে প্রহার,
৩. উলঙ্গ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উন্মুক্ত স্থানে দাঁড় করিয়ে রাখা,
৪. সিগারেটের আগুন দিয়ে সারা শরীরে ছ্যাঁকা দেয়া,
৫. হাত ও পায়ের নখ ও মাথার ভিতর মোটা সুঁচ ঢুকিয়ে দেয়া,
৬. মলদ্বারের ভিতর সিগারেটের আগুনের ছ্যাঁকা দেয়া এবং বরফখন্ড ঢুকিয়ে দেয়া,
৭. চিমটে দিয়ে হাত ও পায়ের নখ উপড়ে ফেলা,
৮. দড়িতে পা বেঁধে ঝুলিয়ে মাথা গরম পানিতে বারবার ডোবানো,
৯. হাত-পা বেঁধে বস্তায় পুরে উত্তপ্ত রোদে ফেলে রাখা,
১০. রক্তাক্ত ক্ষতে লবণ ও মরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দেয়া,
১১. নগ্ন ক্ষতবিক্ষত শরীর বরফের স্ল্যাবের ওপরে ফেলে রাখা,
১২. মলদ্বারে লোহার রড ঢুকিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেয়া,
১৩. পানি চাইলে মুখে প্রস্রাব করে দেয়া,
১৪. অন্ধকার ঘরে দিনের পর দিন চোখের ওপর চড়া আলোর বাল্ব জ্বেলে ঘুমোতে না দেয়া,
১৫. শরীরের স্পর্শকাতর অংশে বৈদ্যুতিক শক প্রয়োগ প্রভৃতি।
এটা তো সার্বজনীন, ছিল।গ ণহত্যার একেবারে শুরুতে ধর্ষণ এবং নির্যাতনের ধরণ যেমন ছিল সেটা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। অবশ্য নির্যাতনের ভয়াবহতার কোন পরিবর্তন হয়নি, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই মাত্রায় নৃশংসতা চালানো হয়েছে।
নির্যাতনের এই ধরণগুলো সংক্ষেপে এরকম –
১. মার্চ এপ্রিলের দিনগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিন্দু মেয়েদেরকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে।কখনো ধর্ষণের পর তাদেরকে রাজাকার,আলবদর ও অন্যান্য দোসরদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে ধর্ষণ ও ভোগ শেষে হত্যা করার জন্য।
২. মুসলিম সম্প্রদায়ের মেয়েদেরকে ( যাদের সংখ্যা মোট নির্যাতিতার শতকরা আশি ভাগ ) যেখানে পেয়েছে সেখানেই ধর্ষণ করেছে, বিশেষ করে একাত্তরের এপ্রিল থেকে।ক খনও তাদের বাসস্থলে,এককভাবে কিংবা পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়েছে। অনেকক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজন ও নিকটজন বিশেষ করে স্বামী-সন্তান। শ্বশুর-শাশুড়ি,বাবা-মায়ের সামনেই ধর্ষণ করা হয়েছে। ধর্ষণের এই বর্বর প্রক্রিয়াটি ব্যবহৃত হয়েছিল ধর্ষিতা এবং তাদের আত্মীয়স্বজনসহ বাঙালি সম্প্রদায়ের অহংকার ও অস্তিত্বকে আঘাত করার জন্য। সেই সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর বিকারগ্রস্ত প্রকৃতি চরিতার্থ করার জন্য।
৩. কখনও তারা বাঙালি মেয়েদেরকে ক্যাম্পে বন্দি রেখে ভোগ্যপণ্য ও যৌনদাসী হিসাবে ব্যবহার করেছে।
৪. কখনও একক সম্পদ ও দাসী হিসাবে মেয়েদেরকে তারা এক বাঙ্কার থেকে অন্য বাঙ্কারে কিংবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে গেছে।
৫. প্রাথমিক অত্যাচারের সময় অথবা দীর্ঘভোগের পর পালিয়ে যাবার সময় পাকিস্তানি বাহিনী এই মেয়েদের স্তন,উরু,যৌনাঙ্গসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গের অংশ কেটে নিয়ে গেছে fetichistic crisis ও মনোবিকারে আক্রান্ত হয়ে।
৬. সৈনিকেরা প্রতিটি যুবতী মহিলা ও বালিকার পরণের কাপড় সম্পূর্ণ খুলে একেবারে উলঙ্গ করে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দিয়ে ধর্ষণে লিপ্ত হতো।
৭. সৈনিকেরা অনেক সময় মেয়েদের পাগলের মত ধর্ষণ করে আর ধারালো দাঁত দিয়ে বক্ষের স্তন কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে দিত,এতে অনেক অল্পবয়স্ক মেয়ের স্তনসহ বুকের মাংস উঠে এসেছিল।মেয়েদের গাল,পেট,ঘাড়,বুক,পিঠ ও কোমরের অংশ পাকিস্তানি সৈনিকের অবিরাম কামড়ে রক্তাক্ত হয়ে যেত।
৮. সাধারণত যে সকল বাঙালি মেয়ে এধরণের পাশবিকতার শিকার হতে অস্বীকার করতো তাদেরকে তখনই চুল ধরে টেনে এনে স্তন ছিঁড়ে ফেলে,যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে বন্দুকের নল,বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে দিয়ে হত্যা করা হতো।
৯. অনেক উচ্চপদস্থ অফিসার মদ খেয়ে উলঙ্গ বালিকা,যুবতী ও বাঙালি মেয়েদের সারাক্ষণ পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করতো। বহু অল্প বয়স্ক বালিকা উপর্যুপরি ধর্ষণ ও অবিরাম অত্যাচারে রক্তাক্ত শরীরে কাতরাতে কাতরাতে মারা যেত।
১০. অনেক সময় প্রাণভয়ে অন্যান্য মেয়েরা স্বেচ্ছায় পাকিস্তানি সৈনিকদের কাছ আত্মসমর্পণ করতো।তাদেরকেও হঠাৎ একদিন ধরে ছুরি চালিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে হত্যা করে আনন্দ উপভোগ করতো সৈনিকেরা।
১১. অনেক সময় যুবতী মেয়েকে মোটা লোহার রডের সাথে চুল বেধে ঝুলিয়ে রাখা হতো।পাকসেনারা প্রতিদিন সেখানে যাতায়াত করতো,কেউ কেউ এসে সেই উলঙ্গ যুবতীদের উলঙ্গ দেহে উন্মত্তভাবে আঘাত করতো,কেউ তাদের স্তন কেটে নিয়ে যেত,কেউ হাসতে হাসতে তাদের যোনিপথে লাঠি ঢুকিয়ে আনন্দ করতো।এসব অত্যাচারে কোন মেয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করলে তার যোনিপথে লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করা হতো।
১২. অনেক মেয়ের হাত পিছনের দিকে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।সৈনিকেরা এসব মেয়েদের এলোপাথাড়ি ভাবে প্রহার করতো।এভাবে প্রতিদিন বিরামহীন প্রহারের মেয়েদের শরীর থেকে রক্ত ঝরতো।কোন কোন মেয়ের সম্মুখের দিকে দাঁত ছিল না,ঠোঁটের দু’দিকের মাংস কামড়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল এবং প্রতিটি মেয়ের আঙ্গুল লাঠি ও রডের আঘাতে ভেঙ্গে,থেঁতলে গিয়েছিল।এক মুহূর্তের জন্যও প্রস্রাব-পায়খানার প্রয়োজনেও এসব মেয়ের হাতের বাঁধন খুলে দেয়া হতো না।অবিরাম ধর্ষণের ফলে ফলে অনেক মেয়ে ঝুলন্ত অবস্থাতেই মারা যেত।
১৩. অনেক সময় বন্দি বাঙালি মেয়েদের নদীতে শিকল বাঁধা অবস্থায় গোসল করতে যেতে দিত।এসময় একটু দেরি হলেই সৈনিকেরা তাদের ঘাঁটি থেকে শিকল ধরে টানাটানি করতো।এধরণের টানাটানিতে অনেক সময়ই প্রায় বিবস্ত্র শরীরে এসব মেয়েকে ঘাঁটিতে ফিরতে হতো।
১৪. গণহত্যার প্রথম দিকে ক্যাম্পে পাকিস্তানি সৈনিকদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেক মেয়ে ওড়না বা শাড়ি গলায় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।এর পর থেকে এসব মেয়েকে বিবস্ত্র অবস্থায় রাখা হয়।
১৫. পাকিস্তানি সৈনিকেরা গর্ভবতী এবং প্রসূতি নারীদেরও ধর্ষণ করে।এতে অনেকেরই মৃত্যু হয়।
১৬. সৈনিকেরা অনেক সময় হঠাৎ গ্রামে বা বসতিতে আক্রমণ চালিয়ে পলায়নরত মহিলাদের ধরে এনে উন্মুক্ত স্থানেই ধর্ষণে লিপ্ত হতো।
১৭. অনেক সময় পিতার সামনেই মেয়েকে, সন্তানের সামনে মাকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ করতো পাকিস্তানি সৈনিকেরা। কখনও কখনও পিতাকে,ছেলেকে বা ভাইকে আদেশ করতো মেয়েকে,মাকে অথবা বোনকে ধর্ষণ করতে। এতে অবাধ্য হলে সাথে সাথে তাদের হত্যা করা হতো।
এ পর্যায়ে যুদ্ধকালীন নারী নির্যাতনের কিছু মৌখিক বয়ান এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠিত ধর্ষণ সম্পর্কিত প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন উল্লেখ করা হলোঃ
রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সুইপার রাবেয়া খাতুনের বর্ণনা
” ১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ রাতে হানাদার পাঞ্জাবী সেনারা যখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উপর অতর্কিতে হামলা চালায় তখন আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনের এস, এফ ক্যান্টিনে ছিলাম। আসন্ন হামলার ভয়ে আমি সারাদিন পুলিশ লাইনের ব্যারাক ঝাড়ু দিয়ে রাতে ব্যারাকেই ছিলাম। কামান, গোলা, লাইটবোম আর ট্যাঙ্কের অবিরাম কানফাটা গর্জনে আমি ভয়ে ব্যারাকের মধ্যে কাত হয়ে পড়ে থেকে থরথরিয়ে কাঁপছিলাম। ২৬ শে মার্চ সকালে ওদের কামানের সম্মুখে আমাদের বীর বাঙ্গালী পুলিশ বাহিনী বীরের মত প্রতিরোধ করতে করতে আর টিকে থাকতে পারি নাই। সকালে ওরা পুলিশ লাইনের এস,এফ ব্যারাকের চারদিকে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং ব্যারাকের মধ্যে প্রবেশ করে বাঙ্গালী পুলিশদের নাকে , মুখে, সারা দেহে বেয়নেট ও বেটন চার্জ করতে করতে ও বুটের লাথি মারতে মারতে বের করে নিয়ে আসছিল। ক্যান্টিনের কামড়া থেকে বন্দুকের নলের মুখে আমাকেও বের করে আনা হয়, আমাকে লাথি মেরে, মাটিতে ফেলে দেয়া হয় এবং আমার উপর প্রকাশ্যে পাশবিক অত্যাচার করছিল আর কুকুরের মত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল। আমার উপর উপর্যুপরি পাশবিক অত্যাচার করতে করতে যখন আমাকে একেবারে মেরে ফেলে দেওয়ার উপক্রম হয় তখন মার বাঁচবার আর কোন উপায় না দেখে আমি আমার প্রান বাঁচাবার জন্য ওদের নিকট কাতর মিনতি জানাচ্ছিলাম। আমি হাউ মাউ করে কাদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরোনা, আমি সুইপার, আমাকে মেরে ফেললে তোমাদের পায়খান ও নর্দমা পরিস্কার করার আর কেউ থাকবে না, তোমাদের পায়ে পড়ি তোমরা আমাকে মেরোনা, মেরো না, মেরো না, আমাকে মেরে ফেললে তোমাদের পুলিশ লাইন রক্ত ও লাশের পচা গন্ধে মানুষের বাস করার অযোগ্য হয়ে পড়বে। তখনও আমার উপর এক পাঞ্জাবী কুকুর , কুকুরের মতোই আমার কোমরের উপর চড়াও হয়ে আমাকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করছিল। আমাকে এভাবে ধর্ষণ করতে করতে মেরে ফেলে দিলে রাজারবাগ পুলিশ লাইন পরিস্কার করার জন্য আর কেউ থাকবে না একথা ভেবে ওরা আমাকে ছেড়ে দিয়ে আমাকে এক পাঞ্জাবী ধমক দিয়ে বলতে থাকে ,’ ঠিক হায় , তোমকো ছোড় দিয়া যায়েগা জারা বাদ, তোম বাহার নাহি নেকলেগা, হারওয়াকত লাইন পার হাজির রাহেগা।’ এ কথা বলে আমাকে ছেড়ে দেয়।
পাঞ্জাবী সেনারা রাজাকার ও দালালদের সাহায্যে রাজধানীর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা এবং অভিজাত জনপদ থেকে বহু বাঙ্গালী যুবতী মেয়ে, রূপসী মহিলা এবং সুন্দরী বালিকাদের জীপে , মিলিটারি ট্রাকে করে পুলিশ লাইনের বিভিন্ন ব্যারাকে জমায়েত করতে থাকে। আমি ক্যান্টিনের দ্রেন পরিস্কার করছিলাম দেখলাম আমার সম্মুখ দিয়ে জীপ থেকে আর্মি ট্রাক থেকে লাইন করে বহু বালিকা যুবতী ও মহিলাকে এস,এফ ক্যান্টিনের মধ্য দিয়ে ব্যারাকে রাখা হল। বহু মেয়েকে হেডকোয়ার্টার বিল্ডিং এ উপর তালায় রুমে নিয়ে যাওয়া হল, আর অবশিষ্ট মেয়ে যাদেরকে ব্যারাকের ভিতর জায়গা দেওয়া গেল না তাঁদের বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখা হল। অধিকাংশ মেয়ের হাতে বই ও খাতা দেখলাম, অনেক রুপসী যুবতীর দেহে অলংকার দেখলাম, তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ মেয়ের চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু পড়ছিল। এরপরই আরম্ভ হয়ে গেল সেই বাঙ্গালী নারীদের উপর বীভৎস ধর্ষণ। লাইন থেকে পাঞ্জাবী সেনারা কুকুরের মত জিভ চাটতে চাটতে ব্যারাকের মধ্যে উম্মত্ত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে প্রবেশ করতে লাগল। ওরা ব্যারাকে ব্যারাকে প্রবেশ করে প্রতিটি যুবতী, মহিলা ও বালিকার পরনের কাপড় খুলে একেবারে উলঙ্গ করে মাটিতে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে বীভৎস ধর্ষণে লেগে গেল। কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই নিরীহ বালিকাদের উপর ধর্ষণে লেগে গেল, আমি ব্যারাকে ড্রেন পরিস্কার করার অভিনয় করছিলাম আর ওদের বীভৎস পৈশাচিকতা দেখছিলাম। ওদের উম্মত্ত উল্লাসের সামনে কোন মেয়ে কোন শব্দ পর্যন্তও করে নাই, করতে পারে নাই। উম্মত্ত পাঞ্জাবী সেনারা এই নিরীহ বাঙ্গালী মেয়েদের শুধুমাত্র ধর্ষণ করেই ছেড়ে দেয় নাই- আমি দেখলাম পাক সেনারা সেই মেয়েদের উপর পাগলের মত উঠে ধর্ষণ করছে আর ধারাল দাঁত বের করে বক্ষের স্তন ও গালের মাংস কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে, ওদের উদ্ধত ও উম্মত্ত কামড়ে অনেক কচি মেয়ের স্তনসহ মক্ষের মাংস উঠে আসছিল, মেয়েদের গাল, পেট, ঘাড়, বক্ষ, পিঠের ও কোমরের অংশ ওদের অবিরাম দংশনে রক্তাক্ত হয়ে গেল। যে সকল বাঙ্গালী যুবতী ওদের প্রমত্ত পাশবিকতার শিকার হতে অস্বীকার করলো দেখলাম তৎক্ষণাৎ পাঞ্জাবী সেনারা ওদেরকে চুল ধরে টেনে এনে স্তন ছোঁ মেরে টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে ওদের যোনি ও গুহদ্বারের মধ্যে বন্দুকের নল, বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে দিয়ে সেই বীরাঙ্গনাদের পবিত্র দেহ ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। অনেক পশু ছোট ছোট বালিকাদের উপর পাশবিক অত্যাচার করে ওদের অসার রক্তাক্ত দেহ বাইরে এনে দুজন দু পা দুদিকে টেনে ধরে চড়চড়িয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিল, আমি দেখলাম সেখানে বসে বসে, আর ড্রেন পরিস্কার করছিলাম, পাঞ্জাবীরা শ্মশানের লাশ যে কোন কুকুরের মত মদ খেয়ে সব সময় সেখানকার যার যে মেয়ে ইচ্ছা তাকেই ধর্ষণ করছিল। শুধু সাধারণ পাঞ্জাবী সেনারাই এই বীভৎস পাশবিক অত্যাচারে যোগ দেয় নাই, সকল উচ্চপদস্থ পাঞ্জাবী অফিসাররাই মদ খেয়ে হিংস্র বাঘের মত হয়ে দুই হাত বাঘের মত নাচাতে নাচাতে সেই উলঙ্গ বালিকা, যুবতী ও বাঙ্গালী মহিলাদের উপর সারাক্ষন পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ কাজে লিপ্ত থাকতো। কোন মেয়ে, মহিলা, যুবতীকে এক মুহূর্তের জন্য অবসর দেওয়া হয় নাই, ওদের উপর্যুপরি ধর্ষণ ও অবিরাম অত্যাচারে বহু কচি বালিকা সেখানেই রক্তাক্ত দেহে কাতরাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে, পরের দিন এ সকল মেয়ের লাশ অন্যান্য মেয়েদের সম্মুখে ছুরি দিয়ে কেটে কুটি কুঁচি করে বস্তার মধ্যে ভরে বাইরে ফেলে দিত। এ সকল মহিলা , বালিকা ও যুবতীদের নির্মম পরিণতি দেখে অন্যান্য মেয়েরা আরও ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তো এবং স্বেচ্ছায় পশুদের ইচ্ছার সম্মুখে আত্মসমর্পণ করতো। যে সকল মেয়ে প্রানে বাঁচার জন্য ওদের সাথে মিল দিয়ে ওদের অতৃপ্ত যৌনক্ষুধা চরিতার্থ করার জন্য ‘ সর্বতোভাবে সহযোগীতা করে তাঁদের পিছনে ঘুরে বেড়িয়েছে তাঁদের হাসি তামাশায় দেহদান করেছে তাদেরকেও ছাড়া হয় নাই। পদস্থ সামরিক অফিসাররা সেই সকল মেয়েদের উপর সম্মিলিতভাবে ধর্ষণ করতে করতে হঠাৎ একদিন তাকে ধরে ছুরি দিয়ে তার স্তন কেটে, পাছার মাংস কেটে, যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে সম্পূর্ণ ছুরি চালিয়ে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ওরা আনন্দ উপভোগ করত।
এরপর উলঙ্গ মেয়েদেরকে গরুর মত লাথি মারতে মারতে পশুর মত পিটাতে পিটাতে উপরে হেডকোয়ার্টারে দোতলা, তেতলা ও চার তলায় উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। পাঞ্জাবী সেনারা চলে যাওয়ার সময় মেয়েদেরকে লাথি মেরে আবার কামরার ভিতর ঢুকিয়ে তালাবদ্ধ করে চলে যেত। ইহার পর বহু যুবতী মেয়েকে হেডকোয়ার্টারের উপর তলায় বারান্দার মোটা লোহার তারের উপর চুলের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়। প্রতিদিন পাঞ্জাবীরা সেখানে যাতায়াত করতো সেই ঝুলন্ত উলঙ্গ যুবতীদের কেউ এসে তাঁদের উলঙ্গ দেহের কোমরের মাংস বেট দিয়ে উম্মত্তভাবে আঘাত করতে থাকতো, কেউ তাঁদের বক্ষের স্তন কেটে নিয়ে যেত, কেউ হাসতে হাসতে তাঁদের যোনিপথে লাঠি ঢুকিয়ে আনন্দ করত, কেউ উঁচু চেয়ারে দাঁড়িয়ে উম্মুক্তবক্ষ মেয়েদের স্তন মুখ লাগিয়ে ধারাল দাঁত দিয়ে স্তনের মাংস তুলে নিয়ে আনন্দে অট্টহাসি করতো। কোন মেয়ে এসব অত্যাচারে কোন প্রকার চিৎকার করার চেষ্টা করলে তার যোনিপথ দিয়ে লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করা হত। প্রতিটি মেয়ের হাত বাঁধা ছিল পিছনের দিকে শুন্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। অনেক সময় পাঞ্জাবী সেনারা সেখানে এসে সেই ঝুলন্ত উলঙ্গ মেয়েদের এলোপাথাড়ি বেদম প্রহার করে যেত। প্রতিদিন এভাবে বিরামহীন প্রহারে মেয়েদের দেহের মাংস ফেটে রক্ত ঝরছিল, মেয়েদের কারো মুখের সম্মুখের দাঁত ছিল না, ঠোঁটের দুদিকের মাংস কামড়ে, টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল, লাঠি ও লোহার রডের অবিরাম পিটুনিতে প্রতিটি মেয়ের আঙ্গুল, হাতের তালু ভেঙ্গে, থেঁতলে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এসব অত্যাচারিত ও লাঞ্চিত মহিলা ও মেয়েদের প্রসাব ও পায়খানা করার জন্য হাতের ও চুলের বাঁধন খুলে দেওয়া হতো না এক মুহূর্তের জন্য। হেডকোয়ার্টারের উপর তলায় বারান্দায় এই ঝুলন্ত উলঙ্গ মেয়েরা হাত বাঁধা অবস্থায় লোহার তারে ঝুলে থেকে সেখানে প্রসাব পায়খানা করত- আমি প্রতিদিন সেখানে গিয়ে এসব প্রসাব- পায়খানা পরিস্কার করতাম। আমি স্বচক্ষে দেখেছি, অনেক মেয়ে অবিরাম ধর্ষণের ফলে নির্মমভাবে ঝুলন্ত অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেছে। প্রতিদিন সকালে গিয়ে সেই বাঁধন থেকে অনেক বাঙ্গালী যুবতীর বীভৎস মৃতদেহ পাঞ্জাবী সেনাদের নামাতে দেখেছি। আমি দিনের বেলাও সেখানে সকল বন্দী মহিলাদের পুতগন্ধ, প্রসাব- পায়খানা পরিষ্কার করার জন্য সারাদিন উপস্থিত থাকতাম। প্রতিদিন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ব্যারাক থেকে এবং হেডকোয়ার্টার অফিসের উপর তলা হতে বহু ধর্ষিতা মেয়ের ক্ষতবিক্ষত বিকৃত লাশ ওরা পায়ে রশি বেঁধে নিয়ে যায় এবং সেই জায়গায় রাজধানী থেকে ধরে আনা নতুন নতুন মেয়েদের চুলের সাথে ঝুলিয়ে বেঁধে নির্মমভাবে ধর্ষণ আরম্ভ করে দেয়। এসব উলঙ্গ নিরীহ বাঙ্গালী যুবতীদের সারাক্ষন পাঞ্জাবী সেনারা প্রহরা দিত। কোন বাঙ্গালীকেই সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না। আর আমি ছাড়া অন্য কোন সুইপারকেও সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না।
মেয়েদের হাজারো কাতর আহাজারিতেও আমি ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাঙ্গালী মেয়েদের বাঁচাবার জন্য কোন ভুমিকা পালন করতে পারি নাই। এপ্রিল মাসের দিকে আমি অন্ধকার পরিষ্কার হওয়ার সাথে সাথে খুব ভরে হেডকোয়ার্টারের উপর তলায় সারারাত ঝুলন্ত মেয়েদের মলমুত্র পরিষ্কার করছিলাম। এমন সময় সিদ্ধেশ্বরীর ১৩৯ নং বাসার রানু নামে এক কলেজের ছাত্রীর কাতর প্রার্থনায় আমি অত্যন্ত ব্যাথিত হয়ে পড়ি এবং মেথরের কাপড় পরিয়ে কলেজ ছাত্রি রানুকে মুক্ত করে পুলিশ লাইনের বাইরে নিরাপদে দিয়ে আসি। স্বাধীন হওয়ার পর সেই মেয়েকে আর দেখি নাই। ১৯৭১ সনের ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ মুক্ত করার পূর্ব পর্যন্ত পাঞ্জাবী সেনারা এসকল নিরীহ বাঙ্গালী মহিলা, যুবতী ও বালিকাদের উপর এভাবে নির্মম-পাশবিক অত্যাচার ও বীভৎসভাবে ধর্ষণ করে যাচ্ছিল। ডিসেম্বরের প্রথমদিকে মিত্রবাহিনী ঢাকায় বোমাবর্ষণের সাথে সাথে পাঞ্জাবী সেনারা আমাদের চোখের সামনে মেয়েদের নির্মমভাবে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করে। রাজারবাগ হেডকোয়ার্টার অফিসের উপর তলায়, সমস্ত কক্ষে, বারান্দায় এই নিরীহ মহিলা ও বালিকাদের তাজা রক্ত জমাট হয়েছিল। ডিসেম্বরের মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী রাজধানীতে বীর বিক্রমে প্রবেশ করলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সকল পাঞ্জাবী সেনা আত্মসমর্পণ করে।”
বীরাঙ্গনা তারা ব্যানার্জির বর্ণনায় সেই দিনগুলোর কথা।
“২৭ শে মার্চ অন্ধকার থাকতেই আমরা গ্রামের বাড়ীতে রওয়ানা হলাম সামান্য হাতব্যাগ নিয়ে। গাড়ি , রিকশা কিছুই চলছে না। হঠাৎ স্থানীয় চেয়ারম্যানের জীপ এসে থামল আমাদের সামনে। বাবাকে সম্বোধন করে বললেন, ডাক্তারবাবু আসেন আমার সঙ্গে। কোথায় যাবেন নামিয়ে দিয়ে যাবো। বাবা আপত্তি করায় চার পাচজনে আমাকে টেনে জীপে তুলে নিয়ে গেল। কোন গোলাগুলির শব্দ শুনলাম না। বাবা মা কে ধরে নিয়ে গেল নাকি মেরে ফেললো বলতে পারবো না। গাড়ি আমাকে নিয়ে ছুটল কোথায় জানি না। কিছুক্ষন হয়ত জ্ঞান হারিয়ে ছিল আমার। সচেতন হয়ে উঠে বসতেই বুঝলাম এটা থানা, সামনে বসা আর্মি অফিসার।
অফিসারটি পরম সোহাগে আমাকে নিয়ে জীপে উঠলো। কিছুদুর যাবার পর সে গল্প জুড়লো অর্থাৎ কৃতিত্বের কথা আমাকে শোনাতে লাগলো। আমার মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। হঠাৎ ঐ চলন্ত জীপ থেকে আমি লাফ দিলাম। ড্রাইভিং সিটে ছিল অফিসার, আমি পেছনে, পেছনে দু জন জোয়ান। আমার সম্ভবত হিতাহিত জ্ঞান রহিত হয়ে গিয়েছিল। যখন জ্ঞান হলো দেখি মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, আমি হাসপাতালের বিছানায়। ছোট্ট হাস্পাতাল। যত্নই পেলাম, সব পুরুষ। একজন গ্রামের মেয়েকে ধরে এনেছে আমার নেহায়েত প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য। মেয়েটি গুন গুন করে কেঁদে চলেছে। সন্ধ্যায় অফিসারটি চলে গেল। যাবার সময় আমাকে হানি, ডার্লিং ইত্যাদি বলে খোদা হাফেজ করল। দিন তিনেক শুয়ে থাকার পর উঠে বসলাম। সুস্থ হয়েছি এবার। আমাদের ভেতর সংস্কার আছে পাঁঠা বা মহিষের খুঁত থাকলে তাকে দেবতার সামনে বলি দেওয়া যায় না। আমি এখন বলির উপযোগী।
প্রথম আমার উপর পাশবিক নির্যাতন করে একজন বাঙালি। আমি বিস্ময়ে বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। অসুস্থ দেহে যুদ্ধ করতে পারলাম না। লালাসিক্ত পশুর শিকার হলাম। ওই রাতে কতজন আমার উপর অত্যাচার করেছিল বলতে পারবো না, তবে ছ’সাত জনের মতো হবে। সকালে অফিসারটি এসে আমাকে ঐ অবস্থায় দেখলো তারপর চরম উত্তেজনা, কিছু মারধরও হলো। তারপর আমাকে তার জীপে তুলে নিল, আমি তৃতীয় গন্তব্যে পৌঁছোলাম… ”
পাবনার মোসাম্মৎ এসবাহাতুন বলেন ,
“১৯৭১ সালের জুলাই মাসে পাক বাহিনী আমার বাবার বাড়ী নতুন ভাঙ্গাবারীতে প্রায় ৫০ জন অপারেশনে যায়। কিছু সময় পরে আমাদের বাড়ীর মধ্যে দুজন পাক সেনা ধুকে পড়ে। তারা ঢুকে পড়ার সাথে সাথে অন্যান্য যে মেয়েরা ছিলো তারা মিলিটারি দেখে দৌড়াদৌড়ি করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু আমার কোলে বাচ্চা থাকার জন্য আমি বেরুতে পারি না। পাক সেনারা দুজন আমার ঘরে ঢুকে পড়ে। আমার বাবা ও ভাই এসে বাঁধা দিতে চাইলে একজন পাক সেনা তাঁদের বুকে রাইফেল ধরে রাখে আর একজন আমাকে ঘরের মধ্যে ধরে ফেলে আমার নিকট হতে আমার পাঁচ মাসের বাচ্চা ছিনিয়ে বিছানার উপর ফেলে দিয়ে আমার উপর পাশবিক অত্যাচার করে। আমার শিশু সন্তান কাঁদতে থাকে। তারপর সে আমার বাবা ও ভাই এর বুকে রাইফেল ধরে রাখে অন্যজন এসে আবার পাশবিক অত্যাচার শুরু করে। দুজন মিলে প্রায় এক ঘণ্টা আমার উপর পাশবিক অত্যাচার করে। তারপর চলে যায়। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকি। তার আধ ঘণ্টা পর আমার জ্ঞান ফিরে পাই।
বীরাঙ্গনা মোসাম্মৎ রাহিমা খাতুন এর বর্ণনায়
১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে একদিন ভোর রাত্রি আমি আমার স্বামীর সাথে ঘুমিয়ে আছি সাথে আমার সাত মাসের শিশু সন্তান, মিলিটারি আসার শব্দ পেয়ে আমার স্বামী পালিয়ে যায়। হঠাৎ প্রায় সাত জন মিলিটারি বাড়ীতে ঢুকে পড়ে এবং ঘরের দরজায় লাথি মেরে দরজা খুলে ফেলে এবং আমার শিশু সন্তানকে আমার নিকট থেকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে মাটির সাথে আছাড় দিয়ে হত্যা করে। তারপর আমাকে এক এক করে ৭ জন পাক সেনা পাশবিক অত্যাচার করে। প্রায় ঘণ্টা আমার উপর পাশবিক অত্যাচার করার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তার আধ ঘণ্টা পর আমি জ্ঞান ফিরে শুনতে পাই যে আমার তিনজন জোরকে পাক সেনারা জোর করে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর আর তাঁদের খোঁজ খবর পাওয়া যায় নাই। একই দিনে ঐ গ্রামের প্রায় ১০/১২ জন মহিলার উপর পাশবিক অত্যাচার করে এবং প্রায় ৭ জন মহিলাকে তাঁদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বেশ কিছুদিন চিকিৎসা হবার পর আমি সুস্থ হয়ে উঠি।
বরিশালের বীরাঙ্গনা ভাগীরথীর বীরত্বের ইতিহাসও আজ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর এই বীরাঙ্গনার বীরত্বের ইতিহাস ছাপা হয়, ৩ রা ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ , দৈনিক আজাদ পত্রিকায়।
“’মহাদেবের জটা থেকে’ নয় বাংলা মায়ের নাড়ী ছিঁড়ে জন্ম নিয়েছিলেন যে সোনার মেয়ে সে ভাগীরথীকে ওরা জ্যান্ত জীপে বেঁধে শহরের রাস্তায় টেনে টেনে হত্যা করেছে। খান দস্যুরা হয়তো পরখ করতে চেয়েছিলো ওরা কতখানি নৃশংস হতে পারে। বলতে হয় এক্ষেত্রে ওরা শুধু সফল হয়নি, বর্বরতার সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অষ্টাদশী ভাগীরথী ছিল বরিশাল জেলার পিরোজপুর থানার বাঘমারা কদমতলীর এক বিধবা পল্লীবালা। বিয়ের এক বছর পর একটি পুত্র সন্তান কোলে নিয়েই তাকে বরণ করে নিতে হয় সুকঠিন বৈধব্য। স্বামীর বিয়োগ ব্যাথা তখনও কাটেনি। এরই মধ্যে দেশে নেমে এল ইয়াহিয়ার ঝটিকা বাহিনী। মে মাসের এক বিকালে ওরা চড়াও হল ভাগীরথীদের গ্রামে। হত্যা করলো অনেক কে, যেখানে যেভাবে পেলো। এ নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের মধ্যেও ভাগীরথীকে ওরা মারতে পারল না। ওকে ট্রাকে তুলে নিয়ে এলো পিরোজপুরে। তারপর ক্যাম্পে তার উপর চালানো হল হিংস্র পাশবিক অত্যাচার।
সতি নারী ভাগীরথী। এ পরিস্থিতিতে মৃত্যুকে তিনি একমাত্র পরিত্রানের উপায় বলে ভাবতে লাগলেন। ভাবতে ভাবতেই এক সময় এল নতুন চিন্তা, হ্যাঁ মৃত্যুই যদি বরন করতে হয় ওদেরই বা রেহাই দেব কেন? ভাগীরথী কৌশলের আশ্রয় নিলো এবার। এখন আর অবাধ্য মেয়ে নয়, দস্তুরমত খানদের খুশি করতে শুরু করলো , ওদের আস্থা অর্জনের আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগালো।
বেশি দিন লাগল না অল্প কদিনেই নারীলোলুপ সেনারা ওর প্রতি দারুণ আকর্ষণ অনুভব করল। আর সেই সুযোগে ভাগীরথী ওদের কাছ থেকে জেনে নিতে শুরু করল পাক বাহিনীর সব গোপন তথ্য। এক পর্যায়ে বিশ্বাস ভাজন ভাগীরথীকে ওরা নিজের ঘরেও যেতে দিতো। আর কোন বাঁধা নেই। ভাগীরথী এখন নিয়মিত সামরিক ক্যাম্পে যায় আবার ফিরে আসে নিজ গ্রামে। এরই মধ্যে চতুরা ভাগীরথী তার মূল লক্ষ্য অর্জনের পথেও এগিয়ে গেল অনেকখানি। গোপনে মুক্তিবাহিনীর সাথে গড়ে তুলল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। এরপরই এল আসল সুযোগ। জুন মাসের একদিন ভাগীরথী খান সেনাদের নিমন্ত্রন করল তার নিজ গ্রামে। এদিকে মুক্তিবাহিনীকেও তৈরি রাখা হল যথারীতি। ৪৫ জন খানসেনা সেদিন হাসতে হাসতে বাঘমারা কদমতলা এসেছিলো কিন্তু তার মধ্যে মাত্র ফিরতে পেরেছিলো।
এরপর আর ভাগীরথী ওদের ক্যাম্পে যায় নি। ওরা বুঝেছে এটা তারই কীর্তি। কীর্তিমানরা তাই হুকুম দিল জীবিত অথবা মৃত ভাগীরথীকে ধরিয়ে দিতে পারবে তাকে নগদ এক হাজার টাকা পুরুস্কার দেয়া হবে।
কিন্তু ভাগীরথী তখনও জানত না ওর জন্য আরও দুঃসহ ভবিস্যত অপেক্ষা করছে। একদিন রাজাকারদের হাতে ধরা পরল ভাগীরথী। তাকে নিয়ে এল পিরোজপুর সামরিক ক্যাম্পে। খান সেনাদের এবার ভাগীরথীর উপর হিংস্রতার পরীক্ষার আয়োজন করলো। এক হাটবারে তাকে শহরের রাস্তায় এনে দাঁড় করানো হলো জনবহুল চৌমাথায়। সেখানে প্রকাশ্যে তার অঙ্গাবরন খুলে ফেলল কয়েকজন খান সেনা। তারপর দু’গাছি দড়ি ওর দুপায়ে বেঁধে একটি জীপে বেঁধে জ্যান্ত শহরের রাস্তায় টেনে বেড়ালো ওরা মহাউৎসবে। ঘণ্টা খানিক রাজপথ পরিক্রমায় পর আবার যখন ফিরে এল সেই চৌমাথায় তখনও ওর দেহে প্রানের স্পন্দন রয়েছে।
এবার তারা দুটি পা দুটি জীপের সাথে বেঁধে নিল এবং জীপ দুটিকে চালিয়ে দিল বিপরীত দিকে। ভাগীরথী দু ভাগ হয়ে গেল। সেই দুভাগে দুজীপে আবার শহর পরিক্রমা শেষ করে জল্লাদ খানরা আবার ফিরে এল সেই চৌমাথায় এবং সেখানেই ফেলে রেখে গেল ওর বিকৃত মাংসগুলো। একদিন দুদিন করে মাংসগুলো ঐ রাস্তার মাটির সাথেই একাকার হয়ে গেল এক সময়। বাংলা মায়ের ভাগীরথী এমনি ভাবেই আবা মিশে গেলো বাংলার ধূলিকণার সাথে।
হাতীবান্ধা,লালমনিরহাটের বীরাঙ্গনা খতিনার মৌখিক বয়ান
“কুত্তাগুলো আইসাই ঘরে ঢুকে পড়ে এবং আমাকে ডাক দিয়ে ঘরে নিয়ে যায়। আমি তো ঘরে ঢুকি না।ত খন ভয় দেখায় মাইরা ফেলবে। আমি আস্তে আস্তে দরজার কাছে যেতেই ছুঁ মাইরা ঘরে নিয়া যায়। কোলের বাচ্চাটাকে একজন ফেলে দেয়। আরেকজন কাপড়-চোপড় ধইরা টানাটানি শুরু করে। আমি চিল্লান দিতে চাইছি তখন আমার মুখ চেপে ধরে কাপড়-চোপড় খুলে ফেলে শুরু করে ধর্ষণ। অন্যজন তখন দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। এভাবেই তারা আমার উপর নির্যাতন করে। এক ফাঁকে আমি অতিকষ্টে চিল্লাচিল্লি শুরু করি। তখন আমার আব্বা আসছিলেন। পায়খানায় গিয়েছিলেন,সেইখান থেকে। আব্বা যখন আমার দিকে আসছে,তখন আব্বার মাথায় বন্দুক ধরে আর বলে নড়লে গুলি করে দিব। আমাকেও বলে,যদি কোন শব্দ করি তবে গুলি করে দিবে। আমার ভাই পশ্চিম ঘর থেকে বাইরে দৌড় দিচ্ছে তখন তারা অন্য ঘরে ঢুকে। দুই জন তো আগে থেকেই ছিল ঐ ঘরে। এই ফাঁকে আমি পালাই। পাটক্ষেতে,নির্যাতনের পরে। পালাবার সময় আমার পরনের কাপড়টা তুলে নিয়া যাই।
সকালে নাস্তা খাইয়া,গুছায়া-টুছায়া ঘরে যাব। স্বামীও চলে গেছে কাজে।তখন তারা আসে। যখন নির্যাতন করে তখন কেউ ছিল না।আর থাকলেই বা কি করার ছিল? না কিছুই করতে পারতো না। ছোট বাচ্চাটাতো কোলেই ছিল। আর বড় বাচ্চাটা মোহাম্মদ আলীর বয়স তখন ৭/৮ বছর হবে। আলী ভয়ে ঘরে চৌকির তলে ঢুকে ছিল। নির্যাতনের পর ঘরের সব জিনিসপত্র তছনছ করে ফেলেছিল। মনে হয় কিছু তল্লাশি করছিল। ছোট বাচ্চাটা সেই থেকে অসুখে ভুগতে ভুগতে শেষ হইয়া যাবার ধরছে। বহু টাকা খরচ করে ভালো করছি। আর আমার পেটে যে আর একটা বাচ্চা ছিল সাত মাসের,এই নির্যাতনের দুই দিন পরে পেটেই বাচ্চাটা মারা যায়। সেটাও ছেলে ছিল। শুধু নির্যাতন করে নাই ছুরি চাক্কু দিয়েও মারছিল। অনেক মার মারছে। তার ওপর আবার প্রায় এক ঘণ্টা ধরে আমাকে নির্যাতন করে।”
হাতীবান্ধার একজন বিরঙ্গনা কমলার বর্ণনা
“আমার তখন একেবারে কাঁচা নাড়, ৩ দিন বয়স মেয়েটার। তখন আমার ওপর চলে এই অত্যাচার। আমি বসে বসে বাচ্চার তেনা ধুইতেছিলাম কলের পাড়। এইখানে ফালাইয়া আমার ইজ্জত মারে ঐসব জানোয়ার। মানুষ তো ছিল না। দেখতে যেমন শয়তানের মতো লাগছে,পরছিল কেমন পোশাক জানি। কাজগুলোও করছে শয়তান-জানোয়ারের মত। কোন মানুষের পক্ষে এই সময় এই কাজ করা সম্ভব নয়। আমি তো বসে বসে তেনা ধুইতেছি। হঠাৎ দেখি,হারামজাদা কুত্তাগুলো লাফাইয়া লাফাইয়া এসে আমার উপর পড়ছে। প্রথমে আমি তো ভয়ে চিল্লাচিল্লি শুরু করি। তারপর শুরু করে। আমি কিছু বলার,কওয়ার সুযোগ পাই নাই। আমার চিল্লাচিল্লিতে তখন অনেক লোক জড়ো হইছে ঠিকই। কিন্তু সবাই খাড়াইয়া খাড়াইয়া তামাশা দেখছে। কেউ আসেনি এগিয়ে হামারে সাহায্য করতে। এক সময় আমি মরার মতো অজ্ঞান হয়ে যাই। কতজন,কতক্ষণ তারা এইসব করছে আমি জানি না, আমার যহন জ্ঞান আইছে তখন দেহি,আমি ঘরে,আমার স্বামী আছে পাশে বসা। যখন এই ঘটনা ঘটায় তখন আমার স্বামী বাড়ী ছিল না,বাজারে গেছিল। কে বা কারা আমারে ঘরে আনছে,তারে খবর দিছে কিছুই কইতে পারি না। পরে ডাক্তার আইনা চিকিৎসা করিয়ে বহুদিন পরে হামারে সুস্থ করে। পরে শুনছি লোকমুখে তারা নাকি ৪/৫ জন ছিল। সবাই নাকি এই কাজ করেছে। আর বাইরে পাহারা দিতেছিল কয়েকজন। পরে কোন দিক দিয়ে কখন যায়,কিছু আমি জানি না। একে তো আঁতুর ঘরে কাঁচা নাড় তার ওপর আবার শত শত লোকের সামনে এই কর্মকাণ্ড করেছে। শরীরের অবস্থা কি,মনের অবস্থা কি,ঘর থেকে আর বাইরে বের হবার মতো পরিবেশ রাখেনি। এক দিক দিয়ে লজ্জা,অন্য দিক দিয়ে শরীর,কোনটাই ভালো না।”
নরসিংদীর জাহেদা খাতুন
“আমাকে যে কোথায় কোন ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিল তা বলতে পারিনি। পরে শুনেছি এটা ঢাকা জেলার গাজীপুর। এখন গাজীপুর একটা জেলা হয়েছে আর তেমন কিছু বলতে পারি না। কারণ,কেউ তো আর কারো সাথে কথা বলতে পারতাম না। যে দুই একটা কথা হতো খুব গোপনে। ঐসব দেখতে দেখতে এবং নিজেও নির্যাতন সইতে সইতে মনে হচ্ছিল,যদি দু’টি চোখ অন্ধ হয়ে যেত তবুও কিছুটা রক্ষা ছিল। একদিন একজন এসে আমার কাছে দাঁড়াল। একজন তার পুরুষাঙ্গটা দেখিয়ে বলল,যদি তোর স্বামীকে বাঁচাতে চাস তবে কোন শব্দ ছাড়াই আমার এটাকে খুশি করিয়ে দে – এটা শান্ত তো সব ঠিক, এই বলেই শুরু করল। তারপর থেকে দিনরাত ঐ শয়তানগুলো আসতো আমার কাছে। এরই মাঝে একদিন চার কি পাঁচজনকে ধরে নিয়ে গেছে। রাতে শুনতে পেলাম তাদেরকে মেরে ফেলেছে।”
গাজীপুরের পরী, তার বর্ণনা থেকেও উঠে আসে অনেক অজানা তথ্য।
“গাড়িতে ওঠানোর পরই চোখ বেধে ফেলল। অনেকক্ষণ যাবার পরে একটি ক্যাম্পে নিয়ে চোখ খুলল। চোখ খোলার পরে দেখি এখানে আরো অনেক মেয়ে,সবাই চুপ করে আছে। আমি কিছু বলতে চাইলাম। কিন্তু অন্যরা ইশারায় না করল। কিছুক্ষণ পর আমি কান্না শুরু করি। তখন পাশ দিয়ে একজন যাচ্ছিল। সে এসেই কোন কথা না বলে আমাকে লাথি মারল এবং আমার গায়ের উপর প্রস্রাব করে দিল। এটা চলে যাওয়ার পর আমি বকাবকি শুরু করলাম। অন্যরা কিছুই বলে না। শুধু ইশারায় এটা সেটা বোঝাতে চেষ্টা করে। বিকাল হতে না হতেই বুট জুতা পরা কয়েকজন এল। আসার পথে যেসব মেয়ে পড়ছে,তাদেরকে লাথি,কিল,ঘুষি মারছে। এগুলো দেখেই আমি চুপ,একেবারে চুপ। দুই তিনজন এসে আমার ওপর নির্যাতন শুরু করল। তারা আমাকে নিয়ে আনন্দ শুরু করল, এমনভাবে আনন্দ করছে, যেন তাদের কাছে মনে হচ্ছে আমি একটা মরা গরু আর ঐগুলো শকুন। আমার সারা শরীরটাকে টেনে কামড়ে যা খুশি তাই করছে।এক সময় আমি যখন আর সহ্য করতে পারছি না তখন একটু একটু কষ্টের শব্দ করছি।
তখন অন্য একজন ইশারা দিল চুপ করতে। কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম,কিন্তু আর পারছি না। নিজের অজান্তেই চিৎকার আইসা গেল, চিৎকারের সঙ্গে শুরু করল মাইর কারে কয়। একজন আইসা আমার মুখের মধ্যে প্রস্রাব করে দিল। এদের ইচ্ছামতো নির্যাতন করল এবং মারল। যাবার সময় আবার হাত বেঁধে রাইখা গেল। কিছুক্ষণ পর একসাথে আসলো অনেকজন। গণহারে নির্যাতন শুরু করল। কারো মুখে কোন কথা নাই। মাঝে মাঝে শুধু একটু শব্দ আসে কষ্টের। একজন সিগারেট খাচ্ছে আর তার পাশে যে ছিল তার গায়ে জ্বলন্ত সিগারেট ধরে রাখছে,অন্য একজন ধর্ষণ করছে। আরেকজন শকুনের মতো তার শরীর খাচ্ছে। ওর অবস্থা দেখে নিজের সব ভুলে গেলাম। কি বিশ্রীভাবে যে ধর্ষণ করছে মোটকথা তারা আমাদেরকে মানুষ বলেই মনে করছে না। এক সময় তারা চলে গেল। একটু-আধটু কথা বলছে সবাই। কিছুক্ষণ পর সবাই চুপ। কিছুক্ষণ পর একজন এল এবং অন্য একটি মেয়েকে ধরে নিয়ে গেল। এর কিছুক্ষণ পর দু’জন তাকে নিয়ে এল। এসেই তার সব কাপড় খুলল এবং গরম লোহা দিয়ে তার সমস্ত শরীরে ছ্যাঁকা দিল,শেষে তার গোপন অঙ্গের ভিতরে বন্দুকের নল ঢুকাইয়া গুলি করে মেরে ফেলল। যখন বন্দুকের নল ঢুকাচ্ছে তখন সে একটা চিৎকার দিয়েছিল। মনে হয়,পৃথিবীর সব কিছুই তখন থমকে গেছে। তারপর তাকে নিয়ে গেল। দুই একদিন পরে জানতে পারলাম, তারা ভুল করে ঐ মেয়েকে নিয়েছিলো। তারা আমাকে নিতে এসেছিলো।
দুলজান, কুষ্টিয়া।
যেদিন আমার এই দুর্ঘটনা ঘটে আমার বাচ্চাটার বয়স ছিল মাত্র সাত দিন। চুল কামিয়ে আঁতুর ঘরে ধোয়া পরিস্কার করেছি। একেবারে কাচা নাড়, তার উপর এত অত্যাচার। জ্ঞান ছিল না। গলগল করে রক্ত বইতে লাগল। সবার অবস্থা খারাপ, কিন্তু আমার অবস্থা খুব বেশি খারাপ, এই দেখেন, আমার এ বুকের মাঝে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কী করেছে। এখনো দাগ আছে। এই দুধটা আর কোনদিন কোনো বাচ্চাদের খাওয়াতে পারিনি।
অনেক সময় ধর্ষণের প্রতিযোগিতা শুরু হত। বাজি ধরে, পাল্লা দিয়ে ধর্ষণ করা হত। এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল জামালপুরের রেশমীর –
আমাদের এখানে একজন বিহারী ছিল, সবাই তাকে করিম পাগলা বলেই জানত। আর সেই করিম পাগলা মান ইজ্জত মারার এক্সপার্ট ছিল।যখন করিম পাগলা যেদিক দিয়ে হেঁটে যেত আমার মনে হয়,তখন মাটিও ভয় পেত। কি ক্ষমতা যে ছিল তার এই মান ইজ্জত মারার! দিনে একই সঙ্গে কয়েক জন মহিলার মান-ইজ্জত মারতে পারত। আর যে একবার ঐ করিম পাগলার হাতে পড়েছে,তার আর রক্ষা ছিল না। এত শক্তি ছিল তার, আর কৌশলও জানত জানার মতো কৌশল। তার মান ইজ্জত আরার কৌশল দেখে অন্য মিলিটারিরাও বোকা হয়ে যেত। করিম পাগলা এসব যখন করতো তখন অন্যরা দাঁড়িয়ে দেখত আর সঙ্গে সঙ্গে তারাও উল্লাস করতো, শাবাস দিত। আর কি বিশ্রিভাবে হা হা করে হাসত। করিম পাগলা যখন ইজ্জত মারার কাজে ব্যস্ত থাকত,তখন অন্য কেউ এসে তার গালে মদ ঢেলে দিত। কতজনই না তার সাথে বাজি ধরত,কিন্তু কেউ তাকে হারাতে পারেনি। মাঝে মাঝে পাগলা বলত, তোরা দশ জন একটার পর একটা করবি, আর আমি একাই করতে থাকব। দেখব কে হারে,কে জিতে? তারপরও তাকে কেউ হারাতে পারেনি। সেই পাগলা ছিল এমন। সে প্রতিদিন কত নারীর ইজ্জত যে মারত তার কোন হিসাব ছিল না মনে হয়।
কিরণবালা; ভালুকা, ময়মনসিংহ।
“আমার পাশেই একটা মাইয়া ছিলো। দেখতে যেমন সুন্দর,বয়সটাও ছিল ঠিক। আর তারেই সবাই পছন্দ করত বেশি। তাই তার কষ্টও হইত বেশি বেশি। একদিন দুই তিনজন একলগে আহে। এরপর সবাই তারে চায়। এই নিয়া লাগে তারা তারা। পরে সবাই এক সঙ্গে ঝাঁপায় পড়ে ঐ মাইয়াডার উপর। কে কি যে করবে,তারা নিজেরাই দিশা পায়না। পরে একজন একজন কইরা কষ্ট দেয়া শুরু করে। তখন সে আর সইতে না পাইরা একজনরে লাথি মাইরা ফেলাইয়া দেয়। তারপর তো তারে বাঁচায় কেডা। হেইডারে ইচ্ছামত কষ্ট দিয়ে মাইরা ঘর থাইকা বের হয়ে যায়। আমরা তো ভাবছি,যাক বাঁচা গেল। কিন্তু না,একটু পরে হে আবার আহে,আইসাই বুটজুতা দিয়ে ইচ্ছামতো লাইত্থাইছে।তারপরে গরম বইদা ( ডিম ) সিদ্ধ করে তার অঙ্গে ঢুকায় দেয়। তখন তার কান্না, চিল্লাচিল্লি দেখে কেডা। মনে হইছিল যে,তার কান্নায় দেয়াল পর্যন্ত ফাইটা যাইতেছে। তারপরেও তার একটু মায়া দয়া হলো না। এক এক করে তিনটা বইদা ঢুকাল ভিতরে। কতক্ষণ চিল্লাচিল্লি কইরা এক সময় বন্ধ হয়ে যায়।
তার পরের দিন আবার হেইডা আহে। আর কয় চুপ থাকবে। চিল্লাচিল্লি করলে বেশি শাস্তি দিব। সেই মেয়ের কাছে গিয়ে দেখে তার অবস্থা খুব খারাপ। তখন বন্দুকের মাথা দিয়ে তার ভেতরে গুতাগুতি করছে। আরেকজন তার পেটের উপর খাড়াইয়া বইছে। আর গড় গড়াইয়া রক্ত বাইর হইতেছে। যেন মনে হয়,গরু জবাই দিছে। সে শুধু পড়েই রইল। প্রথমে একটু নড়ছিলো পরে আর নড়ল না। তারপরেও তার মরণ হইল না। ভগবান তারে দেখল না। এমন কত রকম নির্যাতন করে প্রতিদিন। এই অবস্থায় বাইচা ছিল সাত-আট দিন। পরের দুই দিন চেতনা ছিল না। এক সময় অবশেষে মরল।”
সুজান ব্রাউনমিলার লিখেছেন তের বছরের কিশোরী খাদিজার কথা –
Khadiga, thirteen years old, was walking to school with four other girls when they were kidnapped by a gang of Pakistani soldiers. All five were put in a military brothel in Mohammedpur and held captive for six months until the end of the war. Khadiga was regularly abused by two men a day; others she said, had to service seven to ten men daily… At first, Khadiga said, the soldiers tied a gag around her mouth to keep her from screaming. As the months wore on and the captives’ spirit was broken, the soldiers devised a simple quid pro quo. They withheld the daily ration of food until the girls had submitted to the full quota.
২৭ মার্চ,১৯৭১,ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশ ঘর থেকে লাশ ট্রাকে তুলতে গিয়ে একটি চাদর ঢাকা ষোড়শী মেয়ের লাশ দেখতে পান ডোম পরদেশী। সম্পূর্ণ উলঙ্গ লাশটির বুক এবং যোনিপথ ছিল ক্ষতবিক্ষত,নিতম্ব থেকে টুকরো টুকরো মাংস কেটে নেয়া হয়েছিল। ২৯ মার্চ শাঁখারিবাজারে লাশ তুলতে গিয়ে পরদেশী সেখানকার প্রায় প্রতিটি ঘরে নারী,পুরুষ,আবাল বৃদ্ধ বনিতার লাশ দেখতে পান,লাশগুলি পচা এবং বিকৃত ছিল। বেশিরভাগ মেয়ের লাশ ছিল উলঙ্গ,কয়েকটি যুবতীর বুক থেকে স্তন খামচে,খুবলে তুলে নেয়া হয়েছে,কয়েকটি লাশের যোনিপথে লাঠি ঢোকানো ছিলো। মিল ব্যারাকের ঘাটে ৬ জন মেয়ের লাশ পান তিনি,এদের প্রত্যেকের চোখ,হাত,পা শক্ত করে বাঁধা ছিল,যোনিপথ রক্তাক্ত এবং শরীর গুলিতে ঝাঁঝরা ছিলো।
ঢাকা পৌরসভার সুইপার সাহেব আলী ২৯ মার্চ তার দল নিয়ে একমাত্র মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে কয়েক ট্রাক লাশ উদ্ধার করেন। তিনি আরমানিটোলার এক বাড়িতে দশ এগারো বছরের একটি মেয়ের লাশ দেখতে পান,সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত,জমাট বাঁধা ছোপ ছোপ রক্ত সারা গায়ে,এবং তার দেহের বিভিন্ন স্থানের মাংস তুলে ফেলা হয়েছিল।ধর্ষণ শেষে মেয়েটির দুই পা দু’দিক থেকে টেনে ধরে নাভি পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল। ৩০ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের চারতলার ছাদের উপরে আনুমানিক ১৮ বছরের একটি মেয়ের লাশ পান সাহেব আলী,যথারীতি উলঙ্গ। পাশে দাঁড়ানো একজন পাক সেনার কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন মেয়েটিকে হত্যা করতে ধর্ষণ ছাড়া অন্য কিছু করার দরকার পড়েনি, পর্যায়ক্রমিক ধর্ষণের ফলেই তার মৃত্যু ঘটে। মেয়েটির চোখ ফোলা ছিল,যৌনাঙ্গ এবং তার পার্শ্ববর্তী অংশ ফুলে পেটের অনেক উপরে চলে এসেছে, যোনিপথ রক্তাক্ত, দুই গালে এবং বুকে কামড়ের স্পষ্ট ছাপ ছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সুজিত সরকার ,১৯৭১ সালে দশম শ্রেণীর ছাত্র। ক্যাম্পে বন্দী থাকার সময় দেখেছেন অনেক মেয়েকে অসুস্থ হয়ে যেতে। তাদের শরীরে দগদগে ঘা হয়ে যাচ্ছিল, যৌনাঙ্গ দিয়ে রক্তপাত হত, তারপরও রেহাই পেতেন না তারা। দুই একজন উন্মাদ হয়ে প্রলাপ বকতেন। একদিন রাজাকারেরা ধর্ষণের সময় সুজিত সরকারকেও ধর্ষণে বাধ্য করার চেষ্টা করে। তারা মেয়েদের যৌনাঙ্গে তার মুখ চেপে ধরে ঘষে দেয়।
রাজারবাগ পুলিশ লাইনের একজন সুবেদার খলিলুর রহমানের অভিজ্ঞতা;
মেয়েদের ধরে নিয়ে এসে,ট্রাক থেকে নামিয়ে সাথেই সাথেই শুরু হত ধর্ষন,দেহের পোশাক খুলে ফেলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে ধর্ষণ করা হত। সারাদিন ধর্ষণের পরে এই মেয়েদের হেড কোয়ার্টার বিল্ডিং এ উলঙ্গ অবস্থায় রডের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখ হত,এবং রাতের বেলা আবারো চলত নির্যাতন। প্রতিবাদ করা মাত্রই হত্যা করা হতো, চিত করে শুইয়ে রড, লাঠি, রাইফেলের নল, বেয়নেট ঢুকিয়ে দেয়া হত যোনিপথে, কেটে নেয়া হত স্তন। অবিরাম ধর্ষণের ফলে কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলেও থামত না ধর্ষণ।
’৭১ এ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে পাকবাহিনীর একটি বিরাট ক্যাম্পে পরিণত করা হয়। এখানে বন্দী ছিলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ছাত্রী মঞ্জিলা এবং তার দুই বোন মেহের বানু এবং দিলরুবা। তাদেরকে আরো ৩০ জন মেয়ের সাথে একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়,সার্বক্ষণিক প্রহরায় থাকতো দুজন সশস্ত্র গার্ড। এই মেয়েগুলোকে ওই ক্যাম্পের সামরিক অফিসারদের খোরাক হিসেবে ব্যবহার করা হত। প্রতি সন্ধ্যায় নিয়ে যাওয়া হত ৫/৬ জন মেয়েকে, এবং ভোরবেলা ফিরিয়ে দেয়া হত অর্ধমৃত অবস্থায়। প্রতিবাদ করলেই প্রহার করা হত কায়দায়। একবার একটি মেয়ে একজন সৈনিকের হাতে আঁচড়ে দিলে তখনই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই বন্দীশালায় খাবার হিসাবে দেয়া হত ভাত এবং লবন।
সাংবাদিক রণেশ মৈত্রের একটি অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, রংপুর ক্যান্টনমেন্ট এবং রংপুর আর্টস কাউন্সিল ভবনটি নারী নির্যাতনের জন্য ব্যবহার করা হত। এখানে বন্দী ছিল প্রায় একশ মেয়ে এবং প্রতিদিনই চলত নির্যাতন, যারা অসুস্থ হয়ে পড়ত তাদের হত্যা করা হত সাথে সাথেই। স্বাধীনতার পরে আর্টস কাউন্সিল হলের পাশ থেকে বহুসংখ্যক মহিলার শাড়ি, ব্লাউজ, অর্ধগলিত লাশ, এবং কংকাল পাওয়া যায়।প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা যায়, রংপুর থেকে প্রায় তিনশ/চারশ মেয়েকে ঢাকা এবং অন্যান্য স্থানে পাচার করে দেওয়া হয়,তাদের আর কোন সন্ধান মেলেনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যান বিভাগের ছাত্র ছাত্রীদের একটি গবেষণায় জানা যায় রাজশাহীর জুগিসশো গ্রামে মে মাসের কোন একদিন পাকবাহিনী ১৫ জনমহিলাকে ধর্ষণ করে এবং অন্যান্য নির্যাতন চালায়।এ অঞ্চলের ৫৫ জন তরুনীকেধরে নিয়ে যাওয়া হয়।বাঁশবাড়ীয়া গ্রামে পাকবাহিনী প্রায় দেড়শো জন বিভিন্ন বয়সী মেয়েকে ঘর থেকে বের করে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করে। এদের মধ্যে ১০ জনের তখনই মৃত্যু হয়।
একই গবেষণা থেকে বাগমারা গ্রামের দেলজান বিবির কথা জানা যায়।সময়টা ছিলো রমজান মাস,দেলজান বিবি রোজা ছিলেন। হঠাৎ পাকসেনারা ঘরে ঢুকে পড়ে এবং ধর্ষণশুরু করে।একই গ্রামের সোনাভান খাতুনকেও রাস্তার মধ্যে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করা হয়। ১০ ডিসেম্বর যশোরের মাহমুদপুর গ্রামের একটি মসজিদ থেকে এগারোটি মেয়েকে উলঙ্গ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তাদেরকে যুদ্ধের সময় প্রায় সাত মাস ধরে মসজিদের ভেতরেই ধর্ষণ এবং বিভিন্ন ভাবে নির্যাতন করা হয়।
যশোর ক্যান্টনমেন্টে চৌদ্দ দিন বন্দী থাকা হারেছ উদ্দিনের ভাষ্যে জানা যায় ক্যান্টনমেন্টে ১২ থেকে ৫০ বছর বয়সের ২৯৫ জন মেয়েকে আটক রাখা হয়েছিল,তাদের উপর নির্যাতন চলত প্রতি রাতেই। হারেছ উদ্দিনের সেলটি বেশ খানিকটা দূরে থাকলেও নির্যাতনের সময় মেয়েদের চিৎকার তিনি শুনতে পেতেন। প্রতিদিন বিকেলে একজন সুবাদার এসে এসব কে কোথায় যাবে তার একটি তালিকা বানাত, সন্ধ্যা হলেই এই তালিকা অনুযায়ী মেয়েদের পাঠানো হত। অনেক সময় খেয়াল খুশিমত বাইরে নিয়ে এসে তাদের এলোপাথাড়ি ভাবে ধর্ষণ করা হত।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মাটিরহাট গ্রামের ফুলজান যুদ্ধের সময় আট মাসেরগর্ভবতী ছিল, তার বাবা মায়ের সামনেই তাকে কয়েকজন সৈনিক উপুর্যুপুরি ধর্ষণকরে। তার গর্ভের সন্তানটি মারা যায়।
কুমারখালির বাটিয়ামারা গ্রামের মোঃ নুরুল ইসলামের বর্ণনায় একটি আপাত-অদ্ভুত ঘটনা জানা যায়। ঐ এলাকার একজন রাজাকারকে একদিন দুজন পাকসেনা মেয়ে যোগাড় করে দিতে বললে সে তাদেরকে তার বাড়ি নিয়ে যায়,খবর পেয়ে বাড়ির সব মেয়ে পালিয়ে গেলেও তার বৃদ্ধা মা বাড়িতে থেকে যান। সৈনিক দু’জন রাজাকারটির বুকে রাইফেল ঠেকিয়ে পালাক্রমে তার মাকে ধর্ষণ করে। এর পরে রাজাকারটির আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি।
নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে কম যায়নি বিহারীরাও। নৃশংসতায় তারা কোন কোন সময়ছাড়িয়ে গিয়েছিল পাকবাহিনীকেও। ২৬ মার্চ ’৭১ মীরপুরের একটি বাড়ি থেকে পরিবারের সবাইকে ধরে আনা হয় এবং কাপড় খুলতে বলা হয়। তারা এতে রাজি না হলে বাবা ও ছেলেকে আদেশ করা হয় যথাক্রমে মেয়ে এবং মাকে ধর্ষণ করতে। এতেও রাজি নাহলে প্রথমে বাবা এবং ছেলে কে টুকরো টুকরো করে হত্যা করা হয় এবং মা মেয়ে দুজনকে দুজনের চুলের সাথে বেঁধে উলঙ্গ অবস্থায় টানতে টানতে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।
খুলনার ডাঃ বিকাশ চক্রবর্তীর কাছ থেকে জানা যায়, সেখানকার পাবলিক হেলথ কলোনি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্থাপিত ক্যাম্পে বিপুল সংখ্যক মেয়েকে(প্রায় সববয়সের) আটকে রেখে পূর্বোক্ত কায়দায় নির্যাতন চালানো হয়। যুদ্ধ শেষেক্যাম্পের একটি কক্ষ থেকে কয়েকটি কাঁচের জার উদ্ধার করা হয়,যার মধ্যে ফরমালিনে সংরক্ষিত ছিল মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অংশ। অংশগুলি কাটা হয়ে ছিল খুব নিখুঁতভাবে।
যৌন দাসী হিসেবে বাঙালি মেয়েদের বন্দী করে রাখার একটি ঘটনা প্রকাশিত হয় নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায়,২৫ অক্টোবর ১৯৭১ –
One of the most horrible revelations concerns 563 young bengali women,some of 18, who have been held captive inside Dacca’s dingy military cantonment since the first five days of the fighting,Seized from University and Private Homes and forced into military brohees,the girls are all three to five months pregnant.
১৯৭২ সালে নরওয়ের একদল টেলিভিশন সাংবাদিকের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে সেসময়কার স্বাস্থ্য ও শ্রমমন্ত্রী জহুর আহমদ চৌধুরী জানান, মিত্রবাহিনী কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশ করে সাতশত বিবস্ত্র নারীকে বন্দী অবস্থায় দেখতে পায়। জানা যায়,২৫ মার্চের পর থেকেই সারা দেশ থেকে মেয়েদের ধরে নিয়ে এসে এখানে রাখা হতো। এছাড়াও সিলেট বিমান বন্দরে তিনশত মেয়েকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল বিবস্ত্র অবস্থায়। ঢাকা,চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর তিনটি বন্দিশিবিরে পাঁচশতের বেশি মেয়ে বন্দি ছিল।
রাজশাহীর বাগমারার দেলজান বিবিকে রোজা থাকা অবস্থায় ধর্ষণ করা হয়।রাজশাহী শহরের একটি বাড়িতে আনুমানিক তিরিশ বছর বয়স্কা একজন মহিলা নামাজ পড়ছিলেন। সেই অবস্থাতেই ফেলে দিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়, তিনি মারা যান জায়নামাজের উপরেই। এই ঘটনা দেখে তার স্বামীও তখনই মারা যান। টাঙ্গাইলের ছাব্বিশা গ্রামের ভানু বেগমকে ধর্ষণ করতে গেলে তিনি বাধা দেন। তখন পাকিস্তানি সৈনিকেরা তার এক বছরের শিশু সন্তানকে আগুনে ফেলে দিতে উদ্যত হয়। নিরুপায় ভানু বেগমকে এরপর উপর্যুপরি ধর্ষণ করা হয়, ধর্ষণ শেষে জ্বলন্ত আগুন চেপে ধরে সৈনিকেরা ঝলসে দেয় তার শরীরের বিভিন্ন অংশ।
এখান কয়েকজন নারীর কথা উল্লেখ করছি,যারা ধর্ষণ এবং নির্যাতনের ফলে গুরুতর শারীরিক ও মানসিক সমস্যার শিকার হয়েছেন।
“গণ্ডগোল শুরু হওয়ার পর থাইকাই তো পালাইয়া পালাইয়া বেড়াইছিলাম। একদিন ঐখানে নিছে, কালাই ক্ষেতে। তখন নয় মাসের বাচ্চা পেটে। ছেলেটা হইছিল। পেটে বাচ্চাটা তহনই পইড়া যায়। তহন তো আমার অবস্থাও যায় যায় করে। এক দিকে এই অত্যাচার আবার অন্য দিকে পেটের সন্তানও মারা গেছে। একভাবে তো বাইর করতে হইবো। … আমার অবস্থা ক্রমে খারাপ হচ্ছে। এক সময় আমাকে বাঁচানোই দায় হইয়া পড়ছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও যখন কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি তখন গ্রামের লোকেরাই আমারে বাঁচানোর জন্য আগাইয়া আইল। তখন তারা দা,বটি দিয়ে ছেলেটারে কাইটা কাইটা পেট থেকে বের করে। তখন দেখে যেই সন্তান ছেলে সন্তান। তারপর তো আমার অবস্থা আরো খারাপ হয়। তখন আমারে তাড়াতাড়ি করে মেডিকেলে নিয়ে গেল। ৪ বৎসর রইছি মেডিকেলে। নির্যাতনের কারণে পায়খানার রাস্তাটা আর সন্তানের রাস্তা এক হইয়া গেছিল। অপারেশন করতে হয় পাঁচটা বড় বড় অপারেশন। এই জায়গাটা এভাবেই আছে, সেই ৩০ বছর ধরে এভাবেই। এই পর্যন্ত কত কষ্ট করতাছি। সারাদিন ডোমা ( কাপড়ের নেকড়া ) দিয়া পেঁচায়া রাখি। ঐ যে খাঁচাটা আছে না,তার মধ্যে জমাই। পরে একবারে নিয়া ধুইয়া আনি। সারাদিন কি ধোয়া সম্ভব। একটু পর পর ডোমা পাল্টাতে হয়। এই পাঁচ,দশ মিনিট পরপর।… রাস্তা দুইটা এক হওয়াতে পায়খানার রাস্তা খুবই খারাপ হয়ে যায়। তাই পায়খানার রাস্তাটা পেটের ঠিক নাভির পাশে করিয়ে দেয়। তাই কোন নির্দিষ্ট সময়ে তা করতে হয় না। সারাক্ষণই পায়খানা বের হতে থাকে। তাই এই ডোমা দিয়ে রাখি। গায়ে দুর্গন্ধ হয়ে থাকে। ঐ কাজ করার পরে তো পায়খানা আর পেশাবের রাস্তা এক হয়ে গেছে। ২ টা পর্দা আছে না? এক হয়ে গেছে। পরে পায়খানা সারাক্ষণ আসতেই থাকে সন্তানের রাস্তা দিয়ে। জরায়ু কয় না? জরায়ু দিয়েও পায়খানা আসে। তারপরই অপারেশন করে এই ব্যবস্থা করে দেয়।
… ধইরা নিছে সকাল ১১টার দিকে। আনছে একেবারে মাগরিবের পরে হয়তো। আমি কইতে পারি না কহন আনছে। আমার একটা ননদ আছিল,ঐ ননদের মেয়ে দেইখ্যা বাড়িতে কইলে অন্যরা যাইয়া নিয়ে আসে, কোনো কোনো সময় জ্ঞান ছিল। আবার কোনো কোনো সময় অজ্ঞান ছিলাম। অনেক পাকবাহিনী ছিল।আর দুইজন রাজাকার।”
গাজীপুরের বীরাঙ্গনা মমতার বর্ণনা থেকে উপরের অংশ তুলে ধরা হয়েছে
ফরিদপুরের আন্না সেনকে যখন ধর্ষণ করা হয় তখন অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। স্বাধীনতার পর যদিও বিয়ে হয় আন্নার, ততদিনে তিনি নির্যাতনের তীব্রতায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না এমন মানসিক জটিলতায় আচ্ছন্ন। বিয়ের পরপরই আত্মহত্যা করেন আন্না।
যুদ্ধের পর লজ্জায় অনেক নারীই পাকিস্তানি সৈনিকদের অনুগামী হয়েছেন। চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জেনেও তারা এপথে পা বাড়িয়েছেন পরিচিত সমাজে মুখ দেখানোর লজ্জায়।
কাপাসিয়ার মনোয়ারা বেগমের স্বামীকে হত্যা করার পর এক সিপাহী তাকে সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পে ক্যাম্পে রাখতো, আর গণহারে ধর্ষণ করতো। যুদ্ধ শেষে ঐ সৈনিক মনোয়ারাকে নিয়ে যায় পাকিস্তানের করাচি। করাচির আয়েশা কলোনীতে রেখে সেই সিপাহী মনোয়ারাকে বিয়ে করে। বিয়ের পর প্রতি রাতেই বড় বড় অফিসারদের কাছে নিয়ে যেত। আস্তে আস্তে আরো বড় বড় জায়গায় নিয়ে যেত আর সারাদিন থাকতো বন্দী। এক সময় তাকে বিক্রি করে দুবাই, দুবাই থেকে ফ্রান্স, তারপর সৌদি আরবে, তারপর আবার ফ্রান্স, এভাবেই চলেছে তার উপর নির্যাতন ধর্ষণ। এক সময় যখন সে অচল হয়ে পড়ে, তাকে দিয়ে আর এই সব কাজ চলে না, তখন ফেলে দেয় রাস্তায়। সেই মনোয়ারা এক সময় অর্ধ পাগল অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরে আসে। যখন সে পাকিস্তানের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে কাঁদছে, তখন এক বাঙালির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার কাছে মনোয়ারা চেয়েছিল তার জীবনের একটা ইচ্ছের কথা। সে মরার আগে যেন তার দেশ, প্রিয়জনদের দেখতে পায়। তার এই আকুল আবদারটুকু সেই বাঙালি রেখেছিলো। বহু চেষ্টা করে তার জীবনের এই একটা ইচ্ছা পূরণ করলেন সেই মনোয়ারাকে উদ্ধারকারী সাইফুল ইসলাম, দুই দেশের রাষ্ট্রদূতের সাথে যোগাযোগ করে। ১৯৯১ অথবা ১৯৯২ সালের দিকে মনোয়ারা দেশে ফিরে আসেন। দেশে এসে এখন তিনি ভিক্ষা করে খান।
উপরের ঘটনাগুলো কেবল নির্বাচিত কয়েকটি। এছাড়াও এধরণের অজস্র ঘটনা ঘটেছে দেশের প্রতিটি আনাচে কানাচে। সম্ভবত এখন সময় এসছে এই ঘটনা গুলোকে সামনে নিয়ে আসার। তা না হলে এই রক্তের ঋণ কোনদিন শোধ হবার নয়।

তিরিশ লক্ষ শহীদ, বাহুল্য নাকি বাস্তবতাঃ হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়া ঊনচল্লিশ লাখ মানুষ
5.
আলোচনা শুরু করবো পরিসংখ্যানের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ শব্দ দিয়ে, এই পর্বে যেই শব্দটা’কে ঘুরে আসতে দেখবেন বারবার। কাঠখোট্টার শব্দটা হচ্ছে ‘Demography’, যার অর্থ “একটা জনগোষ্ঠীর অবস্থা নির্ণয়ের জন্য জন্ম, মৃত্যু, রোগব্যাধি ইত্যাদির পরিসংখ্যান এবং এতদ বিষয়ক বিদ্যা; জনসংখ্যা তত্ত্ব”।
ভাবছেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সাথে জনসংখ্যা তত্ত্বের সম্পর্ক কি।
আছে, সেটাই বলবো আজ।
উইকিপিডিয়ার কয়েকটি চমৎকার কাজ হচ্ছে পৃথিবীর প্রায় সবকয়টা দেশের ডেমোগ্রাফি তৈরি করে রাখা, আর উইকিপিডিয়ার সব কয়টা ডেমোগ্রাফিতেই রয়েছে জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশান প্রসপেক্টাস’ অনুসারে একটি ডাটা সীট যেখানে অত্যন্ত গোছানো আছে সব কয়টা দেশের ১৯৫০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতি পাঁচ বছরের ব্যাবধানে কত শিশু জন্ম নিয়েছে, কতজন মানুষ মারা গিয়েছে, জন্ম-মৃত্যুর ফলে মোট কত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, জন্ম হার, মৃত্যু হার এসব।
উইকিপিডিয়া আমাদের জানাচ্ছে ১৯৯৪ সালে সেদেশের সংখ্যালঘু টাট্সি গোষ্ঠীর মানুষ এবং সংখ্যাগুরু হুটু গোষ্ঠীর মধ্যে উদার ও মধ্যপন্থীদের নির্বিচারে হত্যার ঘটনাকে রুয়ান্ডার গণহত্যা বলা হয়ে থাকে। ৬ই এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই গণহত্যা সংঘটিত হয়। অন্তত ৫০০,০০০ টাট্সি এবং এক হাজারেরও বেশি হুটু নিহত হয়। অধিকাংশ সূত্রমতে মোট নিহতের সংখ্যা ৮০০,০০০ এর কাছাকাছি বা ১,০০০,০০০ এর কাছাকাছি। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নানান খবরের ভিড়ে এই গণহত্যার সংবাদ আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে খুব কমই স্থান পেয়েছিলো। এই সুযোগেই গণহত্যা বিভৎস রূপ ধারণ করেছিলো।
জাতিসংঘ এই হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অনিচ্ছুক ছিল। মিডিয়ায় সচিত্র সংবাদ পরিবেশন সত্ত্বেও জাতিসংঘের এমন ব্যবহারে সবাই মর্মাহত হয়েছিলেন এবং জাতিসংঘকে তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এই অনীহার কারণেই রুয়ান্ডায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে গণহত্যা মোকাবেলার মত যথেষ্ট সৈন্য ও কর্মকর্তা ছিল না। Roméo Dallaire এর নেতৃত্বে এই শান্তিরক্ষী দলটি তাই কার্যকরী কিছু করতে পারেনি। একসময় রুয়ান্ডা থেকে সব বিদেশী লোকদেরকে সরিয়ে আনা হয়। কিন্তু সেখানকার অধিবাসীদের রক্ষার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম ও ফ্রান্স সরকারকে এ কারণে এখনও সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। রুয়ান্ডায় শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছিল United Nations Assistance Mission for Rwanda। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের দৃষ্টি এদিকে আকর্ষিত না হওয়ায় তারা কোন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এক সময় সমগ্র রুয়ান্ডার জন্য মাত্র ৩০০ শান্তিরক্ষী মোতায়েন ছিলো।
এবারে একটু নজর দেয়া যাক আমাদের এই পোড়া দেশটার দিকে, যার জন্য এই লেখার অবতারণা। প্রথমেই আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই উইকিপিডিয়ার গনহত্যা সংক্রান্ত আর্টিকেলের দিকে।

লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয়ই ভারতীয় গবেষক শর্মিলা বোসুরর মধুর বাণী, যেখানে তিনি বলছেন একাত্তরে দুই পক্ষের অর্থাৎ বাঙালী, পাকিস্তানী, বিহারী সব মিলিয়ে মোটমাট মারা গেছে পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ মানুষ। উইকিতে আরও একটা গবেষণার কথা বলা হয়েছে যেটা করা হয়েছিলো ২০০৮ সালে, সেই তথাকথিত গবেষক বলেছেন একাত্তরে মৃতের সংখ্যা ২,৬৯,০০০। শেষমেশ একজন বাঙ্গালির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে সেই চির চেনা মিথ, শেখ মুজিব তিন লক্ষ বলতে গিয়ে তিরিশ লক্ষ বলে ফেলেন। শুধু এই ‘মিস স্পেলিং’ মিথ নিয়ে এই সিরিজের একটা আলাদা পর্ব রেখেছি যেখানে হাজার দুইয়ের ওয়ার্ডের একটা আর্টিকেলে ডিটেইলস দেখানো হবে এই ‘মিস স্পেলিং মিথ’ আদৌ কতটা সত্য।

প্রিয় পাঠক খুব কি কষ্ট হচ্ছে দেখতে যে উনিশশো একাত্তর সালে বাংলাদেশের মৃত্যুহার নাটকীয় ভাবে বেড়ে যায়। দেখতে পাচ্ছেন কি যে দেশের স্বাভাবিক মৃত্যু হতো বছরে দশ থেকে এগারো লাখের মধ্যে সত্তুর থেকে পচাত্তরে সেই দেশে গড়ে প্রতি বছর আঠারো থেকে উনিশ লাখ লোক মারা গেলো। এরপরের বছরগুলোতে আবারও আগের জায়গায় নেমে এলো গ্রাফ।
আমি বাসায় বসে হিসাবটা করেছি। স্বাভাবিক মৃত্যুহার বিবেচনায় নিলে সত্তুর থেকে পচাত্তর সালের মধ্যে স্বাভাবিক মৃত্যু বাদে অস্বাভাবিক ভাবে প্রায় উনচল্লিশ লক্ষ মানুষ বেশী মারা গিয়েছিলো।
এখানেই শেষ না, বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে এর ওপর জাতিসংঘের রিপোর্ট থেকে জানা যায়

সত্তুর থেকে পচাত্তরের ভেতর স্বাভাবিক জন্মহার বিবেচনায় তাহলে হারিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা দাড়ায়…

৬৫ লক্ষ!!!
আচ্ছা এই মানুষ গুলো কোথায় হারিয়ে গেলো?
আসুন দেখি উল্লেখযোগ্য কি কি ঘটনা ঘটেছিলো এই পাঁচ বছরে, যেটা এত মৃত্যু কিংবা হারিয়ে যাবার কারণ হতে পারে;
১) সত্তুরের ঘূর্ণিঝড়
২) একাত্তরের যুদ্ধ
৩) যুদ্ধের পর ভারত থেকে ফিরে না আসা শরণার্থী
৪) চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ
না, আপনারা ভাববেন না আমি ক্যালকুলেটর নিয়ে বসে বলে সবগুলো ডাটা যোগ-বিয়োগ করে আমার তিরিশ লাখ তত্ত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবো। আমি জানি সত্তুরের ঘূর্ণিঝড়ের ফলাফল একাত্তর। একাত্তরের ফলাফল চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ। এরা সবাই আমার পূর্বপুরুষ। এরা সবাই মারা গিয়েছিলো কেবলমাত্র পাকিস্তানের কারণে। আমি সব মৃত্যুর দায়ভার সেইসব পাকিস্তানিদেরই দিতে চাই।
তবু এটুকু শুধু বলবো আপনি মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া বাদাবকি প্যারামিটারে সর্বোচ্চ মান গুলো গ্রহণ করুণ যে কোন সোর্স থেকে। এরপর দেখুন মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত আসে, আমি আপনার হিসেবের সংখ্যাটা হয়তো বলে দিতে পারবো না ঠিকই তবে এটুকু নিশ্চিত বলে দিতে পারি সংখ্যাটা শর্মিলা বোসুর এক লাখ কিংবা বিবিসি সাংবাদিকের দুই লাখ উনসত্তর হাজারের চেয়ে অনেক অনেক বেশী হবে।
অস্ট্রেলিও চিকিৎসক ড. জিওফ্রে ডেভিস তার দ্য চেঞ্জিং ফেস অব জেনোসাইড বইতে আমাদের দেশের আদমশুমারির দুর্বলতা নিয়ে লিখেছেন;
“বাংলাদেশে আদমশুমারীর হাল বরাবরই করুণ, অনুমান নির্ভর।“
বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায় মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা আসলে সাড়ে সাত কোটি কোটি থেকে বেশী ছিলো। সংখ্যাটা এক কোটি পর্যন্ত বেশী হতে পারে। ৫ এবং ১২ এপ্রিল ১৯৭১ সালের ‘টাইম’স পত্রিকায় এই উক্তির সমর্থনে তথ্য পাওয়া যায়। যে সাড়ে সাত কোটিকে ভিত্তি ধরে এই মৃত্যুহার বের করা হয়েছে প্রকৃত পক্ষে সংখ্যাটা তার চেয়ে অনেক বেশী বই কম নয়।
এই লেখাকে আর দীর্ঘ করবো না, শুধু একটা কথাই বলতে চাই কাঠখোট্রা পরিসংখ্যানের সারণীতে যখন মৃত্যু আর রক্তের জোয়ারকে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে চলতে দেখি, শহীদ মিনারের সুউচ্চ বেদির মত একাত্তরের নীল রেখাটা দেখি সবাইকে ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে আছে তখন মনে পড়ে;
একটা দেশ এমনি পাই নাই;
কেউ দয়া করে নাই,
কেউ ভিক্ষা দেয় নাই,
দাম দিয়ে কেনা…
রুমির জন্য পাকিদের কাছে ক্ষমা ভিক্ষার প্রস্তাব নাকচ করে ছেলের জন্য শহীদের মৃত্যু পছন্দ করেছিলেন তার বাবা। মায়ের সামনে মেয়ে খায়রুন্নেসার ইজ্জত গ্যাছে, ভাইয়ের লাশ নিয়ে বোন দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে একটু কবর হবে এই আশায়। মেজর নুরুল ইসলামের প্রেগন্যান্ট স্ত্রী’কে পাকিস্তানীরা…… , ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে মা অন্ধ হয়ে গেছে, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের লাশ দেখে নাতি রাহুল আজও মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে বেঁচে আছে, চক্ষু বিশেষজ্ঞের চোখ তুলে নিয়েছে, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের বুক চিরে হৃদয়টাই বের করে নিয়েছে, একজনকে এক রাতে ধর্ষণ করেছে আশি থেকে একশবার। রাতে দিয়ে যাওয়া গণকবর থেকে সকালে উঠে এসেছে রক্তাক্ত জীবন্ত হাত…
না আশা হারাই না,
হতাশ হই না,
৭১’এ এই দুর্বল বাঙালীই জিতেছিলো…
তিরিশ লক্ষ শহীদ, বাহুল্য নাকি বাস্তবতাঃ শরণার্থী শিবিরেই মারা যায় কমপক্ষে ৭ থেকে ৯ লক্ষ মানুষ
6.
৭১ সালে নিউজউইকের সিনিয়র এডিটর Arnaud de Borcgrave প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার একটি সাক্ষাৎকার নেন। সাক্ষাতকারটি তাৎক্ষনিকভাবে ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন সহ অনেক পত্রিকায় অনূদিত হয়। সেখানে শরণার্থী ইস্যুতে খোলাখুলি আলোচনা করা হয়। সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ তুলে ধরছি পাঠকের উদ্দেশ্যে;
প্রশ্নঃ এখনো প্রতিদিন ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ শরণার্থী পূর্ব পাকিস্তান সীমান্ত পেরিয়ে ভারত চলে যাচ্ছে- এটাকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন ?
উত্তরঃ না, তারা যাচ্ছে না। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। যেভাবে ভারতীয়রা গোলা নিক্ষেপ করছে সীমান্তবর্তী মানুষদের এমনিতেই প্রাণের ভয়ে ছুটোছুটি করতে হচ্ছে। সীমান্ত চীনের প্রাচীরের মত নয়। সীমান্তে চিহ্ন নেই। ভারতীয়রা বিদেশী সাংবাদিকদের ভারতের ভেতরের ভূখণ্ড দেখিয়ে বলে এটাই সীমান্ত…
প্রশ্নঃ মাত্র কয়েক মাসে ৯০ লাখ মানুষ কীভাবে নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়?
উত্তরঃ সংখ্যাটা আমি মানতে নারাজ। ২০ থেকে ৩০ লাখ হতে পারে। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক দিয়ে গুনলে ৪০ লাখও পাওয়া যেতে পারে…

ইয়াহিয়া খানের এই চরিত্র অজানা নয় আমাদের। যুদ্ধকালীন সময়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম দেখানোর জন্য এরা মরিয়া হয়ে ছিল। আপনারা হয়ত জানেন মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানে গঠিত হামিদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট প্রকাশ করে যুদ্ধের সময় বাংলাদেশে নিহত মানুষের সংখ্যা ২৬,০০০। তিরিশ লাখকে যারা ছাব্বিশ হাজার বানিয়ে দিতে পারে তারা এক কোটি শরণার্থীকে ২০ থেকে ৩০ লক্ষ বললে আমরা বরং একটু অবাক হই, এতটা বড় ফিগার তারা স্বীকার করে নিলো কি করে!
আসলে ইয়াহিয়া খানের হাতে আর কোন উপায়ও ছিলো না। ৭১ সালে সমগ্র পৃথিবীর দৃষ্টি ছিল আমাদের দিকে দিকে। বিশ্বময় সংবাদপত্র গুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে আসলে যে কোন মানুষ স্বীকার করতে বাধ্য হবে ১৯৭১ সালে ভারতে বাঙ্গালী রিফিউজির সংখ্যা ছিলো এক কোটি কিংবা তার চেয়েও বেশী। মুক্তিযুদ্ধকালীন বিশ্বময় প্রকাশিত প্রায় দেড়-শতাধিক পত্রিকা থেকে আসুন একটু খুঁজে বের করার চেষ্টা করি শরণার্থীদের প্রকৃত সংখ্যা। প্রত্যেকটা রিপোর্ট একটা একটা করে পড়ে দেখা অসম্ভব সেজন্য আমি সব গুলো প্রতিবেদন থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় সংখ্যাটি আলাদা করে বের করেছি। একটা কথা খেয়াল রাখবেন সমস্ত শরণার্থী কিন্তু এক দিনেই ভারতে পাড়ি জমান নি আর তাই সংখ্যাটা বেড়েছে ক্রমান্বয়ে।
. ডেইলি টেলিগ্রাম ৩০ মার্চ ১৯৭১ লিখেছে; ২৫ মার্চ ১৫,০০০ মানুষ দেশ ছেড়ে পালায়।
. নিউইয়র্ক টাইমসের ২৪ মে ১৯৭১ সালের তাদের পত্রিকায় বলেছে এখন ভারতে শরণার্থী সংখ্যা ১৫ লাখ।
. একই পত্রিকা ৬ জুন ১৯৭১ লিখেছে ২০ লক্ষ।
. এরপর একই পত্রিকার ১৩ জুন ১৯৭১ সালের সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে শরণার্থী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ লাখ।
. সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট বলেছে প্রতিদিন ৬০,০০০ মানুষ পালাচ্ছে।
. দ্যা স্পেক্টেটর তাদের পত্রিকায় ১৯ জুন ১৯৭১ বলছে ৫০ লাখ।
. সানডে টাইমস ২০ এবং ২১ জুন ১৯৭১ লিখেছে ৬০ লাখ
. ইকোনমিস্টনিউজ উইক ২৬ জুন বলেছে ৬০ লাখ।
. ওয়াশিংটন ডেইলি নিইউহ৩০ জুন ১৯৭১ লিখেছে ৬০ লক্ষ।
. দ্যা পালাভার উইকলি ৮ জুন ১৯৭১ বলেছে প্রতিদিন ৫০,০০০ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে
. ১৭ জুলাই ১৯৭১ ইকনোমিস্ট বলছে ৬৮ লাখ।
. হেরাল্ড ট্রিবিউন ৯ আগস্ট ১৯৭১ বলেছে শরণার্থী এখন ৭০ লক্ষ।
. কাইহান ইন্টারন্যাশনাল ২ আগস্ট ১৯৭১ রিপোর্ট করেছে ৭৫ লক্ষ।
. সেনেগালের লে সেলাই ৭ সেপেম্বার বলেছে ৮০ লক্ষ।
. টরেন্টো টেলিগ্রাম ১৩ই সেপ্টেম্বার বলছে ৮০ লক্ষ।
. দ্যা ইভিনিং স্টার ৩০ সেপ্টেম্বর লিখেছে ৮০ লক্ষ শরণার্থীর কথা।
. ফার ইস্টার্ন ইকনোমিক রিভিউ ২৫ সেপ্টেম্বার বলছে ৮৫ লক্ষ।
. দ্যা এডভান্স মরিশাস ২৭ সেপ্টেম্বার বলেছে ৮৫ লক্ষ।
. দ্যা ওয়েস্টার্ন মেইল ২৮ সেপ্টেম্বার বলেছে ৯০ লক্ষ
. নিউইয়র্ক টাইমস ১১ই অক্টোবর বলছে ৯০ লক্ষ।
. লস এঞ্জেলস টাইমস ১৮ই অক্টোবর বলেছে ৯০ লক্ষ।
. লা লিবর বেলজিক ১৮ অক্টোবর বলছে সংখ্যাটা ১ কোটি ছাড়িয়েছে।
. নিউজউইক ৬ ডিসেম্বর বলেছে ১ কোটি।
. টাইমস ২০ ডিসেম্বর বলেছে ১ কোটি।
একটু বিশ্লেষণী দৃষ্টি নিয়ে লক্ষ করলে দেখবেন ২৫ মার্চ অর্থাৎ যুদ্ধের প্রথম প্রহর থেকেই শরণার্থীরা দেশ ত্যাগ শুরু করেন এবং সেই সংখ্যাটা মে মাসে এসে দাঁড়ায় ১৫ লক্ষ। জুনের মাঝামাঝি সংখ্যাটা হয় প্রায় ৫০ লাক্ষ যেটা আগস্টে এসে ৭০ থেকে ৭৫ লক্ষ হয়ে যায়। সেপ্টেম্বরে ৮৫ লক্ষ ছাড়িয়ে যায় এবং বাদবাকি সময়ে সংখ্যাটা ছাড়িয়ে যায় কোটির ঘর। পৃথিবীর ইতিহাসে এত কম সময়ে এত বেশী শরণার্থী হবার ঘটনা বিরল।

পৃথিবীর কোন দেশই হঠাৎ করে এক কোটি শরণার্থীকে একসাথে খাওয়াতে-পরাতে পারে না। এটা এক কথায় অসম্ভব। আর যখন এই শরণার্থীদের বড় অংশই শিশু এবং বৃদ্ধ তখন একটা অনিবার্য জিনিস ছিল মৃত্যু। এছাড়া গাদাগাদি করে থাকার কারণে মহামারির মত ছড়িয়ে পড়ে কলেরা প্রাণ হারায় লাখ লাখ শিশু। মাঝখানে শীতের প্রকোপেও অনেক শিশু মৃত্যু ঘটে। এই অধ্যায়ে আমরা একটু ধারণা নেয়ার চেষ্টা করব ক্ষয়ক্ষতিয় পরিমাণ নিয়ে।

নোবেল বিজয়ী আলফ্রেড কাস্টলার লা ফিগারো, প্যারিস পত্রিকায় ৮ অক্টোবর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের শরণার্থী সমস্যাকে হিরোশিমার পারমানবিক বোমা হামলার চেয়েও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন যারা হিরোশিমা ঘটনার শিকার তারা ছিলেন ভাগবান কারণ কিছু বুঝে ওঠার আগের তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন কিন্তু পাকিস্তানের শরণার্থীদের দুর্দশা তার মতে এর চেয়েও ভয়াবহ তিনি লিখেছেন পাকিস্তানি (বাংলাদেশ) শরণার্থীদের জন্য যে তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে তা ফুরিয়ে গেছে। খাবারও রসদ সরবরাহ থেমে গেছে- এটা নিশ্চিত এখন থেকে কয়েকদিনের মধ্যে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু ঘটবে তিনি জোর দিয়ে বলেন
“এখনই যদি খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায় তাহলে ৩ থেকে ৫ লাখ বা তার চেয়েও বেশী শিশু মৃত্যু বরণ করবে”
আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি সেই ট্রেজিডিতে লক্ষাধিক শিশু প্রাণ হারায়।

এরপর দেখি মালয়েশিয়ার দ্যা স্ট্রেইট টাইমস ৮ জুন লিখেছে কলেরার মহামারির কথা। সেখানে বলা হয়েছে মহামারিতে শরণার্থী শিবিরে এখন পর্যন্ত মৃত মানুষের সংখ্যা ৮ হাজার। দ্যাগব্লাতে নরওয়ে লিখেছে ৩ লক্ষাধিক শিশু তীব্র অপুষ্টিজনিত মৃত্যু ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্যা অর্ডিন্যান্স নরওয়ে ২৭ সেপেম্বর লিখেছে শুধু ক্ষুধা ও ঠাণ্ডায় লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে।

ব্রিটিশ এমপি বার্নার্ড ব্রেইন দ্যা টাইমস পত্রিকায় এক দীর্ঘ প্রতিবেদন লেখেন শরণার্থী ইস্যুতে যেটা আলোচনার দাবী রাখে;
তিনি লিখেছেন দিনের পর রাত আসবে এটা যেমন সত্য আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ না আসলে পাকিস্তানে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসবে এটাও তেমনি সত্য কথা। তিনি লিখেছেন পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে এর মধ্যে ৭৫ লক্ষ শরণার্থী ভারতে পাড়ি জমিয়েছে এবং এই সংখ্যাটা বেড়েই চলছে। খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি দেখিয়ে তিনি বলেন শুধু খাবারের জন্য ৩০ লক্ষ মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখি হতে পারে।

শরণার্থী ইস্যুতে জাতিসংঘের টনক নাড়ানোর জন্য যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সহায়তা প্রতিষ্ঠান অক্সফোম এগিয়ে আসে। তারা প্রকাশ করে ‘টেস্টিমনি অব সিক্সটি’। ষাট জন বিশ্ব বরেণ্য মানুষের সাক্ষ্য। সাক্ষ্যদাতাদের মাঝে আছেন মাদার তেরেসা, সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি। সাংবাদিক জন পিলজার, মাইকেল ব্রানসন, নিকোলাস টোমালিন, এন্থনি মাসকারেনহাস এবং আরও অনেকে।
বিরাট সেই দলিলে সাংবাদিক সানিকোলাস টেমালিনের লেখা থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি;
‘যদি এই শিশুদের অতিরিক্ত প্রোটিন দেওয়া না হয়, তাহলে এরা অবশ্যই মারা যাবে। শিশুদের চার ভাগের তিন ভাগ নয় মাসের মধ্যে অবশ্যই মারা যাবে। তার মানে “দশ লাখ শিশু”।’

ষাটজনের সাক্ষ্য থেকে সিনেটর কেনিডির লেখাটি উল্লেখ যোগ্য, উল্লেখ্য সিনেটর কেনিডি বেশ কয়েকটি শরণার্থী শিবিরে যান। তিনি লিখেছেন;
গত তিরিশ বছরে পৃথিবী যত দুর্যোগ মোকাবেলা করেছে তার মধ্যে ভায়াবহটি হচ্ছে পাকিস্তানের সংকট। তিনি লিখেছেন সাপ্তাহের পর সাপ্তাহ গড়াচ্ছে আর মৃত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কেউ কেউ ভারতে যাচ্ছেন আর ৯০ লাখের মধ্যে মাত্র কয়েকশ জনকে খাওয়াচ্ছেন এবং শুশ্রষা দিচ্ছেন।
কোলকাতার সল্ট লেকের শরণার্থী শিবির ঘুরে এসে তিনি জানান ওখানকার ২ লাখ ৫০ হাজার শরণার্থী মোটামুটি ভালো আছেন তারপরেও তার মতে সেখানকার শিশুদের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। বিদেশী ও ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের মতে এই অবস্থা চলতে থাকলে মোট শিশুদের তিন চতুর্থাংশ নয় মাসের মধ্যেই মারা যাবে সংখ্যাটা ১০ লাখ!
তিনি লিখেছেন ৩০ হাজার শরণার্থীর দিয়ারা ক্যাম্পের কথা যেখানে বন্যার পুরো ক্যাম্পটাই তলিয়ে যায়। সেখানকার পরিবার গুলো কাদায় ঢাকা, নিজেদের মল-মুত্র কখনোই ঠিকমত পরিস্কার করা সম্ভব হয় না। পানি ভেঙ্গে খাবার আনতে হয়, ওষুধ থেকেও তারা বঞ্চিত পুরোপুরি।
বন্যার পর আসছে শীত, এই মুহূর্তে ৯০ লক্ষ মানুষের চাই ৩০ লক্ষ কম্বল। এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে কাপড় ও তাবু এরসাথে বাড়ছে কলেরার প্রকোপ।

সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির লেখাটি থেকে খানিকটা উদ্ধৃত না করলে এই লেখা সম্পূর্ণ হবে না। আমি তার লেখা থেকে অল্প কিছু উদ্ধৃত করছি তিনি লিখেছেন
…আমি দেখেছি এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পের অবস্থার মধ্যে বায়পক পার্থক্য। কিন্তু অধিকাংশই বর্ণনা দেয়া অসম্ভব। ক্যাম্প গুলোতে শিশু এবং বৃদ্ধের সংখ্যা মোট শরণার্থীর ৫০ শতাংশ। যাদের বয়স পাঁচ থেকে কম এবং যারা বয় বৃদ্ধ তারাই সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী, এরকম বয়সের মানুষের সংখ্যাই শিবির গুলোতে বেশী, এরা মোট শরণার্থীদের পঞ্চাশ শতাংশ। এদের বেশীরভাগই মৃত্যুবরণ করছে। শরণার্থী শিবিরের মাঝখান দিয়ে হেঁটে গেলে দেখে দেখে সনাক্ত করা সম্ভব এক ঘণ্টার মধ্যে কারা মারা যাবে আর কাদের ভোগান্তি চিরতরে শেষ হওয়াটা কেবল কয়েকদিনের ব্যাপার মাত্র। শিশুদের দিকে দেখুন, তাদের ছোট্র হাড় থেকে আলগা হয়ে ভাঁজে ভাঁজে ঝুলে পড়া ত্বক, এমনকি তাদের মাথা তোলার শক্তিও নেই। শিশুদের পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখুন পা ও পায়ের পাতার পানি নেমে অপুষ্টিতে ফুলে আছে। তাদের মায়ের হাতও নিস্তেজ। ভিটামিনের অভাবে তারা অন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাদের মায়ের হাতও নিস্তেজ। আর সবচেয়ে সবচেয়ে বেশী কঠিন দৃশ্য, গতরাতে যে শিশুটি মারা গেছে, তার মৃতদেহও এখানেই।
… আমি যখন একজন শরণার্থী শিবিরের পরিচালককে জিজ্ঞাসা করলাম তার সবচেয়ে জরুরী প্রয়োজনটি কি। জবাব এল “একটি শব-চুল্লি” পৃথিবীর অন্যতম বৃহত একটি ক্যাম্পের তিনি পরিচালক”

সবশেষে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মাদার তেরেসার সাক্ষ্য থেকে খানিকটা তুলে ধরছি।
তিনি বলেছেন আমরা যেখানেই থাকিনা কেন অনুধাবন করার চেষ্টা করি আমাদের লাখ লাখ শিশু অপুষ্টি ও ক্ষুধার জ্বালায় ভুগছে, পৃথিবী যদি এগিয়ে না আসে তাহলে এই শিশুরা মৃত্যুবরণ করবে। আমি ৫-৬ মাস ধরে শরণার্থীদের মাঝে কাজ করছি আমি এই শিশু আর প্রাপ্তবয়স্কদের মরতে দেখেছি।
এবারে আসুন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টটি নিয়ে। আর সেই ডকুমেন্ট নিয়ে আমার আগেই দুইজন যোগ্য মানুষ কাজ করেছেন তাদের একজন কুলদা রায় আরেকজন কিংবদন্তী তুল্য মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এম এম আর জালাল

জেনোসাইড নামের একটা বই আছে যার লেখক প্রখ্যাত গনহত্যা গবেষক লিও কুপার। বইটির প্রচ্ছদ করা হয়েছে কিছু সংখ্যা দিয়ে। লেখা হয়েছে—১৯১৫ : ৮০০,০০০ আর্মেনিয়ান। ১৯৩৩-৪৫ : ৬০ লক্ষ ইহুদী। ১৯৭১ : ৩০ লক্ষ বাংলাদেশী। ১৯৭২-৭৫ : ১০০,০০০ হুটু। নিচে লাল কালিতে বড় করে লেখা জেনোসাইড। এই অংকের মানুষ গণহত্যার শিকার। এই আট লক্ষ, ৬০ লক্ষ, ৩০ লক্ষ, এক লক্ষ সংখ্যাগুলো এক একটি প্রতীক। গণহত্যার প্রতীক। ক্যালক্যালেটর টিপে টিপে হুবহু মিলিয়ে দেয়া পূর্ণ সংখ্যার হিসেব এখানে পাওয়া যাবে না। পাওয়া যাবে পরিকল্পিত গণহত্যার মানবিক বিপর্যয়ের ইতিহাসের প্রতীক। জেনোসাইড বইটি নিয়ে অসাধারন একটি প্রবন্ধ লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এম এম আর জালাল এবং কুলদা রায়। তাদের প্রবন্ধ থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ তুলে ধরছি;

১৯৭১ সালে জুন মাসে লাইফ ম্যাগাজিনের সাংবাদিক জন সার কোলকাতায় এসেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন ফটোগ্রাফার মার্ক গডফেরি। তাঁরা দুজনে একটি গাড়িতে করে ঘুরে ঘুরে দেখেছেন শরণার্থীদের চিত্র।

সময়টা জুন মাসের মাঝামাঝি। জন সার গিয়েছেন করিমপুরে। বৈষ্ণব ভক্তিবাদের প্রবক্তা চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মস্থান পশ্চিম বঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরের এই গ্রামটি পাকিস্তান সীমান্ত থেকে মাত্র তিন মাইল দূরে। এখানে রাস্তা দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ আসছে পূর্ব পাকিস্তান থেকে। পাক হানাদার বাহিনীর বর্বর গণহত্যার শিকার হয়ে এরা হারিয়েছেন এদের স্বজন, গবাদিপশু, ঘরবাড়ি, সহায়সম্পদ। ধারাবাহিক মৃত্যুর তাড়া খেয়ে এইসব ভয়ার্ত মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে জন্য ভারতে ছুটে আসছে। সরাসরি গুলির হাত থেকে ঈশ্বরের দয়ায় এরা বেঁচে এসেছে। কিন্তু নতুন করে পড়েছে নতুন নতুন মৃত্যুর ফাঁদে। এদের পিছনে মৃত্যু। সামনে মৃত্যু। বায়ে মৃত্যু। ডানে মৃত্যু। সর্বত্রই মৃত্যুর ভয়ঙ্কর থাবা এদের তাড়া করে ফিরছে।

সাংবাদিক জন সার করিমপুরের রাস্তায় দেখতে পেলেন অসীম দৈর্ঘের লম্বা শরণার্থী মানুষের মিছিল। তাদের কারো কারো মুখে রুমাল গোজা। একটা লোকের কাছে তিনি গেলেন। কোনোভাবে রুমালটি মুখ থেকে সরিয়ে লোকটি শুধু বলতে পারলেন, কলেরা। কলেরা। আর কিছু বলার নেই। পিছনে পাক সেনাদের গুলি। আর সঙ্গে কলেরা। সামনে অন্ধকার। কোথায় চলেছে তারা—কেউ জানে না। মৃত্যুকে সঙ্গী করে তবু তারা এগিয়ে চলেছে।
করিমপুরের মধ্যে দিয়ে যে রাস্তাটি চলে গেছে কোলকাতা বরাবর, তার বামদিকে শরণার্থী শিবির। এখানে আশ্রয় নিয়েছে ১৫০০০ মানুষ। এই শরণার্থী শিবিরে কলেরা নির্মমভাবে হানা দিয়েছে। ৭০০ জন ইতিমধ্যে মারা গিয়েছে। বাকীরা শিবির ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পালাবে কোথায়? কলেরাও তাদের সঙ্গে চলেছে। খোলা জায়গায় পড়ে আছে মরা মানুষ।
জন সার দেখতে পাচ্ছেন–
ঝাঁকে ঝাঁকে শকুন নেমে এসেছে। তীক্ষ্ণ ঠোঁট দিয়ে ছিড়ে খুড়ে খাচ্ছে মরা মানুষের দেহ। তাদের চোখ চক চক করছে। কিন্তু মৃত মানুষের সংখ্যা এত বেশী যে শকুনের খেয়ে শেষ করতে পারছে না। শকুনদেরও খাওয়ায় অরুচি এসে গেছে। মরা মানুষের গা থেকে ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলেছে জামা কাপড়। তাদের অনেকের তখনো গা গরম। সবেমাত্র মরেছে। পথে ঘাটে নালা নর্দমায়—সর্বত্রই কলেরায় মরা মানুষ পড়ে আছে। জন সার দেখতে পেয়েছেন একটি শিশুর মৃতদেহ। শিশুটির গায়ে একটি শাড়ির অংশ পেঁচানো। তাঁর হতভাগী মা পেঁচিয়ে পুটুলি বানিয়েছে। ট্রাকের চলার সময় অসুস্থ শিশুটি মারা গেছে। চলন্ত ট্রাক থামেনি। মৃত ছেলের জন্য ট্রাক থামানো কোনো মানেই হয় না। আরও অনেক মৃতপ্রায় মানুষ এই ট্রাকেই ধুঁকছে। আগে পৌঁছাতে পারলে হয়তো কোনো হাসপাতাল পাওয়া যেতে পারে। তাদের সুযোগ মিলতে পারে চিকিৎসার। বেঁচেও যেতে পারে। এই আশায় সময় নষ্ট করতে কেউ চায় না। শিশুটির পুটুলী করা মৃতদেহটিকে ট্রাক থেকে রাস্তার পাশে ধান ক্ষেতে ছুড়ে ফেলা দেওয়া হয়েছে।
একটি ওয়ান ডেকার বাসের ছবি তুলেছে জন সারের সঙ্গী ফটোগ্রাফার মার্ক গডফেরি। বাসটির হাতল ধরে ঝুলছে কয়েকজন হতভাগ্য লোক। আর ছাঁদে বসে আছে–সব মিলিয়ে জনা সত্তর জন। কেউ কেউ বমি করছে। কারো কারো মুখে রুমাল চাপা। কেউ কেউ রুমালের অভাবে হাতচাপা দিয়েছে। ছাঁদের মানুষের বমি জানালা দিয়ে বাসের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আর বাসের মধ্যের বমি জানালা দিয়ে বাইরে ছিটকে পড়ছে। পথে। ঘাটে। মাঠে। খালে। জলাশয়ে। হাটন্ত মানুষের গায়ে। বমির সঙ্গে জীবনবিনাশী কলেরার জীবাণু। এইসব হতভাগ্য মানুষের চোখ গর্তের মধ্যে ঢোকানো। আর তার মধ্যে জ্বল জ্বল আতঙ্ক। বাসভর্তি করে কলেরা চলেছে। বাইরে পড়ে আছে একটি মৃতদেহ।

‘এই সব মানুষ এত বেশী সংখ্যায় মরেছে যে আমরা গুণতে পারিনি। গোণা সম্ভব নয়।‘ একজন স্বেচ্ছাসেবক সাংবাদিক জন সারকে বলছেন, এরা জানে না তারা কোথায় যাচ্ছে। তারা চলছে তো চলছেই। তীব্র রোদে হাঁটতে হাঁটতে তারা ক্লান্ত—অবসন্ন। তৃষ্ণার্ত হয়ে পথের পাশ থেকে আঁজলা ভরে কলেরাদুষ্ট পানি পান করছে। তারা এত দুর্বল হয়ে পড়ছে যে, আক্রান্ত হওয়ার পর একদিনও টিকতে পারছে না। মৃত্যুর কোলো ঢলে পড়ছে।
তিনি লিখেছেন, কাঁটাখালি গ্রামে রাস্তার পাশ থেকে হৈঁচৈ করে একটি ট্রাক থামাতে চেষ্টা করছে একদল শরণার্থী। তারা করুণ স্বরে আবেদন করছে ট্রাকচালককে তাদেরকে ট্রাকে তুলে নিতে। তাদের মধ্যে যারা অসুস্থ হয়ে পড়েছে তারা রাস্তার পাশে মাটির উপরে শুয়ে আছে। তাদের পরিবার পরিবার অসহায় হয়ে চেয়ে। তাদের হেঁটে যাওয়ার শক্তি নেই। যাদের সঙ্গে কিছু টাকা পয়সা আছে তারা কোনোমতে ট্রাকে উঠে পড়েছে। ট্রাকে করে তারা কৃষ্ণ নগর হাসপাতালে যেতে পারবে। সেখানে চিকিৎসা পাওয়ার চেষ্টা করবে।

করিমপুরের আশেপাশে গ্রামগুলোতে কোনো ডাক্তার নেই। কলেরা ভ্যাক্সিন নেই। নেই কোনো প্রতিষেধক অষুদপত্র। কাছাকাছি কৃষ্ণনগরে একটি হাসপাতাল আছে। হাসপাতালের উদ্দেশ্যে অসুস্থ মানুষ চলেছে মানুষের কাঁধে চড়ে। ঝোড়ায় করে। কেউবা বা বাঁশের তৈরি টেম্পোরারী স্টেচারে করে। গরুর গাড়িতে। কেউবা রিকশায়।
কৃষ্ণ নগর হাসপাতালে তিল ধারণের জায়গা নেই। যারা হাসপাতালে এর মধ্যে এসে পড়েছে—তখনো বেঁচে আছে, তাদের রাখা হয়েছে বাইরে খোলা মাঠে। যাদের চিকিৎসা শুরু হয়েছে তাদের রাখা হয়েছে অস্থায়ী ছাউনিতে। বাঁশের কাঠামোতে কাপড় বসিয়ে ছোটো ছোটো শিবির করে চাউনি তৈরি হয়েছে।
সেখানে কিছু কিছু মানুষ বেঁচে থাকার জন্য মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। তাঁদের চোখ গর্তের মধ্যে ঢুকে গেছে। অর্ধচেতন বা অচেতন জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পড়ে আছে। তাদের মুখে মাছি পড়ছে। মশা ঘুরছে। অনন্তবিদারী দুর্গন্ধ। স্বজনদের কেউ কেউ হাত দিয়ে, তালে পাখা দিয়ে বা কাপড়ের আঁচল দিয়ে মাছি তাড়ানোর চেষ্টা করছে। সাদা এপ্রোন পরা নার্সরা তাদের শিরায় ঢোকানোর চেষ্টা করছে সেলাইন। তাদের চেষ্টার কমতি নেই। কিন্তু নার্সের বা ডাক্তারের সংখ্যা হাতে গোণা। অপ্রতুল।

এই হতভাগ্যদের অর্ধেকই শিশু। সাংবাদিক জন সার একটি সাত বছরের ফুটফুটে মেয়ে শিশুকে তুলে এনেছে রাস্তা থেকে। তার চোখ বড় করে খোলা। তার হাত ঝুলে পড়েছে। নার্স এক পলক দেখেই বলছে, সব শেষ। কিছু করার নেই। মেয়েটি মরে গেছে। একজন ক্লান্ত ডাক্তার বলছেন, এর চেয়ে কুকুর-বেড়ালেরাও ভালো করে মরে। কিছুটা হলেও তারা চেষ্টা তদ্বির পায়। আর এই শরণার্থী মানুষদের কলে পড়া ইঁদুরের মত মরা ছাড়া কপালে আর কিছু লেখা নেই।
এতক্ষন তো দেখলেন বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে মৃত্যুর আশংকা নিয়ে অনেক অনেক লেখা, কিন্তু আদতে ঠিক কত মানুষ মারা গিয়েছিলো শরণার্থী শিবিরে সেটা আমাদের জানা নেই। আর জানা সম্ভব হবে কি না তাও জানি না। তবুও একটু রিসার্চের রাস্তা ধরে আইডিয়া করা যায় সংখ্যাটা।
The Lancet কে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে পুরনো মেডিকেল জার্নাল। এটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানজনক মেডিকেল জার্নালও বলা হয়ে থাকে। তাদের রিসার্চ জার্নালে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়েও সচেতনতা তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী শিবির নিয়ে একটা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে তারা তাদের একটি জার্নালে
তাদের ভাষ্য কোলকাতার একটি স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপকে নিয়ে, যারা একাত্তরের জুনের শেষ থেকে বাহাত্তরের ফেব্রুয়ারি শুরু পর্যন্ত পাঁচ মাস চালু থাকা একটা রিফিউজি ক্যাম্পের ওপর সার্ভে চালায়। এবং তাদের সার্ভেটি খুবই বিশ্বাসযোগ্য কারণ সেইসব ডাটা প্রত্যেকটি ঘর থেকে আলাদা আলাদা ভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই সার্ভের উদ্দেশ্য ছিলো ক্যাম্পের জনসংখ্যা, সেখানকার মানুষের বয়সের ধরণ আর মৃত্যুহার নিয়ে।
তাদের ভাষ্য মতে ১,৭০,০০০ শরণার্থীর ঐ ক্যাম্পে কম করে হলেও ৪০০০ মানুষ মারা যায়। তারা বলেছে সংখ্যাটা আরও অনেক বেশী হতে পারে, স্বাভাবিক মৃত্যুকে তারা বিবেচনা করেনি এবং নিহতদের বড় অংশই ছিলো শিশু। এই প্রবন্ধে আরো তথ্য আছে তবে আমার দরকার এটুকুই।
আমাদের কাছে যে ডাটা আছে সেটা থেকে আমরা আগেই দেখছি জুনের আগে থেকেই প্রচুর শরণার্থী ভারতে পাড়ি জমায়। টাইম পত্রিকার ২৪ মে ৭১ সংখ্যা থেকে জানা যায় শরণার্থীর সংখ্যা তখন ছিলো ১৫ লক্ষ এরপর একই পত্রিকার ১৩ জুন ৭১ সংখ্যা অনুসারে সেটা বেড়ে দাড়ায় পঞ্চাশ লাখে। সানডে টাইমস ২১ জুন ৭১ লিখেছে শরণার্থীর সংখ্যা ৬০ লাখ, ইকনোমিস্ট লিখেছে ২৬ জুন তারিখে যে শরণার্থীর সংখ্যা ততদিনে ৬০ লাখ ছাড়িয়েছে।
এখানে দেখালাম সেই শরণার্থী শিবির খোলার আগেই প্রচুর মানুষ দেশ ছেড়েছেন এবং তাদের অনেকে অবশ্যই মারা গিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত নিউজ উইকের ৬ ডিসেম্বর ৭১ থেকে জানা যায় শরণার্থীর সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়েছে।
আমার পড়ালেখায় যতটুকু জানি ভারতের শরণার্থী শিবিরের মধ্যে কোলকাতার শিবিরগুলোই মোটামুটি ভালো বলে বিবেচিত হয়, অন্য অনেক শরণার্থী শিবিরের অবস্থা ছিলো অনেক ভয়াবহ, ছিলো না নূন্যতম খাদ্য আর চিকিৎসা সেবা, সুতরাং সেসব শিবিরে মৃত্যুহার হওয়ার কথা আরও ভয়ঙ্কর রকম বেশী, কিছু কাম্পে কলেরার প্রকোপের কথাও আমরা শুনেছি। বন্যা, শীত এসব তো বাদই দিলাম।
তবুও অনেক কমিয়ে এই সংখ্যাটাকেই ধ্রুব ধরে যদি শরণার্থী শিবিরে নিহত মানুষদের সংখ্যাটা কত হতে পারে সে নিয়ে ধারনা করতে চাই তাহলে হিসাবটা দাঁড়ায় অনেকটা এরকমঃ
১,৭০,০০০ মানুষের মধ্যে কমপক্ষে মৃতঃ ৪,০০০
তাহলে; এক কোটি মানুষের মাঝে পাঁচ মাসে ন্যূনতম নিহতের সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ।
ষাট লাখ জনগোষ্ঠী দেশ ছাড়ার পর এই হিসাব করা হয়েছে। পুরো হিসাবটা আরও ভয়াবহ, হয়ত এই সংখ্যাটার দ্বিগুণ কিংবা তিনগুন। কারণ বলা হয়েছে এটা পাঁচ মাসের হিসাব আর ক্যাম্পটা কোলকাতার সেরা ক্যাম্প যেখানে ছিলো পর্যাপ্ত ডাক্তার, খাদ্য আর থাকার জায়গা
আর জন সারের হিসাবে ১৫০০০ মানুষের মাঝে মৃতঃ ৭০০
তাহলে; এক কোটি মানুষের জন্য হিসাবটা হয় প্রায় পাঁচ লাখ
এখানে আমরা দেখেছি এটা জুন মাসের হিসাব। যদি ধরেও নেই এই শিবিরটা প্রথম থেকেই ছিলো অর্থাৎ মার্চ শেষ দিক থেকে। তাহলে মাত্র তিন মাসের মৃত্যুর হার এটা। এই ক্যাম্প যদি ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থায়ি হয়ে থাকে তাহলে সম্ভবত আপনারা সংখ্যাটা আঁচ করতে পারছেন
আমার ব্যাক্তিগত অভিমত মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী শিবিরে নিহত মানুষের সংখ্যা কম করে হলেও সাত থেকে থেকে নয় লক্ষ। আর যদি সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েও হিসাব করি কোনক্রমেই পাঁচ লাখের কম হবে না।
আজকের দিনে যারা পুরো যুদ্ধেই মৃতের সংখ্যা দুই কিংবা তিন লাখ দাবী করে তাদের আসলে জানা উচিত শরণার্থী শিবিরে মৃত মানুষ গুলোর কথা। এদের শহীদের মর্যাদা দেয়া হবে কি না আমি জানি না কিন্তু এদের মৃত্যুর কারণ সেই একটাই ‘পাকিস্তান’।
আশা করি সামনের দিন গুলোতে শরণার্থীদের নিয়ে আরও অনেক কাজ হবে, আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ অংশটির চিত্র ফুটে উঠবে আরও পরিস্কার হয়ে।

কয়েকটি তথ্য এখানে যোগ করতে চাই-
১। ১২ জুলাই বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, সমগ্র বাংলাদেশে মোট ৩ কোটি মানুষ গৃহহীন।
২। দিল্লীতে বাংলাদেশ মিশনের প্রধান সাহাবুদ্দিন বলেছেন- খুন, অঙ্গহানী, ধর্ষণ, নিগ্রহ সব মিলিয়ে ৯ মাসের বর্বর শাসনে বাংলাদেশে মোট ৭ লক্ষ নারীর জীবন নষ্ট হয়েছে।
৩। কোথাও কোথাও যেমন মেঘালয়ে কিংবা দিনাজপুরে শিবিরবাসীর সংখ্যা স্থানীয় জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়।
৪। কোটি মানুষের ক্ষুধা মেটাতে গেলে রোজ কোটির অধিক টাকা চাই।
৫। ৮২,০২৬ তাঁবু আর ২৪ হাজার ত্রিপল সংগ্রহ করা হয়েছিল আশ্রয় গড়ার জন্য।
৬। খবরের কাগজ, ডাকটিকিট, রেভিনিউ স্ট্যাম্প, সিনেমার টিকিট এসবের উপর অর্ডিন্যান্স করে সারচার্জ বসানো হয়েছিল।
৭। জারজ ইয়াহিয়া প্রথমে বলেছিল, ওরা কলকাতার ফুটপাতবাসী। ভারত বানিয়ে বানিয়ে শরণার্থী আনিয়েছে। শেষে কবুল করেছিল, হ্যাঁ, বিশ লাখের মত মানুষ ভারতের প্ররোচনায় দেশ ছেড়ে চলে গেছে।
৮। ‘কাসা’, ‘রামকৃষ্ণ মিশন’, ‘অক্সফাম’, ‘ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ’, কলকাতার মেডিকেলের ছাত্র-চিকিৎসক, ফার্মাসিউটিক্যালসহ দেশী-বিদেশী অনেক সেবাপ্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছিল।
৯। ভারত সরকার হিসেব করে বলেছিল, শরণার্থীদের সবাইকে মার্চ নাগাদ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো পর্যন্ত ব্যয় দাঁড়াবে ৩৭২ কোটি টাকা।
১০। ভ্যাটিকানসহ ১৭টি দেশ নগদ ও ত্রাণদ্রব্যসহ ৭২ কোটি টাকার সাহায্য দিবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কিন্তু পরে হিসেব করে দেখা গেছে, ঐ প্রতিশ্রুতির মাত্র ৩৮ ভাগ অর্থাৎ ২৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকার মত সাহায্য পাওয়া গেছে। এই টাকায় শরণার্থীদের মোট ১০ দিন খাওয়ানো সম্ভব হয়েছে। প্রতিশ্রুতির ঘোষণা যেভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, প্রতিশ্রুতি রক্ষার এই বিপুল পার্থক্যের কথা খুব সামান্যই প্রকাশিত হয়েছে।
১১। আগস্টের গোড়ায় সিনেটর কেনেডির সঙ্গে শরণার্থী শিবিরে আসা পুষ্টি বিশেষজ্ঞের হিসেবে দিনে কয়েক হাজার শিশুমৃত্যুর কথা।

“নাস্তিক নাস্তিক বলে তিরিশ লক্ষ মেরেছিলেন, আপনাদের অভ্যাস কি এত সহজে যায় ……” আমি এবং আমার ছাত্রের কথোপকথন
7.

আমার একটা ইঁচড়ে পাকা ছাত্র, যার সাথে গাঞ্জাগরন এবং হেফাজত ইস্যুতে আমার মাঝেমাঝেই কথা কাটাকাটি হয়
আমার ছাত্র সেদিন আমাকে বলিল,
ছাত্রঃ
ভাইয়া হেফাজত নাকি ২৪ তারিখে আবার আসছে… আসুক।
যতই লাফালাফি করুক এই দেশে জামাতের আর ভবিষ্যৎ নাই। আমাদের গণজাগরণ মঞ্চ আজ সম্পূর্ণ সফল
আমিঃ
কিসের গাঞ্জাগরণ, কিসের সফল, নাস্তিক পলাপাইনরা হারাদিন নাইচ্যা কুইদ্যা ফ্রি ফ্রি বিরনী খাইয়া আমার গুষ্ঠি উদ্ধার করসে। সফল হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের মুজাহিদদের আন্দোলন।
নাস্তিকদের ঝাটিয়ে বিদায় করেছে।
ছাত্রঃ
ভাইয়া, নাস্তিক টার্মটা ব্যবহার করবেন না।
শফিক রেহমান আর ফরহাদ মাজাহারের মত নাস্তিকদের নিয়া আপনারা “নাস্তিকতা বিরোধী ইসলামী আন্দোলন” করেন।
আমরা কি বুঝি না, কার পারপাস সাভ করতেসেন আপনারা……
আমিঃ
ফরহাদ মাজাহার নাস্তিক তোমার কাছে প্রমাণ আছে ?
উনি প্রগতিশীল…
প্রগতীর আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন
ছাত্রঃ
আমি জানতাম আপনি এই কথাটাই বলবেন… কিন্তু সমস্যাটা ফরহাদ মাজাহারের ধর্মীয় বিশ্বাস না।
সমস্যা হচ্ছে নিজে ধর্ম বিদ্রুপকারী হয়ে নাস্তিকদের বিচার চাওয়া
এই বলে আমার ছাত্র আমাকে মাজাহারের একটা বই (‘এবাদত নামা’ কাব্য গ্রন্থ) বের করে দেখালো
“বিবি খদিজার নামে আমি এই পদ্যটি লিখি:
বিসমিল্লাহ কহিব না, শুধু খদিজার নাম নেবো।
প্রভু, অনুমতি দাও। গোস্বা করিও না, একবার
শুধু তাঁর নামে এ পদ্যখানি লিখিব মাবুদ ।
নবীজীর নাম? উঁহু, তার নামও নেবোনা মালিক
শুধু খদিজার নাম- অপরূপ খদিজার নামে
একবার দুনিয়ায় আমি সব নাম ভুলে যাব
তোমাকেও ভুলে যাব ভুলে যাব নবীকে আমার।”
সেই ফরহাদ মাজাহার যখন হেফাজতে ইসলামের মঞ্চে ওঠে, টিভিতে নাস্তিকদের ফাঁসির দাবিতে বক্তব্য দেয় তখন কেন আপনাদের ধর্মীয় অনুভূতি আহত হয় না ?
আমিঃ
যাই হোক, তোমার আজকে এত দিন পরে কেন মনে হইল গণজাগরণ মঞ্চ সফল ?
কাদের মোল্লার ফাঁসীর কারণে ??
তুমি কি জানো এই কাদের মোল্লা একাত্তরের কাদের মোল্লা না ?
ছাত্রঃ
হ্যা ভাইয়া মনে আছে, গোলাম মাওলা রনি বলেছিলেন এই কাদের মোল্লা সেই কাদের মোল্লা না, তবে এইখানেই শেষ না। সাইদীর ফাঁসির রায়ের পর ড. আসিফ নজরুল বলাছিলেন এই সাইদী সেই সাইদী না।
গুঞ্জন আছে সাকা চৌধুরীও নাকি সেই সালাউদ্দিন কাদের না।
খুবই ভালো কথা, কিন্তু ভাইয়া সমস্যাটা হলো মুক্তমনার এই লেখাটা
“কসাই কাদের আর মোল্লা কাদের নাকি এক ব্যাক্তি ছিলেন না; বীরাঙ্গনা মোমেনা বেগম আমায় ক্ষমা করবেন…”
পড়েন।
আমিঃ
একটা রায় তোমাদের পছন্দ হইলো না তোমরা আইন চেঞ্জ করলা,
তারপর সেই আইনে নিরপরাধ মানুষটার বিচার করলা।
আর সেটা নিয়া এত বীরত্ব !!!
ছাত্রঃ
ভাইয়া আইনের বিশ্লেষণে আমি যাবো না,
আপনি বরং মুক্তমনার এই লেখাটা
“দি কিউরিয়াস কেইস অফ কাদের মোল্লা এবং সাক্ষী মোমেনা”
পড়েন।
আমার কথা একটাই যেই লোকটা হাজার হাজার মানুষকে প্রকাশ্যে হত্যা করলো।
বিভিন্ন জায়গায় দম্ভ ভরে স্বীকার করল কৃতকর্ম।
যার খুনের একাধিক চাক্ষুষ সাক্ষী আছে, যার ধর্ষণের বীজ নিয়ে আজও নির্যাতিতা বেঁচে আছে।
এই স্বাধীন রাষ্ট্র কি শহীদ পরিবারদের দিকটা একবার দেখবে না ?
সব মানবাধিকার শুধু খুনিদের ??
এটাই কি আপনাদের শিক্ষা ?
আর
আজ যদি আপিলে কাদের মোল্লা বেকসুর খালাস পেত,
আপনার কি মনে হয় সে এই রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের আইন, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতো। ??
কক্ষনো না,
তবে এটা আমি বুঝি আপনি বুঝবেন সেটা আমি আশাও করি না।
আমিঃ
হাম্বালিগ একটা কাম করল… লক্ক লক্ক নিরীহ মুমিন হেপাজতিদের মেরে মাসাকার কৈরা দিল।
ছাত্রঃ
কি যে কন ভাইয়া, লক্ষ লক্ষ মানুষ আপনি বুঝেন ?
হেফাজতের সমাবেশে এত লোক হইতেই পারে না, অসম্ভব
আমিঃ
তুমি কি জানো ? পিচ্চি ?
আমি ফেচবুকে বাঁশের কেল্লার ছবি দেখছি,
আহারে নিরীহ মানুষ গুলোকে এভাবে মারল…… জালেম সরকার …….
ছাত্রঃ
ভাইয়া বাঁশের কেল্লার ছবি গুলা একটাও এই দেশের না,
সব মায়ানমার ভুটানের দেখেন “জাগরণ মঞ্চের” পেইজে সব পরিস্কার করে দেয়া আছে।
এই বলে আমার ছত্রাক তার স্যামসাং গ্যালাক্সি ট্যাব খানা হইতে কিছু ছবি বাহির করিয়া দেখাইল ….
আমিঃ
তাইলে তুমি কি কইতে চাও ? কয়জন মরসে ?
ছাত্রঃ
ভাইয়া মতিঝিলে হেফাজতের মোট ৭ জন এবং পুলিশ র্যাবের ৩-৪ জন মারা গেছেন ।
আমিঃ
ফাইজলামি !!
কম কইরা হইলেও হাজার দুয়েক তো অবশ্যই মরসে…..
ছাত্রঃ
ভাইয়া আপনি তো সাভার থাকেন ?
রানা প্লাজা ট্রেজিডির পরে অধরচন্দ্র স্কুলের মাঠেও গেসেন তাই না ?
আমিঃ
হ্যা, তাতে কি প্রমাণ হয় ?
ছাত্রঃ
ভাইয়া আপনি তো দেখেছেন, আমি যেতে পারিনি।
কিন্তু টিভিতে দেখি হাজার হাজার স্বজনের আহাজারি,
কৈ মতিঝিলে যদি হাজার মানুষ মরত তাদের আত্মীয় স্বজন কৈ ?
আমিঃ
ওরা মারদ্রাসার এতিম পোলাপাইন আত্মীয় আর কয়জনের আছে ……
আর বিরোধী মিডিয়া, সব গুলা ইসলামিক মিডিয়া তো বাকশালি সরকার বন্ধই কৈরা রাখসে…..
ছাত্রঃ
ভাইয়া সেখানে ডিউটিতে থাকা পুলিশ সদস্যরা বলছেন কোন গুলি চালানো হয় নি।
রাবার বুলেট, গ্যাস বোমা এসব শুধু মারা হয়েছিল।
আর মিডিয়া,
ভাইয়া আপনি না বলতেন হেফাজত জামাতের বিপক্ষে, দিগন্ত টেলিভিশন তাইলে হেফাজতরে কভার করত ক্যান ?
তখন কিন্তু দিগন্ত ছিলো
আর ভাইয়া সবগুলো ইসলামিক মিডিয়া বন্ধ কথাটা ভুল,
আমি আজকেও একটু আগে পিস টিভি বাংলা দেখছিলাম…
আমিঃ
ওইটা তো ইন্ডীয়ান….
ছাত্রঃ
তাতে কি ইসলামিক তো, ইন্ডিয়ান বলে ডিজনি চ্যানেল কি বন্ধ হয় নাই।
প্রশ্ন হচ্ছে ইসলামী মিডিয়া চলছে কি না ……
আর আপনি যেই কথা গুলা বলতেসেন, ভেবে বলতেসেন ?
হাজার খানিক মানুষ মারা গেলে আহত হয়েছে কমপক্ষে লাখ খানেক….
এনাম মেডিক্যালের মত অবস্থা দেখিনা ক্যান ?
ঘটনার পর বারডেমে সিট ফাঁকা ছিলো জানেন ……
আমিঃ
তুমি কি জানো, কতটুকু জানো ??
ছাত্রঃ
ভাইয়া,
এভাবে কথা বলাটাই আপনাদের সমস্যা কথার উত্তর দিতে না পারলে আপনাদের গলা বড় হয়ে যায়।
পারলে DMP কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনটা দেখবেন, দুইটা টিভি চ্যানেল পুরো ঘটনা লাইভ টেলিকাস্ট করেছে,
হাজার মানুষ মেরে ফ্যালা এত সহজ না ……
আমিঃ
শাহাবাগীদের এই আন্দোলনে আমিও থাকতাম,
যদি রাজনীতি না থাকতো, নাস্তিক না থাকতো।
দেশে কি শুধু একটা সমস্যা ?
সীমান্তে হত্যা,
পদ্মা সেতু,
সাগর-রুনি,
ইলিয়াস আলী,
চাইলের দাম,
তেলের দাম……..
আরও অনেক কিছু।
এগুলা নিয়া কথা বললে শাহবাগ যাইতাম
ছাত্রঃ
জি না ভাইজান, আপনি যাইতেন না
আজকে মানুষ সীমান্ত হত্যা নিয়া মাঠে নামলে
আপনি আপনার টুপি খানা উল্টা কইরা পইরা বলতেন দেশে কি শুধু একটা সমস্যা ?
পদ্মা সেতু,
সাগর-রুনি,
ইলিয়াস আলী,
চাইলের দাম,
তেলের দাম
আর রাজাকার তো আছেই…..
শুধু ব্যাক্তি স্বার্থে আপনার জেনে বুঝে আন্দোলনের বিরোধিতা করছেন।
শাহবাগ আন্দোলনের ভুমিকা কি তার উত্তর ইতিহাস দেবে ।
শাহবাগ যোদ্ধারা ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন।
এই আন্দোলন নিয়ে গবেষণা হবে,পাঠ্য বইয়ে স্থান নেবে শাহবাগ।
বরং প্রস্তুতি নিন, আপনার নাতি নাতনীদের নিজের ভুমিকা নিয়ে কী বলবেন?
ওরা আপনাকে ঠিকই জিজ্ঞেস করবে,
সে সময় তুমি কী করেছিলে ?
আমিঃ
দেখো, এখানে ইমোশনাল হবার কিছু নাই,
দেশ আর ধর্মের মাঝে আমি ধর্মকে বেছে নিয়েছি।
সবার আগে ইসলাম,
হিন্দু আর নাস্তিকদের আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে হাশরের ময়দানে আল্লাহ্র সামনে আমি দাঁড়াতে পারবো না।
ছাত্রঃ
সেটাই ভাইয়া,
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের মুকিযোদ্ধারা ছিল নাস্তিক আর হিন্দু (সংগ্রাম ৩ আগস্ট)।
আমাদের মেয়েরা ছিল গনিমতের মাল (সেইসব পাকিস্তানি, উইটনেস টু সারেন্ডার)।
নাস্তিক নাস্তিক বলে আপনারা তিরিশ লক্ষ মেরেছিলেন।
জাহানারা ইমামের আন্দোলন ছিল নাস্তিকদের আন্দোলন,
আজকের শাহাবাগীরাও নাস্তিক।
এই দেশে যেই জামাতের দিকে আঙুল দিয়েছে সেই নাস্তিক।
নাস্তিকতার নামে ধর্ষক আর খুনিদের সমর্থন দিচ্ছেন………
আমিঃ
দেখ হেফাজতে ইসলাম আর জামাত কিন্তু এক না… আল্লামা শফী পরিস্কার বলেছেন;
“আপনারা হেফাজতে ইসলামকে জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার বদলে বুকে গুলি করে আমাকে মেরে ফেলুন। এই ভিত্তিহীন অভিযোগ শুনে ধৈর্য ধরে রাখতে পারি না। কষ্টে বুকটা ফেটে যায়। আপনারা নব্য জামায়াতবিরোধী, নব্য মওদুদীবিরোধী। এই গোমরাহ গোষ্ঠীর জন্মলগ্ন থেকেই আমরা কওমি চিন্তার আলেমসমাজ তাদের বিরুদ্ধে সতর্ক করে আসছি। জামায়াত ও মওদুদীর ইসলামবিরোধী সব তথ্য আমাদের মতো করে আর কেউ এত বেশি জানে না। তাই দয়া করে আমাদেরকে জামায়াতের সঙ্গে তুলনা করবেন না।”
ছাত্রঃ
যদি সত্যিই জামায়াতের সাথে হেফাজতের কোন সম্পর্ক না থাকত
তাহলে হেফাজতের মঞ্চে সাইদীর মুক্তির দাবীতে শ্লোগান দিল কারা ??
আসেন একটু অনলাইনে ঘেঁটে দেখি হেফাজতের সাথে জামাতের কোন সম্পর্ক আছে কি না
“যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসনে প্রচুর টাকা ঢালা একটি এনজিও হচ্ছে রাবেতা আল ইসলামী যার কান্ট্রি হেড ছিল জামাত নেতা রাজাকার মীর কাসেম আলী, রাবেতার অঙ্গ সংগঠন মাসিক আল-হক্ব পত্রিকা, এই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক এবং রাবেতা আলমে আল ইসলামীর বর্তমান বাংলাদেশ ব্যুরো প্রধান “আল্লামা সুলতান যওক নদভী”। আর এই “আল্লামা সুলতান যওক নদভী” হচ্ছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর নায়েবে আমীর”
এই কথা আপনার জন্য হজম করা কষ্টকর তাই জামাত সমর্থিত পত্রিকার থেকেই প্রমাণ করব আমার কথাগুলো
পয়েন্ট নাম্বার একঃ “মীর কাসেম রাবেতা আল ইসলামীর কান্ট্রি হেড”
ছাত্র শিবিরের প্রথম কেন্দ্রীয়সভাপতি হয় মীর কাশেম আলী। এরপর রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের নামে “রাবেতা আল ইসলামী” গড়ে তুলে। কক্সবাজারে এই রাবেতার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আসে। “রাবেতা আল ইসলামী”র বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর পদে ছিল কাসেম আলী। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সাহায্যের নামে আনা এই টাকায় রাবেতা হাসপাতালও করা হয়েছে। যেখানে ইসলামী জঙ্গিসহ রোহিঙ্গা ইসলামী জঙ্গীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। রোহিঙ্গা জঙ্গিদেরকে দেশে প্রশিক্ষণ ও বিদেশে পাঠিয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে মীর কাসেম আলী সহায়তা করেছে বলে জানা যায়। আর এই রাবেতার মাধ্যমে আসা কোটি কোটি টাকা দিয়ে জঙ্গিবাদে অর্থ সহায়তা এবং জামাতে ইসলামীকে অর্থনৈতিকভাবে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর জন্য মীর কাসেম আলী মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে এমন তথ্য রয়েছে দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছেও। …..”
*এছাড়া গণ জাগরণ মঞ্চ থেকে “True History Of Liberation War 1971″ এবং “স্লোগান’৭১”এর পক্ষ থেকে বিলিকৃত লিফলেটে “রাবেতা আলইসলামী” এর অঙ্গ সংগঠন “রাবেতা-তাওহিদ ট্রাস্ট” কে জামায়াত ও শিবিরের সদস্য দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করে বর্জনের আহ্বান জানিনো হয়েছে।
ভাইয়া “রাবেতা” নামটা মনে রাখেন…
পয়েন্ট নাম্বার দুইঃ “রাবেতা আল ইসলামী এনজিও’র বিনিয়োগের একটা পত্রিকা মাসিক আল-হক্ব“ মাসিক আল হক্বের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক,দারুল মা’আরিফ আল ইসলামিয়ার মহাপরিচালক ও রাবেতা আলমে আল ইসলামীর বাংলাদেশ ব্যুরো প্রধান আল্লামা সুলতান যওক নদভী
সব কিন্তু জামাতের পত্রিকা
পয়েন্ট নাম্বার তিনঃ “মাসিক আলহক্বের সম্পাদক এবং রাবেতা আলমে আল ইসলামীর বাংলাদেশ ব্যুরোর বর্তমান প্রধানই হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর”
এবার আপনারাই বলেন রাজাকার মীর কাসেমের উত্তরসুরী হেফাজতে ইসলাম কি জামাতের অঙ্গ কি না ?
আমিঃ
কিন্তু আল্লামা শফী তাকে নিয়ে কি বলবে ?
ছাত্রঃ
ভালো বলেছেন, আসেন দেখি কে এই শফি, কোথায় ছিলেন যুদ্ধের সময় ??
হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী একাত্তরে মুজাহিদ বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের সহায়তা করেন বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ সম্মিলিত ইসলামী জোট। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবিতে আন্দোলনরত গণজাগরণ মঞ্চবিরোধী হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীকে ‘রক্ষার’ অভিযোগ আসার পর একাত্তরে সংগঠনটির আমিরের ভূমিকা তুলে আনলেন সম্মিলিত ইসলামী জোটের সভাপতি হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান।
“একাত্তরে যখন পাকিস্তানি সেনা আর তাদের দোসররা এ দেশে হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন চালিয়েছিল,
তখন হেফাজতের নেতারা কোথায় ছিলেন?
“হেফাজতের নেতা আহমদ শফী একাত্তরে পাকিস্তানকে রক্ষার জন্য মুজাহিদ বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানি সেনা আর রাজাকারদের সব কাজে সহযোগিতা করেন।”
আহমদ শফী এখন পাকিস্তানের দোসরদের রক্ষার ‘এজেন্ডা’ বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছেন বলেও দাবি করেন ইসলামী জোটের সভাপতি হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান।
আচ্ছা ভাইয়া;
কাবা শরীফের গিলাফেরর অপব্যবহার করে সাঈদীর মুক্তির ভুয়া মানববন্ধনের ছবি কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরেও
কি হেফাজত তার বিরুদ্ধে কোন ব্যাবস্থা নিয়েছিলো,
একটা শ্লোগান উচ্চারিত হিয়েছিলো ??
তারা তো তখন আমার-দেশের সম্পাদক মাহমুদুরের মুক্তির জন্য শ্লোগান দিতো…
আমিঃ
বাদ দাও ভাই… এই সব রাজনীতি নিয়া কথা না বলাই ভালো।
ক্যালকুলাস বই বাইর কর,
আর যা গরম এসিটা ছাড়ো…..
এই শীতেও আমার ঘাম বের হতে থাকে, এ যুগের ছেলেদের সাথে কথায় পারিনা ………
আমি যদি লেখকের কাছে প্রশ্ন রাখি যে, প্রকৃত নাস্তিক্যবাদ আর লেখকের নাস্তিক্যবাদের মাঝে পার্থক্যটা কী ? তাহলে হয়তো হেফাযতের নাস্তিক বিরোধি আন্দোলনের উদ্দেশ্য বুঝে আসবে ।
টিভি টকশোতে কে হেফাযতের পক্ষে বলল, আর কে বিপক্ষে বলল তা আমার কাছে বিবেচ্য বিষয় নয় । তবে ফরহাদ মাজহার হেফাযতের মঞ্চে উঠে বলে তিনি কী বুঝাতে চেয়েছেন, তা বিশ্লেষনের দাবী রাখে ।
হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী একাত্তরে মুজাহিদ বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের সহায়তা করেন বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ সম্মিলিত ইসলামী জোট। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবিতে আন্দোলনরত গণজাগরণ মঞ্চবিরোধী হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীকে ‘রক্ষার’ অভিযোগ আসার পর একাত্তরে সংগঠনটির আমিরের ভূমিকা তুলে আনলেন সম্মিলিত ইসলামী জোটের সভাপতি হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান।
সব জায়গায় তিনি গজামিল রেফারেন্স ব্যবহার করলেও এক্ষেত্রে লেখক মহাদয় কোন রেফারেন্স খুজে পাননি ।
হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী একাত্তরে মুজাহিদ বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের সহায়তা করেন বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ সম্মিলিত ইসলামী জোট। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবিতে আন্দোলনরত গণজাগরণ মঞ্চবিরোধী হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীকে ‘রক্ষার’ অভিযোগ আসার পর একাত্তরে সংগঠনটির আমিরের ভূমিকা তুলে আনলেন সম্মিলিত ইসলামী জোটের সভাপতি হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান।
উপরের কথাটা নিজেই একটা রেফারেন্স
সব জায়গায় তিনি গজামিল রেফারেন্স ব্যবহার করলেও এক্ষেত্রে লেখক মহাদয় কোন রেফারেন্স খুজে পাননি ।
হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী একাত্তরে মুজাহিদ বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের সহায়তা করেন বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ সম্মিলিত ইসলামী জোট।
আপনি কি দাবী করেন বাংলাদেশ সম্মিলিত ইসলামী জোট এই মন্তব্য করে নাই ??
আর তাদের কথা সত্য না মিথ্যা সেটার উত্তর আদালত দিতে পারে কিন্তু একাধিক সংবাদ মাধ্যম এটা নিশ্চিত করেছে “শফি” একজন রাজাকার
বাজ পাখি
প্রকৃত নাস্তিক্যবাদ নিয়ে আলোচনার সময় আমার হাতে নেই। তবে এটুকু বলতে পারি , খ্রিষ্টপূর্ব ২৭০ অব্দে এপিকিউরাস নামক জনৈক বস্তুবাদী দার্শনিকের মধ্যমে এ কল্পিত দর্শন সূচিত হওয়ার পর থেকে কোন প্রতিষ্ঠিত নাস্তিক আজ অবধি কোন ধর্মকে অবমাননা ( নিদিষ্ট কোন ধর্মর্কে গালি দেয়া বা কোন ধর্মের মহাপুরেষের চরিত্র হরন) করেছে বলে আমাদের জানা নেই। সুতরাং নাস্তিক্যবাদের সাথে ধর্মের যে বিরোধ ছিল তা প্রকৃতই বিস্বাস ও আদর্শিক বিরোধ। যার মধ্যে ছিল পরস্পরের সন্মান ও যুক্তি ।
না্তিক্যবাদের নামে এখন যা চলছে তা ইসলাম কেন যে কোন ধর্মের জন্য হুমকি । কারণ যারা নাক্তিক বলে পরিচয় দিচ্ছে তারা আদৌ নাস্তিক নয়; বরং ধর্ম বিদ্বেষী, বিশেষ করে ইসলাম বিদ্বেষী। আর আমাদের আপত্তিটাই সেখান ।
হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী একাত্তরে মুজাহিদ বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের সহায়তা করেন বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ সম্মিলিত ইসলামী জোট। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবিতে আন্দোলনরত গণজাগরণ মঞ্চবিরোধী হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীকে ‘রক্ষার’ অভিযোগ আসার পর একাত্তরে সংগঠনটির আমিরের ভূমিকা তুলে আনলেন সম্মিলিত ইসলামী জোটের সভাপতি হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান।
এই রেফারেন্স দ্বারা আল্লামা শফিকে মুজহিদ বাহিনীর প্রধান প্রমান করার বিষয়টি এমন নয় যে, আপনার বিরুদ্ধে ভারতী এজেন্ট হওয়ার দাবী তুলে , আর সেই সাথে একঠি সংবাদ সন্মেলন করে তা সত্য বলে প্রচার করলাম, আর নিজেদের মিডিয়া দ্বারা তা প্রমাণ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলাম । তাহলে কি আপনি ভারতীয় এজেন্ট একথা প্রমাণ হয় ???
@বাজ পাখি,
প্রকৃত নাস্তিক্যবাদ নিয়ে আলোচনার সময় আমার হাতে নেই
ওরে বাবা তাই নাকি ?
এই রেফারেন্স দ্বারা আল্লামা শফিকে মুজহিদ বাহিনীর প্রধান প্রমান করার বিষয়টি এমন নয় যে, আপনার বিরুদ্ধে ভারতী এজেন্ট হওয়ার দাবী তুলে
এত সহজ ?
আল্লামা শফি মুজাহিদ এটা আমি জানতাম … বাংলাদেশ সম্মিলিত ইসলামী জোটের সংবাদ সম্মেলনের পর আরও ভালো করে বুঝলাম। এত ত্যানা না পেঁচিয়ে আপনি দেখান ৭১ সালে উনি কোথায় ছিলেন… কি করতেন… ??
আপনি কি শিবির করেন নাকি ?
বাজ পাখি এর জবাব:
ডিসেম্বর ২৩, ২০১৩ at ৪:০২ অপরাহ্ণ
@আরিফ রহমান,
এত সহজ ?
এই কঠিন কাজটিই আপনারা কত সহজে করতে পারছেন !!!!!
আল্লামা শফি মুজাহিদ এটা আমি জানতাম
আপনার জানাটা আল্লামা শফি মুজাহিদ হওয়ার জন্য যতেষ্ট নয় । এর প্রমাণ করতে হবে । আর তা কারো সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য দিয়ে নয় ।
এত ত্যানা না পেঁচিয়ে আপনি দেখান ৭১ সালে উনি কোথায় ছিলেন… কি করতেন… ??
৭১ সালে তিনি হাটহাজারী মাদরাসায় সাধারণ একজন মুহাদ্দিস (অধ্যাপক) হিসেবে নিযোজিত ছিলেন এবং স্বাধিনতার পরেও তিনি সে পদে আরো ১৭ বছর নিয়োজিত ছিলেন। (আমার এ তথ্যটির সত্যতা যাচাই করার জন্য লেখককে চট্টগ্রামের হাটহাজরী ও রাঙ্গনীয়া সফর করতে হবে।)
তিনি আজ ইসলামী নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলেই তাকে রাজাকার বানানো প্রয়াস চলছে এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই ।
আসলেই যেন রাজাকারের মানদণ্ডটি আমরা বুঝে উঠতে পারছি না ! অনেক রাজাকারের মুখেই এখন স্বাধিনতার চেতনার কথা । আবার অনেক মুক্তিযোদ্ধাকেও আমরা রাজাকারের কাতারে দেখছি ।
আশা করি লেখক অবশ্যই এর ব্যাখ্যা দিবেন।
আপনি কি শিবির করেন নাকি ?
অনেকের শিবিরকে ভয় করার কারণ আমার বোধগম্য নয়।

তিরিশ লক্ষ শহীদ, বাহুল্য নাকি বাস্তবতাঃ রিসার্চ-পেপার, ডিকশেনারি, এনসাইক্লোপিডিয়া অনুসারে শহীদের সংখ্যা নিরূপণের প্রয়াস
8.
এই পর্বটি সম্ভবত সিরিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এই পর্বে আমরা আলোচনা করবো পৃথিবীময় বিভিন্ন গনহত্যা, রাজনীতি, সংঘাত গবেষকের দৃষ্টিতে ১৯৭১ সালে হতাহতের সংখ্যা। দেখবো বিভিন্ন রিসার্চ পেপার, ডিকশনারি, এনসাইক্লোপিডিয়ায় এই গনহত্যা সম্পর্কে কি বলা হয়েছে। সংখ্যাটা ৩০ লাখ, তিন লাখ, এক লাখ অথবা ছাব্বিশ হাজার যাই হোক না কেন এটা তো মানতেই হবে সংখ্যাটা অনেক বড়।
১) Center for Systemic Peace এর ডিরেক্টর Dr. Monty G. Marshall তাঁর Major Episodes of Political Violence 1946-2014 পেপারে দেখিয়েছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ১০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছে।
২) Dr.Ted Robert Gurr এবং Dr. Barbara Harff দুজন গনহত্যা গবেষক। এঁদের মাঝে Ted Robert Gurr বর্তমানে Maryland বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষক আর Barbara Harff ইউএস নেভি একাডেমীতে পল্যিটিক্যাল সায়েন্সের শিক্ষক। তারা দুইজনই পল্যিটিক্যাল সায়েন্সের দিকপাল হিসেবে পরিচিত। তাদের বিখ্যাত গ্রন্থ Toward Empirical Theory of Genocides and Politicides যেটা প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে, সেই বইতে উল্লেখ করেছেন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ১২,৫০,০০০ থেকে ৩০,০০,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে।
৩) Milton Leitenberg এর গবেষণা পত্র। যেটা প্রকাশিত হয় coronell university থেকে, Deaths in Wars and Conflicts in the 20th Century শীর্ষক সেই প্রবন্ধে লেখা আছে মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ১.৫ মিলিয়ন অর্থাৎ ১৫ লক্ষ
৪) Dr. Jack Nusan Porter একজন লেখক গবেষক, সমাজকর্মী এবং সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট International Association of Genocide Scholars তাঁর বই genocide and human right । এতে উল্লেখ আছে শহীদের সংখ্যা ১০-২০ লক্ষ
৫) 1945 থেকে 1995 সালের মধ্যে ৩০০ টি আন্তর্জাতিক সংঘাত সম্পর্কে বলা হয়েছে International Conflict: A Chronological Encyclopedia of Conflicts and Their Management, 1945-1995 বইটিতে। লেখক Jacob Bercovitch এবং Richard Jackson দুজনেই আন্তর্জাতিক সংঘাত বিশেষজ্ঞ।
৬) গবেষক Tom Hartman এবং John Mitchel তাদের লেখা A world atlas of military history, 1945-1984 বইতে বলেছেন ৭১এর যুদ্ধে দশ লাখ মানুষ মারা যায়।
৭) World Almanac ১৯৮৪। যাদের বলা হয়ে থাকে almanac এর জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ। তারা তাদের বেস্ট সেলার ১৯৮৪ সালের সঙ্খ্যায় বলেছে শহীদের সংখ্যা ১০ লক্ষ
৮) Compton’s Encyclopedia তাদের গনহত্যা পরিচ্ছেদে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা লিখেছে ৩০ লক্ষ।
৯) Encyclopedia Americana তাদের 2003 সালের সংস্করণে বাংলাদেশ নামক অধ্যায়ে একাত্তরে মৃত মানুষের সংখ্যা উল্লেখ করেছে তিরিশ লক্ষ।
১০) গনহত্যা গবেষক লিও কুপার তাঁর বিখ্যাত জেনসাইড বইতে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছে। এই বইটি নিয়ে আমাদের এই গ্রন্থের অন্য অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
১১) বিশিষ্ট রাজনীতি বিজ্ঞানী Rudolph Joseph Rummel STATISTICS OF DEMOCIDE, বইটিকে দাবি করা হয়ে থাকে বিশ্বে গণহত্যা নিয়ে সংখ্যাগতভাবে অন্যতম কমপ্রিহেন্সিভ বই। বইটির অষ্টম অধ্যায়ে Statistics Of Pakistan’s Democide Estimates, Calculations, And Sources নিবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মুক্তির সংগ্রামে সর্বনিম্ন ১৫,০৩,০০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০,০৩,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি বিভিন্ন সময় সংখ্যাটা ১৫ লাখ বলেই উল্লেখ করেছেন। আমরা আমাদের এই নিবন্ধের পরবর্তী অংশে রামেলের গবেষণা এবং তাঁর গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
কিছুদিন আগে আলমগীর মহিউদ্দিন জনকণ্ঠ পত্রিকায় ২০ আগস্ট ২০১৪ রামেলের গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন লিকেছেন। তিনি লিখেছেন;
“অতীত ও বর্তমানের রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণহত্যা, অত্যাচার, অনাচার, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও গুম চলছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। যুদ্ধ বা বিপ্লব হয় কখনো কখনো। দুই প্রক্রিয়াতেই জীবন নাশ ঘটে। একজন বিখ্যাত অনুসন্ধানকারী, ড. রুডলফ যোসেফ রামেল প্রথমবারের মতো জানার চেষ্টা করেন কোন প্রক্রিয়ায় বেশি জীবনহানি হয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়, না যুদ্ধ-বিগ্রহ-বিপ্লব-অভ্যুত্থানে?”
প্রথমত আমরা আলোচনা করব কয়েকটি বহুল প্রচলিত শব্দ নিয়ে
Genocide বা গণহত্যা: Among other things, the killing of people by a government because of their indelible group membership (race, ethnicity, religion, language). অর্থাৎ গণহত্যা হচ্ছে এমন একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড যা কোন সরকার বা শাসক কোন অমোচনীয় জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় বা ভাষাগত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালনা করে।
Politicide বা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড: The murder of any person or people by a government because of their politics or for political purposes. অর্থাৎ কোন সরকার বা গোষ্ঠী যদি কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে তবে সেইরকম হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলা হবে।
Mass Murder বা নির্বিচারে মানব হত্যা: The indiscriminate killing of any person or people by a government. অর্থাৎ একটি সরকার দ্বারা কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের নির্বিচারে হত্যা করা
ড. রামেল রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে হত্যাকাণ্ডগুলোকে একটি নতুন নামে অবহিত করেন। যেটি ইংরেজি ভাষায় একটি নতুন সংযোজন, তাঁর আবিষ্কৃত শব্দটি ‘ডেমোসাইড’। রামেল এ ক্ষেত্রে আর একটি শব্দও আবিস্কার করেছেন তা হলো, ‘মরটাক্রেসি’। এ দুয়ের (Democide and mortacracy) মাঝে পার্থক্য হলো প্রথমোক্তটি হচ্ছে ক্ষমতাসীন দ্বারা ইচ্ছাকৃত হত্যা। আর অপরটি অনিচ্ছাকৃত। তবে দুই প্রকারেই হত্যার সংখ্যা বিশাল।
ড. রামেল তাঁর গবেষণায় টানা আট বছরের ধরে খবরের কাগজ, পুরনো নথি, ইতিহাস ও বক্তব্য গভীরভাবে পর্যালোচনা করে বিশাল তথ্যভাণ্ডার থেকে ‘ডেমোসাইড : সরকারি হত্যা’ নামে চারখণ্ডে একটি বই লিখেছেন।
রামেল পরিস্কার ভাবেই কোনো দল ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমকে ব্যবহার করে এবং সে প্রক্রিয়া ক্ষমতারোহণের পরেও বিরতিহীন চলতে থাকে, সে হত্যাকাণ্ডগুলোকে ‘ডেমোসাইড’ বলেছেন। যে দেশের সরকার যত স্বৈরাচার সেখানে এই ডেমোসাইড কর্মকাণ্ড তত প্রবল এবং এসব সরকার হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটায় সাধারণত প্রতিবাদী ও প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে। তারা এজন্য ক্ষমতায় গিয়েই সর্বাগ্রে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ বাহিনীসহ সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একান্ত নিজের মানুষ দিয়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করে। রামেল দেখিয়েছেন, এই শতাব্দীতে (১৯০০-৯৯) ডেমোসাইড হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা এ সময়ের সব যুদ্ধের হতের সংখ্যার চেয়ে ছয় গুণ। কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এত মানুষের মৃত্যু ঘটেনি। তিনি লিখেছেন এই একশ বছরে বিশ্বের ২৫টি দেশে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা প্রায় ২৫ কোটির ওপরে। রামেল তাঁর বই ‘ডেমোসাইড : সরকারি হত্যা’ শীর্ষক বইতে কোন সরকার কত হত্যা করেছে, তার বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। রামেল বলেছেন, সঠিক সংখ্যা নির্ণয় কঠিন, কেননা এর প্রকৃত তথ্য রক্ষা করা হয়নি বা করতে দেয়া হয়নি।
তার হিসাব অনুসারে বিংশ শতাব্দীতে;
চীনের সরকার (১৯২৮-৮৭) হত্যা করে ৭,৩০,০০,০০০;
সোভিয়েত রাশিয়া হত্যা করে ৬,৮০,০০০;
(জার্মানি) নাজি সরকার ১,০২,১৪,০০০;
জাপান সরকার ৫৯,৬৪,০০০;
খেমাররুজ ২০,৩৫,০০০;
ভিয়েতনাম ১৬,৭০,০০০,
পোল্যান্ড- ১৫,৮৫,০০০,
যুগোস্লাভিয়া ১০,৭২,০০০;
কোরিয়া ১৬,৬৩,০০০;
পাকিস্তান ১৫,০৩,০০০ থেকে ৩০,০৩,০০০;
মেক্সিকো ১৪,১৭,০০০।
সব মিলে রামেলের অনুসন্ধানে প্রায় ১০০ বছরে ২,৬২,০০,০০০ মানুষকে বিভিন্ন সরকার শুধু ক্ষমতার জন্য হত্যা করেছে। রামেল লিখেছেন, এ শতাব্দী (বিংশ শতাব্দী) ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের হত্যার ইতিহাস। আর যারা সহযোগী ছিল তারাও রাষ্ট্রের প্রকারান্তরে অংশ, যেমন ডেথ স্কোয়াড, ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র ক্যাডার অথবা ভাড়াটে গেরিলা। এই সহযোগীরা গণহত্যায় নিয়োজিত ছিল। এরা ডেমোসাইডের এক-চতুর্থাংশ মানুষ হত্যা করে, যা গণহত্যা (Genocide) বলে পরিচিত।
রামেলের গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে লিখেছেন ব্লগার ডঃ পিনাকী ভট্রাচার্য। তাঁর সেই লেখাতে তিনি বলেন;
“পৃথিবীতে যত যুদ্ধ হয়েছে সে যুদ্ধ গুলোর কোনটাতেই বেসামরিক মৃত্যুর কোন নাম ধরে তালিকা নাই। এমন তালিকা এখনো করা হয়না। কারণ এটা করা সম্ভব না। যুদ্ধ একটা অস্বাভাবিক অবস্থা, এটা রোড ট্র্যাফিক অ্যাকসিডেন্ট নয়। এসময় শুধু তথ্য সংগ্রহের সমস্যা নয়, এই অস্বাভাবিক অবস্থায় আরো অনেক ঘটনা ঘটে। যেমন, ব্যাপক সংখ্যক মানুষ দেশ ত্যাগ করে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই ফেরেনা, অনেকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান, পরিবার-সমাজ বিহীন ভবঘুরে মানুষরাও নিহত হন যাদের খোঁজ পাওয়া সম্ভব হয়না। এছাড়াও আছে যুদ্ধের কারণে পরোক্ষ মৃত্যু। যারা হত্যা করে তারাও অপরাধ ঢাকার জন্য মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলে। এসব কারণেই যুদ্ধে নিহতের পরিসংখ্যান সব সময় একটা সংখ্যা; একটা নামসহ পুর্নাঙ্গ তালিকা নয়। এটাই পৃথিবীব্যাপী গৃহীত নিয়ম। যারা মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের তালিকা চায় তাদের যে কোন একটা গণযুদ্ধের বেসামরিক নিহত নাগরিকদের তালিকা দেখাতে বলুন। যুদ্ধে মৃত বা নিখোঁজ সামরিক ব্যাক্তিদের তালিকা করা সম্ভব কিন্তু বেসামরিক ব্যাক্তিদের নয়।”
এরপর তিনি আলোচনা করেন গবেষকরা কিভাবে সংখ্যাটা ধারণা করেন এবন রামেল কিভাবে এ সংখ্যাটি ধারণা করেছিলেন। আর জে রুমেল তার চায়নাস ব্লাডি পলিটিক্স বইয়ে এবং লিথাল পলিটিক্স বইয়ের পরিশিষ্টে গণহত্যার পরিসংখ্যান কিভাবে করতে হয় সেটার একটা মেথডোলজি দিয়েছেন। রামেলের পদ্ধতি অনুসারে প্রাপ্ত মৃতের সংখ্যাকে আরো সাব গ্রুপে ভাগ করতে হবে যেমন জেলা ওয়ারী, নারী পুরুষ অনুযায়ী এরপর প্রয়োজনে ধর্ম বা জাতি অনুযায়ী; ফলে একটা গ্রহণযোগ্য সংখ্যায় উপনিত হওয়া যায়। এটা অনেক সময়েই একটা রেঞ্জ, যেমন হলোকাস্টে মৃতের সংখ্যা ৪২ লক্ষ থেকে ৬০ লক্ষ। রামেল দিয়েছেন তিনটা রেঞ্জ দিয়েছেন লো, মিডিয়াম, হাই।
রামেলের গবেষণার বাংলাদেশ অংশে এসে জেলা-থানা ওয়ারী যে হিসাব দেখানো হয়েছে তা যারপনাই বিস্ময়কর এবং কৌতূহল উদ্দীপক। ICSF গবেষক এবং দেশের বিখ্যাত ব্লগিং প্ল্যাটফর্ম সচলায়তনের নিয়মিত লেখক কৌস্তুভ তাঁর তথ্য’বিনা মিথ্যা বোনা ব্লগে ভারতীয় গবেষক শর্মীলা বোসের প্রত্যুত্তরে রামেলের কথা লিখেছেন সবিস্তরে
রামেলের Statistics of Democide: Genocide and Mass Murder Since 1900, বইতে তিনি দু’শোরও বেশি শাসনকালকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন তাদের হত্যা তথ্য ‘The Pakistani Cutthroat State’ নামেরঅষ্টম চ্যাপ্টারে উনি লিখেছেন,
“In 1971 the self-appointed President of Pakistan and Commander-in-Chief of the Army, General Agha Mohammed Yahya Khan and his top generals prepared a careful and systematic military, economic, and political operation in East Pakistan (now Bangladesh). They also planned to murder its Bengali intellectual, cultural, and political elite. They also planned to indiscriminately murder hundreds of thousands of its Hindus and drive the rest into India. And they planned to destroy its economic base to insure that it would be subordinate to West Pakistan for at least a generation to come. This despicable and cutthroat plan was outright genocide.
After a well-organized military buildup in East Pakistan the military launched its campaign. No more than 267 days later they had succeeded in killing perhaps 1,500,000 people, created 10,000,000 refugees who had fled to India, provoked a war with India, incited a counter-genocide of 150,000 non-Bengalis, and lost East Pakistan.”
কৌস্তুভ লিখেছেনঃ
“ওনার অধ্যাগুলোর যা ধরন দেখলাম, এই ধরনের আলোচনায় ওনার নিজের কথা খুবই অল্প, ছোট খানিক ইন্ট্রোডাকশনের পরই একটি সামারাইজড (৮.১) এবং একটি বিস্তৃত (৮.২) টেবিলে উনি প্রতিটি সূত্র অনুসারে নানা বিভিন্ন বিষয় যেমন বাংলাদেশী হত্যা, বিহারী হত্যা, যুদ্ধে নিহত সেনা, অসুস্থ, উদ্বাস্তু ইত্যাদি সব কিছুর উপর আলাদা ভাবে সংখ্যাগুলো সাজিয়ে দিয়েছেন। সন-তারিখ, উৎস, টীকা তো দিয়েছেনই, সংখ্যাগুলোও তিনটে আলাদা কলামে সাজানো – যদি মূলে ‘অ্যাট লিস্ট’ বলা থাকে তবে ‘লো’, যদি ‘আপ টু’ বা ‘অ্যাট মোস্ট’ বলা থাকে তবে ‘হাই’, আর ‘অ্যারাউন্ড’ বা ‘অ্যাপ্রক্সিমেট’ ইত্যাদি বলা থাকলে ‘মিড’।
আর তথ্য সাজানো তো বটেই, ওনার হিসেব করার পদ্ধতিটাও বেশ যুক্তিসঙ্গত। ধরুন জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর চলা একটা যুদ্ধে, ক বলেছেন জানুয়ারিতে ১০০জন মারা গেছে, খ বলেছেন ডিসেম্বরে ৫০০ জন মারা গেছে, গ বলেছেন পুরো যুদ্ধে ৩০০০ জন মারা গেছে, আর ঘ বলেছেন প্রথম ৫ মাসে ১০০০ জন মারা গেছে। তাহলে চারটে সূত্র থেকে চারটে মাসিক মৃত্যুর হার উনি বের করেছেন – ১০০, ৫০০, ২৫০, ২০০। সবচেয়ে কমটা নিলে মোট মৃত্যুর হার ১২০০, সবচে বেশিটা নিলে ৬০০০, আর গড়ে ৩১৫০। অবশ্য, যদি কোনো সূত্রে ঠিকমত রেফারেন্স দেওয়া না থাকে, বা তথ্য অসম্পূর্ণ বা দুর্বল বা অবাস্তব মনে হয়, উনি সেসব কারণ পাশে টীকায় উল্লেখ করে দিয়ে সেগুলো বাদ দিয়েছেন।”
এখানে উল্লেখ্য রামেল কেবল প্রাইমারী সূত্রই নিয়েছেন, অর্থাৎ কোনো সংবাদ প্রতিবেদন কোনো বইয়ের তথ্যকে রেফারেন্স হিসেবে দিলে উনি সেই খবরটাকে সূত্র না বলে সরাসরি বইটাকেই বলেছেন। তাঁর গবেষণাই যেমন বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতির কথা এসেছে তেমনি এসেছে বিহারী হত্যাকান্ড, পাকিস্তানী সেনা হত্যা, ভারতীয় সেনা হত্যার মত খুঁটিনাটি ব্যাপার গুলোও
ব্লগার তারিক লিংকন সম্ভবত তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ “বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, প্রসঙ্গঃ ৩০ লাখ বাঙালী হত্যার আইকনিক মিথ” নিবন্ধে রামেলের ছক গুলো তুলে ধরেছেন প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা সহ
রামেলের STATISTICS OF DEMOCIDE, আট নাম্বার অধ্যায়ের Statistics Of Pakistan’s Democide Estimates, Calculations, And Sources প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মুক্তির সংগ্রামে ৩০,০৩,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
ডেমিসাইড বাংলাদেশ তালিকার ৩৩ নম্বর সারিতে R.J. Rummel ৩০ লক্ষ ৩ হাজার মানুষের প্রাণ হারানোর কথা বলেছেন উচ্চ সম্ভাবনার কলামে আর মধ্যম সম্ভাবনায় বলেছেন ১৫ লক্ষের কথা। আর রিফিউজি বা শরণার্থীর ক্ষেত্রে ৩৭ নম্বর সারিতে মধ্যম এবং উচ্চ হিসেবে যথাক্রমে ১ কোটি এবং ১ কোটি ২০ লক্ষের কথা বলেছেন।
অনুসন্ধানী পাঠকের সুবিধার জন্য ৮.২ নাম্বার ছকটিও তুলে দিলাম
অনেকের মনে খটকা লেগে থাকতে পারে যে বেশিরভাগ গবেষকের মতে সংখ্যাটা ১০ থেকে ১৫ লক্ষের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্যে বলছি গল্পটা এখানেই শেষ হয় নি শরণার্থী শিবিরে নিহত মানুষের বেশিরভাগ গবেষক গণনায় আনেননি। এক কোটি বিশ লক্ষ মানুষের স্থানান্তরে প্রচুর মানুষের মৃত্যু অনিবার্য এই বইয়ের অন্য অংশে আমরা দেখিয়েছি আমাদের ধারণা অনুসারে কেবল শরণার্থী শিবিরে নিহত মানুষের সংখ্যাই ৫ থেকে সাত লাখ হতে পারে।
এছাড়া হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Global Health and Population বিভাগের অধ্যাপক Dr. Richard Cash বলেছেন,
“আমরা পাবলিক হেলথের লোক হিসাবে যুদ্ধের সরাসরি প্রাণহানি ছাড়াও ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজের’ দিকে নজর রাখতে চাই। এবং এই যুদ্ধের ফলে প্রায় দশ মিলিয়ন মানুষকে ঘরছাড়া হয়ে ভারতে পালাতে হয়েছিল, পাঁচ লাখ মানুষ যুদ্ধপরবর্তী মন্বন্তরে মারা গিয়েছিল”
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন,
“এইসব অতিরিক্ত সমস্যা/প্রাণহানির দায় কার ?
সবই ঈশ্বরের লীলা ?
নাকি যারা এই যুদ্ধ এনেছিল তাদের ?”

তিরিশ লক্ষ শহীদ, বাহুল্য নাকি বাস্তবতাঃ হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়া ঊনচল্লিশ লাখ মানুষ
9.
আলোচনা শুরু করবো পরিসংখ্যানের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ শব্দ দিয়ে, এই পর্বে যেই শব্দটা’কে ঘুরে আসতে দেখবেন বারবার। কাঠখোট্টার শব্দটা হচ্ছে ‘Demography’, যার অর্থ “একটা জনগোষ্ঠীর অবস্থা নির্ণয়ের জন্য জন্ম, মৃত্যু, রোগব্যাধি ইত্যাদির পরিসংখ্যান এবং এতদ বিষয়ক বিদ্যা; জনসংখ্যা তত্ত্ব”।
ভাবছেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সাথে জনসংখ্যা তত্ত্বের সম্পর্ক কি।
আছে, সেটাই বলবো আজ।
উইকিপিডিয়ার কয়েকটি চমৎকার কাজ হচ্ছে পৃথিবীর প্রায় সবকয়টা দেশের ডেমোগ্রাফি তৈরি করে রাখা, আর উইকিপিডিয়ার সব কয়টা ডেমোগ্রাফিতেই রয়েছে জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশান প্রসপেক্টাস’ অনুসারে একটি ডাটা সীট যেখানে অত্যন্ত গোছানো আছে সব কয়টা দেশের ১৯৫০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতি পাঁচ বছরের ব্যাবধানে কত শিশু জন্ম নিয়েছে, কতজন মানুষ মারা গিয়েছে, জন্ম-মৃত্যুর ফলে মোট কত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, জন্ম হার, মৃত্যু হার এসব।
উইকিপিডিয়া আমাদের জানাচ্ছে ১৯৯৪ সালে সেদেশের সংখ্যালঘু টাট্সি গোষ্ঠীর মানুষ এবং সংখ্যাগুরু হুটু গোষ্ঠীর মধ্যে উদার ও মধ্যপন্থীদের নির্বিচারে হত্যার ঘটনাকে রুয়ান্ডার গণহত্যা বলা হয়ে থাকে। ৬ই এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই গণহত্যা সংঘটিত হয়। অন্তত ৫০০,০০০ টাট্সি এবং এক হাজারেরও বেশি হুটু নিহত হয়। অধিকাংশ সূত্রমতে মোট নিহতের সংখ্যা ৮০০,০০০ এর কাছাকাছি বা ১,০০০,০০০ এর কাছাকাছি। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নানান খবরের ভিড়ে এই গণহত্যার সংবাদ আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে খুব কমই স্থান পেয়েছিলো। এই সুযোগেই গণহত্যা বিভৎস রূপ ধারণ করেছিলো।
জাতিসংঘ এই হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অনিচ্ছুক ছিল। মিডিয়ায় সচিত্র সংবাদ পরিবেশন সত্ত্বেও জাতিসংঘের এমন ব্যবহারে সবাই মর্মাহত হয়েছিলেন এবং জাতিসংঘকে তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এই অনীহার কারণেই রুয়ান্ডায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে গণহত্যা মোকাবেলার মত যথেষ্ট সৈন্য ও কর্মকর্তা ছিল না। Roméo Dallaire এর নেতৃত্বে এই শান্তিরক্ষী দলটি তাই কার্যকরী কিছু করতে পারেনি। একসময় রুয়ান্ডা থেকে সব বিদেশী লোকদেরকে সরিয়ে আনা হয়। কিন্তু সেখানকার অধিবাসীদের রক্ষার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম ও ফ্রান্স সরকারকে এ কারণে এখনও সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। রুয়ান্ডায় শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছিল United Nations Assistance Mission for Rwanda। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের দৃষ্টি এদিকে আকর্ষিত না হওয়ায় তারা কোন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এক সময় সমগ্র রুয়ান্ডার জন্য মাত্র ৩০০ শান্তিরক্ষী মোতায়েন ছিলো।
এবারে একটু নজর দেয়া যাক আমাদের এই পোড়া দেশটার দিকে, যার জন্য এই লেখার অবতারণা। প্রথমেই আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই উইকিপিডিয়ার গনহত্যা সংক্রান্ত আর্টিকেলের দিকে।

লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয়ই ভারতীয় গবেষক শর্মিলা বোসুরর মধুর বাণী, যেখানে তিনি বলছেন একাত্তরে দুই পক্ষের অর্থাৎ বাঙালী, পাকিস্তানী, বিহারী সব মিলিয়ে মোটমাট মারা গেছে পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ মানুষ। উইকিতে আরও একটা গবেষণার কথা বলা হয়েছে যেটা করা হয়েছিলো ২০০৮ সালে, সেই তথাকথিত গবেষক বলেছেন একাত্তরে মৃতের সংখ্যা ২,৬৯,০০০। শেষমেশ একজন বাঙ্গালির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে সেই চির চেনা মিথ, শেখ মুজিব তিন লক্ষ বলতে গিয়ে তিরিশ লক্ষ বলে ফেলেন। শুধু এই ‘মিস স্পেলিং’ মিথ নিয়ে এই সিরিজের একটা আলাদা পর্ব রেখেছি যেখানে হাজার দুইয়ের ওয়ার্ডের একটা আর্টিকেলে ডিটেইলস দেখানো হবে এই ‘মিস স্পেলিং মিথ’ আদৌ কতটা সত্য।

প্রিয় পাঠক খুব কি কষ্ট হচ্ছে দেখতে যে উনিশশো একাত্তর সালে বাংলাদেশের মৃত্যুহার নাটকীয় ভাবে বেড়ে যায়। দেখতে পাচ্ছেন কি যে দেশের স্বাভাবিক মৃত্যু হতো বছরে দশ থেকে এগারো লাখের মধ্যে সত্তুর থেকে পচাত্তরে সেই দেশে গড়ে প্রতি বছর আঠারো থেকে উনিশ লাখ লোক মারা গেলো। এরপরের বছরগুলোতে আবারও আগের জায়গায় নেমে এলো গ্রাফ।
আমি বাসায় বসে হিসাবটা করেছি। স্বাভাবিক মৃত্যুহার বিবেচনায় নিলে সত্তুর থেকে পচাত্তর সালের মধ্যে স্বাভাবিক মৃত্যু বাদে অস্বাভাবিক ভাবে প্রায় উনচল্লিশ লক্ষ মানুষ বেশী মারা গিয়েছিলো।
এখানেই শেষ না, বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে এর ওপর জাতিসংঘের রিপোর্ট থেকে জানা যায়

সত্তুর থেকে পচাত্তরের ভেতর স্বাভাবিক জন্মহার বিবেচনায় তাহলে হারিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা দাড়ায়…

৬৫ লক্ষ!!!
আচ্ছা এই মানুষ গুলো কোথায় হারিয়ে গেলো?
আসুন দেখি উল্লেখযোগ্য কি কি ঘটনা ঘটেছিলো এই পাঁচ বছরে, যেটা এত মৃত্যু কিংবা হারিয়ে যাবার কারণ হতে পারে;
১) সত্তুরের ঘূর্ণিঝড়
২) একাত্তরের যুদ্ধ
৩) যুদ্ধের পর ভারত থেকে ফিরে না আসা শরণার্থী
৪) চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ
না, আপনারা ভাববেন না আমি ক্যালকুলেটর নিয়ে বসে বলে সবগুলো ডাটা যোগ-বিয়োগ করে আমার তিরিশ লাখ তত্ত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবো। আমি জানি সত্তুরের ঘূর্ণিঝড়ের ফলাফল একাত্তর। একাত্তরের ফলাফল চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ। এরা সবাই আমার পূর্বপুরুষ। এরা সবাই মারা গিয়েছিলো কেবলমাত্র পাকিস্তানের কারণে। আমি সব মৃত্যুর দায়ভার সেইসব পাকিস্তানিদেরই দিতে চাই।
তবু এটুকু শুধু বলবো আপনি মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া বাদাবকি প্যারামিটারে সর্বোচ্চ মান গুলো গ্রহণ করুণ যে কোন সোর্স থেকে। এরপর দেখুন মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত আসে, আমি আপনার হিসেবের সংখ্যাটা হয়তো বলে দিতে পারবো না ঠিকই তবে এটুকু নিশ্চিত বলে দিতে পারি সংখ্যাটা শর্মিলা বোসুর এক লাখ কিংবা বিবিসি সাংবাদিকের দুই লাখ উনসত্তর হাজারের চেয়ে অনেক অনেক বেশী হবে।
অস্ট্রেলিও চিকিৎসক ড. জিওফ্রে ডেভিস তার দ্য চেঞ্জিং ফেস অব জেনোসাইড বইতে আমাদের দেশের আদমশুমারির দুর্বলতা নিয়ে লিখেছেন;
“বাংলাদেশে আদমশুমারীর হাল বরাবরই করুণ, অনুমান নির্ভর।“
বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায় মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা আসলে সাড়ে সাত কোটি কোটি থেকে বেশী ছিলো। সংখ্যাটা এক কোটি পর্যন্ত বেশী হতে পারে। ৫ এবং ১২ এপ্রিল ১৯৭১ সালের ‘টাইম’স পত্রিকায় এই উক্তির সমর্থনে তথ্য পাওয়া যায়। যে সাড়ে সাত কোটিকে ভিত্তি ধরে এই মৃত্যুহার বের করা হয়েছে প্রকৃত পক্ষে সংখ্যাটা তার চেয়ে অনেক বেশী বই কম নয়।
এই লেখাকে আর দীর্ঘ করবো না, শুধু একটা কথাই বলতে চাই কাঠখোট্রা পরিসংখ্যানের সারণীতে যখন মৃত্যু আর রক্তের জোয়ারকে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে চলতে দেখি, শহীদ মিনারের সুউচ্চ বেদির মত একাত্তরের নীল রেখাটা দেখি সবাইকে ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে আছে তখন মনে পড়ে;
একটা দেশ এমনি পাই নাই;
কেউ দয়া করে নাই,
কেউ ভিক্ষা দেয় নাই,
দাম দিয়ে কেনা…
রুমির জন্য পাকিদের কাছে ক্ষমা ভিক্ষার প্রস্তাব নাকচ করে ছেলের জন্য শহীদের মৃত্যু পছন্দ করেছিলেন তার বাবা। মায়ের সামনে মেয়ে খায়রুন্নেসার ইজ্জত গ্যাছে, ভাইয়ের লাশ নিয়ে বোন দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে একটু কবর হবে এই আশায়। মেজর নুরুল ইসলামের প্রেগন্যান্ট স্ত্রী’কে পাকিস্তানীরা…… , ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে মা অন্ধ হয়ে গেছে, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের লাশ দেখে নাতি রাহুল আজও মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে বেঁচে আছে, চক্ষু বিশেষজ্ঞের চোখ তুলে নিয়েছে, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের বুক চিরে হৃদয়টাই বের করে নিয়েছে, একজনকে এক রাতে ধর্ষণ করেছে আশি থেকে একশবার। রাতে দিয়ে যাওয়া গণকবর থেকে সকালে উঠে এসেছে রক্তাক্ত জীবন্ত হাত…
না আশা হারাই না,
হতাশ হই না,
৭১’এ এই দুর্বল বাঙালীই জিতেছিলো…

নিউটন, মহাকর্ষ ও প্রকৃতির চারটি মৌলিক বল ।

আগের পোস্টে বলা হয়েছিল, “আইনস্টাইনের তত্ত্বের সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে সমন্বিত করে একটি একীভূত তত্ত্ব গঠন করতে হলে আমাদের প্রকৃতির মৌলিক বল, আপেক্ষিক তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কে ভালমতো জানতে হবে”। এই পোস্টে প্রথম মৌলিক বল, “মহাকর্ষ” আবিস্কার ও চারটি মৌলিক বলের পরিচিতি থাকবে।
।এক।
ইংল্যান্ড, ১০৬৬ সাল । ব্রিটিশ ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছর। নরমাল্যান্ডের ডিউক, উইলিয়াম দ্যা কনকিউরের সৈন্যদল ইংল্যান্ড আক্রমণ করেছে। যুদ্ধের সময় এক অদ্ভুত দর্শন ধূমকেতু যুদ্ধক্ষেত্রের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। রাজা হ্যারোল্ডের ভীত স্যাক্সন সৈন্যদের পরাজিত করার এইতো সুযোগ। মুহূর্তের মধ্যে রাজা হ্যারোল্ডকে পরাজিত করে নরমানরা ইংল্যান্ড দখল করে নেয়। প্রতিষ্ঠিত হয় আধুনিক ব্রিটিশ রাজতন্ত্র।
কিন্তু ইংল্যন্ডবাসির মনে তখন একটিই প্রশ্ন, কোথা থেকে আসে এই রহস্যময় ধূমকেতু ? কোথায়ই বা যায় ? ধূমকেতুর আগমন মানে কি একটি রাজ্যের পতন ? তখন কেউই এই প্রশ্নের উত্তর জানত না। শুধু এতটুকুই জানা ছিল, একটি ধূমকেতু মানে এক ভয়ংকর অশুভ বার্তা।

চিত্র: ধূমকেতুর আগমনে ভীত ইংল্যান্ড-বাসী
যে অশুভ ধূমকেতু এসে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সূচনা করেছিল, সেই একই ধূমকেতু আবারও ১৬৮২ সালে লন্ডনের আকাশে দেখা যায়। ইউরোপ-বাসির মনে আবারও ভয়; এবার না জানি কি হয় ! কারণ ততদিনে মানুষের মনে এই ভয় ঢুকে গিয়েছিল- একটি ধূমকেতুর আগমন মানে একটি রাজার পতন। তবে ইতিমধ্যেই গ্যালিলিও, কোপার্নিকাসের প্রভাবে অনেকেই মহাকাশের বস্তুদের আচরণ নিয়ে উৎসাহী হয়ে পরেছে। তেমনি একজন ছিলেন এডমন্ড হ্যালি। হ্যালি ছিলেন ইংল্যান্ডের একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক, নামকরা ধনাট্ট ব্যক্তি ও শখের জ্যোতির্বিদ। হ্যালি এই ধূমকেতু সম্পর্কে কৌতূহল দমন করতে পারলেন না। হ্যালির এক বন্ধু ছিল ক্যামব্রিজের বৈজ্ঞানিক আইজ্যাক নিউটন। বন্ধুত্ব তখনও অতটা গভীর না। মাঝে মাঝেই যোগাযোগ হয়। হ্যালি চিন্তা করলেন নিউটনের কাছে গেলে অবশ্যই কিছু জানা যাবে । যেমন চিন্তা তেমন কাজ। একদিন ক্যামব্রিজে গিয়ে হাজির হলেন বন্ধু নিউটনের কাছে। কোন ভূমিকা না করে প্রথমেই হ্যালি বলতে শুরু করলেন- নিউটন , কেউই জানে না এই ধূমকেতু আসলে কি ? কোথা থেকে আসে আর কোথায়ই বা যায় ? কি এদের গতিপথ ! হ্যালি যথেষ্ট উত্তেজিত থাকলেও নিউটন খুব শান্তভাবে জবাব দিলেন, “ ধূমকেতুরা আসলে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথ মেনে সূর্যের চারদিকে ভ্রমণ করে চলেছে ” । হ্যালি অবিশ্বাসের সাথে বললেন “কিন্তু কোন শক্তির প্রভাবে এরা ঘুরে চলেছে তা আমরা কেউই জানি না !” । এবারও নিউটনের শান্ত উত্তর, “ ধূমকেতু সহ প্রতিটি গ্রহই আমার আবিষ্কার করা মহাকর্ষ বলের ব্যাস্তবর্গীয় নিয়ম মেনে তাদের কক্ষপথে ঘুরে চলেছে। আর আমি আমার নিজের আবিষ্কার করা দূরবীক্ষণ দিয়ে বিগত ২০ বছর ধরে এই ধূমকেতুর কক্ষপথ পর্যবেক্ষণ করছি। প্রতি রাতেই আমি দেখি, আমার গণিতের নিয়ম মেনে এটি একটি কক্ষপথে ছুটে চলছে, ইচ্ছে করলে তুমিও পরীক্ষা করে দেখতে পার”।
নিউটনের কথা শুনে হ্যালি তখন বুঝতে পারলেন, অন্তত একজন মানুষ এই স্বর্গীয় বস্তুটির রহস্য ভেদ করতে পেরেছে। আর প্রতি রাতেই তার গণনা করা পথ দিয়ে এরা চলাচল করে কিনা, সেটিও বিগত ২০ বছর ধরে পরীক্ষা করে দেখছে। হ্যালির কাছে এটি ছিল অসম্ভব এক কাজ। হ্যালি তাই আবারও প্রশ্ন করল তুমি একটি কিভাবে পারলে? নিউটন এবার কিছুটা অধৈর্য হয়ে উত্তর দিলেন, “ কেন ? আমি হিসেব করেছি ” ।
নিউটনের সব কাজ দেখার পর হ্যালি নিউটনকে সম্ভবত বলেছিল, “ ঈশ্বরের দোহাই, তুমি কেন এই আবিষ্কার এখনো প্রকাশ করনি ?” । নিউটন হ্যালিকে বুঝিয়ে বলেন, “আমি যে ক্যালকুলাস ও মহাকর্ষ বলের সূত্র আবিষ্কার করেছি সেগুলোকে সামারাইজ করা অনেক সময় ও অর্থের ব্যাপার। আমি এত সম্পদশালী ব্যক্তি নই যে সবকিছু বাদ দিয়ে এগুলিকে প্রকাশ করার জন্য কাজ করতে পারব ”। হ্যালির উত্তর ছিল, “আমি একজন ধনী ব্যক্তি, তুমি যে মহান আবিষ্কার করেছ তার জন্য সমস্ত খরচ আমি বহন করব। তুমি অবশ্যই এই আবিষ্কার প্রকাশ করবে ” । পরে হ্যালির ক্রমাগত অনুরোধে নিউটন মহাকর্ষ বল ও ক্যালকুলাস সংক্রান্ত সবকিছুর সুন্দর বর্ণনা দিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। বইটি প্রথম ল্যাটিন ভাষায় প্রকাশ করা হয়। নিউটন বইটির নাম দেন, “Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica.”।বইটির ইংরেজি শিরোনাম ছিল, “Mathematical Principles of Natural Philosophy”। বলা হয়ে থাকে মানব জাতি আফ্রিকা ত্যাগ করার পর এই বইটি আজ পর্যন্ত প্রকাশ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। এই একটি বই মানব জাতির ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছে। নিউটন তার বইয়ে গতি বিষয়ক তিনটি সূত্র প্রকাশ করেন। এই গতিসূত্রের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে সূচনা হয় বলবিদ্যা বা মেকানিক্সের। আর শুরু হয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভুলেশন। এক কথায়, মানব জাতির গতিপথ পাল্টে দেবার জন্য এই একটি বই’ই যথেষ্ট ছিল।”

চিত্র: নিউটনের লেখা যুগান্তকারী গ্রন্থ, “ প্রিন্সীপিয়া”
নিউটনের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার সমাজ ও রাষ্ট্রের সবকিছুকেই প্রভাবিত করেছিল। শিল্পচর্চা থেকে আইনকানুন সবই। নিউটনের এই আবিষ্কারে সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আঠারো শতকের কবি অ্যালেকজান্ডার পোপ লিখেছিলেন:
Nature and nature’s laws lay hid in the night,
God said, Let Newton Be! And all was light.
হ্যালি এই ধূমকেতু নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে যান। অনেক পুরনো নথিপত্র ঘেঁটে তিনি দেখতে পান এই একই ধূমকেতুটি ১০৬৬ পরও ১১৪৫, ১২২২, ১৩০১, ১৩৭৮, ১৪৫৬, ১৫৩১ ও ১৬০৭ সালে দেখা গিয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি ঘোষণা করেন এই ধূমকেতুটি আবারও ৭৬ বছর পরে দেখা যাবে। তার নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয় হ্যালির ধূমকেতু। তার করা ভবিষ্যৎবাণী অনুসারে ৭৬ বছর পর ধূমকেতুটি আবার দেখা গেলেও তিনি তার ১৭ বছর আগেই মৃত্যু বরন করেন।
।দুই।
নিউটনের মহাকর্ষ আবিষ্কার নিয়ে অনেক রকম গল্প প্রচলিত আছে। সবচেয়ে প্রচলিত গল্প হল, নিউটন একদিন বাগানে বসে গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন, আর তার সামনেই ধুপ করে একটি আপেল মাটিতে পরে। আর তিনি প্রশ্ন করেন, আপেলটি কেন মাটিতে না পরে ঝুলে রইল না ? এভাবেই তিনি মহাকর্ষের সূত্র আবিষ্কার করেন। অনেকে আবার একধাপ এগিয়ে আপেলটিকে নিউটনের মাথায়ই ফেলে দেন। যেন আপেলের গুঁতো খেয়ে নিউটনের মাথা খোলে। তবে কোন নির্ভরযোগ্য সূত্রেই আপেলের এই ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায় না। বরং বেশিরভাগ নির্ভরযোগ্য সূত্রই বলে গল্পটি একদম বানোয়াট।
১৯৬৫ সালে কথা, নিউটন তখন ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির ছাত্র। এসময় পুরো ইংল্যান্ড জুড়ে প্লেগ মহামারী শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হয়ে গেলে নিউটন তার গ্রামের বাড়ি উলসথ্রোপে(Woolsthrope) চলে যান। নিউটনের হাতে তখন অনেক সময়। ছুটির এই পুরোটা সময় জুরেই তিনি নানা রকম পরীক্ষা করে কাটান। পুরো দেড় বছর সময় তিনি নিজের মত করে গবেষণার কাজ করতে পেরেছিলেন। এসময়ই মহাকর্ষের বিষয়টি তার মাথায় আসে। অনেকেই মনে করেন নিউটনের জন্য এই অবসর সময়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্লেগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়য় ছুটি না থাকলে তিনি হয়ত এতটা সময় নিবিষ্ট মনে ভাবার সময় পেতেন না। আর হয়ত এই মহাকর্ষের নিয়ম থেকে আমরা আরও কয়েক শতাব্দীকাল বঞ্চিত থাকতাম।
এই দীর্ঘ অবসর সময়ে নিউটন অভিকর্ষ বল নিয়ে চিন্তা করছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কোন বস্তুকে উপরে ছুড়ে দিলেও এটি আবার মাটিতে ফিরে আসে কারণ পৃথিবী অবশ্যই এই বস্তুগুলোকে আকর্ষণ করে। নিউটন আরও বুঝতে পেরেছিলেন শুধু পৃথিবীই বস্তুগুলোকে আকর্ষণ করেনা, বরং বস্তুগুলোও পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। কিন্তু নিউটনের কাছে প্রশ্ন ছিল আপেলের মত বস্তু যদি মাটিতে পরে যায়, তাহলে চাঁদও কি সবসময় পড়ছে ? উত্তর হল হ্যাঁ, চাঁদও আপেলের মত সবসময়ই পড়ন্ত অবস্থায় আছে। চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে একটি গোলাকার কক্ষপথের ভিতর সবসময়ই পৃথিবীর উপর পড়ছে। কিন্তু এটি পৃথিবীতে আঘাত করছে না কারণ এর উপর একটি বল কার্যকর রয়েছে [1]।
নিউটন হিসেব করে দেখলেন, যদি এই বল ব্যাস্তবর্গীয় নিয়ম মেনে চলে তাহলেই শুধুমাত্র এরকম কোনকিছুর চারপাশে কেন্দ্র করে আবর্তন করা সম্ভব। সহজ করে বললে বলা যায়, কোন বল যদি এমন হয় যে- দূরত্ব দ্বিগুণ করলে বল চারভাগের একভাগ হয়ে যাবে, দূরত্ব তিনগুণ করলে বলের পরিমাণ নয়ভাগের একভাগ হয়ে যাবে, শুধুমাত্র তাহলেই এরকম কোন কক্ষপথ মেনে চাঁদ পৃথিবীকে আবর্তন করতে থাকবে। তবে এই হিসেব করা কিন্তু এত সহজ ছিল না। সেকালের প্রচলিত গণিতের সাহায্যে কোনভাবেই এই গণনা করা সম্ভব হয় নি। কিন্তু নিউটনকে তো এই বলের রহস্য ভেদ করতেই হবে। তাই তিনি তার নতুন আবিষ্কার করা বলের হিসেব করার জন্য গণিতের এক নতুন শাখার সূচনা করলেন। গণিতের এই শাখার নামই ক্যালকুলাস। ভাবতে অবাক লাগবে, আজকের দিনের শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে গিয়ে প্রথম এই ক্যালকুলাসের সাথে পরিচিত হয়। আর নিউটন ছাত্র অবস্থায়ই এমন একটি জটিল গণিত শাখার সূচনা করেন।

চিত্র: মহাকর্ষ বলের আবিষ্কারক বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন ।
।তিন।
নিউটন তার বইয়ে যে নিয়মগুলো উল্লেখ করেছিলেন, তা শুধু পৃথিবীতে অবস্থিত কোন বস্তুর জন্যই নয়, বরং মহাবিশ্বের সকল বস্তুই এই নিয়মগুলো মেনে চলে। তিনি তার বই শুরু করেছিলেন তিনিটি নিয়ম বর্ণনা করার মধ্য দিয়ে। কোনও গতিশীল বস্তু কেমন আচরণ করবে এই নিয়মগুলো থেকে তার সবই গণনা করা যায়। প্রথম নিয়মে নিউটন বলেন, প্রতিটি বস্তুই তার অবস্থা ধরে রাখতে চায়; স্থির বস্তুকে কোন বল প্রয়োগ না করা হলে সে চিরদীন স্থিরই থাকবে, আর গতিশীল বস্তুকে বাহির থেকে কোন বল প্রয়োগ না করা হলে সে চিরদীন সোজা পথে চলতেই থাকবে। এই নিয়ম মেনে চলার অভিজ্ঞতা কিন্তু আমাদের সবারই আছে। দ্রুতবেগের গাড়িকে যখন হঠাৎ ব্রেক করা হয় তখন সিটে বসা সবাই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ি।আর গাড়ির গতি বেশি থাকার পরও কষে ব্রেক করলে তো সামনের সিটের সাথে মাথার গুঁতো মিস নেই। এমন হয় কারণ- গাড়ি যখন চলতে থাকে তখন আমাদের শরীরের সব অংশই একই বেগে গাড়ির সাথে চলতে থাকে । কিন্তু হঠাৎ ব্রেক করা হলে শরীরের নিচের অংশ গাড়ির সাথে থেমে গেলেও, উপরের অংশ তো গাড়ির সাথে লাগানো না, তাই উপরের অংশ সমান বেগে সামনের দিকে চলতে থাকে। ফলে একটি গুঁতো উপহার পাওয়া যায়। এই সূত্রটিকে বলা হয় জড়তার নিয়ম(Law of inertia)। দ্বিতীয় নিয়ম বলা হয়, বল কিভাবে কাজ করে আর কোন দিক বরাবর কাজ করে। এই সূত্র থেকেই বলের একটি স্পষ্ট সংজ্ঞাও বেরিয়ে আসে। তৃতীয় নিয়মটি দেখতে সাদামাটা মনে হলেও এই নিয়ম মেনেই রকেট মহাকাশে পাড়ি দিতে পারে। এই সূত্রে বলা হয়, প্রতিটি ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। একারণেই রকেটের পেছন পেছন দিক থেকে প্রচণ্ড বেগে ধোয়া ছেড়ে ধাক্কা দিলে রকেটটিও প্রচণ্ড বেগে তার বিপরীত দিকে এগিয়ে যায়। আর এই নিয়ম আমাদের পৃথিবীর পাশাপাশি মহাশূন্যেও প্রযোজ্য। তাই এই সহজ নিয়মকে পুঁজি করে আমরা দূর মহাকাশে পাড়ি দিতে পারি। এই নিয়মটি বলা হয় প্রতিক্রিয়ার নিয়ম(Law of reaction)।
নিউটনের নিজের ভাষায় লেখা মূল ল্যাটিন সূত্রগুলোকে এন্ডু মোট্টে ১৭৭২ সালে অনুবাদ করেন। দেখা যাক তার ভাষায় সূত্রগুলো কেমন ছিল:
LAW I: Every body preserves in its state of rest, or of uniform motion in a straight line, unless it is compelled to change that state by force impressed thereon.
LAW II: The alteration of motion is ever proportional to the motive force impressed; and is made in the direction of the right line in which that force is impressed.
LAW III: To every action there is always opposed and equal reaction; or the mutual action of two bodies upon each other are always equal, and directed to contrary parts.
।চার।
নিউটন যে বল আবিষ্কার করেন তার নাম মহাকর্ষ। এই বল কিভাবে কাজ করে তিনি তার নিয়ম বলে গেছেন। এই বলের নিয়ম অনুযায়ী মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু প্রতিটি বস্তুকে আকর্ষণ করছে। আকর্ষণ বলের পরিমাণ কত হবে তা নির্ভর করে বস্তুদুটির ভরের গুণফলের উপর। বস্তু-দুটি যত ভারি হবে বলের পরিমাণ তত বাড়তে থাকবে। আর এই বল কার্যকর হবে এদের সংযোজক রেখা বরাবর। ভরের পাশাপাশি এটি দূরত্বের উপরও নির্ভর করে। দূরত্ব যত বাড়তে থাকে বল তত কমতে থাকে। দূরত্বের ক্ষেত্রে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে তা হল- দূরত্ব দ্বিগুণ হলে বল চারভাগের একভাগ হয়ে যাবে, দূরত্ব তিনগুণ হলে বল নয়গুণ কমে যাবে। অর্থাৎ দূরত্বের বর্গ অনুপাতে কমে যাবে। আর একারণেই একে বলে ব্যাস্তবর্গিয় নিয়ম(Inverse square law) ।
এই নিয়ম কতটা কার্যকরী তা ভাবাই যায় না। এই এক নিয়ম দিয়েই চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ নক্ষত্রের গতি প্রকৃতি বোঝা যাচ্ছে, তাদের সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করা যাচ্ছে। চন্দ্র-সূর্যগ্রহণের পূর্বাভাস এখন আর অলৌকিক কোন বিষয় না। শুধু মহাকাশের গোলকগুলোই না, পৃথিবীর বুকে যত রকম ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তারও হিসেব করা যাচ্ছে এই নিয়ম দিয়েই। কেন জোয়ার আসে কেনই বা ভাটা পড়ে তা এখন আর ব্যাখ্যার অতীত না। এখানে মূল বিষয়টি ছিল, এসবের ফলে আমরা একটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি পাই, যার দ্বারা মহাবিশ্বের একটি নতুন রূপ আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়; যেখানে কোনকিছুই ব্যাখ্যার অতীত না।এর আগে গ্রহদের আচরণ থেকে কোন বস্তুর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সবকিছুই ছিল ব্যাখ্যার অতীত। কেউই জানত না গ্রহগুলো কিভাবে আর কেন ভ্রমণ করে চলেছে।
।মৌলিক বল।
সাধারণভাবে দেখলে গ্রহদের ছুটে চলা আর একটি আপেল গাছ থেকে মাটিতে পড়াকে দুটি আলাদা ঘটনা বলেই মনে হয়। সাধারণ কোন মানুষ হয়ত কখনই ভাববে না, এই ঘটনাগুলো একই কারণে হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞানের কাজ হল, ঘটনার পেছনের ঘটনাকে খুঁজে বের করা। নিউটন যখন বুঝতে পারলেন, আপেল মাটিতে পড়া আর গ্রহদের ছুটে চলা মূলত একই বলের কারণে হচ্ছে, তখন তিনি একটি মৌলিক বল ও মৌলিক কারণের সন্ধান পেলেন। এই বলকে মৌলিক বলার কারণ হল, এই বলটি অন্য কোন বলের প্রতিক্রিয়ার ফলে তৈরি হচ্ছে না। যেমন- যদি কেন্দ্রবিমুখী বলের কথা বলি, এটি কিন্তু মৌলিক বল না। কিন্তু মহাকর্ষ একটি মৌলিক বল এবং মানব জাতির আবিষ্কার করা প্রথম মৌলিক বল। মহাকর্ষের মত এরকম আরও তিনটি মৌলিক বল রয়েছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ করা দুনিয়াতে যা কিছু হচ্ছে তার সবকিছুর মুলে আছে এই চারটি মৌলিক বল। বলগুলো হল:
* মহাকর্ষ
* তড়িৎ-চুম্বক বল
* সবল নিউক্লীয় বল
* দুর্বল নিউক্লীয় বল
মহাকর্ষ
চারটি মৌলিক বলের ভিতর সবচেয়ে পরিচিত বল হল মহাকর্ষ। আমরা প্রতিনিয়ত সেসব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখি তার বেশীরভাগই এই বলের কারণেই হয়। পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহকে তাদের কক্ষপথের চারপাশে প্রদক্ষিণ ও গ্যালাক্সিগুলোকে বেধে রাখার জন্য এই বল দায়ী। এই বল না থাকলে পৃথিবী সহ অন্য গ্রহগুলো সূর্যের চারপাশে না ঘুরে, বরং মহাশূন্যে হারিয়ে যেত। মহাশূন্যে সূর্যের আলো কম থাকায় তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কম, ফলে সেখানে জীবনধারণ অসম্ভব। পৃথিবীর কোন মহাকর্ষ না থাকলে পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে আমরা শূন্যে ছিটকে যেতাম।আবার এই বলই বায়ুমণ্ডলকে পৃথিবীর সাথে ধরে রেখেছে।মহাকর্ষ না থাকলে বায়ুমণ্ডল ধীরে ধীরে মহাশূন্যে মিলিয়ে যেত।চাদের পর্যাপ্ত ভর নেই বলে তার মহাকর্ষ বলও অনেক কম, তাই চাঁদের কোন বায়ুমণ্ডল নেই। মজার ব্যাপার হল, মহাকর্ষ বল না থাকেল সূর্য নিজেই থাকত না, ভেতরের পারমাণবিক বিক্রিয়ায় উৎপন্ন শক্তির চাপে বিস্ফোরিত হয়ে যেত। এমনকি এই মহাকর্ষ ছাড়া কোন গ্যালাক্সিও তৈরি হত না। মহাকর্ষের টানেই মহাজাগতিক ধূলিকণাগুলো একত্র হয়ে গ্যালাক্সি ও নক্ষত্রগুলো তৈরি করেছে।
মহাকর্ষ বল সব সময় আকর্ষণ-ধর্মী হওয়ায় এই বলের প্রভাব সবথেকে বেশি দৃশ্যমান। এই বলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, এই বল পাল্লা অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ সেই বিলিয়ন কিলোমিটার দুরের কোন লক্ষত্রও আমাদের পৃথিবীকে এমনকি আমাদেরকেও আকর্ষণ করছে। কিন্তু দূরত্ব অনেক বেশি হবার কারণে এই বলের পরিমাণ এতটাই কমে গেছে যে হয়ত মাপাটাই সম্ভব নয়।কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে আরও বেশি দূরত্বের বস্তুও পরস্পরকে আকর্ষণ করে। তবে অন্য তিনটি বলের তুলনায় মহাকর্ষ বল খুবই দুর্বল ।
তড়িৎ-চুম্বক বল
একসময় বিদ্যুৎ শক্তি, চুম্বক শক্তি ও আলো এই তিনটি জিনিসকে আলাদা মনে করা হত। এদের ভিতর সম্পর্ক থাকার প্রথম প্রমাণ পাওয়া যায় ১৮২০ সালের ২১ এপ্রিল। সেদিন হেন্স ক্রিশ্চিয়ান ওরস্টেড লেকচার দিচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন ব্যাটারির সুইচ অন অফ করার সময় পাশের কম্পাসের কাটাটি কেপে উঠছে।এই বিষয়টি নিয়ে পরে কাজ করে তিনি বুঝতে পারেন তড়িৎ প্রবাহের ফলে চৌম্বকক্ষেত্র প্রভাবিত হয়।এরপর মাইকেল ফ্যারাডে দেখান যে, তড়িৎ ক্ষেত্রের কারণে চুম্বক ক্ষেত্র প্রভাবিত হলে চুম্বক ক্ষেত্রের কারণেও তড়িৎ ক্ষেত্রে প্রভাবিত হবে। ফ্যারাডে তড়িৎ ও চুম্বককে এক সুতোয় গাথতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, দুটি চুম্বককে এদের বলক্ষেত্রের ভিতর দ্রুত ঘোরালে, তার দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হবে।এই সাধারণ নীতির উপর ভিত্তি করেই ইলেকট্রিক জেনারেটর তৈরি করা হয়। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি না থাকায় তিনি তড়িৎ-চুম্বক বলের গাণিতিক কাঠামো তৈরি করে যেতে পারেন নি।

চিত্র: ফারাডে ডিস্ক ছিল পৃথিবীর প্রথম ইলেকট্রিক জেনারেটর। চিত্রের অশ্বখুরাকৃতির চুম্বক A ডিস্ক D এর ভিতর একটি চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে। যখন ডিস্কটি ঘুরানো হয় তখন চুম্বকের বলরেখা ছেদ করার মাধ্যমে এখানে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে থাকে। চিত্রের m অংশ দিয়ে একটি তারের মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ অন্য কোন বর্তনীতে প্রবাহিত করা যায়।
জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল তড়িৎ ও চুম্বকে ক্ষেত্রের জন্য গাণিতিক কাঠামো তৈরি করেন।তিনি তড়িৎ ও চুম্বকের ক্ষেত্রের জন্য মোট আটটি সমীকরণ গঠন করেন যেগুলো তড়িৎ-চুম্বক ক্ষেত্র মেনে চলে। এরপর থেকে তড়িৎ ও চৌম্বক আর আলাদা বল না। এই দুই বল মূলত একই বলের দুটি আলাদা রূপ।আর এই তড়িৎ-চুম্বক বল হল একটি মৌলিক বল। ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণের গণনা থেকে দেখা যায়- যখন তড়িৎক্ষেত্র ও চৌম্বকক্ষেত্র দুটি একইসাথে উৎপন্ন করা হবে তখন একটি তরঙ্গ সৃষ্টি হবে। এই তরঙ্গকে বলা হয় তড়িৎ-চুম্বক তরঙ্গ। ম্যাক্সওয়েল তার সমীকরণ ব্যাবহার করে এই তরঙ্গের বেগ নির্ণয় করতে সক্ষম হন। ম্যাক্সওয়েল অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন এই তরঙ্গের বেগ আর আলোর বেগ একই। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আলো নিজেও একটি তড়িৎ-চুম্বক তরঙ্গ।

চিত্র: মাইকেল ফ্যারাডে
শহরময় ঝলমলে বাতি, রক ও মেটাল মিউজিক, স্টেরিও সাউন্ড সবই তড়িৎ-চুম্বক বলের ফল। রেডিও,টেলিভিশন,রাডার, মোবাইল ফোন এমনকি মাইক্রোওয়েভ ওভেন সবই তড়িৎ-চুম্বক তরঙ্গ ব্যাবহার করে চলে।তড়িৎ-চুম্বক বল ব্যাবহার করে সম্প্রতি কম্পিউটার ও লেজারের মত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে, যেগুলো আমাদের জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকেই প্রভাবিত করেছে। তড়িৎ-চুম্বক বলের কারণেই ধনাত্মক চার্জ যুক্ত নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ইলেকট্রন ঘুরছে।যদি তড়িৎ-চুম্বক বল না থাকত তাহলে পরমাণু বলে কোন কিছু থাকত না। সকল প্রকার রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণও এই বল। এই বল না থাকলে পরমাণুগুলো মিলে কোন অণু গঠন করত না, তাই থাকত না এত রকম পদার্থ। তড়িৎ-চুম্বক বল না থাকেল তড়িৎ-চুম্বক বিকিরণ বলেও কিছু থাকত না।আর আলো যেহেতু একটি তড়িৎ-চুম্বক বিকিরণ তাই মহাবিশ্বে আলো বলেও কিছু থাকত না। সবকিছুই অন্ধকারে ডুবে থাকত ।
মহাকর্ষ বলের সাথে এই বলের বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে।যেমন- মহাকর্ষ সকল বস্তুর ভিতর কার্যকর ও সবসময় আকর্ষণ-ধর্মী। কিন্তু তড়িৎ-চুম্বক বল শুধুমাত্র চার্জ-যুক্ত কণিকাদের মধ্যেই কাজ করে। বিপরীতধর্মী চার্জ পরস্পরকে আকর্ষণ করে আর একই চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। একই সাথে আকর্ষণ ও বিকর্ষণ ধর্ম থাকার কারণে এই বলের ক্ষেত্রে কাটাকাটি হয়ে যাবার সুযোগ আছে। যেমন- একটি পরমাণুতে সমান সংখ্যক ধনাত্মক চার্জ-যুক্ত প্রোটন ও ঋণাত্মক চার্জ-যুক্ত ইলেকট্রন থাকে। ফলে একটি পরমাণু সবসময়ই চার্জ নিরপেক্ষ। ফলে পরমাণু দিয়ে গঠিত সব বস্তুও চার্জ নিরপেক্ষ। তাই সচরাচর কোন বস্তুর ভিতর এই বলের প্রভাব দেখতে পাওয়া যায় না। কিন্তু মহাকর্ষ বল সব সময়ই আকর্ষণ-ধর্মী হওয়ায় সব বস্তুর মধ্যেই এই মহাকর্ষের প্রভাব কাজ করে।তবে এই বলের পাল্লাও মহাকর্ষ বলের মত অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত।
দুর্বল নিউক্লীয় বল
দুর্বল নিউক্লীয় বলকে সংক্ষেপে দুর্বল বল নামেও ডাকা হয়। এই বল নিউক্লিয়াসের বিটা ক্ষয়ের জন্য দায়ী। তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে যে তেজস্ক্রিয় রশ্নি বিকিরণ হয় তা মূলত দুর্বল বলের কারণেই হয়ে থাকে। এরকম পদার্থ থেকে বিকিরণের সাথে প্রচুর শক্তি ক্ষয় হয়, ফলে একটি পরমাণু ভেঙ্গে আরেকটি পরমাণুতে পরিণত হয়। পৃথিবীর অভ্যন্তরে তেজস্ক্রিয় শিলাগুলো এভাবেই তাপশক্তি বিকিরণ করে বিভিন্ন সময় আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়। দুর্বল বল না থাকলে কোন তেজস্ক্রিয় পদার্থই থাকত না। তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো দিয়ে একদিকে যেমন জীবন রক্ষাকারী যন্ত্র বানানো যায় আবার এই বিকিরণ মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এই বলের পাল্লা খুবই ক্ষুদ্র; এক ফার্মি বা ১০^ -১৫ মিটার। এই দূরত্বের বাইরে গেলেই এই বল কাজ করবে না। এমন ক্ষুদ্র পাল্লার বল হবার কারণে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব বোঝা যায় না। কিন্তু এই বলের প্রভাবে পরমাণুর অভ্যন্তরের কাঠামতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়া হয়। তাছাড়া মৌলিক কণিকাদের আচরণ বোঝার জন্য এই বলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
সবল নিউক্লীয় বল
এই বলকে সবল বল নামেও ডাকা হয়। নক্ষত্রগুলোর জ্বালানী শক্তি আসে এই বল থেকে। নক্ষত্রগুলো আলোকিত হবার পেছনেও সবল বল দায়ী। যদি হঠাৎ করে সূর্য থেকে সবল বল উধাও হয়ে যায় তাহলে মুহূর্তেই সূর্য আলো বিকিরণ করা বন্ধ করে দেবে, ফলে পৃথিবীতে প্রাণের চিহ্নও থাকবে না। কয়েকজন বিজ্ঞানীর গবেষণায় দেখা গেছে, আজ থেকে প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে একটি বড়সড় ধূমকেতুর ধ্বংসাবশেষ আমাদের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল। এরপর অনেকদিন ধূমকেতুর ধুলোর ফলে পৃথিবীতে সূর্যালোক পৌছাতে পারে নি ফলে তাপমাত্রা খুব দ্রুত কমে গিয়েছিল। এই আকস্মিক তাপমাত্রার পতনে ডাইনোসররা টিকে থাকতে পারে নি। মজার ব্যাপার হল, এই বলের কারণেই নক্ষত্রের ভিতর আমাদের জীবনের জ্বালালি তৈরি হয়ে চলেছে, আবার একদিন এই বলের কারণেই সূর্য একদিন সুপারনোভা বিস্ফোরণ হয়ে আমাদের জীবনের অবসান ঘটাবে।
সবল বলের পাল্লাও দুর্বল বলের মত খুব ক্ষুদ্র; মাত্র কয়েক ফার্মি। আর এই বল চার্জের উপর নির্ভর করে না। অর্থাৎ এই বলের পাল্লার ভেতরে একটি ধনাত্মক কনিকাও একটি ঋণাত্মক কণিকাকে প্রবল বেগে আকর্ষণ করবে। কারণ তড়িৎ-চুম্বক বল যে শক্তিতে এদের বিকর্ষণ করবে সবল বল তার থেকে অনেক শক্তিশালী হওয়ায় বিকর্ষণ বলকে অগ্রাহ্য করতে পারে। একারণেই পরমাণুর ভেতরে নিউট্রন ও প্রোটন এই বলের সাহায্যে যুক্ত হয়ে নিউক্লিয়াস গঠন করতে পারে। একটি প্রোটন ও নিউট্রন তিনটি কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত, এই কোয়ার্ক তিনটিও সবল বলের সাহায্যে যুক্ত হয়ে প্রোটন ও নিউট্রন গঠন করে। এই বলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের কমে এই বল বিকর্ষণ-ধর্মী হতে পারে। দেখা গেছে, নিউক্লিয়াসের ভিতর কণিকাদের দূরত্ব ১.২ ফার্মি থেকে ৩ ফার্মি হলে এই বল আকর্ষণ-ধর্মী ও এই দূরত্ব ১ ফার্মির কম হলে তা অবশ্যই বিকর্ষণ-ধর্মী হবে। প্রকৃতিতে যতগুলো বল আছে তার মধ্যে সবল বল হল সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী বল।
বলগুলো কতটা শক্তিশালী-ভাবে মিথস্ক্রিয়া করবে তা নির্ভর করে এদের কাপোলিং কন্সট্যান্টের উপর। নিচে দুর্বলতার ক্রম হিসেবে চারটি মৌলিক বলকে সাজানো হল। এ থেকে বোঝা যাবে কোন বল কতটা শক্তিশালী।
1. মহাকর্ষ
2. দুর্বল নিউক্লীয় বল
3. তড়িৎ-চুম্বক বল
4. সবল নিউক্লীয় বল
সবল নিউক্লীয় বলের শক্তিকে ১ ধরলে অন্যবলগুলোকে শক্তির ক্রমানুসারে এভাবে সাজানো যেতে পারেঃ
সবল নিউক্লীয় বল———————– ১
তড়িৎ-চুম্বক বল————————–১০^-২
দুর্বল নিউক্লীয় বল————————১০^ -৫
মহাকর্ষ———————————-১০^ – ৪০
উপরের তালিকা থেকে বোঝাই যাচ্ছে অন্য বলগুলোর তুলনায় মহাকর্ষ বল কতটা দুর্বল। প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞান মহাকর্ষ বলের এই অস্বাভাবিক দুর্বল হবার কারন অনুসন্ধান করে যাচ্ছে। কিন্তু অনেক বিজ্ঞানী আজকাল মনে করেন, এই বলের বিষয়টি অতিরিক্ত মাত্রার সাথে জড়িত। তাই স্ট্রিং থিওরির সাহায্যে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে বলে অনেকেই আশা করছেন।
মহাকর্ষ ও তড়িৎ-চুম্বক বলের সন্ধান অনেক আগেই পাওয়া গেলেও গত শতাব্দির ৬০-এর দশকের আগে নিউক্লীয় বলগুলোর(সবল ও দুর্বল নিউক্লীয় বল) সম্পর্কে আমরা তেমন কিছুই জানতাম না। আইনস্টাইন যখন একটি একীভূত তত্ত্ব গঠন করার জন্য কাজ করে যাচ্ছিলেন তখন তিনি নিউক্লীয় বল সম্পর্কে অবগত না থাকায় তিনি সফল হতে পারেন নি।
পাদটীকাঃ
[1] একটি ভারি বস্তুকে সুতোর মাথায় বেধে হাতের আঙ্গুল দিয়ে ঘুরালে, দেখা যায় সেটি আমাদের হাতের চারপাশে ঘুরে চলেছে। আর হাতের বাহিরের দিকে একটি বল অনুভূত হয়। এই বলের নাম কেন্দ্রবিমুখী বল।একটি বস্তু যখন গতি-প্রাপ্ত হয় তখন এটি বাহিরের দিকে এই বলটি অনুভব করে, ফলে আকর্ষণ বল ভিতরের দিকে টানলেও কেন্দ্রবিমুখী বল বাহিরের দিকে টানে। এতে একটি সাম্যাবস্থা তৈরি হয় এবং বস্তুটি চারিদিকে ঘুরতে থাকে। চাদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। পৃথিবীর আকর্ষণ বলের কারণে এটি যখন গতি-প্রাপ্ত হয় তখন এটি বাহিরের দিকে একটি কেন্দ্রবিমুখী বল অনুভব করতে থাকে।ফলে এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠে এসে না কক্ষপথের চারদিকে ঘুরতে থাকে। পৃথিবী থেকে অনেকগুলো কৃত্রিম উপগ্রহ প্রেরণ করা হয়েছে যেগুলো এভাবেই পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে চলেছে। আহ্নিক গতির কারণে পৃথিবীও যেহেতু পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে সবসময় ঘূর্ণায়মান, তাই পৃথিবীর সমান গতিতে যদি কোন কৃত্রিম উপগ্রহ ঘুরতে থাকে, আমাদের কাছে সেটিকে শূন্যে ভাসমান ও স্থির মনে হবে।

ত্রিনিদাদের পুজা এবং কানাডা অভিবাসি এক বাঙালির জীবন উপাখ্যান [অবৈধ পথে ক্যানাডা গিয়ে যেভাবে স্থায়ী হলেন ‘পাগলাবাবা’] ব্লগে লেখালেখির সূত্রে টরেন্টো প্রবাসি ‘পাগলা বাবা’র সাথে পরিচয় হয় আমার গত বছর নেটে। সেই সূত্রে ২-মাস আগে বাংলাদেশে এলে আমার বাসায় অবস্থান করে ‘পাগলাবাবা’। অনেক গল্প, অনেক কথা, অনেক হাসি-কান্নার অভিজ্ঞতা আর জীবন সংগ্রামের এক নাটকিয় কাহিনি শোনায় আমার প্রিয় বন্ধু ‘পাগালাবাবা’। কেমন করে প্রায় ১-বছর ধরে নানা অবৈধ পথে আমেরিকা ঢুকতে না পেরে, কিভাবে ঢুকলেন ক্যানাডাতে প্রায় ২৫-বছর আগে – তারই এক নাটকিয়, বিস্ময়কর, হৃদয়ঘন, আবেগ আপ্লুত, আর কৌতুহল উদ্দিপক জীবনময়তার অনবদ্য কথকতা আজকের লেখা। সে এখন আমার খুব প্রিয় বন্ধু! তাকে এয়ারপোর্টে বিদায় জানাতে যেতে হয় আমাকে অফিস ছেড়ে হলেও!
ঐ বন্ধুর অন্য একটা “রায়’ পদবির নাম থাকলেও, তাকে আমি ‘পাগলাবাবা’ বলে সম্বোধন করি, সেও তা পছন্দ করে খু্বই। ছাত্রাবস্থা থেকেই পাগলাবাবার ইচ্ছে, যে কোন ভাবে আমেরিকা যাবে সে বৈধ কিংবা অবৈধ পথে। খুঁজতে থাকে নানা ফাঁক ফোঁকড়। একজনের কাছে জানতে পারে ‘বাহামা’ থেকে ৩১-কিলোমিটার সমুদ্র-পথ যুক্তরাষ্ট্রের ‘মায়ামি’র। ঐ পথটুকু স্পিড বোটে পাড় হওয়া তেমন জটিল কাজ নয়, সাঁতার জানা এ বাঙালি পাগলাবাবার কাছে। কিন্তু বাহামা যাবে কিভাবে? নানা বইপুস্তক আর তথ্য উপাত্ত ঘেটে (তখন ফেসবুক ছিলনা) বের করে যে, বাংলাদেশের নাগরিকদের ‘বাহামা’ যেতে কোন ভিসা লাগেনা, কেবল রিটার্ন টিকেট আর পর্যাপ্ত ডলার শো’করলেই বাহামা এয়ারপোর্টে ৬-মাসের ভিসা দেয় বাংলাদেশিদের। আরো জানলো যে, বাহামা হচ্ছে একটা পর্যটন প্রধান দেশ, প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষ বাহামা বেড়াতে যায় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে।
প্লান মোতাবেক ঢাকা-লন্ডন-বাহামা রিটার্ন টিকেট কেটে বিমানবন্দরে যথাসময়ে হাজির হলো পাগলাবাবা। সাথে নিল ডলার, বাংলাদেশের অনেক ডাকটিকেট, আর ২/৫/১০/২০ টাকার বাংলাদেশি অনেক নতুন নোট। কারণটা হচ্ছে, বাহামার পর্যটকদের কাছ ডাকটিকেট ও বাংলাদেশি কমদামি নোট বিক্রি করা। চমৎকার বুদ্ধি পাগলাবাবার কিন্তু বুদ্ধি মার খেল ঢাকা বিমানবন্দরে। সব ঠিক থাকা সত্বেও তাকে ছাড়লো না বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন। কারণ দেখালো, তার মত পাগলাবাবার বাহামা ঘুরতে যাওয়া অযৌক্তিক, এটা অবৈধ পথে আমেরিকা যাওয়ার বাহানা মাত্র, অত্রএব ‘রিটার্ন টু ব্যাক হোম’।
কিন্তু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, হার না মানা, যুদ্ধবাজ ‘পাগলাবাবা’ এবার ট্রাভেলে গিয়ে অন্য রকম করলো টিকেট। কোলকাতা-বোম্বে-লন্ডন-বাহামা, আর সাথে ঢাকা-কোলকাতার ১টা আলাদা টিকেট। এবার বাহামার কথা গোপন করে চলে গেল কোলকাতা। সেখান থেকে পরদিন প্লান মোতাবেক সোজা ২-দিনের দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর পথ জার্নি শেষ করলো বাহামার ‘নাসাউ’ বিমানবন্দরে। কিছুই তেমন জানতে চাইলো না কেবল ডলার আছে কিনা এবং ক’দিন থাকতে চান বাহামা? ব্যাস ভিসা! বাহামার ভিসা!!
একটা কমদামি ছোট মোটেলে উঠলো পাগলাবাবা। রাতে থাকে সেখানে, আর দিনে খোঁজ করে মায়ামি যাত্রার পথ ঘাট, রুট। ১-মাসের মধ্যেই দালাল পেয়ে যায় ১০০০ ডলারে যাত্রার, যারা রাতে মায়ামি উপকূলে নামিয়ে দেবে তাকে ও অন্যদের। অনেক পর্যটকের কাছে বাংলাদেশি ডাকটিকেট ও মুদ্রা এক ডলার করে বিক্রি করে প্রায় ৩০০০ ডলার আয় করে পাগলাবাবা। একদিন সত্যিই ২-ইঞ্জিনচালিত “টার্বো-ক্যাটে” রাত ১-টায় ‘নাসাউ’ ছাড়ে পাগলাবাবারা ২৪-জন। এ বিজন জলসমুদ্রে সে একাই বাঙালি, আর সব অন্যান্য দেশের বিশেষত আফ্রিকান। প্রচণ্ড গতির ‘টার্বোজেট’ জলমালাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে বর্ণিত সময়ের আগেই পৌঁছে মার্কিন জলসীমায়। মায়ামির ১০/১৫ কিলোমিটারের কাছাকাছি পৌঁছতেই মার্কিন রণতরী থেকে গোলা নিক্ষেপ করে টার্বোজেটের দিকে। হায় বিপদ ! মার্কিন রণতরীর চোখে পড়ে গেছে টার্বো। সব বাতি নিভিয়ে কিয়ামতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে মুহূর্তে জেট ঘুরিয়ে দেয় অথৈ নীল সমুদ্রে, সোজা দক্ষিণে কিউবা-ক্যারিবিয়ানের দিকে। অন্ধকার প্রবল স্রোত, ঢেউ আর প্রচণ্ড জলকেলিতে টার্বো গিয়ে ওঠে জনমানবহীন ‘বিমিনি’ দ্বীপে। সারারাত অন্ধকার বালুরাশিতে বসে থাকে ২৪-জনের পাগলাবাবার দল শেষ বিচারের প্রতিক্ষায় যেন !
সূর্যালোকে টার্বো-মাঝিরা আবার সবাইকে নিয়ে যাত্রা করে মূল বাহামার দিকে। ১০০০-ডলারের সারারাতের যাত্রা শেষে দুপুরে অভুক্ত ২৪-স্বাপ্নিক আমেরিকাবাসী ক্লান্তি, শ্রান্তি আর একরাশ বিষণ্নতাকে সাথী করে নাসাউর রাস্তায় ঘুরতে থাকে পথহীন পথিকের মত! পাগলাবাবার হৃদয়ে বাজে ক্লান্ত করুণ ঘুঘুর ডাক।
১০/১২ দিন পর হঠাৎ সৈকতে এক বাঙালি ললনার দিকে চোখ পড়ে পাগলাবাবার। কথা হলে বুঝতে পারে সে ‘ত্রিনিদাদ ও টোবাগো’র নাগরিক। তার পূর্বপুরুষ ভারতের ভুপালের। অল্প হিন্দিও জানে মেয়েটি কিন্তু ভারতীয় এথেনিক বিধায় চেহারা বাঙালি ললনার মতই। তার সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করে পাগলাবাবা, সুন্দর চেহারাখানি এখানে প্লাস পয়েন্টের ভূমিকা পালন করে দারুণ। একদিন মায়ামি যাত্রার সব কথা খুলে বলে ত্রিনিদাদ-কন্যা ফিউচার বন্ধু ‘পুজা রত্নাকর’-কে। কেন যেন মায়া কিংবা প্রেম হয় পাগলাবাবার প্রতি পুজার। সে তাকে তার সাথে ত্রিনিদাদ যেতে বলে এবং ওখানের পাসপোর্টে যুক্তরাষ্ট্র ঢোকা সহজতর বিধায়, তাকে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর পাসপোর্ট করে দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। পাগলাবাবা যেন রাজ্য আর রাজকন্যা হাতে পায় এক লটারিতেই। অতএব সানন্দে পুজার সহগামি হয় ঢাকার পাগলা!
পুজার হাতে ধরে ত্রিনিদাদের ‘পিয়ারকো’ বিমানবন্দরে নেমে সোজা চলে যায় পুজার গ্রামের বাড়ি ‘সিপারিয়ায়’, যেখানের অধিকাংশ মানুষই কথা বলে হিন্দি আর ভুপালিতে, যারা ভারত থেকে গিয়েছিল ঐ অঞ্চলে পরিজায়ি পাখির মত অনেক বছর আগে। আখ ক্ষেতের পাশে দরিদ্র পুজাদের কাঠের পাটাতন ঘরে লবনাক্ত সমুদ্রের উথাল বাতাসে আনন্দে দিন কাটে পাগলা বাবার। পুজার পরামর্শে পাগলাবাবা তার বাংলাদেশি পরিচয় গোপন করে কোলকাতার বাঙালি হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয়, যাতে পুজার বাবা সহায়তা করে পাসপোর্টে করতে। ৩-মাসের মাথায় পরিচয়ের সব কাগজপত্র পুজাই ঠিক করে একদিন ‘পোর্ট অব স্পেনে’র পাসপোর্ট অফিস হাজির হয় পাগলাবাবাকে নিয়ে। এর মাঝে হিন্দিতে কথা শিখিয়ে দেয় পাগলাবাবাকে। পুজা পাসপোর্ট অফিসে পাগলাবাবাকে তার ‘স্পাউস’ হিসেবে পরিচয় দেয় ভারত থেকে আসা ‘নবাগত ফিঁয়াসে’ হিসেবে। ৫-দিনের মাথায় পুজা নিয়ে আসে তার “মানবিক স্পাউসের” নতুন দেশের পাসপোর্ট বিনা স্বার্থে, কেবল হয়তো মন কিংবা হৃদয়জনিত কারণে। হায়রে হৃদয় তুই কি বাণিজ্য শিখলি না, এমন কেন হলি?
পাসপোর্ট পেয়ে উতলা পাগলাবাবা পাড়ি জমাতে উদগ্রিব থাকে যুক্তরাষ্ট্রে। ফসলি মাঠের বিদীর্ণ সামুদ্রিক বাতাসে নিজ চোখের চিকচিকে জল চেপে পুজা পাগলাবাবাকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে ক্যানাডা যেতে পরামর্শ দেয়। একদিন ক্যানাডিয়ান এয়ারে বিদায় জানাতে পুজা আসে ত্রিনিদাদের ‘পিয়ারকো’ এয়ারপোর্টে। বোর্ডিংসহ সব নিজেই ঠিক করে দিয়ে, বিদায়ক্ষণে ত্রিনিদাদ-কন্যা আকস্মিক বাঙালি গ্রাম্য নদী-তীরবর্তী কিশোরিতে রূপান্তরিত হয়ে পিয়ারকো বন্দরের বাতাসকে ক্লেদাক্ত করে রিণরিণে কান্নায়। শ্রাবণের অঝোর জলধারায় পাগলাবাবা বুঝতে পারেনা সে কি সিপারিয়ার আখ ক্ষেতের ঝিরঝিরে ছায়ায় ফিরে গিয়ে পুজার হাত ধরবে? নাকি দেশে ফেলে আসা চিন্তিত স্বজনদের মুখে হাসি দেখবে? ঢাকায় প্রায় বছরব্যাপী চিন্তিত স্বজনের মুখ চেয়ে পুজার হাত ছেড়ে ইমিগ্রেশনে এগিয়ে যায় পাগলাবাবা। একটিবারও ফিরে তাকায়না পেছনে এক মুহূর্তের জন্যেও, হয়তো অফ্রিয়াসের সাইরেনের বাঁশির মত পুজা তাকে আটকে দেবে এ ত্রিনিদাদে। হায় হৃদয় ! হায় প্রেম ! তুই কেন এলে বিশ্বে?
বোয়িং ৭৪৭-এ৩ সুপরিসর জ্যাম্বোজেটে কিছুই মুখে দিতে পারেনা পাগলাবাবা। পুজা বিমানের সর্বত্র তাকে ছিন্নভিন্ন আর রক্তাক্ত করতেই থাকে। চালক, ক্রু আর বিমানবালা হয়ে পুজা বিমানকে লণ্ডভণ্ড করতে থাকে ক্রমাগত ক্যারিবিয়ান সামুদ্রিক ঝড় হয়ে। হঠাৎ বুক ফেটে প্রচণ্ড শব্দে তা প্রকাশিত হয় পাগলাবাবার হৃদয় জুড়ে! পাশের সিটে বসা বিদেশি সহযাত্রী বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করে, “Any thing wrong”? অনেকটা ধাক্কা দিয়ে ককপিট থেকে পুজাকে পিয়ারকোতে ফেলে এক সময় টরোন্টোতে নামে ব্যোমযান। নানা প্রশ্নের পর পুলসিরাত পার হয় পাগলাবাবা। নানা সংগ্রাম, ঘাত-প্রতিঘাত, জেল-জীবন আর দু:খের সাথে লড়াই করতে করতে প্রায় ৪-বছর চলে যায় ওন্টারিও আর টরেন্টোতে। অবশেষে একদিন পেয়ে যান কানাডার পাসপোর্ট। এক সময় স্ত্রী আর সন্তানকে নিয়ে যান সেখানে জীবন বাস্তবতায়। ছেলেটি এখন বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে ভাল বেতনে জব করে টরোন্টোতে, আর মেয়েটি পড়ে পাবলিক স্কুলের গ্রেড-টেনে। আমিও হয়তো একদিন দেখতে যাব তার টরেন্টোর সংসার, পাগলাবাবার এমনই ইচ্ছে আমাকে নেয়ার।
সময়ের পেন্ডুলামে ২৫-বছর কাটানোর পর এ লেখকের সাথে এ গল্প যখন বলছিলো ‘পাগলাবাবা’ তার ঢাকার ফ্লাটে, তখন পুজা আর তার সিপারিয়া গাঁয়ের স্মৃতিতে এ পৌঢ় বয়সেও অঝোরে কাঁদলো ‘পাগলাবাবা’। জানিনা এক অচেনা বন্ধু ‘পাগলাবাবা’ আর তার ত্রিনিদাদ বন্ধু ‘পুজা’র জন্যে এ লেখকের চোখও কেন আংশিক ভিজে উঠেছিল সেদিন? এ কথা কি জানে এ মহাবিশ্বের পুজা, সিপারিয়া গাঁ, আর ত্রিনিদাদের মানুষ? পুজা কি এখনো বাস করে পাগলাবাবার স্মৃতি নিয়ে সিপারিয়া গাঁয়ে? এখনো কি সেখানের সামুদ্রিক বাতাস পুজা আর পাগলাবাবার ম্মৃতিগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে ঘুরতে থাকে সিপারিয়া গাঁ আর ক্যারিবিয় সাগরে? এ বাতাস কি ছুঁয়ে যায় টরেন্টোর পাগলবাবাকে আর সিপারিয়ার পুজাকে?
[সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত]

স্বপ্নভঙ্গের ইতিকথা (দ্বিতীয় পর্ব-পঞ্চম কিস্তি)

মোঃ জানে আলম
নিষিদ্ধ রাজনীতি :পতেঙ্গায় শেখ মুজিব গণপাঠাগার
দেশে চলছে সামরিক শাসন। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান-একাত্তুরের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা-একটি সেক্টরের কমাণ্ডার-প্রধান সামরিক প্রশাসক। অথচ দেশে বিরাজ করছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী আবহ। একাত্তুরের স্বাধীনতা বিরোধীরা যেন হিংস্র শ্বাপদের মত গর্ত থেকে বের হয়ে আসছে একে একে। রাষ্ট্রীয়ভাবে পুণর্বাসিত হচ্ছে। দেশটাকে তারা আবার পাকিস্তান বানানোর স্বপ্নে বিভোর।
পক্ষান্তরে শেখ মুজিব, মুক্তিযুদ্ধ, ইত্যাদি শব্দাবলী দেশে যেন নিষিদ্ধ। রেডিও-টেলিভিশনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনুপস্থিত। স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে সরকারী মিডিয়াতে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস প্রচার করা হয় না। এমনকি কারা ছিল হানাদার বাহিনী, কাদের বিরুদ্ধে বাঙালি যুদ্ধ করেছে তা কিছুই বলা হয় না।
এহেন বৈরী পরিস্থিতিতে সম-মনাদের সংগঠিত করার কৌশল হিসাবে আলম সম মনা যুবকদের সমন্বয়ে গড়ে তুলে শেখ মুজিব গণপাঠাগার। মুসলিমাবাদের আইয়ুব আলী বাটলারের বাড়ীর পুকুর পাড়ে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে পাঠাগারের সাইনবোর্ড লাগানো হয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জনাব শফিকুর রহমান উদ্যোক্তাদের কিছু টেবিল চেয়ার ও বইয়ের র্যাক কেনার ব্যবস্থা করে দিলেন। কিছু বইও সংগ্রহ করল উদ্যোক্তারা। পাঠাগারকে কেন্দ্র করে পতেঙ্গা এলাকার কিছু তরুণ প্রজন্ম আবারো সংগঠিত হতে লাগল।
আলমের সহমুক্তিযোদ্ধা মো: ফছিউল আলম ও আবুল কালাম, সহপাঠি মো: রফিকুল ইসলাম, তরুণ আওয়ামী লীগ কর্মী নুরুল হুদা, মো: ইছহাক, প্রতিবাদী ছাত্র আলী আজম প্রমুখ পাঠাগারের উদ্যোক্তাদের মধ্যে আছে। পাঠাগারে সপ্তাহে একদিন বিকাল বেলা পাঠচক্রের উদ্যোগ নেওয়া হল। সে পাঠচক্রে রিসোর্স পারসন হিসাবে শহর থেকে এডভোকেট কাজী গোলাম সারোয়ার, এডভোকেট আনোয়ারুল কবির ও এডভোকেট আনোয়ারুল কবির চৌধুরী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকেন। সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ, রাজনৈতিক অর্থনীতি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও তার বাস্তবায়নের পথ, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ও তৎপরবর্তী দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ইত্যাকার বিষয়ে আলোচনা করত শহর থেকে আগত আলোচকবৃন্দ।
ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের তরুণ কর্মীরা পাঠচক্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে এবং তারা মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনার গতিপ্রকৃতি উপলব্ধি করতে শুরু করে। আলম প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে আলোচকদের আলোচনা শ্রবণ করে, বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আলোচকদের প্রশ্ন করে। এ পাঠচক্রে অংশ গ্রহণ করে আলমের কাছে সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা অনেকটা পরিস্কার হতে থাকে। বিশেষভাবে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে আলমের ধারণা ছিল অনকেটা ভাসা ভাসা। এ পাঠচক্রে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের প্রতি তার উৎসাহ ও আগ্রহ তীব্র হয়ে ওঠে।
বঙ্গবন্ধু কেন সকল রাজনৈতিক দল অবলুপ্ত করে বাকশাল নামক একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন-সেটা আলমের বোধগম্য ছিল না। এ পাঠচক্রে অংশ গ্রহণের পর সে এখন বঙ্গবন্ধুর একক জাতীয় দল গঠনের একটি ব্যাখ্যা খুঁজে পায়। সে জানতে পারে, বিশ্বে যে সকল দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয়েছে-সেখানে একটি একক বিপ্লবী পার্টির নেতৃত্বেই তা হয়েছে। গণতন্ত্রেরও একটি নতুন সংজ্ঞা খুঁজে পায় আলম-জনগণতন্ত্র। বঙ্গবন্ধু যাকে শোষিতের গণতন্ত্র বলে উল্লেখ করেছেন-তার বাকশাল গঠনকালীন ভাষণে।
আলম আশা করেছিল, চরম এ রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে তাদের এ সাহসী উদ্যোগ অন্তত আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের সমর্থন সহযোগিতা পাবে। কিন্তু আলম অবাক বিস্ময়ে দেখল, আওয়ামী লীগের নগর নেতাদের কেহ কেহ ভীষণ মনক্ষুণ্ণ হল। গহিরায় শেখ মুজিব গণপাঠাগার আছে বলে পতেঙ্গায় সে নামে পাঠাগার করা যাবে না মর্মে পত্রিকায় বিবৃতি আসল। জবাবে গ্রামে গ্রামে শেখমুজিব গণপাঠাগার গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে পাল্টা বিবৃতি পাঠানো হল। আওয়ামী লীগের নগর নেতৃত্ব শেখ মুজিব গণপাঠাগার আয়োজিত রাজনৈতিক পাঠচক্রের তীব্র বিরোধীতা করে শহর থেকে আসা আলোচকদের না আসার জন্য প্রথমে বারণ এবং পরে রীতিমত হুমকী প্রদান করতে লাগল। প্রথমে বিষয়টি আলমের মোটেও বোধগম্য হয় না।
পরিশেষে আলম বুঝে, এ নাজুক অবস্থায় আওয়ামী নেতৃত্বের মধ্যে এ কেবল নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নয়-আদর্শের দ্বন্ধ। আলম এ প্রথম বুঝতে পারল, বঙ্গবন্ধু যে সকল নেতা-কর্মী নিয়ে সমাজতন্ত্র করতে চেয়েছিলেন, সে সকল নেতা-কর্মীদের অনেকেই সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসও করত না। অনেকের আবার সমাজতন্ত্র সম্পর্কে কোন ধারণাও ছিল না।
যারা সমাজতন্ত্র, তথা সমাজের প্রগতিশীল পরিবর্তনের পক্ষে ছিল না, তারা আওয়ামী লীগ, যুব লীগ এবং ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের প্রতি ভীতশ্রদ্ধ ছিল। আলম অবাক-বিস্ময়ে দেখল, আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সংগঠনগুলোর সভা-সমাবেশে রুশ-ভারতের দালালেরা হুশিয়ার, সাবধান ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ-ধ্বংস হউক, নিপাত যাক” এ দুই পরস্পর বিরোধী শ্লোগান ধ্বনিত হতে লাগল। এ আদর্শিক দ্বন্ধের শিকার শেখ মুজিব গণপাঠাগার।
সামরিক সরকারী গোয়েন্দা বাহিনীর নজরে পড়ে শেখ মুজিব গণপাঠাগার। ঘন ঘন গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা শেখ মুজিব গণপাঠাগার পরিদর্শন করতে থাকেন এবং আলমসহ পাঠাগারের উদ্যোক্তাদের নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে লাগল-পাঠাগারের আড়ালে কোন রাজনীতি করা হচ্ছে কিনা জানার জন্য বস্তুত তারা ছিল উদগ্রীব।
গোয়েন্দাদের তৎপরতা বুঝতে পেরে আলমেরা ও তাদের পাঠচক্রের কৌশল পাল্টাল। গোয়েন্দাদের দৃষ্টি এড়ানোর জন্য পাঠচক্রের স্থান কখনো কখনো পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বেড়িবাঁধের পাদদেশে স্থানান্তর করা হল। অংশগ্রহণ কারীদের হাতে থাকত কবিতার বই। কোন আগুন্তুক আসলে শুরু হত কবিতা পাঠের আসর।
ইতোমধ্যে আলম ইস্টার্ন রিফাইনারী লি: নামক একটি জ্বালানী তেল শোধনাগারে চাকুরী পায় একজন ল্যাবরেটরী টেকনিশিয়ান হিসাবে । সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ক,খ, অ, আ, পাঠ করে সে জানত পেরেছে-সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে মেহনতি শ্রমিক শ্রেণীর ভূমিকা হয় অগ্রণী। তাই আলম ভাবতে লাগল-সমাজ বিপ্লবের কাজ করার জন্য সে যেন নতুন একটি ক্ষেত্র খুঁজে পেয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করার মাধ্যমে সে দেশের শ্রমিক আন্দোলনে সংযুক্ত হতে পারবে।
১৯৭৮ ইং সালের জানুয়ারী মাস। ইস্টার্ন রিফাইনারী লি: এর শ্রমিক-কর্মচারীরা তাদের দাবীনামা আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করে। প্রতিষ্ঠানে একজন শ্রমিক হিসাবে অত্যন্ত নবীন হওয়া সত্ত্বেও আলম সে আন্দোলনে সক্রিয় কর্মীর ভূমিকা গ্রহণ করে। ফলত: শ্রমিকদের মধ্যে তার একটি পরিচিতি গড়ে ওঠে। তবে তখনো দেশে প্রচলিত শ্রম আইন সম্পর্কে তার কোন সম্যক ধারণা ছিল না। আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ধর্মঘটে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু আইনগত দিক থেকে এ ধর্মঘট ছিল বেআইনী। প্রথমত: দেশে তখন জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসন-রাজনৈতিক তৎপরতার সাথে ট্রেড ইউনিয়ন কর্মকাণ্ডও নিষিদ্ধ। তদুপরি ইস্টার্ন রিফাইনারী এমপ্লয়ীজ ইউনিয়ন(সিবিএ) সর্বশেষ কর্তৃপক্ষের সাথে যে চুক্তি করেছিল, তার মেয়াদ তখনো এক বছর বাকী। চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল চুক্তি বলবত থাকাকালীন সময়ে নতুন কোন অর্থনৈতিক দাবী উত্থাপন করা যাবে না। তারপরও নবনির্বাচিত ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ ধর্মঘট আহ্বান করে।
ধর্মঘট যখন শুরু হয়, তখন শ্রমিক-কর্মচারীরা কারখানার বাইরে অবস্থান নেয়। কর্তৃপক্ষ নির্বিঘ্নে কর্মকর্তাদের সাহায্যে কারখানা টিম্ টিম করে চালিয়ে রাখে। সিবিএ নেতৃবৃন্দ রীতিমত আত্মগোপনে। ধর্মঘট ডেকে কারখানা চত্বর ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে শ্রমিকদের এক সভায় আলম বিরোধীতা করে বক্তব্য রাখলে তাকে সিবিএ নেতাদের তোপের মুখে পড়তে হয়।
পরিশেষে ধর্মঘটের ৪ দিনের মাথায় ধর্মঘট আর ধরে রাখা গেল না। মাথা নত করে শ্রমিক নেতারা কারখানায় প্রবেশ করল। পরাজিত বাহিনীর সামনে বীরদর্পে কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী ড. আজিজুর রহমান ধর্মঘটী শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে তার বিজয়ী ভাষন দিলেন। শ্রমিক রাজনীতির শুরুতেই নেতৃত্বের অদূরদর্শিতার কারণে প্রচণ্ড একটি ধাক্কা খেল আলম। যদিও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন, পরিচালনা কিংবা নীতি নির্ধারণে ক্ষেত্রে কোন ভূমিকাই তার ছিল না তথাপি পরাজয়ের গ্লানি তাকে ভীষণ বিমর্ষ করল। জাতীয় রাজনীতির পরিপূরক হিসাবে শ্রমিক আন্দোলনেও আত্মনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিল আলম।

স্বপ্নভঙ্গের ইতিকথা (দ্বিতীয় পর্ব-ষষ্ঠ কিস্তি)

সেনাশাসনের বুটে পিষ্ট মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
১৯৭৫ এর ৩রা নভেম্বর, খালেদ মোশাররফের অভ্যূত্থানের পরিণতিতে ৬ নভেন্বর খন্দকার মোস্তাক ক্ষমতাচ্যূত হন। প্রায় ৮২ দিনের শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিমূলে একের পর এক আঘাত হেনে বাংলাদেশকে অনেকটা পাকিস্তানমুখী করে তুলেছিল খুনী মোশতাক। এমনকি পাকিস্তানের সাথে নতুন করে কন্ফেডারেশন করার উদ্যোগও গ্রহণ করেছিল সে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে, সেটা হয়ত ভাবতে পারে নি খন্দকার মোশতাক। তার পদত্যাগে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে শপথ নেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মো: সায়েম। খালেদ মোশাররফের অভ্যূত্থান ব্যর্থ হওয়ার প্রেক্ষিতে মেজর জিয়াউর রহমান গৃহবন্ধী থেকে মুক্ত হয়ে আবারো সেনাবাহিনী প্রধান হন এবং উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন।
পরিস্থিতির বরপুত্র মেজর জিয়াউর রহমান-একাত্তুরের ২৭ সে মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে যেমন প্রথম বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা হিসাবে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা প্রদান করার সুযোগ পেয়ে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান, ঠিক তেমনি এবারও হঠকারী কর্ণেল তাহেরের নেতৃত্বে সংগঠিত সেনা বিদ্রোহ খালেদ মোশারফের অভ্যূত্থানকে ব্যর্থ করে দেওয়ার ফলে পদচ্যূত, বন্ধী জিয়াউর রহমান পুন: সেনাবাহিনী প্রধান ও উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হলেন।
অত:পর ১৯৭৬ ইং সালের নভেম্বর মাসে রাষ্ট্রপতি সায়েম এর কাছ থেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব কেড়ে নেন মেজর জিয়া । ১৯৭৭ ইং সালের এপ্রিল মাসে এসে আর লোভ সামলাতে পারলেন না জিয়া- সায়েমকে অসুস্থ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদটাও তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে মেজর জিয়া দেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নেওয়ার পর জিয়ার আসল চেহারা উম্মোচিত হতে থাকে ক্রমান্বয়ে। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ তাকে গ্রাস করতে থাকে ক্রমে। তাই সামরিক প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি জিয়া এবার ১৯ দফা রাজনৈতিক কর্মসূচী প্রণয়ন করেন এবং তার ক্ষমতারোহনকে বৈধতা দেওয়ার প্রত্যাশায় ঐ বছর মে মাসে গণভোটের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
হ্যাঁ, না, ভোট। কোন প্রতিদ্বন্ধী থাকবে না। জনগণ একতরফাভাবে ভোট দেবে। হ্যাঁ ভোট বেশি হলে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসাবে বৈধ হবেন, না ভোট বেশি হলে কী হবে বলা নেই। তবুও ভোট অনুষ্ঠিত হল কোটি কোটি টাকা খরচ করে, সরকারী আমলাদের সাহায্যে-৩০ মে, ১৯৭৭ ইং সালে। আলম পতেঙ্গা এলাকার প্রায় প্রতিটি ভোট কেন্দ্র ঘুরে ঘুরে দেখে। কোন ভোট কেন্দ্রেই পুলিশ আনসার ও নির্বাচনী কর্মকর্তা ব্যতীত ২০/৩০ জন সাধারণ ভোটার উপস্থিত ছিল না। অথচ নির্বাচন কমিশন ফল ঘোষণা করল ৯৮% এর বেশি হ্যাঁ ভোট পড়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এহেন মিথ্যাচার !
১৫ই আগস্টের অভ্যূত্থান পরবর্তী খুব দ্রুত ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহের এক পর্যায়ে মেজর জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নিলেন, তখন নানা দু:খ, বেদনা ও হতাশা সত্ত্বেও আলমের মনে আশার ক্ষীণ শিখা জ্বলছিল এই ভেবে যে, সবকিছুর পরও জিয়াউর রহমান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা-মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এবং বঙ্গবন্ধুর নামে চট্টগ্রাম রেডিও থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানকারী। অন্তত মোশতাকের মত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না জিয়া। বঙ্গবন্ধু নিহত হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরবে না বাংলাদেশ। নিশ্চয় বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার করবে মুক্তিযোদ্ধা জিয়া। বাংলাদেশ জিন্দাবাদের পরিবর্তে একাত্তুরের সে রক্ত-কাঁপানো শ্লোগান-জয় বাংলা-আবার ফিরে আসবে জাতীয় জীবনে। বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতার ভাবমূর্তি আবারো পুন: প্রতিষ্ঠিত হবে।
কিন্তু না, হা হতোস্মি ! এসব কিছুই হল না। প্রথম যে ন্যাক্কারজনক কাজটি করলেন মেজর জিয়া, তাহল বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচারের হাত থেকে অব্যাহতি দিয়ে মোশতাক যে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারী করেছিল, আইনী প্রক্রিয়ায় তার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ায় ১৯৭৭ ইং সালে নতুন একটি অধ্যাদেশ জারী করে জিয়া সে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মেয়াদ বৃদ্ধি করলেন। ১৯৭৭ এর মে মাসে তামাসার গণভোট সম্পন্ন করার পর এবার ১৯৭৮ ইং সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘোষণা করলেন। সেনাবাহিনী প্রধান পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় জিয়াউর রহমান নিজে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হলেন-যা সুস্পষ্ট সংবিধান পরিপন্থী। তার প্রতিদ্বন্ধী হিসাবে বিপর্যস্থ আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রার্থী হলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্ণেল এম,এ,জি, ওসমানি।
১৯৭৮ ইং সালে ঘরোয়া রাজনীতির সুযোগ নিয়ে অনুষ্ঠিত কর্মী সম্মেলনে আলম দক্ষিণ পতেঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হল। সে সুবাদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কর্ণেল ওসমানীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেয় আলম। পতেঙ্গা-হালিশহর এলাকায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনী সভা ছাড়াও পশ্চিম পটিয়ার কয়েকটি জনসভায়ও আলম বক্তৃতা করে বেড়াল। প্রচণ্ড প্রতিকুলতার মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণায় একজন তুখোড় বক্তা ও প্রচারকর্মীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হল আলম।
স্থানীয় পর্যায়ের সভা-সমাবেশগুলোতে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ভাষায় আলম বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিত। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তখন পর্যন্ত জানা ঘটনার আবেগময় বর্ণনা শয়ে শয়ে দর্শক শ্রোতা তম্ময় হয়ে শুনত। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচারের দাবী জানাত আলম এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সম্মুন্নত রাখার জন্য এম,এ,জি ওসমানীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাত। কিন্তু ইতিমধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে অনেক সুবিধাবাদী লোকজন, বিশেষভাবে জামাত, মুসলিম লীগ সহ স্বাধীনতা বিরোধী স্থানীয় হোমরা-চোমরা ব্যক্তিরা জুটে গেল জিয়ার পক্ষে। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের মাধ্যমে মারাত্মক ভাবে বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগ সারা দেশ ব্যাপী পরিচালিত একক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন মোকাবেলা করার মত সাংগঠনিক অবস্থা তখনো গড়ে তুলতে পারে নি। তাছাড়া প্রশাসনও ছিল সম্পূর্ণ বৈরী। ফলাফল যা হওয়ার তাই হল। বিপুল ভোটের ব্যবধানে ওসমানী হারলেন। জিয়াউর রহমান পেলেন ৭৬ শতাংশের উপর, আর ওসমানী পেলেন ২১ শতাংশের উপর। অবশ্য এটা পূর্ব থেকেই ধারণা করা ছিল যে, এ নির্বাচনে জিয়াউর রহমানই জিতবে। হারার জন্য তিনি নির্বাচন দেন নি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে তিনি উপরাষ্ট্রপতি নিয়োগ করলেন। অত:পর তিনি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে মনোনিবেশ করলেন। স্বাধীনতা বিরোধী জামাতে ইসলামী, মুসলিম লীগ সহ চরম ডানপন্থী দলগুলো এবং কট্টরপন্থী বাম-যারা বস্তুত: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে মাংশ নিয়ে দুই কুকুরের কামড়া-কামড়ি বলে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল-সে সকল দলের নেতা-কর্মীদের সমন্বয়ে তিনি প্রথমে জাতীয় গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) এবং পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) নামক রাজনৈতিক দলের জন্ম দিলেন। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা বাঙালি জাতিয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের শ্লোগানকে তিনি সামনে নিয়ে আসলেন। মুসলিম লীগের নেতা শাহ আজিজুর রহমান-যিনি জাতিসঙ্গে গিয়ে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তৃতা করেছিলেন-তাকেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী করলেন। স্বাধীনতা বিরোধীদের গুরু গোলাম আজমকে-স্বাধীনতার অব্যবহিত পর যিনি পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং যার নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছিল-তাকে দেশে আসার সুযোগ করে দিলেন। অত:পর জামাতে ইসলামীর পলাতক নেতারা একে একে দেশে পুনর্বাসিত হতে লাগলেন। তারই প্রশ্রয়ে পুনর্গঠিত হতে লাগল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নতুন ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবির।
গোলাম আজমের দেশে ফেরার প্রতিবাদে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আন্দোলন
১৯৭৮ ইং সালেই আলম মুক্তিযোদ্ধা সংসদে যোগদেয় এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বন্দর থানা কমান্ডের কমান্ডার নির্বচিত হয়। কুখ্যাত গোলাম আযমের দেশে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ প্রদানের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তখন সারা দেশব্যাপী একটি আন্দোলন গড়ে তুলে। সারা দেশে প্রতিটি জেলায় সংসদের উদ্যোগে সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম নগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার যৌথ উদ্যোগে চট্টগ্রামে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হতে লাগল। বন্দর থানার কমান্ডার হিসাবে আলম প্রায় সকল প্রতিবাদ সভা-সমাবেশে উপস্থিত থেকে বক্তৃতা করত। পতেঙ্গা থেকে মিরেশ্বরাই, দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া, চন্দনানইশ, লোহাগড়া, সাতকানিয়া, চকরিয়া প্রভৃতি থানায় থানায় অনুষ্ঠিত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ আয়োজিত সভা-সমাবেশে আলম উপস্থিত থেকে বক্তৃতা করে বেড়াতে লাগল। কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বানে সারাদেশ ব্যাপী হরতালও পালিত হল। কিন্তু সেনাশাসক জিয়াউর রহমান গোলাম আজমের নাগরিকত্বের ব্যাপারে কোন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন না। বরং গোলাম আজমের দায়ের করা রীট মামলায় আইনের ফাঁক-ফোকড় দিয়ে গোলাম আজম তার নাগরিকত্ব ফেরত পেলেন। অত:পর গোলাম আজম পূর্ণোদ্যমে জামায়াতের রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করলেন।
মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনানায়ক যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন, তখন একজন স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধী দেশে পূনর্বাসিত হলেন। ব্যর্থ হল মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আন্দোলন। অথচ মু্ক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রায় সকলে রাষ্ট্রপিত জিয়াউর রহমানের আশীর্বাদপুষ্ঠ ছিলেন । মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বিভিন্ন সভায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাথে আলমের প্রায় বিতর্ক হত। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ঘোষণা যখন প্রদান করা হচ্ছিল, তখন মুক্তিযোদ্ধার নয়- মুক্তিযুদ্ধের পুনর্বাসন চাই-এমন একটি শ্লোগানের পক্ষে ছিল আলম। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের এক সভায় সংসদের কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান বক্তৃতায় বললেন-মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবের কোন অবদান নেই।
জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বানানোর প্রয়াস চলতে লাগল। তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পতাকা তলে সমবেত মুক্তিযোদ্ধা নিজেদের সুযোগ-সুবিধা আদায়ের সংগ্রামে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অবশ্য নিরীহ ও হতদরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থন আদায়ের জন্য নানা টোপও দিচ্ছিল জিয়াউর রহমান। আশাহত হয়ে আলম মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে পদত্যাগ করে চলে আসতে বাধ্য হলেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন: প্রচণ্ড প্রতিকূলতায় আওয়ামী লীগ
১৯৭৮ ইং সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ ইং সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারী জাতীয় সংসদের নির্বাচন ঘোষণা করলেন। ঐ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ বন্দর-ডবলমুরীং নির্বাচনী এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হলেন স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে ১৯৭০ ইং সালের নির্বাচনে এ এলাকা থেকে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য জনাব ইসহাক মিঞা (চেয়ারম্যান)। বিএনপি থেকে প্রার্থী হলেন-পারিবারিকভাবে স্বাধীনতা বিরোধী সাবেক মুসলিম লীগার ব্যারিষ্টার সুলতান আহমদ। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী প্রচারণা সুষ্ঠভাবে পরিচালনার জন্য উত্তর পতেঙ্গা, দক্ষিণ পতেঙ্গা ও দক্ষিণ হালিশহর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ একটি যৌথ নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেন। জনাব ইসহাক মিঞার নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহ করার জন্য আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের কাছ থেকে ৫০ টাকা, ১০০ টাকা করে চাঁদা সংগ্রহ করা হল। অত:পর এ তিনটি ইউনিয়নে সমন্বিত কর্মসূচী প্রণয়ন করে সভা-সমাবেশ-মিছিল অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হল। নির্বাচনী প্রচারে নেমে আলম লক্ষ্য করল, বিএনপি তখন চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষকে নিদারুন ভাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রচারে কাজে লাগাচ্ছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে, রুটি-তাওয়া-বেলুন লঠকিয়ে তারা সাধারণ মানুষদের চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে লাগল। তাদের এ প্রচারণা সাধারন মানুষ, বিশেষ ভাবে মহিলাদের মধ্যে দারুন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে সক্ষম হল।
এতবড় যুদ্ধের সাফল্য, দেশের স্বাধীনতা অর্জন, সব কিছু ভুলে মানুষ কেবল চুয়াত্তর সালে চালের দাম, নুনের দাম, মরিচের দাম কত হয়েছে এসব প্রশ্ন করত। এহেন প্রতিকুল পরিবেশেও আলম তার সহকর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী প্রচার আপোষহীনভাবে চালিয়ে যেতে লাগল। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ যে কৃত্রিম, আমেরিকার যড়যন্ত্র, ফিডেল কা্স্ট্রোর কিউবায় চটের থলে রপ্তানী করার অজুহাতে আমেরিক পিএল ৮৪ এর গমের জাহাজ অর্ধপথ থেকে ফেরত নিয়ে যাওয়া, ইত্যাকার বিষয় তার বক্তৃতায় বলতে বলতে গলদঘর্ম হয়ে যেত আলম। স্বাধীনতা উত্তর সময়ে সাধারণ মানুষের জন্য আসা বিভিন্ন রিলিফ সামগ্রী বিতরণ নিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের অনিয়মের অজস্র অভিযোগ এর মুখোমুখী হতে হত তাদের। তবুও হাল না ছেড়ে ক্লান্তিহীন প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যেত আলম ও তার সহকর্মীরা।
নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে কিছু কিছু জায়গায় সংঘর্ষেও ঘটনাও ঘটতে থাকল।
একদিন সকালে ওঠে আলমেরা দেখল, চট্টগ্রাম স্টিল মিলের প্রধান ফটক হতে সিমেন্ট ক্রসিং পর্যন্ত শয়ে শয়ে বঙ্গবন্ধুর কুশপুত্তলিকা বানিয়ে তার হাতে রুটি-তাওয়া-বেলুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ছাবের কন্ট্রাক্টর ছিলেন এর নাটের গুরু। আলমেরা গোপনে সিদ্ধান্ত নিল একটি মিছিল নিয়ে এক সাথেই এসব সরিয়ে ফেলতে হবে। স্টিল মিল বাজারে অনুষ্ঠিত হল এক নির্বাচনী সভা। রাত প্রায় ৯-০০ঘটিকার সময় সে সভা যখন সমাপ্ত হল, তখন একটি মিছিল সিমেন্ট ক্রসিং এর দিকে রওয়ানা দিল। এক পর্যায়ে পরিকল্পনা মাফিক সে মিছিল জঙ্গীরূপ ধারণ করল। পথের দুপাশে এবং সড়ক দ্বীপে বঙ্গবন্ধুর যত কুশ পুত্তলিকা ছিল একে একে সবই উপড়ে পেলে ভেঙ্গে চুরমার করে দেওয়া হল। চুঁড়ে ফেলা হল রশী দিয়ে ঠাঙানো সকল রুটি-তাওয়া বেলূন উপড়ে ফেলা হল। লাঠিসোটা নিয়ে সিমেন্ট ক্রসিং সংলগ্ন ছাবের কন্ট্রাকটরের বিল্ডিয়ে জমায়েত বিএনপি’র কর্মীরা মিছিলের পেছনে হামলা করার চেষ্টা করলে পূর্বে থেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত কর্মীরা পাল্টা হামলা চালালে বিএনপির নেতা-কর্মীরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হল।
এভাবে সারা দেশে নানা সংঘাত-সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। এ এলাকায় যেমন জিততে পারল না ইছাক চেয়ারম্যান, সারাদেশেও ৩০০ আসনের মধ্যে ২২০ টি আসন পায় নবগঠিত জাতীয়তাবাদী দল।
সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়াউর রহমান দেশে বাকশাল পদ্ধতি রহিত করে বহুদলীয় পদ্ধতি ঘোষণা করলেও ৪র্থ সংশোধনীতে প্রণীত রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার বহাল রাখলেন। ফলত: তার অধীনে নির্বাচিত সংসদ বস্তুত: তারই রাবার ষ্টাম্প হয়ে রইল।
এই সংসদের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ ইং সালে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সংবিধানের অংশে পরিণত করলেন-যার অর্থ দাঁড়াল বঙ্গবন্ধু ও পরবর্তী সময়ে নিহত ৪ জাতীয় নেতা হত্যাকারীদের কোন বিচার করা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী পাকিস্তান আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অভিসিক্ত করতে লাগলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে মোশতাক যে ভাবে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশকে পাকিস্তানমুখী অভিযাত্রার রথে সওয়ার করিয়েছিল-এবার সে রথের হাল ধরলেন একাত্তুরের একজন মুক্তিযোদ্ধা-সেক্টর কমান্ডার। ওল্টো রথে চলল বাংলাদেশ! —–চলবে।

‘ভাষাসৈনিক গোলাম আযম’: একটি গোয়েবলসীয় প্রচারণার ব্যবচ্ছেদ
এই লেখাটির বড় অংশ অভিজিৎ’দার। সুতরাং কৃতজ্ঞতায় গুরুজি
২১শে ফেব্রুয়ারি। আমাদের আবেগের দিন, আমাদের গর্বের দিন। এদিন আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি সালাম, রফিক, বরকত সহ সকল শহীদের আত্মত্যাগকে। কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি আবদুল মতিন, গাজীউল হক, কাজী গোলাম মাহবুব, কামাল লোহানী প্রমুখ ভাষা সৈনিকদের অবদানকে। আমাদের হৃদয়ের অর্ঘ্য দিয়ে বরণ করি, পুষ্পমন্ডিত করে তুলি আমাদের প্রাণপ্রিয় শহীদ মিনারকে। কিন্তু এমন দিন এলেই আপনি যদি শোনেন এক কুখ্যাত রাজাকার, যার একাত্তরে কৃতকর্মের জন্য, তার মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য নব্বই বছরের সাজা দিয়েছে মাননীয় আদালত, এমন একজন লোক ‘ভাষা সৈনিক’ সাজতে চাইছে, কেমন লাগবে শুনতে?
সেটাই কিন্তু করা হচ্ছে। এ প্রচারণা শুরু হয়েছিল সম্ভবত নব্বইয়ের দশকে। হঠাৎ করেই দেখা গেলো কিছু নামগোত্রহীন পত্রিকায় আসতে শুরু করল ‘ভাষা সৈনিক’ হিসেবে গোলাম আযমের নাম। ঢাকার দেওয়াল টেওয়ালেও জামাত শিবিরের কিছু শ্লোগান দেখা যেতে শুরু করল–‘ভাষাসৈনিক গোলাম আযম’। প্রথম দিকে কেউ তেমন গা করেনি। কিন্তু পরে যত দিন গেছে ততই গোয়েবলসীয় কায়দায় জাঁকিয়ে বসেছে এই প্রচারণা। একটা উদাহরণ দেয়া যাক :
“…ভাষা আন্দোলননিয়ে আজ যারা বড় বড় কথা বলছেন, তাঁদের মনে রাখা উচিত ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন আবুল কাশেম ও অধ্যাপক গোলাম আযম।। প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলীর সামনে সাহস করে বাংলাকে রাষ্ট্র করার দাবিতে স্মারকলিপি পেশ করেছিলেন গোলাম আযম । অথচ, ইতিহাস থেকে পরবর্তীতে তার নামটি মুছে ফেলাহয়েছে। দেশের বুদ্ধিজীবীরা তো অন্তত বলতে পারেন“লোকটা খারাপ, তবে এ ভাল কাজটা ভালো করেছে (ভাষা আন্দোলন)।গোলাম আযমকে গালি দিয়ে হলেও তো তারা কথাটি বলতে পারেন। অথচ, আজ ইতিহাস বিকৃত করে নতুন নতুন ভাষা সৈনিক সৃষ্টি করা হচ্ছে…”(জনকণ্ঠ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১১)
কথা গুলো বলছিলেন জামায়াতের আমীর মকবুল আহমাদ, জামায়াত আয়োজিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক আলোচনা ও দোয়া মাহফিলে। জামাতের আমীরের এই বক্তব্য ছাড়াও প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে সারা শহর ছেয়ে যায় নিচের পোস্টারের মত ভয়ঙ্কর পোষ্টারে।

এছাড়াও দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার বিভিন্ন লেখায় অহরহ গোলাম আযম কে ভাষা সৈনিক দাবী করা হয়। তারই একটি উদাহরণ,

গোলাম আজমের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও তাকে ভাষা সৈনিক দাবী করা হয়েছে বলিষ্ঠ কণ্ঠে,

এছাড়াও জামাআতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের ওয়েবেও পাওয়া গেলো একই উচ্চারণ,

১৯৭১ সালে জামাআতে ইসলামী’র আমীর এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড গোলাম আযমকে নিয়ে বরাবরই বিভিন্ন প্রোপ্যাগান্ডা শোনা যায় তার সমর্থকগোষ্ঠীর মুখে। এর মধ্যে সবচেয়ে রসালো প্রচারণাটি হচ্ছে গোলামআযমকে ভাষা সৈনিক প্রমাণ করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। ফেব্রুয়ারি এলেই এই ইস্যু নিয়ে শুরু হয় নানা রকম রকমারি বাণিজ্য। আমাদের এই লেখার উদ্দেশ্য থাকবে সমস্ত তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা দাবীটির সত্যতা কতটুকু, এবং এই বিষয় নিয়ে সমস্ত বিভ্রান্তি দূর করার বস্তুনিষ্ঠ প্রয়াস।
প্রথমে উপরে দেয়া ছবিগুলোর দিকে তাকানো যাক। উপরের ছবি গুলো থেকে একটা কথা তো পরিষ্কার যে জামাত-শিবির এবং তাদের ঘরনার মিডিয়া গুলো প্রকাশ্যে প্রচার করে আসছে গোলাম আযম ভাষা সৈনিক। এখন দেখা যাক ভাষা আন্দোলনে গোলাম আযম কি কি অবদান রেখেছেন বলে দাবী করা হচ্ছে।
প্রথমেই আমরা দেখি গোলাম আযমের নিজের জবানী। তার আত্মজীবনী “জীবনে যা দেখলাম” বইটি ঘেঁটে পাওয়া গেলো ভাষা আন্দোলনে তার অবদান নিয়ে বিশাল এক ফিরিস্তি। তিন খণ্ডের বইটির প্রথম খন্ডের একাধিক অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে ভাষা আন্দোলন সম্বন্ধে।
বিস্তারিত পড়ে জানা গেলো ১৯৪৮ সালের ২৭ নভেম্বর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এক সমাবেশে ভাষণ দেন। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা একটি মানপত্র পাঠ করে। ঐ মানপত্রে বাংলা ভাষা নিয়েও কিছু দাবী জানানো হয়। এ মানপত্রটি পাঠ করেন ইউনিয়নের তৎকালীন সেক্রেটারি গোলাম আযম। যদিও এটি পাঠ করার কথা ছিল ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট অরবিন্দ বোসের। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে ভাষা আন্দোলনের দাবি সংবলিত মানপত্র পাঠ একজন হিন্দু ছাত্রকে দিয়ে করালে তার মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে এবং মুসলিম লীগ সরকার এ নিয়ে নানা প্রকার বিরূপ প্রচার শুরু করবে¬ এ আশংকা থেকেই একজন মুসলমান ছাত্র হিসেবে সেক্রেটারি গোলাম আযমকে সেটা পাঠ করতে দেয়া হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে অগ্রগণ্য ভাষা সৈনিক কামাল লোহানী বলেন,
‘গোলাম আযম ভাষা সৈনিক ছিলেন না। কখনই ছিলেন না। স্বাধীনতা বিরোধীরা তাকে ওটা বানাতে চেয়েছে। এই অপপ্রচারের একটি লাগসই জবাব ভাষা মতীন ভাই দিয়েছেন এভাবে। গোলাম আজমের পিঠে চড়ে আমার তখন ভাষার দাবির পোষ্টার দেয়ালে লাগিয়েছি।
আসল ঘটনা হলো গোলাম আজম তখন ডাকসুর জিএস ছিলেন। অরবিন্দ নামে একজন ভিপি। ঢাকায় আসবেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। ডাকসু থেকে বাংলা ভাষার দাবিতে তাকে একটা স্মারকলিপি দেওয়া হবে। কৌশলগত কারণে অরবিন্দকে বাদ দিয়ে গোলাম আজমকে দিয়ে স্মারকলিপিটি লিয়াকত আলী খানকে দেওয়া হয়েছিলো। এটুকুই তার ইতিহাস। তারপর আর গোলাম আজম ভাষার লড়াইয়ের ইতিহাসে নেই’।
অথচ, গোলাম আযম তার বইয়ে লিখেছেন,

(পাঠক লাল কালিতে আন্ডারলাইন করা জায়গা গুলোর কথা খেয়াল রাখবেন, আমরা পরবর্তীতে এ নিয়ে আলোচনা করবো।)
এর পর বইটিতে গোলাম আযমের মেমোরেন্ডাম পড়ে শোনানোর রগরগে বিবরণ…

এবার আপনাদের কাছে তুলে ধরছি সেই ঐতিহাসিক (!) মানপত্রের মূল কপিটির ভাষা সংক্রান্ত অংশ,
…… We are happy to note that out Central Government, under your wise guidance, has given Bengali an honoured place. This is a step in the right direction which shall go a long way to further strengthen our cultural ties, with our brethren in West Pakistan. Interchange of thoughts and ideas and mutual understanding are essential if we have to develop a homogeneous and healthy national outlook. We have accepted Urdu as our Lingua Franca but we also feel very strongly that, Bengali by virtue of its being the official language of the premier province and also the language of the 62% of the population of the state should be given its rightful place as one of the state languages together with Urdu….
পাঠক লক্ষ্য করবেন এখানে কোন বলিষ্ঠ দাবী রাখা হয়নি বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য। কোন রকমে দায়সারা ভাবে বাংলার কথা এসেছে। উর্দুকে আন্তর্জাতিক ভাষার মাধ্যম হিসেবে (Lingua Franca) মেনে নেয়ার কথা এসেছে, আবার একথাও বলা হয়েছে ‘প্রধানমন্ত্রী’ নাকি বাংলাকে সম্মানজনক অবস্থান দিয়েছেন অথচ বাংলাকে ওই মানপত্রে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিই জানানো হয়নি। কেবল করা হয়েছিল প্রাদেশিক সরকারি কাজকর্মের ভাষা করার। আর তাই প্রধানমন্ত্রী নিজের বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে কিছুই বলেননি (তার স্ত্রীর অনুরোধ সত্ত্বেও)। গোলাম আযমের ভাষায়,

পাঠক লক্ষ্য করবেন, গোলাম আযম এমনি বক্তব্য দিয়েছিলেন যে প্রধানমন্ত্রী তার সব দাবিদাওয়া সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করলেন। তার বক্তব্য শুনে খুশীতে টেবিল চাপড়ে দিলেন আর ভাষার ব্যাপারে কিছুই বললেন না !!!
এবার আসুন একটু বিশ্লেষণী দৃষ্টি নিয়ে দেখি কয়েকটি পয়েন্ট, গোলাম আযম তার একই আত্ম জীবনীতে অনেকবার বাংলা ভাষা নিয়ে আক্রমণাত্মক, বিদ্রুপাত্মক এবং প্রচণ্ড বিদ্বেষ মূলক মন্তব্য করেছে। নিচে তার থেকে অল্প কয়েকটি উল্লেখ করাহলো,
বাংলা ভাষায় আপনি, তুই, তুমি এসবের জন্য আলাদা আলাদা শব্দ ব্যাপারটা গোলাম আযমের পছন্দ হয়নি;তিনি এটাকে চিহ্নিত করেছেন ‘বিরাট সমস্যা’ হিসেবে –

মজার ব্যাপার হচ্ছে, নিজেকে ভাষা সৈনিক দাবী করলেও আপন নাতী-নাতনীদের কিন্তু তিনি বাংলা শিক্ষা দেননি; অবশ্য এ নিয়ে কিছুটা ‘মেকি আপসোস’ও আছে তার –

বিভিন্ন খ্যাতিমান বাংলাভাষী সাহিত্যিকদের প্রতি তিনি ছড়িয়েছেন চরম বিদ্বেষ; বঙ্কিমচন্দ্রকে নিজের বইয়ে‘ইসলাম বিদ্বেষী’হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও তার অনেক জ্বালা। রবীন্দ্রনাথ নাকি ‘মুসলিম স্বার্থের বিরুদ্ধে’ ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ নাকি ছিলেন স্রেফ ‘পৌত্তলিক হিন্দু’ইত্যাদি; তাই ‘বাঙালি জাতীয়তায়’ বিশ্বাসীদের কাছে রবীন্দ্রনাথ গ্রহণযোগ্য হলেও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদীদের কাছে তিনি হবেন সর্বদাই পরিত্যাজ্য:

বাংলা এবং বাঙালি জাতি নিয়ে বিদ্বেষ তার পরবর্তীকালের অনেক উক্তিতেই পাওয়া যাবে। যেমন ১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসে তিনি বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা শ্লোগান ইসলাম ও পাকিস্তানবিরোধী’। তিনি সেসময় আরো বলেছিলেন, ‘বাঙালিরা কখনো জাতি ছিল না’ (দৈনিক পাকিস্তান, ১৩ই এপ্রিল, ১৯৭০)। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, এই যার বাংলা ভাষা আর বাঙালি জাতির প্রতি এতো প্রেমের নমুনা,তিনি কেনইবা প্রধানমন্ত্রীর সামনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা দাবী করলেন।
আমাদের বুঝতে হবে সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ। তিনি নিজেই বলেছেন তিনি সে সময়ের অনির্বাচিত জি এস ছিলেন, এবং মানপত্রটা পড়ার বিষয়টি ছিলো একটা আকস্মিকঘটনা মাত্র। এমনকি, তিনি সেই মানপত্র নিজে লিখেননি, লিখেছিলেন তৎকালীন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি আবদুর রহমান চৌধুরী তারপর একটি কমিটি স্মারকলিপিটি চূড়ান্ত করে। সেদিন সেইদিন স্মারকলিপি পাঠ করা ছাড়া তার কাছে আর কোন রাস্তা ছিলো না। যদি সেদিন তিনিস্মারকলিপি পাঠ করা থেকে বিরত থাকতেন, কিংবা অনাগ্রহী হতেন তাহলে সাধারণ ছাত্রদের হাত থেকে তাকে কেউ রক্ষা করতে পারতো না। কারণ ছাত্ররা তৎকালীন শাসক গোষ্ঠীর ওপর মারাত্মক বিরক্ত ছিলো। প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, সেই বছরের মার্চেই কায়েদে আজম কার্জনে যখন বলে ওঠেন “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা” তখনই সেখানকার ছাত্ররা “না না” বলে প্রতিবাদ করে ওঠে। ধীরে ধীরে এটা হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণের দাবী। কাজেই ছাত্রদের জনপ্রিয় দাবী অস্বীকার করা কিংবা এড়িয়ে যাবার মতো সাহস বা সুযোগ কোনটাই গোলাম আযমের সেদিন ছিল না।
আর তাই ছাত্র প্রতিনিধি হয়ে গোলাম আযম যতটা সম্ভব বাধ্য হয়েই ‘যথেষ্ট নম্র ভাষায়’এই দাবী প্রকাশ করেছিলেন, যদিও উর্দুকেই মনে প্রাণেরাষ্ট্র ভাষা মনে করতেন গোলাম আযম। তিনি ভাষা সৈনিক মোটেই নন। সে সময়কার ঘটনা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আব্দুল গাফফার চৌধুরী তার একটি সাম্প্রতিক কলামে বলেছেন –
‘১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার আগে পর্যন্ত ১৫ মার্চ ছিল ভাষা আন্দোলন দিবস। এই আন্দোলনে কাজী গোলাম মাহবুব, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ সকলকেই গ্রেফতার বরণ করতে হয়েছে। আবদুল মতিনকে হুলিয়া মাথায় করে আন্ডারগ্রাউন্ডেও পালিয়ে থাকতে হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের ভাষার দাবির স্মারকলিপি নিয়ে গিয়েছিলেন সলিমুল্লাহ হলের ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন ভিপি আবদুর রহমান চৌধুরী (পরে বিচারপতি হয়েছিলেন)। তাকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের এই প্রথম পর্যায়েও গোলাম আযমকে কোথাও দেখা যায়নি। তাকে গ্রেফতার হতে হয়নি। ভাষা আন্দোলনকারীদের সচিবালয় ঘেরাও বা রাজপথের মিছিলেও গোলাম আযমকে দেখা যায়নি। ১৫ মার্চের ভাষা দিবস উদযাপনের কোনো বছরের সভায় তাকে দেখা যায়নি। ভাষাসংগ্রাম কমিটিতেও (কেন্দ্রীয় অথবা ছাত্র কমিটি) তার নাম দেখা যায় না। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আরোপিত ১৪৪ ধারা ভাঙার জন্য ভাষা আন্দোলন -সংযুক্ত প্রবীণ ও নবীন নেতাদের কোনো গোপন ও প্রকাশ্য সভাতেই তাকে অংশ নিতে দেখা যায়নি। তাহলে তিনি ভাষাসৈনিক হলেন কীভাবে? কেবল ১৯৪৮ সালে লিয়াকত আলীর ঢাকা সফরের সময় এক্সিডেন্টলি একটি মানপত্র পাঠ দ্বারা ভাষাসংগ্রামী, ভাষাসৈনিক হয়ে গেলেন? ইতিহাস বিকৃতি এবং মিথ্যা দাবি করারও একটা সীমা থাকা দরকার’।
এখন উপরের আলোচনা থেকে তাহলে আমরা কিছু সিদ্ধান্তে আসার মতো জায়গায় পৌঁছুতে পারছি এখন –
১) প্রধানমন্ত্রীর সামনে পাঠ করা মনপত্রটি গোলাম আযম নিজের হাতে লেখেন নি।
২) তার ভাষায়, এই মানপত্র পাঠ করা ছিলো একটা আকস্মিক ব্যাপার এবং স্বাভাবিক অবস্থায় এই মানপত্র তার নিজের পড়ার কথা না, এটা তিনি একটা বিশেষ “সিচুয়েশনে” পড়েছিলেন মাত্র।
৩) মানপত্রটি পাঠ করার কথা ছিলো ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট অরবিন্দ বোসের।
৪) তার আগেই (মার্চেই) জিন্নার সামনে ছাত্ররা ভাষার দাবীতে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জানায়।
৫) গোলাম আযম ভাষার প্রশ্নে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি, ফলে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পান।
৬)বাংলাকে ওই মানপত্রে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়নি। দাবী করা হয়েছিল প্রাদেশিক সরকারি কাজকর্মের ভাষা করার।
সব শেষে আমরা দেখবো ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়গুলোতে গোলাম আযমের ভূমিকা।
১৯৭০ সালের ২০ জুন একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়‘দৈনিকআজাদ’পত্রিকার পঞ্চম পৃষ্ঠায়।

“বাংলা ভাষার আন্দোলন করা ভুল হইয়াছে”শিরোনামের সেই লেখায়গোলাম আযমের বক্তব্য প্রকাশিতহয়। সেই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়,
“বাংলা ভাষা আন্দোলন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ থেকে মোটেই সঠিক কাজ হয়নি।”
(দৈনিক আজাদ, ২০ জুন, ১৯৭০)
এখানেই শেষ নয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর প্রথম দিকেই আমাদের শহীদ মিনারটি গুঁড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সেটিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন আমাদের ‘ভাষা সৈনিক’ গোলাম আযম। তার বরাত দিয়ে মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রাম খবর প্রকাশ করে ১৬ জুলাই,
“ইতিহাস কথা বলে”সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল : আইয়ুব খানের গভর্নর আজম খান ছাত্রদের খুশী করার জন্য যে শহীদ মিনার তৈরি করলেন তাকে পূজামণ্ডপ বলা যেতে পারে কিন্তু মিনার কিছুতেই না। যাহোক সেনাবাহিনী সেই কুখ্যাত মিনারটি ধ্বংস করে সেখানে মসজিদ গড়ে শহীদদের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন জেনে দেশবাসী খুশী হয়েছে।
(দৈনিক সংগ্রাম ১৬ জুলাই, ১৯৭১)
কাজেই গোলাম আযম কোনক্রমেই ভাষা সৈনিক নন। এটা যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে মহিমান্বিত করার জামাতি অপকৌশলমাত্র।
সুত্রঃ

এটা একটা অসাধারণ লেখা। এই লেখার মাধ্যমে সবার মাঝে গোলাম আজমের একটি পূর্ণ ছবি উপস্থাপন করা গেছে। আমাদের মাঝে যদি কারও কাছে গোলাম আজমকে চেনা এবং তার কাছ না জানা থাকে তাহলে বলব তাকে চেনার জন্য এই লেখাটি যথেষ্ট। সুন্দর এই লেখার জন্য আরিফ রহমান এবং অভিজিৎ দা কে ধন্যবাদ।
‘ভাষা সৈনিক’ গোলাম আযম’কে নিয়ে ইতিহাস নির্ভর এই অনবদ্য আলোচনাটির জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্র আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে বেশ ক’বারই সংগঠনে আসা নুতন কর্মীদের এই একই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। তারা জানতে চাইতো- এই ‘প্রখ্যাত ভাষা সৈনিকের’ ইতিবৃত্ত কী? যেহেতু আমার পাঠশালাটিতে শিবিরের আধিপত্য ছিলো তাই ফেব্রুয়রি আসলেই এই মৌসুমী ভাষা সৈনিকের প্রপাগান্ডা বেড়ে যেতো। সেই সুবাধে ইতিহাস কিছুটা ঘাটার অভিজ্ঞতা হয়েছিলো সেইসময়।
রেফারেন্স বই সাথে নেই, তাই স্মৃতির উপর ভরসা করেই মন্তব্যটি করছি। মুলত কেনো আরবিন্দ বোসকে বাদ দিয়ে গোলাম আযম সেই দিন মানপ্ত্রটি পাঠ করেছিলেন সেটির ব্যাখ্যায় এই মন্তব্য। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ এর ১৫ আগস্ট দেশভাগ হবার পর পুরো পাকিস্থান অংশে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছিলো, ভারত অংশেও ছিলো তবে কিছুটা কম। শাসকশ্রেণী সব কিছুতেই সাম্প্রদায়িকতার ওজুহাত খুঁজে বেড়াতো। যেমন ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি (স্মৃতি যদি তারিখটি নিয়ে প্রতারণা না করে) পাকিস্থান গণ পরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হলে পূর্ব বাংলার অন্যতম প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রথমেই প্রস্তাব আনেন যে গণ পরিষদে উর্দু এবং ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকেও স্বীকৃতি দেয়া হোক। তুমুল হট্টগোল লেগে যায় প্রস্তাবটি নিয়ে। আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী বলেছিলেন পাকিস্তানের আধিবাসীদের মধ্যে বিরোধ এবং সাধারণ একটি ভাষাকে নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে এই জঘন্য প্রস্তাব আনা হয়েছে। প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা এমন পর্যায়ে পৌছুয় যে সকল মুসলিম সদস্যই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় এবং শুধুমাত্র হিন্দু সদস্যরা পক্ষে ভোট দেয়। অর্থাৎ পুরো বিষয়টাকে সাম্প্রদায়িকতার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন যেটি শুরু হচ্ছিলো তখন সেটিকে হিন্দু এবং কমিউনিস্টদের চক্রান্ত বলে প্রপাগান্ডা চালানো হয় রাষ্ট্রীয় ভাবে। সেই বাস্তবতায় আরবিন্দ বোসকে দিয়ে লিয়াকত আলী’র বরাবর মানপত্র বা স্মারকলিপি পাঠ করালে মূল বিষয়টা আবারো সাম্প্রদায়িকতার দিকে মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে শাসক শ্রেণি সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়েই তৎকালীন অনির্বাচিত জিএস গোলাম আযম দৃশ্যপটে আসে। এতে গোলাম আযমের কোনো ব্যক্তিগত আগ্রহ বা involvement ছিলোনা, যেটি পরবর্তী আন্দোলন সংগ্রামে তার অনুপস্থিতি এবং উর্দুপ্রীতি সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণ করে। পরবর্তীতে সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্রকরে খুলনা, বরিশাল সহ বিভিন্ন জেলায় যে প্রচন্ড সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিলো ১৯৪৮ সালে সেটি প্রমাণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ সেদিন অরবিন্দ বোসকে সামনে না এনে সঠিক কাজটি করেছিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এই কুলাঙ্গারটা (গোলাম আযম) মানপত্র পাঠক হয়ে যায়। আবারো সময়োপযোগী এই আলোচনার জন্য আরিফ রহমান এবং অভিজিৎ’দাকে ধন্যবাদ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের সবচাইতে বড় বীর – জার্মান আক্রমণ প্রতিহত করার মূল সামরিক কৌশল প্রনেতা। চার্চিলের “আমরা আত্মসমর্পণ (জার্মানদের কাছে) করবনা খ্যাত ” বক্তৃতার মত তার দেওয়া “তারা (জার্মানরা) অতিক্রম (সীমানা) করতে পারবেনা” পুরো দেশ তথা ফ্রান্সকে উজ্জীবিত করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ফ্রান্সের সবচাইতে বড় নায়ক।
প্রায় কম-বেশি বিশ বছর পর তিনিই সবাচাইতে বড় ভিলেনে পরিণত হন। ফ্রান্স জার্মান আক্রমণ পরিকল্পনা মত প্ররতিহত করতে না পারলে পরে ফ্রান্স আত্মসমর্পণ করে। জার্মানরা ফ্রান্স দখল করার পর এর পুতুল সরকার এবং রাষ্ট্র প্রধান করা হয় মার্শাল প্যাঁতাকে।
যে মানুষ ২০ বছর আগে জার্মানদের আক্রমণ প্রতিহতের সবচাইতে বড় নায়ক হয়েছে – ২০ বছর পরেই সবচাইতে বড় ভিলেন। এখন তার জীবন এবং কর্ম নিয়ে সমস্ত স্টাডিতেই তি যা যখন করেছেন সেটার উপরি সমালোচনা করা হয় – খিচুরি বানানো হয়না!!
এমন শত শত উদাহরণ আছে – আরেকটা হতে পারে – ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বেনেডিক্ট আর্নল্ড। যে আমেরিকায় মীর জাফরের সমার্থক।
এখন বাংলাদেশে ফিরে আসা যাক –
একজন মুক্তিযুদ্ধের সাব সেক্টর কমান্ডার জেনারেল হারুনুর রশীদ টাকার লোভে বলী হয়ে দেশের সর্ববৃহৎ অবৈধ অর্থ কেলেঙ্কারি ডেস্টিনি স্কিমে জড়িত হয়েছেন।
লোকাল মিলিশিয়াদের মধ্য সবচাইতে বৃহৎ দল – যাদের অপারেশন এর ব্যাপ্তি সরকারি ব্রিগেড কে, এস কিংবা জেড ফোর্সের থেকে কোন অংশে কম নয় – তার কমান্ডার কাদের সিদ্দিকী মাঝে মাঝে যেসব কথা বলেন – মুক্তিযোদ্ধার ছেলে হিসেবে মাঝে মাঝে খারাপই লাগে।
এরা ছাড়াও বিএনপি কিংবা আওয়ামীলীগের অনেক মুক্তিযোদ্ধাই স্বাধীনতার পর বিভিন্ন অনুচিত কর্ম কান্ডে জড়িত হয়েছেন অর্থনৈতিক কারণে। আবার অনেকেই রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন রাজাকারের ঊথা-বসা করেছিল এবং করেছে। আওয়ামীলীগ বিএনপি দুই দলেই।
বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বেশিরভাগই তো মুক্তিযোদ্ধা।
আবার বর্তমানে গণতন্ত্রকে আঘাত করে যারা মন্ত্রী হয়েছেন তাদের অনেকেও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন – যারা পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরেছিলেন।
তাই বলে আমরা তাদের পরবর্তী কর্মকান্ডের জন্য মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মকান্ড অস্বীকার করব ???
অন্যদিকে, কুখ্যাত রাজাকার এবং গণ হত্যায় অংশ নেয়া মুসা বিন শমসের কিংবা মোশারফ হোসেন আজকে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামীলীগ করে এবং আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে বলে তাদেরতো আমরা ৭১ এর মুক্তিযোদ্ধা বলতে পারিনা!!!
আমার আর্গুমেন্ট – গোলাম আযম স্বেচ্ছায় ভাষার দাবী তুলেছিল নাকি পরিস্থিতির জন্য তুলেছিল কিংবা পরবর্তীতে এই দাবী তোলার জন্য অনুশোচনায় ভুগেছিল না ভুগেনি যেটাই হোক – আমি এই পর্যন্ত যতটুকু জেনেছি এবং বুঝেছি সেই অনুযায়ী আমার এটা স্বীকার করেনিতে কোন অসুবিধা নেই যে ১৯৫২ সালের ভাষার প্রশ্নে যে আন্দোলন হয়েছিল সেখানে তার অবদান পজেটিভ ছিল। ৫২ সালে পজেটিভ ছিল বলে এর জন্য ৭১ এর তার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করতে নিশ্চয়ই কোন বাধা থাকার কোন কথা নেই। ৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হোক এটা সে চায়নি – উপরন্তু গণহত্যায় পাকিস্তানীদের মদদ এবং সহায়তা করেছিল।
আসলে আমাদের “সমালোচনা” কাকে বলে এবং কিভাবে করতে হয় তা আগে শেখা উচিত!!!
মজার ব্যাপার হচ্ছে, নিজেকে ভাষা সৈনিক দাবী করলেও আপন নাতী-নাতনীদের কিন্তু তিনি বাংলা শিক্ষা দেননি; অবশ্য এ নিয়ে কিছুটা ‘মেকি আপসোস’ও আছে তার –
আর বাচ্চাকাচ্চাদের কথা বললে বলতে হয় – এই মূহুর্তে একটি ঘটনা মনে পরে গেল – কিছুদিন আগে- হয়ত আট-নয় মাস – এক মুক্তিযোদ্ধা যিনি সিনেমা বানান, চলচিত্রের জন্য সরকারী অনুদান এবং সহায়তার অনেক কিছুই অগ্রাধিকার পান, গণ জাগরণ মঞ্চের উৎসাহদাতা – তার মেয়ের (আনুমানিক ২৮-৩৮ বছর বয়স্কা) সাক্ষাৎকার প্রকাশ করছিল – তার মেয়ে শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলাতো বলতেই পারেনা উপরন্তু, বাংলা-ইংরেজী মিশিয়ে কথা বলছে!!!
এখানে যা বলা হল এটা আসলে একটা সর্ব সমস্যা… শুদ্ধ ভাবে বাংলা লেখা এবং শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলতে পারাটা…
বিভিন্ন খ্যাতিমান বাংলাভাষী সাহিত্যিকদের প্রতি তিনি ছড়িয়েছেন চরম বিদ্বেষ; বঙ্কিমচন্দ্রকে নিজের বইয়ে‘ইসলাম বিদ্বেষী’হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও তার অনেক জ্বালা। রবীন্দ্রনাথ নাকি ‘মুসলিম স্বার্থের বিরুদ্ধে’ ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ নাকি ছিলেন স্রেফ ‘পৌত্তলিক হিন্দু’ইত্যাদি; তাই ‘বাঙালি জাতীয়তায়’ বিশ্বাসীদের কাছে রবীন্দ্রনাথ গ্রহণযোগ্য হলেও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদীদের কাছে তিনি হবেন সর্বদাই পরিত্যাজ্য:
আমাদের সমস্যা হল – আমরা কোন কিছুর সঠিক মূল্যয়ন করতে পারিনা। যে যে কর্ম করেছে তার কর্মে সমালোচনাই ঠিক মত করতে পারিনা – হয় দেবতা বানাই নয়ত শয়তান বানাই!!!
বঙ্কিম চন্দ্র বিখ্যাত লেখক ছিলেন – বাংলা উপন্যাসের জনক বলে অনেকে মনে করেন। বাংলা সাহিত্য তৎকালীন ম্যাভেরিক চিন্তা ভাবনার জন্য প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য জগতে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। এটা সত্য… তিনি বাংলা সাহিত্য জগতের এক দিকপাল। এখন ঐ যে বললাম – “সমালোচনা” বিষয়টি এখনও ভালোভাবে বিস্তার লাভ করেনি – এজন্য কারো অবদানের সবকিছু এক লাইনে খিছুরি বানিয়ে ফেলা। সত্য হলো – বঙ্কিমের চরম স্তাবকরাও স্বীকার করেন রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনায় তিনি একজন চরম সাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী ছিলেন।
আর রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চেতনা সম্পর্কে বললে বলতে হয় – বাঙ্গালীদের নেতৃত্বে নেশন-স্টেট গঠনের চিন্তা তিনি দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি।
@সংবাদিকা,
আপনার এই অংশটি নিয়ে ভিন্নমত আছে আমার-
“গোলাম আযম স্বেচ্ছায় ভাষার দাবী তুলেছিল নাকি পরিস্থিতির জন্য তুলেছিল কিংবা পরবর্তীতে এই দাবী তোলার জন্য অনুশোচনায় ভুগেছিল না ভুগেনি যেটাই হোক – আমি এই পর্যন্ত যতটুকু জেনেছি এবং বুঝেছি সেই অনুযায়ী আমার এটা স্বীকার করেনিতে কোন অসুবিধা নেই যে ১৯৫২ সালের ভাষার প্রশ্নে যে আন্দোলন হয়েছিল সেখানে তার অবদান পজেটিভ ছিল।”
লিয়াকত আলী’র সামনে মানপত্র পাঠ করেই একজনের ভূমিকা পজেটিভ কি নেগেটিভ সেটি সিদ্ধান্ত নেয়া বোধকরি বাতুলতা হবে। টিভি সংবাদের পাঠকের কিংবা পাঠিকার সংবাদ উপস্থাপন নিয়ে যেমন ঘটনার সঙ্গে তাঁর পজেটিভ নেগেটিভ সম্পৃক্ততা বিচার করা যায়না ঠিক তেমনি একটি মানপত্র পাঠ নিয়ে বিশাল একটি আন্দোলনে কারো ভূমিকা মূল্যায়ন সঠিক হবেনা। লক্ষ্য করবেন আন্দোলন নিয়ে কোনো ইতিহাসেই গোলাম আযমের আর একটি ভূমিকাও আমরা পাইনা। সেটি ড. হান্নানের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস হোক আর সরদার ফজলুল করিম কিংবা অন্য ভাষা সৈনিকদের স্মৃতিচারণে হোক। ইতিহাসকে গতির মধ্যে দেখাই বোধকরি সমীচীন হবে। সেটাই ইতিহাসে তাঁর অংশগ্রহণকে মূল্যায়ন করতে সহায়তা করবে। সরদার ফজলুল করিম মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, কবীর চৌধুরী যেটি করেননি। তাহলে কি আমরা ধরে নিবো সরদার করিমের ভূমিকা নেগেটিভ ছিলো?
আরিফ রহমান এবং অভিজিতের আলোচনাটির স্ববিরোধীতার যায়গা অন্যখানে। আলোচনায় বলা হয়েছে মানপত্রটি গোলাম আযম তৈরি করেননি বা লেখননি, আবার বলা হয়েছে এতে রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার পক্ষে জোরালো দাবি ছিলোনা। মানপত্র কে লিখেছে সেটি প্রসংগিক নয়, তাছাড়া যে লিখেনি সেটা নিয়ে তাঁর দায় কোথায়? আলোচনাটির লক্ষ্য ছিলো ভাষাআন্দোলনে গোলাম আযমের ভূমিকা নিয়ে, মানপত্রের কন্টেন্ট নিয়ে নয়।
আমি কিন্তু ৪৮ এর কথা বলিনি, ৫২র কথাই বলেছি। আর আমি “ভাষা সৈনিক ছিলেন” কথাটাও উল্লেখ করিনি, আমার শব্দ ছিল “পজেটিভ”।
আর আমার লক্ষ্য গোলাম আযম নয় – ব্যাপারটি সামগ্রিক। এবং এখনও এমন আমরা দেখতে পাই – রাজনৈতিক ক্ষেত্রে – সামাজিক ক্ষেত্রে…
এর প্রমাণ লেখক নিজেই দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যর দুই দিকপালের উদাহরণ দিয়ে – এবং তাদের সাহিত্যিক এবং রাজনৈতিক চেতনা মিশিয়ে ফেলে।
এসব মেশানো কিংবা খিচুড়ি করা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে…
তাই বলে আমরা তাদের পরবর্তী কর্মকান্ডের জন্য মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মকান্ড অস্বীকার করব ???
কেউ বলেছে অস্বীকার করতে? এমন যুক্তি কেউ দেখিয়েছে এখানে?? আরিফ রহমান বা অভিজিৎদা এখানে এমন কোন যুক্তি দেখিয়েছেন যে, গোলাম আযম মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিলেন বলেই ভাষা সংগ্রামে তার অংশগ্রহন (যদি থেকে থাকে) একেবারে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় গাণিতিক ইক্যুয়েশনে?? লেখকদ্বয় তো যুক্তি সহকারে বলতে চেয়েছেন, যেভাবে গোলাম আজমকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে মহান ভাষাসৈনিক বানানো হচ্ছে, তিনি আসলে তেমনটা ছিলেন না। লেখকদ্বয়ের যুক্তির বিরুদ্ধে কোন পাল্টা যুক্তি থাকলে আপনি তা পেশ করতেই পারতেন।
কিন্তু আপনি তা করছেন না। বরং ইনিয়ে বিনিয়ে একের পর এক দলীয় আবর্জনা দিয়ে দুর্গন্ধ করছেন এখানকার পরিবেশ। অথচ এই আবর্জনাগুলি ছাগুপেইজগুলির ফুলদানিতে শোভা পেতে পারত।
মুক্তিযোদ্ধার ছেলে হিসেবে মাঝে মাঝে খারাপই লাগে।
আপনার কিসে খারাপ লাগে, তা আর বুঝতে বাকী নাই কারো। লেখাটা হয়েছে গোলাম আযমের ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহনের প্রেক্ষিত ও তাকে মহান ভাষা সৈনিক বানানোর অপপ্রচারের জবাব দিতে; অথচ আপনি নিয়ে এলেন মুক্তিযোদ্ধারা কবে কি অপকীর্তি করেছে, তার পরিসংখ্যান নিয়ে। গোলাম আজমের ভাষা আন্দোলনজনিত মহিমা অবিচল রাখতে ব্যগ্র হয়ে আপনি মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে ডাউন করলেন, তাতে আর কাউকে বুঝিয়ে বলার দরকার আছে, আপনি কিসে খুশী হন, আর কিসে বেজার হন??
একবার ফরিদ ভাই বলেছিলেন, ভারতীয়রা ফুল নিয়ে এলেও তিনি বিশ্বাস করেন না। একইভাবে, খাঁটি বাংলাদেশী বিএনপিওয়ালারা ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘মুক্তিযুদ্ধ’ করতে মুখে ফেনা তুললেও বিশ্বাস করতে কেন জানি কষ্ট হয়। কারণ এই লোকগুলোই একমুখে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক হিসেবে নিজেদের দাবী করবে, আবার অন্যমুখে মুক্তিযুদ্ধে নিহত ‘তিরিশ লাখ’ সংখ্যাটিকে ‘তিন লাখে’ নামিয়ে আনবে ‘বস্তুনিষ্ঠতার’ স্বার্থে। এই লোকগুলোই একমুখে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক সাজবে, আবার অন্যমুখে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করে বলবে যে, পাকিস্তান তো বাংলাদেশের কাছে হারেনি, তারা তো ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এরাই বল্বে, এখন এগিয়ে যাওয়ার সময়, চল্লিশ বছর পেছনের ইতিহাস নিয়ে জাতিকে বিভক্ত করার কি প্রয়োজন!
আসলে আমাদের “সমালোচনা” কাকে বলে এবং কিভাবে করতে হয় তা আগে শেখা উচিত!!!
কারো যেন দুর্ভাগ্য না হয় আপনার কাছ থেকে “সমালোচনা” শেখার। দেখুন, মুক্তমনা ভিন্নমতকে প্রচন্ড শ্রদ্ধা করে বলেই এখন পর্যন্ত ছাগু পেইজের সাথে মিল পাওয়া যায়, এমন মতাদর্শ একের পর এক উগরে দিতে পারছেন। অন্য কোন প্রগতিশীল ব্লগ হলে এতক্ষনে চোখের জলে-নাকের জলে একাকার করতেন! গোলাম আজমের পক্ষে কলম ধরার আর সময়ই পেতেন না।
@কাজি মামুন,
আপনার কথায় আবেগ ঝড়ে পরছে… আপনার আবেগ কে আমি সম্মান করি। তবে আবেগ কে বুদ্ধিমত্তা, কূটনীতি এবং বিচক্ষনতার পরে স্থান দিতে হয়।
আবেগ কে তিনটির আগে স্থান দিলে – গুরুত্বপূর্ন সময় লাভের চেয়ে ক্ষতি হয় – দেশ বিদেশে বিব্রতকর অবস্থায় কিংবা ক্ষতির সম্মুখীন নিজেকে এবং পুরো জাতিকে পরতে হয়!! এমন প্রায়ই হয়…
আর আপনি যেসব “প্রগতিশীল” ব্লগের কথা বললেন না – ওখানে নিজেরা কথা বলে আর নিজেরাই হাসাহাসি করে এভাবে “:-D 😀 😀 :-D” আর গত কাল কিংবা পরশু তারা একটা বই (কিংবা কিছু একটার “প্রিন্টিং” এর বাইন্ডিং) উন্মোচন করছে… এবং ওটারও স্তাবক গাইছে এভাবে ” ” 😀
আমি মুক্তমনাতে এজন্য লেখি – এখানে, জাতীয় পতাকা পোড়ানো কি নাগরিক অধিকার কিংবা অধিকার না ওটা নিয়েও বিতর্ক হয়…… সো আপনার বিভিন্ন বাক্যর লাইন বাই লাইন উত্তর বোধয় এই একটি লাইনেই বুঝতে পারা যাবে
@সংবাদিকা,
আগেও বলেছি, আপনি আসিফ-পিয়াসি কৌশলকেও টপকে এক নতুন কৌশল, নতুন ধারার জন্ম দিয়েছেন। অভিনব এই ধারাটি উদ্ভবের জন্য কাঠালপাতা ভর্তি পেইজটির পক্ষ হতে আপনার জন্য নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে ট্রফি!
যথারীতি আবারও এড়িয়ে যাচ্ছেন, এবং এ নিয়ে বেশ কজন পাঠক আপনাকে ধরতে গেলে আপনি ফাঁক গলে বেরিয়ে যান। এ থেকে আপনার উদ্দেশ্যটি খুব পরিষ্কার হয়ে যায়ঃ নতুন প্রজন্মকে/মুক্তমনার পাঠকদেরকে অথবা এখানে প্রগতিশীলতার দীক্ষা নিতে আসেন যেসব শিক্ষার্থী, তাদের সবাইকে কনফিউজ করা এবং এর মাধ্যমে কাঠালপাতা ভর্তি পেইজটির পরিপূরক হিসেবে কাজ করা। যেমনঃ দশ ট্রাক অস্ত্রের রায় নিয়ে আপনি এমন একটি লেখা লিখলেন, যা পড়ে একজন তরুণ পাঠক নিশ্চিতভাবে কনফিউজড হবে, আর আপনার উদ্দেশ্য তাতে পূরণ হবে। না হলে, বারংবার রিকোয়েস্ট করার পরও আপনি কেন দশ ট্রাক অস্ত্র ভাল দেশের জন্য, সে যুক্তিগুলো পেশ করেননি; অথচ আপনার যুক্তিগুলো পেলে অন্য পাঠকরা তা অন্তত খন্ডানোর সুযোগ পেত।
এই লেখাটিতে লেখকদ্বয় যুক্তি সহকারে বলতে চেয়েছেন, যেভাবে গোলাম আজমকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে মহান ভাষাসৈনিক বানানো হচ্ছে, তিনি আসলে তেমনটা ছিলেন না। লেখকদ্বয়ের যুক্তির বিরুদ্ধে কোন পাল্টা যুক্তি থাকলে আপনি তা পেশ করতেই পারতেন, নীচে গাজী নূর যেমনটা করেছেন। কিন্তু আপনি তা না করে ‘মুক্তিযোদ্ধারা খুন করলে তাদের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় মুছে যেমন যায় না, তেমনি ‘মহান ভাষাসৈনিক গোলাম আজম’ রাজাকারগিরি করলে তার ভাষাসৈনিকত্ব খারিজ হয় না’ তেমনটা প্রমান করতে চাইলেন এবং এভাবেই কাঠালপাতা ভর্তি পেইজটির সম্পুরক কাজ করে এখানকার তরুণ পাঠকদের বিভ্রান্তির পথে ঠেলে দিলেন।
আপনি যতখুশী যুক্তি দিন, এমনকি প্রচলিত মতকে ঝড়ের বেগে আঘাত করুন, কেউ আপত্তি করবে না, হয়ত আপনার যুক্তি খন্ডনে আরও প্রবল ঝড় হয়ে অবতীর্ণ হবে। কিন্তু দয়া করে আর কনফিউজ কইরেন না। যা বলতে চান, পরিষ্কার করে বলেন। ‘সাংবাদিকা’ কৌশল পরিহার করেন! কাঠাল পাতার সওদা করার জন্য বাংলা ব্লগের অভাব নাই। এইখানে কেন রে ভাই?
মার্চ ২, ২০১৪ at ৩:২৭ পূর্বাহ্ণ
@কাজি মামুন,
সংবাদিকার এই এপ্রোচ অবশ্য নতুন নয়। উনি নিজে বৌদ্ধ ধর্মে কত ধরনের সহিংসতা আছে তা নিয়ে নিজেই পোস্ট দেন। কিন্তু ইসলামী সন্ত্রাসবাদ নিয়ে লিখলে তার গায়ে ফোস্কা পড়ে। নানা রকম ভাবে ত্যানা পেঁচিয়ে খণ্ডন করার চেষ্টা করেন। মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতেও তাকে মাঝে সাঝেই রঙ বেড়ঙ-এর নানা পদের খেলা খেলতে দেখা যায়। সত্য হচ্ছে গোলাম আজমের ঘোষণাপত্র পাঠ ছাড়া ভাষা আন্দোলনে কোন ভূমিকাই ছিল না। সেটাও যে কৌশলগত কারণে মূলতঃ হিন্দু অরবিন্দকে বাদ দেয়ার জন্য করা হয়েছিল সেটা ঐতিহাসিক সত্য। এটা যদি বিরাট কোন ব্যাপার হয় তাহলে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের দিন, বিটিভিতে যে কোঁকড়া চুলের ঘোষক (ব্যাটার নামও ভুলে গেছি) ‘ঘটনাক্রমে’ সেটি প্রথম পাঠ করেছিলেন, তাকে ‘স্বৈরাচার পতন দিবসের’ সৈনিক হিসেবে ডাকা লাগে। কি বিরাট ভূমিকা, তাই না! কি ‘পজেটিভ’ অবদান!
এমনকি ভাষা আন্দোলনে গোলাম আজমের তথাকথিত ‘পজেটিভ’ অবদান এর কথা যদি ধরেও নেই, গোলাম আজম নিজেই সেটা বাতিল করেছিলেন ‘বাংলা ভাষার আন্দোলন ভুল হইয়াছিল’ বলে। এমনকি তিনি এও বলেছিলেন, বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা শ্লোগান ইসলাম ও পাকিস্তানবিরোধী’। তিনি সেসময় আরো বলেছিলেন, ‘বাঙালিরা কখনো জাতি ছিল না’ (দৈনিক পাকিস্তান, ১৩ই এপ্রিল, ১৯৭০)। প্রথম শহীদ মিনারকে পুজামণ্ডপ বলেছিলেন, ওটাকে গুড়িয়ে দেয়াকেও স্বাগত জানিয়েছিলেন এই ‘ভাষা সৈনিক’। ত্যানা যতই প্যাচানো হোক না কেন, এই সত্যগুলো সবই ডকুমেন্টেড!
@অভিদা,
কিন্তু ইসলামী সন্ত্রাসবাদ নিয়ে লিখলে তার গায়ে ফোস্কা পড়ে। নানা রকম ভাবে ত্যানা পেঁচিয়ে খণ্ডন করার চেষ্টা করেন।
ইসলাম কি সন্ত্রাসবাদ হতে পারে? এইটা শান্তির ধর্ম ( religion of Piece) না ?
শান্তির ধর্মের মেলা নমুনা আমরা জানি, আজ শান্তির ভয়েই মনে হয় আমেরিকার আদালত পর্যন্ত ভীত।খবরটা আপনি পড়েছেন নিশ্চয়ই তবু যদি বাই এনি চান্স মিস করেন তাই লিঙ্ক টা দিলাম। ‘ইনোসেন্স অফ মুসলিমস’ মুছে ফেলার নির্দেশ । ইসলাম সন্ত্রাসবাদ সমর্থন করতেই পারে না, যারা বলে যে ইসলাম শান্তির ধর্ম না তাদের কল্লা কেটে piece করা হবে
@অভিজিৎ,
উনি নিজে বৌদ্ধ ধর্মে কত ধরনের সহিংসতা আছে তা নিয়ে নিজেই পোস্ট দেন।
এটা হবে “বৌদ্ধ ধর্মের নামে সহিংসতা……”, “বৌদ্ধ ধর্মে কত ধরনের নয়…”
মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতেও তাকে মাঝে সাঝেই রঙ বেড়ঙ-এর নানা পদের খেলা খেলতে দেখা যায়।
রংবেরঙ এর বলতে কি – ব্যাপারটা আমি ধরতে পারলামনা।
কিন্তু ইসলামী সন্ত্রাসবাদ নিয়ে লিখলে তার গায়ে ফোস্কা পড়ে। নানা রকম ভাবে ত্যানা পেঁচিয়ে খণ্ডন করার চেষ্টা করেন।
এই বাক্যর কোন ভিত্তি আছে কিনা আমার জানা নেই!!! আমি অনেক জায়গায়ই বলেছি আমি সকল ধরনের সন্ত্রাসবাদের বিপক্ষে!!!
এমনকি ভাষা আন্দোলনে গোলাম আজমের তথাকথিত ‘পজেটিভ’ অবদান এর কথা যদি ধরেও নেই, গোলাম আজম নিজেই সেটা বাতিল করেছিলেন ‘বাংলা ভাষার আন্দোলন ভুল হইয়াছিল’ বলে। এমনকি তিনি এও বলেছিলেন, বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা শ্লোগান ইসলাম ও পাকিস্তানবিরোধী’। তিনি সেসময় আরো বলেছিলেন, ‘বাঙালিরা কখনো জাতি ছিল না’ (দৈনিক পাকিস্তান, ১৩ই এপ্রিল, ১৯৭০)। প্রথম শহীদ মিনারকে পুজামণ্ডপ বলেছিলেন, ওটাকে গুড়িয়ে দেয়াকেও স্বাগত জানিয়েছিলেন এই ‘ভাষা সৈনিক’। ত্যানা যতই প্যাচানো হোক না কেন, এই সত্যগুলো সবই ডকুমেন্টেড!
এই লাইনেই বলতে হয় – এজন্যই আমি বাস্তব সম্মত সমালোচনার ব্যাপারটা সামনে নিয়ে এসেছি! বাংলা “সমালোচনা” বিষয়টিই আসলে ঠিক উন্নয়ন লাভ করেনি – সমালোচনায় নেগেটিভ এভং পজেটিভ দুইটিই আস্তে হয়।
যেমন, আপনি যদি কোন অ্যাভারেজ হাইস্কুল পাশ আমেরিকান কে জিজ্ঞেস করেন যে বেনেডিক্ট আর্নল্ড কে?? উত্তরে সে শুধু একটি শব্দই বলবে “ট্রেইটর”। তবে শিক্ষিত এবং রাজনীতি এবং ইতিহাস সচেতন ব্যাক্তি বিশেষত ইউনি ফ্যাকাল্টি, মিলিটারি অফিসার কিংবা উচ্চশিক্ষিত পলিটিশিয়ানকে জিজ্ঞেস করেন তাহলে উত্তরটি অন্তত একটি বাক্য হবে।
আর এই লেখার শুধু কনস্ট্রাকটিভ কত গুলো দিক যদি দেখি – তাহলে বলতে হয় কতগুলো ব্যাপার এখানে আলোচনাই করা হয়নি। যেমন – ঐ সময় ভাষা আন্দোলন ঢাকা ছাড়া আর কোথায় কোথায় হয়েছিল, এই আন্দোলনে বিভিন্ন সংঘটন গুলো – সবচাইতে বড় কথা জামায়াত-শিবিরের দাবী গুলো একটি একটি খণ্ডানও হয়নি!!!
একমাত্র কামাল লোহানীর “ব্যাক্তিগত” বরাত ছাড়া আসলে আর কিছুই নেই…… লেখার শিরোনামকে প্রকৃত ভাবে ডিফেন্ড করার জন্য আসলে কোন উপাদানই নেই। আর সবচাইতে হাস্যকর – শেষদিকে লেখক এমন সব ব্যাপারের অবতারণা করলেন পরে মনে হল কিটি পার্টিতে ভদ্র মহিলারা যে ধাঁচে আড্ডা দেন “অ্যাই ভাবী, শোন, মিসেস…… না…… “ তেমন… । লেখক এক জায়গায় বলেছেন – “আপন নাতী-নাতনীদের কিন্তু তিনি বাংলা শিক্ষা দেননি” – এটা একটা কথা হল??? নাতি -নাতনিদের গার্ডিয়ান কে??? কর্মক্ষম বাপ-মা বেঁচে থাকলে তাদের সন্তানদের এসব দায়িত্ব কি নানা-দাদা নেয় ???
এজন্যই বলছি – লেখার শিরোনামের প্রতি এর ভেতরের উপাদান বড়ই অন্যায় আচরন করেছে! আবারও বলছি “আবেগ দরকার” তবে আবেগের কারণে ভুল করে যদি প্রতিপক্ষকে সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে ঐ ধরনের আবেগ অবশ্যই বর্জনীয় – নাহলে ক্ষতি বৈ লাভ হবেনা!!
এটা হবে “বৌদ্ধ ধর্মের নামে সহিংসতা……”, “বৌদ্ধ ধর্মে কত ধরনের নয়…”
সেটাই সই। মুল বিষয় হল, বৌদ্ধ ধর্মের নামে সহিংসতা নিয়ে আপনার অপার আগ্রহ দেখি, কিন্তু ইসলামের নামে সন্ত্রাস নিয়ে কেউ লিখলেই শুরু হয় আপনার ত্যানাপ্যাচানি। রাজীব হত্যার সময় জংগিদের নিয়ে লেখার সময়েও দেখেছি। পাবলিকে তো আর ঘাষ খায় না ভাইজান!
এজন্যই আমি বাস্তব সম্মত সমালোচনার ব্যাপারটা সামনে নিয়ে এসেছি! বাংলা “সমালোচনা” বিষয়টিই আসলে ঠিক উন্নয়ন লাভ করেনি – সমালোচনায় নেগেটিভ এভং পজেটিভ দুইটিই আস্তে হয়।
ওহ তাই নাকি? আপনার দৃষ্টিতে সবই ‘ব্যালেন্স’ করে লিখতে হবে তাই না? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বর্বরতা নিয়ে কেউ লিখলে, আপনি নিশ্চয় তাকেও বলবেন, সমালোচনায় নেগেটিভ এভং পজেটিভ দুইটিই ‘আস্তে’ হয়, রাইট? হিটলারের ভাল গুণ কি ছিল? এই ধরেণ – তিনি ক্যারিশম্যাটিক, কনভিন্সিং, ভেজিটেরিয়ান ছিলেন, ভাল ছবি আঁকতেন — আপনার মত পুটু চালান দিয়ে খুঁজলে নিশ্চয় অনেক গুণ পাওয়া যাবে। আসেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার বর্বরতা গৌন রেখে ওই সব অবান্তর গুণগান নিয়েই লিখি, কেমন? নাৎসী বাহিনীর অত্যাচারের কথা বললেও আগে তাদের কিছুটা গুণগান করে নিতে হবে আমাদের, নাইলে ব্যালেন্সড এপ্রোচ হবে না যে! মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ বাঙালির আত্মত্যাগ, ২ লাখ নারীর ধর্ষণের কথা লিখতে গেলেও বোধ হয় আগে রাজাকারদের কিছু প্রশংসা আর মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকদফা বদনাম না করলে চলবে না বোধ হয়। আপনি করুন যত ইচ্ছা। আমার দরকার নাই। কিছু ক্ষেত্রে ব্যালেন্সড এপ্রোচ বলে কিছু নেই। ওয়ান সাইড ক্যান বি রং, ডেড রং। এটা বুঝতে শিখুন।
একমাত্র কামাল লোহানীর “ব্যাক্তিগত” বরাত ছাড়া আসলে আর কিছুই নেই…… লেখার শিরোনামকে প্রকৃত ভাবে ডিফেন্ড করার জন্য আসলে কোন উপাদানই নেই।
না, কামাল লোহানীর বরাত ছাড়াও আরো অনেক উপাদানই আছে। আপনার অন্ধ চোখে কিছু পড়ছে না। সে সময় যারা ভাষা আন্দলনের সাথে জড়িত ছিলেন, তাদের অনেকের কথাই উঠে এসেছে লেখাটায়। বহু পত্রিকার কাটিং দেয়া হয়েছে, গোলাম আজমের নিজ উদ্ধৃতিই হাজির করা হয়েছে। আছে একই ইস্যুতে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর স্মৃতিচারণও। আমিই বরং আপনি যে তথাকথিত ‘পজেটিভ’ অবদানের দায়সারা উল্লেখ করেছিলেন, সেটার স্বপক্ষে আপনাকে কোন প্রমাণ হাজির করতে দেখিনি, দেখছিনা। আশে পাশে ঝোপঝাড় পিটিয়ে তো লাভ হবে না ভাই। এক্ষেত্রে বার্ডেন অব প্রুফটা সরাসরি আপনার কাঁধেই।
তবে সেগুলো বাদ দিয়ে চুপা-চাগামি করলে আমার কিছু করার নেই।
@অভিজিৎ,
রাজীব হত্যার সময় জংগিদের নিয়ে লেখার সময়েও দেখেছি।
কি দেখেছেন!!
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বর্বরতা নিয়ে কেউ লিখলে, আপনি নিশ্চয় তাকেও বলবেন
ব্যাপারটা যদি অ্যাকাডেমিক অ্যাপ্রোচে হয় – অবশ্যই বলব; আসলে বলতেও হবেনা – তার সম্পর্কে বেশিরভাগ বিখ্যাত লেখাই ওভাবেই লেখা হয় – শুধু হিটলার নয়, স্টালিন এবং মাও সহ আরও অনেকেই…
অত দূরে যেতে হবে কেন – সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ এর ব্যাপারেও একই কথা… সে যেমন ৭১ সালে একজন রাজাকার ছিল – অবৈধ ক্ষমতা দখলদার স্বৈরাচার ছিল – একই সাথে সে প্রেসিডেন্ট থাকার সময় এমন কতগুলো প্রশাসনিক কাজ করেছিল যার ফল সুদূর প্রসারী।
এটা আমি তখনই করব যখন এটা একটা সামগ্রিক আলোচনায় বলা হবে – তবে আমি প্রকাশ্য এসব অবশ্যই বলবনা – যেখানে সে এবং তার চামচারা ওসব ম্যাটেরিইয়ালাইজড করার সুযোগ পাবে!
না, কামাল লোহানীর বরাত ছাড়াও আরো অনেক উপাদানই আছে।
আর যা আছে ওসব যথেষ্ট নয় । আর বাকি কয়েকজনের (আসলে একজনের) টা ততটা বিশ্বাস করা যায়না (ঐতিহাসিক এবং অন্যান্য / বিভিন্ন ব্যাপারে তার স্ববিরোধি বিভিন্ন বক্তব্যর/ কথাবার্তার জন্য উনি অনেক আগেই গ্রহন যোগ্যতা হারিয়েছেন) আর কয়েকটি হাস্যকর!! আর গোলাম আজমের উদ্ধৃতি লেখার উদ্দেশ্যকে মোটেই খন্ডায়না।
মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ বাঙালির আত্মত্যাগ, ২ লাখ নারীর ধর্ষণের কথা লিখতে গেলেও বোধ হয় আগে রাজাকারদের কিছু প্রশংসা আর মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকদফা বদনাম না করলে চলবে না বোধ হয়। আপনি করুন যত ইচ্ছা। আমার দরকার নাই। কিছু ক্ষেত্রে ব্যালেন্সড এপ্রোচ বলে কিছু নেই। ওয়ান সাইড ক্যান বি রং, ডেড রং। এটা বুঝতে শিখুন।
আপনি যেহেতু এই লেখার অন্যতম একজন কন্ট্রিবিউটার এবং স্পষ্টত আপনি বলেছেন এই ক্ষেত্রে আপনার অবস্থান “নিরপেক্ষ” / “সামগ্রিক” আলোচনা নয় – তাহলে আমার আর আগ বাড়ানো উচিত নয়।
আপনাকে ধন্যবাদ।
@সংবাদিকা,
কি দেখেছেন!!
জায়গা বিশেষে ত্যানা প্যাচানো। আপনি নিজেই ইসলামের সন্ত্রাস নিয়ে নিজের মন্তব্য দেখুন, আর বৌদ্ধদের সহিংসতা নিয়ে নিজের পোস্টের সাথে তুলনা করুন। বুঝে যাবেন।
আর যা আছে ওসব যথেষ্ট নয় । আর বাকি কয়েকজনের (আসলে একজনের) টা ততটা বিশ্বাস করা যায়না (ঐতিহাসিক এবং অন্যান্য / বিভিন্ন ব্যাপারে তার স্ববিরোধি বিভিন্ন বক্তব্যর/ কথাবার্তার জন্য উনি অনেক আগেই গ্রহন যোগ্যতা হারিয়েছেন) আর কয়েকটি হাস্যকর!! আর গোলাম আজমের উদ্ধৃতি লেখার উদ্দেশ্যকে মোটেই খন্ডায়না।
সেটা আপনার ভাবনা। সব যদি বাদও দেই, গোলাম আজম যেখানে নিজেই পরবর্তীতে নিজেকে ভাষা আন্দোলনের থেকে সরিয়ে নিয়েছেন, বলেছেন ওটা ভুল ছিল, যিনি জাতি হিসবেই আমাদের সত্ত্বা অস্বীকার করেছেন, স্বাগত জানিয়েছে একুশের শহীদ মিনার গুড়িয়ে দেয়াকে, তাকে কিভাবে ‘ভাষা সৈনিক’ হিসেবে আখ্যা দেয়া যায় তা আমার বোধগম্য নয়। যারা গোলাম আজমের মূল ইনভলভমেন্ট বাদ দিয়ে বাটি চালান দিয়ে জায়গাবিশেষে ‘পজিটিভ’ অবদান খোঁজেন তা আমার কাছে হিটলারের বর্বরতা বাদ দিয়ে ‘তিনি কত বড় আর্টিস্ট ছিলেন’ – সেরকম তানা প্যাচানোর মতোই লাগে।
আর কথা হল ‘পজেটিভ অবদানের’ কথা আপনিই বড় গলায় বলেছিলেন, কাজেই আশা করেছিলাম সেটার রেফারেন্স আপনার কাছে থেকেই আসবে। আসেনি। আমাদের দেয়া দৈনিক পত্রিকার রেফারেন্স, কালাম লোহানী, আব্দুল গাফফার চৌধুরী কারো স্মৃতিচারণই দেখছি আপনার পছন্দ হচ্ছে না। আপনি ড. হান্নানের বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস : ১৮৩০-১৯৭১ পড়তে পারেন। সেখানেও একই বক্তব্য পাবেন। কিন্তু বলে লাভ কি? এ লেখায় তো তাও সমসাময়িক দৈনিক পত্রিকা, গবেষক আর ভাষা সৈনিকদের রেফারেন্স দেয়া হয়েছে, আর আপনি আপ্নার মন্তব্য ডিফেন্ড করতে গিয়ে কেবল ‘রাজনৈতিক সচেতন কোন মুরুব্বী যদি আপনার আত্মীয় স্বজন কিংবা পরিচিত থাকে’ তার রেফারেন্স দিচ্ছেন। এই যদি হয় একাডেমিক এপ্রোচের নমুনা, তাইলে আমার আসলেই বলার কিছু নেই।
স্পষ্টত আপনি বলেছেন এই ক্ষেত্রে আপনার অবস্থান “নিরপেক্ষ” / “সামগ্রিক” আলোচনা নয় – তাহলে আমার আর আগ বাড়ানো উচিত নয়।
ঠিক বলেছেন, আমার অবস্থান এ ক্ষেত্রে শর্মিলা বসুর মত ‘নিরপেক্ষ’ কিছু নয়, আমি মেহেরজানের মত ‘ব্যালেন্সড’ সিনেমাও বানাতে বসিনি। কাজেই এ নিয়ে কথা আর না বাড়ানোই ভাল হবে।
@অভিজিৎ,
গোলাম আজমকে ডিফেন্ড করা আমার উদ্দেশ্য নয় – আমি বলেছি এই লেখা নিয়ে এবং তার শিরোনাম নিয়ে – এই লেখা তার শিরোনামের সৎ ব্যবহার করতে পারেনি কোন ভাবেই।
আবারও বলছি – আমরা যেন আবেগ কে অন্যান্য ফ্যাক্টররের আগে আশ্রয় দিয়ে প্রতিপক্ষকে যেন সুযোগ করে না দেই!!
ধন্যবাদ।
@সংবাদিকা, আমি অভিদার একটা কথা quote করে আপনাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছি
ওয়ান সাইড ক্যান বি রং, ডেড রং।
এই কথাটা কিন্তু অভিদা খুব বাস্তব সম্মত কথাই বলেছেন, আপনি কি ব্যাপারটা বুঝেন না? আচ্ছা আমি একটা ছোট উদাহরন দেই ভাই।আপনি তো ধর্মপ্রান, নিদেন পক্ষে আস্তিক। এখন যদি আল্লাহ আর শয়তান এই দুটিকে বিচার করতে দেয়া হয়, আপনি নিশ্চয়ই শয়তানের কোন ভাল গুন দেখবেন না। তার মানে আপনার নিজের ভাষায় আপনি নিজেরই এখনো সমালোচনা শেখার বাকি আছে।
গনগত্যাকারীর, গনধর্ষনকারীর কোন ভাল দিক খুজতে গেলে শয়তানের ভাল দিক খুজা লাগবে আপনাকে। আপনি যদি এক বাক্যেই ইবলিশ কে বাতিল করে দেন, তবে মনে রাখতে হবে যে হিটলার ছিল দুনিয়াতে এক ইবলিশ শয়তান। ইয়াহিয়া আর তার চ্যালা গো হুজুর শয়তানের আরেক দল। এখন আপনার কথামত যদি গো হুজুরের নেগেটিভ দিন আস্তে দেখতে হয়, সেক্ষেত্রে শয়তানের টাও আস্তে দেখতে হবে। সেটা না দেখলে গো আযমের টা আস্তে দেখার কারন নেই।সত্যিই কিছু ক্ষেত্রে ব্যালেন্সড এপ্রোচ বলে আসলেই কিছু নেই কিছু নেই।
অফটপিকঃ শয়তান যে গন্ধম খাইতে বলেছিল, এইটা নাকি আসলে যৌন সঙ্গম। এইটা অবশ্য আমি নিশ্চিত না তাই জোর দিয়ে বলছি না। তবে যদি এই কথাটা সত্যি হয়, তাহলে বলব যে আল্লাহপাকের চেয়ে বরং শয়তানই মানুষের জন্য অপেক্ষাকৃত কল্যানকামী; জিউস বনাম প্রমিথিউসের মত। 😀
@অর্ফিউস,
হা হা…… ভালোই বলেছেন… অবশ্যই… ডেড রং বলেই দেশের স্বার্থে কোন অবৈধ কাজ করারও আমি পক্ষপাতি… আর যার যার পরিবারের কথা বলাই বাহুল্য! হতেই হবে নাহলে কেউই টিকে থাকতে পারবেনা।
কিন্তু বিষয়টি কি জানেন??
যুদ্ধ ময়দানে যখন সৈনিকরা মনে করে তারাই পৃথিবীর সেরা তখন তাঁবু কিংবা বাঙ্কারের কমান্ড পোস্টে বসে জেনারেলরা আলোচনা করে নিজেদের কি কি দুর্বলতা এবং শক্তিশালী দিক আছে সাথে সাথে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা এবং শক্তিশালী দিক কোনগুলো!!
ভারতের প্রাচীন এবং মধ্যযুগের ইতিহাস পড়েছেন – টারশিয়ারী পাঠ্য বই ??? দক্ষিণ এশিয়ার ৯টি দেশের (আফগানিস্তান এবং মিয়ানমার সহ) ৯ জন স্থানীয় লেখকের লেখা পড়ে দেখেন। আমি অবশ্য শুধু বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়ারটা পড়েছি – নবম শ্রেণীতে থাকতে বাংলাদেশের এবং একাদশ শ্রেণীতে ভারতের রাইটারের লেখা- লাইব্রেরী থেকে নিয়ে – পুরাই তাজ্জব হয়ে গেছিলাম – ১৫-১৬ বছর বয়সে!! কোনটা “শতভাগ” সত্য এটা ভেবে
@সংবাদিকা,
নবম শ্রেণীতে থাকতে বাংলাদেশের এবং একাদশ শ্রেণীতে ভারতের রাইটারের লেখা- লাইব্রেরী থেকে নিয়ে – পুরাই তাজ্জব হয়ে গেছিলাম – ১৫-১৬ বছর বয়সে!! কোনটা “শতভাগ” সত্য এটা ভেবে
সেতো অবশ্যই। এইসব দিনের স্মৃতি কি আর ভোলা যায়, যখন ইসলাম শিক্ষা বই পড়ে পরম তৃপ্তি লাভ করতাম। আরো বেশি জানার আশায় গোলাম মোস্তফার বিশ্ব নবী বইটা আমার বাবার কাছ থেকে নিয়ে পড়লাম। খানিকটা রাগ আর গোস্যা নিয়ে ভাবতাম যে কেন যে অমুসলিমরা( পড়ুন কাফের), জেনেবুঝেও আল্লাহকে বাদ দিয়ে শতানের পথ ধরে!! শতভাগ বিশ্বাস করতাম যে ইয়াহুদী আর নাসারাগন জেনে বুঝেই হুজুরকে অস্বীকার করছে, যদিও মাথায় খেলত না যে জানার পরেও কেন এই আল্লাহদ্রোহ :hahahee:
@অর্ফিউস,
কেন ক্লাশে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী কেউ ছিলনা ??? আমি কিন্তু নবম শ্রেণীর প্রথম মাসেই বৌদ্ধ, খৃসচিয়ান এবং হিন্দু ধর্মালম্বী বন্ধুদের থেকে তাদের বই গুলো নিয়ে খুব আগ্রহ সহকারে পড়ে শেষ করেছিলাম।
আচ্ছা একটা প্রস্তাব দেননা সরকারকে কিংবা আন্দোলন গড়ে তোলেন… যারা কোন ধর্মে বিশ্বাসী নয় তাদের যেন কোন ধর্মের বই পড়তে বাধ্য না হয় এবং তার বদলে পল হেনরি, খ্রিস্টোফার হিচ কিংবা রিচার্ড ডকিন্সের কিশোর উপযোগী রচনা থাকবে।
@সংবাদিকা,
কেন ক্লাশে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী কেউ ছিলনা ???
তা থাকবে না কেন? অবশ্যই ছিল। হিন্দু ছিল শুধু।
আমি কিন্তু নবম শ্রেণীর প্রথম মাসেই বৌদ্ধ, খৃসচিয়ান এবং হিন্দু ধর্মালম্বী বন্ধুদের থেকে তাদের বই গুলো নিয়ে খুব আগ্রহ সহকারে পড়ে শেষ করেছিলাম।
সে সুযোগ কেউ কেউ নাও নিতে পারে যদি শুরু থেকেই নেতিবাচক ধারনা দেয়া হয়ে থাকে। যাক সেই দিন আর নাই ব্যখ্যা করতে গেলে অনেক সময়ে লেগে যাবে বা আমার সংশয় টাইপ কিছু লেখালেখি শুরু করতে হবে, যার ইচ্ছা আমার একেবারেই নেই :)) ।
শুধু এটুকুই বলতে পারি যে বেশ পরে আমি অন্য ধর্মগ্রথগুলো পড়ে তুলনা করার সুযোগ পাই।

অর্ফিউস এর জবাব:
মার্চ ৩, ২০১৪ at ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ
@সংবাদিকা,
আচ্ছা একটা প্রস্তাব দেননা সরকারকে কিংবা আন্দোলন গড়ে তোলেন… যারা কোন ধর্মে বিশ্বাসী নয় তাদের যেন কোন ধর্মের বই পড়তে বাধ্য না হয় এবং তার বদলে পল হেনরি, খ্রিস্টোফার হিচ কিংবা রিচার্ড ডকিন্সের কিশোর উপযোগী রচনা থাকবে।
ঘাড়ে আমার তো আর রাবণের মত দশমাথা নেই, আর একটা কেটে গেলে আরেকটা গজায় না। এই ব্যবস্থা না থাকলে রামের সাথে লাগতে যাবার চিন্তাও কেউ করবে না রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত পরিবারে বাস করে

@সংবাদিকা,
আমি এই পর্যন্ত যতটুকু জেনেছি এবং বুঝেছি সেই অনুযায়ী আমার এটা স্বীকার করেনিতে কোন অসুবিধা নেই যে ১৯৫২ সালের ভাষার প্রশ্নে যে আন্দোলন হয়েছিল সেখানে তার অবদান পজেটিভ ছিল।
দুইয়ে দুইয়ে পাঁচ হয়ে গেলো না ব্যাপারটা? কিসের ভিত্তিতে বললেন কথাটা বুঝিয়ে বলুন, এবং সাথে কিছু নির্ভরযোগ্য সুত্র দিন।গো আজমকে যেকোন বিষয়ে পজিটিভ বানাবার আগে নির্ভরযোগ্য সুত্র দরকার আছে।
@অর্ফিউস,
বিভিন্ন জায়গায় ঘাঁটাঘাঁটি করেন আর সবচেয়ে ভালো হয় যদি ঐ সময়কার রাজনৈতিক সচেতন কোন মুরুব্বী যদি আপনার আত্মীয় স্বজন কিংবা পরিচিত থাকে।
@সংবাদিকা,
রাজনৈতিক সচেতন কোন মুরুব্বী যদি আপনার আত্মীয় স্বজন কিংবা পরিচিত থাকে।
ঘাঁটাঘাটিই করতে হবে,মুরুব্বি ধরে লাভ নেই, যদি তথাকথিত রাজনৈতিক সচেতন মুরুব্বী আজ অন্যদিকে ডাইভার্ট হন তাহলে? বরবাদ মজহারের দশা তো দেখতেই পাচ্ছি; মুরুব্বিরদেরও যে একই দশা হয়নি মনে মনে তা কেমনে বুঝব? আজকাল দেশের মানুষদের বিশ্বাস করতে ভয় হয় খুবই।
মুক্ত মনা চিরকাল আমার জন্য একটা বড় সোর্স ছিল। লেখাটার সহ লেখক অভিদা, আর উনাদের লেখা পড়েই অনেক কিছু জেনেছি আগে, এখনও সঠিক জিনিসটা জানতে পারব আশা রাখি। তবে গোলাম আজম ভাষা সৈনিক এমন দাবী যখন করা হয় প্রথমে মাথা ঘামাইনি, আজকাল যখন মুক্তি যোদ্ধাদের সন্তানরাও তাকে অন্তত পজিটিভ বলা শুরু করেছে, এতেই বুঝে গছি যে কাম হইসে। ওই ইতর টাকে পজিটিভ আপনি বলেছেন, কাজেই আপনার কি একটা নৈতিক দায়িত্ব বর্তায় না এটার স্বপক্ষে কিছু মালমশলা সাপ্লাই করা?

ধন্যবাদ লেখকদ্বয়কে, এমন সুন্দর একটা তথ্যবহুল লেখার জন্য। সম্ভবত গোলাম আজম ঝোঁকের বশে না বুঝে শুনে কিছুটা এডভেন্সারিস্টের ন্যায় মানপত্রটি পড়েছিলেন। পরে যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে- এটা শুধুমাত্র একটা ভাষার ব্যাপার নয়, এটা একটা জাতীয়তার দাবী, শোষন-বঞ্ছনার বিরুদ্ধে ন্যয্যতার দাবী, একটা সংস্কৃতির দাবী- তখন তিনি ভাষা-আন্দোলন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিরাপদ দুরুত্বে অবস্থান নেন। নতুবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জি.এস. হিসেবে (অনির্বাচিত হলেও) এতবড় একটা আন্দোলনে তার সরব উপস্থিতি ইতিহাসের কোথাও নেই কেন? তাকে ‘ভাষা সৈনিক’ বলা যেত, যদি তিনি উক্ত আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নিজেকে শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে রাখতেন।
বাংলা ভাষাকে অবলম্বন করে যে ‘বাঙ্গালী‘ জাতিসত্ত্বার উন্মেষ ঘটেছে, সমগ্র জীবনের গুরুত্বপূর্ন সময়টি যিনি সেই বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাকে কিভাবে ভাষাসৈনিক বলা যেতে পারে এটা আমার বোধগম্য নয়। স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্কের ন্যায় ভাষা আন্দোলনের ঘোষক বিতর্ক শুরু না হয়, সেই আশঙ্কা করছি।
৥ সংবাদিকা এর যুক্তিপূর্ন উপস্থাপনা বেশ হৃদয় আকর্ষী। তবে তাঁর একটা বক্তব্য – “সত্য হলো – বঙ্কিমের চরম স্তাবকরাও স্বীকার করেন রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনায় তিনি একজন চরম সাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী ছিলেন। আর রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চেতনা সম্পর্কে বললে বলতে হয় – বাঙ্গালীদের নেতৃত্বে নেশন-স্টেট গঠনের চিন্তা তিনি দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি ”
এর জবাবে শুধু এটুকু বলতে চাই- বাংলা সাহিত্যের দিকপাল বঙ্কিম এর লেখার মধ্যেই প্রথম বিজ্ঞান মনোস্কতার প্রকাশ ঘটতে থাকে। তিনি মোগলদের জীবনযাত্রার কদর্য দিকগুলিকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন বলে মোগলপ্রেমিকরা তাকে সাম্প্রদায়িক চেতনাধারী বলে মনে করতে পারে। আর রবীন্দ্রনাথের মতো এতবড় একজন দার্শনিককে এতটা হালকাভাবে বিচার করা আমার নিকট কেন যেন বেমানান মনে হয়েছে।

তথ্য বহুল ও সময়োপযোগী লেখার জন্য আরিফ রহমান ও অভিজিৎ দাকে ধন্যবাদ.
ধন্যবাদ পোস্টটি দেয়ার জন্যে। গোলাম আযমের ভাষা আন্দোলনের ভূমিকা নিয়ে অনেকেরই সংশয় দেখা যায় যেটি আমারও অনেক দিন যাবত ছিলো।
তবে পোস্টটি কয়েকটি জায়গায় বেশ স্ববিরোধী ছিলো; গোলাম আযমের আপোসী স্মারকলিপি পাঠ এবং পরবর্তিতে বলা যে, এটি গোলাম আযমের লিখা ছিলো না। সামগ্রিকভাবে পুরো পোস্টটা তেমন কোন অর্থবহন করে নি। শুধু এতটুকু জানা গিয়েছে যে, গোলাম আযমের স্মারকলিপি পাঠ ছিলো একটা দূর্ঘটনাপ্রসূত।
দ্বিতীয়ত ব্যাপার এই যে,
বাংলায় তো আপনি, তুই, তুমি-এর বিরাট সমস্যা।
এটা দেয়ার খুব একটা প্রয়োজন ছিলো না। আমার নিজেরও বাংলা ভাষার একটা সমস্যা মনে হয়। তাছাড়া, আপনি ঠিক ওনার মেকি আফসোস প্রমাণ করার জন্যে যেই উদ্ধৃতি টেনেছেন সেটি ওনাকে মেকি প্রমাণ করার জন্যে যথেষ্ট না। এই অংশটুকু না দিলেও পোস্টের মূল বক্তব্যের কোন সমস্যা হতো না; এটি পোস্টকে যুক্তিগত দিক দিয়ে দূর্বল করেছে বলে আমার মনে হলো।
আর বঙ্কিম তো সাম্প্রদায়িক ছিলেনই। ‘শত বর্ষের ফেরারী’ এই নামে তো আহমেদ ছফার একটা বিশাল প্রবন্ধও ছিলো বঙ্কিমকে বিশ্লেষন করে। তবে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে ওনার মূল্যায়ন সৎ না এটা খুব স্পষ্টই বুঝা যায়। সেক্ষেত্রে পোস্টে এটা উল্লেখ করে ভাষা আন্দোলনে ওনার অবদানকে কিভাবে মূল্যায়ন করা যায় তা আমার কাছে স্পষ্ট না। তাছাড়া এভাবে সমালোচনা পদ্ধতি আমার কাছে সৎ মনে হয় না; মনে হয় লেখক আগে থেকেই একটা উদ্দেশ্যমূলক কাঠামো দাঁড় করিয়ে লিখা লিখছেন। আর ব্যাক্তিগতভাবে আমি মনে করি না শত্রুর লিখাকে ডিসকন্ট্রাকশনের সুযোগ নিয়ে প্রয়োজন মোতাবেক তুলে ধরা।
আপনাকে আমি আহত করার জন্যে কথাগুলো বলি নি; আমি আমার জায়গা থেকে আমার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করলাম মাত্র। তবুও যাই হোক, পোস্টটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ভাষা আন্দোলনের সময় তমাদ্দুন মজলিশ – এর সাথে গোলাম আজমের কি ধরনের সম্পর্ক ছিল ? তার অফিসিয়াল বায়োগ্রাফী পাতায় নিম্নোক্ত তথ্য পেলাম :
He played an active role in the language movement and was arrested twice, in 1952 and in 1955. He also lost his job as an assistant professor at Rangpur Carmichael College for his role in the language movement. Although his job was reinstated after a strong student protest, he did not re-join as he had decided to dedicate his life in the cause of Islam.
He came in touch with a broader socio-political understanding of Islam through a cultural organisation named ‘Tamaddun Mozlish’ – an organisation that also played a key role in the language movement. While a teacher of Political Science in Rangpur Carmichael College, he founded a branch of ‘Tamaddun Majlish’ in Rangpur in 1952.
এ বিষয়ের সত্যতা সম্পর্কে আপনাদের কাছে জানতে চাই। ধন্যবাদ।
গোলাম আজমের ভূমিকা ‘৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পক্ষেই ছিল, এতে কোন ভুল নেই, অস্বীকারের উপায় নেই। প্রয়োযনও নেই। অবদান যাইই থাক, যার প্রক্সিই দিক, মানপত্রে যাইই লেখা থাক সেসব খুব গুরুত্বপূর্ন মূল আর্গুমেন্টে নয়।
মূল টার্নিং পয়েন্ট ‘৭০ সালের তার নিজের এবাউট টার্ন ঘোরা। আমার মতে সেটা সে না করলে তাকে ভাষা সৈনিক ষ্ট্যাটাস দিতে কার্পন্য করাটা বাড়াবাড়ি হত, ‘৭১ এর ভূমিকা যাইই হোক না কেন।
সে নিজে যেখানে কৃতিত্ব অস্বীকার করেছে, ‘৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পজিটিভ ভূমিকা ভুল বলে দাবী করেছিল সেখানে আমরা কোথাকার কে তাকে বলপূর্বক কৃতিত্ব চাপিয়ে দেওয়ার? তার নিজের অস্বীকৃতির পরও তাকে ভাষা সৈনিক দাবী করে যাওয়া তাকেই অপমান করা।
কেউ আজকে কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সব পরীক্ষা পাশ করে ডিগ্রী অর্জন করল, চাকরিতে ঢুকল…… সে হয়ত ২০ বছর পর কোন কারনে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রী বাতিল করল (এমন ঘটনা বহু ঘটে)। তার মানে কি এই যে সে ২০ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা পাশ করার কারনে ডিগ্রী চলে যেতে পারে না?
গোলাম আজমের ঘটনা আরো সরল। এখানে কৃতিত্ব অস্বীকারের পক্ষ আমরা বা তার বিরোধী কেউ নয়, খোদ সে নিজে। সোজা বাংলায় ৭০ সাল পর্যন্ত তাকে ভাষা সৈনিক বলাটা ভুল নয়, এরপরও দাবী করাটা ভুল, সে নিজে দাবী করে গেলে বলতে হয় ভন্ড দ্যা গ্রেট।
ওপরে আরেকজন দেখি যথারীতি চমতকার সব শানিত যুক্তির অবতারনা করেছেন। বংগবন্ধুকে হত্যা করলে মুক্তিযোদ্ধা ষ্ট্যাটাস যায় না, সরকারী টাকা মেরে খেলেও মুক্তিযোদ্ধা ষ্ট্যাটাস যায় না। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা যদি নিজেই স্বীকার করে যে সে মুক্তিযূদ্ধে যোগ দিয়ে ভুল করেছিল তবে তাকে অস্বীকৃতির পর আর মুক্তিযোদ্ধা বলা যায় না। সে সত হয়ে থাকলে এরপর নিশ্চয়ই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোন প্রিভিলেজ নেবে না, মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকেও নাম কাটিয়ে নেবে।
কোন সত লোক দাবী করবে যে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করে ভুল করেছিলাম, কিন্তু হ্যা, আমি কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা? আমার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ দিলে কিন্তু আমি বেজায় গোস্যা করব? তারা হয়ত ততটা গোস্যা করবে না যতটা না গোস্যা করবে তাদের ছূপা সমর্থকরা।
গোলামের পেছনে লেগে অত এফর্ট দেবার তেমন কারন আমি দেখি না। গোলাম আসলে অনেকটাই সফল, লাইক ইট অর নট।
যেমন ১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসে তিনি বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা শ্লোগান ইসলাম ও পাকিস্তানবিরোধী’।
– গোলাম কি ভুল বলেছিল? মাত্র ৪ বছরের মাথায় যেই জয় বাংলা দিয়ে দেশ স্বাধীন হল সেই জয় বাংলা বাংলাদেশে এক রকমের নিষিদ্ধ হয়ে গেল। এরপর পূনঃস্থাপিত করা গেল সরকারের কে তার ওপর নির্ভর করে অনেকটা সিজনাল ধাঁচে। থ্যাংকস টু দ্যা আইডেন্টিটি ক্রাইসিস, গোলাম আজমই দীর্ঘ মেয়াদে বিজয়ী। আমাদের দৌড় বড়জোর ব্লগে ব্লগে কিছু গালাগাল করে গায়ের ঝাল মেটানো।
সবাই ক্ষমা করবেন পরীক্ষার জন্য উত্তর দিতে দেরি হলো।
এই লেখার বিপক্ষে মোটামুটি বড় যুক্তি এসেছে তিনটি আর বাদবাকি ত্যানা। তিনটি যুক্তিই খানিক আলোচনার দাবী রাখে
১) “গোলাম আজম যেহেতু মানপত্র লেখেনি সুতরাং ঐ মানপত্রে “বাংলা ভাষার কথায় জোর দেয়া হয়নি” এই দোষ গোলামের ঘাড়ে বর্তায় না।“
উত্তরঃ
খুবই যৌক্তিক পয়েন্ট। কিন্তু এখানে লক্ষ্য করতে হবে ঘটনা প্রবাহ, অনেক জায়গা লাগবে এবং পাঠক বিরক্ত হতে পারে ভেবে আমি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এখানে পুনরাবৃত্তি করিনি। আপনারা জানেন ৪৮ সালের মার্চে জিন্নাহ যখন সগৌরবে উচ্চারন করে
“উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা”
সেদিনই ছাত্ররা জোরালো প্রতিবাদ জানায়। এবং এরপর থেকে সমস্ত মিটিং মিছিলে এই ভাষা আন্দোলনের ইস্যু আনা অনিবার্য ছিলো। ২৭ নভেম্বর গোলামের যে মানপত্রটি পাঠকরা হয়েছিলো প্রধানমন্ত্রীর সামনে ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারি ভাষা সংগ্রামীরা আর পাকিস্তানপন্থীদের দরকষাকষির মুখে কোন রকমে ভাষা নিয়ে দুয়েক লাইন ঢুকিয়ে দেয়া হয় মানপত্রটিতে।
এরপরেও যদি আমরা ধরেও নেই গোলাম আসলেই মন থেকে বাংলাভাষার পক্ষের লোক তাহলেও এই মানপত্রে যেহেতু “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” জাতীয় কোন লাইন নেই বরং আপসকামী ভাষায় “We have accepted Urdu as our Lingua Franca” বলে উর্দুর প্রশংসা করা হয়েছে তখন গোলাম যে কোন ভাবেই ভাষা সৈনিক বলা যায় না।
গোলাম তৎকালীন জি এস ছিলেন, মানপত্র লেখার সময় সে সেখানে ঘসামাজা করেনি, কিংবা একবারও না পড়ে মঞ্চে উঠে তোতাপাখির মত আউড়ে গ্যাছে এই ব্যাপারটা মনে হয় একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যায় বই কি।
২)
১৯৫২ সালের ভাষার প্রশ্নে যে আন্দোলন হয়েছিল সেখানে তার অবদান পজেটিভ ছিল।
উত্তরঃ
এর সবচেয়ে দারুন উত্তরটা দিচ্ছি। লেখাটা শুরু করার সময় আমার কাছে একটাই মূল উপাদান ছিলো। শুক্কুরের ঐ সমাবেশের পর বের হওয়া দৈনিক আজাদের কপি গোলাম যেখানে বলে,
“বাংলা ভাষার আন্দোলন করা ভুল হইয়াছে”
এই একটা ডকুমেন্টই যথেষ্ট গোলাম যে ভাষা সৈনিক না সেটা প্রমাণ করার জন্য। একবার ভাবুন তো কোন মুক্তিযোদ্ধা যিনি সদম্বে যুদ্ধ করেছেন এরপর আবার সদম্ভে বলে বেড়াচ্ছে
“মুক্তিযুদ্ধ করা ভুল হইয়াছিলো বটে, তবে আমি কিন্তু ভাই মুক্তিযোদ্ধা”
কোন মুক্তিযোদ্ধা যদি নিজেই স্বীকার করে যে সে মুক্তিযূদ্ধে যোগ দিয়ে ভুল করেছিল তবে তাকে অস্বীকৃতির পর আর মুক্তিযোদ্ধা বলা যায় না। সে সৎ হয়ে থাকলে এরপর নিশ্চয়ই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোন প্রিভিলেজ নেবে না, মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকেও নাম কাটিয়ে নেবে।
শুক্কুরের ঐ ঘটনা যদি সত্য হয় (শুধু তাই না এর পরেও সম্প্রতিকালে ইন্ডিপেন্ডেন্ট কে দেয়া এক সাক্ষাতকারেও গোলাম বলেছে “ভাষা আন্দোলন করা ছিলো ভুল সিদ্ধান্ত” ) তাহলে সেই দিনের পর থেকেই ভাষা সৈনিকদের নাম থেকে তার নাম কাটা পড়ে গ্যাছে।
৩)
”নাতি নাতনীদের বাংলা শিক্ষা না দেয়া নানা/দাদার অপরাধ না।” কোটেশান যৌক্তিক না
উত্তরঃ
অবশ্যই নানার অপরাধ না। কিন্তু আপনারা যে ভুলটা করছেন সেটা হচ্ছে রেফারেন্সের গুরুত্ব না বোঝা। গোলাম আযমের জীবনীটি এই লেখার আগে আমি খুবই মনোযোগ দিয়ে পরেছি। এই বইটার উদ্দেশ্যই হচ্ছে গোলামকে ভাষা সৈনিক প্রমাণ করা। আর তাই খুব সু-কৌশলে বাংলার প্রসংসায় ভরা বইটি। বাংলার বিরুদ্ধে যায় এমন একটি বাক্যও এই বইতে পাওয়া অস্বাভাবিক, যখন এই বইয়ের একটা লক্ষই গোলাম কে ভাষা সৈনিক প্রমাণ করা। তারপরেও এই বইতেই যখন পাওয়া যায়
“বাংলাতে আপনি তুমি তুই একটা বিরাট সমস্যা”
তখন এটা কি একটা স্ব-বিরোধী উক্তি হিসেবে বাঙলা নিয়ে তার মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ নয় ?
তারপর একই ভাবে গোলাম যখন বলে সে ভাষা সৈনিক, শরতচন্দ্র ছাড়া ঘুম আসে না আবার এই একই মুখে বলে তার ছেলের বউরা হিজাব করে নাতি-নাতনিরা নামাজ পড়ে, এবং এসব অভ্যাস এসেছে তার কারণেই তখন স্বাভাবিক ভাবেই কি প্রশ্ন আসে না, বাংলা যখন তার এতই পেয়ারের… বাংলা কোরআনের তরজমা ছাড়া তিনি যখন কোরআন বুঝেন না, তখন নাতি নাতনীদের নামাজ শিক্ষা দানের সাথে সাথে বাংলা শেখালেন না কেনো ??
পাঠক আপনারা রেফারেন্সের গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। এসব ছিলো গোলামের নিজের জবানী। কোন গোলাম বিরোধী মানুষের না। তার নিজের স্ব বিরোধী কথাবার্তা অনেক সমালোচনা থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ
ব্যাপারটা অনেকটা
“ল্যাঞ্জা ইজ এ ডিফিকাল্ট থিং টু হাইডে”র মত।
শত চেষ্টা করেও গোলাম ল্যাঞ্জা লুকিয়ে রাখতে পারেনি। নিজের কথার জালে নিজেই ফেঁসে গ্যাছে।

তিন মোড়লের দাদাগিরিঃ জমিদারী প্রদর্শণ, নাকি অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নগ্ন কূটকৌশল…?
আরিফ রহমান
বাঙালী ক্রিকেট পাগল জাতি এটা ব্যাখ্যা করে বোঝানোর কোন বিষয় না। বাংলাদেশের প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক ডঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল একবার লিখেছিলেন,
“……ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপ আমি দুই চোখে দেখতে পারি না। কিন্তু ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ আমার অসম্ভব প্রিয়। কেউ যেন মনে না করে, আমি একজন খাঁটি বোদ্ধা। আমি ক্রিকেটের ওয়ার্ল্ড কাপ অসম্ভব ভালোবাসি, কারণ এই সময়টাতে সারা দেশের মানুষ লাল-সবুজ রঙের খেলায় মেতে ওঠে। এই খেলায় আমার নিজের দেশ খেলছে এবং আমরা ক্রমাগত ‘বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ’ করে চিৎকার করছি। দেশকে ভালোবাসার আর দেশকে নিয়ে গর্ব করার একটা সুযোগ করে দেয় এই ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট খেলা। যাঁরা ক্রিকেট বোদ্ধা, তাঁরা খেলার প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করেন, আমি পারি না। আমি খেলা দেখতে পারি, যখন সেই খেলায় বাংলাদেশ জিততে থাকে, শুধু তখন! বাংলাদেশ যদি কখনো কোনো খেলায় হেরে যায়, তখন দুঃখে আমার বুক ভেঙে যায়, মনে হয় হাউমাউ করে কাঁদি।…”
উপরের ছোট্ট লেখাটা থেকেই বোঝা যায় কি রকম ক্রিকেট পাগল জাতি আমরা

কিন্তু এবার ক্রিকেটের তিন মোড়ল অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের নীতির মুখে অস্তিত্ব হারানোর মুখে পড়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। আইসিসির তিন ‘শক্তিধর’ দেশের নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলাদেশের টেস্ট খেলা আজ সত্যিই হুমকির মুখে।
টেস্ট ক্রিকেটকে ‘আকর্ষণীয়’ করার তারা প্রস্তাব করেছে নতুন এক পদ্ধতির। সোজা ভাষায় বলতে টেস্ট ক্রিকেটে আমাদের র্যাবঙ্কিং ৯ আর প্রথম দশটি দল খেলতে পারে। মোড়লদের প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে এখন থেকে ৮ টি দল খেলতে পারবে টেস্ট ক্রিকেট এই দ্বি-স্তরবিশিষ্ট টেস্ট ক্রিকেটে র্যাপঙ্কিংয়ের ৯ ও ১০ নম্বর দলকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে খেলার ‘আশঙ্কা’ নিয়ে তোলপাড় এখন দেশের ক্রিকেট।
পাঠক একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখবেন তারা আটটি দল নিয়ে খেলার কথা বলছে, নয়টি নয় আবার সাতটিও নয়। এই পদ্ধতিতে প্রথম কোপটি পড়বে বাংলাদেশের দেশের উপর।
ক্রিকেট বিশ্বে আমরা যখন পৌঁছে যাচ্ছি অপ্রতিরুদ্ধ এক অবস্থানে ঠিক তখনই সংস্কারের নামে ক্রিকেটের তিন ‘মোড়লে’র এই অদ্ভুত প্রস্তাবকে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে চিরতরে শেষ করে দেওয়ার আন্তর্জাতিক চক্রান্ত বললেও ভুল বলা হবে না।
তবে আশার কথা হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কার মত দেশ গুলো এই প্রস্তাবের বিপক্ষে তাদের সুস্পষ্ট অবস্থানের কথা বলছে পরিস্কার ভাবেই। এখন দেখার বিষয় ছিলো আমাদের দেশের বোর্ড কি বলে। টেস্ট ক্রিকেটের নবীনতম দেশের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ক্রিকেটকে ‘শেষ’ করে দেওয়ার এই প্রস্তাবের বিপক্ষে কতটা ‘উচ্চকণ্ঠ’ হতে পারবে, উত্কণ্ঠার কারণ মূলত ছিলো এটাই।
সবার অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা আর উদ্বিগ্নতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবশেষে বিসিবির ঘুম ভাঙে ২৩ জানুয়ারি জমিদারদের পক্ষেই কথা বলে আমাদের বিসিবি। সভাপতির নির্লজ্জ দালালি দেখে অবাক হলাম আমরা…
এটাকি আমার বাংলাদেশ !!!

সিদ্ধান্ত গোপন রেখে সভাপতি বললেনঃ
“যেহেতু বিষয়টা জটিল এবং এ-সংক্রান্ত অনেক প্রশ্নের উত্তরই আমাদের জানা দরকার, সে জন্য আমাদের যে মনোভাবই থাক না কেন, সেটা এখন প্রকাশ করতে চাচ্ছি না। এ ব্যাপারে অন্য দেশগুলোর অবস্থান জেনে আমরা আমাদের মতামত
তবে থলের বিড়াল বেরিয়ে গেছে,
আমরা জেনেছি সভাপতিসহ উপস্থিত ২৩ পরিচালকের মধ্যে ২০ জনই মোড়লদের পক্ষে মত দিয়েছেন। প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার দাবি ছিল শুধু আহমেদ সাজ্জাদুল আলম এবং নবীন দুই পরিচালক শওকত আজিজ ও তানজিল চৌধুরীর। সাজ্জাদুল আলম তো প্রতিবাদে ওয়াকআউটই করেছেন সভা থেকে। বোর্ড রুম থেকে বের হয়ে আসার আগে তিনি নাকি এমনও বলেছেন, বিসিবির চিন্তাভাবনায় সর্বাগ্রে থাকা উচিত ক্রিকেটের স্বার্থ। কিন্তু এই সভায় যা হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের মৃত্যুদণ্ডের রায়ই লেখা হয়ে যাচ্ছে।
তবে সভাপতি সাহেবের যুক্তি একটাই প্রস্তাবটি মেনে নিলে বিসিবি আর্থিকভাবে লাভবান হবে, তাদের সর্বশেষ অর্থবছরে আইসিসি যেখানে ১.৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, নতুন প্রস্তাব অনুমোদন হলে নাকি ভবিষ্যতে সেটি ৩.৫ বিলিয়নও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তখন স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের ভাগে এখনকার চেয়ে বেশি টাকা পাবে। এ ছাড়া ভারতসহ ক্রিকেটের বড় তিন দেশের বিপক্ষে যাওয়ার ঝুঁকিটাকেও বড় করে দেখেছেন তাঁরা। পরিচালকদের শঙ্কা, বিসিবি এর বিপক্ষে অবস্থান নিলে ‘বড় ভাই’দের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটবে। তখন অন্যরাও ‘বড়’দের রোষানলে পড়ার ভয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে খেলা এড়িয়ে যাবে।
নাজমুল হাসানের কয়েকটি উক্তি যা এখন ভাসছে অন্তঃজালের দিকে দিকেঃ
“টেস্টে আমাদের রেটিং পয়েন্ট ১৮। আগামী ১০ বছর টেস্ট খেললেও হয়তো আমাদের ৮ নম্বরে ওঠা হবে না। কিন্তু এই পদ্ধতিতে ৮ নম্বরকে হারাতে পারলেই আমরা ৮-এ উঠে যাব। এখন তো নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েও লাভ হচ্ছে না।”
পরে আবার বলেছেন,
“সার্বিকভাবে এই প্রস্তাব গ্রহণ করার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। এটা খারাপ মানছি। কিন্তু ভালোটা কোথায় হচ্ছে? র্যা র্ঙ্কিংয়ের বর্তমান অবস্থান থেকে বের হওয়ারও তো কোনো সুযোগ পাচ্ছি না!”
এমন অন্যায্য পরিস্থিতেও বিসিবি সভাপতি বলেন
“আমরা ঝুঁকি নিতে পারব না। যদি দেখি আমরা হ্যাঁ বললে যা, না বললেও তা, তখন একরকম সিদ্ধান্ত নেব। আবার যদি দেখি, আমাদের অবজেকশনের ওপর প্রস্তাবের পাস-ফেল নির্ভর করবে তখন আরেক রকম।”
মোদ্দা কথা ভারত আর তাদের দোসররা এখন বাংলাদেশের উন্নতি সহ্য করতে পারছে না, এদিকে ক্রিকেট কে কি করে খেলা থেকে পুরপুরি বানিজ্য নির্ভর করে ফেলা যায় সেটাও তাদের মাথায় ঘুরছে। ক্রিকেট বর্তমানে কেবল খেলার মাঝে আটকে নেই, এটি এখন বিরাট এক বাণিজ্যে। যেখানে একজন ক্রিকেটার পণ্যের বিজ্ঞাপন করছেন, নিজেও পণ্যে পরিণত হচ্ছেন, আর ক্রিকেট তার নান্দনিকতার আকর্ষণ হারাচ্ছে জুয়ার আসরে। সাম্প্রতিক সময়ে জুয়ার প্রভাব ও ম্যাচ ফিক্সিং ক্রিকেটে মহামারির আকার ধারণ করেছে। ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট বোদ্ধারা টেস্ট ক্রিকেট ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের কথা বলে আসছেন কয়েক বছর ধরে। আর তারা কয়েকটি ক্রিকেট বোর্ড এবং আইসিসি’কেই এই ষড়যন্ত্রের হোতা বলে দূষছেন। যেহেতু টেস্ট ক্রিকেট সময় সাপেক্ষ, তাই এতে দর্শকদের উন্মাদনা তুলনামূলকভাবে কম, তাই টেস্ট ক্রিকেটে ব্যবসায়িক ফায়দা কম। অপরদিকে, ওয়ান ডে বা টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট খুবই কম সময়ে ফলাফল আসে বলে, এতে দর্শক বেশি, তার মানে বেশি কর্পোরেট বাণিজ্য, যার মানে ক্রিকেট বোর্ডের লাখো ডলারের ফায়দা। আর এরই সাথে আসে বাজিকরদের উন্মাদনা আর ম্যাচ ফিক্সিংয়ের (পাতানো খেলা)। যা ক্রিকেটকে ক্রমাগত কলুষিত করছে।
এমন জুয়া আর ম্যাচ ফিক্সিং শুধু ক্রিকেটকেই আঘাত করছে এমনটাও নয়, তাতে জুয়ার বলি হচ্ছে মানুষের আবেগ। আর ক্রিকেটাররা ক্রমেই পরিণত হচ্ছেন টাকার পুতুলে, যাদের নিজের মত প্রকাশের উপরেও শর্ত আরোপ করে কর্পোরেট কোম্পানি আর কর্পোরেট ক্রিকেট বোর্ড। যে এলিট ক্রিকেট বোর্ডসমূহ নিজেদের এই বনেদী প্রস্তাবনায় তাদের উচ্চাভিলাষ আর বাণিজ্যের চিন্তাটাকেই তুলে ধরেছেন। আর এই বনেদী তত্ত্ব আর কর্পোরেট প্রভাবে ক্রমেই নিষ্প্রভ হচ্ছে নান্দনিক ক্রিকেটের জৌলুস। যার ভাগশেষ কর্পোরেট ক্রিকেট।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে সরিয়ে দিতে পারলে সবার সব দিক থেকে লাভ। আর সামান্য টাকার লোভে যেখানে দেশী সংস্থা বিক্রি হয়ে যায় সেখানে আইসিসি কে আর কি বলব, এটা তো জানা কথা আইসিসির বর্তমান আয়ের সিংহভাগই আসে এই তিন মোড়ল দেশ অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও ইংল্যান্ড থেকে।
লেখার শুরুতেই বলেছিলাম বাঙালীর ক্রিকেট নিয়ে আবেগের কথা। বাঙালী জাতির রক্তে ক্রিকেট আর তাই এই অন্যায়ের মুখে সোচ্চার হয়েছে আমাদের তরুণেরা। ফেসবুক ইভেন্ট পেজ খুলে সবাইকে বের হতে বলা হয় ঘর থেকে…

“তিন ক্রিকেট বোর্ডের অন্যায্য প্রস্তাবনার বিরুদ্ধে বিসিবি কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ।”
শেরোনামে ইভেন্টের শুরুতে সবাইকে বিসিবি কার্যালয়ের সামনে আসতে বলা হলেও পরবর্তীতে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট দল দেশে থাকায় স্থান পরিবর্তন করে নেয়া হয় শাহবাগ জাদুঘরের সামনে।
ইভেন্টের আহ্বায়ক বলেন,
‘শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট দল এই মুহূর্তে ঢাকায় অবস্থান করছে। তারা কাল প্রাকটিসে যাবে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে। ডিএমপির সঙ্গে বিশদ পর্যালোচনা করা হয়েছে কালকের সমাবেশ নিয়ে। কিছু দিন আগে আইসিসির নিরাপত্তা দল মিরপুর স্টেডিয়াম দেখে গেছে। তার নিরাপত্তা নিয়ে অনেক ভুল খোঁজার চেষ্টা করেছে। আর সামনে বিশ্বকাপ, সেটা কে সামনে রেখে আমরাও চাচ্ছি না অপ্রীতিকর কোনো কিছু জন্ম নিক। সত্যি বলতে ৬০ হাজারকে ইনভাইট করা হয়েছে, ৫ হাজারের উপরে গোয়িং বাটন চেপেছেন চার ঘন্টায়। রাতের ভেতর ১০-২০ হাজার লোক হয়তো ব্যাপারটা জানবেন। তার ভেতর এক হাজার লোকও এলে তা মিরপুর জোনের জন্য অনেক। দেশের কথা ভেবেই ভেন্যু পরিবর্তন করা হলো। বিসিবি অফিসের সামনের বদলে শাহবাগ জাদুঘরের সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচি টি পালন হবে। সময় এবং তারিখ আগের টাই অর্থাৎ শনিবার বিকাল ৪টা।’
পেজটিতে বলা হয়,
‘লঙ্কান ক্রিকেট দল অনুশীলনরত কিংবা স্টেডিয়াম ছাড়ার মুহূর্তে এত লোকের সমাগম তাদের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক। মনে আছে কিনা, শ্রীলঙ্কান দলের উপর পূর্বে জঙ্গী কর্তৃক আক্রমণ হয়েছিলো। সুতরাং আমাদের ছোটো কোনো ভুল আমাদের দেশের উপরেই বিপদ ডেকে আনবে।’
আরও বলা হয়,
‘শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচীতে একটি পোস্টার লিখে নিয়ে আসুন, কোনো উগ্র বক্তব্য নয়, তাদের দাবির বিরুদ্ধে যৌক্তিক স্লোগান লিখুন।’
পরদিন বিকেল হওয়ার আগেই জমতে থাকে মানুষ। প্রাণের টানে ক্রিকেটের টানে মানুষ জড় হতে থাকে শাহাবাগে

সময়ের সাথে সাথে মানুষও বাড়তে থাকে।
‘তিন মোড়লের মাতব্বরি, মানি না মানবো না’, ‘এক দাবি এক দেশ, টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ’, ‘তিন শেয়ালের কাছে, মুরগি বর্গা হবে না’, ‘তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’, ‘ক্রিকেট নিয়ে বাণিজ্য, মানি না মানবো না’, ‘তিন মোড়লকে বিসিবি, না বলো না বলো’ – ক্রিকেটপ্রেমীদের এমন স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত শাহবাগ
ব্যানারে ফেস্টুনে আর মুহূরমুহু শ্লোগানে প্রকম্পিত হতে থাকে আকাশ-বাতাস, পোস্টার গুলো পড়ে দেখা গেলো;
‘এক দাবি, এক দেশ, টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ’, ‘ক্রিকেটে ৩ মোড়লের দালালি চলবে না’, ‘৩ মোড়লের সব অন্যায্য দাবিকে না বলো’, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটকে রক্ষা করো’, ‘তিন মাতব্বরের পাগলামি মানি না’, ‘আমাদের ক্রিকেটকে নয়, আমাকে খুন করো’, `This is cricket, not business`, `Cricket is business to you but oxygen to us`, `BCB respect our emotion & say no to big 3 idiots`, `Play for glory not for money` ইত্যাদি
বাংলাদেশের পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুন, প্লে-কার্ড নিয়ে কয়েক হাজার ক্রিকেটপ্রেমীর অংশগ্রহণে শাহবাগ মোড় থেকে চারুকলার সামনে পর্যন্ত মানববন্ধন দীর্ঘায়িত হয়। দুই সারিতে মুখোমুখিভাবে অবস্থান করেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন পেশার লোকজন। অবস্থান কর্মসূচিতে ক্রিকেটপ্রেমী বাংলাদেশির পক্ষ থেকে ৪ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হচ্ছে,
১) ৩ মোড়লের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বিসিবি’র শক্ত অবস্থান গ্রহণ করা।
২) এর বিরুদ্ধে বিসিবি’র দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণ করা।
৩) ক্রিকেট নিয়ে কোনো ধরনের রাজনীতি না করা।
৪) উত্থাপিত দাবিগুলো প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।
তীব্র সমালোচনা আর দেশের মানুষের উত্তপ্ত অবস্থানের কথা বিসিবি সম্ভবত বুঝতে পেরেছে আর তাই তীব্র সমালোচনার মুখে দেশটির ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি জানায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির সংস্কারের খসড়া প্রস্তাবের যে অংশে টেস্ট ক্রিকেটের দ্বিস্তরবিশিষ্ট কাঠামো প্রচলনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে সেই অংশের বিরোধিতা করবে বিসিবি।
এদিকে আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ শ্রীলংকার ম্যাচে আবারো ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে হাজির হবেন স্টেডিয়ামে, সমগ্র বিশ্বের কাছে জানিয়ে দেবেন এই অন্যায্য জমিদারির বিরুদ্ধে আমাদের সুস্পষ্ট অবস্থানের কথা।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতি প্রতিবেশী দেশের এধরণের আচরণ এই প্রথম না। ১৯৭১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, ঢাকা স্টেডিয়ামে শুরু হলো চারদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ। পাকিস্তান ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড দলের প্রতিপক্ষ কমনওয়েল্থ একাদশ। তৎকালীন পাকিস্তানের হয়ে ইনিংস ওপেন করতে নামলেন ১৮ বছর বয়সী বাঙালি ব্যাটসম্যান রকিবুল হাসান। পাকিস্তান ক্রিকেট দলের একমাত্র বাঙালি সদস্য।
পাকিস্তান দলের সব ব্যাটসম্যানের ব্যাটেই সোর্ড [তলোয়ার] স্টিকার। যা জুলফিকার আলী ভুট্টোর নির্বাচনী প্রতীক। কিন্তু ব্যতিক্রম শুধু একজন। তিনি রকিবুল হাসান। তিনি মাঠে নামলেন ব্যাটে জয় বাংলা স্টিকার লাগিয়ে, পাশে বাংলাদেশের ম্যাপ!
১ মার্চ ১৯৭১, সোমবার দুপুর ১টা ৫ মিনিট। নিশ্চিত ড্র-য়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে খেলা। তখন রেডিওতে শোনা গেলো ইয়াহিয়ার ঘোষণা, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিস্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে!
সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠলো গোটা স্টেডিয়াম…!!
ব্যাটে যে জয় বাংলা ধ্বনি নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন রকিবুল হাসান, মুহূর্তেই সেই জয় বাংলা ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠলো গোটা দেশ। খেলা মুলতবি ঘোষণা করা হলো। সমগ্র বাঙালি জাতি নেমে এলো
রাজপথে। শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন। এর পরের ইতিহাস সবার জানা।
একজন ক্রিকেটারের জন্য জাতীয় দলের হয়ে টেস্ট খেলার চেয়ে বড় আর কোনো চাওয়া নেই। কিন্তু মাতৃভূমির জন্য রকিবুল হাসান ত্যাগ করেছিলেন আজীবন লালিত টেস্ট খেলার স্বপ্ন। কোনো রকম রাজনৈতিক নির্দেশ ছাড়াই যিনি বরণ করে নিয়েছিলেন জুলুম নির্যাতন, যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে।
১৮ বছরের টগবগে তরুণ রকিবুল হাসান মাতৃভূমির জন্য টেস্ট খেলার সুযোগ বিসর্জন দিতে পারেন, যে শোষক দলের ওপেনার হওয়ার সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেন তার প্রজন্মই তো আমরা। অন্যায়ের প্রতিবাদে সেদিন যেমন রকিবুল মাঠে নেমেছিলেন, ত্রিদেশীয় মোড়লদের অন্যায়ের প্রতাবাদে আজ আমরাও মাঠে থাকবো সোচ্চার হয়ে।
পৃথিবী আরও একবার বলুক;
“সাবাস বাংলাদেশ
এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়
জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়…”
অনেক ধন্যবাদ লেখাটির জন্য। একথা ঠিক আমরা খুব ভালো খেলি না, কিন্তু আমাদের ছেলেরা চেষ্টা করছে; ইতিমধ্যেই মাঠে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এদের সময় ও সুযোগ দিতে হবে। বোর্ডের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে আত্মঘাতী এবং তা জনমতকে ধারণ করে না। আমার কাছে সবচেয়ে খারাপ লেগেছে দেশের ক্রিকেট-কর্তাদের লুকোছাপা আর মেরুদণ্ডহীনতা। যেখানে দেশের স্বার্থ আর মর্যাদার প্রশ্ন জড়িত সেখানে সাময়িক অর্থপ্রাপ্তি আর ক্ষমতাশালী প্রতিবেশীর নেকনজর বিসর্জন দেয়া যায়।
বিসিসিআই এর প্রধান এন সুভ্রানিয়াম হল একজন ব্যবসায়ী ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট – সে দেখবে কিভাবে টাকা বানানো যায়। ক্রিকেট খেলার সাথে কোন সম্পর্ক ছিল কিনা কেউ জানেনা!! বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সদস্যদের কয়জন ক্রিকেট খেলার সাথে সম্পর্কিত (খেলোয়াড় কিংবা দীর্ঘকালীন সংঘটক হিসেবে) ??? এসব বোঝা যায়…

মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থিরা
দেব প্রসাদ দেবু
বাম আন্দোলনের মূল ভিত্তি হলো শ্রেণিহীন সমাজ, সাম্য, মূল্যবোধ, সমাজ-প্রগতি,আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদি। কিন্তু এই উপমহাদেশে তুখোড় এবং প্রজ্ঞাবান বাম নেতৃত্ব থাকলেও রাষ্ট্রের মূল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদেরকে দৃশ্যপটে নিয়ে আসতে পারেনি। রাজনীতির মূলমন্ত্রই হলো জনগণকে নিয়ে, জনগণের চাহিদানুসারে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনার বা পরিবর্তনের মূল বা সহায়ক শক্তিরূপে নিজেদের দৃশ্যমান করে আন্দোলন সংগ্রাম এবং সমাজ প্রগতির ধারাকে এগিয়ে নেয়া। এখানেই রাজনীতির সফলতা ব্যর্থতা নির্ভর করে। ভারত উপমহাদেশের বাম আন্দোলন তথা এই অঞ্চলের বাম আন্দোলন বরাবরই হয় জনগণের চাহিদার আগে হেঁটেছে কিংবা পিছনে হেঁটেছে, সাথে হেঁটেছে খুব অল্প সময় বা বিচ্ছিন্নভাবে। বহুধা বিভক্ত হয়েছে বাম ঐক্য, পিছিয়েছে সমাজ প্রগতির সংগ্রাম, রাজনীতি হয়ে উঠেছে হালুয়া রুটির ভাগ বাটোয়ারার অভয়ারণ্য।
বিশ্ব-রাজনীতির অনুসারী হতে গিয়ে ষাটের দশকের শেষ দিক থেকে পিকিং এবং মস্কোপন্থী হিসেবে বিভক্ত হয়ে সাম্য এবং ঐক্যের রাজনীতি থেকে দূরে সরে গিয়েছে এই দেশের প্রগতিবাদী এই রাজনীতি। সাথে রণনীতি কিংবা লক্ষ্য এক থাকলেও রণকৌশল অংশে এসে বহুধা বিভক্ত হয় এঁদের প্রায়োগিক তত্ত্ব। যেমন ভাসানীর মতো বড় মাপের নেতা সত্তরের নির্বাচন বর্জনের মতো জন-বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। স্লোগান দিয়েছেন ‘ভোটের আগে ভাত চাই’। মূলত: বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসনকে জোর দিতেই ইনি এই লাইনে আসেন। কিন্তু ছয় দফা এবং এগারো দফার জনপ্রিয়তার জোয়ারে বন্যার দুর্ভোগ সহ্য করে মানুষ যখন স্বায়ত্তশাসন নিয়ে উদগ্রীব তখন ভাসানির এই অবস্থান ছিলো জনগণের পিছনে হাঁটা। অন্যদিকে সিরাজ সিকদারদের রণকৌশল ছিলো জনগণকে পিছনে ফেলে অধিক সামনে এগিয়ে যাবার মতো ওভার স্টেপিং।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে যেমন দলীয় সংকীর্ণতা নোংরা ভাবে দৃশ্যমান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালেও তার কমতি ছিলোনা। শেখ মনির অনুসারী বৃহৎ ছাত্র যুব সংগঠন ছাড়াও আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীণ দক্ষিণ কিংবা উদার বা প্রগতিবাদী অংশ কিংবা সিরাজুল আলম খানের মতো র্যাডিক্যাল ধারণার অনুসারী অংশ কোনটাই মুক্তিযুদ্ধের অফিসিয়াল ভাগীদার করতে চাননি অন্য কোন রাজনৈতিক দলকে।
অন্যদিকে সিরাজ সিকদারের অনুসারী বলে পরিচিত আব্দুল হক এবং তোয়াহা তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে সিরাজ সিকদার থেকে আলাদা হয়ে যান বেশ আগেই। গঠন করেন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (মাওবাদী-লেনিনবাদী)। লরেন্স লিফশুলৎস মোহাম্মদ তোয়াহা ও আব্দুল হকের নেতৃত্বাধীন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (মাওবাদী-লেনিনবাদী)মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে অবস্থান সম্পর্কে বলেন- ‘ভদ্রলোকের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় এঁদের অবস্থান দ্বিধান্বিত আর নিন্দুকের ভাষায় বলতে গেলে দালালীর সমতুল্য’। হক তোয়াহা ১৯৬৮-৬৯ সালে পূর্ববাংলার স্বাধীনতার প্রশ্নে সিরাজ সিকদারের সাথে তাঁদের বিভক্তি শুরু হয়। হক এবং তোয়াহার তত্ত্ব হচ্ছে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার পথ বুর্জোয়া স্বার্থের প্রতিনিধি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তানের বিভক্তিকরণকেই সাহায্য করবে। কিন্তু সিরাজ সিকদার এটি মানতে রাজী ছিলেন না।
কিন্তু ২৫ মার্চের কালোরাতের পর হক এবং তোয়াহার মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নকে মূল শত্রু হিসেবে ভিত্তি ধরে চীনের শত্রু ভারতের ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে পাকিস্তানের পক্ষে লড়াই করতে পাকসেনাদের সাথে লড়ে মুক্তিযোদ্ধা খতমের লাইন নেন আব্দুল হক।
অন্যদিকে তোয়াহা আব্দুল হকের এই লাইনের সাথে এক হতে পারেননি। তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে চান কিন্তু ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনপুষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নয়। স্বাধীন ভাবে। ফলে উনি এবং ওনার সহযোগীরা পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং মুক্তিযোদ্ধা উভয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামেন। দৃশ্যপটে আসে দুই কুকুরের লড়াই তত্ত্ব। ফলে হয়ে পড়েন জন-বিচ্ছিন্ন সংগঠনে।
অন্যদিকে জানুয়ারি ১৯৭১ এ সিরাজ সিকদার রণনীতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন- ‘আমাদের রণনীতি হল জাতীয় দ্বন্দ্বের সমাধান- পাকিস্তানের উপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদকে জাতীয় বিপ্লবের মাধ্যমে উৎখাত করে স্বাধীন সার্বভৌম পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠা করা এবং সকল প্রকার জাতীয় নিপীড়নের অবসান করা; সামন্তবাদকে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে উৎখাত করে কৃষকের হাতে জমি প্রদান করা’।
অনেকেই বলেন সিরাজ সিকদার বঙ্গবন্ধুকে কখনোই নেতৃত্বে দেখতে চাননি, উৎখাত করতে চেয়েছেন। কিন্তু ইতিহাস সেই সাক্ষ্য দেয়না, অন্তত ৭০ এর নির্বাচনের পরে সিরাজ সিকদারের প্রস্তাবনা সেটা বলেনা। ২ মার্চ ১৯৭১ সিরাজ সিকদার শেখ মুজিবের উদ্দেশ্য একটি খোলা চিঠি লিখেন যার ২ নম্বর প্রস্তাবনা হচ্ছে ‘পূর্ব বাংলার কৃষক – শ্রমিক, প্রকাশ্য ও গোপনে কার্যরত পূর্ব বাংলার সকল দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক পার্টি ও ব্যক্তিদের প্রতিনিধি সম্বলিত স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ, প্রগতিশীল পূর্ব বাংলার প্রজাতন্ত্রের অস্থায়ী সরকার কায়েম করুন। প্রয়োজনে এই সরকারের কেন্দ্রীয় দপ্তর নিরপেক্ষ দেশে স্থাপন করুন’। তিন নম্বর প্রস্তাবনা ছিলো- ‘পূর্ব বাংলা-ব্যাপী এই সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানের উপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের আহবান জানান’। এই প্রস্তাবনার মাধ্যমে মূলত সিরাজ সিকদার পূর্ববাংলার নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে মেনে নেন এবং নির্দেশনা দাবি করেন।
২৫ মার্চের কালরাত্রির পর পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির প্রভাবাধীন বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতা কর্মী ও পরিবারকে আশ্রয় দেয় এবং খাদ্য নিরাপত্তা প্রদান করে। কেননা প্রাথমিক প্রতিরোধের পর ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা দেশে প্রবেশের আগ পর্যন্ত সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন অংশ, কাদের সিদ্দীকির গ্রুফ কিংবা এরকম অংশগুলোই মূলতঃ বিচ্ছিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। আবার পিকিং পন্থী বলে পরিচিত এই পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির অনেকেই ভারতে ট্রেনিঙে যেতে আগ্রহী ছিলনা। যারাওবা যেতে চেয়েছে তারা ব্যর্থ হয়েছে। তাঁদের ট্রেনিঙে নেয়া হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের চর হিসেবে ধিকৃত হয়েছে। ফলে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে নিজেরাই গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে বাংলাদেশে থেকেই। এবং বরিশালের পেয়ারা বাগানসহ বিভিন্ন জায়গায় মুক্তাঞ্চল গড়ে তোলে। অন্যদিকে ভারত থেকে ট্রেনিং প্রাপ্ত হয়ে আসার পর আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা, যারা ২৫ মার্চের পর পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো, তারাই সর্বহারা পার্টির সাথে ঐক্যবদ্ধ ভাবে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করে এবং দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। ফলে অন্তর্ঘাতে উভয় পক্ষেরই অনেকে নিহত হন। পিকিং পন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির নিয়ন্ত্রণাধীন অনেক অঞ্চল হাতছাড়া হয়ে যায় সিরাজ সিকদারের দলের।
এইসব ঘটনা, চীনের ঐতিহাসিক ভুল এবং মাওসেতুং এর বাঙালীর মনোভাব বোঝায় অদূরদর্শিতা এবং মাও সেতুং এর প্রতি অন্ধ-মোহ সবকিছু মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ঠিক বিরোধিতা না করেও বাঙালীর মুক্তি বিষয়ে সিরাজ সিকদার তত্ত্বগত-ভাবে ওভার স্টেপিং করে ফেলেন এবং বলেন দেশ প্রেমিক-রূপে আওয়ামী লীগ বাঙালীর উপর ছয় পাহাড়ের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। আওয়ামী লীগকে বর্ণনা করেন ছয় পাহাড়ের দালাল হিসেবে। ছয় পাহাড় বলতে উনি ভারত ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ, সামন্তবাদের প্রতিনিধি, পূর্ববাংলার আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদকে বুঝিয়েছেন। এই ওভার স্টেপিং সিরাজ সিকদারকে জনতার মূল কাতার থেকে ছিটকে ফেলে অনেক দূরে।
কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের গোড়াপত্তনের সবকটি স্টেপে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলো এদেশের বাম চিন্তাচেতণার রাজনীতিকরা। নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত হ’বার পরও এঁরা চেষ্টা করেছে সমাজ প্রগতির সংগ্রামে অবদান রাখতে। রেখেছেও। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সামনের কাতারে থেকেছে। ’৬২ শিক্ষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। ’৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে। সাথে আবার আন্তর্জাতিকতাবাদের রাজনীতি করতে গিয়ে চরম দলাদলির কোন্দলও কম করে নাই। পিকিং পন্থী, মস্কো পন্থী ভাগে বিভক্ত হয়েছে। তবে তুলনামূলকভাবে মস্কোপন্থীরা অনেকাংশেই চেষ্টা করেছে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও জনতার সাথে হাঁটার। প্রায় গোটা পাকিস্তান আমল জুড়েই রাজনৈতিক ভাবে নিষিদ্ধ থেকেও, সবচে’ বেশি কারা নির্যাতন ভোগ করেও আদর্শের সংগ্রামে ছিলো অবিচল। এঁরা কখনো কাজ করেছে আওয়ামী লীগের ভিতরে ঢুকে, কখনো ন্যাপের মাধ্যমে, কখনোবা শুধুমাত্র শ্রমিক কৃষক ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে।
বঙ্গবন্ধুর ৬ দফাকে এগারো দফায় নিয়ে এসেছিলো ছাত্র সমাজ। ১১ দফায় মূলত সাম্রাজ্যবাদ ও একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থের বিরোধিতা করা হয়েছে। এই ১১ দফাকে সামনে এনেছিলো কমিউনিস্টরা। যেটি সমানভাবে জনপ্রিয়তা পায়। যাই হোক, ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চ লাইটের সময় মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের প্রধান কমরেড মনি সিং রাজশাহী জেলে কারাধীন ছিলেন। কিন্তু পাকসেনাদের ভয়াবহ গণহত্যার পর বাঙালীরা মিলে জেলখানা আক্রমণ করে এবং মনি সিং সহ রাজবন্ধীদের মুক্ত করে আনে তালা ভেঙে। এবং সেখান থেকেই মনি সিংকে পাঠিয়ে দেয়া হয় ভারতে।
আগেই বলেছি একটি অপ্রিয় সত্য ইতিহাস হচ্ছে ’৭০ এর নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ এতোটাই মোহগ্রস্ত ছিলো যে অন্য কোন দলকে অফিসিয়ালি মুক্তিযুদ্ধের ভাগীদার করতে চায়নি এমনকি ছাত্র ইউনিয়নের যে সব নেতা কর্মী ভারতে প্রথম ধাপে ট্রেনিং নিতে গিয়েছিলো তাতে বাধা দিয়েছে মুজিব বাহিনী। বিষয়টি সমাধানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটা ভূমিকা ছিলো। চীন এবং আমেরিকার মতো বৃহৎ শক্তি সামাল দিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে সবচে’ বেশি সমর্থন দেয়া ভারতের দরকার ছিলো আন্তর্জাতিক সমর্থনের। ফলে অন্য বৃহৎ শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুকূল অবস্থান জরুরী ছিলো। সেই বিবেচনায় সোভিয়েতের সাথে মৈত্রী চুক্তি করে ভারত আন্তর্জাতিক ভাবে নিজেদের সুরক্ষিত করার কৌশল নেয়। এটি করতে গিয়ে মস্কো-পন্থীদের মূল ফ্রন্টে নিয়ে আসা দরকার ছিলো। সেই লক্ষ্যে গঠিত হয় মুজিব নগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। যেখানে অন্তর্ভুক্ত হন কমরেড মনি সিংহ, কমরেড মোজাফফর আহমেদ। গঠিত হয় ন্যাপ সিপিবি ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনী। যারা সরাসরি বীরত্ব পূর্ণ অবদান রেখেছেন সম্মুখ যুদ্ধে। কিন্তু খেয়াল করবেন মূল বাহিনীর সাথে কিন্তু এঁরা ট্রেনিং নিতে পারেনি। কিন্তু যেসব পিকিং পন্থী কমিউনিস্ট চীনের অবস্থানকে অবজ্ঞা করে ভারতে ট্রেনিং এ গিয়েছিলেন (যেমন মেনন, কাজী জাফর) তাঁরা প্রস্তাব দিয়েছিলেন যেহেতু সর্বদলীয় সমন্বয় কমিটি আওয়ামী লীগ করতে চাইছেনা তাই কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে একটি বাম পন্থী ফ্রন্ট গঠন করার জন্য। কিন্তু মনি সিং এটি গ্রহণ করেননি। মস্কো-পন্থীদের মূল্যায়ন ছিলো এটি বিভেদাত্মক ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐক্যকে দুর্বল করবে। বামপন্থীদের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ভারতের মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর হয়। তাছাড়া পৃথিবীর অন্যদেশে মুক্তিযুদ্ধকে কূটনৈতিক ভাবে তুলে ধরতে যে টিমটি ইউরোপ সহ বিভিন্ন দেশ সফর করে সেটিতে ছিলেন সামাদ আজাদ, ন্যাপের দেওয়ান মাহবুব আলী এবং কমিউনিস্ট পার্টির ডা সারোয়ার আলী। যারা আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
মনে রাখা প্রয়োজন বৃহৎ শক্তি চীন তিন তিন বার জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এনেছে এবং তিনবারই সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোর কারণে সেটি সফল হয়নি, নাহলে ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো। ভুলে গেলে চলবেনা আমেরিকার মতো বৃহৎ শক্তি পাকিস্তানের পক্ষে লড়েছে সামরিক কূটনৈতিক উভয় ভাবে। আমেরিকানদের পাঠানো সপ্তম নৌবহর যখন বঙ্গোপসাগর অভিমুখে তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন সাবমেরিন পাঠিয়ে সেটিকে ঠেকিয়েছে। এই যে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত এবং সেটিকে ঠেকিয়ে দেয়ার কূটনৈতিক সফলতা সেটা সফল হয়েছে তাজউদ্দীন, সামাদ আজাদ, মনি সিং এর যৌথ প্রচেষ্টায়। ফলে সামগ্রিক ভাবে বিবেচনা করতে গেলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বামদের অবদান দৈনন্দিন আলোচনা বা গতানুগতিক ইতিহাসে থাকুক আর না থাকুক প্রকৃত ইতিহাসের পাতা ফুঁড়ে সাক্ষ্য দেবেই।
সময়ের সাথে একটি সুন্দর উপস্থাপন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনৈতিক কার্যক্রমে থাকাকালীন বহুবার এসব ইতিহাসের চর্চা করেছি। আওয়ামীলীগ হাজার চেষ্টাকরলেও যেমন ইতিহাসের মূল সুর বদলাবে না, তেমনি অধুনা অতি ডানেরা যেভাবে মুক্তি যুদ্ধকে কোন সৈনিকের অঙ্গুলের ইশারা বলে প্রমান করতে চান তাদের মাথার খোলে আদৌ কোন পদার্থ বলে কিছু আছে কিনা সন্দেহ হয়। পৃথিবীর বিভিন্নদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে কোন বিকৃতির ছাঁয়া পড়েনা, অথচ আমদের ইতিহাসকে আমরাই কেনো বিতর্কিত করছি জানিনা। এর মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত কার লাভ কার লোকসান ? জাতি হিসেবে শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে হবে নাতো? ভাবি মাঝে মাঝে সেই সততা সেই পৌরুষ আজ আমাদের মাঝে নেই কেনো? কোন কোন মুক্তি যোদ্ধার মুখে রাজাকারের ছায়া দেখা যায় কেনো? সরকার সম্প্রতি নাকি মুক্তি যোদ্ধাদের তালিকা করতে যাচ্ছে! এটি সফল হবার মতো কোন জরুরী প্রজেক্ট নয়। কে মুক্তি যোদ্ধা আমরা জানি। কে নয় সোটাও জানি। ১৯৭১ সালে যারা জন্মে ছিলেন, সবাই মুক্তি যোদ্ধা! যে শিশুটি তখন জন্মেছিলো সেও দেশ মাতৃকার জন্যে তখন ত্যাগ শিকার করেছিলো, একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে। শুধুমাত্র তারা নয়, যারা পাকিস্তানের কোলাবরেটর ছিলো, বিরোধিতা করেছিলো, কিংবা কোন না কোন ভাবে বাংলাদেশের জন্মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলো।
@কেশব কুমার অধিকারী,
হুমায়ুন আজাদ স্যারের কথাই মনে পড়ে- একজন রাজাকার সারাজীবনই রাজাকার কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা সারাজীবন মুক্তিযোদ্ধা থাকেন না। আমরা সব কিছু নিয়ে ব্যবসা করতে অভ্যস্ত, আলু পটল থেকে শুরু করে ইতিহাস কোনটাই বাদ যায়না। অন্যদিকে ইদানিং ইতিহাস নিয়ে লন্ডন ভিত্তিক বালখিল্যতার নতুন ভাঁড় উদয় হয়েছে। কিন্তু দেখুন সামন্তপ্রভুর প্রতি আনুগত্যের মতো সেটির প্রতি অকুন্ঠ সমর্থনদাতা ভাঁড়েরও অভাব হচ্ছেনা।
আমার মন্তব্য এখানে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে তবুও বলছি।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থি ডানপন্থি এমন ভেবে কেউ অংশ নিয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করিনা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস আমাদের সময়ে (এমনকি এখনও) পড়ানো হয় সেখানে বামপন্থিদের অংশগ্রহনের কথা উল্লেখ থাকেই না বলতে গেলে।
বাম আন্দোলনের বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিমত, যারা বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত তারা নতুন করে ব্যক্তিদের এর সাথে যুক্ত করতে পারেন না, বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যে ছাত্ররা বাম রাজনীতি করে এসেছেন তারাই পরবর্তিতে যুক্ত হন। এটা এক ধরনের জনবিচ্ছিন্নতা। বাম রাজনীতির মূলনীতিই সাধারণ মানুষের কাছে পৌছায় না।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থি ডানপন্থি এমন ভেবে কেউ অংশ নিয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করিনা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস আমাদের সময়ে (এমনকি এখনও) পড়ানো হয় সেখানে বামপন্থিদের অংশগ্রহনের কথা উল্লেখ থাকেই না বলতে গেলে।
সহমত।
বামপন্থিদের জনবিচ্ছিন্নতাতো আছেই সেই সাথে আছে মধ্যবিত্ত ভিত্তিক সংগঠনে পরিণত হওয়া। শ্রমিক কৃষকের মাঝে যতোটুকু সংগঠনের বিস্তৃতি আছে সেটি নগণ্য মাত্রার। এখানে আরেকটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে- প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হলে সঠিক, যুক্তিশীল এবং ভদ্রলোকের রাজনীতি জটিল হয়ে পড়ে। জেনারেল জিয়া প্রকৃতার্থে রাজনীতিকে রাজনীতিবিদদের জন্য কঠিন করে দিয়েছেন।