বৃহস্পতিবার , ডিসেম্বর ১৪ ২০১৭ | ৩০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Breaking News
Home / আন্তর্জাতিক / পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস

পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস

প্রাচীন কাল-
আদি যুগ:
জগতে সর্ব প্রথমে কোন যুগে কত কাল পূর্বে,মানবের সৃষ্টি হইয়াছিল, তাই এখনও অজ্ঞাত রহিয়াছে। প্রানিতত্ত্ববিদাগন স্থির করিয়াছেন যে, বর্তমান সময়ের সকল জীবের পর মানবের আবির্ভাব ঘটিয়াছে। ভৃতত্ত্ববিদগন বলিয়া থাকেন যে, নব্যজীবন যুগের শেষ ভাগে মানবের অস্তিত্বের চিহ্ন লক্ষিত হয়।
ভূতত্ত্ববিদগন পৃথিবীর বয়সকে প্রধানত বা প্রথমত তিন ভাগে ভাগ করিয়াছেন। আবার প্রত্যেক কে তিন বা ততোধিক উপযুক্ত ভাগে বিভক্ত করিয়াছেন।

মধ্যাধুনিক ও বহাধুনিক উপযুগে মানবের অস্তিত্বের নির্দেশন পাওয়া যায়। কিন্তু কেহ কেহ এই সকল নিদর্শনের সহিত মানবের স¤ন্ঠশর্ স্বীকার করে না। মাদ্রাজ প্রদেশে কর্ণুল নামক স্থানে একটি পর্র্বতগুহায় জীবাশ্বের সহিত আদিম মানুষের অস্তিত্বের নির্দেশন আবিস্কৃত হয়েছে। ব্রক্ষদেশে বহাধুনিক যুগের লুপ্ত স্থন্যপায়ী জীবের অস্থির সহিত আদিম মানব কর্তৃক ব্যবহৃত প্রন্তর নির্মিত অস্ত্র আবিস্কার হয়েছে।
অন্ত্যাধুনিক ও উপাধুনিক যুগে মানবের অস্তিত্ব সম্বান্ধ মনীষিগনের মতবেধ নাই।

ইতিহাস
মানুষের অতীত ঘটনা ও কার্যাবলীর অধ্যয়ন। বৃহৎ একটি বিষয় হওয়া সত্ত্বেও এটি কখনও মানবিক বিজ্ঞান এবং কখনওবা সামাজিক বিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে আলোচিত হয়েছে। অনেকেই ইতিহাসকে মানবিক এবং সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে দেখেন। কারণ ইতিহাসে এই উভয়বিধ শাস্ত্র থেকেই পদ্ধতিগত সাহায্য ও বিভিন্ন উপাদান নেয়া হয়। একটি শাস্ত্র হিসেবে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনেকগুলো উপবিভাগের নাম চলে আসে: দিনপঞ্জি, ইতিহাস-লিখন, কুলজি শাস্ত্র, পালিওগ্রাফি এবং ক্লায়োমেট্রিক্‌স। স্বাভাবিক প্রথা অনুসারে ইতিহাসবেত্তাগণ ইতিহাসের লিখিত উপাদানের মাধ্যমে বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্ত দেয়ার চেষ্টা করেন, যদিও কেবল লিখিত উপাদান হতে ইতিহাসে সকল তত্ত্ব উদ্ধার করা সম্ভব নয়। ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে যে উৎসগুলো বিবেচনা করা হয়, সেগুলোকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়: লিখিত, মৌখিক এবং শারীরিক বা প্রত্যক্ষ করণ। ইতিহাসবেত্তারা সাধারণত তিনটি উৎসই পরখ করে দেখেন। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে লিখিত উপাদান সর্বজন স্বীকৃত। এই উৎসটির সাথে লিখন পদ্ধতির ইতিহাস অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত।
প্রাক-ইতিহাস বা প্রাগৈতিহাসিক যুগ
লিখিত ইতিহাসের পূর্ববর্তী কালসমূহের ইতিহাসকে বোঝায়। ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক পল তুর্নাল দক্ষিণ ফ্রান্সের গুহায় পাওয়া নিদর্শনগুলি বর্ণনা করতে গিয়ে প্রথম Pré-historique পরিভাষাটি ব্যবহার করেন। ১৮৩০-এর দশকে পরিভাষাটি লিখিত ইতিহাসের পূর্ববর্তী ইতিহাস নির্দেশ করতে ফ্রান্সে ব্যবহার হওয়া শুরু করে। ১৮৫১ সালে ড্যানিয়েল উইলসন এটি ইংরজি ভাষায় উপস্থাপন করেন।
প্রাক-ইতিহাস মহাবিশ্বের জন্মাবধি বিস্তৃত বলে কল্পনা করে নেওয়া যায়। তবে পরিভাষাটি মূলত পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাবের পরবর্তী ইতিহাসের বর্ণনা দিতেই ব্যবহার করা হয়। ডাইনোসরদের প্রাগৈতিহাসিক জন্তু এবং গুহামানবদের প্রগৈতিহাসিক মানুষ হিসেবে ডাকা যায়।

ইতিহাস লিখনধারা
ইতিহাস লিখে রাখার পদ্ধতি এবং ঐতিহাসিক রচনার তত্ত্ব ও ইতিহাসকে বুঝায়। ইতিহাস রচনা করার জন্য মোটামুটি নির্দিষ্ট ধাঁচের নীতি রয়েছে। যেমন, অতীতকালের বিভিন্ন তথ্য উৎস এবং সূত্রের সমালোচনামূলক পর্যালোচনা, সে সমস্ত তথ্যসূত্রের নির্ভুলতা বিচার করে সঠিকটিকে বেছে নেয়া এবং সেই তথ্যগুলোকে বর্ণনা আকারে উপস্থাপন করা। ইতিহাস যে মানব সভ্যতা এবং কর্মকাণ্ডকে সবচেয়ে ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারে সে ধারণা এই অষ্টাদশ শতাব্দীর আগেও মানুষের ছিল না। তাই এর আগে কখনই ইতিহাস লিখনধারাকে স্বাভাবিক শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নেয়া হয়নি। অর্থাৎ মানুষের কর্মকাণ্ড লিখে রাখার প্রচলন বেশ আগে থেকে শুরু হলেও একে একটি বিজ্ঞান হিসেবে ভাবা শুরু হয়েছে এই সেদিন। অষ্টাদশ শতাব্দীর আগেও মানুষের অতীত রক্ষার প্রধান মাধ্যম ছিল ধর্ম, দর্শন, কাল্পনিক সাহিত্য এবং এমনকি কবিতা। তাই ইতিহাস লিখনধারার জন্ম খুব বেশীদিনের নয়। কিন্তু নিঃসন্দেহে ইতিহাস লিখনধারাকে পর্যালোচনা করতে হয় মানব সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকে প্রতিটি মুহূর্তকেই।
ইতিহাস বলতে এখানে মানুষের ইতিহাস বোঝানো হয়েছে, যা মূলত প্যালিওলিথিক যুগে পৃথিবী জুড়ে শুরু হয়। পৃথিবী গ্রহের ইতিহাস থেকে এটি পৃথক। আদিম যুগ থেকে প্রাপ্ত সকল প্রত্নতাত্ত্বিক ও লিখিত দলিল এর আওতাভুক্ত। লেখন রীতি আবিস্কারের মধ্য দিয়ে প্রাচীন প্রামাণ্য ইতিহাসের শুরু হয়। যদিও লেখন রীতি আবিস্কারপূর্ব যুগের সভ্যতার নিদর্শনও পাওয়া গেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের সূচনা ঘটে প্যালিওলিথিক বা আদি প্রস্তর যুগে। সেখান থেকে সভ্যতা প্রবেশ করে নব্য প্রস্তর যুগ বা নিওলিথিক যুগে এবং কৃষি বিপ্লবের (খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০০-খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ অব্দ) সূচনা ঘটে। নিওলিথিক বিপ্লবে উদ্ভিদ ও পশুর নিয়মানুগ চাষপদ্ধতি রপ্ত করা মানব সভ্যতার একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। কৃষির উন্নয়নের সাথে সাথে বেশিরভাগ মানুষ যাযাবর জীবনযাত্রা ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে কৃষকের জীবন গ্রহণ করে। তবে বহু সমাজে যাযাবর জীবনব্যবস্থা রয়ে যায়, বিশেষ করে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অঞ্চল ও যেখানে আবাদযোগ্য উদ্ভিদ প্রজাতির অভাব রয়েছে। কৃষি থেকে প্রাপ্ত খাদ্য-নিরাপত্তা ও উদ্বৃত্ত উৎপাদন এর ফলে গোষ্টীগুলো ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে আরও বড় সামাজিক প্রতিষ্টানের জন্ম দেয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নও এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।
কৃষির উন্নতির সাথে সাথে শস্য উৎপাদনব্যবস্থারও বিকাশ ঘটে, যা সমাজে শ্রমবিভাগকে ত্বরান্বিত করে। শ্রমবিভাগের পথ ধরে সমাজে সুবিধাপ্রাপ্ত উচ্চশ্রেণীর উন্মেষ ঘটে ও শহরগুলো গড়ে উঠে। সমাজে জটিলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে লেখন ও হিসাব পদ্ধতির ব্যবহার জরুরী হয়ে পড়ে। হ্রদ ও নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের মধ্যে অনেক শহর গড়ে উঠে। এদের মধ্যে উন্নতি ও উৎকর্ষতার দিক দিয়ে মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা, মিশরের নীলনদ তীরবর্তী সভ্যতা ও সিন্ধু সভ্যতা উল্লেখ্যযোগ্য। একই ধরণের সভ্যতা সম্ভবত চীনের প্রধান নদীগুলোর তীরেও গড়ে উঠেছিল কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো থেকে এব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়নি।
প্রাচীন পৃথিবীর(প্রধানত ইউরোপ, তবে নিকট প্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাও অন্তর্ভুক্ত) ইতিহাসকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। ৪৬৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রাচীন যুগ; ৫ম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত মধ্য যুগ, যার মধ্যে রয়েছে ইসলামী স্বর্ণযুগ(৭৫০- ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) ও ইউরোপীয় রেনেসাঁ (১৩০০ শতক হতে শুরু)। আধুনিক যুগের সূচনাকাল ধরা হয় পঞ্চদশ শতক হতে অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত যার মধ্যে রয়েছে ইউরোপের আলোকিত যুগ। শিল্প বিপ্লব হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত আধুনিক কাল বলে বিবেচিত। পাশ্চাত্য ইতিহাসে রোমের পতনকে প্রাচীন যুগের শেষ ও মধ্যযুগের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু পূর্ব ইউরোপ রোমান সাম্রাজ্য থেকে বাইজেনটাইন সাম্রাজের অধীনে আসে, যার পতন আরো অনেক পড়ে আসে। ১৫ শতকের মাঝামাঝি গুটেনবার্গ আধুনিক ছাপাখানা আবিস্কার করেন যা যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। ফলে মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটে এবং বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূত্রপাত হয়। ১৮ শতকের মধ্যে ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার এমন একটি চরম অবস্থায় উপনীত হয় যা শিল্প বিপ্লব|শিল্প বিপ্লবকে]] অবধারিত করে তুলে।
বিশ্বের অন্যান্য অংশে, বিশেষ করে প্রাচীন নিকট প্রাচ্য, প্রাচীন চীন ও প্রাচীন ভারতে সভ্যতা ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয়, যেমন চীনের চার অনন্য আবিস্কার, ইসলামের স্বর্ণযুগ, ভারতীয় গণিত। তবে ১৮ শতকের পর হতে ব্যাপক ব্যবসা-বাণিজ্য ও উপনিবেশায়ন এর ফলে সভ্যতাগুলো বিশ্বায়িত হতে থাকে। গত ৫’শ বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য, অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা, পরিবেশগত ক্ষতি প্রভৃতি অসামান্য গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বর্তমান বিশ্বের মানুষের সামনে একই সাথে ব্যাপক সম্ভাবনা ও বিপদ এর দ্বার উন্মোচন করেছে।

প্রত্নতত্ত্ব শব্দটি ‘প্রত্নপ’ ও ‘তৎত্ব’ ধাতু দুটির সমন্বয়, যার অর্থ পুরাতন বিষয়ক জ্ঞান। বস্তুগত নিদর্শনের ভিত্তিতে অতীত পুনঃনির্মাণ করার বিজ্ঞানকেই প্রত্নতত্ত্ব বলে চিহ্নিত করা হয়। অতীতের সংস্কৃতি ও পরিবেশ নিয়ে চর্চা করে এমন অন্যান্য বিজ্ঞান বা বিষয়গুলোর (যেমন- ভূতত্ত্ব, পরিবেশ বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস, মনোবিজ্ঞান, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি) মধ্যে প্রত্নতত্ত্বের বিশেষত্ব হলো- এটি কেবল বস্তুগত নিদর্শন অর্থাৎ প্রামাণ্য তথ্য নিয়ে কাজ করে এবং তার সাথে মানুষের জীবনধারার সম্পর্ক নির্ণয় করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- ভূতাত্ত্বিক ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা প্রাচীন ভূমিরূপ ও অন্যান্য পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণ করে ইনামগাঁওয়ের কয়েকহাজার বছরের বৃষ্টিপাতের ধরনের একটি উপাত্ত হাজির করেছেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রাচীন ভূমিরূপ ও অন্যান্য পরিবেশগত তথ্য উদ্ধারের এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকলেও ওই বিশেষ বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতিতে মানুষ কিভাবে বসবাস ও জীবনযাপন, এই বিশেষ বিশ্লেষণটি প্রত্নতাত্ত্বিকরা করে থাকেন। ইনামগাওয়ের পরিবৈশিক তথ্য ও গর্তবসতিগুলো এই দুই প্রাচীন উপাদান মিলিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেই সময়ের মানুষের জীবনপ্রণালি বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করেন। তাই প্রত্নতত্ত্বের অধ্যয়নের মূল বিষয়গুলো হলো- ভৌত ধ্বংসাবশেষ, পরিবেশগত তথ্য, জৈব অবশেষ বা জীবাশ্ম, প্রাকৃতিক-সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যাবলী ইত্যাদি। আর প্রত্নতত্ত্বের কাজ হলো- এইসব বিষয়কে বিশ্লেষণ করে প্রাচীনকালের মানুষ এবং পরিবেশ ও প্রকৃতির তৎকালীন চিত্র বোঝা এবং তার মাধ্যমে মানুষ এবং পরিবেশ ও প্রকৃতির পরিবর্তনের ধারা ব্যাখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতের মানুষ এবং পরিবেশের রূপরেখা নির্মাণ করা। এর ফলে প্রত্নতত্ত্ব প্রধানত ইতিহাস ও পরিবেশ বিজ্ঞানের এক সহযোগী। তবে পরিবৈশিক প্রেক্ষিতের চেয়ে মানুষের সংস্কৃতির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত এমন বিষয়েই দীর্ঘকাল ধরে প্রত্নতাত্ত্বিক কর্মকাণ্ড সীমিত ছিল। কাজেই সাধারণত প্রত্নস্থান ও পুরাতন জিনিসপত্র আবিষ্কার, স্থান ও বস্তু চিহ্নিতকরণ ও নথিভুক্তকরণ এবং বস্তু ও কাঠামোর বিজ্ঞানসম্মত সংরক্ষণ ও তা জনসমক্ষে উপস্থাপন এর মধ্যেই প্রত্নতাত্ত্বিক চর্চা সীমাবদ্ধ ছিল। প্রাকৃতিক ও পরিবৈশিক প্রেক্ষিত এবং অবস্তুগত ভাবগত নিদর্শন যেমন সামাজিক সম্পর্ক ও মনোস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বর্তমানে প্রত্নতত্ত্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর ফলে প্রত্নতত্ত্ব বর্তমানে মানুষের অতীত ইতিহাসের গৃহবন্দী চর্চার বদলে পরিবেশ, ভূপ্রকৃতি এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের অন্যান্য বিষয়ের অতীত অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যত নির্মাণের বিজ্ঞান হিসেবে চর্চিত হচ্ছে।
উদ্ভব ও বিকাশ
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫৬-খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ অব্দে বেবিলনের সিপপুরে সামাথ নামক একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের নির্মাতার নাম জানার উদ্দেশ্যে সম্রাট নবনিডাস ধ্বংসস্তুপের মধ্যে খননকাজ পরিচালনা করেন। তার এই কীর্তির জন্য তাকে পৃথিবীর প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক বলে অভিহিত করা হয়। সম্রাটের কন্যা এন্নিগালডি নান্না খননে প্রাপ্ত এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে সংগৃহীত নিদর্শনাদি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন।
গ্রিক ঐতিহাসিক থুকিডাইডেস -এর বর্ণনা থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬০- খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৬ অব্দে এথেন্সের প্রত্নতাত্ত্বিকরা দেলস -এর ঈজিয়ান দ্বীপের প্রাচীন সমাধিগুলোতে খনন পরিচালনা করে খননে প্রাপ্ত নিদর্শনাদি সম্পর্কে সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। অন্য দিকে, প্রাচীন চীনে পূর্ব-প্রজন্মের নিদর্শনাদি সংরক্ষণের মাধ্যমে পারিবারিক ও মৌখিকভাবে হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস সংরক্ষণের প্রচলন ছিল। রোমান দার্শনিক লুকরেটিয়াস খ্রিষ্টপূর্ব ৯৯-খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫ অব্দে এবং চীনা দার্শনিক ইউয়ান কং খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে চীনাদের প্রত্ননিদর্শন সংরক্ষণের এই চর্চা এবং এই নিদর্শনগুলোর বিশ্লষেণ করে প্রাচীন চীনা সংস্কৃতির রূপরেখা উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন।
ভারতে সুলতানী শাসনামলে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ ও এর ভিত্তিতে ইতিহাস চর্চার সূচনা হয়। মুহম্মদ বিন তুঘলক (১৩২৪-১৩৫১) ব্যাপক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুশীলন করেন। তিনি সারা ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য প্রাচীন নিদর্শন সংগ্রহ করেন এবং এগুলোর আলোকে ইতিহাস রচনার জন্য পেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিক নিয়োগ করেন। অশোকস্তম্ভসমূহের শিলালিপির পাঠোদ্ধারের জন্য তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা পৃথিবীর প্রথম পেশাদারী প্রত্নতাত্ত্বিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
চতুদর্শ শতক থেকে ইউরোপের রেনেসাঁ পর্বে অভিজাতদের মধ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়; ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক ও প্রত্ন-লুটেরা উভয় সম্প্রদায় মূলত যেকোনো উপায়ে প্রত্ন নিদর্শন সংগ্রহ করার জন্য উৎসাহী হয়ে ওঠেন। মিশরের পিরামিড ও ইউরোপের প্রাচীন সমাধিগুলোতে প্রত্নতত্ত্ব চর্চার নামে এক ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করা হয়। ইতালিতে (রোম) যাচ্ছেতাই খনন এবং নিদর্শন বাণিজ্য এতো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, সেখানে বেশকিছু প্রত্ননিদর্শন বিক্রির বাজার ও বার্ষিক প্রত্ননিদর্শন বিক্রয় মেলা আয়োজন করা হতো।
এই প্রথায় প্রথম বিপরীতমুখী প্রয়াস চালান ইংরেজ গবেষক জন লিল্যান্ড । ১৫৩৩ থেকে ১৫৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি প্রাচীন নথিপত্র সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও গবেষণায় নিয়োজিত থাকেন। অপর ইংরেজ গবেষক উইলিয়াম কার্ডেন ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ইংল্যান্ডের প্রাচীন নিদর্শনসমূহের এক বিস্তারিত তালিকা প্রণয়ন করেন যা “ব্রিটানিয়া” নামে প্রকাশিত হয়। তার গবেষণাকর্মটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা, তিনি স্থানিক প্রেক্ষিতের সাথে সঙ্গতি রেখে প্রাচীন নিদর্শনগুলোর ব্যাখ্যা করেন এবং উদ্ভিদের দেহবৃদ্ধির ধরনের পার্থক্যের ভিত্তিতে মাটির নীচে চাপা পড়া প্রত্নস্থান শনাক্তকরণের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। প্রত্নস্থান চিহ্নিতকরণ ও বিশ্লেষণের এই এরিয়াল পদ্ধতি (প্রাযুক্তিক উৎকর্ষের কারণে বিবর্তিত হলেও) আজো অত্যন্ত জনপ্রিয়। অপর ইংরেজ প্রত্নতাত্ত্বিক জন অব্রে নামে দুটি প্রত্নস্থানের বিশদ বিবরণ ও বিশ্লেষণ করেন। তার বিবরণের ওপর নির্ভর করে ১৭০৯ খ্রিস্টাব্দে হারকুল্যুনেউম ও পম্পেই অঞ্চলে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক খনন পরিচালিত হয়। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এখানে একটানা খনন পরিচালিত হয়, এবং প্রাপ্ত নিদর্শনসমূহের অদ্ভুত ধাঁধায় খনন পরিত্যাক্ত হয় এবং তা থেকে কোনো ইতিহাস ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে খনন আবার শুরু হয়, এখনো সেখানে খনন চলছে।
১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে ডেনিশ প্রত্নতাত্ত্বিক ও কিউরেটর সি জে থমসন “থ্রি এজ সিস্টেম” আবিষ্কার করলে ইতিহাসের অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ হয়ে ওঠে। ফলে প্রত্নতত্ত্ব চর্চা এক নতুন গতি পায়। তিনি পৃথিবীর ইতিহাসকে পাথর যুগ, ব্রোঞ্জের যুগ ও লোহার যুগ – এই তিনটি ভাগে ভাগ করলে, পাথরের হাতিয়ার ও ব্রোঞ্জের হাতিয়ারগুলো আসলে কী তা বোঝা সম্ভব হয়, এবং ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী ব্যাখ্যা প্রদানের হাত থেকে প্রত্নতত্ত্ব রক্ষা পায়। অপর ডেনিশ প্রত্নতাত্ত্বিক জে জে ওয়ারসাই ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে এই গবেষণাকে একটি একক প্রত্নস্থানের স্তরবিন্যাসের মাধ্যমে প্রমাণ করতে সক্ষম হন। একটি প্রত্নস্থানের বিভিন্ন গভীরতায় বিভিন্ন ধরনের প্রত্নসামগ্রী যে একই সময়ের ব্যক্তিরা ব্যবহার করেনি, তা যে মানুষের ইতিহাসের বিকাশের ও পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা এই তথ্য প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় এক অভাবনীয় গতি দেয়।
১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে পম্পেই ও হারকুল্যুনেউম-এ প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয় এবং এইবার প্রত্নতাত্ত্বিকরা উক্ত প্রত্নস্থলের মানুষের জীবনপ্রণালি ব্যাখ্যায় অগ্রগতি লাভ করেন। এই সাফল্য দেশ-বিদেশের প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের এক উৎসবের সূচনা করে। কার্টিয়াস গ্রিসের অলিম্পিয়ায়, কোল্ডওয়ে এবং ওয়াল্টার মেসোপটেমিয়ায়, হার্বাট কনসট্যান্টিন্যাপল ও তুরস্কের বিভিন্ন জায়গায়, পিট রিভার্স ইংল্যান্ডে এবং হুইলার ভারতে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন সূচনা করেন। এই প্রত্যেকটি খনন পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব
আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব চর্চা শুরু হয় জার্মানদের হাতে। জার্মান মানবতাবাদী ও প্রাক-ইতিহাসবেত্তা (প্রিহিস্টোরিয়ান) গুস্তাফ কোসিনা ১৮৯৫ হতে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মৃত্যুর আগ পর্যন্ত “বসতি প্রত্নতত্ত্ব” (সেটেলমেন্ট প্রত্নতত্ত্ব) নামে প্রত্নতত্ত্বের এক আধুনিক মতবাদের বিকাশ ঘটান। এর মূল ভিত্তি ছিল, বস্তুনিদর্শনের (আর্টিফ্যাক্ট) ধরনের মাধ্যমে মানব সংস্কৃতি নির্ণয় এবং স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক অঞ্চলকে প্রাচীন ট্রাইব বা এথনিক গ্রুপের বসতি এলাকা বলে চিহ্নিত করা। তার পদ্ধতির সবচে সমস্যাযুক্ত বিষয় হলো বর্তমান মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গে অতীত সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাকে সরাসরি বর্ণনা করা। এর মাধ্যমে তিনি বর্তমান জার্মানদেরকেই নর্ডিক, আর্য বা ইন্দো-ইউরোপীয় (ইন্দো-জার্মান)-দের উত্তরাধিকার ঘোষণা করেন। তিনি অন্য সংস্কৃতি ও মানুষদের ওপরে জার্মানদের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের পরাজয়ের পর তিনি প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে যুক্তি করতে থাকেন, লৌহ যুগে পোল্যান্ড জার্মানদের বসতির একটি অংশ ছিল। কোসিনার মৃত্যুর পর জাতীয় সমাজতান্ত্রিকদের উদ্ভব হলে তারাও তার এই ডগমা গ্রহণ করে। থার্ড রাইখের সময় (হিটলারের নাজী শাসনামলকে থার্ড রাইখ বলা হয়) এই মতবাদ পৃষ্ঠপোষকতা পায়। নাজী শাসনে এটি প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পায়। আলফ্রেড রোজেনবার্গ এবং হাইনরিখ হিমলার এই মতবাদ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণের চেষ্টা করেন। এডলফ হিটলার এদের উভয়কে সরাসরি সাহায্য করেন। হিমলার গড়ে তোলেন Deutsches Ahnenerbe (জার্মান বংশগতির উত্তরাধিকার) নামক একটি সংস্থা। এরা কোসিনার বসতি প্রত্নতত্ত্বের বাধ্যতামূলক ব্যবহার করে (Jones ১৯৯৮:৩)। তারা জার্মানীর পূর্বদিকে বিস্তার আবিষ্কার করে। এই বিস্তার ছিল পোল্যান্ড, দক্ষিণ রাশিয়া এবং ককেশাস অঞ্চলে। প্রত্নতত্ত্বের এই ধারার সঙ্গে আরও যারা এই দলে যুক্ত ছিলেন তাদের মধ্যে হ্যান্স রাইনার্থ ও হারমান উইর্থের নাম উল্লেখযোগ্য। ইউরোপ বা বৈশ্বিকভাবে ব্যাপারটি যেমন-ই হোক না কেন, এই গবেষণা জার্মানদের জাতীয় চেতনা ও অহমবোধ বিকাশে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অন্যদিকে, পোলিশ প্রত্নতাত্ত্বিক Konrad Jazdewski ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপের প্রত্নতাত্ত্বিক অ্যাটলাস প্রকাশ করেন, তাতে তিনি ব্রোঞ্জ যুগে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে স্লোবানিক জাতির সম্প্রসারনকে চিত্রিত করেন (Kristiansen ১৯৯২:১৮), অর্থাৎ এক অর্থে তিনি পোলিশ (স্লোবানিক)-দেরকেই ইউরোপের প্রকৃত মালিক হিসেবে উপস্থাপন করেন; এটি পোলিশদের আত্মশ্লাঘার একটি হাতিয়ার হিসেবে আজো ক্রিয়াশীল।
একই ভাবে ফ্রান্সে রোমান সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ প্রতিহতকরণে গলদের প্রতিরোধের প্রত্নতাত্ত্বিক নথিগুলো ফরাসি জাতীয় চেতনা বিকাশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। আয়ারল্যান্ডের জাতীয় চেতনার বিকাশ ঘটেছে লা টেনে-র ওপরে প্রত্নতত্ত্বের গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর। যদিও জার্মানদের মতো এখানেও তা একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কারণ ঘটায়, কিন্তু আইরিশ জাতীয় প্রেরণার এক উৎস হিসেবেই থেকে যায়। একই ভাবে ইসরাইলের মাসাদা অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের পর দেখা যায়- সেখানে রোমান সাম্রাজ্যের বিরোধিতাকারী একদল ইহুদি গণ-আত্মহত্যা করেছিল; এই ঘটনা এবং স্থানটি ইসরাইল রাষ্ট্রটির জাতীয় চেতনার প্রতীক হিসেবে তৈরি হয়েছে, স্থানটি সামরিক অনুষ্ঠানাদির কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠেছে ।
প্রত্নতত্ত্বের এই ধারার বিকাশ উত্তর আফ্রিকা এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম গড়ে তুলতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে (Mattingly ১৯৯৬:৫৬-৯ এবং Paddayya ১৯৯৫:১৪১)। সাম্প্রতিক সময়ে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ-রামমন্দির বিতর্কেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রূপে ব্যবহৃত হয়েছে (Rao ১৯৯৪, Pollock ১৯৯৬)।
বসতি প্রত্নতত্ত্বের পর প্রত্নতত্ত্বের যে মতবাদটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব-বিস্তারী ছিল তা হলো সংস্কৃতি-ঐতিহাসিক প্রত্নতত্ত্ব। গর্ডন চাইল্ড এই মতবাদের প্রধান উদ্যোক্তা। প্রত্নতত্ত্ব চর্চায় তার ব্যাপক অবদানের জন্য অনেকে তাকে প্রত্নতত্ত্বের জনক-ও বলে থাকেন। যেসব বিষয় সাধারণভাবে সংস্কৃতির অংশ বলে গণ্য হয় এবং প্রায়ই যা প্রাচীন সামাজিক সত্তার বিভিন্ন খণ্ডাংশের ফল হিসেবে গণ্য হয় তার এককের স্থানিক ও সময়গত কাঠামোর মধ্যে তৈরি বস্তুগত নিদর্শনের অভিজ্ঞতাবাদী সারসংক্ষেপ, বর্ণনা এবং শ্রেণীকরণের (ক্লাসিফিকেশন) বৈশিষ্ট্যকেই সংস্কৃতি-ইতিহাস বলা যেতে পারে। সংস্কৃতি-ঐতিহাসিক প্রত্নতত্ত্বের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতীয় ঐতিহ্যের ভিন্নতা (বা বৈচিত্র্য) সত্ত্বেও এটাই ছিল বিশ শতকের ইউরোপ ও পৃথিবীর অন্যত্র প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক মতবাদ। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে অতীত জনগণ বা জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইতিহাস তৈরি করা হয়, যা আসলে নাজি জার্মানীর প্রত্নতাত্ত্বিক কাঠামোর মূলনীতির সঙ্গে একই।
জাপানের ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও কৃষিনির্ভর সংস্কৃতির প্রতি জাতীয় গুরুত্ব আরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রত্নতত্ত্বের এই ঘরানার গবেষণাগুলো অত্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে।
১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় তাসকান শহরে ড. উইলিয়াম রাথজে পরিচালিত ফেলনাময়লা প্রকল্প আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের এক মাইলস্টোন। শহরের অধিবাসীদের ফেলে দেওয়া ময়লা-আবর্জনা থেকে শহরের মানুষের স্বভাব-চরিত্র-সংস্কৃতি বিশ্লেষণ করে তিনি প্রাচীন নিদর্শন থেকেও যে প্রাচীন মানুষের সংস্কৃতি ব্যাখ্যা করা সম্ভব তা প্রমাণ করেন। এর ফলে প্রত্নতত্ত্ব শুধু বিজ্ঞানকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তা-ই নয়, বরং পদ্ধতি হিসেবেও প্রত্নতত্ত্ব যে বৈজ্ঞানিক তা প্রমাণিত হয়। এই গবেষণা প্রকাশিত হওয়ার পর বিভিন্ন দেশে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরে প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে তথ্য আহরণ করা শুরু হয় এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব জনপ্রিয় বিষয় হিসেবে চালু করা হয়। এর ফলে আশির দশক থেকে বিশ্বব্যাপী প্রত্নতত্ত্ব চর্চা ব্যাপক বৃদ্ধি পেলে এর মতাদর্শিক ঘরানারও ব্যাপক বিস্তার ঘটে। কাঠামোবাদী, প্রক্রিয়াবাদী, উত্তর-প্রক্রিয়াবাদী, নির্মাণবাদী ইত্যাদি নানা ঘরানা দ্রুত প্রকাশিত হয়। আপাত অর্থে বিভিন্ন ছোট ছোট ইস্যুতে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে আলাদা আলাদা গ্রুপ সৃষ্টি হয়, পিটার আকো একে বলছেন “ঘেটো”। এই সময় প্রথমবারের মতো মানুষের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াকে পরিস্থিতি (সিচুয়েশন) এবং প্রেক্ষিত (কনটেক্সট) এর নিরিখে গবেষণা করার প্রচেষ্টা শুরু হয়। আরো পরিষ্কার করে বললে, প্রত্নতত্ত্বের রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়; অতীত মানুষের বিভিন্ন গোষ্ঠী, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক-সূত্র ও সম্পর্কের সামর্থ্য, রাজনৈতিক সংগঠন ও সামাজিক স্তরায়নকে আরো ঘনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঊনিশশো আশির দশকের বিশ্ব পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করার ও সমাধানের পথনির্দেশের জন্য প্রত্নতাত্ত্বিকরা তাদের অবস্থান থেকে অবদান রাখার চেষ্টা করেন। গোষ্ঠী, শ্রেণী, সীমানা, আদিবাসী, জাতিত্ব ইত্যাদি প্রকরণগুলো প্রত্নতত্ত্বে আলোচিত হতে থাকে। এই সময় আকো, জোনস ও আরো কিছু লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্রত্নতাত্ত্বিকের উদ্যোগে কাজের তত্ত্ব বলে এক তত্ত্বহীন ঘেটো-র উদ্ভব ঘটে, এদের মূল বক্তব্য হলো- কাজ করতে করতেই একজন গবেষক তার তত্ত্ব খুঁজে পাবেন, যার সাথে পৃথিবীতে প্রচলিত অন্য তত্ত্বসমূহের কোনো মিল না-ও থাকতে পারে। কিন্তু অন্য তত্ত্বের প্রতি পূর্ব-ধারণার (প্রি-কনসেপ্ট) ফলে তিনি যদি ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হন, সেটি সত্যিই বিপজ্জনক।
প্রত্নতত্ত্বের উপাদান
প্রত্নতত্ত্বের উপাদান হিসেবে সাধারণভাবে ভৌত ধ্বংসাবশেষ, পরিবেশগত তথ্য, জৈব অবশেষ বা জীবাশ্ম, প্রাকৃতিক-সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যাবলী ইত্যাদিকে বিবেচনা করা হয়। তবে ভাবগত নিদর্শন যার আপাত অর্থে কোনো বহনযোগ্য, বাণিজ্যযোগ্য বা দৃশ্যমান অস্তিত্ব নাই এমন কোন বিষয়ও হতে পারে প্রত্নতাত্ত্বিকের প্রধান সূত্র।
প্রস্তর যুগ
বিশ্বের ইতিহাসে প্রস্তর যুগ বলতে মানব ও তার সমাজের বিবর্তনের ধারায় একটা পর্যায়কে বোঝান হয় যখন যখন মানুষের ব্যবহার্য হাতিয়ার তৈরির মূল উপকরণ ছিল পাথর । তবে পাথরের ব্যবহারই প্রস্তর যুগের একমাত্র সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য বলে মনে করা হয় না । বিরল হলেও কাঠ এবং প্রাণির হাড়ের তৈরি হাতিয়ার ব্যবহারের নিদর্শনও পাওয়া গেছে । এসময় স্বর্ণ ছাড়া অন্য কোন ধাতুর ব্যবহার ছিল অজানা । প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার থেকে ও পূর্ব আফ্রিকার সাভানা অঞ্চল থেকে বাকি বিশ্বে মানুষের ছড়িয়ে পড়ার সময় থেকে প্রস্তর যুগের শুরু ধরা হয়। প্রস্তর যুগের শেষ হয় কৃষির উদ্ভাবন, গৃহপালিত পশুর পোষ মানানো এবং তামার আকরিক গলিয়ে তামা আহরনের মাধ্যমে মানুষ ধাতুর ব্যবহার শুরু করলে । এই যুগটিকে প্রাগৈতিহাসিক যুগ বলা হয় কারণ তখনো লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি এবং মানব সমাজের লিখিত ইতিহাস সংরক্ষণ করা শুরু হয়নি ।
প্রস্তর যুগকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয় ।
• প্রাচীন প্রস্তর যুগ বা প্যালিওলিথিক
• মধ্য প্রস্তর যুগ বা মেসোলিথিক
• নব্য প্রস্তর যুগ বা নিওলিথিক
এই যুগটি মুলত ঊষা প্রস্তর যুগ এর পরবর্তী ধাপ কে বলা হয়। এখানে এই সময়ে মানুষেরা সবাই অশোধিত পাথর এর হাতিয়ার ব্যবহার করত। পূর্ব আফ্রিকা থেকে বিবর্তন এর মাধ্যমে মানুষ এর উতপত্তি ঘটার পরে প্রায় ১২ লক্ষ বহর অতিবাহিত হবার পরে ১০০০০০ থেকে শুরু করে প্রায় ৪০০০০ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত সময়কাল কে ধরা হয় প্রাচীন প্রস্তর যুগ। ম্যাগডেলেনিয় সংস্কৃতি, অ্যাবিচিলনিয় সংস্কৃতি, পিকিং মানব; এসমস্ত প্রাচীন প্রস্তর যুগ এর উল্লেখযোগ্য সংস্কৃতি এবং ম্নব গোষ্ঠী। আগুন এই সময় এর উল্লেখযোগ্য আবিস্কার। এই সময়ে মানুষ পুরোপুরি ভবে শিকার এবং খাদ্য সংগ্রহ এর উপরে নির্ভরশীল ছিল
প্যালিওলিথিক
প্যালিওলিথিক বা প্যালিওলিথিক যুগ বলতে প্রাগৈতিহাসিক যুগের ইতিহাসকে বোঝায়।
Age Period Tools Economy Dwelling Sites Society Religion
প্রস্তর যুগ
Paleolithic Handmade tools and objects found in nature – cudgel, club, sharpened stone, chopper, handaxe, scraper, spear, Bow and arrow, harpoon, needle, scratch awl
Hunting and gathering
Mobile lifestyle – caves, huts, tooth or skin hovels, mostly by rivers and lakes
A band of edible-plant gatherers and hunters (25-100 people) Evidence for belief in the afterlife first appears in the Middle Paleolithic or Upper Paleolithic, marked by the appearance of burial rituals and ancestor worship. Priests and sanctuary servants appear in the prehistory.

Mesolithic (known as the Epipalaeolithic in areas not effected by the Ice Age (such as Africa)) Handmade tools and objects found in nature – bow and arrow, fish – basket, boats
Tribes and Bands
Neolithic
Handmade tools and objects found in nature – chisel, hoe, plough, yoke, reaping-hook, grain pourer, barley, loom, earthenware (pottery) and weapons
agriculture Gathering, hunting, fishing and domestication
Farmsteads during the Neolithic and the Bronze Age Formation of cities during the Bronze Age Tribes and the formation of chiefdoms in some Neolithic societies at the end of the Neolithic period’ States and chiefdoms during the Bronze Age.
ব্রোঞ্জ যুগ
Copper and bronze tools, potter’s wheel
Agriculture – cattle – breeding, agriculture, craft, trade

লৌহ যুগ
Iron tools
মধ্য প্রস্তর যুগ বা মেসোলিথিক হল প্রাচীন প্রস্তর যুগ বা প্যালিওলিথিক এবং নব্য প্রস্তর যুগ বা নিওলিথিক-এর মধ্যবর্তী এক যুগ।
নব্য প্রস্তর যুগ বা নবপোলিয় যুগ হলো প্রস্তর যুগের শেষ অধ্যায়, যখন পাথরের অস্ত্রশস্ত্র ও ব্যবহার্য দ্রব্যাদির চরম উন্নতি সাধিত হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১০,২০০ অব্দে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অঞ্চলে এবং পরবর্তীতে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে এই যুগের সূচনা ঘটে। খ্রিস্টপূর্ব ৪,০০০ অব্দ থেকে ২,৫০০ অব্দের মধ্যে এই যুগের সমাপ্তি ঘটে। প্রথাগতভাবে এই যুগ হচ্ছে প্রস্তর যুগের সমাপ্তি। নব্য প্রস্তর যুগ হলোসিন এপিপ্যালিওলিথিক যুগ অনুসরন করে আসে এবং কৃষিকাজের সূচনাকালে নবপলীয় বিপ্লব ঘটে এবং এই সময়টাই নব্য প্রস্তর যুগের শুরু। ধাতুর ব্যবহার শুরু হলে এই যুগ শেষ হয় এবং ব্রোঞ্জ যুগ, তাম্র যুগ এবং কোন কোন ভৌগলিক অঞ্চলে লৌহ যুগ শুরু হয়। এই যুগে আচরণ এবং সংস্কৃতিতে প্রগতি এবং পরিবর্তন দেখা যায়, যার মধ্যে ছিল বন্য ও গৃহজাত শস্যের ব্যবহার এবং বন্য পশুকে গৃহপালিত পশুতে রূপান্তর। ধারণা করা হয় যে নব্য প্রস্তর যুগ শুরু হয় লেভ্যান্টে খ্রিস্টপূর্ব ১০,২০০-৮,৮০০ অব্দে।
ব্রোঞ্জ যুগ
কোন সংস্কৃতির যে সময়কালে সবচেয়ে উন্নত ধাতুশিল্পের উপাদান হিসেবে ব্রোঞ্জ ব্যাবহৃত হয় তাকে ঐ সভ্যতার ব্রোঞ্জযুগ নামে অভিহিত করা হয়। প্রায় সকল ব্রোঞ্জযুগীয় সংস্কৃতি প্রাগৈতিহাসিক যুগে বিকাশ লাভ করে।

ব্রোঞ্জ যুগ
(খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০০ – খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০)
Early Bronze Age
(3300 BCE – 2000 BCE)
Early Bronze Age I
3300 BCE – 3000 BCE

Early Bronze Age II
3000 BCE – 2700 BCE

Early Bronze Age III
2700 BCE – 2200 BCE

Early Bronze Age IV
2200 BCE – 2000 BCE

Middle Bronze Age
(2000 BCE – 1550 BCE)
Middle Bronze Age I
2000 BCE – 1750 BCE

Middle Bronze Age II
1750 BCE – 1650 BCE

Middle Bronze Age III
1650 BCE – 1550 BCE

Late Bronze Age
(1550 BCE – 1200 BCE)
Late Bronze Age I
1550 BCE – 1400 BCE

Late Bronze Age II A
1400 BCE – 1300 BCE

Late Bronze Age II B
1300 BCE – 1200 BCE

লৌহ যুগ
প্রাগৈতিহাসিক যুগের যে সময়কালে কোন এলাকার ধাতব অস্ত্র ও যন্ত্রপাতি মূলত লোহা দ্বারা তৈরি হত সেই সময়কালকে প্রত্নতত্ববিদ্যায় লৌহযুগ বলা হয়। লোহার ব্যবহার শুরুর সাথে সাথে মানবসমাজে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়, যার মধ্যে কৃষিব্যবস্থা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং শিল্পকলা অন্যতম।
প্রত্নতত্ববিদ্যায় প্রাগৈতিহাসিক যুগকে যে তিনভাগে ভাগ করা হয়, লৌহ যুগ হচ্ছে সেই তিন যুগের সর্বশেষ যুগ। প্রস্তর যুগ ও ব্রোঞ্জ যুগের পরে লৌহ যুগের আবির্ভাব। লৌহযুগের সময়কাল ও বৈশিষ্ট্য অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন। সব অঞ্চলেই লৌহযুগ শেষে ঐতিহাসিক যুগের আবির্ভাব, যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল লিখিত সংরক্ষিত ইতিহাস। উদাহরণ স্বরুপ, ব্রিটেন এর লৌহযুগ শেষ হয় রোমান বিজয় এর মাধ্যমে, যার পর হতে ব্রিটেন এর লিখিত ইতিহাস সংরক্ষণ শুরু হয়।

সংস্কৃতির বিভিন্ন প্রাগৈতিহাসিক স্তর
বিশেষজ্ঞের জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়ে মর্গ্যানই সর্বপ্রথম মানবজাতির প্রাগৈতিহাসিক যুগকে নির্দিষ্ট নিয়ম ও শৃঙ্খলার ভেতরে আনয়ন করতে চেষ্টা করেন। তার যতদিন কোনো গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত বিষয়-বস্তুর চাপে পরিবর্তন সাধনের প্রয়োজন উপস্থিত না হয়, ততদিন তাঁর শ্রেণী-বিন্যাসই বলবৎ থাকবে।
অ-সভ্য (savagery) অবস্থা, বর্বর (barbarism) ও সভ্যতা—[মানব সমাজের] এই তিনটি প্রধান যুগের মধ্যে প্রথম দুটো এবং তৃতীয় যুগের পরিবর্তনের সূচনার সময় পর্যন্ত নিয়ে তিনি আলোচনা চালান। অ-সভ্য অবস্থা ও বর্বর যুগকে তিনি আহার্য উৎপাদনে প্রগতির ক্রম অনুসারে নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ এই তিনটি স্তর বা পর্যায়ে বিভক্ত করেন। [আহার্য উৎপাদনের প্রগতিকে মাপকাঠিরূপে ব্যবহারের] কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন :
“আহার্য উৎপাদনে মানবজাতির নৈপুণ্যের উপরই তাদের পৃথিবীতে প্রাধান্য বিস্তারের সমগ্র সমস্যাটা নির্ভর করে। [সকলেরই বিশ্বাস পৃথিবীতে] একমাত্র মানবজাতিই আহার্য উৎপাদনের উপর পুরো ক্ষমতা বিস্তার করেছে, [অর্থাৎ এই সমশাটাকে পুরোপুরি মুঠোর মধ্যে আনয়ন করতে সক্ষম হয়েছে। কাজেই আহার্য উৎপাদিনের উৎস ও উপায়গুলির বিস্তৃতি সাধনের সঙ্গে মানবীয় প্রগতি ধারার প্রধান যুগগুলোকে অল্পবিস্তর প্রত্যক্ষভাবে অভিন্নরূপে কল্পনা করা হয়েছে।”
অসভ্য অবস্থা
(ক) নিম্নস্তর—মানবজাতির শৈশব অবস্থা। মানুষ তখনো তার মূল আবাস-স্থল গ্রীষ্মমণ্ডল ও গ্রীষ্মমণ্ডলের সন্নিহিত বন-জঙ্গলে, অন্তত আংশিকভাবে বৃক্ষে অবস্থান করে; এছাড়া, অতিকায় শিকারী জানোয়ারদের মধ্যে তার অবিচ্ছিন্নভাবে তিষ্ঠিয়া থাকা কল্পনা করাও যায় না; ফল, শাঁস, মূল তার আহার্য দ্রব্য। মৌখিক ভাষার ক্রমবিকাশ এই যুগের প্রধান কীর্তি। এই ঐতিহাসিক যুগে বিদিত কোন জাতিকেই আর আদিম অবস্থায় দেখা যায় না। যদিও এই যুগ চলে হাজার বছর ধরে তবুও এমন কোন প্রত্যক্ষ নজির বা প্রমাণপত্র নেই যা দিয়ে এত অস্তিত্ব প্রমাণ করা যেতে পারে; কিন্তু প্রাণীরাজ্য থেকে মানবজাতির উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ স্বীকার করার সঙ্গে এই পরিবর্তনের যুগটাকেও অবশ্যই মেনে নিতে হয়।
(খ) মধ্যস্তর—ভোজ্যবস্তুরূপে মাছ (কাঁকড়া, ঝিনুক ইত্যাদি জলজন্তু সহ) আগুন ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে এই স্তরের সূচনা। মাছ আর আগুন উভয়ে উভয়ের পরিপূরক; কারণ, একমাত্র আগুনের সাহায্য নিয়েই মাছ শরীরের পুষ্টিসাধন করতে পারে। এই নতুন ভোজ্যবস্তু আবিষ্কারের পর মানুষ জলবায়ু আর স্থানের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করে। এমন কি, সেই নিতান্ত অসভ্য অবস্থাতেও তারা নদী আর সমুদ্রোপকূল ধ’রে পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এই সব দেশান্তর গমনের প্রমাণস্বরূপ বলা যতে পারে যে, প্রত্যেক মহাদেশেই প্রাচীন প্রস্তর-যুগের (Stone Age) বা পেলিওলিথ (Paleolithic) নামে পরিচিত যুগের আনাড়ীভাবে তৈরী ভোঁতা পাথরের অস্ত্র দেখতে পাওয়া যায়; ঐ সমস্ত অস্ত্র বা উহার অধিকাংশের ব্যবহার সর্বতোভাবে বা প্রধানত এই যুগেই আরম্ভ হয়। নতুন অধিকৃত অঞ্চল, উদ্ভাবনের জন্যে অবিশ্রান্ত সক্রিয় তাগিদ বোধ, আর ঘর্ষণ দ্বারা আগুন তৈরীর ক্ষমতা মানুষকে নতুন নতুন ভোজ্যবস্তুর উদ্ভাবনে সক্ষম করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, মানুষ ক্রমে গুড়ো করার যোগ্য মূল ও কন্দ গরম ছাইয়ের গাদায় বা মাটির চুল্লিতে বসিয়ে ভোজ্যদ্রব্যে পরিণত করে। প্রথম অস্ত্র গদা বা বর্শা উদ্ভাবনের পর শিকারলব্দ প্রাণীও মাঝে মাঝে ভোজ্য-বস্তুতে পরিণত হয়। কিন্তু সাহিত্যে কেবল মাত্র মৃগয়াজীবী অর্থাৎ একমাত্র শিকারলব্দ প্রাণীর মাংস খেয়েই জীবনধারণে অভ্যস্ত যে-সব উপজাতির বিবরণী হামেশা চোখে পড়ে, কিন্তু সেই ধরণের কোন উপজাতি কোনদিনই ধরাপৃষ্ঠে বিচরণ করেনি। কারণ শিকারের প্রাণী যোগাড় করা তখন অত্যন্ত বিপজ্জনকই ছিল এবং কাজেই তা সম্ভবপর ছিল না। এই অবস্থায়, ভোজ্যবস্তু সরবরাহের অনবরত অনিশ্চয়তাবশত নরমাংস ভোজন প্রথাও উদ্ভূত হয়ে থাকবে। এই স্তর চলে আরও বহু দীর্ঘ সময় ধরে। অস্ট্রেলিয়ান বাসিন্দারা এবং পলেনেশিয়ার বহু জাতি এখনও অসভ্য অবস্থায় এই মধ্য স্তরেই আছে।
(গ) উচ্চস্তর—তীর-ধনুক উদ্ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে এই স্তরের উৎপত্তি। তার ফলে শিকার-লব্ধ প্রাণী নিয়মিতভাবে ভোজ্য-বস্তু আর শিকার স্বাভাবিক বৃত্তিতে পরিণত হয়। ধনুক, রজ্জু ও তীর তখন অত্যন্ত জটিল অস্ত্ররূপে গণ্য। তীর-ধনুকের উদ্ভাবন মানুষের রীতিমতভাবে বুদ্ধিবৃত্তিতে শাণ এবং বহু বৎসরের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পরিচায়ক; মোটকথা, আরও অনেক কিছু আবিষ্কারের পরিচয় এই নয়া আবিষ্কারের ইন্ধন জোগায়। আমরা দেখতে পাই, মৃন্ময়পাত্র ব্যবহারে অনভ্যস্ত, কিন্তু তীর-ধনুর সঙ্গে পরিচিত জাতিগুলি (মর্গ্যানের মতে এখান থেকে বর্বরযুগের দিকে পরিবর্তনের সূচনা) ইতিমধ্যেই পল্লিগ্রামগুলিতে বসবাস আরম্ভ করেছে। আর তারা ভোজ্যদ্রব্য উৎপাদনের উপায়ের উপরেও অনেকখানি প্রভুত্বলাভ করেছে। কাঠের জলপাত্র ও বাসনকোসন, গাছের ছালের তন্তু দিয়ে হাতে-বোনা (তাঁতের সাহায্যে নয়) বস্ত্র, গাছের ছাল বা পাতলা শাখা দিয়ে তৈরি ঝুড়ি, ধারালো পাথরের অস্ত্রও (Neolithic) আমাদের চোখে পড়ে। আগুন ও প্রস্তরের কুঠার উদ্ভাবনের সঙ্গে সঙ্গে গাছের গুঁড়ি দিয়ে খোদাই করা নৌকার রেওয়াজও আরম্ভ হয়; লোকে কাঠের কড়ি আর তক্তা দিয়ে মাঝে মাঝে বসত-বাড়িও তৈরী করে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তর-পশ্চিম আমেরিকায় ইণ্ডিয়ানদের মধ্যে এই সমস্ত অগ্রগতির ছাপ এখনও দেখতে পাওয়া যায়। এরা তীর ধনুর ব্যবহার জানলেও মৃন্ময়পাত্র সম্পর্কে একেবারে অনভিজ্ঞ। বর্বর-যুগের লৌহ-নির্মিত তরবারি আর সভ্যতার আমলের আগ্নেয়াস্ত্রের মত অসভ্য যুগের তীর-ধনুকই চরম অস্ত্ররূপেই গণ্য।
বর্বর যুগ
(ক) নিম্নস্তর—মৃন্ময়পাত্র প্রবর্তনের সঙ্গে সংগে এই স্তরের সূচনা। আগুনের কবল থেকে রক্ষা করার জন্যে প্রায়ই ঝুড়ি বা কাঠের পাত্রের গায়ে কাদা লেপা হতো। [প্রথম মৃন্ময়পাত্র এইভাবেই তৈরি হয়। নানাক্ষেত্রে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। আর এই প্রক্রিয়া যে সম্ভবও তাতে সন্দেহ করার বিশেষ কোন কারণ দেখা যায় না।] মোটের উপর, এইভাবে মানুষ আবিষ্কার করে যে, ভেতরে কোন পাত্র না থাকলেও মাটির ছাঁচেই বেশ কাজ চলে যায়।
এতক্ষণ আমরা ক্রমবিকাশের যে সাধারণ গতি ও ধারা নিয়ে আলোচনা করলাম, নির্দিষ্ট কোন যুগে, দেশ বা স্থান নির্বিশেষে এই গতি ও ধারা সমস্ত জাতির উপরেই প্রয়োগ করা চলে। বর্বর যুগের প্রারম্ভেই আমরা এমন একটা স্তরে পৌঁছি, যেখানে [পৃথিবীর] দুইটি মহাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর পার্থক্য রীতিমত প্রভাব বিস্তার করতে আরম্ভ করে। পশুপালন, জনন এবং চাষ-আবাদ বর্বর যুগের প্রধান বিশেষত্ব। এই সময় পূর্ব-মহাদেশ, তথাকথিত প্রাচীন-জগত পালনের যোগ্য প্রায় সকলপ্রকার জীব-জানোয়ারের অধিকারী। এখানে কেবলমাত্র একটি ছাড়া সকল প্রকার খাদ্য-শস্যও জন্মায়। পাশ্চাত্য মহাদেশ—আমেরিকার লামা ছাড়া পালনের যোগ্য কোনো স্তন্যপায়ী পশু ছিল না। আর এই লামা প্রাণীরও অস্তিত্ব ছিল দক্ষিণ-আমেরিকার মাত্র একটি অঞ্চলে। চাষ-আবাদের যোগ্য খাদ্যশস্যগুলোর মধ্যে আমেরিকায় মাত্র একটি খাদ্যশস্যের অস্তিত্ব ছিল। এর নাম ভুট্টা। তবে এই শস্যটা ছিল সর্বোৎকৃষ্ট। প্রাকৃতিক অবস্থার এই সমস্ত রকমফেরে জন্য প্রত্যেক গোলার্ধের লোকজন সে থেকে চলে আপন-আপন পথে। ফলে, মহাদেশ দুটিতে বিভিন্ন স্তরে নানা প্রকার পার্থক্যের সৃষ্টি হয়।
(খ) মধ্যস্তর—পূর্ব-গোলার্ধে পশুপালন থেকে এই স্তর আরম্ভ হয়। পশ্চিম-গোলার্ধে পয়ঃপ্রণালীর সাহায্যে খাদ্য-শস্যের চাষ-আবাদ আর রোদে শুকানো ইট ও পাথর দিয়ে বাড়ি তৈরীর সঙ্গে এই স্তরের সূচনা।
পশ্চিম-গোলার্ধ নিয়েই এখন আলোচনা শুরু করা যাক। কারণ এখানে ইউরোপিয়ানদের অধিকার আরম্ভ হওয়ার পূর্বে এই স্তরটি মোটেই পরবর্তী স্তরটির দ্বারা স্থানচ্যুত হওয়ার অবকাশ পায় নি।
ইণ্ডিয়ানরা যখন আবিষ্কৃত হয়, তখন বর্বরযুগের নীচের ধাপের (মিসিসিপি নদীর পূর্বদিকের সমস্ত উপজাতি) ইণ্ডিয়ানরা ইতিপূর্বেই বাগানে ভুট্টার আবাদ আর সম্ভবত কুমড়া, শশা, খরমুজ প্রভৃতির আবাদেও অভ্যস্ত ছিল। এই সমস্ত ও ভুট্টা থেকে তাদের খোরাকের অধিকাংশ সংগৃহীতও হয়। বেড়া-দিয়ে-ঘেরা কাঠের বাড়িযুক্ত গ্রামে তারা বাস করে। উত্তর-পশ্চিমের, বিশেষত, কলম্বিয়া নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ইণ্ডিয়ানরা তখনও অ-সভ্যযুগের উচ্চ স্তরে। মাটির বাসন বা চাষ-আবাদ তাদের নিকট একেবারে অজ্ঞাত বস্তু। অপরদিকে, [ইউরোপিয়ানদের দ্বারা] অধিকৃত হবার সময় নিউ-মেক্সিকোর তথাকথিত পুয়েব্লো ইণ্ডিয়ান, মেক্সিকোবাসী, মধ্য-আমেরিকারবাসী ও পেরুবাসী ইণ্ডিয়ানরা ছিল বর্বরযুগের মধ্য স্তরে। এরা রোদে পোড়া ইট ও পাথরের তৈরী দুর্গসদৃশ বাড়িতে বাস করতো। স্থান ও আবহাওয়ার ব্যতিক্রম অনুসারে ভুট্টা ও আরও পাঁচটা গাছপালার চাষ-আবাদ জানত; কৃত্রিম জলসেচ দ্বারা এরা বিভিন্ন বাগানে বিভিন্ন অঞ্চল ও জলবায়ু অনুযায়ী এইসব চাষ-আবাদ করে; এইগুলোই ছিল তাদের প্রধান আহার্য। এরা সামান্য কিছুকিছু পশুপালনও করে। মেক্সিকোবাসীরা টার্কী ও অন্যান্য পাখী আর পেরুবাসীরা লামা পালনে অভ্যস্ত ছিল। ধাতুর ব্যবহারও তারা জানতো, তবে লোহা এদের কাছে ছিল অজ্ঞাত; সে জন্য পাথরের অস্ত্র ও হাল-হাতিয়ার ব্যবহার ত্যাগ করতে তারা সক্ষম হয় নাই। ঠিক এমনি সময়ে, স্পেনীয়েরা তাদের স্বাধীন ক্রমবিকাশের পথ চিরদিনের জন্য রুদ্ধ করে দেয়।
পূর্ব-গোলার্ধে দুধ ও মাংস-সরবরাহকারী পশু পালনের সঙ্গে সঙ্গে বর্বর যুগের মধ্যস্তর আরম্ভ হয়। কিন্তু এই যুগের শেষাশেষি চাষ-আবাদের সূচনা পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায় না। পশুপালন, পশু-জনন এবং বড় বড় পশুপালন সংগঠন আর্য ও সেমিটিক (semites) এবং অপরাপর বর্বরদের মধ্যে ভেদ্রেখা টেনে দেয়। ইউরোপীয় ও অসিয়াবাসী আর্যগণ গরুর একই রকমের নাম ব্যবহার করলেও চাষ-আবাদের অধিকাংশ শস্যের নামের মিল কদাচিৎ পাওয়া যায়।
সুযোগ-সুবিধামত কতকগুলি স্থানে পশুপালন সংগঠন পল্লি-জীবনে পরিণতি লাভ করে। ইউফ্রেটিস ও তাইগ্রিসের তীরবর্তী তৃণ-পূর্ণ সমতলভূমিতে সেমিটিকগণ এবং ভারতবর্ষ ও আল্পস ও জাক্সার্টেস (Jaxartes), তথা ডন, নীপার তীরবর্তী তৃণপূর্ণ সমতল ক্ষেত্রগুলির আর্যগণ পল্লি-জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠে। এইরূপ পশুচারণ-যোগ্য ভূমিসমূহের, সীমান্ত দেশেই সর্বপ্রথম পশুপালনের রেওয়াজ আরম্ভ হয়ে থাকে। কাজের পরবর্তী যুগগুলির লোকজনদের মনে এই ধারণা জন্মে যে, পশুপালক (pastoral) উপজাতিগুলো এমন-সব অঞ্চল থেকে এসেছে, যেগুলো মানবজাতির প্রসূতিগৃহ হওয়া দূরে থাকে, ঐসব উপজাতির অ-সভ্য পূর্বপুরুষ, এমন-কি সেইযুগের নিম্নস্তরের লোকজনদের কাছেও বাসের অযোগ্য বিবেচিত হয়েছে। আর নদীতীরবর্তী তৃণপূর্ণ সমতলভূমিতে পল্লিজীবন যাপনে অভ্যস্ত হওয়ার পর মধ্যযুগের এই সব বর্বরদের পক্ষে স্বেচ্ছায় আবার তাদের পূর্বপুরুষদের বনজঙ্গলে ফিরে যাওয়ার সম্ভবনার চিন্তা করাও কঠিন হয়ে উঠে। উত্তর ও পশ্চিমে সরে যাওয়ার প্রয়োজন উপস্থিত হওয়ার সময়ও সেমিটিক ও আর্যগণ পশ্চিম-এশিয়া ও ইউরোপের জঙ্গল সমাকীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেনি। খাদ্যশস্যের চাষবাস দ্বারা এই সব অসুবিধাজনক অঞ্চলে গৃহপালিত পশুগুলির আহার্য সরবরাহ এবং শীতকালেও উহাদের পালনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তাদের পশ্চিম-এশিয়া ও ইউরোপে বসবাস সম্ভব হয়নি। যতদূর সম্ভব, পশু-খাদ্যের জন্যই এই সব উপজাতির লোকেরা খাদ্য-শস্যের চাষ-আআব্দ করে এবং পরে ঐসব ভোজ্যদ্রব্য মানুষের পুষ্টিসাধনে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে।
দুধ ও মাংসের প্রচুর সরবরাহ, বিশেষত, শিশুদের পুষ্টিবিধানে এই দু’’রকম খাদ্যদ্রব্যের অনুকূল প্রভাবের ফলেই আর্য ও সেমিটিক জাতিগুলো অন্যান্য জাতির তুলনায় উন্নততর মূল্য জাতি (Race) রূপে গণ্য হয়। বস্তুত নিউ-মেক্সিকোর পুয়েব্লো ইণ্ডিয়ানদের সম্পূর্ণরূপে নিরামিষভোজী বললেই চলে; সেই জন্য অধিকতর পরিমাণে মাছ-মাংস-ভোজী, বর্বরযুগের নিম্নস্তরে অবস্থিত ইণ্ডিয়ানদের তুলনায় পুয়েব্লো ইণ্ডিয়ানদের মগজটা আকারে অনেক ছোট দেখা যায়। যাই হোক, এই স্তরে নরমাংসভোজন-প্রথা ক্রমে একরূপ লোপ পেয়ে যায়। স্থানে স্থানে ধর্মকর্ম ও যাদুবিদ্যার জন্য নরমাংসভোজন-প্রথা কোনরকমে টিকে থাকে। ধর্ম-কর্ম আর যাদুবিদ্যা একই ধরনের চিজই বটে।
(গ) উচ্চস্তর—লৌহ-পিণ্ড ঢালাই করার সঙ্গে সঙ্গে এই স্তরের উৎপত্তি; বর্ণমালার সাহায্যে লিখনপদ্ধতি আবিষ্কার আর সাহিত্যিক আলোচনা গবেষণাগুলির রেকর্ড রাখা সম্পর্কে বর্ণমালার প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে এই স্তর ক্রমশ সভ্যতায় পরিণতি লাভ করে। পূর্বেই বলা হয়েছে এই স্তরটা একমাত্র পূর্বগোলার্ধেই স্বাধীনভাবে ক্রমবিকাশ লাভের অবসর পায়; আর এর বিশেষত্ব হচ্ছে এই যে, পূর্ববর্তী স্তরগুলির সমবেত উৎপাদনের চেয়েও বেশি ধন-দৌলত এই স্তরটিতে উৎপন্ন হয়। পৌরাণিক যুগের (Heroci Age) গ্রীকগণ, রোমের ভিত্তি প্রতিষ্ঠার সামান্য-কিহচু পূর্বের ইতালীয় উপজাতিগণ, তাসিতুসের আমলের জার্মানগণ এবং জল-দস্যু যুগের (Viking Age) নরমানরা এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত।
সকলের উপর, এই স্তরে গো-মহিষ-পরিচালিত লোহার-ফলক-যুক্ত লাঙলের সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় ঘটে। এই লাঙলের কল্যানে জমিতে ব্যাপকভাবে চাষ-আবাদ সম্ভব হয়; ফলে, পূর্ববর্তী যে-কোন যুগের তুলনায় সীমাহীন আহার্য সরবরাহের সুযোগ উপস্থিত হয়। ক্রমে চাষের জমি ও চারন-ভূমির জন্য বন-জঙ্গল সাফ করা চলতে থাকে। লোহার কুড়ুল আর লোহার কোদাল ছাড়া যে বিস্তৃতভাবে বন-জঙ্গল সাফ করার সমস্যাটার আজও সমাধান হত না তা সহজেই অনুমেয়। সঙ্গে সঙ্গে লোকসংখ্যাও বেজায় বেড়ে যেতে আরম্ভ করে; ছোট ছোট অঞ্চলগুলো ঘন-লোক-বসতিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়। [মাঠে-ময়দানে] চাষ-আবাদের রেওয়াজ প্রবর্তিত হওয়ার পূর্বে কোন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে পাঁচ-লাখ লোকেরও একত্র সমাবেশ অতি অনন্যসাধারণ ব্যাপাররূপে গণ্য হয়। যতদূরসম্ভব, এইরূপ লোক-সমাবেশ আদৌ ঘটে উঠেনি।
হোমারের কাব্য-সাহিত্যে, বিশেষত, ইলিয়াদ গ্রন্থে আমরা বর্বরযুগের উচ্চস্তর চরম সীমায় দেখতে পাই। পূর্ণবিকাশপ্রাপ্ত লোহার হাল-হাতিয়ার, কামারের জাঁতা, হাতে-চালানো মিল (hand-mill), কুম্ভকারের চাক, তেল ও মদ প্রস্তুতকরণ, সুকুমার-শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত ধাতুর কাজ, শকট ও যুদ্ধের রথ, কাঠের কড়ি ও তক্তার সাহায্যে জাহাজ প্রস্তুতকরন, কলা-বিদ্যা হিসাবে স্থাপত্য-শিল্পের প্রবর্তন, দুর্গচূড়া ও ফুকারযুক্ত দুর্গ-প্রাচীর সহ প্রাচীর-ঘেরা শহর, হোমারের মহাকাব্য ও পুরোপুরি পুরাবৃত্ত—গ্রীকগণ এই সমস্ত অমূল্য সম্পদ উত্তরাধিকার হিসাবে বর্বরযুগের আমল থেকে সভ্যতার যুগে আনয়ন করে। হোমার-যুগের গ্রীকগণ যখন কৃষ্টিস্তর (cultural stage) থেকে অগ্রগতির পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুত হয়, জার্মানরা তখন কৃষ্টি-স্তরের ঠিক গোড়াতেই দাঁড়িয়ে। সিজার এবং এমন-কি, তাসিতুস এই জার্মানদের সম্বন্ধে যে-সব বিবরণী লিপিবদ্ধ করেন তার তুলনামূলক বিচার করে আমরা দেখতে পাই, বর্বরযুগের উচ্চ স্তরে ধন-সম্পদ উৎপাদন কী অদ্ভুত প্রগতিই না লাভ করে।
মর্গ্যানকে অনুসরণ করে মানবজাতির অ-সভ্য অবস্থা ও বর্বরযুগ থেকে সভ্যতার প্রারম্ভ পর্যন্ত ক্রমবিকাশের যে সংক্ষিপ্ত বিবরণী দেওয়া গেল, তা নিশ্চয়ই নতুন ও অকাট্য বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধি-সম্পন্ন। আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, উৎপাদন-প্রক্রিয়ার অনুসরণ করে প্রত্যক্ষভাবে এই সব তত্ত্ব স্থিত করা হয়; কাজেই এগুলোকে অস্বীকার করা যায় না। তবুও আমাদের আলোচনার শেষ ভাগে যে আলেখ্য উন্মোচন করা হয়, তার তুলনায় এই বিবরণী নিতান্ত আটপৌরে ও সাদাসিধেই বিবেচিত হবে। তখনই বর্বর অবস্থা থেকে সভ্যতার ক্রমিক পরিবর্তনের ছবিটা সম্পূর্ণরূপে নিখুঁত অবস্থায় দেখা যাবে, আর বর্বর অবস্থা ও সভ্যতার পার্থক্যটাও ঝলমল হয়ে ফুটে উঠবে। আপাতত মর্গ্যানের শ্রেণী-বিন্যাসটা নিম্নলিখিতভাবে সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করা যাক : অ-সভ্য যুগ—এই আদি যুগে মানুষ প্রধানত প্রাকৃতিক অবস্থায় অবস্থিত প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আহরণ করে; আর এই সমস্ত প্রাকৃতিক দ্রব্য আহরণের সহায়ক হাল-হাতিয়ারই মানুষের প্রধান কলা-সম্পদে পরিণত। বর্বর যুগ—এই যুগে মানুষ গৃহ-পালিত জীব-জানোয়ার পালন আর কৃষিকার্য শিক্ষা করে এবং মানবীয় শক্তির সাহায্যে প্রাকৃতিক সম্পদ উৎপাদন বৃদ্ধির প্রক্রিয়াগুলো আয়ত্ত করে। সভ্যতা—এই যুগে মানুষ প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর বৃদ্ধির জন্য আরও বেশি উন্নততর কার্যপ্রণালী প্রয়োগ করতে শিক্ষা করে ও শিল্প ও কলাবিদ্যায় (art) জ্ঞান অর্জন করে।

আক্কাদিয়ান সাম্রাজ্য ছিল প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার আক্কাদ এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কেন্দ্রীভূতএকটি প্রাচীন সেমিটিক সাম্রাজ্য, যা সকল আক্কাদীয় ভাষাভাষী এবং সুমেরীয় ভাষাভাষী সেমিটিক জনগোষ্ঠিকে একটি বহুভাষী সাম্রাজ্যের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ করেছিলো।
সুমের যা শুমের, (মিশরীয় সাঙ্গার, বাইবেলে শিনার নামে পরিচিত, স্থানীয় উচ্চারণ কি-এন-গির) মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণাংশের এক প্রাচীন সভ্যতা। এর অবস্থান ছিল আধুনিক রাষ্ট্র ইরাক এর দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে। সুমের সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল খ্রীস্টপূর্ব ৪ হাজার বছর হতে খ্রীষ্টপূর্ব ৩ হাজার বছরের মধ্যে। ব্যাবিলন সভ্যতার উত্থানের সাথে সাথে সুমেরের পতন ঘটে। সুমের সভ্যতাকে পৃথিবীর প্রথম সংগঠিত সভ্যতা হিসাবে গণ্য করা হয়।
উরারতু ছিলো আর্মেনিয়ান পার্বত্য অঞ্চলে লেক ভ্যানের নিকটবর্তী এলাকায় লৌহ যুগে গড়ে ওঠা একটি সাম্রাজ্য।
ব্যাবিলনিয়া ছিলো দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার একটি রাজ্য, যা আধুনিক ইরাকের অন্তর্গত। সুমের এবং আক্কাদ নামের এলাকা দুইটি ব্যাবিলনিয়ার অংশ ছিলো। খ্রিস্টপূর্ব ২৩ শতকে আক্কাদের রাজা সারগনের সময়কালের একটি কাদামাটির ফলকে প্রথম ব্যাবিলনিয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়।
মেসোপটেমিয়া বর্তমান ইরাকের টাইগ্রিস বা দজলা ও ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদী দুটির মধ্যবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল। অধুনা ইরাক, সিরিয়ার উত্তরাংশ, তুরষ্কের উত্তরাংশ এবং ইরানের খুযেস্তান প্রদেশের অঞ্চল গুলোই প্রাচীন কালে মেসোপটেমিয়ার অন্তর্গত ছিল বলে মনে করা হয় । মেসোপটেমিয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার অন্যতম। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ হতে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের মধ্যে মেসোপটেমিয়ায় অতি উন্নত এক সভ্যতার উম্মেষ ঘটেছিল। সভ্যতার আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল মিশরীয় সভ্যতার থেকে অনেকটাই ভিন্ন ছিল এবং বহিঃশত্রুদের থেকে খুব একটা সুরক্ষিত ছিলনা বলে বারবার এর উপর আক্রমন চলতে থাকে এবং পরবর্তীতে এখান থেকেই ব্রোঞ্জ যুগে আক্কাদীয়, ব্যবিলনীয়, এসিরীয় ও লৌহ যুগে নব্য-এসিরীয় এবং নব্য-ব্যাবিলনীয় সভ্যতা গড়ে উঠে।
খৃষ্টপূর্ব ১৫০ সালের দিকে মেসোপটেমিয়া পার্সিয়ানদের নিয়ন্ত্রনেই ছিল কিন্তু পরে এই ভূখন্ডের আধিপত্ত নিয়ে রোমানদের সাথে যুদ্ধ হয় এবং রোমানরা এই অঞ্চল ২৫০ বছরের বেশি শাষন করতে পারে নি। । দ্বিতীয় শতকের শুরুর দিকে পার্সিয়ানরা এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রন নিয়ে নেয় এবং সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত এই অঞ্চল তাদের শাসনেই থাকে, এরপর মুসলিম শাসনামল শুরু হয় । মুসলিম খিলাফত শাসনে এই অঞ্চল পরবর্তীতে ইরাক নামে পরিচিতি লাভ করে ।
আধুনিক ইরাকের টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীদ্বয়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলে যে সভ্যতার আবির্ভাব ঘটেছিল সেটাই মূলত মেসোমটেমিয়া সভ্যতা নামে পরিচিত। তুরষ্কের আনাতোলিয়া (আর্মেনিয়া)) পর্বতমালা হতে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস দক্ষিণ পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে পারস্য উপসাগরে পরেছে। প্রকৃতপক্ষে পলিসমৃদ্ধ নদীদুটির এই অঞ্চলে এরূপ সভ্যতার বিকাশ ঘটাতে সহযোগিতা করেছিল। মূলত এই উর্বরা অঞ্চলটি (টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস) উত্তরে প্রলম্বিত হয়ে পশ্চিমে বাঁক নিয়ে আবার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে নেমে গিয়ে প্রায় ভূমধ্যসাগরে গিয়ে শেষ হয়। বাঁক বিশিষ্ট এই অঞ্চলটিকে “উর্বরা অর্ধচন্দ্রাকৃতিক” হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। ইতিহাস বিক্ষাত এই অঞ্চলটি উত্তর আর্মেনিয়ার পার্বত্য অঞ্চল, দক্ষিণ ও পশ্চিমে আরব মরুভূম ও পূর্বে জাগরাস পার্বত্য অঞ্চল দ্বারা পরিবেষ্টিত। অবস্থানগত এই বৈশিষ্ট ও আরবদের আদিম যাযাবর সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মেসোপটেমিয়া একটি মিশ্র সভ্যতার ধারা নিয়ে গড়ে উঠেছিল। মেসোপটেমিয়া সভ্যতা ৫০০০ খৃষ্টপূর্বে সূচনা হয়ে পরিপূর্নতা লাভ করে প্রায় খৃষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে। ৩৩৩ খৃষ্টাব্দে এসে বিভিন্ন জনগোষ্ঠির আন্তঃকলহের মধ্য দিয়ে পরষ্পরের ধ্বংস ডেকে আনে এবং ক্ষয়িষ্ণু চরিত্র স্থায়িত্ব লাভ করে।
মেসোপটেমিয়া নামটি গ্রীকদের দেওয়া, এর প্রকৃত অর্থ হল দুটি নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল। এই অঞ্চলটি প্রধানত জলাভূমি ছিল। নলখাগড়ার জঙ্গল আর খেজুর গাছই ছিল এ প্রধান বনস্পতি। কালক্রমে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর পলিমাটি জমে নিম্নভূমি ভরাট হয়ে এক উর্বর অঞ্চলের সৃষ্টি হয়। এই উর্বর এলাকায় প্রায় ৬০০০ খৃষ্টপুর্ব থেকেই বিভিন্ন এলাকার মানুষ এসে সমাবেত হতে থাকে। কালক্রমে এরাই মেসোপটেমিয়া সভ্যতার বীজ বপন করে। নদীবিধৌত এবং প্রাকৃতিক কোন সুরক্ষা ব্যাবস্থা না থাকায় এটি কালক্রমে বহিঃশত্রুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিনত হয় এবং বিভিন্ন আক্রমনে বিপর্যস্ত হয়। এর ফলে এই সভ্যতায় কয়েকটি সম্রাজ্যের উন্মেষ ঘটে। উত্তরাংশের নাম ছিল এশেরীয়া এবং দক্ষিণাংশের নাম ছিল ব্যাবিলনিয়া। ব্যাবিলোনিয়ার উত্তরে আক্কাদ ও দক্ষিণে সুমের নামে দুটি অংশে বিভক্ত ছিল। প্রকৃতপক্ষে এই দুটিজনগোষ্ঠির সৃজনশীলতার ফসলই হল মেসোপটেমিয়া সভ্যতা।
মেসোপটেমিয়ানদের বিশ্বাস ছিল যে পৃথিবী একটি বিশাল ফাঁকবিশিষ্ট স্থানে অবস্থিত একটি গোলাকার চাকতি। তারা আরও বিশ্বাস করত যে আকাশে স্বর্গ এবং মাটির নিচে রয়েছে নরক। জল সম্পর্কে তাদের ধারনা ছিল যে পৃথিবী জল দিয়েই তৈরী এবং এর চারপাশজুড়ে জলই আছে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ানরা বহুইশ্বরবাদে বিশ্বাসি ছিলো ইন্তু সময়ের ধারার সাথে কিছু কিছু গোষ্ঠির ধর্মমত পরিবর্তীত হতে শুরু করে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ানদের মধ্যে বিভিন্ন দেবদেবির মূর্তিপূজার প্রমান পাওয়া যায়।
ধর্ম পালনের দিক দিয়ে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার মানুষেরা অনেক অগ্রগামী ছিলো। প্রতিটি জিগুরাট ও মন্দিরেই বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ যেমন ধনি, দরিদ্র, ব্যাবসায়ী, কামার, মজুর, কৃষক ইত্যাদি শ্রেণীর লোকেদের বসার ব্যাবস্থা ছিল। এসব লোকজন যার যার নিজস্ব জায়গায় গিয়ে নগরদেবতাদের প্রনামভক্তি ও বিভিন্ন জিনিষ উৎসর্গ করত। এতে এই সভ্যতার সার্বজনীন ধর্মব্যাবস্থার পরিচয় পাওয়া যায়।
সময়কাল বিচারে মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীরা অতি উন্নত চিন্তার কৃষিবিদ ছিলো। উদ্বৃত্ত ফসল মন্দিরে জমা দেওয়ার রেওয়াজ ছিলো। কৃষকদের মধ্যে কে কতটা ফসল মন্দিরে জমা দিল এই হিসাব রাখতে পুরোহিতরা পাহারের গায়ে দাগ কেটে মনে রাখার চেষ্টা করত। ক্রমেই হিসাব রাখার গুরুত্বটাই প্রাধান্য পেতে শুরু করে। এক পর্যায়ে মেসোপটেমিয়ানরা গনিত শাস্ত্রের উদ্ভাবন ও উন্নতিসাধন করতে সক্ষম হয়। মেসোপটেমীয়দের সংখ্যাগুলি ষষ্ঠিক বা ষাট কেন্দ্রিক ছিলো। সেখান থেকেই এক ঘন্টায় ষাট মিনিট ও এক মিনিটে ষাট সেকেন্ডের হিসাব আসে। এছাড়া তারাই প্রথম বছরকে ১২ মাসে এবং এক মাসকে ৩০ দিনে ভাগ করে হিসাব করা শুরু করে।
যদিও প্রথমদিকে তাদের ধারনা ছিল পৃথিবীটা চ্যাপ্টা চাকতির মত কিন্তু পরবর্তীতে তাদের মধ্যে গোল পৃথিবীর ধারনা জন্মায় এবং তারাই প্রথম পৃথিবীকে ৩৬০ ডিগ্রিতে ভাগ করার পরিকল্পনা করে। ধারনা করা হয় যে তারাই প্রথম ১২ টি রাশিচক্র এবং জলঘড়ি আবিষ্কার করে।
ধাতুর ব্যাবহারেরে ক্ষেত্রে মেসোপটেমীয়রা বেশ উন্নতী সাধন করেছিল। তারা খৃষ্টপূর্ব ২৫০০ অব্দে তামা ও ব্রোঞ্জের ব্যাবহার শুরু করে। মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন মন্দির এবং জিগুরাট থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন বাসন কোসন পর্যবেক্ষন করলে ধারনা করা যায় যে তারাই তামা ও টিনের সংমিশ্রনে তৈরী একটি চমৎকার ধাতু ব্রোঞ্জের আবিষ্কারক। এছাড়া মেসোপটেমিয়ায় কাচের ব্যাবহার খৃষ্টপূর্বাব্দ ১৬০০ থেকে শুরু হয় বলে ধারনা করা হয়।
মেসোপটেমীয়রা যে বা ভাষায় কথা বলত তাকে সেমিটিক ভাষা হিসেবে ইতিহাসবিদরা চিনহিত করেছেন। তাদের এই ভাষায় দৈনন্দিন ভাবের আদান প্রদান সহ বিজ্ঞানচর্চা, প্রশাষনিক কাজে এবং ধর্মকর্ম পরিচালনা করত। মেসোপোটেমীয়দের প্রধান কৃতিত্ব হল প্রয়োজনীয় ভাব বা বার্তা বোঝানোর জন্য আদিম লেখন পদ্ধতির উদ্ভাবন। প্রথম দিকে এই ভাষা কিছু অর্থোবোধক ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করা হত। চিত্রধর্মী এই পদ্ধতিকে বিজ্ঞানীরা পীকটোগ্রাফি বলে থাকেন। মেসোপটেমীয়রা প্রধানত কাদামাটির উপর নলখাগড়ার সূচালো মাথা দিয়ে লিখে শুকিয়ে নিত কিন্তু পরবর্তীতে তা আরো পরিশীল হয়ে বর্নমালায় রূপ নেয়। আনুমানিক ৩৪০০ খৃষ্টপূর্ব অব্দের এই বর্নমালার মাধ্যমে লিখিত দলিল পাওয়া যায়। সেই সময়ের লেখালেখি শুধুমাত্র হিসাব নিকাশ সংরক্ষনের কাজে ব্যাবহার হত। আধুনিক যে দফতরীয় দলিল দেখতে পাওয়া যায় তা সুমেরীয়দের মধ্যেই প্রথম দেখা যায়।
সাহিত্যের জন্য মেসোপটেমীয়রা যে ভাষা ব্যাবহার করত আকে বিজ্ঞানীরা হেমেটিক ভাষা বলে চিহ্নিত করেছেন। প্রখ্যাত লেখক হোমার তার ইলিয়ড এবং ওডেসি লিখারও প্রায় এক হাজার বছর পূর্বে সুমেরীয়রা তাদের নিজস্ব ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছিল। এর নাম ছিল গিলগামেশ। এই সাহিত্য থেকে যানা যায় যে এখানকার লোকজন অত্যন্ত কল্পনাপ্রবণ ছিলো। ব্যাবিলোনীয় শাষন আমলে তাদের লেখালেখিতে পলৌকিক চিন্তার প্রভাব লক্ষ্যণীয়। বসুত এইগুলো ছিল ধর্মাশ্রয়ী সাহিত্যচিন্তা।
ইউফ্রেটিস নদী বা ফোরাত দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার একটি নদী। এটি তুরস্কতে উৎপত্তি লাভ করে সিরিয়া ও ইরাকের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে টাইগ্রিস নদীর সাথে মিলিত হয়েছে এবং শাত আল আরব নামে পারস্য উপসাগরে পতিত হয়েছে। ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর পানি ব্যবহার করেই প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতাগুলি বিকাশ লাভ করেছিল। গ্রিক নাম মেসোপটেমিয়া এই স্বাক্ষরই বহন করছে; শব্দটির আক্ষরিক অর্থ “দুই নদীর মাঝে”। এখানেই প্রাচীন সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয় এবং আসিরিয় সভ্যতাগুলি বিকাশ লাভ করেছিল।
ইউফ্রেটিস নদী ২,৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এর অববাহিকার আয়তন প্রায় ৪,৪০,০০০ বর্গকিলোমিটার। এর মোট অববাহিকার মাত্র ৩০% তুরস্কতে অবস্থিত হলেও এর পানির ৯০%-এর উৎস তুরস্কের উচ্চভূমি। তুরস্কের কোরাসুয়ু নদী, মুরাত নদী এবং আরও অনেকগুলি নদী পূর্ব মধ্য তুরস্কে এলাজিগ-এর কাছে মিলিত হয়ে ইউফ্রেটিসের ঊর্ধ্ব অংশ গঠন করেছে। তারপর নদীটি আলাব শহরের ১২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সিরিয়াতে প্রবেশ করেছে। পূর্ব সিরিয়াতে এর সাথে দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্ক থেকে আগত খাবুর নদী নামের একটি প্রধান উপনদী মিলিত হয়েছে।
ইউফ্রেটিস নদীর গতিপথ মূলত টাইগ্রিস নদীর সমান্তরাল। নদী দুইটি ইরাকে প্রবেশের পর একে অপর থেকে সর্বোচ্চ ১০০ মাইল দূরত্ব বজায় রেখে পাশাপাশি অগ্রসর হয়েছে। উত্তর ইরাকে ইউফ্রেটিস নদী আল জাজিরাহ নামের অঞ্চলের পশ্চিম সীমান্ত গঠন করেছে। অন্যদিকে তাইগ্রিস নদী এর পূর্ব সীমান্ত গঠন করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব ইরাকে এই দুই নদীর মধ্যবর্তী অববাহিকা এলাকাটিতে প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সভ্যতা অবস্থিত ছিল। তাইগ্রিস থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরত্বে এসে ইউফ্রেটিস দুইটি শাখায় ভাগ হয়ে গেছে। শাখা দুইটি ১৮০ কিলোমিটার পরে আবার একত্রিত হয়েছে। এরপর ইউফ্রেটিস ও তাইগ্রিস কুরনাহ শহরের কাছে মিলিত হয়ে শাত আল আরব নদী গঠন করেছে এবং পারস্য উপসাগরে পতিত হয়েছে।
ইউফ্রেটিস নদী প্রতিবছর ২৮০০ কোটি ঘনমিটার পানি বহন করে। এপ্রিল ও মে মাসে পানি ধারণের পরিমাণ সর্বোচ্চ। ইউফ্রেটিস নদীর উপর অবস্থিত প্রধান শহরগুলি হল সিরিয়ার রাকাহ ও দাইর আজ জর, এবং ইরাকের কারবালা, হিল্লাহ এবং নাজাফ।
ইউফ্রেটিস নদীটি অগভীর বলে ছোট নৌকা ছাড়া অন্য কিছু এখানে চালনা করা সম্ভব নয়। এটি পানি সরবরাহের জন্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নদীটি তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনার একটি বড় উৎস। তিনটি দেশই সেচকাজ ও পানিবিদ্যুতের জন্য নদীটির পানির উপর নির্ভরশীল। তুরস্ক গ্রামীণ আনাতোলিয়ার উন্নয়নের জন্য নদীটির পানির একটি বড় অংশ রেখে দেবার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই দক্ষিণ-পূর্ব আনাতোলিয়া প্রকল্পে ২২টি বাঁধ এবং আনাতোলীয় পর্বতমালা থেকে ইউফ্রেটিসের খাড়া পতনকে কাজে লাগানোর জন্য ১৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। আতাতুর্ক বাঁধ এই প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু এবং এটি বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধগুলির একটি। ১৯৯০ সালে এটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। বাঁধটির পেছনের জলাধারের পৃষ্ঠদেশের ক্ষেত্রফল ৮১৬ বর্গকিলোমিটার। ইউফ্রেটিস নদীকে এক মাস ধরে বাধা দিয়ে এই জলাধারটি বারে বারে ভরে তোলা হয়।
কিন্তু নিম্ন অববাহিকাতে ইউফ্রেটিসের জলধারার এই হ্রাস সিরিয়ার জন্য একটি বড় সমস্যা। সিরিয়া নিজে সেচ ও পানিবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ইউফ্রেটিস নদীর উপর আল সাওরা বাঁধ নির্মাণ করেছে। ১৯৭৩ সালে উত্তর মধ্য সিরিয়াতে বাঁধটি নির্মাণ শেষ হয় এবং এর পেছনের আসাদ জলাধার নামের জলাধারের ক্ষেত্রফল প্রায় ৬৪০ বর্গকিলোমিটার। তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব আনাতোলিয়া প্রকল্পের কারণে বর্তমানে এটি যথেষ্ট পরিমাণে সেচের পানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না।
একইভাবে আরও নিম্ন অববাহিকায় অবস্থিত ইরাক সিরিয়ার বাঁধের নিন্দা করেছে। ১৯৭৫ সালে দুই দেশের মধ্যে অল্পের জন্য যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়। অত্যন্ত শুষ্ক ইরাকের কৃষিকাজ ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। পানির প্রবাহের তারতম্য ইরাকে খরার সৃষ্টি করে। ১৯৮৬ সালে পশ্চিম মধ্য ইরাকের আদিসা-তে পানি ধরে রাখার জন্য একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়, কিন্তু এটি খুব একটা কার্যকর হয়নি। ১৯৫০-এর দশক তাইগ্রিস নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের ফলে থারথার নিম্নভূমির মধ্য দিয়ে তাইগ্রিসের কিছু পানি ইউফ্রেতিস অববাহিকাতে আনা সম্ভব হয়েছে, কিন্তু এটিও পানি সরবরাহ সমস্যার তেমন সমাধান করতে পারেনি। সিরিয়া ও তুরস্ক থেকে বয়ে আনা রাসায়নিক বর্জ্যবিশিষ্ট পানিও ইরাকের জন্য একটি বড় সমস্যা।
টাইগ্রিস নদী বা দজলা দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার একটি নদী। নদীটি তুরস্কে উৎপত্তি লাভ করে ইরাকের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ইউফ্রেটিস নদীর সাথে মিলিত হয়েছে এবং শাত আল আরব নামে পারস্য উপসাগরে পড়েছে।
টাইগ্রিস নদীর দৈর্ঘ্য ১,৯০০ কিলোমিটার এবং এর নদীবিধৌত অববাহিকার আয়তন ১,১০,০০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। নদীটি পূর্ব তুরস্কের পর্বতমালায় উৎপত্তি লাভ করেছে এবং দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত হয়ে কিছু সময়ের জন্য সিরিয়া ও তুরস্কের সবচেয়ে পূর্বের সীমান্ত গঠন করে ইরাকে প্রবেশ করেছে। ইরাকের ভেতর দিয়ে এটি সর্পিলাকারে মোটামুটি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ধীর গতিতে প্রবাহিত হয়েছে এবং এর উপত্যকা সমতল ও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে। দক্ষিণ ইরাকে এটি ইউফ্রেটিস নদীর সাথে মিলিত হয়ে শাত আল আরব নদী গঠন করেছে, যা আরও ১৭০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে পারস্য উপসাগরে পতিত হয়েছে। প্রাচীনকালে ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিসের মধ্যবর্তী অববাহিকাতে বিখ্যাত সব মেসোপটেমীয় সভ্যতা বিকাশ লাভ করেছিল। টাইগ্রিস নদীর তীরে প্রাচীন আসিরীয় সভ্যতার নিনেভেহ শহরের ধ্বংসাবশেষ অবস্থিত। এছাড়া সেলেউসিয়া ও তেসিফোনের অবশেষও আছে এখানে।
টাইগ্রিসের প্রধান প্রধান উপনদী হল বৃহৎ জাব, ক্ষুদ্র জাব, দিয়ালা এবং আল উজায়িম। এগুলি সবই ইরাকের অভ্যন্তরে টাইগ্রিস নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। তবে বৃহৎ জাব নদী তুরস্কে এবং ক্ষুদ্র জাব ও দিয়ালা নদী ইরানে উৎপত্তি লাভ করেছে। টাইগ্রিস নদীর তীরে অবস্থিত প্রধান শহরের মধ্যে আছে তুরস্কের দিয়ারবাকির এবং ইরাকের মোসুল ও বাগদাদ শহর। টাইগ্রিস নদী অত্যন্ত অগভীর বলে এখানে ছোট নৌকা ছাড়া আর কিছু চালানো যায় না। বিশেষত বাগদাদের পর থেকে নদীটি একাধিক অগভীর শাখার বিভক্ত হয়ে গেছে এবং ঘন জলাভূমির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে।
অতীতে উচ্চভূমির শীতকালীন বরফগলা পানি এবং শীতের শেষের বৃষ্টিপাতের ফলে টাইগ্রিস নদীতে প্রায়ই বন্যার সৃষ্টি হত। ১৯৫০ সালে সামারা বাঁধ নির্মাণ করে টাইগ্রিসের অতিরিক্ত পানি মধ্য ইরাকের থারথার অঞ্চলে প্রবাহিত করা হয়। টাইগ্রিসের বয়ে আনা অতিরিক্ত পলিমাটি কমানোরও ব্যবস্থা নেয়া হয়। তবে এর ফলে দক্ষিণ ইরাকে সুপেয় পানির সরবরাহ হ্রাস পায় এবং দক্ষিণ ইরাকে পারস্য উপসাগরের লবণাক্ত পানি টাইগ্রিসের সুপেয় পানির সাথে মিশে যেতে থাকে। ফলে স্থানীয় কৃষির ক্ষতি হয়।
হাখমানেশী সাম্রাজ্য বৃহত্তর ইরানের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অঞ্চলে শাসনকারী প্রথম কয়েকটি পারসিক সাম্রাজ্যের একটি। প্রাচীন পারসিক ম’দাই সাম্রাজ্যের পতনের পর এই সাম্রাজ্যটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরাক্রমের শীর্ষে সাম্রাজ্যটির আয়তন ছিল প্রায় ৭৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটার (যা বর্তমান মহাদেশীয় যুক্তরাষ্ট্রের আয়তনের প্রায় সমান) । শতাংশ হিসেবে মোট বিশ্ব জনসংখ্যার সর্বোচ্চ অংশ এই সাম্রাজ্যে বাস করত। এটি প্রাচীন বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্যগুলির একটি। সাম্রাজ্যটিতে কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা মডেলের একটি সফল বাস্তবায়ন ঘটেছিল ।
পারস্যের রাজা দ্বিতীয় কুরুশ এই সাম্রাজ্যটি গড়ে তোলেন। সাম্রাজ্যটি এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা — এই তিন মহাদেশে বিস্তৃত ছিল। ইরান ছাড়াও বর্তমান কালের আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মধ্য এশিয়ার অংশবিশেষ, এশিয়া মাইনর (তুরস্ক), থ্রাকে (গ্রিস), কৃষ্ণ সাগরের উপকূল, ইরাক, সৌদি আরবের উত্তরাংশ, জর্দান, প্যালেস্টাইন, লেবানন, সিরিয়া, প্রাচীণ মিশরের সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং লিবিয়া এই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে সাম্রাজ্যটির ভূমিকা খলধর্মী। গ্রিক-পারস্য যুদ্ধগুলিতে এটি ছিল গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলির শত্রু। এছাড়া ব্যাবিলন থেকে ইহুদীদের স্বাধীনতা দান, আরামীয় ভাষাকে সাম্রাজ্যের সরকারী ভাষার মর্যাদা দানের ব্যাপারগুলিও পশ্চিমা ইতিহাসে উল্লিখিত। ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহাবীর আলেকজান্ডারের সাথে যুদ্ধে সাম্রাজ্যটির পতন হয়।
পারস্যের দ্বিতীয় কুরুশ বা মহান কুরুশ ছিলেন পারসিক হাখমানেশী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। সাম্রাজ্যটি এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা—এই তিন মহাদেশে বিস্তৃত ছিল। ইরান ছাড়াও বর্তমান কালের আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মধ্য এশিয়ার অংশবিশেষ, এশিয়া মাইনর (তুরস্ক), থ্রাকে (গ্রিস), কৃষ্ণ সাগরের উপকূল, ইরাক, সৌদি আরবের উত্তরাংশ, জর্দান, প্যালেস্টাইন, লেবানন, সিরিয়া, প্রাচীন মিশরের সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং লিবিয়া এই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটি প্রাচীন বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্যগুলির একটি। তার রাজকীয় উপধিগুলো ছিল, মহান রাজা, পারস্যের রাজা, অ্যানসানের রাজা, মিডিয়ার রাজা, ব্যাবিলনের রাজা, সুমেরের রাজা ও আক্কাদ, তিনি ছিলেন পৃথিবীর চর্তুকোণের রাজা। এছাড়াও ৫৩৯ এবং ৫৩০ খ্রিস্টপূর্বের মাঝামাঝি কোন এক সময় সাইরাস সিলিন্ডারের ঘোষণা পত্রের মাধ্যমে বৈশ্বয়ীক মানবাধিকার ঘোষণা করেছিলেন যা বিশ্বের ইতিহাসে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম মানবাধিকারের সনদ।
মাহান কুরুশের শাসণকাল ২৯ থেকে ৩১ বছর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। কুরুশ তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন প্রথম মিডিস সাম্রাজ্য দখলের মাধ্যমে, তারপর লিডিয় সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীতে নিও-ব্যাবিলন সাম্রাজ্য দখল করেছিলেন। ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের ভেতরে তখন সিরিয়া ও প্যালেস্টাইনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। যে কারণে এই দুটি দেশও সাইরাসের কর্তৃত্বাধীন হয়ে পড়ে। এরপর কিছুদিন ক্ষমতা সংহত করার পর তিনি মধ্য এশিয়ার মাসাগেটা নামক এক জাতিকে আক্রমন করেন, তার সাথে ছিলেন স্যার দারেয়া। মাসাগেটাদের সাথে যুদ্ধে দারেয়ার সাথে কুরুশও ডিসেম্বর ৫৩০ খ্রিস্টপূর্বে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র দ্বিতীয় ক্যাম্বিসাস সিংহাসনে বসেন ও পিতার মৃতদেহ উদ্ধার করে পাসাগার্ডাতে সমাধিস্থ করেন। মাহন কুরুশ বেঁচে থাকতে কখনো মিশর আক্রমন করেন নি কিন্তু তার পুত্র ক্যাম্বিসাস মিশর আক্রমন ও দখল করে হাখমানেশী সাম্রাজ্যে যুক্ত করেন। এছাও তিনি নাবিয়া ও সাইরেনাইসা নামক আরো দুটি রাজ্য দখল করতে সমর্থOh2OO হয়েছিলেন।

সসনিয়ন সাম্রাজ্য ইরানে ইসলামের আগমনের পূর্বে সেখানকার সর্বশেষ সাম্রাজ্য। প্রায় ৪০০ বছর ধরে এটি পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের দুইটি প্রধান শক্তির একটি ছিল। প্রথম আর্দাশির পার্থীয় রাজা আর্দাভনকে পরাজিত করে সসনিয়ন রাজবংশের পত্তন করেন। ইসলামের আরব খলিফাদের কাছে শেষ সসনিয়ান রাজা শাহানশাহ ৩য় ইয়াজদেগের্দের পরাজয়ের মাধ্যমে সসনিয়ন সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘটে। সসনিয়ন সাম্রাজ্যের অধীনস্থ এলাকার মধ্যে ছিল বর্তমান ইরান, ইরাক, আর্মেনিয়া, দক্ষিণ ককেসাস, দক্ষিণ-পশ্চিম মধ্য এশিয়া, পশ্চিম আফগানিস্তান, তুরস্কের ও সিরিয়ার অংশবিশেষ, পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ এবং আরব উপদ্বীপের কিছু উপকূলীয় এলাকা। সসনিয়নরা তাদের সাম্রাজ্যকে “এরানশাহ্‌র” অর্থাৎ “ইরানীয় সাম্রাজ্য” বলে ডাকত।
সসনিয়নদের সাংস্কৃতিক প্রভাব সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে চতুর্দিকে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে ইসলামের ইরান বিজয়ের পর সসনিয়নদের সময়ে প্রচলিত সংস্কৃতি, স্থাপত্য, লিখনপদ্ধতি, ইত্যাদি পরে ইসলামী সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও লিখনপদ্ধতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

প্রাচীন মিশর
প্রাচীন মিশর উত্তর আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলের একটি প্রাচীন সভ্যতা। নীল নদের নিম্নভূমি অঞ্চলে এই সভ্যতা গড়ে ওঠে। এই অঞ্চলটি বর্তমানে মিশর রাষ্ট্রের অধিগত। খ্রিষ্টপূর্ব ৩১৫০ অব্দ নাগাদ প্রথম ফারাওয়ের অধীনে উচ্চ ও নিম্ন মিশরের রাজনৈতিক একীকরণের মাধ্যমে এই সভ্যতা এক সুসংহত রূপ লাভ করে। এরপর তিন সহস্রাব্দ কাল ধরে চলে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার বিকাশপর্ব। প্রাচীন মিশরের ইতিহাস একাধিক স্থায়ী রাজ্য-এর ইতিহাসের একটি সুশৃঙ্খলিত ধারা। মধ্যে মধ্যে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর্ব দেখা দিয়েছিল। এই পর্বগুলি অন্তর্বর্তী পর্ব নামে পরিচিত। নতুন রাজ্যের সময়কাল এই সভ্যতার চূড়ান্ত বিকাশপর্ব। এর পরই ধীরে ধীরে মিশরীয় সভ্যতার পতন আরম্ভ হয়। প্রাচীন মিশরের ইতিহাসের শেষ পবে একাধিক বৈদেশিক শক্তি মিশর অধিকার করে নেয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৩১ অব্দে আদি রোমান সাম্রাজ্য মিশর অধিকার করে এই দেশকে একটি রোমান প্রদেশে পরিণত করলে ফারাওদের শাসন আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়।
প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার সাফল্যের আংশিক উৎস নিহিত রয়েছে নীল নদ উপত্যকার পরিস্থিতির সঙ্গে এই সভ্যতার মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার মধ্যে। সুপরিচিত বন্যা ও উর্বর উপত্যকার নিয়ন্ত্রিত সেচব্যবস্থার ফলস্রুতি ছিল উদ্বৃত্ত ফসল। যা থেকে এই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। এই সম্পদের সাহায্যেই প্রশাসনের সহায়তায় উপত্যকা ও পার্শ্ববর্তী মরু অঞ্চলে খনিজ পদার্থের উত্তোলন শুরু হয়, একটি স্বাধীন লিখন পদ্ধতির আদি বিকাশ সম্ভব হয়, স্থাপনা ও কৃষিজ পণ্যের সুসংহত ব্যবহার শুরু হয়, পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং সামরিক বাহিনী বহিঃশত্রুদের পরাজিত করে মিশরীয় প্রাধান্য স্থাপন করে। এই সকল কার্যে প্রেরণা জোগানো ও একে সুসংহতরূপে সাধন করা ছিল উচ্চবিত্ত লিপিকার, ধর্মনেতা ও ফারাওদের অধীনস্থ প্রশাসকবৃন্দের আমলাতন্ত্রের নিদর্শন। এঁরা সমগ্র মিশরের জনগণকে একটি বহুব্যাপী ধর্মবিশ্বাসের বন্ধনে আবদ্ধ করে তাদের সহযোগিতা ও একতাকে সুনিশ্চিত করেছিলেন।
প্রাচীন মিশরীয়দের নানান কৃতিত্বগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য খনি থেকে অট্টালিকাদি নির্মাণের জন্য পাথর খনন, সমীক্ষণ ও নির্মাণ কৌশলের দক্ষতা। এরই ফলস্রুতি ঐতিহাসিক মিশরীয় পিরামিডসমূহ, মন্দির, ওবেলিস্কসমূহ, মিশরীয় গণিত ব্যবস্থা, একটি ব্যবহারিক ও কার্যকরী চিকিৎসা ব্যবস্থা, সেচব্যবস্থা ও কৃষি উৎপাদন কৌশল, প্রথম জাহাজ নির্মাণ, মিশরীয় চীনামাটি ও কাঁচশিল্পবিদ্যা, একটি নতুন ধারার সাহিত্য এবং বিশ্বের ইতিহাসের প্রাচীনতম শান্তিচুক্তি ( হিট্টাইটদের সাথে)। প্রাচীন মিশর এক দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকারকে পিছনে ফেলে যায়। প্রাচীন মিশরের শিল্পকলা ও সাহিত্যের ব্যাপক অনুকৃতি লক্ষিত হয়। বিশ্বের দূরতম প্রান্তে বয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এর পুরাকীর্তিগুলি। শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রাচীন মিশরের পুরাকীর্তিগুলির ধ্বংসাবশেষ পর্যটক ও লেখকদের কল্পনাশক্তিকে অনুপ্রাণিত করেছে। আধুনিক যুগের প্রথম ভাগে পুরাকীর্তি ও খননকার্যের প্রতি নতুন করে মানুষের আগ্রহ জেগে উঠলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মিশরের সভ্যতা সম্পর্কে অনুসন্ধান শুরু হয়। এর ফলে মিশরীয় সভ্যতার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারগুলি মিশর ও বিশ্ববাসীর সম্মুখে নতুন রূপে উপস্থাপিত হয়।
সুপ্রাচীনকাল থেকেই নীল নদ মিশরের জীবনযাত্রায় মূল ভূমিকা পালন করছে। নীল নদের উর্বর প্লাবন সমভূমি এই অঞ্চলের অধিবাসীদের স্থায়ী কৃষি অর্থনীতি ও একটি জটিল ও কেন্দ্রীভূত সমাজ গঠনে সাহায্য করে যা মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি মাইলফলক রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। আধুনিক শিকারি-সংগ্রাহক মানুষেরা মধ্য প্লেইস্টোসিন যুগের শেষ ভাগে অর্থাৎ বারো লক্ষ বছর আগে এই অঞ্চলে বসবাস শুরু করেছিল। পরবর্তী প্যালিওলিথিক যুগ থেকেই উত্তর আফ্রিকার শুষ্ক জলবায়ু আরও উষ্ণ ও শুষ্ক হতে শুরু করে। এর ফলে এই অঞ্চলের মানুষেরা নীল নদ উপত্যকায় ঘন জনবসতি গড়ে তুলতে বাধ্য হয়।
রাজবংশ-পূর্ব মিশর
প্রাকসম্রাজ্য এবং আদি সম্রাজ্যের কালে মিশরের জলবায়ু বর্তমানের চেয়ে কম শুষ্ক ছিল। মিশরের বড় অংশ ছিল সাভানা এবং এসকল এলাকায় ক্ষুরযুক্ত পশুপালের বিচরণ ছিল। উদ্ভিদ এবং প্রাণীতে নীল অঞ্চল সমৃদ্ধ ছিল এবং বিপুল পরিমাণ জলজ পাখিও এখানে পাওয়া যেত। এই পরিবেশ শিকারী জীবনযাপন ছিল সাধারণ এবং অনেক প্রাণী এই সময়ে পোষ মানানো হয়।
৫৫০০ খ্রিষ্টপূর্বব্দের মধ্যেই নীলনদ উপত্যকার ছোট ছোট গোত্র বিকশিত হয়ে উন্নত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। তাদের মাঝে পশুপালন এবং কৃষিকাজে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রন লক্ষ্য করা যায়। তাদের মৃতশিল্প এবং বিভিন্ন ব্যক্তিগত জিনিস যেমন চিরুনি,ব্রেসলেট এবং বিড ছিল তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই সকল আদি সংস্কৃতির মাঝে উচ্চ মিশরে সবচেয়ে বড় ছিল বাদারি। তাদের উৎপত্তি সম্ভবত লিবিয় মরুভূমিতে। উন্নত সিরামিক সামগ্রী, পাথরের হাতিয়ার এবং তামার ব্যবহারের জন্য তারা সবচেয়ে বেশি জ্ঞাত।
বাদারিদের পরে আসে আমরতিয় (নাকাদা ১) এবং গেরজেহ (নাকাদা ২) যারা আরো কিছু প্রাযুক্তিক উন্নতি সাধন করে। নাকাদা ১ এর সময় থেকেই মিশরীয়রা ইথিওপিয়া থেকে অবসিডিয়ান আমদানি করে তা দিয়ে ব্লেড বানাতে শুরু করে । নাকাদা ২ সময়ে নিকটপ্রাচ্যের সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়। মাত্র এক হাজার বছর সময়েই নাকাদা সংস্কৃতি ছোট ছোট কিছু কৃষি সম্প্রদায় থেকে এক শক্তিশালী সভ্যতায় পরিণত হয় যে এর নেতারা নীল অঞ্চলের সম্পদ এবং মানুষদের পূর্ণ কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সমর্থ হয়। নাকাদা ৩ এর নেতারা প্রথম নেখেন বা হায়ারকানপলিসে এবং পরবর্তীতে আবিদোসে শক্তিশালী কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে তাদের প্রভাব নীলনদ বরাবর উত্তর মিশরে বিস্তৃত করে। তারা দক্ষিণে নুবিয়া, পশ্চিমে লিবিয় মরুভূমির মরূদ্যানগুলি এবং পূর্বে পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও নিকটপ্রাচ্যের সাথে বাণিজ্য করত। রাজকীয় নুবিয় সমাধির বিভিন্ন হস্তশিল্পে মিশরিয় রাজতন্ত্রের বিভিন্ন চিহ্ণ যেমন সাদা মুকুট এবং শকুন এর সবচেয়ে প্রাচীণ নিদর্শন পাওয়া যায়।
নাকাদা সংস্কৃতি বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত ব্যবহার সমগ্রী তৈরি করত যেমন চিরুনি, ছোট ভাস্কর্য, ছবি অঙ্কিত মৃৎপাত্র, উচ্চ মানের নকশাকৃত পাথরের পাত্র, স্বর্ণ, ল্যাপিস, আইভোরির অলংকার। তারা একধরনের সিরামিক গ্লেজ তৈরি করে যা ফাইয়েন্স নামে পরিচিত যা পাত্র, ছোট মূর্তি, এমুলেট অলংকৃত করতে এমনকি রোমান যুগেও ব্যবহৃত হত। নাকাদা সংস্কৃতির শেষের দিকে চিহ্ণলিপি ব্যবহার শুরু করে যা অবশেষে প্রাচীন মিশরিয় ভাষার লিখনপদ্ধতি হায়ারোগ্লিফের জন্ম দেয়।
আদি রাজবংশীয় যুগ (৩০৫০ – ২৬৮৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)
প্রাচীন সুমেরিয়-আক্কাদিয় এবং প্রাচীন এলামিয় সভ্যতার প্রায় সমসাময়িক ছিল এইযুগ। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মিশরীয় পুরোহিত মানেথো তার সময় পর্যন্ত মিশরের ফারাওদের ত্রিশটি রাজবংশে ভাগ করেন যা এখনো স্বীকৃত। তিনি তার ইতিহাস সূচনা করেন মেনি নামের একজন রাজাকে দিয়ে যার ব্যাপারে বিশ্বাস করা হত যে তিনি উচ্চ এবং নিম্ন মিশরকে প্রায় ৩১০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে একত্রিত করেন। তবে মেনির ব্যাপারে সমসাময়িক কোন রেকর্ড পাওয়া যায় না। অনেক পন্ডিত মেনিকে প্রকৃতপক্ষে ফারাও নারমার মনে করেন।
আদি রাজবংশীয় যুগে প্রথম ফারাওরা মেমফিসে রাজধানী স্থাপন করে নিম্ন মিশরের উপর তাদের নিয়ন্ত্রন বিস্তার করেন। এর ফলে তাদের পক্ষে উর্বর নীল বদ্বীপের শ্রমশক্তি এবং কৃষিশক্তির এবং একই সাথে লেভান্টের বাণিজ্যপথগুলির উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। তাদের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা ও ধনসম্পদের পরিচয় পাওয়া যায় তাদের বিশদ মাসতাবা সমাধি এবং আবিদোসের সমাধিমন্দিরগুলিতে যেখানে ফারাওদের মৃত্যুর পর তাদের অর্চনা করা হত। এইসকল ফারাওদের তৈরী রাজতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান যা ভূমি, শ্রম এবং সম্পদের উপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার টিকে থাকা এবং বিকাশে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।
প্রাচীন রাজবংশ (২৬৮৬-২১৮১ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ )
সুপ্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে এই যুগে কৃষি উৎপাদন আগের চেয়ে বৃদ্ধি পায়। এর ফলশ্রুতিতে কলা, স্থাপত্য এবং প্রযুক্তিতে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। প্রাচীন মিশরের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তিগুলোর মাঝে গিজা পিরামিড ও স্ফিংসের মূর্তি এই সময়ে নির্মান হয়। উজিরের নির্দেশনায় রাষ্ট্রের কর্মকর্তারা কর আদায় করতেন, ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সেচকাজ সমন্বিত করতেন, বিভিন্ন নির্মান প্রকল্পে কৃষকদের নিযুক্ত করতেন এবং একটি বিচার ব্যবস্থা পরিচালনা করতেন।
কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রনের বিকাশের সাথে একটি শিক্ষিত লিপিকার ও কর্মকর্তা শ্রেণীর উদ্ভব হয়। এই শ্রেণীর লোকদের তাদের কাজের বিনিময়ে ফারাওয়ের পক্ষ হতে জমিদারি দেওয়া হত। ফারাওরা তাদের মৃত্যুর পর তাদের সমাধি অর্চনা করার জন্যও ভূমিদান করত। এমনকি স্থানীয় মন্দিরেও তারা ভূমিদান করত। বিশ্বাস করা হয় যে পাঁচ শতক ধরে চলা এই রীতির প্রভাবে ক্রমান্বয়ে ফারাওদের অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে যায় এবং একটি বড় কেন্দ্রীয় প্রশাসন চালাবার ক্ষমতা তাদের লোপ পায়। ফারাওদের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে স্থানিয় প্রশাসকেরা ফারাওয়ের প্রাধান্য অস্বীকার করতে থাকে। এর সাথে খ্রীষ্টপূর্ব ২২০০ থেকে ২১৫০ সাল পর্যন্ত তীব্র খরার, কারণে মিশরের প্রাচীন রাজবংশের অবসান হয় এবং মিশর ১৪০ বছরের দুর্ভিক্ষ এবং যুদ্ধবিগ্রহে পতিত হয় যাকে বলা হয় প্রথম অন্তর্বর্তী যুগ।
প্রথম অন্তর্বর্তী যুগ (২১৮১-১৯৯১ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ )
মিশরের কেন্দ্রীয় সরকারের পতনের পর প্রশাসনের পক্ষে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রাদেশিক গভর্নরেরা দুর্যোগের সময় ফারাওয়ের সাহায্য পেতে ব্যর্থ হয়। একই সাথে খাদ্যাভাব এবং রাজনৈতিক সংঘাত দুর্ভিক্ষ এবং ছোটখাট গৃহযুদ্ধের দিকে দেশকে ঠেলে দেয়। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যার পরেও স্থানীয় নেতারা ফারাওয়ের থেকে অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করার কারণে প্রদেশগুলোতে এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির সূচনা করে। নিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রন নিজের হাতে ফিরে পাবার পর প্রদেশগুলি অর্থনৈতিকভাবেও ধনী হয় যার প্রমাণ সমাজের সব শ্রেণীর মাঝে বড় এবং উন্নত সমাধিস্থানের মাঝে। এই সময়ে সৃজনশীলতার ব্যাপক প্রসার ঘটে। ইতিপূর্বে যেসকল সাংস্কৃতিক মোটিফ রাজকীয়তায় সীমাবদ্ধ ছিল প্রদেশের কারিগররা এ সময় তাকে গ্রহণ করেন এবং নিজেদের মত পরিবর্তন সাধন করেন। লিপিকারগণ নতুন ধরনের সাহিত্যশৈলীর বিকাশ ঘটান যার মধ্যে এই যুগের আশাবাদ এবং মৌলিকতা ফুটে উঠে।
ফারাওয়ের আনুগত্য থেকে মুক্ত হয়ে স্থানীয় শাসকেরা রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং ভূমির নিয়ন্ত্রন নিয়ে পরস্পরের সাথে দ্বন্দে লিপ্ত হয়। খ্রীষ্টপূর্ব ২১৬০ অব্দের মধ্যেই হেরক্লেওপোলিসের শাসকের উত্তরে নিম্ন মিশর এবং তাদের প্রতিপক্ষ থেবেসের ইন্তেফ পরিবার দক্ষিণে উচ্চ মিশর নিয়ন্ত্রন করতে থাকে। ক্রমান্বয়ে ইন্তেফ পরিবার শক্তিশালী হতে থাকে উত্তরে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এতে দুই পক্ষের মাঝে সংঘাত অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। ২০৫৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে মেন্তুহোতেপ ২ এর নেতৃত্বে ইন্তেফ বাহিনী হেরক্লেওপোলিসের বাহিনীকে পরাজিত করে। এভাবে মেন্তুহোতেপ মিশরের দুই ভূমিকে একত্রিত করেন এবং এক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রেনেঁসার সূচনা করেন।
মধ্যকালীন রাজ্য(২১৩৪-১৬৯০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ)
মধ্যকালীন রাজ্যের ফারাওগণ দেশের সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন, ফলে সাহিত্য, কলা এবং বৃহৎ নির্মান প্রকল্পের পুনর্সূচনা হয়। মেন্তুহোতেপ ২ এবং তাঁর এগারতম রাজবংশের ফারাওদের রাজধানী ছিল থেবেস। পরবর্তীতে দ্বাদশ রাজবংশের সূচনায় আমেনেমহাত রাজধানী সরিয়ে ইশতাওয়িতে সরিয়ে নিয়ে আসেন। এখান থেকে ফারাওগণ দূরদর্শী ভূমি উদ্ধার এবং সেচকাজ শুরু করেন যার ফলে এই অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। উপরন্তু নুবিয়া অঞ্চলের স্বর্ণ এবং প্রস্তর খনি সমৃদ্ধ এলাকাও দখল করা হয়। একইসাথে পূর্ব বদ্বীপে “শাসকের-দেওয়াল” নামে প্রতিরক্ষামূলক দেওয়াল গড়া হয়।
অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সুরক্ষা, কৃষি ও খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য, কলা এবং ধর্মের ব্যপক উন্নতি সাধন করে। প্রাচীন রাজ্যের কালে দেবতাদের ব্যাপারে যে অভিজাত মনোভাব ছিল তার স্থলে ব্যক্তিগত ভক্তির প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। এযুগের বিশ্বাসে সকলের আত্মা রয়েছে এবং মৃত্যুর পর তারা সবাই দেবতাদের সাথে যোগ দিতে পারে। এযুগের সাহিত্যে উঠে আসে জটিল থিম, লিখনশৈলীতে দেখা যায় আত্মবিশ্বাসী অলংকারপূর্ণ শৈলী। এযুগের ভাস্কর্যে সূক্ষ ব্যাপারগুলি এমনভাবে ফুটে উঠেছে যা এর কৌশলগত পরিপূর্ণতাকে প্রকাশ করে।
এযুগের শেষ বড় ফারাও আমেনেমহাত ৩ খনিজ উত্তোলন এবং নির্মানকাজের শ্রমশক্তির যোগান দিতে নিকটপ্রাচ্যের সেমেটিকভাষী কানানীয়দের নীল বদ্বীপে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেন। এসকল উচ্চাভিলাষী নির্মানকাজ ও খনিজ উত্তোলন এবং নীলনদের বন্যায় অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মধ্যম রাজ্যের পতনের সূচনা হয়। এই পতনের সময় কানানীয় বসতি স্থাপনকারীরা বদ্বীপের নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিতে থাকে এবং অবশেষে হিসকোস রূপে মিশরের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।
দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী যুগ (১৬৭৪-১৫৪৯ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ] ১৭৮৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের দিকে হিসকোস নামের এক সেমিটিক কানানীয় সম্প্রদায় ফারাওয়ের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মিশরের ক্ষমতা নিয়ে নেয় এবং মিশরের কেন্দ্রীয় সরকারকে থেবেসে সরে যেতে বাধ্য করে। থেবেসে ফারাও এদের করদ রাজায় পরিণত হন। তবে হিসকোসরা মিশরীয় সরকার পদ্ধতি বহাল রাখে এবং নিজেদের ফারাও বলে পরিচয় দেয় এবং মিশরীয় সমাজ-সংস্কৃতির একীভূত হয়। তারা মিশরে কয়েকটি নতুন যুদ্ধাস্ত্র যেমন ঘোড়ায় টানা রথ, কম্পোজিট ধনুক প্রচলন করে।
থেবেসে সরে যাওয়ার পর থেবেসের ফারাওরা উত্তরে হিসকোস এবং দক্ষিণে হিসকোসদের নুবীয় মিত্র কুশীয় মাঝে আটকা পড়ে যায়। দীর্ঘদিন হিসকোসদের অধীন থাকার পর থেবেসীয়রা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয় এবং অবশেষে হিসকোসদের বিরুদ্ধে সংঘাতে অবতীর্ণ হয়। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাত ১৫৫৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে শেষ হয়। ফারাও সেকেনেনরে তাও এবং কামোস দক্ষিনের নুবীয়দের পরাজিত করেন। কামোসের উত্তরাধিকারী আহমোস ১ উত্তরের হিসকোসদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন যার ফলশ্রুতিতে হিসকোসরা মিশর থেকে সম্পূর্ণ বিতারিত হয়। আহমোস ১ একটি নতুন রাজবংশের পত্তন করেন। এর মাধ্যমে মিশরে নতুন রাজ্যের কাল শুরু হয়। মিশরের সীমানা বিস্তৃত করা এবং নিকট প্রাচ্যের উপর কর্তৃত্ব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা নতুন রাজ্যের ফারাওদের কাছে সামরিক শক্তি বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকারে পরিণত করে।
নতুন রাজ্য (১৫৪৯-১০৬৯ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ)
নতুন রাজ্যের ফারাওগণ সীমন্ত সংরক্ষণ এবং প্রতিবেশী আসিরিয়া কানান এবং মিতানির সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে এক নজিরবিহীন সমৃদ্ধির যুগ প্রতিষ্ঠা করেন। থোথমোস ১ এবং তার নাতি থোথমোস ৩ মিশরের সম্রাজ্যকে পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বিস্তৃত করেন। তাদের দুজনের মধ্যবর্তী সময়ে রাজত্ব করেন থোথমোস ১ এর কন্যা হাতশেপসুত। হাতশেপসুতের রাজত্বকাল ছিল শান্তিপূর্ণ এবং তিনি অনেকগুলো পুরোনো বাণিজ্যপথ চালু করেন যেগুলো হিসকোসদের সময় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। একইসাথে তার সময়ে অনেক নতুন অঞ্চলেও বাণিজ্যপথ গড়ে উঠে। ১৪২৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে যখন থোথমোস ৩ এর মৃত্যু হয় তখন মিশরীয় সম্রাজ্য উত্তর পশ্চিম সিরিয়ার নিয়া থেকে নুবিয়ায় নীলনদের চতুর্থ জলপ্রপাত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর ফলে ব্রোঞ্জ এবং কাঠের মত গুরুত্বপূর্ণ মালামাল মিশরে আমদনির পথ উন্মুক্ত হয়।
নতুন রাজ্যের রাজার মিশরীয় দেবতা আমুনকে নিবেদন করে বিশাল বিশাল মন্দির নির্মান শুরু করেন। একই সাথে তাদের নিজের কীর্তির প্রচারের জন্য সৌধও নির্মান শুরু করেন। ফারাওদের মাঝে হাতশেপসুত ছিলেন অত্যন্ত সফল। তার সময়ে পুন্টের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তিনি দার-আল-বাহরিতে তার সমাধিমন্দির নির্মান করেন যা হাজার বছর পরের গ্রীক স্থাপত্যকেও হার মানায়। তবে তার পরে তার সৎপুত্র থোথমোস ৩ ক্ষমতায় আসার পর তার কীর্তিগুলি মুছে ফেলতে সচেষ্ট হন। তিনি এবং তার পুত্র আমেনহোতেপ ২ হাতশেসুতের বিভিন্ন কীর্তিকে নিজের বলে চালিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। এমনকি তারা শত বছরের অনেক প্রচলিত প্রথাও বন্ধ করার চেষ্টা করেন। অনেকে বলে থাকেন এটি ছিল মিশরে নারীদের ফারাও হওয়া থেকে বাধা দেওয়ার এবং তাদের ক্ষমতা হ্রাসের ব্যর্থ চেষ্টা। ১৩৫০ খ্রীস্টপূর্বাব্দের দিকে আমেনহোতেপ ৪ ক্ষমতায় আসেন এবং কতগুলো অভূতপূর্ব এবং বৈপ্লবিক সংস্কার সাধনের করেন। তিনি নতুন নাম ধারণ করেন আখেনাতেন এবং পূর্ব প্রায় অজ্ঞাত সূর্য দেবতা আতেনকে সর্বোচ্চ দেবতায় পরিণত করেন। তিনি থেবেসের আমুন পূজারীদের যাদের তিনি দুর্নীতিবাজ মনে করতেন ক্ষমতা খর্ব করেন। আখেনাতেন তার রাজধানী সরিয়ে নতুন শহর আখেনাতেনে (বর্তমান আমারনা) নিয়ে যান। তিনি তার এই নতুন ধর্ম নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিলেন যে নিকটপ্রাচ্যের রাজনীতির ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পরেন। তার মৃত্যুর পর আমুন পুরোহিতরা পুনরায় তাদের ক্ষমতা ফিরে পায়, রাজধানী থেবেসে ফিরে আসে এবং পরবর্তী ফারাওরা তার ধর্মীয় সংস্কারকে স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে সচেষ্ট হয়। ১২৭৯ খ্রীস্টপূর্বাব্দের দিকে রামেসেস ২ যাকে মহান রামেসেসও বলা হয়, ক্ষমতায় আরোহন করেন, তিনি নতুন নতুন মন্দির, ভাস্কর্য, অবেলিস্ক নির্মান করেন এবং মিশরের অন্য যেকোন ফারাওয়ের থেকে তার ঔরসে বেশি সন্তান জন্ম হয়।. তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী সামরিক নেতা। তিনি হিট্টাইটদের বিরুদ্ধে কাদেশে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেন। এ যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত এক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয় এবং রামেসেস ১২৫৮ খ্রীস্টপূর্বাব্দে শান্তিচুক্তি করেন।এই শান্তিচুক্তি ইতিহাসে জ্ঞাত প্রথম শান্তিচুক্তি। হিট্টাইটদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করতে না পেরে মিশরীয়রা নিকট প্রাচ্য থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। তবে মিশরের ধনসম্পদের প্রাচুর্য তাকে বিভিন্ন শক্তির আক্রমনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। এর মধ্যে ছিল পশ্চিমে লিবিয় বারবার এবং উত্তরে ঈজিয়ান অঞ্চলের গ্রীক, ফিনিসীয়, লুবিয়দের নিয়ে গঠিত এক শক্তিশালী সামুদ্রিক দস্যু বাহিনী। প্রাথমিকভাবে মিশরীয় সেনাবাহিনী এসকল আক্রমন প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও ক্রমে মিশর কানানের উপর নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলে। বহিঃশত্রুর আক্রমনের সাথে সাথে অভ্যন্তরীন সমস্যা যেমন্ দুর্নীতি, গনবিক্ষোভ, সমাধি লুট মিশরের সমস্যাকে আরো গভীর করে। আমুনের পুরোহিতগণ বিশাল সম্পদ এবং ভূসম্পত্তির মালিক হয়। তাদের অত্যাধিক ক্ষমতা মিশরকে খন্ডবিখন্ড করে ফেলে এবং মিশর তৃতীয় মাধ্যমিক কালে প্রবেশ করে।
তৃতীয় অন্তর্বর্তী যুগ (১০৬৯-৬৫৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ)
১০৭৮ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে রামেসেস ১১ এর মৃত্যুর পর তানিস নগরের শাসনকর্তা স্মেন্দেস উত্তর মিশরের উপর কর্তৃত্ব বিস্তার করেন। মিশরের দক্ষিণাংশের নিয়ন্ত্রন ছিল থেবেসের দেবতা আমুনের পুরোহিতদের হাতে, তারা স্মেন্দেসকে নামেমাত্র স্বীকার করতেন। এই সময় লিবিয়ার বারবার গোত্রের লোকেরা পশ্চিম বদ্বীপ এলাকায় বসতি স্থাপন করে এবং তাদের নেতারা ক্রমান্বয়ে স্বাধীন হতে থাকে। এদের মধ্যে শশেনক ১ ৯৪৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে বদ্বীপের নিয়ন্ত্রন গ্রহণ করেন। এভাবে ২০০ বছর ব্যাপী শাসন করা বারবার বা বুবাসতীয় রাজবংশের সূচনা হয়। শশেনক দক্ষিণ মিশরের উপর কর্তৃত্ব বিস্তার করেন গুরত্বপূর্ণ পুরোহিত পদে তার পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে।
খ্রীষ্টপূর্ব নয় শতকের মাঝামাঝি সময়ে মিশর পশ্চিম এশিয়ায় তার কর্তৃত্ব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করে। ৮৫৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে ফারাও ওসোরকোন ২ ইসরায়েল, হামাথ, ফিনিসিয়া/কানান, আরব, আরামীয় এবং নব্যহিট্টাইট সহ বিভিন্ন জাতির এক জোট নিয়ে আসিরিয় রাজা শালমানেসেরের বিরুদ্ধে কারকারে যুদ্ধে লিপ্ত হন। তবে এই জোট যুদ্ধে পরাজিত হয় এবং পশ্চিম এশিয়ায় আসিরিয় কর্তৃত্ব বজায় থাকে।
লিবিয় বারবারদের এই রাজবংশের প্রভাব হ্রাস পায় যখন তারেমুতে প্রতিদ্বন্দী রাজবংশের উত্থান ঘটে। একই সাথে দক্ষিণে কুশের নুবিয়দের প্রভাব বাড়তে থাকে।
৭২৭ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে কুশীয় রাজা পিয়ে তার নুবিয়ার রাজ্ধানী নাপাতা থেকে এসে মিশর আক্রমন করেন এবং সহজেই থেবেস এবং অবশেষে নীল বদ্বীপ দখল করেন। পিয়ে পঁচিশতম রাজবংশের ফারাওদের জন্য উত্তর ও দক্ষিণ মিশরকে একত্রিত করার কাজের ভিত্তি স্থাপন করেন। নীল উপত্যকায় তাদের সম্রাজ্য নতুন রাজ্যের সময়ের বিস্তৃতিতে পৌছায়।পঁচিশতম রাজবংশের সময় মিশরে এক রেনেঁসার সূচনা হয়। ধর্ম, শিল্প এবং স্থাপত্যের ক্ষেত্রে পূর্ব যুগের গৌরব ফিরে আসে।. ফারাওদের মাঝে তাহারকা নীল উপত্যকার মেমফিস, কারনাক, কাওয়া, জেবেলে বারকাল প্রভৃতি এলাকায় মন্দির সংস্কার এবং নির্মান করেন। মধ্যম রাজ্যের পরে এই প্রথম নীল উপত্যকায় বৃহৎ মত্রায় পিরামিড নির্মান শুরু হয়।
পিয়ে আসিরিয়া প্রভাবিত নিকট প্রাচ্যে মিশরের প্রভাব বিস্তারে ব্যর্থ চেষ্ট করেন। ৭২০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে তিনি ফিলিস্তিয়া এবং গাজায় আসিরিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সাহয্যে সৈন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু সার্গন ২ এর হাতে পিয়ে পরাজিত হন এবং এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। ৭১১ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে আশদোদের ইসরায়েলীয়দের বিদ্রোহে পিয়ে সাহয্য করেন কিন্তু সারগন ২ এর কাছে আবার পরাজিত হন। এরপর নিকট প্রাচ্য থেকে পিয়ে সরে যেতে বাধ্য হন।
খ্রীষ্টপূর্ব দশম শতক থেকে আসিরিয়া দক্ষিণ লেভান্টের নিয়ন্ত্রন নেওয়ার জন্য যুদ্ধ শুরু করে। সেসময় দক্ষিণ লেভান্টের শহর এবং রাজ্যগুলি আসিরিয়ার শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায়ই মিশরের কাছে সাহায্য চেত। পিয়ের উত্তরসুরী তাহারকা প্রাথমিকভাবে নিকট প্রাচ্যে সাফল্য লাভ করেন। যখন আসিরিয় রাজা সেন্নাকেরিব জেরুসালেম অবরোধ করেন তখন তাহারকা জুদীয় রাজা হেজেকিয়াহকে সাহায্য করেন। আসিরিয় বাহিনী অবশেষে তাদের অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। বাইবেলে এর উল্লেখ রয়েছে।এর কারন সম্পর্কে পন্ডিতগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেন। হেনরি অবিনের মতে মিশরীয় বাহিনীই আসিরিয়দের থেকে জেরুসালেমেকে রক্ষা করে এবং সেন্নাকেরিবের জীবদ্দশায় জেরুসালেম পুনরাক্রমন থেকে বিরত রাখে। কেউ কেউ বলেন এর মূল কারণ ছিল রোগব্যাধি।তবে সেন্নাকেরিবের বিবরণীতে দাবি করা হয় যে জুদাহ এর পর তাদের করদ রাজ্যে পরিণত হয়।
সেন্নকেরিবের উত্তরসুরী এশারহাদ্দন মিশর অভিযান করেন।৬৭৪ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে তাহারকা এশারহাদ্দনকে পরাজিত করেন। কিন্তু ৬৭১ খ্রীষ্টপূরর্বাব্দে এশারহাদ্দন মিশরের কুশীয় ফারাওদের নুবিয়ায় বিতারিত করে তার অনুগত মিশরীয়দের ক্ষমতায় বসায়। কিন্তু দুই বছর পর তাহারকা আক্রমন করে মেমফিস পর্যন্ত দখল করে নেন। এশারহাদ্দন তাহারকাকে দমন করার জন্য আসতে চেয়েছিলেন কিন্তু তিনি অসুস্থ হয়ে পরেন এবং তার রাজধানী নিনেভে মারা যান। তার উত্তরসুরী আশুরবানিপাল তাহারকাকে দমন করার জন্য একটি ছোট কিন্তু উচ্চ প্রশিক্ষিত বাহিনী প্রেরণ করেন। এই বাহিনী তাহারকাকে মেমফিসে পরাজিত করে এবং নুবিয়ায় বিতারিত করে। তাহারকা দুই বছর পর নুবিয়ায় মারা যান।
তার উত্তরসুরী তানুতামুন মিশর পুনর্দখলের ব্যর্থ চেষ্টা করেন। তিনি আশুরবানিপালের বসানো পাপেট শাসক নেকো পরাজিত করেন, এমনকি থেবেসও দখল করেন। এরপর আসিরিয়রা তার বিরুদ্ধে দক্ষিণে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করে।তানুতামুন পরাজিত হন এবং নুবিয়ায় পালিয়ে যান। আসিরিয়রা থেবেসে এমন লুটপাট চালায় যে থেবেস তা থেকে আর ফিরে আসতে পারেনি। আশুরবানিপাল সামতিক নামের এক স্থানীয় শাসককে মিশরের শাসক নিযুক্ত করেন।
শেষ যুগ (৬৭২-৩৩২ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ)
স্থায়ী দখলদারীত্বের পরিবর্তে আসিরীয়রা স্থানীয় সামন্ত রাজাদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে যায়। এসকল রাজা সৈতে নামে পরিচিত হয়।৬৫৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের মধ্যেই সৈতে রাজা সামতিক ১ মিসরকে আসিরিয়ার অধীনতা থেকে মুক্ত করেন।এ সময় আসিরিয়া এলামের সাথে বড় ধরনের যুদ্ধে লিপ্ত ছিল এবং খুব অল্প সংখ্যক সৈন্য মিশরে বিদ্যমান ছিল। সামতিক ১ একাজে গ্রীক এবং লিডিয় ভাড়াটে সৈনিকদের সাহায্য নেন যাদের নিয়ে পরবর্তীতে মিশরের প্রথম নৌবাহিনী গড়ে উঠে।তবে সামতিক এবং তার উত্তরসুরীগণ আসিরিয়ার সাথে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখতে সচেষ্ট হন। সামতিকের রাজত্বকালে গ্রীকদের সাথে মিশরের সম্পর্ক দৃঢ় হয়। মিশরে গ্রীক প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং নৌক্রটিস নীল বদ্বীপের গ্রীকদের আবাসভূমিতে পরিণত হয়।
৬০৯ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে নেকো ২ আসিরিয়ার সাহায্যার্থে ব্যবিলনীয়, ক্যালডীয়, মেডীয় এবং সিথীয়দের সাথে এক যুদ্ধে লিপ্ত হন। আসিরিয়া এক নৃশংস গৃহযুদ্ধের পর এই জোটবদ্ধ শক্তির হাতে অসহায় হয়ে পড়েছিল।তবে নেকোর এই অভিযান উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয়।কিন্তু মিশরীয় সৈন্যবাহিনী পৌছানোর আগেই নিনেভের পতন হয় আসিরিয় রাজা সিন-শার-ইসকুনের মৃত্যু হয়।তবে নেকোর সৈন্যবাহিনী সহজেই ইসরায়েলি রাজা জোসিয়াহর সৈন্যবাহিনীকে পরাজিত করেন। নেকো এবং আসিরিয় রাজা আশুর-উবালিত ২ এর সৈন্যবাহিনী ৬০৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে সিরিয়ার কারকেমিশে পরাজিত হয়। মিশরীয় সৈন্যবাহিনী আরো কয়েকে দশক সেখানে অবস্থান করে লেভান্টের নিয়ন্ত্রন নিয়ে ব্যাবিলনীয়দের সাথে সংঘাতে লিপ্ত থাকে। অবশেষে নেবুচাদনেজার ২ তাদের মিশরে বিতারণ করেন এবং ৫৬৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশর আক্রমন করেন।
সৈতে রাজাদের অধীনে মিশরে স্বল্প সময়ের জন্য শিল্প এবং অর্থনীতি উজ্জীবিত হয়।কিন্তু ৫২৫ খ্রীষ্টপূর্বব্দে পারস্যরাজ কামবোস ২ মিশর অভিযান শুরু করেন এবং ফারাও সামতিক ৩ কে পেলুসিয়ামের যুদ্ধে বন্দি করেন।পরবর্তীতে কামবোস ফারাও উপাধি ধারণ করেন কিন্তু তিনি মিশর শাসন করতেন পারস্য থেকে। ফলে মিশর পারসিক আখেমেনীয় সম্রাজ্যের একটি প্রদেশে/সত্রপিতে পরিণত হয়। মিশর সাইপ্রাস ও ফিনিসিয়া (বর্তমান লেবানন) মিলে ছিল হাখমানেশী সম্রাজ্যের ষষ্ঠ সত্রপি।৪০২ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে মিশরে পারসিক শাসনের অবসান ঘটে।৩৮০-৩৪৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত মিশরের শেষ রাজবংশ মিশর শাসন করে। মিশরের শেষ রাজা নেকতানেবোর মৃত্যুতে এই রাজবংশের অবসান হয়। এর পরে আর মিশরের স্থানীয়দের হাতে ক্ষমতা ফিরে আসেনি।৩৪৩-৩৩২ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত মিশরে পারসিক শাসন চলে।অনেকে একে মিশরের একত্রিশতম রাজবংশ বলে থাকেন।৩৩২ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে পারসিক শাসক মাজাকেস ম্যসিডোনিয় বিজেতা আলেক্সান্দারের হাতে বিনা যুদ্ধে মিশর সমর্পন করেন।
সরকার এবং অর্থনীতি
ফারাও ছিলেন দেশের সর্বময় রাজা এবং অন্তত তাত্বিকভাবে দেশের সকল ভূমি এবং সম্পদের উপর কর্তৃত্বশালী। তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীপ্রধান এবং সরকারপ্রধান এবং কার্যসম্পাদনে একদল আমলার উপর নির্ভর করতেন। প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করতেন উজীর, যিনি ছিলেন ফারাওয়ের প্রতিনিধি , তিনি ভূমি জরিপ কাজ, কোষাগার, নির্মান প্রকল্প, বিচার ব্যবস্থা এবং আর্কাইভের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতেন। পুরো দেশ ৪২ টি নোমে (গ্রীক: Νομός, বিভাগ প্রাচীন মিশরীয়: সেপাত) বিভক্ত ছিল। প্রতিটি নোমের প্রশাসক নোমর্ক, তার কাজের জন্য উজীরের কাছে জবাবদিহি করত। মন্দিরগুলি ছিল প্রাচীন মিশরের অর্থনীতির মেরুদন্ড। মন্দিরগুলি শুধু প্রার্থনার স্থান হিসেবেই ভূমিকা পালন করত না, বরং একইসাথে রাষ্ট্রীয় সম্পদ সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের কাজও করত।
অর্থনীতি ছিল কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্র্রিত। যদিও শেষ যুগের আগ পর্যন্ত মিশরে মুদ্রার প্রচলন হয়নি তবুও তাদের মাঝে এক ধরনের দ্রব্যবিনিময় ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। এ ব্যবস্থায় প্রমাণ পরিমান খাদ্যশস্যের বস্তা এবং দেবেন (প্রায় ৯১ গ্রাম তামা বা রূপা) বিনিময়ের একক হিসেবে ব্যবহৃত হত। শ্রমিকদের খাদ্যশস্যের মাধ্যমে পারিশ্রমিক দেওয়া হত। একজন সাধারণ শ্রমিক মাসে সাড়ে পাঁচ বস্তা (২০০ কেজি), তাদের তত্ত্বাবধায়ক সাড়ে সাত বস্তা (২৫০ কেজি) করে পেত।দ্রব্যমূল্যের দাম সারা দেশে নির্দিষ্ট করা ছিল। একটি জামা কিনতে ব্যয় হত ৫ দেবেন। একটি গরু কিনতে ব্যয় হত ১৪০ দেবেন। খাদ্যশস্যের সাথেও দ্রব্য বিনিময় করা যেত,তবে বিনিময়মূল্য নির্ধারণ করা ছিল। খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে বিদেশিদের দ্বারা মুদ্রার প্রচলন হয়। প্রথমে এগুলো ছিল দামি ধাতুর প্রমাণ পরিমাণ খন্ড, প্রকৃত মুদ্রা ছিল না। কিন্তু পরবর্তী শতকে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িরা ধাতব মুদ্রার উপর নির্ভর করতে শুরু করে।
মিশরিয় সমাজ ছিল বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত এবং সামাজিক অবস্থান সবসময় স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হত। কৃষকরা ছিল সমাজের সবচেয়ে বড় অংশ। কিন্তু তাদের উৎপাদিত ফসলের মালিক ছিল রাষ্ট্র, মন্দির অথবা কোন অভিজাত পরিবার যারা ঐ ভূমির মালিক। কৃষকদেরকে শ্রমকর দিতে হত এবং কর্ভী পদ্ধতির অধীনে সেচ এবং নির্মানকাজে তাদের কাজ করতে হত। কারিগর এবং শিল্পীদের সামজিক অবস্থান ছিল কৃষকদের উপরে, কিন্তু তারাও রাষ্ট্রের অধীন ছিল। তাদের কাজ করতে হত মন্দির সংলগ্ন দোকানে এবং তাদের পারিশ্রমিক দেওয়া হত রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। লিপিকার এবং কর্মকর্তারা ছিল মিশরের উচ্চশ্রেণি, তাদের সামাজিক স্তরের চিহ্ন ছিল ব্লীচ করা লিনেনের কাপড়। অভি জাত সম্প্রদায়ের ঠিক নিচে ছিল পুরোহিত, বৈদ্য এবং প্রকৌশলিদের অবস্থান, যাদের কোন একটি বিষয়ে পারদর্শীতা ছিল। প্রাচীন মিশরে দাসপ্রথা জ্ঞাত ছিল, কিন্তু তার বিস্তার এবং ব্যাপকতা কেমন ছিল তা অস্পষ্ট।
প্রাচীন মিশরিয়রা দাস ব্যতীত নারী-পুরুষ সমাজের সকল স্তরের মানুষকে আইনের দৃষ্টিতে সমান বিবেচনা করত, সমাজের সবচেয়ে নিম্ন স্তরের কৃষক উজীরের কাছে বিচার চাইতে পারত। মিশরে দাসেরা ছিল শর্তাবদ্ধ কাজের লোকের মত, অর্থাৎ তারা নির্দিষ্ট সময় কাজ করে নিজেদের মুক্তি অর্জন করে নিতে পারত। একইসাথে দাসের বেচাকেনা করতে পারত এবং বৈদ্য দ্বারা চিকিৎসা করাতে পারত।
নারী-পুরুষ উভয়ের সম্পত্তি অর্জন এবং ক্রয়বিক্রয়, চুক্তি করা, বিয়ে এবং ডিভোর্স, উত্তরাধিকার এবং আদালতে বিচার পাওয়ার অধিকার ছিল।বিবাহিতরা একত্রে সম্পদের মালিক হতে পারত। বিবাহ ভেঙে গেলে স্বামীর স্ত্রী ও সন্তান ভরণপোষণ দাবি করতে পারত। প্রাচীন গ্রীস, রোম এমনকি তুলনামূলক আধুনিক বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের নারীদের চেয়ে প্রাচীন মিশরের নারীদের ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি ছিল। হাতশেপসুত এবং ক্লিওপেট্রা ফারাও হয়েছিলেন এবং অন্যান্য অনেকে আমুনের ঐশ্বরিক স্ত্রী পদে থেকেও ক্ষমতাশালী হয়েছিলেন। এইসব স্বাধীনতা সত্ত্বেও মিশরিয় নারীরা প্রায় সময় প্রশাসনিক কাজে অংশ নিতেন না, মন্দিরে অপ্রধান দায়িত্ব পালন করতেন এবং পুরুষদের মত বেশি শিক্ষালাভ করতেন না।
আইনি ব্যবস্থার প্রধান ছিলেন ফারাও, তার দায়িত্ব ছিল আইন তৈরি করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, প্রাচীন মিশরীয়রা এই ধারনাকে বলত মা’ত। যদিও প্রাচীন মিশরীয়দের কোন বিধিবদ্ধ আইনের সন্ধান পাওয়া যায় না, তবে আদালতের নথি থেকে বোঝা যায় যে মিশরিয় আইন ভাল মন্দের সাধারণ ধারণার উপর গড়ে উঠেছিল, যেখানে কতগুলো আইনের কঠোর অনুসরণের চেয়ে দ্বন্দ্ব নিরসন এবং সম্মতিতে পৌছানোকে অধিক গুরত্ব দেওয়া হত। নতুন রাজ্যের সময় স্থানীয় বয়স্কদের নিয়ে গঠিত কাউন্সিল যার নাম ছিল কেনবেত ছোটখাট ব্যাপার মীমংসা করত। গুরুতর ব্যাপার যেমন হত্যা, বড় ভূমি বিনিময় এবং সমাধি লুটের ক্ষেত্রে মহাকেনবেতের কাছে উপস্থাপন করা হত, যার সভাপতিত্ব করতেন উজীর কিংবা ফারাও। বাদি এবং বিবাদি নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করত এবং সত্য বলার শপথ করত। কোন কোন ক্ষেত্রে রাষ্ট্র প্রসিকিউটর এবং বিচারকের উভয় ভূমিকাই পালন করত, এবং স্বীকারোক্তি কিংবা সহযোগীদের নাম আদায়ের জন্য অত্যাচার করতে পারত। ছোট কিংবা বড় যে অপরাধের জন্যই মামলা হোক না কেন, আদালতের লিপিকারেরা অভিযোগ, সাক্ষী এবং রায় ভবিষ্যতের জন্য নজীর হিসাবে নথিবদ্ধ করে রাখত।
প্রাচীন মিশরের কিছু ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য মিশরিয় সভ্যতার সাফল্যে অবদান রেখেছে। তার সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ হল নীল নদের বাৎসরিক বন্যা যা নীল নদের পার্শ্ববর্তী মাটিকে করে তোলে উর্বর। এর ফলে প্রাচীন মিশরিয়রা প্রচুর পরিমাণে খাদ্য উৎপাদন করতে পেরেছিল এবং সাহিত্য, কলা, প্রযুক্তির পেছনে সময় সম্পদ ব্যয় করার সুযোগ পেয়েছিল।
প্রাচীন মিশরের কৃষিকাজ নীলনদের উপর গভীরভাবে নির্ভরশীল ছিল। প্র্রাচীন মিশরিয়রা তিনটি ঋতু চিহ্নিত করেছিল, আখেত (বন্যাঋতু) পেরেত (রোপনঋতু) এবং শেমু (ফসল কাটার ঋতু)। বন্যাঋতুর সময়কাল ছিল জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস। এই সময়ের বন্যায় নদীর পাড়ে উর্বর পলিমাটি জমত। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছিল ফসল উৎপাদনকাল। কৃষকেরা জমিতে লাঙ্গল দিত এবং বীজ বপন করত। খালের মাধ্যমে জমিতে সেচ দেওয়া হত। মিশরে অল্পই বৃষ্টি হত, তাই কৃষকরা ছিল নীল নদের উপর নির্ভরশীল। মার্চ হতে মে মাস পর্যন্ত কাস্তে দিয়ে ফসল কাটা হত এবং মাড়াই করে শস্যদানা আলাদা করা হত। এরপর শস্যদানা ঝেড়ে তুষ আলাদা করা হত। তুষমুক্ত শস্যদানা থেকে গুঁড়া করে ময়দা বানানো হত কিংবা বিয়ার তৈরি করা হত কিংবা ভবিষ্যতের জন্য জমা রাখা হত।
মিশরিয়রা এমার গম, বার্লি এবং আরো কিছু শস্য উৎপাদন করত। এগুলো রুটি এবং বিয়ার, মিশরিয়দের প্রধান দুইটি খাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হত। শণগাছ, যা ফুল দেওয়ার পূর্বে উৎপাটন করা হত, তন্তুর জন্য চাষ করা হত। এই তন্তু থেকে লিনেন এবং কাপড় তৈরি করা হত। নীলনদের তীরে জন্মানো প্যাপিরাস কাগজ উৎপাদনে ব্যবহৃত হত।বাসস্থানের নিকটে উচ্চস্থানে ফল এবং সবজির বাগান করা হত। এই সকল বাগানে হাতে সেচ করা হত। ফল এবং সবজির মাঝে ছিল পেঁয়াজ, রসুন, লেটুস, ডাল, তরমুজ, স্কোয়াশ এবং অন্যান্য ফসল। একইসাথে আঙুর চাষ করা হত যা থেকে মদ তৈরি করা হত।
প্রাচীন মিশরিয়রা বিশ্বাস করত জাগতিক শৃঙ্খলার জন্য মানুষ এবং পশুপাখির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকা প্রয়োজন, তাই মানুষ, পশু এবং গাছপালাকে একের বিভিন্ন অংশ বিবেচনা করা হত। তাই বন্য এবং পোষা পশু মিশরিয়দের জন্য ছিল আধ্যাত্মিকতা এবং সঙ্গের গুরত্বপূর্ণ উৎস। পশুসম্পদের উপর কর আদায় করা হত এবং মন্দির ও জমিদারির জন্য তার পশুপালের আকার ছিল তার মর্যাদা ও প্রতিপত্তির পরিচায়ক। গবাদিপশুর সাথে সাথে মিশরিয়রা ভেড়া, ছাগল ও শুকরও পালন করত।হাঁস এবং কবুতর জালে বন্দি করে পালা হত। নীল নদে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। প্রাচীন রাজ্যের সময় থেকেই মৌমাছি চাষ করা হত এবং মধু ও মোমের যোগান দিত।
প্রাচীন মিশরিয়রা গাধা এবং ষাঁড় ভারবাহী পশু হিসেবে ব্যবহার করত। এদেরকে জমিতে লাঙ্গল দেওয়া এবং জমিতে বীজ ভালভাবে বপন করার কাজে ব্যবহার করা হত। মোটতাজা ষাঁড় বলি দেওয়া ছিল ধর্মীয় আচারের গুরত্বপূর্ণ অংশ।দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী যুগে হিসকোসদের দ্বারা ঘোড়ার প্রচলন হয়। নতুন রাজ্যের সময় উটের ব্যবহার জানা থাকলেও, শেষ যুগের আগে ভার বহনের কাজে উটের প্রচলন ছিল না। শেষ যুগের দিকে হাতি ব্যবহারের লক্ষণ পাওয়া যায়, কিন্তু চারণভূমির অভাবে এই ব্যবহার অচল হয়ে পড়ে। কুকুর, বিড়াল এবং বানর ছিল সাধারণ পোষা প্রাণি। সিংহ ইত্যাদি প্রাণি, যা আফ্রিকার গভীর থেকে নিয়ে আসা হত, তা সাধারণত রাজপরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। প্রাকরাজবংশীয় এবং শেষ যুগে দেবতাদের প্রাণিরূপে পূজা করার ব্যাপক চল ছিল, যেমন বিড়ালরূপ দেবী বাসতেত এবং ইবিসরূপ দেবতা থোথ, এইসব প্রাণি বলি দেওয়ার জন্য বড় বড় খামারে পালা হত।
নির্মানকাজে ব্যবহার্য পাথর, অলঙ্কারের পাথর, তামা, সীসা এবং দামি পাথরে মিশর সমৃদ্ধ। মিশরের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য তাদের ইমারত, ভাস্কর্য, হাতিয়ার এবং অলঙ্কার তৈরিতে সহায়ক হয়। ওয়াদি নাত্রুনের লবন মমি তৈরিতে ব্যবহৃত হত, সেখান থেকে জিপসামও পাওয়া যেত যা প্লাস্টার করার কাজে ব্যবহৃত হত। দূরবর্তী পূর্ব মরুভূমি এবং সিনাইয়ের বসবাসের অযোগ্য ওয়াদিতে খনিজ পদার্থ পাওয়া গিয়েছিল। এসকল এলাকা থেকে খনিজ উত্তোলনে প্রয়োজন হত রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বিশাল অভিযান। নুবিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছিল সোনার খনি এবং প্রথম মানচিত্রের একটি ছিল এখানকার একটি সোনার খনির। ওয়াদি হাম্মামাত ছিল গ্রানাইট, সোনা গ্রেওয়াকের সুপরিচিত উৎস। চকমকি পাথর ছিল প্রথম সংগৃহীত খনিজ পদার্থ যা হাতিয়ার তৈরীতে ব্যবহৃত হত, চকমকি পাথরের তৈরি কুঠার হল নীলনদ উপত্যকায় মানববসতির প্রথম নিদর্শন। চকমকি পাথরের খন্ডে আঘাত করে ধারালো ক্ষুর এবং তীরের ফলা তৈরি করা হত, এমনকি তামার ব্যবহার শুরু হওয়ার পরেও এর চল ছিল। খনিজ পদার্থ যেমন গন্ধক রূপচর্চার কাজে ব্যবহারে মিশরিয়রাই ছিল প্রথম।
হাতিয়ার তৈরির কাজে মিশরিয়দের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ ধাতু ছিল তামা, মালাকাইট আকরিক যা সিনাইয়ে পাওয়া যেত তা থেকে তামা উৎপাদন করা হত। পাললিক শিলার মধ্য হতে সোনার খণ্ড সংগ্রহ করা হত। আবার কোয়ার্টজাইট গুঁড়া করেও তার মধ্য থেকে সোনা বের করা হত। শেষ যুগে উত্তর মিশরে পাওয়া লোহার খনি থেকে লোহা উৎপাদন করা হত। নির্মানকাজে ব্যবহার্য উচ্চমানের পাথর মিশরে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত; নীল উপত্যকা থেকে চুনাপাথর, আসওয়ান থেকে গ্রানাইট, পূর্ব মরুভূমির মরুদ্যানগুলো থেকে থেকে ব্যাসাল্ট ও বেলেপাথর সংগ্রহ করা হত। অলংকারের পাথর যেমন এলাব্যাস্টার, গ্রেওয়াক এবং কারনেলিয়ান পূর্ব মরুভূমিতে প্রচুর পাওয়া যেত এবং প্রথম রাজবংশের আগে থেকেই সংগ্রহ করা হত। টলেমিয় এবং রোমান যুগে ওয়াদি সিকাইত থেকে চুনী এবং ওয়াদি এল-হুদি থেকে পান্না উত্তোলন করা হত।
প্রাকরাজবংশিয় যুগে নুবিয়ার সাথে সোনা এবং ধূপ সংগ্রহের জন্য নুবিয়ার সাথে বাণিজ্যসম্পর্ক স্থাপিত হয়। তাদের সাথে ফিলিস্তিন অঞ্চলেরও বাণিজ্য স্থাপিত হয়, প্রথম রাজবংশের যুগের ফারাওদের সমাধিতে ফিলিস্তিন অঞ্চলে পাওয়া তেলের পাত্রের মত পাওয়া যায়। প্রথম রাজবংশের কালের কিছু পূর্বে কানানে মিশরিয় একটি কলোনি ছিল। রাজা নারমার কানানে মিশরিয় মৃৎপাত্র তৈরি করাতেন এবং তা মিশরে আমদানি করাতেন। দ্বিতীয় রাজবংশের সময় জুবাইলের হতে কাঠ আমদানি করা হয় যা মিশরে পাওয়া যেত না। পঞ্চম রাজবংশের সময় থেকে পুন্ট থেকে সোনা, সুগন্ধী রেসিন, আবলুস, হাতির দাঁত এবং বন্য প্রাণি যেমন বানর ও বেবুন আম্দানি শুরু হয়। টিন এবং প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত তামার জন্য মিশর আনাতোলিয়ার উপর নির্ভরশীল ছিল, এ দুটো ধাতুই ব্রোঞ্জ তৈরির উপাদান। মিশরিয়রা লাপিস-ল্যাজুলির খুব সমাদর করত যা আসত সুদূর আফগানিস্তান হতে। ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের ক্রীট এবং গ্রীস হতে মিশরে জলপাই তেল এবং অন্যান্য দ্রব্যাদি আসত। বিভিন্ন বিলাস সামগ্রীর বিনিময়ে মিশর থেকে প্রধানত খাদ্যশস্য, লিনেন, সোনা, প্যাপিরাস এবং কাঁচ ও পাথরের বিভিন্ন সামগ্রী।
প্রাচীন মিশরিয় ভাষা উত্তর অফ্রোএশিয়াটিক ভাষাপরিবারের অন্তর্ভুক্ত, বারবার এবং সেমিটিক ভাষাগুলির নিকট সম্পর্কিত। সুমেরিয় ভাষার পর এই ভাষার ইতিহাস সবচেয়ে দীর্ঘ; ৩২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ হতে মধ্যযুগ পর্যন্ত এ ভাষা লিখা হত, কথ্য হিসেবে তার চেয়ে দীর্ঘসময় এ ভাষা টিকে ছিল। প্রাচীন মিশরীয় ভাষাকে কয়েকটি পর্যায়কালে ভাগ করা যায়: প্রাচীন, মধ্য (ধ্রূপদী মিশরিয়), পরবর্তী, ডেমোটিক ও কপটিক। কপটিকের পূর্বে মিশরিয় লেখনে উপভাষাগত পার্থক্য দেখা যায় না, তবে ধারণা করা হয় প্রথমে মেমফিস ও পরে থেবেসের উপভাষাই মান ভাষা ছিল।
অন্যান্য আফ্রোএশিয়াটিক ভাষার মত প্রাচীন মিশরিয় ভাষায় ২৫ টি ব্যঞ্জনবর্ণ ছিল। এই ভাষায় তিনটি হ্রস্ব ও তিনটি দীর্ঘ স্বরবর্ণ ছিল, যা পরবর্তীতে নয়টি স্বরবর্ণে পরিণত হয়। মিশরীয় ভাষার একটি শব্দ অন্যান্য সেমিটিক ভাষার ন্যায় দুইটি বা তিনটি ব্যাঞ্জন বা অর্ধব্যাঞ্জন বর্ণ নিয়ে গঠিত প্রকৃতির সাথে উপসর্গ যোগে গঠিত হয়। উদাহরণত : তিন ব্যাঞ্জনের ধাতু S-Ḏ-M, এর সাধারণ ধাতুরূপ sḏm, অর্থ সে (পুরুষ) শোনে। কর্তা যদি বিশেষ্য হয় তবে কোন উপসর্গ যুক্ত হয় না যেমন sḏm ḥmt, মহিলাটি শোনে।
হায়ারোগ্লিফিক লিপি খ্রীষ্টপূর্ব ৩২০০ অব্দ হতে ব্যবহৃত হয় এবং এতে শত শত চিহ্ন রয়েছে। একটি চিহ্ন ধ্বনি, শব্দ কিংবা শুধুমাত্র নির্দেশক রূপে ব্যবহার হতে পারে এবং বিভিন্ন স্থানে একই চিহ্ন বিভিন্ন কিছু বোঝাতে পারে। হায়ারোগ্লিফিক লিপি ছিল এক ধরণের আনুষ্ঠানিক লিপি, প্রস্তর স্তম্ভ এবং সমাধিতে এই লিপি ব্যবহৃত হত, এই লিপি ছিল কলার পর্যায়ে, অত্যন্ত যত্নের সাথে তা লেখা হত। প্রতিদিনের লেখার জন্য লিপিকারেরা টানা হাতের লেখার এক লিপি ব্যবহার করত যাকে হায়ারেটিক লিপি বলা হয়, এতে লেখা ছিল দ্রুত ও সহজ। হায়ারোগ্লিফিক সারি কিংবা স্তম্ভ উভয়েই লেখা হলেও ( সাধরণত সারিতে ডান থেকে বামে লেখা হত), হায়ারেটিক লেখা হত সব সময় সারিতে ডান থেকে বামে। পরবর্তীতে একটি নতুন ধরণের লিপি, ডেমোটিক লিপি, প্রাধান্য লাভ করে; রোসেটা প্রস্তরফলকে গ্রীক ও হায়রোগ্লিফিকের সাথে এই লিপি ব্যবহৃত হয়।
প্রথম শতাব্দীর দিকে ডেমোটিকের পাশাপাশি কপ্টিক লিপির ব্যবহার শুরু হয়। কপ্টিক লিপি মূলত গ্রীক লিপি, যার সাথে ডেমোটিক লিপির কিছু চিহ্ন যোগ করা হয়। চতুর্থ শতব্দী পর্যন্ত হায়ারোগ্লিফ আনুষ্ঠানিক কাজে ব্যবহৃত হত, কিন্তু শেষ দিকে অতি অল্প সংখ্যক পুরোহিতই তা পড়তে পারতেন। স্থানীয় ধর্মের বিলোপের সাথে এই লিপির জ্ঞান প্রায় হারিয়ে যায়। বাইজানটাইন ও ইসলামি যুগে এই লিপি পাঠোদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়। ১৮২২ সালে রোসেটা প্রস্তর আবিষ্কার এবং তার পর থোমাস ইয়ং ও জঁ ফ্রাঁসোয়া শাঁপোলিয়নের বহুবছর গবেষণার পর হায়ারোগ্লিফিক লিপির প্রায় সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়।
প্রাচীন মিশরের ধর্মীয় বিশ্বাস মিশরীয় পুরানে প্রতিফলিত হয়েছে। তিন হাজার বছরেরও কিছু বেশি সময় ধরে মিশরে পৌরানিক ধর্মীয় বিস্বাশ প্রচলিত ছিল। মিশরের সভ্যতা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি তার পুরানও বিবর্তিত হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই পৌরানিক চরিত্রগুলোকে যুগ ভেদে বিভিন্ন ভূমিকায় দেখা যায়। পৌরানিক ধর্মে মূলতঃ বহু দেব-দেবীর অস্তিত্ব থাকলে, প্রাচীন সাম্রাজ্যের কালে আখেনআতেনের (৪র্থ আমেনহোতেপ) শাসনামলে কিছুকালের জন্য সূর্যদেব আতেনকে কেন্দ্র করে একেশ্বরবাদের চর্চা করতে দেখা যায়। কিন্তু আখেনআতেনের মৃত্যুর সাথে এই চর্চাও লোপ পায় এবং আগের বহু দেব-দেবী সম্বলিত পৌরানিক ধর্ম ফিরে আসে।

মায়া সভ্যতা
মায়া জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত হচ্ছেন সেইসব মানুষ যারা প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতির এবং আধুনিক জনগণ, যারা মেক্সিকোর দক্ষিণে এবং উত্তর-মধ্য আমেরিকাতে বসবাস করতো এবং তারা মায়াভাষী় পরিবারের মানুষ। প্রথমদিকে এর সময় কাল প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০-২৫০ অব্দ পর্যন্ত। এর মধ্যে প্রাচীন কালে খ্রিস্টপূর্ব ২৫০-৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অনেক মায়া নগরীগুলোতে তাঁরা উন্নতির উচ্চশিখরে পৌঁছেছিল এবং স্প্যানিশদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত পুরো পোস্টক্লাসিক জুড়ে চালিয়ে গিয়েছিল। এটি ছিলো বিশ্বের সর্বাপেক্ষা ঘন জনবসতি এবং সংস্কৃতিভাবে গতিশীল একটি সমাজ।
উচ্চস্তরের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কারণে এবং সাংস্কৃতিক প্রসারণ করার দরুন অন্যান্য মেসোআমেরিকান সভ্যতার সঙ্গে মায়া সভ্যতাকে অনেক ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যেমন, লেখার উন্নতি-সাধন, গ্রন্থারম্ভে উদ্ধৃত বাক্য এবং বর্ষপঞ্জিকা যা মায়ার সঙ্গে উদ্ভূত হয়নি, তবুও তাঁদের সভ্যতা তাঁদেরকে সম্পূর্ণভাবে বিকশিত করেছিল। হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা, এল সালভাদর এবং যতদূর দেখা যায় মায়া অঞ্চল থেকে ১০০০ কিলোমিটারের (৬২৫ মাইল) চেয়েও বেশি, মধ্যে মেক্সিকোতেও মায়ার প্রভাব লক্ষ করা যায়। এর বাইরেও অনেক মায়া সভ্যতার প্রভাবান্বিত শিল্প এবং স্থাপত্যের খোঁজ পাওয়া যায়, যা বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের চিন্তাধারার ফলস্বরূপ বরং সরাসরি বাহ্যিক জয়। মায়া জনগণ কখনোই অন্তর্ধান হয়নি, প্রাচীনকালেও না, স্প্যানীয় বিজয়ীদের আগমনের সাথেও না, এবং পরবর্তীতে যখন স্পেনীয়রা আমেরিকা মহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করে তখনও না। আজ, পুরো মায়া অঞ্চল জুড়ে মায়া এবং তাদের বংশধরদে বিস্তার। প্রাক কলম্বীয় এবং ভাবতত্ত্বের জয়ের ঐতিহ্য ও ধারণার পাথক্যসূচক একটি সমষ্টির ফলাফল বজায় রাখার অর্ন্তভুক্তি। অনেক মায়াভাষী তাদের প্রাথমিক ভাষা হিসেবে আজও মায়া ভাষায় কথা বলে। রাবিনাল আচি, আচি ভাষায় লিখিত একটি নাটক, যাকে ২০০৫ সালে ইউনেস্কো মানবতার মৌখিক ও স্পর্শাতীত ঐতিহ্যবাহীর শ্রেষ্ঠ অবদান হিসেবে ঘোষণা করেছে।
ধ্রুপদী এবং পোস্ট-ধ্রুপদী মায়া সভ্যতার বিস্তার
মায়া সভ্যতার ভৌগোলিক সীমা মায়া অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। মেক্সিকোর প্রদেশের দক্ষিণে চাপাস, তাবাস্কো এবং ইয়ুকাটান উপদ্বীপের কুইন্টানা রোওকাম্পেছ, এবং ইয়ুকাটান জুড়ে প্রসারিত করেছিল। উত্তরাঞ্চলীয় মধ্য আমেরিকার অঞ্চল, যা বর্তমানে গুয়াতেমালা, বেলিজ, এল সালভাডোর এবং পশ্চিমী হন্ডুরাস জুড়ে মায়া সভ্যতা প্রসারিত করেছিল। মায়া অঞ্চলের জলবায়ু অনেক ভাবে পরিবর্তন হয়েছে। নিচু-অবস্থান এলাকা হওয়ার ফলে মরুভূমির যাত্রীরা নিয়মিত প্রবল হারিকেন ঝড় এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ের সম্মুখীন হয়েছেন। মায়া অঞ্চলকে সাধারণভাবে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিচুভূমি, উচ্চভূমি এবং উত্তরাঞ্চলীয় নিচুভূমি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মেক্সিকোর গুয়াতেমালা এবং চাপাস উচ্চভূমি সমস্ত মায়া উচ্চভূমিতে অন্তর্ভুক্ত। দক্ষিণাঞ্চলীয় নিচুভূমি ঠিক দক্ষিণে উচ্চভূমির কাছাকাছি এবং এতে মেক্সিকার চাপাস, গুয়াতেমালার দক্ষিণ উপকূল, বেলিজ এবং উত্তরাঞ্চলীয় এল সালভাডোর একটি অংশ অন্তর্ভুক্ত। উত্তরাঞ্চলীয় নিচুভূমি সম্পূর্ণ ইয়ুকাটান উপদ্বীপে প্রসারিত হয়েছে। এটি মেক্সিকোর ইয়ুকাটান, কাম্পেছ এবং কুইন্টানা রোও, গুয়াতেমালার পেতেন বিভাগ এবং সমস্ত বেলিজ। এছাড়াও মেক্সিকার রাজ্যের তাবাস্কো এবং চাপাসের অংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রাকধ্রুপদী
পণ্ডিতরা মায়া সভ্যতার যুগের শুরু নিয়ে অবিরত আলোচনা করে যাচ্ছেন। বেলিজের কিউল্লোতে মায়া বসবাসের সাম্প্রতিক আবিষ্কারের কার্বন পরীহ্মা হতে পাওয়া তারিখ অনুযায়ী খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৬০০ বছর আগের। তারা বিস্ময়কর কাঠামো নির্মিত করে। মায়ার বর্ষপঞ্জিকা তথাকথিত মেসআমেরিকানর দীর্ঘ গণনীয় বর্ষপঞ্জিকার উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, যা খ্রিস্টপূর্ব ১১ই আগষ্ট, ৩১১৪ খ্রিস্টাব্দের সমতুল্য।
প্রায় ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মায়ারা চাষাবাদ করা শুরু করে এবং কৃষিজীবী গ্রামের উৎপত্তি ঘটে। সবচেয়ে বহুল প্রচলিত গৃহীত প্রদর্শন যে, প্রায় ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রথম মায়া জনবসতি নিঃসন্দেহে প্রশান্ত উপকূলের সোকোনুস্কো অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই সময়টি প্রাথমিক প্রাকধ্রুপদী নামে পরিচিত,[৫] একে আসনাশ্রিত সম্প্রদায় এবং মৃৎশিল্প প্রবর্তন ও পোড়ানো কাদামাটি মূর্তিসমূহ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ওল্মেক সভ্যতার শুরু হয়। তারা ছিল মায়াদের পূর্বপুরুষ। পণ্ডিতরা প্রারম্ভিক মায়া এবং প্রতিবেশী প্রাকধ্রুপদী মেসোআমেরিকা সভ্যতাসমূহ, যেমন, টাবাস্কো নিচুভূমি অঞ্চলের ওল্মেক সংস্কৃতি এবং চাপাস ও দক্ষিণের ওআজাচার যথাক্রমে মিক্স-জোক এবং জাপোটেক ভাষাভাষী মানুষের, ভৌত এবং সাংস্কৃতিক বিস্তারের সাথে একমত না। প্রাচীনতম উল্লেখযোগ্য শিলালিপি এবং ভবনের অনেকেই এই অধিক্রমণ অঞ্চলে উপস্থিত এবং এর প্রমাণ থেকে বুঝা যায়, যে এই মায়া সংস্কৃতি এবং গঠনাত্মক পরস্পরকে প্রভাবিত করেছিল। তাকালিক আবাজ, গুয়াতেমালার প্রশান্তীয় পাড়ে একমাত্র স্থান, যেখানে ওল্মেক বৈশিষ্ট্যসমূহ পরিষ্কারভাবে মায়ার একটি প্রভাবিত স্থানকে বুঝায়। প্রায় ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হন্ডুরাসের কোপায়েন এবং চালচুয়াপা শহরের পতন হয় এবং এখানে তারা বসবাস করতে শুরু করে।
দক্ষিণ মায়া নিচুভূমিসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্ভুক্ত স্থানসমূহের হচ্ছে: নাকবে, এল মিরাডোর, চিভাল, এবং সান বারটোলো। গুয়াতেমালার উচ্চভূমিতে, প্রায় ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বহিরাগত কামিয়ানালজুয়ু। বহু শতাব্দী ধরে এটি পেতেন এবং প্রশান্ত নিচুভূমিসমূহ জন্য জাদে এবং অবসিদিয়ান উৎসসমূহকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রায় ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইযাপা, তাকালিক আবাজ, এবং চোকোলার গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক স্থানসমূহে কোকো প্রধান উৎপাদক ছিল। এছাড়াও মধ্য ও পরের প্রাকধ্রুপদী দিকে উত্তরাঞ্চলীয় মায়া নিচুভূমিসমূহের মাঝা আকারের মায়া সম্প্রদায়ের বিকাশ শুরু হয়। যদিও দক্ষিণাঞ্চলীয় নিচুভূমিসমূহের বৃহৎ কেন্দ্রের আকার, মাপকাঠি এবং প্রভাবের ইঙ্গিতও দেখা গিয়েছে। উত্তরাঞ্চলীয় দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকধ্রুপদী স্থান হল কোমচেন এবং ডজিবিলচাল্টুন। প্রায় ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এল মিরাডোর শহরে বিশাল বিশাল স্থাপত্যের নির্মাণকার্য শুরু হয়। একই সাথে তারা আধুনিক পদ্ধতিতে জলসেচের সাহায্যে চাষাবাদ শুরু করে। এই সময় তারা টিকাল শহরে বসতি স্থাপন করে এবং পরে এটি মায়াদের বৃহত্তম শহরে পরিণত হয়। ধ্রুপদী যুগে রাজধানীর পরেই এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল। এই যুগের (প্রায় ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) প্রথম লিখিত শিলালিপি মায়া হায়ারোগ্লিফর চিহ্নিত করা হয়েছিল। ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তারা একটি শিলাস্তম্ভের উপরে প্রথম মায়া জ্যোতিষ পঞ্জিকা তৈরি করে। ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে থেকে ২৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রাক-কলম্বীয় মেসোআমেরিকান টিয়োটিহকান শহরের নির্মাণ কাজ চলে। এই শহরের দ্বারা সৃষ্ট মায়া সংস্কৃতি অন্যান্য মায়া সংস্কৃতিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। প্রথমতম মায়া পিরামিড গঠিত হয়েছিল। ১০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি, মায়া শহরগুলোর একটি ব্যাপক পতন ও পরিত্যক্ত ঘটে যাকে প্রাকধ্রুপদী পতন বলা হয়। এটি প্রাকধ্রুপদী যুগের সমাপ্তির চিহ্নিত।
ধ্রুপদী
এই ধ্রুপদী যুগটি (প্রায় ২৫০-৯০০ খ্রিস্টাব্দ) ছিল মায়াদের শ্রেষ্ঠতম যুগ। এই যুগে বড়-ধরনের নির্মাণ এবং নগরবাদ, বিস্ময়কর শিলালিপির লিপিবদ্ধ এবং উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক এবং শিল্পকর্মের উন্নয়ন, বিশেষ করে দক্ষিণ নিচুভূমি অঞ্চলসমূহের শিখরে পৌছায়। তারা কৃষিতে অত্যাধিক বিকশিত হয়েছিল। অনেক স্বাধীন শহর-রাজ্যে এবং কিছু ছিল অন্যদের উপযোগী শহর-রাজ্যের মধ্যে শহর-কেন্দ্রিক সভ্যতা গঠিত হয়। ৪০০ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত নগররাষ্ট্র টিয়োটিহকান এই সময়ে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। এরাই কার্যত মেক্সিকান উচ্চভূমিতে তাদের রাজধানী হয়ে উঠেছিল। ক্যারিকল, তিকাল, পালেকং, কোপান, জুনান্টিনেচ এবং কালাকমুল শহরসমূহ সুপরিচিত, কিন্তু স্বল্প পরিচিত শহরসমূহের মধ্যে রয়েছে লামানাই, ডস পিলাস, কাহাল পেচ, উয়াক্সাক্তুন, আলতুন হা, এবং বোনাম্পাক, প্রমুখ। উত্তরাঞ্চলীয় মায়া নিচুভূমিতে প্রারম্ভিক ধ্রুপদী উপনিবেশ বন্টন দক্ষিণাঞ্চলীয় অঞ্চল মত পরিষ্কারভাবে পরিচিত নয়, কিন্তু একটি সংখ্যা জনসংখ্যা কেন্দ্র, যেমন, অক্সকিন্টোক, চুনচুকমিল, এবং উক্সমালের প্রারম্ভিক পেশা অন্তর্ভুক্ত করে।
এই সময়কালে মায়ার জনসংখ্যা ছিল মিলিয়ন। তারা একটি বিপুল সংখ্যক রাজত্ব এবং ছোট সাম্রাজ্যসমূহ, বিস্ময়কর প্রাসাদসমূহ এবং মন্দিরসমূহ তৈরি, অত্যন্ত উন্নত অনুষ্ঠানে নিযুক্ত, এবং একটি বিস্তৃত চিত্রলিপিতে লেখার পদ্ধতি বিকশিত করেছিল। তিকালের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল কালাকমুল, যা পেতেন বেসিনের একটি শক্তিশালী শহর ছিল। দক্ষিণপূর্বে কোপান ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর। মায়া অঞ্চলের উত্তরে কোবা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মায়া রাজধানী ছিল। ৫৬০ খ্রিস্টাব্দের সময়ে বিখ্যাত হন্ডুরান মায়া শহর তিকাল অন্যান্য মায়া নগররাষ্ট্রের দ্বার সৃষ্ট এক অক্ষজোটের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নেয়। ৬০০ খ্রিস্টাব্দে টেওটিহুয়াকানের ক্ষমতা এই সময় থেকে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে, এবং এই শহর তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে থাকে। ফলে তাদের রাজধানী টিয়োটিহকানের বদলে অন্য শহরে গড়ে ওঠে। এই সমৃদ্ধ সভ্যতার সামাজিক ভিত্তিতে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সামাজিক নেটওয়ার্ক (বিশ্বের পদ্ধতি) মায়া অঞ্চল এবং বিস্তৃত মেসোআমেরিকান বিশ্ব জুড়ে প্রসারিত হয়। কেন্দ্রীয় নিচুভূমিতে ধ্রুপদী মায়া বিশ্ব ব্যবস্থার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রভাবশালী ‘মর্মবস্তু’ মায়া দল অবস্থিত ছিল, যখন দক্ষিণাঞ্চলীয় উচ্চভূমি এবং উত্তরাঞ্চলীয় নিচুভূমি অঞ্চলের তার অনুরূপ নির্ভরশীল বা ‘সীমান্তবর্তী’ প্রান্তে পাশে মায়া দল পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্ত বিশ্বের ব্যবস্থার মত, মায়া মূল কেন্দ্র সময়ের সাথে স্থানান্তরিত হয়, দক্ষিণাঞ্চলীয় উচ্চভূমিতে প্রাকধ্রুপদী সময় শুরু করে, ধ্রুপদী যুগে কেন্দ্রীয় নিচুভূমি হয়ে, পরিশেষে পোস্টধ্রুপদী যুগে উত্তরাঞ্চলীয় উপদ্বীপে পৌছায়। এই মায়া বিশ্ব ব্যবস্থা, অর্ধ-সীমান্তবর্তী (মধ্যস্থতার) মূল সাধারণত বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র আকারে গ্রহণ করে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যসমূহ হল তাদের ধর্মীয় কেন্দ্রে নির্মিত ধাপে ধাপে পিরামিড এবং তাদের শাসকদের সহগামী প্রাসাদসমূহ। কানকুয়েন প্রাসাদ মায়া এলাকায় সর্ববৃহৎ, কিন্তু এই স্থানে কোন পিরামিড নেই। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক অবশিষ্টাংশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত উত্কীর্ণ পাথর স্ল্যাব সাধারণত স্টালি বলা হয় (মায়া তাদেরকে তেতুন বা “গাছ পাথর” বলতো), যা তাদের বংশতালিকা, সামরিক জয়লাভ, এবং অন্যান্য নিষ্পাদনের বর্ণনাকারী চিত্রলিপির পাঠ্যর পাশাপাশি শাসকদের চিত্রিতও বর্ণনা করত।
মায়া সভ্যতা অন্যান্য মেসোআমেরিকান সংস্কৃতি, যেমন, কেন্দ্রীয় ও মেক্সিকোর উপসাগরীয়-উপকূলে টিয়োটিহকান, জাপোটেক, এবং অন্যান্য দলের সাথে দীর্ঘ দূরত্বের বাণিজ্য করতো। তারা মেসোআমেরিকান ছাড়াও আরও দূরবর্তী, যেমন, ক্যারিবিয়ার দ্বীপপুঞ্জের তাইনোস, অন্যান্য দলসমূহের সাথে বাণিজ্য ও পণ্য বিনিময় করতো। প্রত্নতাত্ত্বিকরা পানামার চিচেন ইৎজার সেক্রিড সেনোটা থেকে স্বর্ণ খুজে পেয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পণ্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল কোকো, লবণ, সমুদ্রখোসা, পাথরবিশেষ, এবং কাচের মতো দেখতে একজাতীয় আগ্নেয়শিলা।
৯০০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণের নিচুভূমিতে স্থিত নগররাষ্ট্রের অবলুপ্তি ঘটে এবং মায়ানরা এইসব অঞ্চল সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করে। তাদের এই উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল পরিত্যাগের কারণ আজ অবধি কোনও পুরাতাত্ত্বিক আবিষ্কার করতে পারেনি। তবে এই সময় থেকেই যে ধ্রুপদী যুগের শেষের সংকেত পাওয়া যাচ্ছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
মায়ার পতন
দক্ষিণাঞ্চলীয় নিচুভূমি অঞ্চলের মায়া কেন্দ্র ৮ম এবং ৯ম শতাব্দীতে পতন হয় এবং তারপর পরেই পরিত্যক্ত হয়। এই পতনটি স্মারক শিলালিপি এবং বড় ধরনের স্থাপত্য নির্মাণের একটি বিরতির মাধ্যমে ঘটে। এই পতনের সর্বজন গৃহীত তত্ত্বের ব্যাখ্যা তা দেয়। ৯২৫ খ্রিস্টাব্দের সময়ে বিখ্যাত মায়া নগররাষ্ট্র চিচেন ইৎজা খুবই প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। তারাই এই সময়ে মায়া সাম্রাজ্যের কার্যত রাজধানীতে রূপান্তরিত হয়ে আসে। পরবর্তী ২০০ বছর ধরে এটাই ছিল শ্রেষ্ঠতম মায়া শহর। এই সময়ে বিশ্ববিখ্যাত মায়ান পিরামিড চিচেন ইৎজাতে নির্মিত হয়।
মায়া পতনের পরিবেশদূষণহীন তত্ত্ব বেশ কয়েকটি উপবিভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, যেমন, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, বিদেশী আক্রমণ, চাষি বিদ্রোহ, এবং বিশেষ বাণিজ্য পথের পতন। পরিবেশগত অনুমানের মধ্যে পরিবেশগত দুর্যোগ, মহামারী রোগ, এবং জলবায়ু পরিবর্তন রয়েছে। মায়া জনগোষ্ঠীরা কৃষি সম্ভাবনাময় অবসাদ ও অতিরিক্ত প্রাণী শিকারের মাধ্যমে পরিবেশের বহন ক্ষমতা অতিক্রম করে ছিল বলে প্রমান রয়েছে। কিছু পণ্ডিত সম্প্রতি অনুমান করছে যে ২০০ বছরের একটি তীব্র খরা মায়া সভ্যতার পতনের কারণ। খরা তত্ত্বটি ভৌত বিজ্ঞানীরা লেক তলদেশ, প্রাচীন পরাগরেণু এবং অন্যান্য তথ্য অধ্যয়নের গবেষণা থেকে সম্পাদিত করেছেন, প্রত্নতাত্ত্বিক সম্প্রদায়ের থেকে উত্পত্তি তথ্য থেকে নয়। ২০১১ সাল থেকে নতুন গবেষণায়, উচ্চ-রেজল্যুশনের জলবায়ু মডেল এবং অতীতের প্রাকৃতিক দৃশ্য নতুন পুনর্গঠন ব্যবহারের মাধ্যমে বিবেচনা করা যায় যে, তাদের বনভূমিকে কেটে চাষাবাদের ভূমিতে রূপান্তরনের ফলে বাষ্পের হ্রাস পায় এবং পরে বৃষ্টিপাতের হ্রাস ও প্রাকৃতিক খরা বিবর্ধক ঘটে। ২০১২ সালে বিজ্ঞান প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, মাঝারি বৃষ্টিপাতের হ্রাস, বার্ষিক বৃষ্টিপাতের মাত্র ২৫ থেকে ৪০% পরিমাণ যা মায়া পতনের কারণ হতে পারে বলে চিহ্নিত করেছে। মায়ার প্রধান শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকার হ্রদ এবং গুহার তলানি উপর ভিত্তি করে, গবেষকরা অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নির্ধারণ করতে সহ্মম হয়েছে। ৮০০ এবং ৯৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সংঘটিত হালকা খরা দ্রুত খোলা পানির উপলব্ধতা যথেষ্ট কমিয়ে দেয়।
একটি স্টাল্যাগের খনিজ আইসোটোপ বিশ্লেষণের এই সিদ্ধান্ত উপর ভিত্তি করে একই পত্রিকায় আরও নথিপত্রে সমর্থন এবং প্রসাতিত করে। এটি আখ্যা দেন যে, ৪৪০ এবং ৬৬০ খ্রিস্টাব্দে উচ্চ বৃষ্টিপাতের ফলে মায়াকে প্রথম দৃষ্টান্তস্বরূপ বিকাশের অনুমতি দেওয়া এবং পরবর্তীতে হালকা খরা সময় ব্যাপক যুদ্ধবিগ্রহ ও মায়া সভ্যতার পতন নিয়ে আসে। ১০২০ এবং ১১০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে একটি দীর্ঘায়িত খরা হয় যা ছিল চরমভাবে প্রাণঘাতী।
পোস্টধ্রুপদী যুগ
এই যুগে প্রায় সব দক্ষিণাঞ্চলীয় নগররাষ্ট্রের পতন ঘটেছিল। মায়ারা দক্ষিণাংশ ছেড়ে উত্তরাংশে ইয়ুকাটান ও হন্ডুরাস অঞ্চলে চলে গিয়েছিল নতুন করে বাঁচতে। তারা এখানে অনেক নগররাষ্ট্রের উৎপত্তি ঘটিয়েছিল। মূলত উত্তরপূর্ব মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার ক্যারিবিয়ান সাগর অঞ্চলে মায়ারা বসবাস করতে শুরু করেছিল। ৯২৫ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত মায়া নগররাষ্ট্র চিচেন ইৎজা খুবই প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। তারাই এই সময়ে মায়া সাম্রাজ্যের কার্যত রাজধানীতে রূপান্তরিত হয়ে আসে। পরবর্তী ২০০ বছর ধরে এটাই ছিল শ্রেষ্ঠতম মায়ান শহর। এই সময়ে বিশ্ব বিখ্যাত মায়ান পিরামিড চিচেন ইৎজা নির্মিত হয়।
পদানুবর্তী পোস্ট ধ্রুপদী সময়ে (১০ম থেকে ১৬তম শতাব্দীর প্রারম্ভিক) উত্তরাঞ্চলীয় কেন্দ্রসমূহের উন্নয়ন অব্যাহত থাকে, যা বহিরাগত প্রভাব বৃদ্ধি বৈচিত্র্য দ্বারা চিহ্নিত করা যায়। ইয়ুকাটানের উত্তরাঞ্চলীয় নিচুভূমি অঞ্চলের মায়া শহরগুলো আরও কিছু শতাব্দী ধরে এর উন্নতি অব্যাহত থাকে, এই যুগের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহের মধ্যে রয়েছে চিচেন ইৎজা, উক্সমাল, এদযনা, এবং কোবা। ১২৫০ খ্রিস্টাব্দে চিচেন ইৎজাও মায়াদের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়। ১২৮৩ খ্রিস্টাব্দে এই সময়ে অনন্য মায়া নগররাষ্ট্র মায়াপান শহরের উৎপত্তি হয়। এই শহর একটা সংঘ গড়ে মায়া সাম্রাজ্যের অধিকর্তা হয়ে ওঠে। চিচেন ইৎজা এবং উক্সমাল ক্ষমতাসীন রাজবংশের পতনের পরে, ১৪৫০ সালের বিদ্রোহ শুরু না হওয়া পর্যন্ত মায়াপান সমস্ত ইয়ুকাটান শাসন করে। এই শহরের নামের শব্দের উৎস “মায়া” হতে পারে, যা ইয়ুকাটেক এবং ঔপনিবেশিক স্পেনীয় মধ্যে একটি ভৌগোলিক সীমাবদ্ধ অর্থ ছিল এবং শুধুমাত্র ১৯শ এবং ২০শ শতাব্দীতে তার বর্তমান অর্থে পৌঁছয়। ইয়ুকাটান স্পেনীয়দের দখলে না যাওয়া পর্যন্ত অঞ্চলটি প্রতিদ্বন্দ্বী শহর-রাজ্যের মধ্যে অধঃপতিত হয়েছিল।
“ধ্রুপদী যুগের পতনের” সময় ইত্জা মায়া, কেন্দ্রীয় পেতেনের ইয়ালাইনের ছোট সংখ্যক দল টিকে থাকে এবং ১২৫০ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী শহর-রাজ্য মধ্যে নিজেদের পুনর্গঠন করে। ইত্জা তাদের রাজধানী তায়াসালেই (এছাড়াও নোহ পেতেন নামে পরিচিত) রাখেন, এটি একটি প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট যা লেক পেতেন ইত্জাতে ফ্লোরেস, এল পেতেনের আধুনিক শহরের তলাচি বলে বিবেচনা করা হয়েছে। এটি পেতেন হ্রদ অঞ্চল জুড়ে প্রসারিত একটি এলাকা শাসন করেছে, যার মধ্যে লেক কুয়েসাইলে একিকসোলের সম্প্রদায়ও ছিল। যাকপেতেনে Ko’woj -দের রাজধানী ছিল। এছাড়াও পোস্টধ্রুপদী মায়া রাজ্য দক্ষিণাঞ্চলীয় উচ্চভূমিতে টিকিয়া থাকে। এই অঞ্চলে মায়া জাতির মধ্যে অন্যতম কি’কে’ কুমারকাজের রাজ্য, তারা সবচেয়ে বিখ্যাত মায়া ইতিহাস-রচনা ও পুরাণ পোপোল ভূহ কাজের জন্য অতি পরিচিত। অন্যান্য উচ্চভূমি সাম্রাজ্যের মধ্যে রয়েছে হুয়েহুয়েতেনাঙ্গো-তে মাম ভূমি, ইক্সিমকে-তে কাককিকেলস ভূমি, মেক্সকো ভিয়েজো-তে চাজোমা ভূমি, এবং সান মাতিও ইক্সতাতান-তে কুজ ভূমি। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে উত্তরাঞ্চলীয় ধ্রুপদী যুগ শেষ হয়ে আসে। কেননা স্পেনীয় ফ্রান্সিসকো হার্নান্দেজ দে কর্ডোবা ইয়ুকাটান উপদ্বীপে আসেন এবং তিনি তাদের সাথে বেশ কয়েকটা যুদ্ধ করে তাদের দুর্বল করে দেন।
ঔপনিবেশিক যুগ
তাদের এই অঞ্চলে প্রথম অভিযানের অল্পসময় পরে যে মায়ারা স্পেনীয় মুকুটের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিল তাদেরকে ক্রীতদাস করার প্রচেষ্টা আরম্ভ হয় এবং মায়া ইউকাটান উপদ্বীপ এবং গুয়াতেমালার পার্বত্য অঞ্চলের মধ্যে তাদের ঔপনিবেশিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করে। এই অভিযানকে, কখনও কখনও, “ইউকাটানের স্পেনীয় বিজয়” বলে আখ্যায়িত করা হত, যা সূত্রপাত থেকে দখলদারদের জন্য একটি সুদীর্ঘ এবং বিপজ্জনক অনুশীলন প্রমাণিত হয়। সমস্ত মায়া ভূমির উপর স্পেনীয় স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে সেখান কার শত শত হাজার আদিবাসি এবং প্রায় ১৭০ বছর সময় লেগেছে।
অভিজাত জীবন
একজন মায়া সম্রাট এবং অভিজাতদের জীবন অত্যন্ত সহজ ও বিলাবহুল ছিল। তাদের এমনকি জামাকাপড় ছাড়া কিছু বহনও করতে হত না। তাদের সব ভার বহন করত সাধারণ মায়া অথবা অন্যান্য জাতি হতে আগত ক্রীতদাসরা।
জীবনযাত্রা
একজন মায়া সাধারণ মানুষের যেমন কষ্টকর তেমনি কঠিন পরিশ্রমে ভর্তি ছিল। মজদুররা সাধারণত কৃষাণ হিসাবে জীবিকা নির্বাহ করত। তারা সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত কাজই শুধু করে যেত। তাদের বৌরা সাধারণত রান্নাবান্না এবং সেলাইয়ের কাজে ব্যস্ত থাকত। ছেলে মেয়ে মানুষ করাটাও তাদের অন্যতম কাজ ছিল। চাষিরা সারাদিন চাষাবাদ করার ফাঁকে দিনে একবারই মাত্র বাড়িতে ফিরে আসত; চান করে খেয়ে নেওয়ার জন্য। চান করাটা ছিল তাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। চান না করলে তারা খুবই অসুবিধা বোধ করত। অবশ্য চান করাটা শুধু চাষিরা নয় সব মায়ারাই করত। এটা তাদের সংস্কৃতির অঙ্গ বলে মনে করা হত।
পোশাক
পোশাক তাদের সামাজিক স্তরের প্রকারভেদ এর ওপরে নির্ভর করত। অভিজাতদের পোশাক ও সাধারণ মায়াদের পরিধেয় বস্ত্র এক ছিল না। যারা ধনী ও অভিজাত মায়া ছিল; তারা সাধারণত জন্তু জানোয়ারের চর্ম ও লোম হতে তৈরি বস্ত্র পরিধান করত। যা দেখতে যেমন রঙিন হত তেমনই ভারী হত। তারা মহামূল্যবান রত্ন ও সোনা দ্বারা সৃষ্ট গয়না পড়তে পছন্দ করত।
সাধারণ মায়ারা নেংটি পড়ে থাকত। গ্রীষ্মকালে খালি গায়ে থাকলেও শীতকালে পুরুষরা উর্ধ্বাঙ্গে পঞ্চো ধরণের পোশাক পড়ে থাকত। যা কম্বল দিয়ে তৈরি করা হত। মেয়েরাও একই পোশাক পরে থাকত।
তবে মেয়েরা লম্বা স্কার্ট গোছের পোশাক পড়ত। এদের উভয় লিঙ্গের পোশাকআশাক অনেকাংশে অ্যাজটেক সভ্যতার মতন ছিল। আরও দুটি বিষয়ে উভয় লিঙ্গের মধ্যে মিল ছিল। আর তা হল উভয়েই বিয়ের পরে গায়ে উল্কি মেরে রাখত নিজেদের বিবাহিত প্রমাণ রাখতে। এবং উভয়েই একই রকমের বিশাল কেশরাজি বহন করে রাখত।
খাদ্য
মায়াদের কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ আহার ছিল ভুট্টা বা মেইজে। তারা এই ভুট্টা দিয়ে সব রকমের খাদ্য তৈরি করে খেত। যেমন টর্টিলা, ডালিয়া এবং পনীর জাতীয় খাদ্য। এমনকি ভুট্টা পচিয়ে মদ তৈরি করে খেত। এছাড়া এরা আহার হিসাবে যেসব খাদ্যশস্য ও আমিষ গ্রহণ করত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল শিম, সব রকমের শুঁটি, স্কোয়াশ, লঙ্কা। এছাড়া হরিণ, হাঁস, বক, টার্কি এবং মাছ। মাছ তারা বেশী করে খেত বিশেষতঃ সমুদ্রের মাছ। তেলাপিয়া ছিল তাদের প্রিয় খাদ্য।
মায়াদের কাছ থেকেই বিশ্ব বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য উপহার পেয়েছে। যেমন, চকোলেট, টোম্যাটো, রাঙ্গালু, কালো শিম ও পেঁপে। চকোলেট তৈরি হত কাকাও গাছ থেকে। তারা মনে করত চকোলেট হল ঈশ্বরের অবদান। এবং চকোলেট যে গাছ থেকে উৎপন্ন হত; সেই কাকাওয়ের বীজকে তারা মুদ্রার বিকল্প রূপে ব্যবহার করত। যেমন আমরা এককালে সামুদ্রিক কড়িকে মুদ্রার বিকল্প রূপে ব্যবহার করতাম ওরাও সেইরকমই কাকাওয়ের বীজকে মুদ্রার বিকল্প রূপে ব্যবহার করত।
বাড়িঘর
অভিজাত ও সম্রাট এর আত্মীয় বর্গের দল শহরের মধ্যে নিখাদ গ্রানাইট পাথরের বাড়িতে বসবাস করতেন। তাতে বাগান বাড়ি ও বিরাট স্নানাগার থাকত। আর মায়া জনসাধারণ গ্রামে ক্ষেতের পাশে কুঁড়েঘর বানিয়ে থাকত। এইসব কুঁড়েঘর তৈরি হত এঁটেল মাটি দিয়ে তাই কোয়ালিটি দারুণ খারাপ ছিল। এইসব বাড়িতে ঘরের সংখ্যা ছিল মাত্র দুটি। এক, প্রার্থনা ঘর এবং রান্না ঘর এবং দুই শয়নকক্ষ এবং শৌচাগার। এইসব বাড়ির ছাদ পাম গাছের পাতা দিয়ে ছাওয়া থাকত। তবে কিছু কিছু মায়া সাধারণ মানুষ পাথরের বাড়িতে বসবাসও করত; তবে তাদের সংখ্যা ছিল অত্যল্প। তবে সব মায়ারাই মাটি থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে পাথর দিয়ে মাচা বানিয়ে তার উপরে বাড়ি বানাত। এতে বন্যার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যেত। কেননা অধিকাংশ মায়া নগররাষ্ট্র এবং সংলগ্ন অঞ্চল ছিল সমুদ্রতীরে। সেই জন্যই এমন সতর্কতা পালন করত। বিশেষতঃ ইউকাটায়েন উপদ্বীপ অঞ্চলে সর্বদাই সুনামি বা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস প্রায়ই আসত। সেই জন্যই এমন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল মায়া অঞ্চলে।
বিনোদন
যদিও মায়ারা অত্যন্ত কঠিন জীবনযাপন করত, তবুও তারা বিনোদন এর ব্যবস্থা করত; বিশেষতঃ ছুটির দিনে কিংবা ধর্মীয় দিবসের দিনগুলিতে। তারা নাচতে, গাইতে এবং খেলতে খুবই উৎসাহ পেত। অনেকেরই ধারণা তারা ছিল ভলিবল এর জনক।
কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য
মায়ারা ভাবত যে, মঙ্গোলিয়ানদের ন্যায় টানা চোখ, চওড়া কপাল এবং লম্বা ও বড় নাক সৌন্দর্যের প্রতীক। এর কোনওটাই না থাকলে সেই মায়া বিবাহের পক্ষে অযোগ্য বলে মনে হত। এইজন্য তারা অস্ত্রোপচার এবং সাজসজ্জা করে নাক বড় ও চোখ টানা করার ব্যবস্থা করত।
1. মায়ারা বড় বড় টুপি [অনেকটা বৈষ্ণবদের কানঢাকা টুপির মতন] ও দামী দামী অলঙ্কার পড়া পছন্দ করত, বিশেষ করে যারা অভিজাত তারা। যত উচ্চদরের অভিজাত ততই বড় মাপের টুপি পরিধান করত।
2. মায়ারা ইনকা বা অ্যাজটেকদের মতই লোহার ব্যবহার জানত না। এমনকি চাকার ব্যবহারও জানত না। তারা পাথরের তীক্ষ্ম অস্ত্র দিয়ে সব কাজ চালিয়ে নিত।
3. মায়ারা যে ভলিবল গোছের খেলা খেলত; তা কেবল ধর্মীয় উৎসবের দিনেই খেলত। এই খেলায় যে দল হারত, তারা দেবতার প্রতি উৎসর্গিত হত অর্থাৎ নরবলির শিকার হত!
4. মায়ারা অন্ততঃ ১১১ রকমের নৃত্যকলা জানত। এর মধ্যে প্রায় ১৫ রকমের নৃত্যকলা অদ্যাবধি প্রচলিত। এর মধ্যে বাঁদর নাচ, সাপ নাচ, স্ট্যাগ হরিণের নাচ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
মায়া সভ্যতার দ্রষ্টব্যস্থল এবং নগররাষ্ট্র
আগেই বলেছি যে, মায়ারা মেক্সিকোর বিভিন্ন স্থান জুড়ে বিভিন্ন নগররাষ্ট্রের মাধ্যমে এক বিশাল সাম্রাজ্য নির্মাণ করেছিল। প্রত্যেক শহর ছিল এক একটা নগররাষ্ট্র। প্রত্যেক নগররাষ্ট্রের চারপাশে কয়েকটা ছোট শহর বা বড় গ্রাম ঘিরে থাকত। তাদের খাজনায় চলত এইসব মায়া নগররাষ্ট্র। মায়ারা অবশ্য অ্যাজটেকদের ন্যায় পরিকল্পিত ও সুগঠিত নগররাষ্ট্র তৈরি করতে পারে নি। তাদের প্রবণতা ছিল যে, প্রথমে একটা মন্দির বানাবে তারপর তার আশপাশে কয়েকটা বড় গ্রাম বানাবে এরপর কয়েকটা বড় গ্রামের ঠিক মাঝখানে একটা বড় শহর বানাবে। এইভাবেই মায়া নগররাষ্ট্র তৈরি হত বলে তা ছন্নছাড়া প্রকৃতির হত। প্রত্যেক নগররাষ্ট্রের একেবারে মাঝখানে সূর্য মন্দির বানানোটা ছিল খাঁটি মায়া রীতি। টাইকাল, কোপায়েন, টেওটিহুয়াকান এবং চিচেন ইটজায় সূর্য মন্দিরের অসাধারণ নমুনা দেখা গিয়েছে। সব সূর্য মন্দির ছিল পিরামিড এর ন্যায়।
প্রত্যেক মায়া নগররাষ্ট্রে একটা করে স্থানীয় রাজা বা আহাও থাকতেন। তিনি বসবাস করতেন এক বিরাট রাজপ্রাসাদে। তার সাথে বিরাট রাজ পরিবারও ঐ রাজপ্রাসাদে থাকত। প্রত্যেক রাজপ্রাসাদের উত্তর প্রান্তে থাকত একটা বাণিজ্য কুঠি, বড় রাস্তা এবং দক্ষিণ প্রান্তে থাকত পিরামিড এবং কৃষিজমি। মায়া সাম্রাজ্যের সেরা কৃষিজমির ধারেই রাজপ্রাসাদের অবস্থান থাকত যাতে সেরা খাদ্য সম্রাটের কাছে দ্রুত পৌঁছে যেত।
এল মিরাডর [ঊষ গরৎধফড়ৎ] এল মিরাডর হচ্ছে প্রথমতম মায়া নগররাষ্ট্র। ভাবা হয় যে, যখন এই নগররাষ্ট্র উন্নতির সেরা স্থানে পৌঁছেছে; তখন শহরে বসবাস করত প্রায় ১০০০০০ মানুষ। শহরের মধ্যস্থল এর আয়তন প্রায় ৩.১২ স্কোয়ার কিলোমিটার [১.২০ স্কোয়ার মাইল] ছিল এবং এখানে প্রায় ১০০০ অট্টালিকা ছিল। পুরাতাত্ত্বিকরা এখানে তিনটে বিরাট আকৃতিসমপন্ন পিরামিডের খোঁজ পেয়েছেন। এই তিন পিরামিডের নাম হল যথাক্রমে; এল টাইগ্রে [১৮০ ফিট বা ৫৪.৯ মিটার উঁচু], লস মোনোস [১৫৭ ফিট বা ৪৭.৯ মিটার উঁচু] এবং লা ডানটা [২৫০ ফিট বা ৭৬.৫ মিটার উঁচু]। লা ডানটা পিরামিডকে আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম বলে ধরা হয়।
পুরাতাত্ত্বিকরা কার্বন আইসোটোপ পরীক্ষা থেকে অনুমান করেন এল মিরাডর মোটামুটি ৬০০ খৃষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ উদ্ভব হয়েছিল। সেখান থেকে এল মিরাডর খৃষ্টীয় প্রথম শতক অবধি টিকে ছিল। আর এই নগররাষ্ট্রের স্বর্ণযুগ ছিল আনুমানিক খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে দ্বিতীয় শতক নাগাদ। বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে এটাও অনুমান করা হয় মূল শহরটা ১৫০ খৃষ্টাব্দে পরিত্যাগ করে মিরাডরবাসীগণ অন্যত্র চলে যেতে শুরু করে। ৭০০ খৃষ্টাব্দে তারা অন্য জায়গায় অবশেষে বসবাস করতে শুর করে। কোর্টেজ এবং তার সাথীরা এই শহরকে পরিত্যক্ত অবস্থাতেই দেখেছিল বলে জানা গেছে।
কামিনালজুয়ু
গুয়াটেমালা উচ্চভূমি এবং দক্ষিণ মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী এলাকায় ছিল বিখ্যা মায়া নগররাষ্ট্র কামিনালজুয়ু। বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রমাণ হতে এটা আন্দাজ করা হয় এই নগররাষ্ট্রের আয়ু ছিল প্রায় ২০০০ বছর। অর্থাৎ ১২০০ খৃষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৯০০ খৃষ্টাব্দ অবধি এই কামিনালজুয়ু নগররাষ্ট্র টিকে ছিল। তারপর এই শহর পরিত্যক্ত হয় এল মিরাডর শহরের মতই।
টাইকাল
টাইকাল ছিল মায়া সভ্যতার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও প্রভাবশালী নগররাষ্ট্র। এই নগররাষ্ট্রের উৎপত্তি ঘটে মায়া ধ্রুপদী যুগে। অর্থাৎ ২৫০ খৃষ্টাব্দ থেকে ৯০০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে এই শহর শক্তিশালী নগররাষ্ট্র হিসাবে গণ্য ছিল। এই শহর আয়তনে অন্য মায়া শহরের তুলনায় অনেক ছোট ছিল [মোট আয়তন ১ স্কোয়ার মাইল বা ২.৫ স্কোয়ার কিলোমিটার ছিল] এবং এই শহরে শতাধিক বড় মাপের অট্টালিকা ছিল। তবে টাইকাল শহরে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য ছিল ছয়টি পিরামিড। যা যে কোনও মায়া শহরের তুলনায় বেশী। এর মধ্যে চতুর্থ পিরামিডটি [ ৬০০ খৃষ্টাব্দে নির্মিত] ছিল বৃহত্তম পিরামিড। এর উচ্চতা ছিল ২৩০ ফিট বা ৭৬.২৫ মিটার। টাইকাল শহরে তার স্বর্ণযুগে মোট বাসিন্দার সংখ্যা ছিল ৬০০০০ থেকে ৭৫০০০ এর মধ্যে। ১৯৭৯ খৃষ্টাব্দে এই ঐতিহাসিক নগররাষ্ট্র ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পায়।
টেওটিহুয়াকান
টেওটিহুয়াকান শহরের আয়তন ও জনসংখ্যা ছিল অন্যান্য মায়া নগররাষ্ট্রের তুলনায় বেশ কম। তবে বাণিজ্যনগরী হিসাবে এর গুরুত্ব ছিল অসীম। মধ্য মেক্সিকো উপত্যকায় এই নগররাষ্ট্র অবস্থিত ছিল। অনেকেই বলেন এটি একটি টল্টেখ [ঞড়ষঃবপ] নগর, মায়া নগররাষ্ট্র নয়। মেক্সিকো সিটি হতে ৩০ মাইল বা ৪৯.৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই মহান নগররাষ্ট্র। এই নগরের মোট আয়তন ছিল ৮ স্কোয়ার মাইল বা ২১ স্কোয়ার কিলোমিটার। মায়া সংস্কৃতিতে এই নগররাষ্ট্রের প্রচুর অব্দান আছে। এখানে বেশ কিছু বৃহৎ অট্টালিকা ছিল যার মধ্যে চন্দ্রদেবের পিরামিড ও সূর্যদেবের পিরামিড। এখানে ১৫০০০ বাসিন্দা এই নগররাষ্ট্রের স্বর্ণযুগে বসবাস করত বলে জানা গেছে।
খারাখোল
আনুমানিক ২৫০ খৃষ্টাব্দে খারাখোল শহর এর উৎপত্তি হয়েছিল টাইকাল শহরের যমজ শহর হিসাবে। ঠিক অনেকটা কলকাতা-হাওড়া শহরের মতন। বর্তমানে বেলিজে রাষ্ট্রের রাজধানী বেলিজে শহরের কায়ো জেলায় অবস্থিত। ৬০০ খৃষ্টাব্দে এই শহর টাইকাল এর করদ রাজ্যের তকমা ঝেড়ে স্ববলে মহীয়ান হয়ে ওঠে। অর্থাৎ টাইকাল শহরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। এই শহর আজকের বেলিজে শহরের চেয়ে আকারে ও আয়তনে বড় ছিল। এর আয়তন ছিল আনুমানিক ২০২.৩ স্কোয়ার কিলোমিটার বা ৭৮.১ স্কোয়ার মাইল ছিল। এইভাবেই খারাখোল হয়ে ওঠে মায়া সভ্যতার অন্যতম বৃহত্তম নগররাষ্ট্র। এখানে এর স্বর্ণযুগে প্রায় ২০০০০০ মানুষ খারাখোল শহরে বসবাস করত।
চিচেন ইটজা
চিচেন ইটজা উত্তর ধ্রুপদী যুগের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী মায়া নগররাষ্ট্র ছিল। এখানে বহু বিখ্যাত একশিলাস্তম্ভের স্থাপত্য ছাড়াও অট্টালিকা ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল এল কাস্টিল্লো, গ্রেট বল কোর্ট, যোদ্ধাদের মন্দির ইত্যাদি। নীচে এইসব বিখ্যাত স্থাপত্যের বিবরণ দেওয়া হল ঃ
এল কাস্টিল্লো ঃ এক বিশাল পিরামিড যা নির্মিত হয়েছিল মায়া দেবতা কুকুল্কানের উদ্দেশ্যে। এই পিরামিড ৯৮ মিটার [৩২১ ফিট] উচ্চতাসমপন্ন। এই পিরামিড আনুমানিক খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে নির্মিত হয়েছিল। এই পিরামিডের প্রত্যেক প্রান্তে মোট একানব্বইটি ধাপ ছিল এবং একেবারে ওপরে আয়তক্ষেত্রাকৃতির ভবন ছিল আসলে ৩৬৫টি ধাপ মিলিয়ে এই পিরামিড গড়া হয়েছিল। অর্থাৎ একটা সিঁড়ির ধাপ এক পার্থিব দিনকে বোঝাত।
গ্রেট বল কোর্ট ঃ এটা ছিল বিখ্যাত মায়ান ভলিবল গোছের খেলার মাঠ। এই মাঠ লম্বায় ৫৫১ ফিট এবং ২৩০ ফিট চওড়া ছিল। সব মিলিয়ে মাঠের মোট আয়তন ছিল ১২৬৭৩০ স্কোয়ার ফিট বা ১১৭৭৩ স্কোয়ার মিটার। মাঠের চারপাশে থাকা দেওয়ালের উচ্চতা ছিল ২৬ ফিট বা ৭.৯ মিটার। উত্তরের দেওয়ালের ওপারে ছিল জাগুয়ার দেবতার মন্দির।
যোদ্ধাদের মন্দির ঃ এটাও একটা পিরামিড ছিল।এর গঠন অনেকটাই চিচেন ইটজার ন্যায় ছিল। তবে সিঁড়ির ধাপ ৩৬৪ এর স্থলে ছিল ২০০ টি। অর্থাৎ চার প্রান্ত থেকে ৫০টি করে ধাপ গঠিত ছিল।
কোপায়েন
এটি একটি মায়া নগররাষ্ট্র, যা কিনা বর্তমান হন্ডুরাস রাষ্ট্রে অবস্থিত। এই শহরের পূর্বপ্রান্তে রয়েছে কোপায়েন নদী। এই ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর হন্ডুরাসের সান্টা রোজা ডে কোপায়েন শহর হতে ৩৫ মাইল বা ৫৬ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। এই শহর বিখ্যাত ছিল জ্যোতির্বিদ্যার এবং সাংস্কৃতিক কারণে। খৃষ্টীয় নবম শতকে এই শহরের মোট বাসিন্দা ছিল ২০০০০ এর বেশী। এখানে বহু একশিলাস্তম্ভ দ্বারা সৃষ্ট অতিকায় গ্রানাইট পাথরের মূর্তি, দুটি পিরামিড এবং বল কোর্ট ছিল এই ঐতিহাসিক নগরীতে। মায়ারা আনুমানিক ৩০০ খৃষ্টাব্দে এই শহরের পত্তন করে এবং ১২০০ খৃষ্টাব্দে এই শহর সমপূর্ণভাবে পরিত্যাগ করে। ১৯৮০ খৃষ্টাব্দে এই শহর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে রূপান্তরিত হয়। এর বার্ষিক আগত পর্যটকদের সংখ্যা আনুমানিক ৭ লাখ।
পালেংখুয়ে
কোপায়েন শহরের মতই আরেক বিখ্যাত মায়া নগররাষ্ট্র ছিল এই পালেংখুয়ে। ১৯৫২ খৃষ্টাব্দে জনৈক মার্কিন ইতিহাসবিদ আজকের মেক্সিকোর চিয়াপাস রাজ্যে সমুদ্রের ধারে এক ম্যাংগ্রোভ অরণ্যের মধ্যে এই ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরী আবিষ্কার করেন। এই নগরী অনেক অসাধারণ স্থাপত্যের জন্য বিশেষ স্মরণীয়। এর মধ্যে চারতলা ময়দান, একটি পিরামিড, একটি দুর্গ, দুটি ভুলভুলাইয়া এর জন্য প্রসিদ্ধ।। কেননা আর কোনও মায়া শহরে ভুলভুলাইয়া নেই। তবে পালেংখুয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য হল শিলালিপির মন্দিরের [বষ ঃবসঢ়ষড় ফব ষধ রহংপৎরঢ়পরষ্টহ] জন্য। এই মন্দিরকে বলা হয় সবচেয়ে সুন্দর মায়া মন্দির। এই মন্দিরের ভেতরে বিচিত্র সব শিলালিপি এবং নকশা অঙ্কিত রয়েছে। তবে সবচেয়ে স্মরণীয় নকশা হল এক মহাকাশযাত্রীর। হাজার বছর আগে তো মহাকাশযাত্রী কেমন দেখতে তা ধারণা ছিল না পৃথিবীর বাসিন্দাদের। তবে কেমন করে রকেটে চাপা ঐ মহাকাশযাত্রীর নকশা আঁকল পালেংখুয়ের বাসিন্দারা? নাকি ওটা কোনও দেবতার চিত্র ছিল? এরিক ভন ডানিকেন বলেন দুটিই ঠিক উত্তর। এটা একদিকে দেবতার চিত্র এবং অন্য দিকে মহাকাশযাত্রীর চিত্র। এর চেয়ে কোনও নিখুঁত প্রমাণ আর নেই যে দেবতারা আসলে অন্য গ্রহের মানুষ। মায়া ৬০০ খৃষ্টাব্দে এই শহরের পত্তন করেছিল কিন্তু ১১০০ খৃষ্টাব্দ নাগাদ শহর পরিত্যাগ করে চলে যায়। পাশের চিত্রে পালেংখুয়ের বিখ্যাত শিলালিপির মন্দির [ঞযব ঞবসঢ়ষব ড়ভ ঃযব ওহংপৎরঢ়ঃরড়হ] দেখা যাচ্ছে।
উক্সমাল
দক্ষিণপূর্ব মেক্সিকোর ইউকাটায়েন রাজ্যে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক মায়া নগররাষ্ট্র। আনুমানিক ৬৫০ খৃষ্টাব্দে এই শহরের নির্মাণকার্য শুরু হয় এবং ১০০০ খৃষ্টাব্দ নাগাদ শহরের নির্মাণকার্য অসমপূর্ণ রেখে শেষ করে দেওয়া হয়। এই নগররাষ্ট্র মায়াপান সাম্রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী মিত্র রাষ্ট্র ছিল। যখন মায়াপান নগররাষ্ট্রের পতন হয়; তখন অন্যান্য উত্তরের মায়া নগররাষ্ট্রের মতই আনুমানিক ১৪৫০ খৃষ্টাব্দে উক্সমাল পরিত্যক্ত হয়। এখানে যাদুকরের পিরামিড, কচ্ছপের রাজপ্রাসাদ ও চতুষ্কোণীয় ময়দান ছিল।
মায়া নগররাষ্ট্রের সমপর্কে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য
বেশীর ভাগ মায়া শহরে টুরিস্টরা নিয়মিত ভ্রমণ করেন। এর মধ্যে চিচেন ইটজা আর টাইকাল সবচেয়ে জনপ্রিয়। এই দুটোই ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত।
1. প্রতি বছর ১২ লাখ টুরিস্ট চিচেন ইটজায় আসেন। এর মধ্যে ১০ লাখের বেশী টুরিস্টই ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসেন। টাইকালে বার্ষিক টুরিস্টদের সংখ্যা ৯ লাখের আশপাশে বলে জানা গেছে।
2. পুরাতাত্ত্বিকরা সব মিলিয়ে ১৩ টি গ্রেট বল কোর্টের ঢঙে বানান খেলবার মাঠ খুঁজে পেয়েছেন চিচেন ইটজা নগররাষ্ট্রের কাছে।
3. অন্যান্য মায়া শহরের মধ্যে প্রধান হল খোবা , উক্সমাল, মায়াপান, টুলুম , পালেংখুয়ে এবং কাবাহ।
4. পালেংখুয়ে এককালে স্প্যানিশদের কাছে সিউডাড লা রোজা বা লোহিত নগরী নামে পরিচিত ছিল। কেননা এই শহরের সব অট্টালিকার বহিরঙ্গ ছিল লাল রঙে রঞ্জিত। এই কারণেই এমন নাম পেয়েছিল পালেংখে।
5. টাইকাল নগররাষ্ট্রের প্রধান অনেক ক্ষেত্রে নারী হয়েছেন। বেশ কিছু রাজার নাম বেশ মজাদার যেমন; জাগুয়ারের থাবা, কুঞ্চিত মুন্ডু, রক্ষিত খুলি এবং জোড়া পাখি। এমন বিচিত্র নামকরণের কারণ অদ্যাবধি জানা যায় নি।
অঙ্কন
অনেকেই বিবেচনা করে মায়া শিল্প প্রাচীন যুগের (সি. ২৫০ থেকে ৯০০ এ.ডি.), প্রাচীন নতুন বিশ্বের সর্বাপেক্ষা সফিস্টিকেট এবং সুন্দর শিল্প হইবে। অতীতের অনেক সভ্যতার মত, মায়ার জনগণরা অন্যান্য কেন্দ্রীয় আমেরিকার লোকদেরমত ভাস্কর্য এবং রঙিন ভবন ব্যবহার করার বৈশিষ্ট্য ছিল। বিভিন্ন মন্দিরের কবর গুলোর ভিতর কম্পন সজ্জিত এবং প্রাসাদ গুলোতে খাটি গাঢ় লাল, মেঝেতে নীল। বিষয়বস্তু: গায়করা, নর্তকীরা, মহিলাদের ছাতার সঙ্গে সেবীকা যারা পাখির পালকের দিয়ে ঢাকা ছিল, জলজ প্রাণী বৈশিষ্ট মুখোস, উৎসবের ধর্মযাজকরা এবং প্রভুরা, শাসনকর্তারা এবং মহৎ উদার হ্মমতা সম্পূর্ণ শহর গুলোর, মহিলা নাপিতদের, দেবতার মুখোস, যুদ্ধারা, জীবন থেকে মৃত্যুতে পরিবর্তনের, জয়লাভ উদযাপনের, ধর্মের প্রথাপদ্ধতি গুলোর, হিংসার এবং মানবিক উৎসগের দৃশ্য, সাপের, জাগুয়ারের। সর্বাপেক্ষা এক লক্ষণীয় মায়ার শিল্পসম্মত দানের, দ্বিধা ছাড়া আঁকা নির্দিষ্ট বক্রতা, একটি ধারণা প্রসুত যে অনেক দৃশ্যতে এশিয়ার অঙ্কন। প্রাচীন কালে ৫৫০-৯০০ এ.ডি. এর মধ্যে ভাস্কর্য বিকশিত হয়েছিল কোন বাহ্যিক প্রভাব ব্যতীত, এবং খুব সচ্ছল ছিল। আমাদের কেবল প্রাচীন মায়ার উন্নতির আভাসের চিত্র রয়েছে; বেশির ভাগ যা মৃত্যুর পরও বেচে থেকেছে এবং অন্যান্য মায়া মৃৎশিল্প, এবং তে একটি ভবনের প্রাচীন দেওয়াল গুলোতে অঙ্কন ধরে রেখে সুযোগে বেচে থেকে ছিল। একটি সুন্দর বৈষর্য নীল রং যে শতকের মধ্য দিয়ে বেচে থেকেছে তার এক রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের দরুন যা মায়া নীল অথবা হিসেবে জেনেছে, এবং এইটি বৃদ্ধমান তে এবং এমনকি কিছু ঔপনিবেশিক আশ্রমে। মায়া নীলের ব্যবহার কার্যকরী থেকে ১৬ শতক পর্যন্ত যখন কৌশলটি হারিয়ে যায়।
জ্যোতির্বিদ্যা
বৈশিষ্ট্যযুক্তভাবে, সেখানে কিছু প্রমাণ আবির্ভূত হয় যা মায়াকে মনে হয় কেবল অদ্বিতীয় প্রে-টেলেস্কোপিক সভ্যতা যাদের ওরিয়ন নীহারিকার অস্পষ্ট জ্ঞান দেখা যায়, যা একটি পিন-পয়েন্ট নাহ্মত্রিকা না। তথ্যটি যে তত্ত্বটি ধরে রাখে তা আসে লোকদের একটি গল্প থেকে, সে আকাশের ওরিয়ন তারামণ্ডলীর অঞ্চলের দেখা-শোনা করতো। তাদের ঐতিহ্যবাহী ঘর একটি ঝাপসা দাগসহ উত্তপ্ত আগুনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত যা ওরিয়ন নীহারিকার অনুরুপ। এইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ধারণা সমর্থন করে যা দূরবীক্ষণ আবিস্কারের পূর্বে মায়ারা আকাশের তারকার একটি পরিব্যাপ্ত অঞ্চল পিন-পয়েন্টতে সনাক্ত করেছিল।
মায়ারা জ়েনিয়াল প্রস্থান গুলোতে খুব কৌতূহলী ছিল, যখন সূর্য সরাসরিভাবে মাথার উপর দিয়ে যায়। তাদের নগরীর বেশির ভাগ অক্ষাংশ কর্কটক্রান্তির নিচে হওয়ায, এই প্রকৃত প্রস্থান গুলো নিরহ্মরেখার উপর থেকে সমান দূরত্ব এক বছরে দুইবার ঘটাবে। সূর্য মাথার উপরের এই অবস্থানটি প্রতিনিধিত্ব করতে, মায়ার একটি দেবতা ছিল যার নাম দেবতা ডাভিইং ।
ড্রেসডেন কোডেক্স ধারণ করে উচ্চতম ঘনত্বের জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক পর্যবেক্ষণ এবং যে কোন জীবন্ত বিষয় সমূহ নির্ণয় করে (এইটি আবির্ভূত হয় যে এই কোডেক্সতে তথ্য মূলত অথবা আসলে একটি প্রকৃতির জ্যোতির্বিদ্যা)। এই কোডেএক্সের পরীক্ষা এবং বিশ্লেষণে প্রকাশ করে যে শুক্রের জ্যোতির্বিদ্যা মায়ার কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, এমনকি সূর্যের চেয়ে তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
গণিত
মেক্সিকানের অন্যান্য সভ্যতা গুলোর সাথে মায়া সভ্যতার মিল হলো, মায়া ব্যবহার করতো একটি ২০ ভিত্তি সংখ্যা এবং ৫ ভিত্তি সংখ্যা (মায়া সংখ্যা দেখুন) পদ্ধতি। তা ছাড়াও, প্রেক্লাসিক মায়া এবং তাদের প্রতিবেশীদের ৩৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে শূন্যের ধারণা স্বাধীনভাবে ক্রমবিকাশিত করেছিল। তাদের লেখা হতে বুঝা যায় যে তারা কাজ উপর ভিত্তি করে লাক্ষ লাক্ষ অংকের হিসাব করতো এবং তারিখ গুলো এতো বড় হতো যে তা শুধু লিখতে অনেক লাইনের দরকার হবে। তারা খুব নির্ভূল ভাবে জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ করেছিল; তাদের নকশায় চাঁদ এবং অন্যান্য গ্রহগুলোর পর্যায়কাল সমান অথবা অন্যান্য সভ্যতার খালি চোখে পর্যবেক্ষকগণদের থেকে উন্নত ছিল।
মেক্সিকানের অন্যান্য সভ্যতা গুলোর সাথে মায়া সভ্যতার আরও মিল হলো, মায়া সঠিক এবং নির্ভুলতার সাথে সৌর বছরের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করেছিল। ইউরোপীয়নরা যে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিকা ব্যবহার করতো তার চেয়েও অনেক বেশি সঠিক এবং নির্ভুল ছিল। যাইহোক; তারা যে অপরিণত বর্ষপঞ্জিকা ব্যবহার করেছিল, এটি ভিত্তি করা হয়েছে এক বছর যথাযথভাবে ৩৬৫ দিন, এর অর্থ এই যে বর্ষপঞ্জিকা প্রতি চার বছরে এক দিন বৃদ্ধি পায়। জুলিয়ান বর্ষপঞ্জিকা ব্যবহার হতো ইউরোপে রোমানদের সময় থেকে ১৬ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত। প্রতি ১২৮ বছরে কেবল এক দিনের ত্রুটি জড়িত হয়েছিল। আধুনিক গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিকা আরও বেশি নির্ভূল, প্রায় ৩২৫৭ বছরে কেবল এক দিনের ত্রুটি জড়িত হচ্ছে।
সময়
অতীতের একটি অপরিবর্তনীয় বিন্দু থেকে মায়ার ইতিহাস গণনা করা হয়েছিল। যেমন, খ্রিস্টান ধর্মের অংশ হচ্ছে যিশুর জন্ম, গ্রিকের প্রথম অলিম্পিক গেমস এবং রোমান সাম্রাজ্যের জন্মের রোম থেকে। তাদের বর্ষপঞ্জিকার একটি তারিখ নির্দিষ্ট করা হয়েছে (দীর্ঘের পরিমাণ), অনুবাদ করা হয়েছিল ৩১১৪ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ হিসেবে, সম্ভবত পরস্পর সম্পর্কযুক্ত একটি কাল্পনিক ঘটনাতে যেমন একটি ভীষণ বিপর্যয়ের পরে একটি নতুন বিশ্বের সৃষ্টি। খ্রীষ্টান যুগের আগের শতক থেকে, তাদের পুরোহিত জ্যোতির্বিজ্ঞানী নির্ভুলতার সঙ্গে চন্দ্র, সূর্যের গ্রহণ এবং শুক্রের কক্ষ পথ সম্পূর্ণভাবে নির্দিষ্ট করতে পারতো।
বর্ষপঞ্জিকা
K’in হল মায়া বর্ষপঞ্জিকার একটি সময় যা একটি দিনের অনুরুপ; আর উইনাল (মাস) হল মায়া বর্ষপঞ্জিকার একটি চক্র যা ২০ দিনের একটি পর্যায়কাল সংশ্লিষ্ট হয়। ১৮ উইনাল হল ১ হাব (বছর) এর একটি চক্র যা ৩৬০ দিন বুঝায়। এগুলোর সাথে যোগ করা হয়েছিল ৫ দিন যা ওয়েব ডাক হতো। এই ৫ দিনকে তারা বিশেষভাবে অমঙ্গলজনক হিসাবে বিবেচনা করা হতো। এই ৫ দিন যোগ করে ৩৬৫ দিনের একটি বর্ষপঞ্জিকার ঋতু চক্রে সংযোগ করা হয়েছিল। বর্ষপঞ্জিকা গঠন করা হয়েছিল ২০ দিনের ১ “মাস” আর ১৯ মাসে ১ বছর। মাসগুলোর নাম হলঃ
মাস অর্থ
১ Pop মাদুর
২ Wo কাল যুক্তাক্ষর
৩ Sip লাল যুক্তাক্ষর
৪ Sotz’ বাদুড়
৫ Sek ?
৬ Xul কুকুর
৭ Yaxk’in নতুন সূর্য
৮ Mol জল
৯ Ch’en কাল ঝড়
১০ Yax সবুজ ঝড়
১১ Sak সাদা ঝড়
১২ Keh লাল ঝড়
১৩ Mak পরিবেষ্টিত
১৪ K’ank’in হলদে সূর্য
১৫ Muwan পেঁচা
১৬ Pax গাছ লাগানোর সময়
১৭ K’ayab’ কচ্ছপ
১৮ Kumk’u শস্যভান্ডার
১৯ Wayeb’ অমঙ্গলজনক ৫ দিন
তাদের একটি গৌণ বর্ষপঞ্জিকার উপরে চেইন দিয়ে বেধে দেওয়া হয়েছিল, যেটি ধর্মীয় প্রথা উদ্দ্যেশ্যের জন্য ব্যবহার করা হতো এবং দেবতদের জন্য ২৬০ দিনের একত্র করে একে গঠন করেছিল, ২০ দিনের ১ “মাস” আর ১৩ মাসে ১ বছর এবং ৫২ বছর ১ শতাব্দী ছিল। এক K’atun ২০ বছর, ৩৬০ দিনের একটি চক্র যা পুনরাবৃত্তি হতো তাৎপর্য্য ব্যতীত। ২০ বছরের শুরুতে অথবা প্রান্তে K’atun প্রতিনিধিত্ব করতে গুরুত্বপূর্ণ প্রধান নগরীগুলো নির্মিত করা হয়েছিল। দিন, মাস এবং ঋতুর চিরস্থায়ী প্রবাহের তালগুলো একটি অলৌকিক ঘটনা যা প্রতি সূর্যদয় এবং প্রতি সূর্যাস্ত মায়াদের ধাক্কা দিতো একটি গভীর পবিত্রে। প্রতি ভাবভঙ্গী, প্রতি মানবিক ক্রিয়াকর্ম তার আর্দশের চিহ্ন হয়েছিল যা দিন তার সাথে আন্তো, সূর্যের প্রকৃতিগুলো যা প্রত্যেক ভোরে নরকের রাজ্য থেকে আসে স্বর্গ পৌঁছতে।
লিখনপদ্ধতি
মায়া একমাত্র প্রচীন কলম্বীয় সভ্যতা যা রেখে গিয়েছে অনেক উৎকীর্ণলিপি। একটি বড় পরিমাণ মায়ার উৎকীর্ণলিপি নহ্মত্রদের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এবং ইতিহাস তাদের এই তথ্যগুলোর ধারণের সাহ্মী। মায়া লিখন ছিল একটি , যেটিতে প্রত্যেক চিহ্ন বা বর্ণ, নিজে থেকেই প্রতিনিধিত্ব করতে পারতো এক একটি শব্দ বা অর্থের প্রকাশ। নির্দেশ করতে পারতো একটি শব্দের উচ্চারণের কন্ঠস্বর। অতি প্রাচীন মায়া লেখার সময় কাল সনাক্ত করা হয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব ২০০-৩০০ শতাব্দীর প্রথম দিকে। মায়ারা একটি ভাষা লেখার ব্যবহার শিখার আরম্ভের সময় ধরে খ্রীষ্টান যুগের প্রথম দিকে ফিরে যাওয়া যায়। এইটি প্রাচীন কলম্বিয়ার নতুন বিশ্বের একমাত্র লিখন পদ্ধতি, যেটি এ সম্প্রদায়ের কথ্য ভাষা সম্পূর্ণভাবে বর্ণনা করে। মোট, এক হাজার চেয়েও বেশি আলাদা বর্ণ লিপি রয়েছে, যদিও কয়েকটি একই চিহ্ন অথবা অর্থের পরিবর্তনশীলতা আছে এবং অনেক গুলোকে দূলর্ভ মনে হয় অথবা বিশেষ স্থানে সীমাবদ্ধ করা হয়। যে কোন সময়ে, প্রায় ৫০০ টির চেয়ে বেশি বর্ণ ব্যবহার হত না, এগুলোর মধ্যে প্রায় ২০০ টি ধ্বনি অথবা শব্দের (পরিবর্তনশীলতা সহ) অনুবাদ করা হয়েছিল।
লেখার সরঞ্জাম
যদিও প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ড কোনো দৃষ্টান্ত না দিলেও মায়ার শিল্পে দেখা যায় যে, তারা পশুর চুল বা লোম দ্বারা তৈরি তুলী এবং পাখির পালক দ্বারা তৈরি কলম দিয়ে লেখাতো। লেখতে তারা সাধারণত কালো কালিতে কোডেক্স-স্টাইলের সঙ্গে লাল কালিতে গাঢ় করা হতো। মায়া অঞ্চলের অ্যাজটেক স্থানকে নাম দেওয়া হয়েছে “লাল এবং কালোর জমি” হিসেবে।
সাক্ষরতা
মায়ার আদালতগুলোতে লেখকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখে ছিল। মায়া শিল্পে প্রায়ই ছবির অঙ্কন গুলোতে নিদের্শনা করতো তারা লেখক অথবা অন্তত লিখতে সক্ষম। তা ছাড়া, অনেক শাসকদেরকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে যারা লিখার সরঞ্জামের সঙ্গে যুক্তা করেছে খোসা অথবা কাদা কালি। যদিও লোগোগ্রামসের সংখ্যা এবং সঙ্কেতের চিহ্নগুলো সম্পূর্ণভাবে শতকের ভাষা লেখতে প্রয়োজন বোধ হতো, সাক্ষরতা অভিজাত শ্রেণীর প্রয়োজনীয় ভাবে বহুবিস্তৃত ছিল না। গ্রাফফিট বিভিন্ন প্রসঙ্গগুলোতে উম্মুক্ত ছিল, রান্নার কাজসহ, লিখন পদ্ধতি আনুকরণেতে অর্থহীন প্রচেষ্টায় দেখায়।
মায়াদের দেবতা ও পুরাণ
মায়াদের জীবনযাত্রায় এমন কোনও দিক ছিল না যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রয়োগ ছিল না। তারা এতটাই ধর্মবিশ্বাসী ছিল মতান্তরে ধর্মান্ধও বলা যেতে পারে। তারা ঈশ্বরের ভয়ে সর্বদাই ভীত ছিল। অধিকাংশ পুরাতাত্ত্বিক মায়া ধর্ম সম্বন্ধে জেনেছেন তাদের দ্বারা লিখিত পুরাণ আর শিলালিপি হতে। বিশেষতঃ পালেংখুয়েতে অবস্থিত শিলালিপির মন্দির থেকে। সেখানে বেশ কিছু পাথুরে এবং পোড়ামাটির পুঁথি হতে তাদের ধর্মবিশ্বাস সম্বন্ধে প্রচুর তথ্য পাওয়া গিয়েছে। এইসব মায়ান পুঁথিকে বলা হয় কোডেক্স। এর মধ্যে বিখ্যাততম জীবিত মায়া কোডেক্স হল প্যারিস কোডেক্স, মাড্রিড কোডেক্স এবং ড্রেসডেন কোডেক্স। ড্রেসডেন কোডেক্স সাধারণভাবে পোপোল ভুহ নামে পরিচিত। এই কোডেক্স মায়ান ভাষা খুইচ্যে এবং স্প্যানিশ লিপিতে লেখা হয়েছিল। সম্ভবতঃ ১৫৫৪ থেকে ১৫৫৮ খৃষ্টাব্দে এই মহামূল্যবান কোডেক্স তৈরি করা হয়েছিল জাগুয়ারের চামড়ার ওপরে। এতে সব মায়া সম্রাটের বংশলতিকার তালিকাও ছিল। জনৈক গুয়াটেমালান স্প্যানিশজাত ক্যাথলিক পুরোহিত ফ্রান্সিস্কো জিমেয়নেজ আবিষ্কার করেন ১৭৮৭ খৃষ্টাব্দে।
মায়া দেবতা
মায়ারা হিন্দুদের মতই বহু দেবতায় বিশ্বাস রাখত। তবে তার মধ্যে সামান্য কিছু দেবতা অন্যান্য দেবতার চেয়ে বেশী গুরুত্ব, সম্মান ও মর্যাদা পেতেন মায়া জনসাধারণের কাছে। এরা যেমন শক্তিশালী ছিলেন তেমনই ছিলেন রাগী।
ইটজাম্না ঃ মায়াদের কাছে সম্ভবতঃ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেবতা ছিলেন এই ইটজাম্না। মায়াদের কাছে ইনিই ছিলেন সৃষ্টির দেবতা। অনেকটা ইনকাদের ভিরাকোচার মতই। মায়া পুরাণ অনুসারে তিনিই এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা। তিনিই নাকি দিন এবং রাত্রির সৃষ্টি করেছেন। মায়ারা বিশ্বাস করত যে তিনি স্বর্গের দেবতা। তারা এটাও বিশ্বাস কোর্ট যে, এই ইটজাম্নাই তাদে লিখতে ও দিনপঞ্জী তৈরি করতে শিখিয়েছেন। মায়ান ভাষায় ইটজাম্না শব্দের অর্থ টিকটিকির বাড়ি। চিচেন ইটজার পিরামিড এই দেবতার সম্মানে গঠিত হয়েছিল।
কুকুল্কান ঃ হিন্দুধর্মে যেমন মা মনসা সর্পদেবী; সেরূপই মায়াদের কাছে সর্পদেবতা হলেন কুকুল্কান। মায়া ভাষায় এর অর্থ পালক দ্বারা আবৃত সাপ। তবে প্রাক ধ্রুপদী যুগে এই দেবতার মর্যাদা তুলনায় কম ছিল। তিনি শক্তিশালী হয়ে ওঠেন কেবল যখন মায়ারা ধ্রুপদী যুগে মেক্সিকো শাসন করতে থাকে। বিভিন্ন মায়া দেওয়ালচিত্রে, এবং ভাস্কর্যে কুকুল্কানের চেহারা অবিকল চৈনিক ড্রাগনের মতন। প্রায় সব মায়া মন্দিরেই এর নামে পিরামিড গড়া হয়েছে।
বোলোন টজাখাব ঃ মায়াদের কাছে এই দেবতা অনেক ক্ষেত্রেই হুরাখান নামে পরিচিত। অনেকেই মনে করেন এর নাম থেকেই স্প্যানিশ বিকৃত উচ্চারণে তা হ্যারিকেনে পরিণত হয়েছে। কেননা ইনি ছিলেন একত্রে ঝড়ের, বজ্রপাতের এবং আগুনের দেবতা। তবে ইউকাটায়েন উপকূলে হ্যারিকেনের উৎপাত সবচেয়ে বেশী এবং এই দেবতার পুজাও তাই ঐ অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশী করা হত। মায়া ভাষায় হুরাকান বা বোলোন ট জাখাব শব্দের অর্থ একপদবিশিষ্ট দেবতা। মায়া পুরাণ অনুসারে যখন এই দেবতা ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন তখনই নাকি তিনি বন্যা পাঠিয়ে মানুষকে উচিত শিক্ষা দেন।
চায়াখ ঃ হুরাখানের মতই তিনিও বজ্রপাতের দেবতা। সাথে তিনি বৃষ্টির দেবতা এমন ধারণা ছিল মায়া কৃষকদের মধ্যে। তাই কৃষকরা ভাল বৃষ্টির জন্য তার কাছেই প্রার্থনা করতেন। তিনি নাকি প্রথমে মেঘ তৈরি করেন, তারপর বজ্রপাত উৎপন্ন করেন; শেষে বৃষ্টি নামান। এই রকমই ছিল প্রচলিত মায়া বিশ্বাস।
ঐশ্বরিক সম্রাট
মায়া বিশ্বাস অনুসারে সম্রাট ছিলেন ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী। তিনি নাকি মানুষ ও দেবতার মধ্যে মধ্যস্থতা করেন, এরকমই মায়ারা ভাবত। এই কারণেই রাজার যে কোনও আদেশকেই তারা ঈশ্বরের আদেশ হিসাবে মান্য করত। এমনকি তারা এটাও ভাবত যে, রাজা হলেন ইটজাম্নার পুত্র। অর্থাৎ দেব পুত্র।
পুরোহিত
ধর্মের দিক দিয়ে দেখলে মায়া সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ হলেন এই পুরোহিত বা ংধপবৎফড়ঃব। এরা এমনকি মায়া আহাওয়ের চেয়ে বেশী শক্তিশালী ছিল। তারা চাইলে রাজাদেশ নাও মানতে পারত; কিন্তু তাদের আদেশ মানতে বাধ্য থাকত। এতটাই শক্তিশালী ছিল এই পুরোহিতকূল। তারা বিভিন্ন রকমের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করত যাতে দেবতারা মানুষের ওপরে ক্রুদ্ধ না হন। বিখ্যাত স্প্যানিশ বই দ্য বুক অফ জাগুয়ার প্রিস্ট থেকে জানা যায় যে, তাদের ওপরে কতরকমের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। নীচে সেইসব দায়িত্ব পালনের তালিকা দেওয়া হল।
1. ঈশ্বরকে তুষ্ট রাখা।
2. যথার্থ ভবিষ্যৎবাণী করার ক্ষমতা।
3. অলৌকিক বা ব্যাখ্যাতীত কার্যকলাপের অনুষ্ঠান করা।
4. সূর্যগ্রহণের এবং চন্দ্রগ্রহণের তালিকা প্রস্তুত করা
5. ভূমিকমপ, খরা, দুর্ভিক্ষ, প্লেগ এইসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় আটকানো।
6. যাতে সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত হয় সে জন্য চায়াখ দেবতাকে তুষ্ট করা।
পুরোহিতকূল যদি কোনও কারণে এর কোনও একটা কাজ ঠিকমতন করতে না পারতেন; তবে চাকরিটা খোয়াতে হত।
মৃত্যু পরবর্তী জীবন
মিশরীয় বা অ্যাজটেক, ইনকাদের মতই মায়ারাও তীব্রভাবে মৃত্যু পরবর্তী জীবন আছে বলে বিশ্বাস করত। তারা ভাবত যেহেতু বেশীর মানুষ পাপী তাই তাদের নরকে যেতে হয় যেখানে দুষ্ট দেবতা তাদের গিলে খেয়ে ফেলার জন্য তৈরি থাকেন। তাদের বিশ্বাস অনুসারে কেবলমাত্র যে মহিলা শিশুর জন্ম দেওয়ার পরেই মারা গিয়েছেন এবং যাকে নরবলি দেওয়া হয়েছে তারাই কেবল স্বর্গে যেতে পারবেন।
পিরামিড
সব পিরামিডই ছিল দেবতার প্রতি উৎসর্গিত। অধিকাংশ পিরামিড ছিল হয় কুকুল্কান নয় ইটজাম্নার প্রতি সমর্পিত। এইসব পিরামিডে সিঁড়ি বেয়ে কেবল উঠত পুরোহিতকূল। তারা বছরে কেবল পাঁচদিন বাদে বাকি সব দিনেই পিরামিডের চুড়ায় উঠত। সেখানে তারা নরবলি এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করত। সাধারণ মানুষের সাথে এমনকি রাজারও সেখানে যাওয়া বারণ ছিল। কেবল যেসব দিন শুভ ছিল সেসব দিনে রাজা এবং অভিজাতরা পিরামিডে উঠতেন। সাধারণ মানুষের জন্য বছরে মাত্র একদিনই পিরামিডে ওঠার সৌভাগ্য হত। সেটা হল রাজার জন্মদিন উপলক্ষ্যে!
মায়া ধর্ম ও পুরাণ সমপর্কে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য
মায়ারা বিশ্বাস করত যে আধুনিক সাল অনুযায়ী ৩১১৪ খৃষ্টপূর্বাব্দে তাদের উৎপত্তি হয়েছে। তাদের দিনপঞ্জীতে এটা একটা বিচিত্র পন্থায় চিহ্নিত করা হয়েছে।
1. খুইচ্যে ভাষাগোষ্ঠীর ইন্ডিয়ানরা, যারা গুয়াটেমালার সব চেয়ে বড় জাতি তারা আদতে মায়াদের উত্তরপুরুষ। এদের তরফ থেকে বেশ কিছু দিক থেকে আজও মায়া ধর্ম পালন করা হয় ও দেবতার পূজা করা হয়।
2. এক মায়া অনুসারে ভুট্টা নাকি ভগবানের সৃষ্টি নয়, মানুষই নাকি ভুট্টার জন্ম দিয়েছে।
3. মায়া পুরাণ অনুসারে দুই মায়া দেবতা নরকের দেবতার সাথে যুদ্ধ করে পরাজিত করে তাদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে মানুষকে স্বর্গে নিয়ে যায়। এই যমজ দেবতার নাম যথাক্রমে হুনাহপু এবং এক্সবালাংখুয়ে।
যমজ দেবতা হুনাহপু এবং এক্সবালেংখুয়ের কাহিনী
এই যমজ দেবতার কাহিনী মায়া পুরাণের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় বলে মনে করা হয়। এই কাহিনী যে কটা অদ্যাবধি জীবিত মায়া পুরাণ টিকে আছে তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত। এই কাহিনী বিখ্যাত পোপোল ভুহ গ্রন্থে লিখিত হয়েছে খুইচ্যে ভাষায়; স্প্যানিশ লিপিতে। এখানে গল্পের সংক্ষিপ্তসার দেওয়া হল।
বাবা ও কাকা
এই যমজ দেবতার কাহিনী শুরু হয়েছে যমজ বাচ্চা ছেলের কাহিনী দিয়ে। তাদের নাম ছিল এক হুনাহপু এবং সাত হুনাহপু দিয়ে। এই হুনাহপুদ্বয় বিখ্যাত মায়া বল গেম [ভলিবলের মতন খেলা] খেলতে ভাল বাসত। তারা খুব প্রতিভাবান ছিল, সবসময়েই এই খেলায় তারাই জিতত। জিতলে কী হয়, তারা খেলবার সময়ে বড্ড জোরে জোরে চিৎকার করত। তাদের ক্রমাগত চিৎকার শুনে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল তথাকথিত মায়া নরক দেবতা এক্সিবালবার। তিনি এইরকম চীৎকারে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে নরকের দুটি দূত পাঠিয়ে যমজ দেবতাকে সমন দিলেন। এই এক্সিবালবা অত্যন্ত বদরাগী এবং নিষ্ঠুর চরিত্রের দেবতা ছিলেন। মায়ারা সচরাচর এর নাম মুখে আনতে চাইত না। কেননা মায়াদের বিশ্বাস ছিল কেউ যদি ভুল করেও এর নাম মুখে আনে তবে তার আয়ু দ্রুতই ফুরিয়ে যাবে।
সে যাই হোক, যমজ দেবতা তো সমন পেয়ে দ্রুত নরকে এসে হাজির হল। তখন নরক দেবতা তাদের বেশ কয়েকটা কঠিন পরীক্ষার সামনে ফেললেন। প্রথমে তাদের বলা হল যে তারা যেন যেভাবেই হোক কাঁটার সেতু পেরোয়। এই সেতুর তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল রক্তের নদী। তারা সেই পরীক্ষায় সফল হয়ে নরকের দেবতার কাছে পৌঁছালেন। সেখানে নরক দেবতা একটা কাঠের ছড়ি কাঁধে ঠেকিয়ে অভিবাদন করলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন যে দেবতাদ্বয় কি তাদের চিনতে পারেন। দেবতাদ্বয় তাকে চিনতেন না। ফলে এই পরীক্ষায় তারা অসফল হলেন। তখন এক্সিবালবা তাদের শয়তানি করে একটা নিরীহ কাঠের বেঞ্চিতে বসতে বললেন। দুই ভাই তার চক্রান্ত ধরতে না পেরে সরল বিশ্বাসে সেই বেঞ্চিতে বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা বিস্ময়ের সাথে দেখলেন সে বেঞ্চিতে আগুন ধরে গেল। তারা আগুনে বেঞ্চি থেকে বেরুতে না পেরে পুড়ে মারা গেলেন।
হুনাহপু ও এক্সবালাংখুয়ে জন্মালেন
এক হুনাহপু এবং সাত হুনাহপু তো মারা গেলেন। তারপর কি হল? পুরাণ অনুসারে এক হুনাহপুর একটি সন্তান জীবিত ছিল। তিনি ছিলেন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মায়া দেবী। যথাসময়ে তার দুটি সন্তানের জন্ম হল। এই যমজ সন্তানের নাম হল এক্সবালাংখুয়ে ও হুনাহপু। তারা তার বাবা ও কাকার মতই ভাল বল খেলোয়াড় ছিলেন। কিন্তু তাদের তুলনায় বেশী বুদ্ধিমান ও শক্তিমান ছিলেন। তারাও বাবা-কাকার মতই খেলবার সময়ে প্রচন্ড জোরে জোরে চিৎকার করতেন। তাদের একটানা জোরে জোরে চিৎকার শুনে অত্যন্ত বিরক্ত হলেন নরকদেব এক্সিবালবা। আগের বারের মতই এবারেও তিনি দুটি দূত পাঠালেন সমন পাঠিয়ে যে, তারা যেন এক্সিবালবার সাথে দেখা করে। এবং সেখানে এসে খেলে এক্সিবালবাকে হারিয়ে দেয়।
যমজ দেবতার নরকে অভিযান
অতঃপর দুই ভাই নরকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। তারা মার কাছ থেকে আগেই জেনে মিয়েছিল যে, তারা বাবা ও কাকা কি কি ভূল করেছিল। সেই মতন জেনে তারা নরকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল তারা নরকের দেবতার পাতা ফাঁদে পা দিল না। এক্সিবালবা যতগুলি পরীক্ষায় বসতে দিল ততগুলিই পরীক্ষায় তারা সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হল।
তখন ক্ষিপ্ত এক্সিবালবা প্রতারণার আশ্রয় নিল। তিনি একজন মশার রূপ নিয়ে কামড়ালেন দুই ভাইকে। কিন্তু কিছুই হল না। তারা মশা মারার জন্য খন্তির মতন একরকম কাঠের টুকরো নিয়ে সে মশাকে তাড়া করতেই মশা জীবন বাঁচাবার জন্য পালাতে বাধ্য হল। তারপর এক্সিবালবা তাদের কাঠের বেঞ্চিতে বসতে আদেশ দিলে তারা সুকৌশলে সে আদেশ অমান্য করল। হুনাহপু এবং এক্সিবালেংখুয়ে নরকদেবকে বলল তারা খেলতে এসছে, বসতে আসে নি। নরক দেবতা কি ওদের সাথে হেরে যাবার ভয়েই খেলতে চাইছেন না? তাই কি এমন করে সময় নষ্ট করছেন?
এক্সিবালবা বনাম এক্সিবালেংখুয়ে আর হুনাহপু
এক্সিবালবা বলাই বাহুল্য দুই ভাইয়ের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। তার ধারণা হল যে, নরকে অবস্থিত সব নরকের দূতদের সামনে এমন কথা বলে দুই ভাই তাকে অপমান করছে। সে রেগে গিয়ে দুই ভাইকে বলল না, তিনি ভয় পান নি। এবার খেলতে বসা যাক। এক্সিবালেংখুয়ে আর হুনাহপু এমন কথা শুনে হাসল। এটাই তো তারা চেয়েছিল।
এক্সিবালবা জানত সঠিক ভাবে খেললে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে তিনি জিততে পারবেন না। কারণ তার বয়স হয়েছে; ওদিকে দুই ভাইয়ের বয়স কম, ক্ষিপ্রতা বেশী তাই ওদের জেতার সম্ভাবনা বেশী। তাই তিনি কাঁটাওয়ালা বলের সাহায্যে খেলা শুরু করলেন। তার দুই হাত ছিল মোটা কাপড়ে মোড়া। ফলে তার হাত কাটবার ভয় ছিল না। কিন্তু দুই ভাইয়ের তো তা ছিল না। তারা রেগে গেল এক্সিবালবার ওপরে এমন অন্যায় খেলার অপচেষ্টার কারণে। তারা পরিষ্কার বলল তারা এক্সিবালবা ন্যায্যভাবে না খেললে খেলতেই রাজি নয়। তখন বাধ্য হয়ে ভাল ও কাঁটা মুক্ত বলের সাহায্যে খেলতে শুরু করল।
দুই ভাইয়ের এটা ভালই জানা ছিল যে, তারা জিতলে নরক থেকে জীবন্ত বেঁচে ফিরবে না। তাই চালাকি করে তারা হারবার জন্য খেলতে শুরু করল। তাতে ফল হল। এক্সিবালবা সহজেই জিতলেন। তারপর বরফের খেলা আগুনের ওপরে ঝাঁপ দেবার খেলা শুরু করলেন। প্রতিবারই ইচ্ছা করে হারলেন দুই ভাই।
দুই ভাইয়ের মৃত্যু হল
অবশেষে দুই ভাইয়ের সাথে নরকদেবের শেষ খেলায় সত্যকারের খেলা শুরু হল। প্রত্যেকটা ম্যাচে হারতে আর ভাল লাগছিল না দুই ভাইয়ের। আর তাই তারা শেষ ম্যাচে সত্য সত্যই জিতলেন। তাতেই এক্সিবালবা বুঝলেন, দুই ভাই তার সাথে প্রতারণা করেছেন। তারা সব ম্যাচেই যে ইচ্ছাকৃত ভাবে হেরেছেন তাও বুঝতে পারলেন। তাতে ক্রুদ্ধ হয়ে দুই ভাইকে এক বিশাল চুল্লিতে ঝাঁপ দিতে বললেন। দুই ভাই তাতে ঝাঁপ দিতে সম্মত হলেন। তাতে দুই ভাইয়ের মৃত্যু হল। তারপর নরকদেব তাদের ছাইকে রক্তের নদীতে ফেলে দিলেন। তিনি জানতেন না যে, এটাই ছিল দুই ভাইয়ের গোপন খেলা। দুই ভাইয়ের জানা ছিল যে, ঐ নদীতে তাদের ছাই ফেললেই তারা আবার বেঁচে উঠবেন। তবে মনুষ্যরূপে নয়, কাটলফিশ মাছের রূপে। সেই জন্যই তারা ঝাঁপ দিতে রাজি হয়েছিলেন। এর জন্য একটা গোপন মন্ত্র বলতে হত। ঝাঁপ দেবার পূর্বে দুই ভাই মনে মনে এই মন্ত্র বলে নিয়েছিলেন। ফলে কাটলফিশের রূপে জীবন নিয়ে ফিরতে অসুবিধা হল না।
তাদের এমন চমকপ্রদ যাদু দেখে এক্সিবালবা চমকে গেলেন। তিনি দুই ভাইকে কাটলফিশের রুপ থেকে মনুষ্য রূপে ফিরিয়ে আনলেন। তারপর জীবিত অবস্থায় ফিরে আসবার গোপন রহস্য কি তা জানতে চাইলেন। দুই ভাই তাকে জানাল কীভাবে তারা এই ব্যাপারটা সম্ভব করেছে। শুধু জানাল না যা, তা হল আসল মন্ত্রের পংক্তিটা। তারা একটা মন্ত্র মিথ্যা মিথ্যা বানিয়ে বলল যে এই মন্ত্র বলে ঝাঁপ দিলেই হবে। তারা যেভাবে বেঁচে ফিরেছে, নরকের রাজাও সেভাবেই ফিরে আসবেন। নির্বোধ এক্সিবালবা সে কথা বিশ্বাস করে ঐ বিশাল চুল্লিতে ঝাঁপ দিলেন। এর ফলে তিনি মারা গেলেন। তার ছাইকে মাটিতে পুঁতে দিলেন। এর ফলে এক্সিবালবার ফিরে আসবার কোনও সম্ভাবনা রইল না। এই ভাবে এক্সিবালেংখুয়ে আর হুনাহপু জিতে গেলেন!
এক্সিবালেংখুয়ে আর হুনাহপু সমপর্কে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য
অন্যান্য মেসো আমেরিকান সভ্যতাতেও অনেকটা এই যমজ নায়কের সমতুল্য কাহিনী পাওয়া যায়।
1. মায়ারা বিশ্বাস করত যে, এক্সিবালেংখুয়ে এবং হুনাহপু ছিলেন যথাক্রমে পৃথিবীর শাসক এবং আকাশের দেবতা। পরে দুজন যথাক্রমে চন্দ্রদেব এবং সূর্যদেবে রূপান্তরিত হন।
2. পুরাণ অনুযায়ী দুই ভাই পরে তার বাবা ও কাকাকে নরক থেকে জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।
3. মায়ারা বিশ্বাস করত যে, মায়া সম্রাট আসলে হয় এক্সিবালেংখুয়ে নয় হুনাহপু দেবের পুত্র। এই কারণেই মায়ারা আহাওকে এত মান্য করত।
4. মায়াদের বহু সাহিত্যে এই দুই ভাইয়ের সমপর্কে অনেক ছড়া আছে। এবং অনেক পিরামিডে দুজনের অনেক চিত্র অঙ্কিত আছে।
ভবিষ্যৎবাণী
মায়া ধর্মের অন্যতম অঙ্গ ছিল এই দিনপঞ্জী তৈরি করা এবং যত্ন করে রাখা। তাদের দিনপঞ্জী ছিল অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁত। তারা এমন কিছু দিনপঞ্জী তৈরি করেছিল যা ৫৪ কোটি বছরের অসাধারণ ত্রুটিহীন হিসাব রাখতে সক্ষম হয়েছে। তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত ভবিষ্যৎবাণীর কথা তোমরা নিশ্চয়ই জান। হ্যাঁ ২০১২ এর ২১শে ডিসেম্বরে পৃথিবী ধ্বংস হবার কথা বলা হচ্ছে। বাস্তবে এটা মায়া ভাষা পড়তে না পারার মাসুল। তারা আদপেই পৃথিবী ধ্বংসের কথা বলে নি। তারা বলেছিল যে, এর পর পৃথিবীতে নতুন যুগ শুরু হবে। সেটাকেই ধরে নেওয়া হয়েছিল দুনিয়া ধ্বংসের ভবিষ্যৎবাণী! তারা প্রত্যেক পৃথিবী হতে দ্রষ্টব্য তারার আবর্তন, আগত দিনক্ষণ এর হিসাব অতি নিখুঁত ভাবেই করেছিল। তারা মনে করত যে, বছরের বেশ কিছু দিন তাদের কাছে পয়া এবং বছরের পাঁচ দিন অপয়া (এই পাঁচদিন + বাকি ৩৬০ দিন = ৩৬৫ দিন)। যে পাঁচদিন অপয়া ছিল সেদিন কোনও শুভকাজ তারা করত না, উপবাসে থাকত, কাজে বেরত না। কেবল বিছানায় শুয়ে দিনটা পার করে দেওয়ার চেষ্টা করত। আর যেসব দিন অত্যন্ত শুভ ছিল, সেসব দিনেই তারা ধর্মীয় উৎসব পালন করত।
কৃষি
প্রাচীন মায়ার বিবিধ এবং খাবার উৎপাদনের সফিস্টিকেট পদ্ধতি ছিল। এইটি ইতিপূর্বে বিশ্বাস করা হয়েছিল যে চাষ পরিবর্তন করে (সুইডেনরা) কৃষক তাদের খাবারের সর্বাপেক্ষা জোগান দিয়েছিল কিন্তু এইটি এখন চিন্তা করা হয় যে স্থায়ী জমি উত্তোলন করা হয়েছিল, গৃহের ছাদ, বন বাগান, অনাবাদী (জমি) পরিচালনা করার জন্য এবং কিছু এলাকাতে বন্য শস্য কাটাতে প্রাচীন কালে অনেক জনসংখ্যা সমর্থন করছে তাদের খাদ্যের চাহিদা পূর্ণের জন্য। বাস্তবিকপক্ষে, এই আলাদা কৃষিবিষয়ক পদ্ধতির প্রমাণ আজও টিকে আছেঃ জমি উত্তোলন সংযোগ ছিল খালগুলো দ্বারা যা আকশীক ছবিতে মধ্যে দেখা গিয়েছিল, সমকালীন মৌসমীয় অঞ্চল প্রজাতির গ্রন্থে প্রাচীন মায়ার উচ্চতর যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মূল্যয়ন রয়েছে, এবং হ্রদের পলিগুলোতে পরাগ রেকর্ড ইঙ্গিত করে যে মেসোআমেরিকাতে বন ধ্বংস করে ভুট্টা, সূর্যমুখী বীজ, তুলা এবং অন্যান্য ফসল চাষ করা হয়েছে, অন্তত ২৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে।
মায়ান স্থানসমূহ
এখানে গুরুত্বপূর্ণ মায়া স্থানের শতশত জায়গা আছে এবং ছোট এক হাজার জায়গা আছে। বৃহত্তম এবং সর্বাপেক্ষা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্ভুক্ত করে:
• চিচেন ইৎজা
• ডস পিলাস
• টিকাল
মায়া পঞ্জিকা একরূপ বর্ষগণনা পদ্ধতি যা মায়া সভ্যতায় তথা কলম্বাস-পূর্ববর্তী মধ্য আমেরিকায় প্রচলিত ছিল। আধুনিক গুয়াতেমালা ও মেক্সিকোর কোন কোন অংশে এটি অদ্যাবধি ব্যবহৃত হয়। সে সময়কার মানুষের গড় আয়ুর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মায়া জনগোষ্ঠী ৫২ বৎসরের (১৮,৯৮০ দিনের) পঞ্জিকাচক্র ব্যবহার করতো। এই সময়ের বহির্ভূত ঘটনা-দুঘর্টনার উল্লেখের জন্য ৫,১২৬ বর্ষব্যাপী একটি অধিপঞ্জিকা উদ্ভাবন করা হয় যার শুরু খ্রিস্টপূর্ব ৩,১১৪ সনে এবং শেষ ২০১২ সালে। এই অধি-পঞ্জিকাটি ‘মায়া পঞ্জিকা’ হিসাবে উল্লিখিত। ২০১২ সালের ২১শে ডিসেম্বর মায়া পঞ্জিকার শেষ দিবস। অনেকের ধারণা ২০১২ সালের ২১শে ডিসেম্বর তারিখে সময় শেষ হয়ে যাবে এবং পৃথিবী ধ্বংস হবে। অনেকের ধারণা এদিন ঘটনাচক্রে পৃথিবীতে নতুন জামানার পত্তন হবে।
২০১২ এর রহস্য এক সারি পরলোকতত্ত্বিক বিশ্বাসের ধারণ অনুসারে ২১শে ডিসেম্বর ২০১২ সালে আকস্মিকভাবে পরিবর্তন বা রূপান্তরিক ঘটনা ঘটবে। এই তারিখটি একটি মেসোআমেরিকান দীর্ঘ গণনার পঞ্জিকা যা ৫১২৫ বছরের দীর্ঘ চক্রের শেষ তারিখ হিসাবে গণ্য হয়। বিভিন্ন জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত সারিবদ্ধকরণ এবং সংখ্যাতত্ত্বিক সূত্রে এই তারিখ প্রস্তাবিত করা হয়েছে, যদিও মূলধারার পাণ্ডিত্য কাছে কোনটি গ্রহণ করা হয়নি।
নতুন যুগ এই ক্রান্তিকালের ব্যাখ্যা হল এই যে, তারিখটি একটি সময়ের শুরু নির্দেশ করে যা পৃথিবী এবং এখানকার অধিবাসীদের একটি ইতিবাচক শারীরিক বা আধ্যাত্মিক রূপান্তরের সহ্য করবে, এবং এই ২১শে ডিসেম্বর ২০১২ সাল হবে একটি নতুন যুগের প্রারম্ভ চিহ্ন। অন্যান্যরা ধারণা করে যে, তারিখটি পৃথিবীর অবসান বা অনুরূপ একটি বিপর্যয়কারী ঘটনা চিহ্নিত করে। পৃথিবীর অবসান জন্য প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত পরবর্তী সোলার ম্যাক্সিমাম আগমনসহ, ছায়াপথের কেন্দ্রে পৃথিবী এবং ব্লাক হোলের মধ্যে মিথষ্ক্রিয়া বা “নিবিরু” নামে একটি গ্রহ সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষ অন্তর্ভুক্ত।
২১শে ডিসেম্বর ২০১২ তারিখে সম্পর্কে ইন্টারনেট, বই এবং টিভির প্রতিবেদনগুলোর মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে যে এই তারিখে যেকোন গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটবে অথবা কোন বড় ধরনের বিপর্যয় হবে বলে মনে করছে। এই গুলো মায়া বর্ষপঞ্জিকার একটি চক্র (b’ak’tun) প্রান্তের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, যদিও প্রাচীন অন্যান্য সভ্যতাগুলোর কাছে থেকেও এই ধরনের ধারনা পাওয়া গিয়েছে। এই ধারনাটি বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় সমর্থন করেন না; ভূপদার্থবিদরাও, জ্যোতির্বিজ্ঞানী কিংবা এবং প্রাচীন মায়া মূলস্রোত পণ্ডিতগণ – এদের কেউই সমর্থন করেন না।
মায়া বর্ষপঞ্জিকা
অন্যান্য মেসোআমেরিকান সংস্কৃতি লোকদের মত মায়ারাও সময় পরিমান করার জন্য তিন বর্ষপঞ্জিকা বিশিষ্ট্য একটি বর্ষপঞ্জিকা ব্যবহার করতো। দিনগুলোকে ২৬০ দিন পর্যায়কাল বিশিষ্ট্য একটি ধর্মীয় প্রথার বর্ষপঞ্জিকা দ্বারা সাজানো হয়েছিল যাকে “Tzolk’in” বলা হতো, একে ১৩ দিনের সময় পর্যায়কালে বিভাক্ত করা হয়েছে এবং এটি শুধুমাত্র ধর্মীয় প্রথা উদ্দ্যেশ্যের জন্য ব্যবহার করা হতো। ৩৬০ দিনের একটি সৌর বছর ছিল যাকে “Haab” বলা হতো, একে ১৮ মাস বিভাক্ত করা হয়েছে এবং প্রত্যেক মাস ২০ দিন পর্যায়কাল বিশিষ্ট্য।
মায়ারা বছর গণনা করতো না, ১৮,৯৮০ দিনের (~ ৫২ বছর) চক্রকে স্থান দেওয়ার জন্য উভয় বর্ষপঞ্জিকার তারিখ তাদের মাঝে সংযুক্ত করা হয়েছে, ফলে মোট ৫২ চক্রে রূপান্তরিত হয়েছে। অন্য অতিরিক্ত একটি বর্ষপঞ্জিকা, তথাকথিত লং গুনতি গণনা করতো, অন্যদিকে, মায়ান পুরাণতত্ত্ব অনুসারে বিশ্ব সৃষ্টির তারিখ থেকেই সময় অতিক্রান্ত হচ্ছে (১১ই আগস্ট ৩১১৪ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিকাতে)। এই বর্ষপঞ্জিকা পূর্ববর্তীর বর্ষপঞ্জিকার মত নয়, অগ্রগতিমূলক ছিল এবং সময়কে ভাগ করা হয়েছে চক্রতে, ১৪৪,০০০ দিনের সময়কালের আবর্তকে (b’ak’tun) না। ২০শে ডিসেম্বর ২০১২ ১৩তম b’ak’tun (১২ ১৯ ১৯ ১৭ ১৯ বর্ষপঞ্জিকার আসল স্বরলিপি) শেষ হবে এবং পরবর্তী দিন হতে ১৪তম b’ak’tun (১৩.০.০.০.০) শুরু হবে।

গ্রিসের ইতিহাস

গ্রিসের ইতিহাস বলতে বোঝায় গ্রিক জাতি এবং অতীতে তাঁদের দ্বারা বিজিত অঞ্চল তথা বর্তমান গ্রিস রাষ্ট্রের ইতিহাস সংক্রান্ত অধ্যয়ন। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে গ্রিস জাতি অধ্যুষিত ও শাসিত অঞ্চলের সীমারেখায় নানা পরিবর্তন এসেছে। এই কারণে গ্রিসের ইতিহাসেও বিভিন্ন প্রকার বহিরাগত উপাদান এসে মিশেছে। গ্রিসের ইতিহাসের প্রতিটি যুগের সুনির্দিষ্ট লিখিত বিবরণ বিদ্যমান।
প্রথম আদি গ্রিক উপজাতিটি মাইসেনিয়ান নামে পরিচিত। এরা খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের শেষ ভাগে এবং দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথমার্ধে গ্রিসে মূল ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন করে। মাইসেনিয়ান উপজাতি যখন এই অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করেছিল, তখন এখানে একাধিক অ-গ্রিকভাষী ও দেশীয় আদি-গ্রিক উপজাতিগুলি বাস করত। এরা খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম সহস্রাব্দ থেকে এই অঞ্চলে কৃষিকার্য করে আসছিল।
ভৌগোলিক বিস্তারের মধ্যগগনে গ্রিক সভ্যতা গ্রিস থেকে মিশর ও পাকিস্তানের হিন্দুকুশ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। এই সময় থেকেই গ্রিক সংখ্যালঘুরা পূর্বতন গ্রিক সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে (যেমন: তুরস্ক, ইতালি, ও লিবিয়া, লেভ্যান্ট ইত্যাদি অঞ্চলে) বসবাস করছেন। বর্তমানে সারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রিক অভিনিবেশকারীদের সন্ধান পাওয়া যায়। বর্তমানে অধিকাংশ গ্রিকেরা ১৮২১ সালে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত গ্রিস দেশ ও সিরিয়ায় বসবাস করেন।
নিওলিথিক
৭ খ্রীস্টপূর্ব সহস্রাব্দের দিকে গ্রিস এবং বলকানের মধ্য দিয়ে ইউরোপে নিওলিথিক যুগের সূচনা হয়। খ্রীস্টপূর্ব ২৮ শতকের দিকে ব্রোঞ্জ যুগের আগমনের মধ্য দিয়ে এ যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে।
খ্রীস্ট পূর্ব ১৯ শতকে মাইসেনিয়ান নামের এক প্রোটো-ইন্দো ইউরোপীয় জাতি বর্তমান গ্রীক ভাষার সূচনা করে।
সাইক্লেডিক এবং মিনোয়ান সভ্যতা
গ্রীসে আবির্ভূত হওয়া প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ক্রিটি দ্বীপের মিনোয়ান সভ্যতা যেটা ২৭০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ থেকে ১৪৫০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল আর গ্রীক মূল ভুখন্ডের আদি হেলাডিক সভ্যতা যার স্থায়িত্বকাল ছিল ২৮০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ থেকে ২১০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। মিনোয়ানদের সম্পর্কে খুব কম খবরই পাওয়া যায়, তারা ছিল প্রোটো-ইন্দো ইউরোপীয় জাতের মানুষ, লিনিয়ার-এ (Linear A) নামের এক দূর্বোধ্য ভাষায় লেখতো যার অর্থ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তারা মূলত সামুদ্রিক বাণিজ্যে নিয়োজিত ছিল, নিজেদের দ্বীপের উর্বর প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যাবহার করে উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন, রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে মূলত ছিল কাঠ। রপ্তানি হত মূলত সাইপ্রাস সিরিয়া মিশর এবং এজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলোতে।
মাইসেনিয়ানরা ক্রিটি অধিকার করার পর ক্রিটির সংস্কৃতি নিজেদের মধ্যে আত্মস্ত করে নেয়।
মাইসেনিয়ান সভ্যতা
মাইসেনিয়ানরা এজিয়ান সাগরে আসতে শুরু করে ১৬০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দের দিকে, ১৪০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে তাঁরা মিনোয়ান সভ্যতার কেন্দ্র ক্রিটি দখল করে নেয়। আদি গ্রীক ভাষা লেখার জন্য তাঁরা ক্রিটির লিনিয়ার এ ভাষা ব্যাবহার করতো পরে নিজেদের লিনিয়ার বি ভাষার প্রচলন করে। মাইসেনিয়ানরা এসেছে মাইসেনিয়া নামক অঞ্চল থেকে, অন্যান্য মাইসেনিয়ান অঞ্চল হল এথেন্স, পিলস, থীব, টিরান ইত্যাদী।
মাইসেনিয়ানরা ছিল যোদ্ধা, তাঁদের কবরে মৃতদেহের সাথে যুদ্ধের সরঞ্জাম সমাহিত করার প্রমাণ পাওয়া যায়। ১১০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে মাইসেনিয়ান সভ্যতা ধংস প্রাপ্ত হয়। কোন কোন গভেষক এর জন্য ডোরিয়ান নামের আরেকটি গোষ্টীর আক্রমন করাকে দায়ী করে থাকে কিন্তু তার কোন উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মাইসেনিয়ান সভ্যতার পতনের পর গ্রীক একটা সাময়িক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করে। এসময় গ্রীসের জনসংখ্যা এবং শিক্ষার হার আশঙ্খা জনক ভাবে হ্রুাস পায়।
আদি লৌহযুগ
গ্রীসে অন্ধকার যুগের সূচনা হয়েছিল খ্রীস্টপূর্বাব্দে, মাইসেনিয়ান সভ্যতার পতনের মধ্য দিয়ে। অনেকে এর জন্য ডোরিয়ানদের আক্রমনকে দায়ী করেন। ডোরিয়ান দের সাথে ছিল লোহা নির্মিত শক্তিশালী অস্ত্র, যা দিয়ে দূর্বল মাইসেনিয়ান সভ্যতাকে সহজে পরাস্ত করা সম্ভব হয়েছিল। এ অন্ধকার যুগ টিকে ছিল ৮০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে গ্রীকে নগর রাস্ট্র উদ্ভবের আগ পর্যন্ত, কিংবা হোমারের আগ পর্যন্ত। অন্ধকার যুগে রাজারা খুব দূর্বল ভাবে টিকে ছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত অভিজাত তন্ত্রের কাছে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন, এবং শেষে শেষে অভিজাততন্ত্রের ভেতরে আরো অভিজাত তৈরি হয়। এ যুগে সুলভ এবং সস্তা হওয়ার কারণে তৈজসপত্র এবং যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে ব্রোঞ্জের বদলে লোহার ব্যাবহার শুরু হয়। সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে কিছুটা অর্থনৈতিক সমতা আসে, ফলে রাজাদের সিংহাসনচূত করে পরিবারগুলো সিংহাসনে আরোহন করতে শুরু করে।
অন্ধকার যুগের শেষে গ্রীক নবজাগরণের সূচনা হয় যা কৃঞ্চ সাগর এবং স্পেন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, ফোনেশিয়ানদের কাছ থেকে লেখার কৌশল পুনরায় আয়ত্ত্বে আসে যা উত্তরে ইতালি এবং গাউল পর্যস্ত ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাচীন গ্রীস

“যদি সর্বোচ্ছ নিরাপদ অবস্থান থেকেও বলা হয় তবু সমগ্র পাশ্চাত্য দর্শনের অগ্রগতির ধারাকে প্লেটোর দর্শনের পাদটীকা হিসাবে বর্ণনা করা যায়।”
প্রাচীন গ্রীসের সূচনা ধরা হয় ৭৭৬ খ্রীস্টপূর্বাব্দে অলেম্পিক গেমস এর আয়োজনের মধ্য দিয়ে, অবশ্য অনেকে এটাকে ১০০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত করতে চান। প্রাচীন যুগের পরিসমাপ্তি ধরা হয় ৩২৩ খ্রীস্টপূর্বাব্দে মহামতি আলেকজেন্ডার এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
বেশিরভাগ ঐতিহাসিক প্রাচীন গ্রীসকে আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার ভিত্তিভুমি বলে স্বীকার করেছেন। রোমান সভ্যতার উপর গ্রীক সংস্কৃতির প্রচন্ড রকম প্রভাব ছিল, যা ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। আধুনিক পৃথিবীর ভাষা, রাজনীতি, শিক্ষা ব্যাবস্থা, দর্শন, শিল্পকলা এবং স্থাপত্যের উপর গ্রীক প্রাচীন যুগের প্রভাব অপরিসীম।
সাবেকী গ্রীস
অন্ধকার যুগের সাথে সাথে মাইসেনিয়ান যুগের জ্ঞান এবং বর্ণমালাও হারিয়ে ফেলেছিল গ্রীস। কিন্তু ৮০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দের দিকে নবজাগরিত গ্রীস ফোনেসিয়ান বর্ণমালা সংস্কার করে গ্রীক বর্ণমালার আবির্ভাব ঘটায়। তখন গ্রীক ছিল ছোট ছোট নগর রাস্ট্রে বিভক্ত। গ্রীসের সাবেকী যুগকে প্রাচ্যের সাথে মিলনের যুগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। কারণ গ্রীস তখন নতুন এসিরিয় সভ্যতার প্রান্তে ছিল কিন্তু তার অধীনে ছিলনা। সেই যুগে গ্রীস তাঁর ভান্ডারে প্রাচ্য থেকে প্রচুর জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্পকলাকৌশল, পুরাণ আমদানী করে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল।
ধ্রুপদী গ্রীস
হেরাডোটাস (খ্রীস্টপূর্বাব্দ ৫ শতক), একজন স্বনামধন্য গ্রীক ইতিহাসবিদ যার কাজ এখনো টিকে আছে।

গ্রীস তখন ছোট ছোট নগর রাস্ট্রে বিভক্তছিল যাদের বলা হতো পলিস, পরিটিকস শব্দটার জন্ম এই পলিস থেকে যার অর্থ পলিসের জিনিস। নগররাস্ট্রগুলো কার্যত যাই হোক না কেন নামে স্বাধীন ছিল। হয়তো একটা নগর অন্য নগরের উপর অনেক দিক দিয়ে নির্ভরশীল কিন্তু নগর হিসেবে প্রত্যেকে ছিল সার্ভভৌম। ফলে যখন বাইরের কারো সাথে যুদ্ধ করার প্রয়োজন হতো তখন নগর রাস্ট্রগুলো যুথবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করতো, তবে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধও লেগে থাকতো সব সময়।
প্রধান দুটি যুদ্ধ ধ্রুপদী গ্রীসকে আকার দিয়েছে, তার একটি পারসিক যুদ্ধ (৫০০ খ্রি: পূ: থেকে ৪৪৮ খ্রি: পূ:), এই যুদ্ধে আয়োনিয়ার গ্রীক নগরগুলো পারস্য সভ্যতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল আর গ্রীক মূল ভুখন্ডের কিছু নগর, যেমন এথেন্স তাতে সমর্থন যুগিয়েছিল।
যুদ্ধ পরিচালনা এবং পারসিক আক্রমন প্রতিহত করতে এথেন্স ৪৪৭ খ্রীস্ট পূর্বাব্দে ডিলিয়ান লীগ নামে একটি নগর সমূহের একটি লীগ গঠন করে। লীগের সদস্য নগর গুলো একটা সর্বজনীন সেনাবাহিনী গঠন করে এবং প্রত্যেক সদস্য এই সর্বজনীন সেনাবাহিনীতে সৈনিক এবং নৌযান প্রদান করতো। এথেন্স প্রথম দিকে ছোট ছোট নগর রাস্ট্রগুলোকে লীগে অবদান রাখার সুযোগ করে দেয় পরে পরে অবদান রাখতে বাধ্য করে। লীগ থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদকে অপরাধ হিসেবে গন্য করতে শুরু করে। পারসিক যুদ্ধের পর লীগের কোষাগার ডেলস থেকে এথেন্সে সরিয়ে আনা হয় এবং লীগের উপর এথেন্সের নিয়ন্ত্রন আরো জোরালো করা হয়। এমন অবস্থা দাড়ায়যে ডিলিয়ান লীগকে এথেন্স সাম্রাজ্য বললে ভুল বলা হয়না।
৪৫৮ খ্রী: পূ: তে পারসীয়ান যুদ্ধের মধ্যেই ডিলিয়ান লীগ এবং স্পার্টার নেতৃত্বাধসি পেলোপনেসিয়ান লীগের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যায়। কিছু বছর ফলাফলহীন যুদ্ধের পর ৪৪৭ খ্রী: পূ: তে এ দুটি লীগ একটা ৩০ বছর মেয়াদী শান্তি চুক্তি করে, কিন্তু চুক্তি সত্ত্বেও ৪৩১ খ্রী: পূ: তে পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
যুদ্ধে এথেন্সের সেনাপতি পেরিক্লিস আত্মরক্ষামূলক পদ্ধতি গ্রহন করে, ফলে দিনের পর দিন এথেন্স স্পার্টা কতৃক অবরুদ্ধ হয়ে থাকে। ৪৩০ খ্রি: পু: তে মহামারী প্লেগের খপ্পরে পড়ে এথেন্স, এর চার ভাগের এক ভাগ মানুষ মারা যায়। পেরিক্লিসও মারা যায় এ সময়। পেরিক্লিস এর মৃ্ত্যুর পর নতুন নেতৃত্ব আক্রমনাত্বক ভুমিকা গ্রহন করে। ফিলোসের যুদ্ধে এথেন্স ৩০০ থেকে ৪০০ স্পার্টান যোদ্ধা বন্দী করতে সক্ষম হয়। এই যোদ্ধারা স্পার্টান সেনাবাহিনীর এত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলে যে স্পার্টা এদের হাতছাড়া করতে চাইছিলো না। অন্য দিকে ডেলিয়াম এবং এমিপিফোলিস এর যুদ্ধে এথেন্স শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। অবশেষে ৪২১ খ্রি: পু: তে শান্তিচুক্তি হয় যা Peace of Nicias নামে পরিচিত। এই চুক্তির ফলে স্পার্টা তার যুদ্ধবন্দী ফেরত পায় আর এথেন্স ফেরত পায় হারানো নগর এমপোফোলিস। যুদ্ধের এই প্রথম পর্বকে বলা হয় আর্কেমিডিয়ান যু্দ্ধ।
প্রাচীন গ্রিস
গ্রিস ইতিহাসের অন্তর্গত প্রাচীন সভ্যতা যা প্রাচীন যুগ খ্রিস্টপূর্ব ৮ম-৬ষ্ঠ শতাব্দীতে শুরু হয় এবং ধ্রুপদি সভ্যতা (আনুমানিক ৬০০ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত বিরাজ করেছিল। এরপর পরই কালটি হচ্ছে প্রারম্ভিক মধ্যযুগ এবং বাইজেন্টাইন যুগ। প্রাচীন গ্রিসের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হল ধ্রুপদি গ্রিস যুগ, যা খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ থেকে ৫ম শতাব্দীতে সমৃদ্ধিলাভ করে। ধ্রুপদি গ্রিস শুরু হয় যখন একজন অ্যাথেনীয় নেতৃত্বে পারস্যদের উপদ্রব দমন করা হয়। মহামতি আলেকজান্ডারের বিজয়ের কারণে, হেলেনিস্টিক সভ্যতা মধ্য এশিয়া থেকে ভূমধ্যসাগরের শেষ পশ্চিম পর্যন্ত সমৃদ্ধিলাভ করে।
ধ্রুপদি গ্রিস সংস্কৃতি, বিশেষ করে দর্শন, রোমান সাম্রাজ্য উপর একটি শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেছিল, যা ভূমধ্য অঞ্চল এবং ইউরোপে বিভিন্ন অংশে এর একটি সংস্করণের প্রভাব দেখা যায়। যার কারণে ধ্রুপদি গ্রিসেকে সাধারণত আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ভিত্তি প্রদান যা দিগন্তকারী সংস্কৃতি বলে মনে করা হয়।
সাধারণত খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতাব্দীতে (হোমারের প্রথমদিকের নথিভুক্তকৃত কবিতা সময়) ভূমধ্য অঞ্চলে ধ্রুপদি যুগের শুরু হয়েছে ধরা হয় এবং এটি ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে শেষ হয়।
ধ্রুপদি যুগের গ্রিসের ইতিহাসকে নিম্নলিখিত সময়সীমার উপবিভাজনে ভাগ করা যেতে পারে:
• আর্কইক যুগ (খ্রিস্টপূর্ব সি. ৮০০ – সি. ৫০০), এই সময় শিল্পীরা স্বপ্নের মত হিরাটিক ভঙ্গির সাথে “আর্কইক হাসির” বৃহত্তর মুক্ত স্থায়ী ভাস্কর্য তৈরি করে। আর্কইক যুগকে প্রায়ই অ্যাথেন্সের সর্বশেষ স্বৈরশাসকের উৎখাত এবং খ্রিস্টপূর্ব ৫০৮ শতাব্দীতে অ্যাথেনীয় গণতন্ত্রের শুরু হিসেবে নেওয়া হয়।
• ধ্রুপদি যুগ (খ্রিস্টপূর্ব সি. ৫০০ – সি. ৩২৩) একটি ধরন দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে যা পরে পর্যবেক্ষক দ্বারা আদর্শ অর্থাৎ “ধ্রুপদি” হিসাবে পার্থেনন উদাহরণস্বরূপ গণ্য করা হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে, ধ্রুপদি যুগ ৫ম শতাব্দীতে অ্যাথেন্স এবং ডিলিয়ান লীগের আধিপত্য ছিল, কিন্তু ম্যাসেডোনিয়ার নেতৃত্বাধীন থিবিস, বিওশিয়া এবং পরিশেষে ক্রনথ লীগে ক্ষমতা স্থানান্তরনের পূর্বে খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে স্পার্টান নেতৃত্বে দ্বারা বাস্তুচ্যুত করা হয়।
• হেলেনিস্টিক যুগে (খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩-১৪৬) গ্রিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতা কাছাকাছি এবং মধ্যপ্রাচ্যর মধ্যে প্রসারিত হয়েছিল। এই যুগ শুরু আলেকজান্ডারের মৃত্যু দিয়ে এবং শেষ হয় রোমান বিজয় দ্বারা।
• রোমান গ্রিস, (খ্রিস্টপূর্ব ১৪৬- ৩৩০ খ্রিস্টাব্দ), এই যুগ শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব ১৪৬-তে করিন্থিয়ান্সে সংগঠিত করিন্থের যুদ্ধে রোমানদের বিজযয়ের মাধ্যমে এবং শেষ হয় খ্রিস্টাব্দ ৩৩০ সালে যখন কন্সট্যান্টাইন বাইজেন্টাউমে রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত করেন।
• প্রাচীনকালে চূড়ান্ত পর্যায় হল খ্রিস্টানকরণের যুগ যা শুরু হয় ৪র্থ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে ৬ষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত। জাস্টিনিয়ান I ৫২৯ সালে কখনো কখনো অ্যাথেন্স একাডেমি বন্ধের সম্পূর্ণ করতে নিয়ে যাওয়া হতো।
রোমান গ্রিস
গ্রিক উপদ্বীপ খ্রিস্টপূর্ব ১৪৬-তে করিন্থের যুদ্ধে গ্রিস বিজয়ের পর রোমান শাসনের অধীনে আসে। মেসিডোনিয়া রোমান প্রদেশ হয় যখন দক্ষিণ গ্রিস মেসিডোনিয়ার কর্তার নজরদারিতে পড়ে। যাইহোক, কিছু গ্রিক পোলাইস একটি আংশিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে এবং কর বাতিল করতে পরিচালনা করে। এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জ খ্রিস্টপূর্ব ১৩৩-তে এই অঞ্চলের সাথে যুক্ত করা হয়। অ্যাথেন্স এবং অন্যান্য গ্রিক শহরসমুহ খ্রিস্টপূর্ব ৮৮-তে বিদ্রোহ শুরু করে এবং রোমান জেনারেল সুল্লা উপদ্বীপের বিদ্রোহ দমন করেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২৭-তে আউগুস্তুস আকিয়ার প্রদেশ হিসেবে উপদ্বীপ সংগঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত রোমানদের গৃহযুদ্ধ ভূমিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
গ্রিস রোমান সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব প্রদেশের ছিল, সেখানে রোমান সংস্কৃতি বস্তুত গ্রিকও-রোমান বহুদিন ধরে ছিল। গ্রিক ভাষা পূর্বে এবং ইতালিতে লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে কাজ করে, এবং অনেক গ্রিক বুদ্ধিজীবিদরা যেমন গেলন রোমে তাদের বেশিরভাগ কাজ প্রদর্শন করতেন।

উপনিবেশ
আর্কাইক যুগে গ্রিসের জনসংখ্যা এর কৃষির যোগ্য ভূমির থেকেও বেড়ে গিয়েছিল। প্রায় ৭৫০ খ্রীষ্টপূর্ব থেকে গ্রিক ২৫০ বছর ধরে প্রসারণ হয়, যার ফলে উপনিবেশ স্থাপিত হয় সবদিকেই। পূর্বে এশিয়া মাইনর এর এজিয়ন উপকূল প্রথমে উপনিবেশ হয়েছিল, এবং সাইপ্রাস ও থ্রেস উপকূলে, মারমারার সাগর এবং কৃষ্ণ সাগর দক্ষিণ উপকূলে হয় এর পরপরই।
অবশেষে গ্রিক উপনিবেশ দূর উত্তরপূর্বে বর্তমানে যেটা ইউক্রেন এবং রাশিয়ার টেগানরগ পর্যন্ত পৌছে। পশ্চিমে ইলিরিয়া উপকূল, সিসিলি এবং দক্ষিণ ইতালি এবং তার ধারাবাহিকতায় দক্ষিণ ফ্রান্স, কর্সিকা এবং আরো উত্তরপূর্বের স্পেনে পৌছে। গ্রিক উপনিবেশ মিশর এবং লিবিয়ায় ও পাওয়া যায়।
এখনকার স্যরাকুস, নেপলস, মার্সেই, ইস্তানবুল এবং বাইজেনশনের শুরু হয়েছিল গ্রিক উপনিবেশে। এইসব কলোনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল গ্রিককে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ানোতে এবং সাহায্য করেছিল গ্রিক শহরগুলোতে দূরবর্তী বানিজ্য করতে। এতে পুরাতন গ্রিসের অর্থনীতির ব্যপক উন্নতি সাধন হয়েছিল।
খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ থেকে ৫ম শতাব্দী পর্যন্ত গ্রিসের যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ছিল তা তখনকার সময়ের খুবই উন্নত ছিল। কিছু কিছু ইতিহাসবিদের মতে, এটি ছিল ইন্ডাসট্রিয়াল পূর্ব উন্নত অর্থনীতিগুলোর একটি। এটির ধারনা করা হয় একজন গ্রিক কর্মীর গড় মজুরি দ্বারা যেটি গমের মাপে ছিল ১২ কেজি। রোমান যুগে এটি ছিল ইজিপ্সিয়ানদের তুলনায় ৩ গুন বেশি (তারা পেত ৩.৭৫ কেজি)।
দর্শন
প্রাচীন গ্রিকের দর্শন গুরুত্ব দিত কারন এবং অনুসন্ধান করার ভূমিকার উপর। অনেকভাবেই এটার বেশ গুরুত্ব আছে বর্তমান দর্শনে, এমনকি আধুনিক বিজ্ঞানেও। প্রাচীন গ্রিক এবং হেলেনিষ্টিক দর্শনবিদ থেকে মধ্যযুগের মুসলিম দর্শনবিদ এবং মুসলিম বিজ্ঞানিরা থেকে ইউরোপের রেনেসা এবং এনলাইটেনমেন্ট থেকে আজকের ঐহিক বিজ্ঞান পর্যন্ত এর পরিষ্কার প্রভাব দেখা যায়।
শিল্প এবং স্থাপত্য
অনেক দেশের শিল্প সংস্কৃতির উপর প্রাচীন গ্রিসের শিল্পের প্রভাব দেখা যায় সেই প্রাচীন সময় থেকে আজ পর্যন্ত, বিশেষত ভাস্কর্য এবং স্থাপত্য শিল্পে। পশ্চিমের রোমান সাম্রাজ্যের শিল্পের বেশির ভাগই গ্রিসের নমুনায় বা নমুনা থেকে নেয়া। পূর্বের মধ্য এশিয়া, গ্রিক এবং ভারতীয় সংস্কৃতি তৈরী করেছিল গ্রিকো-বুদ্ধিস্ট শিল্প যা জাপান পর্যন্ত যায়। এগুলোর সূচনা হয়েছিল মহান আলেক্সান্ডারের বিজয়ের অভিযানের মধ্য দিয়ে। ইউরোপে রেঁনেসার যুগে ইউরোপিয় শিল্পীরা অনুপ্রাণিত হয়েছিল গ্রিকদের শিল্প দ্বারা। ঊনবিংশ শতাব্দির মধ্যে সনাতনি ঐতিহ্য যেগুলো পশ্চিমা বিশ্বে তৈরি হয় সেগুলো গ্রিসদের থেকে প্রাপ্ত।
ধর্ম এবং পুরান
গ্রিক পুরান তাদের ঈশ্বর ও হিরোদের গল্প, পৃথিবীর প্রকৃতি এবং উৎপত্তি এবং ধর্ম পালনের গুরুত্ব ইত্যাদি নিয়ে গঠিত। প্রধান গ্রিক ঈশ্বর ছিল বারটি জিউস, হেরা, পোসাইডন, এরিস, হারমিস, হেফেসটাস, আফরোদিতি, এথেনা, এপোলো, আর্টেমিস, ডিমিটার এবং হেডস। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেব-দেবী হল হেব, হিলিওস, ডিওনিসাস, পারসেফন এবং হারকিউলিস (একজন ডেমি-গড যিনি একই সঙ্গে মানুষ এবং দেবতা) জিউসের পিতা ছিল ক্রোনস এবং মাতা ছিলেন রিয়াহ্ । যারা হেডস, পোসাইডন, হেরা, ডিমিটার এবং হেস্টিয়ার ও পিতা-মাতা ছিলেন।
ধ্রুপদি সভ্যতা

ধ্রুপদি সভ্যতা (ইংরেজি: Classical antiquity) হচ্ছে ভূমধ্যসাগর কেন্দ্রিক একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক যুগ, যা অনেকটা প্রাচীন গ্রিস ও রোমের সাথে তুলনীয়। এজন্য এটি গ্রিসো-রোমান বিশ্ব নামেও পরিচিত। এই সময়টিতেই গ্রিক ভাষা এবং রোমান সাহিত্য (যেমন: ইস্কিলুস, ওভিড, হোমার, ও অন্যান্য) পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়।
এটির শুরু হিসেবে বিবেচনা করা হয় খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম-অষ্টম শতকে গ্রিক কবি হোমারে মহাকাব্যিক সাহিত্যের সূচনাকে, এবং এটি চলতে থাকে খ্রিস্ট ধর্মের বিকাশ ও রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে (খ্রিস্টের জন্মের ৫ম শতক পর্যন্ত), এবং এটি শেষ হয় ৩০০-৬০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে, এবং এর পর পরই শুরু হয় প্রাক-মধ্যযুগীয় পর্ব (৬০০-১০০০ খ্রিস্টাব্দ)। বর্তমান আধুনিক সভ্যতার ভাষা, রাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা, দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, এবং স্থাপত্যশৈলীতে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তৎকালীন রেনেসাঁসের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব দেখা যায় আঠারো ও উনিশ শতকের বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
হিরোডোটাস
হেরোডোটাস বা হিরোডোটাস একজন প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক, যিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন হালিকারনাসাস, কারিয়-তে (বর্তমান দিনের বোদরাম, তুরষ্ক)। তিনি ছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দি্র মানুষ (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৪ – আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪২৫)। তাঁকে ইতিহাসের জনক হিসেবে সম্মান দেয়া হয়, কেননা তিনিই প্রথম পদ্ধতিগতভাবে ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন, সেগুলোর সূক্ষ্মতা নিরূপণে উদ্যমী উদ্যোগ নিয়েছিলেন, এবং সেগুলোকে সঠিক ক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যায় বিন্যস্ত করেছিলেন। দ্য হিস্টোরিস(The Histories) বইটি তার অমর সৃষ্টিকর্ম।
ম্যাসেডোনিয়া
মাকেদোনিয়া বা মাকেদনিয়া দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল। বর্তমানে ম্যাসেডোনিয়ার তিনটি প্রধান অঞ্চল এবং দুটি ছোট অঞ্চল ৬টি রাষ্ট্রে অবস্থিত। প্রধান তিনটি অঞ্চল হল:
• এজীয় ম্যাসেডোনিয়া – ম্যাসেডোনিয়া রাজ্য – প্রাক্তন রাজ্য, এবং বর্তমান গ্রীসের বৃহত্তম অঞ্চল।
• ভার্দার ম্যাসেডোনিয়া – ম্যাসেডোনিয়া প্রজাতন্ত্র, প্রাক্তন যুগোস্লাভ ম্যাসেডোনিয়া প্রজাতন্ত্র।
• পিরিন ম্যাসেডোনিয়া – পশ্চিমাঞ্চলিক বুলগেরিয়ার ব্লাগয়েভগ্রাদ অঙ্গরাজ্য।
ফিলিপ দ্বিতীয়

মেসিডোনিয়ার দ্বিতীয় ফিলিপ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দিতে মেসিডোনিয়ার রাজা ছিলেন। রাজা ফিলিপ গ্রীসের সকল নগর রাষ্ট্র জয় করেন। ফিলিপের পুত্র মহামতি আলেকজান্ডার।

মহামতি আলেকজান্ডার
মহামতি আলেকজান্ডার (জন্ম – জুলাই খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫৬, মৃত্যু জুন ১১, খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩)পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম সফল সামরিক প্রধান। তিনি তৃতীয় আলেকজান্ডার বা মেসিডনের রাজা হিসেবেও পরিচিত। তিনি ছিলেন মেসিডোনিয়ার শাসনকর্তা। মেসিডোনিয়া বর্তমান গ্রীসের অন্তর্গত একটি অঞ্চল। তার পিতা ফিলিপ ছিলেন মেসিডোনিয়ার রাজা। তার মৃত্যুর পূর্বে তিনি পরিচিত পৃথিবীর বেশির ভাগ জয় (টলেমির মানচিত্র অনুযায়ী) করেছিলেন। আলেকজান্ডার তার সামরিক কৌশল ও পদ্ধতির জন্য বিশ্ব বিখ্যাত। তিনি পারস্যে অভিশপ্ত আলেকজান্ডার নামেও পরিচিত, কারণ তিনি পারস্য সাম্রাজ্য জয় করেন এবং এর রাজধানী পারসেপলিস ধ্বংস করেন। তিনি ফার্সি ভাষায় “ইস্কান্দর, মধ্য পশ্চিমা স্থানে যুল-কারনাইন, আরবে আল-ইস্কান্দার আল কাবের”, উর্দুতে সিকান্দার-এ-আজম, পস্তুতে স্কান্দর, হিব্রুতে “আলেকজান্ডার মোকদন, আরমেনিয়ানয়ে ট্রে-কারনাইয়া”। তার এজাতীয় কিছু নামের অর্থ “দুই শিং বিশিষ্ট” (যুল-কারনাইন, ট্রে-কারনাইয়া), আবার উর্দু ও হিন্দিতে সিকান্দার যার অর্থ পারদর্শি” বা অত্যন্ত পারদর্শি।
আলেকজান্ডারের পিতা দ্বিতীয় ফিলিপ তার শাসনামলে গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলোকে নিজের শাসনাধীনে আনেন। আলেকজান্ডার নিজেও এই নগররাষ্ট্রগুলিকে একত্রিত করতে অভিযান চালান কারণ ফিলিপের মৃত্যুর পর এগুলো বিদ্রোহ করেছিল। এরপর আলেকজান্ডার একে একে পারস্য, আনাতোলিয়া, সিরিয়া, ফোনিসিয়া, জুডিয়া, গাজা, মিশর, ব্যাক্ট্রিয়া এবং মেসোপটেমিয়া জয় করেন। তার সাম্রাজ্য মেসিডোনিয়া থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। পিতার মৃত্যুর পর আলেকজান্ডার পশ্চিমে অভিযান চালান ইউরোপ জয় করার জন্য। এরপর তিনি পূর্বে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করেন, কারণ শৈশবে তার শিক্ষক বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক, বিজ্ঞানী এরিস্টোটল তাকে বলেছিলেন কোথায় ভূমি শেষ হয় এবং মহাসাগর শুরু হয়। আলেকজান্ডার তার সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে বিদেশী (বিশেষ করে যারা গ্রিক বা মেসিডোনিয়ান নয়) ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করেন। এর মধ্যে কিছু জ্ঞানী ব্যক্তি তাকে “একত্রিকরণ”-এর ব্যাপারে ধারণা দেয়। তিনি তার সেনাবাহিনীতে বিদেশীদের সাথে বিবাহ উৎসাহিত করেন এবং নিজেও বিদেশী মেয়েদের বিয়ে করেন। প্রায় ১২ বছরের সামরিক অভিযানের পর আলেকজান্ডার মৃত্যুবরণ করেন। ধারণা করা হয় হয়ত তিনি ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড অথবা ভাইরাল এনকেফালাইটিস্‌ এর আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হেলেনেস্টিক যুগে তার অভিযানের কাহিনী লোকের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। আলেকজান্ডারের অভিযানের ফলে বিভিন্ন সভ্যতার মিলন ঘটে (মিশর, গ্রিক, পারস্য, ভারতীয়) এক নতুন সভ্যতার শুরু হয়। এই সভ্যতাই হেলেনেস্টিক সভ্যতা। গ্রিক ও গ্রিসের বাইরের বিভিন্ন সভ্যতায় আলেকজান্ডার ইতিহাসে, সাহিত্যে, পুরাণে জীবিত হয়ে আছেন।

শৈশব
আলেকজান্ডার ছিলেন মেসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ ও তার চতুর্থ স্ত্রী অলিম্পাসের সন্তান। পাউলতার্চ হতে জানা যায় মূলত ফিলিপ আলেকজান্ডারের পিতা ছিলেন না। অলিম্পাস সাপের সাথে থাকতে অভস্থ্য হওয়ায় ফিলিপ তার সাথে মিলিত হতে ভীত ছিলেন এবং জিউস অলিম্পাসের গর্ভে আলেকজান্ডারের জন্মের জন্য দায়ী। পাউলতার্চ আরও বলেন যে, অলিম্পাস ও ফিলিপ উভয়েই তাদের ভবিষ্যত সন্তানের জন্মের স্বপ্ন দেখেছিলেন। অলিম্পাস দেখেন তার গর্ভের ভিতর বজ্রপাত ও আলোকপাত হচ্ছে। ফিলিপের স্বপনে ছিল যে সে অলিম্পাসের গর্ভে সিংহের সিল মেরে দিচ্ছেন। এই স্বপ্নের পর ফিলিপ ভবিষ্যত বক্তা এরিস্টান্ডারের সাথে কথা বলেন। এরিস্টান্ডার বলেন যে, অলিম্পাস গর্ভবতী ও তার সন্তানের সিংহের ন্যায় চরিত্র হবে।[১] আর একটি অলৌকিক ঘটনা হল, আলেকজান্ডারের জন্মের ঠিক সময়ই ইফেসাস এর আর্টেমিস এর মন্দিরে আগুন ধরে যায়। পাউলতার্চ এই ঘটনাকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন, সৃষ্টিকর্তা মন্দিরের খেয়াল রাখার থেকেও বেশি আলেকজান্ডারের খেয়াল রাখছিলেন”।
একদিন আলেকজান্ডার তার পিতার সাথে হাটছিলেন। তারা একস্থানে এসে দেখলেন কতগুলো লোক একটি কাল পাগলা ঘোড়াকে বশে আনতে চেষ্টা করছে। আলেকজান্ডারের ঘোড়াটাকে পছন্দ হল এবং তিনি তার পিতার কাছে আর্জি করলেন তাকে ঐ ঘোড়াটা কিনে দিতে। ফিলিপ হেসে বললেন, তুমি যদি ঘোড়াটাকে বশে আনতে পারেন, তবেই ঘোড়াটাকে তুমি পেতে পার। আলেকজান্ডার ঘোড়াটাকে ভাল মত লক্ষ্য করে বুঝতে পারলো, আসলে ঘোড়াটা তার নিজের ছায়া (ঘোড়ার) প্রতি ভীত। সে ঘোড়াটার দিকে এগিয়ে গেলেন এবং ওটাকে সূর্যের দিকে মুখ করালেন যেন সে তার নিজের ছায়ার দিকে লক্ষ্য করতে না পারে। ফলশ্রুতিতে, ঘোড়াটা সহজেই বশে আসলো। ফিলিপ ঘোড়াটাকে আলেকজান্ডারকে কিনে দিলেন। আলেকজান্ডার ঘোড়াটার নামকরণ করলেন, বুসেফেলাস (যার অর্থ ষাড়ের মাথা)। বুসেফেলাস আলেকজান্ডারের শেষ যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করার আগ পর্যন্ত সকল যুদ্ধে আলেকজান্ডারের সাথে ছিল। ভারত হতে ফেরার সময় আলেকজান্ডারে বুসেফেলাসের নামে একটি স্থানের নামকরণ করেন।
মেসিডোনিয়ার রাজত্
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪০ সালে ফিলিপ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে আক্রমণ করেন। তখন, ১৬ বছর বয়সি আলেকজান্ডার মেসিডোনিয়ার দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৯ সালে ফিলিপ মেসিডোনিয়ান ক্লিওপেট্রাকে তার পঞ্চম স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। আলেকজান্ডারের মা অলিম্পাস ছিলেন ইপিরাস (পশ্চিম গ্রিক উপত্যকার ভূমি) হতে। ইপিরাস মেসিডোনিয়ার অংশ ছিল না, অপরদিকে ক্লিওপেট্রা ছিলেন পুরোপুরি মেসিডোনিয়ান। ফলে, ফিলিপ উত্তরাধিকারী হিসেবে আলেকজান্ডারের অবস্থান প্রশ্ন বিদ্ধ্ব হয়ে পরে। ক্লিওপেট্রার চাচা অ্যাটলাস, ফিলিপ-ক্লিওপেট্রার বিয়ের ভোজ-সভায় ঘোষণা দেন, এই ভোজ-অনুষ্ঠানই নির্দেশ করবে ভবিষ্যত মেসিডোনিয়ার শাসক কে হবে। আলেকজান্ডার তখন তার পেয়ালা অ্যাটলাসের দিকে ধরে চিৎকার করে বলেন, “তবে আমি কে, জারজ সন্তান? ফিলিপ তখনই তার তোলোয়ার উম্মুক্ত করে আলেকজান্ডারের দিকে ধরে কিছু বলতে যান, কিন্তু অধিক পান করার জন্য ফিলিপ সেখানেই লুটিয়ে পরেন। আলেকজান্ডার ঐ স্থানে তখন বলেন, “এখানে একব্যক্তি (আলেকজান্ডার স্বয়ং) গ্রিস থেকে এশিয়া জয় করতে পরিকল্পনা করছে, তাকে এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে সরানো যাবে না”। এরপর আলেকজান্ডার, তার মা অলিম্পাস ও বোন ক্লিওপেট্রা রাগ করে মেসিডোনিয়া ছেড়ে চলে যান।
পরবর্তীতে ফিলিপ তার ছেলেকে মানিয়ে নেন এবং আলেকজান্ডার বাড়ি ফিরে আসেন। অলিম্পাস ও আলেকজান্ডারের বোন ইপিরাসে থেকে যান। আলেকজান্ডার তার পিতাকে ক্যারোনিয়ার যুদ্ধে (খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৮ সাল) সাহায্য করেন। এ যুদ্ধে ছিল, এথেন্স এবং থিবস্‌ এর নগর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধে আলেকজান্ডারের নেতৃত্বে অশ্বরোহি বাহিনী থিবস্‌-এর বিশেষ বাহিনীকে পরাজিত করেন। এই বাহিনী অপ্রতিরোধ্য বলে পরিচিত ছিল। যুদ্ধের পর ফিলিপ একটি ভোজনসভার আয়োজন করেন। আলেকজান্ডার এতে অনুপস্থিত ছিলেন। ফিলিপ বিওশিয়া হতে থিবস্‌ দখলের পর অনেকটা সন্তুষ্ট ছিলেন এবং মেসিডোনিয়ান বাহিনীকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে রেখে চলে আসেন। কয়েকমাস পর, গ্রিক নগর রাষ্ট্রগুলিতে মেসিডোনিয়ার শক্ত নিয়ন্ত্রণ রাখার উদ্দেশ্যে লীগ অফ করিন্থ গঠন করা হয়।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৬ সালে ইপিরাস রাজা প্রথম আলেকজান্ডারের সাথে ফিলিপের মেয়ে ক্লিওপেট্রার বিবাহের সময় খুন হন। ধারণা করা হত ফিলিপের খুনের পরিকল্পনাকারী আলেকজান্ডার অথবা অলিম্পাস। আবার এটা ও ধারণা করা হয়, পারস্যের তৃতীয় দারিয়ুস যে কিনা, সম্প্রতিই পারস্যের শাহানশাহের পদ গ্রহণ করেছিলেন সেও ফিলিপের খুনের কারণ হতে পারে। ফিলিপের মৃত্যুর পর সেনাবাহিনী আলেকজান্ডারকে মেসিডোনিয়ার রাজা হিসেবে ঘোষণা দেয়। তখন তার বয়স ছিল মাত্র বিশ। গ্রিক নগর রাষ্ট্র তরুণ আলেকজান্ডার ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথে স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহ ঘোষণা করল। আলেকজান্ডার খুব দ্রুত অভিযান পরিচালনা করলেন। থিবস্‌ নগরীর প্রধান ফটকে আসার পরেই থিবস্‌বাসী অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। বিদ্রোহকারী অঞ্চলগুলোর মধ্যে থিবস্‌ই সবথেকে বেশি সক্রিয় ছিল। করিন্থ প্রণালীতের গ্রিকদের সম্মেলনে স্পার্টা ছাড়া সকল রাষ্ট্রই আলেকজান্ডারকে পারস্যের বিরুদ্ধে অভিযানে আলেকজান্ডারের নেতৃত্ব গ্রহণে সম্মত হয়। এর আগে এই দায়িত্ব ফিলিপের উপর ন্যাস্ত ছিল।
পরবর্তি বছর (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৫) সালে আলেকজান্ডার মেসিডোনিয়ার উত্তর সিমান্তের ডানবির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। আলেকজান্ডার যখন উত্তরে অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন, তখন আবার থিবস্‌ ও এথেন্স বিদ্রোহ করে। এইবার থিবস্‌ সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আলেকজান্ডারের সামনে তারা টিকতে পারে নাই, এবং অনেক রক্তপাতের পর আলেকজান্ডার থিবস্‌ জয় করেন। আলেকজান্ডার থিবস্‌ নগরীকে ধ্বংস করে দেন এবং এর অঞ্চলসমূহ বিওশিয়ান নগর গুলির ভিতর ভাগ করে দেন। নগরীর সকল নাগরিককে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়। শুধুমাত্র পুরোহিত, মেসিডোনিয়ার আগের নেতারা ও পিন্দারের বংশধরদের মুক্তি দেওয়া হয়। শুধুমাত্র পিন্দারের বাড়িটিই অভিযানের পর দন্ডায়মান ছিল। থিবস্‌ এর পরই ভীত এথেন্সবাসি আত্মসমর্পণ করে। মেসিডোনিয়া বিরোধী নেতাদের (সবার আগে ডিমোস্‌থেন্স) দেশত্যাগের শর্তে আলেকজান্ডার এথেন্সবাসিকে ছাড় দেন।
বিশ্ব জয়

আলেকজান্ডারের পারস্য অভিযানের পূর্বে গ্রিকদের কাছে জানা ছিল, পৃথিবীর মোট চার-পঞ্চমাংশই পারস্য সাম্রাজ্য এবং এ যাবৎ কেউ পারস্য জয় করতে পারেননি। পারস্যের রাজধানী ব্যাবিলন গ্রিকদের কাছে ছিল এক স্বপ্ন নগরী। গ্রিকরা পন্ডিতরা তাদের সন্তানদের শেখাতেন পার্সিয়ানরা হচ্ছে বর্বর (বারবেরিয়ান) আর গ্রিকরা হচ্ছে সভ্য। তাই তারা পারস্যের ব্যাপারে আগ্রহী নয়। এই জাতীয় কথা আলেকজান্ডার শেখেন তার গুরু বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটোলের কাছ থেকে। তখন আলেকজান্ডার ভাবতেন গ্রিকরা যদি পার্সিয়ানদের থেকে উন্নতই হয়, তবে কেন তারা পারস্য জয় করছে না?
পারস্যের পতন

আলেকজান্ডার তার ৪২,০০০ সৈন্যের সেনাবাহিনী নিয়ে হেলিস্পন্ট অতিক্রম করেন। সৈন্যদের মধ্যে বেশীরভাগ ছিল মেসিডোনিয়ান এবং গ্রিক। তাছাড়াও কিছু থ্রাসিয়ান, পাইওনিয়ান এবং ইলিরিয়ান। গ্রানিকাসের যুদ্ধে পারস্যের সেনাবাহিনীর পরাজয়ের পর আলেকজান্ডার পারস্যের প্রাদেশিক রাজধানী ও সার্দিসের‌ অর্থভান্ডার দখল করেন। এরপর তিনি আইওনিয়া উপকুল ধরে এগিয়ে যান। হেলিকারনাস-এ আলেকজান্ডার সফলভাবে যুদ্ধের দ্বারা বিভিন্ন বাঁধা অতিক্রম করেন। তার বিপক্ষের রোডস্‌-এর মেমন এবং কারিয়ার পারস্যিয়ান সাত্রাপ সমুদ্র পথে পালিয়ে যায়। আলেকজান্ডার কারিয়ার শাসন ভার এডার কাছে ছেড়ে দেন। এডাকে তার ভাই পিক্সোদারাস ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। হেলিকারনাসাস্‌ হতে আলেকজান্ডার পাহাড়ী লিসিয়া এবং প্যামফিলিয়ান সমতল ভূমি বরাবর চলতে থাকেন। পথে তিনি সকল উপকূলীয় শহর দখল করেন এবং এগুলোর শাসকদের শত্রু ঘোষণা করেন। প্যামফিলিয়া থেকে সামনে আর কোন গুরুত্বপূর্ণ স্থান না থাকায় আলেকজান্ডার ভূমির দিকে অভিযান শুরু করেন। টারমেসাসে আলেকজান্ডার পিসিডিয়া দখল করলেও তেমন ধ্বংসযজ্ঞ করেন নাই।
প্রাচীন ফিজিয়ান রাজধানী গোড়ডিয়ামে পৌঁছলে সেখানে তাকে জানানো হয়, সেখানে অ্যাপোলোর মন্দিরে একটি দড়ির জট রাখা আছে। পুরাণে আছে যে এই জট খুলতে পারবে সে হবে “এশিয়ার রাজা”। পুরোহিতদের এই কথা শোনার পর, আলেকজান্ডার বললেন কিভাবে জট খোলা হল তা ব্যাপার নয়। তিনি ঐ মূহুর্তে তার তলোয়ার খুলে জটটি কেটে ফেলেন। তবে এটাও শোনা যায়, তলোয়ার দিয়ে নয়, বরং আলেকজান্ডার বের করেন কিভাবে এ জট খোলা সম্ভব।
আলেকজান্ডার তার সেনাবাহিনী নিয়ে সিসিলিয়ান দরজা পার করেন এবং ইসাস এর যুদ্ধে খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৩-এ পারস্য সম্রাট তৃতীয় দারিয়ুসের সাথে মিলিত হন। সেখানে আলেকজান্ডার দারিয়ুসকে পরাজিত করেন এবং দারিয়ুস তার প্রাণ বাচিয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু তিনি তার স্ত্রী, দুই কন্যা, তার মা সিসিগাম্বিস্‌ এবং তার ব্যক্তিগত সম্পদের বেশির ভাগ ফেলে যান। দারিয়ুস ভূ-মধ্যসাগরের উপকুল ধরে টায়ার এবং গাজা হয়ে চলে যান। এদিকে আলেকজান্ডার জেরুজালেমের নিকটবর্তি জুডিয়া দিয়ে এগিয়ে যান। তবে আলেকজান্ডার জেরুজালেমে প্রবেশ করেন নাই।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩২-৩৩১ সালে আলেকজান্ডারকে মিশরে মুক্তিদাতা হিসেবে স্বাগতম জানানো হয়। সিউয়া মরুভুমিতে আমুনের (মিশরে জিউসের সমমর্যাদা সম্পন্ন দেবতা) মন্দিরে পুরোহিতরা আলেকজান্ডারকে জিউসের পুত্র হিসেবে ঘোষণা করে। ইতিমধ্যে, আলেকজান্ডার জিউসকে নিজের পিতা বলে স্বীকার করেন, কারণ সেই সময়ের মুদ্রায় আলেকজান্ডারের প্রতিচ্ছবিতে তার মাথায় ভেড়ার শিং থাকত। আলেকজান্ডার মিশরে আলেকজান্ড্রিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর এই আলেকজান্ড্রিয়া মিশরে টলেমী শাসকদের রাজধানীতে হয়। মিশর জয়ের পর আলেকজান্ডার আরো পূর্বে আসরিয়ার (বর্তমানে উত্তর ইরাক) দিকে অভিযান করেন। সেখানে দারিয়ুস এর নেতৃত্বে গৌগামেলার যুদ্ধে তৃতীয় পারস্য সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন। যুদ্ধে দারিয়ুসের রথের সারথীর মৃত্যুবরণ করলে দারিয়ুস আবার পালাতে থাকেন এবং আলেকজান্ডার তাকে আরবেলা পর্যন্ত ধাওয়া করেন। দারিয়ুস ইকবাটানা পাহাড়ে আশ্রয় নিলে আলেকজান্ডার ব্যাবিলনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
ব্যাবিলন থেকে আলেকজান্ডার অন্যতম অ্যাকামেনিড রাজধানী সুসাতে যান এবং এর কোষাগার দখল করেন। সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ রয়েল রোড হয়ে পারস্যের রাজধানী পার্সেপলিস্‌ পাঠিয়ে দেন। অন্যদিকে, নিজে দ্রুত পারস্য দরজা দখল করেন (আধুনিক জাগরস্‌ পর্বতে) এবং তারপরই দ্রুত পার্সেপলিস্‌ এর রাজকোষ লুট হবার আগেই সেখানে চলে যান। এর পরবর্তি কয়েক মাস আলেকজান্ডার সেনাবাহিনীকে পার্সেপলিস্‌ লুট করতে দেন। এসময় পার্সেপলিসের পূর্ব দিকের প্রাসাদ যেরসেক্সে আগুন লেগে তা পুরো শহরে ছড়িয়ে যায়।
আলেকজান্ডার এর পর দারিয়ুসের বিকল্পের সন্ধান করতে থাকেন। এদিকে, দারিয়ুস অপহৃত হন। তার ব্যাক্ট্রিয়ার গভর্নর, বেসাস্‌ ও এক পুরুষ আত্মীয়ের সহকারীরা তাকে হত্যা করে। বেসাস্‌ নিজেকে দারিয়ুসের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে এবং আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের পরিকল্পনা করে মধ্য এশিয়ার দিকে হটতে থাকেন। দারিয়ুসের মৃত্যুর পর আলেকজান্ডার প্রতিশোধের এই যুদ্ধের ইতি ঘোষণা করেন এবং গ্রিক ও অন্যান্য মিত্রদের লীগ অফ করিন্থ হতে মুক্ত করে দেন। তবে, যারা স্বেচ্ছায় তার সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণে উৎসাহী ছিল তিনি তাদের সেনাবাহিনীতে গ্রহণ করেন।
আলেকজান্ডার প্রায় তিন বছর প্রথমে বাসাস্‌ এবং পরে সোগডিয়ানা, স্পিটামেনস্‌-এর গভর্নরদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। এই অভিযান চালাতে গিয়ে আলেকজান্ডার মিডিয়া, পার্থিয়া, আরিয়া, ড্রাজিয়ানা, আর্কোশিয়া, ব্যাক্ট্রিয়া এবং সিথিয়া জয় করেন। তিনি হেরাত এবং সমরখন্দ দখল ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। আলেকজান্ডার অনেকগুলো নতুন আলেকজান্ড্রিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। এগুলোর মধ্যে আছে আধুনিক কালের আফগানিস্তানের কান্দাহার এবং আলেকজান্ড্রিয়া ইসচেট (বর্তমানে তাজাকিস্তানে)। উভয়ই পরবর্তিতে বিদ্রোহ করে। বেসাস্‌ খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৯-এ ও স্পিটামেনস্‌-এর পরের বছর।
ভারত অভিযান
ম্যাসিডনের রাজা আলেকজান্ডারের ভারতবর্ষ আক্রমণ ভারতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পারস্য বিজয়ে পর শুরু হয় তার ভারত আগ্রাসন। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩১ অব্দে তিনি পারস্য সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন। সে সময় সিন্ধুনদ পারস্য সাম্রাজ্যের সীমানা ছিল। আলেকজান্ডারের ভারতবর্ষ আক্রমণের প্রাক্কালে উত্তর-পশ্চিম ভারত পরস্পরবিরোধী অনেকগুলো রাজ্যে বিভক্ত ছিল। তাদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বহিরাক্রমণ ঠেকানো সম্ভবপর ছিল না। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৮ অব্দের মধ্যে সমগ্র পারস্য এবং আফগানিস্তান আলেকজান্ডারের দখলে আসে। অত:পর আলেকজান্ডার খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে ভারত অভিমুখে অগ্রসর হন। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে তিনি ভারত নাম ভূখণ্ডে পদার্পণ করেন। আলেকজান্ডার পুষ্কলাবতীর রাজা অষ্টককে পরাভূত করেন, অশ্বক জাতিও তার নিকট পরাভূত হয়, তক্ষশীলার রাজা তার নিকট স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে, ঝিলাম রাজ পুরু বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাভব মানতে বাধ্য হনঅ অত:পর আরেকজান্ডার রাভি নদীর উপকূলবর্তী রাজ্যসমূহ দখল করেন এবং বিপাশা নদী পর্যন্ত অগ্রসর হন। এই স্থলে তার রণক্লান্ত সেনাবাহিনী দেশে প্রত্যাবর্তনে উণ্মুখ হয়ে পড়লে আলেকজাণ্ডার ভারত অভিযান বন্ধ করে গ্রীসে প্রত্যাবর্তন শুরু করেন। প্রত্যার্তনের পথে তিনি বেলুচিস্তান ও পাঞ্জাব অধিগত করেন্ ঝিলাম ও সিন্ধু নদের অন্তবর্তী সকল রাজ্য তার অধিগত হয়। ভারত ভূঘণ্ডে আরেকজাণ্ডার প্রায় ১৯ মাস অবস্থান করেছিলেন। তিনি ভারত ত্যাগের পর প্রায় দুই বৎসরকাল তার বিজিত অঞ্চলসমূহে গ্রীক শাসন বজায় ছিল। ভারত থেকে প্রত্যাবর্তনের কিছুদিন পর খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দে ব্যবিলনে তার অকাল মৃত্যু হয়। অন্যদিকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের নেতৃত্বে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা পাঞ্জাবে গ্রীক শাসনের অবসান ত্বরান্বিত করে।
আলেকজান্ডার ও গঙ্গারিডই
সম্রাট আলেকজান্ডার সুদূর গ্রিস থেকে একের পর এক রাজ্য জয় করে ইরান আফগানিস্তান হয়ে ভারতের পাঞ্জাবে পৌছে যায়। সুদর্শন তরুণ সম্রাটের চোখে সারা পৃথিবী জয়ের স্বপ্ন। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিশালী সেনাবাহিনীর অধিকারি তিনি। বিখ্যাত ইরান সম্রাট দারায়ুস থেকে শুরু করে উত্তর পশ্চিম ভারতের পরাক্রমশালী রাজা পুরু পর্যন্ত কেউ তার সামনে দাড়াতে পারে নাই। এখন তার সামনে মাত্র একটা বাধা, বিপাশা নদীর ওপারের গঙ্গারিডই রাজ্য। ভারতের মূল ভুখন্ড। এটুকু করতলগত হলেই সমগ্র ভারত তার দখল হয়ে গেল। যে স্বপ্ন নিয়ে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন গ্রিক রাষ্ট্র মেসিডোনিয়া থেকে, তা পরিপূর্ণতা পাবে।
এদিকে গঙ্গারিডই রাজ্যের রাজা তার বিশাল বাহিনী নিয়ে নদীর এপাড়ে আলেকজান্ডারকে প্রতিহত করতে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। গঙ্গারিডই সম্পর্কে প্রাচীন গ্রিক ও ল্যাটিন ঐতিহাসিকগণের লেখায় তথ্য পাওয়া যায়।
মেগাস্থিনিস(৩৫০ খ্রিষ্টপূর্ব-২৯০ খ্রিষ্টপূর্ব) আলেকজান্ডারের সেনাপতি ও বন্ধু সেলুকাসের রাজত্বকালে গ্রিক দূত হিসাবে ভারতে এসেছিল। তিনি লিখেন- ‘গঙ্গারিডাই রাজ্যের বিশাল হস্তী-বাহিনী ছিল। এই বাহিনীর জন্যই এ রাজ্য কখনই বিদেশি রাজ্যের কাছে পরাজিত হয় নাই। অন্য রাজ্যগুলি হস্তী-বাহিনীর সংখ্যা এবং শক্তি নিয়া আতংকগ্রস্ত থাকিত’
‘ভারতের সমূদয় জাতির মধ্যে গঙ্গারিডাই সর্বশ্রেষ্ঠ। এই গঙ্গারিডাই রাজার সুসজ্জিত ও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত চার হাজার হস্তী-বাহিনীর কথা জানিতে পারিয়া আলেকজান্ডার তাহার বিরূদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইলেন না’ – ডিওডোরাস (৯০ খ্রিষ্টপূর্ব-৩০ খ্রিষ্টপূর্ব)
গঙ্গাড়িডই রাজ্যের প্রকান্ড সেনাবাহিনী বর্ণনার ক্ষেত্রে ভারতীয় ও ধ্রুপদী ইউরোপীয় রচনাগুলির উল্লেখে প্রচুর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ডিওডোরাস ও ক্যুইন্টাস কার্টিয়াস রুফাস উভয়েই উল্লেখ করেছেন নন্দরাজের সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিভাগ সম্বন্ধে। যথা- পদাতিক সৈন্য ২ লক্ষ, অশ্বারোহী সৈন্য ২০ হাজার, রথ ২ হাজার, এবং তিন থেকে চার হাজার হাতি।
ধ্রুপদী গ্রিক ও ল্যাটিন বর্ণনায় রাজার নাম আগ্রাম্মেস। তিনি ছিলেন নীচকূলোদ্ভব নাপিতের পূত্র। হিন্দু পুরাণে তিনি মহাপদ্মনন্দন এবং বৌদ্ধ শাস্ত্র মাহাবোধিবংশে উগ্রসেন, অর্থ এমন এক ব্যক্তি যাঁর ‘প্রকান্ড ও পরাক্রান্ত সেনাবাহিনী’ আছে। হেমচন্দ্রের পরিশিষ্টপর্ব নামক জৈন গ্রন্থেও মহাপদ্মনন্দকে বলা হয়েছে নাপিত কুমার। পুরাণে বলা হয়েছে শূদ্রোগর্ভোদ্ভব। আরও বলা হয়েছে, ‘সর্বক্ষত্রান্তক নৃপঃ’ অর্থাৎ সকল ক্ষত্রিয়কে নিধন করে সিংহাসনে বসেছিল।
এই পর্যন্ত আলোচনায় গঙ্গারিডাই নামের পরাক্রান্ত রাজ্যের প্রমাণ পাওয়া গেল। যেটা ছিল পাঞ্জাব পর্যন্ত সমূদয় গঙ্গা অববাহিকায় নিয়ে গঠিত ভারতের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালি রাজ্য। বিজিত স্থানীয় ছোট ছোট ভূস্বামীরা আলেকজান্ডারকে জানাল অপর পাড়ের দেশটির ঐশ্বর্যের কথা, অপরাজেয় সৈন্যবাহিনীর কথা।
এরপর পৃথিবী বিখ্যাত এ অসীম সাহসী বীর করণীয় আলোচনার জন্য নিজের সেনাবাহিনীর সাথে পরামর্শে বসলেন এবং গঙ্গাড়িডই জয় করার জন্য উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সৈন্যরা এমনিতেই বছরের পর বছর যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত। তাছাড়া নদীর ঐপাড়ের ভয়াবহ সেনাবাহিনীর মোকাবেলায় অপরাগতা প্রকাশ করল। বিচক্ষণ সেনাপতি সৈন্যদের পক্ষ হয়ে জানাল সৈন্যরা কেউ বিপাশা পার হয়ে নিজের জীবন দিয়ে আসতে রাজী নয়, তারা পিতামাতা, স্ত্রী, সন্তান ও জন্মভুমিতে ফিরে যাওয়ার হন্য উদ্গ্রীব। এভাবে সৈন্যদের অনাগ্রহের ফলে পাঞ্জাবের বিপাশা নদীর অপর পাড়েই গ্রিক বাহিনীর বিজয় রথ থেমে যায়। আলেকজান্ডার এরপর গ্রিক বাহিনীকে মেসিডোনিয়ার দিকে ফিরতি যাত্রার নির্দেশ দেন।
মৃত্যু
আলেকজান্ডার ৩২৩ খ্রিষ্টপূর্ব জুন মাসের ১১ অথবা ১২ তারিখে ব্যাবিলনে দ্বিতীয় নেবুচাদনেজারের প্রাসাদে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ৩২ বছর।
ব্যক্তিগত জীবন
আলেকজান্ডার এর শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য তার বাবার সান্নিধ্যে গঠিত। তার মায়ের খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল এবং তিনি আলেকজান্ডারকে বিশ্বাস করতে উৎসাহিত করতেন যে পারস্য সাম্রাজ্য জেতাই তার নিয়তি।
বিভিন্ন ধর্মে আলেকজান্ডার বা তার সাথে তুলনীয় সমসাময়িক ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া গেছে। এসব নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত প্রচলিত আছে। পবিত্র কুরআন শরীফে উল্লিখিত জুলকারনাইন ই আলেকজান্ডার ছিলেন কীনা তা নিয়েও মতপার্থক্য আছে।

প্রাচীন রোম
প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম যা খ্রিষ্টপূর্ব ৮ম শতাব্দীর প্রথমভাগে ইতালীয় উপদ্বীপে সূচীত হয়। রোম শহরকে কেন্দ্র করে ভূমধ্যসাগরের তীর ধরে এই সভ্যতা বিকাশিত হতে থাকে, এবং কালক্রমে একটি প্রাচীন যুগের বৃহত্তম সাম্রাজ্যে পরিনত হয়।
এই সভ্যতার স্থায়ীত্বকাল ছিল প্রায় বারো শতক এবং এ দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় রোমান সভ্যতা একটি রাজতন্ত্র থেকে একটি সম্ভ্রান্ত প্রজাতন্ত্র এবং পর্যায়ক্রমে একটি একনায়কতন্ত্রী সাম্রাজ্যে পরিবর্তিত হয়। যুদ্ধ বিজয় এবং আত্তীকরণের মাধ্যমে এটি দক্ষিণ ইউরোপ, পশ্চিম ইউরোপ, এশিয়া মাইনর, উত্তর আফ্রিকা, উত্তর ইউরোপ এবং পূর্ব ইউরোপের একাংশকে এর শাসনাধীনে নিয়ে এসেছিল। রোম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী সাম্রাজ্য এবং প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সাম্রাজ্যগুলোর একটি ছিল। এটিকে প্রায়ই প্রাচীন গ্রিস সাথে একত্রে “উচ্চমানের পুরাতাত্বিক নিদর্শনের” মধ্যে দলবদ্ধ করা হয় এবং এদুটি সভ্যতার সাথে অনুরূপ সংস্কৃতি ও সমাজ মিলে একত্রে গ্রেকো-রোমান বিশ্ব হিসাবে পরিচিত। নর্ডিক জাতি কর্তৃক রোমান সভ্যতা ধ্বংস করা হয়।
রোমান সাম্রাজ্য
রোমান সাম্রাজ্য প্রাচীন রোমান সভ্যতার একটি পর্যায়। এই পর্যায়ে রোমান সরকার ব্যবস্থা প্রজাতন্ত্র থেকে একনায়কতন্ত্রে রূপ নেয়। ৫১০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতক পর্যন্ত রোমান প্রজাতন্ত্র বিরাজমান ছিল। ৪৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জুলিয়াস সিজার তথা ইউলিয়ুস কায়েসারের আজীবন একনায়ক পদে প্রতিষ্ঠিত হবার মধ্য দিয়ে রোমান সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটে। ২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিজারের উত্তরসূরী অক্টাভিয়ানকে রোমান সিনেট কর্তৃক আউগুস্তুস উপাধি দানও রোমান সাম্রাজ্যের শুরুর একটি মাইলফলক। ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই সাম্রাজ্য স্থায়ী ছিল। এর লাতিন নাম ছিল Imperium Romanum ইম্পেরিউম রোমানুম।
উন্নতির শিখরে নীচের এলাকাগুলি রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল: ইংল্যান্ড ও ওয়েল্‌স, রাইন নদীর পশ্চিমে ও আল্পসের দক্ষিণে অবস্থিত সমগ্র ইউরোপ, বলকান অঞ্চল, কৃষ্ণ সাগর, এশিয়া মাইনর, লেভান্ট, আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল।

আউগুস্তুস
সম্রাট আউগুস্তুস (অগাস্টাস) (২৩শে সেপ্টেম্বর, ৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – ১৯শে আগস্ট, ১৪, নোলা, নেপল্‌সের কাছে) ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট। তাঁর জন্মনাম ছিল গাইউস অক্তাভিউস। পরবর্তীতে তিনি নিজের নাম বদলে গাইউস ইউলিউস কায়েসার অক্তাভিয়ানুস রাখেন। সম্রাট হবার পূর্বে তিনি অক্তাভিয়ান নামেও পরিচিত ছিলেন। আউগুস্তুস একটি স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের প্রবর্তন করেন, যা প্রিঙ্কিপাতে নামে পরিচিত ছিল। আউগুস্তুস ছিলেন এই রাষ্ট্রের প্রিঙ্কেপ্‌স বা প্রথম নাগরিক। এই নতুন শাসনব্যবস্থা বাইরের অবয়বে প্রজাতান্ত্রিক হলেও আউগুস্তুস এটিকে কাজে লাগিয়ে রোমান জনজীবনের প্রায় সমস্ত দিক নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হন এবং গ্রিক-রোমান বিশ্বে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসেন। ইতিহাসের অন্যতম দক্ষ প্রশাসক আউগুস্তুস রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতা রোমে কেন্দ্রীভূত করেন।
আউগুস্তুস তথা অক্তাভিয়ান একটি ধনী পরিবারে জন্ম নেন ১৮ বছর বয়সে তার পিতামহের ভ্রাতা জুলিয়াস সিজারের (ইউলিউস কায়েসার) পালিত সন্তান ও উত্তরসূরী হিসেবে নামাঙ্কিত হন। সিজারের মৃত্যুর পর রোমে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, এবং মার্ক অ্যান্টনি এবং লেপিদুসের সাথে তিনি তৃতীয় শাসক হিসেবে ৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পুনর্গঠিত রোমান রাষ্ট্র শাসন করতে থাকেন। ৪২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিজারের আততায়ী ব্রুটাস (ব্রুতুস) এবং কাসিউস-কে ফিলিপ্পিতে পরাজিত করার পর অক্তাভিয়ান ও মার্ক অ্যান্টনি রোমান সাম্রাজ্যকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেন। অক্তাভিয়ান সাম্রাজ্যের পশ্চিম অংশ শাসনের অধিকার পান। এরপর অক্তাভিয়ান বিভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। ৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি লেপিদুসকে এবং ৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি অ্যান্টনি ও মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রাকে পরাজিত করেন এবং এই সাথে গ্রিক-রোমান বিশ্বের একাধিপতিতে পরিণত হন। ৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত তিনি রোমান প্রজাতন্ত্রের একজন কনসাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি আউগুস্তুস উপাধি গ্রহণ করেন এবং ২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে একনায়ক সম্রাটের মর্যাদা লাভ করেন। এরপর তিনি ধীরে ধীরে রোমান সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কার সাধন করেন এবং ইউরোপের অনেক নতুন অঞ্চল বিজয় করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে দেবতার মর্যাদা দেওয়া হয় এবং তাঁর পালিত পুত্র তিবেরিউস রোমান সম্রাট হন।

জুলিয়াস সিজার
গাইও জুলিও চেসার ( ১৩ জুলাই ১০১তে অথবা ১০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ – রোম, ১৫ মার্চ ৪৪ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) রোমান সাম্রাজ্যের একজন সেনাপতি এবং একনায়ক ছিল, ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালীর একজন বলে বিবেচনা করা হয়েছিল।
তিনি সে সময় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিলেন যে শাসন প্রক্রিয়ার সাম্রাজ্যে এবং প্রজাতন্ত্রীক থেকে পরিবর্তন করেছিল। তিনি রোমের একনায়ক ছিল ৪৯ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের শেষে পর্যন্ত, ৪৭ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৪৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে প্রায় দশ বছরের দায়িত্বে এবং ৪৪ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ অনন্ত একনায়কত্ব হিসেবে। কিছু ইতিহাসবিদের দ্বারা বিবেচনা করা হয়েছিল রোমের প্রথম সম্রাট।
গাল্লীয়া জয়ের সঙ্গে যা আটলান্টিক মহাসাগর এবং রাইনতে, রেস রোমান জনগণ শাসন প্রসারিত করেছিল, প্রথম বারের মত ব্রিটেন এবং জার্মানিদের আক্রমণের জন্য সেখানে রোমান সৈন্যবাহিনী নিয়ে যায় এবং স্পেন, গ্রিস, আফ্রিকা, মিশর এবং পন্তুসতেও যুদ্ধ করে।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য অথবা বাইজান্টিয়াম শব্দটি উনবিংশ শতাব্দী থেকে মধ্যযুগীয় গ্রিকভাষী রোমানদের দ্বারা পরিচালিত সাম্রাজ্যের সাধারণ নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই সুবিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল রাজধানী কন্সটান্টিনোপলকে কেন্দ্র করে। এই সাম্রাজ্যের অপর নাম হচ্ছে পূর্বাঞ্চলীয় রোমান সাম্রাজ্য যদিও পশ্চিমাঞ্চলীয় রোমান সম্রাজ্যের পতনের পরবর্তি যুগকে বিবেচনা করলেই কেবল এই নামটি কার্যকারিতা লাভ করে। যখন এই সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল তখন অনেকেই একে গ্রিকদের সাম্রাজ্য নামে অভিহিত করতো, কারণ এ অঞ্চলে গ্রিক আধিপত্যই সবচেয়ে প্রকট রূপ ধারণ করেছিল। একই সাথে সেখানে গ্রিক সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জনগোষ্ঠী এবং মধ্যযুগীয় গ্রিক প্রথার বিস্তার ঘটেছিল। মোদ্দা কথা সাম্রাজ্যটিকে নির্দ্বিধায় রোমান সম্রাজ্য নামে অভিহিত করা যায় এবং এর সম্রাটদেরকে প্রাচীন রোমান সম্রাটদেরই অবিচ্ছিন্ন উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ইসলামী বিশ্বে এই সাম্রাজ্য প্রাথমিকভাবে রূম নামে পরিচিত ছিল, মুসলিমদের ধর্মীয় গ্রন্থ কুরআনে একে এই নামেই উল্লেখ করা হয়েছে।
ঠিক কবে এই সাম্রাজ্যের যাত্রা শুরু হয়েছিল তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়, কারণ বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও এ নিয়ে মতভেদ আছে। অনেকের মতে রোমান সম্রাট প্রথম কন্সট্যান্টাইন (রাজত্বকাল: ৩০৬ – ৩৩৭ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন প্রথম বাইজেন্টাইন সম্রাট। সম্রাট কনস্টান্টিনই ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে রোম থেকে তার রাজধানী বাইজান্টিয়ামে সরিয়ে আনেন এবং এই শহরকে কন্সটান্টিনোপল নামে পুনর্গঠিত করেন যাকে অনেকেই নতুন রোম নামে অভিহিত করে থাকেন।
মহান কন্সট্যান্টাইন ( ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২৭২ – ২২ মে, ৩৩৭), যিনি প্রথম কন্সট্যান্টাইন বা সেইন্ট কন্সট্যান্টাইন নামেও পরিচিত, ছিলেন একজন ৩০৭ হতে ৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত একজন রোমান সম্রাট। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করা প্রথম রোমান সম্রাট হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়। কন্সট্যান্টাইন ও তার সহ-সম্রাট লিসিনিয়াস ৩১৩ সালে এডিক্ট অব মিলান জারি করেন যার মাধ্যমে সাম্রাজের সর্বত্র সকল ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা ঘোষণা করা হয়।
কন্সট্যান্টাইন রোমান গৃহযুদ্ধে সম্রাট ম্যাক্সেন্টিয়াস ও লিসিনিয়াসকে পরাজিত করেন। তিনি ফ্রাঙ্ক, আলামান্নি, ভিসিগোথ, সারমাটিয়ান প্রভৃতি জাতির বিরুদ্ধেও জয় লাভ করেন, এমনকি পূর্বতন শতাব্দীতে হারানো ডেসিয়া ও পুনরুদ্ধার করেন। কন্সট্যান্টাইন বাইজেন্টিয়ামে সম্রাটের নতুন আবাসস্থল নির্মাণ করেন এবং এর নাম দেন নতুন রোম। কিন্তু সম্রাটের সম্মানার্থে সবাই এটিকে কন্সট্যান্টিনোপল নামে ডাকা শুরু করে। পরবর্তীকালে এই শহর-ই এক হাজার বছরের বেশী বাইজেন্টাইন সাম্রাজের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্টিত হয়। এই কারণে কন্সট্যান্টাইনকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রাচীন ভারত
ভারতের ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দ থেকে খ্রিষ্টীয় বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন, মধ্যযুগীয় ও প্রাক-আধুনিক কালের ইতিহাস। খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় দশ লক্ষ বছর আগে উক্ত ভূখণ্ডে প্রথম মানববসতি গড়ে উঠতে দেখা যায়। তবে ভারতের জ্ঞাত ইতিহাসের সূচনা হয় ৩৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সিন্ধু সভ্যতার উন্মেষ ও প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে। পরবর্তী হরপ্পা যুগের সময়কাল ২৬০০ – ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সূচনায় এই ব্রোঞ্জযুগীয় সভ্যতার পতন ঘটে। সূচনা হয় লৌহ বৈদিক যুগের। এই যুগেই সমগ্র গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে মহাজনপদ নামে পরিচিত প্রধান প্রধান রাজ্যগুলির উন্মেষ ঘটে। এই রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল মগধ। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে মগধে জন্মগ্রহণ করেন মহাবীর ও গৌতম বুদ্ধ; পরবর্তীকালে যাঁরা ভারতের জনসাধারণের মধ্যে শ্রমণ ধর্মদর্শন প্রচার করেন।
অব্যবহিত পরবর্তীকালে একাধিক বৈদেশিক শাসনে এই অঞ্চলের সংস্কৃতি সমৃদ্ধি লাভ করে। এগুলি মধ্যে ৫৪৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ প্রতিষ্ঠিত হখামনি পারসিক সাম্রাজ্য ও ৩২৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ মহামতি আলেকজান্ডারের রাজত্বকাল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া পাঞ্জাব ও গান্ধার অঞ্চলে ব্যাকট্রিয়ার প্রথম ডিমেট্রিয়াস কর্তৃক ১৮৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে স্থাপন করেন ইন্দো-গ্রিক রাজ্য। প্রথম মিনান্ডারের আমলে গ্রিকো-বৌদ্ধ যুগে এই রাজ্য বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির চরমে পৌঁছায়।
খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীতে মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে উপমহাদেশে রাজনৈতিক ঐক্য সাধিত হয়। পরবর্তী দশ শতাব্দীকাল একাধিক ক্ষুদ্রকায় রাজ্য ভারতের বিভিন্ন অংশ শাসন করে। চতুর্থ খ্রিস্টাব্দে উত্তর ভারত পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয় এবং পরবর্তী প্রায় দুই শতাব্দীকাল গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে সেই ঐক্য বজায় থাকে। এই যুগটি ছিল হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের কাল। ভারতের ইতিহাসে এই যুগ “ভারতের সুবর্ণ যুগ” নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এই সময় ও পরবর্তী কয়েক শতাব্দীকাল দক্ষিণ ভারতে রাজত্ব করেন চালুক্য, চোল, পল্লব ও পাণ্ড্য রাজন্যবর্গ। তাঁদের রাজত্বকাল দক্ষিণ ভারতের নিজস্ব এক সুবর্ণ যুগের জন্ম দেয়। এই সময়ই ভারতীয় সভ্যতা, প্রশাসন, সংস্কৃতি তথা হিন্দু ও বৌদ্ধধর্ম এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ৭৭ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কেরলের সঙ্গে রোমান সাম্রাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্যের কথাও জানা যায়।
৭১২ খ্রিস্টাব্দে আরব সেনানায়ক মুহাম্মদ বিন কাশিম দক্ষিণ পাঞ্জাবের সিন্ধ ও মুলতান অধিকার করে নিলে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমান শাসনের সূচনা ঘটে। এই অভিযানের ফলে দশম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে মধ্য এশিয়া থেকে সংগঠিত একাধিক অনুপ্রবেশের ভিত্তিভূমি সজ্জিত করে। এরই ফলস্রুতিতে ভারতীয় উপমহাদেশে দিল্লি সুলতানি ও মুঘল সাম্রাজ্যের মতো মুসলমানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। মুঘল শাসনে উপমহাদেশের প্রায় সমগ্র উত্তরাঞ্চলটি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। মুঘল শাসকরা ভারতে মধ্যপ্রাচ্যের শিল্প ও স্থাপত্যকলার প্রবর্তন ঘটান। মুঘলদের সমকালেই দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্ব পশ্চিম ভারতে বিজয়নগর সাম্রাজ্য, অহোম রাজ্য এবং মারাঠা সাম্রাজ্য ও একাধিক রাজপুত রাজ্যের মতো বেশ কিছু স্বাধীন হিন্দু রাজ্যের উন্মেষ ঘটে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ধীরে ধীরে মুঘলদের পতন শুরু হয়। এর ফলে আফগান, বালুচ ও শিখরা উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়। অবশেষে ব্রিটিশরা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার উপরে নিজেদের শাসন কায়েম করে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ও পরবর্তী শতাব্দীতে ধীরে ধীরে ভারত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনাধীনে চলে যায়। ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষিতে কোম্পানির শাসনে অসন্তুষ্ট ব্রিটিশ সরকার সরাসরি ভারতকে ব্রিটিশ রাজের প্রত্যক্ষ শাসনে নিয়ে আসেন। এই সময়টি ছিল ভারতের পরিকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অবনমনের এক অধ্যায়। যদিও পাশ্চাত্য আধুনিক শিক্ষার প্রসার এই যুগেই বাংলার মাটিতে জন্ম দেয় এক নবজাগরণ যুগের।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দেশব্যাপী এক স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেয়। পরবর্তীকালে এই আন্দোলনে যোগ দেয় মুসলিম লিগও। অতঃপর ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ গ্রেট ব্রিটেনের অধীনতাপাশ ছিন্ন করে। তবে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়। উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিমাংশের মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলি নিয়ে পাকিস্তান ও অবশিষ্ট অঞ্চল ভারতীয় প্রজাতন্ত্র নামে পরিচিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।
মধ্যভারতের নর্মদা উপত্যকার হাথনোরায় প্রাপ্ত হোমো ইরেকটাস-এর প্রক্ষিপ্ত অবশেষগুলি ২০০,০০০ থেকে ৫০০,০০০ বছর পূর্ববর্তী মধ্য প্লেইস্টোসিন যুগে ভারতে মানববসতি উন্মেষের সম্ভাবনার দিকটি নির্দেশ করে।সম্ভবত ভারত মহাসাগরের উপকূলভাগে বহিঃআফ্রিকা অনুপ্রবেশের যাবতীয় নিদর্শন অবলুপ্ত হয়ে গেছে উত্তর-তুষার যুগের বন্যার ফলে। তামিলনাড়ু অঞ্চলে সাম্প্রতিক কিছু আবিষ্কার (যার সময়কাল খ্রিষ্টের জন্মের ৭৫,০০০ বছর পূর্ববর্তী, টোবা আগ্নেয় উদ্গীরণের আগে ও পরে) থেকে এই অঞ্চলে প্রথম শারীরতাত্ত্বিকভাবে আধুনিক মানব প্রজাতির উপস্থিতির কথা জানা যায়।
ভারতীয় উপমহাদেশে মেসোলিথিক যুগের সূচনা ৩০,০০০ বছর আগে। এই যুগ স্থায়ী হয় ২৫,০০০ বছর। আজ থেকে ১২,০০০ বছর আগে সর্বশেষ তুষার যুগের অন্তিমপর্বে উপমহাদেশে নিবিড় জনবসতি গড়ে উঠতে দেখা যায়। প্রথম স্থায়ী জনবসতির প্রমাণ মেলে আধুনিক ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ৯০০০ বছর প্রাচীন ভীমবেটকা প্রস্তরক্ষেত্রে।
আধুনিক পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের মেহেরগড়ে খননকার্য চালিয়ে ৭০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ও তৎপরবর্তীকালের দক্ষিণ এশীয় নিওলিথিক সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। ভারতের খাম্বাত উপসাগরে নিমজ্জিত নিওলিথিক সভ্যতার কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে; রেডিও কার্বন পদ্ধতিতে পরীক্ষার পর যার সময়কাল নির্ধারিত হয়েছে ৭৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। এডাক্কল গুহা প্রস্তরযুগীয় লিপির আদিতম নিদর্শনগুলির অন্যতম। সিন্ধু উপত্যকায় ৬০০০ থেকে ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ও দক্ষিণ ভারতে ২৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে পরবর্তী নিওলিথিক সভ্যতা স্থায়ী হয়।
উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বিগত ২০০০০০০ বছরে নিয়মিত জনবসতি গড়ে উঠতে দেখা গেছে। এই অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাসে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম কয়েকটি মানববসতির এবং প্রধান সভ্যতাসমূহের সন্ধান পাওয়া যায়। উপমহাদেশের প্রাচীনতম প্রত্নক্ষেত্রটি হল সোন নদী উপত্যকার প্যালিওলিথিক হোমিনিড স্থলটি। উপমহাদেশের গ্রামীণ জীবনের সূচনা হয় নিওলিথিক স্থল মেহেরগড়ে এবং প্রথম নগরাঞ্চলীয় সভ্যতার বিকাশ ঘটে সিন্ধু অববাহিকা অঞ্চলে।
৩৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিন্ধু সভ্যতার উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রোঞ্জ যুগের সূত্রপাত ঘটে। এই সভ্যতার কেন্দ্রভূমি ছিল সিন্ধু নদ ও তার উপনদী বিধৌত অববাহিকা অঞ্চল; এবং এই সভ্যতার বিস্তার ঘটে ঘগ্গর-হাকরা নদী উপত্যকা, , গঙ্গা-যমুনা দোয়াব, গুজরাট, এবং উত্তর আফগানিস্তান পর্যন্ত।
সিন্ধু সভ্যতার উন্মেষ ঘটে আধুনিক ভারতীয় প্রজাতন্ত্র (গুজরাট, হরিয়ানা, পাঞ্জাব ও রাজস্থান রাজ্য) এবং পাকিস্তান (সিন্ধ, পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তান প্রদেশ) রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে। ঐতিহাসিকভাবে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার অন্তর্গত এই সভ্যতা ছিল মেসোপটেমিয়া ও প্রাচীন মিশরের মতো পৃথিবীর আদিতম নগরাঞ্চলীয় সভ্যতাগুলির অন্যতম। হরপ্পাবাসী হিসেবে পরিচিত প্রাচীন সিন্ধু নদ উপত্যকার অধিবাসীরা ধাতুবিদ্যার কিছু নতুন কৌশল আয়ত্ত্ব করে তামা, ব্রোঞ্জ, সিসা ও টিন উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছিল।
সিন্ধু সভ্যতা ২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই সময়েই ভারতীয় উপমহাদেশে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার সূচনা ঘটে। আধুনিক ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ধোলাবীরা, কালিবঙ্গান, রুপার, রাখিগড়ি, লোথাল ও পাকিস্তানের হরপ্পা, গানেরিওয়ালা, মহেঞ্জোদাড়োতে এই প্রাচীন সভ্যতার বিভিন্ন নগরকেন্দ্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই সভ্যতার বিশেষত্ব ছিল ইষ্টকনির্মিত শহর, পথপার্শ্ববর্তী নিকাশি ব্যবস্থা ও বহুতল আবাসন।

লিচ্ছবি রাজ্যের রাজধানী বৈশালী। লিচ্ছবি ছিল অরোয়াদের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক রাজ্য।
বৈদিক সংস্কৃতে মৌখিকভাবে রচিত হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বেদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আর্য সভ্যতাই ছিল বৈদিক যুগের ভিত্তি। বেদ বিশ্বের প্রাচীনতম প্রাপ্ত গ্রন্থগুলির অন্যতম। এই গ্রন্থ মেসোপটেমিয়া ও প্রাচীন মিশরের ধর্মগ্রন্থগুলির সমসাময়িক। বৈদিক যুগের সময়কাল ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। এই সময়েই হিন্দুধর্ম ও প্রাচীন ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপাদানের মূল ভিত্তিগুলি স্থাপিত হয়। গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সমগ্র উত্তর ভারতে বৈদিক সভ্যতাকে ছড়িয়ে দেয় আর্যরা। ভারতীয় উপমহাদেশে ইন্দো-আর্যভাষী উপজাতিগুলির অনুপ্রবেশের ফলে প্রাগৈতিহাসিক পরবর্তী হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটে এবং বিদ্যমান স্থানীয় সভ্যতার উপরেই স্থাপিত হয় বৈদিক সভ্যতা। স্থানীয় বাসিন্দারা আর্যদের কাছে দস্যু নামে পরিচিত হয়।
আদি বৈদিক সমাজ ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। ফলত এই যুগে পরবর্তী হরপ্পা সভ্যতার নগরায়ণের ধারণাটি পরিত্যক্ত হয়। ঋগ্বেদোত্তর যুগে, আর্য সমাজ অধিকতর কৃষিভিত্তিক হয়ে পড়ে এবং এই সময়েই সমাজে বর্ণাশ্রম প্রথার উদ্ভব ঘটে। মনে করা হয়, হিন্দুদের আদি ধর্মগ্রন্থ বেদ ছাড়াও সংস্কৃত মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারতের আদি সূত্রগুলি এই যুগেই নিহিত ছিল। বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক খননের ফলে প্রাপ্ত মৃৎপাত্রগুলিতে আদি ইন্দো-আর্য সভ্যতার কিছু নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাচীন ভারতের কুরু রাজ্যে কৃষ্ণ ও রক্ত ধাতব ও চিত্রিত ধূসর ধাতব সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া যায়। ১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে উত্তর-পশ্চিম ভারতে লৌহ যুগের সুচনা হয়। এই সময়ে রচিত অথর্ববেদে প্রথম লৌহের উল্লেখ মেলে। উক্ত গ্রন্থে লৌহকে “শ্যাম অয়স” বা কালো ধাতু বলে চিহ্নিত করা হয়। চিত্রিত ধূসর ধাতব সভ্যতা উত্তর ভারতে ১১০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। বৈদিক যুগেই ভারতে বৈশালীর মতো একাধিক গণরাজ্য স্থাপিত হয়। এগুলি খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী এমনকি কোনো কোনো অঞ্চলে চতুর্থ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্তও স্থায়ী হয়েছিল। এই যুগের পরবর্তী পর্যায়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাজ্যস্থাপন ও রাজ্যবিস্তারের সংগ্রাম শুরু হয়। এই রাজ্যগুলিই পরিচিত হয় মহাজনপদ নামে।

ষোড়শ মহাজনপদ ছিল সেযুগের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ষোলোটি রাজ্য ও গণরাজ্য। এগুলি মূল গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে প্রসারিত ছিল। যদিও প্রাচীন ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে একাধিক ক্ষুদ্রকায় রাজ্যও গড়ে উঠতে দেখা যায়।
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে “লিখিত ইতিহাসের প্রথম মহান বিশ্ববিদ্যালয়” মনে করা হয়। ৪৫০-১১৯৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বৌদ্ধ শিক্ষা ও গবেষণার মূল কেন্দ্র।
পরবর্তী বৈদিক যুগে ১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ সমগ্র উপমহাদেশে একাধিক ক্ষুদ্রকায় রাজ্য ও নগররাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। এই সব রাজ্যগুলির উল্লেখ পাওয়া যায় বৈদিক এবং আদি বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যে। ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ মহাজনপদ নামে পরিচিত নিম্নোক্ত ষোলোটি রাজ্য ও গণরাজ্যের উন্মেষ ঘটে – কাশী, কোশল, অঙ্গ, মগধ, বজ্জি (বা বৃজি), মল্ল, চেদী, বৎস (বা বংশ), কুরু, পাঞ্চাল, মচ্ছ (বা মৎস), শূরসেন, অশ্মক, অবন্তী, গান্ধার ও কম্বোজ। বর্তমান আফগানিস্তান থেকে মহারাষ্ট্র ও বাংলা পর্যন্ত গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চল বরাবর এই রাজ্যগুলি বিস্তৃত ছিল। সিন্ধু সভ্যতার পর এই যুগেই ভারতের দ্বিতীয় প্রধান নগরায়ণ ঘটে।
মনে করা হয় প্রাচীন সাহিত্যে উল্লিখিত বিভিন্ন ক্ষুদ্রকায় জনগোষ্ঠী উপমহাদেশের অবশিষ্টাংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এই রাজ্যগুলির কোনো কোনোটিতে রাজপদ ছিল বংশানুক্রমিক; আবার কোনো কোনো রাজ্যে শাসক নির্বাচিত হতেন। শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ভাষা ছিল সংস্কৃত। যদিও উত্তর ভারতের জনসাধারণ প্রাকৃতের বিভিন্ন উপভাষায় কথা বলতেন। ৫০০/৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিদ্ধার্থ গৌতমের সময়কালে এই ষোলোটি মহাজনপদের অধিকাংশ সংযুক্ত হয়ে বৎস, অবন্তী, কোশল ও মগধ রাজ্যচতুষ্টকের সঙ্গে মিলিত হয়।
হিন্দু ধর্মানুষ্ঠান এই সময় অত্যন্ত জটিল ও পুরোহিত শ্রেণীনির্ভর হয়ে পড়ে। মনে করা হয় পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য উপনিষদ পরবর্তী বৈদিক যুগের শেষভাগ ও মহাজনপদ যুগের প্রথম ভাগে (৬০০ – ৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) রচিত হয়। ভারতীয় দর্শনের উপর গভীর প্রভাব সৃষ্টিকারী উপনিষদ ছিল বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্মের বিকাশের সমসাময়িক। এই কারণে এই যুগকে ভারতের দর্শনচিন্তার সুবর্ণযুগ বলে মনে করা হয়।
মনে করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৭ অব্দে বোধি লাভ করে সিদ্ধার্থ গৌতম ‘বুদ্ধ’ নামে পরিচিত হন। একই সময় চতুর্বিংশতিতম জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর একই ধরনের অপর একটি ধর্মতত্ত্ব প্রচার করেন; পরবর্তীকালে যা জৈনধর্ম নামে পরিচিত হয়। জৈন বিশ্বাস অনুযায়ী তাঁদের ধর্মতত্ত্ব অনাদিকাল থেকেই প্রচলিত। এও মনে করা হয় যে বেদে কয়েকজন জৈন তীর্থঙ্কর ও শ্রমণ ধর্মান্দোলনের অনুরূপ এক আধ্যাত্মিক সংঘাদর্শের কথা লিখিত আছে। বুদ্ধের শিক্ষা ও জৈন ধর্মতত্ত্ব নির্বাণতত্ত্বের কথা বলে। প্রাকৃত ভাষায় রচিত হওয়ায় তাঁদের ধর্মমত সহজেই সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে উঠতে সক্ষম হয়। হিন্দুধর্ম ও ভারতীয় অধ্যাত্মতত্ত্বের বিভিন্ন অভ্যাস যথা নিরামিষ ভক্ষণ, পশুবলি নিবারণ ও অহিংসা প্রভৃতির উপর এই নতুন ধর্মমতের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। জৈনধর্মের ভৌগোলিক বিস্তার ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ হলেও বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীরা বুদ্ধের শিক্ষাদর্শকে মধ্য এশিয়া, পূর্ব এশিয়া, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
৫২০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রথম দারায়ুসের রাজত্বকালে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের (বর্তমান পূর্ব আফগানিস্তান ও পাকিস্তান) অধিকাংশ অঞ্চল পারসিক হখামনি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পরবর্তী দুই শতাব্দী উক্ত সাম্রাজ্যেরই অধীনস্থ থাকে। ৩২৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এশিয়া মাইনর ও হখামনি সাম্রাজ্য জয় করে মহামতি আলেকজান্ডার উপনীত হন ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে। সেখানে হিদাসপিসের যুদ্ধে (অধুনা ঝিলম, পাকিস্তান) রাজা পুরুকে পরাস্ত করে পাঞ্জাবের অধিকাংশ অঞ্চল দখল করে নেন।এরপর আলেকজান্ডার মগধের নন্দ সাম্রাজ্য ও বাংলার গঙ্গারিডাই সাম্রাজ্যের সম্মুখীন হতে চাইলে বৃহত্তর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্মুখীন হওয়ার ভয়ে ভীত ক্লান্ত তাঁর বাহিনী হাইফেসিসে (বর্তমান বিপাশা নদী) বিদ্রোহ করে এবং পূর্বদিকে অগ্রসর হতে অস্বীকার করে। সেনা আধিকারিক কোনাসের সঙ্গে আলোচনাক্রমে আলেকজান্ডার প্রত্যাবর্তনকেই শ্রেয় বিবেচনা করেন।
পারসিক ও গ্রিক আক্রমণ ভারতীয় সভ্যতায় গুরুত্বপূর্ণ পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছিল। পারসিকদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা উপমহাদেশের ভবিষ্যত সরকার ব্যবস্থায়কে, বিশেষত মৌর্য প্রশাসনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে গান্ধার অঞ্চল (অধুনা আফগানিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তান) ভারতীয়, পারসিক, মধ্য এশীয় ও গ্রিক সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র হয়ে ওঠে। এই অঞ্চলে গ্রিকো-বৌদ্ধধর্ম নামে এক মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম হয়; যা পঞ্চম খ্রিস্টাব্দ অবধি স্থায়ী হয়ে মহাযান বৌদ্ধধর্মের শৈল্পিক বিকাশে বিশেষ সহায়তা করে।
মৌর্য রাজবংশ শাসিত মৌর্য সাম্রাজ্য (৩২২-১৮৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) ছিল ভৌগোলিকভাবে সুবিস্তৃত ও মহাশক্তিশালী এক প্রাচীন ভারতীয় রাজনৈতিক ও সামরিক সাম্রাজ্য। মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে এই সাম্রাজ্য চরম উৎকর্ষ লাভ করে। এই সাম্রাজ্যের বিস্তার ছিল উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা ও পূর্বে অসম অঞ্চল পর্যন্ত। পশ্চিমে বর্তমান পাকিস্তান, বেলুচিস্তান, এবং হেরাত ও কান্দাহার সহ আধুনিক আফগানিস্তানের অনেকাংশ এই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মধ্য ও দক্ষিণ ভারতের অনেক অঞ্চল চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও বিন্দুসার মৌর্য সাম্রাজ্যভুক্ত করলেও কলিঙ্গের নিকটবর্তী অনাবিষ্কৃত উপজাতীয় ও অরণ্যাঞ্চলগুলি এই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন সম্রাট অশোক।
প্রাচীন যুগের মধ্যকাল গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য প্রসিদ্ধ। ২৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ সাতবাহন বা অন্ধ্র রাজবংশ দক্ষিণ ও মধ্যভারতে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। সাতবাহন বংশের ষষ্ঠ রাজা সাতকর্ণী উত্তর ভারতের শুঙ্গ সাম্রাজ্যকে পরাভূত করেন। গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী ছিলেন এই বংশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সম্রাট। কুনিন্দ রাজ্যটি ছিল একটি ক্ষুদ্রাকার হিমালয় রাজ্য। এই রাজ্য দ্বিতীয় খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে মোটামুটি তৃতীয় খ্রিস্টাব্দ অবধি স্থায়ী হয়। প্রথম খ্রিষ্টাব্দের মধ্যভাগে মধ্য এশিয়া থেকে উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রবেশ করে কুষাণরা পেশাওয়ার থেকে মধ্য গাঙ্গেয় সমভূমি তথা সম্ভবত বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত প্রসারিত এক সুবিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। প্রাচীন ব্যাকট্রিয়া (আধুনিক আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চল) ও দক্ষিণ তাজিকিস্তানও এই সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। পশ্চিম সত্রপরা (৩৫-৪০৫ খ্রিষ্টাব্দ) ছিল পশ্চিম ও মধ্য ভারতের শক শাসনকর্তা। এরা ছিল ইন্দো-সিথিয়ানদের উত্তরসূরি (নিচে দেখুন) তথা ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরাঞ্চলের কুষাণ ও মধ্য ভারতের সাতবাহন (অন্ধ্র) রাজবংশের সমসাময়িক।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজবংশ ও সাম্রাজ্য ভারতীয় উপদ্বীপের দক্ষিণভাগ শাসন করেছিলেন। এগুলির মধ্যে পাণ্ড্য রাজ্য, চোল রাজবংশ, চের রাজবংশ, কদম্ব রাজবংশ, পশ্চিম গঙ্গ রাজবংশ, পল্লব ও চালুক্য রাজবংশ উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৈদেশিক সাম্রাজ্য স্থাপনে সক্ষম হয়েছিল। দক্ষিণ ভারতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে প্রায়শই যুদ্ধবিগ্রহ লেগে থাকত। বৌদ্ধ রাজ্য কলভ্র দক্ষিণ ভারতে চোল, চের ও পাণ্ড্যদের ধারাবাহিক আধিপত্য সাময়িকভাবে ভঙ্গ করেছিল।
ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মিশ্র সংস্কৃতির ধারক ও বাহক ছিল ইন্দো-গ্রিক, ইন্দো-সিথিয়ান, ইন্দো-পার্থিয়ান ও ইন্দো-সাসানিড জাতীয়েরা। এগুলির মধ্যে সর্বপ্রাচীন ছিল ইন্দো-গ্রিক রাজ্য। ১৮০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে গ্রিকো-ব্যাকট্রীয় রাজা ডিমেট্রিয়াস এই অঞ্চল আক্রমণ করে উক্ত রাজ্যটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমান পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল এই রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। পরবর্তী দুই শতাব্দী ধরে একাদিক্রমে ৩০ জনেরও বেশি গ্রিক রাজা এই অঞ্চল শাসন করেন। তাঁরা প্রায়ই পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত থাকতেন। ইন্দো-সিথিয়ানরা ছিল ইন্দো-ইউরোপীয় শক (সিথিয়ান) জাতির শাখা। তারা প্রথমে দক্ষিণ সাইবেরিয়া থেকে ব্যাকট্রিয়ায় এবং পরে সোডিয়ানা, কাশ্মীর, আরাকোশিয়া ও গান্ধার অঞ্চলে অনুপ্রবিষ্ট হয়। দ্বিতীয় খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রথম খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল তাদের রাজ্য। পহ্লব নামে পরিচিত ইন্দো-পার্থিয়ানরাও কুষাণ শাসনকর্তা কুজুলা কদফিসিসের মতো গান্ধার অঞ্চলের একাধিক রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করে বর্তমান আফগানিস্তান ও উত্তর পাকিস্তানের অধিকাংশ অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। পারস্যের সাসানিড সাম্রাজ্য ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্যের সমসাময়িক। বর্তমান পাকিস্তান অঞ্চল পর্যন্ত এই সাম্রাজ্য প্রসারিত ছিল। এখানে ভারতীয় ও পারসিক সংস্কৃতি মিশে গিয়ে ইন্দো-সাসানিড সংস্কৃতির জন্ম দেয়।
প্রথম খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট অগাস্টাসের শাসনকালে তাঁর মিশর বিজয়ের সময় থেকেই ভারতের সঙ্গে রোমের বাণিজ্য শুরু হয়। সেই সময় থেকেই ভারতের মধ্যকালীন রাজারা ছিলেন পাশ্চাত্যের বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগী।
১৩০ খ্রিস্টাব্দে সিজিয়াসের ইউডোক্সাস যে বাণিজ্যের সূত্রপাত ঘটান, তা ক্রমশ সমৃদ্ধিলাভ করে। স্ট্র্যাবোর (দুই।৫।১২। ) মতে, অগাস্টাসের সময়কালে প্রতিবছর সর্বাধিক ১২০টি বাণিজ্যতরী ভারতের মায়োস হর্মোসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করত। এই বাণিজ্যে এত সোনা নিয়োজিত হত এবং কুষাণরা তাদের নিজস্ব মুদ্রাব্যবস্থায় তা পুনর্ব্যবহার করত, তাতে প্লিনি (হিস্টোরিয়া নেচারে পাঁচ।১০১) ভারতে তাঁদের মুদ্রার নির্গমণের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিলেন:

“ভারত, চিন ও আরব উপদ্বীপ প্রতি বছর আমাদের সাম্রাজ্য থেকে পরিমিতভাবে প্রায় ১,০০০,০০০,০০ সেসেরটি নিয়ে যায়: আমাদের বিলাস ও নারীরা আমাদের এই পরিমাণ খরচের কারণ। এই রফতানির কত শতাংশ দেবতা বা মৃতের আত্মার উদ্দেশ্যে বলিপ্রদত্ত হয়?”
—প্লিনি, হিস্টোরিয়া নেচারে, ১২।৪১।৮৪।
প্রথম খ্রিস্টাব্দে রচিত পেরিপ্লাস অফ দি ইরিথ্রিয়ান সি গ্রন্থে এই সব বাণিজ্যপথ ও বন্দরসমূহের বর্ণনা প্রদত্ত হয়েছে।
খ্রিষ্টীয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে গুপ্ত রাজবংশের শাসনকালে উত্তর ভারত পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়। হিন্দু নবজাগরণের সুবর্ণযুগ নামে পরিচিত এই সময়কালেই হিন্দু সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও রাজনৈতিক প্রশাসন এক নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। গুপ্ত রাজবংশের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য সম্রাট ছিলেন প্রথম চন্দ্রগুপ্ত, সমুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। প্রাপ্ত আদি পুরাণ গ্রন্থগুলি এই সময়েই রচিত বলে অনুমিত হয়। মধ্য এশিয়ার হুনদের আক্রমণে এই সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল। ষষ্ঠ শতাব্দীতে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতে একাধিক আঞ্চলিক রাজন্যশক্তির উদ্ভব ঘটে। সাম্রাজ্য বিভাজনের পর গুপ্তবংশের একটি অপ্রধান শাখা মগধ শাসন করতে থাকে। পরে বর্ধন রাজা হর্ষ তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে সপ্তম শতাব্দীর প্রথমভাগে নিজস্ব সাম্রাজ্য স্থাপনে সমর্থ হন।
শ্বেত হুনরা ছিল সম্ভবত হেফথালাইট গোষ্ঠী। পঞ্চম শতাব্দীর প্রথমার্ধে বামিয়ানকে রাজধানী করে বর্তমান আফগানিস্তান অঞ্চলে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে তারা। তারাই ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের কারণ। তৎসঙ্গে ঐতিহাসিকেরা যাকে ভারতের সুবর্ণযুগ বলে থাকেন তারও সমাপ্তি ঘটে এদের হাতেই। অবশ্য দক্ষিণ ভারতের বৃহত্তর অংশই উত্তর ভারতের এই রাষ্ট্রীয় অস্থিরতার প্রভাব মুক্ত ছিল।
ভারতের ধ্রুপদী যুগের সূচনা ঘটে গুপ্ত শাসনকালে। সপ্তম শতাব্দীতে যখন হর্ষ উত্তর ভারতে নিজ কর্তৃত্ব স্থাপন করেন তখন এই যুগ মধ্যগগনে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে উত্তর ভারতীয় আক্রমণকারীদের চাপে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে এই যুগেরও সমাপ্তি ঘটে। এই যুগেই ভারতীয় শিল্পকলার চরম সমৃদ্ধি ঘটে। এই সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্মের প্রধান আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক বিকাশ সম্ভব হয়। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর সপ্তম শতাব্দীতে কনৌজের রাজা হর্ষ সমগ্র উত্তর ভারতকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করেন। তবে তাঁর মৃত্যুর পরেই তাঁর সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
সপ্তম থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে উত্তর ভারতের শাসনাধিকারকে কেন্দ্র করে দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট, মালবের প্রতিহার ও বাংলার পাল সাম্রাজ্যের মধ্যে বিরোধ বাধে। সেন সাম্রাজ্য পরে পাল সাম্রাজ্যকে গ্রাস করে নেয়। প্রতিহারেরা একাধিক রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এরাই ছিল আদিযুগের রাজপুত, যাদের অনেকের রাজ্য পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শাসনের হাত থেকে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের সময়কাল অবধি বিদ্যমান ছিল। রাজস্থানে প্রথম ঐতিহাসিক রাজপুত রাজ্যের উদ্ভব ঘটে ষষ্ঠ শতাব্দীতে। পরবর্তীকালে ছোটো ছোটো রাজপুত বংশ সমগ্র উত্তর ভারত শাসন করেছিল। চৌহানবংশীয় রাজপুত রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান আগ্রাসী ইসলামি সুলতানির বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের জন্য প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে একাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ অবধি পূর্ব আফগানিস্তানের কিছু অংশ, উত্তর পাকিস্তান ও কাশ্মীর শাসন করে শাহি রাজবংশ। হর্ষের সাম্রাজ্যের পতনের পর যখন সর্বভারতীয় সাম্রাজ্য স্থাপনের উত্তর ভারতীয় ধারণাটি বর্জিত হয়, তখনই সেই আদর্শটি স্থানান্তরিত হয় দক্ষিণ ভারতে।
৫৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কর্ণাটকের বাদামী থেকে এবং ৯৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কর্ণাটকের কল্যাণী থেকে চালুক্য সাম্রাজ্য দক্ষিণ ও মধ্যভারতের বিভিন্ন অংশ শাসন করে। কাঞ্চীর পল্লবরা সুদুর দক্ষিণে ছিল তাদের সমসাময়িক। চালুক্য সাম্রাজ্যের পতনের পর তাদের হালেবিডুর হোয়সল, ওয়ারঙ্গলের কাকতীয়, দেবগিরির সেউনা যাদব প্রভৃতি চালুক্যদের সামন্তরা ও কালচুরিদের একটি দক্ষিণী শাখা দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে চালুক্য সাম্রাজ্যকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। পরবর্তীকালে মধ্যযুগে উত্তর তামিলনাড়ুতে চোল রাজ্য ও কেরলে চের রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। ১৩৪৩ সালের মধ্যেই এই সকল রাজ্যের পতন ঘটে এবং উত্থান হয় বিজয়নগর সাম্রাজ্যের। দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যগুলির প্রভাব শুধুমাত্র সুদূর ইন্দোনেশিয়া অঞ্চল পর্যন্তই বিস্তৃত হয়নি, তার একাধিক সুবিশাল বৈদেশিক সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রকও ছিল। দক্ষিণ ভারতের বন্দরগুলি ভারত মহাসাগরে বৈদেশিক বাণিজ্যে লিপ্ত ছিল। তারা প্রধানত পশ্চিমে রোমান সাম্রাজ্য ও পূর্বে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় মশলা রফতানি করত।চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত দক্ষিণ ভারতীয় ভাষাগুলিতে সাহিত্য ও বিভিন্ন অঞ্চলে দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের বিকাশ ঘটে। এরপরই দাক্ষিণাত্যে দিল্লির সুলতানের অভিযান শুরু হয়। হিন্দু বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সঙ্গে ইসলামি বাহমনি রাজ্যের সংঘাত বাধে এবং এই দুই রাজ্যের সংঘাতের ফলে দেশীয় ও বিদেশি সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটে, যার ফল পরস্পরের উপর সুদূরপ্রসারী হয়। উত্তর ভারতের দিল্লির সুলতানদের চাপে পরে ধীরে ধীরে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

প্রাচীন
ধারাবাহিক অস্তিত্বের দিক থেকে ভারতীয় সভ্যতা বিশ্বের সবচেয়ে বেশী বয়সী সভ্যতা। যদি আমরা লিখন পদ্ধতি, ধাতুর কাজ, ও অ-কৃষিভিত্তিক নাগরিক বসতি স্থাপনকে সভ্যতার ন্যূনতম সংজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করি, তবে সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা হল মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ সহস্রাব্দ), এবং প্রায় কাছাকাছি সময়ের মিশরীয় সভ্যতা। খ্রিস্টপূর্ব ৩য় সহস্রাব্দের মধ্যেই সিন্ধু নদের উপত্যকায় এরকম আদি সভ্যতার উন্মেষ ঘটে। চীনে তা ঘটে খ্রিস্টপূর্ব ২য় সহস্রাব্দের সময়। কিন্তু মিশরীয় ও মেসোপটেমীয় সভ্যতাগুলি রোমান সাম্রাজ্যের সময়ে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে এই এলাকাগুলি ইসলামের অধীনে আসে। ফলে এলাকাগুলির বর্তমান সভ্যতার সাথে প্রাচীন সুমেরীয় বা মিশরীয় সভ্যতার কোন মিল নেই। অন্যদিকে ভারতীয় সভ্যতা প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত মোটামুটি অবিকৃত রয়ে গেছে।
ভারতীয় উপমহাদেশ পশ্চিমে আফগানিস্তান থেকে পূর্বে বঙ্গোপসাগর এবং উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে ভারতীয় উপদ্বীপের প্রান্তসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত। রাশিয়াকে বাদ দিয়ে গোটা ইউরোপের আয়তনের সমান এই এলাকার আয়তন। আর ভৌগোলিক, ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত দিক থেকে এটি ইউরোপের চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ লোকের বাস এখানে। এই বিশাল এলাকাটি ইতিহাসের খুব কম সময়ের জন্যই একটিমাত্র শাসকের অধীনে ছিল এবং তা-ও পুরোপুরি নয়। বর্তমানে এলাকাটি পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, ভূটান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা রাষ্ট্রগুলিতে বিভক্ত। কিন্তু প্রতিটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই আঞ্চলিক প্রভেদের পরিমাণ বিপুল। তাই ভারতীয় উপমহাদেশের একটি সাধারণ সামগ্রিক ইতিহাস বর্ণনা করা দুরূহ।
সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা অনেক বিশাল, সুপরিকল্পিত নগরী নির্মাণ করেছিল, এবং এগুলির আংশিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়েছে, কিন্তু এদের সভ্যতার লিখিত নিদর্শনগুলিতে, যেমন – কাদামাটির চাঙড় কিংবা সিলমোহর, ইত্যাদিতে যে লেখা আছে, যেগুলির পাঠোদ্ধার করা এখনও সম্ভব হয়নি।সিন্ধু সভ্যতার বাসিন্দাদের ব্যাপারে আজ পর্যন্ত অসংখ্য মতামত এসেছে,সভ্যতাটি আবিষ্কারের পর তাৎক্ষনিক ভাবে কিছু পশ্চিমা পণ্ডিত(হুইজেল প্রমুখ) দাবী করেন সভ্যতাটি বর্তমান দক্ষিনভারতীয় দ্রাবিড়দের।যাদের বহিরাগত আর্যরা পরাজিত করে ও সভ্যতাটি ধ্বংস করে দেয়।এই তত্ত্ব দীর্ঘদিন প্রাধান্য পায়।কিন্তু গত বিশ বছর যাবত পরিচালিত তাবত পর্যবেক্ষনে এ তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হয়েছে।বর্তমান বিশেষজ্ঞদের ধারণা,এই প্রাচীন সভ্যতাটি আর্য,দ্রাবিড়(অস্ট্রালয়েড),মঙ্গোল এমনকি সুমেরীয়দেরও মিলিত সৃস্টি।তাছাড়া কোন বাইরের আক্রমনের প্রমাণও পাওয়া যায় নি(প্রাপ্ত ত্রিশটির মত মৃতদেহের কঙ্কাল সিন্ধু সভ্যতার বিলুপ্ত হবারও বহু পরের সময়কার যাকে শুরুতে গণহত্যার প্রমান বলা হয়েছিল) ।আবহাওয়া পরিবর্তন,সরস্বতী নদীর শুকিয়ে যাওয়া,ভুমিকম্প প্রভৃতি মিশ্র কারণে এ সভ্যতা পরিত্যক্ত হয়।উদ্ধারকৃত দ্রব্যের মধ্যে স্বস্তিকা ও মাতৃমূর্তি যথাক্রমে আর্য ও দ্রাবিড়দের উপস্থিতির প্রমাণ।যাই হোক,এ সভ্যতা ধ্বংস হলেও এর ধারাবাহিকতায় বর্তমান ভারতীয় সভ্যতার ভিত স্থাপিত হয়। গ্রিক মহাবীর আলেকজান্ডার যখন ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভারত আক্রমণ করেন, তার আগেই ভারতে বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে। আলেকজান্ডার চলে গেলে মৌর্য রাজবংশের অধীনে এই উত্তর ভারতীয় রাজ্যগুলি একত্রিত হয়ে মৌর্য সাম্রাজ্য গঠন করে (৩২২-১৮০ খ্রিপূ)। এরপর কুশানরা উত্তর থেকে আক্রমণ করে এবং ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কুশান সাম্রাজ্য গঠন করে। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে স্থানীয় গুপ্ত রাজবংশ ক্ষমতায় আসে এবং মৌর্যদের হারানো সাম্রাজ্যের প্রায় পুরোটাই পুনরুদ্ধার করে। গুপ্তরা ৩য় শতক থেকে ৫ম শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত উত্তর ভারত শাসন করে। এই সময় দক্ষিণ ভারতে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজ্যের মধ্যে বিভক্ত ছিল। গুপ্তদের পর হর্ষবর্ধন সামান্য সময়ের জন্য উত্তর ভারত শাসন করেন (৬ষ্ট শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত)। এরপর আবার গোটা ভারত বিভিন্ন ক্ষুদ্র রাজ্যের এক জটিল সহাবস্থানমূলক ব্যবস্থায় ফেরত যায়। তবে এই সমস্ত রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মাঝেও ভারতীয় সভ্যতার মূল উপাদানগুলি অবিচ্ছিন্নভাবে খ্রিস্টপূর্ব ৩য় সহস্রাব্দ থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত সঞ্চারিত হয়ে এসেছে।
ভারতে সভ্যতার গোড়াপত্তন
সভ্যতার অনেক আগেই কৃষির উন্মেষ ও বিকাশ ঘটেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১০ম শতকের পরে পশ্চিম এশিয়া (উত্তর ইরাক, সিরিয়া, পূর্ব তুরস্ক) অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক গ্রাম ও ছোট শহরের আবির্ভাব হয়। সুমের সভ্যতা থেকে ভারতের দূরত্ব খুব বেশি ছিল না। পারস্য উপসাগর থেকে উপকূল ধরে এগোলেই সিন্ধু নদের মোহনায় পৌঁছানো যেত। আর স্থলপথে ইরান ও বেলুচিস্তান হয়ে সেখানে পৌঁছানো যেত। ফলে সুমের থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত উপকূলীয় পথ এবং আভ্যন্তরীণ স্থলপথ — উভয় অঞ্চলেই কৃষির প্রসার ঘটেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকের মধ্যেই সিন্ধু অববাহিকায় কৃষিকাজ শুরু হয়ে যায় এবং খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক নাগাদ নদীর উপকূল জুড়ে এখানে ছোট বড় শহর স্থাপিত হয়। কৃষির উন্নয়নের সাথে সাথে বড় বড় নগরীর পত্তন ঘটে এবং সেই সাথে শুরু হয় সিন্ধু সভ্যতার।
সিন্ধু সভ্যতা
সিন্ধু সভ্যতার যেসমস্ত নগরীর সন্ধান পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে আছে রাজস্থানের কালিবাঙ্গান, পাকিস্তানের হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো। এই তিনটি নগরী এবং আরো প্রায় দুশ ছোট বড় শহরের এক বিশাল নগর সভ্যতা পূর্বে ঊর্ধ্ব গঙ্গা এবং দক্ষিণে বর্তমান মুম্বাই শহর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সিন্ধু সভ্যতা আকারে ছিল সমসাময়িক প্রাচীন সভ্যতাগুলির মধ্যে সর্ববৃহৎ। সিন্ধু নদ এবং এর উপনদী ও শাখানদী ছিল এই সভ্যতার প্রাণ। সিন্ধু নদ হিমালয় পর্বতমালায় উৎপত্তিলাভ করে পাঞ্জাবের নিম্নভূমি ও ঊষর রাজস্থানের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সিন্ধু মরুভূমির মধ্য দিয়ে আধুনিক করাচি শহরের কাছে গিয়ে সাগরে পড়েছে। গোটা সিন্ধু অববাহিকাই শুষ্ক অঞ্চল, বিশেষত এর দক্ষিণ অর্ধাংশ মরুভূমিই বলা চলে। তাই কৃষিকাজ ছিল পানিসেচের উপর নির্ভরশীল। বার্ষিক বন্যার কারণে পানির অভাব মিলত ও উর্বর পলির সঞ্চয় হত। কিন্তু বছরের বেশির ভাগ সময় গরম ও শুষ্ক ছিল বলে মিশর ও সুমেরের মত এখানেও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে। নদনদীগুলি সস্তায় ও সহজে বিভিন্ন কৃষিদ্রব্য পরিবহনের কাজেও লাগানো হত।
সুমেরীয় সভ্যতার সাথে সম্পর্ক
সুমেরীয় সভ্যতা ও সিন্ধু সভ্যতার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করা দুঃসাধ্য। সুমেরীয়দের লিপি এবং সিন্ধু সভ্যতার লিপির মধ্যে তেমন মিল পাওয়া যায় না। তাছাড়া সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনা ও শিল্পকলাও অনন্য। তাই সিন্ধু সভ্যতা সুমেরীয় সভ্যতার সম্প্রসারণ নয়, বরং একক, আলাদা একটি সভ্যতা ছিল বলে ধারণা করা হয়। সিন্ধু সভ্যতার লোকেরা যে সিলমোহরগুলি ব্যবহার করত, সেগুলির সাথে সুমের তথা মেসোপটেমিয়ার সিলমোহরের মিল আছে। ধারণা করা হয় সুমেরদের সাথে সিন্ধুর লোকদের বাণিজ্য স্থাপিত হয়েছিল এবং সুমেরদের কাছ থেকে তারা সিলমোহরের ধারণাটি নিয়েছিল। সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন দ্রব্য সুমেরে এবং সুমেরের দ্রব্য সিন্ধু সভ্যতার নগরগুলিতে পাওয়া গেছে। এই দুই সভ্যতার মধ্যস্থলে বর্তমান বাহরাইনে একটি প্রত্নতাত্ব্বিক স্থানের খোঁজ পাওয়া গেছে যেখানে এই দুই সভ্যতারই বিভিন্ন নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়; ধারণা করা হয় এই স্থানটি ছিল দুই সভ্যতার অন্তর্বর্তী একটি বাণিজ্যকেন্দ্র।
প্রাচীন ভারত সম্বন্ধীয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
• ভারতবর্ষে প্রথম মানুষের আবির্ভাব হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩ থেকে ২ লক্ষ বছরের মধ্যে
• দক্ষিণ ভারত এবং সোয়ান উপত্যকা অঞ্চলে ভারতবর্ষের প্রথম আবির্ভাবের প্রমাণ মেলে
• আদিম মানুষের অস্তিত্ব ছিল প্রায় ৮০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ পর্যন্ত
• ভারতবর্ষে মধ্যপ্রস্তর যুগের সূচনাকাল প্রায় ৮০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং স্থায়ী ছিল ৪০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ
• ভারতবর্ষে নব্যপ্রস্তর যুগের সূচনাকাল প্রায় ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে
• নব্যপ্রস্তর যুগে মানুষ প্রথমে কুকুরকে পোষ মানায়
• নব্যপ্রস্তর যুগে প্রথম গৃহপালিত পশু ছিল – ভেড়া
• তাম্রপ্রস্তর যুগের সূচনাকাল ছিল আনুমানিক ১৮০০ খ্রিস্ট পূঃ থেকে ১০০০ খ্রিস্ট পূঃ
• তাম্রপ্রস্তর যুগের নিদর্শন মেলে কাশ্মীর উপত্যকার গুফরাল নামক স্থানে
• লৌহ যুগের সূচনা কাল হল আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্ট পূঃ থেকে ৫০০ খ্রিস্ট পূঃ
• উচ্চ গাঙ্গেয় সমভূমি , বারাণসী , কোশাম্বী , শ্রাবস্তী এবং উজ্জয়িনীতে লৌহযুগের অস্তিত্বে্র সন্ধান পাওয়া যায়
মেহেরগড় সভ্যতা
• অবস্থান – বেলুচিস্তান/বোলান গিরিপথের কাছে অবস্থিত ।পশ্চিমে সাহারা মরুভূমি ও ভূমধ্যসাগর ,পূর্বে হিমালয় ও থর মরুভূমি , উত্তরে বলকান , ককেশাস ,হিন্দুকুশ প্রভৃতি পর্বতমালা এবং দক্ষিণে কর্কটরেখা । অনুমান করা হয় এই সভ্যতা সিরিয়া উপকূল থেকে ইরান পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছিল ।
• আবিষ্কারের সময় – ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দ
• আবিষ্কারক -ফ্রাঁসোয়া জ্যারিজ এবং রিচার্ড মিডো
• সময়কাল- মেহেরগড় সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল কয়েকটি পর্যায়ে । প্রথম পর্যায় আনুমানিক ৭০০০ – ৫০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ । দ্বিতীয় পর্যায় আনুমানিক ৫০০০ – ৪০০০ খ্রিঃ পূঃ । তৃতীয় পর্যায় আনুমানিক ৪৩০০-৩৮০০ খ্রিঃ পূঃ এবং তার পরবর্তী পর্যায়গুলি আনুমানিক ৩২০০-২৬০০ খ্রিঃ পূঃ এর মধ্যে ।মেহেরগড় সভ্যতার পতন ঘটে ২৬০০ খ্রিঃ পূঃ ।প্রকৃতপক্ষে মেহেরগড় সভ্যতা মহেঞ্জোদাড়ো ও লোথাল সভ্যতার সঙ্গে মিশে যায় ।
• সভ্যতা -গ্রাম কেন্দ্রিক
• প্রধান কেন্দ্র – মেহেরগড় , কোটাদিজি
• জীবিকা – কৃষি , শিকার , পশুপালন
• কৃষিজাত দ্রব্য – কার্পাস , যব , বার্লি , গম
• মৃতদেহ সৎকারের নিয়ম – সমাধিস্থ করা
• মৃৎশিল্পের নির্দশন – মেহেরগড় প্রত্নক্ষেত্র থেকে কুমোরের চাকা আবিষ্কৃত হয়েছে । নারিমূর্তি ও সীলমোহর তৈরি করা হত পোড়ামাটি দিয়ে । বিভিন্ন ধরনের অলংকার ব্যবহার করা হত ।তার মধ্যে পাথর ও ধাতুর তৈরি হার ও কানপাশা উল্লেখযোগ্য ।এছাড়া সামুদ্রিক ঝিনুক ও অলংকার হিসাবে ব্যবহারের চল ছিল ।
মেহেরগড় য়ে ৭০০০খ্রীষ্টপূর্ব থেকে ৩২০০ খ্রীষ্টপূর্ব আবিস্কৃত হয়েছে। মেহেরগড় সভ্যতাঃ মেহেরগড় সভ্যতা ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে জাঁ ফ্রাঁসোয়া জারিজ এবং রিচার্ড মিডৌ আবিস্কার করেন। এখন এর বর্তমান অবস্থান পাকিস্থানে।
সিন্ধু সভ্যতা ছিল একটি ব্রোঞ্জ যুগীয় সভ্যতা (৩৩০০ – ১৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ; পূর্ণবর্ধিত কাল ২৬০০ – ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)। এই সভ্যতার কেন্দ্র ছিল মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত সিন্ধু নদ অববাহিকা। প্রথম দিকে এই সভ্যতা পাঞ্জাব অঞ্চলের সিন্ধু অববাহিকায় বিকাশ লাভ করে। পরে তা প্রসারিত হয় ঘগ্গর-ভাকরা নদী উপত্যকা ও গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চল পর্যন্ত। বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ, ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পশ্চিমদিকের রাজ্যগুলি, দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তান এবং ইরানের বালোচিস্তান প্রদেশের পূর্ব অংশ এই সভ্যতার অন্তর্গত ছিল।
পূর্ণবর্ধিত সময়কালে এই সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা নামে পরিচিত। হরপ্পা ছিল এই সভ্যতার প্রথম আবিষ্কৃত শহরগুলির অন্যতম। ১৯২০-এর দশকে তদনীন্তন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে এই শহরটি আবিষ্কৃত হয়। ১৯২০ সাল থেকে সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নস্থলগুলিতে খননকার্য চলছে। ১৯৯৯ সালেও এই সভ্যতার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসামগ্রী ও আবিষ্কৃত হয়েছে।ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান মহেঞ্জোদাড়ো সিন্ধু সভ্যতার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
হরপ্পা ভাষা প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং এই ভাষার উৎস অজ্ঞাত। যদিও ইরাবতম মহাদেবন, অস্কো পারপোলা, এফ জি বি কুইপার ও মাইকেল উইটজেল প্রমুখ বিশেষজ্ঞেরা এই ভাষার সঙ্গে প্রোটো-দ্রাবিড়ীয়, এলামো-দ্রাবিড়ীয় বা প্যারা-মুন্ডা সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন।
১৮৪২ সালে চার্লস ম্যাসন তাঁর ন্যারেটিভস অফ ভেরিয়াস জার্নিস ইন বালোচিস্তান, আফগানিস্তান অ্যান্ড দ্য পাঞ্জাব গ্রন্থের হরপ্পার ধ্বংসাবশেষের কথা প্রথম উল্লেখ করেন। স্থানীয় অধিবাসীরা তাঁকে “তেরো ক্রোশ” দূরে একটি প্রাচীন নগরীর উপস্থিতির কথা বলেছিল। কিন্তু প্রায় শতাব্দীকাল এই বিষয়ে কেউ কোনো প্রকার প্রত্নতাত্ত্বিক আগ্রহ দেখাননি।
১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার জন ও উইলিয়াম ব্রান্টন করাচি ও লাহোরের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে কোম্পানি লাইন স্থাপনের দায়িত্ব পান। জন লিখেছেন: “রেললাইন স্থাপনের জন্য উপযুক্ত ব্যালাস্ট কোথা থেকে পাওয়া যায়, সেই ভেবে আমি খুবই চিন্তিত ছিলাম।” তাঁদের বলা হয় যে, লাইনের নিকট ব্রাহ্মণাবাদ নামে এক প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। সেই শহরে এসে তাঁরা শক্ত ও ভালভাবে পোড়ানো ইঁটের সন্ধান পান এবং নিশ্চিত এই ভেবে যে “ব্যালাস্টের একটি উপযুক্ত উৎস পাওয়া গেছে।” ব্রাহ্মণাবাদ শহর এই ভাবে ব্যালাস্টে পরিণত হয়। কয়েক মাস পরে, আরও উত্তরে জনের ভাই উইলিয়াম ব্রান্টনের কর্মস্থলে “লাইনের অংশে অপর একটি শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। এই ধ্বংসাবশেষের ইঁট নিকটবর্তী হরপ্পা গ্রামের অধিবাসীরাও ব্যবহার করত। এই ইঁটেরই ব্যালাস্টে তৈরি হয় লাহোর থেকে করাচি পর্যন্ত ৯৩ মাইল (১৫০ কিলোমিটার) দৈর্ঘ্যের রেলপথ।”
১৮৭২-৭৫ সালে আলেকজান্ডার কানিংহাম প্রথম হরপ্পা সিলমোহর প্রকাশ করেন। তিনি ভুলবশত এটি ব্রাহ্মী লিপি মনে করেছিলেন। এর প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে ১৯১২ সালে জে. ফ্লিট আরও কতকগুলি হরপ্পা সিলমোহর আবিষ্কার করেন। এই সিলমোহর দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯২১-২২ সালে স্যার জন মার্শাল এই অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য অভিযান চালান। এই অভিযানের ফলস্রুতিতেই স্যার জন মার্শাল, রায়বাহাদুর দয়ারাম সাহানি ও মাধোস্বরূপ ভাট হরপ্পা এবং রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ই. জে. এইচ. ম্যাককি ও স্যার জন মার্শাল মহেঞ্জোদাড়ো আবিষ্কার করেন। ১৯৩১ সালের মধ্যেই মহেঞ্জোদাড়োর অধিকাংশ প্রত্নস্থল আবিষ্কৃত হয়ে গিয়েছিল। তৎসত্ত্বেও খননকার্য অব্যাহত থাকে। এরপর ১৯৪৪ সালে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের তদনীন্তন ডিরেক্টর স্যার মর্টিমার হুইলারের নেতৃত্বে অপর একটি দল এই অঞ্চলে খননকার্য চালায়। ১৯৪৭ সালের পূর্বে আহমদ হাসান দানি, ব্রিজবাসী লাল, ননীগোপাল মজুমদার, স্যার মার্ক অরেল স্টেইন প্রমুখ এই অঞ্চলে খননকার্যে অংশ নিয়েছিলেন।
ভারত বিভাগের পর সিন্ধু সভ্যতার অধিকাংশ প্রত্নস্থল পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্গত হয়। উল্লেখ্য, পাকিস্তান ভূখণ্ডই ছিল এই প্রাচীন সভ্যতার মূল কেন্দ্র। ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান সরকারের পুরাতাত্ত্বিক উপদেষ্টা স্যার মর্টিমার হুইলার এই সব অঞ্চলে খননকার্য চালান। সিন্ধু সভ্যতার সীমান্তবর্তী প্রত্নস্থলগুলি আবিষ্কৃত হয়েছে পশ্চিমে বালোচিস্তানের সুকতাগান ডোর এবং উত্তরে আফগানিস্তানের আমুদারিয়া বা অক্সাস নদীর তীরে শোর্তুগাই অঞ্চলে।
হরপ্পা সভ্যতার পূর্ণবর্ধিত সময়কাল ২৬০০ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। সিন্ধু সভ্যতার পূর্বসূরি আদি হরপ্পা সভ্যতা ও উত্তরসূরি পরবর্তী হরপ্পা সভ্যতার সময়কাল মিলিয়ে এই সভ্যতার পূর্ণ বিস্তারকাল খ্রিষ্টপূর্ব তেত্রিশ শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়। সিন্ধু সভ্যতার পর্ববিভাজনের ক্ষেত্রে যে দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয় সেগুলি হল পর্ব ও যুগ। আদি হরপ্পা সভ্যতা, পূর্ণবর্ধিত হরপ্পা সভ্যতা ও পরবর্তী হরপ্পা সভ্যতাকে যথাক্রমে আঞ্চলিকীকরণ, সংহতি ও স্থানীয়ভবন যুগও বলা হয়ে থাকে। আঞ্চলিকীকরণ যুগের সূচনা নিওলিথিক মেহেরগড় ২ সময়কাল থেকে। ইসলামাবাদের কায়েদ-এ-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের আহমদ হাসান দানির মতে, “মেহেরগড়ের আবিষ্কার সিন্ধু সভ্যতা সংক্রান্ত সম্পূর্ণ ধারণাটিই পরিবর্তিত করেছে। এর ফলে আমরা একেবারে গ্রামীন জীবনযাপনের সূচনালগ্ন থেকে সমগ্র সভ্যতাটির একটি পূর্ণ চিত্র প্রাপ্ত হয়েছি।”
আনুমানিক তারিখ পর্ব যুগ
৭০০০ – ৫০০০ খ্রি.পূ. মেহেরগড় এক (অ্যাসেরামিক নিওলিথিক) আদি খাদ্য উৎপাদন যুগ
৫৫০০ – ৩৩০০ খ্রি.পূ. মেহেরগড় দুই – ছয় (সেরামিক নিওলিথিক) আঞ্চলিকীকরণ যুগ
৫৫০০ – ২৬০০ খ্রি.পূ.
৩৩০০ – ২৬০০ খ্রি.পূ. আদি হরপ্পা
৩৩০০ – ২৮০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ১ (ইরাবতী পর্ব)
২৮০০ – ২৬০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ২ (কোট দিজি পর্ব, মেহেরগড় সাত)
২৬০০ – ১৯০০ খ্রি.পূ. পূর্ণবর্ধিত হরপ্পা (সিন্ধু সভ্যতা) সংহতি যুগ
২৬০০ – ২৪৫০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৩-ক
২৪৫০ – ২২০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৩-খ
২২০০ – ১৯০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৩-গ
১৯০০ – ১৩০০ খ্রি.পূ. পরবর্তী হরপ্পা স্থানীয়ভবন যুগ
১৯০০ – ১৭০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৪
১৭০০ – ১৩০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৫
১৩০০ – ৩০০ (লৌহযুগ) সিন্ধু-গাঙ্গেয় সভ্যতা

সিন্ধু সভ্যতার বিস্তার ছিল বেলুচিস্তান থেকে সিন্ধু প্রদেশ পর্যন্ত প্রায় সমগ্র পাকিস্তান, আধুনিক ভারতের গুজরাত, রাজস্থান, হরিয়ানা ও পাঞ্জাব রাজ্য। উত্তরে এই সভ্যতা উচ্চ শতদ্রু অববাহিকার রুপার পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। সিন্ধু সভ্যতার উদ্ভব মিশর ও পেরুর প্রাচীন সভ্যতার মতো উচ্চভূমি, মরুভূমি ও সমুদ্রবেষ্টিত উর্বর কৃষিজমিতে হয়েছিল। সাম্প্রতিক কালে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশেও সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। আফগানিস্তানেও সিন্ধু সভ্যতার কয়েকটি উপনিবেশের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই সভ্যতার কয়েকটি বিচ্ছিন্ন উপনিবেশের সন্ধান পাওয়া গেছে তুর্কমেনিস্তান ও গুজরাতেও। পশ্চিম বেলুচিস্তানের সুকতাগান ডোর ও গুজরাতের লোথাল ছিল এই সভ্যতার উপকূলীয় বসতি অঞ্চল। উত্তর আফগানিস্তানের শোর্তুঘাইতে অক্সাস নদীর ধারে, উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে গোমাল নদী উপত্যকায়, ভারতের জম্মুর কাছে বিপাশা নদীর তীরে মান্ডাতে এবং দিল্লি থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে হিন্দোন নদীর তীরে আলমগিরপুরেও সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। সিন্ধু সভ্যতার প্রধান কেন্দ্রগুলি নদীতীরে আবিষ্কৃত হলেও, বালাকোটের মতো প্রাচীন সমুদ্র সৈকতেও কতকগুলি কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন, বালাকোট। আবার দ্বীপেও এই সভ্যতার প্রাচীন কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ধোলাবীরার নাম করা যায়।
পাকিস্তানে হাকরা প্রণালী এবং ভারতের মরশুমি নদী ঘগ্গরের পরস্পর-প্রাবৃত প্রাচীন শুষ্ক নদীখাতের প্রমাণ পাওয়া যায়। সিন্ধু সভ্যতার অনেক কেন্দ্র ঘগ্গর-হাকরা নদী অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য রুপার, রাখিগড়ি, সোথি, কালিবঙ্গান ও গনওয়ারিওয়ালা। জে. জি. স্যাফার ও ডি. এ. লিচেনস্টাইনের মতে, হরপ্পা সভ্যতা হল “ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের ঘগ্গর-হাকরা উপত্যকার বাগোর, হাকরা ও কোটি ডিজ সম্প্রদায় বা ‘জাতিগোষ্ঠী’ সংমিশ্রণ।”
কোনো কোনো পুরাতাত্ত্বিকের মতে, ঘগ্গর-হাকরা নদী ও তার উপনদীগুলির শুষ্ক খাতগুলির ধারে এই সভ্যতার ৫০০টিরও বেশি কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে; যেখানে সিন্ধু ও তার উপনদীগুলির তীরে আবিষ্কৃত হয়েছে মাত্র ১০০টির মতো কেন্দ্র। এই কারণে তাঁরা এই সভ্যতাকে সিন্ধু ঘগ্গর-হাকরা সভ্যতা বা সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা বলার পক্ষপাতী। তবে অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ এই মতকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করেন। তাঁদের মতে, সিন্ধু সভ্যতার বসতি ও কৃষি অঞ্চল ঘগ্গর-হাকরা মরু অঞ্চলে গড়ে ওঠেনি; এগুলির অধিকাংশই সিন্ধু অববাহিকার উর্বর অংশে অবস্থিত। দ্বিতীয়ত, ঘগ্গর-হাকরা উপত্যকায় প্রাপ্ত নিদর্শনস্থলের সংখ্যাটি অতিরঞ্জিত। তাছাড়া ঘগ্গর-হাকরা নদীটি নিজেই সিন্ধুর একটি উপনদী ছিল। তাই সিন্ধু সভ্যতার এই নতুন নামকরণ অযৌক্তিক। “হরপ্পা সভ্যতা” নামটি বরং অধিকতর সুপ্রযোজ্য। কারণ অনেক পুরাতাত্ত্বিক এই সভ্যতার প্রথম আবিষ্কৃত কেন্দ্রটির নামে সভ্যতার নামকরণ করার পক্ষপাতী।
আদি হরপ্পা সভ্যতা
নিকটবর্তী ইরাবতী নদীর নামে নামাঙ্কিত আদি হরপ্পা ইরাবতী পর্বের সময়কাল ৩৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ২৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। এটি পশ্চিমে হাকরা-ঘগ্গর নদী উপত্যকার হাকরা পর্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। সিন্ধু প্রদেশের মহেঞ্জোদাড়োর নিকটবর্তী একটি স্থানের নামাঙ্কিত কোট দিজি পর্বের (২৮০০-২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ, হরপ্পা দুই) পূর্ববর্তী পর্ব এটি। সিন্ধু লিপির প্রাচীনতম নিদর্শনটি খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের সমসাময়িক।
পাকিস্তানের রেহমান ধেরি ও আমরিতে পূর্ণবর্ধিত পর্বের প্রাচীন গ্রামীণ সংস্কৃতির নিদর্শন পাওয়া গেছে। কোট দিজি (হরপ্পা দুই) এমন একটি যুগের প্রতিনিধি যা পূর্ণবর্ধিত যুগের আগমনবার্তা ঘোষণা করে। এই স্তরে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের একটি প্রধান কেন্দ্র বিদ্যমান ছিল এবং নাগরিক জীবনযাত্রার মানও ক্রমশ উন্নত হচ্ছিল। এই শহরের আরও একটি শহর ভারতে হাকরা নদীর তীরে কালিবঙ্গানে পাওয়া গেছে।
অন্যান্য আঞ্চলিক সভ্যতার সঙ্গে এই সভ্যতার বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। লাপিস লাজুলি ও অন্যান্য রত্ন প্রস্তুতকারক উপাদান দূর থেকে আমদানি করা হত। গ্রামবাসীরা এই সময় মটর, তিল, খেজুর ও তুলার চাষ করত। এই সময় মহিষ পোষ মানানো শুরু হয়। ২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ হরপ্পা বৃহৎ এক নগরকেন্দ্রে পরিণত হয়। এই সময়কাল থেকেই পূর্ণবর্ধিত হরপ্পা সভ্যতার সূচনা।
পূর্ণবর্ধিত হরপ্পা সভ্যতা
২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ আদি হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীরা একাধিক বৃহৎ নগর কেন্দ্রে গড়ে তুলেছিল। এই ধরনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নগর হল আধুনিক পাকিস্তানের হরপ্পা, গনেরিওয়ালা, মহেঞ্জোদাড়ো এবং ভারতের ধোলাবীরা, কালিবঙ্গান, রাখিগড়ি, রুপার, লোথাল ইত্যাদি। সিন্ধু ও তার উপনদীগুলির অববাহিকায় মোট ১,০৫২টি প্রাচীন নগর ও বসতি অঞ্চলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।
নগর
সিন্ধু সভ্যতায় এক অভিজাত ও উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন নগরাঞ্চলীয় সংস্কৃতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এই শহরগুলিই ছিল এই অঞ্চলের প্রাচীনতম নগরব্যবস্থা। নগর পরিকল্পনার উচ্চমান দেখে অনুমিত হয় নগরোন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে এই অঞ্চলের মানুষের যথেষ্ট জ্ঞান ছিল এবং এখানে একটি দক্ষ পৌর সরকারেরও অস্তিত্ব ছিল। এই সরকারব্যবস্থায় স্বাস্থ্যসচেতনতা যেমন গুরুত্ব পেত, তেমনি নাগরিকদের ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের সুবিধা-অসুবিধার দিকেও নজর রাখা হত।
হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো এবং রাখিগড়ির যে অংশে খননকার্য চলেছে, সেই অংশের নগরোন্নয়ন পরিকল্পনার অন্তর্গত ছিল বিশ্বের প্রথম নগরাঞ্চলীয় নিকাশি ব্যবস্থা। শহরে বাড়ির মধ্যে স্বতন্ত্র কূপ থেকে জল তোলা হত; কোনো কোনো ক্ষেত্রে একাধিক বাড়ি একটি সার্বজনীন কূপ থেকেও জল নিত। স্নানের জন্য নির্দিষ্ট ঘরটি থেকে নালিপথে বর্জ্যজল ঢাকা নর্দমার দিকে পাঠানো হত। এই ঢাকা নর্দমাগুলি শহরের প্রধান প্রধান রাস্তার দুই পাশে অবস্থিত ছিল। বাড়ির দরজা থাকত আভ্যন্তরীণ অঙ্গন বা ছোটো ছোটো গলির দিকে। এই অঞ্চলের কোনো কোনো গ্রামের গৃহনির্মাণ পদ্ধতির মধ্যে আজও হরপ্পার গৃহনির্মাণ পদ্ধতির কিছু রীতি বিদ্যমান রয়েছে।
এই অঞ্চলের জলনিকাশি ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্য, ভারত ও পাকিস্তানে আবিষ্কৃত যে কোনো প্রাচীন সভ্যতার চেয়ে অনেক উন্নত ছিল। পোতাঙ্গন, শস্যাগার, গুদাম, ইষ্টকনির্মিত অঙ্গন ও রক্ষাপ্রাচীরগুলি হরপ্পার উন্নত স্থাপত্যকলার পরিচায়ক।
এই অঞ্চলে দুর্গনির্মাণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতান্তর রয়েছে। মেসোপটেমিয়া বা প্রাচীন মিশরের মতো এই সভ্যতায় কোনো বৃহদাকার ভবন বা স্থাপনার সন্ধান পাওয়া যায় না। প্রাসাদ বা মন্দিরেরও কোনো সন্দেহাতীত প্রমাণ নেই। প্রমাণ নেই রাজা, সেনাবাহিনী বা পুরোহিত শ্রেণীর অস্তিত্বেরও। কয়েকটি বড়ো স্থাপনাকে শস্যাগার মনে করা হয়। একটি শহরে এক সুবিশাল স্নানাগারের (মহাস্নানাগার, মহেঞ্জোদাড়ো) সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এটি সম্ভবত গণস্নানাগার ছিল। দুর্গগুলি প্রাচীরবেষ্টিত; তবে এই প্রাচীর প্রতিরক্ষার্থে নির্মিত হয়েছিল কিনা তাও জানা যায় না। সম্ভবত বন্যার জল প্রতিরোধের জন্যই এগুলি নির্মাণ করা হয়েছিল।
মনে করা হয়, শহরের অনেক বাসিন্দাই ছিলেন বণিক ও শিল্পী। তাঁরা নির্দিষ্ট পেশার ভিত্তিতে শহরের মধ্যে পল্লি নির্মাণ করে বাস করতেন।
সিলমোহর, পুতি ও অন্যান্য দ্রব্য নির্মাণে অন্যান্য অঞ্চল থেকে আমদানিকৃত উপাদান ব্যবহৃত হত। আবিষ্কৃত পুরাদ্রব্যগুলির মধ্যে একটি চকচকে মৃৎনির্মিত পুতি পাওয়া গিয়েছে। সিলমোহরে প্রাণী, মানুষ (সম্ভবত দেবতা) ও লিপি খোদিত থাকত। এই সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধার করা আজও সম্ভব হয়নি। কোনো কোনো সিলমোহর ব্যবহৃত হত পণ্যদ্রব্যের উপর মাটির ছাপ দেওয়ার জন্য। এগুলির অন্যান্য ব্যবহারও সম্ভবত ছিল।
হরপ্পা সভ্যতায় কয়েকটি বাড়ি অন্যান্য বাড়ি থেকে বড়ো আকারের ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই সভ্যতার শহরগুলিতে সমতাবাদী বা ইগালেটারিয়ান সমাজব্যবস্থার দেখা পাওয়া যায়। সব বাড়িতেও জল ও নিকাশি সংযোগ ছিল। এর থেকে মনে হয়, এই সভ্যতায় ধনকেন্দ্রিকতার প্রবণতা কম ছিল। তবে ব্যক্তিগত গৃহসজ্জা থেকে শ্রেণীবিভক্ত সমাজব্যবস্থার পরিচয়ও পাওয়া যায়।
কৃষি ও জীবিকা
একথা অনস্বীকার্য যে, নাগরিক বিপ্লবের জন্য কৃষি উৎপাদনের পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রসারণ প্রয়োজন। সিন্ধু উপত্যকায় কোনো বিশেষ কারণ ছিলো, যা এ ধরনের প্রসারে অভূতপূর্ব সহযোগিতা করোছিলো। বলা হয় যে, খ্রিস্টপূর্ব ৫৫১০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২২৩০, এ সময়কালে আজকের তুলনায় অত্যন্ত বেশি বৃষি্টপাত হওয়ায়, সে অঞ্চলে দীর্ঘকাল আর্দ্র পর্ব স্থায়ী হয়েছিলো। পরিবেশের এ সহায়তার কারণে সিন্ধু উপত্যকায় পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ের তুলনায় সে সময়ে অনেক বেশি পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছিলো। তবে কৃষিক্ষেত্রে সিন্ধু সভ্যতায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটায়, ওই সময়কার কৃষি হাতিয়ার। প্রাচীন সিন্ধু সংস্কৃতির সময়কালে লাঙলের উপস্থিতিই তার একমাত্র প্রমাণ নয়, বরং বানাওয়ালি এবং জাওয়াইওয়ালায় (বাহাওয়ালপুর) কাদামাটির লাঙল আবিষ্কারও একই সূত্রে গৎথা। উত্তরপূর্ব আফগানিস্তানে শোরতুঘাই এর সিন্ধু জনবসতিতে লাঙল-কর্ষিত ভূক্ষেত্র পাওয়া গেছে। লাঙল আসার পরে উৎপাদন ক্ষমতার ব্যাপক উন্নতি সাধিত হলেও, ফসল কাটার জন্য তেমন কোনো যন্ত্রপাতি সেসময়ের ইতিহাস থেকে জানা যায় না।
ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে সঞ্চিত ভৌমজলকে যেসব প্রাচীন সভ্যতায় কূপের সাহায্যে সংরক্ষিত করা হতো, তাদের মধ্যে প্রথম যে সভ্যতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছে, তা হলো সিন্ধু সভ্যতা। গ্রামেও যে কাচা ইদারা খনন করা হতো, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো কারণ নেই। আর আল্লাহডিনো (করাচীর নিকটে)তে উচ্চতর ভূমিতে নির্মিত এক পাথরে বাধানো কূপও রয়েছে। সম্ভবত নিচের ভূক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য এটি উচুতে স্থাপন করা হয়েছে। তবে সেখানে পুলি ব্যবস্থা চোখে পড়েনি।
প্রাচীন এবং পরিণত সিন্ধু এলাকাসমূহে খেজুর, বদরী (ber), আঙুর এবং আনারস উৎপাদিত হবার প্রমাণ (বীজের স্বাক্ষ্য) পাওয়া গেছে। প্রথম দুটি মেহরগড়ের প্রাচীনতম বসতিস্তরে পাওয়া গেছে। পরের দুটি হেলমন্দ উপত্যকায় উৎপাদিত হতো। আবিস্কৃত প্রাণী অস্থির মধ্যে “জেবু”র সন্তানসন্ততিদের হাড়ের সংখ্যা অত্যাধিক। বলদ গাড়ি এবং লাঙল টানতো এবং গরু দুধ দিতো, এতেই বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে সিন্ধু এলাকার মানুষজনের জীবনযাত্রার স্বর্ণইতিহাস। এছাড়া সিন্ধু এলাকার জনগণের অন্যতম পেশা ছিলো শিকার। সিন্ধু সীল মোহর দেখে একটি বিষয় বলা যায় যে, বন্য এবং হিংস্র পশুর মোকাবেলা করা তখনকার সময়ের মানুষদের মধ্যে একটি অন্যতম বিষয় হিসেবে প্রতিভাত হয়।
বৈদিক যুগ বলতে আমরা বুঝি সেই যুগকে যখন বেদ রচনা করা হয়েছিল। ভারতবষর্ের ইতিহাসে যে সময়ে আর্যদের মধ্যে বেদের প্রাধান্য ছিল, তাই বৈদিক যুগ নামে পরিচিত।
লৌহ যুগ
প্রাগৈতিহাসিক যুগের যে সময়কালে কোন এলাকার ধাতব অস্ত্র ও যন্ত্রপাতি মূলত লোহা দ্বারা তৈরি হত সেই সময়কালকে প্রত্নতত্ববিদ্যায় লৌহযুগ বলা হয়। লোহার ব্যবহার শুরুর সাথে সাথে মানবসমাজে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়, যার মধ্যে কৃষিব্যবস্থা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং শিল্পকলা অন্যতম।
প্রত্নতত্ববিদ্যায় প্রাগৈতিহাসিক যুগকে যে তিনভাগে ভাগ করা হয়, লৌহ যুগ হচ্ছে সেই তিন যুগের সর্বশেষ যুগ। প্রস্তর যুগ ও ব্রোঞ্জ যুগের পরে লৌহ যুগের আবির্ভাব। লৌহযুগের সময়কাল ও বৈশিষ্ট্য অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন। সব অঞ্চলেই লৌহযুগ শেষে ঐতিহাসিক যুগের আবির্ভাব, যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল লিখিত সংরক্ষিত ইতিহাস। উদাহরণ স্বরুপ, ব্রিটেন এর লৌহযুগ শেষ হয় রোমান বিজয় এর মাধ্যমে, যার পর হতে ব্রিটেন এর লিখিত ইতিহাস সংরক্ষণ শুরু হয়।
মহাজনপদ-এর আভিধানিক অর্থ “বিশাল সাম্রাজ্য” । বৌদ্ধ গ্রন্থে বেশ কয়েকবার এর উল্লেখ পাওয়া যায়। বৌদ্ধ গ্রন্থ অঙ্গুত্তরা নিকায়া,মহাবস্তুতে ১৬টি মহাজনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তারের পূর্বে ভারতের উত্তর-উত্তর পশ্চিমাংশে উত্থিত এবং বিস্তৃত হয়।
ভারতীয় প্রাচীন গ্রন্থসমূহে উল্লিখিত রাজ্যসমূহের অবস্থান দেখানো হয়েছে
• অবন্তি
• অশ্মক অথবা অস্সক
• অঙ্গ
• কম্বোজ
• কাশী
• কুরু
• কোশল
• গান্ধার
• চেদি অথবা চেটি
• বাজ্জি অথবা বৃজি
• বৎস অথবা বংশ
• পাঞ্চাল অথবা পাঁচাল
• মগধ
• মৎস্য অথবা মচ্ছ
• মল্ল
• সুরসেন
প্রাচীন ইন্দো-আর্য্য রাজনৈতিক গঠনের সূত্রপাত হতে শুরু করে ‘জন’ (অর্থ-প্রজা/ব্যক্তি:উচ্চারণ-জনো) নামীয় অর্ধ যাযাবর গোত্রসমূহের মাধ্যমে। প্রাচীন বৈদিক পুস্তকসমূহে আর্যদের বিভিন্ন জন বা গোত্রের কথা পাওয়া যায়, যারা অর্ধযাযাবর গোত্রীয় কাঠামোতে বসবাস করত এবং নিজেদের ও অন্যান্য অনার্যদের সাথে গরু, ভেড়া ও সবুজ তৃণভূমি নিয়ে মারামারি করত। এই সূচনালগ্নের বৈদিক ‘জন’ নিয়েই মহাকাব্যীয় যুগের জনপদ গঠিত হয়।
অঙ্গ প্রাচীন ভারতের একটি রাজ্য। খ্রিষ্টপূর্ব ৬ শতকের দিকে ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে এটি বিকাশ লাভ করে কিন্তু ওই শতাব্দীতেই এটি মগধ দ্বারা অধীকৃত হয়। প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থসমূহ যেমন: অঙ্গুত্তরা নিকায়াতে উল্লিখিত ষোলটি মহাজনপদের মধ্যে অঙ্গ অন্যতম। প্রাচীন জৈন গ্রন্থ ভৈক্ষপ্রাজনাপ্তির (যা ভগবতী সূত্র নামে সাধারণত পরিচিত) প্রাচীন জনপদের তালিকাতেও অঙ্গের উল্লেখ আছে।
কারো কারো মতে, অঙ্গের বাসিন্দারা ছিল মিশ্র জাতিসত্ত্বার, বিশেষত: পরবর্তী কালে।
মহাভারত ও পৌরাণিক সাহিত্য মতে অঙ্গ নামটির উৎপত্তি হয়েছে এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা যুবরাজ অঙ্গের নামানুসারে। রামায়ণে বলা হয়েছে অঙ্গ নামটির উৎপত্তি হয়েছে সেই স্থানের নাম থেকে, যেখানে শিব কামদেবকে পুরিয়ে হত্যা করে এবং যেখানে তার শরীরের অংশ সমূহ (অঙ্গ) ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল
বৃজি ছিল প্রাচীন ভারতের প্রধান মহাজনপদসমূহের একটি। প্রাচীন বৌদ্ধ লিপি অঙ্গুত্তরা নিকায়া এবং জৈন লিপি ভগবতী সূত্র – এদুটির ষোল মহাজনপদের তালিকাতেই বৃজির উল্লেখ ছিল। এই মহাজনপদের নামের উৎপত্তি এখানকার শাসক উপজাতিদের একটি, বৃজদের নামে। ধারণা করা হয় বৃজি রাষ্ট্র ব্যবস্থাটি ছিল প্রজাতন্ত্রী কাঠামোর। পানিনি, কৌটিল্য এবং জুয়ানজ্যাং এই জাতির উল্লেখ করেছেন।
গুপ্ত সাম্রাজ্য ছিল একটি প্রাচীন ভারতীয় সাম্রাজ্য। আনুমানিক খ্রিষ্টীয় ৩২০ থেকে ৫৫০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে এই সাম্রাজ্য প্রসারিত ছিল, মহারাজ শ্রীগুপ্ত ধ্রুপদি সভ্যতা-র আদর্শে এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন] গুপ্ত শাসকদের ভারতে যে শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থাপিত হয়েছিল, তার ফলশ্রুতিতে দেশ বৈজ্ঞানিক ও শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করতে সক্ষম হয়।গুপ্তযুগকে বলা হয় ভারতের স্বর্ণযুগ।এই যুগ ছিল আবিষ্কার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বাস্তুবিদ্যা, শিল্প, ন্যায়শাস্ত্র, সাহিত্য, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্ম ও দর্শনের বিশেষ উৎকর্ষের যুগ; বর্তমান হিন্দু সংস্কৃতি মূলত এই যুগেরই ফসল। গুপ্ত যুুগের আমলে অনেক পণ্ডিত ব্যাক্তি যেমন কালিদাস, আর্যভট্ট, বরাহমিহির, বিষ্ণু শর্মা -এর অবির্ভাব হয়েছিলো। প্রথম চন্দ্রগুপ্ত, সমুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন গুপ্ত সাম্রাজ্যের সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ সম্রাট।
মগধ সাম্রাজ্য বলতে মগধ অঞ্চলের নিম্নলিখিত সাম্রাজ্যকে বোঝানো হয়।
• হর্য্যঙ্ক সাম্রাজ্য (৬৮৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – ৪১৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
• শিশুনাগ সাম্রাজ্য (৪১৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – ৩৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
• নন্দ সাম্রাজ্য (৩৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – ৩২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
• মৌর্য সাম্রাজ্য (৩২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – ১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
• শুঙ্গ সাম্রাজ্য (১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ– ৭৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
• গুপ্ত সাম্রাজ্য (৩২০ খ্রিস্টাব্দ – ষষ্ঠ শতাব্দী)
মগধ প্রাচীণ ভারতে ষোলটি মহাজনপদ বা অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম। ষোলটি মহাজনপদের মধ্যে মগধ বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই রাজ্য বর্তমানের বিহারের পাটনা, গয়া আর বাংলার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ছিল। রাজগৃহ ছিল মগধের রাজধানী।
রাজা বিম্বসার ছিলেন মগধ প্রথম ঐতিহাসিক রাজা। তিনি অঙ্গ দখল করেন।
রাজা বিম্বসারের পুত্র অজাতশত্রু হাতে মারা যান। অজাতশত্রু রাজা হলে কোশলের রাজা প্রসেনজিতের সংগে তার যুদ্ধ বেধে যায়। যুদ্ধে হেরে গিয়ে প্রসেনজিত মৈত্রী চুক্তি করে ও নিজের মেয়ে সংগে অজাতশত্রুর বিয়ে হয়। অজাতশত গঙ্গা ওপারে রাজ্য বিস্তার করার জন্য পাটলিপুত্রে রাজধানী স্থানারিত করেন। পাটলিপুত্রে তার নতুন দুর্গের সাহায্যে সহজেই লিছ্ছবি প্রজাতন্ত্র দখল করে ফেলেন। শোনা যায় অজাতশত্রু তার দুধরনের নতুন অস্ত্রের (গুলতি ও আচ্ছাদনযুক্ত রথ) সাহায্যে সহজেই সব যুদ্ধে জিতে যান।
পঞ্চম এবং চতুর্থ খ্রীষ্টাব্দে মগধ শাসন করে নন্দ বংশ। শিশুনাংগ বংশের শেষ রাজা মহান্দীনের অবৈধ সন্তান মহাপদ্ম নন্দ নন্দ বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সমস্ত ক্ষত্রিয় রাজাদের পরাজিত করে বিন্ধ্য পর্বত পর্যন্ত সামাজ্য বিস্তার করেন। তাঁকে ভারতের প্রথম সামাজ্য প্র্রতিষ্ঠাতাও বলা যায়। সামাজ্য বিস্তারের জন্য তিনি ২,০০,০০০ পদাতিক, ২০,০০০ অশ্বারোহী, ২,০০০ রথ ও ৩,০০০ হস্তীবিশিষ্ট সুবিশাল বাহিনী গড়ে তোলেন। প্লুটার্কের মতে তাঁর বাহিনী আরো বড় ছিল। এই বংশের শেষ রাজা ছিলেন ধননন্দ।
মহামতি আলেকজান্ডার (জন্ম – জুলাই খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫৬, মৃত্যু জুন ১১, খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩)পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম সফল সামরিক প্রধান। তিনি তৃতীয় আলেকজান্ডার বা মেসিডনের রাজা হিসেবেও পরিচিত। তিনি ছিলেন মেসিডোনিয়ার শাসনকর্তা। মেসিডোনিয়া বর্তমান গ্রীসের অন্তর্গত একটি অঞ্চল। তার পিতা ফিলিপ ছিলেন মেসিডোনিয়ার রাজা। তার মৃত্যুর পূর্বে তিনি পরিচিত পৃথিবীর বেশির ভাগ জয় (টলেমির মানচিত্র অনুযায়ী) করেছিলেন। আলেকজান্ডার তার সামরিক কৌশল ও পদ্ধতির জন্য বিশ্ব বিখ্যাত। তিনি পারস্যে অভিশপ্ত আলেকজান্ডার নামেও পরিচিত, কারণ তিনি পারস্য সাম্রাজ্য জয় করেন এবং এর রাজধানী পারসেপলিস ধ্বংস করেন। তিনি ফার্সি ভাষায় “ইস্কান্দর, মধ্য পশ্চিমা স্থানে যুল-কারনাইন, আরবে আল-ইস্কান্দার আল কাবের”, উর্দুতে সিকান্দার-এ-আজম, পস্তুতে স্কান্দর, হিব্রুতে “আলেকজান্ডার মোকদন, আরমেনিয়ানয়ে ট্রে-কারনাইয়া”। তার এজাতীয় কিছু নামের অর্থ “দুই শিং বিশিষ্ট” (যুল-কারনাইন, ট্রে-কারনাইয়া), আবার উর্দু ও হিন্দিতে সিকান্দার যার অর্থ পারদর্শি” বা অত্যন্ত পারদর্শি। আলেকজান্ডারের পিতা দ্বিতীয় ফিলিপ তার শাসনামলে গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলোকে নিজের শাসনাধীনে আনেন। আলেকজান্ডার নিজেও এই নগররাষ্ট্রগুলিকে একত্রিত করতে অভিযান চালান কারণ ফিলিপের মৃত্যুর পর এগুলো বিদ্রোহ করেছিল। এরপর আলেকজান্ডার একে একে পারস্য, আনাতোলিয়া, সিরিয়া, ফোনিসিয়া, জুডিয়া, গাজা, মিশর, ব্যাক্ট্রিয়া এবং মেসোপটেমিয়া জয় করেন। তার সাম্রাজ্য মেসিডোনিয়া থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। পিতার মৃত্যুর পর আলেকজান্ডার পশ্চিমে অভিযান চালান ইউরোপ জয় করার জন্য। এরপর তিনি পূর্বে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করেন, কারণ শৈশবে তার শিক্ষক বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক, বিজ্ঞানী এরিস্টোটল তাকে বলেছিলেন কোথায় ভূমি শেষ হয় এবং মহাসাগর শুরু হয়। আলেকজান্ডার তার সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে বিদেশী (বিশেষ করে যারা গ্রিক বা মেসিডোনিয়ান নয়) ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করেন। এর মধ্যে কিছু জ্ঞানী ব্যক্তি তাকে “একত্রিকরণ”-এর ব্যাপারে ধারণা দেয়। তিনি তার সেনাবাহিনীতে বিদেশীদের সাথে বিবাহ উৎসাহিত করেন এবং নিজেও বিদেশী মেয়েদের বিয়ে করেন। প্রায় ১২ বছরের সামরিক অভিযানের পর আলেকজান্ডার মৃত্যুবরণ করেন। ধারণা করা হয় হয়ত তিনি ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড অথবা ভাইরাল এনকেফালাইটিস্‌ এর আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হেলেনেস্টিক যুগে তার অভিযানের কাহিনী লোকের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। আলেকজান্ডারের অভিযানের ফলে বিভিন্ন সভ্যতার মিলন ঘটে (মিশর, গ্রিক, পারস্য, ভারতীয়) এক নতুন সভ্যতার শুরু হয়। এই সভ্যতাই হেলেনেস্টিক সভ্যতা। গ্রিক ও গ্রিসের বাইরের বিভিন্ন সভ্যতায় আলেকজান্ডার ইতিহাসে, সাহিত্যে, পুরাণে জীবিত হয়ে আছেন।
বিশ্ব জয়

আলেকজান্ডারের পারস্য অভিযানের পূর্বে গ্রিকদের কাছে জানা ছিল, পৃথিবীর মোট চার-পঞ্চমাংশই পারস্য সাম্রাজ্য এবং এ যাবৎ কেউ পারস্য জয় করতে পারেননি। পারস্যের রাজধানী ব্যাবিলন গ্রিকদের কাছে ছিল এক স্বপ্ন নগরী। গ্রিকরা পন্ডিতরা তাদের সন্তানদের শেখাতেন পার্সিয়ানরা হচ্ছে বর্বর (বারবেরিয়ান) আর গ্রিকরা হচ্ছে সভ্য। তাই তারা পারস্যের ব্যাপারে আগ্রহী নয়। এই জাতীয় কথা আলেকজান্ডার শেখেন তার গুরু বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটোলের কাছ থেকে। তখন আলেকজান্ডার ভাবতেন গ্রিকরা যদি পার্সিয়ানদের থেকে উন্নতই হয়, তবে কেন তারা পারস্য জয় করছে না?
ভারত অভিযান
ম্যাসিডনের রাজা আলেকজান্ডারের ভারতবর্ষ আক্রমণ ভারতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পারস্য বিজয়ে পর শুরু হয় তার ভারত আগ্রাসন। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩১ অব্দে তিনি পারস্য সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন। সে সময় সিন্ধুনদ পারস্য সাম্রাজ্যের সীমানা ছিল। আলেকজান্ডারের ভারতবর্ষ আক্রমণের প্রাক্কালে উত্তর-পশ্চিম ভারত পরস্পরবিরোধী অনেকগুলো রাজ্যে বিভক্ত ছিল। তাদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বহিরাক্রমণ ঠেকানো সম্ভবপর ছিল না। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৮ অব্দের মধ্যে সমগ্র পারস্য এবং আফগানিস্তান আলেকজান্ডারের দখলে আসে। অত:পর আলেকজান্ডার খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে ভারত অভিমুখে অগ্রসর হন। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে তিনি ভারত নাম ভূখণ্ডে পদার্পণ করেন। আলেকজান্ডার পুষ্কলাবতীর রাজা অষ্টককে পরাভূত করেন, অশ্বক জাতিও তার নিকট পরাভূত হয়, তক্ষশীলার রাজা তার নিকট স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে, ঝিলাম রাজ পুরু বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাভব মানতে বাধ্য হনঅ অত:পর আরেকজান্ডার রাভি নদীর উপকূলবর্তী রাজ্যসমূহ দখল করেন এবং বিপাশা নদী পর্যন্ত অগ্রসর হন। এই স্থলে তার রণক্লান্ত সেনাবাহিনী দেশে প্রত্যাবর্তনে উণ্মুখ হয়ে পড়লে আলেকজাণ্ডার ভারত অভিযান বন্ধ করে গ্রীসে প্রত্যাবর্তন শুরু করেন। প্রত্যার্তনের পথে তিনি বেলুচিস্তান ও পাঞ্জাব অধিগত করেন্ ঝিলাম ও সিন্ধু নদের অন্তবর্তী সকল রাজ্য তার অধিগত হয়। ভারত ভূঘণ্ডে আরেকজাণ্ডার প্রায় ১৯ মাস অবস্থান করেছিলেন। তিনি ভারত ত্যাগের পর প্রায় দুই বৎসরকাল তার বিজিত অঞ্চলসমূহে গ্রীক শাসন বজায় ছিল। ভারত থেকে প্রত্যাবর্তনের কিছুদিন পর খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দে ব্যবিলনে তার অকাল মৃত্যু হয়। অন্যদিকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের নেতৃত্বে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা পাঞ্জাবে গ্রীক শাসনের অবসান ত্বরান্বিত করে।
আলেকজান্ডার ও গঙ্গারিডই
সম্রাট আলেকজান্ডার সুদূর গ্রিস থেকে একের পর এক রাজ্য জয় করে ইরান আফগানিস্তান হয়ে ভারতের পাঞ্জাবে পৌছে যায়। সুদর্শন তরুণ সম্রাটের চোখে সারা পৃথিবী জয়ের স্বপ্ন। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিশালী সেনাবাহিনীর অধিকারি তিনি। বিখ্যাত ইরান সম্রাট দারায়ুস থেকে শুরু করে উত্তর পশ্চিম ভারতের পরাক্রমশালী রাজা পুরু পর্যন্ত কেউ তার সামনে দাড়াতে পারে নাই। এখন তার সামনে মাত্র একটা বাধা, বিপাশা নদীর ওপারের গঙ্গারিডই রাজ্য। ভারতের মূল ভুখন্ড। এটুকু করতলগত হলেই সমগ্র ভারত তার দখল হয়ে গেল। যে স্বপ্ন নিয়ে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন গ্রিক রাষ্ট্র মেসিডোনিয়া থেকে, তা পরিপূর্ণতা পাবে।
এদিকে গঙ্গারিডই রাজ্যের রাজা তার বিশাল বাহিনী নিয়ে নদীর এপাড়ে আলেকজান্ডারকে প্রতিহত করতে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। গঙ্গারিডই সম্পর্কে প্রাচীন গ্রিক ও ল্যাটিন ঐতিহাসিকগণের লেখায় তথ্য পাওয়া যায়।
মেগাস্থিনিস(৩৫০ খ্রিষ্টপূর্ব-২৯০ খ্রিষ্টপূর্ব) আলেকজান্ডারের সেনাপতি ও বন্ধু সেলুকাসের রাজত্বকালে গ্রিক দূত হিসাবে ভারতে এসেছিল। তিনি লিখেন- ‘গঙ্গারিডাই রাজ্যের বিশাল হস্তী-বাহিনী ছিল। এই বাহিনীর জন্যই এ রাজ্য কখনই বিদেশি রাজ্যের কাছে পরাজিত হয় নাই। অন্য রাজ্যগুলি হস্তী-বাহিনীর সংখ্যা এবং শক্তি নিয়া আতংকগ্রস্ত থাকিত’
‘ভারতের সমূদয় জাতির মধ্যে গঙ্গারিডাই সর্বশ্রেষ্ঠ। এই গঙ্গারিডাই রাজার সুসজ্জিত ও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত চার হাজার হস্তী-বাহিনীর কথা জানিতে পারিয়া আলেকজান্ডার তাহার বিরূদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইলেন না’ – ডিওডোরাস (৯০ খ্রিষ্টপূর্ব-৩০ খ্রিষ্টপূর্ব)
গঙ্গাড়িডই রাজ্যের প্রকান্ড সেনাবাহিনী বর্ণনার ক্ষেত্রে ভারতীয় ও ধ্রুপদী ইউরোপীয় রচনাগুলির উল্লেখে প্রচুর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ডিওডোরাস ও ক্যুইন্টাস কার্টিয়াস রুফাস উভয়েই উল্লেখ করেছেন নন্দরাজের সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিভাগ সম্বন্ধে। যথা- পদাতিক সৈন্য ২ লক্ষ, অশ্বারোহী সৈন্য ২০ হাজার, রথ ২ হাজার, এবং তিন থেকে চার হাজার হাতি।
ধ্রুপদী গ্রিক ও ল্যাটিন বর্ণনায় রাজার নাম আগ্রাম্মেস। তিনি ছিলেন নীচকূলোদ্ভব নাপিতের পূত্র। হিন্দু পুরাণে তিনি মহাপদ্মনন্দন এবং বৌদ্ধ শাস্ত্র মাহাবোধিবংশে উগ্রসেন, অর্থ এমন এক ব্যক্তি যাঁর ‘প্রকান্ড ও পরাক্রান্ত সেনাবাহিনী’ আছে। হেমচন্দ্রের পরিশিষ্টপর্ব নামক জৈন গ্রন্থেও মহাপদ্মনন্দকে বলা হয়েছে নাপিত কুমার। পুরাণে বলা হয়েছে শূদ্রোগর্ভোদ্ভব। আরও বলা হয়েছে, ‘সর্বক্ষত্রান্তক নৃপঃ’ অর্থাৎ সকল ক্ষত্রিয়কে নিধন করে সিংহাসনে বসেছিল।
এই পর্যন্ত আলোচনায় গঙ্গারিডাই নামের পরাক্রান্ত রাজ্যের প্রমাণ পাওয়া গেল। যেটা ছিল পাঞ্জাব পর্যন্ত সমূদয় গঙ্গা অববাহিকায় নিয়ে গঠিত ভারতের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালি রাজ্য। বিজিত স্থানীয় ছোট ছোট ভূস্বামীরা আলেকজান্ডারকে জানাল অপর পাড়ের দেশটির ঐশ্বর্যের কথা, অপরাজেয় সৈন্যবাহিনীর কথা।
এরপর পৃথিবী বিখ্যাত এ অসীম সাহসী বীর করণীয় আলোচনার জন্য নিজের সেনাবাহিনীর সাথে পরামর্শে বসলেন এবং গঙ্গাড়িডই জয় করার জন্য উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সৈন্যরা এমনিতেই বছরের পর বছর যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত। তাছাড়া নদীর ঐপাড়ের ভয়াবহ সেনাবাহিনীর মোকাবেলায় অপরাগতা প্রকাশ করল। বিচক্ষণ সেনাপতি সৈন্যদের পক্ষ হয়ে জানাল সৈন্যরা কেউ বিপাশা পার হয়ে নিজের জীবন দিয়ে আসতে রাজী নয়, তারা পিতামাতা, স্ত্রী, সন্তান ও জন্মভুমিতে ফিরে যাওয়ার হন্য উদ্গ্রীব। এভাবে সৈন্যদের অনাগ্রহের ফলে পাঞ্জাবের বিপাশা নদীর অপর পাড়েই গ্রিক বাহিনীর বিজয় রথ থেমে যায়। আলেকজান্ডার এরপর গ্রিক বাহিনীকে মেসিডোনিয়ার দিকে ফিরতি যাত্রার নির্দেশ দেন।
ভারতের আদি মধ্যযুগীয় রাজ্যসমূহ বলতে বোঝায় খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতে উদ্ভুত রাজনৈতিক শক্তিগুলিকে। ২৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিমুক কর্তৃক সাতবাহন রাজবংশের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতে আদি মধ্যযুগীয় রাজন্যবর্গের শাসনের সূত্রপাত ঘটে। এই যুগ ভারতের ধ্রুপদি যুগ নামে পরিচিত। এই যুগে বিশ্বের সামগ্রিক অর্থসম্পদের এক তৃতীয়াংশ থেকে এক চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সমগ্র প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে ভারত। এই “আদি মধ্যযুগ” মোটামুটি ১,৫০০ বছর স্থায়ী হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে উত্তর ভারতে ইসলামী সুলতানি রাজ্যগুলির উত্থান (১২০৬ সালে দিল্লি সুলতানির প্রতিষ্ঠা) এবং দক্ষিণ ভারতে চালুক্য চোল রাজ্যের পতনের (১২৭৯ সালে তৃতীয় রাজেন্দ্র চোলের মৃত্যু) সঙ্গে সঙ্গে ভারতে আদি মধ্যযুগীয় রাজন্যবর্গের শাসনের সমাপ্তি ঘটে।
মৌর্য সাম্রাজ্য ছিল প্রাচীন ভারতের একটি সাম্রাজ্য। মৌর্য রাজবংশ-শাসিত এই সাম্রাজ্য ৩২১ থেকে ১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল। মৌর্য সাম্রাজ্যের উৎসভূমি ছিল গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের মগধ রাজ্য (অধুনা বিহার, পূর্ব উত্তরপ্রদেশ ও বাংলা)। সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র (অধুনা পাটনা)।
৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নন্দ রাজবংশকে উচ্ছেদ করে এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং তারপর সামরিক শক্তিবলে মধ্য ও পশ্চিম ভারতের আঞ্চলিক রাজ্যগুলিকে জয় করে বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ৩২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যেই মৌর্য সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ উত্তর-পশ্চিম ভারত জয় করে নেয়।
মৌর্য সাম্রাজ্যের মোট আয়তন ছিল ৫,০০০,০০০ বর্গ কিলোমিটার। এই সাম্রাজ্য ছিল সমসাময়িক বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্যগুলির অন্যতম। সাম্রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তার ছিল উত্তরে হিমালয়, পূর্বে বর্তমান অসম, পশ্চিমে বালুচিস্তান, দক্ষিণ-পূর্ব ইরান ও আফগানিস্তান পর্যন্ত। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও বিন্দুসারের আমলে মৌর্য সাম্রাজ্য মধ্য ও দক্ষিণ ভারতেও প্রসারিত হয়। মহামতি অশোক কলিঙ্গ (বর্তমান ওড়িশা) জয় করেন। অশোকের মৃত্যুর ৬০ বছরের মধ্যে মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন সূচিত হয়। ১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মগধে সূঙ্গ রাজবংশের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই সাম্রাজ্যের পতন সম্পূর্ণ হয়।
মৌর্য বংশের রাজারা চতুর্থ- তৃতীয় খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে প্রতিষ্ঠিত মৌর্য সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা ছিলেন। মগধের নন্দ বংশীয় রাজবংশকে পরাজিত করে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এ কাজে তাকে সাহায্য করেন চাণক্য বা কৌটিল্য নামে খ্যাত বিচক্ষন ব্যক্তি। কথিত আছে যে, নন্দ বংশীয় রাজার কাছে অপমানিত হয়ে চাণক্য বিন্ধ্যপর্বত সন্নিহিত অরণ্যে চলে যান। সেখানেই চন্দ্রগুপ্তের সাথে তার সাক্ষাত ঘটে।
আলেক্সান্ডার এর আক্রমণের পর ভারতীয় দের মধ্যে এককেন্দ্রিক সাম্রাজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। সেই চিন্তাধারার অনুসারী চন্দ্রগুপ্ত ভারত উপমহাদেশে আলেক্সান্ডারের উত্তরসূরী ম্যাসিডোনিয়ান সেনাপতি সেলুকাস নিকেটর কে পরাজিত করেন।এভাবে মৌর্য সাম্রাজ্যের অবস্থান সুসংহত হয়। মৌর্য সাম্রাজ্য বাস্তবে ভারতের প্রথম বৃহৎ আকারের এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য (জন্ম ৩৪০ খ্রিষ্ট পূর্ব, শাসনকাল ৩২০-২৯৮ খ্রিষ্টপূর্ব) ছিলেন ভারতে মৌর্য্য সাম্রাজ্যের প্রতিস্ঠাতা। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় অধিকাংশ অঞ্চল জয় করেছিলেন। তাকে অবিভক্ত ভারতের প্রতিস্ঠাতা এবং ভারতের প্রথম সম্রাট হিসেবে ইতিহাসে স্থান দেওয়া হয়। তার শাসন প্রতিস্ঠিত ছিলো পূর্বে বাংলা থেকে আসাম, পশ্চিমে আফগানিস্তান থেকে বেলুচিস্তান, উত্তরে কাশ্মির থেকে নেপাল এবং দক্ষিণে ডেক্কান উপত্যকা পর্যন্ত্য। মাত্র বিশ বছর বয়সে তিনি নন্দ সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে দিগ্বিজয়ী আলেজান্ডারের সেনাপতি ও তৎকালীন মেসডোনীয় সাম্রাজ্যের অধিকর্তা সেলুকাসের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় তার শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
চন্দ্রগুপ্তের বংশ পরিচয় নিয়ে মতান্তর আছে। কেউ মনে করেন, তিনি কোন নন্দ যুবরাজ ও তার পরিচারিকা মুরা’র সন্তান ছিলেন। মৌর্য্য কথার উৎপত্তি মুরা থেকেই। কেউ কেউ আবার মনে করেন তিনি নেপালের তরাই অঞ্চলের এক প্রজাতন্ত্রের থেকে এসেছিলেন। আবার কেউ কেউ আবার মনে করেন তিনি গান্ধার অঞ্চলের এক প্রজাতন্ত্রের থেকে এসেছিলেন। প্রাচীন স্ংস্কৃত সাহিত্যিক বিশখাদত্ত তার নাটকে চন্দ্রগুপ্তকে মৌর্যপুত্র ও নন্দজায়া হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আবার অনেক মধ্যযযুগীয় সাহিত্য ধারায় তাকে নন্দ বংশের রাজপুত্র ও এক দাসীর পুত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বৌদ্ধ সাহিত্যে তাকে ক্ষত্রিয় বংশের সন্তান হিসেবে ধারনা করা হয়।
বিভিন্ন সংস্কৃত স্তোত্র থেকে জানা যায়, সেসময় তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন ব্রাহ্মণ ছিলেন। তার নাম ছিল চানক্য। তিনি কৌটিল্য নামেও পরিচিত ছিলেন। জৈন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, তিনি কোন কারণে নন্দ রাজাদের দ্বারা অপমানিত হন, তিনি তখন থেকে এর প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করতে থাকেন। এই সময় তিনি বালক চন্দ্রগুপ্ত দেখেন। তার মনে হয় এই বালকের মধ্যে রাজা হবার সবগুণ আছে। তিনি তাকে তক্ষশীলা নিয়ে যান ও বিভিন্ন বিদ্যায় পারদর্শী করে তোলেন। জৈন গ্রন্থ ও বিশাখাদত্তের মুদ্রারাক্ষস থেকে জানা যায়, চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলের রাজা পার্বতকের সাথে মৈত্রী চুক্তি হয়। কোন জায়গায় একে আবার রাজা পুরু বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নন্দরাজাদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রথমে সাফল্য না পেলে চানক্য কৌশল পরিবর্তন করে নন্দ সাম্রাজ্যের প্রান্তিক প্রদেশগুলো আক্রমণ করা শুরু করেন, এতেই সাফল্য আসে। নন্দ সেনাপতি ভদ্রশালা ও ধননন্দকে একের পর পর যুদ্ধে পরাজিত করে চন্দ্রগুপ্তের বাহিনী রাজধানী কুসুমপুরা অবরোধ করে। আনুমানিক ৩২১ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে মাত্র ২০ বছর বয়সে চন্দ্রগুপ্ত নন্দ সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। এইভাবেই তিনি এত অল্প বয়সেই পূর্বে আসাম ও বাংলা থেকে পশ্চিমে সিন্ধু উপত্যকা পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হন।
এরপর চন্দ্রগুপ্ত ভারতের পশ্চিম সাম্রাজ্যের বিস্তারে উদ্যোগী হন। সেসময় সেলুকাস আই নিকাটর, আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্যের ব্যকট্রিয় থেকে সিন্ধু উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করছেন। চন্দ্রগুপ্তের সাথে ৩০৫ খ্রীষ্টপূর্বে তার যুদ্ধ শুরু হয়, পরে তাদের মধ্যে মৈত্রী চুক্তি সাক্ষরিত হয়। মনে করা হয়ে থাকে, এর ফলে হিন্দুকুশ পর্বত ও বেলুচিস্থান পর্যন্ত দীর্ঘ অঞ্চল তাঁর অধীনে আসে। বিনিময়ে চন্দ্রগুপ্ত সেলুকাসকে ৫০০ যুদ্ধের হাতী দেন। সেলুকাসকন্যার সাথে চন্দ্রগুপ্তের বিয়ে হয় বলেও মনে করা হয়।
এরপর চন্দ্রগুপ্ত দক্ষিণভারতে দিকে অগ্রসর হন। তিনি বিন্ধ্য পর্বত পেরিয়ে দাক্ষিণাত্য মালভূমির সিংহভাগ দখল করতে সক্ষম হন। এরফলে কলিঙ্গ ও দাক্ষিণাত্যের অল্পকিছু অংশ বাদে সমগ্র ভারত মৌর্য্য সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়।
জৈন মতানুসারে শেষ বয়সে চন্দ্রগুপ্ত জৈন ধর্মগ্রহণ করে জৈন সন্ন্যাসী ভদ্রবাহুর সাথে দাক্ষিণাত্য যাত্রা করেন ও বর্তমানে‌ কর্ণাটকের শ্রাবণবেলগোলায় স্বেচ্ছায় উপবাসে দেহত্যাগ করেন।
চাণক্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০-২৮৩ অব্দ) ছিলেন একজন প্রাচীন ভারতীয় গুরু (শিক্ষক), দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা।
তিনি প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির অধ্যাপক ছিলেন। তিনি মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উত্থানে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনিই তরুণ চন্দ্রগুপ্তকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। মৌর্য সাম্রাজ্য ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের নথিভুক্ত ইতিহাসে প্রথম সর্বভারতীয় সাম্রাজ্য। চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও তাঁর পুত্র বিন্দুসারের রাজ-উপদেষ্টার কাজ করেছিলেন।
চাণক্যকে কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামেও অভিহিত করা হয়। তিনি প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রবিজ্ঞান গ্রন্থ অর্থশাস্ত্র-এর রচয়িতা।তাঁকেই ভারতের প্রথম অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করা হয়। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে তাঁর অর্থনীতি তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। চাণক্যকে “ভারতের মেকিয়াভেলি” বলা হয়। যদিও তিনি নিকোলো মেকিয়াভেলির ১৮০০ বছর আগের মানুষ ছিলেন। গুপ্ত রাজবংশের শাসনের শেষ দিকে তাঁর বইটি হারিয়ে যায়। এটি আবার আবিষ্কৃত হয় ১৯১৫ সালে।
এই বিজ্ঞ ও প্রতিভাধর ব্রাহ্মণের জন্ম বর্তমান পাকিস্তানের তক্ষশীলায়; যেখানে উপমহাদেশে উচ্চতর জ্ঞান আহরণের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপীঠ অবস্থিত ছিল। রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তব চর্চা ও রাষ্ট্রীয় কৌশলের প্রয়োগ পদ্ধতির নির্দেশনা দানে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসে তার অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী।
বিষ্ণু গুপ্ত নামেও পরিচিত ছিলেন তিনি। কারণ এ নামটিই দিয়েছিলেন তার বাবা মা। এছাড়া তার বিখ্যাত ছদ্মনাম ‘কৌটিল্য’, যা তিনি তার বিখ্যাত সংস্কৃত গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্র’ এ গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রশাসন ও কূটনীতির কৌশলের সারসংক্ষেপ বলা যায় ‘অর্থশাস্ত্রকে’। যেহেতু তিনি ‘কূটিলা গোত্র’ থেকে উদ্ভূত ছিলেন, অতএব তা টিকিয়ে রাখার জন্যে তিনি ‘কৌটিল্য’ ছদ্মনাম গ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে তার অধিকতর প্রিয় নাম ‘চাণক্য’ এর উদ্ভব ‘চানকা’ থেকে, যে গ্রামে তার জন্ম হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে।
তার অসাধারণ কৃতিত্ব ছিল প্রচণ্ড শক্তিশালী নন্দ বংশের শাসন উৎখাত করে সম্রাট অশোকের পিতামহ চন্দ্র গুপ্ত মৌর্যকে ভারতের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। চন্দ্র গুপ্ত মৌর্যকেই উপমহাদেশের প্রথম ঐতিহাসিক সম্রাট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চন্দ্র গুপ্ত মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং পাটালিপুত্রকে তার রাজ্যের রাজধানীতে পরিণত করেন। পাটালিপুত্র বিহারের আধুনিক শহর পাটনার কাছেই অবস্থিত ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২২ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২৯৮ সাল পর্যন্ত চন্দ্র গুপ্ত রাজ্য শাসন করেন। তার সময়কালে সমগ্র রাজ্য জুড়ে শান্তি বিরাজমান ছিল, প্রজাদের প্রতি তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ এবং রাজ্য বিকশিত হয়েছিল সমৃদ্ধিতে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করে গেছেন চন্দ্র গুপ্তের দরবারে গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস তার ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থে।
নন্দ বংশের সর্বশেষ রাজা প্রজা সাধারণের কাছে প্রিয় ছিলেন না। একবার তিনি চাণক্যকে অপমান করেছিলেন। চাণক্য এই অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণের প্রতিজ্ঞা করেন। এদিকে তরুণ ও উচ্চাভিলাষী চন্দ্র গুপ্ত, যিনি নন্দ রাজার পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন, তিনিও ষড়যন্ত্র করছিলেন সিংহাসন দখলের। কিন্তু তার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয় এবং জীবন বাঁচাতে তাকে পালাতে হয়। চন্দ্র গুপ্ত যখন বিন্ধানের জঙ্গলে পলাতক ও নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন তখন ঘটনাচক্রে চাণক্যের সাথে তার সাক্ষাত হয়। চন্দ্র গুপ্ত তার জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন চাণক্যকে এবং তখনই তাকে তার গুরু, উপদেষ্টা ও মন্ত্রণাদাতা হিসেবে মেনে নেন। পরবর্তীতে তিনি চন্দ্র গুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন।
চাণক্যের সক্রিয় সাহায্যে চন্দ্রগুপ্ত একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং গুরুর তৈরি সুনিপুণ পরিকল্পনা অনুসারে পদক্ষেপ গ্রহণ করে শেষ পর্যন্ত নন্দ রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করতে সক্ষম হন। অতঃপর মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন চন্দ্র গুপ্ত মৌর্য।
প্রধানমন্ত্রী চাণক্য
এর আগে আলেকজান্ডারের আকস্মিক মৃত্যুতে গ্রিক শাসনের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবে বিদ্রোহের সূচনা হয় এবং এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে চন্দ্র গুপ্ত গ্রিক বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে তাদেরকে পরাজিত করেন ও পাঞ্জাবকে নিজ শাসনাধীনে আনেন। পরে চন্দ্র গুপ্ত একে একে পশ্চিম ভারতের সকল রাজ্য বিজয় করে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সাম্রাজ্য দক্ষতার সাথে পরিচালনার জন্যে তিনি একটি মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন চাণক্যকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করে।
যে পরিস্থিতিতে চন্দ্র গুপ্ত নন্দ বংশকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজের বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন তা অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে পঞ্চম শতাব্দীতে লিখিত একটি রাজনৈতিক নাটক ‘মুদ্রা রাক্ষস’এ। এ নাটকের রচয়িতা বিশাখাদত্ত নামে এক প্রাচীন নাট্যকার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই নাটকটি পঠিত, মঞ্চস্থ ও প্রশংসিত হয়েছে।
চন্দ্র গুপ্তের শ্রদ্ধেয় গুরু ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চাণক্য অবলীলায় বিলাসবহুল জীবন কাটাতে পারতেন জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদে। কিন্তু তিনি এর পরিবর্তে খুব সাধারণভাবে একটি কুঁড়েঘরে বসবাসের জীবন বাছাই করে নিয়েছিলেন। এই কুঁড়েঘরটি অবস্থিত ছিল এক শ্মশানে। সেখানে ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে দূরে অবস্থান করে তিনি বহু শিষ্যকে রাজ্যশাসনের কৌশল শিক্ষা দিয়েছেন এবং নৈতিক ও আর্থ-সামাজিক বিষয়ে জ্ঞান দান করেছেন। এসব ছাড়াও তিনি তার রাজার দেয়া দায়িত্ব পালন করেছেন বিশ্বস্ততার সাথে। চন্দ্রগুপ্তের জীবনে তিনি ছিলেন অভিভাবক স্বর্গীয় দূতের মতো এবং সত্যিকার বন্ধু, দার্শনিক ও গুরু।
চাণক্যের অর্থশাস্ত্র
চাণক্যের বিরাট সাহিত্য কর্ম ‘অর্থশাস্ত্র’, যার শব্দগত অর্থ ‘পৃথিবীতে সাধারণ কল্যাণ বিষয়ক বিবরণী।’ এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে শাসকের উদ্দেশ্যে পরামর্শ যে, কিভাবে একজন শাসককে তার প্রজাদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও জীবন মান উন্নত করার জন্যে কাজ করতে হবে এবং কিভাবে আরও ভূখণ্ড ও মূল্যবান সম্পদ নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করতে হবে। চাণক্য যে সব পরামর্শ বা নির্দেশনা সেই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন সেসবের অধিকাংশই শুধু রাজ্যশাসন নয় বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। চাণক্য উপমহাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রথম প্রবক্তা এবং তার কিছু নীতি বিশ্বজনীনভাবে প্রযোজ্য।
এই বিজ্ঞ ও বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন দার্শনিক ধর্ম, নীতিশাস্ত্র, সামাজিক আচরণ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু পর্যবেক্ষণ বর্ণনা করেছেন। এসবের কিছু কিছু অন্যান্য বিবরণীতে সংগৃহীত হয়েছে। এ ধরণের একটি সংকলনের নাম ‘চাণক্য নীতি দর্পণ’। তার কথাগুলো হয়তো আধুনিক যুগের পরিশীলিত কথাবার্তা থেকে ভিন্ন, কিন্তু দুই হাজার বছরের অধিক সময়ের ব্যবধানেও সেগুলো গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেনি।
চাণক্য তার কালোত্তীর্ণ গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্রে’ রাজাকে পরামর্শ দিয়েছেন, “যে রাজা শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা করতে পারে না এবং শুধু অভিযোগ করে যে তার পিঠে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে, তাকে সিংহাসনচ্যুত করা উচিত।” অর্থনৈতিক দুর্নীতি সর্বকালেই ছিল এবং চাণক্যের যুগেও তা নতুন কোন বিষয় ছিল না। সে কারণে তিনি লিখেছেন, “সকল উদ্যোগ নির্ভর করে অর্থের ওপর। সেজন্যে সবচেয়ে অধিক মনোযোগ দেয়া উচিত খাজাঞ্চিখানার দিকে। তহবিল তসরুপ বা অর্থ আত্মসাতের চল্লিশটি পদ্ধতি আছে। জিহ্বা’র ডগায় বিষ রেখে যেমন মধুর আস্বাদন করা সম্ভব নয়, তেমনি কোন রাজ কর্মচারীর পক্ষে রাজার রাজস্বের সামান্য পরিমাণ না খেয়ে ফেলার ঘটনা অসম্ভব ব্যাপার। পানির নিচে মাছের গতিবিধি যেমন পানি পান করে বা পান না করেও বুঝা সম্ভব নয়, অনুরূপ রাজ কর্মচারীর তহবিল তসরুপও দেখা অসম্ভব। আকাশের অতি উঁচুতেও পাখির উড্ডয়ন দেখা সম্ভব, কিন্তু রাজ কর্মচারীর গোপন কার্যকলাপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সমভাবে অসম্ভব।”
চাণক্য তার নীতিকথায় বলেছেন, “বিষ থেকে সুধা, নোংরা স্থান থেকে সোনা, নিচ কারো থেকে জ্ঞান এবং নিচু পরিবার থেকে শুভলক্ষণা স্ত্রী – এসব গ্রহণ করা সঙ্গত।”
“মনের বাসনাকে দূরীভূত করা উচিত নয়। এই বাসনাগুলোকে গানের গুঞ্জনের মতো কাজে লাগানো উচিত।”
“যারা পরিশ্রমী, তাদের জন্যে কোনকিছু হাসিল করা অসাধ্য কিছু নয়। শিক্ষিত কোন ব্যক্তির জন্যে কোন দেশই বিদেশ নয়। মিষ্টভাষীদের কোন শত্রু নেই।”
“বিরাট পশুপালের মাঝেও শাবক তার মাকে খুঁজে পায়। অনুরূপ যে কাজ করে অর্থ সবসময় তাকেই অনুসরণ করে।”
“মন খাঁটি হলে পবিত্র স্থানে গমন অর্থহীন।”
চাণক্য তার জীবদ্দশায়, এমনকি মৃত্যুর পরও ভারতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ব্যতিক্রমী প্রতিভার অধিকারী পণ্ডিত, সাধু, দেশপ্রেমিক, গুরু ও কর্মবীর হিসেবে শ্রদ্ধেয়। প্রথমেই তিনি পাঞ্জাবকে বিদেশী শাসন (গ্রিক) মুক্ত করতে রাজাকে সাহায্য করেন। এরপর অযোগ্য শাসক নন্দ রাজাকে উৎখাত করে চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যের সাথে আরও রাজ্য যুক্ত করেন এবং সাম্রাজ্যে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তার ভূমিকা পালন করেন। সন্ন্যাসীর মতো জীবন যাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেও। অসংখ্য শিষ্যকে তিনি জ্ঞান দান করেন। তিনি শিষ্যদের দেশপ্রেম, রাজার প্রতি আনুগত্য শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি প্রজাদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সবসময় রাজাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের মতোই চাণক্যের চেহারাও সুন্দর বা আকর্ষণীয় ছিলনা এবং দৈহিক গড়নও ছিল আকর্ষণহীন। দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন তিনি, যদিও সক্রেটিসের মতোই পণ্ডিত ও দার্শনিক ছিলেন। সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন যে, “দেহের সৌন্দর্যের চাইতে চিন্তার সৌন্দর্য অধিকতর মোহময় ও এর প্রভাব যাদুতুল্য।” অন্যদিকে চাণক্য ছিলেন দক্ষ পরিকল্পনাবিদ। সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল এবং অর্থহীন আবেগের কোন মূল্য ছিল না তার কাছে। নিজস্ব পরিকল্পনা উদ্ভাবন ও তা বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন কঠোর।
বাংলায় প্রচলিত কিছু চাণক্য শ্লোক নিচে উল্লেখ করা হলো-
• অতি পরিচয়ে দোষ আর ঢাকা থাকে না।
• অধমেরা ধন চায়, মধ্যমেরা ধন ও মান চায়। উত্তমেরা শুধু মান চায়। মানই মহতের ধন।
• অনেকে চারটি বেদ এবং ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করলেও আত্মাকে জানে না, হাতা যেমন রন্ধন-রস জানে না।
• অন্তঃসার শূন্যদের উপদেশ দিয়ে কিছু ফল হয় না, মলয়-পর্বতের সংসর্গে বাঁশ চন্দনে পরিণত হয় না।
• অবহেলায় কর্মনাশ হয়, যথেচ্ছ ভোজনে কুলনাশ হয়, যাচ্ঞায় সম্মান-নাশ হয়, দারিদ্র্যে বুদ্ধিনাশ হয়।
• অভ্যাসহীন বিদ্যা, অজীর্ণে ভোজন, দরিদ্রের সভায় বা মজলিশে কালক্ষেপ এবং বৃদ্ধের তরুণী ভার্যা বিষতুল্য।
• অহংকারের মত শত্রু নেই।
• আকাশে উড়ন্ত পাখির গতিও জানা যায়, কিন্তু প্রচ্ছন্নপ্রকৃতি-কর্মীর গতিবিধি জানা সম্ভব নয়।
• আদর দেওয়ার অনেক দোষ, শাসন করার অনেক গুণ, তাই পুত্র ও শিষ্যকে শাসন করাই দরকার, আদর দেওয়া নয়।
• আপদের নিশ্চিত পথ হল ইন্দ্রিয়গুলির অসংযম, তাদের জয় করা হল সম্পদের পথ, যার যেটি ঈপ্সিত সে সেই পথেই যায়।
• আড়ালে কাজের বিঘ্ন ঘটায়, কিন্তু সামনে ভাল কথা বলে, যার উপরে মধু কিন্তু অন্তরে বিষ, তাকে পরিত্যাগ করা উচিত।
• ইন্দ্রিয়ের যে অধীন তার চতুরঙ্গ সেনা থাকলেও সে বিনষ্ট হয়।
• উপায়জ্ঞ মানুষের কাছে দুঃসাধ্য কাজও সহজসাধ্য।
• উৎসবে, বিপদে, দুর্ভিক্ষে, শত্রুর সঙ্গে সংগ্রামকালে, রাজদ্বারে এবং শ্মশানে যে সঙ্গে থাকে, সে-ই প্রকৃত বন্ধু।
• ঋণ, অগ্নি ও ব্যাধির শেষ রাখতে নেই, কারণ তারা আবার বেড়ে যেতে পারে।
• একটি দোষ বহু গুণকেও গ্রাস করে।
• একটি কুবৃক্ষের কোটরের আগুন থেকে যেমন সমস্ত বন ভস্মীভূত হয়, তেমনি একটি কুপুত্রের দ্বারাও বংশ দগ্ধ হয়।
• একটিমাত্র পুষ্পিত সুগন্ধ বৃক্ষে যেমন সমস্ত বন সুবাসিত হয়, তেমনি একটি সুপুত্রের দ্বারা সমস্ত কুল ধন্য হয়।
• একশত মূর্খ পুত্রের চেয়ে একটি গুণী পুত্র বরং ভাল। একটি চন্দ্রই অন্ধকার দূর করে, সকল তারা মিলেও তা পারে না।
• কর্কশ কথা অগ্নিদাহের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
• খেয়ে যার হজম হয়, ব্যাধি তার দূরে রয়।
• গুণবানকে আশ্রয় দিলে নির্গুণও গুণী হয়।
• গুণহীন মানুষ যদি উচ্চ বংশেও জন্মায় তাতে কিছু আসে যায় না। নীচকুলে জন্মেও যদি কেউ শাস্ত্রজ্ঞ হয়, তবে দেবতারাও তাঁকে সম্মান করেন।
• গুরু শিষ্যকে যদি একটি অক্ষরও শিক্ষা দেন, তবে পৃথিবীতে এমন কোনও জিনিস নেই, যা দিয়ে সেই শিষ্য গুরুর ঋণ শোধ করতে পারে।
• গৃহে যার মা নেই, স্ত্রী যার দুর্মুখ তার বনে যাওয়াই ভাল, কারণ তার কাছে বন আর গৃহে কোনও তফাৎ নেই।
• চন্দন তরুকে ছেদন করলেও সে সুগন্ধ ত্যাগ করে না, যন্ত্রে ইক্ষু নিপিষ্ট হলেও মধুরতা ত্যাগ করে না, যে সদ্বংশজাত অবস্থা বিপর্যয়েও সে চরিত্রগুণ ত্যাগ করে না।
• তিনটি বিষয়ে সন্তোষ বিধেয়: নিজের পত্নীতে, ভোজনে এবং ধনে। কিন্তু অধ্যয়ন, জপ, আর দান এই তিন বিষয়ে যেন কোনও সন্তোষ না থাকে।
• দারিদ্র্য, রোগ, দুঃখ, বন্ধন এবং বিপদ- সব কিছুই মানুষের নিজেরই অপরাধরূপ বৃক্ষের ফল।
• দুর্জনের সংসর্গ ত্যাগ করে সজ্জনের সঙ্গ করবে। অহোরাত্র পুণ্য করবে, সর্বদা নশ্বরতার কথা মনে রাখবে।
• দুর্বলের বল রাজা, শিশুর বল কান্না, মূর্খের বল নীরবতা, চোরের মিথ্যাই বল।
• দুষ্টা স্ত্রী, প্রবঞ্চক বন্ধু, দুর্মুখ ভৃত্য এবং সসর্প-গৃহে বাস মৃত্যুর দ্বার, এ-বিষয়ে সংশয় নেই।
• ধর্মের চেয়ে ব্যবহারই বড়।
• নানাভাবে শিক্ষা পেলেও দুর্জন সাধু হয় না, নিমগাছ যেমন আমূল জলসিক্ত করে কিংবা দুধে ভিজিয়ে রাখলেও কখনও মধুর হয় না।
• পরস্ত্রীকে যে মায়ের মত দেখে, অন্যের জিনিসকে যে মূল্যহীন মনে করে এবং সকল জীবকে যে নিজের মত মনে করে, সে-ই যথার্থ জ্ঞানী।
• পাপীরা বিক্ষোভের ভয় করে না।
• পাঁচ বছর বয়স অবধি পুত্রদের লালন করবে, দশ বছর অবধি তাদের চালনা করবে, ষোল বছরে পড়লে তাদের সঙ্গে বন্ধুর মত আচরণ করবে।
• পুত্র যদি হয় গুণবান, পিতামাতার কাছে তা স্বর্গ সমান।
• পুত্রকে যারা পড়ান না, সেই পিতামাতা তার শত্রু। হাঁসদের মধ্যে বক যেমন শোভা পায় না, সভার মধ্যে সেই মূর্খও তেমনি শোভা পায় না।
• বইয়ে থাকা বিদ্যা, পরের হাতে থাকা ধন একইরকম। প্রয়োজনকালে তা বিদ্যাই নয়, ধনই নয়।
• বিদ্বান সকল গুণের আধার, অজ্ঞ সকল দোষের আকর। তাই হাজার মূর্খের চেয়ে একজন বিদ্বান অনেক কাম্য।
• বিদ্যাবত্তা ও রাজপদ এ-দুটি কখনও সমান হয় না। রাজা কেবল নিজদেশেই সমাদৃত, বিদ্বান সর্বত্র সমাদৃত।
• বিদ্যা ব্যতীত জীবন ব্যর্থ, কুকুরের লেজ যেমন ব্যর্থ, তা দিয়ে সে গুহ্য-অঙ্গও গোপন করতে পারে না, মশাও তাড়াতে পারে না।
• বিদ্যাভূষিত হলেও দুর্জনকে ত্যাগ করবে, মণিভূষিত হলেও সাপ কি ভয়ঙ্কর নয়?
• বিদ্যার চেয়ে বন্ধু নাই, ব্যাধির চেয়ে শত্রু নাই। সন্তানের চেয়ে স্নেহপাত্র নাই, দৈবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বল নাই।
• বিনয়ই সকলের ভূষণ।
• বিষ থেকেও অমৃত আহরণ করা চলে, মলাদি থেকেও স্বর্ণ আহরণ করা যায়, নীচজাতি থেকেও বিদ্যা আহরণ করা যায়, নীচকুল থেকেও স্ত্রীরত্ন গ্রহণ করা যায়।
• ভোগবাসনায় বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়।
• মিত ভোজনেই স্বাস্থ্যলাভ হয়।
• যশবানের বিনাশ নেই।
• যারা রূপযৌবনসম্পন্ন এবং উচ্চকুলজাত হয়েও বিদ্যাহীন, তাঁরা সুবাসহীন পলাশ ফুলের মত বেমানান।
• যে অলস, অলব্ধ-লাভ তার হয় না।
• যে গাভী দুধ দেয় না, গর্ভ ধারণও করে না, সে গাভী দিয়ে কী হবে! যে বিদ্বান ও ভক্তিমান নয়, সে পুত্র দিয়ে কী হবে!
• রাতের ভূষণ চাঁদ, নারীর ভূষণ পতি, পৃথিবীর ভূষণ রাজা, কিন্তু বিদ্যা সবার ভূষণ।
• শাস্ত্র অনন্ত, বিদ্যাও প্রচুর। সময় অল্প অথচ বিঘ্ন অনেক। তাই যা সারভূত তারই চর্চা করা উচিত। হাঁস যেমন জল-মিশ্রিত দুধ থেকে শুধু দুধটুকুই তুলে নেয়, তেমনি।
• সত্যনিষ্ঠ লোকের অপ্রাপ্য কিছুই নাই।
• সত্যবাক্য দুর্লভ, হিতকারী-পুত্র দুর্লভ, সমমনস্কা-পত্নী দুর্লভ, প্রিয়স্বজনও তেমনি দুর্লভ।
• সাপ নিষ্ঠুর খলও নিষ্ঠুর, কিন্তু সাপের চেয়ে খল বেশি নিষ্ঠুর। সাপকে মন্ত্র বা ওষধি দিয়ে বশ করা যায়, কিন্তু খলকে কে বশ করতে পারে?
• সুবেশভূষিত মূর্খকে দূর থেকেই দেখতে ভাল, যতক্ষণ সে কথা না বলে ততক্ষণই তার শোভা, কথা বললেই মূর্খতা প্রকাশ পায়।
• হাতি থেকে একহাজার হাত দূরে, ঘোড়া থেকে একশ হাত দূরে, শৃঙ্গধারী প্রাণী থেকে দশহাত দূরে থাকবে। অনুরূপ দুর্জনের কাছ থেকেও যথাসম্ভব দূরে থাকবে।
অর্থশাস্ত্র চাণক্য রচিত একটি সুপ্রাচীন রাষ্ট্রনীতি বিষয়ক গ্রন্থ। মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনকালে রচিত এই গ্রন্থটি প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রনীতি ও শাসনসংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ইতিহাস।
অর্থশাস্ত্র ১৫টি ভাগে বিভক্ত। এই ভাগগুলি ‘অধিকরণ’ নামে পরিচিত। গ্রন্থের মোট শ্লোকসংখ্যা ৬,০০০। রাজ্যশাসন, শত্রুদমন, রাজস্ব, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন, পৌর প্রশাসন প্রভৃতি নিয়ে এই ১৫টি বিভাগের প্রতিটি রচিত। অর্থশাস্ত্রের সকল বক্তব্য পরিষ্কার ও স্ববিরোধিতাদোষ থেকে মুক্ত। বিশুদ্ধ রাজতন্ত্র অর্থশাস্ত্রের মতে শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা। গণজীবনের সকল ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের সমর্থক অর্থশাস্ত্র। এছাড়া দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের স্বার্থে রাজকর্মচারী নিয়োগ কালে সাবধানতা, কৃষির উন্নতিকল্পে কৃষকদের উৎকৃষ্ট বীজ ও সার সরবরাহ, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সেচ ব্যবস্থার উন্নতির প্রস্তাব, জমির উপর চাষীর ন্যায্য অধিকার স্বীকার, নারীর বিশেষ অধিকার স্বীকার, বিবাহ বিচ্ছেদ ও বিধবা বিবাহের বিধান ব্রাহ্মণের বিশেষ অধিকার অস্বীকার ও অপরাধ অনুসারে ব্রাহ্মণেরও প্রাণদণ্ডের বিধান – এই সকল অর্থশাস্ত্রে প্রগতিশীল চিন্তা। রাষ্ট্রবিজ্ঞান সংক্রান্ত তাঁর তত্ত্বগুলির জন্য তাঁকে ইতালির বিশিষ্ট রাষ্ট্রনীতিবিদ মেকিয়াভেলির সঙ্গে তুলনা করা হয়।
বিন্দুসার, চন্দ্রগুপ্তের পর (জন্ম ৩২০ খ্রীষ্টপূর্ব, শাসনকাল ২৯৮-২৭২ খ্রীষ্টপূর্ব) সম্রাট হন।
বিন্দুসার চন্দ্রগুপ্ত ও দুর্ধরার সন্তান ছিলেন। শোনা যায়, দুর্ধরা যখন নয়মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখন বিষযুক্ত খাবার খেয়ে সন্তানসহ তাঁর প্রাণসংশয় হয়। তখন চন্দ্রগুপ্তের প্রধানমন্ত্রী চাণক্য দুর্ধরার পেট কেটে বিন্দুসারের জন্ম দেন। পিতৃসূত্রে তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হন। তাকে বিন্দুসার দক্ষিণ দিকে আরো প্রসারিত করেন ও বর্তমান কর্ণাটক রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল মৌর্য সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। চোল, পান্ড্য ও চের রাজারা তাঁর সঙ্গে মিত্রতার সূত্রে আবদ্ধ হন। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা বাধ্য হন। তাই বিন্দুসার সে’সব অঞ্চল আক্রমণ করেননি। এছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশে কেবল মাত্র কলিঙ্গ তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল না।
বিন্দুসারের সময় তক্ষশীলা লোকেরা দু’বার বিদ্রোহ ঘোষণা করে। প্রথমবার বিদ্রোহের কারণ ছিল তত্কালীন আঞ্চলিক শাসক ও বিন্দুসারের জ্যেষ্ঠ পুত্র সুসীমের অপদার্থতা। দ্বিতীয়বার বিদ্রোহের কারণ জানা যায় না, তবে তা দমন করার আগেই বিন্দুসারের অসময়ে মৃত্যু হয়।
ইতিহাসে তাঁর পিতা চন্দ্রগুপ্ত বা পুত্র অশোকের মত বিন্দুসারের সপম্পর্কে অধিক তথ্য পাওয়া যায় না। বিন্দুসারকে বলা হয় ‘পিতার পুত্র ও পুত্রের পিতা’। তাঁর সময়ে মিশর ও সেলুকাসীয় সাম্রাজ্য থেকে ভারতবর্ষে দূত এসেছিল। গ্রিকদের সঙ্গে তাঁর ভাল সম্পর্ক ছিল। তিনি আজীবক ধর্মাবলম্বী ছিলেন।
মহামতি অশোক
সম্রাট অশোক (জন্ম ৩০৪ খ্রীষ্টপূর্ব, শাসনকাল ২৯৮-২৭২ খ্রীষ্টপূর্ব; প্রাকৃত রাজকীয় উপাধি; দেবতাপ্রিয় প্রিয়দর্শী ও ‘ধর্মা’) সম্রাট হন। তাঁকে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা বলা হয়ে থাকে।
অশোক বিন্দুসারের অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বসম্পন্ন রাণী ধর্মার সন্তান ছিলেন। তবে এ’নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ আছে। তাঁর চেয়ে বয়সে বড় বিন্দুসারের অনেক দাদা ছিলেন, একমাত্র বিদ্দাশোকই ছিলেন তাঁর অনুজ। কিন্তু পরাক্রম ও বুদ্ধির জন্য তিনিই সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন।
অশোক তাঁর সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার জন্য মৌর্য সেনাবাহিনীর উচ্চপদে আসীন ছিলেন ও সেনাবাহিনীর এক বড় অংশের পরিচালক ছিলেন। অশোকের এই শক্তিবৃদ্ধি বাকি ভাইদের ঈর্ষান্বিত করে তোলে; সুসীম, বিন্দুসারের জ্যেষ্ঠ পুত্র তার উত্তরাধিকার নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। ইতোমধ্যে সুসীমের অপদার্থতায় তক্ষশীলায় বিদ্রোহ দেখা দেয়। সুসীমেরই চক্রান্তে বিন্দুসার অশোককে সেখানে বিদ্রোহে দমনে পাঠান। অশোক আসার খবরে সেনাবাহিনী উজ্জীবিত হয়ে ওঠে, পরে বিদ্রোহী সেনারাও তাঁর আগমনে বিদ্রোহের পথ ত্যাগ করে ও বিনাযুদ্ধে অশোক বিদ্রোহ দমন করে ফেলেন।
যখন বিন্দুসারের অসুস্হতার খবর ছড়িয়ে পড়ে তখন অশোক মগধের বাইরে ছিলেন। এরপর বিন্দুসারের পুত্রদের মধ্যে সিংহাসনের দখল নিয়ে রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব শুরু হ্য়। লোকশ্রুতি অনুসারে অশোক তাঁর ভাইদের হত্যা করে সিংহাসনের বাধা দূর করতে সক্ষম হন।
রাজা হওয়ার পরই অশোক সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী হন। তিনি পূর্বে বর্তমান আসাম ও বাংলাদেশ, পশ্চিমে ইরান ও আফগানিস্তান, উত্তরে পামীর গ্রন্থি থেকে প্রায় সমগ্র দক্ষিণ ভারত নিজের সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
এরপর অশোক কলিঙ্গ প্রজাতন্ত্র দখলে উদ্যোগী হন। কলিঙ্গ যুদ্ধ-এর সঠিক কারণ এখন জানা যায় না। মনে করা হয়ে থাকে, অশোকের কোন ভাই কলিঙ্গে আশ্রয় নেন। তার প্রতিশোধ নেবার জন্য অশোক কলিঙ্গ আক্রমণ করেন। খ্রীষ্টপূর্ব ২৬১ (মতান্তরে খ্রীষ্টপূর্ব ২৬৩) অব্দে দয়া নদীর ধারে ধৌলি পাহাড়ের কাছে ভীষণ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। দু’দলের মধ্যে প্রচুর হতাহত হয় এবং অশোক কলিঙ্গ জয় করেন। এই যুদ্ধে কলিঙ্গবাহিনীর ১,০০,০০০ সেনা ও মৌর্য সেনাবাহিনীর ১০,০০০ সেনা নিহত হয় ও অসংখ্য নরনারী আহত হয়। যুদ্ধের এই বীভত্সতা সম্রাট অশোককে বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। তিনি যুদ্ধের পথ ত্যাগ করে তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন ও অহিংসার পথে সাম্রাজ্য পরিচালনের নীতি গ্রহণ করেন।
এরপর অশোক দেশে ও বিদেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে উদ্যোগী হন। এই উদেশ্যে তিনি বিভিন্ন জায়গায় তাঁর প্রতিনিধিদের পাঠান। তাঁর পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রাকে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে শ্রীলঙ্কা পাঠান। এছাড়া তিনি কাশ্মীর, গান্ধার, ভানাভাসী, কোংকন, মহারাষ্ট্র, ব্যাকট্রিয়া, নেপাল, থাইল্যান্ড, ব্রহ্মদেশ, লাক্ষাদ্বীপ প্রভৃতি স্থানেও বৌদ্ধধর্ম প্রচার করান।
চোল রাজবংশ ছিল একটি তামিল রাজবংশ। দক্ষিণ ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে এই সাম্রাজ্যই ছিল সর্বাপেক্ষা দীর্ঘকালীন সাম্রাজ্য। চোল রাজবংশের প্রথম নথিভুক্ত উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে লিখিত সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে। বিভিন্ন অঞ্চলে এই রাজবংশের শাসন খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।
চোল রাজ্যের মূল কেন্দ্র ছিল কাবেরী নদীর উর্বর উপত্যকা। কিন্তু খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত স্থায়ী চোল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে এই সাম্রাজ্য আরও বড়ো অঞ্চলে প্রসারিত হয়েছিল দুই শতাব্দীরও অধিক সময় তুঙ্গভদ্রা নদীর দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত দাক্ষিণাত্যের সকল অঞ্চল এই সাম্রাজ্যের অধীনে এসে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি প্রথম রাজরাজ চোল ও তাঁর পুত্র প্রথম রাজেন্দ্র চোলের শাসনকালে চোল সাম্রাজ্য দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান সামরিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হয়। সম্রাট প্রথম রাজেন্দ্র চোল গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চলগুলি অধিকার করার উদ্দেশ্যে সৈন্য অভিযান প্রেরণ করলে, পূর্বভারতের কিয়দংশ চোল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এছাড়াও রাজেন্দ্র চোল এক প্রবল নৌযুদ্ধের পর শ্রীবিজয়ের সামুদ্রিক সাম্রাজ্য উৎখাত সাধন করেন এবং একাধিকবার চীনা আক্রমণ প্রতিহত করেন। ১০১০-১২০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে দক্ষিণে মালদ্বীপ থেকে উত্তরে বর্তমান অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের গোদাবরী নদী অববাহিকা পর্যন্ত চোল সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। রাজরাজ চোল উপদ্বীপীয় দক্ষিণ ভারত জয় করেন, বর্তমান শ্রীলঙ্কা ভূখণ্ডের কিছু অংশ অধিকার করেন এবং মালদ্বীপ দ্বীপপুঞ্জ নিজ অধিকারে আনেন। প্রথম রাজেন্দ্র চোল উত্তর ভারতে সেনা অভিযান প্রেরণ করেন। তিনি পাটলিপুত্রের পাল সম্রাট মহীপালকে পরাজিত করে গঙ্গা নদীর অববাহিকা পর্যন্ত পাল সাম্রাজ্য প্রসারিত করেন। এছাড়া মালয় দ্বীপপুঞ্জের রাজ্যগুলির বিরুদ্ধেও তিনি সফলভাবে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে পাণ্ড্য রাজ্যের উত্থান ঘটলে চোল সাম্রাজ্য পতনের পথে অগ্রসর হতে থাকে। পাণ্ড্য রাজ্যই চোলদের পতনের প্রধান কারণ হয়।
চোল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার ছিল সুদূরপ্রসারী। তাঁরা তামিল সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তামিল সাহিত্য ও স্থাপত্যের কিছু মহান নিদর্শন তাঁদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় সৃজিত হয়েছে। চোল রাজারা একাধিক মন্দির ও স্থাপনা নির্মাণ করেন। এই মন্দিরগুলি কেবলমাত্র ধর্মোপাসনার স্থানই ছিল না, বরং এক একটি প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠেছিল। তাঁরা ছিলেন একটি কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থার পথপ্রদর্শক এবং একটি নিয়মতান্ত্রিক আমলাতন্ত্রের উদ্ভাবক।
সাতবাহন সাম্রাজ্য
খ্রিষ্টপূর্ব ২য় শতাব্দীর প্রথমার্ধে শুংনু নামে এক উপজাতি তাদের প্রতিবেশী ইউয়েচি নামে অপর এক উপজাতিকে হারিয়ে দেয়। দীর্ঘ সংঘর্ষের পর য়ুঝি উপজাতির লোকেরা পশ্চিমদিকে সরে যেতে বাধ্য হয়। তারা পশ্চিমদিকে সরে ইলি নদীর উপত্যকা পেরিয়ে ইস্সিক কুল হ্রদের (ইংরাজীতে Lake Issyk Kul) দক্ষিণতীর ধরে এগোতে থাকে। তাদের এই স্থান পরিবর্তন শকসহ বেশ কিছু উপজাতিকে তাদের সামনে এগোতে বাধ্য করে। ১৪৫-১২৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী কোন সময়ে তারা ব্যাকট্রিয় ও পার্থিয়ায় বসতি স্থাপন করে। এক প্রজন্ম পর তারা সেই জায়গা ত্যাগ করে কাবুল উপত্যকা পেরিয়ে পাঞ্জাব সমভূমিতে প্রবেশ করে। খ্রীষ্টাব্দ শুরুর দিকে য়ুঝি উপজাতির নেতা কিউ-সিউ-কিও (ইংরাজীতে K’iu-tsiu-k’io) বাকী চার নেতাকে মেরে সমগ্র উপজাতির প্রধান হয়ে বসে। তার নাম থেকেই নাম হয় কিউই-শাং (ইংরাজীতে Kuei-shang), বা কুষাণ।
গুপ্ত সাম্রাজ্য ছিল একটি প্রাচীন ভারতীয় সাম্রাজ্য। আনুমানিক খ্রিষ্টীয় ৩২০ থেকে ৫৫০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে এই সাম্রাজ্য প্রসারিত ছিল। মহারাজ শ্রীগুপ্ত ধ্রুপদি সভ্যতা-র আদর্শে এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। গুপ্ত শাসকদের ভারতে যে শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থাপিত হয়েছিল, তার ফলশ্রুতিতে দেশ বৈজ্ঞানিক ও শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করতে সক্ষম হয়। গুপ্তযুগকে বলা হয় ভারতের স্বর্ণযুগ। এই যুগ ছিল আবিষ্কার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বাস্তুবিদ্যা, শিল্প, ন্যায়শাস্ত্র, সাহিত্য, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্ম ও দর্শনের বিশেষ উৎকর্ষের যুগ; বর্তমান হিন্দু সংস্কৃতি মূলত এই যুগেরই ফসল। যুুগের আমলে অনেক পণ্ডিত ব্যাক্তি যেমন কালিদাস, আর্যভট্ট, বরাহমিহির, বিষ্ণু শর্মা -এর অবির্ভাব হয়েছিলো। প্রথম চন্দ্রগুপ্ত, সমুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন গুপ্ত সাম্রাজ্যের সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ সম্রাট।
পাল রাজবংশ প্রাচীন বাংলার একটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাজবংশ। এর প্রতিষ্ঠাতার নাম গোপাল। পাল বংশের বিস্তার ৭৫০-১১৭৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। ‘

রাষ্ট্রকূট রাজবংশ

রাষ্ট্রকূট সম্রাটগণ (৭৫৩-৯৮২)
দন্তিদূর্গ
(৭৩৫ – ৭৫৬)
প্রথম কৃষ্ণ
(৭৫৬ – ৭৭৪)
দ্বিতীয় গোবিন্দ
(৭৭৪ – ৭৮০)
ধ্রুব ধারাবর্ষ
(৭৮০ – ৭৯৩)
তৃতীয় গোবিন্দ
(৭৯৩ – ৮১৪)
প্রথম অমোঘবর্ষ
(৮১৪ – ৮৭৮)
দ্বিতীয় কৃষ্ণ
(৮৭৮ – ৯১৪)
তৃতীয় ইন্দ্র
(৯১৪ -৯২৯)
দ্বিতীয় অমোঘবর্ষ
(৯২৯ – ৯৩০)
চতুর্থ গোবিন্দ
(৯৩০ – ৯৩৬)
তৃতীয় অমোঘবর্ষ
(৯৩৬ – ৯৩৯)
তৃতীয় কৃষ্ণ
(৯৩৯ – ৯৬৭)
কোট্টিগ অমোঘবর্ষ
(৯৬৭ – ৯৭২)
দ্বিতীয় কর্ক
(৯৭২ – ৯৭৩)
চতুর্থ ইন্দ্র
(৯৭৩ – ৯৮২)
দ্বিতীয় তৈলপ
(পশ্চিম চালুক্য)
(৯৭৩-৯৯৭)
রাষ্ট্রকূট রাজবংশ হল খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ থেকে দশম শতাব্দীতে ভারতে রাজত্বকারী একটি রাজবংশ। রাষ্ট্রকূটদের সবচেয়ে পুরনো যে লেখটি এখনও পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে, সেটি হল সপ্তম শতাব্দীর। এই তাম্রলিপি থেকে জানা যায়, আধুনিক মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের মালওয়া অঞ্চলের মানপুর তাঁরা শাসন করতেন। অন্যান্য কয়েকটি লেখ থেকে সমসাময়িক আরও কয়েকটি রাষ্ট্রকূট শাসকগোষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এঁরা হলেন অচলপুর (অধুনা মহারাষ্ট্র রাজ্যের এলিচপুর) ও কনৌজের রাজা। রাষ্ট্রকূটদের উৎপত্তি, আদি নিবাস ও ভাষা নিয়ে একাধিক বিতর্কিত মত প্রচলিত আছে।
এলিচপুরের শাসকরা ছিলেন বাদামি চালুক্যদের সামন্ত। দন্তিদূর্গের রাজত্বকালে চালুক্যরাজ দ্বিতীয় কীর্তিবর্মণকে পরাজিত করে অধুনা কর্ণাটক রাজ্যের গুলবার্গ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য। ৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ ভারতে রাষ্ট্রকূটরা প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। সেই সময় থেকেই এঁদের মান্যখেতের রাষ্ট্রকূট বলা হত। এই সময়ই পূর্ব ভারতে বিহার-পশ্চিমবঙ্গের পাল রাজবংশ এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতে মালওয়ার প্রতিহার রাজবংশ প্রভাব বিস্তার করেছিল। আরবি গ্রন্থ সিলসিলাতুত্তাভারিখ-এর (৮৫১) মতে, রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বের প্রধান চারটি সাম্রাজ্যের একটি।
অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গাঙ্গেয় উপত্যকায় কনৌজের দখল নিয়ে উক্ত তিনটি প্রধান সাম্রাজ্যের সংঘাতবাধে। মান্যখেতের রাষ্ট্রকূটদের সাম্রাজ্য উত্তরে গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চল থেকে দক্ষিণে কুমারিকা অন্তরীপ পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। রাজনৈতিক ক্ষমতার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্যে স্থাপত্য ও সাহিত্যেরও বিশেষ উন্নতি ঘটেছিল। প্রথম দিকের রাষ্ট্রকূট রাজারা ছিলেন হিন্দু। পরবর্তীকালে তাঁরা জৈনধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন।
রাষ্ট্রকূট শাসনকালে জৈন গণিতবিদ ও পণ্ডিতেরা কন্নড় ও সংস্কৃত ভাষায় বহু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এই সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা প্রথম অমোঘবর্ষ কবিরাজমার্গ নামে একটি বিখ্যাত কন্নড় গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। দ্রাবিড় স্থাপত্য রাষ্ট্রকূট রাজত্বে বিশেষ উন্নতি লাভ করেছিল। এই স্থাপত্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হল ইলোরা গুহার কৈলাসনাথ মন্দির (অধুনা মহারাষ্ট্র রাজ্যে), কাশীবিশ্বনাথ মন্দির ও জৈন নারায়ণ মন্দির (অধুনা কর্ণাটক রাজ্যে)। এই সবকটিই এখন ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।
মান্যখেতে রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্যের মূল এলাকা
ভারতের ইতিহাসে রাষ্ট্রকূট রাজবংশের উৎপত্তি একটি বিতর্কিত বিষয়। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে রাষ্ট্রকূটদের আদিপুরুষদের অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়। খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ ভারতে রাষ্ট্রকূটদের বিভিন্ন গোষ্ঠী ছোটো ছোটো রাজ্য শাসন করত। এই রাষ্ট্রকূট গোষ্ঠীগুলি সঙ্গে সবচেয়ে বিখ্যাত রাজবংশ মান্যখেতের (অধুনা কর্ণাটক রাজ্যের গুলবার্গ জেলার মালখেদ অঞ্চল) রাষ্ট্রকূটদের সম্পর্ক নিয়েও বিতর্ক আছে।
রাষ্ট্রকূট ইতিহাসের প্রধান উপাদান হল মধ্যযুগীয় শিলালিপু, প্রাচীন পালি সাহিত্য, সমসাময়িক সংস্কৃত ও কন্নড় সাহিত্য এবং আরব পর্যটকদের ভ্রমণবৃত্তান্ত। শিলালিপি, রাজকীয় প্রতীক, “রাষ্ট্রিক” প্রভৃতি নাম, “রাট্টা”, “রাষ্ট্রকূট”, “লাট্টালুরা পুরাবরাধীশ্বর” প্রভৃতি উপাধি, রাজকুমার ও রাজকুমারীদের নাম, ধ্বংসাবশেষ ও মুদ্রা থেকে পাওয়া সূত্র ধরে এই রাজবংশের উৎস, আদি নিবাস ও রাজত্ব এলাকা সম্পর্কে নানা তত্ত্বের অবতারণা করা হয়েছে। প্রাচীন রাষ্ট্রকূটরা কোন জাতি বা ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতান্তর আছে। সম্ভবত তারা উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় কোনো জাতিগোষ্ঠী বা কন্নড় বা রেড্ডি বা মারাঠি বা পাঞ্জাব অঞ্চলের গোষ্ঠী ছিল।
তবে গবেষকরা এই বিষয়ে একমত যে, খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে রাষ্ট্রকূটরা কন্নড় ভাষাকে সংস্কৃতের সমতুল্য মর্যাদা দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রকূট শিলালিপিগুলি অধিকাংশই সংস্কৃত ও কন্নড় ভাষায় (ঐতিহাসিক শেলডন পোলক ও জ্যঁ হবের মতে অধিকাংশই কণ্ণড়ে) লিখিত। শাসকেরা উভয় ভাষার সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কণ্ণড় সাহিত্যের প্রচীনতম কীর্তিগুলি শাসক ও সভাকবিদের রচনা। রাষ্ট্রকূটরা কন্নড় হলেও, তাঁদের মাতৃভাষা ছিল একটি উত্তর দক্ষিণী ভাষা।
রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ছিল প্রায় সমগ্র কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র এবং অন্ধ্রপ্রদেশের কিছু অংশ। অন্ধ্রের ঐ অঞ্চলে রাষ্ট্রকূটদের ২০০ বছরের শাসন ছিল। সামানগড় তাম্রলিপি (৭৫৩) থেকে জানা যায়, বেরারের (অধুনা মহারাষ্ট্রের এলিচপুর) অচলপুরের সামন্ত রাজা দন্তিদূর্গ ৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে বাদামির চালুক্য রাজা দ্বিতীয় কীর্তিবর্মণকে পরাজিত করে চালুক্য সাম্রাজ্যের উত্তরাঞ্চল জয় করে নেন। পরে তিনি তাঁর শ্বশুর পল্লব রাজা নন্দীবর্মণকে চালুক্যদের হাত থেকে কাঞ্চী উদ্ধার করতে সাহায্য করেন। তিনি মালওয়ার গুর্জরদের পরাস্ত করেন এবং কলিঙ্গ, কোশল ও শ্রীশৈলম জয় করেন।
দন্তিদূর্গের উত্তরসূরি প্রথম কৃষ্ণ আধুনিক কর্ণাটক ও কোঙ্কণ অঞ্চলের বৃহত্তর অংশ নিজের শাসনাধীনে আনেন। ৭৮০ খ্রিস্টাব্দে ধ্রুব ধারাবর্ষ সিংহাসনে বসেন। তিনি কাবেরী নদী উপত্যকা ও মধ্য ভারতে রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। তিনি তদনীন্তন উত্তর ভারতের ক্ষমতাকেন্দ্র কনৌজে কয়েকটি সফল সামরিক অভিযান চালান। সেখানে গুর্জর প্রতিহার ও বঙ্গের পাল রাজাদের পরাজিত করে প্রচুর খ্যাতি ও লুণ্ঠন সামগ্রীর অধিকারী হন। তবে সাম্রাজ্যের আয়তন বিস্তারে তিনি সক্ষম হননি। তিনি পূর্ব চালুক্য ও তালাকাডের গঙ্গ রাজবংশকে নিজের অধীনে আনেন। আলতেকর ও সেনের মতে, তাঁর রাজত্বকালেই রাষ্ট্রকূটরা সর্বভারতীয় শক্তিতে পরিণত হয়।
ধ্রুব ধারাবর্ষের তৃতীয় পুত্র তৃতীয় গোবিন্দের রাজত্বকালে সাম্রাজ্যের আয়তন সর্বাধিক বৃদ্ধি পায়। রাষ্ট্রকূটদের আদি রাজধানীর অবস্থান সঠিকভাবে জানা যায় না। তৃতীয় গোবিন্দের রাজত্বকালে রাষ্ট্রকূটরা গাঙ্গেয় অববাহিকার দখলকে কেন্দ্র করে পাল ও প্রতিহারদের সঙ্গে ত্রিমুখী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। প্রতিহার সম্রাট দ্বিতীয় নাগভট্ট ও পাল সম্রাট ধর্মপালের বিরুদ্ধে বিজয়ের কথা উল্লেখ করে সঞ্জন লিপিতে বলা হয়েছে, তৃতীয় গোবিন্দের যুদ্ধাশ্ব হিমালয়ের নদীগুলির হিমশীতল জল পান করেছিল এবং যুদ্ধহস্তীরা পান করেছিল গঙ্গার পবিত্র জল। তাঁর সামরিক বাহিনীকে মহামতি আলেকজান্ডার ও মহাভারতের অর্জুনের সেনাবাহিনীর সঙ্গে তুলনা করা হত।কনৌজ জয়ের পর তিনি দক্ষিণে যান এবং গুর্জর, কোশল ও মহীশূর অঞ্চলের রাশ নিজের হাত নেন। তিনি কাঞ্চীর পল্লবদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন, বেঙ্গিতে নিজের আজ্ঞাবহ রাজাকে সিংহাসনে বসান এবং সিংহলের রাজাকে নিজের বশে আনেন। চোল, পাণ্ড্য ও চের রাজারা তাঁকে কর দিতেন। দক্ষিণে কুমারিকা অন্তরীপ থেকে উত্তরে কনৌজ, পূর্বে বারাণসী থেকে পশ্চিমে ভারুচ পর্যন্ত রাষ্ট্রকূটদের সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল।
তৃতীয় গোবিন্দের পুত্র প্রথম অমোঘবর্ষ মান্যখেতে সাম্রাজ্যের রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত মান্যখেতই ছিল রাষ্ট্রকূটদের রাজধানী। ৮১৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি সিংহাসনে বসেন। ৮২১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তাঁকে সামন্ত ও মন্ত্রীদের বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত থাকতে হয়। প্রথম অমোঘবর্ষ তাঁর দুই কন্যার সঙ্গে পশ্চিম গঙ্গ রাজবংশের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। বিঙ্গাবল্লীর যুদ্ধে আক্রমণকারী পূর্ব চালুক্য বাহিনীকে পরাজিত করে “বীরনারায়ণ” উপাধি গ্রহণ করেন। তিনি তৃতীয় গোবিন্দের মতো যুদ্ধবিগ্রহে বেশি সময় দেননি। বরং প্রতিবেশী রাজ্যগুলির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে চলতেন। গঙ্গ, পূর্ব চালুক্য ও পল্লবদের সঙ্গে তিনি বৈবাহিক সূত্রে মিত্রতা করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে শিল্প, সাহিত্য ও ধর্মের সমৃদ্ধি ঘটে। কন্নড় ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত দ্বিতীয় অমোঘবর্ষকে শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রকূট সম্রাট মনে করা হয়। তাঁর কবিরাজমার্গ কন্নড় ভাষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ এবং তাঁর প্রশ্নোত্তর রত্নমালিকা গ্রন্থটি একটি উল্লেখযোগ্য সংস্কৃত গ্রন্থ। শেষোক্ত গ্রন্থটি তিব্বতি ভাষায় অনূদিত হয়। ধর্মের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ, শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ ও তাঁর শান্তিপ্রিয় মানসিকতার জন্য তাঁকে “দাক্ষিণাত্যের অশোক” বলা হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় কৃষ্ণের রাজত্বকালে, রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য পূর্ব চালুক্যদের বিদ্রোহের মুখে পড়ে। পশ্চিম দাক্ষিণাত্য ও গুজরাট এই সময় রাষ্ট্রকূটদের হাতছাড়া হয়।] দ্বিতীয় কৃষ্ণ গুজরাট শাখার স্বাধীনতা বাতিল করে তাদের মান্যখেতের প্রত্যক্ষ শাসনে আনেন। তৃতীয় ইন্দ্র পরামারকে পরাজিত করে মধ্য ভারতে সাম্রাজ্যে হারানো অংশ পুনরুদ্ধার করেন। তারপর তিনি গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চল আক্রমণ করেন। এছাড়া তিনি রাষ্ট্রকূটদের চিরশত্রু প্রতিহার ও পাল রাজাদেরও পরাজিত করেন এবং বেঙ্গিতে রাষ্ট্রকূট আধিপত্য বজায় রাখতে সাহায্য করেন। চতুর্থ গোবিন্দের ৯৩০খ্রিস্টাব্দের তাম্রলিপি থেকে জানা যায় যে, দ্বিতীয় কৃষ্ণের কনৌজ বিজয়ের ফল বহু বছর রাষ্ট্রকূটরা ভোগ করেছে। এরপর কয়েকজন দুর্বল রাজার শাসনে রাষ্ট্রকূটরা উত্তর ও পূর্ব ভারতের কিছু অঞ্চলের দখল হারান। তৃতীয় কৃষ্ণ নর্মদা নদী থেকে কাবেরী নদী পর্যন্ত সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করেন। উত্তর তামিল রাজ্য তোন্ডাইমণ্ডলমও তাঁর অধীনে আসে। শ্রীলঙ্কার রাজারা তাঁকে কর দিতেন।খোট্টিগ অমোঘবর্ষের রাজত্বকালে পারমার রাজা সিকায় হর্ষ রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য আক্রমণ করে মান্যখেত লুণ্ঠন করেন। এর ফলে রাষ্ট্রকূটদের শক্তি হ্রাস পায়। এরপরই রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।[৭৩] এই পরাজয়ের সুযোগ নিয়ে তারদাবাদি প্রদেশের (আধুনিক বিজাপুর জেলা, কর্ণাটক) শাসক তৃতীয় তৈলপ নিজেকে স্বাধীন রাজা ঘোষণা করলে রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্যের পতন সম্পূর্ণ হয়। সর্বশেষ রাষ্ট্রকূট সম্রাট চতুর্থ ইন্দ্র জৈন সন্ন্যাসীদের প্রথা অনুসারে শ্রবণবেলগোলায় অনশনে মৃত্যুবরণ করেন। রাষ্ট্রকূটদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে দাক্ষিণাত্য ও উত্তর ভারতে তাদের সামন্ত শাসকেরা স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পশ্চিম চালুক্য সাম্রাজ্য ১০১৫ খ্রিস্টাব্দে মান্যখেত দখল করে সেখানেই তাদের রাজধানী স্থাপন করে। এরপর একাদশ শতাব্দীতে মান্যখেত পশ্চিম চালুক্যদের সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়। শাসনকেন্দ্র কৃষ্ণা নদী ও গোদাবরী নদীর দোয়াব বেঙ্গিতে স্থানান্তরিত হয়। পশ্চিম দাক্ষিণাত্যে রাষ্ট্রকূটদের পূর্বতন সামন্ত শাসকদের চালুক্যরা নিজেদের অধীনে নিয়ে আসে। এরপর তাঁরা দাক্ষিণাত্যে তাঁদের প্রধান শত্রু তাঞ্জোরের চোল রাজাদের পরাস্ত করে।
মান্যখেতের রাষ্ট্রকূটরা উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুলেমান (৮৫১), আল মাসুদি (৯৪৪) ও ইবন খুরদাধবা (৯১২) তাঁদের রচনায় রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্যকে সমসাময়িক ভারতের বৃহত্তম সাম্রাজ্য বলে উল্লেখ করেছেন। সুলেমান বলেছেন, এই সাম্রাজ্য সমসাময়িক বিশ্বের চারটি প্রধান সাম্রাজ্যের একটি। দশম শতাব্দীর আরব পর্যটক আল মাসুদি ও ইবন খরদিদবিহের মতে, “হিন্দুস্তানের অধিকাংশ রাজা প্রার্থনা করার সময় রাষ্ট্রকূট রাজাদের মুখাপেক্ষী হয়। তাঁরা রাষ্ট্রকূটদের দূতেদের কাছেও প্রণতি জানায়। রাষ্ট্রকূট রাজারা রাজাধিরাজ। তাদের সেনাবাহিনী সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী। তাঁরা কোঙ্কণ থেকে সিন্ধু পর্যন্ত অঞ্চল নিজেদের অধিকারে রাখেন।” কোনো কোনো ঐতিহাসিক এই যুগটিকে “সাম্রাজ্যবাদী কনৌজের যুগ” বলেন। রাষ্ট্রকূটরা যেহেতু কনৌজ সফলভাবে অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাঁরা উত্তর ভারতীয় রাজাদের থেকে কর নিতেন। তাই এই অঞ্চলকে “সাম্রাজ্যবাদী কর্ণাটকের যুগ”ও বলা হয়। অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মধ্য ও উত্তর ভারত দখলের সময়, রাষ্ট্রকূট ও তাঁদের আত্মীয়রা ওই অঞ্চলে অনেক রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। এগুলির কতকগুলি মূল সাম্রাজ্যের সঙ্গে সঙ্গে শাসনকার্য চালিয়েছে অথবা মূল সাম্রাজ্যের পতনের অনেক পরে গুরুত্ব অর্জন করেছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য গুজরাটের রাষ্ট্রকূট (৭৫৭-৮৮৮), কর্ণাটকের সৌনদাত্তির রাট্টা (৮৭৫-১২৩০), কনৌজের গহদবল (১০৬৮-১২২৩), রাজস্থানের রাষ্ট্রকূট ও হস্তিকুন্ডি বা হাথকুন্ডির রাষ্ট্রকূট (৮৯৩-৯৯৬), দহলের (জব্বলপুরের কাছে) রাষ্ট্রকূট, মান্দোরের (যোধপুরের কাছে) রাষ্ট্রকূট, ধানোপের রাঠোর, আধুনিক মহারাষ্ট্রের ময়ূরগিরির রাষ্ট্রকূট, ও কনৌজের রাষ্ট্রকূট। খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীতে রাজাধিরাজ চোল সিঙ্ঘল আক্রমণ করে সেখানকার ৪ জন রাজাকে পরাস্ত করেন। ঐতিহাসিক কে. পিল্লাইয়ের মতে, এঁদের একজন জাফনা রাজ্যের রাজা মহাবরজাহ ছিলেন পূর্বতন রাষ্ট্রকূট অধীনস্থ সামন্ত।
প্রশাসন
শিলালিপি ও অন্যান্য সাহিত্যিক সূত্র থেকে জানা যায়, রাষ্ট্রকূটরা বংশানুক্রমে একজন যুবরাজকে অভিষিক্ত করতেন। সবসময় যে জ্যেষ্ঠ পুত্রই যুবরাজ হতেন, তা নয়। বয়স বা জন্মতারিখের বদলে যোগ্যতাকে যৌবরাজ্যের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হত। যেমন তৃতীয় গোবিন্দ ছিলেন ধ্রুব ধারাবর্ষের তৃতীয় পুত্র। রাজার পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদটি ছিল “মহাসন্ধিবিগ্রহী” বা মুখ্যমন্ত্রীর। পতাকা, শঙ্খ, পাখা, শ্বেতছত্র, ঢাক ও পাঁচটি বাদ্যযন্ত্রযুক্ত তাঁর প্রতীকটিকে বলা হত “পঞ্চমহাশব্দ”। তাঁর নিচে ছিলেন “দণ্ডনায়ক” বা সেনাধ্যক্ষ, “মহাক্ষপতলাধিকৃত” বা বিদেশমন্ত্রী ও একজন “মহামাত্য” বা “পূর্ণামাত্য” বা প্রধানমন্ত্রী। এঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে একজন করে সামন্ত রাজার যোগ থাকত এবং এঁরা সরকারপ্রধানের মর্যাদা পেতেন।”মহাসামন্ত” ছিলেন একজন সামন্ত রাজা বা উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী। সকল মন্ত্রীই রাজনীতি বিষয়ে বিশেষ অভিজ্ঞ ও সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতেন। মহিলারাও বিশেষ স্থান অর্জন করতে পারতেন। দ্বিতীয় অমোঘবর্ষের কন্যা রেবাকানিমাদ্দি এডাতোর বিষয়ের শাসক ছিলেন।
সাম্রাজ্য বিভক্ত ছিল কতগুলি “মণ্ডল” বা “রাষ্ট্রে” (প্রদেশ)। রাষ্ট্রের প্রধানকে বলা হত “রাষ্ট্রপতি”। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্রাট নিজে ছিলেন রাষ্ট্রপতি। প্রথম অমোঘবর্ষ ষোলোটি রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন। রাষ্ট্রের অধীনে “বিষয়” বা জেলা গঠিত হত। জেলাশাসককে বলা হত “বিষয়পতি”। বিশ্বস্ত মন্ত্রীরা মাঝে মাঝে একাধিক রাষ্ট্র শাসন করতেন। দ্বিতীয় অমোঘবর্ষের সেনাধ্যক্ষ বানকেশ ছিলেন বানাভাসি-১২০০০, বেলভোলা-৩০০, পুলিগেরে-৩০০, কুন্ডুরু-৫০০ ও কুন্ডার্গ-৭০-এর শাসক (প্রত্যেক বিষয়ের সঙ্গে জড়িত সংখ্যাগুলি উক্ত বিষয়ের অধীনস্থ গ্রামের সংখ্যা)। বিষয়গুলি “নাড়ু”তে বিভক্ত হত। এগুলির শাসক ছিলেন “নাড়ুগৌড়া” বা “নাড়ুগাভুন্ডা”। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই পদে দুই জন আধিকারিককে নিয়োগ করা হত। একজন বংশানুক্রমে শাসন করতেন, অপরজনকে সম্রাট নিয়োগ করতেন। সর্বনিম্ন বিভাগ ছিল “গ্রাম”। গ্রামের প্রধানকে বলা হত “গ্রামপতি” বা “প্রভু গাভুন্ডা”।
রাষ্ট্রকূট সেনাবাহিনীতে পদাতিক, অশ্বারোহী, ও হস্তি বিভাগ ছিল। মান্যকুটে “স্তিরভূট কটক” নামে একটি বাহিনী সর্বদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখা হত। সামন্ত শাসকেরাও, যাঁরা যুদ্ধের সময় সাম্রাজ্যকে সামরিক সাহায্য দিতেন, তাঁরা বড় সেনাবাহিনী রাখতেন। সকল প্রধান ও আধিকারিকেরা প্রয়োজনের সেনাধ্যক্ষের কাজ করতেন।
রাষ্ট্রকূটেরা “সুবর্ণ”, “দ্রাম্মা” (রুপো ও সোনার মুদ্রা), কালাঞ্জু, “গদ্যনক”, “কাসু”, “মনজাতি” ও “আক্কাম” নামে মুদ্রা চালু করেছিল। এগুলি “অক্কশেল” টাঁকশালে তৈরি হত।
রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্যের অর্থনীতি

প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষিজ পণ্য, শিল্প কর ও অন্য রাজ্য জয়ের সময় লুণ্ঠিত সম্পদ ও করদ রাজ্যগুলি থেকে আদায় করা কর ছিল রাষ্ট্রকূট অর্থনীতির প্রধান উৎস। দক্ষিণ গুজরাত, খান্দেশ ও বেরার অঞ্চলের প্রধান কৃষিজ পণ্য ছিল তুলো। মীননগর, গুজরাত, উজ্জয়িনী, পৈঠান ও তাগারা ছিল বস্ত্রশিল্পের প্রধান কেন্দ্র। পৈঠান ও ওয়ারাঙ্গলে মসলিন বস্ত্র উৎপাদিত হত। ভারোচ থেকে সুতো ও বস্ত্র রফতানি করা হত। বুরহানপুর ও বেরারে সাদা সুতির কাপড় উৎপাদিত হত। এগুলি রফতানি করা হত পারস্য, তুরস্ক, পোল্যান্ড, আরব ও মিশরে। সামন্ত সিলহারদের অধীনস্থ কোঙ্কণ অঞ্চলে প্রচুর পান, নারকেল ও ধান উৎপাদিত হত। সামন্ত গঙ্গদের অধীনস্থ মহীশূরের বনাঞ্চলে চন্দন ও অন্যান্য কাঠ উৎপাদিত হত। ঠাণে ও সাইমুরের বন্দর থেকে ধূপ ও সুগন্ধী দ্রব্য রফতানি করা হত।
দাক্ষিণাত্যের জমি গাঙ্গেয় উপত্যকার মতো উর্বর ও কৃষিসমৃদ্ধ না হলেও এখানে প্রচুর খনিজ পাওয়া যায়। গুডাপ্পা, বেলারি, চন্দ, বুলধান, নরসিংহপুর, আহমদনগর, বীজাপুর ও ধরওয়ারের তাম্রখনি ছিল রাষ্ট্রকূট অর্থনীতির নুতম প্রধান উৎস। গুডাপ্পা, বেলারি, কুরনুল ও গোলকুন্ডা থেকে হিরে উত্তোলন করা হত। রাজধানী মান্যখেত ও দেবগিরি ছিল হিরে ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র। গুজরাত ও উত্তর মহারাষ্ট্রের কোনো কোনো অঞ্চলে চর্মশিল্প বিকাশলাভ করেছিল। মহীশূর অঞ্চলে হাতি পালন করা হত। এই অঞ্চল গজদন্তশিল্পের জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল।
সমকালীন ভারতে আরব সাগরে বাণিজ্য মূলত রাষ্ট্রকূটেরাই নিয়ন্ত্রণ করত। সাম্রাজ্যের গুজরাত শাখা ভারোচের বন্দর থেকে প্রচুর আয় করত। এই বন্দর সমকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্দর ছিল। সাম্রাজ্যের প্রধান রফতানি দ্রব্য ছিল সুতো, সুতির কাপড়, মসলিন, পশুচর্ম, মাদুর, নীল, ধূপ, সুগন্ধী, পান, নারকেল, চন্দন, কাঠ, তিলের তেল ও গজদন্ত। মুক্তো, সোনা, আরবের খেজুর, ক্রীতদাস, ইতালীয় সুরা, টিন, সিসে, টোপাজ, স্টোর‍্যাক্স, মিষ্টি ক্লোভার, ফ্লিন্ট কাঁচ, অ্যান্টিমনি, সোনা ও রুপোর মুদ্রা, রাজসভার বিনোদনের জন্য গায়ক বালক-বালিকা আমদানি করা হত। ঘোড়া কেনাবেচা ছিল গুরুত্বপূর্ণ লাভজনক ব্যবসা। আরব ও কিছু স্থানীয় ব্যবসায়ীর এই ব্যবসা একচেটিয়া ছিল। রাষ্ট্রকূট সরকার বন্দরে নোঙর করা প্রতিটি বিদেশি বাণিজ্যতরীর জন্য এক স্বর্ণ “গদ্যনক” মুদ্রা ও স্থানীয় বাণিজ্যতরীর জন্য এক “কথর্ণ” রৌপ্যমুদ্রা কর বসিয়েছিল।শিল্পীরা গিল্ডের মাধ্যমে ব্যবসা চালাত। শিলালিপিগুলি থেকে বয়নশিল্পী, তেলি, ভাস্কর, ঝুড়ি ও মাদুরশিল্পী এবং ফলবিক্রেতাদের গিল্ডের কথা জানা যায়। সৌনদাত্তি শিলালিপি থেকে স্থানীয় গিল্ডের উদ্যোগে জেলার সকল অধিবাসীর সমাবেশের কথা জানা যায়। কোনো কোনো গিল্ড অন্যান্য গিল্ডের তুলনায় অধিক ক্ষমতাশালী ছিল। এগুলির ক্ষমতার উৎস ছিল রাজকীয় সনদ। শিলালিপি থেকে জানা যায় বাণিজ্যপথে পণ্য সুরক্ষার জন্য এরা সামরিক বাহিনীও রাখত। গ্রামীণ কর্তৃপক্ষ ব্যাংক চালাত। এই ব্যাংক থেকে বণিক ও ব্যবসায়ীদের টাকা ধার দেওয়া হত।সরকারের আয়ের প্রধান উৎস ছিল পাঁচটি: নিয়মিত কর, সাময়িক কর, জরিমানা, আয়কর, অন্যান্য কর এবং সামন্তদের দেওয়া কর। মাঝে মাঝে জরুরি কর আরোপ করা হত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ সামন্ত রাজ্যকে সাহায্য করার জন্য। খাসজমি, পতিত জমি, মূল্যমান কাঠ পাওয়া যায় এমন বনাঞ্চল, খনি, নুন উৎপাদন ও খনি থেকে তোলা অন্যান্য সম্পদের উপর আয়কর আরোপ করা হত। এছাড়া বিবাহ বা ছেলের বিবাহে রাজা বা রাজকীয় আধিকারিকদের উপহার দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল।প্রয়োজন ও অবস্থার ভিত্তিতে রাজা করের পরিমাণ নির্ধারণ করতেন।তিনি দেখতেন যাতে কৃষকদের উপর অতিরিক্ত করের চাপ না পড়ে। ভূস্বামীরা নানা রকমের কর দিত। এর মধ্যে ছিল ভূমিকর, উৎপাদন কর, গাভুন্ডা বা গ্রামপ্রধানকে দেয় কর। উৎপাদন অনুযায়ী উৎপাদনের ৮ % থেকে ১৬ % কর দিতে হত। ৯৪১ খ্রিস্টাব্দের বনবাসী শিলালিপি থেকে জানা যায় পুরনো সেচখাল মজে যাওয়ায় ওই অঞ্চলে ভূমি কর বাড়ানো হয়েছিল। যুদ্ধের সময় সামরিক খরচ মেটাতে ২০ % পর্যন্ত ভূমিকর বাড়ানো হত। রাজ্যের অধিকাংশ অঞ্চলেই ভূমিকর পণ্য ও শ্রমের মাধ্যমে মেটানো হত। খুব কম ক্ষেত্রেই নগদ অর্থে এই কর দেওয়ার নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। করের কিছু অংশ (সাধারণত ১৫ %) গ্রামকে ফিরিয়ে দেওয়া হত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য।
মৃৎশিল্পী, পশুপালক, তন্তুবায়, গোয়ালা, দোকানদার, মালী ও মদ উৎপাদকদের উপর কর আরোপিত হত। মাছ, মাংস, মধু, ওষুধ, ফল প্রভৃতি দ্রব্য, জ্বালানির মতো প্রয়োজনীয় দ্রব্যের উপর সর্বাধিক ১৬ % কর আরোপিত হত। নুন ও খনিজ দ্রব্যের উপর কর দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। যদিও সাম্রাজ্য খনিগুলির মালিকানা দাবি করত না। ব্যক্তিগত উদ্যোগে খনিজ দ্রব্য উৎপাদিত হত। এর ফলে ব্যবসায় মন্দা দেখা দিত না। কোনো সম্পত্তির মালিক মারা গেলে তাঁর কোনো উত্তরাধিকার না থাকলে সেই সম্পত্তি সাম্রাজ্য অধিগ্রহণ করে নিত। ফেরি ও গৃহ কর ছিল অন্যান্য কর। শুধু ব্রাহ্মণ ও তাঁদের ধর্মীয় সংস্থাগুলিকে কম হারে কর দিতে হত।
ধর্ম
রাষ্ট্রকূট রাজারা ধর্মীয় সহিষ্ণুতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সমসাময়িক যুগের জনপ্রিয় ধর্মবিশ্বাসগুলির পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।তাঁদের নিজেদের আচরিত ধর্মমত কোনটি ছিল, তা নিয়ে তাঁদের শিলালিপি, মুদ্রা ও সমসাময়িক সাহিত্যের ভিত্তিতে গবেষকরা বিভিন্ন মত দিয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন, রাষ্ট্রকূটরা জৈন মতাবলম্বী ছিলেন। কারণ, রাষ্ট্রকূট রাজসভার সংস্কৃত, কন্নড় ও অল্পসংখ্যক অপভ্রংশ ও প্রাকৃত সাহিত্যকার ছিলেন জৈন। রাষ্ট্রকূট রাজারা অধুনা বাগলকোট জেলার লোকপুরার বিখ্যাত জৈন মন্দিরগুলি এবং তাঁদের সামন্ত পশ্চিম গঙ্গ রাজবংশ শ্রবণবেলগোলা ও কম্বদহল্লির জৈন স্থাপত্যগুলি নির্মাণ করিয়েছিলেন। গবেষকদের মতে, রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্র আধুনিক কর্ণাটকের প্রধান ধর্মবিশ্বাসই ছিল জৈনধর্ম। এই অঞ্চলের ৩০ শতাংশেরও বেশি মানুষ জৈন ধর্মাবলম্বী ছিলেন। রাজা প্রথম অমোঘবর্ষ ছিলেন জৈন আচার্য জিনসেনের শিষ্য। তিনি তাঁর ধর্মবিষয়ক গ্রন্থ প্রশ্নোত্তর-রত্নমালিকা-য় লিখেছিলেন “বর্ধমানকে (মহাবীর) প্রণাম করে আমি প্রশ্নোত্তর-রত্নমালিকা রচনা করছি।” গণিতজ্ঞ মহাবীর তাঁর গণিত সারসংগ্রহ গ্রন্থে লেখেন, “অমোঘবর্ষের প্রজারা সুখে ছিলেন। রাজ্যে প্রচুর শস্য উৎপাদিত হত। জৈনধর্মের অনুগামী রাজা কৃপাতুঙ্গ অমোঘবর্ষের রাজ্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হোক।” সম্ভিবত বৃদ্ধ বয়সে অমোঘবর্ষ জৈনধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
যদিও রাষ্ট্রকূট রাজারা হিন্দুধর্মের শৈব, বৈষ্ণব ও শাক্ত শাখারু পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাঁদের প্রায় সব কটি শিলালিপির সূচনাতেই হিন্দু দেবতা বিষ্ণু বা শিবের প্রশস্তি দেখা যায়। গুজরাতের সঞ্জন শিলালিপি থেকে জানা যায়, রাজা প্রথম অমোঘবর্ষ রাজ্যকে একটি বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে কোলহাপুরের মহালক্ষ্মী মন্দিরে নিজের বাঁ হাতের একটি আঙুল বলি দিয়েছিলেন। রাজা দন্তিদূর্গ “হিরণ্যগর্ভ” (অশ্বমেধ) যজ্ঞ করেছিলেন। চতুর্থ গোবিন্দের সঞ্জন ও খাম্বাত লিপি হেকে জানা যায়, ব্রাহ্মণেরা রাজসূয়, বাজপেয় ও অগ্নিষ্টোম যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন। রাজা দন্তিদূর্গের প্রথম দিকের একটি তাম্রলিপিতে (৭৫৩) শিবের ছবি দেখা যায়। তাঁর উত্তরসূরি রাজা প্রথম কৃষ্ণের মুদ্রায় (৭৬৮) “পরম মহেশ্বর” (শিবের অপর নাম) কথাটি দেখা যায়। রাজাদের “বীরনারায়ণ” উপাধির মধ্যে বৈষ্ণব যোগসূত্র পাওয়া যায়। তাঁদের পতাকায় গঙ্গা ও যমুনা নদীর চিহ্ন দেখা যায়। সেটি সম্ভবত বাদামি চালুক্যদের অনুকরণে চালু হয়েছিল। ইলোরার কৈলাসনাথ মন্দির ও অন্যান্য হিন্দু মন্দিরগুলি রাষ্ট্রকূট রাজাদের শাসনকালেই নির্মিত হয়েছিল। অর্থাৎ, এই যুগে হিন্দুধর্মও বেশ উন্নতিলাভ করেছিল। রাষ্টকূটদের কুলদেবীর নাম ছিল “লাটানা” (অন্য নাম “রাষ্ট্রশ্যেনা”, “মনসা”, “বিন্ধ্যবাসিনী”)। সেকালের জনপ্রিয় বিশ্বাস ছিল, তিনি বাজপাখির রূপ ধরে এসে রাজ্যকে রক্ষা করেন। রাষ্ট্রকূট রাজারা বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের উপযুক্ত মূর্তি ও অলংকরণসহ মন্দির নির্মাণ করতেন। সালোতগির মন্দিরটি শিব ও বিষ্ণুর অনুগামীদের জন্য নির্মিত হয়েছিল। কারগুদ্রির মন্দিরটি ছিল শিব, বিষ্ণু ও ভাস্কর (সূর্য) পূজার জন্য।
রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্যে বৌদ্ধধর্মের নিদর্শনও পাওয়া যায়। দম্বল ও বল্লিগাভির মতো জায়গায় বৌদ্ধধর্ম বেশ জনপ্রিয় ছিল। তবে পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের জনপ্রিয়তা কমে যায়। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে আদি শঙ্কর দক্ষিণ ভারতে অদ্বৈত বেদান্ত প্রচার করলে বৌদ্ধধর্মের পতন সম্পূর্ণ হয়। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকেই দাক্ষিণাত্যের রাজ্য ও আরব অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যের সূত্রে দক্ষিণ ভারত ইসলামের সংস্পর্শে আসে। খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্যে জুমাম মসজিদ গড়ে উঠতে দেখা যায়।এই সময় রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এগুলি মূলত কয়ালপত্তনম ও নাগোরের মতো উপকূলীয় শহরে গড়ে উঠেছিল। মুসলমান আগন্তুকরা স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করত। তাদের সন্তানসন্ততিদের “মাপিল্লা” (বা “মোপলা”) বলা হত। এরা ঘোড়া কেনাবেচা ও জাহাজ থেকে মাল খালাসের কাজ করত।
সমাজব্যবস্থা
হিন্দু সমাজব্যবস্থার মূল চারটি বর্ণের বাইরেও প্রায় সাতটি বর্ণের উল্লেখ পাওয়া যায় রাষ্ট্রকূট রাজাবলিতে। এক পর্যটকের বর্ণনায় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র ছাড়াও মোট ষোলোটি বর্ণের উল্লেখ পাওয়া যায়। “জাকায়” ও “লাহুদ” বর্ণের মানুষেরা যথাক্রমে নৃত্য ও খেলাধূলায় বিশারদ হত। নৌচালনা, শিকার, বয়ন, জুতাশিল্প, ঝুড়িশিল্প ও মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা নির্দিষ্ট বর্ণের অন্তর্ভুক্ত ছিল। “অন্ত্যজ” শ্রেণির মানুষেরা ধনীদের কায়িক শ্রম দান করত। রাষ্ট্রকূট সমাজে ব্রাহ্মণদের স্থান ছিল খুবই উঁচুতে। ক্ষত্রিয়দের মধ্যে “সৎ-ক্ষত্রিয়”রা উচ্চ স্থানের অধিকারী ছিলেন। জৈনরাও সমাজে উচ্চ মর্যাদা পেতেন।
ব্রাহ্মণদের পেশা ছিল শিক্ষাদান, বিচার, জ্যোতিষ, গণিত, কাব্য ও দর্শন চর্চা।কোনো কোনো ব্রাহ্মণ বংশানুক্রমে প্রশাসনিক উচ্চ পদের অধিকারী হতেন।এছাড়া ব্রাহ্মণরা অব্রাহ্মণদের পেশাতেও (যেমন, কৃষি, পান পাতার ব্যবসা ও সামরিক পদে চাকরি) নিযুক্ত ছিলেন। মৃত্যুদণ্ড বহুল প্রচলিত হলেও, সত-ক্ষত্রিয় বা ব্রাহ্মণদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত না। মধ্যযুগে ব্রাহ্মণকে হত্যা করা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হলেও এই অপরাধে এঁরা মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতেন। বিকল্প শাস্তি হিসেবে ব্রাহ্মণের ডান হাত বা বাঁ পা কেটে নেওয়া হত।
খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে ভারতে চার বর্ণেরই রাজা দেখা যেত। ক্ষত্রিয়রা ব্রাহ্মণদের মতোই বেদ শিক্ষার অধিকার পেত। তবে বৈশ্য বা শূদ্ররা এই অধিকার পেত না। শিলালিপি থেকে জানা যায়, চার বর্ণের মানুষই ভূস্বামীত্ব পেত। আন্তঃবর্ণ বিবাহ হত। তবে তা শুধু ক্ষত্রিয় নারীর সঙ্গে ব্রাহ্মণ পুরুষের। অন্যান্য বর্ণের মধ্যে আন্তঃবর্ণ বিবাহ প্রায়ই দেখা যেত। কোনো অনুষ্ঠানে একাধিক বর্ণের মানুষের উপস্থিতি কমই দেখা যেত। বিভিন্ন বর্ণের মানুষ একসঙ্গে বসে খেত না।
সাধারণত পরিবারগুলি যৌথ পরিবার হত। তবে শিলালিপিগুলি থেকে জানা যায়, ভাইয়ে-ভাইয়ে এমনকি পিতা-পুত্রের মধ্যেই আইনসম্মত বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটত। নারী ও কন্যারাও সম্পত্তি ও ভূমির অধিকার পেতেন। কারণ, শিলালিপি থেকে নারী কর্তৃক জমি বিক্রয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। দুই পরিবারের মধ্যে দেখাশোনা করে বিয়ে দেওয়াই ছিল প্রথা। ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে ছেলেদের বিয়ে হত ১৬ বছরের আগেই আর মেয়েদের ১২ বছরের আগে। তবে অন্যান্য বর্ণের ক্ষেত্রে এই বয়সের নিয়ম কঠোরভাবে মানা হত না। সতীপ্রথা চালু ছিল। তবে শিলালিপিগুলি থেকে অনুমিত হয় যে, তা কেবল রাজপরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।বিধবারা প্রায়শই মস্তক মুণ্ডন করত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিধবারা চুল রাখতেন, তবে তার পরিচর্যা করতেন না।বিধবাবিবাহ সমাজের উচ্চ স্তরে সুলভ ছিল না। তবে নিম্নবর্ণগুলির মধ্যে ছিল।
সাধারণত পুরুষেরা দুটি সাধারণ কাপড় পড়ত। উর্ধ্বাঙ্গে ঢিলা পোষাক, নিম্নাঙ্গে ধুতি সদৃশ একটি পোষাক পরত। কেবল রাজারা পাগড়ি পরেন। সাধারণ্যে পাগড়ির চল অনেক পরে হয়েছিল। নৃত্য ছিল বিনোদনের জনপ্রিয় মাধ্যম। শিলালিপি থেকে জানা যায়, রাজবাড়ির মেয়েদের বিনোদনের জন্য নর্তক-নর্তকী নিযুক্ত থাকত। মন্দিরে দেবদাসী প্রথা ছিল। অন্যান্য বিনোদনের মধ্যে ছিল জন্তুজানোয়ারের লড়াই। আটাকুর শিলালিপিটি উৎসর্গিত হয়েছিল বুনো শুয়োর শিকারে গিয়ে নিহত একটি কুকুরের উদ্দেশ্যে। এই কুকুরটি ছিল পশ্চিম গঙ্গ রাজা দ্বিতীয় বুটুগার প্রিয়। শিকার ছিল রাজাদের অন্যতম প্রধান বিনোদন। শিক্ষার বিষয় হিসেবে জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষ বিশেষ গুরুত্ব পেত। মানুষ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিল। ব্যাধিগ্রস্থ বৃদ্ধেরা তীর্থের পবিত্র নদীর জলে ডুবে বা পবিত্র আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করতেন।
রাষ্ট্রকূট সাহিত্য

রাষ্ট্রকূট রাজত্বে কন্নড় সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পায়। এযুগে শিলালিপি ও সাহিত্যের মাধ্যমে এই ভাষার উল্লেখযোগ্য বিকাশ ও মর্যাদাপ্রাপ্তি ঘটে। এই যুগটিকে ধ্রুপদি প্রাকৃত ও সংস্কৃত ভাষার অন্তিম কাল হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। রাজসভার কবি ও রাজারা কন্নড় ও সংস্কৃত ভাষায় গদ্য, পদ্য, হিন্দু মহাকাব্য ও জৈন তীর্থঙ্করদের জীবনী এবং অন্যান্য সাহিত্যগ্রন্থ রচনা করেন। অসগ প্রমুখ দ্বিভাষিক লেখক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। মহাবীর প্রমুখ গণিতজ্ঞ রাজা প্রথম অমোঘবর্ষের রাজসভায় বিশুদ্ধ গণিত নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।
রাজা প্রথম অমোঘবর্ষের কবিরাজমার্গ (৮৫০) কন্নড় ভাষায় রচিত প্রাচীনতম কাব্যতত্ত্ব-বিষয়ক গ্রন্থ। যদিও এই গ্রন্থই প্রমাণ করে, কন্নড় ভাষায় কাব্যসাহিত্য পূর্ববর্তী কয়েকশো বছর ধরে চলে আসছিল।কবিরাজমার্গ হল সেই সব কাব্যশৈলীর একটি সুসংহত রূপ যা কবিদের শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে রচিত হয়। এই বইতে কবি ও লেখক দুর্বিনীতের উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি সম্ভবত খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে পশ্চিম গঙ্গ রাজবংশের রাজা ছিলেন।
জৈন লেখক আদিকবি পম্পাকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কন্নড় লেখক মনে করা হয়। তিনি চম্পু আকারে রচিত আদিপুরাণ (৯৪১) গ্রন্থের জন্য বিখ্যাত। এটি প্রথম জৈন তীর্থঙ্কর ঋষভের জীবনী। পম্পার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা হল বিক্রমার্জুন বিজয় (৯৪১)। এটি হিন্দু মহাকাব্য মহাভারত অবলম্বনে অর্জুনকে নায়ক করে রচিত। এটিকে পম্পাভারত-ও বলা হয়। এই গ্রন্থে লেখকের পৃষ্ঠপোষোক ভেমুলাওয়াড়ার চালুক্য রাজার (রাষ্ট্রকূট সামন্ত) প্রশংসা করে তাঁকে গুণে অর্জুনতুল্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীকালের লেখকদের উপর পম্পার প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে বহু শতাব্দী ধরে পম্পার রচনার বহু ব্যাখ্যা রচিত হয়েছে।
কন্নড় ভাষায় অপর এক বিখ্যাত জৈন লেখক হলেন শ্রীপোন্না। তাঁর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন রাজা দ্বিতীয় কৃষ্ণ। শ্রীপোন্না তাঁর শান্তিপুরাণ গ্রন্থটির জন্য বিখ্যাত। এটি ষোড়শ তীর্থঙ্কর শান্তিনাথের জীবনী। সংস্কৃত ও কন্নড় দুই ভাষায় সমান দক্ষতার জন্য তিনি “উভয় কবিচক্রবর্তী” উপাধি পান। কন্নড় ভাষায় তাঁর অন্যান্য রচনাগুলি হল ভুবনিকা-রমাভ্যুদয়”, “জিনক্ষরমলে” ও “গতপ্রত্যাগত”। আদিকবি পম্পা ও শ্রীপোন্নাকে বলা হয় “কন্নড় সাহিত্যের রত্ন”।] সংস্কৃত ভাষায় এযুগে অনেক গদ্যগ্রন্থও রচিত হয়। মহাবীরের গণিত গ্রন্থ গণিতসারসংগ্রহ নয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত। রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় কৃষ্ণের সামন্ত দ্বিতীয় অরিকেশরীর সভাসদ সোমদেবসূরি রচনা করেন “যশসতিলক চম্পূ, নীতিবাক্যামৃত ও অন্যান্য গ্রন্থ। চম্পূজাতীয় রচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল জৈন নীতিগুলির প্রচার। এছাড়াও জৈন নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থশাস্ত্রও রচিত হয়।
রাজা তৃতীয় ইন্দ্রের রাজসভার বিশিষ্ট পণ্ডিত ত্রিবিক্রম রচনা করেন নলচম্পূ (৯১৫)। এটি সংস্কৃত ভাষায় লেখা প্রথম দিকের চম্পূ। এছাড়া তিনি দময়ন্তী কথা, নলচম্পূ ও বেগুমরা লিপিও রচনা করেন। কথিত আছে, হিন্দু দেবী সরস্বতী রাজসভায় তাঁর অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে এই সকল গ্রন্থ রচনায় সাহায্য করেন। জিনসেন ছিলেন ধর্মপ্রচারক ও প্রথম অমোঘবর্ষের গুরু। ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে তাঁর গ্রন্থ ধবল ও জয়ধবল (ধর্মতাত্ত্বিক বীরসেনের সঙ্গে লিখিত)। এই গ্রন্থগুলি তাঁদের পৃষ্ঠপোষক রাজা অতিশয়ধবলের নামানুসারে রাখা। জিনসেনের অপর গ্রন্থ আদিপুরাণ (এটি সমাপ্ত করেন তাঁর শিষ্য গুণভদ্র), হরিবংশ ও পার্শ্বভ্যুদয়।
দাক্ষিণাত্যের স্থাপত্য ঐতিহ্যে রাষ্ট্রকূট রাজবংশের অবদান অপরিসীম। শিল্প ঐতিহাসিক অ্যাডাম হার্ডি রাষ্ট্রকূট স্থাপত্যকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন: বাদামি ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ইলোরা, আইহোল ও পাট্টাডাকাল এবং গুলবার্গের কাছে সিরভাল। অধুনা মহারাষ্ট্রের ইলোরা ও এলিফ্যান্টার গুহামন্দিরগুলিতে জৈন সন্ন্যাসীরা বাস করতেন। ইলোরা প্রকৃতপক্ষে ৩৪টি বৌদ্ধ গুহামন্দিরের সমষ্টি। এগুলি সম্ভবত খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথমার্ধ্বে নির্মাণ করা হয়েছিল। এগুলির মধ্যে পাণ্ড্য প্রভাব দেখা যায়। হিন্দু গুহামন্দিরগুলি অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালের নির্মাণ।
রাষ্ট্রকূটরা বৌদ্ধ গুহাগুলির সংস্কার করে প্রস্তরখোদিত বেদিগুলি পুনরায় উৎসর্গ করেন। প্রথম অমোঘবর্ষ ছিলেন জৈনধর্মের পৃষ্ঠপোষক। তাঁর রাজত্বকালে ইলোরায় পাঁচটি জৈন গুহামন্দির নির্মিত হয়েছিল। ইলোরায় রাষ্ট্রকূটদের সবচেয়ে বড়ো ও উল্লেখযোগ্য কীর্তিটি হল একশিলায় খোদিত কৈলাসনাথ মন্দির। এই মন্দিরটিই রাষ্ট্রকূট রাজাদের “বলহার” বা “বিশ্বের চার প্রধান সম্রাটের অন্যতম” সম্মানের পরিচায়ক। এই মন্দিরের দেওয়ালে রাবণ, শিব ও পার্বতী সহ হিন্দু পুরাণের নানা চরিত্রের মূর্তি খোদিত। মন্দিরটির সিলিং চিত্রশোভিত।
সমগ্র দক্ষিণ ভারতে রাষ্ট্রকূট শাসন স্থাপিত হওয়ার পর রাজা প্রথম কৃষ্ণ কৈলাসনাথ মন্দির নির্মাণ করান। অ্যাডাম হার্ডির মতে, এই মন্দিরের স্থাপত্য “কর্ণাট দ্রাবিড়” গোত্রের। নাগর শৈলীর অনুরূপ কোনো শিখর বা চূড়া এই মন্দিরে দেখা যায় না। কর্ণাটকের পাট্টাডাকালে অবস্থিত বিরুপাক্ষ মন্দিরের গড়নের সঙ্গে এই মন্দিরের গড়নের মিল পাওয়া যায়। শিল্প ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথের মতে, কৈলাসনাথ মন্দিরের সাফল্য একশিলায় খোদিত মন্দিরের স্থাপত্য নির্মাণের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য এবং এই মন্দির বিশ্বের অন্যতম বিস্ময় হওয়ার দাবি রাখে। শিল্প ঐতিহাসিক পার্সি ব্রাউনের মতে, শিল্পসৌকর্যের দিক থেকে কৈলাসনাথ মন্দির একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রস্তর স্থাপত্য। এই মন্দির এমন একটি স্থাপত্য যা চিরকালই পর্যটকদের মুগ্ধ করেছে।
এলিফ্যান্টার স্থাপত্য কোনো কোনো গবেষকের মতে, কালচুরি রাজাদের নির্মিত, আবার কোনো কোনো মতে রাষ্ট্রকূট রাজাদের নির্মিত। এই গুহার নটরাজ, সদাশিব ইত্যাদি মূর্তি স্থাপত্যসৌন্দর্যে ইলোরা ভাস্কর্যগুলির থেকেও সুন্দর। এলিফ্যান্টার অন্যান্য বিখ্যাত ভাস্কর্য হল অর্ধনারীশ্বর ও মহেশমূর্তি। মহেশমূর্তি হল ২৫ ফুট (৮ মি) একটি ত্রিমুখবিশিষ্ট শিবের মূর্তি। এটি ভারতের সূক্ষ্মতম ভাস্কর্যগুলির একটি। বলা হয়, ভাস্কর্যের জগতে কোনো দেবতার মূর্তিতে এত সূক্ষ্ম কাজ খুব কম দেখা যায়। মহারাষ্ট্র অঞ্চলের অন্যান্য প্রস্তরখোদিত মন্দির হল ধুমার লেনা ও ইলোরা দশাবতার গুহামন্দির (বিষ্ণু ও শিবলীলা ভাস্কর্যগুলির জন্য বিখ্যাত) এবং মুম্বইয়ের কাছে যোগেশ্বরী মন্দির।
কর্ণাটকে রাষ্ট্রকূটদের সবচেয়ে বিখ্যাত মন্দিরটি হল কাশীবিশ্বনাথ মন্দির ও পাট্টাডাকালের জৈন নারায়ণ মন্দির (একটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান)। অন্যান্য বিখ্যাত মন্দির হল কোন্নুরের পরমেশ্বর মন্দির, সাবাদির ব্রহ্মাদেব মন্দির, আইহোলের সেত্তাব্বা, দ্বিতীয় কোন্তিগুড়ি, জদরগুড়ি ও অম্বিগেরাগুড়ি মন্দির, রোনের মল্লিকার্জুন মন্দির, হুলির অন্ধকেশ্বর মন্দির, সোগালের সোমেশ্বর মন্দির, লোকপুরার জৈনমন্দিরসমূহ, কুকনুরের নবলিঙ্গ মন্দির, সান্দুরের কুমারস্বামী মন্দির, গুলবর্গার শিরিভালের অসংখ্য মন্দির এবং গাডেগের ত্রিকূটেশ্বর মন্দির, যেটি কল্যাণী চালুক্য রাজাদের আমলে পরিবর্ধিত হয়েছিল। পুরাতাত্ত্বিক গবেষণার ফলে জানা গিয়েছে, এই মন্দিরগুলির নকশা ছিল বহুকোণ-বিশিষ্ট। এই নকশাই মূলত বেলুর ও হালেবিড়ুতে হোয়সল রাজারা ব্যবহার করেছিলেন। রাষ্ট্রকূটদের স্থাপত্যশৈলীকে অ্যাডাম হার্ডি “কন্নড় দ্রাবিড়” শৈলী নামে চিহ্নিত করেছেন। এই শৈলী প্রথাগত দ্রাবিড় শৈলীর অনুরূপ ছিল না।
খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে উত্তর ভারতে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর দাক্ষিণাত্যেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়। এই পরিবর্তন শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না, ভাষা ও সাংস্কৃতিক জগতেও বিশেষ পরিবর্তন এসেছিল। উপদ্বীপীয় ভারতের (তামিলকামের বাইরে) রাজসভায় স্থানীয় কন্নড় ভাষার চর্চা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে সংস্কৃত ও কন্নড় সংস্কৃতির মধ্যে আদানপ্রদানও বৃদ্ধি পায়। দ্বিভাষিক শিলালিপিগুলি থেকে অনুমান করা হয়, সংস্কৃতের পাশাপাশি কন্নড়ও প্রশাসনিক ভাষার মর্যাদা পেয়েছিল। সরকারি অভিলেখাগারে জমির অনুদান সংক্রান্ত তথ্যগুলি কন্নড় ভাষায় রক্ষিত হত। স্থানীয় ভাষায় “দেশী” সাহিত্য ও সংস্কৃতে “মার্গ” সাহিত্য রচিত হত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে (“ঘাতিকা”) সংস্কৃত ভাষা ব্যবহৃত হত। কারণ, সংস্কৃত ছিল শিক্ষিত ব্রাহ্মণদের ভাষা। অন্যদিকে পূজার্চনার ক্ষেত্রে সাধারণের কথ্য কন্নড় ভাষা বেশি ব্যবহৃত হত। ধনী ও শিক্ষিত জৈনরা কন্নড় ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করত। যার ফলে পরবর্তী শতকগুলিতে কন্নড় ভক্তি আন্দোলনের ভাষায় পরিণত হয়।
সমসাময়িক সাহিত্য ও শিলালিপিগুলি থেকে প্রমাণিত হয় যে, কন্নড় আধুনিক কর্ণাটক অঞ্চলেই শুধুমাত্র জনপ্রিয় ভাষায় ছিল না, বরং আধুনিক দক্ষিণ মহারাষ্ট্র ও উত্তর দাক্ষিণাত্যেও খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে এই ভাষা বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। কবিরাজমার্গ গ্রন্থে বলা হয়েছে কাবেরী নদী ও গোদাবরী নদীর মধ্যবর্তী সমগ্র অঞ্চলটিই ছিল “কন্নড় দেশ”। বেদ, ব্যাকরণ, জ্যোতিষ, সাহিত্য, মীমাংসা, ধর্মশাস্ত্র, পুরাণ ও ন্যায়ের মতো উচ্চশিক্ষার বিষয় সংস্কৃতে শিক্ষা দেওয়া হত। শিলালিপি থেকে জানা যায়, এই যুগে “কাব্য” বা ধ্রুপদি রচনাশৈলী বেশ জনপ্রিয় ছিল। শিলালিপির উচ্চ ও নিম্ন মান সম্পর্কে অভিলেখাগার-কর্মীদের জ্ঞান দেখে অনুমিত হয় যে, তাঁরা নিজেরা মধ্যমেধার কবি হলেও ধ্রুপদি সংস্কৃত সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। রাজা তৃতীয় কৃষ্ণের একটি কন্নড় শিলালিপি কাব্যিক কণাদ ছন্দে রচিত। এটি পাওয়া গিয়েছে অধুনা মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের জব্বলপুরের কাছ থেকে। কবিরাজমার্গ অনুসারে, সেকালে দাক্ষিণাত্যে কাব্যচর্চা জনপ্রিয় ছিল। ত্রিবিক্রমের নলচম্পূ সম্ভবত দাক্ষিণাত্যের চম্পূ-জাতীয় রচনার আদিতম নিদর্শন।

4_© Aa¨vq :
বঙ্গ, বাঙ্গালাহ, বাংলা, বাংলাদেশ বা বঙ্গদেশ
উয়ারি-বটেশ্বর অঞ্চলে ২০০৬ সালে প্রাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী বাংলাদেশ অঞ্চলে জনবসতি গড়ে উঠেছিলো প্রায় ৪ হাজার বছর আগে। ধারণা করা হয় দ্রাবিড় ও তিব্বতীয়-বর্মী জনগোষ্ঠী এখানে সেসময় বসতি স্থাপন করেছিল। পরবর্তীকালে এই অঞ্চলটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয় এবং স্থানীয় ও বিদেশী শাসকদের দ্বারা শাসিত হতে থাকে। আর্য জাতির আগমনের পর খ্রিস্টীয় চতুর্থ হতে ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত গুপ্ত রাজবংশ বাংলা শাসন করেছিল। এর ঠিক পরেই শশাঙ্ক নামের একজন স্থানীয় রাজা স্বল্প সময়ের জন্য এ এলাকার ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হন। প্রায় একশ বছরের অরাজকতার (যাকে মাৎসন্যায় পর্ব বলে অভিহিত করা হয়) শেষে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজবংশ বাংলার অধিকাংশের অধিকারী হয়, এবং পরবর্তী চারশ বছর ধরে শাসন করে। এর পর হিন্দু ধর্মাবলম্বী সেন রাজবংশ ক্ষমতায় আসে। দ্বাদশ শতকে সুফি ধর্মপ্রচারকদের হাতে বাংলায় ইসলামের প্রবর্তন ঘটে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে সামরিক অভিযান এবং যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে মুসলিম শাসকেরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ১২০৫-৬ সালের দিকে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খীলজী নামের একজন তুর্কী বংশোদ্ভূত সেনাপতি রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে সেন রাজবংশের পতন ঘটান। ষোড়শ শতকে মোঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসার আগে পর্যন্ত বাংলা স্থানীয় সুলতান ও ভূস্বামীদের হাতে শাসিত হয়। মোঘল বিজয়ের পর ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থাপিত হয় এবং এর নামকরণ করা হয় জাহাঙ্গীর নগর।
বাঙলা ও বাঙালী
একশো বছর আগে বঙ্কিমচন্দ্র আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, বাঙালীর ইতিহাস নেই। আজ আর সে-কথা ঘাটে না। নানা সুধীজনের প্রয়াসের ফলে আজ বাঙলার ও বাঙালীর এক গৌরবময় ইতিহাস রচিত হয়েছে। এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক প্রচেষ্টা ছিল রাজশাহীর বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটির। বর্তমান শতাব্দীর সূচনায় ওই সোসাইটির পক্ষ থেকে রমাপ্রসাদ চন্দ লেখেন “গৌড়রাজমালা” ও অক্ষয়কুমার মৈত্র প্রকাশ করেন “গৌড়-লেখমালা।” তারপর রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা করেন তাঁর “বাঙলার ইতিহাস।” কিন্তু বইখানা ছিল রাষ্ট্রীয় ইতিহাস, বাঙালীর জীবনচর্যার ইতিহাস নয়। তিনের দশকে বাঙলার ইতিহাসের একটা কঙ্কাল ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপিত করেন বর্তমান লেখক মহাবোধি সোসাইটির মুখপাত্র ‘মহাবোধি’-তে। চল্লিশের দশকের গোড়াতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বের করল তাদের “হিস্ট্রি অভ্ বেঙ্গল।” এই বইটাতে প্রথম প্রদত্ত হল বাঙালীর জীবনচর্যার বিভিন্ন বিভাগের ইতিহাস। এর ছ’বছর পরে ডঃ নীহাররঞ্জন রায় অসামান্য অর্জন করলেন বাঙলা সাহিত্যের অনবদ্য সৃজন তাঁর “বাঙালীর ইতিহাস—আদিপর্ব” লিখে। কিন্তু বাঙলার ইতিহাসের প্রাগৈতিহাসিক যুগটা শূন্যই থেকে গেল। ষাটের দশকে বর্তমান লেখক তাঁর “হিস্ট্রি অ্যাণ্ড কালচার অভ্ বেঙ্গল” ও “প্রি-হিস্ট্রি অ্যাণ্ড বিগিনিংস অভ্ সিভিলিজেন ইন বেঙ্গল” বই দুটি লিখে বাঙলার প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটা ইতিহাস দেবার চেষ্টা করলেন। শুধু তাই নয়, তিনি বাঙলার ইতিহাসকে টেনে আনলেন ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময় পর্যন্ত। ওই দশকেই রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধিকর্তা পরেশচন্দ্র দাশগুপ্ত বের করলেন তাঁর “একস্ক্যাভেসনস্ অ্যাট পাণ্ডুরাজার ঢিবি।” এর পর ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখলেন চারখণ্ডে তাঁর “বাঙলার ইতিহাস।”
এদিকে বাঙালীকে সম্যকরূপে বুঝবার চেষ্টাও চলতে লাগল। ১৯১৬ খ্রীষ্টাব্দে রমাপ্রসাদ চন্দ তাঁর “ইণ্ডো-আরিয়ান রেসেস্” বইয়ে বাঙালীর দৈহিক গঠনে আল্পীয় উপাদানের কথা বললেন। এর পনেরো বছর পরে ডঃ বিরজাশঙ্কর গুহ বাঙালীর দৈহিক গঠনে আল্পীয় রক্ত ছাড়া, দিনারিক রক্তের কথাও বললেন। ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত অ ক্ষিতিশপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ও এ-বিষয়ে অনুশীলন করলেন। নূতন তথ্যের ভিত্তিতে বাঙালীর প্রকৃক নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের একটা প্রয়োজন অনুভূত হল । অপর দিকে সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্ব সম্বন্ধে কাজ চালালেন প্রবোধচন্দ্র ভৌমিক প্রভুখ নৃতত্ত্ববিদগণ।
অনেক আগেই বাঙালী সংস্কৃতির সাত-পাঁচের সংগে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল নেপাল, তিব্বত প্রভৃতি রাজ্য পরিভ্রমণ করে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন অবহট্ট ভাষায় ‘সন্ধ্যা’-রীতিতে রচিত লুইপাদের “চর্যাপদ-বিনিশ্চয়,” সরোজ বজ্রের “দোহাকোষ,” ও কাহ্নপাদের “দোহাকোষ” ও “ডাকার্ণব”, এই চারখানা বই আবিষ্কার করা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সম্বন্ধে আরও অনেকে অনুশীলন করলেন, যথা রামগতি ন্যায়রত্ন, দীনেশচন্দ্র সেন, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ, বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, পঞ্চানন চক্রবর্তী, আশুতোষ ভট্টাচার্য, শশিভূষণ দাসগুপ্ত, তমোনাশ দাসগুপ্ত, সজনীকান্ত দাস ও আরও অনেকে। তাঁদের সকলের অনুশীলনের ফলে, আজ আমরা সম্পূর্ণরূপে পরিচিত হয়েছি বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ, ও বাংলা সাহিত্যের বিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে।
বাঙলা অতি প্রাচীন দেশ। ভূতাত্ত্বিক গঠনের দিক দিয়ে বাঙলাদেশ গঠিত হয়ে গিয়েছিল প্লাওসিন যুগে (প্রায় দশ থেকে পঁচিশ লক্ষ বৎসর পূর্বে)। পৃথিবীতে নরাকার জীবেরও বিবর্তন ঘটে এই প্লাওসিন যুগে। এর পরের যুগকে বলা হয় প্লাইস্টোসিন যুগ। এই যুগেই মানুষের আবির্ভাব ঘটে।
যদিও প্লাইস্টোদিন যুগের মানুষের কোনও নরকঙ্কাল আমরা ভারতে পাই নি, তবুও তার আগের যুগের নরাকার জীবের কঙ্কাল আমরা এশিয়ার তিন জায়গা থেকে পেয়েছি। জায়গাগুলো হচ্ছে ভারতের উত্তর-পশ্চিম কেন্দ্রস্থ শিবলিক গিরিমালা, জাভা ও চীনদেশের চুংকিঙ। এই তিনটি বিন্দু সরলরেখা দ্বারা সংবদ্ধ করলে যে ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়, বাঙলাদেশ তার কেন্দ্রস্থলে পড়ে। সুতরাং এরূপ জীবসমূহ যে সে-যুগে বাঙলাদেশের ওপর দিয়েও যাতায়াত করত, সেরূপ অনুমান করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক কালে মেদিনীপুর জেলার রামগড় সিজুয়ায় যে মানুষের অশ্মীভূত চোয়াল পাওয়া গিয়েছে, তা বৈজ্ঞানিক মহলে যদি চূড়ান্তরূপে গ্লাইস্টোসিন যুগের বলে স্বীকৃত হয়, তবে এটাই হবে এশিয়ার প্রাপ্ত প্রাচীন প্রকৃত মানবের একমাত্র নিদর্শন।
সিজুয়ায় প্রাপ্ত চোয়ালের অনুশীলন সাপেক্ষে, বলা যেতে পারে যে, প্লাইস্টোসিন যুগের মানুষের কঙ্কাল আমরা এদেশে পাইনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই প্রাচীন যুগ থেকেই মানুষ যে বাঙলাদেশে বাস করে এসেছে, তার প্রমাণ আমরা পাই বাঙলাদেশে পাওয়া তার ব্যবহৃত আয়ুধ সমূহ থেকে। এই আয়ূধ সমূহের অন্তর্ভূক্ত হচ্ছে প্লাইস্টোসিন যুগের পাথরের তৈরি হাতিয়ার, যা দিয়ে সে-যুগের মানুষ পশু শিকার করত তার মাংস আহারের জন্য। এগুলো পাওয়া গিয়েছে বাঁকুরা, বর্ধমান, মেদিনীপুর প্রভৃতি জেলার নানা স্থান থেকে। এগুলোকে প্রত্ন-প্রস্তর যুগের আয়ুধ বলা হয়। প্রত্নপলীয় যুগের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল আনুমানিক দশ হাজার বছর আগে। তারপর সূচনা হয় নব প্রস্তর বা নবপলীয় যুগের। নবপলীয় যুগের প্রাদুর্ভাবের পর, অভ্যুদয় হয় তাম্রাশ্ম যুগের। তাম্রাশ্ম যুগেই সভ্যতার সূচনা হয়। বাঙলায় তাম্রাশ্ম যুগের ব্যাপক বিস্তৃতি ছিল মেদিনীপুর ও বর্ধমান জেলায়। এই যুগের সভ্যতার প্রতীক হচ্ছে সিন্ধুসভ্যতা। বাঙলা এই সভ্যতার নিদর্শন হচ্ছে পাণ্ডু রাজার টিবি।
বাঙলার আদিম অধিবাসীরা ছিল অস্ট্রিক ভাষাভাষী গোষ্ঠীর লোক। নৃতত্ত্বের ভাষায় এদের প্রাক্-দ্রাবিড় বা আদিঅস্ত্রাল বলা হয়। প্রাচীন সাহিত্যে এদের ‘নিষাদ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। বাঙলার আদিবাসীদের মধ্যে সাঁওতাল, লোধা প্রভৃতি উপজাতিসমূহ এই গোষ্ঠীর লোক। এছাড়া, হিন্দুসমাজের তথাকথিত ‘অন্ত্যজ’ জাতি সমূহও এই গোষ্ঠীরই বংশধর। বাঙলার প্রথম অনুপ্রবেশ করে দ্রাবিড়রা। এরা দ্রাবিড় ভাষার লোক ছিল। বৈদিক সাহিত্যে এদের ‘দস্যু’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এদের অনুসরণে আসে আর্যভাষাভাষী আল্পীয়রা। মনে হয়, এদের একদল এশিয়া মাইনর বা বেলুচিস্তান থেকে পশ্চিম সাগরের উপকূল ধরে অগ্রসর হয়ে, ক্রমশঃ সিন্ধু, কাথিয়াবাড়, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কুর্গ, কন্নাদ ও তামিলনাড়ু প্রদেশে পৌঁছায় এবং আর একদল পূর্ব উপকূল ধরে বাঙলা ও ওড়িষায় আসে। এরাই মনে হয়, বৈদিক ও বেদোত্তর সাহিত্যে বর্ণিত ‘অসুর’ জাতি। আরও মনে হয়, এদের সকলেই সামাজিক সংগঠন কৌমভিত্তিক ছিল, এবং এই সকল কৌমগোষ্ঠীর নামেই এক একটা জনপদের সৃষ্টি হয়।
বৈদিক আর্যরা বাঙলাদেশের অন্ততঃ দুটি কৌমগোষ্ঠীর নামের সঙ্গে পরিচিত ছিল। একটি হচ্ছে ‘বঙ্গ,’ যাদের ঐতরেয় ব্রাহ্মণে ‘বয়াংসি’ বা পক্ষী জাতীয় বলা হয়েছে। মনে হয় পক্ষী বিশেষ তাদের ‘টটেম’ ছিল। বৈদিক সাহিত্যে দ্বিতীয় যে নামটি আমরা পাই, সেটি হচ্ছে ‘পুণ্ড্র’। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে তাদের ‘দস্যু’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। মনে হয়, তাদের বংশধররা হচ্ছে বর্তমান ‘পোদ’ জাতি। বৈদিক আর্যরা বাঙলাদেশের লোকদের বিদ্বেষপূর্ণ ঘৃণার চক্ষে দেখতেন। এটার কারণ—দুই বিপরীত সংস্কৃতির সংঘাত। বাঙলায় আর্যদের অনুপ্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত, তাদের মনে এই বিদ্বেষ ছিল।
মহাভারতীয় যুগে আমরা বঙ্গ, কর্বট, সুহ্ম, প্রভৃতি জনপদের নাম পাই। মহাভারতে আরও বলা হয়েছে যে অসুররাজা বলির ক্ষেত্রজ সন্তানসমূহ থেকেই অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পৌন্ড্র, ও সুহ্ম জাতিসমূহের উদ্ভূত হয়েছে।
বৌদ্ধ জাতক গ্রন্থ সমূহ থেকে আমরা বাঙলার দুটি রাষ্ট্রের নাম পাই। একটি হচ্ছে শিবি রাজ্য ও অপরটি হচ্ছে চেত রাজ্য। এ দুটি রাষ্ট্র বুদ্ধদেবের প্রাদুর্ভাবের পূর্বেই বিদ্যমান ছিল। বর্ধমান জেলার অধিকাংশ অঞ্চল নিয়ে শিবি রাজ্য গঠিত ছিল। তার রাজধানী ছিল জেতুত্তর নগরে (বর্তমান মঙ্গলকোটের নিকটে ও টলেমী উল্লিখিত সিব্রিয়াম বা শিবপুরী)। এরই দক্ষিণে ছিল চেত রাজ্য। তার রাজধানী ছিল চেতনগরীতে (বর্তমান ঘাটাল মহকুমার অন্তর্ভূক্ত চেতুয়া পরগণা)। এই উভয় রাজ্যেরই সীমান্ত কলিঙ্গ রাজ্যের সীমানার সঙ্গে এক ছিল। কলিঙ্গ রাজ্য তখন বর্তমান মেদিনীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
সিংহল দেশের ‘দীপবংশ’ ও ‘মহাবংশ’ নামে দুটি প্রাচীন গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি যে বঙ্গদেশের বঙ্গ নগরে এক রাজার বিজয়সিংহ নামে এক পুত্র দুর্বিনীত আচারের জন্য সাত শত অনুচর সহ বাঙলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে সিংহলে যায়, এবং সিংহল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।
আলেকজাণ্ডারের (৩২৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) ভারত আক্রমণের সময় বাঙলায় গঙ্গারাঢ় নামে এক স্বাধীন রাজ্য ছিল। গঙ্গারাঢ়দের শৌর্যবীর্যের কথা শুনেই আলেকজাণ্ডার বিপাশা নদীর তীর থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
এর অনতিকাল পরেই বাঙলা তার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে। কেননা, মহাস্থানগড়ের এক শিলালিপি থেকে আমরা জানতে পারি যে, উত্তর বাঙলা মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, কারণ মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত পুণ্ড্রবর্ধন নগরে এক কর্মচারীকে অধিষ্ঠিত করেছিল। মনে হয় এই সময় থেকেই আর্যসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বাঙলা দেশে ঘটেছিল। ‘মনুসংহিতা’ রচনাকালে (২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ থেকে ২০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে) বাঙলাদেশ আর্যাবর্তের অন্তর্ভুক্ত বলে পরিগণিত হত। কুষাণ সম্রাটগণের মুদ্রাও বাঙলার নানা জায়গায় পাওয়া গিয়েছে। খ্রীষ্টীয় চতুর্থ শতকে বাঙলাদেশ গুপ্তসাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক হয়। কিন্তু ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাঙলাদেশ আবার স্বাধীনতা লাভ করে। এই সময় গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদের নামে তিনজন স্বাধীনরাজা ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি গ্রহণ করেন। গোপচন্দ্র ওড়িষারও এক অংশ অধিকার করেন। এর অনতিকাল পরে বাঙলাদেশের রাজা শশাঙ্ক (৬০৬-৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দ) পশ্চিমে কান্যকুজ্ব ও দক্ষিণে গঞ্জাম পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হন। এরপর বাঙলাদেশে কিছুকাল অরাজকতা দেখা দেয়। এই অজারকতার হাত থেকে বাঙলাদেশকে রক্ষা করেন পালবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল (৭৫০-৭৭০) খ্রীষ্টাব্দ)।
অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাবে গোপালের সময় থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর তৃতীয় পাদে গোবিন্দপালের সময় পর্যন্ত পালবংশই বাঙলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিল। একই রাজবংশের ক্রমাগত চারশো বছর (৭৫০-১১৯৯ খ্রীষ্টাব্দ) রাজত্ব করা ভারতের ইতিহাসে এক অসাধারণ ঘটনা। গোপালের পৌত্র দেবপাল নিজের রাজ্য বিস্তার করেছিলেন দক্ষিণে সমুদ্র পর্যন্ত। দেবপালের পিতা ধর্মপাল দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে গান্ধার পর্যন্ত সমস্ত উত্তর ভারত জয় করেছিলেন। বস্তুতঃ পালরাজগণের রাজত্বকালই বাঙলার ইতিহাসের গৌরবময় যুগ।
পালবংশের পতনের পর বাঙলায় সেনবংশ রাজত্ব করে। এরাও প্রতাবশালী রাজা ছিলেন। সেনবংশের তৃতীয় রাজা লক্ষ্মণ সেনের আমলেই বাঙলা মুসলমানদের হাতে চলে যায়। এ ঘটনা ঘটেছিল ত্রয়োদশ শতাব্দীর (১২০৪ খ্রীষ্টাব্দে) শুরুতেই। তখন থেকেই ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম পাদ পর্যন্ত বাঙলাদেশ স্বাধীন সুলতানদের শাসনাধীনে ছিল। পরের পঞ্চাশ (১৫৩৯-১৫৭৬ খ্রীষ্টাব্দ) বছর বাঙলা পাঠানদের অধীনে যায়। তারপর ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে সম্রাট আকবরের (১৫৯৪ খ্রীষ্টাব্দে) আমলে বাঙলা মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর অপরাহ্নে বাঙলা মোগলদের হাত থেকে ইংরেজদের হাতে চলে যায়।
এখান কেবল বাঙলার সমাজবিন্যাস ও প্রথাসমূহের একটা রূপরেখা টানবার চেষ্টা করব। বাঙলায় ব্রাহ্মণ্যধর্ম খুব বিলম্বে প্রবেশ করেছিল। সুতরাং ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুপ্রবেশের পূর্বে বাঙলায় চাতুর্বর্ণ সমাজবিন্যাস ছিল না। প্রথম ছিল কৌমগোষ্ঠিক সমাজ। তারপর যে-সমাজের উদ্ভব হয়েছিল, তাতে জাতিভেদ ছিল না, ছিল পদাধিকারঘটিত বৃত্তিভেদ। এটা আমরা জানতে পারি ‘প্রথম কায়স্থ’, ‘জ্যেষ্ঠ কায়স্থ’, ‘প্রতিবেশী’, ‘কুটুম্ব’ প্রভৃতি নাম থেকে। এ সব নাম আমরা পাই সমকালীন তাম্রপট্ট লিপি থেকে। তারপর পাই বৃত্তিধারী গোষ্ঠীর নাম, যথা ‘নগরশ্রেষ্ঠী’, ‘সার্থবাহ’, ‘ক্ষেত্রকার’, ‘ব্যাপারী’ ইত্যাদি। পরে পালযুগে যখন রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্মের প্রাধান্য ঘটে, তখন বাঙলায় বৃত্তিধারী গোষ্ঠীগুলি আর বৈবাহিক আদান-প্রদানের সংস্থা হিসাবে স্বীকৃত হয় না। তখনই বাঙলার জাতিসমূহ সঙ্করত্ব প্রাপ্ত হয়। সুতরাং পালরাজগণের পর সেনরাজগণের আমলে যখন ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটে তখন বাঙলার সকল জাতিই সঙ্করত্ব দোষে দুষ্ট। সেজন্য বৃহদ্ধর্মপুরাণ-এ ব্রাহ্মণ ছাড়া, বাঙলার আর সকল জাতিকেই সঙ্কর জাতি বলে অভিহিত করা হয়েছিল ও তাদের তিন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছিল—১) উত্তম সঙ্কর, ২) মধ্যম সঙ্কর ও ৩) অন্ত্যজ। এরপর আর একটা শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছিল—‘নবশাখ’ বিভাগ। নবশাখ মানে যাদের হাতে ব্রাহ্মণরা জল গ্রহণ করত। বিবাহের অন্তর্গোষ্ঠী (endogamous) হিসাবে মধ্যযগে যে সকল জাতি বিদ্যমান ছিল, তাদের নাম আমরা মঙ্গলকাব্যসমূহে পাই। এ সকল জাত আজও বিদ্যমান আছে। ময়ূরভট্টের ‘ধর্মপুরাণ’-এ যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তা নীচে উদ্ধৃত করা হয় :
“সদ্গোপ কৈবর্ত আর গোয়ালা তাম্বুলি।
উগ্রক্ষেত্রী কুম্ভকার একাদশ তিলি।।
যোগী ও আশ্বিন তাঁতি মালী মালাকর।
নাপিত রজক দুলে আর শঙ্খধর।।
হাড়ি মুচি ডোম কলু চণ্ডাল প্রভৃতি।
মাজি ও বাগদী মেটে নাহি ভেদজাতি।।
স্বর্ণকার সুবর্ণবনিক্ কর্মকার।
সূত্রধর গন্ধবেনে ধীবর পোদ্দার।।
ক্ষত্রিয় বারুই বৈদ্য পোদ পাকমারা।
পরিল তাম্রের বালা কায়স্থ কেওরা।।”
মধ্যযুগের সমাজ জীবনকে কলুষিত করেছিল তিনটি অপপ্রথা—১) কৌলিন্য, ২) সহমরণ ও ৩) দাসদাসীর হাট। । ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এ সকল প্রথা বাঙালীসমাজে প্রচলিত ছিল। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ সমাজ-সংস্কারকের প্রচেষ্টার ফলে ইংরেজ সরকার কর্তৃক এগুলি নিবারিত হয়। তারপর বিদ্যাসাগর মহাশয়ের চেষ্টায় বিধবা-বিবাহ আইনসিদ্ধ হয়। পরে অসবর্ণ বিবাহের জন্য বিশেষ আইন প্রণয়ন হয়। আরও পরে বিবাহের ন্যূনতম বয়সও বর্ধিত করা হয়।
নাম ও সীমা
ভারতবর্ষের প্রায় প্রতি প্রদেশেরই নাম ও সীমা কালক্রমে পরিবর্তিত হইয়াছে। শাসন-কার্যের সুবিধার জন্য এক ইংরেজ আমলেই একাধিকবার বাংলা দেশের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে। এখন যে ভূখণ্ডকে আমরা বাংলা দেশ বলি, এই শতাব্দীর আরম্ভেও তাহার অতিরিক্ত অনেক স্থান ইহার অন্তর্ভুক্ত ছিল। আবার বাংলা দুইভাবে বিভক্ত হইয়া দুইটি বিভিন্ন দেশে পরিণত হইয়াছে। সুতরাং এই পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বিভাগের উপর নির্ভর করিয়া বাংলা দেশের সীমা নির্ণয় করা যুক্তিযুক্ত নহে। মোটের উপর, যে স্থানের অধিবাসীরা বা তাহার অধিক সংখ্যক লোক সাধারণত বাংলা ভাষায় কথাবার্তা বলে, তাহাই বাংলা দেশ বলিয়া গ্রহণ করা সমীচীন। এই সংজ্ঞা অনুসারে বাংলার উত্তর সীমার হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত কয়েকটি পার্বত্য জনপদ বাংলার বাহিরে পড়ে। কিন্তু বর্তমান কালের পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ, আসামের অন্তর্গত কাছাড় ও গোয়ালপাড়া এবং বিহারের অন্তর্গত পূর্ণিয়া, মানভূম, সিংহভূম সাঁওতাল পরগণার কতকাংশ বাংলার অংশ বলিয়া গ্রহণ করিতে হয়। প্রাচীন হিন্দু যুগেও এই সমুদয় অঞ্চলে একই ভাষার ব্যবহার ছিল কিনা, তাহা সঠিক বলা যায় না। কিন্তু আপাতত আর কোনও নীতি অনুসারে বাংলা দেশের সীমা নির্দেশ করা কঠিন। সুতরাং বর্তমান গ্রন্থে আমরা এই বিস্তৃত ভূখণ্ডকেই বাংলা দেশ বলিয়া গ্রহণ করিব।
প্রাচীন হিন্দু যুগে সমগ্র বাংলা দেশের কোন একটি বিশিষ্ট নাম ছিল না। ইহার ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। উত্তরবঙ্গে পূণ্ড্র ও বরেন্দ্র (অথবা বরেন্দ্রী), পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় ও তাম্রলিপ্তি এবং দক্ষিণ ও পূর্ববঙ্গে বঙ্গ, সমতট, হরিকেল ও বঙ্গাল প্রভৃতি দেশ ছিল। এতদ্ভিন্ন উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গের কতকাংশ গৌড় নামে সুপরিচিত ছিল। এই সমুদয় দেশের সীমা ও বিস্তৃতি সঠিক নির্ণয় করা যায় না, কারণ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তাহার বৃদ্ধি ও হ্রাস হইয়াছে।
মুসলমান যুগেই সর্বপ্রথম এই সমুদয় দেশে একত্রে বাংলা অথবা বাঙ্গালা এই নামে পরিচিত হয়। এই বাংলা হইতেই ইউরোপীয়গণের ‘বেঙ্গলা’ (Bengala) ও ‘বেঙ্গল’ (Bengal) নামে উৎপত্তি। মুঘল সাম্রাজ্যের যুগে ‘বাঙ্গালা’ চট্টগ্রাম হইতে গর্হি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আইন-ই-আকবরী প্রণেতা আবুল ফজল বলেন, “এই দেশের প্রাচীন নাম ছিল বঙ্গ। প্রাচীন কালে ইহার রাজারা ১০ গজ উচ্চ ও ২০ গজ বিস্তৃত প্রাকণ্ড ‘আল’ নির্মাণ করিতেন; কালে ইহা হইতেই ‘বাঙ্গাল’ এবং ‘বাঙ্গালা’ নামের উৎপত্তি।” এই অনুমান সত্য নহে। খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দী এবং সম্ভবত আরও প্রাচীন কাল হইতেই বঙ্গ ও বঙ্গাল দুইটি দেশ ছিল এবং অনেকগুলি শিলালিপিতে এই দুইটি দেশের একত্র উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। সুতরাং বঙ্গ দেশের নাম হইতে ‘আল’ যোগে অথবা অন্য কোন কারণে বঙ্গাল অথবা বাংলা নামের উদ্ভব হইয়াছে, ইহা স্বীকার করা যায় না। বঙ্গাল দেশের নাম হইতেই যে কালক্রমে সমগ্রদেশের বাংলা এই নামকরণ হইয়াছে, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। প্রাচীন বঙ্গাল দেশের সীমা নির্দেশ করা কঠিন, তবে এককালে দক্ষিণ ও পূর্ববঙ্গের তটভূমি যে ইহার অন্তর্ভুক্ত ছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। বর্তমান কালে পূর্ববঙ্গের অধিবাসীগণকে যে বাঙ্গাল নাম অভিহিত করা হয়, তাহা সেই প্রাচীন বঙ্গাল দেশের স্মৃতিই বহন করিয়া আসিতেছে।
অপেক্ষাকৃত আধুনিক যুগে গৌড় ও বঙ্গ এই দুইটি সমগ্র বাংলা দেশের সাধারণ নামস্বরূপ ব্যবহৃত হইয়াছে। কিন্তু হিন্দু যুগে ইহারা বাংলা দেশের অংশ-বিশেষকেই বুঝাইত, সমগ্র দেশের নামস্বরূপ ব্যবহৃত হয় নাই।
বাঙালীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়
অতি প্রাচীনকাল থেকেই নানা জাতির লোক নানা দিগ্দেশ হতে এসে ভারতের মহাক্ষেত্রে মিলিত ও মিশ্রিত হয়েছে। এই মিশ্রণ ও মিলনের ফলে ভারতের বিভিন্ন অংশের অধিবাসীদের নৃতাত্ত্বিক জ্ঞাতিত্ব নিরুপণ করা বর্তমানে সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। তা হলেও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের নৃতাত্ত্বিক জ্ঞাতিত্ব নিরুপণের একটা চেষ্টা আমরা এখানে করব।
নৃতাত্ত্বিক জ্ঞাতিত্ব নিরুপণের জন্য প্রধানতঃ তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করতে হয়—
১. প্রাচীনতম মানবের কঙ্কালাস্থি।
২. জাতি ও উপজাতি সম্পর্কে প্রাচীন সাহিত্য ও ঐতিহাসিক নজির।
৩. বর্তমানে দৃষ্ট জাতিগুলির নৃতত্ত্বমূলক বৈজ্ঞানিক পরিচয়।
স্যর আরথার কীথ তাঁর সুপ্রসিদ্ধ Antiquity of Man নামক গ্রন্থের প্রথম সংস্করণে বলেছিলেন—‘India is a part of the world from which the student of early man has expected so much and so far has obtained so little.’ (‘প্রাচীন মানুষের সম্বন্ধে যাঁরা অনুসন্ধান করেন, তাঁরা ভারতের দিকেই আশার দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন, কিন্তু এ পর্যন্ত তাঁদের নিরাশ হতে হয়েছে।’) স্যর আরথারের এই উক্তি এখন আর সম্পূর্ণ সত্য নয়। কারণ, এ বিষয়ে অনুসন্ধান এখন অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। এবং ভারতের কোথাও কোথাও প্রাচীন উপমানব ও মানবের কঙ্কালাস্থি পাওয়া গেছে। বাংলার নৃতাত্ত্বিক আলোচনার পূর্বে আমরা সে বিষয়ে পাঠকবর্গের কাছে সংক্ষেপে আলোচনা করব।
ভারতে যাঁরা প্রাচীন কঙ্কালাস্থির অনুসন্ধান করেছেন, তাঁদের মধ্যে বহির্ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অনুসন্ধান-প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য। আমেকার ইয়েলের ন্যাচারাল মিউজিয়ামের অধ্যাপক ডক্টর টেরের এ বিষয়ে অনুসন্ধান-প্রচেষ্টা সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। যদিও তাঁর প্রথম অভিযানে প্রাচীন যুগের প্রকৃত মানবের কঙ্কালাস্থি পাওয়া যায় নি, তথাপি মানবের বিবর্তনের কতকগুলি মূল্যবান সূত্র তিনি এখানে আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। এক কথায় বলতে গেলে মানবাস্থির সন্ধান না পেলেও, মানবের পূর্ববর্তী পুরুষদের অস্থিত সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন। উত্তর-পশ্চিম ভারতের পর্বতমালায় তিনি রামপিথেকাস, সুগ্রীবপিথেকাস, ব্রহ্মপিথেকাস প্রভৃতি নামধেয় নরাকার জীবগণের জীবাশ্মের সন্ধান পেয়েছিলেন। তাঁর এই আবিষ্কারগুলি নৃতত্ত্বের উপর নূতন আলোকপাত করে; কারণ তৎপূর্বে এই পর্যায়ের জীবগণের তথ্য অজ্ঞাত ছিল। ইয়েল অভিযানের সদস্য লুইস সাহেবের মতে এই জাতীয় জীবগুলি (higher primates) জগতের এই অঞ্চলেই প্রথম প্রাদুর্ভূত হয়েছিল। এদের চিবুকাস্থি ও দাম্ভিক সংস্থান অনেকটা মানবেরই কাছাকাছি। এ থেকে মনে হয় যে, মানবের বিবর্তন এই অঞ্চলেই ঘটেছিল।
কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডক্টর টেরা ভারতে তাঁর দ্বিতীয় অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু এই দ্বিতীয় অভিযানেও তিনি আদিম যুগের মানবের জীবাশ্ম পান নি। তথাপি এই প্রথম ও দ্বিতীয় অভিযানের একটা বিশেষত্ব হচ্ছে এই যে, এই অভিযানদ্বয়ে এই লক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষ বৎসরের পুরাতন ভূ-স্তর হতে তৎকালীন ভারতে মানব-বাসের প্রকৃষ্ট প্রমাণ মেলে। এ থেকে মনে হয় যে ভারতে আদিম মানবের জীবাশ্মের সন্ধান নিতান্ত বৃথা স্বপ্নবিলাসমাত্র নয়। জগতের অপরাপর অংশে ক্রমশ সে সন্ধান যেমন মিলছে, একদিন ভারতেও সেরূপ সন্ধান সফল হবে। দ্বিতীয় ইয়েল-কেম্ব্রিজ অভিযানের অন্যতম সদস্য ড্রামণ্ড সাহেব বলেন, প্রাগৈতিহাসিক মানব মধ্য-এশিয়ায় উদ্ভূত হয়েছে। এরূপ ধারণা করা হলেও, প্রাগৈতিহাসিক মানবের বিষয় আলোচনা করতে হলে, ভারতেও গবেষণা চালান আবশ্যক। সুদূর প্রাচীনতম যুগ হতে আদিম মানবের সন্ধান আজকে পাওয়া আদৌ বিচিত্র নয়।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, অনুরূপ নরাকার জীবের কঙ্কাল, আমরা এশিয়ার তিন জায়গা থেকে পেয়েছি। ভারতের উত্তর-পশ্চিম কেন্দ্রস্থ গিরিমালা ছাড়া, জাভা ও চীনদেশের চুংকিঙ-এ। এই তিনটি বিন্দু সরলরেখা দ্বারা সংবদ্ধ করলে যে ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়, বাঙলাদেশ তার কেন্দ্রস্থলে পড়ে। সুতরাং এরূপ জীবসমূল যে বাঙলা দেশের উপর দিয়েও যাতায়াত করত, সেরূপ অনুমান করা যেতে পারে।
জগতের অন্যত্র আদিম মানবের জীবাশ্মের সঙ্গে তার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের নিদর্শন (cultural relics) আবিষ্কৃত হয়েছে। ভারতে আদিম মানবের জীবাশ্ম পাওয়া না গেলেও তার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের নিদর্শন বহুল পরিমাণে পাওয়া গেছে, এবং এখনও পাওয়া যাচ্ছে। সুতরাং আদিম মানব যে ভারতে বহু বিস্তৃতভাবে বাস করত সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। বস্তুতঃ প্রত্ন-প্রস্তর যুগের নানা স্তরের আয়ুধ ও ব্যবহার্য বস্তুর নিদর্শন যেমন পশ্চিম ইওরোপ খণ্ডে পাওয়া যায়, তেমনই বঙ্গদেশ, মাদ্রাজ, গোদাবরী, নর্মদা ও কৃষ্ণার অববাহিকায়, মধ্য ভারতে, বর্তমান কর্ণাটক, ছোটনাগপুরে, বিহারের কোন কোন স্থানে, আসাম, পাঞ্জাবে ও সীমান্ত প্রদেশে পাওয়া গেছে। নবপলীয় যুগেরও নিদর্শন ভারতের নানা অঞ্চলে পাওয়া গেছে। মাত্র নবপলীয় যুগের ও তৎপরবর্তী যুগের (chalcolithic and megalithic ages) মানব জীবাশ্মই ভারতে আবিষ্কৃত হয়েছে। এই সকল জীবাশ্মের পরিচয় দেবার পূর্বে, আমাদের এখানে বিজ্ঞানসম্মত নৃতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য যে সকল পরিমাপ বা মাপজোকের প্রয়োজন হয়, তার একটা পরিচয় দেওয়া দরকার।
নব্য প্রস্তর যুগ – বাঙ্গালাদেশে আবিষ্কৃত নিদর্শন
লক্ষ লক্ষ বৎসর ধরিয়া পাষাণখণ্ড হইতে অস্ত্র নির্ম্মাণ করিয়া আদিম মানব, যে যুগে এই জাতীয় অস্ত্রনির্ম্মাণে পারদর্শী হইয়া উঠিল, সেই যুগের নাম নব্য-প্রস্তরযুগ। এই যুগে দূর হইতে অস্ত্র বর্ষণ করিবার উপায় আবিষ্কার করিয়া মানবজাতি জীবগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছিল। ধনুর সাহায্যে গুটিকা বা শর নিক্ষেপের কৌশল আবিষ্কার করিয়া, আদিম মানবগণ অযথা বলক্ষয় বা শোণিতস্রাব না করিয়াও শত্রু নিপাত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। নূতন শক্তিলাভ করিয়া তাঁহারা প্রাচীন জগতের অতিকায় দুর্জ্জেয়, হিংস্র জীবসমূহের ধ্বংসসাধন করিয়া পৃথিবী মানবের বাসোপযোগী করিয়াছিলেন; বস্তুতঃ এই যুগ হইতেই মানবের সভ্যতা আরদ্ধ হইয়াছে। নব্য-প্রস্তরযুগের আয়ুধসমূল, প্রত্ন-প্রস্তরযুগের তুলনায় সংখ্যায় অধিক, কলানৈপুণ্যের পরিচায়ক এবং আকারে ও প্রকারে বহুবিধ। বঙ্গদেশের যে প্রদেশে প্রত্ন-প্রস্তরযুগের অস্ত্র আবিষ্কৃত হইয়াছে, সে প্রদেশেই নব্য-প্রস্তরযুগের অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গিয়াছে। সর্ব্বপ্রথমে সিংহভূম জেলায় চাইবাসা নগরে নব্য-প্রস্তরযুগের অস্ত্র আবিষ্কৃত হইয়াছিল। ১৮৬৮ খৃষ্টাব্দে কাপ্তেন বীচিং (Captain Beeching) সিংহভূম জেলার চাইবাসা নগরে ও চক্রধরপুরের আট ক্রোশ দূরবর্ত্তী একটি নদীতীরে প্রস্তরনির্ম্মিত ছুরিকা আবিষ্কার করিয়াছিলেন । ভিন্সেন্ট্ বল্ এই সমস্ত স্থান পরীক্ষা করিয়া স্থির করেন যে, আবিষ্কৃত পাষাণখণ্ডগুলি মানব কর্ত্তৃক নির্ম্মিত ও ব্যবহৃত অস্ত্র ।
এই সময়ে বল্ ছোটনাগপুরের বুড়াণ্ডিহ গ্রামে একটু সুন্দর, সুগঠিত ছেদনাস্ত্র (celt) আবিষ্কার করিয়াছিলেন। ১৮৭৮ খৃষ্টাব্দে, তিনি পার্শ্বনাথপর্ব্বরের পাদমূলে আর একখান ছেননাস্ত্র আবিষ্কার করিয়াছিলেন । ১৮৮২ খৃষ্টাব্দে মানভূম জেলার বরাহভূম পরিগণায়, ধাদ্কা কয়লার খনির নিকটে দেওঘা গ্রামে একখানি কুঠারফলক আবিষ্কৃত হইয়াছিল । ১৮৮৬ খৃষ্টাব্দে চট্টগ্রামের নিকট সীতাকুণ্ডপর্ব্বতে অশ্মীভূত কাষ্ঠ (Petrified or fossilized wood) নিম্মিত একখানি কৃপাণ আবিষ্কৃত হইয়াছিল । ১৯৮৮ খৃষ্টাব্দে রাঁচি জেলায় শত শত প্রস্তর নির্ম্মিত অস্ত্র আবিষ্কৃত হইয়াছিল। এই স্থানে অস্ত্র তীক্ষ্ণ করিবার প্রস্তর (Polishing stone), গদাফলক (ring stone), কুঠার ফলক বা ছেদনাস্ত্র (Boucher or celt), ছুরিকা (flake), মুষল (grinder) আবিষ্কৃত হইয়াছিল । ১৯১০ খৃষ্টাব্দে হাজারীবাগের শ্রীযুক্ত নবীনচন্দ্র চক্রবর্ত্তী মহাশয় পার্শ্বনাথপর্ব্বতের নিকটে ও হাজারীবাগের অন্যান্য স্থানে পাঁচটি নব্য-প্রস্তরযুগের অস্ত্র আবিষ্কার করিয়াছিলেন ।
সম্প্রতি প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক, শ্রীযুক্ত হেমচন্দ্র দাশগুপ্ত এম্ এ, আসামে আবিষ্কৃত নূতন প্রকারের দুইটি কুঠারফলকের বিবরণ প্রকাশ করিয়াছেন । ভিন্সেন্ট্ বল্ ১৮৭৫ খৃষ্টাব্দে, সিংহভূম জেলার ধলভূম পরগণায় এই জাতীয় কুঠারফলক আবিষ্কার করিয়াছিলেন । সম্প্রতি শ্রীযুক্ত কগিন্ ব্রাউন আসামে এক নূতন ধরণের মুষলের (Grooved hammer) বিবরণ প্রকাশ করিয়াছেন ।
নব্য-প্রস্তর যুগে আদিম মানবগণ ধাতের ব্যবহার জানিতেন না। ধাতু আবিষ্কৃত হইলে, মানবগণ যখন জানিতে পারিলেন যে, ধাতুর অস্ত্র পাষাণনির্ম্মিত অস্ত্রাপেক্ষা তীক্ষ্ণধার, তখন তাঁহারা ক্রমশঃ শিলানির্ম্মিত আয়ুধ পরিত্যাগ করিয়া ধাতুনির্ম্মিত অস্ত্র ব্যবহার করিতে আরম্ভ করিলেন। সুধীগণ অনুমান করেন যে, আদিম মানবগণ সুবর্ণের সৌন্দর্য্যে আকৃষ্ট হইয়া সর্ব্বপ্রথমে এই ধাতু সংগ্রহ করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। সুবর্ণের পরে তাম্র আবিষ্কৃত হইয়াছিল। মানবজাতির সর্ব্বপ্রাচীন ধাতব অস্ত্রসমূহ তাম্রনির্ম্মিত। তাম্রনির্ম্মিত তীক্ষ্ণধার, কিন্তু সুকঠিন নহে। টিন্ আবিষ্কৃত হইবার পরে, তাম্রনির্ম্মিত দ্রব্যাদি কঠিন করিবার জন্য নয়ভাগ তাম্রের সহিত একভাগ টিন্ মিশ্রিত হইত, এই মিশ্রধাতুর নাম ব্রঞ্জ। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ইতিহাসে নব্য প্রস্তরের যুগের পরবর্ত্তিকালকে তাম্রের যুগ (Copper age) আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। তাম্রের যুগের শেষভাগের নাম ব্রঞ্জের যুগ। উত্তরাপথে বা দক্ষিণাপথে অদ্যাবধি এই নূতন মিশ্রধাতু-নির্ম্মিত কোন অস্ত্র আবিষ্কৃত হয় নাই এবং এই জন্য পণ্ডিতগণ অনুমান করিয়া থাকেন যে, ভারতবাসী আদিম মানবগণ মিশ্রধাতুর ব্যবহার জানিতেন না। নব্য-প্রস্তরের যুগ ও তাম্রের যুগে, এমন কি লৌহের যুগে (Iron age) পর্য্যন্ত শিলানির্ম্মিত অস্ত্রের ব্যবহার দেখিতে পাওয়া যায় ।
ভারববর্ষের নানা স্থানে নানাবিধ তাম্রনির্ম্মিত অস্ত্রশস্ত্র আবিষ্কৃত হইয়াছে। তাম্রনির্ম্মিত কুঠার বা পরশু, তরবারি, ছুরিকা বা কৃপাণ, ভল্ল বা বর্ষার শীর্ষ বক্রদন্তযুক্ত ভল্ল (Harpoon) এবং নানাবিধ ছেদনাস্ত্র আবিষ্কৃত হইয়াছে। কলিকাতা মিউজিয়ামে কাণপুরের নিকটস্থিত বিঠুর, আগ্রার নিকটস্থিত মৈনপুরী, ফরক্কাবাদের নিকটস্থিত ফতেপুর এবং মধ্যপ্রদেশের বালাঘাট জেলায় অবস্থিত গঙ্গেরিয়া প্রভৃতি নানা স্থানের নানাবিধ তাম্রনির্ম্মিত অস্ত্র আছে। বাঙ্গালা দেশে মাত্র তিন স্থানের তাম্রনির্ম্মিত অস্ত্র আবিষ্কৃত হইয়াছে। ১৮৭১ খৃষ্টাব্দে হাজারীবাগ জেলার পচম্বা মহকুমার একটি গিরিশীর্ষে কতকগুলি অসম্পূর্ণ কুঠার বা পরশুফলক আবিষ্কৃত হইয়াছিল । ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে, মেদিনীপুর জেলার পশ্চিমাংশে ঝাটিবনি পরগণায় তামাজুরী গ্রামে একখানি কুঠারফলক আবিষ্কৃত হইয়াছিল । ত্রিশ বৎসরের অধিককাল পূর্ব্বে ডাঃ সইস্ (Dr. Saise) বারাগুণ্ডা তামার খনির নিকটে বহু তাম্রনির্ম্মিত অলঙ্কার ও অস্ত্র আবিষ্কার করিয়াছিলেন; ইহার মধ্যে একখানি বৃহৎ কুঠার বা পরশুফলক এবং একখানি কঙ্কণ মাদ্রাজের চিত্রশালায় আছে।
বাঙ্গালাদেশে প্রত্ন-প্রস্তরযুগে যে কয়টি শিলানির্ম্মিত অস্ত্র আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহার সকলগুলিই দেশের ভিন্ন ভিন্ন সীমান্তে পাওয়া গিয়াছে। বাঙ্গালা দেশ পলিমাটীর দেশ; ভারতবর্ষের অন্যান্য দেশের তুলনায় ইহা বয়সে নবীন। কিন্তু এই নবীন দেশের উত্তর, দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব্ব সীমান্তে অতি প্রাচীন ভূমি আছে; এই সকল প্রদেশেই বাঙ্গালাদেশের প্রত্ন-প্রস্তরযুগের পাষাণনির্ম্মিত আয়ুধ আবিষ্কৃত হইয়াছে। দক্ষিণ-পূর্ব্বসীমান্তে, চট্টগ্রামের পার্ব্বত্য-প্রদেশে, যে সমস্ত অস্ত্র আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহা আকারে প্রত্ন-প্রস্তরযুগের ন্যায় হইলেও, ভূতত্ত্ববিদ পণ্ডিতগণের মতানুসারে অপেক্ষাকৃত আধুনিক। আর্য্যাবর্ত্তের উত্তর-সীমান্তে হিমালয়ের পাদমূলে ও পার্ব্বত্য উপত্যকা সমূহে, আদিম মানবের বাসের কোন চিহ্নই অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয় নাই। বঙ্গদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তস্থিত পার্ব্বত্যপ্রদেশে দুইটি মাত্র প্রত্ন-প্রস্তরযুগের শিলানির্ম্মিত আয়ুধ আয়ুধ অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত এই জাতীয় আর একটি অস্ত্র প্রায় পঞ্চাশৎ বৎসর পূর্ব্বে বঙ্গদেশের সমতলক্ষেত্রে আবিষ্কৃত হইয়াছিল। ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে ভূতত্ত্ববিদ বল্ হুগলী-জেলার গোবিন্দপুর গ্রামের এগার মেইল দক্ষিণ-পশ্চিমে কুণ্কুণে গ্রামে একটি হরিতাভ প্রস্তরনির্ম্মিত কুঠারফলক (Boucher or celt) আবিষ্কার করিয়াছিলেন। এই সময়ে রাণীগঞ্জের নিকটা বোথারোর কয়লার খনিতে এই জাতীয় আর একটু কুঠারফলক আবিষ্কৃত হইয়াছিল । ইহার দুই বৎসর পরে সীতারামপুরের নিকটবর্ত্তী ঝরিয়ার কয়লার খনিতে আর একটি কুঠারফলক আবিষ্কৃত হইয়াছিল, ইহাই এখন কলিকাতা মিউজিয়ামে দেখিতে পাওয়া যায় । পূর্ব্বোক্ত অস্ত্রদ্বয় বোধ হয় ইংলণ্ডে প্রেরিত হইয়াছে। প্রত্ন-প্রস্তরযুগের এই তিনটি প্রহরণ ব্যতীত উত্তরাপথের পূর্ব্বখণ্ডে আর চারিটি মাত্র শিলানির্ম্মিত প্রাচীন অস্ত্র আবিষ্কৃত হইয়াছে। এই চারিটি অস্ত্র উড়িষ্যা-প্রদেশের ঢেঁকানাল, আঙ্গুল, তালচের ও সম্বলপুরে আবিষ্কৃত হইয়াছিল। সুবিখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ পণ্ডিত ভিন্সেন্ট্ বল্ মাদ্রাজে আবিষ্কৃত প্রত্ন-প্রস্তরযুগের অস্ত্রসমূহের সহিত বঙ্গদেশের ও উড়িষ্যারেই যুগের নিদর্শনসমূহের তুলনা করিয়া দেখাইয়াছেন যে, এই উভয় প্রদেশের প্রাচীন শিলানির্ম্মিত প্রহরণের মধ্যে বিশেষ সাদৃশ্য আছে। ইহা হইতে তিনি অনুমান করেন যে, দক্ষিণাপথবাসী আদিম মানবগণের সহিত উত্তরাপথবাসী প্রাচীন মানবজাতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মাদ্রাজে ও বাঙ্গালায় আবিষ্কৃত প্রত্ন-প্রস্তরযুগের অস্ত্রসমূহের সাদৃশ্য কেবল আকারগত নহে, অনেক সময়ে উভয় দেশে আবিষ্কৃত অস্ত্রের পাষাণ একই জাতীয়। যে স্থানে এই জাতীয় প্রস্তর পাওয়া যায়, সে স্থান বাঙ্গালাদেশ হইতে শত শত ক্রোশ দূরে অবস্থিত। ভিন্সেন্ট্ বল্ অনুমান করেন যে আদিম মানবগণ প্রত্ন-প্রস্তরযুগে এই সকল প্রাচীন অস্ত্র দক্ষিণাপথ হইতে উত্তরাপথের পূর্ব্বখণ্ডে আনয়ন করিয়াছিলেন।
জাতি ও দেশবাচক বঙ্গনামের উৎপত্তি
বঙ্গ জাতি হইতে দেশবাচক বঙ্গ নামের উৎপত্তি। বঙ্গ জাতি তথা বঙ্গ শব্দের প্রাচীনতম উল্লেখ রহিয়াছে ঐতরেয় আরণ্যক সেখানে বলা হইয়াছে যে, তিনটি জাতি নষ্ট হইয়া গিয়াছিল, এবং এই তিন জাতি হইতেছে পক্ষী, অর্থাৎ পক্ষিসদৃশ যাযাবর (মতান্তরে পক্ষীর ন্যায় অব্যক্তভাষী, অথবা পক্ষীর “টোটেম” অর্থাৎ আদিপুরুষরূপে কল্পিত পক্ষিবিশেষের চিহ্নধারী)—বঙ্গ, বগধ এবং চেরপাদ।
প্রজা হ তিস্রঃ অত্যায়মীয়ুরিতি যা বৈ তা ইমাঃ প্রজা স্তিস্রঃ অত্যায়মায়ং স্তানীমানি বয়াংসি বঙ্গা বগধাশ্চেরপাদাঃ।
ক্রমশ পূর্ব্বদিকে হটিতে হটিতে এই যাযাবর বঙ্গ জাতি এখন যে স্থানকে পূর্ব্ববঙ্গ বলা হয় তথায় বাস করিতে থাকে, তাহা হইতেই পূর্ব্ববঙ্গের প্রাচীন নাম হয় বঙ্গ। বর্ত্তমান কালে এই নাম সমগ্র বাঙ্গালাদেশ বুঝাইতে প্রযুক্ত হয়, কিন্তু কিছুকাল পূর্ব্বেও শুধু পূর্ব্ববঙ্গ বুঝাইতেই বঙ্গ শব্দের চল ছিল। মেয়েলী ছড়ায় বলে—“তুমি যাও বঙ্গে কপাল যায় সঙ্গে।” ১৮৬০ সালের দিকে মধুসূদন লিখিয়াছিলেন—“অলীক কুনাট্যরঙ্গে মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে।”
রাঢ় ও সুহ্ম জাতির নাম হইতে পশ্চিমবঙ্গের নাম হয় রাঢ় ও সুহ্ম দেশ। রাঢ় ও সুহ্ম (প্রাকৃতে “সুব্ত”) দেশের সর্ব্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় জৈনদিগের আয়ারঙ্গ-সুত্ত বা আচারাঙ্গ-সূত্রে। ইহাতে এই দেশের শয়ন, আসন, ভোজন ও আচরণের নিন্দা করা হইয়াছে। ইহা হইতে আরও জানিতে পারি যে, জৈন শ্রমণদিগের প্রতি রাঢ়-সুহ্মের লোকেরা মোটেই প্রসন্ন ছিল না।
বঙ্গ, রাঢ় ও সুহ্ম জাতি আর্য্যেতর ছিল বলিয়াই মনে হয়; অন্ততপক্ষে ইহারা যে আর্য্য ছিল, এমন কোন প্রমাণ নাই।
বাঙ্গালাদেশে আর্য্যদিগের উপনিবেশ প্রথম স্থাপিত হয় বরেন্দ্র ভূমিতে এবং রাঢ়ের কোন কোন অঞ্চলে, বিশেষ করিয়া ভাগীরথী ও দামোদরের তীরভূমিতে। বরেন্দ্রী বা বরেন্দ্র ভূমির প্রাচীন নাম পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্দ্ধন। এই স্থানের অধিবাসী (?) পুণ্ড্রদিগের উল্লেখ ঐতরেয় ব্রাহ্মণে (৭-১৮) পাওয়া যাইতেছে। এখানে অন্ধ্র, পুলিন্দ, শবর প্রভৃতি ব্রাত্য বা অন্ত্যজ দস্যুভূমিষ্ঠ জাতিদিগের মধ্যে পুণ্ড্রগণের নাম করা হইয়াছে।
এখনও পুঁড় বা পুঁড়ো নামে জাতি এই ব্রাত্য পুণ্ড্রদিগের স্মৃতি জাগাইয়া রাখিয়াছে। বোধ হয় এই পুণ্ড্রজাতি আখের চাষে বিশেষ দক্ষ ছিল, এবং ইহাদের নাম হইতেই আখের নাম হইয়াছে পুঁড় এবং এক জাতীয় দেশী আখের নাম পুড়ী। অথবা এমনও হইতে পারে যে “পুণ্ড্র” ইক্ষুর প্রতিশব্দ ছিল, পরে যাহারা আখের চাষ করিত তাহারা পুণ্ড্র নামে পরিচিত হয়। বরেন্দ্র ভূমির নামান্তর গৌড়। ইহা যদি গুড় শব্দজাত হয় তাহা হইলে এখানেও আখ-চাষের ইঙ্গিত পাওয়া যাইতেছে; কিন্তু শব্দটি বোধ হয় গোণ্ড-জাতির নামের প্রাচীন রূপ হইতে আসিয়াছে। পাণিনি তাঁহার ব্যাকরণের একটু সূত্রে এই গৌড় দেশস্থিত গৌড়পুরের উল্লেখ করিয়াছেন বলিয়া অনেকে অনুমান করেন—“অরিষ্টগৌড়পূর্ব্বে চ” (৬-২০-১০০)—অর্থাৎ অরিষ্ট ও গৌড় শব্দকে পূর্ব্বপদ করিয়া পুব শব্দের সমাস হইলে পূর্ব্বপদ অন্ত্যোদাত্ত হইবে। কিন্তু এই গৌড়পুর যে পূর্ব্বভারতে অবস্থিত ছিল না, তাহা ইহার অব্যবহিত পূর্ব্ববর্ত্তী সূত্র হইতে যানা যাইতেছে—“পুরে প্রাচাম্”, অর্থাৎ প্রাচ্যদেশে (অথবা, প্রাচ্যদেশীয় বৈয়াকরণদিগের মতে) পুর শব্দ পরে রাখিয়া সমাস করিলে পূর্ব্বপদ অন্ত্যোদাত্ত হইবে। “অরিষ্টগৌড়পূর্ব্বে চ” সূত্রটি “পুরে প্রাচাম” সূত্রের অপবাদ। সুতরাং এই গৌড়পুর পূর্ব্বদেশে অবস্থিত ছিল না নিশ্চয়ই। আরও একটি কথা, যখন স্বরের ব্যবস্থা রহিয়াছে তখন গৌড়পুর বৈদিক যুগের নগর ধরিতে হইবে, এবং এই স্থানের সহিত উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের আয্যেরা বিশেষ পরিচিত ছিলেন তাহাও স্বীকার করিতে হইবে। তাহা হইলে স্থানকে পূর্ব্বভারতে টানিয়া আনা সঙ্গত হয় না।
গৌড় শব্দ সাধারণতঃ বরেন্দ্রভূমিকে বুঝাইলেও অনেক সময় রাঢ় ও সুহ্ম ভূমির সহিত বরেন্দ্রভূমিকে অর্থাৎ পূর্ব্ববঙ্গ বাদ দিয়া সমগ্র বাঙ্গালাদেশকে বুঝাইত।
গ্রাম-দেবতা
অনেকে নিশ্চয়ই জানেন, বাঙলার পাড়াগাঁয়ে সর্বত্রই গ্রামের বাহিরে জনপদসীমার বাহিরে ‘থান’ বা ‘স্থান’ বলিয়া একটা জায়গা নির্দিষ্ট থাকে; কোথাও কোথাও এই ‘থান’ উন্মুক্ত আকাশের নীচে বা গাছের ছায়ায়; কোথাও কোথাও গ্রামবাসীরা তাহার উপর একটা আচ্ছাদনও দেয়। এই ‘থান’ বা স্থানে— সংস্কৃতরূপে দেবস্থান বা দেওথান— মূর্তিরূপী কোনও দেবতা অধিষ্ঠিত কোথাও থাকেন, কোথাও থাকেন না, কিন্তু থাকুন বা না-ই থাকুন, সর্বত্রই তিনি পশু ও পক্ষী বলি গ্রহণ করিয়া থাকেন। গ্রামবাসীরা তাহার নামে ‘মানৎ’ করিয়া থাকেন, তাঁহাকে ভয়ভক্তি করেন এবং যথারীতি তাঁহাকে তুষ্ট রাখার চেষ্টাও করেন সকলেই, কিন্তু লক্ষণীয় এই যে, গ্রামের ভিতর বা লোকালয়ে তাঁহার কোনও স্থান নাই।
‘গ্রাম-দেবতা’ সর্বত্র একই নামে বা একই রূপে পরিচিত নহেন; সাম্প্রতিক বাঙলায় কোথাও তিনি কালী, কোথাও ভৈরব বা ভৈরবী, কোথাও বনদুর্গা বা চণ্ডী, কোথা বা অন্য কোনও স্থানীয় নামে পরিচিত। কিন্তু যে নামেই পরিচিত তিনি হউন, পুরুষ বা প্রকৃতি-তন্ত্রেরই হউন, সংশয় নাই যে, সর্বত্রই তিনি প্রাক্-আর্য আদিম গ্রামগোষ্ঠীর ভয়-ভক্তির দেবতা। আদিবাসীদের এই সব গ্রাম্য দেবতাদের প্রতি আর্য-ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি খুব শ্রদ্ধিতচিত্ত ছিল না।
ব্রাহ্মণ্য বিধানে গ্রাম্য দেবতার পূজা নিষিদ্ধ; মনু তো বারবার এই সব দেবতার পূজারীদের পতিতই বলিয়াছেন। কিন্তু কোনও বিধান, কোনও বিধিনিষেধই ইঁহাদের পূজা ঠেকাইয়া রাখিতে আজও পারে না, আগেও পারে নাই। ইঁহাদের কেহ কেহ ক্রমশ ধীরে ধীরে ব্রাহ্মণ্য সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত হইয়া ব্রাহ্মণ্য ধর্মকর্মে ঢুকিয়া পড়িয়াছেন, এমনও বিচিত্র নয়। শীতলা, মনসা, বনদুর্গা, ষষ্ঠী, নানাপ্রকারের চণ্ডী, নরমুণ্ডমালিনী শ্মশানচারী কালী, শ্মশানচারী শিব, পর্ণশবরী, জাঙ্গুলী প্রভৃতি অনার্য গ্রাম্য দেবদেবীরা এইভাবেই ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ ধর্মকর্মে স্বীকৃতি লাভ করিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয়; দুই চারি ক্ষেত্রে তাহার কিছু কিছু প্রমাণও পাওয়া যায়। পরে তাহা বলিতেছি।
প্রাচীন ভারতবর্ষের ধর্মকর্মানুষ্ঠানের সঙ্গে যাঁহারা পরিচিত তাঁহারা জানেন, গরুড়ধ্বজা, মীনধ্বজা, ইন্দ্রধ্বজা, ময়ূরধ্বজা, কপিধ্বজা প্রভৃতি নানাপ্রকারের ধ্বজাপূজা ও উৎসব এক সময় আমাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। প্রাচীন বাঙলাদেশেও তাহার ব্যতিক্রম ছিল না; ঐতিহাসিক প্রমাণও কিছু কিছু আছে।
শত্রুধ্বজা বা ইন্দ্রধ্বজের পূজা যে একাদশ শতকের আগে প্রচলিত ছিল তাহার প্রমাণ তো গোবর্ধন আচার্যই রাখিয়া গিয়াছেন। শত্রোত্থান বা শত্রুধ্বজা পূজার কথা জীমূতবাহনের কালবিবেক-গ্রন্থেও পাওয়া যায়। তাহা ছাড়া, তাম্রধ্বজ, ময়ূরধ্বজ, হংসধ্বজ প্রভৃতি নাম প্রাচীন কালের রাজ-রাজড়ার ভিতর একেবারে অপ্রতুল নয়।
এক এক কোম বা গোষ্ঠীর এক এক পশু বা পক্ষীলাঞ্ছিত ধ্বজা; সেই ধ্বজার পূজাই বিশেষ গোষ্ঠীর বিশিষ্ট কোমগত পূজা এবং তাহাই তাঁহাদের পরিচয়; সেই কোমের যিনি নায়ক বিশেষ বিশেষ লাঞ্ছন অনুযায়ী তাঁহার নাম তাম্রধ্ব, ময়ূরধ্বজ, বা হংসধ্বজ। এই ধরনের পশু বা পক্ষীলাঞ্ছিত পতাকার পূজা আদিম পশুপক্ষী হইতে উদ্ভূতল বহু পরবর্তী ব্রাহ্মণ্য পৌরাণিক দেবদেবীর রূপকল্পনায় তাহা পরিত্যাগ করা সম্ভব হয় নাই। প্রমাণ, আমাদের বিভিন্ন দেবদেবীর বাহন, দেবীর বাহন সিংহ, কার্তিকের বাহন ময়ূর, বিষ্ণুর বাহন গরুড়, শিবের বাহন নন্দী, লক্ষ্মীর বাহন পেঁচক, সরস্বতীর বাহন হংস, ব্রহ্মার বাহন হংস, গঙ্গার বাহন মকর, যমুনার বাহন কূর্ম, সমস্তই সেই আদিম পশুপক্ষী পূজার অবশেষ।
আদিম কোমগত পূজার উপর ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীর সঙ্গে এই সব পশুপক্ষীরাও আজও আমাদের পূজা লাভ করে সন্দেহ কী? দেবদেবীর মূর্তিপূজার সঙ্গে এই সব ধ্বজাপূজার প্রচলন সুপ্রাচীন। দেবী বা মন্দিরের সম্মুখে স্তম্ভের উপর বা মন্দিরের চূড়ায় উড্ডীয়মান ধ্বজা বা কেতনের পূজা খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতক বেশনগরের (মান্দাশোর, মধ্যভারত) সেই গরুড়ধ্বজ, তালধ্বজ, মকরকেতন প্রভৃতির পূজা হইতে আরম্ভ করিয়া আজিকার চড়কপূজা, ধর্মপূজা, অশ্বত্থ ও অন্যান্য বৃক্ষপূজা পর্যন্ত সর্বত্রই বর্তমান। সাঁওতাল, মুণ্ডা, খাসিয়া, রাজবংশী, গারো প্রভৃতি আদিবাসী কোম এবং বাঙালীর তথাকথিত অন্ত্যজ বা নিম্নস্তরের জনসাধারণের মধ্যে কোনও ধর্মকর্ম ধ্বজা এবং ধ্বজাপূজা ছাড়া অনুষ্ঠিতই হয় না প্রায় বলা চলে। সমস্ত উত্তর ও দক্ষিণ-ভারত জুড়িয়া ধর্মস্থান বা ‘থানে’র সঙ্গে ধ্বজা এবং ধ্বজাপূজার সম্বন্ধ অবিচ্ছেদ্য।
গাছপূজা, নানা প্রকারের মাতৃতন্ত্রীয় দেবীর পূজা, ক্ষেত্রপালের পূজা, নানা লৌকিক দেবতা-উপদেবতার পূজার কথা আগেই বলিয়াছি। গ্রামের উপান্তে বসতির বাহিরে যে-সব জায়গায় এই সব অনুষ্ঠান হইত এবং এখনও হয় সে সব পূজাস্থানকে আশ্রয় করিয়া বাঙলার নানাজায়গায় নানা-তীর্থস্থান গড়িয়া উঠিয়াছে। এই ধরনের গাছ বা অন্যান্য গ্রাম্য লৌকিক দেবদেবীর পূজার কিছু কিছু বিবরণ বাঙালীর প্রাচীনতম সাহিত্যে বিবৃত হইয়া আছে। বটগাছের পূজা সম্বন্ধে কবি গোবর্ধন-আচার্যের একটি শ্লোক আছে:
হে কুগ্রামের বটগাছ, তোমার মধ্যে বৈশ্রবণের (কুবের) অথবা লক্ষ্মীর অধিষ্ঠান থাকুক বা না থাকুক, মূর্খ গ্রাম্য লোকের কুঠারাঘাত হইতে তোমাকে রক্ষা করে শুধু মহিষের শৃঙ্গ তাড়না।
সদুক্তিকর্ণামৃতের একটি শ্লোকে গ্রাম্য লৌকিক দেবদেবী পূজার একটি ভালো বিবরণ পাওয়া যায়।
তৈস্তৈর্জীরোপহারৈগিরি কুহরশিলা সংশ্রয়ামর্চয়িত্বা।
দেবীং কান্তারদুর্গাং রুধিরমুপতরু ক্ষেত্রপালায় দত্বা।
তুম্বীবীণা বিনোদ ব্যবহৃত সরকামহ্নি জীর্ণে পুরাণীং
হালাং মালুরকৌষের্যুবতি সহচরা বর্বরাঃ শীলয়ন্তি।।
বর্বর [গ্রাম্যলোকেরা] নানা জীববলি দিয়া পাথরের পূজা করে, রক্ত দিয়া কান্তারদুর্গার পূজা করে, গাছতলায় ক্ষেত্রপালের পূজা করে, এবং দিনের শেষে তাহাদের যুবতী সহচরীদের লইয়া তুম্বীবীণা বাজাইয়া নাচগান করিতে বেলের খোলায় মদ্যপান করিয়া আনন্দে মত্ত হয়।
কৃষিকর্ম সংক্রান্ত নানাপ্রকার দেবদেবীর পূজার কথাও আগেই বলিয়াছি। আখমাড়াই ঘরের (বা যন্ত্রের?) যিনি ছিলেন দেবতা তিনি পণ্ডাসুর (পুণ্ড্রাসুর) নামে খ্যাত, আর পুণ্ড্র বা পুঁড় যে একপ্রকারের আখ তাহা তো অন্য প্রসঙ্গে একাধিকবার বলিয়াছি। উত্তর ও পশ্চিম-বঙ্গে এই পণ্ডাসুরের পূজা এখনও প্রচলিত; সেখানে তিনি পড়াসর (সংস্কৃতিকরণ পরাশর) নামে খ্যাত। এর পূজার অর্বাচীন একটি মন্ত্র এইরূপ :
পণ্ডাসুর ইহাগচ্ছ ক্ষেত্রপাল শুভপ্রদ।
পাহি মামিক্ষুযত্রৈস্ত্বং তুভ্যং নিত্যং নিত্যং নমো নমঃ।।
পণ্ডাসুর নমস্তুভ্যামিক্ষুবাটি নিবাসিনে।
যজমান হিতার্থাং গুড়বৃদ্ধিপ্রদায়িনো।।
যাত্রা (রথযাত্রা, স্নানযাত্রা, দোলযাত্রা প্রভৃতি)
ধ্বজা বা কেতনপূজার মত নানাপ্রকারের যাত্রাও বাঙলার আদিবাসী কোমগুলির অন্যতম প্রধান উৎসব বলিয়া গণ্য করা হইত। রথযাত্রা, স্নানযাত্রা, দোলযাত্রা প্রভৃতি ধর্মোৎসব মূলত তাঁহাদেরই; পরে ক্রমশ ইহাদের আর্যীকরণ নিষ্পন্ন হইয়াছে। লৌকিক ধর্মোৎসবে এই ধরনের যাত্রা বা সচল নৃত্যগীতসহ সামাজিক ধর্মানুষ্ঠানের বিবরণ কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র ও প্রাচীন বৌদ্ধ সংযুত্তনিকায়-গ্রন্থে জানা যায়।
আর্য ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ উচ্চকোটির লোকেরা বোধ হয় এই ধরনের সমাজোৎসব ও যাত্রা খুব পছন্দ করিতেন না; সেই জন্যই সম্রাট অশোক সমাজোৎসবের বিরুদ্ধে অনুশাসন প্রচার করিয়াছিলেন। কিন্তু কোনও রাজকীয় অনুশাসনই লোকায়েত ধর্মের এই লৌকিক প্রকাশকে চাপিয়া রাখিতে পারে নাই; জনসাধারণের ধর্মোৎসব ক্রমশ বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য সমাজে স্বীকৃতি লাভ করিয়াছিল, এবং তাহারই ফলে রথযাত্রা, স্নানযাত্রা, দোলযাত্রা প্রভৃতি ধর্মোৎসবের প্রচলন আজও অব্যাহত। প্রাচীন বাঙলাদেশে প্রচলিত স্নানযাত্রাগুলির মধ্যে অগস্ত্যর্ঘ্যযাত্রা (দশহরার স্নান), অষ্টমী স্নানযাত্রা, মাঘীসপ্তমী স্নানযাত্রা প্রভৃতির কথা কালবিবেক-গ্রন্থে জানা যায়।
ধর্মপূজা সম্বন্ধে যাহা সত্য নীল বা চড়কপূজা সম্বন্ধেও তাহাই। এই চড়কপূজা এখন শিবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে জড়িত। জলভরা একটি পাত্রে প্রতিষ্ঠিত যে-প্রতীকটি এই পূজার কেন্দ্র সেই প্রতীক শিবলিঙ্গ এবং ইহাই পূজারীর নিকট ‘বুড়া শিব’ নামে আখ্যাত। এই পূজার পুরোহিত সাধারণত আচার্য-ব্রাহ্মণ বা গ্রহবিপ্র এবং গ্রহবিপ্রেরা যে ব্রাহ্মণ্যস্মৃতি অনুযায়ী পতিত-ব্রাহ্মণ, এ-তথ্য সর্বজনবিদিত।
কুমিরের পূজা, জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর ছোলা কাঁটা ও ছুরির উপর ঝম্প, বাণফোঁড়া, শিবের বিবাহ ও অগ্নিনৃত্য, চড়কগাছ হইতে দোলা এবং দানো (ভূত) বারাণো বা হাজরা পূজা চড়কপূজার বিশেষ বিশেষ অঙ্গ। এই শেষোক্ত ‘দানো বারাণো’ বা ‘হাজরা পূজা’র স্থান সাধারণত শ্মশানে এবং এই অনুষ্ঠানটির সঙ্গেই পোড়া শোল মাছ এবং তাহার পুনর্জন্মের কাহিনী (মহাভারতের শ্রীবৎসরাজার উপাখ্যান তুলনীয়), চড়কের সং (কলিতাকার জেলেপাড়ার সং তুলনীয়) প্রভৃতি জড়িত। চড়ক-পূজার পূজারীরা আজও আমাদের সমাজে সাধারণত জল অনাচরণীয় স্তরের।
সামাজিক জনতত্বের দৃষ্টিতে ধর্ম ও চড়ক-পূজা দুইই আদিম কোম সমাজের ভূতবাদ ও পুনর্জন্মবাদ বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত; প্রত্যেক কোমের মৃত ব্যক্তিদের পুনর্জন্মের কামনাতেই এই দুই পূজার বাৎসরিক অনুষ্ঠান। তাহা ছাড়া বাণফোঁড়া এবং দৈহিক যন্ত্রণা-গ্রহণ বা রক্তপাত উদ্দেশ্যে যে-সব অনুষ্ঠান চড়ক-পূজার সঙ্গে জড়িত তাহার মূলে সুপ্রাচীন কোম সমাজের নরবলি প্রথার স্মৃতি বিদ্যমান, এ-সম্বন্ধেও সন্দেহের অবকাশ কম। ধর্মপূজার মূলেও তাহাই; এ ক্ষেত্রেও যে অজশিশুটিকে ধর্মের উদ্দেশ্যে বলিপ্রদান করা হয়, সে-টি প্রাচীন নরবলিরই আর্য-ব্রাহ্মণ্য রূপান্তর।
রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণ-গ্রন্থের সাক্ষ্য প্রামাণিক হইলে স্বীকার করিতে হয়, ধর্মপূজার প্রচলন সেন-আমলে, তুর্কী-বিজয়ের আগেই দেখা দিয়াছিল।
ধর্মপূজা ও চড়কের সঙ্গে একই পর্যায়ভুক্ত আমাদের হোলী বা হোলক উৎসব। এই উৎসবটি উত্তর ভারতের সর্বত্র যেমন বাঙলাদেশেও তেমনই সুপ্রচলিত এবং সুআদৃত। হোলাক বা হোলক উৎসবের কথা জীমূতবাহনের দায়ভাগ-গ্রন্থে আছে; দ্বাদশ শতকের আগেই যে এই উৎসব বাঙলাদেশে প্রচলিত হইয়াছিল ইহার তাহার প্রমাণ।
এই হোলী উৎসবের বিবর্তন লক্ষণীয়। বাঙলাদেশের ফাল্গুনী শুক্লাচতুর্দশী ও পূর্ণিমা তিথিতে হোলীর সঙ্গে যে-সব আচারানুষ্ঠান জড়িত সংস্কৃতিগত জনতত্ত্বের দিক হইতে তাহার কিছু কিছু আলোচনা-গবেষণা হইয়াছে; ভারতের অন্যত্র যে-সব জায়গায় হোলীর প্রচলন তাহাও এই আলোচনায় অন্তর্ভূক্ত হইয়াছে।
এ-তথ্য এখন অনেকটা পরিষ্কার যে, আদিতে হোলী ছিল কৃষিসমাজের পূজা; সুশস্য উৎপাদন-কামনায় নরবলি ও যৌনলীলাময় নৃত্যগীত উৎসব ছিল তাহার প্রধান অঙ্গ। তারপরের স্তরে কোনও সময় নরবলির স্থান হইল পশুবলি এবং হোমযজ্ঞ ইহার অঙ্গীভূত হইল। কিন্তু হোলীর সঙ্গে প্রধানত যে উৎসববানুষ্ঠনের যোগ তাহা বসন্ত বা মদন বা কামোৎসবের, রাধাকৃষ্ণ-ঝুলনের এবং কোথাও কোথাও মূর্খতম এক রাজাকে লইয়া নানাপ্রকারের ছল-চাতুরী ও তামাসার।
তৃতীয়-চতুর্থ শতক হইতে আরম্ভ করিয়া ষোড়শ শতক পর্যন্ত উত্তর-ভারতের সর্বত্রই বসন্ত বা মদন বা কামোৎসব নামে একটি উৎসবের প্রচলন দেখা যায়। বাৎস্যায়নের কামসূত্র (তৃতীয়-চতুর্থ শতক), শ্রীকৃষ্ণের রত্নাবলী (সপ্তম শতক), মানতীমাধব নাটক (অষ্টম শতক), অল্-বেরুণী (একাদশ শতক), জীমূতবাহনের কালবিবেক (দ্বাদশ শতক) এবং রঘুনন্দন (ষোড়শ শতক) সকলেই এই উৎসবের কথা বলিয়াছেন অল্পবিস্তর বর্ণনায়। প্রচুর নৃত্যগীতবাদ্য, জুগুপ্সিত উক্তি, যৌন অঙ্গভঙ্গি এবং ব্যঞ্জনা প্রভৃতি ছিল এই উৎসবের অঙ্গ এবং পূজাটি হইত মদন ও রতির, চৈত্র মাসে অশোক ফুলের সুপ্রচুর বর্ষণের নীচে।
প্রাচীন বাংলাদেশে এই উৎসবের কথা জীমূতবাহনই বলিয়া গিয়াছেন। পরবর্তী সাক্ষ্য দিতেছেন রঘুনন্দন। মনে হয়, ষোড়শ শতকের পর কোনও সময়ে চৈত্রীয় বসন্ত বা মদন বা কামোৎসব ফাল্গুনী হোলী বা হোলক উৎসবের সঙ্গে মিলিয়া মিশিয়া এক হইয়া যায় এবং কামমহোৎসব অপ্রচলিত হইয়া পড়ে। বস্তুত, ষোড়শ শতকের পর কামমহোৎসবের কোনও উল্লেখ বা প্রচলন কোথাও আর দেখা যায় না।
মুসলমান রাজা-ওমরাহ্রা এবং হারামের মহিলারা হোলী উৎসবের খুব বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং বোধ হয় তাঁহাদের পৃষ্ঠপোষকতার ফলে হোলী ক্রমশ মদনোৎসবকে গ্রাস করিয়া ফেলে। কিন্তু হোলীর সঙ্গে রাধাকৃষ্ণের ঝুলন এবং আবীর-কুমকুম খেলার ইতিহাসের যোগ হয় আবার অন্য পথে। রামগড় গুহার এক লিপিতে (খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয়-তৃতীয় শতক) এক ঝুলন উৎসবের কথাই আমরা প্রথম শুনি। কিন্তু সে-ঝুলন কোনও দেবদেবীর নয়, বোধ হয় নেহাৎই মানুষের ঝুলন। ঝুলনায় মানুষেরা, নরনারী উভয়েই দোলা খাইত, বেশি করিয়া দোলা দিত মানবশিশুকে, তাহাকে আনন্দ দিবে জন্য। হয়তো তাহারই প্রকাশ পরবর্তী সাহিত্যে। বালকৃষ্ণ বা বালগোপালকে দোলাইতেন মাতা যশোদা। তারপরের পর্বে আর শুধু বালগোপাল নহেন, ভগবান শ্রীকৃষনের যৌবনলীলার সহচরী রাধারো আসিয়া উঠিলেন সেই ঝুলনায় এবং একাদশ শতকের আগেই কৃষ্ণরাধার ঝুলনলীলা ভারতবর্ষের অন্যতম ধর্মোৎসবে পরিগণিত হইয়া গেল।
অল্-বেরুণীর সাক্ষ্যে মনে হয়, এই উৎসব অনুষ্ঠিত হইত চৈত্রমাসে; গরুড়-পুরাণ এবং পদ্ম-পুরাণের সাক্ষ্যও তাহাই। পরবর্তী কোনও সময়ে এই উৎসব ফাল্গুনী পূর্ণিমাতে আগাইয়া আসে (পদ্ম-পুরাণ, পাতালখণ্ড এবং স্কন্দপুরাণ, উৎকলখণ্ড দ্রষ্টব্য) এবং হোলীর সঙ্গে মিলিয়া মিশিয়া এক হইয়া যায়। ঝুলনায় রাধাকৃষ্ণকে দোলাইয়া তাঁহাদের উপর ফুল, কুমকুম এবং আবীরগোলা জল ছড়ানো হইত এবং তাঁহারাও সহচরীদের উপর ফুল, কুমকুম ইত্যাদি ছুঁড়িয়া মারিতেন। হোলীর সঙ্গে পিচ্কারী খেলার যোগাযোগ এইভাবেই। প্রাক্-বৈদিক আদিম কৃষিসমাজের বলি ও নৃত্যগীতোৎসব এই ভাবেই বর্তমান হোলীতে রূপান্তরিত হইয়াছে। ভারতের নানা জায়গায় এখনও হোলী বা হোলক উৎসবকে বলা হয় শূদ্রোৎসব।; হোলীর আগুন এখনও ভারতের অনেক স্থানে অস্পৃশ্যদের ঘর হইতেই আনিতে হয়।
নানা ধর্মমত
জৈন ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, আজীবক ধর্ম এবং যে সকল ধর্মকে বৌদ্ধেরা তৈর্থিক মত বলিত, সে-সকল ধর্মই বঙ্গ মগধ ও চের জাতির প্রাচীন ধর্ম, প্রাচীন আচার, প্রাচীন ব্যবহার, প্রাচীন রীতি, প্রাচীন নীতির উপরই স্থাপিত। আর্যজাতির ধর্মের উপর উহা ততটা নির্ভর করে না। এ কথা যদি সত্য হয়, তাহা হইলে ইহা বঙ্গদেশের কম গৌরবের কথা নয়। এরূপ মনে করিবার অনেকগুলি কারণ আছে। এই সকল ধর্মেরই উৎপত্তি পূর্বভারতে বঙ্গ মগধ ও চের জাতির অধিকারের মধ্যে, যে সকল দেশের সহিত আর্যগণের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল সে সকল দেশের বাহিরে। এ সকল ধর্মই বৈরাগ্যের ধর্ম। বৈদিক আর্যদের ধর্ম সম্পূর্ণরূপে গৃহস্থের ধর্ম। ঋগ্বেদে বৈরাগ্যের নাম গন্ধও নাই। অন্যান্য বেগেও যাগযজ্ঞের কথাই অধিক, সেও গৃহস্থেরই ধর্ম সূত্রগুলিতেও গৃহস্থের ধর্মের কথা। এক ভাগ সূত্রের নামই তো গৃহ্যসূত্র। সূত্রগুলিতে চারি আশ্রম পালনের কথা আছে। শেষ আশ্রমের নাম ভিক্ষুর আশ্রম। ভিক্ষুর আশ্রমেও বিশেষ বৈরাগ্যের কথা দেখা যায় না। এ আশ্রমের লোক ভিক্ষা করিয়াই খাইবেন, এই কথাই আছে। কিন্তু আমরা যে সকল ধর্মের কথা বলিতেছি, তাহাদের সকলেই বলিতেছে গৃহস্থ-আশ্রম ত্যাগ করো। গৃহস্থ-আশ্রমে কেবল দুঃখ। গৃহস্থ-আশ্রম ত্যাগ করিয়া যাহাতে জন্ম, জরা, মরণ—এই ত্রিতাপ নাশ হয় তাহারই ব্যবস্থা করো। আর তাহা নাশ করিতে গেলে “আমি কে?”, “কোথা হইতে আসিলাম?”, “কেন আসিলাম?”—এই সকল বিষয় চিন্তা করিতে হয়। সেই চিন্তার ফলে কেহ বলেন আত্মা থাকে, কিন্তু সে ‘কেবল’ হইয়া যায়, সংসারের সহিত তাহার আর কোন সংস্রব থাকে না, সুতরাং সে জরামরণাদির অতীত। কেহ বলেন, তাহার অহংকার থাকে না; যখন তাহার অহংকার থাকে না, তখন সে সর্বব্যাপী হয়, সর্বভূতে সমজ্ঞান হয়, মহাকরুণার আধার হইয়া যায়। এসকল কথা বেদ ব্রাহ্মণ বা সূত্রে নাই। এ সব ত গেল দর্শনের কথা, চিন্তাশক্তির কথা, যোগের কথা।
বাহিরের দিক হইতেও দেখিতে গেলে, এই সকল ধর্মের ও আর্যধর্মের আচার-ব্যবহারে মিল নাই। আর্যগণ বলেন, পরিষ্কার কাপড় পরিবে, সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকিবে, নিত্য স্নান করিবে। জৈনেরা বলেন, উলঙ্গ থাকো, গায়ের ময়লা তুলিও না, স্নান করিও না। মহাবীর মলভার বহন করিতেন। অনেক জোন যতি গৌরব করিয়া ‘মলধারী’ এই উপাধি ধারণ করিতেন। আর্যগণ উষ্ণীয়, উপানহ ও উপবীত ধারণ করিতেন; তাঁহারা খালি মাথায় থাকিতেন, জুতা পরিতেন না, এক ধুতি ও এক চাদরেই কাটাইয়া দিতেন। আর্যগণ সর্বদাই খেউরি হইতেন। অনেক ধর্মসম্প্রদায় একেবারে খেউরি হইত না। তাহাদের নখ চুল কখনো কাটা হইত না। আর্যেরা মাথা মুড়াইলে মাথার মাঝখানে একটা টিকি রাখিতেন। বৌদ্ধরা সব মাথা মুড়াইয়া ফেলিত। আর্যগণ দিনে একবার খাইতেন, রাত্রিতে একবার খাইতেন। বৌদ্ধরা বেলা বারোটার মধ্যে আহার করিত, বারোটার মধ্যে আহার না হইয়া উঠিলে তাহাদের সেদিন আর আহারই হইত না। রাত্রিতে তাহারা রস বা জলীয় পদার্থ ভিন্ন আর কিছুই খাইতে পারিত না। খাট ছাড়া আর্যগণের শয়ন হইত না। বৌদ্ধেরা উচ্চাসন মহাসন একেবারে ত্যাগ করিত, তাহারা মাটিতেই শুইয়া থাকিত। আর্যগণ সংস্কৃতে লেখাপড়া করিতেন, অন্য সকল ধর্মের লোক নিজ দেশের ভাষাতেই লেখাপড়া করিত।
ইহারা এত নূতন জিনিস কোথা হইতে পাইল? এ সকল নূতন জিনিস যখন আর্যদের মতের বিরোধী, তখন তাহারা আর্যদের নিকট হইতে সে সব পায় নাই। উত্তর হইতে তাহারা এই সব জিনিস পাইতে পারে না, কেননা উত্তরে হিমালয় পর্বত। হিমালয়ের উত্তরদেশের লোকের সহিত তাহাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকিতেই পারে না। দক্ষিণ হইতেও ঐ সব জিনিস আসিতে পারে না, কেননা দক্ষিণের সহিত তাহাদের যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তাহার কোন প্রমাণ নাই; বরং বিন্ধ্যগিরি পার হইয়া যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। সুতরাং যাহা কিছু উহারা পাইয়াছে, পূর্বাঞ্চল হইতেই পাইয়াছে এবং পূর্বাঞ্চলেই আমরা এই সকল নূতন জিনিস কতক কতক এখনও দেখিতে পাই।
জৈনদের শেষ তীর্থংকর মহাবীর ত্রিশ বৎসর বয়সে সংসার ত্যাগ করেন, তাহার পর কিছুদিন বৈশালির জৈনমন্দিরে বাস করেন, তাহার পর বারো বৎসর নিরুদ্দেশ থাকেন। এ সময় তিনি পূর্বাঞ্চলেই ভ্রমণ করিতেন। বারো বৎসরের পর তিনি জ্ঞান লাভ করিয়া বৈশালিতে ফিরিয়া আসেন। তাঁহারও পূর্বের তীর্থংকর পার্শ্বনাথ কাশীতে জন্মগ্রহণ করেন, ত্রিশ বৎসর বয়সে সংসার ত্যাগ করেন, তাহার পএ নানাদেশে ভ্রমণ করেন। তাঁহার ভ্রমণও পূর্বাঞ্চলেই অধিক। শেষ জীবনে তিনি সমেতগিরিতে বাস করেন—সমেতগিরি পরেশনাথ পাহাড়। তাঁহারও পূর্বে যে বাইশজন তীর্থংকর ছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে অনেকেই সমেতগিরিতেই বাস করিতেন ও সেইখানেই দেহ রক্ষা করেন।
সাংখ্য-মত এই সকল ধর্মেরই আদি। সাংখ্যের দেখাদেখি জৈনেরা কেবলী হইতে চাহিত, কৈবল্য চাহিত। বৌদ্ধেরা বলেন, তাঁহারা সাংখ্যকে ছাড়াইয়া উঠিয়াছিলেন। কিন্তু সাংখ্য-মত আর্য মত নহে, উহার উৎপত্তি পূর্বদেশে। কতকগুলি আধুনিক সময়ের উপনিষৎ ও মনু প্রভৃতি কয়েকজন শিষ্টলোক উহার আদর করায়, শঙ্কর উহার খণ্ডন করিবার বিশেষ প্রয়াস পাইয়াছিলেন। এ কথা তিনি স্পষ্টাক্ষরে বলিয়ে গিয়াছেন। নচেৎ তাঁহার মতে উহা শিষ্টগণের গ্রাহ্য নহে। উপনিষদে যে সাংখ্য-মত আছে, শঙ্কর তাহাও স্বীকার করেন না—বলেন, ও সকলের অর্থ অন্যরূপ। সাংখ্যকার কপিলের বাড়ি পূর্বাঞ্চলে, পঞ্চশিখের বাড়িঈ পূর্বাঞ্চলে। মহাভারতের শান্তিপর্ব ‘অত্রাপ্যুদাহরস্থীমহিতিহাসং পুরাতনং’ বলিয়া আরম্ভ করিয়া এক জায়গায় বলিয়া গিয়াছে যে, পঞ্চশিখ জনকরাজার রাজসভায় আসিয়া রাজাকে উপদেশ দেন। সাংখ্য-মত যে পূর্বাঞ্চলের, এ কথা অনেক বার বলিয়াছি। তাই আর এখানে বেশী করিয়া বলিব না।
রেশম
বাংলার তৃতীয় গৌরব রেশমের কাজ। ইউরোপীয়েরা চীনদেশ হইতে রেশমের পোকা আনিয়াছিলেন এবং অনেক শত বৎসর চেষ্টা করিয়া তাঁহারা রেশমের কারবার খুলিতে পারিয়াছেন। তাঁহাদের সংস্কার, চীনই রেশমের জন্মস্থান; চীনেরাও তাহাই বলে। তাহারা বলে খ্রীষ্টের ২৬৪০ বৎসর পূর্বে চীনেরা রানী তুঁত গাছের চাষ আরম্ভ করেন। রেশমের ব্যবসা সম্বন্ধে অতি প্রাচীনকাল হইতেই চীনদেশে অনেক লেখাপড়া আছে। চীনেরা রেশমের চাষ কাহাকেও শিখিতে দিত না। ঐটি তাহাদের উপনিষৎ বা গুপ্ত বিদ্যা ছিল। জাপানীরা অনেক কষ্টে খ্রীষ্টের তৃতীয় শতকে কোরিয়ার নিকট রেশমের চাষ শিক্ষা করে। ইহারই কিছুদিন পরে চীনের এক রাজকন্যা ভারতবর্ষে উহার চাষ আরম্ভ করেন। ইউরোপে রেশমের চাষ ইহার অনেক পরে আরম্ভ হইয়াছে।
কিন্তু আমরা চাণক্যের অর্থশাস্ত্রে দেখিতে পাই, বাংলা দেশে খ্রীষ্টের তিন চারি শত বৎসর পূর্বে রেশমের চাষ খুব হইত। রেশমের খুব ভাল কাপড়ের নাম ‘পত্রোর্ণ’ অর্থাৎ পাতার পশম। পোকাতে পাতা খাইয়া যে পশম বাহির করে, সেই পশমের কাপড়ের নাম ‘পত্রোর্ণ’। সেই পত্রোর্ণ তিন জায়গায় হইত—মগধে, পৌণ্ড্রদেশে ও সুবর্ণকুড্যে। নাগবৃক্ষ, লিকুচ, বকুল আর বটগাচে এই পোকা জন্মিত। নাগবৃক্ষের পোকা হইতে হলদে রঙের রেশম হইত, লিকুচের পোকা হইতে যে রেশম বাহির হইত তাহার রঙ গমের মত, বকুলের রেশমের রঙ সাদা, বট ও আর আর গাছের রেশমের রঙ ননীর মত। এই সকলের মধ্যে সবর্ণকুড্যের পত্রোর্ণ সকলের চেয়ে ভাল। ইহা হইতেই কৌষেয় বস্ত্র ও চীনভূমিজাত চীনের পট্টবস্ত্রেরও ব্যখ্যা হইল।
উপরে যে টুকু লেখা হইল, তাহা প্রায়ই অর্থশাস্ত্রের তর্জমা। অর্থশাস্ত্রের যে অধ্যায়ে কোন কোন ভাল জিনিস রাজকোষে রাখিয়া দিতে হইবে তাহার তালিকা আছে, সেই অধ্যায়ের শেষ অংশে ঐ সকল কথা আছে। অধ্যায়ের নাম ‘কোষপ্রবেশ্যরত্নপরীক্ষা’। এখানে রত্ন শব্দের অর্থ কেবল হীরা জহবরত নয়, যে পদার্থের যাহা উৎকৃষ্ট সেটির নাম রত্ন। এই রত্লের মধ্যে অগুরু আছে, চন্দন আছে, চর্ম আছে, পাটের কাপড় আছে, রেশমের কাপড় আছে ও তুলার কাপড় আছে। যে অংশ তর্জমা হইল, তাহাতে মগধ আ পৌণ্ড্রদেশের নাম আছে, এই দুইটি দেশ সকলেই জানেন। মগধ—দক্ষিণ-বেহার। আর পৌণ্ড্র—বারেন্দ্রভূমি। সুবর্ণকুড্য কোথায়? প্রাচীন টীকাকার বলেন, সুবর্ণকুড্য কামরূপের নিকট। কিন্তু কামরূপের নিকট যে রেশম এখন হয় তা ভেরেন্ডাপাতায় হয়। আমি বলি সুর্ণকুড্যের নাম শেষে কর্ণসুবর্ণ হয়। কর্ণসুবর্ণও মুর্শিদাবাদ ও রাজমহল লইয়া। এখানকার মাটি সোনার মত রাঙা বলিয়া এ দেশকে কর্ণসুবর্ণ, কিরণসুবর্ণ বা সুবর্ণকুড্য বলিত। এখানে এখনও রেশমের চাষ হয় এবং এখানকার রেশম খুব ভাল। নাগবৃক্ষ এখানে খুব জন্মায়। নাগবৃক্ষ শব্দের অর্থ নাগকেশরের গাছ। নাগকেশর বাংলার আর কোনওখানে দেখাযায় না কিন্তু এখানে অনেক দেখা যায়। লিকুচ মাদারগাছ। মাদারগাছেও রেশমের পোকা বসিতে পারে। বকুল ও বটগাছ প্রসিদ্ধই আছে। কৌটিল্য যে ভাবে চীনদেশের পট্টবস্ত্রের উল্লেখ করিলেন, তাহাতে বোধ হয়, তিনি চীনদেশের কাপড় অপেক্ষা বাংলার রেশমী কাপড় ভাল বলিয়া মনে করিতেন। রেশমী কাপড় যে চীন হইতে বাংলায় আসিয়াছিল, তাহার কোনও প্রমাণই অর্থশাস্ত্রে পাওয়া যায় না। চীনের রেশম তুঁতগাছ হইতে হয়। বাংলার রেশমের তুঁতগাছের সহিত কোনও সম্পর্ক নাই। সুতরাং বাঙালী যে রেশমের চাষ চীন হইতে পাইয়াছে, এ কথা বলিবার জো নাই। এখন পরিষ্কার করিয়া বলিতে হইবে যে, রেশমের চাষ বাংলাতেও ছিল, চীনেও ছিল। তবে তুঁতগাছ দিয়া রেশমের চাষ সর্বত্র ছাড়াইয়া পড়িয়াছে। ভারতবর্ষের অন্যত্র যে রেশমের চাষ ছিল, এ কথা চাণক্য বলেন না। তিনি বলেন, বাংলায় ও মগধেই রেশমের চাষ ছিল। কারণ, পৌণ্ড্রও বাংলায়, সুবর্ণকুড্যও বাংলায়। চাণক্যের পরে কিন্তু ভারতবর্ষের নানান স্থানে রেশমের চাষ হইত। কারণ, মান্দাসোরে খ্রীষ্টীয় ৪৭৬ অব্দে যে শিলালেখ পাওয়া যায়, তাহাতে লেখা আছে যে, সৌরাষ্ট্র হইতে এক দল রেশম-ব্যবসায়ী মান্দাসোরে আসিয়া রেশমের ব্যবসা আরম্ভ করে এবং তাহারাই চাঁদা করিয়া এক প্রকাণ্ড সূর্যমন্দির নির্মাণ করে।
অর্থশাস্ত্রে আমরা যে সংবাদ পাইলাম, সেটি বাংলার বড়ই গৌরবের কথা। যদি বাঙালীরা সকলের আগে রেশমের চাষ করিয়া থাকেন, তাহা হইলে ত তাঁহাদের গৌরবের সীমা নাই। যদি চীনেই সর্বপ্রথম উহার আরম্ভ হয়, তথাপি বাঙালীরা চীন হইতে কিছু না শিখিয়াই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ভাবে যে রেশমের কাজ আরম্ভ করেন, সে বিষয়ে আর সন্দেহ নাই। কারণ, তাঁহারা ত আর তুঁতপাতা হইতে আর রেশম বাহির করিতেন না, এ কথা পূর্বেই বলিয়াছি। যে সকল গাছ বিনা চাষে তাঁহাদের দেশে প্রচুর জন্মায়, সে সকল গাছের পোকা হইতেই তাঁহারা নানা রঙের রেশম বাহির করিতেন। চীনের রেশম সবই সাদা, তাহা রঙ করিতে হয়। বাংলার রেশম রঙ করিতে হইত না, গাছবিশেষের পাতার জন্যই ভিন্ন ভিন্ন রঙের সুতা হইত। আর এ বিদ্যা বাংলার নিজস্ব, ইহা কম গৌরবের কথা নয়।
বাকলের কাপড়
বাংলার চতুর্থ গৌরব বাকলের কাপড়। প্রথম অবস্থায় লোকে পাতা পরিত। কটকের জঙ্গলমহলে এখনও দু-এক জায়গায় লোকে পাতা পরিয়া থাকে। তাহার পর লোকে বাকল পরিত; গাছের ছাল পিটিয়া কাপড়ের মত নরম করিয়া লইত, তাহাই জড়াইয়া লজ্জা নিবারণ করিত এবং কাঁধের উপর একখানি ফেলিয়া উত্তরীয় করিত। সাঁচী পাহাড়ের উপর এক প্রকাণ্ড স্তূপ আছে, উহার চারিদিকে পাথরের রেলিং আছে, রেলিংএর চারিদিকে বড় বড় ফটক আছে। দুই-দুইটি থামের উপর এক-একটি ফটক। এই থামের গায়ে অনেক চিত্র আছে। এই চিত্রের মধ্যে বাকল-পরা অনেক মুনিঋষি আছেন। তাঁহাদের কাপড় পরার ধরন দেখিয়া আমরা বুঝিতে পারি, কেমন করিয়া সেখানে লোক বাকল পরিয়া থাকিত। তাহার পর লোকে আর বাকল পরিত না, বাকল হইতে সুতা বাহির করিয়া কাপড় বুনিয়া লইত; শণ, পাট, ধঞ্চে, এমন কি আতসী গাছের ছাল হইতেও সুতা বাহির করিত। এখন এই সকল সুতায় দড়ি ও থলে হয়। সেকালে উহা হইতে খুব ভাল কাপড় তৈয়ার হইত এবং অনেক কাপড় খুব ভালও হইত। বালক হইতে যে কাপড় হইত তাহার নাম ‘ক্ষৌম’, উৎকৃষ্ট ক্ষৌমের নাম ‘দুকূল’। ক্ষৌম পবিত্র বলিয়া লোকে বড় আদর করিয়া পরিত।
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের মতে বাংলাতেই এই বাকলের কাপড় বুনা হইত। বঙ্গে দুকূল হইত, উহা শ্বেত ও স্নিগ্ধ, দেখিলেই চক্ষু জুড়াইয়া যাইত। পৌণ্ড্রেও দুকূল হইত, উহা শ্যামবর্ণ ও মণির মত উজ্জ্বল। সুবর্ণকুড্যে যে কুকূল হইত তাহার বর্ণ সূর্যের মত এবং মণির মত উজ্জ্বল। এই অংশের শেষে কৌটিল্য বলিতেছেন, ইহাতেই কাশীর ও পৌন্ড্র দেশের ক্ষৌমের কথা ‘ব্যাখ্যা’ করা হইল। উহাতে বুঝা যায়, বাংলাতেই বাকলের কাপড় সকলের চেয়ে ভাল হইত এবং ‘দুকূল’ একমাত্র বাংলাতেই হইত। সুতরাং ইহা আমরা বাংলার চতুর্থ গৌরবের বিষয় বলিয়া উল্লেখ করিলাম।
এখানে আমরা কাপাসের কাপড়ের কথা বলিলাম না। কারণ, চাণক্যের মতে কাপাসের কাপড় যে শুধু বাংলাতেই ভাল হইত, এমন নয়—মথুরার কাপড়, অপরান্তের কাপড়, কলিঙ্গের কাপড়, কাশীর কাপড়, বৎসদেশের কাপড় ও মহিষদেশের কাপড়ও বেশ হইত। মথুরা, পাণ্ড্যদেশে, মহিষদেশ, নর্মদার দক্ষিণ, অপরান্ত বোম্বাই অঞ্চলে। কিন্তু চাণক্যের অনেক পরে কার্পাসের কাপড়ও বাংলার একটা প্রধান গৌরবের জিনিস হইয়াছিল। ঢাকাই মস্লিন ঘাসের উপর পাড়িয়া রাখিলে ও রাত্রিতে তাহার উপর শিশির পড়িলে, কাপড় দেখাই যাইত না। একটি আংটির ভিতর দিয়া এক থান মসলিন অনায়াসেই টানিয়া বাহির করিয়া লওয়া যাইত। তাঁতীরা অতি প্রাত্যুষে উঠিয়া একটি বাখারির কাটি লইয়া কাপাসের খেতে ঢুকিত। ফট্ করিয়া যেমন একটি কাপাসের মুখ খুলিয়া যাইত, অমনি বাখারিতে জিড়াইয়া তাহার মুখের তুলাটি সংগ্রহ করিত। সেই তুলা হইতে অতি সূক্ষ্ম সুতা পাকাইত, তাহাতেই মস্লিন তৈয়ার হইত। আকবর যখন বাংলা দখল করিয়া সুবাদার নিযুক্ত করেন, তখন সুবাদারের সহিত তাঁহার বন্দোবস্ত হয় যে, তিনি বাংলার রাজস্ব-স্বরূপ বৎসরে পাঁচ লক্ষ টাকা মাত্র লইবেন, কিন্তু দিল্লীর রাজবাড়িতে যত মালদহের রেশমী কাপড় ও ঢাকার মস্লিন দরকার হইবে, সমস্ত সুবাদারকে জোগাইতে হইবে।
আহার-বিহার
ইতিহাসের ঊষাকাল হইতেই ধান্য যে-দেশের প্রথম ও প্রধান উৎপন্ন বস্তু, সে-দেশে প্রধান খাদ্যই হইবে ভাত তাহাতে আশ্চর্য হইবার কিছু নাই। ভাত-ভক্ষণের এই অভ্যাস ও সংস্কার অস্ট্রিক ভাষাভাষী আদি-অস্ট্রেলীয় জনগোষ্ঠীর সভ্যতা ও সংস্কৃতির দান। উচ্চকোটির লোক হইতে আরম্ভ করিয়া নিম্নতম কোটির লোক পর্যন্ত সকলেরই প্রধান ভোজ্যবস্তু ভাত, এবং ‘হাঁড়িত ভাত নাহি, নিতি আবেশী’, ইহাই বাঙালী জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ! ভাত রাঁধার প্রক্রিয়ায় তারতম্য তো ছিলই, কিন্তু তাহার সাক্ষ্য প্রমাণ নাই বলিলেই চলে। উচ্চকোটির বিবাহভোজে যে-অন্ন পরিবেশন করা হইত স-অন্নের কিছু বিবরণ নৈষধচরিতে দয়মন্তীর বিবাহভোজের বর্ণনায় পাওয়া যায়। গরম ধূমায়িত ভাত ঘৃত সহযোগে ভক্ষণ করাটাই ছিল বোধ হয় সাধারণ রীতি। প্রাকৃত পৈঙ্গল-গ্রন্থেও (চতুর্দশ শতকের শেষাশেষি?) প্রাকৃত বাঙালীর আহার্য দেখিতেছি কলাপাতায়, ‘ওগ্গরা ভত্তা গাইক ঘিত্তা’, গো-ঘৃত সহকারে সফেন গরম ভাত। নৈষধচরিতের বর্ণনা বিস্তৃততর : পরিবেশিত অন্ন হইতে ধূম উঠিতেছে, তাহার প্রত্যেকটি কণা অভগ্ন, একটি হইতে আর একটি বিচ্ছিন্ন (ঝরঝরে ভাত), সে-অন্ন সুসিদ্ধ, সুস্বাদু ও শুভ্রবর্ণ, সরু এবং সৌরভময় । দুগ্ধ ও অন্নপক্ক পায়েসও উচ্চকোটির লোকেদের এবং সামাজিক ভোজে অন্যতম প্রিয় ভক্ষ্য ছিল ।
প্রাকৃত বাঙালীর খাদ্য
ভাত সাধারণত খাওয়া হইত শাক ও অন্যান্য ব্যঞ্জন সহযোগে। দরিদ্র এবং গ্রাম্য লোকদের প্রধান উপাদানই ছিল বোধ হয় শাক ও অন্যান্য সবজি তরকারী। ডাল খাওয়ার কোনও উল্লেখই কিন্তু কোথাও দেখিতেছি না। উৎপন্ন দ্রব্যাদির সুদীর্ঘ তালিকায়ও ডালের বা কোনও কলাইর উল্লেখ কোথাও যেন নাই। নানা শাকের মধ্যে নালিতা (পাট) শাকের উল্লেখ প্রাকৃত পৈঙ্গলে দেখিতেছি। বস্তুত, এই গ্রন্থের প্রাকৃত বাঙালীর খাদ্য-তালিকাটি উল্লেখযোগ্য :
ওগ্গরা ভত্তা রম্ভঅ পত্তা গাইক ঘিত্তা দুগ্ধ সজুক্তা
মোইলি মচ্ছা নালিত গচ্ছা দিজ্জই কান্তা খা (ই) পুনবস্তা।
বিবাহভোজ
কলাপাতায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, মৌরলা মাছের ঝোল এবং নালিতা শাক যে-স্ত্রী নিত্য পরিবেশন করিতে পারেন তাঁহার স্বামী পূণ্যবান, এ-সম্বন্ধে আর সন্দেহ কী! কিন্তু সামাজিক ভোজে, বিশেষত বিবাহভোজে বরযাত্রীরা শাকসবজীর তরকারী পছন্দ করিতেন না। দয়মন্তীর বিবাহভোজে সবুজবর্ণ পাত্রে ভাত-তরকারী পরিবেশন করা হইয়াছিল; বরযাত্রীরা মনে করিলেন বুঝি-বা শাকান্ত পরিবেশন করা হইয়াছে; একটু বিরক্তির ভাবই প্রকাশ করিলেন দেখিয়া কন্যাপক্ষীয়েরা বলিলেন, আপনাদের শাক পরিবেশন করা হয় নাই, পাত্রটির বর্ণ সবুজ বলিয়াই অন্নব্যঞ্জন সবুজ দেখাইতেছে। এই বিবাহভোজে যে-সব ব্যঞ্জন পরিবেশন করা হইয়াছিল তাহাতে দেখা যাইতেছে, ব্যঞ্জন তরকারী প্রভৃতির বাহুল্য সেই যুগেও উচ্চকোটির বাঙালী সমাজে যথেষ্টই ছিল এবং এর বেশি আয়োজন হইত যে, লোকেরা সব খাইয়া, এমন কি গণনাও করিয়া উঠিতে পারিত না। এই ধরনের বৃহৎ ভোজে সামাজিক অপচয়ের কথা ই-ৎসিঙ্ও বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। কবি শ্রীহর্ষের কালে বং আজও দেখিতেছি, বাঙলা দেশে তাহা অব্যাহত গতিতে চলিতেছে। যে-সব ব্যঞ্জনাদি এই বিবাহভোজে পরিবেশিত হইয়াছিল তাহা তালিকাগত করা যাইতেও পারে : দই ও রাই সরিষার প্রস্তুত শ্বেতবর্ণ কিন্তু বেশ ঝালযুক্ত কোনও ব্যঞ্জন (খাইতে খাইতে লোকদের মাথা ঝাঁকিতে এবং তালু চাপড়াইতে হইয়াছিল); হরিণ, ছাগ এবং পক্ষী মাংসের নানা রকমের ব্যঞ্জন; মাংসের নয় কিন্তু দৃশ্যত মাংসোপম, বিবিধ উপাদানযুক্ত কোনও ব্যঞ্জন; মাছের ব্যঞ্জন এবং অন্যান্য আরো নানা প্রকারের সুগন্ধি ও প্রচুর মসলাযুক্ত ব্যঞ্জনাদি, নানা প্রকারের সুমিষ্ট পিষ্টক এবং দই ইত্যাদি। পানীয় পরিবেশিত হইয়াছিল কর্পূরমিশ্রিত সুগন্ধি জল। ভোজের পর দেওয়া হইয়াছিল নানা মসলামিশ্রিত পানের খিলি। অবান্তর হইলেও একটি অনুমানগত তথ্যের উল্লেখ এখানে করা যাইতে পারে। সমস্ত প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলিতে এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-ভারতে পান পরিবেশনের রীতি হইয়াছে পান, সুপারী এবং অন্যান্য মসলা পৃথক পৃথক ভাবে সাজাইয়া দেওয়া। পূজা-পার্বণেও তাহাই প্রচলিত রীতি; আদিবাসী কৌমসমাজের রীতিও তাহাই। পান খিলি করিয়া পরিবেশন করা বোধ হয় পরবর্তী আর্য-ভারতীয় রীতি এবং উচ্চকোটি লোকস্তরে ক্রমশ সেই রীতিই প্রবর্তিত হয়। বৌদ্ধ গান ও দোহায় দেখিতেছি পানের সঙ্গে মসলা হিসাবে কর্পূর ব্যবহার করা হইত।
দই, পায়স, ক্ষীর প্রভৃতি দুগ্ধজাত নানাপ্রকারের খাদ্যের উল্লেখ একাধিক ক্ষেত্রে পাইতেছি। এগুলি চিরকালই বাঙালীর প্রিয় খাদ্য। ভবদেব-ভট্টের প্রায়শ্চিত্ত-প্রকরণ-গ্রন্থে নানাপ্রকারের দুগ্ধপান সম্বন্ধে কিছু কিছু বিধিনিষেধ আছে, কিন্তু তাহা সমস্তই স্বাস্থ্যগত কারণে।
মৎস্য ও মাংস আহার
মাংসের মধ্যে হরিণের মাংস খুবই প্রিয় ছিল, বিশেষ ভাবে শবর পুলিন্দ প্রভৃতি শিকারজীবী লোকেদের মধ্যে এবং সমাজের অভিজাত স্তরে। ছাগ মাংসও বহুল প্রচলিত ছিল সমাজের সকল স্তরেই। কোনও কোনও প্রান্তে ও লোকান্তরে, বিশেষভাবে আদিবাসী কোমে বোধ হয় শুকনো মাংস খাওয়াও প্রচলিত ছিল, কিন্তু ভবদেব-ভট্ট কোনও কারণেই এবং কোনও অবস্থাতেই শুকনো মাংস খাওয়া অনুমোদন করেন নাই, বরং নিষিদ্ধই বলিয়াছেন। কিন্তু মাছই হোক আর মাংসই হোক, অথবা নিরামিষই হোক, বাঙালীর রান্নার প্রক্রিয়া যে ছিল জটিল এবং নানা উপাদানবহুল তাহা নৈষধচরিতের ভোজের বিবরণেই সুস্পষ্ট।
বারিবহুল, নদনদী-খালবিল বহুল, প্রশান্ত-সভ্যতাপ্রভাবিত এবং আদি-আস্ট্রেলীয়মূল বাঙলায় মৎস্য অন্যতম প্রধান খাদ্যবস্তু রূপে পরিগণিত হইবে, ইহা কিছু আশ্চর্য নয়। চীন, জাপান, ব্রহ্মদেশ, পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ও দীপপুঞ্জ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীদের আহার্য তালিকার দিকে তাকাইলে বুঝা যায়, বাঙলাদেশ এই হিসাবে কোন সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। সর্বত্রই এই তালিকায় ভাত ও মাছই প্রধান খাদ্যবস্তু। বাংলাদেশের এই মৎস্যপ্রীতি আর্যদসভ্যতা ও সংস্কৃতি কোনোদিনই প্রীতির চক্ষে দেখিত না, আজও দেখে না; অবজ্ঞতার দৃষ্টিটাই বরং সুস্পষ্ট। মাংসের প্রতিও বাঙালীর বিরাগ কোনোদিনই ছিল না, কিন্তু আর্য-ব্রাহ্মণ্য ভারতে ছিল; বিশেষভাবে খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতক হইতেই খাদ্যের জন্য প্রাণীহত্যার প্রতি ব্রাহ্মণ্যধর্মে (বৌদ্ধ ও জৈনধর্মে তো বটেই) একটা নৈতিক আপত্তি ক্রমশ দানা বাঁধিতেছিল এবং আর্য-ব্রাহ্মণ্য ভারতবর্ষ ক্রমশ নিরামিষ আহার্যের প্রতিই পক্ষপাতী হইয়া উঠিতেছিল। বাঙলাদেশেও এই আপত্তি বিস্তৃত হইয়াছিল, সন্দেহ নাই; কিন্তু চিরাচরিত এবং বহু অভ্যস্ত প্রথার বিরুদ্ধে তাহা যথেষ্ট কার্যকরী হইতে পারে নাই। বাঙলার অন্যতম প্রথম ও প্রধান স্মৃতিকার ভট্ট ভবদেব সুদীর্ঘ যুক্তিতর্ক উপস্থিত করিয়া বাঙালীর এই অভ্যাস সমর্থন করিয়াছেন। মনু-যাজ্ঞবল্ক্য-ব্যাস, ছাগলেয় প্রভৃতি প্রাচীন স্মৃতিকারদের মতামত উদ্ধার করিয়া ভবদেব বলিতেছেন, ইঁহাদের নিষেধবাক্য তো শুধু চতুর্দশী, তিথি বা এই ধরনের বিশেষ বিশেষ বার বা তিথি উপলক্ষে প্রযোজ্য, কাজেই মাছ বা মাংস খাওয়ায় কোনও দোষ স্পর্শে না। বস্তুত, মাংস ও মৎস্য আহার বাঙলাদেশে এত সুপ্রচলিত ও গভীরাভ্যস্ত যে, এই সমর্থন ছাড়া ভবদেবের আর কোনও উপায় ছিল না। বাঙলার অন্যতম স্মৃতিকার শ্রীনাথাচার্যও তাহাই করিয়াছেন; বিষ্ণুপুরাণ হইতে দুইটি শ্লোক উদ্ধা করিয়া তিনি দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, কয়েকটি পর্বদিবস ছাড়া আর কোনও দিনেই মৎস্য বা মাংস আহার গর্হিত কাজ কিছু নয়। বৃহর্দ্বমপুরাণের মতে রোহিত, শফর (পুঁটি বা শফরী মাছ), সকুল (সোল) এবং শ্বতবর্ণ ও আঁশযুক্ত অন্যান্য মৎস্য ব্রাহ্মণদের ভক্ষ্য। প্রাণীজ ও উদ্ভিজ্জ তৈল বা চর্বির তালিকা দিতে গিয়া জীমূতবাহন ইল্লিস (ইলিশ বা ইল্সা) মাছের তৈলের উল্লেখ ও বহুল ব্যবহারের কথা বলিয়াছেন। মনে হয়, আজিকার দিনের মতো প্রাচীনকালেও ইলিশ মাছ বাঙালীর অন্যতম প্রিয় খাদ্য ছিল এবং ইলিশের তৈল নানা প্রয়োজনে ব্যবহৃত হইত। সব মাছ কিন্তু ব্রাহ্মণদের ভক্ষ ছিল না; যে সব মাছ গর্তে বা কাঁদায় বাস করে, যাহাদের মুখ ও মাথা সাপের মত (যেমন, বাণ মাছ), পচা ও শুকনা মাছ খাওয়াও নিষিদ্ধ ছিল, কিন্তু টীকাসর্বস্ব-গ্রন্থের লেখক সর্বানন্দ বলিতেছেন, বঙ্গালদেশের লোকেরা সিহুলী বা শুকনো মাছ খাইতে ভালোবাসিত (যত্র বঙ্গালবচ্চারণাং প্রীতিঃ) এখনও তো তাহাই। শামুক, কাঁকড়া, মোরগ, সারস, বক, হাঁস, দাত্যূহ পক্ষী, উট, গরু, শূকর প্রভৃতির মাংস একেবারেই ছিল অভ্যক্ষ, অন্তত ব্রাহ্মণ্য স্মৃতিশাসিত সমাজে। তবে, সন্দেহ নাই, নিম্নতর সমাজস্তরে এবং আদিবাসী কোমের লোকদের মধ্যে আজিকার মতই শামুক, কাঁকড়া, মোরগ প্রভৃতির মাংস, নানাপ্রকারের আঁশ ছাড়া মাছ, সর্পাকৃতি বাণ মাছ, গর্তকাদাবাসী নানাপ্রকারের অকুলীন মৎস্য, নানাপ্রকারের পক্ষীমাংস সমস্তই ভক্ষ্য ছিল। পঞ্চনখ প্রাণীদের মধ্যে গোধা, শশক, সজারু এবং কচ্ছপ খাওয়ার খুব বাধানিষেধ কাহারো পক্ষে কিছু ছিল না, এ কথা ভবদেব নিজেই বলিতেছেন তাঁহার প্রায়শ্চিত্তপ্রকরণ গ্রন্থে। বাঙালীর মৎস্যপ্রীতির পরিচয় পাহাড়পুর এবং ময়নামতীর পোড়ামাটির ফলকগুলিতে কিছু কিছু পাওয়া যায়। মাছ কোটা এবং ঝুড়িতে ভরিয়া মাছ হাটে লইয়া যাওয়ার দু’টি অতি বাস্তবচিত্র কয়েকটি ফলকেই উৎকীর্ণ। (শবর) পুরুষ হরিণ শিকার কইয়া কাঁধে ফেলিয়া বাড়ি লইয়া যাইতেছে, সে চিত্রও বিদ্যমান। শবর, পুলিন্দ, নিষাদ জাতীয় ব্যাধদের প্রধান বৃত্তিই তো ছিল হরিণ ও অন্যান্য পশুপক্ষী শিকার। হরিণ-শিকারের খুব সুন্দর বর্ণনা আছে একাধিক চর্যাগীতে। একটি গীতে চতুর্দিক হইতে আক্রান্ত ভীত সন্ত্রস্ত হরিণের যে বর্ণনা আছে অবান্তর হইলেও তাহা উদ্ধারের লোভ সংবরণ করা কঠিন :
তেন ন চ্ছুপই হরিণা পিবই না পাণী।
হরিণা হরিণীর নিলয় ন জাণী।।
হরিণী বোলও সুন হরিণা তো।
এ বন চ্ছাড়ী হোহু ভান্তো।।
তরংগতে হরিণার খুর ন দাসই।
ভুসুকু ভণই মূঢ় হিঅহি ন পইসই।।
(ভয়ে) হরিণ তৃণ ছোয় না, জল খায় না; হরিণ জানে না হরিণীর ঠিকানা। হরিণী (আসিয়া) বলে, শোন হরিণ, এ-বন ছাড়িয়া ভ্রান্ত হইয়া (চলিয়া) যাও। তীরগতিতে ধাবমান হরিণের খুর দেখা যায় না। ভুসুক বলেন; মূঢ়ের হৃদয়ে একথা প্রবেশ করে না।
জালের সাহায্যেও হরিণ ধরা হইত, এই ধরণের ইঙ্গিত আছে ভুসুকুরই আর একটি গীতিতে। তরঙ্গসংকুল মাঝনদীতে জাল ফেলিয়া মাছ ধরিবার ইঙ্গিতও আছে একটি চর্যাগীতে। কাহ্নপাদ বলিতেছেন,
তরিত্তা ভবজলধি জিম করি মাঅ সুইনা।
মাঝ বেণী তরঙ্গম মুনিআ।।
পঞ্চ তথাগত কিঅ কেড়ুআল।
বাহঅ কাঅ কাহ্নিল মাআজাল।।
তরকারী
যে-সব উদ্ভিদ্ তরকারী আজও আমরা ব্যবহার করি, তাহার অধিকাংশই, যেমন, বেগুন, লাউ, কুমড়া, ঝিঙ্গে, কাঁকরুল, কচু (কন্দ) প্রভৃতি আদি-অস্ট্রেলীয় অস্ট্রিক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর দান। এ-সব তরকারী বাঙালী খুব সুপ্রাচীন কাল হইতেই ব্যবহার করিয়া আসিতেছে, ভাষাতত্ত্বের দিক হইতে এই অনুমান অনৈতিহাসিক নয়। পরবর্তী কালে, বিশেষভাবে মধ্যযুগে, পর্তুগীজদের চেষ্টায় এবং নানাসূত্রে নানা তরকারী, যেমন, আলু, আমাদের খাদ্যের মধ্যে আসিয়া ঢুকিয়া পড়িয়াছে। কিন্তু আদিপর্বে তাহাদের অস্তিত্ব ছিল না। নানাপ্রকারের শাক খাওয়ার অভ্যাসও বাঙালীর সুপ্রাচীন।
ফল
ফলের মধ্যে কলা, তাল, আম, কাঁঠাল, নারিকেল ও ইক্ষুর উল্লেখই পাইতেছি বারবার। আম ও কাঁঠালের উল্লেখ তো লিপিমালায় সুপ্রচুর। কলা আদি-অস্ট্রেলীয় অস্ট্রিক ভাষাভাষী লোকদের দান; প্রাচীন বাঙলার চিত্রে ও ভাস্কর্যে ফলভারাবনত গলাগাছের বাস্তব চিত্র সুপ্রচুর। পূজা, বিবাহ, মঙ্গলযাত্রা, প্রভৃতি অনুষ্ঠানে কলাগাছের ব্যবহার সমসাময়িক সাহিত্যেও দেখিতে পাওয়া যায়। ইক্ষুর রস আজিকার মতো তখনও পানীয় হিসাবে সমাদৃত ছিল; ইক্ষুর রস জ্বাল দিয়া একপ্রকার গুড় (এবং বোধ হয় শর্করাখণ্ড জাতীয় একপ্রকার ‘খণ্ড’ চিনিও) প্রস্তত হইত। হেমন্তে নূতন গুড়ের গন্ধে আমোদিত বাঙালার গ্রামের বর্ণনা সদুক্তিকর্ণামৃত-গ্রন্থের একটি শ্লোকে দীপ্যমান। অন্যত্র এই শ্লোকটি উদ্ধার করিয়াছি। তেঁতুলের উল্লেখ আছে চর্যাগীতিতে।
কালবিবেক ও কৃত্যতত্ত্বার্ণব গ্রন্থে আশ্বিন মাসে কোজাগর পূর্ণিমা রাত্রে আত্মীয় বান্ধবদের চিপিটক বা চিড়া এবং নারিকেলের প্রস্তুত নানাপ্রকারের সন্দেশে পরিতৃপ্ত করিতে হইত, এবং সমস্ত রাত বিনিদ্র কাটিত পাশা খেলায়। খৈ-মুড়ি (লাজ) খাওয়ার রীতিও বোধ হয় তখন হইতেই প্রচলিত ছিল; খৈ বা লাজ যে অজ্ঞাত ছিলনা তাহার প্রমাণ বিবাহোৎসবে সুপ্রচুর খৈ-বর্ষণের বর্ণনায় লাজহোমের অনুষ্ঠানে।
পানীয়
দুধ, নারিকেলের জল, ইক্ষুরস, তালরস ছাড়া মদ্য জাতীয় নানাপ্রকারের পানীয় প্রাচীন বাঙলায় সুপ্রচলিত ছিল। গুড় হইতে প্রস্তুত সর্বপ্রকার গৌড়িয় মদ্যের খ্যাতি ছিল সর্বভারতব্যাপী। ভাত, গম, গুড়, মধু, ইক্ষু ও তালরস প্রভৃতি গাঁজাইয়া নানাপ্রকারের মদ্য প্রস্তুত হইত। ভবদেব ভট্ট তাঁহার প্রায়শ্চিত্তপ্রকরণ-গ্রন্থে নানাপ্রকার মদ্য-পানীয়ের উল্লেখ করিয়াছেন, এবং সঙ্গে সঙ্গে দ্বিজ ও দ্বিজেতর সকলের পক্ষেই মদ্যপান নিষিদ্ধ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্তু লোকে তাঁহার এই স্মৃতি-নির্দেশ কতটা মানিয়া চলিত, বলা কঠিন। বৃহদ্বর্মপুরাণে দেখিতেছি, শাস্ত্রনিষিদ্ধ কালে স্বর্ণ, মদ্য, রক্ত, মৎস্য ও মাংস উপাচারে এবং নরবলি সহকারে ব্রাহ্মণের পক্ষে শিবপূজা নিষিদ্ধ। ইহার অর্থ বোধ হয় এই যে, শিবপূজা পক্ষে এই নিষেধ প্রযোজ্য হইলেও শক্তিপূজায় এই সব উপাচার ও নরবলি নিষিদ্ধ ছিল না, আর শাস্ত্রনিষিদ্ধ-কাল ছাড়া অন্য সময়ে কোনও পূজায়ই তেমন নিষেধ ছিল না। চর্যাগীতির একাধিক গীতিতে যে-ভাবে শৌণ্ডিকালয় বা শুঁড়িখানার উল্লেখ পাইতেছি, মনে হয়, বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের ভিতর মদ্যপান খুব গর্হিত বলিয়া বিবেচিত হইত না। শৌণ্ডিকালয়ে বসিয়া শৌণ্ডিক বা শুঁড়ির স্ত্রী মদ্য বিক্রয় করিতেন, এবং ক্রেতারা সেইখানে বসিয়াই তাহা পান করিতেন। শুঁড়িখানার দরজায় বোধ হয় একটা কিছু চিহ্ন আঁকা থাকিত, এবং মদ্যাভিলাষীরা সেই চিহ্ন দেখিয়াই গন্তব্য স্থানটি চিনিয়া লইতেন।! এক জাতীয় গাছের সরু বাকল (অন্যমতে, শিকড়) শুকাইয়া গুড়া করিয়া তাহা দ্বারা মদ চোলাই করা হইত। বেলের খোলা করিয়া মদ্য পানের উল্লেখ আছে সুদুক্তিকর্ণামৃত-গ্রন্থের একটি শ্লোকে; চর্যাগীতিতে দেখিতেছি, মদ্য ঢালা হইত ঘড়ায় ঘড়ায়। বিরুবাপাদ বলিতেছেন :
এক সে শুণ্ডিনি দুই ঘরে সান্ধঅ।
চীঅণ বাকলঅ বারুণী বান্ধঅ।
* * *
দশমি দুআরত চিহ্ন দেখিয়া।
আইল গরাহক অপণে বহিয়া।।
চউশটি ঘড়িয়ে দেল পসারা।
পইঠেল গরাহক নাহি নিসারা।।
এক সে ঘড়লী সরুই নাল।
ভণন্তি বিরুআ থির করি চাল।।
এক শুঁড়িনী দুই ঘরে সান্ধে (ঢোকে), সে চিকণ বাকল দ্বারা বারুণী (মন) বাঁধে। শুঁড়ির ঘরের চিহ্ন (আছে) দুয়ারেই; সেই চিহ্ন দেখিয়া গ্রাহক নিজেই চলিয়া আসে। চৌষট্টি ঘড়ায় মদ ঢালা হইয়াছে; গ্রাহক যে ঘরে ঢুকিল তাহার আর সাড়াশব্দ কিছু নাই (মদের নেশায় এমনই বিভোর)! সরু নালে একটি ঘড়ায় মদ ঢালা হইতেছে—বিরুপা সাবধান করিতেছেন, সরু নল দিয়া ঢাল স্থির করিয়া বারুণী ঢাল।
প্রাচীন বাঙালী কি ডাল খাইত না?
আগেই বলিয়াছি, প্রাচীন বাঙালীর খাদ্য তালিকায় ডালের উল্লেখ কোথাও দেখিতেছি না। ইহাতে আশ্চর্য হইবার কিছু নাই। বাঙলা, আসাম ও ওড়িষ্যায় যত ডাল আজও ব্যবহৃত হয়—এ ব্যবহার ক্রমশ বাড়িতেছে সমাজের সকল স্তরেই—তার খুব স্বল্পাংশই এই তিন প্রদেশে জন্মায়। পূর্বেও তাহাই ছিল; বোধ হয় উৎপাদন আরও কম ছিল। পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ায়, প্রশান্ত মহাসাগরের দেশ ও দ্বীপগুলিতে আজও ডালের ব্যবহার অত্যন্ত কম, নাই বলিলেই চলে। সেই জন্য ডালের চাষও নাই। বাঙলা দেশের কোনও কোনও জেলায়, যেমন বরিশালে ও ফরিদপুরের, উচ্চকোটি লোকস্তরে বহুক্ষেত্রে উদ্ভিজ ও আমিষ ব্যঞ্জনাদি খাওয়ার পর সর্বশেষে ডাল খাওয়ার রীতি প্রচলিত। আর, নিম্নকোটি স্তরে বাঙলার সর্বত্রই আজও অনেকে ডাল ব্যবহারই করেন না; প্রাচীন কালে বোধ হয় একেবারেই করিতেন না। আর, সুলভ মৎস্যভোজীর পক্ষে তাহার প্রয়োজনও ছিল কম। বস্তুত, ডালের চাষ ও ডাল খাওয়ার রীতিটা বোধ হয় আর্য-ভারতের চান, এবং তাহা মধ্যযুগে।
এ-তথ্য অনস্বীকার্য যে, সুপ্রাচীন কাল হইতেই মৎস্যভোজী বাঙালীর আহার্য অবাঙালীদের রুচি ও রসনায় খুব শ্রদ্ধেয় ও প্রীতিকর ছিল না; আজও নয়। তীর্থংকর মহাবীর যখন ধর্মপ্রচারোদ্দেশে শিষ্যদল লইয়া পথহীন রাঢ় ও বজ্রভূমিতে ঘুরিয়া বেড়াইতেছিলেন তখন তাঁহাদের অখাদ্য কুখাদ্য খাইয়া দিন কাটাইতে হইয়াছিল। সন্দেহ নাই যে, সেই আদিবাসী কৌম-সমাজের মৎস্য খাইয়া দিন কাটাইতে হইয়াছিল। সন্দেহ নাই যে, সেই আদিবাসী কৌম-সমাজের মৎস্য ও শিকার মাংস ভক্ষণ, সমসাময়িক সাধারণ বাঙালীর উদ্ভিজ্জ ব্যঞ্জনাদি, এবং তাহাদের আদিম রন্ধন প্রণালী ভিন্ প্রদেশী জৈন আচার্যদের নিরামিষ রুচি ও রসনায় অশ্রদ্ধার উদ্রেক করিয়াছিল। সেই অশ্রদ্ধা আজও বিদ্যমান!
শিকার ও অন্যান্য শারীর-ক্রিয়া গৃহক্রীড়া
রাজা-মহারাজ-সামন্ত-মহাসামন্ত প্রভৃতিদের প্রধান বিহারই ছিল শিকার বা মৃগয়া। আর, অন্ত্যজ ও ম্লেচ্ছ শবর, পুলিন্দ, চণ্ডাল, ব্যাধ প্রভৃতি অরণ্যচারী কোমদের শিকারই ছিল প্রধান উপজীব্য ও বিহার দুইও। ইঁহাদের কিছু কচিহু শিকার-চিত্র পাহাড়পুর ও ময়নামতীর ফলকগুলিতে দেখা যায়। এই ফলকগুলিতেই দেখিতেছি, কুস্তী বা মল্লযুদ্ধ এবং নানাপ্রকারের দুঃসাধ্য শারীর ক্রিয়া ছিল নিম্নকোটির লোকদের অন্যতম বিহার। পবনদূতে নারীদের জলক্রীড়া এবং উদ্যানরচনার উল্লেখ আছে; এই দুইটিই বোধ হয় ছিল তাঁহাদের প্রধান শারীর-ক্রিয়া। দ্যুত বা পাশাখেলা এবং দাবা খেলার প্রচলন ছিল খুব বেশি। পাশা খেলাটা তো বিবাহোৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ বলিয়াই বিবেচিত হইত। দাবা খেলার প্রচলন যে বাঙলাদেশে কবে হইয়াছিল, বলা কঠিন; তবে চর্যাগীতিতে ‘ঠাকুর’ (অর্থাৎ ‘রাজা’), ‘মন্ত্রী’, ‘গজবর’ এবং ‘বড়ে’, এই চারিটি গুটি, খেলার ‘দান’ এবং ছকের চৌষট্টি কোঠার বা ঘরের উল্লেখ এমন সহজভাবে পাইতেছি যে মনে হয়, দশম-একাদশ শতকের আগেই এই খেলা বাঙলাদেশে সুপ্রচলিত হইয়া গিয়াছিল। কাহ্নপাদ বলিতেছেন :
করুণা পিহাড়ি খেলহু নঅবল ।
সদ্গুরু-বোহেঁ জিতেল ভববল ॥
ফীটউ দুআ মাদেসী রে ঠাকুর ।
উআরি উএসেঁ কাহ্ন নিঅড় জিনউর ॥
পহিলেঁ তেড়িয়া বড়িআ মারিউ ।
গঅবরেঁ তোড়িয়া পাঞ্চজনা ঘালিউ ॥
মতিএঁ ঠাকুরক পরিনিবিতা ।
অবশ করিয়া ভববল জিতা ॥
ভণই কাহ্ন অম্হে ভাল দান দেহুঁ ।
চউষট্ঠি কোয়া গুনিয়া লেহু ॥
করুণার পিড়িতে নবদল (দাবা) খেলি, সদগুরুবোধে ভববল জিতিলাম। দুই নষ্ট হইল, ঠাকুরকে (রাজাকে) দিওনা; উপকারীর উপদেশে কাহ্নর নিকটে জিনপুর। প্রথমে বড়িয়া তুড়িয়া মারিলাম (অর্থাৎ, প্রথমেই হইল বড়ের চাল); তারপর গজবর (হাতি) তুলিয়া পাঁচজনকে ঘায়েল করিলাম। মন্ত্রীকে দিয়া ঠাকুরকে (রাজাকে) প্রতিনিবৃত্ত করিলাম (ঠেকাইলাম); অবশ করিয়া ভববল জিতিলাম। কাহ্নু বলে, দান আমি ভালই দিই, চৌষট্টি কোঠা গুলিয়া লই।
নিম্নকোটি স্তরে এবং নারীদের মধ্যে কড়ির সাহায্যে নানাপ্রকার খেলা, যথা গুঁটি বা ঘুণ্টিখেলা, বাঘবন্দী, ষোলঘর, দশপঁচিশ, আড়াইঘর, প্রভৃতি তখন হইতেই সুপ্রচলিত ছিল, এমন অনুমানে কিছু মাত্র বাধা নেই! সাংস্কৃতিক জনতত্ত্বের অনুসন্ধানে বহুদিন ধরা পড়িয়াছে যে, এই সমস্ত খেলা সমগ্র পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়া ও প্রশান্তমহাগরবন্ধ দেশ ও দ্বীপগুলির সুপ্রাচীন কৌমসমাজের একেবারে মৌলিক গৃহক্রীড়া।
সর্বানন্দের টিকাসর্বস্ব গ্রন্থ হইতে জানা যায়, ‘অড্ঢ’ বা ‘আঢ’, অর্থাৎ বাজি রাখিয়া তখনকার দিনের লোকেরা জুয়া খেলিতেও অভ্যস্ত ছিল। লোকেরা বাজি রাখিয়া ভেড়া ও মুরগীর লড়াই খেলিত ও খেলাইত।
সমতটেশ্বর শ্রীরাধণ-রাতের কৈলান-লিপিতে বলা হইয়াছে, সতত হস্তী ও অশ্বক্রীড়ায় নিযুক্ত থাকার ফলে শ্রীধারণের দেহ ছিল পেশীসমৃদ্ধ এবং সুদর্শন (গজতুরগ-সতত-পীড়ন-ক্রমোচিতশ্রম বলিততনুবিভাগ- রম্যদর্শন)। রাজ-পরিবারে এবং অভিজাতবর্গের পুরুষদের মধ্যে হস্তী ও অশ্বক্রীড়া সুপ্রচলিত ছিল, সন্দেহ নাই।
নৃত্যগীতবাদ্য ও অভিনয়
নৃত্যগীতবাদ্যের প্রচলন ও প্রসার সম্বন্ধে প্রমাণ সুপ্রচুর। রামচরিত, পবনদূত প্রভৃতি কাব্যে, নানা লিপিতে, সদুক্তিকর্ণামৃতের প্রকীর্ণ শ্লোকে, চর্যাগীতি ও দোঁহাকোষের নানা জায়গায় নানাসূত্রে নৃত্যগীতবাদ্যের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। মনে হয়, উচ্চ ও নিম্নকোটি উভয় স্তরেই এই দুই বিদ্যা ও ব্যসনের সমাদর ছিল যথেষ্ট। বাররামা ও দেবদাসীদের সকলেই নৃত্যগীতবাদ্যপটীয়সী হইতে হইত। তাঁহারা যে নানা কলানিপুণা ছিলেন, এ-কথার ইঙ্গিত সেন-লিপিতে এবং পবনদূতেও আছে। রাজতরঙ্গিণী-গ্রন্থে দেখিতেছি, পুণ্ড্রবর্ধনের কার্তিকেয় মন্দিরে যে নৃত্যগীত হইত তাহা ভরতের নাট্যশাস্ত্রানুযায়ী, এবং নৃত্যগীতমুগ্ধ জয়ন্ত স্বয়ং ভরতানুমোদিত নৃত্যগীত শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন। পাহাড়পুর ও ময়নামতীর পোড়ামাটির ফলকগুলিতে এবং অসংখ্য ধাতব ও প্রস্তরমূর্তিতে নানা ভঙ্গিতে নৃত্যপর পুরুষ ও নারীর প্রতিকৃতি সুপ্রচুর। বৃহদ্ধর্ম ও ব্রহ্মবৈবর্ত উভয় পুরাণেই নট পৃথক বর্ণহিসাবেই উল্লিখিত হইয়াছেন, সমাজের নিম্নতর স্তরে। এখনও বাঙালী সমাজের নিম্নতর স্তরে। এখনও বাঙালী সমাজের নিম্নস্তরে এক ধরনের গায়কগায়িকা দেখিতে পাওয়া যায়, গান গাহিয়া এবং নাচিয়াই যাঁহারা জীবিকা নির্বাহ করেন; ইঁহারাই বোধ হয় উপরোক্ত পুরাণ দুইটির নটবর্ণ। কিন্তু উচ্চকোটির কেহ কেহও বোধ হয় নটনটীর বৃত্তি গ্রহণ করিতেন। জয়দেব-গৃহিনী পদ্মাবতী প্রাকবিবাহ-জীবনে কুশলী নটী ছিলেন এবং সংগীতে তাঁহার খুব প্রসিদ্ধি ছিল। পাহাড়পুর ও ময়নামতীর ফলকগুলিতে, কোনও কোনও প্রস্তরচিত্রে, নানা প্রকারের বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে, যেমন কাঁশর, করতাল, ঢাক, বীণা, বাঁশি, মৃদঙ্গ, মৃৎভাণ্ড প্রভৃতি। রামচরিতে দেখিতেছি, বরেন্দ্রীতে বিশেষ এক ধরনের মুরজ (মৃদঙ্গ) বাদ্য প্রচলিত ছিল; বাঙলার অন্যত্র বোধ হয় অন্য প্রকারের মুরজের প্রচলন ছিল। সদুক্তিকর্ণামৃতের একটি শ্লোকে আছে তুম্বীবীণার উল্লেখ। কিন্তু সর্বাপেক্ষা বিস্তৃত ও ঘনিষ্ঠ বিবরণ পাইতেছি চর্যাগীতিতে—কণ্ঠ ও যন্ত্রসংগীত উভয়েরই, নানাপ্রকার বাদ্যযন্ত্রের এবং বোধ হয় গীতাভিনয়েরও। নিম্নশ্রেণীর নটনটীদের কথা আগেই বলিয়াছি। চর্যাগীতিতে দেখিতেছি, ডোম্বীরা সাধারণত খুব নৃত্যগীতপরায়ণা হইতেন।
এক সো পদ্ম চৌষঠী পাখুড়ী।
তঁহি চড়ি নাচঅ ডোম্বী বাপুড়ী।
একটি পদ্ম, তাহার চৌষট্টি পাপড়ি; তাহাতে চড়িয়ে নাচে ডোম্বী।
লাউ-এর খোলা আর বাঁশের ডাঁট বা দণ্ডে তন্ত্রী (তার) লাগাইয়া বীণা জাতীয় একপ্রকার যন্ত্র ইঁহারা প্রস্তুত করিতেন, আর গান গাহিয়া গাহিয়া গ্রামে গ্রামান্তরে ঘুরিয়া বেড়াইতেন।
সুজ লাউ সসি লাগেলি তান্তী।
অণহা দাণ্ডী চাকি কিঅত অবধূতী।।
বাজই অলো সহি হেরুঅ বীণা।।
সুন তান্তিধ্বনি বিলসই রুণা।।
* * *
নাচন্তি বাজিল গাঅন্তি দেবী।
বুদ্ধনাটক বিসমা হোই।।
সূর্য লাউ-এ শশী লাগিল তন্ত্রী, অনাহত দণ্ড—সব এক করিয়া অবধূতী। ওলো সখি, হেরুক-বীণা বাজিতেছে; শোন্, তন্ত্রীধ্বনি কি সকরুন বাজিতেছে! * * * বজ্রাচার্য নাচিতেছে, দেবী গাহিতেছে—এইভাবে বুদ্ধনাটক সুসম্পন্ন হয়।
বুদ্ধ-নাটকের উল্লেখ লক্ষ করিবার মতন। নৃত্য এবং গীতের সাহায্যে এক ধরনের নাট্যাভিনয় বোধ হয় প্রাচীন বাঙলায় সুপ্রচলিত ছিল, এবং এই নাচ-গানের ভিতর দিয়াই বোধ হয় কোনও বিশেষ ঘটনাকে (এই ক্ষেত্রে বুদ্ধদেবের জীবন কাহিনীকে?) রূপদান করা হইত।
অবান্তর হইলেও এই প্রসঙ্গে বলিয়া রাখা চলে, নৃত্যগীতপরায়ণা ছিলেন বলিয়াই বোধ হয় ডোম্বী ও অন্যান্য তথাকথিত নীচ জাতীয়া রমণীদের সামাজিক নীতিবন্ধন কিছুটা চঞ্চল ও শিথিল হইত, এবং সেই হেতু তাঁহারা অনেক ক্ষেত্রে উচ্চকোটির পুরুষদেরও মনোহরণে সমর্থ হইতেন। তাহা ছাড়া জাতি ও শ্রেণীসংস্কারমুক্ত সহজযানী ও কাপালিকদের যোগের সঙ্গিনী হইতেও কোনও বাধা তাঁহাদের বা যোগীদের কাহারও হইত না।
কইসণি হালো ডোম্বী তোহোরি ভাভরী আলী।
অন্তে কুলিণজণ মাঝেঁ কাবালী॥
* * *
কেহো কেহো তোহোরে বিরুআ বোলই।
বিদুজণ লোঅ তোরেঁ কণ্ঠ ন মেলই॥
কাহ্নে গাই তু কামচণ্ডালী।
ডোম্বীত আগলি নাহি চ্ছিণালী॥
হাঁলো ডোম্বী, কিরূপ (আশ্চর্য) তোর চাতুরী! তোর (এক) অন্তে কুলীন জন, (আর) মধ্যে কাপালী! কেহ কেহ তোকে বলে বিরূপ (তাহাদের প্রতি), (কিন্তু) বিদ্বজ্জন তোকে কণ্ঠ হইতে ছাড়ে না। কাহ্নু (কাহ্ন) গায়, তুই কামচণ্ডালী, ডোম্বীর চেয়ে বেশি ছিলানী (আর) কেহ নাই।
লোকায়ত সমাজে এবং সামাজিত ও ধর্মগত উৎসবানুষ্ঠান উপলক্ষে, নানা ক্রিয়াকর্মে নৃত্যগীতের প্রমাণ সমসাময়িক শিল্প-সাহিত্যে সুস্পষ্ট। চর্যাগীতির একটি গীতে সমসাময়িক বিবাহযাত্রার একটি সংক্ষিপ্ত অথচ সুন্দর বর্ণনা আছে এবং সেই প্রসঙ্গে কয়েকটি বাদ্যযন্ত্রেরও উল্লেখ আছে। কাহ্নপাদ বলিতেছেন :
ভবনির্বাণে পড়হ মাদলা।
মনপবন বেণি করণ্ডকশালা॥
জঅ জঅ দুন্দুহি সাদ উছলিআঁ।
কাহ্ণ ডোম্বী বিবাহে চলিঅ॥
ডোম্বী বিবাহিআ অহারিউ জাম।
জউতুকে কিঅ আণতু ধাম॥
ভব ও নির্বাণ হইল পটহ মাদল; মনপবন দুই করণ্ডক শালা। জয় জয় দুন্দুভি শব্দ উচ্ছলিত করিয়া কাহ্ন চলিল ডোম্বীকে বিবাহ করিতে। ডোম্বীকে বিবাহ করিয়া জন্ম খাইলাম, কিন্তু যৌতুকে (লাভ) করিলাম অনুত্তরধাম (অর্থাৎ, নীচু জাতের ডোম্বীকে বিবাহ করিয়া জাত কুল গেল বটে, কিন্তু ভালো যৌতুক পাওয়া গিয়াছে, তাহাতেই ক্ষতি যেন সব পূরণ হইয়া গিয়াছে, এই ভাবে)।
তখনকার দিনেও বাঙলাদেশে বিবাহ ব্যাপারে বরপক্ষ যৌতুক লাভ করিত, এবং যৌতুকের লোভে নীচকুল হইতে কন্যাগ্রহণেও খুব আপত্তি ছিল না। অন্যান্য সংবাদের সঙ্গে এই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতটিও এই গীতে বিদ্যমান।
যানবাহন ।। নৌযান
সাধারণ লোকেরা স্থলপথে পদব্রজে এবং জলপথে ভেলা বা ডিঙ্গা এবং নৌকাযোগেই যাতায়াত করিত। ভেলা, ডিঙ্গা-ডিঙ্গী-ডোঙ্গা, প্রত্যেকটি শব্দই অস্ট্রিক ভাষার দান, এবং মনে হয়, আদিমতম কাল হইতেই ইহাদের সঙ্গে বাঙ্গালীর পরিচয় ছিল ঘনিষ্ঠ। নৌকার ব্যবহার, নৌ-বন্দর, নৌ-ঘাটি, নৌবাণিজ্য, নৌদণ্ডক প্রভৃতির কথা ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসঙ্গে আগেই বলিয়াছি; কিন্তু নৌকার সঙ্গে বাঙালী জীবনের ঘনিষ্ঠ আত্মিক যোগের কথা ধরা পড়িয়াছে চর্যাগীতিতে। রূপকছলে নৌকা, নৌকার হাল, গুণ, কেড়ুঁয়াল, পুলিন্দা, খোল, চক্র বা চাকা, খুঁটি, কাছি, সেঁউতি, পাল প্রভৃতি এমন সহজভাবে ব্যবহার করা হইয়াছে যে, মনে হয়, এই যানটির সঙ্গে বাঙালীর হৃদয়ের একটি গভীর যোগ ছিল। নৌকায় খেয়া-পারাপারের ইঙ্গিতও আছে। পারের মাশুল আদায় হইত কড়িতে (কবড়ী) বা বোড়িতে। খেয়া-পারাপারের কাজ অনেক সময় নিম্নশ্রেণীর নারীরাও করিতেন। চর্যাগীতির একটি গীতিতে দেখিতেছি পাটনীর কাজটি করিতেছেন জনৈকা ডোম্বী।
গঙ্গা জউনা মাঝেঁরে বহই নাই।
তহিঁ বুড়িলী মাতঙ্গী পোইআ লীলে পার করেই॥
বাহতু ডোম্বী বাহ লো ডোম্বী বাটত ভইল উছারা।
সদ্গুরু পঅইপত্র জাইব পুণু জিণ উরা॥
পাঞ্চ কেড় আল পড়ন্তে মাঙ্গে পিঠত কচ্ছী বান্ধী।
গঅণ খোলে সিঞ্চহু পাণী ন পইসই সান্ধী।।
* * *
কবড়ী ন লেই বাড়ী ন লেই সুচ্ছড়ে পার করই।
জো রথে চড়িলা বাহবা ন জাই কুলে কুল বুলই॥
গঙ্গা আর যমুনার মাঝে বহিতেছে নৌকা; মাতঙ্গ কন্যা ডোম্বী তাহাতে জলে ডুবিয়া ডুবিয়া লীলায় পার করিতেছে। বাহ গো ডোম্বী, বাহিয়া চল, পথেই দেরি হইয়া যাইতেছে; সদগুরু পাদপদ্মে যাইব জিনপুর। পাঁচটি দাঁড় পড়িতেছে পথে, পিঠে কাছি বাঁধ, সেঁউতিতে জল সেচ, জল যেন সন্ধিতে প্রবেশ না করিতে পারে।… কড়িও লয় না, বুড়িও লয় না, স্বেচ্ছায় করে পার; যাহারা রথে চড়িল, নৌকা বাওয়া জানিল না, তাহারা শুধু কুলে কুলে ঘুরিয়া ফিরিল।
সহরপাদের একটা গীতে আছে :
কাঅ ণাবড়ি খাণ্টি মণ কেডুআল ।
সদ্গুরু-বঅণে ধর পতিবাল ॥
চীঅ থির করি ধরহুরে নাই ।
আন উপায়ে পার ন জাই ॥
নৌবাহী নৌকা টানঅ গুণে ।
মেলি মেল সহজে জাউ ণ আণেঁ ॥
বাটত ভঅ খাণ্ট বি বলআ ।
ভব উলোলেঁ সর বি বোলিআ ॥
কুল লৈ খর সে উজাঅঁ ।
সরহ ভণৈ গঅণেঁ সমাঅ ॥
কায় (হইতেছে) নৌকা, খাঁটি মন (হইল তাহার) দাঁড়; সদগুরু বচনে হাল ধর। চিত্ত স্থির করিয়া নৌকা ধর; অন্য উপায়ে পারে যাওয়া যায় না। নৌবাহী নৌকা টানে গুনে; সহজে গিয়া মিলিত হও, অন্য (পথে) যাইও না। পথে (আছে) ভয়, বলবান দস্যু; ভব উল্লোলে (তরঙ্গে) সবই টলমল। কূল ধরিয়া খরস্রোতে উজাইয়া যায়; সরহ বলে, গগনে গিয়া প্রবেশ করে।
অন্যত্র কম্বলপাদ বলিতেছেন :
খুঁটি উপাড়ী মেলিলি কাচ্ছি ।
বাহতু কামলি সদ্গুরু পুচ্ছি ॥
মাঙ্গত চড্হিলে চৌদিস চাহঅ ।
কেডুআল নাহি কেঁকি বহবকে পারঅ ॥
খুঁটি (গাঁজ) উপড়াইয়া কাছি খুলিয়া দাও; হে কামলি (পূর্ব-বাঙলায় মাঝি প্রভৃতি দিন-মজুরদের আজও কাম্লা বা কামুলা) সদ্গুরুকে জিজ্ঞাসা করিয়া নৌকা বাহিয়া চল। পথ চড়িয়া (মাঝনদীতে আসিয়া) চারদিকে দেখিয়া দেখ, দাঁড় না থাকিলে কে বাহিতে পারে।
নদ-নদী-খাল-বিলের বাঙলাদেশে নৌকা ও নদীকে কেন্দ্র করিয়া আধ্যাত্ম-জীবনের রূপ-রূপক গড়িয়া উঠিবে, ইহা কিছু বিচিত্র নয়।
ভবনই গহণ গম্ভীর বেগেঁ বাহী।
দুআন্তে চিখিল মাঝেঁ ন থাহী।।
ভবনদী গভীর, গম্ভীর বেগে বহিয়া চলে। দুই তীরে কাদা, মাঝে ঠাঁই নাই।
এ-ছবি তো একান্তই বাঙলার নদনদীগুলির : দুই তীর পলিমাটি কাদায় ভরা। আর, নদীর গভীর গম্ভীর বেগ, সেও তো গঙ্গা-পদ্মা-মেঘনা-লৌহিত্যেরই। সরহপাদের একটি গীতে আছে,
বাম দহিন জো খাল-বিখলা।
সরহ ভণই বাপা উজুবাট ভইলা।।
(পথে) বামে দক্ষিণে অনেক খাল-বিখাল; সরহ বলেন, সোজা পথ ধরিয়া চল (অর্থাৎ, খাল-বিখালের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িও না, সোজা চলিয়া যাও)।
এই ছবিও তো একান্তই বাঙলাদেশের। এত খাল-বিখালই বা আর কোথায়! শান্তিপাদের একটি গীতে আছে :
কূলে কূলে মা হোইরে মূঢ়া উজুবাট সংসারা ।
বাল ভিণ একুবাকু ণ ভুলহ রাজপথ কন্ধারা ॥
মাআ মোহ সমুদারে অন্ত ন বুঝসি থাহা ।
আগে নাব ন ভেলা দীসৈ ভন্তি ন পুচ্ছসি নাহা ॥
সুনাপান্তর উহ ন দীসই ভান্তি ন বাসসি জান্তে ।
এস আট মহাসিদ্ধি সিঝৈ উজুবাট জাঅন্তে ॥
বামদাহিণ দো বাটা চ্ছাড়ী শান্তি বুলথেউ সংকেলিউ ।
ঘাট ণ গুমা খড়তড়ি ণ হোই আখি বুঝিব বাট জাইউ ॥
হে মূঢ় কূলে কূলে ঘুরিয়া ফিরিও না; সংসারের (মাঝখানে রহিয়াছে) সহজ পথ। সম্মুখে পড়িয়া আছে যে সমুদ্র, তাহার অন্ত যদি না বুঝা যায়, থই যদি না পাওয়া যায়, সম্মুখে যদি কোনও নৌকা বা ভেলা দেখা না যায়, তবে অভিজ্ঞ পথিক যাঁহারা তাঁহাদের নিকট হইতে পথের দিশা জানিয়া লও। শূন্যে প্রান্তরে যদি পথের ঠিকানা না মেলে, তবু ভ্রান্তির পথে আগাইয়া যাওয়া উচিত নয়। সোজা সহজ পথ ধরিয়া গেলেই মিলিবে অষ্টমহাসিদ্ধি। খেলা করিতে করিতে বাম ও দক্ষিণ পথ ছাড়িয়া (মাঝপথে) চলিতে হইবে। এই সহজপথে ঘাট ঝোপ কিছু নাই, বাধাবিঘ্ন কিছু নাই; চোখ বুঝিয়া এই পথে চলা যায়।
গো-যান । হস্তী ও অশ্বযান
স্থলপথে গ্রাম হইতে দূরে গ্রামান্তরে বা নগরে যাইবার লোকায়ত যান ছিল গো-রথ বা গরুর গাড়ি। মহিষের গাড়ির উল্লেখ দেখিতেছি না; কিন্তু নৈষধচরিতের সাক্ষ্য যদি প্রামাণিক হয় তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয়, বাঙালী প্রাচীন কালে মহিষের দধি ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল। গ্রীক ঐতিহাসিকদের বিবরণীতে দেখিতেছি, প্রাচ্য ও গঙ্গারাষ্ট্রের রাজাদের চতুরশ্ববাহিত রথ ছিল। অশ্ববাহিত যান উচ্চকোটির লোকেরা ব্যবহার করিতেন, সন্দেহ করিবার কারণ নাই। গ্রীক ঐতিহাসিকেরা বলিতেছেন, যুদ্ধে গঙ্গারাষ্ট্রের সৈন্যবলের মধ্যে প্রধান বলই ছিল হস্তীবল। অসংখ্য লিপিতেও হস্তীসৈন্যর উল্লেখ সুপ্রচুর। সুপ্রাচীন কাল হইতেই পূর্বভারতের হস্তী অন্যতম প্রধান বাহন বলিয়াও গণ্য হইত। এই পূর্ব-ভারতেই, বিশেষভাবে বাঙলাদেশে ও কামরূপে, হাতি ধরা ও হাতির চিকিৎসা ইত্যাদি সম্বন্ধে একটি বিশেষ শাস্ত্রই গড়িয়া উঠিয়াছিল। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় তো বলেন, হস্তী-আয়ুর্বেদ বাঙলার অন্যতম প্রধান গৌরব। রাজ-রাজড়া, সামন্ত-মহাসামন্তরা, বড় বড় ভূম্যধিকারীরা হাতিতে চড়িয়াও যাতায়াত করিতে সন্দেহ নাই। চর্যাগীতি ও দোহাকোষে হাতির রূপক আশ্রয়ে অনেকগুলি গীত স্থান পাইয়াছে, এবং রূপকগুলি এমন, মনে হয়, এই প্রাণীটির সঙ্গে বাঙালীর প্রাণের গভীর পরিচয় ছিল। খেদা পাতিয়া আজিকার দিনে যেমন করিয়া হাতি ধরা হয় তখনও তেমন করিয়াই হাতি এবং হাতিশিশু (করভ) ধরা হইত। বন্য হাতী সুদৃঢ় করিয়া বাঁধিয়া রাখা হইত। চর্যাগীতিতে কাহ্নপাদের একটি গীত আছে :
এবং কার দৃঢ় বাখোড় মোড়িউ ।
বিবিহ বিআপক বাহ্মণ তোড়িউ ॥
কাহ্নু বিলসঅ আসব মাতা ।
সহজ নলিনীবন পৈসি নিবিতা ॥
কিন্তু বন্যহাতি কোনো বাধা বন্ধনই মানিত না, সমস্ত শিকল ছিঁড়িয়া খুঁটি ভাঙিয়া পদ্মবনে গিয়া প্রবেশ করিত।
পাগলা হাতির বর্ণনা মহীধরপাদের একটি গানেও আছে।
মাতেল চীঅ গএন্দা ধারই ।
নিরনতর গঅণন্ত তুসেঁ ঘোলই ॥
পাপ পুণ্ণ বেণি তোড়িঅ সিকল মোড়িঅ খম্ভাঠানা ।
গঅন টকলি লাগিয়ে চিত্ত পৈতি নিবানা ॥
আমার মত্ত চিত্তগজেন্দ্র ধাবিত হইতেছে; নিরন্তর গগনে সকল কিছু ঘোলাইয়া যাইতেছে। পাপ ও পুণ্য উভয়ই শিকল ছিঁড়িয়া এবং সকল খাম্ভা মাড়াইয়া গগন-শিখরে গিয়া পৌঁছিয়া একেবারে শান্ত হইয়াছে।
উত্তর ও পূর্ব বাঙলার পার্বত্য নদীর তীরে হাতিরা ঘুরিয়া বেড়াইত যথেচ্ছভাবে। সরহপাদ বলিতেছেন :
মুক্কই চিত্তগজেন্দ করু এত্থ বিঅপ্প ণু পুচ্ছ ।
গঅন গিরী ণৈজল পিএউ তিহুঁ তড় বসউ সইচ্ছ ॥
চিত্ত গজেন্দ্রকে মুক্ত কর; এ বিষয়ে আর কোনও বিকল্প জিজ্ঞাসা করিও না। গগন গিরির নদী জল সে পান করুক, তাহার তটে স্বেচ্ছায় সে বাস করুক।
হাতি ধরিবার আগে সারিগান গাহিয়া হাতির মনকে বশ করিতে হইত। বীণাপাদের একটি গান আছে :
আলি কালি বেণি সারি মুণিয়া।
গঅরব সমরস সান্ধি গুণি আ।।
গরুর গাড়ির চেহারা এখনও যেরূপ প্রাচীনকালেও তাহাই ছিল; বাঙলা ও ভারতবর্ষের সুপ্রাচীন প্রস্তর ও মৃৎফলকই তাহার প্রমাণ। বরযাত্রায়ও গরুর গাড়ি ব্যবহার করা হইত, চর্যাগীতির একটি গীতে এইরূপ ইঙ্গিত আছে। পাহাড়পুরের একট মৃৎফলকে সুসজ্জিত অশ্বের একটি চিত্র আছে; এই ধরনের সজ্জিত অশ্বে চড়িয়াই সঙ্গতিসম্পন্ন লোকেরা যাতায়াত করিতেন।
পাল্কীর ব্যবহারও ছিল বলিয়াই মনে হয়। কেশবসেনের ইদিলপুর-লিপিতে দেখিতেছি, একটু প্রচ্ছন্নভাবে হস্তীদন্তনির্মিত বাহদণ্ডযুক্ত পাল্কীর উল্লেখ। বল্লালসেন নাকি তাঁহার শত্রুদের রাজলক্ষ্মীদিগকে বন্দী করিয়া লইয়া আসিয়াছিলেন, এই ধরনের পাল্কী চড়াইয়া।
রামচরিত ও পবনদূতে রামাবতী ও বিজয়পুরের বর্ণনা এবং বাণগড়, রামপাল, মহাস্থান, দেওপাড়া প্রভৃতি স্থানের ধ্বংসাবশেষ হইতে মনে হয়, সমৃদ্ধ নগরবাসীরা ইটকাঠের তৈরী খুদ্র বৃহৎ হর্মে বাস করিতেন; রাজপ্রাসাদও তৈরী হইত ইটকাঠেই। কিন্তু এই সব ভবনের আকৃতি প্রকৃতি কিরূপ ছিল তাহা জানিবার উপায় নাই। গ্রামের ইটকাঠের বাড়ি বড় একটা ছিল বলিয়া মনে হয় না; কোনো গ্রামবর্ণনাতেই সেরূপ কোনো উল্লেখ দেখিতেছি না। দরিদ্র নিম্নকোটির লোকেরা ত বটেই, এমন কি সম্পন্ন মহত্তর-কুটুম্ব-গৃহস্থরাও সাধারণত মাটি, খড়, বাঁশ, কাঠ ইত্যাদির তৈরী বাড়িতে বাস করিতেন; মৃৎফলকের সাক্ষ্যে মনে হয়, চাল হইত খড়ের, বাঁশের চাঁচারী বুনিয়া তৈরী হইত বেড়া, আর খুঁটি হইত বাঁশের বা কাঠের। চর্যাগীতিতে বাঁশের চাঁচারী দিয়া বেড়া বাঁধিবার কথা আছে (চারিপাশে ছাইলারে দিয়া চঞ্চালী)। মাটির দেয়ালও ছিল; রাঢ়াঞ্চলে ও উত্তরবঙ্গে মাটির দেয়াল, পূর্বাঞ্চলে চাঁচারীর বেড়া। প্রস্তর ও মৃৎফলকের চিত্র এবং পাণ্ডুলিপি-চিত্র হইতে মনে হয়, আজিকার মতন তখনও বাঁশের বা কাঠের খুঁটির উপর ধনুকাকৃতি বা দুই তিন স্তরে পিরামিডাকৃতির চাল বা ছাউনি তৈরি হইত। একান্ত গরীব গৃহস্থ ও সমাজ-শ্রমিকেরা কুঁড়েঘরে বাস করিতেন। সদুক্তিকর্ণামৃত-গ্রন্থের একটি শ্লোকে এই ধরনের কুঁড়েঘরের একটি বাস্তব বর্ণনা আছে। ‘প্রচুর পয়সি’ প্রাচ্য দেশে এবং বৃষ্টিবহুল বাঙলাদেশে দরিদ্র গৃহস্থের জীর্ণগৃহের দুর্দশার এমন বস্তুনির