রবিবার , আগস্ট ২০ ২০১৭ | ৫ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Breaking News
Home / ধর্ম ও ইতিহাস / হিন্দু ধর্ম

হিন্দু ধর্ম


হিন্দুধর্শ  উপমহাদেশের বৃহত্তম তথা একটি দেশীয় ধর্ম বিশ্বাস। হিন্দু ধর্মাবলম্বীগন স্বীয় ধর্ম মতকে সনাতন ধর্ম নামেও অভিহিত করেণ। হিন্দুধর্মের সাধারণ“ধরনগুলোর” মদ্যে লৌকিক ও বেদিক হিন্দুধর্মের থেকে বৈষ্ণবধর্মের অনুরুপ ভক্তিবাদী ধারার মতো একাধিক জটিল মতবাদগুলোর সমন্বয়ের এক প্রচেষ্টা লক্ষিত হয়। হিন্দুধর্ম একাধিক ধর্মীয় ঐতিহ্যর সমন্বয়ে গঠিত। এই ধর্মের কোনো একক প্রতিষ্ঠাতা নেই। লৌহিযুগীয় ভারতের এতিহাসিক বৈদিক ধর্মে এই ধর্মের শিকড় নিবদ্ধ। হিন্দুধর্মকে বিশ্বের প্রাচীনতম জীবিত ধর্মবিশ্বাস বা প্রাচীনতম জীবিত প্রধান মতবাদ আক্ষা দেওয়া হয়। জনসংখ্যার বিচারে হিন্দু ধর্ম খ্রিষ্টধর্ম ও ইসলামের পূর্বেই তৃতীয় বৃহত্তম ধর্মমত এই ধর্মের অনুগামীদের সংখ্যা ১০০ কোটিরও বেশি। হিন্দুধর্মের শাস্ত্রগ্রন্থের সংখ্যা প্রচুর। হিন্দুশাস্ত্র শ্রুতি ও স্মৃতি নামে দুই ভাগে বিভক্ত। এই গ্রন্থগুলোতে ধর্মতত্ত্ব, দর্শণ ও পুরান আলোচিত হয়েছে এবং ধর্মানুশীলন সংক্রান্ত নানা তথ্য বিবৃত হয়েছে। এই গ্রন্থগুলোর মধ্যে বেদ, সর্ব প্রাচীন সর্ব প্রধান ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য প্রধান ধর্মগ্রন্থগুলো হল উপনিষদ, পুরান ও ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ন ও মহাভারত। ভগবদগীতা নামে পরিচিত মহাভারতের কৃষ্ণ কথিত একটি অংশ বিশেষ গুরুত্ব সম্পন্ন ধর্মগ্রহন্থের মর্যাদা পেয়ে থাকে। হিন্দু শব্দটি উৎসায়িত হয়েছে সিন্ধু শবদটি থেকে। সিন্ধু ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক নদীয় নাম। ঋগেব্দে সিন্ধুনদের স্থতি করা হয়েছে। পরবর্তীকালের আরবি সাহিত্যেও আল হিন্দু শব্দটির ম,াদ্যমে সিন্ধু নদ অববাহিকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠিকে বোঝানো হয়েছে। এযোদশ শতাব্দীতে ভারতের নামের সমার্থক শব্দ হিসেবে হিন্দুস্থান শব্দটির উৎপত্তি হয়। এই শব্দের আক্ষরিক অর্থ “হিন্দুদের দেশ” ইংরেজী ভাষঅতে ভারতের স্থানীয় ধর্মীয় দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গুলো বোঝাতে হিন্দুইজম বা হিন্দু ধর্ম কথাটি চালু হয় উনবিংশ শতাব্দীতে।

উপবিভাগঃ
হিন্দুধর্ম আজ একাধিক শাখায় বিভক্ত। অতীতে এই ধর্ম ছয়টি দর্শনে বিভক্ত চিল। বর্থমানে এগুলোর মদ্যে কেবল বেদান্ত ও যোগেরই অস্তিত্ব আছে। আধুনিক হিন্ধুধর্মের প্রধান বিভাগ গুলো হ ল বৈষ্ণবধর্ম, শৈবধর্ম, স্মাতর্বাদ ও বিভাগ বা উপবিভাগ লক্ষিত হয়। যাদের অনেকগুলোর পরস্পরের সঙ্গে অংশত আবৃত। ২০০৭ সালে অধিকতর জটিল ও সূক্ষ বিবেচনায় নিরিখে একাধিক মতের বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্যের দিকটি বিচার করে ম্যাক জানিয়েল হিন্দুধর্মের আরো ছয়টি শাখাকে চিহ্নিত করেছেন। এই বিভাগগুলো হলঃ
লৌকিক হিন্দু ধর্মঃ বিভিন্ন স্থানীয় ঐতিহ্য ও লৌকিক দেবদেবীর পূজাকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক বা সম্প্রদায় স্থরের ধর্ম বিশ্বাস বা প্রাগৈতিহাসিক কাল বা অন্ততপক্ষে বেদ রচিত হবার আগে থেকে প্রচলিত।
বৈদিক হিন্দু ধর্মঃ এই বিশ্বাসটি এক শ্রেণীয় ব্রাক্ষণ সমাজে আজও প্রচলিত।
বৈদান্তিক হিন্দুধর্মঃ উপনিষদের শিক্ষা অবলম্বনে প্রচারিত।
যৌগিক হিন্দু ধর্শঃ পতঞ্জলি রচিত যোগসূত্র অবলম্বনে প্রচারিত।
ধার্মিক হিন্দু ধর্মঃ কর্ম ও হিন্দু বিবাহ সংস্কার ইত্যাদি সামাজিক নিয়মকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা শাখা।
ভক্তিবাদঃ বৈষ্ণধর্মের অনুরুপ ভক্তিকেন্দ্রিক মতবাদ।
ধর্মবিশ্বাসঃ হিন্দুধর্ম এমনই একটি মূলধারায় ধর্মবিশ্বাস বা একটি সুবিস্তৃত ভৌগোলিক ক্ষেত্রে এক বহুধাবিভক্ত জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যে দিয়ে বিকাশলাভ করেছে। এই বিকাশলাভ সম্ভবপর হয়েছে দুটি পন্থায়: হিন্দু ধর্মের পুরানো রীতিনীতির নবীকরন এবং বহিরাগত রীতিনীতি ও সংস্কৃতি থেকে আত্মীকরন এর ফলে ধর্মীয় ক্ষেত্রে এক বিরাট বৈচিত্র্যময় সমাবেশ গঢ়ে ওঠেছে। এই সমাবেশ যেমন স্থঅন পেয়েছে অসংখ্যা ছোট ছোট আদিম ধর্মমত তেমনই স্থান পেয়েছে সমগ্র উপমহাদেশের লক্ষাধিক মতালম্বী সমন্বিত প্রধান ধর্মসম্প্রদায় গুলো। হিন্দু ধর্মবিশ্বাসের প্রধান উপাদান গুলো হলঃ ধর্ম নৈতিকতা/কর্তব্য) সংসার (জন্ম- মৃত্যু- পুনজন্মের চক্র)। কর্শ (ক্রিয়া ও তার প্রতিক্রিয়া) মোখ (সংসার থেকে মুক্তি ও বিভিন্ন যোগ (ধর্মানুশীলদের পন্থা)।
ইশ্বর ধারনাঃ একেশ্বরবাদ, বহুদেববাদ, সবেশ্বরময়বাদ অদ্বৈতবাদ, নাস্তিক্যবাদ সকল প্রকার বিশ্বাসের সমাহার দেখা যায় হিন্দুধর্মে। তাই হিন্দু ধর্মে ইশ্বরধারনটি অত্যন্ত জটিল। এই ধারনা মূলত নির্দিষ্ট কোনো ঐতিহ্য অথবা দর্শনের উপর নির্ভরশীল। কখনও কখনও হিন্দুধর্মকে হেনোযেইস্টিক ধর্ম (অর্থ্যাৎ বহু দেবতার অস্তিত্ব স্বীকার করার পাশাপাশি এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী ধর্ম ভ্যবস্থা) বলে উল্লেখ্য করা হয়। তবে এ ধরণের বর্গীকরণ অতিসরলাকরনের নামান্তর।
দেবতা ও অবতারগনঃ-হিন্দুধর্মে দৈব ব্যক্তিত্বদের দেব (স্ত্রীলিঙ্গের দেবী) নামে অভিহিত করা ঞয়। বাংলায় দেবতা শব্দটি দেব শব্দের সমার্থক শব্দরুপে বহুল প্রচলিত। শব্দটির আক্ষরিক দৈব সত্বা। আবার ইংরেজী ভাষায় শব্দটি গত শব্দের সমার্থক। হিন্দু সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হলেন হিন্দু দেবগন। চিত্রকালা ও স্থাপত্যে স্মৃতির আকারে এবং বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থে । বিশেষত ভারতীয় মহাকাব্য ও পুরানে নানান উপথ্যানে তাদের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঈশ্বরের থেকে এরা পৃথক অনেক হিন্দুই তাদের ইষ্টদেবতার রুপে ঈশ্বরকে পূজা করে থাকেন। ইষ্টদেবতার নির্বাচন ব্যক্তিগত আঞ্চলিক বা পরিবারিক ঐতিহ্য অনুসারে হয়ে থাকে। হিন্দু মহাকাব্যে ও পুরানের একাধিক কাহিনীতে বর্ণিত হয়েছে, কেমন করে দেবগন মর্ত্যে অবর্তীন হয়ে সমাজ ধর্ম সুরক্ষিত করেছেন এবং মানুষকে মোক্ষ পথে চালিত করেছেন। এই প্রকারের অবতীর্ণ রুপ অবতারগন বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। রামায়নের নায়ক রাম ও মহাভারতের কেন্দ্রীয় চরিত্র কৃষ্ণ বিষ্ণুরই অবতার রুপে চিত্রিত।

হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ীঃ (যুগ বিভাগ)ঃ
হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী যুগ চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে ।
চার যুগের প্রথম যুগ । সত্যযুগ , ত্রেতা যুগ ,দ্বাপর যুগ ও কলি যুগ,
সত্য যুগঃ বৈশাখ মাসের শুক্ল পক্ষে তৃতীয় তিথিতে রবিবারে সত্যযুগের উৎপত্তি। এর পরিমান ১৭,২৮,০০০ বছর। অবতার সংখ্যা চার। মৎস্য (মাছ) , কুর্ম (কুমির) বরাহ (শুকর), নুসিংহ (মানুষ ও সিংহের সমন্বিত রুপ)। ছয় জন শাসক। বলি বেন, মান্বাতা পুরোরবা, ধুন্ধুমার, কাত্তবীর্য্য অজুন, শুধু পূণ্য ছিল, পাপ ছিল না। প্রাণ ছিল মজ্জায়। মৃত্য ছিল ইচ্ছাধীন। সোনার পাত্র ব্যবহার করা হয়। বেদ ছিল সামবেদ। তীর্থ ছিল পুষ্কর তীর্থ। তারক ব্রক্ষনাল ছিল- নারায়ন পরম বেদ, নারায়ন পরম অক্ষর নারায়ন পরম মুক্তি নারায়ন পরম গুতি।
ত্রেতাঃ চার যুগের দ্বিতীয় যুগ কার্তিক মাসের শুল্ক পক্ষে নবমী তিথিতে সোমবারে ত্রেতা যুগের উৎপত্তি। এর পরিমান ১২.৯৬,০০০ বছর। অবতার সংখ্যা তিন। বামন, পরশুরাম, শ্রীরামচন্দ্র। পূণ্য তিন ভাগ, পাপ এক ভাগ।
সূর্য্য বংশের শাসকঃ ব্রক্ষ, মরীচি , কাশ্যপ, সাবনির্ক, মনু, দনু , সুষেন, হরিদাস, যৌবনাশ্ব, মুচুকুন্দ, শতবাহু, বেন, পৃথু, ইক্ষাকু, দ্যোতকার, কৎসপ, শ্রষ্ঠধর, কুকুৎস্থ, শতজ্ঞীর দন্ড, হরিষ, বিজয়, হনিশচন্দ্র, বোহিতাশ্ব, মৃত্যুঞ্জয়, মহাপদ্ব, ত্রিশঙ্কু, উচ্চহৃদ, মরুৎ অনরন্য, বিকর্নবাহু সগর, অংশুমান, অসমঞ্জা, ভগীরথ, অশ্বজয়, মনিদীলিপ রঘু, অজ্ঞ, দশরথ, শ্রীরাম, লব, কুশ। প্রান ছিল অস্থিতে। বেদ ছিল ঋগ্নেদ। রুপার পাত্র ব্যবহার করা হত। তীর্থ ছিল নৈমিষ অরণ্য।
দ্বাপর যুগঃ ভাদ্র মাসের কৃষ্ণ পক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে বৃহস্পতিবারে দ্বাপর যুগের উৎপত্তি। এর পরিমান ৮,৬৪,০০ বছর। অবতর সংখ্যা দুই। শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধ।
শাসক ছিল শাল্ব, বিরাট, হৎসধ্বজ, কৃশধ্বজ, ময়ূরধ্বজ, বত্রুবাহন, রুক্ষাহ্রদ , দুর্যোধন যুধিষ্ঠির, পরীক্ষিত,জনমেজর, বিষকসেন, শিশুপাল, জরাসন্ধ, উগ্রসেন বংস। প্রাণ ছিল রক্তে । বেদ ছিল যজুবের্দ, তাদের পাত্র ব্যবহার করা হয়। তীর্থ ছিল কুরুক্ষেত্র।
কলিযুগঃ চার যুগের শেষ যুগ। মাঘমাসের শুল্ক পক্ষের পূর্নিমা তিথিতে শুক্রবারে কলিযুগের উৎপত্তি। এর পরিমান ৪,৩২,০০০ বছর। পূর্ণ এক ভাগ পাপ তিন ভাগ। অবতার কল্কি। মানুষের আয়ু একশ বিশ বছর প্রায়। তীর্থগঙ্গা। সব পাত্র ব্যবহার করা হয়। মানুষ তপস্যাহীন, সত্য থেকে দুরে অবস্থানরত। রাজনৈতি কুটিল। শাসন ধনলেভী ব্রাক্ষন শাস্ত্রহীন। পুরুষ স্ত্রীর অনুগত। পাপে অনুরক্ত। সৎ মানুষের কষ্ট বৃদ্ধি। দুস্টের প্রভাব বৃদ্ধি। মনু সংহিতায় বলা হয়েছে যে সথ্যযুগে তপস্যা, ত্রেতা যুগে জ্ঞান, দ্বপর যুগে যজ্ঞ এবং কলিতে দানই প্রদান হয়। বেদব্যাস রচিত বিষœ পুরান, বলা হয়েছে যে, কৃষ্ণের পৃথিবী থ্যাগ করে স্বর্গারোহনের সময় থেকে পৃতিবীতে কলি যুগের সূচনা হয়েছে।

হিন্দু ধর্ম গ্রন্থ সমূহঃ
হিন্দু ধর্মের মধ্যে দু’প্রকার পবিত্র কিতাব পাওয়া যায়। যথা সুরওয়াতি ও সামারাতি।
(ক) সুরওয়াতি ঃ- সুরওয়াতির অর্থ যা শোনা হয়, বোঝা হয়, অনুভব করা হয়, যা প্রত্যাদেশ করা হয়। এটি হিন্দু ধর্মগ্রন্থে প্রাচীন এবং পবিত্র মনে করা হয়। যথা বেদ ও উপনিষদ।
(খ) সামারাতিঃ সামারাতির অর্থ স্মরণীয় বা থাকে মুখস্থ করা হয়েছে। এতে সৃষ্টিগত এবং লক্ষনগত দিক দিয়ে সৃষ্টিজগতের রহস্য বর্ণনা করা হয়েছে। যা মানুষকে অতীতের কর্মপদ্ধতি দিকনিদের্শনা দেয়। হিন্দুদের প্রবিত্রগ্রন্থ অগনিত, সেগুলোর মধ্যে বেদ, উপনিষদ,পুরান বিশেষ ভাবে উল্লেখ্যযোগ্য।

বেদঃ-
১. বেদ (ঠবফধ) সংস্কৃত শব্দ বিদ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এর অর্থ হলো জানা। বেদের অর্থ হলো সীমাহীন জ্ঞান প্রজ্ঞা এবং বিদ্যা।
বেদ বুনিয়াদী হিসাবে চার প্রকারঃ- (১) ঋগবেদ (২) যজুবের্দ (৩) শামবেদ এবং (৪) অর্থর্ববের্দ।
সখ্যা হিসেবে তা ১১৩১টি।
পতজ্ঞলির মহাভাষ্য অনুযায়ীঃ-
(১) ঋগবেদ–২১টি। (২) যজুবেদ—১৩১টি। (৩) শামবেদ—১০০টি।
(৪) অথর্ববেদ-১৯টি।
মোট ১১৩১টি মাখায় বিভক্ত।
(২) ঋগবেদ,শামবেদ ও যজুবেদ অতি প্রাচীন গ্রন্থরুপে বর্ণনা করা ঞয়। এবং ঋগবেদ সর্বাধিক প্রাচীন। ঋগবেদ বুনিয়াধীভাবে প্রশংসা ও গুনগান সূচক কবিতার কাব্যরুপ।
যজুবেদ উৎসর্গ বিষয়ক নিয়ম পদ্ধতির বিস্তারিত বিবরণ। অর্থববেদ যাদু ভিষয়ক বিরাট সংকলন।
(৩) চারটি বেদেরে প্রত্যাদেশ হওয়ার বিষয় এবং তাদের একত্রীকরণ ও সংকলনের সময় সঠিকভাবে ইতিহাসে নে॥ি নির্ভরযোগ্য কোন উৎস বা সূত্রও নেই। এ চার বেদকে হিন্দু ধর্মমতের সর্বাধিক পবিত্র নির্ভর যোগ্য এবং গ্রহনযোগ্য গ্রন্থ মনে করা হয়।
উপনিষদঃ-
(১) উপনিষদ শব্দটি তিনটি শব্দাংশ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। উপ অর্থ্যাৎ নিকট ,নি অর্থ্যাৎ নিচে এবং ষদ অর্থ্যাৎ বসা। উপনিষদের অর্থ হলঃ নিচে নিকটে বা কাছাকাছি বসা শিষ্যের দল গুরুর কাছা কাছি বসত যাতে পবিত্র বিশ্বগুলোর শিক্ষা অজর্ন করতে পারে। উপনিষদের সংখ্রা দুই শ’রও বেশি, হিন্দুস্থানী বর্ণনায় এর সংখ্যা ১০৮টি বলা হয়েছে। এর মদ্যে ১০টি বুনিয়াদী আবারও কেউ কেউ বলে ১৮টি।
(২) বেদান্ত আসলে উপনিসদকেই বলে। কিন্তু ওই শব্দের ব্যবহার দার্শনিক ভাবে নেয়া হয়, যার বুনিয়াদ উপনিষদের উপর। শব্দগত ভাবে বেদান্তের অর্থ বেদের শেষ, বেদের সমাপ্তি। উপনিষদ বেদের শেষ সম্প্রসারিত সংস্করণ।

ইতিহাস বা সংগ্রামী সাহিত্যঃ
(১) রামায়নঃ এটি এমন সংগ্রামী সাহিত্য যা রামচন্দ্রের জীবনচরিত্র সম্বন্ধীয়।
(২) মহাভারতঃ এটিও একটি চিত্তাকর্ষক সংগ্রামী সাহিত্য। এর বিষয়বস্তু চাচাতো ভাই পান্ডব এবং ফৌরবদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের কাহিণী।এতে কৃষ্ণের জীবনচরিত্রের বর্ণনাও আছে।
(৩) ভগবদীগীতাঃ এটি সংগ্রামী সাহিত্য মহা ভারতের বিশেষ একটি অংশ। ভীম্মাপরওয়া অধ্যায় ২৫-৪২ পর্যন্ত ১৮টি অধ্যায়ের সম্পূর্ণ। এটি ওই প্রকার উপদেশ সংবলিত। যা যুদ্ধের ময়দানে কৃষ্ণ অর্জুনকে দিয়েছিলেন।
পুরানঃ এটি সর্বাধিক পাঠ্য ধর্মগ্রন্থ। পূরর্ন শব্দের অর্থ অতি প্রাচীন। পুরান জগতের সৃষ্টিতত্ত্ব। প্রাচীন আর্যদেব ইতিহাস, হিন্দু দেবতা এবং বিভিন্ন উপাস্য পূরান, মহাঋষি বিয়া শিয়া (বিশ্ব) এ পূরানকে ১৮টি পূর্ণ খন্ডে বিভক্ত করেছেন।
মনু সংহতিঃ মনু সংহতি একটি সামারাতি ধর্মগ্রন্থ।

হিন্দু ধর্মের ইতিহাসঃ
হিন্দুধর্ম বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ধর্ম তবে হিন্দু নামটি আধুনিকালের দেওয়া। এর প্রাচীন নাম হল সনাতন ধর্ম। আবার এই ধর্ম বৈদিক ধর্ম নামেও পরিচিত। এই ধর্ম বেদ এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫০০-২৬০০) অব্দের দিকে যখন হাপ্রান যুগ ছিল ঠিক সেই সময়ই এ ধর্মের গোড়ার দিক। অনেকের মতে খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০-৫০০ অব্দ। কিন্তু ইতিহাস বিশ্লেষকদের মতে অর্থ জাতিগোষ্ঠি ইউরোপের মধ্য দিয়ে ইরান হয়ে ভারতে প্রবেশ করে। খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০-২৪০০ অব্দের মধ্যে তারাই ভারতে বেদ চর্চা করতে থাকে এবং তারা সমগ্র ভারতে তা ছড়িয়ে দেয়। আর্য জাতিগোষ্ঠিরা অনেক নিয়ম কানন মেনে চলত। তারা চারটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল এরা হলঃ ব্রাক্ষন,ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শদ্র। এই সম্প্রদায়গুলো তৈরি করার অন্যতম কারন হল কাজ ভাগ করে নেওয়া এক এক সম্প্রদায় এর লোক এক ধরনের কাজ করবে। অনেকের মতে হিন্দু শব্দটি আর্যদেবকে আফগানিস্তানের বাসিন্দা বা আফগানেরা দিয়েছে তারা সিন্দু নদের তীরবর্তী সনাতন ধর্মের সাধু সন্ন্যাসিদেরকে হিন্দু বলত আর এই ভাবেই হিনদু নামটি এসেছে।
বৈদিক সভ্যতায় অর্থ্যাৎ ঐ আমলে কোন মূর্থি পূজা করা হতনা।সেই সময়ে হিন্দুদের প্রধান দোতা ছিলেন ইন্দ্র ,বরুন ,অগ্নি এবং সোম । তখন কার ঈশ্বর আরাধনা হত যজ্ঞ এবং বেদ পাঠের মাধ্যমে। সকল কাজের আগে যজ্ঞ করা ছিল বাজ্জনীয় । সে আমলে কোন মূতি বা মন্দির ছিল না।

প্রাগৈতিহাসিক ধর্ম
ব্রোঞ্জযুগীয় সিন্বু সভ্যতায় ভারতের প্রগৈতিহাসিক ধর্মের নানা নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়।এই সভ্যতায় ধর্মবিশ্বাসে হিন্দুধর্মের অনূরুপ কিছু ধর্মীয় প্রথার সন্ধান মেলে। যেমন-ধর্মীর ¯œান ,শিবলিঙ্গের ন্যায় প্রতীকোসোপান।একটি স্বস্তিক চিহেুর সন্ধানও এখানে পাওয়া গেছে।
সিন্বু সভ্যতায় নগর গুলোতে একাধিক পুরুষ ও নারীমূর্তি পাওয়া গিয়েছে। নারী মূর্তিগলোকে “ মাতৃকা দেবী”’র মূর্থি বলে উল্লেখ্য করা হলেও, অনেকেই এই বিশ্বাসের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে থাকেন। মহোজ্ঞোদাডোয় খনন কার্য চালানোর সময় একটি পাওয়া যায়। এই “পশুপতি সিলমোহর একটি উপবিষ্ট পশুপরিবৃত দেবতার সূতি লক্ষিত হয়। এটিকে শিবের এক আদিরুপ বলে বর্ণনা করেছেন। তারা এই মূর্তিটির বসার ভঙ্গিটিকে বলেছেন“ যোগভভ্গিমা”। বেদিক যুক বা বৈদিক ধর্শ ছিল প্রাচীন ইন্দো ইউরোফীয় ভাষাভাষাদের একটি বলিকেন্দ্রিক ধর্ম। এরা ১৫০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে নাগাদ ইরানীয় মালভূমি থেকে হিন্দুকুশ হয়ে ভারতে প্রবেশ করতে শুরু করে এবং স্থঅনীয় অধিবাসীদের সঙ্গে মিশে যায়। হিন্দুধর্মের আদিতম ধর্মগ্রন্থ চার বেদ ঋগে¦দ প্রাচীনতম। ১৫০০ থেকে ৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মধ্যবর্তী সময়ে এই গ্রন্থগুলো পর্যন্ত এগুলো গুরু শিষ্য পরস্পরায় মৌখিক প্রথার মাধ্যমে প্রচলিত চিল। এরপর থেকে মৌখিক প্রথার সঙ্গে সঙ্গে লিপিবদ্ধ করার প্রথাও চালু হয়।
হিন্দু ধর্মের দেবতা ও অবতারগনঃ-
ইন্দ্রঃ ইন্দু পূরানে স্বর্গের দেবতাদের রাজা। তার রানীর নাম শষীদেবী এবং হাতীর নাম ঐরাবত। তার বাহন পুষ্পক রথ। মূলত ইন্দ্র কোন বিশেষ দেবতা নন। যিনি স্বর্গের রাজা হন তিনিই ইন্দ্র।
ইন্দ্রের বিশেষ অস্ত্র হল বজ্র বা বিদ্যুৎ।
অগ্নিঃ-
অগ্নি হলেন একজন হিন্দু দেবতা। তিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈদিক দেবতা। অগ্নি আগুনের দেবতা এবং যজ্ঞের গ্রহীতা। অগ্নিকে দেবতাদের বার্তাবহ মনে করা হয়। তাই হিন্দুরা বিশ্বাস করেন যজ্ঞকালে অগ্নির উদ্দেশ্যে আকুতি প্রদান করলে সেই আহুতি দেবতাদের কাছে ফৌছে যায়। অগ্নি চিরতরুন, কারন আগুন প্রতিদিন নতুন করে জ্বালা হয় এবং তিনি অমর।
নারায়নঃ-
নারায়ন হলেন বৈদিক সর্বোচ্চ উপাস্য। বৈষবধর্শে তাকে “পুরুষোত্তম” বা শ্রেষ্ট পুরুষ মনে করা হয়। তিনি বিষু বা হরি নামেও “পুরুষোতম” বলা হয়েছে। পরম উপাস্যের ব্যাপী সত্ত্বাটি নারায়ন নামে পরিচিত। তিনিই ঋগে¦দের পুরুষসূত্রে উল্লেখিত পুরুষ। যজুবেদের নারায়ন সূক্তের পঞ্চম শ্লোকে নারায়নকে ব্রক্ষান্ডের ভিতরে ও বাইরের সব কিছুর মধ্যে পরিব্যাপ্ত সত্বা বলে উল্লেখ্য করা হয়েছে।
নারায়ন মব্দের অর্থ যিনি জলের উপর শয়ন করে। হিন্দুশাস্ত্রমতে জল প্রথম সৃষ্ট বস্ত , তাই সৃষ্টিকর্তা নারায়ন জলেই বাস করেন। সংস্কৃত ভাষায় “নর” শব্দের অর্থ মানুষ। তাই নারায়ন শব্দের অন্য অথৃ হল “ মানুষ যেখানে আশ্রয় গ্রহন করে। ভাগবত পূরানে নারায়নকে বলা হয়েছে পরব্রক্ষ বা সর্বোচ্চ উপাস্য। এই পূরান মতে, তিনি অসংখ্যা জগৎ সৃষি।ট করে। প্রতিটি জগতে জগদীশ্বর রূপে প্রবেশ করেছেন।
ব্রক্ষা রূপে রজঃ- গুন অবলম্বন করে তিনি চোদ্দটি জগৎ সৃষ্টি করেছেন। বিষ্ণু রুপে সত্ব গুন অবলম্বন করে তিনি সেগুলো রক্ষা করেন এবং শিব রুপে তমঃ গুন অবলম্বন করে তিনি তা ধ্বংস করেন, এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী ত্রিমূতি ও নারায়ন অভিন্ন।
নারায়নের অপর নাম “ মুকুন্দ” এই মব্দের অর্থ যিনি জন্ম ও মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি অর্থ্যাৎ প্রদান করেন।
ব্রক্ষাঃ-
ব্রক্ষা হিন্দুধর্মের সৃষ্টির দেবতা বিষ্ণু ও শিবের সঙ্গে তিনি ত্রিমূর্তিতে বিরাজমান। তিনি অবশ্য হিন্দু বেদান্ত দর্শনের সর্বোচ্চ দিব্যসত্বা ব্রক্ষের সমরুপ নন। বরং বৈদিক দেবতা প্রজাপতিকে ব্রক্ষা সমরুপ বলা চলে। বিদ্যাদেবী সরস্বতী ব্রক্ষার স্ত্রী।
সৃষ্টির প্রারম্ভে ব্রক্ষা প্রজাপতিদের সৃষ্টি করেন। এই প্রজাপতিরাই মানব জাতির আদি পিতা। মনুসংহিতা গ্রন্থে এই প্রজাপতিদের নাম পাওয়া যায়। এরা হলেন, মরীচি , অত্রি, অঙ্গিরস, পুলস্ত,পুলহ, ক্রভুজ, বশিষ্ঠ, প্রচেতস বা দক্ষ ভৃগু ও নারদ। সপ্তষি নামে পরিচিত সাত মহান ঋষির শ্রষ্টা ব্রক্ষা। এরা তাকে বিশ্বসৃষ্টির কাজে সহায়তা করেন। তার এই পুত্রগন তার শরীর থেকে জাত হননি, হয়েছেন তার মন থেকে। এই কারনে তাদের মানসপুত্র বলা হয়।

সরস্বতীঃ-

জ্ঞান , সঙ্গীত ও শিল্প করঅর হিন্দু দেবী ঋগে¦দে তিনি বৈদিক সরস্বতী নদীর অভিন্ন পতœী এবং লক্ষী ও পারবতীর সঙ্গে একবেগে ত্রিদেবী নামে পরিচিত। এই ত্রিদেবী যথাক্রমে ত্রিমূর্তি সৃষ্টিকর্তা ব্রক্ষা, পালনকর্তা বিষ্ণু ও সংহার কর্তা শিবের পতœী। হিন্দুদের বিশ্বাস সরস্বতী প্রাচীনতম হিন্দু ধর্মগ্রন্থবেদ প্রসব করেন।
বিষ্ণুঃ
বিষ্ণু হিন্দু বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ দেবতা আদি শংকর প্রমুখ ¯œাত পন্ডিতদের মতে বিষ্ণু ইশ্বরের পাঁচটি প্রধান রুপের অন্যতম। বিষ্ণু সহ¯্রানামে বিষ্ণুকে পরমাত্মা ও পরমেম্বর বলে ঘোষনা করা হয়েছে। এই গ্রন্থে তাকে সর্বজীব ও সর্ববস্তুতে পরিব্যপ্ত সত্বা,অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত তথা অনাদি অনন্ত সময়ের প্রভু, সকল অস্তিত্বের সূষ্টা ও ধ্বংসকারী, বিশ্বচরা চরের ধারক শেঅষক ও শাসক এবং বিম্বের সকল বস্তুর উৎসপুরুষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। পুরানে বিষ্ণুর দশাবতারেরও বর্ণনা রয়েছে। বিষ্ণুর এই দশ প্রধান অবতারের মধ্যে নয় জরেন জন্ম অতীতে হয়েছে এবং এক জনের জন্ম ভবিষ্যতে কলিযুগের শেষলগ্নে হবে বলে হিন্দুরা বিশ্বাস করেন। বিষ্ণু সহ¯্রানামে সৃষ্টিকর্তা ব্রক্ষার উক্তিতে বিষ্ণুর সহ¯্রকোটি যুগ ধারিনে বলে উল্লেখ্য করা হয়েছে। এর অর্থ বিষ্ণুর অবতারগন সকল যুগেই জন্মগ্রহন করে থাকেন। ভগবতী গীতা অনুসারে ধর্মের পালন এবং দুষ্টের দমন ও পাপীর প্রানের জন্য বিষ্ণু অবতার গ্রহন করেন। হিন্দুদের প্রায় সকল শাখাসম্প্রদায়ে বিষ্ণুকে বিষ্ণু বা রাম , কৃষ্ণ প্রমুখ অবতারের রুপে পূজা করা হয়।
লক্ষীঃ-
লক্ষী হলেন একজন হিন্দু দেবী , তিনি ধনসম্পদ আধ্যাতিক সম্পদ, সৌভাগ্য ও সৌন্দর্যের দেবী। তিনি বিষ্ণুর পত্মী। তার অপর নাম মহালক্ষী। লক্সী ছয়টি বিশেষ গুনের দেবী। তিনি বিষ্ণুর শক্তির উৎস। বিষ্ণু রামও কৃষ্ণ রুপে অবতার গ্রহন করেন, লক্ষী সীতা ও রাধা রুপে তাদের সঙ্গিনী হণ। কৃষ্ণের দুই স্ত্রী রুক্সিনী ও সত্যভামাও লক্ষী অবতার রুপে কর্পিত হন। লক্ষী পূজা অধিকাংশ হিন্দুর গৃহেই অনুষ্ঠিত হয়। দীপাবলি ও কোজাগরী পুর্নিমার দিন তার বিশেষ পূজা হয়। বাঙ্গালী হিন্দুরা প্রতি বৃহস্পতির লক্ষীপূজা করে থাকেন।
শিবঃ
শিব (আক্ষরিক অর্তে “শুভ” বা মঙ্গল) একজন হিন্দু দেবতা। তিনি ত্রিমূর্থির অন্যতম। ত্রিমূর্তির শিব ধ্বংসের প্রতিক। হিন্দুধর্মের শৈব শাখা সম্প্রদায়ের মতে, শিবই হলেন সর্বোচ্চ ঈশ্বর। যে সকল হিন্দুধর্মাবলম্বী শিবকেই প্রধান দেবতা মনে করে তার পূজা করেন তারা শৈব নামে পরিচিত। শিবকে সাধারণত বিমূর্ত শিবলিঙ্গের রুপ পূজা করা হয়। তার মূর্তির মধ্যে ধ্যানমগ্ন অবস্থা বা মায়াসুরের পিঠে তান্ডবনৃত্যরত অবস্থায় মূর্তি বেশি প্রচলিত। শিব অপর দুই প্রদান হিন্দু দেবতা গনেশ ও কার্তিকের পিতা।
পার্বতীঃ পাবর্তী হলেন হিন্দু দেবী দুর্গার একটি রুপ। তিনি শিবের স্ত্রী এবং আদি পরাশক্তির এক পূর্ণ অবতার। অন্যান্য দেবীরা তার অংশ থেকে জাত বা তার অবতার। পরবর্তী মহাশক্তির অংশ। তিনি ঘৌরি নামেও পরিচিত পারবর্তী শিবের দ্বিতীয় স্ত্রী। তবে তিনি শিবের প্রতমা স্ত্রী দাক্ষায়নীরই অবতার। তিনি গনেশ ও কার্তিকের মা। কোনো কোনো সম্প্রদায়ে তাকে বিষ্ণুর ভগীনী মনে করা হয়। পারবতী হিমালয়ের কণ্যা। শিবের পাশে তার যে, মূর্তি দেখা যায় সেগুলো দ্বিভূজা। সাধারণত তাকে দয়ামী দেবীর রুপেই দেকা হয়। তবে তার কয়েকটি ভয়ংকরী মূর্তিও আছে। তার দয়াময়ী মূর্তিগুলো হল কাত্যায়নী, মহাগৌরী, কমলাত্মিকা, ভুবনেশ্বরী ও ললিতা। অন্যদিকে তার ভয়ংকারী রুপগুলো হল দূর্গা, কালী, তারা চন্ডী, দশমহাবিদ্যা ইত্যাদি।
দাক্ষয়নীঃ দাক্ষায়নী হিন্দুধর্মে বৈরাহিক সুখ ও দাম্পত্যজীবনের দেবী। হিন্দুনারীরা সাধারণত স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনায় সতীর পূজার করে থাকেন। সতী দেবীর এক রুপ। তিনি শিবের প্রথমা স্ত্রী। হিন্দু পুরান অনুসারে তিনি তপস্বীয় জীবনযাত্রা থেকে শিবকে বের করে আনেন এবং গৃহী করেন। দক্ষষজ্ঞের সময় স্বামীর অসম্মান সহ্য করতে না পেরে তিনি প্রাণত্যাগ করেন। পরে হিমালয়ের গৃহে কন্যা পারবতীর রুপে জন্ম নিয়ে পুনরায় শিবকে বিবাহ করেন। দাক্ষায়নীর অপরাপর নামগুলো হল উমা, অপর্না, শিবকামিণী ইত্যাদি। ললিতা সহ¯্রনাম স্তেত্রে তার এক সহ¯্র নাম লিখিত রয়েছে।

হিন্দু দর্শনঃ-
হিন্দুি দর্শন ছয়টি আস্তিক এবং তিনটি নাস্তিক শাখায় বিভক্ত। আস্তিক শাখাগুলো বেদ কে সর্বোচ্চ ধর্মগ্রন্থ হিসেবে স্বীকার করে। কিন্তু নাস্তিক শাখাগুলো তা করে না। আস্তিক শাখাগুলো হল, সাংখ্য, যোগ ন্যায় বেশেষিক মীমাংসা ও বেদান্ত। নাস্তিক মাকাগুরো হলো বৌদ্ধ জৈন ও চার্বাক। এর মধ্যে চার্বাক দর্শন শাখাটি খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতকে অবলুপ্ত হয়ে যায় এবং এর প্রদান ধর্মগ্রন্থগুলোও হারিয়ে যায়। গুপ্তযুগে ছয়টি আস্তিক দর্শন বা ষড়দর্শনের অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায়। মধ্যযুগের শেষভাগে বৈশেষিক ও মীমাংসা শাখাদুটি অবলুপ্ত হয়ে গেলে বেদান্ত শাখায় উপশাখাগুলোর গুরুত্ব বেড়ে যায় এবং বেদান্ত শাখায় উপশাখাগুলোর প্রদান শাখা হয়ে ওঠে। সতেরো শতক পর্যন্ত ন্যায় “ নবন্যায়র” এর আকারে টিংক ছিল। সংখ্যা শাখাটি স্বানন্ত্র্য হাবিবে ধেির ধীরে যোগ ও বেদান্ত শাখার সঙ্গে মিশে যায়।
বেদান্তঃ-
বেদ হিন্দুদের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থের নাম এর চারটি মূল অংশ রয়েছে। ঋগে¦দ যজুবের্দ সামবেদ এবং অথব বেদ। বেদ হল অপৌরসেয় অর্থ্যাৎ কোন মানুষ তা সৃষ্টি করেনি। বেদ ঈশ্বরেরই বাণী। বেদ সন্ত্রসমূহের সমষ্টি। চারবেদে মোট ২০,৪৩৪টি মন্ত্র রয়েছে। বেদ রচনার শুরু থেকে তা সম্পূর্ণ হতে বহুকাল সময় লেগেছে। সেই কালসীমা মোটামুটি ভাবে খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০-৯৫০ অব্দ পর্যন্ত ধারা হয়।
বেদান্ত বা উত্তর মীমাংসা হিন্দু দর্শনের একটি অস্তিক শাখা। বেদান্ত দর্শনের মূল ভিত্তি উপনিষদ “বেদান্ত” শব্দটির অর্থ “বেদের অন্ত বা শেষ ভাগ।
ব্রক্ষসূত্রঃ ব্রক্ষসূত্র হল হিন্দু দর্শনের বেদান্ত শাখার তিনটি প্রধান শাস্ত্রের অন্রতম। এই তিনটি শাস্ত্রকে বলা হয় “ প্রস্থানওয়ী” এর মধ্যে ব্রক্ষসূত্র হল “ ন্যায় প্রস্থান” বা যুক্তি ভিত্তিক প্রস্থান। এটি সংস্কৃতে রচিত। প্রস্তানওয়ীর অপর দুই শাস্ত্র উপনিষদ কে শ্রুতিপ্রস্থান এবং ভগদগীতাকে স্মৃাতি প্রস্থান বলা হয়। ব্রক্ষসূত্রে উপনিষদের দর্শনকে যুক্তিসঙ্গত পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোনো একটি মাত্র বই বেদান্ত দর্শনের উৎস নয়। বেদান্তের প্রতিটি শাখারই প্রধান ধর্মগ্রন্থ হল প্রস্তানত্রয়ী (উপনিষদ , ভগবদ্গীতা ও ব্রক্ষসূত্র)। বেদের বিধিসম্মত ভাগ চারটি বেদের চারটি অংশ মন্ত্র বা সংহতি, ব্রাক্ষণ আরন্যক ও উপনিষদ। যন্ত্রাংশ প্রধাণত রচিত কেবল যজু সংহিতার কিছু অংশ গদ্য রচিত।
অদ্বৈত বেদান্তঃ
অদ্বৈত বেদান্ত বা অদৈ¦তবাদ হল বৈদিক দর্শনের একটি শাখা এবং সাধন পদ্ধতি। অদ্বৈত বেদান্তের প্রধান ব্যাখ্যা কর্তা হলেন আদি শংকর। তবে তিনি এই মতের প্রবর্তক নন। পূর্ব প্রচলিত অদ্বৈতবাদী মতগুলোকে তিনি সুসংবদ্ধ করেছিলেন। পাশ্চাত্য প্রাচ্যবাদ ও দীর্ঘস্থায়ী দর্শন প্রভাব এবং ভারতের নভ্য বেদান্ত মত ও হিন্দু জাতীয় কাদের উপর অদ্বেত বেদান্তের প্রভাবের জন্য অদ্বৈত মতকে হিন্দু দর্শনের বেদান্ত শাখা ও সেগুলোর সাধনপদ্ধতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও শক্তিশালী মত মনে করা হয়। হিন্দুধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়ে অদ্বৈত বাদী শিক্ষার প্রভাব দেকা যায়। ভারতীয় সংস্কৃতির বাইরেও অদ্বেত বেদান্ত হিন্দু অধ্যান্তবিদ্যার একটি সাধারন উদাহরন বলে বিবেচিত হয়। অদ্বৈত মতে মানুষের সত্য কারে সত্বা আত্মা হল শুদ্ধ চৈতন্য এবং সর্বোচ্চ সত্য ব্রক্ষও শুদ্ধ চৈতন্য । অদৈত্য অনুগামীরা আত্মা ও ব্রক্ষ জ্ঞান সংক্রান্ত বিদ্যা বা জ্ঞানের সাহায্যে মোখ লাভ করতে চান । এই মোখ লাভ দীর্ঘকালীন প্রয়াস । গুরুর অধ্যনে থেকে প্রশিক্ষনের মাধ্যমে এটি পাওয়া সম্ভব ।
ইতিহাসঃ আদি শংকরের আগেও অদ্বৈত বেদান্ত মতবাদ প্রচলিত হয় । কিন্তু আদি শংকরের ব্যাখাই এই মতবাদটিকে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী করে তোলে ।
আদি শংকরের পূর্বে অদ্বৈতবাদঃ ব্রক্ষসূত্র (৪০০-৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ) রচনার আগে বেদান্তের কোনো শাখা সর্ম্পকে প্রায়ই কিছুই জানা যায় না । ব্রক্ষসূত্র ও শংকরের মধ্যবর্তী সময়ের (বিশেষত খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়) কথাও বিশেষ জানা যায় না । এই সময়ে লেখা দুইটি বই পাওয়া যায় । ভর্তৃহরির বাক্যপদীয় ও গৌড়পাদের মাতুক্য কারিকা ।
প্রাচীন ইতিহাস ঃ বালসুর ব্রক্ষণ্যমের মতে বেদ বেদান্ত দর্শন সমসাময়িক । কারন বেদান্ত শাখায় ধারনাগুলির মূল উৎস হল বেদ । বৈদিক যুগ(১৫০০-৬০০ পূর্ব খ্রিস্টাব্দ) ঋষিরা যে ধর্ম ও দর্শন শাস্ত্র এবং কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন , সেগুলিই পরে বিস্তার লাভ করে বেদের জ্ঞান কান্ড উপনিষদের মধ্যে “মতবাদ ও মতবাদ প্রবর্তনের উপযোগী সঠিক দর্শন জ্ঞানের অভাব ছিল । এই দার্শনিক ভিত্তিই গড়ে তোলার জন্য পরে ষড়দর্শন নামে পরিচিত ছয়টি মতের জন্ম হয় ।
বাদরায়নের ব্রক্ষসূত্রঃ বাদরায়নের ব্রক্ষসূত্র বা বেদান্তসূত্র গ্রন্থের যে সংস্করনটি এখন প্রচলিত সেটি খিষ্টীয় ৪০০-৪৫০ অব্দের রচনা । তবে সূত্রের অনেক অংশ তার আগেও প্রচলিত ছিল । বাদরায়ন ঠিক কোন সময়ের লোক ছিলেন তা জানা যায় না । তবে সম্ভবত তিনি খ্রিষ্টীপূর্ব ২০০ অব্দ থেকে খ্রিষ্টীয় ২০০ অব্দের মাঝামাঝি লোকছিলেন । বাদরায়ন অবশ্য প্রথম বেদান্তের শিক্ষাগুলির সুসংহত রুপ দেননি । তিনি তার পূর্ববর্তী ৭ জন বেদান্তগুরুর কথা উল্লেখ্য করেন ।
ব্রক্ষসূত্র থেকে শংকর ঃ নাকামুরার মতে সম্ভবত এই সময়ে অনেক গ্রন্থ রচিত হয়েছিল । কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় , তার কিছু খন্ডাংশই আমরা পাই । আবার বহু গ্রন্থ হারিয়ে গেছে । আজ আর সে গুলি পাওয়া যায় নি । শংকর তার রচিত ভাষ্যগুলিতে তার সম্প্রদায়ের ৯৯ জন পূর্বসুরির নাম উল্লেখ্য করেছেন । প্রাক-শংকর যুগের মতবাদ ও উক্তিগুলি পরবর্তীকালের শাখাগুলিকে ব্যবহার করতে দেখা যায়। এই সব মতবাদ ও উক্তির মাধ্যমে প্রাচীন বেদান্ত দর্শনের বিকারের ব্যাপারে অনেক তথ্য জানা যায় । যমুনাচার্যের সিদ্ধিত্রয়(১০৫০ খ্রি.) বাসানুজের বেদার্থ সংগ্রহ (১০৫০-১১৫৭ খ্রি.) ও শ্রীনিবাসদের যতীন্দ্রমতদীপিকা গ্রন্থে আদি বেদান্ত দার্শনিকদের নাম পাওয়া যায় । ব্রক্ষসূত্র ও শংকরের জীবদ্দশার মধ্যবর্তী সময়ে সর্বমোট চোদ্দোজন দার্শনিকের নাম পাওয়া যায় । গৌড়পাদঃ গৌড়পাদ খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী ছিলেন গোবিন্দ ভাগবতপাদের গুরু । গোবিন্দ ভাগবতপাদ আবার ছিলেন শংকরের গুরু । মান্ডুক্য কারিকাঃ গৌড়পাদ মান্ডুক্য কারিকা রচনা অথবা সম্পাদনা করেছিলেন । এই গ্রন্থটি গৌড়পাদ কারিকা বা আগাম শাস্ত্র নামেও পরিচিত । মান্ডুক্য কারিকা হল মান্ডুক্য উপনিষদ এর ভাষ্য । মান্ডুক্য উপনিষদ হল সবচেয়ে ক্ষুদ্রায়তন অথচ অন্যতম প্রধান একটি উপনিষদ । এটিকে উপনিষদ দর্শনের সারমর্ম ঘোষনা করা ঞয় । শ্রীগৌড়পাদাচার্য মঠঃ ৭৪০ খ্রিস্টাব্দ গৌড়পাদ শ্রীগৌড়পাদাচার্য মঠ স্থাপন করেন । এর অপর নাম কাভালে মঠ । এটি গোয়ার পোন্ডা তালুকের কাভালেতে অবস্থিত । এটি দক্ষিন ভারতের সারস্বত ব্রাক্ষনদের প্রাচীনতম মঠ ।
আদি শংকর ঃ আদি শংকর (৭৮৮-৮২০) অদ্বৈত তত্ত্বকে সুসংহত ও পুনরুজ্জীবিত করেন । তিনি শংকর ভাগবদপাদাচার্য বা আদি শংকরাচার্য নামেও পরিচিত । অদ্বৈত বেদান্তকে তিনি বৈদিক শাস্ত্রের ব্যাখ্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন । এই কাজে তিনি অন্যান্য বৈদান্তিক গুরু যেমন- শংকরের গুরু গোবিন্দ বাগবাদপাদ গোবিন্দের গুরু গৌড়পাদ গৌড়পাদের গুরু অজাতিবাদকে গ্রহন করেন । তার ব্যাখ্যা ও তার নাম প্রচলিত রচনাগুলি অদ্বৈত বেদান্তের প্রামানিক ব্যাখ্যা ।
উত্তর – ধ্রুপদি হিন্দু ধর্ম ঃ-
৬৫০ থেকে ১১০০ খ্রিষ্ঠাব্দকে হিন্দুধর্মের ইতিহাসের উত্তর ধ্রুপদি হিন্দুযুগ বলা হয় । শংকর এই যুগের মানুষ ছিলেন । এর পূর্ববর্তী যুগটিকে হিন্দুধর্মের সুবর্নযুগ (৩২০-৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ ) বলা হয় । গুপÍ শাসনকাল (৩২০-৫৫০ খ্রিষ্টাব্দ ) থেকে হর্ষ সাম্রাজ্যের পতন(৬০৬-৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ ) এই যুগের অন্তগর্ত ।
দর্শন(শংকরের)ঃ
শংকর তার পূর্ববর্তী দার্শনিকদের মতবাদকে সুসংহত করেন । উপনিষদের প্রামানিক দর্শনতত্ত্ব ব্যাখ্যার মাধ্যমে তিনিস তার নিজস্ব বেদান্তচর্চার ধারাটি গড়ে তোলেন । শংকরের অন্যতম প্রকরন গ্রন্থ বিবেক- চূড়ামনি-নিম্মোক্ত পংক্তিটি থেকে শংকরের অদ্বৈত দর্শনের ষাংসংখোপ করা যায় -যা কোটি গ্রন্থে বলা হয়েছে , তা আমি এক পংক্তিতে বলি ; ব্রক্ষ সত্য জগৎ মিথ্যা (অথাৎ জগতের পৃথক অস্তিত্ত্ব নেই) এবং আত্মা ব্রক্ষ থেকে নয় । শ্রীঙ্গেরি মঠের মতে শংকরের বাণীকে আরও সংক্ষেপে বলা যায় চিরন্তন নিগুর্ন চৈতন্যরুপ সর্বোচ্চ সত্বা ব্রক্ষ এক এবং অদ্বিতীয় । আদি শংকরের রচনাবলি – আদি শংকরের প্রধান কাজ হল প্রস্থান এষীর ভাষ্যরচনা । তিনি ব্রক্ষসূত্র ভগবদগীতা ও উপনিষদ গ্রন্থাবলির ভাষ্য রচনা করেছিলেন । বিবেকচূড়ামনি গ্রন্থের রচনাকারের নাম সঠিক জানা যায় না । তবে এটি শংকরের রচনা হিসেবে প্রচলিত ।
 আয়াপ্পা দীক্ষিত (সপ্তদশ শতাব্দী)।
 সদাশিব ব্রক্ষেন্দ্র (অষ্টদশ শতাব্দী) ।
 চন্দ্রশেখর ভারতী (বিংশ শতাব্দী) ।
 সচ্চিদানন্দেন্দ্র সরস্বতী ( বিংশ শতাব্দী ) ।
আদি শংকর তিনটি ধর্ম গ্রন্থকে প্রস্থান তয়ী বা প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে নির্ভাচিত করেন। এগুলি পরবর্তীকালে অন্যান্য বেদান্ত শাখাতেও প্রধান হিন্দু দর্শন গ্রন্থের মর্যাদা পায় এগুলো হল-
১.উপনিষদ বা উপদেশ প্রস্থান
২.ভগবদগীতা বা সাধন প্রস্থান
৩.ব্রক্ষসূত্র বা ন্যায় প্রস্থান বা যুক্তি প্রস্থান ।
বারো তোরেটি উপনিসদ প্রধান অণ্যগুলো অপ্রধান । ভগবদগীতা মহাবারতের একটি অংশ । ব্রক্ষসূত্র বা বেদান্তসূত্র গ্রন্থে উপনিষদ ও ভগবদগীতা সামজ্ঞ্যস্য বিধার্ন করা হয়েছে । আদি শংকর প্রস্থান এরীর উপর ভাষ্য লিখেছিলেন । সেই জন্য অদ্বৈত পরস্পরায় মৌলিক ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা পায় ।
শাখা-
শংকরের মৃত্যুর পর অদ্বৈত বেদান্তের একাধিক শাখায় উদ্ভব হয় । এর মধ্যে দুটি শাখা এখনও আছে । এগুলো হল- বামতী বিবরন পঞ্চপাদিকা ইষ্টসিদ্ধি শাখা দুটি একন অবলুপ্ত ।
পরবর্তীকালের বিকাশ-
শংকর পরবর্তীকালের অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের গুরুত্বপূর্ন প্রক্তারা হলেন-
 প্রকাশাত্ম (দশম শতাব্দী)
 বিমুক্ত আত্ম ( দশম শতাব্দী)
 সর্বজ্ঞাত্ম (দশম শতাব্দী )
 চিৎসুখ (দ্বাদশ শতাব্দী)
 আনন্দগিরি (ত্রয়োদশ শতাব্দী)
 অমলানন্দ (ত্রয়োদশ শতাব্দী)
 বিদ্যারন্য (চতুদশ শতাব্দী)
 শংকরানন্দ (চতুদশ শতাব্দী)
 অদানন্দ (পঞ্চদশ শতাব্দী)
 প্রকাশানন্দ ষোড়শ শতাব্দী)
 নৃসিংহাশ্রম (ষোড়শ শতাব্দী)
 মধুসূধন সরসত্বী (সপ্তদশ শতাব্দী)
ভারতীয় র্দশনে পুরুষার্থ বা মানুষের জীবনের প্রধান চারটি লক্ষ্যের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে ।
ধর্মঃ জীবনের সঠিক পথ নিজের ও সমাজের প্রতি ব্যক্তির কর্তব্য ও দায়িত্ব এবং ব্যক্তির প্রতি সমাজের কর্তব্য দায়িত্বকে ধর্ম বলা হয়েছে ।
অর্থঃ ব্যক্তির জীবন নির্বাহের জন্য উপযুক্ত জীবিকা ।
কাম ঃ আনন্দও বিনোদন ।
মোখঃ মুক্তি

উপনিষদঃ উপনিষদ হিন্দুধর্মের এক বিশেষ ধরনের ধর্মগ্রন্থের সমষ্টি । এই বই গুলিতে হিন্দুধর্মের তাত্ত্বিক ভিত্তিটি আলোচিত হয়েছে । উপনিষদ অপর নাম বেদান্ত । ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা বিশ্বাস করেন । উপনিষদ গুলিতে সর্বোচ্চ সত্য ব্রক্ষের প্রকৃতি এবং মানুষের মোক্ষ বা আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভের উপায় বর্ণিত হয়েছে ।
উপনিসদ গুলো মূলত বেদ-আর ব্রাক্ষণ ও আরন্যক অংশের শেষ অংশে পাওয়া যায় । এই গুলি প্রাচীন কালে গুরু শিষ্য পরস্পরায় মুখেমুখে প্রচলিত ছিল ।
দুশোরও বেশি উপনিষদ কথা জানা যায় । এগুলির মধ্যে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ । এই গুলিকে মূখ্য উপনিষদ বলে ।
এই গুলির মধ্যে অন্যতম হল মৃত্তিকা উপনিষদ । এই উপনিষদ ১০৮টি উপনিষদের নাম পাওয়া যায় । এই ১০৮ টি সংখ্যাটিকে হিন্দুরা জৎপর মালা ১০৮ টি দানা থাকে ।
পুরানঃ—–
পুরান হিন্দু বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ আক্ষানমূলক ধর্মগ্রন্থ সমুচ্চর। পুরানে সৃষ্টি থেকে প্রনয় পর্যন্ত ব্রক্ষান্ডের ইতিহাস রাজন্যবর্গ যোদ্ধৃবর্গ, ঋষি ও উপদেবতাগনের বয়শেবৃত্তান্ত এবং হিন্দু সৃষ্টিতত্ত্ব, দর্মন ও ভূগোলতত্ত্ব আলোচিত হয়েচে। পুরানে সাধারণত নির্দিষ্ট কোন দেবতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং তাতে ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তার প্রাবল্যও লক্ষিত হয়। এই গ্রন্থগুলো প্রধানত আক্ষয়িকার আকারে রচিত, যা একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। লোকমতে, মহাভারত রচয়িতা ব্যাসদেব পুরান সমূহের সংকলক। যদিও পুরানের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন পাঠগুলো গুপ্ত সা¤্রাজ্যের (খ্রিষ্টীয় তৃতীয় পঞ্চম শতাব্দী০ সমসাময়িক এর অধিকাংশ উপাদানই ঐতিহাসিক বা অণ্যান্য সূত্রানুযায়ী এই সময়কাল ও তার পরবর্তী শতাব্দীগুরোকে সঙ্গে সম্পর্খিত। পুরানগ্রন্থগুলো ভারতের নানা স্থঅনে রচিত হয়েছিল।

কাশীর মহারাজা ডক্টর বিভূতি নারায়ন সিংহের কাশীরাজ ট্রাষ্ট গঠিত হরে পুরান নিয়ে সুসংহত গবেষনার কাজ শুরু হয়। এই সংস্থা থেকে পুরানের সমালোচনা মূলক সংস্করন এবং পুরানম নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে।
উৎসঃ

খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দে রচিত ছান্দগ্যে উপনিষদে পুরানের একটি প্রাচীন উল্লেখ পাওয়া যায়। বৃহদারন্যক উপনিষদ পুরানকে “পঞ্চম বেদ” নামে অভিহিত করে। এতে প্রাচীন যুগে পুরানের ধর্মীয় গুরুত্বের কথা জানা যায়। সম্ভবত সেই যুগে পুরান মৌখিক ভাবে প্রচারিত হত। মৎস্য পুরান অনুসারে পুরানের মূল বিষয় পাচটি। এগুরো পঞ্চলক্ষন নামে পরিচিত
১. সর্গ -(ব্রক্ষান্ডের সৃষ্টিকাহিনী)।
২. প্রতিসর্গ -পরবর্তীকালের ( মুখ্যত প্রলয় পরবর্তী) সৃষ্টিকাহিনী।
৩. বংশ- দেবতা ও ঋষিদের বংশবৃত্তান্ত।
৪. সমন্বন্তর- মানব জাতির সৃষ্টি ও প্রথম সৃষ্ট মানবজাতির কাহিনি। মনুর শাসনকালের কথ; এই শাসনকালে ৭১টি দিব্যযুগ বা ৩০৮,৪৪৮,০০০ বছরের সমান।
৫. বংশানুচরিতম- রাজবংশের ইতিহাস।
পুরানে বংশবৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ রাখার উপরেও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বায়ু পুরান অনুসারে “ পুরাকালে ল দেবতা” ঋষি গৌরবশালী রাজন্যবর্গের বংশবৃত্তান্ত ও মহামানবের উপর অর্পিত হয়। পৌরানিক বংশবৃত্তান্ত অনুযায়ী মনু বেবস্বত ভারত যুদ্ধের ৯৫ প্রজন্ম পূর্বে জীবিত ছিলেন। স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ পুরানগুলো সহজলভ্য। কথক নামে পরিচিত ব্রাক্ষন পন্ডিতেরা মন্দিরে ঘুরে কথকতার মাধ্যমে ভক্তি দৃষ্টিকোন থেকে পুরানের কাহিনীগুলো প্রচার করে সাধারন্যে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করেন।
পুরানগুরোর তালিকাঃ-
পুরান নামাঙ্কিত সাহিত্যধারার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ মহাপুরান। সাধারন বিশ্বাস অনুযায়ী মহাপুরানের সংখ্যা আঠারো এবং এগুলো ছয়টি করে পুরানযুক্ত তিনটি পৃতক শ্রেণিকে বিন্যস্ত। যদি এই সংখ্যা ও শ্রেনীবিন্যাস নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র অধ্যায়ন করে ডিমিট ও ভ্যান বুইটেনেন ২০টি মহা পুরানের একটি তালিকা প্রস্তুত করেন।
১. অগ্নিপুরান বা আগ্নেয় পুরানঃ শ্ল্রোকসংখ্যা ১১৫০০। এটি একটি প্রাচীন পুরান এবং একে পৌরানিক ও সাহিত্যবিদ্যার কোষগ্রন্থ বলা হয়।
২. ভাগবত পূরানঃ শ্লোকসংখ্যা ১৮,০০০। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও জনপ্রিয় পুরান। এই পুরানের মূল উপজীব্য বিষ্ণুর দশাবতারের কাহিনী।
৩. ভবিষ্যত পুরান- শ্লোকসংখ্যা ১৪,৫০০।
৪. ব্রক্ষপুরান বা আদিপুরান- শ্লোকসখ্যা ২৪০০।
৫. ব্রক্ষান্ড পুরান- ১২,০০০ শ্লোক, হিন্দু প্রার্থনা গাথা ললিত সহ¯্রনামা এই গ্রন্থের অন্তগর্ত।
৬. ব্রক্ষবৈবর্ত পুরান- (১৮,০০ শ্লোক)।
৭. গরুত্ত পুরান -( ১৯,০০০ শ্লোক)।
৮. হরিবংশ পুরান- ( ১৬,০০০ শ্লোক, ইতিহাস নামে সমাধিক আখ্যাত)।
৯. কূর্ম পুরান -(১৭,০০০ শ্লোক)।
১০.লিঙ্গ পুরান -(১১,০০০ শ্লোক)।
১১. মার্কন্ডের পুরান – (৯,০০০ শ্লোক, পবিত্র শাক্ত ধর্মগ্রন্থে দেবীমহাত্ম্যম এই পুরানভুক্ত)।
১২. মৎস্য পুরান -(১৪,০০০ শ্লোক)।
১৩. নারদ পুরান – (২৫,০০০ শ্লোক)।
১৪. পদ্ম পুরান – (৫৫,০০০ শ্লোক) ।
১৫. শিব পুরান – (২৪,০০০ শ্লোক)।
১৬. স্কন্দ পুরান -(৮১,১০০ শ্লোক)।
১৭. বামন পুরান – ( ১০,০০০ শ্লোক)।
১৮. বরাহপুরান – (১০,০০০ শ্লোক)।
১৯. বায়ু পুরান – (২৪,০০০ শ্লোক)।
২০. বিষ্ণু পুরান- (২৩,০০০ শ্লোক)।
পবিত্র ত্রিমূর্তির বিচারে নি¤œ লিখিত তিন ¤্রিেনতে অন্তভুক্ত করা হয়ে থাকে।
 ব্রক্ষা পুরান সমূহ- ব্রক্ষা পুরান, ব্রক্ষান্ড পুরান, ব্রক্ষবৈচির্ত্র পুরান, মার্কন্ডেয় পুরান, ভবিষ্য পুরান।
 বিষ্ণু পুরানসমূহ- বিষ্ণু পুরান, ভাগবত পুরান, নারদেয় পুরান, গরুও পুরান, পদ্ম পুরান, বরাহ টুরান, বামন পুরান, কূর্ম পুরান, মৎস্য পুরান , কল্ফি পুরান।
 শিব পুরান সমূহ- শিব পুরান, লিঙ্গ পুরান, স্কন্দ পুরান, অগ্নি পুরান, বায়ু পুরান, সত্বগুন রজোগুন ও তমোগুন- এই তিন গুনের নিরিখে পুরান দিন প্রকারঃ-
 সত্বগুন- বিষ্ণু পুরান, ভাগবত পুরান, নারদেয় পুরান, গরুও পুরান, পদ্ম পুরান, বরাহ পুরান।
 বজোগুন- ব্রক্ষান্ড পুরান, ব্রক্ষবৈবর্থ পুরান, মার্কন্ডেয় পুরান, ভবিষ্য পুরান বামন পুরান ব্রক্ষা পুরান।
 জমোগুন- মৎস্য পুরান, কূর্ম পুরান, লিঙ্গ পুরান, মিব পুরান, স্কন্দ পুরান, অগ্নি পুরান।

উপ- পুরানঃ
উপ-পুরান অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ অথবা আনুষঙ্গিক ধমৃগ্রন্থ।

স্থলপুরানঃ-
সংস্কৃতে স্থল শব্দের অর্থ স্থান পুরানের এই বিশেস অংশটি মন্দির বা তীর্থের উৎপত্তি ও মহাত্ম্য বর্ণনা করে।
কুলপুরানঃ
সংস্কৃতে কুল শব্দের অর্থ পরিবার বা গোত্র। কুলপুরান সাধারনত নিদিষ্ট বর্ণের উদ্ভব আখ্যান ও কিংবদন্তির বর্ণনা দেয়। বর্ণিভেদ পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল কুল পুরান।
জৈন ও বৌদ্ধ পুরানঃ
বৌদ্ধ স্বঢম্ভু পুরানে কাঠমান্ডু উপত্যকার ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।
জৈন পুরানগুলোতে বর্ণিত হয়েছে জৈন লোক গাথা ইতিহাস ও কিংবদন্তির কথা।
হরিবংশঃ-
হরিবংম সংস্কৃত সাহিত্যর একটি উল্লেখ্য যোগ্য গ্রন্ত। এই গ্রন্থে অনুস্টুপ ছন্দে মোট ১৬,৩৭৪টি শ্রোক আছে। এই গ্রন্থটি হরিবংশ পুরান নামেও পরিচিত। এটিকে মহাভারতের খিল বা পরিশিষ্ট মনে করা ঞয়। বেদব্যাস কে এই গ্রন্থের রচয়িতা মনে করা হয়। আদি পর্ব অনুসারে হরিবংশ দুইটি পূর্বে বিভক্ত এবং এর মোট শ্লোক সংখ্যা ১২,০০০। হরিবংশ পূর্বে ব্রক্ষান্ডের সৃষ্টি এবং কৃষ্ণের জন্ম পর্যন্ত পৌরানিক সূর্য ও চন্দ্রবংশীয় রাজাদের বর্ণনা পাওয়া যায়। হরিবংশ বিষ্ণুর অবতার হিসেবে কৃষ্ণের উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো পাওয়া যায়।
হরিবংশের সংস্করনঃ
হরিবংশের দুইটি সংস্করন পাওয়া যায়। প্রতাগত সংস্করনে তিনটি পর্বে বিণ্যস্ত মোট ২৭১টি অধ্যায় রয়েছে। এর মদ্যে হরিবংম পর্বে ৫৫টি অধ্যায় বিষ্ণু পর্বে ৮১টি অধ্যায় ভবিষৎ পর্বে ১৩৫টি অধ্যায় রয়েছে।
রামায়নঃ
রামায়ন একটি প্রাচীন সংস্কৃত মহাকাব্য। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী ঋষি বাল্লীকি রামায়নের রচয়িতা। এই গ্রন্থটি হিন্দুশাস্তের স্মৃতি বর্গের অর্ন্তগত। রামায়ন ও মহাভারত বারতের দুইটি প্রধান মহাকাব্য। এই কাব্যে বিভিন্ন সম্পর্খের পারস্পারিক কর্তব্য বর্ণনার পাশাপামি আদর্শ ভূত্য, আদর্শ ভ্রাতা, আদর্শ স্ত্রী ও আদর্শ রাজার চরিত্র চিত্রনের মাধ্যমে মানব সমাজের আদর্শ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। রামায়ন ৭টি কান্ড ও ৫০০টি সর্ঘে বিভক্ত ২৪,০০০ শ্লোকের সমষ্টি। এই কাজের মূল উপজীবি হলো বিষ্ণুর অবতার রামের জীবন কাহিনী। বিষয়গত ভাবে রামায়ন উপাখ্যানে বর্ণিত হয়েছে মানব অস্তিত্বের নানান দিক এবং প্রাচীন ভারতের ধর্মচেতনা। রোক বিশ্বাস অনুযায়ী ভারতের আদিকাবি বাল্লীকি রামায়ন রচনা করে ছিলেন। ভারতীয় সংস্কৃতিতে এই ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই যে, রামের সম সাময়িক তথা এই মহাকাব্যের অন্যতম চরিত্র ঋসি বাল্লীকি স্বয়ং এই মহাকাব্য রচনা করেছিলেন। সংস্কৃত বাষায় রচিত রামায়নের মূল পাঠটি বাল্লীকি রামায়ন নামে পরিচিত। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রামায়ন উপাখ্যানের পটভূমি ত্রেতাযুগ নামে পরিচিত পৌরানিক সময়কাল।
চত্রিরঃ
রামঃ এই উপাখ্যানের নায়ক । বিষ্ণুর সপ্তম অর্বতার রাম ছিলেন রাজা দশরথ ও তাঁর জ্যৈষ্ঠা মহিষী কৌশলার জ্যৈষ্ঠ ও প্রিয়তম পুত্র । রাময়ানে রামকে মর্যাদা পুরুষোত্তম অথাৎ সবযুগের আধার অভিহিত করা হয়েছে ।
সীতা ঃ রামের প্রিয়তম পত্মী এবং রাজা জনকের পালিত কন্যা । সীতার অপর নাম জানকী । তিনি বিষ্ণুপত্মী দেবী লক্ষ্মীর অবতার । রাময়ানে তাঁকে নারী জাতির আর্দশ স্থানীয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে । পরবর্তী কালে তিনি রামের দুই জমজ পুত্র লব ও কুশের জন্ম দেন ।
হনুমান ঃ কিষ্কিন্ধ্যা রাজ্যের এক বানর । তিনি শিবের (একাদশ রুদ্র) অবতার এবং রামের আদর্শ ভক্ত । তাঁর পিতা বানররাজ কেশরী ও মাতা অঞ্জনা ।
লক্ষণ ঃ রামের ভ্রাতা । তিনি সেচ্ছায় রাম ও সীতার সঙ্গে বনবাসে গমন করেন ও সেখানে তাঁদের রক্ষা করে চলেন । লক্ষন ছিলেন বিষ্ণুর সহচর শেষনাগের অবতার ।
রাবণ ঃ লঙ্কার রাক্ষস রাজা । দশ হাজার বছর কঠোর তপস্যা করে তিনি সৃষ্টিকর্তা ব্রক্ষ্রায় কাছ থেকে এই বর লাভ করেন যে কোনো দেব দানব বা ভৌতিক জীব তাঁকে বধ করতে পারবেনা । ব্রক্ষ্রার বর দানকে এড়িয়ে তাঁকে হত্যা করার জন্য বিষ্ণু মানব রুপে জন্ম গ্রহন করেন ।
রাবন ঃ লঙ্কার রাক্ষস রাজা । দশহাজার বছর কঠোর পরিশ্রম করে তিনি ¯ৃষ্টিকর্তা ব্রক্ষ্রার কাছ থেকে এই বর লাভ করেরন যে কোনো দেব, দানব, বা ভৌতিক জীব তাকে বধ করতে পারবেন না । ব্রক্ষ্রার বর দানকে এড়িয়ে তাঁকে হত্যা করার জন্য বিষ্ণুকে মানব রুপে জন্ম গ্রহণ করতে হয় ।
দশরথ ঃ অযোধ্যার রাজা ও রামের পিতা । তাঁর তিন পত্মী ঃ কৌশলা, কৈকেয়ী, ও সমিত্রা এবং রাম ব্যতীত অপর তিন পুত্র ঃ ভরত, লক্ষণ, ও শক্রঘ¥ ।
ভারত- দশরফের ও বৈবেয়ী পুত্র। রামের ভাই।
শুক্রক্ষ্ম- দশরথ ও সুমিত্রার পুত্র।
তিনি রামের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ও শ্রুতকীরতির পতি।
আখ্যান বস্তঃ
রামায়ন সাতটি কান্ড বা খন্ডে বিভক্ত। যথা আদিকান্ড বা বালকান্ড, অবোধ্যকান্ড, অরন্যকান্ড, কিষ্কিন্ধ্যাকান্ড, সুন্দরকান্ড, লঙ্কাকান্ড বা যুদ্ধকান্ড ও উত্তরকান্ড।
আদিকান্ডঃ দশরথ ছিলেন কোশপ রাজ্যের রাজা তার রাজধানী চিল অবোধ্যা নগরীতে । তার তিন সহিষী, কৌশল্য,কৈকেয়ী কারনে পুত্রকামনায় রাজা দশরথ পুত্র কামেষ্টী বা পুত্রেষ্টী যজ্ঞের আয়োজন করেন। এরপরই কৌশল্যার গর্ভে রাম কৈকেরীর গর্ভে ভারত এবং সুমিত্রার গর্ভে লক্ষন ও শক্রক্ষ্ম নামে দুই জমজ পুত্রের জন্ম হয়। এই চার জনই ছিলেন বিষ্ণুর অংশসম্ভূত। রাবন নামে এক অথ্যাচারী রাক্ষসরাজকে বধ করবার উদ্দেশ্যে বিষ্ণু মানবের রুপ ধারণ করে অবতার গ্রহন করেণ। উল্লেখ্য ব্রক্ষার বরে এই রাবন একমাত্র কোনো পরাক্রমী নশ্বর মানবের হাতেই বধ্য ছিলেন। চার রাজকুমার শস্ত্রবিদ্যা ও শাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেণ। একদা ঋষি বিশ্বাসিত্র দশরথের সভায় উপস্থিত হয়ে তার আশ্রমে উপদ্রব সৃষ্টিকারী রাক্ষসদের ধ্বংস করতে রাজার সহায়তা প্রার্থণা করেন। তিনি এই কাজের জণ্য ষোড়শ বষীয় রামকে নির্বাচন করেন। রামের সঙ্গে যান তার ছায়া সঙ্গী লক্ষণ। রাম ও লক্ষন ঋষ্রি আশ্রমে উপদ্রব সৃষ্টিকারী সকল রাক্ষসকে হত্যা করেন।এই সময়ে মিছিলীর রাজা ছিলেন জনক। একদিন ভূমিকর্ষন করতে গিয়ে রাজা লাঙ্গলের রেখায় একটি শিশু কন্যাকে কুড়িয়ে পান। তিনি এই কণ্যার রনামকরণ করেন সীতা। সীতা বিবাহ যোঘ্য হলে রাজা তার বিবাহের জন্য স্বয়ম্বয়ের আয়োজন করেন। শিব রাজাকে একটি ধনুক উপহার দিয়েছেন। রাজা পন রাখেন যিনি এই ধনুকে গুন সংযোজন করতে পারবেন, তাকেই অপরুপা সীতা পতিত্বে বরন করবে।
ঋষি বিশ্বাসিত্র রামও লক্ষণকে নিয়ে সেই স্বয়ম্বর সভায় উপস্থিত হলেন। কেবলমাত্র রামই সেই দুনক গুন পরিয়ে তা ভঙ্গ করতে সমর্থ হলেন। রামের সঙ্গে সীতার বিবাহ হল। শুধু তাই নয়, দশরথের অণ্যান্য পুত্রদের সঙ্গে জনকের অন্যান্য কন্যার বিবাহ সম্পন্ন হল। অতঃপর নববিবাহিত দম্পত্বি অযোধ্যা নগরে প্রত্যাবর্তন করলেন।
অযোধ্যাকান্ডঃ
রাম ও সীতার বিবাহের বারো বছর পর বৃদ্ধ রাজা দশরথ রামকে যুব রাজের অভিষিক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কোশল রাজ সভায় তার ইচ্ছাকে সকলেই সমর্থন করল। বহুকাল ফ’র্বে রাজা দশরথ কৈকেয়ীকে দুটি বর দিতে প্রতিশ্রুতি হয়েছিলেন। তার সুয়োগ কৈকেয়ী রাজার কাছে দাবী করেন যে, রামকে চোদ্দো বছরের জন্য বনবাসে পাঠাতে হবে এবং তার স্থলে ভারতকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করতে হবে। বৃদ্ধ ও হতাশ রাজা নিজ প্রতিজ্ঞা রক্ষায় দায়েই কৈকেয়ীকে প্রাথির্ত বর দুটি প্রদান করতে সম্মত হলেন। রাম পিতার আজ্ঞা স্বেচ্ছায় ও শান্ত চিত্তে মেনে নিলেন। পতœী সীতা ও ভ্রাতা রক্ষণ তার সঙ্গী হলেন। রামের প্রস্থানের পর পুত্রশোকে কাতর হয়ে রাজা দশরথ দেহ ত্যাগ করলেন।
অরন্যকান্ডঃ
রাম সীতা ও লক্ষণ দক্ষিন দিকে যাত্রা করেন। গোদাবরী নদীর তীরে পঞ্চবটী বনে কুটির নির্মান করে সেখানেই বসবাস করতে থাকেন তারা। একদিন রাবনের ভগিনী সুর্পনাকা সেই বনে ভ্রমন করতে করতে রাম ও লক্ষনের সাক্ষাৎ ফেলেন। সুর্পনখা সুন্দরী রমনীর ছদ্মবেশে রাম ও লক্ষণকে প্রলুব্দ করতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন। তখন ক্রোধে অন্ধ হয়ে সীতাকে ভক্ষণ করতে গেলে লক্ষন খড়গাঘাতে সুপর্নকার নাসিকা ও কন ছেদন করলেন।
সুর্পনাঘার অপর রাক্ষস ভ্রাতা খর এই সংবাদ পেয়ে সসৈন্যে রাম ও লক্ষণকে আক্রমন করলেন। কিন্তু রাম সসৈন্যেই বধ করলেন খরকে। রাবন এই সংবাদ পেয়ে ভগিনীর অপমানের প্রতিশোধ কল্পে সীতাকে অপহরন করার পরিক্ল্পনা করলেন। এই কাজে তাকে সাহায্য করলেন মারীচ নামে এক মায়াবী রাক্ষস। মারীচ স্বর্ণমূগের ছদ্মবেশ ধরে সীতার দৃষ্টি আবর্ষন করলেন। হরিনটির রূপে মোহিত হয়ে তিনি রামের নিকট হরিনটি প্রার্থনা করে বসরেন। তিনি শুনতে পেলেন রাম আর্তচিৎকার করছেন। আসলে মায়াবী রামের কন্ঠ নকল করে আর্তনাদ করছিল। ভীত হয়ে সীতা লক্ষনকে রামের সন্ধানে যেতে অনুরোধ করলেন। অবশেসে কুটিরের চারিদিকে একটি গন্ডী কেটে সীতাকে সেই গন্ডীর বাইরে যেতে নিষেধ করে লক্ষন গেলেন রামের সন্ধানে।
রাবন এই সুযোগের অপেক্ষাতেই সীতার নিকট ভিক্ষা প্রথর্না করলেন। রাবনের ছলনা বুঝতে না পেরে সীতা গন্ডির বাইরে এসে তাকে ভিক্ষা দিতে গেলে দুষ্ট রাবন বলপূর্বক সীতাকে অপহরন করে নিজ রথে তুলে নিলেন। জটায়ু নামে একটি শকুন জাতীয় রামভক্ত সীতার অপহরন দেখতে পেয়ে সীতাকে উদ্ধার করতে গিয়ে রাবনের হাতে গুরুতর আহত এবং ভূপতিত হল। রাবন সীতাকে অপহরন করে নিয়ে গিয়ে লঙ্কার অশোক কানন বনে নজরবন্দী করে একদল রাক্ষসী তত্বাবধানে রাখলেন।সীতা সেই কুপ্রস্তাব ঘৃনাভরে প্রথ্যাখ্যান করলেন। এদিকে রাম ও লক্ষন মৃত্যপথযাত্রী জটায়ুর কাছে সীতা হরন সংবাদ পেলেন এবং অবিলম্বে সীতাকে উদ্ধার করার জণ্য যাত্রা করলেন। যাত্রা পথে শবরী নামে এক বৃদ্ধা তপস্বিনী তাদের সুগ্রীব ও হনুমানের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দিলেন।
কিষ্কিন্ধাকান্ডঃ
কিষ্কিন্ধাকান্ড এর পটভূমি বানর রাজ্য কিষ্কিন্ধা। সর্বকারের সর্ব মেষ্ঠ বানরবীর ততা সুগ্রীবের অনুগামী হনুমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল রাম ও রক্ষনের। সুগ্রীব ছিলেন কিষ্কিন্ধার নির্বাসিত এক রাজপদপ্রার্থী। রাম সুগ্রীবের সঙ্গে মিত্রতা করলেন। পরিকল্পনা মতো সুগ্রীব বালাকে দ্বন্ধযুদ্ধে আহ্বান করলো এবং রাম তাকে পিছন থেকে তীর ছুড়ে হত্যা করলেন কারন ইন্দ্রের বরে বালাকে সামনে থেকে মারা অসম্ভব ছিলো।রামের সহায়তায় বিনিময়ে সুগ্রীব চতুর্ধিকে সিতার অনুস্কানে বানর দল পাঠালেন। উত্তর পূর্ব ও পশ্চিমগামী দল গুলো ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল। অঙ্গদ ও হনুমানের নেতৃত্বাধীন দলটি শেসে (সম্পাতি) নামে এক শকুন জাতীয় পক্ষীয় নিকট সংবাদ পেলেন যে রাবন সীতাকে লংকার নিয়ে গিয়ে করে রেখেছেন।
সুন্দরকান্ডঃ
সুন্দরকান্ড বাল্লীকি রামায়নের কেন্দ্রীয় অংশ। এই অংশে হনুমানের অভিযানের একটি বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়। সম্পাতির নিকট সীতার সংবাদ পেয়ে হনুমান এক বিশাল শীরর ধারন করে এক লাফে সাগর পার হয়ে লংকায় উপস্থিত হলেন। হনুমান অশোকবনে সীতার সন্ধান পেলেন। তিনি সীতাকে রামের আংটি ও বার্তা দিলেন। তিনি সীতাকে রামের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু সীতা রাজি হলেন না। তিনি বললেন রাম যেন শীঘ্র এসে রাবনকে উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে তার অপমানের প্রেিশাধ নেন এবং তাকে উদ্ধার করেন। অতঃপর হনুমান লংকায় ভ্যাপক ধ্বংসলীলা চালালেন। তারপর ধরা দিয়ে রাবনের সম্মুখে উপস্থিত হলেন। রাবনের রাজ সভায় দাড়িয়ে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে রাবনকে উপদেশ দিলেন, সীতাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু রাবন তার কথায় কর্নপাত না করে তার রেজে আগুন রাগিয়ে দেওয়ার আদেশ দিলেন। এরপর হনুমান নিজের লেজের আগুন সমগ্র লংকাপুরী ভস্মীভূত করে ফিরে এলেন তার অপেক্ষামান দলের কাছে। উল্লাসিত হয়ে তাদের দল ফিরে রামকে সীতার খবর দিলেন।
লংকাকান্ড বা লঙ্কাকান্ডঃ
এই খন্ডে রামও রাবনের যুদ্ধের বিবরন রয়েছে। হনুমানের নিকট সীতার সংবাদ পেয়ে রাম ও রক্ষন বানর সেনা বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে দক্ষিন সমুদ্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। সমুদ্রতীরে রাবনের অনুতপ্ত ভ্রাতা বিভাষন তাদের পক্ষে যোগ দিরেন। বানরেরা সমুদ্রের উপর একটি সেতু বন্ধন করলেন। সেই সেতুপথে রাম সহ,সৈন্য লংকায় প্রবেশ করলেন। এই সেতুটি রামসেতু নামে পরিচিত। লংকায় রাম ও রাবনের মধ্যে এক দীর্ঘ যুদ্ধ সংঘটিত হল। যুদ্ধান্তে রাবন নিহত হলেন। রাম বিভীষনকে লংকার সিংহাসনে স্থাপন করলেন। সীতার সঙ্গে রামের মিলন হল। কিন্তু দীর্ঘদিন রাক্ষস গৃহে বসবাসকারী সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে সতীত্ব প্রমান করতে বললেন। স্বয়ং অগ্নিদেব আবিভূক্ত হয়ে রামের নিকট সীতার পবিত্রতার কথা শোষনা করলেন। এরপর বনবাসের মেয়াদ উর্ত্তীন হয়। রাম সীতা ও লক্ষন অযোধ্যায় ফিরে আসেন। সেখানে রামের রাজ্য ভিষক হয়।
উত্তরকান্ডঃ উত্তরাকান্ড এ বর্ণিত হয়েছে রাম সীতা ও রামের ভ্রাতৃগনের শেষ জীবন রাজা হওয়ার পর রাম অনেক কাল সীতাকে নিয়ে সুখে সংসার করেন। এদিকে অগ্নিপরীক্ষাতা হওয়া সত্বেও সীতাকে নিয়ে অযোধ্যায় নানান গুজব ছড়াতে শুরু করে। এই সব রটনায় বিচলিত হয়ে রাম সীতাকে নির্বাসনে পাঠান। সত্্রানসম্ভবা সীতা আশ্রয় নেন ঋষি বাল্লীকির অআশ্রমে।
সেখানেই তার যমজ পুত্রসন্তান লব ও কুশের জন্ম হয়। লব কুশকে তাদের পিতৃপরিচয় জানানো হয় না। তারা গ্রহন করে বাল্লীকির শিষ্যত্ব।
বাল্লীকি লব ও কুশকে রামায়ন গান শিক্ষা দেয়। ইতোমদ্যে রাম অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করলে বাল্লীকি লব ও কুশকে নিয়ে যজ্ঞস্থলে উপন্থিত হন।
লব ও কুশ সভায় রামায়ন গান গেয়ে শোনান।
সীতার বনবাসের গান শুনে রাম দুঃখিত হয়। তখন বাল্লীকি সীতাকে নিয়ে আসেন রামের সম্মুখে। কিন্তু রাম সকলের সম্মুখে সীতাকে পুনরায় অগ্নিপরীক্ষা দিতে বললে অপমানিতা সীতা মাতা ধরিত্রীকে আহ্বান জানান। মাটি বিদীর্ন হয়। দেবী ধরিত্রী উঠে এসে সীতাকে নিয়ে পাতালে চলে যান। এর পর রাম জানতে পারেন যে, লব ও কুশ আসলে তারই সন্তান। পরে মর্ত্যে অবতার রুপে তার কাজ শেষ হরে রাম পুত্রদ্বয়ের হাতে শাসনভঅর ছেড়ে দিয়ে সরযূ নদীতে আত্মবিসর্জন করে বৈকুন্ঠে ফিরে আসেন।
ধর্ম তাত্ত্বিক গুরুত্বঃ রামায়নের নায়ক রাম হিন্দু ধর্মের একজন অণ্যতম প্রধান দেবতা বিবেচিত হন। রামায়ন মহাকাব্যটি কেবরমাত্র একটি মহৎ সাহিত্যিক নিদশ্যনই নয়, বরং হিন্দু ধর্মের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে বিবেচিত হয়। হিন্দু বিশ্বাস করেন, বিষ্ণু জগতের সকল জীবকে ধর্মের পথ সন্ধঅন দিতে রাম রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
ধর্মমতে মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্টি । ভারতীয় ধমর্তত্ত্বে মানুষ সৃষ্টির যে উল্লেখ্য তা ভিন্ন প্রকৃতির।
মহাভারত অনুসারে ঃ
প্রথমে এই জগৎ ঘোরতর অন্ধকারে আবৃত হইয়া একান্ত অলিখিত ছিল । অনন্তর সৃষ্টি প্রারম্ভে সকল ব্রক্ষ্রান্তবীজভ’ত এ অলৌকিক অশু প্রসূত হইল । নিরাকার, নিবির্কার, অচিন্তীয়, অনির্বচনীয় সর্বত্রসম, সনাতন, জ্যোর্তিময় ব্রক্ষ সেই অশেু প্রবিষ্ট হইলেন । সর্বলোক পিতামহ দেবগুরু ব্রক্ষা তাহাতে জম্ম গ্রহণ করিলেন । তদন্তর রুদ্র, ¯œায়মÍুর মনু, প্রাচেতস দক্ষ, দক্ষের সপ্তপুত্র ও এক বিংশতি উৎপন্ন হইলেন । যাঁহাকে সমস্ত ঋষিগণ যোগ দৃষ্টিতে দর্শন করেন, সেই অপ্রমেয় পুরুষ, বিশ্বদেব গণ, একাদশ আদিত্য, অষ্ট বসু যমজ অশ্বিনীকুমার-যুগল যক্ষগণ, সাধ্যগণ্য, ণিশাচগন স্তহ্যকগণ ও পিতৃগণ জম্মিলেন । তদন্তর ব্রক্ষপরায়ণ ব্রক্ষর্ষিগণ ও সবগÍন- সম্পন্ন অনেকানেক রাজঋষিগণ উৎপন্ন হইলেন । আর জল, বায়ু , পৃথিবী, আকাশ , চন্দ্র, সূর্য, সংবৎসর, ঋতু, মাস, পক্ষ, দিন, রাত্রি, ও বিশ্বান্ত অন্যান্য যাবতীয় পদার্থ সৃষ্টি হইল। এই প্রত্যক্ষ পরিদৃশ্যমান স্থাবর জন্মাতœক জড়ৎ প্রলয় কালে পুনরায় স্বাধিষ্ঠানভূত পর ব্রক্ষে লীন হইয়া যায়। যেমন পর্যায়কাল উপস্থিত হইলে ঋতুগন স্ব স্ব অসাধারন লক্ষন সকল প্রাপ্ত হয়। সেই রুপ যুগ প্রারম্ভে সমুদয় পদার্থ স্ব স্ব নাম, রুপ ও স্বভাব প্রাপ্ত হইয়া থাকে। অনাদি অনন্ত, সর্বভূত সংহারকারী, সংসারচক্র এই রুপে পরিভ্রমন করিতেছে। এরাস্ত্রিংমৎ সহ¯্র এরাস্ত্রিংশৎ শত ,এরাস্ত্রিংশৎ দেবতা সংক্ষেপে সৃষ্টি হইলেন। আর বৃহদ্ভানু, চক্ষু, আত্মা, বিভাবসু সবিতা, ঋচীক, অর্ক, জানু, আশাবহ, রবি ও মহ্য, দিবের এই প্রকাদশ পুত্র জন্মিলেন।সর্ব কনিষ্ঠ মহ্যের পুত্র দেবভ্রাজ, তৎপুত্র সুভ্রাজ। সুভ্রাক্তের দশ জ্যোতিঃ শতজ্যোতিঃ- সহ¯্রজ্যোতিঃ- নামে তিন পুত্র হইলেন। দশ জ্যোতির দশ সহ¯্রপুত্র,শতজ্যোতির লক্ষ পুত্র ও সহ¯্র জ্যোতির দশলক্ষ পুত্র হইল। ইহাদিগের হইতেই কুরুবংশ, যদুবংশ, ভারত রাজষি বংশের উদ্ভব হইল।
বেদের বৃহদারন্যক উপনিষদের সৃষ্টি তত্ত্বে বলা হয়েছেঃ-
এই পরিদৃশ্যমান জগৎ আদিতে পুরুষরুপী আত্মারুপে বিদ্যমান ছিল। সেই আত্মা চারদিকে দৃষ্টিপাত করে কিছুই দেখতে পেলেন না। তখন তিনি বললেন“ আমি আছি” এভাবে “ অহম” নাম হল। একাকীত্বের নিরানন্দ তাঁর কাছে দুঃসহ মনে হত থাকলে তিনি দ্বিতীয় চাইলেন এবং নিজেকে দুই ভাগ করে পতি ও পতœীরুপে আবিভুত হইলেন। তিনি সেই পতœীতে মিথুন ভাবে উপগত হলে মানুষের সৃষ্টি হল। উপনিষদে অন্যান্য প্রানীকুলের সৃষ্টি সম্পর্কেও অনুরুপ প্রক্সিয়া কথাই বলা হয়েছে। সেই স্ত্রী চিন্তা করলেন“ আমাকে আপনা হতে উৎপন্ন করে তিনি কিভাবে আমাতে উপগত আমি অদৃশ্য হই” তিনি গাভী হলেন, অন্যজল বৃষ হয়ে তাতে উপগত হলেন। এভাবে গরুকুল উৎপান্ন হল। একজন অশ্বা হলে অন্যজন অম্ব হলেন। একজন গর্দভী হলে অন্যজন গর্দভ হলেন। তিনি তাতে উপগত হলেন। এই রুপে এক খুর বিশিষ্ট জন্তু উৎপান্ন হল। একজন অজ্য অন্যজন অজ, একজন মেষী অন্যজন মেষ হলেন। তিনি তাতে উপগত হলেন। এই ভাবে ছাগ ও মেষ উৎপন্ন হল। পিপীলিকা হতে শুরু করে যত প্রকার মিথুন আছে সেই সবই তিনি এই ভাবে সৃষ্টি করেছেন।

০১. সৃষ্টি জিজ্ঞাসা
মনুসংহিতা
প্রথম অধ্যায়
সৃষ্টিরহস্য-বিজ্ঞানপ্রকরণ
০১. সৃষ্টি জিজ্ঞাসা
মনুমেকাগ্রমাসীনমভিগম্য মহর্ষযঃ ।
প্রতিপূজ্য যথান্যাযমিদং বচনমব্রুবন্ ।।১
ভগবান মনু ঈশ্বরে একান্ত মনঃসমাধান করিয়া আসনে সমাসীন রহিয়াছেন, এমন সময়ে ধর্ম্মজিজ্ঞাসু মহর্ষিগণ সন্নিধানে সমাগত হইয়া বিধিমত পূজা-বন্দনাদি করত তাঁহাকে এই কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। ১
The great sages approached Manu, who was seated with a collected mind, and, having duly worshipped him, spoke as follows:
ভগবন্ সর্ববর্ণানাং যথাবদনুপূর্বশঃ ।
অন্তরপ্রভবানাং চ ধর্মান্নো বক্তুমর্হসি ।। ২
হে ভগবন্! ব্রাহ্মণাদি বর্ণ সকলের ও অম্বষ্ঠ, করণ, ক্ষত্রিয় (ক্ষত্তা) প্রভৃতি অনুলোম-প্রতিলোমজাত সঙ্করজাতির* পৃথক পৃথকরূপে ধর্ম্মসকল আমাদিগকে বলুন।২
(* উচ্চবর্ণ পুরুষের ঔরসে নীচবর্ণা স্ত্রীর গর্ভে সন্তানের নাম অনুলোমজাত আর নীচবর্ণ পুরুষের ঔরসে উচ্চবর্ণা স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানের নাম প্রতিলোমজাত।)
‘Deign, divine one, to declare to us precisely and in due order the sacred laws of each of the (four chief) castes (varna) and of the intermediate ones.
ত্বমেকো হ্যস্য সর্বস্য বিধানস্য স্বযংভুবঃ ।
অচিন্ত্যস্যাপ্রমেযস্য কার্যতত্ত্বার্থবিত্ প্রভো ।।৩
হে প্রভো! যে বেদ বহুশাখায় বিভক্ত হওয়াতে অসীমরূপে প্রতীয়মান হয়, এবং মীমাংসা, ন্যায় প্রভৃতি শাস্ত্রের সাহায্য ব্যতিরেকে যাহার প্রতিপাদ্য ভাগ বুঝা যায় না, কি প্রত্যক্ষ কি স্মৃত্যাদি শাস্ত্র দ্বারা অনুমেয়* সেই অপৌরুষয় ও নিত্য সমগ্র বেদশাস্ত্রে উল্লিখিত যজ্ঞাদি কার্য্য ও ব্রহ্মতত্ত্বের আপনিই অদ্বিতীয় বেত্তা হয়েন। ৩
(* সাক্ষাৎসম্বন্ধে শ্রুতি না থাকিলেও পণ্ডিতেরা স্মৃত্যাদি শাস্ত্রের উপপত্তি করিবার জন্য শ্রুতির কল্পনা করেন।)
‘For thou, O Lord, alone knowest the purport, (i.e.) the rites, and the knowledge of the soul, (taught) in this whole ordinance of the Self-existent (Svayambhu), which is unknowable and unfathomable.’
স তৈঃ পৃষ্টস্তথা সম্যগমিতোজা মহাত্মভিঃ ।
প্রত্যুবাচার্চ্য তান্ সর্বান্ মহর্ষীংশ্রূযতামিতি ।।৪
অসীমতেজঃসম্পন্ন ভগবান মনু মহানুভব মহর্ষিগণ কর্ত্তৃক উক্ত প্রকারের জিজ্ঞাসিত হইয়া, তাঁহাদিগকে পূজা করিয়া ‘শ্রবণ করুন’ বলিয়া প্রকৃতপ্রস্তাবে উত্তর প্রদান করিলেন। ৪
He, whose power is measureless, being thus asked by the high-minded great sages, duly honoured them, and answered, ‘Listen!’
০২. প্রলয়কালে জাগতিক অবস্থা
‘আসীদিদং তমোভূতমপ্রজ্ঞাতমলক্ষণম্।
অপ্রতর্ক্যমবিজ্ঞেয়ং প্রসুপ্তমিব সর্বতঃ।।’
এই পরিদৃশ্যমান বিশ্বসংসার এককালে (সৃষ্টির পূর্বে) গাঢ় তমসাচ্ছন্ন ছিল; তখনকার অবস্থা প্রত্যক্ষের গোচরীভূত নয়; কোনও লক্ষণার দ্বারা অনুমেয় নয়; তখন ইহা তর্ক ও জ্ঞানের অতীত ছিল। এই চতুর্বিধ প্রমাণের অগোচর থাকায় এই জগৎ সর্বতোভাবে যেন প্রগাঢ় নিদ্রায় নিদ্রিত ছিল। (১/৫)।
প্রলয়কালে এই জগৎ এ প্রকারে প্রকৃতিতে লীন ছিল যে, উহা প্রত্যক্ষ, অনুমান ও শব্দ, এই ত্রিবিধ প্রমাণের বিষয় ছিল না; যেন সকল জগৎ নিদ্রিতাবস্থায় ছিল। ৫
This (universe) existed in the shape of Darkness, unperceived, destitute of distinctive marks, unattainable by reasoning, unknowable, wholly immersed, as it were, in deep sleep.

০৩. পঞ্চভূতের স্থূলরূপে প্রকাশ
‘ততঃ স্বয়ম্ভূর্ভগবানব্যক্তো ব্যঞ্জয়ন্নিদম্।
এহাভূতাদিবৃত্তৌজাঃ প্রাদুরাসীৎ তমোনুদঃ।।’
তারপর (প্রলয়ের অবসানে) অব্যক্ত (বাহ্য ইন্দ্রিয়ের অগোচর অর্থাৎ যোগলভ্য) বৃত্তৌজাঃ (অপ্রতিহত সৃষ্টিসামর্থ্যশালী) ষড়ৈশ্বর্যশালী ভগবান স্বয়ম্ভূ (স্বেচ্ছায় লীলাবিগ্রহকারী পরমাত্মা) তমোনুদ হয়ে অর্থাৎ প্রলয়াবস্থার ধ্বংসক, মতান্তরে প্রকৃতিপ্রেরক হয়ে, এই স্থূল আকাশাদি মহাভূত- যা পূর্বে অপ্রকাশ ছিল- সেই বিশ্বসংসারকে ক্রমে ক্রমে প্রকটিত করে আবির্ভূত হলেন। (১/৬)।
প্রলয়ানন্তর বহিরিন্দ্রিয়ের অগোচর, অব্যাহত সৃষ্টি-সামর্থ্য-সম্পন্ন ও প্রকৃতিপ্রেরক পরমেশ্বর স্বেচ্ছাকৃত-দেহধারী হইয়া এই আকাশাদি পঞ্চ ভূত ঈ মহদাদি তত্ত্ব, যাহা প্রলয়কালে সূক্ষরূপে অব্যক্তাবস্থায় ছিল, সেই সমুদয় স্থূলরূপে প্রকাশ করত আপনিই প্রকাশিত হইলেন। ৬
Then the divine Self-existent (Svayambhu, himself) indiscernible, (but) making (all) this, the great elements and the rest, discernible, appeared with irresistible (creative) power, dispelling the darkness.
০৪. মহদহঙ্কারাদির উৎপত্তি
‘যোহসাবতীন্দ্রিয়গ্রাহ্যঃ সূক্ষ্মোহব্যক্তঃ সনাতনঃ।
সর্বভূতময়োহচিন্ত্যঃ স এব স্বয়মুদ্বভৌ।।’
যিনি মনোমাত্রাগ্রাহ্য, সূক্ষতম, অপ্রকাশ, সনাতন (চিরস্থায়ী), সকল ভূতের আত্মাস্বরূপ অর্থাৎ সর্বভূতে বিরাজমান এবং যিনি চিন্তার বহির্ভূত সেই অচিন্ত্য পুরুষ স্বয়ংই প্রথমে শরীরাকারে (মহৎ প্রভৃতিরূপে) প্রাদুর্ভূত হয়েছিলেন। (১/৭)।
যিনি সকল লোক, বেদ, পুরাণ, ইতিহাসাদিশাস্ত্র প্রসিদ্ধ, যিনি মনোমাত্র-গ্রাহ্য, অবয়ববিহীন, নিত্য ও সকল ভূতের অন্তরাত্মা হয়েন, এবং যাঁহার ইয়ত্তা করা যায় না, তিনি স্বয়ংই মহদহঙ্কারাদি কার্যরূপে প্রাদুর্ভূত হইলেন। ৭
He who can be perceived by the internal organ (alone), who is subtile, indiscernible, and eternal, who contains all created beings and is inconceivable, shone forth of his own (will)

০৫. জল উৎপত্তি
‘সোহভিধ্যায় শরীরাৎ স্বাৎ সিসৃক্ষুর্বিবিধাঃ প্রজাঃ।
অপ এব সসর্জাদৌ তাসু বীজমবাসৃজৎ।।’
সেই পরমাত্মা স্বকীয় অব্যাকৃত (unmanifested) শরীর হতে বিবিধ প্রজা সৃষ্টির ইচ্ছা করে চিন্তামাত্র প্রথম জলের সৃষ্টি করলেন এবং তাতে আপন শক্তিবীজ অর্পণ করলেন। (১/৮)।
সেই পরমাত্মা প্রকৃতিরূপে পরিণত আপন শরীর হইতে নানাপ্রকার প্রজা সৃষ্টি করিবার অভিলাষে, কিরূপে সৃষ্টি-সম্পাদন হইবে, এই সঙ্কল্প করিয়া প্রথমতঃ ‘জল হউক’ বলিয়া আকাশাদিক্রমে জলের সৃষ্টি করিলেন ও তাহাতে আপন শক্তিরূপ বীজ অর্পণ করিলেন। ৮
He, desiring to produce beings of many kinds from his own body, first with a thought created the waters, and placed his seed in them.

০৬. ব্রহ্মার শরীর পরিগ্রহ
তদণ্ডমভবদ্ধৈমং সহস্রাংশুসমপ্রভম্ ।
তস্মিঞ্জজ্ঞে স্বযং ব্রহ্মা সর্বলোকপিতামহঃ ।। ৯
অর্পিত বীজ সুবর্ণ-নির্ম্মিতের ন্যায় ও সূর্য্যসদৃশপ্রভাযুক্ত একটি অণ্ড হইল, ঐ অণ্ডে সকল লোকের জনক স্বয়ং ব্রহ্মাই শরীর পরিগ্রহ করিলেন। ৯
That (seed) became a golden egg, in brilliancy equal to the sun; in that (egg) he himself was born as Brahman, the progenitor of the whole world.
০৭. নারায়ণ শব্দের ব্যুৎপত্তি

আপো নারা ইতি প্রোক্তা আপো বৈ নরসূনবঃ ।
তা যদস্যাযনং পূর্বং তেন নারাযণঃ স্মৃতঃ ।। ১০
নরনামক পরমেশ্বরের দেহ হইতে জলের সৃষ্টি হইয়াছে বলিয়া উহাকে নার বলা যায়। যেহেতু, ঐ জলসকল প্রলয়কালে পরমাত্মার অয়ন অর্থাৎ স্থান হয়, এই জন্য পরমাত্মা নারায়ণ শব্দে কথিত হইয়াছে। ১০
The waters are called narah, (for) the waters are, indeed, the offspring of Nara; as they were his first residence (ayana), he thence is named Narayana.
০৮. ব্রহ্মানামে বিখ্যাত
যত্ তত্ কারণমব্যক্তং নিত্যং সদসদাত্মকম্ ।
তদ্বিসৃষ্টঃ স পুরুষো লোকে ব্রহ্মৈতি কীর্ত্যতে ।। ১১
যে পরমাত্মা সৃষ্টি বস্তুমাত্রেরই কারণ, যিনি ইন্দ্রিয়ের অগোচর, যাঁহারা ক্ষয়োদয় নাই, যিনি সৎপদের প্রতিপাদ্য, এবং যিনি প্রত্যক্ষের বিষয় নহেন বলিয়া অসৎশব্দেও কথিত হইয়াছেন, সেই পরম পুরুষ পরমেশ্বের হইতে উৎপন্ন এই অণ্ডজাত পুরুষ লোকে ব্রহ্মা বলিয়া বিখ্যাত হইয়াছেন। ১১
From that (first) cause, which is indiscernible, eternal, and both real and unreal, was produced that male (Purusha), who is famed in this world (under the appellation of) Brahman.

০৯. পৃথিবী এবং আকাশাদি সৃষ্টি
তস্মিন্নণ্ডে স ভগবানুষিত্বা পরিবত্সরম্ ।
স্বযমেবাত্মনো ধ্যানাত্ তদণ্ডমকরোদ্ দ্বিধা ।। ১২
ভগবান্ ব্রহ্মা সেই অণ্ডে ব্রাহ্ম পরিমাণে এক বৎসরকালে বাস করিয়া, অণ্ড দ্বিধা হউক মনে হইবামাত্র স্বয়ং সেই অণ্ডকে দুই খণ্ড করিলেন। ১২
The divine one resided in that egg during a whole year, then he himself by his thought (alone) divided it into two halves;
তাভ্যাং স শকলাভ্যাং চ দিবং ভূমিং চ নির্মমে ।
মধ্যে ব্যোম দিশশ্চাষ্টাবপাং স্থানং চ শাশ্বতম্ ।। ১৩
তিনি সেই দুই খণ্ডের উর্দ্ধ খণ্ডে স্বর্গ ও অপর খণ্ডে পৃথিবী করিলেন, এবং মধ্যভাগে আকাশ, অষ্ট দিক্ ও চিরস্থায়ী সমুদ্রনামক জলাধার প্রস্তুত করিলেন। ১৩
And out of those two halves he formed heaven and earth, between them the middle sphere, the eight points of the horizon, and the eternal abode of the waters.

১০. অহং ও মনঃসৃষ্টি
উদ্ববর্হাত্মনশ্চৈব মনঃ সদসদাত্মকম্ ।
মনসশ্চাপ্যহঙ্কারমভিমন্তারমীশ্বরম্ ।। ১৪
ব্রহ্মা পরমাত্মা হইতে পরমাত্মার স্বরূপ হইয়া মনের সৃষ্টি করিলেন, যে মন এক এক সময় এক এক প্রকার জ্ঞানের আধার বলিয়া সৎস্বরূপ, ও প্রত্যক্ষ হয় না বলিয়া অসৎস্বভাব। মনের সৃষ্টির পূর্ব্বে অভিমানের জনক ও স্বকার্য্যসাধনক্ষম অহং অর্থাৎ আমিত্ব-বোধক অহঙ্কারতত্বের সৃষ্টি করিলেন। ১৪
From himself (atmanah) he also drew forth the mind, which is both real and unreal, likewise from the mind egoism, which possesses the function of self-consciousness (and is) lordly;
১১. মহত্তত্ত্ব, অহঙ্কারতত্ত্ব, ত্রিতত্ত্ব, পঞ্চগুণ, পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চকর্ম্মেন্দ্রিয় সৃষ্টি
মহান্তমেব চাত্মানং সর্বাণি ত্রিগুণানি চ ।
বিষযাণাং গ্রহীতৄণি শনৈঃ পঞ্চৈন্দ্রিযাণি চ ।। ১৫
ব্রহ্মা অহঙ্কারতত্ত্বের সৃষ্টির পূর্ব্বে পরমেশ্বর হইতে মহত্তত্ত্বের সৃষ্টি করিলেন, যে মহত্তত্ব আত্মা হইতে উৎপন্ন বলিয়া আত্মশব্দে কথিত হইয়াছে। আর সত্ত্বরস্তমোগুণযুক্ত অন্য পাদার্থ সকল সৃষ্টি করিলেন, এবং শব্দ স্পর্শ রূপ রস গন্ধের গ্রাহক শ্রোত্র, ত্বক্, চক্ষু, জিহ্বা, নাসিকা এই পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও বাক্, পাদ, হস্ত, গুহ্য, উপস্থ এই পঞ্চ কর্ম্মেন্দ্রিয় সৃষ্টি করিলেন। ১৫
Moreover, the great one, the soul, and all (products) affected by the three qualities, and, in their order, the five organs which perceive the objects of sensation.

১২. মনুষ্য পশুপক্ষী প্রভৃতি ভূতসৃষ্টি
তেষাং ত্ববযবান্ সূক্ষ্মান্ ষণ্ণামপ্যমিতৌজসাম্ ।
সংনিবেশ্যাত্মমাত্রাসু সর্বভূতানি নির্মমে ।।১৬
অসীম কার্য্যনির্ম্মাণে সমর্থ অহঙ্কার ও তন্মাত্র-পদ-বাচ্য পঞ্চভূত। অহঙ্কারের বিকার ইন্দ্রিয়, তন্মাতর বিকার পঞ্চমহাভূত, তাহাতে তন্মাত্র ও অহঙ্কারের যোজনা করিয়া, মনুষ্য পশু পক্ষী স্থাবর প্রভৃতি সমুদয় ভূতের সৃষ্টি করিলেন। ১৬
But, joining minute particles even of those six, which possess measureless power, with particles of himself, he created all beings.
১৩. ব্রহ্মমূর্ত্তিই শরীর
যন্ মূর্ত্যবযবাঃ সূক্ষ্মাস্তানীমান্যাশ্রযন্তি ষট্ ।
তস্মাচ্ছরীরমিত্যাহুস্তস্য মূর্তিং মনীষিণঃ ।।১৭
যেহেতু মূর্ত্তিসম্পাদক পাঁচটি তন্মাত্র-পদ-বাচ্য সূক্ষ্ম অবয়ব ও অহঙ্কার এই ছয় প্রকৃতির সহিত বর্ত্তমান ব্রহ্মের কার্যরূপে শরীরকে আশ্রয় করে, কেন না, তন্মাত্র হইতে পঞ্চ মহাভূত ও অহঙ্কার হইতে ইন্দ্রিয়ের উৎপত্তি হয়, এই হেতু পণ্ডিতেরা ছয়ের আশ্রয় বলিয়ে ইন্দ্রিয়াদিবিশিষ্ট ব্রহ্মের মূর্ত্তিকে শরীর কহিয়াছেন। ১৭
Because those six (kinds of) minute particles, which form the (creator’s) frame, enter (a-sri) these (creatures), therefore the wise call his frame sarira, (the body.)

১৪. আকাশাদি পঞ্চভূতের অর্থ বিভাগ
তদাবিশন্তি ভূতানি মহান্তি সহ কর্মভিঃ ।
মনশ্চাবযবৈঃ সূক্ষ্মৈঃ সর্বভূতকৃদব্যযম্ ।।১৮
শব্দাদি পঞ্চতন্মাত্রাত্মক ব্রহ্ম হইতে আকাশাদি পঞ্চ মহাভূত আপন আপন কার্য্যের সহিত উৎপন্ন হয়। আকাশের কর্ম্ম স্থানদান, বায়ুর কর্ম্ম বিন্যাস, তেজের কর্ম্ম পাক, জলের কর্ম্ম পিণ্ডীকরণ ও পৃথিবীর কর্ম্ম ধারণ। আর অহঙ্কারাত্মক ব্রহ্ম হইতে সকল ভূতের উৎপত্তির কারণ অবিনাশী মন উৎপন্ন হয়, যে মন শুভাশুভ সঙ্কল্প ও সুখদুঃখাদি কার্য্যের সহকৃত জনক হয়। ১৮
That the great elements enter, together with their functions and the mind, through its minute parts the framer of all beings, the imperishable one.

১৪. আকাশাদি পঞ্চভূতের অর্থ বিভাগ
তদাবিশন্তি ভূতানি মহান্তি সহ কর্মভিঃ ।
মনশ্চাবযবৈঃ সূক্ষ্মৈঃ সর্বভূতকৃদব্যযম্ ।।১৮
শব্দাদি পঞ্চতন্মাত্রাত্মক ব্রহ্ম হইতে আকাশাদি পঞ্চ মহাভূত আপন আপন কার্য্যের সহিত উৎপন্ন হয়। আকাশের কর্ম্ম স্থানদান, বায়ুর কর্ম্ম বিন্যাস, তেজের কর্ম্ম পাক, জলের কর্ম্ম পিণ্ডীকরণ ও পৃথিবীর কর্ম্ম ধারণ। আর অহঙ্কারাত্মক ব্রহ্ম হইতে সকল ভূতের উৎপত্তির কারণ অবিনাশী মন উৎপন্ন হয়, যে মন শুভাশুভ সঙ্কল্প ও সুখদুঃখাদি কার্য্যের সহকৃত জনক হয়। ১৮
That the great elements enter, together with their functions and the mind, through its minute parts the framer of all beings, the imperishable one.

১৫. পুরুষ ও জগতের উৎপত্তি
তেষামিদং তু সপ্তানাং পুরুষাণাং মহৌজসাম্ ।
সূক্ষ্মাভ্যো মূর্তিমাত্রাভ্যঃ সংভবত্যব্যযাদ্ ব্যযম্ ।।১৯
মহত্তত্ত্ব, অহঙ্কারতত্ত্ব ও পঞ্চ মহাভূত এই সাতটি পরমপুরুষ পরমাত্মা হইতে উৎপন্ন বলিয়া উঁহাদিগকে পুরুষ বলে। উহাদিগের শরীরসম্পাদক যে সূক্ষ্ম অবয়ব, তাহা হইতে এই প্রত্যক্ষ পরিদৃশ্যমান জগতের উৎপত্তি হয়, যে জন্য জগৎ বলিয়া নশ্বর। ১৯
But from minute body (-framing) particles of these seven very powerful Purushas springs this (world), the perishable from the imperishable.
১৬. আকাশাদির গুণ
আদ্যাদ্যস্য গুণং ত্বেষামবাপ্নোতি পরঃ পরঃ ।
যো যো যাবতিথশ্চৈষাং স স তাবদ্ গুণঃ স্মৃতঃ ।।২০
আকাশের গুণ শব্দ, বায়ুর গুণ স্পর্শ, অগ্নির গুণ রূপ, জলের গুণ রস, পৃথিবীর গুণ গন্ধ। প্রথম ভিন্ন প্রত্যেকে স্ব স্ব গুণাতিরিক্ত পূর্ব্ব পূর্ব্বের গুণ গ্রহণ করে; যে যত সংখ্যায় গণিত, তাহার ততই গুণ হয়, অর্থাৎ আকাশের গুণ শব্দ, বায়ুর শব্দ ও স্পর্শ, অগ্নির শব্দ স্পর্শ ও রূপ, জলের শব্দ স্পর্শ রূপ ও রস, পৃথিবীর শব্দ স্পর্শ রূপ রস ও গন্ধ গুণ হয়। ২০
Among them each succeeding (element) acquires the quality of the preceding one, and whatever place (in the sequence) each of them occupies, even so many qualities it is declared to possess.
১৭. মনুষ্যাদির নাম ও কর্ম্মবিভাগ
সর্বেষাং তু স নামানি কর্মাণি চ পৃথক্ পৃথক্ ।
বেদশব্দেভ্য এবাদৌ পৃথক্ সংস্থাশ্চ নির্মমে ।।২১
হিরণ্যগর্ভরূপে অবস্থিত সেই পরমাত্মা সকলের নাম অর্থাৎ মনুষ্যজাতির মনুষ্য, গোজাতির গো ইত্যাদি ও ব্রাহ্মণাদি চাতুবর্ণের বেদোক্ত অধ্যয়নাদি কর্ম্ম, এবং অন্যান্য জাতির লৌকিক কর্ম্ম, অর্থাৎ কুলালের ঘটনির্ম্মাণ, কুবিন্দের পটনির্ম্মাণ ইত্যাদি, প্রথমতঃ বেদশাস্ত্র হইতে অবগত হইয়া, পূর্ব্বকল্পে যাহার যেরূপ ছিল, এ কল্পেও তাহার সেইরূপ নির্দিষ্ট করিয়া দিলেন। ২১
But in the beginning he assigned their several names, actions, and conditions to all (created beings), even according to the words of the Veda.

১৭. মনুষ্যাদির নাম ও কর্ম্মবিভাগ
সর্বেষাং তু স নামানি কর্মাণি চ পৃথক্ পৃথক্ ।
বেদশব্দেভ্য এবাদৌ পৃথক্ সংস্থাশ্চ নির্মমে ।।২১
হিরণ্যগর্ভরূপে অবস্থিত সেই পরমাত্মা সকলের নাম অর্থাৎ মনুষ্যজাতির মনুষ্য, গোজাতির গো ইত্যাদি ও ব্রাহ্মণাদি চাতুবর্ণের বেদোক্ত অধ্যয়নাদি কর্ম্ম, এবং অন্যান্য জাতির লৌকিক কর্ম্ম, অর্থাৎ কুলালের ঘটনির্ম্মাণ, কুবিন্দের পটনির্ম্মাণ ইত্যাদি, প্রথমতঃ বেদশাস্ত্র হইতে অবগত হইয়া, পূর্ব্বকল্পে যাহার যেরূপ ছিল, এ কল্পেও তাহার সেইরূপ নির্দিষ্ট করিয়া দিলেন। ২১
But in the beginning he assigned their several names, actions, and conditions to all (created beings), even according to the words of the Veda.

১৮. দেবগণ ও যজ্ঞাদি সৃষ্টি
কর্মাত্মনাং চ দেবানাং সোঽসৃজত্ প্রাণিনাং প্রভুঃ ।
সাধ্যানাং চ গণং সূক্ষ্মং যজ্ঞং চৈব সনাতনম্ ।।২২
সেই পরমাত্মা প্রাণধারী ইন্দ্রাদি দেবগণ, অপ্রানী কর্ম্মহেতুক পাষাণময় দেবগণ ও সাধ্যনামক সূক্ষ্ম দেবসমূহ এবং জ্যোতিষ্টোমাদি নিত্যযজ্ঞ সকল সৃষ্টি করিলেন। ২২
১৯. বেদোদ্ধার
অগ্নিবাযুরবিভ্যস্তু ত্রযং ব্রহ্ম সনাতনম্ ।
দুদোহ যজ্ঞসিদ্ধ্যর্থং ঋচ্.যজুস্.সামলক্ষণম্ ।।২৩
তিনি যজ্ঞকার্য্যসিদ্ধির নিমিত্ত অগ্নি হইতে সনাতন ঋগবেদ, বায়ু হইতে যজুর্ব্বেদ এবং সূর্য্য হইতে সামবেদ উদ্ভূত করিলেন। ২৩

২০. বৎসরাদি কাল, নক্ষত্র সকল, গ্রহসমূহ ও পর্ব্বতাদি সৃষ্টি
কালং কালবিভক্তীশ্চ নক্ষত্রাণি গ্রহাংস্তথা ।
সরিতঃ সাগরান্ শৈলান্ সমানি বিষমানি চ ।।২৪
ব্রহ্মা সূর্য্যাদির ক্রিয়া-প্রচয়রূপ সামান্য কাল ও মাস, ঋতু, অয়, বৎসরাদি বিশেষ কাল, কৃত্তিকা প্রভৃতি সপ্তবিংশতি নক্ষত্র, আদিত্যাদি গ্রহ সকল, নদী, সমুদ্র, পর্ব্বত, সমস্থান ও উন্নতানত বিষমস্থান সকল সৃষ্টি করিলেন। ২৪

২১. প্রজাপত্যাদি তপস্যা ও চিত্তবিকার প্রভৃতি সৃষ্টি
তপো বাচং রতিং চৈব কামং চ ক্রোধমেব চ ।
সৃষ্টিং সসর্জ চৈবৈমাং স্রষ্টুমিচ্ছন্নিমাঃ প্রজাঃ ।।২৫
তিনি বক্ষ্যমাণ বিবিধ প্রকার প্রজা সৃষ্টি করিবার অভিলাষে প্রথমে প্রাজাপত্যাদি তপস্যা, বাক্য, চিত্তসন্তোষ, অভিলাষ ও নেত্রলৌহিত্যাদির কারণ চিত্তবিকার প্রভৃতি সৃষ্টি করিলেন। ২৫

২২. ধর্ম্মাধর্ম্ম বিভাগ ও তাহার ফল
কর্মণাং চ বিবেকার্থং ধর্মাধর্মৌ ব্যবেচযত্ ।
দ্বন্দ্বৈরযোজযচ্চৈমাঃ সুখদুঃখাদিভিঃ প্রজাঃ ।।২৬
তিনি কর্ত্তব্য ও অকর্ত্তব্য কর্মের বিভাগ জন্য ধর্ম্ম ও অধর্ম্ম পৃথক করিয়া বিভক্ত করিলেন। ধর্ম্মের ফল সুখাদি ও অধর্ম্মের ফল দুঃখাদি, এই সুখদুঃখাদি দ্বারা সমূদয় প্রজাদিগকে সংযুক্ত করিলেন। ২৬

২৩. সূক্ষ্মস্থূলাদি ক্রমে জগৎসৃষ্টি
অণ্ব্যো মাত্রা বিনাশিন্যো দশার্ধানাং তু যাঃ স্মৃতাঃ ।
তাভিঃ সার্ধমিদং সর্বং সংভবত্যনুপূর্বশঃ ।।২৭
পঞ্চ মহাভূতের যে সকল সূক্ষ্ম অংশ এবং স্থূলভাগ, তৎক্রমে অর্থাৎ সূক্ষ্ম হইতে স্থূল, স্থূলভাগ হইতে স্তূলতর ভাগ ইত্যাদি ক্রমে এই জগৎ সৃষ্ট হইল। ২৭

২৪. জীবধর্ম্ম
যং তু কর্মণি যস্মিন্ স ন্যযুঙ্ক্ত প্রথমং প্রভুঃ ।
স তদেব স্বযং ভেজে সৃজ্যমানঃ পুনঃ পুনঃ ।।২৮
প্রজাপতি ব্রহ্মা সৃষ্টিকালে যে জাতিকে যাদৃশ কর্ম্মে,–অর্থাৎ ব্যাঘ্রাদিকে হরিণমারণাদিরূপে নিযুক্ত করিলেন, তাহারা বারংবার সৃষ্ট হইয়াও স্বস্ব কর্ম্মানুসারে সেই সেই কর্ম্মই আচরণ করিতে লাগিল। ২৮
হিংস্রাহিংস্রে মৃদুক্রূরে ধর্মাধর্মাবৃতানৃতে ।
যদ্ যস্য সোঽদধাত্ সর্গে তত্ তস্য স্বযমাবিশত্ ।।২৯
পূর্ব্ববচনের উদাহরণ। সিংহাদির হিংসা, হরিণাদির অহিংসা, ব্রাহ্মণাদির দয়া, ক্ষত্রিয়াদির যুদ্ধাদি, ব্রহ্মচর্য্যাদির গুরুশুশ্রুষাদি ধর্ম্ম ও মাংসমৈথুনসেবাদি অধর্ম্ম, সত্য ও অসত্য ইত্যাদি প্রজাপতি সৃষ্টিকালে যাহার যাহা বিধান করিলেন, উত্তরকালেও সকলে অদৃষ্টবলে তাহাই প্রাপ্ত হইল। ২৯
২৫. স্বস্ব কর্ম্মপ্রাপ্তি
যথর্তুলিঙ্গান্যর্তবঃ স্বযমেবর্তুপর্যযে ।
স্বানি স্বান্যভিপদ্যন্তে তথা কর্মাণি দেহিনঃ ।।৩০
যেমন বসন্তাদি ঋতু আপন আপন অধিকারকালে চুতমঞ্জরী প্রভৃতি আপন আপন চিহ্ন ধারণ করিয়া থাকে, সেইরূপ শরীরধারী পুরুষেরাও আপন আপন কর্ম্ম প্রাপ্ত হইয়া থাকে। ৩০

২৬. ব্রাহ্মণাদি চারিবর্ণ সৃষ্টি
লোকানাং তু বিবৃদ্ধ্যর্থং মুখবাহূরুপাদতঃ ।
ব্রাহ্মণং ক্ষত্রিযং বৈশ্যং শূদ্রং চ নিরবর্তযত্ ।।৩১
সৃষ্টিকর্ত্তা পরমেশ্বর ভূলোকাদি প্রজা বৃদ্ধি করিবার মানসে আপন মুখ, বাহু, উরু ও পদ হইতে ক্রমে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারি বর্ণের সৃষ্টি করিলেন, অর্থাৎ মুখ হইতে ব্রাহ্মণ, বাহু হইতে ক্ষত্রিয়, উরু হইতে বৈশ্য ও পদ হইতে শূদ্রের সৃষ্টি করিলেন। ৩১

২৭. পুরুষ্ম নারী ও বিরাট্ উৎপত্তি
দ্বিধা কৃত্বাঽত্মনো দেহমর্ধেন পুরুষোঽভবত্ ।
অর্ধেন নারী তস্যাং স বিরাজমসৃজত্ প্রভুঃ ।।৩২
সৃষ্টিকর্ত্তা জগদীশ্বর আপন শরীরকে দুই খণ্ড করিয়া অর্দ্ধাংশে পুরুষ ও অর্দ্ধাংশে নারী হইলেন। ঐ উভয়ের পরস্পর সংযোগে বিরাট্-নামক পুরুষ উৎপন্ন হইল। ৩২

২৮. মনুর আবির্ভাব
তপস্তপ্ত্বাঽসৃজদ্ যং তু স স্বযং পুরুষো বিরাট্ ।
তং মাং বিত্তাস্য সর্বস্য স্রষ্টারং দ্বিজসত্তমাঃ ।।৩৩
হে দ্বিজসত্তম! সেই বিরাট পুরুষ বহুকাল তপস্যা করিয়া যাহাকে সৃষ্টি করিলেন, আমি সে মনু, আমাকে সৃষ্টিকর্ত্তা বলিয়া অবগত হও। ৩৩

২৯. দশ প্রজাপতি সৃষ্টি
অহং প্রজাঃ সিসৃক্ষুস্তু তপস্তপ্ত্বা সুদুশ্চরম্ ।
পতীন্ প্রজানামসৃজং মহর্ষীনাদিতো দশ ।।৩৪
অনন্তর আমি প্রজা সৃষ্টি করিবার অভিলাষে বহুকাল অতি কঠোর তপস্যা করিয়া প্রথমতঃ প্রজা সৃজনে সমর্থ দশ জন প্রজাপতির সৃষ্টি করিলাম। ৩৪

২৯. দশ প্রজাপতি সৃষ্টি
অহং প্রজাঃ সিসৃক্ষুস্তু তপস্তপ্ত্বা সুদুশ্চরম্ ।
পতীন্ প্রজানামসৃজং মহর্ষীনাদিতো দশ ।।৩৪
অনন্তর আমি প্রজা সৃষ্টি করিবার অভিলাষে বহুকাল অতি কঠোর তপস্যা করিয়া প্রথমতঃ প্রজা সৃজনে সমর্থ দশ জন প্রজাপতির সৃষ্টি করিলাম। ৩৪
৩০. দশ প্রজাপতির নাম
মরীচিমত্র্যঙ্গিরসৌ পুলস্ত্যং পুলহং ক্রতুম্ ।
প্রচেতসং বসিষ্ঠং চ ভৃগুং নারদমেব চ ।।৩৫
আমি মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রুতু, প্রচেতা, বশিষ্ঠ, ভৃগু ও নারদ পূর্ব্বোক্ত এই দশ জন প্রজাপতির সৃষ্টি করিলাম। ৩৫

৩১. সপ্তমনু পূর্ব্বাসৃষ্ট দেবতা, দেবতার বাসস্থান ও মহর্ষি সৃষ্টি
এতে মনূংস্তু সপ্তান্ যানসৃজন্ ভূরিতেজসঃ ।
দেবান্ দেবনিকাযাংশ্চ মহর্ষীংশ্চামিতোজসঃ ।।৩৬
এই মারীচ্যাদি দশ প্রজাপতি মহাতেজস্বী অপর সপ্ত মনু সৃষ্টি করিলেন এবং যে দেবতাদিগকে ব্রহ্মা পূর্ব্বে সৃষ্টি করেন নাই, এমন দেবতা ও দেবতাদিগের বাসস্থান এবং কতিপয় মহর্ষির সৃষ্টি করিলেন। ৩৬

৩২. যক্ষ রাক্ষস প্রভৃতি, সর্পাদি, গরুড়াদি পক্ষিগণ, আজ্যপাদি পিতৃগণ, বিদ্যুৎ প্রভৃতি, এবং নানা প্রকার জ্যোতিঃ সৃষ্টি
যক্ষরক্ষঃ পিশাচাংশ্চ গন্ধর্বাপ্সরসোঽসুরান্ ।
নাগান্ সর্পান্ সুপর্ণাংশ্চ পিতৄণাংশ্চ পৃথগ্গণম্ ।।৩৭
ইঁহারা যক্ষ, রাক্ষস, পিশাচ, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরা, অসুর, অজগরাদি নাগ ও সর্প, গরুড়াদি পক্ষিগণ, আজ্যপাদি-নামক পিতৃগণকে পৃথক পৃথকরূপে সৃষ্টি করিলেন। ৩৭

৩৩. জন্তু সৃষ্টি
কিন্নরান্ বানরান্ মত্স্যান্ বিবিধাংশ্চ বিহঙ্গমান্ ।
পশূন্ মৃগান্ মনুষ্যাংশ্চ ব্যালাংশ্চোভযতোদতঃ ।।৩৯
কিন্নর, বানর, মৎস্য, নানাপ্রকার পক্ষী, গবাদি পশু, নানাপ্রকার মৃগ, মনুষ্য ও দুই পঙ্ক্তি দন্তবিশিষ্ট অশ্বাদি জন্তু এবং সিংহাদি হিংস্র জন্ত সকল সৃষ্টি করিলেন। ৩৯
কৃমিকীটপতঙ্গাংশ্চ যূকামক্ষিকমত্কুণম্ ।
সর্বং চ দংশমশকং স্থাবরং চ পৃথগ্বিধম্ ।।৪০
কৃমি, কীট, শলভ, কেশকীট (উকুন), মক্ষিকা, মৎকুণ (ছারপোকা), দংশ, মশক প্রভৃতি জন্তু ও বৃক্ষলতাদি স্থাবর, পৃথক পৃথকরূপে সৃষ্টি করিলেন। ৪০

৩৪. কর্ম্মানুরূপ দেবমনুষ্যাদি সৃষ্টি
এবমেতৈরিদং সর্বং মন্নিযোগান্ মহাত্মভিঃ ।
যথাকর্ম তপোযোগাত্ সৃষ্টং স্থাবরজঙ্গমম্ ।।৪১
তাঁহারা আমার অনুমতিক্রমে তপোবলে যাহার কর্ম্ম, তদনুরূপ দেব, মনুষ্য, পশু, পক্ষী প্রভৃতি স্বাবর জঙ্গম সমুদয় সৃষ্টি করিলেন। ৪১

৩৫. কর্ম ও জন্মক্রম কথন
যেষাং তু যাদৃশং কর্ম ভূতানামিহ কীর্তিতম্ ।
তত্ তথা বোঽভিধাস্যামি ক্রমযোগং চ জন্মনি ।।৪২
হে মহর্ষিগণ! পূর্ব্বাচার্য্যেরা যে যে জাতির যে-যে প্রকার কর্ম্ম ও যে প্রকারে জন্ম কহিয়াছেন, আমিও ঐরূপ কর্ম্ম ও জন্মক্রম আপনাদিগকে বলিতেছি, শ্রবণ করুন। ৪২

৩৬. জরায়ুজ
পশবশ্চ মৃগাশ্চৈব ব্যালাশ্চোভযতোদতঃ ।
রক্ষাংসি চ পিশাচাশ্চ মনুষ্যাশ্চ জরাযুজাঃ ।।৪৩
পশু, মৃগ, দুই পঙ্ক্তি দন্তবিশিষ্ট হিংস্রজন্তু, রাক্ষস, পিশাচ, মনুষ্য ইহারা সকলে জরায়ুনামক গর্ভাবরণ চর্ম্মে প্রাদুর্ভূত হয় ও তাহা হইতে মুক্ত হইয়া ভূমিষ্ঠ হয়। ৪৩

৩৭. অণ্ডজ
অণ্ডজাঃ পক্ষিণঃ সর্পা নক্রা মত্স্যাশ্চ কচ্ছপাঃ ।
যানি চৈবং.প্রকারাণি স্থলজান্যৌদকানি চ ।।৪৪
পক্ষী, সর্প, কুম্ভীর, মৎস্য, কচ্ছপ, স্থলজ কৃকলাসাদি ও জলজাত শঙ্খাদি জন্তু সকল অণ্ডে উৎপন্ন হইয়া তাহা হইতে প্রাদুর্ভূত হয়। ৪৪
৩৮. স্বেদজ
স্বেদজং দংশমশকং যূকামক্ষিকমত্কুণম্ ।
ঊষ্মণশ্চোপজাযন্তে যচ্চান্যত্ কিং চিদীদৃশম্ ।।৪৫
দংশ, মশক, কেশকীট (উকুণ), মক্ষিকা, মৎকুণ (ছারপোকা) ইহারা ক্লেদ হইতে উৎপন্ন হয়, এতদ্ভিন্ন পুত্তিকাপিপীলিকাদিও উম্মা হইতে উৎপন্ন হইয়া থাকে। ৪৫

৩৯. উদ্ভিজ্জ
উদ্ভিজ্জাঃ স্থাবরাঃ সর্বে বীজকাণ্ডপ্ররোহিণঃ ।
ওষধ্যঃ ফলপাকান্তা বহুপুষ্পফলোপগাঃ ।।৪৬
যাহারা বীজ ও ভূমি উদ্ভেদ করিয়া উত্থিত হয়, তাহাদিগকে উদ্ভিজ্জ অর্থাৎ বৃক্ষ বলে। বৃক্ষ দুই প্রকার;–কতকগুলি বীজ হইতে জন্মে, কতকগুলি রোপিতশাখা হইতে উৎপন্ন হইয়া থাকে। যাহারা বিবিধ পুষ্পফলে সুশোভিত হইয়া ফল পরিপক্ক হইলেই বিনাশ পায়, তাহাদিগকে ঔষধি বলা যায়; যেমন ধান্য-যবাদি। ৪৬

৪০. অপুষ্প বৃক্ষ
March ১৯, ২০১৪ ০১ম অধ্যায় – সৃষ্টিরহস্য-বিজ্ঞানপ্রকরণ ৩৪ বার পঠিত মন্তব্য করুন
৪০. অপুষ্প বৃক্ষ
অপুষ্পাঃ ফলবন্তো যে তে বনস্পতযঃ স্মৃতাঃ ।
পুষ্পিণঃ ফলিনশ্চৈব বৃক্ষাস্তূভযতঃ স্মৃতাঃ ।।৪৭
যাহারা পুষ্পিত না হইয়াই ফলবান হয়, তাহাদিগকে বনস্পতি কহে; আর যাহাদিগের পুষ্প হইতে ফল জন্মে, তাহাদিগকে বৃক্ষ বলে। এইরূপে বৃক্ষ দুই প্রকার বলা যায়। ৪৭

৪১. গুচ্ছ, গুল্ম, প্রতান ও বল্লী
গুচ্ছগুল্মং তু বিবিধং তথৈব তৃণজাতযঃ ।
বীজকাণ্ডরুহাণ্যেব প্রতানা বল্ল্য এব চ ।।৪৮
যাহার মূল হইতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক লতা উৎপন্ন হয়, তাহাকে গুচ্ছ বলে; যেমন মল্লিকা প্রভৃতি। যাহার এক মূলে অনেক অঙ্কুর জন্মে, তাহাকে গুল্ম বলে; যেমন ইক্ষু, শর প্রভৃতি। উলু প্রভৃতিতে তৃণ বলে। তন্ত্রযুক্ত লতা প্রভৃতিকে প্রতান বলে; যথা–শশা, অলাবু প্রভৃতি; এবং যাহারা ভূমি হইতে বৃক্ষে আরোহণ করে, তাহাদিগকে বল্লী বলে, যেমন গুড়ূচ্যাদি। ইহাদিগের মধ্যে কেহ বীজ হইতে উৎপন্ন হয়, কেহ বা কাণ্ড হইতে জন্মিয়া থাকে। ৪৮

৪২. বৃক্ষাদির চৈতন্য ও সুখ-দুঃখ
তমসা বহুরূপেণ বেষ্টিতাঃ কর্মহেতুনা ।
অন্তস্সংজ্ঞা ভবন্ত্যেতে সুখদুঃখসমন্বিতাঃ ।।৪৯
ইহারা বহুবিধ কর্ম্মফলে তমোগুণে আক্রান্ত হইয়া অবস্থান করে, বহির্ব্যাপার থাকে না, কেবলমাত্র অন্তরে চৈতন্যবিশিষ্ট থাকে। কোন কোন সময়ে ইহাদিগের সুখদুঃখের বিলক্ষণ অনুভব হয়। ৪৯

৪৩. সৃষ্টিবর্ণন সমাপ্তি
এতদন্তাস্তু গতযো ব্রহ্মাদ্যাঃ সমুদাহৃতাঃ ।
ঘোরেঽস্মিন্ ভূতসংসারে নিত্যং সততযাযিনি ।।৫০
এই জন্মমরণসমাকূল অনিত্য অতিভয়ানক সংসারে ব্রহ্মাদি স্থাবর পর্য্যন্ত সমুদয় জীব যেরূপে উৎপন্ন হইয়াছে, তাহা অদ্যোপান্ত বর্ণিত হইল। ৫০

৪৪. প্রজাপতি পরমাত্মাতে অন্তর্হিত
এবং সর্বং স সৃষ্ট্বৈদং মাং চাচিন্ত্যপরাক্রমঃ ।
আত্মন্যন্তর্দধে ভূযঃ কালং কালেন পীডযন্ ।।৫১
হে মহর্ষিগণ! অচিন্ত্যশক্তিসম্পন্ন প্রজাপতি এই প্রকারে স্থাবর জঙ্গম সমুদয় জগৎকে ও আমাকে সৃষ্টি করিয়া প্রলয়কাল দ্বারা সৃষ্টিকালের নাশ করত পরমাত্মাতেই অন্তর্হিত হইলেন। ৫১

মহাভারত

মহাভারত সংস্কৃত ভাষায় রচিত প্রাচীন ভারতের দুটি প্রধান মহাকাব্যের অন্যতম (অপরটি হল রামায়ণ)। এই মহাকাব্যটি হিন্দুশাস্ত্রের ইতিহাস অংশের অন্তর্গত।
মহাভারত-এর মূল উপজীব্য বিষয় হল কৌরব ও পাণ্ডবদের গৃহবিবাদ এবং কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পূর্বাপর ঘটনাবলি। তবে এই আখ্যানভাগের বাইরেও দর্শন ও ভক্তির অধিকাংশ উপাদানই এই মহাকাব্যে সংযোজিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ – এই চার পুরুষার্থ-সংক্রান্ত একটি আলোচনা সংযোজিত হয়েছে এই গ্রন্থে। মহাভারত-এর অন্তর্গত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা ও উপাখ্যানগুলি হল ভগবদ্গীতা, দময়ন্তীর উপাখ্যান, রামায়ণ-এর একটি সংক্ষিপ্ত পাঠান্তর ইত্যাদি। এগুলিকে মহাভারত-রচয়িতার নিজস্ব সৃষ্টি বলে মনে করা হয়।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাভারত-এর রচয়িতা ব্যাসদেব। অনেক গবেষক এই মহাকাব্যের ঐতিহাসিক বিকাশ ও রচনাকালীন স্তরগুলি নিয়ে গবেষণা করেছেন। অধুনা প্রাপ্ত পাঠটির প্রাচীনতম অংশটি মোটামুটি ৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ রচিত হয়। মহাভারতের মূলপাঠটি তার বর্তমান রূপটি পরিগ্রহ করে গুপ্তযুগের প্রথমাংশে (খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দী)। মহাভারত কথাটির অর্থ হল ভরত বংশের মহান উপাখ্যান। গ্রন্থেই উল্লিখিত হয়েছে যে ভারত নামে ২৪,০০০ শ্লোকবিশিষ্ট একটি ক্ষুদ্রতর আখ্যান থেকে মহাভারত মহাকাব্যের কাহিনিটি বিস্তার লাভ করে।
মহাভারত-এ এক লক্ষ শ্লোক ও দীর্ঘ গদ্যাংশ রয়েছে। এই মহাকাব্যের শব্দসংখ্যা প্রায় আঠারো লক্ষ। মহাভারত মহাকাব্যটির আয়তন ইলিয়াড ও ওডিসি কাব্যদ্বয়ের সম্মিলিত আয়তনের দশগুণ এবং রামায়ণ-এর চারগুণ।
রচনার ইতিহাস ও গঠন
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ব্যাসদেব এই মহাকাব্যের রচয়িতা। তিনি এই আখ্যানকাব্যের অন্যতম চরিত্রও বটে। মহাভারত-এর প্রথম অংশের বর্ণনা অনুযায়ী, ব্যাসদেবের অনুরোধে তাঁর নির্দেশনা মতো গণেশ এই মহাকাব্য লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব নেন। গণেশ একটি শর্তে এই কাজে রাজি হয়েছিলেন। তাঁর শর্ত ছিল ব্যাস একবারও না থেমে সমগ্র মহাকাব্যটি আবৃত্তি করবেন। ব্যাস রাজি হন, কিন্তু তিনিও পাল্টা শর্ত দেন যে গণেশও প্রতিটি শ্লোকের অর্থ না বুঝে লিপিবদ্ধ করতে পারবেন না।
মহাভারত মহাকাব্যটি গল্পের মধ্য গল্প শৈলীতে রচিত। এই শৈলী ভারতের অনেক ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ রচনার বৈশিষ্ট্য। অর্জুনের প্রপৌত্র জনমেজয়ের নিকট এই কাহিনি পাঠ করে শোনান ব্যাসদেবের শিষ্য বৈশম্পায়ন। অনেক বছর পরে, জনমেজয়ের নিকট বৈশম্পায়নের এই মহাভারত কথনের ঘটনাটি পেশাদার কথক উগ্রশ্রবা সৌতি কর্তৃক ঋষিদের একটি যজ্ঞসমাবেশে কথিত হয়।
মহাভারতের কাহিনি
কাহিনীর শুরু প্রকৃতপক্ষে ভরত রাজার সময় থেকে। কিন্তু বহু পুস্তকে রাজা শান্তনুর সময় থেকে কাহিনী শুরু করা হয়। পিতৃসত্য পালনের জন্য শান্তনুর পুত্র দেবব্রত আজীবন বিবাহ করেন নি ও রাজসিংহাসনে বসেন নি। এই ভীষণ প্রতিজ্ঞান জন্য তাঁকে ভীষ্ম বলা হয়। ভীষ্মের কণিষ্ঠ ভ্রাতা বিচিত্রবীর্য রাজত্ব চালান তাঁর ছিল দুই পুত্র – ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু। জ্যেষ্ঠ ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ হওয়ায় পাণ্ডু রাজা হন। কিন্তু পাণ্ডুর অকালমৃত্যুর পর রাজত্ব ধৃতরাষ্ট্রের তত্বাবধানে আসে। সেখান থেকেই শুরু হয় মহাভারতের মহাবিরোধ। কে রাজা হবেন – পাণ্ডুর পুত্র, না ধৃতরাষ্ট্রের ? শুরু হয় হিংসা, ষড়যন্ত্র, কপট দ্যূতক্রীড়া বনবাস ইত্যাদি । কাহিনীর পরিণতি অষ্টাদশদিবসব্যাপী এক সংহারক যুদ্ধ – যাতে ভারতবর্ষের বহু রাজার প্রাণ যায় । মৃত্যু হয় ধৃতরাষ্টের জ্যেষ্ঠপুত্র দুর্যোধন সহ মোট শতপুত্রের। শেষে রাজত্ব পান জ্যেষ্ঠ পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির। সমস্ত কাহিনীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মুখ্য চালকের ভূমিকায় থাকেন। এই কাহিনীর আধ্যাত্মিক সারাংশ হল ধর্মের জয় ও অধর্মের নাশ।
চরিত্র সমূহ
পাণ্ডব শিবির
পঞ্চপাণ্ডব (যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব), এদের মা কুন্তি (বাবা পাণ্ডু যুদ্ধের বহু পূর্বে বিগত, নকুল, সহদেব-এর মা মাদ্রী সহমৃতা।) স্ত্রী দ্রৌপদী। পুত্র অভিমন্যু, ঘটোত্কচ, শিখণ্ডী, কৃষ্ণ
কৌরব শিবির
দুর্যোধন, দুঃশাসন ইত্যাদি ভাইরা, (পিতা ধৃতরাষ্ট্র রাজধানীতে থেকে সঞ্জয়ের মুখে বর্ণনা শুনছিলেন ও মন্ত্রী বিদুরের সহাতায় রাজ্য চালনা করছিলেন, সেখানে আরো ছিলেন এদের বোন দুঃশলা, মা গান্ধারী), মামা শকুনি। পিতামহ ভীষ্ম, গুরু দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য, কর্ণ, অশ্বথামা, শল্য।
কুরু পরিবারের বংশতালিকা
কুরু রাজবংশ১

গঙ্গা
শান্তনু১
সত্যবতী
পরাশর

ভীষ্ম
চিত্রাঙ্গদ
অম্বিকা
বিচিত্রৱীর্য়
অম্বালিকা
বেদব্যাস

ধৄতরাষ্ট্র২
গান্ধারী
শকুনী
কুন্তী
পাণ্ডু২
মাদ্রী

কর্ণ৩
যুধিষ্ঠির৪
ভীম৪
অর্জুন৪
সুভদ্রা
নকুল৪
সহদেব৪

দুর্যোধন৫
দুঃশলা
দুঃশাসন
(৯৮ জন পুত্র)

অভিমন্যু
উত্তরা

পরীক্ষিৎ

জন্মেজয়

• (১): শান্তনু ছিলেন কুরু বংশের একটি রাজা। গঙ্গার সাথে বিবাহের পর সত্যবতীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হল।
• (২): বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর বেদব্যাস সত্যবতীর অনুরোধে অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভ থেকে যথাক্রমে ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডুর জন্ম দেন । বিদুর অম্বিকার দাসীর পুত্র ।
• (৩): পাণ্ডুর সাথে বিবাহের পূর্বে কুন্তী সূর্যকে আহ্বান করে কর্ণকে লাভ করেন ।
• (৪): পাণ্ডবরা পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ পুত্র যাদের কুন্তী ও মাদ্রী বিভিন্ন দেবতাকে আহ্বান করে লাভ করেন –
o যমরাজকে কুন্তী যুধিষ্ঠিরের জন্য আহ্বান করেন
o বায়ুকে কুন্তী ভীমের জন্য আহ্বান করেন
o ইন্দ্রকে কুন্তী অর্জুনের জন্য আহ্বান করেন
o অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে মাদ্রী নকুল ও সহদেবের জন্য আহ্বান করেন
• (৫):দুর্যোধন ও তাঁর ভ্রাতারা একই সময়ে জন্মলাভ করেন । তাঁরা পাণ্ডবদের সমসাময়িক ।
মহাভারতের কাহিনি

অনুক্রমণিকাধ্যায় – নৈমিষারণ্যে সূতের আগমন | সৃষ্টিবর্ণন | ভারতলেখনার্থ গণেশের স্মরণ | ধৃতরাষ্ট্রাদির জন্ম | মহাভারতের সংক্ষিপ্তাসার | ধৃতরাষ্ট্রের বিলাপ | ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি সান্ত্বনা | মহাভারত প্রশংসা
নারায়ণ ও নরোত্তম নর ও দেবী সরস্বতীকে নমস্কার করিয়া জয় উচ্চারণ করিবে।
নৈমিষারণ্যে সূতের আগমন
কোন সময়ে নৈমিষারণ্যে কুলপতি শৌনক দ্বাদশবার্ষিক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। একদা মহর্ষিগণ দৈনন্দিন কর্ম্ম সমাধানপূর্ব্বক সকলে সমবেত হইয়া কথাপ্রসঙ্গে সুখে অধ্যাসীন হইয়া আছেন, ইত্যবসরে লোমহর্ষণ-পুৎত্র পৌরাণিক সৌতি অতি বিনীতভাবে তথায় সমুপস্থিত হইলেন। নৈমিষারণ্যবাসী ঋষিগণ তাঁহাকে অভ্যাগত দেখিয়া অত্যাশ্চর্য্য কথা শ্রবণ করিবার নিমিত্ত চতুর্দ্দিকে বেষ্টন করিয়া দণ্ডায়মান রহিলেন। উগ্রশ্রবাঃ সৌতি কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহাদিগকে অভিবাদন করিয়া তপস্যার কুশল জিজ্ঞসা করিলেন। তাঁহারাও অতিথির যথোচিত পূজা করিয়া বসিবার নিমিত্ত আসন প্রদানপূর্ব্বক আপনারাও যথাস্থানে উপবেশন করিলেন। অনন্তর সৌতি নির্দ্দিষ্ট স্থানে উপবিষ্ট হইলে ঋষিরা তাঁহাকে বিশ্রান্ত দেখিয়া কথাপ্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করিলেন. “হে কমললোচন সূতনন্দন! এখন কোথা হইতে আসিতেছ এবং এতকাল কোন্ কোন্ স্থানেই বা পর্য্যটন করিলে, তাহা আনুপূর্ব্বিক সমুদয় বল।” সৌতি এরূপ জিজ্ঞাসিত হইলে অতি শান্তপ্রকৃতি ঋষিদিগের সমক্ষে কহিতে লাগিলেন, “হে মহর্ষিগণ! আমি মহাত্মা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞে গমন করিয়াছিলাম। তথায় বৈশম্পায়নের মুখে কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন [ বেদব্যাস] প্রোক্ত মহাভারতীয় কথা শ্রবণ করিলাম। অনন্তর তথা হইতে প্রস্থান করিয়া বহুবিধ তীর্থ দর্শন ও অনেক আশ্রমে ভ্রমণ করিয়া পরিশেষে সমন্তপঞ্চক [কুরুক্ষেত্র] তীর্থে উপস্থিত হইলাম;– পূর্ব্বে যথায় কুরু ও পাণ্ডব এবং উভয়পক্ষীয় ভূপালদিগের তুমুল সংগ্রাম হইয়াছিল। তথা হইতে আপনাদিগের দর্শানার্থে এই পবিত্র আশ্রমে আসিয়াছি। তথা হইতে আপনাদিগের দর্শনার্থে এই পবিত্র আশ্রমে আসিয়াছি। যেহেতু, আপনারা আমার পক্ষে সাক্ষাৎ ব্রহ্মস্বরূপ। হে তেজস্বী ঋষিগণ! আপনারা যজ্ঞে আহুতি প্রদান করিয়া অতি পূতমনে আসনে উপবেশন করিয়া আছেন; অনুমতি করুন, ধর্ম্মসম্বন্ধীয় পৌরাণিকী কথা কি ভূপতিদিগের ইতিবৃত্ত বা ঋষিদিগের ইতিহাস, ইহার মধ্যে কি বর্ণন করিব?” ঋষিগণ কহিলেন, “ভগবান্ বেদব্যাস যে ইতিহাস কহিয়াছেন, সুরগণ ও ব্রহ্মর্ষিগণ যাহা শ্রবণ করিয়া অশেষ প্রশংসা করেন এবং বৈশম্পায়ন সর্পযজ্ঞে জনমেজয়ের নিকট যাহা কীর্ত্তন করিয়াছেন, আমরা সেই ইতিহাস শ্রবণ করিতে সাতিশয় অভিলাষ করি। কারণ, যাহা সকল উপাখ্যান হইতে শ্রেষ্ঠ ও নানাশাস্ত্রের সার-সঙ্কলন করিয়া রচিত ও বেদচতুষ্টয়ের অনুগত হইয়াছে এবং যাহাতে আত্মতত্ত্ববিষয়ক সম্যক্ মীমাংশা আছে, তাহা শ্রদ্ধা ও ভক্তিসহকারে শ্রবণ করিলে পাপভয়ের নিবারণ হয়।” ঋষিগণের প্রার্থনা-বাক্যে সন্তুষ্ট হইয়া উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, যিনি এই অখণ্ড প্রকাণ্ড ব্রহ্মাণ্ডের আদিপুরুষ ও অদ্বিতীয় অধীশ্বর, যিনি স্থাবর-জঙ্গম সকলের স্রষ্টা ও পাতা [রক্ষক], শাস্ত্রে যাঁহাকে একমাত্র পরব্রহ্ম বলিয়া নির্দ্দেশ করে, যাঁহার প্রীতির নিমিত্ত কেহ প্রজ্জ্বলিত হুতাশনে মন্ত্রোচ্চারণপুর্ব্বক বারংবার আহুতি প্রদান করিতেছেন, যাঁহার সাক্ষাৎকারলাভপ্রত্যাশায় কেহ বা শত শত বৎসর নির্জ্জনে একান্তমনে ধ্যান, মনন ও অতি কঠোর ব্রতাদির অনুষ্ঠান করিতেছেন, কেহ বা মায়াপ্রপঞ্চস্বরূপ সংসারে বিরক্তিভাব প্রকাশ করিয়া যাঁহার উপাসনার নিমিত্ত আত্মীয়-স্বজন সকলকেই বিসর্জ্জন করিয়া অরণ্যে অরণ্যে ভ্রমণ করিতেছেন, এইরূপ যাঁহাকে লাভ করিবার নিমিত্ত এই পৃথিবীস্থ সমস্ত লোকেই অতি দুষ্কর কর্ম্মে হস্তক্ষেপণ করিতেছে, –সেই অনাদি, অনন্ত, অভিলষিত-ফলদাতা, বিশ্বপাতা [বিশ্বপালক], চরাচরগুরু হরির চরণে প্রণিপাত করিয়া বেদব্যাস- প্রণীত অতি পবিত্র বিচিত্র ইতিহাস বর্ণন করিব। এই বিশাল মহীতলে কতশত মহাত্মারা ঐ ইতিহাস কহিয়া গিয়াছেন, অনেকেই কহিতেছেন এবং ভবিষ্যৎকালেই কহিবেন। ব্রাহ্মণেরা বহুকষ্টে ও অভিনিবিষ্টচিত্তে সংক্ষেপে বা সবিস্তারে যে বেদ অধ্যায়ন করিয়া থাকেন, যাহা জ্ঞানের একমাত্র সীমা, সেই বেদশাস্ত্রের অনুগত করিয়া এই ইতিহাস মহাত্মা বেদব্যাস কর্ত্তৃক বিরচিত হইয়াছে। ইহাতে শাস্ত্রের মত ও লৌকিক আচার-ব্যবহারের রীতিনীতি স্পষ্টরূপে নির্দ্দিষ্ট আছে। ইহা নানা সুচারু শব্দ ও রমণীয়ভাবে পরিপূর্ণ এবং নানাপ্রকার ছন্দোবন্ধে নিবদ্ধ ও অলঙ্কৃত হইয়াছে। এই নিমিত্ত পণ্ডিতমণ্ডলী মহাভারতের সবিশেষ সমাদর করিয়া থাকেন।
সৃষ্টিবর্ণন
প্রথমতঃ এই বিশ্বসংসার কেবল ঘোরতর অন্ধকারে আবৃত ছিল। অনন্তর সমস্ত বস্তুর বীজভূত এক অণ্ড প্রসূত হইল। ঐ অণ্ডে অনাদি, অনন্ত, অচিন্তনীয়, অনির্ব্বচনীয়, সত্যস্বরূপ, নিরাকার, নির্ব্বিকার, জ্যোতির্ময় ব্রহ্ম প্রবিষ্ট হইলেন। অনন্তর ঐ অণ্ডে ভগবান্ প্রজাপতি ব্রহ্মা স্বয়ং জন্ম পরিগ্রহ করিলেন। তৎপরে স্থাণু, স্বায়ম্ভূব মনু, দশ প্রচেতা, দক্ষ, দক্ষের সপ্ত পুৎত্র, সপ্তর্ষি, চতুর্দ্দশ মনু জন্মলাভ করিলেন। মহর্ষিগণ একতানমনে [একাগ্রচিত্তে] যাঁহার গুণকীর্তন করিয়া থাকেন, সেই অপ্রমেয় [পরিমাণ-শূন্য] পুরুষ, দশ বিশ্বদেব, দ্বাদশ আদিত্য, অষ্টবসু, যমজ অশ্বিনীকুমার, যক্ষ, সাধুগণ (সাধ্যগণ), পিশাচ, গুহ্যক এবং পিতৃগণ উৎপন্ন হইলেন। অনন্তর অনেকানেক বিদ্বান্ মহর্ষি ও রাজর্ষিগণ উৎপন্ন হইলেন। তৎপরে জল, পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, দশ দিক্, সংবৎসর, ঋতু, মাস, পক্ষ, রাত্রি ও অন্যান্য সমস্ত বস্তু ক্রমশঃ সঞ্জাত হইল। কিন্তু প্রলয়কাল উপস্থিত হইলে এই বিশাল বিশ্বসংসার সমুদয়ই সেই একমাত্র পরব্রহ্মে লীন হইবে, আর কোন চিহ্নই থাকিবে না। যাদৃশ কোন ঋতুর পর্য্যায়কালে সমুদয় ঋতুলক্ষণ একৈকশঃ [এক এক ক্রমে] পরিদৃশ্যমান হয়, তাদৃশ যুগপ্রারম্ভে জীবজন্তু ও অন্যন্য সমস্ত পদার্থই স্ব স্ব আকার ও স্বভাব পরিগ্রহ করে। একবার প্রলয়, পুনর্ব্বার উৎপত্তি ও স্থিতি, এইরূপে সংসারচক্র নিরবচ্ছিন্ন ঘূর্ণায়মান হইতেছে।
ত্রয়স্ত্রিংশৎ সহস্র, ত্রয়স্ত্রিংশৎ শত ও ত্রয়স্ত্রিংশৎসংখ্যক দেবতাগণ সংক্ষেপে সৃষ্টি হইলেন। বৃহদ্ভানু, চক্ষু, আত্মা, বিভাবসু, সবিতা, ঋচীক, অর্ক, ভানু, আশাবহ, রবি, মহ্য। এই কয়েকটি দিবের পুৎত্র। মহ্যের পুৎত্র দেবভ্রাট ও সুভ্রাট। সুভ্রাটের তিনপুৎত্র;– দশজ্যোতি, শতজ্যোতি ও সহস্রজ্যোতি। মহাত্মা দশজ্যোতির দশ সহস্র পুৎত্র জন্মে। শতজ্যোতির তাহা অপেক্ষা দশগুণ এবং সহস্রজ্যোতির শতজ্যোতি অপেক্ষা দশগুণ পুৎত্র হয়। এইসকল হইতে কুরুবংশ, যদুবংশ, ভরতবংশ, যযাতিবংশ ও ইক্ষ্বাকুবংশ এবং অন্যান্য প্রভূত রাজর্ষিবংশ সম্ভূত হয়।
যে সকল জীব সৃষ্ট হইল, তাহাদিগের অবস্থিতির স্থান, ত্রিবিধ রহস্য, চারি বেদ, যোগশাস্ত্র, বিজ্ঞানশাস্ত্র, ধর্ম্মার্থ-কাম-প্রতিপাদক বিবিধ শাস্ত্র, লোকযাত্রাবিধান এই সমস্ত মহাত্মা বেদব্যাস যোগবলে অবগত ছিলেন। এই মহাভারতে অশেষ ইতিহাস ও বেদপ্রতিপাদ্য সনাতন ধর্ম্ম এবং তত্ত্বজ্ঞান বিস্তরতঃ ও সঙ্ক্ষেপতঃ কথিত আছে। কোন কোন কৃতবিদ্য ব্রাহ্মণ মহাভারতের প্রথমাবধি, কেহ বা আস্তীকপর্ব্বাবধি, কেহ বা উপরিচর রাজার উপাখ্যানাবধি আরম্ভ বিবেচনা করিয়া পাঠ করিয়া থাকেন। কেহ কেহ ইহার নিগূঢ় মর্ম্ম বিশেষ অনুধাবন করিয়া সুপ্রচার করেন। কেহ মহাভারতের ব্যাখ্যা করিতে সক্ষম; কেহ বা ইহার ধারণায় সুনিপুণ।
সত্যবতীসুত ব্যাসদেব তপোবলে সনাতন বেদশাস্ত্রের সারোদ্ধার করিয়া এই পবিত্র ইতিহাস রচনা করেন। রচনা করিয়া কি প্রকারে শিষ্যদিগকে অধ্যয়নাদি করাইবেন, এইরূপ মনে মনে চিন্তা করিতেছেন, ইত্যবসরে সর্ব্বজ্ঞ, সর্ব্বশক্তিমান, ভগবান্ প্রজাপতি ব্রহ্মা সত্যবতীতনয়ের চিন্তার বিষয় জানিতে পারিয়া তাঁহার প্রীতিবর্দ্ধন ও লোকের হিতসাধনের নিমিত্ত তথায় আবির্ভূত হইলেন। ব্যাসদেব তাঁহার দর্শনমাত্র অতিমাত্র বিস্মিত হইয়া সসম্ভ্রমে গাত্রোত্থানপূর্ব্বক তাঁহাকে বসিবার নিমিত্ত এক আসন প্রদান করিয়া অতি বিনীতভাবে দণ্ডায়মান রহিলেন। হিরণ্যগর্ভ আসনপরিগ্রহ করিয়া তাঁহাকে বসিতে অনুমতি করিলে, বেদব্যাস তাঁহার আসনের সন্নিধানে অতি প্রীতিমনে ও প্রফুল্লনয়নে উপবেশন করিয়া সবিনয়ে নিবেদন করিলেন, “ভগবান্! আমি এক অদ্ভুত কাব্য রচনা করিয়াছি; তাহাতে বেদ, বেদাঙ্গ, উপনিষৎ এই সকলের সার-সঙ্কলন; ইতিহাস ও পুরাণের অনুসরণ ও ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্ত্তমান কালত্রয়ের সম্যক্ নিরূপণ করিয়াছি এবং জরা, মৃত্যু, ভয়, ব্যাধি, ভাব, অভাব, ইহাদের নির্ণয়; বিবিধ ধর্ম্ম ও আশ্রম-লক্ষণের নিদর্শন, চাতুর্ব্বর্ণ্যবিধান, তপস্যা, ব্রহ্মচর্য্য, পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য্য, গ্রহ, নক্ষত্র, তারা ইহাদিগের বিবরণ করিয়াছি। ভূতভাবন ভগবান্ যে নিমিত্ত দিব্য ও মানুষাকারে জন্ম স্বীকার করেন, তাহার তত্ত্বানুসন্ধান, অতি পবিত্র পুণ্যক্ষেত্র ও তীর্থস্থান, ইহারও কীর্ত্তন করিয়াছি। নদ, নদী, সমুদ্র, পর্ব্বত, গ্রাম, নগর, বন, উপবন ইহাদের যথাস্থানে সংস্থান এবং যুদ্ধকৌশল, জাতিবিশেষ, লোকযাত্রাবিধান এই সকলেরও সুস্পষ্ট নিরূপণ করিয়াছি; কিন্তু এই বিশাল বিশ্বক্ষেত্রে একজন ইহার উপযুক্ত লেখক দেখিতেছি না।”
ভারতলেখনার্থে গণেশের স্মরণ
ব্রহ্মা তাঁহার অভিমত বিষয় অবগত হইয়া কহিলেন, “বৎস! এই ভূমণ্ডলে অনেকানেক মহানুভব মুনি আছেন, কিন্তু তুমি তত্ত্বজ্ঞানসম্পন্ন বলিয়া ঐ সকল অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। তুমি জন্মাবধি সত্য বৈ কখন মিথ্যা ব্যবহার কর নাই এবং সর্ব্বদা ব্রহ্মবাদিনী বাণী মুখে উচ্চারণ করিয়া থাক; এক্ষণে যখন স্বপ্রণীত মহাভারতকে কাব্য বলিয়া নির্দ্দেশ করিলে, সুতরাং এই গ্রন্থ কাব্য বলিয়া পরিগণিত ও প্রখ্যাত হইবে। যাদৃশ অপরাপর আশ্রম হইতে গৃহস্থাশ্রম শ্রেষ্ঠ, তাদৃশ তোমার এই কাব্য অন্যান্য কবির কাব্য অপেক্ষা উৎকৃষ্ট হইবে সন্দেহ নাই। অ্তএব এক্ষণে গণেশকে স্মরণ কর, তিনি তোমার লেখক হইবেন।” এই কথা বলিয়া ব্রহ্মা অন্তর্হিত হইলে ভগবান্ সত্যবতীসুত গণেশকে স্মরণ করিলেন। গণপতি স্মৃতিমাত্রেই তথায় উপস্থিত হইলে ব্যাসদেব ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে তাঁহার যথোচিত সৎকার ও আসন প্রদান করিয়া কহিলেন, “হে গণনায়ক! মনঃসঙ্কল্পিত মহাভারতাখ্য গ্রন্থ আমি অবিকল বলিতেছি, আপনি তাহার লেখক হউন।” বিঘ্ননাশক গণেশ বেদব্যাসের এই কথা শুনিয়া কহিলেন. “মুনে! যদি লিখিতে লেখনী ক্ষণমাত্র বিশ্রাম লাভ না করে, তাহা হইলে আমি আপনার লেখক হইতে পারি”। ব্যাসদেব কহিলেন, “হে বিঘ্ননাশক! কিন্তু আমি যাহা বলিব, তাহার যথার্থ অর্থবোধ না করিয়া আপনিও লিখতে পারবেন না।” গণাধিপতি তাহাতেই সম্মতি প্রদান করিলেন। এই কারণে ব্যাস স্থানে স্থানে গ্রন্থগ্রন্থি [গঁট-কঠিন] স্বরূপ কূটশ্লোক রচনা করিয়াছেন এবং তদ্বিষয়ে এইরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়া কহেন যে, এই ভারত-গ্রন্থে অষ্ট সহস্র ও অষ্টশত এরূপ শ্লোক আছে যে, তাহার ভাবার্থ সঙ্কলন করিতে কেবল আমি পারি ও শুক পারে, সঞ্জয় পারেন কি না, তাহা সন্দেহস্থল। অস্পষ্ট বলিয়া ঐ ব্যাসকূটের অদ্যাপি কেহ অর্থ করিতে পারে না। অধিক কি, গণেশ সর্ব্বজ্ঞ হইলেও লিখিবার সময় সেই সকল শ্লোকের অর্থবোধ করিবার নিমিত্ত ক্ষণকাল চিন্তিত হইতেন। ইত্যবসরে ব্যাসদেব বহুতর শ্লোক রচনা করিতেন।
প্রথমতঃ লোক-সকল অজ্ঞানতিমিরে সমাচ্ছন্ন ছিল, কিন্তু এই মহাভারত জ্ঞানাঞ্জন-শলাকা দ্বারা সেই মোহাবরণ উন্মোচন করিয়া ধর্ম্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ সংক্ষেপে ও সবিস্তারে কীর্ত্তন করিয়া জীবলোকের মোহান্ধকার নিরাকরণ করিয়াছে। পুরাণরূপ পূর্ণচন্দ্র উদয় হইয়া শ্রুতিস্বরূপ জ্যোৎস্না প্রকাশ করিয়াছে। তদ্দ্বারা লোকের বুদ্ধিরূপ কুমুদ বিকাশ পাইয়াছে। মোহতিমির নিরাস করিয়া এই ইতিহাসস্বরূপ উজ্জ্বল প্রদীপ এই বিশাল বিশ্বস্বরূপ বাসগৃহকে সুপ্রকাশ করিয়াছে।
এই মহাভারত একটি বৃক্ষস্বরূপ। সংগ্রহাধ্যায় ইহার বীজভূত, পৌলোম ও আস্তীকপর্ব্ব ইহার মূল, সম্ভবপর্ব্ব স্কন্ধ, সভা ও অরণ্য ইহার বিটঙ্ক [পক্ষিগণের আশ্রয়স্থান], অরণীপর্ব্ব পর্ব্বস্বরূপ, বিরাট ও উদ্‌যোগপর্ব্ব ইহার সার, ভীষ্মপর্ব্ব শাখা, দ্রোণপর্ব্ব পত্র, কর্ণপর্ব্ব পুষ্পস্বরূপ, শল্যপর্ব্ব সুগন্ধ, স্ত্রী ও ঐশিকপর্ব্ব ইহার সুশীতল ছায়া, শান্তিপর্ব্ব ইহার মহাফল, অশ্বমেধ অমৃতরস, আশ্রমবাসিকপর্ব্ব ইহার আশ্রয়স্থান, শল্যপর্ব্ব এই বৃক্ষের অগ্রভাগ। যেমন মেঘ সকলের উপজীব্য, তাদৃশ এই অক্ষয় ভারতবৃক্ষ উত্তরকালে সকল কবিকূলের উপজীব্য হইবে। এক্ষণে এই মহাভারত-মহাদ্রুমের সুস্বাদু ফল ও সুগন্ধি পুষ্পসমুদয় বলিব।
ধৃতরাষ্ট্রাদির জন্ম
অতি পূর্ব্বকালে ভগবান্ বাদরায়ণি [বেদব্যাস]-জননী সত্যবতীর অনুমতিক্রমে এবং ধর্মাত্মা ভীষ্মদেবের নিয়োগানুসারে বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্রে [পত্নীতে] অগ্নিত্রয়প্রতিম অতি বীর্য্যবান তিন সন্তান উৎপাদন করেন। ঐ পুৎত্রত্রয়ের নাম ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুর। মহর্ষি ইঁহাদিগকে উৎপাদন করিয়া পুনর্ব্বার তপস্যার নিমিত্ত আশ্রমে প্রস্থান করিয়াছিলেন। অনন্তর ঐ তিন পুৎত্র জরাগ্রস্থ হইয়া লোকান্তরে গমন করিলে মহর্ষি নর

ঋষিগণ কহিলেন, “হে সূতনন্দন! আমরা ভারতের অনুক্রমণিকা শুনিলাম, এক্ষণে সমন্তপঞ্চক নামক যে তীর্থের উল্লেখ করিয়াছ, তাহার যাহা কিছু বর্ণনীয় আছে সমুদয় শ্রবণ করাইয়া আমাদিগকে চরিতার্থ কর।” ঋষিদিগের এইরূপ প্রার্থনাবাক্যে সন্তুষ্ট হইয়া অতি শিষ্টপ্রকৃতি সৌতি কহিতে লাগিলেন, হে ব্রাহ্মণগণ! আমি আপনাদিগের সম্মুখে সমন্তপঞ্চক তীর্থের বৃত্তান্ত ও অন্যান্য কথা প্রসঙ্গক্রমে সমুদয় কীর্ত্তন করিতেছি, অবধান করুন।
অদ্বিতীয় বীর পরশুরাম ত্রেতা ও দ্বাপর যুগের সন্ধিতে পিতৃবধ-বার্ত্তা শ্রবণ করিয়া ক্রোধপরায়ণ হইয়া এই পৃথিবীকে একবিংশতিবার নিঃক্ষৎত্রিয়া করেন। তিনি স্ববিক্রম-প্রভাবে নিঃশেষে ক্ষৎত্রিয়কুল উৎসন্ন করিয়া সেই সমস্তপঞ্চকে শোণিতময় পঞ্চহ্রদ প্রস্তুত করেন। শুনিয়াছি, তিনি রোষপরবশ হইয়া সেই হ্রদের রুধির দ্বারা পিতৃলোকের তর্পণ করিয়াছিলেন। অনন্তর ঋচীক প্রভৃতি পিতৃগণ তথায় আগমন করিয়া পরশুরামকে কহিলেন, “হে মহাভাগ রাম! তোমার এরূপ অবিচলিত পিতৃভক্তি ও অসাধারণ বিক্রম দর্শনে আমরা অত্যন্ত প্রীত হইয়াছি, এক্ষণে তুমি আপনার অভিলষিত বর প্রার্থনা কর।” রাম কহিলেন, “হে পিতৃগণ! যদি প্রসন্ন হইয়া ইচ্ছানুরূপ বর প্রদানে অনুগ্রহ করেন, তাহা হইলে ক্রোধে অধীর হইয়া ক্ষৎত্রিয়বংশ ধ্বংস করিয়া যে পাপরাশি সঞ্চয় করিয়াছি, সেই সকল পাপ হইতে যাহাতে মুক্ত হই এবং এই শোণিতময় পঞ্চহ্রদ অদ্যাবধি পৃথিবীতে তীর্থস্থান বলিয়া যাহাতে প্রখ্যাত হয়, এরূপ বর প্রদান করুন।”পিতৃগণ ‘তথাস্তু’ বলিয়া পরশুরামের অভিমত বর প্রদানপূর্ব্বক সেইরূপ অধ্যাবসায় হইতে তাঁহাকে ক্ষান্ত হইতে আদেশ করিলেন। তিনিও তদবধি ক্ষৎত্রিয়দিগের উপর আর কোনরূপ অত্যাচার করিলেন না।
সেই শোণিতময় পঞ্চহ্রদের সন্নিধানে যে সকল প্রদেশ আছে, তাহাকেই পরম পবিত্র সমন্তপঞ্চক তীর্থ বলিয়া নির্দ্দেশ করা হয়। কারণ, পণ্ডিতেরা কহেন, যে দেশ যে কোন বিশেষ চিহ্নে চিহ্নিত, তাহা তন্নামেই প্রখ্যাত হইয়া থাকে। ঐ সমন্তপঞ্চক তীর্থে কলি ও দ্বাপরের অন্তরে কুরু ও পাণ্ডবসৈন্যের ঘোরতর সংগ্রাম হইয়াছিল। অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা যুদ্ধার্থে ভূদোষবর্জ্জিত সেই পুণ্যক্ষেত্রে সমবেত ও নিহত হয়। হে ব্রাহ্মণগণ! ইহাই তাহার যথার্থ ব্যুৎপত্তিলভ্য অর্থ। সেই তীর্থ অতি পবিত্র ও রমণীয়। হে ধর্ম্মপরায়ণ মহর্ষিগণ! ত্রিলোকে ঐ দেশ যেরূপ বিখ্যাত, তাহা আপনাদের সমক্ষে কহিলাম।
অক্ষৌহিণী-পরিমাণ
ঋষিগণ কহিলেন, “হে সুতনন্দন! তুমি যে অক্ষৌহিণী শব্দের উল্লেখ করিলে, আমরা তাহার অর্থ শুনিতে ইচ্ছা করি। কারণ, তুমি সকলই জান, অতত্রব কত নর, কত হস্তী, কত অশ্ব ও কত রথে এক অক্ষৌহিণী হয়, তাহা সপ্রমাণ করিয়া বল।” সৌতি কহিলেন,– এক রথ, এক হস্তী, পঞ্চ পদাতি ও তিন অশ্ব, ইহাতে একটি পত্তি হয়। তিন পত্তিতে এক সেনামুখ, তিন সেনামুখে এক গুল্ম, তিন গুল্মে এক গণ, তিন গণে এক বাহিনী, তিন বাহিনীতে এক পৃতনা, তিন পৃতনায় এক চমু, তিন চমূতে এক অনীকিনী, দশ অনীকিনীতে এক অক্ষৌহিণী হয়। এক অক্ষৌহিণীতে একবিংশতি সহস্র অষ্টশত ও সপ্ততি-সংখ্যক রথ ও তৎসংখ্যক গজ, একলক্ষ নয় সহস্র তিন শত পঞ্চাশ জন পদাতি এবং পঞ্চষষ্টি সহস্র ছয় শত দশ অশ্ব থাকে। আমি যে অক্ষৌহিণী শব্দের উল্লেখ করিলাম, সংখ্যাতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতেরা তাহার এইরূপ নিরূপণ করিয়াছেন [এক অক্ষৌহিণীমাণ– ১ লক্ষ ৯ হাজার ৫০ পদাতি, ৬৫ হাজার ৬ শত ১০ অশ্ব, ২১ হাজার ৮ শত ৭০ হস্তী, ২১ হাজার ৮ শত ৭০ রথ। মোট সৈন্যসংখ্যা ২ লক্ষ ১৮ হাজার ৭ শত]। সমন্তপঞ্চক তীর্থে কুরু ও পাণ্ডবদিগের এইরূপ অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা একত্র সমাগত হইয়াছিল। সেই সেনা কৌরবদিগকে উপলক্ষ্য করিয়া কালের অদ্ভুত ও অচিন্তনীয় শক্তিসহকারে তথায় মৃত্যুমুখে নিপতিত হয়। তন্মধ্যে পরমাস্ত্রবেত্তা ভীষ্ম দশ দিবস যুদ্ধ করেন, দ্রোণ পাঁচ দিন কৌরবসেনা রক্ষা করিয়াছিলেন। পরবলপীড়ক কর্ণ দুই দিবস ও শল্য অর্দ্ধদিবস মাত্র যুদ্ধ করেন। তৎপরে ভীমসেন ও দুর্য্যোধনের গদাযুদ্ধ আরম্ভ হয়, তাহাও দিবসার্দ্ধ মাত্র। অনন্তর দিবসের অবসানে ও নিশার আগমন হইলে অশ্বত্থামা, কৃতবর্ম্মা ও কৃপাচার্য্য সকলে একমত অবলম্বন করিয়া অসঙ্কুচিতচিত্তে সুখপ্রসুপ্ত যুধিষ্ঠিরের সৈন্যগণকে সংহার করিলেন।
পর্ব্বসংগ্রহ
হে শৌনক! আপনার যজ্ঞে যে ভারতাখ্য ইতিহাস কহিব, বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন জনমেজয়ের সর্পসত্রকালে তাহা কীর্ত্তন করিয়াছিলেন। এই গ্রন্থের আরম্ভে পৌষ্য, পোলোম ও আস্তীকপর্ব্বে মহানুভব ভূপালদিগের বিচিত্র চরিত্র সম্যক্রূপে বর্ণিত আছে। ইহা বহুবিধ উপাখ্যান ও অনেকানেক লৌকিক আচার-ব্যবহারে পরিপূর্ণ। যাদৃশ মোক্ষার্থীরা একমাত্র পারত্রিক শুভসঙ্কল্পে বৈরাগ্য অবলম্বন করেন, তাদৃশ বিজ্ঞেরা মঙ্গললাভ প্রত্যাশায় এই পবিত্র ইতিহাসের আশ্রয় লইয়া থাকেন। যেমন সমস্ত জ্ঞাতব্য বস্তুমধ্যে আত্মা ও সকল প্রিয়বস্তুমধ্যে প্রাণ শ্রেষ্ঠ পদার্থ, সেইরূপ এই গ্রন্থ সর্ব্বশাস্ত্র অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। যেমন অন্নপান ব্যতীত জীবনধারণের আর উপায় নাই, সেইরূপ এই ইতিহাস যে সকল সুললিত কথা প্রতিপন্ন করিতেছে, তদ্ব্যতিরিক্ত ভূমণ্ডলে আর কথা নাই। যেমন সৎকুলোদ্ভব প্রভুকে প্রভুপরায়ণ ভৃত্যগণ অভ্যুদয়বাসনায় উপাসনা করে, সেইরূপ বুধগণ বিবিধ জ্ঞানলাভের অভিলাষে এই ভারতসংহিতার সেবা করিয়া থাকেন। যেমন স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণ কি লৌকিক, কি বৈদিক সকল বাক্যকেই অধিকার করিয়া আছে, সেইরূপ এই অদ্ভুত ইতিহাসে বহুবিষয়ে শুভকরী বুদ্ধিবৃত্তি সমর্পিত হইয়াছে।
হে ঋষিগণ! এক্ষণে বেদপ্রতিপাদ্য, সনাতন ধর্ম্মে অলঙ্কৃত, অনুভূতপূর্ব্ব বিষয়ের মীমাংসাসহকৃত, সুচারুরূপে বিরচিত ভারতের পর্ব্বসংগ্রহ বলিতেছি, আপনারা অবধান করুন। প্রথম অনুক্রমণিকা-পর্ব্ব, দ্বিতীয় সংগ্রহ-পর্ব্ব, পরে পোষ্য ও পৌলোম পর্ব্ব, আস্তীক ও বংশাবতরণ-পর্ব্ব, তৎপরে পরমাশ্চর্য্য সম্ভবপর্ব্ব, তাহা শ্রবণ করিলে শরীর রোমাঞ্চিত হয়। তৎপরে জতুগৃহ-দাহ, তৎপরে হিড়িম্ববধ, তৎপরে বকবধ, তৎপরে চৈত্ররথ-পর্ব্ব, তৎপরে দেবী পাঞ্চালীর স্বয়ংবর-বৃত্তান্ত, তৎপরে বিবাহ, তৎপরে বিদুরাগমন ও রাজ্যলাভ-পর্ব্ব, তৎপরে অর্জ্জুনের অরণ্যবাস, তৎপরে সুভদ্রাহরণ, তৎপরে যৌতুকাহরণপর্ব্ব, তৎপরে খাণ্ডবদাহ ও ময়দানবদর্শন, তৎপরে সভাপর্ব্ব, তৎপরে মন্ত্রপর্ব্ব, তৎপরে জরাসন্ধবধ, তৎপরে দিগ্বিজয়-পর্ব্ব, দিগ্বিজয়ের পর যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় মহাযজ্ঞ, তৎপরে অর্ঘ্যাভিহরণ, তৎপরে শিশুপালবধ, তৎপরে দ্যূত ও অনুদ্যূত-পর্ব্ব, তৎপরে অরণ্য, তৎপরে কির্ম্মীর-বধ, তৎপরে অর্জ্জুনের অভিগমন ও তৎপরে মহাদেব ও অর্জ্জুনের যুদ্ধ, ইহাকে কিরাতপর্ব্ব বলিয়া নির্দ্দেশ করা হয়। তৎপরে ইন্দ্রলোকাভিগমন, তৎপরে নলোপাখ্যান, ইহা শ্রবণ করিলে অশ্রুপাত হয়। তৎপরে যুধিষ্ঠিরের তীর্থযাত্রা-পর্ব্ব, তৎপরে যক্ষযুদ্ধ, তৎপরে নিবাতকবচযুদ্ধ-পর্ব্ব, তৎপরে অজগর-পর্ব্ব, তৎপরে মার্কণ্ডেয়-সমস্যা, তৎপরে দ্রৌপদী ও সত্যভামা-সংবাদ, তৎপরে ঘোষযাত্রা, তৎপরে মৃগস্বপ্নোদ্ভব-পর্ব্ব, তৎপরে ব্রীহিদ্রৌণিক-উপাখ্যান-পর্ব্ব, তৎপরে ঐন্দ্রদ্যুম্ন, তৎপরে দ্রৌপদীহরণ, তৎপরে জয়দ্রথ-বিমোক্ষণ, তৎপরে রামচন্দ্রোপখ্যান, তৎপরে পতিব্রতা সাবিত্রীর অদ্ভুত মহাত্ম্যবর্ণন, তৎপরে কুণ্ডলা-হরণ, তৎপরে আরণেয়, তৎপরে বিরাট-পর্ব্ব, তৎপরে পাণ্ডবদিগের প্রবেশ ও সময় প্রতিপালন, তৎপরে কীচকবধ, তৎপরে গোগ্রহণ, তৎপরে অভিমন্যুর সহিত উত্তরার বিবাহ, তৎপরে উদ্যোগ, তৎপরে সঞ্জয়াগমন-পর্ব্ব, অনন্তর ধৃতরাষ্ট্রের চিন্তামূলক প্রজাগর-পর্ব্ব, পরে সনৎসুজাত-পর্ব্ব, তৎপরে যানসন্ধি-পর্ব্ব, তৎপরে কৃষ্ণের গমন, তৎপরে মাতলীয় উপাখ্যান ও গালবচরিত, তৎপরে সাবিত্রীর উপাখ্যান, বামদেবোপাখ্যান, বৈণ্যোপাখ্যান ও জামদগ্ন্যোপাখ্যান, তৎপরে ষোড়শরাজিক-পর্ব্ব, তৎপরে কৃষ্ণের সভাপ্রবেশ, তৎপরে বিদুলাপুল্র-শাসন, তৎপরে সৈন্যোদ্যোগ ও শ্বেতোপাখ্যান-পর্ব্ব, তৎপরে মন্ত্রনিশ্চয় করিয়া কার্য্যচিন্তন, তৎপরে সেনাপতি-নিয়োগোপাখ্যান, তৎপরে শ্বেত ও বাসুদেব-সংবাদ, তৎপরে মহাত্মা কর্ণের বিবাদ, তৎপরে কুরুপাণ্ডব-সেনানির্যাণ, তৎপরে রথী ও অতিরথ-সংখ্যা-পর্ব্ব, অনন্তর অমর্ষবিবর্দ্ধন উলুকদূতের আগমন, তৎপরে অম্বোপাখ্যান, তৎপরে অদ্ভুত ভীষ্মভিষেক-পর্ব্ব, তৎপরে জম্বুদ্বীপনির্ম্মাণ-পর্ব্ব, তৎপরে ভূমিপর্ব্ব, তৎপরে দ্বীপবিস্তার-কথন-পর্ব্ব, তৎপরে ভগবদ্গীতা-পর্ব্ব, অনন্তর ভীষ্মবধ, তৎপরে দ্রোণাভিষেক, তৎপরে সংসপ্তক-সৈন্যবধ, তৎপরে অভিমন্যুবধ-পর্ব্ব, তৎপরে প্রতিজ্ঞা, তৎপরে জয়দ্রথবধ-পর্ব্ব, তৎপরে ঘটোৎকচবধ, তৎপরে পরমাশ্চর্য্য দ্রোণবধ-পর্ব্ব, তৎপরে নারায়ণাস্ত্রপ্রয়োগ-পর্ব্ব।
অনন্তর কর্ণপর্ব্ব, তৎপরে শল্যপর্ব্ব, তৎপরে হ্রদপ্রবেশ ও গদাযুদ্ধ-পর্ব্ব, অনন্তর সারস্বত ও তীর্থবংশানুকীর্ত্তন-পর্ব্ব, তদনন্তর অতি বীভৎস সৌপ্তিক-পর্ব্ব, অনন্তর দারুণ ঐষীক-পর্ব্ব, তৎপরে জলপ্রদানিক-পর্ব্ব, তৎপরে স্ত্রীবিলাপ-পর্ব্ব, তৎপরে ঔর্দ্ধ্বদেহিক পর্ব্ব, তৎপরে ব্রাহ্মণরূপী চার্বাক রাক্ষসের বধপর্ব্ব, তৎপরে ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের অভিষেক-পর্ব্ব, তৎপরে গৃহপ্রবিভাগ-পর্ব্ব, অনন্তর শান্তিপর্ব্ব, এই পর্ব্বে রাজধর্ম্ম, আপদ্ধর্ম্ম ও মোক্ষধর্ম্ম কথিত আছে। তৎপরে শুকপ্রশ্নাভিগমন, তৎপরে ব্র্হ্মপ্রশ্নানুশাসন, তৎপরে দুর্ব্বাসার প্রাদুর্ভাব ও মায়াসংবাদ-পর্ব্ব, অনন্তর অনুশাসন-পর্ব্ব, অনন্তর ভীষ্মের স্বর্গারোহণপর্ব্ব, তৎপরে সর্বপাপপ্রণাশক আশ্বমেধিক-পর্ব্ব, তৎপরে অধ্যাত্মবিদ্যাবিষয়ক অনুগীতা-পর্ব্ব, তৎপরে আশ্রমবাসিক-পর্ব্ব, তৎপর পুৎত্রদর্শন-পর্ব্ব, তৎপরে নারদাগমন-পর্ব্ব, তৎপরে অতি ভীষণ মৌষল-পর্ব্ব, তৎপরে মহাপ্রস্থানিক-পর্ব্ব, তৎপরে স্বর্গারোহণিক-পর্ব্ব, অনন্তর খিলনামক হরিবংশ-পর্ব্ব; এই পর্ব্বে বিষ্ণু-পর্ব্ব, শিশুচর্য্যা, কংসবধ ও অতি অদ্ভুত ভবিষ্য-পর্ব্ব কথিত আছে। এই শত-পর্ব্ব মহাত্মা ব্যাসদেব কহিয়াছিলেন এবং নৈমিষারণ্যে যথাক্রমে লোমহর্ষণপুৎত্র সৌতি অষ্টাদশপর্ব্ব কীর্ত্তন করেন। সঙ্ক্ষেপে এই মহাভারতের পর্ব্বসংগ্রহ কহিলাম।
আদিপর্ব্ব–শ্লোকসংখ্যা
পৌষ্য, পৌলোম, আস্তীক, আদিবংশাবতরণ, সম্ভব, জতুগৃহ, হিড়িম্ব ও বকবধ, চৈত্ররথ, দ্রৌপদীর স্বয়ংবর, বৈবাহিক, বিদুরাগমন, রাজ্যলাভ, অর্জ্জুনের বনবাস, সুভদ্রাহরণ, যৌতুকানয়ন, খাণ্ডবদাহ, ময়দানবদর্শন এই সকল আদিপর্ব্বের অন্তর্গত। পৌষ্য-পর্ব্বে উতঙ্কের মাহাত্ম্য ও পৌলোমপর্ব্বে ভৃগুবংশবিস্তার কথিত আছে। আস্তীকপর্ব্বে সর্পকুল ও গরুড়ের সম্ভব, ক্ষীরসমুদ্রমন্থন, উচ্চৈঃশ্রবার জন্ম, রাজা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞানুষ্ঠান ও মহাত্মা ভরতবংশীয়দিগের চরিত্র কীর্ত্তিত আছে। সম্ভবপর্ব্বে অনেকানেক ভূপতিদিগের উৎপত্তি, অনেকানেক বীরপুরুষ ও মহর্ষি দ্বৈপায়নের জন্মবৃত্তান্ত এবং দেবতাদিগের অংশাবতরণ বর্ণিত আছে। দৈত্য, দানব, যক্ষ, সর্প, গন্ধর্ব্ব, পক্ষী ও অন্যান্য প্রাণীদিগের সমুদ্ভব; যাঁহার নামের অনুরূপে লোকে ভারতকুল বলিয়া প্রখ্যাত হইয়াছে, মহর্ষি কণ্বের আশ্রমে দুষ্মন্তের ঔরসে শকুন্তলার গর্ভে সেই ভরতের জন্মলাভ। শান্তনুর আবাসে গঙ্গার গর্ভে বসুদিগের পুনর্জ্জন্ম ও তাঁহাদিগের স্বর্গে আরোহণ এবং তেজোংশের সম্পাত, ভীষ্মের সম্ভব এবং তাঁহার রাজ্যপরিত্যাগ ও ব্রহ্মচর্য্যব্রতধারণ, প্রতিজ্ঞাপালন এবং ভ্রাতা চিত্রাঙ্গদের রক্ষা, চিত্রাঙ্গদের মৃত্যু হইলে কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিচিত্রবীর্য্যের রক্ষাবিধান ও তাঁহার রাজ্যাধিকার, অণীমাণ্ডব্যের অভিশাপে ধর্ম্মের নরলোকের অংশে সম্ভব ও বরদানপ্রভাবে কৃষ্ণদ্বৈপায়নের ঔরসে উৎপত্তি, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও পাণ্ডবদিগের সম্ভব, বারণাবতপ্রস্থানে দুর্য্যোধনের মন্ত্রণা, পাণ্ডবদিগের প্রতি ধার্ত্তরাষ্ট্রদিগের কূটপ্রেরণ, ধীমান্ ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের হিতসাধন করিবার নিমিত্ত পথিমধ্যে তাঁহাকে ম্লেচ্ছ ভাষায় বিদুরের অশেষ উপদেশ, বিদুরের পরামর্শক্রমে অতি গোপনে সুরঙ্গনির্ম্মাণ, রাত্রিকালে পঞ্চপুৎত্রের সহিত নিদ্রিতা নিষাদীকে জতুগৃহে পুরোচন নামক ম্লেচ্ছের সহিত দাহ, নিবিড় অরণ্যে পাণ্ডবদিগের হিড়িম্বদর্শন, মহাবল ভীমসেন হইতে হিড়িম্বের বধসাধন ও ঘটোৎকচের উৎপত্তি, মহাপ্রভাব মহর্ষি ব্যাসদেবের সন্দর্শন ও তাঁহার অনুমতিক্রমে একচক্রা নগরীতে এক ব্রাহ্মণের আবাসে ছদ্মবেশে বাস, বকবধে পুরবাসীদিগের বিস্ময়, দ্রৌপদী ও ধৃষ্টদ্যুম্নের জন্ম, ব্রাহ্মণ-সন্নিধানে দ্রৌপদীর জন্মবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শ্রবণপূর্ব্বক স্বয়ংবর-সভাদিদৃক্ষা [দর্শনেচ্ছা]- ক্রান্তচিত্ত হইয়া ব্যাসের আদেশে ও রমণীরত্নলাভের অভিলাষে পাঞ্চালদেশে পঞ্চপাণ্ডবদিগের গমন, গঙ্গাতীরে গন্ধর্ব্বরাজ অঙ্গারপর্ণকে পরাজয় করিয়া অর্জ্জুনের তাঁহার সহিত পরমসখ্যভাব-সংস্থাপন ও তৎসমীপে তপতী, বশিষ্ঠ ও ঔর্ব্বের রমণীয় উপাখ্যান শ্রবণ ও ভ্রাতৃগণের সহিত অর্জ্জুনের পাঞ্চালদেশে গমন, তথায় সমাগত অসংখ্য ভূপাল সমক্ষে লক্ষ্যভেদপূর্ব্বক ধনঞ্জয়ের দ্রৌপদী লাভ, ভীম ও অর্জ্জুন কর্ত্তৃক যুদ্ধে ক্রুদ্ধ রাজগণের সহিত শল্য ও কর্ণের পরাজয়, মহামতি অতি-শিষ্টপ্রকৃতি কৃষ্ণ ও বলরামের ভীমার্জ্জুনের সেইরূপ অপ্রমেয় ও অমানুষ-সাহস সন্দর্শনে পাণ্ডব বোধে তাঁহাদিগের সহিত সমাগত হইবার বাসনায় পরশুরামের গৃহপ্রবেশ, পঞ্চভ্রাতার এক ভার্য্যা হইবে বলিয়া দ্রুপদের বিমর্ষ, এইস্থলে পরমাশ্চর্য্য পঞ্চেন্দ্রের উপাখ্যানের উল্লেখ, পাঞ্চালীর দৈববিহিত অমানুষ বিবাহ, পাণ্ডবদিগের প্রতি ধৃতরাষ্ট্র কর্ত্তৃক বিদুরপ্রেরণ, বিদুরের গমন ও কৃষ্ণের সন্দর্শন, পাণ্ডবদিগের খাণ্ডবপ্রস্থে বাস ও রাজ্যার্দ্ধের অধিকার, নারদের আদেশে পঞ্চপাণ্ডবের দ্রৌপদীবিষয়ক নিয়মসংস্থাপন, সুন্দোপসুন্দের ইতিহাস, অনন্তর দ্রৌপদীর সহিত একান্তে উপবিষ্ট যুধিষ্ঠিরের সন্নিকৃষ্ট হইয়া অর্জ্জুনের অস্ত্রগ্রহণ ও ব্রাহ্মণের গোধন আহরণপূর্ব্বক প্রতিজ্ঞা প্রতিপালন জন্য অরণ্যবাস এবং তৎকালে উলুপীনাম্নী নাগকন্যার সহিত পথিমধ্যে অর্জ্জুনের সমাগম, পুণ্যতীর্থে গমন ও বভ্রুবাহনের জন্ম এবং তথায় তপস্বী ব্রাহ্মণের অভিসম্পাতে গ্রাহ [কুম্ভীর] যোনিপ্রাপ্ত পঞ্চ অপ্সরার শাপমোচন, প্রভাস-তীর্থে কৃষ্ণের সহিত অর্জ্জুনের সাক্ষাৎকারলাভ, কৃষ্ণের অভিমতে দ্বারকায় অর্জ্জুনের সুভদ্রাপ্রাপ্তি, যৌতুক-প্রদানের নিমিত্ত খাণ্ডবপ্রস্থে কৃষ্ণ প্রস্থিত হইলে পর সুভদ্রার গর্ভে অভিমন্যুর জন্ম, দ্রৌপদী-পুৎত্রের উৎপত্তি-কীর্ত্তন, যমুনায় জলবিহারার্থে গমন করিলে কৃষ্ণার্জ্জুনের চক্র ও ধনুলাভ, খাণ্ডবদাহ, প্রদীপ্ত অনলমধ্য হইতে ময়দানব ও ভুজঙ্গের পরিত্রাণ, মন্দপালনামা মহর্ষির ঔরসে শাঙ্গীর গর্ভে সুতোৎপত্তি, আদিপর্ব্বে এই সকল বর্ণিত আছে। বেদব্যাস এই পর্ব্বে দুই শত সপ্তবিংশতিসংখ্যক অধ্যায় কহিয়াছেন, তাহাতে অষ্ট সহস্র অষ্ট শত ও চতুরশীতি শ্লোক রচনা করেন।
সভাপর্ব্ব– শ্লোকসংখ্যা
অনন্তর বহুবৃত্তান্তযুক্ত দ্বিতীয় সভাপর্ব্ব আরম্ভ হইতেছে। পাণ্ডবদিগের সভা-নির্ম্মাণ, কিঙ্কর-দর্শন, দেবর্ষি নারদ কর্ত্তৃক ইন্দ্র প্রভৃতি লোকপালগণের সভাবর্ণন, রাজসূয়-মহাযজ্ঞের আরম্ভ, জরাসন্ধ-বধ, গিরিব্রজে নিরুদ্ধ রাজগণের কৃষ্ণ কর্ত্তৃক বিমোচন, পাণ্ডবদিগের দিগ্বিজয়, ভূপালদিগের রাজসূয়যজ্ঞে আগমন যজ্ঞে অর্ঘ্যদানপ্রসঙ্গে শিশুপালের সহিত বিবাদ ও তাহার বধ, পাণ্ডবদিগের রাজসূয়যজ্ঞে তাদৃশ সমৃদ্ধি সন্দর্শন করিয়া দুর্য্যোধনের বিষাদ ও ঈর্ষা, ভীমকর্ত্তৃক সভামধ্যে দুর্য্যোধনের প্রতি উপহাস ও তাহার ক্রোধ, তন্নিবন্ধন দ্যুতক্রীড়া, ধূর্ত্ত শকুনি-কর্ত্তৃক দ্যূতক্রীড়ায় যুধিষ্ঠিরের পরাজয়, দ্যূতার্ণবমগ্না দুঃখিতা দ্রৌপদীর ধৃতরাষ্ট্র কর্ত্তৃক উদ্ধার, দ্রৌপদীকে বিপদ্ হইতে উত্তীর্ণা দেখিয়া দুর্য্যোধনের পুনর্ব্বার পাণ্ডবদিগের সহিত দ্যূতারম্ভ, দ্যূতে পরাজয় করিয়া তৎকর্ত্তৃক পাণ্ডবদিগের বনপ্রেরণ, মহর্ষি বেদব্যাস সভাপর্ব্বে এই সকল বর্ণন করিয়াছেন। এই পর্ব্বে অষ্টসপ্ততি অধ্যায় এবং দ্বিসহস্র পঞ্চশত একাদশ শ্লোক আছে।
বনপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
অনন্তর অরণ্য নামক তৃতীয় পর্ব্ব। মহাত্মা পাণ্ডবগণ বনপ্রস্থান করিলে পৌরজন কর্ত্তৃক ধীমান্ যুধিষ্ঠিরের অনুগমন, ওষধি ও ব্রাহ্মণগণের ভরণপোষণের নিমিত্ত ধৌম্য মুনির উপদেশ-ক্রমে যুধিষ্ঠিরের সূর্য্যারাধনা, সূর্য্যের অনুগ্রহে অন্নলাভ, ধৃতরাষ্ট্র কর্ত্তৃক হিতবাদী বিদুরের পরিত্যাগ, বিদুরের পাণ্ডবসমীপে গমন ও ধৃতরাষ্ট্রের আদেশে পুনর্ব্বার তাঁহার নিকটে আগমন, কর্ণের উত্তেজনায় বনবাসী পাণ্ডবদিগকে বিনাশ করিবার নিমিত্ত দুর্ম্মতি দুর্য্যোধনের মন্ত্রণা, তাহার দুষ্ট অভিসন্ধি জানিতে পারিয়া ব্যাসের আগমন, ব্যাস কর্ত্তৃক দুর্য্যোধনের বনগমন-প্রতিষেধ, সুরভির উপাখ্যান, মৈত্রেয়ের আগমন, ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি মৈত্রেয়ের উপদেশ, মৈত্রেয় কর্ত্তৃক রাজা দুর্য্যোধনের প্রতি শাপপ্রদান, ভীম কর্ত্তৃক যুদ্ধে কির্ম্মীর রাক্ষস-বধ, শকুনি ছল প্রকাশ করিয়া দ্যূতে পাণ্ডবদিগকে পরাজয় করিয়াছে শুনিয়া পাঞ্চাল ও বৃষ্ণিবংশীয়দিগের আগমন, কৃষ্ণ অতিশয় রোষাবেশ প্রকাশ করিলে অর্জ্জুনের সান্ত্বনাবাক্য, কৃষ্ণের নিকট দ্রৌপদীর বিলাপ, দুঃখার্ত্তা দ্রৌপদীকে বাসুদেবের আশ্বাসদান, সৌভপতি শাল্বের বধ, সপুৎত্রা সুভদ্রাকে কৃষ্ণ কর্ত্তৃক দ্বারকায় আনয়ন, ধৃষ্টদ্যুম্নকর্ত্তৃক দ্রৌপদীর সন্তানগণকে পাঞ্চালনগর-প্রাপণ, রমণীয় দ্বৈতবনে পাণ্ডবদিগের প্রবেশ, দ্রৌপদী ও ভীমসেনের সহিত দ্বৈতবনে যুধিষ্ঠিরের কথোপকথন, পাণ্ডবদিগের সমীপে ব্যাসের আগমন, যুধিষ্ঠিরের ব্যাসদেব হইতে প্রতিস্মৃতিনামক বিদ্যালাভ, ব্যাস প্রতিগত হইলে পাণ্ডবদিগের কাম্যকবনে গমন, অমিততেজা অর্জ্জুনের অস্ত্রলাভপ্রত্যাশায় প্রবাসে গমন ও কিরাতরূপী দেবদেব মহাদেবের সহিত যুদ্ধ, ইন্দ্রাদি লোকপালের দর্শন ও অস্ত্রলাভ, অস্ত্রশিক্ষার্থে অর্জ্জুনের ইন্দ্রলোকে গমন, পাণ্ডববৃত্তান্ত শ্রবণে ধৃতরাষ্ট্রের বলবতী চিন্তা, মহানুভব মহর্ষি বৃহদশ্বের সন্দর্শন, দুঃখার্ত্ত যুধিষ্ঠিরের বিলাপ, ধর্ম্মসঙ্গত ও করুণরসাশ্রিত নলোপাখ্যান, যুধিষ্ঠিরের বৃহদশ্ব হইতে অক্ষহৃদয় নামক বিদ্যালাভ, পাণ্ডবদিগের নিকট স্বর্গ হইতে লোমশ ঋষির আগমন, লোমশ কর্ত্তৃক বনবাসগত মহাত্মা পাণ্ডবদিগের নিকট স্বর্গবাসী অর্জ্জুনের বৃত্তান্ত-কথন, অর্জ্জুনের অনুসন্ধানার্থ পাণ্ডবদিগের তীর্থাভিগমন, তীর্থের ফলপ্রাপ্তি ও পাবনত্ব-কীর্ত্তন, দেবর্ষি নারদের পুলস্ত্যতীর্থযাত্রা, পাণ্ডবদিগের তীর্থযাত্রা, গয়াসুরের যজ্ঞবর্ণন, অগস্ত্যের উপাখ্যান ও বাতাপি ভক্ষণ, অপত্যোৎপাদনের নিমিত্ত মহর্ষির লোপামুদ্রা-পরিগ্রহ, কৌমার ব্রহ্মচারী ঋষ্যশৃঙ্গের চরিত কীর্ত্তন, প্রভূত-পরাক্রম পরশুরামের চরিত্রবর্ণন, কার্ত্তবীর্য্য ও হৈহয়দিগের বধ, প্রভাসতীর্থে পাণ্ডবদিগের সহিত বৃষ্ণিবংশীয়দিগের সমাগম, সুকন্যার উপাখ্যান, শর্য্যাতি রাজার যজ্ঞে চ্যবনমুনি কর্ত্তৃক অশ্বিনীকুমারের সোমপান, অশ্বিনীকুমার কর্ত্তৃক চ্যবনের যৌবন-প্রতিপাদন, মান্ধাতার উপাখ্যান, জন্তু-নামক রাজপুৎত্রের উপাখ্যান, শত পুৎত্রের অভিলাষে সোমক রাজার জন্তু-নামক পুৎত্রের শিরশ্ছোদন, যজ্ঞানুষ্ঠান ও অভীষ্ট-ফললাভ, শ্যেনকপোতীয় উপাখ্যান, শিবি রাজার প্রতি ইন্দ্র ও অগ্নির ধর্ম্ম-জিজ্ঞাসা, অষ্টাবক্রোপাখ্যান, জনক-যজ্ঞে মহর্ষি অষ্টাবক্রের সহিত বরুণাত্মজ নৈয়ায়িক বন্দীর বিবাদ, মহাত্মা অষ্টাবক্র কর্ত্তৃক বিবাদে বন্দীর পরাজয় ও সাগরের অভ্যন্তরগত পিতার উদ্ধার, মহাত্মা যবক্রীত ও রৈভ্যের উপাখ্যান, গন্ধমাদনযাত্রা ও নারায়ণাশ্রমে বাস, পুষ্পানয়নার্থ দ্রৌপদী কর্ত্তৃক ভীমসেনের নিয়োগ, পথিমধ্যে গমন করিতে করিতে ভীমসেনের সহিত কদলীবনে হনূমানের সন্দর্শন, কুসুমাবচয়ন করিবার নিমিত্ত সরোবরে অবগাহন, তথায় অতি ভীষণ রাক্ষসগণ ও মণিমান্ প্রভৃতি মহাবীর্য্য যক্ষদিগের সহিত যুদ্ধ, জটাসুর-নামক রাক্ষস-বধ, তথায় রাজর্ষি বৃষপর্ব্বার আগমন, আর্ষ্টিষেণের আশ্রমে পাণ্ডবদিগের গমন ও অবস্থান, দ্রৌপদী কর্ত্তৃক ভীমসেনের উৎসাহদান, ভীমের কৈলাস-পর্ব্বতে আরোহণ ও মণিমান্ প্রমুখ যক্ষদিগের সহিত ঘোরতর যুদ্ধ, পাণ্ডবদিগের সহিত বৈশ্রবণের সমাগম, দিব্যাস্ত্র প্রাপ্ত হইয়া ভ্রাতৃগণের সহিত অর্জ্জুনের সমাগম, হিরণ্যপুরবাসী নিবাতকবচগণ ও পুলোমপুৎত্র কালকেয়দিগের সহিত অর্জ্জুনের যুদ্ধবর্ণন, তৎকর্ত্তৃক কালকেয়দিগের রাজার প্রাণসংহার, ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সন্নিধানে অর্জ্জুনের অস্ত্র-সন্দর্শনের উদ্যম, দেবর্ষি নারদের তদ্বিষয়ে প্রতিষেধ, গন্ধমাদন হইতে পাণ্ডবদিগের অবরোহণ, গহনবনে ভুজগেন্দ্র কর্ত্তৃক মহাবল ভীম-গ্রহণ, প্রশ্নোত্তর প্রদানপূর্ব্বক যুধিষ্ঠিরের ভীমমোক্ষণ, মহাত্মা পাণ্ডবদিগের কাম্যকবনে পুনরাগমন, তথায় পাণ্ডবদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিবার প্রত্যাশায় পুনর্ব্বার বাসুদেবের আগমন, মার্কণ্ডেয়সমস্যা, পৃথু রাজার উপাখ্যান, সরস্বতী ও মহর্ষি তার্ক্ষ্যের সংবাদ, মৎস্যোপাখ্যান, ইন্দ্রদ্যুম্নোপাখ্যান, ধুন্ধুমারোপাখ্যান, পতিব্রতোপাখ্যান, অঙ্গিরা ঋষির উপাখ্যান, দ্রৌপদী ও সত্যভামাসংবাদ, পাণ্ডবদিগের দ্বৈতবনে পুনরাগমন, ঘোষযাত্রা, গন্ধর্ব্ব কর্ত্তৃক দুর্য্যোধন বন্ধন ও অর্জ্জুন কর্ত্তৃক বিমোচন, ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের মৃগস্বপ্ন-সন্দর্শন, রমণীয় কাম্যকবনে পুনর্গমন, অতি বিস্তীর্ণ ব্রীহিদ্রৌণি কোপাখ্যান, মহর্ষি দুর্ব্বাসার উপাখ্যান, আশ্রমের অভ্যন্তর হইতে জয়দ্রথ কর্ত্তৃক দ্রৌপদী-হরণ, মহাবল ভীমের বায়ুবেগে গমন ও জয়দ্রথের পঞ্চশিখীকরণ, বহুবিস্তার রামায়ণ উপাখ্যান, রামচন্দ্র কর্ত্তৃক রাবণের বধ, সাবিত্রীর উপাখ্যান, কুণ্ডলদ্বয় দান দ্বারা ইন্দ্রের হস্ত হইতে কর্ণের অব্যাহতি, পরিতুষ্ট ইন্দ্র কর্ত্তৃক একপুরুষঘাতিনী শক্তিপ্রদান, আরণেয়-উপাখ্যান ও ধর্ম্মের সপুৎত্রানুশাসন, বরলাভ করিয়া পাণ্ডবদিগের পশ্চিমদিকে গমন, তৃতীয় আরণ্যক-পর্ব্বে এই সকল কীর্ত্তিত আছে। ইহাতে দুই শত একোনসপ্ততি অধ্যায় ও একাদশ সহস্র ছয় শত ও চতুঃষষ্টি শ্লোক আছে।
বিরাটপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
অতঃপর বহু বিস্তৃত বিরাটপর্ব্ব শুনুন। পাণ্ডবগণ বিরাটনগরে প্রবেশ করিয়া শ্মশানে অতি প্রকাণ্ড শমীবৃক্ষ নিরীক্ষণপূর্ব্বক তাঁহাদের সমুদয় অস্ত্র তাহাতে সংস্থাপন করিলেন ও অতি প্রচ্ছন্নভাবে নগরে প্রবেশ করিয়া বিরাট-রাজপ্রাসাদে বাস করিতে লাগিলেন। দুরাত্মা কীচক কামোন্মত্ত হইয়া দ্রৌপদীর নিমিত্ত আপনার অভিমত অভিলাষ প্রকাশ করিলে ভীমসেন তাহার প্রাণসংহার করেন। রাজা দুর্য্যোধন পাণ্ডবদিগের অন্বেষণার্থ চতুর্দ্দিকে অতি সুচতুর চরসমূহ প্রেরণ করিলেন, কিন্তু তাহারা মহাত্মা পাণ্ডবদিগের অনুসন্ধান করিতে পারিল না। প্রথমতঃ ত্রিগর্ত্তেরা বিরাট-রাজার গোপন অপহরণ করে, তদুপলক্ষ্যে তাহাদিগের সহিত বিরাটের যুদ্ধ হয়। শত্রুপক্ষ বিরাট রাজাকে পরাজিত ও বন্ধন করিয়া লইয়া যাইতেছিল। ইত্যবসরে ভীমসেন স্ববিক্রমপ্রভাবে তাঁহাকে মুক্ত করেন, পাণ্ডবেরা বিরাটের অপহৃত গোধন প্রত্যাহরণ করেন। অনন্তর কৌরবগণ তাঁহার গোধন হরণ করিলে অর্জ্জুন বাহুবলে নিখিল কৌরবগণকে যুদ্ধে পরাভূত করিয়া বিরাটের গোধন উদ্ধার করেন। বিরাট সুভদ্রাগর্ভসম্ভূত অভিমন্যুকে উদ্দেশ করিয়া দুহিতা উত্তরাকে সম্প্রদান করিলে অর্জ্জুন তাঁহাকে প্রতিগ্রহ করেন। বেদবেত্তা মহর্ষি বেদব্যাস বিরাট-নামক চতুর্থ পর্ব্বে এই সকল কীর্ত্তন করিয়াছেন এবং ইহাতে সপ্তষষ্টি অধ্যায়, দুই সহস্র ও পঞ্চাশৎ শ্লোক আছে।
উদ্যোগপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
তৎপরে উদ্যোগ-নামক পর্ব্ব শ্রবণ করুন। পাণ্ডবেরা জিগীষা-পরবশ হইয়া উপপ্লব্য-নামক স্থানে অবস্থান করিলে দুর্য্যোধন ও অর্জ্জুন কৃষ্ণের সন্নিকটে উপস্থিত হইলেন। “তুমি এই যুদ্ধে আমাদিগের সাহায্য কর”, তৎসন্নিধানে উভয়ে এইরূপ প্রার্থনা করিলে মহামতি কৃষ্ণ কহিলেন, “আমি এক পক্ষে এক অক্ষৌহিণী সেনা প্রদান করিব ও অন্য পক্ষে আমি একাকী থাকিব; কিন্তু কোনরূপে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইব না ও অকপটে তাহাদিগের মন্ত্রী হইব। এক্ষণে তোমরা অন্যতরের কে কি ইচ্ছা কর, বল।” অনভিজ্ঞ দুর্য্যোধন সৈন্য প্রার্থনা করিলেন ও অর্জ্জুন তাঁহাকে মন্ত্রিত্ব স্বীকার করিতে অনুরোধ করিলেন। পাণ্ডবদিগের সহায়তা করিবার নিমিত্ত সমাগত মদ্ররাজকে পথিমধ্যে দুর্য্যোধন বহুবিধ উপহার প্রদান করিয়া ‘তুমি আমার সাহায্য কর’, এইরূপ প্রার্থনা করিলেন। শল্য তাহাতে সম্মত হইয়া পাণ্ডবদিগের নিকট গমন করিলেন। তথায় যুধিষ্ঠিরের নিকট দেবরাজ ইন্দ্রের বৃত্রাসুরবিজয় বৃত্তান্ত বর্ণন করেন। পাণ্ডবেরা কৌরবসমীপে পুরোহিত প্রেরণ করিলেন। প্রবল-প্রতাপ মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পুরোহিতের কথা শ্রবণ করিয়া শান্তি-স্থাপন প্রত্যাশায় সঞ্জয়কে দূতস্বরূপে পাণ্ডবদিগের নিকট পাঠাইলেন। কৃষ্ণ ও পাণ্ডবদিগের বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া অতিবলবতী চিন্তায় ধৃতরাষ্ট্রের নিদ্রাচ্ছেদ হইল। বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে বিবিধ হিতবাক্য শ্রবণ করান। মহর্ষি সনৎসুজাত রাজাকে শোকসন্তপ্ত দেখিয়া অতি উৎকৃষ্ট বেদশাস্ত্র শুনাইলেন। প্রভাত-সময়ে সভামণ্ডপে উপস্থিত হইয়া সঞ্জয় বাসুদেব ও অর্জ্জুনের অভিন্নত্ব কীর্ত্তন করেন। মহামতি কৃষ্ণ কৃপাপরায়ণ হইয়া সন্ধি বাসনায় হস্তিনাপুরে গমন করিয়াছিলেন। কিন্তু রাজা দুর্য্যোধন, উভয়পক্ষের হিতাকাঙ্ক্ষী তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করিলেন। অনন্তর দম্ভোদ্ভবের উপাখ্যান, মহাত্মা মাতলির বরান্বেষণ, মহর্ষি গালবের চরিত, বিদুলার স্বপুৎত্রানুশাসন বর্ণিত আছে। কৃষ্ণ কর্ণ ও দুর্য্যোধনের নিতান্ত মন্দ অভিসন্ধি জানিতে পারিয়া সমস্ত রাজাদিগকে স্বীয় যোগেশ্বরত্ব দর্শন করাইলেন। কর্ণকে রথে আরোহণ করাইয়া তাঁহার সহিত কৃষ্ণ পরামর্শ করিয়াছিলেন, কিন্তু কর্ণ অহঙ্কার-পরতন্ত্র হইয়া তাঁহার মন্ত্রণা গ্রহণ করিল না। তিনি হস্তিনাপুর হইতে উপপ্লব্যে আগমন করিয়া পাণ্ডবদিগের নিকট সমুদয় বৃত্তান্ত-বর্ণন করিলেন। তাঁহারা কৃষ্ণের কথা শুনিয়া হিতাহিত বিবেচনাপূর্ব্বক যুদ্ধ-সজ্জা করিতে লাগিলেন। অনন্তর হস্তিনাপুর হইতে সংগ্রামবাসনায় হস্তী, অশ্ব, রথ, পদাতি এই সমুদয় ক্রমশঃ নির্গত হইতে লাগিল। রাজা দুর্য্যোধন যুদ্ধের পূর্ব্বদিবস পাণ্ডবদিগের নিকট উলুক-নামক দূত প্রেরণ করেন। রথী ও অতিরথ-সংখ্যা, অন্বোপাখ্যান, বহুবৃত্তান্ত-সংযুক্ত সন্ধিবিগ্রহ বিশিষ্ট উদ্যোগপর্ব্বে এই সকল কথিত হইল। ইহাতে শত ও ষড়শীতি অধ্যায় আছে। মহর্ষি এই পর্ব্বে ষট্সহস্র ষট্শত ও অষ্টনবতি শ্লোক রচনা করিয়াছেন।
ভীষ্মপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
অতঃপর পরমাশ্চর্য্য ভীষ্মপর্ব্ব। ইহাতে সঞ্জয় জম্বুদ্বীপ নির্ম্মাণ বর্ণনা করেন। যুধিষ্ঠিরের সেনাগণ অত্যন্ত বিষণ্ণ হয়। দশ দিবস অতি ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হইয়াছিল। মহামতি বাসুদেব মুক্তিপ্রতিপাদক বহুবিধ যুক্তি প্রদর্শন করিয়া, অর্জ্জুনের মোহজনিত বিষাদ নিরাকরণ করেন। যুধিষ্ঠিরের হিতাভিলাষী মনস্বী কৃষ্ণ সত্বর রথ হইতে লম্ফপ্রদানপূর্ব্বক প্রতোদ [কশা বা চাবুক] হস্তে লইয়া নিঃশঙ্কচিত্তে ভীষ্মকে সংহার করিতে ধাবমান হইয়াছিলেন এবং সকল ধনুর্দ্ধারিশ্রেষ্ঠ অর্জ্জুনকে বাক্যরূপ অসি দ্বারা আঘাত করেন। অর্জ্জুন শিখণ্ডীকে সম্মুখে রাখিয়া শাণিত শরে ভীষ্মকে রথ হইতে ভূতলে পতিত করিয়াছিলেন। ভীষ্ম শরশয্যায় শয়ান হইলেন। অতি বিস্তৃত ভারতের ষষ্ঠ পর্ব্ব সমাখ্যাত হইল। ইহাতে শত ও সপ্তদশ অধ্যায় নির্দ্দিষ্ট আছে। বেদবেত্তা ব্যাসদেব ভীষ্মপর্ব্বে পঞ্চ সহস্র, অষ্টশত ও চতুরশীতি শ্লোক রচনা করিয়াছেন।
দ্রোণপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
অনন্তর বাহুবৃত্তান্তানুগত অতি বিচিত্র দ্রোণপর্ব্ব আরম্ভ হইতেছে। প্রবল-প্রতাপ দ্রোণাচার্য্য সেনাপতিপদে অভিষিক্ত হইয়া দুর্য্যোধনের প্রীতিবর্দ্ধনের নিমিত্ত “ধীমান্ যুধিষ্ঠিরকে যুদ্ধে বন্দী করিব,” এইরূপ অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। সংসপ্তকগণ অর্জ্জুনকে সমরাঙ্গন হইতে অর্পসৃত করিয়াছিলেন। শত্রুতুল্য পরাক্রমশালী মহারাজ ভগদত্ত সুপ্রতীক নামক হস্তীর সহিত অর্জ্জুন কর্তৃক নিহত হন। জয়দ্রথ প্রভৃতি সপ্তরথী অপ্রাপ্তযৌবন একাকী বালক অভিমন্যুর প্রাণদণ্ড করিয়াছিলেন। অর্জ্জুন অভিমন্যু-বধে ক্রোধে অধীর হইয়া সপ্ত অক্ষৌহিণী সৈন্যের সহিত জয়দ্রথকে বিনষ্ট করিলেন। মহাবাহু ভীম ও মহারথ সাত্যকি রাজা যুধিষ্ঠিরের অনুমতিক্রমে অর্জ্জুনের অন্বেষণের নিমিত্ত অতি দুর্দ্ধর্ষ কৌরব-সেনামধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। হতাবশিষ্ট সংসপ্তকগণ যুদ্ধে নিঃশেষ হয়। অলম্বুষ, শ্রুতায়ুঃ,মহাবীর জরাসন্ধ, সৌমদত্তি, বিরাট, মহারথ দ্রপদ ও ঘটোৎকচাদি অন্যান্য বীরগণের নিধনের বিষয় দ্রোণপর্ব্বে কথিত আছে। সমরে দ্রোণাচার্য্য হত হইলে, অশ্বত্থামা ক্রোধান্ধ হইয়া যে ভীষণ নারায়ণাস্ত্র প্রয়োগ করিয়াছিলেন, তাহাও এই পর্ব্বে বর্ণিত আছে। এই পর্ব্বে অত্যুৎকৃষ্ট রুদ্রমাহাত্ম্য, বেদব্যাসের আগমন এবং কৃষ্ণার্জ্জুনের মাহাত্ম্য অভিহিত হইয়াছে। এই মহাভারতের সপ্তম পর্ব্বের বিষয় কথিত হইল। এই দ্রোণপর্ব্বে যে যে বীরপুরুষদিগের কথা নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে, তাঁহারা প্রায় সকলই নিধন-প্রাপ্ত হয়েন। তত্ত্বদর্শী মহামুনি পরাশরাত্মজ এই পর্ব্বে এক শত সপ্ততি অধ্যায় ও অষ্ট সহস্র নব শত নব শ্লোকের সংখ্যা করিয়াছেন।
কর্ণপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
অতঃপর কর্ণপর্ব্বের কথা লিখিত হইতেছে। এই পর্ব্বে ধীমান্ শল্যের সারথ্যকার্য্যে নিয়োগ, ত্রিপুরনিপাতনবৃত্তান্ত, গমনকালে কর্ণ ও শল্যের পরস্পর বিবাদ, কর্ণতিরস্কারার্থ শল্য কর্ত্তৃক হংসকাকীয়োপাখ্যান-কথন, মহাপ্রভাব দ্রোণাত্মজ কর্ত্তৃক পাণ্ড্যের নিধন, দণ্ডসেন ও দণ্ডের বধ, সর্ব্বধনুর্দ্ধরগণসমক্ষে কর্ণের সহিত দ্বৈরথযুদ্ধে যুধিষ্ঠিরের প্রাণসংশয়, যুধিষ্ঠির ও অর্জ্জুনের পরস্পর ক্রোধ, কৃষ্ণ কর্ত্তৃক অনুনয়বাক্য দ্বারা অর্জ্জুনের ক্রোধশান্তিকরণ, ভীমসেন কর্ত্তৃক যুদ্ধে দুঃশাসনের বক্ষঃস্থল-বিদারণপূর্ব্বক রক্তপান এবং অর্জ্জুনের সহিত দ্বৈরথ-যুদ্ধে কর্ণের নিপাত; এই সমস্ত বর্ণিত আছে। ভারতের অষ্টম পর্ব্ব নির্দ্দিষ্ট হইল। এই কর্ণপর্ব্বে একোনসপ্ততি অধ্যায় ও চারি সহস্র নয় শত চতুঃষষ্টি শ্লোক কীর্ত্তিত আছে।
শল্যপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
অতঃপর বিচিত্র শল্যপর্ব্বের বিষয় কথিত হইতেছে। কুরুসৈন্য বীরশূন্য হইলে, মদ্রাধিরাজ শল্য সৈনাপত্যকার্য্যে নিযুক্ত হইলেন। শল্যপর্ব্বে যাবতীয় রথযুদ্ধ ও প্রধান প্রধান কৌরবদিগের বধ বর্ণিত আছে। এই পর্ব্বে মহাত্মা যুধিষ্ঠির কর্ত্তৃক শল্যের বধ ও সহদেব কর্ত্তৃক শকুনির বিনাশ কথিত আছে। দুর্য্যোধন অল্পমাত্রাবিশিষ্ট সৈন্য দেখিয়া দ্বৈপায়নহ্রদে প্রবেশপূর্ব্বক জলস্তম্ভ [নিশ্চল জলমধ্যে লুক্কায়িত ব্যক্তির বাহির হইতে অনুসন্ধান না পাইবার কৌশল] করিয়া তথায় অবস্থান করিতে লাগিলেন। ব্যাধেরা হ্রদমধ্যে দুর্য্যোধনের আত্মগোপন-বৃত্তান্ত ভীমকে বলিয়া দিল। মহামানী দুর্য্যোধন ধীমান্ যুধিষ্ঠিরের তিরস্কারবাক্য সহ্য করিতে না পারিয়া হ্রদ হইতে উত্থিত হইলেন ও ভীমের সহিত গদাযুদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। সংগ্রামসময়ে বলরাম আসিয়া উপস্থিত হইলেন। এই পর্ব্বে সরস্বতী ও অন্যান্য তীর্থ-সমুদয়ের পবিত্রতা কীর্ত্তন ও তুমুল গদাযুদ্ধবর্ণন আছে। যুদ্ধে বৃকোদর ভয়ানক গদাঘাতে দুর্য্যোধনের ঊরুদ্বয় ভগ্ন করিলেন। ভারতের নবম পর্ব্ব নির্দ্দিষ্ট হইল। এই পর্ব্বে নানাবৃত্তান্তযুক্ত একোনষষ্টি অধ্যায় কথিত আছে। এক্ষণে শ্লোকসংখ্যা কথিত হইতেছে। কুরুবংশযশঃকীর্ত্তক মহামুনি বেদব্যাস এই পর্ব্বে তিন সহস্র দুই শত বিংশতি শ্লোকের সংখ্যা করিয়া গিয়াছেন।
সৌপ্তিকপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
অনন্তর দারুণ সৌপ্তিকপর্ব্বের কথা লিখিত হইতেছে। পাণ্ডবেরা সংগ্রামক্ষেত্র হইতে শিবিরে গমন করিলে, সায়ংকালে কৃতবর্ম্মা, কৃপাচার্য্য ও অশ্বত্থামা রুধিরাক্তকলেবর ভগ্নোরুযুগল অভিমানী রাজা দুর্য্যোধনের সমীপে সমুপস্থিত হইয়া দেখিলেন, মহারাজ রণক্ষেত্রে পতিত আছেন। মহাক্রোধ দ্রোণাত্মজ প্রতিজ্ঞা করিলেন, “ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতি পাঞ্চালদিগকে ও অমাত্যসহিত পাণ্ডবগণকে বিনষ্ট না করিয়া বর্ম্মত্যাগ করিব না।” রাজাকে এইরূপ কহিয়া তিন জনেই সেস্থান হইতে অপক্রান্ত হইয়া প্রকাণ্ড বটবৃক্ষের তলে উপবিষ্ট হইলেন। ঐস্থানে অশ্বত্থামা রাত্রিকালে পেচককে বহুসংখ্যক কাক নষ্ট করিতে দেখিয়া পিতৃনিধন-বৃত্তান্ত স্মরণপূর্ব্বক ক্রোধান্ধ হইয়া নিদ্রাতুর পাঞ্চালদিগের বধে সপ্রতিজ্ঞ হইলেন। এইরূপ স্থির করিয়া শিবিরদ্বারে গমনপূর্ব্বক দেখিলেন যে, একটা বিকটমূর্ত্তি ভয়ঙ্কর রাক্ষস আকাশ পর্য্যন্ত ব্যাপিয়া রহিয়াছে। অশ্বত্থামা অস্ত্র ত্যাগ করিতে লাগিলেন, কিন্তু রাক্ষসের কিছুতেই কিছু হইল না। তখন তিনি দেবাদিদেব মহাদেবকে প্রসন্ন করিয়া, কৃতবর্ম্মা ও কৃপাচার্য্যের সহায়তায়, সুষুপ্ত ধৃষ্টদ্যুম্ল প্রভৃতি পাঞ্চালগণকে ও সপরিবার দ্রৌপদীর পুৎত্রগণকে বিনাশ করিলেন। কেবল কৃঞ্চবলে যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চভ্রাতা ও ধনুর্দ্ধর সাত্যকি রক্ষা পাইলেন, আর সকলেই বিনষ্ট হইল। ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথি যুধিষ্ঠিরাদিকে সমাচার দিল যে “অশ্বত্থামা প্রসুপ্ত পাঞ্চালদিগকে বধ করিয়াছে।” দ্রৌপদী পুৎত্র, পিতা, ও ভ্রাতাগণের নিধনবার্ত্তা শ্রবণ করিয়া নিতান্ত অধীরার ন্যায় অনশন সঙ্কল্প করিয়া স্বামিগণের নিকট উপবিষ্টা হইলেন। মহাবলপরাক্রান্ত ভীম দ্রৌপদীর মনস্তুষ্টি-করণার্থ ক্রোধান্বিত হইয়া গদা গ্রহণপুরঃসর অশ্বত্থামার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। অশ্বত্থামা ভীমভয়াক্রান্ত হইয়া সক্রোধে “অদ্য আমি মেদিনী পাণ্ডববিহীনা করিব” এই বলিয়া অস্ত্র ত্যাগ করিলেন। কৃষ্ণ “এমন করিও না” এই বলিয়া অশ্বত্থামাকে নিবারণ করিলেন। অর্জ্জুন পাপাত্মা অশ্বত্থামাকে অনিষ্টাচরণে অভিনিবিষ্ট দেখিয়া স্বকীয় অস্ত্র দ্বারা অশ্বত্থামার অস্ত্রচ্ছেদন করিলেন এবং অশ্বত্থামা ও ব্যাসাদি পরস্পরের প্রতি শাপ প্রদান করিলেন। পাণ্ডবগণ মহারথ দ্রোণাত্মজের নিকট হইতে মণি গ্রহণ করিয়া সানন্দে দ্রৌপদীকে প্রদান করিলেন। ভারতের দশম সৌপ্তিকপর্ব্ব নির্দ্দিষ্ট হইল। ব্রহ্মবাদী মহাত্মা উত্তমতেজা বেদব্যাস এই পর্ব্বে অষ্টাদশ অধ্যায় ও অষ্ট শত সপ্ততি শ্লোকের সংখ্যা করিয়াছেন। ঐষীকপর্ব্ব এই পর্ব্বের অন্তর্গত।
স্ত্রীপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
এক্ষণে করুণরসোদ্ধেধক স্ত্রীপর্ব্বের বিষয় কথিত হইতেছে। এই পর্ব্বে পুৎত্রশোকার্ত্ত প্রজ্ঞাচক্ষু রাজা ধৃতরাষ্ট্র ভীমসেনকে সংহার করিতে সঙ্কল্প করিয়া লৌহময়ী ভীমপ্রতিমূর্ত্তি ভগ্ন করেন। বিদুর মোক্ষোপদেশক হেতুবাদ দ্বারা পুৎত্রশোকাভিসন্তপ্ত রাজা ধৃতরাষ্ট্রের সাংসারিকমোহনিবারণ ও তাঁহাকে আশ্বাস প্রদান করেন। শোকার্ত্ত ধৃতরাষ্ট্র অন্তঃপুরমহিলাগণের সহিত রণস্থলদর্শনার্থ গমন করেন। অতঃপর বীরবনিতাগণের করুণস্বরে রোদন এবং গান্ধারী ও ধৃতরাষ্ট্রের ক্রোধ ও মোহ। তৎপর ক্ষৎত্রিয়পত্নীগণ সমরে অপরাঙ্মুখ নিহত পিতা, ভ্রাতা ও পুৎত্রগণকে দেখিলেন। কৃষ্ণ পুৎত্র-পৌৎত্রশোকাকুলা গান্ধারীর ক্রোধোপশমন করেন। সর্ব্ব-ধর্ম্মজ্ঞশ্রেষ্ঠ, মহাপ্রাজ্ঞ, রাজা যুধিষ্ঠির শাস্ত্রানুসারে নৃপতিগণের শরীর দাহ করাইলেন। ভূপতিগণের উদকক্রিয়া [তর্পণাদি] আরব্ধ হইলে কুন্তী কর্ণকে আপনার গূঢ়োৎপন্ন পুৎত্র বলিয়া স্বীকার ও প্রকাশ করেন। মহর্ষি বেদব্যাস এই একাদশ পর্ব্ব রচনা করিয়াছেন। এই পর্ব্ব শ্রবণ কিংবা পাঠ করিলে সহৃদয় জনের হৃদয় শোকাকুল ও নয়ন অশ্রুজলে পরিপূর্ণ হয়। এই পর্ব্বে বেদব্যাস সপ্তবিংশতি অধ্যায় ও সপ্তশত পঞ্চসপ্ততি শ্লোকের সংখ্যা করিয়া গিয়াছেন।
শান্তিপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
অতঃপর ধীশক্তিবর্দ্ধক শান্তিপর্ব্বে কথা লিখিত হইতেছে। এই পর্ব্বে ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির পিতৃগণ, ভ্রাতৃগণ, পুৎত্র, সন্বন্ধী ও মাতুলগণকে বধ করাইয়া সাতিশয়, নির্ব্বণ্ণ হইলেন। শরশয্যাশায়ী ভীষ্মদেব রাজা যুধিষ্ঠিরকে রাজধর্ম্মোপদেশ প্রদান করেন। ঐ সমস্ত ধর্ম্মের যথার্থ-জ্ঞান দ্বারা লোকে সর্ব্বজ্ঞতা লাভ করে। ইহাতে বিচিত্র মোক্ষধর্ম্মের কথাও সবিস্তারে কথিত আছে। মহাভারতের দ্বাদশ পর্ব্ব নির্দ্দিষ্ট হইল। হে তপোধনগণ! এই শান্তিপর্ব্বে মহামুনি বেদব্যাস ত্রিশত ঊনচত্বারিংশৎ অধ্যায় ও চতুর্দ্দশ সহস্র সপ্ত শত সপ্ত শ্লোক রচনা করিয়াছেন।
অনুশাসনপর্ব্ব –শ্লোকসংখ্যা
ইহার পর অত্যুৎকৃষ্ট অনুশাসনপর্ব্ব। এই পর্ব্বে ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির ভাগীরথীপুৎত্র ভীষ্মদেবের নিকট ধর্ম্মনিশ্চয় শ্রবণ করিয়া বিগতশোক ও স্থিরচিত্ত হইলেন। এই পর্ব্বে ধর্ম্মার্থ-সম্বন্ধ ব্যবহার সমুদয়-কথন, বিবিধ দানের বিবিধ প্রকার ফলনির্দ্দেশ, সৎপাত্র ও অসৎপাত্রের বিশেষ বিবেচনা, দানবিধানকথন, আচার-বিনির্ণয়, সত্যের স্বরূপ-কথন, গোগণের ও ব্রাহ্মণগণের মহত্বকীর্ত্তন, দেশ কালানুযায়ী-ধর্ম্মরহস্য-কথন ও ভীষ্মের অমরলোকসম্প্রাপ্তি কীর্ত্তিত আছে। ধর্ম্মনির্ণায়ক নানা-বৃত্তান্ত-সঙ্কলিত অনুশাসনাভিধান মহাভারতের ত্রয়োদশ পর্ব্ব নির্দ্দিষ্ট হইল। এই অনুশাসনপর্ব্বে মুনিসত্তম পরাশরাত্মজ একশত ষট্চত্বারিংশৎ অধ্যায় ও অষ্ট সহস্র শ্লোক নির্ণয় করিয়াছেন।
অশ্বমেধপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
অতঃপর আশ্বমেধিক-নামক চতুর্দ্দশ পর্ব্বের বিষয় কথিত হইতেছে। এই পর্ব্বে সংবর্ত্তমুনি ও মরুত্ত রাজার আখ্যান, যুধিষ্ঠিরের হিমালয়স্থিত সুবর্ণস্তূপ-সম্প্রাপ্তি ও পরীক্ষিতের জন্ম বৃত্তান্ত বর্ণিত আছে। পরীক্ষিৎ অশ্বত্থামার অস্ত্রানলে দগ্ধ হইয়াছিলেন; কৃষ্ণ তাঁহাকে জীবিত প্রদান করেন। অত্যুৎকৃষ্ট যজ্ঞ-তুরঙ্গরক্ষার্থ তৎপশ্চাদগামী অর্জ্জুনের নানাদেশে ক্রোধনরাজ-পুৎত্রগণের সহিত সংগ্রাম, চিত্রাঙ্গদার গর্ভে সমুদ্ভুত স্বসুত বভ্রুবাহনের সহিত যুদ্ধে ধনঞ্জয়ের জীবন-সংশয়। মহান্ অশ্বমেধযজ্ঞের সমাপ্তির পর নকুলের বৃত্তান্ত। এই পরমাদ্ভুত আশ্বমেধিক পর্ব্বের বিষয় কথিত হইল। এই পর্ব্বে অশেষ-তত্ত্ববিৎ ভগবান্ পরাশরসূনু ত্র্যধিক শত অধ্যায় ও তিন সহস্র তিন শত বিংশতি শ্লোকের সংখ্যা করিয়াছেন।
আশ্রমবাসিকপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
অনন্তর আশ্রমবাসাখ্য পঞ্চদশ পর্ব্ব। এই পর্ব্বে রাজা ধৃতরাষ্ট্র রাজ্যত্যাগ করিয়া গান্ধারী ও বিদুরের সহিত অরণ্যানী [মহাবন] প্রবেশ করিলেন। গুরুশুশ্রূষায় একান্ত অনুরক্তা, সাধ্বী কুন্তীও ধৃতরাষ্ট্রকে বনে গমন করিতে দেখিয়া পুৎত্ররাজ্য পরিত্যাগকরতঃ তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। রাজা ধৃতরাষ্ট্র সমরে নিহত লোকান্তরগত পুৎত্র-পৌৎত্র এবং অন্যান্য ক্ষৎত্রিয় বীরপুরুষগণকে পুনরাগত দেখিলেন। তিনি মহামুনি বেদব্যাসের প্রসাদে এই আশ্চর্য্য ব্যাপার দর্শন করিয়া অবশেষে শোক পরিত্যাগপূর্ব্বক পরমসিদ্ধি লাভ করিলেন। বিদুর ও জিতেন্দ্রিয় গবলগণ-নন্দন সঞ্জয় অমাত্যের সহিত ধর্ম্মপথ অবলম্বন করিয়া চরমে সদ্গতি প্রাপ্ত হইলেন। ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির তপোধন নারদকে সন্দর্শন করিলেন এবং তৎপ্রমুখাৎ যদুকুলধ্বংসের কথা অবগত হইলেন। এই অত্যদ্ভুত আশ্রমবাসাখ্য পর্ব্বের বিষয় কথিত হইল। মহামুনি বেদব্যাস এই পর্ব্বে দ্বিচত্বারিংশৎ অধ্যায় ও এক সহস্র পঞ্চশত ষট্শ্লোকের সংখ্যা করিয়াছেন।
মৌষলপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
হে তপোধনগণ! অতঃপর দারুণ মৌষল-পর্ব্ব জানিবেন। এই পর্ব্বে লবণ-সমুদ্র-সমীপে ব্রহ্মশাপগ্রস্ত পুরুষসিংহ যাদবগণ আপানে [মদ্যপান – দলবদ্ধ হইয়া যেখানে মদ্যপান করা হয়] –মদ্যপান দ্বারা মত্ত হইয়া দারুণ দৈবদুর্ব্বিপাকবশতঃ এরকা [শরতূণ –শরকাঠি] রূপ বজ্র দ্বারা পরস্পর আঘাত করেন। কৃষ্ণ ও বলভদ্র উভয়ে আপনাদিগের কুলক্ষয় করিয়া পরিশেষে আপনারাও সর্ব্বসংহর্ত্তা সমুপস্থিত কালের করাল কবলে নিপতিত হয়েন। নরোত্তম অর্জ্জুন দ্বারবতী নগরীতে আগমনপূর্ব্বক ঐ নগরীকে যাদবশূন্য নিরীক্ষণ করিয়া বিষাদসাগরে নিমগ্ন হইলেন। তিনি নরশ্রেষ্ঠ মাতুল বসুদেবের সংস্কার করিলেন এবং তৎপরে কৃষ্ণ ও বলরামের সংস্কার করিয়া পরিশেষে অন্যান্য প্রধান প্রধান বৃষ্ণিগণেরও সংস্কার করিলেন। অনন্তর তিনি দ্বারকা হইতে বৃদ্ধ ও বালকগণকে লইয়া গমন করিতে করিতে ঘোরতর আপৎকালে গাণ্ডীবের প্রভাবক্ষয় ও দিব্যাস্ত্র সমুদয়ের অপ্রসন্নতা দেখিলেন। তৎপরে তিনি যাদবমহিলাগণের নাশ ও প্রভুত্বের অনিত্যতা দর্শনে সাতিশয় নির্ব্বেদ-প্রাপ্ত হইয়া ব্যাসোপদেশে যুধিষ্ঠিরের নিকট গমন করিয়া সন্ন্যাসধর্ম্মগ্রহণের বাসনা করিলেন। ষোড়শ-সংখ্যক মৌষলপর্ব্ব কীর্ত্তিত হইল। তত্ত্ববিৎ পরাশরাত্মজ এই পর্ব্বে আট অধ্যায় ও তিনশত বিংশতি শ্লোক গণনা করিয়াছেন।
মহাপ্রাস্থানিকপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
তদনন্তর মহাপ্রাস্থানিক-নামক সপ্তদশ পর্ব্বের বিষয় লিখিত হইতেছে। এই পর্ব্বে পুরুষশ্রেষ্ঠ পাণ্ডবগণ স্বকীয় রাজ্য পরিত্যাগপূর্ব্বক দ্রৌপদী দেবীকে সমভিব্যাহারে লইয়া মহাপ্রস্থানে প্রস্থিত হইলেন। তাঁহারা লোহিত্যার্ণবের কূলে অগ্নিসন্দর্শন পাইলেন। অর্জ্জুন মহানুভব অগ্নি কর্ত্তৃক আদিষ্ট হইয়া তাঁহাকে পূজা করিয়া অত্যুৎকৃষ্ট গাণ্ডীবধনু প্রদান করিলেন। যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণ ও দ্রৌপদীকে নিপতিত ও নিহত দেখিয়া তাঁহাদিগের প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপও না করিয়া সমস্ত মায়ামোহ পরিত্যাগপূর্ব্বক প্রস্থান করিলেন। মহাপ্রাস্থানিকাখ্য সপ্তদশ পর্ব কথিত হইল। এই পর্ব্বে অশেষতত্ত্বজ্ঞ ভগবান্ পরাশরনন্দন তিন অধ্যায় ও তিন শত বিংশতি শ্লোক নির্দ্ধারিত করিয়াছেন।
স্বর্গরোহণপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
অনন্তর আশ্চর্য্য অলৌকিক স্বর্গপর্ব্ব জানিবেন। এই পর্ব্বে দয়ার্দ্রাচিত্ত মহাপ্রাজ্ঞ ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির দেবলোক হইতে আগত দৈবরথে কুক্কুর ত্যাগ করিয়া আরোহণে সম্মত হইলেন না। ধর্ম্ম স্বয়ং যুধিষ্ঠিরের ধর্ম্মে অবিচলিত অনুরাগ বুঝিতে পারিয়া কুক্কুররূপ পরিত্যাগপূর্ব্বক দর্শন দিলেন। পরম্-ধার্ম্মিক যুধিষ্ঠির ধর্ম্মের সহিত একরথে উপবিষ্ট হইয়া স্বর্গে গমন করিলেন। দেবদূত ছল করিয়া নরক দর্শন করাইলেন। পরমধার্মিকাগ্রগণ্য যুধিষ্ঠির তৎস্থানস্থিত নির্দেশানুবর্ত্তী ভ্রাতৃগণের করুণ-রসোদ্দীপক ক্রন্দনধ্বনি শ্রবণ করিলেন। ধর্ম্ম ও দেবরাজ ইন্দ্র তাঁহার মনোদুঃখ নিবারণ করেন। তৎপরে ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির সুরদীর্ঘিকায় [স্বর্গনদী–গঙ্গা] স্নান করিয়া মানুষ-কলেবর পরিত্যাগপূর্ব্বক স্বর্গে নিজ ধর্ম্মার্জ্জিত স্থান পাইয়া ইন্দ্রাদি দেবগণ কর্ত্তৃক পরম সমাদৃত হইয়া পরমানন্দে কালযাপন করিতে লাগিলেন। হে তপোধনগণ! অশেষধীশক্তিসম্পন্ন নামাতত্ত্বদর্শী মহর্ষি বেদব্যাস এই অষ্টাদশ পর্ব্ব রচনা এবং ইহাতে পাঁচ অধ্যায় ও দুই শত নব শ্লোকের সংখ্যা করিয়া গিয়াছেন।
হরিবংশ – শ্লোকসংখ্যা
এইরূপে অষ্টাদশ পর্ব্ব সবিস্তারে উক্ত হইল। ইহার পর হরিবংশ ও ভবিষ্যপর্ব্ব কথিত আছে। মহর্ষি হরিবংশে দ্বাদশ সহস্র শ্লোকসংখ্যা করিয়াছেন। মহাভারতের পর্ব্বসংগ্রহ নির্দ্দিষ্ট হইল।
পর্ব্বসংগ্রহ-প্রশংসা
যুদ্ধ করিবার নিমিত্ত অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা আসিয়াছিল। সেই ঘোর সংগ্রাম অষ্টাদশ দিবস ব্যাপিয়া হয়।
যে দ্বিজ অঙ্গ ও উপনিষদের সহিত চারি বেদ উত্তমরূপে অধ্যায়ন করিয়াছেন, কিন্তু মহাভারতাখ্যান জানেন না, তাঁহাকে বিচক্ষণ বলিতে পারা যায় না। অপরিমিত-ধীশক্তিমান্ বেদব্যাস এই ভারতকে অর্থশাস্ত্র, ধর্ম্মশাস্ত্র ও কামশাস্ত্রস্বরূপ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। যেমন পরম সুমধুর পুংস্কোকিলের কলরব শ্রবণ করিয়া কর্কশ কাকধ্বনি শ্রবণ করিতে ইচ্ছা হয় না, সেইরূপ এই আখ্যান শ্রবণ করিলে অন্যশাস্ত্র-শ্রবণে রুচি থাকে না। যেমন পঞ্চভূত হইতে ত্রিবিধ লোকের উৎপত্তি হয়, সেইরূপ এই সর্ব্বোৎকৃষ্ট ইতিহাস হইতে কবিগণের বুদ্ধি উৎপন্ন হয়। হে বিপ্রোত্তমগণ! যেমন জরায়ুজাদি চতুর্ব্বিধ শরীরী অন্তরীক্ষের [আকাশতলের সমগ্র সৃষ্টির] অন্তর্গত, সেইরূপ যাবতীয় পুরাণ এই আখ্যানের অন্তর্ভূত। যেমন বিচিত্রা মানসিক ক্রিয়া সমস্ত ইন্দ্রিয়গণের আশ্রয়, সেইরূপ এই ইতিহাস যাবতীয় দানাধ্যয়নাদি ক্রিয়া ও শমদমাদি গুণের আশ্রয়। যেমন আহার বিনা শরীরীর শরীর ধারণের উপায়ান্তর নাই, সেইরূপ এই সুললিত ইতিহাসান্তর্গত কথা ব্যতিরেকে ভূমণ্ডলে অন্য কথা নাই। যেমন সমুন্নতি-প্রেপসু ভূত্যগণ সদ্বংশজ প্রভুর আরাধনা করে, সেইরূপ কবিবরাগ্রগণ্যগণ এই বিচিত্র ইতিহাসের উপাসনা করিয়া থাকেন। যেমন অন্যান্য আশ্রমাপেক্ষা গৃহস্থাশ্রম উৎকৃষ্ট, সেইরূপ এই কাব্য অন্যান্য কবিকৃতকাব্য অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।
হে মহর্ষিগণ! তোমাদিগের ধর্ম্মে মতি হউক। কারণ, লোকান্তরগত জনের ধর্ম্মই অদ্বিতীয় বন্ধু। অর্থ ও স্ত্রী সাতিশয়ানুরাগপূর্ব্বক সেবিত হইলেও কখন স্থির ও আত্মীয় হয় না। যে ব্যক্তি কৃষ্ণদ্বৈপায়নের ওষ্ঠবিনির্গত অপ্রমেয় পরমপবিত্র পাপনাশক মঙ্গলবিধায়ক পাঠ্যমান ভারত শ্রবণ করে, তাহার পুষ্করজলে স্নান করিবার প্রয়োজন কি? ব্রাহ্মণ দিবাভাগে নিরঙ্কুশ ইন্দ্রিয়গণ-প্রভাবে যে পাপরাশি সঞ্চয় করেন, সন্ধ্যাকালে মহাভারত পাঠ দ্বারা সেই সকল পাপপুঞ্জ হইতে মুক্ত হয়েন; আর নিশাকালে কর্ম্ম, মন ও বাক্য দ্বারা যে সকল পাপ সঞ্চয় করেন, প্রাতঃকালে মহাভারত পাঠ করিয়া সেই সমস্ত পাপ হইতে মুক্ত হয়েন। যে ব্যক্তি বেদজ্ঞ ও বহুশ্রুত ব্রাহ্মণকে কনকমণ্ডিত শত গো-দান করে, আর যে ব্যক্তি পরম পবিত্র ভারত-কথা প্রত্যহ শ্রবণ করে, এই দুইজনের তুল্য ফললাভ হয়। যেমন অর্ণবপোতাদি দ্বারা সুবিস্তীর্ণ অগাধ-জলধি অনায়াসে পার হওয়া যায়, সেইরূপ অগ্রে পর্ব্বসংগ্রহশ্রবণ দ্বারা অত্যুৎকৃষ্ট মহার্থযুক্ত উপাখ্যান সুখবোধ্য হয় জানিবেন।
পর্ব্বসংগ্রহাধ্যায় সমাপ্ত।

পৌষ্যপর্ব্ব-জনমেজয় শাপ | সোমশ্রবা ঋষির উপখ্যান | আয়োধধৌম্য ও আরুণিবৃত্তান্ত | উপমন্যু উপাখ্যান | বেদ ঋষি উতঙ্ক-বৃত্তান্ত | জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞ প্ররোচনা
পৌষ্যপর্ব্ব-জনমেজয় শাপ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, কুরুক্ষেত্রে পরীক্ষিতপুৎত্র রাজা জনমেজয় ভ্রাতৃগণ সমভিব্যাহারে এক দীর্ঘ-সত্র [দীর্ঘকালব্যাপী যজ্ঞ] অনুষ্ঠান করিতেছেন। তাঁহার তিন সহোদর– শ্রুতসেন, উগ্রসেন ও ভীমসেন। তাঁহাদিগের যজ্ঞানুষ্ঠানকালে একটা কুক্কুর তথায় উপস্থিত হইল। জনমেজয়ের ভ্রাতৃগণ ক্রোধান্ধ হইয়া তাহাকে প্রহার করিলে সে রোদন করিতে করিতে মাতৃসন্নিধানে গমন করিল। সরমা তাহাকে অকস্মাৎ রোদন করিতে দেখিয়া কহিল, “তুমি কেন কাঁদিতেছ? কে তোমাকে প্রহার করিয়াছে, বল।” জননী কর্ত্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া সে কহিল, “জনমেজয়ের ভ্রাতৃগণ আমাকে প্রহার করিয়াছেন।” তাহা শুনিয়া দেবশুনী কহিল, “বোধ হয়, তুমি তাঁহাদিগের কোন অপকার করিয়া থাকিবে।” সে পুনর্ব্বার কহিল, “আমি তাঁহাদিগের কিছুমাত্র অপকার করি নাই, যজ্ঞের হবিঃও নিরীক্ষণ করি নাই, তাঁহারা অকারণে আমাকে প্রহার করিয়াছেন।” তৎশ্রবণে সরমা অতি দুঃখিতা হইয়া যথায় জনমেজয় ভ্রাতৃগণসমভিব্যাহারে বহুবার্ষিক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন, তথায় সমুপস্থিত হইয়া রোষভরে কহিতে লাগিল, “আমার পুৎত্র তোমাদিগের কিছুমাত্র অপকার করে নাই, যজ্ঞের হবিঃ অবেক্ষণ [দর্শন] ও অবলেহন করে নাই, তোমরা কি নিমিত্ত ইহাকে প্রহার করিয়াছ, বল?” তাঁহারা কিছুই প্রত্যুত্তর দিলেন না। তখন সরমা কহিল, “তোমরা নিরপরাধকে প্রহার করিয়াছ, অতত্রব অনুপলক্ষিত [অজ্ঞাত] ভয় তোমাদিগকে আক্রমণ করিবে।” জনমেজয় দেবশুনী সরমার এইরূপ অভিশাপ শ্রবণ করিয়া অতিশয় বিষণ্ণ ও সন্ত্রস্ত হইলেন।
সোমশ্রবা ঋষির উপাখ্যান
অনন্তর সেই যজ্ঞ সমাপ্ত হইলে জনমেজয় হস্তিনাপুরে আগমন ও সরমাশাপ-নিবারণের নিমিত্ত সাতিশয় প্রযত্নসহকারে এক অনুরূপ পুরোহিত অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। একদা মৃগয়ায় নির্গত হইয়া জনমেজয় স্বীয় জনপদের অন্তর্গত এক আশ্রম দর্শন করিলেন। তথায় শ্রুতশ্রবাঃ নামক এক ঋষি বাস করিতেন। তাঁহার সোমশ্রবাঃ নামে এক পুৎত্র ছিল। জনমেজয় ঋষিপুৎত্রের সন্নিহিত হইয়া তাঁহাকে পৌরোহিত্যে বরণ করিলেন এবং ঋষিকে নমস্কার করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলেন, “ভগবন্! আপনার এই পুৎত্র আমার পুরোহিত হউন।” রাজার এইরূপ কথা শ্রবণ করিয়া শ্রুতশ্রবাঃ কহিলেন, “হে জনমেজয়! একদা এক সর্পী আমার শুক্র পান করিয়াছিল। ঐ শুক্রে তাহার গর্ভসঞ্চার হয়; আমার এই পুৎত্র ঐ গর্ভে জন্মেন। ইনি মহাতপস্বী, অধ্যয়ননিরত ও মদীয় তপোবীর্য্যে সম্ভূত। মহাদেবের অভিশাপ ব্যতিরেকে তোমার সমুদয় শাপশান্তি করিতে সমর্থ হইবেন। কিন্তু ইঁহার একটি নিগূঢ় ব্রত আছে যে, যদি কোন ব্রাহ্মণ ইঁহার সন্নিধানে কোন বিষয় প্রার্থনা করেন, ইনি তৎক্ষণাৎ তাহা প্রদান করিয়া থাকেন, যদি ইহাতে সাহস হয়, তবে ইঁহাকে লইয়া যাও।” শ্রুতশ্রবার এইরূপ কথা শুনিয়া জনমেজয় প্রত্যুত্তর করিলেন, “মহাশয়! আপনি যাহা অনুমতি করিতেছেন, আমি তাহাতে সম্মত আছি।” এই কথা কহিয়া পুরোহিত-সহ স্বনগরে প্রত্যাগমনকরতঃ ভ্রাতৃগণকে কহিলেন, “আমি এই মহাত্মাকে পৌরোহিত্যে বরণ করিয়াছি, ইনি যখন যাহা অনুজ্ঞা করিবেন, তোমরা তদ্বিষয়ে কোন বিচার না করিয়া তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদন করিবে; কিছুতেই যেন তাহার ব্যতিক্রম না হয়। “সহোদরদিগকে এইরূপ আদেশ করিয়া তিনি তক্ষশিলায় প্রস্থান করিলেন ও অনতিবিলম্বেই সেই প্রদেশ আপন অধিকারে আনিলেন।
আয়োধধৌম্য ও আরুণিবৃত্তান্ত
ইত্যবসরে প্রসঙ্গক্রমে একটি উপাখ্যানের উল্লেখ হইতেছে। আয়োধধৌম্য নামে এক ঋষি ছিলেন। উপমন্যু, আরুণি ও বেদ নামে তাঁহার তিনটি শিষ্য ছিল। তিনি একদিন পাঞ্চালদেশীয় আরুণি নামক শিষ্যকে আহ্বান করিয়া ক্ষেত্রের আলি বাঁধিতে অনুমতি করিলেন। আরুণি উপাধ্যায়ের উপদেশক্রমে ক্ষেত্রে গমন করিয়া অশেষ ক্লেশ স্বীকার করিয়াও পরিশেষে আলি বাঁধিতে অশক্ত হইলেন। অগত্যা তথায় শয়ন করিয়া জলনির্গম নিবারণ করিলেন। কোন সময়ে উপাধ্যায় আয়োধধৌম্য শিষ্যগণকে জিজ্ঞাসিলেন, “পাঞ্চালদেশীয় আরুণি কোথায় গিয়াছে?” তাহারা কহিল, “ভগবন্! আপনি তাহাকে ক্ষেত্রের আলি বাঁধিতে প্রেরণ করিয়াছেন।” তাহা শ্রবণ করিয়া উপাধ্যায় কহিলেন, “যথায় আরুণি গমন করিয়াছে, চল, আমরাও তথায় যাই।” অনন্তর সেই স্থানে গমন করিয়া উচ্চৈঃস্বরে এইরূপে তাঁহাকে আহ্বান করিতে লাগিলেন, “ভো বৎস আরুণি! কোথায় গিয়াছ, আইস।” তৎশ্রবণে আরুণি সহসা তথা হইতে উত্থিত ও উপাধ্যায়ের সন্নিহিত হইয়া অতি বিনীতবচনে নিবেদন করিলেন, “ক্ষেত্রের যে জল নিঃসৃত হইতেছিল, তাহা অবারণীয়; সুতরাং তৎপ্রতিরোধের নিমিত্ত আমি তথায় শয়ন করিয়াছিলাম। এক্ষণে আপনার কথা শ্রবণ করিয়া সহসা কেদার [ক্ষেতের আলি] খণ্ড বিদারণপূর্ব্বক আপনার সম্মুখীন হইলাম; অভিবাদন করি, আর কি অনুষ্ঠান করিব, অনুমতি করুন।” আরুণি এইরূপ কহিলে উপাধ্যায় উত্তর করিলেন, “বৎস! যেহেতু তুমি কেদারখণ্ড বিদারণ করিয়া উত্থিত হইয়াছ, অতত্রব অদ্যাবধি তোমার নাম উদ্দালক বলিয়া প্রসিদ্ধ হইবে এবং আমার আজ্ঞাপালন করিয়াছ, এই নিমিত্ত তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে। সকল বেদ ও সকল ধর্ম্মশাস্ত্র সর্ব্বকালে সমভাবে তোমার অন্তরে প্রতিভাত হইবে।” পরে আরুণি উপাধ্যায়ের আদেশ লাভ করিয়া অভিলষিত দেশে গমন করিলেন।
উপমন্যু-উপাখ্যান
আয়োধধৌম্যের উপমন্যু নামে একটি শিষ্য ছিলেন। একদা উপাধ্যায় তাঁহাকে কহিলেন, “বৎস উপমন্যু! সতত সাবধানে আমার গোধন রক্ষা কর।” এই বলিয়া তাঁহাকে গোচারণে প্রেরণ করিলেন। উপমন্যু তাঁহার অনুমতিক্রমে দিবাভাগে গোচারণ করিয়া সায়াহ্নে গুরুগৃহে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক তাঁহাকে অভিবাদন করিয়া সম্মুখে দণ্ডায়মান থাকিতেন। একদিন উপাধ্যায় তাঁহাকে স্থূলকায় দেখিয়া কহিলেন, “বৎস উপমন্যু! তোমাকে ক্রমশঃ অতিশয় হৃষ্ট-পুষ্ট দেখিতেছি, এক্ষণে কিরূপ আহার করিয়া থাক, বল।” তিনি উত্তর করিলেন, “ভগবন্! আমি এক্ষণে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করিয়াছি।” তাহা শ্রবণ করিয়া উপাধ্যায় কহিলেন, “দেখ, আমাকে না জানাইয়া ভিক্ষালব্ধ দ্রব্যজাত উপযোগ [ভক্ষণ] করা তোমার বিধেয় নহে। “উপমন্যু তাহাই স্বীকার করিয়া ভিক্ষান্ন আহরণপূর্ব্বক গুরুকে প্রত্যর্পণ করিলেন; উপাধ্যায় সমস্ত ভিক্ষান্ন গ্রহণ করিলেন; ভক্ষণার্থ তাঁহাকে কিছুই দিলেন না। অনন্তর উপমন্যু দিবাভাগে গো-রক্ষা করিয়া সায়াহ্নে গুরুগৃহে আগমন ও তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া নমস্কার করিলেন। উপাধ্যায় তাঁহাকে অত্যন্ত পুষ্ট দেখিয়া কহিলেন, “বৎস উপমন্যু! তোমার ভিক্ষান্ন সমুদয়ই গ্রহণ করিয়া থাকি, তথাপি তোমাকে অতিশয় স্থূলকায় দেখিতেছি, এক্ষণে কি আহার করিয়া থাক, বল।” তিনি এইরূপ অভিহিত হইয়া প্রত্যুত্তর করিলেন, “ভগবন্! একবার ভিক্ষা করিয়া আপনাকে প্রদান করি, দ্বিতীয়বার কয়েক মুষ্টি তণ্ডুল আহরণ করিয়া আপনার উদর পূরণ করিয়া থাকি।” উপাধ্যায় কহিলেন, “দেখ, ইহা ভদ্রলোকের ধর্ম্ম ও সমুচিত কর্ম্ম নহে। ইহাতে অন্যের বৃত্তিরোধ হইতেছে, আরও এইরূপ অনুষ্ঠান করিলে তুমিও ক্রমশঃ লোভপরায়ণ হইবে। “উপাধ্যায় কর্ত্তৃক এইরূপ আদিষ্ট হইয়া উপমন্যু পূর্ব্ববৎ গোচারণ ও সায়ংকালে গুরুগৃহে আগমন করিলে উপাধ্যায় তাঁহাকে কহিলেন, “বৎস উপমন্যু! তুমি ইতস্ততঃ পর্য্যটন করিয়া যে ভিক্ষান্ন আহরণ কর, তাহা আমি সম্পূর্ণই লইয়া থাকি এবং প্রতিষেধ করিয়াছি বলিয়া তুমিও দ্বিতীয়বার ভিক্ষা কর না; তথাপি তোমাকে পূর্ব্বাপেক্ষা সমধিক স্থূলকায় দেখিতেছি, এক্ষণে কি আহার করিয়া থাক, বল।” এইরূপ অভিহিত হইয়া উপমন্যু কহিলেন, “ভগবন্! এক্ষণে ধেনুগণের দুগ্ধ পান করিয়া প্রাণধারণ করিতেছি।” উপাধ্যায় কহিলেন, “দেখ, আমি তোমাকে অনুমতি করি নাই, সুতরাং ধেনুর দুগ্ধ পান করা তোমার অত্যন্ত অন্যায় হইতেছে।” গুরুবাক্য অঙ্গীকার করিয়া উপমন্যু পূর্ব্ববৎ গোচারণ ও গুরুগৃহে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া নমস্কার করিলেন। গুরু তাঁহাকে বিলক্ষণ স্থূল দেখিয়া কহিলেন, “বৎস উপমন্যু! তুমি ভিক্ষান্ন ভক্ষণ ও দ্বিতীয়বার ভিক্ষার্থ পর্য্যটন কর না এবং ধেনুর দুগ্ধ পান করিতেও তোমাকে নিবারণ করিয়াছি, তথাপি তোমাকে অতিশয় স্থূলকলেবর দেখিতেছি, এক্ষণে কি আহার করিয়া থাক, বল।” উপমন্যু কহিলেন, :বৎসগণ মাতৃস্তন পান করিয়া যে ফেন উদগার করে, আমি তাহা পান করি।” উপাধ্যায় কহিলেন, “অতি শান্তস্বভাব বৎসগণ তোমার প্রতি অনুকম্পা করিয়া অধিক পরিমাণে ফেন উদগার করিয়া থাকে, সুতরাং তুমি তাহাদিগের আহারের ব্যাঘাত করিতেছ। অতঃপর তোমার ফেন পান করাও বিধেয় নহে।” এইরূপ আদিষ্ট হইয়া উপমন্যু পূর্ব্ববৎ গোরক্ষা করিতে লাগিলেন।
এইরূপে উপাধ্যায় কর্ত্তৃক প্রতিষিদ্ধ হইয়া তিনি আর ভিক্ষান্ন ভক্ষণ করিতেন না, দ্বিতীয়বার ভিক্ষার্থ পর্য্যটন করিতেন না, ধেনুর দুগ্ধপান ও দুগ্ধের ফেনোপযোগেও বিরত হইলেন। একদা তিনি অরণ্যে গোচারণে ক্ষুধার্ত্ত হইয়া অর্কপত্র ভক্ষণ করিলেন। সেই সকল ক্ষার, তিক্ত, কটু, রুক্ষ ও তীক্ষ্মবিপাক অর্কপত্র উপযোগ করাতে চক্ষুদোষ জন্মিয়া অন্ধ হইলেন; অন্ধ হইয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে এক কূপে নিপাতিত হইলেন।
অনন্তর ভগবান্ দিনমণি অস্তাচল-চূড়াবলম্বী হইলে, উপাধ্যায় আয়োধধৌম্য শিষ্যদিগকে কহিলেন, “দেখ উপমন্যু এখনও আসিতেছে না।” শিষ্যেরা কহিলেন, “ভগবন্! উপমন্যুকে আপনি গোচারণের নিমিত্ত অরণ্যে প্রেরণ করিয়াছেন।” উপাধ্যায় কহিলেন, “দেখ, আমি উপমন্যুকে সর্ব্বপ্রকার আহার করিতে নিষেধ করিয়াছি, বোধ হয়, সে কুপিত হইয়াছে; এই নিমিত্ত প্রত্যাগত হইতেছে না। চল, আমরা গিয়া তাহার অনুসন্ধান করি।” এই বলিয়া শিষ্যগণ-সমভিব্যাহারে বন-গমনপূর্ব্বক “বৎস উপমন্যু! কোথায় গিয়াছ?” এই বলিয়া মুক্তকণ্ঠে তাহাকে আহ্বান করিতে লাগিলেন। উপমন্যু উপাধ্যায়ের স্বরসংযোগ শ্রবণ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, “আমি কূপে পতিত হইয়াছি।” তাহা শ্রবণ করিয়া উপাধ্যায় কহিলেন, “তুমি কিরূপে কূপে নিপতিত হইয়াছ?” তিনি প্রত্যুত্তর করিলেন, “আমি অর্কপত্র-ভক্ষণে অন্ধ হইয়া কূপে পতিত হইলাম।” উপাধ্যায় কহিলেন, “তুমি দেববৈদ্য অশ্বিনীকুমারের স্তব কর। তাহা হইলে তোমার চক্ষুলাভ হইবে।” উপমন্যু উপাধ্যায়ের উপদেশানুসারে বেদবাক্য দ্বারা অশ্বিনীকুমার দেবতাদ্বয়ের স্তব আরম্ভ করিলেন। “হে অশ্বিনীকুমার! তোমরা সৃষ্টির প্রারম্ভে বিদ্যমান ছিলে; তোমরাই সর্ব্বভূতপ্রধান হিরণ্যগর্ভরূপে উৎপন্ন হইয়াছ, পরে তোমরাই সংসারে প্রপঞ্চ [সংসার জীব] স্বরূপে প্রকাশমান হইয়াছ; দেশ, কাল ও অবস্থা দ্বারা তোমাদিগের ইয়ত্তা করা যায় না; তোমরাই মায়া ও মায়ারূঢ় চৈতন্যরূপে দ্যোতমান আছ; তোমরা শরীরবৃক্ষে পক্ষিরূপে অবস্থান করিতেছ; তোমরা সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় পরমাণুসমষ্টি ও প্রকৃতির সহযোগিতার আবশ্যকতা রাখ না; তোমরা বাক্য ও মনের অগোচর; তোমরাই স্বীয় প্রকৃতির বিক্ষেপশক্তি দ্বারা নিখিল বিশ্বকে সুপ্রকাশ করিয়াছ। এক্ষণে আমি নির্ব্ব্যাধি হইবার জন্য শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন [প্রগাঢ় চিন্তা] দ্বারা তোমাদিগের আরাধনা করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি। তোমরা পরম রমণীয় ও নির্লিপ্ত, বিলীন জগতের অধিষ্ঠানভূত, মায়াবিকার-রহিত এবং জন্মমৃত্যু বিবর্জ্জিত; তোমরা সর্ব্বকাল সমভাবে বিরাজমান আছ; তোমরা ভাস্কর সৃষ্টি করিয়া দিনযামিনীরূপ শুক্ল ও কৃষ্ণবর্ণ সূত্র দ্বারা সংবৎসররূপ বস্ত্র বয়ন করিতেছ; তোমরা জীবদিগকে সুবিহিত পথ সতত প্রদর্শন কর; তোমরা পরমাত্মশক্তিরূপ কালপাশ হইতে বিমুক্ত করিয়া জীবাত্ম-স্বরূপ পক্ষিণীকে মোক্ষরূপ সৌভাগ্যশালিনী করিয়াছ। জীবেরা যাবৎ অজ্ঞানান্ধকারাচ্ছন্ন থাকিয়া নিরবচ্ছিন্ন ইন্দ্রিয়-পরতন্ত্র থাকে, তাবৎ তাহারা সর্ব্বদোষ-স্পর্শশূন্য চৈতন্যস্বরূপ তোমাদিগকে শরীরী বলিয়া ভাবনা করে। ত্রিশতষষ্টি দিবস-স্বরূপ গোসকল সংবৎসররূপ যে বৎস উৎপাদন করে, তত্ত্বজিজ্ঞাসুরা ঐ বৎসকে আশ্রয় করিয়া পৃথক ফলক্রিয়াসমূহরূপ গো হইতে তত্ত্বজ্ঞানস্বরূপ দুগ্ধ দোহন করেন; উৎপাদক ও সংহারক সেই বৎসকে তোমরাই প্রসব করিয়াছ। অহোরাত্রস্বরূপ সপ্তশতবিংশতি অর [চক্রমধ্যস্থ কাষ্ঠ] সংবৎসররূপ নাভিতে [চাকার হাঁড়ী] সংস্থিত এবং দ্বাদশমাসরূপ প্রধি [রথচক্রের প্রান্ত] দ্বারা পরিবেষ্টিত যুষ্মৎ-প্রকাশিত নেমিশূন্য মায়াত্মক অক্ষয় কালচক্র নিরন্তর পরিবর্ত্তিত হইতেছে। দ্বাদশ রাশিরূপ অর, ছয় ঋতুস্বরূপ নাভি ও সংবৎসররূপ অক্ষ [চক্রের মধ্যমণ্ডল]-সংযুক্ত এবং ধর্ম্মফলের আধারভূত একখানি চক্র আছে, যাহাতে কালাভিমানিনী দেবতা সতত অবস্থিত আছেন। হে অশ্বিনীকুমার যুগল! তোমরা ঐ চক্র হইতে আমাকে মুক্ত কর, আমি জন্ম মরণ ক্লেশে অতিশয় ক্লিষ্ট আছি। তোমরা সনাতন ব্রহ্ম হইয়াও জড়স্বভাব বিশ্বস্বরূপ; তোমরাই কর্ম্ম ও কর্ম্মফল স্বরূপ। আকাশাদি সমস্ত জড়পদার্থ তোমাদের স্বরূপে লয়প্রাপ্ত হয়, তোমরাই অবিদ্যাপ্রভাবে তত্ত্বজ্ঞান উপার্জ্জন করিতে বিমুখ হইয়াও বিষম-বিষয়-রসাস্বাদ-সুখভোগ দ্বারা ইন্দ্রিয়বৃত্তি চরিতার্থ করিয়া সংসার-মায়াজালে জড়িত হও। তোমরা সৃষ্টির পূর্ব্বে দশদিক্ আকাশ ও সূর্য্যমণ্ডলের উদ্ভাবন করিয়াছ; মহর্ষিগণ সূর্য্য-বিহিত সময়ানুসারে বেদ-প্রতিপাদ্য কার্য্যকলাপ নির্ব্বাহ করেন এবং নিখিল দেবগণ ও মনুষ্যেরা বিবিধ ঐশ্বর্য্য ভোগ করেন। তোমরা আকাশাদি সূক্ষ্ম পঞ্চভূত সৃষ্টি করিয়া তাহাদের পঞ্চীকরণ করিয়াছ, সেই পঞ্চভূত হইতে অখিল ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্ট হইয়াছে, প্রাণিগণ ইন্দ্রিয়পরবশ হইয়া বিষয়ানুরক্ত হইতেছে এবং নিখিল দেবগণ ও সমগ্র মনুষ্য অধিষ্ঠানভূতা এই পৃথিবীতে অধিষ্ঠত আছে। তোমাদিগকে ও তোমাদের কণ্ঠদেশাবলম্বিত কমলমালিকাকে প্রণাম করি। নিত্যযুক্ত কর্ম্মফলদাতা অশ্বিনীকুমারযুগলের সাহায্য বিনা অন্যান্য দেবগণ স্বকীয় কার্য্যসাধনে সক্ষম নহেন। হে অশ্বিনীকুমার! তোমরা অগ্রে মুখ দ্বারা অন্নরূপ গর্ভ গ্রহণ কর, পরে অচেতন দেহ ইন্দ্রিয় দ্বারা সেই গর্ভ প্রসব করে। ঐ গর্ভ প্রসূতমাত্র মাতৃস্তন্যপানে নিযুক্ত হয়। এক্ষণে তোমরা আমার চক্ষুর্দ্বয়ের অন্ধত্ব মোচন করিয়া প্রাণরক্ষা কর।” অশ্বিনীকুমারযুগল উপমন্যুর এইরূপ স্তবে সন্তুষ্ট হইয়া তথায় আবির্ভূত হইলেন এবং কহিলেন, “আমরা তোমার প্রতি অতিশয় প্রসন্ন হইয়াছি, অতএব তোমাকে এক পিষ্টক দিতেছি, ভক্ষণ কর।” এইরূপ আদিষ্ট হইয়া তিনি কহিলেন, “আপনাদিগের কথা অবহেলন করিবার যোগ্য নয়; কিন্তু আমি গুরুকে নিবেদন না করিয়া অপূপ [পিষ্টক] ভক্ষণ করিতে পারি না।” তখন অশ্বিনীতনয়দ্বয় কহিলেন “পূর্ব্বে তোমার উপাধ্যায় আমাদিগকে স্তব করিয়াছিলেন। আমরা তাঁহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া এক পিষ্টক দিয়াছিলাম; কিন্তু তিনি গুরুর আদেশ না লইয়া তাহা উপযোগ করেন; অতএব তোমার উপাধ্যায় যেরূপ করিয়াছিলেন, তুমিও সেইরূপ কর।” এইরূপ অভিহিত হইয়া উপমন্যু কহিলেন, “আপনাদিগকে অনুনয় করিতেছি, আমি গুরুকে নিবেদন না করিয়া অপূপভক্ষণ করিতে পারিব না।” অশ্বিনীকুমার কহিলেন, “তোমার এই প্রকার অসাধারণ গুরুভক্তি দর্শনে আমরা অতিশয় প্রসন্ন হইলাম, তোমার উপাধ্যায়ের সন্ত-সকল লৌহময়, তোমারও হিরণ্ময় হইবে এবং তুমি চক্ষু ও শ্রেয়োলাভ করিবে।” উপমন্যু অশ্বিনীকুমারের বরদান-প্রভাবে পূর্ব্ববৎ চক্ষুরত্ন লাভ করিয়া গুরু-সন্নিধানে গমন ও অভিবাদনপূর্ব্বক আদ্যোপান্ত সমুদয় বৃত্তান্ত নিবেদন করিলেন। তিনি শুনিয়া অত্যন্ত প্রীত হইলেন এবং কহিলেন, “অশ্বিনীতনয়েরা যেরূপ কহিয়াছেন, তুমিও সেইরূপ মঙ্গললাভ করিবে, সকল বেদ ও সকল ধর্ম্মশাস্ত্র সর্ব্বকাল তোমার স্মৃতিপথে থাকিবে।” উপমন্যুর এই পরীক্ষা হইল।
বেদ ঋষি-উতঙ্ক-বৃত্তান্ত
আয়োধধৌম্যের বেদ নামে অপর একটি শিষ্য ছিলেন। একদা উপাধ্যায় তাঁহাকে আদেশ করিলেন, “বৎস বেদ, তুমি আমার গৃহে থাকিয়া কিছুকাল শুশ্রূষা কর, তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে।” বেদ তদীয় বাক্য শিরোধারণপূর্ব্বক গুরুশুশ্রূষায় রত হইয়া বহুকাল গুরুগৃহে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। গুরু যখন যাহা নিয়োগ করিতেন, তিনি শীত, উত্তাপ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা প্রভৃতি অশেষ ক্লেশ গণনা না করিয়া ভক্তি ও শ্রদ্ধাসহকারে তৎক্ষণাৎ তাহা অনুষ্ঠান করিতেন; কখন কোন বিষয়ে অবহেলা করিতেন না। এইরূপে বহুকাল অতীত হইলে উপাধ্যায় তাঁহার প্রতি অতি প্রীত ও প্রসন্ন হইলেন। তখন বেদ গুরুর প্রসাদে শ্রেয়ঃ ও সর্ব্বজ্ঞতা লাভ করিলেন। বেদের এই পরীক্ষা হইল।
অনন্তর বেদ উপাধ্যায়ের অনুমতিক্রমে গুরুকুল হইলে প্রত্যাগত হইয়া গৃহস্থাশ্রমে প্রবেশ করিলেন। ঐ আশ্রমে অবস্থানকালে তাঁহারও তিনটি শিষ্য হইল। বেদ শিষ্যদিগকে কোন কর্ম্মে নিয়োগ বা আত্মশুশ্রূষা করিতে আদেশ করিতেন না। কারণ, গুরুকুলবাসের দুঃখ তাঁহার মনোমধ্যে সতত জাগরূক ছিল। এই নিমিত্ত তিনি শিষ্যগণকে ক্লেশ দিতে পরাঙ্মুখ হইলেন।
কিয়ৎকাল পরে রাজা জনমেজয় ও পৌষ্য-নামক অপর এক ভূপাল বেদের নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে উপাধ্যায় রূপে বরণ করিলেন। একদা তিনি যাজনকার্য্যোপলক্ষে স্থানান্তরে প্রস্থান করিবার কালে উতঙ্ক-নামক শিষ্যকে আদেশ করিলেন, “বৎস! আমার অবস্থানকালে মদীয় গৃহে যে-কোন বিষয়ের অসদ্ভাব হইবে, তাহা তুমি তৎক্ষণাৎ সম্পন্ন করিবে।” উতঙ্ককে এইরূপ আদেশ দিয়া বেদ প্রবাসে গমন করিলেন। উতঙ্ক গুরুকুলে বাস করিয়া গুরুর অনুজ্ঞা পালন করিতে লাগিলেন।
একদিন উপাধ্যায়পত্নীরা উতঙ্ককে আহ্বান করিয়া কহিলেন, “তোমার উপাধ্যায়ানী ঋতুমতী হইয়াছেন। এ সময় তোমার গুরু গৃহে নাই। যাহাতে তাঁহার ঋতু ফলহীন না হয়, তুমি তাহা কর, কাল অতিক্রান্ত হইয়াছে।” উতঙ্ক এতাদৃশ অসঙ্গত কথা শুনিয়া কহিলেন, “আমি স্ত্রীলোকের কথায় এরূপ কুকর্ম্মে কদাচ প্রবৃত্ত হইতে পারি না এবং গুরু আমাকে অন্যায় আচরণ করিতে কহিয়া যান নাই।” কিয়ৎকাল পরে উপাধ্যায় প্রবাস হইতে গৃহে আগমন করিয়া উতঙ্কের সুচরিত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিয়া অত্যন্ত প্রসন্ন হইলেন এবং তাহাকে কহিলেন, “বৎস উতঙ্ক! তোমার কি প্রিয়কার্য্য অনুষ্ঠান করিব, বল? তুমি ধর্ম্মতঃ আমার শুশ্রূষা করিয়াছ, তাহাতে আমি অতিশয় সন্তুষ্ট হইয়াছি অতএব এক্ষণে তোমাকে অনুজ্ঞা করিতেছি, তোমার সকল মনোরথ সফল হউক; গমন কর।” গুরু কর্ত্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া উতঙ্ক কহিলেন, “ভগবন্! আমি দক্ষিণা দিতে প্রার্থনা করি। কারণ, এইরূপ শ্রুতি আছে যে, যিনি দক্ষিণা গ্রহণ না করিয়া শিক্ষাদান করেন ও যে ব্যক্তি দক্ষিণা না দিয়া অধ্যয়ন করে, তাহাদের মধ্যে একজন মৃত্যু বা বিদ্বেষ প্রাপ্ত হয়। অনুমতি করিলে আপনার ইচ্ছানুরূপ দক্ষিণা আহরণ করি।” উপাধ্যায় কহিলেন, “বৎস উতঙ্ক! অবসর ক্রমে আদেশ করিব।” উতঙ্ক আর একদিন গুরুকে নিবেদন করিলেন, “মহাশয়, আজ্ঞা করুন, কিরূপ দক্ষিণা আপনার অভিমত, তাহা আহরণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে।” তাহা শুনিয়া উপাধ্যায় কহিলেন, “বৎস উতঙ্ক! গুরুদক্ষিণা আহরণ করিবে বলিয়া আমাকে বারংবার জিজ্ঞাসা করিয়া থাক, অতত্রব তোমার উপাধ্যায়ানীকে বল, তাঁহার যাহা অভিরুচি, সেইরূপ গুরুদক্ষিণা আহরণ কর।” উতঙ্ক উপাধ্যায়ের উপদেশক্রমে গুরু-পত্নী সমীপে গমনপূর্ব্বক কহিলেন, “মাতঃ! গৃহে যাইতে উপাধ্যায় আমাকে অনুমতি করিয়াছেন, এক্ষণে আপনার অভিলষিত গুরুদক্ষিণা দিয়া ঋণমুক্ত হইতে বাসনা করি। বলুন, কি দক্ষিণা আপনার অভিপ্রেত?” উপাধ্যায়ানী কহিলেন, “বৎস! পৌষ্যরাজের ধর্ম্মপত্নী যে কুণ্ডলদ্বয় ধারণ করিয়া আছেন, তাহা আনয়ন করিয়া আমাকে প্রদান কর। আগামী চতুর্থ দিবসে এক ব্রত উপলক্ষে মহা সমারোহ হইবে, সেইদিন ঐ দুই কুণ্ডল ধারণ করিয়া নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণদিগের পরিবেশন করিব; অতএব তুমি সত্বর গমন কর, ইহা করিতে পারিলে তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে, অন্যথা মঙ্গল হওয়া সুকঠিন।”
উতঙ্ক এইরূপ অভিহিত হইয়া প্রস্থান করিলেন। গমন করিতে করিতে পথিমধ্যে অতি বৃহৎ এক বৃষ দেখিলেন। ঐ বৃষে বৃহৎকায় এক পুরুষ আরোহণ করিয়াছিলেন। তিনি উতঙ্ককে আহ্বান করিয়া কহিলেন, “ওহে উতঙ্ক! তুমি এই বৃষের পুরীষ ভক্ষণ কর।” উতঙ্ক তাহাতে অসম্মত হইলেন। তখন ঐ পুরুষ পুনর্ব্বার তাঁহাকে কহিলেন, “উতঙ্ক! তুমি মনোমধ্যে কোনপ্রকার বিচার না করিয়া এই বৃষের পুরীষ ভক্ষণ কর, পূর্ব্বে তোমার উপধ্যায় ইহার পুরীষ ভক্ষণ করিয়াছিলেন।” তখন উতঙ্ক ঐ কথায় স্বীকার করিয়া সেই বৃষের মূত্র ও পুরীষ ভক্ষণ করিলেন। অনন্তর সত্বর আচমন করিতে করিতে সসম্ভ্রমে প্রস্থান করিলেন এবং আসনাসীন পৌষ্যের সন্নিধানে গমন করিয়া আশীর্ব্বাদ-প্রয়োগ-পুরঃসর কহিলেন, “মহারাজ! আমি অর্থিভাবে আপনার নিকট অভ্যাগত হইয়াছি।” রাজা তাঁহাকে অভিবাদন করিয়া কহিলেন, “ভগবন্! এই কিঙ্কর আপনার কি উপকার করিবে, বলুন। “উতঙ্ক কহিলেন, “মহারাজ! আপনার মহিষী যে কুণ্ডলদ্বয় ধারণ করেন, গুরুদক্ষিণা-প্রদান-বাসনায় আপনার নিকট আমি তাহা প্রার্থনা করিতে আসিয়াছি।” পৌষ্য কহিলেন, “মহাশয়! অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া আমার সহধর্ম্মিণীর নিকট উহা যাচ্ঞা করুন।” উতঙ্ক তাঁহার আদেশানুসারে অন্তঃপুরে গমন করিয়া রাজ-মহিষীকে দেখিতে পাইলেন না। তখন তিনি পুনর্ব্বার পৌষ্যের নিকট আসিয়া কহিলেন, “মহারাজ। আমার প্রতি এরূপ মিথ্যা আচরণ করা আপনার উচিত হয় নাই। অনেক অনুসন্ধান করিলাম, কিন্তু অন্তঃপুরে আপনার মহিষীকে দেখিতে পাইলাম না।” পৌষ্য ক্ষণকাল বিবেচনা করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, “মহাশয়! বোধ হয়, আপনি অশুচি আছেন, মনে করিয়া দেখুন। আমার গৃহিণী অতি পতিব্রতা, অপবিত্র থাকিলে কেহই তাঁহার সন্দর্শন পায় না।” এইরূপ অভিহিত হইলে উতঙ্ক সমুদয় স্মরণ করিয়া কহিলেন, “আমি বৃষ-পুরীষ ভক্ষণান্তর সত্বরে উত্থিত হইয়া গমনকালে আচমন করিয়াছিলাম।” পৌষ্য প্রত্যুত্তর করিলেন, “মহাশয়! আপনার ইহাই ব্যাতিক্রম হইয়াছে। উত্থানাবস্থায় ও গমনকালে আচমন করা আর না করা উভয়ই তুল্য।” তখন উতঙ্ক প্রাঙ্মুখে উপবেশন এবং করচরণ ও বদন প্রক্ষালন পূর্ব্বক নিঃশব্দ, অফেন, অনুষ্ণ ও হৃদয়দেশ পর্য্যন্ত গমন করিতে পারে, এইরূপ পরিমাণে জল তিনবার আচমনপূর্ব্বক অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন এবং রাজমহিষীকে দেখিতে পাইলেন। রাজমহিষী তাঁহার দর্শনমাত্রে সত্বরে উত্থিত হইয়া অভিবাদন করিলেন এবং স্বাগত জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন, “ভগবন্! এ কিঙ্করী আপনার কি করিবে, আজ্ঞা করুন?” উতঙ্ক কহিলেন, “গুরুদক্ষিণা প্রদান করিবার নিমিত্ত তোমার নিকট কুণ্ডলদ্বয় ভিক্ষা করিতে আসিয়াছি, আমাকে তাহা দান কর।” রাজমহিষী তাঁহার তাদৃশ প্রার্থনায় প্রীতা ও প্রসন্না হইয়া সৎপাত্র বোধে তৎক্ষণাৎ কর্ণ হইতে উন্মোচনপূর্ব্বক কুণ্ডলদ্বয় তাঁহার হস্তে সমর্পণ করিলেন এবং কহিলেন, “নাগরাজ তক্ষক আগ্রহাতিশয়সহকারে ইহা প্রার্থনা করেন। অতত্রব সাবধান হইয়া লইয়া যাউন।” উতঙ্ক কহিলেন, “তুমি কোনরূপ আশঙ্কা করিও না। নিশ্চয় কহিতেছি, তক্ষক আমার কিছুই করিতে পারিবে না।”
উতঙ্ক ইহা কহিয়া সমুচিত সংবর্দ্ধনাপূর্ব্বক তাঁহার নিকট বিদায় লইয়া পৌষ্য-সকাশে গমন করিলেন এবং কহিলেন, “মহারাজ! অভিলষিত-ফললাভে আমি অতিশয় প্রীত হইয়াছি। “অনন্তর পৌষ্য কহিলেন, “ভগবন্! সকল সময় সুপাত্র-সমাগম হয় না। আপনি গুণবান্ অতিথি উপস্থিত হইয়াছেন। ইচ্ছা হয়, আতিথ্য করি, অতএব কাল-নির্দ্দেশ করুন।” উতঙ্ক প্রত্যুত্তর করিলেন, “আমি এক্ষণেই প্রস্তুত আছি, আপনি অন্ন আনয়ন করুন।” রাজা তদীয় আদেশানুসারে অন্ন উপস্থিত করিয়া তাঁহাকে উপযোগ করিতে দিলেন। তিনি তাহা শীতল ও কেশসংস্পর্শে অশুচি দেখিয়া কহিলেন, “তুমি আমাকে দূষিত অন্ন ভোজন করিতে দিয়াছ, অতএব অন্ধ হইবে।” পৌষ্য এইরূপ অভিশাপ শ্রবণ করিয়া কহিলেন, “তুমি অদূষিত অন্নে দোষারোপ করিলে, অতএব তোমারও বংশলোপ হইবে।” তখন উতঙ্ক কহিলেন, “দেখ তুমি অশুচি অন্ন ভোজন করিতে দিয়া পুনর্ব্বার প্রতিশাপ প্রদান করিতেছ, ইহা তোমার সমুচিত কর্ম্ম হইল না, বরং তুমি অন্নের দোষ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ কর।” পৌষ্য অন্নের অশুচিত্ব স্পষ্টই দেখিতে পাইলেন। পরে উতঙ্ককে বিনয়বাক্যে কহিলেন, “ভগবন্! আমি সবিশেষ না জানিতে পারিয়া এই অশুচি অন্ন আহরণ করিয়াছিলাম, এক্ষণে আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। আপনি প্রসন্ন হইয়া যাহাতে আমি অন্ধ না হই, এইরূপ অনুগ্রহ করুন।”
তখন উতঙ্ক প্রত্যুত্তর করিলেন, “দেখ, আমার বাক্য মিথ্যা হইবার নহে, সুতরাং একবার অন্ধ ও অনতিবিলম্বে চক্ষুষ্মান্ হইবে, সন্দেহ নাই। কিন্তু তুমি যে শাপ দিয়াছ, তাহা হইতে আমাকে মুক্ত কর।” পৌষ্য কহিলেন, “এখনও আমার ক্রোধের উপশম হয় নাই; অতএব শাপ প্রতিসংহার করিতে পারি না। আর আপনি কি জানেন না যে, ব্রাহ্মণের হৃদয় নবনীতের ন্যায় সুকোমল ও বাক্য খরধার ক্ষুরের ন্যায় নিতান্ত তীক্ষ্ম; ক্ষৎত্রিয়দিগের উভয়ই বিপরীত অর্থাৎ তাহাদিগের বাক্য নবনীতবৎ কোমল ও হৃদয় ক্ষুরধার-তুল্য সুতীক্ষ্ম; সুতরাং আমি স্বভাবসুলভ তীক্ষ্মভাব-প্রযুক্ত এক্ষণে প্রদত্ত শাপের অন্যথা করিতে পারি না।” উতঙ্ক কহিলেন, “আমি অদূষিত অন্নে দোষারোপ করিয়া তোমাকে অভিসম্পাত করিয়াছি, এই ভাবিয়া তুমি আমাকে প্রতিশাপ প্রদান করিয়াছিলে। এক্ষণে অন্নের দোষ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়া অনুনয়-বিনয় পূর্ব্বক আমাকে প্রসন্ন করিলে এবং শাপ বিমোচন করিয়া লইলে; কিন্তু তুমি যে শাপ দিয়াছ, তাহা মোচন করিতে চাহিতেছ না। এই প্রবঞ্চনা-প্রযুক্ত সে শাপ আমাকে লাগিবে না; আমি চলিলাম।” এই বলিয়া কুণ্ডলদ্বয় গ্রহণপূর্ব্বক সে স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।
পথিমধ্যে দেখিলেন, এক নগ্ন ক্ষপণক [বৌদ্ধ ভিক্ষুক-ন্যাঙটা ভিখারী] আসিতেছে; কিন্তু সে মধ্যে মধ্যে অদৃশ্য হইতেছে। উতঙ্ক সেই সময়ে পৌষ্য-মহিষীদত্ত কুণ্ডলদ্বয় ভূতলে রাখিয়া স্নানতর্পণাদির নিমিত্ত সরোবরে গমন করিলেন। ইত্যবসরে-ক্ষপণক নিঃশব্দ পদসঞ্চারে সত্বর তথায় আগমন ও কুণ্ডলদ্বয় অপহরণ করিয়া পলায়ন করিল। উতঙ্ক স্নানাহ্নিক-সমাপনানন্তর অতি পূতমনে দেবতা ও গুরুকে প্রণাম করিয়া প্রবলবেগে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। তিনি সেই ক্ষপণকের সন্নিকৃষ্ট হইবামাত্র সে ক্ষপণকরূপ পরিহারপূর্ব্বক তক্ষকরূপ পরিগ্রহ করিল এবং অকস্মাৎ ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ হইয়া তাহার সম্মুখে এক মহাগর্ত্ত সমুৎপন্ন হইল। তক্ষক সেই মহাগর্ত্ত দিয়া নাগলোকস্থ স্বীয়ভবনে গমন করিলেন। তখন উতঙ্ক পৌষ্য-মহিষীর কথা স্মরণ করিয়া প্রাণপণে তক্ষকের অনুসরণে যত্নবান হইলেন এবং প্রবেশদ্বার বিস্তার করিবার নিমিত্ত দণ্ডকাষ্ঠ দ্বারা খনন করিতে লাগিলেন; কিন্তু তাহাতে কৃতকার্য্য হইতে পারিলেন না। দেবরাজ ইন্দ্র তাঁহাকে কষ্টভোগ করিতে দেখিয়া স্বীয় বজ্রাস্ত্রকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “বজ্র! তুমি যাইয়া এই ব্রাহ্মণের সাহায্য কর।” বজ্র প্রভুর আদেশক্রমে তদ্দণ্ডে দণ্ডকাষ্ঠে অনুপ্রবিষ্ট হইয়া গর্ত্তদ্বার বিস্তীর্ণ করিল। উতঙ্ক তদ্দ্বারা রসাতলে প্রবেশ করিলেন। তিনি এইরূপে নাগলোকে প্রবেশ করিয়া বহুবিধ প্রাসাদ, হর্ম্ম্য, বলভী ও নানাবিধ ক্রীড়াকৌতুকের রমণীয় স্থান অবলোকন করিলেন এবং বক্ষ্যমাণ প্রকারে নাগগণের স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন।
“ঐরাবত যে-সকল সর্পের অধিরাজ এবং যাঁহারা যুদ্ধে অতিশয় শোভমান, সৌদামিনী সহকৃত পবনচালিত মেঘমালার ন্যায় বেগবান্ সেই সকল সর্পদিগকে স্তব করি। ঐরাবত সম্ভূত অন্যান্য সুরূপ ও বহুরূপ বিচিত্র কুণ্ডলধারী সর্প, যাঁহারা প্রচণ্ড দিবাকরের ন্যায় অমরলোকে নিরবচ্ছিন্ন বিরাজমান আছেন এবং ভাগীরথীর উত্তর তীরে যে-সকল নাগের বাসস্থান আছে, সেই সকল সুমহৎ পন্নগদিগকেও স্তব করি। ঐরাবত ব্যতিরেকে আর কে সূর্য্যকিরণে বিচরণ করিতে পারে? যখন ধৃতরাষ্ট্র সর্প গমন করেন, তৎকালে বিংশতিসহস্র অষ্টশত অশীতি সর্প তাঁহার অনুসরণ করেন। যাঁহারা ধৃতরাষ্ট্রের সমভিব্যাহারে গমন করেন ও যাঁহারা অতিদূরে বাস করেন, সেই সমস্ত ঐরাবতের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাদিগকে নমস্কার করি। পূর্ব্বে খাণ্ডবপ্রস্থে ও কুরুক্ষেত্রে যাঁহার বাসস্থান ছিল, কুণ্ডলের নিমিত্ত সেই নাগরাজ তক্ষককে স্তব করি। তক্ষক ও অশ্বসেন এই উভয়ে নিত্যকাল সহচর হইয়া স্রোতস্বতী ইক্ষুমতীতীরে সতত বাস করিতেন। মহাত্মা তক্ষকের কনিষ্ঠ পুৎত্র শ্রুতসেন, যিনি সর্ব্বনাগের আধিপত্য লাভ করিবার প্রত্যাশায় কুরুক্ষেত্রে বাস করিয়াছিলেন, তাঁহাকেও নমস্কার করি।”
উতঙ্ক এইরূপে সর্পদিগকে স্তব করিয়াও যখন কুণ্ডলদ্বয় লাভ করিতে পারিলেন না, তখন অত্যন্ত চিন্তিত হইলেন এবং ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলেন, দুইটি স্ত্রীলোক সুচারু বাপদণ্ডযুক্ত তন্ত্রে [তাঁতে] বস্ত্র বয়ন করিতেছে। সেই তন্ত্রের সুত্রসকল শুক্ল ও কৃষ্ণবর্ণ এবং দেখিলেন, দ্বাদশ অর-যুক্ত একখানি চক্র ছয়টি শিশু কর্ত্তৃক পরিবর্ত্তিত হইতেছে। আর একজন পুরুষ ও অতি মনোহর একটি অশ্ব নিরীক্ষণ করিলেন। এইরূপ অবলোকন করিয়া তিনি তাঁহাদিগকেও স্তব করিতে লাগিলেন।
“সতত ভ্রাম্যমাণ চতুর্ব্বিংশতি পর্ব্বযুক্ত এই চক্রে তিনশত ষষ্টি তন্তু সমর্পিত আছে। ইহাকে ছয় জন কুমার পরিবর্ত্তিত করিতেছে। বিশ্বরূপ দুই যুবতী শুক্ল ও কৃষ্ণ সূত্র দ্বারা এই তন্ত্রে বস্ত্র বয়ন করিতেছেন। এই দুই যুবতী সমস্ত প্রাণী ও চতুর্দ্দশ ভুবন উৎপাদন করেন। নিখিল ভুবনের রক্ষাকর্ত্তা, বৃত্রাসুর ও নমুচির হন্তা, বজ্রধর ইন্দ্র, যিনি সেই কৃষ্ণবর্ণ বসনযুগল পরিধান করিয়া ত্রিলোকে সত্য-মিথ্যা উভয়ই বিচার করেন, সেই ত্রিলোকীনাথ পুরন্দরকে নমস্কার করি।”
অনন্তর সেই পুরুষ উতঙ্ককে কহিলেন, “তোমার এইরূপ স্তবে আমি অতিশয় র্প্রীত হইলাম, এক্ষণে কি উপকার করিব, বল?” উতঙ্ক কহিলেন, “ভগবন্! এই করুন, যেন সমস্ত নাগগণ আমার বশবর্ত্তী হয়।” তখন সেই পুরুষ কহিলেন, “ভাল, তুমি এই অশ্বের অপান [গুহ্যদেশ]-দেশে ফুৎকার প্রদান কর।” তদীয় বাক্যানুসারে উতঙ্ক অশ্বের অপানদেশে ফুৎকার প্রদান করিলে তাহার শরীর প্রধূমিত হইয়া উঠিল এবং ইন্দ্রিয়রন্ধ্র হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সকল নির্গত হইতে লাগিল। তদ্দ্বারা নাগলোক সাতিশয় সন্তপ্ত হইলে পর তক্ষক অগ্ন্যুৎপাতভয়ে ভীত ও ব্যাকুলিত হইয়া কুণ্ডলদ্বয়ের সহিত স্বীয় বাসভবন হইতে সহসা নিষ্ক্রান্ত হইলেন এবং উতঙ্ক-সমীপে আসিয়া কহিলেন, “আপনার এই কুণ্ডলদ্বয় গ্রহণ করুন।” উতঙ্ক কুণ্ডল লইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, “অদ্য ব্রতোপলক্ষে মহাসমারোহ হইবে, কিন্তু আমি অতিদূরে রহিলাম, অতএব এক্ষণে কিরূপে উপাধ্যায়ানীর মনোরথ সম্পূর্ণ হইবে?” পরে সেই পুরুষ উতঙ্ককে চিন্তাকুল দেখিয়া কহিলেন, “উতঙ্ক! তুমি আমার এই অশ্বে আরোহণ কর, অনতিবিলম্বেই গুরুকুলে উপস্থিত হইতে পারিবে। উতঙ্ক তাঁহার আদেশানুসারে অশ্বে অধিরূঢ় হইয়া ক্ষণকালমধ্যে গুরুগৃহে প্রত্যাগমন করিলেন। তৎকালে তাঁহার উপাধ্যায়ানী স্নানপূজাদি সমাপনানন্তর কেশবিন্যাস করিতেছিলেন, তিনি উতঙ্কের বিলম্ব দেখিয়া অভিসম্পাত করিবার উপক্রম করিতেছেন, এমন সময়ে উতঙ্ক গুরুগৃহে প্রবেশপূর্ব্বক উপাধ্যায়ানীকে অভিবাদন করিয়া কুণ্ডল দিলেন। তিনি তাহা গ্রহণ করিয়া কহিলেন, “বৎস উতঙ্ক! ভাল আছ ত’? বৎস! তুমি ভাল সময়ে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছ। আমি এখনই অকারণে তোমাকে শাপ দিলাম, ভাগ্যে দিই নাই। এক্ষণে আশীর্ব্বাদ করি, তুমি চিরকাল কুশলে থাক।”
অনন্তর উতঙ্ক গুরুপত্নী সন্নিধানে বিদায় গ্রহণ করিয়া উপাধ্যায়ের নিকট উপস্থিত হইয়া প্রণাম করিলেন। উপাধ্যায় তাঁহাকে প্রত্যাগত দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “বৎস! ভাল আছ ত’? এত বিলম্ব হইল কেন?” উতঙ্ক প্রত্যুত্তর কহিলেন, “ভগবন্! নাগরাজ তক্ষক কুণ্ডলাহরণবিষয়ে অতিশয় বিঘ্ন করিয়াছিলেন, এই নিমিত্ত আমি নাগলোকে গমন করিয়াছিলাম। তথায় দেখিলাম, দুইটি স্ত্রীলোক কৃষ্ণ ও শুক্লবর্ণ সূত্র তন্ত্রে আরোপণ করিয়া বস্ত্র বয়ন করিতেছেন, তাহা কি? ছয়টি কুমার দ্বাদশ অরসংযুক্ত একখানি চক্র নিয়ত পরিবর্ত্তিত করিতেছে, তাহাই বা কি? এবং তথায় এক পুরুষ ও এক বৃহৎকায় অশ্ব দেখিলাম, তাহাই বা কি? আর পথিমধ্যে গমন করিতে করিতে এক বৃষ দেখিলাম, ঐ বৃষে এক পুরুষ আরোহণ করিয়া আছেন, তিনি আমাকে বৃষের পুরীষ ভক্ষণ করিতে অনুরোধ করিলেন এবং কহিলেন, ‘পূর্ব্বে তোমার উপাধ্যায় এই বৃষের পুরীষ ভক্ষণ করিয়াছিলেন।’ পরে তাঁহার নির্দ্দেশক্রমে আমি সেই বৃষের পুরীষ উপযোগ করিলাম, ঐ বৃষ ও বৃষাধিরূঢ় পুরুষই বা কে। আপনি অনুগ্রহ করিয়া এই সমস্ত বর্ণনা করুন, আমি শ্রবণ করিতে অভিলাষ করি।”
উতঙ্কের প্রার্থনায় উপাধ্যায় কহিলেন, “বৎস! তুমি যে দুইটি স্ত্রীলোক দেখিয়াছ, তাঁহারা পরমাত্মা ও জীবাত্মা। দ্বাদশ অর-সংযুক্ত যে চক্র দেখিয়াছ, উহা সংবৎসর। শুক্ল ও কৃষ্ণবর্ণ যে-সকল তন্তু দেখিয়াছিলে, উহা দিবা রাত্রি। ছয়টি কুমার ছয় ঋতু। যে পুরুষ দেখিয়াছ, তিনি পর্জ্জন্য। আর অশ্বটি অগ্নি। পথিমধ্যে যে বৃষভ দেখিয়াছিলে, তিনি নাগরাজ ঐরাবত। আর ঐ অশ্বে যে পুরুষ আরোহণ করিয়াছিলেন, তিনি দেবরাজ ইন্দ্র। যে পুরীষ ভক্ষণ করিয়াছ, তাহা অমৃত। বৎস! সেই অমৃত ভক্ষণ করিয়াছিলে বলিয়াই নাগলোকে পরিত্রাণ পাইয়াছ। ভগবন্ ইন্দ্র আমার সখা, তিনি কৃপারসপরবশ হইয়া তোমাকে রক্ষা করিয়াছেন, নতুবা নাগলোক হইতে কুণ্ডল লইয়া আগমন করা দুষ্কর হইত। বৎস! এক্ষণে আমি তোমাকে অনুমতি করিতেছি, গৃহে গমন কর এবং তোমার শ্রেয়োলাভ হউক।”
জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞ প্ররোচনা
উতঙ্ক উপাধ্যায়ের অনুজ্ঞালাভানন্তর তক্ষকের প্রতি জাতক্রোধ হইয়া তাহার প্রতীকার-সঙ্কল্পে হস্তিনাপুরে প্রস্থান করিলেন এবং অনতিকালবিলম্বে তথায় উপস্থিত হইয়া রাজা জনমেজয়ের সহিত সমাগত হইলেন। তৎকালে মহারাজ জনমেজয় অমাত্যগণে পরিবৃত হইয়া বসিয়া ছিলেন। উতঙ্ক অবসর বুঝিয়া রাজা জনমেজয়কে যথাবিধি আশীর্ব্বাদবিধানপূর্ব্বক কহিলেন, “মহারাজ! প্রকৃত কার্য্যে অনাস্থা করিয়া বালকের ন্যায় সামান্য কার্য্যে ব্যাপৃত রহিয়াছেন।”
জনমেজয় তাঁহাকে যথোচিত সৎকার করিয়া কহিলেন, “হে দ্বিজোত্তম! আমি সুতনির্ব্বিশেষে প্রজাপালন করিয়া ক্ষৎত্রিয়ধর্ম্ম প্রতিপালন করিতেছি, এক্ষণে আপনি কি নিমিত্ত আগমন করিয়াছেন, আজ্ঞা করুন।” উতঙ্ক কহিলেন, “মহারাজ! আমি যে কার্য্যের নিমিত্ত আগমন করিয়াছি, উহা আপনারই কর্ত্তব্য কর্ম্ম। দুরাত্মা তক্ষক আপনার পিতার প্রাণ হিংসা করিয়াছিল, এক্ষণে তাহার প্রতিবিধান করুন। ঐ অবশ্যকর্ত্তব্য কর্ম্মের অনুষ্ঠানকাল উপস্থিত হইয়াছে; অতএব হে মহারাজ! আপনার পিতৃবৈরী তক্ষককে সমুচিত প্রতিফল প্রদান করুন। সেই দুরাত্মা বিনা দোষে আপনার পিতাকে দংশন করিয়াছিল, তাহাতেই তিনি বজ্রহত বৃক্ষের ন্যায় ভূতলে পতিত ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয়েন। বলদৃপ্ত পন্নগাধম তক্ষক বিনা অপরাধে আপনার পিতার প্রাণসংহার করিয়া কি দুষ্কর্ম্ম করিয়াছে, একবার স্থিরচিত্তে ভাবিয়া দেখুন। কাশ্যপ বিষ চিকিৎসা দ্বারা রাজর্ষিবংশরক্ষক দেবতানুভব মহারাজ পরীক্ষিতের প্রাণরক্ষা করিতে আসিতেছিলেন, পথিমধ্যে পাপাধম তক্ষক পরিচয় পাইয়া তাঁহাকে নিবৃত্ত করে। অতএব মহারাজ! অবিলম্বে সর্পসত্রের অনুষ্ঠান করিয়া ঐ পাপাত্মাকে প্রদীপ্ত হুতাশনে আহুতি প্রদান করুন, তাহা হইলে আপনার পিতার বৈরনির্যাতন এবং আমারও অভীষ্টসাধন হইবে সন্দেহ নাই। মহারাজ! আমি গুরুদক্ষিণা আহরণ করিতে গিয়াছিলাম, ঐ পাপিষ্ঠ পথিমধ্যে আমার যথেষ্ট বিঘ্ন অনুষ্ঠান করিয়াছিল।”
রাজা জনমেজয় তাহা শ্রবণ করিয়া তক্ষকের প্রতি অত্যন্ত কোপাবিষ্ট হইলেন। যেমন ঘৃত-সংযোগে অগ্নি প্রজ্বলিত হইয়া উঠে, উতঙ্কের বাক্যে রাজার রোষানলও সেইরূপ উদ্দীপ্ত হইয়া উঠিল। তখন রাজা জনমেজয় অতিশয় দুঃখিত হইয়া উতঙ্ক-সমক্ষে পিতার স্বর্গপ্রাপ্তির নিমিত্ত স্বীয় অমাত্যবর্গকে বারংবার জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন এবং উতঙ্কমুখে পিতৃবধবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া অবধি শোকে ও দুঃখে নিতান্ত আক্রান্ত ও একান্ত অভিভূত হইলেন।
পৌষ্যপর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।
পৌলোম-পর্ব্ব
সৌতি কহিলেন, নৈমিষারণ্যে কুলপতি শৌনকের দ্বাদশবর্ষব্যাপী যজ্ঞে যে-সকল মহর্ষিগণ সমাগত হইয়াছিলেন, সূত বংশ-সম্ভূত লোমহর্ষণাত্মজ উগ্রশ্রবাঃ পুরাণপাঠ দ্বারা তাঁহাদিগের শুশ্রূষা করিতেছিলে। উগ্রশ্রবাঃ কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহাদিগকে নিবেদন করিলেন, “হে মহর্ষিগণ! উতঙ্কচরিত আদ্যোপান্ত কহিলাম, এক্ষণে আপনারা আর কি শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করেন, আজ্ঞা করুন।”
মুনিগণ কহিলেন, হে লোমহর্ষণনন্দন! আমরা প্রসঙ্গক্রমে তোমাকে যখন যে কথা জিজ্ঞাসা করিব, তুমি সেই সমুদয় বর্ণনা করিও। কিন্তু কুলপতি শৌনক এক্ষণে অগ্নিশরণে [অগ্নিগৃহ– যে গৃহে সর্ব্বদা যজ্ঞাগ্নি থাকে।] অবস্থিতি করিতেছেন, তিনি সুরাসুর-মনুষ্য-সর্প-গন্ধবর্বাদিঘটিত বিচিত্র অলৌকিক বৃত্তান্ত জানেন; বিদ্বান্, কর্ম্মদক্ষ, ব্রতপরায়ণ, বেদবেদান্তশাস্ত্রে পারদর্শী, সত্যবাদী, শান্তিগুণাবলম্বী তপোনিরত সেই মহর্ষি আমাদিগের সকলেরই মান্য, তাঁহার অপেক্ষা কর। তিনি পরমার্চ্চিত আসনে অধ্যাসীন হইয়া যে যে কথা জিজ্ঞাসা করিবেন, তাহাই কহিবে।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, “ভাল, সেই মহর্ষি আসনে উপবিষ্ট হইয়া জিজ্ঞাসিলেই বিবিধ পবিত্র কথা বলিব।” ক্ষণকাল পরে বিপ্রশ্রেষ্ঠ শৌনকঋষি দেবযজ্ঞ ও পিতৃতর্পণ প্রভৃতি ক্রিয়াকলাপ বিধিপূর্ব্বক সমাপ্ত করিয়া, যেস্থানে উগ্রশ্রবাঃ ও ব্রতপরায়ণ সিদ্ধ ব্রহ্মর্ষিগণ সুখাসীন আছেন, সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। পরে ঋত্বিক্ ও সদস্যগণ উপবিষ্ট হইলে স্বয়ং আসন পরিগ্রহ করিয়া এই কথা প্রস্তাব করিলেন।

ভূগুবংশ-চ্যবনোৎপত্তি
শৌনক কহিলেন, বৎস সূতনন্দন! তোমার পিতা মহর্ষি বেদব্যাসের নিকট সমস্ত পুরাণ অধ্যয়ন করিয়াছিলেন, তুমিও সেই সমুদয় অধ্যয়ন করিয়াছ। তোমার পিতার মুখে শ্রবণ করিয়াছি, পুরাণে অলৌকিক কথা-সকল ও আদিবংশ-বৃত্তান্ত-সকল বর্ণিত আছে, তন্মধ্যে প্রথমতঃ ভূগুবংশের বৃত্তান্তশ্রবণ করিতে ইচ্ছা করি, বর্ণনা কর।
মহর্ষি শৌনকের আজ্ঞালাভানন্তর সূতনন্দন উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দ্বিজাগ্রণী মহাত্মা বৈশম্পায়ন প্রভৃতি যাহা সম্যক্রূপে অধ্যয়ন ও কীর্ত্তন করিয়াছেন, আমার পিতা যাহা অধ্যয়ন করিয়াছিলেন এবং তাঁহার নিকট আমি যাহা অধ্যয়ন করিয়াছি, সেই সমস্ত বর্ণনা করিতেছি, শ্রবণ করুন।
সুবিখ্যাত ভূগুবংশ ইন্দ্রাদি দেবগণ ও অশেষ ঋষিগণের পূজনীয়। এই বংশ পুরাণে যেরূপ বর্ণিত আছে, তাহা আমি যথাবৎ বর্ণন করিতেছি। স্বয়ম্ভু ব্রহ্মা বরুণের যজ্ঞ করিতেছিলেন, আমরা শুনিয়াছি, সেই যজ্ঞাগ্নি হইতে মহর্ষি ভৃগু সমুত্থিত হয়েন। ভৃগুর পুৎত্র চ্যবন পিতার প্রিয়পাত্র ছিলেন; চ্যবনের পুৎত্র প্রমতি অতিশয় ধর্ম্মপরায়ণ ছিলেন; ঘৃতাচীর গর্ভে প্রমতির রুরু-নামক এক পুৎত্র উৎপন্ন হয়; রুরুর ঔরসে প্রমদ্বরার গর্ভে আপনার প্রপিতামহ শুনক জন্মগ্রহণ করেন। মহর্ষি শুনক বেদাধ্যয়ন-সম্পন্ন, তপোনিরত, যশস্বী, অশেষ-শাস্ত্রজ্ঞ, ব্রহ্মজ্ঞানী, সত্যবাদী ও জিতেন্দ্রিয় ছিলেন।
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! যেরূপে সেই মহাত্মা ভৃগুনন্দন চ্যবন নামে বিখ্যাত হইলেন, তাহা আমার নিকট সবিশেষ বর্ণন কর।
উদ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাত্মা ভৃগুর পুলোমানম্নী প্রিয়তমা ধর্ম্মপত্নী ছিলেন, তিনি ঐ মহর্ষির সহযোগে গর্ভিণী হয়েন। একদা ধার্ম্মিকাগ্রগণ্য মহর্ষি ভৃগু স্নানার্থ গমন করিলে পুলোমা নামে এক রাক্ষস তাঁহার আশ্রমে উপস্থিত হইল। ঐ পাপাত্মা আশ্রমে প্রবেশপূর্ব্বক ভৃগু-গৃহিণীর মনোহারিণী মূর্ত্তি দর্শনে কন্দর্পশরে জর্জ্জরিত ও মূর্চ্ছিতপ্রায় হইল। সুচারুদর্শনা পুলোমা অনায়াসলভ্য বন্যফলমূলাদি দ্বারা সেই অভ্যাগত রাক্ষসের অতিথিসৎকার করিলেন। দুর্ব্বৃত্ত রাক্ষস কুসুমশরের বিষম শরে নিতান্ত উদ্ভ্রান্তচিত্ত হইয়া “এই বরবর্ণিনীকে হরণ করিব” এইরূপ সঙ্কল্প করিবামাত্র সাতিশয় হৃষ্টমনা হইল। পুলোমা রাক্ষস পূর্ব্বে ঐ সুচারুহাসিনী কন্যাকে’ ভার্ষ্যারূপে বরণ করিয়াছিল, কিন্তু কন্যার পিতা তাহাকে না দিয়া মহাত্মা ভৃগুকে বিধিপূর্ব্বক কন্যা সম্প্রদান করেন। সে অন্যায় কার্য্যের অনুষ্ঠান তাহার মনে সর্ব্বদা জাগরূক ছিল, এক্ষণে সে অবসর পাইয়া হরণ করিতে অভিলাষ করিল।
রাক্ষস পুলোমাহরণে কৃতনিশ্চয় হইয়া অগ্নিশরণস্থ প্রজ্বলিত হুতাশন-সমীপে গমনপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিল, “হে হুতাশন! তুমি সর্ব্বদেবগণের মুখ্য। তোমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি, সত্য করিয়া বল, এই সুন্দরী কাহার ভার্গ্যা! আমি পূর্ব্বে এই কামিনীকে স্বীয় সহচারিণী করিব বলিয়া বরণ করিয়াছিলাম, কিন্তু ইহার পিতা আমাকে কন্যা দান না করিয়া ভৃগুকে সম্প্রদান করেন। অতএব যদি এই নির্জ্জন-নিবাসিনী বরবর্ণিনী ভৃগুর ভার্য্যা হয়, তবে বল, আমি আশ্রম হইতে ইহাকে অপহরণ করিব। ভৃগু যে আমার পূর্ব্বপ্রার্থিত সুরূপা রমণীর প্রাণীগ্রহণ করিয়াছে, সেই ক্রোধাগ্নিতে আমার হৃদয় অদ্যাপি দগ্ধ হইতেছে।” দুরাত্মা রাক্ষস ভৃগু-পত্নী-বিষয়ে এই রূপ সন্দিগ্ধচিত্ত হইয়া প্রজ্বলিত অগ্নিকে আমন্ত্রণ করিয়া পুনঃপুনঃ জিজ্ঞাসিতে লাগিল। পরে সম্বোধন করিয়া কহিল, “হে হুতবহ! তুমি সর্ব্বদা সর্ব্বজীবের অন্তরে পাপ-পুণ্যের সাক্ষিস্বরূপ অবস্থিতি কর, অতএব তোমাকে জিজ্ঞাসিতেছি, সত্য করিয়া বল, পাপিষ্ঠ ভৃগু আমার পূর্ব্বপ্রার্থিত ভার্য্যাকে গ্রহণ করিয়াছে, সেই কামিনী আমার হইতে পারে কি না? তোমার নিকট ইহার যথার্থ শ্রবণ করিয়া তোমার সাক্ষাতেই এই ভৃগুপত্নীকে হরণ করিব।” অগ্নি রাক্ষসের জিজ্ঞাসানন্তর একপক্ষে মিথ্যাকথন ও পক্ষান্তরে ভৃগুশাপ এই উভয় সঙ্কটে পতিত হইয়া অতিশয় ভীত হইলেন এবং মৃদুস্বরে কহিতে লাগিলেন, –হে দানব-তনয়! পূর্ব্বে তুমি ইঁহাকে বরণ করিয়াছিলে যথার্থ বটে; কিন্তু তোমার যথাবিধি বিবাহ করা হয় নাই। এই নিমিত্ত যশস্বিনী পুলোমার পিতা সৎপাত্রলাভে ইঁহাকে ভৃগুর হস্তে সমর্পণ করেন। মহাতপা ভৃগু বেদবিধিপূর্ব্বক আমার সমক্ষে ইঁহার পাণিগ্রহণ করিয়াছেন। তথাপি তুমি ইঁহাকে পূর্ব্বে বরণ করিয়াছিলে বলিয়া ইনি বিচারমতে তোমারই পত্নী হইতে পারেন। আমি মিথ্যা কহিতে পারি না, যেহেতু মিথ্যাবাদী সর্ব্বত্র অনাদরণীয় হয়।

রাক্ষস কর্ত্তৃক পুলোমা-হরণ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দুরাত্মা রাক্ষস অগ্নির সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া বরাহরূপ ধারণপূর্ব্বক ভৃগুজায়াকে অপহরণ করিয়া বায়ুবেগে পলায়ন করিতে লাগিল। তখন পুলোমার গর্ভস্থ বালক রাক্ষসের এইরূপ গর্হিত অনুষ্ঠান অবলোকনে ক্রোধান্বিত হইয়া মাতৃগর্ভ হইতে নির্গত হইলেন। তাহাতেই তাঁহার নাম চ্যবন হইল। রাক্ষসসূর্য্যের ন্যায় তেজস্বী সদ্যোজাত সেই শিশুকে অবলোকন করিবামাত্র পুলোমাকে পরিত্যাগ পূর্ব্বক ভস্মীভূত হইয়া ভূতলে পতিত হইল। অনন্তর দুঃখাভিভূতা পুলোমা ভৃগুর ঔরসপুৎত্র চ্যবনকে ক্রোড়ে লইয়া রোদন করিতে করিতে আশ্রমাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা সেই অনিন্দিতা ভৃগুপত্নীকে বাষ্পাকুলিত-লোচনা দেখিয়া সমীপে গিয়া অশেষ প্রকার প্রবোধবাক্যে তাঁহাকে সান্ত্বনা করিলেন। ভৃগুপত্নীর নয়ন-নিপতিত জলধারায় এক মহানদী প্রবাহিত হইল। পিতামহ ব্রহ্মা সেই নদীকে পুৎত্রবধূ পুলোমার অনুসরণ করিতে দেখিয়া তাহার নাম “বধূসরা” রাখিলেন।
পরে পুলোমা চ্যবনকে ক্রোড়ে লইয়া আসিতেছিলেন, ইত্যবসরে মহর্ষি ভৃগু স্নান-পূজাদি সমাপনান্তর প্রত্যাগমনপূর্ব্বক স্বীয় ধর্ম্মপত্নী ও পুৎত্রকে তদবস্থ দেখিয়া ক্রোধান্ধ হইলেন এবং সহধর্ম্মিণী পুলোমাকে সম্বোধনপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে মধুরহাসিনি! হরণেচ্ছৃ দুরাত্মা রাক্ষস তোমাকে আমার ভার্য্যা বলিয়া জানিত না, তুমি সত্য করিয়া বল, কে তাহার নিকট তোমার পরিচয় প্রদান করিল? আমি এক্ষণেই সেই পরিচয়দাতাকে শাপ প্রদান করিব। কোন্ ব্যক্তির এই দুষ্টকর্ম্মের অনুষ্ঠানে সাহস হইল? আমার শাপে ভীত না হয়, এমত লোক কে?” ভৃগু কর্ত্তৃক এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া পুলোমা কহিলেন, “ভগবন্! অগ্নি সেই রাক্ষসের সমীপে আমার পরিচয় দেন, পরে সেই পাপাত্মা রাক্ষস আমাকে রোরুদ্যমানা কুররীর [উৎক্রোশ পক্ষী –কুরল পাখী] ন্যায় অপহরণ করিল। তদনন্তর এই পুৎত্রের তেজঃপ্রভাবে সে ভস্মীভূত হইয়া ভূমিসাৎ হইয়াছে, তাহাতে আমি রক্ষা পাইলাম।” ভৃগু পুলোমার এই বাক্যশ্রবণে অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হইয়া “অদ্যাবধি তুমি সর্ব্বভক্ষ হইবে” বলিয়া অগ্নিকে শাপ প্রদান করিলেন।
পুলোমা রাক্ষস নিধন
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, ভৃগু এইরূপ শাপ প্রদান করিলে অগ্নি সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া কহিলেন, “হে ব্রহ্মন্! আপনি কেন অকারণে আমাকে এই নিদারুণ অভিসম্পাত করিলেন? আমি তৎকর্ত্তৃক জিজ্ঞাসিত হইয়া ধর্ম্মপ্রতিপালনার্থ সত্যকথা কহিয়াছি, ইহাতে আমার দোষ কি? যে ব্যক্তি জিজ্ঞাসিত হইয়া জানিয়া-শুনিয়া মিথ্যা বলে, সে আপনার ঊর্দ্ধতন সপ্তপুরুষ ও অধস্তন সপ্তপুরুষকে নরকে পাতিত করে। আর যে ব্যক্তি যথার্থ জানিয়াও না কহে, সেও সেই পাপে লিপ্ত হয়, ইহাতে সন্দেহ নাই। যাহা হউক, আমিও আপনাকে শাপ প্রদান করিতে পারি, কিন্তু আমি ব্রাহ্মণদিগকে মান্য করি, এই নিমিত্ত বিরত হইলাম। আপনি সর্ব্বজ্ঞ, তথাপি আপনাকে কিছু কহিতেছি, শ্রবণ করুন। আমি যোগবলে আত্মাকে বহুধা বিভক্ত করিয়া শরীরভেদে অগ্নিহোত্র, গর্ভাধান ও জ্যোতিষ্টোমাদি ক্রিয়াকলাপে অধিষ্ঠিত আছি। বেদোক্তবিধিপূর্ব্বক আমাতে হুত যে হবিঃ, তদ্দ্বারা দেবগণ ও পিতৃগণ পরিতৃপ্ত হয়েন। হূয়মান সোমরসাদি সামগ্রী সকল দেবগণ ও পিতৃগণের শরীররূপে পরিণত হয়। দেবগণ ও পিতৃগণকে উদ্দেশ করিয়া একত্র দর্শ ও পৌর্ণমাস যজ্ঞের অনুষ্ঠান হয়, অতএব দেবগণ ও পিতৃগণ অভিন্নস্বরূপ এবং প্রতি পর্ব্বে কখন একত্র, কখন বা পৃথক্ কৃথক্ পূজিত হইয়া থাকেন। আমাতে যে আহুতি-সকল প্রদত্ত হয়, সেই সকল আহুতি দেবগণ ও পিতৃগণ ভক্ষণ করেন। তন্নিমিত্ত আমি দেবগণ ও পিতৃগণের মুখস্বরূপ। অমাবস্যাতে পিতৃগণকে ও পূর্ণিমাতে দেবগণকে উদ্দেশ করিয়া আমাতে আহুতি প্রদত্ত হয়, তাঁহারাও আমারই মুখ দ্বারা তাহা ভক্ষণ করেন, অতএব আমি কি প্রকারে সর্ব্বভক্ষ হইব?”
পরে অগ্নি ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া বিপ্রগণের অগ্নিহোত্রাদি যজ্ঞক্রিয়া হইতে আপনাকে তিরোহিত করিলেন। তাঁহার অন্তর্দ্ধানান্তর প্রজাগণ ওঙ্কার, বষট্কার ও স্বধা-স্বাহা-বিবর্জ্জিত হইয়া দুঃখার্ণবে নিমগ্ন হইল। ঋষিগণ তদ্দর্শনে উদ্বিগ্নমনে দেবগণ সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন, “হে দেবগণ! অগ্নির অন্তর্দ্ধানপ্রযুক্ত ক্রিয়ালোপ হওয়াতে ত্রিলোকী ইতিকর্ত্তব্যতাবিমূঢ় হইয়াছে, অতএব এ বিষয়ে যাহা কর্ত্তব্য হয়, শীঘ্র বিধান করুন, আর কালাতিপাত করিবেন না।”
অনন্তর ঋষিগণ ও দেবগণ ব্রহ্মার নিকট গমন করিয়া অগ্নির শাপ ও তন্নিবন্ধন ক্রিয়ালাপের বৃত্তান্ত নিবেদন করিয়া কহিলেন, “হে ব্রহ্মন্! মহর্ষি ভৃগু কোন কারণবশতঃ অগ্নিকে ‘সর্ব্বভক্ষ হও] বলিয়া শাপ দিয়াছেন, কিন্তু অগ্নি দেবগণের মুখ ও যজ্ঞের অগ্রভাগভোক্তা হইয়া কিরূপে সর্ব্বভক্ষ হইবেন?” বিধাতা তাঁহাদিগের সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া অগ্নিকে আহ্বান করিলেন এবং মধুরবাক্যে সান্ত্বনা করিয়া কহিতে লাগিলেন, “বৎস! তুমি সর্ব্বলোকের কর্ত্তা ও সংহর্ত্তা এবং অগ্নিহোত্রাদি ক্রিয়াকলাপের প্রবর্ত্তয়িতা, তুমিই এই ত্রিলোকী ধারণ করিতেছ; অতএব হে ত্রিলোকেশ হুতবহ! এক্ষণে যাহাতে ক্রিয়াকলাপের উচ্ছেদ না হয়, তাহা কর। তুমি সর্ব্বলোকের ঈশ্বর হইয়া এরূপ বিমূঢ়প্রায় হইতেছ কেন? তুমি সর্ব্বলোকে সর্ব্বদা পবিত্র এবং সর্ব্বজীবের গতিস্বরূপ। অতত্রব আমি বলিতেছি তুমি সর্ব্বশরীরে সর্ব্বভক্ষ হইবে না। অপানদেশে তোমার যে-সকল শিখা আছে, তাহারাই সকল বস্তু ভক্ষণ করিবে এবং তোমার মাংসভক্ষিকা যে তনু আছে, সেই সর্ব্বভক্ষ হইবে। যেমন রবিকিরণ-সংস্পর্শে সকল বস্তু শুচি হয়, সেইরূপ তোমার শিখা দ্বারা দগ্ধ হইয়া সকল বস্তু শুচি হইবে। হে হুতাশন! তুমি সর্ব্বশ্রেষ্ঠ তেজঃপদার্থ, তুমি আপনার প্রভাবে আপনি বিনির্গত হইয়াছ, এক্ষণেও স্বকীয় তেজঃপ্রভাবে ঋষির শাপ সত্য কর এবং তোমার মুখে হুত দেবভাগ ও আত্মভাগ গ্রহণ কর।”
অগ্নি সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার এই বাক্য শ্রবণ করিয়া “যে আজ্ঞা” বলিয়া তদীয় আজ্ঞা-পালনার্থে গমন করিলেন। দেবগণ ও ঋষিগণ আহ্লাদিত হইয়া স্ব স্ব স্থানে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। মহর্ষিগণ পূর্ব্বের ন্যায় যাগযজ্ঞাদি ক্রিয়াসকল সম্পন্ন করিতে লাগিলেন। স্বর্গে দেবগণ ও ধরাতলে নরগণ অত্যন্ত হৃষ্টচিত্ত হইলেন। অগ্নিও শাপ-বিনির্ম্মুক্ত হইয়া সাতিশয় প্রীতিলাভ করিলেন। পূর্ব্বকালে ভগবান অগ্নি মহর্ষি ভৃগু হইতে এইরূপে শাপগ্রস্ত হইয়াছিলেন। অগ্নির শাপ, পুলোমা রাক্ষসের নিধন ও চ্যবনের জন্মবৃত্তান্ত-ঘটিত প্রাচীন ইতিহাস এই।
রুরু-চরিত
সূত কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! ভৃগুনন্দন চ্যবন সুকন্যার গর্ভে পরমতেজস্বী প্রমতি নামে এক পুৎত্র উৎপাদন করেন। ঘৃতাচীর গর্ভে প্রমতির রুরু-নামক এক সন্তান হয়। রুরুর ঔরসে প্রমদ্বরার গর্ভে শুনক নামে তনয় জন্মে। সেই মহাতেজা রুরুর সমস্ত বৃত্তান্ত সবিস্তর বর্ণনা করিতেছি, শ্রবণ করুন।
পূর্ব্বকালে সর্ব্বভূতহিতৈষী, সর্ব্ববিদ্যাবিশারদ, তপোনিরত স্থূলকেশ নামে এক মহর্ষি ছিলেন। ঐ সময়ে গন্ধর্ব্বরাজ বিশ্বাবসুর সংযোগে অপ্সরা মেনকা গর্ভবতী হইয়াছিল। অকরুণা মেনকা প্রসবকাল উপস্থিত দেখিয়া মহর্ষি স্থূলকেশের আশ্রমে গমন এবং তথায় গর্ভবিমোচন করিয়া নদীতীরে পলায়ন করিল। সেই গর্ভে এক পরমা সুন্দরী কুমারী জন্মিয়াছিল। তপোধনাগ্রণী স্থূলকেশ কিয়ৎক্ষণ পরে আশ্রমে উপস্থিত হইয়া সেই সুরকন্যাতুল্য সদ্যঃপ্রসূত কন্যাকে অসহায়া নির্জ্জনে পতিতা দেখিয়া কারুণ্যরসে আর্দ্রচিত্ত হইলেন এবং তৎক্ষণাৎ তাহাকে গ্রহণ করিয়া ঔরসকন্যা-নির্ব্বিশেষে লালন পালন করিতে লাগিলেন। তিনি স্বয়ং তাহার জাতকর্ম্মাদি সমস্ত কর্ম্ম বিধিপূর্ব্বক নির্ব্বাহ করিলেন। কন্যা সেই আশ্রমে শশিকলার ন্যায় দিনে দিনে পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। মহর্ষি স্থূলকেশ সেই কন্যাকে কি রূপে, কি গুণে, কি শীলে সর্ব্বপ্রকারেই সমস্ত প্রমদাগণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দেখিয়া তাহার নাম প্রমদ্বরা রাখিলেন।
একদা প্রমতিনন্দন রুরু স্থূলকেশের আশ্রমে সেই প্রমদ্বরাকে নিরীক্ষণ করিয়া অত্যন্ত কামাতুর হইলেন। পরে আপন বয়স্যগণ দ্বারা পিতার নিকট স্বীয় অভিলাষ জানাইলেন। প্রমতি তদনুসারে মহর্ষি স্থূলকেশের নিকট গিয়া আপন পুৎত্রের নিমিত্ত সেই কন্যা প্রার্থনা করিলেন। মহর্ষি স্থূলকেশ ফল্গুনী নক্ষত্রযুক্ত দিবসে বিবাহের দিন নির্দ্ধারিত করিয়া রুরুকে প্রমদ্বরা সম্প্রদান করিলেন।
একদা বরবর্ণিনী প্রমদ্বরা আপন সহচরীগণ সমভিব্যাহারে ক্রীড়াকৌতুক করিতে করিতে দৈবগত্যা প্রসুপ্ত ও কেলিভূমিতে পতিত এক কৃষ্ণসর্পকে পাদাহত করিল। সর্প ক্রুদ্ধ হইয়া বিষাক্ত দশন-পংক্তি দ্বারা তৎক্ষণাৎ তাহাকে দংশন করাতে সে বিবর্ণা, বিচেতনা ও ভ্রষ্টাভরণা হইয়া ছিন্নমূল কদলীর ন্যায় ভূতলে পড়িল। তদীয় সখীগণ তাহাকে মুক্তকেশা, ভ্রষ্টবেশা ও ভূপৃষ্ঠে পতিতা দেখিয়া বিষাদ-সাগরে নিমগ্ন হইয়া হাহাকার করিতে লাগিল। কিন্তু প্রমদ্বরা ভূজঙ্গবিষে অভিভূতা ও বিবর্ণা হইয়াও পুনর্ব্বার পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর রমণীয় হইয়া উঠিল। ফলতঃ তখন তাহাকে বোধ হইতে লাগিল, যেন অকাতরে নিদ্রা যাইতেছে।
তদীয় পিতা মহর্ষি স্থূলকেশ ও অন্যান্য মহর্ষিগণ প্রমদ্বরাকে বিগতাসু ও ভূতলে পতিত দেখিলেন। তদনন্তর স্বস্ত্যাত্রেয়, মহাজানু, কুশিক, শঙ্খমেখল, উদ্দালক, কঠ, শ্বেত, ভারদ্বাজ, কৌণকূৎস, আর্ষ্টিষেন, গৌতম, প্রমতি, রুরু ও অন্যান্য তপোবনবাসী তপোধনগণ কারুণ্য-রস-পরবশ হইয়া তথায় উপস্থিত হইলেন। পরে সেই পরমাসুন্দরী কন্যাকে আশীবিষ বিষার্দ্দিত মৃত ও ভূতলে পতিত দেখিয়া সকলেই রোদন করিতে লাগিলেন। রুরু প্রিয়তমাকে তদবস্থ দেখিয়া নিতান্ত উদ্ভ্রান্ত ও একান্ত কাতর হইয়া তথা হইতে বহির্গমন করিলেন।

ডুণ্ডুভ-উপাখ্যান
সৌতি কহিলেন, সেই সকল মহাত্মা দ্বিজগণ তথায় উপবিষ্ট হইলে, রুরু সাতিশয় দুঃখিত হইয়া অরণ্যানী প্রবেশপূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন এবং শোকে একান্ত ব্যাকুল হইয়া স্বীয় প্রিয়তমা প্রমদ্বরাকে স্মরণ করিয়া করুণস্বরে এইরূপে বিলাপ করিতে লাগিলেন – “আমার ইহা অপেক্ষা আর দুঃখের বিষয় কি হইতে পারে যে, আমার ও বন্ধুবর্গের শোকবর্দ্ধিনী সেই সর্ব্বাঙ্গ সুন্দরী রমণী ধরাতলে পড়িয়া আছে? আমি যদি দান, তপশ্চরণ ও গুরুজনের শুশ্রূষা করিয়া থাকি, তবে আমার প্রিয়া পুনঃসঞ্জীবিত হউক। আমি জন্মাবধি আত্মসংযম ও ব্রতানুষ্ঠান করিয়া যে-সকল পুণ্যসঞ্চয় করিয়াছি, এক্ষণে আমার প্রাণপ্রিয়া প্রমদ্বরা সেই পুণ্যবলে ভূমিশয্যা হইতে গাত্রোত্থান করুক।”
রুরু স্বীয় প্রিয়তমা প্রমদ্বরাকে উদ্দেশ করিয়া এইরূপে বিলাপ করিতেছেন, ইত্যবসরে দেবদূত তৎসন্নিধানে আসিয়া কহিলেন, “রুরু! তুমি দুঃখার্ত্ত হইয়া যেরূপ প্রার্থনা করিতেছ, উহা নিতান্ত অসম্ভব; যেহেতু, মনুষ্য একবার কালগ্রাসে পতিত হইলে আর কদাচ পুনর্জ্জীবিত হয় না। এই প্রমদ্বরা গন্ধর্ব্বের ঔরসে অপ্সরাগর্ভে জন্মগ্রহণ করে, এক্ষণে আয়ুঃশেষ হইয়াছে বলিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। অতএব হে বৎস! তুমি আর শোকসাগরে নিমগ্ন হইও না। পূর্ব্বে দেবগণ এই বিষয়ে একটি উপায় নির্দ্দেশ করিয়াছেন, যদি তাহা করিতে পার, তবে পুনর্ব্বার প্রমদ্বরাকে লাভ করিতে পারিবে।” রুরু কহিলেন, “হে দেবদূত! দেবগণ এই বিষয়ে কি উপায় স্থির করিয়াছেন, যথার্থ করিয়া বল, আমি এই দণ্ডেই তদনুযায়ী কর্ম্ম করিব।” দেবদূত কহিলেন, “হে ভৃগুনন্দন! তুমি স্বীয় ভার্য্যাকে আপনার পরমায়ুর অর্দ্ধেক প্রদান কর, তাহা হইলেই সে পুনর্জ্জীবিতা হইবে।” রুরু কহিলেন, “আচ্ছা আমি প্রমদ্বরাকে আপন পরমায়ুর অর্দ্ধভাগ প্রদান করিলাম, সে মৃত্যুশয্যা হইতে গাত্রোত্থান করুক।” তখন গন্ধর্ব্বরাজ ও দেবদূত উভয়ে-যম-সমীপে গমন করিয়া নিবেদন করিলেন, “হে ধর্ম্মরাজ! যদি আপনি অনুমতি করেন, তবে রুরুর মৃতভার্য্যা প্রমদ্বরা স্বীয় ভর্ত্তার অর্দ্ধায়ু লইয়া পুনর্জ্জীবিত হয়।” ধর্ম্মরাজ কহিলেন, “হে দেবদূত! যদি তোমার ইচ্ছা হইয়া থাকে, তবে রুরুপত্নী রুরুর অর্দ্ধ পরমায়ু পাইয়া পুনর্জ্জীবিত হউক।” ধর্ম্মরাজ এই কথা কহিবামাত্র প্রমদ্বরা রুরুর অর্দ্ধ পরমায়ু প্রাপ্ত হইল এবং তৎক্ষণাৎ সুপ্তোত্থিতার ন্যায় ধরাতল হইতে গাত্রোত্থান করিল। এইরূপে প্রমদ্বরা পুনর্জ্জীবিত হইলে, রুরুর পিতা এবং প্রমদ্বরার পিতা উভয়ে আনন্দ-সাগরে মগ্ন হইয়া শুভলগ্নে পুৎত্র-কন্যার বিবাহবিধি নির্ব্বাহ করিলেন। তাঁহারাও পরস্পরের হিতসাধনে তৎপর হইয়া পরমানন্দে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। রুরু এইরূপে কমলসমপ্রভা সুদুর্লভা প্রিয়তমাকে পুনর্লাভ করিয়া সর্পবংশ ধ্বংস করিতে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইলেন। সর্প অবলোকন করিবামাত্র তিনি ক্রোধে কম্পান্বিত-কলেবর হইয়া শস্ত্রাঘাতে তাহাকে বিনাশ করিতেন।
একদা তিনি এক নিবিড় অরণ্যানী প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, এক অতি জীর্ণ-কলেবর ডুণ্ডুভ সর্প শয়ন করিয়া রহিয়াছে। রুরু তাহাকে দেখিবামাত্র ক্রোধান্ধ হইয়া যমদণ্ডের ন্যায় নিজ দণ্ড উদ্ধৃত করিয়া তাহার নিধন-সাধনে উদ্যত হইলেন। ডুণ্ডুভ তাঁহাকে জিঘাংসু দেখিয়া কহিল, “হে তপোধন! আমি ত’ তোমার কোন অপরাধ করি নাই, তবে কেন অকারণে রোষপরবশ হইয়া আমার প্রাণবধে উদ্যত হইতেছ?”

রুরুর সর্পমাত্র হিংসার কারণ
রুরু কহিলেন, “হে ভুজঙ্গম! এক দুষ্ট সর্প আমার প্রাণতুল্যা প্রেয়সীকে দংশন করিয়াছিল, সেই অবধি আমি এই অনুল্লঙ্ঘনীয় দৃঢ়-প্রতিজ্ঞা করিয়াছি যে, সর্প দেখিতে পাইলেই তাহার প্রাণসংহার করিব; অতএব আমি তোমাকে হত্যা করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি। অদ্য আমার হস্তে তোমার প্রাণসংহার হইবে।” ডুণ্ডুভ কহিল, “হে ব্রহ্মন্! যে-সকল সর্পেরা মনুষ্যদিগকে দংশন করে, তাহারা স্বতন্ত্র জাতি; ডুণ্ডুভেরা সেরূপ নহে। ইহারা কখন কাহারও হিংসা করে না; অতএব হে মহর্ষে! কেবল সর্পনামের গন্ধমাত্র পাইয়া নিরপরাধ ডুণ্ডুভগণকে বধ করা তোমার সমুচিত কর্ম্ম হয় না। ডুণ্ডুভদিগের সুখভোগাভিলাষ অন্যান্য ভুজঙ্গমের সদৃশ নহে; কিন্তু ইহারা অনর্থ-ঘটনার সময় তাহাদের সমভাগী, অতএব তুমি ধার্ম্মিক হইয়া এবম্ভূত হতভাগ্য নিরপরাধ ডুণ্ডুভদিগকে বধ করিও না।”
রুরু ভয়ার্ত্ত ডুণ্ডুভের এই কাতরোক্তি-শ্রবণে অত্যন্ত দয়ার্দ্র হইয়া তাহার প্রাণসংহারে পরাঙ্মুখ হইলেন এবং শান্তবাক্যে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে ভুজঙ্গম! তুমি কে, কি কারণেই বা সর্পযোনি প্রাপ্ত হইয়াছ, আমাকে বল।” সর্প কহিল, “আমি পূর্ব্বে সহস্রপাদনামা মুনি ছিলাম। ব্রহ্মশাপগ্রস্ত হইয়া ভুজঙ্গ-কলেবর ধারণ করিয়াছি।” ইহা শুনিয়া রুরু কহিলেন, “হে ভুজঙ্গোত্তম! ব্রাহ্মণ কি নিমিত্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তোমাকে শাপ প্রদান করিয়াছিলেন, আর কত কালই বা তোমাকে এই শরীরে থাকিতে হইবে সবিস্তর শুনিতে ইচ্ছা করি।”
আস্তীকপর্ব্ব-খগম-ঋষিবৃত্তান্ত
ডুণ্ডভ কহিল, “সত্যবাদী ও তপোবীর্য্য-সম্পন্ন খগম নামে এক ব্রাহ্মণ আমার বাল্যকালের সখা ছিলেন। একদা তিনি অগ্নিহোত্র-কার্য্যানুষ্ঠানে অত্যন্ত আসক্ত আছেন, এমত সময়ে আমি বালস্বভাবসুলভ কৌতুকের পরতন্ত্র হইয়া তৃণ-নির্ম্মিত ভুজঙ্গম দ্বারা তাঁহাকে বিভীষিকা প্রদর্শন করিয়াছিলাম। তদ্দর্শনে তিনি মূর্চ্ছিত হইয়া মেদিনীপৃষ্ঠে পতিত হইলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে চৈতন্য-প্রাপ্ত হইলে ক্রোধে দুই চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া আমাকে কহিলেন, ‘তুমি আমাকে ভয় প্রদর্শন করিবার নিমিত্ত যাদৃশ বীর্য্যহীন সর্প নির্ম্মাণ করিয়াছ, আমি তোমাকে শাপ দিতেছি, তুমি সেইরূপ নির্বীর্য্য সর্প হও।’ আমি তদীয় তপঃপ্রভাব অবগত ছিলাম; অতএব অত্যন্ত উদ্বিগ্নচিত্তে তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলাম, ‘ভ্রাতঃ! আমি সখা বলিয়া পরিহাসার্থ তোমার প্রতি এই কুকর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়াছি; অতএব এক্ষণে ক্ষমা-প্রদর্শন-পুরঃসর আমাকে শাপ হইতে বিমূক্ত কর।’
“খগম আমাকে এইরূপ ব্যাকুলিত দেখিয়া বারংবার দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক কহিলেন, ‘আমি যাহা কহিয়াছি, তাহা কদাচ মিথ্যা হইবার নহে; অতএব এক্ষণে যাহা কহিতেছি, তাহা সাবধানে শুনিয়া সর্ব্বকাল মনে করিয়া রাখিবে। মহাত্মা প্রমতির রুরু নামে এক পরম-পবিত্র পুৎত্র জন্মিবে, তাঁহাকে দর্শন করিলেই তোমার শাপ-বিমোচন হইবে।’ আপনি সেই প্রমতি-পুৎত্র রুরু, আজি আমি আপনার সন্দর্শন পাইয়াছি, এক্ষণে আমি স্বীয় পূর্ব্বরূপ লাভ করিয়া আপনাকে কিছু হিতোপদেশ দিতেছি, শুনুন।”
শাপভ্রষ্ট সহস্রপাদ এই বলিয়া সর্প-কলেবর পরিত্যাগ পূর্ব্বক নিজ ভাস্বরমূর্ত্তি পুনঃপ্রাপ্ত হইলেন এবং কহিলেন, “হে মহাত্মন্ রুরো! অহিংসা পরম ধর্ম্ম নিমিত্ত ব্রাহ্মণদিগের কখন কোন জীবহিংসা করা উচিত নহে। বেদে এইরূপ কথিত আছে যে, ব্রাহ্মণরা সর্ব্বদা শান্তমূর্ত্তি, বেদবেদাঙ্গবেত্তা ও সর্ব্বজীবের অভয়প্রদ হইবেন। অহিংসা, সত্যবাক্য, ক্ষমা ও বেদবাক্য-ধারণ এইগুলি ব্রাহ্মণের পরম ধর্ম্ম। দণ্ডধারণ, উগ্রত্ব ও প্রজাপালন এই সমস্ত ক্ষত্রিয়ের পরম ধর্ম্ম। আপনি ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণের ক্ষৎত্রিয়ধর্ম্ম অবলম্বন করা অনুচিত। দেখুন, পূর্ব্বকালে রাজা জনমেজয়ের যজ্ঞে সর্পকুল বিনষ্ট হইতে আরম্ভ হইয়াছিল; কিন্তু তপোবলসম্পন্ন বেদবেদাঙ্গপারগ, ব্রাহ্মণাগ্রগণ্য আস্তীক মহাশয় ভয়ার্ত্ত সর্পগণকে পরিত্রাণ করেন।”

সর্পযজ্ঞের প্রশ্ন
রুরু কহিলেন, “হে দ্বিজোত্তম! ভূপতি জনমেজয় কি নিমিত্ত সর্পকুল ধ্বংস করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন, আর কি জন্যই বা ধীমান্ আস্তীক মুনি তাহাদিগকে রক্ষা করিলেন, আমি সবিশেষ শুনিতে ইচ্ছা করি।” “আপনি ব্রাহ্মণদিগের মুখে আস্তীক-বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিবেন” এই বলিয়া মহর্ষি সহস্রপাদ অন্তর্হিত হইলেন। রুরু তিরোহিত ঋষিকে অন্বেষণ করিয়া সমস্ত বন ভ্রমণ করিলেন। পরিশেষে নিতান্ত ক্লান্ত ও একান্ত মোহপরতন্ত্র এবং অচেতনপ্রায় হইয়া ধরাতলে পড়িলেন। অনন্তর চৈতন্য-লাভ করিয়া সহস্রপাদের উপদেশবাক্য পুনঃ পুনঃ স্মরণ করিতে করিতে স্বকীয় আশ্রমে প্রত্যাগমন করিলেন এবং স্বীয় জনক-সন্নিধানে সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করাতে তিনি তাঁহাকে আস্তীকাখ্যান সবিস্তর শ্রবণ করাইলেন।
জরৎকারু-চরিত্র
শৌনক কহিলেন, “হে সৌতে! মহারাজ জনমেজয় কি নিমিত্ত সর্পযজ্ঞ করিয়া সর্পগণকে ধ্বংস করিয়াছিলেন এবং কি কারণেই বা তপোধনাগ্রগণ্য আস্তীক মুনি প্রদীপ্ত হুতাশন হইতে ভুজঙ্গমদিগকে রক্ষা করিয়াছিলেন, তাহা সবিশেষ বর্ণন কর। যে রাজা সর্পসত্রের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন, তিনি কাহার পুৎত্র এবং সেই দ্বিজবর আস্তীক মুনিই বা কাহার পুৎত্র, ইহাও বর্ণন কর।” “হে মুনিবর! আমি আপনার নিকট অতি বিস্তীর্ণ আস্তীকোপাখ্যান আনুপূর্ব্বিক বর্ণনা করিতেছি, শ্রবণ করুন।” শৌনক কহিলেন, “হে সূতপুৎত্র! প্রাচীন মহর্ষি আস্তীকের ঐ মনোহর উপাখ্যান আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ জন্মিয়াছে।”
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, আমার পিতা নৈমিষারণ্যবাসী বিপ্রগণ কর্ত্তৃক অভ্যর্থিত হইয়া সর্ব্বপাপবিনাশক ব্যাসোক্ত ঐ পুরাতন ইতিহাস তাঁহাদিগকে শ্রবণ করাইয়াছিলেন। আমি তৎসমীপে যে প্রকার শ্রবণ করিয়াছি, অবিকল সেইরূপ বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন। তপোধন আস্তীকের পিতা জরৎকারু মুনি সাক্ষাৎ প্রজাপতিসদৃশ ব্রহ্মচারী, ঊর্দ্ধরেতা ও পরম ধার্ম্মিক ছিলেন। তিনি সর্ব্বদা ব্রতানুষ্ঠান, উগ্রতপস্যা ও আহারসংযমে একান্ত তৎপর থাকিতেন। সেই তপোবলসম্পন্ন মহাত্মা সর্ব্বদা তীর্থপর্য্যটন ও তীর্থে অবগাহন করিয়া অবনীমণ্ডল পরিভ্রমণ করিতেন এবং যেস্থানে সায়ংকাল উপস্থিত হইত, সেই স্থানে অবস্থিতি করিতেন। এইরূপে বহুকাল আহার নিদ্রা পরিত্যাগ ইতস্ততঃ পর্য্যটন করিয়া তিনি শীর্ণকলেবর হইয়া ছিলেন; তথাপি বায়ুমাত্র ভক্ষণপূর্ব্বক কঠোর ব্রতের অনুষ্ঠান করিতেন।
একদা জরৎকারু মুনি ভ্রমণ করিতে করিতে কোন স্থানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, কতিপয় ব্যক্তি ঊর্দ্ধপাদ ও অধোমস্তক হইয়া মহাগর্ত্তে লম্বমান রহিয়াছেন; তদ্দর্শনে তিনি কৃপাপরবশ হইয়া তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসিলেন; “আপনারা কে? কি নিমিত্তই বা মূষিকচ্ছিন্নমূল উশীরস্তম্ব [বেণার মূলের গুচ্ছ] মাত্র অবলম্বন করিয়া অধোমুখে এই মহাগর্ভে লম্বমান রহিয়াছেন?” পিতৃগণ কহিলেন, “আমরা যাযাবর [অতিশয় পর্য্যটনশীল- যাহারা একস্থানে স্থির থাকে না।] নামে ঋষি; সন্তানক্ষয় হওয়াতে অধঃপতিত হইতেছি। আমার নিতান্ত হতভাগ্য! আমাদিগের জরৎকারু নামে এক পুৎত্র আছে, সেই দুর্ম্মতি পুৎত্রার্থ দার পরিগ্রহ না করিয়া সংসারসুখে জলাঞ্জলি প্রদানপূর্ব্বক অহর্নিশ কেবল তপস্যায় কালাতিপাত করিতেছে। সুতরাং কুলক্ষয় উপস্থিত দেখিয়া এই মহাগর্ত্তে লম্বমান রহিয়াছি; আমাদিগের বংশবর্দ্ধন জরৎকারু থাকিতেও আমরা অনাথ ও দুষ্কৃতীর ন্যায় হইয়াছি; তুমি কে, কি নিমিত্তই বা আমাদিগের দুঃখ দেখিয়া বান্ধবের ন্যায় অনুশোচনা করিতেছ, জানিতে বাসনা করি।”
জরৎকারু তাঁহাদিগের কাতরোক্তি শ্রবণ করিয়া কহিলেন, “আপনারা আমার পূর্ব্বপুরুষ, আমারই নাম জরৎকারু; এক্ষণে আজ্ঞা করুন, কি করিব?” পিতৃগণ কহিলেন, “বৎস! তোমার এবং আমাদিগের পারত্রিক মঙ্গল-সম্পাদন করিবার নিমিত্ত কুলরক্ষা-বিষয়ে যত্নবান হও। লোকে পুৎত্রৎপাদন দ্বারা যেরূপ সদ্গতিসম্পন্ন হয়, ধর্ম্মফল দ্বারা সেরূপ সদ্গতি লাভ করিতে পারে না। অতএব হে পুৎত্র! আমাদিগের নির্দ্দেশানুসারে দারপরিগ্রহ করিয়া সন্তানোৎপাদনে যত্নবান্ হও। ইহা করিলেই আমদিগের পরম হিতসাধন করা হইবে।”
জরৎকারু কহিলেন, “আমি সম্ভোগার্থে দারপরিগ্রহ বা জীবিকার্থে ধনোপার্জ্জন করিব না, কেবল আপনাদিগের হিতসাধনার্থে বিবাহ করিতে সম্মত হইলাম; কিন্তু তদ্বিষয়ে এই এক প্রতিজ্ঞা রহিল যে, যদি কন্যা আমার সনাম্নী হয় এবং তাহার বন্ধুবান্ধবগণ স্বেচ্ছাপূর্ব্বক আমাকে সেই কন্যা ভিক্ষাস্বরূপ সম্প্রদান করে, তাহা হইলেই আমি তাহাকে যথাবিধি বিবাহ করিব; কিন্তু আমি অত্যন্ত দরিদ্র, বোধ করি, দরিদ্রকে কন্যা সম্প্রদান করিতে কেহই সম্মত হইবে না। হে পিতামহগণ! আমি এই নিয়মে দারপরিগ্রহ করিতে যত্নবান্ হইব, অন্যথা এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হইতে পারিব না। এইরূপে পরিণীতা ভার্য্যার গর্ভে সন্তান জন্মিলে আপনারা উদ্ধার হইবেন এবং অক্ষয় স্বর্গলাভ করিয়া পরম-সুখে কালযাপন করিতে পারিবেন।”
জরৎকারুর বিবাহ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, তদনন্তর জরৎকারু মুনি গার্হস্থ্য আশ্রম করিতে কৃতসঙ্কল্প হইয়া পত্নীলাভার্থ সমস্ত মহীমণ্ডল ভ্রমণ করিতে লাগিলেন, কিন্তু কেহই তাঁহাকে কন্যা প্রদান করিল না। একদা তিনি পিতৃলোকের বাক্য স্মরণ করিয়া বনপ্রবেশপূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে তিনবার কন্যা ভিক্ষা করিলেন। তাঁহার সেই ভিক্ষা-বাক্য শ্রবণে নাগরাজ বাসুকি স্বীয় ভগিনীকে আনয়ন করিয়া সম্প্রদান করিতে উদ্যত হইলেন। কিন্তু জরৎকারু সেই কন্যা সনাম্নী নহে, এই ভাবিয়া তাহার পাণিগ্রহণ পরাঙ্মুখ হইলেন; কারণ, মহাত্মা জরৎকারু প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, যদি সনাম্নী কন্যা পান ও তাহার বন্ধু বান্ধবগণ স্বেচ্ছাপূর্ব্বক ভিক্ষাস্বরূপ তাঁহাকে সেই কন্যা সম্প্রদান করে, তাহা হইলেই তাহাকে সহধর্ম্মিণী করিবেন।
অনন্তর মহাপ্রাজ্ঞ মহাতপা জরৎকারু বাসুকিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে ভুজঙ্গম! তুমি যথার্থ করিয়া বল, তোমার এই ভগিনীর নাম কি? বাসুকি কহিলেন, “হে দ্বিজোত্তম! আমার এই অনুজার নাম জরৎকারু। আমি আপনাকে এই ভগিনীটি সম্প্রদান করিতেছি, আপনি ইহাকে গ্রহণ করুন।” এই বলিয়া বাসুকি জরৎকারুকে স্বীয় ভগিনী প্রদান করিলেন। তিনিও বিধিপূর্ব্বক তাহার পাণিগ্রহণ করিলেন।
সর্পরক্ষার সংক্ষিপ্ত কথা
উগ্রশ্রবাঃ মহর্ষি শৌনককে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে ব্রহ্মজ্ঞানপারদর্শিন্! পূর্ব্বকালে সর্পগণ স্বীয় জননীর নিকট এইরূপ শাপগ্রস্ত হইয়াছিল যে, রাজা জনমেজয়ের যজ্ঞে অগ্নি তাহাদিগকে দগ্ধ করিবেন। ভুজঙ্গরাজ বাসুকি সেই শাপবিমোচনের অভিসন্ধি করিয়া মহাত্মা জরৎকারুকে স্বীয় ভগিনী প্রদান করেন। জরৎকারু বিধিপূর্ব্বক তাঁহার পাণিগ্রহণ করিয়া তদ্গর্ভে আস্তীক নামে পুৎত্র উৎপাদন করেন। মহাত্মা আস্তীক বেদবেদাঙ্গশাস্ত্রে পারদর্শী, সর্ব্বভূতে সমদৃষ্টি ও তপশ্চর্য্যায় নিতান্ত অনুরক্ত ছিলেন। তিনি পিতৃকুল মাতৃকুল উভয় কুলের দাহভয় নিবারণ করেন। পাণ্ডুকুলোদ্ভব রাজা জনমেজয় বহুকালের পর সর্পসত্র নামে এক মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। সেই সর্পকুলকালান্তক যজ্ঞ আরব্ধ হইলে মহাতপ আস্তীক ভ্রাতৃগণ, মাতুলগণ ও অন্যান্য সর্পগণকে রক্ষা করিয়াছিলেন।
জরৎকারু পুৎত্রোৎপাদন ও তপশ্চর্য্যা দ্বারা পিতৃলোকের উদ্ধারসাধন, বিবিধ ব্রতানুষ্ঠান ও বেদাধ্যয়ন দ্বারা মুনিগণের তুষ্টি সম্পাদন এবং নানাবিধ যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা দেবগণের পরিতোষ সমাধান করিলেন। তিনি এইরূপে পুৎত্রোৎপাদন, ব্রহ্মচর্য্য ও যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা পিতৃঋণ, ঋষিঋণ ও দেবঋণ স্বরূপ গুরুতর ভার হইতে মুক্ত হইয়া পূর্ব্বপুরুষগণের সহিত স্বর্গে আরোহণ করেন। হে ভৃগুবংশাবতংস! আমি যথাক্রমে এই আস্তীকোপাখ্যান কহিলাম, এক্ষণে আর কি কহিতে হইবে, আজ্ঞা করুন।
১৬.অরুণ ও গরুড়ের জন্ম
February ২৪, ২০১৩ ০১.আদিপর্ব ১০৫ বার পঠিত মন্তব্য করুন
ষোড়শ অধ্যায়
অরুণ ও গরুড়ের জন্ম
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি যাহা কীর্ত্তন করিলে, পুনর্ব্বার তাহাই সবিস্তরে বর্ণন কর; আস্তীকবৃত্তান্ত বিশেষরূপে শ্রবণ করিতে আমাদিগের নিতান্ত ঔৎসুক্য হইয়াছে। আস্তীকোপাখ্যানটি অতি সুললিত ও সুমধুর বোধ হইল। ইহা শুনিয়া আমার পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইয়াছি। ফলতঃ তুমি পুরাণকীর্ত্তনবিষয়ে স্বীয় পিতার ন্যায় পাণ্ডিত্য প্রকাশ করিয়াছ। তোমার পিতা যেমন অনন্য বিষয়ানুরক্ত হইয়া প্রত্যহ আমাদিগকে পুরাণ শ্রবণ করাইতেন, এক্ষণে তুমিও সেইরূপ অনন্যমনা ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া আমাদিগকে পুরাণ শ্রবণ করাও।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে মহাত্মন্! আমি পিতার নিকট আস্তীকোপখ্যান যেরূপ শুনিয়াছি, অবিকল সেইরূপ কহিতেছি, শ্রবণ করুন। সত্যযুগে দক্ষপ্রজাপতির কদ্রু ও বিনতা নামে দুই পরমাসুন্দরী কন্যা ছিলেন। মহর্ষি কশ্যপ ঐ দুই কন্যার পাণিগ্রহণ করেন। একদা তিনি সেই ধর্ম্মপত্নীদ্বয়ের প্রতি অতিমাত্র প্রসন্ন হইয়া তাঁহাদিগকে বরপ্রদান করিতে চাহিলেন। “পরস্পর সমান-পরাক্রান্ত, এইরূপ সহস্রনাগ আমার পুৎত্র হউক” বলিয়া কদ্রু বর প্রার্থনা করিলেন; কিন্তু বিনতা এই বর চাহিলেন, “আমার দুইটি মাত্র পুৎত্র হউক, কিন্তু তাহারা যেন বল, বিক্রম ও শরীরে কদ্রু-পুৎত্র অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হয়।” মহর্ষি কশ্যপ “তথাস্তু” বলিয়া তাঁহাদিগকে সেই অভিলষিত বর প্রদান করিলেন। বিনতা স্বামিসন্নিধানে স্বাভিলষিত বর সংপ্রাপ্ত হইয়া সাতিশয় সন্তুষ্টা ও কৃতার্থম্মন্যা হইলেন। কদ্রু তুল্যতেজস্বী পুৎত্র-সহস্র-লাভে আপনাকে কৃতকৃত্য জ্ঞান করিলেন। মহাতপা কশ্যপ পত্নীদিগকে “তোমরা স্বীয় প্রযত্নে গর্ভধারণ করিও” এই আদেশ দিয়া অরণ্যানী প্রবেশ করিলেন।
বহুকালের পর কদ্রু অণ্ড-সহস্র ও বিনতা অণ্ডদ্বয় প্রসব করিলেন। পরিচারিকাগণ সেই সমুদয় অণ্ড উপস্বেদযুক্ত [তাপসংযুক্ত– ডিমে তা দেওয়া হয় এইরূপ।] ভাণ্ডমধ্যে পঞ্চশত বৎসর রাখিলেন। তৎপরে কদ্রু-প্রসূত অণ্ডসহস্র হইতে এক একটি পুৎত্র বহির্গত হইল। কিন্তু বিনতার অণ্ডদ্বয় তদবস্থই রহিল। পুৎত্রার্থিনী বিনতা তদ্দর্শনে সাতিশয় লজ্জিতা হইয়া স্ব-প্রসূত অণ্ডদ্বয়ের অন্যতর ভেদ করিয়া দেখিলেন যে, পুৎত্রের পূর্ব্বার্দ্ধকায়মাত্র সুসঙ্ঘটিত হইয়াছে, অন্যার্দ্ধ অতিশয় অপক্কাবস্থায় রহিয়াছে। তখন সেই সদ্যঃ-প্রসূত পুৎত্র সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া স্বীয় জননীকে অভিসম্পাত করিলেন, “লোভ-পরতন্ত্র হইয়া অপক্কাবস্থায় অণ্ড-ভেদনপূর্ব্বক আমাকে তন্মধ্য হইতে বাহির করা তোমার নিতান্ত অসদৃশ কর্ম্ম হইয়াছে; অতত্রব তুমি যে সপত্নীর সহিত স্পর্দ্ধাপ্রযুক্ত এই অন্যায্য কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে, পঞ্চাশৎ বৎসর তোমাকে সেই সপত্নীর দাসী হইয়া থাকিতে হইবে।” আরও বলিলেন, “এই অপর অণ্ডমধ্যে তোমার যে পুৎত্র আছে, যদি অকালে অণ্ডভেদ না কর এবং তাহাকেও আমার ন্যায় হীনাঙ্গ বা বিকলাঙ্গ না কর, তবে সেই তোমাকে দাসীত্ব হইতে মোচন করিবে। যদি তুমি আপন পুৎত্রকে বিশিষ্টরূপে বল বিক্রমশালী করিতে চাও, তবে ধৈর্য্যধারণপূর্ব্বক ইহার জন্মকাল প্রতীক্ষা কর। ইহার জন্মের আরও পঞ্চশত বৎসরকাল বিলম্ব আছে।”
অরুণ এইরূপে জননীকে শাপ প্রদান করিয়া আকাশপথে আরোহণপূর্ব্বক সূর্য্যদেবের সারথ্যকার্য্যে নিযুক্ত হইলেন। সর্পভোজী গরুড়ও যথাকালে জন্মিলেন। তিনি জন্মিবামাত্র ক্ষুধাতুর হইয়া স্বীয় জননী বিনতাকে পরিত্যাগপূর্ব্বক বিধাতৃবিহিত স্বকীয় আহার-সংগ্রহার্থে আকাশমণ্ডলে উড্ডীয়মান হইলেন।

সমুদ্রমন্থনের প্রশ্ন
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে তপোধন! ঐ সময়ে উচ্চৈঃশ্রবা কদ্রু ও বিনতার সমীপ দিয়া গমন করিতেছিল। দেবগণ অমৃতমন্থনকালে উৎপন্ন সেই সর্ব্বোৎকৃষ্ট ও সর্ব্ব-সুলক্ষণ-সম্পন্ন হয়-রত্নকে গমন করিতে দেখিয়া প্রশংসা করিতে লাগিলেন।
শৌনক কহিলেন, হে সূতপুৎত্র! তুমি কহিলে, সেই মহাবীর্য্য অশ্বরাজ সুধা-মন্থনসময়ে উৎপন্ন হয়; অতএব জিজ্ঞাসা করিতেছি, বল, দেবগণ কি কারণে ও কোন্ স্থানে অমৃত-মন্থন করিয়াছিলেন?
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, সুমেরু নামে এক পরম রমণীয় মহীধর আছে। যাহার সুবর্ণময় শৃঙ্গ-পরম্পরার প্রভাজাল প্রদীপ্ত সূর্য্যের প্রভামণ্ডলকে তিরস্কৃত করে, যে অপ্রমেয় ভূধর দেবগণ ও গন্ধর্ব্বগণের আবাস-স্থান, যাহাতে দুর্দ্দান্ত হিংস্র-জন্তুগণ সর্ব্বদা বিচরণ করে, যে পর্ব্বত প্রতিদিন রজনীযোগে নানা প্রকার ওষধি দ্বারা আলোকময় হয় এবং যে পর্ব্বত উন্নতি দ্বারা অমরলোক আচ্ছন্ন করিয়া রহিয়াছে, নানাবিধ নদ নদী ও তরুলতাগণ যাহাকে সুরভিত করিয়াছে, মনোহর বিহঙ্গমগণ যাহার বৃক্ষশাখায় বসিয়া সর্ব্বদা সুমধুরস্বরে কলরব করিতেছে, যে সুবর্ণময় মহীধর প্রাকৃত-জনসমূহের মনেরও অগোচর, একদা, তপোনিয়মানুরক্ত, প্রবলপরাক্রান্ত দেবগণ সেই পর্ব্বতের নানারত্ন সুশোভিত শিখরদেশে উপবেশনপূর্ব্বক অমৃতপ্রাপ্তিবিষয়ক মন্ত্রণা করিতেছিলেন। ভগবান্ ভূতভাবন নারায়ণ দেবতাদিগকে এইরূপে মন্ত্রণা করিতে ব্যাসক্ত দেখিয়া ব্রহ্মাকে কহিলেন, “দেবগণ ও অসুরগণ একত্র হইয়া জলধিমন্থন করিতে আরম্ভ করুন। মন্থন করিলে সমুদ্র হইতে অমৃত উত্থিত হইবে।” তদনন্তর দেবগণকে কহিলেন, “হে সুরগণ! তোমরা সমুদ্র-মন্থন কর, কিন্তু বহুবিধ ওষধি এবং রত্নসমূহ পাইয়াও মন্থনে ক্ষান্ত হইও না। ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক অনবরতই মন্থন করিতে থাকিবে, তাহা হইলেই তোমাদের অমৃতলাভ হইবে, সন্দেহ নাই।”

সমুদ্রমন্থনারম্ভ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দেবগণ অমৃত-মন্থনে আদেশ পাইয়া মন্থর-ভূধরকে মন্থনদণ্ড করিতে মনস্থ করিলেন, কিন্তু গগনস্পর্শী শিখরমালায় সুশোভিত, বহুতর লতাজালে জড়িত, নানাজাতীয় বিহঙ্গমনিনাদে নিনাদিত, বহুবিধ-ব্যালকুল [সর্পসমূহ] সমাকীর্ণ, অপ্সরাগণ ও কিন্নরগণ কর্ত্তৃক নিরন্তর সেবিত, একাদশ সহস্র যোজন উন্নত এবং তৎপরিমাণে ভূগর্ভে নিখাত [প্রোথিত- যতটুকু পোঁতা] গিরিবর মন্দরের উত্তোলনে অশক্ত হইয়া ব্রহ্মা ও নারায়ণের সমীপে গিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, “আপনারা আমাদিগের হিতসাধনার্থে কোন সদুপায় নির্দ্ধারণ ও মন্দরোদ্ধরণে প্রযত্ন করুন।”
অপ্রমেয়াত্মা ভগবান্ বিষ্ণু ও ব্রহ্মা দেবতাদিগের প্রার্থনায় সম্মতিপ্রকাশপূর্ব্বক ভুজঙ্গাধিপতি অনন্তদেবকে মন্দরোত্তোলনে অনুমতি করিলেন। মহাবল-পরাক্রান্ত অনন্ত তাঁহাদের আদেশ পাইয়া সমস্ত বন ও বনবাসিগণের সহিত সেই গিরিবরের উদ্ধরণ করিলেন। অনন্তর দেবগণ অনন্তদেবের সহিত নীরনিধিতীরে সমুপস্থিত হইয়া সমুদ্রকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “আমরা অমৃতলাভের জন্য তোমার জল মন্থন করিব।” অর্ণব কহিলেন, “মন্দর-ভ্রমণ দ্বারা আমাকে অনেক ক্লেশ সহ্য করিতে হইবে, অতএব আমিও যেন লাভের অংশ পাই।” তদনন্তর সমস্ত দেবগণ ও অসুরগণ কূর্ম্মরাজকে কহিলেন, “তুমি এই গিরিবরের অধিষ্ঠান [আধার] হও।” কূর্ম্মরাজ তথাস্তু বলিয়া স্বীয়পৃষ্ঠে মন্দরগিরি ধারণ করিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র কূর্ম্মরাজ-পৃষ্ঠে অধিষ্ঠিত গিরিরাজকে যন্ত্রসহকারে চালিত করিলেন।
এইরূপে দেবগণ মন্দর-গিরিকে মন্থনদণ্ড ও বাসুকিকে মন্থন-রজ্জু করিয়া অম্ভোনিধিমন্থন করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবল-পরাক্রান্ত দানবদল রজ্জুভূত বাসুকির মুখদেশ ও সুরগণ পুচ্ছদেশ ধারণ করিলেন। ভগবান্ অনন্তদেব সাক্ষাৎ নারায়ণের অংশস্বরূপ, এই নিমিত্ত তিনি আপন দুঃসহ বিষবেগ সংবরণ করিলেন। মন্থনকালে দেবগণ নাগরাজকে এমত বলপূর্ব্বক আকর্ষণ করিতে লাগিলেন যে তাঁহার মুখ হইতে নিরন্তর অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সহিত নিঃশ্বাসবায়ু নির্গত হইতে লাগিল। ঐ ধূমাগ্নি-সহিত নিশ্বাসবায়ু সচপলা মেঘমালারূপে পরিণত হইয়া, নিতান্ত শ্রান্ত ও একান্ত সন্তপ্ত দেবাসুরগণের উপর বারিবর্ষণ করিতে লাগিল এবং সেই গিরিবরের শৃঙ্গ হইতে পুষ্পবৃষ্টি হইতে লাগিল।
দেবাসুরগণ মন্দর-ভূধর দ্বারা এইরূপে সমুদ্রমন্থনে প্রবৃত্ত হইলেন। মথ্যমান মহোদধি হইতে ঘোরতর ঘনঘটার গভীর গর্জ্জনের ন্যায় ভয়ঙ্কর শব্দ উঠিল। মন্দরাদ্রির মর্দ্দনে সমুদ্রস্থ শত শত জলচরগণ বিনিষ্পিষ্ট হইয়া পঞ্চত্ব পাইল এবং পাতাল তলস্থ অন্যান্য নানাবিধ জলজন্তুগণও প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল। সেই গিরিরাজ অনবরত ভ্রাম্যমাণ হওয়াতে তাহার শিখরস্থ প্রকাণ্ড বৃক্ষ-সকল পরস্পর সংঘৃষ্ট হইয়া বিহঙ্গকুলের সহিত ভূতলে পতিত হইতে লাগিল। মন্দরগিরি সেই সকল তরুগণের পরস্পর সঙ্ঘর্ষণে সমুদ্ভুত হুতাশন-শিখা দ্বারা সমাবৃত হইয়া তড়িৎপটলাবৃত [বিদ্যুৎশ্রেণীবেষ্টিত] নবীন নীরদের ন্যায় সাতিশয় শোভমান হইল। পরে ঐ অনল ক্রমে ক্রমে প্রবল হইয়া অরণ্যানীবিনির্গত কুঞ্জর, কেশরিগণ ও অন্যান্য বন্যজন্তুগণকে দগ্ধ করিতে লাগিল। সঙ্ঘর্ষণজ হুতাশন এইরূপে পর্ব্বতস্থ সমস্ত জীবজন্তুগণকে দগ্ধ করিতে আরম্ভ করিলে সুরপতি ইন্দ্র মেঘ সমুদ্ভুত সলিল-সেচন দ্বারা তাহা নির্ব্বাণ করিলেন।
অনন্তর নানাবিধ মহীরুহগণের নির্য্যাস ও মহৌষধিরস গলিয়া সমুদ্রে পতিত হইতে লাগিল। অমৃতসম-গুণসম্পন্ন সেই সমস্ত বৃক্ষনির্য্যাস ও কাঞ্চননিস্রাবের [গলিত সোনার ধারা- সোনার কস] প্রভাবে দেবগণ অমরত্ব প্রাপ্ত হইলেন। সমুদ্রজল পূর্ব্বোক্ত বহুবিধ উৎকৃষ্ট রস দ্বারা মিশ্রিত হইয়া ক্ষীররূপে পরিণত হইল। সেই ক্ষীর হইতে ঘৃত উৎপন্ন হয়।
তদনন্তর দেবগণ পদ্মাসনস্থ ব্রহ্মার নিকট উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন, “ভগবান্! নারায়ণ ব্যতিরেকে আমরা সকলে নিতান্ত পরিশ্রান্ত হইয়াছি। কোন্ কালে মন্থন আরম্ভ করিয়াছিলেন, কিন্তু এ পর্য্যন্ত অমৃত সমুত্থিত হয় নাই।” তখন ব্রহ্মা নারায়ণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “তুমি ইহাদের বলাধান কর; তুমি ব্যতিরেকে এ বিষয়ে আর গত্যন্তর নাই।” নারায়ণ কহিলেন, “যাঁহারা এই কার্য্যে ব্যাপৃত আছেন, আমি তাঁহাদের সকলকেই বল প্রদান করিতেছি, তাঁহারা সকলে একত্রিত হইয়া অম্ভোনিধিকে আলোড়িত করুন।”
সমস্ত দেব-দানবগণ বিষ্ণুর এই বাক্য শ্রবণ করিবামাত্র বলপ্রাপ্ত হইলেন এবং সকলে একত্র হইয়া পুনর্ব্বার পূর্ব্বাপেক্ষা প্রবলরূপে জলনিধি মন্থন করিতে আরম্ভ করিলেন। তদনন্তর মথ্যমান মহাসাগর হইতে সুশীতলরশ্মি-সম্পন্ন, সৌম্যমূর্ত্তি, নির্ম্মল শীতাংশু [চন্দ্র] উৎপন্ন হইলেন। তৎপরে ঘৃত হইতে শ্বেত পদ্মোপবিষ্টা লক্ষ্মী ও সুরাদেবী উঠিলেন। উচ্চৈঃশ্রবা নামে শ্বেতবর্ণ হয়-রত্ন ও ঘৃত হইতে উৎপন্ন হইল। পরে মহোজ্জল কৌস্তুভ-মণি ঘৃত হইতে সমুৎপন্ন হইয়া নারায়ণের বক্ষঃস্থলে লম্বমান হইল। লক্ষ্মী, সুরাদেবী, চন্দ্র ও মনোজব [মনের ন্যায় গতিশীল] অশ্বোত্তম উচ্চৈঃশ্রবা সূর্য্যমার্গাবলম্বনপূর্ব্বক সুরপক্ষে গমন করিলেন। পরিশেষে মূর্ত্তিমান্ ধন্বন্তরি অমৃত-পূর্ণ শ্বেতবর্ণ কমণ্ডলু হস্তে লইয়া সমুদ্র হইতে আবির্ভূত হইলেন। দৈত্যগণ এই অদ্ভুত ব্যাপার নিরীক্ষণ করিয়া “এই অমৃত আমার, এই অমৃত আমার” এই বলিয়া ঘোরতর কোলাহল করিতে আরম্ভ করিল। তদনন্তর শ্বেতকায়, দন্তচতুষ্টয়-বিশিষ্ট ঐরাবত নামে মহাগজ সমুৎপন্ন হইল। বজ্রধর ইন্দ্র তাহাকে অধিকার করিলেন। সুরাসুর তথাপি ক্ষান্ত না হইয়া অনবরতই মন্থন করিতে লাগিলেন। তাহাতে কালকুট গরল উৎপন্ন হইল। সধূম জ্বলদগ্নির ন্যায় সেই ভয়ঙ্কর গরল ধরণীতল আকুল করিল। কালকূটের কটুগন্ধ আঘ্রাণ করিয়া ত্রিলোকী মূর্চ্ছিত হইল। ব্রহ্মা তদবলোকনে ভীত হইয়া অনুরোধ করাতে সাক্ষাৎ মন্ত্রমূর্ত্তি ভগবান্ ভবানীপতি তৎক্ষণাৎ ঐ বিষম বিষরাশি পান করিয়া কণ্ঠে ধারণপূর্ব্বক ত্রৈলোক্য রক্ষা করিলেন। তদবধি তিনি নীলকণ্ঠ নামে খ্যাত হইয়াছেন।
দানবগণ এই অদ্ভুত ব্যাপার-নিরীক্ষণে হতাশ হইয়া অমৃত ও লক্ষ্মীলাভার্থ দেবতাদিগের সহিত ভয়ঙ্কর বিরোধ আরম্ভ করিল। তখন ভগবান্ নারায়ণ মোহিনী-মায়া আশ্রয় করিয়া নারীরূপ ধারণপূর্ব্বক অসুরসমূহের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। মূঢ়মতি দানবদল মোহিনীরূপধারী ভগবানের অপূর্ব্ব রূপলাবণ্যদর্শনে মোহিত ও তদ্গতচিত্ত হইয়া তাঁহাকে অমৃত সমর্পণ করিল।
রাহুর মস্তকচ্ছেদ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, অনন্তর সমস্ত দৈত্যগণ একত্রিত হইয়া নানাপ্রকার অস্ত্র-শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক দেবগণকে আক্রমণ করিল। তদবলোকনে মহাপ্রভাবশালী ভগবান নারায়ণ নরদেব সমভিব্যাহারে দানবেন্দ্রদিগকে বঞ্চনা করিয়া অমৃত হরণ করিলেন। অনন্তর দেবগণ বিষ্ণুর নিকট হইতে সেই অমৃত লইয়া পরমাহ্লাদে পান করিতে বসিলেন। দেবগণ অমৃত পান করিতে আরম্ভ করিলে রাহু নামে এক দুষ্ট দানব অবসর বুঝিয়া দেবরূপ ধারণপূর্ব্বক সুরগণের সহিত অমৃতপান করিতে বসিয়াছিল। অমৃত রাহুর কণ্ঠদেশমাত্র গমন করিয়াছে, এমত সময়ে চন্দ্র ও সূর্য্য দেবতাদিগের হিতসাধনার্থে ঐ গুপ্তবিষয় ব্যক্ত করিয়া দিলেন। ভগবান্ চক্রপাণি স্বীয় সুদর্শনাস্ত্র দ্বারা তৎক্ষণাৎ সেই দুষ্ট দানবের শিরচ্ছেদন করিলেন।
রাহুর পর্ব্বত-শিখরাকার প্রকাণ্ড মস্তক ছেদনমাত্রে গগনমণ্ডলে আরোহণ করিয়া ভীষণ-নাদে গর্জ্জন করিতে লাগিল। তাহার কবন্ধকলেবর সকাননা, সদ্বীপা, সপর্ব্বতা বসুন্ধরাকে কম্পিত করিয়া ভূপৃষ্ঠে পতিত হইল। তদবধি চন্দ্র ও সূর্য্যের সহিত রাহুমুখের চিরশত্রুতা জন্মিল। এই নিমিত্তই অদ্যাপি ঐ রাহু মুখ তাঁহাদিগকে গ্রাস করিয়া থাকে। পরিশেষে ভগবান্ নারায়ণ মোহিনীবেশ পরিত্যাগ করিয়া অস্ত্র-শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক দানবগণকে আক্রমণ করিলেন।
দেবাসুর-সংগ্রাম
তদনন্তর লবণার্ণব-তীরে দেবাসুরগণের ঘোরতর সংগ্রাম সমুপস্থিত হইল। প্রাস, তোমর, ভিন্দিপাল প্রভৃতি সহস্র সহস্র তীক্ষ্মাগ্র শস্ত্রবর্ষণে রণস্থল আচ্ছন্ন হইল। খড়্গ, চক্র, গদা, শক্তি প্রভৃতি শস্ত্রাঘাতে দানবগণ রুধির বমনপূর্ব্বক মূর্চ্ছিত হইয়া রণশায়ী হইল। তাহাদিগের তপ্ত-কাঞ্চনাকার মস্তক কপাল পট্টিশাঘাতে ছিন্নভিন্ন হইয়া অনবরত ধরণীতলে পতিত হইতে লাগিল। যুদ্ধে হত দানবগণ রুধিরাক্ত-কলেবর হইয়া ধাতুরাগরঞ্জিত গিরিকূটের [পর্ব্বতশৃঙ্গের] ন্যায় ভূমিশয্যায় শয়ান রহিল। পরস্পরের শস্ত্র প্রহার দেখিয়া রণস্থলে হাহাকার শব্দ উঠিল। দেবগণ দূর হইতে লৌহময় পরিঘাঘাত ও নিকটে দৃঢ়মুষ্টি প্রহার করিয়া রণ করিতে আরম্ভ করিলেন। দানবেরাও ঐরূপ যুদ্ধ করিতে লাগিল। সংগ্রামের কলকলধ্বনি গগনমণ্ডল আচ্ছাদিত করিল। চারিদিকে কেবল ‘ছিন্ধি, ভিন্ধি, প্রধাব ঘাতয়, পাতয়, মারয়’ [ছেদন কর, ভগ্ন কর, বেগে দৌড়াইয়া অগ্রসর হও, আঘাত কর, পাতিত কর, বধ কর] ইত্যাদি ঘোরতর শব্দমাত্র শ্রুত হইতে লাগিল।
এইরূপে ভয়ঙ্কর সংগ্রাম হইতেছে, এমত সময়ে নর ও নারায়ণ রণস্থলে আগমন করিলেন। ভগবান্ নারায়ণ নরদেবের হস্তে দিব্য ধনুঃ সন্দর্শন করিয়া দানবকুল-ধূমকেতু স্বীয় চক্রাস্ত্র স্মরণ করিলেন। মহাপ্রভাবশালী, সূর্য্যসম-তেজস্বী, অপ্রতিহতবীর্য্য, ভীমদর্শন সেই অরিনিসূদন সুদর্শনচক্র স্মরণ মাত্রে নভোমণ্ডল হইতে অবতীর্ণ হইল। আজানুলম্বিতবাহু, ভগবান চক্রপাণি সেই প্রজ্বলিত হুতাশনাকার, ভয়ঙ্কর চক্র বিপক্ষপক্ষে প্রক্ষেপ করিলেন। নারায়ণ-বিক্ষিপ্ত ভীষণ সুদর্শনাস্ত্র মহাবেগে ধাবমান হইয়া সহস্র সহস্র দানবদলের প্রাণসংহার করিল। কোন স্থলে সমুজ্জ্বল হুতাসনের ন্যায় প্রজ্বলিত হইয়া দৈত্যকুল নিপাত করিল, কোথাও বা আকাশমণ্ডলে ও ধরাতলে পরিভ্রমণপূর্ব্বক পিশাচের ন্যায় তাহাদিগের রুধির পান করিতে লাগিল।
নবমেঘাকৃতি, মহাবল-পরাক্রান্ত দানবেরাও আকাশে উত্থিত হইয়া সহস্র সহস্র পর্ব্বত-নিক্ষেপ দ্বারা দেবগণকে আকুলিত করিল। তৎকালে ভগ্নসানু অতি প্রকাণ্ড মহীধরগণ পরস্পরাভিঘাতে ভয়ঙ্কর শব্দ করিয়া ঘোরতর মেঘের ন্যায় চতুর্দ্দিকে পতিত হইতে লাগিল। দুর্দ্দান্ত দানবগণ এইরূপ গভীর গর্জ্জনপূর্ব্বক নিরন্তর পর্ব্বত-বর্ষণ করিয়া সকাননা, সদ্বীপা মেদিনীকে কম্পান্বিত করিল। তখন নরদেব সুবর্ণমুখ শিলীমুখ [শাণিত শর– চোখা বাণ ] দ্বারা দানববিক্ষিপ্ত পর্ব্বতসমূহ বিদারণপূর্ব্বক নভোমণ্ডল ব্যাপ্ত করিলেন। মহাবলপরাক্রান্ত দানবগণ দেবগণ কর্ত্তৃক ভগ্নবল হইয়া এবং আকাশমণ্ডলে জ্বলন্তাগ্নিসদৃশ সুদর্শন-চক্রকে ক্রুদ্ধ দেখিয়া কেহ ভূগর্ভে, কেহ বা লবণার্ণগর্ভে প্রবিষ্ট হইল।
সুরগণ এইরূপে জয়লাভ করিয়া যথোচিত সৎকারপুবঃসর মন্দরগিরিকে স্বস্থানে সংস্থাপন করিলেন। জলধরগণ নভোমণ্ডল এবং সুরলোক নিনাদিত করিয়া যথাস্থানে প্রতিগমন করিল। অনন্তর ইন্দ্রাদি দেবগণ আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইয়া সেই অমৃতপূর্ণ কমণ্ডলু সুরক্ষিত করিয়া নারায়ণের নিকট সমর্পণ করিলেন।

নাগগণের প্রতি অভিশাপ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে ঋষিবর! অমৃতমন্থনসময়ে শ্রীমান্ অতুলতেজা উচ্চৈঃশ্রবানামক যে অশ্বরাজ জলনিধি হইতে সমুত্থিত হয়, তাহার সমস্ত বিবরণ বিশেষরূপে বর্ণিত হইল। কদ্রু সেই অশ্বরাজকে অবলোকন করিয়া স্বীয় সপত্নী বিনতাকে কহিলেন, “বিনতে! বল দেখি, উচ্চৈঃশ্রবাঃ অশ্বের কিরূপ বর্ণ?” বিনতা কহিলেন, “উচ্চৈঃশ্রবাঃ শুক্লবর্ণ; তোমার কি বোধ হয়? আইস, এ বিষয়ে দুইজনে পণ করি।” কদ্রু কহিলেন, “হে মধুরহাসিনি! আমি বোধ করি, এই অশ্বের পুচ্ছ কৃষ্ণবর্ণ; আইস, এ বিষয়ে এই পণ করা যাউক যে, যাহার অনুমান মিথ্যা হইবে, সে দাসী হইয়া থাকিবে।” তাঁহারা এইরূপে পরস্পর দাস্যবৃত্তি অবলম্বনে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইয়া “কল্য এই অশ্বকে দেখিব” এই বলিয়া স্ব স্ব আবাসে প্রত্যাগমন করিলেন। কদ্রু নিজ নিকেতনে আগমন করিয়া কৌটিল্য [কুটিলতা –গুপ্ত ষড়যন্ত্র] করিবার মানসে স্বীয় সহস্র পুৎত্রের প্রতি আজ্ঞা করিলেন, “তোমাদিগকে কৃষ্ণরূপ ধারণপূর্ব্বক উচ্চৈঃশ্রবাঃ অশ্বের পুচ্ছদেশে লম্বমান হইয়া তৎপুচ্ছের কৃষ্ণত্ব সম্পাদন করিতে হইবে। দেখিও যেন, আমাকে দাসীত্ব-শৃঙ্খলে বদ্ধ হইতে না হয়।” যে-সকল ভূজঙ্গম তদীয় আজ্ঞা-প্রতিপালনে পরাঙ্মুখ হইল, তিনি তাহাদিগকে এই অভিসম্পাত করিলেন, “তোমরা পাণ্ডুবংশাবতংস রাজর্ষি জনমেজয়ের সর্পসত্রে অগ্নিতে দগ্ধ হইবে।” সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা কদ্রুদত্ত সেই অতি নিষ্ঠুর শাপ স্বকর্ণে শ্রবণ করিলেন। পরে সর্পসংখ্যার আতিশষ্যপ্রযুক্ত কদ্রুদত্ত শাপ প্রজাবর্গের পরম শ্রেয়স্কর হইয়াছে বিবেচনা করিয়া অন্যান্য দেবগণের সহিত সাতিশয় আনন্দ প্রকাশ করিতে লাগিলেন এবং কহিলেন, “এই সকল মহাবল হিংস্র সর্পগণের বিষ অতিশয় তীব্র ও বীর্য্যশালী; সেই তীব্র বিষে প্রজাগণের সর্ব্বদাই অনিষ্ট-ঘটনা হইয়া থাকে; অতএব কদ্রু ইহাদিগকে এই শাপ দিয়া উত্তম কর্ম্ম করিয়াছেন। তাহারা যেমন সর্ব্বদা প্রজাগণের অহিতাচরণ করে, তেমনি দৈব তাহাদিগের উপর প্রাণান্তিক দণ্ডপাত করিয়াছেন।”
ব্রহ্মা দেবগণের সহিত এইরূপ আনন্দ প্রকাশ করিয়া কদ্রুকে সমুচিত সম্মান প্রদান করিলেন এবং মহর্ষি কশ্যপকে স্বীয় সন্নিধানে আহ্বানপূর্ব্বক কহিলেন, “হে পুণ্যশালিন্! যে সকল তীক্ষ্মবিষ মহাফণ ভুজঙ্গমগণ তোমার ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, কদ্রু তাহাদিগকে শাপ প্রদান করিয়াছেন, অতএব হে বৎস! এ বিষয়ে তোমার ক্রোধ করা বিধেয় নহে। যজ্ঞে সর্পকুল বিনষ্ট হইবে, ইহা পূর্ব্বাপর বর্ণিত আছে।” ব্রহ্মা কশ্যপ প্রজাপতিকে এইরূপে প্রসন্ন করিয়া তাঁহাকে বিষহরী বিদ্যা প্রদান করিলেন।
সমুদ্রবর্ণন
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, কদ্রু ও বিনতা এইরূপে পরস্পর দাস্যবৃত্তি পণ করিয়া এবং তজ্জন্য সাতিশয় অমর্ষাবিষ্ট ও রোষপরবশ হইয়া সেই রাত্রি অতিবাহিত করিলেন। পরদিবস প্রভাতে সূর্য্যোদয় হইবামাত্র তাঁহারা দুইজনে অনতিদূরবর্ত্তী উচ্চৈঃশ্রবাঃ তুরঙ্গমকে দেখিবার মানসে কিয়দ্দুর গমন করিয়া অপ্রমেয়, অচিন্তনীয়, অগাধ, সর্ব্বভূতভয়াবহ, পরমপবিত্র অম্ভোনিধি অবলোকন করিলেন। যে জলধি তিমি [সমুদ্রের সুবৃহৎ মৎস্য], তিমিঙ্গিল [তিমিকে যে গিলিয়া থাকে– তিমি অপেক্ষাও বড় মাছ], মৎস্য, কচ্ছপ, মকর, নক্র-চক্র [দলবদ্ধ কুম্ভীর] প্রভৃতি সহস্র সহস্র ভয়ঙ্কর, বিকৃতাকার জলচরগণে এবং ভীষণাকার সর্পগণে নিরন্তর সমাকীর্ণ; চন্দ্র, লক্ষ্মী, উচ্চৈঃশ্রবাঃ অশ্ব, পাঞ্চজন্য শঙ্খ, অমৃত, বাড়বানল ও সর্ব্বপ্রকার রত্ন যাহা হইতে উৎপন্ন; পর্ব্বতাধিরাজ মৈনাক ও জলাধিরাজ বরুণদেব যাহাতে সতত বাস করেন, যে সমুদ্র দানবগণের পরম মিত্র ও স্থলচর জন্তুগণের সাতিশয় ভয়াবহ শত্রু; যাহাতে ভয়ঙ্কর জলজন্তুসকল সর্ব্বদা ঘোরতর শব্দ করিতেছে এবং বায়ুবেগে অনবরত পর্ব্বতাকার তরঙ্গমালা সমুত্থিত হইতেছে, দেখিলে বোধ হয় যেন, সমুদ্র তরঙ্গরূপ হস্ত উত্তোলনপূর্ব্বক নিরন্তর নৃত্য করিতেছে; চন্দ্রের হ্রাস-বৃদ্ধি অনুসারে যাহার হ্রাস বৃদ্ধি হইয়া থাকে; অমিততেজাঃ ভগবান্ নারায়ণ বরাহরূপ ধারণপূর্ব্বক মধ্যে প্রবেশ করিয়া যাহার জল বিক্ষোভিত ও আবিল করিয়াছিলেন এবং যাহাতে যোগনিদ্রা অনুভব করিয়াছিলেন; ব্রত পরায়ণ ব্রহ্মর্ষি অত্রি শতবৎসরেও যাহার তলস্পর্শ করিতে পারেন নাই; অসুরগণ অরাজক যুদ্ধে পরাভূত হইয়া যাহার মধ্যে বাস করে; যে সমুদ্র স্বীয় গর্ভস্থ বাড়বানলকে সর্ব্বদা তোয়রূপ হবিঃ প্রদান করিতেছে, সহস্র সহস্র মহানদী পরস্পর স্পর্দ্ধা করিয়া যেন অভিসারিকার ন্যায় যাহাতে সতত সমাবেশ করিতেছে।

কদ্রু-বিনতার সাগরতীরে গমন
সৌতি কহিলেন, নাগগণ মাতৃশাপ শ্রবণানন্তর পরামর্শ করিল, “আমাদিগের জননীর অন্তঃকরণে স্নেহের লেশমাত্র নাই, সুতরাং তাঁহার মনোভিলাষ সফল না হইলে রোষপরবশ হইয়া আমাদিগকে ভস্মসাৎ করিবেন; কিন্তু মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইলে প্রসন্না হইয়া আমাদিগের শাপ-বিমোচন করিতে পারেন। অতএব চল, সকলে একমত হইয়া উচ্চৈঃশ্রবার পুচ্ছ কৃষ্ণবর্ণ করি।” নাগেরা এই অভিসন্ধি করিয়া ঐ অশ্বের পুচ্ছদেশে কৃষ্ণকেশরূপে পরিণত হইল। ইত্যবসরে দক্ষতনয়া কদ্রু ও বিনতা গগনমার্গে উঠিয়া বায়ুবেগে বিচলিত, গভীর নিনাদযুক্ত, তিমিঙ্গিলমকর-সার্থ [শ্রেণী– দল–ঝাঁক] সঙ্কুল, বহুবিধ ভীষণ জন্তুগণে সমাকীর্ণ, সকল রত্নের আকর, বরুণদেবের আবাসস্থান, নাগগণের বাসভবন, স্থানে স্থানে স্রোতস্বতীগণে পরিপূর্য্যমান, অপ্রমেয়, অচিন্তনীয়, অগাধ, অতি দুর্দ্ধর্ষ, অক্ষোভ্য, পবিত্রজলবিশিষ্ট, রমণীয় জলনিধি দর্শন করিতে করিতে পরম প্রীতি সহকারে তাহার অপর পারে উপস্থিত হইলেন।

বিনতার দাসীভাবপ্রাপ্তি
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, কদ্রু ও বিনতা সমুদ্র অতিক্রম করিয়া অতিসত্বর তুরগ-সমীপে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, অশ্বটি শশাঙ্ক [চন্দ্র]-কিরণের ন্যায় শুভ্রবর্ণ, কেবল তাহার পুচ্ছদেশের কেশগুলি কৃষ্ণবর্ণ। তদবলোকনে বিনতা অতিমাত্র বিষণ্ণ হইলেন। পরে কদ্রু তাঁহার দাসীর কার্য্য করিতে আদেশ দিলেন। বিনতা পণে পরাজিতা হইয়াছেন, সুতরাং তাঁহাকে অগত্যা সপত্নীর দাস্যকর্ম্ম আশ্রয় করিতে হইল।
এই সময় গরুড় অবসর বুঝিয়া মাতার প্রযত্ন-ব্যতিরেকে স্বয়ং অণ্ডবিদারণপূর্ব্বক বহির্গত হইলেন। মহাসত্ত্ব, মহাবল সম্পন্ন, সৌদামিনীসমনেত্র, কামরূপ, কামবীর্য্য, কামচারী বিহঙ্গমরাজ প্রদীপ্ত হুতাশনরাশির ন্যায় স্বকীয় প্রভামণ্ডলে সহসা দশদিক্ আলোকময় করিয়া আকাশে আরোহণ ও ঘোরতর বিরাব [বিকট শব্দ] পরিত্যাগপূর্ব্বক ভয়ঙ্কর প্রকাণ্ড কলেবর ধারণ করিলেন। তাহা দেখিয়া দেবগণ ভীত ও বিস্মিত হইলেন। পরে তাঁহারা আসনস্থ বিশ্বরূপী ভগবান অগ্নির শরণাগত হইয়া যথাবিধি প্রণতিপূর্ব্বক অতি বিনীতবচনে কহিলেন, “হে হুতাশন! তুমি আর পরিবর্দ্ধিত হইও না, তুমি কি আমাদিগকে দগ্ধ করিতে ইচ্ছা করিয়াছ? ঐ দেখ, পর্ব্বতাকার প্রজ্বলিত অগ্নিরাশি ইতস্ততঃ প্রসূত হইতেছে।” অগ্নি কহিলেন, “হে অসুর-নিসূদন সুরগণ! তোমাদিগের আপাততঃ যাহা বোধ হইতেছে, উহা বস্তুতঃ সেরূপ নহে। আমার তুল্য তেজস্বী বলবান্ বিনতানন্দন গরুড় জন্মগ্রহণ করিয়া কলেবর বৃদ্ধি করিতেছেন; তাঁহার তেজোরাশি নিরীক্ষণ করিয়া তোমরা মোহাবিষ্ট হইয়াছ। ঐ নাগকুলান্তক কশ্যপাত্মজ সর্ব্বদা দেবতাদিগের হিতানুষ্ঠান ও দৈত্যরাক্ষসদিগের অনিষ্ট চেষ্টা করিবেন। অতএব তোমাদিগের কোন ভয় নাই, আইস, আমরা সমবেত হইয়া গরুড়ের নিকট যাই।”
অনন্তর দেবগণ ও ঋষিগণ তৎসন্নিধানে গমন করিয়া গরুড়কে স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন। “হে মহাভাগ পতগেশ্বর! তুমি ঋষি, তুমি দেব, তুমি প্রভু, তুমি সূর্য্য, তুমি প্রজাপতি, তুমি ব্রহ্মা, তুমি ইন্দ্র, তুমি হয়গ্রীব, তুমি শর, তুমি জগৎপতি, তুমি সুখ, তুমি দুঃখ, তুমি বিপ্র, তুমি অগ্নি, তুমি পবন, তুমি ধাতা, তুমি বিধাতা, তুমি বিষ্ণু, তুমি অমৃত, তুমি মহদ্যশঃ, তুমি প্রভা, তুমি আমাদের পরিত্রাণস্থান, তুমি বল, তুমি সাধু, তুমি মহাত্মা, তুমি সমৃদ্ধিমান্, তুমি অন্তক, তুমিই স্থিরাস্থির সমস্ত পদার্থ, তুমি অতি দুঃসহ, তুমি উত্তম, তুমি চরাচরস্বরূপ, হে প্রভূতকীর্ত্তে গরুড়! ভূত ভবিষ্যৎ ও বর্ত্তমান তোমা হইতেই ঘটিতেছে, তুমি স্বকরমণ্ডলে দিবাকরের শোভা প্রাপ্ত হইয়াছ, তুমি স্বকীয় প্রভাপুঞ্জে সূর্য্যের তেজোরাশি সমাক্ষিপ্ত করিতেছ, হে হুতাশনপ্রভ! তুমি কোপাবিষ্ট দিবাকরের ন্যায় প্রজাসকলকে দগ্ধ করিতেছ, তুমি সর্ব্বসংহারে উদ্যত যুগান্তবায়ুর ন্যায় নিতান্ত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করিয়াছ। আমরা মহাবল-পরাক্রান্ত, বিদ্যুৎসমানকান্তি, গগনবিহারী, অমিত-পরাক্রমশালী, খগকুলচূড়ামণি গরুড়ের শরণ লইলাম। হে জগৎপ্রভো! তোমার তপ্তসুবর্ণসম রমণীয় তেজোরাশি দ্বারা এই জগন্মণ্ডল নিরন্তর সন্তপ্ত হইতেছে। তুমি ভয়বিহ্বল ও বিমানারোহণপূর্ব্বক আকাশপথে ইতস্ততঃ পলায়মান সুরগণকে পরিত্রাণ কর। হে খগবর! তুমি পরমদয়ালু মহাত্মা কশ্যপের পুৎত্র, অতএব ক্রোধ সংবরণ করিয়া জগতের প্রতি দয়া প্রকাশ কর। তুমি ঈশ্বর, এক্ষণে ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক আমাদিগকে অনুকম্পা কর। আমরা বিষম বিপদে আক্রান্ত হইয়াছি। তোমার বজ্রনির্ঘোষ-সদৃশ ঘোররবে নভোমণ্ডল, দিঙ্মণ্ডল, দেবলোক, ভূলোক ও আমাদিগের হৃদয় সতত কম্পমান হইতেছে। তুমি অগ্নিতুল্য স্বীয় শরীরের সঙ্কোচ কর। কুপিত কৃতান্তের ন্যায় তোমার অতি ভীষণ কলেবর দর্শনে আমাদের মন ব্যথিত ও শঙ্কিত হইতেছে। হে ভগবান্ খগাধিপতে! প্রসন্ন হইয়া শরণাগতজনের সুখাবহ হও।”
সূর্য্যের সরর্বসংহারক মূর্ত্তিধারণ
গরুড় দেবতা ও ঋষিদিগের এইরূপ স্তুতিবাদ শ্রবণ করিয়া এবং আপনার অতি প্রকাণ্ড কলেবর অবলোকন করিয়া স্বীয় তেজঃপুঞ্জের প্রতিসংহার করিলেন এবং কহিলেন, “আমি আত্মতেজের সঙ্কোচ করিতেছি, আর কাহাকেও ভীত হইতে হইবে না।” এই বলিয়া বিহঙ্গরাজ গরুড় অরুণকে আত্মপৃষ্ঠে আরোহণ করাইয়া পিতৃগৃহ হইতে সমুদ্রের অপরপারবর্ত্তিনী স্বীয় জননীর সন্নিধানে গমন করিলেন। ঐ সময় সূর্য্যদেব দেবতাদিগের প্রতি কূপিত হইয়া প্রখর করজাল বিস্তারপূর্ব্বক ত্রিলোকী দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছেন দেখিয়া খগরাজ স্বীয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা অরুণকে পূর্ব্বদিকে স্থাপন করিলেন।
রুরু কহিলেন, “সূর্য্য কি নিমিত্তে ত্রিলোক দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন এবং দেবতারাই বা তাঁহার কি অপকার করিয়াছিলেন যে, তিনি তাঁহাদিগের প্রতি এইরূপ কুপিত হইলেন?” প্রমতি কহিলেন, “যৎকালে চন্দ্র ও সূর্য্য রাহুকে প্রচ্ছন্নভাবে অমৃত পান করিতে দেখিয়া দেবতাদিগের নিকট প্রকাশ করিয়া দেন, তদবধি তাঁহাদিগের সহিত রাহুর বৈরানুবন্ধ হওয়াতে ঐ ক্রুরগ্রহ রাহু মধ্যে মধ্যে সূর্য্যদেবকে গ্রাস করিত। পরে ভগবান্ সূর্য্য এই অভিপ্রায়ে রোষাবিষ্ট হইলেন যে, আমি দেবতাদিগেরই হিতানুষ্ঠানের নিমিত্ত রাহুর কোপে পড়িলাম এবং তজ্জন্য কেবল আমিই একাকী বহু অনর্থকর পাপের ফলভাগী হইলাম, বিপৎকালে কাহাকেও সাহায্য করিতে দেখি না। রাহু যখন আমাকে গ্রাস করে, দেবতারা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াও তাহা অনায়াসে সহ্য করিয়া থাকে; অতএব আমি অদ্য সমস্ত লোক বিনাশ করিব, সন্দেহ নাই। দিবাকর এইরূপ অভিসন্ধি করিয়া অস্তাচল চূড়াবলম্বী হইলেন এবং বিশ্বসংসার সংহার করিবার মানসে স্বকীয় তেজোরাশি পরিবর্দ্ধিত করিতে লাগিলেন। তদনন্তর মহর্ষিগণ দেবতাদিগের নিকট গমন করিয়া কহিলেন, “অদ্য নিশীথসময়ে সর্ব্বলোকভয়াবহ মহাদাহ আরম্ভ হইবে।”
তখন দেবগণ মহর্ষিদিগের সমভিব্যাহারে সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার নিকট উপনীত হইয়া বিনীতবচনে নিবেদন করিলেন, “ভগবান্! কোথা হইতে ভয়ঙ্কর মহাদাহ উপস্থিত হইল? সূর্য্য লক্ষিত হইতেছে না, অথচ সর্ব্বলোকক্ষয় উপস্থিত। না জানি, সূর্য উদিত হইলে কি দুর্দ্দশা ঘটিবে।” পিতামহ কহিলেন, “দিবাকর সর্ব্বসংহারে উদ্যত হইয়াছেন। তিনি উদিত হইয়া ক্ষণকালমধ্যেই আমাদিগের সমক্ষে সমস্ত লোক ভস্মসাৎ করিবেন; কিন্তু ইতিপূর্ব্বেই আমি ইহার প্রতি বিধান করিয়া রাখিয়াছি। মহাত্মা কশ্যপের অরুণ নামে এক মহাবীর্য্যসম্পন্ন পুৎত্র জন্মিয়াছে। সে সূর্য্যের সম্মুখে থাকিয়া তাঁহার সারথ্য-কার্য্য করিবে এবং তদীয় তেজঃ প্রতিসংহার করিবে; তাহা হইলেই দেবগণ, ঋষিগণ ও সমস্ত লোকের মঙ্গললাভের সম্ভাবনা।” প্রমতি কহিলেন, “তদনন্তর অরুণ পিতামহের আদেশানুসারে সূর্য্য উদিত হইলেই তাঁহাকে আবরণ করিয়া তদীয় সম্মুখে উপবিষ্ট রহিলেন। সূর্য্যদেব যে কারণে কোপাক্রান্ত হইয়াছিলেন এবং অরুণ যে নিমিত্ত তাঁহার সারথ্য-স্বীকার করেন, তাহা আদ্যোপান্ত সমুদয় কীর্ত্তন করিলাম। এক্ষণে পূর্ব্বোল্লিখিত প্রশ্নের প্রত্যুত্তর প্রদান করিতেছি, শ্রবণ কর।”
কদ্রু কর্ত্তৃক ইন্দ্রস্তব
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, “তৎপরে মহাবলপরাক্রান্ত কামচারী বিহঙ্গমরাজ গরুড় সমুদ্রের অপরপারস্থ স্বকীয় জননী-সন্নিধানে গমন করিলেন। তথায় তাঁহার মাতা বিনতা পণে পরাজিতা হইয়া আপন সপত্নীর দাস্যবৃত্তি অবলম্বনপূর্ব্বক দুঃসহ দুঃখে কালক্ষেপ করিতেছিলেন। একদা বিনতা পুৎত্রের নিকট উপবিষ্টা আছেন, এমত সময়ে কদ্রু তাঁহাকে আহ্বান করিয়া বলিলেন, “দেখ বিনতে! সমুদ্রের মধ্যে এক পরম রমণীয় দ্বীপ আছে, ঐ দ্বীপে নাগগণ বাস করে, তথায় আমাকে লইয়া চল।” বিনতা আজ্ঞাপ্রাপ্তিমাত্রে কদ্রুকে পৃষ্ঠদেশে আরোহণ করাইয়া চলিলেন এবং গরুড়ও মাতৃনির্দ্দেশক্রমে কদ্রুপুৎত্র নাগগণকে পৃষ্ঠে লইয়া তাঁহার অনুসরণ করিলেন। বিনতানন্দন গরুড় সূর্য্যাভিমুখে গমন করাতে পন্নগগণ দুঃসহ তপনতাপে অত্যন্ত সন্তপ্ত হইয়া মূর্চ্ছিত হইতে লাগিল।
কদ্রু স্বীয় পুৎত্রদিগের তাদৃশ দুরবস্থা দেখিয়া বৃষ্টিবাসনায় সুরপতি ইন্দ্রকে স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন। “হে শচীপতে সহস্রলোচন দেবরাজ! তুমি বল, নমুচি ও বৃত্রাসুরকে নষ্ট করিয়াছ। এক্ষণ তোমাকে নমস্কার করি। প্রচণ্ড-রবিকিরণসন্তপ্ত মদীয় পুৎত্রদিগের উপর বারিবর্ষণ কর। হে সুরপতে! সম্প্রতি তোমা ব্যতিরেকে আমাদিগের প্রাণরক্ষার আর কোন উপায়ান্তর নাই; যেহেতু, তুমিই প্রচুর বারিবর্ষণ করিতে সমর্থ। তুমি বায়ু, তুমি মেঘ, তুমি অগ্নি, তুমি গগন মণ্ডলে সৌদামিনীরূপে প্রকাশমান হও এবং তোমা হইতেই ঘনাবলী পরিচালিত হইয়া থাকে; তোমাকেই লোকে মহামেঘ বলিয়া নির্দ্দেশ করে; তুমিই ঘোর ও প্রকাণ্ড বজ্র জ্যোতিঃস্বরূপ, তুমি আদিত্য, তুমি বিভাবসু, তুমি অত্যাশ্চর্য্য মহাভূত, তুমি নিখিল দেবগণের অধিপতি, তুমি বিষ্ণু, তুমি সহস্রাক্ষ, তুমি দেব, তুমি পরমগতি, তুমি অক্ষয় অমৃত, তুমি পরমপূজিত, সৌম্যমূর্ত্তি, তুমি মুহূর্ত্ত, তুমি তিথি, তুমি বল, তুমি ক্ষণ, তুমি শুক্লপক্ষ, তুমি কৃষ্ণপক্ষ, তুমি কলা, কাষ্ঠা, ত্রুটি, মাস,ঋতু, সংবৎসর ও অহোরাত্র; তুমি সমস্থ পর্ব্বত ও বন সমাকীর্ণা বসুন্ধরা; তুমি তিমিরবিরহিত ও সূর্য্যসংস্কৃত আকাশ, তুমি তিমি-তিমিঙ্গিলসহিত ও উত্তুঙ্গতরঙ্গ-কুলসঙ্কল মহার্ণব, তুমি অতি যশস্বী, এই নিমিত্তই প্রতিভাসম্পন্ন মহর্ষিগণ প্রশান্তমনে তোমার আরাধনা করিয়া থাকেন। আর তুমি স্তবে পরিতুষ্ট হইয়া যজমানের হিতসাধনার্থে যজ্ঞীয় পবিত্র হবিঃ ও সোমরস পান করিয়া থাক। ব্রাহ্মণেরা একমাত্র পারত্রিক শুভলাভের প্রত্যাশায় সতত তোমার উপাসনা করিয়া থাকেন। হে বিপুলবিক্রমশালিন্! অখিল বেদ বেদাঙ্গ তোমারই অচিন্তনীয় অনন্ত মহিমা কীর্ত্তন করে এবং যজ্ঞপরায়ণ দ্বিজাতিগণ তোমার স্বরূপ অবধারণের নিমিত্ত প্রযত্ন-সহকারে সতত সে সকল বেদ-বেদাঙ্গের মীমাংসা করিয়া থাকেন।
ইন্দ্রের বারিবর্ষণ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দেবরাজ ইন্দ্র কদ্রুকৃত স্তব শ্রবণে সন্তুষ্ট হইয়া নীলবর্ণ জলদজালে দিঙ্মণ্ডল আচ্ছন্ন করিলেন এবং মেঘদিগকে অনবরত মুষলধারে বারিবর্ষণ করিতে আদেশ দিলেন। জলদগণ ইন্দ্রের আদেশ পাইয়া ঘোরতর গভীর গর্জ্জনপূর্ব্বক মুহুর্মুহুঃ সৌদামিনীস্ফুরণ ও প্রচুর বারিবর্ষণ করিতে লাগিল। তৎকালে বোধ হইল যেন, আকাশে প্রলয়কাল উপস্থিত হইয়াছে কিংবা মেঘনির্ঘোষ, বিদ্যুৎ প্রকাশ ও বাহুচালিত নীরধারা দ্বারা যেন আকাশমণ্ডল নৃত্য করিতেছে। সেই মেঘাচ্ছন্ন দুর্দ্দিনে চন্দ্র-সূর্য্য এককালে অন্তর্হিত হইলেন। তখন নাগগণ যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইল। বিশ্বমণ্ডলী সলিলভারে মগ্নপ্রায় হইল। সুশীতল বিমল জলধারা রসাতলে প্রবিষ্ট হইতে লাগিল। পরিশেষে সর্পগণ মাতার সহিত রামণীয়কদ্বীপে উপনীত হইল।
বিনতার দাসীত্বমুক্তির উপায় অনুসন্ধান
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগগণ প্রচুর জলধারায় অভিষিক্ত হইয়া অতি প্রহৃষ্টমনে সুপর্ণ [গরুড়] পৃষ্ঠে আরোহণপূর্ব্বক সেই মকর সমূহের আকর-ভূমি, বিশ্বকর্ম্মবিরচিত রামণীয়কদ্বীপে উপনীত হইল; তথায় যাইয়া প্রথমতঃ অতি ভয়ঙ্কর লবণ-মহার্ণব অবলোকন করিল; পরে সেই দ্বীপের অন্তর্ব্বর্ত্তী পরমশোভাকর এক পবিত্র কাননে প্রবেশ করিয়া বিহার করিতে লাগিল। ঐ কানন সাগর-জলে নিরন্তর অভিষিক্ত হইতেছে; উহাতে বহুবিধ বিহঙ্গমগণ সর্ব্বদা মধুরস্বরে কলরব করিতেছে; বৃক্ষশ্রেণী নিরন্তর ফল-পুষ্পে সুশোভিত রহিয়াছে; ঘন-সন্নিবিষ্ট তরুরাজি, সুরম্য হর্ম্ম্য [অট্টালিকা] পদ্মাকর [যেখানে পদ্ম জন্মে] সরোবর ও স্বচ্ছসলিলপূর্ণ অলৌকিক হ্রদসমূহ সর্ব্বদা উহার অপূর্ব্ব শোভা সম্পাদন করিতেছে; তথায় সুগন্ধ সমীরণ অনুক্ষণ ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করিতেছে; অত্যুন্নত চন্দন ও অন্যান্য বহুবিধ বৃক্ষগণ সতত বিরাজিত রহিয়াছে; ঐ সকল বৃক্ষ বায়ুবেগ-সহকারে বিকম্পিত হইয়া অবিরত পুষ্পবর্ষণ করিতেছে; মধুকরগণ মধুগন্ধে অন্ধ হইয়া মৃদু মধুরবে আগন্তুক ব্যক্তির মনোহরণ করিতেছে। ঐ উদ্যান গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরাদিগের প্রীতিস্থান এবং উহা দেখিলে তদ্দণ্ডেই অন্তঃকরণে আনন্দের সঞ্চার হইয়া থাকে।
কদ্রুপুৎত্রেরা সেই কাননে কিয়ৎক্ষণ বিহার করিয়া মহাবল পরাক্রান্ত গরুড়কে কহিল, “দেখ, তুমি আমাদিগকে অন্য কোন নির্ম্মল জলসম্পন্ন সুরম্য দ্বীপে লইয়া চল। তুমি সমস্ত মনোহর স্থান অবশ্যই জান; কারণ, তুমি গগনে উড্ডীন হইলে কোন রমণীয় স্থান তোমার নয়নের অগোচর থাকে না।” গরুড় সর্পদিগের এইরূপ আদেশবাক্য শ্রবণ করিয়া অতিবিষণ্ণমনে স্বীয় জননী-সন্নিধানে নিবেদন করিলেন, “মাতঃ! আমাকে কি কারণে সর্পগণের আদেশ প্রতিপালন করিতে হইবে, তাহা বল।” বিনতা কহিলেন, “বৎস! আমি দুরদৃষ্টক্রমে নাগগণের মায়াজালে পতিত ও পণে পরাজিত হইয়া সপত্নীর দাস্যবৃত্তি অবলম্বন করিয়াছি।” গরুড় মাতৃসন্নিধানে এই কারণ শ্রবণ করিয়া অতিশয় পরিতাপ পাইলেন ও অনতিবিলম্বে সর্পগণের নিকট গমন করিয়া কহিলেন, “হে নাগগণ! কোন্ বস্তু আহরণ বা কিরূপ পৌরুষ প্রকাশ করিলে আমরা দাসত্ব-শৃঙ্খল হইতে মুক্ত হইতে পারি, তাহা জানিতে ইচ্ছা করি।” তাহা শ্রবণ করিয়া সর্পেরা কহিল, “হে বিহঙ্গমরাজ! যদি তুমি পৌরুষ প্রকাশ করিয়া অমৃত আহরণ করিতে সমর্থ হও, তাহা হইলেই দাসত্ব হইতে মুক্ত হইতে পারিবে।”
অমৃত আহরণে গরুড়ের যাত্রা
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, গরুড় এইরূপ অভিহিত হইয়া মাতার নিকট যাইয়া কহিলেন, “জননি! আমি অমৃত আহরণ করিতে চলিলাম; পথে কি আহার করিব, বলিয়া দাও।” বিনতা বলিলেন, “বৎস! সমুদ্রমধ্যে বহুসহস্র নিষাদ বাস করে, তুমি তাহাদিগকে ভোজন করিয়া অমৃত আনয়ন কর; কিন্তু হে বৎস! দেখিও, যেন ব্রাহ্মণবধে কদাচ তোমার বুদ্ধি না জন্মে। অনলসমান ব্রাহ্মণগণ সর্ব্বজীবের অবধ্য। ব্রাহ্মণ কুপিত হইলে অগ্নি, সূর্য্য, বিষ ও শস্ত্রতুল্য হয়েন। ব্রাহ্মণ সর্ব্বজীবের গুরু; এই নিমিত্ত ব্রাহ্মণ সর্ব্বভূতের আদরণীয়। অতএব হে বৎস! তুমি অতিশয় কুপিত হইয়াও যেন কোনক্রমে ব্রাহ্মণের হিংসা বা তাঁহাদিগের সহিত বিদ্রোহাচরণ করিও না। নিত্যনৈমিত্তিক জপহোমাদি ক্রিয়াকলাপে নিয়ত, বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ ক্রুদ্ধ হইলে যেরূপ দগ্ধ করিতে পারেন, কি অগ্নি কি সূর্য্য, কেহই সেরূপ পারেন না। ব্রাহ্মণ সর্ব্বজীবের অগ্রজাত, সর্ব্ববর্ণের শ্রেষ্ঠ এবং সর্ব্বভূতের পিতা ও গুরু।”
গরুড় মাতৃসন্নিধানে ব্রাহ্মণের এইরূপ অভাবনীয় প্রভাব অবগত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “মাতা! ব্রাহ্মণের কীদৃশ আকার, কি প্রকার স্বভাব ও কিরূপই বা পরাক্রম? ব্রাহ্মণ কি হুতাশনের ন্যায় সর্ব্বদা প্রদীপ্ত কিংবা অতিশয় সৌম্যমূর্ত্তি? যে-সকল শুভলক্ষণ দ্বারা ব্রাহ্মণকে চিনিতে পারা যায়, তুমি হেতুনির্দ্দেশপূর্ব্বক তাহা আমাকে বিশেষরূপে কহিয়া দাও।” বিনতা কহিলেন, “যিনি তোমার জঠরদেশে প্রবেশ করিলে বড়িশের ন্যায় নিতান্ত দুঃসহ ক্লেশদায়ক হইবেন এবং প্রজ্বলিত অঙ্গারের ন্যায় কণ্ঠদাহ করিবেন, তিনিই সুব্রাহ্মণ। তুমি অতিমাত্র ক্রুদ্ধ হইয়াও ব্রাহ্মণকে বধ করিতে প্রবৃত্ত হইও না।” বিনতা পুৎত্রবাৎসল্য প্রযুক্ত গরুড়কে পুনর্ব্বার কহিলেন, “বৎস! যিনি তোমার জঠরদেশে জীর্ণ হইবেন না, তাহাকেই সুব্রাহ্মণ বলিয়া জানিবে।” সর্পবঞ্চিতা পরমদুঃখিতা বিনতা পুৎত্রের অতুল পরাক্রম বুঝিতে পারিয়াও অতি প্রীতমনে তাঁহাকে আশীর্ব্বাদ করিলেন, “বৎস! বায়ু তোমার দুই পক্ষ রক্ষা করুন, চন্দ্র ও সূর্য্য তোমার পৃষ্ঠ, অগ্নি মস্তক এবং বসুগণ ত্বদীয় সর্ব্বাঙ্গ সর্ব্বদা নির্ব্বিঘ্নে রাখুন। হে পুৎত্র! আমিও তোমার স্বস্তি-শান্তি-বিষয়ে তৎপর হইয়া নিরন্তর ত্বদীয় শুভানুধ্যানে এই স্থানেই রহিলাম। তুমি কার্য্যসিদ্ধির নিমিত্ত নিরাপদে প্রস্থান কর।”
গরুড় মাতৃবাক্য-শ্রবণানন্তর পক্ষদ্বয় বিস্তারপূর্ব্বক গগনমার্গে উড্ডীন হইয়া বুভুক্ষা [ক্ষুধা] প্রযুক্ত সাক্ষাৎ কৃতান্তের ন্যায় নিষাদ-পল্লীতে উপনীত হইলেন এবং নিষাদ-সংহারের নিমিত্ত ধূলিরাশি দ্বারা নভোমণ্ডল আচ্ছন্ন ও সমুদ্রের জল শোষণ করিয়া সমীপস্থ সমস্ত মহীধরগণকে বিচালিত করিতে লাগিলেন। পরিশেষে বিহঙ্গরাজ প্রকাণ্ড মুখব্যাদানপূর্ব্বক নিষাদনগরীর পথ রুদ্ধ করিয়া বসিলেন। বিষাদসাগরে নিমগ্ন নিষাদগণ প্রবলবাত্যাহত ধূলিপটলে অন্ধপ্রায় হইয়া ভুজঙ্গভোজী গরুড়ের অতি-বিস্তীর্ণ আননাভিমুখে ধাবমান হইল। যেমন প্রবল বায়ুবেগে সমস্ত বন ঘূর্ণিত হইলে পক্ষিগণ আকাশমার্গে উঠে, সেইরূপ নিষাদেরাও গরুড়ের অতি বিশাল মুখবিবরে প্রবিষ্ট হইল। পরিশেষে ক্ষুধার্ত্ত বিহঙ্গরাজ মুখ মুদ্রিত করিয়া বহুসংখ্যক নিষাদ ভক্ষণ করিলেন।
শাপগ্রস্ত গজ-কচ্ছপবৃত্তান্ত
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, এক ব্রাক্ষণ ভার্য্যা সমভিব্যাহারে গরুড়ের কণ্ঠদেশে প্রবেশ করিয়াছিলেন। তিনি জ্বলন্ত অঙ্গারের ন্যায় তাঁহার কণ্ঠদাহ করিতে লাগিলেন। তখন গরুড় মাতৃবাক্য স্মরণ করিয়া কহিলেন, “হে দ্বিজোত্তম! আমি মুখব্যাদান [প্রসারণ—বড়রকমের হা ] করিতেছি, তুনি অতি সত্বর বহির্গত হও; ব্রাহ্মণ সর্ব্বদা পাপচরণতৎপর হইলেও আমার অবধ্য।” ব্রাক্ষণ খগাধিরাজ গরুড়ের এই কথা শ্রবণ করিয়া প্রত্যুত্তর করিলেন, “তবে আমার ভার্য্যা, নিষাদীও আমার সহিত বহির্গত হউক।” গরুড় কহিলেন, “ভাল, তুমি নিষাদীকে সঙ্গে লইয়া অবিলম্বে আমার আস্যবিবর [মুখগহ্বর] হইতে বহির্গত হও। তুমি এখনও আমার উদরে প্রবেশ করিয়া ভস্মাবশেষ হও নাই। অতএব বিলম্ব না করিয়া শীঘ্র আত্মরক্ষা কর।” তখন ব্রাক্ষণ নিষাদীর সহিত নিষ্ক্রান্ত হইয়া গরুড়কে সংবর্দ্ধনা করিয়া অভিলষিত প্রদেশে প্রস্থান করিলেন।
এইরূপে ব্রাহ্মণ ও তদীয় ভার্য্যা নিষাদী বহির্গত হইলে খগরাজ স্বকীয় পক্ষজাল বিস্তার করিয়া প্রবলবেগে অন্তরীক্ষে উত্থিত হইলেন এবং অনতিবিলম্বে স্বীয় পিতা কশ্যপকে দেখিতে পাইলেন। মহর্ষি কশ্যপ আপন সন্তানের সন্দর্শন পাইয়া কুশলপ্রশ্নানন্তর জিজ্ঞাসা করিলেন, “বৎস! মনুষ্যলোকে তোমার পর্য্যাপ্ত আহার-লাভ হইয়া থাকে?” তখন গরুড় কহিলেন, “পিতাঃ! আমার মাতা ও ভ্রাতা কুশলে আছেন এবং আমারও সর্ব্বাঙ্গীণ মঙ্গল বটে; কিন্তু মর্ত্ত্যলোকে আমার প্রচুর আহারদ্রব্য প্রাপ্ত হওয়া দুষ্কর হইয়াছে।” আরও কহিলেন, “নাগেরা আমাকে অমৃত আহরণ করিতে প্রেরণ করিয়াছে; আমি জননীর দাসীভাব মোচন করিবার নিমিত্ত অদ্য তাহা আনয়ন করিব; মাতা নিষাদগণকে ভক্ষণ করিতে কহিয়াছিলেন, বহুসংখ্যক নিষাদ ভক্ষণ করিয়াছি, তথাপি আমার সমুচিত তৃপ্তিলাভ হয় নাই; অতএব হে ভগবান্! এক্ষণে অপর কোন ভক্ষ্যদ্রব্য নির্দ্দেশ করিয়া দিন, যাহা আহার করিলে আমি অমৃত আহরণ করিতে সমর্থ হইব। হে প্রভো! বলবতী ক্ষুৎপিপাসায় আমার কণ্ঠতালু শুষ্কপ্রায় হইয়াছে।”
তখন মহর্ষি কশ্যপ কহিলেন, “বৎস! অনতিদূরে ঐ পবিত্র সরোবরটি দেখিতেছ. উহা দেবলোকেও বিখ্যাত। ঐ স্থলে দেখিতে পাইবে, এক হস্তী অবাঙ্মুখ [অধোবদন—নিম্নমুখ] হইয়া কূর্ম্মরূপী স্বকীয় জ্যেষ্ঠ সহোদরকে আকর্ষণ করিতেছে। উহাদিগের আকারের পরিমাণ ও জন্মান্তরীণ বৈরবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ কর।”
বিভাবসু নামে অতি কোপনস্বভাব এক মহর্ষি ছিলেন। তাঁহার কনিষ্ঠ সহোদর মহাতপা সুপ্রতীক ভ্রাতার সহিত একান্নে থাকিতে নিতান্ত অনিচ্ছুক; এই নিমিত্ত তিনি আপন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নিকট সর্ব্বদা পৈতৃক ধনবিভাগের কথা উত্থাপন করিতেন। একদা বিভাবসু ক্রুদ্ধ হইয়া সুপ্রতীককে কহিলেন, “দেখ, অনেকেই মোহপরবশ হইয়া পৈতৃকধন বিভাগ করিতে অভিলাষ করে; কিন্তু বিভাগানন্তর ধনমদে মত্ত হইয়া পরস্পর বিরোধ আরম্ভ করে। স্বার্থপর মূঢ় ব্যক্তিরা স্বীয় ধন অধিকার করিলে শত্রুপক্ষ মিত্রভাবে প্রবেশ করিয়া তাহাদিগের আত্মবিচ্ছেদ জন্মাইয়া দেয় এবং ক্রমশঃ দোষ দর্শাইয়া পরস্পরের রোষবৃদ্ধি ও বৈরভাব বদ্ধমূল করিতে থাকে। এইরূপ হইলে তাহাদিগের সর্ব্বদাই সর্ব্বনাশ ঘটিবার সম্ভাবনা। এই কারণে ভ্রাতৃগণের ধনবিভাগ সাধুদিগের অভিপ্রেত নহে। কিন্তু তুমি নিতান্ত অনভিজ্ঞের ন্যায় ঐ কথারই বারংবার উত্থাপন করিয়া থাক। আমি বারণ করিলেও তাহাতেও কর্ণপাত কর না; অতএব তুমি বারণযোনি [হস্তি-জন্ম] প্রাপ্ত হও।” সুপ্রতীক এইরূপে শাপগ্রস্ত হইয়া বিভাবসুকে কহিলেন, “তুমিও কচ্ছপযোনি প্রাপ্ত হও।”
এইরূপে সুপ্রতীক ও বিভাবসু পরস্পরের শাপপ্রভাবে গজত্ব ও কচ্ছপত্ব প্রাপ্ত হইয়াছেন। এক্ষণে তাঁহারা রোষদোষে তির্য্য্গযোনি-প্রাপ্ত, পরস্পর বিদ্বেষরত এবং শরীরের গুরুত্ব ও বলদর্পে একান্ত দর্পিত হইয়া জন্মান্তরীণ বৈরাসুসারে এই সরোবরে অবস্থান করিতেছেন। ঐ দেখ, গজের বৃংহিত [সক্রোধ ধ্বনি] শব্দে মহাকায় কচ্ছপ সরোবর আলোড়িত করিয়া জলমধ্য হইতে সত্বর উত্থিত হইতেছে। গজ তাহাকে দেখিতে পাইয়া অতি প্রকাণ্ড শুণ্ডাদণ্ড [শুঁড়] আস্ফালনপূর্ব্বক জলে অবগাহন করিতেছে। উহার শুণ্ডদণ্ড, লাঙ্গুল ও পদচতুষ্টয়ের তাড়নে সরোবরে অবস্থান করিতেছেন। উহার শুণ্ডাদণ্ড, লাঙ্গুল ও পদচতুষ্টয়ের তাড়নে সরোবর বিক্ষোভিত হইতেছে। অতি-পরাক্রান্ত কূর্ম্মও মস্তক উন্নত করিয়া যুদ্ধার্থে অভ্যাগত হইতেছে। গজের কলেবর ছয় যোজন উন্নত ও দ্বাদশ যোজন আয়ত। কূর্ম্ম তিন যোজন উন্নত ও তাহার পরিধি দশ যোজন। হে বৎস! উহারা পরস্পরের বিনাশে কৃতসঙ্কল্প হইয়া যুদ্ধে মত্ত হইয়াছে, উহাদিগকে ভক্ষণ করিয়া আপনার অভীষ্টসিদ্ধি কর। যাও, তুমিও এই মহাগিরিসদৃশ ঘোররূপী হস্তীকে ভোজন করিয়া অমৃত আহরণ কর।”
মহর্ষি কশ্যপ গরুড়কে ভক্ষ্যদ্রব্য নির্দ্দেশ করিয়া দিয়া আশীর্ব্বাদ করিলেন, “বৎস! দেবতাদিগের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলে তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে। পূর্ণকুম্ভ, গো, ব্রাহ্মণ এবং আর যে কিছু মাঙ্গল্যবস্তু আছে, সে সকলই তোমার শুভপ্রদ হউক। হে মহাবলপরাক্রান্ত! যৎকালে তুমি দেবতাদিগের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবে, তখন ঋক্, যজু:, সাম এই তিন বেদ, যজ্ঞীয় পবিত্র বহিঃ ও রহস্য [বেদের শক্তি—দৈবশক্তি] তোমার বলাধান করিবে।” গরুড় পিতার আশীর্ব্বাদ গ্রহণ করিয়া অনতিদূরে সেই নির্ম্মল জলপূর্ণ হ্রদ দেখিতে পাইলেন এবং তাহাতে নানাবিধ জলচর পক্ষিসকল কলরব করিতেছে দেখিলেন। তখন তিনি পিতৃবাক্য স্মরণ করিয়া এক নখে গজ ও অপর নখে কচ্ছপকে গ্রহণ করিয়া সত্বরে আকাশপথে উত্থিত হইলেন; অনন্তর অলম্ব নামক তীর্থে সমুপস্থিত হইয়া দেববৃক্ষগণের উপর আরোহণ করিতে ইচ্ছা করিলেন। বিটপি-মণ্ডলী [বৃক্ষশ্রণী] গরুড়ের পক্ষ-পবনে [পাখার বাতাস] আহত হইয়া শাখাভঙ্গভয়ে শঙ্কিত ও কম্পিত হইতে লাগিল। বিহঙ্গরাজ সেই অভীষ্টফলপ্রদ দিব্য সুবর্ণময় তরুদিগকে ভঙ্গভয়ে কম্পিত দেখিয়া অতীব উন্নত অন্যান্য বৃক্ষের সমীপে গমন করিলেন। সেই পরম রমণীয় বৃক্ষগুলির সুস্বাদু ফলসকল কাঞ্চনময় ও রজতময়, শাখাসমুদয় প্রবালময় এবং উহাদিগের মূলদেশ সর্ব্বদা সাগরজলে প্রক্ষালিত হইতেছে। তম্মধ্যে অত্যুচ্চ এক বটবিটপী পক্ষিরাজ গরুড়কে আগমন করিতে দেখিয়া কহিল, “হে গরুত্মন! তুমি আমার এই শত যোজন-বিস্তীর্ণ, অতিপ্রকাণ্ড শাখায় উপবেশন করিয়া গজ-কচ্ছপ ভক্ষণ কর।” মহীধর-তুল্য-কলেবর পতগেশ্বর প্রবলবেগে বহুসহস্রপক্ষিসেবিত সেই বৃক্ষশাখায় আরোহণ করিবামাত্র তাহা ভগ্ন হইল।
গরুড়ের অমৃতহরণ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাবল-পরাক্রান্ত গরুড় পাদস্পর্শ মাত্রেই তরুশাখা ভগ্ন হইল দেখিয়া তৎক্ষণাৎ তাহা ধারণ করিলেন। বিহঙ্গমরাজ শাখাভঙ্গ করিয়া বিস্ময়বিস্ফারিত লোচন ইতস্ততঃ অবলোকন করিতেছেন, ইত্যবসরে দেখিতে পাইলেন, তপঃপরায়ণ বালখিল্য ঋষিগণ অধঃশিরা হইয়া বৃক্ষশাখায় লম্বমান রহিয়াছেন। গরুড় তদ্দর্শনে অতিমাত্র ভীত হইয়া মনে করিলেন, শাখা ভূতলে পতিত হইলে নিশ্চয়ই ঋষিদিগের প্রাণনাশ হইবে; অতত্রব গজ ও কচ্ছপকে নখ দ্বারা দৃঢ়রূপে ধারণ করিয়া ঋষিগণের প্রাণরক্ষার্থে ঐ অতি বিশাল বৃক্ষশাখা চঞ্চুপুট দ্বারা গ্রহণ করিলেন। মহর্ষিগণ গরুড়ের অলৌকিক কর্ম্ম দর্শনে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া কারণ নির্দ্দেশপূর্ব্বক তাঁহার এই নাম রাখিলেন, “যেহেতু, এই বিহঙ্গম অতি গুরুভার গ্রহণ করিয়া অবিচলিতচিত্তে গগনমার্গে উড্ডীন হইল, অতএব অদ্যাবধি ইহার নাম গরুড় বলিয়া প্রসিদ্ধ হইবে।” অনন্তর গরুড় পক্ষ-পবন দ্বারা পার্শ্বস্থ সমস্ত পর্ব্বত বিচালিত করিয়া বায়ুবেগে গমন করিতে লাগিলেন।
গরুড় গজ-কচ্ছপ লইয়া বালখিল্য ঋষিগণের প্রাণরক্ষার্থে এইরূপে নানাদেশ ভ্রমণ করিলেন; কিন্তু কুত্রাপি উপবেশনের উপযুক্ত স্থান পাইলেন না। পরিশেষে গন্ধমাদন পর্ব্বতে উপনীত হইয়া স্বীয় পিতা মহর্ষি কশ্যপকে তপস্যায় অভিনিবিষ্ট দেখিলেন। ভগবান্ কশ্যপ সেই বলবীর্য্যতেজঃ সম্পন্ন, মন ও বায়ুসম বেগবান্, অচিন্তনীয়, অনভিভবনীয়, সর্ব্বভূতভয়ঙ্কর, প্রদীপ্ত অগ্নিশিখার ন্যায় সমুজ্জ্বল, অধৃষ্য, দুর্জ্জয়, সর্ব্বপর্ব্বতবিদারণক্ষম, সমুদ্রশোষণে সমর্থ, সর্ব্বলোকসংহারে পটু, কৃতান্তসম ভীমদর্শন, উত্তুঙ্গ [অতূ্যচ্চ] গিরিশৃঙ্গাকার, দিব্যরূপী, বিহঙ্গমরাজ গরুড়কে অভ্যাগত দেখিয়া এবং তাঁহার অভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া কহিলেন, “হে পুৎত্র! তুমি সহসা সাহসের কর্ম্ম করিও না, তাহাতে অশেষবিধ ক্লেশ পাইবার সম্ভাবনা। সূর্য্যমরীচিমাত্রপায়ী [সূর্যকিরণমাত্রসেবী] বালখিল্যগণ রোষপরবশ হইলে তোমাকে এইদণ্ডে ভস্মসাৎ করিবেন।” এই কথা বলিয়া মহর্ষি কশ্যপ পুৎত্রবাৎসল্যপ্রযুক্ত মহাভাগ বালখিল্য ঋষিদিগকে প্রসন্ন করিতে লাগিলেন। হে মহর্ষিগণ! প্রজাদিগের হিতোদ্দেশে গরুড় এই মহৎ কর্ম্ম সাধন করিতে অধ্যবসায় করিয়াছে, তোমরা অনুজ্ঞা কর।” বালখিল্যগণ মহর্ষি কশ্যপের অভ্যর্থনায় সেই বৃক্ষশাখা পরিত্যাগপূর্ব্বক তপশ্চরণার্থ পর্ব্বতশ্রেষ্ঠ পবিত্র হিমালয়ে প্রস্থান করিলেন।
বালখিল্য গমন করিলে বিনতানন্দন নিজ পিতা কশ্যপকে নিবেদন করিলেন, “ভগবন্! আমি এখন এই বিশাল বৃক্ষশাখা কোথায় নিক্ষেপ করি, আমাকে কোন নির্ম্মানুষ দেশ নির্দ্দেশ করিয়া দিন।” তখন কশ্যপ মানুষশূন্য নিরবচ্ছিন্ন তুষাররাশিসমাকীর্ণ এক পর্ব্বত কহিয়া দিলেন। পক্ষিরাজ শাখা ও গজ-কচ্ছপ লইয়া বায়ুবেগে সেই পর্ব্বত অভিমুখে যাত্রা করিলেন। গরুড় যে শাখা লইয়া গমন করিলেন, উহা এমত স্থুল যে, শতগোচর্ম্মনির্ম্মিত রজ্জু দ্বারাও বন্ধন বা বেষ্টন করা যায় না। পতগেশ্বর গরুড় অনতিবিলম্বে শতসহস্র যোজনান্তরে স্থির সেই মহাপর্ব্বতে উপনীত হইয়া পিতার আদেশানুসারে তদুপরি প্রকাণ্ড বৃক্ষশাখা নিক্ষেপ করিলেন। তদীয় পক্ষপবনে আহত হইয়া গিরিরাজ কম্পিত হইল, তরুগণ পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিল এবং যে-সকল মণিকাঞ্চনময় শৈলশৃঙ্গ পর্ব্বতের শোভা সম্পাদন করিত, তাহারা বিশীর্ণ হইয়া ইতস্ততঃ পতিত হইতে লাগিল। বৃক্ষশ্রেণী পরস্পরের শাখাঘাতে অভিহত হইয়া সৌদামিনীমণ্ডিত নবীন নীরদের ন্যায় কাঞ্চনময় কুসুমসমূহে সুশোভিত হইল। গৈরিকরাগরঞ্জিত পাদপ-সকল অবিরল ভূতলে পতিত হইয়া অপূর্ব্ব শোভাধারণ করিল। তৎপরে গরুড় সেই গিরিশৃঙ্গে উপবিষ্ট হইয়া গজ-কচ্ছপ ভক্ষণ করিলেন। খগরাজ এইরূপে সেই কূর্ম্ম ও কুঞ্জরকে উপযোগ করিয়া তথা হইতে মহাবেগে উড্ডীন হইলেন।
অনন্তর দেবতাদিগের উপর অতি ভয়ঙ্কর উৎপাত আরম্ভ হইল। ইন্দ্রের বজ্র ভয়ে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। অন্তরীক্ষ হইতে ধূম ও অগ্নিশিখার সহিত উল্কাপাত হইতে লাগিল। বসু, রুদ্র, আদিত্য, সাধ্য, মরুৎ ও অন্যান্য দেবগণের অস্ত্র সকল পরস্পর বিক্রম প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিল। দেবাসুর-সংগ্রামেও এরূপ অভূতপূর্ব্ব দুর্ঘটনা কদাচ ঘটে নাই। বায়ু প্রবলবেগে প্রবাহিত হইতে লাগিল, শত সহস্র উল্কাপাত হইতে লাগিল এবং মেঘশূন্য নভোণ্ডল অতি গভীররবে গর্জ্জন করিতে আরম্ভ করিল। অধিক কি বলিব, যিনি দেবাদিদেব [পর্জ্জন্যদেব] তিনিও অনবরত শোণিতবর্ষণ করিতে লাগিলেন। দেবতাদিগের গলদেশের মাল্য ম্লান ও তেজোরাশি ক্রমশঃ হ্রাস হইয়া গেল। প্রলয়কালীন অতিভীষণ মেঘের ন্যায় ঘনাবলী মুষলধারে রক্তবৃষ্টি করিতে লাগিল। ধূলিজাল গগনমার্গে উড্ডীন হইয়া দেবগণের মুকুটসকল প্রভাহীন করিল।
অনন্তর দেবরাজ ইন্দ্র ও সমস্ত দেবগণ এইরূপ অতি নিদারুণ উৎপাত দর্শনে ভীত ও বিস্মিত হইয়া বৃহস্পতিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ভগবন্! যুদ্ধে আমাদিগকে আক্রমণ করে, এরূপ শত্রু ত’ লক্ষ্য হয় না। তবে কোথা হইতে এতাদৃশ ঘোরতর উৎপাত সহসা উপস্থিত হইল?” বৃহস্পতি কহিলেন, “হে দেবেন্দ্র! তোমারই অপরাধ ও প্রমাদবশতঃ মহাত্মা বালখিল্যগণের তপোবলে বিনতাগর্ভে মহর্ষি কশ্যপের পক্ষিরূপী এক পুৎত্র জন্মিয়াছে। সেই কামরূপী মহাবল বিনতানন্দন অমৃতহরণে সমর্থ। তাহাতে সকলই সম্ভব হয়। সে অনায়াসে অসাধ্য সাধন করিতে পারে।”
ইন্দ্র তদীয় বাক্য শ্রবণ করিয়া অমৃতরক্ষকদিগকে আদেশ করিলেন, “মহাবীর্য্য মহাবল এক পক্ষী অমৃতহরণে উদ্যত হইয়াছে, আমি তোমাদিগকে সতর্ক করিয়া দিতেছি, দেখিও, যেন সে বলপূর্ব্বক অমৃত হরণ করিতে না পারে। বৃহস্পতি কহিয়াছেন, সে অতুল-বলশালী” তাহা শুনিয়া দেবতারা বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া অতি সাবধানে অমৃত বেষ্টন করিয়া রহিলেন এবং ইন্দ্রও বজ্রহস্ত হইয়া তথায় অবস্থান করিলেন। বিচিত্র বসন-ভূষণে বিভূষিত, পাপস্পর্শরহিত, নিরুপম, বলবীর্য্যসম্পন্ন, অসুরপুরবিদারণে পটু সুরগণ; কাঞ্চনময়, বৈদূর্য্যমণিময় ও চর্ম্মাত্মক, মহামূল্য প্রভাভাস্বর [তেজধারা দীপ্ত], সুদৃঢ় কবচ; তীক্ষ্ণধার ভয়ঙ্কর বিবিধ অস্ত্র-শস্ত্র; ধূম অগ্নি ও স্ফুলিঙ্গ [অগ্নিকণা] সহিত চক্র; পরিঘ, ত্রিশূল, পরশু, বহুবিধ সুতীক্ষ্ণ শক্তি; নির্ম্মল করবাল [তরোয়াল] এবং উগ্রদর্শন গদা এই সমস্ত অস্ত্র-শস্ত্র লইয়া অমৃতরক্ষার্থে সেইস্থানে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তাঁহারা এইরূপে স্ব স্ব অস্ত্র-শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক যুদ্ধার্থে সুসজ্জিত হইয়া সূর্য্যকিরণ বিকাশিত বিগলিতান্ধকার আকাশমণ্ডলের ন্যায় শোভা পাইয়াছিলেন।
গরুড়ের জন্মরহস্য
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! ইন্দ্রের কি অপরাধ ও তাঁহার অনবধানতাই বা কিরূপ? বালখিলা ঋষিগণের তপঃপ্রভাবে গরুড়ের সম্ভব ও মহর্ষি কশ্যপের পক্ষিরূপী পুৎত্র, ইহারই বা কারণ কি? ঐ পক্ষিরাজ কিরূপে সর্ব্বভূতের অবধ্য, অনভিভবনীয়, কামবীর্য্য ও কামচারী হইলেন? আমার এই সকল বিষয় শ্রবণ করিতে নিতান্ত কৌতূহল জন্মিয়াছে, যদি পুরাণে বর্ণিত থাকে, কীর্ত্তন কর।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাশয়! আপনি আমাকে যাহা জিজ্ঞাসা করিতেছেন, পুরাণে এই সমস্ত বর্ণিত আছে, আমি সংক্ষেপে কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। কোন সময়ে প্রজাপতি কশ্যপ পুৎত্রবাসনায় এক মহাযজ্ঞ আরম্ভ করেন। তাঁহার যজ্ঞানুষ্ঠানকালে ঋষিগণ, দেবগণ ও গন্ধর্ব্বগণ সাহায্যদান করিবার নিমিত্ত তথায় সমাগত হইয়াছিলেন। মহর্ষিকশ্যপ দেবরাজ ইন্দ্রকে এবং বাললিখ্য মুনগণ ও অন্যান্য দেবতাদিগকে যজ্ঞীয় কাষ্ঠভার আহরণ করিতে নিয়োগ করিলেন। ইন্দ্র আপন বীর্য্যানুরূপ প্রচুর কাষ্ঠভার আনয়নকালে পথিমধ্যে দেখিলেন, অঙ্গুষ্ঠ-প্রমাণ বালখিল্যগণ সকলে সমবেত হইয়া বহুকষ্টে একটি পত্রবৃন্ত আহরণ করিতেছেন। তাঁহারা অতি খর্ব্বাকৃতি, দুর্ব্বল ও নিরাহার; সুতরাং জলপূর্ণ এক গোষ্পদে মগ্ন হইয়া ক্লেশ পাইতেছিলেন। বলদৃপ্ত পুরন্দব্রতদ্দর্শনে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া তাঁহাদিগকে উপহাস ও অবমাননা করিলেন এবং লঙ্ঘন করিয়া অতি সত্বর-পদে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। ঋষিগণ এইরূপে অবমানিত হইয়া সাতিশয় রোষাবিষ্ট হইলেন এবং ইন্দ্রের ভয়াবহ এক অতি মহৎ যজ্ঞ আরম্ভ করিলেন। তাঁহারা ঐ যজ্ঞে এই কামনায় আহুতি প্রদান করিতে লাগিলেন যে, আমাদিগের তপঃপ্রস্তাবে ইন্দ্র হইতে অধিকতর শৌর্য্যবীর্য্য-সম্পন্ন, কামরূপী, কামবীর্য্য, কামগামী, সর্ব্বদেবের অধিপতি অন্য এক দারুণ ইন্দ্র উৎপন্ন হউন।
দেবরাজ ইন্দ্র তাহা জানিতে পারিয়া প্রজাপতি কশ্যপের শরণাগত হইলেন। কশ্যপ ইন্দ্রেমুখে সমুদয় বৃত্তান্ত অবগত হইয়া বালখিল্য মুনিগণের নিকট গমন করিয়া কার্য্যসিদ্ধির প্রার্থনা করিলেন। সত্যবাদী বালখিল্য মুনিগণ তৎক্ষণাৎ “অভীষ্টসিদ্ধি হইবে” এই কথা বলিলেন। তখন প্রজাপতি কশ্যপ তাঁহাদিগকে মধুর-সম্ভাষণে পরিতৃপ্ত করিয়া সাদর বচনে কহিতে লাগিলেন, “দেখ, ব্রহ্মার নিয়োগক্রমে ইনি ত্রিভুবনের ইন্দ্র হইয়াছেন, তোমরা আবার ইন্দ্রান্তর প্রার্থনা করিতেছ, তাহা করিলে ব্রহ্মার নিয়ম অন্যথা করা হইবে, কিন্তু তোমাদিগের সঙ্কল্প মিথ্যা হয়, ইহাও আমার অভিপ্রেত নহে; অতএব তোমরা যে ইন্দ্রের নিমিত্ত কামনা করিতেছ, তিনি পতগেন্দ্র হউন। হে ঋষিগণ! দেবরাজ প্রার্থনা করিতেছেন, তোমরা তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হও।” এইরূপ অভিহিত হইয়া বালখিল্যগণ কশ্যপকে যথাবিধি পূজা করিয়া প্রত্যুত্তর করিলেন, “হে প্রজাপতে! আমরা ইন্দ্রার্থে এবং তোমার পুৎত্রার্থে এই মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছি, এক্ষণে এই কর্ম্মের ভার তোমার প্রতি অর্পিত হইল, তুমিই ইহা প্রতিগ্রহ করিয়া যাহা শ্রেয়স্কর হয়, করি।”
ঐকালে কল্যাণবতী, কীর্ত্তিমতী, ব্রতপরায়ণা, দক্ষসুতা বিনতা দীর্ঘকাল তপোনুষ্ঠান করণানন্তর ঋতুস্নান করিয়া পুৎত্র বাসনায় স্বামিসন্নিধানে আগমন করিলেন। মহর্ষি কশ্যপ বিনতাকে সন্নিহিতা দেখিয়া কহিলেন, “দেবি! অদ্য তোমার মনোরথ পূর্ণ হইবে, বালখিল্য মুনিগণের তপঃপ্রভাবে ও আমার সঙ্কল্পবলে তোমার গর্ভে মহাভাগ ও ভুবনবিজয়ী দুই বীর পুৎত্র জন্মিবে। তাহারা ত্রিভুবন-পূজিত ও ত্রিলোকীর অধীশ্বর হইবে। তুমি প্রমাদশূন্য হইয়া এই সুমহোদয় গর্ভধারণ কর। সর্ব্বলোক সৎকৃত কামরূপী ঐ দুই বিহঙ্গম সমস্ত পক্ষিজাতির উপর ইন্দ্রত্ব করিবে।” অনন্তর মহর্ষি কশ্যপ অতিপ্রীতমনে ইন্দ্রকে কহিলেন, “সেই দুই মহাবীর্য্য বিহঙ্গম তোমার ভ্রাতা ও সহায় হইবে এবং তাহারা তোমার কখন কোন অপচয় করিবে না। তোমার সকল সন্তাপ দূর হউক, তুমিই ইন্দ্র থাকিবে, কিন্তু হে বৎস! তুমি অহঙ্কারপরতন্ত্র হইয়া যেন আর কদাচ ব্রহ্মবাদী ঋষিদিগকে পরিহাস বা অবমাননা করিও না। তাঁহাদিগের বাক্য বজ্রস্বরূপ এবং তাঁহারা অতিশয় কোপনস্বভাব।”
দেবরাজ ইন্দ্র মহর্ষি কশ্যপ কর্ত্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া নিঃশঙ্কচিত্তে সুরলোকে প্রস্থান করিলেন। বিনতাও চরিতার্থ হইয়া পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন। পরে কশ্যপ-বনিতা বিনতা যথাকালে অরুণ ও গরুড় নামে দুই পুৎত্র প্রসব করিলেন। অরুণ অঙ্গবৈকল্য-প্রযুক্ত সূর্য্যের সারথি হইয়াছেন, তদীয় ভ্রাতা গরুড় পক্ষিগণের ইন্দ্রত্বপদে অভিষিক্ত হইয়াছেন। হে ভৃগুনন্দন! সেই বিনতানন্দন গরুড়ের অতি বিচিত্র চরিত্র কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
গরুড়সহ দেবগণের যুদ্ধ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে দ্বিজেন্দ্র! দেবতারা সকলে সমবেত হইয়া অতি সাবধানে অমৃত রক্ষা করিতেছেন, এই অবসরে গরুড় অতিসত্বর তাঁহাদিগের নিকট উপস্থিত হইলেন। দেবতারা সেই মহাবল গরুড়কে দেখিয়া ভীত ও কম্পিত হইলেন এবং আপনারাই পরস্পর অস্ত্রাঘাত করিতে লাগিলেন। তথায় অপ্রমেয়-বল ও অগ্নির ন্যায় উজ্জ্বল বিশ্বকর্ম্মাও অমৃতরক্ষার্থে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি মুহূর্ত্তকাল গরুড়ের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম করিয়া পরিশেষে তদীয় পক্ষ, নখ ও চঞ্চুপুট দ্বারা ক্ষত-বিক্ষত ও মূর্চ্ছিত হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইলেন। পরে গগনচারী বিহগরাজ পক্ষপবনে ধূলিপ্রবাহ উত্থাপিত করিয়া সমস্ত লোক ও দেবগণকে আচ্ছন্ন করিলেন। দেবতারা ধূলিজালে আকীর্ণ হইয়া মোহপ্রাপ্ত হইলেন এবং তৎকালে অমৃতরক্ষকেরাও অন্ধপ্রায় হইলেন। এইরূপে গরুড় দেবলোক আলোড়িত করিয়া পক্ষতাড়ন ও তুণ্ডপ্রহারে দেবগণকে বিদীর্ণকলেবর করিলেন। তখন সহস্রলোচন ইন্দ্র পবনকে আদেশ করিলেন, “দেখ পবন! তুমি এই রজোবর্ষণ নিরাকরণ [অপসারণ, দূরীকরণ] কর, ইহা তোমারই কর্ম্ম।” বায়ু তৎক্ষণাৎ তাহা অপসারিত করিলেন।
অনন্তর অন্ধকার নিরস্ত হইলে দেবগণ পক্ষিরাজ গরুড়কে প্রহার করিতে আরম্ভ করিলেন। সুরগণ বধ করিতে উদ্যত হইলে মহাবলপরাক্রান্ত গরুড় মহামেঘের ন্যায় সর্ব্বভূত-ভয়ঙ্কর ঘোরতর গর্জ্জন করিতে করিতে নভোমণ্ডলে উত্থিত হইলেন। দেবতারা গরুড়কে অন্তরীক্ষে আরূঢ় দেখিয়া পট্টিশ, পরিঘ,শূল, গদা, প্রজ্বলিত ক্ষুরপ্র ও সূর্য্যাকৃতি চক্র ইত্যাদি নানা শস্ত্র দ্বারা তাঁহাকে আকীর্ণ করিলেন।
পক্ষিরাজ গরুড় দেবগণ কর্ত্তৃক এইরূপে আহত হইয়াও তুমুল সংগ্রাম করিতে কিছুমাত্র বিচলিত বা সঙ্কুচিত হইলেন না; বরং পক্ষদ্বয়ও বক্ষঃস্থলের অধিকতর আঘাতে তাঁহাদিগকে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত করিলেন। সুরগণ এইরূপে গরুড়যুদ্ধে পরাভূত ও রুধিরাক্ত-কলেবর হইয়া পলায়ন করিতে লাগিলেন। গন্ধর্ব্ব ও সাধ্যগণ পূর্ব্বদিকে, রুদ্র ও বসুগণ দক্ষিণদিকে, আদিত্যগণ পশ্চিমদিকে এবং অশ্বিনীকুমার দুইজনে উত্তরদিকে প্রস্থান করিলেন।
অনন্তর পতগেন্দ্র গরুড় অশ্বক্রন্দ, রেণুক, ক্রথন, তপন, উলুক, শ্বসন, নিমেষ, প্ররুজ ও পুলিন এই সমস্ত যক্ষের সহিত ঘোরতর যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। প্রলয়কালে মহাদেব রোষপরবশ হইলে যেরূপ অতি ভীষণ হয়েন, বিনতানন্দনও সেইরূপ অত্যুগ্র হইয়া পক্ষ. নখ ও তুণ্ডাগ্র দ্বারা সকলকে ছিন্ন-ভিন্ন করিলেন। সেই মহাবল মহোৎসাহ বীরপুরুষেরা ক্ষত-বিক্ষত হইয়া রুধিরবর্ষী ধারাধরের [মেঘ] ন্যায় শোভমান হইলেন।
খগেশ্বর সেই সমস্ত যক্ষদিগের প্রাণ-সংহার করিয়া, যেস্থানে অমৃত রহিয়াছে, তথায় উপস্থিত হইলেন এবং দেখিলেন, অমৃতের চতুষ্পার্শ্বে অগ্নি প্রজ্বলিত হইতেছে। সেই অগ্নির শিখা অতি ভয়ঙ্কর এবং তদ্দ্বরা আকাশমণ্ডল আচ্ছন্ন হইয়াছে, দেখিলে বোধ হয় যেন, বিভাবসু বায়ু কর্ত্তৃক প্রেরিত হইয়া সূর্য্যদেবকে দগ্ধ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। অনন্তর মহাত্মা গরুড় শতাধিক অষ্টসহস্র মুখ নির্গত করিলেন এবং ঐ সকল মুখ দ্বারা নদী পান করিয়া প্রবলবেগে তথায় আগমনপূর্ব্বক নদীজলে ঐ জ্বলন্ত অনল নির্ব্বাণ করিলেন। অগ্নি নির্ব্বাণ হইলে গরুড় তাহার মধ্যে প্রবেশ করিবার নিমিত্ত অন্য এক শরীর ধারণ করিলেন।
গরুড়ের অমৃতহরণ-গরুড়ের বিষ্ণুবাহনত্বলাভ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, পক্ষিরাজ অতি ভয়ঙ্কর স্বর্ণময় কলেবর ধারণ করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিলেন এবং দেখিলেন, অমৃতের নিকট লৌহময় ক্ষুরের ন্যায় তীক্ষ্ণধার একখানি শাণিত চক্র নিরন্তর ভ্রমণ করিতেছে। অগ্নিতুল্য প্রদীপ্ত ও সূর্য্যসম তেজস্বী ঐ ঘোররূপ যন্ত্র অমৃতহরণার্থ আগত ব্যক্তিব্যূহের [ব্যুহাকারে সুরক্ষিত লোকদিগের] কণ্ঠনালী ছেদন করিবার নিমিত্ত নিম্মিত হইয়াছে। গরুড় অঙ্গসঙ্কোচপূর্ব্বক ক্ষণমাত্রেই তাহার মধ্যাবকাশ [মধ্যের সামান্য ফাঁক] দ্বারা প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, সেই চক্রের অধঃস্থলে জ্বলন্ত অগ্নির ন্যায় উজ্জ্বল, মহাবীর্য্য, মহাঘোর, নিয়ত ক্রুদ্ধ ও নির্নিমেষনেত্র দুই সর্প অমৃত রক্ষা করিতেছে। তাহাদিগের বিদ্যুতের ন্যায় মুখ হইতে অনবরত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইতেছে এবং চক্ষুদ্বয় নিরন্তর বিষ উদ্গার করিতেছে। তাহাদিগের একতর যাহার প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করে, সে তৎক্ষণাৎ ভস্মসাৎ হইয়া যায়। তখন বিহঙ্গমরাজ ধূলিনিক্ষেপপূর্ব্বক ঐ উভয় সর্পের নয়নদ্বয় আচ্ছন্ন করিলেন এবং অদৃশ্যভাবে আকাশ হইতে তাহাদিগের কলেবর ছিন্ন-ভিন্ন করিয়া অমৃতগ্রহণপূর্ব্বক অতি দ্রুতবেগে গগনমণ্ডলে উত্থিত হইলেন। কিন্তু তিনি স্বয়ং অমৃতপান না করিয়া সূর্য্যপ্রভা আবরণপূর্ব্বক অপরিশ্রান্তমনে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন।
বিনতানন্দন অমৃত হরণ করিয়া আকাশপথে গমন করিতেছেন, এই অবসরে অবিনাশী দেবাদিদেব নারায়ণের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎকার হইল। নারায়ণ গরড়ের লোকাতিশায়িনী ক্রিয়া দর্শনে পরম সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, “হে বিহঙ্গরাজ! প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে অভিলষিত বর প্রদান করিব।” গরুড় কহিলেন, “আমি আপনার উপরিভাগে অবস্থান করিতে বাসনা করি।” এই বলিয়া পুনর্ব্বার নারায়ণকে কহিলেন, “আর আমি যাহাতে অমৃতপান ব্যতিরেকে অজর ও অমর হইতে পারি, এইরূপ বর প্রদান করুন।” বিষ্ণু কহিলেন, “তোমার অভীষ্ট সিদ্ধ হউক।” তখন গরুড় আপনার অভিলষিত বরলাভ করিয়া নারায়ণকে কহিলেন, “ভগবন্! প্রার্থনা কর, আমিও তোমাকে বর প্রদান করিব।” নারায়ণ মহাবল গরুড়কে কহিলেন, “তুমিও আমার বাহন হও” এবং স্বপ্রদত্ত বরের অন্যথা না হয়, এইজন্য পুনর্ব্বার কহিলেন, “তোমাকে আমার রথের ধ্বজ হইয়া থাকিতে হইবে।” পতগেশ্বর “তথাস্তু” বলিয়া বায়ুবেগে গমন করিলেন।
দেবরাজ ইন্দ্র অমৃতাপহারক পক্ষীকে অন্তরীক্ষে গমন করিতে দেখিয়া রোষভরে বজ্র প্রহার করিলেন। গরুড় বজ্রাঘাতে আহত হইয়াও হাস্যমুখে কহিলেন, “দেখ দেবরাজ! বজ্রাঘাতে আমার কিছুমাত্র ব্যথা জন্মে নাই; কিন্তু যে মুনির অস্থি হইতে এই বজ্রের উৎপত্তি হইয়াছে, তাঁহার, বজ্রাস্ত্রের ও তোমার সম্মানের নিমিত্ত আমি একটি পক্ষ পরিত্যাগ করিতেছি, এই পক্ষের অন্ত নাই।” এই বলিয়া পক্ষিরাজ একটি পক্ষ পরিত্যাগ করিলেন। দেবগণ ঐ উৎসৃষ্ট পক্ষটি অতি সুন্দর দেখিয়া হৃষ্টমনে কহিলেন. “এই পর্ণ (অর্থাৎ পক্ষ) অতি সুন্দর, অতএব অদ্যাবধি গরুড়ের নাম সুপর্ণ হইল।” সহস্রাক্ষ ইন্দ্র এইরূপ অত্যাশ্চর্য্য ব্যাপার দর্শনে বিস্মিত হইয়া মনে করিলেন, এই পক্ষী সামান্য পক্ষী নহে, ইনি অবশ্যই কোন মহাপ্রাণী হইবেন। এইরূপ কল্পনা করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, “ওহে বিহঙ্গম! আমি তোমার অলৌকিক বলবীর্য্য জানিতে এবং অনন্ত কালের নিমিত্ত তোমার সহিত মিত্রত্ব সংস্থাপন করিতে বাসনা করি।”

ইন্দ্রের সহিত গরুড়ের মিত্রতা
গরুড় কহিলেন, “হে দেবরাজ! তোমার স্বেচ্ছাক্রমে অদ্যাবধি তোমার সহিত আমার মিত্রত্ব-সংস্থাপন হইল। আমার বল নিতান্ত দুঃসহ ও একান্ত মহৎ। যদিচ স্বকীয় গুণকীর্ত্তন ও বল-প্রশংসা করা পণ্ডিতমণ্ডলীর অনুমোদিত নহে, বিশেষতঃ অকারণে আত্মপ্রশংসা অতিশয় অন্যায়, তথাপি তুমি আমার সখা এবং আগ্রহাতিশয়সহকারে জিজ্ঞাসা করিতেছ, এই নিমিত্ত কহিতে প্রবৃত্ত হইলাম, শ্রবণ কর। আমার বলের কথা অধিক কি বলিব, আমি পর্ব্বতকাননাদিসহিতা এই সসাগরা বসুন্ধরাকে অক্লেশে একপক্ষে বহন করিতে পারি। আর যদি তুমি ঐ পক্ষ অবলম্বন কর, তবে তোমাকেও লইয়া যাইতে পারি। চরাচর বিশ্বকে বহন করিতে হইলেও আমার কিছুমাত্র পরিশ্রম বোধ হয় না।”
গরুড় এইরূপে স্বীয় বলের পরিচয় প্রদান করিলে সর্ব্বলোকহিতকারী দেবরাজ কহিলেন, “হে বিহঙ্গরাজ! তুমি যাহা কহিলে, তোমাতে সকলই সম্ভব; এক্ষণে আমার সহিত সখ্যসংস্থাপন কর এবং অমৃতে যদি প্রয়োজন না থাকে, তবে আমাকে প্রত্যর্পণ কর; এই অমৃত যাহাদিগকে অর্পণ করিবে, তাহারাই আমাদিগের উপর উপদ্রব করিবে।” গরুড় কহিলেন, “হে সহস্রলোচন! আমি কোন কারণবশতঃ এই অমৃত লইয়া যাইতেছি, প্রার্থনা করিলে ইহার বিন্দুমাত্রও কাহাকে প্রদান করিব না; কিন্তু আমি যেস্থানে ইহা রাখিব, তুমি তৎক্ষণাৎ তথা হইতে অপহরণ করিও।” ইন্দ্র কহিলেন, “হে বিহঙ্গরাজ! আমি তোমার এই কথা শ্রবণ করিয়া যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইলাম, এক্ষণে আমার নিকটে অভিলষিত বর প্রার্থনা কর।” তখন গরুড় কদ্রুপুৎত্রদিগের দৌরাত্ম্য ও মাতার ছলকৃত দাসীভাব স্মরণ করিয়া কহিলেন, “আমি সকলের ঈশ্বর হইয়াও তোমার নিকট বর প্রার্থনা করিতেছি, যেন মহাবল সর্পসকল আমার ভক্ষ্য হয়।” দানবনিসূদন ইন্দ্র “তথাস্তু” বলিয়া দেবদেব যোগীশ্বর মহাত্মা হরির নিকট গমন করিলেন। চক্রপাণি দেবরাজ-মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া গরুড়াভিলষিত বিষয়ে অনুমোদন করিলেন।
বিনতার দাস্যমুক্তি
অনন্তর ভগবান্ ত্রিদশেশ্বর গরুড়কে পুনর্ব্বার কহিলেন, “তুমি অমৃত স্থাপন করিলেই আমি তাহা অপহরণ করিব।” এই বলিয়া সাদর-সম্ভাষণে তাঁহাকে বিদায় দিলেন। গরুড় অনতিবিলম্বে স্বীয় জননী-সন্নিধানে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক হৃষ্টমনে সর্পদিগকে কহিলেন, “এই আমি অমৃত আহরণ করিয়াছি; এক্ষণে ইহা এই কুশের উপর রাখিতেছি, তোমরা শীঘ্র স্নানপূজা করিয়া পান কর। দেখ, তোমরা যাহা কহিয়াছিলে, তাহা আমি সম্পাদন করিলাম; অতএব অদ্যাবধি আমার মাতা দাস্যবৃত্তি হইতে মুক্ত হউন।” সর্পগণ “তথাস্তু” বলিয়া স্নান করিতে গমন করিল। এই অবসরে দেবরাজ ইন্দ্র অমৃত অপহরণ করিয়া স্বর্গে প্রস্থান করিলেন। সর্পেরা স্নান, পূজা ও মঙ্গলাচরণ সমাপন করিয়া প্রফুল্লমনে অমৃতপান করিতে আসিয়া দেখিল, গরুড় যে কুশাসনে অমৃত রাখিব বলিয়াছিলেন, তথায় অমৃত নাই। পরে বিবেচনা করিল, আমরা যেমন ছলক্রমে বিনতাকে দাসী করিয়াছিলাম, তেমনি ছলে অমৃত হরণ করিয়াছে। তখন নাগগণ এই স্থানে অমৃত রাখিয়াছিল, এই বিবেচনা করিয়া সেই কুশাসন অবলেহন করিতে লাগিল। তাহাতেই তাহাদিগের জিহ্বা দুই খণ্ডে বিভক্ত হইয়াছে এবং পরম পবিত্র অমৃত কুশে সংস্পৃষ্ট হইয়াছিল বলিয়া তদবধি কুশের নাম পবিত্র হইয়াছে। মহাত্মা গরুড় এইরূপে অমৃতের হরণ ও আহরণ করিয়াছিলেন এবং সর্পদিগকে দ্বিজিহ্ব [দুইটি জিহ্বাযুক্ত] করিয়াছিলেন।
অনন্তর খগরাজ পরিতুষ্ট-মনে সেই কাননে বিহার করিয়া ভুজঙ্গমগণ ভক্ষণপূর্ব্বক স্বীয় জননী বিনতাকে আনন্দিত করিলেন। যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণগণ-সন্নিধানে এই অপূর্ব্ব উপাখ্যান শ্রবণ বা পাঠ করিবে, সে মহাত্মা খগরাজ গরুড়ের চরিত-কীর্ত্তন-প্রযুক্ত পাপস্পর্শশূন্য হইয়া স্বর্গারোহণ করিবে, সন্দেহ নাই।
নাগগণের নামনিরুক্তি
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি ভুজঙ্গমগণের মাতৃশাপ ও বিনতার পুৎত্রশাপের কারণ এবং বিনতাগর্ভসম্ভূত পক্ষিদ্বয়ের নাম কীর্ত্তন করিলে, আর কদ্রু ও বিনতা স্বভর্ত্তা কশ্যপের সন্নিধানে কিরূপে বর প্রাপ্ত হয়েন, তাহাও কীর্ত্তন করিলে; কিন্তু এ পর্য্যন্ত সর্পদিগের নাম কীর্ত্তন কর নাই। আমরা এক্ষণে প্রধান প্রধান পন্নগগণের নাম শ্রবণ করিতে বাসনা করি, বর্ণন কর।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে তপোধন! সর্পসংখ্যার বহুত্বপ্রযুক্ত সকল সর্পের নামোল্লেখ করিব না, কেবল প্রধান প্রধান সর্পের নাম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। শেষ নাগ প্রথমতঃ জন্মগ্রহণ করেন। তদনন্তর বাসুকি; তাহার পর ঐরাবত, তক্ষক, কর্কোটক, ধনঞ্জয়, কালিয়, মণিনাগ, আপূরণ, পিঞ্জরক, এলাপত্র, বামন, নীল, অনিল, কল্মাষ, শবল, আর্য্যক, উগ্রক, কলশপোতক, সুরামুখ, দধিমুখ, বিমলপিণ্ডক, আপ্ত, করোটক, শঙ্খ, বালিশিখ, নিষ্ঠানখ, হেমগুহ, নলুষ, পিঙ্গল, বাহ্যকণ, হস্তিপদ, মুদ্গরপিণ্ডক, কম্বল, অশ্বতর, কালীয়ক, বৃত্ত, সংবর্ত্তক, শঙ্খমুখ, কুষ্মাণ্ডক, ক্ষেমক, পিণ্ডারক, করবীর, পুষ্পদংষ্ট্রক, বিল্বক, বিল্বপাণ্ডর, মূষকাদ, শঙ্খশিরাঃ, পর্ণভদ্র, হরিদ্রক, অপরাজিত, জ্যোতিক, শ্রীবহ, কৌরব্য, ধৃতরাষ্ট্র, শঙ্খপিণ্ড, বিরজাঃ, সুবাহু, শালিপিণ্ড, হস্তিপিণ্ড, পিঠরক, সুসুক, কৌণপাশন, কুটর, কুঞ্জর, প্রভাকর, কুমুদ, কুমুদাক্ষ, তিত্তিরি, হলিক, কর্দ্দম, বহুমূলক, কর্কর, অকর্কর, কুণ্ডোদর এবং মহোদর। হে দ্বিজসত্তম! প্রধান প্রধান সর্পগণের নাম কীর্ত্তন করিলাম, বাহুল্যপ্রযুক্ত অন্যান্যের নামোল্লেখ করিলাম না। হে তপোধন! ইহা ব্যতিরেকে আরও সহস্র সহস্র প্রষুত প্রষুত, অর্ব্বুদ অর্ব্বুদ সর্প আছে, তাহাদের সংখ্যা করা অতিশয় দুঃসাধ্য।
শেষ নাগের সর্পসঙ্গত্যাগ
শৌনক কহিলেন, বৎস সূতনন্দন! তুমি মহাবলপরাক্রান্ত অতিদুর্দ্ধর্ষ প্রধান প্রধান সর্পগণের নাম কীর্ত্তন করিলে, এক্ষণে ঐ সকল সর্পগণ জননীদত্ত শাপ-শ্রবণানন্তর কি করিয়াছিল, তাহা বর্ণনা করিয়া আমার কৌতুহলাক্রান্ত চিত্তকে সন্তুষ্ট কর।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, তাহাদিগের সর্ব্বজ্যেষ্ঠ মহাযশা ভগবান্ শেষ নাগ স্বীয় জননী কদ্রুকে পরিত্যাগ করিয়া, বায়ুভক্ষ, ব্রতপরায়ণ, একান্তচিত্ত, জটাবল্কলধারী ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া গন্ধমাদন, বদরিকাশ্রম, গোকর্ণ, পুষ্কর, হিমবান্ প্রভৃতি পুণ্যতীর্থে গমনপূর্ব্বক অতি কঠোর তপস্যা করিতে লাগিলেন। তপোনুষ্ঠানকালে তাঁহার গাত্রের মাংস, চর্ম্ম ও শিরাসমুদয় শুষ্কপ্রায় হইয়া গেল।
সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা তাঁহাকে তপস্যায় একান্ত অনুরক্ত দেখিয়া স্বয়ং তৎসন্নিধানে আগমনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘নাগরাজ! তুমি এ কি কর্ম্ম করিতেছ? অতঃপর প্রজাগণের হিতসাধনে সচেষ্ট হও, তোমার তীব্র তপস্যার দ্বারা সমস্ত প্রজাগণ সাতিশয় সন্তপ্ত হইয়াছে, আর তপস্যায় প্রয়োজন নাই, অভিলষিত বর প্রার্থনা কর।”
শেষ কহিলেন, “আমার সহোদর ভ্রাতৃগণ অতি মূঢ়, আমি তাহাদিগের সহিত একত্র বাস করিতে বাসনা করি না, আপনি তদ্বিষয়ে অনুমতি প্রদান করুন। তাহারা শত্রুর ন্যায় সর্ব্বদা পরস্পর বিবাদবিসংবাদ করে, অতত্রব আমার আর যেন তাহাদিগের মুখ দেখিতে না হয়। এই অভিলাষেই আমি তপস্যা করিতে আসিয়াছি। তাহারা সর্ব্বদা সপুৎত্র বিনতার অনিষ্টচেষ্টা করে। বিহঙ্গমশ্রেষ্ঠ বৈনতেয় আমাদিগের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা, তিনি পিতা কশ্যপের বরপ্রভাবে মহাবলপরাক্রান্ত হইয়াছেন। আমার সহোদরগণ সর্ব্বদা তাঁহার প্রতি ঈর্ষাপ্রকাশ করে। তন্নিমিত্ত আমি স্থির করিয়াছি যে, তপোনুষ্ঠান করিয়া কলেবর পরিত্যাগ করিব, তাহা হইলে লোকান্তরেও আর সেই দুরাত্মাদিগের মুখাবলোকন করিতে হইবে না।”
শেষ নাগের ধরাধারণ
ব্রহ্মা শেষ নাগের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, “বৎস শেষ! আমি তোমার সোদরগণের আচার-ব্যবহার বিলক্ষণরূপে অবগত আছি এবং তাহারা জননী কর্ত্তৃক অভিশপ্ত হইয়াছে, তাহাও জানি। অতএব তোমার ভ্রাতৃগণের দৌরাত্ম্যপ্রযুক্ত আর শোক করিবার আবশ্যকতা নাই, আমি অদ্য তোমাকে বরদান করিতেছি, অভিলষিত বর প্রার্থনা কর। হে পন্নগোত্তম! আমি তোমার প্রতি পরম সন্তুষ্ট হইয়াছি। সৌভাগ্যক্রমে তোমার ধর্ম্মে মনন হইয়াছে দেখিয়া যৎপরোনাস্তি প্রীত হইলাম, আশীর্ব্বাদ করি, তোমার বুদ্ধি ধর্ম্মে সুস্থিরা হউক।”
শেষ কহিলেন, “হে সর্ব্বলোকপিতামহ! আমি এই বর প্রার্থনা করি, যেন ধর্ম্মে, শমগুণে ও তপস্যায় আমার অচলা ভক্তি থাকে।” ব্রহ্মা কহিলেন, “বৎস! আমি তোমার শম ও দম দেখিয়া সাতিশয় সন্তুষ্ট হইলাম, কিন্তু হে বৎস! তোমাকে এই সর্ব্বলোকহিতকর কার্য্যটি সম্পাদন করিতে হইবে। পর্ব্বত কাননাদি-সমবেত এই ধরণীমণ্ডলকে তোমায় এইরূপে ধারণ করিতে হইবে যেন, উহা আর বিচলিত না হইতে পারে।” শেষ কহিলেন, “হে বরপ্রদ প্রজাপতে! হে ধরানাথ! হে ভূতনাথ! হে জগন্নাথ! আপনি যেরূপ আজ্ঞা করিতেছেন, আমি ঐরূপে মহী ধারণ করিব, কিন্তু আপনি পৃথিবীকে আমার মস্তকোপরি স্থাপন করুন।” ব্রহ্মা কহিলেন, “হে ভুজঙ্গোত্তম! পৃথিবী স্বয়ং তোমাকে যে পথ প্রদান করিলেন, তুমি সেই পথ দিয়া ধরিত্রীর অধোভাগে আগমনপূর্ব্বক ইঁহাকে ধারণ কর তাহা হইলেই আমার পরম প্রীতিকর কার্য্য করা হইবে।”
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, ভুজঙ্গমাগ্রজ শেষ “যে আজ্ঞা” বলিয়া পৃথিবীদত্ত বিবর দ্বারা রসাতলে প্রবেশপূর্ব্বক সসাগরা বসুন্ধরাকে মস্তকোপরি ধারণ করিলেন। এইরূপে মহাব্রতশালী ভগবান্ অনন্ত ব্রহ্মার নির্দেশানুসারে একাকী ধরা ধারণ করিয়া পাতালতলে বাস করিতে লাগিলেন। সর্ব্বামরোত্তম ভগবান্ পিতামহ খগবর বিনতানন্দনকে অনন্তদেবের সখা করিয়া দিলেন।

আত্মরক্ষার্থ নাগগণের মন্ত্রণা
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, ভুজঙ্গোত্তম বাসুকি মাতৃদত্ত শাপ শ্রবণ করিয়া কিরূপে সেই শাপমোচন হইবে, তদ্বিষয়িণী চিন্তায় একান্ত মগ্ন হইলেন। তদনন্তর তিনি ধর্ম্মপরায়ণ ঐরাবত প্রভৃতি ভ্রাতৃগণের সহিত পরামর্শ করিলেন যে, “মাতা আমাদিগকে যে শাপ প্রদান করিয়াছেন, তাহা তোমরা সকলই জান; অতএব আইস, আমরা যাহাতে সেই শাপ হইতে মুক্ত হইতে পারি, এরূপ চেষ্টা করি। সর্ব্বপ্রকার শাপেরই প্রতিবিধানোপায় আছে, কিন্তু মাতৃদত্ত শাপমোচনের কোন উপায় দেখি না। জননী অব্যয়, অপ্রমেয়, সনাতন ব্রহ্মার সমক্ষেই আমাদিগকে শাপ প্রদান করিয়াছেন এবং সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা তাঁহাকে শাপ-প্রদানে উদ্যত দেখিয়াও নিবৃত্ত করেন নাই, ইহা শুনিয়া আমার হৃৎকম্প উপস্থিত হইতেছে। বোধ করি, নিশ্চয়ই আমাদিগকে সমূলে বিনষ্ট হইতে হইবে। তথাপি সম্প্রতি যাহাতে সমস্ত ভুজঙ্গমগণের মঙ্গল হয়, তদ্বিষয়ে পরামর্শ করা যাউক। আমরা সকলই বুদ্ধিমান্ ও বিচক্ষণ, মন্ত্রণা দ্বারা অবশ্যই কোন-না-কোন উপায় স্থির করিতে পারিব। দেখ, পূর্ব্বকালে অগ্নি গুহামধ্যে তিরোহিত হইয়াছিলেন, কিন্তু দেবগণ পরামর্শ দ্বারা তাঁহার পুনরুদ্ভাবন করেন। অতএব এক্ষণে যাহাতে জনমেজয়ের যজ্ঞ না হয় অথবা নিষ্ফল হয়, তাহার চেষ্টা দেখা যাউক।”
মন্ত্রণাবিশারদ সর্পগণ ভুজঙ্গরাজ বাসুকির এই কথা শুনিয়া তৎকার্য্যসম্পাদনে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞা করিলেন। তাঁহাদিগের মধ্যে কেহ কেহ কহিলেন, “আইস, আমরা ব্রাহ্মণবেশ ধারণ করিয়া জনমেজয়ের নিকট যাইয়া তিনি যাহাতে সর্পযজ্ঞ না করেন, এইরূপ ভিক্ষা প্রার্থনা করি।” কোন কোন পাণ্ডিত্যাভিমানী ভুজঙ্গম কহিলেন, “চল, আমরা সকলে গিয়া তাঁহার মন্ত্রী হই, তাহা হইলে তিনি অবশ্যই আমাদিগের পরামর্শ লইয়া সকল কার্য্য অনুষ্ঠান করিবেন। তিনি যজ্ঞবিষয়িণী কোন মন্ত্রণা জিজ্ঞাসা করিলে, আমরা তদনুষ্ঠানে ইহলোকে ও পরলোকে নানাপ্রকার দোষ ঘটিতে পারে, ইহা প্রদর্শন করিয়া এবং অন্যান্য কারণ দর্শাইয়া যাহাতে সেই যজ্ঞ না হয়, এরূপ পরামর্শ দিব।” কেহ কহিলেন, রাজার হিতসাধনে তৎপর যে-কোন সর্পযজ্ঞবিধানজ্ঞ ব্যক্তি সেই যজ্ঞের উপাধ্যায় হইবেন, কোন ভুজঙ্গম যাইয়া তাঁহাকে দংশন করিবে; উপাধ্যায়ের মৃত্যু হইলে সুতরাং যজ্ঞানুষ্ঠানের বিষম ব্যাঘাত জন্মিবে; তদ্ভিন্ন অন্যান্য যে-সকল সর্পসত্রজ্ঞ ব্যক্তি সেই যজ্ঞে ঋত্বিক্ হইতে আসিবেন, আমরা সকলে যাইয়া তাঁহাদিগকে দংশন করিব, তাহা হইলে আর যজ্ঞ হইতে পারিবে না।”
এই কথা শুনিয়া অন্যান্য ধর্ম্মপরায়ণ দয়াবান্ নাগগণ কহিলেন, “তোমরা যাহা কহিতেছ, এ অতি অসৎ পরামর্শ; ব্রহ্মহত্যা করা কোনক্রমেই বিধেয় নহে, বিপৎকালে ধর্ম্মপথ অবলম্বনপূর্ব্বক প্রতীকারচেষ্টা করাই কর্ত্তব্য; কারণ, অধর্ম্মানুষ্ঠান সমস্ত জগতের বিনাশকারী।” কতকগুলি ভুজঙ্গম কহিলেন, “আমরা জলধর কলেবর ধারণ করিয়া মুষলধারে জলবর্ষণ দ্বারা প্রজ্বলিত যজ্ঞাগ্নি নির্ব্বাণ করিব, কিংবা রাত্রিকালে ঋত্বিক্গণ অনবহিত হইলে কোন সর্প তথায় উপস্থিত হইয়া স্রুগ্ভাণ্ড প্রভৃতি যজ্ঞীয় দ্রব্যসমুদয় অপহরণ করিবে, তাহা হইলেই যজ্ঞের বিঘ্ন ঘটিবে। অথবা শত শত ভুজঙ্গম সেই যজ্ঞস্থলে এককালে উপস্থিত হইয়া তত্রত্য সমস্ত লোকদিগকে দংশন করিতে উদ্যত হইবে, তাহা হইলে তাহাদিগের অবশ্যই ভয় জন্মিবে কিংবা সর্পগণ সংস্কৃত যজ্ঞীয় সামগ্রী-সমুদয় স্বীয় মূত্র-পুরীষ দ্বারা দূষিত করিবে, তাহাতেও যজ্ঞবিঘ্নের বিলক্ষণ সম্ভাবনা।”
অন্যান্য নাগগণ কহিল, “আমরাই ঐ যজ্ঞে ঋত্বিক্ হইয়া প্রথমেই ‘দক্ষিণা প্রদান কর’ বলিয়া যজ্ঞবিঘ্ন সমুৎপাদন করিব, তাহা হইলেই রাজা আমাদিগের বশীভূত হইবেন এবং যাহা বলিব, তাহাই করিবেন।” অপর ভুজঙ্গমগণ কহিল, “রাজা যখন জলক্রীড়া করিবেন, সেই সময়ে তাঁহাকে ধরিয়া আপনাদিগের আলয়ে আনয়নপূর্ব্বক বন্ধ করিয়া রাখিব।” কোন কোন পাণ্ডিত্যাভিমানী ভুজঙ্গম কহিলেন, “আইস, আমরা অন্যান্য চেষ্টা পরিত্যাগ করিয়া রাজা জনমেজয়কেই দংশন করি, তিনি মরিলে সকল অনর্থের মূলচ্ছেদ হইবে।” পরিশেষে সকলে বাসুকিকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “হে রাজন্! আমরা স্ব স্ব বুদ্ধি অনুসারে কহিলাম, এক্ষণে আপনার যাহা অভিরুচি হয়, করুন; আর কালক্ষেপ করা কোনক্রমেই বিধেয় নহে।” এই বলিয়া সমস্ত নাগগণ তাঁহার মুখ নিরীক্ষণ করিতে লাগিল।
বাসুকি তাঁহাদিগের বাক্য-শ্রবণানন্তর ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া কহিলেন, “হে ভুজঙ্গমগণ! তোমরা সকলে যে যে উপায় নির্দ্দেশ করিলে, তন্মধ্যে একটিও আমার মনোগত হইতেছে না। যাহাতে সকলের হিতসাধন হয়, তাহাই করা কর্ত্তব্য, অতত্রব এ বিষয়ে ভগবান্ কশ্যপকে প্রসন্ন করাই আমার শ্রেয়ঃকল্প বোধ হইতেছে। জ্ঞাতিগণের প্রতি সৌহার্দ্দ্য ও আত্মস্নেহবশতঃ আমি তোমাদিগের বাক্যানুসারে কর্ম্ম করিতে ইচ্ছা করি না। কারণ, এক্ষণে আমি তোমাদের সর্ব্বজ্যেষ্ঠ, যাহাতে সমস্ত বান্ধবগণের মঙ্গল হয়, আমার সর্ব্বতোভাবে তাহাই করা কর্ত্তব্য। এ বিষয়ে দোষ-গুণ যে কিছু ঘটিবে, তোমরা কেহই তাহার অংশভাগী হইবে না, সমস্তই আমার উপর পড়িবে, এই নিমিত্ত আমি সবিশেষ সন্তপ্ত হইতেছি।”
নাগরক্ষার গুপ্তবাণী
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, বাসুকির ও অন্যান্য নাগগণের এই সকল বাক্য শ্রবণ করিয়া এলাপত্র নামক সর্প বাসুকিকে সন্বোধন করিয়া কহিলেন, হে ভুজঙ্গমনাথ! সেই সর্পসত্র অবশ্যই হইবে সন্দেহ নাই এবং যে জনমেজয় রাজা হইতে আমাদিগের মহৎ ভয় উপস্থিত, তাঁহাকেও বঞ্চিত করিতে পারা যাইবে না। হে রাজন্! যে ব্যক্তি দৈবপর হয়, তাহার দৈবের উপর নির্ভর করাই সর্ব্বতোভাবে বিধেয়। কারণ, সে স্থলে দৈব ব্যতিরেকে তাহার রক্ষা পাইবার আর কোন উপায়ান্তর নাই। হে পন্নগোত্তম! আমাদিগের এ ভয়কে দৈব-ভয় বলিতে হইবে, অতএব দৈব অবলম্বন করাই উত্তম কল্প বোধ হইতেছে। এ বিষয়ে আমি যাহা কহিতেছি, তোমরা অবধানপূর্ব্বক শ্রবণ কর। যখন মাতা আমাদিগকে শাপ দেন, আমি সেই সময়ে ত্রাসাকুলিতচিত্তে তাঁহার ক্রোড়ে বলিয়া দেবগণের এই কথা শুনিয়াছিলাম। দেবগণ সাতিশয় দুঃখিত হইয়া ব্রহ্মার নিকট গিয়া কহিলেন, “হে পিতামহ! পাষাণহৃদয়া কদ্রু আপনার সম্মুখেই স্বীয় প্রিয়পুৎত্রগণকে যেরূপ দারুণ অভিসম্পাত করিলেন, মাতা হইয়া পুৎত্রের প্রতি সেরূপ শাপ প্রদান করিতে কেহই পারে না। আপনিও “এবমস্ত” বলিয়া তাঁহার সেই বাক্যে অনুমোদন করিলেন; অতএব হে ব্রহ্মন্! আপনি কি নিমিত্ত তাঁহাকে স্ব-সমক্ষে শাপ প্রদানে উদ্যত দেখিয়াও নিবারণ করিলেন না, তাহা শুনিতে বাসনা করি।’
ব্রহ্মা কহিলেন, ‘সর্পগণ অতিশয় তীক্ষ্ণবিষ, খল ও প্রজাগণের অহিতকারী, অতএব আমি প্রজাগণের হিতকামনায় শাপ প্রদানোদ্যতা কদ্রু নিবারণ করি নাই; কিন্তু সর্পসত্রে কেবল তীক্ষ্ণবিষ, নীচাশয় ও পাপাচার বিষধরদিগেরই বিনাশ হইবে; ধার্ম্মিক নাগগণের কোন অপচয় হইবে না। তৎকালে তাঁহারা যে প্রকারে ঐ শাপ হইতে মুক্ত হইবেন, তাহা শ্রবণ কর। যাযাবরবংশ অসাধারণ-ধীশক্তিসম্পন্ন, তপোনিরত, জিতেন্দ্রিয়, জরৎকারু নামে এক মহর্ষি জন্মগ্রহণ করিবেন। তাঁহার ঔরসে আস্তীক নামে এক পুৎত্র জন্মিবেন। তিনি মহারাজ জনমেজয়কে সর্পযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতে নিষেধ করিবেন। তাহা হইলে ধর্ম্মশীল সর্পগণের পরিত্রাণ হইবে।’
ব্রহ্মার এই বাক্য শ্রবণ করিয়া দেবগণ জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে ব্রহ্মন্! মহাতপা, মহাবীর্য্য, মুনিবর জরৎকারু কাহার গর্ভে সেই মহানুভব পুৎত্র আস্তীককে উৎপাদন করিবেন?’ ব্রহ্মা কহিলেন, ‘বীর্য্যবান্ জরৎকারু সনাম্নী কন্যাতে সেই মহাবীর্য্যসম্পন্ন পুৎত্র উৎপাদন করিবেন। সর্পরাজ বাসুকির জরৎকারুনাম্নী এক ভগিনী আছেন। তাঁহার গর্ভে সেই পুৎত্র জন্মিবেন এবং তৎকর্ত্তৃক সর্পকুলের পরিত্রাণ হইবে।’ দেবগণ ব্রহ্মার এই বাক্য শ্রবণ করিয়া ‘তথাস্তু’ বলিলেন। সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মাও তাঁহাদিগকে এই কথা বলিয়া ত্রিদশালয়ে প্রস্থান করিলেন।
অতএব হে নাগাধিরাজ বাসুকে! নাগগণের ভয়শান্তির নিমিত্ত সেই সুব্রত ভিক্ষমাণ [ভাবী যাচ্ঞাকারী– যিনি ভিক্ষা করিবেন] মহর্ষিকে তোমার জরৎকারুনাম্নী ভগিনী ভিক্ষাস্বরূপ সম্প্রদান কর, তাহা হইলেই নাগকুল পরিত্রাণ পাইবে। আমি নাগগণের এই মোক্ষোপায় শ্রবণ করিয়াছি।”

নাগগণের আশ্বস্তি
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগগণ এলাপত্রের এই বাক্যশ্রবণে সাতিশয় আহ্বাদিত হইয়া তাঁহাকে সাধুবাদ করিতে লাগিলেন। নাগরাজ বাসুকিও সেই কথা শ্রবণ করিয়া পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন এবং তদবধি জরৎকারুনাম্নী নিজ ভগিনীকে অতি প্রযত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করিতে লাগিলেন।
কিয়ৎক্ষণ পরে দেবাসুরগণ একত্র হইয়া সমুদ্রমন্থন আরম্ভ করিলেন। সর্ব্বনাগশ্রেষ্ঠ বাসুকি তাহাতে মন্থনরজ্জু হইয়াছিলেন। সমুদ্রমন্থন সমাপ্ত হইলে দেবগণ বাসুকিকে সমভিব্যাহারে লইয়া ব্রহ্মার নিকটে গমনপূর্ব্বক নিবেদন করিলেন, “ভগবান্! এই নাগকুলাগ্রণী বাসুকি মাতৃশাপে ভীত হইয়া অত্যন্ত সন্তপ্ত হইয়াছেন। আপনি অনুগ্রহ করিয়া জ্ঞাতিকুলহিতৈষী নাগরাজের মাতৃশাপরূপ হৃদয়শল্য উৎপাটন করুন। ইনি আমাদিগের অত্যন্ত প্রিয়কারী ও হিতসাধনে তৎপর, অতএব অনুকূল হইয়া আপনাকে ইঁহার মনোব্যথা নিবারণ করিতে হইবে।”
দেবগণের এই প্রার্থনা শ্রবণ করিয়া ব্রহ্মা কহিলেন, “পূর্ব্বে এলাপত্র সর্প ইঁহাকে যাহা কহিয়াছেন, সে আমারই বাক্য। ইনি সেই বাক্যানুসারে কার্য্য করুন, তাহার সময়ও উপস্থিত হইয়াছে। যাহারা দুরাচার ও পাপিষ্ঠ, তাহারাই সর্পসত্রে বিনষ্ট হইবে। ধর্ম্মপরায়ণ নাগগণের কিছুই ভয় নাই। সেই জরৎকারু জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং কঠোর তপস্যার অনুষ্ঠান করিতেছেন। নাগরাজ বাসুকি তাঁহাকে যথাকালে ভগিনী প্রদান করুন। হে দেবগণ! এলাপত্র যাহা কহিয়াছেন, উহা নাগকুলের পরম হিতকর, উহাতে সন্দেহ নাই।”
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগাধিপ বাসুকি সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার এই বাক্য শ্রবণ করিয়া অবধি জরৎকারুকে ভগিনী প্রদান করিতে সঙ্কল্প করিলেন এবং ঐ সঙ্কল্পে বহুসংখ্যক সর্পদিগকে তদীয় সন্নিধানে সতত অবস্থান করিতে প্রেরণ করিলেন। ভুজঙ্গমরাজ তাহাদিগকে এই কহিয়া দিলেন, “ভগবান্ জরৎকারু যে মুহূর্ত্তে দারপরিগ্রহ করিতে অভিলাষ প্রকাশ করিবেন, তোমরা তৎক্ষণাৎ আসিয়া আমাকে সংবাদ দিবে।”

পরীক্ষিতের ব্রহ্মশাপ
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি জরৎকারুনামা যে মহর্ষির বিবরণ কহিলে, তিনি কি নিমিত্ত জগতে জরৎকারু নামে বিখ্যাত হইয়াছিলেন এবং জরৎকারু শব্দের যথাশ্রুত অর্থই বা কি, তাহা আমি শুনিতে ইচ্ছা করি, বর্ণন কর।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, জরাশব্দের অর্থ ক্ষয়, কারু শব্দের অর্থ দারুণ। সেই মহর্ষির শরীর সাতিশয় দারুণ ছিল, তিনি কঠোর তপস্যা দ্বারা ক্রমে ক্রমে সেই দারুণ শরীরকে ক্ষীণ করিয়াছিলেন, তন্নিমিত্ত তাঁহার নাম জরৎকারু হইল এবং উক্ত কারণবশতঃ বাসুকির ভগিনী জরৎকারু নামে বিখ্যাত হইলেন।
মহর্ষি শৌনক তৎশ্রবণে কিঞ্চিৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, হাঁ, তুমি যাহা বলিলে. ইহা যুক্তিসিদ্ধ বটে। তুমি ইতিপূর্ব্বে যাহা যাহা কীর্ত্তন করিলে, তৎসমস্তই আমি শ্রবণ করিলাম। এক্ষণে আস্তীকের জন্মবৃত্তান্ত শ্রবণ করিতে বাসনা করি, বর্ণনা কর।
উগ্রশ্রবাঃ শৌনকের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া শাস্ত্রানুসারে কহিতে লাগিলেন। মহামতি বাসুকি ভুজঙ্গমগণের প্রতি উক্তরূপ আদেশ দিয়া মহর্ষি জরৎকারুকে ভগিনী প্রদান করিতে উদ্যত হইয়া রহিলেন। বহুকাল অতীত হইল, তথাপি ঊর্দ্ধ্বরেতা স্বাধ্যায়নিরত সেই মহাত্মা দারপরিগ্রহে অভিলাষী হইলেন না। তিনি কেবল তপস্যাদি ধর্ম্মকর্মে নিতান্ত অনুরক্ত হইয়া নির্ভয়হৃদয়ে সমস্ত মেদিনীমণ্ডল পরিভ্রমণ করিতেন।
কিয়ৎকাল পরে কৌরববংশীয় পরীক্ষিৎ পৃথিবীর অধিরাজ হইলেন। তিনি স্বীয় প্রাপিতামহ পাণ্ডু রাজার ন্যায় অদ্বিতীয়
ধনুর্দ্ধর, যুদ্ধবিশারদ ও মৃগয়াপ্রিয় ছিলেন। মহারাজ পরীক্ষিৎ সর্ব্বদাই মৃগ, বরাহ, তরক্ষু [ব্যাঘ্র], মহিষ ও অন্যান্য বিবিধ প্রকার বন্যজন্তু শিকার করিয়া মহীমণ্ডল পরিভ্রমণ করিতেন। একদা তিনি স্বকীয় আনতপর্ব্ব শর দ্বারা এক মৃগকে বিদ্ধ করিয়া পৃষ্ঠে শরাসন ধারণপূর্ব্বক যজ্ঞরূপী মৃগের অনুযায়ী ভগবান্ ভূতনাথের ন্যায় সেই মৃগের অনুসরণক্রমে নিবিড় অরণ্যানী-মধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। পরীক্ষিতের বাণে বিদ্ধ হইলে কোন মৃগই জীবিতাবস্থায় পলায়ন করিতে পারে না; কিন্তু এই মৃগ যে বাণবিদ্ধ হইয়াও পলায়ন করিল, উহা কেবল তাঁহার অচিরাৎ স্বর্গলাভের প্রতি হেতু হইয়া উঠিল।
রাজা পরীক্ষিৎ মৃগের অনুসরণ-প্রসঙ্গে ক্রমে ক্রমে অতি দূরদেশে উপনীত হইলেন। পরে সাতিশয় পরিশ্রান্ত ও পিপাসার্ত্ত হইয়া এক গোপ্রচারে [গোষ্ঠে–গোচারণ-স্থানে] উপস্থিত হইলেন এবং অবলোকন করিলেন, এক তপস্বী স্তন্যপায়ী বৎসগণের মুখনিঃসৃত ফেনপুঞ্জ পান করিয়া জীবন-ধারণ করিতেছেন। অত্যান্ত ক্ষুৎপিপাসান্বিত রাজা সেই মুনির সন্নিধানে সমুপস্থিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে মুনিসত্তম! আমি অভিমন্যুর পুৎত্র রাজা পরীক্ষিৎ, তোমাকে জিজ্ঞাসিতেছি, আমি এক মৃগকে বাণ দ্বারা বিদ্ধ করিয়াছিলাম, সে পলায়ন করিয়াছে, কোন্ দিকে পলায়ন করিল, তুমি কি দেখিয়াছ?” মুনিবর মৌনব্রতাবলম্বী ছিলেন, কোন কথাই কহিলেন না। তখন রাজা ক্রোধান্ধ হইয়া আপন ধনুর অগ্রভাগ দ্বারা এক মৃতসর্প উত্তোলন করিয়া মহর্ষির স্কন্ধদেশে অর্পণ করিলেন। ঋষি তাহাতে ক্রোধ করিলেন না এবং ভালমন্দ কিছুই বলিলেন না। রাজা তাঁহাকে তদবস্থ দেখিয়া ক্রোধ পরিত্যাগপূর্ব্বক ব্যথিতমনে আপন রাজধানীতে গমন করিলেন, কিন্তু সেই ঋষি তদবস্থই রহিলেন। ঐ ক্ষমাশীল মহামুনি রাজা পরীক্ষিৎকে স্বধর্ম্মনিরত বলিয়া জানিতেন; এই নিমিত্ত তৎকর্ত্তৃক অবমানিত হইয়াও তাঁহাকে অভিসম্পাত করিলেন না। কুরুবংশাবতংস [কুরুবংশের ভূষণস্বরূপ] মহারাজ পরীক্ষিৎও তাঁহাকে তাদৃশ ধর্ম্মপরায়ণ বলিয়া না জানিতে পারিয়াই তাঁহার তাদৃশী অবমাননা করিলেন।
ঐ মহর্ষির শৃঙ্গী নামে এক তরুণবয়স্ক পুৎত্র ছিলেন। শৃঙ্গী সাতিশয় রোষপরবশ। তিনি একবার ক্রুদ্ধ হইলে আর তাঁহাকে প্রসন্ন করা দুঃসাধ্য হইয়া উঠিত। তিনি সময়ে সময়ে সুসংযত হইয়া সর্ব্বভূতহিতৈষী ভগবান্ প্রজাপতির উপাসনা করিতে যাইতেন। একদা শৃঙ্গী সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার উপাসনানন্তর তদীয় আদেশ লইয়া আপন আশ্রমে প্রত্যাগমন করিতেছেন, এমত সময়ে তাঁহার সখা কৃশ নামে এক ঋষিপুৎত্র হাসিতে হাসিতে তৎসন্নিধানে তদীয় পিতার অপমান-বৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন। রুক্ষস্বভাব শৃঙ্গী কৃশ-মুখে পিতার অপমানবার্ত্তা শ্রবণ করিয়া ক্রোধে প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিলেন। কৃশ হাসিতে হাসিতে কহিলেন, “তুমি অত্যন্ত তপোবলসম্পন্ন ও তেজস্বী, কিন্তু তোমার পিতা স্বীয় স্কন্ধদেশে মৃতসর্প বহন করিতেছেন, অতএব হে শৃঙ্গিন! যাও যাও, আর তুমি বৃথা গর্ব্ব করিও না এবং মাদৃশ সিদ্ধ ব্রহ্মবিৎ তপস্বী ঋষিপুৎত্রগণ কোন কথা কহিলে তাহাতে প্রত্যুত্তর প্রদান করিও না। হে শৃঙ্গিন্! কৈ, এক্ষণে তোমার সেই পুরুষত্বাভিমান এবং তাদৃশ সগর্ব্ব বাক্যই বা কোথায় রহিল? তোমার পিতা সেইরূপ অবমানিত হইয়াও ঔদাসীন্য অবলম্বনপূর্ব্বক রহিয়াছেন; তদ্বিষয়ে যাহা কর্ত্তব্য, কিছুই করেন নাই। আহা! ইহা দেখিয়া আমি অত্যন্ত দুঃখিত হইয়াছি?”

রাজার প্রতি শৃঙ্গীর শাপ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাতেজা শৃঙ্গী স্বীয় জনকের স্কন্ধে মৃতসর্প রহিয়াছে শুনিয়া সাতিশয় সংক্রুদ্ধ হইলেন এবং মৃদুমধুরস্বরে কৃশকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কৃশ! কিরূপে আমার পিতার স্কন্ধে মৃতসর্প সংলগ্ন হইল?” কৃশ কহিলেন, “সখে! অদ্য মৃগয়াবিহারী রাজা পরীক্ষিৎ এই তপোবনে মৃগয়া করিতে আসিয়াছিলেন, তিনিই তোমার পিতার স্কন্ধে মৃতসর্প সমর্পণ করিয়া গিয়াছেন।” তখন শৃঙ্গী ক্রোধে দুই চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া কহিলেন, “আমার পিতা সেই দুরাত্মা নরাধম রাজার কি অপরাধ করিয়াছিলেন, সত্য করিয়া বল, আজি তোমাকে আমার তপোবল দেখাইতেছি।”
কৃশ কহিলেন, “অভিমন্যুতনয় রাজা পরীক্ষিৎ অদ্য মৃগয়া করিতে আসিয়াছিলেন। তিনি এক মৃগকে বাণবিদ্ধ করেন। বাণাহত মৃগ প্রাণভয়ে দৌড়িতে লাগিল; রাজাও তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। পরিশেষে রাজা পরীক্ষিৎ মৃগের অনুসরণক্রমে নিবিড় কাননে প্রবিষ্ট হইলেন; মৃগও ক্রমশঃ তদীয় দৃষ্টিপথের বহির্ভূত হইল। রাজা বহুক্ষণ অরণ্যমধ্যে পর্য্যটন করিয়াও তাহার অনুসন্ধান পাইলেন না; তখন তিনি ক্ষুৎপিপাসায় একান্ত কাতর হইয়া তোমার পিতার সন্নিধানে গমনপূর্ব্বক বারংবার জিজ্ঞাসিতে লাগিলেন, ‘মহাশয়! আপনি একটি শরবিদ্ধ মৃগকে এ স্থান দিয়া পলায়ন করিতে দেখিয়াছেন?’ তোমার পিতা মৌনব্রতাবলম্বী, সুতরাং ভালমন্দ কিছুই বলিলেন না। তন্নিমিত্ত রাজা ক্রুদ্ধ হইয়া নিজ শরাসনের অগ্রভাগ দ্বারা এক মৃতসর্প উত্তোলনপূর্ব্বক তাঁহার স্কন্ধদেশে সংলগ্ন করিয়া দিলেন। তোমার পিতা তথাপি সেইরূপ মৌনাবলম্বন করিয়াই রহিলেন। পরে রাজা পরীক্ষিৎ স্বীয় রাজধানী হস্তিনানগরে প্রস্থান করিলেন।”
শৃঙ্গী কৃশের মুখে নিরপরাধ পিতার এইরূপ অপমানবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া কোপোপরক্ত-নয়নে [ক্রোধবশতঃ রক্তচক্ষে] আচমনপূর্ব্বক রাজাকে এই বলিয়া অভিসম্পাত করিলেন, “যে নৃপাধম মৌনব্রতাবলম্বী মদীয় বৃদ্ধ পিতার স্কন্ধে মৃতসর্প সমর্পণ করিয়াছে, আমার বাক্যানুসারে তীক্ষ্ণবিষধর পন্নগেশ্বর তক্ষক সপ্তরাত্রির মধ্যে ব্রাহ্মণের অপমানকারী সেই পাপাত্মাকে যমসদনে প্রেরণ করিবে।” শৃঙ্গী রাজাকে এইরূপে শাপগ্রস্ত করিয়া গোচারণস্থ স্বকীয় পিতা শমীকের সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, সত্যই তাঁহার স্কন্ধে মৃতসর্প রহিয়াছে। তিনি তদ্দর্শনে পুনর্ব্বার সাতিশয় সংক্রুদ্ধ হইয়া মনোদুঃখে রোদন করিতে লাগিলেন। পরে স্বীয় পিতাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “পিতাঃ! দুরাত্মা পরীক্ষিৎ বিনাপরাধে আপনার এই অপমান করিয়াছে শুনিয়া আমি তাহাকে এই উগ্রশাপ প্রদান করিয়াছি যে, পন্নগরাজ তক্ষক সেই কুরুকুলাধমকে দংশন করিয়া অদ্য হইতে সপ্তম দিবসে যমালয়ে প্রেরণ করিবে।”
শমীক কুপিত পুৎত্রের এই অহিতানুষ্ঠান শ্রবণ করিয়া কহিলেন, “হে পুৎত্র! তুমি রাজা পরীক্ষিৎকে শাপ দিয়া অতি কুকর্ম্ম করিয়াছ। আমি ইহাতে প্রীত হইলাম না। তপস্বিগণের এরূপ ধর্ম্ম নহে। আমরা সেই রাজার অধিকারে বাস করি। তিনিও ন্যায়পূর্ব্বক আমাদিগকে রক্ষা করিয়া থাকেন; কখন কোন অত্যাচার করেন না। ন্যায়পরায়ণ রাজা যদিও কদাচিৎ কোন অপরাধ করেন, তাহা আমাদিগের অবশ্যই সহ্য করা উচিত। আরও দেখ, যদি রাজা আমাদিগকে রক্ষা না করেন, তাহা হইলে আমাদিগের যৎপরোনাস্তি কষ্ট হইবার সম্ভাবনা। ধর্ম্মপরায়ণ ভূপতিগণ আমাদিগকে রক্ষা করেন বলিয়াই আমরা বিপুল ধর্ম্ম উপার্জ্জন করিতেছি। অস্মদুপার্জ্জিত ধর্ম্মে রাজাদিগেরও ধর্ম্মতঃ অধিকার আছে। অতএব হে পুৎত্র! রাজা যদিও কোন অপরাধ করেন, তাহা আমাদের ক্ষমা করা উচিত। বিশেষতঃ রাজা পরীক্ষিৎ আপন প্রপিতামহ পাণ্ডুর ন্যায় আমাদিগকে রক্ষা করিতেছেন। প্রজাগণের রক্ষণাবেক্ষণই রাজার প্রধান ধর্ম্ম ও অবশ্য কর্ত্তব্য কর্ম্ম। সেই মহানুভব রাজা পরীক্ষিৎ ক্ষুধিত ও পরিশ্রান্ত হইয়া আমার আশ্রমে আগমন করিয়াছিলেন। ইহা স্পষ্টই বোধ হইতেছে যে, তিনি আমার মৌনব্রতাবলম্বনের বিষয় না জানিয়া এই কুকর্ম্ম করিয়াছেন। আর দেশ অরাজক হইলে তাহাতে সর্ব্বদাই নানাবিধ দোষ ঘটে এবং লোকসকল উচ্ছৃঙ্খল ও উদ্বিগ্ন হইয়া কোন ধর্ম্মকার্য্যের অনুষ্ঠান করিতে পারে না। রাজা উচ্ছৃঙ্খল লোকদিগের প্রতি দণ্ডবিধান করেন। রাজদণ্ড-ভয়ে পুনর্ব্বার ধর্ম্ম ও শান্তির সংস্থাপন হয় এবং ধর্ম্ম হইতে স্বর্গ সংস্থাপিত হয়। রাজার প্রভাবেই সমুদয় যজ্ঞক্রিয়া সুচারুরূপে অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে, যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা দেবগণ পরম প্রীত হয়েন, দেবগণ হইতে বৃষ্টি হয়, বৃষ্টি দ্বারা শস্য জন্মে এবং শস্য দ্বারা মনুষ্যগণের পরমোপকার দশে। ভগবান্ মনু কহিলেন, রাজা মনুষ্যদিগের বিধাতাস্বরূপ ও দশ শ্রোত্রিয়ের সমান। সেই রাজা ক্ষুধিত ও পরিশ্রান্ত হইয়া আমার মৌনব্রতের বিষয় না জানিতে পারিয়াই এবম্ভূত গর্হিত ব্যাপারে প্রবৃত্ত হইয়া থাকিবেন, সন্দেহ নাই। অতএব তুমি কি নিমিত্ত বালকতাপ্রযুক্ত হঠাৎ সেই রাজর্ষির প্রতি এই কুকর্ম্মের অনুষ্ঠান করিলে? সেই ভূপতি কোনমতেই আমাদের শাপ-প্রদানের পাত্র নহেন।”
পরীক্ষিৎকে শাপবৃত্তান্তজ্ঞাপন
শৃঙ্গী পিতার তিরস্কার-বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, “হে পিতা! এই শাপ প্রদান করাতে আমার সাহস প্রকাশ করাই হউক বা দুষ্কর্ম্ম করাই হউক এবং ইহাতে আপনি সন্তুষ্টই হউন বা অসন্তুষ্টই হউন, যাহা করিয়াছি, তাহা মিথ্যা হইবার নহে। মহাশয়! আমি আপনাকে যথার্থ কহিতেছি, ইহা কখন অন্যথা হইবে না। আমি পরিহাসচ্ছলেও কখন মিথ্যা কহি না, অতএব মৎপ্রদত্ত শাপ কিরূপে মিথ্যা হইবে?” শমীক কহিলেন, “পুৎত্র! আমি উত্তমরূপে জানি, তুমি সাতিশয় উগ্র-প্রভাবশালী ও সত্যবাদী এবং পূর্ব্বে কখন মিথ্যা কহ নাই; সুতরাং তোমার সেই শাপ কখনই মিথ্যা হইবে না। কিন্তু হে পুৎত্র! পিতা বয়ঃস্থ সন্তানকেও শাসন করিতে পারেন, যেহেতু তদ্দ্বারা ক্রমে ক্রমে পুৎত্রের গুণ ও যশোবৃদ্ধির সম্ভাবনা; তুমি বালক, অতএব তুমি অবশ্যই আমার শাসনার্হ। আমি জানি তুমি সর্ব্বদা তপোনুষ্ঠান করিয়া থাক, তপঃপ্রভাবশালী মহাত্মারা অতিশয় কোপন-স্বভাব হইয়া থাকেন। কিন্তু হে বৎস! তুমি একে ত’ আমার পুৎত্র, বিশেষতঃ বালক, তাহাতে আবার অত্যন্ত সাহসের কার্য্য করিয়াছ, এই সকল ভাবিয়া-চিন্তিয়া আমি তোমাকে ভর্ৎসনা করিলাম। এক্ষণে তোমাকে কিছু উপদেশ দিতেছি, শ্রবণ কর। তুমি শান্তিগুণ অবলম্বন করিয়া বন্য ফল-মূলাদি আহার দ্বারা ক্রমে ক্রমে ক্রোধের উপশম কর, তাহা হইলে শাপদান জন্য তোমার আর ধর্ম্মক্ষয় হইবে না। দেখ, ক্রোধ সংযমী তপস্বিগণের বহুযত্নে সঞ্চিত ধর্ম্মরাশি লোপ করে। ধর্ম্মবিহীন লোকদিগের সদ্গতি লাভ হয় না। শমগুণই ক্ষমাশীল তপস্বিগণের সর্ব্বত্র সিদ্ধিদায়ক। কি ইহলোক, কি পরলোক ক্ষমাবানের সর্ব্বত্রই মঙ্গল। অতএব হে পুৎত্র! তুমি সর্ব্বদাই ক্ষমাশীল ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া কালযাপন কর। ক্ষমাগুণ অবলম্বন করিলে চরমে পরমপদ প্রাপ্ত হইবে। আমি শমপরায়ণ, অতএব এক্ষণে আমার যতদূর সাধ্য, সেই নরপতির উপকার করা কর্ত্তব্য। সম্প্রতি নৃপ-সন্নিধানে এই সংবাদ পাঠাই যে, আমার পুৎত্র বালক ও অতিশয় অপরিণতবুদ্ধি, সে ত্বৎকৃত মদীয় অবমাননা দর্শনে ক্রোধ-পরতন্ত্র হইয়া তোমাকে শাপ প্রদান করিয়াছে।”
দয়াবান্ মহাতপা শমীক ঋষি রাজা পরীক্ষিতের নিকট এই সংবাদ প্রদান করিবার নিমিত্ত শ্রুতশীলবিশিষ্ট [বেদাদি-শাস্ত্রজ্ঞান ও সৎস্বভাবসম্পন্ন] গৌরমুখ নামে শিষ্যকে প্রেরণ করিলেন। তিনি তাঁহাকে কহিয়া দিলেন যে, “তুমি অগ্রে রাজার ও রাজকার্য্যের কুশল জিজ্ঞাসিবে, তৎপরে এই অশুভ সংবাদ দিবে।” গোরমুখ গুরুর আজ্ঞানুসারে অবিলম্বে হস্তিনানগরে উপস্থিত হইয়া অগ্রে দ্বারপাল দ্বারা সংবাদ দিলেন, পরে রাজভবনে প্রবেশ করিলেন। রাজা তাঁহাকে দেখিয়া পরম সমাদরপূর্ব্বক পাদ্য-অর্ঘ্যাদি দ্বারা পূজা করিলেন। গৌরমুখ রাজকৃত সৎকার গ্রহণ ও কিয়ৎক্ষণ শ্রান্তি দূর করিয়া শমীকোপদিষ্ট বাক্য-সকল অবিকল করিতে লাগিলেন। তিনি কহিলেন, “মহারাজ! শান্ত, দান্ত, পরমধার্ম্মিক শমীক নামে এক মহাতপা মহর্ষি আপনার অধিকারে বাস করেন। আপনি শরাসনের অগ্রভাগ দ্বারা সেই মৌনব্রতাবলম্বী মহর্ষির স্কন্ধে এক মৃতসর্প অর্পণ করিয়া আসিয়াছিলেন। শমগুনাবলম্বী মহামুনি শমীক আপনার সেই অপরাধ ক্ষমা করিয়াছিলেন; কিন্তু তদীয় পুৎত্র শৃঙ্গী সাতিশয় উগ্রস্বভাব। তিনি আপনার গর্হিত অনুষ্ঠান দর্শনে ক্রোধে অধীর হইয়া আপনাকে এই অভিসম্পাত করিয়াছেন যে, সপ্তম দিবসে তক্ষক দংশনে আপনার প্রাণবিয়োগ হইবে। শমীক মুনি শাপনিবারণার্থ পুৎত্রকে যথেষ্ট অনুরোধ করিয়াছিলেন, কিন্তু কাহার সাধ্য যে, সে শাপ অন্যথা করে? মহর্ষি কোপান্বিত পুৎত্রকে কোনক্রমে শান্ত করিতে না পারিয়া আপনার হিতার্থে আমাকে এই শাপসংবাদ দিতে পাঠাইলেন।”
রাজা পরীক্ষিৎ গৌরমুখের মুখে এই দারুণ সংবাদ শুনিয়া এবং আপন দুষ্কর্ম্ম স্মরণ করিয়া অত্যন্ত বিষণ্ণ হইলেন। মুনিবর শমীক মৌনব্রতাবলম্বী ছিলেন, এই নিমিত্তই তাঁহাকে প্রত্যুত্তর প্রদান করেন নাই, ইহা শুনিয়া রাজার শোকাগ্নি দ্বিগুণ প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। তখন তিনি ভাবিতে লাগিলেন, “শমীক মুনি এমত শান্তস্বভাব যে, তিনি মৎকৃত তাদৃশ অপমান সহ্য করিয়াও দয়া প্রদর্শন করিয়াছেন! হায়! আমি কি কুকর্ম্ম করিয়াছি, সেই পরম-কারুণিক মুনিবরের উপর তদ্রূপ অত্যাচার করা আমার নিতান্ত অন্যায় হইয়াছে।” এই ভাবিয়া রাজার আর পরিতাপের পরিসীমা রহিল না। রাজা বিনাপরাধে সেই মুনিবরের তাদৃশী অবমাননা করিয়াছেন বলিয়া যেরূপ শোকার্ত্ত হইলেন, আপনার মৃত্যুবার্ত্তা শ্রবণে সেরূপ হইলেন না। অনন্তর রাজা গৌরমুখকে এই বলিয়া বিদায় করিলেন যে, মহাশয়! আপনি অনুগ্রহ করিয়া সেই মুনিবরকে এই কথা বলিবেন, যেন তিনি আমার প্রতি সুপ্রসন্ন থাকেন।
রাজা এইরূপে গৌরমুখকে বিদায় করিয়া নিতান্ত উদ্বিগ্নমনে আপন মন্ত্রিগণ সমভিব্যাহারে মন্ত্রণা করিতে লাগিলেন। মন্ত্রণানন্তর এক একস্তম্ভ-সুরক্ষিত [একটি মাত্র স্তম্ভের উপর সুব্যবস্থায় স্থাপিত] প্রাসাদ নির্ম্মাণ করাইয়া তথায় নানাবিধ ঔষধ, বহুসংখ্যক চিকিৎসক ও মন্ত্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণগণ নিযুক্ত করিলেন এবং সেই প্রাসাদে সুরক্ষিতরূপে অবস্থান করিয়া মন্ত্রিগণ সমভিব্যাহারে রাজকার্য্য সম্পাদন করিতে লাগিলেন। তাঁহার সমীপে কেহই গমন করিতে পারিতেন না। অধিক কি কহিব, সর্ব্বত্রগামী বায়ুরও সে স্থানে সঞ্চার রহিল না।
বিষবিদ্যা-বিশারদ দ্বিজোত্তম কাশ্যপ মুনি শ্রবণ করিয়াছিলেন যে, রাজা পরীক্ষিৎ ভুজঙ্গশ্রেষ্ঠ তক্ষকের দংশনে প্রাণপরিত্যাগ করিবেন। তন্নিমিত্ত তিনি মনে মনে বিবেচনা করিয়াছিলেন যে, তক্ষক রাজাকে দংশন করিলে আমি মন্ত্রৌষধিবলে তাঁহাকে সঞ্জীবিত করিব, তাহা হইলে আমার ধর্ম্ম ও অর্থ উভয়ই লাভ হইবে। পরে নির্দ্ধারিত সপ্তম দিন উপস্থিত হইলে তিনি রাজাকে রক্ষা করিবার বাসনায় একাগ্রচিত্ত হইয়া রাজভবনে গমন করিতেছেন, এমন সময়ে বৃদ্ধ-ব্রাহ্মণবেশধারী নাগরাজ তক্ষক পথিমধ্যে তাঁহাকে দেখিতে পাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে মুনিবর! তুমি অনন্যমনা হইয়া এত সত্বরগমনে কি অভিপ্রায়ে কোথায় চলিয়াছ?” কাশ্যপ কহিলেন, “অদ্য কুরুকুলোৎপন্ন রাজা পরীক্ষিৎ উরগ-রাজ তক্ষকের বিষানলে দগ্ধ হইবেন শুনিয়া তাঁহাকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত গমন করিতেছি।” তক্ষক কহিলেন, “হে ব্রাহ্মণ! আমিই সেই তক্ষক, আমি অদ্য সেই মহীপালের প্রাণসংহার করিব, তুমি ক্ষান্ত হও, আমি দংশন করিলে তোমার সাধ্য কি যে, তুমি তাঁহাকে রক্ষা কর।” কাশ্যপ কহিলেন, “তুমি দংশন করিলে আমি স্বীয় বিদ্যা-প্রভাবে অবশ্যই তাঁহাকে নির্বিবষ করিব, স
পরীক্ষিতের তক্ষকদংশন
তক্ষক কহিলেন, “হে কাশ্যপ! যদি আমি কোন বস্তু দংশন করিলে তুমি চিকিৎসা দ্বারা তাহাকে রক্ষা করিতে পার, তবে সম্মুখস্থ এই বটবৃক্ষে দংশন করিতেছি, তুমি ইহাকে রক্ষা করিয়া আপনার মন্ত্রপ্রভাব দেখাও।” কাশ্যপ কহিলেন, “হে ভুজগেন্দ্র! তুমি দংশন কর, আমি এই মুহূর্ত্তে ইহাকে পুনর্জ্জীবিত করিতেছি।” ভুজঙ্গেশ্বর রক্ষক মহাত্মা কাশ্যপের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া সম্মুখস্থ সেই বটবৃক্ষে দংশন করিলেন। বটবৃক্ষ তক্ষকের তীব্র বিষানলে মূল অবধি পল্লবাগ্র পর্য্যন্ত প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল এবং ক্ষণকালমধ্যে ভস্মসাৎ হইয়া গেল। তখন তক্ষক কাশ্যপ মুনিকে কহিলেন, “হে দ্বিজোত্তম! এই বৃক্ষকে পুনর্জ্জীবিত করিতে যত্নবান্ হও।” মহর্ষি কাশ্যপ তক্ষকের বাক্য শ্রবণ করিয়া সেই ভস্মীভূত বৃক্ষের ভস্মরাশি গ্রহণপূর্ব্বক তক্ষককে কহিলেন, “হে ভুজগেন্দ্র! আমার বিদ্যাবল দেখ, আমি তোমার সমক্ষেই এই ভস্মীভূত বনস্পতিকে পুনর্জ্জীবিত করিতেছি।” অনন্তর দ্বিজসত্তম কাশ্যপ স্বীয় বিদ্যাপ্রভাবে সেই ভস্মীকৃত ন্যগ্রোধ পাদপকে পুনর্জ্জীবিত করিলেন। প্রথমে অঙ্কুর, তৎপরে পত্রদ্বয়, তদনন্তর পত্রসমূহ, পরিশেষে শাখা-প্রশাখা প্রভৃতি সমুদয় অংশ সুচারুরূপে প্রস্তুত হইল।
এইরূপে মহর্ষি কাশ্যপের মন্ত্রবলে ঐ বটবৃক্ষ পুনর্জ্জীবিত হইল দেখিয়া তক্ষক তাঁহাকে কহিলেন, “হে ব্রহ্মন্! তুমি যে বিদ্যাবলে আমার বা আমার মত অন্য সর্পের বিষক্ষয় করিবে, ইহা বড় আশ্চর্য্যের বিষয় নহে, যেহেতু, ভবাদৃশ মন্ত্রবিশারদ তেজস্বী লোকের কিছুই দুঃসাধ্য নহে। এক্ষণে জিজ্ঞাসা করি, তুমি কি নিমিত্ত তথায় গমন করিতেছ? তুমি যে বস্তুর লাভাকাঙ্ক্ষায় সেই নৃপের নিকট যাইতেছ, তাহা অতি দুষ্প্রাপ্য হইলেও আমি তোমাকে দিব। ব্রহ্মশাপে রাজার আয়ুঃশেষ হইয়াছে, অতএব তুমি তাঁহার রক্ষণ-বিষয়ে কৃতকার্য্য হইতে পার কি না সন্দেহ। যদি তুমি তাঁহাকে রক্ষা করিতে না পার, তাহা হইলে তোমার ত্রিলোকী-বিশ্রুত যশোরাশি নিস্তেজ দিবাকরের ন্যায় একেবারে অন্তর্হিত হইবে।”
কাশ্যপ তক্ষক-বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, “হে ভুজঙ্গম! আমি ধনার্থী হইয়া তথায় গমন করিতেছি, তুমি আমাকে প্রচুর ধন দাও, তাহা হইলেই আমি নিবৃত্ত হইতেছি।” তক্ষক কহিলেন, “হে দ্বিজোত্তম! তুমি যত ধন আকাঙ্ক্ষা করিয়া রাজার নিকট গমন করিতেছ, আমি তদপেক্ষা অধিক দিতেছি, তুমি নিবৃত্ত হও।” দ্বিজোত্তম কাশ্যপ তক্ষকের বাক্য-শ্রবণানন্তর দিব্যজ্ঞান-প্রভাবে ধ্যান করিয়া দেখিলেন যে, সত্যই রাজা পরীক্ষিতের আয়ুঃশেষ হইয়াছে। তখন তিনি তক্ষকের নিকট হইতে স্বাভিলষিত অর্থ লইয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন।
এইরূপে মহাত্মা কাশ্যপ প্রতিনিবৃত্ত হইলে তক্ষক অবিলম্বে হস্তিনানগরে উপস্থিত হইলেন। গমনসময়ে শুনিলেন, রাজা বিষহর মন্ত্র ও ঔষধ সংগ্রহ করিয়া অতি সাবধানে রহিয়াছেন। তখন তিনি মনে মনে চিন্তা করিলেন যে, রাজাকে মায়াপ্রভাবে বঞ্চিত করিতে হইবে, অতএব এক্ষণে কি উপায় অবলম্বন করা কর্ত্তব্য? তদনন্তর নাগরাজ তক্ষক অন্যান্য সর্পগণকে আদেশ করিলেন, “তোমরা ব্রাহ্মণরূপ ধারণপূর্ব্বক বিশেষ প্রয়োজন আছে’ এই ছল করিয়া অব্যগ্রচিত্তে রাজসমীপে গিয়া ফল, পুষ্প, কুশ ও জল প্রদান দ্বারা তাঁহাকে আর্শীর্ব্বাদ করিবে।” নাগগণ তক্ষক কর্ত্তৃক এইরূপ আদিষ্ট হইয়া ব্রাহ্মণ-বেশ পরিগ্রহণপূর্ব্বক রাজ-সন্নিধানে গমন করিয়া কুশ, জল ও ফল দিয়া রাজাকে আশীর্ব্বাদ করিলে রাজা সেই সমস্ত গ্রহণ করিলেন; পরে কার্য্য সমাধানানন্তর তাঁহাদিগকে বিদায় করিলেন। ছদ্মতাপসরূপী [কৃত্রিম মুনিবেশধারী] ভুজঙ্গমেরা গমন করিলে রাজা অমাত্যগণ ও সুহৃদ্গণকে কহিলেন, “আইস, আমরা সকলে একত্র হইয়া এই সকল তাপসদত্ত সুস্বাদু ফল ভক্ষণ করি। দুর্দ্দৈববশতঃ ভূপতির ফলভোজনে প্রবৃত্তি হইল। যে ফলের মধ্যে তক্ষক গুপ্তভাবে ছিলেন, দৈবনির্ব্বন্ধক্রমে তিনি সেই ফলটিই স্বয়ং ভক্ষণ করিতে লইলেন। ভক্ষণ করিবার সময় ঐ ফল হইতে এক অণু পরিমাণ কৃষ্ণনয়ন তাম্রবর্ণ কীট বহির্গত হইল। রাজা সেই কীট গ্রহণ করিয়া সচিবদিগকে কহিতে লাগিলেন, “সূর্য্যদেব অস্তাচলে গমন করিতেছেন, আজি আর আমার বিষের ভয় নাই। এক্ষণে এই কীট তক্ষক হইয়া আমাকে দংশন করুক। তাহা হইলে শাপেরও মোচন হয় এবং ব্রাহ্মণের বাক্যেও সত্য হয়।” মন্ত্রীরাও কালপ্রযোজিত হইয়া তাঁহার সেই বাক্যে অনুমোদন করিলেন। মরণো রাজার দুর্ব্বুদ্ধি ঘটিল। তিনি সেই কীট স্বীয় গ্রীবায় রাখিয়া হাসিতে লাগিলেন। কীটরূপী তক্ষক নিজ দেহ দ্বারা তৎক্ষণাৎ রাজার গ্রীবাদেশ বেষ্টন করিল। তখন রাজার চৈতন্য হইল, তক্ষক অতিবেগে রাজার গ্রীবাদেশ বেষ্টনপূর্ব্বক ভীষণ গর্জ্জন করিয়া তাঁহাকে দংশন করিল।
পরীক্ষিতের প্রাণবিয়োগ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মন্ত্রিগণ রাজাকে তক্ষকের শরীর দ্বারা বেষ্টিত দেখিয়া বিষণ্ণ বদনে ও দুঃখিতমনে রোদন করিতে লাগিলেন; তদনন্তর তক্ষকের সেই ভীষণ গর্জ্জন শ্রবণে ভীত হইয়া সে স্থান হইতে পলায়ন করিলেন। তাঁহারা পলায়নকালে গগনমণ্ডলে দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলেন, ভুজঙ্গরাজ তক্ষক দীপ্তাগ্নি শিখা-সদৃশ স্বীয় শরীর দ্বারা নভোমণ্ডল দ্বিখণ্ডিত করিয়া অতিবেগে গমন করিতেছেন। পরিশেষে সেই একস্তম্ভ গৃহ তক্ষকের বিষাগ্নি দ্বারা প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। মন্ত্রিবর্গ তদ্দর্শনে শঙ্কাকুলিতচিত্তে ইতস্ততঃ পলায়ন করিতে লাগিলেন এবং রাজাও বজ্রাহতের ন্যায় ভূপৃষ্ঠে পতিত ও মূর্চ্ছিত হইলেন। রাজা পরীক্ষিৎ এইরূপে তক্ষকদংশনে প্রাণত্যাগ করিলে তদীয় মন্ত্রিগণ ও রাজপুরোহিতগণ সমবেত হইয়া তাঁহার পারত্রিক ক্রিয়াকলাপ সম্পাদন করিলেন। পরে পুরবাসী সমস্ত প্রজাগণকে একত্র করিয়া তাঁহার শিশুপুৎত্রকে পিতৃরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। ঐ অমিত্রঘাতী কুরুপ্রবীর নৃপাত্মজের নাম জনমেজয়। কুরুবংশাবতংস মহামতি জনমেজয় শিশু হইয়াও মন্ত্রিগণ ও পুরোহিতগণের সহিত মন্ত্রণা করিয়া আপন প্রপিতামহ ধর্ম্মাত্মা যুধিষ্ঠিরের ন্যায় সুচারুরূপে রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। অনন্তর মন্ত্রিগণ ঐ নবীন রাজার রাজকার্য্য-সম্পাদনে বিলক্ষণ নিপুণতা জন্মিয়াছে দেখিয়া তাঁহার পরিণয়ার্থে কাশীপতি সুবর্ণবর্ম্মার নিকটে গিয়া তদীয় কন্যা বপুষ্টমাকে প্রার্থনা করিলেন। কাশীশ্বর সেই কুরুপ্রবীরকে বেদবিধানানুসারে বপুষ্টমা প্রদান করিলেন। রাজা জনমেজয় ঐ লোকললামভূত[অসামান্য রূপবতী] নিতম্বিনীকে [সুলক্ষণাস নারী] পাইয়া পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন। তিনি কদাচ অন্য রমণীর প্রতি কটাক্ষপাতও করিতেন না। পূর্ব্বকালে পার্থিবাগ্রণী [নৃপশ্রেষ্ঠ] পুরুরবা যেমন ঊর্ব্বশীকে পাইয়া তাঁহার সহিত বিহার করিয়াছিলেন, তদ্রূপ ইনিও সেই মনোহারিণী বরবর্ণিনী[উত্তমা নারী]কে পাইয়া কদাচিৎ সুরম্য সরোবরে, কদাচিৎ বিচিত্র উপবনে, তাঁহার সহিত বিহার করিয়া পরমসুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন। রূপলাবণ্যবতী পতিব্রতা বপুষ্টমাও বিহারকাল সাতিশয় প্রেম প্রদর্শন দ্বারা প্রিয় পতিকে যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট করিলেন।
বংশধর সন্তানের প্রশংসা
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, এই সময়ে মহাতপা জরৎকারু মুনি বায়ুমাত্র-ভক্ষণে শীর্ণকলেবর হইয়া তপোনুষ্ঠান ও পুণ্যতীর্থে স্নান করিয়া, অবনীমণ্ডল পরিভ্রমণ করিতেন এবং যেস্থানে সায়ংকাল উপস্থিত হইত, সেই স্থানেই অবস্থিতি করিতেন। একদা তিনি পর্য্যটনক্রমে এক স্থানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, নিরাহারে শীর্ণকলেবর, বায়ুমাত্রভোজী, পরিত্রাণেচ্ছু, অতি দীনভাবাপন্ন, স্বকীয় পিতৃগণ ঊর্দ্ধ্বপাদ ও অধোমস্তকে তন্তুমাত্রাবশিষ্ট উশীরস্তম্ব অবলম্বন করিয়া এক মহাগর্ত্তাভিমুখে লম্বমান রহিয়াছেন। ঐ গর্ত্তে এক প্রকাণ্ড মূষিক বাস করে। সে প্রতিদিন সেই বীরণস্তম্বের মূল সকল ক্রমে ক্রমে ছেদন করিতেছে। মহর্ষি জরৎকারু তাঁহাদিগকে নিতান্ত দীনভাবাপন্ন ও পরিত্রাণেচ্ছু দেখিয়া দয়ার্দ্রাচিত্তে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনারা কে এবং কি নিমিত্তই বা এই উশীরস্তম্ব অবলম্বন করিয়া ঊর্দ্ধ্বপাদে ও অধোমুখে মহাগর্ত্তাভিমুখে লম্বমান রহিয়াছেন? আপনারা যে উশীরস্তম্ব অবলম্বন করিয়া আছেন, উহার একমাত্র তন্তু অবশিষ্ট আছে; এই গর্ত্তনিবাসী মূর্ষিক তাহাও ক্রমে ক্রমে ছেদন করিতেছে। ইহা ছিন্ন হইলেই আপনারা এই গর্ত্তমধ্যে অধঃশিরে পতিত হইবেন। আপনাদের এই দুর্দ্দশা দর্শনে আমার যৎপরোনাস্তি দুঃখ হইতেছে। আজ্ঞা করুন, আপনাদের কি প্রিয়কার্য্য করিব? আমার তপস্যার চতুর্থভাগ বা তৃতীয়ভাগ অথবা অর্দ্ধভাগ লইয়া যদি আপনারা এই বিপদ হইতে মুক্ত হইতে পারেন, লউন। অধিক আর কি কহিব, যদি সমগ্র তপস্যা দ্বারাও আপনাদের এই দুঃসহ দুঃখ-নিবারণ হয়, তাহাতেও আমি সম্মত আছি।”
পিতৃগণ তাঁহার সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, “হে বৃদ্ধ ব্রহ্মচারিন্! তুমি তপঃপ্রভাবে আমাদিগকে পরিত্রাণ করিতে চাহিতেছ, কিন্তু তপস্যা দ্বারা আমাদিগকে উদ্ধার করিতে পারিবে না। আমাদিগেরও তপঃসিদ্ধি আছে; কেবল বংশক্ষয়োপক্রম হইয়াছে বলিয়া আমরা এই অপবিত্র নরকে নিপতিত হইতেছি। সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা কহিয়াছেন, ‘সন্তানই পরম ধর্ম্ম।’ আমরা এই গর্ত্তে লম্বমান হইয়া হতজ্ঞান হইয়াছি, তন্নিমিত্ত তোমার পৌরুষ সর্ব্বলোক-বিশ্রুত হইলেও তোমাকে চিনিতে পারিতেছি না। তুমি আমাদিগের দুঃখদর্শনে সাতিশয় কাতর হইয়াছ, অতএব তোমাকে পরিচয় প্রদান করিতেছি, শ্রবণ কর। আমরা যাযাবর নামে ব্রতশীল ঋষি, সন্তানক্ষয়ের উপক্রম হওয়াতে এই পবিত্র লোক হইতে ভ্রষ্ট হইতেছি। আমাদের কঠোর তপস্যার ফল অদ্যাপিও বিনষ্ট হয় নাই। আমাদের জরৎকারু নামে এক সন্তান আছেন। তিনি বেদবেদাঙ্গ-শাস্ত্রে পারদর্শী, নিয়তাত্মা, ব্রতনিরত ও তপঃপ্রভাবসম্পন্ন; কিন্তু তাঁহার থাকা না থাকা উভয়ই সমান হইয়াছে। তাঁহার স্ত্রী-পুৎত্র বন্ধুবান্ধব কেহই নাই; কেবল কঠোর তপস্যা করিয়াই কালযাপন করেন। তিনি তপস্যা লোভে নিতান্ত আক্রান্ত হওয়াতেই আমাদিগের এই দুর্দ্দশা ঘটিয়াছে। এই যে উশীরস্তম্ব দেখিতেছ, ইহা আমাদের বংশবর্দ্ধক কুলস্তম্ব। আর ইহার যে সকল মূল দেখিতেছ, ইহা আমাদিগের কালকবলিত সন্তানসমূহ। অর্দ্ধভক্ষিত যে মূলটি আমরা অবলম্বন করিয়া আছি, উহা সেই তপোনিষ্ঠ জরৎকারু। আর এই যে মূষিক দেখিতেছ, ইনি মহাবলপরাক্রান্ত কাল। ইনি সেই তপোলুব্ধ মূঢ়মতি জরৎকারুকে ক্ষয় করিতেছেন। জরৎকারুর কঠোর তপস্যা আমাদিগকে রক্ষা করিতে পারিবে না। আমরা অতি মন্দভাগ্য, আমাদিগের মূল ছিন্নপ্রায় হইয়াছে। এই দেখ, আমরা কালোপহতচিত্ত [দৈববিড়ম্বিত] হইয়া দুরাত্মাদিগের ন্যায় অধঃপতিত হইতেছি। আমরা সবান্ধবে এই গর্ত্তে পতিত হইলে তাঁহাকেও কালনিয়ন্ত্রিত হইয়া নিরয় [নরক] গামী হইতে হইবে। হে ব্রহ্মন্! কি তপস্যা, কি যজ্ঞ, কি অন্যান্য পুণ্যকর্ম্ম, সন্তানের সদৃশ কিছুই দেখিতে পাই না। হে বৎস! এক্ষণে তুমি আমাদিগের নাথস্বরূপ। তোমার সহিত সেই মূঢ়মতি জরৎকারুর সাক্ষাৎকার হইলে তাহার নিকট আমাদিগের এই দুর্দ্দশা-বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত পরিচয় দিবে এবং কহিবে, তুমি ত্বরায় দারপরিরগ্রহ করিয়া সন্তানোৎপাদন দ্বারা তাহাদিগের পরিত্রাণ কর। সে যাহা হউক, তুমি যে আমাদের দুর্দ্দশা দেখিয়া পরম-বন্ধুর ন্যায় অনুতাপ করিতেছ, তন্নিমিত্ত আমরা শুনিতে ইচ্ছা করি, তুমি কে?”
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, জরৎকারু তাঁহাদের এই বাক্যশ্রবণে সাতিশয় শোকার্ত্ত হইয়া সবাষ্প-গদগদস্বরে কহিতে লাগিলেন, “হে মহর্ষিগণ! আপনারা আমারই পর্ব্বপুরুষ; আমিই আপনাদিগের সেই পাপাত্মা, নরাধম ও কৃতঘ্ন পুৎত্র; আমার নাম জরৎকারু। সম্প্রতি আপনাদিগের কি প্রিয়কার্য্য করিতে হইবে, আজ্ঞা করুন এবং আমার এই অপরাধের যথোচিত দণ্ডবিধান করুন।”

জরৎকারুর বংশরক্ষায় প্রতিজ্ঞা
পিতৃগণ কহিলেন, “বৎস! আমাদিগের সৌভাগ্যবলে তুমি যদৃচ্ছাক্রমে এই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছ, এক্ষণে জিজ্ঞাসা করি, তুমি কি নিমিত্ত দারপরিগ্রহ কর নাই?” জরৎকারু কহিলেন, “হে পিতৃগণ! আমার মনে সর্ব্বদাই এই ভাব উদিত হয় যে, আমি ঊর্দ্ধ্বরেতা হইয়া ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বনপূর্ব্বক দেহত্যাগ করিব, কদাচ দারপরিগ্রহ করিব না। এক্ষণে আপনাদিগকে এই মহাগর্ত্তমধ্যে পক্ষীর ন্যায় লম্বমান দেখিয়া আমার ব্রহ্মচর্য্যের বাসনা অপনীত হইল। আমি আপনাদের হিতসাধনার্থে অচিরাৎ বিবাহ করিব, কিন্তু তদ্বিষয়ে এই এক প্রতিজ্ঞা রহিল যে, যদি আমি আমার সনাম্নী কন্যা ভিক্ষাস্বরূপ প্রাপ্ত হই এবং তাহাকে ভরণপোষণ করিতে না হয়, তাহা হইলেই তাহার পাণিগ্রহণ করিব, প্রকারান্তর হইলে তদ্বিষয়ে প্রবৃত্ত হইব না। আমার সেই পত্নীর গর্ভে যে পুৎত্র জন্মিবে, সেই আপনাদিগকে উদ্ধার করিবে। হে পিতামহগণ! তখন আপনারা অক্ষয় স্বর্গলাভ করিয়া পরম সুখে কালযাপন করিতে পারিবেন।”
উগ্রশ্রবাঃ শৌনককে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে ভৃগুবংশাবতংস! মহর্ষি জরৎকারু এইরূপে পিতৃগণকে আশ্বাসিত করিয়া সমস্ত মহীমণ্ডল ভ্রমণ করিতে লাগিলেন; কিন্তু তিনি বৃদ্ধ বলিয়া কেহই তাঁহাকে কন্যাপ্রদানে উদ্যত হইল না। যখন তিনি পিতৃগণের আদেশানুসারে বিবাহ করিতে কৃতসঙ্কল্প হইয়াও তৎসম্পাদনে কৃতকার্য্য হইতে পারিলেন না, তখন দুঃখার্ত্তমনে অরণ্যানী প্রবেশ পূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন। পরিশেষে পিতৃলোক-হিতৈষী-মহাপ্রাজ্ঞ জরৎকারু এই বলিয়া ক্রমে ক্রমে তিনবার কন্যা ভিক্ষা করিলেন, “এ স্থানে যে কোন স্থাবর বা অস্থাবর বস্তু বর্ত্তমান আছ অথবা যাহারা অন্তর্হিত [অদৃষ্ট-অগোচর] আছ, সকলে আমার বাক্য শ্রবণ কর। আমি যাযাবরবংশে সমুদ্ভত। আমার নাম জরৎকারু। জন্মাবধি এতাবৎকাল পর্য্যন্ত কেবল ব্রহ্মচর্য্যানুষ্ঠান দ্বারা কালযাপন করিয়াছি। সম্প্রতি আমার পিতৃগণ বংশলোপভয়ে আমাকে পাণিগ্রহণ করিতে আদেশ দিয়াছেন। আমি অত্যন্ত দরিদ্র হইয়াও পিতৃগণের আজ্ঞাক্রমে দারপরিগ্রহাভিলাষে [বিবাহিত পত্নী পাইবার আশায়] নিখিল ধরণীমণ্ডল পরিভ্রমণ করিলাম, কিন্তু কুত্রাপি কন্যালাভ হইল না। অতএব এক্ষণে আমি যাঁহাদের নিকট কন্যা প্রার্থনা করিতেছি, তাঁহাদের মধ্যে যদি কোন ব্যক্তির মৎসনাম্নী [আমারতুল্যা নামের] দুহিতা থাকে, আর যদি আমাকে সেই কন্যা ভিক্ষাস্বরূপ সম্প্রদান করেন এবং তাহাকে যদি ভরণপোষণ করিতে না হয়, তবে আনয়ন করুন, আমি তাহার পাণিগ্রহণ করিব।”
অনন্তর যে সকল সর্প জরৎকারুর দারপরিগ্রহাভিলাষের অনুসন্ধানে নিযুক্ত ছিল, তাহারা সত্বর যাইয়া বাসুকিকে সংবাদ দিল। নাগরাজ বাসুকি তাহাদের মুখে এই বাক্য শ্রবণ করিবামাত্র সাতিশয় সন্তোষপ্রকাশপূর্ব্বক স্বীয় ভগিনীকে বিচিত্র বসন ভূষণে বিভূষিত করিয়া জরৎকারু সন্নিধানে লইয়া গেলেন এবং তাঁহাকে ভিক্ষা-স্বরূপ সেই কন্যা প্রদান করিলেন; কিন্তু মুনিবর কন্যার নাম ও ভরণ-পোষণ-বিষয়ে সন্দিহান হইয়া নাগরাজ বাসুকিকে তাঁহার নাম জিজ্ঞাসা করিলেন এবং কহিলেন, “আমি ইঁহার ভরণপোষণ করিতে পারিব না।” এইরূপে মহর্ষি জরৎকারু মুমুক্ষু হইয়াও দারপরিগ্রহার্থ দ্বিমনা [সংশয়িত চিত্ত- ইতস্ততঃ ভাব] হইয়াছিলেন।

জরৎকারুর পত্নীপরিত্যাগ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগরাজ বাসুকি জরৎকারুকে কহিলেন, “হে তপোধন! আমার এই ভগিনী আপনার সনাম্নী এবং ইনি তপঃপরায়ণা! আপনি ইঁহার পাণিগ্রহণ করুন। আমি ইঁহাকে আপনার সহধর্ম্মীণী করিয়া দিন বলিয়াই এতাবৎকাল পর্য্যন্ত অভিলাষ করিয়া আছি। আর অঙ্গীকার করিতেছি, আমি সাধ্যানুসারে ইঁহার ভরণপোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করিব।” ঋষি কহিলেন, “তবে এই নিশ্চয় হইল যে, আমি কদাচ ইঁহার ভরণপোষণ করিব না এবং ইনিও আমার কোন অপ্রিয় আচরণ করিবেন না, যদি করেন, তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ পরিত্যাগ করিব।”
বাসুকি ভগিনীর ভরণপোষণের ভারগ্রহণ করিলে মহাতপা জরৎকারু তাঁহার বাসভবনে গমন করিয়া যথাবিধানে তদীয় ভগিনীর পাণিপীড়ন [পাণিগ্রহণ-বিবাহ] করিলেন। বিবাহকালে মহর্ষিগণ তাঁহাকে স্তব করিতে লাগিলেন। অনন্তর জরৎকারু ভার্য্যা সমভিব্যাহারে ভুজঙ্গরাজের রমণীয় অন্তঃপুরে প্রবেশপূর্ব্বক সুচারু আস্তরণ-পটে আচ্ছাদিত [প্রচ্ছদ-বাস-ওয়াড় দ্বারা আবৃত] বিচিত্র শয্যায় শয়ন করিলেন। পরে ভার্য্যার সহিত এইরূপ নিয়ম করিলেন যে, “তুমি কদাচ আমার অপ্রিয় আচরণ করিবে না, অপ্রিয় কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে আমি তদ্দণ্ডেই তোমাকে পরিত্যাগ করিব ও ত্বদীয় বাসগৃহে আর ক্ষণমাত্রও অবস্থিতি করিব না। দেখিও, যাহা কহিলাম, যেন কদাপি ইহার অন্যথা না হয়।” পিতৃকুলহিতৈষিণী নাগরাজভগিনী অতিমাত্র দুঃখিত ও উদ্বিগ্নচিত্তে অগত্যা ‘তথাস্তু’ বলিয়া স্বামিবাক্যে অঙ্গীকার করিলেন এবং অতি সতর্কমনে ভর্ত্তৃশুশ্রূষা করিতে লাগিলেন।
কিয়ৎকাল পরে ভুজঙ্গরাজভগিনী ঋতুস্নাতা হইয়া যথাবিধি স্বামিসেবায় নিযুক্ত হইলেন। মহর্ষির সহযোগে তাঁহার গর্ভসঞ্চার হইল। ঐ গর্ভ শুক্লপক্ষীয় শশিকলার ন্যায় দিন দিন পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। একদা মহাযশা জরৎকারু একান্ত ক্লান্ত হইয়া প্রিয়তমার অঙ্কশয্যায় শিরোনিবেশ [ক্রোড়ে-কপলে মাথা রাখিয়া] পূর্ব্বক শায়িত ও নিদ্রিত হইলেন। দ্বিজেন্দ্র নিদ্রাক্রান্ত হইলে দিনমণি অস্তাচলে গমন করিলেন। মনর্স্বিনী নাগভগিনী সায়ংকাল উপস্থিত দেখিয়া স্বামীর তৎকালোচিত সন্ধ্যা-বন্দনাদি ক্রিয়ালোপের আশঙ্কায় চিন্তা করিলেন, “সম্প্রতি আমার কি কর্ত্তব্য, ভর্ত্তার নিদ্রাভঙ্গ করি কি না? ইনি অতি কোপনস্বভাব, নিদ্রাভঙ্গ করিলে নিশ্চয়ই কোপ করিবেন; কিন্তু জাগরিত না করিলেও নিত্যক্রিয়ার ব্যতিক্রম ঘটে; অতএব এক্ষণে কি করা উচিত? ফলতঃ কোপ ও ধর্ম্মশীল ব্যক্তির ধর্ম্মলোপ এই দুইয়ের মধ্যে ধর্ম্মলোপই নিতান্ত দূষণাবহ; অতএব যাহাতে ব্রাহ্মণের ধর্ম্মরক্ষা হয়, তাহাই করা কর্ত্তব্য।”এইরূপ নিশ্চয় করিয়া মধুরভাষিণী বাসুকি-ভগিনী জ্বলন্ত-হুতাশনসন্নিভ তেজঃপুঞ্জাকৃতি সুখপ্রসুপ্ত মহাতপা জরৎকারুকে সম্বোধন করিয়া অতি বিনীত-বচনে কহিলেন, “মহাভাগ! সূর্য্যদেব অস্তাচল শিখরদেশে আরোহণ করিয়াছেন। সন্ধ্যাতিমির [সন্ধ্যার অন্ধকার] পশ্চিমদি্ক অল্প অল্প আচ্ছন্ন করিতেছে। গাত্রোত্থান করিয়া সন্ধ্যোপাসনা করুন, অগ্নিহোত্রের সময় উপস্থিত।” ভগবান্ জরৎকারু জাগরিত হইয়া ওষ্ঠাধর পরিস্ফুরণপূর্ব্বক রোষভরে কহিলেন, “হে ভুজঙ্গমে! তুমি আমার অবমাননা করিলে, অতএব আমি আর তোমার নিকট অবস্থিতি করিব না, যথাস্থানে গমন করিব। হে বামোরু! আমার এরূপ দৃঢ়-নিশ্চয় আছে, আমি নিদ্রিতাবস্থায় থাকিলে সূর্য্যের সাধ্য কি যে, তিনি যথাকালে অস্তগত হন? অপমানিত হইলে সামান্য লোকেও তথায় বাস করে না, আমার বা মাদৃশ ধর্ম্মশীল ব্যক্তির কথা কি বলিব?”
তদীয় এতাদৃশ নির্দ্দয়-বাক্য শ্রবণে বাসুকি-ভগিনী কহিলেন, “ভগবান্! ধর্ম্মলোপের আশঙ্কায় আমি আপনার নিদ্রাভঙ্গ করিয়াছি, অপমানের উদ্দেশ্যে করি নাই।” তখন জরৎকারু ক্রোধাবিষ্ট হইয়া ভার্য্যা-পরিত্যাগ-বাসনায় বলিলেন, “হে ভুজঙ্গমে! আমার কথা মিথ্যা হইবার নহে, আমি অদ্যই এ স্থান হইতে প্রস্থান কবির। আমি ত’ পূর্ব্বেই তোমার সহিত এইরূপ নিয়ম করিয়া-ছিলাম ; অতএব হে ভদ্রে! এতদিন তোমার নিকট পরমসুখে ছিলাম, এক্ষণে চলিলাম। আমি গমন করিলে তোমার ভ্রাতাকে বলিও, সেই মুনি গমন করিয়াছেন এবং তুমিও মদীয় অদর্শনে শোকাভিভূত হইও না।”
তাঁহার এই দারুণ কথা শুনিয়া নাগ-স্বসা [সর্পভগিনী] জরৎকারুর মুখ শুষ্ক হইল ও হৃদয় কম্পিত হইতে লাগিল। পরিশেষে তিনি ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক বাষ্পাকুললোচনে ও গদগদ বচনে কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, “হে ধর্ম্মজ্ঞ! বিনা অপরাধে আমাকে পরিত্যাগ করিও না, আমি কখন অধর্ম্মাচরণ করি নাই এবং প্রাণপণে আপনার প্রিয়কার্য্য ও হিতানুষ্ঠান করিয়া থাকি। ভ্রাতা যে অভিসন্ধি করিয়া আপনার হস্তে আমাকে সম্প্রদান করিয়াছেন, দুরদৃষ্টক্রমে আমি অদ্যাপিও তাহা প্রাপ্ত হইলাম না। তিনিই বা আমাকে কি বলিবেন? আমার জ্ঞাতিবর্গ মাতৃশাপে অভিভূত আছেন; আপনার ঔরসে আমার গর্ভে একটি পুৎত্র জন্মিবে এবং ঐ পুৎত্র হইতে তাঁহাদিগের শাপমোচন হইবে, এই তাঁহাদিগের অভিপ্রেত। কৈ, তাহারও ত’ কোন বিশেষ চিহ্ন দেখিতে পাইতেছি না; অতএব এক্ষণে যাহাতে তাঁহাদিগের ঐ মনোরথ নিষ্ফল না হয়, তাহা সম্পাদন করুন। হে ভগবান্! আমি জ্ঞাতিবর্গের হিতসাধনে প্রবৃত্ত হইয়াছি, আমার প্রতি প্রসন্ন হউন, এই অপরিস্ফুট গর্ভাধান [যে গর্ভ প্রকাশ পাব নাই এইরূপ] পূর্ব্বক বিনা-অপরাধে আমাকে পরিত্যাগ করিয়া কোথায় গমন করিবেন?” মহর্ষি জরৎকারু সহধর্ম্মিণীর এইরূপ বাক্য শুনিয়া তৎকালোপযুক্ত অনুরূপ বচনে কহিলেন, “হে সুভগে! তোমার গর্ভে পরম-ধার্ম্মিক, বেদ-বেদাঙ্গপারগ, অগ্নিকল্প এক ঋষি জন্মিবেন।” এই বলিয়া অতি কঠোর তপশ্চরণে কৃতনিশ্চয় হইয়া সে স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।

আস্তীক নামনিরুক্তি
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে তপোধন! অনন্তর নাগদুহিতা ভ্রাতৃসন্নিধানে আগমন করিয়া স্বভর্ত্তার গমনবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত নিবেদন করিলেন।তখন ভুজঙ্গরাজ বাসুকি অতিশয় অপ্রিয় সংবাদ শ্রবণ করিয়া যৎপরোনাস্তি পরিতাপ পাইলেন এবং কহিলেন, “ভদ্রে! আমি যে অভিপ্রায়ে তোমাকে জরৎকারু-হস্তে সম্প্রদান করিয়াছিলাম, বোধ করি, তুমি তাহা সম্যক্রূপে অবগত আছ। যদি তাঁহার ঔরসে তোমার সন্তান উৎপন্ন হয়, তাহা হইলে সর্পদিগের সবিশেষ উপকার দর্শিবে অর্থাৎ ঐ পুৎত্র রাজা জনমেজয়ের সর্পসত্র হইতে আমাদিগকে পরিত্রাণ করিবে। সর্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা পূর্ব্বে দেবগণের নিকট এই কথা কহিয়াছিলেন, অতএব জিজ্ঞাসা করি, সেই মুনি হইতে তোমার গর্ভসঞ্চার হইয়াছে কি না? আমার জিজ্ঞাসার উদ্দেশ্য এই যে, জরৎকারুকে ভগিনী সম্প্রদান করা কতদূর সফল হইল, জানিতে ইচ্ছা করি। নতুবা তোমাকে আমার এরূপ প্রশ্ন করা কোনক্রমেই ন্যায্য নহে, কিন্তু কি করি, নিতান্ত গুরুতর কার্য্য বলিয়াই অগত্যা এরূপ অনুচিত প্রশ্ন করিতে হইল। তোমার ভর্ত্তা তপস্যায় একান্ত অনুরক্ত ও নিতান্ত রোষপরবশ, বোধ করি, আমি অনুনয় করিলেও তিনি প্রতিনিবৃত্ত হইবেন না। বরং আমাকে অভিসম্পাত করিলেও করিতে পারেন। এই নিমিত্ত আমি তাঁহার অনুগমন করিতে চাহিনা। অতএব হে ভদ্রে! তোমার ভর্ত্তৃবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত পরিচয় দিয়া আমার চিরপ্রোত হৃদয়শল্য [দীর্ঘকালের বিন্যস্ত বাসনারূপ মনের উদ্বেগ] উন্মুলিত কর।”
জরৎকারু নাগরাজ বাসুকিকে আশ্বাস প্রদানপূর্ব্বক কহিলেন, “ভ্রাতঃ! সেই মহাত্মা যৎকালে গমন করেন, তখন আমি পুৎত্রের নিমিত্ত প্রার্থনা করিয়াছিলাম। তৎপরে ‘অস্তি’ অর্থাৎ আমার ঔরসে তোমার গর্ভসঞ্চার হইয়াছে এই উত্তর দিয়া তিনি প্রস্থান করিলেন। আমি তাঁহাকে ভ্রমক্রমেও মিথ্যা কহিতে শুনি নাই, সুতরাং এরূপ বিষয়ে কখনই মিথ্যাকথা কহিবেন না। তিনি গমনকালে আমাকে কহিলেন, ‘হে ভূজঙ্গমে! আমি নিষ্ক্রান্ত হইলে তুমি আমার নিমিত্ত সন্তাপ করিও না। অগ্নিসমপ্রদীপ্ত ও সূর্য্যের ন্যায় তেজস্বী তোমার এক পুৎত্র উৎপন্ন হইবে।” অতএব হে ভ্রাতঃ! এক্ষণে তোমার সেই মনোদুঃখ দূর হউক।” বাসুকি “তথাস্তু” বলিয়া ভগিনীবাক্য স্বীকার করিলেন এবং আহ্লাদ সাগরে মগ্ন হইয়া মধুসম্ভাষণ, সম্মান ও প্রার্থনাধিক অর্থদানে তাঁহাকে সন্তুষ্ট করিলেন।
অনন্তর সেই মহাপ্রভাবশালী গর্ভ শুক্লপক্ষীয় শশধরের ন্যায় দিন দিন পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। পরে নাগ-ভগিনী জরৎকারু যথাকালে পিতৃকুল-মাতৃকুল এই উভয় কুলের ভয়াপহারক দেব কুমারসদৃশ এক পুৎত্র প্রসব করিলেন। ঐ কুমার নাগরাজ-গৃহে অবস্থিত থাকিয়া প্রতিপালিত হইতে লাগিলেন এবং স্বীয় অসাধারণ বুদ্ধিবলে বাল্যকালে ভৃগুনন্দন চ্যবনের নিকট নিখিল বেদ ও বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করিলেন। তাঁহার গর্ভাবস্থানকালে তদীয় পিতা “অস্তি” বলিয়া প্রস্থান করিয়াছিলেন, এই নিমিত্ত তিনি আস্তীক নামে বিখ্যাত হইলেন। বাসুকি অলৌকিক ধীশক্তিসম্পন্ন সেই বালককে পরম-যত্নে প্রতিপালন করিতে লাগিলেন। তিনিও দিন দিন পরিবর্দ্ধিত হইয়া নাগকুলের আনন্দবর্দ্ধন করিতে লাগিলেন।

পরীক্ষিতের নিধনবৃত্তান্ত
শৌনক কহিলেন, রাজা জনমেজয় পিতার স্বর্গারোহণবৃত্তান্ত মন্ত্রিগণকে যেরূপে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি এক্ষণে তাহা সবিস্তারে কীর্ত্তন কর। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে দ্বিজেন! রাজা জনমেজয় যে প্রকারে মন্ত্রীদিগের পিতার নিধন বার্ত্তা জিজ্ঞাসা করেন এবং তাঁহার যেরূপে সেই বৃত্তান্ত বর্ণন করেন, তাহা কহিতেছি, শ্রবণ করুন। একদা রাজা জনমেজয় স্বীয় মন্ত্রীদিগকে কহিলেন, “হে অমাত্যগণ! তোমরা আমার পিতার নিধনবৃত্তান্ত সমুদয় জান, এক্ষণে আমি তোমাদিগের নিকট তাহা আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিয়া যথোচিত প্রতিবিধান-চেষ্টা করিব।” ধার্ম্মিক ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন অমাত্যগণ মহারাজ জনমেজয় কর্ত্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া কহিলেন, “রাজন্! আপনার পিতা মহাত্মা পরীক্ষিতের যেরূপ চরিত্র ও তিনি যে প্রকারে লোকান্তরে গমন করিয়াছেন, তাহা কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। ধর্ম্মাত্মা প্রবলপরাক্রান্ত রাজা পরীক্ষিৎ মূর্ত্তিমান ধর্ম্মের ন্যায় প্রজাপালনপূর্ব্বক ভগবতী ভূতধাত্রীকে রক্ষা করিতেন। তদীয় অধিকার কালে ব্রাহ্মণ, ক্ষৎত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এই চারিবর্ণ স্ব স্ব ধর্ম্মে অনুরক্ত ছিলেন। তিনি কাহারও দ্বেষ্টা ছিলেন না এবং তাঁহার প্রতিও কেহ বিদ্বেষ করিত না। তিনি প্রজাপতির ন্যায় সর্ব্বভূতে সমদর্শী ছিলেন এবং বিধবা, বিকলাঙ্গ, অনাথ, দীন, দরিদ্রদিগকে ভরণপোষণ করিতেন। তদীয় কলেবর দ্বিতীয় শশধরের ন্যায় লোকের প্রিয়দর্শন ছিল। মহারাজ পরীক্ষিৎ শারদ্বত হইতে ধনুর্ব্বেদ শিক্ষা করেন ও ভূতভাবনা ভগবান্ বাসুদেবের অতি প্রিয়পাত্র ছিলেন। প্রজাগণ সকলেই তাঁহার প্রতি সবিশেষ অনুরক্ত ছিল। কুরুকুল পরিক্ষীণ হইলে আপনার পিতা অভিমন্যুর ঔরসে উত্তরার গর্ভে উৎপন্ন হয়েন; এই নিমিত্ত তাঁহার নাম পরীক্ষিৎ হইয়াছিল। তিনি রাজধর্ম্মে সুনিপুণ, নীতিশাস্ত্রে পারদর্শী, জিতেন্দ্রিয়, মেধাবী এবং ষড়বর্গ-বিজেতা [কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ. মদ ও মাৎসর্য্য-এই ষড়্রিপুজয়ী] ছিলেন। রাজাধিরাজ পরীক্ষিৎ ষষ্টিবর্ষ বয়ঃক্রম পর্য্যন্ত প্রজাপালন করিয়া সংসারলীলা সংবরণ করেন। তদীয় নিধনকালে সকলেই শোকাভিভূত হইয়াছিলেন। তৎপরে আপনি কুলক্রমাগত এই রাজ্যতন্ত্র ধর্ম্মতঃ লাভ করিয়াছেন এবং অতি শৈশবাবস্থাতেই রাজ্যে অভিষিক্ত হইয়া সহস্র বৎসর প্রজাবর্গ শাসন করিয়াছেন।”
জনমেজয় কহিলেন, “মদীয় পূর্ব্বপুরুষদিগের বিচিত্র চরিত্র পর্য্যালোচনা করিয়া দেখিলে বোধ হয়, এই বংশে এমন কোন রাজা ছিলেন না যে, তিনি প্রজাবর্গের প্রিয়কার্য্য-সম্পাদন না করিতেন। অতএব আমার পিতা তথাবিধ রাজা হইয়াও কি প্রকারে বিনাশপ্রাপ্ত হইলেন, তাহা যথাযথরূপে বর্ণনা কর, আমি শ্রবণ করিতে বাসনা করি।” রাজার প্রিয়হিতাভিলাষী মন্ত্রিগণ তদীয় আদেশক্রমে পরীক্ষিতের নিধনবৃত্তান্ত যথাবৎ বর্ণন করিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহারা কহিলেন, “মহারাজ! আপনার পিতা পাণ্ডু রাজার ন্যায় অসাধারণ ধনুর্দ্ধর ও মৃগয়াতৎপর ছিলেন। একদা তিনি আমাদিগের প্রতি সমস্ত সাম্রজ্যের ভারার্পণ করিয়া মৃগয়ার্থ অরণ্যানী প্রবেশপূর্ব্বক শাণিত বাণ দ্বারা একটি মৃগকে বিদ্ধ করিয়াছিলেন; বিদ্ধ করিয়া অস্ত্র-শস্ত্র সহিত অতি সত্বরপদে তাহার অনুসরণে প্রবৃত্ত হইলেন; কিন্তু পলায়িত বাণবিদ্ধ মৃগের কিছুই অনুসন্ধান করিতে পারিলেন না। তৎকালে তিনি ষষ্টিবর্ষ বয়স্ক ও অতি দুর্ব্বল হইয়াছিলেন, এই নিমিত্ত অতি অল্পকালের মধ্যে একান্ত ক্লান্ত ও ক্ষুৎপিপাসায় নিতান্ত আক্রান্ত হইলেন। পরে ইতস্ততঃ পর্য্যটন করিতে করিতে অরণ্যমধ্যে এক মুনিকে দেখিতে পাইলেন। ঐ মুনি মৌনব্রতাবলম্বনপূর্ব্বক একতানমনে ধ্যান করিতেছিলেন। রাজা তাঁহার নিকট প্রত্যুত্তর করিলেন না। রাজা ক্ষুধার্ত্ত ও পিপাসার্ত্ত ছিলেন, সুতরাং তিনি মুনিকে উত্তরদানে পরাঙ্মুখ দেখিয়া তৎক্ষণাৎ ক্রোধাবিষ্ট হইলেন এবং তাঁহাকে প্রতিবোধিত না করিয়া রোষাবেশ প্রকাশপূর্ব্বক ধরাতল হইতে ধনুষ্কোটি [ধনুকের অগ্রভাগ] দ্বারা এক মৃতসর্প উদ্ধৃত করিয়া সেই শুদ্ধচিত্ত মুনিবরের স্কন্ধদেশে নিক্ষেপ করিলেন। তথাপি তিনি কিছুই না বলিয়া অক্ষুব্ধচিত্তে স্কন্ধে মৃতসর্পধারণ পূর্ব্বক পূর্ব্ববৎ অবস্থিত রহিলেন।”

অমাত্যগণ কহিলেন, “মহারাজ! ক্ষুৎপিপাসার্ত্ত রাজা পরীক্ষিৎ এইরূপে সেই মুনির স্কন্ধে মৃতসর্প নিক্ষেপ করিয়া স্বনগরে প্রত্যাগমন করিলেন। উক্ত ঋষির মহাবীর্য্যসম্পন্ন অতি কোপনস্বভাব শৃঙ্গী নামে এক গোগর্ভসমুদ্ভুত পুৎত্র ছিলেন। ঋষিকুমার প্রজাপতির আরাধনানন্তর তদীয় অনুমতি লইয়া ব্রহ্মলোক হইতে ভূলোকে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক সখার সন্নিধানে নিজ পিতার অপমান-বৃত্তান্ত শ্রবণ করিলেন। তাঁহার সখা কহিলেন, ‘বয়স্য! তোমার পিতা একতানমনে ধ্যান করিতেছিলেন, এই অবসরে রাজা পরীক্ষিৎ আসিয়া অকারণে তাঁহার স্কন্ধদেশে এক মৃতসর্প নিক্ষেপপূর্ব্বক প্রস্থান করিয়াছেন।’ মহারাজ! শৃঙ্গী অল্পবয়স্ক হইয়াও প্রাচীনপ্রায় ছিলেন। তিনি সখার মুখে নিজ পিতার এইরূপ অপমান-বৃত্তান্ত শ্রবণ করিবামাত্র ক্রোধে অধীর হইয়া আচমনপূর্ব্বক আপনার পিতাকে এই অভিসম্পাত করিলেন, ‘যে ব্যক্তি নিরপরাধে আমার পিতার স্কন্ধে মৃতসর্প নিক্ষেপ করিয়াছে, দুর্বিবষহবীর্য্যসম্পন্ন [অসহনীয় শক্তিযুক্ত] নাগরাজ তক্ষক আমার বাক্যানুসারে সপ্তাহের মধ্যে সেই পাপাত্মকে ভস্মসাৎ করিবে।’ ঋষিকুমার এই অভিশাপ দিয়া সখাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘বয়স্য! অদ্য আমার তপঃপ্রভাব দেখ।’ পরে শৃঙ্গী পিতার নিকট আগমনপূর্ব্বক স্বদত্ত শাপ-বৃত্তান্ত সমুদয় নিবেদন করিলেন। তখন সেই সদাশয় মুনিবর নিরুপায় ভাবিয়া সুশীল, গুণসম্পন্ন গৌরমুখ-নামক শিষ্যকে এই কথা বলিয়া আপনার পিতার নিকট প্রেরণ করিলেন, ‘আমার পুৎত্র আপনাকে অভিশাপ দিয়াছে, নাগরাজ তক্ষক আসিয়া সপ্তাহের মধ্যে স্বকীয় তেজোদ্বারা আপনাকে দগ্ধ করিবে; অতএব হে মহারাজ! আপনি অদ্যাবধি সাবধান হউক।’ গৌরমুখ রাজগোচরে উপনীত হইয়া বিশ্রামান্তে ঋষিবাক্য আদ্যোপান্ত নিবেদন করিলেন। হে মহারাজ! আপনার পিতা এই ভয়ঙ্কর বাক্য শ্রবণ করিয়া তক্ষকের ভয়ে সতত সাবধানে রহিলেন।
অনন্তর সেই সপ্তম দিবস উপস্থিত হইলে মহর্ষি কাশ্যপ রাজার নিকটে আগমন করিতেছিলেন। ব্রাহ্মণবেশধারী নাগরাজ তক্ষক পথিমধ্যে তাঁহার সন্দর্শন পাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘আপনি এত সত্বরে কোথায় যাইতেছেন এবং কি মনে করিয়াই বা যাইতেছেন?’ মহর্ষি কাশ্যপ কহিলেন, ‘হে দ্বিজ! শুনিলাম, অদ্য নাগরাজ তক্ষক কুরুরাজ পরীক্ষিৎকে দংশন করিবেন, আমি তাঁহাকে আরোগ্য করিব বলিয়া অতি সত্বর তথায় গমন করিতেছি। আমি সম্মুখে থাকিলে তক্ষক তাঁহাকে দগ্ধ করিতে পারিবেন না।’ দ্বিজরূপী তক্ষক কহিলেন, ‘মহর্ষি! আমিই সেই তক্ষক। আমি তাঁহাকে দংশন করিলে তুমি কিছুতেই প্রতীকার করিতে পারিবে না। বৃথা কেন কর্ম্মভোগ করিবে? তুমি আমার অদ্ভুত বীর্য্য দেখ।’ এই বলিয়া নাগরাজ পুরোবর্ত্তী এক বটবৃক্ষে দংশন করিলেন। বনস্পতি দংশনমাত্রেই ভস্মবশেষ হইল; মহর্ষিও বিদ্যাবলে তৎক্ষণাৎ তাহাকে পুনর্জ্জীবিত করিলেন। তখন তক্ষক বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া কহিলেন, ‘ঋষে! তুমি কি অভিলাষে তথায় গমন করিতেছ?’ এই বলিয়া তাঁহাকে নানা প্রকার প্রলোভন দেখাইতে লাগিলেন। কাশ্যপ প্রত্যুত্তর করিলেন, ‘আমি ধনলাভের প্রত্যাশায় তথায় গমন করিতেছি।’ তক্ষক কহিলেন, ‘রাজার নিকট যত ধনের আকাঙ্ক্ষায় যাইতেছ, আমি তদপেক্ষা অধিক দিতেছি, তুমি নিবৃত্ত হও।’ তদীয় এতাদৃশ প্রমোদকর-বাক্য শ্রবণ করিয়া কাশ্যপ আপনার অভিলাষানুরূপ অর্থ গ্রহণপূর্ব্বক প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। ব্রাহ্মণ নিবৃত্ত হইলে তক্ষক ছদ্মবেশে প্রবেশ করিয়া স্বীয় দুঃসহ বিষবহ্নি দ্বারা প্রাসাদোপবিষ্ট ধার্ম্মিকবর ত্বদীয় পিতাকে ভস্মাবশেষ করিলেন। তৎপরে আপনি পিতৃরাজ্যে অভিষিক্ত হইয়াছেন। মহারাজ! এই নিদারুণ বৃত্তান্ত আমরা যেরূপ দর্শন ও শ্রবণ করিতেছি, তাহা আদ্যোপান্ত সমুদয় নিবেদন করিলাম; এক্ষণে আপনার পিতার ও মহর্ষি উতঙ্কের পরাভব বিবেচনা করিয়া যাহা সমুচিত হয়, অবিলম্বে সম্পাদন করুন।”
রাজা জনমেজয় পিতার লোকান্তরগমনবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘হে অমাত্যগণ! তক্ষক যে বটবৃক্ষকে ভস্মসাৎ করিয়াছিল, কশ্যপ তাহাকে পুনর্জ্জীবিত করেন, এই অদ্ভুত কথা তোমরা কাহার নিকট শুনিয়াছিলে? বোধ হয়, পন্নগাধম তক্ষক মনে মনে এই বিবেচনা করিয়াছিল যে, আমি রাজাকে দংশন করিলে কাশ্যপ মন্ত্রবলে তাঁহার প্রাণরক্ষা করিতে পারিবেন সংশয় নাই; সুতরাং আমাকে সর্ব্বলোকের উপহাসাম্পদ হইতে হইবে, অতএব এই ব্রাহ্মণকে পরিতুষ্ট করিয়া প্রতিনিবৃত্ত করাই শ্রেয়ঃকল্প। সে যাহা হউক, এক্ষণে আমি এক উপায় অবধারণ করিয়াছি, তদ্দ্বারা তাহাকে সমুচিত প্রতিফল প্রদান করিব। কিন্তু বল দেখি, কাশ্যপ ও তক্ষকে এই অদ্ভুত বৃত্তান্ত নির্জ্জন অরণ্যমধ্যে ঘটিয়াছিল, ইহা কে প্রত্যক্ষ করিয়াছে এবং কি প্রকারেই বা তোমাদিগের কর্ণগোচর হইল? আমি এই সমস্ত বিষয় উত্তমরূপে জানিয়া সর্পকুল সংহার করিব।”
মন্ত্রিগণ কহিলেন, “মহারাজ! আমরা তক্ষক ও কাশ্যপের এই অদ্ভুত বৃত্তান্ত যাঁহার নিকট শুনিয়াছিলাম, শ্রবণ করুন। এক ব্রাহ্মণ শুষ্ক কাষ্ঠ আহরণ করিবার নিমিত্ত সেই বটবৃক্ষে আরোহণ করিয়াছিলেন। তক্ষক ও কাশ্যপ উভয়েই তাহা জানিতে পারেন নাই। তক্ষকের বিষানলে বৃক্ষের সহিত ঐ ব্রাহ্মণের কলেবরও ভস্মাবশেষ হয়; কিন্তু কাশ্যপের অলৌকিক মন্ত্রবলে উভয়েই পুনরুজ্জীবিত হইয়াছিল। পরে সেই ব্রাহ্মণ আসিয়া আমাদিগকে এই সংবাদ প্রদান করেন। মহারাজ! যে দেখিয়াছে ও আমরা যেরূপ শুনিয়াছি, তাহা নিবেদন করিলাম, এক্ষণে যাহা কর্ত্তব্য হয়, করুন।”
তাহা শ্রবণ করিয়া রাজা জনমেজয় অতিশয় সন্তপ্ত হইলেন এবং রোষভরে করে করে পরিপেষণ [এক হস্তে অপর হস্তের ঘর্ষণ] করিতে লাগিলেন। অনন্তর দীর্ঘ ও উষ্ণ নিশ্বাস ত্যাগ এবং অশ্রুমোচনপূর্ব্বক কিয়ৎক্ষণ মৌনাবলম্বনে থাকিয়া মন্ত্রীদিগকে কহিলেন, “হে অমাত্যগণ! পিতার পরাভববৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া যাহা অবধারণ করিলাম, বলিতেছি, শ্রবণ কর। দুরাত্মা তক্ষক শৃঙ্গীকে উপলক্ষ্যমাত্র করিয়া পিতার প্রাণহিংসা করিয়াছে। এক্ষণে তাহার সমুচিত প্রতিফল দিতে হইবে। যদি কাশ্যপ আসিতেন, তাহা হইলে পিতা অবশ্যই জীবিত থাকিতেন, কিন্তু তক্ষক এরূপ দুরাত্মা যে, তাঁহাকে অর্থ দিয়া প্রতিনিবৃত্ত করিয়াছে। যদি পিতা কাশ্যপের প্রসাদে ও মন্ত্রীদিগের মন্ত্রণাবলে জীবনলাভ করিতেন, তাহাতে তক্ষকের কি ক্ষতি হইত? তাহার এ অত্যাচার আর কিছুতেই সহ্য হয় না। অতএব এক্ষণে আমি আমার আপনার, তোমাদিগের ও উতঙ্কের সন্তোষের নিমিত্ত পিতার বৈরনির্য্যাতনে দৃঢ়নিশ্চয় করিলাম।”

সর্পযজ্ঞারম্ভ
তদনন্তর বিধানানুসারে সর্পসত্র আরব্ধ হইল। পুরোহিতগণ স্ব স্ব কর্ম্মে নিযুক্ত হইয়া কৃষ্ণবর্ণ বসন-যুগল পরিধান ও মন্ত্রোচ্চারণ পূর্ব্বক বহ্নিতে আহুতি প্রদান করিতে লাগিলেন। অনবরত ধূম সম্পর্কে তাঁহাদিগের চক্ষু রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল। সর্পগণের নামোল্লেখপূর্ব্বক আহুতি দিতে আরম্ভ করিলে, তাহাদিগের হৃৎকম্প উপস্থিত হইল। পরে নাগগণ নিতান্ত ব্যাকুল ও একান্ত অস্থির হইয়া ঘন ঘন নিশ্বাস পরিত্যাগ এবং পরস্পর মস্তক ও লাঙ্গুল দ্বারা বেষ্টন করিয়া করুণস্বরে পরস্পরকে আহ্বান করিতে করিতে সেই প্রদীপ্ত হুতাশনে অনবরত পতিত হইতে লাগিল। শ্বেতবর্ণ, নীলবর্ণ, কৃষ্ণবর্ণ, বালক, বৃদ্ধ, যুবা, ক্রোশপ্রমাণ, যোজন [চারি ক্রোশ] প্রমাণ, অশ্বাকার, করিশুণ্ডাকার, মহাকায়, মহাবলপরাক্রান্ত শত শত, সহস্র সহস্র, প্রযুত প্রযুত, অর্ব্বুদ বহুবিধ মহাবিষ বিষধরগণ মাতৃশাপদোষে অবশ হইয়া সেই প্রজ্বলিত হুতবহ [অগ্নি] মুখে পতিত হইতে লাগিল।

যজ্ঞে বৃতিগণের নাম
শৌনক জিজ্ঞাসা করিলেন, হে সূতাত্মজ! সর্পকুল-সংহর্ত্তা কুরুবংশাবতংস রাজা জনমেজয়ের সেই সর্পসত্রে কোন্ কোন্ ঋষি ঋত্বিক্ হইয়াছিলেন এবং নাগগণের বিষাদজনক সেই দারুণ যজ্ঞে কোন্ কোন্ ঋষিই বা সদস্য হইয়াছিলেন? হে বৎস! তুমি তৎসমুদয় বর্ণন কর। তাহা হইলে আমি সর্পসত্র-বিধানজ্ঞ মহর্ষিগণের নাম জানিতে পারিব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, রাজা জনমেজয়ের যজ্ঞে যে-সকল মনীর্ষিগণ ঋত্বিক্ ও সদস্য ছিলেন, তাঁহাদিগের নাম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। অসাধারণ বেদবেত্তা চ্যবনবংশীয় সুবিখ্যাত চণ্ডভার্গব সেই মহাযজ্ঞে হোতাজ্ঞ ছিলেন। বৃদ্ধ সুবিদ্বান্ কৌৎস উদ্গাতা এবং জৈমিনি ব্রহ্মা ছিলেন। আর পিঙ্গল, অসিত, দেবল, নারদ, পর্ব্বত, আত্রেয়, কুণ্ডজঠর, কালঘট, বাৎস্য, শ্রুতশ্রবাঃ, কোহল, দেবশর্ম্মা, মৌদ্গল্য, সমসৌরভ প্রভৃতি অনেক বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ-সকল তাহাতে সদস্য হইয়াছিলেন। ইঁহারা সকলে সেই সুমহান্ সর্পসত্রে আহুতি প্রদান করিতে আরম্ভ করিলে, অতি ভীষণাকার সর্প-সকল প্রজ্বলিত হোমানলে পতিত ও বিনষ্ট হইতে লাগিল। তাহাদিগের বসা ও মেদোদ্বারা শত শত কৃত্রিমসরিৎ প্রবাহিত হইল এবং পূতিগন্ধে চারিদিক ব্যাপ্ত হইয়া উঠিল। অনলে পতিত ও পতনোন্মুখ গগনস্থ নাগগণের তুমুল আর্ত্তনাদে সেই প্রদেশ প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। নাগেন্দ্র তক্ষক রাজা জনমেজয়কে সত্রে দীক্ষিত শুনিয়া তৎক্ষণাৎ ইন্দ্রালয়ে গমন করিল এবং আত্মদোষের পরিচয় দিয়া পুরন্দরের শরণাগত হইল। দেবরাজ প্রসন্ন হইয়া তক্ষককে কহিলেন, “নাগেন্দ্র! তুমি ভীত হইও না, আমি তোমার নিমিত্ত পূর্ব্বেই পিতামহকে প্রসন্ন করিয়াছি; অতএব আর তোমার ভয়ের বিষয় কি? মনোদুঃখ দূর কর।”
উগ্রশ্রবাঃ শৌনককে কহিলেন, হে ব্রহ্মণ্! নাগেন্দ্র এইরূপে আশ্বাসিত হইয়া ইন্দ্রালয়ে পরমসুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন। এদিকে সর্পকুল ক্রমে ক্রমে ভস্মাবশিষ্ট হইতেছে দেখিয়া, স্বজনহিতৈষী বাসুকি বন্ধুবান্ধবগণের বিরহে সাতিশয় কাতর, উদ্ভ্রান্তচিত্ত ও ক্ষণে ক্ষণে মূর্চ্ছিত হইতে লাগিলেন। অনন্তর নাগরাজ পরিবারবর্গের অত্যল্পমাত্র অবশিষ্ট আছে দেখিয়া নিজ ভগিনীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “ভদ্রে! আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ-সকল শোকানলে দগ্ধ হইতেছে, শরীর অবসন্ন ও দশদিক্ শূন্য বোধ হইতেছে, মন ও নয়ন নিতান্ত উদ্ভ্রান্ত হইতেছে এবং হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে। অধিক কি কহিব, বোধ হয়, বুঝি অদ্যই আমাকে সেই প্রদীপ্ত-দহনে দেহ সমর্পণ করিতে হইল। রাজা জনমেজয় আমাদিগকে সবংশে ধ্বংস করিবার নিমিত্তই সর্পসত্র আরম্ভ করিয়াছেন, সুতরাং আমাকেও যমসদনে গমন করিতে হইবে, সন্দেহ নাই। হে ভগিনী! আমি যে অভিপ্রায়ে তোমাকে জরৎকারুহস্তে প্রদান করিয়াছিলাম, এক্ষণে তাহার সময় উপস্থিত, অতএব আমাদিগের প্রাণরক্ষা করিয়া সেই চিরাকাঙ্ক্ষিত মনোরথ পরিপূর্ণ কর। পূর্ব্বে পিতামহের মুখে শ্রবণ করিয়াছি, আস্তীক জনমেজয়ের সর্পসত্র নিবারণ করিবেন। অতএব হে বৎস! অধুনা তুমি আমার ও আমার পরিজনবর্গের জীবনরক্ষার্থ অদ্বিতীয় বেদবেত্তা আপন পুৎত্রকে আদেশ কর।”

আস্তীকের প্রতি মাতার আদেশ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, তদনন্তর নাগরাজভগিনী জরৎকারু স্বীয় সন্তান আস্তীককে আহবান করিয়া বাসুকির বাক্যানুসারে কহিলেন, “পুৎত্র! আমার ভ্রাতা যে অভিপ্রায়ে আমাকে তোমার পিতৃহস্তে প্রদান করিয়াছিলেন, এক্ষণে তাহার সময় উপস্থিত হইয়াছে, অতএব যাহা কর্ত্তব্য হয়, কর।” আস্তীক কহিলেন, “মাতঃ! মাতুল কি নিমিত্ত আপনাকে মদীয় পিতার হস্তে প্রতিপাদন [সৎকারপূর্ব্বক প্রদান] করিয়াছিলেন, আজ্ঞা করুন, জানিয়া প্রতিবিধান করিতেছি।” তখন বান্ধবহিতৈষিণী নাগভগিনী কহিলেন, “বৎস! শ্রবণ কর। সর্প-কুলজননী কদ্রু সপত্নী বিনতাকে পণে পরাস্ত করিয়া দাসীত্ব শৃঙ্খলে বদ্ধ করিবেন, এই অভিসন্ধিতে আপন পুৎত্রদিগকে আদেশ করেন, “তোমরা সত্বর যাইয়া উচ্চৈঃশ্রবা অশ্বের অঙ্গবেষ্টন করিয়া থাক, তাহা হইলে অশ্বাধিপের শুভ্রবর্ণ তিরোহিত হইয়া কৃষ্ণবর্ণ হইবে।” কিন্তু তন্মধ্যে কেহ কেহ মাতৃ-আজ্ঞায় অসম্মতি প্রকাশ করাতে কদ্রু ক্রোধভরে তাহাদিগকে এই বলিয়া অভিসম্পাত করিলেন, “তোমরা আমার আজ্ঞা-লঙ্ঘন করিলে, অতএব এই অপরাধে রাজা জনমেজয়ের সর্পসত্রে দগ্ধ ও পঞ্চত্ব-প্রাপ্ত হইবে।” সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মাও ‘তথাস্তু’ বলিয়া সেই শাপবাক্য অনুমোদন করিলেন। নাগরাজ বাসুকি প্রজাপতির সেই অনুমোদন বাক্য শ্রবণ করিয়াছিলেন। অনন্তর তিনি সমুদ্রমন্থনকালে ক্ষমা প্রার্থনা-বাসনায় দেবগণের শরণাগত হইলেন। দেবগণ দুর্লভ অমৃতলাভে হৃষ্টচিত্ত হইয়া আমার ভ্রাতাকে সঙ্গে লইয়া ব্রহ্মার নিকট উপস্থিত হইলেন এবং নানা প্রকার স্তুতিবাক্যে কমলযোনিকে প্রসন্ন করিয়া কহিলেন, “ভগবন্! ইনি নাগরাজ বাসুকি, ইনি জ্ঞাতিবর্গের নিমিত্ত অত্যন্ত কাতর হইয়াছেন; এক্ষণে কিরূপে মাতৃশাপ হইতে মুক্ত হইতে পারেন, আজ্ঞা করুন।”
জনমেজয়ের যজ্ঞে আস্তীকের আগমন
ব্রহ্মা কহিলেন, ‘জরৎকারু মুনি জরৎকারুনাম্নী যে স্ত্রীর পাণিগ্রহণ করিবেন, তাঁহার গর্ভে এক সন্তান উৎপন্ন হইবেন, তিনিই সর্পগণকে মাতৃশাপ হইতে মোচন করিবেন।’ নাগরাজ বাসুকি এই কথা শ্রবণ করিয়া সর্পসত্র আরম্ভের কিয়ৎকাল পূর্ব্বে আমাকে তোমার পিতার হস্তে সম্প্রদান করেন। হে বৎস! তাহাতেই তুমি আমার গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছ। অধুনা সেই অভীষ্টসিদ্ধির সময় উপস্থিত হইয়াছে, অতএব আসন্ন বিপদ্ হইতে মাতুলকুলের পরিত্রাণ করিয়া নাগরাজের আশালতা ফলবতী কর।’
আস্তীক ‘যে আজ্ঞা’ বলিয়া জননীর আদেশ গ্রহণ করিলেন এবং নানা প্রকার প্রবোধবাক্যে বাসুকিকে আশ্বাসিত করিয়া কহিলেন, ‘হে ভুজঙ্গেশ্বর! আমি নিশ্চয় বলিতেছি, তোমার শাপমোচন করিব এবং যাহাতে তোমার মঙ্গল হয়, তদ্বিষয়ে সর্ব্বতোভাবে যত্ন করিব। আর ভীত বা দুঃখিত হইবার প্রয়োজন নাই। আমি ভ্রমক্রমেও কদাপি মিথ্যা প্রয়োগ করি না। হে মাতুল! আমি অদ্যই সেই দীক্ষিত রাজা জনমেজয়ের নিকট গমন করিয়া আশীর্ব্বাদাদি দ্বারা তাঁহাকে পরিতুষ্ট করিব এবং যাহাতে যজ্ঞানুষ্ঠান রহিত হয়, তাহা করিব। আপনি আমার বাক্যে কিছুমাত্র সংশয় করিবেন না, নিশ্চিন্ত থাকুন।’
বাসুকি কহিলেন, ‘বৎস আস্তীক! আমি ব্রহ্মার এই গুরুতর দণ্ডের ভয়ে হতজ্ঞান হইয়াছি, দশদিক্ শূন্য দেখিতেছি এবং আমার চিত্ত উদ্বেগচঞ্চল হইতেছে।’ তখন আস্তীক কহিলেন, “আপনি সন্তাপ পরিত্যাগ করুন, আমি নিশ্চয় বলিতেছি, অচিরাৎ সেই প্রচণ্ড ব্রহ্মদণ্ডের নিরাকরণ করিব।” আস্তীক এইরূপ আশ্বাস বচনে বাসুকির মনোদুঃখ দূর করিয়া স্বয়ং সমস্ত ভারগ্রহণপূর্ব্বক সর্পগণের পরিত্রাণার্থ রাজা জনমেজয়ের সেই সর্ব্বাবয়বসম্পন্ন যজ্ঞে উপনীত হইলেন। তিনি তথায় যাইয়া দেখিলেন, তপোধন তদ্দর্শনে প্রীত হইয়া সেই স্থানে প্রবেশ করিতে বাসনা করিলেন। দ্বারপালগণ প্রবেশ করিতে না দেওয়াতে তিনি সেই যজ্ঞের নানা প্রকার গুণকীর্ত্তন করিতে লাগিলেন। অনন্তর যজ্ঞভূমিতে উপনীত হইয়া তাহার চতুষ্পার্শ্ববর্ত্তী সূর্য্যসদৃশ ঋত্বিক্ ও সদস্যগণের এবং রাজার ও হোমাগ্নির স্তব করিতে লাগিলেন।

আস্তীক কর্ত্তৃক জনমেজয়ের গুণকীর্ত্তন
আস্তীক কহিলেন, “হে ভারতবংশাবতংস! চন্দ্র, বরুণ ও প্রজাপতি প্রয়াগে যে প্রকার যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়াছিলেন, আপনার এই মহাযজ্ঞও তদ্রূপ সর্ব্বাঙ্গসুন্দর হইয়াছে; কিন্তু হে পরীক্ষিতাত্মজ! আমি প্রার্থনা করি, আমার বন্ধুবর্গের মঙ্গল হউক। দেবরাজ ইন্দ্র একশত অশ্বমেধ যজ্ঞ করিয়াছেন, আপনার এই সর্পসত্র তত্তুল্য এক অযুত অশ্বমেধের সদৃশ; কিন্তু হে পরীক্ষিতাত্মজ! আমি প্রার্থনা করি, আমার বন্ধুবর্গের মঙ্গল হউক। যম, হরিমেধাঃ ও রন্তিদেব রাজার যজ্ঞ যেরূপ হইয়াছিল, আপনার এই যজ্ঞও তদ্রূপ হইয়াছে; কিন্তু হে পরীক্ষিতাত্মজ! আমি প্রার্থনা করি, আমার বন্ধুবর্গের মঙ্গল হউক। গয় রাজা, শশবিন্দু রাজা, বৈশ্রবণ [কুবের], নৃগ রাজা, আজমীঢ় রাজা এবং রাম রাজা যেরূপ যজ্ঞ করিয়াছিলেন, আপনার এই যজ্ঞও তৎসদৃশ হইয়াছে, কিন্তু হে পরীক্ষিতাত্মজ! আমি প্রার্থনা করি, আমার বন্ধুবর্গের মঙ্গল হউক। ধর্ম্মপুৎত্র যুধিষ্ঠির ও আজমীঢ় রাজার যজ্ঞ অতি সুপ্রসিদ্ধ, আপনার এই যজ্ঞ তদপেক্ষা ন্যূন নহে; কিন্তু হে পরীক্ষিতাত্মজ! আমি প্রার্থনা করি, আমার বন্ধুবর্গের মঙ্গল হউক। সত্যবতীর পুৎত্র ব্যাসদেব এক মহাসত্র করিয়াছিলেন, সেই সত্রে তিনি স্বয়ং ঋত্বিকের কর্ম্ম করেন, আপনার এই সর্পসত্রও তদনুরূপ হইয়াছে; কিন্তু হে পরীক্ষিতাত্মজ! আমি প্রার্থনা করি, আমার বন্ধুবর্গের মঙ্গল হউক।
আপনার যজ্ঞানুষ্ঠাতা এইসকল সূর্য্যসমতেজা মহর্ষিগণ ইন্দ্রের যজ্ঞানুষ্ঠানকর্ত্তাদিগের সদৃশ; ইঁহাদিগের জ্ঞানের ইয়ত্তা করা অতি দুষ্কর, ইঁহাদিগকে দান করিলে অক্ষয় হয়। আপনার এই ঋত্বিকের কথা অধিক কি বলিব, ব্যাসদেব কহিয়াছেন, ইঁহার সমান লোক ত্রিলোকে লক্ষ্য হয় না, ইঁহারই শিষ্যোপশিষ্যগণ স্বধর্ম্মে নিরত হইয়া এই ভূমণ্ডল ব্যাপিয়া আছেন। আপনার এই প্রজ্বলিত হোমাগ্নি দক্ষিণাবর্ত্ত শিখা দ্বারা দেবোদ্দেশে প্রদত্ত হব্য গ্রহণ করিতেছেন। মহারাজ! আপনার সমান প্রজ্ঞাপালনকর্ত্তা ভূপাল অতি বিরল। আপনি সাক্ষাৎ ধর্ম্মরাজ, বরুণ ও ভাগবান্ বজ্রপাণির [ইন্দ্রেয়] ন্যায় এই ভূমণ্ডল রক্ষা করিতেছেন। আর আপনার বিষয়-নিস্পৃহতা দেখিয়া আমি যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইয়াছি। আপনি খট্বাঙ্গ, নাভাগ, দিলীপ,,যযাতি, মান্ধাতা ও ভীষ্ম প্রভৃতি রাজেন্দ্রগণের সদৃশ; মহর্ষি বাল্মীকির ন্যায় নিগূঢ়-মহত্ত্ব, বশিষ্ঠের ন্যায় জিতক্রোধ, ইন্দ্রের ন্যায় প্রভুত্বশালী, নারায়ণের ন্যায় কান্তি সম্পন্ন, ঔর্ব্ব ত্রিত দুই ঋষির ন্যায় তেজস্বী, যমের ন্যায় ধর্ম্মনিয়ন্তা এবং কৃষ্ণের ন্যায় সর্ব্বগুণালঙ্কৃত। আপনি যেমন অতুল ঐশ্বর্য্যের অধিপতি, তদ্রূপ যাগাদি সৎক্রিয়ার পথপ্রদর্শক। মহারাজ! অধিক কি বলিব, ধৈর্য্য, বীর্য্য, গাম্ভীর্য্য প্রভৃতি যে-সকল সদ্গুণ প্রভাবে লোকে খ্যাতি ও প্রতিপত্তি লাভ করিতে পারে এবং রামাদির ন্যায় চিরস্মরণীয় হইতে পারে, আপনি সেই সমস্ত গুণরাশিতে বিভূষিত হইয়াছেন।” আস্তীক এইরূপ স্তুতিবাক্য দ্বারা নৃপতি, সদস্য, ঋত্বিক ও হব্যবাহ [অগ্নি] প্রভৃতি সকলকেই প্রসন্ন করিলেন। অনন্তর রাজা জনমেজয় আকার ও ইঙ্গিত দ্বারা তাঁহাদিগের সকলের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া কহিতে লাগিলেন।

নাগকুলরক্ষার্থ বরপ্রার্থনা
জনমেজয় কহিলেন, “ইনি বালক, কিন্তু ইঁহার যেরূপ অভিজ্ঞতা দেখিতেছি, তাহাতে বালক বলিয়া কোনক্রমে প্রতীতি হয় না। যাহা হউক, আমি ইঁহার অভিলষিত বর প্রদান করিতে ইচ্ছা করি, হে দ্বিজগণ! আপনাদিগের কি অনুমতি হয়?’ সদস্যগণ কহিলেন, ‘মহারাজ! ব্রাহ্মণ বালক হইলেও রাজাদিগের পূজনীয়, সন্দেহ নাই। বিশেষতঃ ইনি সর্ব্বশাস্ত্রে মহামহোপাঁধ্যায়, অতএব তক্ষক ব্যতিরেকে আর যাহা প্রার্থনা করিবেন, তাহাই পাইতে পারেন।” অনন্তর রাজা ব্রাহ্মণকে বর-প্রদান করিতে উদ্যত হইলে হোতা কিঞ্চিৎ অসন্তোষ প্রকাশপূর্ব্বক তাঁহাকে কহিলেন, “মহারাজ! তক্ষক অদ্যাপিও এই যজ্ঞাঙ্গনে উপস্থিত হইল না।” তখন জনমেজয় কহিলেন, “যাহাতে আমার ক্রিয়া সুসম্পন্ন হয় এবং সেই বিষম শত্রু তক্ষক শীঘ্র সমুপস্থিত হয়, তদ্বিষয়ে আপনারা যথাসাধ্য যত্নবান হউন।” ঋত্বিক্গণ উত্তর কহিলেন, “আমরা শাস্ত্রপ্রভাবে ও অগ্নির মাহাত্ম্যে জানিতে পারিয়াছি, তক্ষক ইন্দ্রের শরণাগত হইয়া তথায় অবস্থিতি করিতেছে।” পৌরাণিক মহাত্মা লোহিতাক্ষ সূতও এই কথা কহিয়াছিলেন। রাজা তৎশ্রবণে সূতকে জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি কহিলেন, “রাজন্! ঋত্বিকেরা যাহা কহিতেছেন, তদ্বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। আমি পুরাণে অবগত হইয়াছি যে, তক্ষক প্রাণভয়ে ভীত হইয়া দেবরাজের শরণাগত হইয়াছে। সুররাজ এই বলিয়া তাহাকে অভয় প্রদান করিয়াছেন, “তুমি অতি গোপনে আমার ভবনে বাস কর, অগ্নি তোমাকে দগ্ধ করিতে পারিবেন না”। রাজা সূতবাক্য-শ্রবণে অত্যন্ত বিষণ্ণ হইয়া হোতাকে নিবেদন করিলেন, “মহাশয়! আপনি ইন্দ্রের আরাধনা করুন।” হোতা তদনুসারে দেবরাজের আরাধনা আরম্ভ করিলে, অমরেন্দ্র বিমানে আরোহণ করিয়া তৎক্ষণাৎ অমরনগরী হইতে যাত্রা করিলেন। চতুর্দ্দিকে দেবতারা স্তুতিপাঠ করিতে লাগিলেন। মেঘমালা, বিদ্যাধরগণ ও অপ্সরাগণ তাঁহার অনুগমন করিল। তক্ষক প্রাণভয়ে ভীত ও সঙ্কুচিত হইয়া দেবরাজের উত্তরীয়বস্ত্রে লুক্কায়িত হইল। এদিকে রাজা ক্রুদ্ধ হইয়া আজ্ঞা করিলেন, “যদি সেই দুরাত্মা তক্ষক ইন্দ্রের নিকট পলায়ন করিয়া লুক্কায়িত থাকে, তবে ইন্দ্রের সহিত তাহাকে অগ্নিসাৎ কর।” হোতা রাজাজ্ঞা পাইয়া তক্ষককে উল্লেখ করিয়া অগ্নিতে আহুতি প্রদান করিবামাত্র নাগেন্দ্র কম্পিত-কলেবর হইয়া ইন্দ্র সমভিব্যাহারে আকাশ-পথে উপস্থিত হইলেন। ইন্দ্র সেই যজ্ঞের আড়ম্বর দর্শনে ভীত হইয়া তক্ষককে পরিত্যাগপূর্ব্বক স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। তখন ভয়বিহ্বল তক্ষক ঋত্বিকগণের মন্ত্রপ্রভাবে অবশেন্দ্রিয় হইয়া ক্রমে ক্রমে প্রজ্বলিত পাবক-শিখার সমীপবর্ত্তী হইল।
ঋত্বিকেরা তক্ষককে সমাগত দেখিয়া কহিলেন, “মহারাজ! আর চিন্তা নাই, তক্ষক আপনার বশংবদ হইয়াছে। বোধ হয়, ইন্দ্র উহাকে পরিত্যাগ করিয়াছেন। ঐ দেখুন, সেই পন্নগেন্দ্র আমাদিগের মন্ত্রপ্রভাবে বিকলেন্দ্রিয় ও বিচেতনপ্রায় হইয়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে আর্ত্তনাদ করিতে করিতে ঘুর্ণিতকলেবরে স্বর্গ হইতে আকাশপথে আগমন করিতেছে। অতএব আপনার অভীষ্টসিদ্ধির আর বিলম্ব নাই। এক্ষণে দ্বিজবরে বর প্রদান করুন।” রাজা প্রসন্ন হইয়া কহিলেন, “হে ব্রাহ্মণকুমার! অভিলষিত বর প্রার্থনা কর। প্রার্থিত বিষয় অদেয় হইলেও আমি তাহাতে পরাঙ্মুখ হইব না।”
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! তক্ষকের অনলে পতিত হইবার অব্যবহিতপূর্ব্বেই আস্তীক কহিলেন, “হে নরেন্দ্র! যদ্যপি আমাকে বর প্রদান করেন, তবে এই বর দিন যে, আপনার এই যজ্ঞ নিবৃত্ত হউক এবং ইহাতে যেন আর সর্পেরা দগ্ধ না হয়।” ইহা শ্রবণ করিয়া রাজা জনমেজয় অনতিহৃষ্টমনে প্রত্যুত্তর করিলেন, “আপনি সুবর্ণ, রজত, গো প্রভৃতি যে-কোন বস্ত্র প্রার্থনা করিলেন, আমি অবিলম্বে প্রদান করিতেছি, কিন্তু যজ্ঞানুষ্ঠানে নিবৃত্ত হইতে পারিব না।” আস্তীক কহিলেন, “মহারাজ! আমি সুবর্ণ, রজত, গো-অশ্বাদির নিমিত্ত আপনার নিকট আসি নাই! মাতুলকুলের হিতার্থে আপনার নিকট অর্থিভাবে [যাচক] আসিয়াছি। অতএব যদি সেই অভিলষিত অর্থসাধনে কৃতকার্য্য হইতে না পারিলাম, তবে রজতসুবর্ণাদি লইয়া কি করিব?” আস্তীকের এইরূপ অতর্কিতচর [অচিন্তিতপূর্ব্ব—অভাবনীয়] বর-প্রার্থনায় রাজা বিষাদসাগরে নিমগ্ন হইলেন এবং বরান্তর দিবার নিমিত্ত পুনঃ পুনঃ অনুরোধ করিতে লাগিলেন; কিন্তু তাঁহাকে ব্যবসায় [সঙ্কল্প] হইতে বিচলিত করিতে পারিলেন না। তদনন্তর বেদজ্ঞ সদস্যেরা একবাক্যে কহিলেন, “মহারাজ! পূর্ব্বে অঙ্গীকার করিয়াছেন, অতএব বর প্রদান করা আপনার সর্ব্বতোভাবে কর্ত্তব্য।”

যজ্ঞাগ্নিদগ্ধ নাগগণের নাম
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! যে-সকল সর্প সর্পসত্রে দগ্ধ হইয়াছে, তাহাদিগের নামোল্লেখ কর, আমি শুনিতে অভিলাষ করি। উগ্রশ্রবাঃ উত্তর কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম! সেই যজ্ঞে সহস্র সহস্র, প্রষুত প্রষুত, অর্ব্বুদ অর্ব্বুদ সর্পগণ বিনষ্ট হইয়াছে। বাহুল্যপ্রযুক্ত সকলের নামোল্লেখ করা অসাধ্য বোধ হইতেছে। তথাপি স্মৃতি অনুসারে কতিপয় বিষোল্বণ [অচিন্তিতপূর্ব—অভাবনীয়] প্রধান প্রধান সর্পের নাম করিতেছি, শ্রবণ করুন। পূর্ণ, শল, পাল, হলীমক, পিচ্ছল, কৌণপ, চক্র, কালবেগ, প্রকালন, হিরণ্যবাহু, শরণ, কক্ষক, কালদন্তক, ইহারা বাসুকির পুৎত্র; এই সকল সর্প এবং বাসুকির কুলজাত মহাবল-পরাক্রান্ত সহস্র সহস্র ভয়ঙ্কর সর্প মাতৃশাপে দগ্ধ হইয়াছে। পুচ্ছাণ্ডুক, মণ্ডলক, পিণ্ডসেক্তা, রভেণক, উচ্ছিখ, শরভ, ভঙ্গ, বিল্বতেজাঃ বিরোহণ, শিলী, শলকর, মূক, সুকুমার, প্রবেপন, মুদ্গর্, শিশুরোমা, সুরোমা, মহাহনু, ইহারা তক্ষকের বংশজাত; এই সকল বিষধর প্রদীপ্ত-দহনে দগ্ধ হইয়াছে। পারাবত, পারিজাত, পাণ্ডুর, হরিণ, কৃষ, বিহঙ্গ, শরভ, মেদ, প্রমোদ, সংহতাপন, ইহারা ঐরাবতকুলে জাত; এই সমস্ত নাগগণ অনলে প্রবেশ করিয়াছে। এরক, কুণ্ডল, বের্ণী, বেণীস্কন্ধ, কুমারক, বাহুক, শৃঙ্গবের, ধুর্ত্তক, প্রাতরাতক, কৌরবকুলাৎপন্ন এই সকল সর্প ভস্মসাৎ হইয়াছে। শঙ্কুবর্ণ, পিঠরক, কূঠার, মুখসেচক, পূর্ণাঙ্গদ, পূর্ণমুখ, প্রহাস, শকুনি, দরি, অমাহঠ, কামঠক, সুষেণ, মানস, ব্যয়, ভৈরব, মুণ্ডবেদাঙ্গ, পিশঙ্গ, উদ্রপারক, ঋষভ, পিণ্ডাকর, রক্তাঙ্গ, সর্ব্বসারঙ্গ, সমৃদ্ধ, পঠবাসক, বরাহক, বীরণক, সুচিত্র, চিত্রবেগিক, পরাশর, তরুণক, মণিস্কন্ধ, অরুণি, ধৃতরাষ্ট্রকুলজাত এই সকল নাগগণ ভস্মীভূত হইয়াছে। বাহুল্য প্রযুক্ত ইহাদিগের পুৎত্র-পৌৎত্রের নাম করিতে পারিলাম না। এতদ্ব্যতিরিক্ত ত্রিশিরাঃ, সপ্তশিরাঃ, দশমুণ্ড, মহাবেগবান্, পর্ব্বতাকার যোজনবিস্তীর্ণ দ্বিযোজনবিস্তীর্ণ কামবল কামরূপী অতি ভয়ঙ্কর নানাপ্রকার মহাবিষ বিষধরগণ প্রজাপতির শাপদণ্ডে নিপীড়িত হইয়া অনবরত প্রদীপ্ত-দহনে দেহত্যাগ করিয়াছে।

সর্পযজ্ঞের উপসংহার
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! অধুনা আস্তীকের আর এক অত্যদ্ভুত উপাখ্যান শ্রবণ করুন। দেবরাজ-হস্ত হইতে ভ্রষ্ট নাগরাজ তক্ষক অতিমাত্র ভীত হইয়া প্রজ্বলিত হুতাশনে পতিত হইতেছে না দেখিয়া রাজা জনমেজয় নিতান্ত চিন্তাকুল হইলেন। শোনক জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস সূতনন্দন! বল দেখি, তক্ষক কি নিমিত্ত সেই সকল মনীষী বিপ্রগণের মন্ত্রবলে হোমানলে পতিত হইল না? উগ্রশ্রবাঃ উত্তর করিলেন, মহাশয়! অলৌকিক ক্ষমতাপন্ন মহাতেজা মহর্ষি আস্তীক ইন্দ্র হইতে ভ্রষ্ট নাগরাজকে ভয়বিহ্বল দেখিয়া উচ্চৈঃস্বরে তিনবার ‘তিষ্ঠ তিষ্ঠ’ এই বাক্য বলিয়াছিলেন। তাহাতেই নাগেন্দ্র ভূতলে পতিত ও ভস্মীভূত না হইয়া অন্তরীক্ষে কালযাপন করিতে সমর্থ হইয়াছিল।
অনন্তর রাজা সদস্যগণের প্রবর্ত্তনাপরতন্ত্র [ব্যস্থার অধীন] হইয়া আস্তীককে অভিলষিত বরদানপূর্ব্বক কহিলেন, “নিবৃত্ত হউক, সর্পকুল নিরাপদ হউক, আস্তীক ঋষি প্রসন্ন হউন এবং সেই সূতবাক্য সত্য হউক।” আস্তীককে এই বর দেওয়াতে সমাগত জনগণ মুক্তকণ্ঠে জয়ধ্বনি করিতে লাগিল এবং যজ্ঞ নিবৃত্ত হইল। রাজা প্রীতমনে ঋত্বিক্ ও সদস্যগণকে প্রার্থনাধিক অর্থদান দ্বারা সন্তুষ্ট করিয়া বিদায় করিলেন। পূর্ব্বে যে লোহিতাক্ষ সূত ‘এক ব্রাহ্মণ এই যজ্ঞের অন্তরায়স্বরূপ হইবেন,’ এই কথা উল্লেখ করিয়াছিলেন, ভূপতি তাঁহাকেও বিপুল ধনদান করিয়া দীক্ষান্ত-স্নান [অবভূত—যজ্ঞান্তে-স্নান] করিলেন। পরিশেষে অশন, বসন প্রভৃতি নানাবিধ দ্রব্যসামগ্রী প্রদানপূর্ব্বক আস্তীককে পরিতুষ্ট করিয়া গৃহে প্রেরণকালে অতি বিনীতভাবে নিবেদন করিলেন, “মহাশয়! আমার অশ্বমেধযজ্ঞে আপনাকে সদস্য হইতে হইবে।”
আস্তীক অতি মহৎকার্য্যের অনুষ্ঠানে সন্তুষ্ট হইয়া রাজাজ্ঞা স্বীকারপূর্ব্বক স্বগৃহাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। তিনি প্রথমতঃ জননী ও মাতুলের সমীপে গমন করিয়া আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন। সর্পগণ আপনাদিগের কুশল-সংবাদ শ্রবণে আনন্দিত হইয়া আস্তীক অগণ্য ধন্যবাদ প্রদানপূর্বক কহিল, “বৎস! অদ্য তুমি আমাদিগের জীবনদান করিলে, আমরা তোমার প্রতি অতিশয় প্রীত হইয়াছি, এক্ষণে বর প্রার্থনা কর।” তাহারা ভূয়োভূয়ঃ বলিতে লাগিল, “বৎস! আমরা তোমা কর্ত্তৃক রক্ষিত হইয়া যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইয়াছি, এক্ষণে বল, তোমার কি প্রিয়কার্য্য সম্পাদন করিব?”
আস্তীক কহিলেন. “যদি আপনারা আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তবে এইমাত্র অনুগ্রহ করিবেন যে, যে-সকল ধর্ম্মপরায়ণ ব্রাহ্মণ ও অপরাপর ব্যক্তি সায়াহ্নে বা প্রাতঃকালে অসিত, আর্ত্তিমান্ ও সুনীথের নাম স্মরণ করিবেন কিংবা (যে আস্তীক মুনি জনমেজয়ের সর্পসত্র হইতে তোমাদিগকে রক্ষা করিয়াছেন, আমি তাঁহাকে স্মরণ করিতেছি, হে সর্পগণ! আমাকে হিংসা করিও না, জনমেজয়ের যজ্ঞাবসানে আস্তীকের বচন স্মরণ কর, যে সর্প আস্তীকের নাম শুনিয়াও হিংসা করিতে নিবৃত্ত না হইবে, শাল্মলী বৃক্ষের ফলের ন্যায় তাহার মস্তক শতধা বিদীর্ণ হইবে এই ধর্ম্মাখ্যান পাঠ করিবেন, আপনারা তাঁহাদিগের কোন অনিষ্ট করিবেন না।” সর্পেরা প্রসন্নমনে আস্তীকের প্রস্তাবে সম্মত হইয়া উত্তর করিলেন, “হে ভাগিনেয়! আমরা কদাচ তোমার প্রর্থিত বিষয়ের অন্যথাচরণ করিব না।”
সূত শৌনককে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, হে দ্বিজোত্তম! আস্তীক সমাগত নাগেন্দ্রগণের এই বাক্য শ্রবণে পরম প্রীতিমনে স্বভবনাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। কিয়ৎকাল পরে তিনি পুৎত্র-পৌৎত্রাদি রাখিয়া লোকযাত্রা সংবরণ করেন। হে ভৃগূত্তম! আপনার পূর্ব্বজ প্রমতি স্বীয় পুৎত্র রুরুর কৌতুকনিবৃত্তির নিমিত্ত আস্তীকোপাখ্যান যেরূপ কীর্ত্তন করিয়াছিলেন, আমি তাহা অবিকল বর্ণনা করিলাম। এই পূণ্যবর্দ্ধক আস্তীকোপাখ্যান শ্রবণ করিলে সর্পভয় বিনষ্ট হয়, অন্তঃকরণে বিশুদ্ধ সুখের সঞ্চার হয় এবং পবিত্র ধর্ম্মলাভ হয়।

আদিবংশাবতরণিকা—মহাভারতপ্রসঙ্গ
শৌনক কহিলেন, বৎস সূতনন্দন! ভূগুবংশবর্ণন প্রভৃতি অতি রমণীয় উপাখ্যান-সকল কীর্ত্তন করিয়া তুমি আমাদিগকে পরম সন্তুষ্ট করিলে, এক্ষণে সেই অতি বিস্তীর্ণ সর্পযজ্ঞে দৈনন্দিন কর্ম্ম-সমাধানানন্তর সদস্যমণ্ডলী প্রসঙ্গক্রমে যে সমস্ত বিচিত্র কথা কীর্ত্তন করিয়াছিলেন, তাহা বর্ণন করিয়া আমাদিগকে চরিতার্থ কর।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, সর্পসত্রে দৈনন্দিন কর্ম্মানুষ্ঠানের মধ্যাবকাশে দ্বিজগণ বেদগান করিতেন, তৎপরে মহর্ষি ব্যাসদেব মহাভারতীয় উপাখ্যান শ্রবণ করাইতেন। শৌনক কহিলেন, ভগবান্ বাদরায়ণি রাজা জনমেজয় কর্ত্তৃক প্রার্থিত হইয়া পাণ্ডবদিগের গুণগানস্বরূপ মহাভারত নামে যে-ইতিহাস কীর্ত্তন করেন, আমি তাহা শ্রবণ করিতে অভিলাষ করি। হে সূতপুৎত্র! তোমার মুখে যে সকল মনোহর ইতিবৃত্ত শ্রবণ করিলাম, তাহাতেও আমার অন্তঃকরণ পরিতৃপ্ত হইতেছে না, অতত্রব সেই বিশুদ্ধাত্মা মহর্ষির মনঃসাগরসমূদ্ভূত অমৃতনির্ব্বিশেষ মহাভারতীয় কথা কীর্ত্তন কর। তখন উগ্রশ্রবাঃ ঋষিপ্রশ্নে সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, হে মুনিবর! কৃষ্ণদ্বৈপায়নপ্রোক্ত সেই অতি মহৎ মহাভারতীয় কথা প্রথমাবধি কীর্ত্তন করিতেছি। উহা বর্ণনা করিতে আমারও অতিশয় কৌতুক হইতেছে।

জনমেজয়-সভায় ব্যাসের আগমন
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, “যিনি যমুনাদ্বীপে শক্তি পুৎত্র পরাশরের ঔরসে অবিবাহিতা সত্যবতীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন, যিনি জাতমাত্রে যাগক্রিয়া দ্বারা আপনার দেহপুষ্টি এবং নিখিল বেদ, বেদাঙ্গ ও ইতিহাস অধ্যয়ন করেন, তপোনুষ্ঠান, বেদাধ্যয়ন, ব্রত, উপবাস, সন্তান ও যজ্ঞ দ্বারা যাঁহাকে কেহই অতিক্রম করিতে পারেন নাই, যিনি এক বেদকে চতুর্দ্ধা বিভক্ত করেন, যিনি শান্তনু রাজার বংশরক্ষার্থে তদীয় ক্ষেত্রে পাণ্ডু, ধৃতরাষ্ট্র ও বিদুরকে উৎপাদন করেন, পাণ্ডবগণের পিতামহ সেই ত্রিলোকীবিশ্রুত মহাকবি মহর্ষি বেদব্যাস শিষ্যগণসমভিব্যাহারে পরীক্ষিৎপুৎত্র রাজা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞদর্শনার্থ সভামণ্ডপে প্রবেশপূর্ব্বক রাজগণ ও সদস্যগণে পরিবৃত সুখাসীন রাজা জনমেজয়ের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। জনমেজয় ঋষিকে সমাগত দেখিয়া সভ্যগণসহ সসম্ভ্রমে দণ্ডায়মান হইয়া উপবেশনার্থ সুবর্ণময় আসন প্রদান করিলেন। মহর্ষি আসনে অধ্যাসীন হইলে জনমেজয় বিধিপূর্ব্বক তাঁহার সৎকারাদি করিয়া পিতামহ ব্যাসদেবকে পাদ্য, অর্ঘ্য, আচমনীয়, মধুপর্ক দিলেন। মহর্ষি তদ্দত্ত পূজা প্রতিগ্রহ করিয়া পরম সন্তুষ্ট হইলেন। রাজা জনমেজয় এইরূপ ভক্তি-সহকারে পূজাবিধি সমাপন করিয়া সমীপে উপবেশনপূর্ব্বক তদীয় কুশলবার্ত্তা জিজ্ঞাসা করিলেন এবং মহর্ষিও রাজার অনাময়-প্রশ্ন [স্বাস্থ্যাদি কুশল-জিজ্ঞাসা] করিলেন। তৎপরে ভগবান্ বাদরায়ণি সভাস্থ ব্যক্তি কর্ত্তৃক পূজিত হইয়া তাঁহাদিগকে প্রতিপূজা করিলেন।
পরিশেষে রাজা জনমেজয় কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, “ভগবান্! কুরু ওপাণ্ডব এই উভয়পক্ষের যাবতীয় বৃত্তান্ত আপনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছেন, অতএব জিজ্ঞাসা করি, ইঁহাদিগের পরস্পর ভেদ ও তাদৃশ সর্ব্বভূতভয়ঙ্কর ঘোরতর সংগ্রাম-ঘটনার কারণ কি? এই সমস্ত বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত কীর্ত্তন করিয়া আমাদিগের একান্ত কৌতূহলাক্রান্ত চিত্তকে পরিতৃপ্ত করুন।” বেদব্যাস তাঁহার প্রার্থনাবাক্যে সন্তুষ্ট হইয়া সম্মুখোপবিষ্ট নিজ শিষ্য বৈশম্পায়নকে আদেশ করিলেন, “বৎস বৈশম্পায়ন! তুমি আমার নিকট কুরু ও পাণ্ডবদিগের ভ্রাতৃবিচ্ছেদ প্রভৃতি যাবতীয় বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়াছ, এক্ষণে তাহা কীর্ত্তন কর।” বিপ্রশ্রেষ্ঠ বৈশম্পায়ন উপাধ্যায়ের আদেশক্রমে রাজা, সদস্য ও অন্যান্য ভূপতিগণের সমক্ষে কুরু-পাণ্ডবদিগের গৃহবিচ্ছেদাদিঘটিত অতি প্রাচীন মহাভারতীয় ইতিহাস বলিতে আরম্ভ করিলেন।

মহাভারত-কথারম্ভ
বৈশম্পায়ন প্রথমতঃ কায়মনোবাক্যে গুরুচরণে প্রণিপাত করিয়া ব্রাহ্মণগণ ও অন্যান্য বিদ্বদ্গণকে প্রণাম করিলেন। পরে মহর্ষি বেদব্যাস-প্রণীত অপূর্ব্ব উপাখ্যান-কীর্ত্তন-বিষয়ে কৃতসংকল্প হইয়া রাজা জনমেজয়কে কহিলেন,—মহারাজ! ভগবান্ বাদরায়ণির মুখনিঃসৃত এই অমৃতকল্প মহাভারতীয় কথা যেমন রমণীয়, আপনাকেও তদনুরূপ উপযুক্ত পাত্র লাভ করিয়াছি; অতএব ভারত-কথনে আমার অন্তঃকরণ অতিমাত্র উৎসাহিত হইতেছে! হে মহারাজ! রাজ্যলোভপ্রযুক্ত কুরু-পাণ্ডবদিগের গৃহবিচ্ছেদ ও সর্ব্বভূতবিনাশক সংগ্রাম এবং পাণ্ডবদিগের দ্যূতমূলক বনবাস সবিস্তর বর্ণন করিতেছি, অবধান করুন।
রাজর্ষি পাণ্ডুর মরণানন্তর যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চপাণ্ডব অরণ্যবাস পরিত্যাগপূর্ব্বক স্বগৃহে প্রত্যাগমন করিয়া অচিরকালমধ্যে বেদবিদ্যা ও ধনুর্বিদ্যায় সম্পূর্ণ খ্যাতিলাভ করিলেন। পুরবাসিগণ তাঁহাদিগের এতাদৃশ অসম্ভাবিত নৈপূণ্য দর্শন করিয়া সকলেই নিতান্ত অনুরক্ত হইয়া উঠিল। কৌরবকুল তদ্দর্শনে সহসা অসূয়া-পরবশ হইলেন। তৎপরে মহাবল সৌবল, ক্রুরকর্ম্মা কর্ণ ও দুর্ম্মতি দুর্য্যোধন, ইঁহারা ঐকমত্য অবলম্বনপূর্ব্বক পাণ্ডবদিগের নিগ্রহচেষ্টা ও নির্ব্বাসনের বাসনা করিলেন। দুর্য্যোধন শকুনির পরামর্শক্রমে রাজ্যলাভার্থ পাণ্ডবদিগের উপর নানাবিধ উপদ্রব করিতে আরম্ভ করিলেন। একদা তিনি অন্নে বিষসংযোগ করিয়া ভীমকে উপযোগ করিতে দিলেন। ভীমসেন সবিশেষ না জানিয়া বিষান্ন ভক্ষণ ও তাহা জীর্ণ করিলেন। অপর এক দিবস ভীম গঙ্গাতটে নিদ্রিত ছিলেন, এই অবসরে দুর্ম্মতি দুর্য্যোধন তাঁহার হস্তপদাদি বন্ধনপূর্ব্বক জলে নিক্ষেপ করিয়া স্বনগরে প্রত্যাগমন করেন। পরে ভীম জাগরিত হইবামাত্র স্বয়ং বন্ধন ছেদন করিয়া উত্থিত হইলেন। একদা বৃকোদর নিদ্রায় অভিভূত আছেন, এমন সময়ে দুর্য্যোধন এক ভয়ঙ্কর কৃষ্ণ-সর্প দ্বারা তাঁহার সর্ব্বাঙ্গ দংশন করান, তাহাতেও তাঁহার প্রাণবিয়োগ হইল না। মহামতি বিদুর পাণ্ডবদিগের সেই সেই বিপদ্-উদ্ধার-বিষয়ে সতর্ক থাকিলেন। যেমন দেবরাজ স্বর্গস্থ হইয়াও জীবলোকের হিতসাধন করেন, তদ্রূপ বিদুর দুর্য্যোধনের পক্ষে থাকিয়াও পাণ্ডবদগের শুভসাধন করিতে লাগিলেন।
দুর্য্যোধন গুহ্য ও বাহ্য বিবিধ উপায় দ্বারা পাণ্ডবদিগকে বিনষ্ট করিতে না পারিয়া পরিশেষে বৃষসেন ও দুঃশাসন প্রভৃতি কতিপয় ব্যক্তির পরামর্শ গ্রহণপূর্ব্বক ধৃতরাষ্ট্রের অনুমতি অনুসারে বারণাবতে জতুগৃহ [গালা প্রভৃতি দাহ্য পদার্থ দ্বারা নির্ম্মিত গৃহ বিশেষ] প্রস্তুত করাইলেন। তৎপরে পুৎত্রবৎসল রাজা ধৃতরাষ্ট্র রাজ্যভোগের লোভ সংবরণ করিতে না পারিয়া পাণ্ডবদিগকে নির্ব্বাসিত করেন। পাণ্ডবগণ মাতৃ-সমভিব্যাহারে হস্তিনা হইতে বারণাবতে প্রস্থান করিলেন। তৎকালে বিদুর তাঁহাদিগের মন্ত্রী ছিলেন। পরে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবদিগকে জতুগৃহ বাসের আদেশ দিলেন। তাঁহারা এক বৎসরকাল তথায় নির্বিবঘ্নে বাস করিয়া পরিশেষে বিদুরের পরামর্শক্রমে এক সুড়ঙ্গ নির্ম্মাণ করিলেন। পরে সেই জতুগৃহে অগ্নি প্রদান করিয়া এবং দুর্য্যোধনের দুর্ম্মন্ত্রী পুরোচনকে দগ্ধ করিয়া সাতিশয় শঙ্কিত-মনে রজনীযোগে জননী-সমভিব্যাহারে অরণ্যে প্রস্থান করিলেন। প্রস্থানকালে পথিমধ্যে বিকটাকৃতি হিড়িম্ব রাক্ষসকে দেখিতে পাইলেন। হিড়িম্ব মুখব্যাদানপূর্ব্বক তাঁহাদিগকে ভক্ষণ করিতে উদ্যত হইলে ভীমসেন স্ববিক্রমপ্রভাবে তাহাকে বধ করেন। অনন্তর আত্মপ্রকাশভয়ে ভীত হইয়া ঐ রজনীতেই তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। প্রস্থানকালে ভীমসেন হিড়িম্বানাম্নী রাক্ষসীর পাণিগ্রহণ করিয়া তাহার গর্ভে ঘটোৎকচ নামক এক পুৎত্র উৎপাদন করেন। পরে পাণ্ডবেরা ব্রহ্মচারিবেশে একচক্র নগরীতে এক ব্রাহ্মণের আবাসে উপনীত হইয়া বেদাধ্যয়নে মনোনিবেশপূর্ব্বক কিয়ৎকাল অতিক্রম করেন। একদা মহাবল মহাবাহু ভীমসেন স্বীয় বাহুবলে ক্ষুধার্ত্ত বকনামক রাক্ষসকে বধ করিয়া একচক্রা-নগরের উপদ্রব নিবারণ করিলেন। তৎপরে পাণ্ডবেরা দ্রৌপদীর স্বয়ংবরবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া পাঞ্চালদেশে আগমনপূর্ব্বক দ্রৌপদী লাভ করেন এবং তথায় এক বৎসর বাস করিয়া পরিশেষে হস্তিনাপুরে প্রত্যাগত হয়েন। তখন ধৃতরাষ্ট্র অভ্যাগত পঞ্চপাণ্ডবকে কহিলেন, “তোমাদিগের ভ্রাতৃবিগ্রহ [ভ্রাতৃদিগের পস্পর বিবাদ] হইবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা দেখিতেছি; যেহেতু আমি খাণ্ডবপ্রস্থে তোমাদিগের বাসস্থান অবধারণ করিয়া দিয়াছিলাম, কিন্তু তোমরা তাহাতে সম্মত হইলে না; অতএব এক্ষণে তোমরা কতিপয় গ্রাম লইয়া বাসার্থ সেই বিশালরথ্যাকলাপমণ্ডিত [বহু বড় বড় প্রশস্ত রাস্তাযুক্ত] খাণ্ডবপ্রস্থে প্রস্থান কর।” পাণ্ডবগণ তাঁহার আদেশক্রমে বহুমূল্য রত্নরাশি গ্রহণপূর্ব্বক স্বজনগণ-সমভিব্যাহারে খাণ্ডবপ্রস্থে গমন করিলেন। পরে বাহুবলে অন্যান্য ভূপালগণকে পরাভূত করিয়া এক বৎসর তথায় অবস্থিতি করেন। ধর্ম্মপরায়ণ পাণ্ডবগণ এইরূপে শত্রুদমন দ্বারা ক্রমশঃ অভ্যুদয় লাভ করিতে লাগিলেন। মহাযশাঃ ভীমসেন পূর্ব্বদিক, অর্জ্জুন উত্তরদিক, নকুল পশ্চিমদিক্, ও সহদেব দক্ষিণদিক, জয় করিয়া এই সসাগরা ধরামণ্ডলে একাধিপত্য স্থাপন করিলেন। সূর্য্য ও সূর্য্যসদৃশ পঞ্চপাণ্ডব দ্বারা ধরণীমণ্ডল যেন ষট্সূর্য্যে উদ্ভাসিত হইল।
একদা ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির কোন বিশেষ কারণবশতঃ প্রাণ হইতে প্রিয়তর ভ্রাতা অর্জ্জুনকে বনে যাইতে কহিলেন। পুরুষশ্রেষ্ঠ অর্জ্জুন তদীয় আজ্ঞাক্রমে বনে প্রবেশ করিয়া ত্রয়োদশমাস তথায় বাস করিলেন। পরে এক দিবস দ্বারাবতী নগরীতে গমন করিয়া কৃষ্ণের সহিত সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁহার সুভদ্রানাম্নী ভগিনীর পাণিগ্রহণ করেন। যেমন শচী ইন্দ্রকে পাইয়া এবং লক্ষ্মী কৃষ্ণকে পাইয়া আহ্লাদিত হইয়াছিলেন, সুভদ্রা অর্জ্জুনকে পতিলাভ করিয়া তদ্রূপ আহ্লাদিত হইলেন। পরে বাসুদেব-সমভিব্যাহারে অর্জ্জুন খণ্ডববন দগ্ধ করিয়া ভগবান্ হুতাশনকে পরিতৃপ্ত করিলেন। অগ্নি পরিতুষ্ট হইয়া অর্জ্জুনকে গাণ্ডীব ধনুঃ, অক্ষয় তূণীর ও কপিধ্বজরথ প্রদান করিলেন। অর্জ্জুন সেই সমস্ত বস্তু প্রতিগ্রহ করিলেন এবং খাণ্ডবাগ্নি হইতে ময়দানবকে উদ্ধার করিলেন। ময়দানব তাঁহার প্রসাদে পরিত্রাণ পাইয়া নানাবিধ মণিকাঞ্চন-মণ্ডিত ও পরমরমণীয় এক সভামণ্ডপ নির্ম্মাণ করিয়া দেন। দুর্ম্মতি দুর্য্যোধন ময়-নির্ম্মিত সভার লোভ সংবরণ করিতে না পারিয়া শকুনির পরামর্শানুসারে কূট পাশক-ক্রীড়া [ষড়যন্ত্রমূলক পাশা খেলা] দ্বারা যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করিয়া দ্বাদশ বর্ষ বনবাস ও এক বৎসর অজ্ঞাতবাসের আদেশ দিলেন। ধর্ম্মরাজ তদনুসারে এয়োদশ বৎসর অতিবাহিত করিয়া নিজ রাজ্যে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক স্বকীয় ধনসম্পত্তি প্রার্থনা করেন। তাহা না পাওয়াতেই তাঁহাদিগের ঘোরতর সমরানল প্রজ্বলিত হয়। পরিশেষে তাঁহারা বিপুলপরাক্রম প্রকাশপূর্ব্বক দুর্য্যোধনের প্রাণসংহার করিয়া পুনর্ব্বার আপন রাজ্য-সম্পত্তি সমুদয় অধিকার করেন। হে মহারাজ! উভয়পক্ষে যেরূপ আত্মবিচ্ছেদ ও সংগ্রাম উপস্থিত হইয়াছিল, তাহা আমি সংক্ষেপে কীর্ত্তন করিলাম।

কুরু-পাণ্ডবের শত্রুতা-কারণ জিজ্ঞাসা
জনমেজয় কহিলেন, হে দ্বিজেন্দ্র! আমি ভারতীয় উপাখ্যান সংক্ষেপে শ্রবণ করিলাম। এক্ষণে কুরুবংশীয়দিগের অতিবিচিত্র চরিত্র সবিস্তর কীর্ত্তন করিয়া আমার কৌতূহলাক্রান্ত চিত্তকে সন্তুষ্ট করুন। পূর্ব্বপুরুষদিগের বিশুদ্ধ চরিতাবলী সংক্ষেপে শ্রবণ করিয়া আমার অন্তঃকরণ পরিতৃপ্ত হইল না। ধর্ম্মপরায়ণ পাণ্ডবগণ যে কারণে অবধ্য জ্ঞাতিকুল সংহার করিয়াও লোকের প্রশংসাপাত্র হইয়াছিলেন, বোধ করি, সে কারণ সামান্য কারণ নহে। আর তাঁহারা নিরপরাধ ও প্রতিবিধানসমর্থ হইয়াও শত্রুকৃত দুঃসহ ক্লেশ সহ্য করিয়াছিলেন, তাহারই বা কারণ কি? মহাবল মহাবাহু ভীমসেন এত কষ্ট স্বীকার করিয়াও কি কারণে ক্রোধসংবরণ করিয়াছিলেন? পতিব্রতা দ্রৌপদী সভামধ্যে তাদৃশ অপমানিত হইয়াও কেন ক্রোধ-চক্ষুদ্বারা সেই দুরাত্মা কৌরবদিগকে ভস্মাবশেষ করিলেন না? যখন ধর্ম্মনন্দন যুধিষ্ঠির দ্যূতে আসক্ত হয়েন, তখন ভীম, অর্জ্জুন ও নকুল সহদেব কেন তাঁহাকে নিবারণ করিলেন না? কি প্রকারেই বা অর্জ্জুন কৃষ্ণের সহায়তায় সেই প্রভূত কুরুসেনা পরাভূত করিয়াছিলেন? হে তপোধন! আপনি এই সকল বৃত্তান্ত এবং পাণ্ডবদিগের আচরিত অন্যান্য বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত কীর্ত্তন করুন।
মহাভারতমাহাত্ম্য
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! কৃষ্ণদ্বৈপায়নপ্রোক্ত এই পবিত্র উপাখ্যান অতি বিস্তীর্ণ, অতএব ইহা শ্রবণ করিবার সময় নির্দ্দেশ করুন, আমি আপনার নিকট উহা সবিস্তার কীর্ত্তন করিব। সত্যবতীপুৎত্র ভগবান্ ব্যাদেব এই গ্রন্থে একলক্ষ শ্লোক রচনা করিয়াছেন। যে-সকল ব্যক্তি উহা শ্রবণ করাইবেন এবং যাঁহারা শ্রদ্ধা ও ভক্তিসহকারে শ্রবণ করিবেন, তাঁহারা ব্রহ্মলোকে গমন করিয়া দেবতুল্য হইবেন। বেদব্যাস-প্রণীত এই পরমপবিত্র রমণীয় ইতিহাস সাক্ষাৎ বেদস্বরূপ। মহর্ষিগণ এই মহাভারতের যথেষ্ট প্রশংসা করিয়া থাকেন। ইহাতে অর্থ ও কামবিষয়ক অশেষ উপদেশ প্রাপ্ত হওয়া যায় এবং এতৎশ্রবণে পরিনিষ্ঠাবতী [আস্তিক্যযুক্তা —নির্ম্মলা] বুদ্ধি জন্মে। বিদ্বান্ ব্যক্তিরা দানশীল, সত্যস্বভাব, ধর্ম্মপরায়ণ ও অকৃপণ ব্যক্তিদিগকে মহাভারত শ্রবণ করাইয়া প্রচুর অর্থলাভ করেন, শ্রোতা অতিনিষ্ঠুর হইলেও এই অপূর্ব্ব ইতিহাস শ্রবণে রাহু হইতে মুক্ত চন্দ্রের ন্যায়, ভ্রূণহত্যাদি মহাপাতক হইতেও আশু বিমুক্ত হইতে পারে। বিজিগীযু [জয়াকাঙ্ক্ষী] ব্যক্তিদিগের এই জয়খ্য ইতিহাস শ্রবণ করা কর্ত্তব্য। রাজারা ইহা শ্রবণ করিলে রাজ্যলাভ ও শত্রুপরাজয় করিতে পারেন। যদি কোন যুবা রাজমহিষীর সহিত এই পুৎত্রফলপ্রদ পরম-স্বস্ত্যয়নস্বরূপ মহাভারত শ্রবণ করেন, তাহা হইলে তাঁহাদিগের বীরপুৎত্র বা রাজ্যভাগিনী কন্যা জন্মে। মহর্ষি বেদব্যাস রচিত এই মহাভারতই পবিত্র ধর্ম্মশাস্ত্র; অর্থশাস্ত্র ও মোক্ষশাস্ত্র, এক ব্যক্তি বক্তা ও অন্যে ইহার শ্রোতা হয়েন। শ্রোতাদিগের পুৎত্র-পৌৎত্রেরও শুশ্রূষাপরায়ণ এবং ভূত্যেরাও প্রভুপরায়ণ হইয়া থাকে। যে-নর মহাভারত শ্রবণ করেন, তিনি কায়িক, বাচিক ও মানসিক ত্রিবিধ পাপরাশি হইতে বিমুক্ত হয়েন। যাঁহারা বিদ্বেষ বুদ্ধিশূন্য হইয়া এই ভারতবংশীয় ইতিবৃত্ত শ্রবণ করেন, তাঁহাদিগের ব্যাধিভয় ও পরলোকভয় নিবারণ হয়। বেদব্যাস স্বগ্রন্থে সর্ব্ববিদ্যা পারদর্শী মহাপ্রভাবশালী পাণ্ডবদিগের ও অন্যান্য রাজর্ষিদিগের কীর্ত্তী বিস্তার করিয়াছেন। ইহা অতি বিচিত্র ও পবিত্র, শ্রবণ করিলে শ্রোত্রযুগল চরিতার্থ হয়। যে মানব জীবলোকে পূণ্যসঞ্চয় করিবার মানসে সদাচারপরায়ণ ব্রাহ্মণগণকে ইহা শ্রবণ করান, তিনি সনাতন-ধর্ম্ম লাভ করেন। যিনি অতি পূতমনে সর্ব্বলোকপ্রখ্যাত এই কুরুবংশীয় ইতিহাস কীর্ত্তন করেন, তাঁহার বংশপরম্পরা ক্রমশঃ বিস্তার হইতে থাকে। যদি বেদপারগ ব্রাহ্মণ ব্রতানুষ্ঠানপরতন্ত্র হইয়া চারি বৎসর ও চারি মাস মহাভারত অধ্যয়ন করেন, তিনি সকল পাপ হইতে মুক্ত হইতে পারেন। এই মহাভারতে দেবতা, রাজর্ষি ও ব্রহ্মর্ষিদিগের বিষয় বর্ণিত ও ভগবান্ বাসুদেবের সুচরিত কীর্ত্তিত আছে। ইহাতে ভগবান্ ভূতভাবন ভবানীপতি দেবী পার্ব্বতীর অনির্ব্বচনীয় মহিমা এবং কার্ত্তিকেয়ের উৎপত্তি ও গোব্রাহ্মণের মাহাত্ম্য বর্ণিত আছে। এই মহাভারত নিখিল বেদের সমষ্টিস্বরূপ। অতএব ধর্ম্মবুদ্ধি লোকদিগের ইহা সর্ব্বদা শ্রবণ করা কর্ত্তব্য। যিনি প্রতি পর্ব্বাহে ব্রাহ্মণগণকে মহাভারত শ্রবণ করান, তাঁহার পাপনাশ ও নিত্যকাল ব্রহ্মলোকে বাস হয়। শ্রাদ্ধকালে ব্রাহ্মণদিগকে ভারতের অন্ততঃ এক চরণমাত্রও শ্রবণ করাইলে পিতৃলোক অক্ষয় অন্নপানে পরিতৃপ্ত হয়েন। মন ও ইন্দ্রিয় দ্বারা অহোরাত্রে জ্ঞানাজ্ঞানকৃত যে-সকল পাপ সঞ্চিত হয়, মহাভারত শ্রবণ করিলে তাহা তৎক্ষণাৎ নষ্ট হয়। এই গ্রন্থে ভারতবংশীয় রাজাদিগের মহাবংশ বর্ণিত আছে বলিয়া ইহার নাম মহাভারত হইয়াছে। যিনি এই মহাভারতের সমুদয় সিদ্ধান্ত স্থির করিতে পারেন, তাঁহার সকল পাপ অপগত হয়। এই অদ্ভুত ইতিহাস শ্রবণ করাইলে শ্রোতা মহাপাতক হইতে পরিত্রাণ পায়। মহর্যি ব্যাস প্রতিদিন প্রাতঃকৃত্যাদি সমাপনানন্তর নিয়মিত তপোজপাদির অব্যাঘাতে [অবিঘ্নে —ব্যাঘাত না হয় এরূপ ভাবের অবকাশে] তিন বৎসরে এই মহাভারত রচনা করেন, অতএব নিয়মবিশিষ্ট হইয়া ইহা শ্রবণ করা কর্ত্তব্য। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন প্রোক্ত এই অপূর্ব্ব মহাভারতীয় কথা যিনি শ্রবণ করান ও যাঁহারা ভক্তি ও শ্রদ্ধাসহকারে শ্রবণ করেন, তাঁহাদিগকে জন্মমৃত্যুরূপ দুর্ভেদ্য শৃঙ্খলে বদ্ধ থাকিয়া আর পাপ-পুণ্যের ফলভোগ করিতে হয় না। যে-নর ধর্ম্মকামনায় এই ইতিহাসের আদ্যোপান্ত সমুদয় শ্রবণ করেন, তাঁহার সকল বাসনা সফল হয় ও তিনি চরমে দেবলোকে গমন করিয়া পরম সন্তোষ লাভ করেন। সমুদ্র ও মহাগিরি সুমেরু যেমন রত্নাকর বলিয়া প্রসিদ্ধ, সেইরূপ বহুবিধ সুচারু শব্দে অলঙ্কৃত এই রমণীয়তর মহাভারতও এক অত্যুৎকৃষ্ট ইতিহাস বলিয়া প্রসিদ্ধ। যে ব্যক্তি অর্থীদিগকে এই শ্রবণ-সুখকর মহাভারত প্রদান করেন, তাঁহার সসাগরা পৃথ্বীদানের ফললাভ হয়। মহারাজ! পুণ্যসঞ্চয় ও বিজয়লাভের নিমিত্ত এই অদ্ভুত কথা শ্রবণ করেন। এই মহাভারতে যাহা বর্ণিত আছে, তাহা অন্যত্রও থাকিতে পারে, কিন্তু ইহাতে যাহা নাই, তাহা আর কুত্রাপি দেখিতে পাইবেন না।

উপরিচর বসুর পরিচয়
বৈশম্পায়ন কহিলেন, পুরুবংশে উপরিচর নামে এক পরম ধার্ম্মিক রাজা ছিলেন। তাঁহার অপর নাম বসু। তিনি সর্ব্বদা মৃগয়ায় আসক্ত থাকিতেন। মহারাজ বসু ইন্দ্রের উপদেশক্রমে রমণীয় চেদিরাজ্য অধিকার করেন। পরে অস্ত্র-শস্ত্র পরিত্যাগপূর্ব্বক আশ্রমে প্রবেশ করিয়া অতি কঠোর তপস্যা আরম্ভ করিলেন। একদা ইন্দ্রাদি দেবগণ তদীয় আশ্রমে উপস্থিত হইয়া ভাবিলেন, ইনি যেরূপ তপস্যা করিতেছেন, ইহাতে বোধ হয়, ইন্দ্রত্ব গ্রহণ করিবেন, এই ভাবিয়া শান্তবাক্য দ্বারা তাঁহাকে তপস্যা হইতে নিবৃত্ত করিলেন। দেবতারা কহিলেন, ‘মহারাজ! যাহাতে পৃথিবীমধ্যে ধর্ম্ম সঙ্কীর্ণ হয়, তাহাই তোমার অবশ্য-কর্ত্তব্য কর্ম্ম। তুমি ধর্ম্ম প্রতিপালন করিতেছ বলিয়া লোক-সকল স্বধর্ম্মে ব্যবস্থিত আছে।” ইন্দ্র কহিলেন, “হে নরনাথ! তুমি অবহিত ও নিয়মশালী হইয়া সতত ধর্ম্মের অনুষ্ঠান কর, তাহা হইলেই নিত্য ও পবিত্র লোক দেখিতে পাইবে। তুমি ভূলোকে থাকিয়াও আমার প্রিয়সখা হইবে। তোমাকে এক সদুপদেশ দিতেছি, শ্রবণ কর। এই ভূমণ্ডলের মধ্যে যে প্রদেশ অতি রমণীয়, পবিত্র ও উর্ব্বরক্ষেত্রবিশিষ্ট এবং পশ্বাদির আবাস ও বিচিত্র ধনধান্যসম্পন্ন, তুমি সেই দেবমাতৃক [বৃষ্টির জল ব্যতীত যে-দেশে শস্য হয় না] প্রদেশে অবস্থিতি কর।
হে চেদিরাজ! চেদিদেশ প্রভূত ধনরত্নাদিবিশিষ্ট, তুমি তথায় গিয়া বাস কর। ঐ জনপদের অধিবাসীরা ধর্ম্মপরায়ণ ও সাধু। অধিক কি বলিব, তাহারা পরিহাসক্রমেও কদাচ মিথ্যা ব্যবহার করে না। পুৎত্রেরা পিতার হিতকার্য্যে তৎপর হইয়া একান্নে বাস করে। তত্রত্য লোকেরা দুর্ব্বল বলীবর্দ্দ [গো-বিশেষ—বলদ]দিগকে ভারবহন বা কৃষিকার্য্যে নিয়োগ করে না। তথায় ব্রাহ্মণ, ক্ষৎত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারিবর্ণ সতত সাবধান হইয়া স্ব স্ব ধর্ম্ম প্রতিপালন করিয়া থাকেন। হে মানপ্রদ! ত্রিলোকে যে-সকল ঘটনা হইবে, আমার প্রসাদে কিছুই তোমার অবিদিত থাকিবে না। মনুষ্যের মধ্যে কেবল তুমিই মদ্দত্ত এই দিব্য স্ফটিকনির্ম্মিত আকাশগামী বিমানে আরোহণ করিয়া বিগ্রহবান্ [শরীরধারী] দেবতার ন্যায় গগনমার্গে সঞ্চরণ করিতে পারিবে। আর তোমাকে এই বৈজয়ন্তীনাম্নী অম্লানপঙ্কজমালা [স্নিগ্ধ পদ্মপুষ্প মাল্য] অর্পণ করিতেছি, এই মালা সংগ্রামকালে তোমাকে রক্ষা করিবে ও ইহার প্রভাবে তুমি অক্ষতশরীরে রণস্থল হইতে প্রত্যাগত হইতে পারিবে। এই সুবিখ্যাত ইন্দ্রমালা তোমার একমাত্র অসাধারণ চিহ্নস্বরূপ হইবে।”
বৈশম্পায়ন কহিলেন, দেবরাজ ইন্দ্র রাজার প্রীতিবিস্তার করিবার উদ্দেশে শিষ্টপ্রতিপালনী নামে এক বেণুষষ্টি [বাঁশের লাঠি] প্রদান করিলেন। সংবৎসর অতীত হইলে ভূপতি শচীপতির আরাধনার নিমিত্ত সেই বেণুষষ্টি পৃথিবীতে প্রোথিত করিতেন। পরদিবস সেই বেণুষষ্টি গন্ধমাল্য ও বসন-ভূষণে বিভূষিত করিয়া উত্থাপনপূর্ব্বক তাহাতে ইন্দ্রের পূজা করিতেন। তদবধি অন্যান্য ক্ষিতিপালেরাও তন্নির্দ্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করিয়া ইন্দ্রের উপাসনা করিয়া থাকেন। ভগবান্ ইন্দ্র বসুরাজের প্রতি প্রসন্ন হইয়া হংসরূপ পরিগ্রহপূর্ব্বক অবনীতে অবতীর্ণ হইতেন এবং সেই প্রকার আকারেই পূজা স্বীকার করিয়া কহিতেন, “মহারাজ! তুমি যেরূপ সৎকার করিলে, তাহাতে আমি পরম প্রীতিলাভ করিলাম। এক্ষণে কহিতেছি, যে-সকল রাজা আমার প্রীত্যুদ্দেশে এই উৎসব করিবেন বা অন্য দ্বারা এই উৎসব করাইবেন, তাঁহাদিগের রাজ্যে ধনসমৃদ্ধির বৃদ্ধি ও বিজয়লাভ হইবে এবং তৎ-প্রদেশবাসীরা সর্ব্বদা সন্তোষে থাকিবে।” হে মহারাজ! এইরূপে বসুরাজ ইন্দ্র কর্ত্তৃক অভিহিত হইয়াছিলেন। ফলতঃ যে-নর ভূমি ও রত্নাদি প্রদান করিয়া ইন্দ্রোৎসব করিয়া থাকেন, তিনি পূজিত হয়েন। চেদীশ্বর বসু বরদান ও শক্রোৎসবের উপদেশ-কথন দ্বারা ইন্দ্র কর্ত্তৃক সম্মানিত হইয়া এই পৃথিবী ধর্ম্মতঃ পালন করিতেন এবং সুরপতির সন্তোষার্থে মধ্যে মধ্যে ইন্দ্রোৎসব করিতেন।
মহারাজ! বসুর মহাবল-পরাক্রান্ত পাঁচ পুৎত্র ছিল। তিনি তাঁহাদিগকে পৃথক্ পৃথক্ রাজ্যে অভিষিক্ত করেন। তাঁহার এক পুৎত্রের নাম বৃহদ্রথ। ইনি মগধদেশে মহারথ বলিয়া বিখ্যাত হইয়াছিলেন। অপর পুৎত্রের নাম প্রত্যগ্রহ। আর একটির নাম কুশাম্ব, কেহ কেহ ইঁহার নাম মণিবাহন বলিয়া নির্দ্দেশ করেন। অন্য পুৎত্রের নাম মাবেল্ল। অপরের নাম যদু। অমিত-পরাক্রমশালী বসুরাজার এই পঞ্চ পুৎত্র জন্মে। তন্মধ্যে যিনি যে-দেশে অভিষিক্ত হইয়াছিলেন, সেই দেশ তাঁহার নামে বিখ্যাত হইয়াছে। সেই ইন্দ্রতুল্য পঞ্চ ভূপতির পৃথক্ পৃথক্ বংশাবলী হইয়াছিল। যখন সেই বসুরাজা ইন্দ্রের প্রসাদলব্ধ সেই স্ফটিক-নির্ম্মিত রথে আরোহণ করিয়া পৃথিবীর উপরিভাগে আকাশপথে সঞ্চরণ করিতেন, তৎকালে গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরা-সকল আসিয়া তাঁহার আরাধনা করিতেন। তিনি উপরি ভ্রমণ করিতেন, এই নিমিত্ত উপরিচর নামে প্রখ্যাত হইয়াছিলেন। তাঁহার রাজধানীর নিকটে শুক্তিমতী নামে এক নদী ছিল। কোলাহল নামে এক সচেতন অচল কামান্ধ হইয়া স্রোতস্বতী-সম্ভোগাভিলাষী হওয়াতে বসুরাজ তাহার শিরোদেশে পদাঘাত করিয়াছিলেন। রাজার পাদপ্রহারে পর্ব্বতবর বিদীর্ণ হইল। অতি বেদবতী স্রোতস্বতী শুক্তিমতী সেই প্রহারমার্গ দ্বারা বহির্গত হইতে লাগিল। উক্ত নদীর গর্ভে কোলাহলের এক পুৎত্র ও কন্যা উৎপন্ন হইল। নদী প্রীতমনে সেই কন্যা ও পুৎত্র লইয়া রাজাকে সমর্পূণ করিল। বসুপ্রদ বসুরাজ সেই পুৎত্রকে আপন সৈন্যাধিকারে নিয়োগপূর্ব্বক কন্যাকে পত্নীরূপে স্বীকার করিলেন। গিরিবালা গিরিকা ঋতুস্নাতা ও শুচি হইয়া সন্তান-বাসনায় রাজাকে আপন অবস্থা নিবেদন করিল। দৈবযোগে সে দিবস রাজার পিতৃলোকেরা প্রসন্ন হইয়া তাঁহাকে মৃগয়া করিতে আদেশ দিলেন। রাজা তাঁহাদিগের আজ্ঞা প্রাপ্তিমাত্রে মৃগয়ার্থ নির্গত হইলেন; কিন্তু অলোক-সামান্য রূপলাবণ্যবতী সাক্ষাৎ লক্ষ্মী-স্বরূপা গিরিকা তাঁহার স্মৃতিপথে সতত জাগরূক ছিলেন।
মৎস্যগন্ধার উৎপত্তি
রাজা সেই রমণীয় বসন্তকালে মৃগয়াক্রমে অশোক, চম্পক, চূত, অতিমুক্ত, পুন্নাগ, কর্ণিকার, বকুল, পাটল, চন্দন, অর্জ্জুন প্রভৃতি বহুবিধ বৃক্ষে পরিশোভিত; কোকিলালাপ-মুখরিত, মধুমত্ত মধুকরের ঝঙ্কারে সঙ্কুলিত; চৈত্ররথতুল্য মনোহর এক কাননে প্রবেশ করিলেন। কিন্তু গিরিকা-বিরহে নিতান্ত কাতর ও দুর্দ্দান্ত মদনবাণে একান্ত অধীর হইয়া যদৃচ্ছাক্রমে [যথেচ্ছ— ইচ্ছানুসারে] ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে এক বিকশিত অশোকতরু অবলোকন করিলেন। তিনি সেই তরুমূলে সুখাসীন হইয়া বায়ু-সেবন দ্বারা অতিশয় আহ্লাদিত হইলেন। এই অবসরে তাঁহার রেতঃস্খলন হইল। রেতঃনিতান্ত নিষ্ফল না হয়, এই মনে করিয়া চেদিরাজ এক পত্রপুটে তাহা ধারণ করিলেন। পরে পত্নীর ঋতুকাল ও আপনার রেতঃ বিফল না হয়, মনে মনে এই বিবেচনা করিয়া রাজা মন্ত্রোচ্চারণপূর্ব্বক বীজ-শোধন করিয়া সমীপবর্ত্তী অতি দ্রুতগামী এক শ্যেনপক্ষীকে কহিলেন, “হে সৌম্য! অদ্য আমার মহিষীর ঋতুকাল, অতএব তুমি অতি সত্বর আমার এই রেতঃ লইয়া তাঁহাকে প্রদান কর।”
বেগবান্ শ্যেন সেই শুক্র লইয়া আকাশপথে উড্ডীন হইল। পথিমধ্যে আর একটি শ্যেনপক্ষী ঐ দ্রুতগামী শ্যেনের তুণ্ডাগ্রে স্থির শুক্র দেখিয়া আমিষ আশঙ্কা [সম্ভাবনা] করিয়া তাহার নিকট আসিল এবং “মাংসখণ্ড বলপূর্ব্বক লইব,” এই ভাবিয়া তাহার সহিত তুণ্ডযুদ্ধ আরম্ভ করিল। যুদ্ধ করিতে করিতে সেই শুক্র যমুনার জলে পতিত হইল। তথায় অদ্রিকা নামে এক অপ্সরা ব্রহ্মশাপ প্রভাবে মীনরূপ প্রাপ্ত হইয়া বাস করিত। সেই মৎস্যরূপা অদ্রিকা শীঘ্র আসিয়া শ্যেনতূণ্ডপরিভ্রষ্ট বীজ ভক্ষণ করিল। বীজ-ভক্ষণের পর দশম মাসে মৎস্যোপজীবীরা সেই মৎসীকে জালে বন্ধ করিল। অনন্তর তাহার উদরাভ্যন্তর হইতে এক কন্যা ও এক পুৎত্র বহির্ভূত হইল। মৎস্যজীবীরা এই অদ্ভুত ব্যাপার দর্শনে চমৎকৃত হইয়া ঐ দুই সন্তানকে ভূপাল-সমক্ষে লইয়া গিয়া নিবেদন করিল, “মহারাজ! এক মৎসীর গর্ভে এই দুই মানুষ জন্মিয়াছে।” উপরিচর রাজা সেই মৎসীগর্ভ-সম্ভৃত পুৎত্রকে গ্রহণ করিলেন। সেই মৎসীপুত্র পরমধর্ম্মিক ও স্থিরপ্রতিজ্ঞ মৎস্যরাজ নামে বিখ্যাত হইয়াছিলেন। শাপপ্রদানকালে ভগবান্ ইন্দ্র অপ্সরা অদ্রিকাকে কহিয়াছিলেন, “তুমি মানুষ প্রসব করিয়া শাপ হইতে পরিত্রাণ পাইবে।” এক্ষণে সেই নির্দ্দিষ্টকাল উপস্থিত দেখিয়া মৎস্যরূপা অপ্সরা মৎস্যরূপ পরিত্যাগপূর্ব্বক স্বকীয় পূর্ব্বাকার স্বীকার করিয়া আকাশপথে প্রস্থান করিল। মৎসাগর্ভসম্ভৃতা দুহিতা রাজার আদেশক্রমে সেই মৎস্যজাবীর কন্যা হইল। মৎস্যঘাতীর সম্পর্কে তাহার নাম মৎস্যগন্ধা হইয়াছিল, ফলতঃ তাহার নাম সত্যবতী। সত্যবতী পিতৃশুশ্রূষার নিমিত্ত যমুনা নদীতে নাবিকের কার্য্য করিত।
ব্যাসের জন্মবৃত্তান্ত
একদা পরাশর ঋষি তীর্থপর্য্যটনক্রমে যমুনায় উপস্থিত হইয়া অলৌকিক-রূপলাবণ্যবতী মুনিজনমনোহারিণী সুচারুহাসিনী দাসনন্দিনীকে দেখিবামাত্র মদনবেদনায় অতিমাত্র ব্যাকুল হইয়া কহিলেন, “হে কল্যাণি! তুমি আমার মনোভিলাষ পূর্ণ কর।” সে কহিল, “হে ভগবান্! ঐ দেখুন, নদীর উভয় পারে পার হইবার নিমিত্ত ঋষিগণ উপস্থিত আছেন, এ অবসরে কিরূপে আপনার মনোরথ-সিদ্ধি হইবে।” তাহার এই কথা শুনিয়া ঋষিবর পরাশর কুজ্ঝটিকা সৃষ্টি করিয়া তৎপ্রদেশ তমোময় করিলেন। ঋষিসৃষ্ট কুজ্ঝটিকা দৃষ্টে কন্যা লজ্জিতা ও বিস্ময়াবিষ্টা হইয়া কহিল, “ভগবন্! আমি পিতার অধীন। অদ্যাবধি আমার বিবাহ হয় নাই। আপনার সহযোগে আমার কুমারীভাব দূষিত হইবে। কন্যাভাব দূষিত হইলে কিরূপে গৃহে প্রবেশ করিব এবং কি প্রকারেই বা লোকসমাজে জীবনধারণ করিব? হে ভগবান্! এই সমস্ত আদ্যোপান্ত অনুধাবন করিয়া যাহা উচিত হয়, বিধান করুন।” পরাশর শুনিয়া প্রীতমনে কন্যাকে কহিলেন, “হে ভীরু! আমার অভিলাষ পূর্ণ করিলে তোমার কন্যাভাব দূষিত হইবে না। আমি তোমার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছি; ইচ্ছানুরূপ বর প্রার্থনা কর। আমার প্রসন্নতা কখনই নিষ্ফল হয় নাই।” তাঁহার এই কথা শুনিয়া কন্যা কহিল, “আমার সর্ব্বাঙ্গ হইতে সৌগন্ধ নির্গত হউক।” ঋষি “তথাস্তু” বলিয়া তাহার অভিলাষানুরূপ বর প্রদান করিলেন। অনন্তর ধীবরকন্যা অভাষ্ট-বরলাভে সন্তুষ্ট হইয়া মহর্ষির মনোবাঞ্ছা পরিপূর্ণ করিল। তদবধি সেই যুবতীর নাম গন্ধবতী বলিয়া ত্রিভূবনে বিখ্যাত হইল। লোকে একযোজন অন্তর হইতে তাহার গাত্রগন্ধের আঘ্রাণ পাইত, এই নিমিত্ত তাহার অপর একটি নাম যোজনগন্ধা হইয়াছিল।
সত্যবতী এইরূপে যমুনা নদীর দ্বীপে এক পুৎত্র প্রসব করিলেন। প্রভূততেজা পরাশরপুৎত্র মাতৃনির্দেশক্রমে তপস্যায় অভিনিবেশ করিলেন এবং জননীকে কহিলেন, “মাতঃ! কার্য্যকাল উপস্থিত হইলে আমাকে স্মরণ করিলেই আমি আসিব।” এইরূপে পরাশরের ঔরসে সত্যবতীর গর্ভে ব্যাসদেব জন্ম পরিগ্রহ করেন। তিনি যমুনা-দ্বীপে জন্মেন, এই নিমিত্ত তাঁহার নাম দ্বৈপায়ন হইল এবং যুগে যুগে ধর্ম্মের পাদক্ষয় ও মনুষ্যদিগের আয়ুঃ ও শক্তির হ্রাস দেখিয়া বেদের স্থায়িত্ব ও ব্রাহ্মণগণের প্রতি অনুকূলতা-প্রযুক্ত বেদের বিভাগ করিয়াছিলেন, এই নিমিত্ত তাঁহার নাম বেদব্যাস হয়। মহর্ষি বেদব্যাস সুমন্তু, জৈমিনি, পৈল, বৈশম্পায়ন এবং পুৎত্র শুকদেবকে বেদ ও মহাভারত অধ্যয়ন করান; তাঁহারাই ভারতের পৃথক্ পৃথক্ সংহিতা প্রকাশ করেন।
সংক্ষিপ্ত ক্ষৎত্রিয় বংশবর্ণন
মহাবীর্য্য মহাযশাঃ শান্তনু-পুৎত্র ভীষ্ম অষ্টবসুর সহযোগে গঙ্গাগর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। আণীমাণ্ডব্যনামক এক মহর্ষি ত্রিলোকে বিখ্যাত ছিলেন। সেই বেদবেত্তা মহাযশাঃ ভগবান্ চৌর্য্যাপবাদে শূলে আরোপিত হয়েন। তিনি শূলারোপণ-কালে ধর্ম্মকে আহ্বান করিয়া এই কথা কহিলেন, “হে ধর্ম্ম! আমি শৈশবকালে ইষীকাস্ত্র [কুশতৃণ] দ্বারা এক শকুন্তিকা[পক্ষী]কে বিদ্ধ করিয়া ছিলাম। আমার স্মরণ হইতেছে, সেই এক দুষ্কর্ম্ম করিয়াছি। তদ্ভিন্ন আর কোন পাপকর্ম্ম করি নাই। কিন্তু আমি তদপেক্ষা সহস্রগুণ তপস্যা করিয়াছি, তদ্দ্বরা কি আমার সেই পাপের শাস্তি হয় নাই? অন্যান্য প্রাণিবধ অপেক্ষা ব্রাহ্মণবধ গুরুতর পাতক। হে ধর্ম্ম! তুমি ব্রাহ্মণবধ করিতে হওয়াতে এক্ষণে তোমার অন্তরে পাপের সঞ্চার হইয়াছে, অতএব আমি অভিশাপ দিতেছি, তুমি শূদ্রযোনি প্রাপ্ত হইবে।” ধর্ম্ম তদীয় শাপ-প্রভাবে বিদুররূপে শূদ্রযোনিতে জন্মগ্রহণ করেন। বিদুরের শরীরে সাক্ষাৎ ধর্ম্ম আবির্ভূত আছেন। সূত গবল্গণ হইতে মুনিতুল্য সঞ্জয় সঞ্জাত হয়েন। কুন্তীর কন্যকাবস্থায় সূর্য্যের ঔরসে তদীয় গর্ভে মহাবল কর্ণ জন্মগ্রহণ করেন।
সর্ব্বলোক-পূজিত, জগৎকর্ত্তা, অনাদিনিধন নারায়ণ লোকদিগকে অনুগ্রহ করিবার নিমিত্ত বসুদেবের ঔরসে দেবকীর গর্ভে আবির্ভূত হয়েন। লোকে যাঁহাকে অব্যক্ত, অবিনাশী ব্রহ্ম, ত্রিগুণাত্মক, আত্মা, অব্যয়, প্রকৃতি, প্রভাব, প্রভু, পুরুষ, বিশ্বকর্ম্মা, সত্ত্বগুণসম্পন্ন, ধ্রুব, অক্ষর, অনন্ত, অচল, দেবহংস, নারায়ণ, বিধাতা, অজ, মোক্ষ-স্বরূপ এবং নির্গুণ বলিয়া নির্দ্দেশ করে; সেই সর্ব্বভূতপিতামহ ধর্ম্মসংবর্দ্ধনের নিমিত্ত অন্ধক-বৃষ্ণিবংশে অবতীর্ণ হয়েন। অস্ত্রজ্ঞ ও সর্ব্বশাস্ত্র-বিশারদ মহাবলপরাক্রান্ত সাত্যকি ও কৃতবর্ম্মা সত্যক ও হৃদিকের ঔরসে জন্মগ্রহণ করিলেন।
এক দ্রোণীতে অর্থাৎ কুম্ভে উগ্রতপা মহর্ষি ভরদ্বাজের রেতঃপাত হয়, তাহাতেই দ্রোণাচার্য্যের জন্ম হইল। অশ্বত্থামার জননী-কৃপী ও মহাবল পরাক্রান্ত কৃপ, শরৎকালীন শরস্তম্বে প্রসিক্ত গৌতমের রেতঃ হইতে উদ্ভূত হইলেন। দ্রোণাচার্য্য হইতে অশ্বত্থামা জন্মগ্রহণ করিলেন। প্রভূত-পরাক্রমশালী প্রদাপ্ত অনলসম তেজস্বী ধৃষ্টদ্যুন্ন দ্রোণ-বিনাশের নিমিত্ত ধনুগ্রহণপূর্ব্বক যজ্ঞবেদী হইতে আবির্ভুত হয়েন। ঐ যজ্ঞবেদী হইতে অলৌকিক রূপলাবণ্যবতী গুণবতী দ্রৌপদী জন্মগ্রহণ করেন। পরে প্রহ্লাদের শিষ্য নগ্নজিৎ ও সুবলের জন্ম হইল। গান্ধাররাজ সুবলের শকুনি নামে এক পুৎত্র ও দুর্য্যোধনের জননী গান্ধারী নামে কন্যা জন্মিল। কিন্তু দৈবকোপে শকুনি অধার্ম্মিক হইয়াছিল। রাজা ধৃতরাষ্ট্র ও মহাবলপরাক্রান্ত পাণ্ডু ব্যাসের ঔরসে মহারাজ বিচিত্রবীর্য্যের ক্ষেত্রে জন্মগ্রহণ করিলেন। দ্বৈপায়নের ঔরসে শূদ্রযোনিতে ধর্ম্মার্থবেত্তা ধীমান্ বিদুর জন্মিলেন। পাণ্ডু রাজার দুই স্ত্রীর গর্ভে পাঁচ পুৎত্র হয়। ধর্ম্ম হইতে যুধিষ্ঠির, বায়ু হইতে ভীম, ইন্দ্র হইতে সর্ব্বশাস্ত্র-বিশারদ অর্জ্জুন এবং অশ্বিনীতনয়দ্বয় হইতে অতি-রূপবান্ যমজ নকুল ও সহদেব। তন্মধ্যে যুধিষ্ঠির সর্ব্বাপেক্ষা অধিক গুণবান্ ছিলেন। ধীমান ধৃতরাষ্ট্রের দুর্য্যোধন প্রভৃতি একশত পুৎত্র জন্মে এবং তাঁহার যুযুৎসু ও করণ নামে আর দুই পুৎত্র জন্মিয়াছিল। তদনন্তর দুঃশাসন, দুঃসহ, দুর্ম্মর্ষণ, বিকর্ণ, চিত্রসেন, বিবিংশতি, জয়, সত্যব্রত, পুরুমিত্র, বৈশ্যাপুৎত্র, যুযুৎসু, এই একাদশ মহারথ জন্মিয়াছিলেন। অর্জ্জুনের ঔরসে সুভদ্রার গর্ভে অভিমন্যুর জন্ম হয়। অভিমন্যু কৃষ্ণের ভাগিনেয় ও মহাত্মা পাণ্ডুর পৌৎত্র। এক দ্রৌপদীর গর্ভে যুধিষ্ঠিরের ঔরসে প্রতিবিন্ধ্য, ভীমসেনের ঔরসে সুতসোম, অর্জ্জুনের ঔরসে শ্রুতকীর্ত্তি, নকুলের ঔরসে শতানীক এবং সহদেবের ঔরসে শ্রুতসেন, এই পঞ্চপুৎত্র জন্মে। ভীমের ঔরসে হিড়িম্বার গর্ভে ঘটোৎকচের জন্ম হয়। দ্রুপদ রাজার শিখণ্ডী-নাম্নী এক কন্যা জন্মে—স্থণ নামে এক যক্ষ আপন প্রিয়কার্য্য সম্পাদন করিবার অভিপ্রায়ে যাহাকে পুরুষ করিয়া রাখিয়াছিল। এতদ্ভিন্ন কুরুপাণ্ডবদিগের যুদ্ধে শত সহস্র রাজা সংগ্রাম-বাসনায় সমাগত হইয়াছিলেন। সেই অসংখ্যা রাজাগণের নাম অযুত বর্ষেও নির্দ্দেশ করা দুষ্কর; অতএব এই উপাখ্যানের মধ্যে যাঁহারা প্রধান, তাঁহাদিগেরই নাম কীর্ত্তিত হইল।

প্রাচীন রাজ্যসংস্থান
জনমেজয় কহিলেন, হে ব্রহ্মণ! যে সমস্ত রাজার নাম কীর্ত্তন করিলেন এবং যাঁহাদিগের নাম অকীর্ত্তিত রহিল, তাঁহাদিগের সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করি। হে মহাভাগ! সেই মহারথ দেবকল্প ভূপালেরা যে নিমিত্ত এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন, তাহার আদ্যোপান্ত সমুদয় বৃত্তান্ত বলুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! আপনি যাহা আদেশ করিতেছেন, এই রহস্য দেবতারাও জানেন কি না, সন্দেহ। এক্ষণে স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মাকে নমস্কার করিয়া সেই রহস্য আপনার নিকট নিবেদন করিতেছি, অবধান করুন। পূর্ব্বকালে পরশুরাম পৃথিবীকে একবিংশতিবার নিঃক্ষৎত্রিয়া করিয়া মহেন্দ্রপর্ব্বতে আরোহণপূর্ব্বক তপস্যায় মনোনিবেশ করেন। ভগবান্ ভার্গব ক্ষৎত্রিয়কুল ক্ষয় করিলে ক্ষৎত্রিয়রমণীগণ সুতার্থিনী হইয়া ব্রাহ্মণদিগের নিকট গমন করিলেন। ব্রাহ্মণগণ ঋতুকালে সমাগত ক্ষৎত্রিয়কুল-কামিনীগণের অভিলাষ পরিপূর্ণ করিতেন; কিন্তু কামতঃ বা ঋতু কালাতিক্রমে তাঁহাদিগের সহবাস করিতেন না। ক্ষৎত্রিয়াঙ্গনারা এইরূপে ব্রাহ্মণ-সহযোগে গর্ভবতী হইয়া যথাকালে সাতিশয় বীর্য্যবান্ পুৎত্র ও কন্যা-সকল প্রসব করিতে লাগিলেন। তাহাতেই ক্ষৎত্রিয়-বংশ পুনর্ব্বার ক্রমশঃ পরিবর্দ্ধিত হইল এবং ব্রাহ্মণ প্রভৃতি চারি বর্ণ পুনঃসংস্থাপিত হইল। তৎকালে তির্য্যগযোনি প্রভৃতি অন্যান্য প্রাণীগণও ঋতুকাল উপস্থিত হইলেই ভার্য্যা-সম্ভোগ করিত; কামতঃ বা ঋতুকালাতিক্রমে কদাচ স্ত্রীসংসর্গ করিত না। কেবল ঋতুকালে স্ত্রীসম্ভোগ করিলে যে সন্তান জন্মে, তাহারা ধর্ম্মপরায়ণ, নির্ব্ব্যাধি ও নিরাধি [মনঃপীড়াশূন্য] হইয়া দীর্ঘকাল জীবিত থাকে। ক্ষৎত্রিয়েরা পর্ব্বত-বন-সমাকীর্ণা এই সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর হইয়া ধর্ম্মানুসারে প্রজাপালন করিতে লাগিলেন দেখিয়া ব্রাহ্মণ প্রভৃতি বর্ণচতুষ্টয় সকলে অতিশয় প্রীত হইলেন। তাঁহারা কাম, ক্রোধ প্রভৃতি দুষ্প্রবৃত্তির বশীভূত না হইয়া দোষাশ্রিত ব্যক্তিদিগের প্রতি ধর্ম্মতঃ দণ্ডবিধানে তৎপর হইলেন এবং তাঁহাদিগের ধর্ম্ম পরায়ণতাপ্রযুক্ত দেবরাজ ইন্দ্র যথাকালে বারিবর্ষণ করিয়া প্রজাপালন করিতে লাগিলেন। হে মহারাজ! তৎকালে লোকের অকাল মৃত্যু হইত না বা যৌবনকাল আগত না হইলে কেহ দারপরিগ্রহ করিত না। এইরূপে সসাগরা ধরা দীর্ঘজীবী প্রজাপুঞ্জে পরিপূর্ণ হইল। সেই সময়ে ক্ষৎত্রিয়েরা প্রচুর ধনদানপূর্ব্বক যজ্ঞানুষ্ঠান করিতেন। ব্রাহ্মণগণ বেদ, বেদাঙ্গ, উপনিষৎ প্রভৃতি অধ্যয়ন করিতেন, তাঁহারা কদাচ বেদ বিক্রয় বা শূদ্রসন্নিধানে বেদোচ্চারণ করিতেন না। বৈশ্যেরা বলবান্ বলীবর্দ্দ দ্বারাই কৃষিকর্ম্ম করিত, দুর্ব্বল গো-সকলকে ভারবহন কার্য্যে নিযুক্ত না করিয়া তাহাদিগকে প্রতিপালন করিত। ফেনপায়ী বৎস সত্ত্বে [বৎসের মুখে ফেন থাকা পর্য্যন্ত] কেহ গো দোহন করিত না; বণিকেরা কূট-পরিমাণে [কম ওজনে] দ্রব্য-সামগ্রী বিক্রয় করিত না। সকল লোকেই ধর্ম্মপরায়ণ ও সদাচারতৎপর ছিল। তৎকালে ধর্ম্মের কিছুমাত্র অপচয় হয় নাই। নারীগণ ও ধেনুগণ যথাকালে সন্তান প্রসব করিত। তরুমণ্ডলী যথাসময়ে ফলপুষ্পে পরিপূর্ণ হইত। সত্যযুগে পৃথিবী এইরূপ বহুসংখ্যক লোকে সমাকীর্ণ হয়।
মনুষ্যলোকের অভ্যুদয়কালে রাজাদিগের ক্ষেত্রে অসুরেরা জন্মগ্রহণ করিতে আরম্ভ করিল। অসুরেরা সুরগণ কর্ত্তৃক বহুশঃ ;পরাজিত এবং ঐশ্বর্য্য ও স্বর্গ হইতে দূরীকৃত হইয়া ধরাতল আশ্রয় করিতে লাগিল। তাহারা ভূলোকে দেবতুল্য প্রভাব অভিলাষ করিয়া গো, মৃগ, হস্তী, অশ্ব, গর্দ্দভ, উষ্ট্র, মহিষ, রাক্ষস প্রভৃতি ভূতযোনিতে উৎপন্ন হইতে লাগিল। জাত ও জায়মান অসুরের ভরে ধরামণ্ডল আপনাকে ধারণ করিতে অক্ষম হইল। অনন্তর দনুর ঔরসে দিতির গর্ভে কতকগুলি অসুর জন্মিল। প্রবলপরাক্রান্ত অতি দুর্দ্দান্ত মদোৎসিক্ত দানবেরা এইরূপে সসাগরা পৃথিবাব্যাপিয়া ব্রাহ্মণ, ক্ষল্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এই চারিবর্ণ ও অন্যান্য প্রাণীগণকে নানাপ্রকারে উৎপীড়ন করিতে আরম্ভ করিল। তাহারা দলবদ্ধ হইয়া প্রাণীদিগকে নিহত ও আহত করিয়া আশ্রমবাসী মহর্ষিদিগের উপর বহুবিধ উপদ্রব করিত এবং পৃথিবীর চারিদিকে ভ্রমণ করিয়া সর্ব্বদা লোকের অনিষ্ট-চেষ্টা করিত।
ভূভার হরণের মন্ত্রণা
হে মহারাজ! তৎকালে অনন্তদেবও দৈত্যভারাক্রান্ত সসাগরা সপর্ব্বতা ধরা ধারণ করিতে অসমর্থ হইলেন। পরে বসুমতী নিতান্ত শঙ্কিতা হইয়া সর্ব্বভূত-পিতামহ ব্রহ্মার শরণাগত হইলেন। ধরণী তথায় উপনীত মহানুভব দেব, দ্বিজ ও মহর্ষিগণে পরিবৃত, গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরাগণ কর্ত্তৃক সেবিত, অবিনাশী, সৃষ্টিকর্ত্তা ব্রহ্মাকে দেখিলেন এবং তাঁহার সম্মুখীন হইয়া প্রণাম করিলেন। শরণার্থিনী অবনী সমাগত সমস্ত লোকপালদিগের সমক্ষে ব্রহ্মাকে আত্মসংবাদ নিবেদন করিলেন। সর্ব্বান্তর্য্যামী ভগবান্ ব্রহ্মা ইতিপূর্ব্বেই ভূমির অভিপ্রায় অবগত হইয়াছিলেন। বিশ্বনির্ম্মাতা সর্ব্বদা সকল লোকের মনোমন্দিরে জাগরূক আছেন; সুতরাং তাঁহার পৃথিবীর অভিপ্রায় জানা নিতান্ত বিস্ময়কর ব্যাপার নহে। তখন তিনি পৃথিবীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “হে বসুন্ধরে! তুমি যে কারণে আমার শরণাপন্ন হইয়াছ, আমি তোমার সেই বিপদ্-নিরাকরণের নিমিত্ত দেবতাদিগকে নিয়োগ করিব।” এইরূপ সান্ত্বনাবাক্যে পৃথিবীকে বিদায় করিয়া ভূতভাবন ভগবান্ ব্রহ্মা দেবগণকে আদেশ করিলেন; “তোমরা ভূমির ভার-হরণ ও অসুরদিগের অনিষ্ট-সাধন করিবার নিমিত্ত অংশক্রমে ভূতলে জন্মগ্রহণ কর” এবং গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরাগণকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, “তোমরা নরলোকে যাইয়া উদ্ভুত হও।” সুরগুরু ব্রহ্মার এই হিতকর বাক্য শুনিয়া ইন্দ্রাদি দেবগণ তাহাতে সম্মতি প্রদান করিলেন এবং পৃথিবীতে অবতীর্ণ হইতে কৃতনিশ্চয় হইয়া বৈকুণ্ঠে নারায়ণের নিকট উপনীত হইলেন। ইন্দ্র ভগবান্ চক্রপাণিকে ভূভারহরণের নিমিত্ত জিজ্ঞাসা করিলে তিনি তাঁহাদিগকে অংশক্রমে ভূতলে অবতীর্ণ হইতে পরামর্শ দিলেন।
আদিবংশাবতরণিকা সমাপ্ত।

সম্ভবপর্ব্ব—ব্রহ্মর্ষিবংশ
বৈশম্পায়ন কহিলেন, দেবরাজ ইন্দ্র নারায়ণের সহিত এইরূপ মন্ত্রণা করিয়া দেবগণকে অংশক্রমে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হইতে আদেশ দিলেন। হে রাজন্! তদনন্তর দেবগণ অসুরবিনাশ দ্বারা প্রজাগণের হিতসাধন করিবার মানসে স্বর্গ হইতে অবতীর্ণ হইয়া স্বেচ্ছাক্রমে কেহ ব্রহ্মর্ষিবংশে, কেহ বা রাজর্ষিবংশে জন্মগ্রহণ করিলেন। তাঁহারা বাল্যকালেই এরূপ বলিষ্ঠ হইয়া উঠিলেন যে, দানব, গন্ধর্ব্ব, পন্নগ, রাক্ষস ও নরমাংসলোলুপ অন্যান্য জন্তুগণকে অবলীলাক্রমে বধ করিতে লাগিলেন।
জনমেজয় কহিলেন, “হে মুনিসত্তম! আমি দেব, দানব, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরা, মানব ও যক্ষ-রাক্ষস প্রভৃতি অন্যান্য জীবগণের জন্মবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শুনিতে বাসনা করি. অনুগ্রহ করিয়া সবিস্তর বর্ণন করুন।
দেবাসুর-বংশবর্ণন
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! আমি ভগবান্ স্বয়ম্ভূকে [ব্রহ্মা] নমস্কার করিয়া সুরাসুর প্রভৃতির জন্মমরণ-বৃত্তান্ত সবিশেষরূপে বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন। সর্ব্বলোক-পিতামহ ব্রহ্মার মরীচি. অত্রি, অঙ্গিরা, পৌলস্ত্য, পুলহ ও ক্রতু নামে ছয় মানস-পুৎত্র জন্মেন। মরীচির পুৎত্র কশ্যপ; কশ্যপ হইতেই এই সমস্ত প্রজার সৃষ্টি হইয়াছে। হে মনুজশ্রেষ্ঠ! অদিতি, দিতি, দনু, কালা, দনায়ু, সিংহিকা, ক্রোধা, প্রধা, বিশ্বা, বিনতা, কপিলা, মুনি ও কদ্রু এই এয়োদশ দক্ষকন্যা কশ্যপের ভার্য্যা ছিলেন। ইঁহাদের গর্ভে কশ্যপের মহাবলপরাক্রান্ত অসংখ্য সন্তান সমুৎপন্ন হয়। হে রাজন! অদিতির গর্ভে যথাক্রমে ধাতা, মিত্র, অর্য্যমা, শক্র, বরুণ, অংশ, ভগ, বিবস্বান্, পূষা, সবিতা, ত্বষ্টা ও বিষ্ণু নামে দ্বাদশ আদিত্য জন্মেন। আদিত্যগণের সর্ব্বকনিষ্ট বিষ্ণু সর্ব্বাপেক্ষা গুণজ্যেষ্ঠ। দিতির গর্ভে একমাত্র পুৎত্র জন্মে। তাহার নাম হিরণ্যকশিপু। হিরণ্যকশিপুর পঞ্চ পুৎত্র;—প্রহ্লাদ, সংহ্লাদ, অনুহ্লাদ, শিবি ও বাষ্কল; ইঁহারা সকলেই সুবিখ্যাত ছিলেন। প্রহ্লাদের তিন পুৎত্র;—বিরোচন, কুম্ভ ও নিকুম্ভ। বিরোচনের পুৎত্র বলি, ইনি ভুবনবিশ্রুত ছিলেন। বলির পুৎত্র মহাবলপরাক্রান্ত বাণ। ইনি বহুকালাবধি ভূতনাথ ভবানীপতির আরাধনা করিয়া মহাকাল নামে বিখ্যাত হন। প্রথম, রাজা, বিপ্রচিত্তি; মহাযশা:, শম্বর, নমুচি, পুলোমা, বিশ্রুত, অসিলোমা, কেশী, দুর্জ্জয়, দানবন, অয়ঃশিরাঃ, অশ্বশিরাঃ, অশ্বশঙ্কু, বীর্য্যবান্, গগনমূর্দ্ধা, বেগবান্, কেতুমান, স্বর্ভানু, অশ্ব, অশ্বপতি, বৃষপর্ব্বা, জ্জক, অশ্বগ্রীব, সূক্ষ্ণ, তুহুণ্ড, মহাবল, একপাদ, একচক্র, বিরূপাক্ষ, মহোদর, নিচন্দ্র, নিকুম্ভ, কুপট, কপট, শরভ, শলভ, সূর্য্য, চন্দ্রমাঃ, এই চত্বারিংশৎ পুৎত্র দনুর গর্ভে জন্মে। একাক্ষ, অমৃতপ, প্রলম্ব, নরক, বাতাপি, শত্রুতাপন, শঠ, গরিষ্ঠ, চ্যবনায়ু, দীর্ঘজিহ্ব এই দশ দানবের পুৎত্র পৌৎত্রাদি অসংখ্য। চন্দ্রার্কবিদ্বেষী রাহু, সুচন্দ্র, চন্দ্রহন্তা ও চন্দ্রমর্দ্দন, এই কয়েকটি পুৎত্র সিংহিকার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। সিংহিকা ক্রুরস্বভাবা ছিলেন, এই নিমিত্ত তাঁহার পুৎত্র-পৌৎত্রগণ ক্রোধপরবশ, ক্রুরকর্ম্মা ও অরিমর্দ্দন বলিয়া লোকে বিখ্যাত। দনায়ুর চারি পুৎত্র;—বিক্ষর, বল, বীর, ও বৃত্র। বিনাশন, ক্রোধ, ক্রোধহন্তা, শত্রু প্রভৃতি শমনসদৃশ প্রহর্ত্তা দানবেরা কালার পুৎত্র। ইঁহারা সকলেই মহাবলপরাক্রান্ত ও অরিমর্দ্দন ছিলেন। ঋষিপুৎত্র শুক্র অসুরগণের উপাধ্যায় ছিলেন।
অসুরগুরু শুক্রের বংশ
শুক্রের চারি পুৎত্র;— ত্বষ্টাধর, অত্রি এবং অপর দুইজন। ইঁহারা চারি জনেই সূর্য্যসম তেজস্বী ও ব্রহ্মলোকপরায়ণ ছিলেন। ইঁহারাই অসুরগণের যাজনক্রিয়া সমাধা করিতেন। হে রাজন! পুরাণে যেরূপ শ্রুত আছে, তদনুসারে দেবাসুরগণের বংশ কীর্ত্তন করিলাম। কিন্তু যে যে দেবতা বা দানবের নামোল্লেখ করিলাম, তাঁহাদের পুৎত্র-পৌৎত্রাদি অসংখ্য। অশেষরূপে তাঁহাদিগের নাম নির্দ্দেশ করা অতিশয় দুঃসাধ্য।
তির্য্যক্প্রাণী প্রভৃতির জন্মক্রম
তার্ক্ষ্য, রিষ্টনেমি, গরুড়, অরুণ, আরুণি ও বারুণি, ইঁহারা বিনতার পুৎত্র। শেষ, অনন্ত, বাসুকি, তক্ষক, কূর্ম্ম ও কুলিক, ইঁহারা কদ্রুর পুৎত্র। ভীমসেন, সুপর্ণ, বরুণ, গোপতি, ধৃতরাষ্ট্র, সূর্য্যবর্চ্চাঃ, সত্যবাক্, অর্ক, পর্ণ, প্রযুত, ভীম, চিত্ররথ, শালিশিরাঃ, পর্জ্জন্য, কলি, নারদ এই ষোড়শ পুৎত্র মুনির গর্ভে জন্মেন। ইঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ দেবতা, কেহ কেহ গন্ধর্ব্ব। প্রধার গর্ভে অনবদ্যা, মনু, বংশা, অসুরা, মার্গণপ্রিয়া, অনূপা, সুভগা ও ভাসী এই কয়েকটি কন্যা এবং সিদ্ধ, পূর্ণ, বহী, পূর্ণায়ু, ব্রহ্মচারী, রতিগুণ, সুপর্ণ, বিশ্বাবসু, ভানু ও প্রচন্দ্র এই দশপুৎত্র জন্মগ্রহণ করেন। পুরাণে কথিত আছে, মহাভাগা প্রধাদেবী দেবর্ষির ঔরসে পরম-পবিত্র সুবিখ্যাত অপ্সরোবংশে সমুৎপন্ন হয়েন। অলম্বুষা, মিশ্রকেশী, বিদ্যুৎপর্ণা, তিলোত্তমা, অরুণা, রক্ষিতা, রম্ভা, মনোরমা, কেশিনী, সুবাহু, সুরতা, সুরজা ও সুপ্রিয়া এই কয়েকটি কন্যা এবং অতিবাহু, হাহা, হূহূ, তুম্বুরু প্রভৃতি গন্ধর্ব্বগণ ও ব্রাহ্মণ, অমৃত, গো গন্ধর্ব্ব প্রভৃতি নানাবিধ অপত্য কপিলা হইতে সমুৎপন্ন হয়। হে রাজন্! আমি তোমার নিকট গন্ধর্ব্ব অপ্সরা, ভুজঙ্গ, সুপর্ণ, রুদ্র, মরুৎ এবং গোব্রাহ্মণ প্রভৃতি সমস্ত জীবগণের জন্মবৃত্তান্ত বর্ণন করিলাম। যে ব্যক্তি অসূয়াশূন্য হৃদয়ে এই শ্রবণানন্দদায়ক সর্ব্বপ্রাণীগণের জন্মবৃত্তান্ত শ্রবণ করে ও অন্যকে শুনায়, তাহার আয়ুঃ, পুণ্য ও যশঃ বৃদ্ধি হয়। আর যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণগণ-সন্নিধানে নিয়মপূর্ব্বক ইহা পাঠ করে, তাহার ইহকালে ধন ও যশঃ এবং পরকালে সদ্গতি লাভ হয়।

রুদ্রাদি সৃষ্টিবিস্তার
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ! পূর্ব্বে আপনাকে কহিয়াছি যে, মরীচি প্রভৃতি অতিবীর্য্যবান্ ছয়জন ব্রহ্মর্ষি ব্রহ্মার মানস-পুৎত্র। মৃগব্যাধ, সর্প, নির্ঋতি, অজৈকপাদ্, অহি, বুধ্ন্য, পিনাকী, দহন, কপালী, স্থাণু ও ভর্গ স্থাণুর এই একাদশ পুৎত্র; ইঁহাদিগকেই একাদশ রুদ্র কহে। অঙ্গিরার তিন পুৎত্র;— বৃহস্পতি, উতথ্য ও সংবর্ত্ত; ইঁহারা সর্ব্বলোকবিখ্যাত। হে নরনাথ! শ্রুত আছে, অত্রির অনেক পুৎত্র; তাঁহারা সকলেই বেদজ্ঞ, সিদ্ধ ও শমগুণাবলম্বী মহর্ষি। হে নরশ্রেষ্ঠ! রাক্ষস, বানর, কিন্নর ও যক্ষগণ ধীমান্ পুলস্ত্যের পুৎত্র। শলভ, সিংহ, কিংপুরুষ, ব্যাঘ্র ও ঈহামৃগগণ পুলহ হইতে সমুৎপন্ন হয়। ক্রতুর পুৎত্রগণ স্বীয় পিতার সদৃশ প্রতাপশালী, সূর্য্যসহচারী, ত্রিভুবনবিশ্রুত ও সত্যনিষ্ঠ ছিলেন। হে ধরানাথ! শান্তিগুণাবলম্বী, তপঃপরায়ণ, ভগবান্ দক্ষ-ঋষি ব্রহ্মার দক্ষিণ অঙ্গুষ্ঠ হইতে ও তাঁহার পত্নী প্রজাপতির বামাঙ্গুষ্ঠ হইতে উৎপন্ন হয়েন। মহর্ষি দক্ষ ঐ ভার্য্যার গর্ভে পঞ্চাশৎ কন্যা উৎপাদন করেন। মহর্ষির পুৎত্র জন্মে নাই, এই নিমিত্ত তিনি ঐ সকল সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী কন্যাগণকে পুৎত্রিকা করিয়াছিলেন। হে রাজন! মহর্ষি দক্ষ ঐ পঞ্চাশটি কন্যার মধ্যে ধর্ম্মকে দশটি, কশ্যপকে ত্রয়োদশটি ও চন্দ্রকে সাতাইশটি বেদ-বিধানানুসারে সম্প্রদান করেন। ধর্ম্ম, চন্দ্র ও কশ্যপের ধর্ম্মপত্নীদিগের নাম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। কীর্ত্তি, লক্ষ্মী, ধৃতি, মেধা, পুষ্টি, শ্রদ্ধা, ক্রিয়া, বুদ্ধি, লজ্জা ও মতি এই দশটি ধর্ম্মের পত্নী। লোকবিশ্রুতা সময়বোধিকা নক্ষত্ররূপিণী অশ্বিনী, ভরণী প্রভৃতি সাতাইশটি চন্দ্রের ভার্য্যা। সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার পুৎত্র মনু। মনুর পুৎত্র প্রজাপতি। ধর, ধ্রুব, সোম, অহঃ, অনিল, অনল, প্রত্যুষ ও প্রভাস এই অষ্টবসু প্রজাপতি হইতে সমুৎপন্ন হয়েন। ইঁহাদিগের মধ্যে ধর ও ব্রহ্মবিৎ ধ্রুব ধূম্রার গর্ভে জন্মেন; সোম মনস্বিনীর গর্ভে, অহঃ রতার গর্ভে অনিল শ্বাসার গর্ভে অনল শাণ্ডিল্যার গর্ভে এবং প্রত্যূষ ও প্রভাস প্রভাতার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। ধরের দুই পুৎত্র;—দ্রবিণ ও হুতহব্যবহ। সংহারকর্ত্তা ভগবান্ কাল ধ্রুবের পুৎত্র। সোমের পুৎত্র বর্চ্চাঃ, যদ্দ্বারা লোক বর্চ্চস্বী হয়। শিশির, প্রাণ ও রমণ ইঁহারা মনোহরার পুৎত্র। জ্যোতিঃ, শম, শান্ত ও মুনি ইঁহারা অহের ঔরসে জন্মেন। শরবনবাসী শ্রীমান্ কুমার অগ্নির পুৎত্র। শাখ, বিশাখ ও নৈগমেয় এই তিনজন কার্ত্তিকেয়ের অনুজ। কুমার কৃত্তিকা কর্ত্তৃক পালিত হইয়াছিলেন বলিয়া কার্ত্তিকেয় নামে বিখ্যাত হইয়াছেন। অনিলের ভার্য্যা শিবা, তাঁহার গর্ভে মনোজব ও অবিজ্ঞাতগতি নামে অনিলের দুই পুৎত্র জন্মে। দেবল ঋষি প্রত্যুষের পুৎত্র। দেবলের দুই পুৎত্র, তাঁহারা সাতিশয় ক্ষমাবান্ ও বিদ্বান ছিলেন। বৃহস্পতির ভগিনী ব্রহ্মবাদিনী যোগাসক্তা বরস্ত্রী সমস্ত পৃথিবী পরিভ্রমণ করেন। ইঁহার গর্ভে অষ্টম বসু প্রভাসের ঔরসে শিল্পপ্রজাপতি দেবসূত্রধর বিশ্বকর্ম্মা জন্মগ্রহণ করেন। ইনি সর্ব্বশিল্পকরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। দেবতাদিগের সমুদয় অলঙ্কার ও বিমানাদি বিশ্বকর্ম্মা নির্ম্মাণ করেন। ইঁহার শিল্পকার্য্য উপজীব্য করিয়া মনুষ্যেরা জীবিকা নির্ব্বাহ করে এবং শিল্পোপজীবী লোকেরা সেই অক্ষয় বিশ্বকর্ম্মাকে পূজা করিয়া থাকে।
সর্ব্বলোক-সুখাবহ ভগবান্ ও ধর্ম্ম নরকলেবর ধারণপুরঃসর ব্রহ্মার দক্ষিণস্তন ভেদ করিয়া বিনির্গত হয়েন। ধর্ম্মের তিন পুৎত্র;—শম, কাম ও হর্ষ। শমের পত্নী প্রাপ্তি, কামের স্ত্রী রতি ও হর্ষের ভার্য্যা নন্দা; ইঁহাদিগকে অবলম্বন করিয়া লোকযাত্রা নির্ব্বাহ হইতেছে। ঘোটকী-রূপধারিণী ত্বাষ্ট্রী সবিতার স্ত্রী। ইনি অন্তরীক্ষে অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে প্রসব করেন। হে রাজন্! মরীচির পুৎত্র কশ্যপ হইতে সুরাসুরগণ জন্মেন। অতএব ভগবান্ কশ্যপ হইতেই সমস্ত লোকের উৎপত্তি হইয়াছে বলিতে হইবে।
অদিতির গর্ভে ইন্দ্রাদি দ্বাদশ পুৎত্র জন্মেন; সর্ব্বজগৎ পালনকর্ত্তা ভগবান্ বিষ্ণু তাঁহাদিগের সর্ব্বকনিষ্ঠ। রুদ্র, সাধ্য, মরুৎ, বসু, ভার্গব ও বিশ্বদেব এই নবতি দেবতার নাম কার্ত্তীত হইল। এক্ষণে ইঁহাদের বংশাবলী পক্ষ ও গণ কীর্ত্তন করিতেছি। বিনতানন্দন গরুড় ও বলবান্ অরুণ এবং বৃহস্পতি ইঁহারা আদিত্যমধ্যে পরিগণিত। অশ্বিনীকুমারদ্বয়, গুহ্যকগণ, যাবতীয় ওষধি ও সমস্ত পশুগণ দেবতামধ্যে পরিগণিত। লোকে আনুপূর্ব্বিক ইঁহাদের নাম কীর্ত্তন করিলে সর্ব্বপাপ হইতে বিমুক্ত হয়। ভগবান্ ভৃগু ব্রহ্মার হৃদয়দেশ ভেদ করিয়া বিনির্গত হয়েন। ভৃগুর পুৎত্র শুক্র, ইনি পরম প্রাজ্ঞ ও কবিশ্রেষ্ঠ। যিনি ত্রৈলোক্যের প্রাণযাত্রার্থে বর্ষাবর্ষ [বর্ষলক্ষণ—অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টি] ও ভয়াভয় বিষয়ে ভগবান্ স্বয়ম্ভূ কর্ত্তৃক নিযুক্ত হইয়া ত্রিভুবন ভ্রমণ করিতেছেন, সেই অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন যোগাচার্য্য শুক্রাচার্য্য দৈত্যগণের গুরু। তিনি যোগক্ষেম [সাংসারিক মঙ্গল —সংসারযাত্রানির্ব্বাহ] সম্পাদনার্থে বিধাতা কর্ত্তৃক নিযুক্ত হইলে ভগবান্ ভৃগু চ্যবন্ নামে আর এক পুৎত্র উৎপাদন করেন। তিনি স্বীয় জননীর দুঃখ মোচনের নিমিত্ত ক্রোধভরে গর্ভ হইতে বহির্গত হয়েন। মনুর কন্যা আরুষী বিচক্ষণ চ্যবনের ভার্য্যা। আরুষীর উরুদেশ ভেদ করিয়া ঔর্ব্ব নামে এক পুৎত্র নির্গত হয়েন। ইনি বাল্যকালেই সাতিশয় তেজঃশালী, মহাবলপরাক্রান্ত ও নানা গুণযুক্ত হইয়াছিলেন। ঔর্ব্বেরপুৎত্র ঋচীকের পুৎত্র জমদগ্নি। মহাত্মা জমদগ্নির চারি পুল। রাম [পরশুরাম] তাঁহাদের সর্ব্বকনিষ্ঠ; কিন্তু সর্ব্বাপেক্ষা গুণজ্যেষ্ঠ সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ ও ক্ষৎত্রিয়কুলান্তক। ঔর্ব্বপুৎত্র ঋচীকের জমদগ্নি প্রভৃতি একশত পুৎত্র। সেই শত পুৎত্রের সহস্র সহস্র পুৎত্রগণ পৃথিবীতে ব্যাপ্ত হইয়াছেন এবং তাঁহার ধাতা ও বিধাতা নামে অপর দুই পুৎত্র আছেন; পদ্মালয়া লক্ষ্মী তাঁহাদের ভগিনী। আকাশগামী তুরঙ্গমগণ লক্ষ্মীর মানস-পুৎত্র। বরুণের জ্যেষ্ঠা ভার্য্যা শুক্রাদেবী, তাঁহার গর্ভে বল নামে পুৎত্র ও সুরানাম্নী কন্যা জন্মে। অন্নার্থী প্রজাগণের পরস্পর ভক্ষণ হইতে সর্ব্বভূত নাশনকারী অধর্ম্মের জন্ম হয়। অধর্ম্মের ভার্য্যা নির্ঋতি; নির্ঋতির গর্ভে রাক্ষসগণের জন্ম হয়, এই নিমিত্ত উহারা নৈর্ঋত নামে বিখ্যাত। অধর্ম্মের নিরন্তর পাপকারী তিন পুৎত্র;—ভয়,মহাভয় ও ভূতান্তক মৃত্যু।

নৃপগণের জন্ম ও কর্ম্ম
জনমেজয় বৈশম্পায়নকে কহিলেন, হে ভগবন্! দেব, দানব, গন্ধর্ব্ব, রাক্ষস, সিংহ, ব্যাঘ্র, মৃগ, সর্প, বিহঙ্গম প্রভৃতি সমুদয় জীবগণ কি উদ্দেশে মনুষ্যলোকে জন্মগ্রহণ করেন ও তাঁহারা মনুষ্যলোকে জন্মিয়া কি কি কর্ম্ম করিয়াছেন, এই সমুদয় আনুপূর্ব্বিক শ্রবণে আমার সাতিশয় বাসনা হইতেছে, মহাশয়! অনুগ্রহ করিয়া কীর্ত্তন করুন। বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! মনুষ্যলোকে যে যে দেবগণ ও দানবগণ জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, অগ্রে তাঁহাদের বিষয় কহিতেছি, শ্রবণ করুন। বিপ্রচিত্তি নামে যে দানবেন্দ্র ছিলেন, তিনি মর্ত্ত্যলোকে জন্মগ্রহণ করিয়া জরাসন্ধ নামে বিখ্যাত হয়েন। হিরণ্যকশিপু নামে যে দিতির পুৎত্র তিনি নরলোকে জন্মিয়া শিশুপাল নামে বিখ্যাত হয়েন। প্রহ্লাদের অনুজ ভ্রাতা সংহ্লাদ পৃথিবীতে জন্মিয়া শল্য নামে বাহ্লীক দেশের অধীশ্বর হয়েন। অনুহ্লাদ নামে প্রহ্লাদের অপর এক অনুজ নরলোকে জন্মিয়া মহারাজ ধৃষ্টকেতু নামে বিখ্যাত হয়েন। শিবি নামে দিতিপুৎত্র ভূমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করিয়া মহারাজ দ্রুম নামে বিখ্যাত হয়েন। বাষ্কলনামা অসুররাজ ভূতলে জন্মিয়া ভগদত্ত নামে বিখ্যাত হয়েন। অয়ঃশিরা, অশ্বশিরা, অয়ঃশঙ্কু, গগনমূর্দ্ধা ও বেগবান্ এই পাঁচ মহাবল-পরাক্রান্ত মহাসুর কেকয়-দেশে জন্মিয়া অতি প্রধান প্রধান ভূপতি হয়েন। কেতুমান নামে মহাপ্রতাপবান্ অসুর ভূমণ্ডলে জন্মিয়া অমিতৌজাঃ নামে অতি নির্দ্দয় নরপতি হয়েন। স্বর্ভানু-নামা সুবিখ্যাত দানব উগ্রসেন নামে অতি নৃশংস ভূপতি হয়েন। ভুবনবিখ্যাত অশ্ব নামে মহাসুর অবনীমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করিয়া অশোক নামে বিখ্যাত হয়েন। ইনি অসাধারণ বলশালী ছিলেন। কোন ব্যক্তি কখন ইঁহাকে পরাজিত করিতে পারেন নাই। অশ্বপতি নামে অশ্বের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ভূমণ্ডলে হার্দ্দিক্য ভূপতি নামে বিখ্যাত হয়েন। বৃষপর্ব্বা নামে সুবিখ্যাত মহাসুর দীর্ঘপ্রজ্ঞ-নামা ভূপতি হয়েন। বৃশপর্ব্বার অনুজ অজক শাল্ব নামে সুবিখ্যাত মহীপাল হয়েন। যে বীর্য্যবান্ মহাসুর অশ্বগ্রীব নামে বিখ্যাত, তিনি অবনীমণ্ডলে রোচমান নামে সুবিখ্যাত নৃপতি হয়েন। সূক্ষ্ম-নামে অসুর ভূতলে বসুধাধিপ বৃহদ্রথ নামে বিখ্যাত হয়েন। দানবেন্দ্র তুহুণ্ড সেনাবিন্দু নামে মহীপতি হয়েন। ইযুপ নামে মহাবল-পরাক্রান্ত মহাসুর নগ্নজিৎ নামে প্রভুত প্রতাপশালী নরপতি হয়েন। একচক্র-নামা যে মহাসুর ছিলেন, তিনি ভূতলে জন্মগ্রহণ করিয়া প্রতিবিন্ধ্য নামে বিখ্যাত হয়েন। বিরূপাক্ষ নামে চিত্রযোধী দানবাগ্রণী ভূতলে জন্মিয়া চিত্রধর্ম্মা নামে সুবিখ্যাত নৃপতি হয়েন। শত্রুপক্ষক্ষয়কারী সুহরনামা দানব অবনীতলে সুবিখ্যাত বাহ্লীক নামে ভূপতি হয়েন। নিচন্দ্র নামে পরম সুন্দর দানব ভূতলে মহারাজ মুঞ্জকেশ নামে বিখ্যাত হয়েন। দিনকুম্ভ নামে যে মহাবলপরাক্রান্ত দানব ছিলেন, তিনি নরলোকে ভূপতিশ্রেষ্ঠ দেবাধিপ নামে বিখ্যাত হয়েন। শরভনামা মহাদানব রাজর্ষি পৌর নামে বিখ্যাত হয়েন। কুপদ নামে মহাবল পরাক্রান্ত মহাসুর সুপার্শ্ব নামে সুবিখ্যাত ভূপতি হয়েন। ক্রম নামে মহাসুর ধরাতলে জন্মিয়া পার্ব্বতেয় নামে বিখ্যাত হয়েন। ইঁহার কলেবর সুমেরু-পর্ব্বতের সদৃশ ছিল। শলভ নামে মহাসুর বাহ্লীকদেশে প্রহ্লাদ নামে নরপতি হয়েন। চন্দ্রসদৃশ রূপবান্ চন্দ্রনামক অসুর মর্ত্ত্যলোকে জন্মগ্রহণ করিয়া কাম্বোজ-দেশাধিপতি চন্দ্রবর্ম্মা নামে সুবিখ্যাত ভূপতি হয়েন। অর্ক নামে যে সুবিখ্যাত দানবশ্রেষ্ঠ ছিলেন, তিনি মর্ত্ত্যলোকে রাজর্ষি ঋষিক বলিয়া বিখ্যাত হয়েন। মৃতপা নামে দানবেন্দ্র ভূতলে পশ্চিমানুপক নামে প্রথিত হয়েন। গরিষ্ঠ নামে ত্রিভুবন-বিখ্যাত মহাবল-পরাক্রান্ত মহাসুর নরলোকে দ্রুমসেন নামে বিখ্যাত নৃপতি হয়েন। ময়ুরনামা শ্রীমান্ মহাসুর ধরাতলে বিশ্ব নামে ভুপতি হয়েন। সুপর্ণ নামে তাঁহার সহোদর অবনীমণ্ডলে কালকীর্ত্তি নামে মহীপাল হয়েন। অসুরপ্রধান চন্দ্রহন্তা রাজর্ষি শুনক নামে বিখ্যাত হয়েন। যে দানব বিনাশন বলিয়া বিখ্যাত ছিলেন, তিনি ভূতলে জানকি নামে বিখ্যাত ভূপাল হয়েন। দীর্ঘজিহ্ব নামে দানবশ্রেষ্ঠ পৃথিবীতে কাশীরাজ নামে বিখ্যাত হয়েন। চন্দ্রসূর্য্য মর্দ্দনকারী যে ক্রুরগ্রহ সিংহিকাগর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তিনি ক্রাথ নামে বিখ্যাত ভূপতি হয়েন। অনায়ুর চারি পুৎত্রের মধ্যে সর্ব্বজ্যেষ্ঠ বিক্ষরনামক অসুর ভূমণ্ডলে বসুমিত্র নামে বসুধাধিপ হয়েন। দ্বিতীয় পাণ্ড্যরাষ্ট্রাধিপ নামে বিখ্যাত ভূপতি হয়েন। বলীন নামে সুবিখ্যাত অসুর ভূতলে পৌণ্ড্র মৎস্যক নামে ভূপতি হয়েন। মহাসুর বৃত্র রাজর্ষি মণিমান্ নামে প্রথিত হয়েন। মণিমানের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ক্রোধহন্তা দণ্ড নামে বিখ্যাত নৃপতি হয়েন। ক্রোধবর্দ্ধন নামে যে অসুর ছিলেন, তিনি দণ্ডাধার নামে সুবিখ্যাত নৃপতি হয়েন। কালেয়দিগের ব্যাঘ্রতুল্য বিক্রমশালী যে আট পুৎত্র ভূমণ্ডলে জন্মেন, তাঁহাদিগের সর্ব্বজ্যেষ্ঠ মগধদেশে জয়ৎসেন নামে সুবিখ্যাত নৃপতি হয়েন। দ্বিতীয় ইন্দ্রতুল্য পরাক্রমশালী ছিলেন, তিনি অপরাজিত নামে নৃপাল হয়েন। মহাতেজাঃ মহাবল-পরাক্রান্ত মহামায়াবী তৃতীয় নিষাদ দেশের অধিপতি হয়েন। চতুর্থ শ্রেণিমান্ নামে বিখ্যাত নৃপতি হয়েন। পঞ্চম মহৌজাঃ নামে শত্রুকুলান্তক নৃপতি হয়েন। তাঁহাদিগের মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান ষষ্ঠ মহাসুর অভীরুনামে সুবিখ্যাত রাজর্ষি হয়েন। সপ্তম সমস্ত অবনীমণ্ডলে সুবিখ্যাত সমুদ্রাসন নামে নরপতি হয়েন। কালেয়দিগের অষ্টম বৃহৎ নামে দানব ভূতলে সর্ব্বলোক-হিতৈষী পরমধার্ম্মিক ভূপতি হয়েন। কুক্ষি নামে মহাবল-পরাক্রান্ত মহাসুর ক্ষিতিতলে পার্ব্বতীয় নামে বিখ্যাত ভূপতি হয়েন। ইঁহার কলেবর কাঞ্চন-পর্ব্বতের সমান ছিল। মহাবীর্য্যসম্পন্ন মহাসুর ক্রথন সূর্য্যাক্ষ নামে বিখ্যাত হয়েন। সূর্য্য নামে পরম-সুন্দর মহাসুর বাহ্লীকদেশে দরদ নামে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ভূপতি হয়েন। হে রাজন! গণ নামে যে ক্রুদ্ধস্বভাব দানবের নাম পূর্ব্বে উল্লেখ করা গিয়াছে, তাঁহা হইতে অনেকানেক মহাবল-পরাক্রান্ত মহীপতি মহীতলে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। মদ্রক, কর্ণবেষ্ট, সিদ্ধার্থ, কীচক, সুবীর, সুবাহু, মহাবীর, বাহ্লীক, ক্রথ, বিচিত্র, সুরথ, নীল, চীরবাসাঃ ভূমিপাল, দন্তবক্র, দুর্জ্জয়, রুক্মী, আষাঢ়, বায়ুবেগ, ভূরিতেজা, একলব্য, সুমিত্র, বাটধান, গোমুখ, কারুষক, ক্ষেমমূর্ত্তি, শ্রুতায়ুঃ, উদ্বহ, বৃহৎসেন, ক্ষেম, অগ্রতীর্থ, কুহর, মতিমান্ ও ঈশ্বর এই সমস্ত মহাবীর্য্য, মহাযশাঃ ভূপতিগণ ক্ষিতিতলে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। মহাবল-পরাক্রান্ত মহাসুর কালনেমি উগ্রসেনের ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়া কংস নামে বিখ্যাত হয়েন। দেবরাজতুল্য দেবক নামে দানব ধরাতলে গন্ধর্ব্বপতি নামক প্রধান ভূপতি হয়েন।
কৌরবকুলের বিবরণ
হে ভরতকুল-তিলক! পবিত্রকীর্ত্তি দেবর্ষি বৃহস্পতির অংশে ভরদ্বাজবংশাবতংস অযোনিজ দ্রোণাচার্য জন্মেন। এই মহাত্মা অসাধারণ ধনুর্দ্ধর, অদ্বিতীয় পরাক্রমশালী, অতুল যশস্বী এবং বেদ ও ধনুর্ব্বেদে সুনিপুণ ছিলেন। মহাদেব, যম, কাম ও ক্রোধ এই চারি জনের সমষ্টিভূত অংশ হইতে মহাবীর অশ্বত্থামার জন্ম হয়। অষ্টবসুগণ বশিষ্ঠের শাপে নিয়ন্ত্রিত হইয়া ইন্দ্রের আদেশানুসারে শান্তনু রাজার ঔরসে গঙ্গাগর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। ভীষ্ম তাঁহাদের সর্ব্বকনিষ্ঠ। ইনি কুরুকুলের অভয়প্রদ, বুদ্ধিমান, বিদ্বান, সদ্বক্তা, শত্রুপক্ষক্ষয়কারী ও সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ ছিলেন। মহাত্মা ভীষ্ম জমদগ্নিনন্দন পরশুরামের সহিত যুদ্ধ করিয়া জয়লাভ করেন। অসাধারণ পুরুষকারসম্পন্ন যে ব্রহ্মর্ষি পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া কৃপ নামে বিখ্যাত হয়েন, তিনি একাদশ রুদ্রের অংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। শত্রুকুলান্তক মহারথ শকুনি দ্বাপরের অংশে জন্মেন। সত্যপ্রতিজ্ঞ, অরাতিকুলনাশক, বৃষ্ণিকুলতিলক সাত্যকি বায়ুদেবতাদিগের অংশে জন্মগ্রহণ করেন। সর্ব্বশাস্ত্রবেত্তা রাজর্ষি দ্রুপদ, ক্ষৎত্রিয়সত্তম নরনাথ কৃতবর্ম্মা ও পররাজ্য-প্রপীড়ক শত্রুনাশক ভূপতি বিরাট এই তিন ভূপতিও বায়ুর অংশে জন্মগ্রহণ করেন। অরিষ্টার পুৎত্র হংস কুরুকুলে জন্মগ্রহণ করিয়া গন্ধর্ব্বগণের রাজা হয়েন। দীর্ঘবাহু, মহাতেজাঃ, প্রজ্ঞাচক্ষু ভূপতি ধৃতরাষ্ট্র কৃষ্ণদ্বৈপায়নের ঔরসে জন্মেন। ইনি মাতৃদোষজন্য কৃষ্ণদ্বৈপায়নের কোপে জন্মান্ধ হয়েন। তৎকনিষ্ঠ পাণ্ডু, মহাবল, সত্যনিষ্ঠ ও ধর্ম্মপরায়ণ ছিলেন। ধীমান্ বিদুর অত্রি মুনির পুৎত্র। দুর্ম্মতি দুর্য্যোধন কলির অংশে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি অতি পাপাশয়, ক্রুর ও কুরুকুলের কলঙ্কস্বরূপ ছিলেন। যে কলি সমস্ত জগতের বিদ্বেষাস্পদ এবং যিনি জীবমাত্রের সংহারকর্ত্তা, তিনিই দুর্য্যোধনরূপে অবনীতলে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। এই দুর্য্যোধন হইতেই ভয়ঙ্কর বৈরাগ্নি উত্তেজিত হয়। পৌলস্ত্যেরা দুর্য্যোধনের ভ্রাতারূপে জন্মেন। দুঃশাসন, দুর্ম্মুখ, দুঃসহ প্রভৃতি দুর্য্যোধনের শত ভ্রাতা। ইঁহারাও অতিশয় ক্রুরকর্ম্মা। এই শত পুৎত্র ব্যতীত ধৃতরাষ্ট্রের বৈশ্যাগর্ভসম্ভূত অপর এক পুৎত্র জন্মেন। তাঁহার নাম যুযুৎসু।
জনমেজয় কহিলেন, ধৃতরাষ্ট্রের পুৎত্রদিগের মধ্যে কাহার কি কি নাম ও তাঁহারা কাহার পর কে জন্মেন, আনুপূর্ব্বিক কীর্ত্তন করুন। বৈশম্পায়ন কহিলেন, দুর্য্যোধন, যুযুৎসু, দুঃশাসন, দুঃসহ, দুঃশল, দুর্ম্মুখ, বিবিংশতি, বিকর্ণ, জলসন্ধ, সুলোচন, বিন্দ, অনুবিন্দ, দুর্দ্ধর্ষ, সুবাহু, সুপ্রধর্ষণ, দুর্ম্মর্ষণ, দুর্ম্মুখ, দুষ্কণ, কর্ণ, চিত্র, উপচিত্র, চিত্রাক্ষ, চারুচিত্র, অঙ্গদ, দুর্ম্মদ, দুষ্প্রহর্ষ, বিবিৎসু, বিকট, সম, ঊর্ণনাভ, পদ্মনাভ, নন্দ, উপনন্দ, সেনাপতি, সুসেন, কুণ্ডোদর, মহোদর, চিত্রবাহু, চিত্রবর্ম্মা, সুকর্ম্মা, দুর্ব্বিরোচন, অয়োবাহু, মহাবাহু, চিত্রচাপ, সুকুণ্ডল, ভীমবেগ, ভীমবল, বলাকী, ভীমবিক্রম, উগ্রায়ুধ, ভীমশর, কনকায়ুঃ, দৃঢ়ায়ুধ, দৃঢ়কর্ম্মা, দৃঢ়ক্ষৎত্র, সোমকীর্ত্তি, অনুদর, জরাসন্ধ, দৃঢ়সন্ধ, সত্যসন্ধ, সহস্রবাহু, উগ্রশ্রবাঃ, উগ্রসেন, ক্ষেমমূর্ত্তি, সেনানী, অপরাজিত, পণ্ডিতক, বিশালাক্ষ, দুরাধন, দৃঢ়হস্ত, সুহস্ত, বাতবেগ, সুবর্চ্চাঃ, আদিত্যকেতু, বহ্বাশী, নাগদত্ত, অগ্রযায়ী, কবচী, নিষঙ্গী, দণ্ডী, দণ্ডাধার, ধনুগ্রহ, উগ্র, ভীমরথ, বীর, বীরবাহু, অলোলুপ, অভয়, রৌদ্রকর্ম্মা, দৃঢ়রথ, অনাধৃষ্য, কুণ্ডভেদী, বিরাবী, দীর্ঘলোচন, দীর্ঘবাহু, মহাবাহু, ব্যূঢ়োরু, কনকাঙ্গদ, কুণ্ডজ ও চিত্রক, এই একশত পুৎত্র ও দুঃশলানাম্নী কন্যা ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসে জন্মেন। এতদ্ভিন্ন বৈশ্যার গর্ভে ধৃতরাষ্ট্রের যে পুৎত্র জন্মেন, তাঁহার নাম যুযুৎসু। ধৃতরাষ্ট্রের পুৎত্রগণের আনুপূর্ব্বিক নাম কীর্ত্তন করিলাম, ইঁহারা সকলেই বেদবেত্তা, রাজনীতি পারদর্শী ও যুদ্ধবিদ্যাবিশারদ এবং সকলেই স্বস্বানুরূপ দারপরিগ্রহ করিয়াছিলেন। রাজা ধৃতরাষ্ট্র সৌবলের অনুমতিক্রমে যথাকালে সিন্ধুদেশাধিপতি জয়দ্রথের সহিত দুঃশলার উদ্বাহক্রিয়া সম্পন্ন করিয়াছিলেন।
পাণ্ডববংশবর্ণন
হে নরনাথ! রাজা যুধিষ্ঠির ধর্ম্মের অংশে জন্মগ্রহণ করেন; ভীমসেন বায়ুর অংশে, অর্জ্জুন দেবরাজ ইন্দ্রের অংশে এবং সর্ব্বভূতমনোহর, অপ্রতিম রূপশালী নকুল ও সহদেব অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের অংশে জন্মেন। সুবিখ্যাত সোমতনয় বর্চ্চাঃ অর্জ্জুন-পুৎত্র অভিমন্যুরূপে জন্মগ্রহণ করেন। বর্চ্চার পৃথ্বীতলে অবতীর্ণ হইবার পূর্ব্বে ভগবান্ সোম দেবগণকে কহিলেন, “হে দেবগণ! এই পুৎত্র আমার প্রাণ হইতেও প্রিয়তর; অতএব ইহাকে দিতে আমি সম্মত নহি। তবে যদি তোমরা এই নিয়ম কর, তাহা হইলে প্রিয়পুৎত্রকে তোমাদিগের হস্তে সমর্পণ করিতে পারি। অসুরবধ কেবল দেবগণের কার্য্য নহে, উহাতে আমাদিগেরও সাহায্য করা কর্ত্তব্য। এই নিমিত্ত অগত্যা ইহাকে দিতে স্বীকৃত হইলাম, কিন্তু এই বর্চ্চাঃ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া চিরকাল থাকিতে পারিবেন না। হে অমরগণ! ইন্দ্রের অংশে পাণ্ডু রাজার অর্জ্জুন নামে অতি প্রতাপশালী যে পুৎত্র জন্মিবেন, বর্চ্চাঃ তাঁহারই পুৎত্র হইয়া পৃথ্বীতলে জন্মগ্রহণ করিবেন ও প্রসিদ্ধ অতিরথ গণনায় পরিগণিত হইয়া ষোড়শ বৎসর পৃথিবীতে অবস্থান করিবেন। হে দেবগণ! তোমরা অংশাবতার হইয়া যে সংগ্রামে অসুরনিপাত করিবে, উঁহার ষোড়শবর্ষ বয়ঃক্রম পূর্ণ হইবার অনতিকালপূর্ব্বেই ঐ যুদ্ধ উপস্থিত হইবে; কিন্তু সেই যুদ্ধে কৃষ্ণ ও অর্জ্জুন থাকিবেন না, কেবল তোমরা চক্রব্যূহ (দুর্গম-রণক্ষেত্র) সংস্থাপন করিয়া অসুরগণের সহিত যুদ্ধ করিবে। আমার এই পুৎত্র সমস্ত শত্রুপক্ষীয় সৈন্যগণকে বিমুখ করিবেন। ইনি দুর্ভেদ্য ব্যূহ ভেদ করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক দিনার্দ্ধভাগের মধ্যে সংগ্রামনিপুণ অতিরথ ও মহারথগণ এবং বিপক্ষপক্ষীয় চতুর্থাংশ সৈন্য শমনসদনে প্রেরণ করিবেন। তৎপরে দিবাবসানসময়ে সংগ্রামে নিহত হইয়া পুনরায় আমার সমীপে আগমন করিবেন। অভিমন্যুরূপী মদীয় পুৎত্রের যে পুৎত্র জন্মিবে, সেই পুৎত্র প্রনষ্টপ্রায় ভরতবংশের পুনরুদ্ধার করিবে।” দেবগণ ভগবান্ সোমের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া ‘তথাস্তু’ বলিয়া স্বীকার করিলেন এবং তাঁহার যথোচিত পূজা করিলেন। হে নরনাথ! তোমার পিতামহ এইরূপে অবনীমণ্ডলে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন।
হে মহারাজ! মহারথ ধৃষ্টদ্যুম্ন অগ্নির অংশে জন্মেন। রাক্ষসের অংশে স্ত্রীপূর্ব্বরূপী (পুরুষলক্ষণহীন) শিখণ্ড উৎপন্ন হন। দ্রৌপদীর গর্ভে যে পঞ্চপুৎত্র জন্মেন, তাঁহারা পূর্বজন্মে বিশ্ব নামে দেবগণ ছিলনে। এই পঞ্চপুত্রের মধ্যে প্রতিবিন্ধ্য যুধিষ্ঠিরের ঔরসে, শ্রুতসোম ভীমের ঔরসে, শ্রুতকীর্ত্তি অর্জ্জুনের ঔরসে, শতানীক নকুলের ঔরসে ও শ্রুতসেন সহদেবের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। যদুবংশাবতংস শূর নামক রাজা বসুদেবের পিতা। তাঁহার পৃথানাম্নী এক পরম-রূপবতী কন্যা ছিল। শূর স্বীয় পিতৃস্বস্রীয়পুৎত্র অনপত্য কুন্তীভোজের নিকট প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন যে, ‘আমার প্রথম সন্তান তোমাকে প্রদান করিব।’ তিনি পূর্ব্বকৃত প্রতিজ্ঞানুসারে সেই সর্ব্বাগ্রজাতা কন্যাটি তাঁহাকে প্রদান করিলেন। পৃথা কুন্তীভোজের গৃহে শশিকলার ন্যায় দিন দিন পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিলেন। তিনি ব্রাহ্মণ ও অতিথিগণের সেবায় নিযুক্ত থাকিতেন। একদা জিতেন্দ্রিয় উগ্রতপস্বী মুনিপ্রবর দুর্ব্বাসা কুন্তীভোজের আলয়ে আতিথ্য স্বীকার করেন। অতিথি সৎকারনিপুণ পৃথা সাতিশয় যত্নসহকারে তাঁহার যথোচিত পরিচর্য্যা করিলেন। মুনিবর পৃথার শুশ্রূষায় পরিতুষ্ট হইয়া তাঁহাকে এক মন্ত্র প্রদান করিলেন এবং কহিলেন, “বৎস! এই মন্ত্র দ্বারা তুমি যে দেবতাকে আহ্বান করিবে, তিনি তৎক্ষণাৎ আগমন করিয়া তোমার গর্ভে স্বানুরূপ পুৎত্র উৎপাদন করিবেন।” দুর্ব্বাসা বিদায় হইলে কুমারী পৃথা বালসুলভ চপলতাপ্রযুক্ত সেই মন্ত্র দ্বারা সূর্য্যদেবকে আহ্বান করিলেন। ভগবান্ ভাস্কর সেই মন্ত্রপ্রভাবে পৃথা-সন্নিধানে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহার গর্ভাধান করিলেন। সেই গর্ভ হইতে সর্ব্বশাস্ত্রদক্ষ, বিচিত্রকুণ্ডলধারী, কবচী, সূর্য্যসম তেজস্বী এক পুৎত্র যথাকালে ভূমিষ্ঠ হইল। কুন্তী কন্যাকাবস্থায় সন্তান হইয়াছে বলিয়া লোকাপবাদভয়ে সেই সদ্যঃ-প্রসূত পুৎত্রকে জলে নিক্ষেপ করিলেন। যশস্বী রাধাভর্ত্তা সেই সুকুমার নব-কুমারকে জল হইতে গ্রহণ করিয়া স্বীয় সহধর্ম্মিণী রাধাকে প্রদান করিলেন। অনন্তর তাঁহার ঐ পুৎত্রের বসুষেণ নাম দিয়া লালন-পালন করিতে লাগিলেন। বসুষেণ কিয়দ্দিনমধ্যেই অত্যন্ত বলবান্, অস্ত্রবিদ্যা বিশারদ ও বেদাঙ্গবেত্তা হইয়া উঠিলেন। এই সত্যপরাক্রম, ধীশক্তিসম্পন্ন বসুষেন যখন জপ করিতে বসিতেন, তখন যে-কোন ব্রাহ্মণ তাঁহার নিকট যাহা প্রার্থনা করিতেন, তিনি তৎক্ষণাৎ তাহা দিতেন। একদা ভগবান্ ইন্দ্র ব্রাহ্মণবেশ ধারণ করিয়া তাঁহার সন্নিধানে গমনপূর্ব্বক আপন পুৎত্রের নিমিত্ত তাঁহার কুণ্ডলদ্বয় ও কবচ প্রার্থনা করিলেন। বসুষেণ তৎক্ষণাৎ স্বীয় শরীর হইতে কবচ ও কুণ্ডল উন্মোচন করিয়া তাঁহাকে প্রদান করিলেন। ইন্দ্র তাঁহার এই অসামান্য বদান্যতা দর্শনে বিস্ময়াপন্ন হইয়া তাঁহাকে একপুরুষঘাতিনী এক শক্তি প্রদান করিলেন এবং কহিলেন, “হে দুর্দ্ধর্ষ! তুমি দেব, দানব, মনুষ্য, গন্ধর্ব্ব, উরগ (সর্প) ও রাক্ষস প্রভৃতি যাহার প্রতি এই শক্তি-অস্ত্র নিক্ষেপ করিবে, তাহার অবশ্যই মৃত্যু হইবে সন্দেহ নাই।” এই বলিয়া ইন্দ্র তিরোহিত হইলেন। তদবধি বসুষেণের নাম বৈকর্ত্তন ও কর্ণ হইল। যে মহাত্মা বসুষেণ নামে বিখ্যাত ছিলেন, তিনিই কর্ণ নামে প্রথিত হইয়া সূতকুলে পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিলেন। হে নরনাথ! এই কর্ণকে সর্ব্বাস্ত্র বিশারদ নরশ্রেষ্ঠ দুর্য্যোধনের প্রধান সচিব এবং সূর্য্যের অংশ বলিয়া জানিবেন।
যদুবংশবর্ণন
হে রাজন! প্রতাপশালী বাসুদেব দেবদেব নারায়ণের অংশ। মহাবল বলভদ্র শেষনাগের অংশ। মহৌজাঃ প্রদ্যুম্ন সনৎকুমারের অংশ। এইরূপে বসুদেববংশে দেবগণের অংশে বহুতর নরেন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। হে মহারাজ! পূর্ব্বে যে-সমস্ত অপ্সরাগণের কথা কহিয়াছি, তাঁহাদের অংশে ইন্দ্রের আদেশানুসারে ষোড়শ সহস্র দেবীগণ ভূতলে জন্মগ্রহণ করিয়া ভগবান্ বাসুদেবের পরিগ্রহ (পত্নী) হয়েন। রুক্মিণী নারায়ণের প্রীতিসাধনার্থ লক্ষ্মীদেবীর অংশে ভীষ্মক রাজার কুলে সমুৎপন্ন হয়েন। সর্ব্বলক্ষণসম্পন্না দ্রৌপদী দ্রুপদ রাজার কুলে শচীর অংশে জন্মেন। এই কন্যা বেদীমধ্য হইতে বিনির্গত হয়েন। ইনি নাতিহ্রস্বা ও নাতিদীর্ঘা। ইঁহার গাত্রে নীলোৎপলগন্ধ চক্ষু পদ্মপত্রের ন্যায় বিশাল, নিতন্ব অতি মনোহর ও বর্ণ বৈদূর্য্যমণির ন্যায় ছিল। ইনি পাঁচ প্রধান পুরুষের চিত্তপ্রমোদ জন্মাইয়াছিলেন। সিদ্ধি ও ধৃতির অংশে কুন্তী ও মাদ্রী জন্মেন। ইঁহারা পঞ্চপাণ্ডবের মাতা। মতিনাম্নী কন্যা সুবলের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। হে নরনাথ! দেব, দানব, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরা ও রাক্ষসদিগের অংশাবতার কীর্ত্তন করিলাম। যে-সমস্ত সংগ্রামলোলুপ মহাত্মা ভূপতিগণ বিশাল যদুকুলে জন্মগ্রহণ করেন এবং যে-সকল ব্রাহ্মণ, ক্ষৎত্রিয় ও বৈশ্যগণ ঐ উপলক্ষে ধরাতলে জন্মেন, তাঁহাদিগেরও নাম কীর্ত্তন করিলাম। প্রাজ্ঞ ব্যক্তি অসূয়া-শূন্য হৃদয়ে এই পরমোৎকৃষ্ট অংশাবতরণ [স্ব স্ব অংশে পৃথিবীতে দেবগণের জন্ম] বৃত্তান্ত শ্রবণ করিলে তাঁহাদিগের আয়ুঃ, যশঃ, বংশবর্দ্ধন ও সর্ব্বত্র বিজয়লাভ হয়। ইহা শ্রবণ করিলে লোকে দেবাসুর প্রভূতির উৎপত্তি ও বিনাশ অবগত হইয়া অত্যন্ত ক্লেশদায়ক অবস্থায়ও অবসন্ন হয় না।

শকুন্তলোপাখ্যান—দুষ্মন্ত-বৃত্তান্ত
জনমেজয় কহিলেন, হে ব্রহ্মণ্! দেব, দানব, গন্ধর্ব্ব; অপ্সরা ও রাক্ষসগণের অংশাবতরণ সবিশেষ শ্রবণ করিলাম। এক্ষণে কুরুদিগের বংশ-বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিতে বাসনা করি; মহাশয়! অনুগ্রহ করিয়া এই সকল ব্রহ্মর্ষিগণ-সন্নিধানে বর্ণন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে ভরতকুলপ্রদীপ! পূর্ব্বকালে পুরু বংশের আদিপুরুষ দুষ্মন্ত নামে এক মহাবলপরাক্রান্ত মহীপাল ছিলেন। সেই মহাত্মা ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়াদি চতুর্ব্বর্ণাধিষ্ঠিত ও যবনাদি ম্লেচ্ছজাতি-সমাকীর্ণ সসাগরা ধরার প্রধান চারি খণ্ডে এবং নানাবিধ দ্বীপ ও উপদ্বীপে একাধিপত্য করিতেন। তাঁহার রাজ্য শাসনসময়ে বর্ণসঙ্কর এবং পরদারনিরত বা অন্য কোন প্রকার পাপাসক্ত লোক ছিল না। সকলেই ধর্ম্মপরায়ণ ছিলেন; কি চৌর্য্যভয়, কি ক্ষুধাভয়, কি ব্যাধিভয়, তৎকালে কিছুই ছিল না; তৎকালীন সমস্ত লোকই সেই মহীপালকে আশ্রয় করিয়া অকুতোভয় ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া কেবল স্বধর্ম্মে ও দৈবকর্ম্মে তৎপর থাকিত। তাঁহার অধিকারকালে ঘনাবলী যথাকালে বারিবর্ষণ করিত, শস্যসকল অতি সুরস হইত এবং পৃথিবী নানাবিধ রত্নে ও পশুযূথে পরিপূর্ণ থাকিত। সেই অসাধারণ-বলবীর্য্যসম্পন্ন রাজার শরীর বজ্রের ন্যায় দৃঢ় ছিল। তিনি স্বহস্তে মন্দর-পর্ব্বত উত্তোলন করিয়া অনায়াসে বহন করিতে পারিতেন এবং চতুর্ব্বিধ গদাযুদ্ধে ও সর্ব্বপ্রকার শস্ত্রযুদ্ধে অসাধারণ্য লাভ করিয়াছিলেন। সেই সর্ব্বলোক-সুবিখ্যাত প্রজারঞ্জক ভূপতি বলে বিষ্ণুতুল্য, তেজে ভাস্করতুল্য, গাম্ভীর্য্যে সাগরতুল্য ও সহিষ্ণুতায় ধরাতুল্য ছিলেন। তিনি ন্যায়পরতা ও ধর্ম্মপরতা দ্বারা সকল লোকের মনস্তুষ্টি সম্পাদন করিতেন।

দুষ্মন্তের মৃগয়া
জনমেজয় কহিলেন, হে তত্ত্ববিৎ! মহামতি ভরতের জন্ম ও চরিত, শকুন্তলার উৎপত্তি এবং মহাবীর রাজা দুষ্মন্ত কিরূপে শকুন্তলা লাভ করিয়াছিলেন, এই সমস্ত আনুপূর্ব্বিক শুনিতে বাসনা করি। বৈশম্পায়ন কহিলেন, একদা সেই মহাবাহু রাজা দুষ্মন্ত শত শত হস্তী ও অশ্বপরিবৃত এবং খড়্গ, শক্তি, গদা, মুষল, প্রাস, তোমর প্রভৃতি বিবিধ শস্ত্রধারী সেনাগণে বেষ্টিত হইয়া মৃগয়ার্থ মহাবনে যাত্রা করিলেন। তাঁহার যাত্রাকালে সেনাগণের সিংহনাদ, শঙ্খদুন্দুভিধ্বনি, রথচক্রনির্ঘোষ, করিবৃংহিত [গজের ধ্বনি] অশ্বহ্রেষিত [অশ্বের শব্দ] ও নানাবিধ অস্ত্র-শস্ত্রের ভয়ঙ্কর নিঃস্বন দ্বারা ঘোরতর কোলাহলধ্বনি উপস্থিত হইল। নগরবাসিনী মহিলাগণ অট্টালিকার শিখরদেশে আরোহণ করিয়া সেই যশস্বী শত্রুহন্তা ইন্দ্রসদৃশ নরপতির সৈন্যশোভাসন্দর্শনে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইল এবং প্রশংসাপূর্ব্বক তদীয় মস্তকোপরি পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারিবর্ণ সেই নারায়ণতূল্য পরাক্রমশালী দুষ্মন্তকে আশীর্ব্বাদ ও জয়ধ্বনি করিতে করিতে পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন।
তাঁহারা কিয়দ্দুর গমন করিয়া রাজার আজ্ঞানুসারে ক্রমে ক্রমে সকলেই প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। পরে রাজা সুবর্ণপ্রভ রথোপরি আরোহণ করিয়া গহন বনমধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক দেখিলেন, সেই অরণ্য বিল্ব, অর্ক, কপিত্থ, ধব, খদির প্রভৃতি নানাবিধ বৃক্ষে সমাকীর্ণ, পর্ব্বতভ্রষ্ট অনল্প পাষাণখণ্ডে ব্যাপ্ত এবং সিংহ, ব্যাঘ্র প্রভৃতি বহুবিধ হিংস্র-জন্তু দ্বারা সমাবৃত রহিয়াছে। ঐ বন বহু যোজন-বিস্তৃত, কিন্তু উহার মধ্যে কোন স্থানেই জল নাই এবং মনুষ্যের সমাগম নাই। মহারাজ দুষ্মন্ত সেনাগণ-সমভিব্যাহারে বিবিধ মৃগবধ দ্বারা সেই বনকে আলোড়িত করিলেন; দূরস্ত মৃগগণকে বাণ দ্বারা এবং সমীপস্থদিগকে খড়্গ দ্বারা বিনাশ করিয়া ভূতলশায়ী করিতে লাগিলেন। সিংহ, শার্দ্দূল, বরাহ প্রভৃতি পশুগণ অসাধারণ বলবীর্য্যসম্পন্ন সসৈন্য রাজার আক্রমণভয়ে আলোড়িত বনভূমি পরিত্যাগ করিয়া প্রাণভয়ে ভয়ানক স্বরে চীৎকার করিতে করিতে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিল। তাহারা পলায়নবেগজন্য ক্ষুৎপিপাসায় বিচেতনপ্রায় হইয়া কেহ নদীমধ্যে, কেহ ভূপৃষ্ঠে, কেহ বা তরুতলে পতিত হইতে লাগিল। সৈন্যগণ অগ্নি-প্রজ্বালনপূর্ব্বক ঐ সমস্ত হত পশুর মাংস দগ্ধ করিয়া ভক্ষণ করিতে লাগিল। ঐরাবততুল্য পরাক্রমশালী মত্ত গজযূথ সকল শস্ত্রাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হইয়া শোণিতমোক্ষণ ও শকৃন্মূত্র [বিষ্ঠামূত্র—বাহ্য-প্রস্রাব] পরিত্যাগপূর্ব্বক শুণ্ডাগ্র সঙ্কোচ করিয়া মহাবেগে পলায়ন করিতে করিতে সহস্র সহস্র জীবের প্রাণ-বিয়োগ করিল। এইরূপে রাজা দুষ্মন্ত সেনাগণ-সমভিব্যাহারে সিংহ, ব্যাঘ্র প্রভৃতি বিবিধ পশু বধ করিয়া সেই বন এককালে পশুহীন করিলেন।

কণ্ব মুনির আশ্রমসমৃদ্ধি
বৈশম্পায়ন কহিলেন, এইরূপে রাজা দুষ্মন্ত সৈন্যসমভিব্যাহারে সহস্র সহস্র মৃগের প্রাণবধ করিয়া অন্য এক বনে প্রবেশ করিলেন। মহারাজ দুষ্মন্ত মৃগের অনুসরণক্রমে সেই বনের প্রান্তভাগে এক মহৎ প্রান্তর দেখিতে পাইলেন। অনন্তর সেই প্রান্তর অতিক্রম করিয়া সুশীতল সমীরণভরে সঞ্চালিত, আশ্রম সমাকীর্ণ অন্য এক পরম-রমণীয় মহারণ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। ঐ বন সুপুষ্পিত পাদপসমূহে সমাকীর্ণ, সুকোমল বালতৃণ দ্বারা আচ্ছাদিত ও বৃক্ষগণের শাখাচ্ছায় আবৃত। উহার কোন স্থানে ময়ূর, পুংস্কোকিল প্রভৃতি নানাবিধ পক্ষিগণ সুমধুরস্বরে কলরব করিতেছে; কোন স্থানে ঝিল্লীগণ নিনাদ করিতেছে; কোথাও বা ভ্রমরগণ ঝঙ্কার করিতে করিতে এক পুষ্প হইতে পুষ্পান্তরে বসিতেছে। ঐ বনে কোন বৃক্ষই ফলপুষ্পহীন বা কণ্টকাবৃত ছিল না এবং যে পুষ্পে ভ্রমর নাই, এমন পুষ্পও ছিল না। রাজা বিহগকুলনিনাদিত, বহুবিধ সুগন্ধি কুসুমে সুশোভিত, সর্ব্বত্তুকুসুমকীর্ণ [সকল ঋতুতে সমানভাবে পর্যাপ্ত পুষ্পশোভিত], সুখচ্ছায়া-সমাবৃত, সেই মনোহর বনে প্রবেশ করিবা মাত্র সুপুষ্পিত তরুগণ সমীরণবেগে সঞ্চালিত হইয়া তাঁহার মস্তকোপরি পুনঃ পুনঃ পুষ্পবর্ষণ করিতে লাগিল; বিচিত্র কুসুমযুক্ত অত্যুন্নত বৃক্ষশ্রেণীতে পক্ষিগণ সুমধুরস্বরে গান করিতে লাগিল এবং পুষ্পভারাবনত তরুপল্লবে মধুলুব্ধ মধুকরগণ সুমধুরস্বরে গুন্গুন্ ধ্বনি করিতে আরম্ভ করিল। রাজা কুসুমিতলতামণ্ডপে [পুষ্পিত লতাকুঞ্জ] সমাকীর্ণ তত্রত্য পরম-রমণীয় প্রবেশ-সকল অবলোকন করিয়া সাতিশয় আহ্লাদিত হইলেন এবং দেখিলেন, পুষ্পভারাবনত ভিন্ন ভিন্ন বৃক্ষসমূহের শাখাসকল পরস্পর সংশ্লিষ্ট হইয়া ইন্দ্রধ্বজের [ইন্দ্রপ্রীতিরজন্য তদীয় উৎসবার্থ নির্ম্মিত মণ্ডপের পতাকাদণ্ড] শোভা সম্পাদন করিতেছে। সিদ্ধ, চারণ, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরাগণ, মত্ত বানরযূথ ও কিন্নরসমূহ তথায় নিরন্তর বাস করিতেছে এবং পুষ্প রেণুবাহী, সুখস্পর্শ, সুশীতল সুগন্ধ গন্ধবহ [বায়ু] সর্ব্বদা বহিতেছে।
এইরূপে রাজা সেই পরম-রমণীয় নদীকচ্ছস্থ [নদীতটস্থিত] বনের শোভা নিরীক্ষণ করিতেছেন, ইত্যবসরে তন্মধ্যে এক শান্তরসাস্পদ আশ্রমপদ দেখিতে পাইলেন। আশ্রমটি নানাবিধ বৃক্ষে সমাকীর্ণ ও তাহার মধ্যস্থলে আহবনীয় অগ্নি প্রজ্বলিত রহিয়াছে; বালখিল্য প্রভৃতি মুনিগণ চারিদিকে উপবিষ্ট রহিয়াছেন এবং পুষ্পসংস্তরণযুক্ত [যে স্থানে পুষ্পরাশি বিছান থাকে এইরূপ] অগ্নিগৃহসকল শোভা পাইতেছে। ঐ আশ্রমের সমীপে হংস, বক, চক্রবাক প্রভৃতি বহুবিধ জলচর পক্ষিগণে সঙ্কীর্ণা, পুণ্যোদকা [পবিত্র জলযুক্তা], সুখস্পর্শা, মালিনী নদী প্রবাহিত হইতেছে। তথায় সিংহ, ব্যাঘ্র প্রভৃতি হিংস্র শ্বাপদগণও শান্তিগুণাবলম্বী। তদ্দর্শনে রাজা সাতিশয় আহ্লাদিত ও চমৎকৃত হইলেন। মহারাজ দুষ্মন্ত অমর লোক-সদৃশ সেই মনোহর আশ্রমের সমীপবর্ত্তিনী, সর্ব্বজীব জননীতুল্যা, পুণ্যতোয়া সেই মালিনী নদীর শোভা অবলোকন করিতে করিতে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। তাহার পুলিনে চক্রবাক সকল সতত ক্রীড়া করিতেছে; কিন্নরগণ সর্ব্বদা বাস করিতেছে; বানর-ভল্লুকাদি জন্তুগণ অবিরত বিচরণ করিতেছে; তপোধনগণ নিরন্তর বেদধ্বনি করিতেছেন এবং মত্ত হস্তিযূথ শার্দ্দূলযূথ ও ভুজগেন্দ্রগণ অনবরত ক্রীড়া করিতেছে।
ঐ আশ্রম ভগবান্ কাশ্যপের পুণ্যাশ্রম। মালিনী নদী এবং মহর্ষিগণসেবিত সেই পরমরমণীয় আশ্রম দর্শনে রাজা দুষ্মন্ত অত্যন্ত কৌতুকাক্রান্ত হইয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিতে বাসনা করিলেন। রাজা মালিনী নদী দ্বারা বেষ্টিত, বৈকুণ্ঠধামবৎ সুশোভিত, মত্তময়ুরনাদে নিনাদিত সেই চৈত্ররথ-সদৃশ মহারণ্যের সম্মুখে সমুপস্থিত হইয়া অশেষগুণালঙ্কৃত কশ্যপাত্মজ মহর্ষি কণ্বকে দর্শন করিবার অভিলাষে সেই স্থানে চতুরঙ্গিণী সেনা সংস্থাপন করিলেন এবং কহিলেন, “আমি ভগবান্ কণ্ব তপোধনকে দর্শন করিতে চলিলাম; যতক্ষণ না প্রত্যাগমন করিব, তোমরা এই স্থানেই অবস্থান কর।” তাহাদিগকে এই কথা বলিয়া সমস্ত রাজচিহ্ন পরিত্যাগপূর্ব্বক কেবল অমাত্য ও পুরোহিত সমভিব্যাহারে তন্মধ্যে প্রবেশ করিয়া নানা প্রকার আশ্চর্য্য শোভা সন্দর্শনে রাজা ক্ষুৎপিপাসা বিস্মৃত ও সাতিশয় আহ্লাদিত হইলেন। আরও দেখিলেন, কোন স্থানে কুসুমিত তরুকলাপে [বৃক্ষশ্রেণীতে] অলিগণ ঝঙ্কার করিতেছে; কোন স্থানে বিহগকুল বৃক্ষশাখায় বসিয়া কলরব করিতেছে; কোন স্থানে ঋগ্বেদী বিপ্রগণ যজ্ঞকার্য্যে উদাত্তাদিস্বরে [বৈদিক স্বর সম্বন্ধীয় উচ্চারণক্রমে] বেদধ্বনি করিতেছেন; কোন স্থানে চতুর্ব্বেদবেত্তা নিয়তব্রত মহর্ষিগণ উপবিষ্ট রহিয়াছেন; স্থানান্তরে যতাত্মা, জিতেন্দ্রিয়, অথর্ব্ববেদবেত্তা ও সামগাতাসকল পদক্রমাদি-সহিত সংহিতা উচ্চারণ করিতেছেন। কোথাও বা শব্দ সংস্কারসম্পন্ন দ্বিজগণ বেদগান দ্বারা সেই ব্রহ্মলোক-সদৃশ আশ্রমকে নিনাদিত করিতেছেন; কোন স্থলে যজ্ঞানুষ্ঠানক্রম, পুরাণ, ন্যায়, তত্ত্ব, আত্মবিবেক, শব্দশাস্ত্র, ছন্দঃ নিরুক্ত ও বেদবেদাঙ্গ প্রভৃতি নানা শাস্ত্রে পারদর্শী, বিশেষ কার্য্যজ্ঞ, মোক্ষধর্ম্মপরায়ণ, উহাপোহ [তর্করহিত] সিদ্ধান্ত-কুশল, দ্রব্য-কর্ম্মের গুণজ্ঞ, কার্য্যকারণবেত্তা, পক্ষী ও বানর প্রভৃতি জীবগণের বাক্যার্থবোদ্ধা মহর্ষিগণ নানাশাস্ত্রের বিচার করিতেছেন এবং বৌদ্ধমতালম্বী লোকেরা নিজ ধর্ম্মের আলোচনা করিতেছেন। শত্রুহন্তা রাজা দুষ্মন্ত জপহোমপরায়ণ সেই সকল একনিষ্ঠ বিপ্রগণকে সন্দর্শন করিতে করিতে আশ্রমসমীপে উত্তীর্ণ হইলেন। মুনিগণ অতি প্রযত্নপূর্ব্বক রাজাকে যে-সকল বিচিত্র আসন প্রদান করিলেন, তদ্দর্শনে তিনি বিস্ময়াপন্ন হইলেন। রাজর্ষি, মহর্ষি কণ্বের সুরক্ষিত ও বিবিধ গুণযুত সেই আশ্রমপদ যতই অবলোকন করিতে লাগিলেন, ততই তাঁহার দর্শনৌৎসুক্য বাড়িতে লাগিল।
দুষ্মন্তের শকুন্তলা-সাক্ষাৎকার
বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর রাজা মন্ত্রী ও পুরোহিতকে আশ্রমের বাহিরে রাখিয়া একাকী তন্মধ্যে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, আশ্রম শূন্য রহিয়াছে, মহর্ষি কণ্ব তথায় নাই। তখন তিনি উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, “কুটীরের অভ্যন্তরে কে আছ, বহির্গত হও।” তাঁহার সেই বাক্য শ্রবণমাত্র তাপসীবেশধারিণী লক্ষ্মীর ন্যায় এক কন্যা কুটীর হইতে বহির্গত হইলেন। তিনি রাজাকে সমাগত দেখিয়া পাদ্য-অর্ঘ্য, আসন দ্বারা তাঁহার যথোচিত আতিথ্যবিধানপূর্ব্বক স্বাগত প্রশ্ন ও কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিলেন। অনন্তর ঐ কন্যা বিনীতভাবে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মহারাজ! এ স্থানে কি উদ্দেশে আপনার আগমন হইয়াছে? আজ্ঞা করুন, আপনার কোন্ কার্য্য সম্পাদন করিতে হইবে?” রাজা সেই সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী মধুভাষিণী কন্যার বাক্য শ্রবণানন্তর তাঁহাকে কহিলেন, “ভদ্রে! আমি মহর্ষি কণ্বের উপাসনা করিতে এস্থানে আসিয়াছি। মহর্ষি কোথায়?” কন্যা কহিলেন, “পিতা ফল আহরণার্থ বনান্তরে গমন করিয়াছেন, তিনি শীঘ্রই প্রত্যাগমন করিবেন; আপনি ক্ষণকাল অপেক্ষা করিলেই তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে পারিবেন।”
রাজা ঋষিকে আশ্রমে অনুপস্থিত দেখিয়া এবং সেই মধুরহাসিনী, রূপযৌবনবতী, লোকলালমভূতা ললনার অলোকসামান্য রূপলাবণ্য সন্দর্শন করিয়া মুগ্ধপ্রায় হইয়া জিজ্ঞাসিলেন, “সুন্দরি! তুমি কে? কাহার রমণী? কি নিমিত্তই বা এই মহারণ্যে আসিয়াছ? আর তুমি কি প্রকারেই বা এরূপ রূপবতী হইয়াছ? তুমি দর্শনমাত্রই আমার মন হরণ করিয়াছ।” রাজার এই বাক্য শ্রবণ করিয়া কন্যা মধুরস্বরে কহিলেন, “মহারাজ! আমি ধৃতিমান্ ধর্ম্মজ্ঞ মহাত্মা কণ্ব তপোধনের কন্যা, আমার নাম শকুন্তলা।” রাজা কহিলেন, “হে বরবর্ণিনি! সর্ব্বলোকপূজিত ভগবান্ কণ্ব ঊর্দ্ধ্বরেতাঃ। ধর্ম্মও কদাচিৎ বিচলিত হইতে পারেন. কিন্তু ঊর্দ্ধ্ব তপস্বীরা কখনই বিচলিত হয়েন না; তবে তুমি কিরূপে তাঁহার দুহিতা হইলে? আমার এ বিষয়ে অত্যন্ত সন্দেহ হইতেছে। তুমি অনুগ্রহ করিয়া সন্দেহভঞ্জন করিয়া দাও।” শকুন্তলা কহিলেন, “মহারাজ! একদা এক ঋষি পিতাকে আমার জন্মবৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করিলে পিতা তাঁহার সমীপে আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করেন। আমি সেই সময়ে তাঁহার নিকটবর্ত্তিনী ছিলাম, সমস্তই শ্রবণ করিয়াছি, বলিতেছি, শ্রবণ করুন।”
রাজার নিকট শকুন্তলার পরিচয়
“মহর্যি কহিয়াছিলেন, পূর্ব্বকালে মহাতপাঃ বিশ্বামিত্র ঘোরতর কঠোর তপস্যা আরম্ভ করেন। তাঁহার তপঃপ্রভাবে ত্রিলোক তাপিত হইল। দেবরাজ ইন্দ্র, ‘তপোবীর্য্যসম্পন্ন বিশ্বামিত্র এই কঠোর তপস্যা দ্বারা পাছে আমার ইন্দ্রত্বপদ গ্রহণ করেন’ এই ভয়ে ভীত হইয়া অপ্সরা মেনকাকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, ‘মেনকে! অপ্সরাদিগের মধ্যে তুমিই সর্ব্বপ্রধান, অতএব তুমি আমার কিঞ্চিৎ উপকার কর। সূর্য্যসদৃশ তেজস্বী, জিতেন্দ্রিয়, মহাতপাঃ বিশ্বামিত্র কঠোর তপস্যা আরম্ভ করিয়াছেন। তাঁহার তপোনুষ্ঠান দর্শনে আমার হৃৎকম্প হইতেছে। অতএব তোমাকে আমি এই ভার অর্পণ করিতেছি, যাহাতে সেই দুর্দ্ধর্ষ বিশ্বামিত্র তপস্যা দ্বারা আমাকে পদচ্যুত করিতে না পারেন, এমন কোন উপায় উদ্ভাবন কর। হে বরারোহে! রূপ, যৌবন, মধুর বাক্য, অঙ্গভঙ্গী, কটাক্ষ, হাব, ভাব, হাস্য প্রভৃতি প্রলোভন দ্বারা তোমাকে ঐ মহর্ষির তপোবিঘ্ন করিতে হইবে।’
মেনকা ইন্দ্রের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, ‘হে দেবরাজ! আপনি ত] জানেন, ভগবান্ বিশ্বামিত্র অতিশয় তেজস্বী, তপস্বী ও ক্রুদ্ধস্বভাব। দেখুন, আপনি ত্রৈলোক্যের অধিপতি হইয়াও যাঁহার তপস্যা, তেজঃ ও কোপে ভীত হইতেছেন, আমি অবলা জাতি, কি প্রকারে তাঁহার অনিষ্ট-সাধন করিতে সাহস করিব? যে মহর্ষি মহাভাগ বশিষ্ঠের প্রাণসম শত পুৎত্রের প্রাণ সংহার করিয়াছেন, যিনি ক্ষিৎত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করিয়াও বলপূর্ব্বক ব্রাহ্মণ হইয়াছেন, যিনি অভিষেক-ক্রিয়া-সম্পাদনার্থ পরমপবিত্র অগাধসলিলা এক মহানদীকে স্বীয় আশ্রম-সমীপে আনয়ন করিয়াছেন, যাঁহার মহিমায় ঐ নদী অদ্যাপি কৌশিকী নামে বিখ্যাত আছে, যিনি ক্রুদ্ধ হইয়া প্রতিজ্ঞাপূর্ব্বক অন্য এক নক্ষত্রলোক ও নক্ষত্রসমুদয় সৃষ্টি করিয়াছেন, যিনি গুরুশাপগ্রস্থ ত্রিশঙ্কুকে অভয়দান করিয়াছেন, হে বিভো! যিনি এই সমস্ত অলৌকিক কার্য্য করিয়াছেন, আমি কোন সাহসে তাঁহার তপস্যা ভঙ্গ করিতে যাইব? আপনি যদি আমাকে এরূপ বর প্রদান করেন যে, তিনি ক্রোধাগ্নি দ্বারা আমাকে দগ্ধ করিতে পারিবেন না, তবে আমি যাইতে সাহস করিতে পারি। হে সুরেশ্বর! যিনি তেজোদ্বারা ত্রিলোকী দগ্ধ করিতে পারেন, যিনি পদাঘাতে মেদিনী প্রকম্পিত করিতে পারেন, যিনি সুমেরু উৎক্ষেপণ ও দশদিক্ আবর্ত্তন [দশ দিকে ঘুরান] করিতে পারেন, আমি কিরূপে সেই তপঃপ্রভাবসম্পন্ন প্রজ্বলিত হুতাশনাকার তপোধনকে স্পর্শ করিব? যাঁহার মুখ সাক্ষাৎ প্রদীপ্ত হুতাশন, যাঁহার অক্ষিতারা [নয়নের তারা-চক্ষুগোলক] মূর্ত্তিমান চন্দ্র ও সূর্য্য, যাঁহার জিহ্বা স্বয়ং কৃতান্ত, মাদৃশ লোক কিরূপে সেই মহাত্মাকে স্পর্শ করিবে? যম, সোম, মহর্ষিগণ, সিদ্ধ, সাধ্য, বিশ্বদেব ও বালখিল্য প্রভৃতি ঋষিগণ যাঁহাকে ভয় করেন; আমি অবলা হইয়া কিরূপে তাঁহার সমীপে গিয়া ক্রীড়া ও অঙ্গভঙ্গাদি করিব? হে দেবরাজ! আপনি আজ্ঞা করিতেছেন, অতএব আমাকে অবশ্যই সেই ঋষির নিকট যাইতে হইবে, কিন্তু আপনি এমত কোন উপায় নির্দ্দেশ করিয়া দিন, যাহাতে আমি তৎসমীপে নির্ব্বিঘ্নে বিচরণ করিতে পারি এবং তাঁহা হইতে পরিত্রাণ পাই। হে দেবরাজ! আমি যে সময়ে সেই উগ্রতপাঃ মুনির সমীপে গিয়া ক্রীড়াকৌতুক করিব, তৎকালে বায়ু যেন আমার বসন উড্ডীন করেন; ভগবান্ মন্মথ যেন আমার সহায়তা করেন এবং বন হইতে যেন সুগন্ধ গন্ধবহ মন্দ-মন্দভাবে বহিতে থাকে।’ ইন্দ্র ‘তথাস্তু’ বলিয়া মেনকাবাক্য স্বীকার করিলেন। মেনকাও তৎক্ষণাৎ বিশ্বামিত্রের আশ্রমে যাত্রা করিলেন।’

বিশ্বামিত্রের তপোভঙ্গ
“অনন্তর পিতা সেই ঋষিকে কহিলেন, ইন্দ্র মেনকার প্রার্থনানুসারে বায়ুকে আদেশ করাতে বায়ু মেনকার সহিত মহর্ষি বিশ্বামিত্রের আশ্রমে গমন করিলেন। বরবর্ণিনী মেনকা তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিল, মহর্ষি তপস্যা দ্বারা সমস্ত পাপ ধ্বংস করিয়াও ক্ষান্ত হয়েন নাই, ঘোরতর তপোনুষ্ঠান করিতেছেন। পরে সে সভয়-অন্তঃকরণে ঋষিকে প্রণাম করিয়া তাঁহার সম্মুখে ক্রীড়া করিতে আরম্ভ করিল। বায়ু অবসর বুঝিয়া তাহার পরিধেয়-বস্ত্র হরণ করিয়া দূরে নিক্ষেপ করিল। মেনকা সাতিশয় লজ্জিত হইয়া বসন আনায়নার্থে দ্রুতপদে গমন করিতেছে, এমন সময়ে অগ্নিসম-তেজস্বী মহর্ষি বিশ্বামিত্রে তাহাকে তদবস্থান্বিতা দেখিলেন এবং তাহার রূপলাবণ্য দর্শনে কন্দর্পশরে জর্জ্জরিতহৃদয় হইয়া নিকটে আহ্বান করিলেন। মেনকার তাহাই অভিসন্ধি ছিল, সুতরাং সে তাহাতে সম্মত হইয়া মুনিসন্নিধানে গমন করিল। মহর্ষি তাহাকে পাইয়া তপ, জপ প্রভৃতি সমস্ত ধর্ম্মকর্ম্মে জলাঞ্জলি প্রদানপূর্ব্বক দিনযামিনী কেবল সেই কামিনীর সহিত ক্রীড়াকরতঃ পরমসুখে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন।
শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্ত
এইরূপে কিয়দ্দিন অতীত হইলে মেনকা মুনির সহযোগে গর্ভবতী হইল। অনন্তর মেনকা যথাকালে হিমালয়ের প্রস্থে এক কন্যা প্রসব করিল এবং সেই সদ্যোজাতা কন্যাকে মালিনী নদীর তীরে নিক্ষেপ করিয়া দেবরাজসভায় প্রস্থান করিল। পক্ষিগণ হিংস্রজন্তু-সমাকীর্ণ নির্জ্জন বনে সেই সদ্যোজাতা অসহায়া কন্যাকে পতিতা দেখিয়া সদয় হৃদয়ে তাহার চতুর্দ্দিক্ বেষ্টন করিয়া রক্ষা করিতে লাগিল। হে তপোধন! আমি সেই সময়ে মালিনীতে স্নান করিতে গমন করিয়াছিলাম, সেই সদ্যোজাত কন্যাকে নির্জ্জন কাননে পক্ষিগণমধ্যে অধিশয়ানা দেখিয়া আমার হৃদয়ে কারুণ্যরসের উদয় হইল। পরে তথা হইতে আশ্রমে আনয়ন করিয়া স্বীয় কন্যার ন্যায় লালন-পালন করিতে লাগিলাম। কন্যাটি শকুন্ত অর্থাৎ পক্ষিকর্ত্তৃক রক্ষিত হইয়াছিল বলিয়া তাহার নাম শকুন্তলা রাখিলাম। ধর্ম্মশাস্ত্রে কথিত আছে, শরীরদাতার ন্যায় প্রাণদাতা ও অন্নদাতাকেও পিতা বলা যায়, এই নিমিত্ত শকুন্তলা আমার কন্যা হইয়াছেন। অগর্হিতা শকুন্তলাও আমাকে যথার্থ-ই পিতা বলিয়া জানেন।”
শকুন্তলা রাজাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “হে নরনাথ! মহর্ষি কণ্ব সেই মুনিকর্ত্তৃক পৃষ্ট হইয়া তাঁহাকে আমার জন্মবৃত্তান্ত এইরূপ কহিয়াছিলেন, অতএব আপনিও আমাকে এইরূপে কণ্বের দুহিতা জানুন। আমি স্বীয় পিতাকে জানি না, ভগবান্ কণ্বকেই আমি পিতা বলিয়া জানি। হে রাজন্! আমি পূর্ব্বে পিতার মুখে যাহা শ্রবণ করিয়াছিলাম, তাহা অবিকল বর্ণন করিলাম।”

শকুন্তলার বিবাহপ্রস্তাব
দুষ্মন্ত কহিলেন, “হে কল্যাণি! তোমার জন্মবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া বুঝিলাম, তুমি রাজপুৎত্রী; অতএব তুমি আমার ভার্য্যা হইতে পার। এক্ষণে বল, তোমার কি প্রিয়কার্য্য সম্পাদন করিব। হে সুন্দরী! আমি তোমার নিমিত্ত স্বর্ণমালা, বস্ত্র, সুবর্ণকুণ্ডল ও নানাদেশোদ্ভব বিচিত্র মণিরত্নাদি আহরণ করিব এবং অদ্যাবধি আমার এই সাম্রাজ্য তোমার হস্তগত হইবে; তুমি আমাকে গান্ধর্ব্ববিধানানুসারে বিবাহ কর। গান্ধর্ব্ব-বিবাহ সকল বিবাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।” শকুন্তলা কহিলেন, “রাজন্! আমার পিতা ফল আহরণ করিতে গিয়াছেন। আপনি ক্ষণকাল বিলম্ব করুন, তিনি আসিয়া আমাকে আপনার হস্তে সম্প্রদান করিবেন।” দুষ্মন্ত কহিলেন, “সুন্দরী! তোমার রূপলাবণ্য দেখিয়া আমি নিতান্ত মুদ্ধ হইয়াছি; আমার মন অন্যান্য বিষয় পরিত্যাগ করিয়া কেবল তোমারই লাবণ্য-সলিলে মগ্ন হইয়াছে; আর তুমি ভাবিয়া দেখ, তোমার আপন শরীরের প্রতি তোমার সম্পূর্ণ হিতৈষিত্ব ও কর্ত্তৃত্ব আছে; অতএব তুমি স্বয়ংই আমার হস্তে আত্মসমর্পণ কর। ধর্ম্মশাস্ত্রে অষ্টবিধ বিবাহ নির্দ্দিষ্ট আছে। ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রাজাপত্য, আসুর, গান্ধর্ব্ব, রাক্ষস ও পৈশাচ। ভগবান্ স্বয়ম্ভুব মনু এই সর্ব্ববিধ বিবাহের যথাসম্ভব ব্যবস্থা সংস্থাপন করিয়া গিয়াছেন। ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য ও প্রাজাপত্য এই চারি প্রকার বিবাহ ব্রাহ্মণের পক্ষে প্রশস্ত। ব্রাহ্মাদি গান্ধর্ব্বান্ত যট্প্রকার বিবাহ ক্ষৎত্রিয়ের পক্ষে প্রশস্ত। রাজাদিগের উক্ত যট্প্রকার বিবাহে এবং রাক্ষস-বিবাহেও অধিকার আছে। বৈশ্য ও শূদ্রের পক্ষে কেবল আসুর বিবাহই বিহিত। অতএব ব্রাহ্মণ ও ক্ষৎত্রিয়ের পৈশাচ ও আসুর বিবাহ কদাপি কর্ত্তব্য নহে। দেখ, যদি গান্ধর্ব্ব ও রাক্ষস বিবাহ ক্ষৎত্রিয়দিগের ধর্ম্মসংযুক্ত হইল, তবে আর শঙ্কার বিষয় কি? এক্ষণে গান্ধর্ব্ব-বিধানেই হউক বা রাক্ষস বিধানেই হউক কিংবা গান্ধর্ব্ব ও রাক্ষস উভয়ের বিমিশ্র বিধানেই হউক, আমাকে বিবাহ করিয়া আমার মনোরথ পরিপূর্ণ কর।”
শকুন্তলা কহিলেন, “হে পৌরবশ্রেষ্ঠ! আপনি যাহা কহিলেন, ইহা যদি শাস্ত্রসম্মত হয় এবং আমার যদি আত্মসমর্পণে প্রভুতা থাকে, তবে, আমি যাহা প্রার্থনা করিতেছি, এই বিষয়ে আপনাকে অঙ্গীকার করিতে হইবে। আপনার ঔরসে আমার গর্ভে যে পুৎত্র জন্মিবে, সে আপনি বিদ্যমানে যুবরাজ ও অবিদ্যমানে অধিরাজ হইবে; যদ্যপি আপনি এই বিষয়ে প্রতিশ্রুত হন, তবে আমি আপনার হস্তে আত্মসমর্পণ করিতে পারি।”
দুষ্মন্ত-শকুন্তলার বিবাহ
রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলার সেই বাক্য শ্রবণে কিঞ্চিন্মাত্রও বিবেচনা না করিয়া ‘তথাস্তু’ বলিয়া স্বীকার করিলেন এবং কহিলেন, “হে নিতন্বিনি! আমি যথার্থই কহিতেছি, তোমাকে স্বীয় নগরে লইয়া যাইব।” এই বলিয়া গান্ধর্ব্ব-বিধানে সেই মরালগামিনী [রাজহংসীর ন্যায় মন্দগতিশালিনী] শকুন্তলার পাণিগ্রহণপূর্ব্বক তাঁহার সহিত ক্রীড়াকৌতুক করিলেন। রাজাধিরাজ দুষ্মন্ত এইরূপে শকুন্তলার পাণিগ্রাহণ করিয়া এবং “তোমাকে অচিরাৎ লইয়া যাইবার নিমিত্ত চতুরঙ্গিণী [অশ্ব, হস্তী, রথ ও পদাতি এই চারি প্রকার বলবিশিষ্ট] সেনা প্রেরণ করিব”, এই কথা বারংবার কহিয়া তাঁহার বিশ্বাসোৎপাদনপূর্ব্বক তথা হইতে প্রস্থান করিলেন।
রাজা গমনমার্গে চিন্তা করিতে লাগিলেন, মহাতপাঃ ভগবান্ কণ্ব এই ব্যাপার জানিতে পারিলে না জানি ক্রোধভরে আমার কি সর্ব্বনাশ করিবেন। তিনি এইরূপ নানাপ্রকার কল্পনা করিতে করিতে আপন নগরে প্রবেশ করিলেন। এদিকে ক্ষণমাত্র পরে মহর্ষি কণ্ব স্বীয় আশ্রমে আগমন করিলেন। শকুন্তলা লজ্জায় অধোমুখী হইয়া তাঁহার নিকট গমন করিতে পারিলেন না। তখন মহর্ষি দিব্যজ্ঞান-প্রভাবে সমস্ত ব্যাপার অবগত হইয়া কহিলেন, “বৎস! তুমি আমার অনুপস্থিতি সময়ে যে পুরুষসংসর্গ করিয়াছ, তাহাতে তোমার ধর্ম্ম নষ্ট হয় নাই। ক্ষৎত্রিয়দিগের গান্ধর্ব্ব-বিবাহই প্রশস্ত। সকামা স্ত্রীর সহিত সকাম পুরুষের নির্জ্জনে যে বিবাহ হয়, তাহাকেই গান্ধর্ব্ব-বিবাহ কহে। হে বৎস! রাজা দুষ্মন্ত অতি মহাত্মা ও ধর্ম্মাত্মা। তুমি সেই মহাত্মাকে পতিত্বে বরণ করিয়াছ। তোমার গর্ভে এক মহাবলপরাক্রান্ত পুৎত্র জন্মিবে। সেই পুৎত্র সসাগরা ধরার একাধিপতি হইয়া অপ্রতিহতরূপে সর্ব্বত্র গমনাগমন করিতে পারিবে।” মুনিবর এইরূপে শকুন্তলার লজ্জাপনোদনপূর্ব্বক স্কন্ধ হইতে ফলভার নামাইয়া পাদ-প্রক্ষালন করিলেন এবং বিশ্রামার্থ সুখাসনে উপবেশন করিলেন। তখন শকুন্তলা কহিলেন, “তাত! আমি মহারাজ দুষ্মন্তকে বরণ করিয়াছি। আপনি অনুকম্পা-প্রদর্শনপূর্ব্বক তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হউন।” কণ্ব কহিলেন, “বৎসে! আমি তোমার নিমিত্ত রাজার প্রতি প্রসন্নই আছি। এক্ষণে তুমি স্বাভিলষিত বর প্রার্থনা কর।” শকুন্তলা মহর্ষির বাক্য শ্রবণ করিয়া রাজা দুষ্মন্তের হিতাকাঙ্ক্ষায় কহিলেন, “হে পিতাঃ! যদি প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তবে এই বর প্রদান করুন যে, পুরুবংশীয়েরা যেন কখন রাজ্যচ্যুত বা অধর্ম্ম পরায়ণ না হন।” মহর্ষি কণ্ব ‘তথাস্তু’ বলিয়া বর প্রদান করিলেন।

শকুন্তলাগর্ভে ভরতজন্ম
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! তদন্তর বরবর্ণিনী শকুন্তলা যথাকালে মহাবলপরাক্রান্ত দীপ্তাগ্নি-সমতেজস্বী অলৌকিক-রূপগুণসম্পন্ন এক সুকুমার কুমার প্রসব করিলেন। ঐ কুমারের বয়ঃক্রম তিন বৎসর পরিপূর্ণ হইলে মহাত্মা কণ্ব বেদবিধানানুসারে তাঁহার জাতকর্ম্মাদি সংস্কার সম্পাদন করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত শকুন্তলাপুৎত্র মুনির আশ্রমে দিন দিন দেবকুমারের ন্যায় বৃদ্ধি পাইতে লাগিলেন। পরে ছয় বৎসর বয়ঃক্রমকালে সিংহ, ব্যাঘ্র, বরাহ, মহিষ, হস্তী প্রভৃতি বন্য স্বাপদগণকে আশ্রম-সমীপস্থ বৃক্ষে বন্ধন করিয়া দমন করিতেন। তদ্দর্শনে কণ্বাশ্রমনিবাসী তাপসগণ তাঁহাকে সর্ব্বদমন বলিয়া ডাকিতেন। তদবধি তাঁহার এক নাম সর্ব্বদমন হইল। মহর্ষি কণ্ব বালকের অসাধরণ বল ও অলৌকিক কর্ম্ম-দর্শনে শকুন্তলাকে কহিলেন, “বৎস! তোমার পুৎত্রের যৌবরাজ্য-প্রাপ্তির সময় উপস্থিত হইয়াছে। অতঃপর তোমার এ স্থানে থাকা কর্ত্তব্য নহে।” পরে মুনিবর স্বীয় শিষ্যগণকে আদেশ করিলেন, “তোমরা পুৎত্রবতী শকুন্তলাকে ভর্ত্তৃভবনে লইয়া যাও; যেহেতু নারীগণের চিরকাল পিতৃগৃহে বাস করা অবিধেয় এবং তাহাতে কীত্তি, চরিত্র ও ধর্ম্ম নষ্ট হইবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা।” শিষ্যগণ ‘যে আজ্ঞা’ বলিয়া ঋষিবাক্য স্বীকার পূর্ব্বক সপুৎত্রা শকুন্তলাকে সমভিব্যাহারে লইয়া হস্তিনানগরে গমন করিলেন।
শকুন্তলার পতিগৃহে গমন
শকুন্তলা দেবকুমারতুল্য আপন কুমারকে ক্রোড়ে লইয়া ক্রমে ক্রমে দুষ্মন্তের ভবনে উপস্থিত হইলেন। কণ্বশিষ্যগণ রাজসমীপে সমুপস্থিত হইয়া যথাবিধি আশীর্ব্বাদবিধানপূর্ব্বক সপুৎত্র শকুন্তলাকে অর্পণ করিয়া আশ্রমে প্রত্যাগমন করিলেন। তাঁহারা আশ্রমে প্রস্থান করিলে শকুন্তলা কৃতাঞ্জলিপুটে রাজাকে কহিলেন, “মহারাজ! এই পুৎত্র আপনার ঔরসে আমার গর্ভে জন্মিয়াছে, আপনি কণ্বমুনির আশ্রমে আমাকে বিবাহ করেন। পরিণয়কালে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন যে, মদ্গর্ভজাত পুৎত্রকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিবেন। এক্ষণে এই পুৎত্রের যৌবরাজ্যে প্রাপ্তির সময় উপস্থিত। অতএব আপনি পূর্ব্বকৃত প্রতিজ্ঞা স্মরণপূর্ব্বক ইহাকে যুবরাজ করুন।”
দুষ্মন্তের শকুন্তলা-প্রত্যাখ্যান
রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলার বাক্য শ্রবণানন্তর অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া কহিলেন, “তাপসি! তুমি যাহা কহিলে, তাহা আমার কিছুই স্মরণ হইতেছে না। তোমার সহিত যে কখন সন্দর্শন হইয়াছিল, তাহাও স্মরণ হয় না। কিংবা তোমার সহিত আমার কোন সম্বন্ধ আছে, ইহাও বোধ হইতেছে না; অতএব হে দুষ্টতাপসি! তুমি এই স্থানে থাক বা স্থানান্তরে যাও, যাহা ইচ্ছা হয় কর।” শকুন্তলা পতির মুখে এই অশনিপাত-সদৃশ বিষময় বাক্য শ্রবণ করিয়া ঈষৎ লজ্জিত ও দুঃখে স্তম্ভিতপ্রায় হইয়া দণ্ডায়মান রহিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে সংজ্ঞালাভ হইলে ক্রোধভরে তাঁহার দুই চক্ষু রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল এবং ওষ্ঠাধর কম্পিত হইতে লাগিল। তিনি এক একবার বক্রনয়নে রাজার প্রতি এরূপ কটাক্ষপাত করিতে লাগিলেন, বোধ হয় যেন, নয়নবিনির্গত ক্রোধাগ্নির দ্বারা রাজাকে একেবারেই দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছেন। পরে ক্রোধসংবরণ করিবার যথেষ্ট চেষ্টা করিলেও তাঁহার সে ভাব অপ্রকাশিত রহিল না। ক্ষণকাল এই অবস্থায় অবস্থান করিয়া রোষকষায়িত-নয়নে রাজার প্রতি দৃষ্টিপাতপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, “মহারাজ! তুমি জানিয়া শুনিয়াও কেন ইতর লোকের ন্যায় অসঙ্কুচিতচিত্তে কহিতেছ, ‘আমি কিছুই জানি না।’ আমি যাহা কহিলাম, তাহা সত্য, কি মিথ্যা, তদ্বিষয়ে তোমার অন্তঃকরণই সাক্ষী। তুমি স্বয়ংই সত্য মিথ্যা ব্যক্ত কর; আত্মাকে অবজ্ঞা করিও না। যে ব্যক্তি মনে একপ্রকার জানিয়া মুখে অন্যপ্রকার বলে, সেই আত্মাপহারী চৌরের কোন্ দুষ্কর্ম্ম না করা হয়? তুমি মনে করিতেছ, একাকী এই কর্ম্ম করিয়াছ, অন্য কেহই জানিতে পারে নাই, কিন্তু তুমি কি জান না যে, মহর্ষি কণ্ব অন্তর্য্যামী? তিনি স্বীয় যোগবলে পাপ-পুণ্য সমুদয় জানিতে পারেন। তুমি তাঁহার কাছে গোপন করিতে পারিবে না। লোকে পাপকর্ম্ম করিয়া মনে করে, আমার দুষ্কর্ম্ম কেহই জানিতে পারে নাই; দেবগণ ও অন্তর্য্যামী পুরুষেরা সকলই জানিতে পারেন। আর সূর্য্য, চন্দ্র, বায়ু, অগ্নি, স্বর্গ, পৃথিবী, জল, মন, যম, দিবা, রাত্রি, প্রাতঃকাল, সায়ংকাল এবং ধর্ম্ম, ইঁহারা মনুষ্যের সমস্ত বৃত্তান্ত জানিতে পারেন। পাপপুণ্যের সাক্ষিস্বরূপ হৃদয়স্থিত আত্মা সন্তুষ্ট থাকিলে বৈবস্বত যম স্বয়ং মনুষ্যের পাপ নাশ করেন। আর যে দুরাত্মার আত্মা সন্তুষ্ট নহে, যম সেই দুরাচারের পাপ বৃদ্ধি করেন। সেই পাপাত্মা আত্মাকে অপমান করিয়া সত্যবিষয় মিথ্যারূপে প্রতিপাদন করে, দেবতারা তাহার মঙ্গলবিধান করেন না। আমি পতিব্রতা। আমি স্বয়ং উপস্থিত হইয়াছি বলিয়া আমাকে অপমান করিও না। আমি তোমার সমাদরণীয়া ভার্য্যা। তুমি কি নিমিত্ত এই সভামধ্যে আমাকে সামান্যার ন্যায় উপেক্ষা করিতেছ? তুমি আমার এই সকল সকরুণ বাক্য কি কিছুই শুনিতেছ না? আমি কি অরণ্যে রোদন করিতেছি? হে দুষ্মন্ত! তুমি যদি আমার কথায় অবজ্ঞাপ্রদর্শনপূর্ব্বক উত্তর প্রদান না কর, তাহা হইলে অদ্য তোমার মস্তক শতধা বিদীর্ণ হইবে। পৌরাণিকেরা কহেন, ‘পতি স্বয়ং ভার্য্যার গর্ভে প্রবেশ করিয়া পুৎত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেন, এই নিমিত্তই জায়ার জায়াত্ব হইয়াছে।’ পুৎত্র জন্মগ্রহণ করিয়া পূর্ব্বমৃত পিতামহদিগকে উদ্ধার করে এবং পিতাকে পুন্নাম নরক হইতে পরিত্রাণ করে, এই বলিয়া স্বয়ম্ভু ব্রহ্মা উহাকে পুৎত্র বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন। গৃহকর্ম্মদক্ষা পুৎত্রবতী পতিপরায়ণা ভার্য্যাই যথার্থ ভার্য্যা। ভার্য্যা ভর্ত্তার অর্দ্ধাঙ্গস্বরূপ, পরম বন্ধু এবং ত্রিবর্গ [ধর্ম্ম, অর্থ ও কাম] লাভের মূল কারণ। ভার্য্যাবান্ লোকেরাই ক্রিয়াশালী হয়। ভার্য্যাবান্ লোকেরাই গৃহী বলিয়া পরিগণিত হয়; ভার্য্যাবান্ লোকেরাই সর্ব্বদা সুখী হয়; ভার্য্যাবান্ লোকেরাই সৌভাগ্যসম্পন্ন হয়েন। প্রিয়ংবদা ভার্য্যা অসহায়ের সহায়স্বরূপ, ধর্ম্মকার্য্যে পিতাস্বরূপ, আর্ত্ত ব্যক্তির জননীস্বরূপ এবং পথিকের বিশ্রামস্থানস্বরূপ। ভার্য্যাবান্ ব্যক্তি সকলেরই বিশ্বাসভাজন। মরণানন্তর আর কিছুই অনুগামী হয় না, কেবল পতিব্রতা পত্নীই সহগামিনী হইয়া থাকে। পতিব্রতা ভার্য্যা যদি পূর্ব্বে পরলোকপ্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে সে তথায় গিয়া পতির অপেক্ষা করে; আর যদি পূর্ব্বে পতির পরলোক হয়, তবে তাঁহার সহমৃতা হয়। হে মহারাজ! যেহেতু পতি ভার্য্যাকে ইহলোক ও পরলোকে সহায়স্বরূপ প্রাপ্ত হন, এই নিমিত্তই লোকে পাণিগ্রহণ অভিলাষ করেন। পতি স্বয়ং ভার্য্যার গর্ভে প্রবেশ করিয়া পুৎত্রনামধারী হইয়া জন্মগ্রহণ করেন। অতএব পুৎত্রপ্রসবিনী ভার্য্যাকে সাক্ষাৎ মাতা বলিয়া মনে করা কর্ত্তব্য। যেমন আদর্শতলে মুখ-প্রতিবিম্ব, পুৎত্রও তদ্রূপ পিতার প্রতিবিম্বস্বরূপ। এই নিমিত্তই লোকে পুৎত্রমুখ নিরীক্ষণ করিয়া স্বর্গভোগের সুখানুভব করে। মনুষ্য শারীরিক বা মানসিক পীড়ার দ্বারা যতই কেন কাতর হউক না, প্রিয়তমা ভার্য্যাকে অবলোকন করিলে আতপতাপিত সুশীতল জলে অবগাঢ় [স্নাতক] ব্যক্তির ন্যায় সর্ব্বদুঃখ বিস্মৃত হইয়া পরম পরিতোষ লাভ করে। ভার্য্যা কর্ত্তৃক সাতিশয় ভর্ৎসিত হইলেও তাহার অপ্রিয় কার্য্য করা কদাপি বিধেয় নহে; কারণ, রতি, প্রীতি ও ধর্ম্ম এই তিন সুখসাধনই ভার্য্যার আয়ত্ত। স্ত্রীলোক আত্মার পবিত্র জন্মক্ষেত্র এবং স্ত্রীলোক ব্যতীত পুৎত্রৎপাদন হয় না। পুৎত্র পিতৃপদে প্রণাম করিয়া ধূলিধূসরিতকলেবর হয় এবং পিতাকে আলিঙ্গন করে; এই অসার সংসারে ইহা অপেক্ষা সুখ আর কি আছে? অতএব হে মহারাজ! স্বয়ং আগত এই প্রাণসম পুৎত্রকে কেন অবমানিত করিতেছ? দেখ, ক্ষুদ্র জীব পিপীলিকারাও স্বীয় অণ্ডসমুদয় সাতিশয় যত্নসহকারে রক্ষা করে, তুমি ধর্ম্মজ্ঞ হইয়াও কি নিমিত্ত আপন পুৎত্রকে পালন করিতে পরাঙ্মুখ হইতেছ? শিশুপুৎত্রের আলিঙ্গনে লোক যাদৃশ সুখানুভব করে, বসন, স্ত্রীগাত্র বা সুশীতল জল স্পর্শ করিয়া কি তাদৃশ সুখাস্বাদন করিতে পারে? যেমন দ্বিপদের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ, চতুষ্পদের মধ্যে গো শ্রেষ্ঠ, গুরুজনের মধ্যে পিতা শ্রেষ্ঠ। সেইরূপ স্পর্শবান্ পদার্থের মধ্যে পুৎত্র সর্ব্বশ্রেষ্ঠ। অতএব এই প্রিয়দর্শন পুৎত্র তোমাকে আলিঙ্গন করিয়া তোমার স্পর্শসুখ উৎপাদন করুক। হে অরিকুল কালান্তক! তিন বৎসর বয়ঃক্রম পরিপূর্ণ হইলে মহর্ষি কণ্ব ইহার ক্ষৎত্রিয়োচিত সমুদয় সংস্কার সম্পাদন করিয়াছেন, অতএব এই পুৎত্র সর্ব্বাংশে তোমার মনস্তাপ নাশ করিবে। হে পুরুবংশাবতংস! যখন এই পুৎত্র ভূমিষ্ঠ হয়, সেই সময়ে আমার প্রতি দৈববাণী হইয়াছিল, ‘এই কুমার যথাকালে শতসংখ্যক অশ্বমেধ-যজ্ঞ করিবে।’ আরও দেখ, পিতা বহুদিনের পর স্থানান্তর হইতে আগমন করিয়া পুৎত্রকে ক্রোড়ে গ্রহণপূর্ব্বক তাঁহার মস্তক আঘ্রাণ ও বদন চুম্বন করিয়া পরম সন্তোষ লাভ করেন। কুমারের জাত কর্ম্মকালে ব্রাহ্মণেরা এই সকল মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া থাকেন, বোধ হয়, তুমিও কোন্ তাহা না জান।–’হে পুৎত্র! তুমি আমার প্রতঙ্গ হইতে সম্ভূত হইয়াছ; তুমি আমার হৃদয় হইতে জন্মিয়াছ এবং তুমি আমার পুৎত্রনামধারী আত্মা; অতএব তুমি শত বৎসর জীবিত থাক; আমার জীবন তোমার অধীন; আমার অক্ষয় বংশ তোমার অধীন; অতএব তুমি সুখী হইয়া শত বৎসর জীবিত থাক।’ হে রাজন! এই পুৎত্র তোমার শরীর হইতে সমুৎপন্ন; অতএব নির্ম্লল সলিলে আত্মপ্রতিবিম্ব-দর্শনের ন্যায় পুৎত্রমুখ নিরীক্ষণ কর। যেমন গার্হপত্য অগ্নি হইতে আহবনীয় অগ্নি প্রণীত হয়, সেইরূপ তোমা হইতে এই পুৎত্র সমুৎপন্ন হওয়াতে একমাত্র তুমিই দ্বিধাকৃত হইয়াছ। হে রাজন! একদা তুমি মৃগয়ায় গমন করিয়া এক মৃগের অনুসরণক্রমে তাত কণ্বের আশ্রমে আমার সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলে। আমি সে সময়ে কুমারী ছিলাম। হে মহারাজ! উর্ব্বশী, পূর্ব্বচিত্তি, সহজন্যা, মেনকা, বিশ্বাচী ও ঘৃতাচী এই ছয়জন অপ্সরা সর্ব্বপ্রধান। তন্মধ্যে ব্রহ্মলোকনিবাসিনী মেনকা স্বর্গ হইতে মর্ত্ত্যলোকে আগমন করিয়া বিশ্বামিত্রের ঔরসে আমাকে উৎপাদন করিয়াছিলেন। অভদ্রা মেনকা হিমালয়ের প্রস্থদেশে আমাকে প্রসব করিয়া শত্রুকন্যার ন্যায় তথায় পরিত্যাগপূর্ব্বক চলিয়া যান। হায়! না জানি, আমি জন্মান্তরে কি মহাপাতক করিয়াছিলাম; যেহেতু, বাল্যকালে বন্ধুবান্ধবেরা আমাকে পরিত্যাগ করিয়াছিল, এক্ষণে আবার তুমি পতি হইয়াও পরিত্যাগ করিলে! যাহা হউক, তুমি আমাকে পরিত্যাগ করিলেও আমার তত ক্ষতি বোধ হইবে না; কারণ, আমি এক্ষণেই পিতার আশ্রমে গমন করিব; কিন্তু তোমার স্বীয় ঔরসজাত এই সুকুমার নবকুমারকে পরিত্যাগ করা নিতান্ত অবিধেয়।”
দুষ্মন্ত কহিলেন, “শকুন্তলে! আমি তোমার গর্ভে যে পুৎত্র উৎপাদন করিয়াছি, ইহা আমার কোন প্রকারেই স্মরণ হইতেছে না, স্ত্রীলোকেরা প্রায়ই মিথ্যা কহিয়া থাকে; বোধ হয়, তুমিও মিথ্যাকথা কহিতেছ; কে তোমার কথায় বিশ্বাস করিবে? কুলটা মেনকা তোমার জননী; তাহার মত নির্দ্দয় লোক জগতে নাই। সে তোমাকে প্রসব করিয়া নির্ষ্মাল্যের [পূজান্তে পরিত্যাক্ত পুষ্প] ন্যায় হিমালয়ের প্রস্থে পরিত্যাগ করিয়াছিল। আর তোমার জন্মদাতা বিশ্বামিত্রও অতি নীচাশয়; কারণ তিনি ক্ষৎত্রিয়কুলোদ্ভব হইয়া পরম পবিত্র সর্ব্বজনমাননীয় ব্রাহ্মণত্ব পাইয়াছেন; তত্রাচ কামপরবশ হইয়াছিলেন। ভাল, তোমাকে জিজ্ঞাসা করি, যদি মেনকা অপ্সরার মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও বিশ্বামিত্র মহর্ষিদিগের অগ্রগণ্য, তবে তুমি তাঁহাদিগের কন্যা হইয়া কি নিমিত্ত পুংশ্চলীর [কূলটা—পরপুরুষগামিনী] ন্যায় মিথ্যাবাক্য প্রয়োগ করিতেছ? এই সভাসদ্গণের সমক্ষে, বিশেষতঃ আমার সমক্ষে এই সকল অশ্রদ্ধেয় কথা কহিতে তোমার কি লজ্জা হইতেছে না? অতএব রে দুষ্টতাপসি! তুমি এ স্থান হইতে প্রস্থান কর। মহর্ষিশ্রেষ্ঠ বিশ্বামিত্র ও অপ্সরাপ্রধানা মেনকাই বা কোথায়, আর তাপসীবেশধারিণী তুমিই বা কোথায়? তোমার এই পুৎত্রকে বাল্যকালেই মহাবলপরাক্রান্ত ও মহাকায় দেখিয়া কোনরূপেই তোমাকে বিশ্বাস হইতেছে না। তুমি আপনিই কহিতেছ, সুনিকৃষ্টা স্বৈরিণী [স্বচ্ছাচারিণী] মেনকা তোমার জননী। সে কামরাগে অন্ধ হইয়া তোমাকে উৎপাদন করিয়াছে। আর তুমিও পুংশ্চলীর ন্যায় কথাবার্ত্তা কহিতেছ। তুমি যে-সকল কথা কহিলে, আমি তাহার বিন্দুবিসর্গও জানি না এবং তোমাকেও চিনি না; অতএব তুমি যথায় ইচ্ছা চলিয়া যাও।”
শকুন্তলা কহিলেন, “মহারাজ! সর্ষপপ্রমাণ পরদোষ নিরীক্ষণ কর, কিন্তু বিল্ব-পরিমিত আত্মদোষ দেখিতে পাও না। মেনকা দেবগণের মধ্যে গণনীয়া ও আদরণীয়া; অতএব তোমার জন্ম হইতে আমার জন্ম উৎকৃষ্ট তাহাতে সন্দেহ নাই। আরও দেখ, তুমি কেবল পৃথিবীতে ভ্রমণ কর, আমি পৃথিবী ও অন্তরীক্ষ উভয় স্থলেই গতায়াত করিতে পারি; অতএব আমার ও তোমার প্রভেদ সুমেরু ও সর্ষপের প্রভেদের ন্যায়। আমার এরূপ প্রভাব আছে, আমি ইন্দ্র, যম, কুবের, বরুণ প্রভৃতি দেবগণের ভবনেও অনায়াসে যাতায়াত করিতে পারি। হে মহারাজ! আমি এস্থলে এক লৌকিক সত্য দৃষ্টান্ত দেখাইতেছি, শ্রবণ কর; রুষ্ট হইও না। দেখ, কুরূপ ব্যক্তি যে পর্য্যন্ত আদর্শমণ্ডলে আপন মুখ না দেখে ততক্ষণ আপনাকে সর্ব্বাপেক্ষা রূপবান্ বোধ করে; কিন্তু যখন আপনার বিকৃত মুখশ্রী নিরীক্ষণ করে, তখন আপনার ও অন্যের রূপ-প্রভেদ জানিতে পারে। যে ব্যক্তি অত্যন্ত সুশ্রী, সে কখন অন্যকে অবজ্ঞা করে না। যে অধিক বাক্যব্যয় করে লোকে তাহাকে মিথ্যাবাদী ও বাচাল কহে। যেমন শূকর নানাবিধ সুখাদ্য মিষ্টান্ন পরিত্যাগ করিয়া পুরীষ [বিষ্ঠা] মাত্র গ্রহণ করে, সেইরূপ মূর্খলোকেরা শুভাশুভ বাক্য শ্রবণ করিলে শুভকথা পরিত্যাগপূর্ব্বক অশুভই গ্রহণ করিয়া থাকে; আর হংস যেমন সজল দুগ্ধ হইতে অসার জলীয়াংশ পরিত্যাগপূর্ব্বক দুগ্ধরূপ সারাংশই গ্রহণ করে, সেইরূপ পণ্ডিত ব্যক্তিরা লোকের শুভাশুভ বাক্য শ্রবণ করিয়া তাহা হইতে শুভই গ্রহণ করেন। সজ্জনেরা পরের অপবাদ শ্রবণ করিয়া অতিশয় বিষণ্ণ হয়েন, কিন্তু দুর্জ্জনেরা পরের নিন্দা করিয়া যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হয়। সাধু ব্যক্তিরা মান্য লোকদিগের সংবর্দ্ধনা করিয়া ষাদৃশ সুখী হন, অসাধুগণ সজ্জনগণের অপমান করিয়া ততোধিক সন্তোষ লাভ করে। অদোষদর্শী সাধু ও দোষৈকদর্শী [কেবল পরচ্ছিদ্রানুসারী] অসাধু উভয়েই সুখে কালাতিপাত করে; কারণ, অসাধু সাধু ব্যক্তির নিন্দা করে, কিন্তু সাধু ব্যক্তি অসাধু কর্ত্তৃক অপমানিত হইয়াও তাহার নিন্দা করেন না। যে ব্যক্তি স্বয়ং দুর্জ্জন, সে সজ্জনকে দুর্জ্জন বলে, ইহা হইতে হাস্যকর আর কি আছে? ক্রুদ্ধ কালসর্পরূপী সত্যধর্ম্মচ্যুত পুরুষ হইতে যখন নাস্তিকেরাও বিরক্ত হয়, তখন মাদৃশ আস্তিকেরা কোথায় আছেন? যে ব্যক্তি স্বয়ং স্ব-সদৃশ পুৎত্র উৎপাদন করিয়া তাহার সমাদর না করে, দেবতারা তাহাকে শ্রীভ্রষ্ট করেন এবং সে অভীষ্টলোক প্রাপ্ত হইতে পারে না। পিতৃগণ পুৎত্রকে কুল ও বংশের প্রতিষ্ঠা এবং সর্ব্বধর্ম্মোত্তম বলিয়া নির্দ্দেশ করেন, অতএব পুৎত্রকে পরিত্যাগ করা অত্যন্ত অবিধেয়। ভগবান্ মনু কহিয়াছেন—ঔরস, লব্ধ, ক্রীত, পালিত এবং ক্ষেত্রজ এই পঞ্চবিধ পুৎত্র মনুষ্যের ইহকালে ধর্ম্ম, কীর্ত্তি ও মনঃপ্রীতি বর্দ্ধন করে এবং পরকালে নরক হইতে পরিত্রাণ করে। অতএব হে নরনাথ! তুমি পুৎত্রকে পরিত্যাগ করিও না। হে ধরাপতে! আত্মকৃত সত্যধর্ম্ম প্রতিপালন কর। হে নরেন্দ্র! কপটতা পরিত্যাগ কর। দেখ, শত শত কূপ খনন অপেক্ষা এক পুষ্করিণী প্রস্তুত করা শ্রেষ্ঠ; শত শত পুষ্করিণী খনন করা অপেক্ষা এক যজ্ঞানুষ্ঠান করা শ্রেষ্ঠ, শত শত যজ্ঞানুষ্ঠান অপেক্ষা এক পুৎত্রোৎপাদন করা শ্রেষ্ঠ এবং শত শত পুৎত্র উৎপাদন অপেক্ষা এক সত্য প্রতিপালন করা শ্রেষ্ঠ। একদিকে সহস্র অশ্বমেধ ও অন্যদিকে এক সত্য রাখিয়া তুলনা করিলে সহস্র অশ্বমেধ অপেক্ষাও সত্যের গুরুত্ব অধিক হয়। হে মহারাজ! সমুদয় বেদ অধ্যয়ন ও সর্ব্বতীর্থে অবগাহন করিলে সত্যের সমান হয় কি না সন্দেহ। যেমন সত্যের সমান ধর্ম্ম নাই এবং সত্যের সমান উৎকৃষ্ট আর কিছুই নাই, তদ্রূপ মিথ্যার তুল্য অপকৃষ্ট আর কিছুই দেখিতে পাওয়া যায় না। হে রাজন্! সত্যই পরব্রহ্ম, সত্যপ্রতিজ্ঞা প্রতিপালন করাই পরমোৎকৃষ্ট ধর্ম্ম, অতএব তুমি সত্য পরিত্যাগ করিও না। আর যদি তুমি মিথ্যানুগামী হইয়া আমাকে অশ্রদ্ধা কর, তবে আমি আপনিই এ স্থান হইতে প্রস্থান করিব, তোমার সহিত আর কদাচ আলাপ করিব না; কিন্তু হে দুষ্মন্ত! তোমার অবিদ্যমানে আমার এই পুৎত্র এই সসাগরা বসুন্ধরা অবশ্যই প্রতিপালন করিবে সন্দেহ নাই।”
দুষ্মন্তের প্রতি দৈববাণী
বৈশম্পায়ন কহিলেন, শকুন্তলা রাজাকে এই কথা কহিয়া নিরস্ত হইবামাত্র ঋত্বিক্, পুরোহিত, আচার্য্য ও মন্ত্রিগণ-পরিবেষ্টিত রাজার প্রতি এই আকাশবাণী হইল,—”মাতা চর্ম্মকোষস্বরূপ, পিতাই পুৎত্ররূপে জন্মপরিগ্রহ করেন; পুৎত্র জনয়িতা হইতে কিছুমাত্র বিভিন্ন নহে, অতএব হে দুষ্মন্ত! তুমি আপনার পুৎত্রকে প্রতিপালন কর, শকুন্তলাকে অপমান করিও না। হে নরদেব! ঔরস পুৎত্র পিতাকে যমালয় হইতে উদ্ধার করে। শকুন্তলা সত্যই কহিতেছেন, তুমিই এই পুৎত্রের উৎপাদক। জনয়িত্রী স্বকীয় অঙ্গকে দ্বিখণ্ড করিয়া অর্দ্ধভাগ পুৎত্ররূপে প্রসব করেন; অতএব হে দুষ্মন্ত! এই শকুন্তলাগর্ভসম্ভৃত পুৎত্রকে প্রতিপালন কর। জীবৎপুৎত্রকে পরিত্যাগ করা শ্রেয়স্কর নহে, অতএব হে রাজন্! শকুন্তলাগর্ভজাত এই স্বীয় পুৎত্রকে লালনপালন কর। যেহেতু, আমাদিগের উপরোধে তোমার এই পুৎত্রকে ভরণ করা আবশ্যক হইল, এই নিমিত্ত ইনি ভরত নামে বিখ্যাত হইবেন।”
রাজা দুষ্মন্ত দৈববাণী শ্রবণে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া পুরোহিত ও অমাত্যবর্গকে কহিলেন, “আপনারা দেবদূতের বাক্য শুনিলেন? আমিও এই কুমারকে আমারই আত্মজ বলিয়া জানি; কিন্তু যদি সহসা ইহাকে গ্রহণ করি, তাহা হইলে লোকে আমাকে দোষী করিবে এবং পুৎত্রটিও কলঙ্কী হইবে; এই ভয়ে শকুন্তলার সহিত বিতণ্ডা করিতেছিলাম।” তাঁহাদিগকে এই কথা বলিয়া রাজা হৃষ্টচিত্তে পুৎত্রকে গ্রহণ করিলেন।
অনন্তর রাজা পিতৃকর্ত্তব্য সমুদয় কার্য্য নির্ব্বাহ করিয়া পুৎত্রের মস্তকাঘ্রাণপূর্ব্বক আলিঙ্গন করিলেন। তৎকালে ব্রাহ্মণগণ তাঁহাকে ধন্যবাদ করিতে লাগিলেন এবং বন্দিগণ স্তুতিপাঠ করিতে লাগিল। অনন্তর রাজা ধর্ম্মপত্নী শকুন্তলাকে যথোচিত সমাদর পূর্ব্বক সান্ত্বনাবাক্যে কহিতে লাগিলেন, “প্রিয়ে! নির্জ্জন কাননে তোমার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলাম, কেহই জানিত না; দোষৈকদর্শী লোক পাছে তোমাকে কুলটা, আমাকে কামপরবশ এবং রাজ্যে অভিষিক্ত পুৎত্রকে জারজ মনে করে, এই ভয়ে আমি এতক্ষণ এতদ্রূপ বিচার করিতেছিলাম; তুমি ক্রুদ্ধা হইয়া আমার প্রতি যে-সকল কটুবাক্য প্রয়োগ করিয়াছ, হে প্রিয়তমে! আমি তাহা ক্ষমা করিয়াছি।”
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে ভারত! রাজা দুষ্মন্ত মহিষীকে এইরূপ কহিয়া বস্ত্রান্নপানাদি দ্বারা পরিতুষ্ট করিলেন এবং শকুন্তলার পুৎত্রের নাম ভারত রাখিলেন। পরে রাজাধিরাজ দুষ্মন্ত পুৎত্রকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। ভরত যুবরাজ হইয়া কতিপয় দিবসের মধ্যে সমস্ত মহীপালগণকে পরাজয় করিয়া ধর্ম্মানুষ্ঠান দ্বারা পরম যশস্বী হইলেন; অনন্তর রাজচক্রবর্ত্তী হইয়া অনল্প অশ্বমেধ-যজ্ঞের অনুষ্ঠান দ্বারা সুরগণের নিকট ইন্দ্রের ন্যায় আদরণীয় হইয়া উঠিলেন। হে মহারাজ! সেই ভরত হইতে ভারতী কীর্ত্তি ও তোমাদিগের ভারতনামক সুবিখ্যাত কুল সমুৎপন্ন হইয়াছে।
আদিপর্ব্বান্তর্গত সম্ভবপর্ব্বাধ্যায়ে শকুন্তলোপাখ্যান সম্পূর্ণ।

সাধারণ সৃষ্টিবর্ণন
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে পুণ্যাত্মন্! মহারাজ দুষ্মন্ত ও পতিপরায়ণা শকুন্তলার উপাখ্যান কীর্ত্তন করিলাম; এক্ষণে দক