সোমবার , নভেম্বর ২০ ২০১৭ | ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Breaking News
Home / প্রচ্ছদ / প্রাচীন ইতিহাস

প্রাচীন ইতিহাস

প্রাচীন ইতিহাস
*********************

পরিবার,
ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি –
সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন প্রাগৈতিহাসিক স্তর :
**************************************************
মানবজাতির প্রাগৈতিহাসিক যুগকে নির্দিষ্ট নিয়ম ও শৃঙ্খলার ভেতরে আনয়ন করতে অনেক দার্শনিক চেষ্টা করেন । তার মধ্যে উন্নতম হচ্ছে মর্গ্যান । তার শ্রেণী বিন্যাস যতদিন কোনো গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত বিষয়-বস্তুর চাপে পরিবর্তন সাধনের প্রয়োজন উপস্থিত না হয়, ততদিন তাঁর শ্রেণী-বিন্যাসই বলবৎ থাকবে ।

তাঁর শ্রেণী বিন্যাসে :-

ক) অ-সভ্য অবস্থা ।
খ) বর্বর অবস্থা ।
গ) সভ্যতা ।

মানব সমাজের, এই তিনটি প্রধান যুগের মধ্যে প্রথম দুটো এবং তৃতীয় যুগের পরিবর্তনের সূচনার সময় পর্যন্ত নিয়ে তিনি [মর্গ্যান] আলোচনা চালান । অ-সভ্য অবস্থা ও বর্বর যুগকে তিনি তিনটি স্তরে আলোচনা করেছেন [ আহার্য উৎপাদনে প্রগতির ক্রম অনুসারে যেমন ] –

(১) নিম্ন স্তর বা পর্যায় ।
(২) মধ্য স্তর বা পর্যায় ।
(৩) উচ্চ স্তর বা পর্যায় ।

আহার্য উৎপাদনের প্রগতিকে মাপকাঠিরূপে ব্যবহারের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন :
“ আহার্য উৎপাদনে মানবজাতির নৈপুণ্যের উপরই তাদের পৃথিবীতে প্রাধান্য বিস্তারের সমগ্র সমস্যাটা নির্ভর করে । সকলেরই বিশ্বাস পৃথিবীতে একমাত্র মানবজাতিই আহার্য উৎপাদনের উপর পুরো ক্ষমতা বিস্তার করেছে অর্থাৎ এই সমস্যাটাকে পুরোপুরি মুঠোর মধ্যে আনয়ন করতে সক্ষম হয়েছে । কাজেই আহার্য উৎপাদিনের উৎস ও উপায়গুলির বিস্তৃতি সাধনের সঙ্গে মানবীয় প্রগতি ধারার প্রধান যুগগুলোকে অল্পবিস্তর প্রত্যক্ষভাবে অভিন্নরূপে কল্পনা করা হয়েছে । ”

(ক) অসভ্য অবস্থা :
******************
(১) নিম্নস্তর :
মানবজাতির শৈশব অবস্থা । মানুষ তখনো তার মূল আবাস-স্থল গ্রীষ্মমণ্ডল ও গ্রীষ্মমণ্ডলের সন্নিহিত বন-জঙ্গলে, অন্তত আংশিকভাবে বৃক্ষে অবস্থান করে । এছাড়া, অতিকায় শিকারী জানোয়ারদের মধ্যে তার অবিচ্ছিন্নভাবে তিষ্ঠিয়া থাকা কল্পনা করাও যায় না । ফল, শাঁস, মূল তার আহার্য দ্রব্য। মৌখিক ভাষার ক্রমবিকাশ এই যুগের প্রধান কীর্তি। এই ঐতিহাসিক যুগে বিদিত কোন জাতিকেই আর আদিম অবস্থায় দেখা যায় না। যদিও এই যুগ চলে হাজার বছর ধরে তবুও এমন কোন প্রত্যক্ষ নজির বা প্রমাণপত্র নেই যা দিয়ে এত অস্তিত্ব প্রমাণ করা যেতে পারে । কিন্তু প্রাণীরাজ্য থেকে মানবজাতির উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ স্বীকার করার সঙ্গে এই পরিবর্তনের যুগটাকেও অবশ্যই মেনে নিতে হয় ।

(২) মধ্যস্তর :
ভোজ্যবস্তুরূপে মাছ ( কাঁকড়া, ঝিনুক ইত্যাদি জলজন্তুসহ ) আগুন ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে এই স্তরের সূচনা । মাছ আর আগুন উভয়ে উভয়ের পরিপূরক । কারণ একমাত্র আগুনের সাহায্য নিয়েই মাছ শরীরের পুষ্টিসাধন করতে পারে । এই নতুন ভোজ্যবস্তু আবিষ্কারের পর মানুষ জলবায়ু আর স্থানের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করে । এমন কি, সেই নিতান্ত অসভ্য অবস্থাতেও তারা নদী আর সমুদ্রোপকূল ধ’রে পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এই সব দেশান্তর গমনের প্রমাণস্বরূপ বলা যতে পারে যে, প্রত্যেক মহাদেশেই প্রাচীন প্রস্তর যুগের (Stone Age) বা পেলিওলিথ (Paleolithic) নামে পরিচিত যুগের আনাড়ীভাবে তৈরী ভোঁতা পাথরের অস্ত্র দেখতে পাওয়া যায় । ঐ সমস্ত অস্ত্র বা উহার অধিকাংশের ব্যবহার সর্বতোভাবে বা প্রধানত এই যুগেই আরম্ভ হয় । নতুন অধিকৃত অঞ্চল, উদ্ভাবনের জন্যে অবিশ্রান্ত সক্রিয় তাগিদ বোধ আর ঘর্ষণ দ্বারা আগুন তৈরীর ক্ষমতা মানুষকে নতুন নতুন ভোজ্যবস্তুর উদ্ভাবনে সক্ষম করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, মানুষ ক্রমে গুড়ো করার যোগ্য মূল ও কন্দ গরম ছাইয়ের গাদায় বা মাটির চুল্লিতে বসিয়ে ভোজ্যদ্রব্যে পরিণত করে ।

প্রথম অস্ত্র গদা বা বর্শা উদ্ভাবনের পর শিকারলব্দ প্রাণীও মাঝে মাঝে ভোজ্য-বস্তুতে পরিণত হয় । কিন্তু সাহিত্যে কেবল মাত্র মৃগয়াজীবী অর্থাৎ একমাত্র শিকারলব্দ প্রাণীর মাংস খেয়েই জীবনধারণে অভ্যস্ত যে-সব উপজাতির বিবরণী হামেশা চোখে পড়ে । কিন্তু সেই ধরণের কোন উপজাতি কোনদিনই ধরাপৃষ্ঠে বিচরণ করেনি । কারণ শিকারের প্রাণী যোগাড় করা তখন অত্যন্ত বিপজ্জনকই ছিল এবং কাজেই তা সম্ভবপর ছিল না । এই অবস্থায়, ভোজ্যবস্তু সরবরাহের অনবরত অনিশ্চয়তাবশত নরমাংস ভোজন প্রথাও উদ্ভূত হয়ে থাকবে । এই স্তর চলে আরও বহু দীর্ঘ সময় ধরে । অস্ট্রেলিয়ান বাসিন্দারা এবং পলেনেশিয়ার বহু জাতি এখনও অসভ্য অবস্থায় এই মধ্য স্তরেই আছে ।

(৩) উচ্চস্তর :
তীর-ধনুক উদ্ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে এই স্তরের উৎপত্তি । তার ফলে শিকার-লব্ধ প্রাণী নিয়মিতভাবে ভোজ্য-বস্তু আর শিকার স্বাভাবিক বৃত্তিতে পরিণত হয়। ধনুক, রজ্জু ও তীর তখন অত্যন্ত জটিল অস্ত্ররূপে গণ্য। তীর-ধনুকের উদ্ভাবন মানুষের রীতিমতভাবে বুদ্ধিবৃত্তিতে শাণ এবং বহু বৎসরের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পরিচায়ক । মোটকথা, আরও অনেক কিছু আবিষ্কারের পরিচয় এই নয়া আবিষ্কারের ইন্ধন জোগায় ।

আমরা দেখতে পাই, মৃন্ময়পাত্র ব্যবহারে অনভ্যস্ত । কিন্তু তীর-ধনুর সঙ্গে পরিচিত জাতিগুলি [ মর্গ্যানের মতে এখান থেকে বর্বরযুগের দিকে পরিবর্তনের সূচনা ] ইতিমধ্যেই পল্লিগ্রামগুলিতে বসবাস আরম্ভ করেছে । আর তারা ভোজ্যদ্রব্য উৎপাদনের উপায়ের উপরেও অনেকখানি প্রভুত্বলাভ করেছে । কাঠের জলপাত্র ও বাসনকোসন, গাছের ছালের তন্তু দিয়ে হাতে-বোনা ( তাঁতের সাহায্যে নয় ) বস্ত্র, গাছের ছাল বা পাতলা শাখা দিয়ে তৈরি ঝুড়ি, ধারালো পাথরের অস্ত্রও আমাদের চোখে পড়ে ।

আগুন ও প্রস্তরের কুঠার উদ্ভাবনের সঙ্গে সঙ্গে গাছের গুঁড়ি দিয়ে খোদাই করা নৌকার রেওয়াজও আরম্ভ হয় । লোকে কাঠের কড়ি আর তক্তা দিয়ে মাঝে মাঝে বসত-বাড়িও তৈরী করে । উদাহরণস্বরূপ – উত্তর-পশ্চিম আমেরিকায় ইণ্ডিয়ানদের মধ্যে এই সমস্ত অগ্রগতির ছাপ এখনও দেখতে পাওয়া যায় । এরা তীর ধনুর ব্যবহার জানলেও মৃন্ময়পাত্র সম্পর্কে একেবারে অনভিজ্ঞ । বর্বর-যুগের লৌহ-নির্মিত তরবারি আর সভ্যতার আমলের আগ্নেয়াস্ত্রের মত অসভ্য যুগের তীর-ধনুকই চরম অস্ত্ররূপেই গণ্য ।

(খ) বর্বর যুগ বা অবস্থা –
************************
(১) নিম্নস্তর :
মৃন্ময়পাত্র প্রবর্তনের সঙ্গে সংগে এই স্তরের সূচনা । আগুনের কবল থেকে রক্ষা করার জন্যে প্রায়ই ঝুড়ি বা কাঠের পাত্রের গায়ে কাদা লেপা হতো । [ প্রথম মৃন্ময়পাত্র এইভাবেই তৈরি হয়। নানাক্ষেত্রে এর প্রমাণ পাওয়া যায় । আর এই প্রক্রিয়া যে সম্ভবও তাতে সন্দেহ করার বিশেষ কোন কারণ দেখা যায় না। ] মোটের উপর, এইভাবে মানুষ আবিষ্কার করে যে, ভেতরে কোন পাত্র না থাকলেও মাটির ছাঁচেই বেশ কাজ চলে যায় ।

আমরা ক্রমবিকাশের যে সাধারণ গতি ও ধারা নিয়ে আলোচনা করলাম, নির্দিষ্ট কোন যুগে, দেশ বা স্থান নির্বিশেষে এই গতি ও ধারা সমস্ত জাতির উপরেই প্রয়োগ করা চলে। বর্বর যুগের প্রারম্ভেই আমরা এমন একটা স্তরে পৌঁছি, যেখানে [পৃথিবীর] দুইটি মহাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর পার্থক্য রীতিমত প্রভাব বিস্তার করতে আরম্ভ করে। পশুপালন, জনন এবং চাষ-আবাদ বর্বর যুগের প্রধান বিশেষত্ব । এই সময় পূর্ব-মহাদেশ, তথাকথিত প্রাচীন-জগত পালনের যোগ্য প্রায় সকলপ্রকার জীব-জানোয়ারের অধিকারী । এখানে কেবলমাত্র একটি ছাড়া সকল প্রকার খাদ্য-শস্যও জন্মায় ।

পাশ্চাত্য মহাদেশ আমেরিকার লামা ছাড়া পালনের যোগ্য কোনো স্তন্যপায়ী পশু ছিল না । আর এই লামা প্রাণীরও অস্তিস্ব ছিল দক্ষিণ আমেরিকার মাত্র একটি অঞ্চলে । চাষ-আবাদের যোগ্য খাদ্যশস্যগুলোর মধ্যে আমেরিকায় মাত্র একটি খাদ্যশস্যের অস্তিত্ব ছিল – এর নাম ভুট্টা । তবে এই শস্যটা ছিল সর্বোৎকৃষ্ট । প্রাকৃতিক অবস্থার এই সমস্ত রকমফেরে জন্য প্রত্যেক গোলার্ধের লোকজন সে থেকে চলে আপন-আপন পথে । ফলে, মহাদেশ দুটিতে বিভিন্ন স্তরে নানা প্রকার পার্থক্যের সৃষ্টি হয় ।

(২) মধ্যস্তর :
পূর্ব-গোলার্ধে পশুপালন থেকে এই স্তর আরম্ভ হয় । পশ্চিম-গোলার্ধে পয়ঃপ্রণালীর সাহায্যে খাদ্য-শস্যের চাষ-আবাদ আর রোদে শুকানো ইট ও পাথর দিয়ে বাড়ি তৈরীর সঙ্গে এই স্তরের সূচনা ।

পশ্চিম-গোলার্ধ নিয়েই এখন আলোচনা শুরু করা যাক। কারণ এখানে ইউরোপিয়ানদের অধিকার আরম্ভ হওয়ার পূর্বে এই স্তরটি মোটেই পরবর্তী স্তরটির দ্বারা স্থানচ্যুত হওয়ার অবকাশ পায় নি । ইণ্ডিয়ানরা যখন আবিষ্কৃত হয়, তখন বর্বরযুগের নীচের ধাপের ( মিসিসিপি নদীর পূর্বদিকের সমস্ত উপজাতি ) ইণ্ডিয়ানরা ইতিপূর্বেই বাগানে ভুট্টার আবাদ আর সম্ভবত কুমড়া, শশা, খরমুজ প্রভৃতির আবাদেও অভ্যস্ত ছিল । এই সমস্ত ও ভুট্টা থেকে তাদের খোরাকের অধিকাংশ সংগৃহীতও হয় । বেড়া-দিয়ে-ঘেরা কাঠের বাড়িযুক্ত গ্রামে তারা বাস করে । উত্তর-পশ্চিমের বিশেষত কলম্বিয়া নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ইণ্ডিয়ানরা তখনও অ-সভ্যযুগের উচ্চ স্তরে । মাটির বাসন বা চাষ-আবাদ তাদের নিকট একেবারে অজ্ঞাত বস্তু ।

অপরদিকে [ ইউরোপিয়ানদের দ্বারা ] অধিকৃত হবার সময় নিউ-মেক্সিকোর তথাকথিত পুয়েব্লো ইণ্ডিয়ান, মেক্সিকোবাসী, মধ্য-আমেরিকারবাসী ও পেরুবাসী ইণ্ডিয়ানরা ছিল বর্বরযুগের মধ্য স্তরে । এরা রোদে পোড়া ইট ও পাথরের তৈরী দুর্গসদৃশ বাড়িতে বাস করতো । স্থান ও আবহাওয়ার ব্যতিক্রম অনুসারে ভুট্টা ও আরও পাঁচটা গাছপালার চাষ-আবাদ জানত । কৃত্রিম জলসেচ দ্বারা এরা বিভিন্ন বাগানে বিভিন্ন অঞ্চল ও জলবায়ু অনুযায়ী এইসব চাষ-আবাদ করে । এইগুলোই ছিল তাদের প্রধান আহার্য । এরা সামান্য কিছুকিছু পশুপালনও করে । মেক্সিকোবাসীরা টার্কী ও অন্যান্য পাখী আর পেরুবাসীরা লামা পালনে অভ্যস্ত ছিল । ধাতুর ব্যবহারও তারা জানতো, তবে লোহা এদের কাছে ছিল অজ্ঞাত । সে জন্য পাথরের অস্ত্র ও হাল-হাতিয়ার ব্যবহার ত্যাগ করতে তারা সক্ষম হয় নাই । ঠিক এমনি সময়ে, স্পেনীয়েরা তাদের স্বাধীন ক্রমবিকাশের পথ চিরদিনের জন্য রুদ্ধ করে দেয় ।

পূর্ব-গোলার্ধে দুধ ও মাংস-সরবরাহকারী পশু পালনের সঙ্গে সঙ্গে বর্বর যুগের মধ্যস্তর আরম্ভ হয় । কিন্তু এই যুগের শেষাশেষি চাষ-আবাদের সূচনা পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায় না । পশুপালন, পশু-জনন এবং বড় বড় পশুপালন সংগঠন আর্য ও সেমিটিক এবং অপরাপর বর্বরদের মধ্যে ভেদ্রেখা টেনে দেয় । ইউরোপীয় ও অসিয়াবাসী আর্যগণ গরুর একই রকমের নাম ব্যবহার করলেও চাষ-আবাদের অধিকাংশ শস্যের নামের মিল কদাচিৎ পাওয়া যায় ।

সুযোগ সুবিধামত কতকগুলি স্থানে পশুপালন সংগঠন পল্লি-জীবনে পরিণতি লাভ করে । ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিসের তীরবর্তী তৃণ-পূর্ণ সমতলভূমিতে সেমিটিকগণ এবং ভারতবর্ষ ও আল্পস ও জাক্সার্টেস, তথা ডন, নীপার তীরবর্তী তৃণপূর্ণ সমতল ক্ষেত্রগুলির আর্যগণ পল্লি-জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠে । এইরূপ পশুচারণ-যোগ্য ভূমিসমূহের, সীমান্ত দেশেই সর্বপ্রথম পশুপালনের রেওয়াজ আরম্ভ হয়ে থাকে। কাজের পরবর্তী যুগগুলির লোক জনদের মনে এই ধারণা জন্মে যে, পশুপালক উপজাতিগুলো এমন-সব অঞ্চল থেকে এসেছে । যেগুলো মানবজাতির প্রসূতিগৃহ হওয়া দূরে থাকে, ঐসব উপজাতির অ-সভ্য পূর্ব পুরুষ । এমন-কি সেইযুগের নিম্নস্তরের লোকজনদের কাছেও বাসের অযোগ্য বিবেচিত হয়েছে ।

আর নদীতীরবর্তী তৃণপূর্ণ সমতলভূমিতে পল্লিজীবন যাপনে অভ্যস্ত হওয়ার পর মধ্যযুগের এই সব বর্বরদের পক্ষে স্বেচ্ছায় আবার তাদের পূর্বপুরুষদের বনজঙ্গলে ফিরে যাওয়ার সম্ভবনার চিন্তা করাও কঠিন হয়ে উঠে । উত্তর ও পশ্চিমে সরে যাওয়ার প্রয়োজন উপস্থিত হওয়ার সময়ও সেমিটিক ও আর্যগণ পশ্চিম-এশিয়া ও ইউরোপের জঙ্গল সমাকীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেনি । খাদ্যশস্যের চাষবাস দ্বারা এই সব অসুবিধাজনক অঞ্চলে গৃহপালিত পশুগুলির আহার্য সরবরাহ এবং শীতকালেও উহাদের পালনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তাদের পশ্চিম-এশিয়া ও ইউরোপে বসবাস সম্ভব হয়নি । যতদূর সম্ভব, পশু-খাদ্যের জন্যই এই সব উপজাতির লোকেরা খাদ্য-শস্যের চাষ-আআব্দ করে এবং পরে ঐসব ভোজ্যদ্রব্য মানুষের পুষ্টিসাধনে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে।

দুধ ও মাংসের প্রচুর সরবরাহ বিশেষত শিশুদের পুষ্টিবিধানে এই দু’’রকম খাদ্যদ্রব্যের অনুকূল প্রভাবের ফলেই আর্য ও সেমিটিক জাতিগুলো অন্যান্য জাতির তুলনায় উন্নততর মূল্য জাতি রূপে গণ্য হয় । বস্তুত নিউ-মেক্সিকোর পুয়েব্লো ইণ্ডিয়ানদের সম্পূর্ণরূপে নিরামিষভোজী বললেই চলে । সেই জন্য অধিকতর পরিমাণে মাছ-মাংস-ভোজী, বর্বরযুগের নিম্নস্তরে অবস্থিত ইণ্ডিয়ানদের তুলনায় পুয়েব্লো ইণ্ডিয়ানদের মগজটা আকারে অনেক ছোট দেখা যায় । যাই হোক, এই স্তরে নরমাংসভোজন-প্রথা ক্রমে একরূপ লোপ পেয়ে যায় । স্থানে স্থানে ধর্মকর্ম ও যাদুবিদ্যার জন্য নরমাংসভোজন-প্রথা কোনরকমে টিকে থাকে ।

(গ) উচ্চস্তর :
লৌহ-পিণ্ড ঢালাই করার সঙ্গে সঙ্গে এই স্তরের উৎপত্তি । বর্ণমালার সাহায্যে লিখনপদ্ধতি আবিষ্কার আর সাহিত্যিক আলোচনা গবেষণাগুলির রেকর্ড রাখা সম্পর্কে বর্ণমালার প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে এই স্তর ক্রমশ সভ্যতায় পরিণতি লাভ করে ।

পূর্বেই বলা হয়েছে এই স্তরটা একমাত্র পূর্বগোলার্ধেই স্বাধীনভাবে ক্রমবিকাশ লাভের অবসর পায় । আর এর বিশেষত্ব হচ্ছে এই যে, পূর্ববর্তী স্তরগুলির সমবেত উৎপাদনের চেয়েও বেশি ধন-দৌলত এই স্তরটিতে উৎপন্ন হয় । পৌরাণিক যুগের গ্রীকগণ, রোমের ভিত্তি প্রতিষ্ঠার সামান্য কিছু পূর্বের ইতালীয় উপজাতিগণ, তাসিতুসের আমলের জার্মানগণ এবং জল-দস্যু যুগের নরমানরা এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত ।

সকলের উপর, এই স্তরে গো-মহিষ-পরিচালিত লোহার-ফলক-যুক্ত লাঙলের সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় ঘটে । এই লাঙলের কল্যানে জমিতে ব্যাপকভাবে চাষ-আবাদ সম্ভব হয় । ফলে, পূর্ববর্তী যে-কোন যুগের তুলনায় সীমাহীন আহার্য সরবরাহের সুযোগ উপস্থিত হয় । ক্রমে চাষের জমি ও চারন-ভূমির জন্য বন-জঙ্গল সাফ করা চলতে থাকে । লোহার কুড়ুল আর লোহার কোদাল ছাড়া যে বিস্তৃতভাবে বন-জঙ্গল সাফ করার সমস্যাটার আজও সমাধান হত না তা সহজেই অনুমেয় । সঙ্গে সঙ্গে লোকসংখ্যাও বেজায় বেড়ে যেতে আরম্ভ করে । ছোট ছোট অঞ্চলগুলো ঘন-লোক-বসতিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয় ।

হোমারের কাব্য-সাহিত্যে বিশেষত ইলিয়াদ গ্রন্থে আমরা বর্বরযুগের উচ্চস্তর চরম সীমায় দেখতে পাই । পূর্ণবিকাশপ্রাপ্ত লোহার হাল-হাতিয়ার, কামারের জাঁতা, হাতে-চালানো মিল, কুম্ভকারের চাক, তেল ও মদ প্রস্তুতকরণ । সুকুমার-শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত ধাতুর কাজ, শকট ও যুদ্ধের রথ, কাঠের কড়ি ও তক্তার সাহায্যে জাহাজ প্রস্তুতকরন । কলা-বিদ্যা হিসাবে স্থাপত্য-শিল্পের প্রবর্তন, দুর্গচূড়া ও ফুকারযুক্ত দুর্গ-প্রাচীর সহ প্রাচীর-ঘেরা শহর, হোমারের মহাকাব্য ও পুরোপুরি পুরাবৃত্ত গ্রীকগণ এই সমস্ত অমূল্য সম্পদ উত্তরাধিকার হিসাবে বর্বরযুগের আমল থেকে সভ্যতার যুগে আনয়ন করে ।

হোমার-যুগের গ্রীকগণ যখন কৃষ্টিস্তর (cultural stage) থেকে অগ্রগতির পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুত হয়, জার্মানরা তখন কৃষ্টি-স্তরের ঠিক গোড়াতেই দাঁড়িয়ে । সিজার এবং এমন-কি, তাসিতুস এই জার্মানদের সম্বন্ধে যে-সব বিবরণী লিপিবদ্ধ করেন তার তুলনামূলক বিচার করে । আমরা দেখতে পাই, বর্বরযুগের উচ্চ স্তরে ধন-সম্পদ উৎপাদন কী অদ্ভুত প্রগতিই না লাভ করে ।

মর্গ্যানকে অনুসরণ করে মানবজাতির অ-সভ্য অবস্থা ও বর্বরযুগ থেকে সভ্যতার প্রারম্ভ পর্যন্ত ক্রমবিকাশের যে সংক্ষিপ্ত বিবরণী দেওয়া গেল, তা নিশ্চয়ই নতুন ও অকাট্য বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধি-সম্পন্ন ।

গ) সভ্যতা
**********
কোন স্থানের মানুষের আচার ব্যবহার, জীবিকার উপায়, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য নাট্যশালা, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতিনীতি, শিক্ষাদীক্ষা ইত্যাদিরযে পরিণত প্রকাশ । প্রাচীন মিশর হল সভ্যতা হিসেবে বিবেচিত প্রাচীন সংস্কৃতির একটি আনুশাসনিক উদাহরণ । সভ্যতা হল কোন জটিল সমাজব্যবস্থা যা নগরায়ন, সামাজিক স্তরবিন্যাস, প্রতীকী যোগাযোগ প্রণালী, উপলব্ধ স্বতন্ত্র পরিচয় এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর নিয়ন্ত্রণের মত গুণাবলি দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত । সভ্যতাকে প্রায়শই আরও কিছু সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয় যেগুলোর উপর সভ্যতা নির্ভরশীল, আর সেগুলো হল কেন্দ্রীকরণ, মানুষ এবং অন্যান্য জীবের আবাসন, শ্রমের বিশেষায়িতকরণ, সাংস্কৃতিকভাবে সৃষ্ট উন্নয়ন আদর্শ, আধিপত্য স্থাপন, ভাস্কর্যের অনুরূপ স্থাপত্য, কর বা খাজনা আরোপ, কৃষির উপর সামাজিক নির্ভরশীলতা, এবং সম্প্রসারণের প্রবণতা ।সভ্যতার ইংরেজি শব্দ হল civilization যা ল্যাটিন শব্দ civis থেকে আগত যার অর্থ নগরে বসবাসরত কোন ব্যক্তি। এর কারণ হল, যখন কোন স্থানের মানুষ সভ্য হয়, তখন তারা কোন ছোট গোত্র বা যৌথ পরিবারের মত দলে নয় বরং নগরীর ন্যায় একটি বৃহৎ সুসংগঠিত আকারের দলে একত্রে বসবাস করে।
সাংগঠনিক বসবাসের ক্রমোন্নত স্তর হল সভ্যতা। এর অর্থ হল এর নিজস্ব আইন, সংস্কৃতি এবং জীবনব্যবস্থা ও আত্মরক্ষার নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। অধিকাংশ সভ্যতারই নিজস্ব কৃষিব্যবস্থা এবং রাজতন্ত্র বা নির্বাচন ব্যবস্থার ন্যায় সরকারপদ্ধতি রয়েছে। তারা একটি সাধারণ ভাষায় কথা বলে, এবং তাঁদের নিজস্ব ধর্ম ও শিক্ষাব্যবস্থাও থাকতে পারে। সুমেরীয় ও মিশরীয় থেকে শুরু করে সকল সভ্যতারই নিজস্ব লিখন পদ্ধতি ছিল। এই লিখন পদ্ধতির মাধ্যমে তারা তাঁদের জ্ঞান সংকলন ও সংরক্ষণ করত।
রোমান সাম্রাজ্য হল বৃহৎ সভ্যতার একটি উদাহরণ। এটি রোম নগরী থেকে সরকারিভাবে পরিচালিত হতো। এই সাম্রাজ্য এককালে স্কটল্যান্ডের সীমান্ত থেকে উত্তর আফ্রিকা ও উত্তর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাঁদের নিজস্ব ভাষা ছিল ল্যাটিন। রোমান সভ্যতা মোট ১০০০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল, কিন্তু প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা টিকে ছিল তার থেকে বেশী দিন। রোমান এবং মিশরীয়গণ অ্যাক্টিয়ামের যুদ্ধে পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁতে রোমানরা জয়ী হওয়ায় মিশর রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

উৎপাদন-প্রক্রিয়ার অনুসরণ করে প্রত্যক্ষভাবে এই সব তত্ত্ব স্থিত করা হয় । কাজেই এগুলোকে অস্বীকার করা যায় না । তবুও আমাদের আলোচনার শেষ ভাগে যে আলেখ্য উন্মোচন করা হয়, তার তুলনায় এই বিবরণী নিতান্ত আটপৌরে ও সাদাসিধেই বিবেচিত হবে । তখনই বর্বর অবস্থা থেকে সভ্যতার ক্রমিক পরিবর্তনের ছবিটা সম্পূর্ণরূপে নিখুঁত অবস্থায় দেখা যাবে । আর বর্বর অবস্থা ও সভ্যতার পার্থক্যটাও ঝলমল হয়ে ফুটে উঠবে । আপাতত মর্গ্যানের শ্রেণী-বিন্যাসটা নিম্নলিখিতভাবে সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করা যাক :
(ক) অ-সভ্য যুগ : এই আদি যুগে মানুষ প্রধানত প্রাকৃতিক অবস্থায় অবস্থিত প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আহরণ করে । আর এই সমস্ত প্রাকৃতিক দ্রব্য আহরণের সহায়ক হাল-হাতিয়ারই মানুষের প্রধান কলা-সম্পদে পরিণত ।
(খ) বর্বর যুগ : এই যুগে মানুষ গৃহ-পালিত জীব-জানোয়ার পালন আর কৃষিকার্য শিক্ষা করে এবং মানবীয় শক্তির সাহায্যে প্রাকৃতিক সম্পদ উৎপাদন বৃদ্ধির প্রক্রিয়াগুলো আয়ত্ত করে ।
(গ) সভ্যতা : এই যুগে মানুষ প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর বৃদ্ধির জন্য আরও বেশি উন্নততর কার্যপ্রণালী প্রয়োগ করতে শিক্ষা করে ও শিল্প ও কলাবিদ্যায় (art) জ্ঞান অর্জন করে ।

সভ্যতা
********
কোন স্থানের মানুষের আচার ব্যবহার, জীবিকার উপায়, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য নাট্যশালা, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতিনীতি, শিক্ষাদীক্ষা ইত্যাদিরযে পরিণত প্রকাশ । প্রাচীন মিশর হল সভ্যতা হিসেবে বিবেচিত প্রাচীন সংস্কৃতির একটি আনুশাসনিক উদাহরণ । সভ্যতা হল কোন জটিল সমাজব্যবস্থা যা নগরায়ন, সামাজিক স্তরবিন্যাস, প্রতীকী যোগাযোগ প্রণালী, উপলব্ধ স্বতন্ত্র পরিচয় এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর নিয়ন্ত্রণের মত গুণাবলি দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত । সভ্যতাকে প্রায়শই আরও কিছু সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয় যেগুলোর উপর সভ্যতা নির্ভরশীল, আর সেগুলো হল কেন্দ্রীকরণ, মানুষ এবং অন্যান্য জীবের আবাসন, শ্রমের বিশেষায়িতকরণ, সাংস্কৃতিকভাবে সৃষ্ট উন্নয়ন আদর্শ, আধিপত্য স্থাপন, ভাস্কর্যের অনুরূপ স্থাপত্য, কর বা খাজনা আরোপ, কৃষির উপর সামাজিক নির্ভরশীলতা, এবং সম্প্রসারণের প্রবণতা ।সভ্যতার ইংরেজি শব্দ হল civilization যা ল্যাটিন শব্দ civis থেকে আগত যার অর্থ নগরে বসবাসরত কোন ব্যক্তি। এর কারণ হল, যখন কোন স্থানের মানুষ সভ্য হয়, তখন তারা কোন ছোট গোত্র বা যৌথ পরিবারের মত দলে নয় বরং নগরীর ন্যায় একটি বৃহৎ সুসংগঠিত আকারের দলে একত্রে বসবাস করে।
সাংগঠনিক বসবাসের ক্রমোন্নত স্তর হল সভ্যতা। এর অর্থ হল এর নিজস্ব আইন, সংস্কৃতি এবং জীবনব্যবস্থা ও আত্মরক্ষার নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। অধিকাংশ সভ্যতারই নিজস্ব কৃষিব্যবস্থা এবং রাজতন্ত্র বা নির্বাচন ব্যবস্থার ন্যায় সরকারপদ্ধতি রয়েছে। তারা একটি সাধারণ ভাষায় কথা বলে, এবং তাঁদের নিজস্ব ধর্ম ও শিক্ষাব্যবস্থাও থাকতে পারে। সুমেরীয় ও মিশরীয় থেকে শুরু করে সকল সভ্যতারই নিজস্ব লিখন পদ্ধতি ছিল। এই লিখন পদ্ধতির মাধ্যমে তারা তাঁদের জ্ঞান সংকলন ও সংরক্ষণ করত।
রোমান সাম্রাজ্য হল বৃহৎ সভ্যতার একটি উদাহরণ। এটি রোম নগরী থেকে সরকারিভাবে পরিচালিত হতো। এই সাম্রাজ্য এককালে স্কটল্যান্ডের সীমান্ত থেকে উত্তর আফ্রিকা ও উত্তর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাঁদের নিজস্ব ভাষা ছিল ল্যাটিন। রোমান সভ্যতা মোট ১০০০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল, কিন্তু প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা টিকে ছিল তার থেকে বেশী দিন। রোমান এবং মিশরীয়গণ অ্যাক্টিয়ামের যুদ্ধে পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁতে রোমানরা জয়ী হওয়ায় মিশর রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

প্রাচীন সভ্যতা –
সুমের সভ্যতা
****************
দক্ষিন মেসোপটিমিয়ার আদি অ-সেমেটিক বাসীরা সুমেরিয়ান নামে পরিচিত । সুমের বা শুমের [ মিশরীয় সাঙ্গারা ,বাইবেলে শিনার নামে পরিচিত ,স্হানীয় উচ্চারন কি – এন – গির ] মেসোপটেমিয়ার দক্ষিনাংশের এক প্রাচীন সভ্যতা । এর অবস্হান ছিল আধুনিক রাষ্ট্র ইরাক এর দক্ষিন – পশ্চিমাংশে ।
সুমের সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৪ হাজার বছর হতে খ্রিষ্টপর্ব ৩ হাজার বছরের মধ্য । ব্যাবিলন সভ্যতার উথানের সাথে সাথে সুমেরের পতন ঘটে । সুমের সভ্যতাকে পূথিবীর প্রথম সংঘঠিত সভ্যতা হিসাবে গন্য করা হয় ।

মেসোপটেমিয়া
**************
মেসোপটেমিয়া বর্তমান ইরাকের টাইগ্রিস বা দজলা ও ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদী দুটির মধ্যবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠেছিল । অধুনা ইরাক ,সিরিয়ার উত্তরাংশ, তুরষ্কের উত্তরাংশ এবং ইরানের খুযেস্তান প্রদেশের এলাকা গুলোই প্রাচীন কালে মেসোপটেমিয়ার অন্তগর্ত ছিল বলে মনে করা হয় ।
মেসোপটেমিয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার অন্যতম । খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ হতে খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের মধ্যে মেসোপটেমিয়ার অতি উন্নত এক সভ্যতার উম্মেষ ঘটেছিল । সভ্যতার আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত এই এলাকা মিশরীয় সভ্যতার থেকে অনেকটাই ভিন্ন ছিল ।
প্রখ্যাত লেখক হোমার তার “ ইলিয়াড এবং ওডেসি ” লিখারও প্রায় এক হাজার বছর পূর্বে সুমেরীয়রা তাদের নিজস্ব ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছিল। এর নাম ছিল “ গিলগামেশ ” । এই সাহিত্য থেকে জানা যায় যে ,এখানকার লোকজন অত্যন্ত কল্পনাপ্রবন ছিলো । ব্যাবিলোনীয় শাসন আমলে তাদের লেখালেখিতে পরলেীকিক চিন্তার প্রভাব লক্ষনীয় । আসলেই এইগুলো ছিল ধর্মাশ্রয়ী সাহিত্যচিন্তা ।

ব্যাবিলনিয়া :
*************
ব্যাবিলনিয়া ছিলো দক্ষিন মেসোপটেমিয়ার একটি রাজ্য ,যা আধুনিক ইরাকের অন্তর্গত । সুমের এবং আক্কাদ নামের এলাকা দুইটি ব্যাবলনিয়ার অংশ ছিলো । ব্যাবিলনিয়াদের বিশ্বাস ছিল যে ,পৃথিবী একটি বিশাল ফাকবিশিষ্ট স্হানে অবস্হিত একটি গোলাকার চাকতি । তারা আরও বিশ্বাস করত যে আকাশে “ স্বর্গ ” এবং মাটির নিচে রয়েছে “ নরক ” । পানি বা জল সর্ম্পকে তাদের ধারনা ছিল যে ,পৃথিবী জল দিয়ে তৈরি এবং এর চারপাশজুড়ে জলই আছে ।
প্রাচীন ব্যাবিলনিয়ারা বহু ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিল কিন্তু সময়ের ধারার সাথে সাথে কিছু গোষ্টির ধর্মমত পরিবর্তন হতে শুরু করে । প্রাচীন ব্যাবিলনিয়াদের মধ্যে বিভিন্ন দেবদেবির মূর্তিপূজার প্রমান পাওয়া যায় । সময়কাল বিচারে ব্যাবিলনিয়া ও মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীরা অতি উন্নত চিন্তার কৃষিবিদ ছিলো । উদ্ধৃত্ত ফসল মন্দিরে জমা দেওয়ার রেওয়াজ ছিলো । কৃষকদের মধ্যে কে কতটা ফসল মন্দিরে জমা দিল ,এই হিসাব রাখতো পুরোহিতরা পাথরের গায়ে দাগ কেটে ,মনে রাখার চেষ্টা করত । ক্রমেই হিসাব রাখায় গুরুত্বটাই প্রাধান্য পেতে শুরু করে । এক পযার্য় গনিত শাস্ত্রের উদ্ভাবন ও উন্নতিসাধন করতে সক্ষম হয় । সংখ্যাগুলি ষাট বা ষষ্টিক কেন্দ্রিক ছিলো ।

আক্কাদীয় সভ্যতা
****************
আক্কাদিয়ান সাম্রাজ্য ছিল প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার আক্কাদ এবং তার পাশ্ববর্তী এলাকা কেন্দ্রীভূত একটি প্রাচীন সেমিটিক সাম্রাজ্য । যা সকল আক্কাদীয় ভাষাভাষী এবং সুমেরীয় ভাষাভাষী সেমিটিক জনগোষ্টিকে একটি বহুভাষী সাম্রাজ্যের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ করেছিলো । খ্রিষ্টপূর্ব ২৩৩৪ সালে আক্কাদীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্টিত হয়েছিল এবং খ্রিষ্টপৃর্ব ২১৯৩ সালে আক্কাদীয় সাম্রাজ্য ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিল ।

মিশরীর সভ্যাতা
*****************
প্রাচীন মিশর উত্তর আফ্রিকার পূর্বাজ্ঞালের একটি প্রাচীন সভ্যাতা । নীল নদের নিম্মভূমি এলাকায় এই সভ্যতা গড়ে ওঠে । এই এলাকাটি বর্তমানে মিশর রাষ্ট্রের অধিগত । খ্রিষ্টপূর্ব ৩১৫০ অব্দ নাগাদ প্রথম ফারাওয়ের অধীনে উচ্চ ও নিম্ম মিশরের রাজনৈতিক একত্রীকরনের মাধ্যমে এই সভ্যাতা এক সুসংহত রূপ লাভ করে । এরপর তিন সহস্রাব্দ কাল ধরে চলে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার বিকাশপর্ব । প্রাচীন মিশরের ইতিহাসের শেষ পর্বে একাধিক বৈদেশিক শক্তি মিশর অধিকার করে নেয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৩১ অব্দে আদি রোমান সাম্রাজ্য মিশর অধিকার করে ,এই দেশকে একটি রোমান প্রদেশ পরিনত করলে ফারাওদের শাসন আনুষ্টনিক ভাবে সমাপ্ত হয় ।

প্রাচীন মিশরীয়দের নানান কৃতিত্বগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো খনি থেকে অট্রালিকদি নির্মান কেীশলের দক্ষতা ,এরই ফলস্ক্রতি ঐতিহাসিক মিশরীয় পিরামিডসমূহ ,মন্দির ,ওবেলিস্কসমূহ ,মিশরীয় গনিত ব্যবস্হা । আরও হলো একটি ব্যবহারিক ও কাযর্করী চিকিৎসা ব্যবস্হা ,সেচব্যবস্হা ও কৃষি উৎপাদন কেীশল ,প্রথম জাহাজ নির্মান ,মিশরীয় চীনা মাটি ও কাচশিল্পবিদ্যা ,একটি নতুন ধারার সাহিত্য এবং বিশ্বের ইতিহাসের প্রাচীন তম শান্তিচুক্তি [ হিট্রাইটদের সাথে ] । প্রাচীন মিশরের শিল্পকলা ও সাহিত্যের ব্যাপক অনুকূতি লক্ষিত হয় । শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রাচীন মিশরের পুরাকীতি গুলির ধ্বংসাবশেষ পযটক ও লেখকদের কল্পনাশক্তিকে অনুপ্রানিত করেছে । এর ফলে মিশরীয় সভ্যতার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারগুলি ,মিশর ও বিশ্ববাসীর সম্মুখে নতুন রুপে উপস্হাপিত হয় ।

মায়া সভ্যতা
**************
মায়া জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত হচ্ছেন সেইসব মানুষ যারা প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতির এবং আধুনিক জনগণ, যারা মেক্সিকোর দক্ষিণে এবং উত্তর-মধ্য আমেরিকাতে বসবাস করতো এবং তারা মায়াভাষী় পরিবারের মানুষ। প্রথমদিকে এর সময় কাল প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০-২৫০ অব্দ পর্যন্ত। এর মধ্যে প্রাচীন কালে খ্রিস্টপূর্ব ২৫০-৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অনেক মায়া নগরীগুলোতে তাঁরা উন্নতির উচ্চশিখরে পৌঁছেছিল এবং স্প্যানিশদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত পুরো পোস্টক্লাসিক জুড়ে চালিয়ে গিয়েছিল। এটি ছিলো বিশ্বের সর্বাপেক্ষা ঘন জনবসতি এবং সংস্কৃতিভাবে গতিশীল একটি সমাজ ।
উচ্চস্তরের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কারণে এবং সাংস্কৃতিক প্রসারণ করার দরুন অন্যান্য মেসোআমেরিকান সভ্যতার সঙ্গে মায়া সভ্যতাকে অনেক ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যেমন, লেখার উন্নতি-সাধন, গ্রন্থারম্ভে উদ্ধৃত বাক্য এবং বর্ষপঞ্জিকা যা মায়ার সঙ্গে উদ্ভূত হয়নি, তবুও তাঁদের সভ্যতা তাঁদেরকে সম্পূর্ণভাবে বিকশিত করেছিল। হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা, এল সালভাদর এবং যতদূর দেখা যায় মায়া অঞ্চল থেকে ১০০০ কিলোমিটারের (৬২৫ মাইল) চেয়েও বেশি, মধ্যে মেক্সিকোতেও মায়ার প্রভাব লক্ষ করা যায়। এর বাইরেও অনেক মায়া সভ্যতার প্রভাবান্বিত শিল্প এবং স্থাপত্যের খোঁজ পাওয়া যায়, যা বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের চিন্তাধারার ফলস্বরূপ বরং সরাসরি বাহ্যিক জয়। মায়া জনগণ কখনোই অন্তর্ধান হয়নি, প্রাচীনকালেও না, স্প্যানীয় বিজয়ীদের আগমনের সাথেও না, এবং পরবর্তীতে যখন স্পেনীয়রা আমেরিকা মহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করে তখনও না। আজ, পুরো মায়া অঞ্চল জুড়ে মায়া এবং তাদের বংশধরদে বিস্তার। প্রাক কলম্বীয় এবং ভাবতত্ত্বের জয়ের ঐতিহ্য ও ধারণার পাথক্যসূচক একটি সমষ্টির ফলাফল বজায় রাখার অর্ন্তভুক্তি। অনেক মায়াভাষী তাদের প্রাথমিক ভাষা হিসেবে আজও মায়া ভাষায় কথা বলে। রাবিনাল আচি, আচি ভাষায় লিখিত একটি নাটক, যাকে ২০০৫ সালে ইউনেস্কো মানবতার মৌখিক ও স্পর্শাতীত ঐতিহ্যবাহীর শ্রেষ্ঠ অবদান হিসেবে ঘোষণা করেছে ।

ভৌগোলিক বিবরণ
ধ্রুপদী এবং পোস্ট-ধ্রুপদী মায়া সভ্যতার বিস্তার
*********************************************
মায়া সভ্যতার ভৌগোলিক সীমা মায়া অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। মেক্সিকোর প্রদেশের দক্ষিণে চাপাস, তাবাস্কো এবং ইয়ুকাটান উপদ্বীপের কুইন্টানা রোওকাম্পেছ, এবং ইয়ুকাটান জুড়ে প্রসারিত করেছিল। উত্তরাঞ্চলীয় মধ্য আমেরিকার অঞ্চল, যা বর্তমানে গুয়াতেমালা, বেলিজ, এল সালভাডোর এবং পশ্চিমী হন্ডুরাস জুড়ে মায়া সভ্যতা প্রসারিত করেছিল। মায়া অঞ্চলের জলবায়ু অনেক ভাবে পরিবর্তন হয়েছে। নিচু-অবস্থান এলাকা হওয়ার ফলে মরুভূমির যাত্রীরা নিয়মিত প্রবল হারিকেন ঝড় এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ের সম্মুখীন হয়েছেন। মায়া অঞ্চলকে সাধারণভাবে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিচুভূমি, উচ্চভূমি এবং উত্তরাঞ্চলীয় নিচুভূমি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মেক্সিকোর গুয়াতেমালা এবং চাপাস উচ্চভূমি সমস্ত মায়া উচ্চভূমিতে অন্তর্ভুক্ত। দক্ষিণাঞ্চলীয় নিচুভূমি ঠিক দক্ষিণে উচ্চভূমির কাছাকাছি এবং এতে মেক্সিকার চাপাস, গুয়াতেমালার দক্ষিণ উপকূল, বেলিজ এবং উত্তরাঞ্চলীয় এল সালভাডোর একটি অংশ অন্তর্ভুক্ত। উত্তরাঞ্চলীয় নিচুভূমি সম্পূর্ণ ইয়ুকাটান উপদ্বীপে প্রসারিত হয়েছে। এটি মেক্সিকোর ইয়ুকাটান, কাম্পেছ এবং কুইন্টানা রোও, গুয়াতেমালার পেতেন বিভাগ এবং সমস্ত বেলিজ। এছাড়াও মেক্সিকার রাজ্যের তাবাস্কো এবং চাপাসের অংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ।

প্রাকধ্রুপদী
পণ্ডিতরা মায়া সভ্যতার যুগের শুরু নিয়ে অবিরত আলোচনা করে যাচ্ছেন। বেলিজের কিউল্লোতে মায়া বসবাসের সাম্প্রতিক আবিষ্কারের কার্বন পরীহ্মা হতে পাওয়া তারিখ অনুযায়ী খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৬০০ বছর আগের । তারা বিস্ময়কর কাঠামো নির্মিত করে। মায়ার বর্ষপঞ্জিকা তথাকথিত মেসআমেরিকানর দীর্ঘ গণনীয় বর্ষপঞ্জিকার উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, যা খ্রিস্টপূর্ব ১১ই আগষ্ট, ৩১১৪ খ্রিস্টাব্দের সমতুল্য । প্রায় ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মায়ারা চাষাবাদ করা শুরু করে এবং কৃষিজীবী গ্রামের উৎপত্তি ঘটে। সবচেয়ে বহুল প্রচলিত গৃহীত প্রদর্শন যে, প্রায় ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রথম মায়া জনবসতি নিঃসন্দেহে প্রশান্ত উপকূলের সোকোনুস্কো অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই সময়টি প্রাথমিক প্রাকধ্রুপদী নামে পরিচিত, একে আসনাশ্রিত সম্প্রদায় এবং মৃৎশিল্প প্রবর্তন ও পোড়ানো কাদামাটি মূর্তিসমূহ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে । প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ওল্মেক সভ্যতার শুরু হয়। তারা ছিল মায়াদের পূর্বপুরুষ। পণ্ডিতরা প্রারম্ভিক মায়া এবং প্রতিবেশী প্রাকধ্রুপদী মেসোআমেরিকা সভ্যতাসমূহ, যেমন, টাবাস্কো নিচুভূমি অঞ্চলের ওল্মেক সংস্কৃতি এবং চাপাস ও দক্ষিণের ওআজাচার যথাক্রমে মিক্স-জোক এবং জাপোটেক ভাষাভাষী মানুষের, ভৌত এবং সাংস্কৃতিক বিস্তারের সাথে একমত না। প্রাচীনতম উল্লেখযোগ্য শিলালিপি এবং ভবনের অনেকেই এই অধিক্রমণ অঞ্চলে উপস্থিত এবং এর প্রমাণ থেকে বুঝা যায়, যে এই মায়া সংস্কৃতি এবং গঠনাত্মক পরস্পরকে প্রভাবিত করেছিল। তাকালিক আবাজ, গুয়াতেমালার প্রশান্তীয় পাড়ে একমাত্র স্থান, যেখানে ওল্মেক বৈশিষ্ট্যসমূহ পরিষ্কারভাবে মায়ার একটি প্রভাবিত স্থানকে বুঝায়। প্রায় ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হন্ডুরাসের কোপায়েন এবং চালচুয়াপা শহরের পতন হয় এবং এখানে তারা বসবাস করতে শুরু করে।
দক্ষিণ মায়া নিচুভূমিসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্ভুক্ত স্থানসমূহের হচ্ছে: নাকবে, এল মিরাডোর, চিভাল, এবং সান বারটোলো। গুয়াতেমালার উচ্চভূমিতে, প্রায় ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বহিরাগত কামিয়ানালজুয়ু। বহু শতাব্দী ধরে এটি পেতেন এবং প্রশান্ত নিচুভূমিসমূহ জন্য জাদে এবং অবসিদিয়ান উৎসসমূহকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রায় ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইযাপা, তাকালিক আবাজ, এবং চোকোলার গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক স্থানসমূহে কোকো প্রধান উৎপাদক ছিল। এছাড়াও মধ্য ও পরের প্রাকধ্রুপদী দিকে উত্তরাঞ্চলীয় মায়া নিচুভূমিসমূহের মাঝা আকারের মায়া সম্প্রদায়ের বিকাশ শুরু হয়। যদিও দক্ষিণাঞ্চলীয় নিচুভূমিসমূহের বৃহৎ কেন্দ্রের আকার, মাপকাঠি এবং প্রভাবের ইঙ্গিতও দেখা গিয়েছে। উত্তরাঞ্চলীয় দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকধ্রুপদী স্থান হল কোমচেন এবং ডজিবিলচাল্টুন। প্রায় ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এল মিরাডোর শহরে বিশাল বিশাল স্থাপত্যের নির্মাণকার্য শুরু হয়। একই সাথে তারা আধুনিক পদ্ধতিতে জলসেচের সাহায্যে চাষাবাদ শুরু করে। এই সময় তারা টিকাল শহরে বসতি স্থাপন করে এবং পরে এটি মায়াদের বৃহত্তম শহরে পরিণত হয়। ধ্রুপদী যুগে রাজধানীর পরেই এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল। এই যুগের (প্রায় ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) প্রথম লিখিত শিলালিপি মায়া হায়ারোগ্লিফর চিহ্নিত করা হয়েছিল । ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তারা একটি শিলাস্তম্ভের উপরে প্রথম মায়া জ্যোতিষ পঞ্জিকা তৈরি করে। ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে থেকে ২৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রাক-কলম্বীয় মেসোআমেরিকান টিয়োটিহকান শহরের নির্মাণ কাজ চলে। এই শহরের দ্বারা সৃষ্ট মায়া সংস্কৃতি অন্যান্য মায়া সংস্কৃতিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। প্রথমতম মায়া পিরামিড গঠিত হয়েছিল। ১০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি, মায়া শহরগুলোর একটি ব্যাপক পতন ও পরিত্যক্ত ঘটে যাকে প্রাকধ্রুপদী পতন বলা হয়। এটি প্রাকধ্রুপদী যুগের সমাপ্তির চিহ্নিত ।

ধ্রুপদী
এই ধ্রুপদী যুগটি (প্রায় ২৫০-৯০০ খ্রিস্টাব্দ) ছিল মায়াদের শ্রেষ্ঠতম যুগ। এই যুগে বড়-ধরনের নির্মাণ এবং নগরবাদ, বিস্ময়কর শিলালিপির লিপিবদ্ধ এবং উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক এবং শিল্পকর্মের উন্নয়ন, বিশেষ করে দক্ষিণ নিচুভূমি অঞ্চলসমূহের শিখরে পৌছায়। তারা কৃষিতে অত্যধিক বিকশিত হয়েছিল। অনেক স্বাধীন শহর-রাজ্যে এবং কিছু ছিল অন্যদের উপযোগী শহর-রাজ্যের মধ্যে শহর-কেন্দ্রিক সভ্যতা গঠিত হয়। ৪০০ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত নগররাষ্ট্র টিয়োটিহকান এই সময়ে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। এরাই কার্যত মেক্সিকান উচ্চভূমিতে তাদের রাজধানী হয়ে উঠেছিল। ক্যারিকল, তিকাল, পালেকং, কোপান, জুনান্টিনেচ এবং কালাকমুল শহরসমূহ সুপরিচিত, কিন্তু স্বল্প পরিচিত শহরসমূহের মধ্যে রয়েছে লামানাই, ডস পিলাস, কাহাল পেচ, উয়াক্সাক্তুন, আলতুন হা, এবং বোনাম্পাক, প্রমুখ। উত্তরাঞ্চলীয় মায়া নিচুভূমিতে প্রারম্ভিক ধ্রুপদী উপনিবেশ বণ্টন দক্ষিণাঞ্চলীয় অঞ্চল মত পরিষ্কারভাবে পরিচিত নয়, কিন্তু একটি সংখ্যা জনসংখ্যা কেন্দ্র, যেমন, অক্সকিন্টোক, চুনচুকমিল, এবং উক্সমালের প্রারম্ভিক পেশা অন্তর্ভুক্ত করে ।
এই সময়কালে মায়ার জনসংখ্যা ছিল মিলিয়ন। তারা একটি বিপুল সংখ্যক রাজত্ব এবং ছোট সাম্রাজ্যসমূহ, বিস্ময়কর প্রাসাদসমূহ এবং মন্দিরসমূহ তৈরি, অত্যন্ত উন্নত অনুষ্ঠানে নিযুক্ত, এবং একটি বিস্তৃত চিত্রলিপিতে লেখার পদ্ধতি বিকশিত করেছিল। তিকালের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল কালাকমুল, যা পেতেন বেসিনের একটি শক্তিশালী শহর ছিল। দক্ষিণপূর্বে কোপান ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর। মায়া অঞ্চলের উত্তরে কোবা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মায়া রাজধানী ছিল। ৫৬০ খ্রিস্টাব্দের সময়ে বিখ্যাত হন্ডুরান মায়া শহর তিকাল অন্যান্য মায়া নগররাষ্ট্রের দ্বার সৃষ্ট এক অক্ষজোটের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নেয়। ৬০০ খ্রিস্টাব্দে টেওটিহুয়াকানের ক্ষমতা এই সময় থেকে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে, এবং এই শহর তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে থাকে। ফলে তাদের রাজধানী টিয়োটিহকানের বদলে অন্য শহরে গড়ে ওঠে। এই সমৃদ্ধ সভ্যতার সামাজিক ভিত্তিতে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সামাজিক নেটওয়ার্ক (বিশ্বের পদ্ধতি) মায়া অঞ্চল এবং বিস্তৃত মেসোআমেরিকান বিশ্ব জুড়ে প্রসারিত হয়। কেন্দ্রীয় নিচুভূমিতে ধ্রুপদী মায়া বিশ্ব ব্যবস্থার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রভাবশালী ‘মর্মবস্তু’ মায়া দল অবস্থিত ছিল, যখন দক্ষিণাঞ্চলীয় উচ্চভূমি এবং উত্তরাঞ্চলীয় নিচুভূমি অঞ্চলের তার অনুরূপ নির্ভরশীল বা ‘সীমান্তবর্তী’ প্রান্তে পাশে মায়া দল পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্ত বিশ্বের ব্যবস্থার মত, মায়া মূল কেন্দ্র সময়ের সাথে স্থানান্তরিত হয়, দক্ষিণাঞ্চলীয় উচ্চভূমিতে প্রাকধ্রুপদী সময় শুরু করে, ধ্রুপদী যুগে কেন্দ্রীয় নিচুভূমি হয়ে, পরিশেষে পোস্টধ্রুপদী যুগে উত্তরাঞ্চলীয় উপদ্বীপে পৌছায়। এই মায়া বিশ্ব ব্যবস্থা, অর্ধ-সীমান্তবর্তী (মধ্যস্থতার) মূল সাধারণত বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র আকারে গ্রহণ করে ।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যসমূহ হল তাদের ধর্মীয় কেন্দ্রে নির্মিত ধাপে ধাপে পিরামিড এবং তাদের শাসকদের সহগামী প্রাসাদসমূহ। কানকুয়েন প্রাসাদ মায়া এলাকায় সর্ববৃহৎ, কিন্তু এই স্থানে কোন পিরামিড নেই। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক অবশিষ্টাংশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত উত্কীর্ণ পাথর স্ল্যাব সাধারণত স্টালি বলা হয় (মায়া তাদেরকে তেতুন বা “গাছ পাথর” বলতো), যা তাদের বংশতালিকা, সামরিক জয়লাভ, এবং অন্যান্য নিষ্পাদনের বর্ণনাকারী চিত্রলিপির পাঠ্যর পাশাপাশি শাসকদের চিত্রিতও বর্ণনা করত ।

মায়া সভ্যতা অন্যান্য মেসোআমেরিকান সংস্কৃতি, যেমন, কেন্দ্রীয় ও মেক্সিকোর উপসাগরীয়-উপকূলে টিয়োটিহকান, জাপোটেক, এবং অন্যান্য দলের সাথে দীর্ঘ দূরত্বের বাণিজ্য করতো। তারা মেসোআমেরিকান ছাড়াও আরও দূরবর্তী, যেমন, ক্যারিবিয়ার দ্বীপপুঞ্জের তাইনোস, অন্যান্য দলসমূহের সাথে বাণিজ্য ও পণ্য বিনিময় করতো। প্রত্নতাত্ত্বিকরা পানামার চিচেন ইৎজার সেক্রিড সেনোটা থেকে স্বর্ণ খুজে পেয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পণ্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল কোকো, লবণ, সমুদ্রখোসা, পাথরবিশেষ, এবং কাচের মতো দেখতে একজাতীয় আগ্নেয়শিলা।
৯০০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণের নিচুভূমিতে স্থিত নগররাষ্ট্রের অবলুপ্তি ঘটে এবং মায়ানরা এইসব অঞ্চল সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করে। তাদের এই উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল পরিত্যাগের কারণ আজ অবধি কোনও পুরাতাত্ত্বিক আবিষ্কার করতে পারেনি। তবে এই সময় থেকেই যে ধ্রুপদী যুগের শেষের সংকেত পাওয়া যাচ্ছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

মায়ার পতন
দক্ষিণাঞ্চলীয় নিচুভূমি অঞ্চলের মায়া কেন্দ্র ৮ম এবং ৯ম শতাব্দীতে পতন হয় এবং তারপর পরেই পরিত্যক্ত হয় । এই পতনটি স্মারক শিলালিপি এবং বড় ধরনের স্থাপত্য নির্মাণের একটি বিরতির মাধ্যমে ঘটে ।এই পতনের সর্বজন গৃহীত তত্ত্বের ব্যাখ্যা তা দেয় । ৯২৫ খ্রিস্টাব্দের সময়ে বিখ্যাত মায়া নগররাষ্ট্র চিচেন ইৎজা খুবই প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। তারাই এই সময়ে মায়া সাম্রাজ্যের কার্যত রাজধানীতে রূপান্তরিত হয়ে আসে। পরবর্তী ২০০ বছর ধরে এটাই ছিল শ্রেষ্ঠতম মায়া শহর। এই সময়ে বিশ্ববিখ্যাত মায়ান পিরামিড চিচেন ইৎজাতে নির্মিত হয়।
মায়া পতনের পরিবেশদূষণহীন তত্ত্ব বেশ কয়েকটি উপবিভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, যেমন, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, বিদেশী আক্রমণ, চাষি বিদ্রোহ, এবং বিশেষ বাণিজ্য পথের পতন। পরিবেশগত অনুমানের মধ্যে পরিবেশগত দুর্যোগ, মহামারী রোগ, এবং জলবায়ু পরিবর্তন রয়েছে। মায়া জনগোষ্ঠীরা কৃষি সম্ভাবনাময় অবসাদ ও অতিরিক্ত প্রাণী শিকারের মাধ্যমে পরিবেশের বহন ক্ষমতা অতিক্রম করে ছিল বলে প্রমান রয়েছে। কিছু পণ্ডিত সম্প্রতি অনুমান করছে যে ২০০ বছরের একটি তীব্র খরা মায়া সভ্যতার পতনের কারণ । খরা তত্ত্বটি ভৌত বিজ্ঞানীরা লেক তলদেশ, প্রাচীন পরাগরেণু এবং অন্যান্য তথ্য অধ্যয়নের গবেষণা থেকে সম্পাদিত করেছেন, প্রত্নতাত্ত্বিক সম্প্রদায়ের থেকে উত্পত্তি তথ্য থেকে নয়। ২০১১ সাল থেকে নতুন গবেষণায়, উচ্চ-রেজল্যুশনের জলবায়ু মডেল এবং অতীতের প্রাকৃতিক দৃশ্য নতুন পুনর্গঠন ব্যবহারের মাধ্যমে বিবেচনা করা যায় যে, তাদের বনভূমিকে কেটে চাষাবাদের ভূমিতে রূপান্তরনের ফলে বাষ্পের হ্রাস পায় এবং পরে বৃষ্টিপাতের হ্রাস ও প্রাকৃতিক খরা বিবর্ধক ঘটে। ২০১২ সালে বিজ্ঞান প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, মাঝারি বৃষ্টিপাতের হ্রাস, বার্ষিক বৃষ্টিপাতের মাত্র ২৫ থেকে ৪০% পরিমাণ যা মায়া পতনের কারণ হতে পারে বলে চিহ্নিত করেছে। মায়ার প্রধান শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকার হ্রদ এবং গুহার তলানি উপর ভিত্তি করে, গবেষকরা অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নির্ধারণ করতে সহ্মম হয়েছে। ৮০০ এবং ৯৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সংঘটিত হালকা খরা দ্রুত খোলা পানির উপলব্ধতা যথেষ্ট কমিয়ে দেয় ।
একটি স্টাল্যাগের খনিজ আইসোটোপ বিশ্লেষণের এই সিদ্ধান্ত উপর ভিত্তি করে একই পত্রিকায় আরও নথিপত্রে সমর্থন এবং প্রসাতিত করে। এটি আখ্যা দেন যে, ৪৪০ এবং ৬৬০ খ্রিস্টাব্দে উচ্চ বৃষ্টিপাতের ফলে মায়াকে প্রথম দৃষ্টান্তস্বরূপ বিকাশের অনুমতি দেওয়া এবং পরবর্তীতে হালকা খরা সময় ব্যাপক যুদ্ধবিগ্রহ ও মায়া সভ্যতার পতন নিয়ে আসে। ১০২০ এবং ১১০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে একটি দীর্ঘায়িত খরা হয় যা ছিল চরমভাবে প্রাণঘাতী ।

পোস্টধ্রুপদী যুগ
এই যুগে প্রায় সব দক্ষিণাঞ্চলীয় নগররাষ্ট্রের পতন ঘটেছিল। মায়ারা দক্ষিণাংশ ছেড়ে উত্তরাংশে ইয়ুকাটান ও হন্ডুরাস অঞ্চলে চলে গিয়েছিল নতুন করে বাঁচতে। তারা এখানে অনেক নগররাষ্ট্রের উৎপত্তি ঘটিয়েছিল। মূলত উত্তরপূর্ব মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার ক্যারিবিয়ান সাগর অঞ্চলে মায়ারা বসবাস করতে শুরু করেছিল। ৯২৫ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত মায়া নগররাষ্ট্র চিচেন ইৎজা খুবই প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। তারাই এই সময়ে মায়া সাম্রাজ্যের কার্যত রাজধানীতে রূপান্তরিত হয়ে আসে। পরবর্তী ২০০ বছর ধরে এটাই ছিল শ্রেষ্ঠতম মায়ান শহর। এই সময়ে বিশ্ব বিখ্যাত মায়ান পিরামিড চিচেন ইৎজা নির্মিত হয়।
পদানুবর্তী পোস্ট ধ্রুপদী সময়ে (১০ম থেকে ১৬তম শতাব্দীর প্রারম্ভিক) উত্তরাঞ্চলীয় কেন্দ্রসমূহের উন্নয়ন অব্যাহত থাকে, যা বহিরাগত প্রভাব বৃদ্ধি বৈচিত্র্য দ্বারা চিহ্নিত করা যায়। ইয়ুকাটানের উত্তরাঞ্চলীয় নিচুভূমি অঞ্চলের মায়া শহরগুলো আরও কিছু শতাব্দী ধরে এর উন্নতি অব্যাহত থাকে, এই যুগের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহের মধ্যে রয়েছে চিচেন ইৎজা, উক্সমাল, এদযনা, এবং কোবা। ১২৫০ খ্রিস্টাব্দে চিচেন ইৎজাও মায়াদের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়। ১২৮৩ খ্রিস্টাব্দে এই সময়ে অনন্য মায়া নগররাষ্ট্র মায়াপান শহরের উৎপত্তি হয়। এই শহর একটা সংঘ গড়ে মায়া সাম্রাজ্যের অধিকর্তা হয়ে ওঠে। চিচেন ইৎজা এবং উক্সমাল ক্ষমতাসীন রাজবংশের পতনের পরে, ১৪৫০ সালের বিদ্রোহ শুরু না হওয়া পর্যন্ত মায়াপান সমস্ত ইয়ুকাটান শাসন করে। এই শহরের নামের শব্দের উৎস “মায়া” হতে পারে, যা ইয়ুকাটেক এবং ঔপনিবেশিক স্পেনীয় মধ্যে একটি ভৌগোলিক সীমাবদ্ধ অর্থ ছিল এবং শুধুমাত্র ১৯শ এবং ২০শ শতাব্দীতে তার বর্তমান অর্থে পৌঁছয়। ইয়ুকাটান স্পেনীয়দের দখলে না যাওয়া পর্যন্ত অঞ্চলটি প্রতিদ্বন্দ্বী শহর-রাজ্যের মধ্যে অধঃপতিত হয়েছিল।
“ধ্রুপদী যুগের পতনের” সময় ইত্জা মায়া, Ko’woj, এবং কেন্দ্রীয় পেতেনের ইয়ালাইনের ছোট সংখ্যক দল টিকে থাকে এবং ১২৫০ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী শহর-রাজ্য মধ্যে নিজেদের পুনর্গঠন করে। ইত্জা তাদের রাজধানী তায়াসালেই (এছাড়াও নোহ পেতেন নামে পরিচিত) রাখেন, এটি একটি প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট যা লেক পেতেন ইত্জাতে ফ্লোরেস, এল পেতেনের আধুনিক শহরের তলাচি বলে বিবেচনা করা হয়েছে। এটি পেতেন হ্রদ অঞ্চল জুড়ে প্রসারিত একটি এলাকা শাসন করেছে, যার মধ্যে লেক কুয়েসাইলে একিকসোলের সম্প্রদায়ও ছিল। যাকপেতেনে Ko’woj -দের রাজধানী ছিল। এছাড়াও পোস্টধ্রুপদী মায়া রাজ্য দক্ষিণাঞ্চলীয় উচ্চভূমিতে টিকিয়া থাকে। এই অঞ্চলে মায়া জাতির মধ্যে অন্যতম কি’কে’ কুমারকাজের রাজ্য, তারা সবচেয়ে বিখ্যাত মায়া ইতিহাস-রচনা ও পুরাণ পোপোল ভূহ কাজের জন্য অতি পরিচিত। অন্যান্য উচ্চভূমি সাম্রাজ্যের মধ্যে রয়েছে হুয়েহুয়েতেনাঙ্গো-তে মাম ভূমি, ইক্সিমকে-তে কাককিকেলস ভূমি, মেক্সকো ভিয়েজো-তে চাজোমা ভূমি এবং সান মাতিও ইক্সতাতান-তে কুজ ভূমি। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে উত্তরাঞ্চলীয় ধ্রুপদী যুগ শেষ হয়ে আসে। কেননা স্পেনীয় ফ্রান্সিসকো হার্নান্দেজ দে কর্ডোবা ইয়ুকাটান উপদ্বীপে আসেন এবং তিনি তাদের সাথে বেশ কয়েকটা যুদ্ধ করে তাদের দুর্বল করে দেন।

ঔপনিবেশিক যুগ
তাদের এই অঞ্চলে প্রথম অভিযানের অল্পসময় পরে যে মায়ারা স্পেনীয় মুকুটের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিল তাদেরকে ক্রীতদাস করার প্রচেষ্টা আরম্ভ হয় এবং মায়া ইউকাটান উপদ্বীপ এবং গুয়াতেমালার পার্বত্য অঞ্চলের মধ্যে তাদের ঔপনিবেশিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করে। এই অভিযানকে, কখনও কখনও, “ইউকাটানের স্পেনীয় বিজয়” বলে আখ্যায়িত করা হত, যা সূত্রপাত থেকে দখলদারদের জন্য একটি সুদীর্ঘ এবং বিপজ্জনক অনুশীলন প্রমাণিত হয়। সমস্ত মায়া ভূমির উপর স্পেনীয় স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে সেখান কার শত শত হাজার আদিবাসি এবং প্রায় ১৭০ বছর সময় লেগেছে।
মায়ানদের দৈনন্দিন জীবনযাপন

অভিজাত জীবন
একজন মায়া সম্রাট এবং অভিজাতদের জীবন অত্যন্ত সহজ ও বিলাবহুল ছিল। তাদের এমনকি জামাকাপড় ছাড়া কিছু বহনও করতে হত না। তাদের সব ভার বহন করত সাধারণ মায়া অথবা অন্যান্য জাতি হতে আগত ক্রীতদাসরা।

জীবনযাত্রা
একজন মায়া সাধারণ মানুষের যেমন কষ্টকর তেমনি কঠিন পরিশ্রমে ভর্তি ছিল। মজদুররা সাধারণত কৃষাণ হিসাবে জীবিকা নির্বাহ করত। তারা সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত কাজই শুধু করে যেত। তাদের স্ত্রীরা সাধারণত রান্নাবান্না এবং সেলাইয়ের কাজে ব্যস্ত থাকত। ছেলেমেয়ে প্রতিপালন করাটাও তাদের অন্যতম কাজ ছিল। চাষিরা সারাদিন চাষাবাদ করার ফাঁকে দিনে একবারই মাত্র বাড়িতে ফিরে আসত; স্নান করে খেয়ে নেওয়ার জন্য। স্নান করাটা ছিল তাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। স্নান না করলে তারা খুবই অসুবিধা বোধ করত। অবশ্য স্নান করাটা শুধু চাষিরা নয় সব মায়ারাই করত। এটা তাদের সংস্কৃতির অঙ্গ বলে মনে করা হত।

পোশাক
পোশাক তাদের সামাজিক স্তরের প্রকারভেদ এর ওপরে নির্ভর করত। অভিজাতদের পোশাক ও সাধারণ মায়াদের পরিধেয় বস্ত্র এক ছিল না। যারা ধনী ও অভিজাত মায়া ছিল; তারা সাধারণত জন্তু জানোয়ারের চর্ম ও লোম হতে তৈরি বস্ত্র পরিধান করত। যা দেখতে যেমন রঙিন হত তেমনই ভারী হত। তারা মহামূল্যবান রত্ন ও সোনা দ্বারা সৃষ্ট গয়না পড়তে পছন্দ করত।
সাধারণ মায়ারা নেংটি পড়ে থাকত। গ্রীষ্মকালে খালি গায়ে থাকলেও শীতকালে পুরুষরা ঊর্ধ্বাঙ্গে পঞ্চো ধরণের পোশাক পড়ে থাকত। যা কম্বল দিয়ে তৈরি করা হত। মেয়েরাও একই পোশাক পরে থাকত।
তবে মেয়েরা লম্বা স্কার্ট গোছের পোশাক পড়ত। এদের উভয় লিঙ্গের পোশাক আশাক অনেকাংশে অ্যাজটেক সভ্যতার মতন ছিল। আরও দুটি বিষয়ে উভয় লিঙ্গের মধ্যে মিল ছিল। আর তা হল উভয়েই বিয়ের পরে গায়ে উল্কি মেরে রাখত নিজেদের বিবাহিত প্রমাণ রাখতে। এবং উভয়েই একই রকমের বিশাল কেশরাজি বহন করে রাখত।

খাদ্য
মায়াদের কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ আহার ছিল ভুট্টা বা মেইজে। তারা এই ভুট্টা দিয়ে সব রকমের খাদ্য তৈরি করে খেত। যেমন টর্টিলা, ডালিয়া এবং পনীর জাতীয় খাদ্য। এমনকি ভুট্টা পচিয়ে মদ তৈরি করে খেত। এছাড়া এরা আহার হিসাবে যেসব খাদ্যশস্য ও আমিষ গ্রহণ করত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল শিম, সব রকমের শুঁটি, স্কোয়াশ, লঙ্কা। এছাড়া হরিণ, হাঁস, বক, টার্কি এবং মাছ। মাছ তারা বেশী করে খেত বিশেষতঃ সমুদ্রের মাছ। তেলাপিয়া ছিল তাদের প্রিয় খাদ্য।
মায়াদের কাছ থেকেই বিশ্ব বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য উপহার পেয়েছে। যেমন, চকোলেট, টোম্যাটো, রাঙ্গালু, কালো শিম ও পেঁপে। চকোলেট তৈরি হত কাকাও গাছ থেকে। তারা মনে করত চকোলেট হল ঈশ্বরের অবদান। এবং চকোলেট যে গাছ থেকে উৎপন্ন হত; সেই কাকাওয়ের বীজকে তারা মুদ্রার বিকল্প রূপে ব্যবহার করত। যেমন আমরা এককালে সামুদ্রিক কড়িকে মুদ্রার বিকল্প রূপে ব্যবহার করতাম ওরাও সেইরকমই কাকাওয়ের বীজকে মুদ্রার বিকল্প রূপে ব্যবহার করত।

বাড়িঘর
অভিজাত ও সম্রাট এর আত্মীয় বর্গের দল শহরের মধ্যে নিখাদ গ্রানাইট পাথরের বাড়িতে বসবাস করতেন। তাতে বাগান বাড়ি ও বিরাট স্নানাগার থাকত। আর মায়া জনসাধারণ গ্রামে ক্ষেতের পাশে কুঁড়েঘর বানিয়ে থাকত। এইসব কুঁড়েঘর তৈরি হত এঁটেল মাটি দিয়ে তাই কোয়ালিটি দারুণ খারাপ ছিল। এইসব বাড়িতে ঘরের সংখ্যা ছিল মাত্র দুটি। এক, প্রার্থনা ঘর এবং রান্না ঘর এবং দুই শয়নকক্ষ এবং শৌচাগার। এইসব বাড়ির ছাদ পাম গাছের পাতা দিয়ে ছাওয়া থাকত। তবে কিছু কিছু মায়া সাধারণ মানুষ পাথরের বাড়িতে বসবাসও করত; তবে তাদের সংখ্যা ছিল অত্যল্প। তবে সব মায়ারাই মাটি থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে পাথর দিয়ে মাচা বানিয়ে তার উপরে বাড়ি বানাত। এতে বন্যার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যেত। কেননা অধিকাংশ মায়া নগররাষ্ট্র এবং সংলগ্ন অঞ্চল ছিল সমুদ্রতীরে। সেই জন্যই এমন সতর্কতা পালন করত। বিশেষতঃ ইউকাটায়েন উপদ্বীপ অঞ্চলে সর্বদাই সুনামি বা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস প্রায়ই আসত। সেই জন্যই এমন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল মায়া অঞ্চলে।

বিনোদন
যদিও মায়ারা অত্যন্ত কঠিন জীবনযাপন করত, তবুও তারা বিনোদন এর ব্যবস্থা করত; বিশেষতঃ ছুটির দিনে কিংবা ধর্মীয় দিবসের দিনগুলিতে। তারা নাচতে, গাইতে এবং খেলতে খুবই উৎসাহ পেত। অনেকেরই ধারণা তারা ছিল ভলিবল এর জনক।
কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য –
1] মায়ারা ভাবত যে, মঙ্গোলিয়ানদের ন্যায় টানা চোখ, চওড়া কপাল এবং লম্বা ও বড় নাক সৌন্দর্যের প্রতীক। এর কোনওটাই না থাকলে সেই মায়া বিবাহের পক্ষে অযোগ্য বলে মনে হত। এইজন্য তারা অস্ত্রোপচার এবং সাজসজ্জা করে নাক বড় ও চোখ টানা করার ব্যবস্থা করত।
2] মায়ারা বড় বড় টুপি [অনেকটা বৈষ্ণবদের কানঢাকা টুপির মতন] ও দামী দামী অলঙ্কার পড়া পছন্দ করত, বিশেষ করে যারা অভিজাত তারা। যত উচ্চদরের অভিজাত ততই বড় মাপের টুপি পরিধান করত।
3] মায়ারা ইনকা বা অ্যাজটেকদের মতই লোহার ব্যবহার জানত না। এমনকি চাকার ব্যবহারও জানত না। তারা পাথরের তীক্ষ্ম অস্ত্র দিয়ে সব কাজ চালিয়ে নিত।
4] মায়ারা যে ভলিবল গোছের খেলা খেলত; তা কেবল ধর্মীয় উৎসবের দিনেই খেলত। এই খেলায় যে দল হারত, তারা দেবতার প্রতি উৎসর্গিত হত অর্থাৎ নরবলির শিকার হত !
5] মায়ারা অন্ততঃ ১১১ রকমের নৃত্যকলা জানত। এর মধ্যে প্রায় ১৫ রকমের নৃত্যকলা অদ্যাবধি প্রচলিত। এর মধ্যে বাঁদর নাচ, সাপ নাচ, স্ট্যাগ হরিণের নাচ বিশেষ উল্লেখযোগ্য ।

মায়া সভ্যতার দ্রষ্টব্যস্থল এবং নগররাষ্ট্র
মায়ারা মেক্সিকোর বিভিন্ন স্থান জুড়ে বিভিন্ন নগররাষ্ট্রের মাধ্যমে এক বিশাল সাম্রাজ্য নির্মাণ করেছিল। প্রত্যেক শহর ছিল এক একটা নগররাষ্ট্র। প্রত্যেক নগররাষ্ট্রের চারপাশে কয়েকটা ছোট শহর বা বড় গ্রাম ঘিরে থাকত। তাদের খাজনায় চলত এইসব মায়া নগররাষ্ট্র। মায়ারা অবশ্য অ্যাজটেকদের ন্যায় পরিকল্পিত ও সুগঠিত নগররাষ্ট্র তৈরি করতে পারে নি। তাদের প্রবণতা ছিল যে, প্রথমে একটা মন্দির বানাবে তারপর তার আশপাশে কয়েকটা বড় গ্রাম বানাবে এরপর কয়েকটা বড় গ্রামের ঠিক মাঝখানে একটা বড় শহর বানাবে। এইভাবেই মায়া নগররাষ্ট্র তৈরি হত বলে তা ছন্নছাড়া প্রকৃতির হত। প্রত্যেক নগররাষ্ট্রের একেবারে মাঝখানে সূর্য মন্দির বানানোটা ছিল খাঁটি মায়া রীতি। টাইকাল, কোপায়েন, টেওটিহুয়াকান এবং চিচেন ইটজায় সূর্য মন্দিরের অসাধারণ নমুনা দেখা গিয়েছে। সব সূর্য মন্দির ছিল পিরামিড এর ন্যায়।
প্রত্যেক মায়া নগররাষ্ট্রে একটা করে স্থানীয় রাজা বা আহাও থাকতেন। তিনি বসবাস করতেন এক বিরাট রাজপ্রাসাদে। তার সাথে বিরাট রাজ পরিবারও ঐ রাজপ্রাসাদে থাকত। প্রত্যেক রাজপ্রাসাদের উত্তর প্রান্তে থাকত একটা বাণিজ্য কুঠি, বড় রাস্তা এবং দক্ষিণ প্রান্তে থাকত পিরামিড এবং কৃষিজমি। মায়া সাম্রাজ্যের সেরা কৃষিজমির ধারেই রাজপ্রাসাদের অবস্থান থাকত যাতে সেরা খাদ্য সম্রাটের কাছে দ্রুত পৌঁছে যেত।

এল মিরাডর
এল মিরাডর হচ্ছে প্রথমতম মায়া নগররাষ্ট্র। ভাবা হয় যে, যখন এই নগররাষ্ট্র উন্নতির সেরা স্থানে পৌঁছেছে; তখন শহরে বসবাস করত প্রায় ১০০০০০ মানুষ। শহরের মধ্যস্থল এর আয়তন প্রায় ৩.১২ স্কোয়ার কিলোমিটার [১.২০ স্কোয়ার মাইল] ছিল এবং এখানে প্রায় ১০০০ অট্টালিকা ছিল। পুরাতাত্ত্বিকরা এখানে তিনটে বিরাট আকৃতিসমপন্ন পিরামিডের খোঁজ পেয়েছেন। এই তিন পিরামিডের নাম হল যথাক্রমে; এল টাইগ্রে [১৮০ ফিট বা ৫৪.৯ মিটার উঁচু], লস মোনোস [১৫৭ ফিট বা ৪৭.৯ মিটার উঁচু] এবং লা ডানটা [২৫০ ফিট বা ৭৬.৫ মিটার উঁচু]। লা ডানটা পিরামিডকে আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম বলে ধরা হয়। পুরাতাত্ত্বিকরা কার্বন আইসোটোপ পরীক্ষা থেকে অনুমান করেন এল মিরাডর মোটামুটি ৬০০ খৃষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ উদ্ভব হয়েছিল। সেখান থেকে এল মিরাডর খৃষ্টীয় প্রথম শতক অবধি টিকে ছিল। আর এই নগররাষ্ট্রের স্বর্ণযুগ ছিল আনুমানিক খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে দ্বিতীয় শতক নাগাদ। বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে এটাও অনুমান করা হয় মূল শহরটা ১৫০ খৃষ্টাব্দে পরিত্যাগ করে মিরাডরবাসীগণ অন্যত্র চলে যেতে শুরু করে। ৭০০ খৃষ্টাব্দে তারা অন্য জায়গায় অবশেষে বসবাস করতে শুর করে। কোর্টেজ এবং তার সাথীরা এই শহরকে পরিত্যক্ত অবস্থাতেই দেখেছিল বলে জানা গেছে।

কামিনালজুয়ু
গুয়াটেমালা উচ্চভূমি এবং দক্ষিণ মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী এলাকায় ছিল বিখ্যা মায়া নগররাষ্ট্র কামিনালজুয়ু। বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রমাণ হতে এটা আন্দাজ করা হয় এই নগররাষ্ট্রের আয়ু ছিল প্রায় ২০০০ বছর। অর্থাৎ ১২০০ খৃষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৯০০ খৃষ্টাব্দ অবধি এই কামিনালজুয়ু নগররাষ্ট্র টিকে ছিল। তারপর এই শহর পরিত্যক্ত হয় এল মিরাডর শহরের মতই।

টাইকাল
টাইকাল ছিল মায়া সভ্যতার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও প্রভাবশালী নগররাষ্ট্র। এই নগররাষ্ট্রের উৎপত্তি ঘটে মায়া ধ্রুপদী যুগে। অর্থাৎ ২৫০ খৃষ্টাব্দ থেকে ৯০০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে এই শহর শক্তিশালী নগররাষ্ট্র হিসাবে গণ্য ছিল। এই শহর আয়তনে অন্য মায়া শহরের তুলনায় অনেক ছোট ছিল [মোট আয়তন ১ স্কোয়ার মাইল বা ২.৫ স্কোয়ার কিলোমিটার ছিল] এবং এই শহরে শতাধিক বড় মাপের অট্টালিকা ছিল। তবে টাইকাল শহরে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য ছিল ছয়টি পিরামিড। যা যে কোনও মায়া শহরের তুলনায় বেশী। এর মধ্যে চতুর্থ পিরামিডটি [ ৬০০ খৃষ্টাব্দে নির্মিত] ছিল বৃহত্তম পিরামিড। এর উচ্চতা ছিল ২৩০ ফিট বা ৭৬.২৫ মিটার। টাইকাল শহরে তার স্বর্ণযুগে মোট বাসিন্দার সংখ্যা ছিল ৬০০০০ থেকে ৭৫০০০ এর মধ্যে। ১৯৭৯ খৃষ্টাব্দে এই ঐতিহাসিক নগররাষ্ট্র ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পায় ।

টেওটিহুয়াকান
টেওটিহুয়াকান শহরের আয়তন ও জনসংখ্যা ছিল অন্যান্য মায়া নগররাষ্ট্রের তুলনায় বেশ কম। তবে বাণিজ্যনগরী হিসাবে এর গুরুত্ব ছিল অসীম। মধ্য মেক্সিকো উপত্যকায় এই নগররাষ্ট্র অবস্থিত ছিল। অনেকেই বলেন এটি একটি টল্টেখ নগর, মায়া নগররাষ্ট্র নয়। মেক্সিকো সিটি হতে ৩০ মাইল বা ৪৯.৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই মহান নগররাষ্ট্র। এই নগরের মোট আয়তন ছিল ৮ স্কোয়ার মাইল বা ২১ স্কোয়ার কিলোমিটার। মায়া সংস্কৃতিতে এই নগররাষ্ট্রের প্রচুর অব্দান আছে। এখানে বেশ কিছু বৃহৎ অট্টালিকা ছিল যার মধ্যে চন্দ্রদেবের পিরামিড ও সূর্যদেবের পিরামিড। এখানে ১৫০০০ বাসিন্দা এই নগররাষ্ট্রের স্বর্ণযুগে বসবাস করত বলে জানা গেছে।

খারাখোল
আনুমানিক ২৫০ খৃষ্টাব্দে খারাখোল শহর এর উৎপত্তি হয়েছিল টাইকাল শহরের যমজ শহর হিসাবে । ঠিক অনেকটা কলকাতা-হাওড়া শহরের মতন। বর্তমানে বেলিজে রাষ্ট্রের রাজধানী বেলিজে শহরের কায়ো জেলায় অবস্থিত। ৬০০ খৃষ্টাব্দে এই শহর টাইকাল এর করদ রাজ্যের তকমা ঝেড়ে স্ববলে মহীয়ান হয়ে ওঠে। অর্থাৎ টাইকাল শহরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। এই শহর আজকের বেলিজে শহরের চেয়ে আকারে ও আয়তনে বড় ছিল। এর আয়তন ছিল আনুমানিক ২০২.৩ স্কোয়ার কিলোমিটার বা ৭৮.১ স্কোয়ার মাইল ছিল। এইভাবেই খারাখোল হয়ে ওঠে মায়া সভ্যতার অন্যতম বৃহত্তম নগররাষ্ট্র। এখানে এর স্বর্ণযুগে প্রায় ২০০০০০ মানুষ খারাখোল শহরে বসবাস করত।

চিচেন ইটজা
চিচেন ইটজা উত্তর ধ্রুপদী যুগের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী মায়া নগররাষ্ট্র ছিল। এখানে বহু বিখ্যাত একশিলাস্তম্ভের স্থাপত্য ছাড়াও অট্টালিকা ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল এল কাস্টিল্লো, গ্রেট বল কোর্ট, যোদ্ধাদের মন্দির ইত্যাদি।

নীচে এইসব বিখ্যাত স্থাপত্যের বিবরণ দেওয়া হল :
এল কাস্টিল্লো : এক বিশাল পিরামিড যা নির্মিত হয়েছিল মায়া দেবতা কুকুল্কানের উদ্দেশ্যে । এই পিরামিড ৯৮ মিটার [৩২১ ফিট] উচ্চতাসমপন্ন। এই পিরামিড আনুমানিক খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে নির্মিত হয়েছিল। এই পিরামিডের প্রত্যেক প্রান্তে মোট একানব্বইটি ধাপ ছিল এবং একেবারে ওপরে আয়তক্ষেত্রাকৃতির ভবন ছিল আসলে ৩৬৫টি ধাপ মিলিয়ে এই পিরামিড গড়া হয়েছিল। অর্থাৎ একটা সিঁড়ির ধাপ এক পার্থিব দিনকে বোঝাত।
গ্রেট বল কোর্ট : এটা ছিল বিখ্যাত মায়ান ভলিবল গোছের খেলার মাঠ। এই মাঠ লম্বায় ৫৫১ ফিট এবং ২৩০ ফিট চওড়া ছিল। সব মিলিয়ে মাঠের মোট আয়তন ছিল ১২৬৭৩০ স্কোয়ার ফিট বা ১১৭৭৩ স্কোয়ার মিটার। মাঠের চারপাশে থাকা দেওয়ালের উচ্চতা ছিল ২৬ ফিট বা ৭.৯ মিটার। উত্তরের দেওয়ালের ওপারে ছিল জাগুয়ার দেবতার মন্দির।
যোদ্ধাদের মন্দির : এটাও একটা পিরামিড ছিল।এর গঠন অনেকটাই চিচেন ইটজার ন্যায় ছিল। তবে সিঁড়ির ধাপ ৩৬৪ এর স্থলে ছিল ২০০ টি। অর্থাৎ চার প্রান্ত থেকে ৫০টি করে ধাপ গঠিত ছিল।

কোপায়েন
এটি একটি মায়া নগররাষ্ট্র, যা কিনা বর্তমান হন্ডুরাস রাষ্ট্রে অবস্থিত। এই শহরের পূর্বপ্রান্তে রয়েছে কোপায়েন নদী। এই ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর হন্ডুরাসের সান্টা রোজা ডে কোপায়েন শহর হতে ৩৫ মাইল বা ৫৬ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। এই শহর বিখ্যাত ছিল জ্যোতির্বিদ্যার এবং সাংস্কৃতিক কারণে। খৃষ্টীয় নবম শতকে এই শহরের মোট বাসিন্দা ছিল ২০০০০ এর বেশী। এখানে বহু একশিলাস্তম্ভ দ্বারা সৃষ্ট অতিকায় গ্রানাইট পাথরের মূর্তি, দুটি পিরামিড এবং বল কোর্ট ছিল এই ঐতিহাসিক নগরীতে। মায়ারা আনুমানিক ৩০০ খৃষ্টাব্দে এই শহরের পত্তন করে এবং ১২০০ খৃষ্টাব্দে এই শহর সমপূর্ণভাবে পরিত্যাগ করে। ১৯৮০ খৃষ্টাব্দে এই শহর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে রূপান্তরিত হয়। এর বার্ষিক আগত পর্যটকদের সংখ্যা আনুমানিক ৭ লাখ।

পালেংখুয়ে
কোপায়েন শহরের মতই আরেক বিখ্যাত মায়া নগররাষ্ট্র ছিল এই পালেংখুয়ে। ১৯৫২ খৃষ্টাব্দে জনৈক মার্কিন ইতিহাসবিদ আজকের মেক্সিকোর চিয়াপাস রাজ্যে সমুদ্রের ধারে এক ম্যাংগ্রোভ অরণ্যের মধ্যে এই ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরী আবিষ্কার করেন। এই নগরী অনেক অসাধারণ স্থাপত্যের জন্য বিশেষ স্মরণীয়। এর মধ্যে চারতলা ময়দান, একটি পিরামিড, একটি দুর্গ, দুটি ভুলভুলাইয়া এর জন্য প্রসিদ্ধ।। কেননা আর কোনও মায়া শহরে ভুলভুলাইয়া নেই। তবে পালেংখুয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য হল শিলালিপির মন্দিরের জন্য । এই মন্দিরকে বলা হয় সবচেয়ে সুন্দর মায়া মন্দির । এই মন্দিরের ভেতরে বিচিত্র সব শিলালিপি এবং নকশা অঙ্কিত রয়েছে। তবে সবচেয়ে স্মরণীয় নকশা হল এক মহাকাশযাত্রীর। হাজার বছর আগে তো মহাকাশযাত্রী কেমন দেখতে তা ধারণা ছিল না পৃথিবীর বাসিন্দাদের। তবে কেমন করে রকেটে চাপা ঐ মহাকাশযাত্রীর নকশা আঁকল পালেংখুয়ের বাসিন্দারা? নাকি ওটা কোনও দেবতার চিত্র ছিল? এরিক ভন ডানিকেন বলেন দুটিই ঠিক উত্তর। এটা একদিকে দেবতার চিত্র এবং অন্য দিকে মহাকাশযাত্রীর চিত্র। এর চেয়ে কোনও নিখুঁত প্রমাণ আর নেই যে দেবতারা আসলে অন্য গ্রহের মানুষ। মায়া ৬০০ খৃষ্টাব্দে এই শহরের পত্তন করেছিল কিন্তু ১১০০ খৃষ্টাব্দ নাগাদ শহর পরিত্যাগ করে চলে যায়। পাশের চিত্রে পালেংখুয়ের বিখ্যাত শিলালিপির মন্দির ।

উক্সমাল
দক্ষিণপূর্ব মেক্সিকোর ইউকাটায়েন রাজ্যে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক মায়া নগররাষ্ট্র। আনুমানিক ৬৫০ খৃষ্টাব্দে এই শহরের নির্মাণকার্য শুরু হয় এবং ১০০০ খৃষ্টাব্দ নাগাদ শহরের নির্মাণকার্য অসমপূর্ণ রেখে শেষ করে দেওয়া হয়। এই নগররাষ্ট্র মায়াপান সাম্রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী মিত্র রাষ্ট্র ছিল। যখন মায়াপান নগররাষ্ট্রের পতন হয়; তখন অন্যান্য উত্তরের মায়া নগররাষ্ট্রের মতই আনুমানিক ১৪৫০ খৃষ্টাব্দে উক্সমাল পরিত্যক্ত হয়। এখানে যাদুকরের পিরামিড, কচ্ছপের রাজপ্রাসাদ ও চতুষ্কোণীয় ময়দান ছিল ।

মায়া নগররাষ্ট্রের সমপর্কে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য :
১] বেশীর ভাগ মায়া শহরে টুরিস্টরা নিয়মিত ভ্রমণ করেন। এর মধ্যে চিচেন ইটজা আর টাইকাল সবচেয়ে জনপ্রিয়। এই দুটোই ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত।
২] প্রতি বছর ১২ লাখ টুরিস্ট চিচেন ইটজায় আসেন। এর মধ্যে ১০ লাখের বেশি টুরিস্টই ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসেন। টাইকালে বার্ষিক টুরিস্টদের সংখ্যা ৯ লাখের আশপাশে বলে জানা গেছে।
৩] পুরাতাত্ত্বিকরা সব মিলিয়ে ১৩ টি গ্রেট বল কোর্টের ঢঙে বানান খেলবার মাঠ খুঁজে পেয়েছেন চিচেন ইটজা নগররাষ্ট্রের কাছে।
৪] অন্যান্য মায়া শহরের মধ্যে প্রধান হল খোবা , উক্সমাল, মায়াপান, টুলুম , পালেংখুয়ে এবং কাবাহ।
৫] পালেংখুয়ে এককালে স্প্যানিশদের কাছে সিউডাড লা রোজা বা লোহিত নগরী নামে পরিচিত ছিল। কেননা এই শহরের সব অট্টালিকার বহিরঙ্গ ছিল লাল রঙে রঞ্জিত। এই কারণেই এমন নাম পেয়েছিল পালেংখে।
৬] টাইকাল নগররাষ্ট্রের প্রধান অনেক ক্ষেত্রে নারী হয়েছেন। বেশ কিছু রাজার নাম বেশ মজাদার যেমন; জাগুয়ারের থাবা, কুঞ্চিত মুন্ডু, রক্ষিত খুলি এবং জোড়া পাখি। এমন বিচিত্র নামকরণের কারণ অদ্যাবধি জানা যায় নি।

অঙ্কন
অনেকেই বিবেচনা করে মায়া শিল্প প্রাচীন যুগের (সি. ২৫০ থেকে ৯০০ এ.ডি.), প্রাচীন নতুন বিশ্বের সর্বাপেক্ষা সফিস্টিকেট এবং সুন্দর শিল্প হইবে। অতীতের অনেক সভ্যতার মত, মায়ার জনগণরা অন্যান্য কেন্দ্রীয় আমেরিকার লোকদেরমত ভাস্কর্য এবং রঙিন ভবন ব্যবহার করার বৈশিষ্ট্য ছিল। বিভিন্ন মন্দিরের কবর গুলোর ভিতর কম্পন সজ্জিত এবং প্রাসাদ গুলোতে খাটি গাঢ় লাল, মেঝেতে নীল। বিষয়বস্তু: গায়করা, নর্তকীরা, মহিলাদের ছাতার সঙ্গে সেবীকা যারা পাখির পালকের দিয়ে ঢাকা ছিল, জলজ প্রাণী বৈশিষ্ট মুখোস, উৎসবের ধর্মযাজকরা এবং প্রভুরা, শাসনকর্তারা এবং মহৎ উদার হ্মমতা সম্পূর্ণ শহর গুলোর, মহিলা নাপিতদের, দেবতার মুখোস, যুদ্ধারা, জীবন থেকে মৃত্যুতে পরিবর্তনের, জয়লাভ উদযাপনের, ধর্মের প্রথাপদ্ধতি গুলোর, হিংসার এবং মানবিক উৎসগের দৃশ্য, সাপের, জাগুয়ারের। সর্বাপেক্ষা এক লক্ষণীয় মায়ার শিল্পসম্মত দানের, দ্বিধা ছাড়া আঁকা নির্দিষ্ট বক্রতা, একটি ধারণা প্রসুত যে অনেক দৃশ্যতে এশিয়ার অঙ্কন। প্রাচীন কালে ৫৫০-৯০০ এ.ডি. এর মধ্যে ভাস্কর্য বিকশিত হয়েছিল কোন বাহ্যিক প্রভাব ব্যতীত, এবং খুব সচ্ছল ছিল। আমাদের কেবল প্রাচীন মায়ার উন্নতির আভাসের চিত্র রয়েছে; বেশির ভাগ যা মৃত্যুর পরও বেচে থেকেছে এবং অন্যান্য মায়া মৃৎশিল্প এবং তে একটি ভবনের প্রাচীন দেওয়াল গুলোতে অঙ্কন ধরে রেখে সুযোগে বেচে থেকে ছিল। একটি সুন্দর বৈষর্য নীল রং যে শতকের মধ্য দিয়ে বেচে থেকেছে তার এক রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের দরুন যা মায়া নীল হিসেবে জেনেছে এবং এইটি বৃদ্ধমান এবং এমনকি কিছু ঔপনিবেশিক আশ্রমে। মায়া নীলের ব্যবহার কার্যকরী থেকে ১৬ শতক পর্যন্ত যখন কৌশলটি হারিয়ে যায় ।

জ্যোতির্বিদ্যা
বৈশিষ্ট্যযুক্তভাবে, সেখানে কিছু প্রমাণ আবির্ভূত হয় যা মায়াকে মনে হয় কেবল অদ্বিতীয় প্রে-টেলেস্কোপিক সভ্যতা যাদের ওরিয়ন নীহারিকার অস্পষ্ট জ্ঞান দেখা যায়, যা একটি পিন-পয়েন্ট নাহ্মত্রিকা না। তথ্যটি যে তত্ত্বটি ধরে রাখে তা আসে লোকদের একটি গল্প থেকে, সে আকাশের ওরিয়ন তারামণ্ডলীর অঞ্চলের দেখা-শোনা করতো। তাদের ঐতিহ্যবাহী ঘর একটি ঝাপসা দাগসহ উত্তপ্ত আগুনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত যা ওরিয়ন নীহারিকার অনুরুপ। এইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ধারণা সমর্থন করে যা দূরবীক্ষণ আবিস্কারের পূর্বে মায়ারা আকাশের তারকার একটি পরিব্যাপ্ত অঞ্চল পিন-পয়েন্টতে সনাক্ত করেছিল।
মায়ারা জ়েনিয়াল প্রস্থান গুলোতে খুব কৌতূহলী ছিল, যখন সূর্য সরাসরিভাবে মাথার উপর দিয়ে যায়। তাদের নগরীর বেশির ভাগ অক্ষাংশ কর্কটক্রান্তির নিচে হওয়ায, এই প্রকৃত প্রস্থান গুলো নিরহ্মরেখার উপর থেকে সমান দূরত্ব এক বছরে দুইবার ঘটাবে। সূর্য মাথার উপরের এই অবস্থানটি প্রতিনিধিত্ব করতে, মায়ার একটি দেবতা ছিল যার নাম দেবতা ডাভিইং ।
ড্রেসডেন কোডেক্স ধারণ করে উচ্চতম ঘনত্বের জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক পর্যবেক্ষণ এবং যে কোন জীবন্ত বিষয় সমূহ নির্ণয় করে । এই কোডেএক্সের পরীক্ষা এবং বিশ্লেষণে প্রকাশ করে যে শুক্রের জ্যোতির্বিদ্যা মায়ার কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, এমনকি সূর্যের চেয়ে তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ।

গণিত
মেক্সিকানের অন্যান্য সভ্যতা গুলোর সাথে মায়া সভ্যতার মিল হলো, মায়া ব্যবহার করতো একটি ২০ ভিত্তি সংখ্যা এবং ৫ ভিত্তি সংখ্যা (মায়া সংখ্যা দেখুন) পদ্ধতি। তা ছাড়াও, প্রেক্লাসিক মায়া এবং তাদের প্রতিবেশীদের ৩৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে শূন্যের ধারণা স্বাধীনভাবে ক্রমবিকাশিত করেছিল। তাদের লেখা হতে বুঝা যায় যে তারা কাজ উপর ভিত্তি করে লাক্ষ লাক্ষ অঙ্কের হিসাব করতো এবং তারিখ গুলো এতো বড় হতো যে তা শুধু লিখতে অনেক লাইনের দরকার হবে। তারা খুব নির্ভূল ভাবে জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ করেছিল; তাদের নকশায় চাঁদ এবং অন্যান্য গ্রহগুলোর পর্যায়কাল সমান অথবা অন্যান্য সভ্যতার খালি চোখে পর্যবেক্ষকগণদের থেকে উন্নত ছিল।
মেক্সিকানের অন্যান্য সভ্যতা গুলোর সাথে মায়া সভ্যতার আরও মিল হলো, মায়া সঠিক এবং নির্ভুলতার সাথে সৌর বছরের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করেছিল। ইউরোপীয়নরা যে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিকা ব্যবহার করতো তার চেয়েও অনেক বেশি সঠিক এবং নির্ভুল ছিল। যাইহোক; তারা যে অপরিণত বর্ষপঞ্জিকা ব্যবহার করেছিল, এটি ভিত্তি করা হয়েছে এক বছর যথাযথভাবে ৩৬৫ দিন, এর অর্থ এই যে বর্ষপঞ্জিকা প্রতি চার বছরে এক দিন বৃদ্ধি পায়। জুলিয়ান বর্ষপঞ্জিকা ব্যবহার হতো ইউরোপে রোমানদের সময় থেকে ১৬ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত। প্রতি ১২৮ বছরে কেবল এক দিনের ত্রুটি জড়িত হয়েছিল। আধুনিক গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিকা আরও বেশি নির্ভূল, প্রায় ৩২৫৭ বছরে কেবল এক দিনের ত্রুটি জড়িত হচ্ছে।

সময়
অতীতের একটি অপরিবর্তনীয় বিন্দু থেকে মায়ার ইতিহাস গণনা করা হয়েছিল। যেমন, খ্রিস্টান ধর্মের অংশ হচ্ছে যিশুর জন্ম, গ্রিকের প্রথম অলিম্পিক গেমস এবং রোমান সাম্রাজ্যের জন্মের রোম থেকে। তাদের বর্ষপঞ্জিকার একটি তারিখ নির্দিষ্ট করা হয়েছে (দীর্ঘের পরিমাণ), অনুবাদ করা হয়েছিল ৩১১৪ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ হিসেবে, সম্ভবত পরস্পর সম্পর্কযুক্ত একটি কাল্পনিক ঘটনাতে যেমন একটি ভীষণ বিপর্যয়ের পরে একটি নতুন বিশ্বের সৃষ্টি। খ্রীষ্টান যুগের আগের শতক থেকে, তাদের পুরোহিত জ্যোতির্বিজ্ঞানী নির্ভুলতার সঙ্গে চন্দ্র, সূর্যের গ্রহণ এবং শুক্রের কক্ষ পথ সম্পূর্ণভাবে নির্দিষ্ট করতে পারতো।

বর্ষপঞ্জিকা
K’in হল মায়া বর্ষপঞ্জিকার একটি সময় যা একটি দিনের অনুরুপ; আর উইনাল (মাস) হল মায়া বর্ষপঞ্জিকার একটি চক্র যা ২০ দিনের একটি পর্যায়কাল সংশ্লিষ্ট হয়। ১৮ উইনাল হল ১ হাব (বছর) এর একটি চক্র যা ৩৬০ দিন বুঝায়। এগুলোর সাথে যোগ করা হয়েছিল ৫ দিন যা ওয়েব ডাক হতো। এই ৫ দিনকে তারা বিশেষভাবে অমঙ্গলজনক হিসাবে বিবেচনা করা হতো। এই ৫ দিন যোগ করে ৩৬৫ দিনের একটি বর্ষপঞ্জিকার ঋতু চক্রে সংযোগ করা হয়েছিল। বর্ষপঞ্জিকা গঠন করা হয়েছিল ২০ দিনের ১ “মাস” আর ১৯ মাসে ১ বছর। মাসগুলোর নাম হলঃ
# মাস অর্থ
১ Pop মাদুর
২ Wo কাল যুক্তাক্ষর
৩ Sip লাল যুক্তাক্ষর
৪ Sotz’ বাদুড়
৫ Sek ?
৬ Xul কুকুর
৭ Yaxk’in নতুন সূর্য
৮ Mol জল
৯ Ch’en কাল ঝড়
১০ Yax সবুজ ঝড়
১১ Sak সাদা ঝড়
১২ Keh লাল ঝড়
১৩ Mak পরিবেষ্টিত
১৪ K’ank’in হলদে সূর্য
১৫ Muwan পেঁচা
১৬ Pax গাছ লাগানোর সময়
১৭ K’ayab’ কচ্ছপ
১৮ Kumk’u শস্যভান্ডার
১৯ Wayeb’ অমঙ্গলজনক ৫ দিন

তাদের একটি গৌণ বর্ষপঞ্জিকার উপরে চেইন দিয়ে বেধে দেওয়া হয়েছিল, যেটি ধর্মীয় প্রথা উদ্দ্যেশ্যের জন্য ব্যবহার করা হতো এবং দেবতদের জন্য ২৬০ দিনের একত্র করে একে গঠন করেছিল, ২০ দিনের ১ “মাস” আর ১৩ মাসে ১ বছর এবং ৫২ বছর ১ শতাব্দী ছিল। এক K’atun ২০ বছর, ৩৬০ দিনের একটি চক্র যা পুনরাবৃত্তি হতো তাৎপর্য্য ব্যতীত। ২০ বছরের শুরুতে অথবা প্রান্তে K’atun প্রতিনিধিত্ব করতে গুরুত্বপূর্ণ প্রধান নগরীগুলো নির্মিত করা হয়েছিল। দিন, মাস এবং ঋতুর চিরস্থায়ী প্রবাহের তালগুলো একটি অলৌকিক ঘটনা যা প্রতি সূর্যদয় এবং প্রতি সূর্যাস্ত মায়াদের ধাক্কা দিতো একটি গভীর পবিত্রে। প্রতি ভাবভঙ্গী, প্রতি মানবিক ক্রিয়াকর্ম তার আর্দশের চিহ্ন হয়েছিল যা দিন তার সাথে আন্তো, সূর্যের প্রকৃতিগুলো যা প্রত্যেক ভোরে নরকের রাজ্য থেকে আসে স্বর্গ পৌঁছতে।

লেখা এবং সাক্ষরতা
লিখনপদ্ধতি
*************
মায়া একমাত্র প্রচীন কলম্বীয় সভ্যতা যা রেখে গিয়েছে অনেক উৎকীর্ণলিপি। একটি বড় পরিমাণ মায়ার উৎকীর্ণলিপি নহ্মত্রদের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এবং ইতিহাস তাদের এই তথ্যগুলোর ধারণের সাহ্মী। মায়া লিখন ছিল একটি logosyllabic, যেটিতে প্রত্যেক চিহ্ন বা বর্ণ, নিজে থেকেই প্রতিনিধিত্ব করতে পারতো এক একটি শব্দ বা অর্থের প্রকাশ। নির্দেশ করতে পারতো একটি শব্দের উচ্চারণের কন্ঠস্বর। অতি প্রাচীন মায়া লেখার সময় কাল শনাক্ত করা হয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব ২০০-৩০০ শতাব্দীর প্রথম দিকে। মায়ারা একটি ভাষা লেখার ব্যবহার শিখার আরম্ভের সময় ধরে খ্রীষ্টান যুগের প্রথম দিকে ফিরে যাওয়া যায়। এইটি প্রাচীন কলম্বিয়ার নতুন বিশ্বের একমাত্র লিখন পদ্ধতি, যেটি এ সম্প্রদায়ের কথ্য ভাষা সম্পূর্ণভাবে বর্ণনা করে। মোট, এক হাজার চেয়েও বেশি আলাদা বর্ণ লিপি রয়েছে, যদিও কয়েকটি একই চিহ্ন অথবা অর্থের পরিবর্তনশীলতা আছে এবং অনেক গুলোকে দূলর্ভ মনে হয় অথবা বিশেষ স্থানে সীমাবদ্ধ করা হয়। যে কোন সময়ে, প্রায় ৫০০ টির চেয়ে বেশি বর্ণ ব্যবহার হত না, এগুলোর মধ্যে প্রায় ২০০ টি ধ্বনি অথবা শব্দের (পরিবর্তনশীলতা সহ) অনুবাদ করা হয়েছিল।

লেখার সরঞ্জাম
যদিও প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ড কোনো দৃষ্টান্ত না দিলেও মায়ার শিল্পে দেখা যায় যে, তারা পশুর চুল বা লোম দ্বারা তৈরি তুলী এবং পাখির পালক দ্বারা তৈরি কলম দিয়ে লেখাতো। লেখতে তারা সাধারণত কালো কালিতে কোডেক্স-স্টাইলের সঙ্গে লাল কালিতে গাঢ় করা হতো। মায়া অঞ্চলের অ্যাজটেক স্থানকে নাম দেওয়া হয়েছে “লাল এবং কালোর জমি” হিসেবে।

সাক্ষরতা
মায়ার আদালতগুলোতে লেখকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখে ছিল। মায়া শিল্পে প্রায়ই ছবির অঙ্কন গুলোতে নিদের্শনা করতো তারা লেখক অথবা অন্তত লিখতে সক্ষম। তা ছাড়া, অনেক শাসকদেরকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে যারা লিখার সরঞ্জামের সঙ্গে যুক্তা করেছে খোসা অথবা কাদা কালি। যদিও লোগোগ্রামসের সংখ্যা এবং সঙ্কেতের চিহ্নগুলো সম্পূর্ণভাবে শতকের ভাষা লেখতে প্রয়োজন বোধ হতো, সাক্ষরতা অভিজাত শ্রেণীর প্রয়োজনীয় ভাবে বহুবিস্তৃত ছিল না। গ্রাফফিট বিভিন্ন প্রসঙ্গগুলোতে উম্মুক্ত ছিল, রান্নার কাজসহ, লিখন পদ্ধতি আনুকরণেতে অর্থহীন প্রচেষ্টায় দেখায়।

মায়াদের দেবতা ও পুরাণ
মায়াদের জীবনযাত্রায় এমন কোনও দিক ছিল না যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রয়োগ ছিল না। তারা এতটাই ধর্মবিশ্বাসী ছিল মতান্তরে ধর্মান্ধও বলা যেতে পারে। তারা ঈশ্বরের ভয়ে সর্বদাই ভীত ছিল। অধিকাংশ পুরাতাত্ত্বিক মায়া ধর্ম সম্বন্ধে জেনেছেন তাদের দ্বারা লিখিত পুরাণ আর শিলালিপি হতে। বিশেষতঃ পালেংখুয়েতে অবস্থিত শিলালিপির মন্দির থেকে। সেখানে বেশ কিছু পাথুরে এবং পোড়ামাটির পুঁথি হতে তাদের ধর্মবিশ্বাস সম্বন্ধে প্রচুর তথ্য পাওয়া গিয়েছে। এইসব মায়ান পুঁথিকে বলা হয় কোডেক্স। এর মধ্যে বিখ্যাততম জীবিত মায়া কোডেক্স হল প্যারিস কোডেক্স, মাড্রিড কোডেক্স এবং ড্রেসডেন কোডেক্স। ড্রেসডেন কোডেক্স সাধারণভাবে পোপোল ভুহ নামে পরিচিত। এই কোডেক্স মায়ান ভাষা খুইচ্যে এবং স্প্যানিশ লিপিতে লেখা হয়েছিল। সম্ভবতঃ ১৫৫৪ থেকে ১৫৫৮ খৃষ্টাব্দে এই মহামূল্যবান কোডেক্স তৈরি করা হয়েছিল জাগুয়ারের চামড়ার ওপরে। এতে সব মায়া সম্রাটের বংশলতিকার তালিকাও ছিল। জনৈক গুয়াটেমালান স্প্যানিশজাত ক্যাথলিক পুরোহিত ফ্রান্সিস্কো জিমেয়নেজ আবিষ্কার করেন ১৭৮৭ খৃষ্টাব্দে।

মায়া দেবতা
মায়ারা হিন্দুদের মতই বহু দেবতায় বিশ্বাস রাখত। তবে তার মধ্যে সামান্য কিছু দেবতা অন্যান্য দেবতার চেয়ে বেশী গুরুত্ব, সম্মান ও মর্যাদা পেতেন মায়া জনসাধারণের কাছে। এরা যেমন শক্তিশালী ছিলেন তেমনই ছিলেন রাগী।
ইটজাম্না : মায়াদের কাছে সম্ভবতঃ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেবতা ছিলেন এই ইটজাম্না। মায়াদের কাছে ইনিই ছিলেন সৃষ্টির দেবতা। অনেকটা ইনকাদের ভিরাকোচার মতই। মায়া পুরাণ অনুসারে তিনিই এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা। তিনিই নাকি দিন এবং রাত্রির সৃষ্টি করেছেন। মায়ারা বিশ্বাস করত যে তিনি স্বর্গের দেবতা। তারা এটাও বিশ্বাস কোর্ট যে, এই ইটজাম্নাই তাদে লিখতে ও দিনপঞ্জী তৈরি করতে শিখিয়েছেন। মায়ান ভাষায় ইটজাম্না শব্দের অর্থ টিকটিকির বাড়ি। চিচেন ইটজার পিরামিড এই দেবতার সম্মানে গঠিত হয়েছিল।
কুকুল্কান : হিন্দুধর্মে যেমন মা মনসা সর্পদেবী; সেরূপই মায়াদের কাছে সর্পদেবতা হলেন কুকুল্কান। মায়া ভাষায় এর অর্থ পালক দ্বারা আবৃত সাপ। তবে প্রাক ধ্রুপদী যুগে এই দেবতার মর্যাদা তুলনায় কম ছিল। তিনি শক্তিশালী হয়ে ওঠেন কেবল যখন মায়ারা ধ্রুপদী যুগে মেক্সিকো শাসন করতে থাকে। বিভিন্ন মায়া দেওয়ালচিত্রে, এবং ভাস্কর্যে কুকুল্কানের চেহারা অবিকল চৈনিক ড্রাগনের মতন। প্রায় সব মায়া মন্দিরেই এর নামে পিরামিড গড়া হয়েছে।
বোলোন টজাখাব : মায়াদের কাছে এই দেবতা অনেক ক্ষেত্রেই হুরাখান নামে পরিচিত। অনেকেই মনে করেন এর নাম থেকেই স্প্যানিশ বিকৃত উচ্চারণে তা হ্যারিকেনে পরিণত হয়েছে। কেননা ইনি ছিলেন একত্রে ঝড়ের, বজ্রপাতের এবং আগুনের দেবতা। তবে ইউকাটায়েন উপকূলে হ্যারিকেনের উৎপাত সবচেয়ে বেশী এবং এই দেবতার পুজাও তাই ঐ অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশী করা হত। মায়া ভাষায় হুরাকান বা বোলোন ট জাখাব শব্দের অর্থ একপদবিশিষ্ট দেবতা। মায়া পুরাণ অনুসারে যখন এই দেবতা ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন তখনই নাকি তিনি বন্যা পাঠিয়ে মানুষকে উচিত শিক্ষা দেন।
চায়াখ : হুরাখানের মতই তিনিও বজ্রপাতের দেবতা। সাথে তিনি বৃষ্টির দেবতা এমন ধারণা ছিল মায়া কৃষকদের মধ্যে। তাই কৃষকরা ভাল বৃষ্টির জন্য তার কাছেই প্রার্থনা করতেন। তিনি নাকি প্রথমে মেঘ তৈরি করেন, তারপর বজ্রপাত উৎপন্ন করেন; শেষে বৃষ্টি নামান। এই রকমই ছিল প্রচলিত মায়া বিশ্বাস ।

ঐশ্বরিক সম্রাট
মায়া বিশ্বাস অনুসারে সম্রাট ছিলেন ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী। তিনি নাকি মানুষ ও দেবতার মধ্যে মধ্যস্থতা করেন, এরকমই মায়ারা ভাবত। এই কারণেই রাজার যে কোনও আদেশকেই তারা ঈশ্বরের আদেশ হিসাবে মান্য করত। এমনকি তারা এটাও ভাবত যে, রাজা হলেন ইটজাম্নার পুত্র। অর্থাৎ দেব পুত্র।

পুরোহিত
ধর্মের দিক দিয়ে দেখলে মায়া সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ হলেন এই পুরোহিত । এরা এমনকি মায়া আহাওয়ের চেয়ে বেশী শক্তিশালী ছিল। তারা চাইলে রাজাদেশ নাও মানতে পারত; কিন্তু তাদের আদেশ মানতে বাধ্য থাকত। এতটাই শক্তিশালী ছিল এই পুরোহিতকূল। তারা বিভিন্ন রকমের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করত যাতে দেবতারা মানুষের ওপরে ক্রুদ্ধ না হন। বিখ্যাত স্প্যানিশ বই দ্য বুক অফ জাগুয়ার প্রিস্ট থেকে জানা যায় যে, তাদের ওপরে কতরকমের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। নীচে সেইসব দায়িত্ব পালনের তালিকা দেওয়া হল ।
১] ঈশ্বরকে তুষ্ট রাখা।
২] যথার্থ ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা।
৩] অলৌকিক বা ব্যাখ্যাতীত কার্যকলাপের অনুষ্ঠান করা।
৪] সূর্যগ্রহণের এবং চন্দ্রগ্রহণের তালিকা প্রস্তুত করা
৫] ভূমিকমপ, খরা, দুর্ভিক্ষ, প্লেগ এইসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় আটকানো।
৬] যাতে সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত হয় সে জন্য চায়াখ দেবতাকে তুষ্ট করা।
পুরোহিতকূল যদি কোনও কারণে এর কোনও একটা কাজ ঠিকমতন করতে না পারতেন; তবে চাকরিটা খোয়াতে হত।

মৃত্যু পরবর্তী জীবন
মিশরীয় বা অ্যাজটেক, ইনকাদের মতই মায়ারাও তীব্রভাবে মৃত্যু পরবর্তী জীবন আছে বলে বিশ্বাস করত। তারা ভাবত যেহেতু বেশীর মানুষ পাপী তাই তাদের নরকে যেতে হয় যেখানে দুষ্ট দেবতা তাদের গিলে খেয়ে ফেলার জন্য তৈরি থাকেন। তাদের বিশ্বাস অনুসারে কেবলমাত্র যে মহিলা শিশুর জন্ম দেওয়ার পরেই মারা গিয়েছেন এবং যাকে নরবলি দেওয়া হয়েছে তারাই কেবল স্বর্গে যেতে পারবেন।

পিরামিড
সব পিরামিডই ছিল দেবতার প্রতি উৎসর্গিত। অধিকাংশ পিরামিড ছিল হয় কুকুল্কান নয় ইটজাম্নার প্রতি সমর্পিত। এইসব পিরামিডে সিঁড়ি বেয়ে কেবল উঠত পুরোহিতকূল। তারা বছরে কেবল পাঁচদিন বাদে বাকি সব দিনেই পিরামিডের চুড়ায় উঠত। সেখানে তারা নরবলি এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করত। সাধারণ মানুষের সাথে এমনকি রাজারও সেখানে যাওয়া বারণ ছিল। কেবল যেসব দিন শুভ ছিল সেসব দিনে রাজা এবং অভিজাতরা পিরামিডে উঠতেন। সাধারণ মানুষের জন্য বছরে মাত্র একদিনই পিরামিডে ওঠার সৌভাগ্য হত। সেটা হল রাজার জন্মদিন উপলক্ষে !

মায়া ধর্ম ও পুরাণ সমপর্কে তথ্য
*****************************
১] মায়ারা বিশ্বাস করত যে আধুনিক সাল অনুযায়ী ৩১১৪ খৃষ্টপূর্বাব্দে তাদের উৎপত্তি হয়েছে। তাদের দিনপঞ্জীতে এটা একটা বিচিত্র পন্থায় চিহ্নিত করা হয়েছে।
২] খুইচ্যে ভাষাগোষ্ঠীর ইন্ডিয়ানরা, যারা গুয়াটেমালার সব চেয়ে বড় জাতি তারা আদতে মায়াদের উত্তরপুরুষ। এদের তরফ থেকে বেশ কিছু দিক থেকে আজও মায়া ধর্ম পালন করা হয় ও দেবতার পূজা করা হয়।
৩] এক মায়া অনুসারে ভুট্টা নাকি ভগবানের সৃষ্টি নয়, মানুষই নাকি ভুট্টার জন্ম দিয়েছে।
৪] মায়া পুরাণ অনুসারে দুই মায়া দেবতা নরকের দেবতার সাথে যুদ্ধ করে পরাজিত করে তাদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে মানুষকে স্বর্গে নিয়ে যায়। এই যমজ দেবতার নাম যথাক্রমে হুনাহপু এবং এক্সবালাংখুয়ে।

যমজ দেবতা হুনাহপু এবং এক্সবালেংখুয়ের কাহিনী
****************************************
এই যমজ দেবতার কাহিনী মায়া পুরাণের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় বলে মনে করা হয়। এই কাহিনী যে কটা অদ্যাবধি জীবিত মায়া পুরাণ টিকে আছে তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত। এই কাহিনী বিখ্যাত পোপোল ভুহ গ্রন্থে লিখিত হয়েছে খুইচ্যে ভাষায়; স্প্যানিশ লিপিতে। এখানে গল্পের সংক্ষিপ্তসার দেওয়া হল।
বাবা ও কাকা
***********
এই যমজ দেবতার কাহিনী শুরু হয়েছে যমজ বাচ্চা ছেলের কাহিনী দিয়ে। তাদের নাম ছিল এক হুনাহপু এবং সাত হুনাহপু দিয়ে। এই হুনাহপুদ্বয় বিখ্যাত মায়া বল গেম [ভলিবলের মতন খেলা] খেলতে ভাল বাসত। তারা খুব প্রতিভাবান ছিল, সবসময়েই এই খেলায় তারাই জিতত। জিতলে কী হয়, তারা খেলবার সময়ে বড্ড জোরে জোরে চিৎকার করত। তাদের ক্রমাগত চিৎকার শুনে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল তথাকথিত মায়া নরক দেবতা এক্সিবালবার। তিনি এইরকম চীৎকারে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে নরকের দুটি দূত পাঠিয়ে যমজ দেবতাকে সমন দিলেন। এই এক্সিবালবা অত্যন্ত বদরাগী এবং নিষ্ঠুর চরিত্রের দেবতা ছিলেন। মায়ারা সচরাচর এর নাম মুখে আনতে চাইত না। কেননা মায়াদের বিশ্বাস ছিল কেউ যদি ভুল করেও এর নাম মুখে আনে তবে তার আয়ু দ্রুতই ফুরিয়ে যাবে।
সে যাই হোক, যমজ দেবতা তো সমন পেয়ে দ্রুত নরকে এসে হাজির হল। তখন নরক দেবতা তাদের বেশ কয়েকটা কঠিন পরীক্ষার সামনে ফেললেন। প্রথমে তাদের বলা হল যে তারা যেন যেভাবেই হোক কাঁটার সেতু পেরোয়। এই সেতুর তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল রক্তের নদী। তারা সেই পরীক্ষায় সফল হয়ে নরকের দেবতার কাছে পৌঁছালেন। সেখানে নরক দেবতা একটা কাঠের ছড়ি কাঁধে ঠেকিয়ে অভিবাদন করলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন যে দেবতাদ্বয় কি তাদের চিনতে পারেন। দেবতাদ্বয় তাকে চিনতেন না। ফলে এই পরীক্ষায় তারা অসফল হলেন। তখন এক্সিবালবা তাদের শয়তানি করে একটা নিরীহ কাঠের বেঞ্চিতে বসতে বললেন। দুই ভাই তার চক্রান্ত ধরতে না পেরে সরল বিশ্বাসে সেই বেঞ্চিতে বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা বিস্ময়ের সাথে দেখলেন সে বেঞ্চিতে আগুন ধরে গেল। তারা আগুনে বেঞ্চি থেকে বেরুতে না পেরে পুড়ে মারা গেলেন।
হুনাহপু ও এক্সবালাংখুয়ে জন্মালেন
*****************************
এক হুনাহপু এবং সাত হুনাহপু তো মারা গেলেন। তারপর কি হল? পুরাণ অনুসারে এক হুনাহপুর একটি সন্তান জীবিত ছিল। তিনি ছিলেন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মায়া দেবী। যথাসময়ে তার দুটি সন্তানের জন্ম হল। এই যমজ সন্তানের নাম হল এক্সবালাংখুয়ে ও হুনাহপু। তারা তার বাবা ও কাকার মতই ভাল বল খেলোয়াড় ছিলেন। কিন্তু তাদের তুলনায় বেশী বুদ্ধিমান ও শক্তিমান ছিলেন। তারাও বাবা-কাকার মতই খেলবার সময়ে প্রচন্ড জোরে জোরে চিৎকার করতেন। তাদের একটানা জোরে জোরে চিৎকার শুনে অত্যন্ত বিরক্ত হলেন নরকদেব এক্সিবালবা। আগের বারের মতই এবারেও তিনি দুটি দূত পাঠালেন সমন পাঠিয়ে যে, তারা যেন এক্সিবালবার সাথে দেখা করে। এবং সেখানে এসে খেলে এক্সিবালবাকে হারিয়ে দেয়।

যমজ দেবতার নরকে অভিযান
*****************************
অতঃপর দুই ভাই নরকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। তারা মার কাছ থেকে আগেই জেনে মিয়েছিল যে, তারা বাবা ও কাকা কি কি ভূল করেছিল। সেই মতন জেনে তারা নরকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল তারা নরকের দেবতার পাতা ফাঁদে পা দিল না। এক্সিবালবা যতগুলি পরীক্ষায় বসতে দিল ততগুলিই পরীক্ষায় তারা সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হল।
তখন ক্ষিপ্ত এক্সিবালবা প্রতারণার আশ্রয় নিল। তিনি একজন মশার রূপ নিয়ে কামড়ালেন দুই ভাইকে। কিন্তু কিছুই হল না। তারা মশা মারার জন্য খন্তির মতন একরকম কাঠের টুকরো নিয়ে সে মশাকে তাড়া করতেই মশা জীবন বাঁচাবার জন্য পালাতে বাধ্য হল। তারপর এক্সিবালবা তাদের কাঠের বেঞ্চিতে বসতে আদেশ দিলে তারা সুকৌশলে সে আদেশ অমান্য করল। হুনাহপু এবং এক্সিবালেংখুয়ে নরকদেবকে বলল তারা খেলতে এসছে, বসতে আসে নি। নরক দেবতা কি ওদের সাথে হেরে যাবার ভয়েই খেলতে চাইছেন না? তাই কি এমন করে সময় নষ্ট করছেন?
এক্সিবালবা বনাম এক্সিবালেংখুয়ে আর হুনাহপু তথ্য
***********************************************
এক্সিবালবা বলাই বাহুল্য দুই ভাইয়ের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। তার ধারণা হল যে, নরকে অবস্থিত সব নরকের দূতদের সামনে এমন কথা বলে দুই ভাই তাকে অপমান করছে। সে রেগে গিয়ে দুই ভাইকে বলল না, তিনি ভয় পান নি। এবার খেলতে বসা যাক। এক্সিবালেংখুয়ে আর হুনাহপু এমন কথা শুনে হাসল। এটাই তো তারা চেয়েছিল।
এক্সিবালবা জানত সঠিক ভাবে খেললে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে তিনি জিততে পারবেন না। কারণ তার বয়স হয়েছে; ওদিকে দুই ভাইয়ের বয়স কম, ক্ষিপ্রতা বেশী তাই ওদের জেতার সম্ভাবনা বেশী। তাই তিনি কাঁটাওয়ালা বলের সাহায্যে খেলা শুরু করলেন। তার দুই হাত ছিল মোটা কাপড়ে মোড়া। ফলে তার হাত কাটবার ভয় ছিল না। কিন্তু দুই ভাইয়ের তো তা ছিল না। তারা রেগে গেল এক্সিবালবার ওপরে এমন অন্যায় খেলার অপচেষ্টার কারণে। তারা পরিষ্কার বলল তারা এক্সিবালবা ন্যায্যভাবে না খেললে খেলতেই রাজি নয়। তখন বাধ্য হয়ে ভাল ও কাঁটা মুক্ত বলের সাহায্যে খেলতে শুরু করল।
দুই ভাইয়ের এটা ভালই জানা ছিল যে, তারা জিতলে নরক থেকে জীবন্ত বেঁচে ফিরবে না। তাই চালাকি করে তারা হারবার জন্য খেলতে শুরু করল। তাতে ফল হল। এক্সিবালবা সহজেই জিতলেন। তারপর বরফের খেলা আগুনের ওপরে ঝাঁপ দেবার খেলা শুরু করলেন। প্রতিবারই ইচ্ছা করে হারলেন দুই ভাই।
দুই ভাইয়ের মৃত্যু হল :
*******************
অবশেষে দুই ভাইয়ের সাথে নরকদেবের শেষ খেলায় সত্যকারের খেলা শুরু হল। প্রত্যেকটা ম্যাচে হারতে আর ভাল লাগছিল না দুই ভাইয়ের। আর তাই তারা শেষ ম্যাচে সত্য সত্যই জিতলেন। তাতেই এক্সিবালবা বুঝলেন, দুই ভাই তার সাথে প্রতারণা করেছেন। তারা সব ম্যাচেই যে ইচ্ছাকৃত ভাবে হেরেছেন তাও বুঝতে পারলেন। তাতে ক্রুদ্ধ হয়ে দুই ভাইকে এক বিশাল চুল্লিতে ঝাঁপ দিতে বললেন। দুই ভাই তাতে ঝাঁপ দিতে সম্মত হলেন। তাতে দুই ভাইয়ের মৃত্যু হল। তারপর নরকদেব তাদের ছাইকে রক্তের নদীতে ফেলে দিলেন। তিনি জানতেন না যে, এটাই ছিল দুই ভাইয়ের গোপন খেলা। দুই ভাইয়ের জানা ছিল যে, ঐ নদীতে তাদের ছাই ফেললেই তারা আবার বেঁচে উঠবেন। তবে মনুষ্যরূপে নয়, কাটলফিশ মাছের রূপে। সেই জন্যই তারা ঝাঁপ দিতে রাজি হয়েছিলেন। এর জন্য একটা গোপন মন্ত্র বলতে হত। ঝাঁপ দেবার পূর্বে দুই ভাই মনে মনে এই মন্ত্র বলে নিয়েছিলেন। ফলে কাটলফিশের রূপে জীবন নিয়ে ফিরতে অসুবিধা হল না।

তাদের এমন চমকপ্রদ যাদু দেখে এক্সিবালবা চমকে গেলেন। তিনি দুই ভাইকে কাটলফিশের রুপ থেকে মনুষ্য রূপে ফিরিয়ে আনলেন। তারপর জীবিত অবস্থায় ফিরে আসবার গোপন রহস্য কি তা জানতে চাইলেন। দুই ভাই তাকে জানাল কীভাবে তারা এই ব্যাপারটা সম্ভব করেছে। শুধু জানাল না যা, তা হল আসল মন্ত্রের পংক্তিটা। তারা একটা মন্ত্র মিথ্যা মিথ্যা বানিয়ে বলল যে এই মন্ত্র বলে ঝাঁপ দিলেই হবে। তারা যেভাবে বেঁচে ফিরেছে, নরকের রাজাও সেভাবেই ফিরে আসবেন। নির্বোধ এক্সিবালবা সে কথা বিশ্বাস করে ঐ বিশাল চুল্লিতে ঝাঁপ দিলেন। এর ফলে তিনি মারা গেলেন। তার ছাইকে মাটিতে পুঁতে দিলেন। এর ফলে এক্সিবালবার ফিরে আসবার কোনও সম্ভাবনা রইল না। এই ভাবে এক্সিবালেংখুয়ে আর হুনাহপু জিতে গেলেন !

এক্সিবালেংখুয়ে আর হুনাহপু :
**************************
১] অন্যান্য মেসো আমেরিকান সভ্যতাতেও অনেকটা এই যমজ নায়কের সমতুল্য কাহিনী পাওয়া যায়।
২] মায়ারা বিশ্বাস করত যে, এক্সিবালেংখুয়ে এবং হুনাহপু ছিলেন যথাক্রমে পৃথিবীর শাসক এবং আকাশের দেবতা। পরে দুজন যথাক্রমে চন্দ্রদেব এবং সূর্যদেবে রূপান্তরিত হন।
৩] পুরাণ অনুযায়ী দুই ভাই পরে তার বাবা ও কাকাকে নরক থেকে জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।
৪] মায়ারা বিশ্বাস করত যে, মায়া সম্রাট আসলে হয় এক্সিবালেংখুয়ে নয় হুনাহপু দেবের পুত্র। এই কারণেই মায়ারা আহাওকে এত মান্য করত।
৫] মায়াদের বহু সাহিত্যে এই দুই ভাইয়ের সমপর্কে অনেক ছড়া আছে।

ভবিষ্যৎবাণী [ ২০১২ রহস্য ] ***************************
মায়া ধর্মের অন্যতম অঙ্গ ছিল এই দিনপঞ্জী তৈরি করা এবং যত্ন করে রাখা। তাদের দিনপঞ্জী ছিল অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁত। তারা এমন কিছু দিনপঞ্জী তৈরি করেছিল যা ৫৪ কোটি বছরের অসাধারণ ত্রুটিহীন হিসাব রাখতে সক্ষম হয়েছে। তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত ভবিষ্যৎবাণীর কথা তোমরা নিশ্চয়ই জান। হ্যাঁ ২০১২ এর ২১শে ডিসেম্বরে পৃথিবী ধ্বংস হবার কথা বলা হচ্ছে। বাস্তবে এটা মায়া ভাষা পড়তে না পারার মাসুল। তারা আদপেই পৃথিবী ধ্বংসের কথা বলে নি। তারা বলেছিল যে, এর পর পৃথিবীতে নতুন যুগ শুরু হবে। সেটাকেই ধরে নেওয়া হয়েছিল দুনিয়া ধ্বংসের ভবিষ্যৎবাণী! তারা প্রত্যেক পৃথিবী হতে দ্রষ্টব্য তারার আবর্তন, আগত দিনক্ষণ এর হিসাব অতি নিখুঁত ভাবেই করেছিল। তারা মনে করত যে, বছরের বেশ কিছু দিন তাদের কাছে পয়া এবং বছরের পাঁচ দিন অপয়া (এই পাঁচদিন + বাকি ৩৬০ দিন = ৩৬৫ দিন)। যে পাঁচদিন অপয়া ছিল সেদিন কোনও শুভকাজ তারা করত না, উপবাসে থাকত, কাজে বেরত না। কেবল বিছানায় শুয়ে দিনটা পার করে দেওয়ার চেষ্টা করত। আর যেসব দিন অত্যন্ত শুভ ছিল, সেসব দিনেই তারা ধর্মীয় উৎসব পালন করত ।

কৃষি
প্রাচীন মায়ার বিবিধ এবং খাবার উৎপাদনের সফিস্টিকেট পদ্ধতি ছিল। এইটি ইতিপূর্বে বিশ্বাস করা হয়েছিল যে চাষ পরিবর্তন করে (সুইডেনরা) কৃষক তাদের খাবারের সর্বাপেক্ষা জোগান দিয়েছিল কিন্তু এইটি এখন চিন্তা করা হয় যে স্থায়ী জমি উত্তোলন করা হয়েছিল, গৃহের ছাদ, বন বাগান, অনাবাদী (জমি) পরিচালনা করার জন্য এবং কিছু এলাকাতে বন্য শস্য কাটাতে প্রাচীন কালে অনেক জনসংখ্যা সমর্থন করছে তাদের খাদ্যের চাহিদা পূর্ণের জন্য। বাস্তবিকপক্ষে, এই আলাদা কৃষিবিষয়ক পদ্ধতির প্রমাণ আজও টিকে আছেঃ জমি উত্তোলন সংযোগ ছিল খালগুলো দ্বারা যা আকশীক ছবিতে মধ্যে দেখা গিয়েছিল, সমকালীন মৌসমীয় অঞ্চল প্রজাতির গ্রন্থে প্রাচীন মায়ার উচ্চতর যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মূল্যয়ন রয়েছে, এবং হ্রদের পলিগুলোতে পরাগ রেকর্ড ইঙ্গিত করে যে মেসোআমেরিকাতে বন ধ্বংস করে ভুট্টা, সূর্যমুখী বীজ, তুলা এবং অন্যান্য ফসল চাষ করা হয়েছে, অন্তত ২৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে।

প্রাচীন গ্রিস
**********
প্রাচীন গ্রিস হল গ্রিস ইতিহাসের অন্তর্গত প্রাচীন সভ্যতা যা প্রাচীন যুগ খ্রিষ্টপূর্ব ৮ম – ৬ষ্ট শতাব্দীতে শুরু হয় এবং ধ্রুপদি সভ্যতা [আনুমানিক ৬০০ খ্রিষ্টাব্দ ] পযর্ন্ত বিরাজ করেছিল । এরপর পরই কালটি হচ্ছে গ্রারম্ভিক মধ্যযুগ এবং বাইজেন্টাইন যুগ । প্রাচীন গ্রিসের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হল ধ্রুপদি গ্রিস যুগ ,যা খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ থেকে ৫ম শতাব্দীতে সমৃদ্ধি লাভ করে । ধ্রুপদি গ্রিস সংস্কৃতি ,বিশেষ করে দর্শন ,রোমান সাম্রাজ্য উপর একটি শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেছিল ,যা ভূমধ্যসাগরীর এলাকা এবং ইউরোপে বিভিন্ন অংশে এর একটি সংস্করণের প্রভাব দেখা যায় । যার কারনে ধ্রুপদি গ্রিসকে সাধারনত আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ভিত্তি প্রদান যা দিগন্তকারী সংস্কৃতি বলে মনে করা হয় ।

রোমান গ্রিস
************
গ্রিক উপদ্বীপ খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৬-তে করিন্থের যুদ্ধে গ্রিস বিজয়ের পর রোমান শাসনের অধীনে আসে । মেসিডোনিয়া রোমান প্রদেশ হয় যখন দক্ষিন গ্রিস মেসিডোনিয়ার কর্তার নজরদারিতে পড়ে । যাই হোক ,কিছু গ্রিক পোলাইস একটি আংশিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে এবং কর বাতিল করতে পরিচালনা করে । এজিয়ান দ্বীপপুজ্ঞ খ্রিষ্টপর্ব ১৩৩-তে এই এলাকার সাথে যুক্ত করা হয় । অ্যাথেন্স এবং অন্যান্য গ্রিক শহরসমূহ খ্রিষ্টপূর্ব ৮৮ -তে বিদ্রোহ শুরু করে এবং রোমান জেনারেল সুল্লা উপদ্বীপের বিদ্রোহ দমন করেছিল । খ্রিষ্টপূর্ব ২৭-তে আউগুস্ত্ত আকিয়ার প্রদেশ হিসেবে উপদ্বীপ সংগঠিত হওয়ার পূর্ব পযর্ন্ত রোমানদের গৃহযুদ্ধ করে । গ্রিস রোমান সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ন পূর্ব প্রদেশ ছিল ,সেখানে রোমান সংস্কৃতি বস্ত্তত গ্রিকও-রোমান বহুদিন ধরে ছিল ।

প্রাচীন রোম
***********
প্রাচীন রোম পৃথিবীর সমৃদ্ধতম সভ্যতারগুলোর মধ্যে অন্যতম যা খ্রিষ্টপূর্ব ৮ম শতাব্দীর প্রথমভাগে ইতালীর উপদ্বীপে সূচীত হয় । রোম শহরকে কেন্দ্র করে ভূমধ্যসাগরের তীর ধরে এই সভ্যতা বিকাশিত হতে থাকে এবং কালক্রমে একটি প্রাচীন যুগের বৃহত্তম সাম্রাজ্যে পরিনত হয় । এই সভ্যতার স্থায়ীত্বকাল ছিল প্রায় বারো শতক এবং এ দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় রোমান সভ্যতা একটি রাজতন্ত্র থেকে একটি সম্ত্রান্ত প্রজাতন্ত্র এবং পযার্য়ক্রমে একটি একনায়কতন্তী সাম্রাজ্যে পরিবর্তিত হয় । যুদ্ধ বিজয় এবং আত্তীকরনের মাধ্যমে এটি দক্ষিণ ইউরোপ ,এশিয়া মাইনর ,উত্তর আফ্রিকা ,উত্তর ইউরোপ এবং পূর্ব ইউরোপের একাংশকে এর শাসনাধীনে নিয়ে এসেছিল । প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সাম্রাজ্যগুলোর একটি ছিল । এটিকে প্রায়ই প্রাচীন গ্রিস’র সাথে একত্রে “ উচ্চমানের পুরাতাত্বিক নিদর্শনের ” মধ্যে দলবদ্ধ করা হয় এবং এ দুটি সভ্যতার সাথে অনুরুপ সংস্কৃতি ও সমাজ মিলে একত্রে গ্রেকো-রোমান বিশ্ব হিসাবে পরিচিত । নর্ডিক জাতি কর্তৃক রোমান সভ্যতা ধ্বংস করা হয় ।

ধ্রুপদি সভ্যতা –
**************
ধ্রুপদি সভ্যতা হচ্ছে ভূমধ্যসাগর কেন্দ্রিক একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক যুগ ,যা অনেকটা প্রাচীন গ্রিস ও রোমের সাথে তুলনীয় । এজন্য এটি গ্রিসো-রোমান বিশ্ব নামেও পরিচিত । এই সময়টিতেই গ্রিক ভাষা এবং রোমান সাহিত্য [ যেমন:ইস্কিলুস ,ওভিড ,হোমার ও অন্যান্য ] পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয় ।।
এটির শুরু হিসেবে বিবেচনা করা হয় খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম-অষ্টম শতকে গ্রিক কবি হোমার’র মহাকাব্যিক সাহিত্যের সূচনা এবং এটি চলতে থাকে খ্রিষ্ট ধর্মের বিকাশ ও রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে [ খ্রিষ্টের জম্মের ৫ম শতক পযন্ত ] এবং এটি শেষ হয় ৩০০ – ৬০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এবং এর পর পরই শুরু হয় প্রাক-মধ্যযুগীয় পর্ব [ ৬০০ – ১০০০ খ্রিষ্টাব্দ ] । বর্তমান আধুনিক সভ্যতার ভাষা ,রাজনীতি ,শিক্ষাব্যবস্থা ,দর্শন ,বিজ্ঞান ,শিল্পকলা এবং স্থাপত্যশৈলীতে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে । তৎকালীন রেনেসাঁসের গুরুত্বপূর্ন প্রভাব দেখা যায় আঠোরো ও উনিশ শতকের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ।

ভারতীয় সভ্যাতা
*****************
ধারাবাহিক অস্তিত্বের দিক থেকে ভারতীয় সভ্যতা সবচেয়ে বেশী বয়সী সভ্যতা । ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমে আফগানিস্তান থেকে পূর্বে বঙ্গোপসাগর এবং উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিনে ভারতীয় উপদ্বীপের প্রান্তসীমা পযন্ত বিস্তৃত । বর্তমানে এলাকাটি পাকিস্তান ,ভারত ,নেপাল ,ভূটান ,বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা নামে রাষ্ট্রগুলিতে বিভক্ত । কিন্তু প্রতিটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই আজ্ঞলিক প্রভেদের পরিমান বিপুল । তাই ভারতীয় উপমহাদেশের একটি সাধারন সামগ্রিক ইতিহাস বনর্ণা করা দুরুহ ।
সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা অনেক বিশাল সু-পরিকল্পিত নগরী নির্মান করেছিল এবং এগুলির আংশিক পূনরদ্ধার সম্ভব হয়েছে ,কিন্তু এদের সভ্যতার লিখিত নিদের্শন গুলিতে যেসন – কাদামাটির চাভড় কিংবা সিলমোহর ইত্যাদি যে লেখা আছে ,সেগুলির পাঠোউদ্ধার এখনো সম্ভব হয়নি । সিন্ধু সভ্যতার বাসিন্দাদের ব্যাপারে আজ পযন্ত অসংখ্যা মতামত এসেছে । বর্তমান বিশেজ্ঞদের ধারনা ,এই প্রাচীন সভ্যতাটি আয , দ্রাবিড় [ অস্ট্রালয়েড ] , মঙ্গোল এমনকি সুমেরীয়দেরও মিলিত সৃষ্টি । আবহাওয়া পরিবর্তন ,সরস্বতী নদীর শুকিয়ে যাওয়া ,ভৃমিকল্প প্রভূতি মিশ্র কারনে এ সভ্যতা পরিত্যক্ত হয় ।
যাই হোক এ সভ্যতার ধ্বংস হলেও এর ধারাবাহিকতায় বর্তমান ভারতীয় সভ্যতার ভিত স্হাপিত হয় । গ্রিক মহাবীর আলেকজান্ডার যখন ৩২৬ খ্রিষ্টপৃর্বাব্দে ভারত আক্রমন করেন ,তার আগেই ভারতে বিভিন্ন আজ্ঞলিক রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে । আলেকজান্ডার চলে গেলে মেীয রাজ বংশের অধীনে উত্তর ভারতীয় রাজ্যগুলি একত্রিত হয়ে মেীয রাজবংশ প্রতিষ্টিত করে [ ৩২২-১৮০ খ্রিষ্ট্রপূর্ব ] ।
রাজনৈতিক উথুান – পতনের মাঝেও ভারতীয় সভ্যতার মূল উপাদানগুলি খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় সহস্রাব্দ থেকে বর্তমান যুগ পযন্ত সজ্ঞায়িত হয়ে এসেছে ।
ভারতীয় আদি মধ্যযুগীয় রাজ্যসমূহ :
[ক] প্রস্তর যুগ : ৭০,০০০ – ৩৩০০ খ্রিষ্টপূর্ব ।
[খ] মেহের গড় : ৭০০০ – ৩৩০০ খ্রিষ্টপৃর্ব ।
[গ] হরপ্পা ও মহেজ্ঞোদাড়ে : ৩৩০০ – ১৭০০ খ্রিষ্টপৃর্ব ।
[ঘ] হরপ্পা : ১৭০০ – ১৩০০ খ্রিষ্টপৃর্ব ।
[ঙ] বৈদিক যুগ : ১৫০০ – ৫০০ খ্রিষ্টপূর্ব ।
[চ] লেীহ যুগ : ১২০০ – ৩০০ খ্রিষ্টপৃর্ব ।
[ছ] মহাজনপদ (ষোড়শ) : ৭০০ – ৩০০ খ্রিষ্টপৃর্ব ।
[জ] মগদ জনপদ : ৫৪৫ খ্রিষ্টপৃর্ব ।
গ্রেট আলেকজান্ডার আক্রমন -৩২৬ খ্রিষ্টপৃবাব্দ ।

মেহেরগড় সভ্যতা –
*****************
বেলুচিস্হান বা বোলান গিরিপথের কাছে অবস্হিত । পশ্চিমে সাহারা মরুভূমি ও ভূ-মধ্যসাগর ,পূর্বে হিমালয় ও খর মরুভূমি ,উত্তরে বলকান ,ককেশাস হিন্দুকুশ প্রভূতি পর্বতমালা এবং দক্ষিনে কর্কটরেখা । অনুমান করা হয় ,এই সভ্যতা সিরিয়া উপকূল থেকে ইরান পযন্ত বিস্তূতি লাভ করে ।
মেহেরগড় সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল কয়েকটি পযায়ে :-
প্রথম পযার্য় : ৭০০০ – ৫০০০ খ্রিষ্টপূর্ব ।
দ্বিতীয় পযার্য় : ৫০০০ – ৪০০০ খ্রিষ্টপূর্ব ।
তৃতীয় পযার্য় : ৪০০০ – ৩৩০০ খ্রিষ্টপূর্ব ।
পরবতী পযার্য়গুলি : ৩৩০০ – ২৬০০ খ্রিষ্টপূর্ব ।
মেহেরগড় সভ্যতার পতন ঘটে ২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বে । প্রকৃতপক্ষে মেহেরগড় সভ্যতা মহেজ্ঞ্জোদাডো ও লোথাল সভ্যতার সাথে মিশে যায় ।
মেহেরগড় প্রত্মক্ষেত্র থেকে কুমোরের বা কুমারের চাকা আবিস্কৃত হয়েছে । নারীমূতি ও সীলমোহর তৈরি করা হত পোড়ামাটি দিয়ে । বিভিন্ন ধরনের অলংকার ব্যবহার করা হত । তার মধ্যে পাথর ও ধাতুর তৈরি হার ও কানপাশা উল্লেখযোগ্য । এছাড়া সামুদ্রিক ঝিনুকও অলংকার হিসেবে ব্যবহারের চল ছিল । মেহেরগড় সভ্যতা ছিল একটি গ্রাম ভিত্তিক সভ্যতা ।

সিন্ধু সভ্যতা :-
*****************
সিন্ধু সভ্যতা একটি ব্রোজ্ঞ যুগীয় সভ্যতা [ ৩৩০০ – ১৩০০ খ্রিষ্টপূবাব্দ ; পূর্নবধির্ত কাল ২৬০০ – ১৯০০ খ্রিষ্টপূবার্ব্দ ] । এই সভ্যতার কেন্দ্র ছিল মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিম এলাকায় অবস্হিত সিন্ধু নদ অববাহিকা । প্রথম দিকে এই সভ্যতা পাজ্ঞাব এলাকার সিন্ধু অববাহিকায় বিকাশ লাভ করে । পরে তা প্রসারিত হয় ,ঘগ্গর-ডাকরা নদী উপত্যকা ও গঙ্গা-যুমনা দোয়াব এলাকা পযর্ন্ত ।
বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রায় সর্ম্পন অংশ , ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পশ্চিমদিকের রাজ্যগুলি ,দক্ষিন-পূর্ব আফগানিস্তান এবং ইরানের বালোচিস্তান প্রদেশের পূর্ব অংশ এই সভ্যতার অন্তগর্ত ছিল ।
পূর্নবধির্ত সময়কালে এই সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা নামে পরিচিত । হরপ্পা সভ্যতার ভাষা অজ্ঞাত । অনেক বিশেষজ্ঞের বলেন যে ,এই ভাষার সঙ্গে প্লোটো – দ্রাবিড়ীয় , এলামো – দ্রাবিড়ীয় বা প্যারা – মুন্ডা সর্ম্পকের কথা উল্লেখ্য করেছেন ।

সিন্ধু সভ্যতার পর্ববিভাজন :
হরপ্পা সভ্যতার পূর্নবধির্ত সময়কাল ২৬০০ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পযর্ন্ত স্হায়ী হয়েছিল । সিন্ধু সভ্যতার পূর্বসূরি আদি হরপ্পা সভ্যতা ও উত্তরসূরি পরবর্তী হরপ্পা সভ্যতার সময়কাল মিলিয়ে এই সভ্যতার পূর্ন বিস্তারকাল খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০০ থেকে ১৩০০ খ্রিষ্টপূর্ব শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময় । সিন্ধু সভ্যতার পর্ববিভাজন ক্ষেত্রে যে দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয় সেগুলি হল পর্ব ও যুগ ।

আদি হরপ্পা সভ্যতা :-
*******************
ইরাবতী নদীর নামে নামাক্ষিত আদি হরপ্পা সময়কাল ৩৩০০ খ্রিষ্টপূবার্ব্দ থেকে ২৮০০ খ্রিষ্টপূবাব্দ । এটি পশ্চিমে হাকরা – ঘগ্গর নদী উপত্যকায় হাকরা পর্বের সঙ্গে সর্ম্পকযুক্ত । ২৬০০ খ্রিষ্টপূবার্ব্দ নাগাদ হরপ্পা বৃহৎ এক নগরকেন্দ্রে পরিনত হয় । এই সময়কাল থেকেই পূর্নবধির্ত হরপ্পা সভ্যতার সূচনা ।
পূর্নবধির্ত হরপ্পা :-
**************
২৬০০ খ্রিষ্টপূবার্ব্দ নাখাদ আদি হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীরা একাধিক বৃহৎ নগর কেন্দ্র গড়ে তুলেছিল । এ ধরনের কয়েকটি উল্লেখ্যযোগ্য নগর হল আধুনিক পাকিস্তানের হরপ্পা ,গনেরিওয়ালা ,মহেজ্ঞোদাডো এবং ভারতের ধোলাবীরা ,কালিবঙ্গাল ,রাথিগড়ি রুপার ,লোথাল ইত্যাদি । সিন্ধু ও তার উপনদীগুলির অববাহিকায় মোট ১০৫২ টি প্রাচীন নগর ও বসতির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে ।

হরপ্পা ও মহেজ্ঞোদাডো :-
************************
হরপ্পা : পাকিস্তানের পাজ্ঞাব প্রদেশের একটি প্রত্মস্হল । এটি সাহিওয়াল থেকে ৩৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্হিত । প্রত্মস্হলটি রাবি নদীর পুরনো খাতের ধারে অবস্থিত একটি স্হানীয় গ্রামের নামাক্ষিত । হরপ্পার বর্তমান গ্রামটি প্রত্মস্হল থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত । আধুনিক হরপ্পা বিৃটিশ আমল থেকেই একটি ট্রেন ষ্টেশন । কিন্তু এটি একটি ছোটো পাকিস্তানি শহরমাত্র । মনে করা হয় ,শহরটিতে ২৩৫০০ মানুষ বসবাস করতেন । সে যুগে বিশ্বের এটি ছিল একটি বৃহৎ শহর । এই শহরের ধ্বংসাবশেষ থেকে ইট এনে তা লাহোর – মূলতান রেলপথ নির্মানের কাজে ব্যবহূত হয় ।
মহেজ্ঞোদাডো : মহেজ্ঞোদাডো ছিল প্রাচীন ভারতের সিন্ধু সভ্যতার বৃহত্তম নগর – বসতিগুলির মধ্যে অন্যতম । এটি অধুনা পাকিস্তান রাষ্ট্রের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় অবস্থিত । ২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ নির্মিত এই শহরটি ছিল বিশ্বের প্রাচীনতম নগরগুলির অন্যতম এবং প্রাচীন মিশর ,মেসোপটেমিয়া ও ক্রিট সভ্যতার সমসাময়িক । ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ এই শহর পরিত্যক্ত হয় ।
মহেজ্ঞোদাডোয় আবিস্কৃত সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ স্থাপনা হল মহাস্নানাগার । এই স্তপটি “মূতের স্তপ ” বা দূর্গ নামেও পরিচিত । সভ্যতার শেষ ভাগের শেষ পর্বে এই স্থানাগারটি অব্যবহারোপযোগী হয়ে পড়েছিল । মহাস্থানাগারের দৈর্ঘ্য ১১.৮৮ মিটার ও প্রস্থ ৭.০১ মিটার । এর সর্বোচ্চ গভিরতা ২.৪৩ মিটার । উত্তরে ও দক্ষিনে দুটি চওড়া সিরির মাধ্যমে স্থানাগারে প্রবেশ করা যেত । মহাস্থানাগার নির্মিত হয়েছিল উন্নতমানের পোড়া ইট দিয়ে । বিটুমেনের সারি থেকে অনুদিত হয় এবং এটি পানি ধরে রাখার জন্য ব্যবহৃত হয় ।
মহেজ্ঞোদাডো ছিলো সিন্ধু সভ্যতার একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র । উন্নতির মধ্যগগনে মহেজ্ঞোদাডো ছিল দক্ষিন এশিয়ার উন্নতম নগরী । এই শহরের নগর পরিকল্পনা ও উন্নত কারিগরি ব্যবস্থা প্রমান করে যে সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের নিকট শহর ছিল অতিগুরুত্বপূর্ন । এই শহরের গনভবনগুলি উচ্চমানের সামাজিক সংগঠনের পরিচায়ক । মহেজ্ঞোদাডোর মহাশস্যাগারটিতে গ্রাম থেকে গরুর গাড়িতে আনীত শস্য জমা রাখা হত ।

সিন্ধু সভ্যতার মূল নিহিত রয়েছে ৬০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মেহেরগড় সভ্যতার মধ্যে । পাজ্ঞাব ও সিন্ধু এলাকার সিন্ধু নদ উপত্যকায় ২৬০০খ্রিষ্টপূবাব্দ নাগাদ । সিন্ধু সভ্যতার শেষ্ট দুটি শহর হরপ্পা ও মহেজ্ঞোদাডো । এই সভ্যতায় লিখন ব্যবস্থা ,নগরকেন্দ্র ,সামাজিক ও অর্থনৈতিক বেচিত্র্যের অস্তিত্ব ছিল । ভারতের পৃর্ব পাজ্ঞাবের হিমালয়ের পাদদেশ থেকে দক্ষিনে গুজরাত পযর্ন্ত এই সভ্যতার একাধিক কেন্দ্র আবিস্কৃত হয়েছে । পশ্চিমে বালুচিস্তানেও এই সভ্যতার নিদের্শন পাওয়া গেছে ।

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস
**********************************
১) প্রস্তর যুগ —– ৭০,০০০-৩৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব ।
** মেহেরগড় — ৭০০০-৩৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব ।
** হরপ্পা ও মহেঞ্জদর সভ্যতা — ৩৩০০-১৭০০ খ্রীষ্টপূর্ব ।
২) ব্রোজ্ঞ যুগ —–
** হরপ্পা সংস্কৃতি — ১৭০০-১৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব ।
** বৈদিক যুগ — ১৫০০-৫০০ খ্রীষ্টপূর্ব ।
৩) লৌহ যুগ —- ১২০০-৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব ।
** ষোড়শ মহাজনপদ — ৭০০-৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব ।
** মগধ সাম্রাজ্য — ৫৪৫ খ্রীষ্টপূর্ব ।
** মৌর্য সাম্রাজ্য — ৩২১-১৮৪ খ্রীষ্টপূর্ব ।

************************************
ভারতের ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দ থেকে খ্রিষ্টীয় বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন, মধ্যযুগীয় ও প্রাক-আধুনিক কালের ইতিহাস। খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় দশ লক্ষ বছর আগে উক্ত ভূখণ্ডে প্রথম মানববসতি গড়ে উঠতে দেখা যায়। তবে ভারতের জ্ঞাত ইতিহাসের সূচনা হয় ৩৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সিন্ধু সভ্যতার উন্মেষ ও প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে। পরবর্তী হরপ্পা যুগের সময়কাল ২৬০০ – ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সূচনায় এই ব্রোঞ্জযুগীয় সভ্যতার পতন ঘটে। সূচনা হয় লৌহ বৈদিক যুগের। এই যুগেই সমগ্র গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে মহাজনপদ নামে পরিচিত প্রধান প্রধান রাজ্যগুলির উন্মেষ ঘটে। এই রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল মগধ।খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে মগধে জন্মগ্রহণ করেন মহাবীর ও গৌতম বুদ্ধ; পরবর্তীকালে যাঁরা ভারতের জনসাধারণের মধ্যে শ্রমণ ধর্মদর্শন প্রচার করেন ।

অব্যবহিত পরবর্তীকালে একাধিক বৈদেশিক শাসনে এই অঞ্চলের সংস্কৃতি সমৃদ্ধি লাভ করে। এগুলি মধ্যে ৫৪৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ প্রতিষ্ঠিত হখামনি পারসিক সাম্রাজ্য ও ৩২৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ মহামতি আলেকজান্ডারের রাজত্বকাল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া পাঞ্জাব ও গান্ধার অঞ্চলে ব্যাকট্রিয়ার প্রথম ডিমেট্রিয়াস কর্তৃক ১৮৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে স্থাপন করেন ইন্দো-গ্রিক রাজ্য। প্রথম মিনান্ডারের আমলে গ্রিকো-বৌদ্ধ যুগে এই রাজ্য বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির চরমে পৌঁছায় ।

খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীতে মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে উপমহাদেশে রাজনৈতিক ঐক্য সাধিত হয়। পরবর্তী দশ শতাব্দীকাল একাধিক ক্ষুদ্রকায় রাজ্য ভারতের বিভিন্ন অংশ শাসন করে। চতুর্থ খ্রিস্টাব্দে উত্তর ভারত পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয় এবং পরবর্তী প্রায় দুই শতাব্দীকাল গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে সেই ঐক্য বজায় থাকে। এই যুগটি ছিল হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের কাল। ভারতের ইতিহাসে এই যুগ “ভারতের সুবর্ণ যুগ” নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এই সময় ও পরবর্তী কয়েক শতাব্দীকাল দক্ষিণ ভারতে রাজত্ব করেন চালুক্য, চোল, পল্লব ও পাণ্ড্য রাজন্যবর্গ । তাঁদের রাজত্বকাল দক্ষিণ ভারতের নিজস্ব এক সুবর্ণ যুগের জন্ম দেয়। এই সময়ই ভারতীয় সভ্যতা, প্রশাসন, সংস্কৃতি তথা হিন্দু ও বৌদ্ধধর্ম এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ৭৭ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কেরলের সঙ্গে রোমান সাম্রাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্যের কথাও জানা যায় ।

৭১২ খ্রিস্টাব্দে আরব সেনানায়ক মুহাম্মদ বিন কাশিম দক্ষিণ পাঞ্জাবের সিন্ধ ও মুলতান অধিকার করে নিলে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমান শাসনের সূচনা ঘটে । এই অভিযানের ফলে দশম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে মধ্য এশিয়া থেকে সংগঠিত একাধিক অনুপ্রবেশের ভিত্তিভূমি সজ্জিত করে। এরই ফলস্রুতিতে ভারতীয় উপমহাদেশে দিল্লি সুলতানি ও মুঘল সাম্রাজ্যের মতো মুসলমানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। মুঘল শাসনে উপমহাদেশের প্রায় সমগ্র উত্তরাঞ্চলটি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। মুঘল শাসকরা ভারতে মধ্যপ্রাচ্যের শিল্প ও স্থাপত্যকলার প্রবর্তন ঘটান। মুঘলদের সমকালেই দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্ব পশ্চিম ভারতে বিজয়নগর সাম্রাজ্য, অহোম রাজ্য এবং মারাঠা সাম্রাজ্য ও একাধিক রাজপুত রাজ্যের মতো বেশ কিছু স্বাধীন হিন্দু রাজ্যের উন্মেষ ঘটে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ধীরে ধীরে মুঘলদের পতন শুরু হয়। এর ফলে আফগান, বালুচ ও শিখরা উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়। অবশেষে ব্রিটিশরা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার উপরে নিজেদের শাসন কায়েম করে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ও পরবর্তী শতাব্দীতে ধীরে ধীরে ভারত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনাধীনে চলে যায়। ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষিতে কোম্পানির শাসনে অসন্তুষ্ট ব্রিটিশ সরকার সরাসরি ভারতকে ব্রিটিশ রাজের প্রত্যক্ষ শাসনে নিয়ে আসেন ।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দেশব্যাপী এক স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেয় । পরবর্তীকালে এই আন্দোলনে যোগ দেয় মুসলিম লিগও। অতঃপর ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ গ্রেট ব্রিটেনের অধীনতাপাশ ছিন্ন করে। তবে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়। উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিমাংশের মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলি নিয়ে পাকিস্তান ও অবশিষ্ট অঞ্চল ভারতীয় প্রজাতন্ত্র নামে পরিচিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ।

প্রাগৈতিহাসিক যুগ
প্রস্তর যুগ
দক্ষিণ এশীয় প্রস্তর যুগ
********************
মধ্যভারতের নর্মদা উপত্যকার হাথনোরায় প্রাপ্ত হোমো ইরেকটাস-এর প্রক্ষিপ্ত অবশেষগুলি ২০০,০০০ থেকে ৫০০,০০০ বছর পূর্ববর্তী মধ্য প্লেইস্টোসিন যুগে ভারতে মানববসতি উন্মেষের সম্ভাবনার দিকটি নির্দেশ করে। সম্ভবত ভারত মহাসাগরের উপকূলভাগে বহিঃআফ্রিকা অনুপ্রবেশের যাবতীয় নিদর্শন অবলুপ্ত হয়ে গেছে উত্তর-তুষার যুগের বন্যার ফলে। তামিলনাড়ু অঞ্চলে সাম্প্রতিক কিছু আবিষ্কার থেকে এই অঞ্চলে প্রথম শারীরতাত্ত্বিকভাবে আধুনিক মানব প্রজাতির উপস্থিতির কথা জানা যায় ।

ভারতীয় উপমহাদেশে মেসোলিথিক যুগের সূচনা ৩০,০০০ বছর আগে। এই যুগ স্থায়ী হয় ২৫,০০০ বছর। আজ থেকে ১২,০০০ বছর আগে সর্বশেষ তুষার যুগের অন্তিমপর্বে উপমহাদেশে নিবিড় জনবসতি গড়ে উঠতে দেখা যায়। প্রথম স্থায়ী জনবসতির প্রমাণ মেলে আধুনিক ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ৯০০০ বছর প্রাচীন ভীমবেটকা প্রস্তরক্ষেত্রে।

আধুনিক পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের মেহেরগড়ে খননকার্য চালিয়ে ৭০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ও তৎপরবর্তীকালের দক্ষিণ এশীয় নিওলিথিক সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। ভারতের খাম্বাত উপসাগরে নিমজ্জিত নিওলিথিক সভ্যতার কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে; রেডিও কার্বন পদ্ধতিতে পরীক্ষার পর যার সময়কাল নির্ধারিত হয়েছে ৭৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ । এডাক্কল গুহা প্রস্তরযুগীয় লিপির আদিতম নিদর্শনগুলির অন্যতম। সিন্ধু উপত্যকায় ৬০০০ থেকে ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ও দক্ষিণ ভারতে ২৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে পরবর্তী নিওলিথিক সভ্যতা স্থায়ী হয়।

উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বিগত ২০০০০০০ বছরে নিয়মিত জনবসতি গড়ে উঠতে দেখা গেছে। এই অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাসে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম কয়েকটি মানববসতির এবং প্রধান সভ্যতাসমূহের সন্ধান পাওয়া যায়। উপমহাদেশের প্রাচীনতম প্রত্নক্ষেত্রটি হল সোন নদী উপত্যকার প্যালিওলিথিক হোমিনিড স্থলটি । উপমহাদেশের গ্রামীণ জীবনের সূচনা হয় নিওলিথিক স্থল মেহেরগড়ে এবং প্রথম নগরাঞ্চলীয় সভ্যতার বিকাশ ঘটে সিন্ধু অববাহিকা অঞ্চলে ।

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস
*******************************
ব্রোজ্ঞ যুগ
সিন্ধু সভ্যতা
************
৩৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিন্ধু সভ্যতার উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রোঞ্জ যুগের সূত্রপাত ঘটে। এই সভ্যতার কেন্দ্রভূমি ছিল সিন্ধু নদ ও তার উপনদী বিধৌত অববাহিকা অঞ্চল; এবং এই সভ্যতার বিস্তার ঘটে ঘগ্গর-হাকরা নদী উপত্যকা, গঙ্গা-যমুনা দোয়াব, গুজরাট এবং উত্তর আফগানিস্তান পর্যন্ত।

সিন্ধু সভ্যতার উন্মেষ ঘটে আধুনিক ভারতীয় প্রজাতন্ত্র (গুজরাট, হরিয়ানা, পাঞ্জাব ও রাজস্থান রাজ্য) এবং পাকিস্তান (সিন্ধ, পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তান প্রদেশ) রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে। ঐতিহাসিকভাবে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার অন্তর্গত এই সভ্যতা ছিল মেসোপটেমিয়া ও প্রাচীন মিশরের মতো পৃথিবীর আদিতম নগরাঞ্চলীয় সভ্যতাগুলির অন্যতম। হরপ্পাবাসী হিসেবে পরিচিত প্রাচীন সিন্ধু নদ উপত্যকার অধিবাসীরা ধাতুবিদ্যার কিছু নতুন কৌশল আয়ত্ত্ব করে তামা, ব্রোঞ্জ, সিসা ও টিন উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছিল।

সিন্ধু সভ্যতা ২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই সময়েই ভারতীয় উপমহাদেশে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার সূচনা ঘটে। আধুনিক ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ধোলাবীরা, কালিবঙ্গান, রুপার, রাখিগড়ি, লোথাল ও পাকিস্তানের হরপ্পা, গানেরিওয়ালা, মহেঞ্জোদাড়োতে এই প্রাচীন সভ্যতার বিভিন্ন নগরকেন্দ্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই সভ্যতার বিশেষত্ব ছিল ইষ্টকনির্মিত শহর, পথপার্শ্ববর্তী নিকাশি ব্যবস্থা ও বহুতল আবাসন।

*********************
বৈদিক ও বেদোত্তর যুগ
*********************
বৈদিক সংস্কৃতে মৌখিকভাবে রচিত হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বেদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আর্য সভ্যতাই ছিল বৈদিক যুগের ভিত্তি। বেদ বিশ্বের প্রাচীনতম প্রাপ্ত গ্রন্থগুলির অন্যতম। এই গ্রন্থ মেসোপটেমিয়া ও প্রাচীন মিশরের ধর্মগ্রন্থগুলির সমসাময়িক। বৈদিক যুগের সময়কাল ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। এই সময়েই হিন্দুধর্ম ও প্রাচীন ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপাদানের মূল ভিত্তিগুলি স্থাপিত হয়। গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সমগ্র উত্তর ভারতে বৈদিক সভ্যতাকে ছড়িয়ে দেয় আর্যরা। ভারতীয় উপমহাদেশে ইন্দো-আর্যভাষী উপজাতিগুলির অনুপ্রবেশের ফলে প্রাগৈতিহাসিক পরবর্তী হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটে এবং বিদ্যমান স্থানীয় সভ্যতার উপরেই স্থাপিত হয় বৈদিক সভ্যতা। স্থানীয় বাসিন্দারা আর্যদের কাছে দস্যু নামে পরিচিত হয়।

আদি বৈদিক সমাজ ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। ফলত এই যুগে পরবর্তী হরপ্পা সভ্যতার নগরায়ণের ধারণাটি পরিত্যক্ত হয় । ঋগ্বেদোত্তর যুগে, আর্য সমাজ অধিকতর কৃষিভিত্তিক হয়ে পড়ে এবং এই সময়েই সমাজে বর্ণাশ্রম প্রথার উদ্ভব ঘটে। মনে করা হয়, হিন্দুদের আদি ধর্মগ্রন্থ বেদ ছাড়াও সংস্কৃত মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারতের আদি সূত্রগুলি এই যুগেই নিহিত ছিল । বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক খননের ফলে প্রাপ্ত মৃৎপাত্রগুলিতে আদি ইন্দো-আর্য সভ্যতার কিছু নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাচীন ভারতের কুরু রাজ্যে , কৃষ্ণ ও রক্ত ধাতব ও চিত্রিত ধূসর ধাতব সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া যায়। ১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে উত্তর-পশ্চিম ভারতে লৌহ যুগের সুচনা হয়। এই সময়ে রচিত অথর্ববেদে প্রথম লৌহের উল্লেখ মেলে। উক্ত গ্রন্থে লৌহকে “শ্যাম অয়স” বা কালো ধাতু বলে চিহ্নিত করা হয়। চিত্রিত ধূসর ধাতব সভ্যতা উত্তর ভারতে ১১০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয় । বৈদিক যুগেই ভারতে বৈশালীর মতো একাধিক গণরাজ্য স্থাপিত হয়। এগুলি খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী এমনকি কোনো কোনো অঞ্চলে চতুর্থ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্তও স্থায়ী হয়েছিল। এই যুগের পরবর্তী পর্যায়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাজ্যস্থাপন ও রাজ্যবিস্তারের সংগ্রাম শুরু হয়। এই রাজ্যগুলিই পরিচিত হয় মহাজনপদ নামে ।

***********
মহাজনপদ
***********
ষোড়শ মহাজনপদ ছিল সেযুগের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ষোলোটি রাজ্য ও গণরাজ্য। এগুলি মূল গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে প্রসারিত ছিল। যদিও প্রাচীন ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে একাধিক ক্ষুদ্রকায় রাজ্যও গড়ে উঠতে দেখা যায়।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে “লিখিত ইতিহাসের প্রথম মহান বিশ্ববিদ্যালয়” মনে করা হয়। ৪৫০-১১৯৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বৌদ্ধ শিক্ষা ও গবেষণার মূল কেন্দ্র ।

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস
*******************************
উপমহাদেশের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়
********************************
বৈদিক যুগে ১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ সমগ্র উপমহাদেশে একাধিক ক্ষুদ্রকায় রাজ্য ও নগররাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে । এই সব রাজ্যগুলির উল্লেখ পাওয়া যায় বৈদিক এবং আদি বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যে। ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ মহাজনপদ নামে পরিচিত নিম্নোক্ত ষোলোটি রাজ্য ও গণরাজ্যের উন্মেষ ঘটে – কাশী, কোশল, অঙ্গ, মগধ, বজ্জি (বা বৃজি), মল্ল, চেদী, বৎস (বা বংশ), কুরু, পাঞ্চাল, মচ্ছ (বা মৎস), শূরসেন, অশ্মক, অবন্তী, গান্ধার ও কম্বোজ। বর্তমান আফগানিস্তান থেকে মহারাষ্ট্র ও বাংলা পর্যন্ত গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চল বরাবর এই রাজ্যগুলি বিস্তৃত ছিল। সিন্ধু সভ্যতার পর এই যুগেই ভারতের দ্বিতীয় প্রধান নগরায়ণ ঘটে ।

মনে করা হয় প্রাচীন সাহিত্যে উল্লিখিত বিভিন্ন ক্ষুদ্রকায় জনগোষ্ঠী উপমহাদেশের অবশিষ্টাংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এই রাজ্যগুলির কোনো কোনোটিতে রাজপদ ছিল বংশানুক্রমিক; আবার কোনো কোনো রাজ্যে শাসক নির্বাচিত হতেন। শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ভাষা ছিল সংস্কৃত। যদিও উত্তর ভারতের জনসাধারণ প্রাকৃতের বিভিন্ন উপভাষায় কথা বলতেন। ৫০০/৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিদ্ধার্থ গৌতমের সময়কালে এই ষোলোটি মহাজনপদের অধিকাংশ সংযুক্ত হয়ে বৎস, অবন্তী, কোশল ও মগধ রাজ্যচতুষ্টকের সঙ্গে মিলিত হয়।

হিন্দু ধর্মানুষ্ঠান এই সময় অত্যন্ত জটিল ও পুরোহিত শ্রেণীনির্ভর হয়ে পড়ে। মনে করা হয় পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য উপনিষদ পরবর্তী বৈদিক যুগের শেষভাগ ও মহাজনপদ যুগের প্রথম ভাগে (৬০০ – ৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) রচিত হয়। ভারতীয় দর্শনের উপর গভীর প্রভাব সৃষ্টিকারী উপনিষদ ছিল বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্মের বিকাশের সমসাময়িক। এই কারণে এই যুগকে ভারতের দর্শনচিন্তার সুবর্ণযুগ বলে মনে করা হয়।

খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৭ অব্দে বোধি লাভ করে সিদ্ধার্থ গৌতম ‘বুদ্ধ’ নামে পরিচিত হন। একই সময় চতুর্বিংশতিতম জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর একই ধরনের অপর একটি ধর্মতত্ত্ব প্রচার করেন; পরবর্তীকালে যা জৈনধর্ম নামে পরিচিত হয় । অবশ্য জৈন বিশ্বাস অনুযায়ী তাঁদের ধর্মতত্ত্ব অনাদিকাল থেকেই প্রচলিত। এও মনে করা হয় যে বেদে কয়েকজন জৈন তীর্থঙ্কর ও শ্রমণ ধর্মান্দোলনের অনুরূপ এক আধ্যাত্মিক সংঘাদর্শের কথা লিখিত আছে । বুদ্ধের শিক্ষা ও জৈন ধর্মতত্ত্ব নির্বাণতত্ত্বের কথা বলে । প্রাকৃত ভাষায় রচিত হওয়ায় তাঁদের ধর্মমত সহজেই সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে উঠতে সক্ষম হয়। হিন্দুধর্ম ও ভারতীয় অধ্যাত্মতত্ত্বের বিভিন্ন অভ্যাস যথা নিরামিষ ভক্ষণ, পশুবলি নিবারণ ও অহিংসা প্রভৃতির উপর এই নতুন ধর্মমতের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর । জৈনধর্মের ভৌগোলিক বিস্তার ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ হলেও বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীরা বুদ্ধের শিক্ষাদর্শকে মধ্য এশিয়া, পূর্ব এশিয়া, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন ।

ইতিহাস
*********
ইতিহাস বা History শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে গ্রিক শব্দ Historia থেকে যার অর্থ মানুষের অতীত ঘটনা ও কার্যাবলীর অধ্যয়ন । বৃহৎ একটি বিষয় হওয়া সত্ত্বেও এটি কখনও মানবিক বিজ্ঞান এবং কখনওবা সামাজিক বিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে আলোচিত হয়েছে। অনেকেই ইতিহাসকে মানবিক এবং সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে দেখেন। কারণ ইতিহাসে এই উভয়বিধ শাস্ত্র থেকেই পদ্ধতিগত সাহায্য ও বিভিন্ন উপাদান নেয়া হয়। একটি শাস্ত্র হিসেবে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনেকগুলো উপবিভাগের নাম চলে আসে – দিনপঞ্জি, ইতিহাস-লিখন, কুলজি শাস্ত্র, পালিওগ্রাফি এবং ক্লায়োমেট্রিক্স । স্বাভাবিক প্রথা অনুসারে ইতিহাসবেত্তাগণ ইতিহাসের লিখিত উপাদানের মাধ্যমে বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেন । যদিও কেবল লিখিত উপাদান হতে ইতিহাসে সকল তত্ত্ব উদ্ধার করা সম্ভব নয় । ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে যে উৎসগুলো বিবেচনা করা হয়, সেগুলোকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়: লিখিত, মৌখিক এবং শারীরিক বা প্রত্যক্ষ করণ ।

ইতিহাসবেত্তারা সাধারণত তিনটি উৎসই পরখ করে দেখেন। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে লিখিত উপাদান সর্বজন স্বীকৃত। এই উৎসটির সাথে লিখন পদ্ধতির ইতিহাস অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। ইতিহাসের জনক হিসেবে হেরোডোটাসকে আখ্যায়িত করা হয় ।

সময়কালভিত্তিক :
****************
** প্রাক-ইতিহাস
** প্রাচীন ইতিহাস
** মধ্যযুগ
** আধুনিক বিশ্ব
** সমসাময়ীক
*************
বিশ্বের ইতিহাস বলতে এখানে মানুষের ইতিহাস বোঝানো হয়েছে, যা মূলত প্যালিওলিথিক যুগে পৃথিবী জুড়ে শুরু হয়। পৃথিবী গ্রহের ইতিহাস থেকে এটি পৃথক। আদিম যুগ থেকে প্রাপ্ত সকল প্রত্নতাত্ত্বিক ও লিখিত দলিল এর আওতাভুক্ত। লেখন রীতি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে প্রাচীন প্রামাণ্য ইতিহাসের শুরু হয় । যদিও লেখন রীতি আবিষ্কারপূর্ব যুগের সভ্যতার নিদর্শনও পাওয়া গেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের সূচনা ঘটে প্যালিওলিথিক বা আদি প্রস্তর যুগে। সেখান থেকে সভ্যতা প্রবেশ করে নব্য প্রস্তর যুগ বা নিওলিথিক যুগে এবং কৃষি বিপ্লবের [ খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০০-খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ অব্দ ] সূচনা ঘটে । নিওলিথিক বিপ্লবে উদ্ভিদ ও পশুর নিয়মানুগ চাষপদ্ধতি রপ্ত করা মানব সভ্যতার একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত । কৃষির উন্নয়নের সাথে সাথে বেশিরভাগ মানুষ যাযাবর জীবনযাত্রা ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে কৃষকের জীবন গ্রহণ করে। তবে বহু সমাজে যাযাবর জীবনব্যবস্থা রয়ে যায়, বিশেষ করে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অঞ্চল ও যেখানে আবাদযোগ্য উদ্ভিদ প্রজাতির অভাব রয়েছে। কৃষি থেকে প্রাপ্ত খাদ্য-নিরাপত্তা ও উদ্বৃত্ত উৎপাদন এর ফলে গোষ্টীগুলো ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে আরও বড় সামাজিক প্রতিষ্টানের জন্ম দেয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নও এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।
কৃষির উন্নতির সাথে সাথে শস্য উৎপাদনব্যবস্থারও বিকাশ ঘটে, যা সমাজে শ্রমবিভাগকে ত্বরান্বিত করে । শ্রমবিভাগের পথ ধরে সমাজে সুবিধাপ্রাপ্ত উচ্চশ্রেণীর উন্মেষ ঘটে ও শহরগুলো গড়ে উঠে । সমাজে জটিলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে লেখন ও হিসাব পদ্ধতির ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়ে । হ্রদ ও নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের মধ্যে অনেক শহর গড়ে উঠে । এদের মধ্যে উন্নতি ও উৎকর্ষতার দিক দিয়ে মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা, মিশরের নীলনদ তীরবর্তী সভ্যতা ও সিন্ধু সভ্যতা উল্লেখ্যযোগ্য । একই ধরণের সভ্যতা সম্ভবত চীনের প্রধান নদীগুলোর তীরেও গড়ে উঠেছিল কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো থেকে এব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়নি ।

প্রাচীন পৃথিবীর ইতিহাসকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয় । ৪৬৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রাচীন যুগ ।৫ম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত মধ্য যুগ, যার মধ্যে রয়েছে ইসলামী স্বর্ণযুগ (৭৫০- ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) ও ইউরোপীয় রেনেসাঁ (১৩০০ শতক হতে শুরু) । আধুনিক যুগের সূচনাকাল ধরা হয় পঞ্চদশ শতক হতে অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত যার মধ্যে রয়েছে ইউরোপের আলোকিত যুগ। শিল্প বিপ্লব হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত আধুনিক কাল বলে বিবেচিত। পাশ্চাত্য ইতিহাসে রোমের পতনকে প্রাচীন যুগের শেষ ও মধ্যযুগের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু পূর্ব ইউরোপ রোমান সাম্রাজ্য থেকে বাইজেনটাইন সাম্রাজের অধীনে আসে, যার পতন আরো অনেক পড়ে আসে। ১৫ শতকের মাঝামাঝি গুটেনবার্গ আধুনিক ছাপাখানা আবিস্কার করেন যা যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। ফলে মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটে এবং বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূত্রপাত হয় । ১৮ শতকের মধ্যে ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার এমন একটি চরম অবস্থায় উপনীত হয় যা শিল্প বিপ্লব অবধারিত করে তুলে ।

বিশ্বের অন্যান্য অংশে, বিশেষ করে প্রাচীন নিকট প্রাচ্য, প্রাচীন চীন ও প্রাচীন ভারতে সভ্যতা ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয় যেমন চীনের চার অনন্য আবিস্কার, ইসলামের স্বর্ণযুগ, ভারতীয় গণিত । তবে ১৮ শতকের পর হতে ব্যাপক ব্যবসা-বাণিজ্য ও উপনিবেশায়ন এর ফলে সভ্যতাগুলো বিশ্বায়িত হতে থাকে। গত ৫’শ বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য, অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা, পরিবেশগত ক্ষতি প্রভৃতি অসামান্য গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বর্তমান বিশ্বের মানুষের সামনে একই সাথে ব্যাপক সম্ভাবনা ও বিপদ এর দ্বার উন্মোচন করেছে ।

প্রাক-ইতিহাস
**********
প্রাক-ইতিহাস বা প্রাগৈতিহাসিক যুগ লিখিত ইতিহাসের পূর্ববর্তী কালসমূহের ইতিহাসকে বোঝায় । ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক পল তুর্নাল দক্ষিণ ফ্রান্সের গুহায় পাওয়া নিদর্শনগুলি বর্ণনা করতে গিয়ে প্রথম পরিভাষাটি ব্যবহার করেন । ১৮৩০-এর দশকে পরিভাষাটি লিখিত ইতিহাসের পূর্ববর্তী ইতিহাস নির্দেশ করতে ফ্রান্সে ব্যবহার হওয়া শুরু করে । ১৮৫১ সালে ড্যানিয়েল উইলসন এটি ইংরজি ভাষায় উপস্থাপন করেন ।

প্রাক-ইতিহাস মহাবিশ্বের জন্মাবধি বিস্তৃত বলে কল্পনা করে নেওয়া যায় । তবে পরিভাষাটি মূলত পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাবের পরবর্তী ইতিহাসের বর্ণনা দিতেই ব্যবহার করা হয় । ডাইনোসরদের প্রাগৈতিহাসিক জন্তু এবং গুহামানবদের প্রগৈতিহাসিক মানুষ হিসেবে ডাকা যায় ।

** যুগ **
*******
বিশ্বের ইতিহাসকে তিনটি যুগে বিভক্ত করে আমরা আলোচনা করবো যেমন – (ক) প্রস্থর যুগ (খ) ব্রোজ্ঞ যুগ ও (গ) লেীহ যুগ ।

প্রস্তর যুগ
*******
বিশ্বের ইতিহাসে প্রস্তর যুগ বলতে মানব ও তার সমাজের বিবর্তনের ধারায় একটা পর্যায়কে বোঝান হয় যখন যখন মানুষের ব্যবহার্য হাতিয়ার তৈরির মূল উপকরণ ছিল পাথর । তবে পাথরের ব্যবহারই প্রস্তর যুগের একমাত্র সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য বলে মনে করা হয় না । বিরল হলেও কাঠ এবং প্রাণির হাড়ের তৈরি হাতিয়ার ব্যবহারের নিদর্শনও পাওয়া গেছে । এসময় স্বর্ণ ছাড়া অন্য কোন ধাতুর ব্যবহার ছিল অজানা । প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার থেকে ও পূর্ব আফ্রিকার সাভানা অঞ্চল থেকে বাকি বিশ্বে মানুষের ছড়িয়ে পড়ার সময় থেকে প্রস্তর যুগের শুরু ধরা হয় । প্রস্তর যুগের শেষ হয় কৃষির উদ্ভাবন, গৃহপালিত পশুর পোষ মানানো এবং তামার আকরিক গলিয়ে তামা আহরনের মাধ্যমে মানুষ ধাতুর ব্যবহার শুরু করলে । এই যুগটিকে প্রাগৈতিহাসিক যুগ বলা হয় কারণ তখনো লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি এবং মানব সমাজের লিখিত ইতিহাস সংরক্ষণ করা শুরু হয়নি ।
প্রস্তর যুগকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয় ।
** প্রাচীন প্রস্তর যুগ বা প্যালিওলিথিক ।
** মধ্য প্রস্তর যুগ বা মেসোলিথিক ।
** নব্য প্রস্তর যুগ বা নিওলিথিক ।

প্রাচীন প্রস্তর যুগ
*************
প্রাচীন প্রস্তর যুগ বা প্যালিওলিথিক বা প্যালিওলিথিক যুগ বলতে সেই সময়কালের ইতিহাসকে বোঝায় যখন আদিম মানুষ একদম প্রাথমিক পাথরের যন্ত্রপাতি বানাতে শুরু করেছিল। মানবজাতির প্রযুক্তিগত প্রাগৈতিহাসের প্রায় ৯৫% জুড়ে রয়েছে পুরা প্রস্তর যুগ । ২.৬ মিলিয়ন বছর আগে হোমিনিনিন যেমন অস্ত্রালোপিথেচিনদের মাঝে পাথরের যন্ত্রপাতি প্রচলনের সময় থেকে বর্তমান হতে ১০,০০০ বছর পূর্বে প্লাইস্টোসিন যুগের শেষভাগ পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ।
এই যুগটি মুলত ঊষা প্রস্তর যুগ এর পরবর্তী ধাপ কে বলা হয়। এখানে এই সময়ে মানুষেরা সবাই অশোধিত পাথর এর হাতিয়ার ব্যবহার করত। পূর্ব আফ্রিকা থেকে বিবর্তন এর মাধ্যমে মানুষ এর উতপত্তি ঘটার পরে প্রায় ১২ লক্ষ বহর অতিবাহিত হবার পরে ১০০০০০ থেকে শুরু করে প্রায় ৪০০০০ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত সময়কাল কে ধরা হয় প্রাচীন প্রস্তর যুগ। ম্যাগডেলেনিয় সংস্কৃতি, অ্যাবিচিলনিয় সংস্কৃতি, পিকিং মানব; এসমস্ত প্রাচীন প্রস্তর যুগ এর উল্লেখযোগ্য সংস্কৃতি এবং ম্নব গোষ্ঠী। আগুন এই সময় এর উল্লেখযোগ্য আবিস্কার। এই সময়ে মানুষ পুরোপুরি ভবে শিকার এবং খাদ্য সংগ্রহ এর উপরে নির্ভরশীল ছিল ।

**********
মধ্য প্রস্তর যুগ
***********
মধ্য প্রস্তর যুগ বা মেসোলিথিক হল, প্রাচীন প্রস্তর যুগ বা প্যালিওলিথিক এবং নব্য প্রস্তর যুগ বা নিওলিথিক-এর মধ্যবর্তী এক যুগ।

নব্যপ্রস্তরযুগ
***********
নব্যপ্রস্তরযুগ বা নবপোলিয় যুগ হলো প্রস্তরযুগের শেষ অধ্যায়, যখন পাথরের অস্ত্রশস্ত্র ও ব্যবহার্য দ্রব্যাদির চরম উন্নতি সাধিত হয়েছিল । খ্রিস্টপূর্ব ১০,২০০ অব্দে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অঞ্চলে এবং পরবর্তীতে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে এই যুগের সূচনা ঘটে । খ্রিস্টপূর্ব ৪,০০০ অব্দ থেকে ২,৫০০ অব্দের মধ্যে এই যুগের সমাপ্তি ঘটে । প্রথাগতভাবে এই যুগ হচ্ছে প্রস্তরযুগের সমাপ্তি । নব্যপ্রস্তর যুগ হলোসিন এপিপ্যালিওলিথিক যুগ অনুসরণ করে আসে এবং কৃষিকাজের সূচনাকালে নবপলীয় বিপ্লব ঘটে এবং এই সময়টাই নব্যপ্রস্তর যুগের শুরু। ধাতুর ব্যবহার শুরু হলে এই যুগ শেষ হয় এবং ব্রোঞ্জ যুগ, তাম্র যুগ এবং কোন কোন ভৌগোলিক অঞ্চলে লৌহ যুগ শুরু হয়। এই যুগে আচরণ এবং সংস্কৃতিতে প্রগতি এবং পরিবর্তন দেখা যায়, যার মধ্যে ছিল বন্য ও গৃহজাত শস্যের ব্যবহার এবং বন্য পশুকে গৃহপালিত পশুতে রূপান্তর । ধারণা করা হয় যে নব্যপ্রস্তর যুগ শুরু হয় লেভ্যান্টে খ্রিস্টপূর্ব ১০,২০০-৮,৮০০ অব্দে ।

ব্রোঞ্জ যুগ
********
কোন সংস্কৃতির যে সময়কালে সবচেয়ে উন্নত ধাতুশিল্পের উপাদান হিসেবে ব্রোঞ্জ ব্যাবহৃত হয় তাকে ঐ সভ্যতার ব্রোঞ্জযুগ নামে অভিহিত করা হয়। প্রায় সকল ব্রোঞ্জযুগীয় সংস্কৃতি প্রাগৈতিহাসিক যুগে বিকাশ লাভ করে।

ব্রোঞ্জ যুগের ভাগ
***************
ব্রোঞ্জ যুগ — (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০০ – খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০)
A. Early Bronze Age :
**************************
**Early Bronze Age – [ 3300 BCE – 2000 BCE ] ।
**Early Bronze Age I – [ 3300 BCE – 3000 BCE ] ।
**Early Bronze Age II – [ 3000 BCE – 2700 BCE ] ।
**Early Bronze Age III – [ 2700 BCE – 2200 BCE ] ।
**Early Bronze Age IV – [ 2200 BCE – 2000 BCE ] ।
B. Middle Bronze Age –
*****************************
**Middle Bronze Age – [ 2000 BCE – 1550 BCE ] ।
**Middle Bronze Age I- [ 2000 BCE – 1750 BCE ] ।
**Middle Bronze Age II -[ 1750 BCE – 1650 BCE ]।
**Middle Bronze Age III -[1650 BCE – 1550 BCE ]।

C. Late Bronze Age –
**************************
**Late Bronze Age – [ 1550 BCE – 1200 BCE ] ।
**Late Bronze Age I – [ 1550 BCE – 1400 BCE ] ।
**Late Bronze Age II A – [ 1400 BCE – 1300 BCE ] ।
**Late Bronze Age II B – [ 1300 BCE – 1200 BCE ] ।

*******
লৌহ যুগ
********
প্রাগৈতিহাসিক যুগের যে সময়কালে কোন এলাকার ধাতব অস্ত্র ও যন্ত্রপাতি মূলত লোহা দ্বারা তৈরি হত সেই সময়কালকে প্রত্নতত্ববিদ্যায় লৌহযুগ বলা হয়। লোহার ব্যবহার শুরুর সাথে সাথে মানবসমাজে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়, যার মধ্যে কৃষিব্যবস্থা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং শিল্পকলা অন্যতম।
প্রত্নতত্ববিদ্যায় প্রাগৈতিহাসিক যুগকে যে তিনভাগে ভাগ করা হয়, লৌহ যুগ হচ্ছে সেই তিন যুগের সর্বশেষ যুগ। প্রস্তর যুগ ও ব্রোঞ্জ যুগের পরে লৌহ যুগের আবির্ভাব। লৌহযুগের সময়কাল ও বৈশিষ্ট্য অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন। সব অঞ্চলেই লৌহযুগ শেষে ঐতিহাসিক যুগের আবির্ভাব, যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল লিখিত সংরক্ষিত ইতিহাস। উদাহরণ স্বরুপ, ব্রিটেন এর লৌহযুগ শেষ হয় রোমান বিজয় এর মাধ্যমে, যার পর হতে ব্রিটেন এর লিখিত ইতিহাস সংরক্ষণ শুরু হয়।

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস
**********************************
১) প্রস্তর যুগ —– ৭০,০০০-৩৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব ।
** মেহেরগড় — ৭০০০-৩৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব ।
** হরপ্পা ও মহেঞ্জদর সভ্যতা — ৩৩০০-১৭০০ খ্রীষ্টপূর্ব ।
২) ব্রোজ্ঞ যুগ —–
** হরপ্পা সংস্কৃতি — ১৭০০-১৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব ।
** বৈদিক যুগ — ১৫০০-৫০০ খ্রীষ্টপূর্ব ।
৩) লৌহ যুগ —- ১২০০-৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব ।
** ষোড়শ মহাজনপদ — ৭০০-৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব ।
** মগধ সাম্রাজ্য — ৫৪৫ খ্রীষ্টপূর্ব ।
** মৌর্য সাম্রাজ্য — ৩২১-১৮৪ খ্রীষ্টপূর্ব ।

************************************
ভারতের ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দ থেকে খ্রিষ্টীয় বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন, মধ্যযুগীয় ও প্রাক-আধুনিক কালের ইতিহাস। খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় দশ লক্ষ বছর আগে উক্ত ভূখণ্ডে প্রথম মানববসতি গড়ে উঠতে দেখা যায়। তবে ভারতের জ্ঞাত ইতিহাসের সূচনা হয় ৩৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সিন্ধু সভ্যতার উন্মেষ ও প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে। পরবর্তী হরপ্পা যুগের সময়কাল ২৬০০ – ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সূচনায় এই ব্রোঞ্জযুগীয় সভ্যতার পতন ঘটে। সূচনা হয় লৌহ বৈদিক যুগের। এই যুগেই সমগ্র গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে মহাজনপদ নামে পরিচিত প্রধান প্রধান রাজ্যগুলির উন্মেষ ঘটে। এই রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল মগধ।খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে মগধে জন্মগ্রহণ করেন মহাবীর ও গৌতম বুদ্ধ; পরবর্তীকালে যাঁরা ভারতের জনসাধারণের মধ্যে শ্রমণ ধর্মদর্শন প্রচার করেন ।

অব্যবহিত পরবর্তীকালে একাধিক বৈদেশিক শাসনে এই অঞ্চলের সংস্কৃতি সমৃদ্ধি লাভ করে। এগুলি মধ্যে ৫৪৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ প্রতিষ্ঠিত হখামনি পারসিক সাম্রাজ্য ও ৩২৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ মহামতি আলেকজান্ডারের রাজত্বকাল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া পাঞ্জাব ও গান্ধার অঞ্চলে ব্যাকট্রিয়ার প্রথম ডিমেট্রিয়াস কর্তৃক ১৮৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে স্থাপন করেন ইন্দো-গ্রিক রাজ্য। প্রথম মিনান্ডারের আমলে গ্রিকো-বৌদ্ধ যুগে এই রাজ্য বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির চরমে পৌঁছায় ।

খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীতে মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে উপমহাদেশে রাজনৈতিক ঐক্য সাধিত হয়। পরবর্তী দশ শতাব্দীকাল একাধিক ক্ষুদ্রকায় রাজ্য ভারতের বিভিন্ন অংশ শাসন করে। চতুর্থ খ্রিস্টাব্দে উত্তর ভারত পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয় এবং পরবর্তী প্রায় দুই শতাব্দীকাল গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে সেই ঐক্য বজায় থাকে। এই যুগটি ছিল হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের কাল। ভারতের ইতিহাসে এই যুগ “ভারতের সুবর্ণ যুগ” নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এই সময় ও পরবর্তী কয়েক শতাব্দীকাল দক্ষিণ ভারতে রাজত্ব করেন চালুক্য, চোল, পল্লব ও পাণ্ড্য রাজন্যবর্গ । তাঁদের রাজত্বকাল দক্ষিণ ভারতের নিজস্ব এক সুবর্ণ যুগের জন্ম দেয়। এই সময়ই ভারতীয় সভ্যতা, প্রশাসন, সংস্কৃতি তথা হিন্দু ও বৌদ্ধধর্ম এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ৭৭ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কেরলের সঙ্গে রোমান সাম্রাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্যের কথাও জানা যায় ।

৭১২ খ্রিস্টাব্দে আরব সেনানায়ক মুহাম্মদ বিন কাশিম দক্ষিণ পাঞ্জাবের সিন্ধ ও মুলতান অধিকার করে নিলে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমান শাসনের সূচনা ঘটে । এই অভিযানের ফলে দশম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে মধ্য এশিয়া থেকে সংগঠিত একাধিক অনুপ্রবেশের ভিত্তিভূমি সজ্জিত করে। এরই ফলস্রুতিতে ভারতীয় উপমহাদেশে দিল্লি সুলতানি ও মুঘল সাম্রাজ্যের মতো মুসলমানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। মুঘল শাসনে উপমহাদেশের প্রায় সমগ্র উত্তরাঞ্চলটি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। মুঘল শাসকরা ভারতে মধ্যপ্রাচ্যের শিল্প ও স্থাপত্যকলার প্রবর্তন ঘটান। মুঘলদের সমকালেই দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্ব পশ্চিম ভারতে বিজয়নগর সাম্রাজ্য, অহোম রাজ্য এবং মারাঠা সাম্রাজ্য ও একাধিক রাজপুত রাজ্যের মতো বেশ কিছু স্বাধীন হিন্দু রাজ্যের উন্মেষ ঘটে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ধীরে ধীরে মুঘলদের পতন শুরু হয়। এর ফলে আফগান, বালুচ ও শিখরা উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়। অবশেষে ব্রিটিশরা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার উপরে নিজেদের শাসন কায়েম করে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ও পরবর্তী শতাব্দীতে ধীরে ধীরে ভারত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনাধীনে চলে যায়। ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষিতে কোম্পানির শাসনে অসন্তুষ্ট ব্রিটিশ সরকার সরাসরি ভারতকে ব্রিটিশ রাজের প্রত্যক্ষ শাসনে নিয়ে আসেন ।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দেশব্যাপী এক স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেয় । পরবর্তীকালে এই আন্দোলনে যোগ দেয় মুসলিম লিগও। অতঃপর ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ গ্রেট ব্রিটেনের অধীনতাপাশ ছিন্ন করে। তবে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়। উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিমাংশের মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলি নিয়ে পাকিস্তান ও অবশিষ্ট অঞ্চল ভারতীয় প্রজাতন্ত্র নামে পরিচিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ।

********************
প্রাগৈতিহাসিক যুগ
প্রস্তর যুগ
দক্ষিণ এশীয় প্রস্তর যুগ
********************
মধ্যভারতের নর্মদা উপত্যকার হাথনোরায় প্রাপ্ত হোমো ইরেকটাস-এর প্রক্ষিপ্ত অবশেষগুলি ২০০,০০০ থেকে ৫০০,০০০ বছর পূর্ববর্তী মধ্য প্লেইস্টোসিন যুগে ভারতে মানববসতি উন্মেষের সম্ভাবনার দিকটি নির্দেশ করে। সম্ভবত ভারত মহাসাগরের উপকূলভাগে বহিঃআফ্রিকা অনুপ্রবেশের যাবতীয় নিদর্শন অবলুপ্ত হয়ে গেছে উত্তর-তুষার যুগের বন্যার ফলে। তামিলনাড়ু অঞ্চলে সাম্প্রতিক কিছু আবিষ্কার থেকে এই অঞ্চলে প্রথম শারীরতাত্ত্বিকভাবে আধুনিক মানব প্রজাতির উপস্থিতির কথা জানা যায় ।

ভারতীয় উপমহাদেশে মেসোলিথিক যুগের সূচনা ৩০,০০০ বছর আগে। এই যুগ স্থায়ী হয় ২৫,০০০ বছর। আজ থেকে ১২,০০০ বছর আগে সর্বশেষ তুষার যুগের অন্তিমপর্বে উপমহাদেশে নিবিড় জনবসতি গড়ে উঠতে দেখা যায়। প্রথম স্থায়ী জনবসতির প্রমাণ মেলে আধুনিক ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ৯০০০ বছর প্রাচীন ভীমবেটকা প্রস্তরক্ষেত্রে।

আধুনিক পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের মেহেরগড়ে খননকার্য চালিয়ে ৭০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ও তৎপরবর্তীকালের দক্ষিণ এশীয় নিওলিথিক সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। ভারতের খাম্বাত উপসাগরে নিমজ্জিত নিওলিথিক সভ্যতার কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে; রেডিও কার্বন পদ্ধতিতে পরীক্ষার পর যার সময়কাল নির্ধারিত হয়েছে ৭৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ । এডাক্কল গুহা প্রস্তরযুগীয় লিপির আদিতম নিদর্শনগুলির অন্যতম। সিন্ধু উপত্যকায় ৬০০০ থেকে ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ও দক্ষিণ ভারতে ২৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে পরবর্তী নিওলিথিক সভ্যতা স্থায়ী হয়।

উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বিগত ২০০০০০০ বছরে নিয়মিত জনবসতি গড়ে উঠতে দেখা গেছে। এই অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাসে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম কয়েকটি মানববসতির এবং প্রধান সভ্যতাসমূহের সন্ধান পাওয়া যায়। উপমহাদেশের প্রাচীনতম প্রত্নক্ষেত্রটি হল সোন নদী উপত্যকার প্যালিওলিথিক হোমিনিড স্থলটি । উপমহাদেশের গ্রামীণ জীবনের সূচনা হয় নিওলিথিক স্থল মেহেরগড়ে এবং প্রথম নগরাঞ্চলীয় সভ্যতার বিকাশ ঘটে সিন্ধু অববাহিকা অঞ্চলে ।

[ সংগৃহিত ]

About Shishir

A positive person can be change the society.

Check Also

আমার পরিচয়

ধর্মীয়বাদ নবী ও রাসূল ************** নবী এবং রাসূলের মধ্যে পার্থক্য হ’ল, আল্লাহ তা‘আলা যাকে নতুন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *